সুচিত্রা ভট্টাচার্য
সকাল থেকে আকাশ আজ মেঘলা। একফোঁটা হাওয়া নেই। চৈত্রমাসের দশ তারিখ হয়ে গেল, এখনও একটা কালবৈশাখী এল না। রোজই বেলা বাড়লে মেঘগুলো বেপাত্তা হয়ে যায়, চলতে থাকে বিচ্ছিরি চাঁদিফাটা গরম। ভ্যাপসা-ভ্যাপসা। গা জ্বালানো।
গরমের মধ্যেই টুপুরকে নিয়ে দুপুরে বেরিয়ে পড়েছিল মিতিন। ঢাকুরিয়া থেকে ট্যাক্সি ধরে সটান নিউ মার্কেট। নতুন থানাটায়।
আরক্ষা বাহিনীর অফিস রীতিমতো ব্যস্ত তখন। ঘরখানা পেরিয়ে মিতিন ওসি-র চেম্বারে উঁকি দিয়েছে।
মধ্যবয়সি থলথলে চেহারার অফিসারটি এক কনস্টেবলকে খুব দাবড়াচ্ছিলেন। মিতিনদের দেখে তাঁর গলা দিয়ে বুলেট ছিটকে এল, “ইয়েস?”
মিতিন ঋজু স্বরে বলল, “আমি প্রজ্ঞাপারমিতা মুখোপাধ্যায়। আপনাকে সকালে ফোন করেছিলাম…।”
“অ। আপনিই তিনি ? আসুন। সঙ্গে লেজুড়টি কে?”
“আমার বোনঝি। কেসে আমাকে হেল্প-টেল্প করে।”
“পড়াশুনো ফেলে চোর-জোচ্চোরদের পিছনে ঘুরছে?”
টুপুর সামান্য সিটিয়ে গেল। কীরকম তেড়ে-তেড়ে কথা বলেন রে বাবা! মিতিনমাসির সঙ্গে পূর্বপরিচয় নেই, এ তো বোঝাই যাচ্ছে। তবে নামটা নিশ্চয়ই জানেন।
মিতিন ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়েছে বেমালুম। দেখাদেখি টুপুরও বসল আড়ষ্টভাবে! কনস্টেবলটিকে ছেড়ে দিয়ে অফিসার গলাখাঁকারি দিলেন, “হ্যাঁ, কী যেন একটা দরকার ছিল আপনার ?”
এবার মিতিন বিনীত স্বরে বলল, “মারকুইস স্ট্রিটের এক আর্মেনিয়ান ফ্যামিলি…।”
“অ। সেই হিরে চুরির কেস? ওটা তো সেকেন্ড অফিসার দেখছেন। বিশ্বনাথ মই।”
“আমি কি বিশ্বনাথবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি ?”
“উনি কি আছেন! দাঁড়ান দেখছি।”
বলেই কলিংবেলে মুষ্ট্যাঘাত। ঝং শব্দ বেজে উঠতেই হুমড়ি খেয়ে ঘরে এক উর্দিধারী। ঝটাক স্যালুট মারতেই হুকুম জারি হল, “মইকো বুলাও।”
হুকুমবরদার বাইরে যেতেই মিতিন কেঠো হেসে বলল, “আপনার খুব দাপট আছে শুনেছি। অনিশ্চয় মজুমদার আপনার খুব প্রশংসা করছিলেন।”
“আপনি আই-জি সাহেবকে চেনেন নাকি?”
“কেসের সূত্রে আলাপ। এখন ফ্যামিলিফ্রেন্ডের মতো হয়ে গিয়েছেন। বাড়িতে আসেন তো মাঝেমধ্যে।”
জাঁদরেল অফিসার পলকে মাখন। একগাল হেসে বললেন, “হেঁ হেঁ, আগে বলবেন তো! দুটো ঠান্ডা আনাই? কী গো বোনঝি, খাবে তো কোল্ডড্রিংক?”।
টুপুরের বাসনায় জল ঢেলে দিল মিতিন। বলল, “না না, এই গরমে ঠান্ডা খাওয়া ঠিক নয়।”
“তা হলে চা? কফি?”
“কিচ্ছু লাগবে না। আমি কাজটা করেই চলে যাব।”
“একটু অতিথি সৎকারেরও সুযোগ দিলেন না! হেঁ হেঁ হেঁ৷”
টুপুরের বেজায় হাসি পাচ্ছিল। হলফ করে বলতে পারে, অনিশ্চয় মজুমদার কস্মিনকালে মিতিনমাসিকে এই অফিসারটির কথা বলেননি। মিতিনমাসি যে এক একসময় কী অম্লান বদনে গুল মারে!
পিছনে হঠাৎ খোনা-খোনা গলা, “আমায় ডাকছেন স্যার?”
ঘাড় ঘুরিয়েই টুপুর বুঝল, ইনি বিশ্বনাথ মই না হয়ে যান না। পদবিটি চেহারার সঙ্গে খাপে-খাপে মিলে গিয়েছে। লিকলিকে রোগা চশমাপরা তালঢ্যাঙা মানুষটিকে দেখলে গা বেয়ে চড়চড়িয়ে উঠে যেতে ইচ্ছে করবে।
বড়বাবু গলা ফের রাশভারী করে বললেন, “এই ম্যাডামকে চেনেন ?”
দু’দিকে মাথা দোলালেন বিশ্বনাথ, “না তো স্যার।”
“নামী ডিটেকটিভ। প্রজ্ঞাপারমিতা মুখোপাধ্যায়। আই-জি মজুমদার সাহেবের বন্ধু। মারকুইস স্ট্রিটের হিরে চুরির ব্যাপারটায় উনি আপনার কাছে কিছু জানতে চান।”
“ও।” চেয়ার টেনে বসলেন বিশ্বনাথ, “কী জিজ্ঞাস্য আছে ম্যাডাম?”
“না মানে… কেসটা তো আপনি ডিল করছেন। কী মনে হচ্ছে?”
“বেশ ভজকট। ওই হিরে উদ্ধার হওয়া খুব মুশকিল।”
“কেন? পাচার হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়?”
“লোকাল মার্কেটে বিক্রি হয়নি এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। ওই সাইজের হিরে কোনও জহুরির কাছে বাঁকা পথে এলে শোরগোল পড়ে যেত। সোর্স তো আমাদের আছেই, কানে ঠিক চলে আসত খবর।”
“আর যদি বাইরে কোথাও চালান হয়ে গিয়ে থাকে?”
“সে আশঙ্কাও আমি খতিয়ে দেখিনি তা নয়।” নাকের মগডাল থেকে চশমা নেমে যাচ্ছিল, আঙুল দিয়ে তুলে বিশ্বনাথ বললেন, “ভেবে দেখুন, চোর যদি হিরেটা কাউকে পাস করে, তার বিনিময়ে নিশ্চয়ই মোটা টাকা নেবে। এবং সেই টাকা হজম করে ঘাপটি মেরে থাকা বেশ কঠিন কাজ। ব্যাঙ্কে তো রাখতে পারবে না, সুতরাং উশখুশ করবে খরচ করার জন্যে। হয় অ্যাসেট কিনবে, নয়তো স্রেফ ওড়াবে। সন্দেহভাজন কারওর সম্পর্কেই এখনও সেরকম পিকচার পাইনি।”
মিতিন ভুরু কুঁচকে বলল, “কত দাম হতে পারে হিরেটার ?”
“এটা অবশ্য অনেকটাই নির্ভর করে যে কিনছে তার শখ-মর্জির উপর। পাঁচ টাকার জিনিস কেউ যদি কুড়ি টাকা দিয়ে কেনে, আপনি কি আপত্তি করতে পারবেন? তবে বাজারচলতি মূল্য সম্পর্কে আমি একটা আন্দাজ দিতে পারি।” বিশ্বনাথ লম্বা শরীরটাকে আরও খানিক লম্বা করলেন, “মিসেস আরাকিয়েল বলছিলেন, হিরেটা নাকি গোলকুন্ডা মাইন্সের। এবং ওটি নাকি তিন পুরুষের সম্পত্তি। তাই যদি হয়, তবে ক্যারাট পিছু কম করে চল্লিশ লাখ।”
বড়বাবু বললেন, “চল্লিশ লক্ষ ইনটু পাঁচ, কত হয়? দু’ কোটি। কী বুঝলেন?”
মিতিনের আগে বিশ্বনাথবাবু বলে উঠলেন, “যে নিয়েছে, তার এখন সাপের ছুঁচো গেলা দশা। না পারছে ফেলতে, না পারছে গিলতে। আমিও তক্কে-তক্কে আছি। যেই না খোলশ ছেড়ে গাঝাড়া দেবে, অমনি ক্যাঁক।”
মিতিন হেসে বলল, “শুনলাম তো আপনি কষে জেরা করেছেন। কাকে-কাকে আপনার সন্দেহ হয়?”
বিশ্বনাথ বুঝি সামান্য অস্বস্তি বোধ করলেন। চশমা ঠিক করতে- করতে বড়বাবুর দিকে তাকাচ্ছেন। বড়বাবু ঢক করে ঘাড় নাড়লেন, “বলে দিতে পারেন। উনি আই-জি সাহেবের লোক।”
মিতিন তাড়াতাড়ি বলল, “বিশ্বনাথবাবু, ডোন্ট মাইন্ড, আপনার লিড থেকে যদি হিরেচোরকে ধরতে পারি, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন কৃতিত্বটা আমি আপনাকেই দেব।”
“আমার তালিকায় প্রত্যেকেই সন্দেহভাজন।” বিশ্বনাথের আঙুল ফের চশমায়। গলায় খানিক রহস্য মিশিয়ে বললেন, “মিসেস আরাকিয়েল নিজেই নাটকটি রচনা করতে পারেন। তারপর ধরুন, মহিলার যে ভাইঝিটি সঙ্গে থাকে… কী যেন নাম?”
“জেসমিন।”
“হ্যাঁ, জেসমিন। সে তো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আরাকিয়েলের সবচেয়ে নিকটজন। চাবিটা অকুস্থল থেকে হাতিয়ে সে যে কুকাজটি করেনি, তাও কি নিশ্চিত করে বলা যায়? আর রাতদিনের কাজের মহিলারা যে কত কী কাণ্ড ঘটাচ্ছে, তা তো আপনারা রোজ কাগজেই দেখতে পাচ্ছেন। সুতরাং হাউসমেডটিকেও আমি ক্লিন- চিট দেব না।”
“আর হ্যারি?”
“সেও তো মোটেই সাধুপুরুষ নয়। প্রিটোরিয়া স্ট্রিটে তার একটি হোটেল আছে। হোটেলটির খুব একটা সুনাম নেই। মাঝে-মাঝেই সেখানে জুয়ার আড্ডা বসে। হ্যারির আর্থিক অবস্থাও এখন পড়তির মুখে। এই ধরনের মানুষরা কখন কী করে বসে বলা কঠিন। আর একতলার ভাড়াটেদের মধ্যে ডিসুজা বড় চাকরি করতেন বটে, তবে তাঁর পুত্রটি ঘোর অপদার্থ। রোজগার প্রায় নেই বললেই চলে, সংসর্গও ভাল নয়। বাবার সঙ্গে সেও রাতে উপরে এসেছিল, আমি খবর পেয়েছি। বাকি রইলেন মিস্টার কুরিয়েন। তিনি একটি চিট ফান্ড চালান। তিনবার কোম্পানির নাম বদলেছেন। একবার জেলে যেতে-যেতেও বেঁচে গিয়েছেন। আশা করি, এঁকে কেন সন্দেহ করছি সেটা আর ভেঙে বলার দরকার নেই। আর আছে দারোয়ান। বাহাদুর। যতই নিস্পাপ দেখাক, আমি কিন্তু এখনও তাকে হেঁটে ফেলিনি। হ্যারির বউও বরের সঙ্গে যোগসাজশ করে…।”
টুপুরের আর কানে ঢুকছিল না। মাথা ঝিমঝিম করছে। বিশ্বনাথ মই বোধ হয় এবার ডাক্তারকেও টানাটানি করবেন। কিংবা মৃত মিস্টার আরাকিয়েলকে…।
মিতিনের কিন্তু এতটুকু বিরক্তি নেই। একগাল হেসে বলল, “অনেক-অনেক ধন্যবাদ। আপনি আমাকে যে অমূল্য সাহায্যটি করলেন, তা আমার বহুকাল স্মরণে থাকবে।”
“এ তো আমার কর্তব্য ছিল ম্যাডাম। আই-জি সাহেবের পরিচিত আপনি… প্রয়োজন হলেই চলে আসবেন।”
বড়বাবু গদগদ মুখে বললেন, “সেদিন কিন্তু আপনাকে কিছু খেতেই হবে ম্যাডাম। নিদেনপক্ষে ডাবের জল…।”
“অবশ্যই।”
থানা থেকে বেরিয়ে ফের ট্যাক্সি গনগনে আঁচ লেপে আছে ট্যাক্সির সর্বাঙ্গে। উনুনে বসানো চাটুর মতো গরম সিটে শরীর ছেড়ে দিয়ে টুপুর বলল, “বিশ্বনাথবাবু তোমায় কিন্তু খুব হ্যারাস করলেন। ইচ্ছে করে গুলিয়ে দিলেন ব্যাপারটা।”
“আহা, ওভাবে ধরছিস কেন? উপরতলার সঙ্গে খাতির আছে বলেছি তো, তাই একটু মই ঘষলেন। তা ছাড়া সরকারি তদন্তের গোপন তথ্য আমার কাছে গড়গড় করে উগরে দেবেন, এতটা আশা করাও কি ঠিক?”
“তা হলে এসেছিলে কেন? দুপুরটা তো বেকার গেল!”
“না রে, জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। নয়-নয় করে ছিটেফোঁটা তো পেয়েছি। ওগুলোই কুড়িয়ে বাড়িয়ে জড়ো করে এখন খেলাতে হবে। দেখি, একটু-একটু করে ছবিটাকে সাজাই।”
বাড়ি ফিরে মিতিন ঢুকে গেল নিজের ছোট্ট স্টাডিতে। বোধ হয় ছবি সাজাতেই। মিতিনমাসি যে-কোনও কেসে কী করে এগোবে, এখনও তার থই পায় না টুপুর। দরকারই বা কী, মাসির পাশে- পাশে থেকে পর্যবেক্ষণ করে যাওয়াটাই তো যথেষ্ট রোমাঞ্চকর। সুতরাং, এক্ষুনি-এক্ষুনি মাসির সঙ্গে বাতচিত করে লাভ নেই। কম্পিউটারে দাবা খেলতে বসে গেল টুপুর।
হিরে চুরির প্রসঙ্গ ফের উঠল সন্ধেবেলায়। প্রেস থেকে ফিরে পার্থ উত্তেজিত মুখে বলল, “তোর মাসি কাল অ্যাডভান্সটা না নিয়ে ভালই করেছে।”
মিতিন টুপুরের সঙ্গে বসে টিভি দেখছিল। ভ্রূভঙ্গি করে বলল, “হঠাৎ এই বোধোদয়?”
“ভেবে দেখলাম, এই কেসে আগাম দু’-পাঁচ হাজার নেওয়া মানে ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা। তার চেয়ে স্ট্রেট পুরো দক্ষিণাটা হেঁকে দেবে। হিরের দামের এক পারসেন্ট।”
টুপুর বলে উঠতে যাচ্ছিল, সে তো অনেক টাকা গো! তাকে থামিয়ে মিতিন সরল মুখ করে বলল, “তাতে লোকশান হয়ে যাবে না তো?”
“কী বলছ? হিরের দাম সম্পর্কে কোনও আইডিয়া আছে?”
“তোমার আছে?” মিতিন পালটা প্রশ্ন হানল, “তুমি কি আজকাল হিরের কারবার করছ?”
“আরে বাবা, হিরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি তো করি। মনে রেখো, আমার প্রেসটা বউবাজারে। যেখানে সোনা, রুপো, হিরে-জহরতের দোকান থিকথিক করছে।”
“বুঝেছি। আজ হিরে সম্পর্কে প্রচুর ফান্ডা নিয়ে এসেছ।”
“উঁহু, আগেই ছিল। আজ আবার একবার ঝালিয়ে নিলাম।” পার্থ সোফায় গ্যাট হয়ে বসেছে, দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় হিরেটার নাম জানো কি? কালিনান। ওজন পাঁচশো ক্যারাটেরও বেশি। দু’নম্বরে আছে ওর্লফ। তিনশো ক্যারাট। আমাদের কোহিনুরের রঙ্ক ফিফ্থ। কেটেকুটে তার ওয়েট এখন দাঁড়িয়েছে একশো দু’ক্যারাটে। আর দশ নম্বর পজিশনটা হর্টেনসিয়ার। কুড়ি ক্যারাটের এই ডায়মন্ডটি এক সময় ফ্রান্সের রাজমুকুটে শোভা পেত। এখন অবশ্য হর্টেনসিয়ার ঠাঁই পেয়েছে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে।”
মিতিন মুচকি হেসে বলল, “তার মানে ওদের তুলনায় আরাকিয়েল বাড়ির হিরে নেহাতই পুঁচকে, কী বলো?”
“যাহ বাবা, পাঁচ ক্যারাট কি ছোট? কীরকম প্রাইস হতে পারে জানো?”
“কত আর! দু’ কোটি মতো।”
“তাই বা কম কী? এক পারসেন্ট পাওয়া মানেও তো দু’লক্ষ। অবশ্য ওজনের হিসেবে।”
“কিন্তু আমার প্রাপ্য তো আরও বেশিও হতে পারে। কারণ, হিরের দাম তো শুধু ওজনে হয় না। কোন খনি থেকে সেটা পাওয়া গিয়েছিল, কতটা বিশুদ্ধ, কেমন কাটিং হয়েছে, রং, গ্লেজ, সবই ম্যাটার করে। প্লাস বিশেষ এক-একটা হিরের কত যে ইতিহাস থাকে! আমাদের কোহিনুরের কথাই ধরো না। মালবের রাজার কাছ থেকে বাবর নাকি কোহিনুর লুট করেছিলেন। মোগল সম্রাটদের হাত ঘুরে সেটি গেল নাদির শাহের কাছে। তারপর পেলেন পঞ্জাব কেশরী রঞ্জিৎ সিংহ। এবং শেষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে কুইন ভিক্টোরিয়ার হাতে। এমন হিষ্ট্রি আছে বলেই কোহিনুর না এত ফেমাস। এবং দামটাও সব হিসেবের বাইরে।”
“সে যদি বলো, ওর্লফের হিষ্ট্রি তো ঢের ঢের বেশি ইন্টারেস্টিং। এখন যদিও মস্কোয় আছে, কিন্তু আদতে ওটা নাকি ভারতের। দক্ষিণের এক মন্দিরে ওরকম দু’খানা হিরে নাকি বিষ্ণমূর্তির দু’চোখে সেট করা ছিল। এক ব্যাটা ফরাসি সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর সময় ওই মন্দিরে ঢুকে পড়ে। পাথর দু’টো দেখেই তো তার চোখ চকচক। কিন্তু একটা চোখ খুবলে নেওয়ার পরেই লোকটা বেজায় ভয় পেয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে মন্দির থেকে ধাঁ। তারপর ঘাবড়ে গিয়েই হোক, কী হিরে বলে চিনতে না পেরেই হোক, রত্নটিকে সে বেচে দিল এক ব্রিটিশ জাহাজের ক্যাপ্টেনকে। মাত্র দু’হাজার পাউন্ডে। তারপর ক্যাপ্টেন জাহাজ নিয়ে গেল আমস্টারডাম। সেখানে তখন থাকতেন রাশিয়ার এক কাউন্ট গ্রিগরি ওর্লফ। রানি ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের বিশেষ বন্ধু। নব্বই হাজার পাউন্ডে হিরেখানা কিনে ওর্লফ উপহার দিলেন রানিকে। আনন্দে আত্মহারা রানি রিটার্ন গিফ্ট হিসেবে আস্ত একখানা প্রাসাদই দিয়ে দিলেন ওরলফকে। তিরিশ বছর পর নেপোলিয়ান হানা দিলেন মস্কোয়। পাছে নেপোলিয়ান হিরেটা নিয়ে চলে যান, ওর্লফকে লুকিয়ে রাখা হল এক পুরোহিতের সমাধিতে। তা নেপোলিয়ানও তো ছোড়নেওয়ালা নন। খুঁজে-খুঁজে ঠিক সন্ধান পেয়ে গেলেন হিরেটার। কিন্তু সমাধিস্থলে গিয়ে যেই না সৈনিকরা মাটি খুঁড়ে হিরে বের করতে যাবে, অমনি পুরোহিতের আত্মা এসে প্রচণ্ড অভিশাপ দিতে লাগল সৈনিকদের। তোদের ভয়ংকর ক্ষতি হবে… কেউ তোরা বেঁচে ফিরবি না… রাশিয়ানদের কাছে হেরে যাবি…!”
পার্থ গোঁফে তা দিল, “কী কপাল, নেপোলিয়ান শেষ পর্যন্ত রাশিয়াতে হেরেও গেলেন, ওর্লফও তাঁর কবজায় এল না।”
“কোথা থেকে পেলে গো গল্পটা?” মিতিন চোখ নাচাচ্ছে, “সাজিয়ে গুছিয়ে গুল মারছ না তো?”
“আজ্ঞে না। ক’দিন আগে একটা বইয়ে পড়ছিলাম।”
“তা বিষ্ণুর চোখের সেকেন্ড হিরেখানা গেল কোথায়?”
“নিশ্চয়ই আছে কোথাও খুঁজে দেখতে হবে। বেশি জেরায় পড়ার আগে পার্থ মানে-মানে উঠে দাঁড়িয়েছে। আড়মোড়া ভেঙে বলল, “আমার সাজেশনটা কিন্তু খেয়াল রেখো। আরাকিয়েলরা যথেষ্ট মালদার পার্টি, দু’ লাখের নীচে কখনও নামবে না।”
“মনে থাকবে।” মিতিন মুখ বেঁকাল। টুপুরকে বলল, “গালগল্পগুলো আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ক্যাল। কাল থেকে আমাদের কিন্তু অভিযান শুরু।”
টুপুর ঘাড় নাড়ল, “জানি তো।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন