পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়
‘দাদা, ভবানীপুর যাবেন?’ সামনে দাঁড়ানো হলুদ ট্যাক্সির জানলার সামনে ঝুঁকল নেত্র৷ ট্যাক্সিওয়ালা উদাস চোখে ওকে একবার দেখে নিয়ে ঘাড় নাড়লেন ওপর নীচে৷ দ্রুত পিছনের দরজা খুলে সিটে বসে পড়ল নেত্র৷ খিদেও পেয়েছে বেজায়৷ কিন্তু কিচ্ছু করার নেই আজ৷ সকালে খবরটা শোনার পর থেকেই পেটের মধ্যে কেমন যেন গুড়গুড় করছে ওর৷ আহুতি ফিরে এসেছে৷ প্রায় সাড়ে চার বছর পর, ওর প্রিয় কানাডা ছেড়ে, নিজের বিদেশি বয়ফ্রেন্ডকে ছেড়ে, তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিয়ে আহুতি ফিরে এসেছে এই কলকাতায়৷ আর তারপর মেহুলকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে যে ও নেত্রর সঙ্গে দেখা করতে চায়৷ প্রথমে তো নিছক মজা ভেবে পুরো ব্যাপারটাই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল নেত্র৷ কিন্তু তারপর একে একে সাগ্নিক, ঋতুপর্ণারাও কনফার্ম করল খবরটা৷ ফেসবুকে তৎক্ষণাৎ আহুতির নাম লিখে সার্চ দিয়েছিল নেত্র৷ কিন্তু ওর প্রোফাইল শো করেনি৷ অর্থাৎ এখনও নেত্রকে ব্লকলিস্টেই রেখেছে আহুতি৷ তাহলে এহেন ডাক পাঠানোর কারণ কী! অবাক হল নেত্র৷ তবে আহুতি সংক্রান্ত কোনও ব্যাপারই লজিক দিয়ে কখনও ভাবতে পারে না ও৷ আর এতদিন পরেও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে আহুতির কথা উঠলেই বুকের বাঁপাশটা আলতো চিনচিন করে৷ ‘দাদা, এসে গিয়েছি কিন্তু৷ কোথায় দাঁড়াব বলবেন!’ ট্যাক্সিওয়ালার ডাকে সম্বিত ফিরল নেত্রর৷ ঝটিতি চারদিকটা একবার দেখে নিল ও৷ বাঁদিকের ওই গলিটায় ঢুকলেই আহুতিদের বাড়ি৷ তবে এতদিন পরে ওদের বাড়ি যাচ্ছে, কিছু একটা নিয়ে যাওয়া উচিত৷ ‘এখানেই রাখুন, দাদা,’ বলে নেমে পড়ল নেত্র৷ ভাড়া মিটিয়ে পিছিয়ে গেল কয়েক পা৷ ভাল একটা মিষ্টির দোকান আছে এখানে৷ কুড়িটা রসগোল্লা কিনে নেত্র পা বাড়াল আহুতির বাড়ির দিকে৷ ঠিক পাঁচ মিনিট পর ইঁটরঙা বড় বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল ও৷ কাঁপা হাতে কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলেন লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধ৷ নেত্র চেনে এঁকে— হরদা৷ আহুতিদের বাড়ির সর্বক্ষণের হাউজহেল্প৷ চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে অনেকটাই৷ হরদা চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখলেন নেত্রকে৷ চিনতে পারলেন বোধ হয়— সরে গেলেন দরজা থেকে৷ হাঁক পাড়লেন, ‘দিদিমণি, তোমার বন্ধু এসেছে৷’ স্মিত হেসে মিষ্টির হাঁড়িটা হরদার হাতে দিয়ে স্নিকার্সের লেস খুলতে বসল নেত্র৷
‘এসেছিস?’ বহু পরিচিত এই গলার স্বরটা এতদিন পরেও আমূল কাঁপিয়ে দিল নেত্রকে৷ আহুতি৷ সিঁড়ির সামনেটায় এসে দাঁড়িয়েছে৷ সাদা টপ, নীল পাজামা, কোমর অবধি লম্বা চুলগুলো এখনও সেই আগের মতো অগোছালো ভাবে খুলে রাখা৷ ও রোগা হয়ে গিয়েছে অনেকটা৷ কিন্তু তবুও চেহারায় সেই লালিত্যটা আছে৷ একবার তাকালে, চোখ ফেরানো যায় না৷ ‘হুঁ৷ ডাক পাঠালি যখন, তখন তো আসতেই হবে,’ হাসল নেত্র৷ —‘চল৷ আমার ঘরে চল,’ হাসিমুখে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল আহুতি৷ ওর পিছন পিছন নেত্র৷ একইরকম আছে ঘরটা৷ বিশাল একটা খাট, কাবার্ড, স্টাডি টেবিল, চেয়ার, ড্রেসিং টেবিল, লাগোয়া বারান্দা৷ এসি চলছে৷ খাটের ওপর বসল আহুতি, ‘কী রে? বোস৷ কেমন আছিস?’ —‘ভাল,’ হাসল নেত্র৷ স্টাডি টেবিলের পাশ থেকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসল৷ কোনও এক অজানা কারণে আহুতির বিছানায় বসতে ইচ্ছে করল না ওর৷ ওকে দু’পলক দেখল আহুতি৷ চোখে এক বিচিত্র ব্যঙ্গ৷ ‘তুই কেমন আছিস—বল! আমাকে ব্লক লিস্ট থেকে মুক্তি দিসনি! অথচ ডাক পাঠিয়ে একদম সোজা বাড়িতে আসতে বলেছিস৷ এখনও একইরকম আনপ্রেডিক্টেবল আছিস,’ প্রসঙ্গ বদলাতে বদ্ধপরিকর নেত্র৷ —‘তুই বুঝি বদলে গিয়েছিস?’ আহুতির গলায় রহস্য৷ —‘না তো!’ নেত্র অপ্রস্তুত৷ —‘শুনেছি এখনও না কি একটাও গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করতে পারিসনি!’ —‘এসব ছাড়৷ তুই কেন ডেকেছিস সেটা বল,’ হাসার চেষ্টা করল নেত্র৷ —‘চাকরি চাই৷ তবে সেটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না৷ ওটা আমি জোগাড় করে নেব৷ তুই আমায় একটা বাড়ি খুঁজে দে৷’ —‘বাড়ি খুঁজে দেব,মানে? তোর এত বড় বাড়ি...৷’ —‘...উঁহু উঁহু! এটা বাবার বাড়ি৷ আই ওয়ান্ট টু হ্যাভ মাই ওন প্লেস৷ তবে এখনই কিনব না৷ রেন্টে নেব৷ উত্তর কলকাতায় হলে ভাল হয়৷ ওখানকার এসেন্সটা আমার বড্ড প্রিয়৷’ —‘ইয়ে, মানে অ্যাঙ্কল-অ্যান্টি জানেন?’—‘এতে জানা না জানার কী আছে? আমার লাইফ৷ আমার ডিসিশন৷’ —‘আর কানাডা? কানাডা ফিরবি না?’ —‘নাহ!’ আহুতি চোয়াল শক্ত করল, ‘যা ছেড়ে এসেছি, ছেড়েই এসেছি৷ সেখানে ফেরার কোনও প্রশ্নই ওঠে না৷’
—‘শুনেছিলাম তুই না কি...’ কথা হাতড়াতে শুরু করল নেত্র৷ এই ওর একটা স্বভাব৷ কিছুতেই কোনও তিক্ত প্রসঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারে না৷ ওর অভিব্যক্তিটা বুঝল আহুতি, ‘কী শুনেছিলি? বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে লিভ-ইন করতাম—এই তো? হুঁ করতাম৷ দেন আই কনসিভড আ ফিউ মান্থস ব্যাক৷ তারপরই সরে গেল ও৷ হি প্রব্যাবলি ডাজ নট উইশ ফর আ বেবি রাইট নাও৷ কিন্তু তাই বলে আই কান্ট কিল আ লাইফ৷ অগত্যা চলে এসেছি,’ শেষ ক’টা শব্দে গলা বুজে এল আহুতির৷
—‘তু...তুই এখন প্রেগন্যান্ট?’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে নেত্র, ‘তুই একা কেন থাকবি দেন? কেউ সঙ্গে থাকলেই তো বেটার হয়৷’
—‘প্রেগনেন্সি ইজ নট আ সিকনেস যে আমাকে সর্বক্ষণ দেখভাল করে রাখতে হবে৷ এটা ভীষণ নরম্যাল একটা ব্যাপার৷ আমার কাউকে লাগবে না৷ তুই বাড়ির খোঁজ শুরু কর৷ এখানে আমার দম আটকে আসছে,’ পাশে রাখা জলের বোতল খুলে দু’ঢোক জল গলায় ঢালল আহুতি৷ ওকে অপলক দেখল নেত্র৷ আহুতি চিরকালই ঝড়ের মতো৷ শান্ত হয়ে আসে৷ নিজে অবিচল থেকে বাকি সকলকে নাড়িয়ে দিয়ে চলে যায়৷ মেহুল, সাগ্নিকরা পইপই করে নেত্রকে বলেছে আহুতির কোনও আবদার নিজের গণ্ডির বাইরে গিয়ে না মেটাতে৷ কিন্তু আহুতিকে না করার কথা ভাবতেই পারে না নেত্র৷ ওই নীল চোখদু’টোকে ফেরানোর আগেই বুক চিনচিন শুরু হয়ে যায়৷ ‘কী রে? কী ভাবছিস? পারবি না?’ আবার জিজ্ঞেস করল আহুতি৷
—‘হুঁ,’ উঠে দাঁড়াল নেত্র, ‘দেখছি৷ আজ আমি আসি৷ তোর ফোন নম্বরটা আমায় টেক্সট করিস৷ এই যে আমার কার্ড৷’
—‘এক্ষুনি চলে যাবি? খেয়ে যা কিছু৷’
—‘না, থাক!’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল নেত্র৷ এই দায়িত্বটা নেওয়া ঠিক হবে না—ও জানে৷ কিন্তু আহুতি একাই বা কী করে ম্যানেজ করবে সবটা! বন্ধু হিসেবে ওর পাশে থাকা উচিত নেত্রর৷ আচ্ছা, ওরা কি শুধুই বন্ধু ছিল? দিনের পর দিন ময়দানে হাত ধরে ঘোরা, উইকেন্ডে কলকাতা চেনা, নন্দনে সিনেমা বা অ্যাকাডেমিতে থিয়েটার—সবটাই যদি নিছক বন্ধুত্বই ছিল, তাহলে ভবিষ্যতের আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখাত কেন আহুতি? কানাডা যাওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে নেত্রকে ও জানিয়েছিল খবরটা৷ ‘আর আমাদের কী হবে?’ জিজ্ঞেস করেছিল নেত্র৷
—‘কী হবে?’
—‘আমাদের ভবিষ্যৎ?’
—‘আমাদের না৷ তোর আর আমার৷ আলাদা আলাদা ভবিষ্যৎ৷ সেটা তো নিজেদেরই বুঝে নিতে হবে৷ আসি৷ টা টা,’ বলে চলে গিয়েছিল আহুতি৷ তারপর সোশাল মিডিয়া থেকে ব্লক করেছিল নেত্রকে৷ ওদের রিলেশনশিপটা ওপেন সিক্রেট ছিল বন্ধুদের মধ্যে৷ আহুতি চলে যাওয়ার পর সকলে জিজ্ঞেস করেছিল নেত্রকে৷ ঠোঁটে হাসি টেনে নেত্র বলেছিল, ‘রিলেশনশিপ আবার কী? সবটাই বন্ধুত্ব!’
‘নেত্রদা, এই সপ্তাহের অ্যাড বাজেট কত যাবে?’ চশমার ওপর দিয়ে জিজ্ঞেস করল নদী৷
—‘তিরিশ দাও৷ মিড উইকে সেল বাড়লে তখন আবার দেখা যাবে৷’
—‘আচ্ছা!’ বলে নিজের ডেস্কের দিকে ছুটল নদী৷ ওর উৎসাহ দেখে হাসি পেয়ে গেল নেত্রর৷ নদী এই কম্পানির নতুন মার্কেটিং ইন্টার্ন৷ নামের মতোই মেয়েটাও ভীষণ উচ্ছ´ল৷ প্রাণবন্ত৷ সাধারণত ইন্টার্নরা খুব বেশি কাজ করতে চায় না৷ কিন্তু নদীর সবেতেই আগ্রহ৷ ডেস্কওয়ার্ক থেকে প্যাকেজিং— দায়িত্ব নিয়ে সামলে দেয়৷ শি ইজ লিটেরালি অল ওভার দ্য প্লেস৷ নেত্রই ওর ইমিডিয়েট সিনিয়র৷ মেয়েটা প্রথমদিন ওকে ‘স্যার’-ই বলেছিল৷ কিন্তু সম্বোধনটা বড্ড ভারী ঠেকেছিল নেত্রর৷ ও বলেছিল, ‘আমাকে তুমি দাদা-ই বলো৷’ একগাল হেসে সায় দিয়েছিল নদী৷ তারপর থেকে ‘নেত্রদা!’ ‘নেত্রদা!’ করে অফিস মাথায় করে রাখে৷ মন্দ লাগে না নেত্রর৷ আসলে এত ইম্পর্ট্যান্স ওকে সাধারণত কেউ দেয় না৷ নদীর আগেও একাধিক ইন্টার্ন এসেছিল৷ কিন্তু তারা দু’দিনেই নেত্রকে টপকে ম্যানেজার, এইচ আর অবধি পৌঁছে গিয়েছিল৷ তবে নদী অন্যরকম৷ নেত্রকে না জিজ্ঞেস করে কিচ্ছুটি করে না৷ গতকাল আহুতিদের বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই নেত্রর মাথা কাজ করছে না৷ কী করা উচিত, কী করা উচিত না—সব গুলিয়ে যাচ্ছে৷ গতকাল রাতেই মেহুলকে ফোন করে সবটা জানিয়েছিল ও৷ ভীষণ রেগে গিয়ে ওকেই অনেকগুলো কথা শুনিয়ে দিয়েছে মেহুল৷ আর কখনও আহুতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পইপই করে বারণ করে দিয়েছে৷ ‘আচ্ছা, ঠিক আছে,’ বলে ফোন কেটে দিয়েছিল নেত্র৷ আহুতি নিজের ফোন নম্বর গতকালই পাঠিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু নেত্র সেভ করেনি নম্বরটা৷ অনিশ্চয়তায় ভুগলে এইরকমই হয় ওর৷ কী করবে বুঝে উঠতে পারে না৷ ছোট ছোট কাজগুলো গুলিয়ে যায়৷ ‘কী ভাবছেন? লাঞ্চ করবেন না?’ নিজের টিফিন বক্স নিয়ে নদী এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে৷
—‘হুম৷ তুমি যাও৷ আমি আসছি,’ হাসল নেত্র৷ —‘জলদি আসবেন,’ বলে চলে গেল নদী৷ ওরা যে একসঙ্গে পাশাপাশি বসে লাঞ্চ করে—এমনটা মোটেই নয়৷ তবুও এই কথাটা বলে নদী৷ মায়েদের মতো একটা আগলে রাখার স্বভাব আছে ওর৷ সবাই নিজেদের লাঞ্চবক্স নিয়ে ক্যান্টিনের দিকে এগোলে, আহুতির নম্বরটা ডায়াল করল নেত্র৷ বেশ কিছুক্ষণ পর, ফোন ধরল আহুতি, ‘হুঁ৷ বল?’ —‘ইয়ে, আমি বাড়ি পাইনি৷ মানে ওই রেন্টের জন্যই আর কী! সরি৷’ —‘ওরা তোকে আমায় হেল্প করতে বারণ করে দিয়েছে৷ তাই না?’ —‘কারা?’ আকাশ থেকে পড়ল নেত্র৷ এইরকম উত্তর ও আশা করেনি৷ —‘কেন? মেহুল, সাগ্নিক, ঋতুপর্ণারা?’ আহুতির গলায় শ্লেষ৷ —‘না তো!’ ঢোক গিলল নেত্র, ‘হোয়াই উড দে ডু দ্যাট? আমি সত্যিই খোঁজ পাচ্ছি না৷’ —‘হুম,’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আহুতি, ‘রাখছি, রে! কাজ আছে৷’ তারপর নেত্রকে অবাক করে সত্যিই ফোনটা কেটে দিল৷ টেবিলে মোবাইলটা রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল নেত্র৷ একটা সমাধানে আসা খুব জরুরি৷ মাথার ভিতর সমস্ত লজিক আর রিজনিং ঘোরাফেরা করছে একের পর এক৷ মনে হচ্ছে—আহুতির সঙ্গে যোগাযোগ না রাখাই ভাল৷ কিন্তু পরক্ষণেই আবার বেঁকেও বসছে মন৷ নেত্র সত্যিই কোনও ব্রোকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি৷ তবে এখন মনে হচ্ছে করতেই হবে৷ ‘কী হল? শরীর খারাপ না-কি?’ নদীর গলায় চমকে উঠল নেত্র৷ —‘না তো৷ এই তো যাচ্ছি আমি খেতে৷ তোমার খাওয়া শেষ?’—‘উঁহু! আপনি আসছেন না দেখে, খোঁজ নিতে এলাম!’ —‘দ্যাটস সো সুইট অব ইউ,’ হাসল নেত্র৷ —‘হি হি! আসুন,’ বলে আবার ক্যান্টিনের দিকে হাঁটা লাগাল নদী৷ ওর পারফিউমের গন্ধটা ভীষণ স্ট্রং৷ এখনও নেত্রর নাকে এসে লাগছে৷ কোনও এক অজানা ফুলের গন্ধ৷ ব্যাগ থেকে লাঞ্চবক্সটা বের করে ডেস্ক থেকে বেরিয়ে এল নেত্র৷
অটোস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে নদী৷ আজ অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে এসেছে ও৷ একবার ডাক্তারকাকুর কাছে যেতে হবে৷ বাবার ব্লাড-রিপোর্টটা দেখাতে৷ সকালে অফিসে ঢুকেই নেত্রদাকে জানিয়েছিল ও যে আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবে৷ কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে মুখ না তুলেই সায় দিয়েছিলেন নেত্রদা৷ অদ্ভুত শান্ত লোক৷ কোনও কিছুতেই যেন ওঁর কিচ্ছু যায় আসে না৷ নিজের কোনও ডিসিশনই জুনিয়রদের উপর চাপিয়ে দেন না৷ উল্টে জুনিয়রদের যে কোনও আইডিয়াই খুব মন দিয়ে শোনেন৷ সো কলড সিনিয়র বললেই যে ইমেজটা মনে ভেসে ওঠে, উনি একেবারেই তা নন৷ নদীর তো খুব ভাল লাগে ওঁকে৷ আজকে ফিন্যান্সের পারমিতা বলছিলই, ‘তুই তোর সিনিয়রকে দেখলেই যা ব্লাশ করিস!’ লজ্জায় দ্রুত টপিক বদলে ফেলেছিল নদী৷ এই ভাললাগাগুলো লুকিয়ে রাখাই ভাল৷ এরা মাঝরাতের কালবৈশাখীর মতো৷ পরদিন সকালের সূর্য তার সমস্ত চিহ্ন মুছে দেয়৷ একটা অটো গোলচক্করটা ঘুরে দাঁড়াতেই, দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়ল নদী৷ এই চত্বরে অনেক নতুন দোকান খুলেছে৷ আলোয় ছয়লাপ পুরো রাস্তা৷ মেট্রো স্টেশনের সামনে নামতেই পকেটে ফোনটা বেজে উঠল ওর৷ একটা আননোন নম্বর৷ একটু ভেবে কলটা রিসিভ করল নদী, ‘হ্যালো?’
—‘নদী, নেত্র বলছি৷’
—‘ওহ! হ্যাঁ, বলুন৷’
—‘এইটা আমার পার্সোনাল নম্বর৷ এনিওয়ে, আগামিকাল একটা মিটিং আছে স্পনসরদের সঙ্গে৷ ওভার ব্রেকফাস্ট৷ ওরা একটা ইভেন্ট অর্গানাইজ করতে চায়৷ আই ওয়ান্ট ইউ টু বি দেয়ার৷ অসুবিধে নেই তো?’
—‘নাহ! অসুবিধে কীসের? এটা তো একটা অপরচুনিটি৷’
—‘ওকে দেন! শার্প নাইন৷ চাঁদনি চক মেট্রো স্টেশনের বাইরে যে সাউথ ইন্ডিয়ান ফুড জয়েন্টটা আছে ওখানে৷’
—‘ওকে, দাদা৷ কোনও ডকুমেন্ট বা সামথিং নিয়ে যেতে হবে?’
—‘আমি মেইল করে দিচ্ছি তোমায় ডিটেইলস৷ বাই৷’
—‘বাই!’ বলে ফোন কেটে দিল নদী৷ তারপর মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে দৌড়ল মেট্রো ধরার জন্য৷
অফিস থেকে বেরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হাঁটল নেত্র৷ যদি মাথাটা একটু কাজ করে! বাড়ি ফেরার তাড়া ওর কোনওকালেই থাকে না৷ তবে জলদি ফিরলে যে বাবা মা খুশি হন—সেটা ও বোঝে৷ আহুতির ব্যাপারটা মন থেকে মুছছেই না৷ করবে না করবে না ভেবেও শেষমেশ ব্রোকারকে ফোনটা করেই ফেলল নেত্র৷ ব্রোকার মানে অসীমদা৷ কিছু লোক হয় না, যারা জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সব পারে৷ অসীমদা সেইরকমই একজন লোক৷ পেশাগতভাবে প্রোমোটার৷ কিন্তু এইসব কাজও পলকে করে দিতে পারে৷ ‘বল, ভাই?’ ওপারে অসীমদা’র গলা শুনেই বোঝা গেল বেশ খোশমেজাজেই আছেন৷
—‘দাদা, নর্থ কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট মিলতে পারে? ভাড়ায়৷ দমদম টু শোভাবাজার—যেখানে খুশি৷’
—‘সে কি? তুই বাড়ি ছাড়ছিস না কি?’
—‘না না! আমার জন্য না৷ আমার এক বন্ধু...ইয়ে মানে বান্ধবীর জন্য৷’
—‘মেয়ে? কলকাতায় নতুন? তা কম দামে অনেক পিজি পাবে তো৷ সেসব দেখতে বল৷ ভাড়ার ফ্ল্যাটে ঝক্কি অনেক৷ টাকার অঙ্কটাও বেশ বড়!’
—‘কলকাতায় নতুন না৷ এই শহরেরই বাসিন্দা৷ এবার বাড়ি ছেড়ে ইন্ডিপেনডেন্টলি থাকতে চায়৷’
—‘এই হচ্ছে তোমাদের বাড়াবাড়ি৷ নিজের বাড়ি থাকতে আবার নতুন বাড়ি দেখার কী আছে? এসব আমি বুঝি না...৷’
—‘...আহ, অসীম’দা!’ গলার স্বরে অনেকটা বিরক্তি ঝরিয়ে দিল নেত্র, ‘ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে কি না- তাই বলো৷’
—‘আচ্ছা, দেখছি৷ কাল-পরশুর মধ্যে জানাচ্ছি৷’
—‘ওকে! জানিও,’ বলে ফোন কেটে দিল নেত্র৷ মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে একটা শপিং মলে ঢুকল৷ প্লে-এরিয়ায় গিয়ে ভিডিও গেম খেলল কিছুক্ষণ৷ তারপর মনটা একটু শান্ত হলে একটা ফুডজয়েন্টে ঢুকে ডিমসাম খেল বেশ অনেকগুলো৷ একটু থুকপাও খাওয়া যেত৷ কিন্তু ইচ্ছে করেই খেল না৷ বাড়ি ফিরে মাছের ঝোল আর ভাত মুখে না তুললে মা রাগ করবেন৷ একটা অনলাইন ক্যাব বুক করতে করতে মল থেকে বেরিয়ে এল নেত্র৷ গন্তব্য বাড়ি৷
আহুতির আজকাল সবকিছুই বিস্বাদ লাগে৷ ডাক্তারবাবু বলেছেন একদম লাইট খাবার খেতে৷ হরদা সেই মতোই বানিয়ে দেয়৷ আজ দিয়েছে ভাত, মুসুর ডালের জল আর একদম সাদা আলুপোস্ত৷ প্রায় তিন বছর পর ফিরে এসে যখন ও বাড়ির কলিংবেলটা বাজিয়েছিল, দরজা খুলে প্রথমে দৃশ্যটা বিশ্বাস করতে পারেনি হরদা৷ তারপর আকুল হয়ে কেঁদে উঠেছিল৷ আহুতি জানত বাবা-মা কলকাতায় নেই৷ পুনেতে৷ দাদাইয়ের কাছে৷ তবে হরদা কিন্তু সেই প্রথম দিন থেকেই যত্নে ত্রুটি রাখেনি৷ জানতে চেয়েছিল, ‘একদম সাদা খাবার কেন খাবে? তুমি তো মশলাদার খাবার ছাড়া খেতেই পার না৷’
—‘ও’দেশে তোমার মতো কেউ রাঁধতেই পারে না৷ তাই স্পাইসকে টা টা করে দিয়েছি,’ হেসেছিল আহুতি৷ সত্যিটা বাড়ির কাউকেই জানায়নি ও৷ নেত্রকেও না৷ ওর জন্য ভাড়া বাড়ির ব্যবস্থাটা যাতে তাড়াতাড়ি হয় সেই জন্য একটু মিথ্যে বলেছে যে ও প্রেগন্যান্ট৷ কথাটা ভাবতেই হাসি পেয়ে গেল আহুতির৷ ডেভিডকে যখন ফিরে আসার কথাটা জানায়, আকাশ থেকে পড়েছিল ও৷ কিচ্ছু বুঝতে না পেরে বলেছিল, ‘হোয়াট?’ —‘আয়্যাম ব্রেকিং আপ উইথ ইউ, ডেভিড৷ গুড বাই,’ দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ক্যাবে চড়ে বসেছিল আহুতি৷ গন্তব্য ছিল এয়ারপোর্ট৷ অনেকবার কল করেছিল ডেভিড৷ আহুতি রিসিভ করেনি৷ এখন তো নম্বর বদলে গিয়েছে৷ মেইল, ফেসবুক মেসেঞ্জার ইত্যাদি অনেকরকম সোশাল মিডিয়ায় নিয়মিত মেসেজ পাঠায় ডেভিড৷ তবে সেসব আজকাল খুলেও দেখে না আহুতি৷ কেবল ড. স্টফারের মেইলের রিপ্লাই দেয়৷ বাকি সময়টা গল্পের বইগুলোর সঙ্গে কাটায় ও৷ মুভি দেখে ল্যাপটপে৷ যোগা করে একটু আধটু৷ রোগটা ধরা পড়ার পরপরই আহুতি ঠিক করে নিয়েছিল ও কলকাতায় ফিরবে৷ তারপর জীবনের শেষ দিনগুলো নিজের মতো করে কাটাবে৷ ডেভিডের কাছ থেকে সবটা লুকিয়ে কলকাতায় ফেরার প্রস্তুতি নিতেএক মাস সময় লেগেছিল ওর৷ প্রত্যেকটা মুহূর্তেই ওর মনে হত ডেভিডকে ও ঠকাচ্ছে৷ অভিনয় করছে৷ কথাগুলো ভাবলেই চোখ জ্বালা করে ওঠে৷ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে খাওয়ায় মন দিল আহুতি৷ ছোটবেলা থেকেই ও ভীষণ হুজুগে৷ যখন যা মনে হয়েছে, সেটাই করেছে৷ ঘুরতে চলে গিয়েছে একা একাই৷ অনেকেই বিভিন্নরকম কথা বলেছেন ওর পিছনে৷ সে সবে কান দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেনি ও৷ তবে নিজের কাছে সবসময় সৎ থেকেছে৷ একটাই প্রেম ওর জীবনে—ডেভিড৷ কলেজ লাইফে সবাই ভাবত নেত্রর সঙ্গে একটা সম্পর্ক আছে ওর৷ ইনফ্যাক্ট নেত্র নিজেও তাই-ই ভাবত বোধ হয়৷ কিন্তু আহুতির কাছে হি ওয়াজ অলওয়েজ আ বাডি৷ বেস্ট ফ্রেন্ড৷ সেই জন্যই তো এখানে আসার পর ওর খোঁজই সবার আগে করেছিল আহুতি৷ নেত্রকে ফেসবুকে ব্লক করার একটাই কারণ—নেত্রর ওর প্রতি অবসেশনটা কাটিয়ে দেওয়া৷ তবে গতকাল বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা করে আহুতি বুঝতে পেরেছে, খুব বেশি কিছু বদলায়নি৷ অবসেশন কেটে গেলেও, নেত্র ওকে পুরোপুরি ভুলতে কখনওই পারেনি৷ ওর চোখদুটো এখনও ভালোবাসার কথাই বলে৷ খাওয়া শেষ করে ল্যাপটপটা খুলে বসল আহুতি৷ ডাক্তার স্টফার বারবার বলছেন একজন লোকাল ডাক্তার খুঁজতে৷ যত দিন এগোবে তত প্রয়োজন অনুসারে মেডিকেশন বাড়াতে হবে আহুতির৷ তাই গুগলে সার্চ দিল ও—‘বেস্ট অঙ্কোলজিস্ট ইন কলকাতা’৷
‘থ্যাঙ্ক ইউ৷ হ্যাভ আ গুড ডে,’ ক্লায়েন্টদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক সেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল নেত্র৷ ওর সঙ্গে সঙ্গে নদীও৷ লাউঞ্জ ছেড়ে বেরিয়ে এসে দু’জনে হাঁটা লাগাল পার্কিং প্লেসের দিকে৷ ‘গুড জব, নদী,’ অফিসের গাড়িতে বসে হাসল নেত্র৷
—‘থ্যাঙ্ক ইউ, নেত্রদা৷ আমার তো মনে হয় ওরা কনভিন্সড৷ আপনার কাছে কনফার্মেশন কল এল বলে৷’
—‘আই টু থিঙ্ক দ্য সেম৷’
—‘বস খুব খুশি হবেন—দেখবেন? আপনার প্রোমোশনও হতে পারে!’
—‘হা হা!’ জোরে হেসে উঠল নেত্র৷ তারপর বলল, ‘অত সহজ না৷ তার জন্য বসের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখতে হয়৷ রাজনীতি করতে হয়৷ সেসবে আমার আবার বড্ড অনীহা৷ আমি মধ্যবিত্ত মানুষ৷ সকালে অফিস যাই৷ সন্ধেয় বাড়ি ফিরি৷ মাস গেলে স্যালারি পাই৷ তাতেই আমার চলে যায়৷ খুব বেশি কিছু আমার চাই না৷’
—‘ইউ আর টু গুড ফর কর্পোরেট কালচার,’ চোখ টিপল নদী৷
—‘কেন?’
—‘আপনার মতো নিপাট ভাল মানুষদের কেউ প্রাপ্যটা দেয় না৷ কেবল ব্যবহার করে নেয়৷’
—‘তোমার আমায় ভাল মানুষ বলে মনে হয়?’ ঈষৎ কেঁপে গেল নেত্রর গলা৷
—‘হুঁ৷ কাছের মানুষগুলোর মতো ভাল,’ হাসল নদী৷ উত্তরে কিছু বলল না নেত্র৷ ওর আঠাশ বছরের জীবনে ওকে কেউ কখনও ভাল মানুষ বলেনি৷ কত কাছের মানুষরা পলকে দূরে ঠেলে দিয়েছে৷ কেউ কেউ ওর ভালমানুষির ফায়দাও তুলেছে৷ কিন্তু নদীর মতো করে ওকে কেউ দেখেনি৷ আসলে ভালমানুষিকে অনেকেই বোকামো ভেবে নেন৷ কিন্তু নদী সযত্নে এই দুইয়ের ফারাক করেছে৷ হঠাৎ কলকাতা শহরটা একটু বেশি-ই জীবন্ত লাগছে নেত্রর৷ একটু বেশি-ই রঙিন৷ ভাবনার তাল কেটে দিয়ে হঠাৎ পকেটে ওর মোবাইলটা বেজে উঠল৷ অসীমদা৷ আবার দ্রুত বাস্তবে ফিরে এল নেত্র৷ মনে পড়ে গেল আহুতির কথা৷ কলটা রিসিভ করল নেত্র ‘হ্যালো?’
—‘শ্যামবাজার পাঁচ মাথা মোড় থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে৷ দোতলায় ফ্ল্যাট৷ ওয়ান বি এইচ কে৷ মাসে বারো হাজার৷ চলবে?’
—‘হ্যাঁ৷ হ্যাঁ৷ দৌড়বে!’
—‘কবে দেখতে আসছ?’
—‘আমি জানাচ্ছি তোমায়, দাদা৷ পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফোন করছি!’ বলে ফোনটা কেটে দিল নেত্র৷ তারপর দ্রুত ডায়াল করল আহুতির নম্বরটা৷
ক্যাবটা একটা বড় অফিস বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই নেত্রকে দেখতে পেল আহুতি৷ কাচ নামাতেই ওকেও দেখতে পেল নেত্র৷ দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠল, ‘শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় যাব, দাদা৷’ তারপর আহুতির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী রে? কেমন আছিস?’
—‘ভাল৷ তুই যে সত্যিই বাড়ির খোঁজ করলি, সেই জন্য থ্যাঙ্ক ইউ!’
—‘আরে, ধুর! তুই কবে শিফট করার কথা ভাবছিস সেটা বল৷’
—‘পারলে কালই,’ হাসল আহুতি৷
—‘কালই? এত তাড়াহুড়ো?’
—‘হুঁ৷ মা-বাবা ফেরার আগে শিফট করে যেতে পারলে ভাল!’
—‘কেন?’
—‘দেখ ওঁদের সঙ্গে আমার রোজই ফোনে কথা হয়৷ সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার স্কাইপও করি৷ বাট ওইটুকুই৷ সারাদিন ওদের সঙ্গে থাকতে আমার আনকার্টেবল লাগবে৷’
—‘ইয়ে,’ একটু ইতস্তত করল নেত্র, ‘ওদেরকে ব্যাপারটা জানিয়েছিস?’
—‘নোপ৷ ব্যক্তিগত ব্যাপার আমি সকলের সঙ্গে শেয়ার করি না,’ কাঁধ ঝাঁকাল আহুতি৷ ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গাড়ির জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল নেত্র৷ কিছু কিছু সময় আহুতিকে খুব স্বার্থপর লাগে ওর৷ তখন মনে হয় সাগ্নিক, মেহুলরাই ঠিক৷ ওই মায়াভরা চোখ দু’টোর অধিকারিণী যে কী করে এত রূঢ় হতে পারে—ভেবেই পায় না নেত্র৷ শ্যামবাজার পৌঁছতে প্রায় পৌনে দু’ঘণ্টা লেগে গেল৷ আসলে সন্ধের কলকাতায় অফিসফেরত জ্যাম থাকেই৷ অসীমদা ওখানেই ছিলেন৷ আহুতিকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ফ্ল্যাটের দিকে হাঁটা লাগালেন৷ অনেকদিন পর কলকাতার রাস্তাঘাট এত কাছ থেকে দেখছে আহুতি৷ তবে এতটা পথ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ওর৷ জিজ্ঞেস করল, ‘আর কতক্ষণ, দাদা?’
—‘এই তো কাছেই,’ ব্যঙ্গাত্মক হাসলেন অসীম, ‘হাঁটার কি একদমই অভ্যেস নেই?’
—‘না! কৌতূহল আর কী!’ ম্লান হাসল আহুতি৷ নেত্র ওর দিকেই তাকিয়ে আছে৷ ভ্রূ দুটো কপালে তুলে জানতে চাইল কোনও অসুবিধে হচ্ছে না কি৷ মাথা নেড়ে না বলল আহুতি৷ তারপর ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ঝুলিয়ে হাঁটায় মন দিল৷
‘আমার তো খুব পছন্দ হয়েছে,’ আহুতির গলায় ঝরে পড়ছে আনন্দ, ‘একদম পারফেক্ট৷’ নেত্ররও ভালই লেগেছে ফ্ল্যাটটা৷ তবে এত তাড়াতাড়ি ফাইনাল ডিসিশন নেওয়ার ইচ্ছে ওর নেই৷ কিন্তু আহুতির চোখ অন্য কথা বলছে৷ অসীমদা খোশমেজাজে দেখছেন ওদের৷ ‘দাদা আমি তো পারলে কালই শিফট হয়ে যাই! আপনি মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন৷ যত দ্রুত সম্ভব ফ্ল্যাটটা আমার চাই,’ অসীম’দার দিকে ফিরল আহুতি৷
—‘সে ম্যাডাম কোনও প্রবলেম নেই৷ আপনি চাইলে কাল এগ্রিমেন্ট সেরে ফেলতে পারেন৷ তারপর একটা শুভ দিন দেখে শিফট করে যাবেন না হয়’ কান এঁটো করে হাসলেন অসীম৷
—‘আমি পরশুই শিফট করবো৷’
—‘ম্যাডাম, সব মিলিয়ে বারো হাজার পার মান্থ হিসেবে এগারো মাসের চুক্তি হবে৷’
—‘এগারো মাস?’ ঠোঁট বাঁকাল আহুতি৷ তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘কোনও অসুবিধে নেই৷’ নেত্র কিছু বলল না৷ ডিসিশনটা আহুতির একান্ত ব্যক্তিগত৷ অসীমদা ফ্ল্যাটের মালিকের সঙ্গে একবার কথা বলিয়ে দিলেন আহুতির৷ তারপর প্রায় আটটা নাগাদ বেরিয়ে এল ওরা সকলে৷ অসীমদা কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে একটা মিনিবাসে চড়ে বসলেন৷ ‘ক্যাব বুক করি?’ জিজ্ঞেস করল আহুতি৷
—‘খিদে পায়নি রে তোর? আমি তো খিদের চোটে চোখে অন্ধকার দেখছি’ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল নেত্র৷
—‘আমি আসলে খেয়ে এসেছিলাম৷ ইশ, আমার জন্য তোর খাওয়া হয়নি!’
—‘চল৷ এখানে একটা নামী রেস্তোরাঁ আছে—খেয়ে আসি৷’
—‘নো ওয়ে,’ সতর্ক হল আহুতি, ‘আমায় বাড়ি ফিরতে হবে৷ আর দেরি হলে হরদা চিন্তা করবে৷’
—‘ফোন করে দে৷ তাহলেই তো হয়৷ আমি দায়িত্ব নিয়ে তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব৷’
—‘বাট আমি কিছু খাব না রে৷ একটুও খিদে নেই৷’
—‘ওকে কুল৷ আমি খাব আর তুই বসে দেখবি,’ আহুতির হাতটা শক্ত করে ধরে পাঁচ মাথার মোড়ের দিকে পা বাড়াল নেত্র৷
বুক পেট রীতিমতো জ্বলছে আহুতির৷ নেত্র নিজের জন্য কিছু খাবার আর আহুতির জন্য ফ্রেশলাইম সোডা অর্ডার দিয়েছিল৷ কোনও বারণ শোনেনি৷ তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু খেতেই হয়েছে আহুতিকে৷ আর তার কিছুক্ষণ পর থেকেই শুরু হয়েছে জ্বলুনি৷ কার্বনেটেড ড্রিংক তো! যত কমই খাক, রিয়্যাকশন শুরু হতে দেরি হয় না৷ বাড়িতে ঢুকেই বাথরুমে দৌড়ল আহুতি৷ গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করল অনেকটা৷ এইরকমভাবে বমি করতে কষ্ট হয় ঠিকই৷ কিন্তু সারারাতের জ্বলুনির থেকে বেটার৷ ঘাড়ে মাথায় অনেকক্ষণ ধরে জল দেওয়ার পর সোজা হয়ে দাঁড়াল আহুতি৷ আর আয়নার দিকে তাকাতেই চমক৷ বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে হরদা৷ চোখাচোখি হতেই জিজ্ঞেস করল, ‘শরীর খারাপ?’
-‘নাহ! তেমন কিছু না৷ তবে আমি আর রাতে কিছু খাব না৷ ঘুম পাচ্ছে৷’
—‘আচ্ছা!’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন হর’দা৷ কতটা বিশ্বাস করল আহুতিকে—বোঝা গেল না৷ জামাকাপড় বদলে, ওষুধ খেয়ে খাটে গা এলিয়ে দিল আহুতি৷ কাল ফ্ল্যাটের এগ্রিমেন্ট৷ পরশু শিফটিং৷ তারপরের দিনই তাহলে ডাক্তারবাবুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবে ও৷ কোমরের ব্যথাটাও বাড়ছে ধীরে ধীরে৷
মন দিয়ে প্রিন্ট মিডিয়া অ্যাডভার্টাইসমেন্টের কপির একটা রাফ তৈরি করছে নদী৷ নেক্সট উইকের প্রথম দিকেই এটা ছাপানো হবে৷ আজ ওর জন্মদিন৷ এর আগে প্রত্যেক জন্মদিনেই মামার বাড়ি যেত নদী৷ এবার সেটা হয়নি৷ চাকরি যত ছোট বা বড়ই হোক—তার একটা নিজস্ব দায়িত্ব থাকে৷ ‘হাই! হ্যাপি বার্থ ডে,’ ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তিলোত্তমা৷ এই অফিসে নদীর প্রথম বন্ধু৷
—‘থ্যাঙ্ক ইউ! ফেসবুক থেকে জানলি?’
—‘অভিয়াসলি! গুড উইশেস৷ কিন্তু ট্রিট কই?’
—‘আর ট্রিট?’ মুখ বাঁকাল নদী, ‘কাজ করতে করতে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে!’
—‘ট্রাস্ট মি, আমি কোনও ইন্টার্নকে এত কাজ করতে দেখিনি৷’
—‘কাজ করতেই তো এসেছি৷ তাই কাজ করি,’ আলতো হাসল নদী৷ ওর দিকে হাত নেড়ে নিজের ডেস্কের দিকে চলে গেল তিলোত্তমা৷ ও চলে যেতেই আশেপাশের বাকিরাও উইশ করতে শুরু করলেন একে একে৷ নেত্র’দা এখনও অফিসে আসেননি৷ ওঁর কোনও এক বন্ধু নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করেছেন কিছুদিন হ’ল৷ আর সেই তখন থেকেই মাঝেমাঝেই ছুটি নিচ্ছেন নেত্র’দা৷ কখনও হাফ ডে৷ কখনও ফুল ডে৷ এসব নিয়ে ভাবতে চায় না নদী৷ কিন্তু তাও ভাবে৷ আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একরাশ মন খারাপ গ্রাস করে ওকে৷ গলার কাছে দুঃখের দলা পাকিয়ে ওঠে৷ কিন্তু অনেক খুঁজেও এসবের কারণ খুঁজে পায় না নদী৷ আবার নেত্রদা’কে সামনে দেখলেই সব মন খারাপ নিমেষে উড়ে যায় জানলা দিয়ে৷ ওর ভাবনার তার ছিঁড়ে দিয়ে ডেস্কের ওপর রাখা ফোনটা বেজে উঠলো৷ নেত্র’দা৷ ‘হ্যালো?’ গলাটা পরিষ্কার করে নিল নদী৷
—‘নদী, আমি নেত্র বলছি৷’
—‘হ্যাঁ৷ বলুন৷’
—‘আমি আজ অফিস যেতেপারবো না৷ লিভ নিয়ে নিচ্ছি৷ বাট কাল তো আবার ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মিটিং আছে৷ লে আউট বানিয়ে ফেলেছ?’
—‘প্রায় শেষের দিকে৷ তবে আপনি একবার দেখলে ভালো হত মনে হয়৷’
—‘ওকে! আমি তাহলে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ একবার অফিস যাব৷ তুমি থাকবে তো তখন?’
—‘হুঁ৷ থাকব৷’
—‘বেশ৷ ওয়ান মোর থিং- একটার বেশি ডিজাইন আর কনসেপ্ট রেডি রেখো৷ ইন কেস, দে ডোন্ট লাইক ওয়ান উই ক্যান শো দেম দ্য আদার৷’
—‘আচ্ছা!’
—‘রাখছি,’ বলে ফোন কেটে দিল নেত্র৷ ফোনটা ফের ডেস্কের ওপর রেখে দিয়ে ওয়াশরুমে দৌড়ল নদী৷ খুব কান্না পাচ্ছে ওর৷ নেত্রদা ফোন করলেন অথচ একবার উইশ করলেন না! আবার নিজেরই মনে হচ্ছে কী ভাবে জানবেন নেত্রদা! ওঁকে তো ফেসবুকে অ্যাডই করেনি নদী৷ সব বুঝেও যে ওর কেন এত খারাপ লাগছে! চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে এল নদী৷ এক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে ফের কাজে মন দিল৷
মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় হয়েছে নেত্রর৷ আহুতির ফ্ল্যাটের এগ্রিমেন্টের দিন, শিফটিংয়ের দিন নিজে থেকেই ছুটি নিয়েছিল ও৷ বন্ধুর সঙ্গে থাকার জন্য৷ আহুতি তাতে রাগও করেনি৷ আবার থ্যাঙ্কসও জানায়নি৷ শিফটিংয়ের দিন হরদা খুব ভেঙে পড়েছিলেন৷ বারবার থেকে যেতে বলছিলেন আহুতিকে৷ অন্তত ওর বাবা-মা ফেরা অবধি৷ আহুতি এক গাল হেসে এড়িয়ে গিয়েছিল সবটা৷ কিন্তু সমস্যায় পড়েছে নেত্র৷ গতকাল কলকাতা ফিরেছেন আহুতির বাবা-মা৷ আর তারপরই ডেকে পাঠিয়েছেন নেত্রকে৷ ওঁদের না করতে পারেনি নেত্র৷ কোনও অজুহাত দেখিয়ে এড়াতেও পারেনি৷ কলেজে থাকাকালীন বহুবার ওঁদের বাড়ি গিয়েছে ও৷ কখনও আহুতির সঙ্গে প্রয়োজন থাকায়৷ কখনও আবার স্রেফ শাঁওলি আন্টির হাতের রান্না খেতে৷ আন্টি বোধ হয় বুঝতেন৷ খুব যত্ন করে খাওয়াতেন ওকে৷ আজও লাঞ্চেই নিমন্ত্রণ ওর৷ আহুতিকে একবার ফোন করেছিল নেত্র৷ সবটা জানানোর জন্য৷ খুব হেসেছিলো আহুতি, ‘তোর ইচ্ছে হলে যাবি!’
—‘তুইও চল না রে! কী নিয়ে কথা হবে— সেটা তো আমরা বুঝতেই পারছি৷ তুই গেলে অনেক জলদি সব মিটে যাবে৷’
—‘আমি তো মেটাতে চাই না,’ কেটে কেটে কথাগুলো বলেছিলো আহুতি৷ তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়েছিলো দ্রুত, ‘সি, ওঁরা আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না৷ হয় তো জিজ্ঞেস করবেন—আমি ফিরলাম কেন বা ডেভিডের সঙ্গে ব্রেক আপ হওয়ার কারণ কী৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ জাস্ট টেল দেম দ্যাট ইউ ডোন্ট নো এনিথিং৷ তাছাড়া, অফিস কামাই করে যাচ্ছিসই বা কেন?’
—‘কী করবো? না করতে পারলাম না যে!’
—‘নেত্র!’ হাসল আহুতি, ‘স্টপ বিয়িং সো ভালো মানুষ অল দ্য টাইম৷ আমার মতো মানুষরা তোর ফায়দা তোলে—বুঝিস তো? রাখছি রে৷ অল দ্য ভেরি বেস্ট!’ ফোন কেটে দিয়েছিল আহুতি৷ ওর বলা শেষ কথাগুলো এখনও নেত্রর কানে বাজছে৷ ঠিক দুপুর একটা নাগাদ ভবানীপুরের ওই বাড়িটার সামনে ট্যাক্সি দাঁড় করাল নেত্র৷ তবে আজ আর কলিংবেলে হাত ছোঁয়াতে হল না৷ বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন হর’দা৷ নেত্রকে দেখে হাসলেন, ‘যাও৷ ভিতরে যাও৷ বাবু আর মা বসার ঘরেই আছেন৷’ আলতো হেসে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল নেত্র৷ ও বসার ঘরে ঢুকতেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শাঁওলী, ‘এসো৷ এসো৷ তোমার আঙ্কলের একটা ফোন এল, তাই ওপরে গিয়েছেন৷ এক্ষুনি চলে আসবেন৷’
—‘কেমন আছেন, আন্টি?’
—‘ভালোই৷ তবে বয়সের নিয়ম মেনে বন্ধু জুটেছে কিছু৷ যেমন প্রেশার,
সুগার, আর্থারাইটিস৷ তুমি কেমন?’
—‘এই তো! ভালোই৷’
—‘আমরা তো কালই পুনে থেকে এলাম৷ আহুতিযে বাড়ি ফিরেছে— সেসবও জানতাম৷ ওই বলেছিল৷ কিন্তু হঠাৎ নিজের আলাদা সেট আপ তৈরি করল কেন বলো তো? এত বড় বাড়িতে ওর জায়গা কম পড়ল!’
—‘আমি জানি না, আন্টি৷ তবে আমার মনে হয় শি ওয়ান্টস টু লিভ ইনডিপেন্ডেন্টলি৷’
—‘নেত্র! কেমন আছ?’ ওপর থেকে নেমে এসেছেন উৎপল আঙ্কল, আহুতির বাবা৷
—‘ভালো! আপনি?’
—‘শারীরিকভাবে একদম ফিট৷ বাট মানসিক ভাবে একটু চাপে আছি৷ ক্রেডিট গোজ টু ইওর ফ্রেন্ড!’
—‘আঙ্কল, আহুতি ভালো আছে৷ সেফ জায়গায় আছে৷ আপনারা চাইলে আমি আপনাদের ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতেও পারি৷’
—‘খেপেছ?’ আঁতকে উঠলেন শাঁওলী, ‘কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দেবে তাহলে মেয়ে৷’
—‘ও ঠিক কেন ফিরে এসেছে জানো? ওই ছেলেটির সঙ্গে ব্রেক আপ হয়ে গিয়েছে বলেই কি?’ জিজ্ঞেস করলেন উৎপল৷
—‘আমি সত্যিই জানি না, আঙ্কল৷’
—‘নেত্র, দেখো তোমার মনে হতে পারে যে আমরা তোমায় জেরা করছি৷ সেরকমটা কিন্তু নয়৷ আসলে হর বলল আহুতি অনেকরকম ওষুধ খেত৷ খাবারে অনেকরকম রেস্ট্রিকশন মেইনটেইন করতো৷ একদিন না কি বমিও করেছিল৷ তাই একটু টেনশনে আছি আর কী!’
—‘ওহ!’ সতর্ক হল নেত্র, ‘আঙ্কল, আমার মনে হয় আপনাদের একদিন সামনাসামনি বসে সবটা সর্ট আউট করে নেওয়া উচিত৷’
—‘সে কি আর হবে? মেয়েটার বড্ড অভিমান৷ ও যখন বিদেশ উড়ে যেতে চেয়েছিল, কতটুকুই বা বয়স ওর তখন? আর যাওয়ার ঠিক সাতদিন মতো আগে বলেছিল৷ তাই ভয় পেয়ে না বলেছিলুম৷ ওইটাই আমার দোষ৷ আমি কিন্তু ওকে তার আগে কখনও কিছুতে না করিনি৷ নিজের মতো করে বেঁচেছে৷ সেইসব ভুলে মেয়েটা কেবল ওই একটা ‘না’ই মনে রেখেছে৷’
—‘আমি কি আহুতির সঙ্গে কথা বলব, আঙ্কল?’
—‘না,’ দু’দিকে মাথা নাড়লেন শাঁওলী, ‘ও তাহলে তোমার সঙ্গেও যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেবে৷ তুমি কেবল আমাদের মাঝে মাঝে খবর দিও৷ আচ্ছা, এবার খেতে এসো৷ মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল করেছি৷ তুমি ভালোবাসো তো?’ উঠে দাঁড়ালেন শাঁওলী৷ পা বাড়ালেন ডাইনিং টেবিলের দিকে৷ নেত্রও উঠল৷ খিদে পেয়েছে ওর খুব৷ তাছাড়া, অফিসেও একবার ঢুঁমারতে হবে৷
আড়াইটে নাগাদ বেরিয়ে এলো নেত্র৷ বেশি খাওয়া হয়ে গিয়েছে৷ চিংড়ির মালাইকারি, মাটন কষা—কবজি ডুবিয়ে খেয়েছে ও৷ এখন হাঁটতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে৷ ভেবেছিল মেট্রো করে যাবে৷ কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না৷ মোড়ের মাথা থেকে একটা বাসে উঠে পড়ল ও৷ এটা অফিস পাড়া দিয়েই যাবে৷ বাসটা তুলনামূলকভাবে ফাঁকা৷ দু’মিনিটের মধ্যেই বসার জায়গা পেয়ে গেল ও৷ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে আহুতিকে ফোন করল৷ প্রথম বারে ফোন ধরল না আহুতি৷ আবার রিং করাতে রিসিভ করলো, ‘হ্যালো?’
—তোর বাড়ি থেকে বেরোলাম জাস্ট!’
—‘তো?’
—‘তো...’ একটু থমকাল নেত্র, ‘...আমার মনে হল তোকে জানানো উচিত৷’
—‘কুল৷ নাও ইয়োর জানানো ইজ ডান—আই হোপ? ফোন রাখি?’
—‘তাড়া আছে কোনও? বিজি আছিস? পরে ফোন করব?’
—‘এক্সকিউজ মি!’ হঠাৎ গলার স্বর উপরে তুলল আহুতি, ‘তুই এইরকম বয়ফ্রেন্ডদের মতো টোনে কথা বলছিস কেন? প্লিজ!’
—‘মানে?’ মাথা গরম হয়ে গেল নেত্রর, ‘কী বলতে চাইছিস তুই?’
—‘এটাই যে তুই কার বাড়ি যাচ্ছিস, সেখান থেকে কখন বেরোচ্ছিস, কী করছিস—আই সিম্পলি ডোন্ট কেয়ার৷’
—‘কার বাড়ি মানে? ওটা তোরই বাড়ি৷ আঙ্কল আন্টি কতটা চিন্তায় আছেন—তুই জানিস? একবার কি সামনাসামনি বসে সবটা মিটিয়ে নেওয়া যায় না?’
—‘ফার্স্ট অব অল, ওটা আমার বাড়ি না৷ মিস্টার উৎপল সিনহার বাড়ি৷ অ্যান্ড সেকেন্ডলি, আমি আগেও বলেছি যে আমার কোনও কিছুই মিটমাট করার কোনও ইচ্ছে নেই৷ তাছাড়া, হু আর ইউ টু সাজেস্ট মি যে আমার কী করা উচিত আর কী নয়? তুই আমার উপকার করেছিস অনেক৷ সেই জন্য থ্যাঙ্ক ইউ৷ বাট ওইটুকুই৷ ডোন্ট ক্রস দ্য লাইন!’ রীতিমতো হাঁপাচ্ছে আহুতি৷
—‘ইউ নো হোয়াট, আহুতি?’ মাথার ভিতর আগুন জ্বলছে নেত্রর, ‘ইউ আর টেরিবলি সেলফিশ৷ সবাই ঠিকই বলেছিল তোকে হেল্প করা মোটেই উচিত না৷ তুই বন্ধু হওয়ার যোগ্যই নোস৷ তুই ভীষণ সেল্ফ অবসেসড৷’
—‘আই নো,’ আহুতির গলায় শ্লেষ, ‘আমি কী—সেটা আমি জানি৷’
—‘রাখলাম,’ বলে ফোনটা কেটে দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে রইল নেত্র৷ তারপর একটু ধাতস্থ হলে ফেসবুক অন করল৷ মনটাকে শান্ত করা ভীষণ প্রয়োজন৷ কিছুটা স্ক্রল করতেই নদীকে দেখতে পেল ও৷ ফ্রেন্ডস সাজেশনসে আসছে৷ চারজন মিউচুয়াল ফ্রেন্ড৷ প্রোফাইলটা খুলতেই নেত্রর অবাক হওয়ার পালা৷ আজ নদীর জন্মদিন! টাইমলাইন ভর্তি বার্থ ডে উইশ৷ মুহূর্তে মনটা খারাপ হয়ে গেল নেত্রর৷ মেয়েটার আজ জন্মদিন! আর আজই এত কাজের চাপ পড়ে গিয়েছে ওর ওপর৷ নিজেকে একটু দোষী মনে হল নেত্রর৷ আর পরক্ষণেই একটু চমকে উঠল ও৷ আহুতি ছাড়া অন্য কোনও মেয়ের জন্য এইরকম ফিলিং ওর এর আগে হয়নি৷ এক অদ্ভুত দায়িত্ববোধ৷ পরক্ষণেই নিজেকে ধমকাল নেত্র৷ নদী ওর থেকে বেশ ছোট৷ আক্ষরিক অর্থেই বাচ্চা মেয়ে৷ ওকে নিয়ে এসব কী ভাবছে নেত্র? কিন্তু ব্রেনের এই ক্যালকুলেশন মুহূর্তে জয় করে নিল মন৷ এইচআর মানসীকে ফোন করল নেত্র৷ ‘ইয়েস, নেত্র?’ ওপারে মানসীর গলায় কর্পোরেট সৌজন্য৷
—‘আজ নদীর জন্মদিন৷ কেক টেক কিছু আনানো হয়েছে?’
—‘নো৷ শি ইজ জাস্ট অ্যান ইন্টার্ন৷ ইন্টার্নদের বার্থ ডে তো সেইভাবে সেলিব্রেট করা হয় না৷’
—‘আচ্ছা! ওকে৷ থ্যাঙ্ক ইউ,’ বলে ফোনটা কেটে দিল নেত্র৷ অফিসের একটা স্টপেজ আগেই নেমে পড়ল ও৷ শহরের নাম করা ক্যাফেগুলোর মধ্যে একটা এখানেই৷ একটা হাফ পাউন্ডের কেক কিনে, অফিসের দিকে হাঁটা লাগাল৷ রাস্তায় একটা বই খাতার দোকান থেকে সুন্দর পার্কার পেন কিনল৷ ধীরে ধীরে মেজাজটা ঠান্ডা হচ্ছে ওর৷ অফিসে পৌঁছতেই নদীকে দেখতে পেল নেত্র৷ ডেস্কের ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে একাগ্র মনে কিছু একটা করছে৷ ‘আপডেট কী?’ ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল নেত্র৷
—‘ওহ! হাই,’ অপ্রস্তুত হাসল নদী, ‘এই তো৷ এটাই লাস্ট ডিজাইন৷ আর এই দেখুন বাকিগুলো এখানে৷
—‘ওকে! ডু ওয়ান থিং৷ আমি ছাদে যাচ্ছি৷ তোমার এই ডিজাইনটা কমপ্লিট
হয়ে গেলে, সবগুলো নিয়ে ছাদে চলে এসো৷ উই উইল ডিসকাস অ্যাবাউট ইট দেয়ার৷ খুব ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার তো! এখানে এত কেয়সের মধ্যে ডিসাইড করাটা ঠিক হবে না৷’
—‘ছাদে?’ দু’মুহূর্ত কী যেন ভাবল নদী, ‘আচ্ছা৷ ঠিক আছে৷ আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি৷’ মাথা নেড়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল নেত্র৷ পিছন ফিরে একবার দেখল ও নদীকে৷ আবার কাজে মন দিয়েছে৷ নিজের অজান্তেই আলতো হাসল নেত্র৷
আজকাল মাঝেমাঝেই দম বন্ধ হয়ে আসে আহুতির৷ পাঁচ-দশ মিনিট সহ্য করার পর আবার ঠিক হয়ে যায়৷ সে’দিন নেত্রর সঙ্গে ইচ্ছে করেই খারাপ ব্যবহার করেছিল ও৷ যাতে নেত্র দূরে সরে যায়৷ প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের রুগিরা আট-ন’মাসের বেশি বাঁচে না৷ কানাডায় যখন ডক্টর স্টফার প্রথম ওর রিপোর্ট দেখেন তখন সময় দিয়েছিলেন দশ মাস৷ ওঁর অনেক বলা সত্ত্বেও কেমোথেরাপিতেরাজি হয়নি আহুতি৷ কিন্তু এবার বোধ হয় সেটাও শুরু হবে৷ গতকাল রাজারহাটের একটা হসপিটালে ডাক্তার নীতিন গুহ রায়ের কাছে গিয়েছিল ও৷ সব রিপোর্ট আর প্রেসক্রিপশন দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন ডাক্তারবাবু৷ তারপর অসহায় চোখে আহুতির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি যন্ত্রণাটা সহ্য করছেন কী করে—বলুন তো? ইউ নিড কেমো সেশনস অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল৷’
—‘খুব জরুরি?’ শেষবারের মতো আর্তি জানিয়েছিল আহুতি৷
—‘ভীষণ জরুরি৷ আমার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে নেক্সট উইকেই ভর্তি হয়ে যান৷ দেরি করবেন না৷ কিছু মেডিসিন বদলে দিচ্ছি৷ কিনে নেবেন৷’
—‘আর কতদিন, ডাক্তারবাবু?’ চেম্বার থেকে বেরোনোর আগে জানতে চেয়েছিল আহুতি৷
—‘আপনি আপাতত নেক্সট উইকের ব্যাপারটায় কনসেন্ট্রেট করুন,’ কড়া চোখে তাকিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু৷ আর কোনও কথা না বলে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছিল আহুতি৷ বাড়ি না ফিরে একটা শপিং মলে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করেছিল৷ অসুখ হলেও শখগুলো রয়েই যায়৷ সুখ এনে দেওয়ার চেষ্টা করে৷ এই বাড়িতে কোনও হাউজহেল্প রাখেনি আহুতি৷ যতটুকু পারে, নিজেই করে৷ সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ও নিজেকে৷ তাছাড়া এটুকু স্বাধীনতা ছাড়া ওর পক্ষে বাঁচা সম্ভব না৷ মাঝে মাঝে ডেভিডের কথা খুব মনে পড়ে৷ ওকে ফোন করতে ইচ্ছে হয়৷ কিন্তু নিজেকে সংযত রাখে
আহুতি৷ মোবাইল ফোনের গ্যালারি ঘেঁটে পুরনো দিনের ছবিগুলো দেখে৷
সেইদিনের পর থেকে প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল নেত্র ফোন করেনি ওকে৷ রেগে গিয়েছে বোধ হয়৷ কিংবা হয়তো দুঃখ বা অভিমান হয়েছে৷ বাবা-মা ফোন করেন৷ দু’-চারটে কথা বলেই তড়িঘড়ি ফোন রেখে দেয় আহুতি৷ আজ সকালে চিকেন স্টু আর ভাত রান্না করেছে ও৷ স্নান সেরে, প্লেটে খাবার সাজিয়ে বসতেই বেডরুমে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল৷ বিরক্ত হয়ে উঠে গেল আহুতি৷ বেদিকা ফোন করছে৷ ডাক্তার গুহ রায়ের ম্যানেজার৷ ‘হ্যালো?’ ফোনটা কানে লাগাল আহুতি৷
—‘অ্যাম আই টকিং টু মিস আহুতি?’
—‘ইয়েস৷ ইউ আর৷’
—‘হাই, ম্যাম৷ ইওর কেমো সেশন ইজ শিডিউলড অন ফিফটিন্থ৷ দ্যাট ইজ কামিং সান ডে৷ ডু কাম বিফোর ইলেভেন৷’
—‘ওকে৷’
—‘থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাম৷ ইউ ক্যান অলওয়েজ কল ব্যাক ফর এনি কাইন্ড অব কোয়্যারি,’ ফোনটা কেটে দিল বেদিকা৷ ক্যালেন্ডারের দিকে একবার তাকিয়ে বিছানার ওপর বসে পড়ল আহুতি৷ কষ্ট হচ্ছে ওর খুব৷ জমে থাকা সব দুঃখ কষ্টগুলো বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করল আহুতি৷ ডাইনিং টেবিলে গিয়ে সব খাবারগুলো আবার তুলে রাখল৷ তারপর ড্রেস চেঞ্জ করে, ব্যাগ নিয়ে, দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল দ্রুত৷
হাতিবাগানে পৌঁছে মনটা একটু শান্ত হল আহুতির৷ চারপাশে অনেক অচেনা লোক৷ প্রত্যেকে নিজের কাজে ব্যস্ত৷ একটা জুস সেন্টারে ঢুকে দু’গ্লাস আখের রস খেল আহুতি৷ তারপর হাঁটতে থাকল এদিক ওদিক৷ কিছুই কেনার নেই তেমন৷ একটু শ্বাস নেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল ও৷ রাস্তা জুড়ে বিভিন্নরকম দোকানের পসরা৷ একটা বাচ্চা মেয়ে কিছু মাটির জিনিস সাজিয়ে বসেছে৷ ওর কাছ থেকে একটা শো-পিস কিনল আহুতি৷ তারপর একটু এগোতেই একটা বড় ফুলের দোকান চোখে পড়ল৷ কতরকম ফুল আর কতরকম রং৷ মোবাইলটা বের করার জন্য পকেটে হাত দিয়েই থমকাল আহুতি৷ মোবাইল নেই৷ ব্যাগের ভেতরটা চেক করল একবার৷ ওখানেও নেই৷ তবে কি বেরোনোর সময় ফোনটাই নিতে ভুলে গেল না কি ও? তাই-ই হবে! বিরক্তিতে একটা পা সজোরে রাস্তায় মারল ও৷ পরক্ষণেই মনে হল ভালোই হয়েছে৷ ফোন নিয়েই বা কী করে ও৷ ছবিটা তোলা হবে না ঠিকই৷ কিন্তু সব সুন্দর মুহূর্ত কি আর ক্যামেরাবন্দি করা যায়! ভাবনাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দোকানে ঢুকল আহুতি৷ রজনীগন্ধা, জারবারা, গন্ধরাজ, ডালিয়া, গোলাপ, বেলি, গ্ল্যাডুলাস আরও কত কী! দোকানের এককোণে ফুল দেখছে অল্পবয়সি দু’টো মেয়ে৷ ‘ও তোর প্রেমে পড়েছে- আয়্যাম শিওর,’ নীল কুর্তি পরা লম্বা মেয়েটা মুখ বাঁকাল৷ মেয়েটার কথা শুনে হাসি পেয়ে গেল আহুতির৷ একটু কান খাড়া করল ও৷ হলুদ চুড়িদার পরা মেয়েটা লজ্জা পেল একটু৷ তারপর বলল, ‘ধুর! জন্মদিনের দিন একটা কেক এনেছিল জাস্ট৷ তাতেই প্রেম হয়ে গেল?’
—‘তবে ছাদে গিয়ে স্রেফ দুজনে মিলে বার্থ ডে সেলিব্রেট করা হল কেন?’
—‘আহ, তিলোত্তমা! ছাড় তো৷ মায়ের জন্য কোন বোকেটা নেব বল৷’ —‘বলব৷ বাট আগে তুই স্বীকার কর— ইউ আর ইন লাভ!’
—‘ধুর বাবা! দি, এক্সকিউজ মি?’ গলাটা একটু ওপরে তুলল মেয়েটা৷ আহুতি বুঝতে পারল ওকেই ডাকছে৷ হেসে মেয়েদুটোর দিকে তাকাল ও, ‘ইয়েস?’
—‘এই দুটোর মধ্যে কোনটা বেটার?’ দুটো ফ্লাওয়ার বোকে দুই হাতে তুলে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা৷
—‘এইটা,’ মেয়েটার ডান হাতে ধরা বোকেটার দিকে আঙুল দেখাল আহুতি৷
—‘থ্যাঙ্ক ইউ, দি!’ হাসল মেয়েটা৷ তারপর দ্রুত দাম মিটিয়ে হাঁটতে শুরু করল৷ অন্য মেয়েটির ব্যাপারটা বুঝতে সময় লাগল কিছুক্ষণ৷ তারপর দৌড়ল বন্ধুর পিছুপিছু, ‘নদী৷ অ্যাই, নদী৷ ওয়েট, আমি আসছি তো৷ আচ্ছা, বাবা! সরি...৷’ ওদের গুলতানি দেখে মন ভালো হয়ে গেল আহুতির৷ একগুচ্ছ লাল গোলাপ কিনে আবার বাড়ির পথে হাঁটা লাগাল ও!
কী যে হচ্ছে ওর জীবনে— বুঝতেই পারছে না নদী৷ জন্মদিনের দিন নেত্রদার ওই জেসচারটা চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে৷ চার পাঁচটা পেপার আর দুটো বড় ফাইল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছাদে গিয়েই আকাশ থেকে পড়েছিল নদী৷ একটা ছোট্ট কেক হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন নেত্র’দা৷ তার ওপর মোমবাতি
জ্বলছে৷ ‘এসব?’ কথা হারিয়ে ফেলেছিল নদী৷
—‘হ্যাপি বার্থ ডে, নদী৷ জলদি কেকটা কেটে ফেলো তো৷ যা হাওয়া দিচ্ছে, মোমবাতিটা যে কোনও মুহূর্তে নিভে যাবে৷’
—‘উঁ?’ অবিশ্বাস লোকাতে পারছিল না নদী৷
—‘কী হল? এসো,’ বলে নিজেই এগিয়ে এসেছিলেন নেত্রদা৷ হাতে ধরা কাগজগুলো চেয়ারের ওপর রেখে দ্রুত কেক কাটায় মন দিয়েছিল নদী৷ নেত্রদা বলেছিলেন, ‘ইউ ডিজার্ভ দিস৷ ইউ আর ওয়ার্কিং সো হার্ড ফর দিস কোম্পানি৷’
—‘থ্যাঙ্ক ইউ!’ নিজের প্রশংসা শুনে কুঁকড়ে গিয়েছিল নদী৷ তারপর কেক খাওয়া মিটে গেলে দ্রুত কাজের কথায় ফিরে এসেছিল ওরা৷ এখন সম্পর্কটা অন্য খাতে বইছে৷ ফেসবুকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছেন নেত্রদাই৷ হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় নিয়মিত৷ কিন্তু অফিসে ঢুকলেই সেসব ভুলে টিপিক্যাল সিনিয়র আর ইন্টার্নের সম্পর্কে ফিরে যায় ওরা৷ এর আগে নদীর সঙ্গে এমনটা হয়নি৷ নেত্রদা অবশ্য স্বাভাবিক কথাবার্তাই বলেন৷ তবুও ওঁর মেসেজের নোটিফিকেশন দেখলেই হার্টবিট মিস হয়ে যায় নদীর৷ আজ শনিবার৷ হাফ ডে৷ তাছাড়া কাজের চাপও আজ খুব বেশি নেই৷ তিলোত্তমা আজ আসেনি৷ মেট্রো স্টেশন অবধি তার মানে একাই ফিরতে হবে নদীকে৷ ব্যাগ থেকে একটা চকোলেট বের করে, খেতেশুরু করল নদী৷ এটাই ওর অভ্যেস—বোরডম ঘিরে ধরলে চকোলেট খায়৷ পরের সপ্তাহেই ওর বানানো অ্যাডটা রিলিজ হবে৷ সেই জন্য ভীষণ এক্সাইটেড ও৷ কেরিয়ারের শুরুতেই বেশ বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট৷ মা-বাবা আজ বাড়িতে নেই৷ ব্যারাকপুর গিয়েছেন— পিসির বাড়ি৷ তিলোত্তমা থাকলে বেশ ঘুরতে যাওয়া যেত কোথাও৷ ‘এই সবাইকে টাটা৷ এলাম,’ এইচআর মানসীর কথায় সম্বিৎ ফিরল নদীর৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল দেড়টা বাজে৷ আশেপাশের প্রত্যেকেই কম্পিউটার বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ মাথাটা একটু তুলে নেত্রর ডেস্কের দিকে উঁকি মারল নদী৷ একমনে কাজ করে যাচ্ছেন৷ কোনও হেলদোল নেই৷ নিজের কম্পিউটার বন্ধ করে, ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল নদী৷ এগিয়ে গেল নেত্রর দিকে, ‘বাড়ি যাবেন না?’
—‘হ্যাঁ, যাব তো৷ সোমবারের শিডিউলটা গুছিয়ে নিয়েই বেরোব৷ পাঁচ মিনিট৷’
—‘বেশ তবে আমি ওয়েট করছি৷’
—‘ওয়েট করবে?’ দু’সেকেন্ড কী যেন ভাবল নেত্র৷ তারপর বলল, ‘ওকে!’ উত্তরে কেবল হাসল নদী৷ প্রায় কুড়ি মিনিট পর কাজ শেষ হল নেত্রর৷ তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে এল দু’জনে৷ ‘তুমি কোথায় যাবে? মেট্রোস্টেশন পর্যন্ত তো?’ জিজ্ঞেস করল নেত্র৷
—‘হুঁ৷ আপনি?’
—‘আমি?’ হাত উল্টোল নেত্র, ‘জানি না৷ তবে এক্ষুনি বাড়ি যাব না৷ এদিক ওদিক ঘুরব৷ বইপাড়া যেতে পারি বা ধর্মতলা৷ ঠিক নেই৷’
—‘ওহ! ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আমি আপনার সঙ্গে বইপাড়া যেতে পারি?’ একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল নদী৷
—‘শিওর! বাড়িতে চিন্তা করবে না?’
—‘নাহ! মা-বাবা পিসির বাড়ি গিয়েছেন৷’
—‘বেশ৷ যাওয়া যাক তাহলে৷ তবে তার আগে চলো কিছু একটা খেয়ে নিই৷ নর্থ ইন্ডিয়ান ফুড খাও তো?’ জানতে চাইল নেত্র৷ তারপর নদীর উত্তরের অপেক্ষা না করেই হাঁটতে শুরু করল দ্রুত৷ নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে ওর পিছন পিছন এগোল নদীও৷
‘আপনার গল্পের বই পড়তে ভালো লাগে?’ প্রিয় লেখকের একটা গল্পসংকলনের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে জিজ্ঞেস করল নদী৷
—‘হ্যাঁ৷ তবে কবিতা বেশি টানে আমায়৷ কিন্তু নিজে এক বর্ণও লিখতে পারি না৷’
—‘আবৃত্তি?’
—‘সেটাও পারি না৷ আসলে কবিতা আমার কাছে অনেকটা বেস্ট ফ্রেন্ডের
মতো৷ আমরা একান্তে অনেক গল্প করি৷ কিন্তু অন্য কেউ সামনে এলেই চুপ করে যাই৷’
—‘বাহ! দারুণ বললেন তো৷ আমার গল্প ভালো লাগে৷ বাস্তব ভুলে অন্য
এক দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া যায়৷ বেফিকর হয়ে হিরোদের ওপর ক্রাশ খাওয়া যায়৷’
—‘তুমি গল্পের হিরোদের ওপর ক্রাশ খাও?’ নাক কোঁচকাল নেত্র, ‘সে কি? বয়ফ্রেন্ড নেই?’
—‘উঁহু৷ আপনার?’
—‘না৷ আমারও বয়ফ্রেন্ড নেই,’ কথাটা বলেই হাসিতে ফেটে পড়ল নেত্র৷ ছদ্মরাগে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে হেসে ফেলল নদীও৷ কলেজ স্ট্রিটে একটা অন্যরকম গন্ধ পাওয়া যায়—তারুণ্যের গন্ধ, ভালোবাসার গন্ধ, বেঁচে থাকার গন্ধ, ইতিহাসের গন্ধ৷ নেত্রর হাবভাবে স্পষ্ট যে ও এখানে প্রায়ই আসে৷ এমনকী বেশ কিছু দোকানদারও ওর চেনা৷ নদীর ইচ্ছে করছে প্রত্যেকটা দোকান ঘুরে দেখতে৷ কিন্তু নেত্রর তদারকিতে সেটা হচ্ছে না৷ ‘চলো, কফি হাউজে ঢুঁ মেরে আসি,’ হাসল নেত্র৷
—‘আবার কফি হাউজ? এই তো লাঞ্চ করলাম!’ আকাশ থেকে পড়ল নদী৷
—‘আরেহ! কফি হাউজে কেউ খেতে যায় না৷ ওটা একটা ফিলিং৷ এসো তো,’ নদীর হাতটা হঠাৎই নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল নেত্র৷ তারপর রাস্তা পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যময় বিল্ডিংটার দিকে৷ কয়েক সেকেন্ড লাগল নদীর ব্যাপারটা বুঝতে৷ নেত্রর হাতের মুঠোয় কী অপরিসীম অধিকারবোধ আর যত্ন৷ যা খুব অনায়াসে বাড়িয়ে দিতে পারে নদীর হার্টবিটস৷ এদিক ওদিক ঘুরে, বই কিনে, ওরা দু’জনে যখন বাড়ির দিকে পা বাড়াল; তখন প্রায় সন্ধে সাতটা৷ ‘ওকে, দেন! বাই,’ মেট্রো স্টেশনের বাইরে এসে হাত নাড়ল নেত্র৷ ও বাস ধরবে৷
—‘ভালো কাটল৷ থ্যাঙ্ক ইউ! আসছি৷ সোমবার দেখা হবে৷’
—‘কাল কী করছ?’ জিজ্ঞেস করল নেত্র৷ গলার স্বরে এক অদ্ভুত আকুতি৷
—‘কিছুই না৷’
—‘টেরিটি বাজার যাবে? ব্রেকফাস্ট করতে? তবে কাল অত সকালে মেট্রো পাবে না৷’
—‘ক্যাবে করে আসব,’ কথাটা বলেই নিজেকে সামলে নিল নদী, ‘না মানে আমার কোনও অসুবিধে নেই৷’
—‘বেশ!’ হাসল নেত্র, ‘বাকি কথা মেসেজে হবে৷ তোমার মেট্রো চলে আসবে তিন মিনিটের মধ্যে৷ বাই!’
—‘বাই!’ বলে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নামতে শুরু করল নদী৷ কাল আবার নেত্রদার সঙ্গে দেখা হবে!
অনেক দিন পর আজ মনটা বেশ ফুরফুরে নেত্রর৷ বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরাল ও৷ নদী সত্যিই স্রোতের মতো স্বচ্ছ৷ যত দিন যাচ্ছে, ওর সঙ্গ প্রিয় হয়ে উঠছে নেত্রর৷ আহুতিকে ও সত্যিই ভালোবাসত৷ বা এখনও বাসে বোধ হয়! কিন্তু আহুতি কখনও নেত্রকে নেত্রর মতো করে আপন করতে চায়নি৷ এই তো, এতদিন পরেও বন্ধুত্বের মোড়কে স্রেফ ব্যবহার করে নিল ওকে৷ রুম থেকে মোবাইলটা নিয়ে বারান্দায় এল নেত্র৷ আহুতির নম্বরটা খুলে চুপ করে দেখল অনেকক্ষণ৷ কিন্তু না, ডিলিট করতে পারল না শেষমেশ৷ প্রথম প্রেমকে অত সহজে মুছে ফেলা যায় না৷ সিগারেটটা শেষ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল নেত্র৷ কাল ভোরে উঠতে হবে৷ ‘টেরিটি বাজার অভিযান!’ নিজের মনেই হাসল নেত্র৷ সেন্ট্রাল মেট্রোস্টেশনের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নদীকে দেখে পলকের জন্য থমকে গেল নেত্র৷ শাড়ি পরেছে নদী৷ গাঢ় নীল শাড়ী৷ সঙ্গে মানানসই জাঙ্ক জুয়েলারি, চোখে কাজল, চুল খোলা৷ অন্যরকম দেখাচ্ছে ওকে৷ অন্তত জিন্স, টি-শার্ট পরা হ্যাপি গো লাকি মেয়েটার থেকে বেশ অন্যরকম৷ নেত্রকে দেখে এগিয়ে এল নদী৷ ‘ইউ আর লুকিং ডিফারেন্ট৷ গরজাস,’ হাঁটতে হাঁটতে বলল নেত্র৷
—‘থ্যাঙ্ক ইউ!’ নদীর গলায় প্রাপ্তির সুর, ‘আমি এখানকার কথা অনেক শুনেছি৷ কিন্তু আজ প্রথমবার এলাম৷’
—‘আমি লাস্ট এসেছি বছর খানেক আগে৷ আসলে আমার কলকাতা ঘুরতে খুব ভালো লাগে৷ তবে একজন সঙ্গী পেলে ব্যাপারটা জমে ভাল৷ কলেজে
থাকাকালীন বন্ধুরা প্রায়ই ঘুরতে বেরোতাম৷ যাক গে, মোমো খাবে তো?’
—‘হ্যাঁ,’ মাথা নাড়ল নদী৷ ওর মন এখন অন্যদিকে৷ জায়গাটার প্রত্যেকটা কোণে আভিজাত্যের ছাপ৷ দোকানিদের কর্মপদ্ধতিতে অবাক করা মুনশিয়ানা৷ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর তাদের এগজিস্টেন্স বজায় রাখার এক অকল্পনীয় স্ট্রাগল৷ খাবারও অতি সুস্বাদু৷ অনেকরকম খাবার ট্রাই করল ওরা- মোমো, থুকপা, রাইস বল, কোকোনাট বল, চিকেন পাই ও আরও অনেক কিছু৷ খাওয়া শেষ করে ছবি তুলতে শুরু করল নেত্র৷ এখানকার পরিবেশটা সত্যিই অন্যরকম৷ অনেক বিদেশি পর্যটকরাও ভিড় করেছেন৷ নদীও ঘুরে দেখছে সবকিছু৷ ন’টা নাগাদ ছবি তোলা শেষ হল নেত্রর৷ ‘এবার বাড়ি যাই?’ জিজ্ঞেস করল নদী, ‘এত খেয়েছি যে আর নড়তে পারছি না৷’
—‘উঁহু৷ চলো এদিক ওদিক আর একটু৷ তুমি হেঁটে হেঁটে খাবার হজম করো আর আমি ছবি তুলব৷’ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল নদী৷ নেত্রর সঙ্গে সময় কাটাতে বেশ ভাল লাগছে ওর৷ উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে শুরু করল ও৷ নেত্র যা সামনে পাচ্ছে তারই ছবি তুলছে৷ স্ট্রিট ফটোগ্রাফি৷ ‘এই নদী, এদিকে তাকাও তো! একটা ছবি তুলি,’ নেত্রর ডাকে পিছনে ফিরল ও৷ পটাপট কয়েকটা ছবি তুলল নেত্র৷ তারপর হাত নেড়ে নদীকে ডাকল, ‘কেমন হয়েছে—দেখে যাও৷’ নেত্রকে আর ঠিক সিনিয়র লাগছে না নদীর৷ বন্ধু বলা যেতে পারে বরং৷ ক্যামেরায় ঝুঁকে পড়ে ছবিগুলো দেখতে শুরু করল ও৷ যথেষ্ট ভালো৷ হঠাৎ ওর কপাল ছুঁয়ে নেমে আসা চুলগুলো আলতো হাতে কানের পিছনে গুঁজে দিল নেত্র৷ ইলেকট্রিক শক খেলে গেল নদীর শরীরে৷ চমকে নেত্রর দিকে তাকাল ও৷ ‘ক্যামেরা আড়াল হচ্ছিল৷ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না৷ তাই...,’ নেত্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠেছে৷ ক্যামেরাটা নদীর হাতে দিয়ে এক পাশে সরে গেল ও৷ অচেনা নম্বর৷ ‘হ্যালো?’ ইচ্ছে করেই গলায় একটু বিরক্তি ঢেলে ফোনটা রিসিভ করল ও৷
—‘নেত্র? আমি আহুতির বাবা বলছি,’ ওপারে উৎপলবাবুর গলা কান্নাভেজা গলা৷
—‘কী হয়েছে, আঙ্কল?’
—‘আহুতির প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়েছে, বাবা৷ ও আমাদের কাউকেই বলেনি৷ এই অসুখের জন্যই সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছে৷ আলাদা থাকছে৷ আজ ওর কেমো৷ হসপিটাল থেকে ফোন করেছিল আমাদের৷ ইমার্জেন্সি কন্ট্যাক্টে ও আমার নম্বরটা দিয়েছে৷ তুমি একবার আসতে পারবে?’
—‘আঙ্কল!’ মাথা কাজ করছে না নেত্রর, ‘এসব কবে? কীভাবে? আ...আমি আসছি৷ কোথায় অ্যাডমিটেড ও?’
—‘রাজারহাটের ক্যান্সার হসপিটালটায়৷’
—‘আমি এক্ষুনি পৌঁছচ্ছি আঙ্কল!’ ফোনটা কেটে দিল নেত্র৷ ঘড়িতে দেখল সকাল সাড়ে দশটা৷ পিছন ফিরতেই নদীকে দেখতে পেল ও৷ চোখে অনেক প্রশ্ন নিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে৷ নিজেকে শান্ত করে এগিয়ে গেল নেত্র৷ নদীর কাঁধে হাত রাখল, ‘আয়্যাম সরি৷ আমায় যেতে হবে৷’
—‘মা...মানে?’
—‘শি ইজ সিক৷ টেরিবলি সিক৷ প্রব্যাবলি ডাইং৷’
—‘হু শি?’
—‘মাই ফার্স্ট লাভ৷ আহুতি৷ শি হ্যাজ ক্যান্সার৷’
—‘হোয়াট?’ গলার কাছে পাকিয়ে ওঠা কান্নাটাকে গিলে ফেলল নদী, ‘আপনি সময় নষ্ট করছেন কেন? এক্ষুনি যান৷ ক্যাব বুক করুন৷’
—‘আমি ট্যাক্সি নিয়ে নেব৷ বাট আর ইউ ওকে?’
—‘ইয়েস৷ আমার আবার কী হবে? ইউ গো অ্যান্ড টেক কেয়ার অব হার৷’
—‘আর ইউ ওকে?’
—‘শি নিডস ইউ৷ গো,’ নেত্রর হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল নদী৷ কয়েক সেকেন্ড বিহ্বল তাকিয়ে থেকে বড় রাস্তার দিকে দৌড়ল নেত্র৷ ও চোখের আড়াল হওয়ার পর, ব্যাগ থেকে সানগ্লাসটা বের করে জলদি চোখে লাগাল নদী৷ এতে চোখের জল লুকোনো সহজ হয়৷ তারপর উল্টো দিকে ফিরে হাঁটা শুরু করল৷
রোববারের ফাঁকা রাস্তা ধরে হু হু করে ছুটছে ট্যাক্সি৷ পিছনের সিটে দু’হাতে মাথা ধরে বসে আছে নেত্র৷ একটা ফোন কলে ওর দুনিয়া আবার এদিক ওদিক হয়ে গেল৷ কারণটা আবারও আহুতি৷ তবে খুব সম্ভবত শেষবারের মতো৷ এবারও ঠিক আগের মতোই করেছে ও৷ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই কাছের লোকেদের দূরে সরিয়ে দেওয়া৷ আর বোকার মতো আবারও সেই ট্র্যাপেই পা দিল নেত্র৷ ‘একটু তাড়াতাড়ি চালান তো, দাদা,’ ড্রাইভারকে কথাটা বলে ফোনে আহুতির নম্বরটা ডায়াল করল ও৷ আজ খুব ঝগড়া করবে নেত্র৷ খুব...৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন