আড়ালের মানুষ

জয়ন্ত দে

আক্কেল বিশ্বাস করে রাতটা হচ্ছে প্রকৃষ্ট কাজের সময়। ঠিক ঠিক ঘুমের সময় শুরু হয় শেষ রাত থেকে। সেক্ষেত্রে একটু নয় বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কোটা কমপ্লিট করতে হবে। এই আর কী!

আজও আক্কেলের ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গেল। ঘুম ভেঙে গেলেও তার বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না। শুয়ে থেকে সে শুনতে পাচ্ছিল বেশ কয়েকজনের গলার আওয়াজ। বেশ আড্ডা জমেছে।

সকালের দিকে দিব্যজ্যোতি বাসুর কাছে বেশ কিছু লোকজন আসে। তারা নানা কারণেই আসে। বেশিরভাগই অফিসিয়াল ব্যাপার স্যাপার। তারা সাতসকালে এসে দরবার করে যায়। যাতে ব্যাপারটা আই এ এস দিব্যজ্যোতি বাসু নিজস্ব ভঙ্গিতে বেলায় সামলাতে পারেন।

আক্কেল ঘড়ির দিকে তাকাল, আটটা দশ। আরও মিনিট পঞ্চাশ বিছানাতে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা যায়। এমন সময় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল মণিমা। বলল, 'উঠেছিস? ব্রাশটা করে আয় তো। দেবাঞ্জনবাবু এসেছেন। তোর কথা জিগ্যেস করছিলেন।'

আক্কেল মনে করার চেষ্টা করল— কোন দেবাঞ্জনবাবু?

ওর মুখ দেখে মণিমা বুঝতে পেরেছে আক্কেল দেবাঞ্জন ব্যানার্জিকে চিনতে পারছে না। বলল, 'আরে পুলিশ অফিসার ছিলেন। এখন যেন কী সব হয়েছেন—।'

'ও দেবাঞ্জন ব্যানার্জি! নিশ্চয়ই কোনও ঝামেলা পাকিয়েছে, এখন বাসু সায়েবকে ধরে উতরাতে চাইছে।'

'অতশত জানি না। উনি আমাদের একবার খুব ভালো করে দক্ষিণেশ্বর মন্দির ঘুরিয়েছিলেন, আমার এটুকু মনে আছে। তুই একটু যা ওর সঙ্গে দেখা করে আয়।'

আক্কেল বিছানা ছেড়ে উঠল, 'যাচ্ছি! সাতসকালে ওই কোরাপটেড পুলিশ অফিসারটার মুখ দেখতে হবে!'

'আর সাতসকাল নেই, অনেক বেলা হয়েছে।'

ওদের একপ্রস্থ চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আক্কেল এসে বসতে সেকেন্ড রাউন্ড চা এল।

কোরাপটেড লোকেরা অক্টোপাসের মতো। ওদের অনেক শুঁড় থাকে। যে কোনও একটা শুঁড় দিয়ে কাছের বস্তুকে টেনে নেয়। আক্কেলকে দেখেই দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বলে উঠলেন, 'কী হল এবার আইপিএল দেখতে মাঠে যাবে তো?'

'আইপিএল তো বেশ দেরি আছে।'

হে হে করে হাসলেন দেবাঞ্জন ব্যানার্জি। 'দেরি কোথায়? শুরু হল বলে। টিকিটের দরকার হলে বলো।'

আক্কেল বলল, 'আপনি কেমন আছেন?'

'ভালো আছি, ভালো! তা তুমি শুনলাম গোয়েন্দাগিরি করছ? ভালো খুব ভালো।'

'না, না কোনও গোয়েন্দাগিরি নয়, এক জায়গায় বেড়াতে গিয়ে ওঁদের একটা পারিবারিক প্রবলেম সলভ করে দিয়েছিলাম।'

'খুনও তো হয়েছিল শুনলাম? খুনিকে পাকড়েছিল?'

'খুনি হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত সুইসাইড করেছে।'

'যাঃ তালে কী করে হল!'

আক্কেল বলল, 'হয়, এমন অনেক কিছু হয়। যেখানে সবকিছু বুঝেও কিছু আর করার থাকে না। মেনে নিতে হয়।' হঠাৎ দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বললেন, 'তা বটে। অনেক সময় হাত ফসকে যায়। তবে সবই তো আসলে বুদ্ধির খেলা। অপরাধী ওয়ান টু করে শুরু হয়ে হানড্রেডে এসে পৌঁছায়। আর আমরা উলটো পথে হানড্রেড থেকে শুরু করে ওয়ানে আসি।'

'কেন খুনির মতো ভাবতে ভাবতে এক থেকেও একশো ছোঁয়া এগোনো যায়।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি হাসলেন। বললেন, 'হ্যাঁ যায়। নিশ্চয়ই যায়। দাঁড়াও তোমাকে একটা ঘটনা বলি, ছোট ঘটনা। খুনি ধরা পড়েও নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে, আর হালকা কিছু বুদ্ধি দিয়ে সবাইকে বোকা বানিয়ে খুনি কেমন পিছলে যাচ্ছিল। ঘটনাটা শোনো, দেখি তুমি কেমন ডিটেকড করো?'

দেবাঞ্জনের কথায় দিব্যজ্যোতি বাসু একটু বিরক্তির চোখে ওর দিকে তাকান। মণিমারও মনে হল এটা আবার কেমন ব্যাপার হচ্ছে, দেবাঞ্জন ব্যানার্জি কি তার আদরের দুলালের বুদ্ধির পরীক্ষা নিচ্ছে?

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বলতে শুরু করলেন—।

দুই

জায়গাটা কলকাতা পুলিশের লাগোয়া একটা অঞ্চল। আনডেভেলপড একটা এলাকা। তবে সেই এলাকার পাশ দিয়ে বাইপাস হচ্ছে, মেট্রো যাবে, ফলে সে সময় হু হু করে জায়গার দাম বাড়ছিল।

মূল কলকাতায় যারা ঠাঁই পাচ্ছে না, বা পকেটে পোষাতে পারবে না তারা এসব জায়গায় জমির জন্য দৌড়চ্ছে। মাল্টিস্টোরিড ওঠা শুরু হল। এখানে সবাই ফ্ল্যাটের জন্য হাত বাড়াচ্ছে। বাড়ি আর ফ্ল্যাট উঠছে দিনে রাতে। নতুন নতুন পরিবার, লোকজন আসছে।

যে সময়টার কথা বলছি সে সময় প্রোমোটারি ব্যবসার রমরমা সবে শুরু হয়েছে। এলাকার ছেলে রমেন। এই সুযোগটাকে কাজে লাগায়। প্রথমদিকে দালালি করত। এর জমি ওর জমি বিক্রি করত। তাতে কিছু টাকা পেত। কিন্তু একসময় নিজেই দুম করে সস্তায় একটা জমি কিনে বসে। এবং কষ্টেসৃষ্টে একটা চারতলা বাড়িও দাঁড় করিয়ে দেয়। সেই প্রথম তারপর আর তাকে পেছন ফিরতে হয়নি। এরপর নিজেই বাড়ি তুলতে শুরু করে একের পর এক। বছর দুয়েক পরে ওর পার্টনার হয় পরিমল।

পরিমলের বেশ কিছু পারিবারিক জমিজমা ছিল। এইসব জমিজমা নিয়ে সে রমেনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে। এরপর দুজনের পয়সা আর ক্ষমতায় এলাকার এক নম্বর প্রোমোটার হয়ে ওঠে। ওরা ছাড়া তাবৎ ওই এলাকায় কোনও কাজ হত না, পলিটিক্যাল পার্টির হাত ছিল ওদের মাথায়। ওখানকার সব ছেলেছোকরাকেও ওরা কাজে টেনে এনেছিল। সবাইকেই ভাগ ভাগ করে কাজ দিচ্ছিল। বেশ চলছিল রাজত্ব।

কিন্তু এই রাজত্বে ঢুকে পড়ল এক রাজকন্যে। দুর্ধর্ষ সুন্দরী। মনীষা। ভালো পরিবারের মেয়ে। এখানে বাড়ি করে এসে পরিমলের সাংস্কৃতিক চক্করে জড়িয়ে পড়েছিল। মেয়েটার সঙ্গে হঠাৎই রমেন আর পরিমলের আলাপ এবং ঘনিষ্ঠতা হয়।

পরিমলের আবার অন্য একটা সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল এলাকায়। সে রক্তদান শিবির করত। সেই শিবিরে রক্তদাতাদের ট্রলি ব্যাগ দিয়ে শুরু করে লাস্ট ইয়ারে মোবাইল ফোন পর্যন্ত গিফট করেছিল। সে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জন্মদিন পালন করে। বছরে দু-বার ঝিনচাক হিন্দি গানের আসর বসায়। এসবের বেশিরভাগ টাকা কিন্তু পরিমলের। রমেন এসব ক্ষেত্রে বড় কৃপণ।

পরিমলের নানা সাংস্কৃতিক-চক্করে পাড়ায় আসা ওই মেয়েটা ফেঁসে গেল। সে পরিমলের রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জন্মদিনে এলাকার মেয়েদের নিয়ে শ্যামা করেছিল। সেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে ওদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। যখন বুঝল তখন দেরি হয়ে গেছে। তবু ফেঁসে গিয়েও মেয়েটা সামলে নিয়েছিল। পরিমল তাকে বিয়ে করতে চায়। উত্তরে সে পরিমলকে পরিষ্কার জানিয়েছিল— সে রাজি নয়। সে ওকে বিয়ে করতে চায় না।

পরিমল নাছোড়। সে ছাড়বে না।

আমি তখন ওখানকার থানাগুলোর দায়িত্বে ছিলাম। মেয়েটা লোকাল থানায় যায়নি। একজনের সূত্র ধরে— মনীষা আমার কাছে আসে। বড় বিপাকে পড়েছে বুঝতে পারি। বলেছিলাম— লিখিত কমপ্লেন করতে। কিন্তু মেয়েটি কোনও লিখিত অভিযোগ করতে চাইল না। বলল, পরিমলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার থেকে সরিয়ে দিতে হবে। আমি পরিমলকে ডেকে পাঠালাম। বেশ কয়েকদিন ধরে ডেকে নরমে গরমে বোঝালাম। ও আমার কথা মেনে নিল। বলল, সে মেয়েটাকে আর কোনও ডিসটার্ব করবে না।

পরিমলের স্বভাবচরিত্র খুব একটা ভালো ছিল না। ফুলে ফুলে মধু খাওয়ার নেশা। অনেক মেয়ে বউয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল। অনেকে বলে, ও এই এলাকার অনেক মেয়ে বউয়ের সর্বনাশ করেছে। এসব কথা জানতে পেরেই মনীষা বেঁকে বসেছিল। আমিও খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম— মনীষা ঠিক কথাই বলেছে।

এইসময় আমার ট্রান্সফার হয়ে যায়।

কিন্তু একদিন শুনলাম ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, জোর করেই পরিমল মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। এ ব্যাপারে রমেন আপত্তি করেছিল। সেটা নিয়ে ওদের দুজনের মধ্যে সামান্য মনোমালিন্য হয়েছিল। কিন্তু সেটা সাময়িক। পরে মিটে যায়। ওদের ব্যবসাও ভালো চলছিল। মাঝে সাঝে আমার সঙ্গে রমেনের কথাবার্তা হত। ওদের খবরাখবর পেতাম।

তবে যে খবরাখবর পেতাম তাতে জেনেছিলাম মনীষা ভালো নেই। ওর প্রতি পরিমলের নেশা কেটে গেছে। সে মনীষাকে টাকাপয়সা গয়নাগাঁটি অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু বাইরে অনেক মেয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখে। কোনও আপত্তি করলে মনীষাকে ধরে মারে। মনীষা ওর সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ও সত্যি সত্যি একদমই ভালো নেই। রাক্ষসটা ওকে শেষ করে দিয়েছে। মনীষার ওই রাক্ষসটার হাত থেকে মুক্তি নেই। হ্যাঁ, এখানে রমেনের কথা বলে নিই। রমেন কোনও বিয়ে থা করেনি। সাতকুলে একমাত্র মা ছিল। তিনিও মারা গেছেন। ওর স্বভাব ছিল বড্ড কৃপণ। অনেক বলে, ও নাকি বাড়িতে টাকা রাখে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যা যৎসামান্য পড়ে থাকে। ও পরিমলের পারিবারিক ব্যাপারে মাথা গলায় না। ও শুধু ব্যবসা জানে। টাকা ছাড়া ও কিছু বোঝে না। এবার মূল ঘটনায় আসি।

একদিন হঠাৎই রমেন খুন হল। বাইপাসের ধারে ওকে পাওয়া গেল। পেছন থেকে ওকে গুলি করে খুন করা হয়েছে। সেদিন সন্ধে রমেন ছিল পরিমলের সঙ্গে। শেষ ওকে পরিমলের সঙ্গেই দেখা গিয়েছিল। খুব সহজেই পরিমলকে অভিযুক্ত করে ধরা হল। আর পরিমল খুব সহজেই দোষ স্বীকার করল। বলল, রমেন নাকি পরিমলের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা নিয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই টাকা শোধ করছিল না। তাই পরিমল রাগের মাথায় ওকে মেরেছে। কিন্তু পুলিশ খুনের অস্ত্র উদ্ধার করতে পারল না। বাইপাসের ধারে কোন জলায় ফেলেছে তা পরিমল দেখাতে পারল না। তদন্তের বড় একটা ত্রুটি থেকে গেল।

তবু পরিমলের কথার ওপর ভিত্তি করে পুলিশ চার্জশিট তৈরি করল। ওকে কোর্টে তোলা হল। আর পরিমল কোর্টে দাঁড়িয়ে পুলিশের কাছে বলা সব কথা অস্বীকার করল। বলল, 'পুলিশের মারের ভয়ে ওকে দিয়ে মিথ্যে কথা বলিয়েছে। কিছুদিন কেস চলার পর ও জামিন পেয়ে যাবে। কেন না কোনও সাক্ষী নেই। পরিমলই স্বীকার করেছিল, এখন ও-ই আবার অস্বীকার করছে।

ঠিক এই সময় কেসটায় আমি ঢুকি।

ওই কেসটায় একজন তরুণ অফিসার কোর্টে বেইজ্জত হয়ে আমার কাছে আসে।

আমি রমেন আর পরিমলের পার্সোনাল সমস্ত হিসেব চেক করি। ওদের পার্টনারশিপ কোম্পানির হিসেব দেখি। দেখতে দেখতে বুঝতে পারি, পরিমল উলটো কথা বলছে। কিছুদিনের মধ্যে রমেনের কাছ থেকে পরিমলই প্রায় দুই কোটি টাকা বিভিন্ন সময়ে মনীষার অ্যাকাউন্টে নিয়েছে। মনীষার নামে ও একটা হোটেল তৈরি করছে রায়চকে।

আমি বুঝলাম, রমেনই টাকা দিয়েছিল। একসময় সেই টাকা ফেরত চাইছিল। পরিমল টাকা শোধ না করে ওকে খুন করে। এরপর আমি...।'

হঠাৎ আক্কেল বলল,—

'এরপর আপনি কেসটা টেকওভার করেন। মনীষাকে ডাকেন। জেরা করেন। জেরা করে জানতে পারেন— পরিমল কোথায় এবং কীভাবে রমেনকে খুন করেছে। আপনি মনীষাকে সাক্ষী করেন। রাজসাক্ষী। মনীষা খুন করেনি। মনীষা কোনও খুনের ষড়যন্ত্রে ছিল না। সে শুধু জেনেছিল, বা জানতে পেরেছিল। তার কথার ওপর ভিত্তি করে পরিমলের বিচার হয়। শাস্তি হয়।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি হাসেন, 'হ্যাঁ, যাবজ্জীবন। সারা জীবন ওকে জেলেই পচতে হবে।'

আক্কেল বলল, 'আপনি এই কেসটা হঠাৎ বললেন কেন?'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বললেন, 'বললাম। আলাদা কোনও কারণ নেই। সলভড কেস। আমি আসলে কেসটা পেয়ে একশো থেকে, মানে পিছন থেকে গুনতে গুনতে একে এসে পৌঁছেছিলাম।

আমার প্রথমে মনে হয়েছিল, কৃপণ রমেন কেন টাকা ধার করবে? ওর এত কীসের টাকার দরকার, যে ধার করতে হল? আর টাকা ধার করলে শোধ করবে না কেন?

আমি তখন ওদের হিসেব মেলাতে যাই। সামান্য একটা ক্লু পাই— মনীষার রায়চকের হোটেল। তখনই মনীষাকে ডাকি। পরিমলের প্রতি মনীষার পুরনো ক্ষোভকে উসকে দিই। ব্যস কাজ হয়ে যায়। ও যা জানে বলে দেয়। আর আমি একশো থেকে একে এসে পৌঁছাই!'

মণিমা বলে, 'খুব সহজ হিসেব, আপনাদের পুলিশের সঙ্গে ওই পরিমলের আগে থেকেই ভাবসাব ছিল। তাই ও দোষ স্বীকার করে ওদেরকে মস্ত চাল দিয়েছে। হয়তো দেখব চার্জশিটেই কেসটা লঘু করে দেখানো হয়েছে। নয়তো পিপি দায়সারা কাজ করেছেন।'

আক্কেল বলল, 'মণিমার কথা খুবই ন্যায্য। আপনার পুলিশ পরিমলের থেকে নানা সুযোগসুবিধা নিত, তাই প্রকৃত আসামির মতো পরিমলকে দেখেনি। সেই সুযোগেই পরিমল বেরিয়ে যাচ্ছিল—।'

'কিন্তু আমি বেরোতে দিইনি। কেসটা রি-ওপেন করিয়ে সলভড করি।' দেবাঞ্জন ব্যানার্জি হাসেন।

আক্কেল বলে, 'আপনি পেছন থেকে সামনে এসেছেন। একশো থেকে একে—। আচ্ছা আমি যদি সামনে থেকে পিছনে— এক থেকে একশোয় যাই— কেমন হবে?'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বলেন, 'কেমন হওয়ার কিছু নেই— কেসটা সলভড। প্রমাণ ও সাজা হয়ে গেছে।' আক্কেল বলল, 'তবু আমার মতো করে আমি বলি, যদি পারমিশন দেন।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি কিছু বলার আগে দিব্যজ্যোতি বাসু বলে, 'পারমিশনের কী আছে, বল—।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বলেন, 'হ্যাঁ হ্যাঁ বলো—।'

আক্কেল হাতে হাত ঘষে। বলে, 'খুন পরিমল করেছে। এ নিয়ে আমার কোনও দ্বিধা নেই। এবং খুনের কারণ টাকা— এ নিয়েও আমার কোনও প্রশ্ন নেই।'

'তাহলে তোমার প্রশ্ন কী?' দেবাঞ্জন ব্যানার্জি ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করেন।

আক্কেল বলল, 'আমি যদি একটু অন্যরকম করে ভাবি। যদি ভাবি পরিমলকে দিয়ে কেউ খুনটা করিয়েছে।'

'কে করাবে? পরিমল বাচ্চা নাকি?' দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বলেন।

'পরিমল বাচ্চা নয়। কিন্তু নানাবিধ খরচ করে সে জীবনযাপন করত। বাইরের নারীসঙ্গে তার বিস্তর টাকা যেত। তারপর মনীষার নামে হোটেল তৈরি করতে তার অনেক টাকা গেছে। হোটেলটা তখনও চালু হয়নি। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক রমেন টাকা চাইল। এই টাকা নিয়ে দুজনের মধ্যে বিবাদ শুরু হল। তখন পরিমলকে কেউ বুদ্ধি দিল— রমেন কৃপণ! রমেন একা। ও মরলে পৃথিবীর কারও কিছু এসে যাবে না। ও যদি মরে যায় ওর ওয়ারিশন কেউ নেই। কেউ ওর পাওনা টাকা চাইতে আসবে না। তাছাড়া সমস্ত জয়েন্ট প্রপার্টিগুলো পরিমল ভোগ করতে পারবে। আর একটা ক্ষীণ ব্যাপার পরিমলের মাথায় ছিল— রমেনের বাড়িতে গোপনে টাকা রাখা আছে। লোভে পড়ে পরিমল। তাকে এই লোভটা উসকে দেয় অন্য একজন।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বললেন, 'তুমি কি মনীষার দিকে ইঙ্গিত করছ? তবে বলব, ভুল। হান্ড্রেড পারসেন্ট ভুল। মনীষাকে তুমি দেখোনি তাই একথা বলতে পারছ। মনীষা ওর স্বামীকে ঘেন্না করে। ও ওর স্বামীর সঙ্গে সাথ দেবে না, কখনোই না। তারপর মানুষ খুনের মতো একটা কিছু— না, না মনীষা সে ধাতুর মেয়ে নয়। সত্যিকারের ভালো মেয়ে। পরিমল ওকে ফাঁসিয়েছে। প্রথমে সাংস্কৃতিক চক্র। পরে জোর করে বিয়ে করে—। সন্তান!'

আক্কেল হাসল, বলল, 'তবে কে?'

'কে তুমি বলো? আর কার কথায় মানুষ খুন করার মতো সাহস পরিমল পেতে পারে?'

আক্কেল আবারও হাসল, 'সাহস শুধু নয়। একটু বেশিই সাহস ও পেয়েছে। যার জন্য ও অন্য কাউকে দিয়ে খুন করানোর ঝক্কি নেয়নি। প্রচণ্ড কনফিডেন্ট। সারা সন্ধে ওর সঙ্গে ছিল। শেষবেলাতেও ও নিজের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। কোনও লুকোছাপা করেনি। কারণ ও এই খুনের সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। যাতে সবাই জানুক এই কাজটা সে-ই করেছে। করেও পালায়নি। পুলিশ ধরতে সহজে স্বীকার করে নিয়েছিল। কনফিডেন্সটা একটু বেশিই।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি তীক্ষ্ন গলায় বলেন, 'হ্যাঁ, কার কথা শুনল ও? তার নাম বলো?'

আক্কেল বলল, 'নাম কী করে বলব? আমি শুধু সেই মানুষটার একটা ছবি আঁকতে পারি। দেখুন তাকে চিনতে পারেন নাকি? পরিমল এসময়ই কোনও একটা জায়গা থেকে পরামর্শ পায়, রমেনকে সরিয়ে দেওয়ার। তার মাথায় যিনি ঢোকান তিনি মস্ত কেউ। হতে পারে কোনও পলিটিক্যাল লোক। কিন্তু কেন ওই পলিটিক্যাল লোকটি এ ধরনের ঝামেলায় জড়াবে? হতে পারে কোনও পুলিশের লোক। মস্ত বড় তিনি। যে পরিমলকে এ কথাগুলো ভাবায়। খুব কায়দা করে মগজে ভরে দেয়। তাকে সাহস দেয়, বল-ভরসা দেয়। বলেন— তিনি ব্যাপারটা সামলে নেবেন। সেই ট্র্যাপে পড়ে পরিমল। সে সেই মস্ত মানুষটিকে বিশ্বাস করে একটা প্রচণ্ড অবিশ্বাসের কাজ করে— রমেনকে খুন করে। তার প্ল্যান মাফিক সবকিছু এগোচ্ছিল। রমেন মরে যেতে সমস্ত প্রোমোটিং ব্যবসাটা পরিমলের হাতে চলে আসছে। এমনকী ব্যবসায় রমেনের লাগানো টাকাও এখন তার। ধারের দু-কোটি টাকা দিতে হল না। উলটে ঘরে আরও টাকা এল।'

'কিন্তু পরিমল তো বেরিয়ে আসেনি। ফেঁসে গেছে, জেল খাটছে। যাবজ্জীবন।' দেবাঞ্জন ব্যানার্জি বললেন।

'ইয়েস, ওইটাই তো মাস্টার স্ট্রোক। শেষ পর্যন্ত ও ফাঁসবে। এটাই ছিল মস্ত মানুষটার ব্রেন। সে তলে তলে সব প্রমাণ তৈরি করে রেখেছিল। টাকা পয়সা সংক্রান্ত সমস্ত প্রমাণ।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জির মুখ থমথমে, বলেন, 'আড়ালের সেই মস্ত মানুষটার লাভ?'

'খুব সামান্য। আবার অসামান্যও হতে পারে। রাক্ষসের হাত থেকে রাজকন্যেকে উদ্ধার। তাকে একটা নিশ্চিন্ত, নিরাপদ জীবন দেওয়া। জানি না রাজকন্যের প্রতি তারও লোভ ছিল কি না? থাকতেই পারে। এত যখন সুন্দরী!'

দেবাঞ্জন কিছু বলতে যাচ্ছিল—

আক্কেল বলল, 'আচ্ছা পরিমলের টাকা পয়সা এখন সব নিশ্চয়ই মনীষা দেখছে? হোটেলটাও চালাচ্ছে? দশ বছর আগের আপনার কথা না শোনা পরিমলকে আপনি ভুলতে পারেননি না দেবাঞ্জনবাবু? ওদের সব খবরই রাখতেন আপনি! আপনি বললেন, রমেনের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ছিল। কিন্তু রমেন ব্যাপারটা নিয়ে আপনার কাছে আসেনি। এসেছিল মনীষা। যোগাযোগ থাকলে, বা খবরাখবর পেতে মনীষাই আপনার মাধ্যম হতে পারে। মনীষার সঙ্গে কী আপনার যোগাযোগ ছিল? নইলে রমেন পরিমলের বিবাদের মাহেন্দ্রক্ষণে আপনি কেসটায় হস্তক্ষেপ করেন কীভাবে! ওই তরুণ পুলিশ অফিসারের কোর্টে বেইজ্জতের ব্যাপারটা মনে হয় গল্পের খাতিরে আপনার এন্ট্রি নেওয়ার জন্য তৈরি।

মনীষা কোনওদিনই পরিমলকে মেনে নিতে পারেনি। আপনিও না। অমন একটা দুর্ধর্ষ সুন্দরী একটা ফালতু ছেলের সঙ্গে জড়িয়ে যাক আপনি আগে চাননি। জড়িয়ে থাকুক হয়তো পরে চাননি। তার ওপর আপনার অপমানটা কিন্তু বড় জ্বালাদায়ক— এত সহজে আপনি ভুলে যাবেন বলে আমার মনে হয় না।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জির চোখটা আক্কেলের দিকে ধক করে জ্বলে উঠে। বললেন, 'খুনি কিন্তু শাস্তি পেয়েছে। আর এসবই তোমার অনুমানমাত্র! তোমার সঙ্গে একদিন মনীষার আলাপ করিয়ে দেব। মেয়েটি বড় ভালো। তার গায়ে কোনও কালি নেই।'

আক্কেল বলল, 'এই কাহিনিতে মোটে চারটি চরিত্র। রমেন, পরিমল, মনীষা আর আপনি। রমেন মরেছে। পরিমল খুনি, খুনের শাস্তি পাচ্ছে। মনীষা নিশ্চিন্ত জীবন পেয়েছে, আর বাকি রইলেন— আপনি।'

দেবাঞ্জন ব্যানার্জি মাথা নিচু করে নিল। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল, কিন্তু সেটা কেউই শুনতে পেল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%