কমলা সুন্দরী ও তিনজন

জয়ন্ত দে

লোকটা অসীমানন্দের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসল। যখন হাসল তখন ওর গালের চামড়া গুটিয়ে হাতমোছা ন্যাপকিনের মতো হয়ে গেল। হাসি যত মোলায়েম হল, গালের চামড়া তখন আবার আগের মতো হয়ে এল।

এ হাসি অসীমানন্দের চেনা।

একটু আগে লোকটা জুতো না ছেড়েই অসীমানন্দের ঘরে ঢুকে পড়েছে। তখন এই ঘরে দুজন সঙ্গীতশিক্ষার্থী ছাত্রী বসেছিল। গানের খাতা খুলে, সামনে হারমোনিয়াম। লোকটা সটান এসে অসীমানন্দের ঘরে ঢুকে পড়ল। ঢুকে এসে কোমরে হাত দিয়ে খুব খারাপভাবে দাঁড়াল। মনে হল, যেন কেউ এলেন শাসন করতে।

লোকটা পুলিশ!

লোকটা এসে আবার নিজের পরিচয় দিল। না দিলেও চলত। তবু দিল মানে খুব শান্ত গলায়, কেটে কেটে বলল। শুধু পুলিশ নই। একটু উঁচু দরের। আগে সিআইডি ছিলাম। এখন আইবি-র।

লোকটা কোমরে হাত দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে। অসীমানন্দ ওর সামনে মেঝেয় পাতা একটা নিচু গদিতে বসে। পিঠে, পাশে তাকিয়া। সামনে হারমোনিয়াম। ওদিকে তবলার ছেলেটা ঠুক ঠুক করে তবলা ঠুকছিল। পুলিশ শুনে সে একটু ঘাবড়ে গেছে। আবার এও ভাবল পুলিশ হয়তো গান শিখবে। তবে বয়সটা বড্ড বেশি। হতেই পারে, কত মানুষের কত ইচ্ছে থাকে। ডান্ডাবাজি করতে করতে সুর ভাঁজবে। সে আবার তবলায় চাঁটি মরতে শুরু করল। একটু বেয়াড়াভাবেই। যেন পুলিশকে টুপি খুলে চাঁটি মারছে। যেমন সিনেমায় দেখায় আর কী!

লোকটা বলল, 'অ্যাই তবলচি থেমে যা বাপ!'

তবলিয়া ছেলেটা বলল, 'কী?'

লোকটা মুখটা আবার কুঁচকানো ন্যাপকিনের মতো করে এক গাল হেসে বলল, 'বাব্বা কেমন চমকে উঠলি আমি কি ব্যাঙাচি বলেছি! যাও, একটু বাইরে গিয়ে হাওয়া খেয়ে আসো, আমি ততক্ষণে গানদাদার সঙ্গে একটু কথা বলেনি।'

তবলচি ছেলেটা অবাক হয়ে অসীমানন্দের দিকে তাকাল, কিন্তু অসীমানন্দ দেখল না। ছেলেটা বুঝল, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, চলে যাওয়াই ভালো। পুলিশ! তারপর এ ভাষায় কথা বলছে। গুরুজি কি আবার কোনও ঘাপলা কেসে ফেঁসেছে? ক-বছর আগে তো খবরের কাগজ, টিভিতে গুরুজিকে নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। ছেলেটা ওসব কথা ভেবেই উঠে পড়ল। ওর দেখাদেখি মেয়ে দুটিও উঠে পড়ল। বলল, 'গুরুজি আজ আমরা আসি।'

'এসো মামণি। পরে গুরুজিকে ফোন করে, আজকের বাতিল ক্লাসটা করে নিও।'

ঘর ফাঁকা হতে লোকটা বলল, 'এই তো এবার বসা যাবে। তালে বসি। কিন্তু কোথায় বসি? একটাও তো উঁচু জায়গা রাখেননি। সবাইকে মাটিতে নামিয়ে আনেন কেন?'

অসীমানন্দ একটু ডান দিকে তাকালেন। ডানদিকের দেওয়ালে পর পর কতগুলো সুদৃশ্য মোড়া। হস্তশিল্প। লোকটা সটান এগিয়ে গিয়ে একটা মোড়া তুলে এনে অসীমানন্দের মুখোমুখি বসল। তারপর আবার হেসে বলল, 'পৃথিবীতে কেউ কোনওদিন শোনেনি মাটিতে বসে জেরা হচ্ছে! মাটিতে বসে ধর্মকথা হয়। আমরা অধর্মের কথাই বলব। তাই মোড়া নিয়ে এলাম। আমার হাঁটুর কোনও ব্যারাম নেই, যেখানে খুশি বসতে পারি, যেখানে খুশি শুতে পারি। কিন্তু ডেকোরাম বলে একটা ব্যাপার আছে তো?'

'না, না, ঠিক আছে আপনি ওখানেই বসুন।' অসীমানন্দ এতক্ষণ পরে প্রথম কথা বললেন। কাল রাতে লোকটা ফোন করেছিল। আসবে। অসীমানন্দ মনে মনে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু এমনভাবে, এ কথা ভাবেনি। অসীমানন্দ ঢোঁক গিলে বলল, 'বলুন, কী জানতে চান?'

লোকটা গলা খাঁকারি দিল। বলল, 'নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছেন আমি সেই ধূমকেতু রাহা। আগেই বলেছি, আইবি-তে আছি। জানেন নিশ্চয়ই, সাসপেন্ডেড ছিলাম। এখন বেকসুর খালাস। কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। পারবেও না, আমার প্ল্যানিং নিখুঁত ছিল। কিন্তু কী জানেন, কাকের মাংস কাক খায় না। কিন্তু মানুষ মানুষের মাংস খায়। আমার কয়েকজন হারামি কলিগ কলকাঠি নেড়েছিল। তাতেই এতদিন ঘানি ঘোরাতে হল। যাক এখন সাফসুফ হয়ে গেছি। আবার জয়েন করেছি। আবার নতুন প্ল্যানিং করছি। আপনাদের তিনজনের জন্য একদম আলাদা আলাদা প্ল্যান। এবারও দেখবেন, কেউ আমার টিকিটি ছুঁতে পারবে না। আমি ঠিক আপনাদের তিনজনকে আমার সুন্দরী কমলার কাছে পাঠিয়ে দেব। বাই দ্য বাই গুরুজি আপনি কিন্তু সুন্দরী কমলা নাচে গানটা হেব্বি তুলিয়েছিলেন। লোকগীতি, না পল্লিগীতি কী যেন বলে? গানটা কিন্তু ঝক্কাস। কমলা ওই গানটা আমাদের একটা পুলিশ-পিকনিকে গেয়েছিল। সব্বাই খুব হাততালি মেরেছিল। বড় বড় সাহেব, মেমসাহেবরাও প্রশংসা করেছিল। বলেছিল কমলা একদিন হেব্বি নাম করবে। ব্যস আমার সর্বনাশের শুরু।'

অসীমানন্দ বিড়বিড় করলেন, 'হ্যাঁ কমলার প্রতিভা ছিল। বেঁচে থাকলে...'

'বেঁচে থাকবে কী করে, আপনাদের নজর পড়ে গেছে। বেঁচে থাকতে আর পারে? পোকা লেগে গেল।' লোকটা রুমাল বের করল, মুখ মুছল। বলল, 'তার আগেই অবশ্য আপনি এন্ট্রি নিয়েছেন। ভালো ভালো গান দিচ্ছেন। আর ও টপাটপ তুলে নিচ্ছে।'

অসীমানন্দ আবার বিড়বিড় করলেন, 'ভালো গাইত। প্রতিভা ছিল।'

'ধুস! প্রতিভা টতিভা ফালতু কথা। একদম বাজে কথা। আপনারা ওসব দেখেননি, আপনারা দেখেছিলেন শরীর! শরীর!' ধূমকেতু মাথা নিচু করল। 'কমলা দেখতে ভালো ছিল। গানটাও ভালো গাইত। সবাই বলত— গান গেয়ে নাম করবে। নামী গায়িকা হবে। এটার সঙ্গে আপনি বলবেন— খুব গায়ে পড়া ছিল, বলবেন— খুব ঢলানি ছিল! আসলে ও উচ্চাভিলাষী ছিল। কিন্তু আপনি তো তেমন নন। অথচ আপনার সঙ্গেই ওর প্রথম সম্পর্ক। পরকীয়া। আপনি ওকে প্রেমের ফাঁদে ফাঁসিয়েছিলেন।'

অসীমানন্দ মাথা নিচু করলেন। লোকটা আবার পুরনো কথাগুলো তুলবে। তাঁর চোয়াল শক্ত হল।

ধূমকেতুর গালের চামড়া কোঁচকাল। 'আপনি গুণীমানুষ, আপনি গান গাইলে এখনও আমি দুচোখ বন্ধ করে শুনি। তারওপর আপনি দেখতে সুন্দর, দারুণ কথা বলতে পারেন, সাজপোশাকেও একটা আলাদা ব্যাপার আছে। ও কী প্রেমে পড়বে, প্রথম যেদিন আমি আপনাকে দেখলাম, সেদিন আমিই আপনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আপনার গা দিয়ে খুব নরম একটা পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, এমন মানুষ না হলে এমন গান বের হয় গলা দিয়ে! অথচ আপনার ভেতর কতটা পচা সেটা আপনি ছাড়া আর কে জানে বলুন?'

ধূমকেতু ঘরের সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলল। খুব আস্তে আস্তে পাকে পাকে পাখাটা ঘুরছে। পুরনো দিনের বাড়ি, দেখলেই বোঝা যায়, দেওয়ালগুলো কুড়ি ইঞ্চির হবে। ক্রিম রঙের দেওয়ালে, জানালা দরজার পরদাগুলো সাদা। নীচে ঝালর।

'ঝালর বুঝলেন। আপনি এমন ঝালর দুলিয়েছিলেন, আমি মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। ও যখন আপনার সঙ্গে গুরুজি বলে কথা বলছিল, আমি কেমন গুরুজি গুরুজি করলাম। আমি স্যার বলতে পারতাম। বলিনি। দাদা বলতে পারতাম। বলিনি কিন্তু আমিও আপনার ঝালরের দোলা খেয়ে গেলাম। আপনিও আমার গুরুজি হলেন। আমার ভেতর ভেতর কী শ্রদ্ধা। রাতে শুয়ে মনে হল ঈশ্বর দর্শন করে এলাম। আমি পুলিশ সার্ভিসের লোক, আমি ভুল করলাম, আর ও তো করবেই। সুন্দরী, উচ্চাভিলাষী, গায়ে পড়া। ও সুন্দরী। এটা নিয়ে কেউ সন্দেহ করবে না। দ্বিতীয়টি হল উচ্চাভিলাষী। এটি আপনি বলেছেন। কোর্টে। ঠিক ঠিক। তৃতীয় নম্বরটি হল গায়ে পড়া, এটা রত্নেশ্বর সমাজপতি বলেছিলেন। পুলিশের কাছে। কোর্টেও। আমি ঠিক এ ব্যাপারে জানি না। উনি যখন বলেছেন, নিশ্চয় বুঝেই বলেছেন।'

'দেখুন কমলা নেই। এই কথাগুলো হয়ে গেছে। কী হবে আর ওসব কথা তুলে?'

'কেন তুলব না? আপনি বলেছেন উচ্চাভিলাষী, কিন্তু কখনো বলেননি প্রতিভাময়ী! বলেননি। আমি আপনার বয়ান পুরো পড়েছি। আপনি ওকে ওই অনন্যা রেকর্ড কোম্পানির মালিক রত্নেশ্বর সমাজপতিকে ভেট দিয়েছিলেন। এবং ওকে বুঝিয়েছিলেন, আপনি ওকে গান শেখাতে পারেন কিন্তু বিখ্যাত করতে পারবেন না। বিখ্যাত করতে পারে রত্নেশ্বর সমাজপতি। ওকে বাধ্য করেছিলেন গায়ে পড়া রত্নেশ্বরকে সহ্য করতে। ও আপনাকে বিশ্বাস করত। ভালোবাসত। আমি বেশ বুঝতে পারতাম। সত্যি বলছি কষ্ট পেলেও এটা নিয়ে রাগ করতাম না। ও যদি কোনওদিন আমাকে এসে বলত আমাকে ছেড়ে দাও। গুরুজি আমাকে বিয়ে করবে। আমি ছেড়ে দিতাম। মা কালীর দিব্যি। কেউ আপত্তি করলে আমি তার মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে দিতাম। কিন্তু ও বলেনি। আমি বলেছি। তোমাদের দুজনকে কী সুন্দর মানায়। ও বলত, ইস অমন যদি গাইতে পারতাম। ও যদি আপনাকে ভালোবাসে তবে গানটাই প্রধান ছিল।'

হঠাৎ ধূমকেতু রাহা থামে। 'আপনার এই ঘরে টিভি নেই?'

'না।'

'শোয়ার ঘরে আছে। হ্যাঁ হ্যাঁ এমনটাই শুনেছিলাম। একটু খবরটা দেখার দরকার ছিল। একটা খবর আসার কথা। কী জানি। কারও ওপর আর আগের মতো ভরসা করা যায় না। ভালো কাজের লোক বড্ড কম। ঠিক আছে যা হওয়ার হবে। ফালতু টেনশন করে লাভ নেই। হ্যাঁ যা বলছিলাম। আমি কিন্তু আপনাকে আর কমলাকে নিয়ে কিছু অন্যরকম ভাবতাম। সন্দেহ করতাম না। ভাবতাম, আপনাদের দুজনের মধ্যে যে সম্পর্কই থাক, মনে হোক, শরীরের হোক সেটা সৃষ্টির আনন্দ। আমি আদার ব্যাপারী জাহাজে উঠব না। কিন্তু যেদিন দেখলাম আমার ঘরের এক কোণে সিগারেটের একটা টুকরো সেদিনই মাথার ভেতর চড়াং করে উঠল। আপনি তো সিগারেট খান না। তবে কে? বিশ্বাস করুন আমি রত্নেশ্বর সমাজপতিকে সন্দেহ করিনি। কেননা রত্নেশ্বর সমাজপতিকে কমলা সহ্য করতে পারত না। আমাকে এসে বলত গুরুজি যে কী করে ওই অনন্যা রেকর্ডসের রত্নেশ্বরবাবুকে সহ্য করে বুঝতে পারি না।'

ধূমকেতু সাহা ছটফট করল। ঘাড় মোচড়াল। ফট ফট করে আঙুল ফাটাল। অসীমানন্দও একটু সোজা হয়ে বসলেন। তিনিই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। কমলাকে প্রথমবার দেখেই রত্নেশ্বরের কুদৃষ্টি পড়েছিল। এটা বেশই বুঝেছিলেন অসীমানন্দ। তিনি নিশ্চুপই ছিলেন। জানতেন, রত্নেশ্বরের ডাকে কমলা সাড়া দেবে না। মেয়েটাকে দেখলে খুব সহজ লাগে কিন্তু অত সহজ ছিল না। কেননা অসীমানন্দও প্রথমদিকে ঠিক তল পায়নি। আলাদা করে যে দু-তিনবার ডেকেছিলেন, ততবারই মেয়েটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে নিজেকে সরিয়ে রেখে গান শিখে চলে গিয়েছিল। এবং দু-তিনটে গানের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় গাড়ির ভেতর বেশ গা বাঁচিয়ে বসেছিল। শুধু কি তাই, রত্নেশ্বর একটু আঁকাবাঁকা কথা বললেই মেয়েটা ওর দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বামীর গল্প বলত। খুব খতরনক ওর স্বামী। কোনও কিছুতেই তার নাকি আপত্তি নেই। কিন্তু বেচাল করতে দেখলে ওকেই খুন করে রাখবে বলে শাসিয়েছে।

যে ওর স্বামীকে একবার দেখেছে, সে ওর কথা শুনলে বিশ্বাস করবে। আর নির্ঘাত সাবধানে থাকবে।

প্রথমবার যেদিন অসীমানন্দের ওকে একা পাওয়ার ইচ্ছে ছিল, তার দুদিন আগে অসীমানন্দ ওর আঙুলের ওপর হাত বুলিয়েছিলেন। সারা শরীর শিরশির করছিল। খুব নিচু স্বরে বলেছিলেন, মঙ্গলবার চারটে নাগাত আসতে পারবেন, আমি একা থাকব।

তখনও অসীমানন্দ ওকে 'আপনি' বলতেন। খুব কমজনকে অসীমানন্দ 'তুমি' বলেন। আর 'তুই' তো পারতপক্ষে কাউকে নয়। বলেছিল, আসুন, দুজনে একটু সুরসাধনা করব।

কমলা এসেছিল সেদিন প্রথমবার স্বামীকে নিয়ে। ঘরের ভেতর এনে গুরুজির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল এই ধূমকেতুকে। অসীমানন্দ মানুষটার দিকে তাকিয়ে দেখেই চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন। কেমন যেন কঠিন, নিরেট একটা লোক! সারা মুখে ছুরির ফালাকাটা দাগ। কুঞ্চিত মুখ। তেমন কালো। ভীষণ সাদা দাঁত। লোকটা হাসছিল। অসীমানন্দ চোখ বন্ধ করলেন। লোকটা তখন এখনকার মতো কুৎসিত দেখতে ছিল না। এত নৃশংস মনে হয়নি। কাল যখন ফোন করল, বলা নেই কওয়া নেই, স্পষ্ট গলায় বলল, 'কাল সন্ধেবেলা আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে।'

'কাল সন্ধেবেলা আমি ব্যস্ত থাকব। ক্লাস আছে।'

'থাকুক। আমি যাব।'

'কেন আসবেন? আপনার না আসাই ভালো। আপনার সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই।'

'আমার আছে। আপনি না বললেও আমি যাব।'

'যদি পুলিশকে জানাই।'

'আমাকে ভয় দেখাবেন না। আমার কেউ নেই। হারাবার কিছু নেই।'

সেই ধূমকেতু রাহা এসেছে।

'সেই সিগারেটের টুকরো বুঝলেন। সন্দেহ হল। লোক লাগালাম। কে আসে, কে যায়? রত্নেশ্বরের নাম উঠল। শুনলাম অনন্যা থেকে ওর অ্যালবাম বের হচ্ছে। সন্দেহ ছিল কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছিল না। সরাসরি জিগ্যেস করলাম, কে এসেছিল? ঘরের ভেতর সিগারেটের টুকরো ছুড়েছে। ও বলল তাহলে রত্নেশ্বরবাবু। কন্ট্রাক্ট ফর্মে সাইন করিয়ে নিয়ে গেলেন।

ভাবতাম, আপনি থাকতে কেউ ওকে ভুল পথে চালিত করতে পারবে না। কেননা ততদিনে আমি বেশ টের পেয়েছিলাম আপনাদের মধ্যে একটা ভালোবাসা প্রেমের সম্পর্ক আছে। কিন্তু মিথ্যে বলব না, ও আমার কোনও অযত্ন করেনি। বরং আমারই মনে হত আমি ওর যোগ্য নই। কিন্তু রত্নেশ্বর মাঝেমাঝেই আসছিল। আমি একদিন ওকে বারণ করলাম। বললাম, লোকটাকে বেশি অ্যালাউ কোরো না। এরপর আর রত্নেশ্বর আসত না। খবর পেতাম ও যেত। একদিন বললাম, রত্নেশ্বরের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? ও ঝটকা দিল, বলল, কিচ্ছু না।

আমি বললাম, গুরুজিকে বলো অন্য কোনও রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে দিতে। ও বলল, গুরুজি কেন আমার কাছে সুরঙ্গমের অফার আছে। সুরঙ্গম বেশ নামী কোম্পানি। সুরঙ্গমের মালিক উৎপলবাবু বেশ বিশিষ্ট লোক। ক্রমশ দেখছিলাম, ওর কাছে আপনার কথা কম। মানে গানের কথা কম। সব কথাই রেকর্ড কোম্পানির। একদিন ওকে বললাম, তুমি গান নিয়ে ভাবছ না। এত অ্যালবাম অ্যালবাম নিয়ে মেতেছ কেন? ও বলল শুধু গান গাইলে হয় না। মার্কেটিংটাই আসল। এই দেখো না কদিনের মধ্যে একটা খবরের কাগজ আমাকে নিয়ে বিশাল খবর করবে। কোন কাগজ! না, নাম বলব না। সারপ্রাইজ। সত্যি সত্যি এক শনিবার দেখলাম খবরের কাগজের হাফ পাতা জুড়ে কমলা। আমি খবরের কাগজের এই লোকগুলোকে চিনি। খুব হারামজাদা। মদ, মেয়েছেলে আর টাকা ছাড়া নড়ে বসে না। তাহলে হঠাৎ ওরা কেন কমলাকে নিয়ে পড়ল। পুরনো এক সাংবাদিক বন্ধু আছে তাকে বললাম, সে বলল চলে আসুন প্রেস ক্লাবে, আমি ঘোড়ার মুখে বসিয়ে দেব। গেলাম। যে লিখেছে তার সঙ্গে তিন পাত্তর মদ খেলাম। বললাম, গত শনিবারের পাতায় নতুন গায়িকা কমলাকে নিয়ে লিখেছেন। আমার একজন আছে, তাকে নিয়ে এমন একটা লেখা করে দিতে পারবেন? সাংবাদিক বন্ধুটি পরিষ্কার বলল পারব না। আপনি টাকা দিলেও পারব না। কেননা এটা আমার বসের অ্যাসাইনমেন্ট। ওই কমলা সুরঙ্গমা রেকর্ড কোম্পানির উৎপলবাবুর কেপ্ট। তারপর শুনেছি, আমার বসও নাকি ওই মহিলার স্পেশাল বন্ধু। মানে প্রসাদ পেয়েছে। তাইজন্যই এত বড় লেখা। আমি আরও তিন পাত্তর মদ খেয়ে বাড়ি এলাম। কমলাকে বললাম, তোমার নামে এসব কথা রটছে। তুমি গিয়ে একবার গুরুজির সঙ্গে কথা বলো। পাবলিসিটির নামে এসব কী? ও ঠোঁট ওলটাল। বলল, সব গসিপ! ঈর্ষা! তুমি বরং আমার পরিচয় কাউকে দিও না। আমার তখন পাগলপারা অবস্থা। একজনকে ফিট করলাম। সে রত্নেশ্বরের কাছ থেকে সব খবর এনে দিল। আপনার সঙ্গে কমলার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আপনি বুঝেছিলেন কমলা আপনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। তার ওপর আপনার নেশা ততদিনে কেটে গেছে। আপনার হাতে কমলার মতো মেয়ের দল লাইন দিয়ে আছে। আপনি ওকে ভেট দিয়েছিলেন রত্নেশ্বরকে। রত্নেশ্বর থেকে কমলা জোগাড় করেছে উৎপলবাবুকে। কমলাকে নিয়ে রত্নেশ্বর আর উৎপলবাবুর খুব ঝামেলা হয়েছিল। ওরা একদিন দুজনেই এসেছিল গুরুজি আপনার কাছে। আপনি নাকি হাসতে হাসতে বলেছেন ওর হাজবেন্ড জানতে পারলে আপনাদের দুজন, সঙ্গে আমাকেও খুন করে রাখবে। অবশ্য ওকে আগে মারবে।'

ধূমকেতু রাহা থামে।

অসীমানন্দের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকায়, বলে, 'গুরুজি দেখেছেন আমি কিন্তু একদম আপনার কথা ফলো করে চলেছি। আপনি কী বলেছিলেন— আমি প্রথম খুন করব কমলাকে! করেছি। কমলা বিসর্জন হয়ে গেছে। তারপর? কমলাকে নিয়ে ঝগড়া করা ওরা দুজন। এবার দুজনের পালা।' ধূমকেতু আনচান করে, 'গুরুজি একটু টিভি খবরটা শোনা যাবে? এতক্ষণ খবরটা হয়ে গেছে। হয়ে যাওয়ারই কথা। কী যে করেন টিভিটা শোয়ার ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছেন।'

ধূমকেতু রাহার কথার মাঝে অসীমানন্দের মোবাইল ফোনে তবলা বেজে ওঠে। লাইন কেটে দেন অসীমানন্দ। আবার তবলা। তেরে কেটে তেরে কেটে। অসীমানন্দ একঝলক দেখে আবার কেটে দেন।

ধূমকেতু রাহা বিরক্তির স্বরে বলে, 'কে, কে এত ফোন করছে আপনাকে? নতুন সঙ্গীতশিক্ষার্থী ফাঁসিয়েছেন না কি? সে জানে না এ সময় আপনার সঙ্গীতশিক্ষার আসর থাকে?'

অসীমানন্দ শান্ত গলায় বলেন, 'উনি রত্নেশ্বরের স্ত্রী প্রত্যুষা!'

'আরে খবর আসছে মনে হচ্ছে। ধরেন ফোনটা, ফোনটা ধরেন। মনে হচ্ছে খবর আসছে। আপনি ওকে একবার রিংব্যাক করে নিন কেন ফোন করল?'

আবার তবলা বেজে ওঠে।

অসীমানন্দ ফোন তুলে বলেন, 'হ্যাঁ বলুন!' তারপর ফ্যাসফেসে সাদা মুখে বলেন, 'সে কী! দুজনেই! ও! আচ্ছা! না, টিভি দেখিনি।'

ফোন রেখে অসীমানন্দ ভয়ার্ত চোখ তুলে তাকান ধূমকেতুর দিকে। বলেন, 'রত্নেশ্বর আর উৎপল গিয়েছিল আসানসোল। একটা টিভি চ্যানেলের ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামে। ওদের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। দুজনেই স্পট ডেড!'

ধূমকেতু হাসল। 'তাহলে কমলা। এবং তারপরের দুজনও হয়ে গেল। বাকি থাকলেন আপনি। আপনার জন্য একটা বঢ়িয়া প্ল্যান করতে হবে। কেননা আপনি খবর হলে মিডিয়াওয়ালারা খুব চেঁচাবে। চিন্তা করবেন না। আমার প্ল্যান একদম ঝক্কাস! প্ল্যান হবে বঢ়িয়া, টেনশন ফ্রি! ঠিক আছে গুরুজি আপনার কথা মতোই কাজ হয়েছে, আপনার কথা মতোই কাজ হবে। নড়চড় হবে না। তাহলে আজ আসি!' ধূমকেতু রাহা হাসেন। 'আমি কিন্তু গুরুজি আপনার সুরে তালেই বাজছি!'

অসীমানন্দ দেখেন ওর গালের চামড়া ন্যাপকিনের মতো গুটিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই আর সমান হচ্ছে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%