ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়

একেবারে ময়ূরভঞ্জ!
তাই ঠিক হল। ব্রিগেডিয়ার ভার্গব চাকরি থেকে অবসর নেবার পর ঠিক করলেন তাঁর শেষজীবনটা ময়ূরভঞ্জেই কাটাবেন। ময়ূরভঞ্জে যাওয়ার আরও একটা কারণ আছে। কিছুটা স্বাস্থ্যের কারণও বটে, আবার কিছুটা শৈশবের দিনগুলির কথা ভেবে। চিরটা কাল বাইরে বাইরেই কাটিয়েছেন তিনি, তাই কলকাতার জলহাওয়া তাঁর একদম সহ্য হয় না।
স্ত্রী বিনতা প্রথমে একটু আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু ভার্গবের মন কিছুতেই থাকতে চাইল না এখানে। তিনি অনেক করে বোঝালেন স্ত্রীকে, জীবনের শেষদিনগুলি সত্যিই যদি সুখেশান্তিতে কাটাতে হয় তো কলকাতায় কখনও নয়, ময়ূরভঞ্জেই ভাল।
চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়। গভীর অরণ্যানি। সবুজের মেলা যেন চারদিকে। কী রমণীয় পরিবেশ। যদিও আগের সেই পরিবেশ এখন আর নেই। শৈশবে যখন তিনি এইখানে মাতুলালয়ে মানুষ হয়েছিলেন, তখন প্রকৃতির যে অনবদ্য রূপ ছিল, এখন তা অনেকাংশে হারিয়ে গেছে। তবু অন্যান্য জায়গাগুলোর মতো শহর-সভ্যতার সংস্পর্শে এসে হতশ্রী নয়।
এখনও কত লোক দু'-চারদিনের ছুটি কাটাতে ময়ূরভঞ্জে বেড়াতে যায়।
কলকাতার ধর্মতলা থেকে বাস ছাড়ে।
এখানকার জলহাওয়া এত ভাল যে মানুষের হৃত যৌবন যেন ফিরে আসে। একটিই মাত্র ছেলে। নাম সৌরভ। ওর ভবিষ্যতের কথা ভেবেও কিছু একটা করতে হবে বইকী। বিশেষ করে এখন যা দিনকাল পড়েছে তাতে। ভারী সুন্দর ছেলেটি। মায়ের মতোই চোখমুখের গড়ন। আর গায়ের রং যেন ফেটে পড়ছে। টানা টানা চোখ, টিকলো নাক, মাথায় ঘন চুল। ময়ূরভঞ্জের প্রাকৃতিক পরিবেশে সৌরভের আরও সৌন্দর্য হবে। নীরোগ শরীর নিয়ে সুস্থসুন্দর দেহে ঝলমল করবে। এত সব চিন্তা করে তবেই তিনি ময়ূরভঞ্জে যাবার পরিকল্পনা করলেন। ওড়িশার এই পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতি তাঁর বরাবরেরই দুর্বলতা। তা ছাড়া
ময়ূরভঞ্জ এখন সব দিক থেকেই উন্নত। ব্যাঙ্ক, পোস্টঅফিস, বড় বড় বাড়ি, বাজার-হাট কী নেই ময়ূরভঞ্জে?
ছেলেটা সেখানে মন দিয়ে লেখাপড়া শিখবে।
মাধ্যমিক পরীক্ষা যখন হয়ে গেছে, তখন ওইখানকার কলেজেই ভরতি হয়ে কলেজের পড়াটা পড়ে নেবে।
সৌরভেরও কলকাতার প্রতি টান একদমই নেই।
তাই বাবার সঙ্গে একমত হল সে। কী আছে কলকাতায়? ব্রিটিশ আমলের পুরনো নোংরা শহর আর নোংরা রাজনীতি ছাড়া আছেটা কী?
তাই সৌরভও বাবাকে বলল, দরকার নেই এই শহরে। তুমি ময়ূরভঞ্জেই চলে চলো।
ভার্গব বললেন, অনেক ভেবেচিন্তে আমিও এই সিদ্ধান্তেই এসেছি বাবা। তা ছাড়া আমার আর ক'টা দিন? তবু ওখানকার জলহাওয়া পেলে হয়তো আরও কিছুদিন সুস্থ শরীরে থাকব।
সৌরভ বলল, আচ্ছা বাবা, আমরা যে আসামে ছিলাম ক’বছর, সেখানকার বন-জঙ্গল পাহাড়-পর্বতের সঙ্গে এখানকার মিল আছে?
না একদমই নেই। এখানকার মাটি গাছপালার রূপই আলাদা। ময়ূরভঞ্জ আরও সুন্দর। নামের মধ্যেই কেমন একটা মাধুর্য আছে দেখছিস না?
সৌরভ বলল, ওখানেই যদি আমাদের বরাবর থাকা হয় তা হলে তুমি ওখানে গিয়েই আমাকে একটা স্কুটার কিনে দেবে।
অবশ্যই। না হলে ওই পাহাড়ি এলাকায় চলাফেরা করবি কী করে? আজকাল অনেক হালকা ধরনের স্কুটার বেরিয়েছে। তারই একটা কিনে দেব তোকে। আমি আগে নিজে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে আসি।
বিনতা বললেন, ছেলে পাশ করে কলেজে পড়ে বেরিয়ে এলে ওখানেই চাকরি বাকরি পাবে তা?
না পেলেই বা ক্ষতি কী? আমার যা সঞ্চয় তাতে ওর কি বড় হয়ে চাকরি করার কোনও প্রয়োজন আছে?
আছে। তোমার আছে বলেই যে ছেলে নিষ্কর্মা হয়ে বসে বসে তোমার টাকায় তার দিন কাটাবে এরকম কথা তুমি বললে কী করে? তোমার যত টাকাই থাকুক ওকে ওর পায়ে দাঁড়াতে দাও।
তা দেব। তবে তুমি আমার কথার অর্থ ভুল বুঝেছ। আমি ব্রিগেডিয়ার ভার্গব। আমি কখনওই চাইব না আমার একমাত্র ছেলের ক্যারিয়ার নষ্ট হোক। তবু আমার এই যে পঁচিশ-ত্রিশ লাখ টাকা, এগুলোকে খরচাও তো করতে হবে? এই টাকা খাটিয়ে যাতে ও ব্যবসা করে খেতে পারে সেই কথাই বলছি আমি। অর্থাৎ আমার ছেলের চাকরির প্রয়োজনটা কী?
বিনতা বললেন, তাই বলো।
এখন ময়ূরভঞ্জে গিয়ে একটা মনোমতো জায়গা খুঁজে বার করতে পারলেই হয়।
তুমি তা হলে নিজে একবার ময়ূরভঞ্জে যাও। তবে একটা কথা, সব সময়ে মনে রেখো দেশের মাটির একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। তাই আমার কথাটাও একটু মাথায় রেখো।
কীরকম!
ময়ূরভঞ্জের ব্যাপারে আমারও আপত্তি নেই। তবে কিনা আমি কলকাতার মেয়ে। যদিও কোনও চুলোয় কেউ নেই আমার তবু কলকাতার টান আমার রক্তে আছে। সাত আট লাখ টাকা খরচা করে আমি বলি কী কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কিনে রাখো। মাঝে মধ্যে আসা যাবে। জিনিসপত্তর কিছু রাখব না। একমাত্র খাট বিছানা ছাড়া। ভবিষ্যতের মুখ চেয়েই একথা বলছি।
সৌরভ বলল, মায়ের এই প্রস্তাবটা কিন্তু অযৌক্তিক নয়। তার কারণ ময়ূরভঞ্জ যত ভাল জায়গাই হোক, আমাদের কিন্তু বিদেশ। আমরা বাংলার মানুষ। ময়ূরভঞ্জ ওড়িশায়। আজকাল তো এক দেশের এক ভাষার মানুষের সঙ্গে অন্যদেশের অন্য ভাষার মানুষের বিবাদ লেগেই আছে। তাই সেইরকম পরিস্থিতি কখনও হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে যাতে পালিয়ে আসতে পারি সেই ব্যবস্থাটা করে রাখতে হবে।
বিনতা বললেন, তা ছাড়া বছরে একবার পুজোর সময় তো আসবই। কলকাতার মতো পুজো কোথাও কি আছে? কলকাতার পুজো ছেড়ে কোথাও থাকতে পারব না আমি।
ভার্গব হাসলেন। বললেন, হ্য!। কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট রাখার ইচ্ছে আমারও যে নেই তা নয়। একথাটা অবশ্য মন্দ বলনি। ময়ূরভঞ্জে বাংলো, বাগান সব কিছুই থাক। কলকাতায় থাক ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট।
তুমি তা হলে কবে যাচ্ছ ময়ূরভঞ্জ?
অরবিন্দর চিঠিটা কবে আসে দেখি।
চিঠি তো তুমি অনেকদিন দিয়েছ? এখনও উত্তর আসছে না কেন?
আসবে আসবে। ক্যুরিয়ার সার্ভিসের চিঠি। সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গেছে। এখন একটু খোঁজখবর নেবে, দেখাশোনা করবে, তবে তো।
সৌরভ বলল, কিন্তু বাবা অরবিন্দকাকুর তো দেখাই ছিল জায়গাটা। উনিই তো পছন্দ করে তোমাকে নিতে বলেছিলেন।
তা ঠিক। তবুও জমি জায়গার ব্যাপার তো। দরদামের প্রশ্ন আছে। তা ছাড়া ময়ূরভঞ্জ এখন অনেক উন্নত মানের জায়গা।
আমার স্কুলের বন্ধুরা গতবছর ধর্মতলা থেকে বাসে কেওনঝোড় গিয়েছিল। ওখান থেকে ময়ূরভঞ্জ কতদূর?
কেওনঝোড়ই তো ময়ূরভঞ্জ। ময়ূরভঞ্জ নামে আলাদা কোনও জায়গা নেই।
ওঁদের এই আলোচনার ফাঁকেই ডাক পিওন এসে একটা চিঠি দিল। চিঠিটা খামে করে এবং অর্ডিনারি পোস্টে পাঠানো। পোস্ট অফিসের ছাপ দেখে বোঝা গেল সেটার কেওনঝোড় থেকে আসতে সময় লেগেছে দশদিন। এবং প্রেরকের নাম দেখে বোঝা গেল অরবিন্দ গাঙ্গুলিই পাঠিয়েছেন চিঠিটা।
ভার্গব চিঠিটা খুললেন। তারপর দু’-এক ছত্রে চোখ বুলিয়েই বললেন, যাক, এতদিনে আমার স্বপ্ন বুঝি সফল হতে চলেছে।
বিনতা বললেন, কার চিঠি? অরবিন্দর?
হাি
কী লিখেছে একটু পড়ে শোনাও?
অরবিন্দ লিখেছে, তোমার চিঠি পেয়েছি। একটা জায়গা আমার খুবই পছন্দ হয়েছে। জায়গাটা মেইন রোডের ওপরে সিনেমা হলের দিকে। আর একটা জায়গা আছে সেটা দামে খুব কম, তবে অত্যন্ত লোভনীয়। কিন্তু শহর থেকে সামান্য একটু দূরে পাহাড়ের কোলে।
ভার্গব বললেন, আমি তো ওইরকম জায়গাই খুঁজছিলাম। একেবারে আইডিয়াল জায়গা যাকে বলে।
সৌরভ বলল, থাকতে গেলে ওই রকম জায়গাতেই থাকতে হয়। বিনতা বললেন, না। তোমাদের বাপ-ব্যাটার দু'জনেরই মাথায় দেখছি ছিট আছে।
ভার্গব বললে, কেন কেন?
তা নয় তো কী? আমরা কি বনবাসে যাচ্ছি? আমরা যাচ্ছি একটা জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে। একদিন দু'দিনের জন্য নয়, বরাবরের জন্য। অতএব এমন একটা জায়গা নির্বাচন করতে হবে যেখানে ডাক্তারবদ্যি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর কেনার দোকান বাজার হাট ইত্যাদি সবকিছুই হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়। এ না হলে তো দু'দিনে হাঁফিয়ে উঠবে। তা ছাড়া অন্য ভয়ও আছে। চুরিডাকাতি আজকাল কোন জায়গায় নেই? কাজেই রাত-বিরেতে বিপদ-আপদ কিছু হলে কারও সাহায্য পাবে?
ভার্গব বললেন, আমি যতদূর জানি ময়ূরভঞ্জ কিন্তু এখনও ওই সবের ঊর্ধ্বে। হোক। তবু আমি ওই রকম পরিবেশে কিছুতেই যাব না। শহরে লোক্যালিটির মধ্যে জায়গা কেনো, আমি যেতে রাজি।
সৌরভ বলল, মায়ের সঙ্গে এই ব্যাপারে আমি একমত। তবে কিনা দুটো জায়গাই দেখা হোক। পাহাড়তলির জায়গাটা যদি সত্যিই লোভনীয় হয় তা হলে সেটাও কিনে রাখলে ক্ষতি কী?
ভার্গব বললেন, কোনও ক্ষতি নেই। ব্যাঙ্কে টাকা রাখার চেয়ে জমি কিনে সৌরভ বলল, ফেলেই বা রাখব কেন? শহরের জমিতে আমাদের বসতবাড়িটা হোক, আর ওইখানে একটা ছোট্ট বাগান, সেইসঙ্গে ছোটখাটো একটা কুঁড়েঘর। বিনতা বললেন, তাতে অবশ্য আমার আপত্তি নেই। ব্রিগেডিয়ারসাহেব একটা বাড়ি হাঁকিয়ে পাহাড়ের কোলে থাকবেন, অথচ সে বাড়িতে রাত্রিবেলা ডাকাতি হবে না, এ আমি কিছুতেই বিশ্বাস করব না। আজকাল স্বর্গেও ডাকাতি হয়।
ভার্গব হাসলেন। বললেন, অরবিন্দ লিখেছে আমাদের সবাইকেই যেতে। বিশেষ করে সৌরভকে কবে সেই দু’বছরেরটি দেখেছিল, এখন সে কত বড় হয়েছে সেটা দেখার ইচ্ছেই তার প্রবল। কেন না ওর মেয়েটাও তো ওরই জুড়ি। তুমি তা হলে কবে যাবে ঠিক করলে?
আমি কেন? তোমরা যাবে না?
শুধু শুধু গিয়ে কী করব।
কী আবার করবে? জায়গা পছন্দ করবে।
ওর ভেতরে আমি নেই। বলে উঠে গিয়ে চায়ের কেটলি নিয়ে চা করতে বসলেন। তারপর পেয়ালায় টুং টাং করতে করতেই বললেন, তোমরা দু’বাপ-ব্যাটায় যাও গিয়ে জমি পছন্দ করে এসো। আমি যাব একেবারে গৃহপ্রবেশের সময়। তবে বাপু একটা কথা। আমার একটা ঠাকুরঘর তোমরা করে দিয়ো।
আমরা চলে যাব, তুমি একা থাকবে?
ক্ষতি কী?
সৌরভ বলল, একা থাকতে মায়ের অবশ্য তা হয়তো হবে না। কিন্তু যাবে না কেন?
কোনও অসুবিধেই হবে না।
ধ্যুৎ। কারও বাড়িতে গিয়ে ওঠা আমার পোষাবে
বেশ তো, না পোষায় হোটেলে উঠব। ওখানে কি হোটেল-লজের অভাব আছে? পঞ্চাশ-ষাট টাকায় ভাল ঘর পাওয়া যায়।
না।
সেটা কি ঠিক হবে? যার এত উৎসাহ তার বাড়িতে না উঠলে সে কী ভাববে বলো তো? তাই বলি কী, তোমরাই যাও।
সৌরভ বলল, আমরাই যাব। কিন্তু বাবা, যাব কীসে আমরা?
দু’রকম উপায় আছে। এক হল ধর্মতলা থেকে সরকারি বাসে কেওনঝোড়। অথবা রাতের তিরুপতি এক্সপ্রেসে যাজপুর কেওনঝোড় রোড স্টেশনে নেমে কেওনঝোড়ে যাওয়া। সকাল ছ'টায় ধৌলি এক্সপ্রেসেও যাওয়া যায়। বেলা বারোটা-একটা নাগাদ পৌঁছে সেখান থেকে বাস। যেতে অবশ্য সন্ধে হয়ে যায়।
বিনতা বললেন, আমার কথা যদি শোনো, তা হলে শেষেরটাই করো। সৌরভ বলল, বাসে যেতে আমার একটুও ইচ্ছে নেই। ট্রেন জার্নির চেয়ে আরামদায়ক কীসে আছে আর? তবে বাবা ওই সকালবেলার ধৌলিতে যাওয়া নয়। রাতের তিরুপতিতেই যাওয়া ভাল।
বিনতা বললেন, তিরুপতি এক্সপ্রেস? ওটা তো
চোরডাকাতের গাড়ি। রোজ কাগজ খুলেই দেখি যত চুরিডাকাতি সব ওই গাড়িতে।
ভার্গব বললেন, সেটা দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। কপাল ফাঁসলে কালকা মেল অথবা
রাজধানী এক্সপ্রেসেও ডাকাতি হতে পারে।
সৌরভ বলল, আমি রাতের গাড়িই পছন্দ করছি। কখন পৌঁছবে গাড়িটা? এই ধরো না কেন, সকাল ছ'টা সাড়ে-ছ'টা নাগাদ।
এখানে ছাড়ছে ক'টায়?
রাত এগারোটা কুড়িতে।
চমৎকার হবে তা হলে। খেয়েদেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনে যাওয়া। তারপর থ্রি-টায়ার শিল্পার কোচে হাত-পা ছড়িয়ে একটা চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে পড়া।
সকাল যখন হবে তখন বাথরুমের কলে মুখহাত ধুয়ে স্টেশন এলেই নেমে পড়া।
ভার্গব বললেন, আমারও ওই একইরকম ইচ্ছা। কেন না সারাটা দিন ধরে বসে বসে যাওয়ার চেয়ে রাতের গাড়িতে জার্নি করা অনেক ভাল। ট্রেনের দোলায় ঘুমোতে ঘুমোতে গেলে সময়টা যে কোথা দিয়ে কীভাবে কেটে যাবে তা বোঝাও যাবে না।
তা হলে আমরা যাব কবে?
ভার্গব হাসলেন। বললেন, টিকিট যেদিনের পাব। কাল পেলে কাল, পরশু পেলে পরশু।
বিনতা চা তৈরি করে মাখনটোস্ট সহযোগে চা দিলেন টি-টেবিলে। ঠিক হল চা-টা খেয়েই ভার্গব টিকিটের জন্য যাবেন।
বিনতা বললেন, সেই যাবেই যখন ঠিক করছ রাতের গাড়িতে, তখন যাও।
তাই বলে যেন দয়া করে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেট না। থ্রি-টায়ার শিল্পার ক্লাসেই কেটো। লোকজন থাকবে অনেক।
ভার্গব বললেন, তাই তো কাটব। শুধু শুধু ফার্স্ট ক্লাসে কেটে কতকগুলি টাকা ফালতু নষ্ট করে লাভ কী?
চা খাওয়া শেষ হলে ভার্গব পোশাক পরিবর্তন করে নিউ কয়লাঘাটা বুকিং অফিসের দিকে চললেন।
সৌরভ গেল তার বন্ধুদের কাছে এই সুখবরটা পৌঁছে দিতে। অবশ্য জমি কেনার ব্যাপারস্যাপারগুলো ও বলবে না কাউকে। শুধু বেড়াতে যাওয়ার কথাটাই জানবে সকলে। সবাই জানবে এক অনবদ্য প্রাকৃতিক পরিবেশে কাজলনয়না হরিণীর দেশে সৌরভ যাচ্ছে কয়েকদিনের ভ্রমণবিলাসে।
ব্রিগেডিয়ার ভার্গব যখন নিউ কয়লাঘাটা বুকিং অফিস থেকে ফিরে এলেন তখন তাঁর চোখেমুখে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতার ছাপ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে হঠাৎ করেই যেন তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন তাঁর।
বিনতা স্বামীর ওইরকম অবস্থা দেখে বললেন, কী ব্যাপার! শরীর খারাপ নাকি?
সৌরভ ছাদে ছিল। বাবার উপস্থিতি টের পেয়েই ছুটে নেমে এসে বলল, টিকিট পেয়েছ বাবা?
পেয়েছি।
তা হলে কবে যাব আমরা?
আজই রাতের গাড়িতে যাবি তুই। আমি যাব?
হ্যাঁ। তুই একা যাবি।
একা কী করে যাব? তুমি যাবে না?
ভার্গব ঘাড় নেড়ে বললেন, না।
বিনতা বললেন, কারণটা কী? টিকিট ছিল না?
তা নয়।
তা হলে?
ভার্গব সোফায় দেহটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, বেলা এখন কত হল? এগারোটা? আমাকে এক কাপ কফি খাওয়াতে পারো?
এক কাপ কেন? দু'কাপ করে দিচ্ছি। কিন্তু হল কী তোমার?
ভার্গব বুকেমুখে, কপালে একবার হাত বুলিয়ে বললেন, ক্যাপ্টেন ঘোষকে তোমার মনে আছে?
তা আবার মনে নেই? কোথায় যেন থাকেন তিনি?
থাকেন নয়, থাকতেন। ল্যান্সডাউন টেরেসে। আমার এক পরিচিত বন্ধুর মুখেই খবরটা পেলাম ওর। আজ সকালে দেশপ্রিয় পার্কে মর্নিং ওয়াকের সময় হার্ট অ্যাটাক হয় তাঁর।
সে কী !
স্পট ডেড।
বিনতার মুখ দিয়ে আর কথা সরল না।
ভার্গব বললেন, শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। মানুষের জীবনের অস্তিম পরিণতি এই। তবু আমরা বাঁচার জন্য কী না করি।
শুধু মানুষের কেন? সকল জীবেরই তো ওই একই পরিণতি।
আমার মনে হচ্ছে ওদের এই বিপদের দিনে এখুনি একবার ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই।
এ তো খুবই ভাল কথা। তাই বলে তুমি নিজের টিকিট না-কেটে, শুধু ছেলের টিকিট কাটলে কেন?
কারণ আছে। ধরো এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমারও যদি ওই রকম হয়? তখন ওকে একাএকাই তো সব কিছু করতে হবে। করবে। কিন্তু তা যখন নয়, তখন হঠাৎ এইসব আবোল তাবোল চিন্তাগুলো তুমি কেন করছ?
তা জানি না। মৃত্যুভয় আমি কখনও করিনি তুমি তো জান? কিন্তু ক্যাপ্টেন ঘোষের এই অকালমৃত্যুর খবর শুনে আমি যেন কেমন ঘাবড়ে গেছি। আসলে ও আমি দু'জনেই সমবয়সি। ওরও একটিমাত্র ছেলে। সৌরভের বয়সি। পিতৃহীন হয়ে বেচারি এখন কী করবে বলো দেখি?
কী আবার করবে? নিজের পায়ে দাঁড়াবে। দাঁড়াবার চেষ্টা করবে। তা ছাড়া ক্যাপ্টেন ঘোষের স্ত্রীও তো শুনেছি কোথাকার কোন স্কুলের যেন হেড মিসট্রেস? তা হবে। কিন্তু তবুও ছেলেটার কথাটা একবার ভেবে দেখো তো। সামনে দীর্ঘজীবন, অথচ এই সময়ে কী অবস্থা।
সৌরভ সব শুনে বলল, তোমার যখন মনের অবস্থা এই, তখন আমার টিকিটও না কাটলে পারতে। বিশেষ করে তোমাদের সঙ্গ ছাড়া একা আমি তো কখনও বাইরে বেরোইনি। তাই বলি কী, আমার টিকিট তুমি ক্যানসেল করিয়ে দাও।
সে কী।
আমি যাব না বাবা! এমনিতেই মাকে বাদ দিয়ে যাবার ইচ্ছে আমার ছিল না। তার ওপরে তুমি না গেলে যেতে আমার একদমই ভাল লাগবে না।
কেন ভাল লাগবে না?
একা একা আমার খুব ভয় করবে।
বিনতা বললেন, তার চেয়ে আমি বলি কী, চলো আমরা তিনজনেই যাই। তোমার মানসিক অবস্থা ভাল নয় যখন, তখন দু’চারদিনের জন্য তোমারই প্রিয় জায়গা থেকে একটু ঘুরে এলে তোমার পক্ষেও ভাল হবে।
আমার এখন কোথাও যাওয়া উচিত হবে না।
সৌরভ বলল, তা হলে আমিও যাচ্ছি না।
যেতে তোমাকে হবেই।
বিনতা বললেন, তোমার যখন জেদ ও তখন যাবেই। কেন না যেতে ওকে হবেই। অতএব আমি বাধা দিয়েও ওকে আটকাতে পারব না। কিন্তু তোমার এই জেদ বজায় রাখতে গিয়ে ছেলেটার বিপদ আপদের কথা একবারও ভেবে দেখলে না তুমি? তা ছাড়া ও নিজে যেখানে যেতে সাহস করছে না, সেখানে তুমি ওকে জোর করে যেতে বল কী করে?
আমি ওকে দিয়ে একটু এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই।
তা হলে ওর কোনও একজন বন্ধুকে অন্তত সঙ্গে দাও।
না। কোনও প্রয়োজন নেই তার। বন্ধুবান্ধবই যদি সঙ্গে থাকবে তা হলে আমার যেতে আপত্তি কী ছিল? আমি চাই ও এখন থেকেই একা একা ঘর ছেড়ে বেরোতে শিখুক। নিজে নিজেই সব কিছু দেখুক, শুনুক। জীবনের চরম অভিজ্ঞতাটা লাভ করুক। তবেই তো।
তা না হয় হল। হাজার হলেও ছেলেমানুষ তো?
এমন কিছু ছেলেমানুষ ও নয়। মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। চালাকি নাকি? বলে সৌরভকে কাছে টেনে পাশে বসিয়ে বললেন, হ্যাঁ রে! পারবি না একা একা যেতে?
সৌরভ মাথা হেঁট করে বলল, খুব পারব। কিন্তু বাবা...।
এর মধ্যে আর কোনও কিন্তু রাখিস না। ধর, ক্যাপ্টেন ঘোষের মতো হঠাৎ করে আজ যদি আমিও মরে যাই তা হলে কি ঘর থেকে বাইরে বেরোবি না? তা কেন?
তাই আমি বেঁচে থেকে দেখে যেতে চাই আমার সৌরভ দুগ্ধপোষ্য শিশু নয়। প্রয়োজনে সে সব পারে। সে লড়তে জানে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে জানে, সাহসে ভর করে বীরদর্পে এগিয়ে যেতে জানে।
বাবার কথায় বুক ফুলে উঠল সৌরভের। তার মনে হল সত্যিই তো, সে তো আর শিশুটি নেই। তার অনেক বন্ধু তো একা একা ছুটি কাটাতে দেশের বাড়িতে যায়। মামার বাড়ি যায়। আর সে কি না ময়ূরভঞ্জে যেতে পারবে না? তাই দারুশ উৎসাহিত হয়ে বলল, এই যদি হয়, তা হলে আমি দেখিয়ে দেব আমি কী পারি না-পারি।
সত্যি বলছিস?
তুমি আমার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারো বাবা।
ভেরি গুড।
কিন্তু বাবা, এইভাবে একা একা আমাকে কেওনঝোড় পাঠানোর মধ্যে তোমার উদ্দেশ্যটা কী বলো তো? শুধুই কি আমার সাহসের পরীক্ষা নেওয়া? না অন্য ব্যাপার?
বিনতা ততক্ষণে তিন কাপ কফি করে ফেলেছেন। তারপর সেটা তিনজনে ভাগ করে মুখোমুখি বসলেন একটা শান্তিনিকেতনি মোড়া নিয়ে।
ভার্গব বললেন, উদ্দেশ্য একটা নিশ্চয়ই আছে। সেটা হল আমি এসব করছি কার জন্য? আমার নিজের জন্য নিশ্চয়ই নয়। আমি চাই সুস্থসুন্দর একটা পরিবেশ। যে পরিবেশে আমি শান্তিতে চোখ বুজতে পারব। মরবার সময় আমার একটাই সান্ত্বনা থাকবে যে, আমার স্ত্রী-পুত্রের গায়ে কেউ আঁচড়টিও লাগাবে না এখানে। ময়ূরভঞ্জ হচ্ছে সেইরকমই একটি আদর্শ জায়গা, কাজেই তুমি সেখানে যাবে। অরবিন্দ যে জায়গা আমাদের জন্য দেখে রেখেছে সেই জায়গাটা ভাল করে দেখবে। সেখানে তোমার থাকতে অসুবিধে হবে কি না, মন বসবে কি না, সব কিছুই ভাল করে দেখবে। তারপর তুমি ফিরে এসে বললেই আমি জমি রেজিস্ট্রি করতে যাব। নচেত নয়।
সৌরভ লাফিয়ে উঠল আনন্দে। বলল, তবে তো আমার একটা বন্ধুকে সঙ্গে নিলে সময়টাও কাটত বেশ।
তাতে কি একা যাওয়ার মজাটা পাবে?
না তা অবশ্য পাব না।
অত বই কিনে দিয়েছি তোমাকে। সেসব কিছু সঙ্গে নাও। পাণ্ডব গোয়েন্দার সব ক'টা খণ্ডই তো তোমার আছে। সোনার গণপতি হিরের চোখ, চতুর গোয়েন্দ৷ চতুরভিযান, আরও অনেক বই তোমার আছে।
তা অবশ্য আছে। আমি তা হলে কীভাবে যাব?
প্রথমেই তোমাকে আমি হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসব। রাত এগারোটা কুড়িতে ট্রেন। পৌঁছবে সকাল ছ'টা বাহান্ন মিনিটে। সারাটা রাত আরামে ঘুমিয়ে নিতে পারবে ট্রেনের ভেতর। তারপর সকালটি হলেই নেমে পড়া। মনে রাখবে স্টেশনের নাম যাজপুর কেওনঝোড় রোড। ওখানে ট্রেন থেকে নেমেই কোনও একটা ভাল দোকান দেখে বেশটি করে জলযোগটা সেরে নেবে। কেন না স্টেশন থেকে কেওনঝোড় পর্যন্ত বাসে সময় লাগবে প্রায় চার পাঁচ ঘণ্টার মতো।
তা হলে তো অনেকদূর।
এইবার তুমি শুধু ওইখানে নেমে অরবিন্দর ঠিকানাটা খুঁজে বার করবে। পারবে না?
খুব পারব।
বিনতা কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, যদি না পারে?
অজস্র হোটেল লজ আছে। সেখানেই কোথাও উঠবে।
এর পরে আর কোনও কথাই নয়। রীতিমতো সাজ সাজ রব পড়ে গেল। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। তাই অল্প এবং হালকা ধরনের শীতবস্ত্রও নিল সঙ্গে।
একটি ব্যাগের মধ্যেই সব কিছু পুরে নিয়ে একটাই লাগেজ করল। আর রাখল একটা ছোট্ট ওয়াটার বটল। এটা না রাখলেই নয়। সেইসঙ্গে লুকিয়ে ধারাল একটা ছুরি। কেন না এখন যা দিনকাল, তাতে শুধু হাতে দূর পাল্লার ট্রেনজার্নি কখনওই নিরাপদ নয়।
একা যাওয়া যে কত বড় ঝক্কির ব্যাপার সেটা এবার হাড়েহাড়ে টের পেল সৌরভ। চিরটা কাল বাবা-মায়ের সঙ্গেই ঘুরেছে। অবশ্য চিরটা কাল বললে একটু বাড়িয়ে বলা হবে। কেন না কতই বা বয়স ওর? চোদ্দো থেকে পনেরো। যাওয়ার মধ্যে বার তিনেক পুরী, একবার বেনারস, একবার রাজগির ও বুদ্ধগয়া। হ্যাঁ, আর একবার খুব ছোটবেলায় দেওঘরে গিয়ে নাকি একমাস ছিল। তখন ওর দু’বছর বয়স। কাজেই দেওঘরের স্মৃতি কিছুই ওর মনে নেই।
যাই হোক। রাত এগারোটার মধ্যেই সৌরভ হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছল।
বাবা-মা দু'জনেই সঙ্গে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সৌরভ তাতে রাজি হয়নি। যে ছেলেটি জীবনে প্রথম একা একা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোচ্ছে সে যদি বাবা-মা'র সাহায্য নিয়ে স্টেশনে এসে ট্রেনে উঠল তাতে তো গোড়ায় গলদ রয়েই গেল।
তাই সম্পূর্ণ একা ওর কিট ব্যাগটা নিয়ে ফাঁকা বাসে চেপে হাওড়া স্টেশনে এল।
দক্ষিণ-পূর্ব রেলের সমস্ত দূরপাল্লার গাড়িই এখন নিউ কমপ্লেক্স থেকে ছাড়ে। সেই মতো সে নিউ কমপ্লেক্সেই এসে হাজির হল। ভেবেছিল ট্রেন প্ল্যাটফর্মেই থাকবে। ও শুধু ওয়াটার বটলে জলটা ভরে নিয়েই উঠে পড়বে গাড়িতে। তারপর নিজের বার্থ খুঁজে নিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে আয়াশে একটা ঘুম দিলেই একঘুমে রাত কাবার।
কিন্তু স্টেশনে এসে দেখল ট্রেন তখনও প্ল্যাটফর্মে দেয়নি। না দিক, যখন দেবে তখন উঠবে। এখন জলটা তো ভরে নেওয়া যাক। মা একবাক্স সন্দেশ দিয়েছেন। সেটা খেয়ে জল খেয়েই শুয়ে পড়বে। যদিও বাড়িতে ভালমতোই খেয়ে এসেছে, তবুও ট্রেনে উঠে একটু মিষ্টিমুখ না করলে নয়।
এই ভেবে স্টেশনের কলে জল নিতে গিয়েই মুশকিলে পড়ল। অতগুলো কল, কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা জল নেই।
জল আছে। তবে সেটা বোতলের জল। দশ টাকা দাম। কিনবে তো কেন, না-কিনলে তেষ্টায় ছাতি ফেটে মরো।
কী জ্বালা। জল ছাড়া কি খাওয়া যায়? যতই কেন এক রাতের জার্নি হোক, তবু জল যে জীবন।
মা অনেক করে বলেছিলেন হাওড়া স্টেশনের জল ভাল না। কোনও স্বাদ নেই। ঘর থেকে জল নিয়ে যেতে। কিন্তু সৌরভ শোনেনি। বলেছিল, খাব তো কত। তার জন্য বাড়ি থেকে জল বইবার দরকারটা কী?
এখন কী করা যায়?
ট্রেন তখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন ছাড়লে হাতে মাত্র দশ মিনিট সময়।
কয়েকজন ভদ্রলোক পরিবার নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা আগের স্টেশনে, মানে বড় ঘড়িটা যেখানে আছে সেইখানে গেলেন জল নিতে।
সৌরভও তাঁদের সঙ্গ নিয়ে গেল।
জল নিয়ে যখন ফিরল তখন ট্রেন ছাড়ার একটু সময় বাকি।
আজকাল প্ল্যাটফর্মে এসে ট্রেনে ওঠার আগে চার্টে নাম মিলিয়ে বগি চিনতে হয় না। এখন সেসব ব্যাপারে খুব সুবিধে হয়ে গেছে। সৌরভের টিকিট ছিল, এস ফোর, সাতাশ।
তার মানে আপার বার্থ। একক যাত্রীর পক্ষে আপার বার্থে জার্নির চেয়ে আরামদায়ক আর কিছুতেই নেই। সৌরভ তাই ট্রেনে উঠেই বার্থের ওপর ওর কিট ব্যাগটা রেখে ওয়াটার বটলটা ঝুলিয়ে দিল লোহার আংটায়।
যথাসময়ে ট্রেন ছাড়ল।
বেশ ভিড় আছে বগিতে। সৌরভের মনেই হল না ও একা যাচ্ছে। কত কত যাত্রী। বাঙালি যাত্রীও অনেক। বেশির ভাগ কটকের যাত্রী। একটি পরিবার ছেলেমেয়ে নিয়ে উঠেছেন, তাঁরা যাবেন বহরমপুর গঞ্জাম। সেখান থেকে গোপালপুর অন সি।
সৌরভ ওর বার্থে উঠে প্রথমেই সন্দেশের প্যাকেটটা বের করে দু’-একটা সন্দেশ খেয়ে নিল। মা প্রায় দশ-বারোটা সন্দেশ দিয়েছেন। অত কী খাওয়া যায়? তারপর ঢক ঢক করে খানিকটা জল খেয়ে শোবার ব্যবস্থা করল।
ওর ওপাশের বার্থে একটি মেয়ে শুয়েছিল। কী মিষ্টি আর কোমল মুখখানা। কচি এবং লাবণ্যময়। কেমন যেন ঢল ঢল করছে। চোখদুটো এত ভাল যে, মনে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই চোখের দিকে চোখের পাতা না-ফেলে চেয়ে থাকে।
মেয়েটি বলল, এই, তোমার জল থেকে আমাকে একটু জল দেবে?
সৌরভ মেয়েটির হাতে ওয়াটার বটল দিয়ে বলল, তুমি জলের জায়গা আনতে ভুলে গেছ বুঝি?
হ্যাঁ।
সৌরভ বলল, আমার কাছে সন্দেশও আছে। তুমি খাবে?
আমি বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি।
সে তো আমিও। সন্দেশ যখন আছে, তখন শুধু জলটা কেন তোমার কম পড়বে না?
খাবে?
কম পড়বে কেন? দেখলে তো আমি কেমন গপাগপ করে খেলাম। তা ছাড়াও আছে। রাত্রে তো আর খাব না। সেই সকালে। সকালে যাজপুর কেওনঝোড়ে নেমে দোকানে গিয়ে ঢুকব।
মেয়েটি সন্দেশ আর জল খেয়ে বলল, তুমি যাজপুর যাচ্ছ? তুমি?
আমিও। তোমার সঙ্গে কেউ নেই?
না। তোমারও তো সঙ্গে কেউ নেই দেখছি।
মেয়েটি হাসল। বলল, ওইজন্যই বোধহয় মুখোমুখি সিট পড়েছে আমাদের। কিন্তু তুমি একা যাচ্ছ কেন?
আসলে আমার একা বেরনোর শখ খুব। তাই বাড়িতে বলেকয়ে একটুখানি সাহসে ভর করে বেরিয়ে পড়লাম।
তা বেশ করেছ। কিন্তু এত জায়গা থাকতে তুমি এই জায়গাটাই বেছে নিলে কেন? পুরী, ভুবনেশ্বর, গোপালপুর এইসব জায়গায় যেতে পারতে। পারতাম। কিন্তু হিলি এরিয়া আমাকে খুব আকর্ষণ করে।
তাই বলো, তার মানে তুমি একজন পর্বত-প্রেমিক?
কিন্তু তুমি একা কেন, তা তো বললে না?
আমি বাড়ি থেকে পালাচ্ছি।
পালাচ্ছ? যাবেটা কোথায়?
জানি না। ভাবছি তোমার সঙ্গে যাজপুরেই নামব। নেমে তুমি যেখানে যাবে আমিও সেখানে যাব।
সর্বনাশ। তোমার টিকিট কোথাকার?
আমার টিকিট নেই। ডব্ল-টি।
সৌরভ ভেবে পেল না বিনা টিকিটের একজন যাত্রী থ্রি-টায়ার শিপার কোচে জায়গা পায় কী করে? এখুনি যার বার্থ সে এসে যদি দাবি করে, তা হলে তো সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে দেবে মেয়েটাকে।
সৌরভ বলল, তা হলে তোমার রিজার্ভেশনও নেই।
মেয়েটি বলল, আছে বইকী। আমি প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটে স্টেশনে এসেছি। তারপর গাড়ির কোচ অ্যাটেনডেন্টকে বলে এই বার্থটা ম্যানেজ করেছি। এবার উনি এলে ঠিক করব কোথায় যাব না যাব, সেইমতো টিকিট হবে! তা তোমার সঙ্গে দেখাটা যখন হয়ে গেল তখন ভাবছি তোমার সঙ্গেই ভিড়ে যাই। কেন না ছেলে হিসেবে তুমি খুব ভাল। তোমাকে দেখতেও সুন্দর। ব্যবহারও ভদ্র। তাই তোমাকে আমি ছাড়ছি না।
কিন্তু তুমি বাড়ি থেকে পালাচ্ছ কেন?
বাবা-মা দু’জনের ওপরই রাগ করে। আমি একটু মাথামোটা। তাই পড়াশুনায় ঠিকমতো মন বসাতে পারি না। এই নিয়ে দাদা আমাকে যখন তখন মারে। বাবা-মা আমাকে সান্ত্বনা তো দেনই না, উপরন্তু দাদাকেই সমর্থন করেন।
সেই রাগে বাড়ি ছেড়ে চলে এলে?
শুধু তাই নয়, একজন আমাকে সিনেমায় নামিয়ে দেবে বলেছিল। তার জন্য দশ হাজার টাকাও চেয়েছিল। বাবা সেটা দিতে রাজি নন। তাই ঠিক করলাম আর ও বাড়িতেই নয়। বনে-জঙ্গলে যেখানে হোক চলে যাব। তবে বোকার মতো আত্মহত্যা করব না। আত্মহত্যা করে বোকারা। রাম বুদ্বুরা।
তুমি যে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছ তোমার বাবা-মা জানেন?
তুমি তো দেখছি আর এক বোকা। না জানলেও এতক্ষণে জেনেছেন। এখন রাত কত? তার ওপর আমি দুপুর থেকে বাড়ি নেই। অবশ্য আমার টেবিলের ওপর এই মর্মে একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছি যে, আমার খোঁজ কোরো না। আমি বরাবরের জন্যই যাচ্ছি। এর পরও কি জানতে বাকি থাকে?
সৌরভ কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে বলল, কাজটা কিন্তু তুমি ভাল করোনি।
খারাপও করিনি। জান তো সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। আমার ফেস কাটিং দেখেছ? দেখো ভাল করে, এই মুখ দেখলে ভগবানেরও ভুল হয়ে যাবে। এই তুমিই একটু ভেবে দেখ না, আমি চাইলাম জল, তুমি অমনি জল ছাড়াও সন্দেশ অফার করলে। তা হলেই বোঝো বনে গিয়েও অন্ন জুটবে আমার।
সৌরভ বুঝল মেয়েটি শুধু যে বাকপটিয়সী তা নয়, একটু ছিটগ্রস্তও। তা না হলে সামান্য একটা ব্যাপারে মাথাগরম করে কেউ কখনও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে? বিশেষ করে এই বয়সের মেয়ে! একেবারে টিন এজার যাকে বলে ও তো তাই।
এমন সময় কোচ অ্যাটেনডেন্ট টিকিট চেক করতে এলে, সৌরভ ওর টিকিট দেখাল।
মেয়েটি ওর ছোট্ট মানি ব্যাগ বার করে দুটো একশো টাকার নোট এগিয়ে দিল অ্যাটেনডেন্টের দিকে।
কোথায় যাবে যেন?
প্রথমে কিছু ঠিক করিনি। তবে এখন ভাবছি যাজপুর যাব।
অ্যাটেনডেন্ট মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, টাকাটা রাখো। ওটা তোমার কাজে লাগবে।
মেয়েটি দারুণ খুশি হয়ে টাকাটা যথাস্থানে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর কোচ অ্যাটেনডেন্ট চলে গেলে সৌরভকে বলল, দেখলে তো ম্যাজিক কাকে বলে? আমি তোমাকে বলেছিলাম না সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। ঠিক কি না?
সৌরভ বলল, ঠিক মানে? কাঁটায় কাঁটায় ঠিক। তা তোমার নামটি জানা যেতে পারে কি?
নিশ্চয়ই। আমার নাম খেয়ালি।
বাঃ ভারী সুন্দর নাম তো।
তোমার নাম কী?
আমার নাম সৌরভ।
তোমার নামও ভাল। দু'জনেরই তিন অক্ষর। তা যাক। আর কোনও গল্প নয়। এবার শুয়ে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো। কেন না সকাল হলেই নামতে হবে তো। আর শোনো, আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, আমাকে তুমি ডেকে নিয়ো কিন্তু। আমি তোমার সঙ্গেই যাব।
সৌরভ বলল, আচ্ছা।
এরপর দু'জনেই চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইল।
একটু একটু করে ঘুম নেমে আসছে সৌরভের চোখে। ট্রেনের দোলা লাগলে এমনিতেই ঘুম এসে যায় ওর। তার ওপর রাতও হয়েছে। তাই কিছু সময়ের মধ্যেই গভীর ঘুমে মগ্ন হল সে।
তিরুপতি এক্সপ্রেসকে লোকে বাজে গাড়ি বলে। কিন্তু এই গাড়িই ফাঁকা মাঠে পড়ে এমন গতি নিল যে, মনে হল লাইন থেকে ছিটকে যাবে বুঝি।
সকাল যখন হল ট্রেন তখন বালেশ্বরে।
সৌরভ ঘুম ভেঙে চোখ মেলেই দেখল পাখি ফুড়ত। অর্থাৎ পাশের বার্থে শুয়ে থাকা সেই খেয়ালি নামের মেয়েটি নেই। কোথায় গেল সে? ওর কোনও জিনিসপত্তর ছিল কি না তা ও জানে না। শুধু গায়ে চাপা
দেবার মতো একটা চাদর ছিল। সেটাও তো নেই।
তবে কি বাথরুমে গেছে? হয়তো। সৌরভ আর শুয়ে না থেকে উঠে পড়ল। দু'দিকের বাথরুমে গিয়ে উকি মেরে দেখল, না কোথাও নেই। তা হলে গেল কোথায় মেয়েটা?
ও নিজেই তখন কলে গিয়ে মুখচোখ ধুয়ে এসে এক কাপ বিস্বাদ চা কিনে খেল।
মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল ওর।
একটু পরেই নড়ে উঠল ট্রেন।
আর অমনি দেখা গেল একটি বড়সড় সুটকেস টানতে টানতে এগিয়ে আসছে খেয়ালি।
খানিক এসেই হাঁক দিল সে, সৌরভ! সৌরভ! একবার এদিকে এসো। সৌরভ ছুটে গেল ওর দিকে। বলল, এ কী! এটা কোত্থেকে পেলে? কার এটা?
আমার সাইডের বার্থে যিনি শুয়ে আছেন তাঁর।
কিন্তু এটা তোমার কাছে কী করে এল?
চলো না বলছি।
ওরা দু'জনে মিলে ধরাধরি করে সুটকেসটা নিয়ে এসে ওদের বার্থের কাছে ডেকে তুলল।
রেখে সাইড আপারে যে ভদ্রলোক শুয়েছিলেন তাঁকে
সৌরভ বলল, দেখুন তো এটা আপনার কি না? ভদ্রলোক লাফিয়ে উঠলেন, হ্যাঁ, এটা তো আমারই। কোথায় ছিল এটা?
কেন আমার পায়ের কাছে!
ওখানেই রাখুন। আর ভেতরটা দেখে নিন জিনিসপত্তর সব ঠিকঠাক আছে কি না।
ভদ্রলোক চাবি লাগিয়ে লক খুলে ভেতরে একবার চোখ বুলিয়েই বললেন,
হ্যা। সবই ঠিকঠাক আছে। কিন্তু এটা তোমাদের হাতে গেল কী করে? খেয়ালি বলল, হঠাৎ ভোরবেলা মাকে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। আমার পাশের এই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দেখি সেও বেশ নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। আমি তখন ঘুরে শুই আর চোখ পিটপিটিয়ে সবকিছু দেখতে থাকি। হঠাৎ দেখি আপনার বার্থের নীচে যে টাকলুবাবু শুয়েছিলেন তিনি উঠে বসেছেন। টাক আর ভুঁড়ি আমি দু'চোক্ষে দেখতে পারি না। দেখলে আমার হাসিও পায়, আবার রাগও ধরে। তা আমি দেখি না সেই টাকলুবাবু উঠেই চটপট সবকিছু গুছিয়ে নিলেন। আমি ভাবলাম উনি নেমে গেলেই আমি জানালার ধারটায় গিয়ে বসব। তারপরই দেখি না, উনি এদিক ওদিক তাকিয়ে আপনার সুটকেসটি নিয়ে হাওয়া। আমি প্রথমটায় ভাবলাম হয়তো এটা ওনারই। তারপরই মনে হল, না তা তো নয়। ওনার সুটকেস হলে সেটা ওনার কাছেই থাকত। অন্যের বার্থে থাকবে কেন? তাই সঙ্গে সঙ্গে লোকটিকে ধাওয়া করলাম আমি। প্ল্যাটফর্মে নেমে লোকটি যখন একটা কুলি ডেকে সেটা তার মাথায় চাপাবার চেষ্টা করছেন আমি তখন শুধুই কাছে গিয়ে বলেছি, এই যে মিস্টার... আর কিছু বলবার আগেই টাকলুবাবু সেই কুলিটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েই কোথায় যে গা ঢাকা দিলেন, তাঁর টিকিটিও দেখা গেল না আর।
সৌরভ হেসে বলল, টাকলুবাবু যদি হয় তো টিকি থাকবে কী করে তাঁর, যে তুমি দেখবে?
খেয়ালি বলল, থাক। খুব হয়েছে। আর ফুট কেটো না তুমি। যেমন ঘুমোচ্ছিলে তেমনি ঘুমোও। কী ঘুম রে বাবা। গাড়িতে এত কেউ ঘুমোয়?
অন্যান্য অনেক যাত্রী জেগে উঠেছেন তখন। সবাই যে যার জিনিসপত্তর হাতড়ে দেখলেন। সবার সব কিছুই ঠিক আছে। একটিই শুধু খোয়া গিয়েছিল, ভাগ্যজোরে পাওয়া গেল সেটাও।
ভদ্রলোক বললেন, তুমি যে আমার কী উপকার করলে না, তা কী বলব। এর ভেতরে অনেক দামি দামি জিনিস ছিল আমার। নগদ টাকা-পয়সাও কিছু ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, আমার ছেলের চাকরির ইন্টারভিউ লেটার, আমার বাড়ির দলিল, আর ইন্টারন্যাশন্যাল পাসপোর্টও ছিল। ওগুলো খোয়া গেলে কী ঝামেলাতেই যে পড়তাম।
সৌরভ বলল, খেয়ালি! তুমি যে কাজ করেছ, তাতে তোমাকে সত্যিই ধন্যবাদ জানানো উচিত। কিন্তু তুমি অতখানি ঝুঁকি না নিয়ে যদি চেঁচিয়ে উঠতে, তা হলে লোকটাকে ধরে আমরা সবাই মিলে আচ্ছা কষে ঘা কতক দিতে পারতাম।
খেয়ালি বলল, আসলে লোকটি আদৌ চোর কিনা বুঝে উঠতেই তো আমার সময় লাগল। তা ছাড়া আমি চেঁচিয়ে উঠলে উনি হয়তো এই সুটকেসটা সঙ্গে নিয়েই পালাতেন।
কিন্তু যদি ও আক্রমণ করত?
তা হলে? বলার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল ওর বুকের কাছে উঁচিয়ে ধরেছে ধারালো একটা ছুরি। সেটা এমনই যে, আর একটু হলেই লেগে যেত সৌরভকে। কী সাংঘাতিক মেয়ে।
শুধু যে ছুরির ফলা তা নয়। ওর দু'চোখেও তখন ঝকঝক করছে হিংসার একটা শানিত ছুরি। এই যদি ওর দেখানোর ভঙ্গি হয় তা হলে বাস্তবক্ষেত্রে এ তো ডেঞ্জারাস।
সৌরভ সভয়ে একটু পিছিয়ে যেতেই, এক মুখ হেসে ওর ঠিক পাশটিতেই বসে পড়ল খেয়ালি।
একটু পরে আবার চা এলে সেই ভদ্রলোক ওদের দু'জনকেই চা খাওয়ালেন। কী একটা স্টেশনে ট্রেন থেমে আবার চলতে শুরু করল।
খেয়ালি বলল, তুমি পাণ্ডব গোয়েন্দা পড়েছ?
সৌরভ বলল, না।
আজকের দিনে যে ছেলে বা মেয়ে পাণ্ডব গোয়েন্দা পড়েনি তার সঙ্গে আমি বন্ধুত্ব করি না। পাণ্ডব গোয়েন্দার বাবলু কী বলেছে জানো তো, এখন যা দিনকাল তাতে খুনজখম করবার জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্যই প্রত্যেকের সঙ্গে একটা-না-একটা অস্ত্র রাখা উচিত। বিশেষ করে তোমার আমার বয়সি ছেলেমেয়েদের। এ যা দিনকাল, এ যা অরাজকতা, তাতে কখন কী হয় কে জানে?
সেইজন্যেই বুঝি তুমি ছুরির খেলা দেখাবে বলে ঘর থেকে ছুরি নিয়ে এসেছ? আরে না না। এটা কালই সন্ধেবেলা আমি হাওড়া স্টেশনে কিনেছি। তবে যাই হোক, তুমি যে আর পাঁচটা মেয়ের মতো নও, তা কিন্তু বোঝাই গেছে।
এ সবই পাণ্ডব গোয়েন্দা থেকে শিখেছি।
কিন্তু তুমি চুপি চুপি যে কীর্তিটা করলে, ওটা যে পঞ্চই করে থাকে সাধারণত। কী বললে? আমি পঞ্চুর কাজটা করেছি? তার মানে আমি বাচ্চু-বিচ্ছুর মতো
না হয়ে পঞ্চর মতো হয়েছি? এ তুমি বলতে পারলে? বলেই মুখ গোমড়া করে সৌরভের পাশ থেকে একটু সরে গিয়ে বসল এবং ফুলতে লাগল রাগে।
সৌরভ বলল, তুমি রাগ করলে?
খেয়ালি প্রথমে ওর কথায় উত্তর দিল না। তারপর এক সময় বলল, তুমি ভীষণ মিথ্যেবাদী।
কেন?
একটু আগে না তুমি বললে পাণ্ডব গোয়েন্দা তুমি পড়নি। তোমার কথা যদি সত্যি হয় তা হলে পঞ্চুর কীর্তিকলাপ তুমি জানলে কী করে?
সৌরভ বলল, যাঃ। তোমার কাছে আমি হেরে গেলাম?
ট্রেন এসে যাজপুর কেওনঝোড় রোডে থামল।
সৌরভ ওর কিট ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নামলে, খেয়ালিও নামল ওর সঙ্গে। ছিটেল মেয়েটা কি সত্যিই ওর সঙ্গ নেবে? তা যদি হয় তা হলে তো মুশকিল। মেয়েটি নিঃসন্দেহে ভাল। ওর সঙ্গে কথা বলেও সময় কাটবে। কিন্তু অরবিন্দকাকুর বাড়িতে ওকে নিয়ে উঠলে ওঁরা কী ভাবে নেবেন?
খেয়ালি বলল, কী ভাবছ? আমাকে সঙ্গে নেবে কি না? যদি আপত্তি থাকে এখনও বলো। আমি ঠিক আমার ব্যবস্থা করে নেব।
সৌরভ বলল, না। আমি ভাবছি অন্য কথা।
চলতে চলতে ওরা গেটের কাছে এসে গেল। টিকিট কালেক্টর কালো কোটের ভেতর থেকে শীর্ণ একটি হাত বার করে বললেন, টিকিট?
সৌরভ টিকিট দিল।
কিন্তু খেয়ালি কোথায়? এই তো ছিল মেয়েটা। কোথায় গেল?
খেয়ালি তখন লাইন টপকে স্টেশনের বাইরে। সেখান থেকেই হাত নাড়তে
লাগল সে, আমি এখানে। সৌরভ! এদিকে তাকাও।
সৌরভ এতক্ষণে দেখতে পেল খেয়ালিকে।
টি সি বললেন, ওর টিকিট কে দেবে?
সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করুন। আমার টিকিট তো আমি দিয়েছি। ও তো তোমার সঙ্গেই কথা বলতে বলতে আসছিল।
তাতে কী হয়েছে। আমি তো আপনার সঙ্গেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি।
তার মানে কি আমিও রেলে চাকরি করি?
টি সি আর কিছু বললেন না।
সৌরভ গেটের বাইরে এল।
আর খেয়ালি দূর থেকে এক চোখটিপে এমন একটা ইঙ্গিত করল টি সি-কে যার অর্থ, বুঝতেই তো পারছেন দাদা, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। অর্থাৎ কিনা প্লিজ, ছোড় দিজিয়ে।
সৌরভ বুঝল, মেয়েটা সত্যিই চমৎকার। অদ্ভুতরকমের একটা ম্যানেজিং টেকনিক জানা আছে ওর। তার মানে পুরোপুরি একটি ম্যানেজ মাস্টারনী। যাই হোক, মেয়েটিকে ও সঙ্গ দেবে। না হলে ওর এই পাগলামির জন্য হয়তো কোনও বিপদও ঘটে যেতে পারে ওর। কেউ হয়তো ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কোথাও নিয়ে গিয়ে বিক্রিও করে দিতে পারে। তাই স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসেই হাত ধরল ওর।
খেয়ালি বলল, কী ঠিক করলে?
কীসের কী?
আমি কি তোমার সঙ্গে থাকব? না ছাড়াছাড়ি হবে দু'জনার? সৌরভ বলল, ছাড়াছাড়ি হবে না বলেই তো হাত ধরলাম। এখন থেকে তুমি আমার কাছেই থাকবে।
তা হলে প্রমিস করো, আমাকে তোমার চেলি করে নেবে।
চেলি। সে আবার কী জিনিস।
বাঃ রে। সাধুসন্ন্যাসীদের চ্যালা থাকে না? আর তুমিও যখন অসাধু নও, তখন আমি তোমার চেলি তো বটেই। দাও তোমার কিট ব্যাগটা। এখন থেকে ওটা আমিই বইব।
তার কোনও প্রয়োজন হবে না।
হবে মশাই হবে। না হলে মানাবে কেন? তুমি হচ্ছ হিরো, আমি হচ্ছি জিরো। আর তোমাকেও যা ফার্স্ট ক্লাস দেখতে না, তাতে সত্যিই যদি কখনও আমি সিনেমায় নামতে পারি তা হলে তোমাকে আমার নায়ক আমি করবই করব।
সৌরভ হেসে বলল, তা তো করবে। কিন্তু তোমার আমার বয়সটার কথা একবারও কি চিন্তা করেছ?
করেছি বইকী। আজকাল তোমার আমার বয়সি টিন এজারদের নিয়েই ছবি খুব ভাল জমে। দেখছ না বম্বের যত বড় বড় ফিল্মস্টারেরা নিজেরা বসে গিয়ে নিজেদের ছেলেমেয়েদের নিয়েই ছবি করছে। শুধু করছে যে তা নয়, দমাদ্দম হিটও করছে সেই সব ছবি। ভাল ছবি করতে গেলে তোমার আমার মতন সুন্দর মুখের ছেলেমেয়েও যেমন দরকার, তেমনি দরকার ভাল লোকেশানের। স্টুডিয়োর অন্ধকার ঘরে নয়, আশ্চর্য সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ চাই ভাল ছবির জন্য। বাংলা ছবি মার খাচ্ছে শুধু সু-রুচির অভাবে। এক ঘেয়ে প্যানপ্যানানি গান, বম্বের অনুকরণে বোকা বোকা নাচ, অনভ্যস্ত হাতের ঢিসুম ঢিসুম, আর লোকেশান? দিঘা আর পুরী ছাড়া কোনও স্পটই খুঁজে পায় না ওরা। দু’-একজন অবশ্য ভুল করে দার্জিলিং-এ গিয়ে পড়ে।
সৌরভ বলল, তুমি তা হলে সিনেমা দেখ বুঝি খুব?
ইদানীং বাংলা ছবি বাদ দিয়ে সব ছবিই দেখি।
তোমার মতে শ্রেষ্ঠ ছবি কোনটি?
আমার মতের সঙ্গে কারওর মত মেলে না। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলব এ পর্যন্ত ভারতীয় ভাষায় যত ছবি তৈরি হয়েছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি হচ্ছে তেলেগু ভাষার একটি ছবি।
সেই ছবির নামটা জানতে পারি কী।
শঙ্করভরণম্। পরে অবশ্য ওই ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে হিন্দিতে আর একটি ছবি হয়েছিল। তার নায়কের ভূমিকায় ছিলেন গিরিশ কারনাড। কিন্তু ছবি বিশ্বাসের কাবুলিওলার পর বলরাজ সাহানির কাবুলিওয়ালাকে যেমন মেনে নেওয়া যায়নি, এ-ও ঠিক তেমনি ব্যাপার হয়েছিল। ,
সৌরভ অবাক হয়ে বলল, তুমি তো অনেক খবরই রাখ দেখছি। এত খবর কিন্তু আমি রাখি না।
এমন সময় পেছনদিক থেকে কে যেন কাঁই কাঁই করে বলে উঠল, বাট মঝিরে ছিড়া হইছ কাহিকি? সাড়কু যাই কথা কহু না।
খেয়ালি বিরক্তির সুরে বলল, আ মর। মুখের ছিরি দেখ। জুতিয়ে মুখ ছিঁড়ে দেব এখুনি।
আর যায় কোথায়? উৎকলমণি তো রেগে লম্ফঝম্প শুরু করে দিল সেখানে, তু কিস কহুচু? তু মতে জুতা মারিবু? তোর এত্ত সাহসঅ? হউ মুভি ছাড়িবি নাই।
কী কেলেঙ্কারি। মারামারি লাগে বুঝি।
ততক্ষণে অনেক লোকজন জড়ো হয়ে গেছে সেখানে। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, কী ব্যাপার! ব্যাপারটা কী? কঁহনঅ হেলা?
সৌরভ ওদের অবস্থার কথাটা বুঝিয়ে বলে শান্ত করল সকলকে। তারপর লোকটির কাছে ক্ষমা চাইলে সেও সরে গেল।
সৌরভ বলল, আর একটু হলেই হয়েছিল আর কী।
তুমি আবার লোকটাকে অত তেলমাখানো কথা বলতে গেলে কেন?
বাঃ রে। ওদেরই দেশে এসে ওদেরকে এইভাবে জুতো মারব বলতে আছে? না বলবে না। ধরে গাঁট্টা মারলেও রাগ যায় না। বলেই বলল, যাই হোক গে, এবার একটু ফায়ার ব্রিগেডের দিকে যাবে কী? ফায়ার ব্রিগেড!
হ্যা। আমার পেটে আগুন লেগেছে। সেটাকে নেভাতে হবে। খিদেয় জ্বলে যাচ্ছে পেট। ওই সামনেই একটা খাবারের দোকান দেখছি, চলো গিয়ে ঢোকা থাক।
ওরা পায়ে পায়ে দোকানের দিকেই এগিয়ে চলল। সৌরভ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সকাল তখন সাতটা। সূর্যের সোনালি রোদ তখন সোনার মতো গলে গলে লুটিয়ে পড়েছে শহরময়।
খাবারের দোকানের যিনি মালিক তিনি বেশ সদাহাস্যময় লোক। ওরা যেতেই নিজে এগিয়ে এসে ভাল একটা চেয়ার-টেবিল দেখিয়ে বসালেন দু'জনকে। খেয়ালি দোকানের কলে চোখেমুখে জল দিয়ে এসে সৌরভের মুখোমুখি বসল। খেয়ালি বলল, তোমার টাকা আছে? না আমি বের করব? তোমার আছে?
উইদাউট মাল্লু খেয়ালি মুখার্জি রাস্তায় বের হয় না।
কত টাকা আছে তোমার?
দু'হাজার টাকা আছে।
এত টাকা কোথায় পেলে তুমি?
চুরি করেছি। তবে প্রতিবেশীর টাকা
নয়। বাবার টাকাই চুরি করেছি। তুমি দেখছি সব দিকেই এক্সপার্ট!
তুমিও বা কী কম যাও বাছাধন? দিব্যি তো বাপের সুপুত্তুরটি হয়ে যার্থে উঠে শুয়েছিলে। বলি আমার মতন পালিয়ে টালিয়ে আসছ না তো?
তা হলে কি আমার কাছে টিকিট থাকত?
দোকানের একজন কর্মচারী এলে সৌরভ তাকে গরম গরম কচুরি আর দুটো করে রাজভোগের অর্ডার দিল।
খেয়ালি বলল, এখন মন দিয়ে শোনো যা বলি। আমার বহুদিনের স্বপ্ন সিনেমায় আমি নামব। তেলেগু ভাষাটা জানি না, না হলে ওই ছবিতে নেমে দেখিয়ে দিতাম অভিনয় কাকে বলে। বম্বে তো অনেকদূর। তা ছাড়া হিন্দি ছবিতে কমপিটিশনও খুব। না হলে হিন্দিতে চান্স পেলে জয়াপ্রদা আর শ্রীদেবীর হাতে হাত আমি মেলাতামই।
তা যখন হচ্ছে না, তখন কী করবে ঠিক করলে?
সেইজন্যেই তো বেছে বেছে তোমাকেই গুরু করেছি ব্রাদার। তুমি সঙ্গে থাকলে আমি বম্বে কেন, গোয়াতেও যেতে রাজি আছি। যাবে? এখানে বেশটি করে পেট ঠুসে জলখাবার খেয়ে চলো আমরা বম্বের গাড়িতে চেপে বসি। রিজার্ভেশনের দরকার নেই, দু'জনে লেডিজ কম্পার্টমেন্টে ঢুকে বসে থাকব।
তারপর চেকার এসে যখন আমাকে ধরবে?
লেডিজ কম্পার্টমেন্টে চেকার খুব কম ওঠে। উঠলেও তুমি একটা বাঙ্কে চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকবে। তা ছাড়া চেকাররা তোমার আমার মতন ছেলেমেয়েদের কিছু বলে না। ধরলে ধাড়িগুলোকেই ধরে।
সৌরভ বলল, তোমার যুক্তিটা মন্দ নয়। তবে কিনা এটা বম্বের লাইন নয়, আর আমারও সিনেমায় নামার ইচ্ছে নেই।
তুমি একটা ওয়ার্থলেশ। তা এই লাইনে কোথায় যাওয়া যায়?
মাদ্রাজ, ব্যাঙ্গালোর। কাছাকাছির মধ্যে বিশাখাপত্তনম, হায়দ্রাবাদ।
তাই চলো। ওইখানকার স্টুডিয়ো পাড়ায় ঘুরে তেলেগু ফিল্মেই একটু চান্স নিই চলো। ওখানে নিশ্চয়ই সিনেমায় নামার জন্য বম্বের মতো অত খেয়োখেয়ি হবে না।
সৌরভ খাবার খেয়ে, জল খেয়ে বলল, আমি তো বললাম, সিনেমায় নামা টামার ব্যাপারে আমি নেই।
দোকানদার এতক্ষণ দূরে বসে ওদের কথাবার্তা সব শুনছিলেন। এবার ইশারায় সৌরভকে ডেকে পরিষ্কার বাংলায় বললেন, মেয়েটি তোমার কে হয়? সৌরভ চাপা গলায় বলল, আমাদের কথাবার্তা কি আপনি শুনেছেন? সব শুনেছি।
তা হলে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে মেয়েটি। ট্রেনেই আলাপ। সেই থেকে সঙ্গ ছাড়ছে না।
দেখে কিন্তু বেশ ভালঘরের মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। তা কোথায় যাবে তোমরা?
আসলে আমি এসেছি কেওনঝোড় যাব বলে। ওখানে একটু পাহাড়-পর্বত দেখব, ঘুরব। শুনেছি ওখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য নাকি চমৎকার।
কোথায় উঠবে ওখানে?
আমার বাবার মামারবাড়ি ওখানে। তাঁরা এখন কেউ নেই। তবে বাবার এক বন্ধু আছেন, তাঁর বাড়িতেই উঠব। না হলে লজ তো আছেই।
তোমার বাবার বন্ধু? কী নাম বলো তো?
পুরো নাম তো জানি না। আমি তাঁকে অরবিন্দকাকু বলি।
তোমার বাবার নাম কী? তুমি ব্রিগেডিয়ার ভাগবের ছেলে?
সৌরভ চমকে উঠল। বলল, আপনি কী করে চিনলেন বাবাকে?
আরে আমার বাড়িও যে কেওনঝোড়ে। যেই বলেছ তোমার বাবার মামারবাড়ি ছিল ওখানে, আর অরবিন্দর নাম করেছ, তখনই বুঝেছি তুমি ভার্গবের ছেলে ছাড়া কেউ নও। অরবিন্দ, আমি, তোমার বাবা, সবাই আমরা পরস্পরের বন্ধু। আমার নাম শৈলজা।
সৌরভ তাড়াতাড়ি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। বলল, আরে! আপনার নামও তো বাবার মুখে অনেক শুনেছি।
দেখ কারবার। তা তোমার বাবা আছেন কেমন?
ভালই আছেন। এখন বলুন আমাদের বিল কত হল?
তুমি ভার্গবের ছেলে, আমার দোকানে খাবার খেয়ে দাম দেবে তুমি? সাহস তো কম নয়। তা শোনো, ওই মেয়েটির দেখছি সিনেমায় নামার খুব শখ। আজ একটা ওড়িয়া ছবির শুটিং হচ্ছে বৈতরণীর ওপারে ছোট্ট একটি দ্বীপে, বরাহনাথ মন্দিরের কাছে। ওকে বরং সেখানেই নিয়ে যাও। অমনি বিরজাদেবীর মন্দিরে গিয়ে একটা প্রণামও করে এসো। এখুনি তোমাদের যাবার তাড়া নেই তো। যাও, চলে যাও।
সৌরভ বলল, বিরজামন্দির কোথায়?
যাজপুরে গিয়ে যাকে জিজ্ঞেস করবে সেই দেখিয়ে দেবে।
এটা তা হলে কী? এইটাই তো যাজপুর।
এটা হচ্ছে যাজপুর কেওনঝোড় রোড। যাজপুর শহর এখান থেকে সাতাশ কিমি দূরে। ঘন ঘন ট্রেকার যাচ্ছে। যে কোনও একটাতে চেপে চলে যাও, চমৎকার বেড়ানো হবে। তারপর ফিরে এসে এখানেই যে কোনও হোটেলে খেয়েদেয়ে কেওনঝোড়ের বাসে চেপে বসো। সন্ধের আগেই পৌঁছে যাবে।
দোকানদারকে অভিনন্দন জানিয়ে ওরা দু'জনে রাজপথে এসে দাঁড়াল। খেয়ালি বলল, দেখলে তো আমি কীরকম লাকি। খাবার খেলুম অথচ এক পয়সাও খরচা করতে হল না। আসলে ওই যে বলেছি সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র।
এটা সুন্দর মুখের জন্য নয় ম্যাডাম। উনি আমার বাবার বন্ধু তাই। ছাড় তো ব্রাদার। আমাদের দু'জনকে প্যাঁচাপেঁচির মতন দেখতে হলে কোনও বন্ধুই দরদ দেখাত না। ঝেঁটিয়ে বিদেয় করত।
ওরা যেখানে এসে দাঁড়াল সেখানে তখন ট্রেকারগুলো একটানা এবং একঘেয়ে সুরে ‘যাজপুর যাজপুর’ করে মুখের ফ্যানা বের করে ফেলছে। সৌরভ ও খেয়ালি তারই একটিতে উঠে বসল।
কয়েকজন বাঙালি তীর্থযাত্রীও সেই ট্রেকারে ছিলেন। তাঁরাও যাচ্ছেন যাজপুর। বিরজামন্দিরে পুজো দিতে।
সৌরভ জিজ্ঞেস করল, আপনারা যে পুজো দিতে যাচ্ছেন ওই মন্দির কি খুবই প্রাচীন? পুজো দিয়েই ফিরে আসবেন, না থেকে যাবেন ওখানে? সঙ্গে অনেক মালপত্তর দেখছি।
যাত্রীদের মধ্যে একজন বয়স্কা মহিলা ছিলেন। উনি বললেন, তোমরা এই প্ৰথম আসছ বুঝি?
হ্যাঁ।
তা হলে শোনো, কাশীর যেমন অন্নপূর্ণা, কালীঘাটের যেমন কালী, যাজপুরের এই বিরজাও তেমনি প্রসিদ্ধ। একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ এটি। বিরজাক্ষেত্র। বিরজা ঔড্রদেশে চ...। সেই বিরজা। দেবীর দুটো হাত এবং সিংহবাহিনী। বহু আগে যযাতি রাজার রাজত্ব ছিল এখানে। তাই যযাতিপুর থেকেই যাজপুর নাম হয়েছে। বৈতরণীর তীরে এক সুপ্রাচীন জনপদ এই যাজপুর।
সৌরভ বলল, ও। আমরা কিন্তু জানতাম না।
তোমাদের সঙ্গে কেউ নেই?
না। আমরা দু'জন। কেওনঝোড়ে যাচ্ছিলাম এক আত্মীয়ের বাড়ি। এখানে যাজপুর স্টেশনে আমাদের পরিচিত একজন বলে দিলেন এই মন্দিরে এসে বিগ্রহদর্শন করে যেতে।
বেশ করেছ বাবা। খুব ভাল কাজ করেছ। মা ভীষণ জাগ্রতা। তোমাদের মঙ্গল করবেন।
খেয়ালি বলল, আচ্ছা মাসিমা, বৈতরণী ওখান থেকে কতদূরে?
দূর আছে। আমরা যেখানে ট্রেকার থেকে নামব সেখান থেকে দুটো পথ দু’দিকে ভাগ হয়ে গেছে। একটা গেছে বিরজা মন্দিরের দিকে, আর একটা বৈতরণীতে। সেখানে অখণ্ডলেশ্বর, অঙ্গেশ্বর শিব আছে। অনেক শিবেরেই মন্দির আছে শহরময়। বহু পুরনো আমলের মন্দির। বৈতরণীর তীরে আছে বিখ্যাত জগন্নাথের মন্দির। ওই বৈতরণীর তীরেই যযাতি রাজা দশাশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। ওখানকার ত্রিলোচনেশ্বর শিবের মন্দিরও বিখ্যাত। অখণ্ডলেশ্বর মন্দিরের গায়ে দেখবে কী সুন্দর জৈন তীর্থংকর আদিনাথের মূর্তি খোদাই করা আছে। তা ছাড়াও দেখবে কালীমন্দির, গণপতি মন্দির। অষ্টমাতৃকা মন্দিরের মূর্তিগুলিও দেখবার। সঙ্গে তোমাদের মা থাকলে খুব ভাল হত। মা এলেন না কেন? আসলে আমার মা সচরাচর বাইরে কোথাও বেরোতে চান না।
কেওনঝোড়ে কে আছেন তোমাদের?
আমার বাবার বন্ধু ওখানে থাকেন। উনি প্রায়ই যেতে বলেন, কিন্তু যাওয়া আর হয় না। তাই এবারে যাব মন করেই বেরিয়ে পড়েছি।
বেশ করেছ। আমরা অবশ্য কখনও যাইনি কেওনঝোড়ে। তবে শুনেছি খুব নাকি ভাল জায়গা। অনেক পাহাড় আছে, জঙ্গল আছে। সেইসব পাহাড়ে-জঙ্গলে নাকি ময়ূর আছে খুব।
সৌরভ বলল, জানি না। আমরা তো প্রথম যাচ্ছি। তবে বাবার মুখে শুনেছি এককালে নাকি ময়ূর ছিল খুব।
সেইজন্যেই বুঝি ময়ূরভঞ্জ?
হবে। ঠিক জানি না আমরা।
তোমরা কোন গাড়িতে এলে?
আমরা এসেছি হাওড়া থেকে তিরুপতি এক্সপ্রেসে। আপনারা?
আমরা কাল সন্ধেবেলা ইস্ট কোস্টে এসেছি। রাত্রে একটা লজে ছিলাম। আজ পুজো দিতে যাচ্ছি। ওখানে ট্রাস্টির পান্থশালা আছে। সেখানে দু'দিন থেকে, তারপর আবার কলকাতায় ফিরে যাব।
ট্রেকার একসময়’যাজপুর শহরে পৌঁছল। স্টেশন থেকে এই বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ভাড়া ছ'টাকা। ওদের ভাড়া ভদ্রমহিলাই তাঁর পরিবারের লোকেদের সঙ্গে দিয়ে দিলেন।
খেয়ালি একচোখ টিপল সৌরভকে। তারপর চাপা গলায় বলল, দেখলে তো, কী বলেছিলাম? সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র।
সেই ভদ্রমহিলা তাঁর পরিবারের লোকেদের নিয়ে একটা জিপ ভাড়া করে পান্থনিবাসের দিকে চলে গেলেন। ওরা দু'জনে গল্প করতে করতে বৈতরণীর দিকে চলল।
সৌরভ বলল, ওখানে একটা দ্বীপের মধ্যে ওড়িয়া ছবির শুটিং হচ্ছে জান তো? বেল পাকলে কাকের কী?
এইবার দেখা যাবে সুন্দর মুখের জয়টা কীরকম হয়। আমি তো সোজা গিয়ে তাদের পরিচালককে বলব তোমাকে একটা চান্স পাইয়ে দেবার জন্য।
সৌরভের কথা শুনে লাফিয়ে উঠল খেয়ালি, রক্ষে করো বাবা। ওই ‘ঠাকুর দরশন পাইব কাঁই’ ছবিটবির মধ্যে আমি নাই। হিন্দি অথবা তেলেগু ছবি ছাড়া নামবই না আমি।
তারপর হঠাৎ কী ভেবে যেন লাফিয়ে উঠল খেয়ালি। বলল, দেখ, হঠাৎ করে আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। ধরো কেউ যদি কোনও ছবিতে আমাদের চান্স না দেয়...।
এর মধ্যে আবার আমাদের আসছে কোত্থেকে?
আমি একটা কথার কথা বলছি। ধরো কেউ যদি চান্স না দেয় তা হলে আমরা নিজেরাও তো নিজেদের মনের মতো করে সুন্দর একটা ছবি করতে পারি। তা হলে ভাল ছবির নায়ক-নায়িকা হওয়ার জন্য আমাদের আর অপেক্ষা করতে হবে না।
সেটা কীভাবে হবে?
কথা বলতে বলতে ওরা বৈতরণীর ঘাটে চলে এল। নির্জন নদীতীর। দু'-একজন স্থানীয় লোক ছাড়া কোনও যাত্রী নেই। সেই ঘাটে এসে দু'জনে পাশাপাশি বসে চারদিকের সুন্দর দৃশ্য দেখতে লাগল।
খেয়ালি বলল, এবারে মন দিয়ে শোনো, আমি কী বলতে চাই। আমাদের ছবির গল্প আমরাই তৈরি করে নেব। সাসপেন্স থাকবে, ঢিসুম ঢুসুম থাকবে, পাণ্ডব গোয়েন্দার পঞ্চুর মতো একটা কুকুর থাকবে। আর থাকবে এক অনবদ্য প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়ের মাথার ওপর থেকে ঝর ঝর করে ঝরনার ধারা গড়িয়ে পড়বে। ঘন অরণ্যের মধ্যে একটা পাতার ঘরে শুধু তুমি আর আমি থাকব। আমাদের বন্ধু কুকুরটা হবে বডিগার্ড। তুমি বনের ভেতর থেকে হরিণ অথবা ময়ূর অথবা যে কোনও পাখিটাখি শিকার করে আনবে, আর আমি রান্না চড়িয়ে অথবা সেইসবের মাংস আগুনে ঝলসে তোমাকে খেতে দেব। সে যা ছবি হবে না, ভাবতেও পারবে না। তোমার-আমার জুটি এমনটি হবে কোথায়? সেই ছবি দেখে তাক লেগে যাবে সকলের। সবাই আমাদের নিয়ে হই হই করবে।
আর যদি তুমি আর একটু বড় হয়ে আমাকে—। থাক ওসব চিন্তা পরে করব। এখন রাজি কি না বলো।
আগে বলো সেটা সম্ভব হবে কী করে?
হাঃ হাঃ। আমার প্রস্তাবটা মন দিয়ে শুনলে তুমি আমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারবে না। আজকাল বিয়েবাড়ি, পইতেবাড়ি, জন্মদিনে ভিডিয়োতে ছবি তোলা হয় দেখেছ? দেড় দু'হাজার টাকা খরচা করলেই তো কেল্লা ফতে। তা আমরা যদি আমাদের দু'জনের টাকা দিয়ে যৌথভাবে ওইরকম একটা ছবি করি, তা হলে কেমন হয়? এখন আমরা লোকেশানটা দেখে যাই, পরে টাকা-পয়সা জোগাড় করে ভিডিয়ো নিয়ে চলে আসব এখানে। এই বৈতরণী নদীটা কিন্তু থাকবে।
খেয়ালির প্রস্তাবটা মন্দ লাগল না সৌরভের। বলল, আরে! তুমি বেশ বলেছ তো? তোমাকে এতক্ষণ ধরে আমি একটা খামখেয়ালি মেয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি তা নও। তুমি অনেক গভীরে অনেক কিছু চিন্তা করো। অথচ ছেলেমানুষ তুমি।
তুমিই বুঝি বুড়ো ধাড়ি? তুমিও তো ছেলেমানুষ।
সৌরভ এবার খুব আদর করে ডাকল, খেয়ালি!
বলো।
তুমি ভারী মিষ্টি। আমার দিকে খুব ভাল করে একবার তাকাও তো দেখি। সত্যি বলতে কী, তোমার মুখটা এতক্ষণ আমি ভাল করে দেখিওনি। খেয়ালি ওর মুখের দিকে ডাগর দুটি চোখ মেলে দিয়ে বলল, নাও দেখো। ভাল করে দেখো। দুষ্টু কোথাকার।
সৌরভ ওকে বেশটি করে খুঁটিয়ে দেখে বলল, নাঃ। সত্যিই তোমাকে দেখতে ভাল। কোথাও কোনও খুঁত নেই। তোমার সবচেয়ে বড় গুণ তোমার এই শিল্পচেতনা। তুমি নির্ঘাত বড় হয়ে একজন সত্যিকারের শিল্পী মেয়ে হবে। তোমার এই ভিডিয়ো নাটকের ব্যাপারে আমি কিন্তু এককথায় রাজি।
খেয়ালি আনন্দের উচ্ছ্বাসে জড়িয়ে ধরল সৌরভকে। বলল, আর দ্বিমত হবে না তো?
না। তা হলে শোনো, আমি এখানে কী জন্য এসেছি। আমার বাবা ব্রিগেডিয়ার ভার্গব। তিনি কেওনঝোড়ের অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে থেকে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়ে দিতে চান। আমিও চাই কলকাতার বাইরে থেকে জীবনটাকে উপভোগ করতে। দুটো জমি দেখা হয়েছে আমাদের। পছন্দ হলে দুটোই আমরা কিনব। একটা শহরের মাঝখানে। সেখানে বাড়ি করে থাকব আমরা। আর একটা পাহাড়ের কোলে অরণ্যের হৃদয়ের কাছে। সেখানে একটা পাতার ঘর করে উইক এন্ড করব আমরা। তা এখন ভাবছি সেই ঘরই হবে তোমার-আমার এই স্বপ্নের ঘর। সব ঠিকঠাক করে, সুন্দর একটা গল্প ফেঁদে দারুণ একটা ভিডিয়োর ছবি তৈরি করে ফেলব আমরা। যে ছবিতে থাকব শুধু তুমি আর আমি। আর থাকবে, বনের হরিণ, ময়ূর, পাখপাখালি আর প্রকৃতির ভুবন ভোলানো রূপ। ঝরনা, জলপ্রপাত ইত্যাদি।
খেয়ালি লাফিয়ে উঠল, হাউ ফ্যানটাস্টিক। চলো, আর এখানে সময় নষ্ট না করে আমরা কেওনঝোড়েই চলে যাই।
সৌরভ বলল, সে কী! ওই দেখো, নদীর ওপারে কী সুন্দর সব দৃশ্য ! ওটা বৈতরণীর একটা দ্বীপ। ওই দ্বীপে এখন শুটিং চলছে। বরাহনাথের মন্দিরও দেখা যাচ্ছে। আমরা ওখানে যাই চলো। মনে হচ্ছে খুব নির্জন সুন্দর জায়গাটা। আমাদের ভিডিয়ো ক্যামেরায় ওই দ্বীপও আসতে পারে। বিশেষ করে ওইসব প্রাচীন মন্দিরগুলোকে ছবির দৃশ্যে ধরে রাখা একান্তই দরকার। যা তুমি বলবে।
ওরা বৈতরণীর বাঁধের ওপর দিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে খেয়াঘাটের দিকে এগিয়ে চলল। খেয়াঘাটে খেয়াতরী যা আছে, তাতে চেপে নদী পার হতে সত্যিই ভয় হয়। অনেকটা নৌকা বাইচ-এর সেই লম্বাটে ডোঙার মতন নৌকো। অনবরত টলমল করছে। একটু এদিক ওদিক হলেই উলটে যাবে বুঝি। যাই হোক ওরা তাতেই খেয়া পার হয়ে ওপারে গিয়ে পৌঁছল।
ওপারটা কী ভীষণ নির্জন!
ওরা হেঁটে বরাহনাথের মন্দিরের দিকে চলল। তারপর মন্দির দেখে একটু এদিক সেদিকে যখন ঘোরাফেরা করছে, তখনই এক জায়গায় গিয়ে দেখতে পেল একটি ছবির শুটিং-এর জন্য তোড়জোড় চলছে। ছবির নাম কালিয়া। ওড়িয়া ছবি। ওড়িয়াতে কালিয়া বলা হয় প্রভু শ্রীজগন্নাথকে। হয়তো কোনও পৌরাণিক ছবি। কয়েকজন ফুটফুটে মেয়েকে দেবদাসী সাজিয়ে নাচানো হচ্ছে। কী তাদের সাজপোশাক। দেখলে
লোভ হয়।
সৌরভ বলল, কী। তুমিও ওদের মতো নাচবে নাকি?
খেয়ালি বলল, আমি যে ও নাচ জানি না।
নাচ না জানলে বোম্বাই ছবিতে নাচবে কী করে?
খেয়ালি চুপ করে রইল। পরে বলল, এরা কি আমাকে এদের ছবিতে নেবে?
আমি কি কথা বলে দেখব?
খেয়ালি বলল, বলে দেখতে পারো। তবে কিনা কোনও লাভ নেই। এ ছবি রিলিজ করলেও আমি জানতে পারব না।
তবু একটু বলেই দেখি না। এই বলে সৌরভ এগিয়ে গেল কর্মকর্তাদের দিকে। তারপর এই ছবির যিনি পরিচালক তাঁর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাবটা রাখতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে না করে দিলেন।
খেয়ালি তখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভদ্রলোক হঠাৎ কী ভেবে যেন খেয়ালির দিকে তাকিয়ে বললেন, এর হবে। হতে পারে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমাদের এই ছবির আজকের দৃশ্যে তো নেওয়া যাবে না। কেন না খুবই ছেলেমানুষ। বলে পকেট থেকে একটি কার্ড বের করে বললেন, এতেই আমাদের ঠিকানা পত্তর সব দেওয়া আছে। কাল সকালে ভুবনেশ্বরে এই ঠিকানায় যেন দেখা করে। ওকে আমরা চান্স একটা দেবই।
খেয়ালি কার্ডটা হাত পেতে নিল বটে, তবে ওর মুখে খুব একটা আশার আলো ফুটল না।
সৌরভ বলল, তবে আর কী? তুমি তো জিতেই গেলে। আর তোমাকে পায় কে?
তারপর খানিকটা এসে বলল, খেয়ালি মৃদু হেসে টান দিল সৌরভকে। শোনো, এদের প্রস্তাবটা আমি মেনে নিচ্ছি না।
সৌরভ বলল, প্রস্তাব তো ওদের না, আমাদের। তা হোক। তবু ভুবনেশ্বরে আমি যাচ্ছি না।
কেন যাচ্ছ না?
ওখানে গেলে তো আমাকে একা যেতে হবে। এখন আমরা যাজপুর যাব। সেখান থেকে তুমি চলে যাবে কেওনঝোড়। আমি একা কী ভাবে যাব?
কেন? ওখান থেকেই তো ভুবনেশ্বরের বাস পেয়ে যাবে।
তা যাব। কিন্তু সেখানে গিয়ে থাকব কোথায়? শুনেছি ওখানকার হোটেল চার্জ অনেক বেশি।
একদিনের তো মামলা। ওঁদের সঙ্গে দেখা করে ওঁদের ছবিতে ভিড়ে গেলে কোনও প্রবলেমই থাকবে না আর।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি চান্স না দেয়।
দেবেই। একান্ত না দিলে তুমি কেওনঝোড়ে চলে আসবে। আমি এখন কয়েকটা দিন ওখানে থাকব। গেলেই খা পেয়ে যাবে আমার।
ওরা কথা বলতে বলতে নদীর ঘাটে এল। তারপর একইভাবে নৌকোয় চেপে নদী পার হল।
কী ভাল যে লাগল নদী পার হতে। ঠিক যেন স্বপ্নের নদী।
ওপারে গিয়ে দু'জনেই একটু করে বৈতরণীর জল মাথায় ছেটাল প্রথমে। তারপরে ডাঙায় উঠে প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে লাগল।
খেয়ালি বলল, দেখো সৌরভ, আমি যখন রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছি তখন আমার মনের অবস্থা একরকম ছিল, এখন কিন্তু সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে গেছে। এখন কোনও কিছুর মোহেই তোমার মতন বন্ধুকে আমি হাতছাড়া করতে পারব না।
তা হলে তো সিনেমায় নামাও হবে না তোমার।
না হোক, তাতে ক্ষতি নেই। তা ছাড়া এইসব ছবির ব্যাপারে উৎসাহও নেই আমার। তার চেয়ে আমরা দু'জনে মনে মনে যেরকম পরিকল্পনা করেছি, সেইরকম হওয়াই ভাল। হাজার পাঁচেক টাকা হলেই হয়ে যাবে। আমরাই আমাদের মনের মতন ছবি করতে পারব।
পাঁচ হাজার লাগবে কীসে?
বাঃ রে। দেড়-দু'হাজার টাকা তো ভিডিয়োওয়ালারাই নেবে। এরপর তাদের গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসা, পৌঁছে দেওয়া এসব বুঝি করতে হবে না? এসবের টাকা কোথা থেকে আসবে?
সত্যিই তো। একথা আমি তো একবারও ভাবিনি।
তাই বলি কী, আর দেরি না করে আমরা যা মন করেছি তাই করিগে চলো। এই পাঁচ হাজারটা কোথা থেকে আসবে তা হলে?
ফিফটি ফিফটি। আমার কাছে তো দু’ হাজার আছেই, বাকিটা বাবার কাছ থেকে চেয়ে নেব। তুমিও তোমার বাবার কাছ থেকে ম্যানেজ করবে হাফ টাকা, পারবে না?
তুমি যখন বাড়ি থেকে চলেই এসেছ, তখন বাবাকে তুমি পাচ্ছ কোথায়? আরে আমি কী বরাবরের জন্য এসেছি? রাগ পড়লেই আবার চলে যাব। তোমার বাড়ি কোথায়?
কৈলাস বোস স্ট্রিটে।
তার মানে কলকাতায়।
ওরা যখন নিজেদের মধ্যে এইভাবে কথা বলতে বলতে আসছে সেইসময় হঠাৎ একটি ছেলে বেপরোয়ার মতো স্কুটার চালিয়ে ওদের দিকে এল। এমনভাবে এল যে, আর একটু হলেই ধাক্কা লাগত ওদের।
. খেয়ালি বোধহয় একটু রাগি প্রকৃতির মেয়ে। তাই ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, জাস্ট লাইক এ মাংকি।
আর যায় কোথা। ঘুরে তাকাল ছেলেটি।
তারপর স্কুটার নিয়ে সবেগে ওদের সামনে এসে ব্রেক সৌরভ আর খেয়ালি দু'জনেই তখন ভয় পেয়ে গেছে। অচেনা জায়গায়, অচেনা পরিবেশে এ কী বিপদ!
ছেলেটি ওদের চেয়ে বয়সেও অনেক বড়। তাকে যুবক বলা উচিত। চেহারা দেখে মনে হয় অত্যন্ত রাফ টাইপের। অর্থাৎ সোজা বাংলায় যাকে বাজে প্রকৃতির বলা হয় তাই।
যুবক স্কুটার থেকে নেমে এসে বলল, কী বললে খুকুমণি?
খেয়ালি বলল, যা বলেছি ঠিকই বলেছি।
আমি মাংকি? তুমি কি নিজেকে ডাকের সুন্দরী মনে করো? এখুনি তোমার ফেস কাটিং আমি চেঞ্জ করে দিচ্ছি। বলে কোমরের বেল্ট খুলে খেয়ালির মুখে, যেই না মারতে যাবে সৌরভ অমনি সজোরে একটা ধাক্কা দিল তাকে। যুবক সেই ধাক্কা সামলাতে না-পেরে বাঁধের ওপর থেকে গড়িয়ে একেবারে বৈতরণীর জলে।
চারদিক থেকে অনেক লোকজন তখন হই হই করে ছুটে এসেছে।
খেয়ালি বলল, সর্বনাশ! এ কী করলে তুমি? এখন যদি উঠে এসে তোমাকে মারে?
না হলে ও যে তোমাকে মারত। আর ওই মোটা বেল্টের আঘাত তুমি কি সহ্য করতে পারতে? তা ছাড়া মারলে ও তোমার মুখেই মারত।
জলে পড়া যুবক তখন সমানে চেঁচাচ্ছে, ওদের দু'জনকেই ধরে রাখ জয়। ওদের আমি ছাড়ব না।
কে জয় তা কে জানে?
অপর এক যুবক তখন ছুটে আসছে ওদের দিকে।
খেয়ালি বলল, সৌরভ পালাও। আমার যা হয় হোক। তুমি অন্তত বাঁচো। সৌরভ খেয়ালির একটা হাত ধরে টান দিয়েই তিরবেগে ছোটা শুরু করল। ওদের পেছনে তখন ধর ধর রবে ছুটে আসছে অনেকেই।
ব্যাপারটা এমনই হয়ে গেল যেন ওরাই দোষী, তাই ওদের ধরবার জন্য তেড়ে আসছে লোকগুলো।
সৌরভ বলল, আর বোধহয় বাঁচলাম না। এবার ধরা পড়লাম বলে।
খেয়ালি বলল, এত সোজ়া নাকি? সামনের ওই চায়ের দোকানের পাশে একটা সাইকেল রাখা আছে সেটা যারই হোক নিয়ে পালিয়ে এখনকার মতো বাঁচতে হবে। তুমি সাইকেল চালাতে পার তো? পারি।
ওরা কথা বলতে বলতেই আচমকা সাইকেলটা টেনে নিয়েই চেপে বসল তাতে। খেয়ালিকে সামনের রডে বসিয়ে নিয়ে ঝড়ের বেগে উধাও হয়ে গেল দু'জনে। তারপর বড় রাস্তার কাছাকাছি এসে সাইকেলটাকে এক জায়গায় রেখে একটা অটো দেখতে পেয়ে উঠে পড়ল তাতেই।
অটো চালক জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবে তোমরা?
আপাতত বিরজা মন্দিরে। খুব তাড়াতাড়ি যাবেন কিন্তু।
অটো জোরেই চলতে লাগল।
চালক বলল, তোমরা এমন হাঁফাচ্ছ কেন ভাই? কী হয়েছে
তোমাদের?
মন্দির দেখতে গিয়েছিলাম। মন্দির দেখে ফেরবার সময় একজন বদ লোকের পাল্লায় পড়ে যাই। তার হাত থেকে বাঁচবার জন্যই এইভাবে ছুটে এসেছি।
সৌরভ বলল, আমরা বৈতরণীর ওপারে বরাহনাথের
তার কি চাপদাড়ি? স্কুটার ছিল সঙ্গে?
হ্যাঁ। সে একা নয়। মনে হয় দলবলও ছিল তার।
বুঝেছি, তোমরা মেনোগুন্ডার হাতে পড়েছিলে
মেনোগুল্ডা! চেহারা কিন্তু খুব একটা সাংঘাতিক নয় তো?
গুন্ডামি করতে গেলে কি চেহারার দরকার হয়? দুর্দান্ত সাহস থাকলেই যথেষ্ট।
খেয়ালি বলল, তবে একেবারে দুর্বলও নয়। আমরা ওর কাছে নেহাতই শিশু। বাপের অফুরন্ত টাকা। দু'-তিনটে কোল্ড স্টোরেজের মালিক। কটকে, ভুবনেশ্বরে ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে মোটা টাকা আয় করে ওর বাবা। তা ছাড়া আরও অনেক রকমের ধান্দাবাজি করে। ওর বাবার নাম শ্যাম বিশোয়াল। বিশাল ব্যাপার ওদের। কিন্তু ছেলেটা একেবারেই যা তা। ওর খপ্পর থেকে বেঁচেছ এই ঢের।
সৌরভ বলল, বাঁচার সম্ভাবনা ছিল না, তবু বেঁচেছি।
এই এলাকার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত এখনও কিন্তু জোর দিয়ে কিছু বলা যায় না।
খেয়ালি বলল, কী নাম যেন বললেন ওর? মেনোগুন্ডা? খুব অত্যাচার করে বুঝি?
করে মানে? তোমাদের বয়সি মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না ওর জন্যে। সে কী! প্রতিবাদ করে না কেউ?
কে করবে? তোমাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমরা বাঙালি। কলকাতার ছেলেমেয়ে। তোমাদের ওখানে কেউ প্রতিবাদ করে? আসলে যুগটা এখন এমনই, প্রতিবাদ করার মনোবল হারিয়ে ফেলেছে লোকে। বলেই একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখে বলল, তোমরা কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকা।
মনে হয় মেনোগুন্ডা তোমাদের পিছু ছাড়েনি।
খেয়ালি বলল, ওরা কী করে জানবে আমরা এদিকে এসেছি?
সৌরভ বলল, হয়তো কেউ বলে দিয়েছে। আমরা যেখানে সাইকেল রেখে অটোয় উঠেছি, সেখানেই কেউ বলে দিয়েছে আমাদের কথা। তাই পিছু নিয়েছে আমাদের।
অটোচালক বলল, মেনোটা একা নয়। সঙ্গে জয়রামও আছে।
জয়রামটা কে?
সে আর এক ধান্দাবাজ। বুধিরাম পতির ছেলে।
খেয়ালি বলল, শনির সঙ্গে রাহুর মিলন।
ঠিক তাই।
মেনোগুন্ডার স্কুটার ঝড়ের গতিতে এসে ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎই ওদের দেখতে পেয়ে সজোরে ব্রেক কষল অটোর সামনে এসে। ওর স্কুটারের চাকা অটোর সামনের চাকায় এমন ধাক্কা মারল যে অটোর সমস্ত ঘড়-ঘড়ানি স্তব্ধ হয়ে গেল।
মেনো আর জয় দু'জনেই নেমে এল স্কুটার থেকে। ওদের দু'জনেরই চোখেমুখে শয়তানের হাসি।
মেনো বলল, পালিয়ে যাবি কোথায়?
অটোচালক বলল, এই সমস্ত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ওপর তোমাদের বীরত্বটা কী না দেখালেই নয়?
মেনো এক ধাক্কায় ফেলে দিল অটোচালককে। বলল, চোপ বে। একদম ফুটুর ফুটুর করবি না। এই বিচ্ছুদের চিনিস? অতলোকের সামনে আমার গায়ে হাত দেয়, আমার প্রেস্টিজ পাংচার করে দিয়েছে একেবারে।
জয় তখন শক্ত করে চেপে ধরেছে সৌরভকে।
আর মেনো একেবারে পাঁজাকোলা করে খেয়ালিকে তুলে নিয়ে বলল, জয় একটু দেখতরে এখানে রাস্তা তৈরির জন্যে যে গরম পিচের ড্রামটা ছিল সেটা কোন দিকে। ওকে আমি জানে মারব না, তবে গরম পিচে ওর মুখটা শুধু ডুবিয়ে দেব।
মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল অঘটন।
হঠাৎ একটা প্রাণান্তকর চিৎকার দিয়ে খেয়ালিকে নামিয়ে বসে পড়ল মেনো। ওর একটা চোখ বেয়ে ঝর ঝর করে রক্ত ঝরছে। খেয়ালি বোধহয় তৈরিই ছিল। তাই কোন ফাঁকে যে ছুরিটা বের করে গুঁজে দিয়েছে ওর চোখে, তা কে জানে?
আর এই রকম যখন অবস্থা, তখন সৌরভও একটা চান্স নিতে ছাড়ল না।
জয়ের হাতটা এত জোরে কামড়ে দিল যে চিংড়ির মতন লাফাতে লাগল জয়।
এই সুযোগে তাকেও কবজা করবার জন্য তার চোখেমুখে একরাশ ধুলো ছুড়ে দিতেই ভুবন যেন অন্ধকার।
খেয়ালি তখন আর সেই শান্ত ধীর কিশোরীটি নেই। সেও যেন মত্ত মাতঙ্গিনী। সে চকিতে মেনোর স্কুটারে চেপেই স্কুটারের মুখ ঘুরিয়ে সৌরভকে বলল, একটুও দেরি না করে বসে পড়ো। যত শিগগির সম্ভব আমাদের পালাতে হবে এখান থেকে।
হতচকিত অটোচালকের চোখের সামনে দিয়ে হাউই-এর মতো উড়ে গেল ওরা। যাবার সময় শুধু অটোচালককে হাত নেড়ে একটা মিষ্টি অভিনন্দন জানিয়ে গেল।
পথ নির্জন। মনে লাগে ভয়। কী জানি কী হয়। তবু এক দুরন্ত গতিতে ছুটে যাওয়া।
হঠাৎ এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল ওরা। সরকারি পথনির্দেশ দেওয়াই আছে। একদিকের পথ চলে গেছে যাজপুর স্টেশন, একদিকের পথ কটক হয়ে বালাশোর। আর এক দিকের পথ গেছে কেওনঝোড় হয়ে রাউরকেলা।
রাউরকেলা ইস্পাতনগরী কতদূর? কে জানে তা?
সৌরভ বেশ শক্ত করে ধরেছিল খেয়ালিকে।
খেয়ালি বলল, ভাগ্যিস স্কুটার চালানোটা শিখেছিলাম। না হলে আজকের এই বিপদে কিছুতেই পার পেতাম না আমরা।
সৌরভ বলল, সত্যি, তোমাকে যত দেখছি ততই বিস্ময় লাগছে আমার। কেন স্কুটার চালাচ্ছি বলে?
অবশ্যই। আমি সাইকেল ছাড়া কিছুই চালাতে পারি না।
আসলে আমার মামার স্কুটার আছে তো, তাই এটা শিখে নিতে খুব একটা অসুবিধে হয়নি। আমি স্কুটার কেন, মারুতিও চালিয়ে নিয়ে যেতে পারি। তুমি তো অসাধারণ।
কিছুই না। দু’দিন চেষ্টা করলে তুমিও পারবে।
ওরা স্কুটার থামিয়ে একবার একটু ভেবে নিল কোনদিকে যাবে। সৌরভ বলল, কী ভাবছ?
ভাবছি এখন আমরা যাবটা কোথায়? যাজপুরেই ফিরে যাব? না সোজা চলে যাব কেওনঝোড়ে?
আমার মতে যাজপুরে যাওয়াই ভাল। ওখানে সেই খাবারের দোকানে ঢুকে শৈলজাবাবুর সঙ্গে দেখা করে সব কথা বলে ওনার পরামর্শ নিয়েই যাওয়া উচিত।
আমার মনে হয় সেটা না করাই ভাল। বলেই হঠাৎ গতি বাড়িয়ে ঝড়ের বেগে উড়িয়ে নিয়ে চলল স্কুটারটাকে।
সৌরভ বলল, কী ব্যাপার! হঠাৎ এত জোরে এমন করে চালাচ্ছ যে? এখুনি একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে। আমার খুব ভয় করছে। একটু আস্তে চালাও। সম্ভব না। চেয়ে দ্যাখো পেছনে আমাদের কে আসছে। তার মানে?
একদম কথা বোলো না। শক্ত করে আমাকে ধরে থাকো।
সৌরভ ভয়ে ভয়ে তাই করল।
খেয়ালি আরও জোরে, ঝড়ের চেয়েও দ্রুতগতিতে উড়িয়ে নিয়ে চলল স্কুটারটাকে।
সৌরভ বলল, কারা আসছে বললে?
যম।
সৌরভ ঘুরে তাকিয়েই দেখল প্রায় আট-দশটা স্কুটার ভীষণ গতিতে ছুটে আসছে ওদের দিকে। সর্বনাশ। ওরা নিশ্চয়ই মেনোগুন্ডার লোক। কোনওরকমে খবর পেয়ে পিছু নিয়েছে ওদের। এমনই ভীষণ গতি তাদের, যে ওদের সঙ্গে দৌড়ের পাল্লায় কিছুতেই পেরে উঠবে না ওরা।
যা ভাবল তাই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা এসে হাজির হল ওদের কাছে। সাংঘাতিক চেহারা ওদের। দেখলে যমের বুকও কেঁপে উঠে বুঝি। কিন্তু আশ্চর্য! ওরা ওদের কাছাকাছি এসেও ওদের আক্রমণ করল না, বরং আরও আরও গতি বাড়িয়ে ওদের ফেলে রেখেই চলে গেল।
খেয়ালি বলল, আঃ বাঁচা গেল।
সৌরভ বলল, মনে হয় ওরা ওদের দলের নয়।
এরা তা হলে কারা?
দুধর্ষ কোনও ডাকাতের দল।
এইরকম চেহারার লোকেরাই ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে।
হয়তো তাই করতে যাচ্ছে কোথাও। কেন না যে অসম্ভব গতি ওদের তাতে সেইরকম মনে হয়। কিন্তু আমরা এদিকে কোথায় যাচ্ছি?
তা তো জানি না।
এখানে তো চারদিকেই পাহাড় দেখছি। শুধু পাহাড় আর জঙ্গল। তারই মাঝখান দিয়ে পিচঢালা পথ।
কী সুন্দর, তাই না? আমার এখুনি একটা পাহাড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে। ওই— ওই দেখো একটা নদী কেমন এঁকে বেঁকে চলেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কত গাছপালা। এখানেও আমাদের ভিডিয়ো শুটিং লাগালে হয়। কিন্তু এদিকে যে বিপদ আমাদের ঘনিয়ে আসছে।
কেন, কী হল আবার?
স্কুটার আর চালানো যাচ্ছে না।
সে কী! কী হল ওটার!
মনে হয়, যা তেল ছিল তা ফুরিয়ে গেছে।
সর্বনাশ! তা হলে কী হবে?
এক সময় সত্যি সত্যিই থেমে গেল স্কুটারটা। অনেক চেষ্টা করেও তাকে আর চালানো গেল না।
ওরা দু'জনেই স্কুটার থেকে নেমে তখন পথের ধারে বসে হাঁপাতে লাগল। কী যে করবে ওরা কিছুই ভেবে পেল না।
তবে বেশিক্ষণ নয় একটু পরেই ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল ওরা।
সৌরভ বলল, এবার তা হলে?
খেয়ালি বলল, চরৈবেতি।
তবে যাবার আগে স্কুটারটাকে পথের ধারে খাদের ভেতর নামিয়ে দিল। তারপর সামনের পথ ধরে নতুন উদ্যমে হেঁটে চলল ওরা।
খেয়ালি বলল, সত্যি, কথায় আছে না ভগবান যা করেন তা মঙ্গলের জন্য, আমাদেরও তাই হল।
কী রকম?
এই ধরো না কেন, আমি স্কুটার চালাতে না জানলে কিছুতেই যেমন ওদের খপ্পর থেকে রেহাই পেতাম না, তেমনি স্কুটারটা যদি এইখানে পথের মাঝখানে খারাপ না হত, তা হলে এই রমণীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার হাত থেকেও আমরা বঞ্চিত হতাম।
তোমার এই কথাটা অবশ্য মানতেই হবে।
খেয়ালি বলল, তবে রাগের মাথায় বাড়ি থেকে বেরোবার সময় একটা ভুল আমি যা করেছি তা বলবার নয়।
বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে যে ভুল তুমি করেছ, তার চেয়ে বড় ভুল আর কী হতে পারে?
ওটাকে আমি ভুল বলে মনে করি না। মাঝে মধ্যে বাড়ি পালানো খুবই দরকার।
তা হলে এখন থেকে তোমাকে আর খেয়ালি নয়, পলাতকা বলেই ডাকি আমি?
যে নামেই ডাক, আমি কিন্তু আমিই থাকব।
বেশ তো, তোমার মধ্যেই তুমি থাকো। এখন বলো দেখি বাড়ি পালানোর দরকারটা কী ছিল?
এই যেমন ধরো একটা একঘেয়েমির হাত থেকে বাঁচা।
আর?
আর বাড়ির লোকও বুঝুক ছেলেমেয়ে চোখের আড়ালে গেলে জ্বালা কত। তারা একটু হায় হায় করুক, কান্নাকাটি করুক, তবে তো মনের জ্বালাটা জুড়োবে বন্ধু।
তাই যদি হয়, তা হলে ভুলটা তুমি কী করলে?
ভুল করেছি আমার রিস্ট ওয়াচটা সঙ্গে না এনে। অবশ্য এর জন্য মনে আমার খেদ নেই। কেন না হাত বাড়ালেই যে বন্ধু পাওয়া যায়, তা তো জানতাম না। তুমি আমার সেই বন্ধু। কাজেই ঘর ছেড়ে লাভ হয়েছে এই যে, তোমার মতো বন্ধু পেয়েছি।
তোমার মতো বান্ধবী পেয়ে আমার লাভও কী কম হয়েছে?
তোমার লাভক্ষতি কী হয়েছে আমি জানি না। তবে তুমি না থাকলে আমি মরতাম। এত সাহসও দেখাতে পারতাম না।
সৌরভ এবার অন্য প্রসঙ্গে গেল। বলল, আচ্ছা, এইবার একটা কথা জিজ্ঞেস করি তোমায়, তোমার বাড়ি তো বললে কৈলাস বোস স্ট্রিটে। কিন্তু তোমার মামার বাড়ি কোথায় বললে না তো? যেখানে তুমি এমন চমৎকারভাবে স্কুটার চালানো শিখলে?
আমার মামার বাড়ি অনেক দূরে। গ্রামের দিকে।
কোথায় সেটা?
তুমি চাঁপাডাঙার নাম শুনছ?
বাব্বা! কে না শুনেছে?
সেই চাঁপাডাঙাতেই আমার মামার বাড়ি। সেখানেই দামোদরের বাঁধের ওপর খোলা জায়গায় স্কুটার চালানো শিখেছি প্রথমে। তারপর ফাঁকা মাঠে। চাঁপাডাঙায় তো মাঠের অভাব নেই। শুধু স্কুটার কেন মোটরও চালাতে পারি। মোটর চালিয়েছ কখনও?
নিশ্চয়ই। তবে কি না ভয় করে খুব।
কথা বলতে বলতেই ওরা সেই পাহাড়-জঙ্গলের দেশে একটু যেখানে লোকালয় সেইখানে পৌঁছল। এখানে কিছু ছোট ছোট দোকানপত্তর আছে। লোকজনের সংখ্যা কম বলে জমজমাটও নয়। জায়গাটাও ভারী সুন্দর।
ঘড়ি না থাকলেও রোদ্দুর দেখে বোঝা গেল বেলা অনেক হয়েছে। তাই খিদেয় চুঁই চুঁই করছে পেট। করলে কী হবে? একমাত্র মুড়ি তেলেভাজা, বোঁদে মিহিদানার লাড্ডু, আর ছানার গজা ছাড়া খাবার মতোও কিছু নেই।
খেয়ালি পায়ে পায়ে এগিয়ে একজন দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, এই জায়গাটার নাম কী?
উত্তরে সে কী যে বলল কিছুই বোঝা গেল না। তবে এটুকু বোঝা গেল এখানকার মানুষজন খুবই উদার এবং অত্যন্ত সরল প্রকৃতির।
আসলে খুবই অনুন্নত জায়গা। মানুষজন যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই গ্রাম্য লোক। দেহাতি যাকে বলে।
সৌরভ নিজে এবার দু'-একজনের সঙ্গে কথা বলে জানল এই পথ কেওনঝোড় হয়ে সোজা চলে গেছে রাউরকেল্লায়। এ পথে বাসও যায়। বাস যায় শুনে বুকে বল পেল একটু। খেয়ালিকে বলল, তা হলে আমাদের দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। যখন হোক একটা-না-একটা বাস পাবই। বলতে বলতেই দেখা গেল একটা বাস আসছে:
সৌরভ বলল, এই বাসেই উঠব আমরা।
খেয়ালি বলল, কখনও নয়। আগে পেটে কিছু দিই, তারপর। বাস রুট যখন, বাস তখন আরও আসবে। বলে একজনকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, এখানে কোনও খানা-খানেকা হোটেল মিলেগা?
লোকটি ওর কথা বুঝল। তারপর কী যেন ভেবে বলল, না, এখানে হোটেল কোথায়? তবে খেতে চাইলে তার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
সৌরভ খেয়ালি দু’জনেই বলল, হ্যাঁ। আমাদের সেই ব্যবস্থাই করে দিন।
লোকটি ওদের গ্রামে একজনদের বাড়িতে নিয়ে গেল। দেখে মনে হল খুবই নিম্নশ্রেণীর লোক এরা। বলল, ভাতের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডিমের ঝোল-ডালভাত। দশ টাকা করে কুড়ি টাকা।
ওরা তো এক কথায় রাজি।
দুঃখ শুধু একটাই, পাহাড়ের কোলঘেঁষে এমন সুন্দর একটা নদী তির তির করে বয়ে যাচ্ছে, অথচ সেই নদীতে দু’জনের পক্ষে স্নান করা সম্ভব নয়, কেন না সৌরভের কিট ব্যাগে যা আছে তাতে ওর কোনও অসুবিধে নেই। এক্সট্রা প্যান্টশার্ট, গামছা, কি তোয়ালে সব কিছুই আছে। কিন্তু এই বাঁদরিটা কিছুই আনেনি।
সৌরভ বলল, তুমি যদি কিছু না মনে করো তা হলে আমি একটু স্নান করে নিই। আমি?
তুমি তো কিছুই আনোনি সঙ্গে, কী করে কী করবে তা হলে?
তোমারটাতেই চালিয়ে নেব। যদি তোমার প্যান্টশার্টগুলো আমাকে ধার দাও।
আমার প্যান্টশার্ট তুমি পরবে?
তাতে কী? মেয়েরা বুঝি ছেলেদের পোশাক পরে না?
তা কেন?
অতএব ওরা একজনের বাড়িতে উঠে পোশাক ছেড়ে তোয়ালে, গামছা ইত্যাদি নিয়ে নদীতে গেল স্নান করতে। পাহাড়িয়া নদী।
উচ্ছল। চঞ্চল। যেন নৃত্যের ভঙ্গিমায় স্রোতের নূপুর বাজিয়ে বয়ে চলেছে। যেখানে একটা বড় পাথর, সেখানে কল কল শব্দ তুলে লাফিয়ে নেচে কী কাণ্ডটাই না করছে। স্নিগ্ধ শীতল জল। কী মিষ্টি... কত মিষ্টি... আহা মিষ্টি...।
খেয়ালি আপন মনে গুন গুন করে একটা গানই গেয়ে উঠল। মন ভ্রমরার গান।
হঠাৎ সৌরভ চেঁচিয়ে উঠল, ময়ূর! ময়ূর! ওই দেখো, কী সুন্দর ময়ুর। কী মজা!
খেয়ালি বলল, কই, কোথায়?
ওই তো। দেখতে পাচ্ছ না, একেবারে চোখের সামনেই। ওই— ওই দেখো। কত— কত ময়ূর !
আরে সত্যিই তো। একটা-দুটো নয়। অনেক ময়ূর, ময়ূরগুলো এ গাছের ডাল থেকে উড়ে ওগাছে যাচ্ছে। এইরকম মুক্ত পরিবেশে ময়ূর দেখার আনন্দই আলাদা।
যাই হোক, ওরা ময়ূর দেখে নদীর জলে স্নান করে যখন গা মুছে পোশাক পরিবর্তন করল, তখন দেহমন বেশ সতেজ হয়ে উঠল ওদের। সৌরভের প্যান্টশার্টে খেয়ালিকে খুবই ভাল লাগল। ওকেও একটা ছেলে বলে মনে হল তখন। এরপর পেটভরে ভাত খেয়ে একটা বাসে উঠতে পারলেই নিশ্চিন্দি।
খাওয়াটা কিন্তু মন্দ হল না। পরিবেশের জলহাওয়ার গুণেই কি না কে জানে, গরিব লোকের মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে ভাত খেতে কী ভাল যে লাগল, তা ওরাই জানে। দোষের মধ্যে চালে একটু কাঁকর থাকায় খেতে অসুবিধে হয়েছিল খুব।
ভাত খেয়ে ওরা বড় রাস্তায় এল বাসের জন্য।
রোদ্দুরের তেজ আছে বেশ। তাই খেয়ালির ভিজে পোশাকগুলো উঠোনে মেলে দেওয়ায় চট করে শুকিয়ে গেল।
এবার বাস একটা হলেই হয়।
কিন্তু বাস আর আসে না। অনেক পরে বাসের বদলে একটি ট্রাক এল। একজন দোকানদার বলল, এই ট্রাক কেওনঝোড় হয়েই যাবে। তোমরা এতে চড়েই যেতে পারো।
সৌরভ বলল, কোনও অসুবিধে নেই। আমাদের যাওয়া নিয়ে কথা।
দোকানদার তখন হাত দেখিয়ে থামাল ট্রাকটাকে। তারপর ওদের দিকে দেখিয়ে কী যেন বলতেই রাজি হয়ে গেল ড্রাইভার।
সৌরভ আর খেয়ালি ট্রাকে উঠতে গেলে ড্রাইভার বলল, পঁচিশ টাকা করে পঞ্চাশ টাকা লাগবে দু'জনের।
সৌরভ বলল, পঁচিশ টাকা করে? কতদূর?
দূর আছে। যাবে তো চটপট উঠে পড়ো।
ওরা আর দেরি না করে ড্রাইভারের পাশেই গিয়ে বসল। ড্রাইভারের পাশে যে দু'জন হেলপার ছিল তারা গিয়ে বসল মাল বোঝাই ট্রাকের মাথার ওপর।
পথঘাট এখানকার খুব ভাল।
তাই ঝড়ের বেগে ট্রাক ছুটে চলল কেওনঝোড়ের দিকে। এ পথের দৃশ্য কী মনোরম। তেমনি মনোরম এই ট্রাকবাহন। গতিময় এবং নিরাপদ।
ড্রাইভার একজন সর্দারজি। স্টিয়ারিং ধরে দিব্যি মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে গাড়ি চালাতে লাগল। গাড়ির স্পিড যে কোন দিকে যাচ্ছে তার আর খেয়ালই রইল না। হঠাৎ একটি গোরুর গাড়িকে পাশ কাটাতে গিয়েই নেমে গেল পাশের খাদে।
যাঃ। ফেঁসে গেল গাড়িটা।
হেল্পার দুজনের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। তারা এমনভাবে ছিটকে পড়ল যে হাত-পা ভেঙে, মাথা ফেটে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। ভয়াবহ ব্যাপার! প্রাণহানি ঘটেনি যে, এই রক্ষে।
ড্রাইভারকেও লেগেছে খুব। দুটো আঙুল গেছে।
সৌরভ ও খেয়ালি দু’জনেই বুকেমুখে চোট পেয়েছে খুব। তাই ভয়ে হাত-পা কাঁপছে থর থর করে। রক্তপাত তেমন একটা ঘটেনি।
ড্রাইভার কাত হয়ে যাওয়া ট্রাকের ভেতর থেকে অতিকষ্টে নামল। তারপর ইশারায় ওদেরও নামতে বলল।
ওরা নেমে বড় রাস্তায় উঠে আসতেই দেখল অনেক লোকজন ছুটে আসছে ওদের দিকে। মোটর লরিও দু’-একটা থেমে পড়েছে রাস্তায়। সবাই উৎসাহ নিয়ে দুর্ঘটনা দেখতে এগিয়ে এল।
কটক থেকে এক ভদ্রলোক আসছিলেন গাড়ি নিয়ে। কেওনঝোড়ে তাঁর একটি হোটেল আছে। নাম ময়ূরী। তিনি তাঁর গাড়িতেই তুলে নিলেন দু'জনকে।
ওরাও লিফট পেয়ে বর্তে গেল।
ভদ্রলোক ওদের পরিচয় জেনে খুশি হলেন খুব। সৌরভকে বললেন, তোমার বাবা যদি সত্যিই বাড়ি করেন এখানে, তা হলে খুবই ভাল হয়। অরবিন্দকাকুকেও তিনি চেনেন। ,
খেয়ালি বলল, আমাদের যেতে কি সন্ধে হয়ে যাবে?
তা একটু হতে পারে। তারপর ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, নাঃ।
মনে হচ্ছে সন্ধের আগেই পৌঁছে যাব।
খেয়ালি বলল, কপালটা কী জ্বালা জ্বালা করছে।
সৌরভ বলল, কই দেখি? কোনখানটা?
এই দেখো।
দেখেই শিউরে উঠল সৌরভ। বলল, এ রাম! তোমার কপাল তো কেটে গেছে। রক্তে ভিজে উঠেছে ওখানটা।
ভদ্রলোক বলেন, কোনও ভয় নেই। কেওনঝোড়ে গেলেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। প্রাইভেট গাড়ি তো, তাই চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতেই এক-এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে লাগল।
অনেকদূর যাবার পর এক জায়গায় দেখল হই হই করছে লোকজন। সে কী অফুরন্ত মানুষের সমাগম সেখানে। চারদিকে লাল শালুর পতাকা উড়ছে। পথের দু'পাশে দোকান। রকমারি দোকান। নিশ্চয়ই কোনও দেবস্থান আছে এখানে। দোকানে দোকানে পূজা সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও আছে খেলনাপাতির দোকান। নানারকম মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। কচুরি, শিঙাড়া, জিলিপি ও তেলেভাজার দোকান। আর আছে অজস্র সস্তার হোটেল। আনন্দের বন্যা বইছে সর্বত্র।
গাড়ি এইখানে থামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, শোনো, তোমরা এখানে জুতো রেখে চট করে মাকে দর্শন করে এসো।
কোন মা?
তারিণী। খুবই জাগ্রতা। এই পথে যাতায়াত করলে তারিণীকে দর্শন না করে কেউ যায় না।
ওরা ভদ্রলোকের কথামতো গাড়িতেই জুতো রেখে চলল মাতৃদর্শনে। ওড়িশার এই অঞ্চলে এই দেবীর মহিমা খুব। কত লোকের কত মনোবাঞ্ছা যে উনি পূরণ করেছেন, তার ঠিক নেই। দলে দলে নরনারী তাই চলেছেন মায়ের পুজো দিতে।
দেবীর কোনও মন্দির নেই এখানে। একেবারেই খোলা জায়গায় গাছতলায় দেবীর অধিষ্ঠান।
পূজারিরা ঘিরে রেখেছেন স্থানটিকে। যে যা পুজো দিচ্ছে তাই নিবেদন করছেন মাকে।
ওরা আর কী পুজো দেবে? একটা টাকা দেবীর দানপাত্রে দিয়ে চারদিক ঘুরে দেখতে লাগল।
এক জায়গায় কী বিশাল একটি ধর্মশালা। ছোটখাটো লজও দু’–একটি আছে। ওরা সব দেখেশুনে গাড়ির কাছে আসতেই ভদ্রলোক ওদের নিয়ে পাশের একটি ওষুধের দোকানে গেলেন। সেখানে খেয়ালির কপালের ওপরদিকে মাথার ঘন চুলের কাছে যেখানে চোট লেগে রক্ত চুঁইছিল সেখানটায় একটু ওষুধ দেওয়ালেন, তারপর ওদের নিয়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে এসে চা আর বিস্কুট খেতে দিলেন ওদের।
ওরা চা-বিস্কুট খেয়ে গাড়িতে বসল।
ভদ্রলোকও এবার সিটে বসে স্টিয়ারিং-এ হাত দিলেন।
হর্ন বাজিয়ে শোঁ শোঁ করে এগিয়ে চলল গাড়িখানা। গাড়ির ভেতরে স্টিরিয়ো বক্স থেকে গান বাজছে। হিন্দি ছায়াছবির সুপার হিট গান। অথচ দেশটা কিন্তু ওড়িশা।
গান শুনতে শুনতে ওরা যত এগোতে লাগল ততই পাহাড় আর জঙ্গল ঘন হতে লাগল। এক সময় তো পাহাড়ের ওপরই উঠে পড়ল গাড়িটা। সে কী নয়নাভিরাম দৃশ্য। অনেক দেখেও যেন মন ভরে না।
তারপর প্রকৃতির লীলাভূমি দেখতে দেখতে একসময় ওরা কেওনঝোড়ে ঢুকে পড়ল। ছোট্টর ওপর বেশ সাজানো শহর। খুবই পরিচ্ছন্ন। ভারী মনোরম এর পরিবেশ! সুন্দর ঘর বাড়ি! চারদিকে দূরে অদূরে পাহাড়ের সারি। জমজমাট জায়গা।
ভদ্রলোক কেওনঝোড়ের রাজবাড়ির সামনে ওদের নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন।
দুর্ঘটনার পর থেকেই খেয়ালি যেন কেমন একটু মিইয়ে গেছে। ও খুব ভয় পেয়ে গেল নাকি? ও মেয়ে তো ভয় পাবার মেয়ে নয়। তা হলে? কী হল ওর? যাই হোক, ওরা সুন্দর সুন্দর পথঘাট পেরিয়ে সিনেমা হলের দিকে এগোল। হলের নাম তারিণী। এই অঞ্চলের দেবীর নামেই নাম। সর্বত্রই তারিণী দেবীর জয়জয়কার।
অরবিন্দকাকু এখানে খুবই পরিচিত। তাই তাঁর নাম বলতেই বাড়ি দেখিয়ে দিল লোকে।
অরবিন্দকাকুর একমাত্র মেয়ে শিল্পা তার কাজলকালো চোখদুটি মেলেই অবাক। শিল্পাও ওদের বয়সি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। তা হোক, যেমনই মুখশ্রী, তেমনি সু-স্বাস্থ্যের অধিকারিণী। সর্বোপরি তার মাথার মেঘকালো চুল আর ভ্রমরের মতো চোখের জন্যই সে বেশি সুন্দর।
শিল্পা অবাক বিস্ময়ে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই নাকি সৌরভ! তা এই মেয়েটি কে?
কাকিমা দু’জনের হাত ধরে ঘরে ঢোকালেন।
অরবিন্দকাকু যে আনন্দের আবেগে কী করবেন কিছু ঠিক করতে পারলেন না।
সৌরভ ও খেয়ালি প্রণামপর্ব শেষ করল।
অরবিন্দকাকু এক মিনিটের মধ্যে ওদের সমস্ত খবরাখবর নিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, এ মেয়েটি কে? একে তো চিনলুম না! কে হয় তোমাদের? আমার সঙ্গে এসেছে।
সৌরভ বলল, ওর ব্যাপারে পরে বলব। ও
শিল্পা বলল, তোমার নাম কী বন্ধু?
লাজুক লাজুক মুখে খেয়ালি ওর নাম বলল।
শিল্পার চোখদুটি যেন উল্লসিত হয়ে উঠল। বলল, ও মা! কী সুন্দর নাম ! যাক ভালই হয়েছে। তোমাদের পেয়ে যে কী আনন্দ হচ্ছে তা বলবার নয়। সৌরভদা আসবে জানতাম, কিন্তু তুমি আসবে তা তো জানতাম না।
খেয়ালি বলল, আমারও ভাগ্য যে তোমার মতন এক বান্ধবীকে পেলাম। কাকিমা সৌরভকে বললেন, আমরা খুব আশা করেছিলাম তোমার বাবামা-ও আসবেন।
অরবিন্দকাকু বললেন, হ্যাঁ, ওঁরা এলেন না কেন?
এলেন না দুটি কারণে। এক, বাবার এক বন্ধু দেশপ্রিয় পার্কে মর্নিংওয়াক করবার সময় হঠাৎ স্ট্রোকে মারা যান। দুই, ওনারা পরখ করে দেখতে চান, আমি একা ঘর ছেড়ে বেরোতে পারি কি না। তবে এখন না এলেও পরে আসবেন।
এই ব্যাপার! যাই হোক। পথে আসতে তোমাদের কোনও কষ্ট হয়নি তো?
কিছুমাত্র না। ভিড়ের জন্য বাসে উঠতে পারিনি বলে একটা ট্রাক ম্যানেজ করেছিলাম। সেটা আবার স্পিড বাড়াতে গিয়ে খাদে পড়ল। তারপর আপনাদেরই এখানকার ময়ূরী লজের মালিক তাঁর মোটরে চাপিয়ে নিয়ে এলেন আমাদের। পথে তারিণীদেবীকেও দর্শন করে এলাম।
খুব ভাল করেছ। মা আমাদের কল্যাণময়ী। মা'র চরণ ভরসা করেই তো আমরা বেঁচে আছি।
কাকিমা ততক্ষণে তাড়া দিয়ে ওদের মুখহাত ধোওয়ালেন।
ওরাও পোশাক পরিবর্তন করল।
শিল্পারই চুড়িদার পরে খেয়ালি এখন খুশিতে ঝলমল করছে। কী ভাল যে লাগছে ওকে!
শিল্পা বলল, এই তো সবে সন্ধে। তোমরা জলটল খাও। তারপর তোমাদের নিয়ে একটু বেড়াতে যাব।
কাকিমা প্রত্যেকের জন্য ভাল রকমের জলখাবার নিয়ে এলেন। সারাটা দিনের পর এই হচ্ছে পরিতৃপ্তির খাওয়া। দেহমন একই সঙ্গে ভরে উঠল যেন। খাওয়াদাওয়া যখন শেষ হল তখন সন্ধে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। চারদিক আলোয় আলো।
আলোর জৌলুসের কারণও আছে। কয়েকদিন আগে কোজাগরি লক্ষ্মীপুজো গেছে তারই প্রতিমা রয়েছে এখানকার বিভিন্ন মণ্ডপে। দলে দলে লোক তাই প্রতিমাদর্শনে যাচ্ছে।
ওরা তিনজনেই চলল প্রতিমাদর্শনে। ঘর থেকে বেরিয়ে পায়ে পায়ে আবার ওরা বড় রাস্তায় এল। তারপর এগিয়ে চলল মেইন রোডের দিকে। চমৎকার পথঘাট।
সৌরভ দেখল শিল্পার হাত ধরে কেমন মৃদুমন্দ গতিতে কথা বলতে বলতে চলেছে খেয়ালি। দেখে খুব ভাল লাগল ওর। বাড়ি পালানো একটি মেয়ের এর চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে? সুস্থ সুন্দর নিরাপদ একটা আশ্রয়ের চেয়ে হিতকর আর কিছু কী আছে?
মেয়েটা যেমন খেয়ালি, তেমনই মিশুকে।
এই অল্পসময়ের মধ্যেই কী সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। এমনভাবে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে যেন কতদিনের পরিচয় ওদের। ভাব দেখে মনে হচ্ছে একটা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের মধ্যেই যেন জড়িয়ে যাবে মেয়েটা। অর্থাৎ শুধু এমনই নয়, পরবর্তীকালেও সৌরভ যখন ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কেওনঝোড়ে বসবাস করবে তখনও ও নিশ্চয়ই আসতে ছাড়বে না এখানে। শুধু সমস্যা এই, মেয়েটা যদি মেয়ে না হয়ে ছেলে হত, তা হলে কী ভালই না হত।
এক সময় ওরা রাজবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। শহরের এই জায়গাটা অত্যন্ত জনবহুল। অর্থাৎ কিনা এই ছোট্ট শহরটির ম্যাল বলা যেতে পারে জায়গাটাকে।
সৌরভ বলল, শিল্পা, তোমাদের এখান থেকে আমার বাড়িতে ফোনে যোগাযোগের কোনও ব্যবস্থা আছে?
কী যে বলো? কেওনঝোড়ের মতন শহরে দাঁড়িয়ে তুমি কিনা ফোনের জন্য চিন্তা করছ? ওই দেখো তোমার সামনেই টেলিফোন বুথ।
তা হলে তোমরা এক কাজ করো, দু'জনে পায়চারি করো এখানে। আমি ফোনে বাবা-মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলে নিই।
খেয়ালি বলল, বেশ তো। আমরা ওই ওদিকের দোকানগুলোর দিকে একবার যাচ্ছি।
ওরা রাস্তা পার হয়ে ওপারে যেতেই সৌরভ বুথে গিয়ে ফোনের লাইন চাইল।
সঙ্গে সঙ্গেই পেয়ে গেল লাইনটা।
সৌরভ বলল, বাবা আমি সৌরভ বলছি।
ওদিক থেকে উত্তর এল, ঠিক মতো পৌঁছেছিস তো? কোনও অসুবিধে হয়নি?
না বাবা। কোনও অসুবিধে হয়নি। এবার থেকে আমি একা-একাই বেরোতে পারব। একা বেরনোর মজা অনেক। তবে অভিজ্ঞতা যা হয়েছে তা কী বলব...।
অরবিন্দর খবর কী আগে বল? আমরা যাইনি বলে কিছু বলেনি?
একটু দুঃখ করছিলেন অবশ্য। তবে আমি সব বুঝিয়ে বলেছি। এই তো একটু আগে এসে পৌঁছেছি আমরা।
আমরা! আমরা আবার কোত্থেকে হলি। বাড়ি থেকে তো একা গেলি তুই। তা ছাড়া তোর বেলা বারোটার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা।
সেই কথাই তোমাকে বলতে চাই। তার আগে বলি তোমার কি শৈলজাকাকুর কথা মনে আছে?
কেন মনে থাকবে না? একবার সানঘাগরায় গিয়ে চিতাবাঘের খপ্পরে পড়েছিলাম আমরা। উঃ! সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও বুকের রক্ত ছলাৎ করে ওঠে। তা হঠাৎ ওর কথা জানতে চাইছিস যে? ও কী এখনও আছে?
আছে মানে? যাজপুর কেওনঝোড় রোড রেল স্টেশনের সামনেই খাবারের বড় করে গুছিয়ে বসে আছেন। আমরা তো ওনার দোকানেই খেলাম। উনি আমাদের কাছ থেকে দাম পর্যন্ত নিলেন না। উনিই বললেন, এখানকার বিরজাদেবী নাকি জাগ্রতা। তাই মন্দির দর্শন করে যেতে বললেন।
ঠিকই বলেছে ও। তোরা গেছলি?
হ্যাঁ বাবা। প্রথমে আমরা বৈতরণীতে গিয়েছিলাম। তারপর ওপারের দ্বীপে গিয়ে বরাহনাথ দেখে এসেছি। বরাহনাথ দেখে ফেরবার সময় এমন একটা চক্রে পড়ে গেলাম যা ফোনে বলবার নয়। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত বিরজাকে দর্শন না করেই চলে আসতে হল।
ওর জন্য কিছু ভাবিস না। আমরা তো ওই দেশেরই লোক হয়ে যাচ্ছি। তা তোর সঙ্গে আর কে আছে? তুই বার বার আমরা আমরা করছিস কেন?
সেই কথাই বলছি বাবা তোমাকে। আমি তিরুপতি এক্সপ্রেসে যে বার্থ পেয়েছিলাম সেই বার্থের মুখোমুখি বার্থে আমারই বয়সি একটি মেয়ে দেখি কোচ অ্যাটেনডেন্টকে ম্যানেজ করে শুয়ে আছে। কথাবার্তা বলার পর বুঝলাম মেয়েটা বাড়ি থেকে পালাচ্ছে। একটু রাগি, আর ছেলেমানুষিভাবও রয়েছে ওর। অসম্ভব চঞ্চল প্রকৃতির। তারপর একটু হেসে বলল, ছিটেলও আছে।
বলিস কী! তারপর?
মেয়েটি আমার সঙ্গ ছাড়তে চাইছে না কিছুতেই। দেখে বেশ ভাল এবং ভদ্রঘরের মেয়ে বলেই সঙ্গে নিয়ে নিলাম।
বেশ করেছিস। খুব ভাল কাজ করেছিস বাবা। কী ভাল কাজ যে করেছিস তা কী বলব। এইভাবে কত ছেলেমেয়ে বিপথগামী হয়, রসাতলে যায় তার ঠিক নেই।
ওর নাম খেয়ালি মুখার্জি। বাড়ি বলছে কৈলাস বোস স্ট্রিটে। কোনওরকমে খোঁজখবর নিয়ে ওর বাড়িতে একটা খবর দিতে পার? না পারার কী আছে? ওর বাবার নাম জানিস? জিজ্ঞেস করিনি।
বাবার নাম আগে জিজ্ঞেস করবি তো।
আসলে কেন করিনি জান? বেশি কথা জিজ্ঞেস করলে যদি পালায় তাই। এখন কেমন বুঝছিস?
এখন মনে হচ্ছে ওর পালিয়ে বেড়ানোর ঝোঁকটা কেটে আসছে। তবে সিনেমায় নামার মোহ আছে খুব। এখন বলছে কলকাতা থেকে ভিডিয়ো ভাড়া করে এনে এইখানকার নৈসর্গিক দৃশ্যের ছবি তুলবে।
তাই নাকি? মনে হচ্ছে মেয়েটা যা তা মেয়ে নয়। ভাবালু। এই ধরনের ছেলেমেয়েরা এমনিতেই একটু আত্মভোলা প্রকৃতির হয়। যাই হোক, নজরে রাখ মেয়েটাকে। ওর নাম আর এলাকা যখন জানা গেছে তখন বাড়ি খুঁজে বের করতে একটুও অসুবিধে হবে না আমার। তুই নিশ্চিন্ত থাক। আমি ওর বাড়িতে খবর দিচ্ছি।
মাকে একবার দাও।
বিনতা পাশেই ছিলেন।
ভার্গব ফোনটা স্ত্রীর হাতে দিয়ে বললেন, ছেলে কথা বলবে তোমার সঙ্গে। বিনতা ফোনে অনেক কথা বললেন ছেলের সঙ্গে। সাবধানে থাকবার উপদেশ দিলেন।
কথা শেষ হলে টেলিফোনের চার্জ দিয়ে বুথ থেকে বেরিয়ে এল সৌরভ। তারপর রাস্তার ওপারে গিয়ে অপেক্ষমান শিল্পা ও খেয়ালির হাত ধরে ঘুরতে লাগল পথে পথে।
সেই রাতটা যে কী আনন্দে কাটল তা বলবার নয়। অনেক রাত পর্যন্ত ওদের অনেক পরিকল্পনা হল। তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল সবাই।
ময়ূরভঞ্জের মায়াময় প্রকৃতির বুকে ভোর হল।
সে কী অপূর্ব সুন্দর ভোর, কাছেদূরে শুধু ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি। তারই কোলে যে সবুজ বনানী, সেই বনানীর হৃদয় থেকে পাখির কলরব মুখর করে দিল চারদিক।
সৌরভ ঘুম থেকে উঠেই ছাদে উঠে দু'চোখ মেলে দিল দূরের প্রকৃতির দিকে। কত নদী, কত নির্ঝরিণীর উৎস ওই পাহাড়গুলো। সেই অপূর্ব সুন্দরের দিকে তাকিয়ে মন যেন ভরে উঠল।
একটু পরেই খেয়ালি ও শিল্পাও উঠে এল ছাদে। মেয়ে তো নয়, যেন একই বৃত্তে দুটি ফুল।
শিল্পা বলল, সৌরভদা, কেমন দেখছ ময়ূরভঞ্জ?
খুব ভাল। এত ভাল যে চোখ আর ফেরাতে পারছি না।
এই ময়ূরভঞ্জের এমনই মোহ যে, এর মোহের কাজল একবার চোখে দিলে আর একে ভোলা যায় না।
তাই তো দেখছি। সুন্দর ছাড়া এখানে তো কিছুই নেই।
আছে। অসুন্দরও আছে। ওই যে দেখছ পাহাড় বনানী, মরণ ওখানে নিয়তির রূপ ধরে ওত পেতে আছে। হিংসা, মৃত্যু, আতঙ্ক কী নেই ওখানে? সৌরভ অবাক বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
শিল্পা বলল, ওই পাহাড়ের কোলে তোমাদের জন্য একটা জমি দেখে রেখেছেন বাবা। তোমার হয়তো খুবই পছন্দ হবে। তবে কিনা ওটা শুধু অবসর বিনোদনের জন্যই ভাল। বসবাসের জন্য যেটা, সেটা
খেয়ালি এতক্ষণে কথা বলল, ওই যে কৃষ্ণচূড়া
হ্যাঁ। ওরই সংলগ্ন পাঁচ কাঠা জমি।
ওই দেখা যায়। গাছ আছে যেটাতে?
ওখানে আমার যেন রাত্রিবাসের একটু কিছু থাকে।
সৌরভ বলল, এটাও কি তোমার খেয়াল?
মোটেই না। আমার অন্তর থেকেই বলছি।
শিল্পা বলল, কী মেয়ে তুমি? বাবা-মাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে কী কাণ্ডটাই না করলে বলো তো।
ঠিক করেছি। একটু বুঝুক ওরা। চোখ থাকতে যারা চোখের মর্ম বোঝে না, তাদের চোখে বালি একটু পড়ুক।
তা না হয় পড়ল। কিন্তু তোমার মন কাঁদছে না বাড়ির জন্য? মা-বাবা-দাদা এদের কথা মনে পড়ছে না?
খেয়ালি সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ওই দূরের পাহাড়গুলোর দিকে কি আজ যাওয়া যাবে?
কেন যাওয়া যাবে না? একটু পরে চা-জলখাবার খেয়ে প্রথমেই আমরা জগন্নাথ দেবের মন্দিরে যাব। সেখান থেকে যাব সানঘাগরায়।
সৌরভ লাফিয়ে উঠল উল্লাসে, সানঘাগরায়? সানঘাগরার নাম আমি বাবার মুখে কতবার শুনেছি। ওইখানে নাকি বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে একবার চিতাবাঘের পাল্লায় পড়েছিলেন বাবা।
ভালুক, চিতা এখনও আছে। নেই শুধু হরিণ আর অসংখ্য ময়ূর। জঙ্গলের নির্বাসনের সঙ্গে সঙ্গে তারাও বিদায় নিয়েছে।
কীভাবে যাওয়া যাবে ওখানে?
অটো আছে, প্রাইভেট ট্যাক্সি আছে, বাস আছে। যাতে ইচ্ছে চলে যাও। তবে ইচ্ছেমতো ঘুরতে গেলে অটো কিংবা ট্যাক্সির বিকল্প নেই।
খেয়ালি বলল, ভুল বললে। তোমার চেনাজানার মধ্যে স্কুটার আছে কারও? অনেকেরই আছে। কিন্তু চালাবে কে? সৌরভদা? খেয়ালি হেসে গড়িয়ে পড়ল।
হাসলে যে?
তোমার কথা শুনে। তোমার সৌরভদা হচ্ছে রাঙা মুলো। দেখতেই লাল টুকটুকে। আসলে একটি মাকাল ফল।
তা হলে স্কুটারের খোঁজ করে লাভ কী? চালাবে কে, তুমি?
ধরো যদি আমিই চালাই।
তবে তো কথাই নেই। এসো নীচে এসো। মা বোধহয় এতক্ষণে চায়ের জল চড়িয়েছেন। চা-টা খেয়ে আমি পরেশদার স্কুটারটা পাওয়া যায় কি না দেখি। ওরা নীচে এল। তারপর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ভোরের তাজা ফসলের মতো ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।
অরবিন্দকাকু বললেন, শিল্পা বলছিল তোমরা নাকি আজই সানঘাগরায় যেতে চাও ?
হ্যাঁ।
কিন্তু তোমরা তিনজনে একটা স্কুটারে যেতে পারবে?
খেয়ালি বলল, এটা তো অভ্যাসের ব্যাপার কাকু। তা ছাড়া আপনাদের এখানে স্কুটার চালানোর অসুবিধে নেই। এমন সুন্দর পিচঢালা পাকা রাস্তা আমরা কোথায় পাব?
তা অবশ্য ঠিক। তবুও সাবধানে যেয়ো কিন্তু।
কাকিমা বললেন, অমনি ফেরার পথে জগন্নাথদর্শনও করে এসো।
অরবিন্দকাকু বললেন, এখানকার জগন্নাথদেবের মন্দির পুরীর মন্দিরের মতোই বড় সড়। অত বড় না হলেও তার কাছাকাছি। মন্দিরের সামনেই প্রশস্ত রাজপথের ওপর রাখা আছে বিশাল রথ। বহু দূর-দূরান্ত থেকে লোক আসে এখানে।
প্রথমেই চা-বিস্কুট। তারপর লুচি-হালুয়া বেশ দমভোর খাওয়া হল।
শিল্পা বলল, আমি তা হলে দেখছি স্কুটারের কী ব্যবস্থা করতে পারি।
খেয়ালি বলল, না পাও চলে এসো। আমরা একটা জিপ অথবা প্রাইভেট ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে নেব।
সৌরভ বলল, ট্যাক্সি স্ট্যান্ড তো বাজারের কাছেই। দেখি না কী বলে ওরা, কত টাকা নেয়।
অরবিন্দকাকু বললেন, বেশি নেবে না। খুব জোর আশি থেকে একশো টাকা নেবে। সেদিন কটক থেকে আমার এক বন্ধু পরিবার এসেছিল। ওদের একটা ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দিলাম তিনশো টাকায়। ওরা তেমনি গোনাসিকায় গিয়েছিল।
সৌরভ বলল, গোনাসিকা আবার কী?
গোনাসিকা হচ্ছে বৈতরণীর উৎস। পাহাড়ের এক উচ্চস্থানে সেখান থেকে বৈতরণী নেমে আসছে, সেই জায়গাটাকে ঠিক গো-নাসিকার মতো দেখতে। তাই এই নাম।
শিল্পা একটা চটি পায়ে দিয়ে খেয়ালিকে বলল, তুমি আর বসে থেকে কী করবে? এসো আমার সঙ্গে। তোমাকে দেখলে হয়তো পরেশদার মন গলে যাবে। না বলবে না।
খেয়ালি একটু হাসির ঝিলিক তুলে শিল্পার সঙ্গ নিল।
ওরা চলে গেলে সৌরভও পায়ে পায়ে নেমে এল রাস্তায়। তারপর এক-পা
এক-পা করে এগিয়ে চলল ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে।
কাছেই বাজার। ঝাঁকা ভরতি সবজি নিয়ে দেহাতিনী পসারিনিরা দলে দলে চলেছে বাজারের দিকে।
ও যখন বাজারের পাশ দিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছে ঠিক তখনই কে যেন একজন এসে ওর জামার কলার ধরল।
সৌরভ ভয় পেয়ে তাকাল তার দিকে।
গেল। সর্বনাশ! এই পাপটা এখানে কেন?
যে ধরেছিল সে বলল, আমাকে চিনতে পারছিস?
সৌরভ বলল, তা পারছি বইকী।
তোর সেই লালপরিটা কোথায়?
দেখামাত্রই বুকের রক্ত হিম হয়ে
কে লালপরি?
বলামাত্রই ঠাস করে একটা চড়।
এই নরম মিষ্টি রোদের সকালে অমন একটা চড় খেয়ে গালটা জ্বলে উঠল যেন।
পথে এখন লোকজন খুব একটা বেশি না হলেও যারা আছে তারা কেউ কিছুই বলল না। অনেকেই ভাবল হয়তো ব্যক্তিগত কোনও ব্যাপার, তাই।
কাল থেকে তোদের আমি হন্যে হয়ে খুঁজছিরে। বল সেটা কোথায়? যদি না বলি?
না বললে তোর জান আমি কয়লা করে দেব। বলে টেনেহিঁচড়ে ওকে একটা গলির ভেতর নিয়ে গেল।
সৌরভ বলল, বৃথাই মারধর করছ। আমার মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারবে না তুমি।
আমার নাম জয়রাম পতি। সম্বলপুরের অরণ্য অঞ্চলের ছেলে আমি। আমি পারি না এমন কাজ নেই। বনের পশুও আমার চেয়ে হিংস্র নয়। ওই মেয়েটাকে আমার চাই। মেনোর চোখটায় কী অবস্থা করে দিয়ে এল কাল?
সে দোষ কি মেয়েটার? আগে বলো আমাদের পেছনে লেগেছিল কারা? আমরা তোমাদের কোন ক্ষতিটা করেছিলাম?
আমি কাউকে কৈফিয়ত দিই না।
তা হলে কী করে আশা করো যে আমি তোমার কথার উত্তর দেব?
মেনোর স্কুটারটা কোথায়?
সেটা রাস্তাতেই পড়ে আছে।
কোন জায়গায়?
এখানকার রাস্তাঘাটের নাম আমি জানি না।
জয়রাম ডাকল, বলাই !
একটি ছেলে মোটর মেকানিকের কাজ করছিল, জয়রামের ডাকে এগিয়ে এল।
এটাকে হাপিস করে দে।
সৌরভ দেখল ওদের সঙ্গে পরে উঠবে না। তাই খুব জোরে একবার চেঁচিয়ে উঠল। পরক্ষণেই মুখ চেপে ধরল ওরা।
সেই মেকানিক ছেলেটি কালিঝুলি মাখা হাত নিয়েই সৌরভকে পাশের একটি গ্যারেজঘরে নিয়ে গিয়ে ঢোকাল।
জয়রামও গেল সঙ্গে। সৌরভের কানের কাছে মুখ এনে সে বলল, আজ রাত্রে সানঘাগরার আতঙ্কর গ্রাস হবি তুই। একটা চিতা বড় বেশি জ্বালাচ্ছে আজ ক’দিন ধরে। পেলে তোকে আর ওই মেয়েটাকে একসঙ্গেই উপহার দেব তাকে। বাঘটা তোদের দু'জনকে খাবে আর আমি খাব বাঘটাকে। অর্থাৎ কিনা ওটাকে গুলি করে ওর চামড়াটা নিয়ে ট্যান করাতে দেব।
সৌরভ বলল, যাই করো না কেন, মেয়েটা কোথায় তা আমি বলব না।
বলবার দরকারও নেই। কান টানলেই যেমন মাথাটা আসে, তেমনি তোর খোঁজে বেরোলেই ওকে ধরব। ও এই কেওনঝোড়েই আছে। কাল রাত্রে কত খুঁজলুম তোদের কিন্তু পেলাম না। বলে সেই মেকানিক ছেলেটিকে বলল, একে শুধু আটকে রাখিস না। ভাল করে বেঁধে রাখ, না হলে পালাবে। মুখটাও বাঁধ শক্ত করে। মুখ না বাঁধলে চেঁচিয়ে লোকজন জড়ো করবে হয়তো।
জয়রাম চলে গেল।
ছেলেটি ওর কাজ শুরু করতেই নিজমূর্তি ধরল সৌরভ।
ওর মাথাটা দড়াম করে ঠুকে দিল ছেলেটার নাকের ওপর। প্রচণ্ড আঘাত। সেই আঘাতে গল গল করে রক্ত ছুটতে লাগল নাক দিয়ে। ছেলেটি বাবারে বলে বসে পড়ল।
সেই সুযোগটা নিতে ছাড়ল না সৌরভ। সে গ্যারেজ থেকে বেরিয়েই প্রাণপণে ছোটা শুরু করল।
ততক্ষণে জয়রাম আবার ছুটে এসেছে। এসেই ওপর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে কী বেদম প্রহার! একটু পরেই জয়রাম ওকে জোর করে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে, বস্তার মুখ বেঁধে গ্যারেজ ঘরে ফেলে রাখল।
অনেক পরে সৌরভের মনে হল কোনও একটা দ্রুতগামী লরি অথবা অন্য কিছুতে করে ওরা ওকে পাচার করছে। কিন্তু কোথায়? ওর দু'চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এল। এটুকু বুঝল আর এদের হাত থেকে মুক্তি নেই।
দুশ্চিন্তার কালো মেঘ একটা ঘনিয়ে এল অরবিন্দবাবুর বাড়িতে। আসবে না-ই বা কেন? ছেলেটা সেই গেল অথচ এখনও পর্যন্ত ফেরার নাম নেই।
শিল্পা খেয়ালিকে নিয়ে স্কুটার আনতে গিয়েছিল। স্কুটার নিয়ে ফিরে এসে ওর জন্য বসে থেকে থেকে হতাশ হল।
খেয়ালি বলল, আমার মনে হয় ওর একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার। ছোট্ট জায়গা, তাই খুঁজে বের করতে অসুবিধে হবে না। চলো আমরা বাজারের দিকেই যাই।
অরবিন্দবাবু বললেন, তোরা যদি দেখা না-পাস তা হলে আমাকে এসে বলবি। বেশি দেরি করলে থানাতেই যেতে হবে আমাকে।
শিল্পা আর খেয়ালি দু'জনেই পায়ে পায়ে বাজারের দিকে এল। কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, সৌরভের কোনও খোঁজ তো পেলই না। উপরন্তু ওর ব্যাপারে বলতেও পারল না কেউ কিছু।
হঠাৎ কোথা থেকে একটা মারুতি ভ্যান যেন গোঁ গোঁ করে ছুটে এল ওদের চাপা দিতে।
ওরা দু'জনেই সভয়ে পিছু হটল। ওরা ভেবে পেল না ভ্যানটা কেন ধেয়ে এল ওদের দিকে। একটু পরেই ভ্যানের ভেতর থেকে যে নেমে এল তাকে দেখেই জ্বলে উঠল খেয়ালি। বলল, অত কাণ্ডর পরও শিক্ষা হয়নি তোমাদের, না? এখান পর্যন্ত ছুটে এসেছ শয়তান?
আমি তো তোরই খোঁজে এসেছি রে বাঘিনী। আয় আমার সঙ্গে। আজ একটা চিতার ক্ষুধা মেটাব তোকে দিয়ে।
খেয়ালি বলল, খুব সাবধান। এক পা-ও এগোবি তো দারুণ বিপদ ডেকে আনবি কিন্তু।
শিল্পা তখন চিৎকার করছে, পুলিশ। পুলিশ!
ওর চিৎকারে পুলিশ এবং পথচারি অনেকেই ছুটে এল। কিন্তু ছুটে যখন এল, মারুতি তখন হওয়া। সেই সঙ্গে জয়রামও।
সবাই জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে খুকি? অমন চেঁচাচ্ছ কেন?
ওরা তখন সব কথা খুলে বলল। এমনকী এও বলল সৌরভের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে ওই লোকটার হাত থাকতে পারে
বলে।
এদিকে সেই মেকানিক ছেলেটি দূরে দাঁড়িয়ে এদের কাণ্ড-কারখানা দেখছিল সব। শিল্পাকে সে চিনত। চিনত, কেন না সে হচ্ছে এখানকারই স্থানীয় ছেলে। তার ওপর কয়েক বছর আগে ওর মা ওদের বাড়িতে কাজ করত। তাই ব্যাপারটা বুঝে নিয়েই সে চুপি চুপি এগিয়ে এসে শিল্পাকে বলল, কী হয়েছে তোমাদের? কাকে খুঁজে পাচ্ছ না?
শিল্পা ওকে সৌরভের ব্যাপারে সব কথা বলে চেহারার বর্ণনা দিতেই ছেলেটি বলল, জয়দা তো ওই ছেলেটাকে মেরে ধুনে দিয়েছে। তারপর একটা বস্তায় পুরে বস্তার মুখ বেঁধে রেখে দিয়েছিল আমাদের গ্যারেজঘরে।
তোর এমন অবস্থা কী করে হল?
আমিই যে ওকে বাঁধতে গিয়েছিলুম। ও তখন মাথা দিয়ে আমার এই নাকের ওপর এমন একটা গোঁত্তা মারল যে আমার এখন এই হল।
শিল্পা ওর পায়ের চটি খুলে মারতে গেল ছেলেটাকে। বলল, আজকাল বুঝি এইসব কাজ করছিস? বলতে লজ্জা করছে না?
আমি কী করে জানব ও তোমাদের কেউ?
যাদেরই হোক, এইরকম কাজ করবি কেন?
আমি তো এটাকে খারাপ কাজ বলে ভাবতে পারিনি। জয়দা মাঝেমাঝে এদিকে আসে। আজও এসেছিল। ওই ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল ও নাকি কার একটা স্কুটার চুরি করে পালিয়েছে। কিন্তু মালটা কোথায় রেখেছে তা কিছুতেই বলতে চাইছে না। সেইজন্য আমাকে বলল, তোদের গ্যারেজে বেঁধে ফেলে রাখ ব্যাটাকে। যতক্ষণ না সত্যিকথা বলে ততক্ষণ ছাড়া হবে না ওকে। আমি তাই মজা পেয়ে ওই কাজ করেছিলাম।
ছেলেটা এখন কোথায়?
ওকে বেদম পিটিয়ে বস্তাবন্দি করে সাতশো আটে তুলে দিয়েছে।
সাতশো আট? সেটা আবার কী?
একটা লরির নম্বর।
লরিটা কোনদিকে গেছে বলতে পারবি?
এই তো এই রোড ধরে গেছে।
শিল্পা বলল, তা হলে হয় গোনাসিকা অথবা সানঘাগরার অরণ্যেই নিয়ে
গেছে ওকে।
খেয়ালি বলল, জয়রাম কোনদিকে গেল দেখেছিস?
না। ওকে তো দেখিনি।
ঠিক আছে। এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলিস না।
শিল্পা বলল, আমাদের উচিত এখুনি বাড়ি গিয়ে বাবাকে সব কথা বলে থানায় যাওয়া।
খেয়ালি বলল, অবশ্যই। তবে আমার ব্যাপারটা কিন্তু সম্পূর্ণ চেপে যেতে হবে এখন।
তোমার কোন ব্যাপারটা?
জয়রামের বন্ধু মেনোগুন্ডার চোখে ছুরি মেরেছি কাল। ওদের স্কুটার নিয়ে পালিয়েছি। এসব জানাজানি হলে পুলিশ কিন্তু আগে আমাকেই অ্যারেস্ট করবে। আর এখনই যদি আমি ধরা পড়ে যাই, তা হলে সৌরভকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে অসুবিধে হয়ে যাবে খুব।
শিল্পা বিস্মিত হয়ে বলল, তুমি খুঁজে বের করবে?
আমি একা তো নয়! তুমিও থাকবে সঙ্গে। আমরা সশস্ত্র সানঘাগরা অথবা গোনাসিকায় চলে যাব। এই দুটো জায়গার একটাতে অন্তত সে থাকবে। আমার মনে হয় সানঘাগরাতেই ওকে নিয়ে গেছে ওরা।
ওরা যখন নিজেদের মধ্যে এইসব আলোচনা করছে তেমন সময় সন্ত্রীক অরবিন্দবাবুই এসে হাজির হলেন সেখানে। বললেন, ব্যাপার কীরে! কোনও সন্ধান পেলি?
শিল্পা বলল, তুমি এখুনি থানায় যাও বাবা। ওর খুব বিপদ। মেনোগুন্ডার সাগরেদরা সম্ভবত ওকে সানঘাগরার দিকেই নিয়ে গেছে।
সে কী! কার মুখের খবর এটা?
যারই মুখের খবর হোক, তুমি আর দেরি কোরো না। সাতশো আট নম্বর প্লেটের লরিতে করে ওকে নিয়ে গেছে ওরা।
বলিস কীরে! আমার যে হাত-পা কাঁপছে। এ কী হল? ওর বাবা-মা এলে তাদের কী কৈফিয়ত দেব আমি?
খেয়ালি বলল, সে চিন্তা পরে করবেন। এখন একদম সময় নষ্ট করবেন না। আপনি যান। আমরা কাকিমাকে নিয়ে ঘরে যাচ্ছি।
অরবিন্দবাবু একটুও দেরি না করে থানায় গেলেন।
ওরাও ঘরে ফিরল।
অরবিন্দবাবুর স্ত্রী মা তারিণীকে ডাকতে লাগলেন।
খেয়ালি শিল্পাকে বলল, পুলিশের কাজ পুলিশ করুক। আমরা আমাদের কাজ করি। তুমি কি আমাকে সানঘাগরার পথ চিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে? হ্যাঁ পারব। যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছিলাম সেই পথটাই সোজা চলে গেছে সানঘাগরার দিকে।
তা হলে আর দেরি না করে এখুনি আমাদের পৌঁছতে হবে। চেষ্টা করতে হবে পুলিশের আগেই যাতে আমরা পৌঁছে যাই।
বাড়িতে কী বলব?
কিছুই বলবে না।
শিল্পা বলল, দাঁড়াও তা হলে, আমি ড্রেসটা একটু চেঞ্জ করে নিই।
আর শোনো, পারলে আত্মরক্ষার জন্য একটা ছুরিটুরি কিছু নিয়ো। একেবারে শুধু হাতে যাওয়াটা ঠিক নয়।
বাবার স্প্রিং-দেওয়া ছুরিটা নিচ্ছি। তোমার কিছু লাগবে?
প্রয়োজন নেই। আমার যা আছে এই যথেষ্ট।
ওরা আর দেরি না করে বাড়িতে একটু আসছি বলে স্কুটার নিয়ে বেরোল।
হাই স্পিডে স্কুটার চালিয়ে ওরা রাজপথ ধরে বনপথের দিকে এগিয়ে চলল। খেয়ালি বলল, তোমার ভয় করছে না তো?
না।
ভয় একদম করবে না। ভয় করলেই বিপদ। ভয় জয় করো, দেখবে বিপদ একসময় দূরে সরে গেছে।
শিল্পা খেয়ালিকে জড়িয়ে ধরে বলল, সত্যি, কী থেকে কী হয়ে গেল দেখো। সৌরভদার জন্য মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
কেন যে বেরোতে গেল ঘর থেকে।
আমরা স্কুটার না পেয়ে ফিরে এলে তারপর তো একসঙ্গেই যেতাম।
আসলে কী জানো তো, সৌরভ ছেলেটা খুব সহজ সরল। তবে একটা দিকে খুব ভাল হয়েছে। আমরা স্কুটার নিয়ে বেরনোর পর যদি ওদের খপ্পরে পড়তাম তা হলে কিন্তু কেউ কারও জন্যই কিছু করতে পারতাম না। পুলিশেও খবর যেত না। এখন ভয় শুধু একটাই, সৌরভকে ওরা মেরে না ফেলে। কেন না যা করে এসেছি কাল, তাতে আমাদের ওপর ওরা খার হয়ে গেছে।
ব্যাপারটা কী হয়েছিল আমাকে বলো তো? কাল তোমরা অত কথা বললে, কিন্তু আসলটাই চেপে গিয়েছিলে কেন?
খেয়ালি তখন এক এক করে সমস্ত কথাই বলতে লাগল। এমনকী ওদের ভিডিয়ো শুটিং-এর পরিকল্পনার কথাও বলল।
শিল্পা বলল, ওর জন্য কলকাতা থেকে লোক আনবার দরকার কী? সেটা এখানেও হতে পারে। ভাল লোক আছে এখানে। কটক-ভুবনেশ্বর থেকে পাওয়া যেতে পারে।
সেই একই তো ব্যাপার হল। কলকাতার াক হলে হয় কী, আমাদের মুঠোর মধ্যে ধরা থাকে।
আমিও থাকব তো তোমাদের ছবিতে?
অবশ্যই। তুমি তো থাকবেই। তুমি না থাকলে আমাদের এমন স্পট চিনিয়ে দেবে কে? তবে একটা ব্যাপারে তোমাকে আমি হিংসা করছি খুব। কোন ব্যাপারে?
সৌরভের বাবা-মা যদি বরাবরের জন্য এখানে চলে আসেন তা হলে তুমি ওকে সব সময়ের জন্যই কাছে পাবে। মাঝখান থেকে আমিই দূরে থাকব।
এই যে বললে তোমার জন্যও একটা ঘর করে দিতে, তুমি এখানে থাকবে
না?
ওটা তো কথার কথা। ওর বাবা-মা যদি রাজি না হন? বিশেষ করে আমি একটা বাড়ি পালানো বাজে মেয়ে।
যাঃ। কী যা তা বলছ? তুমি বাজে মেয়ে কেন হবে? তুমি তো অভিমান করে ঘর ছেড়ে চলে এসেছ! তা ঠিক আছে। তুমি যদি সত্যিই থাকতে চাও, তা হলে আমাদের বাড়িতেও থাকতে পারো। এখানে থেকেই পড়াশোনা করবে। দু' বন্ধুতে একসঙ্গে স্কুলে যাব আমরা।
ঠিক! তোমার বাবা-মা আপত্তি করবেন না?
তোমার মা-বাবা যদি আপত্তি না করেন।
খেয়ালি স্কুটারের গতি এবার একটু একটু করে কমিয়ে আনল। তারপর এক জায়গায় স্কুটার থামিয়ে বলল, পথটা তো এখানে দু'ভাগ হয়ে গেছে দেখছি। আমরা এখন যাব কোন পথে?
কেন, সোজা। ওই যে পাহাড়টা দেখছ, ওই পাহাড়ের মাথার ওপর সানঘাগরা।
এই পথটা তা হলে কোন দিকে গেছে?
কেল্লার পাশ দিয়ে জগন্নাথ মন্দিরে।
খেয়ালি কী যেন ভাবল। তারপর বলল, বহুদিনের পুরনো ভাঙা কেল্লা দেখছি। সৌরভকে নিয়ে গিয়ে এখনকার মতো ওখানেই তো রাখতে পারে ওরা?
সানঘাগরা ছাড়া কোথাও যাবে না।
ঠিক বলছ তুমি ?
বলাইও তাই বলল।
ওই মেকানিক ছেলেটা?
মেকানিক না ছাই। কাজ শিখছে।
তবু আমার মন বলছে এইখানটা একবার দেখে যাওয়াই ভাল। কথায় আছে যেখানে দেখবে ছাই...।
ওরা আবার স্কুটার নিয়ে এগিয়ে চলল সেই কেল্লাটার দিকে। চারদিকে গাছপালা আর ঘন জঙ্গল। পাশেই বড় একটি পাহাড়। সেই পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়েই সানঘাগরার পথ। কেওনঝোড়ের একটি পিকনিক স্পট। কিন্তু আজ কোনও ছুটির দিন নয়। তাই এই পিকনিক করতেও কেউ আসবে না। একসময় কেল্লার কাছে গিয়ে পৌঁছল ওরা।
কী ভীষণ জঙ্গল চারদিকে। আগাছায় ভরা।
ওরা এক জায়গায় ঝোপের আড়ালে স্কুটার রেখে একটা গাছের দুটো ডাল ভেঙে লাঠি করে আগাছা ঠেলতে ঠেলতে কেল্লার ভেতরে ঢুকল। খণ্ডহর।
চারদিকেই কেল্লার ধ্বংসাবশেষ। অতীতের স্থাপত্য। বর্তমানের স্মৃতি। ভাঙা
কেল্লার ফাটল দিয়ে বট-অশ্বত্থের মাথাচাড়া।
হঠাৎ এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল ওরা।
খেয়ালি বলল, ওই দেখো।
শিল্পা দু'চোখ মেলে দেখল এক জায়গায় পাতাচাপা দেওয়া বোমা রাখা আছে কতকগুলো।
আর এক জায়গায় দেখল চার-পাঁচটা মেশিনগান।
শিল্পা বলল, এ কোথায় এসে পড়লাম আমরা?
খেয়ালি হঠাৎ হিস্ করে থামতে বলল ওকে। দেখল দূরে এক জায়গায় কয়েকজন ভয়ংকর চেহারার লোক গোল হয়ে বসে কী যেন ফিস ফিস করছে নিজেদের মধ্যে।
খেয়ালি চাপাগলা বলল, এই লোকগুলোকে আমি চিনি। কাল যখন স্কুটার নিয়ে আসছিলাম, তখন দেখি না এরা দুর্দান্ত বেগে স্কুটার চালিয়ে আসছে। কিন্তু স্কুটারগুলো কই?
হয়তো ভেতরেই কোথাও রাখা আছে।
এরা এই জঙ্গলের মধ্যে কেন?
নিশ্চয়ই কোথাও ডাকাতি করতে যাবার পরিকল্পনা করছে এরা।
এই সময়ে পুলিশে একটা খবর দিতে পারলে ঠিক হয়। কিন্তু এ যা জায়গা এখানে ফোন পাব কোথায়?
এখন একটা কাজ করা যাক। এদের এই মেশিনগানগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে রাখি এসো। যাতে ওরা প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে না পায়। বলামাত্রই কাজ।
দু'জনে চটপট আগ্নেয়াস্ত্রগুলো হাতে নিয়ে কেল্লার পেছনদিকে একটা গর্তের ভেতরে ফেলতে গিয়েই দেখল সেখানেই এক জায়গায় একটি মারুতি ভ্যান রাখা আছে।
শিল্পা বলল, ওই দেখো। সেই ভ্যানটা না? যেটা আমাদের চাপা দিতে আসছিল। এটা তো জয়রামের।
হ্যাঁ, তাই তো। তার মানে রীতিমতো গোলমেলে ব্যাপার। নির্ঘাত ডাকাতির ষড়যন্ত্র।
আসলে জয়রামের সঙ্গে এই দলটার পুরোপুরি যোগসাজশ আছে। হয়তো জয়রামেরই পোষা গুন্ডা এরা। সম্ভবত কাল যখন আমাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ওদের, তখন হয়তো আমাদের ব্যাপারটা ওরা জানত না।
ওরা আর দেরি না করে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো এত কাছাকাছি না রেখে, জঙ্গলের ভেতরে একটা গাছের ডালে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখল যাতে কারও চোখে না পড়ে।
খেয়ালি ওর ছুরিটা দিয়ে সেই গাছের গুঁড়িতে একটা ক্রুশ চিহ্ন দিল। তারপর বলল, যেভাবেই হোক ভ্যানটাকে অকেজো করতে হবে। এই ছুরির ফলা দিয়েই সব চাকার হাওয়া খুলে দেব এখুনি।
ওরা সেই মতলবে যখন মারুতির কাছে এল, তখনই আর এক বিস্ময়। দেখল ভ্যানের মধ্যে বস্তাবন্দি কী যেন।
খেয়ালি বলল, নির্ঘাত সৌরভ। সে ছাড়া আর কেউ নয়।
ওরা আস্তে করে লক খুলে ভেতরে ঢুকে ছুরি দিয়ে বস্তার মুখ খুলতেই পেয়ে গেল সৌরভকে।
সত্যি! কী মারটাই না মেরেছে ছেলেটাকে। ওর চোখেমুখে কালসিটে পড়ে গেছে।
মুক্তি পেয়েই সৌরভ বলল, আমি কোথায়?
কেল্লা পাহাড়ে।
কেল্লা পাহাড়!
শিল্পা বলল, হ্যাঁ। সানঘাগরার নিম্নাচল। ওই পাহাড়ের মাথায় উঠলে তবেই যাওয়া যাবে সানঘাগরায়।
খেয়ালি বলল, তুমি এখানে কী করে এলে? তুমি যে গুম হয়েছ সে খবর আমরা এসেছি।
কিন্তু আমি এখানে আছি তোমরা জানলে কী করে?
আন্দাজে ভর করেই এসেছি এদিকে। তবে গ্যারেজের ছেলেটা আমাদের সবই বলেছে। ওরা তোমাকে একটা লরিতে তুলেছিল না?
হ্যা। পরে লরি থেকে নামিয়ে এই মারুতিতে। এটা হচ্ছে ওই শয়তান জয়রামের।
খেয়ালি বলল, মনে হচ্ছে শয়তানটা কাছাকাছিই আছে।
শিল্পা বলল, ওই লোকগুলোর দলেই হয়তো আছে। আমরা দূর থেকে দেখেছি। কাছে গেলে হয়তো দেখতে পেতাম।
এখন তা হলে করণীয়?
সর্বাগ্রে এখান থেকে কেটে পড়া।
তার আগে মারুতির চাকাগুলোর হাওয়া তো খুলে দিই। তোমরা কীভাবে এলে?
আমরা স্কুটার নিয়ে এসেছি। সেটা বাইরে একটা ঝোপের আড়ালে রাখা আছে।
সৌরভ বলল, খেয়ালি, তুমি না বলেছিলে তুমি মোটরগাড়িও চালাতে পার? তা যদি হয় তা হলে আমরা এটা নিয়েই তো পালাতে পারি।
শিল্পা বলল, পরেশদার স্কুটারের কী হবে?
যেমন আছে তেমনি থাকবে? আর খারাপ কিছু যদি হয় তখন দেখা যাবে।
খেয়ালি বলল, তোমার যুক্তিটা মন্দ নয়। তবে কি না মোটর চালানোয় আমার দক্ষতা খুব একটা নেই। অ্যাকসিডেন্ট হবার ভয়। অবশ্য এখান থেকে ওটাকে আমি বের করে নিয়ে যেতে পারব।
সৌরভ বলল, তা হলেই হবে। এখন দেখো গাড়ির চাবিটা লাগানো আছে কি না। যদি চাবি দেওয়া থাকে, তা হলে চাকার হাওয়া খুলে দিতে হবে। আর তা যদি না থাকে তা হলেই গাড়ি নিয়ে সটকান।
খেয়ালি এক-পা এক-পা করে এগিয়ে গেল মারুতিটার দিকে। গিয়ে দেখে বলল, এই, আছে আছে। চাবিটা লাগানোই আছে। তারপর বলল, তবে আমার মনে হয় আমাদের স্কুটার নিয়েই পালানোই ভাল। তার কারণ ওটা আমার দারুণ কনট্রোলে।
সৌরভ বলল, আসলে কেন আমি মারুতিটা নিয়ে পালাতে চাইছি জানো? আমার মনে হচ্ছে মারুতিটাকে রাস্তায় বের করে এক জায়গায় রেখে কোনওরকমে যদি এদের মৌচাকে একটা ঢিল মারতে পারি, আর ওই শয়তানটাকে যদি বাগে পাই তা হলে ওকেই এই বস্তায় পুরে রেখে আসব সানঘাগরায়।
খেয়ালি আনন্দের উচ্ছ্বাসে নেচে উঠল, ঠিক বলেছ তুমি। বেস্ট আইডিয়া। আ— পারে রাম — পাম, পাম পাম।
ওরা সেই পরিকল্পনা করে যেই না ঢুকে বসেছে গাড়িতে, অমনি দূর থেকে জয়রামের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল ওরা, এই! এখানে এই স্কুটার কোত্থেকে এল রে? কে রাখল এখানে?
কেল্লার ভেতরে যে লোকগুলো ছিল তারাও সতর্ক হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে এল দেখতে।
বাইরে এসে স্কুটার দেখেই বলল, সর্বনাশ! কোনও স্পাই লেগে যায়নি তো? অসম্ভব কিছু নয়। ওরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে থানা-পুলিশ করেছে। তা ছাড়া মেয়েটার চেঁচানিতে আর একটু হলেই ধরা পড়তাম পুলিশের হাতে। তুমি যা করলে রাগের মথায় দিনদুপুরে, ওইরকম কেউ করে?
আসলে কী জানিস, মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গেল। মেনোর চোখে ছুরি মেরে মেয়েটা যা করেছে না, বরাবরের জন্য চোখটাই নষ্ট হয়ে গেল ওর। এখন তা হলে কী করব বলো?
যন্তর নিয়ে রেডি হয়ে যা। কেমন যেন বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।
কেল্লার ভেতর থেকে তখন কে যেন একজন চেঁচিয়ে বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে জয়দা। সমস্ত যন্তর হাপিস।
বলিস কীরে !
একটাও কিছু নেই।
মারুতির ভেতর থেকে সৌরভ চেঁচিয়ে বলল, হল্ট। যে যেখানে আছ সে সেইখানেই থাকো। একদম নড়বে না।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই ম্যাজিক। লোকগুলো যে যেদিকে পারল দৌড়ল। দু’–একজন বোধ হয় লুকিয়েও পড়ল গাছের আড়ালে।
চারদিকে অসীম নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল তখন। যেন হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।
কয়েকটি নিস্তব্ধ মুহূর্ত। খেয়ালি গাড়ি স্টার্ট দিতেই, জয়রামের মনে পড়ল গাড়ির কথা। আর তখনই মনে হল, পুলিশের লোক হলে তো আত্মপ্রকাশ না করে, এইভাবে গাড়ি নিয়ে পালাবে না। তাই সে নিজমূর্তি ধরল এবার।
নিজেরই গুপ্তস্থান থেকে রিভলভারটা বের করে ছুটে এল গাড়ির দিকে। খেয়ালি ততক্ষণে মারুতিটাকে বের করে এনেছে জঙ্গলের ভেতর থেকে। সেই না দেখেই তো ফেটে পড়ল জয়রাম। মারুতিটা লক্ষ করেই ট্রিগার টিপল ঢিসুম।
গুলিটা ওদের না লেগে গাড়ির বড়িতে লাগল।
খেয়ালি তখন কী ভেবে যেন বেগে গাড়িটা চালিয়ে দিল জয়রামের দিকে।
জয়রামেরও এবার পালানোর পালা।
কিন্তু ততক্ষণে বিপদ যা ঘটবার তা ঘটে গেছে। অনভ্যস্ত হাতে গাড়ি চালাতে
গিয়ে গাড়িটা একটা শাল গাছের গুঁড়িতে গিয়ে জোরে ধাক্কা দিল।
এবার যে অবস্থাটা কী হবে তা ওরা জানে।
জয়রামের হাতে তখন উদ্যত রিভলভার।
সৌরভ বিপদ বুঝেই এক পাশের দরজা খুলে লাফিয়ে নামল গাড়ি থেকে।
নেমেই অব্যর্থ একটা পাথরের টিপ শয়তানের মুখে।
জয়রাম হায় রাম বা রামে রাম বলল না বটে, তবে কিছু একটা বলল। বলেই বসে পড়ল ঘাসের ওপর।
ওরা সবাই তখন ছুটে গিয়ে চেপে ধরল ওকে।
খেয়ালি তো প্রথমেই ওর হাত থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিল। নিয়েই মুখের ওপর জুতোসুদ্ধ এক লাথি।
মেয়েদের লাথিও ঠিক জায়গা মতো পড়লে সুস্বাদু লাগে না। তাই লাথি খেয়েই গাঁক করে উঠল জয়রাম।
সৌরভ বলল, কেমন লাগল দাদা? এটা হল পাটিসাপটা। এবার আসকে পিঠে বা ইডলি কেমন লাগে দেখো। বলেই বলল, আবছা একটু নলেন গুড় মাখিয়ে দিই। সকালে তুমি অনেক খানা খাইয়েছিলে, এখন তোমাকেও অনেক— অনেক খাওয়াব। এই কথা বলেই খানিকটা পিছিয়ে এসে সৌরভ জোড়া পায়ে লাফিয়ে পড়ল ওর গায়ের ওপর।
জয়রাম হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ল, সহ্য করতে না পেরে।
খেয়ালি তখন ওর চুলের মুঠি ধরে তুলে বসাল।
সৌরভ বলল, তুমি শোলে দেখছ দাদা?
জয়রাম বলল, হিন্দি সিনেমা আমি দেখি না।
তা হলে এই সমস্ত ফিল্মি টেকনিক তুমি কোত্থেকে শিখলে গুরু? যাক। এবার তোমাকে একটু রাধাবল্লভি খাওয়াই। তার সঙ্গে কষা মাংস। বলেই তার মাথাটা ধরে দুম দুম করে ঠুকতে লাগল একটা গাছের গুঁড়িতে।
এতক্ষণ মাতৃভাষা ফুটে বেরোল মুখ দিয়ে, মরি জীব রে।
সকালে আমাকে যখন মেরেছিলে আমিও তখন মরে গিয়েছিলাম। এখন মরে ভূত হয়ে ভূতের নাচ নাচছি। তুমিও ভূত হয়ে নাচবে।
খেয়ালি সৌরভকে বলল, অনেক হয়েছে। এখন দেব ব্যাটাকে একটা গুলিতে শেষ করে?
জয়রাম সঙ্গে সঙ্গে না না করে উঠল।
সৌরভ বলল, না না মারবে কী? ওর বন্ধু চিতাটা বড়ই ক্ষুধার্ত। ওকে ওই বস্তাতে পুরেই নিয়ে চলো সানঘাগরায়। যেভাবে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেইভাবে।
খেয়ালি হাঁক দিল, শিল্পা! বস্তাটা নিয়ে এসো তো, শিগগির। দেরি কোরো না একদম।
কিন্তু কোথায় শিল্পা? তার কোনও সাড়াশব্দই নেই, এমন কি চিহ্নও নেই কোথাও।
সৌরভ চেঁচাল, শিল্পা-~। তুমি কোথায়?
খেয়ালি বলল, তুমি যেখানেই থাকো, চলে এসো শিগগির। জয়রাম তখন পালাতে যাচ্ছে।
সৌরভ চকিতে একটা পা গলিয়ে দিল ওর পায়ে। যেই না দেওয়া অমনি মুখ থুবড়ে পড়ল সে।
পড়া মানে মোক্ষম পড়া যাকে বলে। একেবারে নাকমুখ থেঁতো হয়ে গেল। একটা দাঁতও মজবুত হয়ে গেল বোধহয়।
যাই হোক! মারুতির ভেতর থেকে বস্তাটা বের করে ওরা বহু কষ্টে জয়রামকে ঢুকিয়ে দিল তার ভেতর। তারপর বস্তার মুখ বেঁধে বলল, আমাদের উচিত ছিল তোমার হাত পাও বেঁধে দেওয়া। কিন্তু অত দড়ি তো নেই। তবে হাতে লাঠি আছে। ছটফট করলেই কিন্তু তুলো ধুনব।
সৌরভের হাতে লাঠি।
খেয়ালির হাতে রিভলভার। যদিও চালায়নি কখনও, তবুও ধরে রইল এমনভাবে যা দেখলে মনে হবে দিল বুঝি।
ওরা তন্ন তন্ন করে শিল্পাকে খুঁজতে লাগল চারদিকে। কিন্তু কোথায় সে? কতবার নাম ধরে ডাকল। কিন্তু এই নির্জনে ওদের ডাক প্রতিধ্বনিই হয়ে ফিরল। কোনও প্রত্যুত্তর এল না।
সৌরভ হঠাৎ এক পাশে শিল্পার এক পাটি চটি পড়ে থাকতে দেখল। দেখেই বলল, কিডন্যাপড!
তার মানে?
নিশ্চয়ই কেউ লুকিয়েছিল ধারেকাছে। আমাদের অসতর্কতার মাঝেই নিয়ে পালিয়েছে ওকে।
এই দারুণ বিপদে কী যে করবে ওরা কিছুই ভেবে পেল না। যাদের আশ্রয়ে এসে ওঠা ওদের জন্য তাদেরই যদি ক্ষতি হয় তো, এর চেয়ে লজ্জার আর কী আছে? কিন্তু কখন কীভাবে নিয়ে গেল ওকে? ওদের চোখের সামনে দিয়ে?
এই নির্জন প্রান্তরে ওরা তাই অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
খেয়ালি চেয়ে রইল সৌরভের দিকে। সৌরভ খেয়ালির দিকে। এমন প্রকাশ্য দিবালোকে এ কী অঘটন! এও কি সম্ভব?
সৌরভ বলল, শিল্পাকে না নিয়ে বাড়ি ফিরছি না
কিন্তু।
খেয়ালি বলল, তাই কি ফেরা যায়? এর চেয়ে ওরা যদি আমাকে নিয়ে যেত তা হলে দুঃখের কারণ ছিল না কিছু। কিন্তু আমরা যে বেনোজল। একটি শান্তসুন্দর পরিবেশে এসে এ কী বিপর্যয় ঘটালাম এক সুখী পরিবারের মধ্যে। সৌরভ দু'হাতে কপাল চেপে ধরে বলল, ওরা ওকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?
সানঘাগরার জঙ্গল ছাড়া এখানে আর লুকনোর জায়গা
তবে সেখানেই যাই চলো।
কোথায়?
খেয়ালি বলল, চলো তবে। বলেই স্কুটারে গিয়ে উঠল।
সৌরভ বলল, আমরা চলে গেলে এই শয়তানটার কী হবে?
ওর জন্যই তো এই বিপদ। দাঁড়াও এখন ওর ব্যবস্থাও করছি। গাড়ির ভেতরে দেখো তো, আর কোনও দড়িটড়ি আছে কি না, যদি থাকে তো নিয়ে এসো।
সৌরভ মারুতি ভ্যানের এদিক সেদিক হাতড়ে অনেক দড়ি পেল।
সেই দড়ি নিয়ে এলে খেয়ালি বস্তার মুখটা দড়ি দিয়ে বেঁধে সেটাকে স্কুটারের পেছনদিকে বাঁধল, তারপর স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে খানিকটা নিয়ে এসে বলল, এভাবে নিয়ে গেলে মরে যাবে কিন্তু। সানঘাগরা তো বেশি দূর নয়। ওকে স্কুটারেই তোলো। তারপর তুমি আমার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়াও। দেখি এইভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারি কি না।
কিন্তু না, বৃথা চেষ্টা। কিছুতেই ব্যালান্স রাখা গেল না।
খেয়ালি বলল, এক কাজ করি। একবার চেষ্টা করেই দেখি মারুতিটাকে আনতে পারি কি না। গাড়িটা ধাক্কা লেগেছে ঠিক, কিন্তু আর সব তো ঠিক আছে। বলে
একটু পিছিয়ে গিয়ে গাড়িটাতে স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আনল সেটাকে তারপর ধরাধরি করে বস্তাবন্দি জয়রামকে ভেতরে ঢুকিয়ে জোরে স্টার্ট দিল গাড়িতে।
গাড়ি স্পিড নিতেই ভয় পেয়ে গেল খেয়ালি। বলল, কেলেঙ্কারি হয়েছে। ব্রেক ধরছে না যে।
কী হবে তা হলে?
ঠিক চালিয়ে নিয়ে যাব। তবে সাবধান! সানঘাগরার কাছাকাছি গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দেব কিন্তু।
তা আর করতে হল না। পাহাড়ে ওঠার মুখেই গাড়িটা টার্ন নিতে গিয়ে আপনিই থেমে গেল।
খেয়ালি বলল, শিল্পা বলেছিল এই পাহাড়ের ঘাটগুলো পেরিয়ে ওপরে উঠলেই সানঘাগরা। তা যদি হয় তা হলে এই আধমরাটাকে টানতে টানতে ওখানেই নিয়ে যাই চলো।
ওরা বহু কষ্টে সেই বস্তাটাকে টেনে টেনে নিয়ে চলল সানঘাগরায়।
বস্তার ভেতর থেকে তখন চাপা একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে। ঘর্ষণে ঘর্ষণে জয়রাম তখন রাম রাম করছে।
সৌরভ বলল, খুব লাগছে নাকি দাদা? আহা। মরে যাইরে। এখন একটু কষ্ট করো, এরপরে মরণঘুমে এমন ঘুমোবে যে সে চোখ আর মেলবে না।
একসময় সানঘাগরায় পৌঁছে গেল ওরা। জায়গাটা যে সানঘাগরাই সেটা আর বলে দিতে হল না কাউকে। কেন না একটা ফলকে ইংরেজিতে লেখাই আছে জায়গাটার নাম।
ভারী মনোরম! কিন্তু নির্জন! এমনই নির্জন যে ভয় হয়। কী জানি কী হয়!
সৌরভ বলল, এটাকে এখন রাখি কোথায়?
কোথাও রাখারাখির দরকার নেই। টেনে নিয়েই চলো।
তাই চলল ওরা। যতটা যাওয়া যায়।
একসময় এক বিস্তীর্ণ তৃণভূমির মধ্যে এসে পৌঁছল ওরা। পাহাড়ের মাথার ওরা সেখানেই ছোট্ট একটা গুহার জঠরে ঢুকিয়ে রাখল বস্তাটাকে। খেয়ালি বলল, একদম নড়া চড়া করছে না যে। মরে গেল নাকি? মরুক। কিন্তু এই যদি সানঘাগরা হয় তা, হলে সেরকম তো ভয়াবহ কিছু নয়।
ওপরে সে এক অনবদ্য প্রকৃতির রূপ। তৃণভূমির চারপাশে বৃত্তাকারে গাছের সারি। আশপাশে শুধু পাহাড়— আর পাহাড়চূড়া। ছোট ছোট অনেক গুহাও আছে। কিন্তু এইসব গুহায় লুকিয়ে থাকার মতো কোনও জায়গা নেই।
এমন সময় ওরা একটা জলপ্রপাতের শব্দ শুনে সেইদিকে এগোল। একটা পাহাড়িয়া নদী জঙ্গলের ভেতর থেকে এঁকেবেঁকে এসে একটি মনোরম জলপ্রপাতের সৃষ্টি করেছে এখানে।
কয়েকজন আদিবাসী মেয়েপুরুষ সেই নদীর জলে কাপড় কাচছে। ওরা ফিরেও তাকাল না ওদের দিকে।
খেয়ালি তাদের জিজ্ঞেস করল, এইটাই সানঘাগরা তো?
তারা খুব গম্ভীর। তবু বলল, হ।
এখানে একটু আগে কাউকে দেখেছ?
ওরা নিজেদের মধ্যে একবার চোখ চাওয়াচাওয়ি করে ইশারায় ওদের নীচের দিকে যেতে বলল। বলেই কেমন যেন ভয় পেয়ে কেটে পড়ল ওরা।
সৌরভ বলল, কীরকম হল?
জানি না। তবে এটুকু বুঝছি সানঘাগরা সত্যিই আতঙ্কময়।
সৌরভ তখন জল যেখান থেকে নীচে পড়ছিল সেইখানে গিয়ে উঁকি মেরেই বলল, খেয়ালি! শিগগির এসো! ওই দেখ।
ওর কথা শুনে খেয়ালিও এসে ঝুঁকে দেখল নীচের দিকে। দেখে বলল, উঃ ভগবান।
ওরা দেখল নীচে একটা পাথরের ওপর অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে শিল্পা। ওর চারপাশে চাপ চাপ রক্ত। ও কি এখান থেকে পড়ে গেছে? না ফেলে দেওয়া হয়েছে ওকে? বেঁচে আছে তো?
কিন্তু শিল্পা এখানে কীভাবে এল? ওরা কীসে করে নিয়ে এল ওকে? হঠাৎই পাহাড়ের খাঁজে এক জায়গায় চার-পাঁচটা মোটর বাইক চোখে পড়ল ওদের।
ওরা আর কোনওদিকে না তাকিয়ে পথ খুঁজতে লাগল কীভাবে ওখানে নামা যায়? একটা পথ সরু হয়ে এক জায়গায় বেঁকে গেছে দেখে ওরা সেইদিকে চলল। কিন্তু খানিক গিয়েই বুঝল পথ এটা নয়। এখানে শুধুই খাদ।
খেয়ালি বলল, পথ নিশ্চয়ই আছে। না হলে ওখানে ও গেল কী করে?
ওপর থেকে ফেলে দেয়নি তো?
অসম্ভব কিছু নয়। না হলে অত রক্ত ওখানে কী করে এল? সবচেয়ে আশ্চর্য! অরবিন্দকাকু থানায় গেলেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত পুলিশের পাত্তা নেই!
হয়তো এসে ঘুরে গেছে। আর সেইজন্যে জনপ্রাণীও নেই এখানে। তাই বোধহয় আদিবাসীরা আমাদের কথা শুনে ভয়ে পালাল।
হবেও বা।
হঠাৎ এক জয়গায় এসে ওরা নীচে নামার পথ পেয়ে গেল।
সৌরভ বলল, এই তো পেয়ে গেছি।
আমরা ভুল করে ওপরের অংশে গিয়ে পড়েছিলাম। এখানে উচিত ছিল ট্যুরিস্টদের জন্য একটু পথনির্দেশ দিয়ে দেওয়া।
ট্যুরিস্ট এখানে আসে বলে মনে হয় না।
কেন আসে না বলো তো? এমন সুন্দর জায়গা!
কী করে আসবে? কোনও গাইডবুকেই তো এর উল্লেখ নেই। অথচ কী সুন্দর একটা বেড়াবার জায়গা।
আমরা যদি ভিডিয়ো নিয়ে এখানে আসি, তা হলে এই সানঘাগরাই হবে আমাদের আসল স্পট। কিন্তু সৌরভ, এ যা জায়গা, এখানে তোমরা বসবাস করতে পারবে বলে তো মনে হয় না। থাকার জন্য সুন্দর প্রকৃতি হলেই হল না, জায়গাটাও নিরাপদ হওয়া চাই।
জায়গার দোষ কী? এখন আমাদের ক্ষেত্রে যা কিছু ঘটল এ সবই তো বহিরাগতদের ব্যাপার। যাই হোক, পুলিশ আসুক-না- আসুক আমরা এদের ঘাঁটিটা কিন্তু চিনে যাব।
ওরা ধীরে ধীরে যেখানে নেমে এল, ওপরের জল সেখানে ভয়ংকর গর্জনে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ছে। অজস্র জলকণায় ধোঁয়ার মতো দেখাচ্ছে জায়গাটা। কিন্তু ওদের এখন সেইসব দেখার সময় নেই। ওরা দু'জনেই ছুটে গেল শিল্পার কাছে। তারপর ওকে চিৎ করে শুইয়ে ওর চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগল। কী ঠান্ডা বরফের মতো জল! কিন্তু এত রক্ত কীসের? দেখে মনে হল ওর তো চোটই লাগেনি কোথাও।
অনেক পরে একটু একটু করে চোখ মেলল শিল্পা। চোখ মেলে ওদের দেখেই বলল, এ কী তোমরা! উঃ কী ভয়ানক।
কেন? কী হয়েছে? তুমি এখানে এলে কী করে?
তোমরা যখন জয়রামের সঙ্গে লড়ছ, ঠিক তখনই একটা বড় গাছের আড়াল থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে শক্ত হাতে মুখ চেপে ধরল আমার। তারপর?
এমনভাবে চেপে ধরল যে আমি চেঁচাতেও পারলাম না। লোকটা আমাকে ওই অবস্থায় পিছু হেঁটে কেল্লার পেছন দিকে নিয়ে গেল। সেখানেই মোটর বাইকগুলো রাখা ছিল ওদের। তারই একটা নিয়ে চলে এল এখানে।
তারপরে কী হল? ওরা কি ওপর থেকে ফেলে দিল তোমাকে? কিন্তু সেরকম বলে তো মনে হচ্ছে না।
না ওরা যখন আমাকে এখানে নিয়ে এল, তখন দেখি না ওদের দলের সেই সব পালিয়ে যাওয়া লোকেরা এখানে বসে বসে নেশা করছে।
তাই নাকি?
তারপর ওরা খুব আজে বাজে আলোচনা করতে লাগল আমাকে নিয়ে। এমন সময়...।
এমন সময় হঠাৎ বড় একটা পাথর এসে পড়ল ওদের একজনের ওপর। লোকটা ধড়ফড়িয়ে মরে গেল।
লাশ কই তার?
বাকি লোকগুলো তাকে আরও নীচে জঙ্গলের দিকে নামিয়ে নিয়ে গেছে। সেই ভয়াবহ দৃশ্য আর রক্ত দেখেই আমি জ্ঞান হারালাম।
তা না হয় হল। কিন্তু পাথর ছুড়ে ওদের মারল কে?
জানি না। তবে আর এখানে নয়, এক্ষুনি পালিয়ে চলো এখান থেকে। এমন সময় হঠাৎ একটা ছায়া দেখা গেল। ওপর থেকে নীচে।
সৌরভ একটু পিছিয়ে এসে দেখেই বলল, নির্ঘাত পুলিশের লোক, খাঁকি পোশাক। তারপর খেয়ালিকে বলল, তুমি ছুটে ওপরে উঠে গিয়ে পুলিশকে ডেকে নিয়ে এসো। আমি এর কাছেই আছি।
শিল্পা বলল, আমি যেতে পারব। কাউকেই ডাকতে হবে না আর। এক সঙ্গেই যাই চলো।
তা হোক, পুলিশকে আসতে দাও। ওরা আসুক, দেখুক। তুমি সব কথা বলো। নীচের লোকগুলো ফিরে এলেই যাতে ওদের অ্যারেস্ট করা হয়, সেই ব্যবস্থা করে তবেই আমরা ওপরে যাব।
খেয়ালি দ্রুত উঠে গেল ওপরে।
সৌরভ শিল্পাকে বলল, কী অনবদ্য প্রকৃতি এখানে। অথচ দুঃখের ব্যাপার এই, আমরা এমন জালে জড়ালাম যে কিছুই অনুভব করতে পারলাম না এর। তাতে কী? আবার আসব আমরা।
হঠাৎ খেয়ালির আর্তস্বর ভেসে এল ওপর থেকে, বাঁচাও— ও– 3-1 বাঁচাও— ও—। সৌরভ...।
কী হল। কী হল খেয়ালির?
ততক্ষণে চার পাঁচজন দুর্ধর্ষ শয়তান এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ওদের ওপর। এরা তারাই। কিন্তু খেয়ালি অমন চেঁচাল কেন? কী হল তার? সেও কি এদেরই কারও হাতে পড়েছে? হয়তো বা। ওরা তখন ওদের দু'জনকে পাঁজাকোলা করে পাহাড়ি পথ ধরে ক্রমশ নীচের দিকে নামতে লাগল।
পুলিশ কিন্তু চুপচাপ বসে ছিল না। অরবিন্দবাবুর কথা মতো সব কিছু ডায়েরিতে লিখে নিয়েই বলল, আপনি নিশ্চিন্তে ঘরে যান। আমরা আপনাদের ছেলেমেয়ে উদ্ধার করে পৌঁছে দিয়ে আসব বাড়িতে। তবে কিনা মুশকিল হয়েছে, আমরা গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি একটা দল ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছে এখানে একটি ব্যাঙ্কে ডাকাতি করবার। আর সেইজন্যই খুব বেশি ফোর্স আমরা এই কাজে ব্যবহার করতে পারছি না। আগের দিন আমরা সানঘাগরা তোলপাড় করেছি। কিন্তু কোনও হদিসই পাইনি ডাকাত দলের। আজ ভোরেও একটা দল গিয়ে টহল দিয়ে এসেছে। তাই আমাদের মনে হচ্ছে, সানঘাগরায় নয়, ওরা ওকে গোনাসিকার দিকেই নিয়ে গেছে। কিন্তু সে জায়গাটা এত দূরে যে সেখানে ফোর্স পাঠালে কেওনঝোড় উইক হয়ে পড়বে। আর সেই সুযোগে ওরাও এখানে এসে অবাধে ডাকাতি করবার সুযোগ নেবে। সেই কারণেই এই চালটা চেলেছে ওরা। না হলে দিনদুপুরে কেউ প্রকাশ্য রাজপথ থেকে ছেলেটাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়? অরবিন্দবাবু বললেন, যাতে ভাল হয় তাই করুন স্যার। ঠিক আছে, আপনি যান। আমরা দেখছি।
পুলিশ ইনস্পেক্টর এবার কয়েকজন পুলিশকে পাঠিয়ে দিলেন খোঁজখবর নিতে।
সশস্ত্র পুলিশের ছোট্ট একটি বাহিনী এই কাজের দায়িত্ব নিয়ে রওনা হয়ে গেল। প্রথমে সানঘাগরায় এল তারা। কিন্তু না, কাউকেই পেল না এখানে। সানঘাগরার গেট সকাল ন'টার আগে খোলে না। তায় আজকে বে-বার। তাই লোকজনও নেই। এখানে গেট খোলবার যে লোক থাকে, কাছেই তার ঘর। সেও বলল সন্দেহজনক কাউকেই সে দেখেনি। এমনকী গত দু'দিনে এখানে বেড়াতেও আসেনি কেউ। তাই তারা জিপ নিয়ে গোনাসিকাতেই চলে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানেও কাউকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে পুলিশ ফিরে আসছিল এই পথে।
এমন সময় দেখল গেটকিপার রাজু রাজপথে এসে গামছা নেড়ে নেড়ে গাড়ি থামাবার সংকেত দিচ্ছে।
পুলিশের গাড়ি থামতেই রাজু বলল, হুজুর, আপনারা চলে যাবার পরে আমি গেট খুলে রেখে একটা পাগলকে তাড়াতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি একটা মেয়ে জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। আমি তাকে ধরে আমার ঘরে আটকে রেখেছি।
পুলিশের লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল সেই ঘরে।
খেয়ালি তখন ঘরের ভেতর থেকে ভীষণ চিৎকার করছে।
ইনস্পেক্টর শিকল খুলতেই বেরিয়ে এল সে। তারপর সামনে পুলিশ দেখেই চুপ করে গেল।
ইনস্পেক্টর বললেন, এ কী! চেঁচাচ্ছ কেন?
এই লোকটার খাকি ড্রেস দেখে আমরা পুলিশের লোক ভেবে ওর সাহায্য চাইতে আসছিলাম। তার জায়গায় লোকটিই এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। তাই আমি একে ডাকাতের লোক মনে করেছি।
ইনস্পেক্টর বললেন, মাই গড। তারপর গেট কিপারকে বললেন, তোমার কি বুদ্ধিশুদ্ধি একদমই লোপ পেয়ে গেছে? কোনও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ না করেই এই নৃসিংহ অবতারের মতন চেহারাটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে ওর ওপর।
লোকটি বোকা বোকা মুখে বলল, কেন হুজুর! আপনি তো বলেইছিলেন কাউকে পেলেই আটকে রাখতে।
তোমার মুণ্ডু। তারপর খেয়ালিকে বললেন, তুমি কে মা! তোমার ব্যাপারটা
কী?
খেয়ালি তখন সকালের পর থেকে সেই ঘটনার কথা সমস্ত খুলে বলল পুলিশকে।
ইনস্পেক্টর তো লাফিয়ে উঠলেন। বললেন, বলো কী! আরে! ওই দলটাকেই তো খুঁজছি। আমরা এদিকে সানঘাগরা আর গোনাসিকা করছি অথচ ওরা ছিল চোখের সামনেই ওই ভাঙা কেল্লার ভেতর? তা ওদের সেই প্রধান পাণ্ডা জয়রামের বাচ্চাটা কই?
জয়রামের বাচ্চা কেন? জয়রামই তো।
ওই হল। কোথায় সেটা।
বস্তাবন্দি করে রেখে এসেছি ওইদিকে।
চলো তো দেখি?
আগে আমার বন্ধুদের দেখবেন চলুন।
নিশ্চয়ই দেখব মা। কিন্তু সর্বাগ্রে ওই শয়তানটার হাতে হাতকড়া পরাতে চাই।
তারপর রাজুকে বললেন, পাগল তাড়াতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে? ওই-ওইদিকে তাড়িয়ে দিয়েছি। পাগলটার অদ্ভুত একটা রোগ এই যে, সে ওই ওপর থেকে দাঁড়িয়ে বড় বড় পাথর নীচে ফেলে।
সর্বনাশ! কোনওদিন তো কোনও ট্যুরিস্টকেই মেরে বসবে।
শুধু তাই নয়। নিজেও এক একসময় লাফিয়ে পড়তে যায়। যেখানে সেখানে নোংরা করে।
খেয়ালি বলল, এইবার বুঝেছি এই পাথরের ঘায়েই মরেছে লোকটা। কী ভাগ্যিস শিল্পাকে লাগেনি।
যাই হোক, পুলিশ গিয়ে বস্তার ভেতর থেকে আহত এবং ক্ষতবিক্ষত সংজ্ঞাহীন জয়রামকে টেনে বের করল। তারপর ওই অবস্থাতেই তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে ফেলে রাখল গাড়ির ভেতর।
ইনস্পেক্টর দু’জন পুলিশকে বললেন, তোমরা বন্দুক নিয়ে রেডি থাকো। না হলে ওর দলের লোকেরা এসে ওকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বলে বাকি দু’জনকে নিয়ে খেয়ালির সঙ্গে নীচে নামলেন।
কিন্তু কোথায় কে? কেউ তো নেই। তবে কী আবার ওরা শত্রুর কবলে পড়ে গেল? নাকি নিজেরাই চলে গেল এখান থেকে?
ইনস্পেক্টর কনস্টেবলদের বললেন, তোমরা খোঁজাখুঁজি করো। আমি ততক্ষণে হেড কোয়ার্টারে জানিয়ে দিই জয়রাম অ্যারেস্ট হয়েছে বলে। খেয়ালির দু’চোখ তখন জলে ভরে এল।
কনস্টেবলরা অনেক চেষ্টা করেও আর নীচে নামার কোনও পথই দেখতে পেল না।
এদিকে হয়েছে কী, সেই লোকগুলো শিল্পা ও সৌরভকে নিয়ে তাদের পথ ধরে আরও নীচে নামল। আসলে কয়েক ধাপ পাথরে পা নিয়ে নেমে একটু লাফিয়ে পড়তে হবে জঙ্গলের দিকে। এবার খুব ঢালু পথ বেয়ে একটু নামতে হবে নীচে। নামার কোনও পথ নেই। কিন্তু উপায় আছে। জঙ্গলের পাহাড়িরা এ পথ জানে, তবে পুলিশ বা অন্যান্য বহিরাগতদের এ পথ যাতায়াতের অসাধ্য।
ওদের নিয়ে নীচে নামতে দুষ্কৃতীরা একটুও বেগ পেল না। তার কারণ সৌরভ বা শিল্পা শান্ত-সুবোধ শিশুটির মতন ওদের বাধ্য হয়ে রইল। কেউ কোনওরকম বাধা দিল না।
সৌরভ ছটফট করছে না বা বাধা দিচ্ছে না দেখে, শিল্পাও নিথর হয়ে রইল। এইরকম থাকার একটাই কারণ এই যে এই অবস্থায় ছটফট করলে একেবারে খাদে গিয়ে পড়তে হবে। ফলে মরতে হবে দু'পক্ষকেই। তা ছাড়া ওদের সঙ্গে গেলে আস্তানাটাও চেনা হয়ে যাবে।
নীচে নামতে নামতে ওরা এমন একটা জায়গায় এসে পড়ল একসময় যেখানে
সানঘাগরার জলধারা একটা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। কী ভীষণ ব্যাপার সেখানে! পাশেই একটি গুহামুখ। সেটাকে দেখে মনে হল গুহাটা প্রকৃতির দান হলেও এটিকে ব্যবহারের প্রয়োজনে একটু ঘিরে ঘুরে কলেবর বৃদ্ধি করা হয়েছে। সামনেই ঘন ঝোপঝাড়। তাই বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝবেও না গুহার প্রকৃত অবস্থান কী এবং তার মুখটা কোনদিকে।
ওরা ওদের দু'জনকে নামিয়ে রেখে বলল, তোদের মতো ছেলেমেয়ের মায়ের কোল কী করে শূন্য করতে হয় এবার দেখ। এখানেই একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পেট্রল ঢেলে একটা দেশলাই কাঠি ধরিয়ে দেব শুধু। তোরা পুড়ে মরবি। আমরা দেখব।
শিল্পা ডুকরে কেঁদে উঠল এবার। বলল, কেন গো আমরা তোমাদের কোন ক্ষতিটা করেছি?
তোরা আমাদের বিরাট একটা পরিকল্পনা বানচাল করে দিয়েছিস। তা ছাড়া তোদের বাঁচিয়ে রাখলেও বিপদ আছে, কেন না তোরা চিনে ফেলেছিস আমাদের।
পাঁচজনের দু'জন রইল ওদের কাছে।
দু’জনেই শক্ত করে ওদের দুটো হাত ধরে রইল।
সৌরভ দেখল পালাবার কোনও পথ নেই এখান থেকে। কিন্তু এইভাবে মৃত্যুকেও তো বরণ করে নেওয়া যায় না।
এমন সময় হঠাৎ কোথা থেকে একদল বাঁদর সে কী ভীষণ দাপাদাপি শুরু করে দিল সেখানে।
লোকদুটো ওদের ছেড়ে যেই না বাঁদরগুলোকে তেড়ে গেল, অমনি তাদের যত রাগ গিয়ে পড়ল ওই লোকগুলোর ওপর।
ততক্ষণে গুহার ভেতর থেকে বাকি তিনজন বেরিয়ে এসেছে হইচই শুনে।
যার হাতে পেট্রলের টিন ছিল, তার হাত থেকে সেই টিন উলটে গিয়ে কী কেলেঙ্কারি। চারদিকে ছড়িয়ে গেল পেট্রল। এদিকে বাঁদরের আঁচড় কামড়ে অবস্থা এমনই শোচনীয় হল তাদের, যে ধূলোয় পড়ে সেই পেট্রল গায়ে মাখামাখি হয়ে একাকার হয়ে গেল।
সৌরভ বলল, এমন সুযোগ আর হবে না শিল্পা। তুমি পালাও। আমি দেখছি কী করা যায়।
পালাবে কী? মেয়েটা তখন সভয়ে জাপটে ধরেছে সৌরভকে।
সৌরভ বলল, এ কী করছ? ছাড়ো ছাড়ো। ভয় পেলে কী করে হবে? আমাকে শুধু একটা কাজই করতে দাও এখন। সেই কাজ সম্পন্ন হলেই সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হব আমরা। সানঘাগরায় কোনও আতঙ্ক আর থাকবে না।
শিল্পা ছেড়ে দিল সৌরভকে।
সৌরভ ওর একটা হাত ধরে বলল, তোমার যদি খুব ভয় করে তবে আমার সঙ্গে এসো। বলেই পেট্রল বাঁচিয়ে গুহার দিকে এগোল ওরা।
শিল্পা বলল, তোমার কী মাথাখারাপ হয়েছে? এই শত্রুপুরীতে কেউ ঢোকে না? এখন এখানেই ঢুকতে হবে। তারপর দেখোই না কী করি।
সৌরভ শিল্পাকে গুহার মধ্যে রেখে এদিক সেদিক হাতড়াতেই একটা দেশলাই পেয়ে গেল। তারপর সেই কাঠিটা ছড়িয়ে থাকা পেট্রলে ধরিয়ে দিতেই মহা কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপারে যাকে বলে।
বাঁদরগুলো তো লাফিয়ে লুফিয়ে পালালো। শুধু পালাল নয়, একেবারে উধাও হয়ে গেল এই অঞ্চল থেকে। কেন না আগুনে ওদের বড় ভয়। আর সেই পঞ্চতস্কর?
ছড়িয়ে পড়া আগুনের হাত থেকে তারা কেউই রক্ষা পেল না। লেলিহান অগ্নিশিখা তাদের শরীর স্পর্শ করে জ্বালিয়ে মারতে লাগল তাদের, কিন্তু সেই আগুনকে অতিক্রম করে সৌরভ ও শিল্পাও পালাতে পারল না গুহার ভেতর থেকে। কী আগুন! কী আগুন!
শুকনো লতাপাতায় আগুন ধরে ভয়ানক কাণ্ড ঘটে গেল একটা।
ধোঁয়ায় ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে গেল চারদিক। সেই ধোঁয়ায় দম যেন বন্ধ হয়ে এল। শিল্পা আবার শক্ত করে চেপে ধরল সৌরভকে। ওরা ক্রমশ গুহার শেষ পর্যন্ত গিয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল। বাইরের বাতাস ভেতরে না আসায় নিস্তেজ হয়ে পড়ল ওরা। একসময় দু'জনেই লুটিয়ে পড়ল সেখানে।
বাঁদরের দাপাদাপি, লোকগুলোর চিৎকার আর এই লেলিহান অগ্নিশিখাই পথ চিনিয়ে পুলিশবাহিনীকে নামিয়ে আনল সেখানে।
জয়রামের গ্রেফতার হওয়ার খবর পেয়েই ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ সেখানে এসে হাজির।
শিল্পা আর সৌরভকে গুহার ভেতর থেকে বের করে যখন ওপরে ওঠানো হল তখন চোখ মেলেই অবাক হয়ে গেল সৌরভ, এ কী! বাবা, মা! তোমরা? খেয়ালি উল্লসিত হয়ে বলল, আমার মা-বাবাও এসেছেন। কী সাংঘাতিক ছেলে তুমি। ভেতরে ভেতরে তোমার বাবাকে দিয়ে আমাদের বাড়িতে খবর পাঠিয়েছ, একথা একবারও বলোনি তো আমাকে?
ভার্গব বললেন, ভাগ্যিস একা পাঠিয়েছিলুম, তাই কত বড় একটা অ্যাডভেঞ্চার করতে পারলি বল তো?
বিনতা বললেন, থাক। খুব হয়েছে। আর একটু হলেই মরে যেত ছেলেমেয়েগুলো।
খেয়ালির বাবা-মাও সৌরভকে অনেক আদর করলেন। করবেন নাই বা কেন? মেয়েটার জন্য কী দুর্ভাবনাই না হয়েছিল তাঁদের।
অরবিন্দকাকুও শিল্পাকে টেনে নিলেন বুকে।
ভার্গব বললেন, কাল রাতে তোর ফোন পেয়ে খেয়ালিদের বাড়িতে গিয়ে ওর বাবা-মায়ের কাছে খবর দিয়ে আজ ভোরেই একটা গাড়ি নিয়ে রওনা হয়েছি আমরা। এসেই শুনি এই কাণ্ড।
শিল্পা বলল, বাবা, পরেশকাকুর স্কুটারটা কিন্তু কেল্লার ওখানে রয়ে গেছে। ইনস্পেক্টর বললেন, ওর জন্য কোনও চিন্তা নেই। ওটা তোমাদের বাড়িতেই পৌঁছে যাবে একসময়। ,
তাবড় তাবড় পুলিশ অফিসাররা তখন ওদের দিকে অভিনন্দনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
ওরা আর দেরি না করে পুলিশের গাড়িতেই ফিরে এল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন