শাশ্বত কর

পাঁচিলের উপর বেড়ালটা অনেকক্ষণ ধরে থাবা চাটছে! কী খেয়েছে কে জানে? যাই খাক, নির্ঘাত সাংঘাতিক রকমের টেস্টি কিছু!
আচ্ছা বেড়ালের কাছে টেস্টি কি হতে পারে? মাছ? যদি বা হয়, তাহলে কি মাছ? আর প্রিপারেশানটাই বা কীসের?
যে রেটে বৃষ্টি হচ্ছে ক-দিন যাবৎ, আর বাড়িতে যে রেটে ইলিশ ঢুকছে—সেই অনুষঙ্গ খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলে অবশ্য বেড়ালটা ইলিশ খেয়েছে বলেই বোধ হয়৷ কিন্তু পর্যবেক্ষণকেও তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না, বরং সেইটেই তো অগ্রগণ্য! ফেলুদা থেকে শার্লক হোমস সব্বাই অবজার্ভেশানের উপর জোর দিয়েছেন৷ আর এখানে আমার অবজার্ভেশান বলছে—না! বেড়ালটা ইলিশ মাছ খায়নি৷ ইলিশ খেলে তো নিশ্চয়ই ঝোলের বাটিতে মুখ ডুবিয়ে খেয়েছে, তবে খামোখা থাবা চাটবে কেন?
অবশ্য হতেও পারে সে ব্যাটা বাটি উলটে খেয়েছে৷ কিন্তু সে সম্ভাবনা তো ক্ষীণ! কারণ—কই এখনও তো রান্নাঘর থেকে তো মা অথবা রাবেয়াদি কারোর চিৎকার শুনছি না! পাশের বাড়ির বাবাইকাকা, সায়নদাদা এমনকী জিদানদাদাদের বাড়িতেও কোনো শব্দ নেই! বলা যায়, একটু আশ্চর্য রকমেরই চুপচাপ সব!
তবে কী খেল বেড়ালটা?
ব্যাপারটা সরেজমিনে দেখতেই হচ্ছে৷ এক ছুটে পড়ার ঘরে গিয়েই টেবিল থেকে বড়ো আতশকাচ আর আলমারির হ্যান্ডেলে ঝোলানো বাবার হ্যাটটা নিয়ে এলাম৷ হ্যাট হল গোয়েন্দার প্রধান অঙ্গ! ও ছাড়া গোয়েন্দাগিরি ঠিক যেন মাছ ছাড়া মাছের ঝোল, মাংস ছাড়া বিরিয়ানি, মিষ্টি ছাড়া পায়েস!
হ্যাটটা মাথায় দিতেই খেয়াল হল—এঃ! গায়ে একটা জামা চড়ালে হত৷ খালি গায়ে চামড়ার হ্যাট, কেমন দেখাচ্ছে আমায় কে জানে! সে যাক গে যাক! দাদানদা বলে, মেজাজটাই না কি আসল রাজা৷ কাজেই বেশ একটা নেপোলিয়ন-নেপোলিয়ন মেজাজ বানিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পা টিপে টিপে দেওয়ালের দিকে গেলাম৷
দেওয়ালটা আমার থেকে উঁচু! বেড়ালটা সেখানে বসে এখনও আয়েশে থাবা চাটছে৷ খানিক ঝুঁকে পড়ে আমায় দেখেই চোখ কুঁচকে একটা তাচ্ছিল্যের ঘড়ঘড় করে ফের কাজে মন দিল৷ কিন্তু এইবার তো আমার আসল কাজ৷! বেড়ালের অবস্থান আর আমার মুণ্ডু—এ দুয়ের মধ্যে হাত দুয়েকের ফারাক! এই ফারাকটা ঘোচাই কেমন করে? লাফাতে পারি! কিন্তু তাতে বিল্লিমাসির ভাগলবা হওয়ার সম্ভাবনা! তাছাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে আতশকাচ দিয়ে তো ঠিকমতো দেখাও যাবে না! হিন্ডার্ড অবজারভেশানের তো কোনো দামই নেই ইনভেস্টিগেশানের ক্ষেত্রে৷
কী করি, কী করি! ঠিক এমন সময় আমি শাহরুখ খানের মাহাত্ম্যটা টের পেলাম৷ শাহরুখ খান যে বলেন, ‘‘আগার কিসি চিজ কো দিল সে চাহো, তো পুরি কায়নাত উসে তুমসে মিলানে কে কওশিশ মে লাগ যাতি হ্যায়!’’—সে যে কদ্দুর সত্য, তা আমি মুহূর্তে বুঝে গেলাম৷ কারণ, ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিক চাইতেই দেখি ডালিমগাছের গোড়ায় কে যেন একটা আগমার্কা সর্ষের তেলের টিন ফেলে রেখেছে!
ব্যস! টিন এলো৷ বেড়ালের পজিশন দেখে টিনের পজিশান অ্যাডজাস্ট হল৷ তারপর শেষ কাজটা, অর্থাৎ এপাশ-ওপাশ ভালো করে দেখে নেওয়া শত্রুপক্ষের কেউ ফলো-টলো করছে কি না—সেটাও সেরে নিলাম৷ দেওয়ালে ভর দিয়ে তারপর আলগোছে চড়ে পড়লাম টিনের উপর৷
ব্যস! এইবার মুখোমুখি আমি আর আমার অবজেক্ট৷ টিনে চড়ার সময় আতশকাচটা দুই ঠোঁটে চেপে রেখেছিলাম৷ সেটা নামিয়ে থাবার পর্যবেক্ষণ শুরু করলাম৷ বেড়ালটা তাও আমায় বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিল না৷ একবার থাবা তুলে ‘হ্যাঁয়াও’ করে ‘সাবধান’ গোত্রের কোনো একটা কিছু বলল মনে হল৷ তারপর ফের মন দিল থাবা চাটায়৷
কই তেমন তো কিছু চোখে পড়ছে না! ওদিকে টিনে চেপে নিজেকে বেশ টিনটিন-টিনটিন মনে হতে শুরু হয়ে গেছে৷ এই বেড়ালটাকে পোষ মানিয়ে স্নোয়ি করব৷ থাবাটা আর একটু ভালোভাবে দেখব বলে একটুখানি ঝুঁকে আতশকাচ ফোকাস করলাম৷ অমনি কে যেন খুব কাছ থেকে বলে উঠল, ‘মান্যবর মঁসিয়ে বেলো! কিছু কি পেলেন?’
হায় রে! যা হল না তারপর! বেমক্কা অমনি আওয়াজ শুনে আমার তো পেটের পিলে চমকে মাথায় উঠলই! তবু তো আমি একজন দুঁদে গোয়েন্দা, সেজন্যে ঝট করে সামলে নিলাম৷ কিন্তু অবোলা বেড়ালটা পারল না! ভয় পেয়ে রোঁয়া খাড়া করে ‘হেঁয়াও মেঁয়াও’ করে দিল আমার দিকে লাফ! ওদিকে তেল আগমার্কা হলেও টিনটা বোধ হয় আগমার্কা ছিল না! কাজেই উত্তেজনার চাপে টিনের ছাত ধ্বসে আমি ধপাত করে ঢুকে গেলাম টিনের ভিতরে! রিফ্লেক্সে গেলাম দৌড়োতে, ওদিকে দুই পাই তো টিনে আটকা! কাজেই হুড়মুড়িয়ে টিন-ফিন সহ টিনটিনিয়ে ঢিনঢিনিয়ে পড়লাম ধপাস করে!
‘এ হে হে! বড্ড লেগেছে আপনার! দাঁড়ান মঁসিয়ে বেলো! আমি আপনাকে হেল্প করছি!’ এই না বলে সেই লোকটা আমায় মাটি থেকে তুলে হাঁটু-টাটু ঝেড়ে দিল৷ তারপর টিনের ভিতর থেকে পা দুটো এক এক করে বার করালো৷ পায়ের পাতা তখন তেলের ক্কাথে মাখামাখি৷ ভালো করে দেখে নিয়ে বলল, ‘না মঁসিয়ে বেলো! কাটেনি৷ কাজেই টেটভ্যাক আর নিতে হবে না!’
কী ভাবছে লোকটা? আর জানছে কী করে যে আমি সুঁই নিতে ভয় পাই?
‘না মঁসিয়ে বেলো! আমি নিজেও তো আসলে ইঞ্জেকশানে বেদম ভয় পাই! কাজেই কথাটা বললাম’৷
আরেব্বাবা! থট রিডিং জানে না কি?
নাঃ! ব্যাপারখানা ঠিকঠাক বোঝাতে হলে এবার লোকটার একটা বর্ণনা দেওয়া খুব দরকার৷ লোকটা বেশ ঢ্যাঙা৷ ফর্সা চিবুকে ছুঁচোলো দাড়ি৷ বাদামি-কালো মেশানো একটা অদ্ভুত রঙের৷ সরু ফ্রেমের চশমা, টিকোলো নাকের ডগায় লাল তিল৷ পরনে ব্ল্যাক জিনসের সাথে হরেকৃষ্ণ পাঞ্জাবি৷ কাঁধে নামাবলির কাপড়ের ঝোলা আর মুখে অলওয়েজ একটা হাসি ঝোলানো৷
হাঁটুর উপরটা ডলতে ডলতে বললাম, ‘কে আপনি? কার কাছে এসেছেন? বাবার কাছে? বাবা তো এখন নেই৷ দাঁড়ান মাকে ডেকে দিচ্ছি৷ মাআআ...’
মাকে ডাকতে যেতেই লোকটা হাউমাউ করে উঠে বলতে লাগল, ‘মঁসিয়ে বেলো! আমি আপনার কাছেই এসেছি৷ অনুগ্রহ করে আপনার মাকে ডাকবেন না!’
ওরে বাবা! এ আবার কী! আমার কাছে আসবে কেন? আমি যে গোয়েন্দাগিরি করি সে খবর তো আমি ভিন্ন জানে আর মাত্র তিন-চারজন! তাহলে ইনি কার রেফারেন্সে? কুমতলব-টুমতলব নেই তো? আর অমনি রসিয়ে রসিয়ে মঁসিয়ে মঁসিয়েই বা আমায় বলছে কেন?
‘আজ্ঞে, মঁসিয়ে বেলো! আমি আসছি ফ্রান্স থেকে৷ আমার নাম পিরেনাভি মনরোঁ৷’
আমি তো হাঁ! খোদ প্যারিস থেকে আমার কাছে! সাত্যকি, সায়ন্তন এরা যদি একবার কাছে থাকত না তাহলে আমার গুরুত্বটা বুঝত! কিন্তু একটা ব্যাপারে খটকা লাগছে৷ লোকটা ফরাসি হলে এমন শুদ্ধ বাংলা বলছে কেমন করে? নাঃ! এটা জানতেই হচ্ছে৷ সিঁড়ির প্রথম ধাপটায় বসে পড়ে সোজাসুজি পিরেনাভির মুখের দিকে চেয়ে বললাম, ‘তা পিরেনাভি আঙ্কেল! আপনি এত ভালো বাংলা বলছেন কেমন করে?’
‘আজ্ঞে মসিঁয়ে বেলো! সবই এর জন্যে৷’ বলে পিরেনাভি ওর গলার কাছে কী যেন দেখাল! ভালো করে চেয়ে দেখি মোবাইলের ইয়ারফোনের মতো কী যেন একটা সেখানে ঝুলছে!
‘ওটা তো একটা ইয়ার ফোন!’
‘না মঁসিয়ে বেলো! এটা একটা ট্রান্সলেশান টুল! এটা বিশ্বের সাতশো সাতাত্তরটা ভাষায় ইন্সট্যান্ট টু ওয়ে ভয়েস ট্রান্সলেট করতে পারে৷ বিশ্বাস না হলে দেখুন!’ এই না বলে সেই লোক গলা থেকে সেটা খুলে হাতে নিয়ে কী যেন বলতে থাকল, সে আমি কিচ্ছু বুঝি না! সে শব্দগুলো খানিক এইরকম : ‘মসিঁয়ে বেলো! পিয়েক্স-তু ম’এন্ত্রেন্দ্রে? পাউভেজ-ভাউস কমপ্রেন্দ্রে মেস মোৎস?’
আমার হাঁ করা মুখের দিকে চেয়ে পিরেনাভি ওই যন্ত্রটা নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগল, ‘মঁসিয়ে বেলো! আভেজ ভাউজ গ্যাগ্নে দে ফয় পোউর সেটে মেশিন ট্রান্সলিটারেলে? সিনন, ভাউস পাউভেজ আই’ একজামিনার ভাউস-মেমে’
আমার অবস্থা তখন চায়ে খসে পড়া বিস্কুটের মতন! কিছুই বুঝছি না! ওদিকে পিরেনাভি যন্ত্রটা আমার দিকে দিচ্ছে আর ‘প্রেন্দস কা! একজামিনেজ সেলা কারেক্টমেন্ট! প্রেন্দস কা!’ বলছে! বোঝো ঠেলা!
শেষমেশ বললাম, ‘ও হরিনাভি! থুক্কু পিরেনাভি আঙ্কেল! আমার ঘাট হয়েছে! আমি সব মানছি গো! তুমি তোমার যন্ত্র লাগিয়ে নাও!’
তো সে আমার কথা বুঝবে কেন? যন্ত্র তো নেই৷ শেষে বুদ্ধি করে ইশারায় দেখালাম৷ ইশারা বুঝে পিরেনাভি তার যন্ত্র আগের মতো ঝুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘কী মঁসিয়ে বেলো! প্রত্যয় হল?’
‘হল বলে হল!’ আর কোনো সন্দেহই চলে না পিরেনাভির ফরাসিত্ব সম্পর্কে৷ ভাবো তো—খোদ একজন ফরাসি কি না আমার কাছে এসেছে! ওফ! এমন আনন্দে মনে হচ্ছে একবার হুল্লা হুল্লা নেচে নিই৷ কিন্তু মক্কেলের সামনে তো আর হ্যাংলামো করা যায় না, কাজেই উচ্ছ্বাস আটকে নিয়ে ফের বিজ্ঞের মতো বললাম, ‘তা মঁসিয়ে পিরেনাভি মনরোঁ! আমার কাছে কী মনে করে?’
‘আপনার কাছে আসার কারণ একটাই মঁসিয়ে বেলো! আর সেই কারণ খুব গুরুতর! আর খুব গোপনীয়ও বটে!’
পিরেনাভি এটুকু বলেই ভাবুকপানা হয়ে গেল৷ বেশ বুঝছি ব্যাপারটা সাংঘাতিক রকমের ঘোড়েল৷ এদিকে পিরেনাভির মুখ দেখে মনে হল বেশ ঘাবড়ে রয়েছে৷ পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করার জন্যে বললাম, ‘সব শুনব৷ আগে আপনি একটু ঠান্ডা হয়ে বসুন৷’
এদিক-ওদিক কী যেন দেখল পিরেনাভি! বোধ হয় বসার জায়গা খুঁজল৷ খুব ইচ্ছে করছে ওকে বসার ঘরের কাউচে নিয়ে বসাই, আর নিজেও বাঁ-পায়ের উপর ডান-পা তুলে পায়ের বুড়ো আঙুলটা বেশ নাচাতে নাচাতে কেসটা শুনি, আর স্যাটাস্যাট সলভ করি! কিন্তু উপায় নেই! ভিতরে নিলেই হাজার গন্ডা প্রশ্নোত্তরের ঠেলায় পুরো কেসটাই কেঁচে যাবে৷ তাছাড়া বাড়ির লোকেরা তো আমায় বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেয় না! কাজেই মক্কেলের সামনে কী বলতে কী বলবে আর আমার প্রেস্টিজে মস্ত ছ্যাঁদা হয়ে যাবে৷ কাজেই থাক, গণ্ডগোল পাকিয়ে দরকার নেই৷ গলা খাঁকরে তাই বললাম, ‘ও ইয়ে! মানে মঁসিয়ে পিরেনাভি! আপনি এখানেই বসুন৷ এটাই আমার সিক্রেট চেম্বার!’ বলে পৈঠার সেকেন্ড ধাপটা দেখালাম৷
পিরেনাভি বেশ সমঝদার আদমি৷ হরেকৃষ্ণ লেখা পাঞ্জাবি দু-হাতে খানিকটা তুলে টুক করে বসে পড়ল৷ আর আমি দৌড়োলাম ভিতরে৷ মক্কেলকে তো কিছু খেতে দিতে হয়৷ বাড়িতে তো রাবেয়াদি থেকেও নেই! প্রতিপক্ষের গুপ্তচর! কাজেই নিজেকেই নিজের জোগাড় করতে হবে৷
রান্নাঘরে মা আর রাবেয়াদি কাজ করছে৷ আমায় দেখেই বলল, ‘কী সোনাবাবা! আবার কী মতলব?’
ভ্যাঙচাতে গিয়েও থেমে গেলাম৷ আমি কিনা আন্তর্জাতিক মানের এক ডিটেকটিভ, আমায় কী আর এদের কথায় রিঅ্যাক্ট করলে চলে! কেবল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম৷ খাওয়ার ঘরের টেবিল থেকে জলের বোতলটা নিয়ে বেরিয়ে আসতে গিয়েই দেখি আমের আচারের শিশিটা বক্স জানালায় রোদ দেখানো আছে৷ ব্যস! একহাতে পানীয় আর আরেক হাতে খাদ্যের শিশি নিয়ে চলে গেলাম মক্কেলের কাছে৷
‘মঁসিয়ে পিরেনাভি! এই নিন৷ এ হল আমাদের স্পেশাল চটপটা প্রিপারেশন৷ মেড ফ্রম গ্রিন ম্যাঙ্গো অ্যান্ড কাঁচা তেঁতুল মানে ইয়ে ট্যামারিন্ড! এটা খান, দেখবেন ভালো লাগবে৷’
পিরেনাভি শিশি থেকে বেশ বড়োসড়ো একটা আমের কুসি বার করে সামনের দু-দাঁতে কাটতেই চোখ বুজে ফেলল আয়েশে৷ আমারও জিভে জল চলে এসেছে৷ গুপ্তচর হোক আর যাই হোক, আচারটা জম্পেশ বানায় রাবেয়াদি!
পিরেনাভিকে আচারের আয়েশ নেওয়ার জন্য বেশ খানিকটা সময় দিয়ে বললাম, ‘এবার বলুন৷’
তর্জনী দিয়ে গড়িয়ে আসা তেলটা জিভ দিয়ে চেটে নিয়ে পিরেনাভি বলল, ‘আসলে কী বলি! আমি কাজ করি স্পেস রিসার্চ সেন্টারে৷ সেখানে মহাকাশের উত্তর না-পাওয়া বিষয় নিয়ে আমাদের, মানে আমাদের টিমের কাজ৷ এবার আমরা কাজ করছিলাম একটা আন রিসলভড কসমিক সিগন্যাল নিয়ে৷ আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে কসমিক সিগন্যাল কি?’
আরে নিয়মিত ডিসকাভারি সায়েন্স দেখি, আর আমি জানব না কসমিক সিগন্যাল কী! বললাম, ‘জানা আছে৷ আপনি আগে বলুন৷’
পিরেনাভি বলে চলল, ‘এই সিগন্যালটা পাওয়া গেছিল স্পেস স্টেশান থেকে৷ ঠিক এরকমই আরেকটা সিগন্যাল মিলেছিল চাঁদে নাসার যে রিসেপটার মেশিন গেছে—তার থেকে৷’
‘ভেরি ইন্টেরেস্টিং! আগে...’
‘হ্যাঁ৷ বহুদিন সেই সিগন্যালটার সোর্স বোঝা যায়নি৷ কেউ ধারনা করেছেন হয়তো বড়ো কোনো মিটিওরাইট থেকে তৈরি হয়েছে৷ কিন্তু ফ্রিকোয়েন্সি জাজমেন্টে সেই আইডিয়া নাল অ্যান্ড ভয়েড হয়ে গেছে৷ কেউ ধারনা করেছেন হয়তো আরও বড়ো কোনো জ্যোতিষ্ক থেকে বা কোনো বিস্ফোরণ থেকে, কিন্তু কোনোটারই বিশেষ কিছু প্রমাণ মেলেনি! কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে গত সপ্তাহে৷ হঠাৎ করেই৷ আর তারপর থেকেই গোপনে রেড অ্যালার্ট জারি হয়ে গেছে সব দেশের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে!’
‘কী সেই বিষয়?’
‘আমি হঠাৎ করে সেই সিগন্যালটা আমার এই ট্রান্সলিটেরাল টুলে পাঠিয়ে শুনি৷ আর অদ্ভুতভাবে সিগন্যালটা ডিকোড হয়ে যায়! হাড় হিম করা বার্তা ফুটে ওঠে কানের ভিতর দিয়ে একেবারে মরমের ভিতরের পর্দায়!’
‘কি?’
‘বার্তাটা আসছে আমাদের থেকে সাতশো সাতানব্বই লাইট ইয়ার দূরের একটা গ্যালাক্সির প্ল্যানেট থেকে৷ কষেমারো গ্যালাক্সির সেই গ্রহের নাম হেঁচকি!’
‘কি যা-তা বলছেন?’
‘যা-তা নয় মঁসিয়ে বেলো! অ্যাকর্ডিং টু দ্য সিগন্যাল, এই যে আপনারা, মানে বাঙালিরা আসলে না কি ওই হেঁচকি প্ল্যানেটের বাসিন্দা! হেঁচকিতে ইলিশ আর রুইয়ের জোগান একসময় দূষণের জন্য মারাত্মক রকমের কমে গেছিল—কিন্তু হেঁচকির সেই মানুষেরা তো রুই আর ইলিশ ছাড়া বাঁচবেই না! মন খারাপের মেঘ ঘিরে থাকবে সবসময়৷ তাই খোঁজ শুরু হল নতুন বাসগ্রহের৷ শেষপর্যন্ত বহু দেশ ঘুরে, বহু গ্রহ ফিরে তারা ডেরা বাঁধল এই বাংলায়!’
‘বাব্বা!’
‘এতেই অবাক হবেন না মসিঁয়ে বেলো!’ সাংঘাতিক রকমের সিরিয়াস মুখ করে পিরেনাভি বলল, ‘এ তো অতীত! বর্তমান যে আরও আশ্চর্যের! যাকে বলে রোমহর্ষক!’
‘কি তা?’
‘হেঁচকিতে একটা কৃস্টালে এইসব ইতিবৃত্ত লেখা আছে৷ সেইসঙ্গে লেখা আছে ভবিষ্যতে হেঁচকি না কি মারাত্মক সমস্যায় পড়বে৷ সেখান থেকে তাদের বাঁচাতে পারবে একজন, আর সেই মহাজন না কি থাকবে এই বাংলায়৷ দাঁড়ান, আরও ভালো করে বলি! যে মহান হেঁচকিয়ান নভশ্চর এই বাংলায় এনে বাঁচিয়েছিলেন হেঁচকিয়ান কমিউনিটিকে, তার নাম ছিল বেলোরিয়ান বাংলুচিচ! তার নাম থেকেই এখানে ওই কমিউনিটির নাম বদলাতে বদলাতে বাঙালি হয়েছে!’
‘এ আবার কী কথা? বইতে তো অন্য কথা...’
কথা শেষ করতে না দিয়ে পিরেনাভি বলে উঠল, ‘বই যা বলছে বলুক! আগে আমার কথা শুনুন৷ হেঁচকি বিপদগ্রস্ত! হেঁচকির টিম গোটা মহাকাশে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে জানতে পেরেছে বাংলার লোকেশান৷’
‘আরে বাবা! ওরা তো এর আগেও এসেছে৷ এমনিই তো জানবে!’
‘না৷ কারণ সেই অভিযাত্রী দলের আর কেউ হেঁচকিতে ফিরে যেতে পারেনি! মাটন গ্রহের গুরুপাকি, থুড়ি গুরুতর হামলায় সবাই টেঁসে গেছে! কাজেই ওদের কাছে আমাদের লোকেশন ছিল না৷ এত বছরের চেষ্টায় ওরা সেই লোকেশন পেয়ে গেছে৷ আর পাওয়ার পর থেকেই মুহুর্মুহু সিগন্যালে খবর পাঠাচ্ছে৷ ওদের দাবি মানতেই হবে৷ নইলে পৃথিবী ধ্বংস করে দেবে ওরা৷’
‘মামদোবাজি না কি? আমাদের সিকিউরিটি সিস্টেম নেই?’
‘সে ওদের কাছে তিন টিপ নস্যি! তার প্রমাণও আমরা পেয়েছি৷ কাজেই ওদের দাবি মানা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই!’
‘ওদের দাবিটা কী?
‘ওদের মহান নভশ্চর নেতাকে ফিরিয়ে দিতে হবে৷’
‘সে কী! সে কী করে হবে? তিনি তো এতদিনে...’
‘আজ্ঞে ঠিকই ধরেছেন মহামান্য বেলো! তিনি এতদিনে অন্তত ন-হাজার নশো নিরানববুই বার টেঁসেছেন! কিন্তু মজার কথা হল এই তথ্যটি তারাও জানেন এবং কেবল এটুকুই যে জানেন তা কিন্তু নয়, সঙ্গে এটাও জানেন সেই নেতা বর্তমান জন্মে কোথায় আছেন, কী তার নাম?’
‘বাপ রে বাপ! কী টেকনোলোজি! সায়েন্স ফিকশানকে হার মানিয়ে দেবে তো!’
‘তাহলেই ভাবুন!’
‘তা কোথায় থাকেন বলছেন সে নেতা? নামই বা কি?’
সাময়িক নীরবতা ভেঙে গম্ভীর গলায় পিরেনাভি বলল ‘সে নেতা হলেন আপনি মঁসিয়ে বেলো!’
‘অ্যাঃ! বললেই হল! তামাশা করবেন না পিরেনাভি আঙ্কেল!’
‘তামাশা না মঁসিয়ে বেলো! আপনি বোধ হয় আপনার সাথে হেঁচকির মহান নভশ্চরের নামের মিলটা লক্ষ্য করেননি!’
‘আরে বাবা! তার ভালো নাম বেলোরিয়ান বাংলুচিচ৷ আর আমাকে তো কেবল বাবা বেলো বলে ডাকে!’
‘না! একটু অসত্য হল! আপনার জ্যাঠা, কাকা, এমনকী দু-একজন বন্ধুও ওই নামে ডাকে৷’
‘হ্যাঁ! তাতে হয়েছে কী!’
‘কিছুই না মসিঁয়ে বেলো’, বলেই সটান উঠে দাঁড়াল পিরেনাভি, ‘আপনাকে এখন আমার সাথে যেতে হবে৷ আপনাকে ওদের হাতে তুলে দিলেই পৃথিবী বাঁচবে৷ কাজেই চলুন মঁসিয়ে!’
‘এঃ! যতসব আজগুবি গপ্প ঝেড়ে আমায় নিয়ে যাওয়ার ধান্ধা! আমি এবার ঠিক বুঝে গেছি! ওসব বেলোরিয়ান বাংলুচিচ-টাংলুচিচ বলে কেউ নেই৷ আর আপনি আসলে একটা ছেলে ধরা! দাঁড়ান বাবাকে ডাকছি৷’
‘আপনার বাবা যে বাড়িতে এখন নেই সে আমার জানা আছে মঁসিয়ে বেলো! আর থাকলেও আপনাকে আমার সাথে যেতেই হত’, বলেই খপ করে পিরেনাভি আমার হাতটা ধরল৷ একহাতে আমায় পাকড়ে আরেক হাত ঝোলায় ভরে কী যেন খুঁজতে লাগল! নির্ঘাত অজ্ঞান করার স্প্রে! ও মাগো! আমায় বাঁচাও! দু-চারবার ধচড়া-মচড়ি করে যখন বুঝলাম ছাড়াতে পারব না, তখন শেষ আশ্রয় মাকে ডাকব বলে চেঁচাতে যাব এমন সময় মায়ের গলা কানে এলো :
‘ও মা! পদ্ম যে! কখন এলি?’
‘এই তো কাকিমা! এই মিনিট পনেরো হল’—বলতে বলতে পিরেনাভি আমার হাত ছেড়ে মায়ের কাছে গিয়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করল!
আমার হাঁ-করা মুখ দেখে মা বলল, ‘পদ্মকে তো তুই কখনো দেখিসনি বাবু তাই না? ও হল তোর বাবার মেজমামার সেজশালির ছেলে! হাজারিবাগে ওদের বাড়ি৷ খুব ব্রিলিয়ান্ট কিন্তু তোমার এই দাদা! ইসরোয় রিসার্চ করে! পাড়ায় পদ্মনাভ মণ্ডল বললেই এখন সবাই একডাকে ওদের বাড়ি নিয়ে যায়৷’ এইটুকু বলেই মা সেই পিরেনাভি না কি পদ্মনাভর হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘মা-বাবা কেমন আছে রে? আর দাদু?’
পদ্মনাভ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমার দিকে তাকিয়ে হাতটা ওয়েভ করল৷ ওর মানে আমি এখন ভালোই বুঝি৷ এতক্ষণ যে আমায় নিয়ে মশকরা করল, তার বদলে ওই মলম-সূচক হাসিমুখ আর ওয়েভ! এই ভাবতে ভাবতেই পাশে ‘হেঁয়াও খ্যাঁচ’ করে শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি সেই ধুমসো বেড়ালটা ফের পাঁচিলের উপর এসে বসেছে৷ এতক্ষণ ওর কথাটা ভুলেই গেছিলাম৷ আচ্ছা বেড়ালটা অমন ‘খ্যাচ ফ্যাঁচ’ করছে কেন? হাঁচছে না কি? হাসছে না তো! হাসি বের করছি ওর!
ছুড়ব বলে ঢ্যালা কুড়োতে গিয়ে চোখে পড়ল আতশকাচটা মাটিতে পড়ে৷ সত্যি তো! ওর থাবা চাটার কারণটা তো এখনও খোঁজা হল না!
ঠিক এই কথাটা মাথায় এসেছে, অমনি ভিতর থেকে রাবেয়াদির চিল চিৎকার ভেসে এলো : ‘ও মা! দেখি যাও! দুধের সর তুলার বাটিখান ফেলি দি ন্যাজ মোটা হুলো বিড়ালডা সব সর চটকি দিইচে গো মা!’
ব্যস! সব পরিষ্কার! কাকতালীয় আর কাকে বলে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন