বেলোর ডায়েরি

শাশ্বত কর

এই গল্পটা আগে কখনো কারও কাছে করিনি৷ অথচ এমন গোপন কথা কারও কাছে না বললেও তো পেট উবুল-খাবুল করে, ঢেঁকুরের মতো নানান কথায় উবলে আসে! ঢেঁকুর না হয় মুখে হাত চেপে সামাল-টামাল দেয়া যায়, কিন্তু কথা তো আর তেমন করে সামাল দেয়া যায় না! মুখ ফসকে টপাস করে পড়ল তো ক্যাচ কট কট! ফিল্ডার যদি নেড়ু, বিল্লু, সায়ন, শ্রীজিতের মতো লুজ হয়তো কথায় খানিক স্যুইং খাইয়ে এপাশে-ওপাশে নিয়ে যাওয়া যায়; কিন্তু ভাবো ফিল্ডার যদি বড়ো কেউ হয়, ব্যস কেল্লাফতে! বাবা, কাকা, দাদা হলে তাও একটা চান্স থেকে যায়, কিন্তু মা, মাসি অথবা দিদিদের কেউ হলে আর নিস্তার নেই! ভবি কোনোভাবে ভুলবে না! একেবারে খপ করে ধরবে!

কীরকম মুশকিল ভাবো! তবে এই মুশকিল থেকে বাঁচার উপায় অবশ্য ক্লাসে স্যার বলে দিয়েছেন৷ যদিও যেভাবে বলেছিলেন, সেও ভারী মজার ঘটনা!

স্যার তখন যাকে বলে একেবারে একঘর মুডে পড়াচ্ছিলেন৷ ‘পাগলা গণেশ’৷ সে এক দারুণ গল্প৷ না পড়া থাকলে আমাদের বাংলা বই থেকে পড়ে নিতেও পারো৷ যাই হোক, গল্পের কল্পপথ ধরে স্যার তো তখন ৩৫৮৯ সালে৷ গপ্পেও বলা নেই এমন সব গুচ্ছ গুচ্ছ আবিষ্কারের টপাটপ কল্পনা করছেন আর সপাসপ শোনাচ্ছেন৷ পিছন বেঞ্চের দুষ্টু ছেলের দল চাপা গলায় একেবারে মাপা মাপা ফুট কাটছে৷ সেসব শুনে পেটের ভিতর থেকে হাসির টর্নেডো ক্রমশ : শক্তি জমিয়ে বাইরে ঠেলে বেরুতে চাইছে, অথচ প্যাঁদানির ভয়ে বেরুতে পারছে না! বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে ডানহাতের তর্জনীর ডগা চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছি! কিন্তু যেভাবে একের পর এক ফুলটস আসছে, হাসির ঢেউ উবলে এসে পড়ছে, মনে হচ্ছে : ছাই কিছু তো ঘটুক, হেসে বাঁচি! এমন সময় লাইফ বোটের মতো এসে উঠলেন হ্যাপি প্রিন্স! মানে আমাদের ফিজিক্সের ল্যাব অ্যাটেনড্যান্ট অশোকদা৷ হাতে নোটিশের লাল খাতা!

ঘরে ঢুকে সামনের বেঞ্চে হেলান দিয়ে ত্রিভঙ্গ মুরারি হয়ে অশোকদা বলল, ‘মে আই কামিং সার?’

পড়ানোর গতিতে হোঁচট লাগায় তিতিবিরক্ত স্যার নিমের পাঁচন মুখ করে বলে উঠলেন, ‘অলরেডি তো ইন হয়েই আছো সম্রাট অশোক! এবার কীসের জন্যে ‘কামিং’ ঝটপট বলে ফেলো!’

অশোকদার মুখটা তুম্বো হয়ে গেল! কিছু না বলে কেবল নোটিশ খাতাটা এগিয়ে দিলেন স্যারের দিকে৷ ঠিক সেই ব্রাহ্মমুহূর্তে আমার পাশ থেকে রাজীব চাপা গলায় ফুট কাটল, ‘দেখ! স্যার এবার বাইবেল পড়বে!’ খ্যাঁক করে হাসতে গিয়েও চুপ করলাম! অনুপমের অবস্থা বোধ হয় আমার থেকেও খারাপ৷ ওকে দেখলাম দু-হাতে চুল টেনে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসি সামলাচ্ছে৷

স্যার সত্যিই দু-হাতে বাইবেলের মতো করেই খাতাটাকে ধরেছেন! ‘পাগলা গণেশে’-র কল্পনার ঠেলায় চশমাটা ঝুলছে নাকের ডগে, লেন্সের মধ্যিখানে আবার খানিক চকের গুঁড়ো লেগে ঝকঝক করছে! স্যার সত্যি সত্যি ফাদারের মতো ধীর মন্দ্রিত স্বরে বলছেন, ‘আগামীকাল...’৷ বলতে বলতে এক্কেবারে শেষে এসে যেই ‘পঠনপাঠন বন্ধ থাকিবে’ উচ্চারণ করেছেন, অমনি রাজীব ঠিক সেই স্বরে মাথা নীচু করে বলে উঠেছে ‘আমেন!’

সাইক্লোন, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস! কত সামলানো যায়! মুখ চেপে ধরতে ধরতেই শুনলাম অনুপম পুরোনো জেনারেটারের মতো শব্দ করে গুবগুবিয়ে হেসে উঠেছে! এসব ক্ষেত্রে ফল যা হবার তাই হল৷ গুবগুবানো হাসির মাশুল গুমগুমানো তাইশানি!

তবে কি না কথাতেই তো বলে, কারও সর্বনাশ তো কারও পৌষমাস! সে কী আর মিথ্যে হবার? অনুপমের ঘনীভূত সর্বনাশে পৌষ এসে ডাক শোনাল আমাদের! উত্তম-মধ্যম খেল বেচারা অনুপম৷ আর সেই ছুতোয় চক্রবৃদ্ধিতে জমা এতক্ষণের হাসি খালাস করে হেসে বাঁচলাম আমরা৷

পিট্টি দেওয়ার পর স্যারের বোধ হয় খারাপ লেগে থাকবে৷ সে জন্যেই সত্যি সত্যি ফাদারের মতো টোনে বলছিলেন, ‘দুঃখ পাস না রে অনুপম! তুই তো ভাগ্যবান মাস্টামশাইয়ের কাছে মার খেলি৷ এ মার সে মার নয় রে! এ হল রূপান্তরিত আশীর্বাদ! এই সবই হল সব সুখস্মৃতি!’

চোখ কচলাতে কচলাতে অনুপম বললে, ‘হ্যাঁ স্যার! ব্যথায় পিঠটা এখনও চড়চড় করছে, সুখস্মৃতিই তো বটে!’

স্যার ওর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘এখন বুঝবি না রে! বড়ো হলেই বুঝবি এ স্মৃতি কত সুখের! তখন মনে হবে, আহা! স্যার যদি আবার এখন একটু পিটিয়ে দিত! আবার যদি ফিরে যাওয়া যেত পুরোনো ক্লাসে!’ খানিক চুপ করে পকেট থেকে ধপধপে রুমাল বার করে চশমার কাচ মুছতে মুছতে স্যার বললেন, ‘কত স্মৃতি জমবে একের পর এক মনের ভিতরে! কাজেই এইসব সুখস্মৃতি যদি পরে কোনোদিন ফিরে পেতে চাস তো এখন একেবারে ডেট ওয়াইজ, প্লেস ওয়াইজ, টাইম ওয়াইজ পাই টু পাই লিখে রাখ সব!’

‘সেই তো স্যার, আপনার কথা শুনে প্যাঁদানির স্মৃতিকথা লিখি, আর সেই লেখা বাড়িতে বড়োদের চোখে পড়ুক! আর তারপরে তাদের কল্যাণে আরও গুচ্ছ গুচ্ছ সব সুখস্মৃতি জমুক!’

‘তা কেন রে! বড়োদের চোখে পড়বে কেন? তোরা কেউ ডায়েরি লিখিস না?’

‘লিখি তো৷ স্কুল ডায়েরি৷ রোজ লিখে ক্লাস টিচার এস.বি. স্যারকে দিয়ে সই করিয়ে নিতে হয়!’ ফার্স্টবয় কাম মনিটর পর্ণাভ ফার্স্টবেঞ্চ থেকে বলল৷

‘ওঃ! থাম তো! খালি ক্লাস আর পড়া! এর বাইরে একটু তাকিয়ে-টাকিয়ে মাঝেমধ্যে দেখ তো পর্ণাভ!’

বেশ হয়েছে ব্যাটা বকা খেয়েছে৷ না হক সবার নাম লিখে ঝাড় খাওয়ায়৷ ওকে ফুস হতে দেখে আমার মতো অনেকেই বেশ শান্তি পেয়েছে এ-ব্যাপারে একদম নিশ্চিত৷

যাই হোক, সবার মুখের দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, ‘শোন ডায়েরি লেখাটা অনুশীলন কর৷ সব বড়ো মানুষেরা ডায়েরি লিখতেন৷ প্রতিদিন এমন কিছু না কিছু ঘটনা আমাদের সবার জীবনে ঘটে বুঝলি, যা আজ হয়তো তেমন গুরুত্বের কিছু নয়, কিন্তু লিখে রাখলে সেই-ই দেখবি বিশ বছর পর অমূল্য স্মৃতি!’

সেদিন স্যার ডায়েরি লেখা নিয়ে আরও যা যা বলেছিলেন, তাতে যাকে বলে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম৷ বাড়ি ফিরে মাকে বললাম ডায়েরি লেখার কথা৷ মানে আমারও একটি ডায়েরি লাগবে এই আর কী! তো মা কী করল জানো? দেরাজ খুলে এটা-সেটা ঘেঁটে শেষ অবধি একটা হলুদ প্যাকেটের ভিতর থেকে একটা লাল মলাটের বইয়ের মতো ডায়েরি বের করে বলল, ‘এটা কী বলত বেলো?’

বললাম, ‘কী আবার! ডায়েরি!’

‘উঁহু! হল না! এটা কেবল একটা ডায়েরি নয়, এটা আমার ডায়েরি!’

‘মানেটা কী হল! ডায়েরিই তো!’

‘খানিকটা তাই, তবে আমার কাছে এটা আসলে টাইম মেশিন৷ এটায় চাপলেই আমি ধাঁ করে চলে যাই সেই ছোট্টবেলায়!’

‘কই দেখি, দেখি! দেখাও দেখাও!’

মায়ের হাত থেকে নিয়ে দেখলাম, আরিব্বাস! মায়ের এক্কেবারে ছোটোবেলার ডায়েরি তো! পেনসিল দিয়ে লেখা৷ কোনো কোনো শব্দ আবার পেন দিয়ে৷ বোধ হয় সেগুলো বেশি গুরুত্বের৷ চারটে পুতুলের ছবি৷ নীচে গোটা গোটা হরফে তাদের নাম লেখা : টাট্টু, টুট্টি, গাট্টু, গুট্টি! মা বলল, ওরা না কি মায়ের খুব প্রিয়! পাতায় পাতায় আরও অনেক অনেক মজার মজার ছবি, ছড়া! সেগুলো সব মায়ের লেখা! মায়ের আঁকা! ছড়াগুলো সব দাদান, আম্মা আর আমার মাসিদের নিয়ে!

সবগুলো তো আর বলতে পারব না, তবে একটা পাতায় দেখা লেখার কথা আমি অবশ্যই তোমাদের বলব৷ কাঁপা কাঁপা হরফে সেখানে লেখা ছিল :

আমার নাম টুকাই৷ আমি বামাসুন্দরী ইস্কুলে থ্রি ক্লাসে পড়ি৷ আমার দুই বোন৷

সবাই ওদের ভালোবাসে৷ সবাই ভাবে আমি একটা ফালতু৷ কিন্তু ওরা জানে না,

আমার মধ্যে একটা গুপ্ত শক্তি আছে, যা আমার চোদ্দ বয়স হলে প্রকাশ পাবে৷

হুঁ হুঁ৷ সবাই তখন বুঝতে পারবে আমি আসলে কে৷ ঠিক চোদ্দ বয়স হলে আমার সেই শক্তি প্রকাশ হবেই হবে৷

‘সেই শক্তি’ লেখাটাকে গোল করে কে যেন তিরচিহ্ন দিয়ে নীচে লিখে দিয়েছে ‘ঘুম শক্তি’! মা বলল, এটা তাতাইয়ের কাজ৷ তাতাই আমার ছোটোমাসি৷ ফ্যাঁক করে হেসে বললাম, ‘তুমি কি খুব ঘুমোতে মা?’

মা বলল, ‘তাতাই লিখেছে যখন ওকেই জিজ্ঞেস করিস!’

‘তুমি ডায়েরিতে এত সব লিখতে?’

‘লিখতাম তো! তোর বড়দাদু আমায় এই ডায়েরিটা দিয়েছিল৷ আমার যখন যা মনে হত সব লিখে রাখতাম৷ তাতাই আর রুবাই দু-জনেই সেটা আবার লুকিয়ে পড়ত৷ রুবাই কিছু করত না, কিন্তু তাতাই অমনি করে কারিকুরি করত৷’

এই পর্যন্ত বলেই মা আবার দেরাজ ঘেঁটে আরেকটা ডায়েরি বার করল! বললাম, ‘এটাও তোমার?’

মা হেসে বলল, ‘না রে! এটা তো তোর জন্যে৷ আজ থেকে তোর মনের কথা এখানে লিখবি৷ সত্যিই যখন বড়ো হয়ে যাবি, দেখবি তোর ছোট্টবেলাটাকে এই ডায়েরিটায় খুঁজে পাবি’৷

তারপর আর আমায় পায় কে? ডায়েরি নিয়ে দিলাম ছুট আমার স্পেশাল জায়গায়, মানে আমার খেলার ঘরে৷ ডায়েরিটা খুলে পৃথিবীর ম্যাপ, ভারতের ম্যাপ থেকে শুরু করে সব পৃষ্ঠা দেখে নিলাম বার কয়েক৷ তারপর মনে হল, না! এভাবে নয়, আগে একটা নাম দিতে হবে আমার ডায়েরির৷ কী নাম , কী নাম ভাবছি আর ভাবছি! কোনো ভাবনাই জুতসই হচ্ছে না৷ এমন সময় নীচ থেকে বাবা ডাকল, ‘বেলো! এই বেলো! আরে কোথায় গেলি! শোন!’

‘আসছি’ বলে জবাব দেবার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ধাঁ করে নামটা খেলে গেল! বাবার মার্কার পেনটা দিয়ে ডায়েরির ভিতরের পাতায় লিখলাম—‘বেলোর ডায়েরি!’

সেই ডায়েরিতেই আমি তারপর থেকে মনের কথাগুলো লিখি৷ আর লিখি সেইসব কথা, যা আমি কাউকে বলি না, মাকেও না!

যদিও ডায়েরিতে দিনক্ষণের উল্লেখ করে নিয়মিত লেখা উচিত, তবে আমি তা করতে পারি না৷ পড়াশুনোর বেজায় চাপ আছে কি না! অবশ্য দিনটার উল্লেখ বেশিরভাগ সময়েই করি, তবে নিয়মিত লেখা হয়ে ওঠে না৷

এই যেমন আজ প্রায় সপ্তাহ তিনেক বাদে লিখতে বসেছি৷ এর মাঝে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে৷ বিস্তারে লিখতে গেলে প্রচুর লিখতে হবে, কাজেই কেবল মূল প্রসঙ্গগুলো লিখছি৷

এই যেমন ধরো, আমার অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হয়েছে৷ তারপর ধরো, আমাদের রান্নাঘরের সানসেটে পেল্লায় একটা মৌচাক হয়েছিল, তার এক-একটা মৌমাছির সাইজ প্রায় ভিমরুলের মতো৷ তারপর ধরো, আমাদের ফুটবল টিম অপোনেন্টকে দু-দু-বার হারিয়েছে৷ তারপর ধরো, সায়নের কাকা একটা এই বড়ো ফোন কিনেছেন, তাতে ঠাসা গেম! তারপর ধরো, রান্নাঘরের সামনে আমার ফেনা বিষয়ক এক্সপেরিমেন্টের সময় জিজ্ঞেস না করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে গিয়ে মায়ের খাস গুপ্তচর রাবেয়াদি একেবারে পা পিছলে আলুর দম হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি৷ তবে সবচেয়ে বড়ো খবর, বাবার বদলি হয়েছে৷

কেবল বদলি নয়, সঙ্গে প্রোমোশান! বাবা এখন বসন্তপুর দোঘরা নেতাজি ইস্কুলের হেডমাস্টার হয়েছেন৷ প্রথমে বাবা একাই গিয়েছিলেন৷ সপ্তাহ খানেক পর বাড়ি ফিরে এলেন৷ মাকে রাত্রিবেলা বললেন,সমস্ত কাজকম্ম সেরে আমাদের নিয়ে যাবেন৷

ঘাপটি মেরে শুয়ে শুয়ে কথাগুলো শুনে বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল! নিয়ে যাবেন মানে! আমরা আর এ-বাড়িতে থাকব না! আমার খেলার ঘর, চিলেকোঠা, ছাতের দুপুর! তার ওপর আরও শুনি, বাবা বলছেন, ‘বেলোটার খুব কম্পিউটার গেমের আদত হয়েছে৷ ওখানে কম্পিউটার নিয়ে যাব না৷ আর মোবাইল টাওয়ারও ভালো নয়, কাজেই মোবাইলও নেব না৷ অবশ্য ল্যান্ডফোনের একটা দরখাস্ত দিয়ে এসেছি৷ হয়তো চলে আসবে৷’

মা কী বললেন, সে আর শোনার ইচ্ছে হল না৷ সত্যি কথাটা তোমাদের বলি, ওটুকু শুনেই আমার খুব কান্না পেল! পাবেই তো বলো? এখানে আমার কত বন্ধু! সবাই মিলে কত খেলি! শুধুই যে গেম খেলি তা তো নয়, ওই গেমের চরিত্রদের নিয়ে ছাতের উপর, নইলে পার্কে আমরা সবাই মিলে রোল প্লে করি! সব কিছু একসাথে কেড়ে নেবে! বাবা এটা করতে পারল! শব্দ না করে বালিশে গাল চেপে ফোঁপাচ্ছিলাম! কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম!

তারপর দিন পাঁচেকের মাথায় সব্বাইকে বিদায় জানিয়ে আমার মার্বেলগুলো নেড়ুকে দিয়ে, ব্যাটটা ভোলার কাছে রেখে চোখ মুছতে মুছতে চলে এলাম এখানে৷

এখানে মানে যেখানে এলাম, সে জায়গার নাম ওয়াশিল চক৷ বর্ধিষ্ণু গ্রাম৷ সব কিছুই আছে৷ সব মানে বেঁচে থাকার সব কিছু, ছেড়ে আমার বন্ধুদের!

যে বাড়িটায় আছি আমরা, সেটাও বেশ বড়ো৷ একতলা দোতলা মিলিয়ে আটটা ঘর৷ আমাদের তো লাগে কেবল তিনটে৷ বাবার ইস্কুল এখান থেকে কিছুটা দূরে৷ সাইকেলে যেতে হয়৷ বাবা ইস্কুলে চলে যাওয়ার পরেই গোটা বাড়িটা খাঁ-খাঁ করে৷ মা রান্নাঘরে রান্না করেন৷ মাঝেমধ্যে কড়াইয়ের গরম তেলে মাছ ছাড়ার ছ্যাঁক ছোঁক আওয়াজ আসে, ওমলেটের গন্ধ আসে! আর আসে রাবেয়াদির বাসন ধোয়া, মায়ের সাথে গপ্প করার শব্দ! মায়ের সাথেও দেখো, রাবেয়াদি এসেছে; বাবার সাথে তো নতুন ইস্কুল এসেইছে, একগাদা বইও এসেছে! কেবল আমার সাথেই কেউ আসেনি! না নেড়ু, না বিশু, না শ্রীজিৎ—কেউ না! আসবেই বা কেমন করে! ওদের বাবা-মা-ই বা ছাড়বে কেন? ওদের বাবা-মা ওদের কত ভালোবাসে, কত ভাবে—আর আমার কপাল দেখো! আমি যেন একটা ফালতু! কেবল, ‘বেলো পুকুরপাড়ে যেয়ো না! বেলো গাছে ঢিল ছুড়ো না! বেলো, খালি পায়ে ঘুরো না! বেলো জঙ্গলে যেয়ো না!’ আরে আমি করবটা কী?

অবশ্য করার মতো এখানে অনেক কিছুই আছে৷ একটা বিরাট মাঠ আছে, ওই যে বিরাট ইউক্যালিপটাস গাছটা, ঠিক ওর পিছনে৷ সেখানে উঁচু-নীচু অনেক টিলা আর গাছের গুঁড়ি৷ এই বড়ো বড়ো মাটির ঢেলা৷ অনায়াসে যেকোনো গেমের দারুণ রোল প্লে করা যায়, কিন্তু করবটা কার সাথে?

বাড়িটার দক্ষিণ দিকে বিরাট একটা পুকুর, ঘাটের পৈঠার কাছে ছোটো ছোটোমাছ কিলবিল কিলবিল করে! সেই পুকুরটাকেও গেমের ভিতর ঢোকানো যায়! একটা গুলতিও আছে, সেটা দিয়েও অনায়াসে অ্যাংরিবার্ড-অ্যাংরিবার্ড খেলা যায়! কিন্তু সেসব কি আর সবসময় একা একা জমে!

এছাড়াও উঠোন ভর্তি কত্তরকম গাছ, এত্তগুলো ঘর, মৌচাক, বাঁশ বাগান-ক্যাসেল অফ ম্যাজিক, প্রিন্স অফ পার্সিয়া, টেম্পেল রান, সুপার মারিয়ো খেলার জন্যে যা যা দরকার সব আছে! কিন্তু থেকেও নেই! কারণ এখানে তো আমার কোনো সঙ্গীই নেই! বন্ধুদের যে কত দরকার সে আমি এখানে এসে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি!

সন্ধ্যেবেলা অঙ্ক কষতে হয়! এও এক জ্বালা! ইস্কুলের অ্যানুয়াল শেষ হয়ে গেছে, তবু রোজ অঙ্ক কষতে হবে৷ বাবার নিয়ম৷ খালি বলেন, ‘অভ্যাস, বেলো অভ্যাস! সু অভ্যাস ছাড়তে নেই রে! গোটা দুনিয়াটাই চলে অভ্যেসে৷ ভাব তো এই আমাদের পৃথিবী সেই কবে থেকে ঘুরেই চলেছে, ঘুরেই চলেছে! একই কক্ষপথে! একবার ভেবে দেখ তো, যদি তারও মনে হয়, নাঃ! আর ভাল্লাগে না! দুটো দিন অন্য পথে একটু ঘুরে আসি, তবে!’

বাবা, মাকে নতুন ইস্কুলের গপ্প বলেন রাতে৷ ঘুমের ভান করে সেও শুনি৷ বাবাদের এই নতুন ইস্কুল না কি বেশ মজার! বাবা তো কেমিস্ট্রি পড়ান, কাজেই স্বভাব মতো নতুন ইস্কুলে গিয়েই না কি ল্যাবে ঢুকেছেন; আর দরজা খুলে ভিতরে পা দিতে না দিতেই কোত্থেকে যেন তিনটে ধেড়ে ইঁদুর হুড়মুড়িয়ে দৌড়ে এসেছে! ভাবটা যেন, ওয়েলকাম! ওয়েলকাম! যাই হোক, এমন গ্র্যান্ড ওয়েলকামের স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে বাবা ‘ইরররক!’ করে লাফিয়ে উঠে টাল সামলাতে না পেরে ঝাপসে পড়েছেন ঝুল ধরা রিয়েজেন্টের র‍্যাকে! ঠেলা খেয়ে ঠাস ঠাস ধুম ধুম করে সেই র‍্যাকেরা দেশলাইয়ের খোলের মতো কাত হয়ে পড়েছে! বাবা তো ভাবছেন, বুঝি অ্যাসিড-ট্যাসিড সব পড়ে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা! সেজন্যে ‘জল ঢালো জল ঢালো’ করে লাফাচ্ছেন! ওদিকে সঙ্গে ছিলেন যে অ্যাটেনড্যান্ট, তিনি ভেবেছেন বাবার বুঝি পায়ে ব্যথা লেগেছে, তাই জল চাইছেন! সে-ও উত্তেজনায় ঘরের কোণের জলের কুঁজো ধরে উপুড় করে ঢেলেছে বাবার পায়ে৷ চামড়ার জুতো-মোজা ভিজে ঢোল!

যাই হোক, জল ঢালায় না কি শেষ পর্যন্ত সব ঠান্ডা হয়েছে৷ বাবারও উত্তেজনা কমেছে, কাজেই সঙ্গের আর সবারও৷ কিন্তু বাবার তারপর মনে হয়েছে, সেই তো! রিয়েজেন্টের র‍্যাক উলটোলো, অথচ কিছুই হল না কেন! সরেজমিনে দেখতে গিয়ে বাবা দেখেন কী, হবে কোথা থেকে র‍্যাকে তো কোনো রিয়েজেন্টই নেই! কেবল গোটা কয়েক ধুলো পড়া ডিস্টিল ওয়াটারের বোতল! রাসায়নিক যা আছে তার সবটাই আলমারিতে তোলা৷ বাইরে কেবল স্যাঁতসেঁতে ব্ল্যাকবোর্ড, সিল করা একবাক্স চক, ম্যাড়মেড়ে ন্যাতা হওয়া পিরিয়োডিক টেবিল, উইয়ের মাটি, ইঁদুরের গর্ত আর টেবিলের উপর লাল সালু দিয়ে ঢাকা একখানা হারমোনিয়াম!

কেমিস্ট্রি ল্যাবে হারমোনিয়াম! সে রহস্য শেষপর্যন্ত উদঘাটন করেছেন স্বয়ং কিশোরকুমার! মানে কিশোরকুমার সারেঙ্গি৷ কেমিস্ট্রির স্যার৷ বাবা মাকে বলছেন, পদবির সাথে লোকটার বেজায় মিল! সিড়িঙ্গে রোগা এক লোক, মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুল! বাবাকে না কি উনি জানিয়েছেন, রসায়নের রসের বদলে সঙ্গীতের রসই তাঁর বেশি পছন্দের৷ সেজন্যেই পৈতৃক নামটারও ওই কুমার অবধি অথবা সারেঙ্গিটুকুই তাঁর পছন্দ৷ এই ল্যাবে তিনি সাধারণত ছাত্র-ছাত্রীদের গানের তালিম দিয়ে থাকেন৷

এ পর্যন্ত শুনেই মুখ চেপে হাসতে গিয়ে বাবার কাছে ধরা পড়ে গেলাম৷ বাবা বলল, ‘কী রে বেলো, ঘুমোসনি?’

কিছু না বলে হাসি থামিয়ে গোমড়া মুখে ধড়মড় করে পাশ ফিরে শুলাম৷

ঘটনাটা ঘটতে শুরু করল ঠিক তার পরদিন সকাল থেকে৷ বাবা তখন ইস্কুলে বেরোনোর জন্য খেতে বসেছেন৷ এবং নিয়ম মতো আমার ডাক পড়েছে৷ যেতেই একটা সিদ্ধ ডিম নিজের পাত থেকে হাতে নিয়ে বললেন, ‘আয় বেলো নিয়ে যা!’

বললাম, ‘না, লাগবে না৷’

‘নিয়ে যা বলছি!’

ব্যাজার মুখে ডিমটা নিয়ে বাইরে এসেই তারিয়ে তারিয়ে স্বাদ করে খেতে শুরু করলাম৷ সবে আদ্দেকটা খেয়েছি অমনি একটা খ্যানখেনে গলা পেলাম, ‘একাই সবটা খেলে, আমায় তো একটু দাও!’

চমকে তাকিয়ে দেখি ইয়া মোটা ন্যাজওয়ালা একটা হুলো! আমার কাছে থাবা বাড়িয়ে ভাগ চাইছে! করুণ মুখ করে থাবা চাটছে৷

এইবেলা একটা কথা আগে ভাগে বলে রাখি, আমি জানি এসব কথা বড়োরা কেউ বিশ্বাস করবে না, তাই তাদের কাউকে কিচ্ছুটি বলিনি; তোমাদের বলছি বটে, তবে ঠিক তোমাদেরকেও নয়! আর কীভাবে ডায়েরি লেখা যায়, সেসব কায়দা আমার খানিক জানা থাকলেও বেশি খাটতে হয় বলে ভুলে গেছি, তাই একমাত্র তোমাদের উদ্দেশ্য করেই এত খেটেখুটে ঘটনাগুলো লিখে রাখছি৷ যদি কেউ পড়েই ফেলো আর পড়ে-টড়ে যদি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে না হয়, কোরো না! কিন্তু তা বলে এইসব নিয়ে আমার সাথে তর্ক জুড়ো না যেন, এই আমি পষ্টাপষ্টি বলে দিলাম!

যাই হোক, সেই বেড়ালের খোনা গলায় কথা শুনে তো আমি হাঁ! অবাক হলেই আমার হাত আপনা-আপনি মাথা চুলকোয়৷ রিফ্লেক্স অ্যাকশান৷ সেই মতোই ডানহাতটা সবে পিছনের চুল খামচেছে অমনি ফের সেই স্বর! ‘কী হল! একাই খাবে? আমায় দেবে না?’

আমি আরও অবাক! কারণ বেড়ালটা থাবা চাটা এক মুহূর্তের জন্যে থামায়নি, হাঁ মুখটা একবারের জন্যও বন্ধ করেনি, অথচ কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেলাম!

‘আরে বাবা! ওদিকে কী দেখছ? ও তো আমার ভুতো! বাঁ-দিকে দেখো! এইত্তো আমি!’

বাঁ-দিকে চেয়েই দেখি গরাদছাড়া জানালাটার দেয়ালে বসে পা দোলাচ্ছে একটা ছেলে! হাফ প্যান্ট, গায়ে একটা নীল রঙের গোল গলা টি-শার্ট!

‘সেই কখন থেকে বলছি! বাবা রে বাবা! বেশ হাঁ করা ছেলে তো ভাই তুমি!’

খটাস করে মুখটা বুজিয়ে নিয়ে বললাম, ‘মোটেই আমি হাঁ-করা ছেলে নই! একটু অন্য কথা ভাবছিলুম বলে বুঝতে পারিনি!’

‘হ্যাঁ, সে তো এই ক-দিন ধরেই তোমায় দেখছি! এমন লাউ-এর মতো মুখ ঝুলিয়ে থাকো কেন সবসময়? এতসব গাছপালার মধ্য দিয়ে অমনি করে বিষ্ঠামুখে কেউ হাঁটে না কি?’

রাগ হল খুব৷ তবে সত্যি কথা কী, কথা কইতেও ইচ্ছে হচ্ছিল বেশ! তাই বললুম, ‘আমার এখানে ভালো লাগে না! আমার বাবা এখানে বদলি হয়ে এসেছেন৷ আমাকেও আমার সব বন্ধুদের ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে৷ আর এর পরে রেজাল্ট বেরোলে, আমি ঠিক জানি, বাবা আমাকে ওই ইস্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে এখানে কোনো ইস্কুলে ভর্তি করে দেবেন! আমার এখানে এসে তাই কিচ্ছু ভালো লাগে না!’

কোথায় তাই তো, তাই তো... ঠিকই তো, ঠিকই তো... ইস—এইসব বলবে তা নয়, সেই ছেলে তার খোনা গলায় একেবারে খনখনিয়ে হেসে উঠল! হাসতে হাসতে দেয়াল থেকে গড়িয়ে পড়ে আর কী!

বললাম, ‘তুমি কেমন ছেলে গো! বন্ধুর দুঃখে হাসতে হয়?’

অমনি সেই ছেলে টক করে হাসি থামিয়ে বলল, ‘ঠিকই তো৷ হাসাটা আমার ভাই ভুলই হয়ে গেছে৷ কিন্তু তুমি এখানে এসেও তো বন্ধু খুঁজে নিতে পারতে! ওই তো ওই মাঠটায় বিকেলবেলা সবাই ফুটবল খেলে, ওদের সাথে গিয়ে তো খেলতেও পারতে!’

‘আমি ভালো খেলতে পারি না৷’

‘ভালো-মন্দের আবার কী আছে? সবাই মিলে খেলাটাই তো মজা! একসাথে খেলা, তারপর মাঠে বসে হাসি মজা, না হলে পুকুরে সবাই মিলে ঝাঁপানো—এর মতো আবার মজা আছে না কি?’

‘আমি সাঁতার জানি না!’

‘ফুটবল জানো না, সাঁতার জানো না! তবে কোন খেলাটা খেলতে তোমরা?’

‘প্ল্যান্ট ভার্সেস জোম্বিস, অ্যাংরি বার্ডস, সনিক দ্য হেজহগ, পোকেমন—এইসব’

‘সেসব আবার কী?’

‘কেন? কম্পিউটার গেম! মোবাইলেও খেলতে পারো৷’

‘ও বাবা! ও তো একা বসে খেলার! ওতে আবার মজা কোথায়?’

‘একা কেন? একা তো বাড়িতে খেলার সময়! সবাই যখন মিলি তখন তো আমরা রোল প্লে করি৷ দল ভাগ করে পোকেমনের লড়াই করাই৷’

‘তোমার সত্যি সত্যি পোকেমন আছে?’

‘সত্যি কোত্থেকে থাকবে? মিছিমিছি খেলা! কিন্তু সত্যি সত্যি, দারুণ মজা!’

‘ধুর! তুমি আমার সাথে বরং চলো, তোমায় দেখাব মজা কাকে বলে! চলো তো দেখি!’ বলেই হাত ধরে দিল এক হ্যাঁচকা টান! টাল সামলাতে না পেরে পড়ছিলাম আর কী! হঠাৎ কে যেন হাতটা টেনে ধরল!

‘কী রে বেলো! এখানে এসেও একা একা বকবক করছিস! এত বেখেয়াল থাকলে তো আছাড় খাবি! চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখ না, কত কিছু তো আছে দেখার৷ পাড়ার ছেলেপেলের সাথে একটু খেলাধুলোও তো করতে পারিস!’

কিছু না বলে মনে মনে মুখ ভ্যাঙচাচ্ছিলাম৷ বাবা মাথাটা নেড়ে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল৷ অমনি খেয়াল হল, আরে সেই ছেলেটা গেল কোথায়? বাবাকে দেখে কি পালাল? এদিক-ওদিক দেখতে দেখতেই শুনি আমগাছটার হেলে পড়া ডালটা থেকে ডাক দিচ্ছে, ‘ও বেলো! ও বেলো!’

দৌড়ে গিয়ে বললাম, ‘তুমি ও নামে ডাকছ কেন? শুধু বাবা ডাকে, আর মা মাঝে মাঝে ডাকে!’

‘কেন আমি যদি ডাকি তাতে কি পঞ্চার ষাঁড় তাড়া করবে, না কি আমার ভুতো মাছ খেতে ভুলবে? যা বলো না! আমি তোমাকে বেলো বলেই ডাকব!’

আচ্ছা জাঁহাবাজ তো! যাক গে যাক! বললাম, ‘তোমার নাম কী?’

কানের পাশ থেকে কী একটা পোকা টকাস করে একটা টোকা দিয়ে ঝেড়ে ফেলে সে ছেলে বলল, ‘আমার নাম ফা-হিয়েন৷’

‘ধ্যাৎ! যা-তা! আমাকে কি বোকা ঠাওরালে? ফা-হিয়েন তো ইতিহাস বইয়ে! পরিব্রাজক!’

‘নাও! আরে সেজন্যেই তো আমার ওই নাম! আমিও যে সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াই!’

‘কোথায় ঘোরো?’

‘কেন এ গ্রামে, ও গ্রামে—সবখানে! যেখানেই দেখি কেউ একা একা বসে বসে ঝিল্লি খাচ্ছে অমনি তার কাছে গিয়ে পড়ি, এই তো যেমনি তোমার কাছে এলুম৷’

‘তোমার বাবা-মা কিছু বলে না? তুমি যে এমনি করে সারাদিন ঘুরে বেড়াও! পড়াশুনো করো না? তাহলে পরীক্ষায় কী করো? ইস্কুলের স্যাররা বকে না?’

‘আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও! হড়বড়িয়ে অত প্রশ্ন করলে উত্তর দেবো কী করে আর শুনবেই বা কেমন করে! শোনো, তোমার সঙ্গে যা যা হয়, আমার সঙ্গেও সেরকমই৷ কাজেই বকুনি, প্যাঁদানি, তাইশানি সবই খেতে হয় সময় সময়৷ তবে কি না গায়ে মাখি না৷ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে চললে ওসব ছোটোখাটো ঝড়ঝাপটা গায়ে মাখতে নেই৷’

‘ওঃ! এই তো আমার মতো ছোট্ট মানুষ! তার আবার মহৎ উদ্দেশ্য!’

‘ছোট্ট তো কী, মানুষ তো! তুমিও একবার আমার সাথে এসো, চারপাশের সাথে মিশ খাও, দেখবে কত কী করতে পারবে৷’

‘কী করতে পারব?’

‘উই দূরে যে খেতের আল দেখছ, সেই আল ধরে হু হু করে দৌড়োতে পারবে, এই আমগাছের ডাল থেকে দোল খেতে পারবে, উই যে ধোঁয়ার মতো পাহাড় দেখছ, ও কী জানো? ও হল ইটভাটার মাটির পাহাড়! সেই পাহাড়ে উঠে তুমি দলবেঁধে অ্যাডভেঞ্চার করতে পারবে, খুব সকালে যদি উঠতে পারো আর দৌড়োও না, তাহলে মন কেমন চনমন চনমন করে বুঝতে পারবে! কত পাখি জানো আমাদের এখানে! চাও কী, সবার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারবে!’

‘ধ্যাত! সে আবার হয় না কি!’

‘বিশ্বাস হয় না তো চলো আজ বিকেলে, নিজের চোখেই দেখবে পাখিরা কেমন সবাই আমার কথা শোনে! আর ভুতোকে তো দেখছই, দেখবে ও কেমন কথা শোনে! কই রে ভুতো, একবার এখানে এসে ডিগবাজির খেলা দেখা তো!’

সবে সেই ভুতোচন্দ্র তার ইয়া মোটা ন্যাজে ভর দিয়ে লাট্টুর মতো চরকি কেটে খান দুয়েক ডিগবাজি দিয়েছে, এমন সময় রাবেয়াদির হেঁড়ে গলায় ডাক, ‘ও সোনাবাবা! মা ডাকতিচে! খেইয়ে যাও!’ সেই হেঁড়ে আওয়াজে ভুতোচন্দ্রর ডিগবাজির তাল গেল কেটে, থ্যাপাত করে পড়েই কী জানি কেন পাঁই পাঁই করে ছুট দিল দক্ষিণের পুকুরঘেঁষা জঙ্গলের দিকে৷ ওর পিছন পিছন ফা-হিয়েনও দিল ছুট! আমিও কী জানি কেন ওদের পিছনে দৌড়োতে গেলুম! কিন্তু তক্ষুনি খপ করে হাত ধরে ফেলল রাবেয়াদি! দেখলাম ফা-হিয়েন যেতে যেতে ইশারা করছে, যার মানে হল, ‘আমি এখানেই আছি৷ তুমি কাজ সেরে এসো৷’

বিরক্ত হয়ে রাবেয়াদিকে বললুম, ‘অমন করে আমায় ধরলে কেন?’

‘না হইলে যে তুমি এতক্ষণে হাওয়া হইয়ে যিতে সোনাবাবা! চলো আগে মুখে কিছু দে নাও, তারপর খেলাধুলো কোরো!’

‘যাবো না যাও!’

‘যাবা না! বেশ তাইলে বাগুন ভাজা আর লুচিগুলান আমিই খাই!’

‘কী! আজ লুচি-বেগুনভাজা হয়েছে?’

‘তবে আর বলতিছি কী! তুমার জন্যিই তো হইয়েছে...’

সে-কথা শোনার জন্যে আমি কি আর সেখানে আছি! কখন ছুট দিয়েছি রান্নাঘরে! এই রান্নাঘরটা আমাদের আগের বাড়ির থেকে অনেকটা বড়ো৷ মাকে দেখলাম তখনও লুচি ভাজছে৷ আমায় দেখে বললেন, ‘এসো, আগে হাতটা ধুয়ে নাও৷’

ফুলকো লুচিতে আঙুল ঠুকে ফুটো করে ধোঁয়া দেখতে আমি ভারি ভালোবাসি৷ আর গোল গোল বেগুনভাজা! উল্লুস! সেও আমার ভারি প্রিয়! মা প্লেটে খাবারটা দিতেই তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেললাম! মা হেসে বললেন, ‘কী! অহনই ছিল আর অহনই মিলাইল!’

এটা আসলে রাবেয়াদির কথা৷ মা-র মুখে শুনতে বেশ লাগল৷ রাবেয়াদি হেসে বলল, ‘তাইলে সোনাবাবা! আসবা না কইছিলা যে!’

‘উঁঃ! আসবা না কইছিলা যে!’ ভ্যাঙচালাম৷

মা বলল, ‘ও কী বাবু!’ তারপর এই বড়ো একটা পাটালি গুড়ের খণ্ড দিয়ে বলল, ‘নাও৷ খেয়ে নাও৷’

সত্যি আজকে দিনটা ভালো৷ কেবল ভালো না এই রাবেয়াদি! দেখ, কেমন আমায় দেখছে আর মুখে আঁচল দিয়ে হাসছে!

খেয়ে-দেয়ে যাওয়ার সময় ইচ্ছে করে কোমর দিয়ে রাবেয়াদিকে একটা ঠেলা দিলাম৷ সেও তেমনি সড়াৎ করে সরে গিয়ে বেঁচে গেল! হেবি চালাক!

মা বলল, ‘বাড়িতেই খেলো৷ জলে জঙ্গলে যেয়ো না যেন!’

ঘর থেকে বেরিয়েই সোজা দৌড়োলাম পুকুরপাড়ে৷ দেখি ঘাটের একেবারে শেষ পৈঠার পাশের ডাঙাটায় দাঁড়িয়ে আছে ফা-হিয়েন, আর ভুতোচন্দ্র ন্যাজ উঁচিয়ে তার পায়ে গা ঘষছে৷ আমি যেতেই ইশারায় আমায় কাছে ডাকল৷ গিয়ে বললুম, ‘অমন করে পালালে কেন? আমার মা আজ কী সুন্দর লুচি-বেগুনভাজা বানিয়েছে জানো! তুমি আমার সাথে গেলেই তো পারতে! দু-জনেই খাওয়া যেত! মা কিচ্ছু বলত না!’

‘না৷ সে আমি জানি৷ মায়েরা কি খাওয়াতে-দাওয়াতে বকেন?’

‘তাহলে পালিয়ে এলে যে বড়ো?’

‘কী জানি! ওই এক ধাত আমার! বাড়ির বড়োদের দেখলেই বুকের ভিতরে গুরগুর করে ওঠে!’

‘সে কী! কেন?’

‘খালি মনে হয় এক্ষুনি গম্ভীর গলা করে হাজারটা প্রশ্ন করবে, তারপর সতেরোর ঘরের নামতা জিজ্ঞেস করবে আর তারপরেই জুলপি টেনে মামার বাড়ি দেখাবে৷’

‘এই! তোমাকেও কেউ জুলপি টানে?’

‘টানে তো৷’

‘আমারটাও টানে জানো! নেড়ুর দাদা পঞ্চাদা, প্রায়ই সুযোগ বুঝে জুলপি টেনে উপরে তুলে দেয়! খুব ব্যথা লাগে!’

‘সে তোমার ওখানে বলে! আমার এখানে হলে না আমি এতদিনে মজা দেখিয়ে দিতাম৷’

‘কী করতে?’

‘কী আবার! ভুলিয়ে-ভালিয়ে লাল পিঁপড়ের বাসার উপর তুলে দিতাম নইলে বিচুটি পাতা পকেটে ভরে দিতাম! হাতে লাগলেই ঠেলা মালুম হত!’

সত্যি কথা বলতে কী, এইসব কথায় ফা-হিয়েনকে বেশ ভালোই লাগছিল৷ অনেকটা আমার মনের মতো একজন৷ কিন্তু সে ভাবটা তো আর এত তাড়াতাড়ি বুঝতে দেওয়া চলে না! তাহলে তো ফা-হিয়েন আমাকে একটা যা-তা ভাববে! কাজেই সে ভালো লাগাটা চেপে গিয়ে বললুম, ‘তুমি এখানে নেমে কী করছ বলো তো!’

‘কী আবার! তোমাকে দুটো জিনিস দেখাব বলে নেমেছি!’

‘কী জিনিস! কই দেখাও!’

ফা-হিয়েন তখন আঙুল দিয়ে ঘাটের পৈঠার কোনার দিকটায় ইশারা করল৷ সেখানে কতগুলো কলমির ডাল জল থেকে মাথা তুলে রেখেছে৷ আর তার মাঝখানে চোবানো রয়েছে ভাতের হাঁড়ি, কাঁসা না পিতলের বাসনকোসন! আর সেই হাঁড়ির চারপাশে... আরিব্বাস! কিলবিল করছে মাছ! এই কড়ে আঙুলের মতো সব মাছ! আর তাদের কোনো কোনোটার সে কী রং! কোনোটা কমলা, কোনোটার গায়ে আবার হলদে কালো ডোরাকাটা! ফা-হিয়েন বলল, হাঁড়ির ভিতরদিকে না কি চিংড়ি মাছও থাকতে পারে!

ও যখন আমায় এত কিছু দেখাল, তখন তো আমারও কিছু জানানো উচিত এই ভেবে যেই না বলতে শুরু করলাম, ‘জানো তো ফা-হিয়েন, চিংড়ি কিন্তু মাছ নয়, জলের পোকা...’ ও বাবা! সে আমায় থামিয়ে কি না চিংড়ির রক্তের নীল রং, হিমোসায়ানিন এইসব কিছু বলে দিল!

তারপর হঠাৎ করে বলল, ‘এটা তো দেখলে, এবার এইটা দেখো!’ বলে এবার সে যেখানটায় দাঁড়িয়ে, ঠিক তার পাশে ইশারা করল৷

ও মা! তাকিয়ে দেখি সে এক মস্ত লম্বা সাপের খোলস! ভয় পেয়ে বললাম, ‘এই! এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকো না! চলো উপরে যাই!’

সেই শুনে ফা-হিয়েন হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘এই তোমার সাহস! আরে খোলস ছেড়ে আর সাপ এখানে আছে না কি! আর থাকলেই বা কী! এ তো দাঁড়াশ সাপ! কামড়ায় না৷ এ হল তোমাদের এই বাড়ির বাস্তুসাপ৷ কত দেখেছি!’

ঠিক এই সময় রাবেয়াদি বোধ হয় বাসন ধুতে ঘাটে এসে থাকবে৷ আমায় দেখেই রাম চিৎকার জুড়ল! ‘ও মাগো! ও সোনাবাবা! তুমি ওই জলের ধারে জঙ্গলে কী করতিছ গো! উইঠে আসো দা ভাই! উইঠে আসো...’

আমি দেখলাম ফা-হিয়েন ঊর্দ্ধশ্বাসে পুকুরের পাড় ধরে মোল্টার ঝাড় ভেঙে উপরের দিকে দৌড়োচ্ছে! আমিও দৌড়োলুম ওর পিছন পিছন! রাবেয়াদি চিৎকার করতে লাগল, ‘ও সোনাবাবা! কই যাও! ও সোনাবাবা! আছাড় খাবা তো! ও...’

দৌড়োতে দৌড়োতে পুকুর পেরিয়ে, বাড়ির পাশের খেত পেরিয়ে, ছায়া ছায়া আম বাগানের ভিতর দিয়ে, সার সার তালগাছের সারি ছাড়িয়ে একটা মাঠে এসে উঠলুম! ফা-হিয়েন তাও থামে না! ওদিকে আমারও দম শেষ! কোনোমতে চেঁচালুম, ‘ফা-হিয়েন! আর পারছি না! থামো, থামো!’

ফা-হিয়েন অমনি থামল৷ আমি তখন পেট চেপে হাঁফাচ্ছি! কাছে এসে বলল, ‘ধুস! এইটুকু দম! রোজ ভোরে আমার সাথে দৌড়োবে, বুঝলে?’

একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বসলাম আর সেই অবসরে আমার সামনে বসে ফা-হিয়েন বলে চলল তার ঘুরে বেড়ানোর সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা! কেমন করে সে ইটভাটার মাঠে চাঁদনি রাতে পিঠে ডানাওয়ালা পরি দেখেছিল, কেমন করে কইচাঁছি গাঁয়ে নদীর পাড়ে মড়ার মতো পড়ে থাকা কুমির মুহূর্তে জলে টেনে নিয়ে গেছিল বাসন্তীকাকিমার ভেড়ার ছানাকে, কেমন করে জান মহল্লার আদিবাসীরা গুলতির টিপে নামিয়ে আনে উড়ন্ত বক অথবা ছুটন্ত ডাহুক, কেমন করে মাথায় মণি নিয়ে রাজগোখরো পার হয়ে যায় ঝুরো খেতের আল, কেমন করে চলতে চলতে নান্নিঝোরার কাছে ঘটাং করে রোজ থেমে যায় রেলের গাড়ি আর দশমাথা নিয়ে নেমে আসেন রাবণ রাজা আর মাসিনদহে গিয়েই কেমন করে সেই রাবণরাজ হয়ে যান নিতাই কৈবর্ত্য, কেমন করে চড়কপুরের বুড়ো শিবের পুকুরে নোলক পরা মাছের মৃত্যু হলেই ঝুলে পড়া আমের ডাল থেকে খসে পড়ে কোদাল আর সেই কোদাল দিয়েই পুকুরপাড়ে মাছ কবর দেন জটাধারী সাধুবাবা—এমনি আরও কত কী!

শুনতে শুনতে কখন যেন সুয্যি মাথা ছাড়িয়ে নামতে শুরু করেছে খেয়াল করিনি৷ হঠাৎ গপ্প থামিয়ে ফা-হিয়েন বলল, ‘এহেহে! অনেক বেলা হয়ে গেল! এরপর আরও দেরি হলে তোমায় বাড়িতে বকবে৷ চলো তোমায় অন্য রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাই৷’

এই না বলে আমার হাত ধরে ফা-হিয়েন সে কোন সব বাগান গোলা পেরিয়ে নিয়ে তুলল পায়ে চলা লাল ধুলোর পথে৷ সে পথের মাঝখানটা উঁচু, আর দুটো ধার ঢালু! ফা-হিয়েন বলল, এ রাস্তায় না কি গরুর গাড়ি চড়ে৷ আমি কখনো গরুর গাড়ি চড়িনি শুনে তার সে কী হাসি!

কোথাও ‘দ’-এর মতো, কোথাও ‘ড’-এর মতো বাঁক খাওয়া সেই লাল মাটির পথে চলতে চলতে কখন যেন গ্রামে পৌঁছে গেলাম৷ এখান থেকে আমাদের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে! হঠাৎ শুনি কাঁপা কাঁপা গলায় কে যেন ডাকছেন, ‘ও গোপাল! একা একা কথা কইতে কইতে যাও কোআনে?’

তাকিয়ে দেখি সে এক থুত্থুড়ি দিদা! হাতে একটা পাকানো লাঠি৷ বললাম, ‘একা কোথায়?’

‘একা না তো কি দুকা? ও গোপাল, আমার চক্ষের বাতি এহনও পষ্ট! আমি পষ্ট দেখছি!’

‘আরে ধুর! এই তো আমার সাথে ফা...’ বলতে গিয়েই দেখি কোথায় সে! ঠিক কোথায় সরে পড়েছে!

দিদা বলল, ‘তুমি আমাগো নয়া হেডমাস্টারের পোলা না কি? কী সোন্দর টানা টানা চোখ! তুমি কইলে সত্যি সত্যিই আমাগো গোপাল! গোপাল বিকালবেলা আইয়ো, তুমার লগে ক্ষীর বানাইয়া রাখুমনে! আমাগো কমলার দুধের ক্ষীর! একবার যদি গোপাল-সেবা দাও, দেখবা বার বার ক্যামন ইচ্ছে করে!’

‘ধ্যাত! কী যে বলো না!’

আমার কথা শুনে সেই দিদা হাসতে হাসতে বলল, ‘কুথায় গেছিলা গো গোপাল? পাও দুইহান ধুলায় ভরা! শীঘ্র বাড়ি যাও গা! নতুন জাগা, নতুন জলে তুমার আবার ঠান্ডা লাগবের পারে! বাড়ি যাও গা!’

চুপচাপ বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম৷ হঠাৎ কানের কাছে ফা-হিয়েনের গলা পেলুম, ‘ভালো করে খেয়ে-দেয়ে নাও, আমি ঠিক আসব সময় মতো৷’

শুনলাম বটে, তবে আশেপাশে তাকিয়েও কোত্থাও তাকে দেখলুম না!

বাড়ির সামনেই দেখি রাবেয়াদি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ আমায় দেখেই ডানহাত তুলে প্যাঁদানির ইশারা করে বলল, ‘চলোগা! আজ মা কেমন তাইশানি দেয় দেখবা!’

জিভ বার করে দু-বার ভেংচে দিয়ে ঘরে ঢুকলাম৷ মা সত্যি খুব গম্ভীর! কিন্তু কিচ্ছু বলল না! এমনকী চানের পর যখন খেতে দিল তখনও কিচ্ছু বলল না! এবার সত্যি সত্যি একটু ভয় ভয় করছিল, কিন্তু রান্নার যা টেস্ট হয়েছিল না! খেতে খেতে সব ভুলে গেলাম!

কী কী রান্না হয়েছিল আজ জানো? আজ হয়েছিল ছোল-বাদাম দিয়ে কচু শাক, লাউডগা দিয়ে ডাল, ঝুরো ঝুরো আলুভাজা, ফুলকপির ডালনা, রুই মাছের ঝাল আর তেঁতুলের টক! টকটা বানায় রাবেয়াদি৷ উফ! টকের রসটা চেটে খেতে যা লাগে না! আপনে আপ জিভ দিয়ে টকাস টকাস শব্দ হয়৷

খেয়ে-দেয়ে চুপচাপ উপরে নিজের ঘরে চলে গেলাম৷ আজ আর বাইরে যাব না বাবা!

ঘরে ঢুকেই হাঁ! বিছানায় আগে থেকেই বসে আছে ফা-হিয়েন আর ভুতোচন্দ্র! আমায় অবাক দেখে ফা-হিয়েন বলল, ‘এতে এত অবাক হবার কী আছে? তোমরা সবাই যখন রান্নাঘরে ছিলে তখন এই ঝুলে আসা লম্বা আমের আমের ডালটা বেয়ে আমি আর ভুতো এসে তোমার ঘরে ঢুকেছি৷ তবে তোমার বাপু যদি ভালো না লাগে তো পরিষ্কার করে বলো, এক্ষুনি চলে যাই!’

হাউমাউ করে না বলে উঠলুম৷ তারপর ওদের বসতে বলে চুপ চুপ করে নীচে নামলুম৷ রান্নাঘরের দরজাটা ভেজানো৷ মা বোধ হয় ঘরে আর রাবেয়াদি কোথায় কে জানে! মিটকেসটা খুলে ছোট্ট একটা বাটিতে দু-টুকরো মাছ নিয়ে ফের দরজা আটকে ওইরকমই চুপ চুপ করে উপরে উঠে এলুম৷ ফা-হিয়েনকে বললুম, ‘এই নাও! তোমার একটা আর ভুতোর একটা৷ খাও৷’

ফা-হিয়েন একগাল হেসে বলল, ‘আমি আর খাব কী গো! এই তো খানিক আগে পেট বোঝাই করে খিচুড়ি আর ডিমভাজা খেলাম৷ তুমি বরং ভুতোকে দাও৷ ভুতো আবার মাছ খেতে খুব ভালোবাসে!’

ভুতোর সামনে বাটিটা দিলুম, তো ও ও খেলো না! ফা-হিয়েন হেসে বলল, ‘ওভাবে নয়! ও বাটিতে খাবে না৷ বাটিটা তাতে নষ্ট হবে কি না! ওকে মাছ দুটো এই পাতায় করে দাও’ বলেই পকেট থেকে এই বড়ো এক শালপাতা বার করে দিল৷ ওইটুকু পকেটে অত বড়ো শালপাতা কেমন করে টান টান থাকে সে নিয়ে বেশ অবাক লাগল! যাই হোক, সেই পাতায় করে যেই না ভুতোর সামনে মাছ দুটো দিলুম, অমনি সে খেতে শুরু করল!

ফা-হিয়েন বলল, ‘তুমি তো আজ আর বেরোবে না! নইলে তোমায় আজ দারুণ একটা জায়গায় নিয়ে যেতাম৷’

বললাম, ‘কোথায়?’

তাতে খানিক বিজ্ঞের মতো গম্ভীর গলা করে ফা-হিয়েন বলল, ‘আগেই যদি সব জেনে যাও তাহলে তো অবাক হবার আনন্দটাই মাটি! পথে নেমে পড়তে হয়, তাহলেই পথ নিজের মতো করে নিজেকে মেলে ধরে৷ চোখ খুলে তখন কেবল দেখতে হয়৷ সেই তো পর্যটকের আনন্দ!’

বললুম, ‘ওরে বাবা! তুমি যে দেখছি ঠিক বাবার মতো কথা বলছ! বাবাও বলেন, বেলো চোখ খুলে নেচার দেখো৷ কেবল বাগানের কেয়ারি করা গোলাপ দেখো না, ঘাস ফুল দেখো, শুশনির পাতা দেখো, পাথরকুচির ফুল দেখ, ঘেঁটুফুলের গন্ধ চেনো, ঝোপ ভেঙে বেজির দল কেমন অফিস যাবার মতো ব্যস্ত হয়ে দৌড়োয় দেখো...’

আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই ফা-হিয়েন বলতে থাকল, ‘কাঠবিড়ালি কেমন করে কিচ কিচ করে কথা বলে দেখো, কেমনি করে দু-হাতে চেপে ফল খায় দেখো, তালের গাছে কেমন করে বাবুইয়ের বাসা ঝোলে দেখো, কচার পাতায় কেমন করে বাঘের চোখ দেখা যায় দেখো, মাঠে কেমন করে লাঙল দেয় দেখো, কেমনি করে মাথায় পাক খাইয়ে ছুড়ে দেয় খেপলা জাল আর আস্তে আস্তে সেই জালে ভরে যায় রুপোলি মাছের ঝাঁক—তা দেখো, শালুক দেখো, পদ্ম দেখো, দিন ফুরোলে স্থলপদ্মের রং বদলানো দেখো, গাছের ডালে ইটের পাঁজায় পাতার ফাঁকে গিরগিটির রং বদলানো দেখো, সোনাব্যাঙের লাফ দেখো...’

‘আরে আরে! দাঁড়াও, দাঁড়াও! তুমি তো একদম বাবার কথাগুলো বলছ! এরপর বলবে না কি ঘরের মধ্যে গেম না খেলে বাইরে গিয়ে একবার খোলা মাঠে খেলে দেখো!’

‘ঠিক তাই৷ তাই তো বলব! তোমার ওই খেলায় কী এমন হাতি-ঘোড়া আছে! কিন্তু আমার সাথে সকালবেলাতেই তো দৌড়োলে, ঘুরে বেড়ালে! তোমার কেমন লাগল বলো! অনেক বেশি এক্সাইটিং না?’

‘সে তো বটেই৷’

‘তবে? আর ঘরে বসে থেকো না কেমন? আমার মধ্যে যেমন একটা ফা-হিয়েন আছে, হয়তো তোমার মধ্যেও তেমন এক হিউয়েন সাং নয়তো অতীশ দীপঙ্কর আছেন৷ ঘরে বসে থাকলে তো আর তাঁর ভালো লাগবে না, তাই না?’

অবাক হয়ে ফা-হিয়েনকে দেখছিলুম! ঠিক বাবার মতো করে কথা বলছে৷ বাবাকেও আমার যেমনি ভালো লাগে, ওকেও তেমনি ভালো লাগছে৷ বললাম, ‘শোনো আমারও ওই খেলা খেলতে এখন ভালো লাগে না! কিন্তু কী করি, বাবাও তো আর আমার সাথে মাঠে যায় না৷ ইস্কুল থেকেই আসে সন্ধ্যেবেলা৷ একা একা কি খেলা যায় তুমি বলো?’

‘হ্যাঁ৷ একা একাও খেলা যায় মাঠে৷ আমি তো খেলি ভাই৷ আর তাছাড়া কী জানো, কেউই তো বেরোও না, কাজেই সব্বাই একা হয়ে বসে থাকো৷ মাঠে একজন-দু-জন করে নেমে দেখো, একদিন একেবারে ফুটবল টিম হয়ে যাবে৷’

‘সে যাক গে! তুমি আর আমাকে বড়োদের মত করে বোলো না৷ আমি তো এমনিতেই গেম খেলছি না৷ বাবা তো সেই গেমগুলো সব ফোন থেকে আনইনস্টল করে দিয়েছেন৷ আর কম্পিউটারও এখানে আনেন নি৷ এখানে তো আমার বন্ধুদের বাড়িও নেই যে সেখানে গিয়ে খেলব!’

‘কে বলল এখানে তোমার বন্ধু নেই! তাহলে আমি কে?’

‘না৷ না৷ সে তো তুমি এখন আছো৷’

‘এখন না শুধু৷ সারাজীবন আমি তোমার বন্ধু হয়ে তোমার সাথে থাকব৷’

‘সত্যি?’

‘সত্যি না তো কী মিথ্যে? ফা-হিয়েনরা মিথ্যে কথা বলে না৷ তোমার যখনই একা লাগবে তুমি একবার আমায় মনে এনো, দেখবে কেমন টপ করে হাজির হয়ে গেছি৷ আর তোমায় নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে কখন পেরিয়ে গেছি ধুপির মাঠ!’

‘ধুপির মাঠ!’

‘ধুপির মাঠ৷ এখান থেকে সে অনেক দূর! সেই মাঠের শেষে নগেনকাকার আম বাগান৷ সেখানে দিনেরবেলায়ও সূর্যের আলো জ্যামিতির মতো ছবি আঁকে! সেই বাগানে সব কাচামিঠা আমের গাছ৷ তোমার রাবেয়াদিকে একটু ঝাল নুন তৈরি করে দিতে বোলো৷ তোমাতে-আমাতে দুপুরবেলা পা ছড়িয়ে সেখানে সেই ঝাল নুন মাখিয়ে আমের কুসি জারাব...’

‘আর চেটে চেটে খাব...’

‘তাইতো৷ নগেনকাকা খুব ভালো৷ কিছু বলবে না৷ কিন্তু সেই বাগান যে লিজ নেয়, তার দারোয়ান যদি তেড়ে আসে তো তাতে বয়েই গেল! দৌড়ে হারাতে পারবে না কি ফা-হিয়েনকে? কেউ কখনো পেরেছে?’

‘তুমি তো খুব জোরে দৌড়োও! দেখলুমই তো!’

‘তুমিও খুব জোরে দৌড়োও৷ আমায় তো প্রায় ধরেই ফেলেছিলে৷ আর যদি ক-দিন আমার সাথে এমন করে দৌড়োও না, দেখবে হাত-পায়ের গাঁট কেমন করে খুলে যায়! আর মনটাও দেখবে সারাদিন কেমন চনমন করবে!’

‘দৌড়োব৷ রোজ দৌড়োব৷ তুমি আমায় সেই ধুপির মাঠে, ইটভাটায় তারপর পরির বিলে নিয়ে যাবে তো? আমি যখন নেড়ুদের সাথে মিলব, তখন সব্বাইকে বলব, আমার বন্ধু ফা-হিয়েনের সাথে কেমন করে সব আশ্চর্য আশ্চর্য জিনিস দেখেছি!’

‘নিয়ে তো যাবই৷ আমাদের এই গ্রামের মাঝখানেই আছে কলাই নদী৷ মসিউর চাচার ডিঙি নিয়ে সেই ডিঙিতে চেপে আমরা এলডোরাডো খুঁজব৷’

‘ধুস! এলডোরাডো এখানে না কি!’

‘তুমি ভাবলেই এখানে! ভাবতে পারলেই ক্যাপ্টেন স্কটের মতো অ্যাডভেঞ্চারের চার্ম মিলবে কলাই নদীতে৷ ডিঙি থেকে তুমি জলে ছুড়ে দেবে গুঁটলি করা পাঁউরুটির টুকরো, পিঁপড়ের ডিম৷ দেখবে ঝাঁকে ঝাঁকে কেমন ছুটে আসবে মাছ! তাদের যদি পিরানহার ঝাঁক ভাবতে পারো, তবেই তো মজা! তারপর ডিঙি বাইতে বাইতে হঠাৎ হয়তো দেখবে জল চিরে সাঁ সাঁ করে সাঁতার কাটছে দাঁড়াশ সাপ, নয়তো পাড়ের লতায় কিলবিলিয়ে দোল খাচ্ছে লাউডগা আর শাখামুটি! পাড়ের ঝোপে তিড়িং তিড়িং লাফাচ্ছে লাল চোখওয়ালা খরগোশ৷ ছানাপোনা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেজির দল! নয়তো বুকে হেঁটে সরসরিয়ে নেমে যাচ্ছে গোসাপ! এমনি কত কিছু দেখতে দেখতেই কখন দেখবে পৌঁছে গেছ আদিবাসীদের গ্রাম৷ সেখানে নদীর পাড়ে খেলে বেড়াচ্ছে তাদের উদ্দাম ছেলের দল আর মাথায় টোকা দিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে মুখভর্তি বলিরেখা আঁকা বুড়ো সোরেঙ! বলো অনেকটাই আমাজনের মতোই তো, তাই না!’

‘তুমি যেমন সুন্দর করে বলছ, তাতে তো তেমনই লাগছে! কবে নিয়ে যাবে?’

‘যাব...’

বলতে না বলতেই নীচ থেকে বাবার সাইকেলের ঘণ্টি শুনলুম৷ ফা-হিয়েন নিশ্চয়ই এবার ভাগবে৷ ওর হাতটা ধরব বলে চাপতে গিয়েই দেখি সে ততক্ষণে আমের ডাল বেয়ে উঠে পড়েছে! ফিসফিস করে বলল, ‘আমার কথা কাউকে বোলো না! যা বলেছি, তা মনে রেখো! আমি তোমার বন্ধু!’

খানিক বাদে গুটগুটিয়ে নীচে নামলাম৷ মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বাবাকে সব বলে দিয়েছে৷ জানতাম৷ দুপুরে যখন আমায় কিছু বলল না, তখনই জানতাম বাবাকে বলবে!

নীচে নেমেই তো অবাক! বসার ঘরে আমার বয়সি আরও চারটে ছেলে!

বাবা বলল, ‘আয় বেলো! এরা সবাই আমার ইস্কুলের ছেলে৷ তুই এসে সারাদিন ঘরে বসে আছিস শুনে দলবেঁধে আমার সাথে চলে এলো তোর সাথে খেলবে বলে!’

আমার খুব আনন্দ হচ্ছে৷ আমাদের টিমটা বড়ো হয়ে গেল! এবার অ্যাডভেঞ্চারে নামা যাবেই! ফা-হিয়েনকে বলতেই হবে! আসতে আসতে বাবার কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাবা, মা কোথায়? মা কিছু বলেছে?’

‘তোর মা তো তোদের জন্য খাবার আনতে গেল! আর কী বললি, কিছু বলেছে কি না? হ্যাঁ বলল তো, তুই না কি আজ খুব আনন্দে চারদিকে ঘুরে বেড়িয়েছিস, স্বাদ করে ভাত খেয়েছিস! তোর মা তাতে খুব খুশি! তাইতো তোদের সবার জন্যে পিঠে বানাচ্ছে!’

আঃ! কী মজা! মায়ের হাতের পিঠের যে কী স্বাদ! আনন্দে বলে উঠলাম, ‘বাবা! আমি এদের উপরে নিয়ে যাই!’

‘হ্যাঁ যা! জিজ্ঞেস করছিস কেন?’

ওদের দিকে ফিরে বললাম, ‘চলো ঘরে যাই৷’

ওরা সব্বাই মিলে বলল, ‘উঁহু, ঘরে না! চলো মাঠে যাই!’

তারপর? তারপর আমরা সবাই মিলে সে কত খেলা! কত খেলার তো আমি নামই জানি না! কিন্তু সে ভারি মজার! সন্ধ্যে হয়ে আসছে যখন, তখন খেয়াল হল আরে! আমি তো কারও নামই জানলাম না! ডেকে বললাম, ‘এই আমার নাম—

সবাই বলল, ‘বেলো৷ জানি তো!’

তোমাদের নাম?

আমাকে অবাক করে দিয়ে লম্বা মতো ছেলেটা এসে বলল, ‘আমার নাম অতীশ!’

মোটু গাবলু এসে বলল, ‘আমার নাম দীপঙ্কর!’

আর আমার মতো রোগা ছেলেটা এসে বলল, ‘আমার নাম জ্ঞান৷ শ্রী জ্ঞান গোস্বামী!’

‘অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান!’

‘সবাই আমাদের তাই বলে!’ অতীশ হাসতে হাসতে উত্তর দিল৷ ‘আর ওর কী নাম জানো?’

টুকটুকে ফর্সা ছেলেটি এগিয়ে এসে বলল, ‘আমার নাম সূর্য!’

আর দীপঙ্কর বলল, ‘সে তো ভালো নাম! আসল নামটা বল!’

অতীশ বলল, ‘আমি বলছি৷ ওর নাম সূর্য৷ মানে ইংরিজিতে সান৷ আর আমরা বলি সাঙ’

ওর কথা শেষ না করতে দিয়ে শ্রীজ্ঞান বলল, ‘হিউয়েন সাঙ!’

সব্বাই মিলে হাসিতে ফেটে পড়ল! আমি চেঁচিয়ে সবাইকে থামিয়ে বললাম, ‘এই শোন, শোন, আমি একজনকে চিনি তার নাম ফা...’

মুখের কথা মুখেই আটকে গেল! কারণ হঠাৎ শুনলাম ‘হেঁয়াও মেঁয়াও’ করে একটা হুলো ডাকছে! তাকিয়ে দেখি ভুতো!

অতীশ বলে উঠল, আরে এটা তো স্বপনকাকাদের বাড়ির শম্ভু! ও এখানে এলো কী করে?

কী করে তা আর তোমরা জানবে কী করে হে পর্যটকের দল! জানি কেবল আমি৷ তোমরা যাকে শম্ভু বলে জানো, তার আসল নাম ভুতোচন্দ্র৷ আর তার মালিকের নাম হল ফা-হিয়েন৷ ওই যে সে ওই ঝুপসে আসা গাছের ডালে বসে সে আমায় ইশারা করছে, যার মানে হল, ‘আমার কথা সবার কাছে বোলো না!’

দীপঙ্কর বললে, ‘সে যাক গে! তুমি কী একটা নাম যেন বলছিলে?’

বললুম, ‘বাদ দাও৷’

সব্বাই মিলে বলল, ‘না না! বাদ দেয়া যাবে না৷ বলো বলো!’

বললুম, ‘ছোট্টবেলা থেকে আমার এক বন্ধু ছিল, তার নাম ছিল ফা-হিয়েন৷’

‘বাঃ! সে কোথায়?’

‘কী জানি! ভারি লাজুক কি না! তাই একদিন হারিয়ে গেল!’

‘এ বাবা! থাকলে তো ভালোই হত! আমাদের টিম পূর্ণ হত!’

‘বেশ! তবে আজ থেকে তোমাকেই আমরা ফা-হিয়েন বলে ডাকব!’ সাঙ চেঁচিয়ে উঠল৷

অতীশ বলল, ‘হ্যাঁ৷ কখনো ফা-হিয়েন, কখনো বেলো...’

‘এই বেলো, বেলো...’ বাবার ডাক শোনা গেল!

দৌড়ে সবাই মিলে বাড়ি ঢোকার আগে দেখলাম ফা-হিয়েন তখনও গাছে দোল খাচ্ছে আর হাসিমুখে আমায় টা টা করছে! আমিও তাকে হাত নেড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে বললাম, ‘বাবা! এই জায়গাটা আমার খুব ভালো লাগছে! ভাবছি আমি এখানেই তোমার স্কুলে পড়ব!’

বাবা হঠাৎ করে থমকে গেল! তারপর অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান আর হিউয়েন সাঙকে দুই হাতে একসাথে জড়িয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে চিৎকার করতে লাগল, ‘কই গো! এদের সবাইকে পিঠে দাও! সব্বাইকে!’

‘আর আমাকে?’ ফস করে বলে ফেললুম৷

বাবা ঘুরে আমাকে জড়িয়ে ধরে ফের চেঁচালেন, ‘আর বেলোকেও দাও, আমাকেও দাও! আমাদের সব্বাইকে দাও!’

বাবার চোখের কোনায় তখন মুক্তোর মতো আলো ঝকঝক করছিল!

তারপর? তারপর আর কী! অ্যানুয়ালের রেজাল্ট বেরোনোর পর একবার ফের পুরোনো ইস্কুলে গিয়ে রেজাল্ট আনা হলো৷ মাস্টারমশাইরা সবাই আদর করলেন৷ ন্যাড়া, শ্রীজিত, ভোলা, বিচ্ছুদের কাছে নতুন বন্ধুদের গল্প করলাম৷ ওরাও বলল সবাই মিলে এরপর থেকে মাঠে গিয়ে খেলবে৷ তারপর ফিরে এসে ভর্তি হয়ে গেলাম বাবার ইস্কুলে৷

সে-কথা সবাই জানে৷ কিন্তু কেউ জানে না ফা-হিয়েনের কথা৷ সে যে বারণ করেছে বলতে! তাই বলতে পারি না! ওদিকে না বললেও পেট গুরগুর করে৷ তাই ওকে না জানিয়েই কথাগুলো এখানে লিখে রেখে দিলুম৷

অধ্যায় ১০ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%