মহাশ্বেতা দেবী
সতীনাথ
দাদার ছেলেমেয়েদের চিঠি পেয়েই বুঝে গেছি, ওদের বাবার জন্মদিনে এ বাড়িতে পারিবারিক সম্মেলন এমন ঘনঘটা করে ঘোষিত হল কেন। যতিনাথ লিখতে কিছু সংকোচ বোধ করেছে। কিন্তু সিধা বুঝছি, ওরা বাড়ি বেচে দেবে।
পারে, দিতেই পারে। ওদের বাবার তৈরি বাড়ি। ওরা বেচে দেবে, আমি বলার কে! আমি তো বাধা দিতে যাব না। বউদির মৃত্যুর পরেও একবার এ কথা উঠেছিল বটে। দাদার কনিষ্ঠ ছেলে সুভাষই জোর করছিল। সে সময়ে আমার ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, আমার কথার কিছু দাম আছে ওদের কাছে। হতে পারি অকৃতদার এবং অপুত্রক। অকৃতদার হলেই অপুত্রক হয় না। আমার এক জ্ঞাতি কাকা ছিলেন খুব ঢঙের মানুষ।
তিনি বিয়ে শাদি করেননি। কাজকর্মও করেননি। একটা মোটা খাতায় তখনকার যুক্তবঙ্গ থেকে ওদিকে সিলেট, শিলচর,—পশ্চিমে বিহার, যুক্ত প্রদেশ (আমরা যুক্ত প্রদেশই বলতাম, এরা বলে উত্তরপ্রদেশ), দিল্লি, পাঞ্জাব, দক্ষিণে নাগপুর, জব্বলপুর, সর্বত্র নিয়োগী বংশের কোনও না কোনও ডালপালা আছে, সকলের নাম ঠিকানা লিখেছিলেন খোঁজ করে করে।
জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ফেমিলির হিসট্রি লিখতাছি। তার লিগ্যা এত খোঁজ করি।
তখন সমাজটা এমনই ছিল, যে জমির ধান থাকলে স্বেচ্ছায় কোনও কোনও শিক্ষিত ছেলে যৌথ পরিবারে বেকার হয়েই থেকে যেত। বিয়েও করত, বাপও হত, এটা অস্বাভাবিক বা স্বার্থপরতা বলে মনে করত না কেউ।
আমার এই কাকা ''পরিবারের ইতিহাস লিখব'' বলে সকলকে চমৎকৃত করে দেন এবং অচিরে নগদ বাইশ টাকা এবং খাতাটি নিয়ে ''গৃহত্যাগ করিলাম'' লিখে রেখে চলে যান। স্নেহাতুরা পিতামহীকে ও জননীকে তিনি মাঝে মাঝে ''তীর্থে তীর্থে সাধুসঙ্গ করিতেছি'' লিখতেন। মহিলারা, ''ও পোলার সন্নাস যোগ আছিল বা!'' বলে শোক করতেন।
বছর ছয়েক বাদে প্রভূত স্বাস্থ্য, পেঁটরা বোঝাই জামাকাপড় নিয়ে ফিরলেন। পরনে গেরুয়া, পায়ে নরম চামড়ার বিলাতি জুতো। বললেন, বা'র বাড়িতে থাকুম। অন্দরে যাইতাম না।
তাঁর আহারাদির ব্যবস্থা চলছে, এমন সময়ে একটি ডাঁটোখাটো স্ত্রীলোক এক বালককে নিয়ে প্রবেশ করল। ইনি বললেন, তীর্থপথে এ আমার সাধন সঙ্গিনী, পোলাটা স্বপনে পাইছে।
বংশের সম্মান রাখতে তাঁকে গ্রাম থেকে দূরে পাবনা টাউনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বপ্নে প্রাপ্ত সাধনসঙ্গিনীর পোলা তাঁকে ''বাবা'' বলেই ডাকত। ছয় বছরে ইনি সিলেট টু লাহোর সব আত্মীয় গৃহে গেছেন, খেয়েছেন, থেকেছেন। সে বিষয়ে ''আমার ভারত ভ্রমণ'' বই লেখা শেষ না হতেই তাঁর অকাল বিয়োগ হয়। পাবনার বাড়ি সেই মহিলাই পেয়েছিলেন।
আমাদের কাছে ওঁকে খুব মজার মানুষ মনে হত। কিন্তু বাড়ির বড়রা ওঁকে ''বংশের কুলাঙ্গার'' বলতেন। তবে বাসা খরচ পাঠানো হত, যাতে তিনি গ্রামে না ফেরেন। অকৃতদার এই লোকের ঔরসজাত ছেলে কিন্তু লেখাপড়া শিখে ঢাকায় কাপড়ের কলে কাজ করতে চলে যায়। আমার ঠাকুর্দা ইংরেজি শিক্ষিত ছিলেন। তিনি বলতেন, দেখ! ইতিহাসের বিবর্তন! আমরা জমি লইয়া আছি। হে গেল ইনডাসট্রিতে। অকৃতদার আর কাউকে পাইনি আমি ছাড়া। আমি সে সময়ে বিপ্লবী দলে যোগ দিয়ে এই জেলে ক'বছর, আবার বাইরে, আবার জেলে। যাক, শিক্ষিত। উঁচু জাতের ও ঘরের ছেলেরা তিন মাস ইংরেজের জেল খাটলেই স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশান পায়। আমার জেল রেকর্ড জুড়লে এগারো বছর। স্বাধিকারে আমি পেনশানভোগী।
তা, আমি এদের কাকা। বুদির মৃত্যুর পরে বললাম, বাড়িতে আমি তো থাকলাম। বাড়ি অরক্ষিত থাকল না। বেচতে হলে চিন্তা করো। ক'বছরে দামও বাড়বে। বেশি টাকা পাবে।
—তুমি থাকছ তো, আমরা ভাবব কেন? মাধবী কান্নাভরা গলায় বলেছিল, তুমি ছাড়া আমাদের কেউ রইল না কাকা।
—তোমরা এসো মাঝে মাঝে। বাড়ি তো তোমাদেরই। এলেও তাদের আত্মাটা শান্তি পাবে।
সুভাষ বলেছিল, বাড়িটা দেখাশোনা করে ঠিকভাবে রাখবারও তো একটা খরচ আছে!
আমি তখন নিজেকে ভাবছি ফাদার ইমেজ। প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলেছি, আমি পেনশান তো পাই। আমি আর ন্যালা। খেয়ে দেয়ে বাড়ি ও বাগান দেখে শুনে রাখতেই পারব।
সুভাষের ভয়েসকন্ট্রোল অসামান্য। আমি ভাবতেই পারি। ওর ল্যাণ্ড অ্যানড প্রপার্টি কেনা বেচা ব্যবসায়ে গলার আওয়াজটা কেমন পর্দায় পর্দায় ওঠায় নামায়।
সুভাষ গাঢ়, অভিভূত গলায় বলেছিল, তুমি থাকলে মানে, তোমার মধ্যেই তাঁদের পাব। সে সময় মনটা নরম কাদাভূমি, যা বুনবে বুনে যাও। যা বলবে তা মেনে নেবে মন। আমি কিছু আপ্লুত হয়েছিলাম। কিন্তু রাতে দেখি ন্যালা আর শুতে আসে না। সকালে বললাম, কী করছিলি?
—সুবাষ ঠাগমার কলসি—মলসি নিয়ে যাবে তো! ওর ঘরে টেনে দিচ্ছিলাম।
—এটা তো ঠিক কাজ নয়।
—বলল, ঠাগমার সিঁতি।
—সিঁতি নয়, স্মৃতি।
—ওই হ'ল। আমাকে পাঁচটা টাকা দিয়েছে, এট্টা শার্ট! আর এই হাওয়াই চটি।
আমি প্রমাদ গুনলাম। ওদের মা, মৃণাল বউদি নিজ বাড়ি হওয়া থেকে বাসন কিনতে শুরু করেন। অনেক বাসনের লৌকিক নাম ছিল, যেমন ''তরকারি ঢালাঢুলির বেলি'', এঁটো না করে জল খাবার পেতলের ''পাউলি ঘটি'', আদা বা পোস্ত বেটে রাখার ''চুন্নুনী বাটি'', কানা উঁচু কালো পাথরের থালা ছিল ''পাথরী''। এসব শব্দ কোনও শব্দকোষে পাওয়া যাবে না। এ সব গার্হস্থ্য শব্দ বিলীন হয়েই যাবে।
সুভাষ কলসি সরাচ্ছে, স্বাধীন বা কী সরাবে,—যজ্ঞির বাসন তো কয়েক প্রস্থ।
সকালে আমি বললাম, বাড়িটা স্থাবর। একে হালকা করে রেখে যাও। আমি সামলে নেব।
—খাট—আলমারি—টেবিল—চেয়ার?
—না কাঁঠাল কাঠের বড় বড় পিঁড়ি?
—বাসন কোসন নিজেরা ভাগ করে নাও। রাখলে রেখো, বেচলে বেচো।
—তুমি আর ন্যালা?
—একটা দুটো রেখে যাও। আমাকে বউদির পাথরীটা দিও। অনেক স্মৃতি জড়ানো। উনি ওটায় খেতেন।
ন্যালা বলল, আমি ঠাগমার জল খাওয়ার পাউলিটা নেব। আর... আর ... ঠাগমা বলিছিল, ঠাকুরঠুকুর কে বা পুজবে ন্যালা, ঠাকুরপো তো চিরকালের কালাপাহাড়,—ও তুই জলে ফেলে দিস।
আমি বললাম, তোমরা নেবে কেউ?
এ—ওর দিকে—সে—তার দিকে তাকাল। ন্যালার মুখের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি হাসি—হাসি,—কাঁদলেও মনে হয় হাসছে। ও বলল, ঠাগমা যেতে না যেতে তাকে ধুয়ে পুঁছে ফেলে দেবে? একথা ওদের কোনও নৈতিকতায় ঘা দিল। সুভাষ সাধারণত সুপার বসের মতো কথা বলে। সে বলল, রেখে লাভ আছে?
আমি বললাম, থাক এখন। মুখুজ্জেদের পুরোহিতকে বলে দেব, ফুল ফেলে ঘণ্টা নেড়ে দিয়ে যাবে। সন্ধ্যায় ধুপধুনা তো মশার জন্য দিতেই হয়।
বাসনকোসন নামানো হয় উঠোনে। ওরা কে কী নিল, কে কী বেচল, সে আমি দেখিনি। জমাদারনি বউটা বউদির অনেক মলমূত্র কাচত, আমার নাম লেখা থালা—বাটি—গেলাস তাকে দিয়ে দিলাম।
ঠিক হ'ল, ঘরে ঘরে আসবাব থাকবে। অস্থাবর বলতে আর কি?
আমি ঈষৎ হেসে বললাম, ঘোরানো সিঁড়িটা কে নেবে, কী হবে ওটার?
সুভাষ বলল, কী হবে, লোহালক্কড়ের দোকানে বেচে দিলে পয়সা পাবে কিছু।
—ঘোরানো সিঁড়িটা এ বাড়িতে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সুভাষ। তোমাদের বাবা...
যতিনাথ, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের এক মিতভাষী অধ্যাপক। ও বলল, হ্যাঁ... ঘোরানো সিঁড়িটা....
মাধবী বলল, হ্যাঁ রে দাদা! বাবা ওটা কোথা থেকে যেন কিনে এনেছিল, তাই না কাকা?
আমি বুঝতে পারছিলাম দেয়ালে পাশাপাশি ঝোলানো আদিনাথ ও মৃণালের ফোটোর চোখে প্রত্যাশা। ওই সিঁড়ির কথা ছেলেমেয়েরা কি জানে। কি মনে রেখেছে সিঁড়ি? সিঁড়িটাতে বাইশটা ধাপ আছে। বছর বছর রং করাই, ঝকঝক করে। বর্তমানে দীর্ঘকাল সিঁড়িটার জন্যই ভিতর উঠানে একটা ছাউনি করা হয়েছে। সেখানে সিঁড়িটি থাকে।
মনে মনে আমি আদিনাথ ও মৃণালের বিদেহী টেনশান টের পাচ্ছিলাম। ঘোরানো সিঁড়িটার পিছনে একটি আপাত সাধারণ মানুষের একটা অসম্ভব স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নটিকে বাস্তবে অনুবাদ করা অসম্ভবই।
যতিনাথ বলল, আমি কী জানব?
আমি নেউগী পরিবারের কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন নানা অর্থেই। বাড়ির ইতিহাসটা জানি। গায়ের রং ঘন কালো, রোমশও বটে। আমি বললাম, দাদা ওটা কেনে খুব সস্তায়। জেল থেকে বেরিয়ে আমি তো কন্ট্রাকটরি করি। সে সময়ে, মানে ১৯৪৭ সালে হুগলি নদীর ওপারে বেশ কিছু কুঠি বাড়ি ভাঙা হয়। মালপত্র কেনাবেচার কাজ কিছুদিন করি। দাদা মাঝে মাঝে যেত। ঘোরানো সিঁড়িটা খুব পছন্দ হয় ওর। তাতেই কিনেছিলাম।
—এ সিঁড়ি কোন কাজে লাগত?
—সায়েবী আমলে এগুলো ছিল বাথরুমে জমাদার ঢোকার সিঁড়ি। পিছন দিয়ে উঠত, কাজ করে নেমে যেত। শুনেছি এখন আবার এ সবের ফ্যাশান হয়েছে।
মাধবী অবাক হয়ে বলল, বাবা কত বড় বাড়ির কথা ভাবত? করেছিল তো একতলা একটা বাড়ি।
স্বাধীন বলল, হয়তো ভেবেছিলেন যে কখনও দোতলা করবেন। তখন জমাদার উঠবে দোতলায়।
—ঘোরানো সিঁড়িটার বিষয়ে আমার কিছুটা দুর্বলতা আছে। ওটা নয় আমিই নেব।
ওরা হেসেই ফেলল। আমি খুব সিরিয়াস। ঘোরানো সিঁড়ি আমার মাধ্যমে ঢুকেছিল, আমার সঙ্গে যাবে।
মাধবী আবার অবাক, এই যে বললে, যাবে না কোথাও?
—একদিন তো যাবই রে মা! তখন যা হয় করিস। আমি তো আর দেখতে আসব না।
ন্যালা এ সময়ে হঠাৎ হাঁউমাউ করে বিচ্ছিরিভাবে কেঁদে উঠল, কোথা যাবে গো ছোটকত্তাদাদা? কত্তাদাদা গেল, ঠাগমা গেল, তুমিও কি মরে যাবে? আমি তাইলে থাকব কোথা গো?
বললাম, আমার মরতে অনেক দেরি এখন। যা, চা করগে যা। আমি যেমন খাই, তেমনি করিস।
এখানেই ঘোরানো সিঁড়ির প্রসঙ্গ থেমে যায়। শ্রাদ্ধশান্তির পর যাবার কালে যতিনাথ বলল, সত্যি! এমন চমৎকার বাড়ি, এমন বাগান, বড় বড় চারটে ঘর, দু'দিকে বারান্দা, দুটো বাথরুম....।
—পুরনো বাংলো বাড়ির স্বপ্ন তো দাদার চোখে ভাসত। সেই মডেলেই....
—তুমিও তোমার সব ঢাললে!
—হ্যাঁ... আমরা তিনজন খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম।
—বিয়ে টিয়ে করলে না...
—আমাদের প্রজন্মে এমন ব্যাচেলর থাকত কেউ কেউ। সেটা এমন আশ্চর্য কিছু নয়।
—এমন বাড়িতে থাকলে আমি তো শান্তি পেতাম। কিন্তু সুলতা রিটায়ার করাবে ২০১০ সালে, আমি রিটায়ার করব ২০০৫ সালে। বেহালায় ফ্ল্যাটটা না কিনলে.....
—অবশ্যই।
দাদার বড় ছেলে যতিনাথ অধ্যাপক। বিয়েও করেছে এক অধ্যাপিকাকে। ওই কলেজের অধ্যাপকরাই সমবায় প্রথায় ফ্ল্যাট করেছে অতি সস্তায়।
—থাকতে পারবে না, মন করলে ঘুরে যেও।
—হ্যাঁ... দেখি....
ওরা আসবে না। সুলতার ব্যক্তিত্ব প্রবল, যতিনাথ দুর্বল চিত্ত। মাঝে মাঝে আজ এসে কাল চলে যেত বাপ—মা থাকতে। শিয়ালদা থেকে এ শহর আসতে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। বেহালা ও এই শহর যেন পৃথিবীর দুই মেরুতে।
—বাবার এ বাড়িটা করা...
—কে করে না যতি? তার তো তিন ছেলে এক মেয়ে ছিল। তোমরা নিঃসন্তান, ফ্ল্যাট করোনি? এ বাড়ির ভাগীদার আছে, ও ফ্ল্যাটের উত্তরাধিকার কার? থাক গা, সম্পর্ক আমি যতদিন আছি রাখব। ন্যালাও যাবে, গাছের আম, নারকেল, পেঁপে, সজনাডাঁটা নিয়ে।
যতি এমনই মূর্খ যে বলল, ন্যালারও কলকাতা বেড়ানো হয়।
আদিনাথ ও মৃণাল নেউগীর বংশধররা ক্রমশ বিদায় নিল। মাধবীই সবচেয়ে দূর থেকে এসেছে। কোথায় শিকাগো, কোথায় এই বাড়ি। মাধবী কোন মিউজিয়ামে কাজ করে, করণিক। ওর স্বামী সবুজ এবং যমজ ছেলে অরু ও বীরু তিনজনেই সবুজের ক্লিনিকে নকল দাঁত তৈরি করে। ওদের বাড়িও শিকাগোর কিছু বাইরে। শুনি অঢেল জমি আছে, সুইমিং পুল। মাধবী বলল, বাবার সময়ে আসতে পারিনি .... মা'র সময়ে তবু...
—দিল্লিতে তো বাড়িও কিনেছ।
—ফ্ল্যাট। দেশে ফিরলেও পশ্চিমবঙ্গে থাকব না।
—ছেলেরা আসবে?
—মনে হয় না।
আদিনাথ ও মৃণালের মাধবীলতা আর বাংলার মাটিতে ফুল ফোটাবে না।
—বাসন কোসন?
—ঘর সাজাব কাকা! ভারতীয় অ্যান্টিক বলে কথা!
—ওই সব গামলা হাঁড়ি?
—স—ব। সুভাষ কলসি নিল কেন? ওর বন্ধু অ্যান্টিক জিনিসের ব্যবসা করে না?
স্বাধীন! সুভাষ! দেশ স্বাধীন হবার পর অনেক বাঙালির মতো আদিনাথ আর মৃণালও ছেলেদের নাম ''স্বাধীন'' ও ''সুভাষ'' রেখেছিলেন।
স্বাধীন তো শ্বশুরাধীন। শ্বশুর ওকে যেমন চালান, তেমনি চলে। লেখাপড়ায় চারজনই চারটি রত্ন। স্বাধীন কেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট করেছিল। কিন্তু তিনি নামী দামি চা—বাগানের মালিক। স্বাধীনকে বিশাল চাকরি দিলেন ল্যাবরেটরিতে। তাঁর তিন মেয়ের এক মেয়েকে বিয়ে করেছে স্বাধীন, যে মেয়ে বিক্রি বাটা দেখে। স্বাভাবিক অঙ্কের নিয়মেই সে শ্বশুরাধীন।
স্বাধীন মায়ের কাজে বউ আনেনি কেন?
বউ ঋষিভ্যালিতে ছেলেমেয়েকে দেখতে গেছে।
স্বাধীনরা গাড়িতে সিকিম বা দার্জিলিং বেড়াতে যাবার পথে এখানে এক বেলা—একদিন— আধবেলা—দু'ঘণ্টা হলট করে যায়। স্বাধীনরা কলকাতায় সল্টলেকে থাকে শ্বশুর প্রদত্ত বাড়িতে।
স্বাধীন নরম, নম্র, শ্বশুরের পথের পথী ও রামানন্দ স্বামীর শিষ্য। এই ছেলেটাই চুল দাড়ি ফেলল, কাছা কম্বল নিল, মাটিতে শুল, হবিষ্য করল। শ্রাদ্ধকালে ওর চোখে জলও দেখেছি।
স্বাধীন বলল, কাকা! যতদিন তুমি, ততদিন বাড়ি। তারপর কে আসবে, কে থাকবে?
—সেই তো!
—ছুটি ছাটায় তো ওদের দাদু দিদিমা ব নাতিনাতনিকে নিয়ে বাইরে যান। মা এত দার্জিলিং দেখতে চাইত... আমি আর ..
—এখন আর ভেবে কী হবে? আমি দু'জনের পাশ পাই। দাদা বউদিকে দক্ষিণ ভারত ঘুরিয়েছি। বউদিকে পুরী, শিলং, খুব ঘুরিয়েছি। সে তো প্রকৃত ভ্রমণরসিক ছিল।
হ্যাঁ.... বরাবর দেখলাম... আমরা কিছুই করলাম না ... অথচ তুমি সবই করলে।
—আমরা তিনজন খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম তো!
—এ বাড়ি যে কী হবে!
—এখন আছে, রাখলে থাকবে। নইলে বেচে দেবে। দেখ। আমি তো এ বাড়ির কোনও অংশ পাই না। আমার হত, তো দেখিয়ে দিতাম!
—কী করতে?
—বৃদ্ধ বয়েসের বৃদ্ধাবাস। বৃদ্ধাবাসই তো হয়ে গিয়েছিল। তিন বুড়া বুড়ি... দাদা টিকিট কাটল তো আমরা থামলাম...
—ওরা কি রাজি হবে?
—সে আমি জানি না। তবে মাসে আটশো—হাজার দিয়ে থাকতে রাজি হবে অনেকজন। এই শহরেও। নিজেদের দোষ দিও না স্বাধীন, বৃদ্ধ বাপ—মা—কাকা—ঠাকুমা—জ্যাঠা, এখন ঘরে ঘরেই অবাঞ্ছিত! এই প্রজন্ম, পূর্ব প্রজন্মকে নিয়ে বসবাস করতে পারে না। দুই মেরুর ব্যবধান।
সুভাষ বলল, ভালো কমার্শিয়াল প্রপোজাল। তবে করতে হলে কলকাতাতেই ভাল।
—তুমি তো আসতেই পারো না।
—টু বিজি কাকা! তবে বিনি কয়েকবার এসেছে, থেকেছে। রুমাও ঠাম্মাকে ভালবাসে, মানে বাসত। খবরটা পেয়ে কেঁদেও ছিল। তার বেশি তো পারে না।
—বিনি কি মাদ্রাজে?
—হ্যাঁ... রুমাকে নিয়ে ছুটেছে। ব্রেনই যার ড্যামেজ, সে মেয়েকে সারাবে কে? না, ওই যে ডক্টর নায়ারের কথা পড়ল...
—তুমি গেলে না?
—বিনি আর রুমা, ওদের জগতে আমি ঢুকিই না। আর রিয়াল এস্টেট ইজ আ নিউ আইডিয়া। আমার সময় কোথায়?
—টাকা বানাতে ব্যস্ত!
—টাকাটা কোনও ব্যাপার নয় কাকা! যাক গে, এ বাড়ি নিয়ে আর যাইহোক, ন্যালাকে মালিক হতে দিচ্ছি না।
—সে মালিক হবে কেন? আমি তারে দেখব।
—মা তো এইসব করত। একে—ওকে—তাকে.....না, বাড়িটার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত করে ফেলতে হবে। আমি ভাবি, তোমার কী হবে?
—না সুভাষ, আমার বিষয়ে ভাবার অধিকার কাউকে দিইনি আমি। মাথা উঁচু রেখে চলেছি, তেমন রেখেই চলে যাব।
—সত্যি কাকা... তুমি এমন হাসাতে পার... মাথা উঁচু মানে কী... যত আদ্যিকেলে ধারণা!
—যাও, শুয়ে পড়ো।
—তুমি কী করবে?
—আমি আর ন্যালাও শোব।
—আজ রাতে জানো তো! দিদি খিচুড়ি রেঁধেছে। সত্যি রেঁধেছে।
—ও দেশে তো রেঁধেই খায় সবাই।
—সে জন্যেই তো যাব না। এন—আর—আই হব না। আর—এন—আই হয়ে গেছি।
—বিনি কী বলে?
—ওরা এক ফ্ল্যাটে, সেম ফ্লোরে আমি আরেক ফ্ল্যাটে। মেয়ে নিয়েই সে...
সুভাষ চলে গেল।
পরদিন থেকেই চলে যাওয়া শুরু। ন্যালাকে দিয়ে টাটকা রাইখয়রা মাছ আনলাম, ঝোল করল ন্যালার মা। সুভাষ ভুরু কোঁচকাল, এসব মাছে বেজায় কাঁটা।
—কষ্ট করেই খাও। তোমার মায়ের ভ্রান্ত ধারণা ছিল, রাইখয়রা খেতে তার ছেলেমেয়ে ভালবাসে। এবারটা যা হবে তারই সম্মানে।
স্বাধীন ও সুভাষ নিজের নিজের গাড়িতে, মাধবী গাড়ি ভাড়া করেই এসেছিল। যতিনাথ গাড়ি—না—থাকা পার্টি, ক্ষমাপ্রার্থীর মতো মাধবীর সঙ্গেই গেল। সুভাষ বলল, দাদা! কেনো তো আমার পুরনো অ্যামবাসাডরটা বেচে দিই।
ওরা চলে গেলে লোহার সিঁড়িটার গায়ে টর্চ ফেলে দেখে এলাম। মৃণাল বউদি বলত, স্বপন দেখতে জানত তোমার দাদা। পোলারা খোঁজ নেয় না, মাইয়া বিদেশে, কার লিগ্যা দোতলা উঠাইত?
আমরা তিনজনে, পরে দু'জনে দেশের কথা বলেছি। বলেছি বলা ঠিক নয়। অবিকৃত তো থাকেনি। টানেটোনে বুঝে নাও কোন দেশের মানুষ।
—মাইয়া পোলাদের লিগ্যা বুক পুরায়?
—না ঠাকুরপো। তারা যে—যার মতো সুখে থাকুক। অহনই এই সব ভাবি,—আমার দিদিমার সাত বছরে বিয়া, দশ না হইতে শ্বশুরঘর,—উৎরানীর চানে বইনরে দেইখাও চিনে নাই। কুনো কষ্ট নাই আমার, তোমরা তো আছ।
দাদা হাঁপানিতে ভুগে ভুগে বড় কষ্ট পেয়ে মারা যায়। দাদার মৃত্যুর আগে বউদি বলত, ঠাকুর অরে লয় না কেন? কত কষ্ট দিব?
মৃত্যুর পরে বলল, হে শান্তি পাইছে গো! দেহ, মুখে কুনো কষ্টের চিহ্ন নাই। য্যান ঘুমাইতেছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই ওরা বিদায় হলে আমি প্রত্যহের মতো নদীর ধারে বেড়াতে যাই। ননীবাবু ঠুকঠুক করে এসে বসল। বলল, ভাবলেন কিছু? কোথায় থাকবেন?
—এখনো তো ওখানে।
—আদিবাবুর ছেলেরা বাড়ি বেচে দেবে। বাপ মা বলেই কোনও টান ছিল না, বাড়ি রাখে?
—মনে হয়..... রাখবে না।
—তখন? পথে বসবেন?
—না না, আপনার প্রস্তাবটা ভাবছি।
—এত ভাবছেন বা কেন? দু'জন ব্যাচেলর মাস্টার, দু'জন স্বাধীনতা সংগ্রামী, আর দু'জন কি জুটবে না? জমি আপনার, সেই আপনি তো থাকবেন। ঘরটা তোলা নিয়ে কথা..... তা তিনটে ঘর, দুটো বাথরুম.....হয়ে যাবে।
—হয়ে যাবে নিশ্চয়। ছ'কাঠায় তিন কাঠা বেচলেই হয়ে যাবে।
—আপনার নামেই হবে।
—আমার নয়, দাদা বউদির নামে। ন্যালা আর ওর মা'র একটা ঘর থাকবে।
—ভাগ্যে কিনেছিলেন!
—সবের মূলেই বউঠান! জোর করে কেড়েকুড়ে নিয়ে নিল টাকা। বলল, তিনশো টাকা কাঠা! কেনো ঠাকুরপো। টাকা তোমার থাকবে না।
ননীবাবু সদুঃখে বলল, আমি কিনেছিলাম দু'শো টাকা কাঠায়। সদরও নয়, মহকুমা শহর। সেখানে জমির দাম চল্লিশ হাজার টাকা কাঠা হবে জানলে কি আরও জমি কিনতাম না? কে জানত, হাইওয়ে হবে, রেললাইন কাছে আসবে। মহকুমা সদর হবে টাউন। এখন ছেলে এমন গাল দেয় ''নির্বোধিতা করেছেন'' বলে, জানলে তো আমিই কিনতাম।
আমি বললাম, সে তো বটেই।
যা বললাম না, তা সবাই জানে, কেউ বলে না। ননীবাবু তখন তিনশো টাকা কাঠায় জমি কিনবে কি, কোনও জমিই কিনত না। জমিদারি এস্টেটের গোমস্তা, সে জমি বা বাড়ি কেনেনি, হাতিয়েছে। তখন পুকুর ধানজমি, ভালই গুছিয়েছিল, ছেলেরা বাগিয়ে নিয়েছে।
আমি জানি, বউঠানের তাড়ায় জমি কিনি, রেজেস্ট্রি করাই, পাঁচিলও দিই। ননীবাবু যতই বলুক, বৃদ্ধাবাস তো করব না। ''আদিনাথ—মৃণাল ভবন'' হবে নিচে দু'খানা, ওপরে একখানা ঘর। ঘোরানো সিঁড়ি ছাড়া সিঁড়ি থাকবে না। নিচে থাকবে ন্যালার মা। আমি ঘোরানো সিঁড়ি ধরে উঠে যাব ওপরে। ''নেউগী বংশের ইতিহাস'' লিখব হয়তো। অন্তত পৃথিবীর বুকে নিজের নাম লিখে যাবার যে মরীচিকা দেখে নেউগীরা প্রজন্ম হতে প্রজন্মে ধাবিত,—তার কিছু নোট করে রেখে যাব।
''তাপস কুমার ঘোষের মতে বর্ষপঞ্জী আর তিনশো পঁয়ষট্টি দিন থাকছে না। পৃথিবীর সূর্য ঘিরে আবর্তনের বলয়টি সঙ্কুচিত হচ্ছে। ফলে বর্ষপঞ্জী থেকে প্রত্যহ ০.১ মিলি সেকেন্ড কমে যাচ্ছে।''
এই যখন ব্যাপার স্যাপার। তখন নেউগীরা নিজ নাম স্থায়ী করার জন্যে কী কী অবিমৃষ্যকারিতা করেছে, সে তো আমার লিখে রাখা কর্তব্য। সেই কাজই করব।
সুভাষটার ঘোর সন্দেহ, একদা দাদাকে কিছু টাকা দিয়েছিলাম বলে, আমি কোনওদিন ও বাড়ির অংশ দাবি করতে পারি।
ছিল, এমন সন্দেহ তার ছিল। এবার তো কাগজপত্র হাবি জাবি, সকলই দিয়ে দিয়েছি। বললাম, দেখিয়ে নিও, দেখে নিও, এই বাড়ির উপর কোনও দখল নেই আমার।
মাধবী বলল, তোমার সম্পর্কে এমন কথা ভাববে কে? তুমি তো মামলা করতে যাবে না।
আমি ঈষৎ হেসে বললাম, এসব কথা উচ্চারণও কোরো না মা!
ব্যাপারটা এই, মামলা যদি করতে চাই, তাহলে আমাকে কেউ ঠেকাতে পারত না। মামলা করেই দাদার সোদপুরের বাড়ি খালাসও করাই, বেচেও দিই। বৃথা কাজ অনেক করেছি।
এখন আমার উদ্যম নেই। বয়স অনেক, শরীর শক্ত, এখনও কাজের কাজ করা বাকি।
ঘোরানো সিঁড়ি নাম দেব কি আমার সেই নোট বুকের, যার একটা পাতাও লেখা হয়নি কাগজে? শুধু মন লিখে চলেছে, মন। ঘোরানো সিঁড়ির বাঁকে বাঁকে কত না কথা, কত তথ্য!
ননীবাবু বলল, কী ভাবছেন?
—ঘোরানো সিঁড়িটার কথা।
—লোহার দামে বেচে দিলেও....।
—ওটা বেচা যাবে না। চলুন, উঠি।
—বাজার করে ফিরবেন না আজ?
—নাঃ, ঘরে আছে সবই।
—সবাই আসতে পারেনি!
—তাই কি পারে? বউঠান তো কোনও দিনই কাজের ব্যাঘাত করে ওরা আসুক, তা চায়নি। মাধবী এসেছিল, সে তো এমন নয়, যে কেষ্টনগরে থাকে! যতি, স্বাধীন, সুভাষ—এরা এল এই তো যথেষ্ট। বউঠান বুদ্ধি করে গ্রীষ্ম বা পূজার ছুটিতে তো মরেননি।
—ওরা কমই আসত।
—এঁরাও যেতেন না। দাদার তো বাড়ি বলে ম্যানিয়া ছিল। বউঠানের আবার সেন্টিমেন্ট জন্মে গেল, তোমার দাদারে কথা দিছি, বাড়ি ছাইরা যামু না।—এইসব হাবি জাবি আর কি...
ঈর্ষা—দগ্ধ নিঃশ্বাস ফেললেন ননীবাবু!
—চার ছেলে মেয়েই লেখাপড়ার রত্ন একেকটি। চারজনই কৃতী!
—হ্যাঁ, দাদা—বউঠানের কৃতিত্ব সেটা। স্কুলের রেজাল্ট দেখেই কলকাতায় রেখে পড়ালেন। ওরা স্কলারশিপও পেয়েছে, আমার কষ্টও করেছে! টিউশানি করা, মেসে হস্টেলে থাকা, কম কষ্ট নয়।
—আমার ছেলে দেখুন! এইচ. এস. তাও ''পি'' ডিভিশনে বিদ্যার জাহাজ!
—টাকা তো করছে!
—তা করছে!
আমি হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটাহাঁটিটা এ বয়সেও বন্ধ করিনি। এটি বন্ধ করলেই মরে যাব।
এতক্ষণ যা বললাম, ১৯৮৭ সালের কথা। বউঠান গেলেন। ওরা এসেছিল।
এই আট বছরে দৃশ্যপটে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যতিনাথের বউ সুলতা মাথায় রক্তচাপে অসুস্থ। কলেজে যেতে পারে না। ঘরবন্দী হয়ে আছে। সুলতার এক ভাইপো সস্ত্রীক ওখানে থাকছে। যতিনাথের খুবই লেজে—গোবরে অবস্থা।
মাধবীর ছেলেরা স্বাবলম্বী হয়ে সরেও গেছে, ও দেশেই যে—যার ব্যক্তিগত জীবন গড়ে নিয়েছে। সুভাষ বলে, বিয়ে, না বিয়ে নয়, তা জানি না। ওসব ভাববে কে?
সবুজ এ বয়সে মাধবীকে ছেড়ে আবার বিয়ে করেছে। এটা ঘটনা। মাধবী বছর তিনেক হ'ল দিল্লিতে। নিজের ফ্ল্যাটেই পেয়িং গেস্ট রেখে চালায়। নিজেও কোথাও পার্ট—টাইম কাজ করে।
স্বাধীন শ্বশুরাধীন ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর বউয়ের অধীন। সে সাত বছরে বার আষ্টেক ঘুরে গেল। প্রতিবারই সদরে ট্যুরিস্ট লজে থাকল,—গাড়ি করে ঘুরে গেল।
সুভাষ নয়, বিনির কথা ভাবলে কষ্ট পাই। ওর মেয়ে রুমা গত বছর মারা গেল। সে যে ভাল হত না, জড়বুদ্ধি মাংস স্তূপ হয়েই থাকত, একথা বিনিও জানে। কিন্তু বিনির অবলম্বন তো চলে গেল। সুভাষ বিনিকে নিয়ে ইউরোপ ঘুরেও এল, কিন্তু বিনির বিমর্ষতা কাটছে না।
আট বছর ধরে আমাদের প্রচুর পত্রালাপ হয়েছে। প্রধানত সুভাষের সেক্রেটারিকে দিয়ে লেখানো কাজের চিঠিপত্র।
তা আমি শেষ পত্রে লিখলাম, যা ঠিক করবে, করো। আমি সকল প্রস্তাবেই ''হ্যাঁ'' বলব, তবে একই শর্ত,—আমি ন্যালা ও ন্যালার মাকে নিয়ে চলে যাব। তোমাদের বাবা—মা, আমার দাদা—বউদির চেয়ে অনেক বেশি ছিল। পৃথিবীতে আমার আপনতম জন। তাদের সম্মানার্থে অনেক দিন কাটিয়ে গেলাম এখানে। এখন মুক্তি চাই। আমার বয়স পঁচাত্তর।
এরমধ্যে আশ্চর্য, বিনি একদিন এল। সঙ্গে এনেছিল একটি মহিলাকে,—যিনি বাংলার চেয়ে ইংরিজি বেশি বলেন। কিন্তু ন্যালার মাকে ও ন্যালাকে নিয়ে বাড়ি পরিষ্কার করলেন দু'দিন ধরে।
বিনি একবারও রুমার কথা বলল না। শুধু বলল, মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কোনও স্কুল কাম মেডিক্যাল সেন্টার গড়ার পক্ষে বাড়িটা ভাল।
—কাজে লাগলেই ভাল। বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি তো মেলে না বিনি। কর্মেই বন্ধন, কর্মেই মুক্তি।
—হ্যাঁ কাকা..... কিন্তু আমার তো কিনে নেবার পয়সা নেই।
—সুভাষের আছে।
—ও মনে করে রুমার নামে মাদার টেরিজাকে দিয়ে দেয়া অনেক ভাল। ও নিজে কিছুতে জড়াতে চায় না। বন্ধুর অসুখ, ফুল পাঠিয়ে দাও। কারও জন্মদিন, উপহার পাঠিয়ে দাও। রুমাকে নিয়ে কষ্ট হচ্ছে? ওর নার্সকে নিয়ে লং ড্রাইভে বেরিয়ে যাও। সুভাষ খুব অপরিণত মানুষ।
—তোমার ওর ওপর কোনও রাগ নেই বিনি?
—একটুও না। মাত্র তো পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স ওর। রুমাও চলে গেল। সুভাষ আমাকে ছেড়ে দিক, আরেকটা বিয়ে করুক!
—করবে না?
—বিবাহিত জীবনের দায় স্বীকারে ওর ভয়।
—তুমি তো মেনেও নিলে এত বছর।
—রুমা ছিল না? ওঃ, সেই জাম গাছটা। ওর নিচে মা বসতেন রুমাকে নিয়ে। ও কাদায় গড়াত। পাখিদের কাছে ডাকত। সকালে পায়রাদের চাল দিত। কাকা! তখন তো তুমিও দেখেছ ওকে।
—বউদি তো ম্যাজিশিয়ান ছিল বিনি।
—মা যতদিন অসুস্থ, আমি রুমাকে নিয়ে কোথাও যাইনি? রাজস্থান, পনহেরী, হায়দ্রাবাদ....কিছু তো হ'ল না।
—বাড়ি এরা রাখবে না।
—দেখি....সুভাষ যদি রাজি হয়...
—না হলে?
—জানি না। চলে যাব পনহেরী। রুমার মতো ছেলেমেয়েদের ইনস্টিট্যুশনে সোশাল ওয়ার্কার হব। একটা কিছু করব। সুভাষ ....আমাকে অবাক করে দিচ্ছে। শুধু বলছে, যেও না। আমাকে ওর খুব দরকার।
—বাইরেই আলানফালান করে, ভেতরটা তো সেই চেনা সুভাষের। মধ্যবিত্ত মানুষ ঘোরানো সিঁড়ি ধরে হাইরাইজে ওঠে, কিন্তু তার রক্তের সংস্কার, মূল্যবোধ, একটা লক্ষ্মণের গণ্ডী দিয়ে রাখে। সংকটকালে বোঝে, বেরতে পারবে না। তুমি আর রুমা। ভাব দেখাত তোমাদের বাদ দিয়ে ওর চলবে। কিন্তু সেটা সত্য নয়।
—হয়তো তাই সত্য, সেটাই।
—ভাঙাচোরা সহজ, এ বয়সে কোন প্রেমিস থেকে শুরু করবে?
—রুমার কথা ভাবলে....
—আমারি কি মনে হয় না? বউদির কথায় তারে কোলে নিয়ে রুপোর বালা পরিয়ে এনেছি। শান্ত মেয়ে—কেন যে এমন হ'ল! যাক, সুভাষও কি তাই বলছে?
বিনি মাথা নাড়ল।
—সে কিছুই বলছে না। জমি বাগাচ্ছে, হাইরাইজ বানাচ্ছে। এটা তো উন্মত্ততা কাকা। তোমার একমাত্র সন্তান, সেও থাকল না। কার জন্য এত সম্পদ বানাচ্ছ? ও উন্মাদ হয়ে গেছে।
—যা ঠিক করবে, তাই করো মা! তবে আমি মনে করি, চলে গিয়ে রুমা তোমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। আমাদের গেনি পিসিমার কথা তো জানো।
—তাঁরও তো মেয়ে।
—মেয়ে তো বটেই। গেনি পিসিমার তেরোতে বিয়ে, ষোলোতে মা। সে মেয়ে জন্মালই এক বিকৃত শিশু। দুটো পা পরস্পরের সঙ্গে জড়ানো, সম্পূর্ণ জড়বুদ্ধি।
—চিকিৎসা হয়নি?
—পূর্ববঙ্গের গজগ্রাম রে মা! অমন মেয়ের জন্ম দিয়ে গিনি পিসি অপরাধী। তা বাদে পিসেমশাইও মারা যান। উনি মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলেন। খুব, খুব নাটাঝামটা হয়েছেন। মেয়েটাকে একটা ঘরে বসিয়ে উনি সেই বৃহৎ সংসারের নানা কাজ সারতেন। বেলা গড়ালে মেয়ের মলমূত্র পরিষ্কার করে তাকে নাইয়ে ধুইয়ে ভাত মেখে খাওয়াতেন, তারপর নিজে স্নান করে খেতেন....
রোগা, ফর্সা, চুল ছাঁটা গিনি পিসি, হাবির মা হয়ে যে কী নরকদণ্ড ভোগ করে গেলেন!
সে মেয়েও একদিন রজঃস্বলা হয়েছিল। সব করে দিতেন গিনি পিসি। এই দণ্ড ভোগ করেন তিনি নব্বই বছর। ততদিনে ভাইয়ের নাতির গলগ্রহ হয়েছেন, বসবাস গোয়ালের পাশে। বলতেন, আমি তো পারিনি। ''দেখ, আমি মরলেই ওরে তোরা বাঁশবনের ডোবায় ফেলে দিয়ে আসিস। অনেকবার ভেবেছি, পরিনি।''—এ কথা বলতেন।
হাবি থেকে থেকে হাঁ করে করে হাসত আর দুলত। ও তো বসতে বা শুতে পারত না। দু'হাতে ভর দিয়ে বসে বসে দুলত।
চুয়াত্তর বছর মাকে যমযন্ত্রণা দিয়ে, চুয়াত্তর বছর বয়সে হাবি একদিন মরে গেল। নড়ে না, চড়ে না, কাঠ।
আর হাবি মরতে না মরতে গিনি পিসি মাঘের বিকেলে গোয়াল ছেড়ে বাইরে গিয়ে শুয়ে থাকলেন গাছের নিচে। ''ওই হিমে জাড়ে মরে যাবে'' শুনে বললেন, কোনদিন তো জ্বরজ্বালা, অসুখ পালা হয়নি এবার হবে, জ্বরজ্বালা হয়নি। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়ে মরে গেলেন।
গেনি পিসির কথা শুনলেই আমার বউঠান শিউরে উঠতেন। বলতেন, কেমন নিয়ম ঠাকুরপো? একা মা দোষের দোষী হয়ে থাকলেন? তখন তো মাসে দুটো টাকা আর কাপড় দিলে একটা কাজের মেয়ে রাখতে পারত।
বিনি বলল, তাঁরা তো নেই।
—নেই তো বটেই। হাবি কিন্তু চুয়াত্তর বছরে মারা যায়। রুমা তোমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। তাই বিনি! যা কোরো ভেবে চিন্তে কোরো। সুভাষ ও তুমি, এক সঙ্গে থাকো, বা দূরে,—এ—ওর শত্রু হোয়ো না।
—না, শত্রু হব কেন?
—হয়, তাও হয়।
—আগেও হত?
—নিশ্চয়। তোমরা কী মনে করো? যা হয় তা এখনই হয়? সবই আগেও হত। বহিরঙ্গ পালটায় রে মা! ভিতর ভিতর আমরা খুব সেকেলে। খুব কি বদল ঘটেছে? আমি তা মনে করি না।
—খুব নেতিবাচক মন্তব্য।
—শুরু হয়েছে, কিছু কিছু প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, তবে সেকালেও ব্যতিক্রম দেখা যেত।
—কাকা!
—বলো।
—ন্যালা, ওর মা.....
—আর আমি?
—কোথায়?
—যাব কোথাও। আমার বয়সই কি কম হ'ল? তবে বউদির কাছে কথা দিয়েছিলাম, তার সন্তানদের হাতে বাড়ি তুলে দিয়ে যাব। তার অবশ্য শেষে জ্ঞানোদয় হয়েছিল। বুঝত যে ছেলেরা বা মেয়ে কেউ থাকবে না।
—বড়ই অবহেলা পেয়ে গেলেন।
—কিসের? আমি ছিলাম না? দাদার নির্দেশ ছিল, ও বাবা! বউদির তুচ্ছতম ইচ্ছাও অপূর্ণ। রুমার কল্যাণে এ বাড়িতে সত্যনারায়ণ পূজা কতবার হয়েছে, তা তোমরা খবরও রাখো না। আরে ন্যালার উপর.... ওঁর যে টান...
—কাকা!
—হ্যাঁ, সে জন্যই। থাক, বিনি, কাল তোমরা যাবে।
বিনির বান্ধবী মহিলা ঘরে ঢুকলেন। বললেন, বাড়ি ঝকঝকে করে দিলাম। অবশ্য তেমন অপরিষ্কার ছিল না।
বিনিরা চলে যাওয়ার পর আমি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ন্যালাকে বললাম, কেমন দেখছিস?
—খু—উ—ব ভাল।
—এমনই রাখবি। যা, ফুল লইয়া আয়। নিত্য ঘরে ঘরে ফুল রাখবি। ধুনা দিবি। তারা আইলে যেমন চক্ষু ধাধায়।
—হ্যাঁ গো ছোটকত্তাদাদা!
—বিনিরে কিছু বলিস নি তো?
—না না। তিনি বলছিল, লোহার সিঁড়ি নিয়ে কাকা যাবে কোথায়?
আমি হাসলাম। ন্যালার চোখে ভীরু আশা, মিনতি, অনিশ্চয় ভবিষ্যতের ভয়।
বললাম, যেখানে যাই, তুই যাবি। তোরে আমি ভাসাব না। দাদা আর বউদি তোরে আমার হাতে সমর্পণ কইরা টিকিট কাটছে। যা, ফুল আন।
বাড়িটা সজ্জিত, ঝকমকে। দাদার জন্মদিনে আদিনাথ ও মৃণালের সন্তানরা আসবে।
আসুক, আমি তৈয়ার।
লোহার সিঁড়িটার উদ্দেশ্যেও বললাম, যাবি, যাবি।
সতীনাথ ও নিয়োগীদের বেভ্রম
ঘোরানো সিঁড়িটা যে কী ভাবে আমাদের জীবনের বিভ্রমের প্রতীক হয়ে উঠল, তাই ভাবি, আর ভাবি। সময় পরে অনেক পাব। এখন শুধু মুখ বন্ধ করি।
আজ বিকালে দেখি ননীবাবু আর তেমন মন খুলে কথা বলে না।
বললাম, নিরাশ হলেন মনে হয়?
—কোথায় আপনার বৃদ্ধাবাস? কী যে তুলছেন, বোঝাই যায় না।
—বৃদ্ধাবাসই হবে। বুড়া বুড়িরাই থাকবে। একেক জন একেক তলায়।
—জমিও বেচলেন না, ঘরের ভিত কাটছেন, ঘরও তো দেখি....
—নিচে একখান, রান্নাঘর, স্নানের ঘর।
—দোতলায়?
—একখান বড় ঘর।
—আপনি তো একা মানুষ। আমাকে অন্তত সঙ্গে রাখুন।
—নিজের বাসায় একা থাকব, সেই আনন্দেই মশগুল হয়ে আছি—যারে কয় বিভোর!
—এ টাউনে আপনি একটা রহস্য হয়েই থাকলেন।
—রহস্য থেকেই চলে যাব।
—অবশ্য এটা সবাই বলে, যেভাবে দাদা—বউদির সেবা করেছেন...
—এর শতগুণ করলেও যথেষ্ট হত না।
—সন্ন্যাসী হবেন না তো?
—ধুর মশাই! ধপধপে জামা ধুতি পরি, লাইব্রেরিতে যাই, সভাসমিতিতে ডাকলেই যাই। এগুলো কি সন্ন্যাসীর লক্ষণ?
—বয়সও ....
—বয়সকেও আমি প্রশ্রয় দিই না।
—আপনার দাদা কিন্তু এমন টগবগে ছিলেন না।
—একো জন, একো রকম।
—বাড়িটা হচ্ছে, দোতলা সিঁড়ি?
—স—ব দেখতে পাবেন।
—গৌরাঙ্গকে দিয়েই করাচ্ছেন?
—প্রতুল গুহর ছেলে! ওর বাপ জেলে আমাকে দেশে দেশে বিপ্লবের ইতিহাস পড়িয়েছিল। বললাম, তোমার ফার্মের নাম আছে। সরকারি ঘরবাড়ি বানাও। এটা করে দাও। সে তো বলছে, কাকা পাগল। একটা পাগলের বাড়ি বানাচ্ছি। গৌরাঙ্গের তৈরি বাড়ির বৈশিষ্ট্য তা দশ বছরে ভেঙে পড়ে না।
—আপনার....কথাই আলাদা। তা নিচে থাকবে কে?
—ন্যালা আর ন্যালার মা, আর কে?
এই ন্যালার কথাও তো সূত্র নির্দেশপূর্বক ব্যাখ্যা করা উচিত। এটা ঘটনা, যে ন্যালার বাবা যোগীন এবং আমরা, একই জেলার একই গ্রাম থেকে আগত। বস্তুত টাউনে পৌঁছে যোগীনকে প্যাডলার হিসেবে দেখে দাদা ও বউদি খুবই আনন্দিত হন।
যোগীনরা সবাই পুবপাড়ায় এসে উঠেছিল। অধিকাংশ প্যাডলার। কেউ সবজি ও মাছের ব্যাপারী,—ওদের বউ বিটিরা শহরে ঝি খাটতে শুরু করে।
এটা খুবই স্বাভাবিক, যে যোগীনের অকাল মৃত্যুর পর ন্যালার মা এবং ন্যালা এ বাড়িতে বহাল হবে। ন্যালা বরাবরই অপরিণত মস্তিষ্ক। বয়স হলে কী হবে, ওর বুদ্ধিসুদ্ধি বাড়ল না। আমার তেজস্বিনী বউঠান ওকে ক্লাস টু পাশ করাতে পারলেন না।
দাদাকে ও বলত, বড় কত্তা দাদা।
বউদিকে বলত, কত্তা মা।
আমাকে বলত এবং বলে, ছোট কত্তা দাদা।
যতিনাথ, মাধবী, এরা একদা যোগীনকে ''যোগীনদা'' বলেছে। ন্যালাকে নিয়ে ন্যালার মা একটা আশ্রয় পেয়ে খুব অভিভূত হয়ে পড়ে।
ন্যালা বাগানের কাজ করতে, বাজার দোকান করতে, গাছে জল দিতে, দরকারে বিছানা মাদুর রোদে দিতে, কয়লা ভাঙতে, সব কাজে খুব উৎসর্গিত প্রাণ। কিন্তু লেখাপড়া বিষয়ে ওকে আগ্রহী করাই গেল না।
ন্যালার মা সাহায্য করত অন্যান্য কাজে। ওর একটা স্বপ্ন ছিল, যে কোনদিন ন্যালাও তার বাবার মতো সাইকেল রিকশা চালাবে। কিন্তু ন্যালা যোগীন নয়। উদ্বাস্তু যোগীন মণ্ডল যখন চলে আসে, পিছনে অপার জমিজমা ফেলে আসেনি। ন্যালার মা ওর দ্বিতীয়া। প্রথমা ও তাঁর ছেলেরা উচ্চাশাতাড়িত ছিল। শুধু খাটাখাটনির ক্ষমতা ও বুদ্ধির জোরে তারা এক ঘুমন্ত শহরের অর্থনীতিক জগতে গর্ত কেটে ঢুকে পড়ে।
আমি তো ওই প্রথম দিকের উদ্বাস্তুদের সেলাম দেই। জমি চাষ, পুকুর সংস্কার ও মাছ চাষ, সম্বৎসর কায়িক পরিশ্রমের কাজ, কী তারা করেনি। তারা তো ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক স্কুলেও ভর্তি করেছে। প্রথম ব্যাচের উদ্বাস্তুদের নাতিপুতিরা এখন তো রীতিমতো দাঁড়িয়ে গেছে। সুসংহত—শিশুবিকাশ—প্রকল্পে ওদের কিছু মেয়ে কাজ করে। শিক্ষকতায় ছেলে ও মেয়েরা তো আছেই। হাসপাতালের সামনের বাজারটি ওদেরই গড়া। আর আজ, প্যাডলারদের মধ্যে নন—বাঙাল একজনও আছে বলে জানি না। দেশে যোগীনরা স্কুলে ছেলেমেয়ে পাঠাবার কথাও ভাবত কিনা, সন্দেহ। দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হয়ে এসেই লেখাপড়ার দিকে ঝুঁকল এমন। আটচল্লিশ বছরের চেষ্টা, শতাব্দীর শেষে ফল দিচ্ছে।
ননীবাবু যা বলে, তা হল, ওঃ! এস. সি. আর. এস. টি। সোনার চাঁদ আর সোনার টিয়া! যত ব্যাপারে ওদের কথা আগে ভাবে সরকার!
এ বিষয়ে গৌরাঙ্গের মনোভাবও অনমনীয়।
—এতে ভাল হবে না। দেশ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। ও. বি. সি., আবার দলিত জাতি, সবাই যেন মাথা—চাড়া দিয়ে উঠেছে।
—ইতিহাসের নিয়মে ঘটছে গৌরাঙ্গ।
—আপনিও তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন।
—আমি কী করলাম?
—ন্যালা ''নমো'' নয়? আপনার পর টঙের ঘরে বসে থাকবে না ও?
আমি হাসলাম। অত তো ভাবিনি। গৌরাঙ্গের কথায় মনে হ'ল, ব্যাপারটি বেশ ''প্রতীকী''। গৌরাঙ্গর বেটা অরূপ এক সময়ে রাজনীতিও করত। সাহিত্য বাতিকও ছিল, কেন না কবিতার কাগজ বের করত। গৌরাঙ্গ বলত, শিক্ষা সমাপন এবং কাজে ঢোকা,—মধ্যবর্তী সময়ে ওর বাবারও সাহিত্য বাতিক ছিল, ওরও আছে।
অরূপ ভীরু ও কুণ্ঠিত হেসে বউদিকে ত্রৈমাসিক ''মর্মর'' পড়তে দিয়ে যেত। বউদি মোচা বা লাউ বা থোড় কুচাত,—সামনে বসে অনেক কথা বলে যেত। 'প্রতীকী'', ''বিমূর্ত'', ''ঐতিহ্যবাহী'' এসব শব্দ ওর পত্রিকাতেই দেখেছি।
তা প্রতীকী ব্যাপারই বটে। নেউগীদের তৈরি বাড়ির দোতলার ঘরে একদিন থাকবে যোগীন মণ্ডলের ছেলে ন্যালা মণ্ডল। অপরিণত বুদ্ধি, পৃথিবীর কাছে বিনা দোষে ক্ষমাপ্রার্থী, পর্বতসানুর অরণ্যে শিশিরের মতো নিষ্পাপ হৃদয় ন্যালা অবাক কৌতূহলে জানলা দিয়ে পৃথিবী দেখবে।
সবই ইতিহাসের নিয়মে ঘটে।
ইতিহাসের নিয়মে ন্যালা ও তার মা এ বাড়িতে ঢুকেছিল। ন্যালা অপরিণত মস্তিষ্ক, একান্ত এক হাবাগোবা ছেলে। ভয় পেলে ওর কথা আটকে যায়,—বাজারের হিসাবে ভুল করে ও নির্মল হেসে বলে, অত টাকা দাও কেন? আমি দশ পনেরোর পর আর গুনতে পারি?
এ হেন ন্যালাকে মেরে মাছওয়ালা গালের চামড়া ফাটিয়ে দিয়েছিল। সে খুবই এক মস্তান মাছ ব্যবসায়ী। আধ কিলোর বাটখারাটি কেন যেন ন্যালার খুব পছন্দ হয়েছিল। কিনছিল আড়াইশো চারা পোনা,—(আদিনাথ নেউগী গ্রীষ্ম হতে বসন্ত ছয় ঋতু জুড়েই চারাপোনা খেতেন) চাপিয়ে দিল আধ কিলোর বাটখারা।
বলে, আরও দাও। আরও মাছ দাও।
পরিণামে গালে চড়। ন্যালা কেঁদে কেঁদে বাড়ি এল। মৃণাল ঠাকরুণ বললে আমি মরতে পারি,—লক্ষ্মণ নয়, আমি লক্ষ্মণাতীত এক দেবর,—সে মস্তানের ব্যবস্থা করেছিলাম।
কিন্তু ন্যালাকে বোঝাতে পারি না যে ভুলটা তোর হয়েছিল।
সে সময়টা আবার রুমার চিকিৎসার এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। বিনি সে চিকিৎসার বিশদ বিবরণী দিয়ে চিঠি দিয়েছে।
বউদি দেখলাম, ন্যালার গায়ে হাত রেখে বসে আছেন।
বললাম, আজ কি আমাগো উপাস? না আপনে কোনও বর্ত করছেন?
বউদি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, না ঠাকুরপো, দেই! ভাবতে আছিলাম, রুমার মতোই তো ন্যালা! একোই অসুখ! ন্যালারে কেও মমতা করে না।
মনে মনে বললাম, আপনে করেন! যার আপনে আছেন, সে তো পুণ্য কইরা আইছে। সেদিনই বুঝেছিলাম, কেন ন্যালার প্রতি ঠাকরুণ এমন বিশেষ দৃষ্টি দেন, ওকে বাঁচিয়ে চলেন।
ন্যালার মা—র কোনও নিজস্ব নাম আছে কি না আমরা জানতে পারিনি। সে হট্টাকট্টা, মজবুত হাড়ের স্ত্রীলোক। ভূতগত না খাটতে পারলে তার ঘুম হয় না। ভূতগত খাটলে সে হাঁপায় না। চোখ মুখ নির্বিকার থাকে। গাছ থেকে নারকেল খসে পায়ে পড়ল, আঙুল ছেঁচে গেল। খানিক চুন হলুদ লাগিয়ে ও কাজে নেমে পড়ল। চোখে মুখে ভাব বদলায় না।
দাদা আর বউদি, দুজনেরই শেষ সময়ে দেখেছি ওর সেবা করা, জেগে থাকা। বড়জোর শেষ রাতে আমাকে ডেকেছে, ছোট কত্তা! বসেন গিয়া। আমি একটু চক্ষু বুইজা লই।
এখন যে বাড়ি এত খালি,—ন্যালার মা আছে বলে আমাদের তিনজনের সংসার চলে নিঃশব্দ নিপুণ পরিচালনায়।
সেদিন নারকেল পাতা চাঁছতে চাঁছতে বলল, ন্যালারে বিয়া দেওন কি উচিত হইত? বনমালীর বউ খুব ধরছে।
বললাম, কিছুকাল দেরি কর রে মা! অদের বাড়ি অরা বুইঝা নিক, তারপর!
ও নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমিও বুঝি যে দেহ য্যান কয়, পারতেছি না। অহনে তারা নাই। আপনেরও বয়স হইল, আমিও একদিন ... অরে কে বা ভাত জল দিব?
বউদি অত বলতেন, তখন রাজি হইলে মা! তিনি শান্তি পাইত।
—ন্যালার ফাঁড়া আছিল।
আমি কাগজ পড়ছি, ও নিপুণ দক্ষতায় নারকেল পাতা চেঁছে যাচ্ছে। খরশাণ বঁটি।
—ন্যালার পোলাও কি অর মতো....?
—না রে মা! তেমুন কুনও ডাক্তার কয় নাই।
—তয় বাড়ির বেপার মিটলে অর বিয়া দিতাম! অরে দেখত কে?
—তাই কইরো রে মা!
মনে মনে অবাক হলাম। এত নির্বোধ কেন আমি? আমি ন্যালাকে আমার স্বপ্নের বাড়িটি দিতে চাইছি। কিন্তু মায়ের মন আসল কথাটি ধরেছে। আমি নেই, ও নেই, তেমন পৃথিবীতে ন্যালাকে দেখবে কে?
—বনমালীর ভাইঝি খাটাপিটা মাইয়া। বয়সও বিস্তর। দাঁত উচা, চক্ষু টেরা, তাতেই বিয়া হয় নাই। বনমালীরাও কুটুম হইব।
—তাই হইব গো মা!
—কত্তা মা সরগ হইতে আশীর্বাদ দিব।
—আমি কি দিতাম না?
—আপনের কথা আলাদা। মরবেন একদিন ঠিকোই, সেদিন মুনি রিষির মতো ধু ধু কইরা পুণ্যবলে জ্বইলা যাইতেন। ক্যারেও কিছু করতে হইত না।
আমার এখন ভাবমূর্তি? ন্যালার মায়ের চোখে আমি এত বড় পুণ্যাত্মা?
বললাম, পুণ্যবানেরেও মশায় খায় রে মা? মশারিটা এট্টু সাইরা দিও।
—দিছি। কাইচাও দিছি।
ন্যালার মা মাসে দু'বার আমার বিছানা কাচে। ধুতি, গেঞ্জি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবী, খাদির গামছা, সবই কাচে প্রত্যহ। দোকানে ইস্ত্রি করায়।
নারকেল কাঠি ও বেচবে। নারকেল পাতা, ঝরা ডালপালা দিয়ে ও বাগানে উনোন জ্বালে। তাতে মাঝে মাঝে সোডা সাবানে সিদ্ধ হয় চাদর, পর্দা, ওদের কাপড় চোপড়।
সব চলে স্বর্গতা (এটা কথার কথা, স্বর্গ বা নরক বিষয়ে আমি ঘোর অবিশ্বাসী) মৃণাল ঠাকরুণের নিয়মে। যেন যে কোনও সময়ে পর্দা সরিয়ে তিনি মুখ বাড়াবেন।
আমরা নিয়োগীরা কয়েক পুরুষ ধরেই ইতিহাসের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলেছি এক ভয়ঙ্কর বিভ্রমের শিকার হয়ে। এ বিভ্রম কী, তা বুঝলেই বোঝা যাবে আদিনাথ কেন ঘোরানো সিঁড়িটি কিনেছিলেন।
এই বিভ্রম আর কিছুই নয়, ইতিহাসের বুকে নিজেদের নাম চিরস্থায়ী করবার প্রয়াস।
বংশবৃক্ষ আমি দেখিনি। কিন্তু পিতামহের মুখে শুনে শুনে সাপের মন্তরের মতো আউড়ে যেতে পারি। দাদা এ টাউনে বাড়ি করার সময়েও আমি বাধা দিয়েছিলাম।
বলেছিলাম, বাড়ি করবি কেন?
এখানে বলে রাখা দরকার, আমার পিতামহীকে অনেক দেখে আনা হয়েছিল, কেন না তাঁদের বংশের মেয়েরা সকলেই পুত্র প্রসবিনী।
আমার পিতামহও অনুরূপ কোনও বিবেচনায় আমার পিতামহীকে বিয়ে করেন।
পিতামহ বিশ্বনাথ বড়ই ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন অনেক কাল। যে দিনকালে ''ছেলে রোজগার করলে তবে বিয়ে'',—বঙ্গভূমির চিন্তাধারাতেই এ দূষণ প্রবেশ করেনি,—তিনি সে যুগেরই বঙ্গসন্তান।
হতে পারে তাঁর কপালে আব ছিল,—কিন্তু বেটাছেলের কপালে আব আজও বিয়ের প্রতিবন্ধক নয়। তখনও ছিল না।
''রোজগার করি, তবে বিয়ে করব'' বলে তিনি গ্রাম ত্যাগ করেন। রোজগার হয়নি, দেশ ভ্রমণ হয়েছিল। তখন ঢাকা থেকে ফরিদপুর বা বরিশাল বা রাজশাহী গেলেই তা দেশভ্রমণ বলে গণ্য হত।
ষোলো বছরে গৃহত্যাগ করে বাইশ বছরে তিনি ফিরে আসেন। এমন বাংলা ও অঙ্কে পারদর্শী, বহুদর্শী যুবককে জমিদার ডেকে সেরেস্তায় বসান। সেকালের নিয়মে তাঁর তিন টাকা মাইনে হয়। নায়েব বা গোমস্তার মাইনে নগণ্য হত। প্রজা ঘরে আদায় করেই তাঁরা সম্পত্তি বানাতেন।
বিবাহও হ'ল। শুনেছি পিতামহী সুন্দরী, মোটাসোটা এবং দজ্জাল ছিলেন। সম্পত্তি, আয়পয়, সবই হয়েছিল। কিন্তু পিতামহী ছয় কন্যা ও এক পুত্রের জন্ম দেন।
আমাদের সেসব পিসিমাদের কার কোথায় বিয়ে হয়, কিছুই জানতাম না। তবে আমি যখন অনেক পরে ''ইংরেজ রাজ! ভারত ছাড়ো'' করছি, তখন প্রথম যে দারোগার হাতে ঠ্যাঙা খাই, পরে তিনি বলেছিলেন, তিনি আমার মেজ পিসির ছেলে।
পিতামহ বিশ্বনাথ, পিতা গীতানাথ, কিন্তু প্রপিতামহ ছিলেন শশাঙ্কমৌলী। মনে হয় এঁরা অ্যাডভেঞ্চারাস ছিলেন। প্রপিতামহের পিতা শান্তাহারের কাছে বামুনপাড়া নামক গ্রামে জমিজমা করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ''মাট্যা দোতলা'' ঘর বানাবার। মাটির দোতলা ঘর কয়েকটি তুলেছিলেন। সবাই বলত ''নেউগীবাড়ি''।
প্রপিতামহ কেন বামুনপাড়া ছেড়ে ঢাকায় গোবিন্দপুর গ্রামে আসেন, তা জানি না। তাঁর অবশ্য চার ছেলে ছিল, এমন শুনেছি। অর্থাৎ পিতামহের আরও ভাই ছিলেন।
এও শুনেছি, প্রপিতামহের মৃত্যুতে প্রপিতামহী ''সতী'' হতে মনস্থ করেন। কিন্তু এক বেয়াড়া 'কায়েত দারোগা'' এ সংকল্পকে বাস্তব হতে দেননি। পরে প্রপিতামহীর ইজ্জত খুব বেড়ে যায়, কেন না তিনি ''সতী'' হতে চেয়েছিলেন। ইনি মটকা বা তসরের থান পরতেন, মাথা নেড়া করেছিলেন এবং হবিষ্যান্নের বদলে আম, কলা, কাঁঠাল ইত্যাদি ফল এবং দুধ—দই—ক্ষীর খেতেন।
গোবিন্দপুরে এসে প্রপিতামহ আবার কুহকিনী ইতিহাসের প্রলোভনে ফেঁসে গেলেন।
—''ইট পুরাইয়া দালান দিমু'' বলে বসলেন। বললেন, ভবিষ্যতে আমার পোলারা দালান রক্ষা করবে। এই গ্রামে নেউগীদের নাম অক্ষয় হইব।
অক্ষয়চন্দ্র মুস্তাফি (''সরল পাটীগণিত'' খ্যাত ভূষণচন্দ্র মুস্তাফির পিতামহ) পই পই করে নিষেধ করেন প্রপিতামহকে।
—নবাবী আমলে যারাই দালান দিছে, তারাই সবংশে মরছে। তাছাড়া নদী তীরে বাস! এই নদী কীর্তিনাশা! এমুন কাম করবেন না।
কে শোনে কার কথা! আমার বাবা যেমন বলতেন, হোআট ইজ পুরুষ মানুষ, বাট জেদ?
পুড়ল ইট, উঠল দালান। গ্রামে দালান বাড়ি কার? না নেউগীদের! দালান বাড়ি হ'ল, অন্দরের মহিলাদের পুকুর হ'ল ; —বাইরে বারোয়ারি পুকুর। পুকুরে কাছিম আনিয়ে ছাড়া হ'ল। খুব ঢাক ঢোল! খুব ধুমধাম!
গোবিন্দপুরে নেউগী বাড়ি কোথায়? গোবিন্দপুরই বা কোথায়। ডাউন দি ড্রেন নয়, ডাউন দি রিভার। সে নদীর নাম কীর্তিনাশা নয়। কিন্তু যে নদী মন্দির—মসজিদ— ইমারত— দালান—কুটীর—শস্যক্ষেত্র খেতে খেতে যায়, সেই কীর্তিনাশা। নেউগীদের নাম চিরস্থায়ী হবে, একই বাড়িতে পুত্র—পৌত্র—সবাই ক্যালব্যাল করবে,—জন্ম—উপনয়ন—বিবাহ—মৃত্যু—বৈধব্য—তীর্থভ্রমণ—স্ত্রী—কোন্দল—ভায়ে ভায়ে বিবাদ পূজা—ব্রত—গুরু দীক্ষা ইত্যাদির চক্র ঘুরতে থাকবে,—দেয়ালে অনেক বসুধারা আলপনা,—ঠাকুরঘরে মৃতদের পায়ের আলতার ছাপ দেয়া কাগজ থাকবে,—সে স্বপ্ন আক্ষরিক অর্থেই জলে গেল। এক অর্থে ওই বাড়ি এবং ঘোরানো সিঁড়ি, দুরাশারই প্রতীক। এক স্বর্ণমৃগ প্রজন্ম হতে প্রজন্মে আমাদের ঘোল খাওয়াচ্ছে।
আমাকেও ছাড়ল না। ন্যালা এবং দোতলা।
পিতামহ বিশ্বনাথ দেশভ্রমণ ও জ্ঞান আহরণের পর যে জমিদারের সেরেস্তায় ঢুকলেন, তিনি পিতামহকে বসত করালেন রংপুর—নীল—ফামারিতে।
সেখানেই তিনি সেরেস্তায় নায়েব। সাদা টাট্টু ঘোড়া চেপে মৌজা দেখতেন।
নেউগীরা পৃথিবীর মায়া কাটাবেন না বলে মনে মনে উদাসীন সাজে সেজেছিলেন। যিনি বাইরে বেরোতেন, তিনিই আর ফেলে আসা ঘরে ফিরতেন না, এটা ঘটনা।
প্রপিতামহ তস্য পিতা, ভাই, বোন, আশ্রিত পরিজনের খবর রাখতেন না। প্রবণতাটা পাশ্চাত্য জগতের মতো। নিজেরটুকু নিয়েই থাকতেন। বামুনপাড়া থেকে গোবিন্দপুর থেকে নীলফামারি, কী অসম্ভব দেশ—দেশান্তরে খুঁটি পুঁতে ঘর বানানো!
এরপর কেন তিনি পাবনা চলে আসেন, সে ইতিহাস অলিখিত।
পাবনা জেলাতেই দুর্গাবাড়ি গ্রামে তিনি বসত করেন। যথারীতি সেখানেও তিনি নেউগীদের এক বিশাল বাড়ি তৈরি করেন। এ বাড়ির বর্ণনা আমি খুব শুনেছি। শুনে শুনে ফুরাত না।
বাবা বলে যেতেন স্মৃতি থেকে। ততদিনে কথা বলার রীতিতেও পাবনার টানটোন ঢুকে পড়েছে বলে বুঝি। বাবা অবশ্য ছয় বোনের পরে এক ভাই, একমাত্র ভাই তিনি।
স্ত্রী—জাতির অ্যাটেনশান খুব পেয়েছিলেন। বোনদের কোলে কোলে ঘুরতেন। ছয় বোনে ভাইফোঁটা দিত। তিনি চাকরের কাঁধে চেপে পাঠশালা যেতেন। পাশের গ্রামে হাই স্কুল ছিল। ফলে ম্যাট্রিকও পাস করেন,—পাবনা টাউনে কলেজেও যান।
তখন অবধি তিনি নেউগী বংশের সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত লোক আই.এ. ফেল।
সেই বাড়ির বাইরে ছিল কাছারি ঘর, যেখানে বসে পিতামহ কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে আমিনের নক্সা চেকের কাজ করতেন।
কাছারি ঘরের মুখোমুখি ঠাকুর মণ্ডপ। কেন নেউগীরা দুর্গা, লক্ষ্মী, কার্তিক, কালী, জগদ্ধাত্রী ইত্যাদি পূজায় অধিকারী ছিলেন না, তা আমার জানা হয়নি।
অন্দর মহলে প্রশস্ত উঠানের চার কোণে চারটি বড় বড় মাটকোঠা ছিল। টিনের ছাউনি দেওয়া।
পিতামহী জলচৌকিতে বসে সংসারের তদারকী করতেন। এক জামাইকে ঘরজামাই রেখেছিলেন। ফলে সংসারে ছেলেপিলের অভাব ছিল না। কিন্তু ছেলের ঘরের নাতিপুতি, সে না হলে কি মন ভরে? বাবার আবার গ্রামের জীবন খুব নিস্তরঙ্গ লাগত।
গ্রামে তাঁর সময় কাটত তারানাথ মৈত্রের সঙ্গে। তারানাথ ও বামানাথ গ্রামে স্বদেশী হাওয়া এনেছিলেন। তাঁরা মাঝে মাঝে ভিটা দর্শনে আসতেন। গ্রামদেবতা ভদ্রকালীর পূজায় অবশ্যই আসতেন। বাবাকে তুইয়ে তুইয়ে তাঁরা কলকাতায় আনেন। সেখানে তাঁদের কুমুদ্রিত এবং প্রায় বাজেয়াপ্ত হওয়া কাগজের প্রেসে চাকরি দেন। কাগজের নাম আজ ''ভৈরব'' তো কাল ''স্বরাজ'', কাল ''স্বরাজ'' তো পরশু ''ভৈরী''। অবশেষে পিতামহ জানতে পারলেন, তারানাথ তাঁর মেয়ে শশীপ্রভার সঙ্গে পিতার বিয়ে দিচ্ছেন।
এ বিয়ে নিয়ে দুই পরিবারে এক প্রখ্যাত কলহ বাধে। তারানাথের মেয়ে শশীপ্রভা রাঁধে বাড়ে, সকলকে পরিবেশন করে ভাত, ইলশার মুড়ো দিয়ে কচু শাকের ঘণ্ট, ইলশার ঝোল, তেঁতুলের টক।
ওইটুকুই যা দেখা শোনা। কিন্তু পিতামহ বেজায় খেপে যান। বলেন, বড় ঘরে বিয়া দিতাম। তারা সোনায় সাজাইয়া দিত। মাইয়া দেখাইয়া আমার পোলারে ভোলাইছে।
পোলা অবশ্য মাইয়ার, অথবা আমার মায়ের হাত ও পা ছাড়া কিছুই দেখেননি। তখনকার নিয়মানুযায়ী তারানাথ ও বামানাথের প্রেসে যারা কাজ করত, আসত যেত, সকলেই তাঁর বাসাতেই খেত। সকালে মুড়ি গুড়, বড়জোর নারকেল কোরা,—দুপুরে ও রাতে ভাত। শশীপ্রভা পরিবেশন করতেন সর্বাঙ্গ আঁচলে ঢেকে। শশীপ্রভাকে বাবা মুখ তুলে দেখেননি। তারানাথই প্রস্তাবটি করেন পিতামহের কাছে। কারণ? অন্য মেয়েদের বিয়ে দূরে দূরে হয়েছে। ছোট মেয়েটিকে তিনি একটু মাঝে সাঝে চোখের দেখা দেখতে চান।
পিতামহী যথেষ্ট ফোঁসফোঁস করেছিলেন। কিন্তু ছেলেকে স্বগ্রামে বিয়ে দেবার জন্য লোভও হয়। তেরো বছরের এক ছলছলে বালিকা,—ভদ্রকালীর পুজোয় তাকে দেখেছেন, বেশ মেয়ে!
মেয়ের বাপ—মা যেখানেই থাকুন, মেয়ে তো থাকবে তাঁর কাছে। মেয়ের ঘরের নাতিনাতনি নিয়ে তিনি কতকাল ঘর করবেন?
পিতামহ অচল, অটল।
এই বড় বড় কোঠা, কাঁঠাল কাঠের চৌকি ও সিন্দুক, কয়েক সিন্দুক ঠিকরে দেওয়া বাসন কোসন, এ কি কম বৈভব?
জমির ধানের চাল আছে, গোহালে গরু আছে। বুকের সবচেয়ে গভীরে আছে বিশ্বনাথ নেউগীর আটচালা মাটকোঠার পর মাটকোঠা। বাইরে থেকে অন্দর দেখা যায় না, কলকে ফুলের গাছের বেড়া।
নেউগী বাড়ি বললেই সবাই চেনে।
বউ আনবো সলপ বা সিরাজগঞ্জ থেকে। বস্তুত সিরাজগঞ্জের সান্ন্যালরা বিশ্বনাথের ছেলেটিকে মনে মনে বেছেই রেখেছেন। তাছাড়া, তারানাথ ও বামানাথ, এ গ্রামে সাবজেকট অফ সাসপিশাস। কেন তারা সাহেব তাড়াতে চায়?
কেন তারা স্বদেশী—করা ছেলেদের বাড়িতে রাখে? কেনই বা শোনা যায়, তারা ''অনুশীলন'' বা 'যুগান্তর'', কী সব দলের সঙ্গে আছে?
পিতামহী বললেন, লয়েন, আরও বাড়ান বিষয় আশয়। ভোগ করব মেয়ে জামাই।
—সকলই গীতানাথের।
—আমি তো মাইয়া মন্দ দেখি না। বাপ—জ্যেঠা সন্ন্যাসী বললে হয়। ওই মাইয়া সংসার চালায়। অর মা বাতে বিছনায় পইড়া থাকে। জ্যেঠি আজ কলকাতা, কাল তারানগর ছুটে। সে তো বাপের বাড়ি চিন্যা থুঁছে।
—আরে! এই যে সম্পত্তি কইরা থুছি, এ তো পোলার লিগ্যা। জমজমাইয়া বিয়া দিমু, নবীন সান্ন্যালরে শ্বশুর পাইব। সরকারি উকিলরে শ্বশুর পাওয়া কম ভাগ্যের কথা? মাইয়ারে দিবে কী জান?
—ছি ছি! পোলা ব্যাচবেন?
—তোমার পোলারে সরকারি চাকরি কইরা দিবে। গরমেনের চাকরি, ভাবতে পারো? দুর্গাবাড়িতে পোস্ট মাস্টার হইছে একা নবনী রায়। তাতেই তার লেজ ফুইলা কলাগাছ। পূজায় আইল, তো খালি ইংরাজি শুনায়।
—দেহেন আপনি! আপনাগো বংশে কে বা পোলা লইয়া ঘর করছে? কে বা এক ভিটায় তিন পুরুষ থাকছে? আমার কই এক পোলা! ছয় মায়্যারে ভাল বংশে দিছি। পোলার মনে বেথা দিয়া আমি কাম করুম না। হেয় যাতে মন সন্তুষ্ট, হেই করুক।
পিতামহ কিছু থতমত খেলেন। কিন্তু স্ত্রী—বুদ্ধির কাছে পরাজিত হতেও কিন্তু কিন্তু লাগছিল। কিংবা নিজের জেদটি বড় হয়ে উঠেছিল। ছেলেকে তিনি পত্র লিখে গ্রামে ফেরার জন্য হুকুম দিলেন।
তা—না—না—না করে বাবা আষাঢ়স্য চতুর্দশ দিবসে গ্রামে এলেন। তিনি এক নৌকায়, আরেক নৌকায় সপরিবারে তারানাথ ও বামানাথ।
তারানাথ ছিলেন খর্বকায়, তেজস্বী, গৌরবর্ণ, অতীব ক্রুদ্ধ। তিনি পিতামহকে গোপনে যা বললেন, তেমন কথা ১৯১৬ সালে অন্তত কেউ কোথাও শোনেনি।
তারানাথ কাঁপতে কাঁপতে (রাগে) বললেন, মায়্যা বই কাগজ পড়ে, তার বুদ্ধি পাকছে। আপনের পোলা কই, দ্যাবাংশী পোলা! কুনোদিন তারে চাইয়া দেখে নাই। বিয়া ঠিক করছিলাম মাইয়ার। আমার বড় বউঠানের ভাস্তা। আদালতে কাম করে, হুনারি পোলা। বউ মরছে, বিয়া করবো। তা আমরা কথাবার্তা কইত্যাছি, এমুন সময়ে ছুড মাইয়া চিল চিৎকার করল।
—ক্যান? ক্যান?
—আমার মাইয়া এক গাছ দড়ি লইয়া ঘরে গিয়া দরজা দিছে। হয় গীতানাথের লগে বিয়া দেও, নয় গলায় দড়ি দিমু, নয় পুকুরে ডুইবা মরুম। গাল পাইরা রাখি নাই কিছু। মাইয়ারে কাটতে বাকি রাখছি।
—অহন আইলেন বা ক্যায়?
—অরে বিয়া দিয়া ফিরুম। কী আছে! রায় বাড়ির সুবইল্যা খায়, দায়, ভেরেণ্ডা ভাজে, অর লগেই বিয়া দিমু। যান, পোলার বিয়া দেন গা!
এমন চমকপ্রদ ঘটনা দুর্গাবাড়িতে কেন, আশপাশেও ঘটেনি। শশীপ্রভা দ্বাদশোত্তীর্ণা বালিকা মাত্র, গীতানাথের বয়স কুড়ি। গীতানাথ এসে চৌকিতে চিত হয়ে পড়লেন। বিশ্বনাথ বারবার গালাগালির গোলাবর্ষণ করলেন, ছেলে নিরুত্তর।
শুধু তাই নয়। কারও সঙ্গেই তিনি কথা বলেন না। শোনা যাচ্ছে ও বাড়িতে মেয়েও অন্ন জল ত্যাগ করে পড়ে আছে।
গ্রামে অনেক গুজব দৌড়তে লাগল। এমন ঘটনা আগে ঘটেনি কখনও। কোনও মেয়ে বলেনি, ওই যুবকটিকে বিয়ে করব।
এর মূলে কী আছে? কলকাতা বাস? বই কাগজ পড়া? থিয়েটার দেখা?
সে তো হতে পারে না। তারানাথের বাড়ির মেয়েরা যোগে গঙ্গা স্নানে যায়, থিয়েটার দেখে না।
এক হাতে কি তালি বাজে?
দু'হাতে কি বাজেনি?
আগেই বলেছি, পিতামহী দজ্জাল ছিলেন। তখনকার দিনে তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন।
—মেয়ে যে অন্নজল ত্যাগ করেছে, সে মরলে তো আমরা পাতকী হব।
তারানাথের ''স্বদেশী দোষ'' আছে, সে বাড়িতে থাকত গীতানাথ,—সব জেনে শুনে সান্ন্যাল, সরকারি উকিল, মেয়ে বিয়ে দেবে?
—মাইয়া কই মন্দ নয়। চলাফিরা ভাল। চক্ষু নামাইয়া কথা কয়। হ! জিদ বিস্তর! তা আমার পোলারও তো মাজাভাঙা, ভিতু! এই বিয়া দেন,—যত কথা উঠছে, হকল চাপা পইড়া যাবে।
পিতামহ বললেন, হারামজাদায় আমারে জুতা মারল। ছি ছি ছি!
—তয় কি পোলার মরা মুখ দ্যাখবেন? হেয় তো খাওয়া ছাইরা দিছে। আর! এ বিয়া যদি না হয়, বামুনের বিটি আপ্তঘাতী হয়, আমাগো পাপ হইত কি না বলেন!
হাহাকার করতে করতে বিশ্বনাথ ও তারানাথ বেহাই হলেন। তুমুল বর্ষণ,—মণ্ডপঘরে বিয়ে হ'ল। শশীপ্রভা তেমন অলঙ্কার আনেননি। পিতামহী তাঁর গয়নায় সাজিয়ে বউ ঘরে তুললেন।
বললেন, ন্যাও! অহনে ঘর সংসার করো, শ্বশুররে দ্যাবতা জানবা,—এই সেজ ননদ ঘরে থাকবো। আর পোলাপানরে দেখবা। আর! আমারে নাতি নাতিন দাও। সেই হুতাশে তোমারে আনছি।
কেন শশীপ্রভা খেপেছিলেন?
পাগলামি, নির্লজ্জতা, কী?
তার নাম প্রেম।
নেউগী বাড়িতে প্রাকবিবাহ বা বিবাহোত্তর প্রেম কেউ জানত না। প্রেম তো হ'ত না, বিয়ে হত।
আমার মাকে আমার যেমন মনে পড়ে,—স্বল্প বাক, সংযত, সভ্য, মার্জিত।
বাবার সগুম্ফ, বাঁকা সিঁথি, শার্ট, ধুতি ও বুট পরিহিত, কাঁধে চাদর,—প্রত্যহ গরম দুধ খেয়ে পেট বাজাতে বাজাতে শৌচালয়ে যেতেন,—ওঁদের বিয়ের মূলে প্রেম, তা ভাবতেও আমার দাদার আশ্চর্য লাগত।
মা মানে কঠোর নিয়মের শাসন। স্কুলে খারাপ ফল করলে কয়েকদিন খেলাধূলা বন্ধ। মা মানে, মোটা ভাত, ডাল, মাছের ঝোল ও পাতলা দুধ। মা মানে খাকি শার্ট ও হেঁটো ধুতি। জন্মদিন মানে পায়েস। মাসে মাসে বাধ্যতামূলকভাবে পিতামহ এবং মাতামহকে চিঠি লেখা।
এই বিয়ের পর কি বাবা দুর্গাবাড়িতে থিতু হয়ে বসেছিলেন?
না, না, না।
নেউগী বংশের কপালে ঘুরণপোকা।
১৯১৬ সালে বিবাহ। ১৯২০ সালের সাতাশে জ্যৈষ্ঠ মা যমজ ছেলে প্রসব করেন।
আদিনাথ সাত মিনিটের বড়, তাই সে দাদা।
আমি সাত মিনিটের ছোট, তাই আমি অনুজ।
দুর্গাবাড়িতেই জন্মাই আমরা। পিতামহ গ্রামে দই কাঁচাগোল্লা বিতরণ করেন, গিনি দিয়ে আমাদের মুখ দেখেন এবং মাকে মটরমালা দেন।
বাবা তখন নটাকোলে মাস্টারি করছেন।
নটাকোলই আমার স্মৃতিতে দেশের বাড়ি। মাস্টারি করার মূলেও মায়ের চাপ।
—শিক্ষকের কাজ ভাল। তারা ছেলেদের শিখায়। বিদ্যার তুল্য কী আছে?
নটাকোলে বাবা শিক্ষক, মা থাকেন দুর্গাবাড়ি। পিতামহ আছেন, পিতামহী আছেন, জাজ্জ্বল্যমান সংসার। তবে বুঝি, সেজ পিসিমা সুরধুনীর মনে ভয় ঢুকেছিল। বাবা দেখে শুনে অনাত্মীয়, অবান্ধব জামাই এনেছিলেন। তিনি পাঁচটি মেয়ের বিয়ে দিকে দিকে দেন। অনাথবন্ধুকে ঘরজামাই রাখা মানে তাকে অন্তত স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে দুধে—মাছে রাখবার ব্যবস্থা করে দেবেন।
ভাই বউ যে যমজ ছেলে বিইয়ে বসল, আর তো ভরসা রাখা চলে না। এনিয়ে ঘরে স্বামী স্ত্রী কানাকানি, পরে মা—বাবার সঙ্গে সক্রন্দন কোন্দল, পরে ভাই বউকে গালাগাল ইত্যাদি শুরু হ'ল।
শশীপ্রভার মৃদু উক্তি, ''আদিনাথ, সতীনাথ যেমন, ওরাও তেমন থাকবে।''
—তোমাগো গোলাম হইয়া?
এই পিসি চিরকালই পিতামহের রান্নাবান্না সেবা যত্ন করেছে, মায়ের মাথায় জবাকুসুম তেল মাখিয়েছে। রান্নার ভার ভাজকে ছাড়েনি।
এখন সে মহাকোন্দল আর কান্নাকাটি জুড়ল। ছুটি কাটাতে এসে কেচামেচা গীতিনাথ বললেন, হাত পুড়াইয়া কতদিন খাইতাম? অনুমতি দেন, অগো লইয়া যাই।
ঠাকুরদা বললেন, অ রে মূর্খ! বামুনের বলদ! একবার বারাইলে অরা সব লইব।
—সেজদিদিরে দেন অর্ধেক।
সে তো পিতামহ পারেননি। এনিয়ে বছর তিনেক জল ঘোলা হয়। পুত্রকে দেয় ভূসম্পত্তি। কন্যাকে কে দেয়?
—তারে তো আপনিই বসাইছেন।
—ঘর তুইলা দিতে পারি, জমি কিন্যা দিতে পারি। ঘরবসতের খরচ দিতে পারি, এ বাড়ির ভাগ দিতে পারি না। তরে ভাইবা সব করছি।
—সেজ জামাইদাদা তো আকম্মা। খায়, ঘুমায়, আর রায়বাড়ি যায়। রাখতে পারত না কিছু।
—তয় কী করন?
—ভাবেন। নেয্য যা হয়, তাই করেন।
দুর্গাবাড়িতে নেউগীদের স্থায়ী বসতির স্বপ্নের গোড়ায় ঘুণ ধরেছিল। অর্ধেক নয়, এক তৃতীয়াংশ মেয়ের নামে লিখে দিয়েই বিশ্বনাথ ভেঙে পড়েন। কোথায় তাঁর সুযোগ্য, শিক্ষিত, আই—এ. ফেল, কোটের উপর উড়ানি ফেলা পুত্র!
আর কোথায় নির্বোধ হাসি মুখে মেখে গোটা কাঁঠাল ও এক কাঠা মুড়ি খাওয়া জামাই! যে রাতে ঘুমায়, দুপুরে ঘুমায় এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় জীবিত, ভূমিষ্ঠ হয়েই মৃত, কয়েক মাসে মৃত সন্তানদের জন্ম দেয়।
পিতামহীও কম মর্মাহত হননি। মা আমাদের নিয়ে নটাকোল গমনের পর তিনি মরাকান্না কেঁদে শোক করেছিলেন।
পিতামহ গেলেন শোথ জ্বরে।
পিতামহী গেলেন নটাকোলে ছেলে—বউয়ের সেবা নিয়ে। আসার কালে সর্বস্ব গয়নাগাঁটি, বাসনকোসন, নৌকোয় বহে এনেছিলেন।
মাকে বলেছিলেন, গীতানাথ দুর্গাবাড়ি যাইয়া দখল নিব? বিশ্বাসও করি না। নেউগীরা নৌকার মাঝি। একেক থনে নঙ্গর ফালায়, আবার ভাইসা পড়ে। যাক, মাছ উঠাইয়া বেচছি,—দ্যাশে মাছের দর কি বা! ধান অর্ধেক বিলাইছি। চাল, চিড়া, গুড় নারকেল, ক্ষীরের পাতিল আনছি। আমি কই, আর বেশিদিন নাই। যে ক'দিন থাকুম, লাতিদের লইয়া থাকুম। তা....বউমা! অগো ভাইবোন হইব না?
মা মাথা নামালেন।
ঠাকুমা মানে একজন মোটাসোটা ফর্সা বৃদ্ধা, যাঁর গলায় আঁচিলটি আমরা নাড়তাম। ঠাকুমা মানে দুর্গাবাড়িতে আলেয়া ভূতের গল্প, ঝড় তুফানে নৌকা ডোবার কথা, কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাতে এক অপরূপা সুন্দরীর ব্রত কথা শুনতে আসা ও পাঁচালী পাঠ,—(প্রত্যূষে তাঁকে দেখা যায়নি, তবে উঠোনে আলতা পরা পায়ের ছাপ ছিল),—এমনই সব কথা। বাস্তব ও অবাস্তবে জড়ানো অতীত কথা বালক মনকে বড় সমৃদ্ধ করে। ঠাকুমা মারা গেলেন।
বাবা আর দুর্গাবাড়ি ফিরলেন না। ঈষৎ হেসে মাকে বললেন, নটাকোল গ্রাম বললে হয়, টাউন বললে হয়। ভাদুড়ীমশাই দানবীর জমিদার। পাঠশালা, হাই স্কুল, ইট বাধাইন্যা রাস্তা, শান বান্ধা পুকুর ঘাট, বান্ধা বাজার, পোস্টাপিস, কী নাই? গ্রামে চারখান ''দৈনিক বসুমতী' আসে, লাইব্রেরি কইরা দিছেন, কত কথা আলোচনা হয়!
মা বললেন, আর পুলিশ নজর রাখে!
—শচীন ভাদুড়ীর গ্রাম! রাখতেই পারে।
—তাই!
—এখানেই দালান তুলব, ভাবত্যাছি। জমি দিবেন, ইট দিবেন, ওনার মেস্তরি শস্তায় কইরা দিব,—জলের ইন্দারা, কুয়া পায়খানা, কেমন মনে কর?
—টাকা?
—মা আনছিল কিছু। বইলা গিছে, তর বাড়ি তুইলা নে।
আমরা আদিনাথের ঘোরানো সিঁড়ির কাছাকাছি চলে আসছি ক্রমে ক্রমে।
বামুনপাড়া, গোবিন্দপুর, দুর্গাবাড়ি, নটাকোল! বাবার স্বপ্নই ছিল দুর্মর। ঘর পাঁচখানা, ছোট ছোট। রান্নাঘর মাঝারি। উঠানটি মস্ত বড় ও বাঁধানো। ভাদুড়ী মশাই সহাস্যে বললেন, বল খেলবেন, না তীর বা বন্দুক চালাবেন?
বাবা বললেন, ছেলেদের পইতা, বিয়া, শুভ কাজে লোক খাইব না?
—আর একটেরে ঘরখানা?
—ছেলেরা পড়ব। অহন তো জমিজমা লইয়া চলত না ভাদুড়ীবাবু। ল্যাখাপড়া করব, মাস্টারি করব, দিন কি একোভাবে যাবে?
এই নেউগী বাড়ির নাম কিন্তু হয় ''বিশ্বনাথ—আলয়''। বাবা বলতেন, আর ঘুরে ঘুরে বেড়াব না। এখানেই থিতু হব।
ঠাকুমার মৃত্যুর পর আমাদের আরেক ভাই হয়, বোন আমাদের ছিল না।
ভাদুড়ী মশাইয়ের এই গ্রাম ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল। তিনি বিরাজমোহিনী হাই স্কুলের জন্যে ভাল ভাল মাস্টার এনেছিলেন,—তাঁদের জন্য একটি দশ কামরা বাড়ি ছেড়ে দেন। শহীদ শচীন ভাদুড়ী তো তাঁরই জাটতুত ভাই, এই স্কুলে পড়তে পড়তেই ক্লাস টেনের কিশোর ঢাকা চলে যায়। তারপর সাহেব মারতে গিয়ে মারা যায়। লাইব্রেরি সম্ভবত ওঁর বাবার স্থাপিত। ইনি তাতে বড় ভূগোলক, পৃথিবী, ভারত ও বঙ্গের বড় বড় মানচিত্র, অনেক অভিধান, অনেক রকম বই এনেছিলেন।
ওই স্কুলেরই ছাত্র মনীন্দ্রমোহন বিশ্বাস পাবনা জেলায় মাট্রিকে প্রথম হন।
শিক্ষকদের গ্রামে বসত করাবার স্বপ্নও তাঁরই। কিন্তু শিক্ষকরা সবাই রাজি হতেন না। বাবা রাজি হওয়াতে তিনি হাতে চাঁদ পান। স্বদেশী ভাবাপন্ন মানুষ, প্রখ্যাত অথচ গরিব দেশপ্রেমিক—সাংবাদিক তারানাথের মেয়ে বাবার স্ত্রী। ভাদুড়ীবাবু উচ্ছ্বসিত। মা লেখাপড়া জানতেন বলে লাইব্রেরির ভবানীবাবু মাকে বই দিয়ে যেতেন।
নটাকোলের স্মৃতিই আমার ও দাদার মনে সব চেয়ে প্রোজ্জ্বল। যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি, বিকালে এসে দেখি মা এক ফুটফুটে বালিকার চুল বেঁধে দিচ্ছে। সেটা ১৯৩৩ সালই হবে।
মা বললেন, এত চুল, নিজে বাঁধতে পারে না, মা সময় পায় না। চিনলি এ কে?
মুখ তুলতেই বললাম, এ তো মৃণাল! এক্কেরে জলের পোকা গো মা! ভয় ডর নাই। সাঁতরাদীঘিতে মাছের মতো সাঁতার কাটে।
মৃণাল জিভ ভেঙিয়ে বসে থাকল।
ভাদুড়ীবাবুর বাড়িতে তখনকার নিয়মেই অনেক পাতা পড়ত, অনেক লোক খেত। নিজের মা ও বিমাতা, আপন ও বৈমাত্রেয় ভাইরা, তাদের ছেলে মেয়ে, তিন বিধবা পিসি, তাঁদের ছেলেমেয়ে, লতায় পাতায় আত্মীয়, আবার অনেক অনাত্মীয়, দাস দাসী, বাইরের পাট করুনী, জলচল দাসীরা বাসন মাজত, জল—অচল দাসীরা ঘর—উঠোন লেপত, বোঝা বোঝা পাটকাঠি এনে কাঁঠালের আঠা জড়িয়ে মশাল বানাত। মৃণাল কোনও আশ্রিত বিধবার মেয়ে। বাড়িতে সবার মতোই থাকত।
স্বাধীনচেতা ছিল। সাপখোপের ভয় ছিল না, আম—জাম—তেঁতুল—জামরুল—নোনা—কুল—আমড়া টুকিয়ে বেড়াত। আমার মা ওকে আর ও বাড়ির আরও কয়টি মেয়েকে অক্ষর চেনাতেন।
মৃণাল বলত, স্কুলে আমাগো নেয় না কেন?
আমি বলতাম, তুই কি বেটাছেলে? ছেলেদের ইস্কুলে মেয়েরা যায়?
—পাঠশালে তো যাইতাম।
—আর যাস না?
মা কয়, বড় হইয়া গিছস। পইড়াই বা কী করবি? বিয়ার পর তো হাড়ি ঠেলবি।
—যাঃ। আমার মায়ে তো বই পড়ে।
—তিনি পণ্ডিতানী।
—ভাল কইরা পড় মৃণাল!
—ক্যান?
ভুরু কুঁচকে তাকাত ও। ফুটফুটে মুখ, ছিপছিপে গড়ন, চুল টেনে বেড়া বিনুনি বাঁধা। গাছকোমর বাঁধা শাড়ি। পায়ে মল।
—না শিখলে বররে চিঠি লেখতেও পারবি না, তার চিঠি পড়তেও পারবি না।
—আমি বিয়াই করুম না।
—তবে কী করবি?
—টোকন পিসি ভাদুড়ী বাড়িরই কেউ। বিয়ে করতে আসার কালে নৌকো ডুবে ভাবী বর মরে যায়। ফলে টোকন পিসির আর বিয়েই হল না। তিনি ঘোর অলক্ষণা বলে প্রতিপন্ন হলেন। না বিধবা, না সধবা, টোকন পিসি সারাজীবন বড়ি, আচার, কাসুন্দি সাম্রাজ্য সামলে গেলেন।
—থাকিস! থাকতে দিবে তোর মা!
—যারে মন লয় তারে বিয়া করুম!
আমি চমকিত হলাম। আমার তেরো, মৃণালের দশ পুরে এগারো। আমি বঙ্কিমচন্দ্র পড়েছি, গিরীন্দ্রমোহন সরখেলের ''কুন্দকুসুম'' পড়েছি। অবশ্যই মা'র কাছে শুনেছি ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল, কানাইলালদের কথা। পড়ার ক্ষুধা, জানার ক্ষুধা অসম্ভব। কিন্তু মৃণাল বলবে, ''যারে মন লয়, তারে বিয়া করুম'',—এমন কথা আমার কিশোর হৃদয় কাঁপিয়ে দিল। বললাম, ঘর যা মৃণাল! বড় পাকা হইছস!
মৃণাল জিভ ভেঙিয়ে পালাল। আম বাগানের অন্ধকার ছায়ার মধ্য দিয়ে মৃণাল মল ঝমঝমিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, এ ছবিটা এখনও আমি দেখতে পাই।
শুনতে পাই, তার সহাস্য কণ্ঠ, অ সতীনাথ দাদা! ঘরে যাও। তোমার মায়ে কাওনের পায়েস বানাইয়া বইসা আছে।
কী স্বাধীনতাই না ছিল সেদিনের মৃণালের!
এক পাল মেয়ে জুটিয়ে সাঁতরা পুকুরে এপার—ওপার সাঁতার কাটত।
আষাঢ়—শ্রাবণের ঝমঝমে বৃষ্টিতে যখন পুকুর ভাসত, কই মাছ ধরতে যেত।
বাড়িতে থাকত কতক্ষণ? সর্বদাই তো আমার মায়ের কাছে।
—দেন, শাক বাইছা দেই,—সরেন, উনানে ফুঁ দেই,—আমারে পোলা দেন, আপনে স্নান করেন গো।
ছোট ভাই মল্লিনাথ মৃণালের কোলে কোলেই থাকত। মল্লিনাথ বড়ই রোগা, বড়ই ফর্সা, বড় ক্ষীণজীবী ছেলে।
আমি চিরকালই ঘোর কালো। হট্টাকট্টা জোয়ান। স্কুলে ফুটবল খেলি। নৌকা বাইতে পারদর্শী, নদীতে সাঁতরাই, আর রাতে লণ্ঠনের আলোয় সখারাম গণেশ দেউকরের ''দেশের কথা'', ''মানিকতলা বোমার মামলা'' পড়ি।
দাদা ছিপছিপে, শ্যামবর্ণ, সুশ্রী,—লেখাপড়ায় খুব মন,—ও যে বড়,—ওকে যে বাড়ির দায় নিতে হবে,—এ বিষয়ে খুবই সচেতন। সবাই বলে, আদিনাথের মতো পোলা এ যুগে দেখা যায় না। আমাদের ভূগোল শিক্ষক সতীশ স্যার বলতেন, আদিনাথ সত্যযুগের ছেলে বললে হয়। সতীনাথ এ যুগের ছেলে। লেখাপড়ায় মন নেই।
মৃণাল যে মায়ের কাছে আসে যায়, এ নিয়ে নটাকোলেও গুঞ্জন হচ্ছিল। আদিনাথের মা সেমিজ পরেন, শহুরে সভ্য ভব্য ভাব! তিনি ছেলেদের পড়তে বসান। ভাদুড়ীবাড়ির পুজোপার্বণে যান, কিন্তু মেয়ে সমাজে খুব গলাগলি করেন না। পুকুরে যান না, বাড়িতে স্নান করেন। স্কুল প্রত্যাগত, অতীব অনুগত স্বামীকে মচমচে পরোটা ভেজে দেন, যা নটাকোলে তখনও প্রবেশাধিকার পায়নি। পূজার সময়ে নৌকায় গ্রামে কাপড়, পাথরের বাসন যেমন,—তেমনি বসুমতী প্রেসের ও দেবসাহিত্য কুটিরের বইও আসে।
বই কেনেন আদিনাথের মা।
আমার মা গ্রামে একটি সসম্ভ্রম রহস্য হয়েই থেকে যান।
মল্লিনাথের যখন ইনফ্যান্টাইল লিভার হয়, পাবনা শহর থেকে যতীন ডাক্তারকে আনা হয়েছিল।
মল্লিনাথ অবশ্য বাঁচেনি।
কিন্তু মা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময়ে ভাদুড়ীমশাই মৃণালের মাকে পাঠিয়ে দেন। যাও, পাকসাক কইরা দাও, উনারে একটু দেখো!
মা এল তো মেয়ে এল।
কয়েকদিন ওরা আমাদের বাড়িতে সকালে আসত, রাতে যেত। এর পরে পরেই মৃণালের মা একদিন মায়ের কাছে এলেন। বললেন, জানেন তো দ্যাশের কথা! অহনো চৌদ্দ পারাইতে মাইয়ার বিয়া দিতে কয় মানুষ।
—না, এখন আর তত বাড়াবাড়ি নেই।
—দিদি, আমি তো পরাশ্রয়ী, নিঃসম্বল মানুষ! বিয়াও দিমু অর ভিক্ষাসিক্ষা কইরা। অবশ্য যানার আশ্রয়ে আছি, তানার কথা বইলা পার পাই না। মেনির মতো এমুন কত মাইয়ারে বিয়া দিয়া দিছে!
—মৃণাল খুব ভাল মেয়ে।
—দিদি, এটা কথা!
—বলেন।
—পায়ে ধরি আপনার,—আপনের পোলারা য্যান সোনার পোলা! মৃণালরে যদি পায়ে ঠাঁই দেন!
—এরা তো আজও ছাত্র।
—তাতে কী?
—না, শিক্ষা শেষ করব, রোজগারি হইব, তয় না বিয়া! তারও দেরি আছে!
—দেখেন! মাইয়ার ভাবগতি দেইখা মনে হয়, ও যেমুন আপনের হাঁড়িতেই চাল দিয়া বইয়া আছে। কয়, আপনার নাখাল মানুষ এ গ্রামে নাই। ভাইবেন দিদি, কোন বা ঘরে যাইব, কেমন বা হাল হইব! মাইয়া তো আগুনের চেংরি। সে কয়, বিয়া বিয়া করো ক্যায়? টোকন পিসির বিয়া হইছিল?
মা বললেন, এখন তো ওসব কথা ওঠে না। পরে বলব আপনেরে। আমাগো না জমিজমা, না কিছু, ওই বাপের ব্যাতন টুকু,—তাও ভাদুড়ীবাবু দ্যাবতা কইলে হয়, তিনি অনেক করে। আম রে, মাছ রে, কাঁঠাল রে, ঘরে জামাইরা আইলে মিষ্টি মাষ্টা রে!
নটাকোল গ্রামই আমার মনে এক আশ্চর্য স্মৃতির আলপনা এঁকে রেখেছে। আমাদের ন্যালা বলে, কত্তামা যেদিনে মরল, সেদিনে দামা পাখি নেমেছিল বাগানে, জানলে ছোট কত্তাদাদা?
—এৎকাল বাদে সে কথা?
—না... ভাবি তো তিনি গেল কেন... আজ সপনে জাজ্যল্য দেকলাম দামা পাখি ঘুরছে।
হ্যাঁ, দশ বছরের কথা সপনে দেখিস!
—তুমি দেখো না?
দেখি, আমি দেখি। মৃণালের মা'র চিতা নিভে এসেছে, আমরা বসে আছি ঘাটে। দেখি, মা যাচ্ছেন ওর মায়ের কাজে। দেখি, ভাদুড়ীমশাই এসেছেন, ওর কোনও কাকাকে নিয়ে। বলছেন, এতকাল খবর ছিল না, অহনে বিধবার চাটিমাটি লইতে আইছে। কয় মৃণালরে দেইখা যাবে।
মা বাবাকে ডাকলেন। কী যেন বললেন। বাবা ভাদুড়ী মশাইকে বললেন, পোলাদের মা, মিরনালের মায়েরে কথা দিচ্ছিল আমার ঘরে অরে লইবে।
ভাদুড়ীমশাই চমৎকৃত!
বললেন, দেবতা! দেবতা তুমি নেউগী? আদিনাথের মা—ও স্বয়ং দেবী ঠাকরুণ! তয় আর কী! আর চিন্তা থাকল না।
রাতে যখন আমি আর দাদা পাশাপাশি শুয়ে আছি, দাদাকে খোঁচা মেরে বললাম, শুনলি?
দাদা ওই বয়সেই যেন ধীর স্থির এক বুড়ো। দাদা বলল, এ তো জানাই ছিল। মায়ে যহন অরে পছন্দ করছে, তহন আর কি ছারে?
আমি বলতেই পারলাম না আমার মনের কথা। বলব কাকে? মৃণাল আর আসেই না। বলব কখন? আমি, শচীন ভাদুড়ীর দাদার নাতি হাম্বির (শহীদের গ্রাম! হাম্বির, প্রতাপ, অর্জুন, ছিল নিজেদের দেয়া নাম। অনাদিনাথ, বাণেশ্বর, অনিলচন্দ্র নামে বীরত্ব কোথায়?) রাজেন গুহর ছেলে প্রতাপ, নেপু ভৌমিকের ছেলে অর্জুন, হাম্বির ও আমি তখন পাবনা থেকে সুকৌশলে আনানো বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের খবর—টবর পড়ে বি. ভি. হব ঠিক করেছি।
চলে যাব পাবনা। অতঃপর ঢাকা। দেশের জন্য আত্মবলি দিতে কিশোরদের রক্ত চাই।
তবে নটাকোলে নয়। এটাও ভাবলাম, যে মৃণালের মনে যদি কোনও আশা উন্মীলিত করে থাকি, সেটি উপড়ে ফেলা দরকার। আমি তারানাথের দৌহিত্র, (যাঁকে দেশ ও মানুষ ভুলে গেছে। 'আমার জীবন স্রোত'' নামক বই ব্যতীত তাঁর ছবি দেখা যায় না) আমি কেন নটাকোলে নেউগী বংশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করি?
পাবনায় ফুটবল খেলতে যাচ্ছিলাম, তা সবাই জানত।
তখন শরৎকাল। পূজা আসে আসে। অতীব প্রত্যূষে আমবাগান দিয়ে শর্টকাট করছি, সহসা দেখি মৃণাল।
রোগা, গম্ভীর, একবেণী ধরা, এক হাতে আঁকশি, এক হাতে সাজি, অনেক, অনেক শিউলি ও স্থলপদ্ম তুলেছে মৃণাল।
বললাম, তুই?
—অবাক হইলা?
—এত ভোরে.....এখানে....... কেউ দেখলে....
—নিন্দা হবে? কারে নিয়া? তুমি তো পলাতেছ!
—ঘর যা মৃণাল।
—যামু, কিন্তু কইয়া গেলাম সতীনাথদা, তুমি বড় নিষ্ঠুর। অনেক কষ্ট দিবা, আবার দুনো কষ্ট পাইবা।
—ঘর যা!
মৃণাল মুখ ফিরিয়ে গটগট করে চলে গেল। শারদ সকালের আলোছায়ার আলপনা মাড়িয়ে চলে গেল রানির মতো। আমি জানি ওর চোখে জল এসেছিল,—এও জানি যে ও আমাকে তা দেখতে দিত না। ও চলে যাচ্ছে, চলে গেল, শরতের মেঘ যেন।
বাবা—মা—দাদা, কাউকে বলে যাইনি।
পাবনা থেকে ঢাকা। হৃদয়ে প্রজ্বলন্ত স্বপ্ন। বি.ভি.—তে যোগ দেব, বিপ্লবী হব, ইত্যাদি। সেদিনের আন্তরিক উন্মাদনাকে অশ্রদ্ধা করি না। কিন্তু কোনও দলীয় শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাইনি,—কোনও পড়াশোনার পটভূমি তৈরি হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের কাছের এক গ্রামে প্রপার শেলটারেই যাই। সেখানেই হারাণ সাহার খোঁজে পুলিশ আসে। হারাণ সাহার বিধবা দিদি আমাদের সাহায্যও করেন। দিনে মানে অন্ধকার ঘরে পড়ে থাকা,—রাতে গোপনে অন্য গ্রামে নেতাদের ডাকে মিটিঙে যাওয়া,—এভাবে তিন মাসও কাটেনি। এরমধ্যে নিখিল দারোগাকে মারার চেষ্টা করলেন সতীশদা।' আমরা গ্রেপ্তার হয়ে গেলাম।
খবর নটাকোলে পৌঁছেছিল। পুলিশ বাড়ি তছনছ করেছিল সকলেরই। বাবা—মা—দাদা, ওদের কী অবস্থা হয়েছিল জানি না। তিন বছরের মাথায় খবর পাই, দাদার সঙ্গে মৃণালের বিয়ে হয়েছে। এভাবেই আমি ও মৃণাল ''বউদি'' ও ''ঠাকুর পো'' হলাম।
জেল থেকে বেরিয়ে কিছুকাল বাদে আবার জেল। আমার জীবনকথা বলতে তো বসিনি, বলব ঘোরানো সিঁড়িটির কথা।
আদিনাথ ও মৃণাল
এসব কথা দাদার কাছেই অতি বিতং করে শুনেছি, চোখ বুজে বলে যেতে পারি।
''বিপ্লব ব্যতীত স্বাধীনতা, স্বাধীনতা নয়'',—এমন বিশ্বাস থেকেই আমি গোপালদা'দের এ. এস. দলে যোগ দিই।
এক পক্ষে সে জীবন, এক অদ্ভুত জীবন।
যুদ্ধের ছত্রছান কাণ্ড, নাজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে মিত্রশক্তির যুদ্ধ, অক্ষশক্তির পরাজয়, স—ব আমরা জেলে বসে জানলাম।
কী হিটলারের সোভিয়েত আক্রমণ, কী হিরোশিমা ও নাগাসাকি, সব সময়েই জেলে।
কম্যুনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ কাগজে পড়ে ঘোর সংশয় প্রকাশ করতাম।
বেয়াল্লিশের আন্দোলন জানি না, মেদিনীপুরের সাইক্লোন, মানবসৃষ্ট মহামন্বন্তর,—কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই।
ছেচল্লিশ থেকে দাঙ্গার শুরু, সেও জানি না।
জাতীয় ফ্রণ্ট, বা হোমফ্রণ্ট, কী বা জানতাম? দেশে ও দুনিয়ায় কত কি ঘটে যাচ্ছে, আমি কারান্তরালে। স্বাধীনতা আসছে, তা জানতাম, স্বাধীনতা কেমন হবে, তা নিয়ে ঘোর বিতর্ক চলত।
হোম ফ্রণ্ট?
বাড়ির চিঠিপত্র পেতাম, লিখতামও। কিন্তু আমার পরিবার কী অবস্থায় ছিল, তা তারা বুঝতে দিত না। দাদা বিবাহের পর বি. এ. পাস করে। লিখেছিল, ডিস্টিংশনে পাশ করলাম, সে আনন্দ কালো হয়ে গেল। আমি তোর চেয়ে ভাল ছাত্র ছিলাম না।
দাদা কয়েকবার দেখা করে গেছে। আমার জন্য তোয়ালে, জামাকাপড়, খাবার দাবার আনত। অপ্রতিভ হেসে বলত, পাবনা স্কুলেই মাস্টার হলাম। তবে ইচ্ছা আছে, সার্ভে বিভাগে যোগ দিব।
আমি স্বভাবোচিত ঔদ্ধত্যে বললাম, সরকারি কাজ করবি? গভরমেন্ট—এর চাকর?
দাদা মৃদু হাসল।
বলল, বাবার বুড়া বয়সে হাঁপানি ধরল। বংশে কারও আছিল না। ঠিক মত স্কুল করতে পারে না। চাকরি পাইতাম তো টাউনে লইয়া...
—মা কেমন আছে?
—কেমুন থাকতে পারে তুই ক! আমি যে আইব, তাও তো লেখ্যা জানাইলাম।
—বউদি তো পাবনায়?
—কিয়ের পাব না? হে নটাকোলেই থাকে। অগো ছাইরা আসবে কার ভরসায়?
—তুই.... একা থাকস?
—মেসে থাকি। এহানে আইলে শিয়ালদায় হোটেল! ভাল থাকিস অইতা! চিঠি দিস মায়েরে,..... মায়ে কইছে, জেলে আন্দোলন কইরা মিয়াদ বারাস না। বাবার কই, দেহগতিক ভাল যায় না।
দাদার গলায় কোনও অভিযোগ ছিল না। কিন্তু পরে ভেবেছি, কেমন করে বলতে পারলাম, গরমেনের চাকর হইবি? দাদা! আমার নিরীহ, সহ্যশীল দাদা! সে তো নিরাপত্তা খুঁজছিল বাবা—মা—বউদির জন্যে।
বললাম, দাদা! তোর ছেলে?
—মা তর নামে নাম মিলাইয়া নাম দিছে যতিনাথ। ভালই আছে। মা তো অরে লইয়াই ভুইলা থাকে। খুব বেতিবেস্ত সবাই। কবে বা ছারা পাস!
—বাবার স্কুল? ভাদুড়ীবাবু?
—চলত্যাছে। তিনি তো গত বছর চইলা গিছে। পোলারা তেমুন নয়..... খরচ কমাইতেছে...... টোকন পিসি, মিরনালের মা.... শচীন ভাদুড়ীর বউ.....কবিরাজ মশাই.. অনেকে নাই। আমি কই, টোকন পিসি আর মিরনালের মা ভালই গিছে। বড় পোলার বউ বড় হেনস্তা করত। মিরনালই মায়ের সব করল। আসি, তুই ভাল থাকিস। পারলে আজই ঢাকা মেল ধরুম।
মায়ের তৈরি ক্ষীরের তক্তি, আর দাদার কেনা জামাকাপড় হাতে নিয়ে আমার হঠাৎ খুব অস্থির হয়েছিল হৃদয়।
১৯৪৭ সালে দাদার পত্রেই জানলাম, বাবা আর নেই। মা, বউদি ও দাদার ছেলে পাবনায়।
দাদা লিখেছিল, সার্ভে বিভাগে কাজ হইলেও হইতে পারে।
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ করে স্বাধীনতা আসে। সে সময়ে দাদা নতুন কাজে, রানাঘাটে। ''বিশ্বনাথ ভবন'' সে বেচেওনি, কোনও পূর্ব বাংলাভিমুখী মুসলিমের সঙ্গে সম্পত্তি বদলও করেনি।
মা বলেছিলেন, সব ফেলে রেখে চল। এখন ভাবি, পরে তো বাংলাদেশে যাইনি। নটাকোলে ''বিশ্বনাথ ভবন'' আছে কি? বাঁশের বাতার বেড়া। গেটের উপর আর্চ করে মাধবীলতার ঝাড়! জবা, অতসী, শিউলী, কোন ফুলটা ছিল না?
সেই প্রশস্ত উঠোন, সেই কুয়োতলা!
না, নেউগীরা ইতিহাসে স্থায়িত্ব খুঁজেই গেল। ক্ষ্যাপাও তো পরশপাথর খুঁজেছিল।
রেফিউজি সার্টিফিকেটের জোরে দাদা সার্ভে বিভাগে আপার ডিভিশান ক্লার্কের কাজ পায়।
রানাঘাটে দাদা ছোট হলেও বাসা ভাড়া করেছিল।
ঠিকানা জানতাম, সব জানতাম, স্বাধীনতার পর মুক্তি পেয়েই আমি রানাঘাটে ছুটি।
টালির চাল, ব্যারাকবাড়ি, দাদার ভাগে দু'খানা বড় ঘর। মনে আছে, দাদা স্টেশনে ছিল না। খুঁজে খুঁজে বাড়ি বের করেছিলাম।
—মা!
বলে ডেকেই আমি থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। বাড়ির সামনে মহিলা ও বৃদ্ধদের ভিড়। কিছু খই কড়ি পড়ে আছে।
আবার ডাকলাম, মা!
বউদি বেরিয়ে এল। শান্ত গলায় বলল, ঘাটে যান ঠাকুরপো! যদি ক'দিন আগে ছাড়ত!
—মা নাই?
—ঘাটে যান।
একটি গম্ভীর চেহারার শিশু বেরিয়ে এল। নিচে প্যাণ্ট, গা খালি। বউদির আঙুল ধরল।
একজন প্রৌঢ় লোক এগিয়ে এলেন, আপনেই ছোট পোলা? আজই খালাস হইলেন? তিনি তো ..... কাল রাতে ... চলেন, ঘাটে লইয়া যাই।
আমার নিরীহ, কাতর দাদা, আর তাজাতাগড়া আমি, যার পরনে শুভ্রাতিশুভ্র পাজামা ও পাঞ্জাবী,—আমরা মায়ের মুখাগ্নি করলাম।
দাদা শুধু বলল, বাবা গেলেন! মা মনে মনে তার কাছে চইলাই গিছিল। কইত, বারো বছর হইতে এত বছর! তারে দেখবে কে? আরে পরলোকেও তো একটা মানুষ লাগে!
শ্মশানে, এক রোগজীর্ণ প্রৌঢ়ার চিতা জ্বলছিল। আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল, মা বাবাকে এবং বাবা মাকে, সেই প্রথম দিনের মতই ভালবাসতেন। হঠাৎ পরলোকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়েছিল।
বাবা—মার হাত ধরেই নেউগী বংশে প্রেম এসেছিল একদিন নীরবে। নীরবেই তা চলে গেল।
আমরা শ্মশান থেকে ফিরে দেখেছিলাম ধোয়া মোছা ঘর তক তক করছে। ব্যারাকবাড়িতে দেখলাম দাদার ইজ্জৎ খুব।
সেই প্রৌঢ় আমাকে সমীহ করে কথা বলছিলেন।
—তোমরা কত কষ্ট কইরা স্বাধীনতা আনলা, তোমাগো জীবন সাথ্যক।
তারপর বললেন, শুনত্যাছি, তোমাগো অনেক সুযোগ কইরা দিবে কংরেস গরমেন। যারা সংগ্রাম করছে তারাগো আগে দেখবে।
বারান্দায় হেলান দিয়ে বসে চূর্ণীর ওপারে স্বাধীনতার যে চেহারা দেখছিলাম, তা নৈরাশ্যজনক। বাঁশের বাতার সার সার ঘর, সবই নাকি কলোনি। কয়েকদিন ধরেই দেখলাম, উদ্বাস্তু আসছে, আসছে। ঢুকে যাচ্ছে কলোনিতে। হাউ কাউ, চেঁচামেচি, উন্মত্ত চিৎকার কোনও যুবকের, শূয়ার পাইছেন? খোঁয়াড়ে ভরতেছেন?—আর দেখেছি মলমূত্রে ভাসাভাসি, হাসপাতাল ক্যাম্প, সে এক হরিহর ছত্র।
বউদি বলল, খুব তো বলছিলেন, দাদা! গরমেণ্টের চাকর ক্যান? হইছিল বইলা আমাগো ক্যাম্পে যাইতে হয় নাই। অবশ্য আপনে বোঝবেন না। এতকাল সংসারের বার! চল্লিশ টাকা মণ চাল পঞ্চাশ সালে। ভাবতে পারেন?
—কেমনে জানুম?
—সকল ঝড় মাথায় নিছে ওই একটা মানুষ। আর তারেই মা! কী কইছে আর কী কয় নাই। একটু মাছ, একটু দুধ, দুগা মোয়া বানাইলাম, কানত আর কইত, তারে ফালাইয়া খাস কুন প্রাণে?
মুখে উঠে?
নিরুত্তাপ গলায় বলল, হুতাশে কইত! শ্যাষে কইলাম হেয় জেলে গিছে বইলা পাকসাক বন্ধ কইরা দেই? তাহলেই সে ফিরবে?
—মা কী বলল?
—খুব কানল। খুব দোষঘাট মানল। আবার ভুইলা যাইত। বাবারে খুব বিন্ধা বিন্ধা কথা শুনাইত।
দেখেছিলাম, দুটি ঘর যেন ঝকঝক করে। নিত্য বিছানা কাচে বউদি। ঠিকে ঝিকে দিয়ে কাপড় কাচায়। দাদাকে যেন ঠাকুরসেবা করে।
ক্রমে বুঝেছি, অনেক পরে, দাদা অনেক কারণেই খুব দগ্ধ হয়েছে অনেকদিন ধরে। ছোটবেলা থেকে আমি ডাকাবুকো, পড়াশোনায় ভাল, খেলাধুলো, সাঁতার কাটা, ইত্যাদিতে এগিয়ে থাকি।
আমার বিষয়ে মায়ের বিশেষ দুর্বলতা তখন তো চোখে পড়ত না।
নিচু গলায় বললাম, বউদি, মায়ে এমুন করত ক্যান? বৌদি নিরুত্তাপ নিরীর্ষ গলায় বলল, আপনেরে কইত যুগ্য সন্তান! তারানাথের যুগ্য নাতি! দ্যাশের কথা যারা ভাবে, তারা আগুনে ঝাপ দেয়।
—মাথা খারাপ হইয়া গিছিল।
—আপনে অনেকরে অনেক দুখ্য দিছেন। আপনের কারণে আপনের দাদায় জ্বইলা জ্বইলা...
—বুঝি নাই।
—আইয়া পরছেন থাকবেন তো না?
আমি নীরব।
—হে অনেক আশা কইরা আছে। তারে বইলা কইয়া যাইয়েন। হেয় তো সামান্যই মানুষ ..... গরমেনের .... চাকর.... মা—ভাই—বউ—পোলা বুঝে .... বরো সপন দেখে না...তারে কষ্ট দিতে দিমু না....
সে সময়ে এক সঙ্গে এত কথা বউদি একবারই বলেছিল। বুঝেছিলাম, আমার নয়, দাদারই দরকার অনেকটা প্রোটেকশান,—বউদি বাঘিনীর হিংস্রতায় দাদাকে আগলে চলছে।
দাদা রাতে বারান্দায় বসে বলল, বিশ্বনাথ—ভবন জলে গেল।
—যাক না দাদা! তুই ভাইবা দেখ, নেউগীরা বাড়ি বানায় আর ছাইরা যায়।
—না রে! ভগবান দিন দেয়, তো আমি বাড়ি তোলব। নিজ ঘরে বাস, সে খ্যাড়া ঘর, মাটির দ্যাল হইলেও শান্তি!
—তোর এই চাকরি.....
—সিকিউরিটি আছে রে! আর, অহনে তো পশ্চিমবঙ্গ! নদীনালার দ্যাশ নয়। এহানে শত শত বছর দালান টেকে। রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, ঘুইরা দেখত্যাছি তো!
দালান থাকে, মানুষ থাকে না। কিন্তু সহসা নিজেকে গীতানাথ মনে হ'ল। সস্নেহে বললাম, দেখ! আমিও কিছু করুম। অহন তো আমি আইয়া পরছি।
দাদা মৃদু হেসে বলল, আইছস, থাকবি তো না। অহন তোর কত কাম থাকব। আর! আমারও বদলির কাম। এট্টা ভাল জায়গায় বদলি হইতে পারি, তো বাড়ি বানাইব।
আমি বললাম, আমি আছি দাদা!
অন্তর থেকেই বলেছিলাম। ভাসতে ভাসতে শেষ অবধি আমরা ক'জন! যে মৃণালকে ছুটে চলে যেতে দেখেছিলাম হাজার বছর আগে, আমবাগানের আলোছায়া মাখা পথ ধরে,—সে মৃণাল এখন আমার পূজ্য ও প্রণম্য।
দাদা তেমনি এরম গলাতেই বলল, তর বউঠানও জীবনেও সিকিউরিটি জানে নাই। নটাকোল ছাইড়া আইতে খুব কানছিল। অর মনেও শান্তি পাইব যদি বাড়ি হয়! এট্টা আশা লইয়া চলতে হয় রে সইতা! আশার দুয়ারে ভূত খাটে,—মায়ে বইলা গিছে।
আমি বললাম, বেশ! আমিও কাজকাম দেখি। অহনে কাম পাইতে কষ্ট হইত না।
আমার ও দাদার বয়স তখন আটাশ।
বউদির বয়স চব্বিশ।
যতিনাথের বয়স দুই বছর।
দাদা বলল, বিয়াসাদী কর, দুই ভাই সংসার করি!
আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, মনে মনে বুড়া হইয়া গিছি রে দাদা! অহনে আর বিয়ার কথা ভাবতে পারতাম না। নেউগী বংশ? তোরে দিয়াই রক্ষা পাইব। বউদি তো লক্ষ্মী!
—লক্ষ্মী নয় রে, দুর্গা! রাগ তো দ্যাখস নাই। দরকারে কাতান ধরতে পারে।
আমার বউদি? মৃণাল? ছিপছিপে ফর্সা মানুষ! এক মাথা চুল! যতিনাথকে বলে, ভাত ফালাইবি না! আবার দাদাকেও বলে, হ! তোমারেই দিছি বেশি কইরা মাছ। কথা না কইয়া খাইবা।
আমার কথা আর বাড়াব না। দেখলাম, ওরা তিনজন ভারি সুন্দর একটি সংসার গড়েছে। দাদা সেবা পেয়ে তৃপ্ত যেমন,—তেমনি বউয়ের শ্রম বাঁচাতে ঝুল ঝেড়ে দেয়, মশারি কেচে দেয়, যতিনাথকে হাঁটিয়ে বেড়াতে নিয়ে যায়। বউদি অতন্দ্র চোখ রাখে তার সাম্রাজ্যের উপর। যতিনাথকে মারধোর করে না, কিন্তু কঠোর শাসনে রাখে। কোনও আবদার দেয় না।
আমি চলে আসি। জেল থেকে কিছু টাকা তো নিয়ে বেরিয়েছিলাম। বউদিকে বললাম, হাজার টাকা রাখেন। আমি এক ঠিকানা থুইয়া যাই, কলকাতায় এনারে লিখলেই যোগাযোগ হইব।
—আর আসবেন না?
—আপনাগো ছাইরা যাইতাম কোথায়? কিন্তু আমিও কামে ঘোরব, দাদাও বদলি হইব,—খবরবার্তা নিতে একটা ঠিকানা দরকার।
—বিয়া করবেন না ঠাকুর পো?
—নিউগীরা বিয়া করত সকলেই। আমি এট্টা নতুন পথ ধরি। একজন বিয়া না কইরা থাকুক।
—আমার জীবন একলাই কাটব।
—কিসে? দাদা আছে, যতি আছে, আর আমি বইলা যাই, আপনাগো' লিগ্যা আমি চিরদিন থাকলাম।
—ইনির ঠিকানাতেই চিঠি দিব?
—হ। বদলির খবর যেমন সত্বর পাই। আর দেখেন? সকল কথা আমার—আপনার। টাকা পাঠামু যেমন পারি,—দাদার সপন বাড়ি বানাইন্যা, উঠুক বাড়ি।
—হ ঠাকুরপো! চিঠি দিয়েন। নিষ্ঠুরতা হইয়েন না। যতির বাপ বড় কষ্ট পাইছে!
—আর.... আপনে?
—চিঠি দিয়েন। আমি তো চার বছর হইতে আগুন মারাইয়া হাটতেছি। মায়ে বেদম মাইরাও কান্দাইতে পারে নাই!
সগর্বে মাথা তুলে বললেন, কানলে আজ এ সংসার বাইনধা উঠত? মাইয়াদের আপনেরা বাইন্ধা রাখছেন। তা'গো শুধা সইয়া চলতে হয়, সংসার বাচাইতে হয়। কুনদিন বা বসুমতী ফাইটা যাইব।
না, এমনভাবে মেয়েদের দেখতে শিখিনি। তারা কাজ করে, সন্তান বহন করে, শুধুই দুঃখ সয়ে যায়।
—আপনের দাদার নাখাল পুরুষ মানুষ ক'জন? যতি প্যাটে থাকতে এক বালতি জল উঠাতে দেয় নাই—ডাক্তার আইনা প্রসব করাইছে,—দুধ রে! ফল রে! কত যত্ন! কত টনিক! আপনের মায়ের যে সেবা করছে.... এমুন মানুষই ঠেলা খাইল সংসারে... আর .... জেল খাইটা আপনে ঠাকুর হইয়া গেলেন মায়ের কাছে....
—আর কয়েন না বউঠান!
—আমার কথায় দোষ নিয়েন না ঠাকুর পো! বড় দুখ্যে কই!
—আপনের কথায়..... আমি দোষ লইতে পারি?
আমি রানাঘাট ছাড়লাম।
আগেই বলেছি এ কাহিনী ঘোরানো সিঁড়ির, আমার নয়। আমার উত্তর—স্বাধীনতা পর্বের জীবনকথা তো লিখতে বসিনি।
জেলের সতীর্থ, আমাদের শ্রদ্ধেয় দাদা, প্রতাপমোহনের ঠিকানা দিয়ে এসেছিলাম। বউবাজারে সেকেলে চকমেলানো বাড়ি,—একদা বিপ্লবীদের মিলন কেন্দ্র ছিল।
প্রতাপদাদা বললেন, চাকরি করবি?
—এই বিদ্যাবুদ্ধি লইয়া?
—তবে কনট্রাক্টরি কর। করতে করতে শেখ। পরে নিজে পারবি।
—দ্যাশের কাম কি ছাইরা দিলেন?
—করবি? কর। তবে দেশের যে হাল.... কত দল... ওদিকে দাঙ্গা... এদিকে উদ্বাস্তু আসছে বন্যার মতো... পশ্চিমবঙ্গের চেহারাটা দেখেছিস? কাজ এখন অনেক থাকবে।
—আপনি কী করবেন?
—অবসর নেব। আঠারো থেকে আটাত্তর, হীরক—জুবিলি হয়ে গেল। এখন আমাদের মতো প্রাচীন বিপ্লবী, আন্দামান ফেরৎ, এদের জন্যে একটা হাসপাতাল, একটা চক্ষু চিকিৎসালয়, তাদের বৃদ্ধাবাস,—স্বাধীন দেশে এসব কাজের কথা তো চিন্তা করা যাবে।
.... আর....
—কী, বলেন?
—কম্যুনিস্ট, আর সি.পি আই, ইত্যাদি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। কম্যুনিস্ট সমর্থনে চলে যাচ্ছে দেশের শ্রেষ্ঠ ব্রেইনস, শিক্ষিত ছেলেরা। এটা ইতিহাসের....
—দিক সংকেত।
—রাইট।
—জেলে বইসা বললে আপনি রাইগা উঠতেন।
—আমার কথা ছাড়। তোকে কি.....
—রোজগারের কথা ভাবতে হইব দাদা! বাবা, মা, গত কয়েক বছরে বিগত। যদি ক'দিন আগে ছাড়ত, মা'রে দেখতে পাইতাম। সে খুব হুতাশে মরছে।
—রইল কে আর?
—যমজ দাদা, বউদি, এক পোলা।
—দাদা কাজ করেন?
—হ। সার্ভে বিভাগে।
—কোথায় আছেন?
—রানাঘাট। দাদার বড়ো ইচ্ছা, আমি যদি পাশে থাকি, হে যেমুনতেমুন একখানা বাড়ি করে। প্রপিতামহ, পিতামহ, বাবা, যিনিই বাড়ি করছে, তিনিদেরই বাড়ি থাকে নাই। পোলারা ছাইড়া গিছে, নয় নদীতে খাইছে, আমরা তো পূর্ববঙ্গের মানুষ! দাদায় একলা খুব করছে! অহন আমার কর্তব্য হয় তারে কিছুদিন সাথ দিই!
—তুই সংসার করবি না?
—নাঃ!
একটা ডাহা মিথ্যা বললাম, নেউগী বাড়িতে একজন না একজন বিয়া না কইরা থাইকা যায়। আমি বা নিয়মটা ভাঙি ক্যান, বলেন?
প্রতাপদাদা বললেন, ঠিকই। থাক আজকে। কাল তোকে নিয়ে যাব অরুণ দত্তের কাছে। ডাট অ্যানড ডাট অ্যানড ডাট,—মার্টিন বার্নের কাজও করে। সেখানে ঢুকিয়ে দেব। অগাবগা জায়গায় পাঠাবে....
—সে তো ভালই। আর দাদা! আপনের বাড়িরে অনুমতি না লইয়াই পোস্টাপিস বানাইলাম। দাদায় লিখবে, আমিও খবর নিব।
—পারবি তুই। এককালে ছিল স্বদেশী পাঁঠার দোকান, রাজবন্দীর ট্রাঙ্কের দোকান.....আজ তো সে নিয়মে চললে হবে না। তোর হবে সতীনাথ! জেলে খেয়ে খেয়ে, ব্যায়াম করে করে, বডি তো বানিয়েছিস! ওই ভাষাটা! যাবে, ক্রমে মিলে মিশে যাবে। আরে আমিই একবার ম্যাট্রিক, না এনট্রান্স ফেল করে বিবাগী হই। খুব হিন্দি ভাষা শিখেছিলাম। চাইলে চাকরিও পাবি।
—না, চাকরি করুম না।
—যা ইচ্ছে করগে যা। চল, খেয়ে নিই।
প্রতাপদাদার বাড়িতে শ্বেতপাথরের দালানে গালচের আসনে বসে ঝকঝকে কাঁসার থালায় সাত ব্যঞ্জনে ভোজন! জেলেও তো হরদম ওঁর বাড়ি থেকে সকল রাজবন্দির জন্য ভারে ভারে খাবার যেত। সবাই খেতাম।
অরুণ ডাটের সঙ্গে ভিড়ে পড়লাম। পুরনো বাড়ি ভাঙা হচ্ছে জানলেই তার মালমশলা, আসবাব, দরজা—জানলা কিনতেন,—সেটা স্বতন্ত্র ব্যবসা।
বানাতেন ব্রিজ, রেল ও হাসপাতালের কোয়ার্টার। দুর্গাপুর যখন অনস্তিত্ব এক কাগুজে প্রকল্প, বলেছিলেন, বিশাল জায়গা হয়ে যাবে।
কুলি বা লেবার খাটানোর কাজ দিয়ে আমার হাতে খড়ি। অরুণ ডাটের বয়স তখন নিশ্চয় চল্লিশ হবে। আমার চেয়ে বছর বারোর বড় হবেন। ''ডাট'' লিখতেন, সাহেবমার্কা ছিলেন। অন্য রকম সাহেব।
খাকি হাফপ্যান্ট ও খাকি হাফশার্ট পরতেন। সোলা হ্যাট পরে রোদে জলে সাইটে থাকতেন। আমাকে বলেছিলেন, গভরমেন্টের কন্ট্রাক্টর,—পরিবারে কেউ ইংরেজের বিরুদ্ধে যায়নি। কিন্তু প্রতাপ কাকার কথায় আপনাকে কাজ দিলাম, অ্যানড, আই ফিল প্রাউড।
প্রতাপদাদা এঁর বাবার বন্ধু ছিলেন। দুটি পরিবারই আমার ভাষায় ক্যালকেশিয়ান।
এঁদের বন্ধুত্ব কেমন করে হতে পারে?
প্রতাপদাদা বললেন, ওদের আদি বাস বলাগড়ে, হুগলী জেলায়। কত সময়ে সেখানে আমরা শেলটার নিয়েছি! আবার টাকার জন্যে জীবনে দু'বার আশুতোষ ঠেকে গেছে,—দু'বারই আমার দাদা দিয়েছেন। এ রকম সম্পর্ক তখনকার দিনে হত হে!
আমি তখন দুইশত টাকা পাই। কিছু দিনেই বেতন আড়াইশো হ'ল। অরুণ ডাট বললেন, আমি তোমার কাজে খুব খুশি হে। এবার তোমাকেই একটা কাজের দায়িত্ব দেব।
এক সরকারি নগরীতে (আজও তা গ্রাম ও টাউনের জগাখিচুড়ি হয়ে আছে) অফিস তৈরির কাজের একাংশ। আমি চার হাজার টাকা লাভ রাখতে পেরেছিলাম।
আর প্রতাপদাদার সে সময়ে রাইটার্সে খুব দহরম মহরম। সে ভাবেই দাদাকে কৃষ্ণনগরে আনা যায়। তখন দাদার মেয়ে মাধবীলতা কোলের শিশু।
চারটি সন্তান হয় আদিনাথ ও মৃণালের। যতিনাথ ও মাধবীর মধ্যেই যা তিন বছরের তফাত। মাধবীর চেয়ে স্বাধীন দু'বছরের ছোট। আবার স্বাধীন ও সুভাষের বয়সের তফাত মাত্রই এক বছর কয়েক মাসের।
এইটে ভাবলে ঘোল খেয়ে যাই। দাদা বিয়ে করল বটে, যতিনাথ জন্মাল পাঁচ বছর বাদে। তিন বছর তফাৎ দিয়ে পর পর মাধবী, স্বাধীন ও সুভাষ।
কৃষ্ণনগরে ওরা ভাল বাসা পেয়েছিল। দাদার বেতনও বেড়েছিল। মাধবী জন্মাল তো বললাম, এমন সেকেলে নাম রাখলি?
বউদি বলল, ঠাকুরপোর কথায় পালিশ আসছে।
—কয়েন, নামরহস্য কী?
দাদা মাথা চুলকে বলল, নটাকোলে মাধবীলতার গাছ ছিল....আর তর বউদিদি ''মাধবী কঙ্কণ'' পইড়া কানত এক সময়ে...
—আপনে বই পইড়া কানতেন?
—সকলে কি আপনের নাখাল পাষাণ না কি? মাইয়ার মুখ ঢাকা দিলাম। খালি হাতে দেখতে দিমু না। আপনে অর একোই কাকা।
আমি একটি খাম ফেলে দিলাম। ডাট অ্যানড ডাট অ্যানড ডাট কোম্পানির নাম ছাপা, কাগজের ভেতর গজের কাপড় সাঁটা শক্ত খাম।
বউদির মুখ সাদা।
—এ কি দিতেছেন?
—ব্যাঙ্কে ফিকস কইরা দিবেন।
—কত টাকা?
—পাঁচ হাজার!
স্বামী স্ত্রী নিরুত্তর। ১৯৪৮—এর মাঝামাঝি সে অনেক টাকা।
দাদা বলল, কেমুন কইরা পাইলি?
—চুরি ডাকাতি করি নাই। কামাইছি, জমাইছি। পাপের টাকা নয় রে দাদা!
বউদি বললেন, আমরা নিমু?
জামা খুলতে খুলতে বললাম, একজনের না বাড়ি বানাইবার বড়ো আশা! তা, আমারও তো থাকতে লাগব। অহন বয়স আছে! বুড়া তো হ'মু একদিন!
দাদা কেঁদে ফেলেছিল।
কাঁদবেই। তখন অবধি নগদে পাঁচ হাজার টাকা আমরা কেন, নেউগী বাড়িতে কেউ দেখেনি। আমার মা—বাবার পাকস্পর্শের দিন দুর্গাবাড়ি গ্রামের মানুষ হেলে ঢেলে খেয়েছিল,—তখন শুভ কাজে মাছই হ'ত,—খরচ হয়েছিল একশো সত্তর টাকা। চাল—ডাল—মাছ ঘি—দই—সন্দেশ,—মণ দরেই এসেছিল।
পাঁচ হাজার টাকায় তখন কৃষ্ণনগরের আশেপাশেই জমি কিনলেও ভিতপত্তনের টাকা থাকে।
দাদা বলল, জমি বায়না করি?
বউদি বললেন, অহনই? বাড়িই যদি করো, এমুন থনে করবা, যে ইস্কুল থাকে, ছেলে মেয়ে পড়তে পারে, ইলেকটিরি থাকে, সভ্য জায়গা।
আমিও বললাম, তুইও বদলি হবি, এখন চাকরিতে উপরে উঠবি। আর! সকল সময়ে ভাল কাম কইরা টাকা পামু, এমন কি বলা যায়? হয়তো অনেকদিন শুকনা যাইত!
কোনও পুরানো বাংলো প্যাটার্নের বাড়ির যা আউট হাউস ছিল, সেটাই দাদা ও গোপালবাবুর কোয়ার্টার।
গোপালবাবুর গৃহিণী এ সময়ে যতিনাথকে দেখেছেন, বউদিকেও দেখতেন।
আমার জন্যে মাছ রেঁধে এনেছিলেন। ননদকে দিয়ে চা পাঠিয়েছিলেন।
বউদি বললেন, ঠাকুরপো! রাজি থাকেন তো বলেন, অতসীর লগে বিয়া দিয়া দেই।
—সকলের কি দাদার নাখাল বউভাগ্য হয়? আমার বাবার ছিল, দাদার আছে,—
—আপনেরও হইব।
—না বউদি! বিয়া মানে বউয়ের ম্যাজাজ, ছাওয়াল মেয়ের কান্নাকান্নি, ন্যানজারি অবস্থা! আমি অহনে তো পারুম না।
—বুড়া বয়সে গিরীশ সা' হইবেন?
—বুড়া হই আগে।
—গিরীশের বিধবা আমারই বয়সী গো! অরা তো সকলটি মুর্শিদাবাদ আইসা উঠছে। শুনছি যতির বাবার কাছে, দেখি নাই!
—দাদার.... আপনের দেহগতিক ভাল তো?
—হ! আমি তো ভালই থাকি। হেয়ও আপনেরে পাইয়া শান্তি পাইছে।
—এ জায়গা ভাল তো?
—খুব, সংসার কইরা শান্তি আছে। খাওন দাওন, চলাফিরা, দোকানবাজার, কুন—অ কষ্ট নাই। গরম যেমুন, শীত তেমুন! আর বেড়াইয়া সুখ! রাজবাড়ি দেখবেন, শিবনিবাস দেখবেন, নদীর ঘাট বা কত সুন্দর!
—নটাকোলের লিগ্যা মন পুরায় না?
—মন পুরাইবে ক্যান? পুরাইয়া লাভ বা কী? হেয় খুব হাহাকার করে, আমি করি না। যা ফালাইয়া আইলাম, সে কথা ভাইবা লাভ? আর দেখতেছেন তো! সংসার....আপনের দাদা... এই যতি....মাধবী.... চিন্তার সময়ও তো পাই না।
—আপনেরে পাইয়া আপনের দাদা য্যান..... চিঠি একখান দেন, তো হেয় পাচখান লিখে...
—আমারই বা কে আছে আর...
—নাঃ। তিনোজনের তিনোজন আছি!
বউদি কথাটা আনমনে বলেন। তখন বাইরে বিকেল পড়ে আসার অবস্থা—প্রাচীন শালগাছের পাতার মর্মর,—যতিনাথ কলকল করে ঝি—কে কী বলছে,—বউদির চেহারা কিছু কাহিল হলেও তেমনই সুন্দরী,—আঙুল দিয়ে চুলে বিলি কাটছিলেন,—পরনে হালকা সবুজ শাড়ি,—''তিনোজনের তিনোজন'' কথাটি মনে গেঁথে গেল।
কথাটি মনে করি, জবাকুসুম তেলের সুবাস পাই। বউদিদি মাখতেন। বউদিদির সঙ্গে জবাকুসুমের সুবাস, কিউটিক্যুরা পাউডারের শিশু—শিশু গন্ধ, এরকম কয়েকটা স্মৃতি বড় জড়ানো।
আর জড়ানো পরিচ্ছন্নতা। আরও তো সন্তান হয়েছিল, আরও তো অন্যান্য বাসায় থাকেন,—সর্বদাই সব যেন ঝকঝক করত।
ছেলে মেয়ে কেন, দাদাকেও রবিবারে পিঠে সাবান ঘষে দিতে দেখেছি। একদিন বাদে একদিন নখ না কাটলে রক্ষা ছিল না। মাধবী ইস্কুল থেকে যতবার মাথায় উকুন এনেছে, ততবার ওর মাথা নেড়া করেছেন। ফলটা খারাপ হয়নি।
এখনও মাধবীর মাথায় ঘন চুল, তাতে রুপোর তারের ঝিকিমিকি।
সেবারই ওদের একটা রেডিও কিনে দিই। দাদা বলল, আবার খরচ?
—বউদি গান শুনবে, খবর শুনবে।
দূরদর্শনের যুগ ছিল না।
সামান্যে সন্তুষ্ট থাকবার দিন ছিল।
কৃষ্ণনগর থেকে ফেরার পথে অরুণ ডাটের গাড়ি পেয়েছিলাম। অরুণ ডাট বলেছিলেন চাকদা ঘুরে যেতে এবং নীলসন সাহেব বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে দেখা করতে।
দাদাকে বললাম, চল না আমার সঙ্গে। গাড়িতে যাব, গাড়িতে আসব?
—এদের রাইখা যাব?
বউদি বললেন, না সিনেমা, না পূজামণ্ডপে থিয়েটার, আমাগো রাইখা হে নরেই না। ঠাকুরপো বলতেছেন, ঘুইরা আস গিয়া।
আমি বললাম, সন্ধার নাখাল আইয়া পরুম।
দাদা শিশুদের মতো আনন্দ পেয়েছিল। ছুটি, ছুটি, মস্ত ছুটি ওর। আটাশ বছর বয়স দুজনেরই, চেহারা ওর রোগাটে, কিন্তু বয়সে যেন বালকের কৌতূহল। জিপে বসেই ওর আনন্দ কি!
বলেছিলাম, থাকে যদি। একটা আশ্চর্য জিনিস দেখবি।
''নীলদর্পণ'' পড়েছিস তো? নীলকর সাহেবদের শেষ বংশধরকে দেখবি।
মনে আছে, বিশাল হাতা, বড় বড় গাছ, মেহগনি, শাল, শিশু। আউট হাউস ধ্বংসস্তূপ, বাংলোটি জীর্ণ, শীর্ণ, তবে দাঁড়িয়ে আছে।
নীলসন সাহেবেরই সন্তান, চোখও নীল। কিন্তু বেজায় বুড়ো, রং তামাটে, চুল কটাশে। শার্ট, প্যান্ট, সবই অতীতের ধ্বংসাবশেষ।
ওর বউ, ছেলে, সবাই ইংলন্ড চলে গেছে। ও যেতে পারছে না কিছুতে।
নিস্পৃহতায় যেন ''আরণ্যক'' বইয়ের ধাওতাল সাহু।
—প্ল্যান্টেশান আমি দেখিনি। সে সব তো কবেই উঠে যায়। মা মারা যেতে বাবা এক বেংগলি মেয়েকে বিয়ে করে। বাগানের কোণে তাদের সমাধি আছে। ছিল প্ল্যান্টেশানের জমি। চাকদা ছড়িয়ে পড়ছে, অনেক জমি চলেও গেছে। আমি এ জমি বা বাড়ি রাখতে পারব না। ডাট আবার জমি চায় না, বাড়ি চায়, মানে বাড়ির মেটেরিয়াল। এসো, দেখো!
—নীল তৈরি হত কোথায়?
—কাছাকাছিই, আমি দেখিনি।
—শুধু বাড়ি বেচবেন?
নীলসন নিরানন্দ হাসল। বলল, ফায়ার প্লেস, দরজা জানলা, একটা বিলিয়ার্ড টেবিল, মার্বেল, বেসিন, বড় বড় চাইনিজ ভেস। মাউন্টেড বাঘ দুটো,—হ্যাঁ হ্যাঁ, শিকার বিস্তর ছিল। এখন যেখানে হাই স্কুল, তার পিছনে একটা বাঘ তো আমিই মারি।
কেমন ভরসাহীন চোখে চাইল ও। বলল, সব বদলে যাচ্ছে।
—আমার বয়সও বাহাত্তর হ'ল। সব বেচে দিয়ে যা পাই....
—ইংল্যান্ড যাবেন?
—এই বয়সে? নো মিস্টার। লাস্ট ব্রিটিশ ইনডিগো প্ল্যান্টার কোনও ওলড এজ হোমে যাবে, বা স্যালভেশান আর্মির শেলটারে।
—একা পড়ে যাবেন।
—ঠিকই আছে ইয়ং ম্যান। একাই তো থাকি। ওই লোকাল একটা পরিবার আছে, স্বামী রিকশা চালায়, স্ত্রী... ছেলে মেয়ে.... ডাটকে তাড়াতাড়ি করতে বলুন। আমার কোনও ক্যাশ নেই.... অসুবিধে হয়ে যায়।
বেরিয়ে এসে হোটেলে ভাত খেয়েছিলাম। দাদাকে বললাম, ল! নীলকরদের অত্যাচারের কথা খুব পড়ছি, আজ জ্যান্ত নীলকর দেখাইলাম।
—বাংলা বলতে আছিল।
—আরে, এটা তো মড়া নীলকর! কুনোদিন পূর্ব পুরুষ আছিল...সেটেল কইরা যায়...ডাট সাহেব বলে, এ ল্যাখাপড়াও করে নাই...জমির ধান খাইত...
—বউ ছেলে বিলাতে থাকে?
—তারা অ্যাংলো আছিল। চইলা গিছে।
—কী থামগুলো! কী সিঁড়ি! কী দেয়াল! বাড়ি বানাইছিল বটে!
—ওই বাড়ির মতো বাড়ি, অহন কে বানাইবে?
—দামি জিনিস সব!
—ডাট সাহেব যদি সাহায্য করে, তবে এইসব কিনুম।
—বেচবি কারে?
—ওনারেই। পরে পারলে নিজের কিছু করব।
—লাভ থাকব?
—তিনি তো কয় থাকব।
—যদি সার্ভিস করতি সইতা...অহন স্বাধীন দেশের সরকার...
—নেউগী বংশে তুই সারভিস করতে আছিস দাদা। আমি নয় বেবসা করি! আর... বাড়ি বানাইতে হইব না?
—অহনই তারা কিসের?
—তাড়াতাড়ি করতে পারলে মন্দ কী? রিটায়ার কইরা বাড়ি বানাইলে কত বৎসর বা বাস করবি? নিজ বাড়িতে থাকলি....সন্তানদের পরাইলি...সে অনেক ভাল। আর...আমিও জানুম আমার জায়গা পাক্কা! একদিন নিশ্চয় গভরমেন আমাগো পেনশান দিব। প্রতাপ দাদার লগে জেলে আছিলাম...মস্ত সাট্টিফিকেট...ল, মিষ্টি কিন্যা লই।
—সইতা!
—ক' দাদা!
—আমার সংসার দাড়া করাইবার লিগ্যা তুই বিয়া করবি না? আমারে দোষী কইরা রাখবি?
—দাদা! আমি দেখ! তোর নাখাল নিঃসাথ্য নয়। তুই সংসার কইরাও বাবা, মা, আমার কথা ভাবছস। আমি কই সাথ্যপর! বিয়া করতে তো মনই উঠে না। যদি করি, সাথ্যপর হইয়া যামু। আমাগো নাইও কেউ আর। তিনজনার তিনো জন আছি। তেমুনই থাকি, কেমুন?
দাদা মুখ ফেরাল।
আমার মানসিক অবস্থান পরিষ্কার করি। একদা, হাজার বছর আগে, অধুনা অবলুপ্ত (আমার কাছে) এক বহতা, সতত জলদায়িনী নদীতটের এক গ্রামে, এক বালিকা এক কিশোরকে বলেছিল, তোমাগো ঘরে যা'মু। মনে মনে বলেছিল। তার মা আমার জননীকে বলেছিলেন। সেই বালিকার মনে গভীর দুঃখ দিয়ে আমি গ্রাম ত্যাগ করি। পরে তার কথা ভাবতাম মাঝে মাঝে। সে আমাদের ঘরেই এল। তাকে নিয়ে আমার দাদার জীবন পূর্ণ থেকে পূর্ণতরো হচ্ছে, এটা চোখে দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হই কেন?
সেও তো বদলাচ্ছে। এখন সে মা, দাদার স্ত্রী,—আমার প্রতি ব্যবহারে কত স্নেহশীল। বলে, আর দাদারে ছাইড়া যাইয়েন না ঠাকুরপো। হেয় বড় দুখ্যে আছিল। অহন শান্তি পাইছে।
দাদাকে কিছু বলার আগেই কৃষ্ণনগরে পৌঁছে গিয়েছিলাম। তখন সন্ধ্যা। কাজের মেয়েটি ঘরে ঘরে ধুনো দিচ্ছিল।
বউদি বললেন, জল রাখছে। পা ধুইয়া উঠবা। পথের ধূলা ঘরে আইনো না।
মন কিছু এলোমেলো ছিল। ধুনোর গন্ধে সহসা নিজের জননীকে মনে পড়ল।
পা ধুয়ে ঘরে উঠে বললাম, দাদার আর শাসন মুক্তি ঘটল না। পরাধীন ভারতে মায়ে যা কইত, স্বাধীন ভারতে আপনে একোই কথা ক'ন।
বউদি হাসলেন।
এভাবে মাল কিনতে মাঝে মাঝেই যখন গেছি, দাদাকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করতাম। দাদা বিমোহিত হয়ে বলত, পার্মানেন্ট স্ট্রাকচার করছিল!
কী ভ্রান্ত উক্তি আমরা করে চলি স্থায়িত্বের স্বপ্ন দেখে দেখে!
দেখছ জনমানব পরিত্যক্ত জীর্ণ বাড়ি, যা ভাঙা হবে। বলছ, পার্মানেন্ট স্ট্রাকচার।
কিছুই চিরস্থায়ী নয় মানুষ ছাড়া।
কালে কালে, অনাদিকাল হতে যুদ্ধে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, রোগেভোগে মহামারীতে, দুর্ভিক্ষে ও খাদ্যাভাবে মানুষ মরছে। তবু মানুষ থাকে।
এমনই এক বিমোহন হৈমন্তিক দিনে দাদার চোখে স্বপ্নমাখা চাহনি দেখে আমি ওই ঘোরানো সিঁড়ি কিনি।
দাদা বলেছিল, কিয়ের জমাদার? ঘুরাইন্যা সিড়ি বসামু বাসার গায়ে, বাগানে। অন্দরে দোতলার সিড়ি থাকব। আমরা ঘুরাইন্যা সিড়ি ধইরা ছাতে গিয়া বসুম।
বাইশটা ধাপ। টাটার লোহা। নির্মাতা ব্ল্যাকবার্ন অ্যানড শেপার্ড কোম্পানি।
আমি, দাদা, বউদি
এ কাহিনী লিখে চলা যেত, যদি লেখক হতেন গণেশ। আমি তো কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। কালো, পেশল, লোমশ, লম্বা, ব্যাসই বটি।
কিন্তু নেউগীদের বাসগৃহ বানিয়ে অমরত্ন লাভের মহাভারত তো সংক্ষেপে করে আনতে হয়। অন্ত্যপর্ব লিখব আমি, আমাকে দিয়ে।
ভাঙা বাড়ির জিনিসপত্র কেনার কাজ স্বাধীনভাবে করতে পারি, এজন্য ডাটসাহেব, আমাকে দশ হাজার টাকাও হাওলাত দিতে রাজি ছিলেন।
আমি বললাম, না। আপনিই আমার মাল কিনবেন যখন, সেই সময়ে যা মার্জিন থাকবে, আমি তাতেই সন্তুষ্ট থাকব।
—তোমার উচ্চাশা নেই?
—সময় নেই।
—সে কী হে, তুমি তো ছোকরা! আমার অরূপ কেন, অমিতের চেয়েও ছোট।
—ওরা আপনার কোম্পানি দেখবে, আমি কার জন্যে কী করব?
—বিয়ে তো করলে না।
—শেয়ালদার হোটেল খুব ভাল।
—দাদার ছেলে মেয়ে আছে তো।
—তারা তো দাদার। এখনও ছোট। আর ওদেরকে দাদা সরকারি কাজেই ঢোকাতে চাইবেন।
—যাক! তোমার এ কাজটা চালিয়ে যাও। একদিন মানুষ এসব খুঁজবে হে!
—কোথায়! এখন বেশি জায়গা, বড় বাড়ির যুগ তো নেই। যত ঘুরি, বিগত শতকের জীর্ণবাড়িই দেখি। খারাপ লাগে।
মূলধন নিই প্রতাপদাদার কাছে হাওলাত। কিনতাম, বেচতাম, মার্জিন বউদিকে দিতাম। মাসে দু'একবার না গেলে দাদা দুঃখ পেত, চিন্তা করত।
ততদিনে স্বাধীন আর সুভাষও জন্মেছে। স্বাধীনতার পরে জন্মালে ছেলেদের নাম স্বাধীন আর সুভাষ রাখা খুব চল হয়েছিল। দাদা ও বউদি তার ব্যতিক্রম নয়।
ওদের আরেকটি সদভ্যাসের প্রশংসা করি। ডাকনামের ব্যাপার রাখেনি। যার যা নাম, তাকে সেই নামেই ডাকত।
একবার বলেওছিলাম সে কথা। বউদি ঈষৎ হেসে বলল, অদের মা চিরকালই মিরনাল। আদর দিবার মানুষও ছিল না, মায়ের সময়ও আছিল না। নাই কাজ তো বাড়ির ডাল বাট,—নয় মশলাপাতি রোদে দে,—নয় ঠাকুরের বাসন মাজ। কমে চলে তো বাড়াই ক্যান? এক নামই থাক।
এক নাম, যতির জুতো জামা স্বাধীন পরে। বড় জোর তিন বা চারটে জামা ঊর্ধ্বাঙ্গে, অধোবাসও তাই। শীতবস্ত্র? কিছুদিনেই বউদি বুনতে শিখেছিলেন। আমি উল কাঁটা এনে দিতাম।
পরপর চারটি সন্তানের জননী হয়ে বউদির শরীর ভেঙেই যাবার কথা। দাদা কাজের লোক অন্তত দু'জন রাখতেন, ছেলে মেয়ের জন্য কোনও প্রৌঢ়াকে। গিরিবালা অনেক কাল ছিল।
দাদা তখন এই শহরে বদলি হয়েছে, বউদিরা তখনো পশ্চিম দিনাজপুরে।
এমন সময়েই দাদা ঠাণ্ডা লেগে, বুকে কাসি বসে অসুস্থ হ'ল। আমি দৌড়ে এলাম। খুবই আশ্চর্য, এতখানি বয়সে দাদাকে হাঁপানিতে ধরল।
খুব, খুব কষ্ট পেল দাদা। বউদি এলেন ছেলে মেয়ে নিয়ে। দাদা দু'মাস ছুটিও নিল। এই বাসা বাড়ি কিন্তু খারাপ ছিল না। দাদার আগেও মহকুমা—জরিপ বিভাগের অফিসাররা ও বাড়িতেই থেকে গেছেন।
বেশ বাড়ি, তিনখানা ঘর। বারান্দায় বসলে খেলার মাঠে উৎসাহী ছেলেদের বল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায়। দাদা তাই দেখত।
একদিন বলল, সইতা! এহানেই সেটেল করি। জল হাওয়া সুট করতেয়াছে। ইস্কুল ভাল, পরিবেশ ভাল, তুই কী ক'স!
—মহারানি কী ক'ন?
—আমি তো রাজি।
বউদি আমাকে বললেন, এই বয়সে হাঁপানি... রোগেই ভয় ধরাইছে। আপনেও বলেন, বয়েস থাকতে বাড়ি করো, বসবাস কইরা লও। এ কথা তো সত্য, যে যতিনাথ জলপানি পাইছে যেমুন, অরে হস্টেলে দিয়া খরচও বাড়ছে কিছু।
—সে টিউশানি করে কেন?
—ক্যান করবে না? আপনে কলকাতায় যোগাযোগ রাখেন। কিন্তু একটা টিউশানি করলে ওর ক্ষতি হইত না। অরা কষ্ট কইরা পরুক ঠাকুরপো! অদের বাপ কাকায় কম কষ্ট করে নাই।
—আর মা!
—মা'র তো কষ্টে অবভাস আছিলই। কষ্ট কমছে তো বিয়ার পর। ছাড়েন মায়ের কথা! দেখেন, আপনের দাদা কই, আপনের নাখাল নয়, আমার নাখালও নয়। সংসারে তপ্ত খোলায় ভাইজা ভাইজা অর কিছু রাখে নাই। আপনের পাইছে থ'নে সহজে ডরায়, দ্যাহও সবল নয়। মন লইছে বাড়ি করুক।
—আপনে যা করেন!
আগেই বলেছি এ শহরের একটা বনেদিয়ানা ছিল। মহকুমা সদর যেমন, সম্পন্ন জমিদারের দানে ধ্যানেই পথ, স্কুল, বাঁধানো ঘাট ও পুকুর, খেলার মাঠ, শরীর চর্চার ক্লাব, ফুটবল শেখার সুবিধা, এসব ছিল। এ শহরই রাজ্যকে কয়েকটি ভাল খেলোয়াড় উপহার দিয়েছিল।
বউদি গভীর উদ্বেগে বললেন, আমি যা কমু তাই হইব? ক্যান, আপনে কি আলদা মানুষ? দেহেন, জমি কিনতে আপইত্য কি! অহনেও সুবিধায় পাইবেন। বাড়িও কম খরচ হইব। মাধবীরেও বাইরে পাঠাইতে হইব।
—তারেও?
—নিচ্ছয়। সুযোগ পাইলে হেও উপরে উঠব। কুমুদবাবুর মাইয়া শান্তা ডাক্তারি পরে না? মালদা'র উকিল যোগেশবাবু তো পয়সার সাগর! তিনি মাইয়ারে ল'পড়াইতেছেন না? অহন দিনকাল অন্য রকম। আমার পোলা মাইয়ারে কষ্ট কইরাই দাঁড়াইতে হইব। মাধবীরে দেখেন না? মাইয়া য্যান ঘোড়া! এই গাছে উঠে, এই সাতার কাটে।
—ঘরের কামও করেন।
—না কইরা যাইত কোথায়?
—আপনে দারোগা হইতে পারতেন!
—থো'ন ফালাইয়া ছিরা কথা! ল্যাখাপড়ি তো আপনের মায়ের কাছে। পরে আপনের দাদাও খুব বই পরাইছে। বিয়ার পাঁচ বছর বাদে যতি হয়। পাঁচ বছর বই ধইরা পাকসাক করছি।
—বেশ! আপনে আর দাদায় কইলে...
—আপনাগো পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়স! আমি আধবুড়া। বাড়ি কি হইত বুড়া বয়সে? আর এ বয়সে হাঁপানি ধরল, তাতেই....
এভাবেই জমি কেনা হয়, পাঁচিল দিয়ে গাছ বসানো হয়। আর ভয়ংকর জেদাজেদি করে বউদি একটা কাজ করে বসেন, যে জন্য দাদার সঙ্গেও তাঁর প্রথম ও শেষ তর্ক বাধে।
মুহুরি রামরতনবাবু বউদিকে ''মা'' বলতেন এবং সত্যিই স্নেহ করতেন। বলতেন, মা আমার সর্ব সুলক্ষণা। যিনি গাছ বসাইলে সে গাছে ফল ধরে, তিনির লক্ষণ খুবই ভাল।
জমিদারি সেরেস্তায় মুহুরি ছিলেন, জমিজমার ব্যাপার ভাল বুঝতেন। আরেক জায়গায় ছয় কাঠা ভাল জমির কথা তিনিই বউদিকে বলেন।
—''সম্পত্তি একটা মা! কিছু না করেন, তো পরে বেচলে দাম পাবেন।''
দাদা বলল, আমার সম্পত্তি বাড়াইবার দরকার নাই রামরতনবাবু।
—নয় বেইচা দিবেন।
—থাক না।
বউদি বললেন, চলেন, আমারে একদিন দেখাইয়া আনেন।
কী দেখেছিলেন বউদি? জমি মানে তখন চোর কাঁটা ও শিয়ালকাঁটায় আচ্ছাদিত এক ভূখণ্ড। জমি মানে বড় বড় শ্বেতআকন্দের গাছ। একমাত্র ইতিবাচক যা, পশ্চিমে রাস্তা আছে।
বউদি ফিরে এসে বললেন, ওই জমির দাম এ জমি হইতে অনেক কম। আমি কই, ছয় কাঠা নিমু কইয়া আসছি।
আমি বললাম, কী হইব বউদি?
—পাঁচিল দিমু কইলাম।
—গোসাঘর বানাইবেন?
—অত সওয়ালের জবাব দিতে পারি না। মাধবী তো গিছিল, অরে শুধান।
মাধবী বলল, ভালই তো।
দাদা বলল, কিন্তু ক্যান মিরনাল?
বউদি বললেন, জীবনে পরথম কিছু চাইত্যাছি, তোমরা যে উকিলের সওয়াল শুরু করলা? যদি একখানা গয়না চাইতাম, দিতা না?
দাদা বলল, দিতাম।
—তয় এ জমি কিনবা।
তারপরের বিস্ময়, জমি আমার নামে রেজেস্ট্রি হওয়া।
দাদা বলল, ক্যান, এ বাড়ি সইতারও নয়?
মাধবী বলল, কাকা। কলকাতায় একটা বাড়ি করো। বেশ আমরা থাকব, পড়তে যাব।
—চুপ যা মাধবী। তরে শুধাইছে কে?
আমি বললাম, আমারে তো কইবেন?
বউদি বললেন, আপনের দাদারে কই? যেদিন জেল থিকা বারাইছে, সেদিন থ'নে যা পারে, যহন পারে, আমারে দেয়। ওই টুক তার নিজস্ব থাক।
—আমার পোলারা কি...
—কেউ কারে ফালায় না গো! আবার ভবিষ্যৎও দেখা যায় না। ধরো, যদি বুড়া বয়সে ঠাকুরপো বিয়াই করেন?
—ভালই বলছেন বউদি। কোনো বুড়ি দেইখা রাখছেন না কি?
—ওইটুক তার নামে থাউক। ঠাকুরপো কিছু নাই করেন, নয় আমি গোসাঘর বানামু।
পরাস্ত করে ছাড়ালেন বউদি। কত সামান্য টাকায় সেদিন জমি কিনি, কী বলব!
দাদার স্বপ্নের বাড়ির খানিকটা হতে না হতে ওই ঘোরানো সিঁড়িটা নিয়ে আসি। বলি, বাড়ির এও একজন সদস্য। ইয়ার থাকার প্রভিশান কইরা বাড়ি বানাইতে হইব।
বউদি বললেন, ঘুরাইন্যা সিঁড়ি!
দাদা বলল, ভিত দোতলায়। কুনোদিন দোতলা উঠাইতে কি পারুম না? তখন এই সিঁড়ি বাগানের দিক বসামু। সিধা ছাতে উঠব গিয়া। কী মজবুত, দেখ মিরন্যাল। একশৎ বৎসর টিকব। টাউনে কারও বাড়িতে নাই। সকলে কইবে, দেখছ নি ঘুরাইন্যা সিঁড়ি? কোথা আছে? না নেউগী বাড়ীতে।
দাদার চোখের অসম্ভব স্বপ্ন বউদিকে নির্বাক করে দিয়েছিল, আমাকেও।
স্বাধীন আর সুভাষ ইস্কুলে সকলের কাছে গল্প করেছিল। ফলে কয়েকদিন ধরে ওদের সহপাঠীরা সে সিঁড়ি দেখতে আসত।
মাধবী আমাকে বলেছিল, কাকা! ''নিশির ডাক'' ছবিতে এ রকম সিঁড়ি আছে। কিন্তু বাবা তো সিনেমা দেখেন না?
—না, হলে গেলে ঘুমাইয়া পরে।
—তোমাদের দেশের বাড়িতে এ রকম সিঁড়ি ছিল বুঝি?
—না রে মা! তর বাপে অনেক কষ্ট করছে। আমার লগে ঘুরতে ঘুরতেই এ সিঁড়ি দেখছিল। যেমুন দেখল, মনে ধইরা গেল।
—মা'দের বাড়িতে ছিল?
—না। নদীর ধারে গ্রাম, সেখানে পাকা বাড়িও অন্য রকম হইত।
—ও বাবা! পাঁচটা বাজে!
—যা, চা বসা। নয় তো মায়ে দিব!
ইট, কংক্রিট, লোহার শিক, সিমেণ্ট, বালি, চুন ও অবাস্তবতা নিয়ে তৈরি হয় বাড়িটা।
গেট দিয়ে ঢুকলে, পাঁচিলের গায়ে গেট। যথেষ্ট উঁচু পাঁচিল, সাদা রং করা। গেটের মাথায় অর্ধচন্দ্রাকৃতি লোহার ফ্রেম। তাতে মাধবীলতা।
গেট, ওই ফ্রেম, দরজা, জানলা, মুখ ধোবার বেসিন, সবই আমি ডাট সাহেবের গুদাম থেকে শস্তা দরে আনি।
ডাট সাহেব কি হাসা হেসেছিলেন। দেখ, সতীনাথের পাগলামি দেখ! ও এসব কেনে, আমি কিনি ওর কাছে। আবার আমার কাছ থেকেই .... সতীনাথ! গিফট নিন একটা। দারুণ একটা আলমারি কিনেছি। এটা নিন অন্তত।
—ওটা নয়। গিফট দেবেন তো ছোট্ট রাইটিং টেবিলটা দিন।
—আপনি এক আশ্চর্য মানুষ বটে! সতেরো বছর ধরে সম্পর্ক, কোনও দিন বিগ প্রফিটে গেলেন না। স্বচ্ছন্দে কলকাতাতেই বাড়ি করতে পারতেন!
—দাদা বউদির ''কলকাতা'' নামে অ্যালার্জি।
—একদিন তো আসতেই হবে!
—দেখা যাক!
—কলকাতা প্রপার না হোক, কল্যাণী, বেহালা, যাদবপুর, গড়িয়া, সবুজের সমারোহ।
—১৯৬৫—৬৬—তে। বিশ বছর বাদে সব কংক্রিট হয়ে যাবে।
—সে জন্যেই তো পিতৃদেব বালিগঞ্জ সার্কুলারে অত জমির মধ্যে বাড়ি করেছিলেন। তখনকার স্ট্রাকচার।
ডাট সাহেব দেখে যাননি, সেখানে এক বহুতল বাড়ি এখন। অরূপ এবং অমিতের দুটো করে ফ্ল্যাট ছিল। আছে কি না জানি না। ডাট অ্যানড ডাট অ্যানড ডাটের মালিকানা এক অনাবাসী বাঙালির, যে নাকি আরেক 'ভারতে বাস করেও অনাবাসী'' মানুষের শিখণ্ডী। এমনই সব শুনি ও কাগজে ''তদন্তমূলক'' রিপোর্টে পড়ি। ডাট সাহেব বলতেন, কয়েক জেনারেশান তো নামটা থাকবে!
প্রতাপদাদাদের বাড়ি তিন শরিকে ভাগ হয়ে গেছে। ওঁর ভাইপোর ছেলে এখন কংগ্রেস নেতা। তার নাম লোকে বেশি জানে। আমি তো কলকাতার কাছে বহুদিন মৃত। গেলেও পালিয়ে আসতাম, এখন আর যাই না।
আমাদের এ বাড়িতে যথেষ্ট বড় ও উঁচু কয়েকটি ঘর। বিশ ইঞ্চি গাঁথনির দেয়াল, সুভাষ বলে, জায়গার অপচয়।
গেট দিয়ে উঠে একটি ঢাকা বারান্দা, তারপর লম্বাটে হলঘর। তার দু'দিকে দুটি করে চারটি শোবার ঘর। তারপর একটি ''আমার ঘর'' সংযুক্ত হয়, অ্যাপেনডিকসের মতো।
দোতলা অবধি সিঁড়ি আছে, যা ছাতেই শেষ। দাদার স্বপ্নের দোতলা অবশ্যই ওঠেনি।
গৃহপ্রবেশের দিনটা মনে থাকবে। পূজা হ'ল, লোকজন খেল। পঁয়ত্রিশ হাজার সাতশো ঊনষাট টাকাতেই এ বাড়ি হয়েছিল। আজ এ টাউনে এ খরচে এমন বাড়ি তৈরি এক স্বপ্ন কথাই বটে।
১৯৬৫ সালে জমি খরিদ।
১৯৭০ সালে বাড়ি তৈরি শেষ হয়।
একখানা ঘর, পাকশালা, বাথরুম, জল ব্যবস্থা হলেই উঠে আসা যেত। কিন্তু দাদার হাঁপানি আরেকবারও হয়। বউদির ভয় হল, চুন, সিমেন্ট, বালির দৌরাত্ম্যে দাদার আবার হাঁপানি হতে পারে।
যতিনাথ ১৯৬৫ সালে, মাধবী ১৯৬৮ সালে কলকাতা চলে যায় পড়তে। বাড়িতে স্বাধীন, সুভাষ ও বউদি।
এটা বলতে হবে, যে বউদির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় এত ভাল হবার কোনও ব্যাখ্যা পাই না। বিপুলা এ পৃথিবীর যতটুকু জানি,—(অনেকদিন যাবৎ ''ভ্রমণ'' পত্রিকা কিনি এবং এখন ভারতে মানসভ্রমণ করি),—নেউগী বংশ বিষয়ে তার চেয়েও কম জানি।
কেউ কি মেধা উজ্জ্বল, বিদ্যা ও জ্ঞানপিপাসু ছিলেন? প্রমাণ পাই না। বাবা আই. এ. ফেল, দাদা গ্র্যাজুয়েট। আমি ''সেলফ—টট'' ব্যক্তি। সে সময়ে জেলে না গেলে, অনেক ভাল লোকের সাহচর্য না পেলে, অনেক বই না পড়লে, অগামুর্খই থাকতাম।
মায়ের দিক থেকে পেয়েছিল মেধা?
প্রমাণ অযোগ্য। বউদির মা অল্প বয়সে মেয়ে নিয়ে বিধবা। বউদি সে বাড়িতে এক আশ্রিতার মেয়ে মাত্র। পাঠশালে গিয়েছিল, লিখতে পড়তে শিখেছিল, আমার মায়ের কাছে পড়তে আসত। পড়ার পিপাসা তার ছিল। মা এবং দাদা ওর পাঠোৎসাহকে লালন করেন।
তার পাঠের নেশা খুবই ছিল। তা মেধার পরীক্ষা তো হয়নি। পড়াশোনার সুযোগ পেলে তবে না বলা যেত।
ছেলেমেয়েদের ''পড়াশোনা করেই দাঁড়াতে হবে'', একথা দাদাও বলত, বউদিও বলতেন। দাদা বলতেন, পড়াশুনা করলে সার্ভিস করতে পারবি। সরকারি সার্ভিস মানে সিকিউরিটি।
বউদি বলতেন, দেখ! মাথা যখন আছে, স্কুলেও তাই কয়, তখন ল্যাখাপড়ায় আগাইয়া পথ কইরা নাও। বাবা আর কাকা জমিদার নয়, ব্যবসায়ীও নয়। কাকা ঠিকাদারি করে বটে, কিন্তু সে পয়সা নয়। এটাও মনে রাখবা, তোমাগো' কই, সৎ বংশ,—আর তোমাদের কাকা স্বাধীনতা সংগ্রাম করছে।
ওরা মনে করত, যত বাধাবন্ধ সব মফঃস্বলে। যত সুযোগ সব কলকাতায়।
যতিনাথটা হাবা, ও বলেই ফেলেছিল, মফঃস্বলে হাঁপ ধরে যায়, তোমরা বুঝবে না।
বউদি বলতেন, এমুন খোলা বাতাসে হাপ ধরে? আমার তো ধরে না।
আমি আড়ালে বলতাম, নটাকোলের পর জেলায় জেলায় পোস্টিং, তোদের বাবা—মা কলকাতায় থাকেও নাই, সেজন্য দুঃখও নাই। অহন তো তোদের বাবা এমন জায়গাতেই ভাল থাকব।
তা, ওরা এতই ভাল ফল করত, যে শিক্ষক শিক্ষিকারা ওদের বিষয়ে বিশেষ যত্ন নিতেন। যে ছাত্র বা ছাত্রী ভাল রেজাল্ট করে স্কুলের, তথা মহকুমার, তথা জেলার মুখ উজ্জ্বল করবে, তার বিষয়ে যত্ন নিতেন।
এটাও অবাক লেগেছে, রাজনীতি ওদের কত কম আকর্ষণ করেছে। হয়তো প্রত্যেক প্রজন্মেই এমন তরুণরা থাকে,—লেখাপড়া কেরিয়ার করা, দূরে চলে যাওয়ার বাইরে ভাবতে পারে না কিছু। ভাবতে চায়ও না।
সে সময়ে এমনটা স্বপরিবারে দেখা কিছু নৈরাশ্যজনক। যতিনাথের সতীর্থ কিশোর কলেজে পা রেখেই প্রথমে আদি কম্যুনিস্ট পার্টি, পরে মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টি দ্বারা আকৃষ্ট হয়।
যতিনাথ রাত জেগে কী করে তা জানতে দাদা বড় উদ্বিগ্ন হত।
বউদি বলতেন, অর কারণে পুলিশ আইব না কোনও দিন। হেয় পরার বই পরে।
ওঁদের কোনও সন্তানের জন্যই পুলিশ এল না কোনও দিন। ওরা আগে আগে ওদের পিতামহীর বাবার রাজনীতিক ব্যাপারটা শুনেছে। আমার কথা তো জানেই।
কোনদিন আগ্রহ দেখিনি জানতে। আমি স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশান নিলাম, কোনও আগ্রহ নেই ওদের। শুধু নিজের বাইরে সব জ্ঞাতব্য বিষয়ে এমন অনাগ্রহী কেন করে হ'ল ওরা?
ইতিহাসে কোনও ''হঠাৎ'' নেই। ''ধারাবাহিকতা'' আছে। একদম আত্মকেন্দ্রিক ও কেরিয়ার—অর্থ—সাফল্য মনস্ক যে তরুণ প্রজন্ম দেখে আমরা ব্যাখ্যা খুঁজছি,—তাদের ঠিক আগের প্রজন্মে তো আমি আদিনাথ ও মৃণালের মতো দুটি অতিসাধারণ, অতি অনন্য মানুষের সন্তানদেরই দেখেছি।
এখন মনে হ'ল, নেউগীদের ধারাবাহিকতা ওরা রক্ষা করছে না তো? হয়তো বা নেউগীরা অতীব মডার্ন ছিলেন সবাই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তো দেখছি, গুষ্টিবর্গের তোয়াক্কা না করে একেক প্রজন্মে একেকজন বামুনপাড়া ছেড়ে দুর্গাবাড়ি, দুর্গাবাড়ি ছেড়ে নটাকোল চলে যাচ্ছেন। কাদের ফেলে এলেন, তা নিয়ে একদম ভাবিত নন?
নেউগীরা সবাই ''দূরাকাঙ্ক্ষের বৃথা ভ্রমণ'' কেন করতেন?
যাক, ''ক'' বলতে ''কামস্কাটকা'' গিয়ে লাভ নেই। মোট কথা, গৃহপ্রবেশ কালে, যতিনাথ ও মাধবী কলকাতায়। বাড়িতে সুভাষ ও স্বাধীন। ওরা এসেছিল। দ্বিপ্রাহরিক ভোজে নটাকোলা স্মরণে রান্না হয়েছিল—
১. সুকতনি
২. তিতার ডাল (কাঁচা মুগের ডাল ও উচ্ছে)
৩. বিউলি ডাল (ভাজা বিউলি)
৪. পাট ভাজা (পাকা কুমড়া পোরে ভাজা)
৫. চাপড় ঘণ্ট (পাঁচ তরকারি কুচিয়ে মটর ডালের ভাজা চাপড়া, আদাবাটা, ঘি ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে। থোড় আবশ্যিক)
৬. কালো জিরা, কাঁচালঙ্কা দিয়ে পাবদা মাছের পাতলা ঝোল (গীতানাথের প্রিয়)
৭. বড় বড় কই মাছের জিরা—কই (শশিপ্রভার প্রিয়)
৮. রুইমাছের নিরামিষ (পিঁয়াজ বর্জিত) কালিয়া
৯. টকের ডাল (মটর ডাল ও আমসি)
১০. তেঁতুলের টক (পাকা তেঁতুল ও আখী গুড়ের ঘন সুমিষ্ট গোলাতে কাগজী লেবুর সুগন্ধি পাতা কচলে দেয়া। এটি কাঁচা টক এবং মৃণালের প্রিয়)।
১১. পায়েস (সতীনাথ এক জামবাটি খেতে পারে)
১২. কাঁচা গোল্লা (নাটোর থেকে আগত এক একদা উদ্বাস্তু ময়রার তৈরি)
১৩. কোমল পিঠা (ক্ষীরের লুচি রসে ফেলা। বড় এলাচের গুঁড়া আবশ্যিক)
না, তেরো ব্যঞ্জনে ভোজ হয়নি। ভাত, ঘি, লবণ, সবই ধরতে হবে।
রান্নার জন্য গদাই সান্ন্যালের জননীকে আনা হয় সাইকেল রিকশা সহযোগে। তাঁর তত্ত্বাবধানে পাচকরা ও বউদির প্রতিবেশিনীরা রান্না করেন। নটাকোলের নিয়মে তাঁকে নতুন কাপড় প্রণামী দিয়ে সাইকেল রিকশায় তুলে দেয়া হয়। নটাকোল হলে পালকিতে বা গরুর গাড়িতে বা নৌকায় আনতে হত। গদাই সান্ন্যালের মা বউদিকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, এতটি সামগগিরি দিছ, তাতেই বেন্ননে স্বাদ হইছে মা!
স্বাধীন, সুভাষ, যতিনাথ এবং যতিনাথের কলকাতার বন্ধু সবুজ দক্ষ হাতে পরিবেশন করেছিল। পরে সুভাষ বাজি ফেলে এক কড়াই পায়েসের অর্ধেকটা খায়।
কেমন করে জানব, সুভাষ কিছু কাল বাদে সকল ভাইবোনের রেজাল্ট নিষ্প্রভ করে এক ''নক্ষত্র ছাত্র'' হবে (বাংলা কাগজের রিপোর্ট, জেলার সাপ্তাহিক সংবাদপত্র),—এবং নিজের রেজাল্টকে হারিয়ে বারবার আরও ভাল করবে?
স্বাধীন চলে যাবার পর, দাদার আবারও হাঁপানি হ'ল।
দাদা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়। আমি বললাম, দ্যাহ আগে, না সার্ভিস আগে?
বউদি বললেন, আর নয়।
—তাই হয়? পোলারা দারায় নাই?
আমি বললাম, আমি কইতাছি, হয়।
সে সময় চার বছর আমি খুব মন দিয়ে কেনা বেচা করি। ডাট সাহেব আমাকে অরূপের নতুন নেশার কাজে লাগান।
ভিনটেজ গাড়ি খোঁজ করে করে আনা, কেনা এবং গাড়ি প্রতি কমিশন।
ডাট সাহেবের অধীনে ও নির্দেশনায় সরকারি আবাসন তৈরি। এ কাজটি উনি মাঝ পথে ছেড়ে দেন। আমিও চলে আসি।
দুর্গাপুরে কারখানার কোয়ার্টার তৈরি।
চার বছরের পর পারিনি। বউদি লিখলেন, ''আপনাদের তো জেল খাটা—পেনশানও হইল। এবার ঘরের ছেলে ঘরে আসেন। একবার আপনার দাদারে কলকাতায় দেখাইলে ভাল হয়।''
দাদা ও বউদিকে কলকাতায় আমার পুরাতন হোটেলের শ্রেষ্ঠ কামরায় রাখি। ডাক্তার দেখাই। ডাক্তার মিত্রর নার্সিং হোমে রাখি, ইনি কমন সেনস ও বাস্তবতা সচেতন এবং বড় ডাক্তার। ইনি বললেন, যেমন খোলামেলা জায়গায় বাড়ি করেছেন, সেখানেই থাকুন। প্রেসক্রিপশান দিচ্ছি। সকালে মাঠে সামান্য হাঁটবেন। কোনও তামাকের নেশা তো নেই?
—নাঃ। ভাতের পরে লবঙ্গ মৌরি।
—ঠিকই আছে। বারো মাস ঈষদুষ্ণ জল খাবেন।
বউদি ডাক্তারকে একান্তে বললেন, কোনও আশঙ্কা তো নেই?
—হাঁপানি..... বেশি বয়সে...... খুব যন্ত্রণাদায়ক। ওখানে অক্সিজেন ব্যবস্থা রাখা সম্ভব? মানে খুব টান উঠলে?
—না। উপায় নাই।
—নিয়েই যান। ওখানে ভালই থাকবেন।
দাদাও বলল, ধোঁয়া আর ধুলা আর মটর বাসের গ্যাস। আমারে লসয়া চল সইতা।
দাদাদের নিয়ে পৌঁছে দেয় যতিনাথ আর মাধবী। আমি কয়েক দিনেই আমার কলকাতার পাট চুকিয়ে ফিরে যাই।
জেনসন ও নিকলসনের লাল রং কিনে নিয়ে যাই। ঘোরানো সিঁড়িটি রং করাতে দাদা খুব আনন্দ পায়। শিশুর মতো।
আমি আর বউদি
ওই হাঁপানিই দাদাকে নিয়ে গেল পনেরো বছর আগে। খুব, খুব কষ্ট পাচ্ছিল দাদা। সুভাষ কলকাতা থেকে গাড়ি করে অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং তা দেবার লোক নিয়ে আসে।
খুব কাজ হয়নি।
বউদির ছেলেমেয়ের মধ্যে যতিনাথ ও সুলতা আগেই এসেছিল। মাধবী ও সবুজ তো আমেরিকায়। ওদের আসার কথা ওঠেইনি। স্বাধীন আগে, তপা পরে আসে। সুভাষ আগে আসে, বিনি পরে এল।
এই যে ছেলেমেয়েরা যে—যার ইচ্ছায় বিয়ে করে, দাদা খুব মর্মাহত হয়েছিল। তার ধারণাতেই ছিল না, যতিনাথ বাবা—মাকে কিছুই না বলে রেজেস্ট্রি বিয়ে করবে।
দাদা বলল, আমারে বললে আমি কী করতাম? বাধা দিতাম, আমি কি দেখি না, পোলা মাইয়া সব স্বেচ্ছায় বিয়া করে?
আমি ব্যাপারটা হালকা করতে চাইলাম। বললাম, দাদা! ওরা কেও এহানে থাকত না।
—কলকাতা টাইনা নিতেছে অগো।
—আমরা তো থাকলাম।
—যতি আছিল নেরু (নিরীহ) পোলা। হে এট্টা মেয়েরে বিয়া বসল, যে নিজেও পরায়। দুজনেই কাজে যাইব, সংসার দেখব কেডা?
বউদির ঈশ্বর বিশ্বাস খুব গভীর। তিনি বললেন, শিক্ষিৎ মাইয়া খারাপ হইব না। যতি তো তুমি নয় গো! মায়ের কথায় কাঙালিনীর মাইয়া লইলা। মা গো! তহনে ''মৃণাল'' লেখতে ''ম্রিনাল' লেখি।
—তোমার লগে তার তুলনা?
বউদি লিখলেন, তোমরা আসিবে। এখানে ছোট করিয়া পাকস্পর্শ হইবে। তোমরা কলকাতায় থাক। আমরা পল্লীসমাজে থাকি। তোমার বাবার দেহ ভাল যায় না। একুশা আষাঢ় শুভদিন। তোমরা আসিবে।
মজার বাপার, সুলতা এতে খুব খুশি হয়। হলে বা যতির সতীর্থ, সমবয়সী,—চেহারাটা কচি কচি, মুখ চোখে আলগা শ্রী আছে। সে সারাদিন গৌরাঙ্গদের বাড়িতে থাকল। সন্ধ্যায় ভাড়া করা মোটরে এ বাড়ি এল। বধূবরণ করে গালচেতে বসিয়ে বউদি তাকে একজোড়া রুলি, একটি ঢাকাই শাড়ি দিলেন।
শতখানেক নিমন্ত্রিত ছিল। খরচপাতি আমিই করলাম। বিয়েতে ওরা বই, শাড়ি ও টি—সেট পায়। মা—বাবার ছবিতে প্রণাম করালেন বউদি। হাসনুহানা, দোলনচাঁপা, রজনীগন্ধা, সবই ছিল বাগানের ফুল।
সুলতা বাড়ি দেখে মুগ্ধ। বলে, চেঞ্জে যাব না কোনদিন, এখানেই আসব।
সুলতার মামা দাদার সহকর্মী ছিলেন। ফলে সুলতা দাদার সঙ্গেও কথাবার্তা বলল খুব।
ওরা চলে গেলে দাদা বলল, স্বজাতি নয়। কী করা যাইব? অহন তো এ বিয়া আইনসিদ্ধ। আমার দুঃখ, যতিনাথ ডবলিউ—বি সি এসে বসব না। কলেজে পরাইব।
সরকারি সার্ভিসের মর্ম এরা বুঝল না।
আমি বললাম, মন্দ কী? মাইনে তো বাড়বে। শুরুতেই আটশো দাদা!
—দেখ, ভাল হইলেই ভাল।
সবুজ ও মাধবীর প্রেম, বিবাহ, বিদেশগমন, সবই সাইক্লোন গতিতে হয়ে যায়। মাধবী ও সবুজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিলই। কিন্তু সবুজের দিদির স্পনসরশিপের জোরে সবুজ সবুজ কার্ড পায়। এই টাউন,—কলকাতা, —বন্ধুদের সঙ্গে কিছু ঘোরা,—একবার সেমিনারে দিল্লি যাওয়া, এটুকু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই মাধবী চলে গেল আমেরিকা।
ও একা এসে বাবা—মা—আমাকে দেখে গিয়েছিল। আমেরিকা থেকে লিখেছিল, দু'বছর বাদে ও নিজে টাকা দিয়ে মা—বাবাকে নিয়ে যাবে। বাবার চিকিৎসা করাবে।
দাদা আস্তে বলল, কবিরাজী ত্যালটা ন্যালার মা ভাল মালিশ করে।
তারপর বলল, মনটা নির্লিপ্ত করতে চেষ্টা করতে আছি মিরনাল! সহজ নয়, তবু পারুম।
আমি বললাম, তুই বিয়া দিলেও তারা যাইতে পারত, অহন তো যায়। ও নিজে বিয়া কইরা গিছে। ভাল মনে ল' ব্যাপারটা।
—হ! কিছু পাইতে গিছে, পাউক।
স্বাধীনকে কেন তপার বাবা নির্বাচন করেন, তা বোঝা খুব সহজ। স্বাধীন হাই—ফাই কাজই করছিল ওঁর চা—রপ্তানির অফিসে। ওঁর তিন মেয়ে, তপা—দীপা—রূপা। ওঁর তিন মেয়ের তিনটি বাড়ি সলট লেকে এ—ই সেকটরে। ওঁর দরকার ছিল ঘরজামাই।
অবশ্য আনুষ্ঠানিকতা বজায় রেখেছিলেন। গাড়ি নিয়ে প্রস্তাব করতে আসেন। স্বজাতি, স্বঘর, বৈভব দেখে পাত্রপক্ষ আসে। স্বাধীন সে গোত্রের নয়। সে বলছে, মা—বাবা—কাকাকে বলুন।
বউদি বলেছে, দেখলেন তো অর বাবারে! অহন আমরা তো কিছু পারতাম না।
—অনুমতি করেন, সব করে দেব। তপা আমার অফিসও দেখে! ওরা দু'জনে দেখবে। নয়, রিসপশানে যাবেন?
—কেমুন কইরা? আমার কর্তব্য ইয়ার সেবা করা। আমি যাইতে পারি?
—কাকা?
—ইনিই তো ধইরা আছেন সংসার।
—এই তো! এমন না হলে পরিবার? এমন না হলে স্বাধীনের মতো ছেলে হয়? কিন্তু এখানে এমন.....
বউদি যেন অনেক দূর থেকে বললেন, বউ নিয়া আইব স্বাধীন! আশীর্বাদ লইয়া যাইব। কাছ থিকা হউক, দূর থিকা হউক,—আশীর্বাদ তো অর দাদা আর দিদিরেও করছি! স্বাধীনরে কইয়েন, বাপরে য্যান দেইখা যায় একবার!
তপার বাবা বললেন, সে কী বলছেন! বাবাকে গাড়ি এনে নিয়ে চলুক কলকাতা! ভাল ডাক্তার......... ভাল নার্সিং হোম.........
—আর লাগত না। একবার য্যান দেইখা যায়। ঠাকুরপো বরো পোলা আর সুভাষরে লেইখা দিবেন, তারাই য্যান দারাইয়া শুভকার্য সম্পন্ন করে। ইনির দ্যাখেন, বুরাবয়সে হাপানি ধইরা দ্যাহ ভাঙল। কলকাতায় লইয়া চিকিৎসা তো ঠাকুরপো করাইছে। আমার মন এহানে, .... কী বা করতাম? আর অবস্থাও দ্যাখলেন। আমরা চলছি আমাগো মাপে।
—তাতেই তো এমন সব সন্তান হয়েছে! সুসন্তান দিয়ে দেশকে আপনারা এনরিচ করেছেন।
উনি সঙ্গে অনেক মিষ্টি এনেছিলেন। সম্ভবত ওঁর অফিসের একটি ছেলে ও ড্রাইভার সঙ্গে ছিল। বউদি আমাকে বললেন, অগো খাইয়া যাইতে বলেন।
তপার বাবা হাত জোড় করলেন। বলেন, ভাত তো চলবে না বেহান। মেয়ের বিয়ে দিতে এসে....
—কিছু হইত না। আর...... ইনি কারেও না খাওয়াইরা ছারে নাই। স্বাধীনরা ফুটবল খেইলা ফিরতে দেরি করছে, তো রাত দশটায় ওদের সগলটিরে পাক কইরা খাওয়াইছি।
—বেয়াইয়ের কথা যখন বললেন....... খেয়ে যাব। তবে বেশি কিছু নয়। সন্ধ্যাতেই ফিরব।
—না, রাতে যেয়েন না। পথঘাট..... শুভ কার্যের আগে কুনঅ বিপদ হইতে পারে....
আমি মাছ আনলাম। বউদি ডাল, পাঁচ রকম ভাজা, টাটকা রুই মাছের ঝোল, ঘরে পাতা দই, টাটকা রসগোল্লা পরিবেশন করলেন বড় বড় খাগড়াই কাঁসার থালা—বাটিতে।
তপার বাবা মুগ্ধ হয়ে বললেন, দেশে গেলে ঠাকুমা রাঁধতেন। সেই কথা মনে পড়ছে।
—আপনাগো দ্যাশ?
—নদীয়া—মেহেরপুর!
—সে তো দ্যাশ ভাগে গিছে।
—হ্যাঁ..... ওই পুজোতে যাওয়া হ'ত! বাড়িতে মা কষে রাঁধতেন, ভুলে গেছি। আমার স্ত্রী তো...
—ব্যস্ত থাকেন!
—খুব, খুব। মা.... মেয়েরা...
—আরেকটা মাছ নেন!
খুব তৃপ্তি করে খেলেন ভদ্রলোক। বাগানে গিয়ে গাছ দেখতে দেখতে আমাকে বললেন, আমার মেয়ের সৌভাগ্য যে এমন পরিবারে বিয়ে করছে।
—দেরি করবেন না....দাদার শরীর ভাল যায় না....
যতিনাথ, সুলতা, সুভাষ ওদের বন্ধু বান্ধবই স্বাধীনের বিয়েতে যায়। শুনলাম সে খুব আলিশান বিবাহ। বউদিকে ওরা অতীব দামি এক লালপেড়ে গরদ দেয়।
বিয়ের পর যতিনাথ, সুলতা, সুভাষ সকলেই আসে ওদের নিয়ে। সদর শহরে সার্কিটহাউসে উঠে স্নান করে তাজা হয়ে তবে এল নববধূ।
তপার বিষয়ে বলব, ও যা, তা তাই। কোন ভানভনিতা নেই। কাঠ কাঠ চেহারা, স্বল্পভাষী, মেপে হাসে, প্রণাম করল আলতো ছুঁয়ে।
বউদি ওকে একটি মুর্শিদাবাদী সিল্ক ও আংটি দেন। দিনে খেয়ে বিকেলে ওরা সার্কিটহাউসে ফিরে যায়। স্বাধীন কাতর কণ্ঠে বলে, ওর বাবার বন্দোবস্ত.... আমরা দার্জিলিং যাব.... চা—বাগানে...... ফিরে এসেই বাবাকে দেখতে আসব।
—আসিস। ভাল থাকিস। সাবধানে থাকিস।
তপাকে বললেন, স্বাধীন আমার শান্ত পোলা। অরে দেইখো। জ্বর হইলে কাতরায় নাই, পা ভাঙলে উঃ করে নাই......... তুমি বুদ্ধিমতী.......... শিক্ষিত..... ভাল থাইকো মা.... আমরা পয়সা চিনি নাই... পোলাগো মানুষ করতে চেষ্টা করছি.....
তপা ওঁর হাতে সামান্য চাপ দিয়েছিল। সেটাই যেন আশ্বাস দিল।
ওরা চলে গেলে বউদির ঠোঁট কেঁপেছিল, চোখ সজল হয়েছিল।
দাদা বলল, কাইন্দনা মিরনাল!
—স্বাধীনরে অরা গ্রাস করবে।
—ক্যান মিরনাল, এ কথা বলো ক্যান?
—তার চক্ষু ধাধাইছে গো! কৎ বরো বারি দিছে শ্বশুর! গারি দিছে অগো! বারির সগল জিনিস না কি বিদ্যাশের! সুলতারে কইতে আছিল। দার্জিলিংয়ে বরো হোটেলে থাকব!
—ঠিকোই আছে। কালের গতি! তুমি আমি কী করতাম?
কী করতাম? কী করেছিলাম? কোনদিন বিদেশী কাপড় পুড়িয়েছিল এ দেশ? কত বিপ্লব, কত সংগ্রাম,—স্বাধীনতার আগে এবং আজও কত আন্দোলন।
দেশের জন্যই তো সব! সে যে পার্টিই করুক। দেশ দেশের মতোই থাকল। বিদেশী আক্রমণ এখন পোশাকে, প্রসাধনে, ওষুধে, গৃহসজ্জায়, সর্বত্র!
আদিনাথ আর মৃণালের তিন ছেলে, এক মেয়ে। নাতি নাতনি চারটি।
স্বাধীন ও তপা এখন এন. আর. আই। নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান। রাজর্ষি বা রাজ্যশ্রী হয়ে গেছে রাজ ও রিচা। ওরা বাংলা জানে না। রুমা তো থাকলই না।
মাধবীর এন. আর. আই. ছেলেরা অরু ও বীরু আমেরিকাতেই বড় হ'ল। বাংলা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য প্রবাসী বাঙালিরা যেসব অনুষ্ঠান করেন, তাতেও ওরা যেতে চান না,—একদা মাধবী লিখেছিল। 'আ মরি বাংলা ভাষা''র দেশে মফঃস্বলে, সমৃদ্ধ গ্রামেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ভাইরাস ব্যাপক ছড়িয়েছে।
আমরা তিনজন যেন নটাকোলেই ফিরে গেলাম।
সুভাষের বিয়েও ধর তক্তা মার পেরেক গোছের। বিনিকে ও প্রায় কিডন্যাপ করে বিয়ে করে। বিয়ে করেই চলে এসেছিল এখানে। বলল, রেজেস্ট্রি সেরেই আসছি মা! বরণ করো, আমি সিঁদুর পরাই।
বিনিই অনুষ্ঠান অভাবে খুব দুঃখ পায়। বউদিকে বলল, আমার কবে থেকে ইচ্ছা, হোমযজ্ঞ করে বিয়ে হবে! আমার বাড়ি বলতে তো মাসির বাড়ি। আপনাদের জানালে হয়তো হ'ত।
—না রে মা! অর বাবা যে কষ্ট পাইত্যাছে। কে হোম যগ্য বেবস্থা করে, বলো?
বিনি বুঝেছিল। বিনি তপার চেয়ে অনেক ইংরেজিনবিশ, অনেক শিক্ষিত। আবার ওর মধ্যে একটি খাঁটি মানুষ আছে।
বউদির একমাত্র ঢাকাই শাড়ি পরিয়ে দেন বউদি। একমাত্র রুপোর সিঁদুর কৌটো থেকে ওর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে কৌটোটি দেন। বলেন, এর বেশি পারলাম না রে মা!
সুভাষ বাড়ির বাতাসে মৃত্যুর আগমনবার্তা শুনেছিল? জানি না।
কিন্তু ওই গিয়ে মাছ কিনে আনল। ন্যালার মাকে বলল, জমিয়ে রাঁধো। আমরা খেলেই হ'ল।
জিগ্যেস করলাম, তোরাও কি হনিমুনে যাবি?
—কিসের? ব্যস্ত, ব্যস্ত এখন কাকা! ফিরে যাব।
বিনি আমাদের অবাক করে বলল, আমি ক'দিন থেকে যাব। তুমিই বা কী? এখানে এমন অবস্থা দেখে ফিরে যাবার কথা বলছ?
—মিটিং, মিটিং, অ্যাপয়েন্টমেন্ট....
—তুমি যাও, আমি দু'দিন বাদে যাব।
বউদি বললেন, বলছ, এই যথেষ্ট রে মা! থাকতে লাগব না।
—আমি তো আমার মা—বাবার জন্য কিছু করতে পারিনি....
সুভাষ বলল, প্লেন দুর্ঘটনায় মারা গেল সকলে.... তুমি কী করতে?
—থাক।
সুভাষ চলে যায়, বিনি সত্যিই দিন তিনেক থাকল। সুভাষ বহির্মুখী স্বভাবের, বিনি অন্তর্মুখী। বিনি সে সময়ে দাদার বুকে মালিশ করেছে, পাখার বাতাস দিয়ে দুধ জুড়িয়ে দিয়েছে, দাদা কাস ফেললে পিকদানি ধরেছে।
আনাড়ি হাত, কিন্তু আন্তরিকতা আছে।
বিনিই আমাকে জিগ্যেস করেছে জেল—জীবনের কথা। বলেছে, আপনাদের খুব ভাল লেগেছে আমার।
—তুমি কী পাশ করেছ মা?
বিনি মুখ নামিয়ে বলেছে, ফিজিকসে এম. এস. সি. করেছিলাম। রিসার্চও করছিলাম। বাড়ির অ্যাকসিডেন্টের পর.... কী যে খেয়াল হ'ল..... একটা বিজ্ঞাপনের অপিসে ঢুকলাম ... তারপর একটা আর্কিটেকটের অফিসে .... সেখানেই সুভাষের সঙ্গে আলাপ.....
—শুনলেও ভাল লাগে।
—সুভাষ খুব উদ্যোগী। ও অনেক দূর যাবে।
হ্যাঁ, এটাই এ শহরের কাছে, আমাদের কাছে ব্যাখ্যাতীত হয়ে রইল। কেন দাদার ছেলেমেয়েরা এমন অত্যুজ্জ্বল হ'ল? কেন তারা সকলেই এমন বিয়ে করল, যা গতানুগতিক নিয়মের বাইরে?
বিনি চলে যাবার পর বউদি সদুঃখে বললেন, ঠাকুরপো! টাউনে এরাদের ছুটকাল হইতে দেখতেয়াছে। কিন্তুক অহনে সগলে এমুন ভাব দেখায়, জানি আমাগো মধ্যে কী বা রহস্য আছে। কয়, আপনেরা তো কীর্তিমান পোলাগো মা—বাপ! কলকাতায় বারি কিনা চইলা যান! মটর কিনেন! নয় দশটা চাকর দাসী রাখেন!
—ঈর্ষা করে। মানুষের যা ধর্ম!
—আমারই কি মন পুরায় না? সাদাসিধা হইত তো একোজন কাছে থাকত!
দাদা বললেন, কলকাতাই অদেরে খাইল!
সুভাষের বিয়ের পর দাদা বেশি দিন বাঁচেনি। হাঁপানিগ্রস্ত মানুষ নাকি দীর্ঘজীবী হয়। দাদা তো উপর্যুপরি আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
যাবার আগে কয়েকদিন বড়ই কষ্ট পায়। সুভাষ অক্সিজেন সিলিন্ডার ও তা দেবার লোক নিয়ে আসে। রাত জেগে জেগে বউদির অবস্থাও কাহিল। ছেলেরা বউরা আগে পরে এল।
বৃহস্পতিবার বউদি ও ঘর ছেড়ে বাগানের দিকে বারান্দায় চলে গেলেন।
বিনি ভয়ে ভয়ে বলল, মা কথা বলছেন কার সঙ্গে। বুঝতে পারছি না।
যতিনাথ বলল, আমি দেখছি।
দাদার সামনে বসেও আমি বুঝতে পারছিলাম, বউদি কী বলছেন!
বলছেন, ভগমান অরে নিক, অরে নিক! এই কষ্ট আর দেখা যায় না! অরে আর কষ্ট দিয়েন না ঠাকুর।
গৌরাঙ্গ সহসা বলল, যতিকে ডাকুন।
যতি ঢুকতেই বলল, জল দাও বাবাকে।
বউদি মেঝেতে বসে পড়লেন দেয়ালে হেলান দিয়ে। আমি ঘর ছেড়ে চলে গেলাম। নটাকোলে শৈশব থেকে কৈশোর, অনেক স্মৃতির চলমান মিছিল। মনে যেন নদীর ধস নামছিল। আমিই তো চলে যাই, দাদা তো থাকে? দাদা কেন চলে যাচ্ছে? ও ঘরে পড়শী, চেনাজানাদের ভিড়। কে যেন বলল, যতি! আর জল দিও না।
আমি বউদিকে ছুঁই না। স্বাধীনভাবে বললাম, মা'রে ধরো। উনি বেচেতন হইয়া গিছেন।
এমনি করেই আদিনাথ নেউগী আমাকে বউদির জন্য, বউদিকে আমার জন্য রেখে চলে গেল।
দাদা বউদিকে পুরী দেখিয়ে এনেছিলাম। হঠাৎ মনে হ'ল দাদা বলেছিল, তুই আমার কুনো সাধই অপূর্ণ রাখলি না সইতা।
ঘোরানো সিঁড়িটা নিয়ে দাদার যে সাধ, তা তো অপূর্ণ থেকে গেল।
দাদার কৃতী ছেলেরা দাদার কাজ খুব সাড়ম্বরে করে। যতিনাথ ও স্বাধীনকে দেখে সুভাষও মাথা কামায়।
যতিনাথ, সুলতা ও বিনি ছাড়া কেউই টানা থাকতে পারেনি। স্বাধীন, সুভাষ ও তপা ফিরে গেল, আবার এল ছেলেরা। তপার আসা ঠিক হবে না, স্বাধীন বলল, ও খুব ভেঙে পড়েছে। তবে সব নিয়মই অবজার্ভ করছে।
বউদি নিজেকে গুটিয়েই নিলেন। বললেন, অরাই করুক। এ করা বেশি করা নয়। অদের বাপ নিজের বাপ—মার লিগ্যা অনেক করছে। তখন তো সংসারের পালে বরো বরো ছিদ্দির।
আমাকে বললেন, আপনেও করেন। সকল দুর্দিনে সে আপনের নাম করছে। যমক ভাই, নাড়ী কাটলেও বান্ধা থাকে।
আদিনাথ নেউগীর শ্রাদ্ধ, টাউনে এক গল্প কথাই হয়ে দাঁড়ায়।
সব মিটে গেলে আমরা বৈঠকে বসলাম। নিয়মভঙ্গে মাছের সমারোহ হবে কাল। বউদিকে যে যা বলে, উনি বলেন, তোমরাই করো।
সুভাষ বলল, এখন কী হবে? মাকে নিয়ে যাই কলকাতা?
যতিনাথ বলল, কোথায়?
—আমার ওখানেই? বিনিও তো.....
বউদি মাথা নাড়লেন। বললেন, কুন বাল্য বয়সে বিয়া! এক দিনের লিগ্যাও ছাইরা থাকি নাই। আমারে বারবার বলছে, বারি ছাইরা থাইক না মিরনাল! অহন...আমি এহানেই থাকুম!
—বাবার পেনশান তো পাবে?
—ঠাকুরপো আছেন! কী পামু, সেসব কথা ভাবিও নাই। চিন্তা করিস না, হইয়া যাইব। আর দরকারে তোরা তো আছস।
এবার বিনি কয়েকদিন থেকে গেল। কয়েক মাস সন্তানসম্ভবা, সুভাষ রাজি হচ্ছিল না। বিনি বলল, ক'দিনে কিছু হবে না। তুমি যাও।
খুব সাধারণ আশা আকাঙ্ক্ষার সামান্য একটি মানুষের কৃতী ছেলেরা একে একে চলে গেল।
বিনি বলল, বাবার ঘর যেমন আছে, তেমনি থাকুক মা?
—হ বিনি। অহন আমি ওখানে থাকব, ন্যালার মা মাটিতে শুইব। ন্যালা থাকব ঠাকুরপোর কাছে, আর কী!
—আমি যদি পারতাম...
—না রে মা! আর মায়া কাইড় না। কলকাতা গিয়া সাবধানে থাকবা, ডাক্তারের নিয়মে চলবা। আমাগো কালে এত সুবেবস্থা আছিল না গো! কষ্ট পাইছি অনেক।
বিনি চলে যেতে বউদি বলেছিলেন, দু'জনের স্বভাবে এমুন তফাৎ! মাইয়াটা কষ্ট না পায়।
তারপর প্রত্যহের মতোই দরজা জানলা বন্ধ আছে কি না দেখলেন। ন্যালার মাকে বললেন, তারাতারি খাইয়া শো'রে মা! কতদিন ঘুমাস না।
বনমালীর বউ ও বোন, ন্যালার পিসি সিদ্ধেশ্বরী, বা ঘনার মা, এরা এ কয়দিন এখানেই। ওরা এ রাতটাও রইল।
বউদি বললেন, পোলারা যে খরচ এই কাজে করল ঠাকুরপো! যদি তারে দিত...
—দোতলায় একখান ঘর উঠত.....ঘুরাইন্যা সিঁড়ি বসত, এই তো!
—তাই! যাক, ছিরা কথা ভাইবা লাভ নাই। অহন থাকলাম আমি আর আপনে।
—হ বউদি। দাদায় সেই ভরসা লইয়া গেছে।
—আমি আর আপনে।
—ন্যালা আর ন্যালার মা'রে ভুলবেন না।
—তাই পারি?
ন্যালা এসে বলল, আমিও কত্তা মা'র ঘরে ঘুমাব।
রাতে বউদির বিনবিন কান্নার গুঞ্জন শুনেছিলাম। যেন কোনও স্থায়ী আবহসংগীতের মতো কিছুকাল রাতে শোনা যেত, কথা বলে বলে কাঁদতেন বউদি। কথা বোঝা যেত না।
একদিন কান্না থেমে যায়।
বেলায় ঘুম থেকে উঠলেন বউদি। বললেন, কাল খুব ঘুমাইছি ঠাকুরপো!
আর শুনিনি কান্না।
ছয়
আমি
আমি আর বউদি, সে পাঁচ বছরই হবে, দুজনে রইলাম।
বউদিকে সান্ত্বনা দেবার জন্য একটা কথাও বলা যেত না। ঠোঁট টিপে হেসে উনি যেতেন। শোকটা, শূন্যতাটা এতই ওঁর নিজস্ব, তাকে যেন সযত্নে রক্ষা করে চলতেন।
দাদা গেল ষাট বছরে।
বউদির তখন পঞ্চান্নই হবে। পঞ্চান্ন বছরের বিধবা স্ত্রীলোককে আন্তরিক সৎপ্রস্তাব দ্বারা আক্রমণ করে চলাও সমাজের নিয়ম।
বউদি আবার খাওয়া দাওয়া, ওঠা বসা, জীবনচর্যা, সব কিছুতে খুব স্বতন্ত্র ও প্রাইভেট পারসন। এটাকে দাদা মর্যাদা দিত আজীবন। তাই প্রতিবেশিনীরা খুব নিরুৎসাহিত হন।
—চলেন যতির মা, আমাগো বারি কীর্তন হইব। প্রতি বছরই হয়, যাইতেন না। এখনে চলেন। মন শান্তি পাইব।
—না দিদি। ঘর ছাইরা ভালো লাগেনা।
—ব্রজবাবুর মা অনন্ত চতুর্দশী ব্রত উদযাপন করবেন, ডাকতে এলাম।
—শরীলে দেয় না দিদি।
—কেদারবদ্রীর প্রসাদ যতির মা!
বউদি কপালে ঠেকিয়ে রেখে দিলেন। একদিন কাতর হয়ে বললেন, কুনো দিন পারা বেড়াই নাই, ইচ্ছাও হয় নাই। অহনে ওনাদের লগে কী কথা কমু বলেন?
—বলবেন না। যেমন মনে লয়, তেমন চলবেন। আপনেরে টোকাবো কে?
—শুধা ছাওয়ালরা আসে না কি, টাকা পাঠায় না কি, মাইয়া কবে আইব...
—শুনবেন না।
—আপনে তো জীবন ছইকা নিছেন। চা খাইলেন, হাটতে গেলেন, বাজার করলেন, ফিরা চা খাইলেন, বাগানের কাজ করলেন,—দুপারে স্নানাহার সারলেন, কাগজখান খুটাইয়া পরলেন,—বিকালে চা খাইয়া হাটতে গেলেন,—লাইব্রেরি গেলেন, আইসা ন্যালারে যুক্তাক্ষর শিখাইতে খানিক যুদ্ধ করলেন,—রেডিও শুনলেন,—খাইয়া দাইয়া বই লইয়া শুইলেন।
—রুটিন মাইপা চলি বউদি! কইতে পারেন, আপনেরে সময় দেই না। কিন্তু সময় তো আপনের কাইটা যায়।
—হ ঠাকুরপো! কুনঅ অভাব বোধ করি না। সারাদিনই ত হে আমার মনের মধ্যে থাকে। কই, দেখ! ফুল সাজাইলাম...অহনে ঘর গোছাইতেছি...কই, তুমি দুঃখ করতা, মিরনাল বই পরতে সময় পায় না! দেহ, আমি মন দিয়া কত বই পরি অহনে। যতিনাথ আমারে বিভূতি বাঁড়ুজ্জার রচনাবলী আইনা দিছে।
ঠাকুরপো হেমচন্দ্র—নবীনচন্দ্র—মাইকেল—রমেশ দত্ত—গ্রন্থাবলী কিনতেছেই। ''সঞ্চয়িতা'' খানও পরি। পইরা পইরা ন্যালারে গল্প শুনাই। কাপর ছারলে বলি, সেই কালা চিকন পার পরাইয়া ছারলা! অর লগে কথা কইয়াই সময় কাটে।
বউদি নির্মল হাসলেন। ছিপছিপে শরীর,—সাদা সিঁথি ও নিরাভরণ দেহ,—ধপধপে সাদা শাড়ি, সাদা জামা,—গুচ্ছ গুচ্ছ চুলে ঘেরা মুখ, ছোটোবেলার মৃণাল নয়, বিবাহিতা বউদি নয়। এ আরেক রকম শুচিতাময় কুমারী সৌন্দর্য। শুধু রং যেন ফর্সা লাগে।
—ফর্সা হইতাছেন, না এনিমিয়া ধরল?
—হা রে পুরুষের বুদ্ধি। জীবনে প্রথম সংসার নাই, রোগীর সেবা নাই। রাইত জাগা নাই, সময়ে খাই, সময়ে ঘুমাই,—রং তো ফর্সাই আছিল এককালে, আছিল না? শ্বাশুড়ি কইতেন, আমার সোনার প্রতিমা জ্বইলা গেল।
—মায়ে বলত?
—খুব বলত। আপনের দুর্ভাগ্য, অমন মা—বাপেরে স্যাবা করতে পারলেন না। মায়েই ত কইত, পরবা। পইরা পইরা শিখে মানুষ।
—আপনে যা পরতেছেন, বাংলার মাস্টারেও পরে না এখন।
—আপনের দাদায় বলত, পরো, ভিত পাকা হইব। আর ভিত পাকা! পরি, ভালো লাগে, মনটা ভইরা থাকে।
বউদি যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের ''বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি'' ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত রায়ের ''ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব'' আর উপেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্যের (শ্রী অরবিন্দের সহযোগী বিপ্লবী অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের ভাই) ''আমার এলোমেলো জীবনের কয়েকটি অধ্যায়'' বারবার পড়ত। বলত, দেখেন। উপেন ভটচাজ আপনের মাতামহের কথা লেখছেন।
আর পড়ত ''ভ্রমণ'। বলত, যাইতে তো পারি না সর্বত্র, মনে মনে ঘুইরা লই। ইশ! আপনে তো পাশ পান, যান না?
—আপনে যাইতেন?
—না ঠাকুরপো! এই বারি অহনে আমার হিমালয় হইতে কন্যাকুমারিকা। ছাইরা গেলে তার কাছে পাতকী হইতাম! হে যা যা দেখে নাই...
—দাদা কিন্তু আমার সঙ্গে একটু বেড়ালেই খুশি হত।
—হইব না? তারে নিত কে?
—যাক, আমার সৌভাগ্য যে দাদাকে কিছু কাছে পেলাম!
—একদিন কইছিলাম...আপনে দুঃখ দিবেন...দুঃখ পাইবেন...দেখলেন তো, সত্য হইল?
—আপনেও তো পাইছেন।
—হে তো জন্ম থিকাই। ডাকাইতা মাইয়া আছিলাম, মায়ে বলত, এমুন ঘরে দিমু, যে তারা বারিন্দায় বারাইতে দিব না। মায়েরে জিভ দেখাইয়া পলাইতাম।
—রাতদিন ফল টোকাইতেন!
—না টোকাইয়া উপায়?
বলছেন আর হাসছেন বউদি। হাতে ন্যালার জামা, বোতাম বসাচ্ছেন।
—কী পরিবর্তন মিরনালের! পোলাদের বলছি, বোতাম টাইকা লও, ছিরা ফাটা সিলাও, জুতায় রং দাও, বিছানা পাইতা লও আর আজ...তা ভাদুড়ীবাড়িতে কর্তা কইতেন, সকালে সকল ছোটোদের ক্ষীর, মুড়ি, বাতসা দাও। উনার বোন কইত, তোরা আলাদা বসগা যা! অর্থাৎ, আমাগো গুড় মুড়ি। ভাত খাইব তো মা'র লগে তেতপ্পর বেলায়। তাই জাম, জামরুল, ফলসা, টোপাকুল, কাচা আম, খুব খাইতাম।
—জানতাম না সব কথা।
—আগে তো কাঁদি নাই। কানছি বিয়ার পর। ঘুরাফিরা এক্কেরে বন্ধ! তহনে শাশুড়ি মাটির পুতুল। মাটির রান্নাবাটি কিন্যা দিছে, শ্বশুরে রোজ সন্দেশ আইন্যা দিছে। অত যত্নেন না বুনা টিয়া পোষ মানল?
—আর দাদা?
—হেয় কী দিব? বাপ—মা আছে না? পাবনা হইতে ''বর্ণপরিচয়'' আইনা দিছে,—হাতের ল্যাখা লেখাইছে। রাতে পরাইত। তবে শাসন করে নাই।
খারাপ খবরটা আমিই এনেছিলাম। আমাদের চক্ষু হাসপাতালের উদ্বোধনে কলকাতা গেলাম। বউদি বলে দিলেন, বিনির তো পরসব হইবার কথা! খবরটা লইবেন।
খবরটি ভালো ছিল না। সুভাষের তখন একটাই ফ্ল্যাট।
পাশেরটিও যে ওর। তা জানতাম না।
নবজাতিকার আগমনে বাড়ি উৎসব মুখর থাকবে। বাড়ি থমথম করছিল। যতিনাথ, সুলতা, স্বাধীন ও তপাকে দেখলাম। দেখলাম না সুভাষকে।
যতিনাথ আমাকে বলল, সুভাষ খুব দাপাদাপি করে ঘুমোচ্ছে, ঘুমের ইনজেকশানে।
—কী হইছে, বলবি তো?
—অগো মাইয়া...মংগোলয়েড বেবি।
—তার মানে?
—বিনিকেও ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। বেবিকে দেখছে নার্স।
—মংগোলয়েড বেবি কী?
ওরা নিচু গলায় যা বলল, তার সারাংশ যা, এও এক অর্থে গেনি পিসির মেয়ের মতোই ভার ও বোঝা।
এমন শিশু শান্ত হয়, কাঁদে না বললে হয়। শরীর ও মনের বৃদ্ধি একেবারে রিটার্ডেড। নাক চেপটা, চোখ মঙ্গোলিয়ান, মুখ হাঁ, জিভ বেরিয়ে থাকে। হাত বেঁটে ও চওড়া, আঙুলও তাই। পায়ের পাতায় দেখা যায় বুড়ো আঙুল ও পরের আঙুলের মাঝে ফাঁক।
তপা নিচু গলায় বলল, মংগোলয়েড বেবিদের জন্মগত হার্টের রোগ থাকে,—লিউক্যেমিয়াও হয়। বেশিদিন বাঁচে না।
—সুভাষ...খুব বিচলিত?
—উন্মাদের মতো। সে তো ও বেবি আনতেই চায়নি। বিনি বলেছে, ও আমার সন্তান। আমি নিয়ে যাব।
সুলতা বিষণ্ণ হেসে বলল, বিনি বলছে, ও আমার গর্ভজাত, আমারই ক্রুশ, আমিই বহন করব।
—ঈশ! এতো বরো আঘাতটা পাইল অরা!
যতিনাথ সদুঃখে বলল, মেয়ে হলে রুমা, ছেলে হলে রূপক, কত আলোচনা! জানাব কী! এই জন্যেই জানাইনি। এমন শিশু ক্বচিৎ কদাচ, কোটিতে গোটিক, বেশি দিন বাঁচে।
সুলতা সদুঃখে মাথা নাড়ল। বলল, দ্বিতীয় সন্তানও মংগোলয়েড হবে, তা বলে না ডাক্তার। কিন্তু বিনি বা সুভাষ...!
—এই শিশুর নিরন্তর ডাক্তার দেখানো দরকার হবে না যেদিন,—সেদিন বউদির কাছে বিনি ওকে নিয়ে যেতে পারে। আমি চলি আজ! বড়ো ভারাক্রান্ত হয়ে গেল মনটা! সুভাষ আর বিনি যে এমন চোট পাবে, কে ভেবেছিল!
অতীব আলোকপ্রাপ্তা তপা গভীর দুঃখে বলল, নিশ্চয় ওরা কোনও পাপ করে থাকবে পূর্বজন্মে!
আমি চোরের মতো বেরিয়ে এলাম। গেনিপিসির ভাগ্য যা, বিনিরও তেমন হবে?
পরদিন ডাক্তার মুখার্জির মাধ্যমে এক তরুণ শিশু চিকিৎসকের কাছে গেলাম।
সে বলল, মায়ের বয়সও কম। তারপর...এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যা পাই...
কিছুই আমার মাথায় ঢুকল না। বললাম, এই শিশু চুয়াত্তর বছর অবধি বাঁচতে পারে? (গেনি পিসির মেয়ে হাবি তো বেঁচেছিল।)
ডাক্তার খুব সুপিরিয়র হেসে বললেন, এটা স্পোরেডিক বা ট্রাইসোমিক মংগোলিজম মনে হচ্ছে। হার্ট ঠিক থাকলে, যা খুবই বিরল, যৌবন, বা প্রৌঢ় বয়স অবধি বাঁচতে পারে। নিরানব্বই ভাগ কেসে তাড়াতাড়ি চলে যায়।
মন বলল, তাই যাক! মন আরও বলল, সুভাষের উপরে ওঠার, বাজি জিতবার দুরন্ত জেদ! বিনি এখন এই মেয়েকে নিয়ে...
বউদি সব শুনে স্থির হয়ে গেলেন। পাথর পাথর। বললেন, আপনে জাপানে এটম বোমার গল্প করছিলেন। তখন নাকি অনেক শিশু.....বিনিদের কেন এমন হইল?
—আরও হয় বউদি। আমরা জানতে পারি না। আমাদের ঘরে হইছে বইলা....
এই একটি ঘটনা নানাভাবে বউদির বাঁচার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়, তাতে আমার সন্দেহ নেই। খবরটা পেয়ে থেকে যেন নিভে গেলেন।
একদিন বললেন, ''কেন'' জিগ্যাসা কইরা তো লাভ নাই। আমার নাকাল কতজনা খাইয়া না—খাইয়া, অসুমার খাইটা, অন্য পোলাপানদের ঝক্কি সামলাইয়া সন্তান বিয়াইছে। এমুন তো হয় নাই। শুনছি আপনেগো গেনি পিসির .... আর ....
—এমন শিশু দীর্ঘজীবী হয় না বউদি।
—হেই ভাবতেও তো বুক ফাটে। সন্তান মরলে তয় মা বাপে শান্তি পাইব?
দাদার মৃত্যুর ঠিক পাঁচ বছর বাদে বউদি ১৯৮৫ সালে মারা যান। একদিন বললেন, মন দিয়া পূজাপাট করলে কি শান্তি মিলে ঠাকুরপো? কুনো দিন তো করি নাই....
—বউদি! করেন নাই, করেন নাই! আজ মনে করেন তো করেন। কয়েন কী করতে চান?
—ন্যালার মা কয় সত্যনারায়ণরে সিন্নি দেন গো কত্তা মা! দোষ আপাই কাইটা যাইব।
—ন্যালার নিশ্চয় খুব আগ্রহ?
—খাওনদাওন, যগ্যিপূজা, হে তো পাইলেই নাচে। আহা। অর মায়ের বা কী কষ্ট!
—হয়তো মেনে নিয়েছে।
—মায়ে মাইনা নিতে পারে না কুনো দিন!
—সুভাষও কম ঘা খায় নাই।
—জানি! তাতেই ক্ষ্যাপা ক্ষ্যাপ্ত হইয়া কাম বারাইতেছে। বিনি ত' লেখছে, মা! অরে কই, আমারে ছাইরা তুমি এট্টা বিয়া করো। হে শুনে না। কয়, কারো পাপে এমুন হইলে দুজনে পাপ করছি। তুমি একা অরে লইয়া থাকবা, আর মানুষ আমারে থুথু দিব,—তা হইতে দিমু না।
ততদিনে বিনি ডাক্তার, স্বপ্নাদ্য ওষুধ, কোনও কিছুই বাকি রাখেনি। এখানে আসত ওর মাদ্রাজী আয়া আর রুমাকে নিয়ে। বউদির কাছে এলে শান্তি পেত। বলত, শান্তি পাই মা!
—তয় থাকো ক'দিন। এহানে খাও, ঘুমাও। রুমারে লইয়া তো কোনও অশান্তি নাই।
—হ্যাঁ..... এখানে সব কেমন মাপের মধ্যে.....এখন আমার আর রুমার তো আরেকটা ফ্ল্যাট.....তিনটে শোবার ঘর, চারটে বাথরুম, সব কলকাতার লিডিং ডেকোরেটারের সাজানো। আমি, রুমা আর কনকাম্মা তো একটা ঘরেই থাকি।
তারপর বলত, বিবাহিত জীবন বলে কিছু নেই। তবু ও আমাকে ছাড়বে না।
স্থির হয়ে এখানেও থাকতে পারত না, আবার ও চলে যেত।
বউদির মৃত্যুর দশ বছর পর মাধবীর আসাটা শুধু বউদির জন্য নয়। মাধবীর দিল্লির ফ্ল্যাটটা সুভাষই কিনে দেয় ব্যবস্থা করে। সুভাষই রুমার বিষয়ে সব বিশদ লিখে পাঠিয়েছিল। জানলে মাধবী জানবে, বিনি যদি রুমাকে ওখানে কোথাও ভর্তি করে নিজেও থাকতে পারে।
সুভাষ এই স—সে—মি—রা অবস্থাটা মেনে নিতেও পারছিল না। বিনি আর রুমাকে অন্য কোথাও বাড়ি কিনে দিয়ে টাকা পয়সা দিয়ে থিতু করে দিতেও পারছিল না।
যতিনাথ বলত, নিঃসন্তান জীবন মেনে নেয়া যায়, এমন সন্তান নিয়ে...
স্বাধীন আর তপা ছেলেমেয়েকে ঋষিভ্যালি সে জন্যেই পাঠায়। সুভাষ আর বিনির সামনে ওরা যেন কুণ্ঠা বোধ করত।
বউদি সত্যনারায়ণ একবার নয়, দু'তিন বার করেন। বলেন, কইরা তো যাই। ফলাফল কী হইত কে জানে।
রুমার মতো না হলেও ন্যালা যে অসহায়, সেটা ওঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ন্যালা, হিসেব করে দেখেছি, বউদির কাছে খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। দাদার জন্যে বউদি যেসব সোয়েটার বুনেছিলেন, ন্যালাই সেগুলো পরে।
এ সময়টা, কয়েক বছর ধরে মাঝে মাঝে বলতেন, চলেন ঠাকুরপো নটাকোলের কথা কই।
—কুন কথা বউঠান?
—ন্যালা জানে! ঠাকুর বানাইতে কুমার আসত, কুন গ্রাম থিকা?
—আদ্যাবাড়ি।
—দেবীপক্ষে নৌকায় গাদা কইরা শত শত বঙ্গলক্ষ্মী আর মোহিনী মিলের শাড়ি—ধুতি থান আইত। আপনেরা দেখেন নাই। ভাদুরীবাড়ির দালানে ঢালা হইত। উনি তো সগলরে কাপড় দিত।
—উনি অন্য মাপের মানুষ আছিলেন গো!
—হ। উনি বলত, পূজায় নটাকোলে কী আমার নাতি, কী বেন্দা জাউলার বেটা, সব এক কাপড়। বিজয়ার দিন ঠাকুর ভাসাইয়া সকলে নূতন কাপড় পরবা।
—হ বউদি, আমরাও ধুতি পাইছি।
—বেটা ছেলেদের সবুজ, খয়েরি আর লাল পার ধুতি। বউগো লাল পার, গিন্নি গো লাল আর কালা পার। বিধবা গো থান, আর আমাদের, মাইয়া গো লাল আর সবুজ নকশা পাড়। নকশা তো শঙ্খ পদ্দ, নয় রেল পার। আমরা হা কইরা থাকতাম। সবাই দু'খান কইরা পাইতাম তো!
কখনো বলতেন, ঠাকুরপো আছিলেন ডাকাত! ঠাকুর জলে পড়ল, উনি ঝাপ দিয়া ঠাকুরের মটুক, হাতের খারা, নিবই নিব।
এ সবই মৃণালের কথা, বালিকা মৃণাল।
আবার আপন মনেই বলতেন, যতি কুনোদিন জিদ করে নাই, শুধা সুজির পায়েস রানলে কইছে, মা আরটু দিবা? জিদ কি স্বাধীনের! ক্যান তুমি সুভাষরে কোলে নিবা? ক্যান তারে আগে খাওয়াইবা?
একদিন বললেন, অগো নামে নামে থালা—বাটি—গেলাস! ভাবতাম অগো মাইয়া পোলারে দিমু। কারে দিমু। আমার মাইয়া পোলাদেরই নাগাল পাই না! কী আছিল আমার দুধে, যে তারা সকলার হইল, আমাদের হইল না?
তারপরই বলতেন, ভাল থাক, শান্তিতে থাক। আমাগো শান্তি ছিল যৎসামান্যে। অগো শান্তি ... অরা বুঝুক!
বই পড়াও কমিয়ে আনলেন। কাগজটা উলটেও দেখেন না। কেমন উদাস উদাস ভাব। বললাম, বউদি! কলকাতা যাইবেন? অরাদের দেখবেন?
—কেমনে? আজকাল তো বেশি কইরা শুনি, সে যাইতে নিষেধ করে। ঠাকুরপো!
—কয়েন।
—এত টাকা সুভাষের। একখান ঘর তুইলা ঘুরাইন্যা সিঁড়িটা বসাইলে তার বাপ শান্তি পাইত। সে সাধ তো মিটে নাই?
—এই কথা বউদি? ঘুরাইন্যা সিঁড়ি আমি বসামু। কথা দিলাম।
—কোথায়।
—যেখানেই দেই, সে দাদা আর আপনের বারিই হইত।
বউদি গভীর, গভীর চোখে চাইলেন। আমার চোখ নিচু।
তারপর বললেন, সাধে কি দাদা ভাই বইলা মরত? হ, আপনের বারি তো আমাদেরি। তিনজনার।
—হ। আপনে যেয়েন না বউদিদি।
—কনে যাইতাম? দাদাই কি গিছে? দিনে দিনে যেমুন কাছে আইতাছে।
তারপর বললেন, চলেন তো। চা কইরা খাই দু'জনে। ন্যালারে পাঠান। এই সময়ে কুচা নিমকি ভাজে। না, আমার লিগ্যা ভাইবা ভাইবা আপনে...
তয় কয়েন, ডাক্তার দেখাই আপনারে?
—শান্তি পায়েন, তো ডাকেন। রোগ তো নাই ঠাকুরপো, কেমুন জানি মনে হয়, দূরে চইলা যাইত্যাছি।
—আমিও পাছ ল'মু।
—আর বারিতে বট অশথ গজাইত।
—তয় কী করুম?
—আমাগো বাসায় হাত দেন। ঘুরাইন্যা সিঁড়ি তো বসাইবেন।
—টাকা কোথা?
—তা জিগাইবেন মিরনাল ঠাকুরানীরে। পাসবুক ফালাইয়া দিমু। দ্যাখবেন, সংসার চালাইয়াও দু'জনের পেনসানে কত বাচছে, —কতটি ফিকছে রাখছি,—পোলারা বৎসরে মাঝে মাঝে পাঠায়,—সব রাইখা দিছি। অরা টাকা পাঠায়, অপরাধী বোধ করে ত! টাকা পাঠায়।
—আপনের টাকায় হাত দিতে দেই না, আমার টাকা হইতেও বাচান?
—অত কৈফিয়ৎ দিতে পারি না। ন্যালারে ডাকেন।
না, অসুখ কিছু ছিল না। কিন্তু, খাওয়া কমে যাচ্ছিল, দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন। ন্যালার মা বলল, কী বোঝেন? রাতে ঘোম নাই। শুধা কথা কয়, বরো কত্তার লগে, কার কার লগে, বুঝি না। কিন্তুক চক্ষু বন্ধ। ডাকলে ধরমরাইয়া উঠে।
সদর থেকে প্রবীণ ও বিচক্ষণ ডাক্তার অনন্তবাবুকে আনলাম। বললাম, জ্বর নেই, পেচ্ছাপ, পায়খানা, রক্তপরীক্ষায় কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু খাওয়া কমে আসছে, হাঁটা চলা প্রায় বন্ধ। বাগানে অনেকদিন নামেন না।
অনন্তবাবু ভাল করে দেখলেন। রক্ত পরীক্ষা আবার হ'ল। হেমোগ্লোবিন বড় কম। এনিমিক হয়ে যাচ্ছেন। বললেন, এই ইঞ্জেকশান, সুখাদ্য, টনিক, এগুলো চলুক। দুর্বল যথেষ্ট, কিন্তু ভয়ের কিছু দেখলাম না।
আমি ধমক দিয়েই বললাম, দাদার সময়ে আমি, আপনি, ন্যালার মা! অহনে আমি আর ও পারি।
ভোরের চাঁদের মতো ম্লান হাসলেন বউদি। বললেন, একা আপনে আমাগো কষ্ট দিয়া পার পাইয়া যাইতেন? আমরা অহনে দিতেছি।
—আপনি আর কে?
—ক্যান, আপনের দাদা?
বউদি খুব স্বাভাবিক ভাবে বললেন।
—দাদা আজ পাচ বৎসর নাই বউদি।
—হে তো আমি জানি। কিন্তু আমার মনের মধ্যে বইসা কথা কয়। চক্ষু বুজলে খুব ভাল থাকি ঠাকুরপো। আমার মা, তোমার মা, শিউলিরে মনে পরে না। আমাগো লগে খেলাইত? হে'র লগেও কথা কই।
—কী কথা কন?
—এই ঘর..... সংসার.....ছাওয়াল মাইয়া.....এই সকল সইত্য নয় ঠাকুরপো... আমি পাগল হই নাই.... কিন্তু সইত্য মনে হয়...
—পোলাদের খবর দিমু?
—অরা....ব্যস্ত.....
বউদি পাশ ফিরে শুলেন।
আমার ধমক ধামকে বেশ খাচ্ছিলেন একটু একটু। স্বাভাবিক ঘুমও হচ্ছিল। কিন্তু বাথরুমে যেতে গিয়ে শোবার ঘরেই শুকনো মেঝেতে আছাড় খেলেন যেদিন, সেদিন ন্যালার মা চাল বাছছে, ন্যালা দোকানে, আমি বাজারে।
খুব, খুব পরিশ্রম হয় আমার। আমার বয়সও তো পঁয়ষট্টি। ছুটোছুটি করে টাউন হাসপাতালেই নিলাম। পায়ে ফ্র্যাকচার, এক্স—রে প্লাস্টার, হেনতেন। ন্যালার মাকেই বসিয়ে রেখে এলাম।
গৌরাঙ্গদের বাড়ি থেকে কলকাতায় যতিনাথকে ফোন করলাম। অন্যদের খবর দিতে বললাম।
ওরা এসেছিল, দু—চার দিন করে থেকেও যায়। সুভাষ বলল, হাসপাতাল নয়, কলকাতা নিয়ে যাই.....নার্সিং হোমে রাখি।
বউদি মাথা নাড়লেন।
বললাম, এখানে ডাক্তার পালের নার্সিং হোমও ভাল।
বউদি মাথা নাড়লেন।
—বারি নেন ঠাকুরপো। বারি নিলেই আমি ভাল হইয়া উঠুম।
বারি নেন আমারে।
অগত্যা বাড়ি। অগত্যা ডাঃ পালের সাহায্যে নার্স সীমা। ছেলেরা ফিরেও গেল। বলল, এখন তো শুধু শুয়ে থাকা।
—অহনে তোমরা ভার নেও।
—মা কলকাতা যাবেন না। এখানে নার্সিং হোমেও থাকবেন না। আমরা কতদিন কাজ ফেলে থাকব?
সুভাষ বলল, টাকার জন্য ভেবো না কাকা। ডে অ্যানড নাইট নার্স রাখো। এই টাকাটা রাখো।
বউদি ক্ষীণ স্বরে বললেন, টাকাই কি সব? নার্স রাখলে তাদের খেজমত খাটে কে? অরাদের সময় নাই, ছাইরা দেন।
ওদের বললাম, চান মানুষের সঙ্গ।
—বুঝি......বুঝি..... প্রবেলমটা খুব হিউম্যান। তোমার শরীর ভাল তো কাকা?
—১৯২০ সালে, তোমার বাবার সাত মিনিট বাদেই জন্ম। আমার জন্য ভাবতে হইত না।
—এই বয়সেও......
ন্যালার মা বলল, ছোটকত্তারে চলতে হইব, তাই চলতাছে। যার চারপাশে কেও নাই, মাথায় আছে বোঝা, তারে চলতেই হয় রে দাদা। ভগমানে চালায়। কত্তা মা আর থাকত না। হে নিজেরে তুইলা নিতেছে।
আমি বললাম, থাক ন্যালার মা।
—ক্যান? থাক থাক করো ক্যান? বলি নাই। যে বড় কত্তার লগে কথা কয়, চক্ষু বুইজা কথা কয়? তিনিই কত্তা মারে লইয়া যাত্যাছে।
সুভাষ বলল, সুপারস্টিশান যত! ডেথ ইজ ন্যাচারাল এনড অফ লাইফ।
আমি বললাম, পলিথিনের বেডপ্যান আর ইউরিন্যাল পাঠিয়ে দিও।
—তুমিও নাইট নার্স রাখো একজন।
ওরা চলে গেলে বউদি বনমালীর বোন সিদ্ধেশ্বরীকে ডাকলেন। বললেন, অ পাকসাক করুক, ন্যালার মা আমারে দেখব। কাম বেশি হয়, তো বনমালীর বউ বাগান—বাসন—কাপড় কইরা দিব।
ন্যালা বলল, আমি নেই কত্তা মা?
—হ, আমার ন্যালা তো আছে। তুই ছোট কত্তাদাদারে দেখবি। আর ঠাকুরপো। এই নাসরে ছুটি কইরা দেন। নাস্যে তো হাগাইব না, মোতাইব না, এমন নয় যে জ্বরো রোগী, জ্বর দেখব, ঔষধ দিব।
বউদির এই গোপন ষড়যন্ত্রের ফলে আমরা আমাদের চেনা জগতে ফিরে এলাম। বউদিকে ব্যথা না দিয়ে সযত্নে তুলতে ন্যালা,—আমাকে চা করে দিতে ন্যালা,—বউদি বললেন, যান। হাটাহাটি করেন যেমুন করতেন!
আমি খুব স্বস্তি পেলাম।
আর বউদি ধীরে ধীরে নিভতে থাকলেন। খাওয়া কমাতে কমাতে....
—শুইয়া শুইয়া কত খাওন যায়?
—তবে ফুটবল খেলেন?
—বাতাপি লেবু লাথাইতেন, মনে পরে?
—মায়ে জাইন্যা....
—মায়ের শাসন ছিল কি। চুল যখন বাইধা দিছে, একটু মাথা নড়ছে তো ধমক দিছে।
—চরও তো খাইছেন!
—বিয়ার পরে নয়। তহনে তো খুব আদর। তবে কষ্ট দিছে বরো পোলারে। য্যান, তার দোষেই আপনে জেলে গেলেন।
আমি নীরব।
—কতদিনের কত কথা ঠাকুরপো।
—নেন ঘুমান।
—এট্টা কথাই কইয়া যাইতাম।
কথাটি না বলেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
না, বউদির বিষয়ে এটাই বলা যায়, বাঁচার ইচ্ছা ছিল না আর। থাকলে বাঁচতেন। যথাসাধ্য সবাই করেছিলাম। বনমালীর বউ কি ঝুক্তি ফুলের পাতা বেটে দিত, তিতা খাইলে জিভের সোয়াদ ফিরব।
ডাক্তার বলেছিলেন, সিমপল ফ্র্যাকচার। একটু হাঁটাবেন। পায়ে রক্ত চলাচল হবে।
ন্যালার মা দিকে দিকে মানত করেছিল।
কিছুতেই কিছু কাজ হয়নি।
শেষে ন্যালা বলত, কত্তা মা! আমি গপ্প বলব? তুনি যেমন বলতে?
—ঠাকুর পাটে ফুল জল দে' ন্যালা।
—সকালে দিয়েছে মা!
—কচুর শাক বেশ কইরা ভাপাইয়া—জল নিস্যরি কইরা—তা বাদে নাইরকেল কুইরা...
—তুমি খাবে?
—ঝর উঠছে... জানলা বন্ধ কর.....
সব অসংলগ্ন কথা। শেষটা খুব ধীরে আসে। আমাকে বললেন, এট্টা কথা.... পোলারা....মাইয়া.... বারির ভার নিলে তবে যেয়েন...
—কথা.... দিলাম বউদি।
কয়েক দিনের মাথাতেই চলে যান বউদি। তখন ভরা সকাল, প্রসন্ন নীল আকাশ, সাদা মেঘের পালে মন্থর বাতাস, শরতের ফুল শিউলি তুলেছিল ন্যালা। আমি বুঝলাম বউদি ঘুমোচ্ছেন না।
আমি একা হয়ে গেলাম।
এমন নিঃশব্দ প্রস্থান দেখিনি। যেন পর্দা সরিয়ে পা টিপে টিপে চলে গেলেন।
মৃণাল, মিরনাল, বউদি। আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। এক সময়ে আবিষ্কার করলাম, সবাই ঘাটে।
বাড়িতে শুধু আমি আর ঘোরানো সিঁড়িটা।
ওরা
বাবার জন্মতিথিতে ওরা সবাই সমাগত। ন্যালার মা বলল, তিনি থাকতে তো জন্মতিথি দেখি নাই।
—না থাকতে দেখতেছ। দেখা নিয়া কথা। সে থাকতেই দেখ, বা না—থাকতেই দেখ।
ছেলেরা, মেয়ে ও বিনি ঘুরে ঘুরে দেখছিল। বিনি এখন খুব শান্ত। রুমার মৃত্যুর অনেক পরে ও যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছে। বিনিকে এমন আত্মস্থ ও নিজের পরে বিশ্বাসী আমি কখনো দেখিনি।
আমাকে বাগানে নিয়ে গিয়ে বিনি বলল, কাকা। আমার সিদ্ধান্ত কিন্তু অবিচল আছে।
—সবই তোমাদের ওপর।
—আপনি কোনও দাবি করবেন না?
—যাদের উপর দাবি খাটত, তারাই নাই।
—কাকা, আপনি বাঙাল, অ—বাঙাল দু'ভাবেই কথা বলতে পারেন।
—তোমরা যেমন ইংরাজি বলো।
এখানে এলে.... মনে হয় রুমার কথা....
—চলে গিয়ে সে তো মুক্তি দিয়ে গেল মা, মুক্তি পেয়েও গেল। তোমার কিছু হ'লে তার কী হত?
—সুভাষ .... কোনও ব্যবস্থা হয়তো করত।
—গাছপালা সব মায়ের লাগানো?
—দাদা... বউদি..... ন্যালা.....আমার আনা গাছ ওই চাঁপা গাছটা। এখন ফুল ফোটার মতো বড় হয় নাই।
—দিদিকে বাইরে যত শক্ত দেখায়, সে তেমন নয়। ভিতরে খুব ভেঙে গেছে।
হতেই পারে। মাধবীর বয়স সাতচল্লিশ। শিকাগোতে জীবনের অধিক সময়টা কাটাল। সবুজ ওকে ছেড়ে আরেকটা বিয়ে করল। ও কেন সব ছেড়ে চলে এল তাই ভাবি। ছেলেরা তো আসবে না। ও সেই দেশেই কোনও কাজকর্ম করে থেকে যেতে পারত।
দিল্লিতে ... একা একা....
সন্ধ্যায় দাদা বউদির ছবিতে মালা ঝুলেছিল, ধূপ এবং গুডনাইট একাধারে জ্বলেছিল। আজ প্রতি ঘরে গুডনাইট জ্বলবে। ডেকরেটরের ঘর থেকে নাইলন নেটের মশারি, বালিশ, তোষক, চাদর এসেছে।
সবাই যেন অপেক্ষা করছিল। আমি সহাস্যে বললাম, তোমরা তো কোনও সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছ। বলেই ফেল। আগেই বলেছি, তোমাদের কোনও সিদ্ধান্তেই ''না'' বলব না। আমি—থার্ড পার্টি।
স্বাধীন ঈষৎ হেসে বলল, অন্য পার্টি কে কে?
—বাড়িটা আর তোমরা । তোমাদের মায়ের অনুরোধ ছিল, বাড়িটা তোমাদের হাতে তুলে দিই।
—তুমি কোথায় যাবে?
বিনি বলল, আজ তো কাকারও জন্মদিন। তোমাদের সেটা মনে পড়ল না?
আমি বললাম, আমার নিষেধ ছিল। জীবিতের আবার জন্মদিন কেন? জীবিত যে, সে বাঁচে। যা হোক, তোমরা কী ঠিক করলে তাই বলো।
—সুভাষ বলুক।
—সেই বলুক।
—এ বাড়ি রাখা যাবে না।
—রেখো না।
মাধবী বলল, কাকা। অমন করে বলছ কেন?
—আমি ক্লান্ত রে মা! এবার এই বিনি মাইনের চাকরি থেকে ছুটি চাই।
সবাই চুপ। ন্যালা ট্রে—তে চা, বিস্কুট ও কাজু বাদাম রেখে গেল।
সুভাষ বলল, বাড়ি বেচেই দিতে হবে।
—বেশ তো।
—এখন... বিনি চায় এ বাড়িতেই রুমার নামে কিছু করতে... শিশুদের জন্যে। আমি মনে করি, এ বাড়ি আমি বাজার দরেই কিনে নেব.... দাদা, দিদি, ছোড়দাকে যা প্রাপ্য দিয়ে দেব।
আমি বললাম, এখানে অমন কিছু করা.... আমার মতে অবাস্তব।
—কেন? কেন?
বিনি বলল, আপনি তো জানতেন।
—কোনও দিন মহকুমা টাউনে থাকোনি, অনেক অসুবিধা হবে। স্থানীয় রাজনীতি ইত্যাদির প্রভাব পড়বেই .... আর.... সবাই জানত, বুড়া বুড়ি থাকে, তাদের কিছু নাই। তোমাদের বিষয়ে ধারণা, তোমরা লক্ষ কেন, কোটিপতি। নিরাপদ হবে বলেও মনে করি না।
সুভাষ বলল, হি ইজ রাইট।
—আমি ওখানে থাকতে পারছি না।
—এখানে থাকতে পারবে?
মাধবী বলল, আঃ! তোমাদের সমস্যা নিজেরা ফয়সালা কোরো। এখন সুভাষ বলুক।
—আমি বলি, আমি কিনে রাখি, ফেলে রাখি, তোমাদের যা ভাগে পড়ে, দিয়ে দিই। পরে...
বিনি বিষণ্ণ হেসে বলল, বেশি দামে বেচবে, সুভাষ?
—প্রপার্টির নিয়মই তাই।
—কলকাতায় ওই দুটো ফ্ল্যাট.....বাইপাসে জমি.... সাউথে কোথায় অনেক জমি... কার জন্যে?
—কী করে জানব তুমি মংগোলয়েড...
আমি হাত তুললাম।
—তোমাদের বাবা—মা, শত দুঃখেও অশালীনভাবে কথাবার্তা বলেননি। এখানে বসে তোমরা ও রকম কোরো না।
সুভাষ বলল, এনাফ ইজ এনাফ। দাদা যে ফ্ল্যাট কিনল, সেখানে কি দাদার কেউ থাকবে?
আমি বললাম, সে অর্থে আমাদের বংশে তো একই ইতিহাস... মাধবীর দিল্লির ফ্ল্যাটে কে থাকবে? .... স্বাধীনদের সল্টলেকের বাড়িতে তার ছেলে মেয়ে থাকবে কি না জানো না। থাকলে ভাল, নয় তো... সুভাষের কথা বিনিই বললে দাদা বউদির চার ছেলে মেয়ে ছিল.... বড় সাধের বাড়ি.... কিন্তু এ বাড়িতে কেউই থাকবে না।
—কে থাকবে কাকা? কেমন করে থাকবে?
—তোমরা বোঝ রে মা! তবে এতদিনে আমি নোটিস দেই। হাতে পাঁজি, মঙ্গলবার,—কথায় বলে। আজ রবিবার, মঙ্গলবার আমি গুডবাই করব।
—কোথায়?
—কোথাও।
—কিন্তু এ বাড়িতে তোমারও হক আছে।
—কিসের হক? দাদা বউদি যতদিন ছিলেন, ছিলাম। বউদিকে কথা দেই, তোমরা বাড়ির ভার বুঝে নেবে, তবে যাব। এখন তো থাকার দরকার নেই?
—মঙ্গলবারই।
—হ্যাঁ। ন্যালা আর ন্যালার মা—ও যাবে।
সুভাষ বলল, এ বাড়িতে তো কেয়ারটেকার হয়ে থাকতে পারত!
আমি মৃদুস্বরে বললাম, এনেছিলেন বউদি,—রেখেছিলেন তিনি ... এখন আমার ওপরেই ওদের দায়িত্ব।
—না না, অবশ্যই ওরা অনেক করেছে.... দে শুড গেট সামথিং।
—না রে বাবা! কিছু দিতে লাগবে না। অস্থাবর আর আছে বা কী! খাট চৌকি, ফ্যান, লাইট, একখান হাঁড়ি, একটা কড়াই। ও সব থাকুক। তোমরা যা মনে করো, কোরো।
যতিনাথ বলল, কাকা! একটু ভাববে না?
—অনেক ভেবেছি যতি। এখন যে ক'টা দিন বাঁচি, নিজের মতো বাঁচতে চাই। তবে হ্যাঁ, ঘোরানো সিঁড়িটার কথা তখনি হয়েছিল। ওটা আমি দিন দশেক আগে নিয়ে গেছি।
সুভাষ বলল, ঘোরানো সিঁড়ি!
—হ্যাঁ, এ বাড়িটার চেয়ে ওর দাম অনেক বেশি।
দাদা....পাগলামি করে কিনেছিল।
বিনি উঠে এসে আমার হাতে চাপ দিল। বলল, আমি কিন্তু আপনাকে ছাড়ছি না।
—মা রে! ধরে কে, আর ছাড়ে কে! এসব কথা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।
মাধবী বলল, আজ মনে হচ্ছে......বাড়িটা থাকবে না........কী যেন হারিয়ে গেল।
যতিনাথ বলল, তবু ন্যালা যেত....
আমি বললাম, যাক! গাছের ফলপাকুড় পাঠাবার দায় থেকেও মুক্তি পেলাম।
স্বাধীন বলল, কাকা! তোমার কষ্ট হবে না?
—চলো তোমরা, খেয়ে নেয়া যাক। দাদা—বউদির ছবি কি তোমরা নেবে? বিনি বলল, আমরা? আপনি নেবেন।
সুভাষ বলল, ক্রেজি! দুটো ছবি, একটা ঘোরানো সিঁড়ি।
ঘোরানো সিঁড়ি
সতীনাথ নেউগীর কথা মরদ কা বাৎ!
হাতি কা দাঁত বলতে পারব না, কেন না সব দাঁত আর নিজস্ব নয়।
আমি, ন্যালা আর ন্যালার মা গেট খুলে সকালে গৃহ প্রবেশ করলাম।
কোথায় যাব, তা দেখার কৌতূহলে বিনি, মাধবী, দুজনেই এসেছে সঙ্গে সঙ্গে। ওরা তিন ভাই না কি কেয়ারটেকারের খোঁজে অনুপমের বাড়ি গেছে। অনুপম স্বাধীনের সহপাঠী ছিল, বড় উকিল।
আমি বললাম, আমাকে ব'ল না।
আমাদের স্বাগত জানাতে বনমালীর বউ আর সিদ্ধিবালা এগিয়ে এল।
সিদ্ধিবালা বলল, নূতন কলসিতে জল রাখছি, উপরেও, নিচেও। পাকঘর যা বরোসরো হইছে দিদি! দুপারে ওহানেই ঘোম আসবা। নূতন হাঁড়িতে খিচুড়ি রানছি, পায়েস।
মাধবী বলল, খিচুড়ি আর পায়েস, কাকা?
—হ্যাঁ রে মা! নিউগী বংশের নিয়ম।
বনমালীর বউ বলল, আসেন দিদি! আসেন বউদি! কল পায়খানা দেখেন! সকল বেবাক মৌজুদ!
আমি বুঝলাম, ও মানসচক্ষে দেখছে, ন্যালার বউ হয়ে ওর মেয়ে এই ঘরে, রান্নাঘরে ঘুরছে। ন্যালার মা ঘরে ঢুকে বলল, নূতন চৈকি ক্যান? মেঝাতে শুইলেই গা ঢাইলা ঘোম আসত। তিন দিকে জানালা, তায় জাল। বাতাস কি বা।
বসল চৌকিতেই। তারপর বলল, বাচলাম গো ছোট কত্তা। অৎ বরো বারি ঝাট দিতে, মুছতে, আর য্যান পারতাম না।
বিনি সানুযোগে বলল, কাকা। সারপ্রাইজ দিলেন বটে।
—ঘোরানো সিঁড়ি দেখো?
—ওপরে আপনার ঘর?
—হ্যাঁ, ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাব, দরজা বন্ধ করব, ব্যস হয়ে গেল।
—একটু জমি তো রইল।
—ন্যালার মা লঙ্কা, কুমড়া, ডাঁটা লাগাবে।
—ন্যালা লাগাবে না?
—না। ন্যালা বিজনেস করবে।
—কিসের?
—এটাই তো আমার স্বপ্ন। ওকে তিন চাকার ভ্যান কিনে দেব। ও তাতে করে গ্রাম থেকে সবজি, ফল, চাল আনবে, বাজারে বেচবে। ওর কর্তা মা'র ব্যবস্থা।
মাধবী বলল, কাকা। রাখবে কোথায়?
—পাশে তো পাকা শেড তুলব।
—সব ভেবেছিলে?
—স—ব।
—তোমার পরে, কাকা?
—এখানেই জিতে গেছি মা। ন্যালার বিয়ে হবে। ও এই বাড়ি পাবে। ওরা থেকে যাবে কয়েক জেনারেশান। দিল্লির বা সুভাষের ফ্ল্যাট নয়, এখানে মানুষ থাকবে।
—চলুন ওপরে উঠি।
একটু দাঁড়ালাম। দু'খানা ছবি, আর দাদা বউদিকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকলাম। গুনে গুনে বাইশটা ধাপ। খুব শক্ত করে নিচটা বাঁধানো।
দাদা, বউদি আর আমি ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওপরের ঘরে উঠলাম। বড় ঘর, একটি তক্তাপোশ, একটা চেয়ার, একটা টেবিল, একটি ছোট কাঠের আলমারি। তিনটে জানলাই খোলা। আলমারির উপর ছবি দুটো রাখলাম। মাধবী আর বিনি চুপ।
আমি মনে মনে বললাম, দাদা! বউদি! নেউগীরা নয়, তবুও মানুষ থাকব। ঘোরাইন্যা সিঁড়ি অহনে কেও সরাইতে পারত না।
দাদা আর বউদি আমার সব কথা শুনতে পাচ্ছিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন