স্কুল ছুটি

পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়

সেকেন্ড পিরিয়ড শেষ হওয়ার বেল বাজতেই ইংলিশের বাণীদি ক্লাস থেকে চলে গেলেন৷ এবার ভূগোল ক্লাস৷ ইংলিশ খাতাটা ডেস্কে ঢুকিয়ে রেখে, ব্যাগ থেকে বই বের করছিল শ্রবণা৷ ‘তুই আজ ভূগোল পড়া করে এসেছিস?’ হঠাৎ চোখ দুটো ছোট করে জিজ্ঞেস করল শ্রেয়া৷ শ্রেয়া ওর পাশেই বসে৷ একটু আগেই নীলিমার কাছে কী একটা দরকারে গিয়েছিল৷ ফিরে এসেই এই প্রশ্নটা করল৷

—‘না তো! কেন? দিদি পড়া ধরবেন বলেছিলেন না কি?’ শ্রবণার গলায় ভয়৷

—‘হুঁ৷ নীলিমা তো তাই বলল৷’

—‘আজ শিওর ক্লাসের বাইরে গিয়ে কান ধরে দাঁড়াতে হবে৷’

—‘কী হবে? ফাইভের বোনগুলো দেখবে আমাদের!’

—‘ইশ! আমি কোনওদিন দাঁড়াইনি রে,’ শ্রেয়া ঠোঁট বাঁকাল৷

—‘আর আমি যেন রোজ দাঁড়াই৷ দিদি এসেছেন আজ?’

—‘হ্যাঁ৷ আমি স্টাফরুম থেকে বেরোতে দেখেছি,’ শ্রেয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্লাসে ঢুকে এলেন ভূগোলের স্মৃতিদি৷ সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে ‘গুড মর্নিং’ জানাল দিদিমণিকে৷ প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ পড়ালেন দিদি৷ এর ফাঁকেই সামনের বেঞ্চের অঙ্কিতাকে একবার পড়া ধরার ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করে নিল শ্রবণা৷ ঘাড় নেড়ে নীলিমার কথাটাকেই ঠিক বলল ও৷ ‘তবে আমরা শুনতে পেলাম না কেন?’ শ্রবণা অবাক৷

—‘তোরা দু’জনে সারাদিন যা গল্প করিস, শুনবি কী করে?’ সামনে তাকাল অঙ্কিতা৷ ওর কথা শুনেই মুখ লুকিয়ে হাসতে শুরু করেছে শ্রেয়া৷ বিষয়টা চোখ এড়াল না স্মৃতিদির৷ আচমকা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন দিদি৷ বললেন, ‘পড়া ধরার কথা ছিল না আজ? শ্রেয়া, প্রথমে তুমি৷’ মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়াল শ্রেয়া৷ দিদি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভূ-মধ্যসাগরীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য বলো৷’ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল শ্রেয়া৷ এই একটা গুণ ওর৷ জানলে, পুরো পড়াটাই গুছিয়ে সঠিকভাবে বলে আর না জানলে, টুঁ শব্দটাও করে না৷ স্মৃতিদি এবার শ্রবণার দিকে তাকালেন, ‘পাশের জন, তুমি বলো৷’

—‘ভূ-মধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে মাঝে মাঝেই ঝোড়ো হাওয়া দেখা যায়৷ তাই প্রায়শই নৌকাডুবি হয়,’ শ্রবণার উত্তর শেষ হওয়ার আগেই ক্লাসের সবাই হেসে উঠল৷ দিদি আরও গম্ভীর হয়ে বললেন,

‘এই জলবায়ু কোথায় দেখা যায়?’

—‘ভূ-মধ্যসাগরে৷’

—‘মানে সাগরের মধ্যে?’

—‘হুঁ,’ মাথা দোলাল শ্রবণা৷ ক্লাস ফেটে পড়েছে হাসিতে৷ পাশে দাঁড়িয়ে শ্রেয়াও খুক খুক করে হাসছে৷ দিদি বললেন, ‘যাও, দু’জনেই বেরিয়ে গিয়ে কান ধরে দাঁড়াও৷’ কোনও কথা না বলে ক্লাসের বাইরে চলে এল ওরা৷ কান ধরে হাসছে দু’জনেই৷ ফাইভের বোনগুলো দেখছে ওদের৷ হঠাৎ জোরে বেল বাজার আওয়াজ৷ ক্রিং ক্রিং ক্রিং...

...ক্রিং ক্রিং ক্রিং৷ ঘুম ভেঙে উঠে বসল শ্রবণা৷ অ্যালার্মটা বন্ধ করল দ্রুতহাতে৷ পাশে অঘোরে ঘুমোচ্ছে সাগ্নিক৷ আজ তো আগস্ট মাসের দশ তারিখ৷ স্কুলের রি-ইউনিয়ন৷ স্কুল ছাড়ার পর, কুড়ি বছরে এই প্রথম একটা রি-ইউনিয়ন অ্যারেঞ্জ করেছে কর্তৃপক্ষ৷ উপলক্ষ- স্কুলের একশো বছর পূর্তি৷ সেই আনন্দেই এইসব স্বপ্ন দেখছিল শ্রবণা৷ আজ অনেক দিন পর সকলের সঙ্গে দেখা হবে৷ শ্রেয়া, অঙ্কিতা, নীলিমা, জুঁই, তিতাস, অর্পিতা—সববাই আসবে৷

মেয়েকে স্কুলে আর বরকে অফিসে পাঠিয়ে রেডি হতে শুরু করল শ্রবণা৷ তারপর ডাইনিং টেবিলে শ্বশুর-শাশুড়ির খাবার গুছিয়ে রেখে, বেরিয়ে পড়ল বেলা এগারোটা নাগাদ৷ এখন কলকাতায় থাকে শ্রবণা৷ কিন্তু বাপের বাড়ি সোদপুর৷ অতএব মেট্রো করে দমদম এসে, লোকাল ট্রেনে উঠল ও৷ তারপর সোদপুর স্টেশনে নেমে একটা রিকশা নিয়ে স্কুলে এল৷ মা-বাবার সঙ্গে বিকেলে দেখা করে নেবে৷ কারণ এখন বাড়ি গেলে স্কুলে আসতে দেরি হয়ে যেত৷

স্কুলটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে৷ বর্তমান ছাত্রীরা সব লালপাড় সাদা শাড়ি পরে ভলেন্টিয়ারিং করছে৷ শ্রবণাকে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এল একজন৷ জিজ্ঞেস করল, ‘কোন ইয়ার, দিদি?’

—‘নাইন্টি সেভেন৷ উচ্চমাধ্যমিক৷’

—‘আপনি টেন সি-র ক্লাসরুমে চলে যান৷ এই গেট দিয়ে ঢুকেই দেখবেন সিঁড়ি৷ উঠে গিয়ে, দোতলায় ডানদিকের শেষ ঘরটা৷’ সৌজন্যের হাসি হেসে ভিতরে ঢুকে গেল শ্রবণা৷ আর ঢুকেই একটা বড় ধাক্কা খেল৷

স্কুলের সেই অত বড় মাঠটা অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে৷ একটা সুন্দর বিল্ডিং উঠেছে সেই জায়গায়৷ এমনকী যে বিরাট তেঁতুল গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে ওরা রোজ টিফিন খেত, সেটাও কাটা পড়ে গিয়েছে৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল শ্রবণার৷ সিঁড়ি দিয়ে উঠে টেন সি-র ঘরে ঢুকল ও৷ তিনজন গোল হয়ে বসে গল্প করছে৷ ঋতুপর্ণা, সোমা আর ছন্দা৷ শ্রবণা ঢুকতেই হাসিমুখে জড়িয়ে ধরল ওরা একে একে৷ ফেসবুকে সকলের সঙ্গেই ফ্রেন্ড শ্রবণা৷ লাইক আর কমেন্টের সম্পর্ক৷ কথা-বার্তা খুব একটা হয় না৷ কুশল বিনিময় হওয়ার পরই নিজের নিজের সংসারের গল্প নিয়ে মেতে উঠল ছন্দারা৷ শ্রবণার পরনিন্দা-পরচর্চা করা ধাতে নেই৷ সময়ও নেই৷ অতএব ফোন খুলে নিজের কুকিং ব্লগটায় খুটখাট করতে শুরু করল ও৷ শ্রবণার একটা কুকিং সাইট আছে, সঙ্গে ইউটিউব চ্যানেল৷ এখনও পর্যন্ত প্রায় বারো হাজার সাবস্ক্রাইবার্স৷ ভালোই আয় হয়৷ একবার মনে হল শ্রেয়াকে ফোন করে দেখে কতদূর! কিন্তু তক্ষুনিই ঘরে ঢুকল অর্পিতা আর নীলিমা৷ ‘কেমন আছিস?’ বলে উঠে দাঁড়াল শ্রবণা৷ উফ! পুরনো বন্ধুগুলোকে হাসিখুশি দেখেও কত শান্তি! এমনিতে তো যতই দেখা করার প্ল্যান বানানো হোক, কখনওই সাকসেসফুল হয় না৷ অর্পিতা স্কুলে পড়াকালীন পুরো টমবয় ছিল৷ গাছে ওঠা, মারামারি করায় সিদ্ধহস্ত৷ গোটা স্কুলজীবন ঘাড় অবধি চুল ছিল ওর৷ অথচ এখন এত্ত বড় একটা খোঁপা করেছে৷ শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে অ্যাকসেসরিজ৷ ‘তোর তো হেবিব চেঞ্জ রে?’ ফুট কাটল শ্রবণা৷

—‘হবে না? বনেদি বাড়ির বউ বলে কথা,’ যোগ দিল নীলিমাও৷ উত্তরে কেবল ম্লান হাসল অর্পিতা৷ একটু পরে বলল, ‘চেঞ্জই বটে৷ নিজেই নিজেকে চিনতে পারি না৷’ শ্রবণা আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু চোখের ইশারায় ওকে বারণ করল নীলিমা৷ তারপর অন্য প্রসঙ্গে ঘুরিয়ে নিল আলোচনার মোড়৷ কেমন অবাক লাগছে শ্রবণার— একসময় যাদের সামনে নিজের রোজনামচার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ না দিলে শান্তি হত না, তাদের সঙ্গে এরকম অপরিচিতের মতো ভাসা ভাসা খেজুরে আলাপ করতে হবে! ঘরটা ভর্তি হচ্ছে ধীরে ধীরে৷ যখনই নতুন কেউ ঢুকছে, সবাই চোখ তুলে তাকাচ্ছে, হাসছে৷ সৌজন্য সেরে সে গিয়ে বসছে নিজের বন্ধুদের সঙ্গে৷ তিতাস, জুঁই, অঙ্কিতারা একের পর এক এলেও, শ্রেয়া এল অনেক পরে৷ হলুদ রঙের সিল্ক শাড়ি৷ হাতে একটা দামি ব্র্যান্ডের ব্যাগ৷ ব্র্যান্ডের লোগোটা সকলকে দেখাতে যেন একটু বেশিই মরিয়া শ্রেয়া৷ হাতের মোবাইলটাও দামি৷ ওদের দেখে ঝকঝকে হাসি উপহার দিল শ্রেয়া৷ তারপর বলল, ‘উফ! কী গরম৷ স্কুলটা এখনও এসি করেনি? কী আশ্চর্য!’ বাকিরাও ওর কথায় সায় দিল সঙ্গে সঙ্গে৷ শ্রবণা বলল, ‘কী যে বলিস তোরা! এই বিল্ডিংয়ে লোডশেডিং হওয়ার পরও কত ক্লাস করেছি৷ মে-জুন মাসের গরমে ওই মাঠে খেলার ক্লাসে পিটি, প্যারেড সব করেছি৷ আর এখন এই হেমন্তের দুপুরে তোদের গরম লাগছে?’

—‘আরে! তুই কি সেই কুড়ি বছর আগের মেয়েটাই আছিস? কাম অন৷ আমাদের বয়স বেড়েছে৷ দিনকাল কত এগিয়েছে৷ এসিটা আর লাক্সারি নেই, কমফর্ট হয়ে গিয়েছে’, বাঁকা হাসল শ্রেয়া৷ ঘনঘন ফোন চেক করছে ও৷ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন মুখভঙ্গি করছে৷ ব্যস্ততা জাহির করছে আপ্রাণ৷ শ্রেয়া ফেসবুকে খুব একটা রিপ্লাই করে না৷ অন্যের পোস্টে কমেন্ট করে না৷ তবে ফোন করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে৷ সেই চেনা শ্রেয়ার সঙ্গে আজকের এই শ্রেয়াকে মেলাতে পারছে না শ্রবণা৷ ঘনঘন লিপগ্লস লাগাচ্ছে, কিছুতে হাত দিলেই স্যানিটাইজারে হাত পরিষ্কার করছে৷

স্কুলের অডিটোরিয়ামে একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল৷ বর্তমান হেডমিসট্রেস ছোট্ট অথচ সুন্দর একটা বক্তব্য রাখলেন৷ স্কুলের পুরনো কিছু ছবি দেখানো হল৷ কত স্মৃতি এই অডিটোরিয়ামটা জুড়ে৷ অ্যাসেম্বলি, যে কোনও ফাংশন, রিহার্সাল, মিউজিক ক্লাস— সব তো এখানেই হত৷ চোখ বন্ধ করলেই সব স্পষ্ট৷ শ্রবণা একমনে স্মৃতিপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ একবার নীলিমা আর শ্রেয়াকে একটা পুরনো ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিতে ওরা হাসল মাত্র৷ তারপর ‘হুঁ, হাঁ’ করে কাটিয়ে দিল৷ সারাক্ষণ বান্ধবীদের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে চর্চা করে যাচ্ছে সকলে৷ যে চোখের একটু আড়াল হচ্ছে— সেই টপিক৷ সে ফিরে এলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আবার অন্যজন৷ কে কী চাকরি করছে, কার মাইনে কত, কার বরের মাইনে কত, কে কতবার বিদেশে গিয়েছে, কার শাশুড়ি বেশি অত্যাচারী, কার বরের এক্সট্রা-ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার আছে, কে সেপারেটেড তাও সিঁদুর পরে—এইসব নিয়েই মেতে আছে ওরা৷ জানলার বাইরে তাকাল শ্রবণা৷ দু’জন ভলেন্টিয়ার কী একটা কাগজ দেখে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে৷ ওদেরকে একটা কথা খুব বলতে ইচ্ছে করছে শ্রবণার—‘খুব করে বেঁচে নাও৷ হারিয়ে যাবে৷ সব হারিয়ে যাবে৷’

পুরনো বিল্ডিংয়ের বারান্দা জুড়ে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ৷ পোলাও, বেগুনি আর আলুর দম৷ কেউ খাচ্ছে, কেউ বা স্বাদ নিয়ে অভিযোগ করছে, কেউ আবার ‘ভীষণ তেল’ বলে নাক কুঁচকোচ্ছে৷ অথচ এরাই সকলে মিলে চিলড্রেনস-ডের দিন স্কুল থেকে দেওয়া কেক, লজেন্স বা স্পোর্টসের দিন দেওয়া পাঁউরুটি, কলা, ডিমের জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকত৷ শ্রেয়া শ্রবণার পাশেই বসেছে৷ খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই বাংলার এত জনপ্রিয় একজন কুকিং এক্সপার্ট৷ একটু সেজে আসলে কী হত?’

—‘ধুর! লোকে আমার ভিডিয়োয় রান্না শেখে৷ আমায় দেখে না৷’

—‘ওরকম মনে হয়৷ কাম অন, ইউ আর শ্রবণা বোস৷ একটু ঘ্যাম নিবি না? আমায় দেখ, বর একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হাওড়া ব্রাঞ্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার৷ তাতেই গাড়ি ছাড়া পাড়ার মোড়েও যাই না৷ আর তুই শুনলাম লোকাল ট্রেনে এসেছিস৷ তাও সকলের আগে৷’

—‘স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে এত দেখনদারি আসে না রে৷ তুই কিন্তু আজ একটু আজব বিহেভ করছিস, শ্রেয়া৷’

—‘আরেহ! তোদের সঙ্গে কই করলাম? এইসব ওই অতসী, বহ্নি, সুস্মিতা- ওদের জন্য৷ ওদের বররা আমার বরের সাবর্ডিনেটস,’ গর্বের হাসি হাসল শ্রেয়া৷ শ্রবণার মাথা ধরে যাচ্ছে এইসব কথা শুনে৷ বাল্যবন্ধুদেরও এইভাবে বিচার করা যায়! এখানে উপস্থিত অনেক সিনিয়র-জুনিয়রদের চোখ বলে দিচ্ছে যে ওরা শ্রবণাকে চেনে বা ওর চ্যানেল ফলো করে৷ কিন্তু না চেনার ভান করছে৷ আসলে অ্যাপ্রিশিয়েট করতেও আমাদের ছোট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে৷

খাওয়া শেষ করেই সবাই বাড়ি যাওয়ার জন্য উদ্যত৷ গেটের কাছে গিয়ে শ্রবণা বলল, ‘চল, কয়েকটা ছবি তুলি৷’ নিমরাজি হয়ে ওখানেই পোজ দিল সবাই৷ স্কুলের ভীষণ পরিচিত কোণগুলোতে গিয়ে আরেকবার সেই ছোটবেলার মতো করে দাঁড়ানোরও সময় নেই ওদের হাতে৷ কারোর ছেলের স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে, কারোর বা পার্লারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, কেউ বা শপিংয়ে যাবে, কেউ অনেক ভোরে উঠেছিল বলে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ সব দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শ্রবণা৷ ওর সত্তরোর্ধ্ব শাশুড়ি কেবল রান্নাটা করতে চান না৷ বাকি সব সামলে নিতে পারেন৷ আজ নিজেই বলেছেন, ‘তুমি আজ বাপের বাড়িতেই থেকে যেও, বৌমা৷ আমি একদিন ঠিক ম্যানেজ করে নেব৷ ফ্রিজে তো খাবারদাবার আছেই৷’ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে সকলে৷ শ্রবণার বাপের বাড়ি স্কুল থেকে হাঁটাপথে পনেরো মিনিট৷ ও রইল, যতক্ষণ থাকা যায়৷ টাটা করল সকলকে৷

এর মধ্যেই অসংখ্য নোটিফিকেশনের জানান দিচ্ছে ফোন৷ এইমাত্র তোলা ছবিটা সকলেই একে অন্যকে ট্যাগ করে পোস্ট করছে৷ কত সুন্দর সুন্দর সব ক্যাপশন৷ শ্রেয়া লিখেছে—‘দ্য বেস্ট পার্ট অ্যাবাউট ওল্ড বাডিজ ইজ দ্যাট দে নেভার চেঞ্জ৷’ হাসি পাচ্ছে শ্রবণার৷ সবটাই আসলে হিপোক্রেসি৷

স্কুল থেকে বেরিয়ে এল শ্রবণা৷ এখানে ফুচকাকাকু, ঝালমুড়িকাকু, আইসক্রিমকাকুরা সব বসত৷ প্রত্যেক শনিবার নিয়ম করে ফুচকা খাওয়া হত সকলে মিলে৷ বাড়ির রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল ও৷ দিনটা স্বপ্নে কেমন ভেবেছিল আর বাস্তবে কেমন হল! বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল সবকিছু৷ দিনটা না এলেই কি ভাল হত? বেশ একটা হ্যালুসিনেশনের মধ্যে জীবন কাটছিল৷ এইসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি পৌঁছে গেল ও৷ মা দরজা খুলে বললেন, ‘চোখমুখ অমন থমথমে লাগছে কেন, সাবু? শরীর খারাপ?’

—‘উঁহু,’ হাসল শ্রবণা৷ তারপরই চোখভর্তি জল নিয়ে বলল, ‘আমায় একটু তোমার কোলে মাথা রেখে শুতে দেবে, মা? আর চুলে বিলি কেটে দেবে— সেই ছোটবেলার মতো? শৈশবের অনেকটা হারিয়ে গিয়েছে—জানো? শিকড়টা ঠিক ঠাহর করতে পারছি না৷ তুমি তোমারটুকু ফিরিয়ে দেবে, মা? প্লিজ....!’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%