পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়
নিজের সবথেকে ভাল পাঞ্জাবিটা আলমারি থেকে বের করেছে প্রত্যয়৷ আজ নয়নার বিয়ে৷ নয়না হল প্রত্যয়ের বন্ধু সমীরের বোন৷ সমীর, ওর বাবা, মা- সকলেই পইপই করে প্রত্যয়কে দুপুরের মধ্যে চলে যেতে বলেছেন৷ ওকে নাকি বর আনতে যেতে হবে৷ চিরকালের মুখচোরা প্রত্যয় ‘না’ বলতে পারেনি৷ সব কষ্টগুলোকে হাসির আড়ালে লুকিয়ে নিয়ে সদর্থক ঘাড় নেড়েছে৷ বন্ধুর বোনকে বোন হিসেবেই দেখা উচিত৷ কিন্তু প্রত্যয় কখনওই সেটা পারেনি৷ নয়নার দীঘল চোখ আর মিষ্টি হাসি ওর হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছে বারবার৷ কিন্তু নয়নাকে কখনও বলা হয়ে ওঠেনি সেকথা৷ আর্থিকভাবে প্রত্যয়রা স্বচ্ছল৷ কিন্তু সমীররা বড়লোক৷ ওদের ব্যবহারে কখনও সেই কথা প্রকাশ না পেলেও, প্রত্যয়ের মন থেকে এই মধ্যবিত্ত ভাবনাটা কখনওই যায়নি৷
ক্লাস ইলেভেনে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছিল প্রত্যয়৷ সেখানে প্রথম দিনই ওর আলাপ হয় সমীরের সঙ্গে৷ তারপর সমীরের বাবা, মানে অঙ্কের অধ্যাপক বিজনকুমার গাঙ্গুলীর কাছে টিউশন পড়তে শুরু করেছিল ও৷ বিজনবাবু প্রথাগত টিউটর ছিলেন না৷ কেবল ওদের দু’জনকেই অঙ্ক দেখিয়ে দিতেন৷ নয়নার তখন ক্লাস এইট৷ মাঝে মধ্যেই ওদের সঙ্গে বসে পড়ত অঙ্ক কষতে৷ দাদার সঙ্গে খুনসুটিও চলত পুরোদমে৷ প্রত্যয়ের সঙ্গেও ওর বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি৷ কিন্তু নয়না ওদের সঙ্গে পড়তে বসলেই, কোনও অঙ্ক মাথায় ঢুকত না প্রত্যয়ের৷ ফর্মুলাগুলোও কেমন ওলটপালট হয়ে যেত৷ এরপর ফিজিক্স অনার্স নিয়ে একই কলেজে ভর্তি হয়েছিল সমীর আর প্রত্যয়- দু’জনেই৷ সমীরের বাড়িতে প্রত্যয়ের যাওয়া আসা দিনের পর দিন বেড়েছে বই কমেনি৷ নয়নাকে চোখের সামনে বালিকা থেকে কিশোরী আর তারপর যুবতী হতে দেখেছে ও৷ ততদিনে নয়নারও সমস্ত আবদারের একমাত্র জায়গা হয়ে উঠেছে ওর প্রত্যয়দা৷ মাধ্যমিকের আগে ভূগোল বুঝিয়ে দেওয়া, ইলেভেন-টুয়েলভে প্র্যাকটিকাল লিখে দেওয়া, নতুন কোনও সিনেমা রিলিজ করলে দেখাতে নিয়ে যাওয়া- সবকিছু করেছে প্রত্যয়৷ শুধু ‘ভালোবাসি’ বলতে পারেনি৷ তাই নয়না ছ’মাস আগে, হঠাৎ একদিন হোয়াটসঅ্যাপ করে যখন জানিয়েছিল যে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, গলার কাছে পাকিয়ে ওঠা দুঃখের দলাটাকে গিলে নিয়ে প্রত্যয় লিখেছিল ‘কনগ্র্যাচুলেশনস’৷
আজ আর মেট্রো নয়, একটা ক্যাব নিয়েছে প্রত্যয়৷ সাড়ে চারটের মধ্যে পৌঁছে যাবে ও সমীরদের বাড়ি৷ এর মধ্যেই দু’বার ফোন করে ফেলেছে সমীর৷ আসলে দুই বন্ধুর যা ঘনিষ্ঠতা- তাতে গতকাল থেকেই সমীরদের বাড়িতে উপস্থিত থাকা উচিত ছিল প্রত্যয়ের৷ কিন্তু ও ছুটি পায়নি৷ অবশ্য ছুটি নেওয়ার খুব চেষ্টাও যে করেছে- এমন নয়৷ নিজের ভালবাসাকে প্রত্যেক মুহূর্তে অন্যের হতে দেখা ভীষণ কষ্টের৷ ইচ্ছে করে সেই কষ্ট থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে চেয়েছে ও৷
পৌনে চারটে নাগাদ সমীরদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ক্যাবটা৷ গেটের সামনে কমলা আর সাদা রঙের প্যান্ডেল৷ মাইকে সানাই বেজে চলেছে৷ ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল প্রত্যয়৷ অনেক চেনা-অচেনা মানুষ৷ কী করবে ভেবে না পেয়ে সমীরকে ফোন করতে যাবে- এমন সময় ওর সামনে এসে দাঁড়াল বহু পরিচিত এক মুখ৷ হাতে মেহেন্দি, পায়ে আলতা, হালকা প্রসাধন, অল্প কিছু গয়না, হাতে গাছকৌটো—অপরূপা লাগছে নয়নাকে৷ ‘তোমার অবশেষে সময় হল, প্রত্যয়দা?’ চোখদু’টো ছোট করে তাকাল নয়না৷
—‘সরি রে৷ আসলে ছুটি পাইনি তো!’
—‘আর আজ? এতক্ষণ কী করছিলে বাড়িতে?’
—‘সমীরের সঙ্গে এখনই আসার কথা হয়েছিল যে৷ আমি তো তোর বর আনতে যাব,’ হাসল প্রত্যয়৷
—‘মোটেই না৷ তুমি আমাকে পার্লারে নিয়ে যাবে৷ প্লিজ!’
—‘তা বোধ হয় হবে না৷ এই নে তোর গিফট৷ পরে যদি আর সময় না পাই,’ পকেট থেকে একটা ছোট্ট কৌটো বের করল প্রত্যয়৷ ভেতরে দুটো ঝুমকো দুল৷ কৌটোটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত অপলক তাকিয়ে রইল নয়না৷ তারপর বলল, ‘তুমি আমাকে নিয়ে পার্লারে যাবে৷ বলে দিলাম৷’
সমীরদের বাড়ির পাশেই একটা লজ আছে৷ সেখানেই খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ বিজনবাবুর সঙ্গে ওখানেই বসেছিল প্রত্যয়৷ বাড়িতে অত লোকের মাঝে থাকার চেয়ে, এখানে বসে সব তদারকি করাই ভাল৷ ইন্ট্রোভার্টদের ভিড় দেখলেই প্যালপিটিশন বাড়ে৷ বিজনবাবুর ঘনঘন ফোন আসছে৷ আক্ষরিক অর্থেই তিনি এখন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা৷ সাদা আর গোলাপি ফুলে সেজে উঠেছে হলটা৷ মাটিতে রেড কার্পেট৷ বিভিন্ন রকমের আর বিভিন্ন সাইজের আলো লাগানো হচ্ছে একের পর এক৷
ঘরের একদিকে বুফের ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷ তার সামনে সাদা চাদরে মোড়া অনেক চেয়ার৷ ‘বাবা, আমি আর ছোটমামা বর আনতে বেরিয়ে পড়ি তাহলে?’ সমীর এসে দাঁড়িয়েছে প্রত্যয়ের পাশে৷
—‘চল৷ আমিও তো যাব,’ পাঞ্জাবির হাতাটা গোটাতে গোটাতে উঠে দাঁড়াল প্রত্যয়৷
—‘না, না৷ তুই একটু পরে বোনকে নিয়ে পার্লারে যাবি৷’
—‘কেন? এইরকম তো কথা ছিল না!’
—‘বোন বলল তুই সঙ্গে গেলে ওর সুবিধে হয়৷ আমরা আসি রে,’ হাত নেড়ে চলে গেল সমীর৷ মুখ বেজার করে বসে রইল প্রত্যয়৷ ঠিক যে ভয়টা ও পাচ্ছিল, সেটাই হল৷
গাড়ির ব্যাক-সিটে বসেছে প্রত্যয়৷ ওর পাশেই একটা বড় ব্যাগ কোলে নিয়ে বসে আছে নয়না৷ ওই ব্যাগে নাকি ওর বেনারসী শাড়ি আর মেকআপ আছে৷ ‘নয়না, এত মেকআপ?’ প্রত্যয় অবাক৷
—‘না, জুয়েলারিও আছে৷’
—‘তাহলে এই বাক্সতে কী?’ নয়না আর ওর মাঝখানে রাখা বাক্সটার দিকে আঙুল দেখাল প্রত্যয়৷
—‘ওর ভেতরেও গয়না আছে,’ অপ্রস্তুত হাসল নয়না৷
—‘এত গয়না নিয়ে বেরিয়েছিস? বাড়ি ফিরে গিয়ে পরলে হত না?’ প্রত্যয়ের গলায় শঙ্কা৷
—‘না৷ পার্লারে সব সুন্দর করে পরিয়ে দেবে৷ অত ভয় পেও না তো, প্রত্যয়দা৷ কিচ্ছু হবে না৷’
পার্লারে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা বেজে উঠল নয়নার৷ এক হাতে ফোন ধরে আর অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল ও৷ প্রত্যয় খেয়াল করল— সিটে রাখা বাক্সটা নিতে ভুলে গেছে নয়না৷ তাড়াতাড়ি ওকে ফোন করল প্রত্যয়৷ এনগেজড বলছে৷ লেডিজ পার্লারে তো ও ঢুকতেও পারবে না৷ ভেতরে অনেক গয়না আছে, অচেনা সিকিওরিটি গার্ডের হাতে বাক্সটা দিতেও মন চাইছে না৷ অগত্যা গাড়িতে বসেই বাক্সটা পাহারা দিতে
লাগল ও৷ ড্রাইভার গাড়ি পার্ক করে, এসি নিভিয়ে চলে গিয়েছে৷ প্রত্যয় গাড়িতে বসে থাকবে শুনে বেশ অবাকই হয়েছিল সে৷ গলগল করে ঘামছে প্রত্যয়৷ সব জানলাগুলোর কাচ যে নামিয়ে দেবে- তাও সম্ভব না৷ গয়নার বাক্স পাহারা দেওয়ার পূর্বাভিজ্ঞতাও ওর নেই৷ নয়নাকে আরও কয়েকবার ফোন করেছিল ও৷ লাইন এনগেজডই আছে৷
প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পার্লার থেকে বেরোল নয়না৷ লাল বেনারসী, গা ভর্তি গয়না— ওর দিক থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না৷ গাড়িতে বসেই একগাল হেসে প্রত্যয়ের দিকে তাকাল ও, ‘কেমন দেখাচ্ছে?’
—‘অসাধারণ!’ হাসল প্রত্যয়, ‘তুই তো এই বাক্সটা গাড়িতেই ফেলে গিয়েছিলি রে৷ তবে আর গয়না পরতিসই বা কোথায়?’
—‘ওহ! হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম৷’
—‘চিন্তা করিস না৷ আমি সারাক্ষণ গাড়িতেই ছিলাম৷ কেউ হাত দেয়নি বাক্সে৷’
—‘কেউ হাত দেয়নি?’ নয়নার গলার অসহায়তাটা কানে লাগল খুব৷ পরক্ষণেই ও বলে উঠল, ‘মানে—ভাগ্যিস, কেউ হাত দেয়নি!’ তারপরেই কীরকম গম্ভীর হয়ে গেল নয়না৷ ব্যাপার কী বুঝতে না পেরে আর কথা বাড়াল না প্রত্যয়ও৷
রাস্তায় জ্যাম থাকায় ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেল ওদের৷ বরযাত্রী এখনও এসে না পৌঁছলেও, বর এসে গিয়েছে৷ নয়নাকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করল প্রত্যয়৷ ভারী শাড়ি আর গয়নায় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে ও৷ ‘সাবধানে আয়,’ বাড়ির দিকে পা বাড়াল প্রত্যয়৷
—‘প্রত্যয়দা!’ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল নয়না৷
—‘হ্যাঁ? বল৷’
—‘এটা তোমার,’ গাড়িতে ফেলে যাওয়া সেই কাঠের বাক্সটা ওর হাতে দিল নয়না৷
—‘আমার? মানে?’ যারপরনাই অবাক হয়েছে প্রত্যয়৷
—‘তুমি তো কোনওদিন কিছু বললে না!’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নয়না, ‘আমিই না হয় বলে দিলাম৷ নতুন জীবনে পুরনোর ছায়া রাখতে চাই না৷ তোমার রেশটুকু তাই তোমাকেই ফেরত দিচ্ছি৷ প্রত্যেকবার রাখি বা ভাইফোঁটার সময় পিসির বাড়ি চলে যেতে যে কারণে, ঠিক সেই কারণেই আমিও কখনও তোমার জন্য রাখি কিনিনি৷ শুধু যদি একবার বলতে...৷’ মাথা কাজ করছে না প্রত্যয়ের৷ নয়নার কথাগুলো তিরের মতো বিঁধেছে ওকে৷ বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে ও৷ ‘দাদাভাইয়ের ঘরে চলে যাও, প্রত্যয়দা৷ ওখানে এখন কেউ যাবে না৷ ভাল থেকো,’ প্রত্যয়কে পিছনে ফেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল নয়না৷
সমীরের ঘরে এসে বসেছে প্রত্যয়৷ এই ঘরটা বাড়ির একদম প্রান্তে৷ পনেরো মিনিটের মধ্যেই নয়নার বিয়ের লগ্ন৷ অতএব এখন এই ঘরে কারোর আসার সম্ভাবনা খুব কম৷ আলতো হাতেবাক্সটা খুলল ও৷ ডালাটায় লেখা—‘প্রত্যয়দা’র জন্য’৷ বাক্সের ভেতর অজস্র কাগজ৷ কোনওটা বা ওদের একসঙ্গে দেখা মুভির টিকিট, কোনওটা বা ছিঁড়ে যাওয়া ভূগোলের ম্যাপ- যেটায় প্রত্যয়ের হাতের লেখায় পয়েন্টিং করা৷ কিছু কাগজে কেমিস্ট্রির রিয়্যাকশন বা বায়োলজির প্র্যাকটিকাল লেখা৷ এছাড়াও বিভিন্ন জায়গার টিকিট, কিছু গ্রিটিংস কার্ড৷ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে প্রত্যয়ের চোখ৷ একটু নীচের দিকে একটা পার্কার পেন—মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর পর এই পেনটা নয়নাকে গিফট করেছিল প্রত্যয়৷ উচ্চমাধ্যমিকের পরে দেওয়া রিস্টওয়াচটাও আছে৷ বাক্সের নীচে সেলোটেপ দিয়ে আটকানো একটা চিরকুট৷ আস্তে করে চিরকুটটা খুলে হাতে নিল প্রত্যয়৷ হাতের লেখাটা নয়নার—
‘প্রত্যয়দা,
প্রাক্তনকে অতীতে রেখে গেলাম৷ তবে তার ভবিষ্যৎ যেন খুব ভালভাবে কাটে৷ নতুনকে সুযোগ দিও৷ আমাকে না হয় বলতে পারলে না৷ কিন্তু তাকে মনের কথা জানিও৷ অপেক্ষা বড্ড কষ্ট দেয়, জানো তো!
ভাল থেকো,
—নয়না৷’
চোখের জল হাতের চেটোয় মুছে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল প্রত্যয়৷ বাক্সটা রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না ওর৷ ওটা হাতে নিয়ে যখন ছাদনাতলায় এসে দাঁড়াল ও— সাতপাকে ঘুরছে নয়না৷ বড্ড মোহময়ী লাগছে ওকে! সকলের চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে এল প্রত্যয়৷ একটা ক্যাব বুক করে বাড়ি চলে যাবে ও৷ খুব ভাল থাকুক নয়না৷ ভাল থাকবে প্রত্যয় নিজেও—কথা দিল প্রাক্তনকে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন