রাঘব বোয়াল

জয়ন্ত দে

রাঘব ঘোষালকে পুলিশ যেদিন ধরল সেদিন এ পাড়ার সবার টনক নড়ল। লোকটা যে এতদিন পাড়ায় ছিল তা যেন অনেকেই বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। কেননা পাড়ার সেই সব ছেলে ছোকরারা বড় হয়ে গেছে। যারা রাঘব ঘোষালকে রাঘব বোয়াল বানিয়েছিল। তারা এখন ছেলেপুলের বাপ। তারা যখন খবরটা পেল, হাঁ করে শুনল। শুনে প্রথমে নিজেদের বাহবা দিল। তারপর এ ওকে ফোন করে বলল— আমরা কী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম— শালা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। মালটা সত্যিই রাঘব বোয়াল।

সেই রাঘব বোয়াল— প্রফেসর রাঘব ঘোষাল এখন পুলিশ কাস্টডিতে। তার সামনে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একজন অল্প বয়সি অফিসার। এই আপাত হালকা কেসটা তাকে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রফেসর মানুষ। বুঝে শুনে হ্যান্ডেল করবেন। মিডিয়া ব্যাপারটাকে কিন্তু নজরে রাখছে।

আপনার নাম—

—রাঘব ঘোষাল। পাড়ার লোকেরা রাঘব বোয়াল বানিয়েছে।

লোকটির বাড়ির নেমপ্লেটে এই রাঘব ঘোষাল নামটাই লেখা ছিল। এটাই লেখা থাকার কথা। কিন্তু একদা এ পাড়ার কিছু দুষ্টু ছেলে ছোকরা রাঘবটা অক্ষত রেখে ঘোষালে নানাবিধ নকশা ও ডিজাইন করেছে। যেমন, ঘোষালের 'ঘ' এর একটু ঘষে, একটু ছুরি দিয়ে, একটু দাগ টেনে তাকে 'ব' বানিয়েছে। 'ষ' এর পেট-কাটা দাগটা মুছে দিয়েছে। আর তলায় খোদাই করা একটি ফুটকি দান করে তাকে 'য়' করেছে। ফলে ঘোষাল হয়েছে বোয়াল। আর লোকটির নাম দাঁড়িয়েছে রাঘব বোয়াল।

রাঘব কিন্তু তাকে এই ঘোষাল থেকে বোয়াল করে দেওয়ার জন্য কোনও চিৎকার চেঁচামেচি করেননি। কোনও ছেলের বাড়িতে গিয়ে রিপোর্ট করেননি। চুপচাপ বসে বসে দেখেছেন সে একটু একটু করে ঘোষাল থেকে বোয়াল হয়ে গেছেন।

পাড়ার দু-একজন দু-মুখো লোক তাকে এ ব্যাপারটা নোটিস করেছিল। বলেছিল, 'দেখেছেন আপনার নেমপ্লেটটা অশিক্ষিত ছেলেগুলো কী করেছে?

রাঘব হ্যাঁ, না কিছু বলেনি, শুধু বক্তার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন।

বক্তা বলেছিল, 'আপনি প্রতিবাদ করুন। নইলে এ-পাড়ায় থাকা দায় হয়ে যাবে। ওরা দিনরাত মেয়েদের টোন টিটকিরি করছে। এর তার বাড়ির ফোন নম্বর ম্যানেজ করে বেনামে ফোন করছে। চিঠি দিচ্ছে। ওগুলো মেনে নিলেও এটা কিন্তু মানা যায় না। লিখিতভাবে একজন মানুষের টাইটেল চেঞ্জ করে দেওয়া ক্রিমিনাল অফেন্স!'

রাঘব বলেছিলেন, 'কেন অনেক লোক তো টাইটেল চেঞ্জ করে। মশা থেকে রায় হয়। দাস থেকে ব্যানার্জি হতেও দেখেছি।'

'আরে মশাই সে তো কোর্ট করে। ওরা কি কোর্ট?'

রাঘব এবার সত্যি সত্যি যেন চিন্তায় পড়লেন। বলল, 'তা কী করা যায় বলুন তো, আমি কি পুলিশে যাব?'

উসকানিদাতা বলল, 'না, না, পুলিশটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আপনি গুণী মানুষ, পুলিশ এসে যদি পাড়ার ছেলেদের প্যাঁদায়, কেমন একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে না। আপনি বরং ওদের বাপমায়েদের সঙ্গে কথা বলুন।'

'কাদের বাপ মায়েদের?'

'এইসব পাড়ার ছেলে ছোকরাদের।'

'ওরা কারা? নামগুলো বলুন।'

'আমি নাম বলতে পারব না। নাম বললে অনেক হ্যাপা। আপনি এক কাজ করুন— সামনে যে মুদিখানা দোকান আছে তার কাছে গিয়ে ওদের নাম জেনে নিন। আপনি তো ওই দোকানের মাল খান। ও বলে দেবে। ছেলেটা খুব সাহসী।'

'ও যদি না বলে?'

'ও কী আর এমনি বলবে? ওকে ভয় দেখান, ব্ল্যাকমেল করুন। বলুন, না বললে ওর দোকানের মাল আর খাবেন না।'

রাঘববাবু কোনও দিন দোকানে গিয়ে ওই ছেলেগুলোর নাম জানতে চাননি। কিন্তু বুঝেছেন কাদের দ্বারা তিনি ঘোষাল থেকে বোয়াল হয়েছেন।

ছেলেগুলো তার নেমপ্লেটে বোয়াল করে ক্ষান্ত হয়নি। রিকশাওয়ালাদের বুঝিয়েছে— এই গলির মুখটার নাম রাঘব বোয়ালের মোড়।

ওরা রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে কায়দা করে ওদের ভাড়ার লিস্টে 'রাঘব বোয়ালের বাড়ি— ৩ টাকা' লিখিয়ে দিয়েছে। তা এখন বাড়তে বাড়তে ১০ টাকা হয়েছে।

এতেও রাঘব ঘোষাল সামান্য উষ্মা প্রকাশ করেননি।

কিন্তু তিনি যে ভেতর ভেতর ভয়ংকর রাগছিলেন সেটা পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর আবিষ্কার করে।

আগাগোড়াই রাঘব ঘোষাল এ-পাড়ার অনেকের চক্ষুশূল! কিন্তু কেন তিনি চক্ষুশূল তা পাড়ার লোকেরা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারে না। তাদের মতে লোকটা নাকি খুব বদমায়েশ।

তা লোকটার বদমায়েশির উদাহরণ চান, কেউ দিতে পারবে না। সবাই বলবে ওর মুখ দেখে বোঝা যায়। ও খুব বদমায়েশ। বদমায়েশ নাহলে মা বাবা ভাই বোন কোনও আত্মীয়স্বজন নেই। ঠিক আছে ধরলাম আত্মীয়স্বজন নেই, কিন্তু বন্ধুবান্ধব? কোন একটা দূরের কলেজে পড়ায়, তাহলে একটা ছাত্রছাত্রী কোনওদিন আসবে না বাড়িতে— তা কি হয়? আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহ শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী সবাইকে উনি অফ করে দিয়েছেন। ঠিক আছে সবাই যাক, তাহলেও পাড়া প্রতিবেশী থেকে যায়। তাদের দিকে ও ঘুরে তাকায় না। একজন বলল, লোকটা খুব কৃপণ। কিন্তু ওর বাড়ির রং সর্বদা ঝকঝকে। গ্রিলে বর্ষার আগে নিজে রং করে। চাঁদা নিয়ে কোনওদিন ঝামেলা পাকায়নি। তবে হ্যাঁ, রক্তদান শিবিরে যায় না, রক্তদান করতে। কিন্তু দেওয়ালির আগেই তার দোতলা বাড়ির তিনখানা বারান্দায় আলো জ্বালান। কালীপুজোর দিন ছাদে ওকে অনেকেই বসন তুবড়ি জ্বালাতে দেখেছে। ইলিশ মাছের সময় বাজারে ইলিশ মাছ কিনতে দেখা গেছে। জামাকাপড় বেশ ভদ্রলোকের মতো পরে। তাহলে কৃপণ কথাটা টেকে না।

পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর গোয়েন্দা দপ্তর খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রাঘবের কাছ থেকেই তাকে অপছন্দের কারণ জানতে চেয়েছে। শোনা গেছে রাঘব ওদের সাহায্য করেছেন।

বলেছেন, আমাকে দেখতে অদ্ভুত তাই।

মানে তাঁর রূপই তাঁকে সবার কাছে চক্ষুশূল করেছে।

গোয়েন্দা অফিসারটি নতুন। সদ্য পাশ করে জয়েন করেছে। তার কাছে এই কেসটা একটা দারুণ ব্যাপার, বেশ গবেষণাপত্র হয়ে উঠেছে। সে বিভিন্ন দিক থেকে আলো ফেলে রাঘব ঘোষাল ও তার কেসটি দেখতে চাইছে। বেশ ইন্টারেস্টিং কেস। গোয়েন্দা অফিসারটি ভালো করে রাঘব ঘোষালকে দেখল। লোকটার শরীরের তুলনায় মাথাটা বড়। তার ওপর মাথার চাঁদিটা ওপরের দিকে পটলের মতো ঠেলে উঠেছে। পুরো মাথা বড্ড তেলা। তাতে শন-নুড়ির মতো চুল মাথার সঙ্গে সেঁটে আছে।

রাঘব বললেন, 'জানেন আমার স্কুলের এমন একটা ছেলে ছিল না যে এই মাথায় চাঁটি মারেনি। খেলার মাঠে চাঁটি গাঁট্টা সমানে চলত।

কতরকম চাঁটি আমার মাথা হজম করেছে, বসা চাঁটি— এ চাঁটি মেরে হাতটা তুলবে না। উড়ন চাঁটি— শুধু কটা আঙুল দিয়ে চটাস। থুতু দিয়ে চাঁটি।'

গোয়েন্দা অফিসারটি বলল, 'চাঁটি ছাড়ুন, তারপর বলুন।'

'গাঁট্টা আছে। রাম গাঁট্টা।'

'ওসব চাঁটি গাঁট্টা বাদ দিয়ে আর কিছু বলুন।'

'আমার প্যান্ট ধরে টানত, অনেকদিন খুলে দিত।'

'ছেলেমানুষি ব্যাপার। ছোটবেলায় অনেকেই অনেককে মুরগি করে। বড় কিছু নয়।'

'মুরগি না। মুরগিও একটু এদিক ওদিক হলে ডানা ঝাপটায়। কঁক কঁক করে ডাকে। আমি হলাম গিয়ে মাছ। আমাকে না মেরে জ্যান্ত অবস্থায় আঁশ ছাড়ানো যায়। পেট টিপে পোঁটা গালানো যায়। কই মাছকে দেখেছেন বাটখারা দিয়ে মাথায় মারা হয়। শিঙি মাছে নুন দেওয়া হয়। আমাকে বেশ বড় বেলাতেও প্যান্ট খোলা হত। জ্যান্ত অবস্থায় আঁশ ছাড়ানোর মতো।'

'বড্ড উপমা দিচ্ছেন। আপনাকে এত লোকের অপছন্দের কারণগুলো বলুন।'

'প্রথম কথা আমার দর্শন। বলে না পহেলে দর্শনধারী।'

'ওটা আগেই বলেছেন। নেক্সট?

'আমার পিসি আমাকে বড় একটা বাড়ি দিয়ে গেছেন। তাতে মানুষের ঈর্ষা।'

'নেক্সট?'

'আমার পরীক্ষার খাতায় অনেক অনেক নম্বর লেখা থাকত। ওতেও সবার ঈর্ষা।'

'বুঝলাম আর?'

'ভালো রেজাল্টের জন্য কেউই আমাকে আটকাতে পারল না, আমি আমার মনের মতো চাকরি পেলাম।'

'কলেজে পড়ান। সংস্কৃত। সংস্কৃত কেউ পড়ে— স্টুডেন্ট খুব অল্প, তাই তো।'

রাঘব হাসেন। 'মৃত ভাষা— সবাই বলে। আমি বলি মৃতসঞ্জীবনী। একটু জল সিঞ্চন করলেই মরে থাকা ভাষা কেমন সবুজ পত্রে পুষ্পে ভরে ওঠে।'

'থাক থাক, আপনাকে সংস্কৃত নিয়ে গুণকীর্তন করতে হবে না।' অফিসারটি আপত্তি জানাল। কিন্তু রাঘব ঘোষাল থামলেন না, বললেন, 'সংস্কৃত যারা পড়তে আসে তারা প্রথম থেকেই মনে মনে উইক হয়ে থাকে। স্টুডেন্টদের মধ্যে একটা হীনমন্যতা কাজ করে। অন্যান্য বিষয়ের ছেলেমেয়েরা সংস্কৃত যারা পড়ে তাদের ব্যাপক আওয়াজ দেয়। যেমন বলে, টুলো পণ্ডিত হবি? পুরুতগিরি করবি? ফলে সংস্কৃত স্টুডেন্টরা তাদের স্যারদের বেশি ঠোক্কর দেয় না। নিজেরাই নিজেদের নিয়ে এত বিব্রত থাকে—।'

'আপনি সংস্কৃত চ্যাপ্টার ক্লোজড করুন। কাজের কথায় আসুন।'

রাঘব ঘোষাল হাসলেন। বললেন, 'এগুলো কাজের কথা। বরং আপনি বলুন অকাজের কথা! বলব, বলব, ধরা যখন পড়ে গেছি সব বলব।'

রাঘব ঘোষালের কথা শুনে গোয়েন্দা অফিসারটির কেমন ধন্দ লাগে। লোকটির কি মাথার গন্ডগোল আছে, না কি হাবিজাবি কথা বলে আসল ঘটনাটা ক্যামোফ্লেজ করতে চাইছে? অফিসারটি বলল, 'আপনি ছররা গুলি ছুঁড়ছিলেন কেন?'

রাঘব ঘোষাল হাসলেন। বললেন, 'একেবারে ছররাগুলিতে চলে গেলেন ভাই, রাঘব বোয়াল শুনবেন না?'

তরুণ অফিসারটির গলা হঠাৎ শুকনো হল। এই প্রথম পুলিশকে কেউ ভাই বলল। সবাই তো স্যার, স্যার করে—।

রাঘব বললেন, 'শুনবেন না, আমার নেমপ্লেটের সারনেমটা ওরা নানা কায়দা করে বোয়াল করে দিয়েছিল। আমি ঘোষাল নই বোয়াল। কেন না আমি দেখতে আপনাদের মতো স্বাভাবিক নই। আমার মাথাটা হামটি ডামটি মার্কা। আমার হাঁ মুখটা স্বাভাবিকের চেয়ে বড়।'

অফিসার আরও মুখ গম্ভীর করল। তার কচি মুখ এত গম্ভীর করলে মানায় না। তবু চাকরির খাতিরে করতে হয়। বলল, 'আপনি কি আপনার লুক নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন?'

'আমার হীনমন্যতা নয় ভাই, বরং বলতে পারি আমাকে দেখে আর পাঁচজনের এক্সট্রা হরমোন ক্ষয়। সায়েন্স-এর টিচার হলে বলে দিতাম কোন হরমোন। বাড়তি এনার্জি, উল্লাস কোন হরমোন থেকে হয় জানেন?'

'আপনি ছররা গুলি ছুঁড়লেন কেন?'

'আবার পেছন দিকে চলে গেলেন। তার আগেও আমি অনেক কিছু করেছি। যা অনেকেই জ্বলেছে কিন্তু বুঝতে পারেনি। এবারও পারত না।' রাঘব ঘোষাল হাসলেন।

গোয়েন্দা অফিসারটি দেখল, লোকটির হাঁ-মুখটি বিতিকিচ্ছিরি মতো বড়। আর দাঁতগুলো খুদে খুদে। তার ফলে ঠোঁটের কাছে এক্সট্রা এক পরত মাংসের ভাঁজ। রাঘব বললেন, 'সব যখন শুনছেন, আর একটু শুনুন।'

'বলুন।'

'জানেন পিসিমা বেঁচে থাকতেই ওই বাড়িতে এসেছিলাম। তারপর পড়া শেষ করে কলেজে শিক্ষকতা নেওয়ার সময় পিসিমা দেহ রাখলেন। বাড়িটা আমি পেলাম। বাড়িটা পেতেই সবার কেমন ঈর্ষা হল। যেন, আমার মতো একটা অসুন্দর লোকের ওই সুন্দর বাড়িটা থাকার জায়গা নয়। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না। বললেও, নানা চালাকির কথা। যাতে আমার সঙ্গে কারও লেগে যায়। একদিন দেখলাম আমার নেমপ্লেটকে কেউ বা কারা রাঘব বোয়াল করে দিয়েছে। অসাধারণ উইট। ঘোষালকে বোয়াল বানানো সত্যিই একটা মননের পরিচয়। আর পরিবর্তনটা শিল্পের পর্যায়ে।'

'প্রতিবাদ করেননি কোনওদিন?'

'না, না, কোনওদিন না। তারপর রিকশাওয়ালাদের ম্যানেজ করে আমার বাড়ির মোড়টা করে দিল রাঘব বোয়ালের মোড়।

রিকশাচালকদের ফেয়ারচার্টের বোর্ডে এখনও সেটা লেখা আছে। আগে আমি রাস্তায় বের হলেই পাড়ার ছেলেরা বোয়াল বোয়াল বলে আওয়াজ দিত।'

'এখন কেউ দেয়? তার নাম বলুন।'

'এখন কেউ দেয় না। বিশ্বাস করুন সবাই যেন ভুলেই গেছে— আমি আছি। এটা হয়েছে বছর চার পাঁচেক। প্রথমে কিছু মনে হত না। কিন্তু ইদানীং মনে হত— আমাকে সবাই খুব ইগনোর করছে। আমি প্রথম দিকে একটা দূরবিন কিনেছিলাম। দুপুরে রাতে ছাদে উঠে উঠে দেখতাম। এই দেখতে দেখতে অনেক অনেক গোপন তথ্য পেয়েছিলাম। তারপর সেগুলো চিঠি লিখে লিখে সেই সব বাড়িতে জানাতাম। কিন্তু তেমন করে কোনও বাড়িতেই রিপারকেশন দেখিনি। সবাই যেন কেমন নেতিয়ে গেছে।'

গোয়েন্দা অফিসার বললেন, 'চা খাবেন?'

'আগে জল খাব।'

বোতল এগিয়ে দেওয়া হয়। রাঘব ঘোষাল জল খান। বলেন, 'এখনও রকে অল্প বয়েসি ছেলেমেয়েরা আড্ডা দেয়। কিন্তু তারা কেউ আমার দিকে তাকায় না। আসলে ওরা ফোনের স্ক্রিন ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না। আমাকে দেখে হাসে না। যখন হাসে বুঝতে হবে ওয়াটসআপে কোনও অসভ্য জোকস এসেছে।'

'হ্যাঁ, বলুন। দূরবীন, চিঠি লেখা ছাড়া আর কী করলেন?'

'লেসার লাইট কিনে এসে রাতে ভিতে এর বাড়ির দেওয়ালে, ওর ঘরের মশারিতে ফেললাম। কিন্তু খুব ভালো রেজাল্ট পেলাম না।

এমনিতে ধুলোর জন্য সবাই জানালা বন্ধই রাখে। তারপর গরমের সময় এসি। শীতের সময় ঠান্ডা হাওয়া। লেজার ঠিক কাজ দিল না।' 'তারপর?'

'দু-একটা খুচরো বলেনি। এই যেমন দোলের সময় জলবিছুটির জল পিচকারি করে ছাদ থেকে দিয়েছি। তাতে অবশ্য রং ছিল। কিন্তু রেজাল্ট বুঝতে পারিনি। তারপর— দুম! একবার খালি মদের বোতল নিয়ে এসে পাড়ায় রাস্তা ছাদ থেকে ফেলেছি। কেউ একবার উঁকি মেরেও দেখেনি। মানুষ কেমন নিস্পৃহ হয়ে গেছে।'

'তারপরই কি ছররা বন্দুক থেকে গুলি চালালেন?'

'না, তার আগে রাতের বেলা অনেক অনেক ঢিল ছুঁড়েছি। একটাও কোনও জানলায় লাগাতে পারিনি। তারপর পাড়াও কোনও টালি বা টিনের চালের বাড়ি নেই। পুরো হতাশ হয়েছি।'

'ছররা ছুঁড়লেন কখন?'

'সবার শেষে হতাশ হয়ে। আর পারলাম না বুঝলেন। সন্ধের মুখে আধো অন্ধকারে ছররা চালালাম। দু-একজনের কেটে কুটে গেল।

কেউ আর তেমন চিৎকার করে না। এদিক ওদিক দেখে চলে গেল। বুঝলেন, ভদ্রলোকদের দিয়ে আর হবে না। ওরা মারও হজম করতে শিখে গেছে। তাই শেষে বেছে বেছে রিকশাওয়ালাদের অ্যাটাক করা শুরু করলাম। আমার বাড়ির সামনে এসে প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন দিয়ে যেই মোড় ঘোরে আমি ফুট করে ছররা চালিয়ে দিই। দারুণ রেজাল্ট। কী হইচই।'

'আপনি সেরেফ মজা করার জন্যে ছররা ছুঁড়ছিলেন। আশ্চর্য!'

রাঘব ঘোষাল হাসলেন। বললেন, 'আমার কেসটা খুব খেয়েছে না! শুনলাম তো খবরের কাগজ বেরিয়েছে, টিভিতে আলোচনা তর্ক বিতর্ক হচ্ছে। তা কী মনে হয় কেমন শাস্তি হতে পারে আমার?'

তরুণ অফিসারটি মাথা চুলকাল। 'আপনি অদ্ভুত মানুষ! যারা আপনাকে ঘোষাল থেকে বোয়াল বানাল তাদের প্রতি আপনার কোনও রাগ নেই। আপনার রাগের কারণ আপনাকে কেউ দেখছে না বলে—।'

'ঠিক বলেছেন— এত অবহেলা সহ্য করা যায় না। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই, এই যে ফুটবল সে যদি ঘরের কোণে পড়ে থাকে তার কি ভালো লাগবে? সে চায় তাকে লাথাক, সবাই মিলে লাথাক। মাথায় নাচাক, গোলে ঢোকাক—।'

পুলিশ অফিসারটির বেশ গুলিয়ে গেছে। কী বলবে, কেসটাকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সে বুঝে উঠতে পারছে না। একবার তার লোকটিকে পাগল মনে হচ্ছে, আবার মানুষটাকে খুব অসহায়ও মনে হচ্ছে। সে হঠাৎ বলল, 'আমি আপনার কেসটা হালকা করে দিতে পারি। শাস্তি হবে, তবে তা সামান্য। আবার কোর্টের ক্ষমা প্রার্থনা করে, ভর্ৎসনা শুনে খালাসও পেয়ে যেতে পারেন।'

রাঘব ঘোষাল অফিসারের মুখে দিকে তাকিয়ে আছে। বলুন, বলুন ভাব।

অফিসারটি বলল, 'আপনি একটা চোর বেড়ালের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে ছররা চালিয়েছিলেন। মানুষের জন্য নয়। কী ঠিক আছে?'

'শেষে কি না বেড়াল। না, না, ব্যাপারটা ঠিক হচ্ছে না।'

'বিড়াল ছাড়া বাঘ পাবেন কোথায়। আমি যদি আপনার কথা মতো মানুষ দিই, তাহলে মারাত্মক হাম্পু খেয়ে যাবেন। অ্যাটেম্প টু মার্ডার! কী করব বলুন?'

রাঘব ঘোষাল দু-চোখ বুজিয়ে বিড়বিড় করে, 'কচু গাছ কাটতে কাটতে একদিন মানুষ কাটা যায়! প্রবাদটা শুনেছেন?'

'মানে!' পুলিশ অফিসারটি চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে। 'মানে আপনি বলছেন। এক প্রকার আমাকে শুনিয়েই রাখছেন, ছররাটা আপনার হাত মকশো করা, হাত পাকানো ব্যাপার। আপনি ভবিষ্যতে বড় কাণ্ড ঘটাবেন। না, না, আপনাকে ছাড়া যাবে না। আমি আপনার এগেনস্টেই রিপোর্ট দেব। আপনি মানুষ দেখে দেখে গুলি করেছেন। তারপর পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছেন। পুরো হাম্পু দিয়ে দেব আপনাকে।'

রাঘব ঘোষাল অমায়িক হাসল। বলল, 'আপনার শেখানো কথাই আমি বলব— বেড়াল তাড়াতে গিয়ে ছররা ছুঁড়েছি। কাক তাড়াতে গিয়ে ছররা ছুঁড়েছি। এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। স্বাভাবিক ব্যাপারটাই সবাই মেনে নেবে। অস্বাভাবিকতা কেউ মানতে চায় না। আমি যে অস্বাভাবিক কথাগুলো বললাম আপনি কোর্টে তা প্রমাণ করতে পারবেন না। আপনি কোর্টে দাঁড়িয়ে বলতেও পারবেন না, আমি ডেঞ্জারাস লোক। এটা আমার কচুগাছ কাটা! রাঘব ঘোষাল থেকে রাঘব বোয়াল হওয়ার পথে একটুখানি এগিয়ে যাওয়া।' রাঘব ঘোষাল হাসল, বলল, 'রাঘব বোয়াল— কচু গাছ কাটতে কাটতে— কদম কদম বঢ়ায়ে যা...।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%