শাশ্বত কর

ভোলা কল খাটাচ্ছে৷ কলকাঠি খাটানোয় ওর মতো ওস্তাদ আমাদের মধ্যে আর কেউ নেই৷ সবাই তো আর সব কিছু ভালো পারে না! এই যেমন নেড়ু, ওর মতো বাছাই করে ঘুড়ি আনতে পারে ক-জন? তারপর ঘন্টের কথাই ধর না কেন? পাণ্ডা হোক চাই নাইলন, সুতো ধরে তার কোয়ালিটি ওর মতন আর কেউ বলুক তো দেখি? আর আমার কথা না হয় অত বিছরিয়ে নাই বা বললাম, তবু বন্ধুরা বলে কোল পেঁচিয়ে ভড়ভড়িয়ে টানতে না কি আমার মতন কেউ পারে না!
যাই হোক, আদত কথা হল, আজ হল গিয়ে বিশ্বকর্মা পুজো৷ কাজে কাজেই কাল বাদ পরশু, পরশু বাদ তরশু থেকে চলছে আমাদের প্রস্তুতি৷ পার হেড চারটে করে মোট এক ডজন ঘুড়ি এসে গেছে৷ সুতো এসে গেছে৷ এখন চলছে কল খাটানো আর আকাশ, হাওয়া এইসব জরিপের কাজ৷ মাঝে মাঝেই টুকরো কাগজ উড়িয়ে হাওয়ার দিক বোঝার চেষ্টা করছি৷ সেই সঙ্গে চলছে এই মুহূর্তে উড়ন্ত নানান ঘুড়ি, তাদের প্যাঁচ খেলার টেকনিক—এইসব নিয়ে টুকটাক অ্যানালিসিস৷ যা হয় আর কী!
এমন সময় হঠাৎ খানিক সুতো কোত্থেকে ঢল খেয়ে পড়ল ছাতে! নেড়ু চেঁচিয়ে উঠল, ‘বেলো! হাত্তা মার! হাত্তা মার!’
রিফ্লেক্সে লাফ মেরে এসে সুতোটা ধরলাম৷ অমনি হাঁ হাঁ করে উঠল ঘন্টে! ‘আরে! ওভাবে নয়! ওতে তো বুঝে যাবে হাত্তা মারা হচ্ছে!’
নেড়ু বলল, ‘ক্যাদ্দানি না দেখিয়ে কামটা করে দেখাও না! তাহলে আমরাও বুঝি তুমি কত বড়ো শাহেনশা!’
মুচকি হেসে মুহূর্তের মধ্যে ঘন্টের পকেট থেকে বেরোল বাবার গোঁফ কাটার কাঁচির থেকেও ছোটো একটা ফোল্ডিং কাঁচি! সেই দিয়ে কুচুত করে কেটে দিল ঢল খাওয়া সুতো৷ সুতোর মালিক লাটাই গুটিয়ে নেওয়ার সময় না অনুভব করল কোনো বিপরীত টান, না বুঝতে পারল হাত্তা হল কোত্থেকে!
বাকি সুতোটা ফাঁকা একটা লাটাইয়ে গোটাতে গোটাতে শুনি নীচ থেকে মা ডাকছে, ‘বেলো! নীচে আয়! শুনে যা৷’
ধুস! কাজের সময় যত ডাক! ডাকছে ডাকুক গে!
মা আবার ডাকল! উত্তর দিলাম না৷ নেড়ু বলল, ‘কী রে বেলো! কাকিমা ডাকছে! উত্তর দিচ্ছিস না!’
বললাম, ‘তুই শুনেছিস যখন তুই-ই যা না!’
‘নেড়ু গেলে হবেনি! তুমাকেই যাতি হবে সোনাবাবা!’ রাবেয়াদির গলা পেয়ে তাকিয়ে দেখি—ঠিক! গুপ্তচর হাজির! রাবেয়াদি হল মায়ের খাস গুপ্তচর! আমি কোথায় কোথায় কী কী কখন কখন করি, তার পাই টু পাই মা-র কাছে পেশ করাই হল রাবেয়াদির একমাত্র কাজ!
বললাম, ‘লাটাই গোটাচ্ছি, দেখছ না? যাচ্ছি একটু পরে!’
‘পরে হবেনি! জরুরি তলপ করিছে তুমারে মা! এখুন চলো সোনাবাবা!’
ঘন্টে আমার হাত থেকে লাটাইটা নিয়ে বলল, ‘আমিয়ে গুটিয়ে নিচ্ছি! তুমি বরং যাও সোনাবাবা!’
রাবেয়াদিকে ভ্যাঙানো দেখে ঘন্টের উপর যেমন পিত্তি জ্বলল, তেমন রাগ হল রাবেয়াদির উপরেও৷ সেসব সামলে লাটাইটা ভোলার হাতে দিয়ে বললাম, ‘গোটা৷ আমি আসছি৷’ বলেই দুড়দাড় করে নেমে এলাম নীচে৷
দেখেছ! কোনো আক্কেল আছে রাবেয়াদির! বললেই পারত, সেজকাকু, জেঠু, পার্থকাকা—সব্বাই এসেছে! ধুস!
‘কী বেলোভূষণ? কেমন আছো?’ পার্থকাকা জিজ্ঞেস করল৷
মাথা চুলকে বললাম, ‘ভালো! তোমরা?’
‘আমরা তো ভালোই! কিন্তু তুমি এরকম মুখ পোড়ালে কীভাবে?’
‘হবে না!’, মা বলল, ‘তিনদিন ধরে তো গোটাদিন ছাদেই ওর বাড়ি! সারাদিন রোদে পুড়ছে!’
‘কেন?’
মুখটা নামিয়ে বললাম, ‘বিশ্বকর্মা পুজো না!’
সঙ্গে সঙ্গে জেঠু বলে উঠল, ‘হ্যাঁ তো! তাই নাওয়া-খাওয়া পড়াশুনো সব বাদ দিয়ে শুধু ঘুড়ি আর ঘুড়ি! কারা ঘুড়ি ওড়ায় জানিস? কোনো ভালো ছেলে ঘুড়ি ওড়ায়?’
‘আই প্রোটেস্ট বড়দা!’ সেজকাকু বলে উঠল, ‘ঘুড়ি ওড়ানোর সাথে ভালো হওয়া বা মন্দ হওয়ার কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই! ঘুড়ি না উড়িয়েও ছেলে ভোগে যেতে পারে! আবার উড়িয়েও ভালো হতে কেউ আটকায় না!’
‘তোমার প্রোটেস্টে আমার কিস্যু হয় না’, জেঠু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘শোন বেলো! ঘুড়ি-টুড়ি ছাড়! পড়াশুনোয় মন দে৷ আমাদের বাড়িতে ওসব কালচার কোনোদিন নেই৷’
‘কালচার নেই মানে? দাদা, তুই ভুলে গেছিস!’ বাবা বলল, ‘মনে করে দেখ, আমরা সবাই কেমন একসাথে ঘুড়ি ওড়াতাম৷ তুইও তো...’
বাবার কথা শেষ করতে না দিয়ে জেঠু বলে উঠল, ‘দেখলে আক্কেল! এটার আর বুদ্ধি হবে না কোনোদিন! আরে দেখছিস ছেলেটাকে টুকটুক করে পথে আনছি! অমনি দিলে ডাল ঢেলে! আরে আমিও যে ওড়াতুম, সে তুইও যেমন জানিস, সে তো আমিও জানি! কিন্তু বেলোটাকে তো ঘরে বসাতে হবে!’
‘না বড়দা!’ পার্থকাকু বলল, ‘গুল দিয়ে কোনো মহৎ কর্ম হয় না!’
‘তাছাড়া ঘুড়ি ওড়ানো এমন কোনো গর্হিত কর্ম নয়, যে তা বন্ধ করার জন্য নিজেদের আইডেন্টিটি সাপ্রেস করতে হবে!’ সেজকাকু বলল৷
‘কী এমন কথা বড়দা বলল ঠাকুরপো, যে তোমার আইডেন্টিটি সাপ্রেশনের কথা মনে হল?’ মা বলল৷
‘ওই যে বড়দা বলল, আমাদের বংশে না কি ওই সব কালচার নেই! আরে ঘুড়ি ওড়ানোটা আমাদের কালচারের সাথে ওতপ্রোত জড়িয়ে বউদি! তুমিও তো জানো! আমরা সবাই কেমন করে ঘুড়ি ওড়াতাম ছাতে৷ আজও তো বড়দা ঘুড়ি ওড়াবে বলেই আমাদের সব্বাইকে নিয়ে এখানে এসেছে! এবার তুমিই বলো, এটা আইডেন্টিটি সাপ্রেশন নয়?’
‘না! বংশের পরবর্তী প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে ওটুকু বলাতে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয় না, ঠাকুরপো৷ ছেলেটার চোখ-মুখ দেখেছ? কারোর কথা শুনছে না! না আমার, না রাবেয়ার৷ অবশ্য এর প্রধান কারণ ওর বাবার তোল্লাই৷ ওর বাবাই তো সুতো-টুতো সব কিনে এনে দিয়েছে’, মা বলল৷
‘কে ভাই?’ জেঠু চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভাই এনেছে সুতো? ও আবার কবে সুতো চিনল? ও সুতোয় তো বলে বলে কাটা খাবে!’
ব্যস! জেঠু বোল্ড! এতক্ষণ টানা পাখার মতো একবার এদিক আর একবার ওদিক তাকিয়ে শুধু শুনে যাচ্ছিলাম৷ এবার নিশ্চিন্ত হয়ে গেলাম ব্যাপারটা ঠিক দিকেই গড়াবে!
‘হাতে নিয়ে দেখো না একবার’, বাবা বলে উঠল! তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা তো বেলো লাটাইটা এনে জেঠুকে দেখা তো!’
দৌড়োতে যাচ্ছি, অমনি পার্থকাকা আমার হাত টেনে ধরল, বলল, ‘উঁহু! বেলোকে যেতে হবে না! আমরাই বরং চলো ছাতে যাই!’
জেঠু, কাকু, বাবা তিনজনেই দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘সেই ভালো! ছাতেই যাই৷’
মা গজগজ করে বলল, ‘এ জন্যই ছেলেটাও এরকম৷’
জেঠু ফিরে বলল, ‘কিছু বললে বউমা?’
মা বলল, ‘না! কী আর বলব? বললাম, দিদি সঙ্গে আসলে ভালো হত৷ তিনিই যা বলার বলতেন আপনাকে৷’
‘তোমার দিদিরাও আসছে রিক্সায়৷ ওদের কাছে আমাদের কিছু সামানও আছে৷ আসলেই খবর দিয়ো বউমা!’
‘কী সামান রে দাদা?’ বাবা জিজ্ঞেস করল৷
‘তেমন কিছু না! ওই হাজার তিনেক সুতো ভরা খান দুয়েক লাটাই, আর আমাদের বংশের পেটেন্ট চাঁদিয়াল গোটা বারো!’
‘জেঠু!’ বলে হাতটা চেপে ধরলাম৷
মা বলল, ‘ভালোই! আজ খাওয়া-দাওয়াও তাহলে ছাতেই সেরো৷’
‘সে হলে তো বউদি ভালোই হয়’, পার্থকাকা বলল৷
জেঠু বলল, ‘বউমা! রাগ কোরো না! ঘুড়ির মতো উচ্চমার্গের কি কিছু আর আছে বলো? যত লড়াই সব হল গগনে গগনে!’
‘সেই তো! আর যত দাপাদাপি সব মাথার উপরে!’ মা বলল৷
‘না বউমা! এ আর কতটুকু! ঘুড়ি তো হল আসলে জীবন! এই যে আজ আমরা তিনজন এসে উঠলাম হঠাৎ তোমাদের বাড়িতে, এও ভাবো না, যেন তিনটে মুখপোড়া ঘুড়ি লাট খেতে খেতে এসে ঠুকরে পড়ল তোমার ছাতে, তাই না?’
ছাত থেকে নেড়ুর আওয়াজ ভেসে এলো, ‘এ বেলো! একটা লাট্টু আর মোম ঘুড়ি ছাদে পড়ল রে!’
‘গুছিয়ে রাখ!’ বলতে বলতেই শুনি জেঠু মাকে বলে চলেছে, ‘দেখলে বউমা! কেমন কোইন্সিডেন্স! আমি তোমাকে বললাম, আর ছাতে দুটো ঘুড়ি এসে পড়ল! এ হল ঈশ্বরের দেওয়া প্রমাণ বউমা! ঘুড়ি তো আসলে ঈশ্বরের বার্তাবহ দূত! ঘুড়ির ঈশ্বর আমরা৷ আমাদের হাতে লাটাইয়ের দণ্ড! ঘুড়ি উড়ছে আকাশে৷ ভাবছে, আহা! কী উড়লাম! কী গোঁত খেলাম! কেমন কাটলাম! কত দর্প! কত অহঙ্কার! ঠিক ওমনি আমরা হলাম একটা একটা ঘুড়ি! আমাদের কলে সুতো বেঁধে ওড়াচ্ছেন অলমাইটি গড! আর আমরা একেকটা পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগগা—ভাবছি আহা! কেমন উড়ছি! ইস! কেমন মুখ থুবড়ে পড়ছি মাটিতে! ওফ! কেমন কাটছি একটার পর একটা! কত অহঙ্কার আমাদের! কত বিষাদ!’
‘আসলে কোনোটাই আমাদের নয়৷ সব সেই অলমাইটির হাতে৷ দারুণ বললে দাদা!’ বাবা বলে উঠল৷
মা বলল, ‘বেশ! যাচ্ছ যাও৷ আমি রাবেয়াকে দিয়ে চা-জলখাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি৷ তবে দেখো বেলো যেন বেশি রোদে না থাকে! সামনে কিন্তু ওর পরীক্ষা!’
জেঠু আমার চুল নেড়ে দিয়ে বলল, ‘কুছ পরোয়া নেহি বউমা! আজ আমি বেলোকে ঘুড়ি দিয়ে ত্রিকোণমিতির অঙ্ক বুঝিয়ে দিচ্ছি৷’
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললাম, ‘ঘুড়ি দিয়ে অঙ্ক!’
‘ইয়েস ডার্লিং! ঘুড়ি দিয়ে অঙ্ক!’ বলে জেঠু বাবার দিকে ফিরে বলল, ‘এই যে মাস্টার! বলো দেখি কী কী সাম করা যায় ঘুড়ি দিয়ে?’
‘বাবা বলল, উন্নতি কোণ অবনতি কোণের একটা কনসেপসন দেয়া যেতে পারে!’
‘কেন রে মেজদা?’ কাকু বলল, ‘এককথায় হাইট অ্যান্ড ডিস্ট্যান্স বল না! সবসময় বিছরিয়ে বলিস কেন?’
জেঠু বলল ‘আর?’
ততক্ষণে আমরা ছাতে এসে গেছি৷ পার্থকাকু নেড়ু আর ঘন্টের মাথায় আলতো আলতো করে চাঁটি কষিয়ে একটা লাটাই তুলে গোটানোর ভঙ্গিতে নাচাতে নাচাতে বলল, ‘থাক না ও সব! ধান ভানতে যত শিবের গীত! ছাত আছে, লাটাই আছে, ঘুড়ি আছে৷ সোজা চলো ওড়াই৷’
ছাতের মাঝখান থেকে ভোলা বলল, ‘না গো কাকু হাওয়া নেই৷’
পার্থকাকু অলরেডি একটা ঘুড়িতে সুতো বেঁধে ফেলেছে৷ টঙ্কাতে টঙ্কাতে গলা ভারী করে ভেংচির টোনে বলল, ‘তাই নাকি হাওয়া নেই! দেখি তো!’
বাবা বলল, ‘হাওয়া না থাকলেও পার্থ ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ঘুড়ির লেজে যেন হাওয়া ভরে দেয়৷ দেখিস এক্ষুনি কেমন বেড়ে ফেলে!’
সত্যি তাই৷ কয়েক মিনিটে ঘুড়ি উড়ে গেল আকাশে৷ জেঠুকে ওড়াতে বলায় জেঠু রাজি হলেন না৷ চাঁদিয়াল ছাড়া জেঠু আর কিছু ওড়ান না৷ বাবা বলল, সারাদিন ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যেবেলা জেঠু লাটাই থেকে চাঁদিয়ালের সুতো নিজে ছিঁড়ে দিতেন একসময়৷
কাকু আর বাবাও আরও দুটো পেটকাটি ঘুড়ি উড়িয়ে দিয়েছে আকাশে৷ আমরা তিনজন বন্ধু পালা করে বাবা, কাকু আর পার্থকাকুর লাটাই ধরে আছি৷ কানের কাছে জেঠু আমায় বলছে, ‘দেখো বেলোবাবু! ঘুড়িগুলো এবার বড়ো হয়ে গেছে৷ আকাশে উড়ছে৷ ঠিক যেমন করে আর কয়েক বছর পরে তোমরা উড়বে সমাজের আকাশে!’
বলতে বলতেই একটা কালো হলুদে লাট্টুর প্যাঁচ লেগে গেছে কাকুর ঘুড়িটার সাথে! বাবা চেঁচাচ্ছে, ‘ভাই! ঘাড় দিয়ে দে! ঘাড় দিয়ে দে!’
পার্থকাকু বলছে, ‘টেনে খেল! টেনে খেল!’
সেজকাকু চেঁচাচ্ছে, ‘ছাড়া সুতো! টেনে হবে না! লাটালাটি খেলব!’
‘কাকু! লাটালাটি খেলো না! পলকা সুতো! হাওয়া দিচ্ছে যা! উপড়ে যাবে!’
জেঠু বলল, ‘উপড়ে গেলে যাবে! এই উপড়ে যাওয়াই তো স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা বেলো! কোনো কিছু উপড়ে যাওয়াতে দুঃখ করা যাবে না! কেউ তো টিকবে না চিরদিন! কাজেই ওপড়ানোর ভয় নিয়ে নয়, বরং ইচ্ছেমতো আনন্দে বাঁচো! ওর যখন লাটালাটি খেলতে ইচ্ছে হচ্ছে, তাই খেলুক না!’
লাটালাটি চলছে আকাশে৷ বাবা বলছে, ‘ঘুড়িটা ভাই তোর কান্নিক টাল! এরপর নামিয়ে একটা কান্নিক দিস!’
জেঠু বলছে, ‘বেলোবাবু! এও একটা শিক্ষা! কোনো দিকে জীবনে একরোখা হয়ে ঘাড় কাত করা যাবে না! জীবনে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে সবসময়৷ যদি একমুখী হয়েও যায়, কান্নিক দিয়ে আবার সিধে উড়তে হবে৷ নীল আকাশে সিধে ওড়াটাই আসল! আকাশ হল ঈশ্বর৷ সেই ঈশ্বরকে ছুঁয়ে ওড়াটাই জীবন!’
বলতে বলতেই নেড়ু চেঁচালো, ‘ভোকাট্টা!’
কাটা খাওয়া ঘুড়ির মালিককে দুয়ো দিতে সবাই একসাথে চেঁচালাম, ‘ওয়! ওয়! ওয়! ভোকাট্টা! ভো হরে! ভোকাট্টা!’
নেড়ু আনন্দে খানিক ছাতের টিনের দরজাটা পিটিয়ে নেচে নিল! উল্লাস থামতে জেঠু আমায় কেটে যাওয়া ঘুড়িটা দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখ বেলোবাবু! ওই হল জীবনের মানে! ঘুড়ি কেটে গেল! শেষ হল না কিন্তু বেলোবাবু! বরং আরেকটা সুতোর খোঁজে একা একা রওনা হল বাতাসে! কী আনন্দ দেখো তাই ওর! কেমন নাচতে নাচতে ভেসে যাচ্ছে বাতাসে! এই আমরাও তেমন! এই দেখ কেমন বুড়ো হয়ে আসছি আমি! একদিন অমন করে আমিও এই জনমের সুতো কেটে ভাসতে ভাসতে চেত্তা খেতে খেতে চলে যাব উই আকাশে!’
‘বড়দা! ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন ওড়ান৷ আনন্দ করুন! আর যেন কক্ষনো অমন কথা বলবেন না!’ কাঁপা কাঁপা গলায় মা কথাগুলো বলেই রাবেয়াদিকে চায়ের গেলাস আর বিস্কুটের কৌটোদুটো নামাতে বলে নেমে গেল নীচে!
জেঠু বলল, ‘মা তো! তাই ভয় পেয়েছে বেলোবাবু! কিন্তু তুমি ভয় পাবে না কখনো! মনে রেখো যো ডর গয়া! সমঝো মর গয়া!’
‘আর ডর কে আগে জিৎ হ্যায়!’ ভোলা বলে উঠল৷
জেঠু ভোলার মাথায় আদর করে সবাইকে ডাকল, ‘ওহে রেসপেক্টেড ভ্রাতাগণ! টি ব্রেক! চলে এসো সব!’ বলেই হাতে তুলে নিল চায়ের গেলাস৷
বাবা, কাকা আর পার্থকাকা ওদের উড়ন্ত ঘুড়িগুলো এবার তুলে দিল আমাদের হাতে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন