জয়ন্ত দে
একটা মেয়ে বালালের স্বপ্নের মধ্যে বার বার আসছে। আসছে মানে অন্য মেয়েরা যেমন স্বপ্নের মধ্যে হুটপাট করে চলে আসে, তারপর চেনা নেই, জানা নেই বিছানায় যাচ্ছেতাই করে কেটে পড়ে, এই মেয়েটা ঠিক তেমন নয়। ওই মেয়েটা বেশ কয়েকদিন ধরে বালালের স্বপ্নের মধ্যে আসছে। একটু একটু করে আসছে—।
এই একটু একটু করে বালালের স্বপ্নের মধ্যে মেয়েটা আসার কথা শুনে সন্দীপ বলল, 'বালাল মনে হচ্ছে তোর র্যামটা কম।'
সন্দীপের কাছ থেকে র্যাম ব্যাপারটা বালাল জেনে গেছে। কম্পিউটারে থাকে। এখন শুয়োরের বাচ্চাটার কথা শুনে বালালের গা পিত্তি জ্বলে গেল। মনে হয়, দিই খিস্তি! কিন্তু যতই হোক সন্দীপ লেখাপড়া জানা লোক। বালালকে নুন খাইয়েছে। এখন সে কী করে সন্দীপের গুণ না গেয়ে খিস্তি দেয়। তাকে ঠিক খিস্তি দেওয়াটা মানায়?
সন্দীপ আবার বলল, 'কত জিবি? মেয়েটা এত স্লো নামছে কেন শালাবাবু?
শালাবাবু!
সন্দীপের মুখে শালাবাবু শুনে বালাল মনে মনে বলল, আর দাঁত কেলিয়ে শালাবাবু বোলো না, অমন বউটাকে খেয়ে এখন আমাকে শালাবাবু মারাচ্ছে। নাঃ, বালাল কিছু বলল না। শুধু বলল, 'কাগজে কোনও নিউজ আছে?' খবরের কাগজে তো খবর থাকবেই। বাংলা ইংরেজি করে পাঁচখানা ছ-খানা খবরের কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সন্দীপ বেশ খোশমেজাজে ছিল। বলল, 'ভয় নেই, সব কাগজ ফরসা!'
ফরসা শুনে বালাল লম্বা হয়ে শুল। নিশ্চিন্ত ভঙ্গি! বলল, 'আমার দিদির পেটির মতো ফরসা।'
'বানচোত!' সন্দীপ বিড়বিড় করল।
বালাল খ্যা খ্যা করে হাসল, 'দেখো আমি জামাইবাবুকে খিস্তি দিলাম না। কিন্তু জামাইবাবু আমার বোন তুলে খিস্তি মারল।'
সন্দীপ আবারও বলল, 'বানচোত!'
হে হে করে হেসে বালাল বলল, 'আমার বোনকে ভুলতে পারছ না বুঝি! তা পেপারটা ভালো করে দেখেছ— বোনের খবর কিচ্ছু নেই বলছ? হাত পা কোথাও ঠেলা মেরে ভেসে ওঠেনি? পুরো ভ্যানিস!'
সন্দীপ খুব বিরক্তির চোখে বালালের দিকে তাকাল। এইসব লোকগুলোর স্ট্যান্ডার্ডটাই এমন হয়। শালারা খেয়ে এসে বার বার হাত শোঁকে। হাতের গন্ধে জিভে জল আনতে চায়। সন্দীপ বলল, 'ব্রেকফাস্টে কী খাবে? ব্রেড বাটার টোস্ট আর অমলেট বলব? ঘরে দিয়ে যাক।'
সন্দীপ ভারী হওয়ার জন্যে বালালকে এখন 'তুমি' সম্বোধন করল।
'না, আমি কচুরি খাব।'
'আবার কচুরি! চারদিন ধরে ব্রেকফাস্টে কচুরি খাচ্ছ।'
'কেন তার আগে প্রথম দুটো দিন মন্দারমনিতে ডিম-পাউরুটি গিলেছিলাম। এখন আমি কচুরিই খাব।'
'আমি হোটেলের বেয়ারাদের বলতে পারব না। তোমায় পয়সা দিচ্ছি, কিনে খেয়ে আসো।'
বালাল বিছানা ছেড়ে উঠল না। শুয়ে শুয়ে বলল, 'বাইরে যাব?' ওর কপালে চিন্তার রেখা।
'যাও। একদম ঘরে শুয়ে থাকলে বেয়ারাগুলো আবার সন্দেহ করবে। ওরা সব পুলিশের টিপার।'

'আমি বরং শুয়ে থাকি। তুমি আমার জন্যে আট পিস কচুরি এনে দাও বস!'
'আমি তোর বাপের চাকর। আর দু-একটা দিন থেকে এবার তুই ফুটে যাবি। আর যেন তোর মুখ না দেখতে পাই।'
বালাল হাসে। 'আমি না তোমার শালাবাবু হই!'
সন্দীপ রাগতে গিয়ে রাগে না। বলল, 'স্বপ্নে আসা মেয়েটা কেমন? সাইজ বল?'
সন্দীপের কথায় বালালের হাসি পেল। আগে স্বপ্নের মধ্যে যারা এসেছে তারা মেয়ে। খাসা মেয়ে। তোফা মেয়ে। সেক্সি মেয়ে। লস্যি মেয়ে। কিন্তু এ মেয়ে এমনটি নয়।
প্রথম দিন মেয়েটার দুটো হাত দেখেছিল। দারুণ দুটো হাত। এক্কেবারে মাটির প্রতিমার মতো করে বানানো।
নিটোল। পেলব আঙুলগুলো। কিন্তু আঙুলের মাথায় শিরস্ত্রাণের মতো নখ নেই। বিলকুল ফাঁকা। মেয়েটা প্রতিবাদ করে খিমচে দিতে পারবে না। ঘুমের ভেতর চমকে উঠে বালাল মেয়েটার মুখ দেখতে চাইল। মেয়েটির নির্ঘাত নখ খাওয়ার বদ অভ্যাস আছে। ছোট ছোট দাঁত দিয়ে সে কুট কুট করে নখগুলো খেয়ে রেখেছে।
পরবর্তী স্বপ্ন না দেখা পর্যন্ত বেশ কয়েকদিন ধরে নখহীন সেই হাতদুটোই বালালের সামনে ঘুরেছে।
যখনই ঘুমিয়েছে, দু-চোখের পাতা এক হয়েছে, মেয়েটার হাত দুটো ভেসে এসেছে। গোটা মেয়েটা ভেসে এলে বালাল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের ভেতর একটু মস্তি করে নিত। সেটা হল না। তবু সে মন্দারমনি ছেড়ে দিঘায় ঢুকেই ওই বিধবা সন্দীপকে বলেছে, 'জামাইবাবু দুটো মেয়েছেলে তুলে নিলে হয় না। শরীলটা বড় টাটাচ্ছে!'
সন্দীপ তখন কোনও কথা বলেনি।
সন্দীপের তখন হেভি টেনশন। ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে খান পাঁচেক খবরের কাগজ কিনে বগলদাবা করে আছে।
কাগজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না পড়া পর্যন্ত ওর শান্তি নেই। খবর থেকে হারানো প্রাপ্তি। একটাও খবর যেন বাদ না যায়। সমস্ত পুলিশি রিপোর্ট। নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন। মৃতদেহ উদ্ধার।
বালাল বুঝল সন্দীপ মালটার কিছু হবে না। শালা বিধবামার্কা। যতই সাহসী কথা বলুক আসলে ডরপুক! খবরের কাগজ না পড়া পর্যন্ত ওর মুখ দিয়ে জল গলবে না। ওর নতুন বউ এলে তাকেও আবার কাউকে না কাউকে দিয়ে মারাবে।
বালাল বলল, 'একটা বোতল কিনে নেবে নাকি? তবে ঘর থেকে আর বের হতে হত না।'
সন্দীপ গলা চেপে বলল, 'মালের খরচাও আমাকে দিতে হবে?'
'তুমি আমাকে সঙ্গে রেখেছ— তাই বলছি। আমি যদি কাজ সেরে চলে যেতাম— থোড়ি আমাকে আজ মালের পয়সা দিতে!'
যেন বালালের মুখ বন্ধ করতেই সন্দীপ একটা পাঁচশোর নোট এগিয়ে দিয়েছিল। বালাল একটা এক লিটার এনেছে।
তার থেকেই সন্দীপ দু-পেগ খেয়েছে, বালাল সারাদিন ধরে বোতলটা খেয়ে চলেছে—।
বালাল বলল, 'জামাইবাবু তুমি খুব হিসেবি।'
'বেহিসেবি হলে এতক্ষণ ক্যালানি খাচ্ছ।'
'না, তোমার সঙ্গে কাজ করে বেশ মজা পেলাম। এক্কেবারে গুছানো কাজ। মালগুলো ঠিক ঠিক জায়গায় ডেলিভারি দিলে। এমনকী যন্তরপাতিগুলো চলন্ত ট্রেন থেকে কোথায় যে ফেললে এখন নিজেও মনে করতে পারবে না।'
সন্দীপ কাগজ পড়তে পড়তে ওর গুণপনা শুনছিল। হোটেলের ঘরে টিভিটা খোলা। খবর চলছে। চলেই যাচ্ছে। একটু নাচা গানা হিন্দি সিনেমা হবে না। সন্দীপ বলেছে, 'খবর ফলো করে যেতে হবে।'
বালাল বলল, 'জামাইবাবু তুমি কিন্তু বেশ কাজ পাগলা। কাজ শেষ করেও কাজের মধ্যে থাকো।'
সন্দীপ বলল, 'আমার ঘানি ঘোরাবার ইচ্ছে নেই।'
বালাল বলল, 'আবার তুমি বিয়ে করবে। গোটা একটা মেয়েছেলে পুষবে। তাকে আদর করবে। সংসার করবে। হাঁড়ির গরম গরম ভাত খেয়ে লোকের বাড়ি, অফিসে কম্পিউটার সারাতে যাবে। তোমার কথা, মানে আমাদের কথা কেউ জানতে পারবে না।'
সন্দীপ বলল, 'কেন জানতে পারবে না— তুই মাল খেয়ে ঠেকে বসে উগরাবি। মনে রাখিস পুলিশের টিপার কিন্তু সব জায়গায় আছে। একটু গন্ধ পেলে পেছনে সেঁটে যাবে।'
'যা!' একটু লজ্জা পেল বালাল। 'তাতে তোমার মতো আমারও বিপদ। হাতে কলমে কাজটা আমাকেই করতে হয়েছে জামাইবাবু। ঝামেলায় আমিই বেশি পড়ব। ফাঁসি যাবজ্জীবন সব আমার। তুমি কাজটা করালে, অথচ দেখব তুমি রাজসাক্ষী হয়ে বেকসুর খালাস হয়ে গেলে। টাকার জোর বড় জোর। টাকা খেয়ে পুলিশ চার্জশিটে ছয় কে নয় করে দেবে। আমি সব জানি।'
সন্দীপ এ-গল্প আগেই কায়দা করে বালালকে শুনিয়ে রেখেছে। ওর মুখে নিজের কথা শুনে হাসি পেল। তবে ব্যাজার মুখ করে বলল, 'বেড়াচ্ছিস বেড়ানোর মজাটা নে। যা টাকা দিয়েছি সারা জীবনে আচ্ছাসে খেয়ে দেয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবি।'
হে হে হাসল বালাল, 'জামাইবাবু তোমার প্ল্যান কিন্তু ফাটাফাটি। কোনও কথা হবে না।'
সন্দীপ কাগজ পড়ছিল না, খবরের কাগজের দিকে তাকিয়েছিল। সন্দীপ টিভি দেখছিল না, টিভির দিকে তাকিয়েছিল।
প্ল্যান! প্ল্যানটা সে ঠিক ঠিক করতে পেরেছিল। কোনও ভুল থাকেনি তো? কোনও ফাঁকফোকর?
পর্ণশ্রীর ভাড়ার ফ্ল্যাটটা এ মাসের ৩১ তারিখ ছেড়ে দেবে, তা এক মাস আগেই বাড়িওয়ালা অচিন্ত্যবাবুকে জানিয়ে রেখেছিল। বলেছিল, বাঘাযতীনের দিকে ভাড়া যাচ্ছে। বড় ফ্ল্যাট। হেভি বাড়ি। লিফট আছে।
৩০ তারিখ রাতে মালপত্তর গোছানোর জন্য ডেকে নিয়ে আসে বালালকে। ব্যাগে ছিল যন্তরপাতি। বালাল জানে কাজ সারতে কী কী লাগবে? তবে ২৫ তারিখে সন্দীপ একটা ইলেকট্রিক কার্টার কিনেছিল। কী প্রচণ্ড ধার! কারেন্ট চালু করলে শোঁ করে আওয়াজ উঠে আসে, আর মুহূর্তের মধ্যে কাঠগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
পুবালী বলেছিল, 'তুমি কাঠ কাটার জন্যে একটা মেশিন কিনে আনলে?'
সন্দীপ বলেছিল, 'শুধু কাঠ নয়, এতে সব কাটবে। এমনকী মানুষের হাড়ও।'
পুবালী বিরক্ত হয়েছিল, 'কী কথার কী ছিরি!'
সন্দীপ কসাইয়ের মতো মুখ তুলে পুবালীকে বলেছিল, 'বিশ্বাস হচ্ছে না, আমি মিথ্যে বলব...। ঠিক আছে তুমি দেখে নিও। ও তোমাকে দেখাব কী করে?' কথাটা বলে সন্দীপ আবার অদ্ভুত হেসেছিল। এই ধরনের হাসিকে কসাইয়ের হাসি বলা যায়। ওর হাসি দেখে পুবালীর বুকের ভেতর হিম হয়ে গিয়েছিল। হয়তো এই কসাইমার্কা হাসিটাই সন্দীপের কাল হল! কেননা সন্দীপের কসাইমার্কা হাসি আর ইলেকট্রিক কার্টারটা পুবালীকে কেমন হিম করে দিয়েছিল। তা পুবালী রাতে অর্ণবকে সব কথা জানিয়ে মেসেজ করেছিল।
অর্ণব লিখেছিল : 'কম্পিউটার সারানোর জন্য ইলেকট্রিক কার্টার কেন লাগবে? আশ্চর্য!'
পুবালী লিখেছিল : 'হয়তো আমাকে মারবে। মেরে টুকরো টুকরো করবে।'
: যত বাজে কথা।
: কেন খবরের কাগজে তো হামেশাই এমন ঘটনা শোনা যায়।
: অহেতুক ভয় পাচ্ছ?
: ভয় নয়, তবে ভয়ের কিছু আমার মন বলছে।
: কেন ও আমাকে নিয়ে আর কিছু বলছে?
: না, অদ্ভুত চুপচাপ।
: চুপ করল কেন?
: যেদিন আমি স্পষ্ট করে বললাম, আমি অর্ণবকে ভালোবাসি। আমি চলে যাব। সেদিন প্রথমে ও ভয়ংকর রেগে গেল। তারপর কাঁদল। তারপর খুব চুপ করে গেল।
: বেশ করেছ বলেছ। আর একটা কথা বললে সত্যি সত্যি চলে আসবে।
২৫ তারিখ ইলেকট্রিক কার্টারটা কেনার পর সন্দীপ সেটা দিয়ে কাঠ টুকরো করল। অহেতুক। কতগুলো বাতিল পেন টুকরো করল। অহেতুক। পুরনো একটা হাওয়াই চপ্পলকে কেটে টুকরো টুকরো করল। ঘর নোংরা। অহেতুক। ওদিকে পুবালী তার জিনিসপত্র গোছাচ্ছে। না, অর্ণবের কাছে চলে যাওয়ার জন্য নয়। তারা বাড়ি পরিবর্তন করবে। বেহালা থেকে যাবে বাঘাযতীন। হেভি ফ্ল্যাট। লিফট আছে। অর্ণবের বাড়ি যাদবপুরে। ভালোই হবে। ও যখন তখন আসতে পারবে।
৩০ তারিখ রাতে এল বালাল সাউ। সন্দীপ নিয়ে এল। বলল, 'এত মাল আমি একা গোছাতে পারব না। ও গুছিয়ে প্যাকিং করে দেবে। কাল সকালে আরও দুজনকে বলে রেখেছি। তারা গাড়িতে মাল তুলে দেবে।'
বালাল নিখুঁত ছেলে। কী সহজেই সব কাজ শেষ করল। স-ব-ব! এক্কেবারে সন্দীপের প্ল্যান মাফিক তেইশটা টুকরো। তারপরেও ঘুমাল না, বিশ্রাম নিল না। প্যাকিংকর্মীর দক্ষতায় ফ্ল্যাটের মালপত্রও গুছিয়ে দিল। আটটা নাগাদ চা খেল, ব্রেকফাস্ট করল। গাড়ি এল। মালপত্র উঠল। বাড়িওয়ালাকে সন্দীপ বলল, 'পুবালী সাত সকালে নতুন ফ্ল্যাটে চলে গেছে। কাজের লোক দিয়ে ধুয়ে মুছে রাখবে।
অর্ণব বাইকে করে এসেছিল দেখতে। ওকে আজ নতুন ফ্ল্যাটটা চিনে আসতে হবে। অর্ণব সকালে আর পুবালীকে দেখতে পেল না। তারা গাড়িটাকে ফলো করে চলল। গাড়ি যাওয়ার কথা ছিল বাঘাযতীন। গাড়ি গেল নৈহাটি। গঙ্গার কাছাকাছি একটা বাড়িতে সেখানেই মালপত্র নামল।
অর্ণব পুবালীকে দেখতে পেল না। সন্দীপের সঙ্গে একটা ছেলে। পুবালী তো সন্দীপের এমন কোনও বন্ধুর কথা বলেনি। ফোনেও পেল না।
অর্ণব ফিরে এল। পরের দিন গিয়ে দেখল নতুন ভাড়ার বাড়িটা তালাবন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানল মালপত্তর রেখে নতুন ভাড়াটে কদিনের জন্য কাজে বাইরে গেছে। বেড়াতে। আরও জানল, নতুন ভাড়াটে নাকি একা মানুষ। ব্যাচেলর! ব্যাচেলর!
সন্দীপ বলল, 'তোর র্যামটা বাড়া— স্বপ্নের মেয়েটাকে জলদি নামা। তিনদিন ধরে কখনো হাত, কখনো নাভি দেখলি। পুরোটা কখন নিবি?'
'সত্যি কেন যে ইনস্টলমেন্টে আসছে বুঝতে পারছি না।' বালাল বেশ দুঃখ পাওয়া গলায় বলল।
সন্দীপ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, 'তুই ধারে খাওয়া পার্টি, তোর মেয়েমানুষও ইনস্টলমেন্টেই আসছে।'
দুজনে মাল খেয়ে বিছানায় লাট খাচ্ছিল। খালি বোতলটা বিছানার ধারে বিপজ্জনকভাবে ঠেকে আছে। আর একটু আদর পেলেই গড়িয়ে নীচে পড়বে। নীচে কী কার্পেট পাতা? সন্দীপ জেগে, ঠায় টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। বালালের দু-চোখ ঝাপসা হয়ে ঘুম নেমেছে। মাথার ভেতর অন্ধকার হতেই— উররে শালা... এবার মেয়েটার লেগ পিস! কী ঠ্যাং! মাখন, পুরো মাখন! আ হা হা বালাল হাত বোলায়, কিন্তু ফট করে ফুরিয়ে যায় পা-টা। ভেবেছিল পা ধরে আস্তে আস্তে বডিতে পৌঁছে যাবে। কিন্তু আবার সেই— খণ্ডিত। ইনস্টলমেন্টে মেয়েটা আসছে। অথবা বালালের র্যাম কম, তাই একটু একটু করে নামছে। এমন সময় বেল বাজল। বালালের দিকে সন্দীপ তাকাল। যেন বালাল গিয়ে দরজাটা খোলে। বালাল পাত্তাই দিল না। চোখ বন্ধ করল। যদি স্বপ্নে পরের অংশটা দেখতে পায়।
সন্দীপ উঠে গিয়ে দরজা খুলল। একজন বেয়ারা এসে দাঁড়াল, বলল, 'রুমে খাবার দেওয়া যাবে না। আপনারা ডাইনিং রুমে যান।'
'কেন?' সন্দীপ তেরিয়া গলায় জিগ্যেস করল।
ঠ্যাং নাচিয়ে বালাল বলল, 'ডাইনিং রুমে যাব না, এখানে পাঠিয়ে দিন।'
'এটাই নিয়ম স্যার— আপনাদের ডাইনিং রুমে যেতে হবে।'
'আর এটা দিলে?' সন্দীপ একটা একশো টাকার নোট দু-আঙুলে নাচায়।
বেয়ারা ছেলেটা ঢোঁক গেলে, আমতা আমতা করে বলে, 'খুব প্রবলেম স্যার। ম্যানেজার জানলে আমার চাকরি চলে যাবে। প্লিজ ডাইনিং রুমে যান।'
সন্দীপ আরও একশো টাকার একটা নোট বের করে নাচায়। দুশো টাকা! এবার ছেলেটা স্থির চোখে তাকায়। বলে, 'ঠিক আছে, আমি খাবার দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু রুমের বাইরে কোনও প্লেট রাখবেন না। খাওয়া শেষ করেই আমাকে ডাকবেন। আমি নিয়ে যাব।' বেয়ারা ছেলেটি চলে গেল দুশো টাকা নিয়ে। একটু পরে এসে খাবার দিয়ে গেল। খাবারের প্লেট দেখেই লাফিয়ে উঠল বালাল। রাক্ষসের মতো হামলে পড়ল প্লেটে।
বেশ কিছুটা খেয়ে ওর হুঁশ হল সন্দীপ খেতে বসেনি। হাঁ করে টিভির খবর গিলছে। বালাল বলল, 'জামাইবাবু খাবে না?'
সন্দীপ টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, 'কাজের মধ্যে দুই— খাই আর শুই।'
কথাটা শুনে মেজাজ খিঁচড়ে গেল বালালের। সে যেন হারামখোর! সন্দীপের পয়সায় বসে বসে খাচ্ছে। নেশার ঝাক্কিতে এমন অনেক কথায় অনেকের আঁতে লাগে। সে বলল, 'আমি হারামখোর!'
সন্দীপ এসে টেবিল থেকে ভাতের থালা টেনে খেতে বসল। বালাল মুখ গোঁজ করে খাচ্ছিল হঠাৎ ওর কী যেন হল, ও বেশ তেরিয়া ভাবে বলল, 'কাজটার জন্য এই হারামখোরটার পায়ে তেল মেরেছিলে—!'
'এক রাতের কাজ— কত পেয়েছিস, সে হুঁশ আছে!'
কথাটা শুনে বালাল কঠিন চোখে তাকাল।
'সত্তর হাজার টাকা—।' সন্দীপ চোখ নাচিয়ে বলে ঝোলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে মাংস তুলল, নলি হাড়, ঠোঁটের মাঝে নিয়ে সুড়ুত করে টানল। বলল, 'থুতু মেরে টাকা গুনে নিয়েছিস—।'
'মানুষ খুন করায়, লাশ ফেলে— তুমি আমাকে দিয়ে শুধু লাশ ফেলাওনি সন্দীপদা সেটাকে তেইশটা টুকরো করিয়েছ। রক্ত মাংস থেঁতলে...! হাড় কেটে টুকরো টুকরো করা, কম ঝামেলা!'
সন্দীপ মুখের ভেতর এক টুকরো মাংস নিয়ে নাড়ছিল, চাড়ছিল। হঠাৎ ওর গা গুলিয়ে উঠল। বলল, 'চুপ!'
'কেন ভয় লাগছে? আরে তোমার প্ল্যান একদম ঝক্কাস! কোন শালা বলবে নিজের বউকে তুমি পৃথিবী থেকে হাপিশ করে দিয়েছ। একটা চিহ্ন রাখলে না। কী প্ল্যান মাইরি।'
'শুয়োরের বাচ্চা তোকে থামতে বলেছি—।' সন্দীপ চাপা গলায় হুংকার দিল। বলল, 'বালাল তোর নেশা হয়ে গেছে। নেশা হলেই তুই কথা উগরাস। চুপ যা। চুপ!'
'আমি হলাম প্যাকার্সের লোক। রাত জেগে মাল প্যাক করব। সকালবেলা ভাড়ার ঘর ছেড়ে দেবে। মালপত্তর নিয়ে চলে যাবে বাঘাযতীন, নতুন ভাড়াবাড়িতে। মালের সঙ্গে তুমি বউয়ের লাশের তেইশ টুকরো প্যাক করালে। কী সুন্দর ম্যাটাডোরে খাট বিছানা আলমারি আলনা উঠল, তার সঙ্গে তোমার বউয়ের তেইশটা টুকরো উঠে গেল। গাড়ি যাবে বাঘাযতীন। কিন্তু গাড়ি গেল নৈহাটি। জায়গার নামে বাঘ ছিল। মাইরি জামাইবাবু তুমিই কিন্তু আস্ত একটা বাঘ! রক্ত পর্যন্ত চেটে পুটে খেয়ে নিলে। কমোডের মতো তোমার হাঁ মুখ। কমোডে ফেললে আর ফ্লাশ মারলে!'
সন্দীপের গা গোলাচ্ছে। একটা মানুষের শরীরে এত রক্ত থাকে! হাড় মাংস ছাড়া এত নাড়ি ভুঁড়ি, মাদার বোর্ড, হার্ড ডিস্ক, প্রসেসর, মেমারি, র্যাম, ফ্যান, সাউন্ড কার্ড, গ্রাফিক্স কার্ড, সরু মোটা তার, সাটা, পাটা... ওয়াক! না অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে সন্দীপ বমি করার আগে থমকে থাকে।
বালাল বলল, 'তোমার প্ল্যানটা মাইরি খাসা। পুরনো ভাড়াবাড়ির লোক জানল তোমার বউ ভোরবেলা নতুন বাড়িতে চলে গেছে। আর নতুন বাড়ি জানেই না তোমার বউ আছে কি না? কী প্ল্যান গুরুদেব। তারপর দুপুর থেকে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম পিঠে ব্যাগ নিয়ে। ট্রেন লাইনের ধারে ধারে নয়নজুলিতে একটা একটা পার্টস পোস্টিং করে দিলাম। হাঁটু সমান জলে নেমে মালটা পাঁকে গেঁথে দেওয়া। জামাইবাবু তুমি কী হারামি মাইরি। বউয়ের টুকরোগুলো মাটির পেটে চালান করছিলে আর বলছিলে, পৃথিবীর এক নম্বর দেশগুলো নাকি তোমারই মতোই হারামি। ওরাও তোমার মতো কম্পিউটারের যত ভাঙা রদ্দি মাল সব জাহাজ ভর্তি করে এনে গরিব দেশে ফেলে দিয়ে যায়। ট্রেন লাইনের ধারে ধারে নয়নজুলিতে তুমি ফেলছিলে আর হায় হায় করছিলে, বলছিলে, আর একটু রিস্ক নিয়ে যেখানে রাক্ষুসে মাগুর চাষ হয় সেসব জায়গায় যদি পার্টসগুলো টপকে দেওয়া যেত। তবে আর কোনও প্রমাণ থাকত না।' সন্দীপ কঠিন চোখে আপত্তিজনক মুখে বালালের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কেন যেন এখন সে সাহস পেল না। তার গলার কাছে বমি আটকে। যে হারে গা গোলাচ্ছে মুখ একটু খুললেই হড় হড় করে বেরিয়ে আসবে। তবু সে চোখ বন্ধ করে ভাবছিল, সে দু-চোখ বন্ধ করে দেখার চেষ্টা করছিল, পুবালীর হার্ডডিস্কটা।
পুবালীর হার্ট সুদ্ধ বুকটা খবরের কাগজে বালাল যখন প্যাকিং করছিল ওর তখন মনে হচ্ছিল মালটা একবার খুলে দেখে। এখানে কী করে ওই অর্ণব ছেলেটা ঢুকল? মৌমাছি হয়ে মধু আর মোমের স্বর্গ বানাল? কী করে? কী করে? রোজ দুপুরবেলা ছেলেটা ওর ঘরে আসত। এত প্রেম, এত ভালোবাসা! সন্দীপ কম কী দিয়েছিল? ওর গোনা কনডোম মাঝে মাঝেই কম হত। সন্দীপ সব বুঝেছিল, ভাইরাস! ভাইরাস!
সে পুবালীকে ফরম্যাট করে দিয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। চলে যাবে বলে ভয় দেখাচ্ছিল। এত বেইমানি! সন্দীপ ওর জন্য কী না করেছে। ওইটুকু মেয়ে তাকে ভয় দেখায়! ও অর্ণবকে বিয়ে করবে। অর্ণব ওর জন্য মালা হাতে নিয়ে বসে আছে। যা, তোর খেল খতম, পয়সা হজম!
বালাল বলল, 'আমাকে পয়সার কথা বলছিলে। আমি তোমার কাজ করেছি তুমি আমায় পয়সা দিয়েছ। কিন্তু সঙ্গে নিয়ে ঘুরছ কেন? কাজ মিটে গেছে আমাকে রিলিজ দাও।'
সন্দীপ ক্লান্ত, বিষণ্ণ মুখে বলল, 'রিলিজ, আর দু-একদিন যাক। সাবধানের মার নেই।'
'সাবধান, কীসের সাবধান? সব ঠিক আছে। তোমার প্ল্যান ওস্তাদ, চ্যাম্পিয়ন। এবার আমি কোনও নতুন কেস পেলেই তোমাকে বলব। তুমি প্ল্যান দেবে। আমি হাতে কলমে কেসটা সারব। তোমাকে কমিশন দেব। টোয়েন্টি পারসেন্ট।'
সন্দীপ না তাকিয়ে বলল, 'তোর খাওয়া হয়েছে। যাঃ উঠে যা!'
সন্দীপ উঠে পড়ল। ওর প্লেটে ভাত, মাংস পড়ে। ও হাত ধুতে টয়লেটে ঢুকল। ঢুকতে ঢুকতে বলল, 'প্লেট বাইরে বের করিস না। ও ঠিক এসে নিয়ে যাবে।'
সন্দীপ টয়লেটে ঢুকলেই চেয়ার থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল বালাল। শালা, দুশো টাকা ঝেড়ে ঘরে খাবার দিলি। নিয়ম দেখানো হচ্ছিল, নিয়ম! দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি! সে ভাত ভরা প্লেট, এঁটো কাঁটা নিয়ে ঘরের দরজা খোলে। তারপর দ্রুত হাতে ঘরের বাইরের করিডরে ছড়িয়ে দেয়। দুটো প্লেট বসিয়ে দেয় করিডরের মাঝে। তারপর দরজা বন্ধ করে অপেক্ষা করে টয়লেট থেকে সন্দীপের বেরিয়ে আসার।
সন্দীপ বেরিয়ে এসে দেখে টেবিল সাফ। সে বিস্মিত মুখে জিগ্যেস করে, 'ছেলেটি এসেছিল— সব নিয়ে গেছে?'
বালাল ঘাড় নেড়ে টয়লেটে ঢোকে। একটু পরে হাত ধুয়ে এসে গড়িয়ে পড়ে বিছানায়। আরও একটু পরে ওদের ঘরের বেল বাজে। দরজা খুলতেই হোটেলের ম্যানেজার, দুজন বেয়ারা এসে দাঁড়ায়! ম্যানেজার বলে, 'আমাদের ডাইনিং রুমে গিয়ে খাওয়ার নিয়ম। আপনারা জোর করে একে দিয়ে খাবার আনিয়েছেন রুমে। তারপর এই খাবার এভাবে সারা করিডরে ছড়িয়েছেন!'
বিব্রত সন্দীপ মাথা নিচু করল। হারামজাদা!
বিছানায় পড়ে নেশাতুর বালাল অকাতরে ঘুমাচ্ছে। বেয়ারা ছেলেটির দু-চোখে আগুন। সন্দীপ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
বিকেলে ওরা কোথাও বেরল না। টিভি দেখেই কাটিয়ে দিল। এমনভাবে সন্ধে পেরিয়ে রাত হল। একবার শুধু সন্ধেবেলা ঘুম থেকে উঠে বালাল ঝামেলা শুরু করল। ওর টাকা লাগবে। ওকে সঙ্গে রাখতে গেলে যেমন খাই-খরচা দিতে হবে, তেমন মদের খরচাও জোগাতে হবে। সন্দীপের থেকে টাকা নিয়ে বালাল আবার বাইরে গেল। একটা মদের বড় বোতল কিনে আনল, আর বাদামের প্যাকেট, চিপস, সোডা। রাতে ডাইনিং রুমে গিয়ে এক ধারে বসল। কোনও মতে খাবার খেয়ে দুজনে এসে আবার ঘরে ঢুকল। আবার টিভি। নিউজ চ্যানেল। না, কোথাও কিছু নেই।
সন্দীপ হিসেব করল চারদিন হয়ে গেছে। কাল পাঁচদিনে পড়বে। বালালকে এবার ছেড়ে দিতে হবে। তাকেও ফিরতে হবে নতুন ভাড়ার ঘরে। সে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল— সে কি গিয়ে পুলিশে একটা ডায়েরি করে রাখবে, তার স্ত্রী লাভারের সঙ্গে চলে গেছে। না, খুঁচিয়ে ঘা করবে না। থাকুক চুপচাপ। যদি পুবালীকে ওর মা মোবাইলে না পেয়ে সন্দীপকে ফোন করে, সে স্পষ্ট জানিয়ে দেবে ওঁর মেয়ের প্রেম বৃত্তান্ত।
শুয়ে শুয়ে সন্দীপের মনে হচ্ছিল বালালকেও যদি সমুদ্রের পাড়ে গলা টিপে মেরে রেখে দেওয়া যেত, তবে একেবারে নিশ্চিন্ত। কিন্তু ও সেটা পারবে না। এত সাহস বা ক্ষমতা ওর নেই। ও পারবে না, নইলে পুবালীর কাজটার জন্য ওকে বালালকে ধরতে হয়? ও নিজেই করে নিত, এতগুলো টাকাও যেত না, সাক্ষীও থাকত না। আর কাজ সেরে হাতে টাকা পেয়ে বালাল যাতে বাইরে না কপচায় তার জন্য তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেও হত না। বেশ বেলা পর্যন্ত ঘুমাল বালাল। সন্দীপ ভোরবেলা উঠে খবরের কাগজ কিনে নিয়ে এসেছে। না, কোথাও কোনও খবর নেই। তেইশটি টুকরোই তাহলে ভ্যানিশ। একটা টুকরোও তাকে বিপদে ফেলার জন্য কাদা মাটি-জল ফুঁড়ে ওঠেনি। প্রতিটা টুকরো বালাল নয়নজুলির ধারে এক হাঁটু জলে কাদা মাটিতে পুঁতেছিল।
ঘুম ভাঙতেই সন্দীপ বেরিয়ে পড়েছিল। পাঁচখানা খবরের কাগজ কিনে সে হোটেলের ঘরে ফিরল। ফেরার সময় দেখল সেই বেয়ারা ছেলেটা তার দিকে খুব কট কট করে দেখছে। ঘরে ঢুকেই সে বসে গেল কাগজগুলো নিয়ে। বেশিক্ষণ সময় নয়, আধ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট হবে সে প্রতিটি কাগজের হেডিং পড়ে ফেলল। কাগজগুলো শেষ করে এক অপার শান্তি নেমে এল তার বুকের ভেতর। সে এলিয়ে পড়ল বিছানায়। মনে হল চা খেতে হবে। সে কি বেল বাজিয়ে চা চাইবে? না, বাইরেই যাওয়া যাক। টাকা ফুরিয়ে আসছে। এখন এত হোটেলবাজি করলে হবে না। এই কদিনে তারা মারাত্মকভাবে হোটেলের ঘর বন্দি হয়ে আছে। বাইরের সঙ্গে একটু সড়গড় হয়ে নিতে হবে। ওর মনে হল, আজ, আজই ও এই দিঘা থেকেই বালাল সাউকে রিলিজ দেবে। সে-ও ফিরে যাবে নৈহাটির নতুন ভাড়াবাড়িতে।
বালাল হাঁ করে ঘুমাচ্ছে। সন্দীপ ওকে ডাকল। ডাকল কি, শুধু একটু আলতো হাতে ধাক্কা দিয়েছে কি দেয়নি ধড়মড় করে উঠে বসল বালাল সাউ। আঁতকে উঠে বলল, 'কী হয়েছে? খবরের কাগজে খবর আছে কিছু?'
সন্দীপ ঘাড় নাড়ল। বলল, 'আজই আমরা দিঘা থেকে ফিরে যাব যে যার ঘরে। চলো শালাবাবু কাজ শেষ। আজ দুপুরের ট্রেনেই রওনা দেব।'
বালাল হাসল। সন্দীপ বলল, 'ব্রাশ করে নাও। বাইরে গিয়ে চা খেয়ে আসি।'
'একসঙ্গে!' বালাল তেরছা গলায় বলল।
'হ্যাঁ।' বেশ লম্বা করে সুর টেনে সন্দীপ কথাটা বলল।
একটু পরে ওরা হোটেলের বাইরে এল। মোড়ের মাথায় এসে একটা দোকানে চা খেল। বালাল বলল, 'মন্দারমনি, দিঘা ঘুরলাম, সমুদ্রে চান করিনি জামাইবাবু। আজ সি বিচে বিয়ার খেতে খেতে চান হয়ে যাক।'
সন্দীপ খুব সাবধানি গলায় বলল, 'না, না, অত বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। সি বিচে মাল খাওয়া মানা।'
'ধুস! আমি ওসব মানি না। কত করেছি।'
'না, এবার ওসব হবে না। আমার সঙ্গে হবে না।'
চা খেয়ে চায়ের কাপ ফেলতে গিয়ে সন্দীপের মনে হল ওকে কেউ দেখছে। ওর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। বলল, 'চ হোটেলে যাই।'
হোটেলে ঢোকার মুখে সন্দীপের ঘাড়ে টোকা দিল একজন।
যে টোকা দিল— সে খুব সাধারণ একজন। আলতো স্বরে বলল, 'আপনাদেরই খুঁজছিলাম স্যার, একটু কথা আছে। চলুন আপনাদের রুমে গিয়ে বসি।'
'আপনি কে?'
'আমি? নাম বলতে হবে স্যার? আমার নাম আক্কেল বসু। আমি পুলিশের লোক। গোয়েন্দা বিভাগের। নতুন চাকরি স্যার। দেখুন না, কেমন একটা ফালতু কেস দিল। আর কী খুঁজতে খুঁজতে কোনও সুতো ধরে কোথায় এসে পড়লাম। আপনাদের কাছে কিছু কথা জানার ছিল। একটু রুমে চলুন স্যার।'
স্যার, স্যার করছে। লোকটা বিনয়ের অবতার! লোকটা সন্দীপ আর বালালের সঙ্গে ঘরে এসে ঢুকল। তারপর ওদের নাম ধাম জানল। ভোটার কার্ড দেখল। তারপর এটা সেটা এক রাশ কথা জানতে চাইল। কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন? বেড়াতে? তাহলে বেড়াচ্ছেন না কেন? কেন হোটেলের ঘরে ঘাপটি মেরে আছেন? এত লুকোছাপা কেন? কেন দিঘায় এসে এনজয় নেই? হোয়াই?
সন্দীপ সব উত্তর দিচ্ছিল। উত্তর দিচ্ছিল আর বুঝতে পারছিল— ঠিক আছে। ওই হারামজাদা হোটেল বয়টা পুলিশের কাছে তারা যে 'সন্দেহজনক' সেই চুকলি কেটে দিয়েছে। তাইজন্যই পুলিশ এসেছে তাদের খোঁজখবর নিতে। বালাল একবার ইশারা করল। টাকার ইশারা। সন্দীপ ওর ইশারাকে পাত্তা দিল না। ভাবটা এমন কোনও অন্যায়ই তারা করেনি। অহেতুক ঘুষ দেবে কেন? টাকার কথা বললে বেশি সন্দেহ করবে। ব্যাটার নতুন চাকরি, তেমন এলেমদার কিছু নয়। হলে এত স্যার স্যার করত! তার হাঁক ডাকই অন্যরকম হত।
পুলিশটি উঠতে যাচ্ছিল। আবার ধপ করে বসে পড়ল, বলল, 'আচ্ছা স্যার আপনি বিবাহিত বললেন, তা আপনার স্ত্রী কোথায়? দিঘার মতো জায়গায় নিয়ে এলেন না?'
সন্দীপ ঢোঁক গিলল। তারপর স্পষ্ট গলায় কেটে কেটে বলল, 'আমার স্ত্রী পাঁচদিন আগে আমাকে ছেড়ে ওর লাভারের সঙ্গে চলে গেছে—।'
পুলিশটি মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করল। বলল, 'কোথায় গেছে জানেন?'
'না, জানি না। জানার চেষ্টাও করিনি। আমার রুচিতে বাধে।'
'রু—চি!' পুলিশটি কেটে কেটে কথাটা বলে ঘরে জমা খালি মদের বোতল দুটো দেখল। সন্দীপ আর বালালের মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকল। বলল, 'ঠিক বলেছেন স্যার! তা লাভারটিকে চেনেন? ভালো ছেলে তো? নিয়ে গিয়ে আবার বিক্রিবাটা করে দেবে না? আপত্তি করলে খুনটুনও করে দিতে পারে?'
'চিনি। একদিন আমার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ভালো মন্দ জানি না। আমি ওর সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না।'
'ঠিক ঠিক, যে অন্যের বউ নিয়ে ভেগে যায় সে ভালো হবে কী করে? তবু আপনার বউকে বিক্রি করে দেবে না, খুন করে পালাবে না, সেটা একটু দেখতে হবে স্যার। যতই হোক আফটার অল নিজের বউ তো। আপনি একটা কাজ করবেন স্যার, বাড়ি ফিরে লোকাল থানায় বউ মিসিং-এর একটা ডায়েরি করে রাখবেন। আর তার সঙ্গে ছেলেটার নাম ধাম জুড়ে দেবেন। ছেলেটা চাপে থাকবে। সাবধানের মার নেই। বুঝলেন।'
সন্দীপ মাথা নিচু করল, বিড়বিড় করে বলল, 'ও চলে যেতে, আমিও একে সঙ্গে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দুদিন মন্দারমনি ঘুরেছি, দুদিন দিঘায় আছি। খারাপ মন ভালো করছি।'
পুলিশটি আবার মুখে চুক চুক শব্দ করল। বলল, 'মনের দুঃখে বনে চলে এলেন স্যার। যাই হোক, আপনি ফিরে গিয়ে স্যার লোকাল থানায় একটা ডায়েরি করে রাখবেন। নইলে বড় কেসে ফেঁসে যাবেন।'
পুলিশটি উঠল। হোটেলের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, 'আর কদ্দিন আছেন স্যার?'
সন্দীপ স্মার্ট গলায় বলল, 'না, আজই চলে যাব।'
'আজই চলে যাবেন? আবার আসবেন স্যার। এবার মন খারাপ নিয়ে এসেছেন, এর পরের বার খুশি মন নিয়ে আসবেন।'
সন্দীপ হাসল। বুঝল সে পাশ করে গেছে। একটু উৎসাহেই সে খুশি খুশি গলায় বলল, 'নাও হে শালাবাবু— রেডি হয়ে নাও।'
পুলিশটি ঘুরে দাঁড়াল, ভ্রু কুঁচকে বলল, 'উনি আপনার শালাবাবু! আপনার পলাতকা মানে চলে-যাওয়া-স্ত্রীর ভাই বুঝি? বাঃ বেশ মজা তো! স্ত্রী চলে গেল আর শালাবাবু থেকে গেল! আপনার স্ত্রীর সঙ্গে শালাবাবুর কেমন সম্পর্ক?'
সন্দীপ কিছু বলতে যাচ্ছিল। বলতে যাচ্ছিল— তেমন কিছু না, এই লতায় পাতায়, এক পাড়ার, এক গাঁয়ের, পাতানো বা তেমন কিছু। কিন্তু তার আগেই তড়বড় করে উঠল বালাল সাউ। এক গাল হেসে বলল, 'ওর স্ত্রীর সঙ্গে আমার বেলাড রিলেশন স্যার!'
পুলিশটি পকেট থেকে রুমাল বের করল। মুখ মুছল। ওর বিস্ফারিত দু-চোখ। সে যতখানি ঘরের বাইরে গিয়েছিল ততখানি ফিরে এসে আবার আগের জায়গায় গুছিয়ে বসল। তারপর এক গলা হেসে বলল, 'বেলাড রিলেশন! বাহ!' ওর চোখে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। বলল, 'আরে সে কাহিনিটাই তো জানতে সেই কলকাতা থেকে আপনাদের খোঁজ করতে করতে আসছি। তা সম্পর্কটা কী?'
বালাল সাউ ছটফট করে উঠল, 'ওই যে বললাম স্যার— বেলাড রিলেশন!'
'আমার নাম আক্কেল। আক্কেল বসু। কিন্তু আক্কেলজ্ঞান আমার অত কম নয়, যতটা আপনারা ভাবছেন। নতুন চাকরি, ফার্স্ট কেস। বউটির নাম পুবালী। প্রেমিকটির নাম অর্ণব। মানুষ বউ খুঁজে পায় না, ও প্রেমিকা খুঁজে পাচ্ছে না। যাওয়ার কথা ছিল বাঘাযতীন, গাড়ি গেল নৈহাটি। প্রেমিকার বিয়ে করা বর হঠাৎ ব্যাচেলর হয়ে গেছে। সন্দেহ তো হবেই। তা বেলাড রিলেশন! মানে রক্তের সম্পর্ক! তা সেটা বংশধারায়, না কি রক্ত ঝরায়!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন