পঞ্চমুণ্ডির অভিশাপ

জয়ন্ত দে

আজ রোববার। সকালে সবে বাজার করে ফিরেছি তখনই বেজে উঠল ফোনটা। ফোন তুলে দেখি সরসকালী ভদ্র। সরসকালী ভদ্রকে চেনেন নিশ্চয়ই? আরে, যিনি সুপার ন্যাচারাল, প্যারানর্মাল, ব্ল্যাক ম্যাজিক, প্যারাসাইকোলজির মতো ব্যাপারস্যাপার নিয়ে কাজ করেন। এসব কাজের জন্য আমাদের একটা ছোট্ট সংস্থাও আছে 'স্পিরিট', তারই প্রধান সরসকালী ভদ্র। যাঁর ফোন পেলেই অজানার ডাকে আমার চারপাশের জগৎটা হঠাৎই বদলে যায়। মোবাইলের স্ক্রিনে তাঁর নামটা দেখেই আমি সোজা হয়ে বসলাম। আমার সামনে গরম চা আর খবরের কাগজ। কিন্তু আমার এখন সমস্ত আগ্রহ বেজে ওঠা ফোনে। আসলে সরসকালী ভদ্রের ফোন পেলেই আমার চারপাশের জগৎটা হঠাৎই যেন থমকে যায়। অসময়ের ফোন আমাকে বিব্রত করে না, বরং কৌতূহলী করে। মোবাইলের স্ক্রিনে তাঁর নামটা ভেসে উঠলেই, আমি নিজেকে প্রস্তুত করি, আর এক আরম্ভের জন্য। গত কালই সারা সন্ধেবেলা তাঁর বাড়িতে আমরা আড্ডা মেরেছি। এখন ফোন মানে, অজানার ডাক।

'হ্যাঁ বলুন।'

'বিকেলে কী করছেন?'

'কিচ্ছু না।'

'তাহলে ঠিক পাঁচটার সময় চলে আসুন, একসঙ্গে চা খাব।'

এটুকু ডাকই আমার জন্য যথেষ্ট।

যথারীতি বিকেল পাঁচটার একটু আগে আমি চলে এসেছি। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এই ডাক আমার জন্য নয়। আমি আর ডাঃ সরসকালী একপক্ষ, অপরপক্ষ অবশ্যই থাকবেন। তিনি কে বা তাঁদের পরিচয় আমি জানি না।

পাঁচটার আগেই আমি হাজির হলাম। আমি যে পাঁচটার আগেই যাব সরসকালী ভদ্র জানতেন। তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, 'বসুন, মুকুলবাবুর দশ-পনেরো মিনিট দেরি হবে। ততক্ষণে এক রাউন্ড চা হয়ে যাক।'

আমি বুঝলাম, মুকুলবাবু বলে কেউ একজন আসছেন। আমি শুনলাম এই পর্যন্তই। কিন্তু কে মুকুলবাবু? কেন আসছেন আমি জানতে চাইলাম না। প্রশ্ন করে জানতে চাওয়ার থেকে সাক্ষাতে বুঝে নেওয়া ঢের ভালো। অগত্যা অপেক্ষা।

চা এল। সঙ্গে আদি অকৃত্রিম মেরি বিস্কুট। আমাদের চা পর্ব শেষ হওয়ার আগেই শুনলাম গাড়ির আওয়াজ। রামদুলাল এসে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। বলল, 'একটা গাড়ি এল, মনে হয় ওঁরা এসেছেন।'

'নিয়ে আয়...।'

'আপনাদের চা খাওয়া হয়েছে? তাহলে কাপগুলো নিয়ে যাই।'

আমরা দুজনেই সামনের ট্রে-তে কাপ-প্লেট রাখলাম, রামদুলাল খুব দ্রুত সেগুলো নিয়ে চলে গেল। তার কয়েক মুহূর্ত পরেই ঘরে ঢুকলেন দু-জন। একজন পুরুষ ও একজন মহিলা। দু-জনই পঞ্চাশোর্ধ। কিন্তু ভদ্রমহিলাকে একটু বেশিই বয়স্ক মনে হচ্ছে। না, একঝলক দেখেই বুঝলাম এঁরা স্বামী স্ত্রী নন। দিদি ভাই হলেও হতে পারে। বসতে বসতেই মুকুলবাবু আমাদের দু-জনের দিকে হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বললেন, 'আমি মুকুলকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়, উনি আমার দিদি মঞ্জুশ্রী চট্টোপাধ্যায়।'

আমরাও হাত তুলে প্রতিনমস্কার জানালাম।

চেয়ার টেনে বসেই মুকুলবাবু বললেন, 'আসলে কাল আমি দীনেনবাবুর ফার্মে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের পারিবারিক একটা বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল, তখন দীনেনবাবুই বললেন, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে, যদি কোনও দিশা পাওয়া যায়। উনি আপনাকে ফোনে ধরিয়ে দিলেন।'

মুকুলবাবু বিনয়ে একটু মাথা ঝোঁকালেন।

'আমি বাড়ি ফিরে দিদিকে বলছিলাম। দিদি বলল, তোর সঙ্গে আমিও যাব।'

সরসকালী মাথা ঝাঁকালেন, বললেন, 'খুব ভালো করেছেন।' তারপর একটুখানি চুপ করে থেকে আমাকে দেখিয়ে বললেন, 'উনি আমার বিশেষ বন্ধু। আমি বিভিন্ন বিষয়ে ওঁর থেকে নানা সাহায্য পাই, আপনারা আসছেন, তাই ওঁকেও ডেকে নিলাম।'

আমি মৃদু হেসে বললাম, 'আমার নাম সুজন।'

'বাহ আশা করি আপনাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে আমার সমস্যা মিটবে।'

আমরা দু-জনেই চুপ করে আছি।

'সমস্যাটা আমার এক কাকাকে নিয়ে। তার নাম অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়, আমরা বলি রাঙাকাকা।' মুকুলবাবু একটু থামেন। বুঝতে পারি উনি কথা বলার শুরুটা খুঁজছেন। কিন্তু কথা শুরু করলেন দিদি মঞ্জুশ্রী চট্টোপাধ্যায়,

'আমার ঠাকুরদারা চার ভাই। বড় ভাই সাধু হয়ে চলে যান। ছোট ঠাকুরদা মারা যান অল্প বয়েস। আত্মহত্যা করেছিলেন। আমরা বাবা মেজ। মানে আমরা মেজ তরফের। আমার বাবা এক সন্তান। রাঙাকাকারা সেজ তরফের। রাঙাকাকা সেজ ঠাকুরদার ছোট ছেলে। ওরা তিন ভাই, এক বোন। আমারও মনে আছে, রাঙাকাকার সঙ্গে কতদিন আমি খেলেছি। আমার যেটুকু মনে আছে, ছোটবেলায় খেলতে গিয়েও রাঙাকাকা নানা গোলমাল পাকাত। কিছুতে সুষ্ঠু স্বাভাবিকভাবে কাউকে খেলতে দিত না।

আসলে রাঙাকাকার এই উৎপাতটা আমি ছোট থেকেই দেখে আসছি। ভাই কমই দেখেছে। ও বুঝেছে বড় হয়ে। আমি সেই ছোট থেকে কাকাকে দেখছি। মানুষটার এত বয়স হয়ে গেল একটুও শোধরাল না। বরং দিন দিন আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে।'

মঞ্জুশ্রী দেবী শুরু করে হঠাৎ চুপ করেও গেলেন। ঘরের ভেতর এক অখণ্ড নীরবতা। আমরা তৈরি অপরপক্ষের নীরবতা ভাঙার অপেক্ষায়।

মুকুলবাবু মুখ মুছলেন, 'কী হয়েছে জানেন, এত সব পারিবারিক কথা, সব কথা যেন বলেও উঠতে পারছি না। কোথাও যেন আত্মসম্মানে লাগছে। বার বার মনে হচ্ছে, আমরা ঘরের কথা বাইরে বলছি।'

'কিন্তু না বলে তো উপায় নেই। কাল এসব কথা আলোচনা করতেই দীনেনবাবুর কাছে ভাই গিয়েছিল। না গিয়ে আর উপায় কী বলুন!' মঞ্জুশ্রী দেবী বললেন।

মুকুলবাবু বললেন, 'আমাদের রাঙাকাকা মানুষটা একেবারেই সুবিধের নন। সুবিধের নন বলতে ভালোমানুষ নন। সবসময় ওঁর মাথার ভেতর কিছু না কিছু বদ মতলব যেন পাক দিচ্ছে। অথবা বলতে পারা যায়, বদ মতলবেই যেন উনি বেঁচে আছেন। এক একজন মানুষ থাকেন, যাঁরা হয়তো আর পাঁচজনের মতো হন না। পাঁচজন বলতে আমি, আপনি, বা আমাদের আরও আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব যেমন হয় তেমন নয়। রাঙাকাকার সঙ্গে কিন্তু আমাদের রক্তের সম্পর্ক। তবু তিনি কিন্তু স্বাভাবিক ছিলেন না। তাঁর এই অস্বাভাবিকত্ব কোনও অসুখ নয়। কিন্তু কখনো কখনো অসুখের মতোই লাগে।'

'এটা ছোটবেলা থেকেই।' মুকুলবাবুকে থামিয়ে কথা বলে উঠলেন মঞ্জুশ্রী দেবী। 'আমি অন্তত ছোটবেলা থেকেই রাঙাকাকাকে এমনই দেখছি। রাঙাকাকা মানে কিছু না কিছু গোলমাল। একটা ঝামেলা।'

আমি বুঝতে পারছিলাম, এতক্ষণ পর্যন্ত মুকুলবাবু বা মঞ্জুশ্রী দেবী তাঁদের রাঙাকাকাকে নিয়ে ঘুরপাক খেয়েই চলেছেন। কিছুতেই প্রথম যে কথাটা বলেছেন 'মানুষটা একেবারেই সুবিধের নন' তার থেকে এক বিন্দু এগোতে পারেননি। এসময় ওঁদের প্রশ্ন করা উচিত, ওঁদের এই বলতে চাওয়া, দ্বিধা কাটিয়ে অকপট হওয়াটাকেই প্রশ্ন করে উসকে দিতে হয়। তাহলে তারা কথা বলার দিশা পায়। সময় নষ্ট হয় না, গড়গড় করে কথা এগোয়।

কিন্তু সরসকালী ভদ্রর মত ভিন্ন। তাঁর যুক্তি, এই সময়ে প্রশ্ন করতে নেই। প্রশ্ন করলে, সামনের মানুষটা নির্দিষ্ট একটা লক্ষ্যের দিকে ধাবমান হন। বরং তাঁকে প্রশ্নহীন রাখলে তিনি নানা দিকেই আলো ফেলেন।

মুকুলবাবু একটু ছটফট করলেন, 'রাঙাকাকা যে কী সবটা আপনাদের বোঝাতে পারব না।'

'ছোট থেকেই ও এমন।' মঞ্জুশ্রীদেবী সুর মেলালেন মুকুলবাবুর সঙ্গে।

মুকুলবাবু আর মঞ্জুশ্রী দেবীর কথা শুনে মনে হল, ওঁরা যেন কোনও ল-ইয়ারের কাছে এসে পড়েছেন। পারিবারিক গোলমালের ফিরিস্তি শোনাচ্ছেন। কিন্তু তা হলে হবে না, সরসকালী ভদ্র তাঁর রোববারের বিকেল কারও পারিবারিক গোলমালের ফিরিস্তি শুনে দানছত্র করবেন না। নিশ্চয়ই অন্য কিছু আছে, যা তিনি বুঝেছেন, কিন্তু সেটা এখনও প্রকাশ্যে আসছে না। ক্রমশ প্রকাশ্য যেটা হতে চলেছে।

ওঁদের সমস্যাটা এক নিকট আত্মীয় অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে। যিনি ওঁদের কাকা। রাঙাকাকা। ওঁরা এই রাঙাকাকাকে ভয় পাচ্ছেন। কেমন ভয়?

মুকুলবাবু বললেন, 'রাঙাকাকার সঙ্গে আমার এই দিদির বয়সের তফাত সাত বছর। দু-জনেরই শৈশব-কৈশোর কেটেছে এক উঠোনে, একই ছাদে।' কথাটা বলে মুকুলবাবু একটু থামলেন, বললেন,

'ছোট থেকেই আমি রাঙাকাকাকে ভয় পাই। সাইকেলে বসিয়ে উনি হাত ছেড়ে দেন। কয়েত বেল মাখায় অহেতুক একগাদা লংকা ঠেসে জীবন বের করে দেন। শুনেছি, ছোটবেলায় একবার নাকি রাঙাকাকা আমাকে ছাদের ধারে দাঁড় করিয়ে নীচে এসে ডাকছিল। আমি ঝাঁপ দিলে আমাকে লুফে নেবে। ছোটবেলা থেকেই রাঙাকাকা নানা গোলমাল পাকাত। শুনেছি, এই জন্য ওকে বাদ দিয়েই সবাই খেলত। কেউ ওকে নিতে চাইত না।'

মঞ্জুশ্রী দেবী মুখ মোছেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, 'তবে ওকে বাদ দিয়েও কেউ শান্তি পেত না। রাঙাকাকার বদমায়েশির জন্য একবার ওকে খেলতে নেওয়া হল না। পরের দিন ছাদে গিয়ে দেখা গেল কেউ কাচের শিশি ভেঙে রেখেছে। হাত-পা কাটার ভয়ে তিনদিন খেলা বন্ধ। আরও একবার এমনভাবেই উঠোনে পাওয়া গেল মুঠো মুঠো পেরেক। সেবারও রাঙাকাকাকে খেলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ওর এইসব শয়তানি ছোটবেলা থেকে। একটু বড় হতেই আমরা সবাই একদিকে আর রাঙাকাকা আলাদা। এরপর আমাদের বড় হয়ে ওঠার পালা। আমরা বড় হয়ে উঠছি, আমাদের বাড়িও দুটো ভাগে ভাগ হল। মেজ তরফ আর সেজ তরফ। বড় আর ছোটর কোনও উত্তরাধিকার নেই। ছাদে পাঁচিল উঠল না, আর উঠোনও থাকল এক। বাদবাকি সব আলাদা। ওদের অংশের পুরোটা রাঙাকাকা দখল করে রয়েছে। ওর দাদা রাঙাকাকার ভয়ে বাড়ি ছাড়া। তিনি এ-বাড়ির দিকে ফিরেও তাকান না। ওর এক বোন, আমাদের রাধুপিসি, আসে বিজয়া দশমীর পরে, প্রণাম করে চলে যায়। এক গ্লাস জল পর্যন্ত খায় না। ওর ভয় করে। রাধুপিসি আমাকে বলেছিল স্বামী-ছেলেপুলে নিয়ে সংসার করি, না এলে দাদা ক্ষতি করতে পারে। ওর খুব ভয় করে ওই বাড়ির ভেতর ঢুকতে। কেমন ভয় জানেন? এক বছর যে কোনও কারণেই হোক রাধুপিসি ভেবেছিল আসবে না। কিন্তু পর পর তিনরাত্তির নাকি ঘুমাতে পারেনি, ঘুমিয়ে পড়লেই মনে হত কেউ ডাকছে। শেষে মিষ্টির হাঁড়ি দিয়ে প্রণাম করে স্বস্তি পায়। আর একবার রাধুপিসি বাড়ি নিয়ে কিছু বলেছিল। শুনে রাঙাকাকা বলে এই বাড়িকে তুই খুব ভালোবাসিস? তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে তুই যাস না রাধু। রাধুপিসি বলে তা কী করে হয়, আমার স্বামী সন্তান সংসার আছে। তখন রাঙাকাকা নাকি খপ করে রাধুপিসির হাত ধরে, বলে, তাহলে তোর বাম হাতের কড়ে আঙুলটা রেখে যা রাধু। আমি এই বাড়ির উঠোনে পুঁতে দেব। এই বাড়ি তোর কড়ে আঙুল জড়িয়ে থাকবে। সেদিন রাঙাকাকা নাকি জাঁতি নিয়ে এসে রাধুপিসির কড়ে আঙুল কেটে নেওয়ার তোড়জোড় করে। রাধুপিসি কান্নাকাটি করে, কাকুতিমিনতি করে মুক্তি পায়। রাঙাকাকা এত শয়তান! ভাবতে পারেন কেউ জাঁতি দিয়ে নিজের বোনের কড়ে আঙুল কেটে নিচ্ছে বাড়ির উঠোনে পুঁতে রাখবে বলে! অঙ্গুরীলতা! তার অপরাধ সে বাড়িটাকে ভালোবাসে।'

সরসকালী স্থির বসে আছেন, চোখে মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। আমি ঢোঁক গিললাম। কত কথা, কত জিজ্ঞাস্য আমার গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে।

মঞ্জুশ্রী বললেন, 'শুনবেন আরও অসভ্যতামি। রাঙাকাকার বড়দা ওর থেকে বছর ছয়েকের বড়। তিনি এই বাড়ি ভাইয়ের উৎপাতে ছেড়ে চলে গেছেন। থাকেন বাগবাজারে। তবু ভাই তো, একবার কী মনে হয়েছিল এসেছিলেন। দু-এক কথার পর রাঙাকাকা নিজের দাদাকে বলল, আমাকে প্রণাম কর। দাদা ভাবল ভাই ইয়ার্কি করছে। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল ইয়ার্কি নয়, সত্যি, বেপরোয়া রাঙাকাকা তার দাদাকে প্রণাম করিয়েই ছাড়বে। এমনকী দাদার কান ধরে টানাটানি কি না দাদার কানে মন্ত্র দেবে। নিজের ভাইকে গুরু মানতে হবে! ওর বড়দা মান সম্মান নিয়ে পালিয়ে বাঁচে।'

মঞ্জুশ্রী দেবী থামলে শুরু করেন মুকুলবাবু, 'বছর দুয়েক আগে রাঙাকাকাকে দিদি একবার বলেছিল, তুমি তোমার মতো থাকো। এত বড় একটা অংশ নিয়ে আছো, আর কী চাই তোমার? দিদির এই কথা শুনে রাঙাকাকা কী বলল জানেন, তোদের ওদিকেই তো আমার সবকিছু আটকে আছে।' মুকুলবাবু থামলেন।

মঞ্জুশ্রী বললেন, 'ভাইয়ের কথা শুনে আপনারা নিশ্চয়ই পুরোটা বুঝতে পারলেন না। আমি একটু পরিষ্কার করে দিই। আমাদের পুরনো বাড়ির ঠাকুরঘর এখন আমাদের দিকের অংশে। ওই ভাঁওতাবাজ রাঙাকাকার নজর ঠাকুরঘরটা দখল করার। একতলার ওই ঘরে একটা বেদি আছে। রাঙাকাকার বক্তব্য ওটা পঞ্চমুণ্ডির আসন। পঞ্চমুণ্ডির আসন গাঙ্গুলি বংশের সম্পদ। এই আসন, এই ঠাকুরঘরের হক ওর। কিন্তু আমরা জানি, একবার ওই ঘরে রাঙাকাকা ঢুকতে পারলে আমাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে ছাড়বে। আমি রাঙাকাকাকে পরিষ্কার বলেছিলাম, ঠাকুরঘর যেমন আমাদের অংশে, তেমন তার দায়িত্বও আমাদের। ওখানে নিত্যপুজোর ব্রাহ্মণ আছে। তিনি দুবেলা আসছেন, পূজার্চনা হচ্ছে, আর কী চাই? কোনও তো অবহেলা করা হচ্ছে না। রাঙাকাকার বক্তব্য ওই আসনে ও বসবে। ওই আসনের হকদার রাঙাকাকা, আর কেউ নয়। সেখান থেকেই এই অশান্তি। আসলে কিন্তু এটা একটা বাহানা। ওর লক্ষ্য ওই ঘরটা। ওই বেদি নিত্য পরিষ্কার হয়। সুন্দর আসন পাতা থাকে। তার পাশেই আছে দাদামশাইয়ের যজ্ঞ করার চিমটে। সেখানে নিত্য ধূপ ধুনো দেওয়া হয়। প্রদীপ দেখানো হয়। কিন্তু রাঙাকাকা সেসব শুনবে না। ও দখল করতে চায়।'

মুকুলবাবু বললেন, 'আপনারা হয়তো আমাদের খুব ছোট মনের ভাবছেন। ভাবছেন, একটা মানুষ যদি ঠাকুরঘরে যেত, পূজার্চনা করত, তাহলে কী এমন ক্ষতি হত? আমি বলছি, রাঙাকাকা ওই ঘরে পা রাখলেই ক্ষতি হত। রাঙাকাকা শুধু পুজো করার লোক নয়, ওই আসনে বসতে পারলে ও এবাড়ির অনেক ক্ষতি করত।'

আমার মনে হচ্ছিল, সরসকালীর এবার কিছু প্রশ্ন করা উচিত। নাহলে কতক্ষণ ধরে দিদি আর ভাই তাদের কথার মাঝে ঘুরপাক খাবে? কিন্তু সরসকালী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নীরবতা বজায় রাখলেন। ভাবটা এমনই যেন এখনই তিনি প্রশ্ন-উত্তরপর্বে ঢুকতে চান না।

'দেখুন দীনেনবাবু আমাদের ল-ইয়ার তিনিই বিষয়টা দেখছেন। আইনত রাঙাকাকা আমাদের জায়গায় পা দিতে পারছেন না। কিন্তু।' মুকুলবাবু থামেন। 'আগে ছাদ এক ছিল। আমরা বছর খানেক হল ঘিরে নিয়েছি। পুরনো বাড়ির সিঁড়িও ব্যবহার করি না। আমরা আগেই নতুন সিঁড়ি বানিয়ে নিয়েছি। কিন্তু তাতেও শান্তি পাচ্ছি না। উঠোনটা এক। দীনেনবাবু বলেছেন, আমরা মত দিলেই উনি কোর্ট থেকে অর্ডার বের করে উঠোনে পার্টিশন তুলে আলাদা করে দেবেন। এখনও সেটা বলিনি। সেটা নিয়েই কাল আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। তখনই উনি বললেন, একবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে।'

মঞ্জুশ্রী বললেন, 'খুব অশান্তিতে আছি, আইনের পথে গেছি, কিন্তু ও যে বাঁকা পথে নেমেছে। ও নিজে তন্ত্রসাধনা করে। সবাই বলে ও তান্ত্রিক! কিন্তু কিছুদিন হল ওর বাড়িতে কিছু লোকের আনাগোনা হচ্ছে, মানুষগুলো সুবিধের নয়। ইদানীং মাঝে মাঝেই জবাফুল থেকে পোড়া শোলমাছ পড়ে থাকছে উঠোনে। এগুলো ভালো জিনিস নয়। ক্ষতিকর। রাঙাকাকা তন্ত্রমন্ত্র করে আমাদের ক্ষতি করতে চাইছে।'

মঞ্জুশ্রীদেবীর কথা কেড়ে নিয়ে মুকুলকিশোর বললেন, 'একটা কথা বলব বিশ্বাস করবেন কি না জানি না। মাঝে মাঝেই রাতে আমরা কিছু অপার্থিব আওয়াজ পাই। এইসবের মাঝে আমার মেয়েটা দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। রাঙাকাকা ওকে কিছু করেছে। গুণতুক। রাঙাকাকার জন্যই দোয়েল অসুস্থ হয়ে পড়ছে এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।'

মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়ছে!

ঠিক এই কথাতেই সরসকালী ভদ্র সোজা হয়ে বসলেন। আমি বুঝলাম কেসটা উনি নিচ্ছেন। মানে অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে রাঙা ভার্সেস সরসকালী ভদ্র।

দুই

দোয়েল ছাদে উঠেছিল। ইদানীং সে খুবই কম ছাদে ওঠে। ও বেশ অসুস্থ। কিন্তু অসুখটা কোথায় ডাক্তারবাবুরা ধরতে পারছেন না। আগে এ বাড়িতে কোনও বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন এলেই তারা ছাদে উঠত। এত বড় ছাদ এ তল্লাটে আর কোনও বাড়ির নেই। ছোটখাটো একটা ফুটবল খেলার মাঠ। একসময় এই বাড়ির ছাদে দোয়েলের বাবা থেকে কাকা, পিসিরা সারা বিকেল খেলত। এখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী, নাটক করত। এখন দিনকাল পালটে গিয়েছে। এ বাড়িতে ছেলেমেয়ে বলতে তারা দুই ভাই বোন। আর পেছনদিকে পিসির অংশে একটি ভাড়াটে পরিবার। তারা বছর দুয়েক এসেছে। তাদের দুই মেয়ে। তুতুল আর মিতুল। দোয়েলের সেকেন্ড ইয়ার, ইংরেজি অনার্স। কিন্তু ইদানীং তার শরীরটা বড্ড খারাপ হচ্ছে। শরীর খারাপ, না মন খারাপ সে ঠিক বুঝতে পারে না। কিন্তু খারাপ হচ্ছে।

তার বাবা তাকে ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তারবাবু বেশ অনেকগুলো ওষুধপত্র দিয়েছিলেন। কয়েকটা টেস্টও করালেন। ডাক্তারবাবু এখন বলছেন, একজন সাইকোলজিস্ট দেখাতে। বাবা মা ওকে সাইকোলজিস্ট দেখাতে চেয়েছিল, সে রাজি হয়নি। বলেছিল, একটু সময় দাও, ঠিক হয়ে যাবে। আমি নিজে নিজেই ঠিক করে নেব।

কিন্তু কী ঠিক করবে সে?

দোয়েল আপ্রাণ চেষ্টা করছে ভালো থাকার। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে বলছে দোয়েল ভালো থাকতে হবে। কিন্তু দশটা এগারোটার পর কেমন যেন অসহ্য লাগছে। বাবা মা দুজনেই অফিস বেরিয়ে গেলে, আরও অসহ্য লাগে। ঠাকুমা তাকে চোখে চোখে রাখে। একটিবারের জন্য একা হতে দেয় না। দুজন কাজের মেয়ে তারাও সর্বদা দোয়েলের কাছাকাছি থাকে। তবু তার একা লাগে। ভীষণ একা। দুপুরবেলার শূন্যতা তাকে বড্ড বেশি গ্রাস করে। ভাই স্কুল থেকে ফিরলে কিছুটা মুক্তি। তাতার স্কুল থেকে ফেরে ঠিক সাড়ে চারটে। তাতার এসেই হইচই লাগায়। এঘর ওঘর জুড়ে সে ঘুরে বেড়ায়। দোয়েলের মনে হয় সে ভাইয়ের সঙ্গে আর কোনও দিন আগের মতো হইহই করতে পারবে না। তার খালি শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। খুব খুব ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, কিন্তু ঘুমাতে পারে না।

একটু আগে মিতুল এসেছিল। এসে ওকে বলল, 'তোর মোবাইলটা অফ কেন রে? চার্জ দে অভিদা তোর সঙ্গে কথা বলবে।'

'কী কথা?'

'তা আমি কী করে জানব? অভিদা ওর হোস্টেলে। আমাকে ফোন করে বলল, তোর মোবাইল অফ, একটু কথা বলতে চায়। চল, ছাদে চল।'

'ছাদে! ছাদে কেন?'

'এমনি। তোর কি ছাদে যেতে আপত্তি আছে? ঠাকুমাকে বলতে হবে তো, পারমিশন, আমি বলে নিয়ে নিচ্ছি।'

মিতুল দু-লাফে ঘরের বাইরে গেল। এই ঘরের পাশেই দোয়েলের ঠাকুমার ঘর। ঠাকুমা খবরের কাগজ পড়ছিলেন।

মিতুল গিয়ে বলল, 'আমি আর দোয়েল ছাদে যাচ্ছি।'

'ছাদে? কেন?'

'দুজনে দু কার্নিসে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করব!'

ঠাকুমা হাসলেন, 'পাগলি!'

মিতুল এসে বলল, 'চ, পারমিশন নিয়ে এসেছি। হ্যাঁ রে তুই প্রেম করার সময় পারমিশন নিয়েছিলি?'

মিতুলের কথা শুনে চমকে উঠল দোয়েল। বলল, 'চুপ!'

তবু যেন দোয়েল উঠতে চাইছিল না। মিতুল বলল, 'চ। অভিদা তোর জন্য অপেক্ষা করছে।'

তারপর তারা উঠে এল ছাদে। অনেকদিন পরে। ছাদে দাঁড়িয়ে মিতুল বলল, 'চ, এবার কার্নিসে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করি!'

কথাটা শুনেই দোয়েল আঁতকে উঠল। 'না, না, কার্নিসে বসব কেন?'

মিতুল অবাক হয়ে দোয়েলের দিকে তাকাল। বলল, 'মজা করলাম। এতে এত আঁতকে ওঠার কী আছে!'

'এমন মজা করিস না।'

মিতুল চুপ করে ওর দিকে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। বলল, 'সত্যি কথা বলতো, তোর এত ভয় কীসের?'

দোয়েল ফ্যাকাসে মুখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। মিতুল বলল, 'তোকে নিয়ে চিন্তা করে করে অভিদার কেরিয়ার ডুম হয়ে যাচ্ছে। তুই ওকে কী বলেছিস?'

'আমি! তেমন কিছু তো বলিনি।'

'বলেছিস। মনে করে দেখ তুই অভিশপ্ত, তোর সঙ্গে মিশলে ওর ক্ষতি হবে!'

দোয়েলের দু-চোখ ভিজে।

'কেন ওসব বলেছিস? শোন, অভিদা খুব কষ্ট পেয়েছে। তোর ভালো না লাগলে এইসব প্রেম ট্রেমের চ্যাপ্টার এন্ড কর। ঝামেলা মিটে যাবে।'

দোয়েলের গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে নামে।

'অভিদা বলছিল, ও তোর মুখ দিয়ে একটা ফাইনাল ডিসিশন শুনতে চায়। ব্রেকআপ করলে সোজাসুজি বলবি। অভিশপ্ত-টপ্ত গল্প দিলে ও শুনবে না। ওকে ঝুলিয়ে রাখিস না দোয়েল।'

দোয়েল দু-হাত দিয়ে মুখ মুছল।

ভোকাট্টা! দূরে একসঙ্গে অনেক গলা চিৎকার করে উঠল। একটা নীল ঘুড়ি দিশাহীন ভেসে যাচ্ছে টলতে টলতে। ঘুড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল দোয়েল। হঠাৎ মনে হল, ওর শরীরটাও টলে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে আকাশে। কিন্তু সে আকাশ এমন নীল নয়, ঘোলা ঘোলা আর হু হু শূন্যতা।

মিতুল বলল, 'কেন যে অভিদা তোর পেছনে পড়ে আছে বুঝি না। আমার তো তোকে মানুষ বলেই মনে হয় না। সিম্পল একটা ডেড বডি মনে হয়!'

'ডেড বডি' শুনে দোয়েলের মাথার ভেতর পাক দিয়ে উঠল। মনে হল সে ধপ করে পড়ে যাবে। কী বলবে সে! কী বলতে পারে! সে কি অভিলাষকে বলবে দুধসাদা বাথটবে একটা মেয়েকে খুন করে ফেলে রাখা হয়েছে? রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। তারমধ্যেই মেয়েটার মুখ দেখেছে সে। মেয়েটাকে চিনতেও পেরেছে। মেয়েটা অন্য কেউ নয়। মেয়েটা সে! দোয়েল। সে স্পষ্ট দেখেছে, তারই মুখ, দোয়েলের নিজেকে চিনতে ভুল হয়নি। কারও কি নিজেকে চিনতে ভুল হয়? আর বাথটবটা! সেটাও যে চেনা! স্পষ্ট তাদের বাড়ির বাথটব। তাহলে অভিলাষকে কী বলবে সে?

দোয়েলের দম বন্ধ হয়ে আসে।

তখনই মিতুলের মোবাইলে ফোন এল অভিলাষের। ফোনটা ধরে মিতুল দিল দোয়েলকে। কিন্তু দোয়েল স্তব্ধ। ওর মুখ দিয়ে স্বর বের হল না। অনেকক্ষণ পর পর কতগুলো হু আর হ্যাঁ শোনা গেল। অভিলাষ বলল, 'তুমি মনে হয় আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছ না দোয়েল। ঠিক আছে আমি আর তোমাকে ডিসটার্ব করব না।'

ছাদের আর একধারে ঘুরছিল দোয়েল। মিতুল এসে বলল চ এবার কার্নিশে বসি! মিতুলের কথায় আবার যেন কেঁপে উঠল দোয়েল।

মিতুল হাসছে।

তিন

রাঙাকাকার ভালো নাম অনিন্দ্যকিশোর। মানুষটা সত্যিটা অনিন্দ্যসুন্দর! যেমন লম্বা, তেমনই ফরসা। শান্ত সৌম্য চেহারা। একটু লম্বাটে মুখে টিকালো নাক, কোটরাগত দু চোখ, গালে হালকা দাড়ি। পাট করে লুঙ্গির মতো ধুতি পরা, গায়ে গেরুয়া ফতুয়া। হাতে একটা অদ্ভুত আঁকা বাঁকা লাঠি। লাঠিটা সব সময় তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাখেন।

কেউ ভালো করে দেখেও ঠাহর করতে পারবে না মানুষটা ভেতরে ভেতরে এত কুটিল! এ-বাড়ির বিরাট একটা অংশ জুড়ে থাকেন। সেজ তরফের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ছোট তরফের অংশ। তবে অনিন্দ্যকিশোর বড় যত্নে রাখেন বাড়িটিকে। ওপর নীচে করে পর পর অনেকগুলো ঘর। ওঁর বড়ভাই আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। সবাই বলে, তিনি চলে গেছেন রাঙার জ্বালায়। রাঙা সারাদিন পুজোপাঠ হোম যজ্ঞ করেন। ভদ্রলোক নাকি গুণতুক তন্ত্রমন্ত্রও করেন। কালাজাদু, বশীকরণ বিদ্যা, প্রেতচর্চা করেন। বেশ কিছু শিষ্য-শিষ্যাও আছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসছে, যাচ্ছে। এদের অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে আসে। যারা আসে অনেক সময় তারা নিজেরাই রান্নাবান্না করে। ও বাড়িতে তাদের ভিড় লেগেই থাকে। কেউ কেউ এখানে থেকেও যায়।

এটুকু ইনফরমেশন যে কেউ এই এলাকায় এলে পাবে। সেই সঙ্গে এও জানতে পারবে, ওঁদের পারিবারিক সংঘাতের কথাও। দুই পরিবারের মধ্যে মকদ্দমা চলছে। আইন আদালতের খবরও কারও অজানা নয়।

সরসকালী ভদ্রের সঙ্গে ওঁদের বাড়ির পথে রওনা হওয়ার আগেই আমি খবরগুলো দিলাম। ওই এলাকায় আমার পুরনো অফিসের এক সহকর্মী অধীর গুছাইত থাকেন। তাঁর কথা অনুযায়ী লোকটার 'পাওয়ার' আছে।

সরসকালী ভদ্র আমার দিকে তাকালেন, বললেন, 'কী পাওয়ার!'

'অধীর আমাকে স্পেসিফিক কিছু বলেনি। কিন্তু...'

কিছু কথা বলেছে সেটা আমি সাহস করে সরসকালী ভদ্রকে বলতে পারলাম না। অবিশ্বাস্য কিছু খোশগল্প। আপাতত সে সব কথা আমাকে ঢোঁক গিলে হজম করতে হল। আমি জানি উনি শোনা কথা শুনতে চান, কিন্তু সেটা সেটুকুই। তার বেশি নয়। এখন থাক সেসব কথা।

তবে একটা কথা আমি না-বলে থাকতে পারলাম না। এই ইনফরমেশনটা মনে হয় জরুরি। আমি শুনিয়ে রাখলাম মঞ্জুশ্রী দেবী, মানে দিদির কথা শুনেই মুকুলকিশোরবাবু চলেন। এটা ওঁর স্ত্রী পছন্দ করেন না। এ কারণেই ওঁদের স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কটা মসৃণ নয়। হয়তো সেটাই সাফার করছে দোয়েল।

একথাটা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল গাঙ্গুলিবাড়িতে গিয়ে। প্রাথমিকভাবে মুকুলকিশোরবাবুর স্ত্রী তৃষ্ণা আমাদের সামনে এলেন না। মুকুলবাবু বললেন, ওঁর শরীরটা একটু খারাপ।

আমরা এসেছিলাম দোয়েলের সঙ্গে কথা বলব বলে। শুনেছিলাম ওর শরীর খারাপ। কী খারাপ, কতটা খারাপ সরসকালী জানেন না। কিন্তু পারিবারিক টানাপোড়েন যদি একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দেওয়ার দিকে এগিয়ে দেয় তখন চুপ করে বসে থাকা যায় না।

এ বাড়িটি বিশাল বড়। চৌহদ্দি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। লোহার গেট পার হলেই সামনে খোলা মাঠের মতো উঠোন। তারপর বাড়ি। লম্বা একটানা। দোতলা। লালচে মেটে রং করা। দোতলার ওপর দিকে সাদা বর্ডার। বাড়িটির মাথার ওপর ঠিক মাঝখানে একটা ত্রিশূল। হতে পারে বজ্রনিরোধক বা দৈবিক কিছু।

আমরা এলাম ডানদিকের অংশে। বাঁদিকে অনিন্দ্যকিশোরের অংশ। ডানদিকে এলেও আমার চোখ বাঁদিকে সেঁটে ছিল। যেন অজানা জগৎ। কিন্তু সরসকালী বাঁদিকে তাকালেনই না। তাঁর সব মগ্নতা ডানদিকে। মুকুলবাবুর বাড়ির অন্দরে। আমাদের আসা নিয়ে এ বাড়িতে বিরাট আয়োজন। সে এক হইহই কাণ্ড যেন। খাওয়াদাওয়ার আয়োজন এলাহি। তবে মুকুলবাবুর স্ত্রী তৃষ্ণা একবার এসে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে চলে গেলেন। তাঁর শরীরটা ঠিক নেই।

কিন্তু খাতির যত্নে আমাদের মন নেই। মুকুলবাবু আর মঞ্জুশ্রী দেবী আমাদের এই আসাটা ভীষণভাবে গুরুত্ব দিয়ে বুঝে ওঠার চেষ্টা করছেন, কীভাবে আমাদের সাহায্য করবেন। সরসকালী সোজাসাপটা বললেন, আমরা সারা বাড়িটা ঘুরতে চাই। অবশ্যই ঠাকুরঘর।

এ বাড়িতে ঢুকেই আমরা দোতলায় এসেছিলাম। তাই দোতলা থেকে শুরু হল আমাদের বাড়িঘর দেখার পর্ব। ওপরে বিশাল ড্রয়িংরুম। তার পাশেই আরেকটি ঘরে ডাইনিং। সেখানেই লাগোয়া কিচেন। ওপরে আরও চারটে বেডরুম। তিনটি বেডরুমের সঙ্গেই বারান্দা। একটা ঘরে তৃষ্ণাদেবী আছেন। সে ঘরে আর ঢোকা হল না। বাড়ির মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি নেমেছে। বেশ বোঝা যায় সিঁড়িটা পরে করা হয়েছে। খুবই আধুনিক রেলিং দেওয়া। পেতল আর কাঠের কাজ চমৎকার।

ওপরদিকটা দেখিয়ে মুকুলকিশোর যখনই বসতে যাচ্ছিলেন তখনই সরসকালী বললেন একতলাটা যে দেখা হল না, নীচে যাব।

'নীচে আর কী দেখবেন? একটা গেস্ট রুম আছে। তরণীবাবু, উনি আমাদের বাড়ি দেখাশোনা করেন, ওনার একটা ঘর। আর আমাদের বাড়িতে থাকে সন্ধ্যা, শশীর একটা ঘর। অন্য দুটো ঘরে পুরনো আসবাব আছে। একটা ঘরে রান্নার ব্যবস্থা। তবে সেখানে রান্না হয় না। এমনি পড়ে আছে।'

সরসকালী বললেন, 'আমি একটু নিজের চোখে দেখতে চাই।'

'তাহলে চলুন।' নিমরাজি হয়েই মুকুলকিশোর নীচে চললেন। আমরা ওর পেছনে। খুব লজ্জিত ভঙ্গিতে তরণীবাবু। পারলে মাটিতে মিশে যান। তার ঘর যে বড়ই অগোছালো। তবে সন্ধ্যা বা শশীর ঘর বেশ পরিচ্ছন্ন। পরের দুটো ঘরে তালা দেওয়া। বাতিল আসবাব আছে। রান্নাঘরটা উঁকি দিয়ে আমরা দেখলাম সরু একটা বারান্দা চলে গেছে ওদিকে। ওদিকটা মঞ্জুশ্রীদেবীর অংশ। মঞ্জুশ্রী দেবী যেমন আজ আছেন তাই ওদিকের দরজা খোলা, নইলে বন্ধই থাকে। আর বাইরের দিকে, মানে এই অংশের মূল গেট দিয়ে ঢুকলেই সাজানো গোছানো ঘরটা গেস্ট রুম।

সব দেখে সরসকালী বললেন, 'তাহলে আপনাদের বাড়ির ঠাকুরঘর?'

রান্নাঘরের পাশে সরু করিডরের মুখোমুখি ঠাকুরঘর। বেশ বড়। ঘরের সিলিংটা বেশ উঁচু। সেখান থেকে দড়িতে ঝুলছে লালচে একটা বাল্ব। আলো জ্বেলে দিয়েই তরণীবাবু আর একদিকের দরজার ছিটকিনি খুলে দিলেন। কিন্তু দরজা খুলল না। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। উনি চকিতে বাইরের দিকে চলে গিয়ে ঠাকুরঘরের দরজা খুলে দিলেন। এবার ঘর ভরে শেষ বিকেলের আলো এসে পড়ল। দেখলাম, ঠাকুরঘরে অনেক ঠাকুর। সাজানো গোছানো পরিপাটি করা। বাঁদিকে একটা বেদি, বেদির সামনে বসার জায়গা। সেখানে আসন পাতা। আসনের পাশেই একটা চিমটে গাঁথা। আমি বললাম, 'এই তাহলে পঞ্চমুণ্ডির আসন!'

মুকুলকিশোর হাত তুলে প্রণাম করলেন।

সরসকালী ঠাকুরঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। যে প্রশস্ত উঠোনটা পেরিয়ে আমরা এই বাড়িতে এসেছিলাম, এটা সেই উঠোন। ঠাকুরঘরের উলটোদিকে এই বাড়ির দারোয়ান বুধনের ঘর। তার পাশে আপাতত আমাদের গাড়িটা রাখা। বুধনের ঘর ফেলে চলে গেলে পর পর দুটো গাড়ি দাঁড় করানো, হয়তো একটা মঞ্জুশ্রীদেবীর, অন্যটা মুকুলকিশোরের।

সরসকালী বললেন, 'নিন তরণীবাবু দরজায় তালা মেরে দিন।'

তরণীবাবু বললেন, 'আপনি যে বাইরে চলে গেলেন।'

'আমি আবার ওদিকের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকছি।'

আমি মুকুলকিশোরবাবু বাড়ির ভেতর দিকে চলে গেলাম। ঠাকুরঘর আবার তালা বন্ধ হয়ে গেল। সরসকালী এলেন ওইদিকের দরজা ঘুরে।

সব দেখার পালা শেষ করে ফিরে এসে দোতলায় উঠে সরসকালী সরাসরি বললেন, 'আচ্ছা আমরা কি দোয়েলের সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলতে পারি?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।'

সরসকালী দোয়েলকে বললেন, 'চলো আমরা তাহলে ছাদে গিয়ে কথা বলি।'

মুকুলবাবু বললেন, 'ছাদে সে অর্থে বসার কোনও ব্যবস্থা নেই। আমরা ঘরের বাইরে যাচ্ছি, আপনারা এখানেই কথা বলুন।'

সরসকালী বললেন, 'আরে তেমন কিছু জরুরি বা গোপন কথা নয়, আমরা ছাদে যেতে চাই। ঘুরতে ঘুরতে কথা বলব।'

ছাদে উঠে সরসকালী প্রথম যে প্রশ্নটি দোয়েলকে করলেন, তাহল, 'শেষ কবে ছাদে উঠেছিলে?'

'ছাদে!' ঢোঁক গিলল দোয়েল। বলল, 'দিন চারেক আগে, মিতুল এসেছিল, সেদিন।'

'মিতুল তো তোমাদের এই বাড়ির মঞ্জুশ্রী দেবীর অংশে ভাড়া থাকে। রোজ আসে?'

'হ্যাঁ।'

'ওর দিদি তুতুল আসে?'

'না।'

'কেন?'

'তুতুল আমাকে ঠিক পছন্দ করে না।'

'কেন?'

'বলতে পারব না।'

'আগে কথা বলত?'

'হ্যাঁ, ওরা বছর দুয়েক হল এসেছে, তখন দুজনেই আমার বন্ধু ছিল, তুতুলের সঙ্গেই আমার বেশি ভাব ছিল। কিন্তু ইদানীং ও আমাকে এড়িয়ে চলে।'

সরসকালী বললেন, 'কলেজে এত অ্যাবসেন্ট হচ্ছ কেন?'

'শরীরটা বড্ড খারাপ। বাইরে বেরিয়ে কেমন যেন লাগে।'

'কাকে ভয় পাও?'

'ভয়!'

'হ্যাঁ, ভয়। তোমার বাবার রাঙাকাকাকে?'

দোয়েল চুপ করে থাকে। 'রাঙাদাদু ওদিকে থাকেন, আমি বিজয়াদশমী বা নববর্ষের দিন প্রণাম করতে যাই। আমাকে কিছু বলেন না। আশীর্বাদ করেন। এছাড়াও কখনো দেখা হলে উনি আমার সঙ্গে কথা বলেন। আমার কিন্তু খারাপ লাগে না।'

'তাহলে কার খারাপ লাগে?'

'মানুষটা শুনেছি খারাপ। সবাই বলে।'

'তোমার বাবা আর পিসি বলছিলেন, উনি তোমাকে কিছু করেছেন, গুণতুক, তাই তোমার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে, একথা আমি বিশ্বাস করি না। তুমি কি করো?'

'না। কিন্তু বাড়ির সবাই বলে। রাঙাদাদুর জন্য আমার শরীর খারাপ হচ্ছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না।'

'তোমার মায়েরও কি এমন কোনও কারণে শরীর খারাপ?'

'মায়ের শরীর খারাপ? কই না তো। আজ মায়ের ছুটি, বাড়িতেই আছে। সকালবেলা গোপাআন্টিদের বাড়ি গিয়েছিল। আমাকে যেতে বলেছিল, আপনারা আসবেন বলে ঠাকুমা যেতে দিল না।'

'তোমার মা কখন ফিরেছেন?'

'মা তো সকাল দশটা নাগাদ গিয়েছিল, একটার মধ্যেই ফিরে এসেছে। শরীর খারাপের কোনও কথা তো শুনিনি।'

'তোমার মা তো ব্যাঙ্কে আছেন?'

'হ্যাঁ, স্টেট ব্যাঙ্ক, উলটোডাঙা ব্রাঞ্চ।'

'দোয়েল তুমি কীসের ভয় পাও? পরিষ্কার করে যদি আমাদের বলো, একটু সুবিধে হয়। তোমাকে নিয়ে তোমার বাবা মা পিসিমা খুব চিন্তায় আছেন। তুমি জানো তোমাদের এই বাড়ি নিয়ে আদালতে কেস চলছে। এটা ওনাদের কাছে একটা মানসিক চাপ, তার ওপর তোমার এই শরীরখারাপ, ভয় পাওয়া, তুমি যদি কারণটা একটু হলেও বলতে আমাদের সুবিধে হত।'

দোয়েল খুব শান্ত গলায় বলল, 'আপনারা কি সাইকোলজিস্ট?'

সরসকালী খুব শান্ত গলায় বললেন, 'আমি সাইকোলজিস্ট নই, আমি সাইকিয়াট্রিস্ট। তবে আমি একজন ডাক্তার হিসেবে বা তোমার চিকিৎসক হিসেবে এই বাড়িতে আসিনি। তোমার বাবার যিনি আইনি পরামর্শদাতা দীনেন লাহিড়ী তিনি আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। আমার আসার বিষয়টা ভিন্ন। আমি খুঁজতে চাই, তোমার শরীর খারাপ রাঙাকাকার জন্য, না অন্য কারণে? তোমার বাবা মা পিসি তোমার রাঙাদাদুকে ভয় পান, ওঁরা মনে করেন, ওনার কোনও পাওয়ার আছে। আমরা দেখতে চাই সত্যিই কি ওনার কোনও পাওয়ার আছে, থাকলে কোন পাওয়ার আছে? আর কিছু নয়। এটুকু জানতে পারলে, আমরা তোমার বাবা বা পিসিকে তাদের রাঙাকাকা সম্পর্কে ভয়টা কাটাতে পারতাম। আর কিছু নয়।'

দোয়েল আমার দিকে তাকায়, সরসকালী বলেন, 'উনি আমার বন্ধু, একজন সরকারি কর্মী। একসঙ্গেই কাজ করি। আবারও বলি, আমি এখানে সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে আসিনি। এসেছি প্যারানর্মাল কোনও ব্যাপার সত্যি আছে কি না তার খোঁজে।'

দোয়েল অস্ফুটে বলল, 'রাঙাদাদু ভালো না খারাপ আমি জানি না। রাঙাদাদুকে নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে। আমি বা মা তাদের কথা বিশ্বাস করি না। কিন্তু।' দোয়েল থামে। ওর দু-ঠোঁট কাঁপে, 'আমার খুব ভয় লাগে। উনি অদ্ভুতভাবে কথা বলেন। আপনারা ওনার সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারবেন।'

'তোমাকে উনি কোনওদিন কিছু বলেছেন?'

দোয়েল কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

'কী বলেছেন?'

দোয়েলের মুখ দিয়ে কোনও কথা সরে না। 'কী বলেছেন তোমার রাঙাদাদু?'

'খারাপ কিছু বলেননি।'

'তাহলে বলছ না কেন? কেন ভয় পাচ্ছ?'

'উনি আমাকে বলেছেন সকালে ঘুম থেকে উঠে তুই আমাকে স্মরণ করবি। রাতে শুতে যাওয়ার আগেও স্মরণ করবি। আমি তোকে রক্ষা করব। কেউ তোর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।'

'মানে, তোমার কথা ঠিক বুঝলাম না দোয়েল।'

'এটুকুই, আর কিছু না।' দোয়েল বলল, 'আমার শরীরটা কেমন খারাপ লাগছে। আপনারা কি রাঙাদাদুর সঙ্গে কথা বলবেন? ও-বাড়ি যেতে পারেন, নিজের চোখে দেখে আসবেন। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন। উনি সবার সঙ্গে কথা বলেন।'

সরসকালী দোয়েলের মাথায় হাত রাখলেন, 'তুমি বলেছ, আমরা নিশ্চয়ই যাব। দেখা করে আসব তোমার রাঙাদাদুর সঙ্গে। তবে সেটা অন্যদিন। আমি তোমাকে আমার এই কার্ডটা দিলাম। এখানে আমার ফোন নম্বর, ঠিকানা সব লেখা আছে। যদি কোনও সময় দরকার পড়ে, তুমি নির্দ্বিধায় আমাকে জানাবে। তবে, আমার মনে হয়, আমাকে তোমার প্রয়োজন পড়বে না। তুমি নিজেকে নিজেই সামলে নিতে পারবে।'

আমি এতক্ষণ চুপ করে ছিলাম। এবার একটু কথা বলা দরকার মনে হল, বললাম, 'তুমি নিজেই পারবে। প্রয়োজনে মায়ের সঙ্গে সব কথা খুলে বলো। কোনও বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করো। পারিবারিক টানাপোড়েনের মধ্যে ঢুকো না। ওদের জায়গা জমি, মামলা মকদ্দমা, ওদের বুঝতে দাও। তুমি ওসব দিকে ফিরেও তাকাবে না। দেখবে তুমি আবার আগের মতো হয়ে যাবে।'

দোয়েল ঘাড় নাড়ল। ওর চোখের আলো বড্ড ক্ষীণ। মন বলছে, ও পারবে না। তবু, চেষ্টা ওকেই করতে হবে।

বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে সরসকালী বললেন, 'দোয়েল কি সব কথা বলল? এটুকুই কি কথা?'

'না।' সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলাম আমি।

'তবে? সব কথা জানব কী করে?'

'মা আর বন্ধু।' আমি বললাম।

'মা বুঝলাম, বন্ধু মানে মিতুল। শুধু মা আর বন্ধু কেন? ঘোড়ার মুখ থেকে খবর নিলে হয় না?' সরসকালী ঝটিতি জবাব দিলেন।

'এখানে ঘোড়া কে?'

শান্ত গলায় সরসকালী বললেন, 'কেন? রাঙাদাদু, অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়!'

'আমাদের যদি আজ দেখে থাকেন, তবে?'

'দেখে থাকলে দেখে থাকবেন। কী করবেন, চিৎকার চেঁচামেচি, কামড়ে তো দেবেন না। ভয় পাচ্ছেন নাকি?'

'না, রিস্ক তো নিতেই হবে।'

'রিস্ক!' সরসকালী হাসলেন, 'সামনাসামনি কথা বলার কার্ড কিন্তু ওনার হাতে।'

'মানে?'

'উনি দোয়েলকে বলেছেন ওনাকে সকালে রাতে স্মরণ করতে। দোয়েলকে ভালো করার জন্য আমরা যদি ওনার শরণ নিই?'

আমি সরসকালীর কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু আমি জানি সরসকালী ভদ্র এখন রাস্তা খুঁজছেন সদর দরজা না হলে খিড়কি, তাও না পেলে উনি জানালা দিয়ে গলে ঢুকবেন। আমিও মন স্থির করি এবার রাঙাকাকা! রাঙাদাদু!

দোয়েলের রাঙাদাদুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে, কোন পরিচয়ে যাব?

চার

বালিশে মুখ গুঁজে দোয়েল শুয়েছিল। অভি, অভিলাষের জন্য ওর খুব কষ্ট। বুকের ভেতর ভারী হয়ে থাকে। অভি ওর জন্য অনেক অপমান সয়েছে। এই বাড়িতে আর কোনওদিন অভি আসবে না। দোয়েল আর কোনওদিন ওর সঙ্গে দেখা করবে না। মুকুল স্পষ্ট গলায় বলে দিয়েছে, ওই ছেলেটাকে একদম এ বাড়িতে অ্যালাউ করবে না। ও তুতুল মিতুলদের ঘরে আসে তো আসুক। কিন্তু এদিকে যেন না দেখি।

দোয়েল বলতে চেয়েছিল, বাবা ও আমার ভালো বন্ধু।

কিন্তু বাবার সঙ্গে গলা মেলালেন ঠাকুমা। ওই ছেলেটা নিচু জাতের। না, না, তুমি ওকে নিয়ে ছাদে যেও না।

হোয়াট! নিচু জাত!

মুকুল গম্ভীর হয়ে বলেছিল, কাদের সঙ্গে যে মেশো! তোমার নজরটা বড় নীচের দিকে।

এতসব কথার পরেও জেদ ধরেছিল দোয়েল। বলুক ওরা। এবাড়িতে এলেও না আসুক তাদের ঘরে। কিন্তু অভিলাষকে সে আঁকড়ে থাকবে।

তাই তো সময় সুযোগ পেলেই সে অভিলাষকে ডাকত। কিন্তু এ কী হল? দোয়েল চায় না তার জন্য অভির ক্ষতি হোক। ও খুব গরিব ঘরের ছেলে। অভির বাবা মা বোন ওর মুখ চেয়ে আছে। অভির কেরিয়ার যদি তার জন্য খারাপ হয়, দোয়েল নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না।

দোয়েল কাঁদছিল বালিশে মুখ চেপে। কেউ যেন শুনতে না পায়। তবু মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল অভি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সে জানে তার মাথায় আর কোনওদিন অভি হাত রাখবে না। তাকে স্পর্শ করবে না। সে অভিশপ্ত। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল দোয়েল।

ঘুম ভাঙল এক তীব্র টানে। সে দু চোখ বন্ধ করে বুঝতে পারছিল, কেউ তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তার হাতের মুঠোয় দোয়েলের চুলের গোছা! সে কেমন ভেসে ভেসে ওপরদিকে উঠে যাচ্ছে। কী নিঃসীম শূন্যতা! দোয়েল চিৎকার করার চেষ্টা করল অভি! অভি! কিন্তু তার গলায় যেন কার হাত। ঠান্ডা। তার শীত শীত করছে। একটা বাথটবের ভেতর সে শুয়ে আছে। চারদিকে রক্ত আর রক্ত! কাটা একটা হাত! গলা বুক শুকিয়ে তার ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু সে উঠতে পারল না। তখনই সারা ছাদ জুড়ে দাপাদাপি। কীসের শব্দ? মনে হচ্ছে কোনও আহত পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পায়ের নখ দিয়ে ছাদের মেঝে চিরে দেবে। সিমেন্ট ফাটিয়ে ঠোঁট ঠুকছে। ছাদ ফুঁড়ে সে দোয়েলের পাঁজরের হাড়ে যেন ঠোকর দিচ্ছে।

দোয়েলের ছটফটানি দেখে তৃষ্ণা উঠে পড়েছিল। 'কী রে দোয়েল তোর শরীর খারাপ লাগছে?'

'মা, ও কীসের আওয়াজ?'

ও-ঘর থেকে এসে মুকুলকিশোর এসে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত। ঘরে এসে দাঁড়িয়ে মাথার ওপর দিকে তাকাল। তার ভেতর ভেতর রাগ। এদিকে দোয়েলকে একটু সামলে সে বন্দুকটা নিয়ে ওপরে ছাদে যাবে। দেখে নেবে কী হচ্ছে, কে করছে?

তৃষ্ণা বলল, 'দোয়েলের শরীরটা মনে হয় খারাপ করছে, ওপরে ছাদে কী হচ্ছে?'

'মনে হচ্ছে ভামবিড়াল কোনও পাখি ধরেছে। ডিসগাস্টিং!' মুকুলকিশোর জবাব দিল। দোয়েল মাথার ওপর বালিশ চাপা দিয়ে ছটকাচ্ছে। মুকুলকিশোর ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বলল ছাদের আওয়াজ শুনে ভয় পাচ্ছিস? দূর দূর ভামবিড়ালের উৎপাত বেড়েছে। তুই যদি বলিস আমি এখুনি বন্দুক নিয়ে ছাদে উঠে ওটার উৎপাত বন্ধ করে দিয়ে আসতে পারি।'

কথাটা বলে মুকুলকিশোর বন্দুক রাখা আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। 'না, না, তুমি যাবে না।' দোয়েল আর্তনাদ করে উঠল। 'তুমি যাবে না। বন্দুক নিয়ে তুমি যাবে না।'

মুকুলকিশোর বলল, 'তাহলে তুই একটু স্বাভাবিক হ। এত ভয় কীসের? আমি তো আছি।'

মুকুলকিশোরের বলা কথা আমি তো আছি শুনে খুব ঠান্ডা চোখে তৃষ্ণা ওর দিকে তাকাল।

'দাঁড়া, আমি মিউজিক চালিয়ে দিচ্ছি।' মুকুলকিশোর হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া চালিয়ে দিল। কিন্তু বাঁশির আওয়াজ ডিঙিয়ে আধিভৌতিক সেই আওয়াজ সারা ছাদ জুড়ে! উঃ কী ভয়ানক! বাঁশি শুনে সে আওয়াজ যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠছে। আর সেই আওয়াজে এত বড় একটা মেয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।

জ্বর এসে গেল দোয়েলের।

আওয়াজ যখন থামল, তখন অদ্ভুত নীরবতা। যেন চারদিক শ্মশান! শ্মশানের ভেতর সবাই জেগে আছে।

ভোর হতেই ছাদে গিয়েছিল মুকুলকিশোর। কিন্তু অন্যবারের মতো এবারও ছাদে কিছু নেই। কিচ্ছু নেই। যেন কাল রাতে কিছু হয়ইনি।

সকালে তৃষ্ণা জানিয়ে দিল এভাবে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমরা নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে চলে যাব।

নিউটাউনে তৃষ্ণার একটা ফ্ল্যাট আছে। বেলায় মুকুলকিশোর ফোন করেছিল সরসকালী ভদ্রকে। 'আমাদের বাঁচান!'

সরসকালী বললেন, 'শক্ত হোন, দু-একদিনের মধ্যে আমি যাব।'

কিন্তু আমরা যাওয়ার আগেই পরের দিন দৌড়ে এলেন মুকুলকিশোর আর মঞ্জুশ্রী দেবী।

পাঁচ

কিন্তু আমাদের যাওয়ার আগেই সরসকালী ভদ্রের চেম্বারে হাজির হলেন মুকুলকিশোরবাবু ও মঞ্জুশ্রী দেবী। আসার ঘন্টাখানেক আগে ওঁরা ফোন করেছিলেন। ওঁদের আসার খবর পেয়ে সরসকালীও আমাকে ফোন করলেন। একটা হাফ সি-এল নিয়ে বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে। প্রায় আমার একটু পরে পরে এসে ঢুকলেন ভাই আর বোন। দু-জনেই খুব ভয়ার্ত। চোখে মুখে বিমর্ষভাব।

ওদের মুখ থেকে যা শুনলাম। তা মুকুলকিশোরের ভাষ্যেই পেশ করলাম—

কাল রাতে আমাদের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল সাড়ে দশটার মধ্যে। দোয়েল, তাতার আর আমার স্ত্রী ওরা ছিল ভেতরের ঘরে। মা শুয়ে পড়েছিলেন। আমাদের বাড়িতে আপনারা গেছেন। এদিকের অংশে আমরা একটা সিঁড়ি বানিয়ে নিয়েছি, ছাদে ওঠার জন্য। সেই সিঁড়ির নীচের দিকের গেট আমাদের সদর দরজার ভেতরে। দরজা বন্ধ হলে সিঁড়ি দিয়ে কেউ ওপরে যেতে পারবে না। আর ওপরে কোলাপসিবল এবং লোহার দরজা আছে। ভেতর দিকে দুটো তালা মারা থাকে। বাইরে ডানদিকে চলে গেলে দিদির অংশ। সেখানে একটি পরিবার থাকে। আর কিছুটা বন্ধ। দিদিরা এলে ওখানেই ওঠে। আমাদের একতলার দিকটা বন্ধই পড়ে আছে। দিদির একতলায় ভাড়াটে। দোতলা বন্ধ। ওদিকেই গ্যারাজ, দারোয়ানের ঘর। আমাদের দারোয়ান বুধন দীর্ঘদিন এ বাড়িতে আছে। বয়সও হয়েছে। সে সন্ধে হলেই শুয়ে পড়ে। ঘটনাটি ঘটল মাঝরাতে। সারা ছাদ জুড়ে দাপাদাপি। মনে হচ্ছে কোনও আহত পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পায়ের নখ দিয়ে ছাদের মেঝে যেন চিরে দেবে। এমনভাবে সে আঁচড়াচ্ছে। খট খট করে ঠোঁট ঠুকছে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে, সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল ছাদে উঠে পাখিটাকে গুলি করে মারি।

(আমি সাধারণত, সরসকালী ভদ্রের কোনও ক্লায়েন্টের সঙ্গে কোনও কথা বলি না। আমার কাজ শুনে যাওয়া। খুব প্রয়োজনে সরসকালীর চোখে চোখ রাখা। সেটা কোনও পয়েন্টে হাইলাইটস করার জন্য। কিন্তু ঘটনার তীব্র অভিঘাতে শর্ত ভেঙে আমি জিগ্যেস করে ফেললাম গুলি! আপনার কাছে কি বন্দুক আছে?

উত্তর: হ্যাঁ। দীর্ঘদিনের। ঠাকুরদার সময় থেকে। এখনও লাইসেন্সটা আমিই রিনিউ করে যাই। আপাতত সেটা আমার নামে।)

আবার মুকুলকিশোরের ভাষ্যে ফিরে আসা যাক—

বিশ্বাস করুন, আমি আলমারি খুলে যখন বন্দুকটা বের করছি তখন আমার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল তৃষ্ণা। বলল, দোয়েলের শরীরটা মনে হয় খারাপ করছে। ওপরে ছাদে কী হচ্ছে? ভামবিড়াল কি কোনও পাখি ধরেছে? আমাদের ঘরে এসো। ওদের ঘরে গিয়ে দেখলাম, দোয়েল মাথার ওপর বালিশ চাপা দিয়ে। আমি গিয়ে ওর পাশে বসলাম। জিজ্ঞাসা করলাম কী রে তোর কী সমস্যা হচ্ছে? ওর চোখ মুখে যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে। বলল, আর পারছি না। আমি বললাম, ছাদের আওয়াজ শুনে ভয় পাচ্ছিস? দূর দূর ভামবিড়ালের উৎপাত বেড়েছে। তুই যদি বলিস আমি এখুনি বন্দুক নিয়ে ছাদে উঠে ওটার উৎপাত বন্ধ করে দিয়ে আসতে পারি। কিন্তু দোয়েল আমার হাত চেপে ধরল। না, না, আর্তনাদ করে উঠল। তুমি যাবে না। বন্দুক নিয়ে তুমি যাবে না। আমি বললাম, দাঁড়া আমি মিউজিক চালিয়ে দিচ্ছি। আমি হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া চলিয়ে দিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন অমন বাঁশির আওয়াজ ডিঙিয়ে আধিভৌতিক নানা আওয়াজ সারা ছাদ জুড়ে। উঃ কী ভয়ানক! আপনি নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। কত রাত্রি পর্যন্ত সে! তার আগেই আমি মিউজিক সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কেননা বাঁশির আওয়াজ শুনে আওয়াজটা যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিল। জ্বর এসে গেল মেয়েটার। এত বড় একটা মেয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। তৃষ্ণা রাতেই জানিয়ে দিল এভাবে এখানে থাকা সম্ভব নয়। আমরা কালই নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে চলে যাব। নিউটাউনে তৃষ্ণার একটা ফ্ল্যাট আছে। আওয়াজটা যখন থামল, তখন এমন নীরবতা যেন চারদিক শ্মশান! শ্মশানের ভেতর আমরা জেগে আছি। এক অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিয়ে সারাটা রাত কাটালাম। ভোর হতেই ছাদে গিয়েছিলাম। রাতের ঘটনার একটা জুৎসই জবাব পেতে। কিন্তু অন্যবারের মতো এবারও ছাদে কিছু নেই। কিচ্ছু নেই। আগেও অনেকদিন ছাদে রাতে নানা ধরনের আওয়াজ পেতাম, কিন্তু সকালে তার কোনও চিহ্ন থাকত না। কিন্তু এবার বিষয়টা এখানেই শেষ নয়। এখানে শেষ হলে তো একরকম হত।

মুকুলকিশোর থামলেন। তারপর শুরু করলেন দ্বিতীয় পর্ব।

সকালে তুতুলের মা এসে এক আজব খবর দিল। আমাদের নীচের তলার ঠাকুর ঘরের বাইরের দিকের একটা দরজা আছে। সেটা তালা মারা। বন্ধই থাকে। সেই বন্ধ দরজার সামনে পায়ের ছাপ। আলতা বা রক্তমাখা পায়ের ছাপ যেমন হয়। বিশ্বাস করুন পায়ের ছাপগুলো দেখে যে কোনও মানুষের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যাবে। একদম জীবন্ত! যেন ভোরবেলা দু-পায়ে রক্ত মেখে কেউ এসে ওই দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল।

আমি সেই পায়ের ছাপ দেখেই প্রথমেই দিদিকে ফোন করি। দিদি আধঘন্টার মধ্যে চলে আসে। দিদি আসার সময় বীরেশ্বরবাবুকে তুলে এনেছিলেন। বীরেশ্বরবাবু আমাদের বাড়িতে গীতাপাঠ চণ্ডীপাঠ করেন, সেইসঙ্গে তন্ত্রমন্ত্র তান্ত্রিক ব্যাপারস্যাপারগুলোও উনি চর্চা করেন। বেশ জানেন টানেন। উনি এসেছিলেন, উনি এসে পায়ের ছাপগুলো বেশ ভালো করে দেখে আঁতকে উঠলেন। ব্যাপারটা ওনার কাছে মোটেই ভালো ইঙ্গিত দেয়নি। উনি পায়ের দাগগুলোর ওপর গোবরজল ঢেলে দেন। তারপর পায়ের দাগগুলো ঝাঁটা দিয়ে ঘষে ঘষে তোলেন।

মুকুলকিশোরকে থামিয়ে সরসকালীর মুখ থেকে 'ওফ' হতাশাজনক একটা আওয়াজ ছিটকে বেরিয়ে এল।

সরসকালী বিস্মিত গলায় বললেন, 'পায়ের দাগটা আপনারা তুলে ফেললেন! এমন একটা জিনিস হাতের সামনে পেয়েও হারিয়ে গেল! যা, খুব ভুল হল বুঝলেন। বীরেশ্বরবাবু কী বললেন, মনুষ্য নয় এমন কারও পায়ের দাগ! ভূত হোক, প্রেত হোক, অপদেবতা হোক তেনাদের পায়ের দাগ মুছে ফেললেন। ওফ! দাগটা দেখে ওদের পায়ের সাইজটা আমি জানতে পারতাম।'

'দেখুন আমরা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এখনও সেই দাগের কথাটা মনে পড়লে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। দেখে মনে হবে ঠিক যেন কেউ আলতা পরে এসে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। গোবরজল দিতে রক্তধোয়া জলের মতো লালচে! বিশ্বাস করুন কী করব, আমি ভেবে পাচ্ছি না। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছি। তাতার-দোয়েলকে নিয়ে তৃষ্ণা চলে যাবে বলে মনস্থির করে ফেলেছে।'

'এই বললেন রক্তমাখা পায়ের দাগ, এখন আবার বলছেন আলতা পরা। তা পায়ের দাগগুলোর সাইজ কেমন হবে?'

'সাইজ!' ঢোঁক গিললেন মুকুলকিশোরবাবু।

মঞ্জুশ্রী দেবী বললেন, 'প্রমাণ সাইজ। পূর্ণাঙ্গ একটা মানুষের পায়ের ছাপ যত বড় হয়।'

'তবু চোখে দেখে কী মনে হল? ছোট, না বড়? আন্দাজ করুন।'

'একটু ছোট মতো।' মঞ্জুশ্রী দেবী দু-চোখ বন্ধ করে স্মরণ করলেন। 'যেন কোনও মেয়ের পায়ের দাগ।'

'দাগটা থাকলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত। ভবিষ্যতে এমন কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন। আর একটা কথা, আপনাদের নীচের তলাটা তো ফাঁকাই বললেন। তা আমাকে ভাড়া দেবেন নাকি? দু-চারদিন, বড়জোর সপ্তাহখানেকের জন্য। যা ভাড়া চাইবেন দেব।'

'মোস্ট ওয়েলকাম! নীচের তলার ঘরদোর গোছানো। সবকিছুই পরিপাটি করে রাখা। ওটা আমাদের গেস্টরুম। কবে থেকে আসবেন বলুন? আপনি ইচ্ছে করলে আজই যেতে পারেন।'

সরসকালী হাসলেন, 'আজ নয়, কাল যাব। তবে আপনি একটা কাজ করবেন, এখন বাড়ি ফিরে আপনার কাজের লোক, দারোয়ান, বাড়িতে যাঁরা যাঁরা আছেন সবাইকে বলে দিন কাল থেকে নীচের ঘরে আপনি পেয়িং গেস্ট রাখছেন। পারলে আপনার রাঙাকাকার কানেও খবরটা দেবেন। যেভাবেই হোক। আমরা চাই আমাদের যাওয়ার আর থাকার খবরটা সবাই জানুক।'

মঞ্জুশ্রী দেবী বিড়বিড় করলেন, 'আমি তো ভাবলাম, আপনারা গোপনে গিয়ে থাকবেন।'

'না, না, কোনও গোপন নয়, একদম ওপেন।'

'তাহলে যে রাঙা সতর্ক হয়ে যাবে।'

'হোক সতর্ক। সবাই জানুক, আমরা যাচ্ছি, পারলে কেন যাচ্ছি, কী জন্য যাচ্ছি তাও একটু বলে দেবেন।'

মুকুলকিশোর বিব্রত গলায় বললেন, 'ঠিক কী বলব বলুন তো?'

নির্লিপ্ত সরসকালী জবাব দিলেন, 'আপাতত পেয়িং গেস্টই বলুন। চিন্তা করবেন না, ভূতেরাও আমাদের খুঁজে নেবে। তাদেরও তো জ্ঞান বুদ্ধি আছে, না কি?'

ছয়

সরসকালী ভদ্র একা মানুষ। পেশাও স্বাধীন। উনি হুট বললেই বেরিয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু আমার তা হয় না। অন্তত বাড়িতে স্ত্রীকে জানাতে হবে। সেখানে একটু গুছিয়ে দিয়ে আসতে হবে। সংসারী মানুষের যা হয় আর কি! অফিসেও ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে। বললাম, 'কদিন ছুটি নেব?'

সরসকালী বললেন, 'আপনি ছুটি নিয়ে আমার সঙ্গে যাবেন নাকি? আমরা তো পেয়িং গেস্ট। অফিস টফিস করে পাঁচটা নাগাদ আপনাকে তুলে নেব। দু-চারদিন বেড়াতে যাওয়ার মতো ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নিয়ে যাবেন। শুনুন, একটা কথা বলি, জিনিস অল্প হোক, ব্যাগ কিন্তু বড় হবে। যাতে কারও মনে সন্দেহ না হয়। সবাই আমাদের ব্যাগ দেখেই বুঝবে এরা থাকতেই এসেছে, সহজে যাবে না। আপনার অফিস থেকে গাঙ্গুলিবাড়ি যেতে মেরে কেটে ঘণ্টাখানেক। সন্ধে সন্ধে আমরা ওখানে ঢুকে পড়ব। যেমন সবাই অফিস থেকে ফেরে। আপনি শুধু বাড়িতে বলে দেবেন কদিন আমরা অন্য জায়গায় রাত কাটাব। সেখান থেকেই অফিস যাওয়া আসা করবেন।'

সেভাবেই চলছে। সরসকালী ভদ্র বিশাল বড় বড় দুটো ব্যাগ নিয়েছেন। তাতে ঠাসা জিনিস। আমার একটা বড়, একটা মাঝারি। ওখানে পৌঁছে দুজনে হইহই করে চারটে ব্যাগ নামালাম। কাল অফিস করে সন্ধেবেলা এখানে এসেছি। সন্ধেবেলা চা জলখাবার থেকে রাতের খাবার সবই মুকুলবাবুর দোতলা থেকে আসছে। রাতে শোয়ার সময় বললাম, 'এখানে কদিন নিশিযাপন করতে হবে?'

'তেরাত্তির।' খুব নিশ্চিন্তে জবাব দিল সরসকালী।

'তেরাত্তিরের মধ্যে মিটে যাবে!'

'নার্ভের খেলা! আমাদের নিয়ে কারও যদি অসুবিধে হয়, সে আমাদের তাড়াতে চাইবে। তাই তিনদিন সময় নিলাম। কারণ সে প্রথম রাতেই বেড়াল মারতে চাইবে।'

'আজই?'

'হ্যাঁ, আজই। কাল থেকে শুনেছে পেয়িংগেস্ট ঢুকছে নীচের তলায়। সে প্রায় চব্বিশঘণ্টা সময় পেয়েছে তৈরি হওয়ার!'

'তাহলে আজ আমাদের বিনিদ্র রাত্রি!'

'একদম নয়, আরে মশাই চোর ডাকাত নয়, যে সারারাত রিভলভার আঁকড়ে বসে থাকবেন। বিষয়টা তো ভূত প্রেত তন্ত্রমন্ত্র অপদেবতা, ভয় দেখাবে। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। ঘুমিয়ে পড়লে ভয় কাছে ঘেঁষে না।'

কিন্তু সরসকালীর কথা মিলল মধ্যরাতে। আবার মিললও না। প্রথমত বলেছিলেন, আজ প্রথম রাতেই কিছু একটা হবে। সেটা মিলে গেল। কিন্তু দ্বিতীয়টা বলেছিলেন, ঘুমিয়ে পড়লে ভয় থাকে না। কিন্তু ভয় পেলাম প্রচণ্ড। এক্ষেত্রে ঘুমিয়ে পড়ার জন্যই ভয়টা বেশি হল।

মধ্যরাতে এত পোড়া গন্ধ। আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বিছানায় উঠে বসতে গিয়ে দেখলাম সরসকালী উঠে ঘরের মেঝেতে সটান দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, 'খুব পোড়া গন্ধ! কোথাও কি আগুন লেগেছে?'

'কিছু একটা পুড়ছে। আমাদের ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত। চলুন বাইরে যাই।' সরসকালীর খুব সাবধানি গলা।

ততক্ষণে বাইরে পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি। কেউ যেন জোরে জোরে কথা বলছে। দরজা খুলে বাইরে আসতেই দেখলাম সিঁড়ির ওপর মুকুলবাবু, এক কাজের মহিলা ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে। মূল দরজায় তালা দেওয়া। আমাদের দেখেই মুকুলবাবু এগিয়ে এলেন। বললেন, 'আপনাদের ঘরে কিছু পুড়ছে না তো?'

'না, আমাদের ঘরে সব ঠিক আছে। আপনি বরং দরজার তালাটা খুলুন, বাইরেটা দেখি।'

মুকুলবাবু ইশারা করতে অধর এসে বাইরের দরজার তালা খুলল।

বাইরে বেরিয়ে দেখলাম কিচ্ছু নেই। কোথাও কোনও পোড়ানো বা আগুন ধরানোর চিহ্ন নেই। সত্যি বলতে কী বাইরে তেমন কোনও পোড়া গন্ধও নেই। অথচ বাড়ির ভেতর এত তীব্র পোড়া গন্ধ! আমরা পুরো বাড়ির চারপাশ ঘুরলাম। নাহ আমরা ছাদে গেলাম। ছাদেও কিছু নেই। খুব আশ্চর্য লাগছে। কিছু পুড়লে তার চিহ্ন থাকবে। এক ফোঁটা ছাই কোথাও না কোথাও থাকবে। শুধু বাড়ির ভেতর গন্ধটুকু আছে।

এই রাতেই মুকুলবাবুর স্ত্রী তৃষ্ণার মুখ দেখলাম থমথম করছে। পারলে তিনি আজই তাতার ও দোয়েলকে নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

সরসকালী খুব নিচু স্বরে বলল, 'দোয়েল ঠিক আছে?'

'হ্যাঁ, কিন্তু এভাবে ঠিক থাকতে পারবে না। মেয়েটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।' তৃষ্ণা বলল। ওর গলায় বেশ তাপ। বলল, 'আমার মনে হয়, একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এ আসা উচিত। উনি তো কিছুই চাইছেন না। ওঁনার একটাই কথা আমাকে ঠাকুরঘরে ঢুকতে দিতে হবে। আইন আদালত আমি মানি না। ওই আসনে বসার অধিকার আমার।'

'কোন আসনে?' সরসকালী বললেন।

'আপনাকে দিদি বলেননি আমাদের নীচের ঠাকুরঘরে পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে। উনি সেই পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসার অধিকার চান। ওনার এই চাওয়াটার মধ্যে আমি অন্যায্য কিছু দেখতে পাই না। উনি পুজোআচ্চা হোম যজ্ঞ করে জীবন কাটিয়ে দিলেন। সাধু সন্ন্যাসী মানুষ। বংশের পঞ্চমুণ্ডির আসনের ওপর হক ওনারই থাকার কথা।'

তৃষ্ণার কথায় চুপ করে ছিলেন মুকুলকিশোর। হয়তো ভেবেছিলেন চুপ করেই থাকবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারলেন না। ফোঁস করে উঠলেন, 'আহা আপত্তির কি আছে, উনি নিজের বাড়ির ভেতর একটা পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করে নিন, ঝামেলা মিটে যাবে। পরের জিনিস নিয়ে টানাটানি করছেন কেন?'

তৃষ্ণা বলল, 'দেখুন, উনি তো আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি। ঠাকুর নিয়ে ভাগাভাগিটা মনে হয় ঠিক নয়। আমি আমার মতামত জানিয়ে দিলাম। এর পরে যাদের জিনিস তারা বুঝবে। কিন্তু এর মাঝে পড়ে আমার মেয়েটার মানসিক যন্ত্রণা বাড়ছে। আমার মনে হয়, দোয়েলের মুখ চেয়ে বিষয়টার একটা নিষ্পত্তি করা উচিত। ওই আসন আমাদের কী কাজে লাগে।'

মুকুলকিশোর বললেন, 'ওই আসন নয়, ঠাকুরঘর। তারপর পুরো এই বাড়ি ওর দখলে যাবে। আমাদের উৎখাত করে দেবে।'

'এখনই তো উৎখাত হয়ে গেছি। আর কী করবেন!' তৃষ্ণা বলল। 'খাওয়া নেই, ঘুম নেই, শান্তি নেই। এই বাড়িতে আর থাকা যাচ্ছে না। আমার মনে হয়, আলোচনা করে বিষয়টা মেটানো উচিত।'

'না, কোনও আলোচনা নয়। এদিকে পা রাখলে আমি গুলি করে মারব।'

'আমিও সব সময় আলোচনার পক্ষে। আর সেটা আপনাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু মঞ্জুশ্রী দেবীও তো বলছিলেন ওনার অভিপ্রায় অন্য। হয়তো পুরো বাড়িটাই দখল করার।'

'উনি এ বাড়ি দখল করবেন? দিদিও আপনাকে এসব কথা বলেছেন? অথচ উনি আসনে বসার অধিকারের বিনিময়ে দোয়েলকে ওনার পুরো অংশ দিয়ে যেতে চান।'

'আগেভাগে লিখিত দেবেন, না, মুখে মুখে? মুখের কথায় কী দাম আছে?'

সরসকালীর কথায় হকচকিয়ে গেল তৃষ্ণা।

একরাশ অস্বস্তি নিয়ে আমরা বিছানায় এলাম। সরসকালী সারারাত কোনও কথা বললেন না। জানালা খুলে শুয়ে থাকলেন। ভাবছিলাম, সেদিন দোয়েল তো বলেনি ওর রাঙাদাদু ওকে সব সম্পত্তি দিয়ে দেবে বলেছে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়া একটা মেয়ের কাছে বিষয় সম্পত্তির মূল্য কতটুকু! তার কাছে কথাটা হয়তো গুরুত্বহীন।

সকালে ঘুম ভাঙল মন্ত্রোচ্চারণে। দেখলাম বিছানায় সরসকালী নেই। দরজা ভেজানো। আমার প্রথমেই যেটা মনে হল উনি নিশ্চয়ই ভোর হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। সাতসকালে উঠে গত রাতের পোড়া গন্ধের উৎস খুঁজতে বেরিয়েছেন। যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন!

বাইরে এসে সরসকালীর সঙ্গে দেখা হল। বললাম, 'আমাদের আজকের প্রোগ্রাম কী?'

'অ্যাজ ইউজুয়াল ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়ব। আপনার অফিস, আমার চেম্বার। সন্ধেবেলা এখানে ফিরব। সবাই যেমন নিজেদের ডেরায় ফেরে।'

আমাদের সামনের উঠোন দিয়ে একটা মেয়ে দৌড়ে গেল। সরসকালী বললেন, 'তেরো।'

বুঝলাম, মেয়েটি এই বাড়িটাকে তেরোবার প্রদক্ষিণ করল। বললাম, 'এ কে? তুতুল, না মিতুল?'

সরসকালী বললেন, 'এ তুতুল। মিতুল হলে একবার না একবার আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে হাসত। মিতুলের সঙ্গে দোয়েল বা এই পরিবারের ভাব আছে। তুতুলের সঙ্গে নেই।'

সতেরো পাক শেষ করে মেয়েটা স্কিপিং করতে শুরু করল। সরসকালী একটু এগিয়ে গেলেন মেয়েটার দিকে। বললেন, 'ক পাক দিলে কুড়ি?'

'না, সতেরো। অন্যদিন পঁচিশ দিই।'

'আজ তাহলে কম হল?'

'দেখলেন তো কাল মাঝরাতে কী কাণ্ড হল। ঘুম ভেঙে একটা যা তা ব্যাপার। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম, আগুন টাগুন লেগেছে। মাংস পোড়া গন্ধে ঘরে টিকতে পারছিলাম না। আপনারা তো বাইরে বেরিয়েছিলেন দেখলাম। বিশ্বাস করুন আর পারা যাচ্ছে না। বাবা মাকে কাল রাতেই বলেছি এ বাড়ির মায়া ত্যাগ করো। আমাদের ফ্ল্যাট আছে সল্টলেকে। শুধু বাবার কলেজের জন্য এদিকে থাকা। কিন্তু আর নয়। মা আজই মঞ্জুশ্রী পিসিকে জানিয়ে দেবে। প্রায়দিনই রাত্রিবেলা কিছু না কিছু ঘটছে। আর যা ঘটছে তার ব্যাখ্যা আমি পাচ্ছি না। সব অ্যাবনর্মাল ব্যাপার স্যাপার!'

সরসকালী অদ্ভুত মুখ করে বলল, 'কেমন, কেমন?'

'কদিন আগে ছাদের ওপর তাণ্ডব চলল। কারা যেন ছাদের ওপর তুমুল লড়াই করে গেল। সেই লড়াইয়ের আওয়াজ শুনলে রক্ত হিম হয়ে যাবে। সারারাত দম বন্ধ করে বিছানায় পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সকালে ছাদে গিয়ে রক্ত মাংস দাঁত নখ পালক ধড় মুন্ডু সব পাব। কিন্তু ছাদে গিয়ে দেখলাম শুনশান। একটা আঁচড়ের দাগ পর্যন্ত নেই। আবার একদিন সকালে উঠে দেখলাম, ওই বন্ধ দরজাটার বাইরে রক্তমাখা পায়ের দাগ। মঞ্জুশ্রী পিসি এসে গোবরজল দিয়ে ধোয়াল। কাল রাতে হল মাংস পোড়া গন্ধ! আর পারা যাচ্ছে না।'

'তুমি একা একা দৌড়ঝাঁপ করো? মিতুল করে না?'

'মিতুল! ও ন-টার আগে ঘুম থেকে ওঠে না।'

'আর দোয়েল?'

'দেখুন আমি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি। ন্যাকাপুশি আমার স্বভাব নয়।' তুতুলের মুখে তীব্র বিরক্তি। 'আপনারা তো দিন দশেক আগে এসেছিলেন। আপনি তো সাইকিয়াট্রিস্ট। সুপার ন্যাচারাল, প্যারানর্মাল, স্পিরিট, ব্ল্যাক ম্যাজিক, প্যারাসাইকোলজি নিয়ে কাজ করেন। তাই তো?'

'বাহ তুমি তো আমার সম্পর্কে আমার থেকে বেশি জানো।'

'এখানে পাগল ভালো করতে এসেছেন। কাল দেখলাম, আপনারাই নীচের তলার পেয়িং গেস্ট! এখানে আছেন যখন রাঙাদাদার সঙ্গে আলাপ করে নেবেন। উনি বলে দেবেন মানুষ কেন পাগল হয়!'

তুতুল চলে গেল।

আমি বললাম, 'পোড়া গন্ধ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কি মাংস পোড়া গন্ধ?'

সরসকালী হাসলেন, 'বেশ মেয়ে! সকালে উঠে দৌড়ঝাঁপ করছে।'

'আপনার খবরও রাখছে। বেশ মেয়ে!'

সাত

আমরা এখানে ফিরেছি ঠিক সাড়ে ছ-টা। আসতে আসতে আমি জিগ্যেস করলাম, 'আজ কী কিছু হবে?'

'আপনি কি ঘুমাতে চান? এমন ঘুমের আশা করলে, তাহলে এখানে আমাদের মাসখানেক থেকে যেতে হবে। অমাবস্যা পূর্ণিমায় ভূত প্রেতরা নাচনকোঁদন করবে। মাঝের দিনগুলোতে রেস্ট ডে। বলুন মাসের পর মাস থেকে যেতে পারবেন?'

'আপনি যে বললেন তেরাত্রি!'

সরসকালী হাসলেন, বললেন, 'আমি চাই সবাই হইহই করে নেমে পড়ুক। আমি বিনিদ্র রাত চাই। ভয়ার্ত রাত। ভূত প্রেত সব জেগে উঠুক। শবসাধনা জানেন, চিতায় শবের বুকের ওপর বসে তাকে জাগানো হয়। সে জেগে উঠলে তার মুখে ছোলা কড়াই দিতে হয়। আমি সেই শবসাধনা করছি। ওদের বুকের ওপর বসে জাগানোর চেষ্টা করছি। যা হবার তাড়াতাড়ি হয়ে যাক। যাকে বলে এসপার নয় ওসপার!'

আমি বললাম, 'গুন্ডা মস্তান হলে জানি আপনার কাছে রিভলভার আছে। অবশ্য ওই বাড়িতে একটা বন্দুকও আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার অস্ত্র কী?'

'আলো! মনের আলো।' সরসকালী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।

উঠোন পেরিয়ে আমরা এ-বাড়ির গ্যারাজের সামনেই গাড়ি রাখলাম। সরসকালী বললেন, 'এখন ঠিক সাতটা, না? কোথাও গেলে এখুনি যাওয়া উচিত। এর পরে রাত হয়ে যাবে।'

আমি অবাক হয়ে বললাম, 'কোথায় যাবেন?'

'অনিন্দ্যকিশোরবাবু, মানে রাঙাদাদুর সঙ্গে আলাপটা করে আসি। দোয়েল বলল, তুতুল বলল। দেরি করা ঠিক হবে না। চলুন আমার সঙ্গে। কুইক!'

এখন আমার কাজ সরসকালীকে অনুসরণ করা।

সরসকালী লম্বা লম্বা পা ফেলে আড়াআড়ি হাঁটতে শুরু করলেন। এদিক থেকে ওদিক। ওদিকে গিয়ে সটান অনিন্দ্যবাবুর বাড়ির সদর দরজায়। দরজা খোলাই ছিল। অনুমতির অপেক্ষা না করে আমরা ঢুকে পড়লাম ভেতরে। বাড়ির ভেতর দিকটায় আবার ছোট একটা উঠোন। চারদিকে ঘর। একনজরে দেখলে, এই বাড়ি অনেক খোলামেলা। কিন্তু মুকুলবাবুদের বাড়ির ভেতরটা অনেক চাপা। বাড়ির উঠোন দিয়েই নতুন সিঁড়ি বানিয়ে ছাদে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

রাঙাকাকার বিশাল বাড়িটার ভেতর ইচ্ছে করলে হারিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের হারিয়ে গেলে চলবে না। আমরা উঠোনে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখছিলাম। একটা ঘরের দরজার বাইরে বেশ কিছু জুতো খোলা।

এবার আমাদের দেখে একজন এগিয়ে এলেন। নিচু স্বরে বলল, 'ওই ঘরে যান। উনি আছেন।'

আমরা সেই ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বিশাল একটা হল ঘর। ঘরের ভেতর আলো নেই। দুই কোণে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। যেটুকু আলো তা অন্ধকারকে নাচিয়ে চলেছে। দেওয়াল জুড়ে জুড়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে ছায়া।

ঘরের ভেতরে অনিন্দ্যকিশোরবাবু পদ্মাসনে টানটান বসে, ওঁর সামনে বড় একটা প্রদীপ। তাঁর দৃষ্টি প্রদীপের শিখার দিকে। সামনে জনা পাঁচেক নারী পুরুষ বসে। সবাই ভীষণরকম চুপ। একজন ইশারা করে বসতে বললেন। সরসকালীর পিছন পিছন আমি ঢুকে বসে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। সবাই স্থির। উনি প্রদীপের শিখার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিরতির করে শিখাটি কাঁপছে। হঠাৎ শিখাটিতে চটপট চটপট শব্দ হতে শুরু করল। প্রদীপটি সরিয়ে ঘরের কোণে নিয়ে গিয়ে রাখা হল। ওঁর সামনে একটা সাদা কাপড় পাতা ছিল, এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি। উনি খুব ধীরে ধীরে সেই চাদরটা তুললেন। তারপর অদ্ভুত হাসলেন। বললেন, 'নগেন কী দেখছ?'

আমরা দেখলাম অনিন্দ্যকিশোরের সামনে একটা কঙ্কাল শোয়ানো।

নগেন বিস্ফারিত চোখে বলল, 'কঙ্কালটার বডি আছে, হাত নেই, কঙ্কালের হাত দুটো কোথায় গেল রাঙাবাবা?'

'ওই হাত দুটো গেছে তোমার শত্রুর গলা এবার টিপে ধরবে। ভবেশ আর বাঁচবে না।'

ঘরের ভেতর মোমবাতির আলোয় সবাই একটু কেঁপে উঠল। 'ভবেশের মরণ ঘনিয়ে এসেছে। ওই হাত ভবেশের দম বন্ধ করে দেবে।'

ঘরের ভেতর মোমবাতির আলোয় সবাই একটু কেঁপে উঠল।

ওম শান্তি! ওম শান্তি! ওম শান্তি!

কঙ্কালটার গায়ে আবার সাদা চাদর ঢেকে দিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে অনিন্দ্যকিশোর বলে উঠলেন। 'তুই ঘুমো, ঘুমিয়ে থাক। যে হাত গেছে, তারা ফিরে আসবে। হাত দুটো ফিরে এলে তোকে আমি তোর জায়গায় ফিরিয়ে দেব।'

সবাই চুপ। কী ভয়ংকর নিস্তব্ধতা।

'নগেন যেটুকু করার আমি করলাম। বউমা ঈশ্বরকে ডাকো। মনে মনে সবাই আরাধ্য দেবীকে স্মরণ করো। মাকালী, চামুণ্ডাকে স্মরণ করো। জয় মা চামুণ্ডা! জয় মা বগলা!'

নীরবতা। প্রদীপ নিভে যেতে আঁধারের সঙ্গে সঙ্গে নীরবতাও বেশ জমাট হয়ে উঠল।

নীরবতা ভাঙলেন অনিন্দ্যকিশোর, 'আজ এসো তাহলে তোমরা। অনেক দূর যেতে হবে তোমাদের।'

সবাই বসে বসেই প্রণাম করল। তারপর উঠে পড়ল সবাই, পর পর বেরিয়ে গেল। একজন খুব নিচু স্বরে বলল, 'বাবা আপনার ল্যান্ড লাইন নম্বরটা আমি নিয়েছি। আপনার মোবাইল নম্বরটা দেবেন। হোয়াটসঅ্যাপ আছে?'

'ধুর পাগলা! আমার ওসব মোবাইল টোবাইল নেই। ল্যান্ড ফোনে দিব্য কাজ চলে যাচ্ছে। যা পালা। এ পাগল মোবাইল নম্বর চায়! ন্যাংটাকে টাই বাঁধা শিক্ষা দেবে!'

আমার ইনফরমেশন অনুযায়ী অনিন্দ্যকিশোর কোনওদিনই রোজগারের চেষ্টা করেননি। চারদিকে যে ছড়ানো ছিটানো পৈতৃক বিষয়সম্পত্তি আছে, তাই বিক্রি করে দিনযাপন করছেন।

আমি আর সরসকালী বসে। সবাই চলে যেতে উনি আমাদের দিকে তাকালেন। বললেন, 'আপনাদের কথা শুনেছি কাল থেকে আপনারা আমার প্রতিবেশী। তাই তো, কি আমি ঠিক বলছি?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি সম্পূর্ণ ঠিক বলছেন।' সরসকালী পূর্ণ বিনয়ের সঙ্গে বললেন। আমি ঘাড় নাড়ালাম।

'আমি জানতাম, আপনারা এসেছেন, অথচ চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল এবাড়িতে এলেন না। কী আশ্চর্য! আমি ডাকতে পারি না, আমি টানতে পারি। তাই এই ভরসন্ধেবেলা আপনাদের টেনে নিয়ে এলাম। জানতাম, আপনারা আসবেন।'

আমি বিড়বিড় করে বললাম, 'আপনি জানতেন?'

স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, 'জানতাম।'

'দোয়েল আপনার কথা বলছিল।' সরসকালী বললেন।

'দোয়েলপাখিটা খুব ভালো মেয়ে। আমাদের বংশে মেয়ে কম। কম ফল। কিন্তু, সবই পোকা কাটা। ভালো ফল আরও কম।'

'আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না।'

অনিন্দ্যকিশোর হা হা হা হা করে বাড়ি কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন, 'একদিনে কি সব বোঝা যায়? যায় না। আপনাদের দুজনের আসা যাওয়া চলুক। হৃদ্যতা বাড়ুক। তাপ উত্তাপ বিনিময় হলে, অনেক কিছুই বলতে হবে না বুঝে যাবেন। তবে ওই যে বললাম, দোয়েলপাখিটা ভালো মেয়ে। ওকে উড়ে যেতে দেবেন না। ওর প্রাণপাখিটা কষ্টে ছটফট করছে। ওর যন্ত্রণা উপশম করতে হবে।'

'ওর এত কীসের যন্ত্রণা আপনি কিছু জানেন?' সরসকালী খুব মোলায়েম গলায় জিগ্যেস করলেন। 'ইদানীং ওর শরীরটা বড্ড খারাপ যাচ্ছে লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। কেন? কেন এমন হচ্ছে?'

'শুনুন, আপনি যখন জানতেই চাইছেন, তাহলে আপনাকে বলি। ওই যে আপনাকে বললাম, ও ভালো মেয়ে। আমাদের বংশের মেয়েগুলো পোকা কাটা। আমার বোন রাধু। এই বাড়িকে নাকি প্রাণের চেয়ে ভালোবাসে। বড্ড ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা নিয়ে গালভরা কত কথা। তো একদিন ওকে বললাম, রাধু তুই এই বাড়িতে এসে থাক। বলল না দাদা আমার ঘর সংসার ছেলে পুলে আছে। ও থাকবে না শুনে, বললাম, তাহলে তোর ভালোবাসার চিহ্নস্বরূপ অঙ্গুরীলতা থাকুক উঠোনে। তাতেও তার আপত্তি।'

'অঙ্গুরীলতা বলতে? আঙুরলতা?' আমি হালকা গলায় জানতে চাইলাম।

স্মিত হাসলেন অনিন্দ্যকিশোর। বললেন, 'আঙুর ফলের গাছ! আরে না, না। এসব আধ্যাত্মিক ব্যাপার, তন্ত্রক্রিয়া, আপনারা ঠিক বুঝবেন না কড়ে আঙুলটি হল বীজ, তা রোপণ করে, জলসিঞ্চন করে অঙ্কুরোদগম হবে, জাগাতে হবে। লতানে গাছ, সারা বাড়িতে লতিয়ে লতিয়ে শিকড়ে ডালে পাতায় জড়িয়ে থাকবে। রাধু রাজি হল না। যে বাড়িকে ভালোবেসে প্রাণ দিতে পারে, সে একটা কড়ে আঙুল দিতে পারল না। আর আমার অঙ্গুরীলতাও হল না!'

অনিন্দ্যকিশোরের কথায় আমার গা শিউরে উঠল। বাকশক্তিরহিত হয়ে আমি বসে থাকলাম। কিন্তু সরসকালী নির্লিপ্ত।

অনিন্দ্যকিশোর বললেন, 'এ তো গেল আমার বোনের কথা। বংশের আর এক মেয়ে, আমার ভাইঝি মঞ্জুশ্রী। মুখরা রমণী। ওপরে গিয়ে ওকে জবাবদিহি করতে হবে। তিন তিনবার আমার পুজোর উপকরণের ওপর ও গোবরজল ঢেলে দিয়ে গেছে। আমাকে ভয় দেখিয়েছে এবার বিষ্ঠা ফেলবে। এক একটা ফল পোকায় কাটলে উৎকট গন্ধ বের হয়, মঞ্জুশ্রী ঠিক তাই। তৃতীয়টি দোয়েলপাখি বড় নরম, হালকা রাশ! ওর প্রাণপাখি সর্বদা ধুকপুক ধুকপুক করছে, যন্ত্রণায় শরীর ছেড়ে ফুড়ুৎ হতে চাইছে। ভালো মেয়ে কিন্তু জাঁতির মুখে পড়ে গেছে।'

'কী যন্ত্রণা ওর?' সরসকালী আবারও প্রশ্ন করলেন।

'আপনি তো শুনলাম, ওর ডাক্তার। নাড়ি টেপা নন, মনের ডাক্তার! তা আপনি কী পেলেন? কিছু পেলেন?'

'আমি ওর ডাক্তারি করতে ঠিক এখানে আসিনি।' সরসকালী বেশ কেটে কেটে কথার উত্তর দিলেন।

'তবে কী করতে এসেছেন ভূত তাড়াতে, না ভূত ধরতে?'

'এখানে ভূত আছে নাকি!'

'এ কী এসেছেন, ভূতের গল্প শোনেননি? তাহলে দু-একদিন থাকুন শুনে যাবেন।'

'কী শুনব ভূতের গল্প!'

'শুনবেন না, টের পাবেন। ভূত প্রেত অপদেবতা আরও কত কিছু। কিন্তু যা সত্য তা হল এই বাড়ি এখন প্রেতের কবলে। এই বাড়িতে একটি পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে। পঞ্চমুণ্ডির আসন জানেন তো, মারাত্মক বস্তু, তার নীচে জেগে জেগে শুয়ে আছে পাঁচটি মুণ্ড। শৃগাল, সারমেয়, বৃষ, সর্প, চণ্ডাল এই পাঁচ পাঁচটি মুণ্ড জাগিয়েছিলেন আমার পূর্বপুরুষ। ওই আসনের ওপর বসে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বেহিসেবি তন্ত্রে তাঁর দেহ নিপাত হয়েছে। কিন্তু ওই পাঁচ প্রাণী তো রয়ে গেছে। তারা জীবন্ত। তারা ডাকছে। বলছে, জল দে। তারা সাধন চায়, নয় মুক্তি চায়। সেই পাঁচ মুন্ডু এবার নৃত্য করবে। মারণ নৃত্য! এর দায় কার? ওদের শান্ত রাখতে হয়। ওদের পরিচর্যা করতে হয়। দেখভাল করতে হয়। ওরা জাগ্রত। ওদের জাগিয়েছেন আমাদের বংশেরই এক পুরুষ। তাই ওদের শান্ত করার দায় আমাদের। কিন্তু কে করবে? ওই গাম্বাট মুকুল, মুখরা রমণী মঞ্জু! মঞ্জু এ-বাড়ির সর্বনাশ করছে। ও মুকুলটার পরিবারটা শেষ করবে। ও মুখরা রমণী! ছোটবেলা থেকেই এ এমন হিংসুটে। বলুন তো আমি যদি দু-বেলা ঠাকুরঘরে যেতাম কী ক্ষতি হত ওদের? বাইরের একজন ঠাকুরমশাই আসছেন। প্রতিদিন অংবংচং করে মন্ত্র পড়ে পুজো করছেন। অথচ ওই আসনের হকদার আমি, আমাকে ওরা বঞ্চিত করে রেখেছে। খুব কষ্ট হয় আমার। পাঁচ পাঁচটা জ্যান্ত মুন্ডু একটু জলের জন্য হাহাকার করে ঘুরছে! কে ওদের শান্ত করবে!'

'তাহলে আপনি বলছেন ওই পাঁচ মুন্ডুই সব উপদ্রব করছে!'

'না, না, আমি কিছু বলছি না। আমার মুখে কোনও কথা বসাবেন না। তবে ওদের শান্ত করতে হবে। নইলে আজ দোয়েল, কাল ওর ভাই, কেউ থাকবে না, কেউ বাঁচবে না, এ বংশ নির্বংশ হয়ে যাবে। ওই বাড়িতে একদিন হাওয়া বাতাস চলাচলও বন্ধ হয়ে যাবে। আপনি ভালো করে লক্ষ্য করবেন ওই বাড়ির ভেতর ঢুকে শ্বাস নিতে গেলে হাওয়ার সংকুলান হয়। দেখুন, এখানে বসে আপনি মিলিয়ে নিন। এখানে, এদিকে হাওয়া বাতাসের আসা যাওয়া কত সহজ। আমার কথা বিশ্বাস নাহলে মিলিয়ে নিন।

'কীভাবে মেলাব?'

'আমি বলছি আপনাকে আমার সঙ্গে সঙ্গে করুন। নিন চোখ বন্ধ করুন। চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিন।'

ওঁর কথায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো সরসকালী দু-চোখ বন্ধ করলেন।

'নিন, এবার শ্বাস নিন, গভীর শ্বাস, বুক ভরে। শ্বাস ছাড়ুন, একেবারে নয়, ধীরে ধীরে। আবার নিন এভাবে দশবার করুন। শরীর মন হালকা হয়ে যাবে।'

আমার পাশে বসে সরসকালী পাক্কা অভিনেতার মতো দু-চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিচ্ছেন, শ্বাস ফেলছেন।

'কি পারলেন? কোনও অসুবিধে হল? হবে না। এই স্থানে হাওয়া বাতাসের পথ সুগম! এবার আপনার ঘরে বিছানায় বসে এভাবেই শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করবেন। দেখবেন, পারবেন না। বুক ভারী হয়ে যাবে। আমার কথা চেক করে নেবেন, আমার কথা সত্যি কি না?' কথাটা বলে অনিন্দ্যকিশোর হাসেন।

মাথা নাড়লেন সরসকালী। বললেন, 'আচ্ছা, ওই পঞ্চমুণ্ডির আসনটাই তাহলে যত নষ্টের গোড়া। ওই আসনটা তুলে ফেলা যায় না? কী বিধান আছে শাস্ত্রে?'

সরসকালীর কথায় বসে বসেই লাফিয়ে উঠলেন অনিন্দ্যকিশোর। 'সর্বনাশ হয়ে যাবে! এ বুদ্ধি কার ওই মঞ্জুর নাকি? সর্বনাশ হয়ে যাবে। ঝাড়ে বংশে সব শেষ হয়ে যাবে। ওই পাপের কথা মুখে আনতে নেই। বরং আপনি ওদের ভাই বোনকে বোঝান অমাবস্যা পূর্ণিমায় ওই ঠাকুরঘরটা আমাকে ছেড়ে দিক। পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে ওদের শান্ত করতে হবে। আমার দোয়েলপাখি ভালো হয়ে যাবে। সব উপদ্রব কমে যাবে। আমি বলছি, আমি। দোয়েল আমাদের পরিবারের মেয়ে, ওর রাশ হালকা, ও নিতে পারছে না। ওই বাড়ির সব কু ওর শরীরে ভর করছে। মেয়েটা শুকনো হয়ে যাচ্ছে, শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঝড়ে সব গাছ পড়ে না, কোনও কোনও গাছ উপড়ে যায়। আমি শত চেষ্টা করেও ওই ঝড় থামাতে পারছি না, আমার প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে। ওর গবেট বাপটা কবে বুঝেছে? মেয়েটা ভয় পাচ্ছে। কেন ভয় পাচ্ছে একবার ভেবে দেখেছে? যাক আপনি এসেছেন, আপনার কথা হয়তো ওর বাপ বিশ্বাস করবে। তাকে গিয়ে বলুন। মঞ্জুকে বোঝান। আপনাকে আমি দূত করে ওই বাড়িতে পাঠালাম। এখন থেকে আপনি আমার লোক। আপনি বলবেন আমার অবর্তমানে সব বিষয় সম্পত্তি আমি দোয়েলকে দিয়ে যেতে চাই। বিষয় সম্পত্তি আমার কাছে তুচ্ছ। আমার কে আছে? সব দোয়েলের। যান গিয়ে বলুন।'

অনিন্দ্যকিশোরের কথার মধ্যে ঘোর আছে। তিনি বার বার একই কথা বলে একটা ঘোর সৃষ্টি করতে চাইছেন। তাঁর নরম আর নিচু স্বর, খুব সুন্দর কথা বলেন। কিন্তু ওঁর কথায় শিষ্য শিষ্যারা মোহিত হবেন, সরসকালী বা আমার কাছে এ শুধুমাত্রই চালাকি।

আমরা অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়ের দূত হয়ে ও-বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে বললাম, 'আপনি লোকটাকে এতক্ষণ সহ্য করলেন? উনি তো আপনাকে নিজের লোক বানিয়ে নিলেন। আমরা এখন ওঁর দূত!'

নির্লিপ্ত গলায় সরসকালী বললেন, 'কাঁহাতক আর অপেক্ষা করা যায়, রাতের খেলাটা আমিই শুরু করে দিয়ে এলাম। রাঙাবাবা আমি আপনার দূত, না আপনি আমার ফাঁদের জন্তু দেখা যাক?'

আট

আমাদের গাড়ি তাঁর বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেখেছেন মুকুলকিশোর, কিন্তু আমরা বাড়ি ঢুকিনি। ঘরে আসিনি। উনি তখনই বুঝেছেন আমরা ও-বাড়ি গিয়েছি। আর সেটা বুঝেই ওঁর টেনশন শুরু হয়ে গেছে। আমরা যেতেই মুকুলকিশোর ঠাকুর প্রণাম করলেন, বললেন, 'আপনারা ঠিক আছেন তো?'

সরসকালী বললেন, 'তরণীবাবু একটু চায়ের ব্যবস্থা করা যায়? মনটা চা চা করছে।'

তরণীবাবু সদর দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, 'এখনি দিচ্ছি।'

'আপনারা ওখানে কিছু খেয়েছেন নাকি?' প্রচণ্ড উদ্বেগমাখা গলায় প্রশ্ন করলেন মুকুলকিশোর।

'কেন বলুন তো?'

'খেয়েছেন কী না বলুন না? প্রসাদ দিতে চায়নি?'

'না, কিছু দিতে চাননি। আমরাও খাইনি।' আমি বললাম।

আমার কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মুকুলকিশোর। 'ঈশ্বর রক্ষা করেছেন। আমার আগেই সর্তক করে দেওয়া উচিত ছিল। ওই বাড়ির কোনও জিনিস খাবেন না, কোনও জিনিস সঙ্গে রাখবেন না। গুণতুক বিশ্বাস করেন? ব্ল্যাক ম্যাজিক!'

সরসকালী বললেন, 'একটা প্রবাদ আছে জানেন তো, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আমার বিশ্বাস বা অবিশ্বাস আমার কাছেই থাক। আপনার রাঙাকাকা দোয়েলকে তার অবর্তমানে সব বিষয় সম্পত্তি দিয়ে যেতে চান, তার বিনিময়ে চান ওর ঠাকুরঘরে প্রবেশের অধিকার।'

'জানি। এটা রাঙাকাকার একটা বাহানা। উনি এই প্রস্তাব দিয়ে দূত পাঠিয়েছিলেন আমার কাছে, আমি হাত জোড় করে তাঁকে বলেছি আমাদের ভিক্ষে চাই না, শুধু কুকুরটা বাঁধতে বলুন।'

আমি সরসকালীর দিকে তাকালাম। আজ সরসকালী ভদ্রও তো অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়ের দূত।

আমাদের কথার মাঝে মাথা নিচু করে একটা মেয়ে চলে গেল। এ-ই মিতুল।

মুকুলকিশোর বললেন, 'আপনাদের কুকুরকে বিস্কিট খাওয়ানোর উদাহরণ দেননি? আজ দেননি। কাল দেবেন। যারা রাস্তার কুকুরকে রোজ বিস্কিট খাওয়ায়, তারা ইচ্ছে করলে সেই কুকুরদের কোনও পথচারীর দিকে লেলিয়েও দিতে পারেন। এটা ওনার হুমকি। সুযোগ পেলেই ভয় দেখান। যাঁর নিজের সম্পত্তির দান করে দেওয়ার মতো এমন মহৎ ইচ্ছে, তিনি কী করে সামান্য একটা ঠাকুরঘরের জন্য নিজের নাতনিকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেন? উনি প্রেতচর্চা করেন। শ্মশানে মড়ার ওপর বসে শবসাধনা করেছেন। ভূত প্রেত ওনার কথা শুনে চলে। তাদের উনি লেলিয়ে দেবেন। তবে আমিও ওনাকে বলে এসেছি যদি আমার সন্তানের কোনও ক্ষতি হয়, আমি ছাড়ব না। ওকে কোনও ভূত প্রেত বাঁচাতে পারবে না। বন্দুকটা ওর গলায় ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপে দেব। রাঙাকাকা জানে, আমি এটা পারব। কারণ, আমি মাথামোটা, গাম্বাট, গর্দভ। আমি ওকে বলে এসেছি। এই বাড়িতে কেউ থাকবে না। শুধু আপনি থাকবেন প্রেত হয়ে। আমার ক্ষতি হলে আমিও তোমাকে প্রেত বানিয়ে নাচাব।'

চা এল। সঙ্গে জলখাবার।

চা দিলেন তরণীবাবু। তাঁকে সরসকালী ভদ্র বললেন, 'আর একটা উপকার করতে হবে তরণীবাবু। আমার টেবিলে একটা ফ্লাক্স আছে। সেখানে আরও চার কাপ গরম জল দিয়ে রাখবেন। আমার কাছে টি ব্যাগ আছে। আজকের রাতটা মনে হয় জাগতে হবে।'

মুকুলকিশোর বললেন, 'জাগতে হবে কেন? আপনি কোনও সন্দেহ করছেন?'

সরসকালী বললেন, 'আপনার চিন্তার কিছু নেই। আপনারা ঘুমাবেন, আমার রাতে ঘুম আসে না।'

মুকুলকিশোর বিড়বিড় করলেন, 'তা বললে হয়! উনি খুব শয়তান, যেকোনও সময় বিপদে ফেলে দিতে পারে। আমি মাথামোটা, গাম্বাট, আমার কাছে বন্দুক আছে। আমার মোটা বুদ্ধি আর বন্দুককে উনি ভয় পান। আমিও জেগে থাকব।'

চা জলখাবার খেলাম প্রায় আটটা। দু-ঘণ্টা পরেই রাতের খাবারের ডাক এল। এসে বুঝলাম, তাতার দোয়েলের খাওয়া হয়ে গেছে, এখন মুকুলবাবু সহ আমরা তিনজনে বসলাম। মুকুলবাবুর মা-ই খাওয়ার টেবিলের তদারকি করছেন। মঞ্জুশ্রী দেবী নেই। উনি চলে গেছেন। শুনলাম ফোনে ফোনে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছেন। এখনও ধারে কাছে সৌজন্যের খাতিরে তৃষ্ণাকে দেখলাম না। সরসকালী বিষয়টা লক্ষ্য করেছেন কি না জানি না, কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ দৃষ্টিকটু।

খেয়ে শেষ করে এসে আমি ডায়েরি নিয়ে বসলাম, আর সরসকালী বসলেন বই নিয়ে। ওর পঠিত বইয়ের দিকে এক ঝলক দেখলাম, স্বামী নিগমানন্দ পরমহংসের তান্ত্রিক গুরু বা তন্ত্র ও সাধন পদ্ধতি। এই বইটির আরও দুটো কপি বিছানার ওপর। এগুলো উনি কী করবেন কে জানে?

সরসকালীর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। সত্যিই সরসকালীর ফাঁদে পড়ল দু দুটো জন্তু। কুকুর আর শিয়াল।

সারারাত ঘুম এল না শিয়াল আর কুকুরের ডাকে।

কী আশ্চর্য এখনও এদিকে এত শিয়াল আছে! শিয়ালগুলো যেন আমাদের ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে দৌড়ে যাচ্ছে। আমাদের জানালার সামনে এসে ডেকে যাচ্ছে।

সরসকালী জানালা খুলেছিলেন, কিন্তু অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হল না। শিয়াল কুকুরের ডাক শুনতে শুনতে এক সময় আমরা ঠিক করলাম, দরজা খুলে বাইরে যাব। বাইরে গিয়ে দেখব। শিয়াল কুকুরদের এত উৎসবের কারণ কী? হয়তো আমাদের দরজা খোলার আওয়াজ পেয়েছিলেন মুকুলকিশোর। কেননা দরজা খুলতেই সিঁড়ির ওপর দেখলাম তাঁকে, দাঁড়িয়ে আছেন। মুকুলবাবু নিচু গলায় বললেন, 'আপনারা অনুগ্রহ করে বাইরে যাবেন না। আপনাদের কোনও বিপদ হলে আমি বিপদে পড়ে যাব।'

'বিপদে পড়লে ওঠার ক্ষমতা আমি রাখি। আপনি সদর দরজার তালা খুলতে বলুন। আর যে কদিন আমরা থাকব, সে কদিন আমরা আমাদের দায়িত্বেই থাকব।' সরসকালী স্পষ্ট গলায় জানিয়ে দিলেন।

অনিচ্ছুক মুকুলবাবু তরণীবাবুকে বললেন আমাদের সদর দরজার চাবি দিতে।

দরজার তালা খুলে আমরা বাইরে এলাম। বাইরে বেশ অন্ধকার। আমি একটু ইতস্তত করছিলাম। সরসকালী বললেন, 'ভূত প্রেত অশরীরীরা ছুরি চালায় না, গুলি ছোঁড়ে না, নিশ্চিন্তে আসুন। আর নিশ্চয়ই কুকুর শিয়ালের কামড়ের ভয় পাচ্ছেন না!'

বলতে পারলাম না যদি কামড়ে দেয়। সাবধানের মার নেই। টর্চ জ্বালালাম।

সরসকালীর সঙ্গে আমি নিশ্চিন্তে সারাবাড়ির চৌহদ্দি ঘুরে এলাম। আমাদের দেখে বেশ কয়েকটা কুকুর চিৎকার জুড়ে দিল তারস্বরে। তারা এতক্ষণ মাংসের হাড় নিয়ে ঝটাপটি করছিল। আমার টর্চের আলোয় ওদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে। সরসকালী দাঁত চেপে বললেন, 'ঘুরছে কুকুর, ডাকছে শিয়াল! বাহ রে!'

আমরা ঘরে না ফেরা পর্যন্ত মুকুলকিশোরবাবু তরণীবাবুকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। ওঁদের দেখে সরসকালী অবাক হয়ে বললেন, 'এ কী আপনারা জেগে? শুয়ে পড়ুন।'

'আপনারা বাইরে আমরা কি ঘুমাতে পারি!'

ঠিক এই সময় আমাদের মাথার ওপর ঠক ঠক ঠক ঠক করে একটা আওয়াজ ঘুরে ঘুরে গেল।

তরণীবাবু তাকালেন মুকুলকিশোরের দিকে।

মুকুলকিশোর বললেন, 'আজ রাতে আর কোনও অশান্তি হবে না, নিশ্চিন্তে থাকুন, উনি এসে গেছেন।'

তরণীবাবু বললেন, 'দাদামশাই, অনেকদিন পর!'

আমি বললাম, 'লাঠির আওয়াজ!'

'না, চিমটে! ভালো করে শুনুন। আহ আজ রাতে ভালো করে ঘুমাব।' মুকুলকিশোরের গলায় নিশ্চিন্তভাব।

আমরা এসে শুয়ে পড়লাম। সরসকালী স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, 'আমিও তোমাকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেব না। দেখব, কতরকম ম্যাজিক তুমি জানো। রাত জেগে জেগে আমাদের ম্যাজিক দেখাও। চমৎকারী সব বুদ্ধি খাটায়। তুমি ফাঁদে পড়েছ রাঙাবাবা!'

নয়

সকালে তুতুলের সঙ্গে দেখা হল। টগবগ করে দৌড়াচ্ছে। সরসকালী বললেন, 'আজ ক পাক হল?'

'পনেরো।'

'পঁচিশ থেকে পনেরো ভালো কথা নয়! কাল অনেক রাতেও তোমার ঘরে আলো দেখলাম। অত রাত জেগে ভোরে উঠে দৌড়ালে শরীরে পারবে কেন?'

'কী করব সামনে পরীক্ষা।'

'কী পড়ছ তুতুল!'

'এম এসসি করছি।'

'সাবজেক্ট?'

'অরগ্যানিক কেমিস্ট্রি।'

'এখানে পড়াশোনায় নিশ্চয়ই খুব ডিসটার্ব হচ্ছে?'

'হচ্ছে তো। বাবা কাল জানিয়ে দিয়েছে। আমরা সামনের মাসে চলে যাচ্ছি।'

'কাল রাতে এত শিয়াল ডাকল। তার সঙ্গে কুকুরের চিৎকার' সরসকালী বললেন।

'তোমাদের এখানে এত শিয়াল!' আমি বললাম।

তুতুল স্থির হয়ে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়াল। 'ডাক শুনেছেন কিন্তু দেখেছেন কি? আমি আজ পর্যন্ত একটাও শিয়াল দেখিনি। কাল রাতে আবিষ্কার করলাম, এখানে শিয়াল আছে।'

'কালই তাহলে প্রথম শিয়াল ডাকল?' আমি বললাম।

'তুমি কি কাল রাতে শিয়াল দেখেছ?' সরসকালী বললেন।

'কী করে দেখব? ওদের দেখা যায় না। ওদের শুধু ডাক আছে। কারণ, ওদের শুধু মুন্ডু আছে। শরীর নেই।'

'মানে!'

'মানে জানতে হলে রাঙাদাদুর কাছে যান। উনি মানে বলে দেবেন ওই পঞ্চমুণ্ডির আসনের তলায় শিয়ালের মুন্ডু আছে। জাগ্রত! তারই ডাক শুনেছেন। আরও জানতে রাঙাদাদুর কাছে যান। ডিটেলস পেয়ে যাবেন।'

তুতুল স্কিপিং করতে করতে চলে গেল। চলে গেল, ভেবেছিলাম তুতুল স্কিপিং করতে করতে যেমন চলে গেল, আবার হয়তো তেমনভাবেই ফিরে আসবে। কিন্তু এল না। তুতুল এলে, জানতে চাইতাম ওকে একথা কে বলেছে? রাঙাদাদু? কাঁচা মাথাগুলো উনিই চিবিয়েছেন।

সরসকালী বললেন, 'চলুন অনিন্দ্যবাবুকে একটু সুপ্রভাত জানিয়ে আসি।'

'এই সাতসকালে মেজাজ খারাপ করবেন?'

সরসকালী হাসলেন, 'আমার নয়, ওনার মেজাজটা সাতসকালে খারাপ করে আসি। চলুন।'

ও-বাড়ির ভেতর পুবদিকের বারান্দায় ইজিচেয়ারে অনিন্দ্যকিশোর বসে। আমি আর সরসকালী অবলীলায় ঢুকে পড়লাম বাড়ির ভেতর। বারান্দা থেকে উনি আমাদের দেখছেন। সরসকালী হাওয়াই চপ্পলের ফট ফট আওয়াজ তুলে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। 'সুপ্রভাত!'

'সুপ্রভাত! আপনাদের ঘুম ভালো হয়েছিল?'

'আপনাদের এখানে এত শিয়াল! ঘুম হবে কী করে!' সরসকালী বললেন।

অনিন্দ্যকিশোর হাসলেন, 'ডাক শুনেছেন দেখতে পাননি তো? ওদের ডাক আছে। কারণ, ওদের শুধু মুন্ডু আছে, শরীর নেই।'

আমি বললাম, 'হ্যাঁ, শুনছিলাম, ওই শিয়াল নাকি সেই পঞ্চমুণ্ডির শিয়াল। সে জেগে উঠেছে! বাপ রে কাল কী ডাকটাই না ডাকল। বেচারা!'

হো হো করে হেসে উঠলেন অনিন্দ্যকিশোর। 'বাব্বা, সব কিছুই তো জেনে গেছেন তবে একটা জিনিস ভুল বুঝেছেন, ওরা ডেকেছে, খুব ডেকেছে। ওরা ক্ষুধার্ত! কিন্তু ওরা বেচারা নয়, ভয়ংকর। ওদের সঙ্গে পাঙ্গা নিলে সাক্ষাৎ মৃত্যু। আর সে মৃত্যু সহজ মৃত্যু নয়, আস্তে আস্তে ধিকিয়ে ধিকিয়ে হিংস্র দাঁত চেপে বসবে ঘাড়ে, তারপর টেনে নিয়ে যাবে অতলে।'

আমি বুঝলাম, সাতসকালে উনি বেশ একটা ভয় ভয়, গা শিরশির করা হাওয়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

সরসকালী বললেন, 'আপনার কঙ্কালটার হাত দুটো কাজ সেরে ফিরে এল? কোনও খুন টুন করল নাকি?'

'খুন করতে বললে করবে। ওই হাতদুটো আমার পোষা!' অনিন্দ্যকিশোর চাপা গলায় উত্তর দিলেন।

'আপনি তো বললেন, ভবেশ মরবে। ভবেশ মরেছে? আমি কাল শুনলাম, তাই আজ জিগ্যেস করলাম। আমার সাদা মনে কাদা নেই! তা ওরা আর কী করতে পারে? আমার কিছু কাজ আছে, ওরা করে দেবে? ওদের কেমন পেমেন্ট টেমেন্ট করতে হয়? দক্ষিণাটা বলবেন?'

'আপনার ঘরে গিয়ে হাত ঘুরিয়ে নেচে আসতে পারে। দেখবেন নাকি ওদের নাচ! পারবেন ওদের গন্ধে টিকে থাকতে? দু-হাতে মাংস পচা গন্ধ! পারবেন তো সহ্য করতে? আমি হাত দুটোকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব।'

সরসকালী হাসলেন, 'সেদিন রাতে পোড়া গন্ধ পেয়েছি। এবার মাংস পচা গন্ধ! পোড়া আর পচা! বাহ তবে নাচটা নয় রাতের জন্য তোলা থাক। রাতের আঁধার না নামলে ভূতের নৃত্য, প্রেতের নৃত্য ঠিক জমে না।'

অনিন্দ্যকিশোর দাঁত কিড়মিড় করলেন, 'আপনি ব্যঙ্গ করছেন। আমার বাড়ি বয়ে এসে ব্যঙ্গ করছেন। ফল ভালো হবে না। আপনি গাম্বাট মুকুলের কথায় নাচছেন। আমি আপনাদের নাচিয়ে ছাড়ব।'

সরসকালী হাসলেন, 'আপনিই যে ডান্স মাস্টার সে আমরা জানি। আমি কিন্তু রিংমাস্টার! বাঘের খাঁচার ভেতর ঢুকে আমি নাচাই। আর আপনি সেরেফ কাগুজে বাঘ, শুধু হুংকার দেন। বোকা লোকদের তন্ত্রের নামে ঠকান, অল্প বয়সিদের বিপথে চালিত করেন। এবার আপনি টের পাবেন। দেখবেন কত ধানে কত চাল!'

শত্রুপক্ষকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ করলে সে অনেক বেশি সাবধান হয়ে যায়। তার গতিবিধি আগাম আঁচ করা যায় না। কেননা সে নিজেকে গোপন করে ফেলে। তাই সরসকালী একটু রয়েসয়ে খেলতে পারতেন। লোকটা ভালো নয়, খুব ধুরন্ধর। আর এইসব তন্ত্রমন্ত্র গুণতুক যারা করে তাদের বোধবুদ্ধি বড়ই কম। আইন-পুলিশের তোয়াক্কা করে না। এদের একটু অন্যভাবেই হ্যান্ডেল করা উচিত। এটা আমার অভিমত। কিন্তু আমার অভিমত খাটবে না। কারণ সরসকালী ভদ্রকে আমি অনুসরণ করি। তাঁর পথই আমার পথ। তাঁর মতামতই ফাইনাল। সরসকালীর মতে, অ্যাটাক করলে উনি ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারবেন না, সবকিছু নিয়ে বেরিয়ে আসবেন। তখনই।

দশ

ব্রেকফাস্ট করে আমি আর সরসকালী ভদ্র বের হলাম, এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু গাড়ির দরজা খুলতেই বিপত্তি। গাড়ির ভেতর থেকে ভক করে বিচ্ছিরি গন্ধ বেরিয়ে এল। এত বিচ্ছিরি গন্ধ পেয়ে আমরা দুজনেই আশপাশে দেখলাম। গাড়ির দরজা বন্ধ ছিল, জানালার কাচও তোলা। গাড়ির ভেতর যে কেউ কিছু বদমায়েশি করে ফেলবে তার উপায়ও তো ছিল না। তবে?

তবু সরসকালী অপেক্ষা করলেন না। কয়েক মিনিট থমকে থেকেই বেরিয়ে পড়লেন গাড়ি নিয়ে। ভাবটা এমন কিচ্ছু হয়নি, 'ঘাবড়াও মাত!'

সরসকালী ভদ্র খুব ধীরে সুস্থে রয়ে সয়ে গাড়ি চালান। কিন্তু গাড়ি যেন ঠিকমতো চালানোই যাচ্ছে না। সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতর এত পচা গন্ধ! আমি আর সহ্য করতে পারছি না। বমি উঠে আসছে।

সরসকালীর চোখ মুখ থমথম করছে। গাড়ির ভেতর এত পচা গন্ধ কোথা থেকে এল! সব জানালাই খুলে দেওয়া হল, তাতে গন্ধ যদি একটু কমে। কেউ কোনও কথা বলছি না। শুনেছি তন্ত্রমন্ত্রে বিভিন্নরকম বাণ থাকে, অগ্নি বাণ, জ্বালা বাণ, এটা কি সেরকমই কোনও বাণ, গন্ধ বাণ। কথাটা ভাবলাম কিন্তু সাহস করে বলতে পারলাম না।

চিন্তান্বিত সরসকালী গাড়ি চালাচ্ছেন, চোখেমুখে চিন্তা। উনিও নিশ্চয়ই গন্ধ নিয়ে ভাবছেন।

গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ সরসকালী বললেন, 'আশ্চর্য!'

বিচ্ছিরি গন্ধ তো বেশ কিছুক্ষণ আগেই পেয়েছেন। সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কথাও হয়েছে। গাড়ির সব জানালা আমরা খুলে দিয়েছি। তাহলে কীসে উনি অবাক হলেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। হঠাৎই উনি গাড়িটা নিয়ে একটা পেট্রল পাম্পে ঢুকলেন। কালই আসার সময় তেল নিয়েছেন, আজ আবার তেল নেওয়ার প্রয়োজন হল? আমি একটু অবাক হলাম। খুব সামান্য টাকার তেল নিলেন। তেল নিয়ে বাইরে এসে উনি বললেন, 'আমার অনুমান একদম ঠিক, বুঝলেন!'

কী অনুমান আমি বুঝতে পারলাম না। বললাম, 'কী ব্যাপার বলুন তো?'

'বলছি।'

সরসকালী আর একটু এগিয়ে বেশ একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি থামালেন। তখনই দেখলাম, আমাদের পাশ কাটিয়ে একটা বাইকে বেরিয়ে গেল। বাইকে দুটি ছেলে।

সরসকালী ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ওরা সোজা চলে গেল।

সরসকালী ধীরে সুস্থে গাড়িতে বসলেন। বললেন, 'অনেকক্ষণ থেকে ফলো করছিল।'

'বাইকের ছেলে দুটো? কী করবেন? তাহলে কি আমাদের পেছনে লোক লাগানো হল?'

'তাই তো মনে হচ্ছে।'

আমি বললাম, 'একটা কথা বলব?'

'বলুন।'

'আচ্ছা অনিন্দ্যকিশোরের কোনও খারাপ উদ্দেশ্য নেই তো? মনে করুন, আমরা গাড়ির দরজা খুলতেই খুব বিশ্রী গন্ধ পেলাম। এত উগ্র আর বাজে গন্ধ যে গন্ধের চোটে আমরা গাড়ির সব জানালা খুলে আসছি। এখন ওরা আমাদের ফলো করছে। এমন তো নয়, গাড়ির দরজার গায়ে অদৃশ্য কোনও গন্ধজাতীয় কিছু লাগিয়ে আমাদের বাধ্য করল জানালা খুলে রাখতে। এরপর ফলো করে এসে সুযোগ বুঝে খোলা জানালা দিয়ে কোনও কিছু ছুড়ে মারবে?'

সরসকালী ভদ্র চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। বললেন, 'কিছু ছুড়ে মারার জন্য চলন্ত গাড়ির থেকে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি বেশি সুবিধেজনক। ওরা দু দুবার সুযোগ মিস করল! আপনার কথায় কোথাও যেন একটু ফাঁক থেকে গেল। না, এমনটি নয়। অন্য কিছু।'

সরসকালী ভদ্র আবার গাড়ি চালাতে শুরু করলেন। কিন্তু মিনিট দশেকের রাস্তা এসে সরসকালী বললেন, 'ওরা আবার আমাদের পেছনে। এবার ওদের দাঁড় করাতেই হবে। ওরা মনে হয় কিছু বলতে চায়।'

সরসকালী জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করালেন। তারপর ধড়াস দরজা খুলে বেরিয়ে এসে হাত ইশারা করে ওদের থামতে বললেন। ওরা এগিয়ে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। সরসকালী ওদের হাত তুলে ডাকলেন। দাঁড়িয়ে থাকা বাইক থেকে একটি ছেলে নেমে এল। সে আসতে আসতে হেলমেট খুলল। ছেলেটা সামনে আসতে সরসকালী বললেন, 'আমি অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ্য করছি তোমরা আমাদের ফলো করছ, কেন?'

ছেলেটা ঘাবড়ে গেল। বলল, 'ফলো না তো।'

'ফলো করছ না?'

'না।'

'তাহলে?'

'স্যার আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। কথাগুলো বলার জন্যই আমি চেষ্টা করছিলাম।'

সরসকালী বললেন, 'এখানে বলবে?'

'হ্যাঁ, এখানে বলতে পারি।'

'চলো গাড়ির মধ্যে গিয়ে বসি। তোমার সঙ্গীকে ডেকে নাও।'

'তার দরকার পড়বে না। আমি বেশিক্ষণ সময় নেব না।'

ছেলেটা বেশ সপ্রতিভ। বয়স চব্বিশ পঁচিশ, লম্বা, শ্যামলা, কাটা কাটা চোখ মুখ। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় বুদ্ধিমান। শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট।

সরসকালী সামনে, আমি আর ছেলেটা পেছনে বসলাম।

ছেলেটা বলল, 'আমার নাম অভিলাষ। অভিলাষ রজক। রজক, বুঝতেই পারছেন নিচু জাত। ধোপা। আমার বাবা এখনও এই কাজ করেন। এর জন্য আমি লজ্জা পাই না।'

'আমার নাম সরসকালী ভদ্র। আমি ভদ্র ধোপা। মানুষের মন পরিষ্কার করি। তোমার বাবা আর আমার পেশা এক। দুজনেই কাজ করি। এতে লজ্জার কিছু নেই। বলো।'

'আমার সঙ্গে দোয়েলের বন্ধুত্ব ছিল। এখন নেই। কেন নেই সেটা স্যার অন্য গল্প। আমি নিচু জাত তাই নেই, এটাই আসল কথা। আমি এসব বলে আপনাদের সময় নষ্ট করব না। আমি আমার দুঃখের কথা আপনাদের বলতে আসিনি। কিন্তু আপনারা দোয়েলকে বাঁচান স্যার। ওর ভারী বিপদ। আর ও আমার জন্য এই বিপদটা ফেস করছে।'

ছেলেটার চোখমুখ লাল হয়ে কথা জড়িয়ে এল। আমি জলের বোতলটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম।

'স্যার, কীভাবে বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। ওর বাবা আমাকে পছন্দ করেন না। একবার ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম, ওর বাবা আমাকে প্রচণ্ড অপমান করেছিল। বন্দুক তুলে গুলি করবে বলেছিল... তারপর অনেকদিন যেতাম না। দোয়েল আর আমার কথা স্যার ওদের বাড়ির সবাই জানে। তবু আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি। আমরা রাস্তায়, কলেজে দেখা করতাম। এর মাঝে একদিন তুতুল খবর দিল দুপুরবেলা দোয়েল আমাকে যেতে বলেছে। আমাকে দোয়েলও ফোন করল, বলল, ঠাকুমা থাকবে না, শশীদি আর তরণীদাকে নিয়ে হাওড়া যাবে। সন্ধ্যামাসি দুপুর হলেই ঘুমায়। তুমি এসো।... আমি গিয়েছিলাম স্যার। ওদের বাড়িতে ঘন্টাখানেক ছিলাম। কিন্তু।'

অভিলাষ থামে।

'আগেও কি কোনওদিন গিয়েছিলে?'

'হ্যাঁ আগেও একদিন দোয়েল আমাকে ডেকেছিল। সেদিনও বাড়ি ফাঁকা ছিল। কিন্তু আমি যাইনি। তাই নিয়ে দোয়েল খুব রাগ করেছিল।'

'সেদিন তাহলে গেলে, তারপর?'

'সেদিনও আমি যেতে চাইনি স্যার। কিন্তু দোয়েলের জন্যই যেতে হয়। গিয়েছিলাম। আমরা গল্প করছিলাম হঠাৎই ওদের একজন আত্মীয় এসে পড়েন। দোয়েল তাকে দেখে খুব ভয় পেয়ে যায়। আমাকে একটা ঘরে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। মানে লুকিয়ে রাখে। সেটা ওদের ঠাকুরঘর। আমি ওই ঘরে ঢুকে ভুল করেছি। ওই ঘরে একটা আসন পাতা বসার জায়গা ছিল, আমি সেখানে গিয়ে বসেছিলাম। সেটা নাকি দোয়েলের এক দাদু যিনি সাধু ছিলেন, যিনি মারা গেছেন, ওটা তাঁর আসন। আমি সেই আসনে বসেছিলাম। সেখানে বসে সিগারেট খেয়েছি...।'

'তারপর আত্মীয় চলে যেতে ওই আসনে বসার জন্য দোয়েল তোমাকে কী বলল?'

'ঘটনাটা স্যার তারপরই ঘটল। আমি একটা পাপ কাজ করেছি। আত্মীয়টি চলে যেতে দোয়েল আমাকে ডাকতে ওই ঘরে ঢোকে। ও আমাকে দেখে আঁতকে ওঠে, কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি ওর কথা পাত্তা দিই না। ওই আসনে টেনে ওকে বসাই। হয়তো ওর কথা শুনেও ওই ঘরের ভেতর ওকে একা পেয়ে একটু বেশিই পাগলামি করি, আমার মাথায় যে কী ভূত চাপল! দোয়েল প্রথম দিকে বাধা দিয়েছিল, তারপর... যা আমার করা উচিত হয়নি। আমরা খুব বেহিসেবি আচরণ করেছি। এটা ঠিক নয়। ওটা ঠাকুরঘর। ওই আসন নাকি পঞ্চমুণ্ডির। ওই আসন আমরা অপবিত্র করে দিয়েছি।' অভিলাষ মাথা নিচু করে বসল।

অল্প সময় বিরতি। সরসকালী বললেন 'দোয়েল এখন কী বলছে?'

'দোয়েল নাকি অভিশপ্ত হয়ে গেছে।' অভিলাষ ঘরঘরে গলায় বলল।

'মানে?'

'এসব কথা জেনে যায় দোয়েলের রাঙাদাদু। আমি শুনেছি ওই আসন নিয়েই ওদের মামলা মকদ্দমা চলছে। তার মধ্যে আমি এই কাণ্ড ঘটিয়েছি। তিনিই বলেছেন।'

'রাঙাদাদু জানল কীভাবে?' সরসকালী ভদ্র বলেন।

'অপরাধবোধ থেকে দোয়েল কথাগুলো বলেছিল তুতুলকে। ওর কাছ থেকেই কীভাবে জানতে পারে রাঙাদাদু। তিনি দোয়েলকে ডাকেন, ডেকে প্রদীপের সামনে বসান। ওর পেট থেকে সব কথা বের করেন। তখনই রাঙাদাদু ওকে বলে ও অভিশপ্ত! ওই আসন নাকি ভয়ংকর। সাক্ষাৎ মৃত্যু। তা একবারে আসবে না।'

পাগলের মতো মাথা নাড়ায় অভিলাষ, 'আমি মারাত্মক অপরাধ করেছি, আমার ভুলে জড়িয়ে গেল দোয়েল। কী করলে দোয়েল মুক্তি পাবে আমি জানি না। আপনারা দোয়েলকে বাঁচান স্যার।'

'আমাদের কথা তোমাদের কে বলল?'

'মিতুল।'

'তুমি কী করো?'

'আমি মেডিকেলের ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট।'

সরসকালী বলল, 'তুমি ডাক্তারি পড়ছ?'

'হ্যাঁ, স্যার। এনআরএসএ আছি।'

'তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে এসব কথা বিশ্বাস করো?'

'বিশ্বাস অবিশ্বাস নয় স্যার, দিন দিন দোয়েল কেমন হয়ে যাচ্ছে। আপনি দোয়েলকে বাঁচান স্যার। আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে না। আমি ছোট জাত স্যার, আমি সরেই থাকব। কিন্তু আমার ভুলে ওর কিছু হলে আমাকে সুইসাইড করতে হবে।'

সরসকালী হো হো করে হাসলেন, 'দূর বোকা। কিচ্ছু হবে না। নিশ্চিন্ত থাকো। আমি দোয়েলের সঙ্গে কথা বলব। ওর ভয় কাটাতে হবে। ওর রাঙাদাদু ওকে বলেছে সব বিষয় সম্পত্তি দিয়ে দেবে।'

'বিষয় সম্পত্তি দিয়ে দেবে!' ফুঁসে ওঠে অভিলাষ। 'জানেন রাঙাদাদু কী বলেছে বলেছে? তুই অভিশপ্ত। বংশের ওই আসনকে তুই নোংরা করেছিস। তোর অভিশপ্ত জীবনে যাকে জড়াবি তারই অপঘাতে মৃত্যু হবে। ক্রমশ তোর রক্ত শুকিয়ে যাবে। একদিন একমুঠো ছাই ছাড়া কিচ্ছু থাকবে না তোর। দোয়েল রক্তশূন্য হয়ে পড়ছে স্যার, ওকে বাঁচান।'

সরসকালী বলেন, 'তুমি আর কদিন পরে একজন ডাক্তার হবে। তুমি একটা প্রবাদ নিশ্চয়ই জানো, শকুনের শাপে গোরু মরে না। তুমি আর কিছু বলবে? এই আমার কার্ড। এতে ফোন নম্বর আছে। একবার ফোন কোরো। তোমার নম্বরটা থাকলে আমি যোগাযোগ করতে পারব।'

'আর একটা কথা আমার বলার ছিল।'

'বলো।'

'বেশ কিছুদিন আগে দোয়েলের হোয়াটসঅ্যাপে দুটো ছবি আসে। একটা ছবি বাথটবে একটা রক্তাক্ত মেয়ে মরে পড়ে আছে। ছবিটা বড় করলে স্পষ্ট বোঝা যাবে ওটা দোয়েল। আরও একটা ছবি এসেছিল, তাতে ছিল একটা মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। সেই মেয়েটার মুখও দোয়েলের।'

'ছবিদুটো তুমি দেখেছ?'

'হ্যাঁ, দুটোই দেখেছি। আমার মনে হয়েছে ওটা ফোটোশপে দোয়েলের মুখ বসানো। কিন্তু দোয়েল আর মিতুলের মনে হয়েছে ওটা দোয়েল।'

'তুমি কি তুতুল মিতুলেরও বন্ধু?'

'তুতুলের থেকেই আমার সঙ্গে দোয়েলের আলাপ হয়। আমি আর তুতুল একসঙ্গেই টুয়েলভ পর্যন্ত পড়েছি।'

'তুতুল খুব ভালো মেয়ে।'

'হ্যাঁ স্যার ওরা দুই বোনই খুব ভালো। আসলে স্যার আমরা রজক। নাহলে হয়তো... ঠিক আছে স্যার আপনাকে আমি ফোন করে নেব।'

অভিলাষ চলে যায়। সরসকালী চুপ করে বসে থাকেন। তারপর আস্তে আস্তে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামেন। বলেন, 'আমি আপনি পচা গন্ধ পেয়েছি অভিলাষ কিন্তু গন্ধটা পায়নি।'

'আশ্চর্য!'

আমি চাপা গলায় বললাম, 'তুতুল কেমিস্ট্রির ছাত্রী!' কেমিকেলের কত বর্ণ, কত গন্ধ!'

সরসকালীর গাড়ি চলছে, গতিবেগ ঘণ্টায় বিশ কিলোমিটার, হয়তো একটু বেশিই বললাম। বুঝলাম, উনি ভাবছেন।

এগারো

...কাল শিয়াল ডাকছিল, শৃগাল। সারমেয়। কুকুর ডাকছিল। শৃগাল, সারমেয়, সর্প, বৃষ, চণ্ডাল। ওরা সব ওই আসন থেকে জেগে উঠছে একে একে। সবার প্রথম জেগে উঠেছে সর্প! সাপ। সেই সাপকে জাগিয়েছি আমি। সাপ জাগিয়ে আমি অভিশপ্ত। আমি...আমি সাপেরও হিসহিস শুনেছি। এবার একে একে সবাই জাগবে। শেষে জাগবে চণ্ডাল। মানুষের মুন্ডু এসে নৃত্য করবে।

মুকুলকিশোর বলল, 'ওর মাথায় ঢুকে গেছে ওই পঞ্চমুণ্ডির আসন থেকে সব একে একে জেগে উঠছে। ডিসগাস্টিং! কী করে যে এই সব মাথায় ঢুকল!'

কাল রাতে দোয়েলের জ্বর এসেছিল। সকালবেলা আমরা বেরিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার এসে ঘুরে গেছে। ডাক্তারবাবুর কথায় তেমন কিছু না, টেম্পারেচারও বেশি নেই। দুর্বল। একটু রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তৃষ্ণা ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। তৃষ্ণা ভাবছে ওকে একবার চেন্নাই নিয়ে যাবে। সাউথে দেখাবে। দেড় দু-মাস ধরেই দুদিন ছাড়া ছাড়া জ্বর আসছে। শরীরও ভেঙে যাচ্ছে দ্রুত।

সরসকালী আর আমি বসেছিলাম দোয়েলের ঘরে। তৃষ্ণা খুব কম কথার মানুষ। আমাদের সঙ্গে কাজের কথাটুকু বলে চলে গেল। কিন্তু মুকুলকিশোর ঠায় বসে আছেন। তাই বাধ্য হয়েই সরসকালী বললেন, 'মুকুলবাবু আমরা দোয়েলের সঙ্গে একটু কথা বলি।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়, নিশ্চয়।'

দোয়েলের এখন জ্বর নেই।

সরসকালী বললেন, 'দোয়েল তোমাকে পঞ্চমুণ্ডির আসন থেকে ওদের জেগে ওঠার কথা কে বলেছেন, তোমার রাঙাদাদু, তাই তো?' প্রশ্ন করলেন যিনি, তিনিই উত্তর দিলেন। সরসকালী দেখছি দোয়েলের সঙ্গে কথা বলার সময় সোজা ব্যাটে খেলছেন। উত্তরের অপেক্ষা করছেন না। 'কেন বলেছেন? সেটাও আমি জানি।'

সরসকালীর কথা শুনে দোয়েল চমকে উঠল। 'তোমার রাঙাদাদু জানতে পেরেছেন ওই পঞ্চমুণ্ডির আসনে তোমাকে জোর করে অভিলাষ বসিয়েছে। ওই আসনে বসিয়ে অভিলাষ তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়েছে, হয়তো তোমরা তোমাদের মতো আনন্দও করেছ...। হতে পারে সেই আনন্দ শারীরিক। যা অনেকের চোখে অন্যায়, খারাপ কাজ, ইত্যাদি ইত্যাদি...।'

কথাগুলো বলে সরসকালী ভদ্র থামেন। দোয়েলের মাথা নিচু। ওর চোখে জল।

সরসকালী বললেন, 'দোয়েল আমি তোমার জন্য কটা বই এনেছি। তার মধ্যে একটা শ্রীমৎ স্বামী নিগমানন্দ পরমহংস-র তান্ত্রিক গুরু বা তন্ত্র ও সাধন পদ্ধতি। এই বইটি পড়লে তন্ত্র সাধনা সম্পর্কে খুব সামান্য হলেও একটা ধারণা তুমি পাবে। তারপর আরও দু-একটা বই তোমাকে পড়াব। যদি তোমার আগ্রহ থাকে। আমি কেন তোমাকে এই বইটি দিচ্ছি, তার কারণ তন্ত্র সাধনার কয়েকটি কথা তোমাকে বলতে চাই। তোমার এখন যাবতীয় সমস্যার কেন্দ্রে শরীর। অথচ দেখো তন্ত্র সাধনায় বা শক্তি উপাসনায় শরীর কিন্তু ব্রাত্য নয়। পাঁচ-ম নিয়েই তন্ত্র। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন। এই শেষ ম-টি নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব। মৈথুন একটি লয় যোগ। মৈথুন ব্যাপারটি সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের কারণ। মৈথুনের ছটি অঙ্গ। এই যোগ ক্রিয়ায় শরীরের নাম আলিঙ্গন, ধ্যানের নাম চুম্বন, আবাহনের নাম শীৎকার, নৈবেদ্যর নাম অনুলেপন, জপের নাম বমণ, দক্ষিণান্তের নাম রেতঃপাতন। এটা একটা সাধন প্রক্রিয়া। তার বিভিন্ন পর্ব।'

সরসকালী থামেন, দোয়েল অদ্ভুতভাবে তাঁর দিকে তাকায়।

'দেখো দোয়েল, তুমি লেখাপড়া করা মেয়ে। তাই তোমাকে এই কথাগুলো বলতে পারছি। বাদবাকিটুকু তুমি নিজে পড়বে। যে কথার মানে বুঝবে না অভিধান খুলে দেখে নেবে। তন্ত্র কয়েক হাজার বছরের পুরনো এক শাস্ত্র। তোমার মতোই আমিও এর কিছুই বুঝি না। একটু করে পড়ছি, পড়ে পড়ে জানছি। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার রাঙাদাদুও সবটুকু জানেন না। আর যেটুকু জানেন তা খণ্ডিত বা তাঁর নিজের মতো করে দেখা। আর সেই দেখার মধ্যে বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য আছে। সে উদ্দেশ্য ভালো নয়। তাই, সেদিন তোমরা ন্যায় করেছ, না অন্যায় করেছ সে প্রশ্ন ভিন্ন। কিন্তু আমি বলব তোমরা ওই আসন নষ্ট করোনি। কারণ, তন্ত্রে শরীর এবং দুটি শরীরের মিলনও একটি সাধন প্রক্রিয়া। কে বলতে পারে, কোনও অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলিহেলনে তোমরা চালিত হয়েছ কি না? তিনি হয়তো চেয়েছেন ওই আসনে বসে তোমরা তন্ত্রের কোনও সাধন ক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের বন্ধন সুদৃঢ় করো। তুমি শরীর দেখছ দোয়েল, আমি কিন্তু ওই আসনে দুটি মানুষের, দুটি আত্মার মিলন দেখছি। তাহলে তুমি অভিশপ্ত হবে কীভাবে?'

সরসকালী থামেন। খুব ধীরে ধীরে বলেন, 'তোমার রাঙাদাদু বলেছেন সর্প জেগেছে? সাপ কীসের প্রতীক, একবার ভেবে দেখেছ? সর্প যৌনতার প্রতীক। তোমার রাঙাদাদু তোমাকে বুঝিয়েছে ঠাকুরঘরে, ওই আসন বেদিতে তোমাদের মেলামেশা, যা আমাদের কাছে ভালোবাসাবাসি, তা ওনার কাছে যদি যৌনতা হয়, তবে যৌনতা। সেই যৌনতার পাপে তোমরা পঞ্চমুণ্ডির আসনের সাপকে জাগিয়ে তুলেছ। মহাপাপ করেছ। অথচ উনি যদি একটু গভীরে যেতেন, তবে দেখতেন, যৌনতা মানে সৃষ্টি। তোমার রাঙাদাদু তোমাকে লয়, ধ্বংসের কথা বলেছেন। অথচ সৃষ্টির কথা বলেননি। উনি পারিবারিক সংঘাতে তোমার কয়েক মুহূর্তকে নিজের মতো করে ব্যবহার করছেন। নিজের মতো করে তোমাদের ব্যাখ্যা করেছেন।'

দোয়েল শক্ত হয়ে বসে। তার দু-চোখ বিস্ফারিত।

'আমার অল্প বুদ্ধিতে এটুকুই মনে হয়েছে। তন্ত্র নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন আমি তাঁদের সঙ্গেও কথা বলেছি, আলোচনা করেছি, তাঁরা কিন্তু তোমাদের কোনও দোষ খুঁজে পাননি। তাঁরা বলেছেন, ওই আসনে বসে তোমরা যা করেছ, তা যদি ভালোবাসা না হয়, তাহলে সেটা শারীরিক মিলন। তাঁদের কাছে যৌনতা বলে কোনও শব্দ নেই। যৌনতার কোনও কনসেপ্টই নেই। তারা মনে করে এটা সৃষ্টির আহ্বান। আর যা করেছ তা ওই আসনের আজ্ঞায়, অনুমতিতে। তোমাদের কেন, কারও ক্ষমতা নেই ওই আসন না চাইলে সে ওখানে বসে। ওই আসন তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আর একটা কথা, পঞ্চমুণ্ডির আসন মানেই সেটা জীবন্ত। তাকে আর নতুন করে ঘুম ভাঙাবে কে? কার এমন সাধ্য আছে? তাই কোনও অভিসম্পাতও এক্ষেত্রে খাটে না। তোমার রাঙাদাদু ভুল বলেছেন। আমি ওনার সঙ্গে তর্ক করতে পারি। বোঝাতে পারি। ওনার লক্ষ্য লয়, ধ্বংস। তোমাদের পরিবারের স্থিতি ধ্বংস করা, আর কিছু নয়। উনি ভালোমানুষ নন। আমি তোমার রাঙাদাদুর কাছে গিয়েছিলাম। আমি যেটুকু জানি, এই তত্ত্বকথাটুকু তাঁকে বলে এসেছি। উনি যেটা করছেন, তার নাম ব্ল্যাকমেল। উনি একজন ভণ্ড। আমি সেই কথাটুকুই তোমাকে বলতে এসেছিলাম। আর এই বইটি দিয়ে গেলাম। পড়ো। যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করো। ওনার দেখানো পথে তুমি হেঁটো না, এমনকী তোমার বাবার দেখানো পথেও হেঁটো না। অভিলাষ ভালো ছেলে। রজক, নিচু জাত, ছিঃ! ভালোবাসার কাছে, প্রেমের কাছে ছোট বড় উঁচু নিচু কোনওদিন ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না।'

আমি দেখলাম মুহূর্তে দোয়েলের মুখে আলো ফিরে এসেছে। মুখখানা চকচক করছে।

সরসকালী বললেন, 'এই সময় দাঁড়িয়ে কোনও মেয়ে এভাবে জাতের বিচার করতে বসে? অভিলাষের সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়েছে। খুব ভালো ছেলে। ও আমাকে কিছু ছবির কথা বলছিল। তোমার মোবাইলে কি ছবিগুলো আছে?'

শান্ত দোয়েল ঘাড় নাড়ল। 'না, নেই। ছবিগুলো দেখলে আমার খুব ভয় লাগত। আমি ডিলিট করে দিয়েছি।'

'বেশ করেছ। অভিলাষ বলেছে ওই ছবিগুলো সব ফোটোশপের কারিকুরি। সে জন্যই ও তোমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল। কিন্তু তুমি ওর ফোন ধরোনি। ও তোমার জন্য ভাবে, চিন্তা করে। তোমার জন্য খুব কষ্টে আছে। তোমাকে খুব খুব ভালোবাসে। এই ভালোবাসা পায়ে ঠেলে দিও না।'

আমি সরসকালীর দিকে তাকালাম। একজন চির ব্যাচেলর মানুষের মুখে প্রেম ভালোবাসার কথা শুনলে কেমন যেন বিস্মিত হতে হয়।

দোয়েল শান্ত গলায় বলল, 'রাঙাদাদু আমাকে ছাড়বেন না। আমাকে শুকনো করে দেবেন। ওই প্রদীপের শিখা এখনও জ্বলছে, উনি ইচ্ছে করলেই ফুঃ দিতে পারেন।'

সরসকালী উঠে দাঁড়ালেন, 'আমি এই বইয়ের আরও একটি কপি তোমার রাঙাদাদুর কাছে দিয়ে এসেছি। উনি পড়ছেন, বুঝছেন, না বুঝতে পারলে আমার নাম সরসকালী ভদ্র আমি তোমার রাঙাদাদুকে বোঝাব। বুঝিয়েই ছাড়ব। একজন ব্ল্যাকমেলারকে যেভাবে বোঝাতে হয়, সেভাবেই বোঝাব!'

সরসকালী উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, 'আর একটা কথা, একজন হরবোলা আর একটা মাইক্রোফোন এনে আমি তোমার রাঙাদাদুকে সারারাত ম্যাজিক দেখাব। উনি যেমন আমাদের ম্যাজিক দেখানোর চেষ্টা করছেন। কুকুর ডাকছেন, শিয়াল ডাকছেন। ছাদের ওপর আঁচড়ের, ঝগড়ার আওয়াজ শোনাচ্ছেন, আমি তেমন শুকনো আকাশে তোমার রাঙাদাদুকে ঝড়ের আওয়াজ শোনাব। দরজা জানালা খুলে দেখবেন, কিচ্ছু নেই। জেনে রেখো ওইসব আওয়াজও মিথ্যে। প্রতারণা। তারও প্রমাণ আমার কাছে আছে। সেই প্রমাণ দিয়ে আমি ওঁকে জেল খাটাতে পারি। কিন্তু তোমাদের পরিবারের মান সম্মানের কথা ভেবে আমি ওঁকে ছেড়ে দিচ্ছি।'

সরসকালীর কথায় দোয়েল হেসে ফেলল। 'রাঙাদাদু কিন্তু দারুণ মিমিক্রি করে। এর-তার গলা নকল করে চমকে দেয়। তাহলে রাঙাদাদু কি হরবোলা! ওই সব আওয়াজ রাঙাদাদুর করা।'

'একদম। আমার কাছে প্রমাণ আছে। আমরা এখন আসি দোয়েল, তুমি রেস্ট নাও। আর বইগুলো পড়ো। নিজের যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে সবকিছু দেখো। অন্যের চোখে নয়, নিজের চোখে দেখো।'

বারো

সিঁড়ি দিয়ে সরসকালী ভদ্র সোজা নেমে এলেন নীচে। তারপর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে উঠোন। উঠোন পেরিয়ে ওদিকে ও-তরফের বাড়ির দিকে লম্বা লম্বা পায়ে উনি হাঁটছেন। ওঁর পেছনে আমি। আমরা এসে সোজা ঢুকলাম অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়ের ডেরায়। গেট টপকাতেই বসে থাকা লোকটি দৌড়ে ভেতরে গেল খবর দিতে। উনি ওঁর সাধনার ঘর থেকেই গুরুগম্ভীর আওয়াজ তুলে বললেন, 'আসুন আসুন। তা ওদিকের খবর কী?'

সরসকালী গিয়ে সটান ওঁর সাধনার ঘরে ঢুকে পড়লেন। আজ আর দরজার সামনে জুতো খুললেন না। সামনে পেতে রাখা শতরঞ্চি নয়, দেওয়ালের ধার থেকে একটা চেয়ার টেনে এনে দোয়েলের রাঙাদাদুর মুখোমুখি বসলেন। বললেন, 'আমি আপনার দূত নই। আমি সরসকালী ভদ্র। আমার নামের পেছনে ভদ্র বলে একটা শব্দ আছে, তাই আপনার সঙ্গে অভদ্রতা করব না। যদি তন্ত্র সম্পর্কে কিছু সামান্য হলেও জানতে চান তাহলে এই বইগুলো আপনাকে আমি উপহার দিয়ে গেলাম। পড়ুন। যদি কোনও ভুল ধারণা থাকে, তার থেকে নিজে মুক্ত হোন, দোয়েলকে মুক্তি দিন। '

'আপনি আমাকে তন্ত্র শেখাচ্ছেন? এত বড় সাহস!'

'ওই যে বললাম, আমার নামের শেষে ভদ্র আছে। তাই অভদ্রতা করতে পারি না। বাধে। তবু একটা কথা আপনাকে আমি বলি, আপনি একটা বাচ্চা মেয়েকে ব্ল্যাকমেল করছেন। যে হিসেবমতো আপনার নাতনি। সেই ব্ল্যাকমেলের সব প্রমাণ আমার হাতে আছে। আপনার খেলা শেষ ভণ্ড তান্ত্রিক! আপনি ভয় দেখাচ্ছেন ওই প্রদীপের শিখায় ফুঃ দেবেন? আমি আপনাকে বলছি আমার গাড়ির ডিকিতে পাঁচ লিটার পেট্রল আজই কিনে রেখেছি। সেই পেট্রল আপনার গায়ে ঢেলে দিয়ে আমি ওই প্রদীপের শিখা আপনাকে স্পর্শ করিয়ে দেব। আপনার অনন্ত প্রজ্বলনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তারপর আমি প্রমাণ করে দেব চিরপ্রণম্য অগ্নি আপনাকে আলিঙ্গন করেছেন। আপনি মহান। আপনার নামে জয়ধ্বনি দেব। গলায় মালা দেওয়া আপনার একটা ছবি নয় রেখে দেব পঞ্চমুণ্ডির আসনের নীচে। চাইলে আপনার একটা মূর্তিও প্রতিষ্ঠা হবে এই বাড়িতে।'

'কী?' ঠিকরে উঠে দাঁড়ালেন অনিন্দ্যকিশোর।

উঠে দাঁড়ালেন সরসকালী, ঠান্ডা গলায় বললেন, 'ফাঁকা আওয়াজ ভাববেন না। মনে রাখবেন ভদ্রলোকের এক কথা! আর আমি ভদ্র। চলুন সুজনবাবু। এখানকার এসপি-র সঙ্গে একবার কথা বলে রাখি। আমাদের রাঙাকাকা, রাঙাদাদু, রাঙাবাবা, অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়ের মধ্যে একটা সুইসাইড টেনডেন্সি আছে। আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে জানিয়ে রাখব আত্মহত্যা মহাপাপ তবু উনি আত্মহননের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। আমি ওনার চিকিৎসা করছি। কিন্তু মনে হয় বাঁচাতে পারব না। উনি মৃত্যুবিলাসী। মরবেনই। আত্মঘাতী হবেন। মৃত্যু এগিয়ে আসছে ওনার দিকে। আপনার তন্ত্র যেমন ভালো কাজ ছেড়ে খারাপ কাজের দিকে ছুটছে, আমার শিক্ষাদীক্ষা অর্জিতবিদ্যাও সেভাবেই ব্যবহার হবে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বেঁকাতে হয়, আমি জানি।'

অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায় শান্ত গলায় বললেন, 'আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন। আমার শিষ্যশিষ্যারা যদি জানতে পারে তারা তাণ্ডব করবে। আমি বাঁচতে পারবেন না।'

'সেটাই তো আমি চাই। তারা জানুক। পুলিসের প্যাঁদানি কী জিনিস তারা জানে না। পেছন লাল করে দেবে। একবার চেষ্টা করে দেখুন না। তাহলে তো ভালো হয়। এলাকার লোকজনও আপনার ওপর খেপে, আপনাকে উৎখাতের দায়িত্ব তাহলে আর আমাকে নিতে হয় না, তারাই নিয়ে নেবে। ও হ্যাঁ আর একটা কথা, আমি আজ পারব না, দু-একদিনের মধ্যে সঙ্গে করে একজন হরবোলা নিয়ে আসব। আপনি যখন রাতের অন্ধকারে মাংসের হাড় ছুড়ে কুকুর দৌড় করাবেন, আর হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া করে শিয়াল ডাকবেন, আমি তখন হরবোলাকে দিয়ে বাঘের গর্জন করাব। আপনাদের পঞ্চমুণ্ডির আসনে তো বাঘ নেই। কিন্তু সেদিন রাতে দেখবেন বাঘ ডাকছে। কিংবা রেলগাড়ির আওয়াজ। আপনাদের বাড়ির ভেতর দিয়ে যদি ট্রেনের আওয়াজ হয়, কেমন লাগবে? নিশ্চয়ই আপনাদের পঞ্চমুণ্ডির আসনে পাঁচটি মাথার সঙ্গে ট্রেনের একটা কাটা ইঞ্জিন ঘুমিয়ে নেই? কিংবা প্রবল ঝড়ের আওয়াজ উঠবে। দরজা জানালা খুলে দেখবেন, আকাশ বাতাস শুনশান। একজন হরবোলা আর একটা মাইক্রোফোন এনে আমি সারারাত আপনাকে ম্যাজিক দেখাব। আট ঘণ্টা রাতের ঘুম কিন্তু সব মানুষের জরুরি। আপনি না ঘুমাতে দিলে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে হাজতবাস করাব। দয়া করে নিজে ঘুমান, অন্যকে ঘুমাতে দিন। হরবোলার নামে বাঁদরামি করবেন না। আপনার নাতনিও জানে আপনি একজন হরবোলা। এবার কিন্তু আমি ওই উঠোনে আপনাকে দাঁড় করিয়ে ব্যা ব্যা করিয়ে ছাড়ব।'

'আপনি কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।'

'এখনও সীমার মধ্যে আছি, তাই আপনাকে জানিয়ে গেলাম। নোটিস। এবার কাজ শুরু হবে। চলি। আবার দেখা হবে। যে কোনও সময়ে। অবশ্যই সেটা আপনার অসময়।'

আমরা দুজন গটগট করে অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আমরা যখন উঠোন পেরিয়ে এ-বাড়িতে ঢুকছি তখন আমাদের পাশ দিয়ে মিষ্টি হেসে মিতুল ওপরে উঠে গেল। আর ওদিকে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম তুতুল কুকুরদের বিস্কিট দিচ্ছে।

এ বাড়িতে ঢুকেই সরসকালী বললেন, 'তরণীবাবু খুব জমিয়ে চা খাওয়ান। কড়ক চা।'

আমি বিছানায় গা এলিয়ে বললাম, 'ব্যাপারটা কী হল?'

'আরে মশাই ঘটনাটি একটু আগে পরে করলাম। দোয়েলকে বলে এলাম তোমার রাঙাদাদুকে বই দিয়ে এসেছি। সেই বইটিই এখন, মানে পরে দিয়ে এলাম। নাহলে উনি বলতেই পারেন, কোনও বই পাননি। আর একটা কী জানেন বড্ড ঢিমে তালে দিন গড়াচ্ছে, কতদিন এখানে আটকে থাকব বলুন তো। খুঁচিয়ে এলাম। দেখাই যাক না অনিন্দ্যকিশোর কীভাবে কামড়াতে চায়। বড্ড রেগে গেছে। বেচারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আছে। এবার খেলা জমবে।'

'আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে?'

'প্রমাণ! প্রমাণ কিচ্ছু নেই, সবটাই অনুমান। তবে ভাববেন না, অন্ধকারে ঢিল ছুড়লাম। আমি জানি ওনার কাচের ঘর, আমি ঠিক ঢিলই ছুড়েছি। লেগেওছে ঠিক জায়গায়। দেখলেন না কেমন ঝনঝন করে আওয়াজ হল। দু-একদিনের মধ্যে চুরমার হওয়া দেখতে পাবেন।'

'তাহলে আজও বিনিদ্র রাত্রি!'

'বিনিদ্র কী? মন বলছে আজ রাতেই শেষ অঙ্ক! এরপর উনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না।'

'আজ তাহলে খুব সাবধানে রাত কাটাতে হবে।'

'না, না, আমরা ঘুমাব। ভয় দেখানোর দায়িত্ব ওনার। আমরা কেন ভয় পাবার জন্য রাত জেগে বসে থাকব।'

তেরো

কিন্তু শেষ অঙ্কের যবনিকা যে এভাবে উঠবে আমি ভাবিনি। প্রথম থেকেই বলা যাক অনেক রাত পর্যন্ত আমি আর সরসকালী বসে আছি। যতই বলি ঘুমিয়ে পড়ব, ঘুম কিন্তু আমাদের আসছিল না। আমাদের আশা ছিল কিছু একটা হবে। সরসকালী গিয়ে যে আঘাত করে এসেছে তাতে প্রত্যাঘাত আসবেই। না এলে এতকিছু বৃথা!

আজ এ-বাড়ির সদর দরজার চাবি আমাদের কাছে। একটু আগে সামনের দেওয়াল ঘড়িতে দেখলাম একটা। অনিন্দ্যকিশোর কি ঘুমিয়ে পড়লেন? প্রতিশোধ নেবেন না? আমরা বেশ আশাহত। সরসকালী বললেন, 'দোয়েলের রাঙাদাদুর ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ নেই। তাহলে ওঁর এই কাজগুলো কে করে দিচ্ছে? ফোটোশপে কারিকুরি, লোক লাগিয়ে করাচ্ছেন? শিষ্য-শিষ্যা!'

আমি বললাম, 'সাঁড়াশি আক্রমণ! একদিকে তন্ত্রমন্ত্র, অন্যদিকে আধুনিক টেকনোলজি।'

আমাদের কথার মাঝে একটা ঠক ঠক ঠক ঠক আওয়াজ ভেসে এল।

আমি বললাম, 'লাঠি ঠুকে ঠুকে কেউ হাঁটছে। কে হাঁটছে এত রাতে?'

'উঁহু, লাঠি নয় চিমটে। শুনলেন না দাদামশাই। দাদামশাইয়ের চিমটের আওয়াজ শুনে মুকুলকিশোরবাবু কাল কেমন নিশ্চিন্ত হলেন। বললেন আজ আর ভয় নেই।'

'পঞ্চমুণ্ডির আসন পেতে এই দাদামশায়-ই গোলমালটা পাকিয়েছেন। যার দখল নিতেই অনিন্দ্যকিশোরের এত প্ল্যানিং।'

সরসকালী বললেন, 'এখন পঞ্চমুণ্ডির আসন, নাহলে উনি অন্যকিছু নিয়ে ঘোঁট পাকাতেন। সাধারণত যিনি এই আসন পাতেন তিনিই জীবৎকালে পঞ্চমুণ্ডির আসন ভেঙে দিয়ে যান। তাহলে নিজের সাধনা সিদ্ধি করার জন্য যে পাঁচটি প্রাণীকে ওই আসনে জাগিয়ে তোলা হয়েছে তারা মুক্তি পায়। কিন্তু মৃত্যুর কথা তো বলে কয়ে আসে না, হঠাৎ যদি সাধক মারা যান, তখন তাঁর আসন নিয়ে সমস্যা হয়। বিধান আছে কোনও কুমারী মেয়েকে দিয়ে এই আসন গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হয়।'

ঠক ঠক ঠক ঠক আওয়াজটা ঘরের সিলিং স্পর্শ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অদ্ভুত একটা অস্বস্তি।

সরসকালী বললেন, 'ফ্যান চালালে ক্যালেন্ডার উড়লে এমন শব্দ হয়।'

কান খাড়া করে আওয়াজটা মাপতে মাপতে আমি বললাম 'হতে পারে।'

'তাহলে দোয়েলের রাঙাদাদু চ্যালেঞ্জটা নিলেন না। এত স্লো হলে চলে? আমরা কতদিন এখানে আটকে বসে থাকব।' সরসকালী বেশ হতাশ গলায় বললেন। 'আমি ভাবছি, মুকুলকিশোরবাবুদের বলব ওই আসন ভেঙে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দিতে। সব সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে যাবে।'

আমি সম্মতি জানালাম। 'ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু ওঁরা কি মানবেন?'

'ওদের মনের শান্তির জন্য একজন তান্ত্রিক ধরে আনতে হবে। বিধান যখন আছে, অসুবিধে কী? ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত না করেই কাজটি সারতে হবে। এটাই সোজা রাস্তা।'

আমাদের কথা জড়িয়ে আসছিল। আমরা দুজনেই ঘুমের মধ্যে চলে যাচ্ছিলাম। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল এক তীব্র আর্তনাদে।

আমি আর সরসকালী জেগে উঠেছি। সরসকালী বললেন, 'আপনি কিছু শুনেছেন?'

'একটা আর্তনাদ!'

সরসকালী আলো জ্বাললেন। আমরা বিছানায় উঠে বসলাম। ঘরের ভেতর অখণ্ড নীরবতা। এখনই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া যায়। কেননা আমরা দু-জনে একরকম তৈরি হয়েই ছিলাম। আমি হালকা গলায় বললাম, 'নারী কণ্ঠের আর্তনাদ!'

সরসকালী বিছানা থেকে নেমে পড়লেন। 'চলুন। দেরি করা উচিত নয়।' মাথার বালিশের নীচে থেকে রিভলভারটি বের করে পকেটে রাখলেন। দরজা খুলতেই দেখলাম মুকুলকিশোর, তৃষ্ণা, তরণীবাবু, একজন কাজের মহিলা উদগ্রীব হয়ে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে। মুকুলকিশোরের পায়ের সামনে লাঠির মতো বন্দুকটা রাখা।

আমাদের দেখে তরণীবাবু খুব নিচু স্বরে বললেন, 'বাবু আপনারা কিছু শুনেছেন?'

'হ্যাঁ, আর্তনাদ!' আমি বললাম।

সরসকালী বললেন, 'দোয়েল কোথায়?'

'ও ঘুমাচ্ছে, টের পায়নি।' খুব চাপা গলায় বলল তৃষ্ণা।

'ও কি একা?'

'না, তাতার আছে। আমি সন্ধ্যাকেও রেখে এসেছি। কিন্তু এমন চিৎকার কে করল? কোনও মেয়ের গলা মনে হল।'

'হ্যাঁ, একটা মেয়ের গলা, দু-বার আমি স্পষ্ট শুনেছি। আমি তখন কলঘরে ছিলাম।' তৃষ্ণার পাশে দাঁড়ানো শশী বলল।

সরসকালী বললেন, 'আমরা বাইরে যাব। তৃষ্ণা তুমি দোয়েলের কাছে যাও।'

বন্দুক হাতে মুকুলকিশোর নেমে এলেন, পাশে তরণীবাবু। 'চলুন, আমিও যাব।'

দরজা খুলে বাইরে এলাম আমরা। সামনের ঘাস জমির উঠোন জুড়ে আকাশের আলো ময়লা চাদরের মতো পড়ে। বেশ কিছুটা দূরে এ-বাড়ির বিশাল লোহার গেট। তালা ঝুলছে। গ্যারাজের দিকে চাপা অন্ধকার। ওদিকে পাঁচিলের একটা অংশ ভাঙা, সেখান দিয়েই মাঝে মাঝেই কুকুর ঢোকে। পাশেই দারোয়ান বুধনের ঘর। সরসকালী আগে, আমরা ওদিকে যেতেই দেখলাম, দরজা খুলে বুধন বেরিয়ে এল, অস্ফুট স্বরে বলল, 'বাবু!'

সরসকালী বললেন, 'কেউ কি বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে? তুমি কোনও চিৎকার শুনেছ?'

বুধন কাঁপতে কাঁপতে ঠাকুরঘরের দিকে হাত তুলে দেখাল। এ-বাড়িতে এসে প্রথম দিনেই আমরা ঠাকুরঘরে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা বাইরের দরজা দিয়ে নয়। বাড়ির ভেতরের এ-ঘর ও-ঘরের পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলাম। বরং ঠাকুরঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন সরসকালী। বাইরের দিকের যে দরজা সেটা বন্ধ থাকে, তালা ঝোলে। আমরা সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকালাম। সরসকালী বললেন, 'দরজাটা খোলা। তালা নেই।'

'তরণীবাবু আপনি কি তালা লাগাননি?' মুকুলকিশোর চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।

'না, বাবু, তালা তো খোলাই হয়নি।' তরণীবাবু জবাব দিলেন।

'তাহলে কে? কে তালা খুলল?' গর্জে উঠলেন মুকুলকিশোর। 'কার এত বড় সাহস!'

তখনই ওদিক থেকে বুধন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 'ঠাকুরঘরের ভেতরে কেউ আছে বাবু। ওদিক থেকেই চিৎকার করেছিল।'

বুধনের কথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে মুকুলকিশোর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আমার হাতের টর্চের আলো দরজার ওপর। মুকুলকিশোর বন্দুক তুলে হুংকার দিলেন ভেতরে কে বেরিয়ে আয় নইলে গুলি করব।

কোনও সাড়া শব্দ নেই।

সরসকালী বললেন, 'মুকুলবাবু কিন্তু গুলি করবে আমি বলছি, যে থাকুন বেরিয়ে আসুন। কোনও ভয় নেই।'

এবারও কেউ সাড়া দিল না।

তরণীবাবু বলল, 'বাবু চোর নয়তো? ঠাকুরের বাসনপত্র আছে।'

কিন্তু তরণীবাবুর কথা নস্যাৎ করে সরসকালী চিৎকার করলেন, 'অনিন্দ্যবাবু আমি জানি আপনি ভেতরে আছেন, এবার ফালতু গুলি খেয়ে মরবেন বেরিয়ে আসুন।'

তখনই ভেতর থেকে ঘন ঘন শ্বাস ফেলার শব্দ এল। শ্বাস নয় যেন ঝড়ের গর্জন!

'কে, কে ভেতরে?'

আমরা আর অপেক্ষা করলাম না। এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলাম। টর্চের আলো স্থির হয়ে আছে দরজায়। সরসকালী বললেন, 'মুকুলবাবু আপনি সরে যান।'

'না, না, আপনারা সরে যান, শয়তানটা থাকলে আজ গুলি করে মারব।'

সরসকালী বললেন, 'আমার কাছেও রিভলভার আছে। গুলি আমিও চালাতে জানি। আপনি সরে যান।'

সরসকালী আমাকে ইশারা করলেন, 'আপনি ওদিকে সরে গিয়ে আলো ফেলুন আমি দরজা খুলছি।'

দরজা ভেজানো ছিল। হাত দিয়ে ঠেলতেই খুলে গেল। আর টর্চের আলোয় দেখলাম মিতুল অদ্ভুতভাবে মেঝেতে বসে আছে।

'এ কী মিতুল তুমি!'

মিতুল ফ্যালফ্যাল করে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। মুকুলবাবু বললেন, 'ডান দিকে দরজার পাশে সুইচ বোর্ড আছে।'

ডানদিকে তরণীবাবু। ঝটিতি হাত বাড়িয়ে তিনি সুইচ টিপে দিলেন। ঘরের ভেতর লালচে একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোটা সিলিং থেকে লম্বা দড়িতে ঝুলছে। তার গায়ে ঝুল জমে প্রায় নিভেই আছে। কিন্তু সেই আলোর এক ঝলকে দেখলাম, মিতুল যেমন মেঝেতে অদ্ভুতভাবে বসে, তেমন পঞ্চমুণ্ডির আসনের পাশে রাখা চিমটেতে গলা গেঁথে পড়ে আছেন অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায়! গলা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে, চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। তাঁর দিকে তাকিয়ে যে কেউ এক ঝলকেই বুঝে যাবে ওঁর শরীরে আর প্রাণ নেই।

মুকুলকিশোর সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

সরসকালী বললেন, 'মুকুলবাবু এগোবেন না। এর পরের কাজ পুলিশের। আমরা শুধু মিতুলকে বের করে নেব।'

মুকুলকিশোর বললেন, 'বলেছিলাম না, দাদামশাই এসেছেন, তার চিমটের ঠক ঠক আওয়াজ আমি শুনেছিলাম, জানতাম আর কোনও ভয় নেই। দাদামশাইয়ের হাতেই নিকেশ হল।'

তরণীবাবু ঠক ঠক করে কাঁপছেন।

মিতুলের দৃষ্টি শূন্য। সরসকালী এগিয়ে গিয়ে ওর হাত ধরতেই মিতুল যেন সম্বিত ফিরে পেল। ভয়ার্ত চোখে তাকাল চিমটেতে গলা গাঁথা রাঙাদাদুর দিকে। তারপর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ করে আওয়াজ বেরিয়ে এল। তার দু-চোখে ভয়ের সঙ্গে আগুন জ্বলছে যেন। গোঁ গোঁ আওয়াজের ভেতর ভয়, না রাগ কেমন যেন একটা সন্দেহ থেকে গেল!

রাত নিঝুম!

দুই ছায়া মূর্তি এসে দাঁড়াল ঠাকুরঘরের বন্ধ দরজার সামনে। দুজনে একবার পুরো বাড়িটার দিকে তাকায়। অনিন্দ্যকিশোর বলেন, 'মাতব্বর দুটো ঘুমিয়েছি। আমার সঙ্গে লাগতে এসেছে, এবার দেখ মজা!'

মিতুল বলল, 'অভিলাষ আজ ওদের সঙ্গে দেখা করেছে।'

চাপা গলায় অনিন্দ্যকিশোর বললেন, 'খুব ভুল করেছ। ও কী করে জানল এ বাড়ির কথা? এখানে কী হচ্ছে?'

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মিতুল বলল, 'আমি বলেছি!'

'বলার আগে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করলে না!'

মিতুলের হাত থেকে অনিন্দ্যকিশোর কাটা হাত আর রক্তের প্যাকেট নেন। নিঃশব্দে বাইরের দরজার তালা খোলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিতুল, তাকে ভেতরে ডাকেন। দরজাটা ভেজিয়ে দিতে বলেন। অনিন্দ্যকিশোর পঞ্চমুণ্ডির আসনের সামনে এসে দাঁড়ান। তিনি পঞ্চমুণ্ডির আসনের ওপর কাটা হাতটা রাখেন।

মিতুল দেখল কাটা হাতটা আসনের ওপর রাখতেই সেটা কেমন তির তির করে কাঁপছে। না, চোখের ভুল! সে দেখল কাটা হাতটা একটু একটু নড়ছে। মিতুল স্থির চোখে তাকিয়েছিল। ও কি ঠিক দেখছে! ওকে যেন বোবায় ধরেছে। সে কি রাঙাদাদুকে বলবে। কিন্তু তার গলায় জোর নেই।

অনিন্দ্যকিশোর এসব দেখেননি। তিনি তখন প্রস্তুত হচ্ছেন প্যাকেট খুলে ঘরময় রক্ত ছড়িয়ে দেবেন। কিন্তু প্যাকেট থেকে এক ফোঁটা রক্ত পড়ার আগেই মিতুল দেখল, বেদির ওপর রাখা কাটা হাতটা নড়ছে। হঠাৎ জীবন্ত হয়ে লাফিয়ে উঠল। সেই হাতে যেন বিদ্যুতের জোর! তার ঝটকায় রাঙাদাদু ছিটকে পড়ল বেদির ধারে। আর তার গলায় গেঁথে গেল দাদামশাইয়ের রেখে যাওয়া চিমটে।

প্রবল জোরে আর্তনাদ করে উঠল মিতুল!

চোদ্দো

এর আগে আমরা মিতুলকে বার তিনেক দেখেছি। কথা হয়নি, আমাদের দেখে হেসেছিল। আমরা তুতুলের খোঁজ নিয়েছি, তুতুল এম এসসি করছে। কিন্তু মিতুল যে মেডিকেলের ছাত্রী একবারও জানতে চাইনি। জানতে চাইলে হয়তো, ওকেও নজরে রাখা যেত। অনিন্দ্যকিশোর কাজে লাগিয়েছিলেন মিতুলকে। তার নজর ছিল ঠাকুরঘরের পঞ্চমুণ্ডির আসন।

তাহলে বলব, মিতুলও হয়তো অনিন্দ্যকিশোরকে কাজে লাগাচ্ছিল। তার নজর ছিল অভিলাষের দিকে।

তুতুলের বন্ধু অভিলাষ এক সময় পড়াত মিতুলকে। সেখানে থেকেই চোরাটান মিতুলের। মিতুল সেটা অভিলাষকে বলেওছিল কিন্তু অভিলাষ ধমক কষিয়ে তাকে পড়ায় মন দিতে বলেছিল। বলেছিল, ওসব পাগলামি ছাড়! তুই একটা পাগলি!

কিন্তু সেই পাগলি মিতুল অভিলাষের প্রেমে পাগল হয়ে পড়ে গেল আর এক পাগল রাঙাদাদুর হাতে। শুরু হল রাঙাদাদুর নানা খেলা। সেই খেলার সঙ্গিনী মিতুল। ফোটোশপের কারসাজি করে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠিয়েছিল মিতুলই। যা সে সরসকালীর কাছে স্বীকার করে। তবে শেষ খেলাটি ছিল মারাত্মক।

মিতুল কোনও এক সময় গাঙ্গুলীবাড়ির ঠাকুরঘরের বাইরের দরজার তালার ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়েছিল। সে চাবি ছিল অনিন্দ্যকিশোরের কাছে। ঠিক ছিল মিতুল কোনও এক ফাঁকে সন্ধেবেলা ঠাকুরঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দেওয়া বাইরের দরজার খিল ও ছিটকিনি খুলে রাখবে। তারপর রাতে রাঙাদাদু খেলবে একটা ভয়ঙ্কর খেলা। খেলার উপকরণ জোগাড় করেছিল মিতুল। ব্ল্যাড ব্যাঙ্ক থেকে এনেছিল এক প্যাকেট রক্ত। মানুষের রক্ত! আর মর্গের ডোমকে ঘুষ দিয়ে এক বেওয়ারিশ লাশের কব্জি থেকে কেটে নেওয়া হাত। আঙুল সহ হাতের কাটা তালুটা সে ড্রাই আইসের ভেতর প্যাকেট করে দু'দিন আগেই জোগাড় করে এনেছিল। কিন্তু ঠিক ছিল সরসকালীরা চলে গেলে ধীরে সুস্থে এটা এক রাতে ঠাকুরঘরের ভেতর রেখে দেবে। কিন্তু সরসকালী অনিন্দ্যকিশোরের ঘরে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করে আসায়, তিনি মিতুলকে বলেন আজই ঘটনাটি ঘটাতে হবে। সেই মতো মিতুল এ-বাড়ি এসে ফিরে যাওয়ার সময় এক ফাঁকে ঠাকুরঘরে ঢুকে বাইরের দরজার ছিটকিনি খুলে দেয়। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে অনিন্দ্যকিশোরের ফোনে মিতুল আসে রক্তের প্যাকেট আর কাটা হাতের তালু নিয়ে হাজির হয় ঠাকুর ঘরের সামনে।

তারপরেই এই ঘটনা ঘটে।

কাটা হাতটার হদিশ আমরা পাইনি। তবে মিতুলের কথামতো রক্তের প্যাকেট পাওয়া গিয়েছিল ঘরের বাইরে। আর পোড়া গন্ধ, গাড়ির গায়ে বিচ্ছিরি গন্ধ সবই মিতুলের কাজ। এই সব গন্ধমাদন আমদানি করেছিল তুতুলের কেমিস্ট্রি বিদ্যা থেকে। যা বিভিন্ন কথা কথায় সে তার দিদির কাছে থেকে জেনেছিল। তুতুল ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি মিতুল এই গন্ধ নিয়ে এমন খেলা খেলছে।

কয়েক দিন পরে থানা পুলিশের কাজ মিটলে পঞ্চমুণ্ডির আসনটি ভাঙা হয়। তুতুলই সেটা বিসর্জন দেয় গঙ্গায়। ওরা এ বাড়ি ছেড়ে পরের সপ্তাহেই সল্টলেকে চলে যাচ্ছে। দোয়েলও ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠে। অভিলাষের সঙ্গে সম্পর্কটা সে রাখছে। তবে সেটা আপাতত গোপন।

এই কাহিনি এখানেই সমাপ্ত।

কিন্তু সরসকালী ভদ্র এখানেই কাহিনির সমাপ্তি ঘোষণা করেননি। তিনি তাঁর পরিচিতি ও ডাক্তার মহলের প্রভাব খাটিয়ে মিতুলের হাসপাতালে খোঁজ নেন। উদ্দেশ্য কাটা হাত! সেই কাটা হাতটা তো খুঁজে পাওয়া যায়নি ঠাকুরঘরের কোথাও। তাহলে হাতটা গেল কোথায়?

কিন্তু তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন ওই সময় কোনও বেওয়ারিশ লাশেরই হাত কাটা ছিল না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে তবে কি কোনও কাটা হাতই মিতুল নিয়ে যায়নি। নিয়ে গিয়েছিল সেরেফ একটা রক্তের প্যাকেট। কাটা হাতের কথাটা মিথ্যে?

প্রশ্ন ওঠে তবে কি অনিন্দ্যকিশোর গঙ্গোপাধ্যায় ঠাকুরঘরের দরজা খোলা পেয়ে, পঞ্চমুণ্ডির আসন পেয়ে, হাতের মুঠোয় কুমারী এক নারী পেয়ে...কোনও সাধনক্রিয়ায় মেতে উঠতে চেয়েছিলেন?

সাধনক্রিয়া নাকি রতিক্রিয়া!

পঞ্চমুণ্ডির আসনের ভেতর শীতঘুমে থাকা কোনও প্রাচীন সাপ জেগে উঠতে চেয়েছিল হিসহিস করে? আর স্পষ্ট করে 'না' বলা মিতুল, প্রবল আপত্তি করা মিতুল, তীব্র প্রতিবাদ করে চিমটেটা আমুল বসিয়ে দিয়েছিল অনিন্দ্যকিশোরের গলায়?

হতে পারে, হতেই পারে।

কিন্তু কে এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন সরসকালী ভদ্র?

তিনি যে এ প্রশ্নের মীমাংসা চান না।

অধ্যায় ১ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%