শাশ্বত কর

গোটা মামার বাড়িটাই বিস্ময় মাখানো! যেখানে তাকাবে, সেখানেই অবাক করা কিছু ঘটছে৷ নয়তো তোমাকে চুপ করিয়ে দেবার মতো কিছু একটা হয়েই রয়েছে৷ এই ধরোই না, আমি এখন যে দাঁড়িয়ে রয়েছি দাদুতুতুদের ঘরের পাশে, আমার সামনে ফাঁকা জমিটায় অদ্ভুত সব কাণ্ড হয়ে চলেছে! অত্ত বড়ো জমিটা ভর্তি জংলা গাছ৷ না, একটু ভুল হল৷ ওখানে ওই যে একটা শুঁটকো কাঁঠাল গাছ, ওটা মামার লাগানো৷ বাকিগুলো জংলা৷ সে যাই হোক, ওখানটায় এখন জঙ্গলটা তোলপাড় হচ্ছে! নিশ্চয়ই কোনো জীবজন্তু আছে! নইলে ঢোলকলমির ঝাড়টা অমন নড়বে কেন! কচুর বনে অমন বেমক্কা তোলপাড়ই বা হবে কেন? আছে কিছু বেশ বুঝতে পারছ, কিন্তু সঠিক করে মালুম করতে পারছ না! বলো, অবাক হবে কি না?
এই জংলা জমিটা আর বাড়ির মাঝখানে তফাৎ টেনেছে প্রায় পাঁচ নম্বরের ফুটবলের সাইজের ঝুলন্ত লেবুর পুরোনো বাতাবি গাছটা! ফুলন্ত বাতাবির গন্ধ পেয়েছ কোনোদিন? উফ! সে যা মিষ্টি না! বাতাবির ফুল ফুটলেই ম-ম করে৷ তখন দিদিদি খালি বলে বেড়ায়—‘বুঝলে নটি, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিসের উপরে একটি শিশির বিন্দু!’
এর পাশেই একটা কাঁচা-মিঠা আমের ধামসা গাছ৷ গোড়ার মাটি ছেয়ে লিলির ঝাড়, আর একটা ইউক্যালিপটাস গাছ৷ বাবা বলে মহাক্যালিপটাস! এটাও একটা বিস্ময়! ইয়া লম্বা! ঘাড় ব্যথা হয়ে যায় দেখতে গিয়ে৷ মনে হয় যেন আকাশটা ঢেকে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ গাছটার নীচের দিকের গা বাদামি আর উপরের দিকের গা পুরো গাওয়া ঘিয়ের রঙের! ওর গা থেকে একটা গন্ধও বেরোয়! আমি তো পাই৷ গরমের ছুটিতে এসেছিলাম যখন, কালবোশেখির তাণ্ডবে দুটো ডাল মড়মড়িয়ে ভেঙেছিল৷ চারিদিকে তখন ইউক্যালিপটাসের গন্ধ! মনে হয়েছিল ও বোধ হয় ব্যথা পেয়ে গন্ধ ছড়িয়ে কাঁদছে! হতেই তো পারে বলো! আমারও তো কত বন্ধু আছে, যারা ইস্কুলে অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবে কাঁদে! আর গাছেরও যে ব্যথা-বেদনা আছে সে তো কবেই আচার্য বসু বলে গেছেন!
সেই মহাক্যালিপটাসের গোড়ায় জড়িয়ে-পেঁচিয়ে আছে পাইরেট শিপের নোঙরের মোটা মোটা কাছির মতো একটা লতা! তার এইব্বড় বড়ো ছেঁড়া ছেঁড়া পাতা! কোনোটার আবার মাথাটা মোড়ানো! দিদিদি বলে, ওটা মানিপ্ল্যান্ট! আমি বিশ্বাস করতে পারি না! আমাদেরও মানিপ্ল্যান্ট আছে৷ ব্যালকনিতে৷ লতানো বটে, কিন্তু এমন দৈত্যর মতো তো নয়৷ আমি ঠিক জানি এটা সেই জাদু বিনের গাছ৷ বেয়ে বেয়ে উঠতে পারলেই সেই দৈত্যপুরী! টেবিলের উপর সেই সোনার ডিম পাড়া মায়া মুরগি! অনেক দিন ওঠার চেষ্টাও করেছি৷ কিন্তু পাতা নাতা ছিঁড়ে ধাঁই ধপাস হওয়া ছাড়া আর কিছুই বরাতে জোটেনি!
এখানটা থেকে এবার যদি একটু এগিয়ে যাও; না, না! গেট অবধি যেতে হবে না—তার খানিক আগেই ছোটো কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাশে গিয়ে দাঁড়াও৷ খুঁজে পাচ্ছো না বুঝি? কৃষ্ণচূড়া গাছটা নামেই কিন্তু ছোটো৷ লম্বায় আমার মতো সতেরো জন তো হবেই! ওর পাশেই দেখ ভাঙা ভাঙা বড়ো গোল টবটায় একটা গাছ আছে৷ ঝিরি ঝিরি পাতাগুলো ছুঁয়ে দাও৷ ব্যস! দেখলে! কেমন বুজিয়ে নিল না পাতাগুলো! ও হল লজ্জাবতী৷ আমার এখন আর অবাক লাগে না৷ বুঝে গেছি, ও কেন এমনি করে৷ ও আসলে আমার মতো৷ আমিও তো অচেনা লোক দেখলে বেশ লজ্জা পাই৷ সব সময় হয়তো আমায় দেখে বুঝতে পারবে না, কিন্তু আমি তখনও বেশ লজ্জা পাই৷ ট্রেনে আসবার সময় যখন কেউ আমায় কোলে টানে, আমারও অমন গুটিয়ে যেতে ইচ্ছে করে৷ পারি না৷ কিন্তু কথাও বলি না৷ বাবা বলেন, ‘বাবু, উত্তর দাও৷ কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তো উত্তর দিতে হয়৷’
উঁহুহু বাবা! ও ভুল আর করব না৷ উত্তর দিই, আর তারপর প্রশ্ন বাড়ুক—‘নাম কী খোকা, কোথায় থাকো, কোন ক্লাস, কোথায় যাচ্ছো, সেখানে কে আছে...?’
উফ! বরাত খারাপ থাকলে বলা যায় না আবার ছড়াও বলতে হতে পারে! তার চেয়ে বাবা চুপ করে থাকি৷ কাচের জানলা দিয়ে বাইরে দেখি৷
কত কী দেখা যায়! আগে কখনো দেখিনি এমন কত কিছু! হাঁ করে তাকিয়ে থাকি৷ এই তো আগেরবার আসার সময় দেখেছিলাম ধু-ধু করছে মাঠ৷ বোধ হয় ফসল যা ছিল কাটা হয়ে গেছে৷ কতক জায়গায় গরু ছাগল ভেড়া চড়ছে৷ আর দূরে, অনেক দূরে মাঠ আর আকাশের মাঝখানের রেখা বরাবর ধোঁয়া উঠছে! অনেকটা জায়গা থেকে! কী পোড়াচ্ছে কে জানে!
মা বলল আগাছা পোড়াচ্ছে চাষিরা, আর বাবা বলল নাড়া৷ নাড়া মানে ফসল কাটার পরে যা পড়ে থাকে সেগুলো৷ সে যাই পুড়ুক দেখতে কিন্তু দারুণ লাগছে! আইসক্রিমের শেপের ধোঁয়ার নীচের দিক সাদা আর উপরের দিক কালো! খানিক উঁচুতে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে! যেন কেউ লক্ষণ-গণ্ডি কেটে দিয়েছে, ওর উপরে আর ওঠা মানা! তাই সে দাগের কাছে এসে সাদা ধোঁয়াগুলো মুখ ভার করে কালো হয়ে আছে৷
এই ধু-ধু মাঠটাই আবার শীতের সময় ভরে থাকে হলুদ ফুলে ফুলে৷ সে সময়ও কয়েকবার দেখেছি৷ কী অদ্ভুত! এই খালি তো এই ভর্তি! অবাক কাণ্ড! একবার ট্রেনটা ক্রসিংয়ের জন্যে দাঁড়িয়ে গেছিল এইরকম একটা মাঠের সামনে৷ কেমন সুন্দর হলুদ ঢেউ তখন ফুটে উঠেছে মাঠে! ঢেউটা একদিক থেকে উঠছে আর বয়ে বয়ে আরেক দিকে চলে যাচ্ছে! বাবা ক্যামেরায় তুলেওছিল ভিডিয়োটা৷
ট্রেনের ভিতরেও কি কম কিছু বিস্ময়! বাঙ্ক ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমোয় কত লোক! ঘাড়টা ঘুমে ন্যাতাপ্যাতা হয়ে কাঁধে ঢলে পড়ে! ট্রেনও দোলে, মাথাও দোলে! তলতলিয়ে দোলে বটে, কিন্তু পড়ে যায় না! এক খেলনাকাকু কীসব অদ্ভুত খেলনা নিয়ে ওঠে! খেলনা তো কতই দেখেছি, অমন খেলনা ওর কাছে ছাড়া আর কোত্থাও পাওয়া যায় না৷ কোনোটা মাটির, কোনোটা পাতার, কোনোটা কাগজের আবার কোনোটা যে ঠিক কীসের তৈরি—বুঝতেই পারি না! আর সেই খেলনাকাকু ট্রেনে উঠেই এমন সুরে গান গায়, যে গানের কথা-টথা সবটা বুঝতে না পারলেও হাসি ভুকভুক করে বেরিয়ে আসে পেট থেকে৷ আরও একজন আছেন৷ তাঁর কথা বলতেই হবে৷ তিনি তো প্রায় ম্যাজিশিয়ান! এমনিতে অবশ্য নানান মাপের চিরুনি বিক্রি করেন৷ একটা বড়ো চিরুনি বার করেন প্রথমে, তারপর সেটা ঘুরিয়ে আরেকটা, তারপর সে দুটোকে ঠুকে আর একটা... এমনি করে পাঁচটা বানিয়ে তারপরে বেচেন! দেখতে দেখতে মুখটা হাঁ হয়ে যায়, আর অমনি মা মুখে বিস্কুট নয়তো কেকের টুকরোটা ঢুকিয়ে দেয়৷ তাকালেই চোখ ঘুরিয়ে হাসে৷
এই যে আমার মা—ইনি তো আগা-গোড়া বিস্ময়ের! বাড়িতে যতক্ষণ, ততক্ষণ মায়ের রূপ একরকম—এই বকছে, ওই পড়াচ্ছে! এই এটা কোরো না, ওটা কোরো না বলছে, ম্যাজিকের মতো বুঝে যাচ্ছে ইস্কুলে কী কী দুষ্টুমি করেছি! কিন্তু এই মাকেই মামাবাড়ি যাবার সময় দেখো, কেমন বদলে গেছে! বক-ঝকা স্টপ! বরং আদর করছে, কত গল্প বলছে মামাবাড়ির—দাদুদের ছোটোবেলার, নিজের ছোটোবেলার—কত্ত সব মজার মজার ঘটনা!
মামাবাড়িতেই মাকে বেশি মানায়, জানো? কেমন সুন্দর সেজেগুজে থাকে! কোনো কিছুর জন্যে হুড়োহুড়ি করে না৷ বকেও না৷
অবশ্য বকবেই বা কেমন করে? আম্মা, দাদানদা আছে না! ওরা তো মায়েরও মা-বাবা৷ তারপর আছে দিদিদি, ছোদ্দিদি, দাদুতুতু, সোনামা, মোজোদাদু, মামণি, টোকাটুলি, রাঙামানি, ছোদ্দাদা, মানি—কত্ত দাদু-দিদা আমার! ওরা সবাই মায়ের কাকু-কাকিমা আর পিসিমণি৷ আমাকে একটুও বকা খেতে হয় না! একটু বকলেই সব্বাই মিলে মাকে বকে দেয়৷
বলছিলাম না, পুরো মামাবাড়িটাই বিস্ময়ের? কেন বলছিলাম শোনো—যদি তুমি বাইরের বড়ো লোহার গেটটা ঠেলে একবার ভিতরে ঢুকে আসো না, নিজে নিজেই বুঝে যাবে৷ রাস্তার দুই ধারে শুধু বড়ো বড়ো গাছ! কৃষ্ণচূড়া, বকুল, নিম, অশোক, বোগেনভেলিয়া (বাবা বলেছে ওর বাংলা নাম নাকি বাগান বিলাস), পেয়ারা, কাঁঠাল, কুল, লিচু আরও কত কী! আর কত্তরকম ফুল! কত্ত সব রং! কত্ত সব পাখি তাদের ডালে ডালে! কত্তরকম তাদের ডাক! চাও কি তুমি ভ্যাঙাতেও পারো! ঠিকঠাক ভ্যাঙালেই দেখবে সেই পাখিটা উত্তর দেবে!
আর একটা অদ্ভুত জিনিস আছে৷ পুকুর পারে৷ একটা হেলে পড়া খেজুর গাছের গা থেকে একটা বট না কি অশ্বত্থ গাছ! কেমন লতিয়ে-পেতিয়ে এক হয়ে গিয়ে তারপর সোজা উঠে নিজের ডালপালা মেলেছে! দীপমামা দেখিয়েছিল একদিন৷ ওটা আমি যত দেখি ততই অবাক হই৷ কেমন করে হতে পারে!
বাড়িময় শুধু ফুল আর ফুল! গোলাপ ঝাড়ে ফুল, জবা ঝোপে ফুল, লতিয়ে থাকা তরুলতায় মিষ্টি ম্যাজেন্টা রঙের ফুল, মাঠের আগাছার ঝোপে ফুল, পুকুর পারজুড়ে জ্যাবোরান্ডির ঝোপময় ফুল, আপন-জালা নয়ন তারায় ফুল, এমনকী টবে রাখা বিচিত্র আকারের ক্যাকটাসগুলোতেও ফুল! পেয়ারা ডালে বাঁশের টুকরোয় প্যাঁচানো নারকেল দড়ি থেকে অর্কিড ঝোলে, সেগুলোতে বেগুনি রঙের আর ম্যাজেন্টা রঙের ফুল! রেলের জমির জংলা গাছগুলোও সব ফুলে ফুলে ভরা! আর প্রজাপতিও কতরকম রে বাবা! আমাদের বাড়ির ওখানেও তো মাঝেমধ্যে প্রজাপতি দেখি, সে এত্তরকম বাহারের নয়! কত্তরকম যে তাদের রং! কত্তরকম যে নকশা আঁকা ডানা! ওদের ফুলের উপর বসে মধু খাওয়ার ধরন দেখলে, আমি জানি, তুমিও অবাক হবে৷
মামাবাড়ির যে-পাশটায় রেললাইন, সে দিকের ফাঁকা জমিটায় পুজোর সময় কাশফুল ফোটে৷ কখনো কাশফুলের উপর দিয়ে হাওয়া বইতে দেখেছ? আমার তো কাশফুল ফুটলে মনে হয় যেন সার সার সান্টাক্লস এসে দাঁড়িয়ে আছে পুজো দেখবে বলে, আর হাওয়ায় তাদের ঘাড় নড়ছে দিদিদির মতো৷ দিদিদির ঘাড়টা এখন দেখি মাঝে মাঝে একা একাই নড়ে! মা বলে, মায়ের ঠাম্মারও নাকি এমনি হত৷ আর দিদিদি তো সেই ঠাম্মারই মেয়ে—তবে তো এমনি হতেই পারে, বলো?
মা বলে, মায়ের ছোটোবেলায় না কি বাড়িটা আরও সুন্দর ছিল৷ ছোদ্দিদি বলে ছাদে উঠে উত্তর-দক্ষিণে যতটা চোখ যায়, তার সবটা আগে নাকি এই বাড়ির সাথেই ছিল৷ তখন মায়ের দাদা বেঁচে ছিলেন৷ এখন যেখানে বাবলার ঝাড়, আগাছার বন, তখন সেখানে ফসলের খেত ছিল৷ আমার ভারি অবাক লাগে, তখন হত, তবে এখন হয় না কেন?
মা বলে, দাদা নাকি দেশের জন্যে লড়াই করেছেন৷ স্বাধীনতা সংগ্রামী৷ জেলও খেটেছেন! আর স্বাধীন হবার পর হোমের সুপার ছিলেন৷ তারপর এই বাড়ি৷ সবাই বলত হোমের সাহেবের বাড়ি৷
গাছগুলো কেমন ঝুঁকে আছে দেখেছ, পুকুর পারে! গায়ে কত সব লতা আর লম্বা লম্বা ফল৷ ওগুলো তিতপটল৷ এখন তো দেখতে বেশ ভালোই লাগছে, সন্ধ্যে হয়ে এলেই দেখবে ওরা কেমন বদলে যাবে! রাজ্যের অন্ধকার এসে জড়ো হবে লতাগুলোর গায়ে! থোকা থোকা অন্ধকার ঝুলবে তখন গাছ থেকে! বাবা বলে ওগুলো নাকি ভূতের দাড়ি! হতেও পারে! বাবা খুব একটা ভুল কিছু তো বলে না!
দোতলার ল্যান্ডিং-এর জাফরিটার ওই পারে একগাদা পাতা-নাতা দিয়ে কাঠবিড়ালি ঘর বানিয়েছে৷ আম্মা দুপুরে ওদের ভাত খাওয়ায়৷ পাঁচিলের ওপর ভাত মেখে দেওয়ার সাথে সাথেই চারটে কাঠবিড়ালি আমড়া গাছের ডাল ঝুলে নেমে আসে৷ লেজ চেপে বসে সামনের দু-পায়ে ধরে সে কী ভঙ্গি খাওয়ার! আর কিচকিচিয়ে কত সব কথা! ওরা খেয়ে যাবার পর খেতে আসে একটা কুবোপাখি৷ আম্মা ওকে বলে ইন্সপেক্টার! তার পরে আসে একটা ডাহুক৷ আম্মা ওকে কোনোদিন বলে উকিলবাবু, কোনোদিন বলে লাজুকলতা, আবার কোনোদিন বলে দুয়োরানি! এদিক-ওদিক দেখে কেউ ওকে খেতে দেখল কিনা, যেই কেউ কোত্থাও নেই, অমনি একটু ভাত ঠোঁটে তুলেই সরে যায়, যেন খায়নি কিছুই অথবা খাওয়াটা যেন সাংঘাতিক কিছু অপরাধ! হাবভাবগুলো দেখলে বেশ মজা লাগে! ওর খাওয়া শেষ হতে না হতেই কোত্থেকে বিড়ালটা লাফিয়ে এসে হাজির হয়, অমনি সে কী চোঁ-চাঁ ছুট! বিড়ালটার কাণ্ডি দেখ, নিজে আদ্ধেক দিন কিচ্ছুটি খায় না, কিন্তু হামলে পড়ে অন্যদের খাওয়া মাটি করে! অবিশ্যি ইন্সপেক্টারের সাথে নাকি পারে না! আম্মা বলে এক-এক দিন এমনি তাড়া লাগায় ইন্সপেক্টার, যে বিল্লিমাসি পালাবার পথ পায় না!
একদিন ওইখানেই তো চ্যাঁ-চ্যাঁ-চিঁইই শব্দ শুনে বাবাকে ধরে এনেছিলাম৷ বাবা শুনে বলল, ‘সাপে ব্যাঙ ধরেছে’৷ সাপ ধরলে ব্যাঙের ডাক এমনি বদলে যায়! কী আশ্চর্য! বাবা বলল, গোটা পৃথিবীটাই নাকি এমন সব আশ্চর্যে ভরা৷ যত বড়ো হব সব নাকি জানতে পারব৷ পিরামিড জানতে পারব, তুর্কমেনিস্তানের নরকের দরজা জানতে পারব, কানাডার আব্রাহাম লেকে বরফের বুদবুদ হয় জানতে পারব, ফারাফ্রার সাদা মরুভূমি জানতে পারব, ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব আশ্চর্য প্রাণী, আদিবাসীদের তৈরি অদ্ভুত সব আধুনিক যন্ত্রপাতি, ওদের সভ্যতা—সব জানতে পারব! বাবার কাছে যখন শুনি, মনে হয় একবার গেলেই তো উরুবাম্বা নদী উপত্যকার উপরে, আন্দিজ পর্বতে৷ কী যেন নাম? মাচুপিচু না কী একটা যেন! সেখানে আড়াই হাজার মিটার উঁচুতে নাকি ইনকা সভ্যতার অবাক করা সব পাথুরে দেওয়াল! ইনকা-রা না কি সূর্যদেবের পুজো করত! অথবা যেতে পারি সেই ইস্টার আইল্যান্ড, যেখানে কি না আগ্নেয়গিরি ভরা উপত্যকায় ৯০০টা মোয়াই!
বাবা এত কিছু জানে আর হনুমান যে দাঁত খিঁচিয়ে তাড়া করে এটা জানে না! সোনামা-র কাছে কিন্তু এই হনুবীররা পুরো টাইট! লিচুগাছের মাথাটায় যখন তেনারা হুপহুপিয়ে নাচেন, নয়তো লঙ্কাগাছের অথবা পেঁপেগাছের মাথা মটকান, সোনামা ‘অ্যাইই’ করে এইসান বকা দেয় না, যে দুদ্দাড় করে সব পালায়! কিন্তু এই হনুরাই বাবাকে যাকে বলে একেবারে মোক্ষম হনু তাড়া করেছিল! সত্যি! এই তো ঠিক এইখানেই! বাবার সে কী ছুট! ঘ্যাঁক করে কী এক শব্দ করে সেই যে পাঁই পাঁই ছুটল, তারপর কোথায় যে গেল কে জানে! আর আসে না, আর আসে না! শেষে দাদানদা গিয়ে কোত্থেকে যেন নিয়ে এলো৷ কই দাদানদাকে তো হনুমান কিছু করল না! বাবা কি তাহলে আমার মতো ঢিল-টিল কিছু ছুঁড়েছিল!
এই শোনো, আমি যে মৌচাকে গুলতি দিয়ে ঢিল ছুড়েছি, সে কিন্তু এখনও কেউ জানে না, বুঝলে? আসলে ব্যাপারটা কী হয়েছে, বকুলগাছটায় তো একটা চাক হয়েছে৷ এই এত্ত বড়ো! ছোদ্দিদি দেখিয়ে বলেছিল, ‘খবদ্দার নটি! বেশি কাছে যেও না যেন, বিরক্ত করলে কিন্তু ওরা বোঁওও করে তাড়া করবে আর কামড়াবে, তখন হয় এই ভ্যাপসা গরমেও কম্বল মুড়ি নয়তো ওই এঁদো ডোবায় ডুব—এ ছাড়া বাঁচার আর কোনো পথ পাবে না!’
শোনার পর থেকেই মনটা কেন যেন ওখানেই পড়ে আছে৷ কাজেই সবাই যখন খাবার টেবিলে গপ্প করছে, গুলতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি৷ বেরিয়েই দেখি দুটো বেজি আড়াআড়ি রাস্তা পার হচ্ছে৷ আমায় দেখে দাঁড়াল, গোল্লা গোল্লা চোখ করে দেখল! তারপর বাচ্চাদুটো আসতেই সবাই মিলে সড়সড়িয়ে নেমে গেল জঙ্গলে৷ আমিও অমনি মাটি থেকে ঢ্যালা নিয়ে গুলতি দিয়ে উপরে ছুড়লাম৷ লাগল না৷ আবার৷ চাকের পাশ দিয়ে কান ঘেঁষা হয়ে বেরিয়ে গেল৷ এক চোখ বন্ধ করে তাক করলাম৷ এবার লাগল চাকের একটু দূরে, ওই ডালেই৷ তাতেই দেখি মৌমাছিগুলো চৌকান্না হয়ে গেছে৷ ভনভন করে উড়ছে৷ এদিকে আসছে কয়েকটা! ওরে বাবা! যেন মিসাইল! ছুট ছুট! একদম খাওয়ার ঘর৷
যে ডোবাটার কথা ছোদ্দিদি বলেছিল, তার থেকে একটু দূরেই কয়েকটা লম্বা লম্বা তালগাছ আছে৷ ওখানে বাবুইপাখির বাসা ঝোলে৷ আমি হাঁ করে দেখি! কেমনি করে বোনে এত সুন্দর বাসা! ওইটুকু তো ঠোঁট! মোজোদাদু বলে, ওরা না কি জোনাকি দিয়ে বাসায় আলো জ্বালে!
জোনাকিও কি কম বিস্ময়ের! জোনাকি আসলে পরি৷ আমি ঠিক জানি৷ অন্ধকারে একদিন ওদের পুকুর পাড়ে আলো নিয়ে নড়াচড়া দেখেছি৷ যদি তুমিও দেখো না, তাইলে তোমারও অমনিই মনে হবে৷
মা, মায়ের দাদাকে খুউব ভালোবাসে৷ আমাকে কত্ত গল্প বলে৷ মায়ের কাছে শুনে শুনে মনে হয়, দাদা থাকলে আমাকেও খুব ভালোবাসতেন৷ কেন নেই বললেই মা বলে উনি নাকি আকাশে গিয়ে তারা হয়ে গেছেন! আমার মনে হয় দাদা জোনাকি হয়ে গেছেন৷ মা এখানে এলে দাদা জোনাকি হয়ে তাই দেখতে আসে৷ কেউ বুঝতে পারে না৷ আমি ঠিক বুঝতে পারি৷ ইস! যদি উনি থাকতেন, তাহলে মাকে যেমন দিয়েছিলেন, আমাকেও অমন একটা ছোটো কোদাল গড়িয়ে দিতেন৷ আমরা তিনজন উবু হয় বসে কোদাল দিয়ে খেতের ঢ্যালা ভাঙতাম৷ কী মজা হত! কিন্তু হয় কোথায়! মানুষ কেন তারা হয়ে যায়, বলো তো? আসেই বা কোত্থেকে?
বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম৷ বলল, ভগবান নাকি একদিন দিয়ে যান মায়ের কাছে৷ মা নিজের মধ্যে লুকিয়ে বড়ো করে তবে বাইরে আনেন৷ আর তারপর সব কাজ হয়ে গেলে, খেলার পর যেমন আমি বাড়ি আসি, মানুষও নাকি ভগবানের কাছে ফিরে যায়! উই আকাশে!
আরে! ওই লোকটা বাঁশে চড়ে আকাশের কাছে করছেটা কী! ও, বুঝেছি, প্যান্ডেল বানাচ্ছে৷ পরশু তো কালীপুজো৷ আমরা তো সেজন্যেই গতকাল এলাম৷ কিন্তু, লোকটা অদ্ভুত তো! একটা লিকলিকে বাঁশে চড়ে কেমন ঝুলে ঝুলে আরেকটা বাঁশে দড়ি বাঁধছে! কী ব্যালেন্স!
ওকে দেখে হাঁটতে হাঁটতে বাগানে ঢুকে পড়েছি৷ এটা আবার কী পোকা রে বাবা! লিলির পাতায় চটকে আছে! অমনিই সবুজ, শুঁয়োপোকার মতন বড়ো—কিন্তু শুঁয়ো নেই! এদিকে কতগুলো কুমড়ো পোকা উড়ছে৷ গুবরে পোকা ঘুরছে৷ ওদের সবাইকে এখন চিনি৷ তবুও পাখার আঁকিবুকি রং দেখলে অবাক লাগে!
বেলা পড়ে আসছে৷ ছায়া ছাইছে ইটের রাস্তায়৷ কৃষ্ণচূড়ার মগডালে কোকিল ডাকছে৷ মামাবাড়িতে সারাবছরই কোকিল ডাকে! রাতেও ডাকে!
কিন্তু বাবা ওখানে করছেটা কী? ছবি তুলছে? কানে তো ইয়ারফোন! দৌড়ে গিয়ে ইয়ারফোনটা টেনে নিয়ে কানে গুঁজলাম৷ বাবা হাসল৷ ইয়ারফোনে একটা ইংরিজি গান হচ্ছে৷ ভাঙা ভাঙা গলায় কে যেন গাইছেন : ‘হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্লড!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন