মহাশ্বেতা দেবী
''পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের প্রখ্যাত মঞ্চাভিনেত্রী সরসী তালুকদার বিগত শনিবার পরলোকগমন করেছেন। তিনি আন্ত্রিক ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিন মাস যাবৎ শয্যাশায়ী ছিলেন ... ঠাকুরপুকুরে...'স্ফুলিঙ্গ' নাটকে রাধা বৈষ্ণবীর ভূমিকায় তাঁর আত্মপ্রকাশ এবং শততম রজনীর পর...'করুণা' নাটকে একদা বিখ্যাত, আজ বিস্মৃত মঞ্চতারকার অভিনয়ে করুণার ভূমিকা তাঁকে খ্যাতির তুঙ্গে তুলে দেয়। বিয়োগান্তক ভূমিকায় তাঁর অভিনয় তাঁকে 'ট্র্যাজিডি কুইন' খ্যাতি এনে দেয়। ...তাঁর ইচ্ছাতেই তাঁকে তাঁর বাড়িতে আনা হয় বুধবার এবং শনিবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর স্বামী প্রখ্যাত অভিনেতা, মঞ্চ ও যাত্রার নাট্যকার অরুণ তালুকদার ও একমাত্র পুত্র প্রখ্যাত স্থপতি প্রলয় তালুকদার উপস্থিত ছিলেন... শনিবার বিকালে তাঁর মরদেহ কেওড়াতলা মহশ্মশানে ভস্মীভূত হয়...'' ইত্যাদি, ইত্যাদি।
বিশেষ সংযোজন, শোকাচ্ছন্ন অরুণ তালুকদারকে কিছু জিজ্ঞাসা করা যায়নি। প্রলয় তালুকদারও কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
শেলী
আমাকে উনি শেলী বলতেন। আমার নাম সেলিমা। কাগজে নাকি সব লিখেছে দেখলাম। হোঃ! বাড়ি তো তাঁর এটাই ছিল, এ—ই ২। ৫। এ, মেহতাব রোড। আমারই ওনার কাছে আটত্রিশ বছর হয়ে গেল। আগে সব এখেনেই থাকত আমি যখন এসেছি। তা, তখন আমার দশ বছর হবে। বাবু থাকত, মা থাকত। পিপুল তখন ছোট ছেলে। এনাদের দুই লোকের কাজ বাইরে বাইরে, ছেলেকে কাছে রাখত না। দার্জিলিঙে পাঠিয়ে দিয়েছিল। মা বলত, বড় দুঃখের দিনে পিপুল এসেছিল, জানলি শেলী? তাই কষ্ট করেও ভাল জায়গায় পড়াচ্ছি, যাতে মানুষ হয়। তা মানুষ তো সে ভালই হয়েছে শুনতে পাই। আজ সেও তো আধবুড়ো বেটাছেলে। অনেক নামডাক, অনেক কামায়। কিন্তু আমি বলি মহাপাপী। অমন মা, তারে দেখল না, বাপ বলতে মুচ্ছো যায়। এসব শোনা কথা নয়, দেখা কথা।
মিছে বলব কেন? মা অনেক করেছে আমার। এত করা কেউ করে না।
শুনচি, এ বাড়ি বেচে দেবে বাবু। বাড়ি, যা শুনেচি, বাবুর নয়, মায়ের দিদমা মাকে দিইছিল। তিনি খুব খাণ্ডার মেয়েছেলে ছিল। উদোম খেতে পারত। আম, কাঁটাল, দুধ, ঘি খুব খেত। তিনির বংশেও এক মেয়ে। মায়ের মা। মায়ের দিদমাকে তাদের জমিদারিতে সবাই বলতে সিংহবাঘিনী। জমিদারি সামলেচে, কাছারির কাগজপত্তর দেখেচে—আর মায়ের বাবাকে ঘরজামাই রেখেছিল, ছেলে হয়ে থাকবে বলে।
মা বলত, বড়লোকের ঘরজামাই মানুষ হয় না। মায়ের বাবাও তেমন ধারাই ছিল শুনি। ভাতের পাতে গোটা ইলিশ ভাজা খাব, লুচির ফুলকো ছিঁড়ে কচি পাঁঠার ঝোল খাব। খেতে খেতে ঘুমোতে যেত, ঘুমিয়ে খাবার স্বপন দেখত উঠে আবার খেতে থাকত।
তিনি তো একঘরের এক ছেলে। যতদিন মায়ের দিদমা বেঁচে ছিল, ততদিন সাওস পায়নি। তিনি মরল তো তার জ্ঞাতগুষ্টি এসে চেপে বসল। তাদের খাইয়ে—মাখিয়েই সব জলে চলে গেল।
এই বাড়িটা, আর পাশের জমিটা মায়ের নামে ছিল, এটুকুই যা বেঁচেচে।
এটুকু না থাকলে মার চলত? পাশের জমি বেচেও তো টাকা বেহাত হয়ে যেত। নেহাৎ বিনয়বাবু ধমকেধামকে ব্যাঙ্কে রাখিয়ে দেয়, তাতেই মাকে হাত পেতে চাইতে হয়নি। কত বলেচে বিনয়বাবু, বেচে দিন সব—ফেলাট কিনে নিন। মা শোনে নে। কিন্তু কিচু জমি তো বন্দকী বোদ করি, জানি নি।
এসব কথাই কিরে দিয়ে বলতে পারি। মা যা বলেচে, আমি তাই বলচি। বলেচে বা বলচি কেন, স্বচোখ্যে তো দেখিচি এত বছর ধরে।
অবশ্যি এ কথা বললেই বাবু চেয়ারে কাত হয়ে চোখ উলটে খানিক মুচকে হেসে বলবে, অতই যদি জানবে তবে সেই কেন লিখুক না তার মায়ের কথা? আসল কথা তো বলা যায় না, ওই শেলী সরসীর কাছে তো মাঝে মাঝেই থাকেনি। চলে যায়নি যখন তখন?
বলতে পারে, বললে মিছে বলবো না কিন্তু কি করতাম? নিজের মা নেই না আছে জানিনে কোনোদিন। বাপ বলত, মায়ের নাম কল্যে কেটে ফেলে দেব। শেষমেশ বাপ জেলে, আমার গতি হতো এতিমখানা। মা বলল, ওর বাপ গ্যারেজে কাজ কত্ত না? সব কতা শুনেমেলে বলল, চ, আমার সঙ্গে চ।
তখন হতেই মায়ের কাচে। আমাকে নতুন জামা কিনে দিল। মাতার উকুন ছাড়াল। আমি রোজ ভাবতাম তাইড়ে দেবে, নয় বেচে দেবে। এমন তো বেচে মেয়েদের...বাপ বলত, জাঁললার ধারে যাবিনি, কে ধরে নে যেয়ে বেচে দেবে।
কেমন করে জানব, সেই মাকেও কেউ বেচে দিয়েচে কিনা?
আমার মা নাকি খুব ডবকা ছিল।
মা তখন হতেই তিনি আমার মা।
বাবু বলত, পুষ্যি বাড়াচ্ছ, ভাল করছ?
মা বলত, পিপুল নি কাছে, আমার খালি খালি লাগে নে? ও কাছে থাকুক।
—মেয়েছেলেদের ভার নেয় কেউ?
—কেউ না কেউ তো নেয়! যেমন আমি নিলাম।
তখনে মা উটচে ওপর পানে—পরের রমরমা তখনে হয়নি, হবো হবো কচ্চে। কিন্তুক মায়ের বাড়ি তো নিজের বাড়ি, থেটার কত্তে যায়। বাবু আর মা ট্যাসকি চেপে যায়। বাড়িতে বাসিনী মাসি আর তার ছেলে ভানু সব্যস্য কাজ করে। মাসির কাছে বসে খুব শোলোক শিকতাম। মাসি রাঁদত, বাড়ত, কালনির মা ঠিকে কাজ করত, ভানু আর সব দোকানপাট...ছুটোছুটি...কিন্তু বাবুর তরে সে খাটত বেশি।
বাবুর কি ম্যাজাক, কি ম্যাজাক—সব্যদা সব হাতে হাতে চাই... লেখায় ঘরে কেউ ঢুকবে না মা ছাড়া। থেটারের বই লিখত। পরে তো যাত্তারার পালা লিখে লিখে... থেটার করে...গান লিখে অত রমরমা হল।
মা যেন ঠাকুরসেবা কত্ত।
বাবুর ইচ্ছে হল তো ভরা বৈশেখে কমলালেবুর পায়েস আর ফুলকপির ডাঁললা খাবে।
মা ছুটল নিউ মার্কেটে!
কোথ্যেকে যোগাড় করে আনত বল তো?
সব—সব বিনয়বাবু।
কোথ্যেকে এসে জুটেছিল মায়ের কপালে, কে বলবে! বাবুর ওপর ভকতিভরে এসিছিল প্রথমে! ভদ্দরঘরের ছেলে...থিয়েটার সিনেমার কতা লিকত আর ফটো তুলত। মায়ের সকল ছবিই তো তেনার তোলা। সিদিনে তার বয়সও কম, শামবন্য ছেলে। কতা কম কয়— কেমন করে জানব অত পয়সা ওদেরে—কাজের নামডাক বাড়চে—
মায়ের জন্যে জীবন দিতে পাত্ত। বিনয়বাবুর গাড়িটা তো মায়ের দোরেই বাঁদা থাকত। তা মা নজ্জা নজ্জা হেসে বলত, বিনয়! ওর তো জানো—যা বলবে সেটি চাই। নে যাবে নিউ মার্কেটে?
—একনি চলুন না।
সেই কমলালেবু এল, পায়েস করল মা, রেঁদেবেড়ে বাবুকে খাইয়ে—দাইয়ে বলল, হ্যাঁ গো! জমিদারি তো আমাদের ছিল। তোমার এমন জমিদারি ম্যাজাক হল কোত্থেকে?
বাবুও তখনে, মিছে বলব না, বলত, কেন? তুমি আচ, আমি তো রাজা!
ওই মাজেসাজে। মা সব্যস্য খেটে মত্ত। বাবু মাজে মাজে খানিগ সাজানো কতা ছুঁড়ে দিত। তাতেই মা এমন কত্ত, যেন আসমান থেকে তারা পেয়েচে।
মা, লাগাবাঁদা থাকিনি তখনে।
মা কত বলত, মাস্টারনী রেখিচি, ভাল করে পড় শেলী। তোরে আমি খরচ করে বে দেব।
বাবু বলত, কেন? থেটারে নামাবে না?
—'মা' বলেচে, ওরে থেটারে দেব?
আমাকে সাজ্যে—গুজ্যে, চুল বেঁদে নিজের কাপড় পইনে নে ঘুত্ত।
—কোথা যেত?
—থেটারে গেচি তো বটেই। রাধা বষ্টুমী হয়ে মা নলিনবাবুর জন্যি কেঁদে কেঁদে গান গাইতে গাইতে মরে গেল দেকে আমার কি কান্না। —থেটার সব দেকেচি...দাজ্যিলিং, পাটনা, ধানবাদ। যকনে যেতা থেটারে কত্তে গেচে আমারে নে যেত।
—ঠিক বলোচো, আমিই মার চুল বাঁদতাম, মার জামাকাপড় দেকে রাকতাম। লেকাপড়া যকনে করলামই না, চিঠিপত্তর কষ্টে—ছিষ্টে...মুকের বোলও পষ্কের হল না... মা বলত তোরে দোকান করে দোব। কনে সাজাবি...চুল বাঁদবি...
—সর্বত্তর গেচি। বাবু চলে গেল যকনে তকন তো মা কপাল চাপড়ে চাপড়ে...সে সময়ে বিনয়বাবুর বাসায় তো আমি দৌড়লাম! নহলে কি আর মাকে...আর এই হাসপাতাল থেকে হাসাপাতাল? সে এই শেলী। নুন খেইচি, গুণ গাইব, কিন্তু মা তো থাগল না। শেষকালটা ...বিনয়বাবুও তকনে কোত...না মত্ত না। বিনয়বাবু, চাঁদুদাদা, দত্তবাবু, অরুবাবু সকল আপনজনদেরে ছাড়ল যেদিন থেকে...
—না, আমি লাগাবাঁদা থাকিনি গোড়ের দিকটায়। বয়স তখনে একুশই হবে, তা ইলোটিরি দোকান যার, সেই দিলীপের সঙ্গে পেনয় হয়ে গেল যে! সে কি পেরেম আমার, সে কি পীরিতি! ওরে নইলে চক্কে আঁদার দেখি!
মা কত বকেচে, বুজিয়েচে, ওর বয়স ছত্তিরিশ... বউ—সন্তান আচে...ও তোরে নে দুদিন খেলবে, তা বাদে ছেড়ে দেবে!
তকনে আমি সুচিত্রা—উত্তম দেখচি ওর সঙ্গে পাইলে পাইলে...মায়ের থেটার দেকচি...বাবু গান বাঁদচে, সব্যদা লোকের মুকে মুকে গান 'যারে চাই তারে না পেলে সই, জীবন সঁপিব জলে...' কি এট্টা গানের সিনিমার জন্যে বেঁদিচিল গানটা...
আমার তখন দশ অবস্তা!
মা যকনে বলল, ঘরে তালা দে রাকব শেলী! ভাল ছেলে দেকে বে দেব বলিচি না?
আমারও তখনে দুজ্যয় পেরেম! আহা! মুকখানা নয় যেমন তেমন, দেহে এট্টা জ্বালা নি? খুব মনে আচে, 'করুণা' নাটকের একশো নাইট... দেড় বচর বমরমিয়ে চলিছিল ...মায়ের আলাদা সাজঘর...আলাদা ব্যবস্তা... থেটারে সীন ওটার একঘণ্টা আগে থেকে মা বসে থাকে নিশ্চুপ...পেত্যহ, পেত্যহ...কারো সঙ্গে কতা কয় নে...বাবুর সঙ্গেও না...স—ব জানি আমি। থেটার থেকে ফিরবে...গরম জলে নাইবে...আমি গা—হাত পাউডারে ডলে দোব, তবে ঘুমুবে।
স—ব জানি। স—ব ভুলে গেলাম। কোনো কিচু নয়, এ মাস মাইনের টাকাটা ডেক্রন শাড়ি কিনব বলে চেয়ে রেখিছিলাম...তাই নে, আর গায়ে যা ছিল কানফুল...গলার চেন...হাতের ঘড়ি...তাই নে বেইরে এলাম। সিধে শ্যালদা। বেলেঘাটায় এট্টা বস্তিতে তুলিছিলি বটে, কিন্তুক আমি জানি বে করবে। বে—র নাম করে নে বলে, তুই মোচনমান, আমি হিঁদু, বে হয়?
আমার তো মায়ের শিক্ষে। বলি, বে না করে বিচনায় তুলবি ভেবেছিলি? আর কোতা বা তোর ঘরদোর, কোতা কি?
বলে কি, কানফুলটা দে, বেচে টাকা নে এসে তোরে নে ধানবাদ যাব। সেতা বে—র কোনো ঝামেলা নি। আমার রাগ চড়ে গেল। দুজ্যয় পেরেম ছিল, দুজ্যয় রাগ উঠে গেল। খুব খানিক চেঁচালাম। ফলে?—
ভুস্যি নাশ যাকে বলে। বস্তি তো রেলধাওড়া। পরদিন কল হতে জল নিতে দেয় নি কেউ। বলে, মোচনমানের মেয়ে নে এসে সব্যনাশ করচে।
খুব শোরগোল। আমি তো ভয়ে বাঁচি না। মোচনমান বলতে পারো, সেলিমা নাম ছিল, বাপের নাম ছোলেমান।
কিন্তুক গভ্যধারিণী মা তো রামলাল ভুজাওয়ালার কেমন বোন ছিল বলে শুনিচি। দশ বছরেরটি এনে মা বলেছিল, এ তোর নবজন্ম হল শেলী। পুরনো সব ভুলে যা!
আমি অনেক সিনেমা থেটার দেকিচি। আমি জানতাম গরিব হলেও সুক হয়। মাকে দেকিচি, বাবুর জন্যে প্রাণ দিতে। ভাবতাম তেমন করেই সংসার করব। সে সব আশায় ছাই পড়ল। ওই যে 'করুণা' নাটকে বোরেগী গাইত, 'আশা করো কেন মন, আশা শুধু ছলনা'—আমারও তাই হল।
বাবু গান বাঁদত, নীলকণ্ঠবাবু সুর দিত। সে সব সামাজিক পালার থেটার— কোথায় কি, সবেতে ছাই! নীলকণ্ঠবাবুও তো মরে গেচে কবে। একনে তার নাম করে নে কেউ! তবে বাবুর লেখা গানের ক্যাসেট বেরিয়েচে। মা পিপুলকে বলেছিল, তোমার বাবার উচিত, নীলকণ্ঠবাবুর বউ—মেয়েকে টাকা দেওয়া। সুরটা তো তার।
পিপুল বলল, তোমার অত দরদ তো তুমি দাও গে।
ক্যাসেট দুটোই মা খুব শুনত। বলত, ভাবতে পারি, কত গান আমিও গেয়েছি সে সময়ে?
সে—সময় আর এ—সময় কি। তোমার চে' বয়সে কত বড় কতজনা বেঁচে আছে, মানুষ তাদের দেখছে, মনেও রেখেছে। তুমিই বাবুর কথায় নিজেরে সইরে নিলে। বিনয়বাবু তখনে কত বলল, নিজেরে সইরে নিলে মানুষ ভুলে যাবে।
তুমি তা মানলে না।
যা হোক, সে সব হাংনামায় পরে রেলপুলিশ আমাদের বেলেঘাটা থানায় নে গেল। থানাবাবু বলে, অমন একটা নামী লোকের বাড়ি ছেড়ে ভটার সঙ্গে ভাগলে? চুরিটুরি করিছিলে কিছু?
—ও ভটা কেন হবে বাবু?
—ওর নানা কীর্তি। নানা নাম।
আমারে কোতা পাটাত কে জানে, মা খবর পেয়ে বিনয়বাবুরে পাটাল। ছাই ফেলতে এট্টা কুলোই পেইছিল, ময্যাদা কত্তে পারল না। থেটারের লাইনে মা যেন এক...
তা বাবু তো ঢুকতে দেবে নে। কত গাল যে বাপছেলেতে করল মাকে! এ পাড়ায় থাকা যাবে নে, বাড়ির ইজ্জত বলতে থাকল না কিচু...!
মা বলল, দিলীপ তো দিব্যি সংসারে ফিরে যাচ্ছে। যত দোষ শেলীর হলো? বয়সের গরমে এট্টা কাজ করে ফেলেছে...
—তা বলে...তা বলে...
—ভালবাসলে মানুষ অন্ধই হয় অরুণ। রায়বাড়ির মেয়ে হয়ে থিয়েটারে নামলাম। তোমাকে বিয়ে করলাম...
—অন্ধ হয়ে করেছিল?
বাবু অমনি চিবিয়ে চিবিয়ে কতা বলত সব্যদা। সিনিমার ভিলেনরা একেকজন যেমন করে। ঠোঁট টিপে হেসে, মহাতাচ্ছিল্যভরে কতা কইত। মা তো গলাও তুলত না, জবাবও দিত না।
মা বলল, হয়তো জনমভোর অন্ধই থাকব। সে কথা নয়, শেলী আর পিপুল, বয়সে তেমন তফাৎ নেই। ও আমারে 'মা' বলেচে। আমার মায়ের বাড়ি থাকতে আমার মেয়ে যাবে কোতা?
এ কতা বললেই বাবু চুপ।
মা কিন্তুক টেনে এট্টা চড় মেরিছিল আমাকে। সেই যা চলে গিইছিলাম...
তা বাদে...অনেক কাল বাদে...মায়ের ওপর অযতা রাগ করেই চলে যাই কাজ নে। ওই যে সেদিনে এয়েছিল? মলিনী মিত্রের কাচে। বাবু ছ্যাঁচা দিয়েই যাচ্চে, আর বাবুদের ধরে রাকবার জন্যে মায়ের সে কি সাদাসাদি!
—না না না। চন্দ কেন, কারো লেকা নাটক করব না...
—শত বললেও সিনিমায় নামব না...
—তুমি কোতা যেয়ে থাকো, জানতেও যাব না...
স—ব দেকতে পাচ্চিলাম। চন্ননবাবু, যার খুব নাম গো! নার নাটক একন কত নাম হয়েচে, কত সিনিমার গপ্প লেকে, বোম্বাইতে নাকি বাড়ি করেচে। বউ ছেড়ে ওদেশী মেয়ে বে করেচে—তার নাটক কল্য মা 'জীবন পিপাসা'!
আপনারা তো সকলই জানো। এই যে টেপ চালাচ্চে, সকল কতা লিকবে তো?
স—ব লিকো।
আমার মায়ের কতা বুকে নে জ্বলে মরচি বাবু!
সে সময়ে আমার মা একেবারে সুজ্য হয়ে জ্বলচে। থেটারে এমন ওটা কেউ ওটেনি!
যেকেনে মার লাশ নামাল, মালা দিল, সেই অপরূপা থেটারেই তো মা বাঁদা আকটিন করে গেচে।
তা অপরূপা হলেন মালিক মরে গেল। তিনির নাম শক্তিপদ কয়াল। তবে সবাই বলত কয়লাবাবু। তিনির চা বাগান, হেন তেন অনেক ছিল। মাত্তর জলের দামে কিনল 'সান' থিয়েটার। লাক লাক টাকা খর্চো করে ঢেলে সাজল।
বাড়তে বাড়তে মায়ের মাইনে তকনে অনে—ক। বোনাস রে, এ রে! সে রে!
বাবুতে মাতে যকনে ঢুকিছিল, বাবুর লেকা বই খুব নিত পাবলিক। বাবুর বই, মার অ্যাকটিনি। শেষে তো কয়লাবাবুর সঙ্গে মার কনটাকট হল, কৎ বচর যেন কত্তে হবে।
বাবুর 'তাসের বিবি' বইয়ের কালেই নতুন মালিক—কয়লাবাবুর ভাইপো—অধীরবাবু। সে বলল, আপনার বই অদলবদল কত্তে হবে।
এ বইটা লেকার পরে মাতে বাবুতে খুব তক্কো হইছিল। মা বারবার বলিছিল, বিনতা তপনের সঙ্গে পাইলে গেলে ওর চরিত্তিরের কোনো মানেই হয় না। এ তুমি বদলাও।
বাপ রে, বাবুর পজ্যলন্ত রাগ দেখিছি তকনে।
মাকে হাতে মারচে না, কিন্তু ঘরে পাইচারি কচ্চে আর চিবিয়ে চিবিয়ে কতা ছুঁড়ে দিচ্চে, যেন গুলি ছুঁড়চে।
—সুজাতা, মিস্টার বোস—তারা তোমার বচ, ভাল বোজে নাটক। বিনতা ওখেনে পাইলেই যাবে।
—তা বাদে ছ্যাঁচালাতি খেয়ে এসে সোয়ামির পায়ে পড়ে মরবে?
—তবে কি করবে?
—আর সোয়ামি পিয়ানো বাইজে অৎগুলো বচর কাইটে দেবে?
—তুমি নাটক লেকার কি বোজ? পারো তো শুদু কেঁদে হেসে লোক ভোলাতে।
—কিচুই না পাল্যে অরুণ! পাবলিক আমায় তাইড়ে দিত।
—পাবলিক বা কি বোজে! পাবলিক হলো পুতুল! যেমন খেলাবে, তেমনি খেলবে।
—আমি বারবার বলচি, তুমি নাটকের ধারা পালটাও।
—না! আমি আমিই থাকব।
সে টেকটেকানি তো টিকল না। কয়লাবাবুও ব্যবসা কত্ত, অধীরবাবু নতুন ছেলে, সেও ব্যবসা করে।
বাবুকে যকনে বাগ মানাতে পাল্য না, বলল, চন্নন মল্লিকরে দে আমি বই পালটে দেব।
বাবুর তো একটা অ্যাকটিনি জানা ছিল। এমন সব কতা হলেই সে বুকে হাত দে 'মাতা ঘুচ্যে, শরীল কেমন কচ্যে' বলে মুচ্ছো যেত। আর মা'র সেকি দাপাদাপি!
অধীরবাবু! এমন তুমি কত্তে পার না! তুমি অরুণ তালুকদারের সঙ্গে কতা কইচ মনে রেকো।
তা বাবদ ডাক্তার রে, নার্সিংহোম রে! এমন কবার করেচে।
কোন রোগ নি শরীরে। সব ভাল মত টেপ করে নাও বাবুরা। এ সগল কতা বিনয়বাবুরে শুইনে জেনে নিও সত্যি, না মিত্যে!
পরের দিকে তো বাবু বাড়ি বসে লিকতেও পাত্ত না! বিনয়বাবুর গাড়ি চেপে এগবার ডায়মনহারবার যেয়ে লিকল। আবার পুরীতে যেত যকন—তকন।
দেক! কোন কতা বলতে কোন কতা বলচি। তা 'তাসের বিবি' নাটক খুব, খুব চলিছিল। মায়ের জয়জয়কার যারে বলে। কাগজে কি নাম! আর সিনিমায় নামার জন্যে কি ঝোলাঝুলি মানুষের!
তাবড়, তাবড় মানুষরা এয়েচে। একনে কিচ্চু দেকতে পাচ্চ না। ঘরে ঢুকতে আগেই চোক পড়বে মায়ের 'করুণা' পাট্যের ছবি। ঘরের পর ঘর ছিল মায়ের ফটো দ্যালে, আর মায়ের দিদমার আমলের শ্বেতপাথরের টেবিল, বড় বড় ফুলের টব পেতলের! আবার মায়ের কত মেডেল, কত কি পেইছিল, স—ব সাজানো ছিল।
মা ওই চেয়ারটায় বসত।
ওই এট্টা জিনিসই আচে। আর সব?
বাবু বলে, কোনো ভাল জিনিসের কদর বুজত না। বেচে দিয়েচে। আট্যের কিচু বুজত না তো!
মা থাগতে বলেচো, তারে পিষে খেওচো দুজনায়।
বাপ আর ছেলে।
মরে যেতেও বলচো?
বাবুরা! আমি জানিনি আমি হিঁদু না মোচনমান। বাপ ছিল ছোলেমান। গভ্যধারিণী মা ছিল রামলাল ভুজাওলার বোন। বাপ আজ একেনে কাজ কত্ত, চুরি করে পালাত। আবার অন্যত্তর কাজে ঢুকত। ভাল মিস্তিরি ছিল। লেগেপড়ে কাজ করেচে যকনে, ভাল কাইমেচে। কিন্তুক লেগে তো সে থাগত না। তার কাচে কাজ শিকে শংকর দেক, মল্লিকবাজারে নিজের গ্যারেজ করেচে।
আমার কতা দেকানো কেন? বস্তির বাউড়িলি মাসির কাচেই তো থেকেচি। তারা দোকনো তো, আমিও দোকনো। বাপ অবিশ্যি দোকনো ছিল। গভ্যধারিণী মায়ের কতা মনে পড়ে নে তেমন।
তা দেক! হিঁদু না মোচনমান জানিনি। আমায় মা বলত, নতুন জম্মেছিস তুই। তুই হিঁদু, নয় মোচমান নয়, কেরেস্তান নয়, তুই মানুষ!
সেই আমি বলচি, সে ফেলাট কিনল বাবু।
ওই যে 'অরুণোদয়', সেতা কিচু দেকবে মায়ের জিনিস।
আর দেকবে ছেলের কাচে।
ছেলে তো বাপের ধারা পেয়েচে। মা কি খায়, কি পরে, কেমন থাকে, কিচু দেকত না। কি সব ঘরবাড়ি কেমন হবে, নকশা আঁকতে শিখিছিল। তা বাদে সেই কাজ করে। আবার ঘরদোর তৈরিও করায়। পেরথম বে'র বউ তো ঘরই করেনি। পরে যেটারে বে কল্য, সে বড়লোকের মেয়ে বটে। তবে মুক দেকলে মনে হবে টিভির 'মহাভারত'—এর ভীম। হট্টাকট্টা বাজখেঁয়ে মেয়ে।
পিপুল বউ নে আসত, আর বউ একেকটা জিনিস দেকে মুচ্ছো যেত, কি মিষ্টি! দেক দেক, ঠিক যেন অ্যান্টিক।
অ্যান্টিক আবার কি বাবু? আর অতবড় দ্যালঘড়ি, চীনদেশ না কোৎকার ইয়া বড় বড় ছবি—আঁকা ফুলদানি, এসব মিষ্টি বা হয় কি করে?
মা ওটুকুতেই গলে যেত।
—নেবে? নেবে শ্রী? নাও না।
বাগাতেই আসত, বাগিয়ে চলে যেত! মা এগ জাতের মানুষ বটে। যে—সোয়ামি ছেড়ে গেচে, তার অসুক জানলে ছুটে যেয়ে সেবা করবে।
সে জনা ফেলাট কিনল—ছেলেই করিয়ে দিল— সঙ্গে সঙ্গে তার লেকার ঘরের টেবিল, চেয়ার, বইয়ের শেলপো, হেন, তেন, পাট্যে দিলে। বাবু চেয়েচে, আমি না বলতে পারি শেলী?
তা সে সময়ে 'তাসের বিবি' নে নানা কীত্তিকাণ্ড হল। অধীরবাবু বলল, ই কি 'বিরাজ বৌ' হচ্চে? তার স্বামী আর বিনতার সোয়ামিতে তপাৎ কি? বিরাজ অর বিনতা সবাই সোয়ামীর পায়ের কাচে মরবে, আর আমি পাপী! আমি পাপী বলবে? আমার কাচে এটা ব্যবসা। আমার লাব কিসে আমি দেকব না?
মাকেও মানতে হল।
বাবু খুব শাসাল, দাপাল, তোমারে আমি তৈরি করিচি। কে পুচত তোমাকে? যেমন মানায় তেমন বই লিকিচি?
—তাকনো যা লিকেচ, একনো তা লিকলে পাবলিক নেবে না অরুণ!
—আমার সঙ্গে দুব্যবহার করচে, তোমার 'অপরূপা' ছেড়ে দেয়া উচিত।
—কনটাকট করিচি, ছাড়তে পারব না।
আমি রাতে মায়েরে গা ডলতে ডলতে বললাম, মা! সগলেরি এদিন—সিদিন আচে। হটক্কারে কাজ কোর না।
বিনয়বাবু তো মারে বুজিয়ে বুজিয়ে বলল, এ লাইনে আপনার শত্তুর অনেক। এৎকাল রাজত্ব করচেন, পাবলিক টানচেন, শত্তুর অনেক। হটক্কারে করবেন না কিচু। 'অপরূপা'র সঙ্গে দুব্যবহার কল্যে আপনি বিপদে পড়বেন।
—কেন?
—নিজের ভাল বোজেন না বলে।
শেষে বিনয়বাবুই অধীরবাবু, চন্ননবাবু, বাবু আর মাকে নে বসল। অধীরবাবু হটাৎ পয়সা দেকেনি। 'অপরূপা' না থাগলেও তারা জ্যাটার দরুণে বড় বড় বাড়ি পেয়েচে। সব্যত্তর আপিস ভাড়া আচে। সে হটচটকা লোক। কিন্তু বিনয়বাবুও কম যায় না। সেই সব রাজী করাল।
যে 'তাসের বিবি'র জয়জয়কার হইছিল, তাকে চন্ননবাবু খানিক খানিক নতুন করে লিখিছিল।
নামটাই সব বাবু! আপনাদের দুনিয়াতে। সে বই হয়েও লেকা, যারে কেউ চেনে না। বেরুল বাবুর নামে। মা তকনো বলিছিল, এ বইয়ের টাকার অদ্যেক তো চন্ননের পাওনা হয়।
—না সরসী! তার নাম কোতাও নি।
—না থাগলেও তুমি মনে মনে তো জানো।
—এটাই তো ভুল করচ সরসী। নাম হল সব। নামের ওপরে কিচু নি। যদ্দিন নাম আচে, তদ্দিন তুমি আচ। আর এ তো তেমন, যারে বলে মডান থেটার নয়, যে আজ না হোক, কাল মানুষ কদর করবে, সম্মদ্দনা দেবে, বই লিকবে তাদেরে নে। এ হল পাবলিক থেটার।
—সে জন্যেই ওর নাম তুলে দিচ্চ?
—যা মনে করো। যা করবে বেঁচে থাগতে। সরযূ দেবী আচেন, লোকে নাম কচ্যে। আর সেকালের তাবড়, তাবড় লোকদের নাম কোতায়?
—তুমি অধম্য কচ্য অরুণ।
—দেক! আমার লেকা বই। তাতে অ্যাকটিনি করেই তুমি উটোচো অ্যাত দূর। আমাকে ধম্যঅধম্য শিকিও না।
মা বলল, খুব খারাপ কাজ হয়ে গেল।
আর ছেলে? সে তো ইংরিজি বিনে কতা কয় নে। মাকে কৎ উপদেশ না দিত! মা একজন অ্যাকটেস মাত্তরে, আর বাপ একজন জিনিস...কি বলচো বাবু? জিনিস নয়, জিনিয়াস? যে যা বলো, আমি তারে জিনিসই বলি। এমন আমি চিরকাল বলিচি। জিবের আড় ভাঙেনি ককনো। আর আমার যিনি সব্যস্য, সেই মা বলত, মুকের বুলি ছাড়বিনি শেলী! আমার কানে মিষ্টি লাগে। কেন! চন্ননবাবুর ত্যাখনকার বউ গো? সব আপিসে অ্যাকটিন কত্ত ...আমার সঙ্গে কতা বলে বলে শিকিছিল 'দরিয়ার ডাক' নাটকে ফতেমার কতাবত্তা।
তা ছেলে সব্যদা বাপের দিকে। বাপের মতই নাক তুলে তুলে কতা কইত মায়ের সঙ্গে। মায়ের সঙ্গে মা নাকি জাস একজন অ্যাকটেস...অমন অত এয়েচে, কত আসবে, কত যাবে। কিন্তুক বাপ একজন জিনিস। থেটারের বই লেকা কম কতা নয়। বাপ লেকে বলেই মা অ্যাকটো কত্তে পারে।
বোজো কতা! মা যদি কিচু না হবে তো তারে টাকা দিচ্চে কেন মানুষ? কেন নামডাক তার? অ্যাকটো করা কি চাট্টিখানি কতা?
যা হোগ গে, মা অনেক দিয়েচে পিপুলদেরে...আর এগ সময়ে বেচেচে এও সত্যি। মা চলে গেচে, জানে না, বিনয়বাবু বলিছিল তোমারে দে বেচাবে। তুমি কিন্তুক জীবন থাগতে মারে বলো নি যে আমারে দেচো ওসব সামিগগিরি।
মা বুকে থাগলেও কিচু বলেনি। এ সব বিনয়বাবুর কাচে জেনে নেবেন। শুনিচি তিনি এ সব নে কোতা যেমন রাকবে!
বাবু! আমারে মায়ের কতা শুদোলে আমি অমন ধারাই হয়ে পড়ে। কত বচরের কত কতা!
কি বলচো? মারে ছেড়ে কেন মালিনী মিত্রের কাচে গেলাম?
তকনে 'তাসের বিবি' নে ফাটাফাটি হাউসফুল। সামাজিক বইয়ের মত কি আচে বলুন? যকনে বিনতা চিৎকার করে বলচে, ভেবোচো আমি তাসের বিবি? কাগজে পিন্টো করা ছবি? ছিঁড়বে, নয় ফেলে রাকবে, এট্টা নতুন কিনে নেবে? আমি মানুষ! আমার ... দেহ আচে...মন আচে...
মানুষে কম হাততালি দিত? ওই যে মা পাবলিক পানে চেয়ে হঠাৎ ভীতু হেসে গলা নাম্যে বলত, নেই?
বেটাছেলে কেঁদে ফেলত।
যকনে 'তাসের বিবি' নে ফাটাফাটি চলচে দুজনে, মা এসে ওই ঘরে শুত। খাট আচে, বিচনা আচে, মানুষ নি!
তা খুব বুজি যে সে মানুষ রাতে ঘুমোয় নে। সকালা উটে আবার বাবু আর ছেলের মুকের মত বাঁদাবাড়ার যোগাড় দেকবে। সোমসার দেকবে— তাতে আমি দোষের মদ্যে বলিচি, তুমি তো দশবার খবর নাও। থেটারে গেলেও ফোন করো। কাদের জন্যে করচো বলতে পার?
—হঠাৎ এ কতা বললি?
—বাবু আর পিপুল তো আদ্যেক দিন খাবার ঠেলে দে বেইরে যায়।
—গেলে যায়, তোর কি?
—না, আমার আবার কি?
—ওই 'তাসের বিবি' নে বাবুর রাগ হয়েচে, জানলি? চিরকাল তো অভিমানী। নুন থে' চুন খসলেই বাবুর অভিমান।
—খেটেট মরচো তো তুমি। মান—অভিমান তোমার থাগতে নেই। এই যে অধীরবাবু তোমার সম্মানে অৎবড় আয়োজনটা কল্যা, সেতা তোমারে যেতে দিল বাবু? কি, না অসুক!
—করিছিল তো অসুক!
—অসুক কল্যে পরদিন সকালা বেইরে যেয়ে কোতা দিন কাইটে আসত? এই যে সাদাসাদি কল্যে, এগবারটি যেয়ে চলে আসব, 'হ্যাঁ' বলো! বলিছিল?
মা চুপ।
—নিজের সব্যনাশ কোর না মা।
পরদিন বাবুকে মা কিচু বলে থাগবে। মা বেইরে গেল রিয়াসসালে, বাবু আর ছেলে আমারে যা মুক কল্য কি বলব! ড্যাং, ইস্টুপিড...বদমাশ মেয়েছেলে...লাই পেয়ে মাতায় উটেচে...লাত মেরে বের করে দেব...বাবু আবার চেকন চেকন হেসে বলচে, ও হল তোর মায়ের যুগ্যি মায়ের মত বন্দু! ওর সঙ্গে যত কতা। যা, বাক্স—বিচনা নে বেইরে যা!
আমি কি বললাম?
বললাম, যে এনেচে সে বের করে দিক, তবে যাব। তোমার ভরসায় তো আসিনি। লাত মারবে? মারো দেকি কেমন হেম্মত? চেঁচিয়ে নানাখানা করব বাবু। লোক জড়ো করে ফেলব। ছি ছি ছি! মা পায়ের পাপোশ হয়ে পড়ে আচে, তার এত হেনস্তা করচো, ধম্যে সইবে?
রান্নার মাসি এসে আমারে সইরে নে গেল। কিন্তুক ওপরঅলা নি গো বাবুরা! মা মল্য শ্যালকুকুরের মত! আর বাবুর দেক কত নাম।
তা মা এসতেই বাবু নানাখানা করে লাগল। আমি কিচু বলিনি। শুদু বলিচি, তুমি এনোচো, জান দে, তোমার সব্যস্য সামলাচ্ছি—এৎকাল থাগলে একটা কুকুরকেও 'বেরো' বলে না মানুষ। তোমার সোয়ামি আর ছেলে তো লাত মেরে বের করে দিচ্ছিল।
বাবু বলল, ও থাগলে আমি মারে বললাম, বাবুরে না দেকলে, ছেলেরে না দেখলে তুমি মরে যাবে মা! আমি চলেই যাই।
মা বলল, তাই যাস।
মা যকনে এ কতা বলল, বড় যন্তন্নায় বলিছিল। কিন্তু আমারও দুজ্যয় দুখ্যু হল বাবু। বাবু তো মতলবী। মায়েরে আগলে রাকি, তাতেই তাড়াতে চাইচে। তকনে তইলে ভাবিনি। পরদিনেই মালিনী মাসির হোতা চলে গেলাম।
সব আমার দুজ্যয় গো বাবু। মাকে দুজ্যয় ভালবাসতাম— রাগ উঠলেও দুজ্যয়—জলে যাচ্চি, না আগুনে, তো ভাবতাম না।
মালিনী মাসি তো হাতে চাঁদ পেল। বলল, বুজিচি তোমাদের মা—মেয়েতে কিচু হয়েচে। তবে তুই থাগলে তো আমি বত্তে যাই।
মালিনী মাসির মা, ভাই, ভাই—বউ, সব এগ জায়গায়। অনেক লোক, চাট্টে কুকুর, মটর গাড়ি—ওই যে 'রঞ্জনা' আর 'নর্মদা' সিনিমা হাউস যানার, সেই জেটমলবাবু ওনারে রেকিছিল। বাড়ির দোতলায় মাসি থাকত, এগতলায় এরা। মালিনী মাসির বুদ্দি ছিল। ব্যাঙ্কে টাকা, গায়ে গয়না, এই বাড়ি, মটর গাড়ি, সব করে নিইছিল। বলত, সময় থাগতে গুচিয়ে না নিলে বিন্দুবাসিনী হয়ে যাব শেলী!
বিন্দুবাসিনীর নাম খুব শুনিচি। এগকালে সে থেটারের মহারানী! চার ঘোড়ার গাড়ি গোলাপ ফুলে সাইজে তারে নে বেড়াত কোৎকার জমিদার। আবার শেষ জীবনে সেই লোগই নাকি বাবুঘাটে বসে ভিখ মাঙত।
তা সেতা ধরো ছ'মাসও থাগিনি।
বিনয়বাবু সেতা গেল। বলল, খুব অন্যায় করোচো শেলী। তুমি বিনা বউদির আপনজন নেই হোতা। তারে কিসের মুকে ফেলে এসোচো জান না?
—মা আমারে তো যেতে বলেনি।
—তিনি তোমার জন্যে শুষচে, আবার বলে, বিনয়। মালিনীর কৎ উপকার হচ্চে। ওরে নে আসাটা ধম্য হয়? তোমার তরে কেঁদে কেঁদে বউদি...তুমি চলো।
—আর হেতা?
—হেতা এরা লোক দেকে নেবে। আর...গেলেই জানবে... হোতা এট্টা বিপদ আসচে।
—কি বিপদ বাবু?
—গেলেই জানবে। বউদির জীবনটা...
—কি বলচো বাবু?
—আমার বলায় কতা নয়।
তদ্দিনে আমি অনেক বুজি। মালিনী মাসির হোতা না এলে সব বুজতাম না। মালিনী মাসি তো মা, ভাইকে অকর্তব্য করেনি। ভাইয়ের চাগরি করে দিল আর বলল, দেকে—শুনে নাও একটা ছোটমোট বাড়ি, যেমন সাত—আট হাজারে হয়। সেতা চলে যাও। আমারে ভাইঙে অনেকদিন খাচ্চ, এবারে নিজেদের মত থাকো গে। টাকা—পয়সা, এ বাড়ির ভাগ, কিচু পাচ্চ না তোমরা।
আমারে বলত, দিন থাকতে দিন গুচিয়ে নিতে হয়। তোর মা তো তা বুজবে না। সে থেটার কচ্যে ঠিকই। তবে বনেদী বংশের মেয়ে, শিক্কা অন্যরকম, সোয়ামিকে পুজো কত্তেই শিকেচে। ওনার বাপ জমিদারি ধ্বংস কল্য, ওনার মা চিরকাল সেই সোয়ামির পাদ্যোক খেয়েচে। আর! অরুণবাবুকে যা ভালবাসে, যেন সীতা—সতী—সাবিত্রীর মতো। ও এক আশ্চাজ্য মেয়েছেলে!
বলত, আমারও তো বে হবে এগদিন, সোমসার হবে। নয়তো থাগব কোতা? কারে নে?
ঠিক বলত। জেটমলবাবুর বড় বড় ছেলেমেয়ে, ভরাভর্তি সোমসার।
তেনার দু ছেলে দু মেয়ের এক সাতে বে হয়। খুব ধুমধাম, খুব পাট্টি হল হেতাহোতা। কিন্তুক মালিনী মাসি তা বাদেই বলল, একনে এট্টা থেটারের মেয়েছেলে নে থাকা তোমার সাজে না বাবু। সম্মান বলে এট্টা কতা আচে সমাজে। না, আমি আর বাবু করব না। বে করব।
এসব পরে হয়েচে, শুনিছিলাম মাত্তর।
মালিনী মাসি দেক, কারে বে করল! ওর যে লোক বাবুকে জুট্যে দিছিল, সেই নিখিলবাবুকে। নিখিলবাবুর বউ মরিছিল আগে, তার তিনটে মেয়েকে শুদ্দু নে এল। নিজের হয়নি বটে, কিন্তু তাদেরে পইড়ে শুইনে মানুষ করল, বে দিল। এখন সোয়ামি নেই, নাতি—নাতিনে ভরা সোমসার এখনো সিনিমায় মাসি, শাউড়ি, হেন—তেন পাট করে। যে বাড়ি দেখিছিলাম তা বেচে ফেলাট কিনেচে, গাড়ি রেকেচে— সে গাড়ি ভাড়াও খাটায়, নিজেও চাপে। ওই যে গো! মা যেতে শোঁসানে যেয়ে যে আমার হাত ধরে কাঁদছিল, সেই। বলল, সরসীদিদি তো বাঁচতে পারত না শেলী। অমন উচ্চণ্ড ভালবাসলে মানুষ খাক হয়ে যায়।
তা, বিনয়বাবুর কতা শুনে আমি চলে এলাম।
খাটে মা বসে আচে, যেন অশোক বনে সীতে। চুল এলো, মুক পাতর—পাতর।
আমি রান্নামাসিকে বলি, সব কোতা?
মাসি ফিসফিস করে বলল, ছেলে তো কি পড়তে দিল্লি গেচে। বাপ তার লেকার ঘরে।
মা আমারে দেকে মা শুদু বলল, থাগতে এলি, না দেকতে?
—থাগতে।
—ভাল। আর যসিনি যেন। জানিনি, হয়তো তুই আর আমিই থাগব। তাই মনে হচ্চে।
আমি কতা কইনি। কিচু বাদে বললাম, রিয়াসসাল আচে?
—আচে।
—যাবে তো তিনটেয়। একনে শোও খানিক।
—যাসনি শেলী।
—আর যাব না। কারো কতায় যাব না।
মাজে কত কি হয়েচে, সে কি আমি জানি? মালিনী মাসি জানলেও আমাকে বলেনি।
আপনারা বলচো বাবু থেটারের বই লিকলে যেমন, যাত্তারার পালা লিকতে তেমন।
সত্যিই তাই।
বাবুর যাত্তারার পালা লেকা থেকে দেক, কি হইরই কাণ্ড ঘটে গেল।
কত মানসম্মান, গরমেন বা কত খাতির করে। খুব হয়েচে সব।
আর সেদিনে?
'তাসের বিবি' চলচে, চলচে—বাবু কি বই লিকে বসল বলো তো?
'গৃহত্যাগিনী।'
হ্যাঁগো হ্যাঁ, সেটাই পরে যাত্তা পালা হয়। যে পালায় নায়ক আর নায়িকা হইছিল বরুণকুমার আর শকুন্তলা। যে পালা নাকি পেরথোম সাম্যাজিক পালা!
মাকে মোটে পড়ে শোনায়নি বাবু। 'তাসের বিবি' যেমন চলতে থাকল, বাবুর ম্যাজাকও চড়বড়িয়ে উটতে থাগল। এট্টা কতা বলব, অভিনয় উনি মঞ্চে কমই করেচে, কিন্তুক ঘরে?
মাকে ছোবল মেরে চলেচে, মেরে চলেচে।
কিন্তুক বিনয়বাবু বা কেউ আসুক তো? মুকে মধু মেকে ডাককে সরসী। সরসী!
লোকদের বলবে, বলেন কেন! কতায় কতায় অভিমান! ধানবাদে ডেকেচে সম্মান করে—কত টাকা পাবে—আমি শরীলের জন্যে যেতে পাচ্চি না বলে সেও যাবে না!
সেই লোকই আমাদেরে চোক পাকিয়ে বলবে, মাইনে নে কাজ করো, ভুলে যেও না।
আবার যে ছোঁড়াটাকে মা রেখেছে বাবুকে ডলামলাই করবে বলে—তাকে কেমন নিশ্বাস টেনে টেনে বলবে, সিগারেট এনে দিবি বাবা? এ কাজটা করে দিবি? ও কাজটা করে দিবি? এ বাড়িতে তুই ছাড়া কারে বলব বল?
অ্যাকটিনি করেই চাইলে গেল।
তকনে 'গৃহত্যাগিনী' বই নিয়ে তো অধীরবাবুকে শোনাতে গেচে বাবু। অধীরবাবু, আর কে কে ছিল জানিনি।
অধীরবাবু নাকি বলেচে, অরুণবাবু! জ্যাটা আপনাকে খুব মান্য করেচে। আপনার লেকা পাবলিক জবর নিয়েচে, মানচি। কিন্তু আপনার এই বই...ম্যাডাম শুনেছিলেন?
মা তো শোনেনি। মা শত বললেও বাবু শোনায়নি। মা'র আবার মিথ্যে জবাব মুকে আসত না।
মা মাতা নেড়ে বলচে, 'না'।
তকনে অধীরবাবু বলেচে, 'তাসের বিবি' নে যতষ্টো হয়েচে, আমি অশান্তি চাই না। কিন্তু এটা কোনো থেটারের বই হয়নি।
বাবু সব্যদা বলত, মানুষ পয়সায় বাঁচে না, মান নিয়ে বাঁচে।
তা মানীর তো মানে লেগে গেল।
তা বাদে খণ্ড পেলয় যারে বলে।
শেষে অধীরবাবু বলল, পেয়েচেন কি আপনি? সব্যদা দেকাবেন মেয়েরা হয় লাতি খাচ্চে, নয় পাপ কচ্যে, নয় সোমসার ভাঙচে, আর শেষেমেশে এসে বেটাছেলের কাচে হার মানচে। আজকাল এসব নেবে কেন এ যুগের পাবলিক? দূর্বা ব্যানার্জি প্রথম মেয়ে পাইলট, আরতি সাহা সাঁতরে চ্যানেল পেরুল—একনে সমাজ পালটাচ্চে, জানলেন? মেয়েদেরে অমনভাবে সদাসব্যদা দেকালে চলবে?
বাবু বলে, আলবাৎ চলবে।
অধীরবাবু বলল, যাত্তারা আলদা, থেটার আলদা। আপনি যাত্তারার পালা লিকেচেন।
—বটে! তবে নিয়ে চললাম বই... সরসী! উটে এসো। তুমি একেনে অ্যাকটো করবে না।
অধীরবাবু বলল, ওনার সঙ্গে রীতিমতো নতুন কনটাকট হয়েচে না? একনো অনেক বচর হেতা থাগতে হবে। আপনার সাতে কনটাকট নি, আপনি যেতে পারেন।
মা বলল, নতুন করে লিকলেই তো হয়।
অধীরবাবু বলল, দরকার হবে নে। যে লেকে লিকুক...অরুণ তালুকদার আর নয়। ই কি দুব্বাসা লোক রে বাবা! ইনভেস আমার...লস—পফিট আমার...
হেসো না বাবুরা। এমন ইংরিজি শুনে শুনে বুজতে পারি, বলতে পারি—লস—পফিট ডাং—আনকালচার—টাজিডি—ব্যাড ক্যারেকটার—মানি ইয়েস—কালচার নো—বিচ—হাউসফুল—এমন বুকনি ছোটবেলা থে শুনতে...
তা অধীরবাবুকে বাবু বলল, রইল আপনার ম্যাডাম!
বলে বেইরে গেল।
বলিনি বুজি? তদ্দিনে মারের গাড়ি হয়েচে। বিনয়বাবুই দেখেমেলে সেকেনে হ্যান ফিয়েট গাড়ি কিনে দেয়। শোভারাম চালাত। বাবু গাড়ি নিয়ে বেইরে গেল।
মা নাকি ছাইবন্ন মুক করে বসেছিল।
অধীরবাবু খুব মাপ চাইল।
মা বলল, আপনি অন্যায় কিছু বলেননি।
—আপনি এগবার শুনলেন না?
—না অধীরবাবু। নতুন নাটক পেয়েচেন?
—চন্ননবাবু দিয়েচে।
—আমরা কাল শুনব, তবে? বিনয়! আমায় পৌঁচে দেবে ভাই?
—চলুন বউদি।
মা এট্টু হেসে বলল, আজ ইংরিজি মাসের এক তারিক, তাই নয়?
—তাই তো!
—জানতাম, তাই হবে।
বেইরে এসে মা বলিছিল, কোন কতা শুদোবে না বিনয়। আমাকে এট্টু গঙ্গার ধারে নে চল। আমি এট্টু চুপ করে থাগতে চাই।
পরদিন সকালাই বিনয়বাবু এসে আমারে নে গেল।
চন্ননবাবুর সে নাটক 'জীবন পিপাসা'। তা বাদে 'কালরাত্রি'। তা বাদে 'অশান্ত ঘুন্নি'! এট্টার পর এট্টা, এসব জানতে পারবেন চাঁদুবাবুদের কাচে।
ইদিকে বাবুও বলল, আমারে যাত্তারার লেখক বলেচে, যাত্তারার পালা লিকেই দেকাব। কিন্তুক এখেনে বসে লেকা হবে নে সরসী। আমাকে অন্য ব্যবস্তা কত্তে হবে।
শুদোচ্চ কি ব্যবস্তা কল্য বাবু?
বাবু কেন করবে? তিনি শুদু ওপরতলার মতো বলত, কত্তে হবে, দিতে হবে। এটা চাই, ওটা চাই।
আর সবারে গোলাম মনে কত্ত।
ব্যবস্তা মা—ই কল্য। বিনয়বাবুরে বলল, কাচে পিটে এট্যা ঘর বা দুটো ঘর ভাড়া নাও বিনয়, যাতে খাবার পাটানো যায়।
বাবু তো পাবার কপাল করে এইছিল। কংরেস এগজিবিশান রোডে দিব্যি দুখানা ঘরের ফেলাট...ভাড়া করা ফান্নিচার...ডলাই—মলাই করার ছোঁড়াটারে চাকর রেকে দিল। বলল, তুমি যা চাও, সব করে দিচ্চি অরুণ, শুদু তুমি...
ভেবো না সরসী...পত আমাদের এগ করিছিল, একনে পত দুভাগ হয়ে যাচ্চে... দেক কি হয়!
সে বটে যাত্তারা পালা লেকার র্যালা! এই টিপিন বাটিতে খাবার যাচ্চে... এই পাড়ি হোতা বাঁদা থাকচে...আর যে যাচ্চে, তারেই বাবু নিশ্বাস ফেলে মা যে কত নিমায়া, বাবুর ঋণ ভুলে গেচে...সব শোনাচ্চে।
মানুষ বিশ্বেসও কচ্যে। তোমাদের মুক দেকে খুব বুঝতে পাচ্চি, তোমরাও তাই বিশ্বাস করো। কত্তে পারো। বড় ঘরের মেয়ে... তার থেটার কত্ত...তার চরিত্তির কি ঠিক থাকে? তাই ভেবোচো।
ভাবো! মাকে তো আর কষ্ট দিতে পারবে না কেউ। সোয়ামির জন্যে এমন হা—পিত্যেশে জীবনটা জ্বাইলে দেওয়া...সতীসাবিত্তি এলেও পাত্ত না। আমার বুক একনো জ্বলচে গো বাবুরা...কার জন্যে সব ছাড়লে...জ্বলে জ্বলে মল্যে...সোয়ামি? ছেলে? কে দেকল?
তা বাদে...সব ওনারা বলবে...বাবুর যাত্তারা পালা তো লেগে গেল। মা তো আনন্দে বাঁচে নে। খুব ধুমোধামে বিবাহবাষ্যিকী কল্য। বাড়িতে খাওনদাওন, সবাই আসচে। পিপুল সে সময়েই মস্ত চাগরি পেল...তারও বে হল। ঝপ করে পেরেম...ধপ করে বে... সে মেয়ে না মেমসাহেব কে বলবে? ফসফস করে সিগারেট টানচে, হসহস করে ধোঁ ছাড়চে, বড়লোক বাপের পেল্লাদী মেয়ে... বাবু তো বলচে 'হায় হায়'! মা বলচে, ওদের জীবন ওরা বুজুক না। আমি আর তুমি, আমাদের মত থাগি।
না, পিপুলের বে ভাঙা, আবার বে, সে পজ্যন্ত বাবু হেতা থাকেনি।
কি করে যে কি হল! মা বলল, দেক শেলী! আমার নামডাক বাড়চে, পয়সা আসচে, তাতেই তো ওনার যত গোঁসা হইছিল? একনে ওনার নামডাক হয়েচে, পয়সাও আসচে, একনে ওনার মাতা ঠিক হবে। আমার তো ঠিকুজি কইরেছিল মা... ওর এসবে বিশ্বাস নি...আমিও রাকিনি...তবে মা বলত, দুক্যের পরে সুক হবে...অনেক সুক...
অনে—ক সুকই হল।
পাঁচ বচরের কনটাকট শেষ হবো হবো। বাবুকে ঘিরে তকনে অনেক লোগ। যুদ্দ, বিলপব, সামাজিক, মদের নেশা সব্যনাশা, কি নিয়ে পালা লিকচে না? সে সব পালা নামাচ্চে বড় বড় কোম্পানি। থেটার কেন, সিনিমার লোগেরাও তাতে নামচে।
আর মা তো দশ মুকে লোককে বলে যাচ্চে। থেটার কৎজনা দেকে? যাত্তারা হল দেশের জিনিস...মাটির জিনিস...হাজার মানুষ দেকে...মানুষ শিক্কা পায়...যাত্তরার পালা লিকতে পারে কৎজনা? লিকতে যদি বা পারে, গান লিকতে পারে সেই সাতে?
মা খুশি তো আমরাও খুশি।
এমন কালেই চন্ননবাবুর 'তাসের বিবি' গল্প বোম্বাইয়ে ছবির জন্যে বিক্রি হল। চন্ননবাবুর সঙ্গেই হেতা এল ভদ্দরলোক। খুব কটমটে নামটা... সেই যে, গো কি জানি চৌধুরী...বাঙালি বটে...তিনি বলল, ম্যাডাম, বিনতার মা গোপার রোলে আর কাউকে ভাবতে পাচ্যি না।
মা তো হেসে বাঁচে না। বলে, শোনো বিনয়! বাংলা ছবিতেই নামলাম না, একন হিন্দী ছবি করব...
—বাংলা ছবিতে ডাক তো 'নিরুদ্দেশ' থেকেই পেয়েচেন বউদি...
—সে থাগ গে! জান তো সবই...
এ ভদ্দরলোক... হ্যাঁ হ্যাঁ, মনোজ চৌধুরী নাম বটে...হ্যাঁ। তিনিই। ফ্যামিলি সিনেমা কত্তেন, যেমন ছবি সবাই বসে দেকতে পারে...তিনি বলল। এ ছবি তো বাংলা আর হিন্দি এক সাতে হবে, করবেন?
মা বলল, এট্টু ভেবে দেকি।
ব্যস! অমনি যা কুলুখেত্তর বাঁদল সে কি বলি! সব আমি বলতেও পারচি না বাবু! বড্ড কষ্ট হচ্চে আমার। সব্যদিকে সব্যনাশ ধেয়ে এল। পিপুলের বউ তো ঘরই করত না, সে নামে যশে ছেড়ে গেল।
আর বাবুর সে কি পেলয় মুত্তি!
যাও! তুমিও যাও! কোন পরিচয়টা গব্যের মেয়েমানুষের? না, সে একজনের বউ, এক জনের মা! তুমি যে দেখচি শনি হয়ে ঢুকোচো, রাহু হয়ে বেরোচ্চ! থেটার আমি আনলাম! শেষে হলাম অমুকের সোয়ামি। থেটার ছেড়ে যাত্তারায় উঠচি বোঁ বোঁ করে...একনে তুমি সিনিমা করবে! তাও বাংলা আর হিন্দিতে! জানি না ভেবেচো? কতকগুলো লোকে খেলাচ্চে, আর তুমি খেলচো। যেতে পারো! থেটার—সিনিমা—কলকাতা—বোম্বে কত্তে পারো। কিন্তু আমি তোমায় তালাক দেবো। ওই হল বাবু, তালাক নয়, ডিভোস বলিছিল।
অবাক হচ্চ? বিশ্বাস হচ্চে নে?
কেন? বাড়িতে তো সেদিনে অনেক লোক ছিল।
বিনয়বাবু...চাঁদুবাবু...অরুবাবু...দত্তবাবু...এনাদের পুরনো বন্দুবান্দব যত।
জিগ্যেস করো...?
পিপুলও বলিছিল, বাবাকে তোমার জন্যে দুঃখ পেতেই দেকিচি মা! কৎটুকু কাচে পেইচি তোমাকে? বাবাই তো...
মা বলল, এ কতা আমাতে—বাবাতে হবে পিপুল!
কি টানাটানি না চলল। টানা একমাস!
চলতে, চলতে, চলতে, চলতে বাবু সত্যিই ...বাড়ি ছেড়ে...চলে গেল!
আর মা মাটিতে আচড়ে পড়ে অজ্ঞান... বেহুঁশ ...চোকের মণি নড়ে নে...
আমি হাহাকার কত্তে কত্তে দৌড়লাম বিনয়বাবুর বাড়ি।
ওনার কাচে দৌড়নো অব্যেস বাবু! দোরগোড়ে ডাক্তার...বাড়িতে টেলিফোন...
কি বলছ? বাড়ি আমার দে গেচে মা?
না, বাবু! তোমরা ভাবচো সম্পত্তির নোবে বাবুর কুচ্ছো গাইচি?
না, বাড়ি দেয়নি।
তবে জমি বেচার পরে বিনয়বাবুকে বলল, পরে তো ওরাই নেবে সব। এদেরকে কিচু দেবে না বিনয়। তুমি আমায় 'না' বোল না। আমি কত্যব্য করে যাই।
রান্নামাসির ছেলেরে, সেই বাসিনী মাসি গো...তার ছেলেরে মা কবে সরকারি চাগরি করে দিই ছিল। মাসি, ডাইভার, কারেও তো রাকতে পারেনি। মাসি ছেলের কাচেই চলে যায়। তারে ডাইকে এনে পাঁচ হাজার টাকা দিল। মাসি কাঁদচে তো মা বলচে, কেঁদো না তো! অমন কান্না আমি অনেক কেঁদিচি। এওচো...বাজার করো... রেঁদে—বেড়ে খাইয়ে যাও।
ডাইভারকে খোঁজ করে পায়নি। সে কোতা, কবে চাগরি নে গেচে, কে জানে!
আমার জন্যে, আমার নামে বিশ হাজার টাকা দে গেচে, ব্যাঙ্কে আচে।
টাকা দে কি করব?
বিনয়বাবুর মা শয্যেগত হয়ে আচে, সেতা যাবার কতাই আচে।
তবে জানি না কি করব! এ বাড়ির দায় মা দে গেচে, বাবু এলে চাবি তারে দে যাস শেলী।
খালি বাড়িতে ভয় করে কিনা?
না, বাবু, ভয় করে নে। বস্তি ভেঙে দিয়েচে না? যেতা বাপ থাগত! তারা ক'ঘর তো মা থাগতেই নিচে এসে উটিচিল। তাদেরও বলিচি, বাবু এলেই তোমাদের তাইড়ে দেবে।
ঠিক জেনো, বাবু আসবে ইংরিজি মাসের পয়লা তারিকে।
ইংরিজি মাসের পয়লা তারিকের কতা বারবার কেন বলচি?
বিনয়বাবু বলবে।
বিনয় গুহ
হ্যাঁ, আমার কাছেই ছুটে এসেছিল শেলী। শুনলাম, শেলীর ক্যাসেট শুনলাম। চমৎকার গুছিয়ে বলেছে। আমি তোমাদের পাঠিয়েছিলাম, তা বুঝতে দাওনি বলে ধন্যবাদ। তোমরা খানিকটা অরুণদা'র সপক্ষে কথা বলে ভাল করেছ। তাতেই ও এমন মনে করে বলেছে।
আমি গেলে?
আমি, বা আমরা, অর্থাৎ বউদির সঙ্গে ভালয়—মন্দয় যারা থেকে গিছলাম, আমি... চাদু...দত্তবাবু...অরু পরে এলেও অরু...বিশেষ করে আমি গেলে শেলী এত কাঁদত... এত কাঁদত যে কোনো কথাই ক্যাসেট করা যেত না। কাজটা এখনি করে ফেলব ঠিক করেছি আমরা। চাঁদু, অর্থাৎ চন্দ্রনিভ...না, এ নামটা ব্যবহার করে না ও। ও সকলের কাছেই চাঁদু সামন্ত। চাঁদু তো আজ এখানে, কাল পুনা, পরশু ব্যাঙ্গালোর ঘুরে বেড়ায়। ও হপ্তাখানেক আছে!
শোক টাটকা টাটকা থাকতে যা বলা যাবে ক'মাস বা ক'বছর গেলে দেখা যাবে মন তত, উদ্বেল নেই। বেশ একটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গজিয়ে উঠছে... বউদির ছবি এক শেড ফিকে হয়ে যাবে।
মনে রেখো, সম্পূর্ণ সত্য, চাইলেও আমরা বলতে পারি না। মানুষী ব্যর্থতা। আমরা বলি, আবার এমন শোকার্ত সময়েও নিজের বিষয়ে কিছু কিছু ঢাকি।
শেলী সবই বলেছে।
একটু গোপন করে গেছে।
বউদিদের ড্রাইভার শোভারামের সঙ্গে ওর বিয়ে হতে হতে হয়নি বলে কিছুদিন ও মানসিক বিষাদের শিকার হয়ে যায়।
বউদি ওকে বছর খানেক রেখেছিল ডক্টর সেনরায়ের নার্সিংহোমে।
আর, বউদির অবস্থা দেখে অরুণদাকে ও মারতে গিয়েছিল।
বউদি একসময় অরুণদা'র সঙ্গে লড়াই করে শেলীকে কাছে রেখেছে।
পরে শেলীও, বাঘিনী যেভাবে সদ্যোজাত শাবককে হিংস্রভাবে রক্ষা করে—সেইভাবে বউদিকে রক্ষা করেছে।
বউদি অন্যকে বাঁচাতে জানত, নিজেকে বাঁচাতে জানত না। সে জন্যেই মরে গেল।
অত বড় পেশাদার মঞ্চের অভিনেত্রী—নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী হয়ে কিভাবে বড় হচ্ছিল আরো—তার অভিনয় ছেড়ে সরে আসা মানে দেহ জীবিত থাকলেও মরে যাওয়া, তাই নয়?
রাগ হয়েছে, প্রচণ্ড রাগ হয়েছে, বহু বছর রেগেই থেকেছি। বউদিকেই বলেছি, জীবনকে শিল্পের চেয়ে বড় করে ফেললেন? শিল্প তো জীবনের চেয়ে বড়। শিল্পের জন্যে কঠিনও হতে হয়। অলকাদিকে ছেড়ে জীমূতবাবু চলে গেল, সেও বিয়ের কত বাদে। অলকাদি আর বিয়েও করেনি। কিন্তু গান তো সে ছাড়েনি? অভিনয় জগতে দেখেননি? তপনবাবুকে ছেড়ে কালীদি চলে গেলেন। তপনবাবু কি অভিনয় ছাড়লেন? ঠিক চালিয়ে গেলেন।
বউদি চুপ করে থাকত, ঠোঁটে একটু হাসি মেখে। কথাও বলত না।
কত, কত ভাবে চেষ্টা করেছি।
এমন কি অরুণদা'র কথাও বলেছি।
বলেছি, যার জন্যে এমন একখানা ত্যাগ করলেন, সে তো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
বউদি ঈষৎ হেসে বলল, সে তো আমার মতো ভালবাসেনি।
—একতরফা ভালবাসা আপনাদের?
—কি জানি বিনয়! না...ভালবাসত, খুব ভালবাসত...এখনো নিশ্চয় বাসে। নইলে...
—নইলে মাঝে সাঝে আপনাকে স্মরণ করে কেন? তাই তো?
—দেখা না...অসুখ হলেই আমাকে পথ্য রেঁধে পাঠাতে হবে ...ওর কেউ এলেই এখানে পাঠাবে...
—আচ্ছা, তারা ওখানেই বা যায় না কেন?
—আহা! তারা তো পর নয় আমার! আমারই দেওর, ননদ, তাদের ছেলেপিলে...
—নাঃ, আপনি একেবারে...
—যাচ্ছেতাই, তাই না?
কি বলতাম? কি বলার ছিল? 'তাসের বিবি' ছবিও হয়েছিল। বিনতার মা গোপার ভূমিকায় শুভশ্রী করল বাংলায়, হিন্দীতে মঞ্জরী আচেকার। মঞ্জরী জাতীয় পুরস্কারও পেল। বউদি পেতেই পারত। ছবি দেখে বেরিয়ে এসে বউদি বলল, আমি অমন পারতাম না। অত লাউড অথচ কত সুন্দর অ্যাকটিং!
—থাক, অ্যাকটিঙের নাম করবেন না।
এত বছরের এত কথা কেমন করে বলি? পেশাদারী মঞ্চজগতের এবং একজন যাত্রা—জগতেরও—বিখ্যাত স্বামীর একদা বিখ্যাত স্ত্রীর সঙ্গে আমি, বিনয় গুহ, একদিনের প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী কেমন করে যে জড়িয়ে পড়েছিলাম!
পরের কথা আগে না বলে আগের কথা আগে বললে বলতে সুবিধে হবে।
শেলী বারবার 'পয়লা তারিখ' বলেছে।
এ থেকে কোনো জ্যোতিষশাস্ত্রী হিসেব—নিকেশ করতে পারে কিনা জানি না।
আমার ওসবে বিশ্বাস নেই।
আমার বাবা প্রাণকৃষ্ণ গুহ, যিনি শেয়ার কেনাবেচা করে অগাধ পয়সা করেছিলেন, তিনি বাড়িতে জ্যোতিষী ঢুকতে দিতেন না। মাকে বলেছিলেন, বিশাল জ্যোতিষী আমার কোষ্ঠীপত্র করেছিল—আমার উনিশ বছরে মরে যাওয়ার কথা! উনিশ বছর তিনবার পার করেও তো বেঁচে আছি।
উনিশ বছর চারবার পার করে আশি বছর বয়সে মারা গেলেন। মা বিরাশিতে মাঝে মাঝে বাতের জন্যে বিছানা নিচ্ছেন বটে, তবে মরবেন ঝট করে, তা মনে হয় না।
আমার বাবার খুব মুক্তমনা ছিলেন। আমি বড় ছেলে, আমাকে অবাধ স্বাধীনতা দিলেন। প্রেসিডেন্সি থেকে বি এস—সি পড়েও কিছু করলাম না। ফোটো তুলতে থাকলাম। ক্রমে থিয়েটার সিনেমা জগতেই ঢুকে গেলাম, কিছু বলেননি। বিয়ে করলাম না, তো মাকে বললেন, আমার জাঠতুতো বড়দাও ব্যাচেলর, এখনো বেঁচে আছেন।
মাকে সুখ দিয়েছে অন্য ভাইরা। সবাই কৃতী, ভালই রোজগার করে। তাদের ছেলেমেয়েও আছে। বাবার কল্যাণে চার ভাই চারটে বাড়িও পেয়েছি। মা মনে করেন, তাঁর দুর্বোধ্য জ্যেষ্ঠ পুত্রের কাছে থাকা তাঁর কর্তব্য, আমার কাছে থাকেন। আসলে মা ডাণ্ডা ঘোরাতে এখনো ভালবাসেন। যা স্নেহময়, শুভময় বা কল্যাণময়ের বাড়িতে সম্ভব নয়। বিয়ে করিনি, সংসার আছে। দিদি জামাইবাবু মারা যাবার পর ভাগ্নে—ভাগ্নীরা এখানে। বাবার কোন জ্ঞাতি খুড়তুতো ভাই, আমাদের পটল কাকা চিরকালই এ সংসারে। তিনি নেই, তাঁর ছেলে আছে। সেই ভাই আর বউমা, ওদের ছেলেমেয়ে, মা মনের সুখে ডাণ্ডা ঘোরান। স্টুডিও একতলায়। 'মন্তাজ' স্টুডিওর বয়স অনেক।
আমি একতলাতেই থাকি। একতলাটা আমার। ভেতরে এক টুকরো মাটিতে দুটো কামিনী, একটা জবা, একটা শিউলি গাছ আছে। একটা কাচঢাকা বারান্দা। বউদি এখানে বসে থাকতে ভালবাসতেন। বউদি সম্পর্কে 'ভালবাসতেন' বলছি, এটাও খুব বিস্ময়কর। শ্মশানে যাইনি। শুনলাম, যা করবার সব পিপুল করেছে। কাগজে দেখলাম, অরুণদা এসেছিলেন।
বউদি সম্পর্কে একটা স্ক্র্যাপবুক অনেকদিন ধরে তৈরি করে যাচ্ছি। তাতে যে কত কি আছে! একটা নয়, বারোটা মোটা মোটা অ্যালবাম। সব ছবি বউদিকে দিওনি। যদি কোনোদিন কেউ একটা অনেস্ট জীবনী লেখে তাকে দেব।
কিংবা চাঁদু যেমন বলে, একটা ছোট্ট মিউজিয়াম করে রেখে দেব আমরা।
এসব অবশ্য এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, পরে হয়তো মনে হবে না।
কিছু ছবি কাউকে দেখাব না।
বউদি গড়ের মাঠে ফুচকা খাচ্ছে।
বউদি আমাদের লক্ষ্মীপুরের বাগানে পুকুরের ঘাটের রানায় পা ছড়িয়ে বসে পেয়ারা খাচ্ছে।
পুরনো দিনের অ্যাকট্রেস মোহিনীবালার টিবি হলে বউদি কয়লাবাবুকে রাজী করিয়ে একটা চ্যারিটি শো করে 'শাজাহান'।
বউদি জাহানআরার ভূমিকায়।
বউদি চিবুকে হাত রেখে গান শুনছে।
খবরটা জেনে আমাদের বাড়িতেই কতজন দুঃখ করল।
হরদম আসত তো!
আমার মা—ই ভাল বলল। বলল, তুই যাদের ছবি তুলিস, তারা বড্ড মরে যায়। সরসীর অত ছবি বা তুললি কেন? আমার ছবি আগে যা তুলেছিস, তুলেছিস। এখন যেন তুলিস না আর।
পটল কাকার ছেলে বাদলের বউ বলল, জ্যেঠিমা! বড়দা যাদের ছবি তোলেন না, তারাও তো মরে। আবার কত জন তো বেঁচেও আছে।
আমি নিচে এসে ঘর বন্ধ করে বসে থাকলাম।
আবার আগে পরে গুলিয়ে ফেলছি।
জ্যোতিষীদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছি। তারা হিসেব—নিকেশ করে সরসী তালুকদারের মতো একটি একান্ত প্রেমনিমজ্জিত নারীর জীবনের অঙ্ক মেলাতে পারবে?
গিনেস ওয়ার্লড বুকে যাবার মতে খবর।
সরসী রায়ের জন্ম : ১/১/১৯২৮,
প্রথম মঞ্চাবতরণ : ১/১/১৯৪৬,
বিয়ে : ১/১/১৯৭৪,
পিপুলের জন্ম : ১/১/১৯৪৮,
মঞ্চত্যাগ : ১/১/১৯৪৭,
মৃত্যু : ১/১/১৯৯৪।
বলেছিলাম, অমন একটা গোঁড়া পরিবারের মেয়ে হয়ে স্টেজে নামলেন কি করে?
—জেদ করে।
—আর, পৌষ মাসে নাকি বিয়ে হয় না?
—রেজেস্ট্রি বিয়ে, বিনয়।
—ফাংশানই হয়নি?
—বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম না! মা তো দিদমার ভয়ে মুখই খুলতে পারেনি। দিদমা মরল, মা তখন সেধে নিয়ে এল।
জন্মেছিল যে, সে সরসী রায়। দিদিমার সম্পত্তি। খাণ্ডারনী মেয়েমানুষ ছিলেন। গরিব ঘরের ছেলেকে ঘরজামাই রাখলে সে রানী রাসমণির মথুর জামাইয়ের মতো যোগ্য হবে এমন বিশ্বাসে মথুরামোহন রায়ের সঙ্গে বিয়ে দেন মেয়ের।
এ মথুর, সে মথুর নয়। তার পিছন পিছন তার আপন ও বৈমাত্র ভাইবোন এসে বাড়িতে চেপে বসল। বউদির বাবার বিশ্বাস ছিল, যতই ওড়াবে টাকা, তত যাবে বেড়ে। শেষে গরমকালে কমলালেবু, শীতকালে পাকা আম, বর্ষাকালে গোটা ইলিশ ভাজা, এভাবে খেতে খেতেই তিনি মারা যান।
দিদমা জামায়ের জ্ঞাতগুষ্টিকে তাড়ালেন। উকিলকে বললেন, এরও একটা মেয়ে। বিয়ে হয়ে চলে যাবে—জমিদারি তো যাবে যাবে শুনি। তুমি নয় বেচেই দাও। মেয়েকে যেমন শিকিয়েচি, তেমন করেচে। আমি সোয়ামিকে দাপের ভয়ে বশ রেখিচি, আবার পাদ্যোকও খেয়েচি। এখনো তাঁর খড়ম পুজো করি মেয়েটা তো আমার রাশ পায়নি। স্বামী ডাণ্ডা ঘোরাত মেয়ে পাদ্যোক খেত। নাতনি ইস্কুলে যাচ্ছে বটে, কিন্তু কি সব্যনাশ করবে কে জানে। বিষয় হলো বিষ। সব বেচে দাও। বাড়িটা আর পাশের জমিটা থাকুক। সব বেচেবুচে একবার তীর্থ ঘুরে আসি।
বউদির কাছে শুনেছি, দিদিমা তাঁকে দিয়ে মেয়েলী ব্রত করাতেন 'সাজ' বা যোগাড় দিতে বউদি খুব শিখেছিল। বউদির মা কার্পেটের ফোঁড়ে 'পতি পরম গুরু' সেলাই করে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন।
এসবের মধ্যে বড় হয়েছিল বলে কি...?
শেলী আমার কাছে দৌড়ে এসে আছড়ে পড়েছে—স্টুডিওতে খুব তোড়জোড়, বম্বের এক চিত্রতারকার ছবি তুলব। হ্যাঁ, আমিই তো চিত্রজগতের নামকরা স্টিল ক্যামেরাম্যান। আমাদের কালে মঞ্চ ও চিত্রজগতের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকত, তারা সাধারণত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের, ট্রাডিশান থেকে নিঃসৃত মানুষ। একেবারে পেশাদারী একেবারে। তার মধ্যেই অধিকাংশ মানুষই গৃহস্থ মনোভাবের। তারকারা, অথবা অতি বিখ্যাত কেউ, তাঁরা ব্যক্তি—জীবনে যাই হোন, স্টেজে বা স্টুডিওতে, প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে, একটা 'নর্ম' বা সৌজন্য রেখে চলতেন।
আমরা বাংলা মঞ্চ ও সিনেমার স্বর্ণযুগ দেখেছি। 'বাংলা' ও বাঙালি' নাম নিয়ে খুব গর্ব। অনীতা গুহ বা স্মৃতিরেখা বিশ্বাস বা মালা সিংহ, এঁরা বোম্বাই গেলে জল্পনা বসে যেত 'রায় কেবিন'—এ।
সবচেয়ে চিন্তিত হতো 'অপরূপার' মেকাপম্যান হরিবাবু।
'অগো যদি সুইমিং কস্টুম পরায়, বাংলার তো বদনাম অইব।''
রক্ষণশীল ছিল মূল্যবোধ।
এখনকার মতো ছিল না সময়। সব 'সেক্সি সেক্সি' বা 'ল্লাভ ল্লাভ' বা 'আব আয়েগা মজা' হয়ে যায়নি। কেন, এক বিখ্যাত অভিনেত্রী, নায়িকার রোল প্রত্যাখান করে দিলেন, যখন তিনি বিখ্যাত নন, যখন স্বামী—স্ত্রীর ঘোর আর্থিক সংকট—কেন? না, কাপালিক যখন তাঁকে অপহরণ করে পাঁজাকোলা করে নিয়ে দৌড়াচ্ছে তখন তাঁর কাপড় হাঁটু অবধি উঠে যাবে।
বললেন, হাঁটু দেখাব? তারপর বলবেন কাঁধের আঁচল ফেলে দিন?
এসব কথা বকছি কেন? একটা বিগত সময়কে বোঝাবার চেষ্টা করছি। সময়ের মধ্যে বাঙালির রক্ষণশীল মূলবোধ ছিল। মঞ্চ পর্দার সামনেটা এবং পেছনটা এই একই মূল্যবোধে আচ্ছন্ন ছিল।
ব্যতিক্রম কি আমরা মেনে নিতাম না? নিতাম, বোবা হয়ে যেতাম গল্প শুনে। জ্যোতিপ্রকাশ আর শীলা হালদারের গল্প। শীলা হালদারের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্টুডিওতে জ্যোতিপ্রকাশ বিষপানে আত্মহত্যা করেন। আমরা এ কাহিনী শুনেছি, প্রেমকে জানিয়েছি সেলাম।
বউদির ব্যাখ্যা খুঁজছি, আর খুঁজছি, আর খুঁজছি!
বউদির এই প্রচণ্ড ভালবাসা, যার প্রতিরোধ করার ক্ষমতাই ছিল না ওর—প্রতিদান ব্যতিরেকেই যা শেষ দিন অবধি বেঁচেছিল—তার ব্যাখ্যা খুঁজছি।
সেই কি ওর পারিবারিক পটভূমি থেকে জাত?
তা তো নয়! সেটা তো ছিল বিনা প্রশ্নে, মুখ বুজে যান্ত্রিক আনুগত্যের শিক্ষা।
সেটা কিছু ছিল, তার বাইরেও ছিল বউদির ভালবাসার শক্তি, যে শক্তি ওর সহনক্ষমতার চেয়ে জোরালো।
সে কি নিহিত ওর সময়ের বা আমাদের সময়ের মূল্যবোধে?
না, তার চেয়েও বেশি আদিম ও অচেনা প্রচণ্ড শক্তিমান কোনো জুরাসিক যুগে—তাই হবে তাই হবে।
শেলী এসে আছড়ে পড়ল।
আমি ফিলিপকে বললাম (ফিলিপ রাজেন বোস, আমার সহকারী), তুই ম্যানেজ করে নিস। বউদি অজ্ঞান হয়ে গেছে।
গিয়ে কি দেখলাম!
চিত হয়ে পড়ে আছে। পড়ার সময়ে পেলমেটে ঝোলানো পর্দা আঁকড়ে ধরেছিল, পেলমেট ভেঙে সব পর্দা জড়িয়ে, মড়িয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে কাছে সুলতানা আন্টির নার্সিংহোম। ওখানেই নিয়ে গেলাম। মাথা ফেটেছিল, সর্বাঙ্গ কেটেকুটে গেছে, আঘাত কতটা জানি না।
তারপর তখনকার অভিজাত নার্সিংহোম এলগিন নার্সিংহোম। হাসপাতালে তো নেব না। শহর জেনে যাবে। হাসপাতাল অ্যাকসিডেন্ট কেস থানাকে জানায়—খবরের কাগজে থানা বা হাসপাতাল কে জানায় জানি না।
টাকা কি লাগবে, খরচা কি হবে, কিছুই ভাবিনি।
বউদির জ্ঞান ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। শেলী তো নড়বে না কিছুতে। শেষে অরু, অরিন্দম সোম—সবে যাকে এনে দিয়েছে দত্তদা, অরু বলল, আমি থাকব। তুমি যাও বিনয়দা, খেয়ে দেয়ে এসো।
দত্তদার কোনো আত্মীয়ের ছেলে অরু—জীবিকার খোঁজে কলকাতা এসেছিল বলে শুনেছি—শ্যামবর্ণ মিতভাষী ছেলে কপালে ও গালে কয়েকটা ক্ষতচিহ্ন সেলাই করা—দত্তদা বলল, নিমতেল নিমোলা আর দাদের মলম ডারমোলা বিক্রির চাকরি করে দিয়েছি। খুব সবরকম কাজের ছেলে। তোমার ওখানে রাতটা শুয়ে থাকবে, অসুবিধে আছে? খাবে হোটেলে।
এ সময়ে অরু খুব সার্ভিস দিল। হাসপাতালে থাকা ও রোগীর শুশ্রূষায় ও এত দক্ষ তা এখন দেখলাম।
ও বলল, জখম তেমন জোর নয়—তবে মনে কোনো আঘাত পেয়েছেন।
শেলীকে বাড়ি পৌঁছলাম। বললাম, সব দেখেশুনে রাখো। মায়ের দায়িত্ব আমাদের।
তারপর সে একদিন গেছে বটে।
দৌড়লাম অরুণদার বাড়ি। অরুণদা সব শুনেটুনে চুপ করে থাকল। বলল, সরসী তালুকদারের স্বামী হয়ে থাকাটা পোষাল না বিনয়।
—বউদি সিরিয়াস অরুণদা।
—হ্যাঁ...অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখিনি...তবে ভীষণ ইমোশনাল তো!
—আপনার মতো কে জানবে অরুণদা? আপনিই পারেন বউদিকে বাঁচাতে।
—কি করব, বলতে পারো? আমার অবস্থা বুঝতে পারো তোমরা...তুমি?
—আপনি তো নিজের হিম্মতেই বিখ্যাত।
অরুণদা একটা দামী কথা বলল। সেদিন কথাটা দামী মনে হয়নি। অরুণদাকেও নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল। এখন বুঝি, মিথ্যে বলেনি।
অরুণদা বলল, বাড়িটা সরসীর।
—সে তো বরাবরই ছিল।
—তখন অন্যরকম, এখন অবস্থা অন্যরকম।
অরুণদার কথা বলা, তাকানো, হাঁটা—চলা, মাঝে মাঝে হাতের আঙুল ছড়িয়ে সেদিকে চেয়ে থাকা—সবকিছু আশ্চর্য মাপা মাপা। ঠিক যে এফেক্টটা ও তৈরি করতে চায়, তা করতে পারে। অভিনয় ও বলতে গেলে করেনি। আমি মনে করি বাংলার পুরনো ট্রাডিশনের পেশাদারী রঙ্গমঞ্চে ওর অভিনয় না—করাটা একটা বিশাল ক্ষতি।
আমি বললাম, অন্যরকম কিসে? বউদি আপনার জন্যে প্রাণ দিতে পারে।
—বিনয়! বিনয়! প্রত্যহ চলার জন্যে ওরকম অসম্ভব উচ্চমাত্রার, যাত্রামার্কা প্রেম, প্রাণদান, আত্মত্যাগ ইত্যাদি ইত্যাদির দরকার হয় না। হাঁপ ধরে যায়, মনে হয় কি জানো? এই যে কাচের কাগজচাপাটা দেখছ? দেখ! একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। উল্টে দিলাম, সোজা করলাম, ছেলেটাকে ঘিরে বরফ পড়ছে। সুজাতা আর মিস্টার বোস, বিলেত থেকে এনে দিলেন এটা। ওদের 'লেখক' নামের ওপর অন্ধভক্তি।
—আপনি কি পাগল? এসব বলছেন কেন? বউদি ওদিকে...
—এ ছেলেটা কাচের ভেতর থেকে বেরোতে পারব না। সরসীর টু ম্যাচ প্রেম, টু মাচ অনুরাগ, আমার নিজেকে বন্দী বন্দী লাগে। আমাকে অরুণ তালুকদার হতে হবে। যাত্রা যে কি ভয়ানক শক্তিশালী গণমাধ্যম, তোমরা বুঝছ না। আমাকে সেখানে মুকুটহীন রাজা হতে হবে। ওখানে...সরসীকেন্দ্রিক আবহাওয়াতে...আমি নিশ্বাস নিতে পারি না।
—বউদির অভিনয়প্রতিভা আছে, ও কি করবে? সব ছেড়ে দেবে?
—সে ও বুঝবে।
এখন অরুণদা হঠাৎ নিজের মুখ দেখাল। বলল, এই সরসী কে? এ তো আমার তৈরি। আমি চরিত্র সৃষ্টি করেছি, ও অ্যাকটিং করেছে। সৃষ্টি, স্রষ্টাকে উপেক্ষা করে চলবে...না!
—আপনার সব কথা মানলাম। সব করবেন আপনি। শুধু এ সময়টা...
—চলো...যাচ্ছি
—আমার বলা সাজে না...
—সে কি হে? তোমরা, বিশেষ তুমি তো ও—বাড়িতে...সরসী মানেই তার চার সেপাই। তুমি অবশ্য ক্যাপটেন।
—আমাকে আপনি এ কথা বললেন? আপনার জন্যে আমি...
—হ্যাঁ, অনেক করেছ, করে যাচ্ছ। ঠিক আছে, আমি যাব।
—নয় এখানেই আনুন বউদিকে। নয় দুজনে বাইরে যান কোথাও। আপনাকে দেখলেই বউদি...
—বেশ, কালই যাব। কথায় বলে, ভালবাসা এবং যুদ্ধে, সবকিছু করা চলে। ভালবাসায় তো আমি ক্লান্ত। এটা হয়তো যুদ্ধ। যুদ্ধে আমি জিততেই ভালবাসি।
ভালবাসায় অরুণদা ক্লান্ত!
'জি' টিভি—র সরব ঘোষণা শুনতে পাচ্ছি।
'গর্মিসে ম্যয় থক গিয়া হুঁ'।
থক—পক—বকবক—অর্থহীন প্রলাপ দ্বারা মস্তিষ্ককোষকে সুকৌশলী আক্রমণ। তখন এসব ভাবা যেত না। রেডিওতে 'বিবিধ ভারতী'তে শুধু শোনা যেত, 'লাইফবয় যেখানে, স্বাস্থ্যও সেখানে!'
বিবিধ ভারতী ছিল, না রেডিও সিলোন? যাই থাক, সেটা শোনা কুরুচি বলে গণ্য হতো। আমার মামা বলতেন, বড়টাই যদি এসব শোনে, পরেরগুলো উচ্ছন্নে যাবে।
কখন বাড়ি ফিরলাম, কখন ঘুমোলাম...পরদিন অরুণদাকে নিয়ে গেলাম। বউদির পাশে গিয়ে বসল অরুণদা, আমরা বেরিয়ে এলাম।
অরুণদা বলল, এখানে এনে ভাল করেছে। হাসপাতালে গেলেই কাগজে বেরোত। কেচ্ছা! কেচ্ছা! যাত্রার লোকজন রক্ষণশীল তো!
—কাল তো ছেড়ে দেবে।
—বাড়িতে নিয়ে এসো, আমি নয় থাকব। কাল আবার...যাব একবার।
অরুণদা চলে গেলে দত্তদা বলল, যাবেন...থাকবেন না...জানি না দিদি এমন অবুঝ হছেন কেন! অরুণদা আর কোনোদিনই ওখানে থাকবেন না।
দত্তদার নাম অলক দত্ত। দত্তদা নামেই পরিচিত সর্বত্র। দত্তদার নানা গুণ। মঞ্চে সেট—সেটিং তৈরি করত। সিনেমাতেও সে কাজ করেছে। আসল কারবার ছিল পোশাক তৈরি করা। যাত্রা থিয়েটারে ও সিনেমায়, 'দত্ত অ্যানড সানস' কোম্পানিই সায়েবি মোগলাই, পাঠানী, রাজপুত, নানা ঢঙের পোশাক সাপ্লাই দিত। এক পার্শী ভদ্রলোক ওকে দোকানটা করে দেয়। দত্তদার বিয়ে হয়েছিল দশ বছর ছেলেপিলে হয়নি। আমরা বলতাম, অ দত্তদা! অ্যানড সানসের কি হবে?
—হয়ে যাবে, হয়ে যাবে, ভরসা রাখো।
শেষ অবধি শালার ছেলেরাই অ্যানড সানস হয়ে বসল। দত্তদা খুব ফুলবাবু ছিল। কোঁচানো ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি, চীনে পাড়ার জুতো, বর্ষাকালে র্যালি ব্রাদার্সের ছাতা—ইয়ার্ডলি ল্যাভেন্ডার সুগন্ধি রুমাল। প্রচুর সিগারেট খেত, খাওয়াত, দরাজ দিল, দরাজ হাত।
বউদিকে কি চোখে দেখেছিল কে জানে! অরুণদার বয়েসী হবে, প্রথম দিনই বলেছিল, আপনি আমার দিদি হলেন।
—ওমা! ছোট বোন বলুন।
—তা কি করে বলব? আপনার নাম কি মানসী? আমার বড়দি সরসী, মেজদি অতসী, আমার পরের বোন মানসী। টেকিনকালি আপনি দিদি।
দত্তদা আরো বলল, অরুণদা দিদির সঙ্গে থাকবেন না। তাছাড়া ওর নাটক সর্বসমক্ষে বাতিল করার শোধ ও দিদির উপর তুলবে।
—কিন্তু কেন? বউদি তো বাতিল করেনি।
—ওই যে অধীরবাবু বলেছিল, ম্যাডাম! আপনি এ নাটক শুনেছেন? দিদি তো 'হ্যাঁ' বলেনি, স্বামীকে ব্যাকও করেনি।
—শোনায়নি দত্তদা, বিশ্বাস করুন! বউদি কতবার সেধেছে তখন!
—এই তো হয় রে ভাই। তুমি আমি কি করব?
সেদিন থেকেই দিদির নামে ফুল চড়াচ্ছি মায়ের পায়ে। মা নিচ্ছেই না।
তখন প্রথা ছিল, এখনো আছে কিনা জানি না, থাকাই সম্ভব। কালীবাড়ি গিয়ে পুজো দেওয়াতে, ফুল চড়ানোতে মঞ্চ ও পর্দার লোকদের অগাধ বিশ্বাস ছিল। শুনতাম, নতুন নতুন পরিচালকরা এসব মানেন না। কিন্তু যারা তাঁদের ছবিতে টাকা ঢালত, তারা মানত বলেই জানি। অসুবিধে তো নেই কিছু। আপনি মহৎ চিত্র করছেন, করুন। আমার কাছে এটা এই লাইনের রীতি। 'তুফান' ছবি সুপারহিট করতে কাপাডিয়াবাবু কালীঘাটের ঠনঠনের আর দক্ষিণেশ্বরের তিন কালীকে তিনটে মুকুট দিয়েছিলেন।
দত্তদা, যার অলক দত্ত নাম কেউ জানে না, তার আজও গভীর বিশ্বাস কালীতে। বউদির খবর জেনে থেকে বলছে, যা হোক করে মায়ের হোথা যেয়ে দিদির নামে কাঙালি খাইয়ে দেব।
আমি আর দত্তদা ভেতরে গেলাম। বউদি বলল, তোমাদের বড্ডই কষ্ট দিচ্ছি, তাই না বিনয়?
—নিজেকে কি করেছেন বউদি? মাথা ফেটে, সব কেটেকুটে ...নাঃ। আপনাকে নিয়ে পারা যাবে না।
—কাল তো...বাড়ি যাব।
দত্তদা বলল, যাবেন দিদি। অরুণদাও আসবেন। আপনি যুক্তি দিয়ে বুঝুন,...
—জানি, জানি...ও বলেছে...ওর ভীষণ কাজ আছে। তাই আসবে একবার, আবার চলে যাবে।
—এই তো, দিদি সব বুঝেছে। এখন ঘুমোন দেখি। যত ঘুমোবেন, তত তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন।
—অরুণকে কিন্তু নিয়ে যাব সঙ্গে।
—কোথায় বউদি?
—আমার কাছে রেখে দেব। ও বেশ...আমার গার্জেন হয়ে থাকবে...
অরু বলল, বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো পরে হবে। আজ ঘুমোন। আপনি কি, বউদি? এটা কি স্টেজ? পতন ও মূর্ছা গেলেই হলো?
—হাসিও না, হাসিও না অরু...হাসলে সেলাই ছিঁড়ে যাবে।
—কেন? 'মৃদু হাস'ও তো স্টেজে করতে হয়।
বেরিয়ে এসে দত্তদা বলল, নিমোলা আর ডারমোলা নয়, অরুলা হচ্ছে আসল ওষুধ। সত্যি অরু! তুমি ওখানে থাকলে আমরা একটু নিশ্চিন্ত থাকব।
আমরা তিনজন আমার বাড়িই এলাম। তারপরই চাঁদুর ফোন। বলল, আমি আসছি, কথা আছে। বউদির ব্যাপারে দরকারি কথা।
দত্তদা বলল, কাল দিদির বাড়িতেই এসো বিকেলে। না এলে হবে না।
দত্তদা নিঃসন্তান ছিল, দত্তদা অরুকে এনেছিল। নিজের বাড়িতে ওকে রাখেনি, ভাগ্যে রাখেনি।
আমরা চা খেলাম। কাটলেট আনালাম দোকান থেকে। অরু বলল, এ ভদ্রলোক তো ফিরবে বলে মনে হয় না। বউদি যে কি করবে... কাল বলেই যাচ্ছে বিড়বিড় করে, আমাকে ফেলে ফেলে যেও না অরুণ...আমাকে নিয়ে যাও...
দত্তদা উঠে পড়ল। বলল, একজনের ডায়াবেটিস থাকে জানো? যা সারে না? কন্ট্রোলে না রাখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি চললাম। কাল দেখা হবে।
ঝড়—জল—দুর্যোগ—ট্রামবাস বন্ধ, যাই হোক না কেন, দত্তদা প্রত্যহ কালীঘাটেও যেত, আবার আনোয়ার শা' রোডে ধীরাদির বাড়িতেও একবার যেত। ধীরাদি ছিল সিনেমায় দু—একবার মুখ—দেখানো মহিলা। দত্তদার ছিল নীরব, প্রত্যাশাহীন, দীর্ঘস্থায়ী প্রেম। ধীরাদির স্বামী সরোজবাবু রাধা ফিলম স্টুডিওর কাছে চা—নিমকির দোকান চালাত। ওদের ছেলেমেয়েও ছিল। দত্তদা বলত, যাই প্রত্যহের কর্তব্যটা করে আসি।
চাঁদু বলত, এ কেমন ব্যাপার দত্তদা?
—এ কি সিনেমা বা থিয়েটার রে ভাই! আমিও মজনু নই, সেও লায়লা নয়। ওই যাই, সরোজবাবু, ধীরা, ছেলেমেয়ে, 'কেমন আছ' জিগেস করি। এক কাপ চা খাই। আবার টুকটুক করে ট্রামে চেপে চলে আসি। এরকম অনেক কাল চলছে, অনেক কাল চলবে। তোমাদের বউদি সব জানে। তোমরা পারবে এরকম?
—না...তা পারব না...
—তবে? ভালবাসা হবে যাকে বলে গঠনমূলক, অর্থাৎ ভাঙবে না কিছু। আমার শিক্ষা সে রকমই। এ সরোজবাবুও জানে। কিছু মনে করে না।
—ছেলেমেয়েকে ভর্তিও করিয়েছেন।
—বাপ—মা'র 'ক' অক্ষর গোমাংস। ছেলে বাপের দোকানে চা করবে, এর বেশি আশা করেনি। এখন বুঝছে।
সেই ছেলে ড্রাফটসম্যানশিপ পাস করে কাজ করছে। সেই বাড়ি এখন পাকা হয়েছে। সেই মেয়ে নার্সও হয়েছে, বিয়েও করেছে। সরোজবাবু মরে গেছে বলে দত্তদা ধীরাদির বাড়ি যায় না।
পরদিন বউদি বাড়ি এল। তারপরই বলে, শেলী, বাড়ি পরিষ্কার করা। বাবু নোংরা দেখতে পারে না। আমার বিছানায় ভাল চাদর পেতে দে। চুলে হাত দিসনি বাপু। সে আমি আলগা করে এলো খোঁপা বেঁধে নেব। ইস! মুখের চেহারা যে কি হয়েছে।
এটা বরাবর দেখেছি যে বউদির মধ্যে ভারি শোভন নারীত্ববোধ ছিল। অলকাদির কথা উঠলেই বলত, কি করে পারে বাবা? যেমন তেমন চুল জড়িয়ে, যা পরে আছে তাই পরেই বেরিয়ে গেল? আমি মরে গেলেও পারব না।
তার রমরমার দিনে তো বটেই, বিস্মৃতির দিনেও দেখেছি যে আর কেউ নয়, আমি বা আমরা গেছি—নিমেষে কাপড় বদলে চুলটি আঁচড়ে মুখ মুছে তবে আসবে। রাস্তায় সাবান ও পেস্ট কিনতে যাবে—চুল বেঁধে, পাউডার মেখে, টিপ পরে যাবে।
বলত, জানো বিনয়! প্রভাদেবীর মতো বড় অভিনেত্রী বলতেন, মেয়েরা! সাম্য হয়ে বোস। সরসী কেমন করে বসেছে দেখছ না? পা মুড়ে, আঁচলে ঢেকে, মেয়েদের যেমন বসতে হয়।
তা, সেদিন বউদির অপেক্ষা আর ফুরোয় না। অরুণদা এল সন্ধ্যায়, সেও ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে। আমি বেরিয়ে গেলাম। অরুণদাও পাঁচ মিনিট বাদে বেরিয়ে গেল।
পরে যখন ঢুকলাম, বউদি বলল, এখন থেকে এরকম আসা—যাওয়া নিয়েই খুশি থাকতে হবে বিনয়। আর...পিপুল এলে বলতে হবে যে আমি বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গেছলাম, আর...আর...এই তো!
আমি কি বলতাম?
—আমি কি করলে ও ফিরবে বলতে পার? একবার বলুক, আমি সব করব। উনিশ বছর বয়সে বিয়ে, আজ আমার ছেচল্লিশ চলছে, আমি তো ওকে ছাড়া কিছু জানি না বিনয়!
—আপনি জোর করে...মানে মানে জোর করে বেশ সুস্থ হয়ে উঠুন তো। অরুণদা কেরিয়ার করছেন, যা খুব প্রশংসনীয়...
—অধীরবাবুর মুখের মতো জবাব, বলো? 'যাত্রার পালা লেখেন' বলেছিল, তা যাত্রার পালা লিখেই দেখিয়ে দিচ্ছে।
—সেটা ভাল করছেন?
—নিশ্চয়।
—আপনিও নিজের কেরিয়ার করুন।
—হ্যাঁ বিনয়...ঠিক বলেছ...
—'জীবন পিপাসা' বা 'কালরাত্রি' বা 'অশান্ত ঘূর্ণী', সব বইয়েই নায়িকা দুজন। একজন মাঝবয়সী, একজন তরুণী। আপনি...বলতে গেলে...চরিত্রাভিনয়, মানে ক্যারেকটার অ্যাকটিঙের দিকেই যাচ্ছেন। যেটা খুবই ভাল। ক্যারেকটার অ্যাকটিং দীর্ঘদিন করা যায়।
—সেই তো! ঠিক বলেছ।
অরু ঢুকে বলল, তাহলে সেই কথাই রইল। এখন যবনিকা পতন। বউদি বিশ্রাম করুন। বিনয়দা বাড়ি যান। আমি আজ রাতটা তো থাকি।
—কেন, সবসময়ে থাকবে না?
—দেখাই যাক না। এই মুহূর্তেই সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে নাকি? আপনি জীবনটা স্টেজ করে ফেলবেন না। স্টেজে দু—আড়াই ঘণ্টায় পঞ্চাশ বছর কাটানো যায়। জীবনকে সময় দিতে হয়।
বেরিয়ে এসে অরু বলল, বাড়ি চলুন।
যেতে যেতে বলল, বউদি যেমন, স্বামী বা ছেলে তেমন নয়। স্বামী তো কাপ্তেন বললেই হয়। এসেছিল ট্যাক্সিতে এসে মুটকি বসেছিল। কি বাতাস খাচ্ছিল আঁচল নেড়ে!
—খুব ফর্সা? বব চুল?
—হ্যাঁ।
—সুজাতা বসু। স্বামী—স্ত্রী, বাড়ির সবাই অরুণদার ভক্ত।
—অরুণবাবু ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতে বলল, সেই এক নাকে—কাঁদুনি...ডিসগাসটিং।
—এখনি এসো না তবে।
—বউদি তো বোঝে না...বউদির ওপরও রাগ হচ্ছে আমার।
আমি ভীষণ স্বস্তি পেলাম। যাক, আমার একার নয়, অরুরও রাগ হচ্ছে। বউদির ওপর রাগ হলে সে লোক থেকে যাবে।
তারাই থেকে গেল।
যাদের রাগ হতো না—করুণা, ঈর্ষা, ডিসগাসট হতো, তারা থাকল না।
বউদির কথা কি বললে শেষ হবে?
সে সময়কার ঘটনা—পিপুল আপিসের কাজে এসে হোটেলের বদলে মা—র কাছে উঠল।
আমি বললাম বউদি! পিপুল এসেছে, এখন ক'দিন আমরা নয় না এলাম।
বউদির হাসি ছিল খুব সরল, খুব স্বতোৎসারিত, আবার একটু ভীরু।
ওর হাসি দেখলে, অমন মানুষের ওপর রাগ করে যে, সে লোক অমানুষ।
বউদি বলল, কেন বিনয়? তোমরা কেন আসবে না? পিপুল তো তোমাদের চিরকাল দেখছে। জানে, তোমরা ওর বাবাকে কত মান্য করো! ও তো..ছেলেমানুষ নেই আর...ছাব্বিশ বছর বয়স...এ বয়সেই বড় চাকুরে...কত দুঃখও তো পেল বলো? পেল না? বউ চলে গেল...
পিপুলের প্রথম বিবাহ, বউ চলে যাওয়া, ডিভোর্স ও দ্বিতীয় বিবাহ সবই জেটগতিতে ঘটে। আমি বললাম, আপনি ওর সঙ্গে একান্ত যতটুকু পারেন, থাকুন না!
—ঠিক বলেছ—নইলে...ও যা অবুঝ...রেগেমেগে ওর বাবার কাছেই চলে যাবে হয়তো...কিন্তু আমার ব্যান্ডেজ ড্রেসিং...?
—সব তো সুলতানাদির লোক করে দিয়ে যায়। ও থাকার সময়ে শেলীদের একটু হাসিখুশি থাকতে বলবেন।
—নিশ্চয় বলব, নিশ্চয়।
—বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন, মনে রাখবেন।
—মনে রেখেছি, রেখেছি, রেখেছি।
—চললাম বউদি।
—কিন্তু...কোনো দরকার হলে?
—হবে না। হলে ফোন করবেন।
পিপুল এসেছিল। কলকাতায় চার দিন ছিল। রোজই বউদির কাছে এসেছে, খেয়েছে রাতে। এক রাত কাছেও ছিল।
এখন আগের কথা কিছু বলা যাক।
বউদি যখন সরসী রায়, বিধবা দিদিমা ও বিধবা মায়ের আদরে মানুষ হচ্ছে, স্কুলেই আবৃত্তি, নাটক, গান এসবে খুব কৃতিত্ব দেখায়।
ওদের জমিতেই বারোয়ারি দুর্গোৎসব হতো। আর, কয়েকখানা বাড়ি বাদ দিয়ে পাড়ার নাটকের ক্লাব। পরিচালক অরুণ তালুকদার।
অরুণদার মোহিনীমায়া ছিল, আজও আছে। ওর সংস্পর্শে যে আসত, সেই ভয়ভক্তি করত।
বউদিদের বাড়িতে দুর্গোৎসবের পর ফাংশান হয়। অরুণদা ওর লেখা 'দশমী' নাটক করায়। বউদি তখন নাটক—পাগল। খুব জেদাজেদি করে পাড়ার ক্লাবের নাটকে যোগ দেয়। দিদিমার বাধানিষেধ খাটেনি। ওর মাও বলেছিলেন, সবাই চেনাশোনা—বাড়ির মাঠেই থিয়েটার হবে—ইস্কুলেও খুব সুখ্যাতি পেয়েছে, করুক না।
—শেষে নাটক! মেয়েকে খুব আহ্লাদ দিয়েছ মা!
—ওর বাবার থিয়েটার দেখার নেশা ছিল না? আর আমার কালে আপনি স্কুলের পড়া শেষ করতে দেননি। পনের না হতে বিয়ে দিলেন। সরসীকে আমি কলেজেও পড়াব।
—তোমার মেয়ে, তুমি বুঝবে। আমি তো বুঝি, বয়স হলেই বিয়ে দাও।
—আর ঘরজামাই রাখো? না মা, এখন সবাই পড়ে, সবাই কলেজে যায়, দিনকাল কবেই বদলে গেছে। ও পড়াশোনায় ভাল, দেখতে ভাল, নাচ—গান—নাটকে ভাল। শক্তসমর্থ হয়ে মানুষ হোক। নইলে আমার দশা হবে। তিনি ঘরজামাই ছিলেন, ঘরে ক'দিন পেয়েছি তাঁকে? ইয়ারবকসি নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছি, পিকনিক করতে যাচ্ছি, থিয়েটারে যাচ্ছি...আমার জীবন তো কাটল আঁশ—হেঁশেলে।
সেই 'দশমী' নাটকেরই পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত রূপ 'অপরূপা'য় নতুন নাট্যকার অরুণ তালুকদারের লেখা 'স্ফুলিঙ্গ' যাতে বউদি প্রথম নামে এবং মঞ্চজগতের তখনকার ভাষায় 'ক্যান্টার' করে দেয়।
'দশমী'—র রিহার্সাল থেকেই প্রেম। 'দশমী' এতই সফল হয় যে ক্লাবের টাকা তোলার জন্য তা টিকিট বেচে হল ভাড়া নিয়ে করা হয়। 'দশমী'—কে 'স্ফুলিঙ্গে' রূপান্তরিত করল অরুণদা। 'স্ফুলিঙ্গ', 'সূর্য' রঙ্গমঞ্চে একদিন চারিটি শো হল। সরসী রায়ের সুখ্যাতি ও ছবি বেরোল কাগজে। টাকা পয়সা আসতেই নাটকের ক্লাবে ভাঙন ধরল।
আর বউদি প্রথম ডিভিসনে বাংলার লেটার নিয়ে ম্যাট্রিক পাস করল—আশুতোষ কলেজে ভর্তি হল...এর কিছুদিন বাদেই ঘোষণা করল অরুণদাকে বিয়ে করবে।
বাড়িতে ঝড় উঠল বলা যায়। দিদিমা তীর্থযাত্রা বন্ধ করলেন। জাতে অমিল নেই, এরা এবং ওরা উভয় পক্ষই ব্রাহ্মণ। কিন্তু যার চালচুলো নেই—মেসে থাকে—ছুটছাট নাটক লেখে ও করে—তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায় না।
দিদিমা ঘটক ডাকলেন। বললেন, এই ফালগুনেই নাতনির বে দেব। এ ছোঁড়া তো নাতনিকে দেখে মজেনি, সম্পত্তি দেখে মজেছে। আমিও দেখে নেব।
বউদি বাড়ি ছেড়ে পালাল।
১৯৪৭ সালের পয়লা জানুয়ারি, তিন আইনে বিয়ে হয়ে গেল। ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেট বলে দিচ্ছে, মেয়ের উনিশ বছর পূর্ণ হচ্ছে বিয়ের দিন। দিদিমা থানা—পুলিশ করতে পারেননি।
ওরা কসবায় ওদের এজমালি বাড়িতে উঠেছিল। ঠিক এক বছরের মাথায় পিপুলের জন্ম হয়। পিপুলের বছর খানেক না হতে কয়লাবাবু 'স্ফুলিঙ্গ' রিহার্সালে ফেলল। ১৯৪৯ থেকেই বউদি পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রী।
এর মধ্যে দিদিমা মারা গেলেন। মেয়েকে বললেন, আগে তোমার, তোমার পরে তোমার মেয়ের। ও ছোঁড়ার নামও রেখো না কোথাও। তারপর তোমার মেয়ে যা করবে। ভবিষ্যৎ তো দেখা যায় না!
বউদির মা কিছুকাল বেঁচে ছিলেন। বউদি মাকে 'স্ফুলিঙ্গ' নাটক দেখিয়েছিল। মা দেখুন, জামাই কি রকম লেখে, আর স্বামীসেবা, ঘরসংসার সব করেও তাঁর মেয়ে কি অসামান্য অভিনয় করে!
মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়েছিল।
—এমন নিষ্ঠুর বই লিখল অরুণ? কি দোষ করেছিল রাধা যে একটা ভুলের জন্যে ওকে সন্তান, সংসার সব ছেড়ে চলে যেতে হল? শেষে বাইজি হল, ছি ছি ছি! আর স্বামীর পায়ের কাছে পড়ে মরতে হল?
অরুণদা বলেছিল, এখানেই নাটকের সার্থকতা। আপনি যেমন কাঁদছেন, দর্শকও তেমনি কাঁদছে। নাটকটা নিয়েছে লোকে।
—আমি তো আমার মেয়েকে দেখছিলাম। বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। তা বাবা! তোমার হাতেই তো কলম, অভাগীকে একটু সুখ দিলে না?
—নাটক, নাটকই মা!
—যাকগে, দুঃখ যেন ওখানেই থাকে, তোমরা সুখে বেঁচে—বর্তে থাকো।
বউদি পরে বলত, ওর বাড়ির এ—সে আসে বলে রাগ করে বিনয়! আমার মা—ই যাওয়া—আসার সেতু বেঁধেছিল।
পৌষ মাসে রেজিস্ট্রি বিয়ে মায়ের বুকে তো বিঁধে থেকেছিল। অনেক স্বস্ত্যয়ন পুজো এসব করান তিনি।
মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বলে একটু বস্তু আছে, তা জানার পর সেখানে আমের সময়ে আম, পুজোর সময়ে কাপড়চোপড়ও পাঠান।
অরুণদা নাকি মাকে শুনিয়ে মেয়েকে বলেছিল, তোমার মাকে ওসব লৌকিকতা করতে নিষেধ কোর।
—কেন বলো তো?
—ওরা লোক ভালো নয়। ভালো নয়, কালচার নেই, থাকলে আমি বাড়ি ছেড়ে আসি?
তা, বউদি এটাও বলে, আমার সঙ্গে কখনো জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খোলেনি। বলত, তোমার টাকা তোমারই থাক। আমার প্রয়োজন খুব কম।
প্রয়োজনের তো ব্যাপার ছিল না। বউদির মা জানতেন, বেটাছেলেকে তুষ্ট রাখতে হয়। অরুণদার ঠাটবাট, সেবাযত্ন, মাঝরাতে চাইলে বাঘের দুধ জাতীয় ব্যাপারে কোনো ত্রুটি হয়নি।
বউদির মা বছর খানেক বাদে মারা যান। বউদি বলে, একে একগাদা উপোস করত, তার ওপর বিধবার আচার বিচার মানত... তারপর, বাবা থাকতেই চার ধাম তীর্থ করে আসে। টাইফয়েড যখন হল, দেহে যুঝবার মতো শক্তি ছিল না।
—খুব ধার্মিক ছিলেন বুঝি?
—ধর্ম—টর্ম করত খুব। সেও শূন্যতা ভরাতে। আমার দিদিমার মেয়ে, আমার বাবার স্ত্রী, দুটো হওয়া সহজ ছিল না। বাবার জঘন্য মেজাজ ছিল, জানো?
বউদি যদি বাবার মেজাজও পেত!
—আপনি কার মতো হয়েছেন?
হ্যাঁ, বউদি নিজের মতোই ছিল। পেশাদার অভিনেত্রী, অভিনয়ে ঠিক আছে। কিন্তু জীবন যাপনের ব্যাপারে একেবারে সশস্ত্র ছিল না। তাকে আঘাত করা, তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়া অতি সহজ ছিল সেই লোকের পক্ষে, যাকে বউদি অসহায়ভাবে ভালবাসত। যে জন্য ইদানীং বলত, এখনো ওকে এত ভালবাসি কেন বিনয়? কেন?
আমি মঞ্চ ও পর্দার পুরনো ট্রাডিশনের লোক, এখনও তাই রয়ে গেছি। আমার সময়কার বাংলা ছবি দেখার সুযোগ পেলে হামলে পড়ি। কি সিনেমা, কি থিয়েটার—আমি গল্প খুঁজি। এখনো বাণিজ্যিক মঞ্চে ও পর্দায় সেই আত্মত্যাগিনী স্ত্রী বা মা, পরিবারকে একান্নে রাখার জন্যে আত্মোৎসর্গকারী বড় দাদা ও মাতৃসমা বড় বউদি, স্বামীর জন্য অক্লেশে কর্মজীবন ত্যাগকারিণী রান্নাঘর—নির্বাচনকারী স্ত্রী, এদেরকেই নানাভাবে দেখা যায় শুনেছি।
দেখি না, সিনথেটিক লাগে।
এখনকার নায়ক—নায়িকাদের সিনথেটিক লাগে।
নিশ্চয় আমি ভীষণভাবেই ব্যাকডেটেড হয়ে গেছি। এখন আর বদলাই কেমন করে নিজেকে?
বউদি সম্পর্কে এত বিগলিত আমি কেন, এ কথা অরুণদা ভেবে পায় না। শুনেছি বলে, আমার কাছেই এসেছিল, আমারই অনুগত ছিল, তারপর...জানি না...সরসীর খবর তো রাখি না, শুনতে পাই।
বউদি বলত একসময়ে, বিনয়, তুমি বিয়ে করোনি কেন গো?
—হয়ে ওঠেনি বউদি, বিশ্বাস করুন।
—বিয়ে করলে সে মেয়েটা বড় সুখী হতো গো! তুমি এত ভাল, এমন সবদিকে নজর, এমন দয়ামায়া তোমার।
—তা কে জানে? আমার তো ধারণা মেয়েরা নিষ্ঠুর পুরুষদেরই ভালবাসে।
—দূর! সবাই কি আমার মতো গাধা?
আর পিপুল যখন একদিন, বছর ছয়েক আগে হঠাৎ বলল, বিনয়কাকা! ম্যান টু ম্যান প্রশ্ন করছি, তুমি বিয়ে করনি কেন?
—প্রশ্নটা কত বছরের, পিপুল?
—অনেক বছরের।
—ম্যান টু ম্যান। এর চেয়ে ফ্রাংক হতে পারতে। অনেক বছর আগেই। আমার কথা বলতে পারি, আমাদের বাড়িতেই একটা ট্রাডিশন—বড় ছেলে বিয়ে করে না। আমার জ্যাঠামশাই বিয়ে করেননি (ঘটনা), আমার পিতামহের বড়দাদা বিয়ে করেননি (এটা বানালাম)। আমরা বিয়ে করি না, বিয়ে দিই। আমার মতো চরিত্র তুমি পুরনো বাংলা ছবিতে, পুরনো বাংলা নভেলে অনেক পাবে।
—রিয়ালি...আমি খুব...যাকে বলে অভিভূত...যে আমার মা—র এত ভাল ভাল বন্ধু আছে।
—সে তো ছোটবেলা থেকেই দেখছ যে আমরা তোমার বাবা ও মার অনুগত সৈনিক।
—যাঃ, বাবার নয়!
—তাহলে তুমি ভুলে গেছ। তোমার বাবার...এখন আমাদের দরকার নেই...তিনি শক্তিমান...তোমার মা দুর্বল...তাঁর অসুখ—বিসুখ...বাড়ির সমস্যা...বউদিকে তোমার কাছে কেন নিয়ে যাও না পিপুল?
পিপুল কতকগুলো বানানো কথা এতকাল শুনছে যে সেগুলো বিশ্বাসও করে অনেককাল। তা ছাড়া যেদিনের কথা বলছি, পিপুল সামান্য মদ খেয়েছিল। ও মদ্যাসক্ত, মদ্যপ কিছুই নয়। হেলথ ক্লাব এবং 'ইয়োগা' এবং 'নো সিগারেট' এবং ওর পিতার অমোঘতায় এবং ওর স্ত্রীর অতিমানবীত্বে বা সুপার উওম্যানশিপে বিশ্বাসী—চল্লিশ বছর বয়স্ক, দু ছেলের বা এক স্থবির বৃদ্ধ চিরন্তন বাঙালি—যেমন বাঙালিরা একদা সতীদাহের বিধান দিত।
পিপুল, অতএব, খুব আন্তরিক ভাবেই বলল, মা আসবেই না।
—বলে দেখেছ?
—বাবা বলেছে, বাবাকেই বলেছে, যাব না।
—তুমি সরাসরি বলো না কেন?
—নট দ্যাট ক্লোজ টু হার। তুমি জান না, কি অবহেলিত ছোটবেলা আমার! মা যদি স্টেজ অ্যাকট্রেস হয়, সন্তানকে দেখবে কখন? দেখত তো বাবা।
বুঝলাম, কথা বলা বৃথা। কোনো কোনো রাস্তা বা সেতু বা বাড়ি কনডেমড হয়ে যায়। তাকে মেরামতের চেষ্টা করা বৃথা ও বিপজ্জনক।
বললাম, এটা তো মানবে যে সে দীর্ঘকাল সব ছেড়ে বসে আছে?
—হ্যাঁ...তা তো বটেই!
—একা থাকে, তোমরা দেখাশোনা করলে...
—মা কেন যে বাবার সঙ্গে থাকল না, জানি না...
বুঝলাম। এখন কথা বলা একেবারে বৃথা।
—এখন তো কলকাতাতেই বেশি থাকো।
—বউ দিল্লিতে। ওর তো নিজের ফার্ম। ছেলেরা ঋষিভ্যালিতে। আমি তো বাবার ঠিক উলটো দিকের ফ্ল্যাটটা...ইন ফ্যাকট, কলকাতাকে...সুন্দর করার জন্যে একটি বিশাল প্রজেকট...জানি না কি হবে! খুব দৌড়চ্ছি।
—নিশ্চয় হবে পিপুল।
এর পরে পরেই আমি তেড়েফুঁড়ে লেগে যাই বউদির পিছনে। বাড়ির সংলগ্ন জমি জোর করে বিক্রি করাই। বলি, ভাঁড়ে মা ভবানী হয়ে থাকবেন কেন? টাকা ব্যাঙ্কে রাখুন লগ্নী করে। বাড়ি রং—মেরামত করিয়ে নিন। চলে যান না ভালো নার্সিংহোমে, সব দেখিয়ে শুনিয়ে নিন। দেরী করবেন না।
—ওকে...একবার জানাব না?
—দেখুন, আপনি সচ্ছল ঘরে জন্মেছিলেন, কিন্তু বিষয়বুদ্ধি আপনার নেই। অরুদা, গরিবের ছেলে। সে এসব ব্যাপারে আপনার স্বার্থ দেখে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে না। আপনার মায়ের রেখে যাওয়া টাকা নিয়ে তার পরামর্শে যা করলেন...আশি হাজারে এক বিঘা ধান জমি কিনলেন...যখন তার দাম চার লাখ, তার কথাতেই এক লাখ ত্রিশ হাজারে বেচলেন...দালাল খেল খানিক...এবার আর সে কাজ করবেন না। সে আপনার স্বার্থ দেখবে?
—সে এ সব বোঝে না বিনয়?
—বউদি! আমি সামান্য মাপের মানুষ। আপনাকে বুঝতে আমি একান্ত অক্ষম। হয় আমার কথামতো কাজ করবেন, নয় আমি আর আসব না। আমি ভীষণ ক্লান্ত বউদি। শুভময়ের জামাই টিকিট পাঠিয়েছে, আমি হিমাচলপ্রদেশে ওর আপেল বাগানে দুমাস থেকে আসব। এখন আপনি বুঝুন।
—আমাকে নিয়ে যাবে বিনয়?
—আমি? আপনাকে? অরু নিয়ে যেতে চাইল চাঁইবাসা, অলকাদি বলল, বাঙ্গালোর, চলো, আমি বললাম, আমরা সপরিবারে যাচ্ছি হাজারীবাগ—চলুন! কোথায় গেলেন, কবে? না, বউদি, আপনাকে নিয়ে যাব না। তা ছাড়া...অরুণদা কখন অসুস্থ হবেন, কখন পিপুল জানাবে...আপনি ঝোল—সুকতো রেঁধে দৌড়বেন—নো।
জমি বেচে চার লাখ টাকায়—আমি তো সব ব্যবস্থা করে রওনা হলাম। হঠাৎ বোধহয় মনে হলো কিছু—শুনলাম যাকে যা দেবার দিয়ে—থুয়ে, কিছু খরচ করেছে।
অরুণ বউকে নেকলেস কিনে দিয়েছে। অরু বলল, এটা ইডিয়টিক। ও নেকলেস পরবে না। টাকাটা দিলে কাজ হতো!
দেখলাম, ফিরে এসে দেখলাম, দোতলাটা রং করিয়েছে, বাথরুম নতুন করে নিয়েছে, আর, আর অবিশ্বাস্য, একটা ভালো ইনভার্টার কিনেছে।
সোনারপুরের জমি বেচে টি. ভি. কিনেছিল।
এখন কিনেছে ইনভার্টার।
—বাকি টাকা কি করলেন?
—ও তো ছোঁবেই না...ফোনই করেছিলাম। বলল, বাড়িও বেচে দাও না? বেশ ইউরোপ বেড়িয়ে এসো।
—প্রত্যাশিত। কি করেছেন টাকাটা।
—বাপ রে বাপ, পিপুলকে নমিনি করে ফিকসে রেখেছি। সুদে আমার চলে যাবে। খুব বেড়িয়েছ, তাই না?
—খুব শান্তি পেয়েছি। ওখানে সেটল করতেও পারি।
—অরু চলে গেছে... তুমি চলে যাবে...
—অরু এক বছরের জন্য গেছে, আবার আসবে। আমিও যাব বললেই যাচ্ছি না...
—যেতে হলে যাবে বিনয়...কতকাল আর...
—জানি না। দেখে যাই। এ কি! শেলী চা আনছে কেন? যে মেয়েটাকে রেখে গেলাম?
—কোনো দরকার নেই বিনয়...মিছেমিছে...
—নিজের জন্যে খরচ করবেন বা কেন? সবকিছুই তো আপনতম জনার্থে। চললাম।
'চললাম' বলেছি, পারিনি। অনেক কথা বলে যাচ্ছি, আসল কথাগুলো স্ক্র্যাপবই দেখে বলে যাই।
বউদি সেই মাথা ফাটার পর সেরে উঠলেও, অরুণদা এ—বাড়িতে ফেরেনি। বউদির সে সময়ে আশ্চর্য এবং দৃষ্টান্তমূলক আত্মত্যাগ—অভিনয় করাই বন্ধ করে দিল।
আমি এত রেগে যাই যে মাস ছয়েক যাইনি। দত্তদা, চাঁদু, অরু যেত।
দত্তদা একদিন বলল, চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত কত দিন খাবে ব্রাদার। দিদি কেন অভিনয় করবে না, তার যুক্তি খাড়া করে ফেলেছে।
—আমাকে বলবেন না দয়া করে।
—শোনাই না, যেতে তো বলছি না।
—একটা লোক, এখন ত্রিশ বছরও বাঁচতে পারে...
—পারে। মানুষের লংজিভিটি বাড়ছে। আগে কলেরা, বসন্ত, সর্পাঘাত, ম্যালেরিয়া,বছরে ক—হাজার যেত! এসব তো কমে গেছে। ঘাটের মড়াগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের জোরে ফিরে আসছে।
—একটা লোক বহু বছর ধরে আত্মহত্যা করবে, তা শুনতে চাই না।
—সে মনে করে, সে বসে গেলে অরুণদা বুঝবে যে দিদি যশাকাঙ্ক্ষী নয়। এখন রে রে করে সে ওপরে উঠতে পারে। আর এটা যেই বুঝবে, সেই ফিরে আসবে।
—সে আশা জলে গেল।
—হতেও তো পারে।
—আপনি বিশ্বাস করেন?
—না। অরুণ হালদার স্বার্থসর্বস্ব ছোট মাপের মানুষ। দিদি কেন, মেয়েছেলে জাতের ওপরেই ওর বিদ্বেষ।
—বউদি বিশাল ভুল করল।
—হয়তো শুধরে নেবে।
—কবে? আর হবে না দত্তদা, আপনি যান।
ভীষণ, ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়ি আমি। অসম্ভব ভয় পেয়ে যাই। কারো সঙ্গে কথা বলা দরকার, কিন্তু বলব কাকে? অবশেষে চাঁদু, দত্তদা আর অরুকেও ডাকলাম।
ওদের বুঝিয়ে বললাম আমি কেন এত ভয় পাচ্ছি। বউদিকে, বউদির হাত থেকে আর বাঁচানো যাবে না, সেটাও বললাম।
আমার যুক্তিগুলো এরকম ছিল : অরুণদা একেবারে সামন্তপুরুষ, সব মেয়েদের সম্পর্কেই। নারীবিদ্বেষ ওর ভেতরের ব্যাপার। নাটকের পর নাটকে ও মেয়েদের চিরঋণ, পদদলিত ভূমিকাই বহাল রেখেছে।
এবং সে বউদিকে তিলে তিলে শেষ করতে চায়, যা সে পারবে। নতুন নাটক নিয়ে চড় খাওয়া ও ভুলবে না। অধীরবাবু বা চন্দনবাবু নয়, বউদির ওপর শোধ তুলবে।
একই সঙ্গে এটাও সত্যি, যা ও নিজেই বলেছে যে এত বিরাট আত্মোৎসর্গ, এই যুক্তি—বুদ্ধি অতীত বিশাল প্রেম, এই নিরন্তর প্রেমাঞ্জলি গ্রহণ করা ওর সাধ্যাতীত। ওর হাঁফ লাগে। নিজেকে বন্দী—বন্দী লাগে। কাচের কাগজচাপার দৃষ্টান্ত বলেছিলাম।
বউদি কেরিয়ার ছেড়ে দিলে, জীবিত থেকেই মরে গেলে ওর কিছু এসে যাবে না। ও স্বরাষ্ট্রে সম্রাট। দম্ভস্ফীত অহংকারে নিজেই নিজেকে মুকুট পরিয়ে কোনো এক সিংহাসনে বসে আছে। ও ধূর্ত, কুশলী, ওর মন রুগণ। ও জানে, দিন বদলাবে, স্তাবক জুটবে, যশ, অর্থ, খ্যাতি ও পেয়ে যাবে। কেননা জনগণ চোখের সামনে যা দেখে, কানে যা শোনে, তাই বিশ্বাস করে।
আর অরুণদা নিজের স্বপক্ষে বউদির বিপক্ষে অনেক কাল ধরে জনমত তৈরি করছে। প্রথম শিষ্য পিপুল। আরো অনেকেই মনে করে বউদি ডাঁটিয়াল—সে অভিনয় করায় স্বার্থে স্বামী ও সন্তানকে অবহেলা করে—শেলীকে রেখে সে অরুণদাকে অপমান করেছে—অরুণদা 'সরসী তালুকদারের স্বামী' হয়ে থাকতে পারছে না।
এখন বউদির এই আশ্চর্য আত্মবলিদান, এর পর অরুণদা এত বড় ত্যাগের ভার বইতে চাইবে না। সব কাজকর্ম ছেড়ে নিরন্তর ঘরের বউয়ের ভূমিকায় সরসী তালুকদার থাকুক—কিন্তু অরুণদা সেখানে থাকবে না। কখনোই না। এ কাজ সে নিশ্চিন্তে করতে পারে, কেননা সে জানে, বউদি তার জন্যে বাঁচে, তার জন্যে বহু বছর ধরে মরবে! অতএব, বউদির হাত থেকে বউদিকে বাঁচাতে হলে তাকে কাজের জগতেই ফেরাতে হবে। অভিনয়ের লাইন এমনই যে, এখনি যে মানুষ চরিত্রাভিনেত্রী, সে ছেড়ে দিলে শূন্যস্থান যে ভাবেই হোক পূর্ণ হয়েই যাবে।
পাবলিক ভুলে যাবে।
মানুষ এখন সমান্তরাল ছবি ও নাটক দেখছে। আরো দেখবে। সময়ের গতি এখন জেট—সেট।
পেশাদার থিয়েটারকেও এসব ভাবতে হবে। অন্যরকম রুচি আমদানী করতে হবে।
বউদি যে ধারার অভিনয় করেছে, তা ধীরে ধীরে পালটাবে।
সময়ের সংকট বা সন্ধিকাল এটা।
এখন সব ছেড়ে চলে যাবে কেন? যার জন্য যাবে, তাকে তো পাবে না।
চাঁদু অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে। এমন করা মূর্খতা। বউদি বুঝুক!
অরু বলল, এমন নির্বোধের মতো নিজেকে অপচয় করবে ওই লোকটার জন্য?
দত্তদা বলল, ভালবাসে।
অরু বলল, সেনসলেস। বউদি তো অন্য যুগের মেয়ে, অন্য সময়ের। এ কি বিনোদিনীর যুগ, না উমাশশীর? বিয়ে করে মঞ্চ বা পর্দা ছেড়ে চলে গেলাম?
আমি নীরব।
—বয়স কত ওর?
—দেখলে কে বলবে! এমন নয় যে সুন্দরী থাকার জন্যে প্রচুর খাটছেন।
না, আমি সুন্দরী বলব না বউদিকে—সুন্দরের চেয়ে অনেক বেশি! অসম্ভব মোবাইল মুখ, চোখ, গ্রীবা। খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম স্তরে বদলে বদলে যায়। রং তো ফর্সাও নয়। চেহারায়, গড়নে, হাসিতে এমন একটা অসহায় নিষ্পাপ ভাব আছে, যা ব্যাখ্যাতীত।
চাঁদু বলল, চালাবে বা কি করে?
আমি বললাম, ত্যাগ কোর না বললে ও মানবে। ত্যাগ ও করবেই। অরুণদা যেহেতু জানে আমৃত্যু সরসী তার পথ চেয়ে থাকবে, সে হেতু ফিরবে না।
দত্তদা বলল, ফিরবে বা কেন? যারা তাকে প্যালা দিচ্ছে, তার মধ্যে অনেক মেয়েছেলে।
অরু ঈষৎ হেসে বলল, মেয়েরা সাধারণত মেয়েদের ওপর খুব সদয় কোনোকালেই নয়।
সময়টা ১৯৭৪। কত কি ঘটে গেছে, কত কি! নকশাল আন্দোলন, এমার্জেনসি আসে আসে—সিনেমায় সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, তপন সিংহ, রাজেন তরফদার, কত নতুন নতুন নাম তখন, বহুকাল, দু দশক আগে প্রতিষ্ঠিত।
আমরা তার বাইরে থেকেছি।
একটি রমণীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছি, যার বিষয়ে আমরা কেউ প্রেমাসক্ত নই, কিন্তু সে আমাদের জীবনে অমোঘ হয়ে থেকে যাচ্ছে দীর্ঘকাল। কি করতে পারতাম?
আজ বউদির মৃত্যুর পর ভাবছি। এটাও বুঝতে পারি, আমিই চির অনুগত থেকে গেছি বেশি করে।
দত্তদার নিজস্ব জীবন আছে। শালার ছেলেদের তো দত্তকই নেন। তাদের বউ, ছেলে, মেয়ে, ভরাভর্তি সংসার। ধীরাদিকে 'কেমন আছ' বলতে যান না, কিন্তু আজকাল নাকি চলে যান আলিপুর হর্টিকালচার বাগানে। পোশাকের কারবার বহুদিন নেই। 'দত্ত অ্যান্ড সানস' এখন ইস্পাতের আসবাব বিক্রি করে। দত্তদা বলেন, আমাদের জমানা চলে গেছে রে ভাই। এখনকার মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেও সুখ নেই। কত কি এল—গেল, দেখলাম। গাছপালার মধ্যে বসে বেশ শান্তি পাই।
চাঁদু সামন্তও মহাব্যস্ত লোক। অন্তরটা তেমনি নরম, তেমনি সাচ্চাই আছে। কিন্তু বাবু—সংস্কৃতির বিষাক্ত প্রভাব ও লোক—সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করে, বই লিখে ও বেজায় ব্যস্ত মানুষ হয়ে গেছে। জয়া থাডানি নামে একটি কলকাতা—নিবাসী সিন্ধী মেয়েকে বিয়ে করেছে গত বছর। দুজনেই রিসার্চ করে, লেকচার দেয়। বউদি জয়াকে একটা বেজায় দামী জামদানী ঢাকাই দিয়েছিল।
ওটা 'জননী'র শততম রজনীতে পাওয়া।
ওই শাড়ি পরে বউদি সংবর্ধনা নিচ্ছে চন্দ্রাবতী দেবীর হাত থেকে, ছবিটা আমার আছে।
—অরু বউদির চরম দুঃসময়ে বউদির কাছে বছর আষ্টেক থেকে আমাকে চিরঋণী করেছে।
অরু একটি মস্ত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে কাজে ঢুকেছে। বিহারের আদিবাসী ক্রিশ্চান মেয়ে এলসাকে বিয়ে করেছে। চাঁইবাসায় এক বছর থাকছে। তারপর বাঁকুড়া গিয়ে সেন্টার খুলবে। গাছগাছড়া থেকে ওষুধ বানাবে।
১৯৭৪ সালে ফিরে যাই।
বউদি, যা ভেবেছিলাম, তাই, মঞ্চ কেন, অভিনয়ই ছেড়ে দিল।
অধীরবাবুকে বলল, কন্ট্রাক্ট আর রিনিউ করব না। ছাব্বিশ বছর না সাতাশ বছর অভিনয় করলাম, আর পারছি না।
—ম্যাডাম! স্টেজ আপনার জীবন!
—না, অধীরবাবু, আর না।
অধীরবাবু একটা ফেয়ারওয়েল দিল। ফেয়ারওয়েল নিতে গিয়ে বউদি কেঁদেও ফেলল।
আমরা একসঙ্গেই ফিরলাম।
বউদি বলল, সবাই চুপ কেন? কিছু বলুন?
অরু বলল, এত তাড়া কিসের? এখন বছর তিরিশ...মানে যতদিন বাঁচবেন... ধীরে ধীরে বলা যাবে। চাই কি, একটা আত্মজীবনীও লিখতে পারেন।
—দাঁড়াও, আসল লোককে জানাই...
বউদি ফোন করছে, আমরা বেরিয়ে এলাম।
কয়েকদিন না যেতেই আমাকে ফোন। গেলাম।
দেখলাম ভয়ানক নার্ভাস। বলল, বিনয়, বিনয়! এ কি বলছে জানো?
—বলছে আর ফিরবে না।
—সে এখানে এসে থাকবে না। আমাকেও নিয়ে যাবে না, এখন কি হবে?
—এই রকমই হবে।
—কিন্তু, সে কেন আসবে না?
—সেই জানে।
—আমি কি করব?
—আপনি জানবেন।
—তুমি কিছু বলবে না?
—আমরা সবাই মনে করি, কেরিয়ার ছেড়ে আপনি শেষ, অসংশোধনযোগ্য ভুল করলেন। অরুণদার আপনাকে দরকার নেই। পাবলিক আপনাকে ভুলে যাবে।
—যাঃ, তা কখনো হয়?
—অরুণদা তার মতো কাজ করছে, আপনি আপনার মতো কাজ করতেন না হয়? নাকি সেটা অসম্ভব?
—সে তো আমাকে ছাড়তে বলেনি বিনয়। আমিই বললাম সব ছেড়ে দেব। সে হেসে বলল, সময় কাটবে। কি করে? বললাম...কেন, তুমি আমি একসঙ্গে কাজ করব? যাত্রাতেও তো অভিনেত্রী থাকে... এমন করে হাসল জানো? এমন করে...হাসল আমার ভয় করছে বিনয়...
—আমি চলি বউদি।
—অধীরবাবুকেও যা তা বললাম... সব তো ওর জন্যে...ওতো এই চাইছিল, আমি মুছে যাই...সরে যাই...পিপুলেরও অনেক নালিশ...
—আমি চলি।
—সবাই ছেড়ে যাবে আমাকে? সবাই?
আমার বুক ছিঁড়ে গেল। সেখানে একটা স্থায়ী ক্ষত থেকে গেছে। বউদির কথা ভাবতে বসলেই রক্তক্ষরণ হয়।
না, আমি শরীরে সুস্থ।
কোনো রোগ নেই আমার, কোনো বদভ্যাস নেই।
১৯৭৪ সাল থেকে মাঝে মাঝেই আমি বেরিয়ে গেছি কলকাতা থেকে। আন্দামান থেকে সৌরাষ্ট্র, হিমাচল থেকে কন্যাকুমারিকা, অনেক, অনেক ঘুরেছি। পাখির ছবি তোলা আমার নবতম নেশা। দত্তদার গাছপালা, আমার পাখি। কিন্তু পাখির ছবি নিয়ে ক্যালেন্ডার করেছিল এক বড়সড় কোম্পানি। কিছু ছবি নিয়ে পিকচার পোস্টকার্ড করে দিয়েছি এস. টি. বা আন্তর্জাতিক 'সেভ দেম'—এর জন্যে। নাম ও টাকা দুটি পাচ্ছি।
আমি বউদিকে বলেছিলাম, ছেড়ে যাচ্ছি কোথায়? আমরা আছি, আমরা থাকব।
বউদি সে সময়ে অত্যন্ত দিশাহারা হয়ে যায়, অত্যন্ত এলোমেলো। অরুণদাকে ফোন করে করে... শেষে একদিন বলল, আমি তো আর পারি না আমাকে নিয়ে।
—বাইরে ঘুরে আসুন না কোথাও?
—মনে হয়, মনে হয় বিনয়...যাই না কেন জান? হঠাৎ যদি হাজির হয়? তখন আমি না থাকলে যে কি রেগে যাবে...
বউদির মুখে, তেমন সম্ভাবনাতেই যেন আলো জ্বলে উঠল।
আমি বললাম, অরু এখানে থাকতে পারে?
—সে তো তখনি বলেছিলাম।
—পিপুল বা অরুণদা...
বউদি নিশ্বাস ফেলল। বলল, থাকবে তো আমার বাড়ি। এতগুলো ঘর...আমায় যেন খেতে আসে। এত জিনিস...এত আসবাব...সব ঝাড়ামোছা, পরিষ্কার রাখা...আমি আর পারি না।
—অরুর সম্পর্কে একটাই কথা—সুব্যবহার না করুন, দুর্ব্যবহার করবেন না।
—আমি কি দুর্ব্যবহার করি?
—আপনার কথা হচ্ছে না।
বউদি নিশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল। বলল, কেউ দুর্ব্যবহার করবে না।
—আপনার ভার আপনাকেই নিতে হবে, মনে রাখবেন। তাহলে ভালো থাকবেন।
—তোমরাও নিশ্চিন্ত হবে।
—সে তো আপনার হাতে।
—ভাল থাকব, বিনয়...
বউদি চলে গেল।
আর বলতে পারি না।
আন্ত্রিক ক্যানসার হয় যার, সে কেন বোঝেনি। এত ওজন কমে যাচ্ছে—হজমে এত কষ্ট, যা খায় সবেতে জ্বালা—এটা স্বাভাবিক নয়?
কার্যকারণ এমনই যে সে সময়ে আমি ছিলামই না। অরু তো চলেই গিয়েছিল—শেলীই দাপাদাপি করছিল।
দত্তদা বললেন, ডাক্তার নিয়োগীর কাজ নয়, ভর্তি হন কোথাও।
সুলতানাদির কাছে আমরা এজন্য ঋণী যে তিনি ঠাকুরপুকুরে ভর্তি করেন।
সেখানে ছিল তিন মাস। আমি যখন দেখতে যাই, একটু ভালোই মনে হলো। ক্যানসারের প্রথমাবস্থা, চিকিৎসায় রেসপনড করেছিল।
আমাকে বলল, ও এসেছে ক'বার...পিপুল...এসেছে...সব খরচপত্র ওরা করছে, জানো? আমি অবশ্য চেক লিখে দিলাম দত্তবাবুর কাছে। কত খরচ হবে কে জানে! মালিনী বলছে সরকার নাকি খরচ দেয়। আমি বলেছি, 'না'।
অরুণদারা কি দিয়েছিলেন জানি না। কিন্তু আমার জেদে বউদি একটা ফিকস ডিপোজিট ভাঙালেন। তারপর...তারপর...বাঁচবেন না জেনেই বাড়ি ফেরার জন্যে ভীষণ জেদ ধরেন।
সুলতানাদির নার্সিংহোম থেকে ব্যবস্থা করে বউদির ঘরকে কেবিন করে ফেলা হয়। পিপুল বলল, আপনাদের থাকার দরকার দেখি না।
বাড়িতে বুধবার...মারা যায় শনিবার...নার্সরা ছিল...আয়া...শেলী...অরুণদা আর পিপুল ও—বাড়িতে থাকেনি, যাচ্ছিল—আসছিল...মৃত্যুর সময়ে কে কে ছিল বলতে পারি না।
সবচেয়ে অবাক কথা, বউদির আলমারিতে একটা পাসপোর্ট পাওয়া যায়। ঠিক রিনিউ করিয়ে গেছে।
যে শহর ছেড়েই বেরোয়নি এক অলীক প্রত্যাশায়, তার কাছে পাসপোর্ট!
বউদি কোথায় যেতে চেয়েছিল?
অলক দত্ত
আমার কথা আমাকে বলতে দে—দেখছি বিনয় সব বলে রেখেছে। যা বলেনি, তাই বলি।
বাবা আমার নাম অলক রাখেননি। নাম রেখেছিলেন গোবিন্দচন্দ্র। গোবিন্দচন্দ্র। গোবিন্দ, গোপাল, কানাই, মুরলীধর, যত সব সেকেলে নাম। তা, পাখা গজাতেই আমি এপিডেবিট করে করে নাম করলাম 'অলক'। এই নামটাই কেন? তখন রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড 'অলকে কুসুম না দিও' শুনেছি। শুনেছিলাম বিশ্বকবি সকলকে সুন্দর নাম দেন। বন্ধুরা বলেছিল, লিখে দেখ না একবার।
না, আমার সাহসে কুলোয়নি। আমি নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে নাম পালটে নিই। বউয়ের নামও কেতকী রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শান্তিলতা যদি কেতকী হতে না চায়, তবে আমি কি করব?
'দত্ত অ্যানড সানস'—এর কথা বলেছে বিনয় ভায়া—এও আমার নিজের তৈরি। নইলে বাবার মশলার কারবারে ঢুকতে হতো। আমার সে পোষাত না।
যারা লেখে—টেখে, তাদেরকে খুব শ্রদ্ধা করতাম। যে জন্যে অরুণবাবুর নামে মূর্ছা যেতাম। বিনয় ভায়া তাঁকে নারীবিদ্বেষী হেন তেন বলেছে। আমি অত বলি না। পাবলিক যা খায়, তাই তো খাওয়াতে হবে। তখনকার পাবলিক মদ্দামার্কা মেয়েছেলে দেখালে সে নাটক নিত না।
সরসী তালুকদারকে আমি 'দিদি' বলেছিলাম। শরৎচন্দ্রর পড়লে দেখা যাবে, ছোট বোনটি আদরের হলে বড় দাদা হরদম তাকে 'দিদি' বলে। তিনি আমার দিদি ওই অর্থে।
শেলী আর বিনয় যা হয়েছে, তাতে তো সবই বলা হয়েছে। নতুন করে আমি কি বলব? দিদিকে খুব কাছে পেয়েছি, অনেক বছর দেখেছি। আমাদের সকলের সঙ্গেই তার ভালবাসার সম্পর্ক কিন্তু সে ভালবাসায় কোনো 'ইয়ে' ছিল না। আমি বলি, দিদির দিক থেকে এ একটা বিরাট হেম্মতের কাজ। চারটে বেটাছেলের সঙ্গে এমন ওঠাবসা, খাওয়া—দাওয়া, গল্পগুজব,—অথচ তার নামে কেউ কোনোদিন একটা কথা বলতে পারেনি।
কথা কি বলেনি? বলেছে, অনেকে বলেছে। দিদি কাদার পুতুল ছিল। আমি তা মনে করি না। অরুণবাবু তো দিদির কাছে ঠাকুরদেবতা ছিল। দিদির আমার দুটি ঠাকুর। একটি স্বামী, আরেকটি ছেলে। পাথরের দেবতা হলেও সে ঠাকুর সাড়া দিত। মানুষ ঠাকুররা দিদিকে বোঝেনি, সাড়াও দেয়নি।
—তোমার তো তোমার লেফটেনাণ্টদের ওপর বেশি নির্ভর।
এমন কথা দিদি অনেক শুনেছে।
অরুণবাবুর মেজাজ অনুযায়ী আমাদের একেক রকম নাম হতো। কখনো লেফটেনাণ্ট, কখনো সোলজার, কখনো স্তাবক, কখনো পরামর্শদাদা, কখনো উজির—নাজির, কখনো আবার কুপরামর্শদাতা। বলতে পারে, সৃজনশীল লোক তো। নব নব নাম আবিষ্কার করতেই পারে।
তখন আমার দিদির হেম্মত দেখেছি। হেসেই বলত, অবিশ্বাস করার মতো কোনো কাজ ওরা কোনোদিন করেনি। বিশ্বাসের মর্যাদাও ভাঙেনি। আমার কাছে আসে, আমাকে ভালবাসে বলে। আমিও ওদের ভালবাসি।
দিদির হেম্মতটাকে আমি তো সেলাম করি। দিদি কতকগুলো লক্ষ্মণের গণ্ডী মেনে চলত। তার অরুণবাবুর ওপর যে ভালবাসা, তা নিয়ে মন্তব্য করতে দিত না। সে একটা লক্ষ্মণের গণ্ডী বটে।
আমরা তার মর্যাদা রেখেছি। সে লোক ফিরবে না। হেন রে, তেন রে, অনেক কথা বলেছি অনেক বছর ধরে—কিন্তু এ কথাটা কখনো বলিনি 'সে—আপনাকে—ভালবাসে না'।
বলার এক্তিয়ার আমাদের ছিল না। স্বামী—স্ত্রী সম্পর্ক, অন্য কেউ বলাটা মানায় কি? আর দিদিও তো এমন মেয়েছেলে নয় যে বলে বেড়াবে, ওগো! সে আমায় ভালবাসে না।
অনেক মেয়ে বলে। এককালে ধীরা আমায় বলেনি? বলেছে, স্বামী আমায় ভালবাসে না। ঘর কত্তে ইচ্ছে হয় না।
আমি বলেছি, দেখ! সিনেমায় যেমন দেখ, তেমন প্রেম রোজকার জীবনে ঘটে না। ঘটলে কাজকারবার চৌপাট হয়ে যেত। তোমার স্বামী ভদ্দরলোক। ছোট দোকান চালায়, শান্ত মানুষ। আমি তো বলি সে মহান। তোমার বিষয়ে আমার মনে 'ইয়ে' আজ জেনেও মেনে নিয়েছে। গেলে বেজার হয় না। এ যথেষ্ট পাওনা ধীরা। উলটো—পালটা বকলে আমি মানব না। তুমি যদি আমার বাড়ি প্রত্যহ 'কেমন আছ' বলতে যেতে, আমার বউ তোমাকে ঝাঁটা মেরে বের করত।
ব্যস, ধীরা চুপ। আর বলেনি।
ভালবাসা নিয়ে হাঁইমাত্তোম আমার দুচোখের বিষ। দীপিকা আর রঞ্জন সিনেমায় নামল, বিয়ে করল। তা বাদে দীপিকা কেন ময়ূখবাবুর সঙ্গে ঘুরছে বলে রঞ্জন দীপিকার ওপর গুলিই চালিয়ে দিল?
লাভটা কি হলো? মেয়েটা অকালে মরল, আর তুই আউট হয়ে গেলি।
এর পালটাটাও দেখেছি। আমার পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের ছেলে বিয়ে করল নিজের পছন্দে। বউয়ের বিরাট সন্দেহ বাতিক। ছেলে অতিষ্ঠ হয়েই গিয়েছিল। বউয়ের বান্ধবীর বাড়ি গিয়ে বসে থাকত। বেটার বউ তা নিয়ে এমন তাণ্ডব করল যে লজ্জায় ঘেন্নায় ছেলেটা আত্মঘাতী হলো।
দিদি আমার এসব খুব জানত। আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, বা দিদি যেটা ন্যায্য মনে করে, যেমন শেলীকে রাখা—এসব বিষয়ে অরুণবাবুর কোনো কথা মানত না। সেও এক লক্ষ্মণের গণ্ডী।
অরুণবাবু দিদিকে তুচ্ছ—তাচ্ছিল্য কম করেনি, শেষ অবধি করেছে।
দিদি করেনি। বড় বংশের মেয়ে, কালচার ওর ভেতরে ছিল।
অনেকবার মুখে এসেছে, বলতে পারিনি, আজ বলছি।
অরুণ তালুকদার নিজেকে ছাড়া কাউকে ভালবাসেনি, সে ক্ষমতাই ওর নেই। দিদির মর্যাদা করবে ও? সকল মানুষ যে কুকুর বেড়াল মনে করে?
দিদির সর্বনাশ তো সে নানাভাবে করে গেল। দিদির বিষয়—বুদ্ধি ছিলই না, তাতে অরুণবাবু যখন হঠাৎ খবর দিল যে সোনারপুরে রেললাইনের পুবে, অনেকটা পথ গিয়ে এক বিঘা ধানী জমি আশী হাজার টাকায় পাওয়া যাবে—সে যে আগ্রহ করে বলেছে, তাতেই দিদি আহ্লাদে যেন আটখানা।
আমি বললাম, নাচছেন তো খুব—আপনার বাড়ি আছে, জমি আছে, আর জমি দিয়ে করবেন কি?
—কেন? সম্পত্তি একটা, ভবিষ্যৎ আছে না? কোনোদিন একটা ছোট্ট বাড়ি করতে পারি...বাগান থাকবে...
—খবরটা আনল কে?
—পিপুলের...বাবা...
—তিনি বিষয়—সম্পত্তি বোঝেন না। আপনি বোঝেন না, চলুন দেখে আসি।
—আপনি যাবেন সেখানে?
—যাব? আমার শালাকে নিয়ে যাব। ও উকিলও বটে, জমিজমার মধ্যস্থতাও করে, কমিশন পায়। ওকে দিয়েই সার্চ করিয়ে দেব।
—মানে...ও খবরটা দিল তো! আবার...
—তবু যাব। সর্বদা আপনার অন্যায় কথাতেও 'হ্যাঁ' বলি, জমিজমার ব্যাপারে পারলাম না। আপনার নিজের কোনো উকিল আছে?
—সে দিদমা আর মা থাকতে...ভবতারণবাবু ছিলেন। আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। দিদিমার উইল আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে বলেন, তোমার কোনো কাজে আমাকে ডেকো না। শুনেছি, দিদিমা ওঁকে দিয়েই বিষয়—সম্পত্তি বেচান, তারপর উনি মস্ত বাড়ি করেন লেকটাউনে।
—স্বাভাবিক। তাহলে কাল যাচ্ছি।
জমির ব্যাপারটা অবশ্য সাচ্চাই ছিল। যাঁর জমি, তিনি ওটা বেচে দুই মেয়ের বিয়ে দেবেন। দিদি আশী হাজারে ওটা কিনে নেয়।
দিদিই বলেছে, আমি মধ্যস্থতা করেছিলাম বলে অরুণবাবু যথেষ্ট গালাগালি করেছে দিদিকে। পিপুল একটু একটু করে জমি উন্নয়ন ও বাড়ি তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছে। দিল্লি থেকে আসা—যাওয়া করছে। হয়তো চাকরি ছেড়েই দেবে। এ কাজই করবে কলকাতায়। দিদি দত্তবাবুকে মাঝে রাখার ফলে বাপ ও ছেলে খুবই মনক্ষুণ্ণ।
আমি বললাম, বাঃ বেশ তো শুভাকাঙ্ক্ষী উনি? ওঁকে বা পিপুলকে যদি জমি কিনতে হয়, সার্চ করাবে না? দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা খুব খতরনাক জায়গা, ওখানে জমির মামলা খুব হয়।
দিদি তো চুপসে গেল। আর বাড়ি বা বাগানের কথা বলে না। আগে ক'দিন তো মুখে খই ফুটছিল।
—যেমন বাংলো বাড়ি...চারপাশে শুধু ফুলের গাছ কামিনী, জবা, শিউলি...
অরু বলল ক'শো করে বউদি? কত গাছ লাগালে এক বিঘা জায়গা ঢেকে যাবে?
—সে তখন দেখব। শেয়ালদা থেকে গাছ কিনব...আর একটা ছাতিমগাছের বেদী বানাব...
—আপনার ছাতিমতলা?
—আমরা সবাই বসে বেশ গল্প করব...
—আমি যাচ্ছি না। কেন্নো, কেঁচো, পিঁপড়ে, সাপ...
—পাখি আসবে অনেক! আঃ অরু! একটু স্বপ্ন দেখতে দাও না।
—দেব না, টাকা দিন।
—কেন?
—টেলিফোনের বিল দেব, সে তো চেক দেবেন। ইলেকট্রিক বিল...সাবান...
—বাড়ির নাম দেব 'করুণা'।
—আমি চললাম।
তা, সেই যে জমি...তা তখন অরুণদার কে ভক্ত বলল যে সে বাগানবাড়ি করবে—অরুণদা বউদিকে বলল, বেচে দাও। অবশ্য একে না বেচতেও পারো। পরামর্শদাতারা যা বলবে, তা করতেও পারো।
বউদি আমাদের জানাইল না। বলল, তুমি লোক পাঠাও, আমি বেচব।
এ লোক আবার এক দালাল জোটাল। তখন রাস্তাঘাট হচ্ছে—ওখানে পাগলের মতো জমি কিনছে মানুষ—দিদি আমার জমি কিনল চার হাজার টাকা কাঠা, বেচল সাড়ে ছ'হাজার করে কাঠা—কম করে দশ হাজার করে কাঠা বেচতে পারত।
দিদি নিজেকে বাঁচাতে জানত না। এই যে অভিনয় ছেড়ে দিল দিদি, যখন ছাড়ল তখন তো নায়িকা হতে পারে না। কিন্তু একটু বয়স্কা মেয়েছেলের ভূমিকাতেই মাতিয়ে দিত। ছাড়ল তো ছাড়লই, আর অভিনয় করল না।
সবই ফানুস, ফেটে যায় শুধু। যার জন্যে এত ত্যাগ, সে তো এল না। স্বচক্ষে দেখেছি, সে যে আসবে না সেটা মেনে নিতে কি কষ্টটা পাচ্ছে!
অরু এসে না থাকলে, একটা সময় ঠিকমতো স্নানাহারও করত না মনে হয়।
শেষ সময়টা, বোধ করি মরবে বলেই অমনধারা করল আমাদের সঙ্গে।
দিদির জন্মদিনটা আমরাই করতাম। ওই চীনে খাবার আনলাম, ফুল আনলাম, গল্পগুজব হলো। ভুলেও বলতাম না এটা ওদের বিবাহবার্ষিকীও বটে, আবার বিনয়ের ক্যাসেটে শুনছি, পিপুলের জন্মও ওই তারিখেই। কি তালগোলের দুনিয়া বাবা! মাকে তো কম চড়ালাম না ফুল, দিদির কল্যাণ চেয়ে। প্রতি শনি—মঙ্গলে পাঁচ সিকের ফুল চড়বেই। সবই ফানুস! মা কিস্যু করল না দিদির জন্যে। শেষ সময়ে অযথা কষ্ট দিল, অযথা...
তা সে জন্মদিনের আগেই আমরা জানি। 'অগ্নিযুগের অগ্নিশিখা'—রাজনীতি + বিপ্লব + প্রেম ও আত্মত্যাগ ইত্যাদি ইত্যাদি যাত্রাপালার রচয়িতা অরুণ তালুকদারকে সংবর্ধনা দিচ্ছে একটা ক্লাব ধুমধাম করে, 'অপরূপা' রঙ্গমঞ্চে।
দিদির নামে এক পেল্লায় কার্ড এসে হাজির। টেবিলে সে কার্ড রাখা, তা ছাড়া আমরা যা যা ভালবাসি সেইসব পকোড়া, পট্যাটো চিপস, চা সাজানো।
তখনো ঘরে ঢোকেনি দিদি, কার্ডও দেখে নি।
আমরা ভাবছি, কার্ড কে পাঠাল! দিদি ঢুকল, কার্ডটা খুলল ভুরু কুঁচকে, তারপর বসে পড়ল।
—ও...আমাকে...ওর...সংবর্ধনায়...ডেকেছে বিনয়!
আমরা নিশ্চুপ।
—নিজের সংবর্ধনায় নিজে ডাকল কেন?
দিদির চোখ জলে ঝাপসা, দিদি বসে পড়ল চেয়ারে।
বিনয় বলল, শান্ত হন বউদি। বসুন। নিজে ডেকেছে...?
—হ্যাঁ...দেখ...
বিনয় বলল, বউদি! এ তো অরুণ তলাপাত্র! ক্লাবের সেক্রেটারি।
দিদি চোখ মুছে ভালো করে দেখল। তারপর বলল, তালুকদার নয়! তলাপাত্র! আমার চোখে তো কিছু হয়নি?
চাঁদু একটু হেসে, অবস্থা সহজ করার জন্যে বলল, তা আপনি শুধু 'অরুণ তালুকদার' নাম জপে যাবেন...তাই তলাপাত্রকে দেখেছেন তালুকদার? এটা অটো—সাজেশান বউদি, রেখে দিন!
দিদি যেন জ্বলে উঠল। বলল, সবসময়ে তার নাম জপ করি? তাই ভুল দেখছি? এ কথা তুমি বলতে পারলে চাঁদু? তোমরা...তোমাদের আমি সবচেয়ে আপনজন ভাবি...কিসের জন্মদিন? কার জন্মদিন? তোমরা আমাকে নিয়ে হাসো?
তারপরেই বলল, যাও যাও, যাও তোমরা! কাউকে চাইনা আমি...আমি একটা করুণার পাত্র হয়ে গেছি...যাও! যা—ও!
বলেই বসে পড়ল মাটিতে, কাঁদতে শুরু করল।
শেলী দৌড়ে এল। বিনয় বলল, আমরা যাচ্ছি শেলী, তুমি বউদিকে শান্ত করো। উনি...অসুস্থ...হয়ে পড়বেন।
অরুও বেরিয়ে এসেছিল। ও ভুরু কুঁচকে হাঁটতে লাগল।
খানিকক্ষণ বাদে বলল, এত রিঅ্যাকশন এই তো প্রথম, তাই না?
চাঁদু হ্যাঁ...আমি অপরাধী হয়ে গেলাম।
বিনয় বলল, ননসেনস। সেও তো অমানুষ, জন্মদিনে একটা ফোন করতেও...
আমি বললাম, প্রতিবার তো করে, দিদি বলে যে আমাদের?
অরু বলল, করে না। কয়েক বছরই তো দেখেছি। বউদি ভোরে নিজে ফোন করেন আর প্রখ্যাত অরুণ তালুকদার দু—এক কথায় সেরে দেন।
আমি বললাম, তাহলে দিদি আজও নিশ্চয় ফোন করেছিল।
—করেছিলেন, কেউ ধরেনি।
বিনয় বলল, ছি ছি! নিষ্ঠুরতার একটা... না, শেষ নেই।
অরু বলল, আমি ডাক্তার না হয়েও ডাক্তারের মতো বলছি—এটা কিন্তু ভালো নয়। এ ভাবে হিস্টিরিক হয়ে পড়া।
বিনয় বলল, বহুদিন একটা কবজায় একটা দরজা ঝুলছে। দরজাটার অবলম্বন ওই কবজাটায়। কবজাটায় মরচে পড়বে, খসে পড়গে, এ থেকেই বুঝে নাও।
অরু বলল, আপনারা যান, আমি ফিরে যাই। অবশ্য মনে হচ্ছে, সবাই ফিরে গেলে ভালোই হতো, নাকি, হতো না?
আমি বললাম, কাঁদতে দাও দিদিকে...কেঁদে হালকা হোক...দিদি তো! কাল থেকেই ফোন করবে।
চাঁদু বলল, সে—ই তো করে। অনুশোচনা করে, কাকুতি—মিনতি করে...বউদি ভেঙে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে।
বিনয় মৃদু গলায় বলল, বাঁচতে যে চায় না, তাকে বাঁচাবে কি করে?
এর পরেও গেছি আমরা, কিন্তু কোথায় যেন কি ঘটে গেল...দিদি যেন এতদিনে হাল ছেড়ে দিল, অরু চলে গেল...তেমন তাপ—উত্তাপ দেখলাম না...অরু বিয়ে করল...চাঁইবাসা গেল...অনেক আশীর্বাদ করল, দুম করে একটা নেকলেসই কিনে আনল বউয়ের জন্যে।
অরু বলল, কোনো মানে হয়? ও তো পরবেই না...টাকাটা দিলে বউদি...
দিদি বলল, টাকার লাভ তো তোমাদের নেই। রোজগারও করছ। এটুকু করতে দাও আমাকে। 'বউদি' বলো, ছেলেরই মতো তো!
দিদির শেষ সময়টার কথাই ভাবতে পারি না।
ঠাকুরপুকুরে, আমরা জানি ওরা যায়—আমরা তত যাই না।
শুনি, সব খরচ ওরা করছে।
অলকা আর মালিনী একদিন এল। বলল, যাবেন তো ওখানে। সরসীদি আপনাকে খুঁজছিল। খুব দরকার।
আমি আর বিনয় গেলাম।
টাকা তোলার কথা তো বিনয় বলেছে।
যখন বুঝল আর থাকবে না, তখন বলল, বাড়ি যাব।
—সেখানে কে আছে, দিদি?
—সব আছে। স—ব।
সুলতানাদিদির নার্সিংহোমে খবর দিয়ে দিদির শোবার ঘরটাই কেবিন করে ফেলা হয়। নার্স, আয়া, ডাক্তার গুহ, সব ব্যবস্থা হলো। বুধবার বাড়িতে আনার পর পিপুল এল। বলল, আমাকে জানানো উচিত ছিল না?
—ফোনে তোমায় পাইনি। আর...দিদি বাড়ি আসতে চেয়েছিল।
—আর কষ্ট করবেন না আপনারা...আমি থাকব।
আমরা চলে এলাম।
আর বলতে ভালো লাগছে না। তিন দিন জ্ঞান ছিল না, অজ্ঞান অবস্থাতেই চলে যায়, এটাই যা স্বস্তি।
ক্যানসারের যন্ত্রণায় মানুষ উঃ করে না, ঠোঁট কামড়ে নীরবে কাঁদে?
আগে থেকেই গাছের কাছে গিয়ে বসছিলাম। এখন আরোই বসব।
হ্যাঁ, আমার বিশ্বাস আছে। দিদির নামে কালীঘাটে একদিন...
কিছুতে হিসেব মেলাতে পারি না, চেষ্টাও করি না এখন।
দিদি একটা গাছের নিচে বসতে চেয়েছিল, সেটা কি খুব বেশি চাওয়া?
চাঁদ সামন্ত
সরসী তালুকদারকে আমি 'বউদি' বলেছি, বিনয়দা বলত বলে। অরুণ তালুকদারকে আমি 'দাদা' বলিনি, অরুণবাবু বলি। যে লোক নেটের গেঞ্জির ওপর চিকনের পাঞ্জাবি পরে, গায়ে সুগন্ধি মাখে, চুলে কেয়োকার্পিন তেল—দাশরথি রায়ের নাম জানে না, অথচ যাত্রা বিষয়ে বক্তৃতা দেয়, তেমন অশিক্ষিত লোককে আমি 'দাদা' বলি না।
বিনয়দাকে 'দাদা' বলি। প্রথমত, তাকে ভালবাসি (এঃ, বিনয়দা জেনে গেল), শ্রদ্ধা করি। ওর দুর্লভ গুণ হলো ও সবসময়েই সমসাময়িক থেকে যায়। আমি বয়সে বিনয়দার চেয়ে তের বছরের ছোট, আমার সবসময়ে মনে হয়েছে একজন সমসময়ের লোকের সঙ্গে কথা বলছি। অরু আমার চেয়ে পনের বছরের ছোট ওরও নিশ্চয় তেমনই মনে হয়। তার ওপরে যেটা আকর্ষণ করে, কোনো ভানভণিতা নেই। নির্ভেজাল সেই বাঙালি, যার রুচি, প্রবণতা, সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা, মনের সততা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে গঠিত। এবং বাণিজ্যিক মঞ্চ ও সিনেমার লাইনের লোক। সে মঞ্চ ও চিত্রজগতের খুঁটিনাটি সব খবর রাখে, সে সবে ওর ভালোবাসা প্রোথিত।
দেবী মুখার্জি আত্মহত্যা করলে আঠারো বছরের বিনয়দা কেঁদেছিল।
ছবি বিশ্বাসকে ও বলত রাজা—আর উত্তম—সুচিত্রার জুটির পর রোমান্টিক বাংলা ছবি মরে গেছে বলে ওর বিশ্বাস।
আধুনিক নয় ও? অনাধুনিকও নয়। এস ফোটোগ্রাফার ছিল। খুব সেনসিটিভ পোর্ট্রেট তুলতে পারত।
হেমন্ত মুখার্জির বাংলা গানের হিসেব ও মুখে মুখে দিতে পারে। মনটা ওর অত্যধিক নরম।
বিনয়দা কেন বিয়ে করে নি, তার একটুখানি আমি জানি। মেয়েটিকে ভালবাসত বছর ছয়েক ধরে—কিন্তু মেয়েটিকেই সে কথা বলে উঠতে পারেনি।
অবশ্যই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। আত্মীয়বৃত্তেই পড়ে, ফলে ক্বচিৎ কদাচ দেখাও হয়ে যায়। কিন্তু এ কথা মেয়েটি আজও জানে না।
আমার বহুদিনের বান্ধবী যখন আমাকে বিদায় জানিয়ে আমার এক দূরসম্পর্কের বকসওয়ালা কাকাকে বিয়ে করল, আমি কেঁদেছিলাম।
বিনয়দা আমাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজের কাহিনী বলে।
আমার বান্ধবী এবং বিনয়দার সেই প্রেমাস্পদার নামটাও একই। বিনয়দা বলতে অনুমতি দিয়েছে বলে বললাম।
দত্তদাকেও আমি বিনয়দার সূত্রেই জেনেছি। দত্তদাকেও আমার ভারি পছন্দ। এমন খাঁটি মানুষ কমই দেখা যায়। দত্তদাও রুচি ইত্যাদিতে বিনয়দার স্কুলেরই লোক। দত্তদাও অনেক লোকের আপনজন হতে পারেন।
বউদির যে ব্যাপারটা আমাকে অভিভূত করত, তা হলো, অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা দিয়ে নয় (বউদি কোনো ইংরিজি বই পড়েনি), হৃদয়ানুভূতি দিয়ে ও অনেকটা বুঝতে পারত।
পুরনো কেতার বাণিজ্যিক রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রী। কিন্তু আধুনিক যা কিছু, তা বুঝুক, না—বুঝুক—বুঝতে চেষ্টা করত।
আমি একান্তই পুঁথিগত বিদ্যা নিয়ে চলি। আমার সকল জ্ঞানই সেকেন্ড হ্যান্ড। অর্থাৎ অন্যের বইপত্রই আমার জ্ঞানের উৎস। অবশ্য এখন উৎসের সন্ধানও করি।
আমার নাম চন্দ্রনিভ সামন্ত। আমার বিচারক বাবা (স্কুলে শুনতাম 'জজের ব্যাটা') এবং সংস্কৃতে আদ্য—মধ্য—অন্ত পাশ মা, আমার অজানিত এবং ওঁদের জানিত কোনো গোপন ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন সাতটি সন্তানের বিদকুটে সব নাম রেখে বিদ্যুৎনিভ (বব সামন্ত), সূর্যনিভ (সানি), বিশ্বনিভ (বেচারা আজও বিশে), চন্দ্রনিভ (চাঁদু বা চাঁদ), কুসুমবল্লভা (মানে কি?) এবং সমুদ্রপ্রভা (মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন)। এ হেন নামের বিরুদ্ধে যে—যার মতো বিদ্রোহ করেছি। বড়দা ও মেজদা যে জীবনবৃত্তে ঢুকেছে সেখানে বড় নাম চলে না। সেজদা চিরকাল স্কুলে গাল খেয়েছে, আ হা হা হা, বিশ্বনিভ! মানে বিশ্ব সদৃশ! নাম বদলাও, নাম বদলাও। বড়দি ভালমানুষ, জামাইবাবু ওকে এখানে 'অয়ি বল্লভে'! বলেন। ছোড়দি এফিডেবিট করে সাগরী হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া!
আমার বাবার নাম কিন্তু লালগোপাল এবং মায়ের নাম কুমুদিনী। আমার নাম সংহিতা শুনে বউদি হাসতে হাসতে গড়িয়ে যেত। বলত, বাপ রে বাপ! নাম নিয়ে কি ভোগা না ভুগেছ!
—খুব। বিনয়দার মতো সৌভাগ্যবান নই। অরু তো আধুনিক সময়ের ছেলে।
আমি অনেক কথা বলব না।
বউদির 'তাসের বিবি' থেকে সব নাটকই দেখেছি আমি। অরুণবাবুর লেখা নাটকগুলো পড়েছি মাত্র। তাও কি 'তাসের বিবি' দেখতাম? বাবার ছবি রি—টাচ করাবার জন্যে কার কথায় যেন বিনয়দার স্টুডিওতে যাই।
বাবার গোঁপ ও স্যর আশুতোষ মার্কা জ্বলন্ত চোখ সেই জীর্ণ ফোটো থেকে উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু বিনয়দা আমার বন্ধু হয়ে গেলেন।
কোন বাড়ির ছেলে, কি পড়েছি, কি করি, বড়দের মতো জিগ্যেস করছিলেন, আমি উত্তর দিচ্ছিলাম। প্রেসিডেন্সি শুনে বললেন, আমিও প্রেসিডেন্সি হে। ১৯৪৯ সালের বি.এস.সি।
—আর আমি ১৯৬২—তে ইংরিজি অনার্স।
বিনয়দাই একদিন বললেন, চলো একজনের অসামান্য অভিনয় দেখিয়ে আনি।
বাণিজ্যিক মঞ্চকে তখন তাচ্ছিল্য করি। বলি, ওসব বস্তাপচা মালের দিন চলে গেছে। দেখা যায়, বসে?
—আমি তো দেখি।
দেখলাম। 'তাসের বিবি' দেখে সরসী তালুকদারের পায়ে মাথাটি রেখে এলাম, মনে মনে।
—এ রকম ট্যালেন্ট নিয়ে এই মঞ্চে?
—ভিড় দেখেছিলে? ভিড় হয়, মানুষ হাসে, কাঁদে আবার দেখে। ওঁর তো সব নাটকই হিট হয়। এটা অবাক কাণ্ড।
—নাট্যকারের বউ?
—হ্যাঁ। যদিও এ নাটক কিছুটা শোধরানো হয়েছে।
—নাট্যকার নারীবিদ্বেষী।
তখনো নারীমুক্তি আন্দোলন, ফেমিনিস্ট মুভমেন্ট, এসব শব্দ এমন প্রচলিত হয়। কিন্তু আমাকে লোকে ফেমিনিস্ট বলে, এবং আমি কারো দুঃখ—কষ্ট—যন্ত্রণা সহ্য করতে পারি না। মেয়েদের তো নয়ই। নাট্যকারের নারীবিদ্বেষ আমার ভালো লাগেনি।
বিনয়দা একটু চুপ করে থেকে বলেছিল, কি করবে বলো? পাবলিক পতিপরায়ণা সতী স্ত্রী, সন্তান—বাৎসল্যে প্রাণ দিতে প্রস্তুত মা, ইত্যাদি ইত্যাদি জীবনেও দেখতে চায়, মঞ্চ এবং পর্দাতেও।
—জীবনেও?
—আমার ধারণা, সাধারণত তাই চায়। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে।
পরে বুঝেছি কথাটা সত্যি। সে সত্য অবশ্য বদলাচ্ছে, তবে ধীরে, অতি ধীরে।
বিনয়দা, দত্তদা—এদের সঙ্গেই অরুণ তালুকদারের বাড়িতে যাই, সরসী তালুকদারের সঙ্গে আলাপ করতে।
অরুণবাবু বলল, এদের তোয়াজ করো সরসী। এরা এ যুগের ছেলে...কালচার নিয়ে লেখে...উলটোপালটা লিখে দিলে তোমার ক্ষতি।
—তুমি কাগজে নাট্যসমালোচনা লেখো ভাই?
—না না, আমি লিখব নাট্যসমালোচনা?
বউদি অরুণবাবুকে বলল, তবে? বিনয় বাড়িতে কখনো কাগজের লোকজন ধরে আনেনি। অন্তত আমার জন্য নয়।
—আমার জন্যে এনেছিল, স্বীকার করি। তাতে লাভ হলো কি? এখন তো (কাঁধ ঝাঁকিয়ে অবজ্ঞার হাসি) আমি নাট্যকার হিসেবে...আউট হতে চলেছি।
বিনয়দা বলল, আপনাকে আউট করবে কে? একের পর এক মঞ্চসফল নাটক লিখে চলেছেন? কত লোক যে আপনাকে ঈর্ষা করে!
—হ্যাঁ (অহংকারী হাসি। লোকটাকে মুখ খুলে হা হা করে হাসতে দেখিনি কখনো। দেখছিলাম, ওর হাসি, কথা বলা, অসম্ভব চেষ্টিত)। ঈর্ষা তো করবেই। নাটক দিয়েছি, ট্রাজিডি কুইন দিয়েছি, ঈর্ষা হতেই পারে।
—ট্র্যাজিডি কুইন দিয়েছি! বুঝলাম না অরুণবাবু।
—আমার স্ফুলিঙ্গ, করুণা নিরুদ্দেশ, জননী।
—প্রত্যেকটা সুপারহিট নাটক।
—তাতে অভিনয় করেই তো ইনি তারকা হলেন। আমি চরিত্র দিয়েছি, ও অভিনয় করেছে।
বুঝলাম লোকটা অহং—উন্মাদ।
—অবশ্য চরিত্র না পেলে অভিনয় করতেন কি করে? এটা তো প্রথম কথা। পরের নাটক কি লিখছেন?
—এখন গোপন থাকুক।
বউদি এসে বলল, বাববাঃ! এত গোপন, এত গোপন যে লেখার ঘরে আমার ঢোকবার হুকুম নেই।
—স্টাডিতে বসে লেখেন?
—লেখার জন্য স্টাডিই তো চাই। বসার জন্যে বারান্দা, খাওয়ার জন্যে খাবার ঘর, শোবার জন্যে বেডরুম।
—কি সাজানো বাড়ি! যেন কোনো যুগের সেট ফেলেছে কোনো আর্ট ডিরেকটর।
বউদি ঝরঝর করে হেসে বললেন, সব যে সেকেলে ভাই! দাদামশায়ের আমলের। এর শ্বেতপাথরের টেবিলটা আবার তাঁর বাবার। তারপর...এর শখে স্টাডি সাজানো হয়েছে। আমার রিহার্সাল কিন্তু এ ঘরে—ও ঘরে।
আমি বোকার মতো বলেছিলাম, আপনার দাদামশাই কি অ্যান্টিক আসবাবের ব্যবসা করতেন?
অরুণবাবু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, প্রজাশোষণ করতেন। জমিদার ছিলেন। 'করুণা' নাটকে দেখবেন জমিদারদের কেমন এক হাত নিয়েছি। দেব, বই দেব। পড়বেন। আপনি চন্দন মিত্রের নাম শুনেছেন?
—না তো।
—হয়তো শুনবেন।
আমি তো জানি না চন্দন মিত্র 'তাসের বিবি' রিভাইজ করেছে বলে বাড়িতে কি টেনশন চলেছে!
—অভিনেতা?
—নাট্যকার। অধীর কয়ালের মতে মহান নাট্যকার।
—থাক না ওসব ওসব কথা। চলো তোমরা। একটু চা খাবে চলো।
'একটু চা' মানে মটরশুঁটির ঘুগনি, আলু—পরটা, মাংসের চপ, কেক, চা।
—এত আয়োজন?
—ওর জন্যে করতেই হয়। তাও তো যে খেয়ালী! হয়তো বলে বসল এসব খাব না, নারকেলের সিঙাড়া খাব। তাই করতে হয় তখন! ও যে শিবঠাকুর! তুষ্ট না রাখলেই তাণ্ডব!
বউদির মুখে যেন ভেতর থেকে আলো জ্বেলে দিত কেউ অরুণবাবু প্রসঙ্গে কথা হলে।
আমি বিনয়দাকে বলেছিলাম, অভিনেত্রী বটে! গলার পাল্লা কি, ভয়েস কন্ট্রোল, ভয়েস থ্রো (স্বরনিয়ন্ত্রণ, স্বরনিক্ষেপ বলতে পারি না আমি। আমরা এক সংকর সময়ের প্রডাকট, কথায় কথায় ইংরিজির শরণ নিই) আশ্চর্য। ওরকম একটা মোটা দাগের চরিত্রকে কোথায় নিয়ে গেল? আর ওই যে চিৎকার, 'আমার গলা ভেঙে যাচ্ছে কুমার। আমি কথা বলতে পারব না...গলা ভেঙে যাচ্ছে কুমার। আমি কথা বলতে পারব না...গলা ভেঙে যাচ্ছে...'
—যাকে বলে শ্যাটারিং, তাই না চাঁদু?
—হ্যাঁ, বিনয়দা।
—অরুণবাবুর নাটকগুলো পড়ো।
শেলী, বিনয়দা, দত্তদা যা বলেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আমি বলব না। ওরা ওদের মতো বলেছে, আমি আমার মতো বলি। এ সময়টা এখানে আছি বলে এ কাজটা করে যেতে পারছি। তারপরেই তো বেরিয়ে যাব আমি আর জয়া। লম্বা, বহুত লম্বা সফর—রাজস্থান, হিমাচল, সৌরাষ্ট্র—লোকসংস্কৃতির নানা কর্মের সন্ধানে! কিন্তু বউদি সম্পর্কে আজ বলতে না পারি তো আর বলাই হবে না।
আমার অভিজ্ঞতাগুলো সাম—আপ করছি।
তবে বলা দরকার, অরুণবাবুর নাটকগুলো আমি পড়েছিলাম।
অসম্ভব মোটা দাগের নাটক। চড়া রঙের চরিত্র, আবেগের সাইক্লোন।
কি নাটকে, কি যাত্রাপালায়, সে এক জিনিসই লিখে যাচ্ছে। যে মেয়েটিই স্বাধীন ইচ্ছা বা সত্তা নিয়ে বিকশিত হবার স্পর্ধা করেছে, তাকে গভীর অনুশোচনায়, ভুল স্বীকার করতে করতে ফিরে আসতে হচ্ছে পুরুষের পায়ের নিচে।
পুরুষ চরিত্রগুলোও এমন যে তারা মা—স্ত্রী—বোন—মেয়ে—প্রেমিকা—বউদির বোন—বোনের ননদ—আশ্রয়দাত্রী প্রেমময়ী বেশ্যা—ইত্যাদি ইত্যাদি, কোনো মেয়ের প্রয়োজনীয়তাই স্বীকার করে না। তারা স্বয়ম্ভূ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। মেয়েদের ত্যাগ, প্রেম, জীবনোৎসর্গ তারা নেয় অধিকার বলে।
প্রতিক্রিয়াশীল, সামন্ততান্ত্রিক, ভয়ংকর নীতিবাগীশ ও কট্টর।
'করুণা' নাটক থেকে শেষ যাত্রাপালা অবধি একই বিষয়বস্তু ঘুরে ঘুরে এসেছে। অবশ্য বিভিন্ন পটভূমিতে।
ভাষা—টাষা শাণিত হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু অরুণ তালুকদার যেমনটি ছিল, তেমনটি থেকেই জনগণ মনোরঞ্জন করে যাচ্ছে।
সাফল্যের মতো কিছুই সফল হতে পারে না। তা ছাড়া গান লেখে, পালার বিজ্ঞাপন লেখে, অরুণ তালুকদার একটি নাম।
আমি মনে করি লোকটা রক্তে রক্তে নারীবিদ্বেষী। উপেক্ষা দেখিয়েই বউদিকে আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু বউদির ভালবাসার অপার ক্ষমতার জন্যে প্রস্তুত ছিল না।
আমার বন্ধু, যাত্রা—সাংবাদিক কুশলকে খিকখিক করে হেসে বলেছিল, যখন মঞ্চ ছেড়ে দিল, তখন থাকলেও থাকতে পারত। মা—মাসী—ধাই—দাসী, ক্রমে ক্রমে করতেই হতো। কিন্তু থাকল না তো? তাতেই মুছে গেল। শিল্পী হলে শিল্পের তাগিদেই করত। এখন তো...মুছে গেছে।
অরুণবাবুকে দোষ দেব কেন? বউদি এক অতি মানবীয় মাপের হৃদয় নিয়ে জন্মেছিল। অরুণ তালুকদারকে ভালবাসার জন্যই।
এ পর্যন্ত সবাই জানে।
যেটা জানে না, যেটা মর্মে বিঁধে আছে, সেটা হলো, বউদিকে কয়েক বছর ধরেই আমি নতুন নাটক পড়তে দিতাম, দেখাতেও নিয়ে যেতাম। খেলাচ্ছলেই বলতাম, পড়ুন তো, শুনি?
—একা একা কি পড়া যায়?
—পড়ুন না।
দেখলাম, গলার রেঞ্জ ভালোই আছে।
বললাম, আমার জানাশোনা ছেলেমেয়েরা সবাই ইয়ং। বাংলা ক্লাসিকাল নাটকে কোনো রসই পায় না। ওদের যদি একটু পড়ে শোনান—ধরুন মাইকেল, গিরিশ ঘোষ...দীনবন্ধু মিত্র...
—পুরুষ চরিত্রও তো আছে চাঁদু!
—কুশল চমৎকার আবৃত্তি করে। ও পড়বে।
বিনয়দা তো বিশ্বাসই করে না।
—রাজী হয়েছে?
—হয়েছেন, হয়েছেন...এটার অন্য দিকও আছে বিনয়দা। জনা, বা প্রমীলা, এসব চরিত্রের ক্রেডিবিলিটি আনতে গেলে...বউদিই পারবে। দেখবেন...
খুব, খুব জমে উঠেছিল কয়েকটা দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা।
বউদি অনেকদিন বাদে বাড়ি পরিষ্কার করে, আয়োজন করে বসে থাকত।
এখনকার সালোয়ার—কামিজ, বা জিনস ও কুর্তা—পরা মেয়েদের ও তরুণ ছেলেদের দেখে কি খুশি, কি খুশি।
ওরাও বউদির পাঠ শুনে খুব ইমপ্রেসড। টিটু বলল, এসব স্কুল অফ অ্যাকটিং চলে গেছে চাঁদুদা। এখন বিনোদিনী, বা তারাসুন্দরী, বা সরযূ দেবীর বিষয়ে শ্রদ্ধাসমীহের ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে।
আর বউদি পরে বলল, কত, কত সহজ হয়ে গেছে সব, বলো? মেয়েদের পোশাকে কত স্বাধীনতা আর শোভনতা! ছেলেতে মেয়েতে কত সহজ বন্ধুত্ব। আমি জানতামই না। জানব বা কি করে? কাচের ঘরে সব বন্ধ করে বসে থাকলে কি রোদ—বাতাস আসে।
আমাদের এগারোটা সেশান হয়েছিল। বিনয়দা আর দত্তদা খুব খুশি।
অরু তো স্বল্পভাষী। ও বলল, কবে থেকে রগড়ে যাচ্ছি, হ্যাঁ বলেই না বউদি। কেমন, এখন ভালো লাগছে না?
—লাগছে।
—শুধু বই পড়ে, আর ছাতে হেঁটে, আর মাঝে মাঝে গঙ্গার ধারে বা গড়ের মাঠে বসে থাকলে কি সময় কাটে?
কলকাতা ছোট্ট গ্রাম। সাংস্কৃতিক জগতের বৃত্তটাও একটুখানি। কুশলের ও আমার উদ্যোগে, অলকাদির উৎসাহে, এ বাড়িতেই খাবার হলঘরে একটা ছোট্ট সেশন হয়।
অলকাদি বলল, যাক! সরসীদি নির্বাসন থেকে ফিরল! চলো! এবার বড় করে করব।
আর বউদি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
—আমি পেরেছি অলকা, আমি পারব?
—নিশ্চয় পারবে। এর পর মাঝে মাঝে, আমাদের অনুরোধে নাটকও করবে।
—পয়সা নেব না কিন্তু।
অরু বলল, তা নেবেন কেন? খাট—আলমারি—ফুলদানি বেচার জিনিস তো এখনো আছে। আমাকে চটাবেন না।
—আমার ওপর রাগতে রাগতে কতগুলো বছর কাটিয়ে দিলে অরু?
—আপনি ভালোই জানেন, রাগ কার ওপর?
—থাক থাক, অন্য কথা বলো।
ওই যে বললাম, কলকাতা একটা ছোট্ট গ্রাম। এই সেশনের পর, ক'দিনও যায়নি, বিনয়দার ফ্র্যান্টিক ফোন।
—অরু চলে এসেছে চাঁদু, তুমি এসো।
গেলাম।
অরু বলল, দত্তদাও আসবেন। তাছাড়া আপনারা দু'জন আছেন। দেখুন, আপনারা তিনজন দায়িত্ব দেন, আমি বউদির কাছে ছিলাম। আমি চলে যাচ্ছি, সেটা জানিয়ে গেলাম।
—কিন্তু কেন?
—ভোরে সেই কাপালিকাটা ফোন করেছিল। (অরু অরুণ তালুকদারকে ভণ্ড কাপালিক বলত)। ফোন করে বলেছে, এতকাল বাদে ধাষ্টামো করার মানে কি? কতকগুলো ডেঁও ছেলেমেয়ে জুটিয়ে সেশন হচ্ছে? তুমি ক্লাসিকাল নাটক পড়ছ, ওদের উচ্চারণ, হেন—তেন শেখাচ্ছে? যাক! যারা নাচাচ্ছে, তারা কি শেষরক্ষা করবে?
—গড!
—বউদি পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, আমি ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলেছি, তুমি একটা বাস্টার্ড! বদমাশ! ভণ্ড কাপালিক!
দত্তদা বলল, যাক! কেউ বলল তবে!
বিনয়দা বলল, বউদি কি...?
—না। আমিই বললাম, লোকটাকে যা মনে করি তাই বলেছি। আমি কেন, বহুজনই মনে করে। কিন্তু আপনি তাকে বিশাল ভালবাসেন—বহু বছর ধরে তার জন্যে আত্মহত্যা করেছেন। এখন আমাকে আপনি বদমাশটার ভালোত্ব এবং আপনার ওপর অপার ভালবাসা বিষয়ে বোঝাতে থাকবেন। তখন আমি লোকটাকে ঠাঙাতে যেতেও পারি। অতএব বউদি, আমি চললাম। কেন না আমি জানি, এর পর আর আপনি নাটক পড়তে সাহস করবেন না। দোকানে বেণুকে বলে যাব, ও আপনার বিল—টিল দিয়ে দেবে। ওঃ! একসঙ্গে এত কথা বলে ক্লান্ত লাগছে।
দত্তদা বলল, যাচ্ছ কোথায়?
—হাওড়া। তারপর রাঁচী—বরিহাতু। 'সেভ দেম'—এর সঙ্গে কিছু কাজ করছি, ওখানেই ওদের সেন্টারে যাব।
বিনয়দা বলল, এখানে থাকো।
অরু বলল, আপনারা আমাকে চেনেনা। আমার হাতের থাপ্পড় খেয়ে কুচবিহারে কয়েকজনের মুখের ম্যাপ পালটে গেছে। এখানে থাকে আমি কাপালিকাটাকে ছাত থেকে ফেলে দেব। বউদি হয়তো দক্ষ—কন্যার মতো প্রাণত্যাগ করবে। দরকার কি?
—আর...আসবে না?
—এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। আমি ভয়ও খেয়ে গেছি। গাছগাছড়ার ওষুধ নিয়ে কাজটায় লেগে পড়া বাকি—বিয়ে করতে হবে—নর্মাল জীবন চাই, আমাকে বাধা দিলে আমি লণ্ডভণ্ড কাণ্ড করব। চললাম।
বিনয়দা বলল, ব্যাক টু স্কোয়্যার ওয়ান।
আমি ভায়োলেন্ট নেই। রাগলে বাড়ি চলে আসি। দুঃখ হলে কাঁদি। রাতদিন লেখাপড়া, বই, আলোচনা, ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে থাকি। অত্যন্ত সেকেনড অস্তিত্ব আমার।
অরুণ তালুকদার কি, তা বোঝাতে পারলাম বোধহয়।
বউদি আমার ব্যাখ্যাতীত।
হয়তো ওই ফোনটা না পেলে বউদি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেত—জীবনে ফিরে আসত।
কিংবা আসত না।
ঠাকুরপুকুরে গেলাম—হেলান দিয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। বলল, কয়েকটা কবিতা পড়ব, ক্যাসেট করে রাখব ভাবছি।
—শুধু কবিতা?
—নাটকও।
অপচয়, অপচয়, কি অর্থহীন অপচয়! আমরা কেন অপচয় না—করতে শিখলাম না?
ছয়
অরু
হ্যাঁ, চলে এসেছিলাম আমি বউদিকে ছেড়ে। চলে এসেছিলাম বলে বিনয়দা! আপনি বলেছিলেন, ছি ছি! বউদি একলা থাকবেন?
তুমি এ কি করলে অরু?
কি করতাম, কি করতাম আমি তখন? বউদিকে কার হাত থেকে বাঁচাতাম? বউদি বিশ্বাস করত, ম্যারেজেস আর মেড ইন হেভন।
আমার সঙ্গে তর্ক লেগে যেত।
—সব বিয়েই কি স্বর্গে হয় বউদি?
—বিয়ে করো অরু বুঝতে পারবে।
—আপনাকে দেখেই বুঝতে পারছি।
—তুমি বিয়ে তো করবে বাপু।
—অবশ্যই। বিনয়দাকে দেখে ভয় হয়ে গেছে।
—বিনয় তো ওইরকমই।
কি রকম তা আমি জানি না। আগে ভাবতাম বিনয়দা বউদিকে ভালবাসে। বউদি অবশ্যই ভালবাসে কাপালিকটাকে। সত্যি, লোকটাকে আমি ভণ্ড কাপালিক ছাড়া কিছুই মনে করতে পারি না। সেই পুরনো সিনেমার, বা 'উল্লাসিনী গ্রন্থমালা' সিরিজের ভণ্ড কাপালিকদের মতো, যারা মাঝে মাঝেই হঠাৎ আবির্ভূত হয়। আর মানুষের সুখশান্তিতে আগুন ছিটিয়ে দিয়ে হঠাৎ মিলিয়ে যায়। একটা দামড়া মদ্দ নেটের গেঞ্জি পরে। মোজার সঙ্গে নাগরা, দাড়ি কামিয়ে কি সব মাখে। চোখ সরু করে হাসে, কাপালিক ছাড়া আর কি?
চাঁদুদা বলে, বাবু কালচারের প্রতিনিধি।
আমার বিশ্বাস, ছোটবেলা ওর বাবা পেটাত যখন, তখন নিশ্চয় তার কারণ ছিল।
বউদি বলত, বাবার কাছে মার খেয়ে খেয়ে...
আমার ওকে পেটাবার খুব ইচ্ছে ছিল অনেকদিন ধরে। বউদির জন্যে পারি নি।
না, বউদি বোধহয় মরেই যেত এ কথা জানলে। বউদিকে ছেড়ে না এসে কি করতাম? লোকটা তো কবেই চলে গেছে আলাদা বাড়িতে। বছরের পর বছর দেখেছি, নিজের জন্মদিনে, নিজের বিবাহবার্ষিকীতে, ছেলের বিয়ের তারিখে, বউদি ফোন করে যাচ্ছে, যেন ক্ষমা চাইছে। আর ওদিক থেকে কিছু বাঁকা কথা, ব্যঙ্গের হাসি, কত সহ্য করা যায় বলুন?
এই যে ইয়ং ছেলেমেয়েরা (জিনিকে আমার বেশ লেগেছিল) আসছিল। বউদি একটা বাস্তব জগতে ফিরে আসছিল, নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছিল। লোকটা তার ওপর রোলার চালিয়ে দিল তো?
বউদির কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম ও কি বলছে!
—কি বললে? আমি ধাষ্টামো করছি?
—কতকগুলো কি ছেলেমেয়ে? ডেঁও ছেলেমেয়ে মানে কি? ওরা তোমার বিরোধী শিবির? ছি ছি, ওরা ছাত্রছাত্রী।
—ক্লাসিকাল নাটক পড়ব, তাতে কি হল?
—আমি উচ্চারণ শেখাতে পারি না?
—কারা নাচাচ্ছে? আমার স্তাবকরা? দেখ! অনেকবার বলেছি তুমি বিনয়দের সম্পর্কে...
আমি সইতে পারিনি আর। বউদির হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলেছি, তুমি একটা বাস্টার্ড! বদমাশ! ভণ্ড কাপালিক! তোমাকে মেরে ভুট্টা করে দেব, বুঝেছ?
বউদি চেয়ারে বসে পড়েছিল। আমি বললাম, আমি জানি কি কি হবে। আপনি আমার মুখ দেখতে চাইবেন না, আমি বেরিয়ে যাব। আপনি তারপর শেলীকে দৌড় করাবেন। আমি ফিরে আসব। না, আর নয় বউদি।
বউদি কাঁদতে কাঁদতে বলল, সাত সকালে ওকে...
—জন্মে তো ফোন করে না, আপনি করেন। তা সাতসকালে ফোন করে ও কি কথামৃত শোনাচ্ছিল? সোজা কথা, আপনি একটু একটু করে ধাতস্থ হচ্ছিলেন, ও তা হতে দেবে না।
দত্তদা, আপনি বললেন, ভণ্ড কাপালিক! বেশ বলেছ! বলা দরকারই ছিল।
বিনয়দার তো যত ভাবনা বউদিকে নিয়ে। আপনি বললেন, বউদির সামনে বললে!
বলেছিলাম। আপনারা অনেক দেখেছেন, অনেক দেখেন নি। শীতের সময়ে পুরনো সোয়েটার খুলে, উল সাবানে ধুয়ে বুনতে দেখেন নি গায়ের জামা। বললাম, এমন নয় যে আপনি শাড়ি কিনতে পারেন না, অথবা একটা উলের সোয়েটার।
একটু হাসত। বলত, এক সময়ে টাকাকে টাকা মনে করিনি অরু! এমন অলক্ষ্মী কেন হলাম? আমার মা তো এ রকম ছিল না।
না, আপনারা দিনের পর দিন বউদির মুখে তাঁর মায়ের কথা শোনেন নি। এটা কি আশ্চর্য নয়, যে কুমারী জীবনের কথাই বলত, বিবাহিত জীবনের কথা আমার কাছে বলত না? হয়তো আশ্চর্য নয়। বউদি তো জানত যে আমি লোকটার নাম সহ্য করতে পারি না।
অবশ্য দূরে গিয়ে বুঝেঝি, যে অরুণ তালুকদার কোনো ক্রিমিনাল হয়তো নয়। বউদির মতো ভালবাসার তীব্রতা তার ছিল না।
অসুস্থতা এটা। উন্মত্ততা। প্রতিদিন পাচ্ছে না, একতরফা ভালবেসে যাচ্ছে। কি অর্থহীন আত্ম অপচয়!
আপনারা জানেন না, বাড়ি থেকে এটা সেটা বিক্রি করার ভয়ঙ্কর ইতিহাস! জানেন না শুধু ভ্রমণ নিয়ে কত কথা বলত!
বউদির কে এক আত্মীয়া ছিলেন। তিনি না কি তীর্থে তীর্থে ঘুরতেন।
বললাম, যান না, বেড়িয়ে আসুন না দেশ বিদেশ।
বলত, মনে মনে কম বেড়াই না কি? ম্যাপের বই দেখি, টাইমটেবিল দেখি, তা জান?
না, সেদিন ধৈর্য ছিল না আমার। একজন মহিলা, যার জন্যে আমরা চারজন ভেবে যাচ্ছি বছরের পর বছর,—শেলী নিজের কথা না ভেবে সেবা করে যাচ্ছে,—তাঁকে ভীষণ স্বার্থপর মনে হয়েছিল।
ভাগ্যে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। বউদি ককিয়ে উঠল, শেলী! অরু যে সত্যিই চলে যাচ্ছে। দুমদাম করে ব্যাগে ভরছে সব!
শেলী বিরস গলায় বললে, তার পায়ে তো বেড়ি পরানো নেই মা! আমার পায়ে বেড়ি, সারাজীবন থাকব। অরুদাদা থাকবে কেন?
ভাগ্যে চলে এসেছিলাম। কিছু দিন ভেবে চলে গেলাম বাঁকুড়া। তারপর রাঁচি...তারপর সেরেংসিঘাটি...না গেলে এলিকে জানা হত না, জীবনটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত, অর্থহীন, অপচয় হয়ে যেত নিশ্চয়।
অপচয়ই তো দেখেছি চিরকাল। দেখেছি, মনে মনে রাগে জ্বলে গেছি। কষ্ট হয় না, রাগ হয়, এতো আপনারা জানেন। কাকে বিশ্বাস করি ভাবালুতায় নয়, এটা বউদির কাছেও বাড়াবাড়ি মনে হত। কেন নিজের জামাকাপড় নিজে কাচি, ঘর পরিষ্কার করি, শখ শৌখিনতার ধার ধারি না, বউদি কষ্ট পেত।
আপনারাও কম নন। বউদিকে অনেক আগে যদি বাস্তবজগতে টেনে আনতেন অরুণ তালুকদারের সঙ্গে সঙ্গে আপনারাও ওকে ছেড়ে যেতেন, বউদি হয়তো অন্যরকম হতে শিখত।
অলকাদির মতো।
মালিনীদের মতো।
হয়তো ও বাড়ির ঘড়িগুলো চলত। ঘড়িগুলো তো ১৯৭৪ সালের সেই দিনটায় থেমে আছে, যেদিন অরুণ তালুকদার ও বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সমস্ত বাড়িতে তার ফিরে আসার প্রতীক্ষা।
প্রতীক্ষা খুব নিঃশব্দ।
নৈঃশব্দ্য ভয়ংকর গুরুভার।
আপনারা বউদির জন্যে ভাবেন, এই তো! আপনারা তাঁর জীবনের খুঁটিনাটিতে জড়িয়ে আছেন, অথচ তাঁকে চেনেন নি।
বউদির কাছে আমরা নিঃশেষে প্রয়োজনীয় ছিলাম না। ও অরুণ তালুকদারের জন্যে বেঁচে থাকত। আমরা সবাই সরে গেলেও ও বেঁচে থাকত, যদি ওর স্বামী ওকে একবার...
এ সব পুরাণে—মহাকাব্যে পড়তে ভালো, প্রাত্যহিক জীবনে অমন বিশাল ত্যাগ, প্রচণ্ড স্বামী—আনুগত্য, স্বামীর জন্য আত্মত্যাগ এ সব খাটে না। ভারতবর্ষ সম্পর্কে সে সব প্রাচীন ভাবমূর্তি বিসর্জন দরকার। সেই সীতাসাবিত্রীর মডেল ছিল বউদি। আর, এখন আমি বিশ্বাস করি, ভয়ংকর সচেতন না হলে, বেজায় ঝামেলা না পাকালে এ সব মূর্তি ভাঙা যাবে না। হায়! এ তো সে যুগও নয়, যে 'আদর্শ রমণী' হিসেবে বউদিকে উপন্যাসের নায়িকা করে মেয়েদের শিক্ষা দেয়া যাবে।
পিপুলকে আপনারা একতরফা 'অভিযুক্ত' বলেই জানালেন দেখছি।
আমি দূরত্বে বিশ্বাস করি। কিছুটা তফাৎ থেকে না দেখলে কোনো কিছুই ঠিক চেহারায় ধরা দেয় না।
আমি তো দূরেই চলে যাই সেদিন। এখন ভালো করেই বুঝি, পিপুল যে মনে করে তার মা তার বিষয়ে কিছুটা নিরাসক্ত ছিল, তারও হয়তো কারণ আছে।
স্বামী—স্ত্রী ব্যস্ত থাকে বলে ছেলেকে ছোটবেলাই হস্টেলে দিল ছেলেরই ভালোর জন্যে, ঠিক আছে। কিন্তু বাবারাই ব্যস্ত থাকেন। মা—রা নয়। এ হেন ধারণা হয়তো পিপুলের ছিল। মা নয়, বাবাই ওকে সময় দিয়েছেন বেশি, এটা ঘটনা। অরুণাবাবুকে পিপুল নিশ্চয় খুব ভালবাসে। কিন্তু ও একদিন না কি বউদিকে বলেছিল। তোমাকে আমি পেলাম কোথায়? সবসময়েই তো বাবাকে ঘিরে তোমার জীবন ঘুরত। আমি বাইরে থেকে দেখতাম মা!
মহিলা খুবই দুর্ভাগিনী। একজনের জন্যে সকলকেই হারাল।
আপনারা বলবেন, না।
সেটা কি সত্যি? বিনয়দার জীবন খুব কি শূন্য হবে? উনিও তো বাইরে চলে যান মাঝে মাঝে। পাহাড়ে গিয়ে প্রশান্তি খোঁজেন। দত্তদার আছে গাছপালা,—এবং মা কালী। চাঁদুদা আর জয়া বউদি অন্য রকম কাজ করছেন। তাই, কার্যকারণ যাই হোক, সরসী তালুকদারকে নিয়ে বসে নেই কেউ। এটা সমালোচনা নয় তারিফ জানাচ্ছি। আপনারা যে যার মতো বাঁচার ছক করে নিয়েছেন।
আর আমি? আমি তো পাহাড়ে গেলে প্রশান্তি পাই না, পাহাড়ের সন্তানদের জীবনে বিষ ঢেলে যাচ্ছি। আমি দেখি পতিত বনভূমি। নিঃশেষিত জীব ও প্রাণী জগৎ, বাতাস ও জল দূষণ।
আমার দেখাটা সত্তর ভাগ সত্য। আপনাদেরটা ত্রিশ ভাগ। আলিপুরের বাগানে মহীরুহরা আমাকে শান্তি দেয় না। কলকাতা ও জেলা শহরে শহরে ব্যাপক বৃক্ষ হত্যা আমাকে ক্ষেপিয়ে তোলে।
এই ক্ষ্যাপাক্ষেপি থেকে নৈরাজ্যবাদী হয়ে যাওয়াতে আমি বিশ্বাস করি না। 'যা হচ্ছে, সব বিধ্বংসী' বলে নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকাকে আমি ঘৃণা করি।
কাজ, কাজ, কাজের মতো কোনো কাজ খুঁজতে চলে যাই, যে কাজ করে আমার মনে হবে সামান্য হলেও ভালো কিছু করছি।
এলির সঙ্গে বিয়ে অবশ্য হতেই হতো। এলি নার্স, পুরো না হলেও আধা ট্রেনিং নিয়েছে। সেরেংসিঘাটিতে ওদের, হো আদিবাসীদের গ্রামে গ্রামে বড় বড় গাছে মাচা বেঁধে ওরা ধান রাখে হাতির ভয়ে। এলেনা জোংকো ওখানে মাদার ফিগার। সকালেই ব্যাগে ওষুধপত্তর গুছিয়ে সাইকেলে বেরিয়ে যেত। দিনে ১৪—১৬ ঘণ্টা সাইকেলে ঘুরত।
আমি ওষুধ বানাতাম। ও নিয়ে যেত। আমরা তো ওখানে স্থানীয় লোকজনের প্রয়োজন মতো গাছগাছড়ার ওষুধ বানাই। কুষ্ঠ আর যক্ষ্মা যে ওষুধ খেলে সেরে যায়। তা বোঝাই। খুব স্বাভাবিক, স্বীরছন্দ জীবন। ফটাফট ইংরেজি বলে এলি। ওর সম্মান খুব।
বউদি তো নিজেই 'আনারকলি' হয়ে কবর গাঁথছিল নিজেকে ঘিরে, শেলীও তার মধ্যেই তলিয়ে যাচ্ছিল। বউদিকে তো বাঁচানোই গেল না। ক্যানসারের সাতটা লক্ষণ ও জানত না। চোখে ঝাপসা দেখছে, চশমা পালটাল, পেট দমসম লাগছে, রাতে খেল না, এর বেশি বুঝত না।
ভাগ্যে সুলতানাদি ছিলেন!
কত বলেছেন, আমায় নার্সিংহোমে নয় অ্যাসিসট করলে? বউদি যাবে পরের সেবা করতে? ওর নিজের দুঃখ সবসময়েই কত বড় নয়?
ওই মহিলাই তো ঠাকুরপুকুরে...আর বউদিও মরে যাবে জেনে আত্মস্থ হয়েছিল,—ঠাকুরপুকুরে নেবার প্রস্তাবটা সুলতানাদির। বউদি রাজী হলো।
আর মরে যাবে জেনেই বলল, 'বাড়ি যাব।'
শেলী হাত পা ছেড়ে বসে আছে। বউদি নেই, ওরই যেন যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে।
ওর কি হবে?
আমি খুব গদ্যময় মানুষ বিনয়দা, আপনারা বউদির কথাই ভাবছেন। আমি ভাবছি শেলীর কথা।
শুনতে অ্যাবসার্ড লাগবে। কিন্তু এবার আমি ওকে নিয়ে চলে যাব।
কি বললেন? কোথায় যাব?
আমি যেখানে থাকি, সেখানে।
ও সব জায়গা এখনো সম্পূর্ণ দূষিত নয়। নষ্ট হয়ে যায় নি সব কিছু। অন্তত দুঃখবঞ্চনা দেখতে হলে চেষ্টা করতে হয় না। তার মধ্যেই বাস করি বলতে পারেন। শেলীকে একটা অন্য মেরুতে নিয়ে যাওয়া দরকার। বউদি থাকলে বুঝত কি বলছি। কত রকম মানুষ ওখানে,—ড্রাইভার—বাসের হেলপার—মদের দোকানী—চাঅলা—ম্যাজিকঅলা,—হাটবারে তো মানুষের ভিড় ওখানে। হাটে যাওয়াটাই অন্যতম আকর্ষণ, কেনাবেচা না করলেও।
শেলী একদিন জুটে যাবে কারো সঙ্গে। ওরও একটা জীবন হবে। আমার যেমন হয়েছে।
ওর কথা ভেবেছেন?
বহু বছর ধরে ভণ্ড কাপালিকটার প্রতি বউদির প্রতিদান—অপ্রত্যাশী রাক্ষুসে অতিকায় প্রেমের তাজমহলের চৌকিদারনী করে রাখা হয়েছে ওকে—ভিনিশিয়ান কাচের আয়নায় মুখে দেখতে দেওয়া হয়েছে—পুরনো পোকায় কাটা শ্রফের কার্পেটে শুতে দেওয়া হয়েছে—সেট ভেঙে যাওয়া দামী এবং ফাটা ডিনার প্লেটে ভাত, শাকভাজা আর কাদাচিংড়ির চচ্চড়ি খেতে দেওয়া হয়েছে—ওর যাবজ্জীবনের মেয়াদ খতম। ওকে আমি নিয়ে যাব জ্যান্ত মানুষদের জগতে। ও বিনয়দা নয়, পাখির ছবি তুলবে না, দত্তদা নয়, ক্যাসুরিনা বা জ্যাকারান্দা গাছের নিঃশব্দ সংগীত শুনবে না—চাঁদুদা নয়, রিসার্চ করবে না। এ শহরে কাপালিক থাকে, নির্ঘাৎ টার্গেট করবে ওকে—ওকে আমি নিয়ে যাব।
আমি আর এলি একটা কাঁচা, রোদে শুকনো ইটের এক কামরা বাংলায় থাকি। বাংলার চারপাশে ফণীমনসার গাছ। আমি আর এলি দুজনে মিলে হাজার টাকা পাই। আমাদের একটা চৌকি, একটা টেবিল, দুটো চেয়ার করে দিয়েছে রয়্যাল কার্পেন্টার শংকটা জোংকো। চাপাকল থেকে জল যে পারি আনি, রান্না করার জন্য কাঁচা ইটের একটা উঁচু ধাপি আছে—একটা জনতা স্টোভ, একটা কড়াই, একটা খুন্তি, দুটো গেলাস একটা থালা, ব্যাস! যে যখন পারি কড়াইয়ে খিচুড়ি রাঁধি, এক থালাতেই খাই। ওষুধপালার গাছগাছড়ার বাগান আছে সংগঠনের, একটা ছোট দু'কামরার হাসপাতাল, একটা রোগী থাকার শেড। এলি নার্স, আমি ওষধি চাষ করতে ও ওষুধ বানাতে শিখছি—রুগীর ভিড় থাকে, চর্মরোগ, আন্ত্রিক, জ্বর ইত্যাদি সারে।
এ শহরে থাকব না আমি, বউদির শোক আপনাদের বিনয়দাকে কোথাও বন্দী করে ফেলছে। আপনারা এই শহর নামক কাপালিকটার শিকার হয়ে যাবেন বলে দিলাম। শেলীকে ছেড়ে দিন, শেলী আর এলি বেশ থাকবে—শেলী নার্মাল জীবন পাক একটা। না, আমি বলব না বেশি কিছু—বউদির চেহারা আমাকে তাড়া করছে। চলে আসার সময়ে আমার সব কথা শুনে ও বলেছিল, আমাকে ফেলে যেও না অরু—আর জিগ্যেস করবেন না।
নেকলেসটা বেচে এলির বাপকে কিছু জমি কিনে দিয়েছে এলি—কিছু রেখেছে—সপ্তাহে সপ্তাহে বউদির চিঠি পেতাম, জবাব দিতাম না—সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে মাথার মধ্যে।
ক্যাসেটে আপনারা বংশপরিচয়, নাম, হেন—তেন বলেছেন কেন? পুলিশ কি জেরা করেছিল? আমি অত বলতে পারব না, দত্তদা হয়তো কিছু জানে—ওর বোন আমার মামিমা হয়—কুচবিহারে আমার বাবা, মা, একপাল ভাই—বোন—সবাই আছে। বাবা আমাকে ছোটবেলা থেকে পিটিয়ে পিটিয়ে ঘ্যাঁচড়া করে দেয়। বাড়ি থেকে আমি অনেক দিনই পলাতক—ওসব জীবন ফালতু হয়ে গেছে অনেককাল—কিন্তু আমার জীবন—কাহিনী তো অবান্তর, না? আপনাদের যেমন বংশ বা বাড়ি, বা বাবা নিয়ে অনেক বলবার আছে, আমার তা নেই মানে ওগুলো আমার কাছে ফালতু।
বউদিকে আমার মা বোন বা অনুরূপ কিছু মনে হয়নি। আপনাদের কথাতেই যাই—কিন্তু তার আগেই বুঝেছিলাম, বউদি, শামুক বা কাঁকড়া বা কচ্ছপকে জ্যান্ত রেখে—খোলাটা তুলে দিয়ে জীবনযুদ্ধে ফেলে দিলে সে যেমন অসহায়, তেমন অসহায় একটা প্রাণী। তাকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দেওয়া খুব সোজা, সে নিজেকে বাঁচাতে অক্ষম। এখন অসহায় কোনো প্রাণীকে নির্যাতিত দেখলে আমি জ্বলে যাই। আমার ছোট ভাই কয়েকটা বেড়াল—ছানা থলিতে ভরে পুকুরে ডুবিয়ে মেরেছিল বলে আমি তার ডান হাত মুচড়ে এমনভাবে ভেঙে দিই যে সে নুলো হয়ে আছে। এরকম কাজ আমি অনেক করেছি, অনেক। শেলী বলুক না, ওকে না বউদিকে কি বলেছিল বলে আমি রকের মস্তানকে কি পেটান পেটাই।
বউদিকে ওরকম মনে হয় বলেই আমি থাকতে গেলাম। আমি কাছ থেকে যা দেখেছি—তা আপনারা দেখেননি। বিনয়দা জমিটা বেচে দেবার আগের অবস্থা জানেন? আমি তো বাড়িতে খেতাম না, খুব ক্বচিৎ কদাচ খেয়েছি। দেখি বাজারই হয় না, মাছই আসে না। তারপর বুঝি জিনিসপত্র বেচছে। একদিন বললাম, যদি বেচতে হয়, আমাকে জানাবেন। আমি লোক আনব, সঠিক দাম পাবেন। অ্যান্টিক ফার্নিচারের ভীষণ দাম, বোকার মতো বেচবেন না।
জিনিস বেচবে, গয়না ব্যাঙ্কে রেখে গোলড লোন নেবে না। ওগুলো পিপুলের বউ পাবে। আপনারা কিছু মনে করবেন না, বউদি নিজেও নিজের কম শত্রু ছিল না।
আর ওই কাপালিকটা! বছরের পর বছর বউদির ভীরু গলায়—চেষ্টা করে সপ্রতিভ হেসে সাতসকালে ফোন করা—আজকের দিনটা মনে আছে তো?
একবার বউদির জবাব থেকেই বুঝলাম, ও কি বলছে।
—কি বললে? আমার জন্মদিন আমার কাছেই স্মরণীয় হয়ে থাক?
—...
—ও! বিয়ের তারিখটা তোমার মনে থাকে না? হ্যাঁ...হ্যাঁ...জানি, পিপুলের জন্মদিন...আমি এস.টি.ডি তো রেখেছি সে জন্যেই...তবে আশীর্বাদ জানাব না তা কি হয়?...পিপুল...জাপান গেছে সস্ত্রীক?...ও! না, ও তো লেখে না...সময়ই পায় না হয়তো...
এগুলো আপনারা শোনেননি। আমি শুনেছি। কতবার বলতে ইচ্ছে হয়েছে, ওদের জীবন আছে, কাজ আছে, ব্যস্ততা আছে—আপনি তার বাইরে...আউটসাইডার...অন্ত্যেবাসী... আপনার কাছে পয়লা জানুয়ারির মর্মার্থ যা, ওদের কাছে তা নয়...
বলতে পারিনি...ওঁর যন্ত্রণা দেখে রাগ হতো ওঁর ওপরেই...বলতে পারিনি...
আমাকে দেখতে হয়েছে, পালাকারের জন্মদিনে উনি টাকা দিচ্ছেন, একটা সরু, গুঁফো প্রৌঢ় ফুল আর কার্ড নিয়ে যাচ্ছে...যদিও পয়লা জানুয়ারি একটা ফোনও ওদিক থেকে আসত না। সবই ওয়ান—ওয়ে ট্রাফিক। একবার বলেওছি, টেলিফোনে এত বিল ওঠে আপনার...
বলত, ওর গলা শুনব বলে একেক দিন কত বার ফোন করি যে? আর ফোন না থাকলে তো পিপুলের গলাও...
দিনের পর দিন...দিনের পর দিন...যেদিন ফোনে 'বাস্টার্ড' বলে বেরিয়ে এলাম, সেদিনই বুঝেছিলাম বউদি ভেঙে যাচ্ছে।
এটাই যদি শেষ কথা হতো! এটাই যদি হতো শেষ কথা...আমার এত রাগ হতো না...পড়ুন, এই চিঠিটা পড়ুন... আমি অন্য ব্লকে কাজ করতে গিয়ে দুমাস থেকেই যাই...অনেকদিন বাদে ফিরে এসে চিঠিটা পাই...কি লিখেছে দেখুন!
'অরু! আমার বোধহয় কিছু হয়েছে। ডাক্তার মনে করে জটিল কিছু। আমার বিশ্বাস হয় না। বিনয়রা কেউ জানে না। তোমাকে চিঠি লিখছি। অরু! আমি তোমাদের কাছে যেতে চাই। সব লিখে রেখেছি খাতায়, তুমি যেমন লিখেছ...আগে যাব চক্রধরপুর...সেখানে থেকে চাঁইবাসা যাব বাসে...তারপর রাজাঙ্কা...তারপর সেরেংসিঘাটি...তোমার সেই সব গাছগাছড়ার ওষুধের কথা লিখেছ না? সে সব খেলে আর এলির কাছে থাকলেই আমি... ভালো...হয়ে...যাব...তোমাদের কাছেই থাকব...অন্যরকম...কাজ করব...লিখেছিল...লিখেছিল...লিখেছিল...ওঃ!
না, নিজেকে ধরে রাখতে হবে এখন...এই, এই যে দেখুন—ব্যা...গ! (অরু চেঁচায় ও কাঁদে)...জামা—কাপড়...সাবান...টুথব্রাশ...পেস্ট...গরম জামা...সাদা কাগজে স্টেপল করা ছোট্ট খাতার ওপর লেখা...অরু আর এলির ঠিকানা! অরু আর এলির ঠিকানা...অরু আর এলির...।
না, আর বলতে বলবেন না আমায়। ভীষণ রেগে যাচ্ছি আমি। ভীষণ...আমাকে আপনারা চেনেন না...আমি রাগলে নাপাম হয়ে ফেটে পড়ব এই এসেলওয়ার্লড শহরের ওপর...তেমন দুনিয়ার ওপর...ওয়াহ! কেয়া সীন হ্যায়! বলার জন্যে কাউকে রাখব না, কেননা চিঠিটা পেয়েই আমি দৌড়ে এসেছি আর ততদিনে বউদি কোমাটিক...বাড়িতে...
আর রাগতে দেবেন না আমায়...এ প্রচণ্ড সর্বনাশা রাগ ধরে রাখতে না পারলে আমি...
বউদির নাম করলেই সেই ভীষণ রাগে ফেটে যাব...।
ব্যাগটা আমার ঘরেই থাকবে, বিনয়দা।
—
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন