পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রায় পনেরো মিনিট হয়ে গেল রাতুলদের বাড়িতে বসে আছে ওরা চারজন৷ দীপ, রঙ্গন, টিটো আর হৃদ৷ রাতুল এসে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে৷ এরা প্রত্যেকেই জিওগ্রাফি অনার্স৷ সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র৷ অনেক রিকোয়েস্ট করার পর, কলেজেরই একজন প্রফেসর ওদের টিউশন পড়াতে রাজি হয়েছেন৷ রাতুলের বাড়িটাই স্যারের মেসের সবথেকে কাছে৷ অতএব স্যার এখানেই পড়াবেন৷ কিন্তু এখনও অবধি উনি এসে পৌঁছননি৷ ‘রাতুল, একটু জল হবে?’ হাঁক পাড়ল রঙ্গন৷ কয়েক সেকেন্ড পরই রাতুলের গলা শোনা গেল, ‘নূপুর, ড্রয়িংরুমে একটা জলের বোতল দিয়ে আয় প্লিজ!’ রাতুলদের জয়েন্ট ফ্যামিলি৷ অনেককেই দরজার সামনে দিয়ে হাঁটাচলা করতে দেখছে দীপরা৷ হঠাৎ একটা মেয়ে ঘরে ঢুকে এল৷ নীল সালোয়ার কামিজ, কোমর অবধি লম্বা চুল হেলায় ছড়ানো, মায়াবী দুটো চোখ৷ হাতে একটা ট্রেতে দু’টো জলের বোতল৷ ওদের চারজনের দিকে তাকিয়ে, আলতো হেসে একটা টুলের ওপর ট্রেটা রেখে চলে গেল৷ যেন হঠাৎ এসে পড়া এক ঝোড়ো হাওয়া৷ চোখের পলক ফেলতে পারছে না হৃদ৷ কেমন যেন মনে হচ্ছে, পলক ফেললেই এই অনুভূতিটা মন থেকে মুছে যাবে৷ আজ ও বুঝতে পারছে হৃৎপিন্ড সত্যিই লাবডুব শব্দ করে৷ রঙ্গন দ্রুতহাতে একটা বোতল নিয়ে গলায় জল ঢালতে শুরু করেছে৷ হৃদ জিজ্ঞেস করল, ‘রাতুলের বোন?’
—‘হুঁ৷ তবে আর কিছু ভেবো না৷ ও আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয়৷ শি ইজ ডিফারেন্টলি এবেলড,’ মোবাইল থেকে মাথা না তুলেই উত্তর দিল টিটো৷
—‘মানে?’ হৃদ অবাক৷
—‘শি ইজ মিউট৷ কথা বলতে পারে না৷ তবে শুনতে পারে৷ রাতুলই একদিন বলেছিল,’ শ্রাগ করল টিটো৷ আর ঠিক তক্ষুনি স্যার ঢুকে এলেন ঘরে৷ পিছনে রাতুল৷ হৃদের মাথা কাজ করছে না৷ কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছে না ও৷ যার হাসি এত সুন্দর, সে কথা বলতে পারে না! ভাগ্যের এ কী নিষ্ঠুর পরিহাস!
বাড়ি ফিরেই ফেসবুকে লগ ইন করল হৃদ৷ সার্চ দিল- নূপুর চৌধুরী৷ অনেক প্রোফাইল এল পরপর৷
কিন্তু সকালে দেখা স্বপ্নপরীকে সেখানে খুঁজে পেল না হৃদ৷ এরপর রাতুলের প্রোফাইলে গিয়েও চিরুনিতল্লাশি চালাল ও৷ কিন্তু নূপুর নেই সেখানেও৷ তার মানে ওর ফেসবুকই নেই৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল হৃদের৷ দেওয়াল থেকে গিটারটা নামিয়ে বাজাতে শুরু করল ও৷ রাতুলদের বাড়ি টিউশন আবার এক সপ্তাহ পর৷ তার মানে নূপুরকে এতদিন না দেখে থাকতে হবে৷ কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও, এক মুহূর্তের জন্যও নূপুরকে ভুলতেপারছে না হৃদ৷ আগামিকাল সোমবার৷ কলেজ আছে৷ রাতুলকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে নূপুর সত্যিই কথা বলতে পারে কি না! হতেও তো পারে যে রাতুলের আরও অনেক বোন আছে এবং তাদেরই কারোর গল্প ও টিটোর সঙ্গে করেছে! আপাতত চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করার জন্য ইউটিউব খুলে বসল হৃদ৷
‘রাতুল, শোন না!’ প্র্যাকটিক্যাল রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বন্ধুকে ডাকল হৃদ৷ পিছনে ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল রাতুল৷ পিঠ থেকে ব্যাগ নামিয়ে খাতা ভরতে ভরতে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী? বল৷’
—‘ইয়ে, কাল স্যার যা যা পড়িয়েছিলেন—সব বুঝতে পেরেছিলি?’
—‘হ্যাঁ৷ কেন?’
—‘আমায় একটু এক্সপ্লেন করে দিবি, ভাই? কিচ্ছু বুঝতে পারিনি৷ পরীক্ষাও চলেই এল৷’
—‘নিশ্চয়ই৷ এখন বুঝবি? আজকের মতো তো ক্লাস শেষ৷’
—‘হ্যাঁ৷ চল তোর বাড়ি যাই৷’
—‘বাড়ি কেন? কমনরুমে চল৷’
—‘আরে! স্যারের নোটসগুলো তো তোর বাড়িতেই৷ অতএব বাড়ি গেলেই সুবিধা হত না?’ ঢোক গিলল হৃদ৷
—‘তা অবশ্য ঠিক,’ দু’মিনিট কী যেন ভাবল রাতুল৷ তারপর বলল, ‘আচ্ছা, চল৷ আমার আজ চেতলায় একটা কাজ ছিল যদিও৷ যাক গে, ওটা কাল করে নেব৷’ খুব কষ্ট করে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে রাতুলের সঙ্গে মেট্রো স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগাল হৃদ৷
বাড়ির ঠিক সামনে ব্যাডমিন্টন খেলছিল নূপুর৷ গলিতে ঢুকতেই ওকে দেখতে পেল হৃদ৷ আর সঙ্গে সঙ্গেই কালকের সেই লাবডুবটা আবার টের পেল ও৷ রাতুল হাঁটছে কয়েক পা এগিয়ে৷ জিজ্ঞেস করলো, ‘ব্যাডমিন্টন খেলবি?’
—‘হ্যাঁ,’ অপ্রত্যাশিত এই সুযোগ লুফে নিল হৃদ৷
—‘নূপুর, আমরা খেলব,’ গলা তুলল রাতুল৷ ডাগর চোখদু’টো তুলে পিছনে তাকালো নূপুর৷ দাদাভাইকে দেখে একগাল হাসল৷
কিন্তু পরক্ষণেই হৃদকে দেখে সামলে নিল নিজেকে৷ র্যাকেটটা রাতুলের হাতে দিয়ে সরে দাঁড়াল পাঁচিল ঘেঁষে৷ তারপর হৃদ আর রাতুল খেলতে শুরু করলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল দ্রুতপায়ে৷
মিনিট পাঁচেক পর, হীরক কাকাকে সঙ্গে নিয়ে আবার বেরিয়ে এল নূপুর৷ হীরক কাকা রাতুলদের সর্বক্ষণের হাউজহেল্প৷ বাড়ির সকলেই ওঁকে হীরকা বলে ডাকে৷ ওঁর হাতে দু’গ্লাস ফলের রস৷ রাতুল আর হৃদ দুজনের হাতেই একটা করে গ্লাস ধরিয়ে দিলেন৷ কোনও কথা না বলে গ্লাসে চুমুক দিল হৃদ৷ বনেদি বাড়িতে এইসব হয় বোধ হয়৷
রাতুলের ঘরে পড়ছিল হৃদ৷ গতকাল ও সত্যিই একটুও কনসেন্ট্রেট করতে পারেনি৷ রাতুল সাহায্য করছে পুরোমাত্রায়৷ ‘আমারও একবার পড়া হয়ে যাচ্ছে ভাই তোর জন্য,’ হাসল রাতুল, ‘আসতেই পারিস মাঝে মাঝে৷ গ্রুপস্টাডি করলেও মন্দ হয় না৷’ ঢক করে ঘাড় নেড়ে দিল হৃদ৷ একথা ওকথার পর জিজ্ঞেস করল, ‘নূপুর তোর নিজের বোন?’
—‘উঁহু, খুড়তুতো৷’
—‘কোন ক্লাসে পড়ে?’
—‘ফার্স্ট ইয়ার৷ ও আমাদের থেকে একটু আলাদা৷ কথা বলতে পারে না,’ ম্লান হাসল রাতুল৷ কথাটা শোনার পরই মনটা হু হু করে উঠল হৃদের৷ তাহলে টিটো ঠিকই বলেছিল৷ আবার সেই মনখারাপটা গ্রাস করল ওকে৷ বই বন্ধ করে উঠে পড়ল হৃদ, ‘আজ আসি রে, অনেক থ্যাঙ্ক ইউ৷’
—‘আয়৷ মোড়ের মাথায় বাস পাবি,’ জানিয়ে দিল রাতুল৷ ওকে টা টা করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল হৃদ৷ তারপর সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে এসে, সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল৷নূপুরকে কোত্থাও দেখতে পেল না ও৷
দাদার বন্ধুটা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই জানলা থেকে সরে এল নূপুর৷ ছেলেটা বারবার পিছন ফিরে দেখছিল৷ ভীষণ স্নিগ্ধ দেখতে ওকে৷ দেখলেই কেমন আপন মনে হয়! ওর নাম অবশ্য জানে না নূপুর৷ গতকালও এসেছিল ও৷ টিউশন পড়তে৷ তবে তখন আরও অনেক বন্ধুরা ছিল৷ জানলার পাল্লাটা ভেজিয়ে দাদাভাইয়ের ঘরে গেল নূপুর৷ এই ঘরটায় আজ একটা অন্যরকম গন্ধ৷ বোধ হয় ওই ছেলেটার পারফিউমের৷ নূপুর জানে, কথা বলতে না পারলেও ওর বাকি ইন্দ্রিয়গুলো অন্যদের থেকে অনেক বেশি সজাগ৷
রাতুল মোবাইলে গেম খেলছিল৷ বোনকে ঢুকতে দেখে বললো, ‘কী খবর?’ ইশারায় নূপুর বোঝাল ‘কিছু না’৷ তারপর হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা চাইল৷ হেসে বোনকে মোবাইলটা দিয়ে দিল রাতুল৷ নূপুরের ফোন আছে৷ কিন্তু ওর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই৷ খুব আন্তরিক হলেও, সোশাল হতে বা অচেনা কারোর সঙ্গে মিশতে ও একটু হীনমন্যতায় ভোগে৷ তাই দিনে একবার রাতুলের ফোনটা নিয়ে একটু ফেসবুক ঘাঁটে৷ রাতুল না করে না, নূপুরের ব্যাপারটা ও বোঝে৷ তাছাড়া, এই বোনটা ওর প্রাণাধিক প্রিয়৷ মোবাইল দেখতে দেখতেই নূপুর ইশারায় জিজ্ঞেস করল ‘যে ছেলেটা এসেছিলো, ওর নাম কী?’
—‘হৃদ৷ পড়া বুঝতে এসেছিল৷ ও কিন্তু খুব ভালো ক্যারাম খেলতে পারে৷ তোকেও হারিয়ে দেবে,’ চোখ টিপল রাতুল৷ ওমনি রাগত চোখে দাদার দিকে তাকালো নূপুর৷ বোনের রিয়্যাকশন দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল রাতুল৷ নূপুর এই বাড়ির সবথেকে ভালো ক্যারাম প্লেয়ার৷ সত্যিই দারুণ খেলে৷ একবার স্ট্রাইক করে তিন পকেটে তিনটে ঘুঁটি ফেলতে পারে৷ ভাইবোনদের তো বটেই, বড়দেরও হারিয়ে দেয় পলকে৷ তাই ওকে ক্যারাম নিয়ে কেউ কিছু বললে রেগে যায়৷ ইশারায় বলল ‘পরের দিন এলে, খেলতে বোলো আমার সঙ্গে৷ দেখব৷’
সরস্বতী পুজোর আর বেশিদিন বাকি নেই৷ বাড়ির একদম খুদে সদস্য ঋভু বায়না ধরেছে আজ থেকেই কাগজের শিকল বানানো শুরু করতে হবে৷ বড়রা ওর কথায় এখনও তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না৷ অতএব নূপুরের কাছে এসে বায়না জুড়েছে ও৷ নূপুর কখনও কাউকে ‘না’ বলতে পারে না৷ অতএব ভাইয়ের আবদার মেটাতে এখন পাড়ার মোড়ের দোকানে এসেছে৷ বিভিন্ন রঙের কাগজ লাগবে ঋভুর৷ সময় নিয়ে প্রত্যেকটা কাগজ হাতে নিয়ে দেখছে৷ দোকানের নিতাইকাকু ওকে কাউন্টারের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়েছেন৷ নূপুর বাইরে দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখছে৷ হঠাৎ দাদাভাইয়ের বন্ধুদের দেখতে পেল ও৷ লাইন বেঁধে হেঁটে আসছে৷ আজ রবিবার—ওদের পড়া আছে৷ সেই ছেলেটা হাঁটছে সকলের পিছনে৷ হৃদ৷ নীল রঙের একটা ফুলহাতা টিশার্ট আর একটা হাফ-জ্যাকেট পরেছে৷ মাথার চুল এলোমেলো৷ এমন করে হাঁটছে, যেন এখনও ঘুম কাটেনি৷ হঠাৎ চোখ তুলে ঠিক নূপুরের দিকেই তাকাল ও৷ যেন জানত যে নূপুর ওখানে ওর দিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে আছে৷ পলকে চোখ সরিয়ে নিল নূপুর৷ ইশ, কী ভাবল ছেলেটা! কিন্তু ততক্ষণে ঝড় উঠেছে নূপুরের মনে৷ গলা শুকিয়ে মরুভূমি৷ আগে তো কখনও হয়নি এমনটা! তবে কি নিজের অজান্তেই হৃদকে পছন্দ করে ফেলেছে ও? কিন্তু সেরকম তো হওয়ার কথা নয়৷ ছোটবেলা থেকেই নূপুর নিজেকে বুঝিয়েছে যে ওকে সারা জীবন একাই কাটাতে হবে৷ কে ভালোবাসবে এমন মেয়েকে—যে কথাই বলতে পারে না! ছেলেগুলো যখন ওর পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে, আর একবার আড়চোখে ওদের দিকে তাকাল নূপুর৷ হৃদ এখনও তাকিয়ে আছে এইদিকে৷ ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখেছে এক অদ্ভুত হাসি৷ দ্রুত দোকানের দিকে ফিরে ঋভুতে মন দিল নূপুর৷
‘নূপুর, ক্যারামবোর্ড রেডি৷ খেলতে আয়,’ হাঁক পাড়ল রাতুল৷ এই ভয়টাই পাচ্ছিল নূপুর৷ একটু আগেই দাদাভাইয়ের স্যারকে বেরিয়ে যেতেদেখেছে ও৷ সেই জন্যই রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ভাবটা এমন যেন মাকে সাহায্য করতেএসেছে৷ নূপুরের মা অমিতাদেবী একজন সোশাল ওয়ার্কার৷ রাতুলের ডাক শুনে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, যা৷ দাদাভাই ডাকছে তো!’ ঘাড় নেড়ে ‘না’ জানাল নূপুর৷ সামান্য চোখ বড় করলেন অমিতা, ‘কেন রে? তুই তো ক্যারাম খেলতে ভালবাসিস৷’ অপরিচিত মানুষদের সামনে মেয়ের এই ইনসিকিওরড ফিল করাটা বদলাতে চান উনি৷ নূপুর সব বিষয়েই যথেষ্ট ভালো৷ শুধুমাত্র একটা ফিজিক্যাল ইস্যুর জন্য ওর কনফিডেন্সের অভাব হবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না৷ ‘নূ-পু-র!’ আবার ডাকল রাতুল৷ সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে তাড়া দিলেন অমিতা, ‘যা, যা!’ অগত্যা দাদাভাইয়ের ঘরের দিকে পা বাড়াল নূপুর৷ হার্টবিটস বেড়ে গিয়েছে সামান্য ওর৷ হাতের চেটো ঘামতে শুরু করেছে৷ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল ও৷
ঠিক করে স্ট্রাইকারে হাতই লাগাতে পারছে না হৃদ৷ হাত কেঁপে, গলা শুকিয়ে একাকার অবস্থা৷ ওর ঠিক পাশেই বসে আছে নূপুর৷ একমনে তাকিয়ে আছে বোর্ডের ঘুঁটিগুলোর দিকে৷ দুই দলে ভাগ হয়ে খেলছে ওরা৷ এক দলে হৃদ আর টিটো, অন্যদলে নূপুর আর রাতুল৷ রঙ্গন আর দীপ চিয়ারলিডার৷ জামায় একবার হাত ঘষে নিল হৃদ৷ তারপর একটা ঘুঁটি তাক করে স্ট্রাইকার মারল৷ কিন্তু না—ঘুঁটিটা পকেটে পড়ল না৷ এবার বোর্ড থেকে স্ট্রাইকার নিয়ে নিজের লাইনে বসাল নূপুর৷ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সজোরে সামনের দু’পকেটে দু’টো ঘুঁটি গিয়ে পড়ল৷ তুমুল আনন্দে হাততালি দিতে শুরু করেছে রাতুল৷ এক ঝলক ওকে দেখে নূপুরের দিকে তাকাল হৃদ৷
একগাল হাসি নিয়ে দাদাকে কিছু একটা ইশারায় বোঝাচ্ছে ও৷ ওদিকে টিটোর মাথায় হাত৷ শেষমেশ নূপুরের কাছে পরপর দুটো গেমে হেরে গিয়ে হাসিমুখে বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লো হৃদ৷ ওর আজ হেরে গিয়েও ভীষণ আনন্দ৷ ‘কেস কী, ভাই? দু-দু’টো গেম হেরেও তুই এত খুশি কেন? হৃদ সান্যাল ক্যারামে পরপর দু’বার হারল! আনবিলিভেবল,’ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মুখ বাঁকাল রঙ্গন৷
—‘নূপুর আমার থেকেও অনেক গুণ বেশি ভালো খেলে৷ তাই ও জিতেছে৷ সিম্পল,’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেল হৃদ৷
বেলা একটু বাড়লেই গায়ে সোয়েটার রাখা যায় না কলকাতায়৷ তাই আপাতত সোয়েটারটা খুলে কোমরে বেঁধেছে হৃদ৷ ওর বাড়ি শোভাবাজারে৷ রাতুলদের বাড়ি থেকে দূরত্ব প্রায় দেড় ঘণ্টার৷ পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা একসঙ্গে বসে কিছু আলোচনা করছিলো৷ ওকে দেখেই বুড়োদা ডাকল, ‘এই হৃদ, এদিকে আয়৷ এবারের পিকনিক নিয়ে মিটিং বসেছে৷’
—‘আমার একটু তাড়া আছে, বুড়োদা৷ তোমরা সবাই মিলে যা ঠিক করবে, তাতেই আমি ইন,’ হাত তুলে জানিয়ে দিল হৃদ৷ হাঁটার গতি কমায়নি ও৷ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে ওর৷
বাড়ি পৌঁছেই ল্যাপটপ খুলে বসল হৃদ৷ সার্চ দিলো ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’৷ পরপর অনেক রেজাল্ট এল স্ক্রিন জুড়ে৷ এক এক করে দেখতে শুরু করল ও৷ অঙ্গভঙ্গিগুলো শক্ত না হলেও, মনে রাখা বেশ শক্ত৷ অনেক ধৈর্য লাগবে৷ একটা একটা করে শিখতে শুরু করল হৃদ৷
ডায়েরিটা খুলে লিখতে বসেছে নূপুর৷ ও কবিতা লিখতেপারে৷ তবে এই কথাটা আর কেউ জানে না৷ তিনটে কবিতাভর্তি ডায়েরি ওর আলমারিতে রাখা আছে৷ এখন যেটাতে লিখছে, সেটা চার নম্বর৷ এটাই ওর একমাত্র স্ট্রেস রিলিভার৷ তবে আজ চোখের সামনে কেবল হৃদের মুখটা ভেসে উঠছে৷ নূপুর ভালো স্ট্রাইক করলেই কেমন অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে তাকাচ্ছিল ছেলেটা৷ সেই চাহনিতে অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস৷ লজ্জায় পুরো সময়টাই প্রায় জোর করে বোর্ডের দিকে তাকিয়েছিলো নূপুর৷ দাদাভাইয়ের বাকি বন্ধুরা অবশ্য খেলাতেই ডুবেছিল রীতিমতো৷ ‘নূপুর, খেতে আয়,’ নীচ থেকে ডাকলেন বড়মা মানে দাদাভাইয়ের মা৷ ডায়েরিটা বালিশের তলায় ঢুকিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড়লো নূপুর৷ ঠাকুরদা আজ সক্কলকে একসঙ্গে ডিনার করতে বলেছেন৷ সরস্বতী পুজো সংক্রান্ত আলোচনা আছে বোধ হয়৷
চৌধুরী বাড়িতে সরস্বতীপুজো বেশ বড় করে হয়৷ পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাইকে নেমন্তন্ন করা হয়৷ বড়রাই মেইনলি আলোচনা করেন৷ ছোটরা চুপচাপ শুনে যায়৷ আজও ঠিক তাই-ই হল৷ সবশেষে দেখা গেল- প্রায় সত্তরজনকে নিমন্ত্রণ করতে হবে এবার৷ নূপুরের বন্ধুরা আগের বছরও এসেছিল৷ রাতুলের কলেজের বন্ধুরা এবারের নতুন সংযোজন৷
আজ সরস্বতীপুজো৷ সকালে উঠে হলুদ মেখে, স্নান সেরে একটা কমলা রঙের শাড়ি পরেছে নূপুর৷ এখন ঠাকুরঘর জুড়ে আল্পনা দেওয়ায় ব্যস্ত ও৷ দাদাভাই গিয়েছে শেষ মূহূর্তের দশকর্মা বাজার করতে৷ ছোট ভাইবোনেরা তখনও হলুদ মাখছে মা-কাকিমার কাছে৷ ‘এই নূপুর, এইদিকে তাকা একবার’ বাবার ডাকে নূপুর পিছনে তাকাতেই ওর ফটো উঠে গেল৷ শখের এই ক্যামেরাটা কিছুদিন আগেই কিনেছেন বাবা৷ অতএব আজকে এটার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবেন৷ বড়মা আর ঠাকুমা ভোগের কাজে ব্যস্ত৷ দালানজুড়ে পরপর চেয়ার রাখা হয়েছে৷ অতিথিদের জন্য৷ একটু পরেই আসতে শুরু করবেন সকলে৷ ঋভুর আবদারের কাগজের শিকলও লাগানো হয়েছে৷ কিছু ঠাকুরঘরে৷ আর কিছু দালানে৷ ‘পুরোহিতমশাই ফোন করেছিলেন৷ পৌনে এগারোটা নাগাদ আসবেন৷ ঠাকুরঘরে এসে দাঁড়ালেন নৃপেন্দ্র চৌধুরী, নূপুরদের ঠাকুরদা৷ হাতজোড় করে প্রণাম করলেন প্রতিমাকে৷ এই বাড়িতে প্রতি বছরই একইরকম প্রতিমা গড়ানো হয়৷ রুপোলি রঙের৷ নূপুরের আল্পনা দেওয়া শেষ৷ মায়ের পাশে গিয়ে বসল ও৷ অমিতাদেবী তখন ফল কাটছেন একের পর এক৷ বড় একটা বারকোশে কেটে রাখা ফলগুলো সাজাতে শুরু করল নূপুর৷
আজ রাতুলদের বাড়ি নেমন্তন্ন ওদের সকলের৷ সরস্বতী পুজো৷ তাই হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরেছে হৃদ৷ গালভর্তি দাড়িটা ট্রিম করেছে অনেকদিন পর৷ চুলে একটু জেল লাগিয়ে স্পাইকও করেছে৷ ‘তোকে দেখে সত্যিই মনে হচ্ছে আজ বাঙালিদের ভ্যালেন্টাইনস ডে,’ ছেলেকে দেখে ফুট কাটলেন হৃদের বাবা কৌশিকবাবু৷
—‘কী যে বলো না, বাবা! রাতুলদের বাড়ি যাচ্ছি,’ ঠোঁট বাঁকাল হৃদ৷
—‘সে যা৷ কিন্তু পথে যে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করবি—সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে৷ তা কবে থেকে চলছে এসব?’
—‘বাবা! ইউ আর ইম্পসিবল৷ আমি এলাম,’ জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে পড়ল হৃদ৷ বন্ধুরাও বেরিয়ে পড়েছে যে যার বাড়ি থেকে৷ অন্যান্য বছর এই দিনটা পাড়ার ক্লাবের পুজোতেই কাটায় হৃদ৷ আজ ওকে চলে যেতে দেখে সন্দিগ্ধ চোখে তাকাল সকলে৷ ‘বিকেলে আসবো,’ ওদের দিকে তাকিয়ে হাসল হৃদ৷
—‘গিটারটা নিয়ে আসিস, ভাই৷ গান গাইতে হবে!’
—‘আচ্ছা!’ বলে হাঁটা শুরু করল হৃদ৷ একটু আধটু গান গাইতে পারে ও৷ নিছক শখ৷ পাড়ার সব অনুষ্ঠানেই তাই ডাক পড়ে ওর৷
নূপুরকে দেখেই থমকে গিয়েছে হৃদ৷ অপরূপা লাগছে ওকে৷ সকলের সঙ্গে বসে পুজো দেখছে৷ ঋভু বসে আছে ওর কোল ঘেঁষে৷ দালানের চেয়ারে বসল হৃদরা৷ রাতুলও এসে বসল ওদের পাশে৷ গল্পগুজব শুরু হল নিজস্ব ছন্দে৷ হঠাৎ রাতুলের সামনে এসে দাঁড়াল নূপুর৷ ইশারায় বলল ‘ওপর থেকে থার্মোকলের প্লেটগুলো নামাতে হবে’৷ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রাতুল৷ জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় আছে ওগুলো?’ নূপুর জানাল ‘বারান্দায়’৷ হৃদ ওদের কথোপকথন দেখছিল চুপচাপ৷ নূপুরের ইশারার মানেগুলো যে ও বুঝতে পারছে, এতেই ভীষণ খুশি ও৷ রাতুল ততক্ষণে পা বাড়িয়েছে সিঁড়ির দিকে৷ নূপুরও ফিরে গেল ঠাকুরঘরের দিকে৷ যাবার আগে এক ঝলক তাকাল হৃদের দিকে৷ সত্যিই তাকালো না কি হৃদের মনের ভুল—কে জানে!
অঞ্জলি শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে৷ এবার প্রসাদ বিতরণের পালা৷ লাইন করে দাঁড়িয়েছেন সবাই৷ একে একে প্রসাদ নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন দালানে৷ প্রসাদ দিচ্ছে হীরকা আর নূপুর৷ লাইনের প্রায় শেষের দিকে দাঁড়িয়েছে হৃদ৷ যত এগোচ্ছে লাইন, তত টেনশন বাড়ছে ওর৷ হঠাৎ উঠে, ভিতরে চলে গেলেন হীরকা৷ নূপুর এবার একাই সামলাচ্ছে সবটা৷ হৃদকে দেখেই একটু গুটিয়ে গেল ও৷ জলদিহাতে একটা প্লেট তুলে এগিয়ে দিল৷ ঠিক এই মুহূর্তটারই অপেক্ষা করছিল হৃদ৷ সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে নূপুরকে ইশারা করে দেখাল ‘তোমাকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে’৷ তারপরই প্লেটটা নিয়ে হাঁটা লাগাল দালানের দিকে৷ মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে গিয়েছে নূপুরের চারপাশ৷ যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে ঘড়ির কাঁটা৷ একটা হলুদ পাঞ্জাবি পরা যুবককে ছাড়া আর কিছু দেখতেপাচ্ছে না ও৷ নূপুর শুনতেপায়৷ সেই জন্য বাড়ির কারোরই ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ’ শেখার প্রয়োজন হয়নি৷ তবে ওঁরা নূপুরের ইশারা বোঝেন৷ এই ছেলেটা সেখানে খামোখা এই ভাষা শিখতে গেল কেন?
কোনওরকমে বাকিদের হাতে প্লেট তুলে দিয়ে, দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল নূপুর৷ ওর মনে তখন কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছে৷ জলদি লিখে ফেলতে হবে সবকিছু ডায়েরিতে! ঘরে পৌঁছেই আলমারি থেকে ডায়েরিটা বের করল নূপুর৷ নতুন পৃষ্ঠার একদম ওপরে লিখল, ‘হৃদ...’৷
সেই প্রসাদ নেওয়ার পর থেকে নূপুরকে আর দেখতে পাচ্ছে না হৃদ৷ অল্প অল্প টেনশনও হচ্ছে ওর৷ মেয়েটা কি রাগ করল বা হার্ট হল? হৃদের কিন্তু এইরকম কোনও ইনটেনশনই ছিল না৷ ওর চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ওপরের বারান্দার দিকে৷ যদি দেখা যায় নূপুরকে! টিটো, রঙ্গন আর দীপ আলোচনা করছে ক্রিকেট নিয়ে৷ রাতুল ছাদে গিয়েছে৷ ওখানেই মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ হঠাৎ বারান্দার এককোণে নূপুরকে দেখতে পেল হৃদ৷ ঠিক ওর দিকেই তাকিয়ে আছে৷ কিছু বুঝতে না পেরে কাঁচুমাচু মুখ করে কান ধরে ফেলল হৃদ৷ উত্তরে ওকে উপরে উঠে আসতে ইশারা করলো নূপুর৷ বুক ঢিপঢিপ শুরু হয়ে গিয়েছে হৃদের৷ এখন ও উপরে উঠবে কী করে? কেউ দেখে ফেললে! তাছাড়া, টিটোদেরই বা কি বলবে? হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল ওর মাথায়৷ গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে ও বলল, ‘রাতুল আমায় উপরে ডাকছে৷ হেল্প দরকার৷ তোরা গল্প কর৷ আমি আসি৷’ তারপর এক মুহূর্তসময় নষ্ট না করে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে৷ সিঁড়ির ওখানেই দাঁড়িয়েছিল নূপুর৷ সঙ্গে ওর তিন চারজন বন্ধু৷ হৃদ উঠতেই ওর হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল নূপুর৷
এদিকটায় আগে কখনও আসেনি হৃদ৷ রাতুলের ঘর অন্যদিকটায়৷ নূপুর ওকে এনে দাঁড় করাল একটা ছোট্ট বারান্দা মতো জায়গায়৷ হরেকরকম গাছ লাগানো এখানে, একটা দোলনা আর একটা ছোট্ট গোল টেবিল৷ ওকে দোলনায় বসতে ইশারা করল নূপুর৷ তারপর জানতে চাইলো ‘আমার ভাষা তুমি আগেই জানতে না নতুন শিখেছ?’
—‘শিখেছি,’ আমতা আমতা করে বলল হৃদ৷ নূপুর আবার জানতে চাইল ‘কেন?’ এবার ওর ভাষাতেই ওকে উত্তর দিল হৃদ ‘তোমার বন্ধু হতে চাই— তাই!’ গাল বেয়ে জল নেমে এসেছে নূপুরের৷ দ্রুত হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে সেটা মুছে ফেলল ও৷ জিজ্ঞেস করল ‘ভালো লাগে আমায়?’
—‘উঁহু৷ ভালোবাসি৷’
—‘ইয়ার্কি কোরো না৷ আমি আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক নই৷’
—‘জানি৷ তুমি ইউনিক! সেই জন্যেই তো অন্যদের থেকে তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালো লাগে৷’
—‘দাদাভাই জানে?’
—‘না!’
—‘সবাই জানলে, খুব প্রবলেম হবে৷ তুমি বোঝার চেষ্টা করো৷’
—‘সেটা তখন দেখা যাবে৷ আপাতত তুমি উত্তর দাও৷’
—‘আমি কথা বলতে পারি না, হৃদ৷ মানিয়ে নিতে পারবে তুমি?’
—‘এই তো কথা বলছি আমরা,’ হেসে ফেলল হৃদ৷ হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ফ্রেন্ডস?’ একটু ইতস্তত করে হাত মেলালো নূপুর৷ হাসল অল্প৷ তারপর জানাল ‘সাইন ল্যাঙ্গুয়েজটা তোমার এখনও ঠিক সড়গড় হয়নি৷ আমি শিখিয়ে দেব!’
হৃদ এখন নূপুরের বেস্ট ফ্রেন্ড৷ এত ভালো বন্ধু এর আগে কখনও পায়নি নূপুর৷ সব কথা মন খুলে শেয়ার করা যায় হৃদের সঙ্গে৷ প্রায় রোজ রাতেই হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে ওরা৷ এই ক’দিনে নূপুরের সবথেকে বড় পাওয়া হল গায়ক হৃদ৷ বিভিন্ন গান রেকর্ড করে নূপুরকে শোনায় ও৷ ভীষণ ভালো লাগে নূপুরের৷ বন্ধুমহলে আর পরিচিত মানুষদের মাঝে গায়ক হিসেবে যথেষ্ট সুখ্যাতি আছে ওর৷ ‘তুমি সিঙ্গার হলে বেশ হয়,’ টাইপ করল নূপুর৷
—‘ছাপোষা মধ্যবিত্ত ছেলের এই পাড়ার ফাংশনই ঠিক আছে৷’
—‘মোটেই না৷ তুমি রিয়্যালিটি শোগুলোয় অডিশন দিতে পারো তো!’
—‘তুমি আমায় স্বপ্ন দেখাচ্ছ!’
—‘স্বপ্ন বাস্তবায়নেও সঙ্গী হতে চাই,’ উত্তর দিল নূপুর৷ তারপর মোবাইলটা রেখে ডায়েরি খুলে বসল৷ হৃদের সব সুখস্মৃতিই খাতাবন্দি করার চেষ্টা করে ও৷ কখনও বা ছন্দে বেঁধে কবিতার আকারে, কখনও গল্পের মতো৷ তবে হৃদ এখনও জানে না যে নূপুর লেখালেখি করে৷ আসলে বাড়ির বাইরে ওদের দেখা সাক্ষাৎ খুব একটা হয়নি৷ হৃদ মাঝেমাঝেই বায়না ধরে কলেজের পর নূপুরের সঙ্গে দেখা করার৷ রাজি হয় না নূপুর৷ লজ্জা মেশানো ভয় লাগে ওর৷ সমাজ কি আদৌ মেনে নেবে ওদের এই অসাধারণ সুন্দর সম্পর্ককে?
আজও আর একটা মন ভালো করা রবিবার৷ হৃদ আসবে৷ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে নূপুর৷ প্রিয় বারান্দাটায় বসেছে কয়েকটা গল্পের বই নিয়ে৷ এখান থেকে সদর দরজাটা স্পষ্ট দেখা যায়৷ ইদানীং আলাদা আসে হৃদ৷
সময়ের একটু বেশিই আগে৷ রাতুলের ঘরে গিয়ে গল্প করে বা দাবা খেলে৷ নূপুরও যোগ দেয় ওদের সঙ্গে৷ ‘দিদিভাই,’ ঋভু এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে, ‘আমায় কাগজের প্লেন বানিয়ে দিবি?’ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো নূপুর৷ তারপর ঋভুর হাত থেকে কাগজ নিয়ে প্লেন বানাতে শুরু করল৷ ‘অ্যাই নূপুর,’ রাতুলও এসেছে বারান্দায়৷ ঋভুর চুলটা ঘেঁটে দিতে দিতে বলল, ‘আমি একটু বেরোচ্ছি৷ প্রীতমদা মোড়ের মাথায় ডাকল৷ হৃদ এলে ওকে বলে দিস৷ আধ ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব৷’ তারপর হেঁটে চলে গেল দ্রুত৷
‘ওই দেখ, দাদাটা এসে গিয়েছে,’ সদর দরজার দিকে হাত দেখাল ঋভু, ‘আমি নিয়ে আসি ওকে?’ দশ নম্বর প্লেনটা বানাতে বানাতে ঘাড় নাড়ল নূপুর৷ লাফিয়ে বেরিয়ে গেল ঋভু৷ হৃদকে নিয়ে ফিরল তিন মিনিটের মধ্যেই৷ নূপুরকে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকাল হৃদ৷ তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘কী হচ্ছে এখানে ঋভুবাবু? অরিগ্যামি?’
—‘মানে?’ কৌতূহলী চোখে তাকাল ঋভু৷
—‘কাগজ দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানোকে অরিগ্যামি বলে৷ তবে তুমি তো কেবলই এরোপ্লেন বানাচ্ছ দেখছি!’
—‘আরও কিছু বানানো যায় বুঝি?’
—‘হুঁ৷ পাখি, সোফা, বাক্স বানানো যায়৷ নৌকা তো তুমি নিশ্চয়ই বানাতে পারো৷’
—‘তুমি আমায় পাখি বানিয়ে দেবে, দাদা?’ ঋভুর চোখে মুখে এক্সাইটমেন্ট৷
—‘দেব, কাগজ দাও,’ হাত বাড়াল হৃদ৷ আর সঙ্গে সঙ্গেই টেবিলে রাখা বইগুলোর মধ্যে থেকে নূপুরের কবিতা লেখার ডায়েরিটা বের করে আনল ঋভু৷ হৃদের হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা থেকে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নাও৷’ এতক্ষণ চুপ করে হৃদ আর ঋভুর কথোপকথন শুনছিলো নূপুর৷ ঋভুর এই পদক্ষেপটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল ওর৷ হৃদ ততক্ষণে ডায়েরি খুলে, কয়েকটা পাতা উল্টে পড়তে শুরু করেছে৷ তড়িৎগতিতে উঠে গিয়ে হৃদের কাছ থেকে ডায়েরিটা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল নূপুর৷ চেয়ার ছেড়ে উঠে ওর আয়ত্বের বাইরে চলে গেল হৃদ৷ প্রত্যেক পৃষ্ঠায় চোখ বোলাচ্ছে দ্রুত৷ পড়ছে৷ পাতা ওল্টানোর সময় অবিশ্বাসের চোখে দেখছে নূপুরকে৷ ওই দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে বেআব্রু হচ্ছে নূপুরের মন৷ ডায়েরি থেকে চোখ না সরিয়েই হৃদ জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার লেখা?’ সদর্থক মাথা নাড়লো নূপুর৷ ডায়েরিটা বন্ধ করে ঋভুর দিকে তাকাল হৃদ, ‘এই পৃষ্ঠায় হবে না, ঋভুবাবু৷ এগুলো অমূল্য৷ তুমি দৌড়ে গিয়ে অন্য কোনও কাগজ নিয়ে এসো৷’
কিচ্ছু বুঝতে না পারলেও চলে গেল ঋভু৷ আর সঙ্গে সঙ্গেই হাঁটুর ওপর বসে পড়ল হৃদ৷ বিহ্বল চোখে ইশারায় বলল, ‘জানাওনি তো?’
—‘সুযোগ হয়নি’, জানালো নূপুর৷
—‘ট্যালেন্টেড’!
—‘কেউ জানে না৷ শখে লিখি৷ কাউকে বোলো না প্লিজ’ হাতজোড় করল নূপুর৷
—‘হোয়াট? আচ্ছা! একটা রিকোয়েস্ট আছে৷ করি?’
—‘করো’৷
—‘এই ঘুমিয়ে থাকা কবিতাগুলো আমার হাতে আড়মোড়া ভাঙুক প্লিজ৷ আমি গান বাঁধব এদের নিয়ে!’
—‘সত্যি?’ নূপুরের চোখে জল৷ কিন্তু তারপরেই নিজেকে সামলে নিল ও৷ হাতনেড়ে জানাল— ‘নাহ! আমার নাম চাউর হোক, আমি চাই না৷’
—‘তবে ছদ্মনামে হোক৷’
—‘কী নামে?’
—‘কথিকা!’ স্মিত হাসল হৃদ৷ ততক্ষণে বহু রঙিন কাগজ নিয়ে ফিরে এসেছে ঋভু৷ নিজেকে সামলে নিয়ে ওর হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল হৃদ৷ আড়চোখে দেখল হাতের উল্টোপিঠে চোখের জল মুছছে নূপুর৷ ইশারায় বলল, ‘তবে ডায়েরিটা তোমার কাছেই থাক!’
সাতবছর পর...
জলদি হাতে চোখে কাজল লাগাচ্ছে নূপুর৷ নূপুর সান্যাল চৌধুরী৷ হৃদের পছন্দ করে দেওয়া শাড়িটা বিছানার ওপর রাখা৷ এখন তিনটে বাজছে৷ সাড়ে চারটে নাগাদ গাড়ি আসবে ওকে নিয়ে যেতে৷ বেডরুম থেকে বেরিয়ে হৃদের মিউজিক রুমে গিয়ে ঢুকল নূপুর৷ স্টুডিয়োও বলা যায় এটাকে৷ চারিদিকে ছড়ানো কাগজ, বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র, হেডফোন৷ তবে কম্পিউটারের ওপর খুব যত্নে রাখা সেই গোলাপি ডায়েরিটা৷ নূপুরের কবিতার ডায়েরি৷ কথিকার কবিতার ডায়েরি৷ কলেজ শেষ হওয়ার পরপরই একটা রিয়েলিটি শো-এ পার্টিসিপেট করেছিল হৃদ৷ টপ ফাইভে উঠে এলিমিনেটেড হয়ে যায়৷ তবে দর্শকমহলে সাড়া ফেলেছিল খুব৷ তারপর ইউটিউবে চ্যানেল খুলল৷ ওর চ্যানেলের বিশেষত্ব ছিল অরিজিনাল গান৷ অল্প দিনেই খুব পপুলার হয়ে গিয়েছিল চ্যানেল৷ লিরিক্স পছন্দ করে কথিকার খোঁজও নিয়েছেন অনেকে৷
তবে নূপুর আড়ালেই থেকেছে৷ কতদিন এমন হয়েছে যে রাত জেগে কবিতা লিখে দিয়েছে নূপুর আর পরের দিনই তাতে সুর দিয়ে গান বেঁধেছে হৃদ৷ ‘বৌমা,’ নূপুরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন হৃদের বাবা, ‘রেডি হয়ে নাও৷ যেতে হবে তো!’ মাথা নেড়ে আবার স্টুডিয়োর দরজা ভেজিয়ে দিল নূপুর৷ পা বাড়াল বেডরুমের দিকে৷
‘হৃ...দ হৃদ,’ এই ছন্দে গর্জে উঠছে গোটা অডিটোরিয়াম৷ চিৎকারে কান পাতা দায়৷ নূপুররা যখন পৌঁছল তখন আর তিলধারণের জায়গা নেই৷ আশাতীত রেসপন্স৷ এতটা সত্যিই আশা করেনি ওরা৷ ব্যাকস্টেজে কোম্পানির লোকেরা নিজেদের কাজকর্ম করছেন আর নার্ভাসমুখে বসে আছে হৃদ৷ নূপুরদের দেখে উঠে এল৷ ওর মাথায় হাত রাখলেন কৌশিক, ‘অবশেষে স্বপ্ন সফল৷ অ্যালবাম বেরোচ্ছে আমার ছেলের!’ বাবাকে জড়িয়ে ধরল হৃদ৷ এবার ওর স্টেজে ঢোকার পালা৷
প্রথমে ইউটিউবের হিট গানগুলোর মধ্যে থেকে দুটো গাইল হৃদ৷ তারপর নতুন অ্যালবামের একটা গান৷ ততক্ষণে এসে গিয়েছেন বসুধা চক্রবর্তী৷ হৃদের ছোটবেলার গানের শিক্ষিকা৷ তিনিই ফিতে কাটবেন অ্যালবামটির৷ শ্রোতাদের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে বসে আছেন নূপুরের পরিবারের সক্কলে৷ ঋভুর হাতে একটা প্ল্যাকার্ড৷ সবসময় হৃদ-নূপুরের পাশে ছিলেন ওঁরা৷ আজ ওঁদেরও ভীষণ খুশির একটা দিন৷ অ্যালবামের নামটা খুব সুন্দর ‘হৃদকথা’৷ প্রত্যেকটা গানই নূপুরের লেখা আর সুর এবং কণ্ঠ হৃদের৷ লঞ্চ করার পর সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে মাইক হাতে নিল হৃদ৷ বলল, ‘আরও একটা সারপ্রাইজ বাকি৷ আপনারা চেয়েছিলেন কথিকা সামনে আসুক৷ আর আজ সে রাজি হয়েছে৷’ আবার গর্জে উঠল পুরো হল৷ হাত ধরে নূপুরকে স্টেজে নিয়ে এলো হৃদ, ‘মিট মাই ওয়াইফ নূপুর, ওরফে কথিকা৷’ আজ আর হাতের চেটো ঘামছে না নূপুরের৷ নার্ভাসও লাগছে না৷ সকলের উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে নমস্কার জানাল ও৷ তারপর ইশারায় বোঝাল, ‘আয়্যাম মিউট৷’ ওর ইশারা মাইকে অনুবাদ করে দিচ্ছে হৃদ৷ গোটা হল পলকে নিস্তব্ধ৷ নূপুর আবার বলল, ‘তবে কমিউনিকেট করতে পারি৷ কথা বলতে আমার বাকযন্ত্রের দরকার হয় না৷ আমি একটু অন্যভাবে কথা বলি৷ একটু স্পেশাল ভাবে৷ আর তোমাদের কাছে আমার সেই কথা পৌঁছয় গানের মাধ্যমে৷ হৃদের সুরে কথা ভরি আমি৷ আমি সত্যিই কথিকা!’ নূপুর শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা হল ফেটে পড়ল হাততালিতে৷ হৃদ আর নূপুর দু’জনেরই চোখ চিকচিক৷
তবে মুহূর্তটা ছবিবন্দি হওয়ার আগেই চোখ মুছে ফেলল দু’জনে৷ হৃদ গান ধরল, ‘তোর জন্য আকাশপুরের মেঘ পাঠালাম...৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন