হ্যাংলা

শাশ্বত কর

জল ঝরেই চলেছে পরশু সন্ধ্যে থেকে৷ নিম্নচাপ৷ বাবা বাজার থেকে ফিরলেন৷ হাঁটু অবধি পাজামা গোটানো৷ ছাতা বেয়ে টপ টপ৷

পুকুর ভেসেছে৷ উঠোনে কইমাছ কেবলার মতো বুকে হাঁটছে৷ নিতাইদা কান পেঁচিয়ে খপাখপ ধরছে আর স্টিলের বালতিতে বাস্কেটে বল ছোঁড়ার মতো ছুড়ছে! অমনি মেজদি বালতির মুখে ঢাকনা চেপে দিচ্ছে! মাঝে মাঝেই দাদা চেঁচাচ্ছে, ‘ওই যে! নিতাইদা! তোমার বাঁ-দিকে আরেকটা!’ মাছ ধরতে গিয়ে নিতাইদার লুঙ্গি ফতুয়া সব ভিজে একেবারে গায়ে চেপে বসেছে! রাবেয়াদি যেতে যেতে একবার আড়চোখে দেখে ‘নোলার ধার দ্যাহো! একখান কাঁটা খেলই না..’ বলতে বলতে চৌকাঠে হোঁচট খেয়েছে৷ নিতাইদার মাছগুলো সব মেজদির তত্ত্বাবধানে স্টিলের বালতিতে রাখা! বাবা এসেছে দেখে মেজদি যেই উঠল, বালতির মুখের ঢাকনা তুলে দেখতে গিয়েছিলুম৷ টপাং করে লাফ দিয়ে একটা ভেগেছে! কাউকে বলিনি বাবা, কী দরকার!

বাবা ছাতা গোটাতে গোটাতে বলছেন, ‘আজ বাজার তেমন বসেইনি৷ শুধু গৌর৷ এটা-সেটা বলতে বলতে একেবারে জোড়া ইলিশ গছিয়ে দিল৷’

ডাঁটার আঁশ ছাড়াতে ছাড়াতে মা গজগজ করে উঠল৷ সেজমা হাতাটা কড়াইয়ে ঠেসে দিতে দিতে বলল, ‘সে কী ঠাকুরপো! একে এই বাদলার দিন! কাটিয়ে এনেছো তো?’

মা উঠে এসে ব্যাগ খুলে বলল, ‘তবে তো মিটেই যেত! আঁশটুকুও ছাড়ানো নেই!’

বাবা তুম্বো মুখে ভিতরে গেলেন৷ আমি গেলাম রাবেয়াদির সাথে কুয়োতলায়৷ কাক তাড়াতে হবে৷ কাকগুলোর চোখে একেবারে লাজলজ্জা নেই! এই বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে নুজবুজে! পালকের নীচের সাদা লোম অবধি দেখা যাচ্ছে, তবু ইলিশের লোভে একেবারে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিয়েছে! রাবেয়াদি হুইই হুউশশ করতে করতে আঁশবটিতে ইলিশ ঘষছে৷ টুকরো টুকরো রুপো ছিটকে ছিটকে পড়ছে৷ কাকগুলো তারস্বরে চেঁচিয়ে আবেদন জানাচ্ছে৷ আমি পেয়াদা লাঠি নিয়ে যথাসাধ্য হেই হুঁই করছি৷ তাতে ক্ষুধার্ত কাক-সমাজ একবিন্দুও মানছে না৷ খ্যাঁকানি দিয়ে একটু উড়ে কুয়োর পাটে বসে ধমকাচ্ছে৷

পেয়াদার কাজ করতে করতেই রাবেয়াদিকে বললাম, ‘বড়ো পেটিটা কিন্তু আমার!’

পিছন থেকে ছোড়দা চেঁচাল, ‘ওই হ্যাংলামো শুরু৷’

বড়োজ্যাঠার ব্যায়াম শেষ৷ ফরসা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম! কাঁধে তোয়ালে! এদিকে একবার উঁকি দিয়ে ছোলা বাদাম আনতে রান্নাঘর গেলেন৷ কানে এলো, মাকে বলছেন, ‘ইলিশদুটোর সাইজ দেখেছ উমা? ভাইটার এলেম আছে৷ নইলে এই বাদলায়...!’

সেজমা বললেন, ‘কিন্তু আর তো কিছুই পায়নি!’

পিসেমশাইয়ের গলাও পেলাম৷ বলছেন, ‘তো কী হল! বাইরে এমন বৃষ্টি, ঘরে জোড়া ইলিশ! এমন সংযোগ তো কালেভদ্রে হয়৷ চালে ডালে বসিয়ে দাও৷’

বড়োজ্যাঠা সায় দিয়ে বলল, ‘ঠিক ঠিক৷’

ছোড়দা দৌড়ে এসে বলল, ‘রাবেয়াদি, চাকা পিস৷ খিচুড়ি হচ্ছে৷’

রাবেয়াদি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘নেইচে নাও গো সোনাবাবা৷ আইজ কিসুরি আর হিলসা ভাজা!’

‘ইয়া!’ লাফিয়ে নিয়ে রাবেয়াদির ভুল শুধরে বললাম, ‘কিসুরি না, খিচুড়ি৷’

‘একই অইল৷ তুমরা কও বেগুন, আমরা কই বাগুন... আমরা কই আখা, তুমরা কও উনুন—একই’

হোক গে! আজ সত্যিই নাচার দিন৷ একে ইলিশ তায় খিচুড়ি! ওয়াঃ!

খিচুড়ি নামটাই আমায় হেবি টানে৷ ছোট্টবেলায় শুনেছিলাম, ‘হাঁস ছিল সজারু ব্যাকরণ মানি না৷ হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানি না!’ একদম ঠিক৷ চাল ডাল আর ঘি মিলেমিশে অমন একটা স্বর্গ কীভাবে যে বনে যায়! উল্লুস!

মা অনেকরকম খিচুড়ি বানাতে জানে৷ সেজমা আবার ভুণা খিচুড়িতে ওস্তাদ৷ বর্ষায় তো হয়ই৷ তাছাড়া খুব শীত পড়লেও রাতে হয়৷ পথ্যের খিচুড়ি অবিশ্যি রোজই হয় বল্টেটার জন্য৷ ও আমার খুড়তুতো ভাই, সবে হাঁটতে শিখেছে৷ ওকে যখন কাম্মা খাওয়ায়, আমি বসে দেখি৷ লোভ দিই না, বিশ্বাস কর! দেবোই বা কেন? ওর শেষ হলে কাম্মা আমাকেও তো দেয়! আমায় খাওয়াতে দেখলে বল্টেটা হাততালি দিয়ে নাচে৷ গা থেকে শুকনো খিচুড়ি লুটের বাতাসার মতো ছড়ায়৷

পাশের বাড়ির বম্মারাও তো হর পুন্নিমায় খিচুড়ি ভোগ দেয়৷ সে আবার অন্যরকম৷ চালগুলো সব ছাড়া ছাড়া৷ ফুলের পাপড়ির মতো৷ আর কী দারুণ গন্ধ! মেজদি বলে ভোগের গন্ধ৷ বম্মা ডাকে, ‘ও গোপাল, এসো, ভোগ খেয়ে যাও!’

মা বলেন, ‘দিদি! হ্যাংলাটাকে আর লাই দেবেন না!’

বম্মা মাকে বকে আর আমি বম্মাদের বাড়িতে ঢুকে যাই৷

আমাদের বাড়িতেও খিচুড়ি ভোগ হয়৷ অষ্টমীতে, লক্ষ্মীপুজোয়, সরস্বতী পুজোয়৷ দারুণ ব্যাপার৷ সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া হয়৷ আজও অবশ্য তাই৷ লম্বা বারান্দায় পরপর পাত পড়েছে৷ বড়োজ্যাঠা, সেজজ্যাঠা, পিসেমশাই, বদ্দাদা, ছোড়দা, দিদি আর আমি৷ কাকা আর মেজজ্যাঠা বাড়িতে নেই৷ থাকলে আরও জমত৷

কাঁসার থালা বেরিয়েছে৷ সবার সামনে সেই থালায় হলুদ খিচুড়ি৷ মুগডালের৷ ধোঁয়া উঠছে৷ ধোঁয়ায় খিদে-খিদে গন্ধ! হাত দিলুম৷ উঃ! হাত জ্বলে গেল! মেজদি বললে, ‘ওভাবে খায় না কি রে হাঁদা! আগে ছড়িয়ে নিয়ে পাশ থেকে শুরু করতে হয়৷ দাঁড়া আমি দিচ্ছি৷’ দিদির আঙুল লাল হয়ে যাচ্ছে৷ একটু করে ছড়াচ্ছে আর শোষাচ্ছে! শেষ করে আঙুল মুখে পুরে বলল, ‘নে, এবার খা৷’

মুখে দিলাম৷ আঃ! কী স্বাদ!

বাইরে এখনও ঝম ঝম৷ পিসেমশাই বলছেন, ‘ফাসক্লাস বানিয়েছ!’

বড়দা আমার দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘খিচুড়ি কোত্থেকে এলো জানিস বেলো?’

বাবা বললেন, ‘সংস্কৃত ‘খিচ্চা’ থেকে কথাটা এসেছে, বুঝলি?’ মাথা নাড়লুম বটে, তবে খিচ্চার চেয়ে খিচুড়িটাই বেশি টানল৷

সেজকাকা বলল, ‘ইজিপ্টের একটা ডিশ আছে৷ কুশারি৷ খিচুড়ির থেকে প্যালা পেয়েছে শোনা যায়৷’

হল! এবার খিচুড়ির দাদা পরদাদা উঠে আসবে! এরা কেন এত পড়ে আর কেন যে এত পড়ায়! স্বাদ নিতে জানে না চুপচাপ!

সেজজ্যাঠা বলছেন, ‘ইবন বতুতাও আমাদের খিচুড়ির কথা বলে গেছেন, কত পুরোনো তা হলে, ভাব!’

বাবা বলছে, ‘আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিতেও তো উল্লেখ আছে, তাই না সেজদা?’

‘আছেই তো? থাকবে না? মুঘলদের তো বড়ো পছন্দের খানা! জাহাঙ্গীরের সময় তো খুব৷ অবশ্য সেটা ঠিক এরকম নয়৷ আমরা আমাদের মতো রেসিপিতে যোগ-বিয়োগ করেছি৷’

মেজদি আঙুল চাটতে চাটতে বলছে, ‘মা, একটু আচার দাও না’

বললাম, ‘আমাকেও৷’ খিচুড়ির সাথে আচার খুব জমে৷’

পিসেমশাই বলল, ‘প্রায় সব রাজ্যেই নিজেদের মতো করে খিচুড়ির চল আছে জানো?’

বাবা বলছে, ‘সে তো বটেই৷ মহারাষ্ট্রেই তো দেখেছি৷ খিচুড়িতে ওরা চিংড়ি দেয়৷’

পিসেমশাই কর্মসূত্রে বিহারে থাকতেন একসময়৷ খানিকটা ভাজা মাছ মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে বলল, ‘বিহারে মকর সংক্রান্তিতে খিচুড়ির চল আছে৷ অবশ্য ওরা প্রচুর গরম মশলা আর ঘি দেয়৷’

‘মোষের?’ বদ্দাদা বলল৷

‘হতেও পারে৷ আর সঙ্গে থাকে বাইগন কা ভর্তা, আলু কা ভর্তা, টমেটোর চাটনি৷’

‘আমাদের লাবড়া ওর থেকে ঢের ভালো৷’ বড়োজ্যাঠা এতক্ষণে মুখ তুললেন৷

বদ্দাদা বলল, ‘ঠিকই তো৷ জানো জেম্মা, এই খিচুড়ির টানে অনেকদিনই রিসেসে ডেকার্স লেন দৌড়োই৷’

‘কেন?’

‘আরে, ওখানকার এ জিনিস তো বিখ্যাত৷’

দেখেছ এরা সবাই কেমন হ্যাংলা! অথচ কেবল আমারই নাম রটে!

পিসেমশাই বললেন, ‘ঠিকই৷ তবে সে জিনিস, বউঠান, তোমাদের মতো এত সুস্বাদু নয়’

বাবা বলছেন, ‘নিউ মার্কেটের কাছে ভোজ কোম্পানি আর সুরুচিতে দেখেছি একেবারে বাড়ির মতো বানায়৷ অবশ্য দামটা একটু বেশি!’

মা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সেজমাকে বলল, ‘শুনলে দিদি?’

সেজমা মুখে আঁচল চেপে বলল, ‘কী গো ঠাকুরপো? তুমি একা একা রেস্তরাঁয় যাও?’

সবার হাসির মাঝেই বড়োজ্যাঠা বলল, ‘বেলোটাকে আট্টু খিচুড়ি আর একটা মাছ দাও৷ কী রে খাবি তো!’

আমি আর কী বলি! হাসি হাসি মুখ করে চাইলাম৷ মেজদি পিঠে একটা কিল মেরে বলল, ‘হ্যাংলা কোথাকার!’

দেখলে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%