শাশ্বত কর

বাবাকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না! নাও, এবার বোঝো ঠেলা! ড্যালা সাক্ষী, মাকে পইপই করে কতবার বলেছিলাম, বাবার সাথে অমন কোরো না! না হয় চিনি, মিছরি, ড্যালার জন্যে আনা জামাগুলো যাকে বলে রামঢোলা হয়েইছে, গিঁট দিয়ে তো তবু পরাই যায়! না হয় মন্টুর দোকানে গিয়ে আধঘণ্টা বাদে গোটা সুপুরির জায়গায় লোটা ভরে দুধ এনেছে—তাতেই বা কী এমন অনাসৃষ্টি হল গা, বলি পুজোতে তো দুধও লাগে! ওই তো দাদুতুতুকে সোনামা সকালবেলা পুজোর দুধের জন্যে কেমন পাখি-পড়া করছিল—নিজের কানেই তো শুনলাম!
ছোটো বলে আমার কথায় মা তেমন পাত্তা দেয় না! আরে বাবা তেমন ছোটো তো আর আমি নই! থ্রি-তে পড়ি! তিন-তিনটে দস্তুরমতোদস্যি মাসতুতো বোনের দাদা! ক্যারাটের কিক জানি, গুলতি দিয়ে ঢ্যালা ছুড়তে জানি, নীল পাহাড়-কমলা সূর্য-হলদে ধানের গোলার মাথায় সবজে কলাপাতা আঁকতে জানি, সকালবেলায় আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর... গাইতেও জানি! এরপরেও ছোট্টটা ভাবা কি ঠিক? কিন্তু মাকে কে বোঝাবে? কিচ্ছু বুঝবে না, উলটে গাল রগড়ে নয়তো নাক মুচড়ে আদর করে চলে যাবে৷
বাবাকে যে পাওয়া যাচ্ছে না সে নিয়ে এ-বাড়িতে কিন্তু তেমন হুলুস্থুল নেই! এটা আমায় বেশ অবাক করছে! একটা জলজ্যান্ত মানুষ—সকালে আমার সাথে বাগানে টইটই করে বেড়ালো, কোকিলকে খানিক কুউউ কুউউ করে ভ্যাঙচাল, পুকুরে চারা ছুড়ে ব্যাঙ নাচাল, পুকুরপাড় থেকে গোলাপ জাম তুলে আনতে গিয়ে সুড়ুৎ করে পিছলে হলুদ পাজামার পিছনে কালো কাদার ছাপ বানাল—সেই লোকটা কিনা একঘণ্টা ধরে গায়েব! যাকেই জিজ্ঞেস করি কেউ বলতে পারছে না কোথায় গেছে! মা না, আম্মা না, সোনামা না, দাদুতুতু, দাদানদা, মোজোদাদু, টোকাটুলি, ছোদ্দাদু কেউ না! কেবল ড্যালা বলল, কোথায় যেন দেখেছে, তবে কোথায় দেখেছে ঠিক মনে করতে পারছে না! আর চিনি-মিছরির কথা তো ছেড়েই দাও৷ চিনিকে জিজ্ঞাসা করলাম, তো চোখ গোল্লা গোল্লা করে মাথা টাথা নেড়ে হাতের মুঠোটা ঘুরিয়ে বলল, ‘উম্মম্মম উয্যেইইই’! আর মিছরিকে জিজ্ঞেস করলাম, তো সে ‘ইলিলিলিলিলি’ করে কীসব বলে তলবল তলবল করে ঘুরতে লাগল, তারপর থপ করে মাটিতে বসে চটাচট মাটি থাবড়ে বলল ‘ইত্তো ইত্তো ইত্তো’! কেবল ফজুদাদুর কাছে একটা উত্তর পেলাম৷ ফজুদাদু তখন খড়ির ঘরে উনুনে জ্বাল দিচ্ছিল৷ গিয়ে যেই জিজ্ঞেস করলাম, আমার বাবা কোথায় গো? তো পাকাচুল থেকে কী একটা পোকা বেছে মাটিতে ফেলে দিয়ে বলল, ‘তুমার বাবা? সে তো চলি গেল৷ যাবার কালে বলি গেল যে, বাবু এত্ত জ্বালায়! আর সইহ্য হয় না!’ ধ্যাত! সব কিছু নিয়ে ঠাট্টা!
তবে হ্যাঁ! ঠাট্টা না-ও হতে পারে! বাবা চলে যেতেও পারে! ওই যে মা বলল না, চোখটা কপালে তুলে না কি বাবা হাঁটে, সেই শুনেই তো দেখলাম বাবার মুখটা তুবড়ির খোলের মতো তুম্বো হয়ে গেল৷ হবে না! চোখ কপালে তুলবে মানে? বাবা কি মনস্টার? না জোম্বি? আমি তখনি জানি, বাবা দুঃখ পেয়েছে! আর দুঃখ পেলেই বাবা হয় কলম নিয়ে, ঘচঘচ করে লিখবে নয়তো বনেবাদাড়ে ঘুরবে! তখন খেলতে বললে আর খেলবে না৷ ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলবে আর ‘হরি ওম হরি ওম’ বলবে৷ আবেগের বেগ বাড়লে আবার গানও শোনাতে পারে!
কথাটা মনে আসার সাথে সাথেই দৌড়োলাম৷ পিছনের বাঁশবাগান থেকে শুরু করে দক্ষিণের পুকুরপাড়, আমবাগান, লিচুতলা, আমড়াতলা কোত্থাও নেই! নির্ঘাত চলে গেছে! ধুস! এইত্তো কালই এলাম মামাবাড়ি! সবার সাথে খেলাই হল না! এরই মধ্যে বাবা চলে গেল! আর পারি না!
যাই দেড়তলার ঘরে গিয়ে একটু বসি৷ ওখানে জানলার পিছনের আমডালে একটা বাসা হয়েছে৷ কী পাখির কে জানে? তিনটে বাদামি বাদামি হাঁ করা ছানাও হয়েছে! ওদেরই না হয় দেখি গে!
আরে! দেড়তলার ঘরের হ্যাসকলটা খোলা কেন? নিশ্চয়ই ড্যালাটা আগেভাগে এসেছে৷ ড্যালা মিছরির চেয়ে বড়ো৷ কিন্তু তাও তো ছোটোই! ওর থেকে বাঁচাতে এই ঘরে আমার বিশেষ খেলনাগুলো লুকিয়ে রেখেছি৷ বোধ হয় সেগুলোই খুঁজতে এসেছে৷ ব্যাটাকে হামলে পড়ে ভয় দেখাব, এই ভেবে যেই না দড়াম করে দরজা খুলে হালুম করে পড়েছি, অমনি ‘অইইইই! বাপরে!’ বলে যে কিম্ভূত লাফটা দিল সে তো ড্যালা নয়! সে যে আমার বাবা!
‘ও বাবা! তুমি চুপ করে এখানে কী করছো? আমি গোটা বাড়িতে তোমায় খুঁজে এলাম!’
বাবা বাঁ-হাতে বুক ডলতে ডলতে ডানহাতের ইশারায় দরজাটা চাপাতে বলল৷ বললাম, ‘কেন?’
বাবা ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আস্তে!’
ব্যস, বুঝে গেলাম, একটা মারাত্মক প্ল্যান চলছে৷ চুপিচুপি দরজাটা চাপিয়ে আসলাম৷ বাবা আঙুল দিয়ে ইশারায় মেঝের এক কোণে দেখাল৷ দেখি সেখানে এক কাঠের নকশাকাটা বাক্স! বাক্সটার ডালা খোলা৷ ভিতরে অনেকগুলো পুরোনো দিনের চিঠিপত্তর৷ হলুদ পোস্টকার্ডের রং কেমন ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেছে, আর নিব পেনের নীল কালির লেখাও কোথাও কোথাও ঝাপসা হয়ে মিশে গেছে! আরেকদিকের খোপে অনেকগুলো ডায়েরি৷ বাবা বলল, ‘এগুলো সব তোর বড়দাদার, মানে তোর দাদানদার বাবার ডায়েরি৷ বড়ো হয়ে পড়বি৷ এত সুন্দর ইংরিজি, দেখবি মনে হবে যেন বড়দাদা নিজে তোকে তাঁর গপ্প বলছেন৷’
বললাম, ‘তুমি এতক্ষণ এই সব পুরানা জমানার চিঠি পড়ছ! আর আমি গোটা বাড়ি তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি!’
বাবা মাথাটা উপরে তুলে ঠোঁট বেঁকিয়ে বেশ একটা কেউকেটা মার্কা হাসি ঝুলিয়ে বলল, ‘যেখানে পাইবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন!’
বললাম, ‘মানে?’
বাবা বলল, ‘এই দেখ বেলো! কী অমূল্য রতন পেয়েছি!’
সাধে মা রেগে যায়! এত কিছু বলে ম্যাজিশিয়ানের টুপি থেকে খরগোশ বার করার কায়দায় ‘ঢ্যানটানা’ বলে যেটা হাতে নিয়ে দেখাল, সেটা একটা মামুলি খাতা৷ কমলা নীল বর্ডার দেয়া খানিক লম্বাটে ছোট্ট একটা বাঁধানো খাতা৷ সেইটে হাতে নিয়েই বাবা একদম নেপোলিয়নের মতো ভাব নিচ্ছে (এইটে বাবারই ডায়ালগ, আমায় প্রায়ই বলে, সুযোগ পেয়ে বাবাকেই উলটে বলে দিলাম)!
গলায় খানিক বিতৃষ্ণা এনে বললাম, ‘ওটা কী? কার খাতা?’
‘খুলেই দেখ না৷’
হাতে নিয়ে বাঁধানো মলাট উলটোলাম৷ প্রথম পাতায় লাল কালিতে লেখা ‘আমার নোটবই’৷ নীচে নীল কালিতে লেখা—শ্রীমান গিরিশিখর গাঙ্গুলী৷ আরিব্বাস! এ যে দাদানদার নাম! মানে এটা দাদানদার বাঁধানো খাতা! উৎসাহে পাতা উলটোলাম—পাতায় পাতায় আঁকা চকরা-বকরা মুখ, আর তার নীচে নীচে চার-ছ-লাইনের ছড়া! প্রথমেই যে ছেলেটার ছবি তার খালি গা, হাফ প্যান্টুল, মাথায় খান কয়েক চুল আর চিমড়ে রোগা৷ পিছনে আবার ন্যাজ! ন্যাজের শেষে তির চিহ্ন দিয়ে ছড়া লেখা :
আন্টু বান্টু গা আর পোকায় ধরা দাঁত
লিখতে পড়তে বললে চাঁদু এক্কেবারে কাত
সারাটাদিন খেলায় ধুলোয় তবু কত্ত আদর!
ন্যাজযুক্ত ভাইটি আমার শশাঙ্কশেখর!
এ বাবা! এ যে মোজোদাদুর নামে লেখা৷ তারপর একে একে দাদুতুতু থেকে ছোদ্দাদু এমনকী বদ্দিদি ছোদ্দিদি সব্বার নামে পেলাম৷ তারপর দাদানদার ইস্কুলের বন্ধুদের নাম৷ নিজের খেলনা-টেলনার নাম৷ তারপর কয়েক পাতা গ্যাপ৷ মাঝামাঝি এক জায়গায় পেনসিলে কী যেন খুদে খুদে অক্ষরে লেখা! বাবাকে পড়ে দিতে বললাম৷ বাবা পড়ল—
‘‘অদ্য সেই অমূল্য দ্রব্যখানি হাতাইলাম৷ অবশ্য ইহা আমারই প্রাপ্য ছিল৷ মেজো ছল করিয়া তাহা হস্তগত করিয়াছিল৷ কিন্তু উহারা তো জানে না, পেটরোগা বলিয়া বল খানিক কম থাকিতে পারে তবে কৌশলে আমি সত্যই উহাদিগের দাদা৷ হুহুহাহাহাহাহা (অট্টহাস্য)! কী কৌশলে যে উহা হস্তগত করিলাম তাহা লিখিব না৷ উহা গুপ্তই থাক৷ এক্ষণে সর্বাগ্রে যাহা প্রয়োজন, তাহা হইল এই দ্রব্যটিকে লুক্কায়িত করা৷ একখানি মনোরম স্থান আবিষ্কার করিয়াছি, যেইখানে এই ষণ্ডবাহিনীর যাতায়াত তেমন নাই৷ থাকিলেও খুঁজিয়া বাহির করা ইহাদিগের কম্ম নহে৷ স্থির করিয়াছি, দ্রব্যটি সেই স্থানে লুকাইয়া নিজেও বৎসরকাল সেই দিকে আর যাইব না৷ পরে ভুলিয়া গেলেও যাহাতে সেই স্থান খুঁজিয়া পাইতে অসুবিধা না হয় তাই সেই স্থানের হদিশ এই নোটবুকের শেষ পাতায় সংকেতে লিখিলাম৷ ইতি—শ্রীমান গিশিগাং’’
‘বাবা গিশিগাং মানে?’
‘বুঝলি না? গিরিন্দ্রশিখর গাঙ্গুলী—ছোট্ট করে গিশিগাং৷’
‘বাবা! দাদানদার তো দারুণ বুদ্ধি! কিন্তু সংকেতটা দেখলে?’
‘দেখলাম বই কী৷ নইলে দু-ঘণ্টা ধরে করলামটা কী? এই দেখ৷’ বলে বাবা খাতার এক্কেবারে শেষ মলাটের পাতাটা খুললে৷
‘যা! এ তো পুরো ফাঁকা! তবে যে বললে সংকেত আছে!’
‘আছে তো৷ বলেছে না শেষ পাতায় আছে!’
‘এটাই তো শেষ পাতা৷’
‘না হে শ্রীমান বেলোভূষণ! শেষ পাতাটি হল এইটি’৷ বলেই বাবা মলাটের বাঁধাইয়ের ভিতরের পাতাটা খুলে দেখালেন৷
‘কিন্তু বাবা, ওখানে যে এত্ত কুদিকুদি লেখা! এত বড়ো সংকেত হয় নাকি?’
‘উঁহু৷ অতবড়ো তো নয়৷ অনেক লেখার মধ্যে কয়েকটা শব্দ দেখ গোল গোল করা৷ ওগুলোকে পরপর লিখলেই দেখ একটা সংকেত হয়৷ একটা ছড়া৷ এই দেখ এই কাগজে সেটা আমি আলাদা করে লিখেছি :
ভুঁইকেল নিয়ে এলো গোপিরাম সরখেল
গাছ থেকে টপাটপ পেড়ে নিল কৎবেল
পাঁচ পা কখন থাকে ওরে মোটু হাতি?
অগ্নিতে পড়ে নাকি কেউ বর্ষাতি?
দুই হাত নাড়ু দেবো যদি পাও তল
খুঁড়লে বুঝবে চাঁদু কতখানি জল!’
‘লে হালুয়া! থান্ডারিং টাইফুনস!’ ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতো মুখ থেকে বেরিয়ে গেল! ‘যত্তসব গেঁড়িগুগলির ঝাঁক!’ বাবা আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে ছড়াটা আরেকবার পড়ল৷ এবার শেষ লাইনের শেষ শব্দটা বলা খতম হতেই একেবারে মহিষাসুরের মতো হুহুহাহাহাহা করে হেসে উঠলাম৷
‘বাবা বলল, হাসিস নি বেলো৷ একবার ভাব, কী বুদ্ধি তোর দাদানদার মাথায়!’
‘ঘোড়াড্ডিম বুদ্ধি! বুঝছো না আবোল-তাবোল লিখে মোজোদের ভড়কি দিয়েছে!’
‘যাক জিনিসটা যে লুকিয়েছে ভাইদের জন্যেই সেটা তো তুই বুঝলি৷ তার মানে তুই বড়ো হচ্ছিস রে বেলো৷’
‘বুঝব না কেন? আমিও তো ড্যালার ভয়ে খেলনা লুকোই৷’
‘তাই না কি? কোথায় রে?’
‘কেন এই ঘরে৷’
‘সে কি? দেখতে পাচ্ছি না তো!’
‘হুঁ হুঁ বাবা! এত্ত সহজে মিলে গেলে আর লুকোনোর মজা কোথায়? এই দেখো’—বলে আমি ড্যাক্সোর ভিতর থেকে পুরোনো বালিশগুলো টেনে বার করলুম আর তার খোলে হাত ঢুকিয়ে একে একে খেলনাগুলো বার করে আনলুম৷
বাবা তালি দিয়ে বলে উঠল, ‘ব্রাভো! এই না হলে দাদুর নাতি!’
তারপর বলল, ‘তোরটা তো পেলুম, এবার চল তোর দাদানদার দ্রব্যটি দেখে আসি৷’
‘মানেটা কি? তুমি সংকেতের মানে ধরতে পেরেছ? বলো বলো, ও বাবা! বলো! বলো!’
‘রোসো বেলোভূষণ, রোসো! অত হড়বড় করলে কি চলে?’ বলে ফের একটা নেপোলিয়ন-নেপোলিয়ন ভাব নিয়ে বাবা বলতে শুরু করল, ‘এই দেখ—প্রতিটা লাইনের প্রথম একটা বা দুটো শব্দ নিলে কী দাঁড়ায়? কই, একবার জোরে জোরে পড় তো!’
পড়ে দেখি বাবা লিখেছে—‘ভুঁইকেল গাছ থেকে পাঁচ পা অগ্নিতে দুই হাত খুঁড়লে’
‘আরিব্বাস! এ যে পুরো গুপ্তধনের হদিশ!’ তড়াক করে লাফিয়ে নিয়ে বাবাকে বললাম, ‘কিন্তু বাবা ভুঁইকেল গাছটা কি? আর অগ্নি মানে তো আগুন, আগুনে পাঁচ পা দিতে হবে! মানে কার কার পা?’
‘ধুস হাঁদা! অগ্নি মানে যেমনি আগুন, তেমনি আবার অগ্নি দশদিকের একটা দিকও৷ মানে হল ভুঁইকেল গাছ থেকে পাঁচ পা অগ্নিকোণে দুই হাত খুঁড়তে হবে, বুঝলি?’ বলেই ঘচঘচ করে খানিক চিবুকের দাড়ি চুলকে বলল—‘কিন্তু বুঝলি, ল্যাঠা অন্যখানে!’
‘কোথায়?’
‘ছাতা, ভুঁইকেল গাছের কথা তো জীবনে শুনিনি! হতে পারে এটাও সাংকেতিক কিছু৷’ বলেই খানিক আড়খ্যাপা বিজ্ঞানীর মতো আলশের দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বলল, ‘এই বেলো—’
‘কী?’
‘চট করে যা তো, তোর বদ্দিদির কাছে জেনে আয় তো ভুঁইকেল গাছ নামে বাড়িতে কোনো গাছ ছিল বা আছে না কি?’
বলা মাত্র তুড়ড় করে দৌড়োলাম৷ এক দৌড়ে দোতলার হলঘরে৷ সেখানে তখন আড্ডা জমেছে৷ দাদানদা, মোজোদাদু, দাদুতুতু, টোকাটুলি সব্বাই আছে৷ দিদিদি চৌকির উপর বসে৷ ঘাড়টা টুরটুরিয়ে নড়ছে৷ দৌড়ে গিয়ে পড়তেই দিদিদি হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘আরে এসো এসো নটি৷ বাবাকে পেলে?’
বললাম, ‘হ্যাঁ৷ দেড়তলায় ছিল৷ বাক্স ঘাঁটছিল৷ ওসব এখন বাদ দাও৷ তাড়াতাড়ি বলো তো, ভুঁইকেল গাছ কোথায় আছে?’
দিদিদি হাসতে হাসতে বিষম খেলো৷ তারপর বলল, ‘কিন্তু নটি, আমি যদ্দূর জানি ও নামে তো কোনো গাছ হয় না৷’
দাদানদা হঠাৎ অঙ্কস্যারের মতো গম্ভীরভাবে বলল, ‘তুমি কার কাছে ওই নাম শুনলে?’
বললাম, ‘পরে বলব৷’
এরই মাঝে হঠাৎ টোকাটুলি বলে উঠল, ‘কী রে দিদি! ভুলে গেলি! আরে, পুকুরপাড়ের সেই বাজপড়া ভুয়ো নারকেল গাছটাকে বাবা ভুঁইকেল বলত, মনে নেই? কী রে দাদা?’
শেষ প্রশ্নটা ছিল দাদানদার জন্যে৷ দাদানদা রয়ে-সয়ে কী উত্তর দিল সেটা জানার মতো সময় আমার নেই৷ গাছটার কথা জানা হয়ে গেছে, কাজেই আমি বোঁওও করে ফের ছুটলাম বাবার কাছে৷
বাবাকে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে উগরে দিতেই বাবা বলল, ‘চল’৷
দু-জনে মিলে চললাম বাগান পেরিয়ে৷ বাবার হাতে একটা খন্তা, নাকি শাবল! খড়ির ঘর থেকে জুটিয়েছে৷ কী পাওয়া যাবে সে নিয়ে উত্তেজনায় আমার বুকে ধাপধুপ হচ্ছে৷ আবার বেড়ে মজাও লাগছে৷ বাগান পেরিয়ে ওপাশে যাওয়া আমার মানা৷ তা বলে আসি না যে তা নয়, তবু নজর এড়িয়ে আসা আর বাবার সাথে বীরের মতো গুপ্তধন খুঁজতে আসার মধ্যে বিস্তর ফারাক৷ তিড়িং তিড়িং করে নাচতে নাচতে চললাম৷ খালি হাতে গুপ্তধন খুঁজতে আসাটা খারাপ দেখায় বলে একটা কঞ্চি এনেছি৷ সে দিয়েই পুকুরপাড়ের জঙ্গলের মুণ্ডচ্ছেদ করতে করতে এগোলাম৷ অন্য সময় হলে হয়তো বাবা ঠিক কিছু বলত, কিন্তু এখন কোনো কথা না বলে সোজা চলল৷
পুকুরের শেষ৷ এখানেই সার সার সুপুরির গাছ৷
বাবা দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখে বলল, ‘দেখছিস বেলো, বাড়ি থেকে ঠিক মালুম হয় না, এখানটায় পুরো পুকুরপাড়টাজুড়ে ঠিক তিনটে নারকেল গাছ৷ তার মধ্যে...ওই যে একদম লাস্টের গাছটা দেখ বাজে জ্বলা৷ তার মানে, ওইটাই ভুঁইকেলের গাছ৷ চল দেখি৷’
এগোতে গিয়েই মায়ের গলা কানে এলো, আমায় জঙ্গলে দেখে ডাকছে৷ বাবাকে বললাম, ‘মা ডাকছে৷’
‘উত্তর দিস না৷ মিশনটা বিগড়ে যাবে৷ শুনিসনি-শুনিসনি ভাব করে চলে আয়৷’
‘কিন্তু বাবা! পরে যে ঠ্যাঙানি খেতে হবে!’
‘সে নয় একটু খাবি৷ গুপ্তধন খুঁজতে গিয়ে কতজনকে কত কিছু হারাতে হয় আর সামান্য ঠ্যাঙানি খেতে পারবি না? তুই কি আমার সেই ছেলে?’
বাবার কথায় বুকে কী যেন একটা হল! হাতের কঞ্চিটা দিয়ে গাছের গুঁড়িতে দড়াম করে একটা ঘা বসিয়ে ধাঁই ধাঁই করে হাঁটা লাগালাম ভুঁইকেল গাছের দিকে৷
গাছটা প্রায় সীমানায়৷ আশপাশে দেদার ঝোপজঙ্গল আর তেমনি মশা! মুহূর্তের মধ্যে পায়ে একেবারে জঙ্গী হামলা চালাল! উফ!
বাবার মশার কামড়ে কোনো নজর নেই৷ স্পষ্ট দেখছি চিবুকের পাশে এক ব্যাটা মশা রক্ত চুষে একেবারে টোমলা হয়ে আছে, কিন্তু কোনো যেন সাড় নেই বাবার! গাছটার গোড়ায় একবার চারপাশে নজর বুলিয়ে বললে, ‘এখান থেকে অগ্নিকোণে পাঁচ পা... মানে পুব আর দক্ষিণের মাঝ বরাবর... এই বেলো এদিকে আয় তো!’
‘বলো!’
‘এখান থেকে পা গুনে গুনে ঠিক পাঁচ পা যা তো... ঠিক ওই বাবলা গাছটার দিকে!
‘এক... দুই... তিন... চার... পাঁআআ... উফ! উরিবাবা!’
‘কী হল রে!’
‘আর কী হল! পাঁচ গুনতে না গুনতেই কীসে একটা ঠোক্কর খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম! বাবা এসে তুলে দিয়ে হাঁটুটা ঝেড়ে দিল৷ তারপর নীচের দিকে তাকিয়ে হাতের খন্তাটা দিয়ে কী একটা ঘষঘষ করে ঘষেই ভাইকিংদের মতো চেঁচিয়ে উঠল, ‘ও হো হো!’
কী রে বাবা! খেপে গেল কেন?
‘হুঁ হুঁ বাবা! তবে?’ বলেই এবার যে ভঙ্গিটা করল আমি নিশ্চিত সেটা পুরো আর্কিমিডিসের কপি! ‘এই দেখ বেলো, এই সেই স্থান৷ লম্বালম্বি ইট পুঁতে তোর দাদানদার মার্ক! যে ইটে তুই হোঁচট খেয়েছিস, ভালো করে দেখ সেখানে কুঁদে কুঁদে ‘গিশিগাং’ লেখা! দাঁড়া, আর সময় নষ্ট না করে কাজে লাগি৷’
এই না বলে সেই শাবল, নাকি খন্তা দিয়ে হাঁইহাঁই করে গর্ত খুঁড়তে লেগে গেল৷ খোঁড়ে আর গায়—
চল কোদাল চালাই... ধপ... ভুলে রোগের বালাই... ধপ...
এমনিই ধপধপানি চলতে চলতে একসময় শব্দ পেলাম—ঠং! বাবা দেখি চোখ নাচিয়ে আমায় ডাকছে! আরিব্বাস! গুপ্তধন! বাবা এবার থেবড়ে বসল মাটিতে!
এঃ! মা দেখলে যা দেবে না! পাজামা পড়েই হামু খেয়ে পড়ল গর্তে, তারপর দু-হাতে মাটি সরিয়ে সরিয়ে আলগোছে বার করে আনল একটা মাটিমাখা কালচে বাক্স! বলল, এটা না কি অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস৷ এতে না কি আগে বইপত্তর রাখা হত৷ বাবারও ছিল৷
সুটকেসের ডালা খুলে পাওয়া গেল আরও একটা বাক্স৷ সেটাও আগেরটারই মতো, তবে ছোটো৷ তার ভিতরে রাজ্যের কাগজপত্তর, একটা ছবির বই আর লাল কাপড়ে মোড়া লম্বা মতো কী যেন একটা! ওটা কী, সেই কথাটা বাবাকে জিজ্ঞেস করতে যাব, এমন সময়—
‘কী! গুপ্তধন মিলল?’
আরি! দাদানদা! কখন এলো বুঝতেই পারিনি!
দাদানদার আঙুল ধরে লাফাতে লাফাতে বলতে থাকলাম, ‘দাদানদা তোমার লুকোনো জিনিস পেয়ে গেলাম, পেয়ে গেলাম...’
দাদানদার মুখ ভর্তি হাসি৷ বাবাকে বলল, ‘কই ওটাও এবার খুলে দেখো!’
বাবা মোড়কটা খুলতেই বেরোল তিরের মতো সোনালি ক্লিপের কালো একটা কলম! বাবা বলল ‘ফাউন্টেন পেন?’
দাদানদা বলল, ‘পার্কার৷ বাপির কলম৷ মেজো অঙ্কে ভালো করায় বাপি দিয়েছিল৷ আমিও প্রতিবার ভূগোলে ভালো করতাম! তবু ওই পেল! হিংসে হয় না? আজ যখন বাবু দোতলায় গিয়ে ভুঁইকেলের খোঁজ করল, তারপর তোমাদের খুঁজতে দেড়তলায় গিয়ে খাটের উপরে বাঁধানো খাতাটা পেলাম, অমনি সব পুরোনো কথা মনে পড়ে গেল! জানো, ভরদুপুরে একা একা এসে সেই যে লুকিয়েছিলাম তারপর আর আসা হয়নি! কবে যেন ভুলেই গেছি!’ তারপর কলমটার দিকে চেয়ে খানিক চুপ থেকে দাদানদা ফের বললে, ‘যাই হোক, সবই তো জানলে৷ যা জানলে তা আর সবাইকেও তো জানাতে হবে! যার কলম তাকে তো ফেরত দিতেও হবে! কাজেই উঠে পাজামাটা ঝেড়েঝুড়ে নাও৷ তারপর চলো৷’
দাদানদার আঙুল ধরে আমি৷ আমার পিছনে সুটকেস ধরে বাবা৷ পাজামার পাশ থেকে মরা ঘাস না কী একটা শুকনো লতা ঝুলছে, দু-হাঁটুতে ধুলোর কালো ছাপ! যা বকা খাবে না! হি-হি!
ফরোয়ার্ড মার্চ করতে করতে এসে ঢুকলাম ঘরে৷ ঘরে ঢুকেই সব্বাইকে হাঁকড়ে হাঁকড়ে ডাকলাম৷ সবাই এসে হামলে পড়ল বাক্সটায়৷ বদ্দিদি হাসতে হাসতে বলল, ‘যেমন শ্বশুর তেমনি তার জামাই!’
‘ও! আর আমি বুঝি কিচ্ছু না!’
‘আরে তুমিই তো সব৷ তুমিই তো আমাদের ক্যাপ্টেন স্কট!’ বলেই মোজো আমার পেটে একটা আদরের ঘুঁসো ঝেড়ে দিল৷
দাদানদা মোজোদাদুর হাতে কলমটা দিয়ে বলল, ‘নে মোজো তোর জিনিস ফেরত নে৷’
মোজোদাদু বলল, ‘খেপেছিস? আরে দাদা, তুই লুকিয়েছিলে বলেই না আজ অ্যাদ্দিন পর সেই সুখটা ফেরত এলো৷ নইলে তো আমি কবেই ভুলেগুলে খেয়েছিলাম৷ ও জিনিসের হকদার তুই-ই৷ ও তোর কাছেই থাক৷’
দাদানদা বলল, ‘না রে! ও তো আমার নয়! যে ভুলটা না বুঝে ছেলেবেলায় করেছিলাম, ঈশ্বর যখন তা বুড়োবেলায় শোধরানোর সুযোগ দিয়েইছে, সে সুযোগ কেড়ে নিসনি ভাই!’
‘আরে বল্লাম না ও কলম তুই-ই রাখ!’ মোজো কপাল কুঁচকে বলে উঠল৷
আমি একটা কথা বলব, ভাই? ঘাড় নাড়তে নাড়তে বদ্দিদি বলে উঠল৷
সবাই তাকাল বদ্দিদির দিকে৷ বদ্দিদি বলল, ‘বলি কী কলমটা বাপির ছবির পাশটায় থাক৷ ফুলদানিটার পাশে একটা কলমদানি রেখে সেখানেই রাখা থাক৷’
সবাই হইহই করে সায় দিল৷
তারপর আর কী? হুলুস্থুলু! মামাবাড়িতে নতুন কিছু হলেই যেমন হয়!
অবশ্য তারপরের ধাপটা হল গ্র্যান্ড! পোলাও আর লাল ডিম! আর দাদানদার বাঁধানো খাতা আবিষ্কারের জন্যে দাদানদার তরফ থেকে এবেলার মতো পেল্লাই সাইজের ছানাবড়া! খাবার টেবিলে গপ্প উঠল দাদানদাদের ছোটোবেলার৷ উরিব্বাবা! সে যা হাসির শব্দ না, সে শুনলে তোমাদের কানে তালা লাগবেই লাগবে৷ আর সে আসরে যা যা শুনলাম সে বলতে গেলে নির্ঘাত দিন কাবার হয়ে যাবে৷ কাজেই সে গপ্প অন্য সময়ের জন্যে তাকে তোলা থাক৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন