জয়ন্ত দে
আমি বা রাধা কেউ গল্পটি শুনতে চাই না। কিন্তু লোকটা যেন নাছোড় তিনি আমাদের গল্পটি শুনিয়েই ছাড়বেন। উনি দু-দুবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলেছিলেন, মানে শুরু করেছিলেন 'আপনারা যেখানে উঠেছেন জায়গাটা সুবিধের নয়।'
ওঁর প্রথম কথায় আমি একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। ঘাড় বেঁকিয়ে তীক্ষ্ন গলায় জিগ্যেস করেছিলাম 'কেন, এখন তো শান্তিপূর্ণ। এখানে কোনও অশান্তির খবর নেই। তাহলে?'

লোকটা আলতো ঘাড় কাত করে, এক হাত জিভ কাটল, 'না, না মশাই, উগ্রপন্থা এখন উবে গেছে। চারদিকে শান্তি বিরাজমান! ধূপ ধুনো! কর্পূরের ঘ্রাণ!'
কথাটা বলে লোকটা অদ্ভুত হাসল। আমি ওর হেঁয়ালিপূর্ণ হাসি আর কথা ধরেই জিজ্ঞাসা করতে পারি তাহলে কেন জায়গাটা সুবিধের নয়?
না, জানতে চাইলাম না। কেন না, রাধা আমার দিকে বিরক্তির চোখে তাকাল। ওর মুখের রেখায় লেখা লোকটা বেশি বকছে।
আমি আর ঘাঁটালাম না। আমরা থাকব দু-দিন, সেখানে এত সুবিধে অসুবিধের কী আছে?
লোকটা বলল, 'অনলাইনে বুক করেছেন? তাহলে আগেই জেনেছিলেন নিশ্চয়ই কোনও কেয়ারটেকার নেই। যা আছে, তাকে কেয়ারটেকার বলা চলে না। আধা। হাফ। ওই মুদি দোকানদার রামশঙ্করের কাছে চাবি থাকে। ওর সঙ্গে সেটিং। কেউ এলে চাবি দিয়ে দেয়। ব্যস। যা খেতে চাইবেন ওর দোকানে বলে দিলে টিফিন কৌটো আসবে। ভাত, রুটি, চিকেন। দেশি মুরগি চাইলে, দেশিই মিলবে। সেটা বলে দিতে হবে। নইলে পল্ট্রি । ডিমও দেশি-পল্ট্রি আছে। যা লাগবে মুখ ফুটে বলবেন, মিলে যাবে। চা চাইলে ফ্লাক্সে! দারু চাইলে বোতলে, একশো টাকা বেশি। রামশঙ্করই ব্যবস্থা করে দেবে। আর...'
রাধা বলল, 'এখানে কি আর টোটো আছে, না, এই একটাই?'
লোকটা বলল, 'এদিকে আর কারও টোটো নেই। আমারটাই ভরসা। কেন আপনাদের কি আরও বন্ধু বান্ধব আসবে, কজন? আমার গাড়িতে আরও চারজন হয়ে যাবে।'
'না, আর কেউ আসবে না। আর কোনও টোটো থাকলে তাহলে আমরা...'
আমি রাধার দিকে তাকালাম। রাধা এমনধারাই কথা বলে। ইশারায় রাধাকে থামালাম। রাধা নির্ঘাত লোকটার মুখের ওপর বলত, তাহলে আপনার টোটোটা নিতাম না। অন্য গাড়িতে যেতাম।
রাধা আগাগোড়া এরকম। সহনশীলতা বড্ড কম। এইজন্য ওকে অনেক সমস্যাতেও পড়তে হয়। ওর ভেতর ভেতর রাগ জমে, তারপর দুম করে বার্স্ট করে। রাধা বাইরের প্রকৃতিতে চোখ রেখেছিল, আমার দিকে তাকাতেই বললাম, 'কুল, কুল!'
'কুল! কুল গাছ দেখছেন স্যার? সব টোকো কুল, মুখে তুলতে পারবেন না।' লোকটা ফুট কাটল।
লোকটার কথায় আমি কোনও উত্তর করলাম না। লোকটা বলল, 'কী আজব ফল মাইরি, যেমন টক তেমন কাঁটা!' লোকটা হাসল। 'বলুন ম্যাডাম, গোলাপের কাঁটা মানুষ সইবে, কিন্তু কুলের কাঁটা কেন সইবে? তাই মানুষ কষ্ট করে ছোঁয় না। যেটুকু নাগালে পেল সেটুকুই ভালো। গাছ ঝেঁপে হয়, আদাড়ে বাদাড়ে পড়ে থাকে। কী ম্যাডাম ঠিক বলিনি? কথাটা ভেবে দেখবেন।'
ধীর গতি কিন্তু রয়ে সয়ে টোটো চলেছে। যাব জঙ্গলের ভেতর একটা কালী মন্দির আছে সেখানে। আসলে আমরা মন্দির দেখতে যাচ্ছি না, যাচ্ছি কিছুটা বেড়াতে, কিছুটা জঙ্গলের নির্জনতা উপভোগ করতে। কিন্তু এই মানুষটাকে না থামাতে পারলে জঙ্গলের নির্জনতা চৌপাট হয়ে যাবে।
আজই এসেছি জঙ্গলগড়ের এই রিসর্টে। নির্জন এই জায়গার খোঁজ পেয়েছিলাম ফেসবুক থেকে। কেউ একজন ঘুরে এসে ফেসবুকে রিভিউ লিখেছিল। সেখান থেকেই ফোন নম্বর নিয়ে ফোন। তারপর এখানে আসা। ওখানেই ছিল ধ্বংসস্তূপ হওয়া এই মন্দিরের কথা।
বেরিয়েছি সকালে। হাওড়া স্টেশনে এসে ট্রেন ধরা। সাড়ে এগারোটা মধ্যে অজয়ের ধারে এই রিসর্টে ঢুকেছি। আমাদের নিয়ে আসার সময় এ-লোকটাই কিছু খোঁচামারা কথাবার্তা বলেছিল। এই রিসর্টে কেন এলাম? বলেই দিল, এরপর যখন আসবেন 'অজয় বননিবাসে' উঠবেন। সেফ। বেশ বুঝতে পারছিলাম ওই বননিবাসের সঙ্গে ওর বন্দোবস্ত আছে। কমিশন। তবে এখানে আনসেফ কেন সেটা অবশ্য তখন বলেনি। দুপুরে জঙ্গলগড়ের পাতা কালীমন্দির দেখতে যাওয়ার কথা বলতে প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। স্পষ্ট বলল, ওখানে কী দেখবেন স্যার, ভাঙা মন্দির, আর জমিদারবাড়ির ধ্বংসস্তূপ। দেখার কিছু নেই।
ওর কথা বলার ভঙ্গিতে আমার জেদ চেপে গেল। আমি টাকা দিয়ে যাব, ওর কথা শুনব কেন? শান্ত গলায় বললাম, ওখানেই যাব।
আমি জেদ ধরায় শেষে রাজি হল। এখন আবার যাওয়ার সময় ছুঁক ছুঁক করছে কী একটা গল্প শোনাবে বলে।
গল্পটা শোনার ইচ্ছে আমার ছিল। কিন্তু রাধার মুখ দেখে সাহস পেলাম না।
রাধা প্রথম থেকেই লোকটাকে সহ্য করতে পারছিল না। সেটা কেন আমি বুঝতে পারছি না। খেতে বসে, যখন রামশঙ্করের সঙ্গে কথা বলছিলাম, টোটোচালক কখন আসবে, জানতে চাইছিলাম, তখনই রাধাই অস্ফুটে বলল, 'অসহ্য।'
খেয়ে উঠে রাধা বলল, 'ওই টোটোর লোকটাকে সহ্য করতে পারছি না।'
'কেন?'
কেন কথার উত্তর রাধা দিতে পারল না। লোকটা একটু বেশি কথা বলে, একটু বেশি স্যার স্যার ম্যাডাম ম্যাডাম করছিল। লোকটা যেতে যেতে আবার বলল, 'আচ্ছা, ওই পাতা কালীর সন্ধান আপনাদের কে দিল?'
রাধা কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি ওর হাত চেপে ধরলাম। কিন্তু ওর কথার উত্তরে মৌন থাকা যাবে না।
খুব স্পষ্ট গলায় বললাম, 'কেন বলুন তো, এ প্রশ্ন করছেন?'
'না, ওখানে তো কেউ সচরাচর যায় না।'
রাধা বলল, 'আমরা যাব।'
'যান, এই তো আমি নিয়ে যাচ্ছি। যেতে চাইলে কে বারণ করবে ম্যাডাম। তবে জায়গাটা ঠিক সুবিধের নয়।'
'সুবিধের নয় মানে? আপনি আসার সময় বলছিলেন, রিসর্টটা সুবিধের নয়। এখন বলছেন, কালী মন্দির সুবিধের নয়। এখানে কী সুবিধের তাহলে?'
লোকটা হাসল, 'আর সবই। আসলে একটা গল্প আছে, কাহিনি।'
রাধা বলল, 'আমরা কোনও গল্প শুনব না। আপনার যদি নিয়ে যেতে অসুবিধে না থাকে চলুন। আর অসুবিধে থাকলে গাড়ি ঘোরান। আমরা ফিরে যাব। আপনার ভাড়া আপনি পেয়ে যাবেন।'
লোকটা ম্লান হাসল, 'রাগ করছেন ম্যাডাম। এসে তো গেছি, এই বাঁকটা ঘুরলেই মন্দির। সাবধানে যাবেন সাপখোপের খুব উৎপাত। যতটা পারবেন শুকনো পাতায় কম পা দেবেন। কার গায়ে কখন পা পড়ে যায়।'
আমি বিড়বিড় করলাম, সাপখোপের এখনও শীতঘুম ভাঙেনি। যত্তসব!
মন্দিরটা খুব পুরনো। ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। বট অশ্বত্থের শিকড় সারা মন্দিরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। পেছনদিকে বিশাল এক ধ্বংসস্তূপ। বোঝা যায় মন্দির লাগোয়া কোনও বড় বাড়ি ছিল। চারদিকে শুকনো পাতার স্তূপ। এক পা ফেললেই মচমচ আওয়াজ উঠল।
রাধা দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, 'আমি ওদিকে যাব না। আমি বরং ওই চাষ হয়েছে, ওদিকে যাচ্ছি। ওদিকটা খুব সুন্দর।'
লোকটা বলল, 'সেই ভালো, সেই ভালো ম্যাডাম। আপনি ওদিকে যান। সত্যি বলতে কি এদিকে কিছু দেখার নেই।'
আমি বললাম, 'আরে মন্দির দেখতে এলাম তুমি ওদিকে যাবে?'
টোটোচালক বলল, 'মন্দিরে আপনি ঠাকুর দর্শন করতে পারবেন না। বছরে একবার...অমাবস্যার সময় মন্দির খোলা হয়, বাদবাকি সময় বন্ধই পড়ে থাকে। কেউ ভুলেও আসে না।'
মন্দিরের দরজা বন্ধ। ছোট একটা তালা ঝুলছে।
আমি একটু এগিয়ে আবার ডাকলাম রাধাকে। আমার ঠিক পেছনে টোটোচালক। সে বলল, 'আর বেশি এগোবেন না স্যার।'
আমি হাত ওড়ালাম, 'ঠিক আছে।'
আমার পাশে এসে দাঁড়াল টোটোচালক। বলল, 'দাঁড়িয়ে যান স্যার।' এবার আবারও একটু তুচ্ছ করার ভঙ্গিতে বলল, 'আছেটা কী এখানে? ভাঙা খণ্ডহর, ধ্বংসস্তূপ। এখানকার খবরটা আপনাদের কে দিল বলুন তো? আমরা তো পারতপক্ষে এখানে কাউকে আনতে চাই না। এখানকার কথাও বলি না। পাপ! পাপ!'
আমি বললাম, 'আপনার নাম কী?'
'শম্ভুচরণ চক্রবর্তী। সবাই শম্ভু বলে।'
'চলুন ওদিকে যাই।' আমি শম্ভুচরণকে বললাম, 'ওদিকে কী আছে?'
'ওদিকে মন্দিরের আর একটা সাইড, আর কিছু নেই।'
শেষ দুপুরে বেরিয়েছিলাম, ঝপ ঝপ করে দিনের আলো কমে আসছে। শীত শহর থেকে বিদায় নিলে কী হবে এখনও এখানে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে।
আমি বললাম, 'কী হল ভয় পাচ্ছেন সাপ?'
শম্ভুচরণ ওদিকেই তাকিয়ে আছে। বলল, 'এর আগে আমি এখানে বেশ কয়েকবার এসেছি। জায়গাটা আমার ভালো লাগে না। শরীর খারাপ করে স্যার, শরীর কেমন ভারী হয়ে আসে। গলা বুক শুকিয়ে যায়। মনে হয়, কেউ যেন আমাকে দেখছে। মানে আমাদের দেখছে। আর যে দেখছে, সে যেন পছন্দ করছে না। চলে যেতে বলছে। আমি যেন তাকে ডিসটার্ব করছি। মনে হয় কত তাড়াতাড়ি চলে যাব।' শম্ভুচরণ একনাগাড়ে কথাটা বলল।
আমি শম্ভুচরণের দিকে তাকালাম। পরক্ষণেই মুখ ফিরিয়ে সামনে দেখলাম। রাধা গাছের তলায়। আমি সামনে এক পা এগোতেই শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি উঠল। আর তখনই শম্ভুচরণ বলল, 'শুনলেন?'
আমি চমকে উঠে বললাম, 'কী?'
'কেমন আওয়াজ হল।'
'শুকনো পাতার আওয়াজ। আমি হাঁটলাম।'
'না, না' শম্ভুচরণ একটু আতঙ্কের গলায় বলল, 'এখানে কেউ আসুক, উনি পছন্দ করেন না। এটা তারই গলার আওয়াজ। স্যার ফিরে আসুন।'
আমি আবার দু-পা ফেলে এগিয়ে গেলাম। বাঁক পেরিয়ে দেখি পুরনো ধ্বংসস্তূপ হওয়া প্রাসাদ, মন্দির। ধ্বংসস্তূপেরও একটা সৌন্দর্য আছে। রাধাকে দেখাই। একটু অধৈর্য হয়েই গলা তুলে ডাকতে গেলাম রাধা!
'আঃ, এত চিৎকার করবেন না স্যার। চুপচাপ এসেছেন, দেখছেন, দেখুন, ফিরে যাবেন। হইচই চিৎকার চেঁচামেচি উনি পছন্দ করেন না।'
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছি। 'কে পছন্দ করেন না?'
'সাধু স্যার। এখানকার দখলদার সাধু। ভালো নয় স্যার। খতরনক স্যার! তবে তাঁকে না ডিসটার্ব করলে তিনি কারও ক্ষতি করেন না।'
'সাধু আবার ভালো নয়। তাহলে তো অসাধু। সে আবার খতরনাক?' আমি তির্যক গলায় বলি।
'হ্যাঁ স্যার, এই মন্দিরে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন। সাধু ছিলেন না স্যার, তান্ত্রিক। পিশাচ সাধনা করতেন। মন্দিরে বলি দিয়েছিলেন এই বাড়ির একটা ছেলেকে। কেউ জানতে পারেনি। এখানে পিশাচ জাগিয়েছিলেন। সেই পিশাচই সব ধ্বংস করে দিল। সব কিছু শুকিয়ে দিয়েছিল। শুকনো হতে হতে এ বাড়ির মানুষগুলো মরে গিয়েছিল। যারা দেখেছিল তারা বলত, সব শুকনো পাতা হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে গাছ দেখুন, পাতা গজায় কিন্তু সে পাতা বড় হওয়ার আগেই ঝরে যায়। ওই পিশাচ সাধু শুকনো পাতা খেত। আসলে মানুষ খেত। এদিকে কেউ ভুলেও আসে না, এলে ফেরত যায় না।'
শম্ভুচরণের কথা শুনে আমি হাসি। 'কোথায় সেই সাধু? সাধু না অসাধু! দেখাও তো, তাকে একবার দেখি। কেমন সে মানুষ খায়?' আমি হাসি।
'হাসবেন না। ওই সাধু আর দেহে নেই, কিন্তু তিনি আছেন, তিনিও নাকি শুকনো পাতা হয়ে এখানে আছেন। এই শুকনো পাতার ভেতর মিশে আছেন। কোনও একটা শুকনো পাতার রূপ ধরে।'
আমি হাসি। হাসতে হাসতে এগিয়ে চলি। জমানো শুকনো পাতার ওপর পা ছুড়ি, শুকনো পাতাগুলো আমাদের সামনে তালগোল পাকিয়ে উড়ে যায়।
'এমন করবেন না স্যার ওর মাটিতে দাঁড়িয়ে ওনার নিন্দে-মন্দ, হে পিশাচবাবা ক্ষমা করো বাবা।' শম্ভুচরণ মাথার ওপর দু-হাত তুলে প্রণাম করে। 'স্যার আলো কিন্তু কমে আসছে। অনেকটা জঙ্গলের পথ যেতে হবে, ম্যাডামকে ডাকছি, চলুন এবার আমরা ফিরে যাই।'
আর একটু দেখি আপনার পিশাচ সাধুর সঙ্গে দেখা হয় নাকি।
আমি গলা তুলে সাধুকে ডাকার চেষ্টা করলাম। গলায় তেমন জোর পেলাম না। সে যেন নিজেই শুনতে পেলাম না, কোনও সাড়া শব্দ নেই। আবার ডাকতে যাই, হঠাৎ মনে হয় আমার গলায় যেন স্বর নেই। গলা খাঁকারি দিই। ঠান্ডা লেগে গেল? হতেই পারে কোন সাতসকালে বেরিয়েছি। বোবার মতো আমার পেছনে দাঁড়িয়ে শম্ভুচরণ।
সত্যিই দিনের আলো কমছে। আমি সামনের দিকে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম। মন্দিরের তালা দেওয়া দরজা। ঠেললাম। একটু ফাঁক হল। ভেতরে নিকষ অন্ধকার। পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বালালাম। আলো ফেললাম ভেতরে। ভেতরে একটা বড় পাথর। তার সারা গায়ে সিঁদুর লেপা।
আমি গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, 'ভেতরে একটা সিঁদুর মাখানো পাথর।' কথাটা শেষ করতে পারলাম না, গলাটা মুচড়ে উঠল।
শম্ভুচরণ বলল, 'ওই পাথরটাই পাতাকালী। প্রণাম করুন স্যার। বলুন রক্ষা করতে।'
আমি গলা চেপে বললাম, 'আর সেই অসাধু!'
শম্ভুচরণ গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে, যেন আমার কথা ঠিক পছন্দ হল না। আমি এবার বাঁদিকে এগিয়ে যাই।
'ওদিকটা যাবেন না স্যার।'
দ্রুত এগিয়ে চলি। ওই শম্ভুচরণ এত বারণ করার কে? মাতব্বর! একটা উঁচু মতো ঢিবি জায়গা দেখি। আমি মৃদু স্বরে ডাকি, 'শম্ভুবাবু আসুন।'
'আর যাবেন না স্যার।'
আমি এগিয়ে যেতে চাই। আমার দিকে কয়েক পা ছুটে আসে শম্ভুচরণ, 'চলে আসুন, ওদিকে যাবেন না স্যার।'
আমি ওর কথায় কর্ণপাত করি না। এগিয়ে যাই। এখানে মাটি দিয়ে জায়গাটা উঁচু। সেই উঁচু জায়গাটার ওপর একটা ঢিবি। আমি এগিয়ে গেলাম। আর দ্রুত যেতে গিয়ে শুকনো পাতা চাপ একটা গর্তের ভেতর আমার পা আটকে, হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমি অপ্রস্তুত, উঠে পড়ে ওঠার চেষ্টা করছি। কিন্তু এ কোথায় পড়লাম? আমার গলাটা যেন কোথায় ঢুকে। দ্রুত উঠে বসলাম। কেউ আসার আগেই উঠে বসেছি, আমার সামনে একটা হাড়িকাঠ। আরে আমার গলাটা এই হাড়িকাঠের মধ্যেই ঢুকে গিয়েছিল!
হাড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় শম্ভুচরণ বলল, 'পড়ে গেলেন, হে মা পাতাকালী রক্ষা করো মা। স্যার এবার চলুন স্যার।'
আমি উঠে বসি। আমার সারা গায়ে শুকনো পাতা লেগে। দু-হাতে ঝাড়ি। শম্ভুচরণ এগিয়ে এসেছিল। ওর দু-চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। আমাকে ধরে তুলল।
আমরা গিয়ে বসতেই শম্ভুচরণ টোটো স্টার্ট দিল। গাড়ি একটু গড়াতেই বলল, 'বড্ড দেরি করলেন। অন্ধকার নেমে যাবে। এখন অনেকটা পথ।' একটু থামল, তারপর ভাঙা গলায় বলল, 'ওসব জায়গায় কেউ যায়? ওটা একটা শয়তানের আস্তানা!'
আমরা কেউ কোনও কথা বলছি না। আমার গলা খুব শুকনো, কোনওক্রমে বললাম, 'জল আছে রাধা?'
রিসর্টে যখন ফিরলাম অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে। রাধা বলল, 'তুমি হঠাৎ ওই মন্দিরটা দেখার জন্য পাগল হলে কেন? তবে জায়গা বেশ অন্যরকম, আর ওদিকটা খুব সবুজ চোখ জুড়িয়ে যায়।'
সত্যিই তো আমি কেন অমন পাগল হয়ে উঠলাম?
টোটোতে আসতে আসতে আমি গা ঝেড়ে যাচ্ছি। আমার গা থেকে যেন শুকনো পাতা আর যাচ্ছে না। এই হাতে এক টুকরো লেগে, তো এই গালের ওপর একটা পাতা সেঁটে। কী আপদ! শুকনো মরমরে সব পাতার ছিন্ন অংশ।
টোটোর ভাড়া মেটানোর সময় শম্ভুচরণ বলল, 'সাবধানে থাকবেন স্যার। বাচ্চাটাকে নিয়ে ওরা এখানেই উঠেছিল।'
'কোন বাচ্চা?'
শম্ভুচরণ একটু থামল। তারপর রামশঙ্করের দোকানের দিকে তাকিয়ে বলল, 'খবরের কাগজে পড়েননি, টিভিতেও তো দেখিয়েছিল, এক তান্ত্রিক পাতাকালীর থানে এসে একটা বাচ্চাকে বলি দিয়েছিল। বাচ্চাটার সঙ্গে তার মা বাবা ছিল।' শম্ভু থামল, ঢোঁক গিলল, 'কী মা বাবা বলুন, নিজেরা বড়লোক হবে, ধনে সম্পদে ফুলে ফেঁপে উঠবে, দুঃখের দিন চলে যাবে বলে তান্ত্রিকের কথা মেনে নিজের সন্তানকে বলি দিতে চলে এল।'
আমি শম্ভুচরণের দিকে তাকিয়ে আছি।
শম্ভুচরণ বলল, 'ওই চারজন তো এই রিসর্টেই উঠেছিল। তারপর থেকে এটা বন্ধই পড়েছিল। কম পুলিশি হাঙ্গামা হল! তবে কী জানেন স্যার, পিশাচ সাধু কিন্তু ওই তান্ত্রিকের থেকেও ভয়ংকর।'
'কেন?' আমি বিড়বিড় করলাম।
'তান্ত্রিক যেই বলি শেষ করল, অমনি একটা সাপ এসে ছোবল দিল তান্ত্রিককে। দুজনে একই জায়গায় মরল। আসলে পিশাচ সাধু দুজনকেই খেল।'
আমি হিসহিস করি, 'শম্ভুচরণ চুপ করো, এর একটা কথাও যেন তোমার বউদি না জানতে পারে।'
শম্ভুচরণ হাতজোড় করল, 'আমি দু-টাকার মানুষ স্যার, আমি বলব না স্যার। আর আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন রামশঙ্করও কিছু বলবে না। আসি স্যার, সাবধানে থাকবেন।'
রাধা যদি শম্ভুচরণের কথা শোনে তবে একটা প্রলয় কাণ্ড ঘটে যাবে। একটা কথা আপনাদের আমি জানিয়ে রাখি, রাধা আমার স্ত্রী নয়। ওর বিয়ে হয়েছিল, ডিভোর্স হয়ে গেছে। বছর দুয়েক হল আমাদের সম্পর্ক। ভালোই চলছিল সম্পর্কটা, কিন্তু বাধ সেধেছে রাধার এই হঠাৎ প্রেগনেন্ট হয়ে পড়াটা। ক-দিন ধরেই ও বলছে বিয়ে করো। সব ঝামেলা মিটে যাবে। ওকে এখানে তাই জন্যই নিয়ে আসা, একটা হেস্তনেস্ত করে ফিরব। আমি ওকে ভালোবাসি, আমি ওকে বিয়ে করব, তবে এখনই না। আর আমি রাধাকে বলব ওই বাচ্চাটা রাখা চলবে না। ফিরেই আমার সঙ্গে গিয়ে ঝামেলাটা মিটিয়ে আসতে হবে। সবে বিসিএসটা পেয়েছি। পোস্টিং আমডাঙায়। এখন এ ঝামেলা নেওয়া যায় না। রাধাকে প্রস্তাবটা দিয়েছি। ও কথাটা শুনে গুম মেরে আছে। ওর বিশ্বাস অর্জন করানোর জন্যই এখানে নিয়ে আসা। বিশ্বাস অর্জন করানোটা আমার পক্ষে জরুরি। সেখানে যদি এইসব আজেবাজে কথা শোনে, না, না, ও যদি একবার বেঁকে বসে, আমি মুশকিলে পড়ে যাব। আর থাকা চলবে না। কালই লাঞ্চ করে বেরিয়ে পড়ব আমরা।
ডিনার এল। খেতে খেতে রাধাকে বললাম, 'রাধা, ফিরে আমার সঙ্গে নার্সিংহোমে চলো। প্লিজ। কোনও ভয় নেই। আমি আছি। চাকরিতে একটু থিতু হই। এক দুটো বছর পরেই বিয়েটা করে ফেলব।'
রাধার চোখে জল।
আমি বললাম, 'নার্সিংহোম থেকে ঘুরে এসে নোটিস দেব। রেজিস্ট্রিটা করে নেব এবার। কী বলো?'
রাধার চোখ থেকে টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ল খাবার প্লেটে।
সেটা চোখের জলের ফোঁটা দেখতে দেখতে আমি দেখলাম, আমার প্লেটে একটা শুকনো পাতা।
কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললাম, 'এখানকার সার্ভিস একদম ভালো নয়। না, কালই চলে যাব। এই দেখো, খাবার প্লেটে শুকনো পাতা।'
'তুমিই ভালো করে হাত ধোওনি, তোমার হাতেই তো পাতা লেগে।' রাধা বলল।
রাধা আমার হাত থেকে শুকনো পাতা তুলে ফেলে দিল তো আমার আঙুলে দেখলাম একটা পাতার কাঠি। সেটা ফেললাম, এবার মুখের ভেতর। থুঃ থুঃ! ওফ আর পারা যায় না। খুব কষ্টে খাওয়া শেষ করলাম।
রাধা হাসছে। ওর পাতে শুকনো পাতার কোনও অংশই পড়ল না। কী আশ্চর্য! যত পাতা কাঠি সব আমার পাতে! না, না, কালই চলে যাব।
খেয়ে কিছুক্ষণ গান শুনছিলাম। রাধা বলল, 'খুব ক্লান্ত? তোমার মুখটা খুব শুকিয়ে গেছে।'
আমি বললাম, 'না, তেমন ক্লান্ত নই তো।'
রাধা আমার কাছে সরে এল, তারপরই নাক সিঁটকে বলল, 'তুমি কি শুকনো পাতার ওপর গড়াগড়ি খেয়েছ, তোমার গায়ে শুকনো পাতার কী তীব্র ঝাঁজ! যাও, পারলে স্নান করে এসো।'
আমি বললাম, 'বাজে কথা রাখো। এই বুনো জায়গায় বিচ্ছিরি কোনও পাতা ছিল, তারই এমন গন্ধ। তবে আমি কোনও গন্ধ পাচ্ছি না।'
আমি রাধাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম। 'তুমি কী ডিসিশন নিলে? কাল ফিরে যাব। পরশু নার্সিংহোম। আমি চাই না ওকে।'
'তোমার কেরিয়ারের জন্য ওকে বলি দেবে?'
আমি ম্লান গলায় বললাম, 'বলি! বলি কেন বলছ? আমি যা ভাবছি তা আমাদের ভালোর জন্য।'
কথাটা বলেই আমার মনে পড়ে গেল শম্ভুচরণের কথাগুলো। রাধা কেন বলির কথা বলল? শুয়োরের বাচ্চাটা আবার রাধার কাছে গল্পটা বলে যায়নি তো! শালাদের বিশ্বাস নেই।
আমি নিজেকে ঝটকা দিলাম। যত্তসব ফালতু কথা। আমি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য রাধার মাথায় হাত দিলাম। 'এবার রেজিস্ট্রিটা করে নেব। সাক্ষী তোমার মা, আর আমার মা, তোমার বন্ধুদেরও ডেকে নিও। কেমন হবে?'
হঠাৎ রাধা তীব্র গলায় চিৎকার করে বলল, 'একটা শুকনো পাতা নিয়ে এসে এই রাতদুপুরে আমার মাথায় বোলাচ্ছ!'
আমি আপত্তি জানিয়ে বলতে যাচ্ছিলাম, এটা আমার হাত, কিন্তু পারলাম না, আমার মুখের ভেতর, গলার ভেতর শুকনো শুকনো পাতায় ভরে গেছে। আমি হাত বাড়িয়ে বেড সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে উঠে বসতেই হড় হড় বমি করে ফেললাম।
রাধা বলল, 'মানুষ জলে ডুবে জল খায় শুনেছি, তুমি কি শুকনো পাতায় ডুবে শুকনো পাতা খেয়েছ?'
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, রাধাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না! কেমন ঝাপসা! চোখের সামনে যেন শুকনো পাতার জালি আটকে আছে। তবু বললাম, 'চাকরিটা সবে হয়েছে, এখন কোনও টেনশন রাখতে চাই না। নার্সিংহোমে তুমি যাবে। যেতেই হবে। আমি তোমাকে অস্বীকার করছি না। শুধু একটু সময় চাইছি।'
রাধা বলল, 'তোমার সময় মানেই ওকে বলি দেওয়া।'
'আরে তুমি এত বলি বলি করছ কেন? ও অবাঞ্ছিত।'
'আমার সঙ্গে ওকেও স্বীকার করে নাও তাহলে আর অবাঞ্ছিত থাকবে না।'
'আমি ওকে চাই না।'
'সেটা তোমার কেরিয়ারের জন্য। ওকে তুমি কেরিয়ারের জন্যই বলি দিচ্ছ।'
আমি রাধার কথার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু এ আমার কী হচ্ছে! সারা শরীর যেন দুমড়ে মুচড়ে আসছে। মাথার ভেতর মট মট কাঠি ভাঙার আওয়াজ, বুকের ভেতর খস খস শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি, সারা শরীর হালকা, ফ্যাসফেসে, অনুভূতিহীন। হঠাৎ আমার শম্ভুচরণের কথাগুলো মনে পড়ল, বলি দিয়ে তান্ত্রিক ফেরত যায়নি।
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, রাধা বলল, 'চোখগুলো এমনি করছ কেন? তোমার চোখের পাতায় কী আটকে। দাঁড়াও পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
রাধা হাত বাড়িয়ে চোখের পাতার ওপর থেকে কিছু একটা টেনে ফেলতে গেল। আর আমি চিৎকার করে উঠলাম। 'ছাড়ো ছাড়ো! আমার চোখের পাতাটাই তো তুমি ছিঁড়ে নিচ্ছ। আমার লাগছে!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন