পারিবারিক

মহাশ্বেতা দেবী

পিতা

সনকা যে চলে যাচ্ছেন, বিশ্বনাথ তা বুঝেছিলেন বলেই ওঁর পাশ ছাড়েন নি। এই সেদিন বিয়ের ষাট বছর পূর্ণ হল। মেয়ে জামাই, ছেলে বউ, নাতি নাতনি, বাড়ি ভরে উঠেছিল। মেজছেলে কলকাতার কেটারিংকে খবর দেয়। ফলে ভ্যানে খাবার এসেছিল।

সেদিন কত আলো, ক্যাসেটে সানাই, পোলারয়েডে বিশ্বনাথ ও সনকার কত ছবি তোলা হল। ওয়াশিংটন থেকে বড় ছেলে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল, ছোট মেয়ে বন থেকে।

সনকাকে দিয়ে গান ওরা গাওয়াবেই। সনকা গাইবেন না। শেষে বিশ্বনাথ বলেছিলেন, ওঁর গান শুনবে? আমি শোনাতে পারি।

সনকা পঁচাত্তর বছর বয়সেও কি লজ্জা পাচ্ছিলেন। পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদূর, গলায় ফুলের মালা।

—না, ও গান তুমি শোনাবে না।

—আজ শোনানো যায়।

—তবে শুধু গান।

—গানই তো।

বড় মেয়ে বলেছিল, ব্যাপারটা কি?

—শোনোই না।

বিশ্বনাথ একটি শস্তার টেপরেকর্ডার আনলেন। বললেন, কিনে ফেললাম। ছয়শো নিল, বেশ জিনিস!

বড় মেয়ে বলে, এই দেখ! বাড়িতে তো কয়েকটা পড়েই আছে। কতবার ভাবি দিয়ে যাব একটা...

জামাই বলে, এগুলো তেমন...

বিশ্বনাথ বলেন, আমার কাজ চলে যায়।

—এ যে অনেক ক্যাসেট।

সনকা বলেন, ওঁর কথা বলো কেন। ওঁর কথা, আমার কথা, সব টেপ করছেন।

—বাঃ করব না। দু'জনে কে আগে যাই, কে পরে, গলাটা শুনতে পাব।

—ক্যাসেট কোথায় কেনো?

—সব দিলীপ। ও আমাদের ডান হাত।

—দিলীপ কে?

—ওই যে মীরা... কাজ করে... ওরই বর। তোমার মায়ের মেয়ে আর জামাই। গান শোনো।

—এই, সবাই চুপ! দিম্মার গান শোনো।

—বুমবা চুপ। তাম্মার গান শোনো।

সনকা আঁচলে মুখ ঢাকেন। ও কি গান?

কাঁপা কাঁপা গলায় গান, অথচ বেসুরো নয়। তাল লয়ের বালাই নেই। দমটা বারবার নেয়া হয়েছে।

—তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে...

গান শেষ হতে বিশ্বনাথ সপ্রংশস চোখে তাকান।

—কেমন, ভালো না?

—খুব ভালো।

—ওঁর খুব গানের কান ছিল। যা শুনতেন, তাই তুলে নিতেন। একটা ভক্তিগীতি শোনো।

সনকা বলেন, রাখো তো! তোমার নাতি নাতনিরা তো ইংরিজি আর হিন্দী গান ছাড়া কিছু চেনে না। ওদের ভাল লাগবে কেন? বেবিকে কীর্তন শিখিয়েছিলাম...

বড় মেয়ে বলে, মা, কীর্তন কি রাখা সম্ভব? সংসারের কীর্তন যা!

—কি জানি মা! ছেলেও বড়, মেয়েও বড়, বাড়িভর্তি কাজের লোক। গান গাওয়া যায় না?

জামাই বলে, হ্যাঁ, একটা গানই আপনার মেয়ে গাইতে জানে, টাকা ফুরিয়েছে, টাকা দাও।

ছোট ছেলের ছেলেটি সবচেয়ে ছোট। বছর ছয়েকের। ও বলে, তাম্মা, তোমার সিংগিং আমার লাভলি লেগেছে।

বউ বলে, এই বুবাই! বাংলায় বলতে পার না?

সনকা বলেন, ওতেই হবে।

সারাদিন আনন্দ করে ওরা সন্ধ্যায় চলে গিয়েছিল। তখনো বাড়িতে অনেক পোলাও, অনেক মাছের ফ্রাই, অনেক মাংস, দই, মিষ্টি।

মীরা আর মীরার মা বাড়ি পরিষ্কার করেছিল। সনকা বলেছিলেন, সব তোরা নিয়ে যা রে।

—রাখব না?

—একটু দই মিষ্টি। আর ওঁর জন্যে দু'খানা ফ্রাই। আজই অনিয়ম হল। কাল খেলে...

দিলীপ সলজ্জ হেসে বলেছিল, দিদমা, আমি একটা জিনিস এনেছি।

—কি রে?

—ফ্লাক্স। আপনারটা ভেঙে গেছে।

—ও বাবা, কত দাম নিল? বেশ জিনিস হয়েছে। কাজের জিনিস।

মীরা বলেছিল, দাদুর তো পঁচাশি হলো। পনেরো বছর বাদে দাদুর শতবার্ষিকী করবে।

আনন্দের দিন, উৎসবের দিন।

রাতে সনকা বা বিশ্বনাথ কিছু খাননি। রাতে উপোস, একটু লেবুর শরবত। মীরা সারাদিন থাকে, মীরার মা রাতে থাকে কিছুকাল ধরেই বিশ্বনাথ ভাবছেন, বাগানের কোণে ওদের দু'খানা ঘর তুলে দেবেন। ইঁটের ঘর, খোলার চাল। ওরাও বাঁচে, উনিও বেঁচে যান।

রাতে সনকা বলেছিলেন, বাড়িটা কি খালি হয়ে গেল? সবাই এলে যে কি ভরে ওঠে।

বিশ্বনাথ বলেছিলেন, হেসেই বলেছিলেন, সেই মনে করেই তো সোদপুরে ভালো পাড়ায় এ বাড়ি করা।

দুই মেয়ে, তিন ছেলে। ভিত পাঁচতলার। বাড়িটি দোতলা। নিচে চারটে ঘর, ওপরে দুটো ঘর, সবটা শেষ করেন নি।

বড় ছেলে বলেছিল, সব ভিতে ঢালছ?

—তোমরা পাঁচজন, পাঁচটা ফ্লোর করে নিও।

—দূর! কে থাকবে সোদপুরে? আসব যাব, তা নিচু তলাটাই যথেষ্ট।

—কেউ থাকবে না তোমরা?

—কে থাকবে?

—রিটায়ার করার পরেও নয়?

—বাবা! তখন বড়জোর কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনবে, থাকবে। সোদপুরে কে থাকবে?

—সকলে থাকবে বলে...

—না বাবা, ওটা প্র্যাকটিকাল নয়।

—আমি ভেবেছিলাম...

—ভেবো না। গোবরডাঙ্গায় তোমার বাবা বাড়ি করেছিলেন তুমি কলকাতায় সরকারি বাড়িতে থেকে চাকরি করলে, সে বাড়ি বেহাত হয়ে গেল।

—আমারই বোন, ভাগ্নে, অনাথ সব...

—তুমি যদি কলকাতায় বাড়ি করতে...

—একটু মাটি, একটু বাগান...

—বেশ তো, তোমরা থাকো না।

সনকা বলেছিলেন, বড়খোকা, তোমাকে ইঞ্জিনীয়ারিং, মেজখোকাকে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, ছোটখোকাকে সি এ পড়িয়ে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে... বড় কাজ যেমন করেছেন, তেমন কলকাতা বাড়ি করার সংগতি তো ছিল না। সেজন্যেই...

—বেশ তো। তোমরা থাকো।

বিশ্বনাথ সনকাকে বলেছিলেন, আমরাই থাকব যখন, তখন আর বাড়াব কেন?

ওপরে দুটি ঘরের সঙ্গে রান্নাঘর ও বাথরুম করেন। বিশ বছর আগে ভাড়া দেবার কথা ভাবেননি। সঞ্চয় বা কত। বছর দশেক আগে এক ডাক্তারকে ভাড়া দিয়েছেন। পেনশানের টাকা, ভাড়ার দুশো টাকা মিলিয়ে চলে যায়।

বড় ছেলে, বউ, ছেলে দীর্ঘকাল ওয়াশিংটনে। বাড়ি কিনেছে। ফেরে কি না সন্দেহ।

মাঝে মাঝে আসে। কয়েক বছরে একবার। গতবার তো ছেলেকেও আনেনি। ছেলে ভারতে আসতে চায় না। এখানে কোনো লাইফ নেই। গরিব, নোংরা দেশ।

বড় বউ এসেই জল ফোটাতে হুকুম দিল।

আমাদের টিউবওয়েলের জল তো ভালো।

—না বাবা, আমি পারব না।

সেবারই সনকা জানলেন, ওরা সানি পার্কে ফ্ল্যাট কিনেছে। বড়খোকা বলল, কিনেই ফেললাম বাবা। যদি কখনো আসি, থাকা যাবে।

বড় ছেলে সানি পার্কে ফ্ল্যাট কিনেছে। মেজ ছেলে নিজেই আমদানি—রপ্তানির ব্যবসা করছে। তার ফ্ল্যাট আলিপুরে। ছোট ছেলে সৌভাগ্যবান। ''ডলফিন'' নামক বহুতল বাড়িটি ওর শ্বশুরের। ওর বউ দুটো ফ্ল্যাট পেয়েছে। গুরুসদয় দত্ত রোডের প্রায় ওপরই। ছোট ছেলে নিজেই সি এ ফার্ম করেছে।

বড় জামাই কন্ট্রাক্টর। লান্সডাউন ও লোয়ার সার্কুলারের মোড়ের কাছে সে বাড়ি কিনেছে। ছোট জামাই বন—এ থাকে, চাকরি করে। ওখানেই বাড়ি কিনেছে।

ওরা অকৃতজ্ঞ নয়। বাবা—মাকে নিয়মিত টাকা পাঠায়। বড় ছেলে সেবারে ফ্রিজ কিনে দিল। মেজ কিনে দিল টেলিভিশন।

সবাই ওঁদের সুখী দম্পতি বলে।

সবাই চলে যাবার পর সনকা বললেন, এটা কেমন হলো?

ও টেপ তুমি—আমি শুনব।

—বাজাব?

—আজকে থাক।

—কাল তুমি কি বলেছ শোনো।

—কি বলেছি?

—শোনো।

...পনেরো বছরে বিয়ে হয়েছিল। শ্বশুর দেখতে এসেই কথা দিয়ে গেলেন। বললেন, গোবরডাঙ্গার বাড়ি আলো হয়ে উঠবে আমার। তা...দাদা তো বলছে, সনুর বরকে দেখেছি, ইয়া বড় গোঁফ, মুশকো জোয়ান, কালো রং।

আমার মন তো খুব খারাপ। গোঁফ আমি দেখতে পারি না। বিয়ের দিন ছাঁদনাতলায় আমি যেন চাইতে পারছি না। শেষে শুভদৃষ্টির সময়ে দাদা বলছে, দেখে নে। গোঁফ দেখবি না?

ও মা! কোথায় গোঁফ, কোথায় কি? দেখি দিব্যি রং, দিব্যি চেহারা।

গোবরডাঙ্গার কথা বলি। ওখানে গিন্নি ছিলেন আমার বড় ননদ। মেয়ে নিয়ে বিধবা হয়ে থেকেই বাপের কাছে। ওখানে তখন অত ফুল মেলে না। দিদি কোথা থেকে যে অত ফুল এনেছিলেন। আমার এক খুড়শাশুড়ী ফুলের গয়না গড়েছিলেন। ফুলশয্যের দিনই পুকুরে নাইতে গিয়ে কানের দুল জলে পড়ে গেল।

আমি তো ঘাটে বসেই কাঁদছি। ও মা? ওই খুড়শাশুড়ী ঠিক তুলে আনলেন। বউভাতের পরদিন আমার শ্বশুর পুকুরের মামলায় জেতেন। তাতে সবাই বলল, লক্ষ্মী বউ। বউ ঘরে এল, মামলায় জিতলে।

উনি কলকাতায় চাকরি করতেন, শনিবার বাড়ি আসতেন। শনিবার খুব ঘর—বার করতাম। দিদি বলতেন, চুল বেঁধে কাপড় ছেড়ে বসে থাকো। আমার ভাই এসে কি এমন চেহারা দেখবে?

দিদি ওঁর চেয়ে আট বছরের বড়। প্রথমে ভেবেছিলেন, সংসারের গিন্নিত্ব আমি কেড়ে নেব। আমি কিন্তু তা করি নি। উনি যেন শাশুড়ী। আমি যেন বউ। এইরকম মান্য করতাম।

বিশ্বনাথ ক্যাসেট বন্ধ করেন।

—দিদিকে তোমার খুব মনে পড়ে?

—খুব।

—কি কপাল তাই দেখ!

—হ্যাঁ, তীর্থে যাব, একবার তীর্থ করব, সময় তো হলো সেই মেয়ের বিয়ের পর।

—তুমি বললে, কি বললে মনে আছে?

—কি বললাম?

—বললে, দেখ। বাবা খুব ধরেছেন এবার পুজোয় আমাকে পাটিহার দেবেন। এই সবে ভাগ্নীর বিয়ে হলো, খরচ—খরচা গেল, এবারে থাকুক।

—আমি বললাম, বাবাকে বলো।

শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলার সময় ছিল শোবার আগে পায়ে বাতের তেল মাখানোর সময়টুকু।

সনকার এখনো মনে পড়ে, তেল মাখাচ্ছেন আর আস্তে আস্তে বলছেন, এবার আমি পাটিহার নেব না।

—কেন মা?

—পাড়ার সবাই যাচ্ছেন। দিদি ওঁদের সঙ্গে যান, প্রয়াগ গয়া, কাশী ঘুরে আসুন।

—সে যেতে চায়?

—হ্যাঁ বাবা। কোনদিন তো বেরোতে পারেন নি। আমি এখন সব পারি। নুটুরও বিয়ে হয়েছে...

—সঙ্গী কারা?

—ও বাড়ির দুই খুড়িমা, জ্যেঠাইমার ছেলে প্রভাস, আরো কয়েকজন।

—সত্যি! ওদের মা—ও গেল, ও যেন এসংসারের হাল ধরবে বলেই বিধবা হলো। সেই থেকে...

—শ্বশুরবাড়ির কিছুই পাননি...

—কিচ্ছু না। ভাসুরটা অমানুষ।

—দিদি যাবেন তাহলে?

—আমি ''না'' বলতে পারি?

ষাট বছর বিবাহবার্ষিকীর রাতটি বড় মধুর হয়ে উঠেছিল। খাওয়ার হাঙ্গামা নেই। দু'জনে কত গল্প, কত গল্প। বিশ্বনাথ কি জানেন যে ওই শেষ অমন করে গল্প করা, কথা বলা?

ননদ কোনদিন কোথাও যাননি। তীর্থে যাবেন শুনে সে কি উৎসাহ। ট্রাঙ্ক কেনা হলো, নতুন বিছানা, অম্বলের ওষুধ, কাশির কবিরাজী বড়ি, সাবান, তেল, গামছা, পায়ে কাপড়ের চটি, সে এক সংসার।

শুধু বলেন, কত খরচ হচ্ছে।

যাবার দিন সনকাকে জড়িয়ে কত কাঁদলেন। তোমার জন্যেই যাওয়াই হলো।

শ্বশুর টিকিটের ওপর একশো টাকা দিলেন, বিশ্বনাথ দিলেন দু'শো।

তখন ওতেই অনেক হ'ত।

যাবেন, থাকবেন ভারত সেবাশ্রমে, ভোলাগিরি আশ্রমে। কোন অসুবিধে হবার কথা নয়। চিঠি লিখতেন পথ থেকে তা কি দেখছেন সে সব কথা খানিক। বেশি চিন্তা বাড়ি নিয়ে।

গরু কে বাঁধছে, মনো রান্নার জোগাড় দিচ্ছে কি না, সনকার কত কষ্ট হচ্ছে, এই সব।

তিন মাসের আগে ফেরার কথা নয়। দু'মাসও কাটেনি, খবর নিয়ে এল প্রভাস।

—সর্বনাশ হয়ে গেছে গো বউদিদি, কাকাকে বা কি বলব, বিশুদাকে বা কি বলব।

—কি হয়েছে অ প্রভাস।

—দিদি নেই গো কাকা! কাশীতে যেয়ে ঠিক তিনদিনের জ্বর, মাথায় রক্ত উঠে গেল। মণিকর্ণিকায় তাঁকে রেখে এলাম গো কাকা।

—অন্যেরা কোথায়?

—আমরা সবাই ফিরে এসেছি।

তারপর যেন দুঃস্বপ্ন সব। নুটুকে এনে প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে মায়ের কাজ করানো, শ্বশুর সেই আঘাতেই বিছানা নিলেন। সনকার ওপর সমস্ত। বড় খোকা তখন ছোট, তবে এ—বাড়ি ও—বাড়ির পাঁচজন খুব সাহায্য করেন।

নুটুর কপালও মায়েরই মতো। বিয়ের সাত বছর না পুরতে সেও থান পরে ছেলেমেয়ে নিয়ে মামাবাড়িতেই ফিরে এল। অলক্ষুণে, অমঙ্গুলে বউয়ের ওখানে জায়গা হলো না। ওর বরকে ধরেছিল ম্যালিগনান্ট ম্যালেরিয়াতে।

শ্বশুর মারা যেতে তবে সনকা কলকাতায় আসেন। সরকারী কোয়ার্টার, সব সাজানো—গোছানো। রেলের কোয়ার্টার তখন ভালই হ'ত।

নুটু গোবরডাঙ্গাতেই থেকে যায়। ওর ছেলে বড় খোকার চেয়ে সামান্য ছোট। বিশ্বনাথই তাকে রেলে ঢুকিয়ে দেন। যুদ্ধের সময় রেলের চাকরি। সে খুব গুছিয়ে নিয়েছে। গোববডাঙ্গার বাড়ি ও মামার কাছে কিনে নিতে চেয়েছিল। বিশ্বনাথ বলেন, কিনবি কেন? ও তোরা আছিস, তোরাই থাকবি। তবে বেচিস না।

—মনে আছে। বড় খোকা বলেছিল, গোবরডাঙ্গার বাড়ি বেদখল হয়ে গেল?

—বলুক গে।

—আমাদের তো কোন অসুবিধে হয়নি।

—কিচ্ছু না।

—নটু, তোমার চেয়ে...?

—বছর তিনেকের ছোট।

—বাবা, কত বয়স হলো সব।

নটুর তো নাতি কেন, পুতিও হয়েছে।

—বেশ শক্ত আছি।

—হ্যাঁ। গোবরডাঙ্গা তো এখন বড় জায়গা।

—আমার পঁচাশি, তোমার পঁচাত্তর।

—বেশ কেটে তো গেল।

—ছেলে—মেয়েরা বোঝে না।

—না, ওদের জীবনযাত্রা, ধরন—ধারণ...

—যখনকার যা।

—নাও ঘুমোও এখন।

—দু'জনেই শক্ত আছি এখনো।

—তা আছি।

—পরের শতাব্দীটা দেখে যাব?

—দেখলেই বা কি, না দেখলেই বা কি। সত্যি ষাটটা বছর কাটল?

—ছেলে—মেয়েদের বিয়ে দেখ না। বড় খোকার আটচল্লিশ। মেজ খোকার বেয়াল্লিশ, ছোট খোকার চল্লিশ, বেবির ছত্রিশ, ডলির চৌত্রিশ।

—বিয়ে সব করলে বটে ছেলেরা... কারো ছেলেই দাঁড়ায় নি।

—মেয়েদের বিয়েটা দিতে পেরেছিলাম তবু।

—ছোট খোকার কথা ভাবলে কষ্ট হয়।

—কেন?

—বিয়ে হলো, বিয়ে ভাঙ্গল, আবার বিয়ে...

—এ সব তো এখন হচ্ছেই।

—প্রিয়া আবার বিয়ে করেছে।

—তোমার ছেলেও তো করেছে।

—বিয়ে করে ছেলেটাকে শুদ্ধু বোম্বে নিয়ে গেল। আমরা আর দেখতে পাব না।

—যা গেছে তা গেছে সনু। ভেবো না। আমাদের খুবই সৌভাগ্য যে, ওদের সঙ্গে থাকতে হয় না। ওদের কথা ভাবতে হয় না...

—ওরাই বা কতটা ভাবে?

—এই দেখ! যখনি আসে, দেখে আমরা দু'জনে দু'জনকে নিয়ে ভালো আছি। ভাববে কেন?

কলকাতা গেলে যেন হাঁপিয়ে উঠি। বাবা, ওদের জীবনে যা ছুটোছুটি।

—আর আমাদের এখানে?

—সব অন্যরকম।

বাড়ির বয়স তিরিশ। সাত কাঠার মতো বাগান। তাতে ইউক্যালিপটাস, বোগনাভিলিয়া, দেবদারু, সুপুরি, কিছু ফুল।

আসল বাড়িটা আড়াই কাঠার ওপর। বাগানের শখ সনকারই বেশি। রবিবার, রবিবার ভরত আসে, বাগান সাফ করে।

বিশ্বনাথের শখ ক্যাকটাসের। একটি বারান্দায় উনি নানা জাতের ক্যাকটাস লাগিয়েছেন।

মীরার মা বলে, তোমরা যেমন! তরকারি লাগালে কেমন হ'ত?

মীরা বলে, চোরে খেত।

বিশ্বনাথ বলেন, আজ ঘুমোও, কেমন?

—হ্যাঁ।

—তোমাকে যা দেখাচ্ছিল আজ!

—দূর, এই বয়সে...

—আমি তো সেই পনেরো বছরের সনকাকেই দেখলাম। তাই দেখি।

সে তোমার চোখ খারাপ হয়েছে।

—ছানি কাটালাম, দিব্যি দেখছি এখন...

সনকা ঘুমিয়ে পড়েন। বিশ্বনাথও। দু'জনের পক্ষেই দিনটি ছিল নিয়মছাড়া উত্তেজনার।

এমনিতে তো রুটিন—বাঁধা জীবন। সনকার প্রেসারের ধাত, বিশ্বনাথের সর্দি লাগে সহজে।

সময় ধরে মেপে যান, মেপে বেড়ান, বাগানে বসেন মোড়া পেতে, গল্প করেন, রেডিও শোনেন।

দূরদর্শনে সিনেমা, সংবাদ, তাও দেখেন।

অভ্যাসের বাইরে গেলেই অসুবিধে হয়।

পরদিন সকালে ওপর থেকে ডাক্তার দম্পতি নেমে আসে।

দু'জনেই ডাক্তার, নিঃসন্তান। চেম্বার বাজারের কাছে।

তুহিন আর বিদিশা দু'জনেই বলে, কাল খুব মিস করলাম আমরা। কলকাতা থেকে ফিরতে এত দেরী হলো।

—কালই কলকাতা গেলে?

—বিদিশার মা না খাইয়ে ছাড়লেন না।

বিদিশা হেসে ফেলল, এই। এঁদের সামনে মিথ্যেকথা? ন মাসিমা, কাল আমরা হঠাৎ একটা সিনেমা দেখে...বাইরে খেয়ে...

বিশ্বনাথ বললেন, বেশ করেছ!

—এখন চলি, কেমন?

ওরা চলে যায়। ওদের দু'জনকে বিশ্বনাথ ও সনকার বেশ লাগে। ছাত্র—জীবনের প্রেম। কিন্তু তুহিন বোনদের বিয়ে দিল, বিদিশা ভাইকে পড়িয়ে মানুষ করল, কর্তব্য কাজ সেরে তবে বিয়ে করল।

বয়স দু'জনেরই চল্লিশ মতো হবে। দেখলে মনে হয় না। ওরা থাকা একটা ভরসা।

বিশ্বনাথ তো জানতেনই না যে, কত তাড়াতাড়ি ওদের দরকার পড়বে।

বিবাহবার্ষিকীর পর সাতদিনও কাটে নি। বিশ্বনাথ ডেকেছিলেন, তুহিন! তুহিন!

তখন রাত এগোরোটা হবে।

—মেসোমশাই না?

—চলো চলো।

—কি হলো মেসোমশাই?

—তোমার মাসিমা... তোমার মাসিমা...

তুহিন দৌড়ে নেমেছিল, বিদিশাও।

—সরে যান মেসোমশাই।

—কি হয়েছে?

—দেখতে দিন।

ব্লাড প্রেসার দেখে তুহিন, সনকার চোখ দেখে টেনে বিদিশাকে কি বলে। বিদিশা দৌড়ে ওপরে যায়, নেমে এসে ইঞ্জেকশান দেয়।

বিশ্বনাথ বলেন, সেদিন থেকেই শরীরটা...আজও রাতে কিছু খায়নি...শুয়েই ছিল... হঠাৎ মাথা গেল, বুক গেল বলতে বলতে ওই যে বমি করল, ব্যাস, সাড়া নেই।

—বড়ো মতো অ্যাটাক হয়ে গেল।

—করোনারি, তুহিন?

—আপনি মাসিমার কাছে বসুন। বিদিশা! আরেকটা ইনঞ্জেকশান দাও। আমি ডক্টর অধিকারীকে ডেকে আনি...হাসপাতালে নিতে পারলে...

তুহিন স্কুটারে বেরিয়ে যায়।

বিশ্বনাথ পাশে বসেন। সনকার হাত ধরেন। ডক্টর অধিকারীকে নিয়েই আসে তুহিন। ওঁর নার্সিংহোম থেকে অক্সিজেন ওই আনে।

ডক্টর অধিকারী, সম্ভবত শুনেই ওষুধ, ইঞ্জেকশান সবই এনেছিলেন।

বিদিশা সনকার মুখটা মোছায়। অধিকারী নাড়ী দেখেন।

বিশ্বনাথ নিস্পন্দ, পাথর। অক্সিজেন যখন এসে পৌঁছায়, তার আগেই সনকা চলে যান।

ডক্টর অধিকারী উঠে দাঁড়ান।

—বিশ্বনাথবাবু!

বিশ্বনাথ হাত তোলেন। কথা বলতে নিষেধ করেন। বলেন

—করোনারি?

—হ্যাঁ বিশ্বনাথবাবু।

—কলকাতা...হলে কি...

—এমন হঠাৎ, এমন সিভিয়ার অ্যাটাক... কলকাতা না হলেও আমার নার্সিংহোমে তো সব ব্যবস্থাই আছে...অ্যাম্বুলেন্সও।

—সনকা সময় দিল না।

—না মেসোমশাই।

বিদিশা ওঁর হাত ধরে। তুহিনকে বলে, তুমি মীরার মাকে ডাকো। ও তো ওদিকের ঘরে দোর বন্ধ করে অজ্ঞান হয়ে ঘুমোচ্ছে।

বিশ্বনাথ সনকার হাত ধরে চেয়ে থাকেন, চেয়েই থাকেন।

বিদিশা ডক্টর অধিকারীকে বলে, আমি জানি কোন খাতায় লেখা আছে। আপনার নার্সিংহোম থেকেই ওঁর ছেলেদের ফোন করি, কেমন?

—নিশ্চয়।

বিশ্বনাথের সামনেই সব ঘটে, কিন্তু কিছুই ওঁর মাথায় ঢোকে না।

কোন এক সময়ে তুহিন ওঁকে তুলে নিয়ে যায়। ঘরে মীরা, দিলীপ, মীরার মা, পাশের বাড়ির নন্দীবাবু ও তার স্ত্রী (সনকা বলতেন নন্দী—ভৃঙ্গী), আরো কত লোক, কত।

বিশ্বনাথ যেন বুঝতে পারেন না ওরা কেন এখানে, উনি কেন বাইরের ঘরে।

কিছুক্ষণ বাদে বিদিশাই ওঁকে হাত ধরে নিয়ে যায়। এখন মশারি নেই। বিছানা খুব পরিষ্কার, পরনে ঢাকাই শাড়ি, চুল আঁচড়ানো, বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে রাখা।

মীরাকে ধমকে—ধামকে সামলে রাখা গিয়েছিল। এখন ও ডুকরে কেঁদে ওঠে, ওর মা—ও। বিশ্বনাথ দেখেন ওঁর বালিশ চেয়ারে রাখা।

বিদিশা ওদের বলে, এই, এ ঘরে নয়। এ ঘরে নয়।

বিশ্বনাথ বলেন, বিদিশা! আমার বালিশটা দাও মা!

বালিশ নিয়ে সনকার পাশে শুয়ে পড়েন উনি। সনকার মাথায় হাত রাখেন, বুলতে থাকেন।

তুহিন আস্তে বলে, আপনার প্রেসারটা দেখব।

—কোন দরকার নেই তুহিন।

—দেখব মেসোমশাই।

—দেখ।

তারপর বলেন, প্রেসার ঠিক আছে তুহিন। না, আমাকে কামপোজ দিতে হবে না। ওঁর প্রেসারও তো তুমি পরশুই দেখেছ। তোমরাই তো বরাবর...

হাত বুলিয়ে চলেন, বুলিয়ে চলেন। বলেন, আজই বলছিল, দত্তবাবুর কথা। স্ত্রী মারা গেলে এই বয়সে...স্বামী বড় অসহায়...আর দেখ!

সকালে গাড়ির পর গাড়ি আসে। ছেলেরা, বউরা জামাই, মেয়ে, বৈবাহিকরা, ফুল।

মেজ খোকা বলে কলকাতায় থাকলে...

তুহিন ওর হাত ধরে নিয়ে যায় অন্য ঘরে। বেবি বলে, বাবা, ওঠো। আমি বসছি। ছোট ছেলে বলে, বাবাকে ও ঘরে শুইয়ে দে বেবি।

সকলেই খুব সংযত থাকে, খুব। মেজ খোকা বলে, কোন চেঁচামেচি নয়। বাবা আছেন মনে রেখো।

তারপর বলে, কি ব্যবস্থা হবে?

তুহিন একটু হেসে বলে, কলকাতা তো নয় যে কাচের গাড়ি পাবেন।

—ওঃ! সেই প্রিমিটিভ ব্যবস্থা।

বেবি বলে, কলকাতায় নেয়া যায় না?

বিশ্বনাথ মাথা নাড়েন, এখানেই, কলকাতায় নয়। এ—বাড়ি থেকেই।

নন্দীবাবু বলেন, বড় ছেলে তো বিদেশে। কনিষ্ঠকেই মুখাগ্নি করতে হবে।

—আমি! কি করতে হবে?

—মুখাগ্নি...শ্রাদ্ধ...

—যত প্রিমিটিভ রাইটস...

ছোট বউ শিপ্রা বলে, বাবা—মা যা বিশ্বাস করেন সে রকমভাবেই করতে হবে।

মেজ বউ মালিনী বলে, আমি একটু চায়ের ব্যবস্থা করি। ওঃ এখনো ভাবা যাচ্ছে না।

বিশ্বনাথ বলেন, তোমাদের ছেলেমেয়েরা?

বেবি তাড়াতাড়ি বলে, ওদের আমরা ইচ্ছে করেই আনিনি বাবা। মানে মৃত্যু তো ওরা দেখেনি...ওদের মনে একটা...

—প্রচণ্ড আঘাত লাগবে?

—হ্যাঁ বাবা।

মীরার মা বলে, সে কি গো। দিদমা হ'ত, ঠাম্মা হ'ত, আর দেখতে পাবে না, তা তাদের আনলে না?

মেজ খোকার শাশুড়ী গেরস্ত মহিলা। তিনি বলেন, বেয়ান যে চলে গেলেন, তা তো সত্যিকথা মা! তোমার বাবা সইতে পারছেন, তোমরা সইতে পারছ, ওদেরি কি এমন ঘা লাগত?

বেবি ধারালো হেসে বলে, আপনার মেয়েও তো ছেলেকে রেখে এসেছে মাসিমা!

—কি জানি!

শিপ্রার মা খুবই সুসভ্য, নাইলন শোভিতা, খুব কেতাদুরস্ত। তিনি মিহি গলায় বলেন, বাচ্চাদের এ সবে একটা ট্রমা...

এ সময়ে পাড়ার ছেলেরা মঞ্চে ঢুকে যায়। বেবির স্বামী দীপক ওদের বলে, ভাই। তোমরাই সব...

—হ্যাঁ হ্যাঁ। আমাদের দিদমা, আমরা নিয়ে যাব।

—আমিও যাব।

দেখা যায় দীপক এসব কাজে বিশেষ অভিজ্ঞ। সেই ছেলেদের বলে জুতো চটি ছাড়ো।

—খালি পায়ে যাব?

—হাওয়াই কিনে নাও। কাঁধও দিতে হবে।

জনৈক যুবক বলে, ওঁরা পারবেন না। ছুঁয়ে চললেই হবে। কষ্ট হবে বটে। তা মা তো রোজ মরছেন না।

তুহিন বলে, আঃ, নীপু।

—থামো তো তুহিনদা!

শিপ্রা বলে, ওরা তো ঠিকই বলছে। মার জন্যে একদিন...

দিলীপ! গাড়িতে ফুলগুলো আছে।

ছোট খোকা বলে, ছোট ছেলেকেই করতে হবে?

—আছ যখন, করবে নাই বা কেন?

বিশ্বনাথ বলেন, তুহিন, দেরী না করাই ভালো।—ওঁর মনে হয় সনকার সামনে ওরা এ সব কি বলছে?

শিপ্রা আস্তে বলে, কখন বেরোনো হবে?

তুহিন বলে, দশটা বাজল, এবারে বোধ হয়...

বিশ্বনাথ ছেলেদের, মেয়েকে যেন নতুন চোখে দেখতে পান।

নীপু অভিজ্ঞ চোখে সনকাকে দেখে।

তুহিনকে বলে, আর দেরি করলে...

বেবি বলে, কি হবে?

—রস কাটবে।

—মানে?

তুহিন ইংরেজিতে বোঝাতে চেষ্টা করে।

নীপু বলে, দাদু! যদি যান, গাড়িতে যাবেন।

মীরা বলে, দাদু! এই চা আর বিস্কুট খাও তো! কখন ফিরবে, শরীর এলে পড়বে।

দীপক বেবিকে বলে, তোমরা বাড়ি ধুয়েমুছে রেখো। নিমপাতা, মটরডাল, লোহা, আগুনের ব্যবস্থা...কিছু মিষ্টি...

দিলীপ বলে, আমাকে দিন।

দীপক দিলীপকে সব বোঝায়। বস্তুত অনেক লোক, অনেক কথা। বিশ্বনাথ আবার এসে সনকার পাশে বসেন। মাথায় হাত রাখেন।

সনকা দেখতে পাচ্ছেন না ওঁর ছেলেমেয়েরা এখন কত রকম কথা বলে নিজেদের আন্তরিকতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। কারণ, পাড়ার লোকজনের কিছু মন্তব্য (যা বিদ্বেষপ্রসূত নয়, এমন পরিস্থিতিতে খুবই স্বাভাবিক)।

—এই বয়সে কেউ বুড়া বাপ—মারে দূরে রাখে?

—দুইটা ছেলে কলকাতায়, কারো জল পাইল না।

—এই যা উৎসবের সময়ে এল নইলে কোথায় আর...

—আজ অবশ্য এসেছে!

—কারেও তো তেমুন কানতে দেখি না।

—বিশ্ববাবু যেন পাথর!

—এইরকমই হয়।

এ সব কথাবার্তাই ছেলে—মেয়েদের কানে গেছে। সেজন্যে ওরাও বলতে থাকে।

—কতবার নিয়ে যেতে চেয়েছি!

—বাড়ি বলে মা'র সে কি টান ছিল...

—কলকাতায় থাকলে অন্তত চিকিৎসাটা হ'ত।

—তা বলতে পার না মেজদা। তুহিন আর বিদিশা এতটুকু ত্রুটি রাখতে দেয়নি।

মেজ খোকার শ্বশুরও প্রবীণ, গৃহস্থ স্বভাবের ও অভিজ্ঞ। তিনি মাথা নাড়েন।

—এ রকম অ্যাটাক, মাসিভ হেমারেজ...আমার বড় বউমা তো আমাদের সকলের সামনেই ...পাঁচ—সাত মিনিটের মধ্যে...কিছু করতে পারলাম কি? দেখ! এ সময়ে কোন কথা শুনো না, বোল না। যে যা বলছেন খোলা মনে গ্রহণ করো। এখনকার যা কাজ...

পাড়ার ছেলেরা একটু থতমত খাচ্ছিল। বাড়ির কোন লোক ভার নিয়ে নেতৃত্ব না দিলে তারাই কি সব করবে?

দীপক সে নেতৃত্বটা দেয়। দিলীপকে বলে, তুমি তো জানো সবই। বাড়ির দিকটা দেখ।

মীরার মা বলে, সে আমি আর মীরা সামলে নেব...ও দাদুর সঙ্গে যাক।

দীপক বলে, ওঁকে আগেই পাঠিয়ে দেব।

মালিনীর মাকে বলে, মাসিমা! আপনি এদিকটা একটু দেখুন।

—এরা কি হবিষ্যি করবে?

—ছেলেরা? কি জানি!

বেবি এ সময়ে খুব গোঁড়া হয়ে যায়। ও বলে, করা তো উচিত। সবাই করে।

দীপক ঈষৎ হাসে। ও বলে, সবাই সব করে না বেবি।

তোমরা তো আবার অন্য জগতের লোক।

শিপ্রা মৃদুস্বরে বলে, এখন ওসব কথা থাক দীপকদা। দেখা যাবে পরে।

—নতুন ধুতি...উত্তরীয়...কিনে তো নিই।

মালিনীর মা বলেন, করলে তো নিয়ম অনেক...

শিপ্রা দরজায় হেলান দিয়ে সনকাকে দেখে। মহিলাকে ও খুব কম চিনত।

মালিনীও ওর পাশে দাঁড়ায়।

—কি সুন্দরই না দেখাচ্ছে, তাই না?

শিপ্রা বলে হ্যাঁ।...ওঁরা তো খুব সুখী ছিলেন।

—খুব।

—খুব সুখী হতে কি কি লাগে, কি কি লাগে না, তাই ভাবছিলাম। বোধহয়...

—কি?

—দু'জনে দু'জনকে ভালোবাসা, মন বুঝে চলা, সম্মান করা, এতেই বোধহয় সুখ, শান্তি।

মালিনীর এ কথায় কোথায় আঘাত লাগে, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, ও বলে, বোঝে না...সবাই বোঝে না...

শিপ্রা ওর মাথায় হাত রাখে, ওঠো।

—মা আর বাবা যাদের এরকম...

—মালিনী!

মীরার মা বলে, কাঁদতে দাও ছোট বৌদি। এমন শাশুড়ী, পুণ্যবান মানুষ কাকে বলে...

ও কেঁদে ফেলে, কষ্ট পেল না...কষ্ট দিল না... রাতে আমি ঘরে জল রাখলাম...বলল, দরজা—জানালা বন্ধ করে দেখে নিও মীরার মা! কি কালঘুম গো! মা চলে গেল, জানতে পারি নি।

সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। বিশ্বনাথের সঙ্গে তুহিন আর বিদিশাও গাড়িতে ওঠে। বৈবাহিকরা যে যার গাড়িতে ওঠেন। ওঁরা শ্মশান ঘুরে চলে যাবেন।

সনকাকে বের করা হয়। বিশ্বনাথ হঠাৎ বলেন মুখে রোদ লাগছে।

বিদিশা বলে, হেলান দিন মেসোমশাই।

—ছেলেরা হেঁটে যাচ্ছে?

—হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনি ভাববেন না।

তখনো কাঁদেন না বিশ্বনাথ, তখনো ভাঙ্গেন না।

সব হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে সনকার ঘরের দরজার বাজু ধরে একবার বিশ্বনাথ হা—হা করে কেঁদে ওঠেন।

—আমাকে কার হাতে রেখে গেলে সনকা?

দীপক, তুহিন ও দিলীপ ওঁকে শুইয়ে দেয় পাশের ঘরে। তুহিন বলে, এবার একটু দুধ খাবেন, একটা কামপোজ, আমি একটু দেখব তার আগে।

—না তুহিন, না।

—মেসোমশাই, এখন তো আপনার অনেক কাজ বাকি...

—কি কাজ?

—অনেক। দেখি একটু হাতটা।

দীপক বলে, দেবেন কামপোজ?

—হ্যাঁ। কাল থেকে...

—আপনারাও তো...

—হ্যাঁ, এখন স্নান করব, বিশ্রাম নেব।

ওপরে গিয়ে বিদিশা বলে, ওঁকে কি রেখে যাবে?

—সেটা আমাদের চিন্তার বিষয় নয়।

—না। তা তো বটেই। জানো...

—কি?

—ওঁদের মতো সুখী দম্পতি দেখি নি।

—না।

—মাসিমা সেদিনের ধকলটা নিতে পারেন নি।

—হয়তো।

বিদিশা ঈষৎ হেসে বলে, মৃত্যুর একটা সামাজিক দিকও আছে। এবারে দেখো।

এরপর কিছুই আর বিশ্বনাথের হাতে থাকে না। বেবি সাড়ম্বরে চতুর্থী করে কলকাতায়, স্বগৃহে।

ওয়াশিংটন থেকে টেলিগ্রাম আসে, গ্রেট শক। রাইট ডিটেল'স।

—দীপ, রঞ্জা, জোজো।

বন থেকে টেলিগ্রাম আসে, মে হার সোল রেস্ট ইন পীস। —ডলি, নীলাভ, নীনা।

মালিনী ও শিপ্রা আজ এ—কাল ও থেকে যায়। ছেলেরা আসে রোজই বিকেলে। ওরা নাকি সব রিচুয়াল খুব ফেইথফুলি করছে।

আত্মীয়—স্বজনের নাম—ঠিকানা লেখা খাতা সনকারই ছিল। তাই দেখে দেখে চিঠি পাঠানো হয়। বিপিনানন্দ (স্থানীয় নেতা), দীপক চার্জে। অতএব নেতাজী হল ভাড়া নিয়ে সাড়ম্বরে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়। জ্ঞাতিভোজন, নিয়মভঙ্গ, কিছুতেই ত্রুটি থাকে না। দুই ছেলে ঢেলে খরচ করে এবং দীপক কীর্তন পার্টি, গীতা পাঠক সব এনে ফেলে।

এ সবে বিশ্বনাথ বহিরাগত, বহিরাগত। তিনি শিপ্রাকে বলেন, তোমাদের মা ছিলেন ঘরের মানুষ। এত বড় পাবলিক অনুষ্ঠান...

মালিনী হঠাৎ বলে করুক না বাবা। কোনদিন কিছু করেছে, না করতে হয়েছে?

—কাগজে কাগজে ছবি...খবর...

নুটুর ছেলে গোবিন্দ, সেও এসেছে। নুটু আসতে পারেনি, তার আথ্রাইটিস।

গোবিন্দ বলে, দাদু! ওদের তো স্টেটাস আছে একটা। সে জন্যেই...

বিশ্বনাথ বোঝেন, ওর কথাই ঠিক। ছেলেরা মা'র জীবিত কালে যথেষ্ট আসতে পারে নি, আসত না। এখন শহরবাসীকে দেখিয়েও দিচ্ছে।

মীরার মা খুব অভিভূত।

—এমন যজ্ঞি, আমাদের জনে জনে এমন দামী কাপড়... না, দেখলাম বটে। শুনলাম বড়দাদাও নাকি টাকা দিয়েছে তার কলকাতার ব্যাঙ্ক থেকে।

বিশ্বনাথ মাথা নাড়েন। তিনি জানেন না। দেয়ালজোড়া সনকার ছবিটিকেও বড্ড বেশি বড়ো মনে হয়। ওঁর ছোট নাতি, ছোট খোকার ছেলে বুবাই ওঁকে বলে যায়, দাদু! তোমার এই ভিলেজের বাড়িটা আমার খুব ভালো লাগছে।

—এটা ভিলেজ?

—নিশ্চয়।

—কেন?

—কত গাছ...ঘাস আছে...মীরাদি আমাকে কাঠবেড়ালি দেখিয়েছে...ভিলেজই তো। এটা কি কলকাতা?

বিশ্বনাথ মাথা নাড়েন। শিশু যা শোনে তাই বলে। শিখছেন উনি, শিখছেন ক্রমে।

সনকার মৃত্যুর পরেই ছেলেরা, বউরা মেয়ে সম্মেলনে বসে। সম্মেলনটি হয় দীপকের বাড়িতে।

বিষয়, বিশ্বনাথ।

ওঁকে তো ওখানে একলা রাখা চলে না।

বেবি প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়ে কথা শুরু করে, মা নেই। ওঁর ওই বয়স।

—বেবি, আমরা আলোচনা করছি, ঝগড়া নয়।

—ঝগড়া আমিও করছি না মেজদা।

—দীপক, কি বলো।

—আমি কি বলব? তোমাদের বাবা, তোমরাই ঠিক করবে। এখানে আমি কথা বলতে পারি না।

—আমি মনে করি, ওঁর ছেলেদের বাড়িতে থাকাই ভালো। সেটাই সম্মানজনক।

—বেবি!

—সেটাই নিয়ম ছোড়দা। তোমরা যদি ওঁদের দু'জনকেই আগে নিয়ে আসতে, মা হয়তো বিনা চিকিৎসায় ও রকম একটা জায়গায় মারা যেতেন না।

—চিকিৎসা করার চেষ্টা তো হয়েছিল।

—শিপ্রা! ও রকম জায়গায়...কয়েকটা হাতুড়ে ডাক্তার...ওখানে কি বেলভিউ আছে, না উডল্যান্ডস, না ক্যালকাটা হসপিটাল?

দীপক ব্যঙ্গভরে হাসে। বলে, তুমি তো ওখানেই থাকতে বেবি। বিয়ের আগে কোন উডল্যান্ডসে চিকিৎসা করাতে? সত্যি!

—তোমার কাছে সোদপুর, মধ্যমগ্রাম এ সব জায়গা খুব ভালো হতে পারে, আমার কাছে নয়।

—আবার সেই কথা?

—বলব না? মধ্যমগ্রাম থেকে তুলে এনেই তো তুমি সেই ডাইনিটাকে পার্ক স্ট্রীটে রেখেছ।

সে আমার...অফিসে...চাকরি করে।...

—ও নো, নো নো। সে তোমার ব্যবসার জন্যে ওখানে...ওখানে কারা আসে, কি হয়, তা আমি জানি না?

—কি জানো?

—এটা জানি যে, তুমি ওকে ভাঙ্গিয়ে কাজ জোগাড় করো, ওকে পার্সেন্টেজ দাও।

দীপক অত্যন্ত রেগে যায়। সামনের টেবিল থেকে ও দ্বিতীয় হুইস্কিটি খায় তাড়াতাড়ি।

মেজ খোকা বলে, দীপক! গো স্লো!

—তোমার বোনকে বলো। কি দিইনি আমি তাকে? জীবনে ভেবেছে, এ রকম বাড়িতে বাস করবে? নিজের গাড়ি, ড্রাইভার থাকবে? কণ্টিনেণ্টে যাবে বেড়াতে?

মালিনী হতাশ হয়ে বসে থাকে ও সকলের দিকে তাকায় বারবার।

আর শিপ্রা বলে, আমি বরং বাড়ি যাই। মালিনী যাবে না কি? গেলে নামিয়ে দেব।

মেজ খোকা বলে, বাড়ি যাবে মানে?

—আলোচনা তো হচ্ছে না মেজদা।

—দীপক আর বেবি...

—দীপকদা!

—কি, বলো?

দীপকদা! আপনি না থাকলে সেদিন সোদপুরে...তারপর কাজের সময়ে...আপনি যদি অবুঝ হন...

—শিপ্রা অবুঝ আমি নই। অবুঝ হলে আর...কিন্তু বেবিকেও বলো। তার বাড়িতে তোমরা এসেছ...

বেবি বলে, ঠিক আছে।

উঠে যায় ও। মুখে—চোখে জল দিয়ে ফিরে আসে আবার। বলে, সরি। আমার যে কি হয়েছে...

ছোট খোকা বলে, আসল কথা হল মা নেই। ওঁরা কলকাতায় ছিলেন না, তাই কলকাতার মতো চিকিৎসা হয়নি, একথা বলা অর্থহীন। মা নেই। বাবার বয়স পঁচাশি। আমদের স্বীকার করাই ভালো যে, মা থাকতেও সোদপুরে আমরা কমই যেতে পারতাম...

দীপক বলে, যেতে না তাই বলো। হ্যাঁ আমি আলাদা বাড়ি করেছি! তবু বাগবাজারের বাড়িতে প্রতি রবিবার আমি যাই। বেবিও জানে যে, আমার জ্যাঠামশাই মারা যেতে আমি মুখাগ্নি করি, শ্রাদ্ধ করি, মাসিক শ্রাদ্ধ প্রতি মাসে করে তবে বার্ষিক করি।

ছোট খোকা বলে, আমরা সে রকম নই।

শিপ্রা হঠাৎ বলে, কিন্তু দীপকদা! আমি যতটুকু দেখেছি, ওঁরা দু'জনে দু'জনকে নিয়ে খুব সুখী, খুব পরিপূর্ণ ছিলেন। কলকাতায় থাকতে কখনো চাননি।

—সে কথাও সত্যি?

—এখন যদি মা থাকতেন...

—তাহলে এ কথা উঠত না।

—মা নেই বলেই...

—তাই বলো। যুক্তি দিয়ে কথা বলো, দীপকদা আছে। এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। ওই বৃদ্ধকে একা ফেলে রাখা...অবশ্য উনি আসতে চাইবেন না। তবু ওখানে ওঁকে রাখবে কি না, কোথায় রাখবে, সেটা তোমরাই ঠিক করো।

মালিনী বলে বাবারও তো একটা মত আছে।

—সেটাকে কতটা গুরুত্ব দেবে তাও ভাবো।

মেজ খোকা বলে, আনতে হলে...সোদপুরের বাড়ি?

—আমার একটা কথা শুনবে?

—বলো দীপকদা।

—আনো, রাখো, দেখো। তোমাদের জীবন এক রকম, ওঁর জীবন আরেক রকম...

মালিনী বলে, ওঁকে কে কতটা সময় দিতে পারবে, সেটাও ভাবা দরকার।

মেজ খোকা বলে, কেন? আমার বাবা আসবেন, থাকবেন, তাতে তোমার তেমন ইচ্ছে নেই মনে হচ্ছে?

মালিনী স্বচ্ছল গৃহস্থ পরিবারের মেয়ে। স্বামীর ইচ্ছেই সব, এ রকম ধারণা ওর ছোটবেলা থেকেই। ওর কোন বোনই ওর মত এত ধনী হয়নি, আর কাউকে নিজেকে বদলে বদলে অন্যরকম করতে হয়নি।

তবু ও যেন দিশেহারা, ভীষণ ক্লান্ত, জোর করে কিছু বলতে পারে না।

বেবি বলে, মেজদাই এখন বড়। ওর বাড়িই যথেষ্ট বড়। মেজদারই উচিত...

মেজ খোকা বলে, বেশ।

ছোট খোকা বলে, আমার বাড়িতেও থাকবেন। ওখানে কয়েক মাস, এখানে কয়েক মাস...

শিপ্রা বলে, আসতে চাইবেন?

বেবি বলে, তুমি ওঁকে আর ক'দিন দেখছ শিপ্রা? ছেলেরা আনলে বাবা আসবেন না?

শিপ্রা ঈষৎ হাসে, কথা বলে না।

বেবি বলে, রাজাকেও আমি জানিয়েছি।

ছোট খোকা বলে, কবে?

—জানিয়েছি।

দীপক বলে, কি দরকার ছিল?

—ছিল। ওরও ঠাকুমা গেছেন।

ছোট খোকা বলে, ঠাকুমা!

—নিশ্চয়।

দীপক বলে, জানি না বেবি। প্রিয়া এক সময়ে ছোট খোকার স্ত্রী ছিল। রাজার এক বছর বয়সে ডিভোর্স! প্রিয়া বহুদিন মারাঠী না মাদ্রাজী বিয়ে করে বম্বেতে। রাজার নামও পাল্টে গেছে। তার বয়সও দশ হলো। তোমাদের কারো সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। সেখানে...

—জানানো কর্তব্য মনে হলো, জানিয়েছি।

ছোট খোকা যখন রাগে, তখন ওর গলা নীচু হয়ে যায়। ও বলল, রাজাকে জন্মদিনে টাকা পাঠালে মানিঅর্ডার ফেরত আসত। কোন প্রেজেন্ট পাঠালে... দেখ বেবি! আমার তখন রাগ হয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝেছি ওটাই ভালো। ও যেখানে আছে, সেখানেই ওকে মানিয়ে নিতে হবে।

—হঠাৎ তাকে এ খবরটা জানালে কেন?

মালিনী বলে, রাজার মা'র সঙ্গে তো আমার মেজদির দেখা হয়েছিল। রাজাকে ওরা কোথায় সিমলার কাছে কোন হস্টেলে রেখেছে।

শিপ্রা হঠাৎ হাসে। বলে, আমার বলা ঠিক হবে না, কিন্তু এটা তো বলতে পারি যে, রাজার মা আমাকেই লিখেছিল, তোমার স্বামীকে দয়া করে বোলো, রাজার সঙ্গে কোন যোগাযোগ না রাখতে। আমি মনে করি না, হঠাৎ এ রকম একটা খবর পেলে সে আবার চিঠি লিখবে কি না।

—অত ভেবে দেখিনি...

ছোট খোকা বলে, যথেষ্ট উপকার করেছ। আর কোর না বেবি। যা বোঝ না...

দীপক বলে, এ সব কথা এখানেই শেষ হোক।

মেজ খোকা বলে, তা'হলে বাবা আমার কাছে আসছেন। অর্থাৎ মালিনীর কাছে। আমি আর কতটা সময় বাড়িতে থাকি বা থাকব।

মালিনী বলে, বেশ। তাই হবে। কিন্তু তোমাকেও মনে রাখতে হবে যে, বাড়িতে বাবা আছেন।

—আমাকে মনে রাখতে হবে কেন? গেস্টরুম আছে, সঙ্গে বাথরুম, বাড়ির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। ওঁর মতো উনি থাকবেন।

দীপক ঈষৎ হাসে। বলে, এই বয়সে মানুষ কিন্তু সঙ্গ চায়। নিঃসঙ্গতা সহ্য করতে পারে না।

—সব সময় সঙ্গ কে দেবে? তা হ'লে তো... তোমার না বেবির বন্ধু সেই মহিলার... কি যেন... সেখানে রাখতে হয়।

মেজ খোকা হাসে।

বেবি বলে, হাসার কি আছে? কতখানি জমি নিয়ে কি চমৎকার হোম করেছেন মিসেস দেশাই, বৃদ্ধ—বৃদ্ধাদের জন্যে...একেবারে বিদেশী মডেলে...

—নামটা কি যেন?

—আশ্রয়।

—আর চার্জটা?

—সে তুমি বলতে পার না মেজদা। ও রকম থাকা, ও রকম খাওয়া, কম্যুনিটি হলে টিভি দেখা, কতরকম লোক যায়, আলোচনা, গান, কত কি হয়। ডাক্তার, নার্স, কি নেই? তাতে হাজার টাকাটা বেশি হলো?

দীপক বলে, না না, সত্যিই ভালো। আমি তো ভাই দশ হাজার টাকা দান করেছি। বুড়ো হলেই যাতে একটা জায়গা পাই। যাইও মাঝে মাঝে।

—কি রকম? ভালো?

—থাকতে কেমন জানি না। দেখতে তো ভালই লাগে। বাগান আছে, বেড়াও। লাইব্রেরি আছে, পড়ো।

মালিনী বলে, বাব্বাঃ! বাপ—মা বুড়ো হলে সঙ্গে রাখা যাবে না, মাসে হাজার টাকা দিয়েও..

দীপক বলে, আহা! বুঝছ না? আমরা তো অন্য যুগে পৌঁছে গেছি। ঘরে জায়গা থাকলেও মনে জায়গা দিতে পারছি না। সে জন্যেই অনেক বুঝেই মহিলা ব্যবসা ফেঁদেছেন।

বেবি বলে, ওটা ব্যবসা হলো?

—নিশ্চয়! ফান্ড কত টাকার তা জানো?

মালিনী বলে, কারা যায় ওখানে?

—সমাজের সুপারস্ট্রাকচার থেকেই যায়। সীটও গুণতি করা। নাম লেখাতে হয়।

—এই কলকাতায়!

—নয় কেন? এখন ভারতবর্ষ জেট গতিতে এগোচ্ছে। কলকাতা কি ভারতের বাইরে, না কলকাতায় টাকাওলা লোক কম আছে?

—তবু!

—আরে, তোমরা, আমি সবাই তো সমাজের ওই স্ট্রাকচারে যাচ্ছি, পৌঁছে গেছি প্রায়। তোমাদের কথা জানি না। আমি যেই বুড়ো হব, অমনি ভি ডি ও ক্যাসেট, ভি সি আর, পাঁচশো না পড়া ক্রাইমের বই নিয়ে আশ্রয়ে ঢুকে যাব। সব ব্যবস্থাই আছে হেঁ। তেমন টাকা দাও, আলাদা কটেজ করে দেবে।

শিপ্রা বলে, থাক। কি কথায় কি কথা।

দীপক বলে, দেখ! শেষ অবধি ওঁকেও...

মেজ খোকা একটি নীট হুইস্কি খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, তুমি যা বলছ, তা আমি করব না।

ছাত্র ইউনিয়নে একদা বক্তৃতাবাজ মেজ খোকা টেবিল চাপড়ে বলে, আমার বাবা কোন বোঝা হবেন না। অসম্ভব যত্নে থাকবেন, ডাক্তার, চিকিৎসা, ওঁর জন্যে আলাদা লোক... দেখে নিও। ওল্ড ম্যান ইয়ং হয়ে যাবেন। আমাদের বাড়ির সামনেই পার্ক। রোজ বেড়াবেন।

—থ্রি চিয়ার্স মেজ খোকা।

বেবি বলে, আমি বাবার ঘর গুছিয়ে দিয়ে আসব।

মালিনী বলে, তার দরকার হবে না। তুমি গেলেই হবে। ছেলে—মেয়েকেও নিয়ে যেও।

—যাব।

—বাবারও জেদ আছে। দাদা কতবার বলল, বাবা—মা গেলেন? ওখানে থাকতেই ওঁদের ভাল লাগত।

শিপ্রা বলে, এখন ওঁর যা মনের অবস্থা। হয়তো চলে আসতে পারলে খুশিই হবেন।

—নিশ্চয়। ছেলের কাছে আসছেন!

মেজ খোকার অতিথিদের জন্যে নির্দিষ্ট ঘর। টেবিল, চেয়ার কাপড় রাখার আলমারি বইয়ের তাক। ডানলোপিলোর গদি, ফুলকাটা চাদর ও বালিশের ওয়াড়। খাটের মাথার কাছে পড়ার ল্যাম্প। ঘরে ফ্যান ও এয়ারকন্ডিশনার দুই আছে। যার যেটা সুবিধে হয়।

বাইরে ব্যালকনিতে ইজিচেয়ার। বাথরুমে যাওয়ার এবং বাথরুমের বাতাসকে মোহনীয় করার জন্যে কোন সুগন্ধি ছেটানো হয়।

বিশ্বনাথ দেখবেন বলে এ ঘরে একটি দূরদর্শন। রঙিন। না, তাঁর সুখ—স্বাচ্ছন্দ্যের কোন ব্যবস্থায় ত্রুটি নেই। রোজ তাঁর ঘরে টাটকা ফুল রাখা হয়। ফুল থাকলে নাকি মন ভালো থাকে।

সনকার ছবি দেয়ালে।

ব্যালকনিতে বসে বিশ্বনাথ ভাবছিলেন, এখানে তিনি এলেন কি করে।

সনকা চলে যাবার পর বড্ড ভেঙ্গে পড়েছিলেন। ভাবতে পারছিলেন না ওখানে একা থাকবেন কেমন করে।

মীরার মা ওঁকে খাওয়াতে পারছিল না।

—রাতদিন বাগানে বসে কাঁদলে সে মানুষ ফিরবে? খাওয়া ছেড়ে...ঘুম ছেড়ে...

তুহিন আর বিদিশাও ঘাবড়ে গিয়েছিল। ছেলেরা যখন গেল, তারাও বলেছিল, সেই ভালো, নিয়ে যান।

বিশ্বনাথ নিজেও আর সনকাহীন সনকাবাসে থাকতে চাননি। এমন সময়ে তো ছেলেদের কাছেই থাকে মানুষ।

—বাড়িটা কি করবে?

—কি আর করব, থাকবে।

—এখানে তো তুমি আর থাকছ না।

—তবু থাকুক। মাঝে মাঝে তো আসব।

—সব এইভাবে রেখে যাবে?

—দিলীপ আর মীরা থাকবে এখন।

—ওরা বিশ্বাসী তো?

—ওদের ভরসাতেই তো ছিলাম।

—শেষে গোবরডাঙ্গার বাড়ি না হয়।

—তা কেন হবে?

বাড়ি, একটা বাড়ি যে কত আপন হতে পারে, তা বিশ্বনাথ ছেলেদের বোঝাবেন কেমন করে? বাড়ির প্রতিটি গাছ সনকা আর তাঁর লাগানো। প্রতি ঘরে, বারান্দায় সনকা। এ বাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে?

—ওরা থাকলে বাড়িতে মানুষ থাকবে। ঝাঁটা পড়বে ঘরে ঘরে। বাগানটা...

—বুঝলাম। ফ্রিজ... টেলিভিশন...

—ও সব যা হয় করো।

—বাবা!

—বলো।

—কথাটা খুব খারাপ লাগবে শুনতে। মা'র কোন গয়না ছিল না?

—হাতের রুলি, যে হারটা পরে থাকত, বাঁধানো লোহা, কানে যে ফুলটা পরত...

—আর কিছু নেই?

—আর কি থাকবে বলো? বেবি, ডলির বিয়েতেই তো সব দিল। তোমাদের বউদেরও... আর কি থাকে? কোন শখও ছিল না। আমিও কিনে দিইনি।

—যাকগে যাকগে। সে সব কোথায়?

—আলমারিতে।

—ওগুলো নিয়ে যেতে হবে! ফ্রিজ, টিভি বেচে দেব...আর কি...আর কি...ও, বেবি বলেছে বাসনপত্রও বন্ধ ঘরে রাখতে।

—যা হয় করো।

—হ্যাঁ, তোমার অ্যাকাউন্ট!

—ব্যাঙ্কে?

—হ্যাঁ। ওটা আমার সঙ্গে জয়েন্ট করে নাও। না না... তোমার ওই সামান্য টাকায় আমার কোন লোভ নেই! তবে জীবনমৃত্যু ...দেখলেই তো...

—ছোট খোকা কিছু বলবে না?

—ছোট খোকা? ওর শ্বশুর ওই বাড়ির প্রোমোটার। আসলে ওঁরই বাড়ি। দুটি তো মেয়ে। দু'জনে দুটো করে ফ্ল্যাট পেয়েছে। ওঁদেরও দুটো। মানেটা বুঝলে?

—কি!

—সব দুই মেয়ে পাবে। ছোট খোকাও বলেছে, তুমি যাচছ, তুমিই জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করে নাও। যাতে বাড়ি ভাড়ার টাকা, পেনশনের টাকা, সব ওখানে জমা পড়ে। যাতে পরে কোন অসুবিধে না হয়।

মেজ খোকার কথাবার্তা খুবই বাস্তবসম্মত। সে সময় বিশ্বনাথ অত্যন্ত কাতর, অত্যন্ত বিপন্ন! কারো ওপর নির্ভর করতে চাইছেন।

—বেশ তো। তাই হোক।

—উইল করেছ?

—সবই তোমাদের। তবে তোমার মা বলতেন...

—কি?

—মীরাদের কিছু দিতে।

—কেন?

—''কেন'' মানে! উনি বলতেন, সেটাই যথেষ্ট। তাছাড়া ওরাই তো সব করছে এতকাল।

—করেছে! পেয়েছেও তেমনি।

—ও ভাবে বোল না মেজ খোকা।

—দেয়া যাবে...দেয়া যাবে।

—এ বাড়িতেই তোমার মায়ের বাৎসরিক কাজও হবে। ওরা থাকবে। মানুষ না থাকলে বাড়ি পোড়ো হয়ে যায়।

—ও সব ফ্যাচাং কলকাতাতেই করা চলে। আমরা তো মনে করি, ক্রমে ক্রমে এ বাড়ি বেচে দিলেই ভালো। কে আসবে?

বিশ্বনাথ চুপ করে থাকেন।

—অবশ্য এখনো নয়।

আসার সময়ে মীরার মা, মীরা, সবাই কেঁদেছিল। মীরার ছেলে অবাক হয়ে দেখছিল সব।

তুহিন আর বিদিশা নেমে এসেছিল। বিশ্বনাথ বলেছিলেন, ছেলেদের, মেয়েদের সবার ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। কখন কোথায় থাকি তা জানাব। তোমরা তো কলকাতা যাও। মাঝে মধ্যে যেও, কেমন?

—নিশ্চয় যাব।

মীরার মা কাঁদতে কাঁদতে একটা থলি এনেছিল।

—এগুলো কী?

—বাবুর ইসবগুল, বেলচূর্ণ, তালমিছরি...

—ও! ভালো কথা। বেবি বলেছিল তুমি কখন কি খাও তা জেনে নিতে।

—সবই খাই। তাই তো, মীরার মা?

—সবই খাও, তবে ঝালমশলা নয়...আর তেতো তো বাবুর নিত্য চাই।

—ও সব তুমি মালিনীকে বলে দিও।

সনকা বাসা ছেড়ে আসতে ব্যস্ত হয়েছিলেন। আসার সময়ে কিন্তু ওঁর চোখ দিয়ে জল পড়েছিল।

মেজ খোকা ওঁর দিকে তাকায় নি। এ বাড়ির দাম কত হতে পারে। তাই ভাবছিল!

বেবির নির্দেশ খুব কড়া। কোন কারণে ওঁকে যেতে দেওয়া হবে না সোদপুরে। ওঁর কিছু হলে আবার ওই জায়গায় দৌড়নো... হোক, না হোক। বেঁচে থাকলেও তো যেতে হবে। না, আর ওরকম হতভাগা জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়। মেজ খোকা বলছিল—

—আমি কি ''না'' বলেছি?

—আরেকটা কথাও ভাবতে হবে।

—কি?

—মীরার মা কেমন জাঁকিয়ে বসেছে দেখেছ?

—খুব দেখেছি।

—মা আর বাবা, চিরকাল কাজের লোকদের...

—সে দোষ মালিনীরও আছে।

—দূরত্ব রেখে চলা উচিত।

—যা বলেছ।

মেজ খোকা সে সব কথাই ভাবতে ভাবতে কলকাতা পৌঁছে গেল। তারপর বলল, পৌঁছে গেলাম।

এ বাড়িতে বিশ্বনাথ আগেও এসেছেন। এবার যেন বাড়িটাকে বড্ড বড়ো মনে হলো, বড্ড উঁচু।

বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মালিনী প্রণাম করেছিল, হাত ধরেছিল।

—তোমার কাছেই এলাম মা!

—তাই তো আসবেন।

—এই বুড়ো ছেলেটার ভার এখন...

—বাবি! দাদুকে প্রণাম করো।

ওঁর ষোল বছরের নাতি অত্যন্ত বিরস মুখে নিচু হয়ে কোনমতে পা ছোঁয়।

—থাক থাক!

—চলুন, আপনার ঘর দেখুন।

ঘর দেখে বিশ্বনাথ বলেছিলেন, তোমাদের অসুবিধে হবে না? অতিথি এলে তো এখানেই থাকেন?

মালিনী মাথা নিচু করে বলেছিল, না বাবা! ও তো এই বাড়িতেই দশতলায় একটা ছোট ফ্ল্যাট লীজ নিয়েছে। কেউ এলে সেখানেই থাকে।

—আরেকটা ফ্ল্যাট।

—এর চেয়ে ছোট। ...চলুন স্নান করবেন তো?

মেজ খোকা বলেছিল, হ্যাঁ হ্যাঁ। স্নান করবেন, খাবেন, বিশ্রাম করবেন। আমিও আজ একসঙ্গেই খাব।

একসঙ্গে খেতে খেতে বিশ্বনাথের মনে হয়েছিল, এরাই তো ওর আপনজন। এদের কাছে থাকা খুব দরকার ছিল। ওখানে থাকলে...

—বিকেলে কি খান বাবা?

—চা, দুটি শুকনো মুড়ি, কখনো দুটি বিস্কুট...

—ফল খান না? ছানা?

—ফল মানে পেঁপে...কলা...না, ছানা খাই না। এ বয়সে বউমা, মেপেজুখে না চললে...

—হাঁটেন কখন?

—সকালে...বিকেলে... আমাদের মানে বুড়োদের। সেখানে আড্ডা হয়!

মেজ খোকা বলেছিল, লুঙ্গি পরেই থাকো?

—বাড়িতে।

—মালিনী! বাবার জন্যে কয়েকটা পাজামা...পাঞ্জাবী...আর কি লাগে...

—পাজামা তো পরি না।

—ঘরে লুঙ্গি পরতে পার। কিন্তু ...কয়েকদিনেই বিশ্বনাথ বুঝেছিলেন, এখানে নিয়মকানুন অন্যরকম। লুঙ্গিটা অসভ্য পোশাক। ঘরে স্নান করে লুঙ্গি পরা চলে। খাবার ঘরে চলে না।

লিফটে নেমে রাস্তা পেরিয়ে সামনে পার্ক। একটি চাকর তাঁকে রাস্তা পার করে দিয়ে যায়। সে—ই সময়মতো নিয়ে আসে।

সন্ধ্যা হলেই তিনি নিজের ঘরে বন্দী। ব্যালকনিতে হাঁটো, টিভি দেখো। না, সমস্ত কলকাতা অন্ধকারে ডুবে গেলেও এ বাড়িতে নিষ্প্রদীপ হয় না।

কয়েকদিন বাদেই উনি বলেছিলেন, আমাকে আনতে যেতে হবে না।

—একা আসবেন?

—হ্যাঁ হ্যাঁ। সোদপুরে তো স্টেশন অবধি চলে যেতাম। ওঁর আবার মাঝে মাঝে মিঠে পান খেতে শখ হ'ত।

—বেশ তো আসবেন!

—রাতের খাবারটা ঘরে কেন দেয়?

মালিনী নিচু গলায় বলেছিল, রাতে তো একেকজন একেক সময়ে খায়...ও রোজ খায়ও না।

—আমি, তুমি আর বাবি তো একসঙ্গে খেতে পারি। কিংবা আমি আর বাবি...

মালিনী ওঁর দিকে দুর্বোধ্য চোখে তাকিয়েছিল। স্বচ্ছল, গৃহস্থ ঘরের মেয়ে। একটু মোটাসোটা। লম্বা চুল ছিল। মেকাপ করতে কখনো দেখেন নি।

এখন ওর চুল ছোট করে ছাঁটা, মেকাপের নিচে এক ক্লান্ত, বিভ্রান্ত মুখ। বাড়িতে হাউসকোট, বেরোলে শাড়ি। ডান হাতে একটি চুড়ি, বাঁ হাতে লোহা, অবশ্যই সোনা বাঁধানো। কানে হীরে।

মোটা মানুষ রোগা হলে যেমন দেখায়, তেমনই চেহারা। যেন কোনো অসুখ আছে।

—তুমি খুব রোগা হয়ে গেছ।

—কই, না তো?

—দেখতে পাচ্ছি।

—খুব মোটা হয়ে যাচ্ছিলাম... ও বলল, তাই... শ্যেরি লুইতে গিয়ে...

—রোগা হয়ে এলে?

—হ্যাঁ বাবা।

—এত কম খাও কেন?

— খেতে পারি না আর।

—কি আশ্চর্য! কেউ মোটার ধাত, কেউ রোগার...

ওর কাছে কতরকম বন্ধু...কাজের লোকজন আসে...

—তা আমাদের একসঙ্গে খাওয়ার কি হ'ল?

—বাবিও তো, যখন ওর সময় হয়...

—রাতে?

—মানে...পরীক্ষা তো হয়ে গেছে...

—কি করে?

—বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও দেখে।

—সে তো বাড়িতেও আছে।

—বাবা! আপনার খাবারটা আমিই নিয়ে আসব। খাবার সময়ে কাছে বসব, কেমন?

—বেশ। তোমার যা সুবিধে!

মালিনীর নয়, মালিনীর নয়, তার স্বামীর। কিন্তু সে কথা মালিনী বলতে পারবে না।

সেদিন পার্কে অনেকক্ষণ হেঁটেছিলেন বিশ্বনাথ। পার্কটি ছোট। বৃদ্ধেরা আলোর নিচে বেঞ্চে বসে থাকেন। সকলেই কাছাকাছি বাড়িতে থাকেন।

যেচে আলাপ করেছিলেন একজন।

—আমার নাম সুপ্রভাত দত্ত।

—নমস্কার। বিশ্বনাথ চৌধুরী।

—কোন বাড়িতে থাকেন?

—সৈকত।

—আরে আমিও তো ওখানেই।

—কত তলায়?

—পাঁচতলা। আপনি?

—চোদ্দতলা। আমার ছেলে নন্দন...

—বুঝেছি। ব্যবসা করেন।

—হ্যাঁ। আপনার ছেলে?

—আমি একা মশাই।

—ও!

—আপনি নতুন এসেছেন?

—হ্যাঁ। সোদপুরে ছিলাম...স্ত্রী মারা যেতে...

—আমার চেয়ে ভাগ্যবান।

—কেন?

—আমার স্ত্রী মশাই, থেকেও নেই।

—সে কি রকম?

—ছিলাম ফরেস্ট সার্ভিসে। ছেলেরা বর্তমানে তিনজনেই বিদেশে।

—আসে না?

—আসবে কেন? বাড়ি করেছে, ও দেশে বিয়ে করেছে, আর কি আসে?

—স্ত্রী?

—আপনার ছেলের তো দুটো ফ্ল্যাট...ওপরেরটা মস্ত বড়। আমারটা ছোট। দুটো বেডরুম, দুজনে থাকব। তা কি যে গুরু জুটল মশাই। সংসারে তিনি থাকতেই পারলেন না।

হিমাচল প্রদেশে গুরুর আশ্রমেই...

—আপনার তো বড় কষ্ট।

—কিছু বলতে পারবেন না। ছেলেরাও লিখল, মা'র ইচ্ছেমতো জীবনযাপনের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে গুরুও এমন—তেমন নন। সে আশ্রমেও টাকার খেলা। তা ছেলেরা ডলার পাঠাল, মা চলে গেলেন।

—আপনার কথা ভাবলেন না?

—মশাই! রীতিমত হোমযজ্ঞ করে, নিজের শ্রাদ্ধ নিজে করে এ জীবন ও জন্মকে ত্যাগ করে তিনি এখন প্রজ্ঞা সরস্বতী। আমি কে, বলুন?

—আপনার তো বড় কষ্ট।

—না না, সময় বদলাচ্ছে, আমি যদি নতুন সময়ের নতুন নিয়ম মেনে নিতে না পারি...

—ঝি—চাকরের সংসার?

—একটি পুরাতন ভৃত্য এবং আমি।

—সময় কাটানোই তো...

—সকালে চলে যাই ন্যাশনাল লাইব্রেরী। খানিক বই পড়ি। নয়তো হর্টিকালচারে ...দুপুরে ফিরি...বিকেলে হাঁটি। সন্ধ্যায়...

—টিভি দেখেন?

—না মশাই, জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বুঝলেন...শব্দ আর সহ্য করতে পারি না। আমি না দেখলে কি হবে। প্রতি ঘরে টিভি...ভিডিও...

—শব্দদূষণ যাকে বলে।

—বয়সটা বেশী হয়ে গেছে। নইলে...

—কি করতেন?

—ঝাড়গ্রাম...হাজারিবাগ...কোথাও থাকতাম এ বাড়ি বেচে দিয়ে। তিয়াত্তর বছর হ'ল...

—আমার পঁচাশি।

—বাঃ, চমৎকার রেখেছেন শরীর।

—সবই তো সে দেখত...

—কি হয়েছিল?

—করোনারি। সময়ও দিল না, কিছু করতেও পারলাম না। সে থাকলে কি আর...

—নিজে বাড়ি করেছিলেন?

—হ্যাঁ। জমিটা অনেক আগে কেনা।

—কি করতেন?

—রেলে ছিলাম।

—ওখানেই থাকতেন?

—হ্যাঁ। ছেলেরা অবশ্য কলকাতায়। এক ছেলে আবার ওয়াশিংটনে।

—হ্যাঁ। বিদেশই এখন স্বদেশ।

—আমরা দু'জনে ...কখনো ছেড়ে থাকিনি...এখনও ভাবতে পারি না।

—ও বাড়ির কি করলেন?

—তেমনিই আছে।

—কে দেখছে?

—একটি পরিবার...আমরা ওদের ভরসাতেই ছিলাম...কাজ করত, বাড়ির লোক বললে হয়।

সুপ্রভাত বলেন, ছেলেরা রাখতে দেবে না। দেখবেন, বেচিয়ে ছাড়বে।

—আমি থাকতে নয়।

—বলতে পারেন না। ওই যে বৃদ্ধকে দেখছেন? উনি গুজরাটি। স্ত্রী নেই। ছেলে কলকাতাতেই। বাপকে রেখেছে এখানে নার্স, চাকর, এদের কাছে। উনি কানেও শোনেন না, চোখেও ঝাপসা দেখেন। বাপকে দিয়ে ব্যবসা বেচিয়ে নিজে এখন অন্য ব্যবসা করছে। ওই যে, যাঁকে হাত ধরে নিয়ে আসে।

—দেখেছি।

—আপনাকে যা বলব বলে ডেকে আলাপ করলাম। শুনুন, সন্ধ্যের পর পারতপক্ষে পার্কে থাকবেন না। থাকলেও এই দিকে আলোর নিচে।

—কেন বলুন তো?

—নতুন আপনি, তাই জানেন না। সন্ধ্যের পর পার্কের ওদিকটায় গেলে...

—এ এলাকাতেও সমাজবিরোধী?

সুপ্রভাতের প্রতিটি উচ্চারণে কেমন বিদ্রূপ। জীবন ওঁকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছে উনি যেন সেটা মেনে নিতে পারেননি। কাকে বিদ্রূপ? নিজেকে?

—না না, সমাজবিরোধী বলতে পারবেন না। এখানে যারা আসে, তারা এইসব বড় বাড়িরই ছেলেমেয়ে।

—বলেন কি!

—আরও শুনুন, আসে তারাই, যাদের বাড়িতে সুবিধে হয় না। বেশির ভাগ বাড়িতেই তো বাপ বেরিয়ে যায়, মা বেরিয়ে যায়, কখন ফেরে কে জানে। সে সব বাড়িতে ছেলেমেয়েরাও...

—বাড়িতে শাসন করে না?

—কে করবে? কখন করবে?

—এইসব ছেলেমেয়ে...

—বুঝতেই তো পারছেন। আবার ড্রাগও চলে। সে সময়ে ওদিকে গেলে ছুরিও খেতে পারেন।

—ছুরি?

—তেমন ছেলেও আসে।

বিশ্বনাথ মাথা নাড়তে থাকলেন বারবার, এসব কি বলছেন সুপ্রভাত?

—চলুন যাওয়া যাক।

—খুবই চিন্তায় ফেললেন। আমারও তো একটা নাতি আছে। বছর ষোল বয়স!

—চিন্তার কথা। কিন্তু কেউ চিন্তা করে কি?

—এইসব বাড়ির ছেলেমেয়েও বললেন...

—কে ছেলে, কে মেয়ে আপনি বুঝবেন কি করে? সবাই প্যান্ট পরে এক রকম, চুল ছাঁটে এক রকম, দেখে চেনাও মুশকিল।

—খুব চিন্তার কথা।

—ওদের নিয়ে ভাববেন না। সৈকতে দশ বছর বাস করে আমার বিশ্বাস হয়েছে যে একেবারে শিশু এবং একেবারে বুড়ো, এর মাঝামাঝি যারা, তাদের জন্যে কেউ ভাবতে গেলে ওরা পছন্দ করে না।

—নাতিটার জন্যে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

—কি নাম বলুন তো?

—বাবি বলে।

—বাবি, ববি, বুবি, বিবি, এখন নামে চেনা মুশকিল। দাঁড়ান, লম্বা রোগাটে, ফর্সা, তামাটে চুল? চোখ ক'টা?

—হ্যাঁ, বাপের ধাঁচ পেয়েছে।

—বুঝেছি!

—চেনেন?

—দেখেছি। বলতে পারেন দেখেও থাকি। মানে...আমি যেখানে, তার উল্টোদিকের ফ্ল্যাটেই ওদের আড্ডা আছে। খুব আসে, তাতেই দেখেছি।

—আমাদের সময়ে...

—ভাববেন না। না ভাবলে আরো পনেরো বছর বেঁচে পরের শতাব্দী দেখে যেতে পারবেন।

—আরো পনেরো বছর...

—আপনি তো সুস্থ আছেন।

—আপনিও তো...ভালই দেখা যায়।

—মাঝে মাঝে হাঁপানি। নইলে...

—একা থাকেন!

—ওই যে বললাম, পুরাতন ভৃত্য।

—ভাল খুব, তাই না?

—বাহাদুর...আমার চাকরির প্রথম জীবনে দার্জিলিং থেকে আনি। ওর ছেলেদের চাকরি করে দিয়েছি...ওর বউয়ের ক্যান্সারে চিকিৎসা করিয়েছি...ও তো বলে, যে আমাকে ফেলে যাবে না।

—যাব একদিন আপনার ওখানে।

—আসবেন। নিশ্চয় আসবেন।

এসব নানা কথায় ওঁরা বাড়ি পৌঁছে যান। সুপ্রভাত বলেন, আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ। অনেককাল পরে বাংলায় কথা শুনলাম, বললাম।

—হ্যাঁ...তা বটে...আমার সঙ্গে বাংলা বললেও, ছেলেরা বউরা, নাতি—নাতনি, মেয়ে সকলেই নিজেরা ইংরিজিটাই বলে বেশি।

লিফট ওঁদের নিয়ে উঠতে থাকে। সুপ্রভাত বেরিয়ে যান ছ'তলায়। বিশ্বনাথ অন্যমনস্কভাবে বেরোন লিফট থেকে এবং অন্যমনস্ক থাকেন বলেই লক্ষ্য করেন না কোন ফ্ল্যাটে ঢুকছেন।

পাশাপাশি নয়, মুখোমুখি ফ্ল্যাট। একটির দরজায় পিতলের তন্ত্রোক্ত কঙ্কাল কালিকার ফলক, অন্যটিতে ওড়িশার সিংহ—সিংহী।

বেল টেপেন তিনি।

দরজা খুলে দেন আঁটো গেঞ্জি ও শর্টস করা এক প্রৌঢ়া মহিলা। চুল ছাঁটা, হাতে গেলাস, ওঁর পেছনে কয়েকটি কুকুরের ঐক্যতান।

বিশ্বনাথকে দেখে উনি এবং ওঁকে দেখে বিশ্বনাথ হাঁ; মহিলা ওঁর আপাদমস্তক দেখে বলেন, বাঙালী, নন্দন চৌ? বেঙ্গলী?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—দ্যাট ওয়ান, দ্যাট ওয়ান।

নমস্কার করেন বিশ্বনাথ। লজ্জায় কান লাল হয়ে গেছে তাঁর। হ্যাঁ, ওটাই তো!

করিডর দিয়ে হেঁটে তাঁর ঘরে ঢোকেন। এ ফ্ল্যাটের গেস্টরুম থেকে বাইরে বেরোনো যায়, হল দিয়ে বেরোনো যায়, চাকরদের ঢোকা—বেরোনো রান্নাঘর থেকে।

খাটে একটু বসেন। মালিনী ঢোকে।

—বাবা, এত দেরি?

—বড় ভুল করেছি মা।

—কি করলেন?

—উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে...

—ঢুকে পড়েছিলেন?

—না, ঢুকিনি। এক মহিলা...মহিলা তো? মানে গেঞ্জি হাফপ্যান্ট পরা...

মালিনী বলেন হ্যাঁ হ্যাঁ, মিসেস দারুওয়ালা।

—খুব লজ্জা পেলাম।

—তাতে কি হয়েছে? নতুন নতুন, ভুল তো হতেই পারে। আমারও হ'ত।

—তোমাদের সে বাড়ি তো ভালই ছিল।

—বালিগঞ্জ গার্ডেনসের বাড়ি?

—হ্যাঁ হ্যাঁ। বেশ গেরস্ত পাড়া।

—ওর এ বাড়িটাই...মানে ব্যবসা করে তো...

—মেজ খোকার অনেক আয়, তাই না?

—জানি না বাবা। বিশ্বাস করুন।

—সেটা বেশ পাড়ামতো ছিল।

—আমার তো ভালই লাগত।

—এখানে পার্কে একজনের সঙ্গে আলাপ হল সুপ্রভাত দত্ত। বেশ লোক।

—কোথায় থাকেন?

—এ বাড়িতেই। ছয়তলায়।

—বুঝেঝি। ওই যে, যার স্ত্রী...

—হ্যাঁ। খুব দুঃখ হ'ল শুনে।

—গুরুর আশ্রমে গেছেন।

—তুমিও গুরুটুরু করেছ না কি?

—ও...আমিও...এ ফ্ল্যাটে অনেকেই...স্বামী বরদানন্দের ভক্ত।

—তিনি কোথাকার?

—আমেরিকায় থাকেন।

—ভক্তরা দর্শন পায় না?

মালিনী গভীর বিশ্বাসে বলে, ওঁর জীবন নিয়ে ভিডিও ফিল্ম তোলা আছে! গুরুদর্শন ও গুরুবাণী। প্রতি বছর তোলা হয়—আমরা কিনি।

—তারপর?

—ওঁর জন্মদিনে...মানে সন্ন্যাস নেবার দিনে...এ বাড়ির সবচেয়ে বড় ফ্ল্যাটটা তো ওঁর। সেখানে সবাই যাই। দেখি।

—ঘরে বসেই তো দেখতে পারো।

—না বাবা।

মালিনী ছোটছেলেকে বোঝাবার মতো সযত্নে বুঝিয়ে বলে।

—প্রতি বছর যে নতুন ছবি তোলা হ'ল, সেটা আমরা পয়লা মার্চ ওপরে প্রথম দেখব তার আগে পুজো হবে, প্রার্থনা হবে।

—মূর্তি পুজো?

—না, না। যত বড় মানুষ তত বড় ছবিকেই পুজো করব। একই সঙ্গে ভারতে কত জায়গায়, আমেরিকার কত শহরে, ইউরোপে, স—ব জায়গায় পুজো হবে। আর কি জানেন? প্রত্যেক জায়গায় ভক্তরা ওঁর উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করবে।

—কেমন করে?

—সে বোঝানো যাবে না।

—তারপর?

—তারপর ভক্তেরা ক্যাসেট কিনবে। হ্যাঁ, যে ছবি আছে তা ঘরে বসে প্রতি মাসে দেখার কথা। না দেখলে প্রায়শ্চিত্ত, পূজা করুন।

—তিনি আমেরিকায়, তোমরা এখানে...

—ওপরে হলটা বাদে বাকি সবটাতে তো আপিস চলে। গুরুবাণী বই বিক্রি হয়, ওঁর ছবি, প্রসাদী ফুল।

—আপিস চালায় কারা?

—লোক আছে। তবে আমাদের সকলকেই কিছু না কিছু কাজ করতে হয়।

—ফ্ল্যাটের সবাই যায়?

—সবাই আর যায় কোথায়? তবে মিসেস দারুওয়ালা ওঁর খুব ভক্ত।

—ওই মহিলা?

—হ্যাঁ, ভীষণ ভক্ত। আপিসের কত কাজ করেন। আমাদের সকলের চেয়ে বেশি।

—মেজ খোকা তো খুব র‍্যাডিক্যাল ছিল।

—তা এখনও আছে।

—আমি জামাকাপড় ছাড়ি...

—হ্যাঁ আমি আপনার খাবার আনি।

খেতে খেতে বিশ্বনাথ বলেন, ভালো কথা! সুপ্রভাতবাবু যা বললেন, ওই পার্কটাতে সন্ধ্যার পর নাকি... তোমার ছেলে কোথায় যায়?

মালিনীর চোখের ওপর কোনো পর্দা নেমে আসে, গোটা মানুষটার ওপরেই।

—ও বন্ধুদের কাছে যায়। পার্কে যায় না।

—খেলাধুলা করে না?

—স্কুলে করত!

—এখন করে না?

—না।

—ফুটবল নিয়ে কলকাতায় যে এত...

—ওর কোন ঝোঁক নেই।

—আমি তো ওকে দেখতেই পাই না।

—আসলে ...পরীক্ষার পরে ওদের স্কুলের কয়েকটি ছেলেই ইউরোপ বেড়াতে গেল।

—ইউরোপ!

—ট্রাভেল কোম্পানির ব্যবস্থা অবশ্য। ওর বাবা যেতে টাকা দেয়নি, তাতেই খুব মনমরা হয়ে আছে।

বিশ্বনাথের বিশ্বদর্শন হচ্ছে! মানুষ খেতে পায় না। আর স্কুলের ছেলে...ইউরোপ যেতে পায়নি বলে...

মালিনী বলতে চায় না, তবু বলে ফেলে, আমিই যেতে দিইনি। সেইজন্যেই তো ছেলেরও রাগ, বাবাও বলে...

—কত টাকা?

—জানি না। পঁচিশ হাজার...পঞ্চাশ হাজার...জানি না। ওর বাপ ওকে, অবশ্য ভালোভাবে গ্র্যাজুয়েট হলে, বিদেশ তো পাঠাবেই!

—তোমরা একবার গেলে না?

—না বাবা, আমি নয়। ও তো কতবারই গেছে। বাবি যদি ব্যবসা করে, সেও যাবে।

—বিদেশই স্বদেশ!

—কিছু বললেন বাবা?

—না। কি বলব?

—আমি যাই বাবা! ও কয়েকজনকে খেতে বলেছে, সব আসবে।

—ওর ব্যবসার লোক?

—হ্যাঁ বাবা।

—এসো মা!

''মা'' শুনে মালিনীর মুখ কেমন যেন হয়ে যায়। ও আস্তে বলে, ওদের রাত হবে। হৈ হল্লা হবে। আপনি যেন বেরিয়ে আসবেন না।

—না মা, আসব না।

এঁটো বাসন নিতে আসে গোপাল। গোপালই ওঁকে পার্কে পৌঁছত, আনত।

—দাদুর আর কিছু লাগবে?

—না, কি লাগবে আর।

—লাগলে বেল বাজাবেন।

—হ্যাঁ। তবে লাগবে না।

—শুয়ে পড়ুন। আজ তো আমার রাত তিনটে।

—কেন?

—এখন ডিনার হবে, কত খাওয়া, জল খাবে সবাই...

—জল?

—রঙিন জল।

—বাবু খায়?

—হ্যাঁ দাদু!

—গোপাল! বাবি কোথায় থাকে রে?

—ছ' তলায় দাদু! মেমসাহেবকে বলবেন না কিন্তু, এই যে আমি বলে ফেলেছি... সায়েব একটা চাকরি করে দেবে এই জন্যে পড়ে আছি।

—না...বলব না...একটু গরম জল?

—ফ্ল্যাস্কে রেখেছি তো।

গোপাল চলে যায়। বিশ্বনাথ ভাবেন আর ভাবেন এবং মনে হয়, হয়তো এসে খুব ভালো করেননি।

হলঘরে অনেক আলো। টেবিলে যদিও ব্যুফে ডিনার সজ্জিত আমন্ত্রিতরা ও গৃহকর্তা কারোই খাবার অবস্থা তেমন নেই। রাত একটা।

মালিনী অসম্ভব দামী শাড়ি (সমুদ্র নীল রঙের), ম্যাচ করা গয়না, মেকাপ সহ অনেকক্ষণ এক গেলাস কাম্পাকোলা নিয়ে বসে আছে।

মেজ খোকা বলে, তুমি না হস্টেস?

—কি করতে হবে?

—অন্তত...কথা বলো।

—কেউ শোনার জন্যে বসে নেই।

—আজ যে দেখছি...

—তোমায় বারবার বলেছিলাম, বাবা থাকার সময়টা এসব তুমি বাইরে কোর।

—কেন? ওঁকে বেরোতে বারণ করনি?

—করেছি।

—তবে আর কি! ওঁর জন্যে তো আমি কাজকর্ম বন্ধ রেখে বসে থাকতে পারি না।

—আমি একটা ফোন করব।

—কোথায়?

—ছ' তলায়।

—কেন?

—বাবি এখনো আসেনি।

—বা! চমৎকার মা।

—না, আমি চমৎকার মা নই, চমৎকার স্ত্রী নই, আমি কিছু হতে পারিনি।

—কোথায় যাচ্ছি?

—ছ' তলায়।

—হয়তো মিসেস কেডিয়া ওকে থেকে যেতে বলেছেন। আর...আর...কি যেন? মুন তো ওর বন্ধু...বান্ধবী।

—সে জন্যেই যাব। কেডিয়ারা স্বামী—স্ত্রী ব্যাঙ্গালোরে। মুন আর জিন এখানে। রাত একটা...

মালিনী বেরিয়ে আসে। লিফটে ছ' তলা। ও তো মদ খায় না, ও কেন, ভেতর থেকে টলে যাচ্ছে? ও বেল টেপে। রাত ন'টায় ''ক্যাসেট বদলে আনছি'' বলে নাকি বাবি চলে এসেছে, গোপাল বলল।

দরজা খুলে যায়।

ঘর কটুগন্ধী ধোঁয়ায় অন্ধকার। লালচে আলো জ্বলছে। দরজা খুলতেই কোন বাজনা কানে আসে।

মুন। চোখ অদ্ভুত। অল্প টলছে। এখন সব কথাবার্তা ইংরিজিতে।

—বাবি কোথায়?

বাবির গলা, কে?

—তোমার মা।

বাবির জড়ানো গলা, চলে যেতে বলো।

—বাবি। চলে এসো।

বাবি টলতে টলতে এসে দাঁড়ায়। ওর মুখে খুব ধূর্ত হাসি।

মা'র দিকে তাকায়।

—তোমরা...

—নিশ্চয়।

কি খাচ্ছ?

—মারিহুয়ানা। খাবে?

মালিনী ওর হাত ধরে। বাবি হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে নেয়।

—ছোঁবে না, ছোঁবে না। ছুঁলেই আমরা রেমবো। 'ফার্স্ট ব্লাড,'' পড়েছ? দেখেছ?

বাবি দরজা বন্ধ করতে যায়। মালিনী ওর হাতের কবজি ধরে টানে।

বাবির পিছনে অনেকগুলি মুখ। একটি ছেলে এগোয়। মুন ওকে পিছনে ঠেলে দেয়।

—জিন ভায়োলেন্ট হোয়ো না। আপনি চলে যান।

—বাবি!

—মা'দের দিন আর নেই। আমি পরে যাব।

দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

মালিনী দরজায় মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। উল্টো দিকের দরজা খুলে যায়।

—মিসেস চৌধুরী।

—আপনি।

সুপ্রভাত দত্ত আস্তে বলেন, আপনি আমার মেয়ের মতো। শুনুন, চলে যান।

—চলে যাব? আমার ছেলে...

—ওদের ড্রাগ সেসান চলছে। ওরা কেউ প্রকৃতিস্থ নেই। আপনি ডাকলে ওরা যাচ্ছেতাই করতে পারে! কাল ছেলেকে শাসন করবেন।

—আমার...ছেলে...

—আপনার বাড়িতেও তো পার্টি আছে, তাই না?

—হ্যাঁ। আছে।

—চলে যান। রাত দেড়টা বাজে।

—যাচ্ছি... যাব...

মালিনী পুতুলের মতো হাঁটে। বাবি এখানে আসে, রাত এগারোটায় ফেরে। কিন্তু আজ?

আবার লিফট আবার চোদ্দতলা। রান্নাঘর দিয়ে ঢোকে মালিনী। গোপালকে বলে, বাবি তোকে বলে বেরিয়ে গেল, তুই আমায় বললি না?

জবাবের জন্যে দাঁড়ায় না ও। আবার হলঘর। মেজ খোকা সকলকে খেয়ে নিতে চেষ্টা করছে।

—সরো, আমি দিচ্ছি।

—কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

—সরো, সরে যাও।

মালিনী স্বামীর হাত ধরে সরিয়ে দেয়, বসায় ডিভানে।

তারপর প্লেটে তুলতে থাকে খাবার। কাপুর সেন, কুট্টি, বসুরায়, দেশাই, আসলাম,...না, খাবার আবার গরম করা হয়েছে। ওরাও শিখেছে। মাথা নাড়ে মালিনী। মালিনী স্বামীর প্রয়োজনে লোক রেখে ইংরিজি বলতে শিখেছে, বাবির কাছে শিখেছে কায়দাকানুন, চুল ছেঁটেছে, সাজতে শিখেছে। কিন্তু মেজ খোকার প্রয়োজন যে অনেক। তাই তো বড় পার্টিতে বাইরে থেকে হস্টেস আনতে হয়। সব যে পারে না মালিনী।

স্বামীর বিয়াল্লিশ, ওর সাঁইত্রিশ, ছেলের ষোল।

বাবি!

—সর্বনাশ! কাপুর গেস্টরুমে যাচ্ছে।

প্রায় ছুটে যায় মালিনী। ওদিকে নয়, এদিকে, এই বাথরুমে, ওদিকে নয়।

—কেন?

মেজ খোকা বলে, (এখানেও সব কথাবার্তা ইংরিজিতে) আমার বুড়ো বাবা ও ঘরে আছেন।

—তোমার বাবা।

—হ্যাঁ কাপুর। মা মারা গেলেন। আমি...আমি ওঁকে নিয়ে এসেছি।

—ভালো, খুব ভালো। কর্তব্যপরায়ণ পুত্র। আমি...আমি কি করব মিসেস চৌধুরী।

—কেন, কি হলো?

—আমার বাবা যে নেই!

—কাঁদবেন না। গোপাল, কাপুর—সাহেবকে বাথরুমে নিয়ে যা তো!

মেজ খোকা বুকে হাত রেখে বলে, আমি বাবাকে এনেছি।

—আমি।

বাথরুম থেকে এসে কাপুর বলে, যথেষ্ট হয়েছে। এখন যাওয়া যাক।

যেতে যেতে তিনটেই বাজে।

মালিনী বাবির ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে মোড়ায় বসে।

বিশ্বনাথ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শোনেন, ওঁর ছেলে অতিথিদের এগিয়ে দিচ্ছে।

বাথরুমে যাবার জন্যে না উঠলে ব্যালকনিতে দাঁড়াতেন না। ব্যালকনিতে না দাঁড়ালে শুনতে পেতেন না মেজ খোকা এককথাই বলে যাচ্ছে ইংরিজিতে।

—আমি কর্তব্যপরায়ণ ছেলে। আমি বাবাকে এনেছি। বেজন্মা দীপকটা আমার কর্তব্য শেখায়।

দরজা বন্ধ করেন বিশ্বনাথ। শুয়ে পড়েন। অন্ধকারে সনকার ছবির দিকে তাকান। তারপর মনে মনে কথা বলেন সনকার সঙ্গে।

—তুমি জানতে না সনকা, আমিও জানতাম না। আমাদের কাছে ওরা অন্যরকম মুখ দেখাত। বছরে কয়েকবারই তো! অন্যরকম মুখ দেখাত। আমাদের যখন নন্দীবাবু বলত, ব্যবসা করতে গেলে আজকাল এসব করতে হয় আমি শুনতাম, বুঝতাম না। এসব না করলে আজকাল সাফল্য আসে না সনকা। তুমি জানতে না। আমিও জানতাম না।

বাইরে সব নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। আস্তে আলো জ্বালেন বিশ্বনাথ। পড়ার আলো। টেপরেকর্ডটি বালিশের পাশে রাখেন। যে কোনো ক্যাসেট। আজকে বিশ্বনাথ হারিয়ে যাচ্ছেন, ভেসে যাচ্ছেন, ঘুমোতে পারছেন না, সনকার গলা খুব আস্তে শুনলে তবে উনি ঘুমোতে পারবেন।

—তোমার শুধু এক কথা। বলো, বলো আর বলো। কেবল শুনতে চাও, কেন আমি ভাবছি। আজ ষষ্ঠী। জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠীতে ছেলেদের কথা, মেয়েদের কথা মনে করে মনটা খারাপ হচ্ছে না?

—দূর থেকে আশীর্বাদ করো।

—তা তো সর্বদা করছি। আসলে ওদের ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ে। সেই যে ওরা পাঁচজনে আসনে বসত আমি নতুন পাখার ওপর পাকা আম, দুর্বো সব রেখে ওদের মাথায় ঠেকাতাম, তারপর নতুন পাখায় জল দিয়ে বাতাস দিতাম...সেবারে তুমি দূরে বেগুসরাই গেছ। ফেরার কথাই নয়, পাশে গোবিন্দও আছে, বেশ মনে পড়ছে, তুমি হঠাৎ এলে জোড়া ইলিশ নিয়ে। কি আনন্দ! জোড়া ইলিশ! আজ সে কথা ভাবা যায়?

—গঙ্গার ইলিশ! দুটো বুঝি দু'টাকা।

—তাই তো ছিল...মেজ খোকা বলছে আমি একটা পুরো খেয়ে নেব। কি ভালবাসত ইলিশ। ষষ্ঠীর দিনটা। তাই ওদেরকে মনে মনে আশীর্বাদ করলাম। মীরাদের আম—কাঁঠাল—মিষ্টি দিলাম। আর তোমাকে একটা প্রণাম করলাম। আবার হাসছ, থামতে বলছ কেন? ও...টেপ শেষ হয়ে গেছে বুঝি?

রেকর্ডার বন্ধ করেন বিশ্বনাথ। রেকর্ডারে হাত রেখে ঘুমোন।

ছোট খোকা, শিপ্রা, ওদের ছেলে বুবাই। বেবি, ওর ছেলে ও মেয়ে সোনা আর রূপা।

মেজ খোকা নেই। দিল্লীতে। মালিনীকে যথেষ্ট হালকা মনে হচ্ছে আজ।

—বাবা! ওদের সকলকে আসতে বললাম। আজ রবিবার। এখানে খাবে। বিকেলে যাবে। বিকেলে আমি আর আপনি কোথায় যাব বলুন তো?

—কোথায় মা?

—মাসিমার বাড়ি।

—মাসিমা?

—আপনার বড় শালী। অসুস্থ হয়ে কতদিন পড়ে আছেন। আপনি তো এসেই যেতে চেয়েছিলেন।

—বাড়ি চিনতে পারব?

—আমি পারব। আগে আগে তো গেছি। আর কোথায় কোথায় যেতে ইচ্ছে হয় বলবেন। ও যখন থাকবে না, আমি আপনাকে নিয়ে যাব।

সেই ডিনারের দিন থেকে কি হয়েছে বাড়িতে বিশ্বনাথ জানেন না। কিন্তু বাবি রাত ন'টার সময়ে ওঁকে ''হাই''! বলে যাচ্ছে। গোপাল বলছে ও বাড়ি ফিরছে ন'টার মধ্যে, তাই হবে। কেন না ওর ঘর থেকে বাজনা, গান, এ সবের সুর বিশ্বনাথ শুনতে পান!

মালিনীই ওঁর সঙ্গে কথাটথা বলে। পরদিন সন্ধ্যেয় মেজ খোকাও ঘরে এল। একটু বসল, কথা বলল।

বিশ্বনাথ আঁচ করতে পারছেন, কিছু হয়েছে একটা। কি, তা উনি জানেন না।

বেবির ছেলে মেয়ে ওঁকে ''হাই দাদু!'' বলে বাবির ঘরে ঢুকে যায়। বেবি বলে, আর যা করো, তোমাদের গানবাজনাগুলো আস্তে বাজিও। মাথা ধরে যায় একেবারে গোলমালে।

ছোট খোকা বলে, হঠাৎ তলব কেন?

মালিনী বলে, বাবা আছেন, সবাই এলে বেশ ভাল লাগে না?

—মেজদা নেই, তাই বলো।

—সে যাই বলো।

বেবি বলে, কেন, মেজদা থাকলে কি অসুবিধে?

মালিনী আস্তে বলে, ও থাকলেই বিয়ার—টিয়ার আনত, কোনো কথা শুনত না। বাবা আছেন না?

বেবি বলে, সে তো বাপু আমিও খাই, শিপ্রাও খায় কখনো—সখনো। তোমার কথা অবশ্য আলাদা।

ছোট খোকা বলে, না না, থাক।

শিপ্রা বলে, বাবা যখন এখানেই থাকবেন, উনি তো বুঝেই যাবেন সব...

মালিনী বলে, তোমরা তো কেউ এমন নও যে, চাই—ই চাই। সে জন্যেই...

শিপ্রা বলে, বাবা থাকলে তোমাকেও...

মালিনী বলে, ওসব কথা থাক এখন। চলো না, বাবার ঘরে চলো।

সবাই এসে বসে বিশ্বনাথের ঘরে।

—কেমন আছ বাবা?

—ভালো, খুব ভালো। বউমা খুব যত্ন করে।

—আমি আর কি করি!

—গোপাল বলেছে, আমার রান্নাবান্না করেও দাও, দেখিয়েও দাও।

মালিনী অপ্রতিভ হয়ে বলে, করতে কি আর পারি? সব সময়ে করি না, ভুলেও গেছি।

—আমি তোমার জন্যে মাছ রেঁধে আনব।

—আমি তোমার জন্যে মাছ রেঁধে আনব বাবা একদিন। মা'র মতো হবে না...

শিপ্রা সহাস্যে বলে, আমার দৌড় চা—কফি—ভাত—ডাল—ডিম সেদ্ধ—আলু সেদ্ধ, ব্যাস। ওর ছেলে বুবাই বলে, তোমার চেয়ে ননী অনেক ভালো রাঁধে।

—তোর ভালো লাগলেই ভালো।

বেবি বলে, তোমার রান্না করার দরকার কি শিপ্রা? তোমার ননী যা ভালো রাঁধে।

ছোট খোকা বলে, বাবা যেন কি বলবে বলবে মনে হচ্ছে?

—হ্যাঁ...কথাটা...দরকারী।

—কী বলো? মেজবৌদি চলে যাচ্ছ?

—একটু শরবত দিতে বলি। আর, বাবার কথা আমি শুনেছি। তোমরা শোনো, আমি আসছি।

—বলো বাবা।

—ছোট খোকাকে বলছিলাম...তুমি মায়ের মুখাগ্নি করলে...শ্রাদ্ধও করলে...এক বছরের কাজটা তো করতে হবে। তার আগে, প্রতি মাসে একটা করে কাজ থাকে। সে কথাই বলছিলাম।

সবাই চুপ। মালিনী শরবৎ নিয়ে ঢোকে।

ছোট খোকা একটু ভাবে, তারপর বলে, বাবা! এসব যা বলছ, তাকি করতেই হয়?

বিশ্বনাথ ঈষৎ হাসেন।

—তাই তো নিয়ম।

—আমার পক্ষে...মাসে মাসে...

বেবি বলে, ও যদি করতে পারে, তুমি পারবে না কেন? শিপ্রার কি আপত্তি আছে?

শিপ্রা যথেষ্ট আত্মস্থ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে। তাকে মালিনীর মতো বা বেবির মতো চেষ্টা করে সামাজিক রীতিনীতি শিখতে হয় নি। মালিনীর মতো ও বিশ্বসংসারকে ভয়ও পায় না।

ও ঈষৎ হেসে বলে, আমার আপত্তি থাকবে কেন? তখন কি আপত্তি করেছিলাম? আমার মা—বাবা মারা গেলে আমি যদি কোনো রাইটস করি, ও আপত্তি করবেও না, করলেও আমি মানব না।

ছোটখোকা বলে, মাসে মাসে...

বিশ্বনাথ বলেন, কৃত্য তো অনেক থাকে বাবা। মাসেরটা মাসে না করলে বাৎসরিকের সময়ে বড় কষ্ট পেতে হয়।

ছোট খোকা বলে, বাবা! আমার পক্ষে মাসে মাসে...বা এক বছর হলে...ও সবে আমার তেমন বিশ্বাস নেই। তাই...

—তখন করেছিলে কেন?

—সবাই বলল বলে।

—ছোট খোকা! অন্তর থেকে বলছি, নেভার ডু দিস। যে জিনিসে বিশ্বাস নেই, তা কোর না।

—বাঃ, তোমার একটা সেন্টিমেন্ট নেই।

বেবি বলে, ছোড়দা! মায়ের শেষ কাজ করেছিলে শুধু বাবার সেন্টিমেন্টের জন্যে?

—বেবি! তুমি কথা বোল না। তুমি বড্ড খোঁচা মেরে বলো, আমার সব গুলিয়ে যায়।

—ও, আমার কথায় খোঁচা থাকে?

বিশ্বনাথ বলেন, এসব কথা থাক এখন। তবে আমার কি মনে হয় জানো? তোমরাও সব বিশ্বাস সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে পার নি। সেদিন ওসব কাজ করার সময়ে একবারও মনে হয়নি, কোনো ঘোর নাস্তিক এ কাজ করছে।

শিপ্রা বলে, বাবা ঠিক বলেছেন, যুক্তি আছে কেমন, জবাব দাও? আমাকে তো খুব তর্কে হারাও।

—তোমরা খুব তর্ক করো বুঝি?

—হ্যাঁ বাবা। রাজনীতি থেকে মাছের ঝোল, সব বিষয়ে আমাদের দারুণ মতের অমিল।

ছোট খোকা বলে, বাবা ঠিকই বলেছ।...আমার কি মনে হয় জানো? মাসে মাসে ওসব করা—টরা হবে না। বরঞ্চ সেই এক বছর হলে...

বেবি বলে, তখন বারোটা না তেরোটা...শ্রাদ্ধের ম্যারাথন ছোড়দা...

—কিন্তু আমাদের বাড়ি, এ বাড়ি, কোথায় মাসে মাসে এসব করার মতো পরিবেশ বলো?

শিপ্রা বলে, এর মানে কি? করতে চাও, করতেই পারো। বাড়িতে না করো, হিন্দু মিশনের...বাড়িতেও করতে পারো...

—তুমি জানো না, সে কি ঝুটঝামেলা...

—কিসের ঝামেলা? আমাদের বিল্ডিং—এই হালদার করছেন তো! পুরুত আসে, ফর্দ করে জিনিস আসে, উনি করেন দেখলাম তো।

—তুমি আবার কখন গেলে?

—যখনই হোক গেছি।

মালিনী শরবৎ নিয়ে ঢোকে, প্রত্যেককে দেয়। বেবি তির্যক হাসে।

—এ বাড়িতে সকালে শরবত!

মালিনী সমিনতি চোখে তাকায়। ছোট খোকা বলে, দাও তো মেজ বউদি।

—বাবা আপনি?

—না মা, নিয়মের বাইরে কিছু খেলে—

—শিপ্রা! বেবি! বাবার চেহারাটা বেশ ভালো হয়েছে, তাই তা? বেশ ভালো।

—ভালোই তো!

—একটু রান্নাঘরটা দেখে আসি।

—কি খাওয়াবে, মালিনী?

—শিপ্রা! খুব সাধারণ রান্না। বাবা যেমন খান।

বেবি বলে, আমাকে তা'হলে একমুঠো কাঁচালঙ্কা দিও। সত্যি ভাবি খাব না, আলসার হবেই হবে, তবু...

বিশ্বনাথ বলেন, আগে তো খেতে না?

—বাবা! মানুষ বদলায় না?

—নিশ্চয়। পরিবর্তন তো স্বাভাবিক।

ছোট খোকা বলে, পরিবর্তন মানে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে চলা। তাই বাবা! ওসব মাসে মাসে কাজটাজ...

শিপ্রা নিচু গলায় বলে, আমি কিন্তু কোনো আপত্তি করছি না। এটা তোমার যা মনে হয় তাই বলছ...

—তোমার এসব হিঁদুয়ানি তো দেখি নি?

—হিঁদুয়ানি আমার থাকতে পারে না, কেন না আমি সেভাবে বড় হই নি। কিন্তু আমি এও মনে করি যে, যদি কেউ করে তাহলে সেটাকে অশ্রদ্ধা করার অধিকারও আমার নেই। সে সময়ে তুমি যদি বাবার কথা ভেবেই সব করে থাকো, এখনো তাই করা উচিত।

—তোমার শুধু উচিত, উচিত আর উচিত।

বেবি বলে, বেশ! এখানে না করো সোদপুরে গিয়ে করো। সেটাই ভালো।

—দীপক যা করে, আমাকেও তাই করতে হবে?

—কেন নয়? ও কর্তব্যগুলোও করে, আবার নিজের যা কিছু নিজেই করেছে। তোমার মতো শ্বশুরের দেয়া বাড়ি গাড়ি তো ওর ছিল না!

শিপ্রা বলে, এ কিরকম কথা বেবি?

ছোট খোকা বলে, দীপকের ব্যবসার কথা আমাকে বোল না। কিভাবে যে টেন্ডার ধরায়...

বিশ্বনাথ অবাক হয়ে ছেলে—মেয়েকে দেখেন, দেখতে থাকেন।

শিপ্রা দুবার ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলায়। তারপর বলে, দোহাই তোমাদের! তোমরা একসঙ্গে হলেই এমন করো যে, আমার...বাবা আছেন সে কথাটাও ভাবো।

ছোট খোকা ও বেবি চুপ করে যায়। বেবি উঠে যায় ঘর থেকে। ছোট খোকা বলে সরি!

শিপ্রার চোখ থেকে হঠাৎ একটু জল গড়ায়। মুছে নিয়ে ও বলে, একসঙ্গে হলেই বেবি...

বিশ্বনাথ মনে মনে দুটি ছবি মেলাতে চেষ্টা করেন। তাঁর মেয়ে বেবি যাকে আঠারো বছর আগে বিয়ে দিয়েছিলেন, যার স্বভাব ছিল নরম, যে কীর্তন শিখেছিল, ছোটবোনের চেয়ে একটু বোকাই ছিল, লম্বা চুলে যে বেণী বাঁধত, রোজ সোৎসাহে মাকে পুজোর ফুল তুলে দিত, সে বেবি একটা চেনা ছবি।

এখন উগ্র মেকাপ, চুল ছাঁটা সদাই অসুখী, বিশ্বসংসারের ওপর কোনো আক্রোশে তিক্ত, ঝাঁঝালো এই বেবির সঙ্গে সে বেবির কোনো মিল নেই।

হঠাৎ ওঁর মনে হয়, হয়তো বেবির ভেতরে আত্মবিশ্বাস নেই, নিরাপত্তাবোধ নেই। হয়তো ও অসুখী। সে জন্যেই এত ছোবল মেরে কথা বলে।

আর ছোট খোকা? এই ছেলেকেই কি তিনি চেনেন?

প্রিয়ার সঙ্গে বিয়ে, সে বিয়ে ভাঙল। তারপর শিপ্রাকে বিয়ে...কোনো বিয়েটাই তিনি দেননি। প্রিয়া ছিল অন্য রকম। শিপ্রা অন্যরকম।

ছোট খোকাও কি সুখী নয়?

বিশ্বনাথ আস্তে বলেন, ছোট খোকা। শ্রাদ্ধটা তো কিছুই নয়। পরলোকে যে গেছে, তাকে শ্রদ্ধা জানানো। আমার যা মনে হয়েছে আমি বলেছি। তোমাদের যা মনে হয় তোমরা কোর।

—পরেও তো ভাবা যাবে বাবা।

শিপ্রা হঠাৎ বলে, বাবা, মা'র নামে কোথাও কোনো ভালো ভালো কাজে দান করলেও তো হয়।

—বেশ তো! সেরকম আগেও করত মানুষ...তবে শ্রাদ্ধশান্তি বাদ দিত না।

ছোট খোকা বলে ওঃ আগে!

বিশ্বনাথ ঈষৎ হেসে বলেন, হ্যাঁ ছোট খোকা। আগেকার লোকদের বুদ্ধি কম হ'ত। খোকা। আগেকার লোকদের বুদ্ধি কম হ'ত।

ছোট খোকা বলে, তা বলছি না। কিন্তু এটা ঠিক যে, দিনে দিনে মানুষের আয় কিন্তু বাড়ছে।

—অর্থাৎ আমার চেয়ে তুমি বুদ্ধিমান, তোমার চেয়ে তোমার ছেলে বুদ্ধিমান, তাই তো? জানি, তুহিন আর বিদিশা দুই ডাক্তার তো! ওরা আমাকে কতরকম লেখা পড়ে শোনাত, কত কথা বলত...

শিপ্রা বলে, সোদপুরের কথা খুব মনে হয়, তাই না বাবা? ওদের কথা?

—তা তো হবেই।

মালিনী এ সময়ে ঢুকে পড়ে। বলে, ছেলে—মেয়েদের খেতে দিয়ে দিচ্ছি শিপ্রা।

—আমার পুত্র?

—বুবাই তো আজ আমার হাতেই খাবে।

—আহ্লাদ দিও না তো। নিজে দিব্যি খায়।

—তাহলেও আজ আমি খাইয়ে দেব।

—তুমি পারও, মালিনী।

মালিনী আজ খুব খুশি, খুব স্বাভাবিক। ও বলে, খুব পারি ভাই। এসব আমার ভালও লাগে। আমার বাপের বাড়ি তো দেখনি। রবিবারে ছুটির দিনে, যত আত্মীয়—স্বজন সবাই আসবেন, সব একসঙ্গে খাওয়া—দাওয়া হয়...

—সত্যি!

—তোমাকে ত কত বলেছি চলো একবার!

—যাব, ঠিক যাব!

—আর গিয়েছ!

—মাংস মাংস গন্ধ পাচ্ছি?

—হ্যাঁ ছোট খোকা। ছেলেমেয়েদের জন্যে মাংস তো করতেই হবে। জানেন বাবা, ছেলেমেয়েরা কেউ মাছ খেতে চায় না।

—বুবাই খায় কিন্তু। আমার অবাক লাগে। ওর বাবা, আমি, কেউ অত তৃপ্তি করে মাছ খাই না।

বিশ্বনাথ হেসে বলেন, ঠাকুমার মতো হয়েছে।

—মা খুব মাছ ভালবাসতেন?

—মাছ তার চাই রোজ। তবে খেত বড়জোর দু'খানা। তবু রোজ চাই।

ছোট খোকা বলে, তুমি আমাদের রোজ ছোট মাছ খেতে বলতে। তাতে নাকি বুদ্ধি বাড়ে।

—যা শুনতাম তাই বলতাম। তবে নুটু যখন বিধবা হল, তোমার মা কতদিন মাছ খায় নি।

শিপ্রা ছোটদের খাওয়া দেখতে উঠে যায়। ছোট খোকা বলে, কাগজটা দেখি বাবা।

—এ ঘরে তো বাংলা কাগজ।

—তুমি ইংরিজি কাগজ পড়ো না?

—তোমার মায়ের জন্য...আর বাংলা কাগজই বা কি পড়ব? শুধু বধূহত্যা...দাঙ্গা—হাঙ্গামা...

—দেখি, ও ঘরে কাগজ আছে বোধহয়...

—হ্যাঁ, পাবে।

পড়ুক না পড়ুক, মেজ খোকা দুটি ইংরিজী কাগজ, অনেক ইংরিজী সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, রীডার্স ডাইজেস্ট সবই রাখে। মাসে মাসে কাগজের বিল দেয় কয়েকশো টাকা।

সব কাগজের ভাঁজও খোলা হয় না। মাসে মাসে সেসব কাগজ বেচে দেয় মালিনী। বিশ্বনাথের জন্যে বাংলা কাগজের ব্যবস্থাও মালিনীর এবং সে খুব মন দিয়ে কাগজে খুন—জখম—ধর্ষণ—রাহাজানির খবর পড়ে।

অর্থাৎ মেজ খোকা যতই দাবড়াক, মালিনী এখনো মনে মনে বাঙালিনী রয়ে গেছে।

বিশ্বনাথ মনে মনে বলেন, সনকা এদের তুমি চেনো না। এক শহরেই থাকে, কিন্তু শিপ্রা কখনো মালিনীর বাপের বাড়ি যায় না। আমি যে দীর্ঘকাল বাংলা কাগজই পড়ি, তা ছোট খোকা জানে না। একসঙ্গে হলে তোমার ছেলে—মেয়ে এ—ওকে আক্রমণ করে। আর মালিনী! সে তার স্বামীর সামনে অন্যরকম, স্বামী না থাকলে খুব সহজে স্বাভাবিক।

ছোট খোকা তোমার বাৎসরিক কাজ করতে চায় না। মাসে মাসে কাজ করার কথা তুললে...

—চলুন বাবা।

শিপ্রা এসে দাঁড়ায়।

—চলো মা।

—বুবাই এখনি আপনার ঘরে আসছে। ওর খুব পছন্দ ঘরটা। ও ওখানেই ঘুমোবে।

—সে তো আমার সৌভাগ্য।

—মালিনী ওকে যা খাওয়া খাইয়েছে।

বুবাই ঢোকে, বলে, তুমি তো কখনো খাওয়াও না। জেজেম্মা খাইয়ে দিলে আমি এত এত খেতে পারি।

—খুব হয়েছে, শুয়ে পড়ো।

—তুমি আমার কাছেও শোও না। শুধু...বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলে...বলে দেব?

—বুবাই!

বিশ্বনাথ শুনেও শোনেন না। বলেন, চলো চলো। ছোট ছেলের কথা কি ধরতে আছে?

—বড্ড পাকা হয়ে যাচ্ছে। সে জন্যেই ওকে হস্টেলে পাঠাব ভাবছি।

—ওইটুকু ছেলেকে?

—দার্জিলিঙে বাবা! আসলে আমরা দুজন এত ব্যস্ত থাকি...

—যে ওকে সঙ্গ দিতে পারি না।

—তাই!

—হস্টেলে!

—আমি তো মুসৌরিতে হস্টেলেই মানুষ।

—তুমি কি কোন কাজটাজ করো?

শিপ্রা অপ্রতিভ হেসে বলে, ওর সেক্রেটারি।

—আপিসে যাও?

—হ্যাঁ বাবা।

বেবি এ ঘর থেকে উঠে গিয়ে দুটি নীল বড়ি খেয়ে নিজেকে বশে এনেছে। মিসেস ভরদ্বাজ না বললে ও জানতেই পারত না এমন কোনো বড়ি আছে।

চায় না, বেবি রাগতে চায় না। দীপকের অনুগত স্ত্রী হয়েই থাকতে চায়। কিন্তু দীপকের শাসন অত্যন্ত কড়া। দীপকের স্ত্রী হিসেবে বেবিকে সমাজে চলবার মতো সবই নিখুঁতভাবে জানতে হবে। নইলে আর ইউরোপে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া কেন, স্টেটাসের জন্যেই তো! স্টেটাস অনুযায়ী চলতে গেলে...

হ্যাঁ, দীপকের দরকারে তুমি কখনো স্কচ, কখনো বিয়ার খাবে, দীপক যখন বলবে।

একই সঙ্গে তুমি ছেলে—মেয়েকে এই সব পার্টি—হুল্লোড়—ব্যবসার জন্য মদের আসর, সব কিছু থেকে বাঁচিয়ে চলবে, চলতে বাধ্য।

শ্বশুরবাড়িতে মাসে একবার তাঁতের শাড়ি পরে মাথায় কাপড় দিয়ে যাবে, যেতে বাধ্য।

তুমি মনে রেখে চলবে যে, তোমার ভাইদের মতো দীপক টপকা বড়লোক নয়, সে বনেদী ঘরের ছেলে। ছোট খোকা এবং তার বউ, নো মাখামাখি। ডিভোর্স, আবার বিয়ে, এগুলো দীপকের পছন্দ নয়।

মেজ খোকা ও মালিনীর সঙ্গেও নো মাখামাখি। মালিনীর ছেলেটি বখাটে এবং মেজ খোকা ব্যবসার খাতিরে বাড়িকে বাজারে তুলে দিয়েছে।

এ সবই তুমি করবে এবং মিসেস দেশাই, মিসেস ভরদ্বাজ, মিসেস মুখার্জী, এঁদের সঙ্গে সমাজসেবা করবে। তাতে তোমার আরেক রকম আভিজাত্য বাড়ে।

হ্যাঁ, আমি অনিতাকে মধ্যমগ্রাম থেকে তুলে এনে পার্কস্ট্রীটে রাখব। নিজের দিকে চেয়ে দেখো আয়নায়। আমার সব দরকার তুমি মেটাতে পারবে না। আমি মেজ খোকা নই যে, পার্টি দেবার জন্যে হোটেল ভাড়া করব এবং কখনো হোটেল কখনো কলগার্লের সঙ্গে একই বাড়িতে স্বতন্ত্র ফ্ল্যাটে রাত কাটাব।

আমি যা করব, বুক বাজিয়ে। নৈতিকতা দেখিও না বেবি। আমার ঠাকুর্দা থিয়েটারের অ্যাকট্রেস রাখতেন। আমার জ্যাঠামশাই তাঁর সিন্ধুবালাকে বৌবাজারে বাড়ি কিনে দিয়েছিলেন।

তোমার জীবনটা আমি কয়েকটা কামরায় ভাগ করে দিয়েছি বেবি। এ ঘরে তার সোনা—রূপায় মনোযোগী মা, আবার তুমি বাড়িতে ব্যবসার লোকজন এলে কেতাদুরস্ত গৃহিণী, চোস্ত ইংরিজি বলো, একটু মদ খাও, মদ দাও। এ ঘরে তুমি বনেদী ঘরের বউ, মাথার কাপড় সরে না। ও ঘরে তুমি সমাজ সেবিকা, রবীন্দ্রসদন ও কলামন্দিরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করিয়ে মিসেস দেশাই—এর ''আশ্রয়'' হোমের জন্যে টাকা তোলো।

এভাবে নিজেকে ভাগ করতে করতে, বিভিন্ন ভূমিকায় ঠিক মতো অভিনয় করতে করতে বেবির স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায়, যেত। সর্বদা আক্রোশে চলে বেবি, সকলের ওপর ক্রোধে।

মিসেস ভরদ্বাজ একদিন বললেন, বেবি।

—বলুন!

—আমি তোমার বন্ধু?

—নিশ্চয়।

—তাহলে...

নীল বড়ির সঙ্গে পরিচয় উনিই করান। বেশি খেও না বেবি, অভ্যেস জন্মে যাবে। শুধু যখন দেখবে যে, আর পারছ না...আর পারছ না...

খাবার টেবিলে যে এসে বসে, সে বেবি খুব শান্ত, হাসিখুশি। একটু প্রগলভও।

—শিপ্রা তো ছোড়দার সেক্রেটারি ইচ্ছে করে হয়েছে। কর্তাকে আঁচলে বেঁধে রাখবে বলে।

—ভালো, খুব ভালো।

—সুকতনিটা খাও বাবা।

—চমৎকার হয়েছে।

মালিনী একটু হাসে। বলে রান্নাবান্না ভুলেই যাচ্ছিলাম বাবা। শেষে বেবি বুদ্ধি দিল, রান্নার বই কিনে নাও। দেখলেই মনে পড়বে।

বেবি বলে, ডলিও বই কিনে নিয়ে গেছে।

শিপ্রা বলে, বই তো আমারও আছে। বাংলা বই পড়তেও তেমন পারি না, বুঝতেও পারি না।

বেবি উদার হয়ে যায়। বলে, বেঁচে গেছ ভাই। বিয়ের পর শাশুড়ি আমাকে দিয়ে যে কি রান্নাই করাতেন! আর কি খুঁত খুঁতে।

—এখনো তো করো মাঝে মাঝে।

—না করে উপায় আছে? ওকে তো জানো না। রান্নাটি ঠিকমতো না হলে প্লেট ছুঁড়ে ফেলবে। ছেলে—মেয়েও তেমনি। এটা চাই, ওটা চাই।

ছোট খোকা বলে, সর্বদা বলি বটে, বাঙালীরা রান্না বিষয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করে...

শিপ্রা খেই ধরিয়ে দেয়, খাওয়ার জন্যে বাঁচে, বাঁচার জন্যে খায় না, এই বলবে তো?

—বলি, বলে যাব নিশ্চয়। কিন্তু মাঝে মাঝে সুকতো ঝাল, ঝোল, বেশ হয়েছে।

মালিনী বলে, দয়া করে এলেই তো পারো। আমিও ভালবাসি...আসলে এখন সবাই এত ব্যস্ত থাকো না। আগে তবু আমাদের ঘনঘন দেখা হ'ত।

শিপ্রা বলে, আমি যখন থেকে দেখছি...

—মালিনী বলে, ততদিনে সবাই ভীষণ ব্যস্ত মানুষ হয়ে গেছি।

বেবি হঠাৎ বলে, মা থাকলে সোদপুরে...মাঝে মাঝে...তবু তো!

বিশ্বনাথ বলেন, ডলি চিঠি লিখেছে?

—হ্যাঁ বাবা। তখনি তো...

—তারপর আর লেখে নি।

ছোট খোকা বলে, ডলিও কাজ করে, নীলাভও কাজ করে, ওখানে সত্যিই ব্যস্ত থাকে ওরা। ঘরের কাজকর্ম সবই তো নিজেদের করতে হয়।

—হ্যাঁ, তা তো বটেই।

—তোমাকে একবার ঘুরিয়ে আনব বাবা।

—এই বয়সে?

শিপ্রা বলে, বয়সটা আবার কি! মনটাই সব। ওদেশে বুড়োরাও বুড়ো হয় না।

বেবি বলে, তা বোল না। বুড়ো হলে সাধারণত একাই থাকে, নয়তো কোনো হোমে।

মালিনী বলে, আমারই যাওয়া হয় নি।

—মেজদা কতবার যায়, গেলেই পারো।

—বাবাকে রেখে...খুব ইচ্ছে ছিল একবার দক্ষিণ ভারতটা ঘুরি। কত মন্দির, কত দেখার জায়গা...

—গেলেই তো হয়।

মালিনী বলে, একবার যাব। আমি, বাবা আর বাবি। বাবিকে একবার তিরুপতি মন্দিরে নিয়ে যাব...

ছোট খোকা বলে, কেন?

মালিনী চোখ নামায়। বলে, এমনি।

বিশ্বনাথ খেয়েদেয়ে উঠে পড়েন। বলেন, আজ তো আবার বিকেলে ভ্রমণ আছে। একটু শুই।

—হ্যাঁ বাবা শুয়ে পড়ুন।

শিপ্রা বলে, বুবাই জায়গা রেখেছে তো?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, অনেক জায়গা।

বিশ্বনাথ চলে যান। হাত ধুয়ে ওরা মালিনীর ঘরে বসে। ছোট খোকা বলে আমি বাপু একটু ঘুমোব। এত খেয়েছি...

বেবি বলে, আমিও।

শিপ্রা আর মালিনী দু'জনে মেজ খোকার ঘরে বসে।

মালিনী বলে পান খাবে? আজ আনিয়েছি।

—দাও।

—পান খেতে কি ভালবাসতাম...

—খাও না কেন?

—ও রাগ করে।

—ওঁর যা ইচ্ছে উনি করবেন, তুমি একটু পানও খেতে পারবে না?

—পান খাওয়া তো অসভ্যতা।

—কিসে? তুমি আবার বড্ড ভীতু।

—ভীতু? হয়তো! কিন্তু যে অশান্তি করে...এখন আর সইতে পারি না।

—আমাদের দেখ তো, পরিষ্কার সম্পর্ক।

—তোমার যে মনের জোর আছে।

—কি ভাবছো বলো তো?

—না...এই...

—বলোই না।

মালিনী বলে, বলব?

—বলো। বাবার কথা তো?

—হ্যাঁ।

—অসুবিধে হচ্ছে?

—অসুবিধে হচ্ছে, তবে সেটা ওঁর জন্যে নয়।

—বলো!

—সে সময়ে কথা হলো, ও বাবাকে নিয়ে এল, সব কথা ভাইবোনের হলো, ওরাই ঠিক করল।

—তুমি কিছু বলো না কেন?

—একটু বলছিলাম...ও ধরে নিল ওর বাবাকে আনাতে আমার আপত্তি আছে। ওর বাড়ি, ওর বাবা আসবেন, এইরকম ভাবখানা।

—জানি। আমিও ছিলাম।

—ওর বাড়ি, ওর বাবা আসবেন, সবই ঠিক। কিন্তু...শিপ্রা...এখানে আমাদের জীবন কি রকম...বাড়িতে মদের হুল্লোড়...বেলেল্লাগিরি...বাবা এসব জানতেন না। বাবা আছেন বলে বাবির বাবা যে নিজে একটুও সংযত হয়ে চলবে...

—মেজদার ব্যবসার জন্যেই তো...

—বেশ! ব্যবসার জন্যে বাড়িতে বাজার চলা দরকার। তার মধ্যে বাবাকে আনা...আমার ওপর হুকুম, উনি যেন কিছু টের না পান...তুমি বলো সেটা কি সম্ভব।

—না, সম্ভব নয়।

—বারবার মনে হচ্ছে, কোনদিন কি জানবেন, কি আঘাত পাবেন...উনি অন্য রকম মানুষ।

—আমার ওখানে অবশ্য তোমার মতো সমস্যা নেই। কিন্তু সত্যি বলছি, টাকা দিতে পারি...মাঝে মাঝে নিয়ে যেতে পারি...মাঝে মাঝে আসতে পারি...কিন্তু খোলাখুলি, বলাই ভালো, আমার পক্ষে ওঁকে নিয়ে বসবাস করা সম্ভব নয়।

—তোমারও...

—না, ও মেজদা নয়। কিন্তু আমার সমস্যা অন্যরকম। কি জানো! আমরা দু'জনে হয়তো বিয়ার খাই বা ব্রান্ডি, কিন্তু সেটা কোন সমস্যা নয়। ব্যাপার হলো, ওর নিজের ফার্ম, ফলে আপিসে কাজ চলে, বাড়িতেও। ও এমন উগ্র কেরিয়ারিস্ট যে ব্যক্তিজীবন বলে আমাদের কিছু নেই।

—আমি ভাই বুঝি নি।

—তা ছাড়া, আমি তো জানি ও আগে বিয়ে করেছিল। জেনে শুনেই বিয়ে করেছি। আমি অতীতের কথা ভুলেও মনে করাই না। আর ও...সব সময়ে আমাকে প্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করে।

—ছিঃ!

—বাবা ফ্ল্যাট দিয়েছেন। তুমিও নিয়েছ। তা'হলে কথায় কথায় তোমার বাবা বড়লোক...তুমি বড়লোকের মেয়ে...সবচেয়ে অবাক হবে একটা কথা জানালে।

—কি?

—কেউ যেন জানে না। ওর এমন হীনমন্যতা যে, ওর বাবাকে ও বাড়ি নিয়ে যেতে লজ্জা পায়।

—লজ্জা!

—হ্যাঁ, লজ্জা। উনি আমার বাবার মতো নন, যথেষ্ট পালিশ নেই...হেন তেন, মানুষ হিসেবে ও এতটা অসম্পূর্ণ, তা আমি আগে বুঝি নি। ও মায়ের জন্যে ওসব করবে? করার সাহসই নেই। বলে কি জানো? ও সব সোদপুরে করা চলে, এখানে নয়।

—জানতাম না ভাই।

—নিজের বাবা—মাকে নিয়ে লজ্জা। ওঁরা কি লজ্জা পাবার মতো মানুষ? অন্যরকম, খুব অন্য রকম, কিন্তু আত্মসম্মানী, অত্যন্ত সভ্য। আর কি জানো! এটা জেনেছি যখন তখন থেকেই ওর ওপর আমার শ্রদ্ধা কমে গেছে। সেই জন্যেই বুবাইকে...

—হস্টেলে দিচ্ছ?

—দিতেই হবে। বাপ—মার মধ্যে অশান্তি দু'জনের কেউ ছেলেকে সঙ্গ দিতে পারি না...আমার একেক সময়ে মনে হয়, প্রিয়া ওকে ছেড়ে গেছে বলে সেই যে ওর পৌরুষে ঘা লাগে, তারপর থেকেই সমাজে কেউকেটা হব বলে...খুব হিসেব কষে আমাকে বিয়ে করে।

—না না, তা কেন হবে?

—তাই। মালিনী, তাই। কত সময়ে বলেও ফেলে। আমি...আমি কিন্তু ওকে ভালবেসেই...

—শিপ্রা! ওর মেজদা হয়তো অন্য রকম...কিন্তু টাকা আর টাকা! কত টাকা ওর দরকার? বাবার কথা বলছ? বাবাকে ওঁর ঘরে সন্ধ্যার পর বন্ধ করে রাখা হয়, সে এক কারণে। যাতে ওর সন্ধ্যা কেমন কাটে তা বাবা জানবেন না। বাবাকে নিয়ে ও—ও তো লজ্জা পায়। লুঙ্গি পরা অসভ্যতা, গামছায় স্নান করা অসভ্যতা, হেন...তেন...

—এরা সবাই যেন নিজের সঙ্গে বাজি রেখে ছুটছে।

—বাবা যদি তাঁর মত ওখানেই থাকতেন তা'হলে আত্মসম্মান নিয়ে থাকতেন।

—বয়সটা বড় বেশি...

—কে ক'বার দেখতে যেত বলো? বাড়ি আছে, জায়গা আছে, টাকা আছে, কিন্তু তোমারই বাবা! তোমার যেমন জীবন, তার মধ্যে ওঁকে এনে...কবে যে কি হবে, ফট করে ও কি বলে বসবে...আমি দুদিক সামলাতে সামলাতে আমার ভালো লাগে ওঁকে, কিন্তু আমি তো সব নই। হয়তো কেউই নই।

—বেবির কাছে বাবা আছেন, ভাবতে পারো?

—অসম্ভব! ওর যা মেজাজ!

শিপ্রা একটু হাসে। বলে হবে না মেজাজ? ও তো ড্রাগ করে।

—ড্রাগ!

—নিশ্চয়! আমি ঠিক বুঝেছি।

—মা গো!

—তোমার ছেলের ওপরেও নজর রাখো। কেন, কেন এ কথা বলছ?

—এই বয়স। এরকম বাড়ি! এ সব বাড়ি তো এখন...এখন এই বয়স...বড়লোকের ছেলেমেয়ে...ড্রাগ...কাঁদছ কেন? মালিনী!

মালিনী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, কেঁদে চলে। বলে, আমি কি করব বলতে পারো? কোনদিকে যাব? ছেলেকে দেখব, না তার বাবাকে দেখব...এই এত বড় বাড়ি, এত ব্যবসা কারবার। এ সব কিছু দরকার ছিল না আমার। আমি আর পারছি না।

—এই যাও! মুখ ধোও। বেবি বোধ হয় উঠেছে। গলা পাচ্ছি বলে মনে হয়।

—বাবিকে একবার তিরুপতিনাথে নিয়ে যেতে পারলে...অনেকের কাজ হয়েছে।

—মেজদা জানেন?

—জানলে আমাকে আস্ত রাখবে না।

মালিনী বাথরুমে ঢুকে যায়।

সোনালি বিকেল গড়িয়ে নেমে আসে। ছেলেমেয়েরা বলেছিল...ওরা বিকেলে লুচি খায়।

চা খেয়ে বেবি ও ছোট খোকারা চলে যায়। মালিনী বাবির ঘরে ঢুকে কি যেন বলে অনেকক্ষণ ধরে নিচু গলায়।

তারপর বলে, চলুন বাবা!

বকুলবাগানে খুঁজে খুঁজে মালিনী ওকে নিয়ে গিয়ে ঠিক হাজির করে সনকার বড় বোনের বাড়ি। যেমন বাড়ি তেমনি আছে, অপরিবর্তিত। বিশ্বনাথের খুবই অবাক লাগে।

শেষ কবে এসেছেন এখানে?

সনকার দিদি মেনকার শিরদাঁড়ায় বাত, শয্যাশায়ীও বটেন। কিন্তু কথায় দাপট কমেনি।

—বড়লোক বোনপোরা তো মাসির বাড়ি ভুলেই গেছে। বউমা কেমন করে চিনে এলে তাই ভাবি।

অপ্রতিভ মালিনী বলে, সময় পাই না মাসিমা।

—ছেলেরা বলে, মেজ খোকা, ছোট খোকা, সব এখন রাজপ্রাসাদে থাকে।

—ফ্ল্যাট বাড়ি।

—এখন তো ফ্ল্যাটেরই যুগ গো বউমা! আমার ছেলেরাও নেচে আছে, বুড়ি মরলেই বাড়ি বেচে যে যার মতো ফ্ল্যাট কিনে চলে যাবে।

—ছেলেরা কোথায়?

—সব ডাকি।

ওঁর ছেলেরা, বউরা, নাতি নাতনি। এক নাত বউ—সবাই আসে। প্রণাম করে।

—চা জলখাবার আনে।

—না না, আমি কিছু খাব না।

—আমিও না।

—সনকা চলে গেল!

—রাখতে পারলাম না।

—ভাগ্যিমানী ছিল, আপনাকে রেখে গেল! আর আমি! তার চেয়ে বয়সে বড়। সে কবে কপাল পুড়েছে, আজ পাঁচ বছর শয্যা ধরেছি, তা যম আমাকে তো নেবে না।

ছেলেরা বলে, মেসোমশাই কি সোদপুরের বাড়ি বেচে দিলেন?

—না না, বেচব না।

মেনকা বলেন, ছেলেদের কাছেই থাকবেন। বাড়ি রেখে আর হবে কি?

—সে আমি চলে গেলে...

—আপনি তো বেশ শক্ত আছেন।

—তা আছি।

—কোন ছেলের কাছে আছেন?

—মেজ খোকার কাছে।

—শুনেছি খুব বড় বাড়ি। তা যাওয়া—আসা তো নেই। আগে বরং...

—না, এরা সবাই দেখি ব্যস্ত খুব।

—মেনকা, সনকা, কনকা তিন বোন। তা কনকা তো বিয়ের পরেই...সনকাও চলে গেল! ছেলেদের ঘরে ছেলেপিলে কি?

—সব একটি একটি। বেবির দুটি।

—আমার দুই ছেলে দুই মেয়ে। তা নাতি—নাতনি সতেরটি। রবিবার হলেই সব আসে, থাকে!

—সেই তো ভালো।

—দুঃখ হয়। সনকার ছেলে—মেয়েদের সঙ্গে আমায় দেখুন। এক শহরে বাস করেও...

—এখন তাই! বড় খোকা আমেরিকা, ছোট মেয়ে জার্মানী, এদের নিজেদের মধ্যেই কি যোগাযোগ থাকবে? থাকবে না, থাকা সম্ভব নয়।

—এই মেজ বউমাই আসত আগে।

—এখন আর...

—তা, তুমিও মা চুল কাটলে?

—ওর সখে মাসিমা।

—আমার নাতনিও নেচেছিল। তিন ধমকে মাথার ভূত ছাড়ালাম। ও মা! বিয়ের পর শাশুড়ী তাকে ফ্যাশনী করবে বলে চুল কাটাল।

বিশ্বনাথ বলেন, বাড়ি, বাগান সবই তো রেখেছেন। এমন কি, বাড়িও ঠিক তেমনি আছে।

—আমি যতদিন, ততদিন। আমার নামে বাড়ি তো।

—সোদপুরের বাড়িও চমৎকার। কত গিয়েছি একসময়ে।

শুধু বাড়ি নয়, মেনকার বোধ হয় আরো জোর আছে। কথা যা বলবার উনি একাই বলে যান, প্রৌঢ় ছেলেরা, শাশুড়ী হয়ে যাওয়া বউরা চুপ করে থাকে। মালিনীর দিকে ওরা এমন ভাবে তাকায়, যেন অন্য গ্রহের জীব।

মেনকার কানে তার বউ কি যেন বলে। মেনকা বলেন, কি? তোতার কথা? তুমিই বলো না।

তারপর মালিনীকে বলেন, আমার সেজ নাতি তোতার কথা গো বউমা!

—কি কথা, মাসিমা?

—বেচারার কপালে শনি। কত পরীক্ষা দিচ্ছে তো দিচ্ছেই।

—কমার্সে এম এ, টাইপ জানে। মেজ খোকাকে বলে ওর একটা কাজ...কদ্দিন বলেছি, যা না, গিয়ে দেখা কর। কাকা তো হয়! তা লজ্জা পায় ভীষণ।

মালিনী বলে, নিশ্চয় বলব। তোতা একদিন বাড়িতেই এসো না। বলেও রাখব, কথাও বলিয়ে দেব। তোতা কোথায়?

—সে গেছে ক্লাবে। ওরা বেশ সব...খেলাধূলা, পুজো, ফাংশান...কত প্রতিযোগিতা করে।

তারপরেই বলেন, বাবা বলতেন, শ্বশুর দেখে মেনকার বিয়ে দিয়েছি, ছেলে দেখে সনকার। কনকার তো ঘরে ঘরে হলো আমারই মামাত দেওরের সঙ্গে। তা দেখুন না, শ্বশুরের তৈরি এই বাড়ি, পঁচিশ ইঞ্চি দেয়াল। সামনে দু—কাঠা জমি, ওপরে নিচে দশখানা ঘর, এতে ছেলেদের মন ওঠে না।

—এক ছেলে হেসে বলে, আর যে ধরে না মা!

—না ধরে তো সামনে জমি আছে বাড়াও। তা কি করবে? বাড়িতেই দুটো হেঁসেল চলছে। তখন মাড়োয়ারিকে বেচবে আর যে যার মতো সরে পড়বে।

বিশ্বনাথ সহাস্যে বলেন—আপনি কার ভাগে পড়লেন? বড়, না ছোট?

—ছ' মাস এর, ছ' মাস ওর।

—আমরা উঠি।

—এলেন বলে দেখা হলো। নইলে...সনকার কপাল ছিল, চলে গেল। আমি আর বউমা! মেজ খোকাকে বোল। তবু এলে মুখটা দেখলাম। ছোট খোকা...বেবি...কেউ আসে না। এক শহরে বাস, কেউ কাউকে চিনবে না।

মালিনী বলে, তোতা কোথায় পড়েছে?

—এ বাড়ির সব ছেলে মিত্র স্কুলে, সব মেয়ে বেলতলা স্কুলে, ছেলেমেয়ে সবাই আশুতোষ কলেজে, যোগমায়াতে, শ্যামাপ্রসাদে।

—ইংরেজি বলে ভালো?

—ওই যা জানে। পরীক্ষায় তো ভালোই করেছে বরাবর। এখন চারিদিকে ইংরিজি স্কুলের হাওয়া...

না। এ বাড়িতে হাওয়া ঢোকে নি। সবাই খুব বাঙালী থেকে গেছে। মেঝেতে পঙ্খের কাজ করা লুডোর ছক। কোনো সময়ে মাসিমারা খেলতেন। বাইরে বারান্দা অত্যন্ত চওড়া।

ওঁদের এগিয়ে দিতে দিতে এক ছেলে বলে, যেদিকে তাকাবেন, জায়গার অপচয় মেসোমশাই। দুটো রাক্ষুসে উঠোন, ওপরে প্রতি ঘরের সামনে বারান্দা, তখনকার লোকের কোনো বুদ্ধি ছিল না।

মালিনী বলে, ওঁরা থাকার জন্যে বাড়ি করেছিলেন। ভাড়া দেবার জন্যে তো নয়।

—যা আছে, তাতেই ভেঙ্গেচুরে বড় ফ্ল্যাট বাড়ি উঠতে পারে। প্রত্যেকের ফ্ল্যাট থাকল, কিছু বেচাও গেল। মা থাকতে তা হবার নয়। এ বাড়ি মেরামত করা...ট্যাক্স দেয়া...আমাদের কি সে ক্ষমতা আছে?

গাড়িতে উঠে বিশ্বনাথ বলেন, কেউই তার নিজের অবস্থায় সুখী নয় এখন।

মালিনী বলে, ওঁদের অবশ্য মানুষও অনেক বেড়ে গেছে।

বহুতল বাড়ি বেলতলায়, হাজরায়, বকুলবাগানে। না। কলকাতা বদলে যাচ্ছে বলে ক্ষোভ করে লাভ নেই। মানুষ বাড়ছে, আবাসন চাই।

বিশ্বনাথ বলেন, সবই বুঝলাম। কিন্তু মানুষের তো এখন সমাজের একটা স্তরে বড্ড বেশি চাই সব। সব কিছু অনেক অনেক। বড় বেশি চাহিদা।

মালিনী চুপ করে থাকে। তারপর বলে, আপনি এলেন বলে আমার একটু আসা হলো।

তোমার ইচ্ছে হলেই চলে এস।

না। তা পারে না মালিনী। মেজ খোকার কড়া নির্দেশ, নো আত্মীয়স্বজন। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে চার—পাঁচটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারো, ওরা স্টেটাসে সমান না হোক, কাছাকাছি।

আর যাঁরা আছেন, এই কলকাতাতেই আছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ? একেবারে নয়। ওদের তুমি চেনো না। ঢুকতে দিলেই আসতে থাকবে। তখন আমি কেন, তুমিও লজ্জায় পড়বে।

একদল হচ্ছে মনে মনে ভিখিরি, প্রার্থী, কোনো না কোনো ধান্দায় আসবে।

আরেক দল হচ্ছে, সামনে প্রশংসা করবে কিন্তু হিংসেয় জ্বলে মরবে। এ সব লোক ভয়ানক বিপজ্জনক। আসতে দিলেই পেছনে তল্লাস চালাবে। কোথা থেকে, কেমন করে তোমার এত রমরমা হলো।

কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবে! তুমি কি জানবে মালিনী! আমি সর্বদা টুরের সময় বই পড়ি, পত্রিকা পড়ি, তাতে হরদম দেখছি—সাংবাদিক বলো, যে কোন লোক বলো, পেছনে লেগে থেকে কি সর্বনাশ করতে পারে।

কেঁচো খুঁড়তে সাপ কেন বেরোবে। সে কথা মালিনী কখনো জিগ্যেস করে নি। মেজ খোকা বা দীপকের রমরমার পেছনে অনেকটাই যে অন্ধকার ঘোর প্যাঁচ তা মালিনী বোঝে। এখন তেমনি সব লোকজনের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখবে যারা আমাদের সঙ্গে সমানে সমান। ভিখিরি ভিখিরি চেহারার লোকজন এলে...

মালিনী জানে, ভিখিরি ভিখিরি চেহারার সংজ্ঞাটা মেজ খোকার কাছে কি! যারা ওদের মতো নয় তারাই....অথচ তারা কেউ দীনদরিদ্র নয়, আত্মসম্মানী মধ্যবিত্ত।

না, মধ্যবিত্ত না কি এখন মেজ খোকা, ছোট খোকা, দীপক। ওরা তাহলে নিম্ন—মধ্যবিত্ত। এ শহরের প্রতি অঞ্চল মেজ খোকাদের মতো বাঙ্গালী, অবাঙ্গালীর হাতে চলে যাওয়াটা ওরা খুব সমর্থন করে। মেজ খোকা হরদম বলে, তেমন বহুতল বাড়িতে বাস করা যায় না, যেখানে শুধু বাঙ্গালী থাকে।

মালিনী ভেবে পায় না ওকে নিয়ে ওর স্বামী লজ্জায় পড়ে না কেন। অনেক কিছুই ভেবে পায় না মালিনী। বর্তমানে ওর দুটি সমস্যা। বিশ্বনাথ কবে অপমানিত হয়ে চলে যাবেন।

বাবির কি হবে। কাকে জিগ্যেস করবে ও, কে ওকে বলে দেবে কি কর্তব্য।

এ সব ভাবতে গেলেই মালিনীর মনে হয় ও ভেসে যাচ্ছে অন্ধকার সমুদ্রে। হিংস্র স্রোত ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দূরে, কিছু করতে পারছে না ও।

এরকম মনে হয় বলেই এ বাড়ির ছাদে ওঠে না মালিনী। ছাতটা প্রকাণ্ড, খেলার মাঠ বললেও হয়। বহু টিভি অ্যান্টেনা, তবু অনেকটা ফাঁকা আছে।

বিশ্বনাথ আসার আগে আগেই এই থেকে কেডিয়াদের মাদ্রাজী ঝি রাজাম্মা লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। ও সন্তানসম্ভাবিতা ছিল। কোনো তদন্তই হয় নি।

ছাদে উঠতে মালিনীর ভয় করে। প্রেত ভয় নয়, অন্য ভয়। এত বড় ছাত। এমন বাতাস, ছাতের চারিদিকে সমুদ্র শূন্যতা। ভয় হয়, যদি ও লাফিয়ে পড়ে? যদি এই অন্ধকার বাতাস ও নির্জনতা ওকে পেয়ে বসে? তাহলে কি হবে?

বিশ্বনাথ বলেন, পৌঁছে গেছি।

—পৌঁছে গেলাম!

মালিনী এতক্ষণ অন্যত্র ছিল। সেখান থেকে ফিরতে খুব অসুবিধে হয়।

—কি ভাবছ মা?

—ভাবছি পরের রবিবার কোথায় যাব।

—যাবার মতো আত্মীয়স্বজন তো অনেক কিন্তু কি জানো মা! তোমাদের সঙ্গে তো সকলের যোগাযোগ নেই...

—আপনার যেখানে ইচ্ছে যাবেন।

—দাঁড়াও দাঁড়াও, আগামী রবিবার তারিখ কত?

—একুশে।

—দিলীপ আসতে পারে।

—লিখেছে?

—আমিই লিখেছি। চিঠি লিখি, জবাব পায় না, বাড়ির কি হচ্ছে না হচ্ছে...

মালিনীর বুক শুকিয়ে যায়। এ বাড়িতে দিলীপ, মানে মীরার বর। এ বাড়িতে রবিবার মানে অনেক রকম হতে পারে। যদি মেজ খোকা থাকে, যদি তার ব্যবসার জন্য একুশেটা 'বিশেষ' রবিবার হয়, তাহলে? দিলীপকে দেখলে...না, অনেকদিন করা হয় না, সে নিশ্চয় মালিনীর দোষ। কিন্তু দিলীপ এলে...

সুপ্রভাতের ঘরে বসেছিলেন বিশ্বনাথ। পার্ক থেকে ফিরতে হয়েছে। বৃষ্টি হঠাৎ নামল। হচ্ছে তো হচ্ছেই বৃষ্টি সেই থেকে।

এ ঘরে দেয়ালে দেয়ালে গাছের ছবি, বড় বড় রঙ্গিন। খুব সবুজ, খুব শান্ত। দেয়ালের তাকে অনেক বই। সবই অরণ্য সম্পর্কীয়। একটি হাতির ছবি, পিঠে সুপ্রভাত।

—হাতির পিঠে আপনি?

—আমরা তো জঙ্গলের কাজে হাতিকে দিয়ে গাছ টানাতাম, জঙ্গলে যেতাম। উনি বেদানা, আমি তখন আসামে। আমার খুব বাধ্য হয়ে গেছল। হাতির বুদ্ধি খুব বেশি, জানে তো ওরা বিশ্বস্ত হতে জানে। মানুষের মতো নয়...

—এ আপনি বলতে পারেন না। কেন, এই বাহাদুর কি আপনার জন্যে কম করে?

—তা বটে। তা রবিবার তো আসেন নি?

—বউমা নিয়ে গেল বড় শালীর বাড়ি।

—আছেন ভালো।

—বউমা খুব যত্ন করেন।

—কপাল থাকা চাই। ছেলে?

—সে তো সদাই ব্যস্ত।

—তাই মনে হয়।

কোথা থেকে উৎকট গানের সুর আসে। সুপ্রভাত মাথা নাড়েন, সবই ভালো মশাই। তবে বরদানন্দের খপ্পরে পড়েছেন, দেখুন কি হয়।

—ওদের তো গুরু।

—এই সৈকতে কারা থাকে তা বুঝতেই পারছেন। সমাজের কোন মহলের মানুষেরা! মজা কি জানেন, এমন ফ্ল্যাট নেই যেখানে কোনো না কোনো গুরু নেই। শক হূণ দল, পাঠান মোগলের মতো সত্য স্বামীবাবা, বরদানন্দ, লোকপিতা এমন নানা গুরুর আক্রমণের কাছে এখানকার বাসিন্দারা সব মাথা মুড়িয়েছে।

—সবাই?

—দু'ঘর মুসলিম, এক ইহুদী ছাড়া সবাই।

—আশ্চর্য।

—প্রত্যেকটি গুরু কোটিপতি তো বটেই, তার চেয়েও বেশি কিছু...

—কিন্তু কেন?

—সেটাই তো মজা। ঘরে ঘরে বেলেল্লাপনা, ঘরে ঘরে ভি ডি ও—তে পর্ণো ফিল্ম, বাচ্চারা, বাপ—মা সবাই ড্রাগ করছে, অথচ গুরুভক্তি সকলের।

—এ যে ভয়াবহ কথা।

সুপ্রভাতের চোখ যেন জ্বলে ওঠে। বলেন, পাখি দেখার দুরবীণ দিয়ে অনেক সময়ে মানুষ দেখি। সময়ও অঢেল আমার। এ সব কেন হচ্ছে জানেন :

—কেন?

—কোরাপশান। এরা সব আসলে পাপী। এই গুরুর দলও এদের দল। এদের এত আছে, তবু গুরু চাই। কেন না এদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ নেই।

—তাই হয়তো হবে।

—এই যে কেডিয়ারা! এদের ছেলে—মেয়েগুলা ফ্ল্যাটের যত ছেলে—মেয়ে সব বখাচ্ছে।

—আপনি কিছু বলেন না?

—ড্রাগের পর এরা তো হিংস্র হয়ে থাকে। এমনিতেই আপনার নাতি আসছে না বলে ওরা ক্ষেপে আছে আমার ওপর।

—ও আসত, তাই না?

—আসত, এখন দেখছি না।

—এদের বাড়িতে শাসন নেই।

—কে কাকে শাসন করবে! বাপ—মা—ই সাহস পায় না, আমি তো কোন ছার।

—না। আমার নাতিকে দেখলে বলবেন।

—এখানে...কি হয় না হয়..

—আপনি এখানে এলেন কেন?

—সেটাই তো ভুল হয়েছে। তখন জানি গাছপালা পাব। ন্যাশনাল লাইব্রেরি, হর্টিকালচার সোসাইটি, সব কাছে...

—আমাকে তো এরাই নিয়ে এল।

—সে আপনার কপাল। হালদাররা তো বুড়ো বাপকে কোন হোমে পাঠিয়ে তবে ফ্ল্যাটে ঢুকল।

—হোম?

—হ্যাঁ, খুব দামী হোম। না ''আশ্রয়''। কলকাতার দক্ষিণে মিসেস দেশাই না কোন এক মহিলার বিরাট ব্যাপার। মাসে হাজার টাকা দিতে হয়।

—হাজার টাকা!

—হ্যাঁ মশাই। অসুখ হলে চিকিৎসা খরচ আলাদা। আরে, বুড়ো বাপকে সঙ্গে রাখবে? হাজার টাকা যায় যাক, আপদ বিদায় হোক।

—খুব বড়লোক ছাড়া...

—সে তো বটেই। কলকাতায় কালো টাকা উড়ছে। সৈকতে আমার মত পেনশনার ক'জন?

—আমার ছেলে অবশ্য বিজনেস করে।

—জানি।

—সত্যি ওদের যে কত টাকা, আমি ভেবে পাই না। এই বাড়িতে দুটো ফ্ল্যাট...তিন—চারটে চাকর...দুটো ড্রাইভার...আমি ভাবতেই পারি না।

—ভাববেন কেন? ভাববেন না। ভাবতে গেলেই আমার আপনার মতো লোক গোলমালে পড়ে যাব।

—ভাবতাম না। এখন সামনে আছি, ভাবি।

—সময় কাটে কি করে?

বিশ্বনাথের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

—শুনলে আপনি হয়তো হাসবেন।

—হাসব কেন?

—ছেলেরা, মেয়ে, বউ জানে না।

—খুবই গোপন ব্যাপার।

—হ্যাঁ...আমার স্ত্রী আর আমি...আমারই পাগলামি...একটা কমদামী টেপ—রেকর্ডার কিনে কথাবার্তা টেপ করতাম।

—এমনি কথাবার্তা?

—হ্যাঁ...সাধারণ, ঘরোয়া কথা...কথা ছিল, একজন তো আগে যাবেই, ইচ্ছামৃত্যু তো হয় না...তখন আরেকজন বাজাবে আর শুনবে।

—তাই শোনেন?

—হ্যাঁ সুপ্রভাতবাবু। একলা ঘরে...ওর গলা শুনতে শুনতে...মনটা যেন শান্ত হয়।

বিশ্বনাথ সহাস্যে চেয়ে থাকেন। সুপ্রভাত অবাক, মুগ্ধ। তারপর বলেন, আপনি ভাগ্যবান।

—ভাগ্যবান হলে সে কি যায়?

—না না, ভাগ্যবান।

—কাউকে বলবেন না।

—না, এ বড় পবিত্র কথা। কাকে বলব?...আর আমি...না, আমাদের কোনোদিন তেমন সম্পর্ক হয়তো ছিল না। সেজন্যেই ও চলে যেতে পারল।

—বড় দুঃখের কথা।

—ও চলে গেল...আমিও কেমন যেন হয়ে গেলাম...ওর ছবি, চিঠি...সব পোড়ালাম...এখন মনে হয় অতটা না করলেও পারতাম!

—কি বলব, বলুন!

—তখন...সে যখন নিজের শ্রাদ্ধ নিজে করে পূর্বজীবনকে মুছে দিয়ে যেতে পারল...

—মাথা ঠিক থাকে না।

—আমার তো থাকে নি।

—খুবই দুঃখ হয় ভাবলে।

—উঠবেন?

—উঠি। আমি তো আবার কারফুতে বাস করি...সন্ধ্যার পর ছেলের লোকজন আসে...আমি বেরোই না আর...ঘরেই খাই...

—আমি যদি আপনি হতাম, আর দেখার লোকজন থাকত, আমি তাহলে বারুইপুরেই থাকতাম।

—সোদপুর।

—হ্যাঁ হ্যাঁ, সোদপুর।

—সেখানেও নানারকম হচ্ছে আজকাল। তবে আমাদের পাড়াটা ভালো। আমরাও কারো সাতে—পাঁচে থাকতাম না। তাই তেমন আঁচ লাগে নি।

—আপনি ভাগ্যবান, বলেছি তো?

—যদি দেখাতে পারতাম...আপনি তো গাছ ভালবাসেন...কত গাছ...কত গাছ...

—হয়তো দেখব।

—হয়তো বর্তমানে একটু মনঃকষ্টে আছি। ছেলেরা তো মায়ের বাৎসরিক কাজ করবে না বলে মনে হয়...আচ্ছা, আসি।

''সৈকত'' বহুতল বাড়ি। আলিপুরের বহুতল বাড়িকে চমকে দেয়া বা বিব্রত করা কোনোমতেই সম্ভব নয়। লালবাজার থেকে কাস্টমস, কারোর পক্ষেই সম্ভব নয় ''সৈকত''—এর সম্পর্কে কোনো তদন্ত চালানো, হঠাৎ হানা দেয়া।

কেন না এ বাড়িতে কয়েক ঘর বাদ দিলে সকলেই এমন প্রভাবশালী যে, কলকাতা থেকে দিল্লী, কোথাও না কোথাও তাদের টিকেতে আগুন দেবার লোক আছে।

তবু তেমন ঘটনা ঘটে যায়।

কারণ, মালিনীর ছেলে বাবি।

মুনদের বাড়িতে সে সবে যেতে শুরু করেছিল, নেশাতে সবে ডুবছিল, কিন্তু পরের দিনটি ভয়াবহ।

কেন না মা ওকে ধরেছিল। মালিনী সব সময়ে কাগজ পড়ুক না পড়ুক, চরস হেরোইন ইত্যাদি ইত্যাদির পরিণাম কি হয়, তা বাংলা মেয়েদের পত্রিকাতে পড়েছিল। ছেলের কখনো বুঁদ হয়ে থাকা, কখনো ভয়ংকর রেগে ওঠা, কখনো ফুরফুরে হাসি, ওর সন্দেহ হচ্ছিল।

সেদিন রাতে তো সব সংশয় ঘুচে যায়।

মেজ খোকাকে বলার আগে ও ছেলেকেই ধরেছিল। মালিনীর এমন রুদ্রমূর্তি বাবি কখনো দেখে নি। মালিনী জেরা করেছিল নির্মমভাবে।

সবই ও বলে ফেলে। কেন না এখনো ও তেমন পাকা হয় নি। আর মালিনী, মুন, টিংকা, জনি, রাহুল এদের মাদের মতো নয়। সে বাড়িতেই থাকে এবং মুনদের কাছে ওর মা গেঁয়ো বাঙালী। বহু সময়ে মা কেঁদে বলেছে, তুমি আমার একমাত্র ভরসা বাবি।

বাবি জানে, বাবার কারণে ওর মার মনে কোনো দুঃখ আছে এবং বাবাকে মা ভয় পায়।

সেই মা কথার চাবুক মেরেছিল।

—হস্টেলে দিই নি, ছেড়ে থাকতে পারব না বলে, তার খুব প্রতিদান দিলে।

—তোমার ওপর ভরসা করেছিলাম, তার খুব প্রতিদান দিলে!

—এসব করতে হলে বাড়ি থেকে বেরোও।

—দুঃখ ভুলতে ড্রাগ! কিসের দুঃখ। কি জন্যে দুঃখ? ছুটিতে ইউরোপ যেতে পারো নি। তুমি নিজেকে কি মনে করো, সুপারম্যান? একজন জিনিয়াস?

—বিদেশে যাবে, যখন নিজে লেখাপড়ার জন্যে যাবার মত যোগ্য হবে। না চাইতে পেয়ে পেয়ে গোল্লায় গেছ। তোমারই দাদু এখানে আছেন...বলতে লজ্জা করে না, যে মুনরা ওঁকে বলে ক্রীপ! চাকরদের মতো ফানি পোশাক করেন। মুনরা তোমার দাদুকে, মাকে নিয়ে হাসে, তুমি সয়ে যাও। ছি ছি ছি! ওদের বাপ—মা সম্পর্কে কিছু বলে দেখো ওরা কি করে?

—না, আর পকেটমানি নয়, ওদের বাড়ি নয়, ওদের সংশ্রব নয়। তোমার ব্যবস্থা আমি করছি। যদি নিজেকে না শোধরাও, তোমাকে মেরে আমি আত্মহত্যা করব, এটা জেনে রেখো। তোমার মতো একটা পাপকে রেখে যাব না।

মা'র মুখ—চোখ দেখে বাবির মনে হয়েছিল, শেষের কথাগুলো মা ওর বাবাকে বলছে। যা হোক, বাবি ভয় পেয়ে যায়।

কাউকে না জানিয়ে মা ডাক্তারের কাছে ওকে নিয়ে যায়। সেখানেও জেরা, জেরা, জেরা!

এখন ও সকালে জগিং করছে, তিনটে থেকে ছয়টা থাকছে জিমনাসিয়ামে।

আশ্চর্য, ওর ভাল লাগছে।

কিন্তু বর্তমানে ও গভীর জটাজালে পড়েছে।

মুন ফোন করে করে ওকে পাগল করে দিচ্ছে। না, ফোন নামিয়ে রেখেও লাভ নেই। লিফট দিয়ে উঠতে—নামতে ওকে দেখে ওরা ঈষৎ হাসে।

গতকালের অভিজ্ঞতাটা ভয়ংকর।

ফোনে মুন হিশহিশ করে বলেছে, আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে ছাতে দেখা করছ। না করলে পরিণামটা ভেবে রেখো। চাঁদ...সানিয়াল।

পার্কে চাঁদ সানিয়ালের হাতে—মুখে হালকা হালকা ধারালো ব্লেডের টান।

পার্কে!

তার মানে বিগ জনি।

ভীষণ ভয়ে বাবি ছাতে গিয়েছিল। মুন বলেছিল (ইংরিজিতে) ভীরু! মায়ের খোকা! শোনো, তুমি যে ভাবছ বেঁচে গেছ, সে কথা ভুলে যাও। আমাদের ক্লাবে জয়েন করলে কেউ বেরোতে পারবে না।

—আমি...আমি...

—হাজার টাকা ক্যাশ দিচ্ছ। তাহ'লে আমরা...

—কোথায় পাব?

—চুরি করো, যা ইচ্ছে করো।

—হাজার টাকা।

—বিগ জনিকে দিতে হবে।

—কেন?

—বাচ্চু! খোকাবাবু! বিগ জনি ছাড়া কে সাপ্লাই করবে? এটা তোমার পেনাল্টি।

—মুন! আমি তো আগে আগে...

—ও সব রোজ দশ—পঞ্চাশের ব্যাপার নয়।

—মা টাকা সব সরিয়ে রাখে।

—হাজার টাকা!

বাবি ভীষণ ভয়ে সাদা হয়ে নেমে আসে। পরদিন, বহু ডিকেটটিভ বই পড়ে পড়ে অভিজ্ঞ বাবি বাড়ি থেকে দূরে পোস্টাপিসের পাবলিক ফোন থেকে থানায় ফোন করে। ভয়ে ও সাদা, কিন্তু নাম বলে নি। শুধু বলেছিল, এই বাড়িতে, এত নম্বর ফ্ল্যাটে নিয়মিত চরস, হেরোইন...আপনারা সন্ধ্যার পর আসুন।

—গলা শুনে...আপনি কে?

বাবি ফোন রেখে দিয়েছিল।

এর ফলেই সৈকতকে চমকে দিয়ে পুলিশ ঢোকে। সাদা পোশাক। তবুও পুলিশ। মুন ও জিনকে জেরা করে। ছোকরা অফিসার এখনো তেমন পোক্ত নয়। ও জানে না, কাস্টমস ড্রাগ র‍্যাকেট ধরলে যা পাবে, ও তার সিকির সিকিও পাবে না। ওর কানে শুধু ভীত, অসহায় একটি কিশোরের গলা বাজছিল।

যা বেরোয় তা যথেষ্ট নয়। মুন হিংস্র আক্রোশে বলে (ইংরিজিতে), তা হলে এসব ফ্ল্যাটেও যান (নাম করে করে বলে)। আমাদের এটা দরকার (ও নেশায় ছিল)। বিগ জনি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

যেসব ফ্ল্যাটে ও যেতে বলে, সেসব ফ্ল্যাটে ঢোকার এলেম এর নেই। নামগুলোই ভয়ংকর ভয়ধরানো। তবে বিগ জনিকে ধরা যায়। কাস্টমসে ফ্ল্যাটের নাম ও তালিকা পৌঁছে যায়। অতঃপর কোনো ফোন চলে যায় প্রতি ফ্ল্যাটে। তারপর কাস্টমস হানা দেয়।

সামান্যই উদ্ধার হয়। মিসেস দারুওয়ালা অত পোক্ত নন। তাঁর ফ্ল্যাট থেকে কিছু...

কিন্তু 'সৈকত' তোলপাড় হয়ে যায়। উচ্চপর‍্যায়ে ফোন ও সাক্ষাৎ চলতে থাকে। আজ ড্রাগ, কাল কালো টাকা, সরকার ভেবেছে কি? সৈকতবাসীরা হেঁজিপেঁজি লোক? কেডিয়ার যুবতী ঝি রাজাম্মা গর্ভ হলে আত্মহত্যা করে, মদ ও ড্রাগের পার্টিতে কলগার্ল খুন হয়, বাইরে থেকে ডবগা মেয়ে এনে নীল ছবি তোলা হয়, কবে কোন ব্যাপারে তদন্ত হয়েছে?

উৎসাহী পুলিশ অফিসারটির সামনেই এলেবেলে হয়ে যায় সব।

মুন হিংস্র ক্ষুব্ধ, অপমানিত মুন। বাবিকে সন্দেহ করে না। দুধের খোকার কাজ নয়।

ওই সুপ্রভাত দত্ত!

বিগ জনি ঠিক বেরিয়ে আসবে। সে মুনকেই ধরবে।

বিগ জনির প্রতিশোধ বড় ভয়ংকর।

ওই সুপ্রভাত দত্ত!

পুলিশ বাবির কাছেও গিয়েছিল। মেজখোকা বেইজ্জত, বেইজ্জত। মালিনী বাবিকে বাঁচায়। আর মেজখোকা মালিনীকে আক্রমণ করে।

বিশ্বনাথ সবই শুনতে পেয়েছিলেন।

—তোমার উচিত ছিল বাবিকে সামলে রাখা!

—বাবির দায়িত্ব আমার একার?

—ঘরে বসে করো কি?

—যা করাও তাই করি।

—তোমার মতো স্ত্রীলোক...

—তুমি বুঝতে পারছ না, এভাবে চললে ছেলেকে বাঁচাতে পারবে না, আমরাও বাঁচব না...আমাদের জীবন সবটাই অসুস্থ...অসভ্য।

—রাবিশ!

—মিনতি করছি, তুমি যা বলবে তাই করব। চিরদিন তাই করেছি, শুধু তুমি বাবিকে বাঁচাও।

—আঃ, অমন কোর না।

—তোমার ব্যবসার জন্যে যা করার, তা হোটেলে করো, ওই ফ্ল্যাটে করো, বাড়িটা বাড়ির মতো থাকতে দাও। এই পরিবেশে ছেলে মানুষ করা যায় না।

—কি বলছ কি? বাড়িতে যদি লোকজনকে ডাকতে না পারলাম, এত বড় ফ্ল্যাট কেনা কেন?

মালিনীর গলা কান্নায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমি যে আর পারছি না। এর মধ্যে বাবি...এর মধ্যে বাবাকে...

—আমার বাবা তোমার কি করলেন?

—এ সব কতদিন লুকিয়ে রাখা যাবে? সব জানতে দিই না, যতটা পারি আগলে চলি...কিন্তু এত বড় শোকের পর এই বয়সে...এসব তো উনি জানেন না, জানলে ওঁর কি রকম আঘাত লাগবে? একেই তো ছোট খোকা মায়ের কাজ নিয়ে যেমন করছে তাতে ওঁর মনে...

—তুমি কি বলছ? বাবা থাকবেন বলে আমি আমার জীবনযাত্রা পালটে ফেলব?

বেশ কিছুক্ষণ বাদে মালিনী বলে, বেশ। কিছুই কোর না। সব যেমন চলছে তেমন চলুক...আমিও দেখে যাই।

—কি দিই নি আমি তোমাকে?

মালিনী ওর কথা শোনে না। যেন নিজেকেই বলে, অনেক আগে আমি অনেক ভালো ছিলাম। তুমি আমার কাছে থাকতে সন্ধ্যায়। বাবি পাড়ার নার্সারিতে পড়ত...আমরা মাসে মাসে সোদপুর যেতাম...নারকেল পাড়া হলেই মা লিখতেন...এত টাকা ছিল না, নিজেদের বাড়িও না, তবু...

—তুমি সেই খোঁয়াড়ের জীবনে ফিরে যেতে চাও?

—কোনটা খোঁয়াড়, কোনটা স্বর্গ, সব হিসেব আমার গুলিয়ে গেছে। আমি তো নির্বোধ, তুমি বলো, বেবি বলে, ছোটখোকা বলে। থাক, আর কথা থাক। বাবা এখন বেড়াতে যাবেন। আর কথা থাক।

মেজ খোকা দুমদাম করে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। মালিনী যখন ওঁর ঘরে ঢোকে বিশ্বনাথ বিছানায় বসে সনকার ছবির দিকে চেয়ে আছেন।

—বাবা!

—কাছে এসো মা।

মালিনী ওঁর পায়ের কাছে বসে পড়ে। হাঁটুতে মুখ ঢোকে। বিশ্বনাথ ওর মাথায় হাত বুলোতে থাকেন। জীবনেও বোলান নি।

আস্তে বলেন, কেঁদ না মা! তুমি ভেঙ্গে পড়লে কি চলে? সব ঠিক হয়ে যাবে।

—সব?

—নিশ্চয়।

বিশ্বনাথ প্রাচীন বিশ্বাসে বলেন, অশুভ শক্তি কখনো শেষ অবধি জয়ী হয় না মা।

—এখন যে...

—বিশ্বাস রাখো, স্থির হও।

বিশ্বনাথ কি সব শুনেছেন? মালিনী মুখ—চোখ মোছে। তারপর হাসতে চেষ্টা করে। বলে, আপনার ছেলেকে তো চেনেন...ও শুধু হম্বিতম্বি করে...নইলে ওর মনটা খুব ভালো। আসলে...

বিশ্বনাথ যেন অনেক দূরে চলে গেছেন। তেমনই গলায় বলেন, এই মেজখোকাকে আমি চিনি না। তোমাকে চিনছি...জানছি...জীবনে এটাও কম পাওনা নয় মা।

—যদি...কিছু শুনে থাকেন...ওকে ক্ষমা করবেন। ব্যবসা ব্যবসা করে ওর মাথায় আর কিছুই নেই।

—নিশ্চয়। সব বুঝি...

—বেড়াতে যাবেন?

—হ্যাঁ, একটু হাঁটি।

সুপ্রভাত আজ অন্যমনস্ক। যেন চিন্তিত।

—কি ভাবছেন।

—যে প্রহসনটা হয়ে গেল...

—ওই পুলিশ আর কাস্টমস?

—হ্যাঁ।

—প্রহসনই বটে। দেখুন...সোদপুরেও সবই আছে। অস্থিরতা, অশান্তি, দাঙ্গা—হাঙ্গামা, মস্তানি, থানার নিষ্ক্রিয়তা, রাজনীতির নামে গুণ্ডামি...

—সৈকতের মতো এক জায়গায় সব সোদপুরে নেই। সেখানে তো আপনিও থাকতেন।

—হ্যাঁ...তবে সমাজের কোন কোন মহল এমন উঁচু, তাও জানতাম না, আর সেখানে যে এত রকম...কি ভাবছেন বলুন তো?

—পুলিশে প্রথম জানাল কে?

—কে জানে!

—কেডিয়ার ছেলে—মেয়ে আমাকে সন্দেহ করছে। দরজায় লিখে রেখে গেছে, ''র‍্যাট''।

—অর্থাৎ ইঁদুর?

—ওদের ভাষা তো আলাদা। তাতে ''র‍্যাট'' মানে যে পুলিশকে খবর দেয়।

—ছি ছি! কি করলেন?

—ওরা লিখে যাচ্ছে। আমি মুছে যাচ্ছি।

—বলেন নি কিছু?

—লিখতে দেখি নি, বলতে পারি না।

—তবু বুঝছেন?

—হ্যাঁ...বুঝেছি...ভয় পাচ্ছি।

—ভয়!

—হ্যাঁ ভয়। এদেরও তো বস আছে। তাকেই ভয়। সে মানুষ নয়।

—শুনলাম কাকে ধরেছে।

—ওকে কতবার ধরল, কতবার ছাড়ল। ওর বাবার পোর্টে বিশাল কারবার...সমাজবিরোধী এবং ধনী বাপের লাফাঙ্গা ছেলে...ওকে ধরে রাখবে কে?

—বাপ—মা জানে?

—ওর বাপ—মা জানলেও বা কি! ছেলে যা ছোট স্কেলে করছে বাপ তো তাই করছে বড় স্কেলে।

—এসব...পড়েছি কাগজে...

—সবই সত্যি।

—পুলিশকে বললে...

—পুলিশ। পুলিশ ওদের পকেটে থাকে। যাক গে, আজ আমার মনটা বিশেষ খারাপ।

—কেন?

—আসামেও শালগাছ হত। আমি একটা জঙ্গলকে শালগাছে ভরে দিয়েছিলাম। এ একটা অদ্ভুত আনন্দ। এখানে থাকি বটে, কিন্তু মনে করতে ভালো লাগত, যে সব জায়গায় কাজ করেছি, কত গাছ লাগিয়েছি, কত গাছ বিশাল হয়ে গেছে, কোথাও সেসব আকাশছোঁয়া গাছ আছে ভাবলেও শান্তি পেতাম।

—তা তো বটেই।

—আজকের কাগজে দেখলাম, সেসব বন সাফ, নির্মূল। উন্মাদ সরকার, উন্মাদ অরণ্যনীতি। অসাধু বনবিভাগ আর লোভী ঠিকাদার, মাটি থেকে সবুজ মুছে দিচ্ছে। দেখে আমার...

—সর্বত্র এক রকম।

—একটা গাছ বড় হতে, বয়স্ক হতে কত বছর লাগে, গাছ কি ভাবে মানুষকে বাঁচায়...

—একবার বহরমপুরের ওপারে বসনতলায় যাবেন। দেখবেন কি বড়ো, কত জায়গা জোড়া একটা বটগাছ! আমার দেশের বাড়িতেও একটা অর্জুন গাছ ছিল। আমরা তার নিচে পোষলা করতাম।

—মনটা বড় খারাপ আজ।

—ভেবে কি করবেন?

—কিছু না। কি করব? আমি কে? বয়স তিয়াত্তর, জীবন নিঃসঙ্গ...জীবনে কোনো ছোট কাজ করলাম না। আজ একটা ছোট মেয়ে আমাকে ''র‍্যাট'' বলছে। কি করতে পারছি?

—চলুন ফেরা যাক।

—একবার আপনার সোদপুরেও যাব।

—নিশ্চয় যাবেন। আমিও চিন্তায় আছি। ওখানকার খবর পাই না। ভাদ্র মাস পড়লে নারকেল পাড়াতে হয়, গাছ পরিষ্কার করতে হয়, ওঁর বড় শখের গাছ। কিছুই নয়, সামান্য গাছের ফল। সকলকে বিলিয়ে দিয়ে কি যে আনন্দ পেতেন!

দুই বৃদ্ধ বাড়ি ফেরেন। বাড়ি! বাড়ি বলতে আজও বিশ্বনাথের মনে হয় সনকাবাসের কথা। মালিনী আজ ওঁর মনটি ব্যথায় ভরে দিয়েছে।

বিশ্বনাথ বলেন বাড়িটা কত উঁচু!

—হ্যাঁ, বিশাল।

—সুখের সব উপকরণ যাদের হাতে...

—তারাও সুখী নয়।

—''সুখ'' শব্দের মানেও পালটে গেছে।

—বলতে পারেন।

—এরা মনে করে ভূমৈব সুখমল্পে নাস্তি। তা কিন্তু সত্যি নয়। সব সময় ভূমাতেই সুখ হয় না। সুখী হতে যে জানে সে অল্পেই সুখী হতে পারে।

—কাকে বোঝাবেন, কে বুঝবে?

দুজনে দুই ফ্ল্যাটে চলে যান। কেডিয়াদের দরজা খোলা। দরজায় হেলান দিয়ে মুন দাঁড়িয়ে। চামড়ার সঙ্গে আঁটা লাল নাইলনের গেঞ্জি ও প্যান্ট। মুখে বিচিত্র হাসি। সুপ্রভাত ঢুকে যান।

কিছুক্ষণ বাদে ফোন বাজে।

—র‍্যাট! বিগ জনি বেরোচ্ছে শীঘ্রই।

—কে, কে?

সুপ্রভাত টেলিফোন নামান, রিসিভার টেবিলে রাখেন। মুনের গলা নয়। অন্য কেউ, অন্য কোথাও থেকে ফোন করছে।

সুপ্রভাত কি করবেন? কোথায় নিরাপত্তা চাইবেন? কার কাছে?

না, কিছুই করবেন না।

ভয়ের কাছে হেরে যাবেন?

কখখোন না।

কিন্তু পুলিশকে খবর কে দিল?

সুপ্রভাত নিশ্চল বসে থাকেন। বয়স তিয়াত্তর। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ। চারদিকে গাছের ছবি।

তিনিও বৃদ্ধ, বাহাদুরও তাই। টেলিফোনে শাসানি। শাসানি থেকে আরো রক্তাক্ত কিছু গড়ালেও...সুপ্রভাতের মনে হয়, এর চেয়ে সে সময়ে ছেলেদের কথামতো বিদেশে চলে গেলে হয়তো ভালো হত।

কিংবা হত না।

না, ভয় পাবেন না। লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিভলবার তাঁর আছে। ব্যবহার করার দরকার পড়ে নি। আর জীবন তো তাঁর একেবারে অপচিত নয়। কত ঘুরেছেন, কত জায়গায় বনের সীমানা বাড়িয়েছেন, কত পশুপাখিকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, স্ত্রী সঙ্গে কত ছুটি কাটিয়েছেন কত বন বিভাগের বাংলোয়। সে সব বন, সে সব গাছ, সে সব পাখি, আজ থাক বা না থাক, তাঁর মনে তো বেঁচে আছে।

সুপ্রভাত শান্ত হয়ে যান। খুব শান্ত।

পরদিন সকালেই কেডিয়া দম্পতি এসে পড়েন। অন্তত দ্রুত বাড়ি বন্ধ করে ছেলেমেয়েকে নিয়ে আবার চলে যান কোথায়। দুপুরে নিজেরা ফিরে আসেন।

বাহাদুর বলে, মেয়ের জন্যে ভয় পাচ্ছে।

—কেন?

—ওর মেয়েই তো সেই বদমাসের নাম বলে দিয়েছিল। তাতেই তো সে ধরা পড়ে। সে যখন বেরোবে, তখন তো ওই বদমাস লেড়কির মুখ অ্যাসিডে জ্বালিয়ে দেবে।

—তোকে কে বলল?

—ওদের চাকর, আবার কে!

তবে তিনিও র‍্যাট, মুনও র‍্যাট। তাঁর র‍্যাটিংয়ে পুলিশ এসেছে (ওদের বিশ্বাস) মুনের র‍্যাটিংয়ে সেই বদমাস ধরা পড়েছে।

সুপ্রভাত নিজেকে নিরাপদ বোধ করেন।

—তুই এসব নিয়ে কোনো কথা বলিস না।

—না না। আমি হাওয়া বুঝি।

এখন হাওয়া কেমন তা বোঝা আবহাওয়া দপ্তরের একার দরকার নয়। মানুষদেরও চলার জন্যে অন্যদের মেজাজের হাওয়া বোঝা দরকার।

তোতার কথা মালিনী মেজখোকাকে বলবে, অনুরোধ করবে, ''কাজ দিতে পারো না পারো, খেঁকিয়ে উঠো না'', সে সময় তোতা দেয় না।

বকুলবাগানের ''বিপিন স্মৃতি'' থেকে আলিপুরের ''সৈকত'' লক্ষ যোজন মাইল দূরে। সভয়ে তোতা এসে ঢোকে। ভীষণ বড়লোকদের ওর ভীষণ ভয়ভক্তি। খুব অনন্যসাধারণ না হলে কেউ এত বৈভব করতে পারে না। মেজখোকা সম্পর্কে ওর কাকা হতে পারে কিন্তু নিশ্চয় সে নমস্য ব্যক্তি।

মেজখোকা বিদেশে গেলে স্টেটসম্যানে ব্যক্তিগত খবরাখবরে সে খবর থাকে। পার্সোনাল কলামের খবর যে পয়সা দিয়ে ছাপাতে হয় তা তোতা জানে। তাই সে কাকার নাম দেখলেই ক্লাবে গিয়ে হামবড়াই করে।

ফলে ওর অবস্থা সঙিন, সঙিন। সবাই বলে, কাকার মতো কাকা হলে চাকরি করে দিত।

সেদিন মালিনীও গেল, ঠাকুমাও তোতার কথা বলল, কাগজের রাশিফলে তোতার সময়টাও ভালো, তোতা অনেক আশা নিয়ে ঢোকে।

ঢুকেই মেজখোকাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে, মালিনীকেও, বিশ্বনাথকে তো বটেই।

বহুকাল পরে মেজখোকা বাপের ঘরে ঢুকেছে এবং সোদপুরের বাড়ি বিক্রি করার দরকার বোঝাচ্ছে। ক্রেতা বেনামে মেজখোকা! ওখানেও এখন আট—দশতলা বাড়ি তুলে ফ্ল্যাট বিক্রি করলে...অতটা জমি...সনকাবাস ভেঙে ফেললে...

বিশ্বনাথ শুনে যাচ্ছিলেন।

এ ঘরেই ঢোকে তোতা। কথায় বাধা পড়ে। মেজখোকা বলে, কে? একেবারে ভেতরে?

সেদিন স্বামী—স্ত্রীর কথাবার্তা শোনার পর থেকে বিশ্বনাথ যেন অন্যরকম হয়ে গেছেন। কি যেন ভেবে নিয়েছেন এবং কথা—বার্তার ধরণ বদলে গেছে।

বিশ্বনাথ বলেন, তোমার বড়মাসিমার নাতি। প্রমথেশের ছেলে, তোমার ভাইপো তোতা।

—অ! তা হঠাৎ?

—হঠাৎ নয়। আমরা সেদিন গিয়েছিলাম...

—বড়মাসিমার বাড়ি?

—হ্যাঁ।

—তুমি, আর কে?

—বউমা। আমিই নিয়ে গেলাম।

—তা...এ ছেলেটি?

—কমার্সে এম এ...টাইপ জানে...

—চাকরি?

—হ্যাঁ।

—প্রথমত আমার হাতে কোনো চাকরি নেই। আর কাজের কথাবার্তা আমি বাড়িতে বলি না।

—মেজখোকা।

—তোমার নাম কি?

—অ...অনিমেষ।

—কোন, স্কুল, কোন কলেজ?

—মিত্র ইনস্টিটিউশন, শ্যামাপ্রসাদ।

—ছি ছি ছি! এ সব স্কুল কলেজে এখন কেউ পড়ে? একটা ভালো স্কুল...ভালো কলেজ...

—তুমি তো সোদপুর স্কুল, আর রিপনের ছাত্র মেজখোকা!

বাংলা স্কুলেও অনেকে পড়ে।

—সে সময় আর এ সময়ে অনেক পার্থক্য বাবা...যাক, আর কি করেছ? কোনো সেক্রেটারিয়াল কোর্স? বিজনেস ম্যানেজমেন্ট? কস্টিং?

—টা...টাইপ শিখেছি।

—দেখ, তোমার মতো ছেলেকে...পার্ক স্ট্রীটে আপিসে এসো একদিন, দেখব কোথাও বলা যায় কি না...বাড়িতে নয়, বাড়িতে নয়!

—কবে আসব?

—যে কোনো দিন। লাঞ্চের আগে।

—তবু...

—বিষ্যুৎবার এসো।

—আচ্ছা।

মালিনী বলে, চলো তোতা! প্রথম এলে, একটু মিষ্টি খেয়ে যেতে হয়।

ওরা বেরিয়ে যায়।

—মেজখোকা!

—বলো।

—বিষ্যুৎবার তো তুমি বম্বে যাচ্ছ।

—হ্যাঁ, যাচ্ছি।

—ওকে আসতে বললে?

—তুমি ভেবো না তো। ওর দরকার, ও আসবে, ঘুরবে, তুমি ভেবো না।

—সোজাসুজি বললেও পারতে।

—দেখাই যাক না।

মেজাখোকা বলে, আসছি।

মালিনী তোতাকে নিয়ে ঢোকে। বিশ্বনাথ বলেন, তোতা। তুমি পরীক্ষায় বস না?

—কয়েকটা দিয়েছি।

—আমার মনে হয়...ওগুলোতেই বোস। পরীক্ষার খাতা না কি কমপ্যুটারে দেখা হয়... মানুষের কোনো ব্যাপার নেই...

—আগেও দিয়েছি, এবারও বসছি।

—ঠাকুমা ভালো আছেন?

—আছেন। আপনাকে আবার যেতে বলেছেন।

—যাব।

আরেকটু বসে তোতা উঠে পড়ে। মালিনী বেরিয়ে যায়। বিশ্বনাথ বলেন, দরজাটা খোলা থাক মা।

—বাবা...

—খোলাই থাক।

মেজখোকা বেরোবার জন্য তৈরি। মালিনী আসবে বলে ও বেরোতে পারছে না।

—তুমি বাবাকে নিয়ে ও বাড়ি গিয়েছিলে?

—শুনলেই তো।

—তুমি জানো আমি কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া পছন্দ করি না?

—উনি হয়তো করেন।

—না! তুমি...বাবা...

মেজখোকা এ ঘরে ঢোকে।

—বাবা!

—বলো।

—তুমি এখানে থাকবে...একশোবার থাকবে...কিন্তু দোহাই তোমার, ওই সব আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যেও না। তুমি যাবে...ওরা আসবে...

—সেটা তুমি চাও না।

—না বাবা। এ সব আত্মীয়রা কাজ বাগাতে আসে, মনে মনে হিংসে করে...আমাদের সঙ্গে মেলেও না কিছুতে...

—ছেলেটি কাজের জন্যেই এসেছিল বটে।

—কে বলল আসতে?

—আমিই বললাম।

—বাবা! আমার যা ব্যবসা, তাতে কোনো আত্মীয় ঢোকানো আমার নীতিবিরোধী। আমি চাই না, আমার ব্যবসা নিয়ে কথা হোক।

—আমার কোথাও যাওয়াও...

—যাবে কেন? ওরা কারা? এখানে তোমার অসুবিধে কি? ঘর বিছানা, টেবিল...বিকেলে হাঁটছ...বেড়াতে চাইলে ময়দানে যাও...গঙ্গার ধারে...

—না, সকলই সুবিধা।

—সোদপুরের ব্যাপারটা ভেবো।

—আরেকবার বলো।

—ধরো আমিই কিনলাম...

—কিনবে কেন? বাড়ি তো সকলের।

—বাড়িটার দাম কষলাম, প্রত্যেকের শেয়ার কিনলাম, টাকাটা তুমিই তো পেলে...

—কেমন করে? তুমি তো ওদের দিচ্ছ।

—আমি তোমার কাছেই কিনছি, তুমি ওদের যা দেবার দিও, নিজেরও রেখো...

—এত জটিলতা করবে কেন?

—কি করে বোঝাই! এখন জমি, বাড়ি, এ সবে যা টাকা...ও বাড়ি ভেঙে ফেললে...

—অনেক ফ্ল্যাট উঠবে।

—নিশ্চয়ই। সর্বত্র হচ্ছে। ফ্ল্যাট বাড়ির প্রোমোটার হলে এখন ঢেলে টাকা আসবে...

—অনেক টাকা?

—অনেক।

—বেশ, ভাবব।

—ভাবো, ভাবো। ঝটপট করো।

—ধরো, তুমি এটা করলে।

—কলকাতাতেও করছি।

—ভালো। কোথায়?

—গড়িয়া, চেতলা...

—ধরো অনেক টাকা হল।

—হবেই, হতেই হবে।

—তখন তুমি কি করবে?

—আমি? আমি এখানেই থাকব। প্রতি বাড়িতে ফ্ল্যাট রাখব একটা ভাড়া দেব।

বিশ্বনাথ বলেন, ভেবে দেখব? কি বলে বউমা? ভাবব না? বয়স পঁচাশি, ছেলেকে বাড়ি বেচে টাকা পাব...

—বাবা! ওখানে তো কেউ থাকবে না। তোমার যা আছে না আছে, তাতে তোমাদের কোনো দরকারও নেই। তোমাকে আমার আগেই...

—এ সব ভেবেছিলে?

—মনে হয়েছিল।

—সে জন্যেই আননি তো?

—না না...হে হে...তুমি ঠাট্টা করছ।

—ভালো, খুব ভালো।

মেজখোকা বেরিয়ে যায়। মালিনী ওঁর দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

—বউমা!

—বাবা!

—কোথায় কোথায় যাব বলেছিলাম...

—যাবেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাব।

—না মা, তা হয় না। হুকুম হুকুমই।

—ও আপনাকে হুকুম দেবার কে?

—মা! আমরা গেলেই তারাও আসবে। তোমাদের বৈভব দেখে কারো হয়তো চোখ টাটাবে, কেউ হয়তো এমনিতেই বেশি বেশি যাবে আসবে...ধরো কেউ যদি অপমানই হয়ে যায়...তুমি আমি কি করব?

—আমার...আমার যে কেমন লাগে। মন খারাপ কোর না।

—রবিবার দিলীপ আসবে।

—হ্যাঁ, ওটা ঠেকাবার উপায় নেই।

—আমি আপনার কাছে অপরাধী হয়ে থাকলাম।

—না, তোমার কোন দোষ নেই। একটা জিনিস শুনবে? শোনো।

কি বাবা?

—শোনোই না।

এক বাক্স ক্যাসেট। ক্যাসেটের ওপর তারিখ ও বিষয় লেখা। বেছে বেছে বের করেন বিশ্বনাথ।

—ও কি?

—শোনো, বুঝবে।

মালিনী শোনে।

—বলো তো দিনটা কেমন কাটল?

—খুব ভালো। মেজখোকা বউমা বাবি...সারাদিন কি ভালো লাগলো।

—ভালই তো লাগে সনকা।

—মেজখোকা ঠিক তেমনি আছে তাই না? মাছ কিনে আনবে ফরমাশ করে রাখবে, মেজবউমাও এতটুকু বদলায় নি। ওই চুলটা যা কেটেছে।

—মেজবউমা মানুষটা ভারি ঠাণ্ডা।

—আমার পছন্দ করা মেয়ে, হবে না? মেজখোকা কেমন সাদাসিধে, বউও তেমনি। আমি তো ছবি দেখেই বললাম, আর কোনো কথা নয়। এখানেই বিয়ে হবে।

—আমি কি বললাম?

—তুমি বললে, তুমি লক্ষ্মী, তোমার পছন্দে লক্ষ্মীই আসবে। তোমার তো আমার কথা বলতে...

—মেজবউমা কাছে থাকত যখন...

—বড় ভাল লাগত গো! বউ নয় তো, মেয়ে!

বিশ্বনাথ বন্ধ করে দেন।

—বন্ধ করে দিলেন?

—এরপর শুধু আমাদের কথা।

—আপনার কাছে এরকম ক্যাসেট ক'টা আছে বাবা? অনেক?

—অনেক। আমাদের তো শর্তই ছিল, যে আগে যাবে, তার কথা আরেকজন শুনবে।

শস্তার রেকর্ডার, শস্তার ক্যাসেট, বড্ড দামী জিনিস। মালিনী বলে, ভালো ক্যাসেটে রি—রেকর্ড করিয়ে দেব, ভালো রেকর্ডার দেব, শুনবেন।

বিশ্বনাথ বলেন, ও বাবা! অত টাকা তোমাদের আছে, যে ওঁর কেনা শস্তার রেকর্ডার, শস্তার ক্যাসেটকে টেক্কা দিতে পারে এমন মেশিন কিনবে? এর দাম কত জানো?

মালিনী জলভরা চোখে তাকায়। ঘাড় নাড়ে। এমন ক্যাসেটের দাম ও জানে না।

আজকাল কেউই জানে না।

ক্যাসেটটা শোনার পর মালিনীর মন যেন পূর্ণ হয়ে ওঠে। শান্তি পায় ও। মনে হয় না গুরুদেবের ধ্যান করি, তাঁর ছবি দেখি, ক্যাসেটে শুনি গুরুবাণী।

মনে যেন জোরও পায় ও।

এ বাড়িতে পাশাপাশি বাস করলেও কেউ কারো আপন নয়, তেমন হওয়াটা নিয়মও নয়। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, লাঞ্চ, ডিনার, ককটেইল (আজকাল কেউ চা খেতে ডাকে না) এ সবে ডাকলে যেতে পারো।

তেমন ডাকাও সকলকে ডাকা চলে না। যে—যার সে—তার মতো থাকো।

এ বাড়িতে খবর চালাচালি হয় দাসদাসী—জমাদার—ড্রাইভার মারফত।

গোপালও বলে যায়, কেডিয়াদের ছেলেমেয়ে এখন বাইরে, অন্য এলাকায়। কেন না বিগ জনি খুব মস্তান ছেলে। মুন ওর নাম পুলিশকে বলেছে, ওর শোধ ও নেবেই নেবে। মুন বলেছে যে পুলিশকে খবর দিয়েছে সেই বুড়োবাবু কি ছাড় পাবে।

বাবি নিবিষ্ট মনে সকালে জগিং ও তিনটে থেকে জিমন্যাশিয়াম চালিয়ে যায়। মা বলেছে, পাশ করলেই সকালে সেন্ট জেভিয়ার্সে কমার্স পড়বে, দুপুরে বিশ্রাম, তিনটে থেকে জিমন্যাশিয়াম।

মালিনী এখন নিশ্চিন্ত। মুনরা নেই। বাবি কথা শুনছে। মেজখোকা বাড়িতে এমন কিছু করছে না যাতে বিশ্বনাথ বিরূপ হন।

বরঞ্চ বলেছে, তোমার সঙ্গেই তো বনে বেশি বাবার। ওঁকে নিয়ে বেড়াও, ঘোরো, আর মাঝে মাঝেই বোলো সোদপুরের বাড়িটার কথা।

—আমি কেন বলব?

—কি আশ্চর্য, টাকাটা কার হবে?

—তোমার।

—বাঃ. মালিনী, বাঃ।

—টাকার হিসেব আমি রাখি, না জানি! তুমি যখন বলো, কাগজে সই করি। কিসে সই করছি তাও জানি না।

—তোমারই তো সব।

—এক সময়ে এত ছিল না। যা দিয়েছ তাতেই চালিয়েছি। এখন এত হয়েছে যা দিচ্ছ তাতেই চালাচ্ছি।

—সোদপুরে আজ ফ্ল্যাট তোলা মানে জনসেবা করা। মানুষের বসবাসের একটু জায়গা...

—বাবার ওই বাড়ি বাদ দিলে সোদপুরে আর জায়গা কি নেই?

—সর্বত্র ফাটকাবাজ।

—বাবার যা বয়স...

—হ্যাঁ, কদ্দিন বাঁচবেন।

—জানোই যখন, সবুর করো না।

—সবুর করলে বাড়ি পাঁচ ভাগ। তখন সকলকে রাজী করানো কাজে এগোনো...বাবির ভবিষ্যৎটাও ভাবো।

—বাবির ভবিষ্যৎ কি খুব অনিশ্চিত। জানি না তুমি এত নিশ্চিন্ত হয়ে থাকো কেমন করে। আমি তো ভাবলে কূল পাই না...

এই ফ্ল্যাট তিন হাজার বর্গফুট, অন্যটি বড্ড ছোট, আঠারো শো বর্গফুট। পার্ক স্ট্রীট, ডালহৌসিতে নামী—বেনামী দুটি অফিস গোলডিলক ম্যানসনে লীজ নেয়া ফ্ল্যাট (উদ্দেশ্য এনটারইনমেন্ট। সব মক্কেলকে বাড়িতে আনা যায় না), দুটি আপিসে ছয়টি গাড়ি বাড়িতে দুটি...

এই সব কিছুর মালিক মেজখোকা ভাবলে কূল পায় না কিছুতে মালিনী, স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে। তারপর বলে, দেখব।

—দেরি কোর না।

—সে আমি বলতে পারি না।

আঁচল উড়িয়ে চলে যায় মালিনী। মেজখোকা দেখে, যেন বদলে যাচ্ছে মালিনী।

দুপুরে ছেলে ও শ্বশুরের সঙ্গে খাচ্ছে। ডায়েট ছেড়ে দিয়েছে। আবার সুতির শাড়ি পরছে। চুল টেনে দেখছে কতটা লম্বা হল।

সেদিন বেশ জোর দিয়েই বলল, গোপালকে চাকরি করে দেবে বলেছিলে, কবে দেবে।

—দেব, দেব।

—ও তো অফিসার হবে না। হবে পিওন বা বেয়ারা। —সেটা করে দাও।

—এত তাড়া কিসের।

—চার বছর হল, ও আর থাকবে।

—দেখছি, দেখছি।

—লোক গেলে লোক আমি খুঁজতে যাব না।

—আমি যাব।

—এদিকে লোকজন পাওয়া, রাখা, খুব বিপজ্জনক। ওই তো কপোত কমপ্লেক্সের মালীটা সবাইকে লোক দেয়। পোর্ট এলাকার লোক যত। জাল সার্টিফিকেট দেখায় সব। ও বাড়িতে কতগুলো বড় চুরি—ডাকাতি হল বল তো। গোপালের মত লোক গেলে পাব।

—এবার ওকে করে দেব।

—টাকা আনছ, রাখছ লকারে, ও বোঝে না।

—দেব, বলছি তো!

বিশ্বনাথ যেন বদলে যাচ্ছেন। সোদপুরের কথা বললেই বলেন, ভাবছি মেজখোকা।

সত্যি বলতে কি, ছোটখোকা, বেবি, কাউকে বিশ্বাস পাচ্ছে না মেজখোকা। ''বাবা এসে ক'দিন থাকুন'' এ হেন সন্তানোচিত প্রস্তাবকে ও নাকচ করে দিচ্ছে।

—না না, আমার ওখানে উনি চমৎকার আছেন। মালিনী সর্বদা দেখছে পার্কে বন্ধু হয়েছে কিছু...

—বাঃ, আমরা ওঁকে কাছে পাব না।

—তোমরাই এসো না ঘন ঘন।

দীপক বলে, অযথা উদ্যম খরচে আমি নেই ভাই। সামনে তোমার বিবাহবার্ষিকী...কত বছর হল। আঠারো না উনিশ।

আঠারো

—শ্বশুরমশাই যেমন আছেন থাকুন না। উনি ঠিক সেঞ্চুরি করবেন। পাঁচ বছর তুমি, পাঁচ বছর ছোটখোকা, শেষ পাঁচ বছর বেবি।

বেবি বলে, বাবা জামাই বাড়িতে থাকবেন না।

দুটি গোলমেলে টেন্ডার ধরিয়ে দীপক এখন খোসমেজাজে। দীপক বলে, আরে দশ বছর বাদে জামাই কোথায়। উনি তো মেয়ের কাছেই থাকবেন।

—তুমি কোথায় থাকবে।

—মরদ কা বাৎ হাতি কা দাঁত প্রেয়সী! তখন আমি ''আশ্রয়'' হোমে থাকব। মোটা টাকা ফেলব, আলাদা কটেজ নেব, ভিডিও থাকবে। ওয়েস্টার্ণ ছবির ক্যাসেট আর পাঁচশো ডিটেকটিভ বই, ব্যস। টা টা গুড বাই!

—ছেলে—মেয়ে।

—তখন তোমার আটচল্লিশ, ছেলে—মেয়ের ত্রিশ—একত্রিশ। আমি ভাবব কেন। মেয়েকে তো কুড়ি না হতে বিয়ে দেব, তখন তুমি হয়তো দিদিমা!

—দীপকদা! কুড়ি না হ'তে।

—শিপ্রা! সবাই তুমি নয় ভাই। আমার কন্যা ও পুত্রের পেছনে যা খরচ করি তাতে দশটা ছেলে মানুষ করা যায়। কিন্তু কন্যাটি কোনমতে পাশ করে।

কৃতজ্ঞ মেজখোকা দীপকের কাছে। বাবা প্রসঙ্গটি ঘুরিয়ে দেবার জন্যে।

দীপক বলে, মালিনী এল না।

—না। ওর খুব স্বাধীন মতামত হয়েছে।

শিপ্রা ঈষৎ হেসে বলে, ভালো।

—ভালো নিশ্চয়, তবে বাড়াবাড়ি ভালো নয়। আমাদের ক্লাবের বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় কিছুতে জজ হল না। বলল, তোমার বউ বলেই এতদিন হয়েছি! আর না। আঁকার কিছু জানিই না যখন...অথচ একসময়ে মালিনী বেশ আঁকত...

ছোটখোকা ঈষৎ হাসে। বলে, আঁকত বড়বউদি। মেজবউদি সেলাই—টেলাই করত এক সময়ে...খুব গোছালো সংসারী ছিল।

বেবি বলে, সে এখনো আছে।

দীপক বলে, তোমরা এমনভাবে বলছ যেন গোছানো সংসারী হওয়াটা কিছু নয়। ওটা খুব বড় গুণ। মালিনীকে আমি খুব তারিফ করি।

এখানেই কথাটা ফুরোয়।

বিবাহবার্ষিকীর কথা বলতে মালিনী বলে, থাকুক এবার।

—কেন।

—মা গেছেন আজ সাত মাস...

—তা ব'লে আমরা কেন...।

—মা—বাবা কোনদিন বিবাহবার্ষিকী করেননি। আমরাই ষাট বছর হতে...সুখী দম্পতিদের বিজ্ঞাপন দেবার দরকার করে না।

—এ সবের সামাজিক দিকও তো আছে।

—দেরি তো আছে, দেখা যাক।

—এই রবিবার বেবিদের ডাকবে।

—না, এ রবিবারটা থাক।

—বেবি বলছিল।

—তা তুমিই যাও না। বাবিকেও নিয়ে যাও। ও তো সোনা রূপার সঙ্গে ভালই থাকে। ওখানে গেলে তোমরাও বিয়ার খেতে পারবে।

—ব্যাপারটা কি বলো তো।

—কিছুই না। সোদপুর থেকে বাবার কাছে দিলীপ আসবে বাড়ির খবর নিয়ে।

—দিলীপ কে।

—আশ্চর্য! মীরার বর।

—মীরা!

—বাবা—মার কাছে থাকত, ও বাড়িতে থাকে।

—ও!

—আমি না থাকলে...

—হ্যাঁ...আমি না থাকলে চলবে। কিন্তু তুমি না থাকলে...সে কি খবর আনবে।

—বাড়িটার খবর, আর কি!

—তা আসুক। বেশিক্ষণ যেন না থাকে। আসলে বাবাকে আমার কথাটা বুঝতেই হবে।

—কি কথা।

—সোদপুরের বাড়ির কথা। তখন বাবা উদার হলেন, গোবরডাঙার বাড়ি বেহাত হল।

—সে তো তোমাদের পিসীমার মেয়ে...সে সময়ে তার কিছু ছিল না...তোমাদের তো অনেক আছে...

—তুমি বুঝবে না।

—কেমন করে বুঝব। আমার মা—বাবাকেও কতজনের ভার নিতে দেখেছি...

—দেখ মালিনী, গোবরডাঙার বাড়ি মায়ের ভোগে গেছে। সে যাক। কিন্তু জমি মানে সোনা। সে বাড়ি তো আমাদেরই প্রাপ্য ছিল, তাই না।

—জানি না।

—সোদপুরের বাড়িও মায়ের ভোগে যাবে, দেখো। ওই সব মীরা, দিলীপ! ওপরের ভাড়াটেরা...

—কাকে কি বলছ? ওঁরা ডাক্তার। তোমার মা যেটুকু চিকিৎসা পেলেন, ওঁরাই করেন। মীরার মা, মীরা, দিলীপ, এরা বাবা—মাকে কিভাবে আগলে রাখত। মাইনে তো ওঁরা ভাড়ার থেকেই দিতেন, দেন।

—মাইনে, কতভাবে বাগাত, বাগাচ্ছে...

—দেখ! সোদপুরের চিঠি পান না বলে বাবাই ওকে আসতে লিখেছেন। তাই তুমি যদি থাকো, তাহলেও কোনভাবে অশান্তি কোরো না।

—ঠিক আছে, ঠিক আছে। ...কি জানো...আমারই ভুল! চিঠি বোধ হয় এসেছিল...

মালিনী ফ্যাকাসে হয়ে যায়।

—ওদের চিঠি এসেছিল?

—বোধহয়।

—কোথায় গেল?

—আমিই কোথাও...দেখব...

হতাশ গলায় মালিনী বলে, না। এখন দিও না। বরঞ্চ চিঠি আসে নি, বাবা তাই জানুন। চিঠি যদি দিতে, তাহলে হয়তো উনি ওকে আসতে লিখতেন না। কিন্তু...সে চিঠিতে কি ছিল যে তুমি বাবাকে দাও নি।

—গেঁয়ো লোকদের কৌশল যত। বাবাকে ওখানে নিয়ে যাবার চেষ্টা। ওঁকে না দেখে মন কত খারাপ হচ্ছে, মায়ের নামে ওরা তুলসী দিচ্ছে! রাবিশ! তোরা, তোরা দেবার কে? বাবার ছেলে, না নাতি?

—তোমরা তো কিছু করছ না। ওরা যদি...

—আরে যত ননসেনস। কোন গাছে কি ফুল ফুটছে, পাম্পটা তুহিন সারিয়ে নিয়েছে...বাৎসরিক যেন ওখানে করা হয়...

—এগুলো তো খুব নির্দোষ কথা।

—না। প্যাঁচ কষে বাবার মন গলিয়ে ওঁকে নিয়ে যাবার চেষ্টা। সেজন্যেই দিই নি। আমি চাইনি যে বাবার সঙ্গে সোদপুরের কোনো যোগাযোগ থাকুক।

—আমার কিছু বলার নেই। শুধু দোহাই তোমার, এ সব নিয়ে মাথার জট পাকিয়ে রবিবার বিয়ার—টিয়ার খেয়ে অসময়ে এসে পোড় না।

—এলে আসব।

—বাবার সামনে!

—আমি বাবার বাড়িতে নেই। বাবা আমার বাড়িতে আছেন। আমার জীবন যেমন তা জানলে জানবেন। আমি তো পাপ করছি না।

—আমার কিছু বলার নেই।

রবিবার এসে পড়ে। মালিনী যন্ত্রচালিত, যন্ত্রচালিত। মেজখোকা বাবিকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বিশ্বনাথ মালিনীকে বলেন, দিলীপ ভাত একটু বেশি খায় মা, খাটাপেটা মানুষ।

—হ্যাঁ বাবা। ভাববেন না।

—তুমি কি ভাবছ বল তো?

—কই কিছু না তো।

—কোনো আড়ম্বর কোর না।

—না না, মাছ দু'রকম...

—ওরা তো মাছ পায়ও না। খায়ও না বলতে গেলে। দু'রকম মাছ। দিলীপের মহাভোজ।

বিশ্বনাথ আজ অসম্ভব খুশি। ছোট ছেলের মতো। বলেন, তোমাকে তো বলাই হয় নি একটা কথা।

—কি, বাবা?

—আজকের দিনটা কি, তা জানো?

—না, বাবা।

—আজ ওঁর জন্মদিন। যদি থাকতেন, আজ পঁচাত্তর পুরে ছিয়াত্তরে পড়তেন। দেখ কি যোগাযোগ। আজকের দিনেই দিলীপ আসছে।

—দিলীপ তো মাকে খুব ভালবাসত।

—খুব। ছেলেটা এমন সৎ! এটা ওটা কেনা—বেচা করে পেট চালায় তা বাজারে কোন ফড়ের ব্যাগ পড়ে যায়। ও সেটা খুলেও দেখে নি। ঠিক তাকে পৌঁছে দিয়েছিল। কতজন বলল। নিয়ে নে।

—ও নেয় নি?

—সে ছেলেই নয়। ফড়ে তো অবাক। বাজারিয়া একটা ছেলে। দেড় হাজার টাকা। ছোট ব্রিফ ব্যাগ, তা একটা নোট সরায় নি? সে ওকে দুশো টাকা দেয়। তাই নিয়ে ও কারবার শুরু করে।

—কিসের কারবার?

—শস্তার লাইটার...টর্চ...হাতের কাজও জানে নানা রকম। আমরা তো কোনোদিন ইলেকট্রিকের কোন ব্যাপারে ছোটখাট মেরামতিতে কারিগর মিস্ত্রিকে পয়সা দিই নি।

স—ব দিলীপ!

—বাবা! মার সন্তান বেশি বয়সে হয়েছিল। তাই না? আজ ভাবছিলাম। বড়দার তো আটচল্লিশ।

—হ্যাঁ মা! প্রথম দিকে তিনবার হয়েই মরে যায়। অনেক চিকিৎসার পর...বড়খোকা হয় যখন, ওঁর প্রায় সাতাশ।

—সাতাশ!

—হ্যাঁ...সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল। সেই জন্যেই তো উনি বলতেন। ওরা আমার তপস্যার ফল, বিধাতার আশীর্বাদ!

—অত্যধিক আদর দিতেন?

—না না। বেশ শাসন করতেন। মারেননি কখনো, তবে রাগ ছিল।

কারা তপস্যার ফল, বিধাতার আশীর্বাদ? নির্লিপ্ত বড় ছেলে। টাকার নেশায় নির্লজ্জ মেজ ছেলে। অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক ছোট ছেলে। কখনো অস্থির কখনো শান্ত স্বার্থপর বড় মেয়ে। বিদেশে নিজের জীবন গড়তে ব্যস্ত ছোট মেয়ে?

—মারো না মারো, রাগটা দরকার।

—হ্যাঁ, বাবা।

—বাবি তো বেশ শান্ত হয়ে গেছে।

—হ্যাঁ।

—না চাইতে সব পেয়ে যায় তো। তাই এখনকার বড়লোকের ছেলে—মেয়েরা কোনো কিছুর মূল্য বোঝে না।

—আমরাও তো মন দিতে পারি না বাবা। তাই সর্বদা যা চায় দিয়ে...

—ওই ভুল কোর না। ঘুষ দিও না।

—বড় ভাবনা হয়। দেখি, কতদূর পারি।

—তোমার মা ছিলেন সম্রাজ্ঞী। আমি ওঁর সংসার সাম্রাজ্যে একটি কথাও বলতাম না।

—ওরা সোদপুরে পড়ল কেন? বাড়ি তো করলেন অনেক পরে।

—ঘোরার চাকরি। ওখানে জমি কিনলাম...জায়গাটাও ভালো লাগল...বাড়ি ভাড়া নিয়ে ওঁকে রাখলাম...আমারও রিটায়ার করার সময় হলো...এক্সটেনশান আরো ক'বছর তারপর...

—কলকাতায় ওরা?

—হস্টেলে থাকত।

—আপনাদের নিজেদের খুব মিল ছিল।

—তা ছিল। কোনো কাজেই উনি বা আমি, যেন সঙ্গে আছি, যেন একলা নই, এরকম একটা...কলকাতায় ছোট খোকার জন্যে ঘর ভাড়া...সে অনেক ইতিহাস। বললে ফুরোবে না।

—তারপরেও তো বাড়ি করলেন!

—উনি ছিলেন ব'লে। কত টেনে চলতেন। সংসারে কিসে সাশ্রয় হয়...সব উনি!

আর মালিনী নিঃসঙ্গ, নিঃসঙ্গ। এমন একাকিত্ব বড় দুঃসহ।

দিলীপ এসে পড়ে।

দিলীপ, তুহিন, বিদিশা।

—আসুন আসুন। এসো দিলীপ।

বিদিশা বলে, মেসোমশাই আছেন। লিখেছেন, ও আসবে। তা ও তো ভয়ে সারা।

—কিসের ভয়?

—এ সব বাড়িতে ঢুকতে আমাদেরই একটু সাহস লাগে, ওর তো লাগবেই।

—চলুন বাবার ঘরে।

ঘরদোর দেখতে দেখতে ওরা ঢোকে বিশ্বনাথের ঘরে।

দিলীপ আড়ষ্ট, বিশ্বনাথ খুশিতে উচ্ছল।

—এ যে সবাই মিলে!...বউমা!

—সব ঠিক আছে বাবা।

—বিদিশা বলে, আমরা খেয়ে এসেছি।

মালিনী বলে, শুনছে কে? আবার খাবেন। দিলীপ এত চুপচাপ কেন?

তুহিন বলে, ও ওর দাদুর সঙ্গে গল্প করবে।

—বিশ্বনাথ বলেন, দিলীপ চিঠি লিখেছিল বলছে?

—লিখেছি দাদু। তিনটে চিঠি।

—পাই নি তো। ঠিকানা ঠিক ছিল?

—ডাক্তার মামী লিখে দিয়েছিলেন।

—কি জানি ডাকের তো গোলমাল হয়। থাক, বাড়ির খবর বলো।

মালিনী বলে, আমরা ও ঘরে যাই?

—না না, তুমি থাকো। বুঝলে তুহিন। কলকাতায় বাস, সে আমার পক্ষে...এই বউমা আমাকে ভুলিয়ে রাখে। সব সময়ে আগলায়।

—বাবার যেমন কথা।

—যেন আমি ওর ছেলে।

বিদিশা বলে, সে তো হবেই। আপনার ছেলে বউয়ের কাছে থাকবেন...মীরার মা, ওরাও তা মানে কিন্তু আপনাকে দেখতেও...আমাদেরও ইচ্ছে হয়।

—আসেন না কেন? কলকাতায় তো আসেন।

—কাজ নিয়ে আসি তো...

দিলীপ বলে, বাড়ি যেমন ছিল তেমনই আছে দাদু। বাতাপি লেবুর গাছের গোড়ায় উই লেগেছিল, ওষুধ দিয়েছি। নারকেল গাছ ছাড়াতে হবে, ফল পাড়তে হবে...

—সে তো ভাদ্র মাসে রে!

—এই সাত মাস মা দিদিমার নামে তুলসী দিয়েছে। তা বছুরকির কাজ কোথায় হবে!

—বাৎসরিক! দেখি কোথায় হয়।

রব উঠে গেছে, বাড়ি ভাড়া দেবেন। সামনে লোক আসছে, খোঁজ নিচ্ছে। তা আমি বলি, আমি কিছু জানি না।

—তোরা কোন ঘরে আছিস?

—আছি রান্নাঘরের বারান্দায়! তবে রাতে আমরা বাইরের ঘরে শুই, মা ওদিকে দুটো দিকেই পাহারায় থাকে। মীরা একটা নেড়ি কুকুর পুষছে, সে বাগানে...

—বাগানের আলো তো জ্বালা থাকে?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ।

তুহিন বলে, আপনি বলেছিলেন নিচের ইলেকট্রিক বিল, বাড়ির ট্যাক্স ভাড়া থেকে কাটান করে ব্যাঙ্কে জমা দিচ্ছি।

—কি রকম বোঝ? মিস্ত্রি লাগানো দরকার।

—একবার লাগলে ভালই হত...

—হ্যাঁ, পাঁচিলটা...বাইরের কলতলা...

—এই থলিটা কোথায় রাখব মামীমা?

—কি আছে?

—এই...

ডাঁটা, লেবু, লঙ্কা, বেগুন, হলুদ, জবা ফুল সেলোফেন মোড়কে বিশ্বনাথ হাত বোলান বারবার ফুলে।

বউমা! এখন নীল জবা, সাদা জবা, হলুদ জবা, রক্তজবা, গোলাপী জবা...ওঁর হাতে লাগানো।

—আমি সাজিয়ে রাখি আপনার ঘরে। দিলীপ, তরকারি নিয়ে এসো ভাই।

—এ সব জিনিসের স্বাদই আলাদা। আর কিচেন গার্ডেন তো মীরার মায়ের। উনি আর মীরার মা পরামর্শ করে করে...

আগে আগে আমিও কত এনেছি।

মালিনী বেরিয়ে যায়। বিদিশা ওর পেছন পেছন আসে। বলে, একটু দেখি। বিজ্ঞাপন ছাড়া তো দেখতে পাই না। এ সব।

নিকিতাশা ওভেন, কতরকম বাসন, ডীপ ফ্রিজ, এমনি ফ্রিজ। রান্নার ঘর বিদিশার শোবার ঘরের সমান।

মালিনী বলে, আমি অত কিছু সব সময়ে ব্যবহার করি না। গ্যাসেই কাজ চালাই। সুবিধে বোধ করি।

—বউদি! একটা কথা ছিল।

—বলুন না।

—কোথাও বসি।

—আমার ঘরে চলুন।

—চলুন।

মালিনীর ঘরে বিশাল আলমারি, বিশাল খাট, ড্রেসিং টেবিল, সবই পুরনো আসবাব।

—ওর সখ। নিলাম থেকে পুরনো জিনিস কিনবে, পুরনো ডিজাইন হবে, সে শুধু আমার ঘরে।

—একেক ঘরে একেক রকম?

—বলো কেন?

মালিনী কি যেন ভাবে। বলে, বিয়ের ফার্নিচার তো ফেলেই দিল। এ বাড়ির ঘর—দোর কারা যেন...নবীনা ইনটেরিয়ার ডেকোরেটর্স সাজিয়ে দিয়েছে!

—খুব সুন্দর তো।

—ওর শখ!

বিদিশা দেখে নেয় ঘরে ঘরে টিভি, ভি সি আর। না, বিলাসের উপকরণ অঢেল।

—কি বলছিলেন?

—মেসোমশায়ের সামনে বলা ঠিক হত না...একটু ডেলিকেট ও একদিন নন্দন (মেজখোকা) বাবুর আপিসে গিয়েছিল, ওদিকে কাজ ছিল ওর...

—ও কিছু বলেছে?

—বলেছিলেন—বাড়ি বেচে দেবেন...ওপর—নিচ খালি করবেন...মানে...

—কবে? সময় দিয়েছে?

—ওই বলেছে, মানে তুহিন, অন্তত তিন মাস সময় দিতে। উনি বলেছেন, সে সময় পাবেন আর এ কথা মেসোমশাই যেন না জানেন।

মালিনী বলে, কতদিন আগে?

—মাস চারেক তো বটেই।

মেজখোকা! ওর স্বামী!

—আপনাকেই বললাম।

—দিলীপরা জানে?

—না, ওদের বলি নি। আমরা বলার কে? আপনাদের বাড়ি, আপনারা যা কিছু করবেন তাই হবে। আমরা কেন বলব?

—এ কথা আমার—আপনার মধ্যেই থাকুক ভাই। এখনি এ কথা উঠছে না। বাবাকে বললে বাবা মনে ভীষণ আঘাত পাবেন।

—মাসীমার কাজ?

মালিনী অনেক দূরে চলে যায়। বেদনার্ত ওর হাসি। ও বলে আমার কথায় তো কিছু হবে না। ছোটছেলে বোধ হয়...সে ওরা ভাইবোনে যা ঠিক করবে...মা বাবা বিশ্বাস করতেন, আমিও করি, কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার কোন কথাই খাটবে না।

—আপনি তো স্ত্রী।

—ওদের মা, ওদের বাবা, ওর বাড়ি।

—এসব খাওয়াটাওয়া...

—বাবা কত খুশি হয়েছেন! বাবাকে তো এই কাছে পেলাম! ওঁর জন্যে কি বা করতে পারি...

—ওঁর প্রাণটা সনকাবাসে পড়ে আছে।

—একেবারে।

—ওঁদের মতো সুখী...

—দেখা যায় না।

—চলুন, ও ঘরে যাই।

—হ্যাঁ, আমি খাওয়ার ব্যবস্থা দেখি।

—আমরা চারটের মধ্যে পৌঁছতে চাই।

আজ বিশ্বনাথের পছন্দমতো সব রান্না। মোচার ঘন্ট, মটর ডাল, সুক্তনি, রুইমাছ ভাজা, রুইমাছের ঝোল। টক, দই, মিষ্টি বিশ্বনাথ খাবেন না ওরা খাবে।

টেবিলে ওঁরাই বসেন। দিলীপ এখানে বসে খাবে না। ওকে রান্নাঘরে বসিয়ে খাওয়ায় মালিনী। ও শুধু বলে, এত পারব না মাসীমা। অভ্যেস নেই।

তুহিন হেঁকে বলে, সব খাও দিলীপ। অসুখ হলে আমি দেখব। আর মাদুলি নয়।

বিদিশা বলে, বলেন কেন! আমাদের দেখাবে, ওষুধ খাবে, সব করবে। কিন্তু মীরার মা টোটকা—তাগা—মাদুলি ঠিক আনবে। বিশ্বনাথ বলেন, আমাদের কম জ্বালাত?

মালিনী মনে মনে বলে, চলে যাক, চলে যাক ওরা। ও আসার আগে চলে যাক।

যাবার সময় হয়ে আসে। বিশ্বনাথ দিলীপের ঘাড়ে হাত রেখে বলেন, আবার আসবি। তোর চিঠি আমি এবার যেন পাই।

এবং মেজখোকা ঢুকে পড়ে।

ওকে দেখেই বোঝে মালিনী, ও বেশ তৈরি হয়ে এসেছে। শুধু বিয়ারে মেজখোকা এমন প্রমত্ত হয় না।

—এই তো! ফুল হাউস।

—তুমি ঘরে চলো।

—চুপ করো।

—বাবি কোথায়?

—পরে আসবে।

—তুমি ঘরে চলো।

—কেন?

—তুমি এখন...

—না, মাতাল নই। সরে যাও।

মালিনীকে ঠেলে দেয় ও।

বিশ্বনাথ বসে পড়েন ডিভানে। ছেলের দিকে তাকান।

—এই যে! তুহিন ডাক্তার এবং বিদিশা এবং দিলীপ। তোমরা ভেবেছ কি?

—ছি ছি ছি। চুপ করো।

—এটা কি হোটেল?

—নন্দনবাবু!

—ওখানে তো জেঁকে বসেছ। ভেবেছ ওপরে তিন পয়সা ভাড়া দেবে, নিচে বিনা পয়সায় কয়েকটা বস্তির লোক...না, তা হবে না।

—আমরা চলে যাচ্ছি।

—হ্যাঁ, এখান থেকেও, সোদপুর থেকেও। ওপর নিচ সবটা খালি চাই আমার।

—বাড়ি তোমার নয়। বাড়ি বাবার। বাবা যা বলবেন তাই হবে। তুমি বলার কে?

—চুপ করো। বাবা...বাবা...বাবা...বাবা আছেন এটা কোর না, বাবা আছেন ওটা কোর না...বাবাকেও বলে দিচ্ছি এ বাড়িতে তুমি আমার লাইফপ্যাটার্ন মেনে নেবে...বাবা!

—নইলে কি আমাকেও চলে যেতে হবে মেজখোকা? সেটাও বলো।

—ভেবো না ওখানে ফিরছ। এখানে না রাখি, তুমি ''আশ্রয়'' হোমে যাবে। তোমার জন্যে আমার জীবন যাত্রা আপসেট...

মালিনী বলে, চুপ করো।

—করব না।

—বেশ। তাহলে জেনে রাখো...

কি জানবে তুমি?

মেজখোকা মাতালের পক্ষে স্বাভাবিক, এমন ধূর্ত হাসি হাসে, আমিই বলছি। ওই দিলীপ বদমাশ তোমায় চিঠি লিখেছিল...

—লিখেছিল।

—আমি ছিঁড়ে ফেলি। আমি চাই না ওরা তোমার সেন্টু—মেন্টুতে সুড়সুড়ি দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাক। ও সব বদমাশিয়ে আমার জানা আছে। তুলসী দিচ্ছি! মার বাৎসরিক!

যত্তো সব...

—চলো বিদিশা।

—নিয়ে গিয়ে, তুমি চোখ বুজলে বাড়িটি ওপর—নিচে মিলে হাতিয়ে নিয়ে...নো! তা হবে না। এ বাড়িতে থাকতে হবে বাবা!

—বলো বলো। বিশ্বনাথের বিশ্বদর্শন হচ্ছে।

—নো আত্মীয়স্বজন, নো যোগাযোগ উইথ সোদপুর, ওরা তোমাদের দেড়েমুশে অনেক খেয়েছে। এখন আর অতীতের সঙ্গে...

—কোনো যোগাযোগ নয়।

—না। তোমার সময়ও হয়ে এসেছে। একটা বাড়ি ভিখিরিদের দিয়ে এসেছ, এ বাড়িটা আমি চাই। এরা ফুটে যাক।

—মেসোমশাই! কাঁপছেন কেন?

মালিনী বলে, বাবা!

বিশ্বনাথকে ওরা শুইয়ে দেয়। তুহিন নাড়ী দেখে।

বিদিশা বলে, ঠান্ডা জল! তোয়ালে!

মালিনী বলে, বাবার ঘরে নিয়ে চলুন।

বিশ্বনাথকে ওরা ঘরে এনে শোয়ায়। তুহিন বলে, না নার্ভাস হবেন না বউদি।

বিশ্বনাথ চোখ খোলেন। আস্তে বলেন, ব্যস্ত হয়ো না। হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গেল।

তুহিন বলে, বউদি! এ ফ্ল্যাটে কোনো ডাক্তার নেই? আমাদের সঙ্গে তো...

বিদিশা বলে, নাড়ী ভালো...তবু একটা কোরামিন ড্রপ দিলে ভালো হত।

মালিনী বলে, আমি আসছি।

ফ্ল্যাটের ডাক্তার গাইনি। রবিবার ওঁরা ভীষণ ব্যস্ত।

মালিনী বলে, একবার আসুন। বাবার প্রেসারটা...

মেজখোকা এখন ডিভানে চিৎ। ওর চোখ বোজা। ও বলে, ওসব বাবার অভিনয় মালিনী! তোমার সেন্টুমেন্টু...

মালিনী বলে, গোপাল! ভুবন! সায়েবকে তার ঘরে নিয়ে যা।

—আমার ঘরে? বেশ? প্যারাসাইটগুলো গেছে? ওদের তাড়াও, তবে তো যাবো।

মালিনী ঝুঁকে পড়ে বলে, এখনি যাবে। না গেলে তোমাকে আমি কি করি...

—বড্ড বেশি মারদাঙ্গা ফিলম দেখ...

ওর কথা জড়িয়ে আসে। নাক ডাকে।

ডাক্তার রুদ্র ঢোকেন। বিশ্বনাথকে দেখেন। না, তেমন কোনো ব্যাপার নয়। প্রেসারটা যৎসামান্য...এই সব ওষুধ...

তুহিনই চলে যায় আনতে। দিলীপ নীরবে কাঁদে। বিদিশার মুখ অপমানে লাল।

মালিনী বলে, ওর কোনো কথা আমল দেবেন না। বাড়ি বাবার। আপনারা থাকবেন।

বিশ্বনাথ বলেন, হ্যাঁ।

—চিঠির ব্যাপার আমি দেখব।

বিশ্বনাথ ক্ষীণ হাসেন। বলেন, তুমি!

—কথা বলবেন না মেসোমশাই। বিশ্রাম করুন।

—তোমরা তো জানো, আমার কোনো...

—অসুখ নেই, জানি।

তুহিন ফিরে আসে। ওষুধ পড়ে। বিশ্বনাথ ঘুমোন।

বিদিশা বলে, ওঁকে আজ...

—কেউ ঘরে ঢুকবে না। আমি থাকব।

—আমরা চলি।

—আসুন। আমার তো আর কোন ক্ষমতা নেই। আমি শুধু ক্ষমা চাইতে পারি।

—আপনি কেন ক্ষমা চাইবেন?

—আপনাদের শেয়ালদায় পৌঁছে দিই?

বিদিশা হাসে! বলে, আপনার গাড়ি হলে 'হ্যাঁ' বলতাম। ভাববেন না, চলে যাব।

দিলীপ হঠাৎ কেঁদে মালিনীর পা ধরে। বলে, যেদিন বলবেন, ও বাড়ি ছেড়ে চলে যাব মামীমা। আমাদের দাদুকে শুধু দেখবেন।

—ওঠো দিলীপ। দেখব।

—কোথায় পাঠাবে বলল।

—আমার কাছ থেকে?

মালিনী বেরিয়ে আসে। ঈষৎ হাসে। বলে, ওকে আমি জানি। তবু ওর হয়ে বাবার কাছেও ক্ষমা চেয়েছি সেদিন। মনে করতাম...কিছু মনুষ্যত্ব ওর তবু আছে...

বিদিশা বলে, ভাববেন না। আপনার তো কিছু করার নেই।

—আমি বাবাকে আনতে চাইনি। জানতাম একদিন না একদিন...আমার মতের কোনো দাম তো নেই। কি করব বলুন? আজ আপনারা যা দেখলেন...

—এটা আপনার প্রত্যহের অভিজ্ঞতা! চলি।

ওরা বেরিয়ে যায়। মালিনী পাথর, পাথর। বিশ্বনাথের ঘরের দু'টি দরজা বন্ধ করে। তারপর গোপালকে বলে, তোরা খেয়ে নে। কেউ এলে, যদি আমি ঘুমিয়েও পড়ি আমাকে ডাকবি।

—হ্যাঁ মা।

—সায়েব?

—ঘুমোচ্ছেন।

মালিনী বিশ্বনাথকে দেখে আসে। ঘুমোচ্ছেন। তারপর ডিভানে শুয়ে পড়ে। ঘুম আসে না, ঘুম এলে হবে না। এখন ওকে জেগে থাকতে হবে।

—মা!

—কি গোপাল?

—আমি দাদুর ঘরে শোব?

—না না। শুলে তো ঘুমোবি।

—মা!

—আবার কি?

—দিলীপদা বলছিল...

—কি?

—সোদপুরে গেলে ও মাদুলি দিতে পারে।

—মাদুলি!

—হ্যাঁ গো মা। খুব তেজী মাদুলি। বেকারের চাকরি হয়, আপাই ক্ষেতি দোষ কেটে যায়...

—যাস একদিন।

—আচ্ছা।

মালিনী জেগে থাকে। বিশ্বনাথকে সে কার হাত থেকে আড়াল করবে? ''আশ্রয়'' হোম! নিশ্চয় এ বিষয়ে ওখানে কোনো কথা হয়েছে। বেবির কথায় যত বিষই থাক, দাদারা ওর মতামত ছাড়া কোনো কাজ করবে না। দীপক কিছু বলতে যাবে না, খানিক বাঁকা পথ বলবে। ছোটখোকা ''হ্যাঁ'' বলবে। শিপ্রা কি বলবে?

বিকেলের অনেক পর, সন্ধ্যা হলে ওরা আসে। দীপক, বেবি, ছোটখোকা, বাবি।

—শিপ্রা?

—সে কথা কাটাকাটি করে বাড়ি চলে গেছে।

ছোটখোকা বলে, আমিও যাই।

—বাবার সঙ্গে দেখা করে যাও।

মালিনী বলে, আমার ঘরে চলো।

—কেন?

—বাবার শরীর ভালো নয়। ওঁর ঘরে আজকে কেউ যেও না। বাবার...

—মেজদা কিছু বলেছে?

—আমার ঘরে চলো।

—মেজদা কোথায়?

—নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছে।

—বাবাকে দেখব না, এ কেমন কথা। উনিই বা কি ভাববেন?

—এক ছেলে ওঁকে আজ...ওরা এ—ওর দিকে তাকায়। মালিনী ঘরে যায়। না, কফি, আতিথ্য, সৌজন্যের দরকার নেই। বেবির বাড়ি রবিবার মানে ছেলে—মেয়েরা দোতলায়।

বড়রা একতলায়। বিয়ার, রাম, স্কচ, মাংস, ভাত। এরা প্রত্যেকেই যথেষ্ট তৃপ্ত।

দীপক বলে, মালিনী!

—বলো।

—কালো কফি।

—বলছি, তোমরা?

—না, নাথিং।

—গোপাল! একটা কালো কফি।

—বউদি! মেজদা এসে কি...

—তাকে আসতে দিলে কেন?

—সে শুনল কারো কথা?

—ভালো।

সবাই আবার চুপ। মালিনী ওদের দেখছে।

—মেজদা এসে কি খুব...

—ওখানে বাবার বিষয়ে তোমরা কি কিছু ঠিক করেছ? কোন আলোচনা হয়েছিল?

—কথা তো মেজদাই বলছিল।

—আমি সঠিক জবাব চাই বেবি।

—ছোড়দা বলুক।

—বলছি মেজদা খুব হাই হয়ে যায়...

—সেটা তো তোমরা জানো। যখন ও বাড়িতেই ফিরবে, বাবা বাড়িতেই থাকবেন, সেটা তোমাদের দেখা দরকার ছিল।

—মেজদা কি খুব...

—আজ বাড়িতে দিলীপ, তুহিন আর বিদিশা এসেছিল। বাবা দিলীপকে আসতে লেখেন। কেন না, উনি লিখেছেন, ওর জবাব পাননি, উদ্বেগ হয়েছিল।

দীপক বলে, স্বাভাবিক।

—আজ সকালেই আমি ওকে বলি, দিলীপ আসবে। তখন ও ক্ষেপে যায়। তখন জানতে পারি চিঠি ঠিকই এসেছে ও বাবাকে দেয়নি।

—কারণ? দীপকই কথা বলছে।

—কারণ হল, ও চায় না সোদপুরের সঙ্গে বাবার কোনো সম্পর্ক থাকুক।

—তারপর?

—ফিরে এসে কদর্য ভাষায় ও ওদের তিনজনকে বেরিয়ে যেতে বলে। ওরা নাকি বাড়ি দখল করবে বলে ব'সে আছে! প্রথমেই বলে, এটা হোটেল নয়। যেহেতু ওরা খেয়েছে। তারপর ওদের যথেচ্ছ অপমান! বাবাকে বলে এ বাড়ি ওর। এ বাড়ির জীবনযাত্রা মেনে নিতে উনি বাধ্য। সোদপুরের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ওর টার্মসে। নইলে ওঁকে ''আশ্রয়'' হোমে পাঠাবে।

—তারপর?

—বাবার মাথা ঘুরে যায়। প্রেসার সামান্য হাই। ডাক্তার দেখেছে, ওষুধ পড়েছে, বাবা ঘুমোচ্ছেন। বাবার ঘরে আজ কেউ যাবে না।

বেবি বলে, তুমি বড় মাসীমার বাড়ি...

—হ্যাঁ, সেটা ও বাবাকেই বলেছে। এখানে থাকতে হলে কোনো আত্মীয়—স্বজন নয়।

দীপক বলে, ''কেন না তারা ভিখিরি।'' মেজখোকার ভাষা আমি জানি।

—আমাদের কাছে কি জানতে চাও?

—ওঁকে হোমে পাঠানোর বিষয়ে কোনো আলোচনা করেছ?

বেবি বলল, মেজদা যখন বলল, বাবাকে রাখার জন্যে তোমার স্ট্রেইন হচ্ছে, তখন অবশ্য ও কথাটা আমি বলি। ছোড়দাও সায় দেয়।

দীপক বলে, শিপ্রা ক্ষেপে যায়। বলে, মালিনী এ কথা বলতে পারে না। তোমরা সবাই অমানুষ। তোমার হয়ে ঝগড়া করে ও চলে যায়। এটা হল পাদটীকা বা ফুটনোট, যাই বলো।

মালিনী বলে, আমার দোহাই দেয়! ছি—ছি, কোথায় নেমে গেছে ও, কোথায়।

বেবি বলে, তোমার অসুবিধে না হলে তো চুকেই গেল। আর কথা কি?

মালিনী জীবনে প্রথম তিক্ত ও তির্যক হাসে। বলে, কথা আছে বই কি? বাবাকে আনার সময়ে আমার সম্মতি ছিল না। কেন না, আমি জানতাম দূরে থাকেন, সব জানেন না। কাছে থাকলে...

মালিনী উঠে যায়, জল খায়, ফিরে আসে।

—এ বাড়িতে ওঁকে আনার পর হুকুম হল, বাবা যেন কিছু না জানতে পারেন। মদের পার্টি, অমন ফ্ল্যাট, কল গার্ল! সন্ধ্যে থেকে ওকে ও ঘরে বন্ধ করে রাখো। ও—সব চেষ্টা করেছি, পারিনি। দু'দিন রাখতেই কি শুধু স্ট্রেইন আমার? বাবিকে কুসঙ্গ থেকে আগলানো, এ বাড়ির জীবন—পদ্ধতি থেকে বাবা আর বাবিকে রক্ষা করা...স—ব করে গেছি।

—খুব কষ্টকর।

—এ রকম হবে তোমরা জানতে। তবু...যাক, ওঁর ছেলেই ওঁর সামনে নিজেকে নগ্ন করে দিল। আমার লাভ কোথায় জানো? বাবাকে কাছে পেয়ে তবে আমি বুঝলাম তোমাদের মেজদার এই উন্মত্ত জীবনে তালে তাল দিয়ে আমার কি দুঃসহ ক্লান্তি বলো, ঘৃণা বলো, এসে গেছে। আজ সবাই ঠিক করেছ ওঁকে হোমে দেবে? তা বেবি, না ছোটখোকা, তা আমি হতে দেব না।

—কি করবে?

—দরকার যেমন বুঝব, তাই করব।

—বাবার বিষয়ে অবশ্য সকলেরই কর্তব্য আছে, কিন্তু তোমার বাড়িটাই বড় বলে...

—বাড়িতে তিন জনেরই জায়গা আছে। মনের দিকে...যেমন লাইফ প্যাটার্ন, সেখানে স্থানাভাব। কার স্থানাভাব? যিনি সকলের বাবা। যাঁর জীবন সম্পর্কে ধ্যানধারণা খুব অন্য রকম। যাঁর কোনো চাহিদা নেই। যিনি রাতে শুয়ে ওঁর আর মার কথাবার্তার কাসেট শোনেন। সেই লোকটাকেই তোমাদের মেজদা...

ওরা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। এ কি সেই মালিনী? ওরা তো যে—যার মতো তেমনি আছে। একা মালিনী এত বদলে গেল?

দীপক বলে, ও সব কথা থাক।

—না সবটাই শোনো। বাবার বিষয়ে এই হুকুম কেন? কেন না মেজদা চায়, সোদপুরের বাড়ি ভেঙ্গে ফেলে ফ্ল্যাটের ওপর ফ্ল্যাট তুলবে। কই! অবাক হলে না? তাহলে এ বিষয়েও কথা হয়েছে।

—আমি ও কথার মধ্যে যাই নি।

—তুমি না গেলে। বেবি? ছোটখোকা?

—কথাটা তো...

—খারাপ নয়...

—বাবার পঁচাশি। আর ক'বছর বাঁচবেন? যদি বা বাঁচতেন, ছেলে—মেয়েদের এ সব সিদ্ধান্তের ফলেই আগে মারা যাবেন।

দীপক বলে, ও সব কথা থাক। কিছু অন্য রকম হোক। তোমাদের বিবাহবার্ষিকীটা এবার...

মালিনী হাসে। বলে, আর তো হবে না দীপক। হলে তোমরা কোর। আমি তাতে থাকব না। হবেই না। যে সম্পর্কে...আমার এত চেষ্টার পর...এমন অপমান...আমার বাড়িতে ক'টা লোক ভাত খেয়েছে বলে...না আর নয়।

ওরা চেয়ে থাকে, চেয়ে থাকে।

—আর কোনো কথা আছে?

না, ওদের আর কোনো কথা নেই। ওরা বেরিয়ে যায়। বেবি বলে, কাল খবর নেব বাবা কেমন আছেন।

—বাবার কাছে যে আসবে, দয়া করে ও'কে আর আঘাত দিও না।

ওরা নিরুত্তর।

মালিনীর মনে মুক্তির বোধ, শান্তি। জীবনেও ও ভাবেনি এসব কথা ওদের বলতে পারবে।

ও বিশ্বনাথের ঘরে ঢোকে।

—বাবা।

—ওরা চলে গেছে?

—আপনি কতক্ষণ জেগেছেন?

—খানিকক্ষণ।

—ওরা চলে গেছে।

—তোমার শাশুড়ির তপস্যালব্ধ তিনটি রত্ন।

—আপনি শুনেছেন কোন কথা?

—উঠেছিলাম। তোমার কথা শুনছিলাম।

—আমার কথা...

—হ্যাঁ। এখন তোমার অনেক কাজ।

—উঠেছেন কেন?

—বারান্দায় বসি একটু।

—চলুন।

বিশ্বনাথ আর মালিনী বারান্দায় বসেন।

—বউমা।

—বলুন?

—তোমার সাহায্য চাই।

—যা সাধ্য সব করব।

—তবে শোনো।

বিশ্বনাথ বলতে থাকেন। মালিনী শুনে যায়। ঘাড় নাড়ে বারবার।

—আর দেরি নয়।

—না, দেরির কি?

শুক্রবার সকালে সৈকত বাড়ি আরেকবার চমকে ওঠে। এবারে আর পুলিশকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। কেন না বাহাদুর থানায় গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

—মেরা সাব...মেরা সাব...

—মালিনী বলে, বাবা যেন না শোনেন।

—না না, কে বলবে? কি ডেঞ্জারাস!

সেদিনের পর মেজখোকা খুব সংযত। মালিনী খুব স্বাভাবিক।

অবশ্য আজকের সকালটা অন্য রকম।

বিশ্বনাথই বলেন, কি তোমরা লুকোচ্ছ বলো তো? কি এমন কথা?

—কিছু না বাবা...

—আমি শুনেছি।

—শুনেছেন?

—হ্যাঁ। কেডিয়া গৃহিণীর মুখে অ্যাসিড বালব। পার্কের পেছনে সুপ্রভাত দত্তের মৃতদেহ।

—কে বলল? ছি ছি ছি...

—যতটা বিচলিত হব ভেবেছিলাম...তা হইনি মা! যা প্রত্যাশিত তাই ঘটেছে।

—আপনি তো ওঁর ঘরে গেছেন।

—হ্যাঁ। নিজের মনে নিজে থাকেন, গাছের ছবি দেখেন, নিঃসঙ্গ লোক।

—বাহাদুরকে ধরে নিয়ে গেল।

—সেটাও প্রত্যাশিত। আসল অপরাধীকে তো ধরা যাবে না, ধরলেও ধরে রাখা যাবে না...

মালিনী ভয়ে বিবশ হয়ে থাকে।

কোন সমাজে বাস করছে ওরা, কোন ব্যবস্থায়? বলে বাহাদুর কাল সন্ধ্যার পর থেকে ওঁকে খুঁজছে আর খুঁজছে। ও নিজেও তো ভালো দেখে না।

—শুনলাম। সকালে পেয়েছে।

—আর মিসেস কেডিয়া...

—উনি এখন তো...

—বাঁচবেন?

—জানি না।

—তুমি এখন কি করবে?

—আমি বাবিকে আমার মায়ের কাছে রেখে আসি বাবা। এ বাড়িতে রাখতে ভয় লাগছে।

—মেজখোকা?

—ওকে বলেছি।

—রাজী হল?

—খুশি হল না, রাজী হল।

—তা হলে তো...

—আমাদের কথা ঠিকই থাকছে।

—চিঠি লিখেছ?

—পরদিনই।

—ভালো। খুব ভালো।

মালিনী বাবিকে নিয়ে চলে যায়। বিশ্বনাথ একটি নতুন ক্যাসেট বের করেন। মানুষ কোথায় নিরাপদ? নিজের ঘরে নয়, নিজের নৈঃসঙ্গ নয়। সর্বত্র শান্তিকামী মানুষ বিপন্ন, বড় বিপন্ন।

আজকের দিনটা খুব দরকারী। নিজের গলা নিজে রেকর্ড করবেন।

সুপ্রভাত দত্তের হত্যা ও মিসেস কেডিয়ার ঘটনা নিয়ে সৈকত গুজবে ফেটে পড়ে।

ওঁদের মধ্যে কোনো গোপন সম্পর্ক ছিল।

সুপ্রভাত পার্ক থেকে ড্রাগ আনতেন।

এর মধ্যে কেডিয়ার মেয়ে...

বাহাদুর কিছু জানে।

সুপ্রভাত কিছু জানতেন।

ভদ্রমহিলার একটা চোখ গেছে।

আসলে কে কোন ফ্ল্যাট কিনছে...

ফ্ল্যাট মালিকরা সৈকতের জন্যে সিকিউরিটি এজেন্সিকে খবর দেয়।

প্রেসের লোকেরা ভিড় করে থাকে।

এসব নিয়ে মেজখোকাও বিব্রত, বিব্রত। প্রেসের লোকজনকে বিশ্বাস নেই। সৈকত বাড়ির আদ্যোপান্ত ইতিহাস লিখে বসে থাকবে।

কার ক'টা ফ্ল্যাট, কে কি করে...

—প্রেস এলে ঢুকতে দিও না।

—না না, তাই দিই?

—বাবা ওকে চিনতেন না জানলে তা থেকেই একটা গল্প বানাবে।

—বানাবে না।

—আমি যাচ্ছি, তাড়াতাড়ি ফিরব।

—বিকেলে!

—হ্যাঁ, হ্যাঁ।

—আমিও বেরোব।

—কোথায়!

—মার্কেটিংয়ে।

—দেরি কোর না।

—তাই করি!

মেজখোকা বেরিয়ে যায়। না, মালিনী খুব শান্ত আছে। যথেষ্ট সহযোগিতা করছে। বাবাও চুপচাপ হয়ে গেছেন খুব।

বেরোবার সময় মেজখোকা বাবাকে বলে যায়, বাবা আসছি।

—এসো।

এ রকম কয়েকদিন ধরেই বলছে ও।

এক উত্তরই পাচ্ছে।

বিকেলে ফিরে এসে তবে মেজখোকার মনে হয়েছিল বাড়ি যেন বড় বেশি চুপচাপ।

—ভুবন! গোপাল! রাজু!

—সায়েব!

—সব গেল কোথায়?

—মা তো সকালেই দাদুকে নিয়ে...

—গোপাল!

—গোপালও সঙ্গে গেছে।

—কোথায় গেছেন!

—দাদুর জিনিসপত্র নিয়ে...

—কি!

বাবার ঘর শূন্য, শূন্য। মায়ের ছবি...ওঁর ওষুধ...চটি...মেজোখোকা টেলিফোনের কাছে ছুটে যায়। ছোটখোকা! শিপ্রা! বেবি! দীপক! এটা এস ও এস!

দীপকের গড়ানো গলা, কি হল! আবার কাউকে খুন করলে না কি!

—ঠাট্টা—তামাসা নয় দীপক।

—কি হল!

—বাবা...বাবা...

—মারা গেছেন!

—ও, নো নো নো। পালিয়েছেন।

—পালিয়েছেন!

—সঙ্গে মালিনী।

—মালিনী।

তোমরা এসো।

সবাই ছুটে আসে। সবাই কৌতূহলী। মেজখোকা চুল খামচাতে থাকে। দীপক বলে, হ্যাভ ওয়ান। মেজখোকা ক্ষেপে যায়।

—এটা ইয়ার্কির সময় নয়। বুঝতে পারছ বাবা সোদপুরে গেছেন...মালিনী নিয়ে গেছে...

দীপক হাসতে শুরু করে। বলে, বুড়োর হাড়ে হাড়ে ভেলকি ভাই। কোনো কিছু না জানিয়ে...

ছোটখোকা বলে, পরিষ্কার।

—কি পরিষ্কার।

—খুনটুন দেখে...

—ভয় পেয়েছেন।

—তা ছাড়া কি!

বেবি বলে, তোমারই দোষ মেজদা। সেদিন ওরকম কাণ্ড না করলে...

—তা বলে চলে যাবেন।

—যাবেন নয়, গেছেন।

—কোনো চিঠি নয়...কিছু নয়...

—দাঁড়াও দেখে আসি।

দীপক দেখতে যায়। তারপর হো—হো করে হাসতে হাসতে ঢোকে। বলে, ভাই। শ্বশুরমশাই যে এরকম মডার্ন, কে জানত। ভাবতে পারো ওঁর ছেলেমেয়েদের জন্যে...একটি ক্যাসেট। উপরে লেখা চিলড্রেন্স।

বেবি বলে, গুরুবাণী তো শোনো। এবারে বাবার বাণী শোনো। তুমি মেজদা। হড়বড়িয়ে সব করতে গিয়েই সব গোল পাকালে।

—মালিনীর আস্পর্ধাটা দেখলে! ওকে...

ছোটখোকা বলে, বউদি সে বউদি নেই আর।

—কি বলেছেন উনি!

বাবির ঘর থেকে প্লেয়ার আনে দীপক। বলে, শোন তোমরা।

—তুমিও শোনো।

—হ্যাঁ হ্যাঁ...ওঃ ক্লাবে যখন গল্পটা ছাড়ব, যা জমবে না?

—খবরদার!

—চোখ পাকিও না বেবি।

এতক্ষণ নিশ্চুপ থেকে এখন শিপ্রা বলে, চালাচ্ছি।

মেজখোকা, ছোটখোকা, বেবি।

আমি বেশ কিছুদিন আগেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

সেদিন মেজখোকা আমাকে সাহায্যই করেছে। বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে সব।

চলে যাব বলে আসি নি। হয়তো চলে যেতাম না। কিন্তু এখানে এসে পরিষ্কার বুঝলাম, তোমাদের বাড়ি যত বড়ই হোক, তোমাদের জীবনে আমার জন্য কোনো জায়গা নেই।

দোষ দিই না। তোমাদের জীবনযাত্রা অন্য রকম, মূল্যবোধ অন্য রকম, সেখানে আমি খুবই বেমানান।

সেদিন বৌমার সঙ্গে তোমাদের কথা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনলাম। শেষ অবধি হোমের কথাও ভেবেছ।

তোমাদের মা বলতেন, তাঁর তপস্যার ফল পাঁচ সন্তান, পাঁচটি রত্ন। তাই জেনেই গেছেন।

যার কেউ নেই সে হোমে যায়। আমি কেন যাব? আমার বাড়ি আছে, চিরকাল আমাদের দেখেছে, সে সব লোকজন আছে। উপরে ডাক্তার আছে, নীচে আমার ঘর, আমার বাগান, তোমার মায়ের লাগানো গাছ...

না, মেজখোকা, ছ'মাস বাঁচি, ছ'বছর বাঁচি, ''সনকাবাস'' ছেড়ে কোথাও যাব না। আমার মৃত্যুর পর এ বাড়িতে আমার ও তোমার মায়ের নামে নার্সিং হোম হবে। তেমন লেখাপড়াই করব। শর্ত দিলীপ, মীরা ও মীরার মা থাকবে কর্মী হিসবে। তোমাদের প্রত্যেকের যথেষ্ট আছে, আরো হবে। আমার স্বোপার্জিত যা তার ব্যবস্থা আমি ইচ্ছামতো করব। ''সনকাবাস''—এ আমাকে নিয়ে কেউ লজ্জায় পড়বে না, কারো জীবন এমন নয়, যে আমার চোখ থেকে লুকোতে হবে। লুকোতে তোমরা পারনি। বাপের চোখে এড়ানো কি যায়?

ইচ্ছা হলে দেখতে এসো। ইচ্ছা না হলে এস না আমি কোনো রাগ রাখিনি মনে। তোমার মায়ের কাজ। সে আমিই যেভাবে হয় করব। মেজখোকা। বৌমাকে কোনো অপমান কোর না। আমার বার্ধক্য ও বয়সের কারণে তাঁর সাহায্য নিয়ে এসেছি, এই মাত্র। পারলে তাকে মর‍্যাদা দিও, না পারলে অপমান কোর না, এটা অনুরোধ মাত্র। সকলে আমার আশীর্বাদ জেনো। ইতি, তোমাদের বাবা বিশ্বনাথ চৌধুরী। প্রার্থনা করি, তোমাদের সন্তানরা যেন আমাদের সন্তানদের মতো না হয়।

ঘস ঘস শব্দ। শিপ্রা রেকর্ডার বন্ধ করে।

মালিনী ঘরে ঢোকে।

বলে, সবাই এসেছ? বাবা, সোদপুর কি এখানে? ভালই হল। এত এত বেগুন লঙ্কা, ডাঁটা এনেছি।

—বাবা?

—আবার বাবার কথা কেন?

সহাস্য মালিনী বলে, বাবার অধ্যায় তো শেষ।

মালিনী ওদের দিকে তাকায়, ওরা মালিনীর দিকে। মেজখোকা মালিনীকে যেন প্রথম দেখে।

''বাবার অধ্যায় তো শেষ।''

কথাটাতে যেন কোনো ইংগিত থাকে। আর কোন অধ্যায়ের কি শুরু?

মালিনী কিছু বলে না। কিন্তু ঘরের হাওয়া যেন কোনো ছিলা—টান—টান উত্তেজনায় বিদ্যুৎতাড়িত হয়ে ওঠে।

পুত্র

সকাল থেকে বৃষ্টি নেমেছিল, নীরজা ভেবে পাচ্ছিলেন না কেমন করে বউ ছেলের স্কুল ও আপিসের ভাত দেবেন। গ্যাস নয়, কেরোসিন নয়, কয়লায় রান্না। ঘুঁটে ভিজে জাব, রান্নাঘরটায় জল পড়ে। এ ঘরের কোলেই কয়লা ঘুঁটে থাকে।

এ বাড়িতেই আরেকটি মিনি ব্যবস্থা আছে। আরেকটি ছোট ঘরে ভালো স্টোভ, জলের আলমারি, এমন কি কল পর্যন্ত।

ওটি বউয়ের। বউ বা ছেলের বন্ধু—বান্ধব, বউয়ের বাপের বাড়ির লোকজন এলে ও ঘরে বউ ডিম ভাজে, পাঁপড়, চা করে। ওর ছেলের জলখাবারও ও ঘরে থাকে। ওদের জলখাবারের ব্যবস্থাও ওখানেই।

ও ঘরে নীরজার ঢোকা বারণ। রত্না স্কুলে যায়। ছেলেকে নিয়ে যায়। নামী ও দামী স্কুল। ছেলেকে নিয়েই ফেরে। শুভ অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যে। নীরজা সাত বছরের ছেলের খাদ্যে কতটা ক্যালোরি দরকার তা বোঝেন না বলে রত্না ওঁর হাতে ছেলের রাতের খাওয়ার ব্যাপারটাও রাখেনি।

ওখানেই প্রেসারে গলা ভাত, নরম মাংস সিদ্ধ তরকারি, শুভও আজকাল বলে, মার রান্না আর খাওয়া যায় না এখানেই করলে পারো।

—লোক রাখলেই পারো।

না, এখনো লোক রাখা সম্ভব নয়। কেন না ওরা শুভর আপিসের কর্মীরা সমবায় করে যে বাড়ি করেছে তাতে ফ্ল্যাট নিচ্ছে।

টেলিভিসনের কিস্তি, ফ্ল্যাটের কিস্তি।

লোক রাখলে নীরজা বেঁচে যান। কিন্তু রত্নাই বলে যে একেবারে বসে থাকাটা কোনো কাজের কথা নয়। ''লোক রাখলেই পারো'' কথাটা রাগের কথা।

—আমি বাইরে খাটছি। উনি এটুকু পারবেন না কেন?

রত্নার বন্ধুরাও ওদের বাড়ি এসে বহুভাবে দুঃখ জানায়। কি সংগ্রাম করছে রত্না। বিবর্ণ বাড়িতে বাস। অত্যন্ত আনফ্যাশানেবল ঠিকানা, সতোরো বাই ষোল বাই তিনের—বি ধর্মঠাকুর লেন কি একটা ঠিকানা হল? সর্বোপরি, আজকের দিনকালে শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে বাস করা, ভাবা যায়?

রত্নার পাঞ্জাবী সহকর্মিণী জুলির অবশ্য কেন জানি না রত্নাদের বাড়ির সব কিছু খুব ''ইনটারেস্টিং'' লাগে। কি রকম আঁকা বাঁকা রাস্তা, পথে কি জঞ্জাল, বাড়িটা কি বিবর্ণ এটাই নাকি আসল কলকাতা। একদিন ও বলেছিল, (ইংরাজীতে) এই ধর্ম ঠাকুর কে? রবীন্দ্রনাথের পরিবারের কেউ!

রত্না বলেছিল, না ধর্ম ঠাকুর মানে... দেবতা, দেবতা বুঝলে!

—মন্দির আছে!

—না, থান আছে। মেলা হয়।

—তুমি গিয়েছ।

—না না, যা নোংরা...যা ভিড়।

—ইনটারেস্টিং।

রত্নার বাপের বাড়ির লোকেরাও বলে থাকেন, রত্না কি সংগ্রাম করছে, কতটা কষ্ট। আর শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে থাকা...আজকের দিনে।

রত্না তখন বলে, রান্নাটা করেন।

—সেটা আর এমন কি!

নীরজা শুনতে পান সব, বুঝতে পারেন সবই। কিন্তু তাঁকে সয়ে যেতে হয়, তিনি বাধ্য।

কোনো মতে উনোন ধরিয়ে উনি এদিকে আসেন।

রমাপতি এখন কানেও শোনেন না, চোখেও দেখেন না। নীরজা হাত ধরলে উনি বোঝেন। আর ওঁর কানের কাছে মুখ এনে খুব চেঁচিয়ে কথা বললে শুনতে পান, যদি নীরজা বলেন।

এখন রমাপতির হাত ধরে তুলে বারান্দায় আনেন নীরজা। মুখ ধোবার জল দেন। ঘরে নিয়ে বসাতেই রমাপতি চা চান। নীরজা মাথা নেড়ে চলে যান। চেঁচিয়ে যদি বলেন, সবুর করো, চা আনছি,—তাহলে বউ বিরক্ত হবে। সকালে যখন ওরা নিজেরা চা খায়, তখন রমাপতিকে এক পেয়ালা দিলেও পারে। সে কথা বলবেন কাকে?

পাখার তাড়নায় উনোন ধরিয়ে, এক কাপ চা করে নিয়ে তবে ভাতটা বসান। রান্নাঘরের তাক থেকে দুটি ফুসফুসে খাস্তা বিস্কুট। রমাপতির সামনে রেখে স্বামীর হাতটি কাপে ঠেকিয়ে দেন। রমাপতির মাথা বোঝাই সাদা কোঁকড়া চুল। শরীরের আড়া খুব বড়সড়। রমাপতি পরম খুশিতে মাথা হেলান।

এখন নিশ্চিন্ত। ওই চা আর বিস্কুট উনি তারিয়ে তারিয়ে খাবেন। তারপর একটি সিগারেট। সারাদিনে একটি।

বাসিনী বাজার এনে ফেলে। বাসিনী আছে বলে নীরজা বেঁচে আছেন। মাছটা কেটে দেয়, ধুয়ে দেয়। ডালটা ধুয়ে দেয়। ওঁকে সাহায্য করে ও বলে, ধন্যি বাবা। শাউড়িকে ঝি পেয়েছে।

এ কথাটা নিচু গলায়।

গলা চড়িয়ে ওই বাসিনীই বলে, এটা বলতেই হবে দিদমা, মামা মামীর কোনো ঝামালি নেই। ডাল, মাছের ঝোল, ব্যস!

নীরজা কোনো কথাতেই হ্যাঁ বা না বলেন না। রমাপতি অন্ধ এবং কালা। নীরজার কোনো ইন্দ্রিয় বিকল হয় নি, তবু ওঁকে বোবা হতে শিখতে হয়েছে। স্বস্বার্থে।

ডাল, ভাত, মাঝের ঝোল ওদের বারান্দায় টেবিলে পৌঁছে দেয়া। রত্না বাসিনীকে বলে, বাসিনী! ওই দুটো শাড়ি, একটা শার্ট, একটা প্যান্ট, আর বাবির মোজা ভেজানো রইল।

হ্যাঁ, মামীমা।

বাসিনী ওদের জামাকাপড় কেচে দেয়, যা বলে তা করে, এবং রোজই বলে, মামীমা চ্যায়রা রেকোচো বটে। কে বলবে অৎ বড় ছেলের মা!

এ সব কথা বাসিনী বলে স্বস্বার্থে। কেন না রত্নাও (স্বস্বার্থেই) বাসিনীকে ওর বহুবার পরা নাইলন, ব্লাউজ, পেটিকোট দেয়। নীরজার সঙ্গে কোন কথা না বলে রত্না ছেলে নিয়ে চলে যায়। শুভ অবশ্য বলে যায়, মা! আসছি।

—এসো বাবা।

ওরা বেরোলে তবে নীরজা তাড়াতাড়ি রুটি করেন ওবেলার, তরকারি ওবেলার মাছটা অন্যরকম করে রাঁধেন। এ সবের মধ্যেই এক সময়ে দু—পেয়ালা চা ও কালকের রুটি নিয়ে রমাপতির কাছে বসেন।

স্বামী আর স্ত্রী চায়ে ভিজিয়ের রুটি খান। রমাপতি বলেন, ক'টা বাজল?

এখন চেঁচানো যায়, সাড়ে ন—টা।

চা খাওয়া হলে রমাপতি নিজেই যান পায়খানায়। এখনো স্নানটানও নিজেই করেন। বাসিনী ঘরের কাজ সারে, কাপড় কাচে, মেলে। নীরজা ও রমাপতির কাপড় নীরজাই কাচেন স্নানের সময়ে। ওর তেমন আপত্তি হয়তো ছিল না, মাঝে মধ্যে কাচত, কিন্তু রত্না বলেছিল, মা! গরিব লোককে শোষণ করা কি ঠিক?

—কার কথা বলছ মা?

—বাসিনীর মাইনে আমরা দেব...আপনাদের ওই ময়লা, ভারি সূতির কাপড় ও কাচবে...এটা ঠিক নয়। ওকে আলাদা টাকা দিলে অবশ্য...

—কোত্থেকে দেব মা?

বাঃ। ভাড়ার টাকাটা পাচ্ছেন না?

ভাড়া বলতে বাইরে আদ্যিকালের দোকান ঘর। ভাড়া পঁয়ত্রিশ, লাইটের জন্যে পাঁচ। ওই টাকার মধ্যে নিজেদের তেল, সাবান, ওর পান, রমাপতির সিগারেট, রমাপতির জন্যে কখনও অ্যানাসিন, কখনো পেটের ব্যথার ওষুধ, গেঞ্জিটা, গামছাটা।

বোবা, বোবা নীরজা দীর্ঘকাল। যেদিন থেকে ছেলের বিয়ে হয়েছে। শুভ ওঁর জন্যে বসে থাকেনি। কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে উপার্জনশীল মেয়ে বিয়ে করেছে।

শুভ এ টুকু দয়া করে, কখনো সখনো মাকে দশটা টাকা দেয়। একবার বাবাকে একটা টনিকও কিনে দিয়েছিল, পুজোর কাপড় জামা।

কি ভাগ্য যে রমাপতির অসুখ—বিসুখ তেমন হয় না। পুরনো ঝি মালিনী, মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে। ছেলের চাকরি হতে কাজ ছেড়ে গিয়েছিল, ও এখন সুখী সংসারের কর্ত্রী।

ও এলে ওকে বসিয়ে নীরজা প্রাচীন কেঠো গরদটি পরে ধর্ম ঠাকুরের থানে যান। ধর্ম তলার মাঠই এখন পাড়ার বিবিধ ফাংশান সভা, যাত্রার জায়গা। ঠাকুরেরও রমরমা। ধর্ম পুজো চৈত্র মাসে, কিন্তু ওদের শনির থানও আছে। পূজারী একটা তত্ত্বও বের করেছে স্বপ্নাদেশের বহু ব্যবহৃত তত্ত্ব।

—তকন গভীর ঘুমে আচি। ধর্ম্ম ঠাকুর জানান দিচ্চে, আমার পুজো একবার, আমি ছোট ভাই শনি বিনে থাকতে পারচি না। তাকে আন। তা হলে সারা বছর পুজো চলবে।

সবাই জানে যে পূজারী এটা ধাপ্পা দিল। তবু সবাই শনির পুজো দেয়। যাত্রী ও ভক্ত বসার চাতাল আছে, এক সঙ্গে জড়ানো বট—অশ্বত্থের গাছ। পূজারী ভেবে রেখেছে, কিছুকাল চুপ করে থেকে ও আবার স্বপ্নাদেশ পাবে। এবারে স্বপ্নে শনি বলবেন, ওরে! আমার বোন শেতলা ছাড়া থাকতে পাচ্চি না। তুই সত্বর শেতলা পিতিষ্ঠে কর।

এই আদেশটি ওর বউ পেলে ঠিক হত। মেয়ে ছেলে স্ত্রী—দেবতার আদেশ পাবে। বউ নারাজ। সে বলে, ঘুমোলেই অচেতন, স্বপ্ন দেকলে তো স্বপ্নাদেশ পাবো?

ওই চাতালেই গিয়ে বসেন নীরজা। দুটি থানে পাঁচটি করে পয়সা দেন ও মনে মনে বলেন, ওঁকে রেখে আমাকে নিও না ঠাকুর। তাহলে ওঁর সর্বনাশ হবে। আমাকে রেখে ওকে নিও।

ওই বসে থাকাটুকু বড় শান্তির। আগেকার কথা মনে পড়ে। যখন ইচেছ স্বাধীন মতো আসতেন এখানে।

স্বপ্ন, স্বপ্ন সব! রমাপতি আপিস থেকে আসছেন, ওঁর জন্যে মিঠে পানের দোনা, ছেলের জন্যে ফল বা মিষ্টি আনছেন।

তখন তো সরকারি আপিসে মাইনে এত ছিল না। তবু অবসর নেবার পরেও পাট কোম্পানির আপিসে কাজ নেন। ছেলেকে ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ানো, শ্বশুরের রেখে যাওয়া ছোটবাড়িটি বড় করা, কত স্বপ্ন ছিল রমাপতির।

—দিনকাল বদলে যাচ্ছে, বুঝলে গো? আমার মতো মনমোহিনী স্কুলে পড়লে এখন আর হবে না! আমাদের কপালে নেই, তখনই সাতটা...মরে কোলেরটা ওকে তো বড়ো হতে হবে।

চারটি বড় ঘর, একটা ছোট ঠাকুর ঘর, দুটো বাথরুম, রান্নাঘর বেশ বড়ো।

—তুমি হেঁসেলে থাকবে, ঘর বড় না করলে...

এত ঘর কি বলছ, শুভর বউ আসবে, ছেলে মেয়ে হবে, সব ঘর লাগবে।

এখন দুটি ঘর ওদের দখলে। ঠাকুর পাট নীরজার শোবার ঘরে। ঠাকুর ঘরই ওদের মিনি কিচেন।

তখন এ পাড়া থেকে একা শুভ ইংরাজী স্কুলে যেত। ফটফটিয়ে ইংরাজী বলত, ঝকঝকে ইউনিফর্ম, বড় রাস্তায় বাস আসত।

সবাই বলত, শত পুত্র সম এক পুত্র হয়েছে আপনাদের।

রমাপতি বলতেন, বাপের মতো কবি তো হবে না। ওকে অন্যরকম হতে হবে।

ওই বাতিক ছিল রমাপতির। এত সব করেও উনি কবিতা লিখতেন, আর জীবনে নিজের জন্যে খরচ বলতে ওই, হাজার টাকা খরচ করে দু'খানি বই ছাপিয়েছিলেন।

স্বপ্ন, স্বপ্ন সব এখন। দু'খানি বই—ই নীরজাকে উৎসর্গ করা। ছোট ছোট পত্রিকার সম্পাদকেরা আসত। নীরজা চা করতেন, দিতেন। পাড়া কেন, অঞ্চল জুড়ে যত রবীন্দ্রজয়ন্তী, যত সাহিত্যসভা, সব তাতে রমাপতির সাদর আমন্ত্রণ।

সভাপতির মালাটি এনে নীরজাকে পরিয়ে দিতেন। বই বিক্রি হত না, বিতরণেই আনন্দ। তবু কবি বলে একটা আলাদা খাতির ছিল। পাড়ার পুজোর স্যুভেনিরে একটি কবিতা থাকতই। মনমোহিনী স্কুলের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে যে বই বেরোয় তাতে কৃতী ছাত্রদের তালিকায় দু'জন জজ, একজন সাব ডেপুটি, দুজন ডাক্তার ও সুকবি রমাপতি মিত্রের নাম ছিল।

আপিসের ফেয়ারওয়েলের মানপত্রেও রমাপতিকে কবি বলে সুখ্যাতি করা হয়েছিল।

রমাপতি বলতেন, সংসারের চাপ এতটা না থাকলে...হয়তো ...বুঝলে গো? তা শুভ দাঁড়ালেই আমার ছুটি। তখন অনেক লিখব।

নীরজা বলতেন, তা লিখো।

কিন্তু শুভ অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। বাবা মার সঙ্গে কথা বলার কোনো বিষয় খুঁজে পেত না ও। প্রথমত বাংলা ও পড়ত না, দ্বিতীয়ত বাবার কাব্যচর্চা বিষয়ে ওর কোন আগ্রহই ছিল না।

ওর শুধু মনে হত। এ জীবন থেকে বাঁধন ছিঁড়ে বেরোতে হবে।

''জীবন প্রবাহ'', ''কাল, কুহকিনী'', বই দু'খানা ও খুলেও দেখেনি। তৃতীয় বই ''আশা নিরাশা'' ছাপতে যাচ্ছেন জেনে ও বলেছিল, কেন, কেন, বই ছাপবেন?

—বাঃ! তোমাকে একটা বই না দিলে হয়? এটা তো সেজন্যেই...

—কেউ খরচ করে ছাপছে?

—না না, আমিই...

—কেউ কিনবে?

—কেনাটাই কি সব?

—কোনো বড় কাগজে লেখেন?

—কবিতা তো ছোট কাগজেই...

—আপনি ছাপলে ছাপতে পারেন। কিন্তু যা থেকে আপনি নাম বা টাকা কিছুই পাচ্ছেন না, সে বিষয়ে আমার কোনো সহানুভূতি নেই।

নীরজা বলেছিলেন, ওঁর টাকায় যদি ছাপেনই খোকা...

—তোমাকে বোঝানো সম্ভব নয়।

রমাপতির মনে খুব ঘা লেগেছিল। ধর্মতলার মাঠে যখন বেড়ান, মাস্টারমশাই, উকিল বাবু, হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, সবাই বলেন, কাব্যপ্রবাহ কি শুকিয়ে গেল?

স্কুলে স্কুলে এখনো বাণীবন্দনায় ওঁর লেখা কবিতাতে সুর দেয়া হয়। বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানা তো বলেন, আপনার কবিতা মেয়েদের পক্ষে খুব ভালো। কোনো আপত্তিকর চিন্তা বা ভাষা নেই। উচ্চ নীতিবোধ!

রমাপতি তো জানতেন, তিনি বড় কবি নন। ওই এলাকায় একমাত্র কবি হয়ে থেকে, চার—পাঁচটি ছোট কাগজে লিখে তাতেই ওঁর আনন্দ ছিল।

বড় বড় কবিদের বই পাঠাতেন, ঠিকানা যুক্ত খাম দিয়ে। তাঁদের তরফ থেকে প্রাপ্তি স্বীকার, কখনো সংক্ষিপ্ত প্রশংসা, এ সবেও ওঁর আনন্দ ছিল।

শুভর কথাবার্তা ওঁর কাছ থেকে সে আনন্দ কেড়ে নেয়। নীরজার সেদিনই বোঝা উচিত ছিল ভবিষ্যৎ কি হবে। শুভ এবং ওঁরা, দু জগতে বাস করছেন।

আজ মনে হয়, এর চেয়ে অনেক ভালো হত, শুভ যদি এখানেই পড়ত, বাপের মতো সাধারণ কাজ করত, একটি গেরস্ত মেয়ে বিয়ে করত!

মালিনী বলে, তোমার কথা ঠিক নয় গো! ছেলে যদি টানত, এই বউই যত্ন করত। তা ছেলেকে তো দাপে রেখে মানুষ করনি, তকন থেকেই দেকেচি মা হয়ে ছেলেকে ভয় পেতে। আমার ছেলে আমায় টানে, তাতেই আমি মান্যি পাচ্চি।

বিয়ের কত আগে থেকে শুভ কি হিসেবী, কি হিসেবী! বিয়ের সময়েও ওর কত হিসেব! বিয়ের পরেই অন্য কোথাও চলে যাবার কথা রত্না বলেছিল।

শুভ বলেছিল, গাধা না কি আমি? এখানে থাকব, ভাড়া লাগবে না। এ রকম জায়গায় থাকলে থাকার স্টেটাসও বাড়াতে হচ্ছে না। থাকতে থাকতে কোথাও ফ্ল্যাট কিনে নেব।

—ওঁরা?

—ওঁরা এখানেই থাকবেন। বাড়িটা আমারই হবে। তখন বেচে দেব। বাইপাসের কাজ হয়ে গেলে এ সব বাড়ি কি থাকবে? সব ভাঙা পড়বে। যে অত দামে কিনবে, সে এ বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট বাড়ি তুলবে।

নীরজা সবই বোঝেন, ওরা কেন এখানে পড়ে আছে। বোঝেন রমাপতিও। ছেলের ব্যবহারে আজকাল আর নীরজা আঘাত পায় না।

মনে হয়, মালিনীর কথাই সত্যি। শুভকে গায়ে আঁচ লাগতে দেন নি, অন্য স্কুলে পড়িয়ে...অন্যভাবে মানুষ করেছেন...আজ এমন ব্যবহার পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। বিয়ে তো ও আগেও করতে পারত। প্রোমশন হোক, মাইনে দু'হাজার হোক, তবে তো!

বিয়েও করল যাকে, সেও স্কুলে পড়িয়েছে, বিয়ের জন্যে টাকা জমিয়েছে।

বউভাত হয় কেয়াতলায়, বাড়ি ভাড়া নিয়ে। সব শুভই করে। রমাপতি ও নীরজার ভূমিকা সামান্যই ছিল।

তা শেষ বইটি, নীরজা হার বেচে ছাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। রমাপতি একটু হেসে বলেছিলেন, থাকুক। ওটা না হয় খাতাতেই থাকুক। শুভ তো ভুল বলেনি।

—ওর কথাই শুনবে?

—শুনতে হবে, শুনতে হবে নীরু। বুঝতে পারছ না? যা খুদকুঁড়ো আছে আর অপচয় করা নয়। তোমার আমার নামে চলো ব্যাঙ্কে ডিপোজিট করে রেখে আসি।

—কেন?

রমাপতি মাথায় হাত রেখেছিলেন ওঁর। বলেছিলেন আমি গেলে তোমার লাগবে, তুমি গেলে আমার। পেনশানের দুশো এগারো তো আছেই।

—কেন?

—তুমি বুঝতে পারছ না? আমি খুব বুঝতে পারছি। বাবার একটা সেন্টিমেন্ট যে বোঝে না... তোমার আমি, আর আমার তুমি ছাড়া আর তো কেউ থাকবে না।

—শুভ...শুভ...

—তুমি কাঁদছ?

কাঁদব না নীরু? শুভ এক কথায় কত বড় শিক্ষাটা দিল, কাঁদব না?

তারপরেই রমাপতির চোখের রোগ ধরা পড়ে। চিকিৎসা হল সাধ্যমত, অপারেশনও, কিন্তু কিছু করা গেল না। ম্যালিগনান্ট গ্লুকোমা। দেরিতে ধরা পড়ে।

না, শুভকে কেউ অবিবেচক বলতে পারবে না। সংসারে ও চারশো টাকা দেয়। পেনশনের টাকা, ওই টাকা তাতেই বাড়ি চালাও। দোকানের টাকা তোমাদের। ঝিয়ের মাইনে, ইলেকট্রিকের বিল ও থেকেই দিও।

—কেমন করে?

—যেমন করে পারো। হিসেব রেখো।

ওর মধ্যেই চালান নীরজা। রান্নাঘরটা মেরামতের কথা বলে দেখেছেন, কাজ হয় নি।

স্বামী যখন অন্ধ, ছেলে যখন পর তখন নীরজা বোবা না সেজে আর কি করবেন?

শুভও যখন বলে, তোমাদের জন্যে আমরা যথেষ্ট স্যাক্রিফাইস করছি। অন্যেরা বোঝে, তোমরা বোঝ না।

সে জন্যেই তো নীরজা ধর্মঠাকুরের চাতালে বসে থাকেন।

—হে ঠাকুর! ওঁকে রেখে আমায় নিও না। এটুকু দয়া করো।

নীরজা বয়সও তো সত্তর হল। স্বামীকে খাইয়ে নিজে খেতে বসেন যখন, বুক ব্যথা করে।

রমাপতি বলেন, ডাক্তার দেখাও।

কিসের ডাক্তার? দয়াময়ী ফ্রি ক্লিনিকের ডাক্তার তো দিলীপ! সে বলে, ভালো খান, বিশ্রাম করুন, বেড়াতে যান।

না, ডাক্তারের কাছে যান না নীরজা। স্বামীর কাছে শুয়ে থাকেন দুপুরে।

রমাপতি বলেন, ওরা ফ্ল্যাট তুলছে?

নীরজা ওঁর পিঠে লিখে দেন, হ্যাঁ।

—কবে যাবে?

—জানি না।

—এখন তো ওরা ঘরে নেই।

—না।

—তবে তো মুখে কথা বলতে পারো।

—বুকে ব্যথা করে।

—বিকেলে কাগজ পড়ে শোনাবে তো?

—হ্যাঁ।

বিকেলে বাসিনীকে দিয়ে রমাপতির জন্যে কখনো কয়েকটি কুচো নিমকি, কখনো চারটি গুঁজিয়া, কোনোদিন একটা আম আনান। রত্না বাসিনীকে বলে এ বয়সের লোককে ওই সব গুরুপাক জিনিস খাওয়াচ্ছেন, ভালো!

বাসিনী বলে, না না, দাদুর কোনো হজমের কষ্ট নেই গো মামী!

নীরজা মনে মনে বলেন, হোক, ওদের বাড়ি হোক। হলে দুটো ঘর রাখব, দুটো ভাড়া দেব, পেনশন আছে আমাদের চলে যাবে।

বাসিনী একদিন সহাস্যে বলে, বাড়ি বোধহয় ওদের হয়ে গেল গো!

জানতেন হয়ে যাবে তবু বুকে ঘা লাগে।

—হয়ে গেল?

নিশ্চয় তাই। নইলে মামীমা বলচে কেন তুইও চল আমাদের সঙ্গে?

—তুই যাবি?

—তাই যেতে পারি? এখানে করব, নয় ব্রিজের ওপারে, তবু যেতাম। ঘর ছেড়ে...সোয়ামি ছেলে...

বহুকাল পরে নীরজা সন্ধ্যা দিয়ে শুভদের ঘরের দরজায় দাঁড়ান।

—মা কিছু বলবে?

—বাসিনী বলছিল, তোমাদের বাড়ি হয়ে গেছে।

—শুভ যে শুভ, সেও খানিক লজ্জা পায়।

—বাসিনী বলতে গেল কেন? আমিই তো!

—হয়ে গেছে?

রত্না বলে, হ্যাঁ, হয়ে গেছে।

—তোমরা চলে যাবে?

রত্না সহসা খুব আপন—আপন গলায় বলে, তা তো আপনি বলবেন।

—আমি!

—বাঃ, বাড়ি দেখবেন, গৃহপ্রবেশের পুজোর ব্যবস্থা করবেন, তবে তো।

—ওঁকে রেখে আমি যাব কি করে?

—উনিও যাবেন সেদিন।

—সব চুরি হয়ে যাবে বউমা।

শুভ বলে, সে পুজো—টুজো হয়ে যাবে।

—বড় বাড়ি?

—নাতি বলে, হাঁ ঠাম্মা। তিনটে বেডরুম, দুটো বাথরুম, ডাইনিং কাম সিটিং স্পেস, কিচেন ব্যালকনি...

শুভ বলে, তোমরাও যাবে...দেখবে...অবশ্য গেলেও আমরা আসব ঠিকই। আমি তো নিশ্চয়...

নীরজা আস্তে বলেন, তোমার বাবাকে বোল।

নাতি বলে, বাড়ির নাম মধুমালতী ঠাম্মা।

—বেশ নাম।

শুভ বলে, মা।

—বলো?

—আমরা চলে গেলে তোমরা অবশ্য...

নীরজা ওঁর শতপুত্রসম এক পুত্রের দিকে চেয়ে থাকেন। ওঁর মুখে একটা দুর্বোধ্য হাসি ফুটে ওঠে। উনি বলেন, আমাদের জন্যে ভেব না। নয় দুটো ঘর ভাড়া দেব। তাতে... পেনশানে আমাদের চলে যাবে।

রত্না বলে, ভাড়াটে বসালে তো আগামও পাবেন মোটা।

বেশ অনেক হবে।

শুভ বলে, সে দেখা যাবে।

—তোমদের খরচা অনেক থাকবে এখন। আমাদের জন্যে আর...

শুভ এই বিবর্ণ, নীরক্ত, আধময়লা কাপড় পরা অচেনা মহিলার দিকে তাকাতে পারে না।

নীরজা চলে যান।

রত্না বলে, সেন্টিমেন্টাল হোয়ো না শুভ। ওঁকে যত অসহায় মনে করো, ততটা উনি নয়। দেখছ না, বাড়ি ভাড়া দেবার কথা টথা ভেবেই রেখেছেন আগে ভাগে।

শুভ শান্ত গলায় বলে, মা এত রোগা হয়ে গেছেন...কাপড় এত ময়লা...বাবাকে তো কতদিন ঘরে ঢুকে দেখিই নি...মনটা কেমন হয়ে গেল রত্না।

নাতি বলে, তবে ঠাম্মাদেরও নিয়ে চল।

রত্না বলল, বড়দের কথার মধ্যে কথা বোল না।

তারপর স্বামীকে বলে, এটা তো ভালই বলেছেন মা। ধরো ভাড়াটে যদি টাকা দেয়, তাহলে সে টাকা থেকেই বাড়ি সারাতে পারবেন, ভালোই থাকবেন।

—অর্থাৎ আমাদের আর আর্থিক দায় থাকবে না?

—না, কিসের দায়?

শুভ একটু হেসে বলে, সবই সত্যি। তবে এই প্রথম নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে কেন যেন...বাবা অন্ধ! মা কেমন করে ভাড়াটে খুঁজবেন, বাড়ি সারাবার ব্যবস্থা করবেন?

—পারলেই পারা যায়। আমাদের বাড়িতে অবশ্য বাবা অন্ধ অপটু নন, কিন্তু বাড়ি সারাই, ভাড়াটের সঙ্গে এগ্রিমেন্ট সব মা করেন।

শুভ বলে, মা তো কোনদিন বাইরে বেরোননি।

—সে যদি তোমার বাবা ফিউডাল হন।

সুবিধার্থে বিবাহ, ম্যারেজ ফর কনভিনিয়েনস... শুভ কিছু বলতে পারে না। এভাবে জাগতিক সুখসুবিধাগুলি অর্জন করা যাবে বলেই তো দু'জনেই হিসেব কষে বিয়ে করেছে।

নীরজার কিন্তু খুব হালকা লাগে। সবসময় এক বাড়িতে থেকেও কাছে ছিলেন না, নামে যশে দূরে চলে যাচ্ছে, তাই যাক।

হালকা লাগে, আবার সেই সঙ্গে চাপা বেদনা। আর কি ওদের দেখতে পাবেন? কবে?

রাতে শুয়ে মনে হয়, আর অশক্ত শরীরে সকাল থেকে রান্নাঘরে ছুটতে হবে না, থাকতে হবে না, ভয়ে ভয়ে। তাতে ভালো লাগা উচিত, কিন্তু চোখ দিয়ে জল পড়ে নীরবে।

রমাপতি বলেন, কাঁদছ নীরু?

নীরজা পিঠে লেখেন, এমনি।

—না, এমনি নয়। ...ওরা চলে যাচ্ছে।

হ্যাঁ।

রমাপতি ওঁকে কাছে টেনে নেন, গায়ে হাত বোলান। নিচু গলায়, প্রগাঢ় মমতায় বলেন, চোখ হারালে দিব্যচক্ষু হয়। তোমার কখন কি হয়, তা সব বুঝতে পারি। কেঁদ না। আমার চোখ যখন গেল, দেহ শক্ত, কর্মক্ষম, চোখ চলে গেল। সে যাওয়া তো মেনে নিয়েছিলাম নীরু।

—হ্যাঁ।

—ওরা চলে যাবে, তাও মেনে নাও। যা হবে, যা ঠেকানো যাবে না, তা মেনে নেয়াই ভালো। আর, কাছে থেকেও তো ও কাছে ছিল না।

নীরজা চোখ মোছেন।

—এ আমি বহুকাল আগেই বুঝেছিলাম, যখন বই ছাপা নিয়ে...তখনি তোমাকে বলেছিলাম, আমার তুমি, তোমার আমি ছাড়া কেউ নেই।

নীরজা বলেন, ঘুমোও। পিঠে হাত বুলিয়ে দিই।

শুভর মনে, বাবা—মাকে একলা রেখে যাচ্ছে বলে ক্ষণিকের যে বিবেকদংশন হয়েছিল, তাতে প্রলেপ দিয়ে দেয় দোকানী, ওদেরই ভাড়াটেটি।

বলে, এখনি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ভাড়াটে মজুদ, অ্যাডভান্স দেবে, লেখাপড়া করে দিচ্ছি।

—আমি থাকতে থাকতে...

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি থাকতে থাকতেই। একেবারে লেখাপড়া করে ভাড়াটে ঢোকান। মোটা আগাম নেবেন, ঘর তো বড় বড়, তবে আলাদা ব্যবস্থা তো নেই। লাইট বলে এত দেবে, ভাড়া থেকে কাটান দেবেন কিছু। এ সব কাকে...বাড়ি মেরামত না করে তো...

—মেরামত...চুনকাম...

—সব আমি করিয়ে দেব।

—ভাড়াটে কোথায়?

—আমার হাতেই। আমার ভাইপো...বাজারে তিনটে দোকান...ওতো কবে থেকে খুঁজছে।

নীরজা বলেন, ওর কথায় ভরসা কি? আজ ঢুকল, কাল থেকে যদি ভাড়া না দেয়? এখন তো এরকম হচেছই।

তুমি পারবে না, আমিও পারবে না, কাউকে তো বিশ্বাস করতে হবে?

—আমি পারব।

—কাকে চেনো তুমি?

—দয়াময়ীতে দেখাতে যাই। দিলীপ ডাক্তার রাস্তার ওপর ঘর খুঁজছে। ওকেই বলব।

—বেশ তাই করো। তবে এমন ভাবে কিছু লিখে দিও না, যাতে পরে ভাড়াটে তুলতে কষ্ট হয়।

যেহেতু একথাটা ও খুব জোরে বলে, সেহেতু রমাপতিও শুনতে পান। তিনি নিজেই দরজায় এসে দাঁড়াল, শুভ।

—তুমি উঠে এলে কেন?

—কেননা বাড়িটা আমার বলে। তোমার কথা আমি শুনেছি। ''পরে'' মানে আমাদের মৃত্যুর পর তো?

উনি ঈষৎ হাসেন, তোমার তখনো কোনো অসুবিধে হবে না শুভ। এক বাড়িতে দু—রকম রান্নার ব্যবস্থা করতে, মাকে দিয়ে দাসীবৃত্তি করাতে, নিখরচায় থেকে অন্যত্র ফ্ল্যাট করে নিতে, কোনোটাতে তো তোমার অসুবিধে হয়নি? তোমার বাপ মা কোনো অসুবিধে তো করে নি তোমায়। তখনো করবে না। তোমার কবে কিসে অসুবিধে হয়েছে? হয়নি তো!

—বেশ যা মনে হয় তাই করুন।

—চেঁচিয়ে বলো!

—যা মনে হয় তাই করুন।

তুমি আমাদের কি হবে, তা নিয়ে ভেব না। তোমার মা তোমাকে চেনেন নি, আমি অনেকদিনই চিনেছি। এবং তোমাকে আমি অ্যাডমায়ার করি। আমার মতো ব্যর্থ, পশ্চাৎপদ হতে চাওনি, সফল ও সার্থক হতে চেয়েছিলে, হয়েছ। এখন, যাবার আগে কোনো তিক্ততা করার দরকার দেখি না।

শুভর নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণার বেলুনটি এ ভাবে ফুটো হয়ে যায়। এত চেঁচিয়ে কথা বলে ও নিজের ভাবমূর্তি যেন নষ্ট করে ফেলে। পাড়ার সব বাড়ি এত গায়ে গায়ে, রাস্তা বাড়ির এত সামনে।

নীরজা ওঁর হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যান। রমাপতি বলেন, যখন চোখে দেখি। তখনি লিখে ব্যবস্থা করে রেখেছি যে আমার পর বাড়ি তোমার মায়ের। আমি মরলাম, ওঁকেও তুলে দিলে, সে যদি ভেবে থাকো...

শুভ বলে, তুমি আমায় কি ভাব, অমানুষ?

—না না, তা ভাবব কেন? তুমি আমাদের বয়সী লোকদের উত্তর প্রজন্মের তাদের মধ্যে একজন, যাদের আমাদের মতো লোকেরা চেনে না, বিশ্বাস করে না। তুমি মানুষ না অমানুষ, তা আমি কেমন করে বলব? আই ডু নট নো ইউ।

রত্না গনগনে মুখে শুভর হাত ধরে টানতে থাকে, দোহাই তোমার! আর চেঁচিও না...আর না...

নীরজা পাথর হয়ে মেঝেতে বসে থাকেন।

এর পরে আর ফ্ল্যাটে গিয়ে গৃহপ্রবেশের পুজো সারতে এবং সেখানে চলে যেতে কোনো বাধা থাকে না। যাবার সময় শুভ রত্না ও নাতি ওঁদের প্রণাম করে যায়। ওঁরা বলেন, এসো। যাদবপুর বাস টার্মিনাসের অনতিদূরে ''মধুমালতী''র বারো নম্বর ফ্ল্যাটে গুছিয়ে বসতে সাহায্য করেন রত্নার মা। আজকের রান্নাটা উনিই করে আনেন।

রত্নার বাড়ির লোকজনই এসে উৎসবের হাওয়া গড়ে তোলে। ক্যাসেটে গান বাজে, মাংস ভাত, তাস খেলা।

রত্না বলে, হাওয়া দেখেছ? পাখা লাগবেই না। আর কি রোদ!

শুভ সব কিছুতেই থাকে, অথচ যেন থেকেও থাকে না।

সন্ধ্যায় ও বারান্দায় এসে বসে। হ্যাঁ চমৎকার দৃশ্য। প্রচুর আকাশ, বাতাস, পরিসর। ওপাশে টি. ভি. টাওয়ারের লাল চোখ জ্বলে। ওপর থেকে নিচে চাইলে মনে হয় যেন নিত্যদীপান্বিতা।

শুভ সব দেখে, অথচ দেখে না, এক ক্রুদ্ধ, অন্ধ বৃদ্ধ, তার গলায় তাচ্ছিল্য আর উপেক্ষা, এখনো ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

কত বছর ধরে শুভ মনে মনে ওঁদেরকে নিজের জীবনের হিসেব থেকে বাদ দিয়ে রেখেছিল, তা শুভ জানে। কিন্তু রমাপতি কতদিন ধরে ওকে নিজেদের জীবনের হিসেব থেকে বাদ দিয়ে চলছিলেন?

সেটা শুভ জানে না। এবং নিজেকে ওঁর কাছে খানিকটা দীন মনে হচ্ছে, তাও তো সত্যি, খুব সত্যি।

অন্তত এখন সত্যি।

কাল হয়তো ভুলে যাবে।

রত্না দরজায় দাঁড়াল, কি হয়েছে, তুমি এমন আলাদা আলাদা হয়ে থাকছ কেন? ওখানকার কথা ভাবছ? কেন ভাবছ? তোমার যথাসাধ্য তা তো করেছ বাপু!

শুভ ঈষৎ হেসে বলে, তাহলে তোমার মতে আমি একজন কর্তব্যপরায়ণ ছেলে? যথাসাধ্য করেছি?

—নিশ্চয়! ঘরে চলো।

—ভাবছি।

—কি?

কাল থেকে এই বারোতলা ফ্ল্যাটবাড়ির অন্যরকম জীবন শুভকে গ্রাস করতে থাকবে, খুব তাড়াতাড়ি ও অভ্যস্ত হয়ে যাবে এ জীবনে। শুধু আজকের দিনটাই যা একটু...

শুভ তেমনি হেসেই বলে, আমরা নিশ্চয় ছেলেকে সাধ্যের অতিরিক্ত স্ট্যান্ডার্ডেই মানুষ করব?

—নিশ্চয়। ওর সময়ে দিনকাল আরো কঠিন হবে না?

ভাবছিলাম...বাবা যা যা আমাকে বলল, ও কি সে সব কথাই আমাকে দিয়ে বলাবে কোনোদিন? চলো ঘরে চলো।

দু'জনে ঘরে ঢোকে। রত্না বুঝতে পারে অনাগত ভবিষ্যতের আশঙ্কা ওদের সঙ্গেই ঘরে ঢুকল। বড় ফ্ল্যাট, সব ক'জনকেই ধরে যাবে।

স্ত্রী

সকাল থেকেই জয়ার কোনো অবসর ছিল না। রাজনীতিক নেতার একদা রাজনীতিক এবং পাঁচ বছর রাজনীতিবিমুখ স্ত্রীদের থাকে না।

শহরের দামী নেতা পলটুদার জন্মদিন।

এমন দিনে জয়া সহযোগিতা করবেই এটা পলটু জানে। বরাবর করেছে। স্ত্রী অরাজনীতিক, ঘর সংসার নিয়ে থাকে। এমন দিনে সে শতশত পেয়ালা চা করবে, বাইরের ঘরে পাঠাবে, শত শত সন্দেশ।

সন্দেশ বা চা পাতা জয়াকে দীর্ঘ পাঁচ বছর কিনতে হয় না।

কারা যেন সব উপহার দিয়ে যায়। দার্জিলিঙের চায়ের পেটি, কমলালেবুর ঝুড়ি, শাড়ি ও ধুতি, পাঞ্জাবীর কাপড়। অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার সন্দেশ পাঠিয়েছিল।

সকাল থেকে কত যে উপহার এল। জয়া দেখে ক্লান্ত, ক্লান্ত। রাজনীতিক নেতার বউ হিসেবে তার জন্যেও শাড়ি।

এ সব শাড়ি জয়া পরবে না, বিলিয়ে দেবে, সবাই জানে, তবু দেয়।

সকাল থেকেই ও ক্লান্ত, ক্লান্ত, লিলির পাশে বসা হয়নি, যাওয়া হয় নি ও ঘরে। ভাগ্যে দিনটা রবিবার আর তনিমাও এসেছিল।

তনিমা লিলির ঘরে বসে আছে। আজ বাড়ির কাজের লোকেরাও ব্যস্ত এবং লিলির জন্য অন্য কাউকে করতে দেয় না জয়া।

এ নিয়ে পলটু ওকে অনেক বার বলেছে।

—এটা তোমার ম্যানিয়া হয়ে যাচ্ছে।

—হয়তো।

জয়া দীর্ঘকাল স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে হলে প্রতিরক্ষা পাঁচিলের ভেতর থেকে কথা বলে।

পুরনো জয়াকে পলটু আঘাত করতো হরদম। জয়া ছিল পলটুর বক্সিং—এর ঘুষি অভ্যাসের বালির ব্যাগ।

নিরন্তর জখম হতে হতে পুরনো জয়া আর অটুটু নেই। না, চল্লিশ বছর বয়সে এখনো ওর বাইরের চেহারা তেমন জখম নয়।

কপাল থেকে ডান কানের সামনে দিয়ে কাঁধ অবধি কাটা দাগটা বাদ দিলে জয়া এখনো চলে যাবার মতো চেহারা। চুল ওর আজও অন্ধকার বিদিশার নিশা। বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করার মতো চুল।

ভেতরে তো জয়া অক্ষত নেই। পলটু রাজনীতির কেরিয়ারে ওপরে উঠতে উঠতে পুরনো, আদর্শবাদী, রাজনীতিক আনুগত্যে অটল জয়াকে বড্ড জখম করছে।

যে টুকু ওর বাকি আছে, সেটুকুর চারদিকে জয়া সে জন্যেই পাঁচিল তুলেছে। স্বামীর সঙ্গে কথা বলে ও সেই আড়াল থেকে।

মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা ওর ম্যানিয়া, এ কথার জবাবে জয়া যখন বলে, ''হয়তো',—পলটু ক্ষেপে যায়।

—তোমার ভাবখানা দেখলে মনে হয় এখনো আমরা সেই...

—না, আমি জানি আমরা সেখানে নেই।

—স্বচ্ছন্দে তুমি ওর জন্যে নার্স রাখতে পারো।

—না। কেন না শহরে একটা নাসিংহোম থেকেই নার্স—এর খবর মেলে।

—হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বললে...

—তারা মিনিমাগনা সার্ভিস দিতে বাধ্য।

—তার মানে?

—মানে পরিষ্কার। তুমি এ শহরে সম্রাট। তোমার মেয়েকে যে দেখবে সে পয়সা চাইলে শহর থেকে তার বাস উঠে যাবে।

—তুমি আমায় কি ভাব?

—কিছুই ভাবি না।

—কেন, নার্স আনি নি?

—সে বেচারা ডবল কেন তিনটে ডিউটি করতে পারছিল না। আমিই তাকে চলে যেতে বলি। অবশ্য সে শহর ছেড়েই পালিয়েছে।

—তিনটে ডিউটি?

—নিশ্চয়।

জয়া বেণী বাঁধতে বাঁধতে বলে, লিলিকে দেখা, মাঝে মধ্যে তোমার সঙ্গে শোয়া, সে কথা আমার কাছে চেপে রাখা...ক'টা হল?

—জয়া!

—বেচারা তুমি! অন্য কেউ এ কথা বললে তাকে তুমি ''নিখোঁজ'' করে দিতে। আমার বেলা একটু অসুবিধে আছে বই কি! আমি তোমার স্ত্রী! অবশ্য দুর্ঘটনার চেষ্টা করতে পারো। তবে আমার দাদারা আবার তোমার বিরোধী, আমার খবর রাখে, দু'জন নামকরা ক্রিমিনাল ও সিভিল ব্যারিষ্টারের বোনকে দুর্ঘটনায়...বললে তারা ছেড়ে দেবে না।

—জয়া! তুমি ম্যানিক হয়ে যাচ্ছ।

—ম্যানিক, ম্যানিয়া, এ সব শব্দ বোধহয় সম্প্রতি শিখেছ কোনো বই থেকে।

—অসুস্থ মেয়ের কাছে থেকে থেকে...

—অসুস্থ নয়।

—ওটা কি আমার ইচ্ছাকৃত!

—কি করে জানব? শিলিগুড়ি থেকে এতটা পথ...ড্রাইভার চালাচ্ছিল...তুমি প্রথমত ভালো চালাও না। দ্বিতীয়ত মদ খেয়েছিলে। অবশ্য ওর হাত থেকে হুইল নেবার আগে থেকেই তুমি ক্ষেপে ছিলে!

—সেই কথা, আবার!

—আঃ, কেউ না জানলেও, অবশ্য সবাই জানে, কিন্তু আমিও তো জানি।

জয়া মধুর হাসে। বলে সব জানি। বনমহোৎসব করছ, শহরে গাছ লাগাচ্ছ, সাতটা জেলার কাগজের লোক ছবি তুলছে, ভ্যান্টার স্টুডিও ছবি তুলছে, কলকাতায় যাবে। এরই মধ্যে তোমারই লোকের চোরাই কাঠের লরি আটকাল, তোমাকে দৌড়তে হল।

—লাডিয়া আমার লোক নয়।

—নিশ্চয় তোমার লোক। কার মদতে ও জঙ্গল কাটায়, পঞ্চাশটা ট্রাক খাটায়, শহরে বেআইনী স—মিল খুলে যায়, তোমাকে মারুতি উপহার দেয়?

—চুপ করবে?

—না, চুপ করব না। কার গাড়িতে তুমি দৌড়েছিলে? কার কৌশলে থানা অফিসার, বিট অফিসার সাসপেনড হল? লাডিয়া তোমার লোক নয়! লাডিয়া তোমার লোক, কলকাতার লোক, লালবাড়ির লোক, বেশ! তাই হোক!

—ছি ছি ছি, জয়া!

—ছি ছি ছি পলটু। তোমার চক্রান্তে সবই উলটে যায় পরে। কিন্তু সেদিন তুমি ভয় পেয়েছিলে, ক্ষেপেছিলে ভীষণ। ভালো। কিন্তু আমি, লিলি, আমরা শিলিগুড়িতে আমার বন্ধুর বাড়িতে কয়েকদিন ধরে, আমাদের ডাকতে গেলে কেন?

—খালি বাড়িতে ফিরব...

—চালাতে গেলে কেন? কেন ওখানে জঘন্য একটা সীন করলে? কেন আমাদের বাধ্য করলে লাডিয়ার গাড়িতে উঠতে? আমি উঠি না, তুমি জানো না?

পলটু নিরুত্তর, হতাশ।

—কেন চালালে গাড়ি? কেন দুর্ঘটনা হল? কেন লিলি পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে? কেন ড্রাইভার মরল আর তুমি রইলে প্রায় অক্ষত? বুঝতে পারো না?

—কি বুঝব?

—সবটা তোমার পরিকল্পনা মতো হল না। লিলি যখন পঙ্গু, কোমর থেকে ওর সবটা অসাড়, চোখ যখন অন্ধ, তখন আমাকেই ওর সেবা করতে হবে।

—পরিকল্পনা!

—নিশ্চয়। লিলিকে আমি মনে করে ধাক্কা দিয়েছিলে, জয়া! বলে চেঁচিয়েছিলে, কি ভেবেছিলে?

—তুমি পাগল হয়ে গেছ জয়া। তোমাদের বাঁচাবার জন্যেই আমি...

—তোমাকে তো তাই বলতে হবে।

—লিলির কাছে থেকে থেকে...

—নিশ্চয় থাকব। তুমি ক'বার মেয়েকে দেখতে আস? অবশ্য ও তো মেয়ে। তার ওপর আমার মতো বলে তোমার রাগ ছিল...যে তোমার মতো সেই ছেলেকে তো মস্কো পাঠিয়েছ...যে নড়তে পারে না, দেখতে পায় না, তার দায়িত্ব অন্য লোকের ওপর ফেলে রেখে আমি তোমার স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনব করব না।

সে জন্যেই জয়া পলটুর জন্মদিনে যায়নি বাইরের ঘরে। পলটুর একার ছবিই তুলতে হয়। পলটু বলল, মেয়ের জন্যে ও...

লাডিয়া বললো, পুজা উজা দিলে কাজ হয়। সে তো আপনি দিবেন না।

—পলটু দা পূজো দেবেন।

—না না, তবে ওঁর পরিবার দিতে পারেন।

—দেবেন না।

পলটু ওদের বলতে পারে না। জয়া আগে পূজাবিরোধী ছিল কি না কে জানে। বর্তমানে ও সব কিছুরই বিরোধী।

মেয়ের জন্যে ফিজিওথেরাপি, মেয়ের জন্যে ডাক্তার, মেয়ের জন্যে বই পড়ে শোনাবার লোক, খরচের কথা জয়া ভাবে না।

—তোমার টাকার অভাব?

জয়া জানে পলটু কোথায় টাকা রাখে। না, জয়াকে নিয়ে পলটুর সব চেয়ে বেশি...

লাডিয়া বলে, ঠিক আছে। আপনি দাদা। দাদার মেয়ের জন্যেই আমিই পূজা দিয়ে দেব। জয়া এ পাশ থেকে শোনে।

হঠাৎ তীক্ষ্ন গলা শোনা যায়, লালু! বাইরের ঘরে বলে দে, লিলির জন্যে কোনো প্রসাদ, ফুল, এ সব যেন বাড়িতে না ঢোকে।

পলটুর মুখ লাল হয়ে যায়।

ওর চামচা এবং যুবক নেতা (সরকারী ঘর বাড়ির ঠিকাদার এবং পার্টি ফান্ডে টাকা দেয়) চেহারায় না হোক, কেশ সজ্জা ও গলার স্বরে অমিতাভ বচ্চন। অমিতাভ বচ্চন বিরোধী দলের এম পি. হতে পারে, কিন্তু অনুকরণ করতে হলে ওই একটা লোকই আছে।

যুবক নেতা বলে, বউদি আমাদের পোকিত মার্কোসবাদী। পুজো আচ্ছায় বিশ্বাস করে না।

শিক্ষক সমিতির নেতা বলে, আদর্শ যারে কয়! কুনোদিন দামী কাপড় পরল না।

যুবক নেতা বলে, চলুন পলটু দা। লাঞ্চে আজকে আপনার অনারে...

লাডিয়া বলে, নিজে না খেলাম। খাওয়াতে কি দোষ?

—কোথায়?

—সে আমার দুসরা বাড়িতে। এ বাড়িতে তো কিছু ঢুকবে না।

পলটু বলে, বলে আসি ভেতরে।

জয়া ওপরে উঠে যাচ্ছে। হাতে খাবার সাজানো ট্রে।

—ওগো! আজ আমি দুপুরে...

জয়া উঠে যায়।

লিলি নিথর নিস্পন্দ কোমর থেকে। ওপরটি সজীব। দেখতেও ভালো ছিল না। কিন্তু বাস্কেটবলে, ব্যাডমিন্টনে, সাঁতারে...লিলি আর কোনোদিন খেলতে যাবে না। কলেজে যাবার জন্যে দৌড়বে না সাইকেলে। চোখ চাইলেও দেখতে পাবে না, ওর ঘর মা কেমন করে সাজিয়েছে।

—লিলি!

—মা!

—এবার তো খাওয়াব।

—ব্যাকরেস্টটা দাও।

ব্যাকরেস্টে বসে লিলি। তারপর বলে, কোলে ট্রে দাও। আমি নিজে খাব।

—মাছে কাঁটা আছে।

—বেছে নেব। আমি মেছো না?

—তনিমা, একটু দেখবে?

—দেখব মাসিমা।

—তনিমাদি আজ থাকবে?

—ওর অসুবিধে হবে না?

—কি অসুবিধে? জানো মা! ওখানে থাকতে ওর একটুও ভালো লাগে না, গাদাগুচ্ছের খরচও হয়, বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারে না।

—আমাকে তো এত কথা বলেনি।

—আমি ওর বন্ধু, তুমি তো মাসিমা।

—তাও সত্যি।

—ও আমাদের বাড়িতেই তো থাকতে পারে। আমার ঘরে থাকবে?

তনিমা বলে, সে হবে এখন লিলি!

—মা!

—বলো।

—আজ তো বাবার জন্মদিন।

—হ্যাঁ।

—নিচে অনেক লোক এসেছিল?

—অনেক।

—চলে গেছে?

—হ্যাঁ। তোমার বাবাকে ওরা...

—লাঞ্চ খাওয়াবে।

—হ্যাঁ।

—যাকগে, আমি তো খাই।

—হাতটা ধুয়ে দিই।

—আমি নিজে ধোব।

হাত ধোয় লিলি, হাতড়ে হাতড়ে খেতে থাকে। তারপর খেতে খেতে বলে, তুমি সব করে দিতে চাও। তনিমাদি সব নিজে করতে বলে। কেন বলে জানো? নিজে যতটুকু পারি তা আমাকেই করতে হবে। নইলে আমি পরনির্ভরশীল হয়ে যাব ভীষণ রকম। সেটা মোটেই ঠিক নয়।

পারে, একা তনিমা পারে লিলিকে দিয়ে আগেকার লিলির মতো যুক্তিবাদী কথা বলাতে। সাধে কি তনিমা জয়ার এত প্রিয়?

—মাছটা বেশ ভালো।

—আরেকটা খাবে?

—না, আর না। শুয়ে শুয়ে খেয়ে খেয়ে যদি মোটা হয়ে যাই?

—সেটাও সত্যি।

—তনিমাদি আরো বলেছে...

—কি?

—সিলেবাস ধরে কেউ যদি পড়ে শোনায় বারবার, আমি পড়া তৈরি করে নিই। আমি পরীক্ষাও দিতে পারব।

তনিমা বলে, মাসিমা আর তুমি আলোচনা করে নাও। তারপর এটা খুব পারা যাবে। ব্যাপারটা তেমন কঠিন নয় মাসিমা, লিলির পক্ষে তো নয়ই। ব্যাপার কি জানেন? পুরো সিলেবাসটা ক্যাসেটে ধরে নিতে হবে।

লিলি বলে, এটা কার আইডিয়া সেটা বলো?

—তোমার।

—নিশ্চয়। আমি শুনে শুনে ঠিক শিখে নেব।

—ও পরীক্ষা দিতে পারবে তনিমা?

অ্যাকসিডেন্টের সময়ে লিলির বয়স পনেরো। এখন ওর উনিশ। বয়স আন্দাজ ও তখনো ছেলেমানুষ ছিল, এখনো। ছেলেমানুষ বয়সে মানুষ সোজা হিসেবে কথা বলে।

লিলি বলে, কেন পারব না? হলে আমায় নিয়ে যাবে। আলাদা ঘরে আমি হেলপার নিয়ে পরীক্ষা দেব। অন্ধরা তো তাই করে।

লিলি নিজের অন্ধত্বের কথা এমন সহজে বলে, যে জয়ার বুক ছিঁড়ে যায়। কিন্তু জয়া তো তা বুঝতে দেবে না লিলিকে!

—এটা খুব ভালো হবে।

খেয়ে, হাত ধুয়ে লিলি বলে, এবারে মাকে চাই।

ব্যাকরেস্ট সরাও। লিলিকে ইউরিনাল দাও। পরিষ্কার করো। লালুর মাকে ডাকো, এঁটো বাসন সরাবে। ঘর মুছে নেবে। বড্ড পিঁপড়ের উৎপাত এ সময়টা।

—মা! তোমরা খেয়ে এসো। আমি ঠিক ঘুমিয়ে পড়ব। তিনটে না বাজতেই তো তোমার ভানুবাবু আসবে।

ভানু ছেলে নয়, মেয়ে। ফিজিওথেরাপির ট্রেনিং নিয়ে ও নিজেই সেন্টার খুলেছে। ও মেয়েদের, ছেলেদের ট্রেনিং দেয়। ভানুর সেন্টার খোলার সময়ে জয়াও খুব সাহায্য করে। ভানু ওটা ভোলে নি।

ওর চেহারা পুরুষালি, গলাও বাজখাঁই। লিলি ওকে ''ভানু বাবু'' বলে।

জয়ার মেয়ের মাসাজের ব্যাপারও অন্যকে দেয় নি, নিজেই আসে। ওই বলেছে, হুইল চেয়ারে ও বসতে পারবে। নিজে ঘুরতে পারবে এ ঘর, ও ঘর।

নিচে এসে ওরা খেতে বসে। সব বেড়ে নিয়ে খেতে বা। এতকাল লালু আর লালুর মা ছিল ভরসা। লিলি আর জয়া দুজনের দুর্ঘটনার পর রান্নার জন্যে একটি মেয়েকে রাখতেই হয়েছে।

আজ ও বাড়ি গেছে। আসবে কাল।

খেতে বসে তনিমা চোখ কুঁচকে দেখে। লাডিয়ার আনুকূল্যে শালের জন্য একদা বিখ্যাত কুকমারি জঙ্গলের শাল কাঠে তৈরি টেবিল, চেয়ার, কাবার্ড, বিশাল মীটসেফ। শহরের একমাত্র মেহগনি গাছটিও লাডিয়ার কবলিত।

বাইরের ঘরে মেহগনির আসবাব।

—চেয়ারের ডিজাইনটা নতুন।

—তাই কি?

—চমৎকার দেখতেও।

—সব কৃতিত্বই গৃহস্বামীর।

—মাসিমা।

—বলো তনিমা।

—কি করি, বলুন তো?

—আমি একটা কথাই বলতে পারি।

—জানি।

—এটা আমার বাড়ি হলে তোমাকে এখনি চলে আসতে বলতাম, বাড়ি তো আমার নয়।

—আপনার বাড়ি না হোক...

—দেখছি তনিমা।

—সুনীলাদি পারেন...

—ভয় পাচ্ছেন।

—ভীষণ ভয়।

—দাঁড়াও, কথা বলে দেখি।

—ওঁকে বলবেন?

—বলতাম না। পারত পক্ষে বলি না। বলব।

—চাকরিটা যদি এত দরকারী না হত...

—চলে যেতে?

—তাও ভেবেছি। তারপর মনে হয়েছে যাব কেন? আমি তো কাজ করতে এসেছি।

—না, কেন যাবে? শহরের মানুষকেও বলিহারি ভাই। কেউ একটা কথা বলে না।

—কেন বলে না আপনি তো জানেন।

—জানি। রাজনীতিক গুণ্ডামির ভয়ে।

—ভানুদির মতো মেয়ে, ওই সাহস পায় না।

—জানি।

—আমার শুধু মনে হয় কি জানেন?

—কি?

—আপনাকে আমি যেমন দেখেছি...আপনি যেমন মানুষ...আপনি যার স্ত্রী...আপনি যদি এগিয়ে এসে একটা স্ট্যান্ড নিতেন, তাহলে খুব ভাল হত।

—তনিমা! তুমি যা যা বলছ সবই ঠিক। আমার ভূমিকা ইতিবাচক হওয়া উচিত ছিল।

—ছিল না?

—ছিল।

—কিন্তু...আমি কার স্ত্রী তনিমা? তোমার জীবন যে দুর্বিষহ করেছে, শুধু কি তোমার! আগে আরো কত মেয়ে... সেই তো আজ এসে শহরের নেতাকে ওই প্যাকেটটা দিয়ে গেল। কি আছে তা জানো? বিদেশী রুমহীটার। এখানে তো খুব শীত পড়ে।

—ও!

—তনিমা! আমার সব কথা আমি বলতে পারব না, বোঝাতে পারব না। এই রাজনীতি, যে রাজনীতির জন্যে ও লাডিয়ার বাড়ি লাঞ্চে যায়, বাচ্চু ওকে রুমহীটার দেয়, সে রাজনীতি থেকে আমি নিজেকে অনেকদিন হল সরিয়ে নিয়েছি।

—সরিয়ে নিলেও...

—ওই লাডিয়া! যার কারণে লিলি আজ অন্ধ আর পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে...জানি, সরিয়ে নিলেও মানুষ আমাকে বিশ্বাস পায় না। কাপড় কিনতে গিয়ে দেখেছি...দোকান করতে গিয়ে...

—হ্যাঁ, বুঝতে পারছি।

—আমার ক্ষমতা সত্যিই খুব কম।

—তবু তো আমার বাড়ি গিয়েছিলেন।

—ইচ্ছে করে। আমি গেলাম, তোমাকে ডেকে আনলাম...সবাই জানুক যে আমি তোমায় পৌঁছে দিই...তুমি এখানে আস...তাতে যদি তুমি কোনো নিরাপত্তা পাও।

তনিমা চোখ নামিয়ে বলে, ওখানে থাকা যাবে না।

—তোমার বয়স...তোমার চেহারা...

—নানা কারণেই।

—তোমার সঙ্গে যার বিয়ে হবার কথা...

—সুবীর তো এখনি রাজী মাসীমা। কিন্তু ভাইটা পাশ না করলে কাজ না পেলে আমি বিয়ে করি কি করে? বড়দি তো আমাদের মানুষ করতে গিয়ে বিয়েই করল না। মেজদির বিয়ে দিল...আমি কাজ পেতে না পেতে বেচারা আপিসের কাজেই ট্যুরে গিয়ে কি না কি ভাইরাসে মরেই গেল। কথা আছে...ভাইটা পাশ করলে বড়দির আপিসে কাজ পাবে।

—কথা ওর রাখবে?

—হ্যাঁ, বড়দি তো ইউনিয়নও করত। ওর সুনাম ছিল খুব। মনে হয় কথা রাখবে।

—তোমার মেজদি?

—সে খুবই আলগা আলগা বরাবর। ওদের বাড়িও এক অদ্ভুত বাড়ি। আমি গেলেও ওর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে পারি না। শাশুড়ি সামনে থাকবেই।

—আশ্চর্য তো!

—তার চেয়েও আশ্চর্য, মেজদি তাতেই সুখী।

—কেনো ব্যক্তিত্ব নেই।

—সে তো আমিও রামভিতু। বড়দি অন্যরকম ছিল। দেখতে সেও ভালো ছিল, কিন্তু তেজ কি!

—রায়গঞ্জেত তোমাদের নিজেদের বাড়ি?

—বাবাই করেছিলেন। টিনের চাল, পাকা ভিত, পাকা দেয়াল।

—মার বয়স হয়েছে?

—ষাট বছর হবে।

—এখানে ওঁরা তোমার কে হন?

—খুবই দূর সম্পর্কের বোন। তবে আমার মা মানুষ করেছিলেন দশ বছর অব্দি।

—নিশীথবাবু তোমার ভগ্নীপতি?

—হ্যাঁ। ওই বোনের কথায় ওদের ওখানে উঠেই ভুল করেছি। নইলে অন্য টীচাররা মেস করে আছে, থাকতে পারতাম।

তনিমা ভুরু কুঁচকে কি ভাবে। খুব সুন্দর দেখায় ওকে। যার জীবনে অনেক সংগ্রাম, তার চেহারা এমন নরম কেন?

—তোমার বয়স কত, তনিমা?

তেইশ

—আমার বিয়ে আঠারো বছর বয়সে। উনিশ বছরে রণি। একুশ বছরে লিলি। তোমার বয়সে আমি দুজনের মা।

—এখানে ছিলেন?

—না, এখানে তো পরে আসা হয়।

—কোনোদিন কাজ করেছেন?

—পার্টি করতাম।

—কলকাতায়?

—হ্যাঁ।

—ওখানেই পরিচয়?

—হ্যাঁ।

—আপনার সঙ্গে ওঁর...

—অত্যধিক আদরে মানুষ, অত্যাধিক জেদ ছিল...চলো উঠি। লালুরা খাবে।

—তনিমা ঘড়ি দেখে।

—ফেরার কথা ভাবছ?

—হ্যাঁ।

—আজ থেকে যাও।

তাহলে আমি লিলির ঘরে গিয়ে একটু ঘুমোই। আপনিও শোবেন তো?

—তোমার পাশেই।

—লিলি যে একলা শোয়...

—এখন বলে নয়। ছোটবেলা থেকেই ওর ভয় কম, একলা শুত। ওর দাদার চেয়ে খেলাধূলায় অনেক ভাল ছিল। লেখাপড়ায় মন দিত না। সেই মেয়ে...

—সত্যিই ভাবতে পারি না।

—ওর জন্যেই তো আমায় বাঁচতে হবে তনিমা। ওর জীবনটা তো নষ্ট হয়ে গেল।

—আপনি না কি চাকরি পেয়েছিলেন, করেন নি? সত্যি, আপনাকে নিয়ে কত কথাই যে শুনি।

—করি নি, তার আদর্শ আছে বলে।

খট খট করে ভানু ঢুকে পড়ে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, সব সময়ে ধপধপে সাদা কাপড়। সাদা জামা। চুল নেই বললে হয়, শূন্যে তুলে বড়ি খোঁপা বাঁধা।

—বউদি ইচ্ছে করলে আজ...

—তিনটে বাজে?

—সময় কারো জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে না তনিমা। চারটেয় উঠব, যোগব্যায়াম করব, ছোলা আর মুড়ি খাব, স্নান করব, ছ'টার মধ্যে তৈরি। দুপুরে খাব বারোটায়।

—চলো ভানু।

—লিলি কি বলছে?

—তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

—কলকাতায় যান বউদি। ডাক্তার আশীষ লাহিড়ী আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। ওঁকে একবার দেখান।

—যাব।

—আপনার দাদাদের লিখুন।

—লিখব। কিন্তু লিলির কি...?

—পারলে উনিই পারবেন।

—চোখ তো পাবে না আর...যদি হাঁটতে পারত!

—আশা কি ছাড়তে আছে?

—ভানু খট খট করে উপরে উঠে যায়।

তনিমা বলে, সত্যি! পারেন বটে।

—হ্যাঁ সাংঘাতিক জেদী মেয়ে। ওর কথা তো তুমি জানো না। লিখতে পারলে লিখতাম।

—চাকরির ব্যাপারটা বলুন না।

—আগো বলো, শহরে আমাকে নিয়ে কি বলে।

—কেন চাকরি নিলেন না, কেন আপনি সাদাসিধা কাপড় কিনে পরেন। কেন পারতপক্ষে গাড়ি চড়েন না। কেন রিকশায় চলাফেরা করেন। কেন দীপালিদি আপনার কাছে আসেন, কেন আপনি আদিমহিলা সেবাসমাজে যান...

—পাবলিক এ থেকে দুয়ে দুয়ে চার করে না?

—ওরা মনে করে আপনি এ সব করেছেন, যাতে পলটু দত্তের সুবিধে হয়।

—ওর সুবিধে!

—হ্যাঁ। আপনার এ সব ব্যবহারই প্রমাণ করে, আসলে পলটু দত্ত বড় দলের নেতা হলেও সে খুব উদার, সে কারণেই আপনাকে এ ভাবে জনসংযোগ করতে দেয়।

জয়া বিচিত্র ও বিষণ্ণ হাসে। বলে, আমি মনে করি আমার নিজস্ব জীবনে স্বাধীন ভাবে চলব। অথচ দেখ, সব রাস্তাই গিয়ে রোমে পৌঁছয়।

—চলুন, ওপরে চলুন।

—চলো।

লালুর মা বলে, রাতে রান্না হবে কিছু?

—কিছু না, রুটি।

এ বাড়ির একতলাটি গৃহকর্তার। দোতলা জয়ার। দোতলা বাড়ির সামনে বাগান ছিল। বাগানের আধখানা ঘিরে পল্টু দত্তের গুদামঘর। সে তো ঠিকাদারও বটে। শহরে সিমেন্ট যোগানদার।

আদি বাড়িটা কেমন ছিল তা জয়া মনে করতে পারে না। উত্তরবঙ্গের এ শহরও ছিল এক দেশীয় নৃপতির সীমানায়। তখন চারিদিকে জঙ্গল। মাঝে ছোট শহর।

এখন এটা জেলার দ্বিতীয় শহর।

এ শহরে জয়ার শ্বশুর হোমিওপ্যাথি ডাক্তারি করেই ছোট একটা বাড়ি করেন। আশেপাশের জমি কেনেন। কুকমারির জঙ্গল সেদিন শহরের সীমানায়।

এ বাড়িকে তিলে তিলে নয়, তালে তালে বাড়ানো, জমিগুলি প্লট করে বিক্রি করা, সবই পল্টুর কৃতিত্বে হয়েছে। সাত আট বছরে ও জয়াকে শহরের অন্যতম দর্শনধারী বাড়ির গৃহিণী করে দিয়েছে।

সবচেয়ে দর্শনধারী বাড়ি অবশ্যই লাডিয়ার। কয়েক পুরুষে উত্তরবঙ্গে বাস কিন্তু বিকানীরে ও প্রতি বছর যায়। আগে কথা ছিল নির্ভেজাল বাংলা। এখন একটু অন্য টান আসছে।

সম্ভবত স্ত্রীর কারণে। স্ত্রী বিকানীর দুহিতা, অত্যন্ত পর্দানশীন, অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা। তাঁর কথাতেই লাডিয়া প্রাচীন শিবমন্দিরটিকে আমূল সংস্কার করে একটা জগঝম্প বানিয়ে শহরবাসীকে উপহার দিয়েছে। প্রাচীন শিবলিঙ্গটি যথাস্থানে আছেন। পাশে মহাবীর। রঘুপতি রাঘব রাজা রাম ও সন্তোষী মার তিনটি মন্দির হয়েছে।

এজন্যে জায়গা দরকার হয়েছে। পলটু দত্তকে লাডিয়া ভুলবে না, ভুলবে না। কেন না তার মদতেই ওই জমি থেকে কিছু কোমরভাঙা লোককে উচ্ছেদ করা গেছে এবং সরকারী খাস জমি ভূমিরাজস্ব দপ্তরকে কলা দেখিয়ে সৎ কাজে লেগেছে।

এ নিয়ে পিছনে লেগেও শহরের একমাত্র প্রতিবাদী কাগজ (বিরোধী পক্ষের) ''কৃপাণ'' কোনো সুবিধে করতে পারে নি। স্বপক্ষের মেজ শরিকের কাগজ ''সত্যবার্তা''ও পারে নি।

''কৃপাণ'' জয়াকে নিয়েও লেখে। ওর শস্তার কাপড় কেনা, পলটুর বৃত্তের বাইরে জনসংযোগ রেখে চলা, সবই ওই কাগজের ''বাঁকা চোখে'' কলমে বেরোয়।

পলটু বলে, বেরোক না। যারা বুঝবার তারা ঠিকই বুঝবে।

বাচ্চু পলটুর অনুগত যুবনেতা।

বাচ্চুর বাবা ''কৃপাণ'' কাগজ, প্রেস, পাটের আড়ত ও কাপড়ের মালিক।

মেজ শরিকের কর্মীদের বড় শরিকের কর্মীরা কাটে, মারে।

''সত্যবার্তা'' সে খবর ছাপে।

মেজ শরিকের পার্টি সম্পাদক ও পলটু সমঝোতা রেখে চলে। যে তারা থাকুক ধরাছোঁয়ার বাইরে, ক্যাডার বা কর্মী দলীয় সংঘর্ষে মরতে পারে।

মাঝে মাঝে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশকে মঞ্চে ঢুকতে হয়। তখন হত্যা, গৃহদাহ, শস্য লুণ্ঠন, এ সব ঘটনা আসলে দলীয় সংঘাতের ফলে ঘটলেও সবগুলি কাগজেই ''উগ্রপন্থী বনাম পুলিশ'' সংবাদ হয়ে যায়।

এরকমই চলে এ শহরে, নিরন্তর চলে। বুঝতে জয়ার সময় লেগেছে। তাড়াতাড়ি অসম বিয়ে করলেও, দুটি ছেলে মেয়ের মা হলেও, বড়দা জোর করে ওকে কাছে রেখে বিএ—টা পাস করান, এমএ.।

বলেন, পার্টি করো, যা করো, নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো যোগ্যতা অর্জন করে নাও।

পলটু তাতে বাধা দেয় নি। কেন দেবে? রাজনীতিক আদর্শের মিল থেকে প্রেমজ বিবাহ। সই করা বিয়ে হোক। মেয়ের বড়দা যদি যৌতুক, গহনা, আসবাব দেন, সে কি করতে পারে?

ওঁদের বাড়িতেই সে সময়টা থাকা? জয়ার বাবার উইল মতো ওর তো বসবাসের অধিকার আছেই। জয়ার মা যদি একমাত্র মেয়ের ছেলেমেয়ে বিষয়ে অত্যন্ত দুর্বল হন, পলটু কি করতে পারে?

১৯৬৩—তে ওদের বিয়ে। পলটু লাইফ ইনসিওরেন্স ইউনিয়নের জঙ্গী কর্মী। রায় স্ট্রিটের অভিজাত বাড়িটিতে সে শুধু নিশিযাপন করে এবং জয়াকে বলে, একদিন এসব শ্রেণী মালিকানা ঘুচে যাবে।

জয়ার বড়দা প্রাজ্ঞ চোখে পলটুকে দেখে যান, দেখে যান। ১৯৭০—৭১ সালে পলটুকে দেখে উনি এখানে এসেছিলেন। উনি রায় দিয়ে যান, জয়া! তোর বিয়ে নিয়ে মনে দুঃখ একটা ছিল। কিন্তু এখন দেখছি ভালোই করেছিস। রাজনীতি হল আসলে কেরিয়ার, ওদের রাজনীতি। পলটু অনেক ওপরে যাবে।

সেদিন জয়া যথেষ্ট প্রতিবাদ করেছিল।

—ওর রাজনীতি কেরিয়ার করার জন্যে নয় বড়দা। দেখছ না, এ রকম একটা সময়ে ও কি ভাবে পার্টির কর্মীদের বাঁচাবার জন্যে দৌড়চ্ছে।

ব্যস্ত ব্যারিস্টার, যিনি দার্জিলিং থেকে ফেরার সময়ে অনেক পথ ঘুরে ঘুরে বোনকে দেখে যেতে এসেছেন, তিনি বোনের কথা সস্নেহে শুনেছিলেন।

নিজের ছেলেমেয়ে যখন ছোট ছিল, তাদের কথা যেমন শুনতেন, তেমনি সস্নেহ প্রশয়ে।

—এ সব জায়গাও বেড়ে উঠছে...হ্যাঁ...পলটু পারবে। এখনি তো কথাবার্তায় অনেক যুক্তি এসেছে।

—তোমাদের আর ক্যাপিটালিস্ট বলে না।

—ব্যারিস্টারকে পুঁজিবাদী বলা রাজনীতিক অজ্ঞতা জয়া। আর...এমন টালমাটালের সময়েও তোরা তো ঠিক দরিদ্রদের মতো থাকছিস না।

—জমিগুলো বিক্রি করল...

—ভালো। বুদ্ধিমান ছেলে!

—ছোড়দা না কি নতুন বাড়ি করছে?

—করছে, থাকবে এখানেই।

—রায় স্ট্রিটের বাড়ি তো যথেষ্ট বড়।

—হ্যাঁ হ্যাঁ, দু'ভাগে ভাগ করা ...মায়ের অংশটা তোর...এ বাড়িটা তো লাকি, তাই না?

—আমি আর অংশ দিয়ে কি করব!

—কলকাতায় একটা থাকার জায়গা!

লিলির জন্যে পরে তো কাজেই লাগছে বাড়ির ওই অংশ। যেতে হয়, থাকতে হয়। রণিও ওখানে থেকেই পড়ল। লিলিও মামাবাড়ি যেতে ভালবাসত।

সে সময়টা, যখন জয়ার বড়দা আসেন, সত্যিই বড় উত্তাল সময়। উত্তরবঙ্গ তখন তোলপাড়। পলটু দত্ত তখনই বেশ কেউকেটা। বোঝাই যাচ্ছে যুক্তফ্রন্ট থাকবে না, থাকবে না। তারপর কি হবে, তা ভাবা যায়নি তখনো।

উগ্রপন্থীদের ঠেঙিয়ে নিঃশেষ করার কাজেই সবাই ব্যস্ত ছিল এবং সে সময়ে এই ছোট শহরেও যে কত চেনা মুখ সারি সারি লাশ চালান যায়, ভাবলে আজও জয়ার আশ্চর্য লাগে।

সেই সময়ে জয়ার বাড়িতে শরদিন্দু রায়বর্মা ঘনঘন আসতেন। জেলার প্রবীণ পার্টি কর্মী, দীর্ঘকাল কৃষকদের মধ্যে কাজ করেছেন, তেভাগার সময়ে চা—বাগান এলাকায় ছিলেন। সে সময়ে ওঁর বয়স বছর বাষট্টি হবে। বারবার আলসার হবার কারণে পার্টি—সেক্রেটারি হয়ে শহরেই ছিলেন। রায়বর্মা শহর কেন, মহকুমা কেন, জেলার মধ্যেই বেশ শ্রদ্ধেয়, সম্মানিত মানুষ। ওঁর সত্যপ্রিয়তা ও সত্যবাদিতা এ শহরে গল্প কথা। যে পুলিশ ওঁকে তেভাগার পর ধরে, তাকে উনিই সময় সংশোধন করে বলেছিলেন, দশটা থেকে এগারোটা কি করেছিলেন মানে কি? ন'টা আটান্ন থেকে দশটা এগারোটা অবধি পায়খানায় ছিলাম, দশটা বারো থেকে দশটা বেয়াল্লিশ স্নান করেছি, মশারি কেচেছি। এখন বাজে দশটা বাহান্ন, এগারোটা বাজে নি, এগারোটা অবধি কি করেছিলেন মানে? ঠিক ভাবে প্রশ্ন না করলে রায়বর্মা জবাব দেয় না।

এমন অনেক কথা।

'পণ দিব না' জেদের ফলে তিনটি মেয়েই অবিবাহিত থেকে যায় এবং ছেলের বিয়েতে পণ নেন স্ত্রী (রায়বর্মা তখন জেলে) সেজন্যে ছেলের কাছে স্ত্রীকেও পাঠিয়ে দেন।

রায়বর্মা পলটুকে বলেছিলেন, তোমরা বললে, আমিও মানছি, উগ্রপন্থীরা খতমের রাজনীতি করেছে। কিন্তু তোমরা তাদের খতমের যে রাজনীতি করছ, সেটা বন্ধ করো।

—রায়বর্মাদা, এটা আপনি কি বলছেন?

—আমাদের ছেলেদের ওপর ঠ্যাঙা আসছে।

এসেছিল। বাহাত্তর থেকে কর্মীদের পালাতে হয়, মরতে হয়, নেতারা থাকে চুপচাপ। সে সময়ে রায়বর্মা বহুজনকে পালাবার ব্যবস্থাও করে দেন।

এবং একদিন একরাত বেপাত্তা থেকে তিনি যখন ফেরেন, তখন শহর ফেটে পড়ে উত্তেজনায়, গুজবে। বাড়িতে পুলিশ। ওঁর তিন চাকুরে ও অনূঢ়া, প্রায় প্রৌঢ়া মেয়ে নিশ্চুপ (নার্স, শিক্ষিকা, স্বাস্থ্যবিভাগের কেরাণী) বসে আছে।

রায়বর্মা থানায় যান।

কারা ওঁর বাড়িতে সেলটারে ছিল, কাদের উনি কুকমার্রি জঙ্গলে পার করে দিয়ে এলেন, তা ওঁর মুখ থেকে বের করা যায় নি।

—সত্যি কথা বলা যাবে না, মিথ্যে বলতে পারব না। অতএব কিছুই বলব না আমি। আমার মনে হয়, আমার জীবনের বিগত ত্রিশ ঘণ্টা তেরো মিনিট সতেরো সেকেন্ড কোথায় ছিলাম, কি করছিলাম, সেটা আপনারাই লিখে নিতে পারবেন। যা ঘটে তা না লিখে যা ঘটেনি লেখায় আপনাদের ক্ষমতা তো সবাই মানে।

সেই সময় থেকে রায়বর্মা একাধারে পুলিশের ও পলটুদের সন্দেহভাজন হয়ে যান। ওঁর মেয়েরা ওঁরই মতো। বাপের বিরুদ্ধে ওরা মুখও খোলে না। এবং রোগাটে, কালো মানুষটিকে সকলে নতুন চোখে দেখতে থাকে। সন্দেহ, সন্দেহ!

পলাতক মাত্রেই আশ্রয় দেবেন, প্রাণ বাঁচাবেন, এ কেমন কথা?

পলটু ক্ষেপে গিয়ে বলে, যদি পুলিশ পলাতক হয়ে আসে, তাকেও বাঁচাবেন?

—পলটু? জ্ঞানকাণ্ড রেখে কথা বলো। তুমিও কি খোয়াব দেখছ? বিপ্লব এসে গেছে এবং প্রাণভয়ে পুলিশ এসে শেলটার চাইছে?

—তবু...

—বিপ্লব আমরা দেখি নি, তোমরা দেখবে না, ঝুড়িতে টাটকা ডিম আর নেই হে আমাদের, এখন থেকে পচা ডিমই বেরোবে।

এ সব বলে রায়বর্মা নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মায়ের ভোগে দেন এবং জরুরি অবস্থায় এ শহরে একা তিনিই গ্রেপ্তার হন।

অবস্থা অবসানে মুক্তিপ্রাপ্ত রায়বর্মা নিজের বাড়িতে নিজেকে বন্দী রেখেছেন। শরীর তাঁর বড়ই ভাঙা। পলটুরা ওঁকে গ্রহণ করে নি, ত্যাগও করে নি। কোনো বৃদ্ধ মন্ত্রী শহরে এলে দেখাও করে যান। ওঁকে সাহায্য করাও মুশকিল। জীর্ণ বাড়িতে বসে নিজের আমাশা ও আলসার জীর্ণ পেটে উনি হাত বোলান ও প্রাচীন কমরেডদের লজ্জা দিয়ে বলেন, আমার কি চাই! আমার তো কিছু চাই না। ঠিকাদারী, কোনো পরামর্শদাতা কমিটির চেয়ারম্যানসিপ, নাঃ, কিছু চাই না।

—তুমি বুনো রামনাথ হয়ে গেলে?

—তাই বা পারলাম কই। মেয়েদের রোজগারে খাই, স্বর্গত দেবনাথ রায়বর্মার তৈরি বাড়িতে বাস করি, শেলটার দিয়ে চলি...

—শেলটার? কাকে? এখন তো...

রায়বর্মা অত্যন্ত কুচুটে হাসি হেসেছিলেন, শেলটার বলতেই ভূত দেখলে মনে হচ্ছে?

মন্ত্রী বড় বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর বয়সও অনেক, মনে তাঁরও শান্তি নেই, মানুষ তিনিও সৎ। ঔচিত্য বোধে প্রাচীন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা করতে আসার জন্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বোধনী সভার জন্য অন্যের লিখিত ভাষণ ছাঁটাই করে সময় চুরি করতে হয়েছে, শরীর তাঁরও ভালো যায় না। রায়বর্মা তাকে ভয় দেখাচ্ছে কেন? জীর্ণ ও সংস্কারহীন ভূতুড়ে বাড়িতে বসে?

—শেলটার! এই দেহে। লাগাবাঁধা আমাশা, লাগাবাঁধা আলসার, এক চোখে ছানি, পিতৃদত্ত বাত, মাতৃদত্ত অর্শ, কত কিছুকে পুষে চলেছি বলো তো?

—একবার কলকাতায় এলে...

—কি, মস্কো পাঠাতে?

—ঠাট্টাই করো।

—না রে ভাই, মহানগরী যাব ভাবলেও ভয় করে। আমার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসালয়ই ভালো।

—পলটুর তো উচিত...

—ও বাবা! সে এখন মস্ত মানুষ। সেদিন যেয়ে লাডিয়ার সার্কাস উদ্বোধন করল।

—সার্কাস?

—আহা? লাডিয়ার মন্দির মালা!

এই রায়বর্মার কাছেই জয়া যেত। দু'দণ্ড শান্তি পেত। না, সবাই কেনাবেচা হয়ে যায় না। অন্যরকম মানুষ বিরল হলেও এখনো আছে।

রায়বর্মাই ওকে ভানুর কথা বলেন।

—বড় তেজী মেয়ে বউমা! স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চলে এসেছে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে বলে ফিজিওথেরাপি শিখে এসেছে।

—ওর বিয়ে হয়েছিল?

—হ্যাঁ। দেখতে ভালো নয়, বাপ টাকা দিয়ে...যা হয়...মেয়েকে পেল না...নিজে চলে এল...মেয়েও অদেখা অযত্নে মরে গেল...যাক, অতীত, অতীতই। বর্তমানে সমস্যা, শহরে ও একটা সেন্টার খুলতে চায়, বাড়িও দেখেছে, টাকা দরকার।

—কত?

—বলছিল চার—পাঁচ হাজার...

—দেখি!

জয়া নিজে কিছু দেয়, কিছু চেয়ে নেয় স্বামীর কাছে। ওর নিজের টাকা মানে মায়ের দেয়া হাজার তিন।

ভানু অসীম জেদে, ব্যাপারটিকে সফল করে তুলেছে। কয়েকটি বিপন্ন মেয়ে, মহিলাশ্রম বা পতিতালয় ছাড়া যাদের জায়গা ছিল না, তাদের এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপার্জনক্ষম ওই করে দেয়। সে সময়ে এ শহরে ''মেয়েছেলে মালিশ করবে, ব্যায়াম করাবে আবার কি? ওই ভানুমতী নিজেও দুশ্চরিত্র, শহরের বুকে পাপের ব্যবসা খুলছে'' বলে খুব হইচই হয়।

জয়া একদিকে, অন্যদিকে রায়বর্মা ভানুর পেছনে থাকেন। আজ ভানু স্বপ্রতিষ্ঠিত। জয়ার টাকা ও কবেই শোধ করে দিয়েছে।

উত্তরবঙ্গের এ জায়গায় বর্ষা, বাত ও হঠাৎ ধনীর সংক্রমণ খুবই বেশি। লাডিয়ার মতো মাড়োয়ারি পরিবারও অনেক। ডাক্তাররা এখন ফিজিওথেরাপি ও মালিশ করাতে বলেন। ভানুর আজ নিজের বাড়ি, সে বাড়িতে সেন্টার, সেন্টারের নাম অসীমা (ওর মৃতা কন্যার নাম) ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র। ছয়টি মেয়ে ওর স্টাফ। অনেক মেয়েই ওর কাছে শিখে মাসাজ করছে।

জয়া সব কথা তনিমাকে বলে না। ভানুর কথা বলে। আরো বলে, তোমার ব্যাপারটা দেখছি।

রাতে ও নিচে নেমে আসে।

পলটু দত্ত ভাবছিল আর ভাবছিল। লোকসভার নির্বাচনে মেজ শরিকের প্রার্থী ওদের মদতে জিতেছে, কিন্তু ব্যবধান মাত্র চার হাজারের।

নির্বাচনী কেন্দ্রে বিরোধী দলের ভোট এত বাড়ল কেমন করে তা নিয়ে দুই শরিক পরস্পরের ওপর দোষারোপ, পঞ্চায়েত পর‍্যায়ে কিছু খুনোখুনি, এ সবও হয়ে গেছে।

মেজ শরিক মায়ের ভোগে যাক, তার ঘরে সব ঠিক আছে তো?

বেশ কিছু কর্মীর ব্যবহার ও কথাবার্তা পলটুকে সংশয়ে ফেলে দিচ্ছে।

যেমন রথীনরা। যুবকরা।

—এখন আপনার আর আমাদের দরকার নেই। ওই বাচচু এখন আপনার মদতে নেতা!

—কুকমারি জঙ্গলের ব্যাপারটা আমরা ছেড়ে দেব না।

—দুর্নীতি তদন্ত কমিশন বসাচ্ছেন না কেন?

—আপনি মন্দির উদ্বোধন করলেন কেন?

—এ শহরে পার্টির আপনজন কারা?

—পৌরসভা নির্বাচনের কি হল?

পলটু বুঝতে পারছে না রথীনদের কোন দলে ফেলা যাবে? বিক্ষুব্ধ? মানে উগ্রপন্থী? কে বিশ্বাস করবে? কি ভাবে কি কথা যায়?

এ সময়ে রায়বর্মা সঙ্গে থাকলে ভালো হত। শহরে ওঁর ভাল ভাবমূর্তি আজও আছে।

—কিন্তু উনি আসবেন না।

ভাবমূর্তি বলতে মনে পড়ল শহরের প্রাচীন ঐতিহাসিক গুণবর্ধন রায়ের মূর্তির কথা।

চাঁদা তোলা হয়েছিল, স্মৃতিরক্ষা তহবিলও হয়েছিল। সে সব খাতাপত্র এবং টাকা নিয়ে ভ্যানটা স্টুডিওর ছেলে ঘ্যান্টা মালদা চলে গেছে।

পলটু কেমন করে শহরবাসীদের ও রথীনদের বোঝাবে যে সে টাকা ও মারে নি।

লিখবে না কেউ, সে সাহস হবে না। কিন্তু কানে কানে প্রচার তো চলছে।

লাডিয়া বলছে, লাগান মুরত। টাকা আমি দিয়ে দেব। কিন্তু শহরের লোক খুব খচরা। সেবার সেই ডাক্তারের মুরত নিয়ে কত কথা বলল!

সত্যিই হারামজাদা শহর। প্রসূতিসদনের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার সচ্চিদানন্দ রাহুতের মূর্তি নিয়ে কি হইচই, কি হইচই! তাঁর মুখ না কি নেতাজীর মতো ছিল না।

আসলে ভাস্কর ভাস্কর পাল সে সময়ে নেতাজীর মূর্তি গুটি দশেক করার ফলে রবীন্দ্রনাথ, বিপ্লবী তারক কান, মাইকেল, সকলের মূর্তিতেই নেতাজীর গোলালো মুখের আদল এসে যাচ্ছিল।

ও বলেও ছিল, গুণবর্ধন রায়ের ফটো দেখে কি হবে পলটুদা? সে তো পরে। সচ্চিদানন্দ রাহুতের মূর্তি যা হবে না! তবে সামনে নেতাজী গড়ছি, মুখটা নিয়ে...

নেতাজীর মুখ মনে রেখে ডাক্তার রাহুতের মূর্তি গড়ার ফলে শহরে বিপুল ঝামেলা হয়। কাগজে লেখা, জনসভা, পাবলিকের টাকা কি শস্তা, হেন রে তেন রে!

অবশেষে সে মূর্তি ভেঙে ফেলতে হয়। মূর্তি ভাঙার রাজনীতিতে একান্ত অবিশ্বাসী পলটুকেই নেতৃত্ব দিতে হয়। ডাক্তার রাহুতের মেয়ে আমেরিকায় বসে সব জেনে নতুন মূর্তির টাকা দান করে। ডাক্তার রাহুতের লণ্ঠনের মতো মুখ ও কদমছাঁট চুলের যথাযথ মূর্তি স্থাপিত হয়।

বাতিল মূর্তিটি এখন পলটুর বাগানের সামনে। মূর্তির গায়ে দড়ি দিয়ে গরু বাঁধা হয়, পিঠে ঘুঁটে দেয়া হয়। মূর্তির মাথায় গোবরের ঝুড়ি উপুড় করা থাকে।

এটাও ''কে বা কাহারা''দের খচরামি। এত জায়গা থাকতে পলটুর বাগানের পাঁচিল ও নেতাজী রোডের মাঝামাঝি ঘাসের ওপর মূর্তিটা রেখে যাবার মানে কি?

সে জন্যেই তো ''কৃপাণ'' কাগজ লিখতে সাহস পেল, ''প্রথমে রাহুতের মূর্তি নেতাজী আদলে বানাইয়া প্রয়াত ডাক্তার ও মহান নেতাজীকে করা হল অপমান! সহে না সহে না আর দুঃসহ এ জ্বালা! তদুপরি বাতিল মূর্তিটির মাথায় গোবরমাখা ঝুড়ি, গলায় গরু বাঁধা, পিঠে ঘুঁটের চাপড়! হায়! ক্ষমতামত্ত জননেতার মনে নাই, ওই ডাক্তারের হাতেই তিনি প্রসব হইয়াছিলেন! আপাতদৃষ্টে প্রাণহীন শিশুকে পিঠে চাপড় মারিয়া তাহার ''ট্যাঁ'' কান্না তিনি প্রথম শোনেন!''

এখন ''সত্যবার্তা'' লিখছে, ''ভাস্কর ভাস্কর পাল ও নেতা পলটু দত্তের অশুভ আঁতাতের ফলে নগরটি বিকৃত দর্শন মূর্তিতে প্লাবিত। এক্ষণে গুণবর্ধন রায়ের মূর্তি কে করে তাহা দেখিতে আমরা উৎসুক। এ কথা কি সত্য, যে সরকারী হাসপাতালে অপেক্ষমাণ রোগীদের জন্য যে পাবলিক শৌচাগারটি ভাঙিয়া যায়, এবং যাহা বৃহদাকারে পুনর্নির্মাণের জন্যে চার লক্ষ একুশ হাজার টাকা বরাদ্দ হইয়াছে, তাহা আর হইবে না? সেই টাকাতেই নগরে মূর্তিগুলি হইতেছে ও হইবে?''

এ সবের পেছনে কে আছে, জানা দরকার। বড়ই দুঃখ ও চিন্তার বিষয়, শহরে ''কৃপাণ'' ও ''সত্যবার্তা''ই চলে। পলটুদের ''গণমত'' মানুষ বাধ্য হয়ে কেনে, কিন্তু পড়ে না। ঠোঙা খুলে দেখ, প্রায়ই দেখবে ''গণমত''।

শোনা যাচ্ছে দীনু আবার 'প্রতিবাদ' বের করবে। আগে দু'বার ঠ্যাঙা খেয়েছে, এবার পেছনে থাকবেন রায়বর্মা।

রায়বর্মার কাছে যেতে হবে। বলতে হবে, জমানা বদলে গেছে দাদা, জমানা এখন আমাদের। এখন ওসব প্রতিবাদী কাগজ বের করে কোনো লাভ হবে না।

দীনু, রায়বর্মা, রথীনরা, কোন অশুভ আঁতাতের গন্ধ টের পাচ্ছে পলটু। নাকটা ওর বরাবরই খুব ভালো। গন্ধ ও আগে ভাগেই পায়।

জয়া নেমে আসতেই পলটু বিপদের গন্ধ পেল।

—কি ব্যাপার তুমি?

—কথা আছে।

—কি এমন জরুরি কথা?

—জরুরি না হলে আসতাম না।

—বেশ তো, বোস।

জয়া চেয়ারে বসে। স্বামীকে দেখতে থাকে।

—কি দেখছ?

—তোমাকে?

—কেন?

—ভাবছি তোমার মূর্তি কে করবে, কার সে ক্ষমতা আছে।

—মূর্তি কেন করবে?

—করা দরকার। আবক্ষ মূর্তি। চারপাশে লেখা থাকবে তোমার জীবনী। যে লাডিয়ার কারণে তোমার একমাত্র মেয়ে জীবন্মৃত, সেই লাডিয়ার সঙ্গে তোমার রাজনীতিক দোস্তালি সব লেখা থাকবে। যারা পর্ণো পড়ে তারা জীবনী পড়বে। যারা পর্ণো ছবি দেখে ভি.ডি.ও—তে তারা তোমাকে দেখবে।

—আজেবাজে কথা শোনার সময় আমার নেই।

—আমার কথা তো তুমি শুনতে বাধ্য, তাই না? কেন না তোমার আসল কথা তো আমি জানি। কি, মারুতি চড়েই ফিরলে?

—মারুতিটা ও ব্যবহার করতে দিয়েছে।

—সত্যি, সবাই কত আপনভোলা তাই ভাবি। কেউ ভি.আই.পি., স্যুটকেস, কেউ মারুতি, কেউ আসবাব, কেউ ডানলোপিলো, কেউ এয়ারকন্ডিশনার, সবাই সব ব্যবহার করতে দেয় তোমাকে, ফিরিয়ে নিতে ভুলে যায়।

—একই কথা, জয়া!

—আগে দিত না, এখন দেয়। রায়বর্মাকে দেয় না, তোমাকে দেয়।

—রায়বর্মা রায়বর্মা কোর না। বোঝ না কিছু? ওঁর রাজনীতিক সততায়...

—কে প্রশ্ন করছে? পলটু দত্ত। চমৎকার।

—ওঁর বাড়িতে...

—একশো বার যাব। আমার যেখানে ইচেছ যাব, যার সঙ্গে ইচ্ছে সম্পর্ক রাখব, ওসব কথা বলে লাভ নেই।

—জয়া, জয়া, যা হয়ে গেছে তা ফেরানো যাবে না। এখন তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই।

—খুব লাভ আছে। আমার কাছে। আমাকে ভাবতে হচ্ছে। আমি লিলিকে দেখি।

—যাক! কি বলবে বলো।

—তনিমাকে চেনো নিশ্চয়।

—চিনি।

—আজ ও এখানেই আছে।

—ভালো তো।

—দেখ! তোমার জন্যে মেয়েটার জীবন আজ বিপন্ন। কোথাও ও থাকার জায়গা পাচ্ছে না।

—আমার জন্যে! জয়া, যা বলেছ যথেষ্ট। পলটু দত্তের জন্যে কোনো স্ত্রীলোকের...

—তুমি নিজে গিয়ে তাকে চটকাচ্ছ তা আমি বলি নি। সে রকম করার সাহস তোমার নেই। কিন্তু ইচ্ছে হয় কিনা তা আমি কেমন করে বলব?

—না, জয়া, না।

—হয় না সেটা আশ্চর্যও। সুযোগসুবিধে কম পাও না, আসলে সাহসে কুলোয় না। মফঃস্বলে সব বদমাশি চলে যাচ্ছে রাজনীতির নামে, তবে মেয়েবাজিটা বোধ হয়...না, চলবে না।

—জয়া, এই কি বলবে?

—হ্যাঁ। তোমার কারণেই ওর অস্তিত্ব বিপন্ন। ও যেখানে আছে...

—নিশীথ বাবুর বাড়ি।

—নিশীথ বাবু কে?

—মিউনিসিপ্যাল অফিসে ক্লার্ক।

—ওর বউ?

—প্রাইমারি টিচার।

—বাড়িটায় কি হয়?

—কর্মী ইউনিয়নের আপিস।

—চমৎকার! মিউনিসিপ্যালিটি একটা অকর্মণ্য বডি, দুর্নীতির আখড়া। আর কর্মী ইউনিয়ন যেহেতু তোমাদের, সে হেতু বাড়ি পেয়ে গেছে। এ শহরে কি না হয়।

—ওখানে ওর কোনো অসুবিধে হচ্ছে?

—হচ্ছে। তোমার কারণে।

—আবার!

—চেঁচিয়ে লাভ নেই। তোমার ডান হাত, ওই লম্পট বাচ্চু, যাকে যুবনেতা করেছ, এবং এটা অপ্রাসঙ্গিক মনে কোর না, তোমার সঙ্গে শহরের জঞ্জালগুলোর আঁতাতের জন্যেই লোকসভায় শহরের ভোট এত কম হল। যাক গে, ওই বাচ্চু ওর পেছনে লেগেছে।

—কে বলল?

—আমি বলছি। পার্টির মস্তান একটা নিরীহ মেয়ের পেছনে লেগে তার জীবন দুর্বিসহ করে তুলছে এ খবরটা ''গণমত'' কাগজে বেরোলে কি বিশ্বাস করতে?

—নিশীথ তো কিছু বলেনি...

—সে কেন বলবে? বাচ্চুর বিরুদ্ধে সে কেন বলবে? তা ছাড়া, তোমাদের তো এখন পার্টিতে নানা শ্রেণী। শিল্প নগরীতে যেমন মাইনে ও পদমর‍্যাদা অনুযায়ী কোয়ার্টার হয়। কে কোথায় থাকে তাতেই বোঝা যায় তার পোজিশান।

—এ সব কথার সঙ্গে...

—আছে, যোগ আছে। নিশীথ বাচ্চুর নামে বলবে না, কেন না বাচ্চু চিরকালের মস্তান, বর্তমানে তোমার মদতে মদমত্ত নেতা।

—না না, সে কথা নয়।

—তোমার ভয়ে শহর কাঁপে! সুনীলা তার ওয়ার্কিং গার্লস হস্টেলে ওকে রাখতে ভয় পায়। ভানু তার সেন্টারে রাখতে ভয় পায়, নিশীথের বাড়িতে ও থাকতে ভয় পাচ্ছে, সব এক কারণে।

—আমার জন্যে?

—হ্যাঁ। ও যেখানেই যাবে বাচ্চু সেখানে ঢুকবেই ঢুকবে। তা নিয়ে কিছু বলতে গেলে তুমি ক্ষেপে যাবে। তুমি ক্ষেপলে কেমন শোধ নিতে পারো তা সবাই জানে।

—আমি তোমার চোখে কি? দানব না পিশাচ?

—আমার চোখে ও শহরের চোখে তাই।

—শহরের চোখে?

—নিশ্চয়।

না, তা হতে পারে না। ও শহরে একটি নাম, পলটু দা! পলটু দা!

সে সভা করলে সে সভায় কত মানুষ, কত!

জয়া আজ রাতে অন্য জয়া। তির্যক হেসে ও বলে, শহরে সভায় লোক হয়, তোমার পেছনে পার্টি আছে বলে। তোমার কাছে লোক আসে, পাবার জন্যে। না, দানব না পিশাচ নয়। তুমি আমাদের চোখে বর্তমান রাজনীতির প্রতিনিধি বিশেষ, বুঝলে?

—না জয়া, না।

—পাইয়ে দেবে, নিজে লুঠবে, এখানেই তো সবাই মিলে নামিয়েছ রাজনীতিকে। নইলে বাচ্চু! মেয়েবাজি বদমাশির জন্যে যার বিষয়ে ''গণমত'' তিন বছর আগে চেঁচাত, আজ সে ''যুবসমাজের পথপ্রদর্শক।'' কোন পথ ও দেখাতে পারে? তোমাকে টাকা খাইয়ে কি ভাবে টেন্ডার ধরাতে হয়। চমৎকার।

—তুমি বুঝবে না।

—বুঝব না, ক্ষমা করব না, এখন আমি জানতে চাই তনিমার ব্যাপারে তুমি কিছু করবে কিনা।

—হ্যাঁ...বলব...

—করছ কি না তা ওর কাছেই জানতে পারব।

—বলব, ব্যবস্থা করব।

—না করলে ওকে আমার কাছে রাখব।

—এ বাড়িতে?

—নিশ্চয়। লিলির আজ যে অবস্থা, ও অন্যলোক হলে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারত। তোমার কারণে আমার মেয়ে, আজ...এটা ক্ষতিপূরণ।

—জয়া! সম্পর্কটা কোথায় দাঁড়িয়েছে...

—সম্পর্ক? তুমি তোমার রাজনীতিক কেরিয়ারের জন্যে আমাকে ব্যবহার করেছ। তোমার সঙ্গে আজ আমার সম্পর্ক কি?

—তুমি...তুমি কি ডিভোর্স চাও?

—তাহলে শহরে তোমার মুখ খানিক পুড়বে। সেটা ভাবলে ভালো লাগে। তবে এ বাড়িতে থেকে তোমার কাছ থেকে আমার জীবনের ক্ষতিগুলোর পালটা আদায় করাই আমার এখনকার সিদ্ধান্ত।

—তুমি কত বদলে গেছ।

—মনে রেখো, অন্যথায় ও এ বাড়ি থাকবে।

—তা হয় না।

—খুব হয়। ও থাকলে লিলি ভালো থাকে, হাসে, অন্য রকম হয়ে যায়। লিলির মনে ও এরপরেও বাঁচার আশা জাগাতে পারে। তোমার কাছে অবশ্য লিলি মৃত। ওর ঘরেও তুমি ঢোক না, কথাও বলো না। রণিকে নিজের আদর্শে তৈরি করছ...ওকেও তুমি ছেড়ে দিলে পারতে। তোমার আদর্শ এখন যা, তাতে বাচ্চুই যথেষ্ট।

—বেশ! বাচ্চুকে আমি কড়কে দিচ্ছি, তাতে কাজ হবে। না হলে অবশ্যই...তুমি যা বলছ...

—কড়কে দেবে? পারবে? রথীনদের তুমি কড়কাতে পারো। বাচ্চুর বেলা তোমার অন্য গলা।

—রথীন...আসে?

—আসে, আমার কাছে।

—রথীনরা এখন...

—কি? বিক্ষুব্ধ? উগ্রপন্থী? দাও না লেবেল মেরে। তারপর তোমার ঠ্যাঙাড়েরা আর পুলিশ বুঝবে। কলকাতায় তোমার নাম আরো ''আপ'' হবে। শহর তোমার দাপট দেখে ভয়ে কাঁপবে।

—না জয়া, না।

পলটু এতক্ষণ মুখোস খুলে রেখেছিল। এখন পরে। মোলায়েম হেসে বলে, রথীন কত সাচ্চা ছেলে তা আমি জানি।

—সেই জন্যেই ওর একটা চাকরি হয় না। অবশ্য সাচ্চা ছেলেরা তো মুফতে অনুগত থাকবে। হোলটাইমার ওয়েজ, চাকরি, ঠিকাদারি, এ সব তো অন্যদের দিতে হবে। যাতে দল বাড়ে।

—তা বলি নি।

—তুমি কখন কেমন হেসে কি উদ্দেশ্যে কোন কথা বলো তা আমি জানি। ভুলে যেও না বহুকাল ধরে আমি তোমার স্ত্রী।

জয়া বেরিয়ে যায়।

পলটু ভাবে, ভাবতে থাকে। আজ মম জন্মদিন? জন্মদিনে লাডিয়ার খাওয়ানো মুরগীর বিরিয়ানি, চিকেন ভর্তা, ফিশ ফিংগার, আইসক্রীম, সব এখন তেতো লাগবে। শিলিগুড়ি থেকে ও বাবুর্চি এনেছিল। জবা সব তেতো করে দিয়ে গেল।

না, লিলির ঘরে ও ঢুকতে পারে না। ঢুকতে গেলে ওর ভয় করে।

পলটু ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল, আরেকটা খায়। আলো নিভায়। বিছানায় ঢোকে।

এক থেকে গুণে যাও মনে মনে, ঘুম আসবে, ঘুম আসে, পলটু ঘুমিয়ে পড়তে থাকে। রায়বর্মা বলত, লৌহমানব পলটু। সব খেয়ে হজম করতে পারে, যে কোনো জায়গায় ঘুমায়। আমার একটা গর্ব পলটু।

ঘুম আসতে থাকে। এবং ঘুমের সঙ্গে সঙ্গে শত শত গাছ ওকে ঘিরে কর্ডন করে এগোতে থাকে। অসহায়, অসহায় পলটু। ও কি এখন কুকমারির জঙ্গলে? গাছ তো এগোতে পারে না?

হ্যাঁ, কুকমারির জঙ্গলে। পনেরো বছর আগেকার জয়া আর পলটু জঙ্গল বাংলার বাগানে বসে আছে। ছোট্ট রণি আর ছোট্ট লিলি খেলা করছে।

চার বছরের লিলির গলা।

—বাবা আমায় ধরতে পারে না!

পলটু মেয়েকে ধরে ফেলেছে, কোলে নিয়েছে, লিলি ওর গলা জড়িয়ে ধরেছে।

ছোট্ট, ছোট্ট লিলি।

পলটুর কোলেই লিলি হঠাৎ বড় হয়ে যায়, পাথরের মতো ভারি, মুখটা বদলে যেতে থাকে। আগাগোড়া ক্ষতচিহ্ন।

চোখ খোলা, দৃষ্টিহীন।

না, এ লিলিকে ও চায় না।

কিন্তু নামানো যায় না। লিলি ওর গলা জড়িয়ে ধরে, আমি বাবাকে ধরে ফেলেছি।

ঘুম মানেই দুঃস্বপ্ন।

গাছগুলো কত কাছে। ওরা ঝুঁকে পড়ে পলটুকে দেখছে। প্রতিটি পাতায় পাতায় চোখ।

ঘুমন্ত পলটু মাথা নাড়ায়, বিড়বিড় করে। হাত চলে যায় বালিশের নীচে। লিলির জন্যে পূজাউজা দেয়নি লাডিয়া। ওর গৃহদেবতার প্রসাদী ফুল বালিশের ওয়াড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে বলেছে।

ও আঙুল চালায়। আঙুলগুলো কি ভারি!

সেদিন ছিল বনমহোৎসব।

বনমহোৎসব করা হবে কি হবে না তা ভেবে পাচ্ছিল না পলটু।

কারণ রথীনরা।

শহরে ''কুকমারির জঙ্গল বাঁচাও'' এ নিয়ে রথীনরা বেশ হইচই জুড়েছিল। আর এ বিষয়ে যথেষ্ট সাড়াও দিচ্ছিল শহরবাসী।

মাস তিনেক আগে থেকেই হাওয়া ঘুরতে থাকে। বুঝতে পারা উচিত ছিল পলটুর, বোঝেনি।

ঠিক তিন মাস আগেকার কথা। তারিখটাও মনে আছে পলটুর, পনেরোই মে।

এ শহরে বর্ষা নামার আগে, মে জুন মাসে দিনে থাকে ভ্যাপসা গরম। আবার দু'এক পশলা বৃষ্টি হলেই সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা নামবে। রাতে তো হালকা কিছু গায়ে দিলেই ভালো।

গায়ে দেবার প্রসঙ্গে পলটুর মায়ের কথা মনে পড়ে। মায়ের হাতে সেলাই কাঁথা গায়ে দিয়ে ওর আরাম হত কত।

এখন অবশ্য বাড়িতে বালাপোষ, রাজস্থানী হালকা লেপ, আসাম ও মণিপুরের খেস, বেঙ্গল হোম—এর বিদেশে রপ্তানির জন্য তৈরি দুর্মূল্য কাঁথা, বিদেশী কম্বল, স্বদেশী লেপ, সবই অঢেল।

লেপ ছাড়া সবই উপহার। মানুষ দিতে যে এত ভালবাসে তা পলটু জানত না।

সেবার মে মাসে আবহাওয়া যথেষ্ট মনোরম। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, শিরীষ, সবই ফুলে ফুলে সুন্দর। বিশাল প্যান্ডেল করে পরিবেশ দূষণে গাছ লাগাবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারী সভা হচ্ছিল।

আজকাল সরকারী বা দলীয় কোনো সভাই বিপুল ব্যয় ছাড়া হয় না। প্যান্ডেল, ডেকোরেশন, বিদ্যুৎ, আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্যে সার্কিট হাউসে থাকার ও রাজকীয় আহারের ব্যবস্থা, সব কিছুই বড় বাজেটে হয়।

সভায় কলকাতা থেকে সরকারী, বেসরকারী লোকজন, শহরের এস.ডি.ও, সদরের ডি.এম. ও বিভিন্ন মান্যগণ্যরা ছিলেন। বৃক্ষবন্ধু শ্যামাদাস গায়েন বিশেষ অতিথি।

উনি তো আসবেনই না। পশ্চিমবঙ্গে কোনো বৃক্ষ চেতনা নেই। সবাই মিলে প্রাকৃতিক বন ধবংস করছে আর সর্বনেশে ইউক্যালিপটাস লাগাচ্ছে। না, উনি জাপানে যাবেন। যাবেন আমন্ত্রণে।

অনেক বলে কয়ে ওঁকে আনা যায়। ওঁর শর্ত, রায়বর্মাকে আনতে হবে। কেন না ওঁকে এ কাজে ব্রতী করেন রায়বর্মা।

—কবে! কোথায়!

পলটু ঘাবড়ে যায়। রায়বর্মার জীবনের কতটা সে জানে না? অস্বস্তি, অস্বস্তি।

—কেন? উনিশশো সাতষট্টিতে?

শ্যামাদাস খ্যাঁক করে ওঠেন। অগত্যা পলটুকে দৌড়তেই হয়। রায়বর্মার বাড়িতে ঢুকে দীনুকে দেখে ও চমকে যায়।

—দীনু!

—হ্যাঁ, দীনু।

—কবে এল? আমি তো জানি না।

—তোমাকে না জানিয়ে শহরে এসেছে...দীনু। পায়ে পড়ো, ক্ষমা চাও।

—ছি ছি, আমি তাই বলেছি?

—কি জানি পলটু! আজকাল তোমাদের কথাবার্তা বুঝতে আমার অসুবিধে হয়।

—যা বলবেন বলুন। আপনি যা বলবেন, আমাকে মেনে নিতেই হবে।

—ও রকম বোল না পলটু। উত্তেজিত হব, আলসারের জ্বালা বাড়বে, নানা ঝামেলা...

—তা দীনু আছ কেমন?

—ভালো।

—এখন কি থাকবে?

—বলা কঠিন।

—কেন?

দীনুর রং কটাশে, চুল ছাঁটা, চোখ ফ্যাকাশে, শরীরটা বড় হাড়চওড়া, কেমন যেন। কথা বলার আগে ও চেয়ে থাকে মুখের দিকে, সেটা বড় অস্বস্তির।

—বনানী যেমন করায়, তেমন করতে হবে।

—বিয়ে করেছ?

—বনানী ঔষধালয়। উত্তরবঙ্গে আমি ওদের সেলসম্যান। অতএব...

—তাই বলো, তাই বলো! আমি ভাবলাম...

—আবার কাজ করতে এসেছি?

—হ্যাঁ...করেছিলে তো!

—করেছিলাম। আপনি ঠেঙিয়ে তুলে দেন।

—আমি নয় দীনু। সে সময়ে...

—আমার কথা কি বলা যায়?

রায়বর্মা বলেন, আঃ দীনু, কি হচ্ছে!

—তা এখানে উঠলে।

—বাড়িতে কেন উঠলাম না?

—সেই তো...তিনু তো আমার সঙ্গেই...ও তো বলেনি যে তুমি এসেছ।

—নাঃ! তিনুটা বিশাল দালাল হয়ে গেছে, ম্যাটাডোর কিনেছে, অর্ডার সাপ্লাই করছে, এ সব জেনেই ওর কাছে উঠলাম না। যাব পরে।

—যেও।

—বাড়িতে আমার শেয়ারটা নিতে যাব।

—সে তোমার কথা। তিনু কিন্তু মোটেই যা ভাবছ তা নয়। ও খুব পরিশ্রমী ছেলে।

—আপনার এক রকম ধারণা, আমার আরেক রকম। বৈচিত্র্য নিয়েই তো জগৎ, না কি বলেন?

—সত্যি, তোমাকে দেখে যে কি ভালো...

—বিশ্বাস করি না।

—মানে?

—আমাকে দেখে আপনার ভালো লাগবে না, লাগতে পারে না।

—কেন?

—কেন না আপনাকে দেখে আমার ভালো লাগে না। তারপরেও যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে বলতে হবে আপনি শ্রীগৌরাঙ্গ হয়ে গেছেন। যাক গে, আমি গাছগাছড়ার হার্বাল চা করছি, আপনি খাবেন?

—না না, থাক থাক।

—আপনারা কথা বলুন।

দীনু ভেতরে চলে যায়। পরনে লুঙ্গি, কোমরে গামছা, পলটুর একদা পরমানুগত কর্মী দীনু! কর্মী সম্মেলনে যে পলটুকে বলেছিল, আপনি ক্ষমতালোভী হয়ে যাচ্ছেন, নেতৃত্ব দিতে পারছেন না...রাজনীতিক আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন...

সে কর্মী সম্মেলনে কি ফাটাফাটি ঝগড়া।

তার পরেই দীনু দল ছেড়ে দেয় ও ''প্রতিবাদী'' কাগজ বের করে।

প্রতিবাদী! কি উগ্র নাম! শহরে প্রচুর সাড়া ফেলে কাগজটি। তারপর ''কে বা কাহারা'' ওর কাগজ যেখানে ছাপা হত, সে প্রেস জ্বালিয়ে দেয়, দীনুকে মারে বেদম।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দীনু, ''কে বা কাহারা''র একজনকে বেদম মেরে লিখিয়ে নেয় কি ভাবে কার নির্দেশে কাজটি করা হয়েছিল।

সে সমরও নেই, সে শিলিগুড়িতে চলে গেছে। শিলিগুড়ি এখন পয়সার সমুদ্র। ছিপ ফেলতে জানো যদি, নোট উঠে আসবে।

বছর দেড়েক দীনু নিপাত্তা থাকে।

তিনু বলে, দাদার মাথা আছে বটে! সাবানের গুঁড়ো...মানে ডিটারজেন্ট...ঝলক দেখেন নি? ঝলক সাবান তো দাদা আর তার বন্ধু এজেন্সি নিয়েছে।

—কোথায়?

—শিলিগুড়িতে।

—আছে কোথায়?

—সমরের কাছে।

—সমরের কাছে?

—হ্যাঁ পলটু দা।

এটা কেমন করে হতে পারে তা ভেবে পায় না পলটু। সমর দীনুকে মারল, দীনু সমরকে মারল, এ থেকে তা ''বাগে পেলেই খুন করব'' এই ব্যাপারটা স্বাভাবিক। সেটাই এখনকার নিয়ম। সে নিয়ম পালটে গেল কেমন করে?

পলটু সমর বিষয়ে অত্যন্ত হতাশ হয়। সমর কি, মানুষ, না কেঁচো?

সমর শহরে এলে ও চেপে ধরে। সমর মৃদু হাসে, হাতের সময়, তারিখ, বছর, সব ডায়ালে শোভিত চোরাচালানী ঘড়ির দিকে তাকায় ও বলে, দীনু! দীনু আর আমি মিউচুয়াল করে নিয়েছি।

—দীনুর সঙ্গে মিউচুয়াল!

—হয়ে গেল!

—কি করছে ও?

—ঝলক সাবান। খুব চলছে।

যাক! তোমরাই দেখালে।

—ও আমাকে বাঁচিয়েছে পলটু দা। তিনটে মাতালের খপ্পরে পড়েছিলাম। তারা পেটাচ্ছিল। দীনু না থাকলে সেদিন...

—দীনু তোমায় বাঁচাল?

—হ্যাঁ। কতদিন ধরে সেবা করে...গলার হাড়, কবজি, সব ভাঙা। ও খাইয়ে দিত।

—যাক গে! ওই কাজেই লেগে থাকুক।

লেগে থাকে না দীনু। দীনু অনন্তমূল। যত উপড়াও, তত ফনফনিয়ে গজিয়ে উঠবে।

ঝলক এজেন্সিতে ওর অংশ বেচে দিয়ে ও চলে আসে। বলে, জন্মভূমির টান কি ছড়াতে পারি?

এবারে ও ছোট একটি প্রেস করে। জব প্রেস। টাইপ নেই। পলটু ওর ওপর নজর রাখে।

চলছে চলছে, দোকানের, সার্কাসের, মাখী মেলার ইস্তাহার ছাপা, লেটারহেড ছাপা, লন্ড্রীর বিল ছাপা।

দেখে শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে পলটু কুন্ডু স্পেশালে দক্ষিণভারত চলে যায় সপরিবারে। মন্দিরের দেশ, বেড়াবার দেশ। কন্যাকুমারিকা, রামেশ্বরম, মাদুরাই, পন্ডিচেরি, মাদ্রাজ থেকে মহাবলীপুরম।

ভ্রমণের ফলে মনে আনন্দ ও বাক্স বোঝাই উপহার সামগ্রী নিয়ে ফিরতে না ফিরতে পলটুর জীবন বিষময় হয়ে যায়। পাশের মহকুমা টাউন থেকে দীনু আবার ''প্রতিবাদ'' বের করছে।

—গ্রামোন্নয়নের টাকা কোথায় গেল?

—হিমাচল রেডিও এজেন্সির মালিক কে?

—ময়াহাটা পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে চোলাই মদের ফলাও কারবার সম্পর্কে প্রশাসন নীরব কেন?

—আদালতের উলটো দিকে খাস জমিতে বেনামী দোকানগুলি ভাঙা হচ্ছে না কেন?

—প্রবীণ সমাজসেবী অমলকান্তি বর্মার হত্যা সম্পর্কে গোপন তদন্ত চালিয়ে জানা যায়...

দলীয় আপিসে চাঞ্চল্য। মেজ শরিক সন্দেহজনক ভাবে নীরব, যদিও হিমাচল রেডিও এজেন্সির ব্যাপারটি মেজ শরিকের এক পান্ডার। কিন্তু প্রথম, চতুর্থ ও পঞ্চম সংবাদটি তো পলটুর আঁতে ঘা দেয়া।

পলটু ক্ষেপে যায়। তার ক্ষমতার দৌড় সে দীনুকে দেখিয়ে ছাড়ে। অন্য মহকুমায় কাগজ ছাপা হবে, প্রকাশ হবে এই মহকুমা থেকে? শহরে ঢোকার মুখেই ''প্রতিবাদ'' বাহী ম্যাটাডোর লুঠ হয়ে যায়, ড্রাইভার মার খায়, গাড়িটি জ্বলে যায়।

''অত্যাচারে প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করা যায় না'' হ্যান্ডবিল শহরে ছড়িয়ে দিয়ে দীনু আবার চলে যায়। এবারে পলটু ওর সম্পর্কে ''সন্দেহজনক; বিক্ষুব্ধ, উগ্রপন্থী'' লেবেলগুলি সাজিয়ে ফেলে এবং দৃপ্ত আনন্দে বলে, সাপের কোমর ভেঙে দিয়েছি।

এতকাল বাদে বনানী ঔষধালয়ে সেলসম্যান হয়ে দীনু আবার এ শহরে।

রায়বর্মা বলেন, কি ভাবছ?

—না...কি আর...

—দীনুর কথা...

—একটু অপ্রত্যাশিত তো বটেই!

—হ্যাঁ, কথাবার্তাও ভালো নয়।

—আপনি বলছেন?

—আমাকে কি কম বলে?

—আপনি শুনে যান?

—কি আশ্চর্য পলটু! পৃথিবীর সকলে আমার কথামতো জল উঁচু, জল নিচু না করলে আমি বিচলিত হই না। তুমি অবশ্য হও। অন্যের নিজস্ব মতামত পছন্দ কর না। যাকগে, কি জন্যে এসেছিলে?

—পরিবেশ দূষণ বিষয়ে সভা...

—হ্যাঁ, গাছের ভূমিকা!

—শুনেছেন তা হলে?

—শুনেছি। কিন্তু দেশের যা অবস্থা, গাছ অবশ্য চাই, কিন্তু গাছ লাগালেও তো দূষণ কাটবে না।

—গাছ তো দরকার।

—কিন্তু রাজনীতি যে পার্থেনিয়াম। সেখানকার দূষণ কাটাবে কোন ওষুধে?

—চেষ্টা তো করতে হবে...

—কে চেষ্টা করবে? বাজে বোক না।

—শ্যামাদাস গায়েন আসছেন।

—পাগলা শ্যামাদাস?

—না না, বৃক্ষবন্ধু!

বুঝেছি। এখন তার আমাকে চাই।

—আমাদেরও।

—পলটু! শ্যামাদাস না বললে তুমি আমার কাছে আসতে কি?

—যেতে হবে দাদা।

—দেখি।

—আপনিই নাকি ওঁকে...

—আরে না না। মেধাবী ছেলে, অ্যাপ্লায়েড বটানি থেকে গাছপালায় ঝোঁক...তা আমিই বললাম, গাছ আমাদের কেন দরকার তা নিয়ে...তখন এত পরিবেশ চেতনা আসেনি এ দেশে। এল যখন, তদ্দিনে প্রাকৃতিক বনও সাফ, দেশ ঘরের গাছপালাও...ও শহরেই কি গাছ কম ছিল?

—তাহ'লে যাচ্ছেন?

—যাব...যথেষ্ট আড়ম্বর হবে নিশ্চয়ই...পলটু, আমি এখন আর কিছুতেই নেই। কিন্তু কৃষক সম্মেলনে মাছের মুড়ো, যে কোন সম্মেলনে আড়ম্বর, এগুলো ঠিক হচ্ছে না।

—চলি দাদা।

—এসো।

সে সভাতেও যথেষ্ট আড়ম্বর হয়েছিল। পরিবেশ দূষণ রোধে গাছের ভূমিকা নিয়ে শ্যামাদাস গায়েনের কথা সবাই খুব বোঝেনি। পলটু যখন বলে, তখনো সভা চুপচাপ। কিন্তু ওর কথা শেষ হতেই একটা গলা শোনা গিয়েছিল। চেনা গলা, চেনা মুখ। দীনু।

—একটা প্রশ্ন।

সবাই খুব চমকে যায়। সভাপতি বলেন, বলুন।

—পরিবেশ দূষণ রোধে গাছ যখন দরকার, তখন বন খুবই দরকার তা বক্তা বললেন এবং কুকমারি জঙ্গলে কি ভাবে বনসৃজন হচ্ছে তাও বললেন।

—হ্যাঁ, খুবই প্রশংসনীয়।

—আমার এবং অনেকেরই প্রশ্ন, অরণ্যনীতি এ মহকুমায় কি রকম? উত্তরবঙ্গের অন্যতম সমৃদ্ধ জঙ্গল কুকমারি থেকে প্রত্যহ গাছ কাটা হচ্ছে, এ শহরে চোরাচালান আসছে, বেআইনী স—মিলে চেরাই হচ্ছে, প্রত্যহ ট্রাকে চালান যাচ্ছে। সে বিষয়ে কারা জড়িত, কেন তা বন্ধ করা হচ্ছে না, ট্রাক কার, স—মিল কার, কেন এই চোরাকারবারীকে ধরা হচ্ছে না, আমরা তা জানতে চাই।

রথীন দাঁড়ায়, এ প্রশ্ন আমাদেরও।

তারপর হঠাৎ গণ্ডগোল বেধে যায়। পলটুর ছেলেরা ''সভায় ডিসটার্ব করা চলবে না'' বলে ওদের টানতে থাকে। রথীন চেঁচায়।

—জবাব দিন পলটু দা। এ প্রশ্ন হাজার জনের। কুকমারি জঙ্গল ধবংস করছে কে?

—সভা চলতে দাও রথীন।

—না, আমরা অনেক কথা শুনছি, জবাব দিতে পারছি না।

সভাপতি কি বলতে যান। শেষ অবধি মারামারি ঠেকানো যায়। রায়বর্মা উঠে দাঁড়ান ও ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে একটি কাগজ দিয়ে বলেন, কুকমারি জঙ্গল বিষয়ে সব খবর এতেই পাবেন। সুপরিকল্পনায় কয়েক হাজার গাছ কাটা হয়েছে এক মাসে। বন নির্মূল করে কয়েকশো গাছ লোক দেখিয়ে লাগালে বন বাঁচবে না। চোরাচালান যাচ্ছে চোরাই শিকারের মাংস, চামড়া, সিং। এবং একথা শহরে কোন দলেরই অজানা নয়।

—নাম বলুন, নাম বলুন!

এটা মধুর গলা।

পলটু চোখ তোলে। সামনেই জয়া, লিলি। জয়ার চোখ বড় বড়। ওদের পাশে রায়বর্মার তিন মেয়ে, সীতা, গীতা, নীতা। বাবা পণ দেবে না বলে ওদের বিয়ে হয় নি। আর কোন দিন বিয়ে হবে না এটা ওরা যৌবনেই মেনে নেয়।

কারোই ভাব ভালোবাসা করে বিয়ে করার মানসিকতা ছিল না। মা ওদের দাদার কাছে থেকেই মারা যান।

তিনটে মেয়েই যৌবনেই বুড়িয়ে গেল। এখন ওদের দেখলে মনে হয় তিন বিধবা। বাবাকে কেন্দ্র করেই ওদের জীবন। যে যার টাকা যতটা পারে জমায়। বাপ মরে গেলে ওরা কি করবে কে জানে।

ওরা ওদের বাপের দিকে চেয়ে আছে।

মধু আবার ক্রুদ্ধ গলায় বলে, নাম বলুন।

রায়বর্মা তাকাল।

—এটা জনসভা, বাজার নয়। যা জানাবার, ম্যাজিস্ট্রেটকে জানালাম। নাগরিকদের আবেদন দিলাম। প্রশাসন কি ব্যবস্থা নেন, দেখার জন্যে আমরা অপেক্ষা করব।

''সত্যবার্তা'' ও ''কৃপাণ'' কাগজের পরের সংখ্যাতেই নাগরিকদের স্মারকলিপি বেরিয়ে যায়।

পলটুকে বাচ্চু বলে, মেরে টেংরি খুলে দিই?

—কার? রায়বর্মার? না।

—রথীন, দীনু, মধুর?

—না।

যথারীতি ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেন না। কিন্তু ''কে বা কাহারা''র কথায় গাছ কাটতে গিয়ে সাতপুরুষে এদেশী হয়ে যাওয়া কিছু বাদিয়া, সাঁওতাল ও স্থানীয় রাজবংশী চালান যায়।

ওরা অরণ্য ধবংস করছিল।

পলটু শহরে যুবকদের দিয়ে একটা দৃপ্ত শোভাযাত্রা করায়, ''কুকমারির জঙ্গল ধবংস করা চলবে না। চলবে না!''

যারা ধরা পড়ে তাদের কথা সবাই ভুলে যায়। লাডিয়া অবিচলিত। কেন না গাছ কাটার জন্যে সকুঠার কালো হাত অনেক পাওয়া যাবে।

রায়বর্মার কাছে ধনচাঁদ মুর্মু, এসে হাজির হয়। তেভাগার কারণে ডুয়ার্স থেকে বিতাড়িত যে সব মুর্মু, টুডু, বাদিয়া, বর্মন কেরকেটা, খাওনি একদিন কুকমারি জঙ্গলের আশপাশে বসত করেছিল। তাদের বৃদ্ধ প্রতিনিধি ধনচাঁদ।

তারাই বলে, যাও, যাও তুমি। আমাদের ছেলেদের কি দোষ? তারা আটকে পচলে আমরা খাব কি?

—কোথা যাব?

—রায়বর্মার কাছে যাও।

রায়বর্মা ও ধনচাঁদ এক সময়েই জেল খেটেছিল। রায়বর্মা রাজনীতিক পেনশান প্রত্যাখান করেন। ধনচাঁদকে কেউ পেনশান নিতেই বলে নি।

দু'জনেই ক্ষমতাহীন, ব্যর্থ। তবু ধনচাঁদ ওঁর কাছেই আসে। বলে, রায়বর্মা বাবু হে! আর্জি আছে।

''আর্জি আছে'' শব্দ দুটি বড় ভয়ংকর। কিসের আর্জি? কার কাছে আর্জি? এ কি অবিভক্ত পার্টির তেভাগার দিন। যে কৃষক সভার সম্পাদক রায়বর্মা মাঠে ঘাটে বসে বিচার করে দেবে। সে বিচার মানা হবে?

''জান দেব তো ধান দেব না''র দিন নয়! নয় ''ময়নবাড়ির রাখব মান তৈরি আছে শত কিষাণ''—এর দিন।

এখন সব কেনাবেচা বেচাকেনার দিন। তবু ধনচাঁদ ওঁর কাছেই আসে।

ধনচাঁদ লবণ ও কালো চা'র কড়া অনুপান খায়। ফাটাচটা পায়ের দিকে চেয়ে বিড়ি ধরায়। তারপর হলুদরঙা চোখ তুলে বলে।

—গোষ্ঠ বাদিয়া, কুটুম্ব বাদিয়া, সখীন বাদিয়া, মঙ্গল মুর্মু, লখা টুডু, হরতন বর্মন, যমরাজ বর্মন।

—চালান গেছে?

—লাডিয়া বাবু গাছ কাটাল।

—জানি।

—এখন উপায়?

রায়বর্মার একটা মন বলে ঘাড় পেত না। পরের ঝামালি ঘাড়ে নিও না।

মনের ভিতরের মন বলে, বাঁধনা পরবে গুরু জাগানিয়া গান হচ্ছিল। ধনচাঁদ মদ খেয়ে নাচছিল। তুমি, রায়বর্মা! তিনটি ছেলেকে নিয়ে গেলে।

—ধনচাঁদ বলল, পুলিশ মারবে, নয়?

—তুমি বললে, হ্যাঁ ধনচাঁদ।

—ও বলল, জঙ্গলে পশাই দিব?

—তুমি বললে, বন পারাই দাও।

—তো তাই করল ধনচাঁদ। কুকমারি বন ওদের পার করে দিল। তোমার কথায়।

পরে পুলিশ ওদের নকড়াছকড়া করে। সেই থেকে পুলিশের খাতায় গ্রামগুলি অপরাধ প্রবণ। চিহ্নিত কয়েকটি গ্রামে বর্গাদার নেই, উন্নয়ন নই, পঞ্চায়েতী কাজ নেই, বাঁচার উপায় নেই।

চিহ্নিত কয়েকটি গ্রাম থেকেই লাডিয়ারা সকুঠার হাত ভাড়া করে। চোরাচালানে কাজে লাগায়। চোলাই কারবারে নিযুক্ত রাখে।

রায়বর্মা বাবু হে! রাত কাটলে দিনের দিশা তোমরাও দেখাতে পারলে না, আমরাও আর খুঁজিনা দিশা, তবু সাত সাতটা মানুষ!

রায়বর্মা বলেন, কেস দিয়েছে?

—না, দেয় নি।

দেখি। দিনু, রথীনকে ডাকো।

রথীন আসে, মধু আসে। খুব আলোচনা হয়। রায়বর্মা নিজে সদরে যান।

ম্যাজিস্ট্রেট, দরবার, দৌড়োদৌড়ি। রায়বর্মা থাকাতে কেসটি অন্যরকম হয়ে যায়। অবশেষে ওদের নিয়ে শহরে ফেরেন রায়বর্মা।

বলেন, চলো। গ্রামে রেখে আসি।

দীর্ঘকাল বাদে গ্রামে যান রায়বর্মা। সঙ্গে দীনু ও রথীন। জঙ্গলের কোলে গ্রাম ছিল। কোথায় গ্রাম, কোথায় জঙ্গল।

রায়বর্মা বলেন, রথীন! তোমরা সক্রিয় না হলে কুকমারির যেটুকু আছে তাও থাকবে না।

—না, থাকবে না।

দীনু বলে, ওই পলটু দত্ত!

—জঙ্গল থাকবে না।

—দেখা যাক।

ধনচাঁদ বলে, আগে ট্রাকে বন্দুক থাকত, এখন তাও থাকে না। থাকবে কেন? কে ধরছে?

দীনু বলে, দেখা যাবে। কুকমারিতে থাকতে পারলে...

ধনচাঁদ বলে, থাক না কেন?

—কুকমারি গ্রামে।

কুকমারি জঙ্গল। কুকমারি গ্রাম। সেখানেই থানা, পোস্টাপিস, তালা বন্ধ গ্রামীণ কৃষি সমবায় লোন আপিস, পঞ্চায়েতের নতুন বিলডিং।

রায়বর্মা বলেন, বনানী ঔষধালয়?

দীনু বলে, বনানী ঔষধালয়ের কাজেই তো আসব যাব। ওষুধ বেচার কাজ কি ছাড়তে পারি।

রথীন বলে, কত পাও?

—মাইনে চারশো। কমিশন আছে।

—ওষুধ চলে?

—চালালেই চলে।

—দিনু দা! এ কাজটাও ছেড়ে আবার শহরে ফিরলে পলটুদা এবার কেলিয়ে দেবে।

—কাকে দিয়ে? বাচ্চুকে? বাচ্চুর পিঠে এখনো আমার চাবুকের দাগ আছে।

—বাচ্চুই তো পলটুদার...

—নির্বাচিত যুবনেতা।

—হ্যাঁ।

—স্বাভাবিক।

এ কথা এখানেই শেষ হয়। পলটু দেখে দীনু ওষুধের দোকানে ঘুরছে। উপহার দিচ্ছে ডেসক ক্যালেন্ডার, কাগজচাপা, হেনতেন?

সব ভেষজ ওষুধ ওদের। আমাশায় ওদের বাড়ি, কাশিতে সিরাপ, বাতে মলম না কি আশু ফলপ্রদ।

এই থাকছে দীনু, এই থাকছে না।

একদিন বলল, শতখানেক বিঘা জমির ব্যবস্থা করে দিন তো? নয়নতারা চাষ করব। শিকড় চালান দেব। একশো বিঘে জমি পেলে অনেক লোক কাজ পাবে।

—জমি কি আমার ট্যাঁকে থাকে?

—স্টেডিয়াম তো হবে না, ওই মাঠটাই...

—বাজে বোক না দীনু। তিনু বলছিল...

—কি?

—তুমি ওকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলছ?

—আমার অংশটা কিনতে বলছি।

—কেন দীনু?

—এ শহরে আমার কি বা আছে? টাকা নেব, যেখানে পারি জমি নিয়ে...

—নয়নতারা চাষ করবে?

—নয়নতারা।

—কিনবে কে?

—বিদেশে যাবে। যাচ্ছে তো।

—তিনু কিনতে পারবে?

—ও না পারে বাইরে বেচে দেব।

পলটুই তিনুকে চাপ দেয়। কিনে নিক তিনু। দীনু চলে যাক শহর ছেড়ে। দীনু মানেই হাওয়াবদল। রথীন, মধু, সব বিগড়ে যাওয়া। দীনু মানেই রায়বর্মার বাড়িতে থাকা। দীনু মানে হঠাৎ হঠাৎ পলটুর বাড়িতে ঢুকে পড়া ও লিলির মতো মেতে ওঠা।

বয়সের তুলনায় ছেলেমানুষ, উচ্ছল লিলি।

—দীনুদা কি বলে জানো বাবা?

—কি বলে?

—পেঙ্গুইনরা না কি স্বয়ংবর সভা ডেকে বিয়ে করে। ও নিজে দেখে এসেছে।

—বটে! ও গিয়েছিল?

—যাবে কেন? বাবা, তুমি কি বোকা! ও সিনেমায় দেখেছে বুঝলে?

জয়া ঈষৎ হাসে। বলে, লিলি! তোকে বোকা বানানো বড্ড সোজা।

—কেন?

দীনু বলে একটা বই কিনেছে। বিশ্ববিচিত্রা ও সাধারণ জ্ঞান, তাই থেকে সব বলে।

—দীনু আসে কেন?

—বাঃ! দীনুদা আমার বন্ধু। আমার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলে, অঙ্ক বলে দেয়।

—তোমার মাকে তো বলা না বলা সমান। বাড়িতে যে—সে ঢোকা...

—আমি ডেকেছি, তাই এসেছে। মা তো ডাকে নি। দীনুদা আগে আসত না?

জয়ার মুখে চাপা হাসি।

—দীনুদা, রায়বর্মা জেঠা, আমি আর মা কুকমারি যাব বেড়াতে, বুঝেছ বাবা?

—বটে?

—যাব, বেড়াব, সাঁওতালদের বাড়ি যাব।

—না, যাবে না। আমার সম্মতি না নিয়ে তুমি কোথাও যাবে না।

—বাবা! তুমি খুব ফিউডাল হয়ে যাচ্ছ।

—লিলি!

—ফ্যাসিস্তও হয়ে যাচ্ছ।

—এত কথা শিখলে কোথায়?

—তোমার তিনটে লেকচার শুনলেই এ সব কথা শেখা যায়, তাই শিখেছি।

—মায়ের মেয়ে হচ্ছ!

—বাঃ! মার মেয়ে হব না তো কার মেয়ে হব?

—তুমি যা হচ্ছ দিন দিন!

নির্ভয়, বেপরোয়া লিলি। ছোটবেলা থেকে ভূতের ভয় ছিল না, ভয় ছিল না অন্ধকারে।

বাবা মার ভেতরের সম্পর্ক যে খারাপ, তা ও ভালোই বুঝত। বুঝে ও মার দলে চলে যাচ্ছিল, মার দিকে। পলটু দত্তের সেটা মস্ত পরাজয়।

এমনি করেই তিনমাস কেটে যায়। এসে পড়ে পনেরোই আগস্ট।

স্কুল পরপর চারদিন ছুটি। স্বাধীনতা দিবস, স্কুল প্রতিষ্ঠা দিবস, স্কুল প্রতিষ্ঠাত্রীর জন্মদিবস। রবিবার। তার আগেই লিলির স্কুলে ছুটি নিয়ে জয়া আর লিলি শিলিগুড়ি চলে যায়।

জয়ার অধ্যাপিকা বন্ধু গায়ত্রীর বাড়ি।

গায়ত্রীর কাছে ও মাঝে মাঝেই যায়, থাকে। গায়ত্রীকে লিলিরও খুব পছন্দ। গায়ত্রীর মেয়ে ওর বন্ধু, দুজনেই খেলা পাগল।

গায়ত্রী খুব শক্ত মেয়ে, স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স মামলা করে মেয়েকে আদায় করেছে! ওর বাবা কার্শিয়াঙে থাকেন। অবসরপ্রাপ্ত জজ। ঘনঘন কার্শিয়াং যাওয়াও লিলির কাছে কম আকর্ষণের নয়।

পনেরোই আগস্ট সমারোহে বৃক্ষরোপণ হচ্ছে। পলটু দত্ত গাছ লাগাবে। জেলার সাতটা কাগজের সাংবাদিক হাজির। ভ্যান্টার স্টুডিও থেকে ছবি তোলা হবে। সংগীত বিদ্যালয়ের বালিকারা ''মরু বিজয়ের কেতন উড়াও'' গাইবে। উবু হয়ে গর্তে গাছ বসানো, ক্যামেরার দিকে সহাস্য মুখে চাওয়া, গরদের পাঞ্জাবী বাঁচানো, পলটু সব সামলাতে গিয়ে ঘেমেঘুমে অস্থির।

এরই মধ্যে ভিড় ঠেলে বাচ্চু এগিয়ে এসেছিল। কানে কানে বলেছিল, জলদি সারুন।

—কেন?

—কেস বিলা হয়ে গেছে।

—কেন?

—কুকমারি থানায় লাডিয়ার চারটে ট্রাক আটকেছে দীনুরা। পুলিশ ওদের সাথে।

—পুলিশ।

—বিশ্বাসকে জানেন না? খচ্চরের গাছ শালা। সব জায়গায় কাজ দেখাতে যায়।

—বিশ্বাস তো বদলি হয়ে গেছে।

—ছাই! বদলি লোকই আসে নি।

বিশ্বাস! কুকমারি থানায় লাডিয়ার লরি আটক! দীনুরা ওখানে!

—রায়বর্মাও বসে আছেন।

সাংবাদিকরা এগিয়ে আসে।

—কি হয়েছে কুকমারিতে?

কিছু না...

পুলিশ কি করেছে?

পলটু পাঁচ পাবলিককে জটলায় ব্যস্ত রেখে বেরিয়ে আসে। বাড়ি, আগে বাড়ি।

—না, লাডিয়া বসে আছে, চলুন।

লাডিয়ার থমথমে মুখ। চাপা গলায় হিংস্র আক্রোশ।

—প্রোটেকশান ভি দেবেন না, বাট্টা ভি নেবেন, বেইমানি ভি করলেন?

—বেইমানি?

—নয় তো কি আছে?

চোরা ব্যবসায়ী ছাড়া আজ রাজনীতিক নেতাকে কে এমন দাবড়ে কথা বলতে পারে? নেতা কার দাবড়ানি সহ্য করে চোরা কারবারী ছাড়া?

—বেইমানি নয়? রথীন, মধু, ওই রায়বর্মাবাবু, সব আপনার পার্টির লোক নয়? ভাবছেন আমাকে ফাঁসাবেন? না দাদা, না। লডিয়া বেওসা বুঝে। আপনাকে ছেড়ে দিব, বাচ্চুর বাবাকে ধরব।

—আমি সত্যিই জানি না।

—আমার আপনাদেরকে থোড়াসে দরকার। আপনাদের আমাকে বহোত দরকার।

—আমি জানি না।

লাডিয়া ধমকে বলে, তবে যান। গিয়ে জানুন। গিয়ে সামলান। আমার কি! আমি ড্রাইভারের উপর দিয়ে চালিয়ে দিব। তবে আপনাকেও ফাঁসাব।

—রায়বর্মা দাদা!

—বহোত দিন সে খেল জমছে। আপনি খবর রাখেন নি কেন?

ইনটেলিজেনস ব্যর্থ, অক্ষম হয়েছে। সংবাদ সরবরাহকারী ইনটেলিজেনস বিভাগ যখন খবর দেয় না, তখন বিপর্যয় ঘটে যায়। জরুরি অবস্থার সময়ে উক্ত বিভাগ বলেছিল ''সব ঠিক হ্যায়। নির্বাচন হতে পারে।'' সে জন্যেই প্রধান মন্ত্রী জরুরি অবস্থার অবসান ঘটান। নির্বাচন ডাকেন, এবং...এবং...

পলটু তো সে তুলনায় কীটপতঙ্গ।

তার চামচারা শুধু পকেট গুছিয়েছে, খবর রাখে নি কোনো। তার জন্যেই পবিত্র স্বাধীনতা দিবসে, বৃক্ষরোপণের মতো মহান কাজে বাগড়া পড়ে। কুকমারি জঙ্গলের চোরাই কাঠবাহী লাডিয়ার ট্রাক আটকা পড়ে।

প্রতি ট্রাকে আশি হাজার থেকে লাখ টাকার মাল। প্রাচীন মেহগনি, প্রাচীন শাল।

—কখন আটকা পড়ল?

—রাতে। খবর এখন এল।

—চলে যান স্পটে।

বাচ্চু বলে, আমাকে বলল মধু!

—মধু!

—হ্যাঁ। ওতো শহরে বলতে বলতে...

লাডিয়া বলে, আমি বাড়ি গেলাম। আপনি এই গাড়ি নিয়ে চলে যান।

শহরে সেদিন কি উত্তেজনা। পলটু লাডিয়ার গাড়িতে। ম্যাটাডোর করে বাচ্চুর বাবা সাংবাদিকদের পাঠায়। রাজনীতিতে কোন দয়ামায়ার জায়গা নেই। বাচ্চুর নয়। মধুও ম্যাটাডোরে। ও প্রকৃত ঘটনা বলতে বলতে আসছিল।

পলটু পাথর, পাথর, হিম, হিম।

বিশ্বাস!

অন্তর্দলীয় সংঘাতে, খুনোখুনির পর ''সত্যবার্তা'' রিপোর্ট লিখল, মেজশরিক মিটিং করল।

বিশ্বাস কি ত্যাঁদড়ামিটা না করল! না, সে রিপোর্ট পালটাবে না। হ্যাঁ, সে খুনীদের ধরেছে। শহরের পি.টি.আই সংবাদদাতা কালুদা যদি খবরটি বড় কাগজে পাঠিয়ে থাকে সেবিষয়ে সে কিছু জানে না।

কোনো অন্যায় করে নি সে। নিজের যা ডিউটি তাই করেছে। হ্যাঁ, সে সগর্বে বলে থাকে উত্তরবঙ্গে তার মতো ঘনঘন বদলি কম লোকই হয়।

—ডিউটি করতে গেলেই বদলি, এ তো আপনাদের রাজত্বে নিয়ম এল। কি করব, বলুন?

কত দৌড়াদৌড়ি করে ওর বদলি করানো গেল। কেস তো মায়ের ভোগে গেলই। পলটু কি শহরে বসে নেই? পলটুকে নির্বাচনে দাঁড়াতে হয় না। নির্বাচন ব্যতীতই সে মহকুমা মুঠোয় রাখে।

বিশ্বাসের বদলি আসে নি, এ কেমন কথা? এ প্রশাসনকে নিয়ে পারে না, পারে না পলটু। এ তো তাকে অপমানও করা।

বাচ্চু বলে, আসবে কেন? এখানে কি আছে?

জঙ্গল আছে, লাডিয়া আছে, ট্রাক আছে। কুকমারি থানা এমন কি মন্দ? কুকমারি জঙ্গল ক্রমশ মরুপ্রান্তর হতে পারে, তবু জঙ্গলের কারণেই বহু কালোটাকার উজান ভাটা চলে।

থানাও খায়।

জঙ্গল আপিসের বিট অফিসার, গার্ড, কে না জানে কি হচ্ছে? কয়েকজন বনরক্ষী খুন হবার পর ওরা বনরক্ষার চেষ্টাও করে না।

ফরেস্ট বাংলোর মনোরম পরিবেশে লাডিয়ার আমন্ত্রণে যদি শহরের রুই কাতলারা আনন্দ করতে আসে, তাহলে ওই বাংলো প্রান্তে বাগানের কোয়ার্টারে বসে বনরক্ষীরা তো সবই দেখে।

ওরা নীরব থাকে।

বিট অফিসার বাড়ির হাতায় বেগুন লাগায়।

এখন শুধু অবাধ লুটোর দিন।

স্বাধীন সবাই, ভীষণ রকম স্বাধীন।

এখন শুধু দেখে যাওয়ার দিন।

কুকমারি থানার হাতায় আটক ট্রাক। মাল আটক।

থানার বারান্দায় অনেক চেয়ার।

বিশ্বাস সহাস্যে অভ্যর্থনা জানায়।

—আসুন, আসুন, সবাই। বাঃ, এটা যে লাডিয়ার নতুন গাড়িটা। আসুন সবাই।

পলটু বলে, কি হচ্ছে?

—গাড়ির নম্বরটা লিখে নিই। হাড়িকাঠে মাথা, খাঁড়া আপনার হাতে, নিজের দিক থেকে যতটা...

ম্যাটাডোর থেকে সবাই নামে। রায়বর্মা এক পা চেয়ারে তুলে এক পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। রথীন, দীনু, তপু, ধনচাঁদ, আরো অনেক লোক। কুকমারি ভেঙে লোক আজকে থানায়।

কে বলে, পাবলিকের কি কম রাগ আছে? বারোআনা খাও, চারআনা দাও, সকলকে ঠান্ডা রাখো। তা লাডিয়া ষোলআনাই খাবে।

—মেড়া খায় আর খুঁটি খায়। মেড়া লড়ে খুঁটি জোরে, জানো না?

—মেড়া তো আসেনি, গাড়ি করে খুঁটিকে পাঠিয়েছে।

পলটু বিষে জ্বলে যায়। কিন্তু পাঁচ পাবলিকের সামনে ওকে অন্য ভূমিকা পালন করতে হবে, অন্য মুখোশ পরতে হবে।

—কি ব্যাপার, বলুন তো বিশ্বাসবাবু?

—আমাদেরও বলুন।

সাংবাদিকরা ভিড় করে আসে। মধু, রথীন, দীনু ও তপু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে। বিশ্বাসকে ওরা মঞ্চ ছেড়ে দেয়।

—বলছি। অনেকদিন ধরেই সন্দেহ করছি, বিশেষ কয়েকটি ট্রাক কুকমারি থেকে গাছ পাচার করছে। মজা হচ্ছে, প্রতিবার ট্রাকে নতুন প্লেট থাকছে। চ্যাসিস নম্বর থেকে চেক করে জেনেছি...মানে সেবার যখন ট্রাক ধরে ওই বাচ্চুবাবুর হাতে বাজারে মার খেলাম...ট্রাকের মালিক লাডিয়া।

সাংবাদিকরা লিখতে থাকে।

—কুকমারি জঙ্গলের কাঠ পাচার নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। থানার নামেও অনেক দুর্নাম। তবে আমার আমলে থানা টাকা খায় নি। সেজন্য এবং অন্য কারণেও আমার বদলির ব্যবস্থা করা হয়। লিখছেন তো, লিখুন।

—বলে যান। খেলা জমছে।

—এবারে গত রাতে পাবলিকই ট্রাক ধরে, থানা থেকে আমি যাই।

পলটু বলে, কে কে ধরল?

—পাবলিক।

—পাবলিক মানে?

—পাবলিক।

পলটু চেনা চেনা মুখের সারির দিকে তাকায়। বিশ্বাস বলে, গ্রামের লোকজন ধরেছে। এঁরা তো সকালে এলেন। যাক...ট্রাক থানায় আনলাম। ট্রাক আটক থাকবে। ড্রাইভাররা চালান যাবে। এদের কাছে কোনো কাগজপত্র নেই। এরা কিছু বলছেও না।

—পলটুবাবু কিছু বলুন।

—আমি কি বলব?

—যেমন, যার ট্রাক ধরা পড়েছে, আপনি তার গাড়িতে কেন এলেন?

পলটু ঈষৎ হাসে।

—শহরে বনমহোৎসব হচ্ছিল...খবর পেয়ে এ গাড়িটা সামনে ছিল...চেয়ে নিলাম...

—লাডিয়াও কি গাছ লাগাচ্ছিল?

—না না, তা কেন?

—এখন কি হবে?

—কি আশ্চর্য! কুকমারি জঙ্গলকে চোরাকারবারীর হাত থেকে বাঁচাতে আমরা সকলে চাই। চোরাচালান ট্রাক ধরা পড়েছে...বিশ্বাসবাবু তো ঠিক কাজই করেছেন। ধন্যবাদ দিই জনগণকে যে তাঁদের সম্পত্তি তাঁরাই রক্ষা করেছেন।

—এখন কি হবে পলটু?

—রায়বর্মাদা! আইন যা বলে তাই হবে।

—আইন! তা এমন একটা ব্যাপার, তুমি নেতৃত্ব দাও না।

—কিসে?

—যাতে ওরা চালান যায়, কেস হয়, লাডিয়া শাস্তি পায়, এই কাঠ বনবিভাগে জমা পড়ে, বিশ্বাসের বদলি রদ হয়...

বিশ্বাস বলে, এটা কি বললেন দাদা! পলটুবাবু আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন বলেই জঙ্গলে ফেলে রাখতে চাইছেন না। সে জন্যেই তো...

রথীনরা বলে, আমরাও দেখছি। এবার আমরা কলকাতা যাব। ডেপুটেশন নিয়ে যাব।

দীনু বলে, আগে সদরে।

রায়বর্মা বলেন, আরে সব শর্মা সমান। ম্যাজিস্ট্রেটকে মেমোরেন্ডাম দিই নি?

''কৃপাণ'' বলে, পলটু দা! আপনি তো হরদম কুকমারি আসেন লাডিয়ার সঙ্গে। জঙ্গল যে কাবার, তা দেখেন নি? অবশ্য দেখবেন বা কি করে!

—কাবার হত না, যদি বনরক্ষীরা সতর্ক থাকত।

অন্যতম বনরক্ষী রমনী বর্মন বলে, আমরা? চার পাঁচজন আমাদের খুন হয়ে গেছে, ট্রাক আসছে, সঙ্গে বন্দুক থাকছে, আমাদের বাঁচাবে কে?

—আপনারাই তো মদত দেন।

—না পলটুবাবু, মদত বনরক্ষী দেয় না। বনবিভাগে রিপোর্ট করলে কাজ হয় না, জীবন বিপন্ন হয় আমাদের। মদত দেয় বড় বড় মাথা, তিন পয়সার বনরক্ষী দেয় না। বলতে পারেন টাকা খায়।

—খান কেন?

—খায় নি বলে দুটো রক্ষী খুন হয়েছে। তখন সব ওপর তলায় টাকা খায় মশাই। বনরক্ষী যখন খায় তখন তাকে ভাবতে হয় টাকা নেব না গুলি খাব।

''সত্যবার্তা'' বলে, কি করে কি হয় সে তো সবাই জানে। লাডিয়ার স—মিলে টাউন ছেয়ে গেল। তার বিরুদ্ধে যতই বলা হোক, তাকে মদত দেয় কে?

—পলটু দত্ত, আবার কে!

—পলটু দত্ত, আবার কে!

—পলটু দত্ত, আবার কে!

রায়বর্মা বলেন, যাক। পাবলিকের কাজ পাবলিক করেছে। থানার কাজ থানা করেছে। আমরা আশা করব, রাজনীতিক নেতারা তাঁদের কাজ করবেন।

পলটু বলে, নিশ্চয় করব।

বিশ্বাস সেপাইদের বলে, ড্রাইভারদের থানা হাজত থেকে সদরে নিতে হবে। রায়! তুমি সঙ্গে যাও। কাঠের ট্রাকও সদরে যাবে। আমি নিয়ে যাব। আগে কাগজ রেডি করি।

—সদরে কেন?

—সদরেই তো যাবে। টাউনে তেমন লকআপ কোথায়?

লকআপে খুনজখম...সদরেই ভালো।

কিছুই হাতে থাকে না পলটুর। সব ওর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সব ও নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলবে। এ মুহূর্তে নয়।

—তুমিও যাও পলটু। পরিস্থিতি তেমনই।

—আমরাও যাব।

মোটর, জীপ, ম্যাটাডোর মিছিল সদরের দিকে। সদরে যেয়েও সহজে ছাড়া পায় না পলটু। পাঁচ পাবলিকের সঙ্গে তাকেও থাকতে হয়।

এম.পি.ও ম্যাজিস্ট্রেট বুঝতে পারেন না এ কেমন খেলা। পলটু দত্ত সঙ্গে আছে, লাডিয়ার ড্রাইভার লকআপে যাচ্ছে, থানা কেস করছে।

বিকেল নাগাদ পলটু লাডিয়াকে ফোন করতে পারে, তার আগে পারে না।

লাডিয়া কলকাতা চলে গেছে।

—চলে গেছে!

বাচ্চু বলে, এখানে বসে কি করবে?

—তুমি বোঝ না।

—আপনার ওপর লাডিয়া টেক্কা দিল। ব্যবস্থা ওই করে আসবে। যতক্ষণে এদের ডেপুটেশন যাবে, তার আগে কাজ হাসিল।

পলটুর মাথার মধ্যে সব ঘুরপাক খায়। বাচ্চু যা বলছে সব সত্যি। এ সব কাজ পলটুরই করার কথা ছিল। লাডিয়া আর ওর ওপর তত ভরসা করে নি। পরাজয়, পরাজয়!

—সব কাগজে আপনার নামও বেরোবে।

—চুপ করবে তুমি?

—দেখবেন, বউদিও জানত।

—কার কথা বলছ?

—জয়া বউদি।

—না, সে জানত না।

—আলবাৎ জানত। তার কাছে রথীনরা যায়। তিনি রায়বর্মাবাবুর বাড়ি যান।

—সে জানত?

—লাডিয়াবাবু বলছিল, এ সময়ে পলটুবাবু ইচ্ছে করেই ফ্যামিলি শিলিগুড়ি পাঠিয়েছে।

—আর কি বলেছে লাডিয়া?

—ইচ্ছে করে কুকমারিতে ঝামেলা ঘটিয়েছে। তো আমি বললাম, কেন? ও আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলল, বাচ্চু পোলিটিকাল আদমি গোখরো সাপ। হাত থেকে দুধও খাবে ছোবলও মারবে।

—আমার সম্পর্কে?

—হ্যাঁ, দাদা!

—কেন, কেন আমি এ কাজ করব?

—নিজের ইমেজ তোলার জন্যে।

—তুমিও তাই বিশ্বাস কর?

শহরের লাফাঙ্গা মস্তান বাচ্চু। ''কৃপাণ'' কাগজের কট্টর কংগ্রেসী মালিকের লালটু ছেলে বাচ্চু বর্তমানে পলটুর দলের লোক। বাপ বলেছে, এখন তুই ওদিকে থাকগে যা। ওদের জামানা যখন, তখন ওদিকে থাকা দরকার।

বাচ্চুকে পেয়ে পলটু রথীনদের ডাউন করে বাচ্চুকে আপ করেছে। রাজনীতিতে এখন মস্তানি, পেশল শরীর, রোয়াবি ও রেলা করার ক্ষমতা দরকার। মার দাঙ্গা সন্ত্রাস করা দরকার। রথীনরা এ সময়ে অচল।

পার্টি ভাঙিয়ে চাকরি নেব না, দুর্নীতিকে আমল দেব না, জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছি,—অচল এ সব কথাবার্তা।

সেই বাচ্চু বলে, নিশ্চয় বিশ্বাস করি।

—কেন?

পলটু অতল খাদে পড়ে যাচ্ছে।

—এটা আপনি ব্যক্তি স্বার্থে করেন নি। দলের স্বার্থে করেছেন। দারুণ দিয়েছেন একখানা। জানতেন সব, ভাঙেন নি। পাবলিককে বোকা বানিয়েছেন। এখন পার্টির ইমেজও উঠল।

—ওই রথীনরা...

—সে তো ভালো হল।

লাডিয়া, লাডিয়া, কলকাতা, কোনো ভয়ংকর ক্ষমতাশালী লোকের ফোন,—কেস মায়ের ভোগে যাচ্ছে,—বিশ্বাস বদলি হচ্ছে,—গ্রেপ্তার হবে কয়েকটা বনরক্ষী (জামিন পাবে),—গ্রেপ্তার হবে কয়েকজন ধনচাঁদ (জামিন পাবে না),—ট্রাক আবার কাঠ নিয়ে শহরে ঢুকবে।

হবে, সব হবে। শুধু গোটা ছবিটায় পলটু কোথাও থাকবে না।

রায়বর্মা দাদার খেলা!

পলটু? পাবলিক তোমার ভূমিকাকে প্রশংসা করছে। তুমি পক্ষ বেছে নাও। লাডিয়ার পক্ষে যাবে, না তোমার মসীলিপ্ত ভাবমূর্তি, যা পার্টির ভাবমূর্তিতে কালি ঢেলেছে, সে কালিমা ধোবে?

সুযোগ একবারই মেলে পলটু।

লাডিয়াকে শত্রু বানিয়ে ছাড়বে? পলটুর মাথায় আগুন জ্বলে যায়। ষড়যন্ত্র এ সব, ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রে জয়াও আছে।

—আমি শিলিগুড়ি যাব।

—এখন?

—হ্যাঁ, ওদের নিয়ে আসব।

পেট্রল ভরে নিয়ে শিলিগুড়ি। ড্রাইভার অসন্তুষ্ট। ঠিক আছে, আমিই চালাব।

পথ লম্বা হচ্ছে, কালো হচ্ছে। পলটুর মাথা কাজ করছে না আর।

গায়ত্রীর বাড়ি।

পলটুর জীবনে লালবাতি জ্বেলে দিয়ে লিলি, গায়ত্রী ও রিনার সঙ্গে স্ব্র্যাব্ল খেলছে জয়া?

—ভেবেছ কি তুমি?

—তুমি?

—শয়তানী, হারামজাদী,.......চলো, বাড়ি চলো। তোমাকে আজ...

—পটলবাবু!

—থামুন আপনি। নিজে স্বামী ছেড়ে এখানে ফুর্তি করছেন, আমার স্ত্রী মেয়েকে....

—বাবা।

—উঠে আয় শীগগির!

পলটু ফুঁসতে থাকে। জয়া চেয়ে থাকে। তারপর বলে গায়ত্রী! পরে কথা হবে।

গায়ত্রী চলে যায় ঘর ছেড়ে।

—চল লিলি।

—মা।

—চল শীগগির। তোর বাবা জানোয়ার হয়ে গেছে। এখানে থাকলে গায়ত্রীকে...

রিনা ওদের ব্যাগ নিয়ে আসে। জয়া ব্যাগ নেয়, বেরোয়।

—এর দাম তুমি দেবে। আমি আদায় করব।

—চল শীগগির।

—জানোয়ার, জানোয়ার, জানোয়ার।

—ওঠো গাড়িতে।

—এ কি! কার গাড়ি?

—লাডিয়ার।

—আমি ও গাড়িতে উঠব না।

—তুমি এ গাড়িতেই উঠবে।

—তুমি চালাবে না কি?

—আমি চালাব।

গাড়ি ছুটছে, ছুটছে। পলটুর কথা ছিটকে আসছে, হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে।

—তুমি সব জানতে।

—কি জানতাম?

—কিসের চক্রান্ত?

—কুকমারিতে...আমাকে প্যাঁচে ফেলার জন্যে...আমাকে ডোবাবার জন্যে...

—কি বলছ?

—বাবা! গাড়ি পিছলে যাবে।

—তোমার মতো স্ত্রীলোকের...

ড্রাইভার চেঁচিয়ে ওঠে, হোঁশিয়ার।

লিলির চীৎকার বাবা!

গাড়ি পথ ছেড়ে সরছে, সহসা ট্রাকটা প্রচণ্ড চেষ্টায় ধাক্কা সামলায়, গাড়ি গড়াচ্ছে, নামছে, সামনে কাঠের গুদাম, প্রচণ্ড ধাক্কা। পলটু জয়াকে ঠেলতে থাকে, ঠেলে দেয়, জয়া! এবার?

ভীষণ সংঘর্ষে সব তালগোল পাকিয়ে যায়? জয়ার চীৎকার, তুমি লিলিকে ফেলে দিলে?

তারপর সব অন্ধকার, অন্ধকার, অন্ধকার।

না, লাডিয়া কোনো কথাই বলে নি। অনেকদিন বাদে পলটুর সামনে বসে বলেছিল, দুশমনি বেইমানি যা করলেন, সব আমি মাপ করে দিয়েছি দাদা। উপরওয়ালা আপনাকে খুব বড় শাস্তি দিয়ে দিলেন। ইস্তিরি ভি ইনজুরি, মেয়ে ভি না—জিন্দা না—মরা। গাড়ি তো ইনসিওর ছিল। আমার কিছু দণ্ড গেল, ড্রাইভার মরে গেল। ওর পরিবারকে দিয়ে দিলাম টাকা! ছেলেটাকে কাজে লাগিয়ে নেব। আপশোস, আপশোস।

—আমার কিছু বলার নেই।

—পলিটিক্স করবেন, মাথাও গরম করবেন, এ তো চলে না।

বাচ্চু বলল আমি কলকাতা গেছি, তব ভি আপনি ক্ষেপে গেলেন, শিলিগুড়ি ছুটলেন, আর লগন চাঁদকে চালাতে দিলেন না...খুব ভুল করলেন! যাক! উপরঅলা আপনাকে শাস্তি দিয়েছেন, আমি কি বলব!

হাসপাতালে লিলি।

জ্ঞান ফিরতে আর্ত চীৎকার, না বাবা নয়! বাবা আসবে না। বাবা আমাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে দিয়েছিল।

না, পলটু লিলিকে ফেলে দেয় নি, ফেলতে চায়নি জয়াকে সে সময়ে ওর মাথায় লোডশেডিং হয়ে গিয়েছিল। কেন ও অমন করছিল, কি করেছিল, কোনো কিছুই পরে মনে করতে পারে নি।

জয়া আর লিলি ফেরার পর রায়বর্মা এসেছিলেন। লিলিকে দেখে নেমে এসেছিলেন।

পলটু তখন তিন মাস ধরে লোকের সমবেদনা আর সহানুভূতি কুড়োচ্ছে।

জয়া ফেরার পর অবশ্য ওর মুখের চেহারা বদলে যায়। জয়ার কথা খুব স্পষ্ট ছিল।

—লিলি তোমাকে সহ্য করতে পারবে না। ও ঘরে ঢুকবে না। আমার সঙ্গেও দরকারের বাইরে কথা বলবে না। তুমি ওপরে না উঠলেই ভালো।

—জয়া!

—আর কথা নয়। আরো কি চাও তুমি? লিলি অন্ধ, পঙ্গু, আরো কিছু চাও?

—আমাকে বলতেও দেবে না?

—না। তুমি কোন জীবন, কাদের সঙ্গ চাও, তা তো বেছেই নিয়েছ। আমরা তার বাইরে।

—এত ঘৃণা নিয়ে তুমি ফিরলে কেন?

—তোমাকে নিরন্তর মনে করিয়ে দেবার জন্যে। সবসময়ে যাতে মনে থাকে যে ক্ষমতা, টাকা, প্রতিপত্তি তুমি নিজের মেয়ের বিনিময়ে সংগ্রহ করছ। তা ছাড়া লিলি তোমার মেয়ে। আমি তোমার স্ত্রী! আমাদের ভার বহন করার দায়ও তোমার, অন্য কারো নয়।

—অসহ্য, অসহ্য।

—ঠিক সয়ে যাবে। তুমি তুমিই থাকবে। তোমার চামড়া যথেষ্ট পুরু।

রায়বর্মা ওর দিকে তাকান নি, বসেননি। দাঁড়িয়ে দরজার ওপারে বাগানের দিকে চেয়ে বলেছিলেন, অঙ্কের সব হিসেবই অঙ্কের নিয়মে মিলে গেল পলটু। ড্রাইভার মাতাল ছিল, তার জন্য দুর্ঘটনা। ট্রাক ছাড়া পেল, ড্রাইভারদের নামে কেস হল না। বিশ্বাস বদলি। দু'জন বনরক্ষী গ্রেপ্তার। লাডিয়া পার্টির দরদী বন্ধু!

—রায়বর্মাদা! আমি আর শুনতে পারছি না।

—সব অঙ্কের হিসেবে মিলে গেল। মিলে তো যেতই। তা তুমিও জানতে। জানতে যখন, তখন গাড়ি চালাতে গিয়ে তুমি...লিলির জীবনটা...বউমার মুখটা...ড্রাইভারের জীবনটা...

মাথা নেড়ে নেড়ে উনি বেরিয়ে যান। যেতে যেতে বলেন, লিলির এই পরিণামটাও কি অঙ্কের হিসেবে ছিল। না ঘটে গেল?

উত্তর শোনার জন্যে উনি দাঁড়ান নি।

তারপর তিন বছর কেটে গেছে। পলটুর দুঃস্বপ্নের কুকমারির জঙ্গল ও গাছ খুব সজীব, হিংস্র।

ট্রাউনের পরিচিত কুকমারি জঙ্গল এখন সরতে সরতে অন্য জেলার সীমান্তে পৌঁছেছে।

এক সময়ে, পুরনো লোকেরা বলে, জঙ্গল এত ঘন ছিল যে সামনের মানুষ পেছনের মানুষকে দেখতে পেতনা। তীক্ষ্ন কুক ডেকে সাড়া দিত।

অরণ্যভূমে বাঁশ বা সাবুই ঘাস লাগিয়ে এখানে ভবিষ্যতে কাগজকল করবার একটি দীর্ঘমেয়াদী বহু কোটি টাকার পরিকল্পনা করার কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়।

পলটুই বলে, তা করবে কেন? এ রাজ্যে কোনো কিছু হোক...ষড়যন্ত্র! ষড়যন্ত্র!

পাঁচ পাবলিক বোবা চোখে শুনে যায়।

বাচ্চুকে তনিমা প্রসঙ্গটি বলা যত সহজ হবে ভেবেছিল তত সহজ হয় না।

বাচ্চুকে পাওয়াই মুশকিল হয়। এ সময়ে ও কাছাকাছি দেশের বাড়িতে। ওর বাবা কৃপাণসিন্ধু (কৃপাসিন্ধু নয়) স্বনামের প্রথমাংশে কাগজের নাম দিয়েছেন। দ্বিতীয়াংশে টাউনের বাড়ির নাম ছিল ''সিন্ধুভিলা।''

দেশের বাড়ির নাম বাবার নামে ''গোবিন্দ নিবাস।'' কৃপাণসিন্ধু বছরে চারবার কালী পুজো করেন। ঘোর শাক্ত পরিবার। শ্যামাকে মদ মাংস সবই দিতে হয়। পুজোর আগে থেকে অভিজ্ঞ লোক সাতু বাবু গিয়ে শুদ্ধ মতে কারণ বারি প্রস্তুত করে।

নিজেও ঘন ঘন খায়। হেলে না টলে না। কৃপাণসিন্ধুর হয়ে জোড়া পাঁঠা, ও অন্যদের মানসিকের পাঁঠা সাতুবাবুই বলি দিত, এখন বাচ্চু দেয়।

দেশের বাড়িতে শ্যামা মায়ের মূর্তি থাকে খড়ের চালের মন্দিরে। শ্যামা মায়ের স্বপ্নাদেশ, আমাকে পাকা মন্দিরে রেখো না।

এ সময়ে গোবিন্দ নিবাসে দুশো মজা। জালায় কারণ বারি। তাতে মানসিক করা বিবিধ জাতের মদের বোতল ঢালা হয়। ভক্তরা খায়।

কয়েক বছর এ উপলক্ষ্যে যাত্রাও হচ্ছে। এবার কলকাতার পার্টি। ''মেয়ে দস্যু রেশমা'', ''বিপ্লবী বিশে ডাকাত'' ও ''কলঙ্ক কঙ্কাবতী''। প্রথমটি রক্ত গরম করবে। দ্বিতীয়টি বিপ্লব চেতনা জাগাবে, তৃতীয়টি নারীর আত্মত্যাগের মহিমা ঘোষণা করবে।

পলটু যেতে পারে নি। দীর্ঘকাল নীরব থেকে তার অর্শ আবার দেখা দিয়েছে। ফলে বাচ্চুই ''যাত্রা হল গণ শিক্ষার হাতিয়ার'' বক্তৃতাটি দিয়েছে।

সমস্ত কর্মকাণ্ড শেষ করে তবে বাচ্চু শহরে উদয় হয়।

—বাপ রে বাপ! বড় পার্টির বায়নাক্কা কত। থাকার ব্যবস্থা শোয়ার ব্যবস্থা, নায়িকা রোজ মাগুর মাছ খাবে, তার ব্যবস্থা।

—সব মিটল?

—মিটল। আমাকে খুঁজছেন শুনলাম।

—হ্যাঁ, কথা ছিল।

—খুব গম্ভীর হয়ে গেছেন?

—কথাটা গুরুত্বপূর্ণ।

—বলুন।

—নিশীথের বাড়িতে একটি মেয়ে থাকে।

—দেখেছি! তনিমা নাগ। টীচার।

—তুমি ওর পেছনে লেগেছ কেন?

—আমি? ওর পেছনে? কে বলল?

—নিশীথ বলে নি।

—কে বলল?

—ওই বলেছে তোমার বউদিকে। আর, খবরটা যে সত্যি, তা তুমিও জানো।

—মাইরি বলছি...

—ওকে ফলো করো। স্কুল থেকে বেরোলে বলো তোমার মোটরবাইকে চাপতে!

—বাজে কথা।

—আমি খবর নিয়েছি বাচ্চু।

বাচ্চু গুম হয়ে যায়।

—তোমাকে আমি একটা কথাই বলেছিলাম! আগে যা করেছ, তা করেছ। আমাদের রাজনীতিতে এ সব নোংরামি চলবে না।

—পলটু দা! আমাকে চোখ রাঙাবেন না।

—তার মানে?

—আপনাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক, ফান্ডে টাকা দেব, যা বলবেন করে দেব, কিন্তু প্রাইভেট ব্যাপারে বাচ্চু কারো কথা শোনে না।

—এ ক্ষেত্রে তোমায় শুনতে হবে।

—আমি...আমি ওকে বিয়ে করব।

—আমি যতদূর জানি, মেয়েটি ভালো। ভাইকে দাঁড় করাবে বলে কাজ করছে। ভাই দাঁড়ালেই ও বিয়ে করবে। পাত্রও নিজেই ঠিক করেছে।

—কে, কে? টাউনের কেউ?

—না, বাইরে থাকে।

—বউদি বলেছে?

—হ্যাঁ বাচ্চু।

—এখানে আসে বটে।

—আসে, থাকে লিলির কাছে। লিলি ওকে খুব ভালোবাসে। ওর বিষয়ে আমার একটা দায়িত্ব আছে।

—বুঝলাম। তা, দায়িত্ব আছে তো ওকে ওই চোর নিশীথটার বাড়ি রেখেছেন কেন?

—নিশীথের স্ত্রী ওর সম্পর্কে বোন।

—বেশ! ভেবে দেখব।

—দেখব নয় বাচ্চু, কথা দিতে হবে।

—এটা মোহববতের ব্যাপার দাদা!

—না, এখানে নয়।

—ওকে যত ভাল ভাবছেন, তত ভাল নয়। কেন? রথীন, মধু, দীনু সকলের সঙ্গে কথা বলে, আমার সঙ্গে বলে না কেন?

—ওরা অন্যরকম ছেলে।

—কতকগুলো পার্টিবিরোধী ছেলেকে আপনি...

—সে জানি। তবে মদ খাওয়া, স্ত্রীলোকের ব্যাপার, এ সব তো ওদের নেই।

—আমার তো সবই আছে। সব জেনে শুনে আমাকে আপনি আনলেন কেন?

—বাচ্চু! আমি তোমাকে বলছি...

—শুনলাম। ভেবে দেখব।

—বিয়ে করবে! তুমি বিবাহিত নও?

—সে কালীঘাটের বিয়ে! ফুর্তিফার্তা করে টাকা দিয়ে ফুটিয়ে দিয়েছি।

—তোমার বাবা জানেন?

—সব জানে।

বাচ্চু সগর্বে বলে, বাবা জানে, মা জানে, টাউনসুদ্ধ লোক জানে, জানে না কে?

বাচ্চু বেরিয়ে যায়। পলটু উদ্বেগে থমথমে হয়ে থাকে। নিজেকে বড় একলা মনে হয় তার। রথীনের কথা মনে পড়ে, আমাদের দূরে সরালেন, কাছে টানলেন বাচ্চুকে। টাউন কেন, জেলাতেও আমাদের পার্টির যেটুকু ছিল, সব আপনি শিকড় ছিঁড়ে উপড়ে দিলেন।

যেহেতু বাচ্চুর কথাবার্তায় পলটু বোঝে যে বাচ্চু তাকে মানল না, সেহেতু ওর অহেতুক রাগ হয় তনিমার ওপরে। কি দরকার ছিল জয়ার কাছে আসার, নিজের সমস্যার কথা বলার?

যা হবার হত তনিমার। নিজেকে যদি বাঁচিয়ে চলতে না পারো, বাইরে চাকরি নিয়ে এলে কেন?

বাচ্চুকে উপেক্ষাই বা দেখাও কেন?

জয়া ঢোকে।

—বাচ্চুর সঙ্গে কথা হল?

—বললাম।

—কড়কাতে পারোনি। তাহলে তুমি চেঁচাতে।

—বলেছি।

—ও কি বলল?

—ভেবে দেখবে।

—ভেবে দেখবে! চমৎকার! মেয়েবাজ, লম্পট একটা ছেলে! লাথি মেরে যাকে বের করে দেওয়া উচিত ছিল...না, তা তো তুমি পারবে না।

—আমি দেখছি ব্যাপারটা।

—তোমার দেখার মানে তো আমি জানি। আলোচনায় বসবে, সিদ্ধান্ত নেবে, চামচারা ''হ্যাঁ হ্যাঁ'' করবে। ছি ছি! তুমি কোথায় নেমে গেছ?

—ওকে বলেছি তো যা বলার।

—কিছুই বলোনি।

—বলেছি। তুমি তনিমার ব্যাপারে নিজেকে অতটা জড়িও না। মিছি মিছি...

—চমৎকার সিদ্ধান্ত। মেয়েটার জীবন গোল্লায় যাক। আমি আলগা হয়ে থাকি, কেমন?

—মুশকিলটা হল...

—বাচ্চু তোমার দলের ছেলে। রথীন, মধু, তপু, দীনু, সবাইকে সরিয়ে দিয়ে...বাচ্চু যেমন ছেলে...

—সেখানেই আমার ভয় জয়া।

ওর যদি আক্রোশ হয়...লিলি তো নড়তে পারে না...

যদি কিছু...

জয়া বলে, অনেকদূর ভেবেই ওর সঙ্গে অমন গলায় কথা বলছিলে...

—একেবারে ভেতরের ব্যাপার!

—না, আর সহ্য করা যায় না।

—তুমি ভেবে দেখ...

—ভেবেছি। দেখছি। একা তুমিই বহুজনের সর্বনাশের জন্যে দায়ী। তোমার মরা উচিত।

বেরিয়ে আসে জয়া। কি করবে? কেমন করে তনিমাকে রক্ষা করবে? কে তনিমাকে বাঁচাবে? বড় শরিকের আক্রোশকে সবাই ভয় করে।

রায়বর্মার কাছে যাবে?

ওঁর প্রধান ভরসা দীনু, সেই তো নেই। নিজের অংশ ভাইকে বেচে দীনু, ছোট প্রেস কিনেছে, ''প্রতিবাদ'' বের করবে। রথীন, মধু, তপু সকলকে নিয়ে সমবায় ভিত্তিতে প্রেস চালাবে।

দীনু টাইপ কিনতে কলকাতায় গেছে।

আসুক, দীনু আসুক। কোনো না কোনো ব্যবস্থা জয়া করবেই। তারপর লিলিকে নিয়ে কলকাতা যাওয়া...ডাক্তার লাহিড়ীকে দেখানো...আর না ফিরলে কেমন হয়?

কিন্তু তনিমা, তনিমার কি হবে?

ভানুর সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। ভানু আরও আলোচনা করলে নিশ্চয় কোনো পথ বেরোবে।

বাচ্চু জ্বলতে জ্বলতে বাড়ি ফেরে। বাড়িতে ওর মহলও আলাদা, সেখানে বাচ্চুর রক্ষার্থে দুই মস্তান কাবলি আর রাজা সর্বদা থাকে।

কাবলি বা রাজা কোনো পার্টির ধার ধারে না। বাচ্চু ওদের কাছে ''গুরু''। বাচ্চু যা বলবে ওরা তাই করবে।

বাচ্চু ওদের বলে, বিয়ার নিয়ে আয়।

—কিনে আনব?

—ফ্রিজ থেকে।

—গুরু গরম মনে হচ্ছে?

—চুপ করে থাক।

ওরা বিয়ার খায়।

—গুরু! তোমার তনিমা তো চলল।

—কোথায়?

—রথীনের বাড়ি যাচ্ছে। ওর বোনের সঙ্গে...সে অবশ্য লোক দেখানো...

—না তোদের খবর সত্যি নয়।

—কেন?

—রথীন সীমাকে বিয়ে করবে।

—নার্স সীমাকে?

—হ্যাঁ হ্যাঁ।

—করছে না কেন?

—করবে।

—ধুস, সীমাটা মুটকি।

—তাতে কি?

—তনিমাকে দেখছে...সীমাকে ফুটিয়ে দেবে।

রাজা বলে, না না। তনিমার ইয়ে আছে একজন।

—সে কে?

—খড়গপুরে আই.আই.টি—তে পড়ায়। দারুন আঁতেল? তনিমা নিজেও আঁতেল তো!

—আঁতলেমি আমি ঘুচিয়ে দেব।

—কেমন করে?

—চুপ কর। পলটু দত্ত আমায় দাবড়াচ্ছে। (বুকে চাপড় মেরে) আমি বাচ্চু! কোনো দাদার দাবড়ানি আমি সহ্য করি না।

—বাঃ! পলটু তোমার পোটেকশান দেয়।

—না দিলে কলা হত।

বাচ্চু লালচে ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

—পলটু দত্তকে বলে দিস, ওর আমাকে দরকার। আমার ও ছাড়াও চলবে। আমি বাপ কা বেটা! আমার বাবার ছেলের কোনো পোটেকশান দরকার করে না। পলটুই দীনু রথীনের ভয়ে মরে।

—কেন?

—তারা আদসসোবাদী। পলটু দু'নম্বরী। ওদেরকে পলটু ডরায়।

—রায়বর্মাকে?

—তাকেও। আর ডরায়...

—কাকে?

—নিজের বউকে। মেয়েছেলেকে বেটাছেলে কখন ডরায়? যখন সে মেনিমুখো হয়।

—বউদি কিন্তু হেভী গম্ভীর...

—আঁতেল। আঁতেল।

—আঁতেল?

—আমি যে এত যাই...কোনদিন ভালো মুখে একটা কথা বলল না। রথীন...দীনু...

—বউদি হেভি ফ্যামিলির মেয়ে...

—মানছি। কিন্তু...

—কি সিম্পল থাকে...রিক্সা চাপে...

—সোয়ামীকে ঘেন্না করে। মেয়েছেলেকে জুতোর নিচে রাখা দরকার। তা না করলেই...

—যা! দু'দুটো ব্যারিস্টারের বোনকে কেউ জুতোর নিচে রাখতে পারে?

—বাচ্চু হলে দেখিয়ে দিত।

—কি জানি...

—আসলে বউদি...তনিমা...সব এক গোত্তরের। আঁতেল। আমার যদি রথীনের মতো লেখাপড়ার ফান্ডা থাকত, তাহলে আমার কদর হত।

—আরো তো কত মেয়ে আছে।

—ও আমাকে অপমান করেছে।

—তুমি বদলা নেবে?

—ওকে তুলে এনে বিয়ে করব।

—তা পারবে না।

—কেন?

—তোমরা সব এক পাট্টির লোক।

—কিসে? আমি আঁতেল পাট্টি?

পাট্টি—পোটেকশান—আদসসোবাদী—রাজা ও কাবলি বোঝে গুরু রিয়ার খেয়েই নেশাগ্রস্ত হচ্ছে, কথা জড়াচ্ছে। বোধ হয় ট্যাবলেটও খেয়েছে।

—না না। মানে পলটুদা, তুমি, নিশীথ, তনিমা, সব তো এক পাট্টি!

—তাতে কি?

—নিজেদের মধ্যে...

—আমার কেউ নেই। (ঘন ঘন নিশ্বাস) আমার আমি আছি। যে মেয়েকে যখন মনে করেছি, তুলে এনেছি, ওর বেলা হিসেব পাল্টে যাবে?

—গুরু! দোষ নিও না। তা নিয়ে তো অনেক ঝামেলাও হয়েছে।

—হয়েছে! দীনু আমায় মেরেছে। কিন্তু বারবার পলটু আমায় পোটেকশান দিয়েছে।

—তারা বাইরের মেয়ে, গুরু!

এ পাট্টির মেয়ে?

—নয়? নিশীথের কুটুম্ব, ইস্কুলে ইউনিয়নও তোমাদের ইউনিয়ন!

—এখন আমার বুকে আগুন জ্বলছে রে রাজা। ভালো কথা ভাল লাগছে না। চল বেরোই।

—কোথা যাবে?

—ডিসকো হোটেলে। মাংস পরোটা খাব।

সিনেমা হলের নাম একদা ''উর্বশী'' ছিল, এখন ''ডিসকো।'' সময়ের হাওয়া সিনেমা মালিক ভালো বোঝে। এখন বাতাসে নোট উড়ছে, তুমিও ধরো।

সিনেমার সঙ্গেই হোটেল ও ডিসকো কেটারিং সার্ভিস। হোটেলের পিছনের ঘরে সকলের প্রবেশাধিকার নেই। সেখানে শুধু গণ্যমান্য নাগরিকরা ছোট একটি মিনি সিনেমা ঘরে বসে মদ ও ড্রাগ সহযোগে নীল ছবি দেখতে পারে। মদের লাইসেনস নেই।

এ রকম যে চলে তা সবাই জানে।

পুলিশ সব চেয়ে বেশি জানে।

বাচ্চু ডিসকো হোটেলে যায়। রগরগে মাংস চাই। মচমচে পরোটা। রগরগে মাংস।

যেতে যেতে ও বলে, ভালো কথায় না মানলে ওকে তুলে নিয়ে শিলিগুড়িতে ফেলব, ব্লু ফিলিম তোলাব। তখন অপসে মুরগি হাত থেকে ধান খাবে। অমন সতীপনা অনেক দেখেছি।

রাজা ও কাবলি চুপ করে থাকে। গুরুর মনে কত কথা জাগে মাইরি! গুরু! তুমি জিনিয়াস। কিন্তু গুরু! এ থেকে ঝামেলা বাধলে রাজা আর কাবলি টাউন থেকে ছুটে যাবে।

দুজনের নামেই বহু রেকর্ড আছে। নেহাৎ বাচ্চুর সঙ্গে আছে বলে গায়ে হাত পড়ছে না। নইলে দুজনকেই পুলিশ...

ওরা ডিসকো হোটেলে ঢোকে।

ম্যানেজার দৌড়ে আসে।

—কি দেব, বলুন?

বাচ্চু লালচে চোখে চেয়ে থাকে।

—যা চাইব তাই দেবে?

—নিশ্চয়।

—তনিমা দিদিমণিকে চাই।

রাজা তাড়াতাড়ি বলে, কষা মাংস আর পরোটা। দিব্যি ময়ান দিয়ে...।

এত কথার কিছুই জানেনি তনিমা।

স্কুল থেকে ফিরে এসে স্নান করে, চা খেয়ে ও আবার বেরোবার জন্যে তৈরি হল।

না, ঘরটা বড়ই। ওর ঘরের সঙ্গে বাথরুমও আছে। জানলা খুলে দিলে বেশ হাওয়া।

নিশীথ আর গীতুও ঠিকই আছে। ওরা সাধ্যমতো ওকে যত্ন করে।

পরিবেশটা ভালো নয়।

লম্বাটে গড়নের একতলা বাড়ি। সামনের ঘরটি পৌরকর্মী ইউনিয়ন আপিস। পরের দুটি ঘরে গীতুর সংসার।

শেষ ঘরটি তনিমার।

স্নানের ব্যবস্থা বাইরে। বাথরুম, রান্নাঘর। তনিমার ঘরের সংলগ্ন বাথরুমে স্নান বা জলের ব্যবস্থা নেই।

বাইরের ঘরে সন্ধ্যার পর অদ্ভুত সব লোক আসে, জুয়ার আড্ডা হয়। যারা আসে তারা কেউ পৌরকর্মী নয়।

আগে আগে অনেক বলেছে তনিমা।

—কেমন করে সহ্য করো তোমরা?

—ওরা ওদের মতো থাকে...

—বাড়ি ছেড়ে যেতে পার না?

—কোথায় পাব এমন বাড়ি?

—আমি এসেই ভুল করেছি।

গীতু শুকনো মুখে কথা বলে, তোমার ঘর তো খুব ভেতরে ভাই।

—এত হট্টগোল...এত চেঁচামেচি...

গীতু নিচু গলায় বলে, কি করবো?

এ বাড়িতে যে ও থাকে, তা বাচ্চু আগে বোঝে নি। যেদিন বুঝল, সেদিন থেকেই বাচ্চুর ভাবগতিক পালটে গেল।

স্কুলে যাবে, বেরিয়ে রিকশায় উঠবে, বাচ্চু পাশে পাশে মোটরসাইকেলে।

স্কুল থেকে বেরবে, সামনে বাচ্চু।

রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠানে গেছে তনিমা। সহকর্মীদের সঙ্গে। একটা ছোট ছেলে এসে এক ঠোঙা চানাচুর এগিয়ে ধরে বলল, বাচ্চুদা দিলেন।

চানাচুর ও ফেলে দিয়েছে, পাশে পাশে চলা উপেক্ষা করেছে।

তারপর কথা বলার চেষ্টা।

—শুনছেন? সিনেমা যাবেন?

—আমাকে বলছেন?

—হ্যাঁ, আপনাকে।

—লজ্জা করে না, ভদ্রলোকের মেয়েকে ডেকে ''সিনেমা যাবেন'' বলতে?

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ফিরেছে তনিমা। নিশীথকে বলছে, ওই লোকটি কে? ছোটলোকের বেহদ্দ একেবারে? পথে বেরোলেই কুকুরের মতো সঙ্গে আছে। আজ বলছে, সিনেমা যাবেন?

শুনে নিশীথের মুখ চুপসে গেছে।

—তুমি ওকে কিছু বলনি তো?

—নিশ্চয় বলেছি।

—কি বলেছ?

—ভদ্রলোক হলে আর কথা বলবে না।

—এমন বলেছ?

—ও যে স্তরের লোক, সে স্তরে নেমে কথা বলা তো সম্ভব নয়, তবু বলেছি। ও কে?

—ও...বাচ্চু...

গীতু, সম্পর্কে যে ওর বোন, শৈশবে যে তনিমার মায়ের কাছে থেকেছে, সে তনিমার ওপরই রেগে উঠেছে।

—কার সঙ্গে অমন করেছ তা জানো?

—কার সঙ্গে?

—ও পলটু দত্তের ডান হাত, যুবনেতা।

—ওই লোকটা?

—হ্যাঁ, ওই। ওর এ শহরে...ওর গায়ে হাত দেবে, ওকে দাবড়াবে, এমন ক্ষমতা কারো নেই। না না, এ তুমি ঠিক করো নি।

—আশ্চর্য, আশ্চর্য গীতু!

—তুমি বুঝবে না। ও ক্ষেপে গেলে আমাদের এখানে থাকা অসম্ভব হবে।

—ও!

তারপরেই তনিমা ভানুর কাছে যায়।

ভানু বলে, তনিমা! তোমার এখানে থাকার কোনো অসুবিধেই নেই। শুধু...

—কি?

—বাচ্চু মানুষ নয়, জানোয়ার।

—ওকে তুমিও ভয় পাও?

—কয়েকটা মেয়েকে নিয়ে বাস করি...বোম মারতে পারে...ঢুকে তোমাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে...থানা, পুলিশ, কেউ কিছু করবে না।

—সে কি ভানুদি?

—এ রকম ও আগেও করেছে।

—এ শহরে কি মানুষ নেই?

—কে ওকে কি বলবে ভাই? ওর খুঁটি যে বড্ড শক্ত।

—সুনীলাদির কাছে যাব?

—ওঁর হস্টেলের বকুলকেই তো...

—তুলে নিয়ে গিয়েছিল?

—তাই শুনেছি।

—বকুলের কি হল?

বকুল...সব লিখে রেখে আত্মহত্যা করেছিল...কেস হয়...কিছু হয় নি।

—আমি কি করব ভানু দি?

—জয়াদির কাছে চলো।

—জয়াদি!

—চলোই না।

জয়ার কাছে ও যেতে শুরু করে। তারপর জয়ার সূত্রেই রথীনদের সঙ্গে আলাপ।

রথীনকেও আজ সব কথা বলবে।

স্কুল থেকে ফিরে স্নান করে চা খেয়ে ও যখন বেরোচ্ছে, গীতু বলল বেরোচ্ছ?

—হ্যাঁ।

—কোথায়?

—নীপাদের বাড়ি।

—একলা ফিরো না।

—না। দেরি হলে লোক নিয়েই ফিরব।

গীতু এটা সেটা নাড়ে। কাপড় ভাঁজ করে।

—তনিমা!

—বলো।

—নীপা তো রথীনের বোন।

—হ্যাঁ।

—ওদের বাড়ি গেলে বাচ্চুর আক্রোশ তো বেড়েই যাবে। আমি যে বলেছি একথা কাউকে বোল না যেন। রথীনদের এখন...

—না, বলব না।

—তোমার জন্যে আমারও খুব চিন্তা। কি করব বলো। বাচ্চু এমন একজন লোক...

—আমি তোমাদের বেশি দিন জ্বালাব না। তেমন হয় তো চলেই যাব।

—কাজ ছেড়ে?

—দেখা যাক।

রথীনদের বাড়িতে অনেক লোক। রথীনের মা, বাবা, দাদা, বউদি, ভাইপো, এক পিসি, দুই বোন। নীপা স্কুলে তনিমার ছাত্রী।

নীপার বউদি এক আশ্চর্য মানুষ। ভাত রেঁধেই যাচ্ছেন, চা করেই যাচ্ছেন, কখনো বিরক্তি নেই। রথীনের দাদাও বেশ ভাল মানুষ।

তনিমাকে দেখে বউদি বলেন, এস ভাই। ওপরে যাও। আজ সীমাও এসেছে।

সীমা ও রথীনের সম্পর্ক সবাই জানে। সীমার ইচ্ছে, এখনি বিয়ে করা। রথীন তা করবে না। নিজে কিছু করতে পারলে তবে বিয়ে।

দীনুর সঙ্গে প্রেস করবে বলে রথীন বেশ উৎসাহিত। ওর মুখেও হাসি ফুটেছে।

রথীন বলে, আসুন।

সীমা বলে, এস ভাই।

—আমার যে কথা ছিল।

—কথা বলবেন বলেই তো ডাকলাম সীমাকে। সীমাও শুনুক।

তনিমা বলে, বাচ্চুর জন্যে আমার জীবন তো অসহ্য হয়ে উঠেছে রথীনবাবু। সীমাদি! আমি যে কিসের মধ্যে পড়েছি...

—বুঝতে পারছি ভাই।

—সবটা শুনলে...

সবই বলে চলে তনিমা। প্রতিদিনের ঘটনা, একটি কথাও বাদ দেয় না।

রথীন মাথা নিচু করে শুনে যায়। সীমাও শোনে সব। কথা বলে, তনিমা বলে, জয়াদি বললেন, কোনো অসুবিধে ছিল না, কিন্তু...

রথীন বলে, বাড়ি তো জয়াদির নয়।

সীমা বলে, কেউ সাহস পাচ্ছে না?

—না। সর্বত্র রাজনীতি।

রথীন ব্যাকুল ও ক্রুদ্ধ উদ্বেগে বলে, ওর নাম রাজনীতি নয় তনিমা, বিশ্বাস করো।

তনিমা সদুঃখ হেসে বলে, আসলে রাজনীতি যে কি, তা আমরা কেউই ভাবিনি। আমি স্কুলের ইউনিয়নে আছি, আপনাদের ইউনিয়ন। নিশীথবাবু পৌরকর্মী ইউনিয়ন করে, আপনাদের ইউনিয়ন। আমরা ধরেই নিয়েছি, এটাই যথেষ্ট।

রথীন বলে, আমরা তা ভাবিনি, এখনো ভাবিনি। কিন্তু রাজনীতি মানে যে শেষ অবধি কেরিয়ার করার, যে কোনো উপায়ে লুণ্ঠনের রাজনীতি হয়ে দাঁড়াবে...আমরা এ রাজনীতি চাই না। জনগণকে নিঃস্ব করে, তাদের মধ্যে দালাল তৈরি করে, মানুষকে ভয়ে দাবড়ে বোবা বানিয়ে রেখে চলতে চাই না।

সীমা বলে, যা বলবে ঘরে বলো। বাইরে বললে তোমাকে লেবেল এঁটে দেবে। বিক্ষুব্ধ, উগ্রপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী। বাপ রে বাপ, কপচাতেও পারে!

—বিচ্ছিন্নতাবাদীও বলছে?

—বাঃ! তোমরা কুকমারি জঙ্গল নিয়ে লড়বে, আর ''বিচ্ছিন্নতাবাদী/উত্তরাখণ্ডী'' এ সব শুনবে না? সব শুনতে হবে। রাজনীতি।

—তনিমা, এটাই লজ্জা ও দুঃখের কথা, যে বর্তমানে বাচ্চুও বর্তমান রাজনীতির কাছে আমাদের চেয়ে অনেক দরকারী।

—সবই বুঝলাম। আমি কি করব?

রথীন ঈষৎ হাসে। বলে, বলতে পারতাম, দীনু ফিরছে। তারপর থেকে তুমি রায়বর্মার বাড়িতে থাকো। সীমার কোয়ার্টারে চলো, আজ তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি। বাড়িতে কথা বলে নিই।

—তারপর?

—এখানেই থাকবে।

—এখানে!

—খুব কষ্ট হবে।

—আপনাদের হবে না?

—না না। আমার বাড়ির লোকদের অভ্যেস আছে। এ বাড়ি বহুকাল আগেই শ্রীক্ষেত্র করে ফেলেছি।

সীমা বলে, তাই ভালো। আমাদের কোয়ার্টারও অরক্ষিত। আর হাসপাতালের বারান্দায়, কম্পাউন্ডে সন্ধ্যে থেকে তুমি সব পাবে।

—কি কি?

—চোলাই, ড্রাগ, সাট্টা, জুয়া, বেশ্যা।

রথীন বলে, সর্বত্র, সর্বত্র। কয়েক বছর ধরে সমানে রাজনীতিক স্বার্থে চাকরি দেয়া হচ্ছে। পলটুদা, নেপাদা (মেজশরিক) এরাও দিয়েছে, মহামান্য কৃপাণসিন্ধুও কম দেয় নি। বর্তমানে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ তো লাডিয়া আর বাচ্চুর নির্দেশে চলে। পোলিটিকাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলে শিক্ষক, কেরানী থেকে ওয়ার্ডবয়, জমাদার কারোই আর কাজ করার দায় থাকে না, নিয়ম মানার ভয় থাকে না, খুঁটির জোরে লড়তে লড়তে ম্যাড়ারা হয়ে ওঠে হায়েনা, নেকড়ে।

—যাক নিশ্চিন্ত হলাম।

সীমা বলে, আমার হবু বরটিকে ভাঙিয়ে নিওনা ভাই। তোমার যা রূপ!

—যাঃ, কি যে বলেন!

—তুমি বিয়ে করবে কবে?

—সুবীর তো এখনি চায়।

—বাড়িতে অসুবিধা?

—খুব। আর দু'বছর না গেলে...

—এ শহরে সবাই এত ভয় পায়!

রথীন বলে, সময়টা পচে গেছে।

—নেতারাও দেখেও দেখে না।

—জেলার, না রাজধানীর?

—রাজধানীর।

—জেলার প্রত্যেকটি নেতার খুঁটি আছে রাজধানীতে। পলটু দত্তের খুঁটি খুব শক্ত।

—হ্যাঁ নিশ্চয়। ও রকম একটা দুর্ঘটনা...

—কোনটা নয় সীমা? আসলে এ শহরের একটা প্রচণ্ড আঘাত দরকার।

—আঘাত?

—চাবুক। চাবুক খেলে সাধারণ মানুষের ভয় কাটবে, বিবেক জাগবে।

—মনে তো হয় না।

—চলো, আজ তনিমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। কাল সকালে কিছু না বলে তনিমা কেটে যাবে।

তনিমা বলে, আপনি আমাকে খুব নিশ্চিন্ত করলেন রথীনদা, আজ আমি ঘুমোব।

রথীনের সঙ্গে তনিমা ফেরে। নিশীথ দরজা খুলে দেয়। রথীনের সঙ্গে একটা কথাও বলে না।

তনিমা ঢুকে যায়।

রথীন বেরিয়ে আসে। আজ ওর মনটা নিশ্চিন্ত। রায়বর্মাকে বলবে। জয়া বউদিকে জানাবে। একটা কথা রথীন খুব ভালো করে বুঝেছে যে, দীনু থাকলে রায়বর্মার বাড়ি থাকতে পারতো এ রকম ভাবে ভাবা মানে নিজের ওপর থেকে দায়িত্ব এড়ানো।

নিজে দায়িত্ব এড়িও না রথীন (রায়বর্মাদার কথা), সর্বদা নিজেকে শুধাবে যা করতে পারতাম তা নিজে কি করেছি?

নিজে যদি না করে থাকো, ''ও কেন করল না'' এ কথা বলবে না।

মানুষের সুখ দুঃখে জড়িয়ে থাকো রথীন। মানুষের বিশ্বাস অর্জন করো। অন্য কোন পথ নেই। এইদিনও দিন নয়। দলমত নির্বিশেষে চেষ্টা করলে দিন ফেরানো যায়।

এ কথার জবাবে রথীন হেসেছিল।

—হেসো না। আমাদের ওপর বার বার আঘাত আসেনি?

—তারপরেও তো...

—তখন তো রাজনীতি অন্য রকম ছিল।

—হ্যাঁ, এখন লুটের দিন। যে যত পাইয়ে দেবে, সে তত বড় নেতা।

রায়বর্মার কাছে ও সকালে গেল?

তনিমার চলে আসা পর্ব মিটলে পরে। রথীনের বউদি বললেন, কষ্ট হবে, নীপাদের ঘরে থাকবে। তবে নিচের ঘরে রথীন, মধু, তপু তো থাকে।

—অনেক নিরাপদ।

—এ পাড়াতেই ওরা আছে বলে...

ওদের অত্যন্ত বিস্মিত করে বিকেলে মেজশরিকের উৎসাহী কর্মী ও ট্রেনিং কলেজের শিক্ষিকা দীপালি আর আদি মহিলা সেবাসমাজের ভারতী আসেন। দুজনেই প্রৌঢ়, দুজনেই অবিবাহিত, শহরে ওদের যথেষ্ট সুনাম আছে।

—রথীন কোথায়, রথীন?

—বেরিয়েছে।

—কখন ফিরবে?

—এখনি। আবার বেরোবে।

রথীনের সঙ্গে দেখা করব।

—বসুন। চা খাবেন?

ভারতী বলেন, না। চা আমিও খাব না, তুমিও খাবে না, লোকজনকেও দেবে না। চা পান মানে বিষ পান। এখন চায়ে চামড়ার কুচি থাকছে।

—কি খাবেন?

—জল। বিশুদ্ধ পানীয় জল।

—কোত্থেকে আসছেন?

—কত জায়গা ঘুরে।

রথীন এসে যায়। যে সব কথাবার্তা হয়, তনিমা খুবই অবাক। তাকে নিয়ে অত কথা হচ্ছে? রথীন কত কি করেছে?

দীপালি আর ভারতী কথা বলতে থাকে।

—তনিমার সমস্যাটা আমরা সমাধান করতে পারি নি।

—রথীন যা করল...

—এখন আমরা লড়ে যাব।

—লড়ে যাবেন দীপালিদি?

—হ্যাঁ রথীন। এতদিন তনিমা ওখানে, পারিনি। এবার বাচ্চু আর তার মস্তানদের নামে লিখে স্বাক্ষর সংগ্রহ করব। ম্যাজিস্ট্রেট, এস.পি. কলকাতায় মন্ত্রীদের দেব।

—সবাই সই করবে না।

—পলটু করবে না, রায়বর্মাদা সই করবে। আমি, নেপুদা, ডাক্তারদের মধ্যে অধীপ, বিমলেন্দু, উকিলদের মধ্যে তো অনেককেই পাব। মহিলা সংগঠনগুলি...

—পলটুদাদের কোনো সংগঠন করবে না।

—সে তো ভালই! পরিষ্কার বোঝা যাবে, টাউনের লোক বুঝবে কারা বাচ্চুর কাজে মদত দিচ্ছে।

—তা হবে।

—তোমরা, রায়বর্মাদা, তোমরাও চিহ্নিত হয়ে যাবে। কিন্তু একাজ করলে পলটুর দলের ইমেজটা কেমন দাঁড়াবে? সমাজবিরোধীকে কোনো ব্যক্তি মদত দিতেই পারে। কিন্তু গোটা দলটাকে জড়ানো...

তনিমা ক্ষীণস্বরে বলে, কেন? এত সব?

—তুমি যে এ বাড়িতে এসেছ, এ খবর তো শহরে রটে গেছে। কেন এসেছ, তাও সবাই বুঝছে। তুমি বাইরের মেয়ে। তুমি বাইরের মেয়ে শহরে কাজ করতে এলে বিপন্ন হবে কেন? নাগরিকদের কোনো কর্তব্য নেই? সেজন্যেই...

—রথীন! রায়বর্মাদা কি বললেন?

—আপনারা যা বলছেন।

—জয়াদি?

—বউদি আমার হাতটা চেপে ধরলেন। বললেন, রথীন! তোমার ঋণ আমি জীবনে ভুলব না।

—জয়াদির জন্যে কষ্ট হয়।

—উনি সই দেবেন।

—দেবে?

—হ্যাঁ, দেবেন।

—কি ভাবছ হঠাৎ?

—একটু অবাকই হলাম।

—কেন?

—বউদি সই দিলে পলটুদা কি বলবে তা জানি না। তবে তনিমাকে আমাদের বাড়িতে এনেছি শুনে পলটুদা যেন স্বস্তি পেল। বলল, খুব ভালো করেছ রথীন। তোমার বউদি ওর জন্যে খুব চিন্তিত ছিল...আমিও...।

—খুবই আশ্চর্য কথা।

—যেন মুখোশ খুলে আগেকার পলটুদা কয়েক মিনিটের জন্যে...বলল, ভুল বোঝাবুঝি তো হতেই পারে রথীন। তা বলে আমাকে একেবারে ত্যাগ করলে!

—তুমি কি বললে?

—বললাম, ভুল তো আপনিই বুঝলেন পলটুদা। আমরা কবে অন্যরকম ছিলাম বলুন?

দীপালি মাথা নাড়ে বার বার। বলে, বাম রাজনীতিটা একেবারে দেউলে করে দিলাম সকলে মিলে...নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস...সন্দেহ...

—বেনোজল ঢুকে গেল।

—বাঁধ ভাঙছে তা আমরা দেখেও দেখিনি রথীন। কেউই দেখিনি। বেনোজল যদি ঢুকে থাকে, সেও আমরাই ঢুকিয়েছি।

—ওই বাচ্চু আর লাডিয়া...

—ওরাই যদি এখানকার রাজনীতিতে প্রয়োজনীয় হয় তাহলে ওরা গেলে আরেক বাচ্চু, আরেক লাডিয়াকে সময়ই তৈরি করে নেবে।

—হ্যাঁ, তাও সত্যি। তবু দুঃখ হয়।

—দুঃখ কোরনা, —দীপালি সান্ত্বনা দেয়, অন্ধকারের পর আলো আসেই। প্রকৃতির নিয়ম।

—প্রকৃতির নিয়মে বর্তমান অবস্থার কোন সমাধান হবে না দীপালিদি। এ শহর এখন সমগ্র রাজ্যের দর্পণ। এ শহরের সামাজিক রাজনীতিক অবস্থা যা, সমগ্র রাজ্যে তাই।

—আশা হারিও না।

রথীন তনিমাকে রায়বর্মার বাড়িতেও নিয়ে যায়। সে এখন এতবড় একটা আলোচনার বস্তু হয়েছে, তাতে তনিমার বড় সংকোচ।

—এস মা, বোস।

''মা'' শুনে তনিমা হঠাৎ অভিভূত হয়। ওর চোখে জল আসে। বাবার মৃত্যুর পর ওকে ''মা'' কেউ বলে নি।

বাবা বলতেন, তোকে নিয়েই আমার ভাবনা মা! তুই এত নরম!

মা ওকে ''মা'' বলেন না।

মার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা খুব অদ্ভুত। সুবীরকে বিয়ে করবে শুনে মা খুশি হননি।

—মা ভাইকে ভাসিয়ে দিবি?

—না মা, ভাই আগে দাঁড়াক।

—দেখিস! এ টুকু দয়া করিস।

—দয়া কেন বলছ মা? কর্তব্য...

—তোর বড়দির ছিল কর্তব্যজ্ঞান। বিয়ে করেনি, নিজের কথাও ভাবে নি...

—মা! বড়দি যদি বেঁচে থাকত তাহলে একদিন তো সেও দেখত যে ভাই সংসারী হল, তুমিও থাকলে না, তার জীবনটা শূন্য হয়ে যেত না?

—সে অন্য আদর্শ বুঝত।

বড়দিই তনিমাকে বলত, আমার মতো ভুল করিস না তনিমা। বিয়ে করিস। নইলে বড় শূন্য লাগবে।

সে কথা তনিমার মাকে বলে নি। মেয়ের রোজগারের ওপর যখন নির্ভর করতে হয়, তখন মেয়ের বিষয়ে মা স্বার্থপর হবেই। এটাই হয়তো নিয়ম।

এইতো দীপালিদি! দেখতেও সুন্দর ছিল, মানুষটাও কত ভালো।

—কেন বিয়ে করেন নি দীপালিদি?

—ভাইবোনদের মানুষ করতে করতে, ওদের বিয়ে দিতে দিতে, আমার আর হল না।

—দুঃখ হয়?

—না না। ভাবিই না।

রায়বর্মা বলেন, রথীন আমাদের মুখ রেখেছে মা। যেদিন থেকে শুনেছি...

—আমাকে বাঁচিয়েছেন।

—আমার কাছে দীনু থাকলে...

—দীনুদা তো আসবেন।

—ক'দিন বাদে। যাক! প্রমাণ হল যে এ শহরে এখনো মানুষ আছে, সাহস আছে। থাক, তবুও সাবধানে চলাফেরা কোর।

—হ্যাঁ, নিশ্চয়।

—এই যে তনিমা।

—জয়াদি!

—রায়বর্মাদার জন্যে একটু...

—কি, আমলকীর মোরববা?

—ভালো হয় নি।

—ওই আমার খুব ভালো।

—তনিমা, আমি যে কি নিশ্চিন্ত হয়েছি...

রথীন বলে, পলটুদাও।

জয়া তির্যক হাসে। বলে, পলটুদার ব্যাপারটা আলাদা। আমার কথায় ও বাচ্চুকে ডেকেছিল।

—ডেকেছিলেন?

—হ্যাঁ। মিনমিনে গলায় বলেও ছিল। বাচ্চু ওকেই দাবড়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়।

—তারপর?

—আমি ওকে যা নয় তাই বললাম।

—উনি কিন্তু খুশিই হয়েছেন।

—ও একটু ভাল করে কথা বলল, তাতেই গলে গেলে? সত্যি! নেতারা তোমাদের ক্রীতদাস বানিয়ে ছাড়ে। ওকে তুমি চেন না, আমি চিনি।

—বেশ তো বউমা। তুমিই বলো।

—ওর সবটাই একসঙ্গে জটিলতা আর ধান্দাবাজি। বাচ্চুকে ও থামাতে পারত না। আবার তনিমার কিছু যদি বাচ্চু থেকেই হয়, তাহলে ওর একটা পরিষ্কার স্ট্যান্ড নেবার প্রশ্ন এসে যেত। বাচ্চু, লাডিয়া, মহীন্দর, এদের বিরুদ্ধে স্ট্যান্ড নেয়া ওর পক্ষে অসম্ভব। কেন না সেখানে টাকাকড়ি, দশ আনা—ছ'আনার ব্যাপার। তুমি তো ওকে বাঁচিয়ে দিলে।

—পলটুদাকে?

—নিশ্চয়। এখন ও বলতে পারবে রথীন নিয়ে গেছে, আমি কি করব? ও জানে যে বাচ্চু তোমাদের সঙ্গে খোলাখুলি সংঘর্ষে নামবে না। ও তো নিজের বাড়িতেই রাখতে পারত তনিমাকে। ওকে কিছুই করতে হল না। এখন ও বলতেও পারবে যে আমাদের রথীনই কাজটা করেছে।

—ওঃ! কত ঘোরপ্যাঁচ।

—বাচ্চু ওকে সেদিন দাবড়ে অপমান করে। তোমার এ কাজটার ফলে বাচ্চু খানিক দাবড়া খেয়েছে এ জন্যেও ও খুশি। অথচ লোকটা নিজের ফাঁদে এমনই বন্দী যে সে কথা খোলাগলায় বলে বাচ্চুকে চটাতে পারবে না।

রথীন বলে, এ শহরে একটা কিছু ঘটা দরকার। যাতে সব পর্দা ছিঁড়ে যায়। মানুষকে বিবেকীর বা অবিবেকীর, একটা স্ট্যান্ড নিতে হয়।

রায়বর্মা বলেন, বর্তমানে তা অসম্ভব।

—কেন?

—সব তুষচাপা আগুন। দাবানল নয়।

বাচ্চু মনে মনে জ্বলছিল।

আগুন জ্বালিয়ে দেবে ও, সইবে না এমন অপমান। ''ওকে যেতে দিলে কেন শুওরের বাচ্চা'' বলে নিশীথকে লাথির পর লাথি মেরে ও শান্তি পায় নি।

পাঁজরা ও হাড় ভেঙে নিশীথ এখন হাসপাতালে। ''কে বা কাহারা''র আক্রমণে নিশীথ জখম হবার প্রতিবাদে শহরে বড় শরিক উৎকৃষ্ট কাগজে ছাপানো ইস্তাহার মেরেছে, উচ্চ পর‍্যায়ে আলোচনা করেছে এবং শহরে আইন শৃঙ্খলা উন্নত না করলে কপালে দুর্ভোগ আছে বলে এস.ডি.ও—কে শাসিয়েছে।

এ কারণে পৌরসভা কর্মীদের মধ্যে কৃপাণসিন্ধুর লোক ও পলটুর লোকদের মধ্যে মারামারিও হয়েছে।

কৃপাণসিন্ধুও ইস্তাহার ছেড়েছে, বড় শরিকের গুন্ডাবাজির প্রতিবাদে বন্ধ ও হরতাল পালন করুন।

কবে ''পালন করুন'' তারিখ ঠিক হয়নি।

বাচ্চু বর্তমানে রাজা ও কাবলি ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলছে না।

পলটু ডাকলে যাচ্ছে না।

পলটু ওকে বোঝাতে পারছে না, নিশীথের ওপর হামলা নিয়ে বাচ্চুর নেতৃত্বে যুবোদের প্রতিবাদ মিছিল করা দরকার।

বাচ্চু বলেছে, মাইরি আর কি! ''সত্যবার্তা'' দেখেছেন? ওরা তো লিখেই দিয়েছে যে আততায়ীকে সবাই চেনে, ভয়ে মুখ খুলছে না।

—তুমি এসো।

—না।

ফোন নামিয়ে রেখেছে বাচ্চু।

রথীনের বাড়ি! এত বড় ঔদ্ধত্য। বিয়ে তোমায় করব না তনিমা নাগ, শিক্ষা দেব।

আমার হাত ছাড়িয়ে...

রাজা ও কাবলি প্রমাদ গণেছে।

—কত মেয়ে তো আছে গুরু!

—চুপ করে থাক।

গুরু এখন ক্ষ্যাপা কুকুর। না, কোনো একটা হাঙ্গামা বাধতে চলেছে।

—আমরা কেটে যাব।

—কোথায়?

—নেপাল, বাংলাদেশ।

—হ্যাঁ, এখানে আর নয়।

—গুরু কিছু একটা করে বসবে।

তনিমা এত কথার কিছুই জানে নি। এখন ওর জীবন কত আতঙ্কমুক্ত। রথীনকে ও বাধ্য করেছে কিছু টাকা নিতে। দীনু বলেছে,

—প্রেসটা দাঁড়াক। মধু বিয়ে করবে। বউ নিয়ে থাকবে ওখানে। আমিও থাকব। ওখানে আপনি থাকতে পারবেন? কোনো ঝামেলা হবে না।

—ওই বাচ্চু?

—বাচ্চু আমায় চেনে। ভয়ের তো শেষ থাকে না তনিমা ভয় কাটাতে হয়।

তনিমা সে জন্যেই সুবীরকে সব খুলে মেলে লিখতে পেরেছে।

''আর তো দেড় বছর। তারপরেই আমরা বিয়ে করতে পারব। এখন তুমি খুব নিশ্চিন্ত হতে পারো, জানো? আমি ভাবতাম, এ শহরে বুঝি সবাই ভিতু। কিন্তু জানো, মানুষের মতো মানুষও অনেক আছে। এটা কি কম পাওনা? তুমি এবারে এলে সবায়ের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দেব।''

—মানুষের মতো মানুষ!

রথীন, দীনু, তপু, মধু, দীপালি, সীমা, জয়া, ভারতী, রায়বর্মা।

মানুষের মতো মানুষরা কিছুই করতে পারে না।

সেদিন শহরে সাতদিন ব্যাপী মুক্ত মঞ্চে নাট্যোৎসবের আসর থেকে তনিমা উঠে যায় হঠাৎ।

একটা চিরকুট পেয়ে।

—একবার আসবে তনিমা? লিলি খুব অসুস্থ।

—জয়াদি।

লেখাটা কার, জয়াদির কি না তা তনিমা ভেবে দেখেনি। লিলির শরীর খারাপ যাচ্ছে জানে। জয়া নাটক দেখতে আসে না, জানে। নীপাকে ও বলে, এই! লিলি বোধ হয় অসুস্থ। জয়াদি লিখে পাঠিয়েছে। এই দেখ।

স্থানীয় নাট্যদলের ''সাজানো বাগান'' দেখতে নীপা তখন মশগুল। চিরকুটটা ও নেয়, ব্যাগে রাখে।

—আমি একটু যাচ্ছি, কেমন?

নীপা ঘাড় হেলায়।

তনিমা বেরিয়ে আসে। মুক্তমঞ্চ, ময়দানে মঞ্চ। চা, পান, ঝালমুড়ি, বাদাম, চপ ও রোলের দোকান, কোলড্রিংক। তপুর ভাই দীপু চা খাচ্ছিল।

—তনিমাদি?

—তুমি নাটক দেখছ না?

—এ নাটক আগেও খোদ কলকাতায় বসে দেখা। আপনি?

—লিলি খুব অসুস্থ ভাই, জয়াদি ডেকেছে।

—চলুন, এগিয়ে দিই।

...না না। আমি যেতে পারব।

—অন্তত চেনা রিকশায় তুলে দিই।

—রিকশায় যাব? সামনেই তো?

—তবে সাইকেলের পেছনে বসুন।

—বেশ, চলো।

—একা যাবেন কেন?

দীপুর সাইকেলের পেছনে তনিমা বসে। ময়দানের পর রাস্তা। নীরব ও অন্ধকার পৌরভবন। রাস্তা বেঁকে যায়। নীরব ও অন্ধকার স্কুল বাড়ি। তারপর পথ। পলটুর বাড়ি ওই বাঁক ঘুরলেই।

দীপ বাঁক ঘুরতে পারেনি।

কি যে হল ও বুঝতেও পারেনি। সামনে গাড়ি আড়াআড়ি করে রাখা, স্টার্ট নিয়েই আছে।

সাইকেল দাঁড় করাতেই ওর মাথায় রড পড়ে। পড়ে যেতে যেতে...পড়ে যেতে যেতে ...ও দেখছিল একটা মাংসল মুখ ও আর্ত চীৎকার হঠাৎ থেমে যেতে শুনেছিল তনিমার।

—দীপু—উ—উ—উ—উ।

স্কুলের দারোয়ান সবই দেখে ও ''রাম রাম'' বলে ঘরে ঢুকে যায়।

—কি হল?—বউ বলে।

—কিছু নয়।

—কে চেঁচাল?

—কেউ না। কিছু বলবিনা কাউকে, কিচ্ছু না, রাম রাম!

—কি হল?

—ওহি বাচ্চু বাবু!

—কাকে মারল? আওরৎ?

—আওরৎকে তুলে নিল। ঔর সাইকেল ওয়ালাকে...

—মেরে ফেলেছে?

—জানি না।

—বাবা রে বাবা! কুছ তো করিও।

—না। বাচ্চু বাবু কা কাম। আমাদের জীবনের কা ভরোসা? দেখতে যাব তো আমাদেরও...

—হা ভগবান!

দীপু পড়ে থাকে, পড়ে থাকে। মাথার পিছনে কান ঘেঁষে রড পড়েছে। দীপু অজ্ঞান।

একটি ট্রাক ঘণ্টাখানেক বাদে দীপুকে আবিষ্কার করে। শহরের ট্রাক। দীপুকে চেনে।

দীপুকে হাসপাতালে পৌঁছে তবে ড্রাইভার তপুর খোঁজে যায়।

নাট্যোৎসবের ভিড় থেকে তপুকে পেতে পেতে আরো সময় যায় এবং নাটক ভাঙলে তবে নীপার খেয়াল হয় যে তনিমা ফেরে নি।

নীপাকে রথীন ধমকাতে থাকে, ভীষণ ধমকাতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে নীপা চিরকুটটি বের করে দেয়। নাটক ভাঙলেও ওদের ঘিরে ভিড় ভাঙে না।

অবশেষে চায়ের দোকান থেকে জানা যায় যে দীপু তনিমাকে নিয়ে সাইকেল নিয়ে কোথায় যেন গেল। হ্যাঁ তনিমা কি বলছিল বটে!

এই চিরকুট!

দীপু রড খেয়ে অজ্ঞান। তবে মাথা ফাটার ওর দিয়েই গেছে। ভিতরে রক্তক্ষরণ হয়তো হয় নি। রথীন বলে তপু, তুই এখানে থাক। তনিমাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

—পাওয়া যাচ্ছে না।

—সার্চ পার্টি চাই।

—তুই, দীনু, মধু...শান্তিদার চায়ের দোকানে খবর দে, আর শোন, দীপালিদির ভাইপোরা আছে।

খোঁজ চলতে থাকে, চলতে থাকে। দীপুর জ্ঞান ফেরে রাত দুটো নাগাদ।

তিনটে নাগাদ ও বলতে পারে, দাদ...বাচ্চু...গাড়িতে তনিমাদিকে...

—গাড়ি কোথায় ছিল?

—স্কুলবাড়ির সামনে...

জয়ার বাড়িতে তার আগেই যায় রথীন। জয়া পাথর হয়ে যায়।

—বউদি!

—এ আমার লেখা নয় রথীন।

—তনিমা আপনার লেখা চেনে না?

—জানি না...মনে করতে পারছি না...

—পলটু কোথায়?

—নেই। নিউ জলপাইগুড়ি গেছে।

—আমরা খুঁজতে বেরোচ্ছি?

—শুধু তোমরা কেন? পুলিশও খুঁজুক! জয়া ফোন তোলে।

—হ্যাঁ, আমি জয়া দত্ত। আমার নাম লেখা জাল চিঠি দেখিয়ে কেউ আজ নাট্যোৎসব থেকে তনিমা নাগকে আমার বাড়ি আসতে বলে।

—কে?

—জানি না। তনিমাকে দীপক পাল, তপন পালের ভাই সাইকেলে পৌঁছে দিচ্ছিল।...দীপু মাথায় রড খেয়ে হাসপাতালে। আপনারা এখনি তনিমার খোঁজ করুন। বুঝলেন? আমি প্রমট অ্যাকশন চাই।

রথীন বলে, বউদি! চিরকুটটা দিন। ওটা নজীর। পুলিশ নিলে চেপে দেবে।

—নাও।

—এটা জেরক্স করিয়ে...

—তোমরা কেউ গাড়ি চালাতে জানো?

—মধু জানে।

—চলো। গ্যারেজ খুলে দিচ্ছি। ওর গাড়ি নিয়ে যাও।

—পলটুদার গাড়ি?

—একদিন আমার কাজে লাগুক।

—মারুতি চালানো...

—মারুতি নিয়ে ও গেছে।

—বেশ! চাবি দিন।

দীনু বলে, তাড়াতাড়ি।

ওরা খুঁজতে থাকে। খুঁজতে থাকে। তারপর ভোর নাগাদ শহরের উপকণ্ঠে। পি.ডবলিউ.ডি—র গুদামের মাঠে ওরা তনিমাকে পায়।

উলঙ্গ। কাপড় জামা পাশে পোঁটলা করে রাখা। অজ্ঞান। মুখ থেকে উরু কামড়ে কামড়ে রক্তাক্ত। দুই উরুর মাঝখানে রক্তের ধারা। কাপড় দিয়ে মুড়বে বলে নিচু হতে ওরা অদ্ভুত গন্ধ পায় মুখে।

একটা তেল ঢালার ফানেল। জ্বলে গেছে যেন। দীনু বলে, ''আদালত ও একটি মেয়ে!'' তুলে নে আস্তে। যত্ন করে তুলবি।

হাসপাতালে তনিমা। অজ্ঞান, অজ্ঞান। অক্সিজেন কোথা দিয়ে দেয়া যাবে? গলায় ফানেল ঢুকিয়ে অ্যাসিড ঢাললে গলনালী পুড়ে যায়। গলা ফুটো করা যাবে না। নাক দিয়ে?

তনিমাকে ঘিরে দীপালি, জয়া, ভারতী, স্কুলের শিক্ষিকারা। রথীন, মধু, দীনু।

রায়বর্মা সীমাকে ডাকেন!

—বলুন!

—পুরুষরা সরে যাও। চাদর সরিয়ে দাও সীমা। কোথায় কি ক্ষত, সব লিখে নাও দীপালি। দেখে নাও।

—কি দেখব আর!

—বউমা!

রায়বর্মা মাথা নাড়তে থাকেন।

—সব ওরা রিপোর্টে ঘুরিয়ে দেবে। সব চেপে দেবে। থাকবে শুধু মিথ্যা!

—শুধু মিথ্যা।

—হ্যাঁ। তোমরা যা দেখবে, দীপালি যা লিখে নেবে, দীপু যা বলেছে, ওই চিরকুট, এগুলোই নজীর। একটা বিশাল মদমত্ত ক্ষমতাচক্রের মার আসছে সর্বশক্তি নিয়ে। এই নজীর দিয়ে তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

—কি করে বেঁচে আছে!

—ও তো কিছু বলতে পারবে না। পাছে বলে, সেজন্যেই তো অ্যাসিড ঢালা। আমরা পারলাম না, পারলাম না মেয়েটাকে বাঁচাতে। আমাদের সকলের কাছে ও নিরাপত্তা চেয়েছিল।

দীনু ছটফট করে ওঠে।

রথীন বলে, সিগারেট খা।

—আমি একাই পারব।

—লাভ নেই দীনু দা। বাচ্চু শহরে নেই। ভোরে কেটে গেছে।

—কোথায় যাবে ও? কতদিন সরে থাকবে?

—দীনু দা...আমি বারবার বলতাম, এ শহরে মানুষ সবাই বিকিয়ে গেছে কিনা যাচাই করার জন্যে একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটা দরকার। কিন্তু সেটা তনিমাকে নিয়ে ঘটুক...তনিমাকে নিয়ে...

রথীন কাঁদতে থাকে।

জয়া বসে থাকে বারান্দায়, বসেই থাকে। আরো কত লোক, কত লোক! আজ ও লিলির কথাও ভাবছে না। লালুর মাকে বসিয়ে রেখে এসেছে।

এর পরে কি? এর পরে?

ভিড়ের মধ্যে থেকে কথা কানে আসে।

—পলটু দত্তের বউ এখানে কেন?

—মুখ দেখাতে এসেছে।

—বাচ্চু তো পলটু দত্তের লোক।

—বাচ্চুর টাকায় তো সংসার চালায়।

—লজ্জা করে না?

—থুতু দিতে হয়।

জয়া চোখ বোজে। চোখ দিয়ে জল পড়ে ওর। হ্যাঁ, তোমরা আরো বলো। আমাকে অপমান করো। পলটু দত্তের স্ত্রী হয়ে থাকার জন্যে তোমাদের ঘৃণা আমার ওপর নেমে আসুক।

—কাঁদছে...ঢং দেখাচ্ছে।

—পলটুই বাচ্চুকে বাঁচাবে রে ভাই। দুধেল গাই কি হাত ছাড়া করে কেউ?

ওরা ঠিক বলছে। ওরা পলটুকে চিনেছে। শান্তি, তাতেও শান্তি।

জয়া কি করবে?

লিলিকে নিয়ে চলে যাবে।

কোথায়?

কলকাতায়।

তারপর?

আর ফিরবে না।

আর না, আর না। তনিমা ওকে পথ বলে দিয়ে গেছে।

তনিমা অজ্ঞান অবস্থাতেই বেলা একটা নাগাদ মারা যায়।

রায়বর্মা সরেন না।

—তোমরা থাকো। পোস্টমর্টেম দুরকম হবে। আসল রিপোর্টটা দরকার হলে...

দীনু বলে, বের করব।

—কি করে?

—তা আপনার জানার দরকার নেই। আমি অ্যাকশান করা ছেলে দাদা। এখানে আমারও চেনাজানা আছে। চিরবে কাটবে তো লখীন্দর ডোম!

—হাসপাতাল ছেড়ো না।

—তাই ছাড়ি?

—চলো বউমা।

—কোথায়?

—বাড়ি চলো, আবার এসো।

আজ শহরে কোথাও মানুষ নেই। সবাই হাসপাতালে। জয়া শুনতে শুনতে বেরোয়।

কাল মিছিল করে তনিমাকে শহরে ঘোরানো হবে। কাল সব বন্ধ থাকবে।

আজ কি হবে, আজ?

একটা বিশাল মদমত্ত ক্ষমতাচক্র বাচ্চুকে বাঁচাতে, হাসপাতাল ও মর্গের রিপোর্ট পালটে দিতে ঝাঁপ দিল বলে।

আজ শুধু পাহারা দেবার দিন।

জয়া বাড়ির দিকে চলে। হেঁটে। কোথায় সময় বাজে। কোতোয়ালিতে? সময় থেমে যায় নি? ঘড়ি চলছে? কেমন করে?

বাড়িতে পলটু।

পলটু, সামন্ত শ্রীমতী আশা রায়, হরি বোস। বড় শরিকের জরুরি মিটিং না কি?

জয়া আস্তে আস্তে ওপরে ওঠে।

পলটু বেরিয়ে আসে, জয়া!

লিলি শুয়ে আছে। মুখ পাথর পাথর।

—মা?

—লিলি?

—আমি এখানে থাকব না মা।

—না লিলি, থাকবে না।

—তনিমাদি...তনিমাদি...

—কে বলল?

—লালুর মা।

—না লিলি। তুমি আর আমি চলে যাব। চলে তো, যেতামই। ডাক্তার লাহিড়ীকে দেখাবার জন্যে আমরাই যাব। তারপর...

—আর আসব না?

—না লিলি।

—ঠিক বলছ?

—আমি তো তোমার কাছে মিথ্যা বলি না।

—মা।

—বলো?

—তনিমাদি...খুব কষ্ট তো পায় নি?

—ওর তো জ্ঞানই ফেরে নি লিলি।

—না লিলি।

—তোমার নাম করে কে ওকে লিখেছিল মা? আমার অসুস্থতা জেনেই তো ও আসছিল...

—জানি না লিলি। শোনো, যদ্দিন না চলে যাই, তদ্দিন এ সব নিয়ে কোনো কথা বোল না কেমন? একটা কথাও না।

—বলব না।

—আমি স্নান করি?

—করো।

—জয়া স্নানের ঘরে ঢুকে যায়।

পরদিন শহর বন্ধ।

পরদিন শহর ভেঙে শোক মিছিল।

প্রতিবাদ মিছিলও বটে।

প্রতিটি মানুষ নীরব। মিছিলের মাঝে মাঝে উত্তোলিত ব্যানার।

—তনিমা নাগের ধর্ষণ ও হত্যার জবাব চাই।

—অপরাধীকে আশ্রয় দেয়া চলবে না।

—সম্পূর্ণ তদন্ত ও বিচার চাই।

—তনিমা নাগের হত্যাকারীর চরম দণ্ড চাই।

পলটু বেরিয়ে আসে।

—তুমি কোথায় যাচ্ছ?

—মিছিলে।

—না না। আমরা মিছিলে যাচ্ছি না।

—তোমরা মানে?

—আমাদের পার্টির কোনো সংগঠন মিছিলে যাবে না।

—ভালো। শহরবাসী পরিষ্কার জানবে, দেখবে কারা অনুপস্থিত থাকছে।

—তুমি গেলে জয়া...

—সরে যাও।

—আমার এ শহরে...

—থাকা চলবে না?

—যেওনা জয়া।

—আস্তে, চেঁচিও না। তুমি থাকবে। তোমরাই থাকবে। স্বসৃষ্ট সাম্রাজ্যে থাকবে।

—তুমি?

—আমি থাকব না, আমি থাকব না। লিলি থাকবে না। টেলিগ্রাম করেছি, ছোড়দা আসছে, আমাদের নিয়ে যাবে।

—চলে যাবে?

—এই তো যাচ্ছি। এখনো তো যাচ্ছি।

বেরিয়ে আসে জয়া। আসছে, মিছিল আসছে। পলটু দত্ত পরাজিত, বিধবস্ত। ও জানালা দিয়ে চেয়ে থাকে।

মৃতদেহ নিয়ে মিছিল আসছে। ওর বাড়ির সামনে দাঁড়াচ্ছে কেন? কেন ওর বাড়ির দিকে তাকাচ্ছে?

মিছিলের দিকে এগিয়ে যায় ওর স্ত্রী। পলটুর দিকে সারি সারি ব্যানার উঁচানো।

প্রতিটি ব্যানার বেয়নেট।

জয়াও একটি ব্যানার উঁচিয়ে ধরে।

—তনিমা নাগের হত্যাকারীকে আশ্রয়দাতাদের শাস্তি চাই।

জয়ার চোখে কিসের ঝলক? ইস্পাতের? পলটু দত্ত ওর স্ত্রীর দিকে তাকাতে পারে না, তবু চেয়ে থাকে।

বারবার বিদ্ধ হয়, বারবার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%