পৌষালী বন্দ্যোপাধ্যায়
—‘কাল আমার জন্মদিনে কী দিবি তুই?’ আদুরে গলায় প্রশ্ন করল তরী৷
—‘সারপ্রাইজ, ম্যাডাম৷ বলা যাবে না,’ ও’প্রান্ত থেকে হেসে উঠল আলেখ্য৷
—‘বাড়ি পৌঁছলি?’
—‘না, এই তো সবে নামলাম ট্রেন থেকে৷’
—‘রাত দশটা বাজে, সাবধানে বাড়ি যা৷’
—‘হুম, টাটা৷’
—‘এত তাড়াতাড়ি?’
—‘ম্যাডামকে আবার বারোটার সময় ফোন করতে হবে যে!’
—‘ও হ্যাঁ৷ তাই তো! বাই,’ ফোনটা কেটে দিল তরী৷ বিছানায় গা এলিয়ে নতুন গল্পের বইটায় মন দিল৷ তারপর অজান্তেই একসময় পাড়ি দিল ঘুমের দেশে৷
পরদিন ভোরবেলা ফোনের আওয়াজে ঘুম ভাঙল তরীর৷ আলেখ্য কল করছে ভেবে ফোনটা হাতে নিল ও৷ কিন্তু না— নূপুরের ফোন৷ একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোনটা ধরল তরী, ‘হ্যালো?’
—‘তরী,’ রীতিমতো কাঁপছে নূপুরের গলা, ‘পনেরো মিনিটের মধ্যে সায়ক তোর বাড়ি পৌঁছে যাবে৷ ওর সঙ্গে হসপিটালে চলে আয়৷’
—‘হসপিটাল? কেন?’
—‘আলেখ্যর একটা ছোট্ট অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে৷ এমন কিছু সিরিয়াস না৷ তুই টেনশন করিস না৷’
—‘তুই কোথায়?’ যন্ত্রচালিতের মতো জিজ্ঞেস করল তরী৷
—‘আমি বাড়িতে, তবে এক্ষুনি বেরোব৷ পিকু এসে নিয়ে যাবে আমায়৷ ওরা সকলে কাল রাত থেকেই হসপিটালে আছে৷ তুই তৈরি হয়ে নে তাড়াতাড়ি,’ ফোনটা কেটে দিল নূপুর৷ কিচ্ছু বুঝতে পারছে না তরী৷ ওয়ালপেপারটার দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল ও৷ আচ্ছা, আলেখ্য তো বলেছিল ওকে সারপ্রাইজ দেবে৷ এটা কোনও প্র্যাঙ্ক নয়তো? নিজেকে শান্ত করল তরী৷ রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরোতেই আবার ফোন৷ এবার সায়ক৷ ‘আসছি, দু’মিনিট,’ বলে ফোনটা কেটে দিল তরী৷ বাবা-মাকেও ঘরে গিয়ে জানিয়ে এল ব্যাপারটা৷ এত ভোরে ওকে একা বেরোতে দিতে প্রথমে একটু চিন্তা করছিলেন ওঁরা৷ পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রাজি হয়ে
গেলেন৷
বাড়ি থেকে বেরিয়েই সায়ককে দেখতে পেল তরী৷ চোখদুটো লাল, চুল এলোমেলো৷ মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে—চিন্তায় আছে৷ তাহলে কি সত্যিই আলেখ্যর কিছু হয়েছে? বুকের ভেতরটা জ্বালা করে উঠল তরীর, ‘কী হয়েছে, আলেখ্যর?’
—‘উঠে বোস,’ বাইকে স্টার্ট দিল সায়ক, ‘টেনশন করিস না৷ এভরিথিং উইল বি অলরাইট৷’
—‘ভুলটা কী হয়েছে, বলবি প্লিজ?’ তরীর কথা শেষ হওয়ার আগেই সশব্দে বাইকে স্টার্ট দিল সায়ক৷ কোনও কথা না বলে, চালিয়ে দিল মেইন রোড ধরে৷ হসপিটালের পিছনদিকে এসে বাইক থামাল সায়ক৷ তারপর সরু একটা গলি দিয়ে তরীকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল৷ ওদের দেখেই ছুটে এল নূপুর৷ তরীকে টেনে নিয়ে গেল একপাশে, ‘শোন, মিডিয়ার লোকজন ভিড় করতে শুরু করেছে অলরেডি৷ বেশি ইমোশনাল হয়ে পড়লে কিন্তু চলবে না৷ বি স্ট্রং৷ ওকে?’
—‘কেউ কি আমায় প্লিজ বলবে যে কী হয়েছে আলেখ্যর?’ ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল তরীর৷
—‘সায়ক বলেনি?’ অবাক হল নূপুর, ‘গতকাল রাতে বাড়ি ফেরার সময় আলেখ্যকে কিছু গুন্ডা ব্রুটালি মারধোর করেছে৷ হি ইজ সিরিয়াসলি ইনজিওরড৷ কাল রাতেই একটা অপারেশন হয়ে গেছে৷ আইসিইউ-তে আছে৷ এখনও জ্ঞান ফেরেনি৷ ’
—‘কেন?’ নূপুরের কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছে না তরীর৷
—‘ওরা দুটো মেয়েকে টিজ করছিল৷ আলেখ্য বাধা দিতে গেলে ওর ওপর চড়াও হয়৷ তুই এত ভয় পাস না, সব ঠিক হয়ে যাবে,’ তরীকে চেয়ারে বসাল নূপুর৷
—‘আমি একবার দেখতে যেতে পারি?’ বিড়বিড় করে বলে উঠল তরী৷
—‘এখন ওর বাবা-মা আছেন ওখানে৷ আমিও দেখতে পারিনি এসে থেকে৷ তুই আয় আমার সঙ্গে, চেষ্টা করে দেখি,’ তরীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাঁটা লাগাল নূপুর৷
আলেখ্যকে গোল কাচটার ভেতর দিয়ে দেখে এসেছে তরী৷ সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে কেউ যেন যত্ন করে মুড়ে দিয়েছে আলেখ্যর মাথাটা আর বড্ড প্রশান্তিতে ঘুমোচ্ছে ও৷ ‘তুমিই তরী?’ পাশে এসে বসা মহিলাকে চেনে তরী—আলেখ্যর মা৷
—‘হ্যাঁ, কাকিমা৷’
—‘এইটা আলেখ্যর পকেটে ছিল, মা৷ তোমার জন্যই বোধ হয়,’ ভদ্রমহিলার হাতে একটা বাক্স৷ কাঁপা হাতে বাক্সটা নিল তরী৷ ভেতরে একটা গলার চেন—ছোট্ট লকেট দেওয়া৷ সঙ্গে একটা ছোট্ট চিরকুট৷ তাতে লেখা—‘জন্মদিনে, সখীকে দোসর হওয়ার আহ্বান জানালাম৷’ মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে গেল তরীর চোখদুটো৷ এইটাই তবে সারপ্রাইজ ছিল! গতকাল কলকাতা গিয়েছিল আলেখ্য৷ বলেছিল চাকরির ইন্টারভিউ আছে৷ সঙ্গে এটাও কিনে এনেছে তরীর জন্য! ‘আজ তোমার জন্মদিন?’ আলেখ্যর মায়ের কথায় সম্বিত ফিরল তরীর৷
—‘হ্যাঁ৷’
—‘শুভ জন্মদিন৷’
—‘শুভ আর হল কই? আমার তো দুনিয়াটাই ধসে যাচ্ছে!’
দুপুর নাগাদ ওদের সামনে এসে দাঁড়াল দুটি মেয়ে৷ দুজনের চোখেই সংকোচ মেশানো ভয়৷ ‘তোমরা?’ জিজ্ঞেস করলেন আলেখ্যর বাবা৷
—‘আঙ্কল, ওরা আলেখ্যর খবর নিতে এসেছে৷ কাল ওদের বাঁচাতে গিয়েই...’ মেয়েদুটির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সায়ক৷ তরী ভাল করে দেখছে ওদেরকে, স্কুল স্টুডেন্টস বলেই মনে হয়৷ বয়স পনেরো-ষোলো হবে৷ ভয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছে দু’জনেই৷ ‘তোমরা অত রাতে কী করছিলে ওখানে?’ জানতে চাইল তরী৷
—‘আমাদের টিউশন ছিল দিদি৷ তাড়াতাড়ি হয় বলে, ওই রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম৷’
—‘আর কোনও বন্ধু-বান্ধব ছিল না?’
—‘ওরা কেউ দাঁড়ায়নি, দিদি৷ ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল৷ এই দাদাই...’ আর বলতে পারল না মেয়েটি৷ ছলছলে চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে৷ যেন অপরাধী৷ এগিয়ে এসে ওদের জড়িয়ে ধরল তরী৷ ‘পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে৷ আধঘণ্টা পর ভিজিটিং আওয়ার, যে কোনও একজন গিয়ে দেখা করে আসতে পারেন,’ নার্সের হঠাৎ আগমনে চমক ভাঙল সবার৷ পলকে সবার চোখে স্বস্তি৷ মেয়েদুটিও ভারী খুশি হয়েছে৷ আলেখ্যর মা ইষ্টদেবতা স্মরণ করছেন কপালে হাত ঠেকিয়ে৷
আলেখ্যকে ওর মা দেখতে যাবেন বলে ঠিক হয়েছে৷ শুধুমাত্র একজনই ঢুকতে পারেন আইসিইউয়ের ভেতরে৷ তরীও খুশি মনে সায় দিয়েছে এই সিদ্ধান্তে৷ পাঁচটা বাজার পর ওরা সবাই উঠে এল দোতলায়৷ আইসিইউতে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে তরীর দিকে ফিরলেন আলেখ্যর মা৷ কার্ডটা ওর হাতে দিয়ে বললেন, ‘জন্মদিনের উপহার৷’ তরী বাধা দিতে গেলেও শুনলেন না৷ অতএব, ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকল তরী৷ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে আলেখ্য, ও ঢুকতেই তাকাল৷ হাসার চেষ্টা করল সামান্য৷ অক্সিজেন মাস্ক, স্যালাইনের নল আর মনিটরের মাঝে কেমন বিসদৃশ লাগছে ওকে৷ আস্তে করে ওর হাতে হাত রেখে হাসল তরী, ‘ব্যথা আছে?’
—‘সরি,’ অস্ফুটে বলল আলেখ্য৷ বাঁ হাত দিয়ে খুলল অক্সিজেন মাস্ক, ‘তোর সারপ্রাইজটা...৷’
—‘চুপ,’ কথা শেষ হবার আগেই জোর করে আলেখ্যকে মাস্কটা পরিয়ে দিল তরী৷ হাতের মুঠো খুলে ওকে দেখাল চেনটা, ‘সারপ্রাইজ আমি আজ অনেকগুলো পেয়েছি৷ সুস্থ হয়ে উঠলে নিজের হাতে এটা আমায় পরিয়ে দিস৷ অবশ্য তুই যা করেছিস, সেটা সব সারপ্রাইজকে হার মানায়৷ আয়্যাম প্রাউড অব ইউ!’ যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে, বেশিক্ষণ এখানে থাকা যাবে না৷ উঠে দাঁড়াল তরী৷ বেরোনোর আগে আলেখ্যর কানে কানে বলল, ‘দোসর হতে সায় দিলাম৷’ সামান্য হেসে জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করল আলেখ্য, খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে হবে ওকে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন