পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়
এপ্রিলের প্রথমেই পাড়ার ক্লাব ‘বিভাবরী’র দুর্গাপ্রতিমা গড়ার কথা নব পালকে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছে সম্পাদকমণ্ডলী৷ আসলে সবাই আজকাল নবকে আগে থেকে বুক করে রাখতে চায়৷ মৃণ্ময়ীকে চিন্ময়ী করে তুলতে এই এলাকায় নবর জুড়ি মেলা ভার৷ বহুবছর ধরে ‘বিভাবরী’র প্রতিমা তৈরি করছেন নব৷ শেষ কয়েক বছর লাগাতার পুরস্কারও পাচ্ছেন৷ ছোটোবেলা থেকেই মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত তিনি৷ প্রথমে জ্যাঠামশাইয়ের শাগরেদি করতেন, এখন নিজের ব্যবসা৷ তিনজন কর্মচারীও রেখেছেন৷ ‘শুনছ’, স্ত্রী নন্দিনীকে হাঁক পাড়লেন নব, ‘আজ একটু ব্যাঙ্কে যেতে হবে৷’ স্বভাবতই কোনও উত্তর এল না৷ প্রায় সাতবছরের গার্হস্থ্য জীবন নব আর নন্দিনীর৷ এখন গতি বেশ শ্লথ৷ কারণ একটাই—সন্তান না হওয়া৷ ডাক্তারও দেখিয়েছিলেন ওঁরা৷ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গিয়েছিল যে নন্দিনীর নয়, খামতি আছে নবরই৷ প্রথমদিকে নিয়ম করে ওষুধও খেতেন তিনি৷ কিন্তু কোনও ফল না মেলায়, ছেড়ে দিয়েছেন সব৷ চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে, জলখাবারে মন বসালেন নব৷
বেরোনোর আগে একবার রান্নাঘরে উঁকি মারলেন নব৷ মন দিয়ে রান্না করছে নন্দিনী৷ আজকাল নিজেদের কেমন ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হয়৷ শারীরিক মিলন নিয়ম মেনে হয় বটে কিন্তু একে অপরের মনের কিনারা পান না ওঁরা৷ ‘কিছু আনতে হবে তোমার জন্য?’ জানতে চাইলেন নব৷
—‘কে?’ নন্দিনী চমকে উঠল, ‘ও তুমি! না, কিছু লাগবে না৷’
—‘বাজার টাজার?’
—‘সব আছে৷ দেখি একটু,’ বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ে এল নন্দিনী৷ কিছু একটা খুঁজছে৷ নব বেশ বুঝতে পারেন, আজকাল তাঁকে দেখলেই কেমন যেন গুটিয়ে যায় নন্দিনী৷ কিছু জানতে চাইলে দায়সারা উত্তর দেয়, যেন এড়িয়ে যেতে পারলে বাঁচে৷ ‘মাধব আসতে পারে একটা লিস্ট দিতে, নিয়ে নিও৷ সাবধানে রেখো, খুব জরুরি ওটা,’ —‘মাধব আসবে?’ সতর্ক চোখে তাকাল নন্দিনী, ‘ঠিক আছে, নিয়ে রাখব৷’
হেঁটেই ব্যাঙ্কে যাচ্ছেন নব৷ সকালবেলায় হাঁটতে মন্দ লাগে না৷ ব্যাঙ্কে পৌঁছতেই, তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়াল এটিএম গার্ড, ‘ব্যাঙ্ক তো বন্ধ, দাদা৷ সেকেন্ড স্যাটারডে৷’ কয়েক মুহূর্ত থমকে গিয়ে নব সজোরে হেসে উঠলেন৷ ব্যাপারটা তো খেয়াল হয়নি৷ অবশ্য তাদের মতো স্বল্পশিক্ষিত মানুষেরা প্রয়োজন হলেই ব্যাঙ্কে দৌড়ে আসেন৷ অগত্যা মনে মনে নিজেকে খানিক দুষে নিয়ে ফের বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালেন তিনি৷ খামোখা কতটা সময় নষ্ট হয়ে গেল! অনেকগুলো লক্ষ্মী-গণেশ মূর্তি তৈরি হয়ে, ফাইনাল টাচের অপেক্ষায় পড়ে আছে৷ মন ভাল করার জন্য ফেরার পথে, এক ঠোঙা জিলিপি কিনলেন তিনি৷ নন্দিনী ভালোবাসে৷ অন্তত এককালে বাসত৷
বাড়ি ফিরে আগে স্টুডিয়োয় গেলেন নব৷ কর্মচারীরা— মানে বংশী, জিৎ, গোপাল—সকলেই কাজে ব্যস্ত৷ ওদেরকে জিলিপি দিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি৷ নন্দিনী এই সময়টায় পুজোয় বসে৷ ওকে ডেকে লাভ নেই, ও নিশ্চয়ই এখন ঠাকুরঘরে৷ ঠোঙাটা টেবিলের ওপর রাখলেন নব৷ বেডরুমের দরজাটা ভেজানো৷ তার মানে ঘরে কোনও খাবার জিনিস রাখা আছে৷ বেড়াল থেকে বাঁচতে প্রায়ই এই কৌশলটা ব্যবহার করে নন্দিনী৷ হালকা হাতে দরজাটা ঠেলতেই হাত-পা হিম হয়ে গেল নবর৷ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত ছিটকে বেরিয়ে এলেন তিনি৷ অন্ধকার ঘরের বিছানায় একজোড়া নগ্ন শরীর আদিম খেলায় মেতেছে৷ দু’জনকেই চেনেন তিনি— একজন তাঁর সহধর্মিণী নন্দিনী, অন্যজন দীর্ঘদিনের বন্ধু মাধব৷ প্রচণ্ড গা গুলোচ্ছে নবর৷ সকালের রুটি—তরকারি যেন পেট, বুক জ্বালিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ কোনওরকম শব্দ না করে কলতলায় ছুটলেন তিনি৷ গলায় আঙুল ঢুকিয়ে অনেকটা বমি করলেন৷ তারপর বাঁধানো কলতলাটা জল দিয়ে ধুয়ে দিয়ে, ধীরপায়ে হাঁটা লাগালেন স্টুডিয়োর দিকে৷ তবে তার আগে জিলিপির ঠোঙাটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে বাড়ির পিছনের ঝোপে ফেলে দিলেন৷ মাধব আর নন্দিনীকে কোনওভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে তিনি ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পেয়েছেন৷ খুব ইচ্ছে করছিল পর্দাটা সরিয়ে আর একবার উঁকি মারতে, কিন্তু নিজেকে সংবরণ করলেন নব৷ ওদের হাতেনাতে ধরতেও ইচ্ছে করল না৷
লোক জানাজানি হলে, একথা সেকথার পর তাঁর পৌরুষের দিকেও আঙুল উঠবে৷ এই চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে আর যাই হোক, কেচ্ছা হজম হবে না৷
নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে স্টুডিয়োয় গিয়ে বসলেন নব৷ অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও কাজে মন বসল না৷ গোপাল কী একটা বলছিল, হাতের ইশারায় ওকে থামতে বললেন৷ ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা মন থেকে কিছুতেই সরছে না৷ শুধুমাত্র সন্তানহীনতা নন্দিনীকে পরপুরুষে আগ্রহী করে তুলল! অবশ্য মেওয়া ফলবে না জেনে গেলে, কেউ কি আর সবুর করে? স্টুডিয়োর ভিতরের ঘরে ঢুকলেন নব৷ এখানে মূর্তি রং করা হয়৷ তিনটে শীতলা মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে হলুদ রঙের প্রলেপ৷ তুলি আর কালো রঙের মগটা নিয়ে এগিয়ে গেলেন নব৷ চোখ আঁকবেন৷ চক্ষুদান তাঁকে সবকিছু ভুলিয়ে দিতে পারে, নিজেকে ভগবান মনে হয় তখন৷ তিনি সৃষ্টি করতে পারেন, রূপ দিতে পারেন৷ একমনে প্রথমে ভ্রু-যুগল, তারপর ধীরে ধীরে চোখ, মণি আঁকতে শুরু করলেন নব৷ হঠাৎ মাধবের কথায় ঘোর কাটল তাঁর, ‘আরে! তুই এখানে? আর আমি এতক্ষণ ধরে ভিতরে অপেক্ষা করছি৷ বৌদি বললেন তুই বেরিয়েছিস৷ ফিরতে এত দেরি দেখে আমি তো বাড়িই চলে যাচ্ছিলাম৷’
—‘এই ফিরলাম,’ মিথ্যে বললেন নব, ‘দেরি হয়ে গেছে দেখে আর বাড়িতে ঢুকিনি৷’
—‘ওহ! এই নে লিস্ট,’ পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন মাধব৷
—‘নন্দিনীকে দিয়ে দিলেই পারতিস,’ ঠান্ডা গলায় বললেন নব, ‘এতক্ষণ তো ভিতরেই ছিলি!’
—‘হ্যাঁ, তা পারতাম,’ থমকালেন মাধব, ‘আসলে, আমি ভাবলাম তুই লিস্টটা নিজে দেখে নিলেই ভাল৷ আমি আসি রে৷’
—‘আয়৷’
দুপুর দেড়টা নাগাদ, খাবার টেবিলে এসে বসলেন নব৷ এই টেবিলটা গতবছরই কেনা হয়েছে, হাঁটুদুটো বিগড়োনোর লক্ষণ দেখানো শুরু করার পর৷ রোজকার মতোই নন্দিনী এক থালা ভাত আর বাটি ভর্তি ডাল এনে রাখল৷ অজান্তেই নবর চোখ চলে যাচ্ছে নন্দিনীর ঘাড়, পিঠের অনাবৃত জায়গাগুলোয়৷ নিজেকে ধমক দিয়ে খাবারে মন দিলেন তিনি৷ দুপুরবেলা নিরামিষই খান নব৷ ঈশ্বর গড়লে, কিছু বিশ্বাস তো রেখে চলতেই হয়৷ কিছুক্ষণ পর, আলুভাজা দিতে এসে থমকাল নন্দিনী, ‘এ কী? এখনও খাওয়া শুরু করনি? ডালটা ভাল হয়নি বুঝি?’ নব উত্তর দিলেন না৷ কী অসাধারণ অভিনয় করছে নন্দিনী৷ কে বলবে, এই মহিলাই কিছুক্ষণ আগে অবৈধ আনন্দের খেলায় মত্ত ছিল৷ স্ত্রীয়ের সঙ্গে কথা বলতেও রুচিতে বাধছে নবর৷ থালাভর্তি ভাতে জল ঢেলে দিয়ে উঠে পড়লেন তিনি৷ ‘আরে, কী হল?’ নন্দিনীর গলায় শঙ্কা স্পষ্ট ‘শরীর খারাপ লাগছে না কি?’
—‘স্বাদ পাচ্ছি না কোনও৷ সবকিছু কেমন কষাটে লাগছে,’ স্টুডিয়োর দিকে হাঁটা লাগালেন নব৷ নন্দিনী কি কিছু আন্দাজ করতে পারল? অবশ্য করলেও কিছু এসে যায় না৷ ওর সঙ্গে এক বিছানায় রাত কাটাতে হবে ভাবলেই গা ঘিনঘিন করছে৷ গোপালকে এক পাতা ডাইজিন আনতে বলে, আবার রঙের কাজে মন দিলেন নব৷ হাত কেঁপে যাচ্ছে মাঝে মাঝে, চোখও ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে৷ আধঘণ্টার মধ্যেই তীব্র মাথা যন্ত্রণায় বসে পড়লেন তিনি৷ হাঁটুর মাঝে মাথা গুঁজে বসে থাকলেন৷ ব্যথাটা বাড়ছে ধীরে ধীরে আর নেশার মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে৷ মানসিক যন্ত্রণার তুলনায় শারীরিক যন্ত্রণা যে কম কষ্টদায়ক, সেটা বুঝতে পারছেন নব৷
সেই ঘটনার পর প্রায় পনেরো দিন কেটে গেছে৷ এক সেকেন্ডের জন্যও সেই দৃশ্যটাকে ভুলতে পারেননি নব৷ স্ত্রীকে আপন ভাবতে বেশ কষ্টই হয় আজকাল৷ দিনের বেশিরভাগ সময় স্টুডিয়োতেই কাটে৷ রাতে নন্দিনী ঘরে ঢোকার আগেই, নব চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়েন৷৷ নন্দিনীর সঙ্গে অবশ্য এই প্রসঙ্গে কোনও কথা হয়নি৷ সে নিজে থেকে ভেবে নিয়েছে যে নবর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না৷ সম্পর্কে শৈত্য ছিলই, এখন বেশ কনকনে ঠান্ডা৷ কিছুদিন আগেই পয়লা বৈশাখ গেছে৷ গতকাল অক্ষয় তৃতীয়া ছিল৷ বেশ ভালোই ইনকাম হয়েছে এই কয়েকদিনে৷ এখন ধীরে ধীরে দুর্গাপুজোর অর্ডার আসা শুরু হবে৷ ‘বিভাবরী’রটা ছাড়া আরও চার-পাঁচটা ঠাকুর বানান তিনি৷
এছাড়াও দুটো কালীমূর্তি, মিত্তিরদের বাড়ির জগদ্ধাত্রী ঠাকুর৷ লক্ষ্মী-বিশ্বকর্মা-কার্তিকগুলো কর্মচারীরাই সামলে নেয়, তিনি কেবল চোখ আঁকেন৷ ‘জিৎকে একটু বাজারে পাঠাও না গো৷ দাদা ফোন করেছিল— আজ দুপুরে আসবে৷ একটু মাছ আনাতে হবে,’ নন্দিনী যে কখন স্টুডিয়োয় এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করেননি নব৷ ভাবলেশহীন মুখে জবাব দিলেন, ‘ওকে বলো৷ আমার আপত্তি নেই৷’
—‘আচ্ছা,’ বলে এগিয়ে গেল নন্দিনী৷ জিতের কাছে গিয়ে ওকে কী যেন বোঝাচ্ছে৷ নব তাকিয়ে দেখছেন ওদের৷ নন্দিনীর কোমরে একটু মেদের আধিক্য দেখা দিয়েছে যেন৷ পিঠের ওপর হেলায় ছড়ানো ভেজা চুলে ধূসর ছোপও স্পষ্ট৷ তবে ঢলঢলে শরীরটা ভীষণই মোহময়ী৷ কতদিন নিজের স্ত্রীকে ছুঁয়ে দেখেননি নব৷ জিতের হাতে টাকা দিয়ে স্টুডিয়ো থেকে বেরিয়ে গেল নন্দিনী৷ নবও উঠে দাঁড়ালেন৷ একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে হাঁটা লাগালেন স্ত্রীর পিছুপিছু৷
নন্দিনী রান্নাঘরে ঢুকেছে৷ নবও ঢুকলেন, তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিলেন৷ দরজা বন্ধর শব্দে চমকে উঠল নন্দিনী, ‘কী হল? দরজা বন্ধ করলে কেন?’ নবকে পাশ কাটিয়ে দরজা খুলতে তৎপর হল ও৷ ক্ষিপ্রগতিতে স্ত্রীকে টেনে নিয়ে দেওয়ালে ঠেসে ধরলেন নব৷ ডান হাতটা নন্দিনীর গলায় আর বাঁ হাতটা দেওয়ালে৷ ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে নন্দিনী৷ জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে৷ ওর শরীর থেকে সাবানের গন্ধ পাচ্ছেন নব৷ পাশে রাখা সবজির গামলা থেকে ছুরির লাল হাতলটা উঁকি মারছে৷ হাত বাড়ালেই ওটা ধরতে পারবেন নব৷ নন্দিনীর ঠোঁটের ওপর ঘাম জমেছে বিন্দু বিন্দু৷ নাকের পাটা দুটো ফুলে ফুলে উঠছে৷ ওর চোখে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন নব৷ সব ভুলে নন্দিনীর ঠোঁটের ওপর বসিয়ে দিলেন নিজের ঠোঁট৷ দ্রুতহাতে সরাতে শুরু করলেন ওর যাবতীয় আবরণ৷ তারপর ধীরে ধীরে মিশে গেলেন নন্দিনীর শরীরে৷
দুপুরে, বড় শ্যালক রতনের সঙ্গে বসে খাওয়া সারলেন নব৷ মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে৷ নন্দিনী সেই মুহূর্তে ঘাবড়ে গেলেও, এখন সামলে নিয়েছে৷ হাতের কাজ সারতে সারতে গল্প করছে দাদার সঙ্গে টুকটাক৷ রতনের ফুলের ব্যবসা৷ প্রত্যেকবারের মতো এবারও বলল, ‘পুজোর সিজনে আপনিই কিন্তু ভরসা, নবদা৷ যারা আপনার ঠাকুর নেবে, তাদের কাছ থেকে ফুলের কন্ট্র্যাক্টটা পাইয়ে দেবেন৷’ বিয়ে হওয়া ইস্তক শ্যালকের সঙ্গে এই অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন নব৷ আজ অবধি কোনও বছরই অন্যথা হয়নি৷ তাও ফি বছর চুক্তির কথা মনে করিয়ে দেয় রতন৷
বিকেলে রতন চলে গেলে, কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্গা কাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের হিসেব করতে বসলেন নব৷ বাকি সব প্রয়োজন নিয়েও কথা হল৷ কাজ শেষে আজ একটু বেরোলেন নব৷ এই গলির মুখের চায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালেই বেশ অনেকের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যায়৷ মফসসল শহরে লোকে অন্যের মাইনে দেখে বন্ধুত্ব পাতায় না, দেখা হলেই গল্প জুড়ে দেয়৷ ফেরার পথে দু’প্লেট মোগলাই কিনলেন নব৷ এই দিয়েই রাতের খাওয়া সারবেন আজ৷ নন্দিনী কিছু রেঁধে থাকলে সেগুলো ফ্রিজে রেখে দিলেই হবে৷ আজ ভীষণ খুশি তিনি৷ নিজেকে কেমন বিজয়ী সম্রাট মনে হচ্ছে৷ কিন্তু নন্দিনী তো আইনি ও শাস্ত্র- উভয়মতেই তাঁর, ওকে জয় করার কী আছে? তবে কি ফিরে পাওয়ার আনন্দ? মন থেকে জটিল সব চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে বাড়ি ঢুকলেন নব৷ তারপর হাঁক পাড়লেন, ‘এই শুনছ? এগুলো নিয়ে যাও...৷’
জুন মাসের মাঝামাঝি৷ ভীষণ গরম পড়েছে আর বৃষ্টির নামগন্ধ নেই৷ কালকেই পাশের পাড়ার ক্লাব ‘প্রতিবিম্ব’র ছেলেরা এসেছিল ঠাকুর গড়ার আর্জি নিয়ে৷ বেশ বড় অঙ্কের পারিশ্রমিকের কথা বলেছিল৷ কিন্তু ওদের ঠাকুর গড়লে, বাকিদের না করে দিতে হবে৷ সেটা করতে পারবেন না নব৷ কথার দাম রাখতে পারলেই তো বাজারে দাম বাড়ে৷ ‘বিভাবরী’র ঠাকুরের কাঠামো বাঁধা শুরু হয়েছে৷ বিচুলি আর মাটির তৈরি তাঁর সৃষ্টির সামনে যখন সবাই ভক্তিভরে হাতজোড় করে প্রণাম করে, নবর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে৷ এ যেন বাপ-মেয়ের সম্পর্ক, মূর্তিটি তখন একাধারে তাঁর সন্তান আর মা৷
নন্দিনীর শরীরটা সপ্তাহখানেক হল ভাল যাচ্ছে না৷ গা গরম থাকছে সবসময়৷ নব তিন-চারবার বলেছেন ডাক্তার দেখানোর কথা, কিন্তু সে রাজি হয়নি৷ তবে গতকাল শাশুড়ি গোপীবালা এসেছেন, এই রক্ষে৷ মাঝে মাঝেই মেয়ের কাছে এসে থাকেন বৃদ্ধা৷ নবর লাভ বলতে, শাশুড়ির হাতের অসাধারণ রান্না৷ গোপীবালা এলে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ এই তো কিছুক্ষণ আগে পান্তাভাত আর আলুভাতে দিয়ে জলখাবার সারলেন নব৷ অপূর্ব স্বাদ হয়েছিল৷ নন্দিনী অবশ্য তখনও ঘুমোচ্ছিল৷ মা এলেই ওর অখণ্ড বিশ্রাম৷ তাঁদের সম্পর্কে আগের শীতল বোঝাপড়াটা ফিরে এসেছে৷ নব খেয়াল করেছেন গোপীবালা আসার পর থেকেই, ওরা মায়ে-মেয়েতে কী যেন ফিসফিস করে আলোচনা করে আর তাঁকে দেখলেই চুপ করে যায়৷ নবর অবশ্য ওইসব মেয়েলি আলোচনায় কান দেওয়ার সময়ও নেই৷
‘দাদা, জেঠিমা তোমায় ঘরে ডাকছে,’ জিৎ এসে বলে গেল৷ ও এখন বাড়ির দিকটাতেই মাটির গয়না বানানোর কাজ করছে৷ বিরক্ত হলেও, বাড়ি গেলেন নব৷ নন্দিনী খাটের ওপর শুয়েছিল, তাঁকে দেখেই উঠে বসল৷ ‘কী হয়েছে? শরীরটা বেশিই খারাপ নাকি? এখন তো আবার ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া হচ্ছে,’ জিজ্ঞেস করলেন নব৷
—‘তুমি বাবা হচ্ছ, বাবাজীবন,‘ একটা চৌকোমতো জিনিস তাঁকে দেখালেন গোপীবালা৷ ওটাতে দুটো লাল দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷
—‘মা...মানে?’ মাথা কাজ করছে না নবর৷
—‘অবশেষে ভগবান চোখ তুলে চেয়েছেন গো,’ হাসলেন গোপীবালা, ‘তাই ভাবি, যে এত নিষ্ঠা নিয়ে ভগবান বানায়, তার ঘরে গোপাল আসবে না, তা কি হয়!’
—‘সত্যি?’ নন্দিনীর দিকে চাইলেন নব৷ চোখের ইশারায় হ্যাঁ বলল সে৷ অনেক চেষ্টা করেও খুশি হতে পারলেন না নব৷ সাতবছরে যা হয়নি, তা আজ এমন হঠাৎ করে হয়ে গেল? আড়াই মাস আগের দুপুরে দেখা সেই ভয়াবহ দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল নবর৷ নিজের স্ত্রীকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে নিলেন তিনি৷ ওর গর্ভের বাচ্চাটা আদৌ তাঁর নিজের তো? না কি মাধবের? ঠিক সেইদিনের মতো গা গুলিয়ে উঠল নবর৷ দৌড়ে কলতলায় গেলেন তিনি৷ অনেকটা বমি হওয়ার পর, কল খুলে মাথাটা জলের নীচে ধরলেন৷ ঘাড়ের ওপর জলের ধারা বেশ সজোরে পড়ছে আর বড্ড আরাম লাগছে তাঁর৷ বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর, কলটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন নব৷ ‘কী হল, বাবা?’ পিছনে গামছা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন গোপীবালা৷
—‘বোধহয় অম্বল হয়ে গেছে৷ পান্তা ভাতটা সহ্য হয়নি৷ আমি দুপুরে কিছু খাব না, মা৷ তাই আর ডাকবেন না,’ গামছায় হাত মুখ মুছে নিয়ে স্টুডিয়োর দিকে পা বাড়ালেন নব৷ ঘরের দরজায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নন্দিনী৷ চোখেমুখে ভয়৷ এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখলেন নব, তারপর বললেন, ‘এবার থেকে নিজের যত্ন নিও৷’ অবাক চোখে তাকাল নন্দিনী৷ কিছু কি বুঝতেপারল ও—কে জানে!
স্টুডিয়োয় বিচুলিগুলো এক জায়গায় জড়ো করছে গোপাল৷ পাশে সদ্য শেষ হওয়া তিনটে কাঠামো৷ ভাল করে হাত দিয়ে দেখলেন নব৷ বেশ ভাল কাজ শিখে গিয়েছে কর্মচারীরা৷ ‘বিভাবরী’তে এবার একচালার দেবীমূর্তি হবে৷ রথের দিন পুজো হওয়ার পর ঠাকুর বানানো শুরু হওয়াটাই রীতি৷ কিন্তু অত মানলে কাজ শেষ হবে না৷ আগে থেকেই মূর্তি বানানো শুরু করতে হয়৷ বিচুলির দাম অনেকটা বেড়েছে এই বছর৷ অবশ্য তাঁর প্রতিমার দামও সমানভাব বেড়েছে৷ তবে এইসব নিয়ে এই মুহূর্তে ভাবতে পারছেন না নব৷ তাঁর মস্তিষ্ক এখন নন্দিনীর গর্ভের জট খুলতে ব্যস্ত৷ বিয়ের দু’বছর পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেকদিন তিনি ভগবানের কাছে সন্তান চেয়েছেন৷ কিন্তু আজ পুরো ব্যাপারটাই কেমন বেমানান লাগছে৷ অবশ্য সন্তান এলে লোকের সমব্যথী দৃষ্টি থেকে মুক্তি পাবেন তাঁরা৷ জীবনও সম্পূর্ণ হবে৷ কিন্তু একটা প্রশ্ন তাঁকে কাঁটার মতো বিঁধছে, ‘নন্দিনীর গর্ভের বাচ্চাটার দেহে কার রক্ত বইছে?’
গোপীবালা নন্দিনীকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু রাজি হননি নব৷ উল্টে শাশুড়িকেই এই বাড়িতে থেকে যেতে বলেছেন৷ গোপীবালা প্রথমে ‘না’ বললেও, শেষমেশ রাজি হয়ে রয়ে গেছেন৷ নন্দিনী ভালই আছে, তবে নবকে দেখলেই যেন একটু সংকুচিত হয়ে যায়৷ ‘কানা, মনে মনে জানা,’ হাসেন নব৷ কিন্তু নন্দিনীকে তাঁর মানসিক দ্বন্দ্বের আঁচ পেতে দেন না একটুও৷ মনের দোটানাকে কাবুতে রাখতে আজকাল প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যায় বিড়ি লাগে৷ নন্দিনীকে কিছুদিন আগেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন গোপীবালা৷ ডাক্তার নন্দিনীকে ভারী কাজ করতে বারণ করেছেন, বেশি করে বিশ্রাম নিতে বলেছেন৷ অতএব, আজকাল বেশিরভাগ সময় ঘরেই কাটায় ও৷ গতকাল রাতে ঘুমোনোর আগে, আদুরে গলায় নন্দিনী বলেছিল, ‘অত বিড়ি খাও কেন? ওতে বাচ্চার শরীর খারাপ হয়৷’
—‘তাই বুঝি?’ স্ত্রীর পেটে আলতো করে হাত রেখেছিলেন নব, ‘আচ্ছা! আর খাব না৷ আমায় একটা কথা বলবে?’
—‘কী?’
—‘কবে হল বলো তো?’ ভীষণ কষ্টে নিজের উত্তেজনা লুকিয়ে প্রশ্নটা করেছিলেন নব৷ মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে গেছিল নন্দিনী৷ না কি ভয়ে? আস্তে করে অন্য দিকে পাশ ফিরে মুখ লুকিয়েছিল৷ ‘কী হল? বলো, কবে হল?’ ধৈর্য্যচুতি ঘটেছিল নবর৷
—‘কেন? রান্নাঘরের ঘটনাটা বুঝি মনে নেই?’ নন্দিনীর গলার উষ্ণতা স্তিমিত করে দিয়েছিল নবকে৷ প্রত্যেকবারের মতো এবারেও নিজেকে শান্ত করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি৷ কী হবে অহেতুক ঝামেলা করে? কেচ্ছাতে তাঁর বড় ভয়!
আজ রথযাত্রা৷ একটা কাঠামোই পড়ে রয়েছে স্টুডিয়োয়, বাকিগুলো সব ক্লাবেরা নিয়ে গেছে পুজো করার জন্য৷ পড়ে থাকা কাঠামোটা পাশের টাউনের একটা ক্লাবের৷ ওরা পাটাপুজো করে নেবে বোধ হয়৷ আগামিকাল থেকে এই বিচুলি আর কাদামাটির খেলায় সেজে উঠবেন মা দুর্গা৷ বাঙালির প্রাণের উৎসবের প্রাণভোমরা প্রাণ পাবে তাঁদের মতো গরীবের হাতে৷ কর্মচারীরা আজ ছুটি নিয়েছে৷ নিজেই কাদামাটি আর তুষ মাখতে বসে পড়লেন নব৷ তাঁর হাতে আর নন্দিনীর গর্ভে একই খেলা চলছে- গড়ার খেলা৷ এই যে তিনি মাটির দলা বানাচ্ছেন, নন্দিনীর পেটেও এখন একটা রক্তের দলা অল্প অল্প করে বেড়ে উঠছে৷ হঠাৎ চোখদুটো ঝাপসা হয়ে গেল নবর৷ আচ্ছা, নবজাতক কার ঔরসজাত—তা জানা কি খুব জরুরি? একটা শিশু পৃথিবীর আলো দেখবে, তাকে সন্তান স্নেহে মানুষ করতে পারবেন না নব? এত ক্ষুদ্র মনের অধিকারী তো তিনি নন আর এমনও তো হতে পারে যে বাচ্চাটি তাঁরই৷ আলতো হাতে চোখ মুছে নিয়ে কাজে মন দিলেন নব৷ ‘নবদা, আছ না কি?’ বিশুর গলায় চোখ তুলে তাকালেন নব৷ বিশু এই পাড়ার মস্তান বলেই পরিচিত৷ ‘বিভাবরী’র একজন কর্মকর্তা৷
এছাড়া স্টেশনের কাছে ওর একটা গ্যারেজ আছে৷ ওকে দেখলে কেউই খুব একটা খুশি হয় না৷ নবও হলেন না৷ মুখটা একটু হাসি হাসি করে জানতে চাইলেন, ‘কী রে? তুই এখানে?’
—‘দুগ্গা শুরু করে দিয়েছ? বাহ! আমি কিন্তু বিশ্বকর্মা নেব একটা৷ মনে আছে তো?’ জুতো না খুলেই স্টুডিয়োয় ঢুকে এল বিশু৷
—‘হ্যাঁ, মনে আছে৷ বিশ্বকর্মা শুরু করিনি এখনও৷ ওতে বেশিদিন লাগে না৷’
—‘শুনলাম তুমি নাকি ‘প্রতিবিম্ব’র লোকেদের না করে দিয়েছ?’ ঘোলাটে চোখে তাকাল বিশু৷
—‘হ্যাঁ৷ হাত এমনিই ভর্তি আর কাজ নিলে সময়ে শেষ করতে পারব না৷’
—‘ভাল করেছ৷ ‘বিভাবরী’ কি তোমায় কম দেয়? আমরা জানি, তুমি এমন ঠাকুর করবে যে আমাদের প্যান্ডেল ছেড়ে কেউ ওদেরটায় যাবেই না,’ হ্যা হ্যা করে হাসল বিশু, ‘কী, তাই তো?’
—‘চেষ্টা করব৷’
—‘চেষ্টা ফেস্টা জানি না৷ গ্যারান্টি লাগবে৷ আচ্ছা, বৌদি কি ইয়ে না কি গো?’ চোখ দুটো ছোট করে জিজ্ঞেস করল বিশু৷ চমকে উঠলেন নব৷ এর মধ্যেই খবরটা জানাজানি হয়ে গিয়েছে তাহলে৷ কী উত্তর দেবেন ভেবে না পেয়ে সামান্য চোয়াল ফাঁক করলেন আর তাতেই বুঝে গেল বিশু, ‘ঠিকই শুনেছি তাহলে৷’
—‘কী করে জানলি, ভাই?’
—‘আরেহ, যে ডাক্তারখানায় বৌদি গিয়েছিলেন, তার লাগোয়া ওষুধের দোকানে আমার ভাই কাজ করে তো৷ ওই বলল আমায়৷ তাই ভাবলাম যাই, সুখবরটা শুনে আসি৷ নবদা তো আর নিজে থেকে মিষ্টি ফিস্টি খাওয়াবে না!’
—‘হে হে!’ হাসার চেষ্টা করলেন নব৷
—‘আচ্ছা! আমি আসি তাহলে৷ ঠাকুরটা কিন্তু হেবিব বানিয়ো,’ বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল বিশু৷ ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন নব৷ খবরটা যখন ছড়িয়েই গেছে তখন আর বাচ্চাটাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই৷ তাই-ই করবেন তিনি৷ কিন্তু বড় হয়ে সে যদি মাধবের মতো দেখতে হয়? তাহলে তো আবার অন্য কেচ্ছা৷ আর কেচ্ছাকে নবর বড় ভয়!
আর বারো দিন বাকি দুর্গাপুজোর৷ জোরকদমে চলছে প্রস্তুতি৷ আগামী পরশু বিশ্বকর্মা পুজো৷ প্রায় পঁচিশটা বিশ্বকর্মা বানিয়েছে গোপাল-বংশী-জিৎরা৷ দ্রুত হাতে চক্ষুদান শেষ করছেন নব৷ এলাকার লোকে নবর আঁকা চোখ আর অন্যের আঁকা চোখের পার্থক্য বোঝে৷ নবর এখন বেশ খুশির সময়৷ তাঁর বানানো দুর্গাপ্রতিমারা ও স্ত্রী নন্দিনী সমান গতিতে মা হয়ে উঠছে৷ নিজের মনকে মানিয়ে নিয়েছেন নব৷ নন্দিনীর গর্ভজাত সন্তান তাঁকেই বাবা বলে জানবে৷ বলতে নেই, নন্দিনীর স্বাস্থ্য বেশ ভাল হয়েছে৷ ভরাট পেট আর অদ্ভুত এক মাধুর্যে বেশ মা লক্ষ্মীর মতো দেখায় ওকে৷ যদিও গোপীবালার কল্যাণে ওকে ঘরের বাইরে খুব একটা দেখা যায় না৷ ‘কী রে, কেমন আছিস?’ মাধব এসে স্টুডিয়োয় ঢুকলেন, ‘বিশ্বকর্মা পুজোর নেমন্তন্ন করতে এলাম৷’ বন্ধুকে দেখেই মেজাজটা খিঁচড়ে গেল নবর৷ একরাশ বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ অনেক কষ্টে মুখে হাসি টেনে বললেন, ‘আমরা বোধহয় যেতে পারব না৷’
—‘কেন? বৌদির শরীরটা বুঝি ভাল যাচ্ছে না?’ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন মাধব, ‘চল তাহলে- একটু দেখা করেই যাই বৌদির সঙ্গে৷’ কথাটা শুনে মাথাটা যেন দপ করে জ্বলে উঠল নবর৷ কিন্তু ওঁকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মাধব হাঁটা লাগিয়েছেন বাড়ির দিকে৷ অগত্যা হাতের কাজ ফেলে বন্ধুর পিছু নিলেন নব৷
গোপীবালা মাধবকে জোর করে বসিয়ে চা-বিস্কুট খেতে দিয়েছেন৷ মাধবও হাসিমুখে বসে ওঁর সঙ্গে কুশল গল্প করছেন৷ নন্দিনী ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে৷ পর্দা দিয়ে যতটা সম্ভব আড়ালে রেখেছে নিজেকে৷ ওর চোখে মুখে অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন নব৷ মাধব ওঁদের সবাইকে পুজোয় যেতে বললে, দায়সারা ভাবে এক টুকরো হাসি ছুঁড়ে দিল নন্দিনী৷ মাধব চলে যাওয়ার সময়, বন্ধুকে সদর দরজা অবধি এগিয়ে দিলেন নব৷ সাইকেলে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে নবকে জড়িয়ে ধরলেন মাধব, ‘বাবা হচ্ছিস তাহলে? অবশেষে!’ শেষ শব্দটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল নবকে৷
বুক ফেটে কান্নার দলা যেন ঠেলে উঠে আসতে চাইছে গলা বেয়ে৷ মাধব কি তবে নিজের দয়া সম্পর্কে অবগত করে গেল তাঁকে?
পরের দিন যখন নিজের শাগরেদদের নিয়ে বিশু ঠাকুর নিতে এল, তখন প্রায় সন্ধে আটটা৷ সারা দিনের ক্লান্তিতে তখন বিপর্যস্ত নব৷ ঠাকুরখানা বেশ পছন্দ হয়েছে বিশুর, জিজ্ঞেস করল, ‘কত?’
—‘টাকা লাগবে না৷ আমার একটা কাজ করে দিতে পারবি, ভাই?’
—‘কী কাজ?’ সিরিয়াস চোখে তাকাল বিশু৷
—‘এতজনের সামনে বলা যাবে না৷ এদিকে আড়ালে আয়,’ বিশুকে নিয়ে স্টুডিয়োর পিছন দিকে গেলেন নব৷ তারপর লজ্জার মাথা খেয়ে বললেন, ‘তোর বৌদির পেটের বাচ্চাটার বাবা কে, সেটা জানতে হবে৷’
—‘কী?’ বিস্ফারিত চোখে তাকাল বিশু, ‘তোমার মাথার ঠিক নেই, নবদা৷’
—‘ঠিকই, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে৷ তোর ভাইকে ধরে একটা ব্যবস্থা করে দে, বিশু৷ তোর এই ঠাকুরের দাম লাগবে না৷ আর ওই পরীক্ষা করতে যত লাগে—সেও আমি দেব৷’
—‘নবদা, বিশু খারাপ হতেপারে কিন্তু বদ না৷ এইভাবে বৌদির চরিত্র নিয়ে আমি খেলতে পারব না৷’
—‘আমি হাতজোড় করছি৷ বিশ্বাস কর, এটা তোর বৌদির ভালর জন্যই করা৷’
—‘কী মুশকিলে ফেললে বল দেখি,’ কয়েক মুহূর্ত কি যেন ভাবল বিশু৷ তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে ভাইকে ফোন করল৷ স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে একটা বিড়ি ধরালেন নব৷ প্রায় দশ মিনিট পর, নবর সামনে এসে দাঁড়াল বিশু৷ লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল, ‘ওসব হবে না, নবদা৷ অনেক ফেরি৷’
—‘ফেরি বলতে?’
—‘আরেহ, কীসব পারমিশন টারমিশন নিতে হয়৷ কোর্ট কাছারিতে চক্কর লাগাতে হয়৷’
—‘এত কিছু?’ দৃশ্যতই বিমর্ষ হলেন নব৷
—‘তবে আর বলছি কী? ওসব ঝক্কিতে ভাই কোনওরকম সাহায্যই তোমায় করতে পারবে না৷’
—‘তাহলে?’
—‘তাহলে আবার কি? কিছুই না৷ ঠাকুরটার দাম বলো৷ তাকে দেবতা মেনে ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলি৷’
—‘এমনি সাড়ে তিনশো নিচ্ছি৷ তুই তিনশোই দে৷’
—‘ইশ! ধন্য করে দিচ্ছে যেন!’ মুখ বেঁকিয়ে বুক পকেট থেকে টাকা বের করল বিশু, ‘এই নাও৷’ হাত পেতে টাকাটা নিলেন নব৷ তিনটে একশো টাকার নোট৷ একবার মাথায় ছোঁয়ালেন বিশ্বকর্মা ঠাকুরবাবদ এই বছরের শেষ পারিশ্রমিক৷ তারপর একটু ইতস্তত করে বলে উঠলেন, ‘ইয়ে বিশু, এই কথাটা...মানে বুঝতেই পারছিস— পাঁচকান না হলেই...!’
—‘...হুঁ হুঁ,’ নবকে কথা শেষ করতে দিল না বিশু, ‘তোমার এই ভীমরতির কথা এই বিশু কাউকেই বলবে না৷ তুমি বরং নিজের মুখে তালা দিয়ে রেখো৷ চলি৷’ নিজের শাগরেদদের দিকে এগিয়ে গেল বিশু৷ তারপর ঠাকুর কাঁধে নিয়ে চলে গেল ওরা৷ গেটে তালা লাগিয়ে দিয়ে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন নব৷ এ কোন দোটানায় পড়লেন তিনি!
আজ বিজয়া দশমী, নবর হাতে তৈরি মায়েদের জলে মিশে যাওয়ার দিন৷ তবে অন্যান্য বছরের মতো এবার মন খারাপ নেই, আছে এক অজানা ভয়৷ বিশু কথাটা পাঁচকান করবে না কথা দিলেও, রাস্তায় বেরোলেই নবর কেন যেন মনে হয় পরিচিত অপরিচিত সবাই ওঁকে দেখে হাসছে৷ অদ্ভুত এক ইনসিকিওরিটিতে ভোগেন তিনি৷ ‘আমি একবার ঠাকুরটা দেখে আসি?’ ঘর থেকে বেরিয়ে এল নন্দিনী৷ সে এবার পুজোয় একদিনও বেরোয়নি৷ বিদায়বেলায় একবার ঠাকুর দেখে আসতে চায়৷ নব ঘাড় নেড়ে সায় দিলেও বাদ সাধলেন গোপীবালা, ‘একা যাবি? আমি যাব সে উপায়ও নেই, রান্না বসিয়েছি৷’ উঠে দাঁড়ালেন নব, ‘আমি যাচ্ছি সঙ্গে’৷ খুশি হয়ে রান্নাঘরে ফিরে গেলেন গোপীবালা৷
প্যান্ডেলের বাইরে ছোটবেলার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল নবর৷ নন্দিনীকে ভিতরে যেতে বলে বন্ধুর সঙ্গে খোশগল্প জুড়লেন তিনি৷ মিনিট পনেরো পর আনমনে প্যান্ডেলে ঢুকেই থমকে গেলেন৷ এককোণে দাঁড়িয়ে বরণ দেখছে নন্দিনী আর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মাধব৷
প্যান্ডেলের বাকি সবাই কি ওদেরকেই দেখছে? নবকেও কি দেখছে ওরা? তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে না কি অবজ্ঞার? নবর মাথাটা হঠাৎ ঝিমঝিম করে উঠলো৷ নিঃশব্দে বাইরে বেড়িয়ে এলেন তিনি৷ একটা বিড়ি ধরিয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন প্যান্ডেলের পিছন দিকটায়৷ মনে মনে ঠিক করে নিলেন প্রতিশোধের পদক্ষেপ৷ তারপর ফিরে গেলেন নন্দিনীর কাছে৷ একা দাঁড়িয়ে আছে ও৷ মাধব আর নেই৷ এদিক ওদিক তাকিয়েও ওকে দেখতে পেলেন না নব৷ নন্দিনীকে বললেন, ‘আমার একটা কাজ মনে পড়ে গেছে, আমি সেখানে যাচ্ছি৷ তুমি বাড়ি চলে যেও, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরব৷’ তারপর দ্রুতপায়ে হাঁটা লাগালেন৷
প্যান্ডেল থেকে সোজা বাড়ি এলেন নব৷ স্টুডিয়োয় ঢুকে খুঁজতে শুরু করলেন এক বিশেষ জিনিস৷ খুব একটা কাজে না লাগলেও, সেটা আছে তাঁর কাছে— তিনি নিশ্চিত৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই নব পেয়ে গেলেন সেই হলুদ তরলের বোতল৷ রান্নাঘর থেকে খুন্তি নাড়ার শব্দ আসছে, গোপীবালা ব্যস্ত৷ নিশ্চিন্ত হয়ে ধীরপায়ে সদর দরজার সামনে সেই হলুদ তরল ঢেলে দিলেন নব৷ গন্ধ জানান দিচ্ছে, তরলটির পোশাকি নাম তার্পিন তেল৷ তারপর সোজা চলে গেলেন স্টুডিয়োর পিছন দিকটায়, এখানে কেউ তাঁকে দেখতেও পাবেনা, খুঁজতেও আসবে না৷ এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা৷ বসে থাকতে থাকতে একটু বোধ হয় আনমনাই হয়ে গিয়েছিলেন তিনি৷ হঠাৎ চমকে উঠলেন এক আর্তচিৎকারের শব্দে আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া গেল এক ভারী বস্তুর পড়ে যাওয়ার আওয়াজ৷ আবার কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা৷ তারপরই কানে এল গোপীবালার গগনভেদী চিৎকার৷ আরও পাঁচ-সাত মিনিট অপেক্ষা করলেন নব৷ দু-চারটে চেনা-অচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুরু করলে, বুঝতে পারলেন যে ভিড় হতে শুরু করেছে৷ এইবার বেশ হন্তদন্ত মুখ করে বেরিয়ে এলেন তিনি৷ দৃশ্যটা যে এত বীভৎস হবে, তা বোধ হয় তাঁর কল্পনাতেও আসেনি৷ রক্তে ভেসে যাচ্ছে বাড়ির সদর দরজা, অচেতন হয়ে পড়ে আছে নন্দিনী, ওর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়েছেন গোপীবালা৷ বিধবার সাদা শাড়িতেও লাল লাল ছোপ৷ নবকে দেখেই কাঁদতে শুরু করলেন গোপীবালা৷ নবরও তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা৷ এ কী করে ফেললেন তিনি? স্রষ্টার এ কী ধ্বংসাত্মক রূপ! ‘অ্যাম্বুলেন্স এসে গেছে৷ নবদা, বৌদিকে নিতে হবে এবার,’ পাশের বাড়ির খগেনের গলায় ঘোর কাটল নবর৷ স্ট্রেচারে করে নন্দিনীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলে, তিনিও উঠে বসলেন৷
বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে৷ নন্দিনীকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছে৷ যতক্ষণ জ্ঞান ছিল, ফ্যালফ্যাল করে নবর দিকে তাকিয়ে ছিল ও৷ সবাই ওকে সান্ত্বনা দিলেও, নব দিতে পারেননি৷ নিজেকে খুনি মনে হচ্ছে তাঁর৷ ঘড়িতে এখন সন্ধে ছ’টা৷ হসপিটাল থেকে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরালেন নব৷ নিজের মনের কথা শুনেই এসব করলেন, অথচ এখন নিজেকেই ক্ষমা করতে পারছেন না৷ গড়ার খেলার থেকে ভাঙার খেলা অনেক সহজ কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র গর্ব নেই৷ মাথাটা ঘুরছে নবর৷ গা গুলোচ্ছে ভীষণ৷ ঝাপসা লাগছে চারপাশ৷ পকেট হাতড়ে লাইটারটা বের করে, একটা বিড়ি ধরাতে চেষ্টা করলেন অনেকবার৷ কিন্তু কিছুতেই জ্বলল না বিড়িটা৷ রাগে সেটাকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উদভ্রান্তের মতো নব হাঁটতে শুরু করলেন শহরের শেষপ্রান্তের দীঘিটার দিকে৷
আধঘণ্টা পর ঘাটের শেষ সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালেন নব৷ তাঁর বানানো প্রতিমাদের ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে একে একে৷ তাঁর অন্তরের অসুরকে বধ না করেই বিদায় নিচ্ছেন দেবী৷ আজ নবর সব সন্তানদের বিসর্জনের দিন৷ ওদের সঙ্গে ভেসে যেতে ইচ্ছে করছে নবরও৷ কেমন যেন ফুরিয়ে যাচ্ছেন তিনি৷ ওই তো দাঁড়িয়ে আছে ‘বিভাবরী’র প্রতিমা৷ হ্যালোজেনের আলোয় আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে বরণের সিঁদুরমাখা প্রতিমার মুখখানি৷ ঘোরাচ্ছন্ন নবর চোখে নিজের মায়ের মুখ ভেসে উঠল হঠাৎ৷ বারবার চোখ খোলা-বন্ধ করে নিজের ভ্রান্তি ভাঙতে চাইলেন তিনি৷ কিন্তু মায়ের মুখটা যেন ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠতে লাগলো৷ অনেকটা তিরষ্কার মায়ের চোখে৷ কী ভীষণ ঘৃণা! হঠাৎ আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে দিশাহীনের মতো সেই প্রতিমার দিকে ছুটতে শুরু করলেন নব৷ তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন গোটা ঘাট জুড়ে বেজে চলছে, ‘ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ? ঠাকুর যাবে বিসর্জন...৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন