সুচিত্রা ভট্টাচার্য
বাড়িটা প্রাচীন, কিন্তু জরাজীর্ণ নয়। পাঁচিল ঘেরা সাহেবি ছাঁদের চেহারা। দোতলা। বেশ বড়সড় গাড়িবারান্দাওয়ালা। মজবুত পিলারে গাঁথা লোহার গেটখানা রীতিমতো সম্রম জাগায়। বাড়ি আর গেটের মধ্যে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। চাতালের মতো। ঈষৎ এবড়োখেবড়ো, ঘাসবিহীন। পাঁচিলের গায়ে দু’খানা খুপরি-খুপরি ঘর। দরোয়ানের কোয়ার্টার।।
মিতিন আর টুপুর খোলা গেট পেরোতেই এক নেপালি যুবক বেরিয়ে এসেছে, “কাঁহা জানা হ্যায়?”
“উপর। জেসমিন মেমসাবকা পাস।”
“আইয়ে। আইয়ে।”
গাড়িবারান্দা পর্যন্ত টুপুরদের পৌঁছে দিল গাঁটাগোট্টা চেহারার যুবকটি। সম্ভবত জেসমিনের নির্দেশেই এই খাতিরদারি। টুপুর ভাল করে দারোয়ানটিকে দেখে নিল। এই তবে বাহাদুর? বিশ্বনাথ মইয়ের মতো মিতিনমাসিও কি একে সন্দেহের তালিকায় রাখবে?
গোটা তিনেক ধাপ টপকালে চওড়া প্যাসেজ। তিনখানা টিউবলাইট জ্বলছে প্যাসেজে। দু’পাশে দুখানা লম্বা-লম্বা দরজা। নেমপ্লেট লাগানো। ডিসুজা আর কুরিয়েন। আলোকিত প্যাসেজের শেষ প্রান্তে দোতলায় ওঠার কাঠের সিঁড়ি। বারচারেক পাক খেয়ে সিঁড়ি পৌঁছেছে উপরে। সিঁড়ির শেষে আবার একখানা লম্বা টানা প্যাসেজ। অন্দরে যাওয়ার জন্য দু’প্রান্তে দু’খানা, মধ্যিখানে পাশাপাশি তিনটে, মোট পাঁচটা দরজা। সামনেরটাতেই ডোরবেল।

জেসমিন বুঝি বেল বাজার প্রতীক্ষাতেই ছিল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই খুলেছে দরজা। নরম হেসে বলল, “ওয়েলকাম। আন্টি আপনাদের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন।”
বর্গাকৃতি ড্রয়িংরুমে টুপুরদের বসিয়ে পিসিকে ডাকতে গেল জেসমিন। টুপুর ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখছিল ঘরটাকে, আর চমৎকৃত হচ্ছিল। আসবাবপত্র, সাজসজ্জা, সর্বত্রই অ্যান্টিকের ছড়াছড়ি। দেওয়ালআলমারিতে কত যে দুষ্প্রাপ্য পুতুল। যিশুখ্রিস্ট, মা মেরি থেকে শুরু করে কিমোনো পরা জাপানি মেয়ে… ঘরের চারকোণে রাখা চারটে অর্ধচন্দ্রাকার শ্বেতপাথরের টেবিলে সাবেকি ফুলদানি, রঙিন বাতিদান। এখানে সেখানে শোভা পাচ্ছে সুদৃশ্য মোমবাতি। নানান নকশার, নানান আকারের। দেওয়ালে ছোট-বড় অয়েলপেন্টিং, রকমারি মুখোশ… । অদ্ভুতদর্শন এক বাঁশের চোঙাও টাঙানো আছে দেওয়ালে। পাশে একজোড়া বাঁকানো কাঠের পাত, গায়ে ছবি আঁকা। একখানা গ্র্যান্ড পিয়ানোও ঘরে মজুত। কার্পেটে শুয়ে আছে পিতলের হরিণ।
তারিফের সুরে টুপুর বলে উঠল, “কী গ্র্যানজার গো!”
মিতিন অনুচ্চ কণ্ঠে বলল, “মাথার উপর ল্যাম্পশেডগুলো দ্যাখ। স্টেন্ড গ্লাস। ইতালিয়ান।”
“জগঝম্প বাঁশের ভেঁপুটা কী গো?”
“ডিজিরিডু। অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের বাজনা। পাশের দু’টো বুমেরাং।”
“সেই অস্ত্র, যা ছুড়লে টার্গেটকে হিট করে আবার হাতে ফিরে আসে?”
“ইয়েস। তবে ছোড়াটা সহজ নয়। কেরামতি লাগে। এটাও অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরাই..।”
মিতিন থেমে গেল। এক বয়স্ক মহিলাকে ধরে-ধরে আনছে জেসমিন। মহিলার চোখে রিমলেস চশমা, চুল ছোট করে ছাঁটা, পরনে লম্বা গাউন। চেহারাটি ছোটখাটো, রোগাসোগা। গায়ের রং এককালে টকটকেই ছিল, এখন তাতে কেমন বাদামি-বাদামি ভাব। চামড়াও বেশ শিথিল। বয়সের তুলনায় যেন একটু বেশিই বুড়িয়ে গিয়েছেন মহিলা।
মিতিন আর টুপুর উঠে দাঁড়িয়েছিল। জেসমিনের পিসি ইংরেজিতে বললেন, “শুভ সন্ধ্যা। আমি ইসাবেল আরাকিয়েল। প্রয়াত জোসেফ মেলিক আরাকিয়েলের হতভাগ্য স্ত্রী। তোমরা দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বোসো।”
আলাপ-পরিচয়ের পালা সাঙ্গ হতেই মিতিন দ্রুত কাজের প্রসঙ্গে চলে এল, “প্রথমে মিস্টার আরাকিয়েলের মৃত্যুর রাতটার সম্পর্কে বিশদ জানতে চাই। এবং একটু একান্তে।”
ইঙ্গিত বুঝেছে জেসমিন। তাড়াতাড়ি বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আপনারা কথা বলুন, আমি ততক্ষণ একটু চা-কফির বন্দোবস্ত করি।”
“শুধু চা কিন্তু। লিকার উইদাউট সুগার। আর আমার এই অ্যাসিস্ট্যান্টের জন্য…।”
“কোল্ডড্রিংক, তাই তো?”
“দ্যাটস নাইস অফ ইউ।”
মধুর হেসে চলে গেল জেসমিন। মিতিন সোফা বদলে ইসাবেলের পাশে গিয়ে বসেছে। ইসাবেল অল্প-অল্প হাঁপাচ্ছিলেন। দম নিয়ে বললেন, “আমি বাংলা বুঝি, কিন্তু বলতে পারি না।”
“ঠিক আছে, আপনি ইংরেজিতেই বলুন।”
“বাইশে ডিসেম্বরের ওই অপয়া রাতটাকে আমি মনে করতে চাই না। তবু তুমি যখন শুনতে চাইছ…। সন্ধে থেকে শুরু করি?”
“যেভাবে আপনার সুবিধে হয়।”
“বিকেলবেলা রোদুর পড়ে এলে জোসেফ রোজ হাঁটতে বেরোতেন। অনেক কালের অভ্যেস। সেদিন ফিরলেন সাতটা সওয়া-সাতটা নাগাদ। তখন আমি টিভি দেখছিলাম। তা উনি তো গল্ফ কিংবা কার রেস ছাড়া অন্য কোনও অনুষ্ঠান পছন্দ করতেন না… আমাকে ইভনিং টি দিতে বলে উনি চলে গেলেন পাশের লাইব্রেরিরুমে। চা নিয়ে গিয়ে দেখি, যথারীতি খবরের কাগজ খুলে বসেছেন। একটা পিকিউলিয়ার হবি ছিল জোসেফের। রোজ তিনটে-চারটে করে নিউজ পেপার কিনতেন, আর বসে-বসে যত ক্রসওয়ার্ড আর জাম্বল আছে, সেগুলোর সমাধান করতেন। বিশেষ বিশেষ দিনে খবরের কাগজ বন্ধ থাকলে জোসেফ ছটফট করতেন সারাদিন। এমনই নেশা, ওই সময়ে কেউ কথা বলতে গেলেও তাঁর কী বিরক্তি।” ইসাবেল একটু থামলেন। বারকয়েক চোখ পিটপিট করে বললেন, “তবে সেদিন, কে জানে কেন, আমার সঙ্গে গল্প করলেন খানিক। হয়তো চিরতরে চলে যাবেন বলেই…।”
টুপুর ঝানু গোয়েন্দার স্বরে প্রশ্ন করল, “কী কথা হয়েছিল স্মরণে আছে?”
“তেমন বিশেষ কিছু নয়। ইসাবেলের মুখে দুঃখী হাসি, কাকে- কাকে কার্ড পাঠানো যায়, কার জন্য কী উপহার কিনতে হবে… দু’ সপ্তাহ পরেই ক্রিসমাস ছিল তো।”
“দু’ সপ্তাহ পরে ?” টুপুর অবাক, “সেদিন তো ছিল ডিসেম্বরের বাইশ…?”
“আমরা পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিন পালন করি না, মাই চাইল্ড। সেদিন শুধু একটা বাতি জ্বালাই। আর্মেনিয়ানদের ক্রিসমাসের উৎসব হয় ছয় জানুয়ারি।”
“তাই বুঝি?” ব্যাপারটায় বিশেষ একটা উৎসাহ না দেখিয়ে মিতিন ইসাবেলকে প্রসঙ্গে ফেরাল, “হ্যাঁ, তারপর কী হল?”।
“আমি আবার বেডরুমে গেলাম টিভি দেখতে। জোসেফ ক্রসওয়ার্ড পাজলে মন দিলেন। জেসমিন আসার পর তিনজনে একসঙ্গে ডিনার সারলাম।”
“জেসমিন এলেন কখন?”
“ন’টা নাগাদ। কাজে বেরোলে ওর একটু রাতই হয়। … ডিনারের পর জোসেফ কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন টেরেসে। তারপর আমরা তো শুয়েই পড়লাম। ঘুমটা যখন আসছে… হঠাৎ টের পেলাম জোসেফ আমায় ঠেলছেন। আলো জ্বেলে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখি, বুকের যন্ত্রণায় উনি কুঁকড়ে-কুঁকড়ে যাচ্ছেন। ঘামছিলেনও ভীষণ ভয় পেয়ে জেসমিনকে ডেকে তুললাম। আওয়াজে নির্মলাও জেগে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে লোকাল ডাক্তারকে কল দিয়েছিল জেসমিন। তবে ডাক্তারবাবু আসার আগেই তো উনি কেমন স্থির হয়ে গেলেন।” ইসাবেলের গলা ধরে এল। নাক টেনে বললেন, “ডাক্তারবাবু চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেননি। হার্ট পাম্প করলেন, মুখে মুখ লাগিয়ে বাতাস পাঠিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করারও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু যার সময় শেষ, তাকে কি আর ধরে রাখা যায় ! ইনঞ্জেকশনটাও তো দেওয়া গেল না।”
“সরি আন্টি।” মিতিন ইসাবেলের হাতে হাত রাখল, “জানি আপনাকে এসব প্রশ্ন করা মোটেই সমীচীন নয়। কিন্তু কয়েকটা ব্যা পার যে আমায় জানতেই হবে।”
“কিন্তু কিন্তু করছ কেন? বলো না?”
“আমি তো এসেছি আপনাদের হিরে হারানোর তদন্ত করতে…।” মিতিন গলা ঝাড়ল, “আর হিরেটা খোওয়া গিয়েছে মিস্টার আরাকিয়েল মারা যাওয়ার পর-পরই…।”
“মৃত্যুর ঠিক পরেই কিনা তা কিন্তু নিশ্চিত হয়ে বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, পঁচিশ তারিখ সকালে যখন সিন্দুক খুললাম, তখন দেখি বাক্সটা খালি।”
“আপনি তো আগে কখনও সিন্দুকে হাত দেননি?”
“না। জীবনে ওই প্রথম। সিন্দুক থেকে কিছু বের করার দরকার হলে জোসেফ ঘর বন্ধ করে সিন্দুক খুলতেন। তখন আমারও ঘরে থাকার অনুমতি ছিল না।” ইসাবেল একটা নিশ্বাস ফেললেন, “সেদিন জেসমিন কিছু টাকা চাইল। সমাধি দেওয়ার দিন খরচাপাতিগুলো হ্যারি মানে আমার ভাসুরের ছেলেই তো করেছিল। ওকে টাকাটা ফেরত দেবে বলে…। ভাগ্যিস খুললাম, চুরিটা তাই তখনই ধরা পড়ল।”
“হঠাৎ বাক্সটাই বা দেখতে গেলেন কেন? ওটা তো খোলার প্রয়োজন ছিল না!”
“নিছকই কৌতুহলে। আগে কখনও সিন্দুক খুলে দেখার সুযোগ পাইনি তো।”
“হুম। জেসমিন তখন কোথায়?”
“বেরিয়েছিল কী যেন কিনতে। ফোন করে জানাতেই ও চলে এল। আর সঙ্গে-সঙ্গে পুলিশকে…।”
“ও।” মিতিন একটু থেমে থেকে বলল, “আচ্ছা আন্টি, চাবিটা তো মিস্টার আরাকিয়েলের কাছেই থাকত?”
“বরাবর। আমি যখন বিয়ের পর এ বাড়িতে আসি, তখন থাকত শ্বশুরমশাইয়ের হেপাজতে। তিনি গত হওয়ার পর থেকে জোসেফই…। চাবিটা যেন ওঁর শরীরের একটা অংশ বনে গিয়েছিল।”
“তা আপনার হাতে চাবিটা এল কখন?”
“ওই রাত্তিরে তো চাবির কথা আমার মাথাতেই ছিল না। মগজ কাজই করছিল না কোনও। কখন যেন জেসমিনের ঘরে গিয়ে শুয়েছিলাম, তারপর সকালে ফের ও ঘরে যেতে সুজান আমাকে চাবিটা দিল।”
“মিস্টার হ্যারির বউ?”
“তুমি তাকে চেনো?”
“জেসমিনের মুখে নামটা শুনেছি।”
“হ্যারি আর সুজান আমার উপর খুব রেগে আছে।”
“কেন?”
“পুলিশ ওদের খুব জেরা করেছে তো। ভাবছে আমি ওদের নামে নালিশ করেছি।” ইসাবেল ফের একটা নিশ্বাস ফেললেন, “বোঝে না, আমিও নিরুপায়। পুলিশকে তো বলতেই হবে সেদিন রাতে জোসেফের পাশে কারা-কারা ছিল।”
“বটেই তো। রাতভর চাবি ছিল মিস্টার আরাকিয়েলের কোমরে। তখনই সিন্দুক খুলে হিরে সরানো হয়েছে কিনা পুলিশ তো খতিয়ে দেখবেই।” মিতিন আড়চোখে অন্দরে যাওয়ার দরজাটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “তা সুজানের হাতে চাবি এল কীভাবে?”
“সুজান তো সকলের সামনেই জোসেফের কোমর থেকে খুলল।”
“সবাই মানে? কে কে ছিল তখন?”
“অনেকে। হ্যারি, মিস্টার ডিসুজা, মিসেস কুরিয়েন…। এছাড়া জেসমিন, নির্মলারা তো ছিলই।”
“আপনার ভাড়াটেরা কি হিরেটার কথা জানতেন?”
“অজানা ছিল না। আমি কখনও সেভাবে আলোচনা করিনি বটে, তবে দু’-একবার হয়তো বলেছি। ডিসুজা কুরিয়েনদের সঙ্গে জোসেফের যথেষ্ট হৃদ্যতা ছিল। জোসেফও হয়তো গল্প করে থাকতে পারেন।”
“এবার একটা ডেলিকেট প্রশ্ন। ভাড়াটেদের কাউকে কি আপনার সন্দেহ হয়?”
ইসাবেল চুপ। প্রায় মিনিটখানেক নীরব থেকে বললেন, “পিটার ডিসুজা ছিলেন জোসেফের বন্ধু। অ্যালবার্ট এই বাড়িতেই জন্মেছে। কুরিয়েনরাও আছে প্রায় তিরিশ বছর। ওদের সম্পর্কে আমি কী মন্তব্য করব বললা? সজ্ঞানে এরা আমাদের ক্ষতি করবে, এ আমি ভাবতেই পারি না। ওদের সন্দেহ করলে তো জেসমিন, নির্মলা, হ্যারিদেরও সন্দেহ করতে হয়।”
“নির্মলাও কি বহুদিনের পুরনো…?”।
“হ্যাঁ। ষোলো বছর বয়স থেকে আছে। আর্মেনিয়ান চার্চ কিছু বৃদ্ধাশ্রম আর অনাথালয়ের সঙ্গে যুক্ত। ওই রকমই একটা অনাথ আশ্রম থেকে জোসেফ এনেছিলেন নির্মলাকে। এখন জেসমিনও আমার মেয়ে, নির্মলাও আমার মেয়ে।” বলতে বলতে ইসাবেল হঠাৎই চঞ্চল, “কী কাণ্ড দ্যাখো… নির্মলা এখনও তো তোমায় চা দিয়ে গেল না! দাঁড়াও তো, দেখি উঠে।”
ইসাবেলকে অবশ্য উঠতে হল না। নির্মলা প্রায় তখনই ট্রে সাজিয়ে ঢুকেছে। ক্ষণিকের জন্য টুপুরের মনে হল, আড়াল থেকে তাদের কথা শুনছিল নাকি নির্মলা? চা, কোল্ডড্রিংক নামিয়েই সে চলে গেল বটে, তবে তার আগেই টুপুর তাকে মোটামুটি জরিপ করে নিয়েছে। চেহারায় একটু যেন আদিবাসী- আদিবাসী ভাব। বছর তিরিশেকের নির্মলার কালোকুলো মুখে একটা আপাত সারল্য থাকলেও খুদে-খুদে চোখের ঘূর্ণন বলে দেয়, সে মোটেই বোকা নয়। মিতিনমাসি কি নজর করল ব্যাপারটা?
চা শেষ করে মিতিন বলল, “চলুন আন্টি, এবার আপনার শোওয়ার ঘরে যাই।”
ইসাবেল বললেন, “তা হলে জেসমিনকে ডাকি? আমাকে একটু ধরুক।”
“আমি হেল্প করব?”
“না না, তুমি কেন? ওরা তো আছে।”
“আপনার প্রবলেমটা কী আন্টি? হাঁটু?”
“শুধু হাঁটু নয়, সর্বাঙ্গই যেন অচল হয়ে আসছে। এই ক’মাসে যে কী হল, পায়ে আর তেমন জোর পাই না, হাতে বল নেই, আঙুলগুলোও বড্ড কাঁপে…।” ইসাবেলের স্বর দুলে গেল, “অবশ্য আমার আর থেকেই বা কী লাভ! উনি নেই, আরাকিয়েল বংশের সৌভাগ্যের প্রতীক হিরেটাও বিদায় নিল…।”
ইসাবেলের হাহাকারে টুপুরের চোখ ছলছল এবার। মিতিনের কিন্তু তেমন কোনও তাপউত্তাপ নেই। গলা উঁচিয়ে ডাকল জেসমিনকে। ভাইঝিকে ধরে কাঁপা কাঁপা পায়ে হাঁটছেন ইসাবেল। পিছন পিছন মাসি-বোনঝি।
ড্রয়িংরুমের ডান পাশের ঘরটি লাইব্রেরি। মোটা-মোটা আইনের বইয়ে চার দেওয়াল ঠাসা। আইনজ্ঞের টেবিলচেয়ার ছাড়াও একখানা গোল শ্বেতপাথরের টেবিল রয়েছে ঘরে। সাবেকি আরামকেদারাও। কড়িবরগাওয়ালা উঁচু সিলিং থেকে ঝুলছে চার ডাঁটির ফ্যান।
ঘরটা পেরোতে-পেরোতে টুপুর প্রশ্ন করল, “মিস্টার আরাকিয়েল বুঝি ল’ইয়ার ছিলেন?”
“উহু।” জেসমিন উত্তর দিল, “আঙ্কলের বাবা ছিলেন ব্যারিস্টার। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। ভাল পশার ছিল।”
“আর আঙ্কল? বিজনেস?”
“অনেকটা ওই রকমই। আঙ্কলের ঘোড়দৌড়ে খুব আগ্রহ ছিল। তাঁর নিজের ঘোড়াও দৌড়ত কলকাতা আর বেঙ্গালুরুর ট্র্যাকে। পরে রেসের মাঠের রোজগার লাগিয়ে দেন বিভিন্ন কোম্পানিতে। নিয়মিত ডিভিডেন্ড পেতেন, দিব্যি চলে যেত।”
কথায় কথায় পরের ঘরখানায় পা রেখেছে টুপুর। আগের দু’টো ঘর বড় ছিল বটে, কিন্তু এটা যেন বিশাল। চারখানা দরজার একটা বাইরের প্যাসেজে বেরনোর, একটা পাশের ঘরে যাওয়ার, তৃতীয়টি অন্দরকে যুক্ত করেছে, চতুর্থটি দিয়ে গাড়িবারান্দার মাথার টেরেসটিতে যাওয়া যায়। লাইব্রেরি ঘরের দরজাটি ছাড়া বাকি তিনটি দরজা অবশ্য বন্ধ। লম্বা-লম্বা জানলায় ভারী-ভারী পরদা ঝুলছে।
ঘরে ঢুকেই টুপুরের চোখ গিয়েছে সিন্দুকে। গোলাকার হাতলওয়ালা দেওয়ালে গাঁথা আয়রন চেস্ট। বিছানার ওপাশে, ঘরের কোনায়। প্রকাণ্ড খাটটি থেকে মাত্র হাত পাঁচেক দূরে। আস্তে-আস্তে বাকি আসবাবেও দৃষ্টি ঘুরল টুপুরের। বিডে কারুকাজ করা ভারী চমৎকার দু’টো কাঠের আলমারি, তাদের মাঝখানে একটা পুরনো অ্যাকোয়ারিয়াম, সাহেবি আমলের ড্রেসিংটেবিল, মানুষপ্রমাণ দোলআয়না, সবই বেশ ছড়িয়ে-ছড়িয়ে সাজানো। মেঝের লতাপাতার স্কার্টিং যেন আলাদা একটা মাত্রা এনেছে সজ্জায়। শুধু হালফ্যাশনের স্ট্যান্ডে টিভিটাই যা খাপছাড়া।
ইসাবেল খাটে বসেছেন। পাশে জেসমিন। মিতিন সোজা সিন্দুকের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “একবার খোলা যাবে কি?”
“অবশ্যই।” গাউনের পকেট থেকে একজোড়া চাবি বের করলেন ইসাবেল। জেসমিনকে বললেন, “দেখিয়ে দাও।”
পুরু লোহার পাল্লার ভিতরভাগে অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সঠিক চাবি ছাড়া খোলার চেষ্টা করলে যা কিনা সশব্দে বেজে ওঠে। সিন্দুকের দু’টো তাকই প্রায় শূন্য। ফাঁকা ভেলভেটের বাক্স, একখানা ডায়েরি, খুচখাচ কাগজপত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। নীচে বন্ধ লকার। জেসমিন বলল, “ওখানে টাকাপয়সা আর শেয়ারের সার্টিফিকেট থাকে। দেখবেন কি?”

“থাক।” মিতিন নীল ভেলভেটের আধারখানা খুলে দেখল। আবার যথাস্থানে রেখে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাক্সটা কি এখানেই ছিল? না লকারে ?”
ইসাবেল বললেন, “আমি তো সেল্ফেই দেখেছি।”
“খোলা ছিল? না বন্ধ?”
“বন্ধই।”
“আচ্ছা আন্টি, হিরেটার কোনও ইনশিওরেন্স করানো হয়নি কেন বলতে পারেন ?”
“শুনেছি আমার শ্বশুরমশাই একবার চেষ্টা করেছিলেন। ইনশিওরেন্স কোম্পানি নাকি খুব বেশি টাকার প্রিমিয়াম হাঁকে। শর্তও দেয় অনেক। কোথায় রাখতে হবে, কীভাবে রাখতে হবে…। শ্বশুরমশাই হিরে সিন্দুক থেকে সরাতে রাজি হননি। জোসেফও আর ও ব্যাপারে গা করেননি কোনও।”
“ও।” মিতিন কথা বলতে বলতে ডায়েরিটা দেখছিল। হালকা বিস্ময়ের সুরে বলল, “এ তো অনেক পুরনো! উনিশশো বাহাত্তর সালের।”
“ওটিও শ্বশুরমশাইয়ের। ওই বছরে তিনি মারা যান। জোসেফ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন।”
“হুঁ।” ডায়েরিটা রেখে মিতিন এবার পায়ে-পায়ে এগোল দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবির সামনে। হ্যাট-কোট পরা এক সুপুরুষ সাহেবের ফোটো। ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটির নীচে ছোট্ট শ্বেতপাথরের টেবিল, কাঠের চেয়ার। টেবিলে মোমদানিতে লাল বাটি-মোমবাতি। অর্ধেক জ্বলা বাতি থেকে মোম গলে টেবিলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ছবিতে চোখ রেখে মিতিন বলল, “ইনি নিশ্চয়ই মিস্টার আরাকিয়েল?”
জেসমিন সিন্দুকের ডালা বন্ধ করে ইসাবেলকে চাবি দিয়েছে। পকেটে চাবি রাখতে-রাখতে ইসাবেল ঘাড় নাড়লেন, “প্রায় কুড়ি বছর আগের। মধ্যবয়সে উনি যেন আরও রূপবান হয়েছিলেন।”
“ছবির নীচে মোমবাতি কে জ্বালান? আপনি?”
“হ্যাঁ। শুতে যাওয়ার আগে রোজ রাতে ওঁর ধ্যান করি। ওই চেয়ারে বসে।”
“সুন্দর-সুন্দর মোমবাতির সাপ্লায়ার কে? নিশ্চয়ই জেসমিন?”
লাজুক হেসে জেসমিন বলল, “অন্য কোনও মোমবাতি আন্টি ব্যবহারই করবেন না।”
“আপনার কারখানাটি কোথায়?”
“কারখানা-টারখানা আবার কী! নীচের একটা গ্যারাজে নিজে- নিজেই বানাই। হঠাৎ বেশি অর্ডার এসে গেলে নির্মলা সাহায্য করে হাতে-হাতে।”
কথোপকথনের মাঝে টুপুরের দৃষ্টি হঠাৎ অ্যাকোয়ারিয়ামে। দু’টো রেডসোর্ড টেল মারামারি জুড়েছে। একটা ধাড়ি অ্যাঞ্জেল ভারিক্কি ভঙ্গিতে এসে ঝগড়া থামাল। জলে ভাসমান কাচের পাত্র থেকে পুটপাট কেঁচো খেয়ে চলেছে মলির ঝাঁক। গাপ্পি গোরামিনরা টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে আপন মনে। আশ্চর্য, এত কাণ্ডকারখানা চলছে জলে, অথচ জলের তলদেশ একদম স্থির। ঈষৎ সবজেটে জলে দুলছে ঝাঁঝি, ভাসছে জলজ উদ্ভিদ, মাছেরা হঠাৎ-হঠাৎ ডুব দিচ্ছে তলায়, সব মিলিয়ে কী অপরূপ দৃশ্য। বদলে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যগুলো, প্রতি মুহূর্তে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে যেন নেশা লেগে যায়।
সত্যি, কী নিশ্চিন্ত জীবন মাছেদের। চুরিচামারির বালাই নেই। শোকতাপ নেই। বাড়ির কর্তা মারা গিয়েছেন, তাই নিয়ে কোনও বিকারও নেই। দিব্যি মজাসে আছে।
আহা রে, মানুষের জীবনও যদি এমন হত!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন