শেকড়

পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়

—‘ম্যাম, বিলটা কী নামে হবে?’

—‘দক্ষিণী মুখার্জী৷’

—‘ওকে ম্যাম, থ্যাঙ্ক ইউ৷ একটু ওয়েট করুন৷ এক্ষুনি হয়ে যাবে৷’

—‘নো প্রবলেম৷ টেক ইয়োর টাইম,’ হাসিমুখে শো-রুমের এক কোণে গিয়ে একটা চেয়ারে বসল দক্ষিণী৷ কাস্টমাইজড জিনিসপত্র ওর খুব পছন্দের৷ তাই কাল এই নতুন ব্যাগটা কিনে আজই এখানে চলে এসেছে নিজের নামের ইনিশিয়ালস দিয়ে এটাকে কাস্টমাইজ করার জন্য৷ ছোটবেলা থেকেই নিজের জিনিসপত্রে নাম খোদাই করতে পছন্দ করত দক্ষিণী৷ তা সে পেন্সিলবক্স হোক বা স্কুলব্যাগ৷ সেই অভ্যেসটিই বোধ হয় রয়ে গিয়েছে৷ তবে এখন আর নিজের পেন বা কম্পাসে না, অত্যাধুনিক টেকনোলজিতে খোদাইয়ের কাজ হয়৷ নিজের এই খামখেয়ালিপনার কথা ভাবতে ভাবতে মনে মনে হাসছিল দক্ষিণী৷ হঠাৎ একজন স্টাফ এসে ওর সামনে দাঁড়াল, ‘ম্যাম, আমাদের নতুন ম্যানেজার স্যার আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চান৷ আপনি কি কাইন্ডলি একটু ভিতরে আসবেন?’

—‘আমার সঙ্গে দেখা করতে চান? কিন্তু কেন বলুন তো?’

—‘আমি তো ঠিক বলতে পারব না, ম্যাম৷ আমায় স্যার বললেন যে আপনার সঙ্গে ওঁর কিছু প্রয়োজন আছে৷ তবে হ্যাঁ, উনি আপনাকে জোর করতেও বারণ করেছেন৷’

—‘আচ্ছা, ঠিক আছে৷ চলুন,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দক্ষিণী৷ ছেলেটা কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে হাঁটতে শুরু করল৷ কাউন্টারের গেট দিয়ে ঢুকে দোকানের পিছন দিকে এল ওরা৷ শোরুমের পিছনে যে এত বড় একটা অফিস আছে— সেটা ধারণাই করতে পারেনি দক্ষিণী৷ প্রায় কুড়িজন লোক কাচঘেরা একটা বড় ঘরে বসে একমনে কাজ করছে৷ আর অন্যদিকে সারি বাঁধা কয়েকটা কেবিন৷ তারই মধ্যে একটার দরজা খুলে উঁকি মারল ছেলেটা, ‘স্যার, ম্যাম এসেছেন৷’ তারপর দরজা থেকে সরে এসে বলল, ‘যান, ম্যাম৷ ভিতরে যান৷’

—‘ওকে,’ বলে খানিক ইতস্তত হাতে কেবিনের দরজাটা খুলল দক্ষিণী৷ আর খুলতেই চমক৷ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন এই স্টোরের নতুন ম্যানেজার৷ ‘সৌজন্য’দা!’ বিস্ময় লুকোতে পারল না দক্ষিণী৷

—‘কী ভাগ্যিস নামটা চোখে পড়েছিল! নয়তো দেখাই হত না৷ বোস,’ চেয়ারের দিকে হাত দেখাল সৌজন্য৷

—‘হুঁ,’ বসল দক্ষিণী, ‘কেমন আছ? এতদিন পর দেখে সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে৷’

—‘ভালো৷ তুই কেমন?’ সৌজন্যর গলার স্বরও কেঁপে যাচ্ছে৷

—‘আমার কথা ছাড়ো৷ কোথায় ছিলে এতদিন? ওরকম কাউকে কিছু না বলে, অত রাতে কেউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়?’

—‘দক্ষিণী!’ হাসল সৌজন্য, ‘প্রায় দশ বছর আগের একটা ঘটনার জন্য এখন বকুনি দিবি?’

—‘আলবাত দেব৷ কাকু-কাকিমার কী অবস্থা হয়েছিল বলো তো? তুমি ইচ্ছেমতো যখন খুশি বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছ ভাল আছ৷ মানে বেঁচে আছ আর কী! কোথায় আছ, কী করছ—এইগুলো কখনও জানাওনি...৷’

—‘...মুম্বইতে ছিলাম৷ আর্টস্কুলে পড়ছিলাম৷’

—‘সেগুলো বাড়িতে বললে কী হত, সৌজন্য’দা?’

—‘যে বাড়ির লোকগুলো আমার ড্রয়িংয়ের কাজগুলো দেখে বলেছিল- ‘এই বাড়ির ছেলে আঁকলে যে মান সম্মান থাকবে না’, তাদের এসব বলে কী হত! একমাত্র মা-ই আমায় যতটা পেরেছে সাপোর্ট করেছে৷’

—‘আর কেউ তোমার পাশে ছিল না, বুঝি?’ দক্ষিণীর স্বরে অভিমান৷

—‘আমি বাড়ির লোকের কথা বলছি, দক্ষিণী৷ আমার আর তখন পড়াশোনা করতে ভালো লাগছিল না৷ মন বসাতে পারছিলাম না জাস্ট৷ বাবা আর জেঠুকে সেটা বলতেই ওঁরা ভীষণভাবে রিয়্যাক্ট করলেন৷ শিল্পকে যে অতছোট করে দেখা যায়, আগে কখনও ভাবতেও পারিনি৷ আমার তৈরি করা ডিজাইনগুলো আমার পরিচয় ছিল৷ ওঁরা যখন সেগুলোকে অদ্ভুত এক তাচ্ছিল্য নিয়ে ছুড়ে ফেলছিলেন, নিজের বেঁচে থাকা কনফিডেন্সটুকুকে সম্বল করে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না৷’

—‘আর একটু বোঝালে হয় তো বুঝে যেতেন!’

—‘তা জানি না৷ তবে রণবীর কাপুরের একটা ডায়লগ শুনলাম কিছুদিন আগে৷ খুব সত্যি কথা জানিস- ‘কহিঁ পে পঁহৌছনে কে লিয়ে কহিঁসে নিকালনা বহুত জরুরি হোতা হ্যায়!’

—‘আচ্ছা, থাক ওসব৷ ভাল আছ?’

—‘অন্তত শিল্পে আছি৷ এইমাত্র আমার তৈরি একটা ফন্টস্টাইল তুই পছন্দ করে ব্যাগ কাস্টমাইজ করতে দিলি৷ এর থেকে বেশি আর কী ভাল থাকব?’

—‘ওটা তোমার তৈরি? আই ফিল অনার্ড৷’

—‘তোর খবর বল৷’

—‘ওই রুটিনমাফিক চাকরি, ফ্ল্যাট, সোশাল লাইফ৷ মাসে দু’বার বাড়ি৷’

—‘বিয়ে করিসনি?’

—‘নাহ! তুমি?’

—‘উঁহু৷’

—‘বাড়ি যাবে, সৌজন্যদা?’

—‘দক্ষিণী! আবার?’

—‘কাল যাচ্ছি আমি বাড়ি৷ প্লিজ না কোরো না৷ আচ্ছা, বাড়ি যেতে ইচ্ছে না করলে যেও না৷ শহরটা ঘুরে আসবে চল৷ ছোটবেলাটা দেখে আসবে,’ দক্ষিণীর চোখে উচ্ছ্বাস৷ অপলক তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবল সৌজন্য৷ তারপর সদর্থক ঘাড় নাড়ল ধীরে ধীরে৷ ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাত বাড়াল দক্ষিণী, ‘ভিজিটিং কার্ডটা দাও তোমার৷ বাকি কথা ফোনে হবে৷ এবার আসি৷’

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়েছে সৌজন্য৷ বারবার আয়নার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে৷ কথা বলছে প্রতিবিম্বর সঙ্গে৷ ঠিক হচ্ছে কি এতদিন পর ওখানে যাওয়া! দু-দিন আগেই মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে৷ ওই বাড়িতে একমাত্র ওর সঙ্গেই কথা হয় সৌজন্যর৷ তবে ও বোঝে মা ফোনটা লাউডস্পিকারে দিয়ে কথা বলেন৷ একাধিক লোকের শ্বাসপ্রশ্বাসের আওয়াজ ওর কানে আসে৷ আগে মা ওকে খুব বাড়ি যেতে বলতেন, এখন আর বলেন না৷ ছেলেকে শুধুমাত্র কণ্ঠস্বরে কাছে পেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন৷ গতকাল দক্ষিণীর নামটা দেখে নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারেনি সৌজন্য৷ শৈশব, কৈশোরের সবথেকে প্রিয় মানুষটার হাতছানি এত সহজে এড়ানো যায় না৷ নিজের জন্মদিনগুলোয় দক্ষিণী মুখিয়ে থাকত সৌজন্যর হাতে আঁকা ছবি উপহার হিসেবে পাবে বলে৷ ওর আবদার কখনওই ফেলতে পারে না সৌজন্য৷ সেইজন্যেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় ওকে বলে আসেনি৷ কারণ দক্ষিণী ওকে থেকে যেতে বললে, স্বপ্ন অধরা রয়ে যেত৷ গতকালও সেই একই কারণে বাড়ি যাবার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে সৌজন্য৷ ওই দীঘির মতো চোখগুলোকে না করা যায় না৷ আর দক্ষিণী চাইলে, সৌজন্য নিজের সবটা দিয়ে দিতে পারে৷ আজও৷ ঠিক সকাল ন’টার সময় সৌজন্যর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল৷ দক্ষিণী ফোন করছে৷ ‘হ্যালো,’ কাঁপা হাতে ফোনটা ধরল সৌজন্য৷

—‘চলে এসো৷ আমি আর সাত মিনিটের মধ্যে লেকটাউন মোড়ে পৌঁছব’, ওপারে দক্ষিণীর গলায় অর্ডার৷ অগত্যা কিছু না বলে ফোন কেটে দিল সৌজন্য৷ ব্যাগপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে৷

দক্ষিণী নিজেই ড্রাইভ করে৷ সৌজন্যর তাতে কোনও প্রবলেম নেই৷

‘মেয়েরা ড্রাইভ করতেপারে না’- এই ধারণাটা আজকাল বড্ড ব্যাকডেটেড আর ক্লিশে শোনায়৷ ও মন দিয়ে রাস্তা দেখছে৷ গাড়িতে রেডিয়ো চালিয়ে রেখেছে দক্ষিণী৷ অকওয়ার্ড সাইলেন্সের ভয় নেই৷ এয়ারপোর্ট পেরোতেই একটু স্পিড বাড়াল ও৷ সৌজন্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর? মুম্বই গেলে কী করে?’

—‘সে এক গল্প,’ হাসল সৌজন্য, ‘ঝোঁকের মাথায় চলে গেলাম৷ ওখানে সার্ভাইভালটা একটু কষ্টের৷ কিন্তু মুম্বই কাউকেই ফেরায় না৷ আমিও টিকে গেলাম৷ ফুডচেনে কাজ থেকে পোস্টার আঁকা— স-অ-ব করেছি৷’

—‘সিরিয়াসলি? তুমি তো বাড়িতে জলটুকুও নিজে নিয়ে খেতে না৷’

—‘দায়ে পড়লে সব করতে পারে লোকে৷ যাই হোক, তারপর আর্টস্কুলে অ্যাডমিশন আর ধীরে ধীরে লাইফ ওয়াজ অন ট্র্যাক৷’

—‘বাহ!’

—‘আর তোর কী খবর?’

—‘আমার তোমার মতো অত সাহস ছিল না, সৌজন্যদা৷ বাড়িতে বলতেই পারিনি যে আমার ইতিহাস পড়তে ভাল লাগে৷ আর দশটা মধ্যবিত্ত বাঙালি সন্তানের মতো ইঞ্জিনিয়ারিং আর তারপর চাকরি৷’

—‘আর গানটা?’

—‘ধুস! প্রত্যেক বাঙালি কন্যেই ক্লাস এইট অবধি গান শেখে৷ তারপর নাইনে মাধ্যমিকের ভয় দেখিয়ে তাদের গানের ক্লাস একদিন হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়৷’

—‘ইশ! কী সুন্দর গলা ছিল তোর, দক্ষিণী৷ চর্চা করলে অনেক কিছু হতে পারত৷’

—‘ওটাকে বিলাসিতা বলে৷ বাদ দাও৷ গাড়ি দাঁড় করাই? ব্রেকফাস্ট করবে তো?’ পার্কিংয়ে মন দিল দক্ষিণী৷

‘এই যে, সৌজন্য ব্যানার্জী, আপনার নিজের শহরে আপনাকে ওয়েলকাম’, হাসল দক্ষিণী৷ গাড়ি ঢুকেছে ওদের শহরে৷ এসি চলা সত্ত্বেও জানলার কাচ নামিয়ে দিয়েছে সৌজন্য৷ অপলক চোখে দেখছে সবকিছু৷ আর দক্ষিণী দেখছে ওকে৷ ‘এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু,’ নিজের মনে বিড়বিড় করল সৌজন্য৷ ইচ্ছে করেই গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে দক্ষিণী৷ পাশ দিয়ে রিকশাও চলে যাচ্ছে ওভারটেক করে৷ ‘কোথায় যাবে? দীঘির ধারে?’ জিজ্ঞেস করল দক্ষিণী৷

—‘হ্যাঁ চল,’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল সৌজন্য৷ কথা না বাড়িয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে দিল দক্ষিণী৷ দীঘির ধার এই ছোট্ট শহরের সবথেকে সুন্দর জায়গা৷ গাড়ি থামাতেই নেমে পড়ল সৌজন্য৷ দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল দীঘির দিকে৷

ওকে একান্তে কাটানোর জন্য সময় দিল দক্ষিণী৷ গাড়ি থেকেই মাকে ফোন করে জানাল যে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে৷ অতএব বাড়ি পৌঁছতে একটু দেরি হবে৷ ফোন রেখে, আরও কয়েক মিনিট পর গাড়ি থেকে নেমে দীঘির দিকে এগোল ও৷ বাঁধানো স্ল্যাবগুলোর একটায় বসে আছে সৌজন্য৷ একমনে জল দেখছে৷ ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল দক্ষিণী৷ জানতে চাইল, ‘ভালো লাগছে?’ উত্তর দিল না সৌজন্য৷ দক্ষিণীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল কেবল৷ হেসে ওর পাশে বসল দক্ষিণী৷ ক্ষণিকের প্রশ্রয় যে এত বড় আশ্রয় হতেপারে—জানা ছিল না সৌজন্যর৷

‘তোমার খিদে পায়নি, সৌজন্যদা?’ মাঠের ঠিক মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল দক্ষিণী৷ ওরা এখন কড়িতলার মাঠে এসেছে৷ এই শহরের কেন্দ্রবিন্দু এই মাঠটা৷ বছরে দু’বার মেলা বসে৷ দুপুরবেলা বলে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এখন৷ ‘পেয়েছে হয় তো৷ কিন্তু মালুম হচ্ছে না,’ উত্তর দিল সৌজন্য৷ সে এখন ছবি তোলায় ব্যস্ত৷

—‘খুব যে আসতে চাইছিলে না!’ দক্ষিণীর গলায় ছদ্মরাগ৷

—‘সে তো ফিরতে কষ্ট হবে তাই৷ দৌড়োদৌড়ির রসকষহীন জীবনে হঠাৎ করে অনেক ভালোবাসা চলে এলে, ফিরতে কষ্ট হয়,’ আকাশের দিকে তাকাল সৌজন্য৷

—‘বাড়ি যাবে?’

—‘ভয় করছে৷ দীর্ঘদিনের অনভ্যাস৷’

—‘আচ্ছা৷ আপাতত চলো কিছু খেয়ে নিই৷ মাথা কাজ করছে না৷’

এক সময় ছিল যখন এই শহরে একটাও রেস্তোরাঁ ছিল না৷ এখন সেই সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না৷ সবথেকে নামী রেস্তোরাঁয় সৌজন্যকে নিয়ে গেল দক্ষিণী৷ খাওয়া হল দু’জনেরই পছন্দের বিরিয়ানি৷ খুব একটা বেশি কথা বলছে না সৌজন্য৷ বোঝাই যাচ্ছে ওর সাবকনশাসে এই মুহূর্তে যুদ্ধ চলছে৷ গাড়িতে ওঠার পরও কোনও কথা বলল না ও৷ শহরের এ’গলি—ও’গলিতে অকারণ ঘোরাঘুরি করে, সৌজন্যর বাড়ির সামনে যখন গাড়ি দাঁড় করাল দক্ষিণী, তখন ঘড়িতে সন্ধে ছ’টা৷ ওর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে বুকভরা শ্বাস নিল সৌজন্য৷ কয়েক সেকেন্ড পরে বলল, ‘এলাম রে৷ বাড়ি যাই৷’ তারপর দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল৷ ওর পরে গাড়ি থেকে নামল দক্ষিণীও৷ পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সৌজন্যের দিকে৷ ও ততক্ষণে কলিংবেল বাজিয়ে দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে৷ একজন বৃদ্ধা দরজা খুললেন৷ হাতে একটা ঘটি৷ সন্ধে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বোধহয়৷ ইনি সৌজন্যর জেঠিমা৷ ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল তাঁর৷

তারপরই বুকে আঁকড়ে ধরলেন সৌজন্যকে৷ আগলহীন ভালোবাসায় ভিজিয়ে দিলেন ওর টি-শার্ট৷ চিৎকার জুড়লেন, ‘সকলে কোথায় গেলে গো? দেখো কে এসেছে?’ তারপর সৌজন্যের দিকে ফিরে বললেন, ‘হতভাগা, বাবা-জ্যাঠার ওপর এত অভিমান! আমাদের কথাও মনে পড়ল না...!’ ততক্ষণে এসে পড়েছেন বাড়ির বাকিরাও৷ সকলেরই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা৷ চোখভর্তি জল নিয়ে পিছন ফিরল দক্ষিণী৷ বাকিটুকু সৌজন্যর পরিবারের একান্ত ব্যক্তিগত৷ ওকে যে এবার নিজের বাড়ি ফিরতে হবে৷ মা অপেক্ষা করছেন৷

গাড়ির কাছে ফিরছে দক্ষিণী৷ পাড়ার বাকি বাড়িগুলোর জানলা দিয়ে ততক্ষণে উঁকি মেরেছে অনেকগুলো উৎসুক মুখ৷ পথচারীরা হাঁটা থামিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন পরিস্থিতির গভীরতা৷ একাধিক কণ্ঠস্বরের বার্তালাপ কানে আসছে দক্ষিণীর৷ সেদিকে না তাকিয়ে গাড়িতে উঠে বসল ও৷ স্টার্ট দিয়ে গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে দিল নিজের বাড়ির দিকে৷ মাত্র একটা গলির পরই ওদের বাড়ি৷ সৌজন্য আর দক্ষিণীর বাবারা ছোটবেলার বন্ধু৷ সেই বন্ধুত্বই নিয়ম মেনে ওদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল৷ যখন তখন একে অন্যের বাড়ি যেতে কখনও দু’বার ভাবতে হত না ওদের৷ দক্ষিণী বয়সে সৌজন্যর থেকে পাঁচ বছরের ছোট৷ তাই ছোটবেলা থেকেই সৌজন্যদা ছিল ওর সুপারহিরো৷ সৌজন্যদার ক্রিকেট খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, ড্রয়িং, তবলা বাজানো- সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হত দক্ষিণীর৷ আর সেই সুপারহিরো কোনও কাজে ওকে শাগরেদ বানালে তো কথাই নেই৷ খুব ভাল গল্পও বলতে পারত সৌজন্যদা৷ পুজোর ছুটির দুপুরগুলো একসঙ্গে শারদীয়া পত্রিকাগুলো পড়তে পড়তেই কাটত ওদের৷ সৌজন্যদা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর কিছুদিন প্রায় বিভীষিকার মতো কেটেছিল দক্ষিণীর৷ সুপারহিরোরা আবার গায়েব হয়ে যায় না কি! তারপর সময় ধীরে ধীরে সামলে দিয়েছে সব৷ তবে সৌজন্যদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেনি দক্ষিণী৷ এখনও এখানে এলেই একবার দেখা করে আসে কাকিমার সঙ্গে৷ গাড়ি গ্যারেজে ঢুকিয়ে দোতলায় উঠে এল দক্ষিণী৷ মা টিভি দেখছিলেন৷ ওকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, ‘কোন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলি, দিখু? এত দেরি হল!’

—‘পরে বলছি৷ আগে বলো, তুমি কেমন আছ? বাবা কোথায়?’

—‘ভালো আছি৷ তোর বাবা বেরিয়েছে৷ ক্লাবের মিটিং৷’

—‘ওহ! মা, আমি ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে আসছি৷ সেই কোন সকালে এসব পরেছি৷ তুমি টিভি দেখো,’ নিজের রুমের দিকে হাঁটা লাগাল দক্ষিণী৷ মাকে বলাই যেত সৌজন্যদার ফিরে আসার কথা কিন্তু ওদের বাড়ির অবস্থা ঠিক কী—তা না জানা অবধি কাউকে কিছু বলতে চাইছে না দক্ষিণী৷

কোনও অপ্রিয় ঘটনা ঘটলে সেই প্রসঙ্গ চাপা থাকাই ভালো৷ পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে, ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে বাবার সঙ্গে গল্প করছিল দক্ষিণী৷ বাবা-মা অনেক দিন হয়ে গেল কলকাতা যাননি৷ সেই নিয়েই জোরাজুরি করছিল ও৷ এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল৷ ওদের বসতে বলে মা দরজা খুলতে গেলেন৷ কয়েক মুহূর্ত পরই ধরা গলায় চিৎকার করে উঠলেন, ‘সৌজন্য? তুই? এখানে কবে এলি? বাড়ি গিয়েছিলি?’ মায়ের কথা কানে যেতেই সচকিত চোখে দক্ষিণীর দিকে তাকালেন বাবা৷ তারপর দ্রুতচেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলেন সদর দরজার দিকে৷ কিন্তু দক্ষিণী নিজে চুপ করে বসে রইল৷ প্রত্যেক সম্পর্কের নিজস্ব সমীকরণ থাকে৷ সেখানে বাকিদের ঢুকতে নেই৷ প্রায় পনেরো মিনিট পর সৌজন্যকে নিয়ে ডাইনিংরুমে ঢুকলেন বাবা-মা৷ সকলের চোখেই উপচে পড়া ভালোবাসা৷ সৌজন্য বসল দক্ষিণীর পাশে৷ জিজ্ঞেস করল, ‘কাকিমা, লুচি তো আজ ব্রেকফাস্টে?’

—‘হ্যাঁ, রে৷ পাঁচ মিনিট বোস৷ এক্ষুনি বানাচ্ছি,’ বলে হাসিমুখে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন দক্ষিণীর মা৷

—‘দিখু, সৌজন্য তোর সঙ্গে এসেছে—এই কথাটা আমাদের জানাসনি কেন?’ প্রশ্ন করলেন দক্ষিণীর বাবা৷

—‘বলিনি কারণ বললে এই এত সুন্দর সারপ্রাইজটা মিস করে যেতে,’ হাসল দক্ষিণী৷ এরপর কথা এগোতে থাকল নিজস্ব ছন্দে৷ সৌজন্যর কাছে নিজেদের প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসলেন দক্ষিণীর বাবা-মা৷ গল্প এগোতেথাকল নিজস্ব ছন্দে৷

দুপুর এগারোটা নাগাদ দক্ষিণীর বাবা বেরিয়ে গেলেন৷ প্রত্যেক ছুটির দিনেই ওঁদের ক্লাবে আড্ডা বসে৷ ‘তোদের ছাদটা এখনও একইরকম আছে রে?’ জানতে চাইল সৌজন্য৷

—‘হ্যাঁ,’ হাসল দক্ষিণী, ‘যাবে?’

—‘চল,’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সৌজন্য৷ তারপর দু’জনে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে৷ দক্ষিণীদের ছাদটা সত্যিই সুন্দর৷ ওর বাবা একদিকে নিজের পছন্দমতো ফুল, ফল, সবজির চারাগাছ লাগিয়ে বাগান করেন৷ মানে ফুলের বাগান আর কিচেন গার্ডেন একসঙ্গে৷ পুবদিকটা আগে পুরো ফাঁকা ছিল৷ এখন সেখানে সুন্দর দেখতে একটা দোলনা বসানো হয়েছে৷ অন্যদিকটায় ওদের চিলেকোঠার ঘর৷ ওদের ছোটবেলায় খেলার জিনিস, ছেঁড়া ঘুড়ি, লুকোনো সম্পত্তি— সব এই ঘরেই রাখা থাকত৷ ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে দু’জনেই ম্লান হাসল৷ ‘খোলা যাবে না?’ একটু ইতস্তত করেই জিজ্ঞেস করল সৌজন্য৷

—‘হ্যাঁ, একটু ওয়েট করো৷ চাবি নিয়ে আসি,’ বলেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল দক্ষিণী৷ তারপর ফিরে এল এক মিনিটের মধ্যেই৷

চাবিগোছার সবক’টা চাবিই একে একে ঘুরিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করতে শুরু করল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই খুলল তালা৷ আলতো ঠেলে দরজাটা খুলল দক্ষিণী৷ সঙ্গে সঙ্গেই একটা ন্যাপথালিনের গন্ধ মেশানো সোঁদা হাওয়া ধাক্কা দিল ওর নাকে৷ ওর খেয়াল হল, কলকাতা চলে যাওয়ার পর আর খুব বেশি আসা হয়নি এই ঘরটায়৷ নীরব পদক্ষেপে দক্ষিণীর পাশে এসে দাঁড়াল সৌজন্য৷ তারপর ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে ভিতরে ঢুকল৷ ঘরটা আগের মতো নেই ঠিকই৷ এখন অনেক গোছানো আর পরিপাটি৷ সংসারের বিভিন্নরকম জিনিসে ভর্তি৷ ‘কত স্মৃতি বলো, সৌজন্যদা?’ সৌজন্যর গা ঘেঁষে দাঁড়াল দক্ষিণী৷

—‘হ্যাঁ৷ সব যেন স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি! তোর ‘ঠাকুমার ঝুলি’র ছেঁড়া পাতা, চোখ বন্ধ না হওয়া ডলপতুল, রঙিন ক্লিপগুলো, হারমোনিয়াম, লাল রঙের ব্যাডমিন্টন স্টিক, দু’টুকরো হয়ে যাওয়া লুডো...’, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে সৌজন্যর৷

—‘...আর তোমার সবুজ রঙের ক্যাম্বিস বল, লাল-সাদা ব্যাট, ঘুড়ি-লাটাই, ডাংগুলি, পেন্সিল স্কেচ, আরও কত্ত কী!’ হাসল দক্ষিণী৷ তারপর দুজন গিয়ে বসল জানলার নীচটাতে৷ ছোটবেলায়ও এখানে বসেই খেলা করত ওরা৷ প্রসঙ্গ বদলাতে দক্ষিণী জিজ্ঞেস করল, ‘কাল বাড়িতে সবাই খুব খুশি হল তো?’

—‘হুঁ৷ বাঙালি প্যারেন্টরা যদি মন খুলে ‘আই লাভ ইউ’ বলতে পারতেন, তাহলে সব অনেক সহজ হত —জানিস?’

—‘হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ?’

—‘এই যে সব বকুনির ভিতরেই তো আসলে অনেকটা করে স্নেহ থাকে৷ কিন্তু বকুনির আস্তরণটা এত পুরু যে আমরা স্নেহটা মিস করে যাই৷ কাল আমায় দেখেই বাবা খুব বকুনি দিতে শুরু করেছিলেন৷ তারপর আমি জড়িয়ে ধরতেই বললেন—‘ছেলের ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করেছিলাম বলে এত বড় শাস্তি দিলি!’ অথচ তখন যদি বলতেন যে সৌজন্য আমার তোর কেরিয়ার চয়েস দেখে ভয় লাগছে, তাহলে হয় তো ব্যাপারটা অন্যরকম হত!’

—‘ইটস ওকে৷ এখন তো সব ঠিকঠাক!’

—‘বিশ্বাস হচ্ছে না রে৷ এত্ত আদরও পাওয়া যায়?’

—‘আপনজনেরা সবসময়ই ভরিয়ে দেন৷ তুমি এতদিন মিস করে গেছ৷ এবার কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে খুব আনন্দ করো এখানে৷’

—‘তুই ফিরছিস কবে?’

—‘আজ বিকেলে৷’

—‘এবার আমরা একসঙ্গেই আসাযাওয়া করতে পারি তো?’

—‘একদম,’ হাসল দক্ষিণী৷ হঠাৎ ওর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ বন্ধ করল সৌজন্য৷ তারপর বলল, ‘প্রায় সবকিছুই আগের মতো আছে, দিখু৷ তাই না?’ দৃশ্যতই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে দক্ষিণী৷ কিন্তু পলকে নিজেকে সামলে নিল ও৷ বলল, ‘অবশেষে আমায় ডাকনামে ডাকলে! সেই দেখা হওয়া থেকেই তো দক্ষিণী নামেই ডাকছো৷’

—‘এই দক্ষিণীর আড়ালে সেই ছোট্ট দিখু এখনও রয়ে গিয়েছে কি না, বুঝতে পারছিলাম না৷ কিন্তু কাল যখন তুই আমায় বাড়ি পৌঁছে দিলি, আই রিয়ালাইজড যে আমরা যতই বদলাই না কেন, আমাদের সম্পর্কটা এখনও একইরকম আছে৷’

—‘দ্য ইনার চাইল্ড অলওয়েজ সার্ভাইভস, সৌজন্যদা৷ হয় তো আড়াল হয়ে যায়৷ কিন্তু একটু সময় নিয়ে খুঁজলেই বেরিয়ে পড়ে৷’

—‘আমাকে আমার দিখু ফিরিয়ে দিবি?’

—‘সময় নিয়ে খুঁজে দেখো পাও কি না! তবে সেও নিজের সেই ছোটবেলার সুপারহিরোকে খুঁজছে,’ হাসল দক্ষিণী৷ হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল সৌজন্য৷ ওর অনেক কিছু বলার আছে দক্ষিণীকে৷ কিন্তু এই মুহূর্তে শব্দেরা সহযোগিতা করছে না৷ অস্ফুটে বলল, ‘এখন এলাম রে৷ পরে দেখা হবে৷’ ওকে বাধা দিল না দক্ষিণী৷ ও জানে সম্পর্ককে সময় দিতে হয়৷ তবেই তা নিজের মতো করে ডালপালা ছড়ায়৷ আপাতত ছাদের দোলনায় গিয়ে বসল ও৷ গুনগুন করে গাইতে শুরু করল, ‘...আমার আকুল জীবনমরণ টুটিয়া লুটিয়া নিয়ো—তোমার অতুল গৌরবে...৷’

‘কী আশ্চর্য! তুমি আজ ফিরবে কেন? এতদিন পরে এলে,’ ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ফোনের ওপারে থাকা সৌজন্যকে জিজ্ঞেস করল দক্ষিণী৷ ও বেরিয়ে যাবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই৷ কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সৌজন্যও ফিরতে চাইছে আজ৷ ও না কি ছুটি নিয়ে আসেনি আর সেই জন্য আগামিকাল প্রবলেম হতে পারে৷ অগত্যা রাজী হতেই হল দক্ষিণীকে৷ বলল, ‘ঠিক আছে৷ রেডি হয়ে নাও৷ আমি বেরোনোর আগে কল করে দেবো৷’ আজকাল রাস্তাঘাট সবসময়ই এত ব্যস্ত যে রাতে গাড়ি চালিয়ে কলকাতা ফিরতেও আনসেফ লাগে না৷ ‘দিখু, কিছু খাবার নিয়ে যাবি?’ ঘরে ঢুকলেন দক্ষিণীর মা৷

—‘না, মা৷ ফ্রিজে অনেক কিছু আছে৷ এই সপ্তাহে আসলে বেশিরভাগ দিনই অফিস ক্যান্টিনে লাঞ্চ করেছি৷’

—‘আচ্ছা! তবে ক’টা মালপোয়া নিয়ে যা৷ সবেমাত্র বানালাম৷ সৌজন্যকে দেব৷ ও তো খুব ভালোবাসে মালপোয়া৷’

—‘ইশ! এত তাড়াতাড়ি পর করে দিলে আমাকে?’ ঠোঁট বাঁকাল দক্ষিণী৷

—‘ও মা, এ কেমন কথা! ছেলেটা এতদিন পরে এল!’

—‘আমি নিয়ে এলাম বলেই তো ও এল, মা,’ কাঁধ ঝাঁকাল দক্ষিণী, ‘সেই জন্য আমায় দুটো মালপোয়া বেশি দেবে৷’

—‘আচ্ছা,’ হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন দক্ষিণীর মা৷ দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে খাটের ওপর বসল দক্ষিণী৷ সন্ধে নামছে ধীরে ধীরে৷ জানলা দিয়ে কমলা আকাশ দেখা যাচ্ছে৷ পাখিরা দল বেঁধে বাড়ি ফিরছে৷ কলকাতায় এইসব দেখা যায় না৷ কিংবা হয় তো স্ট্রিটলাইটের আলোর রোশনাইকে অতিক্রম করে বোঝা যায় না৷ সকলের চোখে এত খুশি অনেকদিন পর দেখছে দক্ষিণী৷ বিশ্বাস করতে কেমন যেন কষ্ট হচ্ছে৷ সত্যিই তো দশ বছর পর এইভাবে সৌজন্যদা ফিরে আসবে আর সবটা তখনও একইরকম থাকবে—এটা ও কখনও কল্পনাও করেনি৷ এই দশটা বছরকে এখন কেমন দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যেতে ইচ্ছে করছে!

ঠিক সন্ধে সাতটায় সৌজন্যর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড় করাল দক্ষিণী৷ বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল সৌজন্য৷ পাশে ওর মা৷ দক্ষিণীকে দেখে অভিযোগের সুরে বললেন, ‘তুই এবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এলি না যে, দিখু?’

—‘আসলে কাকিমা, আমি ভাবলাম যে এই সময়টুকু কেবল তোমার আর সৌজন্যদার হওয়া উচিত৷’

—‘আর আমি যে তোর জন্য নিমকি বানিয়ে রেখেছিলাম৷ তার বেলা? এই নে,’ একটা বড় বয়াম দক্ষিণীর হাতে দিলেন ভদ্রমহিলা৷ হাসিমুখে সেটা নিয়ে গাড়িতে উঠল দক্ষিণী৷ সঙ্গে সঙ্গে সৌজন্যও৷ তারপর গাড়ি রওনা দিল কলকাতার উদ্দেশে৷ কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ড্রাইভ করছে দক্ষিণী৷ গুগল ম্যাপে দেখাচ্ছে এনএইচ থার্টি ফোরে জ্যাম আছে৷ অতএব রাস্তাবদল৷ সৌজন্য বয়াম খুলে নিমকি খাচ্ছে মুঠো মুঠো৷ ‘ ওটা তো আমার৷ তোমায় মা মালপোয়া দিয়েছে — সেটা খাও,’ চোখ কোঁচকালো দক্ষিণী৷

—‘উঁহু৷ ওটা ভবিষ্যতের জন্য বাঁচিয়ে রেখেছি৷’

—‘তা বলে আমার নিমকিগুলো শেষ করবে?’

—‘হুঁ৷ বেশ করব৷ শোন, একটা চায়ের দোকান দেখে গাড়ি দাঁড় করা তো৷ চায়ের তেষ্টা পেয়েছে৷’

—‘এই রাত আটটার সময় চায়ের তেষ্টা পেয়েছে?’

—‘হুঁ!’

—‘আচ্ছা,’ বলে রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলো দেখতে শুরু করল দক্ষিণী৷ প্রায় পনেরো মিনিট পর একটা মোড়ের মাথায় চায়ের দোকান দেখে গাড়ি থামাল ও৷ ততক্ষণে নিমকির বয়ামের অর্ধেকটা খালি হয়ে গিয়েছে৷ গাড়ি থেকে নামল ওরা দু’জনেই৷ দুটো স্পেশাল চায়ের অর্ডার দিয়ে দাম মেটাল সৌজন্য৷ তারপর দক্ষিণীর দিকে ফিরে বলল, ‘তুই চা দুটো নিয়ে আয়৷ আমি গাড়িতে গেলাম৷’

—‘হোয়াট?’ দক্ষিণী অবাক, ‘কিন্তু কেন? এখানে চা খেতে তো ভাল লাগবে৷’

—‘নো, ম্যাম৷ এখানে নিমকি নেই,’ একগাল হেসে গাড়িতে ফিরে গেল সৌজন্য৷ প্রায় দশ মিনিট অপেক্ষা করার পর, চা নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা লাগল দক্ষিণী৷ প্রথমে জানলা দিয়ে সৌজন্যর হাতে কাপ দু’টো দিয়ে, তারপর ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলল৷ আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক খেল ও৷ ওর সিটের ওপর একটা আংটি রাখা৷ দেখেই মনে হচ্ছে সাবেকি ঘরানার পুরনো আংটি৷ আর সিটের ওপরে পরপর নিমকি সাজিয়ে লেখা, ‘আই লাভ ইউ, দিখু৷ —‘ফ্রম ইওর সুপারহিরো৷’ অনেকবার লেখাটাকে পড়ছে দক্ষিণী৷ ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না ওর৷ নিজের হার্টবিটস শুনতে পারছে, হাত কাঁপছে৷ ‘ওইরকম করছিস কেন? লোকে দেখছে যে!’ অবাক হয়ে দক্ষিণীর দিকে তাকাল সৌজন্য, ‘শিগগির পিছনের সিটে উঠে বস৷’ মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছনের সিটে উঠে বসল দক্ষিণী৷ বলল, ‘তোমায় যে সময় নিতে বলেছিলাম!’

—‘এত বছরেও যখন আমাদের রিলেশনশিপটা একটুও বদলায়নি, তখন আরও সময় নিয়ে নতুন করে কী আর চেঞ্জ হবে? তাছাড়া, আমি থার্টি টু আর তুই টোয়েন্টি সেভেন৷ এরপর তো এত বুড়ো হয়ে যাব যে আর প্রেম করা যাবে না,’ সৌজন্যর গলায় আকুতি৷

—‘আর আমাদের যদি না দেখা হত?’

—‘এখন যখন দেখা হয়েই গিয়েছে, তখন দেখা না হলে কী হত—সেটা কী করে বলি?’

—‘তুমি এখনও খুব সুন্দর কথা বলতে পার, সৌজন্যদা!’

—‘আর তুই এখনও বহুত বোকা বোকা প্রশ্ন করতে পারিস!’

গাড়ি ছুটছে দ্রুতগতিতে৷ তবে এখন গাড়ির ড্রাইভিং সিটে সৌজন্য৷ দক্ষিণীর হাত কাঁপা দেখে ওকে আর আজকে গাড়ি চালাতে দিতে সাহস হয়নি সৌজন্যর৷ পিছন থেকে সামনে চলে এসেছে দক্ষিণী৷ সৌজন্যর পাশে বসে হাতে পরা আংটিটা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে৷ হঠাৎ বলে উঠল, ‘আচ্ছা, প্রথম থেকেই কিছু জিনিস ক্লিয়ার করে নেওয়া ভালো৷ আমার কিছু শর্ত আছে৷’

—‘কীরকম শর্ত?’ ভ্রূ কপালে তুলল সৌজন্য৷

—‘আমার কিন্তু এবার থেকে সব নতুন জিনিসপত্রে এক্সক্লুসিভ ফন্টসে কাস্টমাইজেশন চাই৷’

—‘ওকে! আর?’

—‘সারাবছর নিমকির জোগান চাই!’

—‘এই আমারও মালপোয়া চাই৷’

—‘মাসে দু’বার বাড়ি আসতেই হবে৷’

—‘হুম!’

—‘ঘুরতেও যেতে হবে বছরে একবার৷’

—‘ডান!’

—‘আর কখনও না বলে চলে যেও না, প্লিজ৷ কেমন অসহায় লাগে—জানো! আর চিটেড ফিল হয়৷’

—‘নেভার! সরি!’ গলা বুজে আসছে সৌজন্যর৷

—‘যদি একান্তই পালাতে হয়, আমায় নিয়ে পালিও,’ গিয়ারের ওপর রাখা সৌজন্যর হাতের ওপর হাত রাখল দক্ষিণী৷ হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখছে সৌজন্য৷ গলার কাছে জমাট বাঁধছে দুঃখের মেঘ৷ অনেক স্মৃতিভিড় করছে মনে৷ কেমন একটা বিষাদময় আনন্দ হচ্ছে ওর৷ গাড়ি বোধ হয় থামাতে হবে— নয় তো অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে৷ অতএব রাস্তার বাঁদিকে ফাঁকা পার্কিং দেখতে শুরু করল সৌজন্য৷ রেডিয়োতে তখন বাজছে, ‘...বন্ধু চল...৷’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%