ন্যাদোশ

মহাশ্বেতা দেবী

ন্যাদোশের গল্প

''সন্দেশ'' কাগজে না লিখলে মন খুঁৎখুঁৎ—অথচ গল্পরা সব কোথায় যেন পালিয়েছে, তাদের খোঁজ পাচ্ছি না মোটে। এসব কথাই ভাবছিলাম, এমন সময়ে চলে এল ন্যাদোশ।

ন্যাদোশাকে তোমরা হয়তো জানো না। জানবে বা কী করে? ন্যাদোশ হোল গে ভারতের, হয়তো দুনিয়ারই প্রথম গোরু, যে মাছ—মাংস খেত। না, ধাপ্পা দিচ্ছি না। কেন না ন্যাদোশ ছিল আমাদের বাড়ির গোরু। কবে কোন আদ্যিযুগে, সত্যজিৎ রায় যখন ''সন্দেশ'' সম্পাদনা করছেন, একটা গল্প লিখতে বললেন।

তখন আমি বেকার, যাকে বলে কেজোকর্মা ছিলাম। অর্থাৎ চটপট লিখতে পারতাম। ভাবলাম, ছোটদের জন্যে যখন লিখব, সত্যি ঘটনাই লিখি। তাই ন্যাদোশের গল্প লিখে ফেললাম।

বলছি, ''সত্যি ঘটনা,''—লিখলাম ''গল্প''। তোমরা জিগ্যেস করতেই পারো, গল্প কি সত্যি হয়?

হয়। হয়। যত গল্প পড়ো, স—ব সত্যি।

যাক গে,—''ন্যাদোশ পুরাণ'' নামে যদি কোনো বই বেরোয়, তাতে ন্যাদোশের গল্প স—ব থাকবে। সত্যজিৎ রায় নেই। তাই ন্যাদোশের ছবি কে আঁকবে তা জানি না। আঁকলে আঁকবে। না—আঁকলে না—আঁকবে। যাক গে, ব্যাপারটা হোল এই। প্রতি বছর পুজোর আগে ন্যাদোশ চলে আসে।

কোথা দিয়ে যে ঢোকে, তাও জানি না। দিব্যি চলে আসে। সেই ল্যাগবেগে পা, খ্যাটখেটে ল্যাজ আর ট্যারা চোখ। আমি কখন লেখার টেবিলে বসি, ও তা জানে। যথারীতি ঢুকল জানলা দিয়ে। চার ঠ্যাং ছেতরে বসে পড়ল। আমার বাড়ি যে দোতলায়, তাতে ওর কোনো অসুবিধে হোল না। কবেই বা হয়েছে! যখন ইচ্ছে, তখনি চলে আসে।

এসেই বলল, ক্যাট আনড টাইগার আর দি সেম।

বললাম, ন্যাদোশ! সেই কবে তুমি গো—লোকে, অর্থাৎ গোরুদের স্বর্গে গেছ। আসই বা কেন? বকই বা কেন?

—বাঃ! তোমার ভাইবোনদের বইখানা খেয়েই তো শিক্ষিত হয়ে গেলাম। জানো, কচ্ছপের ইংরিজি কী?

—ওঃ! ন্যাদোশ! জ্বালিও না।

ন্যাদোশ বলল, তোমার লেখা বই পড়েই তো গোলোকের, মানে গোরুদের স্বর্গের, মানে হেভনের সবাই ক্ষেপে গেছে। আমাকে এখন ওই অশিক্ষিত গোরুদের ইংরিজি পড়াতে হচ্ছে।

—সত্যি?

—নিশ্চয়!

—কেন ওরা ইংরিজি শিখে কী করবে?

—প্রোমোশান চায়, প্রোমোশান!

—এ কথার মানে কী?

—ওরা অকসফোর্ড যাবে, কেমব্রিজ যাবে, হারভার্ড যাবে। যাবেই তো! ও সব জায়গার গোরুদের মেজাজ কী! হবে না? বেটারা ক্রিকেট খেলে, টি. ভি. দেখে!

—বলছ কী?

—যাও, দেখ, বোমকে যাবে! যা তোমরা করবে, তাই ওদের করা চাই। চ্যাংড়া চ্যাংড়া বাছুর সব, প্রত্যেকের কানে আটা মোবাইল। ভাবতে পারো?

—না ন্যাদোশ!

ন্যাদোশ হঠাৎ সামনের ঠ্যাং তুলে কানে ঢোকাল। ন্যাদোশ তো জানো, আমার খাটে বসে, মেঝেতে বসে। ঘরে যারা ঢোকে, তারা ওর ভেতর দিয়েই চলাফেরা করে। এমনটা তো হয়ই। যে ন্যাদোশ চলে গিয়েছিল, সে তো গোরুদের স্বর্গ গোলোকে গেছে।

গোলোক চমৎকার জায়গা! সেখানে খাওয়াদাওয়া বেজায় ভালো। এনতার ফল খায় ন্যাদোশরা। ন্যাদোশের ভেতর দিয়ে শৈলী ঘর ঝাঁট দিল। বেরিয়ে গেল। আমার নিজের মোবাইল নেই, ন্যদোশ তার কান থেকে মোবাইল বের করল। বলল, মোবাইল ছাড়া কাজ চলে?

—কী কাজ, ন্যাদোশ?

—আর বোল না? দিব্যি ছিলাম গোলোকে, ঘাস বলো, জল বলো, সব ফাসক্লাস! কোথা থেকে এসেছে সতোরোটা চ্যাংড়া বজ্জাত গোরু। তাদের মোবাইল চাই! গোলোকের কিছু তাদের পছন্দ নয়। কী চায় জানো?

—কী চায়?

বলতে বলতেই দেখতে পেলাম, আদি ঢুকছে বাড়িতে। আদিকে তোমরা চেনো না। ওর বয়স তিন, থাকে হায়দ্রাবাদে, কলকাতা এলেই বলে, হ্যারি পটারের গল্প বলো!

ঘরে ন্যাদোশ, ঢুকছে আদি। তবু ন্যাদোশ বলে কথা! বললাম, ওই গোরুরা কী চায়?

—হ্যারি পটারের বই খেতে চায়।

—কেন?

—তা কি আমি জানি? আমি যে সব বই খেয়েছি, সেগুলোই জানি। সে সব বই বাংলায় লেখা!

—তা হলে তো মুশকিল! হ্যারি পটার ইংরিজিতে লেখা।

—এ যে কী মুশকিল! আমাকে সবাই শিক্ষিত গোরু বলে জানে! আজ ইংরিজিতে হ্যারি পটার পাব কোথায়? খাব কী করে? দেখছ, কী ঝামেলায় ফেললে?

সঙ্গে সঙ্গে আদি ঢুকে পড়ল ওর দাদীর সঙ্গে। আর ঢুকেই আদি চেঁচাল, বড়দিদা! আমি হ্যারি পটার! এসে গেছি!

শুনেই ন্যাদোশ ছিটকে উঠল। আমার টেলিফোন, কলমদানী, সবকিছুর মধ্যে দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেল। বলতে বলতে গেল, এখানেও হ্যারি পটার? যাই! ওই ডেঁপো গোরুদের জানিয়ে দিই।

ব্যস! এ বছরের মতো ন্যাদোশ হাওয়া! বলতে বলতে গেল, লাইফটা হেল করে দিল। কোথাও শান্তি নেই?

দেখলাম, ন্যাদোশ এখনো ছোটবেলার মতোই লাফ মারতে পারে। পারবেই তো! গল্পের গোরু তো।

ন্যাদোশের জন্মদিন

সকালবেলা উঠে (আমার সকাল আটটায় হয়) তিনটে বাংলা আর দুটো ইংরিজি কাগজ ওল্টাই। সেইসঙ্গেই কম করে চার কাপ চা খাই। আর সেটাই হল শ্রীমতী ন্যাদোশের অ্যানুয়েল ভিজিটের সময়।

এ—কথা তো 'সন্দেশ'—পড়ুয়ারা জানোই। কখন ন্যাদোশ আসে! 'সন্দেশ'—এর পড়ুয়া মানে ১০ থেকে ৬০—সব বয়সের পড়ুয়া!

কী? আজকালকার বাচ্চারা বাংলা পড়ে না? শুনছি না—শুনব না। মানছি না—মানব না। কেন জানো? শান্তনু ত্রিপাঠী একজন বেজায় ভালো ডাক্তার। তাঁর ১৪—১৫ বছরের মেয়ে দেবলীনা, ছোট্ট বয়স থেকে আমার বই পড়ছে আর পড়ছে। তার সঙ্গে সেদিনও ফোনেও কথা হল।

গোদা কথা এই—বাঙালি ছেলেমেয়ে বাংলা বই পড়ছে, এর চেয়ে ভালো খবর কী দিতে পারতাম? খবরটা তোমাদের পুজোর উপহার।

যাক গে! পুজোর 'সন্দেশ' কাগজে ন্যাদোশের গল্প লিখতেই হবে। এ একটা জঘন্য অভ্যেস! লিখতেই হয়, কেন—না সে—সময়েই তিনি এসে উদয় হন।

ন্যাদোশ ওইরকমই। হ্যাঁ, মানছি তুমি ভারতের, বা এশিয়ার, হয়তো গোটা দুনিয়ার প্রথম মাছ—মাংসখেকো গোরু! কিন্তু এটাও তো মনে রাখবে—৫০ বছর আগে পৃথিবীকে টা—টা জানিয়ে তুমি গো—লোকে, অর্থাৎ গোরুদের স্বর্গে চলে গেছ!

সে—সব ভুলে প্রতিবছর আসছ তো আসছই। বাড়ি বদল করছি। মোটে নিস্তার নেই। ঘোরানো সিঁড়ির সেই বাড়িতে ২৭ বছর থাকলাম! তারপর এলাম ছায়াঢাকা ঠাণ্ডা একটা একতলা বাড়িতে। সেখানেও তুমি। এখন কী সুন্দর একটা দোতলা বাড়িতে এসেছি। সেখানেও তুমি!

আছ ভালো। চলতে—ফিরতে পয়সা লাগে না। হাওয়ায় ভেসে চলে আসো! এই—তো আজই...

আমার শোবার খাট আর লেখার টেবিলের মাঝখানের জায়গাটা খুবই ছোট, খুব! সেখানে ন্যাদোশ ল্যাগবেগে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে পড়ল। বলল, 'ঘন ঘন বাড়ি পাল্টাচ্ছ কেন, বলতে পারো? তিন বছরে দুটো বাড়ি বদল? এর মানে কী?'

'তোমার তাতে কী? তুমি তো আসছই।'

'সে তো আসতেই হবে। বুঝলে না? হাজার হলেও তোমাদের গোরুই ছিলাম। মাছ বলো, মাংস বলো—কী খাইনি?'

'গো—লোকে তো নিরামিষ!'

'হ্যাঁ হ্যাঁ, মাছ—মাংসের পাট নেই। যে—সব ফল তরিতরকারি খাই, সে—যে কী...'

'ভালোই হয়েছে।'

'সে তো বটেই। এখন তো সর্বত্র লিখছে—নিরামিষ খাও। আর ধরাধামে যত মাছ—মাংস, তার তেমন সোয়াদ নেই। তা... তোমার নাতির একটা খোকা হয়েছে!'

'সে—খবরও রাখো?'

'কোন খবরটা রাখি না? তাকে দেখেই এলাম। দিব্যি ছেলে! আশা করছি, তোমার নাতির মতোই বিচ্ছু হবে। ঘুমোচ্ছিল বটে! দারুণ তেজি তেজি ভাব। দ্যাখো, তোমাদের পরিবারে কে কোথায় কেমন আছে, সে—খবর রাখাটা আমার কর্তব্য।'

'তোমার উচ্চারণও বদলে যাচ্ছে।'

'ভালো হচ্ছে, না মন্দ?'

'ভালো হচ্ছে।'

'আমি গো—লোকে 'যে—যার মাতৃভাষা পড়ো'—এ—নিয়ে খুব বলছি। বাংলার বাছুর, বাংলা পড়ো—'

'হ্যাঁ, বাঙালি শিশুরা তো ভুলে যাচ্ছে সব!'

'যাক, ভুলে যাক। আবার বাপ—বাপ বলে বাংলা পড়বে সবাই। গো—লোকে সব বাঙালি বাছুর সকালবেলা 'ভোর হল দোর খোলো, খুকুমণি ওঠ রে—' গড়গড়িয়ে বলে।'

'সে কী?'

'শুধু কী বাংলা? হিন্দি উর্দু মারাঠি তামিল—স—ব ভাষায় ওরা বলে। তোমাদের মতো নয়। ওখানে সব বাছুরকে আটটা ভারতীয় ভাষা জানতে হয়।'

'বাঃ!'

'বললাম, ওদের শিশুপাঠ্য বই খেতে দাও। আমার কথা মানল কোথায়?'

'তুমি সমাজসেবী হয়ে গেলে?'

'বলতে পারো, বলতে পারো। সেইজন্যেই তোমার কাছে এলাম।'

'অর্থাৎ, মতলব নিয়ে এসেছ তো?'

'মতলব শব্দটা সন্দেহজনক। বলতে পারো, কাজ নিয়ে এসেছি।'

'কাজটা কী?'

'যাদের কাজ, তারাই বলুক। পাখাটা বাড়িয়ে দাও। একে তো তোমাদের দুনিয়ায় বাতাসে দূষণ, তায় নিশ্বাস নেওয়া কষ্টকর। পাখাটা বাড়িয়ে দাও। ওই যে, দ্যাখো কে এলেন!'

ন্যাদোশের মুখের কথা ফুরোয়নি। অমনি লাফ মেরে চলে এলো একটা পেল্লায় বাঘ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

আর ন্যাদোশ বলল, 'এই যে! ইনি হলেন দ্য গ্রেট আলবার্ট অব দ্য গ্রেট জুবিলি সার্কাস!'

আমার মুখে বাক্যি নেই। ন্যাদোশ আসে গো—লোক থেকে, সে তো জানি। ইনি এলেন কোথা থেকে? বাঘরাও কি স্বর্গে যায়?

আমার মনের কথা বুঝে নিয়ে ন্যাদোশ বলল, 'যায় বইকী। জগদ্ধাত্রী বাঘে চাপেন না? তাঁর বাহন তো স্বর্গেই যাবে। সত্যি, কী—যে লেখাপড়া শিখেছিলে!'

'স্যরি।'

বাঘটা বলল, 'একটু পরিচয় দিই?'

'দিন।'

'দেখুন, আমি উচ্চবংশের বাঘ। জিম করবেটের বই নাকি পড়েছেন?'

'পড়েছি।'

'ওই—যে 'কানহার মানুষখেকো বাঘ'—এর গল্প পড়েছেন? আমি তেনারই বংশধর বটে!'

'ও! নমস্কার, নমস্কার।'

'তিনি যে কে হতেন, সে বলতে পারব না। যা—হোক, আমি হলাম আলবার্ট। জুবিলি সার্কাসের আলবার্ট। সার্কাসের বাঘ হলেই সাহেবি নাম হবে, বুঝলেন? পান্না সার্কাসে ছিল এডওয়ার্ড। গ্রেট ন্যাশনালে ছিল মাইকেল—'

'বুঝলাম, বুঝলাম। তা আমার কাছে কেন? আমি...মানে...কী করব?'

আলবার্ট বলল, 'উনিই বলবেন।'

'ন্যাদোশ?'

'উনি আমাদের মন্ত্রণা দেন, কাউনসেলিং করেন। ওঁর পরামর্শ নিয়েই চলি।'

'বাঘকে উপদেশ দেয় গোরু?'

ন্যাদোশ মুচকি হাসল।

আর আলবার্ট বলল, 'উনি শিক্ষিত গোরু। হাই কোয়ালিটির মাছ—মাংস খেতেন। ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়তেন। সে—কথা আমরা আপনার বই পড়ে জেনেছি।'

'বুঝলাম, বুঝলাম! কিন্তু আমি...কেন?'

'আমাদের...মানে বাঘেদের অনেক অভিযোগ আছে। তা তিনি আপনাকে লিখতে হবে।'

'মানে...মরা বাঘদের নিয়ে?'

'আজ্ঞে না। মেরে তো শেষ করে এনেছেন। যে—ক'টা জ্যান্ত আছে, তাদের কথাই লিখবেন। ন্যাদোশ, তুমিও বলো না গো।'

'শুরু করো, আমি আছি।'

'বেশ।'

ন্যাদোশ একটা চেয়ারে দু'—ঠ্যাঙে দাঁড়ায়। আলবার্টকে বলে, 'তুমিও দাঁড়াও হে! আমি একলাইন বলব, তুমি একলাইন বলবে। বুঝলে? এবার শোনো—আজ আমরা বাঘদের অভিযোগ জানাতে চাই। তাদের কথাই বলব—যারা আজও বেঁচে আছে...এবার তুমি।'

'জঙ্গলে যে—ক'জন ছিল, তারাও মারা পড়ছে। বাঘ মারছে। তার নখ, দাঁত, চামড়া বিক্রি করছে। আর সার্কাসে বাঘের খেলা...'

'বন্ধ করে দিল? তাহলে আর...'

'রইল কী? সার্কাসে বাঘ নেই, মানুষ কি মানুষ দেখতে যাবে?'

আমি কানে হাত—চাপা দিলাম। কিন্তু ন্যাদোশ আর আলবার্টকে থামাবে কে?

ন্যাদোশ বলল, 'সার্কাসে যে বাঘগুলো ছিল তাদের রেখেছে...'

'ছোট ছোট খাঁচায়! নড়াচড়ার জায়গা নেই।'

'পেট ভরে খেতেও দেয় না। তাই আমরা বলব—

বাঘের খেলা খতম কিনা

সে—সব কথা মানব না।

বাঘের চাই বিশাল খাঁচা

বাঘের চাই জবর খানা।'

'বুঝলাম। বুঝলাম। বলবে কার কাছে?'

'আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্রাধিকার কমিশনের কাছে। তাই করাই তো নিয়ম।'

'ইয়ে...'বাঘ বাঁচাও' নাম কোনও কমিশন কি হয়েছে?'

আলবার্ট বলল, 'নিশ্চয়ই হয়েছে। ন্যাদোশ বলছে, তুমি তা লিখেছ যেন কোথায়!'

'বাজে কথা।'

ন্যাদোশ বলল, 'আলবার্ট, আমি—চারঠেঙোরা তো লিখতে জানে না। তুমিই লিখতে বসে যাও।'

'হ্যাঁ, বসে যাও।' বলেই আলবার্ট এক হুঙ্কার ছাড়ল।

আমি—কী আশ্চর্য—বেজায় ভয় পেলাম। বললাম, 'কমিশনটা হল কোথায়?'

আলবার্ট বলল, 'কেন? পরলোকে?'

ন্যাদোশ বলল, 'তোমাকে জানানো যায়নি। তোমার কি ই—মেল আছে? যা হাড়কিপটে! দ্যাখো, লেখালেখি তোমাকেই করতে হবে। নইলে—'

'লিখব।'

'এই তো, পথে এসেছ। কথা রেখো কিন্তু...নইলে যত বাঘের গল্প পড়েছ, সব্বাইকে পাঠাব।'

'বাঘে আর গোরুতে এতই বন্ধুত্ব?'

'আমরা কি মানুষ নাকি? হিংসে নেই, ঝগড়া নেই, যে—যার জিগরি দোস্ত! মানুষ তা পারবে?'

তারপরই ন্যাদোশ বলল, 'কেমন ঘাবড়ে দিলাম? এটা আমার জন্মদিনের সারপ্রাইজ।'

তারপর?

ন্যাদোশ নেই! আলবার্ট নেই!

ভাবছি, বাড়ি বদলে গো—লোকে যাব নাকি!

তোমরা কী বলো?

আমার ন্যাদোশ

ন্যাদোশ কে?

ন্যাদোশ আমার মায়ের গোরু। আমার বয়সই পঁচাত্তর, আমার আবার মা! বেঁচে থাকলে মায়ের বয়স হত তিরানব্বই। ন্যাদোশ আমার মায়ের গোয়ালে ঢুকেছিল ১৯৪৫ সালে। এবং সে ১৯৪৭—এ স্বাধীনতা আসার আগেই মারা যায়।

ন্যাদোশ মাছ মাংস খেত।

আমার ভাইবোনের স্কুলের বই খেত।

ন্যাদোশ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী।

কেন না সে সময় ভারত পরাধীন। থানার পুলিশরা যখন ভোরবেলা গঙ্গাস্নান করত, ন্যাদোশ ওদের ঢুঁ মেরে গঙ্গায় ফেলে দিত।

তোমরা জানো কিনা জানি না, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা সবাই পুলিশের সঙ্গে লড়াই করতেন।

'গল্পের গরু ন্যাদোশ' নামে ন্যাদোশের জীবনী বোধহয় ২৪—২৫ বছর আগে 'সন্দেশ' কাগজেই লিখেছিলাম।

লীলাদি, নলিনীদি, সত্যজিৎ রায়, সব সম্পাদকরাই লেখা পড়ে খুশি হয়েছিলেন।

'গল্পের গরু ন্যাদোশ' নামে বইও বেরিয়েছিল।

এ সব কথা তোমাদের কেন বলছি? কেন না ন্যাদোশ বিষয়ে দু'চার কথা না বললে তোমরা গল্পটা বুঝবে না।

এ বছর পুজোর একটা কাগজে আমি ন্যাদোশের গল্প লিখেছিলাম। লিখতেই হয়েছিল। কেন না ন্যাদোশ আমার কাছে এসেছিল।

কেমন করে এসেছিল তা জিগ্যেস কোর না। ভূত হয়ে আসে নি। ওর কাছে অনেক খবর জানা গেল।

ও মরে যাবার পর গোরুদের স্বর্গ গো—লোকে আছে। এখন আর মাছ মাংস খায় না। গো—লোকে স্বর্গের ডাক্তার সুশ্রূত মুনি ওকে কি যেন খাইয়ে দিয়েছেন। মাছ মাংস আর খায় না, অর্থাৎ ইচ্ছেই হয় না।

'গল্পের গরু ন্যাদোশ' লিখে ওর গুপ্ত কথা সব ফাঁস করে দিয়েছি বলে ও ঝগড়া করতেই এসেছিল। তবে সব বুঝিয়ে বলতে খুশি হয়ে ভ্যানিশ করে গেল। যেন ইন্দ্রজাল হচ্ছে!

তাহ'লে বুঝতেই পারছিলাম, ন্যাদোশের যেমন 'হাই আই—কিউ', ও আবার আসবে। সেবার ওকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, নিন্দে তোমাকে করি নি। তোমাকে বানিয়ে দিয়েছি পথিকৃৎ, অর্থাৎ পাইয়োনীয়ার। দুনিয়াতে বিশ্ব জুড়ে সবাই বলছে, গোরু মাছ—মাংস খেলে 'ম্যাড কাউ ডিজিজ' হয়। তুমিই হ'চ্ছ প্রথম গোরু, যে পঞ্চান্ন বছর আগে মাছ—মাংস খেয়ে এই নতুন রোগ সৃষ্টি করো।

এ কথা শুনে ন্যাদোশ কি খুশি!

ভাবলাম, যা হোক, ন্যাদোশের হাত থেকে ছুটি পেলাম।

আমরা হচ্ছি সেকেলে লোক। বাড়ির খবর টবর বাড়ির লোকজনকে জানাই। তাই ন্যাদোশ যে এসেছিল, তা আমার ভাইবোনদের যে—কটাকে পাচ্ছি, তাদের জানিয়ে দিলাম।

তারপর, তোমাদের জন্যে গল্প লিখব, আরো কি কি লিখব। বেজায় ব্যস্ত আছি। আমার জীবনও তো সৃষ্টিছাড়া। মানে অদ্ভুত—কিম্ভুত যাকে বলে। যার ইচ্ছে করে, সেই ওড়িশা থেকে ওড়িয়াতে, রাজস্থান থেকে হিন্দীতে, অন্ধ্র থেকে তেলেগুতে, মহারাষ্ট্র থেকে মারাঠীতে পত্রিকা পাঠাচ্ছে, আর ইংরিজীতে চিঠি দিচ্ছে, পড়ে কেমন লাগল জানাও।

এ সব ভেবেই মহা চিন্তায় আছি। শেষে ভাবলাম একটু ঘুমোনো যাক।

ঘুমোই নি, ঘুমোতে যাব ভেবেই হঠাৎ শুনি, 'একি, তোমার কম্পিউটার নেই? ছো ছো, কলমে লিখছ?

'ন্যাদোশ!'

'আর কে বা তোমার কাছে আসে?'

ন্যাদোশ! সেই ন্যাদোশ! আমার লেখার টেবিল আর বাথরুমের মাঝে একফালি জায়গায় দিব্যি সেঁটে বসেছে। আশা এসে দিব্যি ন্যাদোশের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঝাঁটা বুলিয়ে চলে গেল।

ন্যাদোশ চোখ মটকাল। আমিও ঘাড় নাড়লাম। এখন তো এ রকমই হবে সব। ন্যাদোশ আছে, আমি দেখছি। আর সবাই ওর মাথা, পেট, ল্যাজ মাড়িয়ে চলাফেরা করছে।

আমি বললাম, 'আজ কি মনে করে?'

'মনে হচ্ছে এসে ভুল করেছি। তোমার যে বোনটা পাগল ছিল, ওই যে যার বর শুধু ডিকশনারি লেখে, তার কমপিউটার আছে, তোমার ল্যাগবেগে ভাইটা কমপিউটারে কি সব লিখছে, আর তুমি একটা, সত্যি!'

'তুমি ওদের ওখানে যাও নাকি?'

'তোমার এখানে আসার সময়ে ওদের 'হাই!' বলে আসি। হাজার হ'লেও ওদের বই খেতাম ব'লেই তো যা লেখাপড়া শিখেছিলাম!'

'গো—লোকের গোরু কমপিউটারের খবর জেনে কি হবে?'

ন্যাদোশ ওর একদিকে যে কানটা একটু কাটা, মানে কান আছে, কিন্তু একদিক চেরা, সেই কানটা নাচিয়ে হাসল।

'তোমাদের ছাড়া কাকে জানি বলো? তোমাদের গোরুই ছিলাম...'

'তুমি জগদেওর গোরুও ছিলে না, আমাদের গোরুও ছিলে না। তুমি ছিলে তোমার। যা ইচ্ছে, তাই করতে, মনে নেই আবার?'

ন্যাদোশের গলা সেন্টুমেন্টু হয়ে গেল। বলল, 'তা বটে, তা বটে, স্বাধীনতা বলতে...'

'জগদেওকে ঢুঁ মারতে।'

'অমন ঢুঁ ন্যাদোশ, দি প্রথম ম্যাড কাউ অনেককে মেরেছে।'

নিশ্বাস ফেলল ও, 'ভাবতে কত ভালো লাগে! তখনকার যে রকম ইলিশ মাছ খেয়েছি, এখন তেমনটি হয়ই না! কত ধবধবে জামা কাপড়, মেলে দিলেই খেয়েছি। এখন তেমন গেঞ্জীই হয় না। খেয়েছিলাম বলেই তো তোমার ভাই...'

'ওর সাধের পাজামা হাঁটু অবধি খেয়েছিলে, সেজন্যেই ও কান কেটে দেয়!'

'ছি ছি! কে চিনত তোমাদের? যত নামডাক তো ন্যাদোশের জন্যে! তা ব'লে একতরফা ব'লে গেলে ছেড়ে দেব?'

'তার মানে?'

ন্যাদোশ পিছনের ঠ্যাঙে দাঁড়ান। সামনের ঠ্যাং দুটো আড়াআড়ি করে চেপে ধরে ঘন ঘন পায়চারি করতে থাকল।

না বলে পারলাম না, 'ওঃ! বিবেকানন্দের ছবি দেখে...'

'আজ্ঞে না। মনীশ ঘটকও যখন সিরিয়াস হ'তে চাইতেন এমনি করেই পায়চারি করতেন।'

'চটে গেলে না কি?'

'দুঃখ পেয়েছি। সে সময়টা কি? তোমার মা সব ওই ভাই আর বজ্জাত নারাণটার ওপর চাপিয়ে দিয়ে শান্তিনিকেতন গেলেন।'

'নারাণ বজ্জাত ছিল না।'

'রাতদিন বিড়ি খেত আর আমাকে বলত গো—ভূত। বেটা সরি, মানে নারাণ বাড়িতে মাছ মাংস রাধতই না। তোমার কারণে আমি আমিষ ধরেছি। ঘাস—খড়—ভুষি খেলেও প্রত্যহ চিকেন চাই! সে সব না পেয়ে আমি ক্ষেপে যাচ্ছি। তোমার ভাইটা বুঝেও বুঝছে না, মরিয়া হয়ে...ওকে বোঝাবার জন্যে...'

'পাজামা চিবোলে।'

'ওর মনে আঘাত দিতে হবে তো! জীবনের প্রথম নতুন পাজামা খেলে ওর শিক্ষা হবে ভেবেই...তোমার মা ছিলেন মানুষের মত মানুষ। আমার কান কাটার জন্যে কত হাহাকার করলেন, তোমার ভাইকে ঝাড় দিলেন।'

'যাক, বোস।'

'বসব। ল্যাংপেঙেটা আসছে।'

বাবু এল। চিঠিপত্র দেখল, কি সব লিখে নিয়ে চলে গেল। ও ন্যাদোশের মধ্যে দিয়ে, অথবা ন্যাদোশ ওর মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করছিল। আমি ভাবলাম, অবুর পাজামা কেন ন্যাদোশ খেয়েছিল, তা এতদিনে জানা গেল।

বাবু বেরিয়ে যেতেও ন্যাদোশের অভিমান কমে না।

অবশেষে ও শান্ত হ'ল।

'দেখ! গো—লোকে মহা হাংগামা। আমি আজ একটা বিশেষ কারণে এসেছি। এর জন্যেও তুমিই দায়ী।'

'আবার কি হ'ল। তখন তো মনে হ'ল গো—লোকে তোমার বিষয়ে যত চ্যাঁচামেচি, সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।'

'গল্পের গরু ন্যাদোশ' লিখেই তো আমাকে ফাঁকে ফেলেছিলে। না লিখতে যদি....'

'তুমি ম্যাড—কাউ ডিজিজে পাইওনীয়ার এ কথা জানার পরেও ঝামেলা?'

'হবে না? গো—লোকে কি হিংসেহিংসি কম? যখন গিয়ে সব বললাম, তখন সে কি হাম্বা হাম্বা চতুর্দিকে। ভজনলালের হরিয়ানা গোরু বাহাদুর তো বিশাল গো—সভা ডাকলেন। মালার পর মালা পরাচ্ছে। দেবলোকের গোমাতাশ্রী সুরভি আর নন্দিনী দেবলোক থেকে পারিজাত বর্ষণ করছেন, যাকে বলে মহোৎসব!'

'তোমার কেমন লাগছিল?'

'খুবই ভালো। দিব্যি লাগছিল। গো—লোকে এমন প্রেসটিজ কি চাট্টিখানি কথা? কিন্তু ওদিকে বেজায় হিংসে শুরু হয়ে গেল, কি চক্রান্ত, ওঃ!'

'চক্রান্ত?'

'নিশ্চয়। সেদিন বাহাদুর বলে কি, খুব যে তড়পাচ্ছিলে, স্বাধীনতা সংগ্রামী! ম্যাড কাউ ডিজিজের আবিষ্কারক! এ সব কথার প্রমাণ কোথায়?—সঙ্গে সঙ্গে গোরুর পাল চেঁচাতে থাকল, সে কি হাম্বা! হাম্বা! রীতিমত গর্জন শুরু হ'ল, প্রমাণ কোথায়! জবাব দাও!'

'বলো কি?'

'এ রকমটা ইয়ে...মর্ত্যলোকে হয় জানি, গো—লোক কি গোল্লায় গেল?'

'ওদের বলেছিলে?'

'অবশ্যই! মনে রেখো, তোমার বাবা হরদম 'অবশ্যই' বলতেন।'

'মনে আছে।'

'তোমার মা কোনো কথায় অবিশ্বাস হ'লে নাক দিয়ে আর গলা দিয়ে কি রকম তাচ্ছিল্য করে একটা ছোট্ট শব্দ করতেন! করতেই পারেন। তোমার বাবা বাজার থেকে মাছ কিনে এনে বলতেন, পুকুরে ধরলাম! মিছে কথা আর কি!'

'বাপ রে বাপ!'

'তারপর আমি ওদের বজ্র হাম্বায় বললাম, তোমরা গোল্লায় গেছ! সাধে কি মানুষেরা বলে 'বোকা বলদ!' 'গোরুর মত নির্বোধ!' বলার কালে খেয়ালও নেই, বাহাদুর আসলে এক পেল্লায় বলদ!—ব্যস! সব গোরু—ষাঁড়—বলদ—হেন তেন একজোটে হাম্বাতে থাকল। প্রমাণ নাই, নিপাত যাও। নইলে শিবের ত্রিশূল খাও!'

'আমার মাথা ঘুরছে।'

'ঘুরলে তো হবে না। শিবের বাহন ষাঁড়, মানে গো—জাতির একজন। বাহাদুর আরো বলল, প্রমাণ না আনলে...! দেখ! আমাকে সাহায্য করা তোমার পারিবারিক কর্তব্য।'

ভাবতে ভাবতে মনে হ'ল ইউরেকা! অর্থাৎ পেয়েছি! পেয়েছি!

ন্যাদোশ বলল, 'ইউরেকা?'

'ইউরেকা।'

'ভাগ্যে জানতাম ওটা গ্রীক শব্দ।'

'বাজে বোক না।'

'বই চিবিয়ে জেনেছি।'

'সত্যি!'

'এবার বলো! কত আর বকতে পারি!'

'ওরা কি 'শহীদ' শব্দ জানে?'

'খালি খেতে জানে। আর ঝামেলা পাকাতে জানে। আর কি জানবে।'

'তুমি একটা মহতী গো—সভা ডাকো।'

'আমাদের প্রচারককে ডাকতে হবে। বেটা নাকি বৃন্দাবনের গোরু!'

'তাই ডাকো। সেই সভায় বলবে। আমি, ন্যাদোশ হলাম শহীদ!'

'একসপ্লেন উইথ রেফারেনস টু দি কনটেকসট!'

'এমন বিপদেও ইংরিজি বলছ?'

'নিশ্চয়। নেসফিলডের গ্রামার খাইনি? মলাট দুটো তো তোমার ক্ষেপী বোন, যেটা ছোট ছিল, সে ছিঁড়ে বাতাস খেত।'

'যাক গে! কনটেকসটা তো তুমি! বলবে, যারা শারদীয়া কাগজপত্তর পড়োনা, তারা জানো না, এ সব কথা লেখাও হয়েছে, ছাপাও হয়েছে!'

'হামম! গুল মারছ না তো?'

'বোক না। শোনো!'

'বলো!'

'তোমাকে বলতে হবে...মানে আমি যেন তুমি, আর তুমি হচ্ছ...ইয়ে...গোলোকের...'

'বিক্ষুব্ধ গো—পাল।'

'অবশ্যই। আমি হচ্ছি ন্যাদোশ! আমি বলছি! শহীদ শব্দের অর্থ অতি মহান। কোনো আদর্শ বা সত্যের জন্য যে প্রাণ দিতে পারে, সেই হ'ল শহীদ!'

'বটে? বলতে চাইছ কি?'

'শহীদের মৃত্যু নেই।'

'বললেই হ'ল?'

'অমর লোকেই তার নমুনা বিস্তার! দধীচি মুনি প্রাণ দেন ব'লেই তাঁর হাড়ে ব্রজ তৈরি হয়।'

'সে তো সবাই জানে!'

'ভক্ত ধ্রুব, ভক্ত প্রহ্লাদ, এঁরাও ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যে শহীদ হন।...এঁরা ধর্মযোদ্ধা।'

'তুমি কি বলতে চাইছ?'

'তুমি এবার পারবে, চেষ্টা করো।'

'ভো ভো গো—গণ! শহীদ শব্দটি বোঝো। যে সে শহীদ হয় না। স্বর্গে যেমন দধীচি...পেল্লাদ, ধ্রুব...সবাই...'

'ধর্মযোদ্ধা। কেননা ওঁরা সত্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে প্রাণ দেন। আমি কেন শহীদ বলে গণ্য হবো। এই! প্রমপট করো।'

'আমি ম্যাড কাউ ডিজিজ নিজ শরীরে...

'কালটিভেট, মানে তৈরি করি, সে রোগ যে একদা মর্ত্যলোকের কোথাও কোথাও দেখা দেবে তা জেনে স্বদেহে রোগলক্ষণাদি বাড়তে দিই, এবং শেষে সে কারণেই গোরুর ডাক্তারকে ঢুঁ মেরে রত্তারক্তি করে ছিটকে বেড়িয়ে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিই। তাই আমি শহীদ ন্যাদোশ! এবং হে অজ্ঞ গো—পাল! শহীদদের মূর্তি হয়। তাদের কেউ প্রশ্ন করেনা, পূজা করে! দেখ বাঘাযতীন, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, মহাত্মা গান্ধীকে! শহীদদের কেউ প্রশ্ন করে না, চ্যালেঞ্জ করে না। আমি শহীদ। এ মর্মে গল্পও লেখা হচ্ছে। ঠিক বলেছি? দাঁড়াও, দাঁড়াও, পয়েট্রি আসছে,—

শহীদের নামে যদি প্রশ্ন তোলে কেউ

অচিরে পাঁচন খাবে, কাঁদবে ভেউ ভেউ!'

'অসামান্য! ন্যাদোশ! তোমার ভেতর থেকে জ্যোতি বেরোচ্ছে। অত শহীদের নাম...'

'জানা যায়। বই খেলে...মর্ত্যের খোঁজখবর রাখলে জানা যায়! ওঃ! আমি শহীদ!'

'শহীদের নামে প্রশ্ন তোলে কুলাঙ্গরু।'

'ক্ষুদিরাম...বাঘাযতীন...সূর্য সেন...ন্যাদোশ!'

'ভাগ্যে বই গুলো খেয়েছিলে!'

'এ যে বহরমপুর গোরুশ্রী থেকে শুরু করে ভারতরত্নম!'

'কি বললে সে রকমই বটে! এখন আমাকে পায় কে? চলি তাহ'লে? বিদায়! তবে আসি? আদিয়ু! চিয়াও। ফেয়ারওয়েল! বাই বাই! আলোহা। শ্যালোম। চলি গো!'

ন্যাদোশ আমার ছোট্ট জানালা দিয়েই ভেসে বেড়িয়ে গেল।

ন্যাদোশ কি আর আসবে? কি মনে করো? এবার 'ন্যাদোশ অমনিবাস' লিখতেই হচ্ছে।

ন্যাদোশ ও কুচবিহারের হাতী

বাতাসে পুজো পুজো গন্ধ নেই। তবু ন্যাদোশ চলে এল। ঘরে ঢুকতে তো ওর অসুবিধে নেই। হাওয়ায় ভেসে চলে আসে, আমার ঘরে ঢুকে যায়।

পুজো নিশ্চয় আসছে। কিন্তু এখনো আকাশ যথেষ্ট নীল নয়। শাদা মেঘের নৌকোও নীল আকাশে ভাসছে না। ক্যালেণ্ডরে পুজোর তারিখ দেখতে পাচ্ছি। জানলার বাইরে কিছুই দেখছি না।

এসব কারণে মন ভালো নেই।

এরই মধ্যে চলে এলেন তিনি। সেই ল্যাগবেগে পা, চোখে হিংস্র চাহান। ঘরে ঢুকেই আমার টেবিলের সামনে গড়িয়ে গেল। যেহেতু ন্যাদোশ ৫০/৬০ বছর আগে গোরুদের স্বর্গে গেছে, সেহেতু ও মেঝেতে শুয়ে থাকলেও অসুবিধে নেই।

ওকে মাড়িয়েই লোকজন ঢোকে বেরোয়।

ক'বছর ধরে দেখছি, ন্যাদোশ বেজায় চিন্তাশীল হয়েছে। চোখ দেখেই বোঝা যায়। সর্বদা কি যেন ভাবছে। এবার ঘরে ঢুকেই বলল,—কি রকম দেখছ?

—যেমন ছিলে, তেমনি আছ।

—আরে, চেহারাটা দেখে জ্ঞানী—জ্ঞানী মনে হচ্ছে না?

—মনে হবার কথা ছিল?

—নিশ্চয়। আজকাল...যাকে বলে...আমি বেজায় চিন্তা করি, বুঝেছ?

—আমাদের...যাকে বলে স্বর্গে! বেজায় গণ্ডগোল পাকিয়েছ হাতী, বাঘ, গণ্ডার, এরা!

—হ্যাঁদোশ! গোরু মরলে গোলোকে যায়। হাতী, বাঘ...বলছ কি?

ন্যাদোশ চোখ মটকে হাসল। বলল,—দুর্গা তো পুজো নিতে আসবেন। শিব বেজায় বিপদে পড়েছেন।

—কেন?

—কেন আবার! এতকাল ধরে শিবকে বলা হচ্ছে ''পশুপতি''!

তিনি পশুদের দেবতাও হবেন, অথচ তারা মরলে কোথায় যাবে, তার কোনো জায়গা বানাননি!

—শিব বলে কথা! তিনি তো ইচ্ছে করলে...

—আমরা গোরুরা একেবারে বাধা দিচ্ছি। আমাদের সবজি বাগান, কলাগাছ, হাতিরা কিছু রাখবে?

—শিব কি বলছেন?

—বিপদে পড়েছেন তো! খেপে গেছেন মানুষের ওপর।

—কেন? আমরা কি করলাম?

—এই যে বাঘ মারছ। কুচবিহারের হাতিগুলো তো হরদম মরছে। এ তো মানুষের জন্যেই হচ্ছে...।

—তা বটে! তা বটে! এ সব খবর তো বেরোচ্ছে।

ন্যাদোশ হ্যাব্যা করে হাসল। বলল,—এখন আর কাগজের পরোয়া করে কে? টি.ভি. এসে গেছে না? সব দেখে ফেলছে সবাই।

বাপ রে বাপ!

—সে কি। স্বর্গেও টি.ভি?

—তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছেতাই হয়ে গেছ। গতবারই তো বলে গেছি, যে গোলোকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গোরু আসছে। ছোকরা গোরুরা টি. ভি. দেখছে...মোবাইল আটকে রাখছে কানে, মেসেজ পাঠাচ্ছে মোবাইলে....।

—শিব কি বলছেন?

—স্বর্গে কি জায়গার অভাব আছে? তিনি হলেন দেবাদিদেব!

নিমেষে পশুপতিলোক বানিয়ে নেবেন।

—সেখানে সবাই থাকবে?

—সবাই।

—কি খাবে?

—সেটা দেবাদিদেবই বুঝবেন!

—বাঘরা কি খাবে?

—স্বর্গে এলে ওরা ''ভেজ'' হয়ে যাবে।

—তা কি সম্ভব?

—নিশ্চয় সম্ভব। দেবতারা স—ব পারেন। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা ছিল।

—আমার মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে আর হাতি—বাঘ—ময়ূর বলে কিছু থাকবে না। তোমরা, মানে মানুষরা জঙ্গলগুলো তো ধ্বংস করেইছ। সবাই মোবাইল নিয়ে ঘুরছে, তাতে পাখিদেরও জীবন হালুয়া!

—আমি কি করব?

—কাজ করো কাজ! লেখো! নইলে...

—কি হবে?

—দেখবে আমরা কি করি! চলি! লেখো! লেখো! আমরা নইলে...ভীষণ শোধবেন।

—দেখব দেখব!

—আশ্বা! চলি! তোমার বাড়িতে কি রান্না হচ্ছে?

—ওই! চিকেন টিকেন হবে!

—আঃ! রাঁধবেন বটে তোমার মা!

—তোমার মনে আছে?

—থাকবে না? আমাকে দুনিয়ার প্রথম নন—ভেজ গোরু কারা বানাল? তোমরাই তো!

—সম্মান তো পাছ?

—তা পাচ্ছি। গোলোকে ''ন্যাদোশ'' বললেই সবাই খাতির করে। এই রে! কে যেন আসছে। আমি চললাম।

ন্যাদোশও বেরোল, আর ''সন্দেশ'' কাগজের ছেলেটাও হাজির।

বলল—''এবারকার সন্দেশের লেখা?''

সন্দেশ

'সন্দেশ' যারা পড়ো। তারা কেউ জানো না, বছর খানেক আগে আমি একটা বেজায় নিষ্ঠুর কাজ করেছি। সাতাশ বছর ছিলাম সে বাড়িতে, সে বাড়ি ছেড়ে নতুন একটা ভাড়া বাড়িতে চলে এসেছি। আসার সময়ে কতজনকে যে দুঃখ দিয়েছি, তা বলতে পারি না। দেয়ালে টাঙানো ছবির পিছনে থাকত একজোড়া মোটাসোটা।

টিকিটিক। টিকটিক বিষয়ে তোমাদের তেমন পরিচয় নেই।

গৃহপালিত ক্ষুদে জন্তুদের মধ্যে টিকটিকিদের মতো প্রভুভক্ত প্রাণী আর নেই। বইয়ের তাকে আরশোলা? ওরা মিটমিট করে তাকাতো। তারপর খপাখপ আরশোলা ধরত আর খেত। এ রকমই চলছিল। পিঁপড়ে কিছু কম ছিল না। তবে আমাকে তেমন কামড়াত না। ছিল কাঠবিড়ালি। চড়াই পাখি। ছাতে ধান, মুড়ি বা চাল ছড়িয়ে দিলে আগে আসত পায়রার ঝাঁক। পায়রাদের পিছন পিছন আসত কাক। তারপর গোটা কয় শালিক দেখা দিত। ওই সব বন্ধুদের ফেলে চলে এলাম কেন বলো তো? ন্যাদোশের জন্যে।

ও বাড়িতেই ন্যাদোশ যখন তখন ঢুকতে শুরু করল। যখন বেঁচেছিল, কী রকম স্বাধীনচেতা গোরু ছিল তা তো জানোই। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা আসার অনেক আগেই ন্যাদোশ মরে যায়। তারপর পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে।

আবার হঠাৎ একদিন দেখি, আমার ঘরে ন্যাদোশ। এর আগে কয়েকবার এসেছে। তারপর আবার...

—তুমি?

—এই...দেখা করতে।

—এলে কী করে?

—মাঝে মাঝে মন খারাপ তো হয়।

—ঢুকলে কী করে?

—কেন। জানলাটা খোলা ছিল না?

—কিছু খাবে?

ন্যাদোশ হ্যা হ্যা করে হাসল। বলল—জানো, আমি থাকি গো—স্বর্গে? নন্দনকাননের পাশে আমাদের জন্যে বিশাল তরকারির খেত। যত ইচ্ছে খাও। মন্দাকিনীর জলে স্নান করো, আমি একজন...যাকে বলে—সর্বজন শ্রদ্ধেয় গোরু।

—কেন? মাছ মাংস খেতে বলে?

সত্যি বলতে কি ন্যাদোশ কী করে 'সর্বজন শ্রদ্ধেয়' হতে পারে তা ভেবে আমি মনে মনে ভির্মি খেলাম। যদিও তোমরা আমার মতো শিবরাম চকরবরতির অথবা লীলা মজুমদারের গপপো পড়ে বড়ো হওনি, তবু একটা নিশ্চয় জানো 'ভির্মি' কোনো সুখাদ্য নয়। ভির্মি খাওয়া মানে কি, তা কোনো বুড়োবুড়ি পেলে জেনে নিও। আমি তো বড় হতেই পারলাম না, ঝপ করে বুড়ো হয়ে গেলাম।

আমার কথা শুনে ন্যাদোশ নিশ্বাস ফেলে বলল, তোমার বুদ্ধি আর পাকল না। মাছ, মাংস খেতাম বটে। কিন্তু সে জন্যে কি সর্বজন শ্রদ্ধেয় খেতাব পেয়েছি? সর্বজন শব্দটা খেয়াল করো। এই 'জন' মানে মানুষ নয়, গোরু। আমি গো—লোকের প্রতি গোরুর শ্রদ্ধেয়।

—বটে? তুমি এখন শ্রীকৃষ্ণের গোলোকে আছ?

—ইডিয়ট! কি জানো স্বর্গ সম্পর্কে? কৃষ্ণ আছে গোলোকে। আর একদা গোরু চরাতেন বলে আমরা, বিখ্যাত গোরুরা আছি গো—লোকে, অর্থাৎ গোরুদের স্বর্গে। সেখানে আমি সর্ব গোরুদের শ্রদ্ধেয়। কেন বলো তো?

—বলছি বলছি।

তোমরা, যারা লেখাটা পড়ছ, তারা দৃশ্যটা কল্পনা করো। ঘরটা বড় জোর দশ বাই পনেরো ফুট।

ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। যে জানলার পাশে আমার লেখার টেবিল, সে জানলার ওপারেই এক টুকরো ছাত। জানলায় কাক বসছে, রোজই বসে। ঘরে আমার সাধের বেড়াল সুন্দরী কুট্টি ঘুরছে।

ন্যাদোশ ধরাধামে, মানে পৃথিবীতে, মানে বহরমপুরে যেমন দেখতে ছিল, তেমনই আছে। পেট মোটা। ল্যাগবেগে পা, উচঁনো শিং আর ট্যারা চোখ। সে আমার সামনেই বসে আছে। অথচ ওর মধ্যে দিয়ে কুট্টি ঘুরছে, চেনা পিওন এসে চিঠি দিয়ে গেল। ন্যাদোশ আছে, কিন্তু নেই। এযে কি ঝামেলা কী বলব। যখন তখন জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে।

—বলি শুনছ, না শুনছ না?

—শুনছি, শুনছি।

—যখন তোমাদের বাড়ি ছিলাম, তখন মাছ মাংস খেতাম বটে, আবার তোমাদের ভাইবোনদের স্কুলের বইও খেতাম, মনে আছে?

—থাকবে না কেন? বছরে কয়েকবার ওদের বই কিনতে হোত।

—বই খেয়ে খেয়ে আমার ইংরিজির নলেজটা যাকে বলে ভেরি ডীপ!

—ছি ছি, বাংলা ইংরাজির ফোড়ন দিচ্ছ?

ন্যাদোশ অতি বিচ্ছিরি ভাবে হাসল। বলল, বাংরেজি তো সেই বুড়োটার কাছে শেখা, যে তোমার ভাইদের মাঝে মাঝে অঙ্ক শেখাত?

—ছি ন্যাদোশ! মধুময়বাবু গরম কালে আম আর ইলিশ মাছ বরাবর পাঠাতেন। তুমি অনেক খেয়েছ। তাঁকেই বলছ বুড়ো?

—আহা হা! সে বলত না। ডগটা আমাকে অ্যাটাক করবে বলে চেজ করেছিল, কিন্তু বাইট করতে পারে নি।

—বলতেন...বলতেন...যাক গে, সর্বজন শ্রদ্ধেয় ন্যাদোশ! আজ আগমনের কারণ কী?

ন্যাদোশ বেজায় লজ্জা লজ্জা মুখ করল। আমি ভাবলাম জীবনে ভাবিনি ন্যাদোশ এমন কিন্তু কিন্তু মুখ করবে! কী বজ্জাতি না করেছে একদা! সর্বদাই তো বেপরোয়া নির্ভীক!

—বলতে লজ্জা পাচ্ছ?

—মানে...তুমি আমাকে নিয়ে 'গল্পের গরু ন্যাদোশ' লিখেছিলে বলেই তো যাকে বলে...আমার নামডাক হল!

—ভুলে যাচ্ছ। ভুলে যাচ্ছ ন্যাদোশ! ওই বইয়ের কথা জানাজানি হয়ে যাবার পর তোমাদের গো—স্বর্গের পঞ্চায়েত তোমাকে একঘরে করে নি?

—করেছিল। বেজায় বিপদে পড়েছিলাম। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচলের হাতি মার্কা। গোরুগুলো 'বেটা মাছ মাংস খেত' বলে বেজায় ক্যাচাল বাধায়! তখন...

—তুমি যথারীতি আমার কাছে এলে। আমি বোঝালাম আমেরিকা আর ইংল্যান্ড এখন গোরুদের অ্যানথ্রাকস রোগ নিয়ে ভীষণ ভাবছে। তা তুমি হচ্ছ গোরুদের মধ্যে প্রথম শহীদ! মাছ মাংস খেয়ে শরীরে ওই রোগটি তুমিই বাধালে, মরেও গেলে!

—তাই তো বটে!

—তারপরে?

—সবাই আমাকে ধন্যি ধন্যি বলল।

—দেখ ন্যাদোশ, আমার কাছে এখন লোক আসবে, আমার কাজ আছে।

—কাজ দেখিও না তো! কাজের মধ্যে কাজ তো বসে বসে লেখা! আর লোক আসবে মানে? তারা কি ধরাধামে আছে? না আমার মতো জানলা দিয়ে ঢুকবে?

—রীতিমতো জলজ্যান্ত মানুষ। সিঁড়ি ধরে উঠবে।

—আসুক না! আমিও থাকি।

—না ন্যাদোশ! প্লিজ!

—ধুস! আসল কথাটাই বলতে দিলে না।

—আরো কথা আছে?

—হ্যাঁ, একটা ডেট দিতে হবে।

—ইচ্ছে মতো যাচ্ছ আসছ। ডেট দিতে হবে কেন?

ন্যাদোশ টপ করে পেছনের দু ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে গেল। সামনের দুটো ঠ্যাঙ জোড়া করে বলল, তোমার গল্প ওদের বলেছি। ওরা তোমাকে দেখতে চায়।

—কেন?

—তার কারণ তুমি 'গল্পের গরু ন্যাদোশ' লিখে আমাকে বিখ্যাত করেছ। ওরা দল বেঁধে আসবে। তোমাকে সম্মান জানাবে। আমার ইজ্জতের ব্যাপার!

—আমি...আমি তো বাইরে যাচ্ছি।

—কোথায় যাচ্ছে?

—ভাবছি একবার মেদিনীপুরে যাব।

—ক'দিন থাকবে?

—ঝাড়গ্রামে ক'দিন...কানাইসর পাহাড়...বেশ ক'দিন লাগবে।

—আমাদেরও তৈরি হতে সময় লাগবে।

—তোমরা ক'জন আসবে?

—আসতে তো চায় অনেকেই! তা তোমার ঘরদোর যা! ধরো কেটেছেঁটেও জনা পঞ্চাশেক তো হবেই।

—পঞ্চাশটা গোরু?

—তা হবে না? প্রতি রাজ্য থেকে একজন আসবে। তা ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের বেন্দাবনী গোরুরাও..

—বসবে কোথায়?

—তুমি বসবে তোমার ছাতে। আমরা নয় শূন্যে ভেসে থাকব।

—তার চেয়ে একটা হলঘর ভাড়া করি?

—সেটাই ভালো হবে। তাই করো। পাকা কথা তো?

—একদম পাকা।

—বাববা! বাঁচা গেল। আজ দেখ, আড্ডা মারতে আসিনি। কাজের কথা বলতে এসেছিলাম।

সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ। নিশ্চয় ভোম্বল আর পল্টু উঠছে! ন্যাদোশ বলল—বাই বাই।

আমিও বললাম—বাই!

ন্যাদোশ জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

আর আমি? ন্যাদোশদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আগেই বেজায় তাড়া লাগালাম সকলকে। বাড়ি চাই, বাড়ি! যে বাড়িতে ন্যাদোশ আর আসবে না। অথবা এলেই আমি বলব, নিকাল যাও। এতদিন আসছিল, আসছিল। গোরুদের স্বর্গের পঞ্চাশটা বড় বড় গোরু এসে আমাকে সম্মান জানাবে?

হিমাচলের গোরুরা (মানে গো—স্বর্গবাসী গোরুরা), না কি সংস্কৃত বলে, ন্যাদোশই বলেছিল। আমি কেমন করে সংস্কৃত বলব? ক্লাশ সেভেন আর এইটে কী পড়তাম, তাই কী মনে আছে?

বেজায় তাগাদা লাগালাম সকলকে, বাড়ি দেখো। বাড়ি খোঁজো।

আমি বাড়ি খুঁজছি জেনে কুট্টি একদিন ওর দারুণ সুন্দর লেজটা তুলে টা টা জানিয়ে দেশে চলে গেল। বেড়ালরা এমন যে করেই থাকে, তা বেড়াল পুষিয়েরা জানে।

টিকটিকিরা জানিয়ে গেল, ওরা মনক্ষুণ্ণ হয়েছে।

আরশোলাদের সঙ্গে তেমন বন্ধুত্ব কোনোদিনই হয়নি। তবে লাল পিঁপড়েদের বক্তব্য, ওরা কোনদিনই আমাকে তেমন কামড়াইনি। ওদের উৎপাতে আমি চলে যাচ্ছি। এমন কথা যেন না বলি!

পায়রা, শালিক কাক আর চড়াইরা খুব অভিমান করেছিল। আর মশারা বলেছিল, যেখানেই যাও, আমরা সেখানেও যাব। ভাবছ গা—ঢাকা দেবে? অলিতে গলিতে মশাদের ইউনিয়ন আছে। তারাই খবর দেবে।

ওই ন্যাদোশের জন্যেই বাড়ি ছাড়লাম। ন্যাদোশের হাত থেকে কি মুক্তি পাব?

দেখাই যাক।

যদি এখানেও আসে, সবচে' আগে জানবে তোমরা।

সেই ন্যাদোশ

এখন যারা 'সন্দেশ' পড়ো, তারা জানোই না, যখন সত্যজিৎ রায় 'সন্দেশ' হাতে নিলেন, তাঁর অনুরোধেই সেবারকার সংখ্যায় 'ন্যাদোশ' লিখেছিলাম। এক সময়ে আমার মা বহরমপুরে গরু পোষা শুরু করেন। আমাদের বাড়ি তো! আমাদের বাড়ির গরু বলো, মুরগি বলো, সকলেই মুক্তমনে স্বাধীনভাবে চিন্তা করত, আচরণও ছিল সে রকম।

যেমন অতীব মিলিট্যান্ট মুরগি দলি বুড়ি ডিম পাড়ত বাবার জুতোর মধ্যে, তাঁর কোটের পকেটে, আমার বোনদের ড্রেসিং টেবিলের দেরাজে।

আর ন্যাদোশ, আমাদের গরু, সে বর্ষার দিনে (ওখানে বর্ষা সময়ে ৩—৪ দিন ধরেও হত) মাছ মাংস মাখা এঁটো কলাপাতা খেয়ে বিদ্রোহী হয়ে গেল। নিয়মিত মাছের লোভে রান্নাঘরেও ঢুকে যেত। সে 'গরু শাস্ত্র বিরোধী' সব কাজই করত। 'সন্দেশ' কাগজ যখন আবার বেরোল, সম্পাদকের অনুরোধেই গল্প লিখতে শুরু করি, এ ভাবেই ন্যাদোশের বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব।

স্বভাবতই যখন তার গল্প লিখছি, ততদিনে ন্যাদোশ গো—লোকে গেছে। এই গো—লোক, গোলক নয়, যে গোলকধামের কথা গানে—কীর্তনে—ভজনে শোনা যায়। এটা গরুদের স্বর্গ, তাই গো—লোক!

আমার ন্যাদোশের গল্পে ন্যাদোশ গো—লোক থেকেই আসে এবং ন্যাদোশোচিত বক্তব্য রেখে যায়। এ গল্পতেও তাই ঘটবে। কেননা, যতদিন পারব, ন্যাদোশের গল্পই লিখে চলব।

এবার বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে হবার কথা, হচ্ছে না। তা নিয়ে মনে অনেক চিন্তা। কেননা জানলার বাইরে চাইলে অনেক গাছপালা, ঝোপঝাড় দেখতে পাই। ন্যাদোশের কথাও মনে যথারীতি সামনের জানলা দিয়ে ভেসে চলে এল। আমার লেখার টেবিল, আর সামনের জানলার মধ্যে আরাম করে বসল। বলল, কি গো! সুকো তো এসে যাচ্ছে। এবার আমার গল্প লিখবে না?

—এতদিন আস নি কেন?

—আহা! ব্যস্ত ছিলাম! ব্যস্ত ছিলাম!

—কিসে?

—ওই যে তোমরা বলছ পরিবর্তন চাই! আমিও তা কেনে... যাকে বলে খাপচুরিয়াস হয়ে গেলাম! গো—লোকে, অর্থাৎ আমাদের লোকে, সব গরুই তো পৌঁছয়... তাদের বোঝালাম। সব কিছু ওরা করবে? আমরা গরুরা কিছুই করব না! একটা 'কল' দিলাম।

—কাকে?

—কেন? গরুদের? স্বর্গে গরু কম আছে?

—স্বর্গে গরু? ন্যাদোশ! বাজে বোকো না!

ন্যাদোশ বজ্র কণ্ঠে গলা খাঁকারি দিল। বলল, কিছুই জানোনা! বৃন্দাবন থেকে কৃষ্ণর গরুগুলো পালে পালে এসেছে না? এত গরু পেলাম যখন, তখন তোমার খবর নিলাম।

—কার কাছে?

—আহা! মর্ত্যের সঙ্গেও যোগাযোগ তো থাকে! তেমন একজনই জানাল... যে তোমরা না কি বিদ্রোহী হয়েছো। সর্বদা বলছ, 'পরিবর্তন চাই!' ঘাবড়ে গেলে?

—ভাবছি, তোমার মতো...

—বজ্জাত গরু আর দেখ নি।

—না।

—দেখবে কি করে? আরেকটা ন্যাদোশ করেছে?

—তোমারও যাকে বলে...

—বিদ্রোহী হয়েছি।

—কি করছ?

—আমি যা বলছি, ওরাও তাই করছে।

—সেটা কি?

—স্বর্গের সেরা সেরা বাঁধাকপি বলো, ফুলকপি বলো, সব ওঠাচ্ছি আর খাচ্ছি।

—সে সবের চাষও হয়?

—হয় না? হল্যাণ্ডের গরু! আমাদের হরিয়ানার গাই! সকলের খাওয়ার যুগ্যি সব কি চাষ হয়।

—এটাই বিদ্রোহ?

—সবে তো শুরু হয়েছে। দেখ! পরিবর্তনকামী গরুরা কি কাণ্ডটা করে! ভেবো না, খবর পাবে। ব্যস, নিমেষে ন্যাদোশ হাওয়া! ভাবলাম, জিজ্ঞেস করব, স্বর্গেও কি মাছ মাংস খাও?

সময় পেলাম না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%