সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ইসাবেলের ঘর থেকে বেরিয়ে আরাকিয়েলদের দোতলাটা ঘুরে- ঘুরে দেখছিল মিতিন। ভিতরবারান্দা, রান্নাঘর, বাথটব শোভিত স্নানাগার, নির্মলার থাকার জায়গা, জেসমিনের ডেরা…। জেসমিন থাকে ইসাবেলের শয়নকক্ষের একেবারে উলটো প্রান্তে। ঘরটা ওরকমই বড়, তবে আসবাবপত্র দিব্যি আধুনিক। কম্পিউটার, টিভি আর মিউজিক সিস্টেম মজুত। এ ঘর থেকেও টেরেসে যাওয়ার একটা দরজা আছে।
টেরেসে দাঁড়িয়ে মিতিন বলল, “আপনাদের গাড়িবারান্দার এই ছাদটাই বাড়ির সেরা জায়গা। কী হাওয়া এখানে।”
মিতিন-টুপুরের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরছিল জেসমিন। হেসে বলল, “এই জায়গাটা আমারও খুব প্রিয়। কত সময় আমি এখানে বসে গান শুনি, বই পড়ি…”
টুপুর বলল, “আমি হলে তো রাতে মাদুর পেতে এখানেই শুয়ে থাকতাম।”
“পারতে না। বড্ড মশা।” জেসমিন হাসিটাকে ছড়িয়ে দিল। মিতিনকে জিজ্ঞেস করল, “এবার এককাপ কফি হবে নাকি?”
“চলতে পারে। তবে তার আগে একবার নির্মলার সঙ্গে বসব।”
জেসমিনের হাসি নিবল, “আপনার কি নির্মলাকে সন্দেহ হয় ম্যাডাম?”
“নট এগ্জ্যাক্টলি। সেদিন রাতের ডিটেলটা আমি প্রত্যেকের মুখ থেকেই আলাদা-আলাদাভাবে শুনতে চাই। নীচে ভাড়াটেদের কাছেও যাব।”
“বেশ। নির্মলাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
নিজের ঘরের মধ্যে দিয়ে অন্দরে গেল জেসমিন। মিনিট দুয়েকের মধ্যে নির্মলা হাজির। কোমরে জড়ানো ন্যাপকিনে হাত মুছতে মুছতে বলল, “আমায় ডাকছেন?”
কোনও ঘোরপ্যাঁচ নয়, মিতিন সরাসরি প্রশ্ন হানল, “হিরেটা কে সরিয়েছে বলো তো?”
নির্মলা পলকের জন্য থতমত। পরক্ষণে অবাক স্বরে বলল, “আমি কী করে বলব?”
“তুমিই তো বলবে। চুরিটা হয়েছে মিস্টার আরাকিয়েলের মৃত্যুর রাতে। এবং একমাত্র তুমিই গোটা রাত ওই ঘরে ছিলে।”
“কে বলেছে?”
“তা জানার তো দরকার নেই। যা জিজ্ঞেস করছি, তার উত্তর দাও।”
নির্মলা একটুক্ষণ চুপ। আস্তে-আস্তে ঠোঁটে একটা ফ্যাকাশে হাসি ফুটেছে। কেটে-কেটে বলল, “খবরটা যে-ই দিয়ে থাক, ভুল বলেছে। আমি মোটেই সারারাত ওই ঘরে ছিলাম না। দু’-দু’বার তো কিচেনে যেতে হল। কফি বানাতে।”
“কখন? কত রাতে? মিসেস আরাকিয়েল জেসমিনের ঘরে শুতে যাওয়ার পর ?”
“হ্যাঁ। জেসমিন আন্টিকে নিয়ে গেল। একতলার পিটার আঙ্কল তো আগেই নেমে গিয়েছিলেন নীচে। মিস্টার হ্যারি আর অ্যালবার্ট গিয়ে বসলেন লাইব্রেরিরুমে। আঙ্কলের ফিউনারেল নিয়ে ওঁরা আলোচনা করছিলেন। তখনই মিস্টার হ্যারি আমায় ডেকে কফি বানাতে বলেন।”
“তার মানে আঙ্কলের ঘরে তখন আর কেউ নেই?”
“না, মিস্টার কুরিয়েন ছিলেন। উনি অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ, আঙ্কলের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে প্রেয়ার করছিলেন। আমি ওঁকেও এককাপ কফি দিই।”
“মিস্টার কুরিয়েন ছিলেন কতক্ষণ?”
“কফি শেষ করেই তো চলে গেলেন। ফের সেই সকালে এসেছিলেন।”
“তুমিই শুধু রয়ে গেলে মিস্টার আরাকিয়েলের ঘরে?”
“একা ছিলাম না। কাপগুলো রাখতে এসে জেসমিনের রুমে গিয়েছিলাম। আন্টিকে দেখতে। ফিরে দেখি, মিস্টার হ্যারি আর অ্যালবার্ট বসে আছেন আঙ্কলের পাশে।”
“তারপর?”
“ওঁরা আমায় বললেন একটু রেস্ট নিতে। আমার একদম ইচ্ছে করছিল না। আঙ্কল আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, নিজের মেয়ের মতো মনে করতেন…।”
নির্মলার গলা আবেগে বুজে এল। ঘনঘন চোখ মুছছে। মিতিন যেন দেখেও দেখল না। কাঠখোট্টাভাবে বলল, “আর দ্বিতীয়বার কফি করতে গেলে কখন?”
“সাড়ে তিনটে নাগাদ। মিস্টার হ্যারির ঢুলুনি আসছিল, ঘুম তাড়াতে…।”
“তুমি ছাড়া তখন কি মিস্টার হ্যারিই শুধু আঙ্কলের কাছে…?”
“অ্যালবার্টও ছিল। ওদের কফি দিয়ে এর পর আমি নিজের রুমে যাই।”
“শুতে?”
“না। মা মেরির কাছে প্রার্থনা করছিলাম, আঙ্কলের আত্মা যেন শান্তি পায়।”
“ফের আঙ্কলের ঘরে এলে কখন?”
“ভোর হওয়ার মুখে-মুখে।”
“তখন ঘরে কে কে ছিল?”
“কেউ না। অ্যালবার্ট নীচে চলে গিয়েছিল। মিস্টার হ্যারি ঘুমোচ্ছিলেন। ড্রয়িংরুমে। আমি গিয়ে বসার পরই অবশ্য মিস্টার হ্যারি জেগে যান। তারপর সকাল হওয়া পর্যন্ত তো আমি আর মিস্টার হ্যারি…।” নির্মলা মিতিনের চোখে চোখ রাখল, “পুলিশকেও আমি একই কথা বলেছি। মিলিয়ে দেখবেন।”
“ঠিক আছে, তুমি যাও! জেসমিনকে বলো, আমরা ড্রয়িংরুমে আসছি। ওখানেই কফি খাব।”
নির্মলা চোখের আড়াল হতেই টুপুর কলকলিয়ে উঠল, “নির্মলাকে পুরো বিশ্বাস কোরো না মিতিনমাসি। ওর চোখ দু’টো মোটেই সুবিধের নয়।”
“দুনিয়ায় ক’জনই বা পুরো সত্যি বলে রে টুপুর ! ঘেঁটে-ঘেঁটে সত্যিটাকে বের করতে হয়।”
“কিছু কি ধরতে পারলে?”
“সবে তো কলির সন্ধে।” মিতিন মৃদু হাসল, “চল, কফিতে চুমুক দিয়ে একতলার কাজটাও আজ চুকিয়ে ফেলি।”
শুধু কফি নয়, সঙ্গে এবার প্লেটভর্তি কাজু-চানাচুর। জেসমিন জোর করে একখানা খামও ধরিয়ে দিল মিতিনকে। অগ্রিম বাবদ চেক। না নিলে আন্টির নাকি অস্বস্তি হবে।
ইসাবেলের সঙ্গে অবশ্য আর দেখা হল না মিতিনদের। তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন ঘরে। জেসমিনকে বিদায় জানিয়ে মিতিন-টুপুর এসেছে ডিসুজাদের দরজায়।
একবার নয়, বারতিনেক বেল বাজানোর পর পাল্লা খুলেছেন দশাসই চেহারার এক প্রবীণ। বছর সত্তরের মানুষটির গায়ের রং ঈষৎ তামাটে, মাথাজোড়া টাক, চোখের পাতা ফোলা-ফোলা। পরনে গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট আর হাফহাতা গেঞ্জি।
হাসি-হাসি মুখে বৃদ্ধ বললেন, “ইয়েস?”
ইংরেজিতেই কথা শুরু করল মিতিন। হেসে বলল, “আমি দোতলার হিরে চুরির ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছি।”
“কী চুরি?”
“হিরে। মিস্টার জোসেফ আরাকিয়েলের।”
“না না, আমি মিস্টার ডিসুজা। আরাকিয়েলরা উপরে থাকে। ওই যে সিঁড়ি।”
টুপুর আর মিতিন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ভদ্রলোক বোধ হয় কানে ভাল শোনেন না। এঁর সঙ্গে কীভাবে কথা চালানো যায়?
তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে মিতিন নিজের কার্ডটা বের করে দিল। চোখ থেকে অনেকটা তফাতে ধরে পড়লেন পিটার। তারপর একবার মিতিনকে দেখছেন, একবার টুপুরকে।
গলা সামান্য চড়িয়ে মিতিন বিনীতভাবেই বলল, “আমরা কি ভিতরে যেতে পারি?”
“ও শিওর। কাম ইন।”
বড়সড় ড্রয়িংরুমখানা রীতিমতো অবিন্যস্ত। সোফাগুলো দামি, কিন্তু এখন বেশ তেড়াবেঁকা দশা। কাগজ, জলের বোতল, আর সিগারেটের প্যাকেট ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র। সেন্টার টেবিলে তাস। ঘরটা বোধ হয় পরিষ্কারও হয় না নিয়মিত। আসবাব-কার্পেট- মেঝেতে ধুলোর আস্তরণ।
মিতিন-টুপুর অন্দরে আসতেই পিটার যেন খানিক ব্যস্ত হয়েছেন। বিছানো তাস প্যাকেটে ভরতে-ভরতে বললেন, “বোসো। বিপত্নীকের ফ্ল্যাট তো, একটু অযত্নেই থাকে।”
“না না, ঠিক আছে।” মিতিন আর টুপুর বসেছে পাশাপাশি। মিতিন ফের গলা তুলে বলল, “আপনি নিশ্চয়ই হিরে চুরির সংবাদটা জানেন ?”
“জানব না? এত থানা-পুলিশ হয়ে গেল!” পিটারের ঘড়ঘড়ে গলা বেজে উঠল, “ওফ, পুলিশ আমাদের যা নাস্তানাবুদ করেছে। অ্যালবার্ট, মানে আমার ছেলে তো বাড়িতে থাকতেই চাইছে না। এমনিই মা মারা যেতে কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল…।”
“এখনও বুঝি উনি বাড়ি নেই?”
“আজ একটা কাজে বেরিয়েছে। দু’জন ফরাসি টুরিস্টকে কলকাতা দেখাচ্ছে।”
“গাইডের কাজ করেন বুঝি?”
“ওই আর কী। ও যে কখন কী করে…।”
টুপুর কানে কানে মিতিনকে বলল, “তা হলে আর এখানে বসে কী লাভ? চলো, উঠে পড়ি।”
মিতিন যেন শুনেও শুনল না। সামান্য ঝুঁকে পিটারকে বলল, “আপনাকে কি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি? জেরা নয়, কৌতূহল।”
“বলো কী জানতে চাও?” পিটার টানটান হলেন, “তবে আমি কিন্তু ওই চুরির ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না।”
“হিরেটার ব্যাপারে তো জানেন?”
“জোসেফের মুখে শুনেছি। ওর ঠাকুরদার ঠাকুরদা ছিলেন সুরাটের নামী ডাক্তার। গুজরাতের কোনও এক স্থানীয় রাজাকে কঠিন অসুখ থেকে বাঁচিয়ে ওই হিরে উপহার পেয়েছিলেন। জোসেফ বড় সাবধানে রাখত রত্নটিকে।”
“আপনি কখনও হিরেটা দেখেছেন?”
“না। অনাত্মীয় কাউকে দেখানোর নাকি রেওয়াজ ছিল না।”
“আরাকিয়েল পরিবার সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?”
“আমি ওদের খুব সম্মান করি। অর্থবান আর্মেনিয়ান হিসেবে জোসেফের একটা অহংকার ছিল বটে, তবে আচার-ব্যবহারে কখনও সৌজন্যের অভাব দেখিনি। সত্যি বলতে কী, দীর্ঘদিন রেলে চাকরি করেছি, রিটায়ারমেন্টের আগে ডিজিএম হয়েছিলাম, কিন্তু জোসেফের তুলনায় আমি তো নেহাতই চুনোপুঁটি। অথচ জোসেফ আমাকে বন্ধুর মতোই দেখত। ইদানীং জোসেফ দানধ্যানও করছিল খুব। কলকাতার আর্মেনিয়ান কলেজ অ্যান্ড ফিলানথ্রপিক অ্যাকাডেমিতে মোটা ডোনেশন দিত। প্রায়ই বলত, বউটউ না থাকলে গোটা সম্পত্তিটাই নাকি লিখে দিত অ্যাকাডেমিকে, কোনও হোমটোম করার জন্যে। আর্মেনিয়া থেকে অনেক গরিব-দুঃখী ছেলে এখানে এসে পড়াশুনো করছে তো, তারা যেন এখানে একটা আস্তানা পায়।”
মিতিনের ভুরুতে পলকা ভাঁজ পড়েই মিলিয়ে গেল, “আর মিসেস আরাকিয়েল কেমন?”
“যথেষ্ট সহৃদয় মহিলা। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মিসেস আরাকিয়েল যেভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তা বলার নয়। তাই তো সেদিন দুঃসংবাদটা পেয়েই অ্যালবার্টকে নিয়ে উপরে ছুটলাম। অ্যালবার্ট এমনই অবশ্য দোতলায় বেশি যেতে চায় না…।”
“কেন?”
“জেসমিন ওকে তেমন পছন্দ করে না যে। মেয়েটা একটু নাকউঁচু ধরনের। ওর মামারা ছিল গালস্টুন ফ্যামিলির, সেই দেমাকেই যেন ফুটছে।”
টুপুর জিজ্ঞেস করল, “গালস্টুনরা খুব বড়লোক ছিলেন বুঝি?”
“শুধু বড়লোক কী বলছ, টাকার কুমির। জোহানেস গালস্টুন তো এক সময় সাড়ে তিনশোখানা বাড়ি বানিয়েছিলেন কলকাতায়। দক্ষিণ কলকাতার কুইন্স পার্ক, সানি পার্ক, ওঁরই হাতে তৈরি। এখন যেখানে নিজাম প্যালেস দ্যাখো, ওই জায়গাটাও ছিল গালস্টুনদের। বিশাল একটা পার্ক ছিল ওখানে। গালস্টুনদেরই নামে। তারপর তো হায়দরাবাদের নিজাম জায়গাটা কিনে…।”
পিটার বকবক করেই চলেছেন। মিতিন থামাল বৃদ্ধকে। গল্পের মাঝেই প্রশ্ন জুড়ল, “আপনার সঙ্গে জেসমিনের সম্পর্ক কী রকম?”
“আমিও ওই মেয়ের সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলি না। এমন অসভ্য… আমার ফ্ল্যাটের পাশেই বাহারি মোমবাতি বানাচ্ছে… ভুলেও একটা উপহার দিল না কোনও দিন !”
“সত্যি, এ ভারী অন্যায়।” মিতিন ভঙ্গি করল, “আচ্ছা, হ্যারির সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?”
“অল্পস্বল্প। দেখা হলে হাসে, কেমন আছি জিজ্ঞেস করে…। তবে অ্যালবার্টের সঙ্গে ওর খাতিরটা আর-একটু বেশি।”
“কী করে হল?”
“শুনেছি হ্যারির হোটেল শিলটনকে ও টুরিস্ট জোগাড় করে দেয়।”
“বুঝলাম।” মিতিন কবজি উলটে ঘড়ি দেখল। দুম করে প্রশ্ন থামিয়ে বলল, “অনেক ধন্যবাদ মিস্টার ডিসুজা। আজ তা হলে উঠি। পরে একদিন অ্যালবার্টের সঙ্গে নয় মোলাকাত হবে।”

“ওই হতচ্ছাড়াকে কি সহজে বাড়িতে পাবে?” পিটার মাথা নাড়লেন, “বরং অ্যালবার্টের মোবাইল নম্বরটা রাখো। তবে হিরের ব্যাপারে ও কিছু বলতে পারবে বলে মনে হয় না।”
মিতিন আর কথা বাড়াল না। নম্বরটা চুপচাপ তুলে নিল নিজের মোবাইলে।
পিটারের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে টুপুর ফিক করে হাসল, “চেঁচিয়ে- চেঁচিয়ে কথা চালাতে গিয়ে তোমার গলা চিরে যায়নি মিতিনমাসি?”
“ওফ, তাও আবার ইংরেজিতে!” মিতিনও হাসছে, “একটা অভিজ্ঞতাও হল। ভাবছি এবার থেকে জেরা করতে বেরোলে ব্যাগে লবঙ্গ রেখে দেব।”
কুরিয়েনের ফ্ল্যাটে অবশ্য চিৎকারের প্রয়োজন হল না। ফটর- ফটর ইংরেজি বলারও নয়। বছর ষাটেকের কেরালাইট ক্রিশ্চানটি ভালই বাংলা জানেন। সম্ভবত ব্যবসার সুবাদেই। শীর্ণকায় মিসেস কুরিয়েনও বোঝেন মোটামুটি। তবে মিতিনের ভিজিটিং কার্ড দেখে এবং আগমনের উদ্দেশ্য শুনে দু’জনের কেউই প্রীত হলেন না।
মিতিনরা বসতে না-বসতেই কুরিয়েন গজগজ করে উঠলেন, “এভাবে আমাকে বারবার জ্বালাতন করার কী অর্থ?”
বিরক্তিটাকে বিশেষ আমল দিল না মিতিন। ঠান্ডা গলায় বলল, “উপায় নেই বলেই তো আসা। মিস্টার আরাকিয়েলের মৃত্যুর রাতে আপনার হোয়্যার অ্যাবাউটস্টা জানাটা খুব ভাইটাল।”
“পুলিশকে তো বলেছি।”
“আমাকেও বলুন।”
“আপনি কে, অ্যাঁ?” লুঙ্গি-শার্ট পরা কুরিয়েন তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “মিসেস আরাকিয়েল আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করেছেন বলে কি মাথা কিনে নিয়েছেন? আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে আমি বাধ্য নই।”
“বলবেন কি না বলবেন সে আপনার ইচ্ছে।” মিতিনের স্বর আচমকাই কঠিন, “মনে রাখবেন, লজিক্যালি আপনিই কিন্তু মেন সাসপেক্ট।”
মোটা-মোটা সাদা গোঁফের ফাঁক থেকে প্রশ্ন ঠিকরে এল, “কোন হিসেবে?”
“কারণ তো অনেক। প্রথমত, আপনার চিটফান্ডের অবস্থা এখন খুব ভাল নয়। যারা টাকা রেখেছিল, তুলে নিতে চাইছে। আর আপনিও টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, আপনার আগের কোম্পানিগুলো… মানে এখনকার বিজনেস আগে যেসব নামে ছিল…।”
“দাঁড়ান-দাঁড়ান। আমার ব্যবসার খবর আপনি কোথা থেকে পেলেন?”
“বাজারে আপনার রেকর্ড তো ভাল নয় স্যার। খবর তো বাতাসে উড়ছে।” মিতিন বেতের চেয়ারে হেলান দিল, “তারপর ধরুন, চটজলদি লাভের আশায় যেসব শেয়ার কিনেছিলেন, সেগুলোও তো ডুবুডুবু। হালে পানি পেতে এখন আপনার অনেক টাকার দরকার। পুলিশ তো বলছে, আপনি সম্ভবত ডায়মন্ডটা বেচে…।”
“বেচার প্রমাণ পুলিশের হাতে আছে নাকি?”
“প্রমাণ পুলিশ ঠিক বের করে নেবে। একবার হাতে দড়ি পড়তে-পড়তে বেঁচে গিয়েছেন, এবার আপনাকে গারদে পোরা এমন কিছু শক্ত হবে না।”
“আপনি কিন্তু বাড়ি বয়ে এসে আমায় ইনসাল্ট করছেন ম্যাডাম।”
“ইনসাল্ট কি সতর্কবাণী সেটা পরে টের পাবেন। শুধু শুনে রাখুন, আপনি যে সেদিন সিন্দুক খুলেছিলেন তার কিন্তু একজন প্রত্যক্ষদর্শী আছে।”
“মিথ্যে। ডাহা মিথ্যে।” কুরিয়েন প্রায় লাফিয়ে উঠেছেন, “আমি সিন্দুক স্পর্শও করিনি।”
“নির্মলা যখন কফি বানাতে গেল, তখন কি একা ঘরে শুধুই ধ্যান করছিলেন? ভুলে যাবেন না, ও ঘরের চারটে দরজাই তখন খোলা।”
“মোটেই না। ভিতরবারান্দার দরজা তখন ভেজানো ছিল।”
“প্রেয়ার করতে-করতে সেটাও লক্ষ করেছেন তা হলে?”
“হ্যাঁ...না…মানে...আগেই চোখে পড়েছিল।”
“বটে?”
মিতিনের ধারাল দৃষ্টির সামনে এবার যেন বেশ মিইয়ে গেলেন কুরিয়েন। স্বর নরম করে বললেন, “আপনি কিন্তু মিছিমিছি আমাকে জড়াচ্ছেন ম্যাডাম। মা মেরির নামে শপথ করে বলছি, হিরে আমি নিইনি।”
এতক্ষণে মিসেস কুরিয়েনেরও বাক্য ফুটেছে। ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, “আমার স্বামী আর যাই হোন, চোর-বাটপাড় নন। নেহাতই সংসারী মানুষ আমরা। দু’-দু’টো মেয়ে আছে, তাদের ভাল ঘরে বিয়ে দিয়েছি… সমাজে আমাদের প্রতিষ্ঠাও কম নয়। এক সময় ব্যবসায় একটু এদিক-ওদিক হয়েছিল ঠিকই, তা বলে উনি অন্যের বাড়ি থেকে হিরে হাতিয়ে নেবেন? এ আমি মরে গেলেও বিশ্বাস করব না। ঢের হয়েছে, এখন আপনারা আসতে পারেন।”
মিস্টার কুরিয়েনের পাংশু হয়ে থাকা মুখখানা দু’-চার সেকেন্ড দেখল মিতিন। তারপর মিসেস কুরিয়েনকে বলল, “বেশ তো, চলে যাচ্ছি। আপনিই বরং আপনার হাজব্যান্ডকে একটা প্রশ্ন করবেন।”
“কী?”
“একা ঘরে মিস্টার আরাকিয়েলের মৃতদেহের উপর ঝুঁকে উনি কী করছিলেন।”
বলেই আর বসল না মিতিন। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এসেছে টুপুরকে নিয়ে।
টুপুরের পেট কৌতূহলে ফুলছিল। গাড়িবারান্দায় এসে জিজ্ঞেস করল, “এটা কেমন হল মিতিনমাসি? জানলে কী করে মিস্টার কুরিয়েনই সিন্দুক খুলেছিলেন?”
মিতিন মুচকি হাসল, “ধরে নে, মনশ্চক্ষে দেখেছি।”
“তুমি শিওর, হিরে মিস্টার কুরিয়েনই নিয়েছেন?”
“ক্রমশ প্রকাশ্য। সবে তো পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো শুরু হল। এবার দ্যাখ না, একটু-একটু করে কেমন ঝাঁঝ ছড়ায়।”
“আশ্চর্য! মিস্টার কুরিয়েনের ব্যবসার হালহকিকতই বা এত জেনে ফেললে কীভাবে?”
“দুয়ে-দুয়ে চার করে।” মিতিন আলগা টোকা দিল টুপুরের মাথায়, “বুদ্ধিটাকে খেলা, তা হলেই বুঝে যাবি।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন