সুচিত্রা ভট্টাচার্য
সন্ধেবেলা বুমবুমের খাটে বসে হিরে চুরির কেসের একটা নোট মতো বানাচ্ছিল টুপুর। মিতিনমাসি এবার তাকে কোনও কাজই দেয়নি, তবু প্রত্যেকের জবানবন্দি, কার সম্পর্কে টুপুরের কী ধারণা জন্মেছে, লিখছে সাজিয়ে গুছিয়ে। হঠাৎ কোনও নতুন পয়েন্ট মনে পড়লে যোগ করে নিচ্ছে সঙ্গে-সঙ্গে। যেমন এইমাত্র স্মরণে এল, পিটার ডিসুজা একজন সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও উইলের খবর টুপুরদের কাছে গোপন করে গিয়েছিলেন। মিসেস আরাকিয়েলও নিজে থেকে উইলের কথা ভাঙেননি! জেসমিন-নির্মলারাও নয়। ভুলটা ইচ্ছাকৃত? না অনিচ্ছাকৃত? টুপুরের মন্তব্যটা হয়তো কাজে লাগবে না, তবু নোট থাকা ভাল। টুপুর দেখেছে বিবরণী বিশদ হলে মিতিনমাসির কাজে সুবিধে হয়। টুপুর নিজেও শিখতে পারে, তদন্তের কোন-কোন সূত্র দরকারি, কোনটাই বা নেহাত অদরকারি।
ঘরে বুমবুমও মজুত। কম্পিউটারে ভিডিও গেমস খেলছে এক মনে। মা বাড়ি নেই, দিদিও কম্পিউটারের দখল চাইছে না, বুমবুমের এ ভারী সুখের সময়। পরশু অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে, মঙ্গলবারই নতুন ক্লাস শুরু। ছুটির শেষ দু’টো দিন যেন চুটিয়ে উপভোগ করছে বুমবুম।
পার্থ ফিরল সাড়ে আটটা নাগাদ। চৈত্রের গরমে থসথস করতে- করতে। এসেই শাওয়ার চালিয়ে স্নান। তারপর পাউডার-টাউডার মেখে আয়েশ করে বসেছে সোফায়। খবরের কাগজ উলটোতে- উলটোতে হাঁক পাড়ল, “টুপুর...? অ্যাই টুপুর...?”
কাগজ-কলম ফেলে দৌড়ে এল টুপুর, “কী বলছ?”
“তোর মাতৃষ্বসাটি গেলেন কোথায়?
“কী জানি! দুপুরে মারকুইস স্ট্রিট থেকে ফিরেই নাকে-মুখে গুঁজে কোথায় বেরিয়ে গেল।”
“তোকে নিল না?”
“তাই তো দেখছি।”
“একাই হিরে উদ্ধারে গেল নাকি?”
“বুঝতে পারছি না।”
“এহ্, তোর মাসি এখনও তোকে এলেবেলেই ভাবে রে। তুই আর জাতে উঠলি না।”
টুপুর হেসে ফেলল। পার্থমেসো তাকে রাগাতে চাইছে। হাসতে- হাসতেই বলল, “মাসি তার নিজের ডিউটি করছে, আমি আমার।”
“তোর কী ডিউটি শুনি?”
“রিপোর্ট তৈরি করা। কদ্দুর কী প্রোগ্রেস হল...।”
“আদৌ কিছু এগিয়েছে কী?”
“জানতে চাও, এখনও পর্যন্ত কী করেছি? আনব লেখাটা?”
“ওরে বাবা, এখন ওটা পড়বি নাকি?” পার্থ হাই তুলল, “তার চেয়ে বরং দ্যাখ, খাবারদাবার কিছু আছে কি না।”
উৎসাহে জল ঢেলে দিতেই টুপুর বিরস মুখভঙ্গি করে বলল, “আরতিদি ইডলি-সম্বর বানিয়ে রেখে গিয়েছে। মাইক্রোওয়েভে গরম করে দেব?”
“সঙ্গে একমুঠো চানাচুরও দিস। আর চা।”
“ইডলির সঙ্গে চানাচুর? কী কম্বিনেশন গো?”
“ভ্যারাইটি জীবনের মশলা রে। তুইও ট্রাই করে দেখতে পারিস।”
“নো চান্স। ওই বিদ্ঘুটে মিক্সচার তুমিই খাও।”
জলখাবার হাতে পেয়েই তুবড়ি ছোটাতে শুরু করেছে পার্থমেসো৷ আর্মেনিয়ানদের সম্পর্কে আরও কিছু জ্ঞান আহরণ করেছে, এখন ভাণ্ডার উজাড় করার পালা। সম্রাট আকবর নাকি এক আর্মেনিয়ানকে ছেলে হিসেবে দত্তক নিয়েছিলেন। আকবরের সাম্রাজ্যে প্রধান বিচারপতিও নাকি ছিলেন একজন আর্মেনিয়ান। বিচারপতির নাম ছিল আবদুল হাই। আকবরের সময় থেকেই দিল্লি, আগ্রা, পঞ্জাব, সর্বত্রই আর্মেনিয়ানরা জাঁকিয়ে বসতে থাকে। একটা গির্জাও নাকি তারা বানিয়ে ফেলেছিল আগ্রায়, আকবর বেঁচে থাকাকালীন।
বক্তৃতার মাঝেই হঠাৎ মিতিনের প্রবেশ। পার্থর ডাকাডাকিতে সাড়া না দিয়ে থমথমে মুখে সটান ঢুকে গেল স্টাডিতে। বন্ধ করে দিয়েছে দরজা। টুপুর আর পার্থ মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কেস চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলে এমনটাই করে মিতিন, তারা জানে।
রাতে অবশ্য মিতিন বেরিয়ে খেতে বসল একসঙ্গে। এলোমেলো কথা বলল দু’-চারটে, কিন্তু কেসের ব্যাপারে আশ্চর্য রকম নীরব। অর্থাৎ কেস নিয়েই ভাবছে। এবং কেস সংক্রান্ত কোনও আলোচনাই এখন পছন্দ করবে না। আহার সেরে ফের সেঁধিয়ে গেল নিজস্ব কুঠুরিতে। টুপুর যখন শুতে গেল, তখনও স্টাডির আলো নেবেনি।
সকালবেলা মিতিন কিন্তু একদম অন্য মেজাজে। নিজেই ব্যালকনির গাছে জল দিল, মাঝে-মাঝে গুনগুন গান গাইছে, আরতিকে আলুর পরোটা ভাজতে বলল, খুনসুটি করল বুমবুমের সঙ্গে।
টুপুরও গন্ধ পেয়ে গিয়েছে ওমনি। আলুর পরোটার প্লেট হাতে নিয়ে মাসিকে জিজ্ঞেস করল, “কেস মনে হচ্ছে সল্ভড?”
“ইয়েস। যবনিকা কম্পমান।” মিতিনের মুখে বিচিত্র হাসি, “এবার পরদাটা তুলে দিলেই হয়।”
“কে নিয়েছে তা হলে হিরেটা?”
“সাসপেন্স।”
“বুঝেছি, বলবে না।” টুপুর চোখ তেরচা করল, “জিনিসটা পাওয়া যাবে তো? নাকি পাচার হয়ে গিয়েছে?”
“ঘরের মধ্যে ঘর, তার মধ্যে পচে মর। কী বুঝলি?”
“ধাঁধাটার জবাব তো মশারি।” টুপুর ঘাড় চুলকোচ্ছে, “একটু ঝেড়ে কাশো না মিতিনমাসি।”
“আর তো কয়েকটা ঘণ্টা। দমটাকে ধরে রাখ।” মিতিন পার্থর দিকে তাকাল, “তুমি কী করছ বিকেলে?”
শব্দজব্দ করতে-করতে পরোটা ছিঁড়ছিল পার্থ। তবে কান কিন্তু এদিকেই খাড়া। ঠোঁট উলটে বলল, “ঠিক নেই। ভাবছি অ্যাকাডেমিতে একটা নাটক দেখতে যাব।”
“উঁহু। আমাদের সঙ্গে মারকুইস স্ট্রিট চলো।”
“গিয়ে?”
“জোড়া নাটক দেখবে। উইথ ফাটাফাটি ক্লাইম্যাক্স। ...উঁহুহু, চোখ বড়-বড় কোরো না। ঠিক চারটেয় শো। রোববার দুপুরে না ঘুমিয়ে তৈরি থেকো।”
পার্থর পরোটা বোঝাই গাল হাসিতে ভরে গেল, “ও কে, ম্যাডাম টিকটিকি।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন