শাশ্বত কর

ঘুটঘুটে রাত্তির! চারদিকে চাপচাপ অন্ধকার! একে ভরা কৃষ্ণপক্ষ, তার উপর এই গাছে জঙ্গলে ভরা বাগানবাড়ির মতো ফাঁকা রিসর্ট! এমন অন্ধকারে তারাদের থেকে যে অল্প আলোটুকুও আসতে পারে, গাছেরা সব জড়াজড়ি করে তার পথ আটকে দিয়েছে৷ লোকালয় থেকে অনেকটা ভিতরে বলে এখানে কোনোরকম পরিচিত আওয়াজ পাওয়ার সম্ভাবনাই নেই৷ পরিচিত বললাম এইজন্যেই যে, আলো নেভার পর থেকে যে-সমস্ত আওয়াজ এ-পর্যন্ত আমার কানে এসেছে, তার নাইনটি নাইন পয়েন্ট নাইন নাইন পার্সেন্ট আমার অচেনা! অবশ্য পদ্মদার কল্যাণে তার অনেকগুলোই এখন জানা হয়ে গেছে৷
ওই যে মাঝে মাঝে ঝড়ঝড় খড়খড় করে বা কখনো ঝুমঝুমির মতো আওয়াজ আসছে, সেটা শিরীষগাছের৷ এখন মার্চের প্রায় মাঝামাঝি৷ শিরীষগাছের পাতা ঝরে গেছে৷ টিকে আছে শুধু শুকনো লম্বাটে শিমের মতো ফলগুলো! হাওয়ার দোলায় সেগুলোয় দোলা লাগছে, আর অমনি সুন্দর শব্দ হচ্ছে৷ সুন্দর বলছি বটে, তবে প্রথম শুনে আমার খানিক ভয়ই লেগেছিল! মনে হয়েছিল যেন পায়ে নূপুর পরে কতজন ছুটে যাচ্ছে আর ফিরে ফিরে আসছে! পদ্মদা বলছিল, ‘শোন বেলো! যেন অন্ধকারের দেশে নেচে চলেছে অচেনা অজানা কোন অন্ধ দেশের রাজকন্যা! সঙ্গে তার বন্ধুর দল!’ আমি বলেছিলাম, ‘আমার তো শুনে মনে হচ্ছে যেন উইচ হান্টিং-এ নেমে এসেছে কোনো উইচ হান্টারের টিম আর মরিয়া উইচ ঝাঁটায় চেপে গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে দিয়ে উড়ে পালাচ্ছে! তার সরু সরু লম্বা নখআলা আঙুলের ইশারায় সরসর করে শুকনো ডালপালা গজিয়ে উঠছে! তাতে আটকা পড়ছে হান্টারের দল আর অমনি অমানুষিক উল্লাসে চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ করে হেসে উঠছে বিজয়ী উইচ!’
পদ্মদা সেই শুনে বলেছিল, ওই চ্র্যাঁ চ্র্যাঁ আওয়াজ নাকি শকুনের বাচ্চা অথবা বালিহাঁস জাতীয় পাখির বাচ্চাদের শব্দ! পদ্মদা যাই বলুক, এই তুমুল ফাঁকা জায়গায় সেই অমানুষিক আওয়াজে আমার তো মাঝে মাঝেই পিলে চমকে চমকে উঠছে! পদ্মদাও যা বলছে সেও তো অনুমানই রে বাবা! হতেও তো পারে এ কোনো অমানুষিক অশরীরীর আক্রমণে আহত বাচ্চার আর্তনাদ! হয়তো সেই অশরীরী একজন নয়! হয়তো অশরীরীর দল থলিতে বেঁধে বেঁধে নিয়ে এসেছে বাচ্চাদের! আর থলির গিঁট খুলতেই প্রচণ্ড ভয়ে হয়তো শেষ আর্তনাদ করে উঠছে সেই শিশু! হয়তো এর পরেই শিশুর গলার কাছে নেমে আসবে অশরীরীর ধারালো স্বদাঁত! হয়তো...!
এই সাংঘাতিক রকমের ভয়ের ভাবনাচিন্তা ক্রমশ : আমার চারপাশের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলছে! এর উপর আবার মাঝে মাঝে হায়নার পিলে চমকানিয়া হাসি, রাত জাগা পেঁচার চেঁচানি, পেঁচা তাড়া করে যাওয়া শিকারি কুকুরের শ্বাসসর্বস্ব দৌড়, পার্কের লোহার পাইপগুলোর ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের বিচিত্র শব্দ, থেকে থেকে দাঁড়কাকের বেমক্কা ডাক! সব কিছু মিলিয়ে একটা চরম ভৌতিক আবহ তৈরি হয়েছে৷ তার সাথে উপযুক্ত সঙ্গত দিয়েছে এই লম্বা লোডশেডিং!
কাচের জানালা দিয়ে দু-চারবার বাইরে চেয়ে দেখছি৷ জানালার বাইরের উঁচু গাঢ় সবুজ পাহাড়টা এখন পেল্লায় দৈত্যের মতো কালো হয়ে ঝুঁকে আছে! আবছা অন্ধকারে মনে হচ্ছে যেন ওর গা থেকে কীসের বিকিরণ উঠছে কেঁপে কেঁপে! রহস্যে ভরা ওই পাহাড় থেকেও যেন কীসের চিৎকার ভেসে এলো! ভয় পেয়ে পদ্মদার হাতটা ধরতেই পদ্মদা বলে উঠল, ‘ভয় পাস না বেলো৷ পাহাড়ের জঙ্গলে নিশাচররা এখন জেগেছে৷ এই তো তাদের চরার আসল সময়! এসময়ই তো তারা হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়বে শিকারের উপর! তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিকার খতম!’
পদ্মদার বলার ধরনটায় ভয় দেখানোর পুরো কম্পলিট এলিমেন্ট ছিল৷ ভয় পেয়ে বললাম, ‘পদ্মদা! ভয় দেখিয়ো না! বাবাকে বলে দেবো কিন্তু!’
‘ওরে বেলো! বাবাকে পাবি কোথায়? এখানে যে কেউ নেই! শুধু আমি আর তুই! আমি, তুই আর এই নিকষ রাত্রির অতল নৈঃশব্দ্য!’
বলার সাথে সাথে হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ করে তীক্ষ্ণ গলায় ডাকতে ডাকতে একটা পাখি উড়ে গেল৷ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে ‘পদ্মদা’ বলে প্রায় কেঁদে উঠলাম!
পদ্মদা অমনি ফ্যা ফ্যা করে হেসে উঠে আমার বুক-পিঠ থাবড়ে-টাবড়ে বলল, ‘ও বাবা! এই তোর সাহসের দৌড়! ভয় পাস না৷ আমি তো আছি৷ সে আমি মানুষ হই চাই না হই, তোকে তোর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি যখন বাড়িতে ঠিক ফিরিয়ে দেবো!’
‘পদ্মদা!’ রাগের ডাকটাও আমার কেমন যেন আর্তনাদের মতো শোনাল আমার৷ মা-র জন্য মনটা হু হু করতে শুরু করল৷ তবু পদ্মদাকে তো আর সেসব বুঝতে দেওয়া যায় না, কাজেই মুখ গোমড়া করে চুপ করে রইলাম৷
মনে মনে মনকে বললাম, সত্যি তো! এত ভীতু তো তুমি নও হে বেলো! তোমার কাণ্ডিতে বরং আর সবাই ভয় খায়! তবে এখানে এসে এমন করে ভয় পাওয়া কি তোমার সাজে?
সব বোঝালাম, সব বুঝলাম৷ কিন্তু ভয় যায় কই? ‘আচ্ছা, এমন করে ভয় পাচ্ছি কেন বলো তো?’
পদ্মদা বলে উঠল, ‘আরে! বাবা-মাকে ছাড়া প্রথম বেড়াতে এসেছিস৷ ছোটোবেলায় অমনি অমনি সবারই হয়৷ সারাদিন হইচই করে কাটে, তারপর রাত হলেই মায়ের জন্য মন খারাপ হয়৷ আমার তো ফি বছর মামারবাড়ি গিয়ে বাবার জন্য মন খারাপ হত!’
পদ্মদার এই থট রিডিং-এর ক্ষমতাটা আমার জব্বর লাগে৷ ঠিক কীভাবে যেন বুঝে যায় কী ভাবছি! অবশ্য পদ্মদার আরও অনেক গুণ আছে, যেগুলো পুরো তাক লাগিয়ে দেবার মতো! হবেই তো৷ যেমন-তেমন ছেলে তো আর নয়! ইসরোর স্কলার! পদ্মদার সাথে আলাপটাও আমার অদ্ভুতভাবে৷ সে তো আমি আগে এক জায়গায় লিখেওছি৷ সেই যে সেবার আমাদের বাড়ি এলো, তারপর থেকে ছুটিছাটা জুটলেই ফ্লাইট পাকড়ে চলে আসে৷ বলে, ‘আসি কেবল বেলোর জন্য৷ ওর মধ্যে আমার ছোটোবেলাটা খুঁজে পাই!’
আর এবার তো পুরো সারপ্রাইজ! আমার অ্যানুয়াল শেষ হল সাত তারিখ আর আট তারিখ ঘুম থেকে উঠেই দেখি পদ্মদা বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে৷ একদম প্ল্যান করেই এসেছে৷ আট তারিখে এলো, আর ন-তারিখেই ট্রেনে চেপে আমায় নিয়ে চলে এলো পুরুলিয়ার এই নির্জন পাহাড়লগ্ন রিসর্টটায়! মা যে গাঁইগুঁই করেনি তা নয়, তবে পদ্মদার চাপাচাপিতে রাজি হতেই হয়েছে৷ আর বাবা তো রাজিই৷
আমরা হাওড়া স্টেশান থেকে ভোরের ট্রেনে চেপে এসেছি আসানসোল পর্যন্ত৷ তারপর সেখান থেকে রিসর্টের গাড়ি চেপে এখানে৷ গাড়ি চালাচ্ছিল অরূপকাকু৷ এই রিসর্টেরই ড্রাইভার৷ চালাতে চালাতে আমার হাজারো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিল৷ আমি অবশ্য প্রশ্নগুলো করছিলাম পদ্মদাকেই; কিন্তু সে তখন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে, মাঝেমধ্যে একটা আধটা হুঁ-হাঁ করছে! কাজেই অরূপকাকু স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই আমার উত্তরগুলো দিতে থাকে৷ তারপর একে একে লোকালয় ছাড়িয়ে, ধু-ধু মাঠ পেরিয়ে, ধোঁয়া ঢাকা কয়লাখনির এলাকা ছেড়ে আমরা ক্রমশ : ঢুকে পড়লাম লাল পলাশে ঢাকা সরু পাথুরে পথে! রাস্তাটা এখানে ভারী সুন্দর! যেদিকে তাকাই ছোটো-বড়ো টিলা মাথা উঁচু করে রয়েছে৷ আর সেইসব টিলার চারপাশে সার বেঁধে মাথা ভর্তি লাল ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সার সার পলাশ! তাদের পায়ের কাছে ঝরে পলাশে সব কিছু লাল হয়ে আছে৷ অবশ্য শুধু লাল পলাশই নয়, আমি ওই দূরের একটা পাহাড়ের শির ধরে টানা হলুদ পলাশের গাছও দেখেছি৷ সবমিলিয়ে জায়গাটা খুবই সুন্দর, অথচ বেশ শান্ত! বেশ নির্জন!
গাড়িটা রিসর্টে ঢোকার মুখে খানিক দাঁড়িয়েছিল ফটক বন্ধ বলে৷ দারোয়ান ফটক খুলতেই দেখি বাঘের মতো চার-চারটে কেঁদো কুকুর! তাদের লালা ভরা জিভ বেরিয়ে রয়েছে এক বিঘত করে! ওরা নাকি এই রিসর্টের পাহারাদার! পাহারাদার বলে পাহারাদার! পদ্মদা বলল, একটা ডোবারম্যান, একটা ডালমেশিয়ান আর বাকি দুটো অ্যালসেশিয়ান৷ রাত হলে গার্ডরা এদের ছেড়ে দেয়৷ গোটা প্রপার্টিটায় ওরা টহল দিয়ে বেড়ায়৷ খুব ইচ্ছে করছিল ওদের নামগুলো জানতে, কিন্তু অরূপকাকু সাবধান করে দিল৷ ওরা না কি ওই গার্ডদের ছাড়া আর কাউকে চেনে না!
তবে বলতেই হবে, প্রথম দেখেই জায়গাটা আমার খুব ভালো লেগে গেছিল৷ সামনে তাকালেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরো সবুজ একটা পাহাড়! কত উঁচু তার চুড়ো! আমাদের রিসর্টটা হল সেই পাহাড়ের একটা অংশ জুড়ে৷ রিসর্টটায় লোকজন তেমন বড়ো একটা চোখে পড়ল না বটে, কিন্তু যা চোখে পড়ল তাতে আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠল! অনেকটা জায়গাজুড়ে একটা পার্ক! আর কী নেই সেখানে! ফাঁকা ফাঁকা চারখানা সুসজ্জিত দোলনা দুলে দুলে যেন আমায় ডাকছে! ছুটে গিয়ে চড়ে পড়লাম একটায়৷ আঃ! এমন জায়গায় দোলনা দুলে কী মজা! পাহাড়টা যেন আমার সাথে সাথেই নড়াচড়া করছে! যেই না আমি এগোচ্ছি অমনি এগিয়ে আসছে, আবার পরক্ষণেই যেই আমি পিছিয়ে যাচ্ছি অমনি সেও পিছিয়ে যাচ্ছে!
পার্কটাজুড়ে শুধু ফুল আর ফুল! পাড়ার নরেনকাকুর ফুলের বাগান আছে৷ এই বড়ো বড়ো ডালিয়া হয়! কিন্তু নরেনকাকুর বাগানে এত সব ফুল নেই৷ এদের বেশির ভাগেরই নাম আমি জানি না৷ এখানেও অনেক পলাশগাছ৷ তাদের ডাল সব ফুলে ভরে লাল হয়ে আছে৷ লাল মাথার মাঝখান থেকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ টিয়া! একটা-দুটো-তিনটে... আরেব্বাস! এ যে ঝাঁক ঝাঁক টিয়া পাখি! ছুটে যেতেই ফর ফর করে টিয়াগুলো ঝাঁক বেঁধে উড়ে গেল! দৌড়োলাম পিছনে৷ পদ্মদার ডাক শুনলাম, ‘বেলো একা একা যাস না! দাঁড়া৷ আমিও যাব!’ শুনেই অ্যাবাউট টার্ন নিয়ে দৌড়োলাম পদ্মদার কাছে৷
পদ্মদা মালপত্র ঘরে রেখে নেমে এসেছে৷ আমাদের ঘরটা দোতলায়৷ ঘরের ঠিক বাইরেই, বাঁ-দিকটায় একটা পলাশ রাঙা হয়ে আছে৷ আর দিকে একটা শিরীষগাছ৷ আমাদের ওই বিল্ডিংটা থেকেই রিসর্টের থাকার জায়গা শুরু বলা যায়৷ তারপর কেয়ারি করা রাস্তার দু-ধারে শুধু বড়ো বড়ো গাছ! পদ্মদা বলল, এমন পথকে বলে বীথি৷ গাছগুলোর মধ্যে বেঁটে বেঁটে আমগাছও আছে৷ ঝেড়ে মুকুল এসেছে সেগুলোয়৷ মুকুলের গন্ধে ম-ম করছে চারদিক৷ আমি গাছ অনেক দেখেছি৷ দাদানদার বাড়ি ভর্তিই তো শুধু গাছ আর গাছ৷ কিন্তু এমন নির্জনে গাছগুলো যেন একদম অন্যরকম লাগছে! যেন মনে হচ্ছে এটা আসলে ওদেরই এলাকা৷ আমরা যেন ওদের এলাকায় হঠাৎ করে ঢুকে আসা কেউ৷
পদ্মদাকে পার্কটা দেখালাম৷ বলল, ‘একটু ঘুরে নিই, ফেরার সময় নয় পার্কে কাটাব৷’
পার্কটাকে ডানদিকে রেখে আরও একটু এগোলে ডানপাশে সার সার টেন্ট৷ সামনে ইজি চেয়ার পাতা৷ কোনো কোনো টেন্টে মনে হল লোক আছে৷ চার-পাঁচজন বাচ্চাকেও দেখলাম সামনে খেলে বেড়াচ্ছে৷
আমাদের রাস্তার বাঁ-পাশে হঠাৎ করে এবার এসে গেল একটা গ্রাম! সত্যিই সার সার মাটির ঘর, তুলসী মঞ্চ—একদম গ্রাম৷ পদ্মদা বলল, ‘এই গ্রামটাও বানানো৷ দেখছিস না, সব-কটা হাট কেমন এয়ার কন্ডিশন্ড!’
সেই বানানো গ্রামের ভিতরের পথ দিয়ে ডাইনিং হল যেতে হয়৷ আর ডাইনিং পেরিয়ে যেতে হয় পুকুরে৷ পুকুরে তখন ছিপ ফেলে মাছ ধরছেন দাদানদার মতো বয়সের একজন৷ টকটক করছে তার গায়ের রং! পদ্মদা বলল, ‘কাল ব্রেকফাস্ট সেরে আমি আর তুই ওখানে ফিশিং করব!’
‘আরে ফিশিং তো আমার প্রিয়! আমি এই ব্যাপারটায় মাহির!’
‘তাই না কি! কোথায় ধরেছিস মাছ?’
‘ধরিনি, কিন্তু জানি কীভাবে ধরে! অনেকবার টিভিতে দেখেছি৷’ কথাটা বলেই আমার একটা সম্ভাবনা মনে হল, ‘আচ্ছা পদ্মদা! এই পুকুরটায় জল আসে তো ওই পাহাড় থেকে, তাই না?’
‘বোধ হয় তাই৷ বৃষ্টির জল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এসে জমা হয় বোধ হয় পুকুরটায়৷’
‘তাহলে তো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেক কেমিক্যাল এই জলে মিশতে পারে৷ হতেও পারে সেই কেমিক্যালে এখানকার মাছের মিউটেশান হয়ে গেছে৷ হতেও পারে ওরা এখন মনস্টার ফিশ! কেউ নামলেই সঙ্গে সঙ্গে চুষে নেবে তার রক্ত, অথবা বুঝতেও পারবে না কখন কুচ করে কেটে নিয়ে গেছে তার পা!’
ভুক ভুক করে খানিক হেসে নিয়ে পদ্মদা বলল, ‘এই গ্যাঁজাগুলো তোর মাথায় আসে কী করে? এইটুকু ছেলে, মিউটেশানের নাম জানলি কোত্থেকে?’
‘আরে রিভার মনস্টার দেখো না অ্যানিমাল প্ল্যানেটে? কত তো এরকম ঘটনা ঘটে৷ অ্যামাজনে, অ্যারিজোনায়, চেরনোবিলে, সুমাত্রায় কত তো এরকম মনস্টার ফিশ আছে রিভারে!’
‘আরিব্বাস! এ তো গোটা দুনিয়ার সফর করে গেলি রে! বেশ! কালকে তো ধরছিই৷ দেখাই যাবে তেলাপিয়া মিউটেশনের ফলে পিরানহা-টিরানহা হয়ে গেল কি না!’
‘হলে কিন্তু বেশ হয় বলো!’
এইসব বলতে বলতে গোটা রিসর্টটা ঘণ্টাখানেক ধরে জরিপ করে অনেকগুলো লাল হলুদ পলাশ, রুদ্রপলাশ কুড়িয়ে, টোপা কুলে পকেট ভর্তি করে আমরা এসে উঠলাম ডাইনিং-এ৷ আদ্ধেক আদ্ধেক গন্ধরাজ লেবু চটকে মুগ ডাল দিয়ে গরম ভাত! ডালের উপর ঝিরিঝিরি আলুভাজা৷ ডুমো ডুমো ফুলকপির ঝোল আর চিকেন কারি৷ শেষে দুটো রসগোল্লা৷ এইসব দিয়ে লাঞ্চ সেরে ঘরে ফিরেই পদ্মদা দিল টানা ঘুম, আর আমি কুড়িয়ে আনা একটা লাঠির ডাল নিয়ে ব্যালকনিতে খেলতে শুরু করলাম৷
সন্ধ্যেবেলাটাও খুব সুন্দর ছিল৷ সানসেট যে এত সুন্দর হতে পারে ভাবিনি! আমার ফুটবলের ব্লাডারের মতো পুরো অরেঞ্জ হয়ে গেল সূর্যটা, তারপর যত নামে তত লাল হয়! নামতে নামতে একসময় টুক করে ডুবে গেল সবুজ পাহাড়ের ঘাড়ের পিছনে! ঠিক তক্ষুনি চোখে পড়ল সবুজ পাহাড়টা কেমন যেন কালচে হয়ে গেছে! আর কোত্থেকে যেন রাজ্যের ধোঁয়া এসে জড়িয়ে ধরেছে ওকে! ঠিক তক্ষুনি আমার মায়ের মুখটা ভেসে উঠল মনে৷ মা-র জন্যে খুব মন কেমন করে উঠল৷ আর পাহাড়টাকে মনে হতে লাগল ভূতুড়ে কাণ্ডের আখড়া!
তবু ঘরে ফিরে টিভি-ঠিভি দেখে একরকম লাগছিল৷ এখানে মোবাইলে না কি সিগন্যাল মেলে না, পদ্মদা বলছিল৷ যাই হোক, বাড়ির সাথে কথা না হলেও গরম গরম পনির পকোড়া আর চিকেন পকোড়ার স্বাদ সন্ধ্যেটা ভালো করে দিয়েছিল৷ আর সাথে ছিল পদ্মদার কাছ থেকে মহাকাশের নানান কথা৷ ও, এখানে আকাশ এত পরিষ্কার যে পদ্মদা আমাকে অনেকগুলো তারা চিনিয়ে দিল আর অনেকগুলো কনস্টিলেশানও!
ডিনারটাও যাকে বলে ছিল একেবারে জম্পেশ৷ লাঞ্চের মতোই ঝিরিঝিরি আলুভাজা, ডাল তো ছিলই৷ আর ছিল ওমলেট আর চিকেন! পদ্মদা পেটুক মানুষ৷ কাজেই ও তো খুব খুশিই৷ আমারও ভালোই লাগছিল তবে কী যেন একটা নেই নেই মনে হচ্ছিল খালি খালি৷ আসলে এখানে সব কিছুই কেমন যেন ভীষণ রকমের চুপ! আর আমি হলাম গিয়ে হইচই করা বেলো৷ বাবা বলে হুপো বেলো৷ এমন চুপচাপ আমার আর কত ভালো লাগবে, বলো!
ডাইনিং হল থেকে ফেরার সময় অল্প আলোয় রহস্যময়ী সেই বীথিতে পদ্মদা বলল, ‘প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যা বেলো৷ এখানে দেখ সব কিছুই নেচার৷ এই গাছ, ওই ঝিঝি পোকার একটানা সুর, শেয়ালের ডাক, রাতচরার ডানা ঝাপটানো সব নেচারের আপন সম্পদ! সুযোগ পেয়েছিস যখন, শুধু সেই সম্পদ দেখে যা! চোখ ভরে দেখ, কান ভরে শোন আর প্রাণ ভরে শ্বাস নে!’
এই আবছা আলোয় পদ্মদাকে বেশ ভালো লাগছে৷ বড়ো হয়ে আমিও এরকম হব৷ শুধু জানব, শুনব আর আনন্দে ঘুরে বেড়াব৷ তবে একা একা না বাবা! মাকে নিয়ে নেব৷
ঘরে এসে ঢোকার পর থেকে লোডশেডিং! সেই যে গেল, আর এলো না! আড়াই ঘণ্টা হয়ে গেল! আমরা দু-জন ব্যালকনিতে বসে আছি চেয়ারে৷ হাওয়ায় কেমন শীত শীত ভাব! বাঁচোয়া একটাই, এখানে একটাও মশা নেই৷ এই যদি আমাদের কলকাতা হত, ভাবো তাহলে এতক্ষণ পায়ে, গায়ে চাকা চাকা গোল গোল ফুলে যেত, তাছাড়া কানের ভিতর পুনপুনানি নাকের ভিতর আচমকা সুড়সুড়ানি তো আছেই! বাপরে বাপ! মশার মতো জ্বালাময়ী পতঙ্গ বোধ হয় আর একটাও জগতে নেই!
কাজ নেই, কাজেই মশা নিয়েই পদ্মদার সাথে গপ্প শুরু করলাম৷ পদ্মদা যে কত কী জানে! কোন মশা কেমন দেখতে, কার কামড় কেমন, কে কামড়ালে কতটা ভোগান্তি সব বলতে শুরু করল৷ তারপর বলতে থাকল আফ্রিকান আদিবাসীদের মশার লার্ভা থেকে কুকি তৈরি করার গল্প৷ ওরা নাকি মশার লার্ভা থেকে এক রকমের কুকি বানায়, যা কি না ওদের প্রোটিনের ঘাটতি মেটায়! ভাবা যায়!
এইসব মশাচর্চা চলছে এমন সময় হঠাৎ করে কী যেন একটা হুউউসস করে দৌড়ে গেল আমাদের ব্যালকনির নীচ দিয়ে! যেন একটা অন্ধকার জড়ানো দমকা হাওয়া! পদ্মদাকে বলতে যাব, দেখি পদ্মদা নিজেই কপাল কুঁচকে দেখছে! বলল, ‘দেখেছি৷ কী গেল বুঝতে পারলাম না! মানুষের মতোই তো মনে হল!’ তারপর খানিক এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে বলল, ‘আশ্চর্য! কুকুরগুলো তো ছাড়াই! কিন্তু কই একটা আওয়াজও তো করল না!’
‘পদ্মদা! চলো ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়ি৷’
‘কথাটা খানিক আগেও যদি বলতিস, ভাবা যেত৷ এখন তো আর তা হয় না বেলো৷ অমন উড়ন্ত না কি ছুটন্ত বস্তুটি আদতে কী, সে না জানলে তো আর আমার শোয়া হবে না!’
‘বাদ দাও না৷ আমাদের কী?’
‘ও মাই লিটিল এসকেপিস্ট, সমাজে এর থেকে দায় এড়ানো কথা আর হয় না৷ বাদ দেওয়া যদি একবার মজ্জায় ঢুকে যায়, অনেক অদ্ভুত সুন্দরের দেখা পাওয়ার রাস্তা কিন্তু পুরোপুরি আটকে যাবে৷ তুই তো তেমন ছেলে নস বেলো! তাছাড়া আমি আছি তো! ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি যে তাইকুন্ডোর সেনসেই, সে খবর জানিস?’
‘না জানি না পদ্মদা! আর তাছাড়া, হলেও বা, ভূতের সাথে তোমার তাইকুন্ডো কোন কাজে লাগবে বলো তো?’
‘ভূতই যে, তুই এত নিশ্চিত হচ্ছিস কী করে?’
‘ভূত না হলে এমন ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে কে আর অমন করে আসবে? ও পদ্মদা! চলো না, ভিতরে চলো!’
‘চল’
ভিতরে এসেই পদ্মদা হ্যাঙার থেকে ট্র্যাকস্যুটটা নামিয়ে পরতে শুরু করল৷
‘ও পদ্মদা! এটা পড়ছ কেন? কোথায় যাবে?’
‘নীচে নেমে ব্যাপারটা দেখতে হবে৷’
‘কী যা তা বলছ?’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, ‘আমি কী করে একা একা থাকব ঘরে?’
‘পারবি না তো তুইও চল আমার সাথে৷ ভূত দেখতে পাস চাই না পাস, এমন নিরালায় ওই পাহাড়টাকে উপভোগ করতে পারবি৷ ঘরের কোনায় এমন অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে ক-জন পারে বল তো?’
‘থাক না! সকাল হলে না হয়...’
দেখলাম আমার কথায় কর্ণপাতও করছে না পদ্মদা৷ প্রায় তৈরিই হয়ে গেছে৷ কাজেই আমাকেও ট্র্যাকস্যুটটা পরতে হল৷ বেরোতেই হবে যখন একটা অস্ত্র থাকুক হাতে এই ভেবে বিকেলে আনা সেই গাছের ডালটা হাতে নিলাম৷ পদ্মদা সেই দেখে মুচকি হাসল৷ তারপর টেবিল থেকে দরজা খোলার কার্ডটা পকেটে ঢুকিয়ে নিল৷ দরজা বন্ধ করে আমরা বেরিয়ে এলাম করিডোরে৷
এমনিই দোতলায় আর কোনো ঘরে লোক নেই৷ নীচের রিসেপশানও শুনশান! দরজা বন্ধ করার সেই সামান্য শব্দ যেন প্রতিধ্বনি করে উঠল গোটা বাড়িতে! আমার বুকের ভিতরেও সেই শব্দের রেশ ঢেউ তুলে দিল৷ পদ্মদার হাতটা চেপে ধরলাম৷
গোটা করিডোরটা মনে হচ্ছে অন্ধপুরীর মায়াপথ! একটা আলোও জ্বলছে না! মোবাইলের টর্চ জ্বালল পদ্মদা৷ অন্ধকার ছিঁড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল সাদা আলো৷ আস্তে আস্তে নেমে এলাম আমরা৷
নীচেও কেউ নেই৷ রিসেপশান ডেস্ক লাগোয়াই ম্যানেজারের ঘর৷ ভিতর থেকে বন্ধ৷ পদ্মদাকে ইশারায় বললাম ম্যানেজারকে ডাকতে৷ মাথা নাড়ল৷
সিঁড়ি পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে মাটিতে নামলাম৷ বেশ ঠান্ডা এখন চারপাশ৷ ব্যালকনি থেকে যেদিকটায় সেই ছুটে যাওয়া দেখেছিলাম, সেদিকে বেশ কিছু গাছ জড়ো হয়ে আছে৷ সেদিকে এগোতে এগোতেই মোবাইলের টর্চটা সামনের দিকে ফেলল পদ্মদা! যা দেখলাম তাতে ভয়ে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো! চোখের সামনে সব কিছু দুলে উঠল! মা বলে চিৎকার করতে গিয়েও গলা থেকে একটুও আওয়াজ বেরোলো না!
আমাদের চোখের সামনে সেই গাছের গুঁড়ির ভিড়ে কালো কাপড়ে সর্বাঙ্গ ঢাকা কতগুলো ছায়ামূর্তি ঝুঁকে পড়ে কী যেন খাচ্ছে! হাতে তাদের কী এক পোঁটলা! সেই পোঁটলা থেকে কেবল খেয়েই চলেছে! আলো দেখে খটাশ করে কী যেন পোঁটলা থেকে মাটিতে পড়ে গেল! অমনি মাটি থেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেয়ে নিল! আমাদের টর্চের যতটুকু আলো ওদের কাছে পৌঁছেছে, সেই আবছা আলোয় তাদের ঘোমটা ঢাকা মুখে কেবল ঠোঁটটুকু ঠাহর হচ্ছে! আর সেই ঠোঁটের চারপাশে ভেজা ভেজা কীসব যেন লেগে আছে! কী অমানুষিক কাণ্ড!
পদ্মদাও থমকে দাঁড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরেছে! তবে সাহস বটে পদ্মদার! গলা খাঁকরে মুহূর্তের মধ্যে ছায়ামূর্তিগুলোকে প্রশ্ন করে বসেছে, ‘কে তোমরা? এত রাতে এখানে কী করছ?’
পদ্মদার কথা শুনে ছায়ামূর্তিগুলো উঠে দাঁড়িয়েছে৷ একজন আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে! বাকিরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দুলছে! সামনে-পিছনে অদ্ভুত ছন্দে তাদের দুলুনি! আমার হাত-পা সব কাঠ হয়ে গেছে! হয়তো আর কিছুক্ষণ, তারপরেই ওই ছায়ামূর্তিদের হাতে ধরা পড়ে যাব আমরা! আর হয়তো যাওয়া হবে না আমার সাধের কলকাতার বাড়িতে! মায়ের কাছে যাওয়া হবে না! মা, মাগো! কেন যে তোমায় ফেলে এলাম এখানে! মা! মাগো! চোখ বন্ধ করে ফেললাম!
‘বাবু গো!’
ওরে বাবা! সেই অশরীরী আমাদের সামনে এসে কথা বলছে! কিন্তু বাবু বলছে কেন?
‘বাবু গো! এরা সবাই এই গাঁয়েরই সব লোকজন গো বাবু!’
পদ্মদা বলল, ‘তবে এত রাতে এখানে কেন?’
‘দুটি খেতে গো বাবু! এখানে যে বড়ো অভাব! আপনারা বেড়াতে এয়ে তার কিচ্ছুটি টের পাবেন না! ওই গেটের বাইরে যে গাঁ, সেখানেই এদের বাস৷ এই পাহাড়, এই জঙ্গল—এই এদের রুটি রুজি গো বাবু! জঙ্গল কেটে সব হোটেল হয়ে গেল, যেইটুকু বন আর টিকে থাকল, তাতে যে আর চলে না! পেট ভরা খিদে নিয়ে সারাদিন এরা ঘুরে বেড়ায় বনে বনে৷ কোনোদিন কন্দ, ফল, শজারু মিললেও এক-এক দিন কিচ্ছুটি মেলে না গো বাবু! রাতেরবেলা তাই মাঝে মাঝে এদের ডাকি গো বাবু৷ কত খাবার বলেন নষ্ট হয় হোটেলে! ভুখা পেট মানুষগুলোকে একটু খাইয়ে দিই৷’
‘তুমি কে?’ পদ্মদা জিজ্ঞেস করল৷
‘বাবু আমি ওই বাগানের মালি৷ আমিও ওদের একজন৷ কিন্তু এখানে চাকরি করি বলে কুকুরগুলো আমায় চেনে৷ আমি ওদেরও চিনিয়ে দিয়েছি৷ কুকুররা তাই কিচ্ছু বলে না! এরা কিচ্ছু করে না বাবু! আসে, খায়, চলে যায়৷ সবাই জানে বাবু৷ দারোয়ান, সিকুরিটি সবাই জানে৷ সবাই তো এখানকারই মানুষ, তাই কেউ কিচ্ছু বলে না৷ আপনি বাবু দয়া করে ম্যানজারবাবুকে বলবেন না!’
‘বলব না!’
আমি এতক্ষণে বুঝে গেছি এরা কেউ ভূত নয়৷ পদ্মদাকে ডেকে বললাম, ‘ও পদ্মদা! ঘরে চারটে আপেল আর কেক আছে তো! ওদের এনে দেবে?’
পদ্মদা বলল, ‘যা৷ তুই-ই নিয়ে আয়৷’
সত্যি বলছি, আর একটুও ভয় করল না আমার৷ মোবাইলের টর্চটা নিয়ে ঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আপেল আর কেক এনে দিলাম পদ্মদার কাছে৷
পদ্মদা বলল, ‘তুই-ই দিয়ে দে৷’
আমি মালির কাছে গিয়ে ওকে দিতেই সে বলে উঠল, ‘কাল সকালবেলা আপনারা দু-জন আসবেন বাবু৷ আমি আপনাদের উই পাহাড়ে নিয়ে যাব৷’
‘কিন্তু সেখানে যে হায়না আছে শুনলাম!’ আমি বললাম৷
‘সে তো অন্যদের জন্যে খোকাবাবু৷ তোমাদের জন্য তো আমি থাকব৷ হায়না আর আসবে কোত্থেকে? উই পাহাড়ে তোমাদের-আমাদের দেবতার থান দেখাব৷ বড়ো পাথরের থান দেখাব৷ দেখবে কেমন গাছের লতায় এই এত বড়ো পাথরটা আটকে আছে! তারপর কেন্দুগাছ দেখাব, গোবোইরার গাছ দেখাব, টিয়ার ঝাঁকের বিল দেখাব৷ উঠতে উঠতে হাঁফিয়ে গেলে তুমি পাথরে বসে নেবে৷ পাহাড়ের হাওয়া এসে তোমার ঘাম মুছিয়ে যাবে৷’
‘সে তো হবে’, পদ্মদা বলল, ‘কিন্তু সকালে তোমাকে চিনব কেমন করে?’
‘আমি তো চিনে নিব তুমাদের৷ আর যদি আমায় খুঁজতে চাও, তাইলে উই পার্কের বাগানের কাছে দেখবে৷’
‘তোমার নাম কি?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম৷
‘নবু৷ তবে আমাকে এখানে সবাই বলে বড়োবাবু৷’
‘বেশ, বড়োবাবু! তা-লে সেরকমই কথা রইল৷ কাল সকালে আমরা যাব সবুজ পাহাড়ে!’ পদ্মদা বড়োবাবুকে কথাটা বলেই আমার দিকে ফিরে বলল, ‘কেমন বেলো?’
আমি আর কী বলি! এর চেয়ে আনন্দের কিছু কি আর হয়?
বড়োবাবুকে ‘গুড নাইট’ বলে যেই না আমরা উপরে ঘরে এসে ঢুকলাম অমনি লাইটও এসে গেল! ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই পদ্মদা বলল, ‘এমন জায়গায় লোডশেডিংটাই বেশি মানায়৷ না রে বেলো?’
এল.ই.ডি.র আলোয় প্রায় ঝলমল করা বাইরেটা দেখে নিয়ে বললাম, ‘একদম ঠিক বলেছ!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন