শেষ কফি

জয়ন্ত দে

সুপ্রিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি অনেকদিন। তবে ইচ্ছে করলেই দেখা হতে পারত। আমি জানি ও এই শহরেই থাকে। আর আমার কোয়ার্টার থেকে ওর বাড়ি থেকে বড় জোর আধ ঘন্টার জার্নি। আসলে ওর সঙ্গে দেখা করার আমি কোনও টান অনুভব করিনি। করার কথাও না। মানুষ যত বড় হয়, ওপরে ওঠে, কিছু কিছু জিনিস তাকে ছেড়ে আসতে হয়। নাহলে নীচের দিকটা বড্ড ভারী হয়ে যায়। এটা কোনও মহাপুরুষের বাণী নয়। যারা বড় হয়, তারাই একথাটা অনুসরণ করে। যা আমি বেশ পরে বুঝেছি। যতদিন বুঝিনি ততদিন ভেতর ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করত। যা এখন করে না।

তাহলে আমি এত বছর পরে সুপ্রিয়ার কথা ভাবছি কেন?

আসলে আমি সুপ্রিয়াকে ভুলতেই চাই, ভুলেও গিয়েছিলাম, কিন্তু হঠাৎ ওর মেয়ে এসে আমার সব কিছু ওলটপালট করে দিল। ওর মেয়ে কলকাতার একটা বড় সংবাদপত্রের জেলা করসপন্ডেন্স। খুব স্মার্ট, ঝকঝকে, কথাবার্তায় বেশ চৌকস। প্রথমদিনই দেখে মেয়েটাকে আমার নজরে পড়েছিল। ম্যাড়মেড়ে জেলা করসপন্ডেন্সদের থেকে বেশ আলাদা। ও বুঝেছিল, আমি ওকে আলাদা করে দেখছি। কথা বলার সময় বার বার ওর চোখে চোখ রাখছি। পরে বুঝেছিলাম, আসলে ওর চুল, চোখের দৃষ্টি আমার বড় চেনা। কী করে চিনলাম! আমার তো চেনার কথা নয়, তবে আমি চিনলাম কী করে! ওর চোখ মুখ চুল কি সুপ্রিয়ার মতো!

না, তা তো নয়। বরং ওর চোখ মুখ সুপ্রিয়ার ঠিক উলটো। এ মেয়ের গায়ের রং ময়লা। নাকটাও চাপা। চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। ছোট্ট কানে লম্বা দুল, ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো দুলছে। কিন্তু চেহারার মধ্যে প্রচণ্ড শার্পনেস, যা সুপ্রিয়ার মধ্যে ছিল না। বরং সুপ্রিয়া ছিল ফরসা, বেশ সুন্দরী, লম্বা চুল, কাটা কাটা চোখ নাক, একটু ভিতু ভিতু এক বউ।

সুবর্ণা আমাকে বলেনি ও সুপ্রিয়ার মেয়ে। বলার কথাও নয়। ও এসেছিল, এইচ আর সেন-স ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাকিয়ে ওঠা গোলমাল কভার করতে। প্রথমদিনই ও আমাকে প্রশাসনিক ব্যাপারে বেশ কয়েকটা বাঁকা প্রশ্ন করেছিল। অন্য সবাই অবশ্য ওর প্রশ্নকে তেমন গুরুত্ব দিল না। কিন্তু মেয়েটা আবার, আবার প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিচ্ছিল, বারবার। আমি সন্তর্পণে ওর প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। ও তৃতীয় প্রশ্নটা করার পর আমি ওর দিকে বেশ বিরক্তির চোখে তাকালাম। স্পষ্ট করে বলেই দিলাম, আমি এ বিষয়ে একটিও কথা বলব না। আলাদাভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসুন, আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেব। আজকের কারণটা সম্পূর্ণ আলাদা।

আসলে আমার জুরিসডিকশনে একটি নতুন প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের যে বিষয়গুলো পড়ানোর এক্তিয়ার নেই, সেই সব কোর্সে বেশ কিছু স্টুডেন্ট ভর্তি করিয়েছে। ওরা ভেবেছিল কোর্সটা চালু করে দেবে। যে কোনও সময় ওদের কোর্সটি করার অ্যাফিলিয়েশন এসে যাবে। কিন্তু যে কারণেই হোক আসেনি। এখন বছরের মাঝামাঝি সময়, এতগুলো ছেলের ভবিষ্যৎ সংকটের মুখে। পরীক্ষা আটকে গেছে। সিএম পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়িয়েছে। তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, বিষয়টা নিয়ে যেন কোনও হইচই না হয়, যেভাবেই হোক সামলে নিতে হবে। তিনি চাইছেন না, পুলিশ ডেকে আন্দোলনকারীদের হটানো হোক। যা করতে হবে তা আলোচনার ভিত্তিতে।

কিন্তু আমি সামলাব কী করে? সবাই চাইছে কলেজ কর্তৃপক্ষকে শাস্তি দিতে। শাস্তি দিলে আরও অনেক স্টুডেন্ট-এর ভবিষ্যৎ সংকটে পড়বে। সবমিলিয়ে বেশ উভয়সংকটে আছি। এর আগে কয়েকজন ডেপুটিকে পাঠিয়েছিলাম। তারাও কোনও সমাধানসূত্র বের করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে আমি এসেছি। আমি এখানকার এস ডি ও। আলোচনার সময় মেয়েটা এই বেয়াড়া প্রশ্নগুলো করে বসল। প্রশ্নগুলো ছিল এই বেসরকারি কলেজকে কত টাকায় সরকার জমিটা দিয়েছে? এই জমির ব্যাপারে মন্ত্রী ভগবতীপ্রসাদ মিশ্রের ভূমিকা কী ছিল? আর একটি প্রশ্ন সরাসরি অরুন্ধতী সেনকে নিয়ে। ওঁর অনাথ মেয়েদের জন্য যে হোম আছে, সেই হোম সম্পর্কিত নানা দুর্নাম শোনা যায়, তাহলে অরুন্ধতী সেনকে সরকার কী করে ভরসা করে?

তিনটি প্রশ্নই ছিল খুব গুরুতর। অন্য কোনও মন্ত্রী হলে আমি আগের সরকার মন্ত্রী এবং তাঁর কুকর্ম বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু ভগবতীপ্রসাদ মিশ্র যে দল পালটে বর্তমান সরকারেরও একজন। তাঁকে নিয়ে টানাটানি হলে সিএম ভয়ংকর রেগে যাবেন। এবং আমি সামলাতে পারিনি এটাই প্রতিপন্ন হবে। অগত্যা আমি মেয়েটিকে বলি, এখন স্টুডেন্ট আর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। অন্যকিছু ভাবার জন্য পরে অনেক সময় পাব আমরা।

দুই

আমি মেয়েটাকে বেয়াড়া প্রশ্নগুলোর জন্য পরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে বলেছিলাম। মেয়েটা পরের দিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইল। আমার সেক্রেটারি ওকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এ সপ্তাহে হবে না। পরের সপ্তাহে ফোন করতে বলেছে। কিন্তু মেয়েটা নাছোড়, পরের দিন সরাসরি আমার দপ্তরে চলে এল। আমি বুঝলাম—এ মেয়ে জ্বালাবে। একে আমাকেই ট্যাকেল করতে হবে। মেয়েটি আসতে বললাম— চা না কফি?

মেয়েটাকে খুব ভালো করে স্পেশাল কফি খাওয়ালাম। বললাম, এদিকটা একটু শান্ত হোক, আমি সব কিছু আপনাকে জানাব। প্রয়োজনে আমি পুরনো ফাইলের কপি আপনাকে দেখাব। আগে আমি দেখে নিই। কনফার্ম না হয়ে কী করে বলি?

মেয়েটা শান্ত হয়ে আমার কথা শুনল। মেয়েটার নাম সুবর্ণা।

পরের দিন আবার এল সুবর্ণা। আমাকে বলল, আমরা কলেজের ব্যাপারে কী ডিসিশন নেব, ওকে যেন আগে বলি। ও তাহলে স্কুপ নিউজ করতে পারে।

আমি বললাম। ঠিক আছে প্রথম আপনাকেই জানাব। আজ সুবর্ণা নিজেই বলল, কফি খাওয়াবেন না? সেদিন দুজনে বসে কফি খেলাম।

এদিকে আন্দোলনটা ফুলে ফেঁপে বেশ বড় হয়ে উঠছে। জেলার আরও কিছু কলেজ আন্দোলনটাকে সমর্থন করছে। ফেসবুকে একদল যা তা লিখছে। বিরোধী একটা রাজনৈতিক দল গুটিগুটি করে আন্দোলনটার দিকে এগিয়ে আসছে। যে কোনও সময় ছাত্ররা বনধ ডেকে দিতে পারে। ডিএম সাহেব ঘন ঘন নোট পাঠাচ্ছেন। কোনওদিক থেকেই কোনও ইতিবাচক কিছু পাচ্ছি না, যে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাব। এর মধ্যে ছাত্ররা একদিন তিনঘন্টার জন্য জাতীয় সড়ক অবরোধ করল। আমার রাতের ঘুম চলে গেছে। বাধ্য হয়ে পুলিশ এল।

সুবর্ণা রোজ আসে খবরের জন্য। কফি খায়। জেলার বেশ কিছু বিষয় নিয়ে টুকটাক কথা হয়। হঠাৎই একদিন সুবর্ণা বলল, আমার কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন আছে।

জানতে পারলাম ওই ত্রিশজন ছেলের মধ্যে দু-জন ঘুরপথে ঢুকেছে, প্রচুর টাকা দিয়ে। ওদের ভর্তির ব্যাপারে প্রচুর টাকা পয়সার ডিল হয়েছে। সুবর্ণা বলতে চেয়েছিল, এখানে ভর্তির ব্যাপারেও টাকা পয়সার ঘাপলা আছে। ওই ছেলে দুটো ঠিক আন্দোলনে নেই। ত্রিশজন নয়, আঠাশজন। ও অদ্ভুত একটা ইঙ্গিত করল। যেন আমি বাঁশিটাকে উলটো দিকে দিয়ে বাজাই। সুবর্ণা ওই দুটো ছেলের হদিশ দিল। ওই দুটো ছেলেকে গোপনে তুলে আনলাম। ওদেরকে সরাসরি বললাম কত টাকা ঘুষ দিয়ে ভর্তি হয়েছ? তোমরা তো ভর্তি হওয়ার যোগ্যই নও। ঘুষ দেওয়া অপরাধ। ছেলে দুটো খুব ভয় পেয়ে গেল। ওদেরকে আমি বোঝালাম। তোমরা দুজন কাল থেকে আর আন্দোলনে যাবে না। আমি জানি তোমাদের অনেক টাকা পয়সা গেছে। আমি তোমাদের অন্য কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেব। তোমরা আন্দোলন থেকে অফ হয়ে যাও।

পরের দিন আন্দোলনকারীর সংখ্যা হল আঠাশ। তারপরের দিন এই দুটো ছেলেকে কাজে লাগালাম, এরা এদের ঘনিষ্ঠ পাঁচজনকে নিয়ে এল, যাদেরকে আমি কথা দিলাম অন্য কোনও কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেব। একটা ফলস ফরমও ফিলআপ করিয়ে নিলাম। পরেরদিন আন্দোলনকারীর সংখ্যা হল তেইশ। ততক্ষণে চাউর হয়ে গেছে। ভেতর ভেতর অনেকেই কলেজ পেয়ে যাচ্ছে। আমি আমার লোক লাগিয়ে দিলাম। দু-একজন ছাড়া সব মাছই আমার জালে। আন্দোলন শেষ। আজ কাল করে ওরা ঘুরছে। কেউ কেউ বুঝতে পেরেছে, এ বছরে আর কিছু হবে না। পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

সুবর্ণা প্রায় দিনই আমার কাছে আসে। খবর নেয়, খবর দেয়, কফি খায়। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের দেখা হয়। ওকে আমি সরকারি দু-চারটে ভালো খবরও দিয়েছি। আমাদের দুজনের সম্পর্কটা খুব সহজ হয়ে গেছে। ওদিকে কলেজের বিষয়টা মোটামুটি শান্তিতে মিটিয়ে দিতে পেরেছি, ডিএম সাহেব খুশি। সিএমও খুশি। একদিন ভগবতীপ্রসাদ মিশ্র ফোন করে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। জানালেন, কলেজটা খুব শীঘ্রই অ্যাফিলিয়েশন পেয়ে যাচ্ছে। সমস্যা মিটে গেছে।

খবরটা আমি সুবর্ণাকে জানালাম। ও বলল, আমি কি এটা খবর করব? আমি ওকে মৃদু বকলাম। এখন নয়। অনুমতি পাক, আমি কনফার্ম হই। তোমাকে প্রথম জানাব। ও রাজি। খবরটা চেপে গেল। বলল, যাক, ওই ত্রিশজনের একটা বছর নষ্ট হলেও ওরা আবার পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে।

আমি সুবর্ণাকে বললাম, মাথা থেকে এসব কথা হটাও। ওটা তোমার আমার দেখার কাজ নয়।

সুবর্ণা ভ্রু কোঁচকাল। আমি ওকে যেটা বললাম না, তা হল মন্ত্রী ভগবতীপ্রসাদ মিশ্রকে আমি ওই ত্রিশজন স্টুডেন্ট-এর ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলাম। উনি আমার কথায় বেমক্কা রেগে গেলেন। বললেন, আপনার কাজ আপনি করুন। অরুন্ধতী সেন চান না ওই ঝামেলাবাজ স্টুডেন্টদের আবার ক্যাম্পাসে ফেরাতে। নয়া কোর্স নয়া স্টুডেন্ট। আপনি এটাই দেখবেন, যেন কোনও হুজ্জতি না হয়। তাহলে সিএম খুব রেগে যাবেন।

আমি সুবর্ণাকে বোঝালাম এই বিষয়টা মাথা থেকে হটাও।

সুবর্ণা বলল, ওই ছেলেগুলোর টাকা গেল, একটা বছর গেল। এটা ঠিক হল না স্যার।

এ নিয়ে তুমি আর মাথা খারাপ করো না। বললাম, তোমাকে একদিন ট্রিট দেব। সুবর্ণা রাজি। কবে? দিন ঠিক হল। আমি আর সুবর্ণা সন্ধেবেলা খেতে গেলাম। সুবর্ণা আমাকে বলল, ও জেলা ছাড়তে চায়। কলকাতায় সাংবাদিকতা করার খুব ইচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই জেলা থেকে বেরোতে পারছে না।

ওর কথা শুনে আমার কেমন যেন একটু লোভ হল। আবার। বললাম, 'বড় ক্যাচ চাই'!

'কে? কে হতে পারে?'

'ভগবতীপ্রসাদ মিশ্র।'

'করে দেবেন?'

'আমি বললে রাজি হবে। ওর সব বাঁ হাতের খেল। কিন্তু...'

'কিন্তু কী?'

'লোকটা ভালো নয়। নরখাদক।'

সুবর্ণা হাসল, 'কাঁচা খাবে, না রান্না করে?'

'ওর যদি তোমাকে পছন্দ হয়?'

'ওই একটা বুড়ো, ছুঁচোর মতো দেখতে একটা লোক, সে আমাকে পছন্দ করবে না কী?' কথাটা বলে, সুবর্ণা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে চুমু খেল। বলল, 'আমাকে তোমার পছন্দ?'

বললাম, 'খুউব।'

'তাহলে তুমি আমার জন্য ওই বুড়োটাকে ম্যানেজ করতে পারবে না।'

'ওই বুড়ো ম্যানেজ হওয়ার জিনিস নয়। অরুন্ধতী সেন ওই বুড়োর জন্যই অনাথ মেয়েদের হোমটা বানিয়ে রেখেছিল। ফি রাতে ওখান থেকে ওর জন্য মেয়ে ভেট যেত। কী জানো ওর সম্পর্কে? ও একটা মারাত্মক লোক। ও কাউকে ছাড়ে না।'

'কাউকে ছাড়ে না মানে?'

'আমি জানি। আমার মতো কেউ জানে না। ও কী জিনিস!'

সুবর্ণা কাঁধ ঝাঁকাল। বলল, 'আমি অরুন্ধতী সেনের জন্য ভেট যাব না। আমি যাব নিজের জন্য। তুমি দেখো, কলকাতার অফিসে ব্যবস্থা করে দিতে পারে কি না? তাহলে ও যা চায় আমি রাজি। আমাকে শুধু ভালো করে চান করতে হবে।'

আমি হাসতে হাসতে বললাম, 'তুমি আমাকে দিয়ে দালালি করাতে চাইছ?'

সুবর্ণা হাসল, বলল, 'তুমিও ঘুরপথে আমাকে দিয়ে এই কাজটা করিয়েছ। আমার ইনফরমেশন থেকে তুমি ঘুষ দিয়ে ভর্তি হওয়া ওই দুটো ছেলের কথা জানতে পেরেছিলে। আর আমি তোমাকে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলাম।'

আমি হাসলাম। বললাম, 'বাহ, তুমি তো খেলাটা বেশ ধরতে পেরেছ!'

সুবর্ণা হাসল, 'খেল আভি কুছ বাকি হ্যায় এসডিও সাব।'

বললাম, 'তুমি কি আমার সঙ্গে শুয়ে চান করেছ?'

তিন

তখনও জানতাম না ও সুপ্রিয়ার মেয়ে। জানলাম ও যখন নিজের মুখে আমাকে জানাল। তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আমি জানতাম এ মেয়ে সহজ নয়। এ মেয়ে সহজ নয় বলেই ওর লুকানো ক্যামেরায় ভগবতীপ্রসাদ মিশ্রের আন্ডারওয়ার পরা নাচের ছবি মানুষ দেখল। টিভির ছবিতে অনেক কিছু কাটছাঁট করা। কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিন জুড়ে মন্ত্রী ভগবতীপ্রসাদের মত্ত অবস্থায় উলঙ্গ নৃত্য। সেই সঙ্গে কী অকপট স্বীকারোক্তি অরুন্ধতী সেনের হোমের মেয়েদের নিয়ে মন্ত্রীমশাই কতরকম ফুর্তি করেছেন! ওই হোমের মেয়েদের মন্ত্রীমশাই আর কাকে কাকে ভেট দিয়েছেন। এবং স্বয়ং অরুন্ধতী সেনকে 'রেন্ডি রেন্ডি' করে মন্ত্রীমশাইয়ের কী আবেগঘন ডায়লগ!

প্রচণ্ড চাপে ভগবতীপ্রসাদ মিশ্র পদত্যাগ করেছে। দল থেকে বহিষ্কার। এখন জেলে ঢোকা সময়ের অপেক্ষা।

ঠিক এই সময় মেয়েটি এসে জানাল সে সুপ্রিয়ার মেয়ে।

সুবর্ণা আমার সামনে বসে। এসেই কফি আনতে বলেছে। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভেতর ভেতর কাঁপছি। ওর মুখ শান্ত গম্ভীর। কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলল, 'স্যার আপনার কিছু ক্লিপিংস আমার কাছে আছে। আমি মাকে বলেছিলাম, এগুলো নিয়ে কিছু একটা করি। এসডিও প্রভাতরঞ্জন মুখার্জির বউ ছেলে মেয়ে দেখুক তার বাবা একজন কতবড় খেলুড়ে। কিন্তু আমার মা বলল না থাক।'

'তোমার মা?'

'ও হো আপনাকে তো বলাই হয়নি, আমার মায়ের নাম সুপ্রিয়া। চিনতে পেরেছেন? আরে যে বউটাকে আপনি মন্ত্রীর ঘরে ভেট দিয়ে প্রোমোশন নিয়েছিলেন। তাকে ট্র্যাপে ফেলেছিলেন। একদিন নয়, বার বার। আপনার দরকার পড়লেই তাকে ডেকে পাঠাতেন। আপনার বউ সাজিয়েও কোন এক বড় সাহেবের বাংলোয় প্রথম নিয়ে গিয়েছিলেন, মনে আছে?'

'সুপ্রিয়া মাইতি তোমার মা?' আমি শান্ত গলায় বললাম, 'তোমার মায়ের চাকরিটা আমিই করে দিয়েছিলাম।'

'জানি তো। মা আমাকে সব বলেছে। সত্যি কথাই বলেছে। কোনও সাফাই দেয়নি। দুর্ঘটনায় মৃত স্বামীর জায়গায় চাকরিপ্রার্থী ছিল। আর আপনি ছিলেন সে চাকরি দেওয়ার মালিক। কিন্তু প্রথমবার কী বলে নিয়ে গিয়েছিলেন বউটিকে? বলেছিলেন তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, তাকে কী করতে হবে? নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন। দু ঘন্টা পরে বড় সাহেবের বাংলো থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর ঠান্ডা মাথায় তাকে বলেছিলেন, এটুকু না করলে আপনিও কিছু করতে পারবেন না। এবার তার চাকরিটা হয়ে যাবে। তার পরেও কিন্তু হয়নি। এরপরে বার বার তাকে আপনি বাধ্য করিয়েছিলেন আপনার কথা শুনতে। ততদিনে মা জেনে গেছেন, মাকে ব্যবহার করে আপনিও ওপরে ওঠার রাস্তা তৈরি করলেন।'

আমি মাথা নিচু করি, 'আমি কিন্তু বেইমানি করিনি। তোমার মায়ের চাকরিটা করে দিয়েছি। এখন বলো, কী করতে হবে আমাকে, তোমার মায়ের কাছে গিয়ে কি ক্ষমা চাইব?'

'না, না, আমার মায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে না। আমি চাই না এসবের মধ্যে মাকে জড়াতে, সে সামান্য একটা চাকরি করে শ্বশুর শাশুড়িকে সামলায়। মেয়েকে বড় করেছে। সে এসবের মধ্যে থাকবে না।'

'তাহলে আমি কী করব?'

'ক্ষমা চাইবেন।'

'ক্ষমা চাইব কার কাছে?'

'নিজের বউ ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনির কাছে। এই যে আপনি সুইসাইড করছেন, এর জন্য ওদের কাছে ক্ষমা চাইবেন, ব্যস।'

'সুইসাইড!'

'হ্যাঁ, আপনার জন্য এটা যথেষ্ট সম্মানজনক মৃত্যু। নইলে আপনার সব কীর্তিগুলো আমি একটু একটু করে ফাঁস করব। আপনার সময় শুরু এখন থেকে। নিন, আর এক কাপ কফির অর্ডার দিন। আপনার সঙ্গে শেষ কফি খাই। ও আর একটা কথা আমি কিন্তু আপনার সঙ্গে শুয়েও চান করেছি।'

অধ্যায় ৮ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%