অষ্টম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

হেঁয়ালি ক্রমেই বাড়ছিল। বাড়ি ফিরে গোটা সন্ধেটা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রইল মিতিনমাসি। রাতে খেতে বসেও আনমনা। মুরগির ঠ্যাং চিবোতে-চিবোতে আর্মেনিয়ানদের সম্পর্কে অজস্র জ্ঞান বিতরণ করল পার্থমেসো। রেজাবিবির সমাধিটাকে যদি হিসেবে না ধরা হয়, তা হলে কলকাতায় পা রাখার ঢের আগেই নাকি চুঁচুড়ায় ঘাঁটি গেড়েছিল আর্মেনিয়ানরা। তারপর চন্দননগরে। তারপর মুর্শিদাবাদের লাগোয়া সৈদাবাদে। মোগল বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের ফরমান নিয়ে সৈদাবাদে নাকি জমিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল আর্মেনিয়ানরা। অবশ্য প্রথম গির্জাটি নাকি গড়ে চুঁচুড়ায়। আমাদের বঙ্গদেশে সেটাই নাকি দ্বিতীয় প্রাচীনতম গির্জা। পার্থমেসোর এমন লম্বা বক্তৃতাও চুপচাপ গিলে নিল মিতিনমাসি, একটাও টীকা- টিপ্পনী জুড়ল না। এমনটা কালেভদ্রে ঘটে। মিতিনমাসির মগজে যখন জট পড়ে যায়, শুধু তখনই। কেসটা কি তবে, টুপুর যেমনটা ভাবছিল, তত সরল নয়? মিস্টার কুরিয়েনই বা কী এমন সংবাদ শোনাল টেলিফোনে? দুয়ে-দুয়ে চার কি তবে হচ্ছে না?

পরদিন সকালেও মিতিনমাসি ঝিম মেরে বসে৷ পার্থমেসো কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎই সালোয়ার-কামিজ পরে তৈরি। আরতিকে বলল, “আমি আর টুপুর একটু বেরোচ্ছি। ফিরতে দেরি হতে পারে। বুমবুমকে খাইয়ে দিয়ো৷”

বিস্মিত মুখে টুপুর বলল, “কোথায় যাবে?”

“মারকুইস স্ট্রিট।”

“কেন গো?”

“কয়েকটা গিঁট খুলতে হবে। জেসমিন আর ইসাবেল আন্টিকে একবার মিট করা দরকার।”

জেসমিনও মিতিনদের দেখে অবাক। বলল, “কী ব্যাপার ম্যাডাম? ফোনটোন না করেই হঠাৎ…?”

“চলে এলাম।” মিতিন একগাল হাসল, “অসুবিধে করলাম কি?”

“তা নয়... তবে আমি যে একটু বেরোব এখন...।”

“একদম সময় নেই?”

“না না, আমি কিছুক্ষণ। আসলে বারোটায় এক পার্টিকে টাইম দিয়েছি তো...।”

“মিনিট কুড়ির মধ্যেই আপনাকে ছেড়ে দেব।”

“আহা, এত ইতস্তত করছেন কেন? আসুন তো।”

ড্রয়িংরুমে মিতিনদের বসিয়ে নির্মলাকে শরবত তৈরির নির্দেশ দিয়ে এল জেসমিন। মুখোমুখি সোফায় বসে বলল, “কদ্দুর এগোলেন?”

“সামান্যই। অন্ধকার সুড়ঙ্গে হাঁটছিলাম, সবে যেন একটু আলোর দিশা পাচ্ছি।”

জেসমিনের চোখ জ্বলজ্বল, “হিরেটা তা হলে পাওয়া যাবে?”

“সম্ভাবনা আছে।”

“থ্যাঙ্ক গড। আন্টি তা হলে প্রাণ ফিরে পাবেন।”

“আন্টি এখন আছেন কেমন?”

“একই রকম। ওষুধ তো চলছে, তবে তেমন উন্নতি হচ্ছে না। হিরেটা পেলে হয়তো শকটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন, শরীরটাও ফিরবে।”

“হুঁ।” মিতিন মাথা নাড়ল, “এবার তা হলে কাজের কথায় আসি?”

“বলুন?”

“মিস্টার আরাকিয়েলের মৃত্যুর পর মিস্টার হ্যারি তো আর এ বাড়িতে আসেননি, তাই না?”

“তা কেন, আসছিল তো। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করার পর থেকে আর যোগাযোগ রাখছে না। একমাত্র ফিউনারেল ডিনারের দিন সপরিবার এসেছিল। ঘণ্টাখানেকের জন্য।”

“আন্টিকে টেলিফোনও করছেন না?”

“উঁহু। পিসি তো সে জন্যও খুব আপসেট।”

“ফিউনারেল ডিনারের দিন মিস্টার হ্যারির মুড নিশ্চয়ই ভাল ছিল না?”

“একেবারেই না। প্রায় কারওর সঙ্গেই কথা বলেনি।”

“আচ্ছা, মিস্টার হ্যারি কি শুধু পুলিশের ব্যাপারেই আহত? নাকি অন্য কোনও কারণ আছে?”

“আর কী কারণ থাকবে?”

“শুনলাম মিস্টার আরাকিয়েল উইল করে যাবতীয় সম্পত্তি ইসাবেল আন্টিকে দিয়ে গিয়েছেন। সেই কারণেও কি মিস্টার হ্যারি...?”

জেসমিন ক্ষণিকের জন্য থতমত। অস্ফুটে বলল, “আপনি হ্যারির কাছে গিয়েছিলেন?”

“হ্যা। মনে হল ওঁর কিছু এক্সপেক্টেশন ছিল।”

“আশ্চর্য, আঙ্কলের প্রপার্টি আন্টি পাবেন, এটাই তো স্বাভাবিক! হ্যারি আশা করে কোন মুখে?”

“কারণ, সম্পত্তির অনেকটাই যে বংশগত। এমনকী হারানো হিরেটাও। সুতরাং, মিস্টার হ্যারির যে একটু হলেও দাবি নেই, একথা বোধ হয় আইনও বলবে না।”

“দেখুন ম্যাডাম, আইনি কুটকাচালি আমি একদম বুঝি না। আঙ্কল যদি তাঁর স্ত্রীকেই সব দিয়ে যান, কার কী বলার আছে?”

“তা তো বটেই। …আচ্ছা, মিস্টার হ্যারি কি আগে শুনেছিলেন উইলের কথা?”

“জানার তো কথা নয়। আমাকেও আঙ্কল কখনও বলেননি। আন্টিকেও না।”

“ও।... আপনারা জানলেন কবে?”

“ফিউনারেল ডিনারের পর। আঙ্কলের সলিসিটর আমাদের জানালেন। উইল তো ওঁদের কাছেই গচ্ছিত ছিল।”

“মানে সলিসিটার ফার্মে?”

“হ্যাঁ। রয় অ্যান্ড সেন। তিন নম্বর ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট।”

“কে কে সাক্ষী ছিল উইলের?”

“একতলার সিনিয়র ডিসুজা। আই মিন, পিটার আঙ্কল। আর আমাদের হাউস ফিজিশিয়ান, যিনি সে-রাত্রে আঙ্কলকে দেখতে এসেছিলেন।”

“ও। কবে নাগাদ উইলটা করা হয়েছিল?”

“ডেট তো দেখলাম বছর তিনেক আগের।” জেসমিনকে ঈষৎ অসহিষ্ণু দেখাল, “কিন্তু হিরে চুরির সঙ্গে উইলের কী সম্পর্ক ম্যাডাম?”

“হয়তো কিছুই না। তবু বুঝে নিতে দোষ কী!” আলোচনার মাঝে নির্মলা নিঃশব্দে শরবত রেখে গিয়েছিল, চুমুক দিয়ে মিতিন বলল, “আচ্ছা… একটা কথা। আন্টি এত তড়িঘড়ি উইলের প্রোবেট নিতে গেলেন কেন?”

“আমিই অ্যাডভাইস করেছিলাম। হিরে মিসিং হওয়ার পর আমার খুব নার্ভাস লাগছিল। মনে হয়েছিল, সম্পত্তিটা এক্ষুনি- এক্ষুনি পিসির নামে করে নেওয়া উচিত। তা ছাড়া আঙ্কলের শেয়ার সার্টিফিকেটগুলোর নাম ট্রান্সফারও তো জরুরি ছিল।”

“ভাল করেছেন। ঠিকই করেছেন। ইসাবেল আন্টির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দিকটাও তো ক্লিয়ার থাকা দরকার।” মিতিন সামান্য হাসল, “প্রপার্টি এখন তা হলে ইসাবেল আন্টির নামেই, কী বলেন?”

“হ্যাঁ। ওটা নিয়ে আর কেউ ট্যাঁফোঁ করতে পারবে না।”

“আচ্ছা জেসমিন, হিরের সম্পর্কে উইলে কোনও উল্লেখ ছিল কি?”

“আলাদাভাবে থাকবে কেন! স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বলতে তো হিরেটাও…” জেসমিনের চোখ সহসা স্থির, “হিরেটা কি তবে হ্যারিই সরিয়েছে?”

“আরও দু’-একটা দিন যাক, সব জেনে যাবেন।” মিতিন আবার হাসছে, “শুধু এটুকু বলতে পারি, আমাকে অগ্রিম দেওয়াটা আপনার বৃথা যাবে না।”

“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।”

“ইউ আর ওয়েলকাম।” শরবত শেষ করে মিতিন গ্লাস টেবিলে রাখল, “আপনি যেখানে যাচ্ছিলেন… যেতে পারেন এবার।”

“আপনারা?”

“আর-একটু বসি। ইসাবেল আন্টির সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।”

“এখন কথা বলবেন?” জেসমিন দু’-এক সেকেন্ড ভাবল, “বেশ তো, নির্মলাকে ডেকে দিচ্ছি। ও আপনাদের আন্টির রুমে নিয়ে যাক।”

ইসাবেল বিছানায় শুয়ে একটা বই পড়ছিলেন। নির্মলা ধরে বসিয়ে দিতেই চোখ ঘষে বললেন, “ওমা, তোমরা! কখন এলে?”

“এই তো…।” টুপুরকে নিয়ে মিতিন খাটের ধারটায় বসল, “কী বই পড়ছেন আন্টি?”

“মঁপাসার ছোট গল্প।”

“আপনি বুঝি মঁপাসার ভক্ত?”

“ভীষণ। গল্পগুলো তো বারবার পড়ি। তবে এখন চোখের যা হাল, দু’-চার পাতা পেরোতে না-পেরোতে অক্ষরগুলো কেমন ঝাপসা হয়ে যায়।”

“ছানি আসেনি তো? ডাক্তার দেখিয়েছিলেন?”

“আর আমার ডাক্তারে কাজ নেই। রোগ ধরতে পারে না, শুধু গাদাগাদা ওষুধ দেয়। আমি আর ওষুধও খাব না।” ছোট্টখাট্টো শান্ত ইসাবেল গজগজ করে উঠলেন, “ভাবছি এবার ধ্যান করাটাও ছেড়ে দেব।”

“কেন আন্টি? ধ্যান কী ক্ষতি করল?”

“ধ্যানই তো যত নষ্টের গোড়া। যেদিন থেকে জোসেফের ছবির সামনে বসছি, সেদিন থেকেই জোসেফ আমায় ডাকাডাকি করছেন। শরীরও বিগড়োচ্ছে দিনদিন। যখনই ধ্যান সেরে উঠি, মনে হয়, আরও যেন কমজোরি হয়ে গেলাম, হাত-পায়ের কাঁপুনি যেন বেড়ে গেল। আরে বাবা, টেনে নিতে হয় তো টেনে নাও, এরকম দগ্ধে-দগ্ধে মারা কেন?” ইসাবেল আবার দু’হাতে চোখ রগড়ালেন, “যাক গে, আমার কথা ছাড়ো। হিরের কী খবর?”

“প্রাণপণ চেষ্টা করছি আন্টি। মনে হয় শিগগিরই পেয়ে যাবেন।”

“মনে হয়-ফয় নয়। ওই হিরে আমার চাইই চাই। আরাকিয়েল বংশের ‘গুড লাক’ যদি না মেলে, এই বুড়ি তা হলে আর বাঁচবে না।”

“ওসব অলক্ষুনে কথা মুখেও আনবেন না।” মিতিন ঝুঁকে ইসাবেলের হাতে হাত রাখল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব আন্টি?”

“বলো।”

“আপনি কি কখনওই আঙ্কলকে সিন্দুক থেকে হিরেটা বের করতে দেখেননি?”

“সেদিন তো বললাম, সিন্দুক খোলার সময় উনি আমাকেও ঘরে থাকতে দিতেন না।”

“হুঁ। … আজ আর-একবার সিন্দুকটা দেখতে পারি?”

“দ্যাখো।” পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নির্মলাকে চাবির গোছা বাড়িয়ে দিলেন ইসাবেল, “যা, খুলে দে।”

সিন্দুকের অভ্যন্তর সেদিনের মতোই ফাঁকা-ফাঁকা। ভেলভেটের ফাঁকা বাক্স খোলা পড়ে। ডায়েরি আর টুকরো-টুকরো কাগজ যেখানে ছিল সেখানেই। বাক্সখানা আবার ভাল করে পরখ করে ডায়েরিটা হাতে নিল মিতিন। উলটোচ্ছে পৃষ্ঠা। সময় নিয়ে নিয়ে। হঠাৎই বাড়িয়ে দিয়েছে টুপুরকে। চাপা গলায় বলল, “লাস্ট পেজটা দ্যাখ।”

ডায়েরিটা সংখ্যায় সংখ্যায় ঠাসা। পাতায়-পাতায় হিসেব। একদম শেষ পৃষ্ঠায় লাল কালিতে বড়-বড় করে লেখা, GOLD 13578.

টুপুরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “গোল্ড তেরো হাজার পাঁচশো আটাত্তর? এর মানে কী?”

উত্তর না দিয়ে মিতিন ডায়েরি রাখল স্বস্থানে। নির্মলাকে সিন্দুক বন্ধ করতে বলে ফিরেছে ইসাবেলের কাছে।

ইসাবেল জিজ্ঞেস করলেন, “ফের দেখে লাভ হল কিছু?”

“লাভ-লোকসানের হিসেব কি সহজে করা যায় আন্টি?” মিতিন মৃদু-মৃদু হাসছে, “মিস্টার আরাকিয়েলের উইলের বলে বিশাল সম্পত্তি আপনি পেয়ে গেলেন। এটা আপনি কী মনে করেন? লাভ? না লোকসান ?”

“পুরোটাই লোকসান, বাছা। সেই মানুষটাই আর রইলেন না... তাঁর সম্পত্তি নিয়ে এই বয়সে আমি কী করব?”

“তবু তো তাড়াহুড়ো করে উইলের প্রোবেটটা নিলেন।”

“জেসমিন বলল যে। না নিলে নাকি অসুবিধে হতে পারে। কেন, ভুল করেছি?”

“না না, ভুল কীসের!”

“আমার কিন্তু কেমন যেন খচখচ করছিল। মনে হচ্ছিল, বড্ড বিষয়ী হয়ে যাচ্ছি। তারপর থেকেই তো ধ্যানে মন দিলাম।”

“হুঁ। তা আপনি উইল করার কথা ভাবছেন না?”

“ভাবছি তো। জোসেফের কয়েকটা ভুল তো শোধরাতে হবেই।”

“কীরকম?”

“জোসেফের খুব ইচ্ছে ছিল আর্মেনিয়ান অ্যাকাডেমিকে কিছু দান করার। হয়তো উইলটা উনি বদলাতেনও। কিন্তু সময় তো পেলেন না। ভাবছি, টাকাকড়ি যা আছে তার একটা মোটা অংশ অ্যাকাডেমিকে দিয়ে যাব। এই বাড়ি আর কিছু টাকা পাবে জেসমিন।” বলতে-বলতে ইসাবেল ফিরেছেন নির্মলার দিকে, “আমার এই মেয়েটাকেও ফেলব না। এর জন্য বাড়ির একখানা ঘর আর আজীবন মাসোহারার বন্দোবস্ত অন্তত করে যাব।”

টুপুর ফস করে বলে উঠল, “আর হিরে?”

“আগে খুঁজে তো পাওয়া যাক। তারপর ভেবে দেখব।”

ইসাবেলের গলায় সংশয়ের সুর। টুপুর হাসল মনে-মনে। এই প্রবীণা মহিলা জানেন না, মিতিনমাসি যখন একবার কেসটা হাতে নিয়েছে, ওই হিরে উদ্ধার হবেই। যদি হিরে পাচারও হয়ে গিয়ে থাকে, তাও মিতিনমাসি এ ক’দিনে টের পেতই। শুধু উইল নিয়ে এত পুছতাছ কেন, সেটুকুই টুপুরের বোধগম্য হচ্ছে না। ওই আজব লেখাটাই বা হঠাৎ দেখাল কেন? সোনার সঙ্গে হিরের কী সম্পর্ক? ১৩৫৭৮-এরই বা মানে কী?

ভাবনাটাকে বেশি খেলানোর অবকাশ পেল না টুপুর। গাড়িবারান্দার ছাদটা একবার ঘুরে এসে ইসাবেলের কাছ থেকে বিদায় নিল মিতিন। দরজা বন্ধ করতে নির্মলাও এসেছে পিছন- পিছন। হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়ে মিতিন তাকে বলল, “আন্টির ঠিকমতো খেয়াল রাখছ তো?”

নির্মলা নীরস গলায় বলল, “দেখাশুনো করাটাই তো আমার কাজ।”

“বিনিময়ে তো পাচ্ছও অনেক কিছু। আন্টি তো তোমার সারা জীবনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।”

“আন্টির করুণা। আমার ভাগ্য।”

“তুমি কিন্তু আন্টির ভালবাসার পুরো মর্যাদা দাওনি নির্মলা।”

“একথা কেন বলছেন?”

“বাইশে ডিসেম্বরের রাতটা ভাবো, তা হলেই জবাব পেয়ে যাবে।”

পলকে নির্মলার মুখ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে। মাথা নিচু করে বলল, “আপনি যা ভাবছেন তা কিন্তু...।”

নির্মলা থেমে গেল। দু’-চার সেকেন্ড তীক্ষ্ণ চোখে নির্মলাকে দেখল মিতিন। তারপর সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে গেল নীচে।

টুপুর কৌতূহলে টগবগ করে ফুটছিল। একতলায় এসে বলল, “মিস্টার হ্যারি আর নির্মলা কি আঁতাত করে...?”

“এখন কোনও প্রশ্ন নয়। চল, জেসমিনের মোমবাতির কারখানাটা একবার দেখে যাই।”

“কেন?”

“বললাম যে, নো প্রশ্ন। জাস্ট ফলো মি।”

গিয়ে অবশ্য লাভ হল না। বাড়ির পিছনের গ্যারাজ ঘরটা বন্ধ। তালামারা পুরনো আমলের কাঠের পাল্লা ঠেলেঠুলে ভিতরটা দেখার চেষ্টা করল মিতিন। কিছুই বোধহয় গোচরে এল না। হতাশ হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। হঠাৎই হনহন করে চলে গেল পাঁচিলের ধারের ঝোপটায়। ছোট্ট একটা কাগজের বাক্স কুড়িয়ে দেখছে ভুরু কুঁচকে। বাক্সটা ফেলে দিয়ে টুপুরকে বলল, “দাঁড়া এখানে। আমি আসছি।”

বলেই দুদ্দাড়িয়ে আবার দোতলায়। টুপুর হতবাক। গিয়ে বাক্সটা তুলে দেখল একবার। কী কাণ্ড, এ যে এক ডজন থার্মোমিটারের বাক্স। এটা দেখে মিতিনমাসি অত উত্তেজিত হয়ে পড়ল কেন? কী ছাই রহস্য পেল বাক্সটায়?

মিনিট পাঁচেক পর ফিরেছে মিতিন। আর-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না, টুপুরকে ডেকে নিয়ে সোজা গেটের বাইরে। বাহাদুর যে প্যাটপ্যাট করে তাকিয়ে, সেদিকেও নজর নেই যেন।

লম্বা-লম্বা পায়ে হাঁটছিল মিতিন। তাল মেলাতে টুপুরের গলদঘর্ম দশা। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মুখে এসে মিতিন ট্যাক্সি ধরতে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে-সঙ্গে টুপুর জিজ্ঞেস করল, “ব্যাপারখানা কী? আবার ওপরে ছুটলে কেন?”

ব্যাগ খুলে মিতিন একটা আধপোড়া লাল বাটি-মোমবাতি বের করে দেখাল, “এটা আনতে।”

টুপুরের গুলিয়ে যাচ্ছিল সব কিছু। মোমের মধ্যে হিরে আছে নাকি?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%