মুখ

মহাশ্বেতা দেবী

খুব সকালে ফোনটা বেজেছিল, ঋষি যখন অগাধ ঘুমে। খুব আশ্চর্য ব্যাপার। স্বপ্নে ও প্রেমজার কাছে ছিল। নার্সিংহোমে প্রেমজা। পেনিসিলিনে প্রেমজার অ্যালার্জি আছে কিনা, সে কথা জিগ্যেস না করেই ডাক্তার ইনজেকশান দিয়েছে। রুদ্র সবে জন্মেছে, সিজারিয়ন শিশু।

পেনিসিলিনের প্রতিক্রিয়ায় প্রেমজা ফুলে যাচ্ছে। সেলাই ছিঁড়ে যাচ্ছে। ঋষি অসহায়। অসহায়। প্রেমজার চোখ আচ্ছন্ন। ঋষি অসহায় দর্শক।

আজ থেকে দশ বছর আগে অঘ্রানে শীতের রাতে নিষ্ঠুর শিশিরাঘাতে ঋষি রাত তিনটে অবধি নার্সিংহোমে ছিল। এক সময়ে বাড়ি এল টাকা নেবে বলে। প্রেমজার অবস্থা তখন খুব খারাপ, অথচ টাকা চাই।

ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে।

ভোর না হতে ফোন বেজেছিল।

—কনডিশান খারাপ। চলে আসুন।

এটা কি নিয়ম? মরে গেছে না বলা? ''কনডিশান খারাপ'' বলা?

—বেঁচে আছে?

—চলে আসুন।

ঋষি ছুটে নেমেছিল। ট্যাক্সি খুঁজতে ওকে যেতে হয়নি। কমল ট্যাক্সি নিয়ে এসেছিল।

—কমল!

—উঠে পড়ো।

—বলো, বলো কমল...

কমল অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল।

—বউদি নেই।

—প্রেমজা নেই।

—এই তো আধ ঘণ্টা আগে...

—তুমি কি করছিলে? আধঘণ্টা আগে আমি কেন খবর পাইনি? কেন, কেন?

নার্সিংহোম পৌঁছে গিয়েছিল ওরা। প্রেমজার ঘরে নার্স, ডাক্তার, এবং অন্য ডাক্তার।

—ডাক্তার পাল কোথায়?

কমল আস্তে বলেছিল সম্ভবত এক্স—রে করাচ্ছে। আমার হাতে তিনটে ঘুসি খেয়েছে তো।

গভীর সন্তোষে, হিংস্র আনন্দে বলে, চোখ থেকে চশমার কাচ বের করাক এখন। চোখটা থাকবে না।

—তুই ওকে—

—এটা প্রথম অধ্যায়। কেসে তুলব ওকে কাঠগড়ায়।

প্রেমজা, প্রেমজা। রোগী মারা যাবার পর নার্সিংহোমের পক্ষ থেকে অপার সহযোগিতা। প্রেমজার বাবা, মা, ভাই।

বাবার বুক ভাঙা প্রশ্ন, কি হল? আমার কথায় তোমরা এখানে আনলে ওকে...

—পেনিসিলিন দিয়েছিল।

—অ্যান্টিবায়োটিকের অনেকগুলোতে ওর অ্যালার্জি। লিখে দেয়া হল, তারপরেও সেই ইনজেকশান দিল?

তারপরেও। এ রকম ভুল কখনো কখনো হয়ে যায়। ঋষি কাগজে পড়েছে। কখনো শুনেছে।

কিন্তু তার প্রেমজা তেইশ বছর বয়সে অত স্বাস্থ্য, লাবণ্য, অত ভালবাসা নিয়ে নির্বোধ এক ডাক্তারের ভুলের শিকার হবে তা কে জানত?

তারপর সব ধোঁয়া ধোঁয়া, আচ্ছন্ন।

সত্যি ক্যাওড়াতলা। সত্যি বিদ্যুৎ চুল্লীতে প্রেমজার ঢুকে যাওয়া। সত্যি কমলের কথা, ঋষিদা, রুদ্র আছে। সেটা ভাবো।

আশ্চর্য। স্বপ্নে ও প্রেমজার মৃতদেহের সামনে ছিল। কিন্তু ফোন বাজতেই ওর মনে হল, তবে প্রেমজার মৃত্যু সংবাদ এসেছে। রিসিভার তুললেই শুনবে, অবস্থা খারাপ।

চোখ কচলে ঋষি উঠে বসে। না, দেয়ালে হরতনীর পোশাকে প্রেমজার সহাস্য নৃত্যভঙ্গিমা। ওই ছবি ছাড়া এ ঘরে কোথাও প্রেমজা নেই।

রুদ্র বালিশের ওপর উঠে উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। জ্ঞান হওয়া থেকে মাকে দেখেনি। মাকে না পাওয়ার দুঃখ ওর নেই। ভালো, খুব ভালো।

অন্তত নিরূপ আর মমতার ছেলেমেয়ের চেয়ে রুদ্র অনেক ভাগ্যবান। 'মা' শব্দটার কোনো তাৎপর্য নেই ওর কাছে।

নিরূপ আর মমতা তিন বছর আগে পরে ওদের ছেলেমেয়েদের অনাথ করে রেখে গেছে। বাপ যাবার সময়ে ওদের বয়স এগারো আর আট। মা যাবার সময়ে চোদ্দ আর এগারো। বাবা মার কথা ওদের মনে আছে। আর ওদের দিদিমাও সে কথা ভুলতে দেন না।

রিসিভার তোলে ঋষি।

—ঋষি বলছি।

—ঋষি। যত তাড়াতাড়ি হয় চলে এসো।

—কোথায়?

—আমার বাড়িতে।

—ঘণ্টাখানেক লাগবে।

—এক ঘণ্টা?

—রুদ্র ওঠেনি...মা...দেখছি।

—সকালের কাগজ দেখেছ?

—না। এই তো উঠলাম।

—লাইনের পাশে মৃতদেহ—

—দেখছি।

—যত তাড়াতাড়ি পার এসো।

এটা আদেশ। বসের আদেশ। বস আদেশ করতে পারেন, করেন। ঋষি তো ওঁর কাছে ঋণবদ্ধ।

বস বুঝে ফেলেছেন জমি ও বাড়ির ফাটকা, ঠিকাদারি, এসবে প্রচুর টাকা করে ফেললে হবে না। হাতে কাগজ থাকলে ক্ষমতা আরো বাড়বে।

সেইজন্যই উনি ''নো'' নামে ইংরিজি সাপ্তাহিক বের করতে চলেছেন।

''নো'', অর্থাৎ জানো।

কাগজের পরিকল্পনাও ওঁর। মধু আগরওয়াল সম্পাদক। এ কাগজ পাঠককে জানাবে মোহনেশ স্বামীর আরো খবর, পাঞ্জাবের রাজনীতি, পাইলটের চিত্রতারকা হবার ইতিহাস। শিল্পপতিদের খবর এবং অবশ্যই সে সঙ্গে থাকবে ''ইওর ইন্ডিয়া'' বা ''তোমার ভারত'' বিভাগ। যাতে বেগার শ্রমিক, হরিজন হত্যা, আদিবাসী উন্নয়নের নামে টাকা লুঠ, পণপ্রথার নামে বধূহত্যা, এমন অনেক বিষয়ে তদন্তধর্মী রিপোর্ট।

সমান গুরুত্ব পাবে মেয়েদের বিভাগটি। সেটি সম্পাদনা করবে রুচি পেরেরা। ব্যাঙ্গালোরে রেসের ঘোড়ার মালকিন হওয়া আর মেয়েদের বিভাগ সম্পাদনা করা, সবই রুচি সমান জোরকদমে করবে।

বস থাকছেন নেপথ্যে। ঋষি হবে ''তোমার ভারত'' বিভাগের সম্পাদক। পুরনো ফিলমি গানের মতো বস ''দিল্লি সে দুলহন আর বোম্বাই সে বালম'' আনেননি। দিল্লি ও বম্বের দুই শিল্পপতি এ কাগজের অর্থদাতা। ওঁরা যে যার জায়গায় বসে আছেন।

ওঁদের বিরুদ্ধে লেখা যাবে না।

না যাক। ঋষি আপাতত ''নো'' কাগজের সঙ্গে থাকতে পেরে খুব আশ্বস্ত। ডুরাই পেপার ফ্যাক্টরির কেচ্ছা লিখে ঋষি ''ফর ইউ'' কাগজ থেকে বিতাড়িত, কে জানত যে রঙ্গনাথনরা এমন শক্তিশালী।

শেষ অবধি ও কি করত জানে না। আবার কি পুলিশ রিপোর্টার হয়ে ফিরে যেত পুরনো কাগজে? ঋষি তখন রীতিমত বিভ্রান্ত। সে সময়ে বস ওকে তুলে আনলেন হতাশার অন্ধকার থেকে।

বসের দুরাশা অন্তহীন।

কলকাতার কয়েকটি বহুতল বাড়ির প্রোমোটর উনি। এ ভূমিকায় ওঁকে দেখা যেত না, যদি না তার আগে সরকারী আবাসন বিভাগে উনি ঠিকাদারি করতেন।

তারপর নিজের পাখার কারখানা করে ফেললেন সকলকে তাজ্জব করে। এবং ''স্নো কুল'' পাখার বিজ্ঞাপন যখন দূরদর্শনেও দেখা যায়, তখন বোঝাই যায় যে পাখার কারবারে উনি জিতে গেছেন।

দূরদর্শনের আগামী এক সিরিয়ালে উনি, মানে ''স্নো কুল'' হবে প্রযোজক।

কলকাতা নয়। বম্বে, দিল্লী, পরিচালক থেকে তারকারা। প্রতিটি ছবির গল্প যারই লেখা হোক, বিশেষ আবশ্যিক হল, প্রতি ছবিতে ''নো'' কাগজের ডামি দেখানো হবে।

দেখুক, ডামি দেখুক। কাগজের নামটা জানুক। তারপর কাগজের প্রথম সংখ্যা উদ্বোধন করা হবে একই সঙ্গে বম্বে, দিল্লী ও কলকাতায়।

বর্তমানে ''নো'' কাগজের আপিস সাজানো চলছে। বস চান, তারপরেই বাংলা দৈনিকে নামতে।

কলকাতায় না কি অপার সম্ভাবনা। এ শহরে এখনো নাকি কয়েকটি দৈনিক, কয়েকটি সাপ্তাহিক চলতে পারে। বসের কেন যেন মনে হচ্ছে, ওঁর কাজ এখনো অনেক বাকি।

কাগজটা খোলে ঋষি।

খবর কোথায়, কোথায় খবর। এই তো। ঝাড়গ্রাম ছাড়িয়ে লাইনের পাশে যুবতীর মৃতদেহ। ছবি দেখে কে বোঝে কার। এ খবরে বস এত বিচলিত হলেন?

আগের কাজ আগে।

রুদ্র ভীষণ ঘুমোচ্ছে।

ঋষি বাথরুমে ঢুকে যায়। স্নান টান সেরে ফেলা দরকার। খুবই সৌভাগ্য যে পাইপ পালটাবার পর জলকষ্ট ঘুচেছে। আগে জলের বড় কষ্ট ছিল। কমলই উদ্যোগ করে পাইপ বদলায়। গত বছর বাড়ি চুনকাম কমলই করিয়েছে। প্রেমজা যাবে বলেই যেন কমল এ বাড়িতে এসেছিল এ সংসারের হাল ধরতে।

ঋষির ডানহাত হবে বলে। এ কথা তো সত্যি, যে কমল আছে বলে ঋষি অনেক, অনেক নিশ্চিন্ত।

কমলের এ বাড়িতে আসাটা খুব অদ্ভুতভাবে ঘটে যায়। এখন কেউ বলতেও পারবে না যে কমল এ বাড়ির কেউ নয়।

আজ বৃহস্পতিবার, ছুটি। রুদ্রর ইস্কুল আজ বন্ধ থাকে। রুদ্র একতলায় মাসিমার বাড়ি নেমতন্ন খাবে, দূরদর্শনে ফুটবল দেখবে। মেসোমশায় রুদ্রকে খুব পছন্দ করেন। ওঁদের দায়িত্বে যে ছেলেকে রেখে ওঁর মেয়ে জামাই কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিল, মোটর দুর্ঘটনায় তারা আর ফেরেনি।

কুশল একলা, রুদ্রও তাই। কুশল আর রুদ্র একই ইস্কুলে পড়ে। মাসিমারা বড় বড় তিনটে ঘরের জন্যে দেড়শো টাকা ভাড়া দেন। কিন্তু ওঁদের কাছে ঋষি এত উপকার পায়! সম্পর্কটাও এমন, যে ভাড়া বাড়াবার কথা বলতে পারে না।

আরেকটি ছোট ঘর ঋষিই কমলকে দিয়েছে। কমলের একটা রাজনীতিক অতীত আছে। জেল থেকে বেরোবার পর কমল তখন কোথায় যায়, কি করে ভেবে পাচ্ছিল না। ঋষি ওকে নিয়ে আসে। তখনো কমলের চোখে খুব যন্ত্রণা, হাতের আঙুল নাড়াতে কষ্ট।

অথচ কি নির‍্যাতন সয়েছিল, কি হয়েছিল, জিগ্যেস করলে বলত না।

—কি হবে ঋষিদা? আমি তো একলা নই। কত ছেলে আরো কত সয়েছে। কতজন মরে গেছে।

তখনো ঋষির জীবনে প্রেমজা আসেনি। কমলকে চিকিৎসা করানো, ওকে সুস্থ করা—একদিন কমল রাতে প্রচুর মদ খেয়ে ফিরল। তারপর ঋষিকে কি অশ্লীল গালাগালি! বাপ মা তুলে গালাগালি।

—কেন আমাকে সাহায্য করছো বেজন্মা? দয়া দেখাচ্ছ? কে চায় তোমার দয়া?

ঋষি ওকে টেনে একটা চড় মেরে ঘরে ঢুকিয়ে তালা আটকে দেয়।

পরদিন কমল ব্যাগ গোছাচ্ছিল।

—ওটা কি হচ্ছে?

—চলে যাব।

—কোথায় যাবে?

—যেখানে হয়।

—আর না কমল, আর না। বাঁচতে শেখো। চলে যেতে দেবই বা কেন? তোমার পেছনে আমার সময়, টাকা, খরচটা ভেবে দেখেছ? খরচটা তুলে নেব না।

—কি করব আমি? কি করার যোগ্যতা আছে আমার? দেখতেই পাচ্ছ আমি একটা—

—কমল! তুমি এত দুর্বল?

—দুর্বল! আমি!

—কাজ করো।

—কি করব?

—একটা ছোট ইলেকট্রিকের যন্ত্রপাতির দোকান খোলো। এখানেই খোলো, দরজাটা রাস্তার ওপর আছে—পেছনের বারান্দাটা ঘিরে নিলে শুতে পারবে—কাজ তো একটু আধটু জানো। এ ক'মাসে দেখেছি।

জানত কমল, কাজ জানত। ইলেকট্রিক দোকানের কর্মী কমল। লেখাপড়া শেষ করতে না—পারা কমল, পাড়ার ধারালো, রাজনীতিক, ব্যক্তিত্বউজ্জ্বল দীপেন্দুর অন্ধ ভক্ত ছিল। তারপর দীপেন্দুর সঙ্গে রাজনীতিতে ঢুকে প্রথম মনে হল আমারও দাম আছে। তারপর সে কি আশ্চর্য আশাউজ্জ্বল দিন, দিনের পর দিন।

বহুযুগের ওপার থেকে স্মৃতিকণা বহে মনে ভেসে আসে অতীতের মেঘ।

—দীপদা! আমি গ্রামে যাব না?

—তুই যেখানে আছিস সেটাই তোর ক্ষেত্র। সবাই সব জায়গায় যাবে না।

—এখানেই থাকব?

—খবর পৌঁছনো, কর্মীদের সাহায্য করতে দৌড়ে বেড়ানো, হাতিয়ার লুকিয়ে রাখা—

খুব কাজের ছেলে হয়ে উঠেছিল কমল। দীপদা—র কাকার ছেলে নবেন্দু ওকে লক্ষ্য করে যেত। পরে নবেন্দুই ওকে ধরিয়ে দেয়।

নবেন্দু এখন কর্পোরেশনে কাজ করে। কর্পোরেশনে কাজ করেই কয়েক বছরে বাড়ি দোতলা করেছে। মোটর সাইকেল কিনেছে, ডেকোরেটরের দোকান দিয়েছে, কেটারিংও খুলবে।

দীপদা—র ছবিটা দীপদাদের বাড়িতে কোথাও ঝুলছে অথবা ঝুলছে না। কমল জানে না।

কমলের বাড়ির লোকেরা সব চলে গেছে বেহালায়। আজাদগড়ে ওদের বাড়ি তো ছিল ভাড়া বাড়ি। ভাড়া বাড়ি থেকে কমলের বাবা দাদাদের ওঠানো খুব সহজ কাজ ছিল সে সময়ে। মনে পড়ে, সব মনে পড়ে। যদিও কমলের খোঁজ বাবা কিংবা দাদারা রাখেনি, কমলও রাখেনি।

যারা খোঁজ রাখে না, তাদের খোঁজ ও করবে কেন? আজাদগড়ে গেল, তা বাড়িঅলা বললেন, বস, বলতে আছি। দেখ! তোমার লিগ্যা বাড়িতে পুলিশ রে! পার্টির পোলারা রে! হেই ডরেই তোমার বাপ কইল, আমি চইলা যাই। আমিও কই হেই ভালো! তা বাপ তোমার, কাইন্দা বইলা গেল, হেয় যদি কুনোদিন আসে, তয় কইবেন, আমু এহন পোলাদের অন্নদাস। পোলারা তার মুখ দেখব না। আমার ক্ষমতা নাই যে হেয়ার লগে যুগাযুগ রাখি।

বড়দা, মেজদা, বউদি দুজন, সকলে চাকরি করত। কমলের তো পোজিশানই ছিল না। এতকাল পরে তারা কেন কমলকে থাকতে দেবে?

বন্ধুর বাড়িতে ফিরে এসেছিল কমল। সেখানেও পোজিশান খুব সম্মানের ছিল না। ঋষি ওকে নিয়ে এসেছিল। কেন, আমার বাড়ি নেই?

—কি করব গিয়ে?

—দোকান করতে পারবে?

—পারব। টাকা?

—দেখছি। সব হিসেব রেখে চলব। তুমি আমায় একে একে সব একদিন শোধ করে দেবে।

—যদি না পারি?

—বড় কাজ করতে গিছলে, ছোট কাজ করতে পারবে না? আর আমারও স্বার্থ আছে। মা আছে, তুমি থাকলে—

কয়েক বছরে কমলের দোকান টুক টুক করে করে চলতে লেগেছে। ঘরভাড়া একশো টাকা ও দিয়ে যায়। বড় কাজ ধরতে পারলে ঋণ বাবদ কিছু শোধও দেয়। ডেকোরেটরদের হয়ে যখন কাজ করে। পাড়ার কালীপুজোয় কমলের বিদ্যুৎসজ্জা বেশ নাম করেছে। এখন পাড়ার নেতা স্বয়ং ভজন কমলের ভক্ত। ফলে বিয়ে বাড়ির কাজ, ফাংশনের কাজ, দুর্গাপুজোয় পথ ও মঞ্চের আলোক সজ্জার কাজ, কমল মন্দ রোজগার করে না।

কমলকে ছাড়বে না ঋষি।

—বিয়ে কর কমল। এখানেই থাক।

—বিয়ে কেউ করে?

—সবাই করে।

—কি দরকার? এখনো মাসিমা বেঁচে আছেন। শয্যাশায়ী। রুদ্র এখনো বেজায় ছোট। বিয়ে করলে সংসার আমাকে স্বার্থপর করে দেবে। এদের দেখব কি করে?

—তুমি কি ব্রহ্মচারী হয়ে থাকবে?

—দেখাই যাক।

ঋষির মা সংসারে থেকেও নেই। হাঁপানিতে উনি অচল।

হাঁপ যখন ওঠে। অসহ্য কষ্ট পান।

হাঁপ যখন ওঠে না, মনোকষ্টে কাঁদেন।

কমল ধমক দেয়। আবার কাঁদছেন?

—কাঁদব না? অমন জ্বলজ্বলে বউ চলে গেল। একটা ছেলে আমার, জীবনটা ছন্নছাড়া হয়ে গেল। নাতিটাকে কাছে ডাকতে পারি না। অসুখের ঘর।

—কাঁদলে কিন্তু আমি চলে যাব।

—যাস না বাবা।

—তবে চোখ মুছুন।

—দেখতে পারি না কিছু সংসারে।

—আপনিই তো চালান সব।

—ওই, বলে বলে দিই।

বাড়িতে দুটি মহিলা কাজ করে। নলিনী আর রানী। অনেকদিনের লোক বলে মায়ামমতা আছে। ঋষির মার পরিচর‍্যা, রুদ্রকে দেখা, রান্না, বাসনকোসন, কাপড় কাচা, ঘরদোর, কাজ কম নয়।

সংসার চালায় ঋষি। কমল সহকারী।

রুদ্র আর কমল পরস্পর খুব ঘনিষ্ঠ। কমল কাকু রুদ্রকে মেট্রো রেলে চড়ায়, চিড়িয়াখানা নিয়ে যায়। স্কুলের বন্ধুদের জন্মদিনে পৌঁছে দেয়।

রুদ্রর মামাবাড়ি। ওর পিসির বাড়ি। ঋষির মামার বাড়ি। সর্বত্র কমল হল রুদ্রর বাহন।

এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুম থেকে ওঠায় ঋষি রুদ্রকে। ''ছুটির দিন বাবা''!

—এবার উঠে পড়ো।

—তুমি বেরোচ্ছ?

—হ্যাঁ, এবারে স্নান, খাওয়া, তারপর সারাদিন তো কুশলদের বাড়িতে হইচই।

—কমল কাকু যাবে না?

—কমল কাকু বাজার করবে। ঠাম্মাকে দেখবে। আর বিকেলে তোমাদের মেট্রোতে চাপিয়ে আইসক্রিম খাইয়ে আনবে। তোমরা যখন ফিরবে, ততক্ষণে আমি এসে গেছি।

—আমাকে পদান্বয়ী অব্যয় শিখিয়ে দেবে না?

—দেবো। সন্ধেবেলা।

—বাংলা মিসকে তো জানো না। রোজ আমার হোমটাস্ক ক্যাঁচকুচ করে কেটে দেয়।

—শিখিয়ে দেব।

—তুমি জানোই না।

—দেখই না।

ছেলের জন্যে ঋষিকে এখন উঁচু ক্লাসের বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে বসতে হচ্ছে। বাংলা অব্যয় যে কি, কত যে তার ভাগ। সে সব ও ভুলে গিয়েছিল।

ছেলের জন্যে ওর কষ্টও হয়। এই বয়স। এত পড়ার চাপ, এত বইয়ের ভার!

এক সময়ে ওর খুব জেদ ছিল রুদ্র প্রতি বিষয়ে অনেক নম্বর পাক। তারপর ক্রমে ক্রমে সে জেদটা কেটে গেছে। পড়াশোনা করুক, যেমন হয় হবে। অসম্ভব বইসর্বস্ব পণ্ডিত হয়ে হবেটা কি? শেষে সব বিষয়ে প্রথম হতে পারলাম না বলে মন ভেঙে যাবে। কি না কি করে বসবে।

ঋষির ক্রমেই বিশ্বাস হচ্ছে, বর্তমান সময়টা একটা চক্রব্যুহ। স্কুলে না ঢুকতেই ছেলে মেয়েদের ওপর ভীষণ চাপ। ভয়ংকর রকম ভালো তোকে হতেই হবে। কেন না তোদের যৌবনকালে এ দুনিয়া দেখবি এক ভীষণ রণক্ষেত্র। জয়ীরা ছাড়া কেউ টিকতে পারবে না। জানার জন্য পড়িস না। রেজালটের জন্যে পড়বি। হিসেব করে পড়বি।

জিততে না পারলে দেখবে দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ। ছাত্র ছাত্রীদের রোবট করে ফেলছে এই শিক্ষাব্যবস্থা।

না, ওই অসম্ভবের প্রতিযোগিতায় রুদ্রকে নামাবে না ঋষি। রুদ্র স্বাভাবিক সম্পূর্ণ মানুষ হোক। দারুণ রেজালট, বিরাট পণ্ডিত, কিংবা মস্ত বক্সওয়ালা, এদের সঙ্গে দেশ ও মানুষের কোনো যোগ থাকে না।

—বাবা।

—কি রুদ্র?

—তুমি তো নতুন আপিসে যাবে।

—যাব তো।

—আমাকে হোমটাস্ক কে করাবে?

—দেখা যাক। তুমি ভেবো না।

রুদ্র তৈরি হতে হতে নলিনী এসে দাঁড়ায়।

—বা বা। ছেলের সারাদিন নেমন্তন্ন। বাপও তো চললেন। সারাদিন হবেটা কি?

—কমল বাজার করে দেবে।

—রেশনও আসবে আজ।

—রানীদি আসবে না?

—আসবে।

—টাকা নাও।

—মাকে চান করাব না আজ। গা মুছে মাথা ধুয়ে দেব। কাল সর্দি হয়েছিল।

—ওষুধটা ঠিক মতো দিও।

—দেব, দেব।

—আমি কিন্তু বাড়িতে খাব।

—তোমাকে বিশ্বাস নেই দাদা। খাবার সময়ে এসে যাও তো নিমেষে ভাত করে দেব। যেদিন বলো ''খাব'', সেদিনই তো খাও না।

—টাটকা পাবদার ঝোল! শুনিয়েই গেলে।

—কি দাম! কি দাম!

—যাক গে। ভালমন্দ রেঁধে তোমরাই খাও।

—এখন এসো। বাপ ব্যাটা খেয়ে উদ্ধার করো। লুচি ভেজেছি। আলু ভেজেছি...

—নলিনী পিসি, গুড় দেবে না?

—নিশ্চই দেব। তোমায় দেব না তো কাকে দেব? তুমি হলে বাড়ির কর্তা। চলো তো, খেয়ে নেবে।

জীবনে ক্ষত যত, ক্ষতি তত, আবার ক্ষতিপূরণও হয় নানাভাবে। মা অসুস্থ, প্রেমজা চলে গেল। নলিনী, রানী, এরা যে স্নেহ যত্ন করে, বাড়ি দেখে, মাকে আর রুদ্রকে দেখে, এটা কি কম পাওয়া?

''ওখানে ওই টাকায় কাজ করছ? এখানে এসো। এত টাকা দেব'', এমন কথা বলার লোক এ পাড়াতেই আছে। সব পাড়াতেই থাকে ঝি—শিকারীর দল। একটি মেয়ে কাজ শিখে তৈরি হল তো আরেকজন তাকে ভাঙিয়ে নিল।

কাজের মেয়েদেরও বেশি টাকা দরকার। কাজ করতে গিয়ে তারা বিপদেও পড়ে!

নলিনী আর রানীকে ভাঙানো যায়নি।

—না বাবু! গিন্নি পড়ে থাকে। বাড়িতে মেয়েছেলে নেই। ইচ্ছে স্বাধীনমতো থাকি! দাদা তো সংসারটা আমাদের হাতেই ছেড়ে রেখেছে। মাইনে পোস্টাপিসে জমিয়ে দেয়। কিছু টাকা বেশি পাব বলে বেইমানি করব? মিহিন কাপড় পরি। সিনেমাও দেখি। পান দোক্তাও খাই, সব দেয়। অসুখে পড়লে পয়সা দিয়ে ওই অধীর ডাক্তারকেই দেখায়।

ঋষির মার আমলের লোক ওরা। ঋষির বিয়ে দেখেছে, প্রেমজার মৃত্যু দেখেছে, রুদ্রকে মানুষ করেছে। ওদের মধ্যে ব্যাঙ্গমা—বেঙ্গমীর মতো কথা হয়।

—দাদা যদি বিয়ে করত রানী!

—সংসার ভেসে যেত।

—কিসে?

—সে বউ সতীনপোকে যদি না দেখত?

—তা বটে। তবে বেটাছেলে, এই বয়স!

—বিয়ে করতে চায় না। নইলে বিয়ের কথা তো কম জনা বলেনি।

—ছেলেটা হেনস্তা হত।

—আমাদের হাতে কর্তাত্তি থাকত না। নতুন বউ গিন্নি হত। আমাদের দেখতে হত আর সইতে হত।

—হ্যাঁ। এখনকার মেয়েরা কি আর...

—সতীনপো আর সৎ—মা! দূয়ে মেলে না গো। আমার সৎ ছেলে যদ্দিন আশা করত, মা টাকা দেবে, আমি ভ্যানরিক্সা কিনব। তদ্দিন আসত। যখন বুঝল আমি হাত উপুড় করব না, সেই থেকে আর আসে না।

নলিনী বলে, তোরও কপাল! নিজের একটা হল না! আর আমি তো মহারানী। এক সোমবারে বিয়ে, আর সোমবারে বিধবা। মা বাপ বলত অলক্ষ্মী। শাশুড়ী বলত অলক্ষ্মী। না বাবু, খেটে যখন খাব, আর কারো ধার ধারি না।

—দাদার মতো মানুষ! এত দুঃখ কপালে ছিল। যেন সেদিনের কথা মনে হয়। বউদি এসে ওইখানে দুধআলতায় দাঁড়াল। আমাদের সব বুঝিয়ে দিয়ে ভাঁড়ারের চাবি দিয়ে নার্সিংহোমে গেল। যাবার কালেও পানটা মুখে দিল।

ঋষি বলে একটা টান পাড়াতেও আছে। তার কারণ এ পাড়াটায় এখনো বাইরের মানুষ ঢুকে পড়েনি। একটু জায়গাও নেই যেখানে বহুতল বাড়ি ওঠা সম্ভব। সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, দোকানী, বাস ড্রাইভার, গোয়ালা, এরাই থেকে গেছে। কোনোদিন কলকাতা আমূল বদলালে এ পাড়াটা হয়তো মিউজিয়াম পীস হয়ে থাকবে।

এ পাড়ার কেন্দ্রবিন্দু দুটি। একটি হল প্রাচীন শীতলাতলা। বারোমাস পুজো চলে। শীতলার গাধার চোখ দিয়ে জল পড়লে ভিড় বেড়ে যায়। চুনী কাহারের বউয়ের উপর শীতলা চৈত্রমাসে ভর করেন। তখন চুনী কাহারের বউ দেবীর অংশ হয়ে যায়।

আরেকটি কেন্দ্রবিন্দু এ পাড়ার প্রাচীন ক্লাব। ক্লাবটি চিরকাল ''তরুণ সংঘের'' হাতে আছে। সব জায়গার মতো এখানেও ক্লাবটি দখলে আনার জন্য রাজনীতিক দলের মধ্যে লড়াই চলেছে। বর্তমানে ক্লাবের নীতি সহাবস্থানের।

সকলকেই তরুণ বলা চলে না। নৈশ বিদ্যালয়ে আসে প্রৌঢ়রাও, পড়ায় যুবকরা। প্রায়ই ধরে মেরে পোড়ো আনতে হয়।

ক্লাব প্রাঙ্গণে খেলাধুলার আসরে ছোট থেকে তরুণদের ভিড় এবং পাঠ্যপুস্তক পাঠাগারে ভিড় পোড়োদের। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এ পাড়ার বড় বস্ত্র ব্যবসায়ী চাঁদমোহন বাবু। তাঁকে চটাতে চায় না কেউই। ব্যবসায়ী বললে হবে না। তাঁর পরিবারই পশ্চিমবাংলার ফুটবলে দুটি বড় খেলোয়াড় উপহার দিয়েছিল। যদিচ তারা বসে গেছে, তবু গৌরব কি যায়?

ঋষি ক্লাবের উৎসাহী সদস্য ছিল। দুর্গাপূজার স্মারণিক ওই সম্পাদনা করত। পাঠ্যপুস্তক পাঠাগারে একজন উদ্যোক্তাও ঋষি। এখন রুদ্র ক্লাবের মাঠে খেলতে যায়। রুদ্র মোহনবাগান সমর্থক। কুশল ইষ্টবেঙ্গলের। এবং বড় ম্যাচের দিন ওদের বচসা শোনার মতো।

ঋষি আজও সাধ্যমত পাড়ার সুখদুঃখে থাকে। কার রেশন কার্ড হচ্ছে না, কাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, পাবলিক কলে কেন জল নেই, এসব নিয়ে সাধ্যমতো ছোটাছুটি করে।

মায়ের অসুস্থতা, প্রেমজার মৃত্যু, ছোট্ট রুদ্রকে মানুষ করা। কমলকে আশ্রয় দেওয়া। মাসিমাদের ভাড়া না বাড়ানো, এসব কারণে ঋষির ওপর পাড়ার সহানুভূতি একটা আছেই। ক্লাবের খাতায় ওর নাম পরামর্শদাতাদের মধ্যে। সেক্রেটারি ভোঁদা রুদ্রকে বলেছে, বারো বছর বয়স হলেই পুজোতে রুদ্র স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাজ পাবে।

ভোঁদা এখনো কাজ পায়নি। চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্প্রতি ও বিজ্ঞান—চেতনা আনার জন্য খুব ব্যস্ত। ব্যস্ত পাড়ার কুসংস্কার কাটাতেও।

—শীতলাতলায় যখন চুনী কাহারের বউয়ের ভর হয়, লোকের ভিড় দেখেছ?

—দেখেছি।

—এ সব কাটাতে হবে।

—কি করবি?

—প্রগতিশীল ফিলমোৎসব করব।

—ওরা ''দামুল''ও দেখবে, ওখানেও যাবে। যোগবিয়োগ হতে হতে একদিন হয়তো...

—আসলে পাড়াটা বেজায় আদ্যিকেলে।

—সেজন্যেই শান্তিতে আছ। বহুতল বাড়ি আর লাকসারি দোকানে ভরে গেলে কেউ চিনত না।

কয়েক বছরে কমলও পাড়ার লোক হয়ে গেছে। ঋষি ভাবতেও পারে না পাড়া ছেড়ে কোথাও থাকবে।

কমল বাজার বুঝে নেয়।

—সাত সকালে দৌড়চ্ছ?

—বসের টেলিফোন।

—বস তো হয়নি।

—ওর নামই হওয়া। টাকা দিচ্ছে।

—যাও। আমি আছি।

—মায়ের ঘরের ফ্যানটা দেখিস তো।

—ও আর চলে না। নতুন কেনো।

—কিনব। কিনব।

বি. বি. বা ব্রজেন বসু বা বসের বাড়ি কাছেই। এলগিন রোডে ওঁর বাড়িতে ঢোকার সময় ঘাসের করিডোর মাড়িয়ে যেতে হয়। যে সব বহুতল বাড়ি উনি করেছেন, তাতে উনি থাকেন না। যদিও ''হার্মিটেজ'' বাড়ির দোতলাতেই ''নো'' কাগজের অপিস।

ফ্ল্যাটে বাস করা যায় না। বসবাস করবে বাড়িতে। বি. বি.—র ব্যক্তিত্ব এমন বিশাল যে ওঁর জন্যে বড় বাড়িই যেন দরকার (এটাই ওঁর বক্তব্য)।

বাড়িটি পুরনো কেতার সাহেবী আমলের ঢঙের বাড়ি। গাড়ি—বারান্দা, বারান্দায় পেতলের টবে রবার গাছ। নীলামে কেনা পুরনো ঢঙের আসবাবে সাজানো বসার ঘর। কিছুরই অভাব নেই। ওপরে ওঠার সিঁড়ির মুখেও পেতলের টব, তাতে অবশ্যই মানিপ্ল্যান্ট।

ব্যাপারটি ঋষির চোখে খুব বিস্ময়কর। বস এই বাড়ি, বার্মিজ লুঙ্গি, চুরোট ইত্যাদি দ্বারা নিজেকে একটা ইতিহাস বা ঐতিহ্য দিচ্ছেন। যেন এই বনেদিয়ানা তাঁর বংশগত।

তা যে সত্যি নয় তা তো সবাই জানে।

টাকার গোড়াপত্তন ঠিকাদারিতে।

বাড়ি কেনা সেদিনের কথা।

আসবাব ইত্যাদি সবই এক ইনটেরিয়ার ডেকোরেটর ফার্মের সৌজন্যে।

উক্ত ফার্মের শিল্প উপদেষ্টা সুমিত্রে (সুমিত রে) চেহারায় দানবের মতো। লালচে ফর্সা রং। ভুরু ও চোখের পাতা নেই বললে হয়। লম্বায় যদি ছ'—ফিট চার ইঞ্চি হয়, চওড়ায় বোধহয় তিনফুট। চোখ লালচে, ফর্সা লোমশ কানে অনেক আঁচিল। মাথায় টাক, শরীর লোমশ, কথাবার্তায় অন্যকে তাচ্ছিল্য দেখায়। সকলেই সব হজম করে। কেন না নিজের লাইনে সুমিত্রে বাঘ সিংহ।

যে মক্কেল টাকা ঢালবে, তাকেও ও রেয়াত করে না। করবে কেন? বিপ্লবী অভিনেতার বাড়ি ও বই দিয়ে সাজিয়ে দেয়, নতুন শিল্পপতির বাড়ির ভেতরে তুলে আনে আসাম ও নাগাল্যান্ড। জনৈক অভিনেত্রীর বাড়ি গুজরাটের কাঠ ও গালার আসবাবে সাজাবার পর অভিনেত্রী, তার চতুর্থ স্বামী ও প্রথম স্বামী, স—আসবাব যদি পুড়ে মরে যায়, সে দোষ সুমিত্রের নয়।

বসকে ও কি ধমকটাই মেরেছিল।

কি চান? একবিংশ শতাব্দীর ফিউচারিস্টিক ব্যাপার? না উনিশ শতক, না অষ্টাদশ শতকের ডেকাডেন্ট লক্ষ্নৌ, না বাবু কালচার?

—আভিজাত্য।

—আভিজাত্য দেয় রক্ত।

—মানে, চল্লিশের দশকের বাড়ি। এ সব অঞ্চলের যেমন হত...

—তাই বলুন! ওটা ক্যালকাটা ক্লাব, মাহজং পার্টি, রেসকোর্সের আভিজাত্য।

ওটাও যে সুমিত্রের মতে আভিজাত্য নয় তা শুনে বস মুষড়ে পড়েন।

—বাড়ি সাজিয়ে দেওয়া যাবে।

—এস্টিমেট?

—পাঁচ লাখ ধরে রাখুন।

—বাড়বে?

—বাড়তে পারে।

—পাঁচ লাখ!

—তবে মেছো বাজারে যান।

—না না।

আপনি মশাই প্রগত। অর্থাৎ প্রগতিশীল উটকো ধনী। পাঁচ বা পঞ্চাশে আপনার কি এসে যায়?

—সব ঠিক মতো হবে তো?

—আপনি তো এ বিষয়ে অতি মূর্খ। তেমন দিনে তেমন বাড়িতে জীবনে ঢোকেননি। ঠিক হল না ভুল হল, বুঝবেন? ক্ষমতা আছে? বর্বর অসভ্য তো!

গাল খেয়ে বস চুপ। সুমিত্রে শেষ অবধি এগার লাখ খসায়! কিন্তু রান্না ঘর থেকে শোবার ঘর, সর্বত্র এনে দেয় ঔপনিবেশিক সাহেবী বাঙালীর শেষ চেহারা। বাড়ি দেখে বস অভিভূত হয়ে যান। সে জন্যেই তিনি বিশ্বাস করেছেন যে এই বাড়ি এবং তিনি একই রকম প্রাচীন আভিজাত্যের পরিচয়।

ঋষি ঢুকেই বুঝল কেস খারাপ। কেন না বস লাল চোখে চারটে টেলিফোনে কথা চালাচ্ছেন।

মিসেস বস বসে আছেন।

—কি হল?

মিসেস বস কেঁদে ফেলেন। একদা সর্বদাই শাড়ি পরতেন। চুড়িতে সেফটিফিন ঝুলত। কপালের টিপ ঘামে গলে নামত। যখন থাকতেন বেলেঘাটায় শ্বশুরবাড়িতে।

এখন ডায়েটিং ও ফেসিয়ালের কারণে অন্য চেহারা। চুল কেটে নকল চুলে রোল, পরনে হাউসকোট, পায়ে চম্বার ঘাসের চটি, গলায় রুদ্রাক্ষ এবং হারের লকেটে মায়ের ছবি। প্রগত পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী মা ব্রহ্মশান্তিদায়িনীর ভক্ত। ছেলে ভক্ত বউয়ের, বউ ভক্ত তস্য পিতার। রূপা কখন কার ভক্ত হবে তা এখনও বলা কঠিন। তবে গোপা ছিল ঋষির ভক্ত। ''ঋষিদা!'' বলে ও লাফিয়ে চলে আসত ঋষি এসেছে খবর পেলেই।

''গোপা'' এ বাড়িতে কিছুকাল একটি নিষিদ্ধ নাম। রূপাও ওর নাম করে না।

অবাধ্য, দুর্বিনীত, জেদী রূপা!

—যতদিন এ বাড়িতে আছি, ততদিন বসের কথা মেনে চলব, কি বলো মা? তোমার তো একটি মেয়ে।

মিসেস বস ঠোঁট এঁটে শোনেন।

এখন উনি কাঁদছেন।

ঋষি ঘাবড়ে যায়।

—কি হল? গোপার কোনো খবর...?

বস টেলিফোন চারটেই নামিয়ে রাখেন।

—রূপা জোর দিয়ে বলছে লাইনের পাশের মৃতদেহটা গোপার।

আমাকে যেতে বলছে।

—কোথায়, কোন লাইনের পাশে?

—ঝাড়গ্রাম ছাড়িয়ে, কোন এক জায়গায়।

—রূপা কোথায়?

—সেখানেই।

—রূপা সেখানে?

মিসেস সুপ্তি বসু চোখ মোছেন।

—ও ভাবে বললে ঋষি কি বুঝবে? সব খুলে মেলে বলো। ঋষি ঘরের ছেলে। ও কারুকে বলবে না।

—ভাস্বর কোথায়?

বস যেন হঠাৎ চাবুক হয়ে যান। টান টান, হিংস্র, কাঁটাঅলা চাবুক। পথে এসো বস। তোমার এই চেহারা চেনা চেহারা। সাপের মত চাপা আক্রোশে হিসহিসিয়ে কথা বলো।

—ভাস্বর বম্বেতে, দিল্লী আর ব্যাঙ্গালোর হয়ে ফিরবে। ভাস্বরকে কিছু বলা চলবে না। দরকারী মিটিঙে গেছে। ওর কারখানার ব্যাপারে। এ সময়ে ওকে জানালে ও বিচলিত হবে, আর কাগজগুলো কেচ্ছা ছেপে দিলে...

সুপ্তি বলেন, সর্বনাশ হবে।

—আমার আজ পর পর মিটিং। রাতে যাচ্ছি দিল্লী আমার পক্ষে কোনো ভাবেই...

—যেতে পারবেন না।

—না। এবং ওটা গোপা নয়। হতে পারে না। হলে হাটে হাঁড়ি ভাঙবে। বুঝেছ?

—যদি গোপা হয়?

—না।

—সুজয়কে, মানে গোপার স্বামীকে...

—না। সুজয় আমার বিজনেস পার্টনার।

—হতে পারে...

—তুমি জানো না।

—আমাকে না বললে কি করে জানব?

—বলছি। সুপ্তি, কফি দিতে বলো।

—আর কিছু খাবে না?

—সামান্য কিছু।

সোফার সঙ্গে লাগানো বেল টেপেন সুপ্তি। এ বাড়িতে ঘর থেকে ঘরে বেল বাজে, ইনটারকমে কথা বলা যায়, কিচেনে নির্দেশ দেয়া যায় বিছানায় শুয়েই। বসের এন্টারটেইনমেন্ট অ্যাকাউন্ট আছে বিলডার্স অ্যানড কনস্ট্রাকটারস আপিসে। সেই অ্যাকাউন্ট খরচ দেয়।

বস নিয়মিত পার্টি দেন, আপ্যায়ন করেন। ঋষি শুনেছে সে সব পার্টির জন্যে হস্টেস আসে। সুপ্তি বসুকে দিয়ে সব কুলিয়ে ওঠা যায় না। এক বছর বাদে বাদে য়ুরোপ যান মহিলা, স্বামীর সঙ্গে। তবুও এখনও দূরদর্শনের বিজ্ঞাপনের মতো ঝলমলে হতে পারেননি।

রূপা এ সব তালেগোলে থাকে না।

গোপা তো একটি নিষিদ্ধ নাম।

বেল বাজে, বেল বাজে। কার তরে এ ঘণ্টা ধ্বনি? অবশ্যই মাঙ্গুরামের তরে। মাঙ্গুরাম পলিশ দুরন্ত, কেতা কায়দা জানা মানুষ। সর্বদা থাকে ঝকঝকে নীল উর্দিতে। বেল বাজাবার সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি ঠেলে ঢুকে পড়ে ও।

এটা কোন মাস, কোন ঋতু, তা দিয়ে কি হবে? লনে রাধাচূড়া যখন ফুটেছে, হয়তো এটা কুসুমের মাস। কিন্তু ট্রলিতে সর্ব ঋতু সমারোহ। উজ্জ্বল কমলালেবু, রক্তাভ আপেল। সোনালি কলা, সবুজ আনারস। বেগুনি আঙুর,—

বহুকাল আগে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে গ্রাজিয়া দেলেদ্দার ''মা'' পড়েছিল ঋষি। ''যার বাগানে এত ফল, পল তাকে ফল দেয় কেন?''

ট্রলিতে কয়েকরকম চীজ, মাখন, জ্যাম, মধু, ক্রীম, রুটি, ডিম, চা।

মাঙ্গুরাম যন্ত্রের মানুষের মতো সব সাজাতে থাকে, সাজাতে থাকে। ভিটামিনের শিশি। এরপরেও স্বামী স্ত্রীর ভিটামিন বড়ি লাগে।

—খাও ঋষি।

—আমি খেয়েই এসেছি।

—খেয়ে এসেছ?

—নইলে রুদ্র খায় না।

এখন সুপ্তি বসু যেন ককিয়ে ওঠেন।

—এখনো তুমি রুদ্রকে বাড়িতে রেখেছ? ওরকম একটা পাড়ায়?

—কোথায় রাখতাম?

—ঋষিভ্যালি, পঞ্চগনি, নিদেনপক্ষে নর্থ পয়েন্ট, নৈনিতালে শেরউড,—পাহাড়ী অঞ্চলে পাবলিক স্কুল। পরিবেশ, প্রকৃতি, কি নেই বলো? আর ডিসিপ্লিন বা লেখাপড়া ওখানেই হয়। মা নেই যার...

বস মৃদু ধমক দেন, ঋষি টাকা কোথায় পাবে? কাকে যে কি বলো।

—বিয়েও করলে না!

—আমরা কি ঋষির কথাই বলব?

—না...তুমি বলো, আমি ভাবতে পারছি না। ভাবতে গেলেই মাথা ঘুরে যাচ্ছে।

—তুমি শান্ত হও। এখন অনেক কাজ। রূপা যে কি করল। ওই মেয়ে চিরদিন...

হঠাৎ সুপ্তি বলেন, সত্যি যদি গোপা হয়?

বস কাঁধ নাচান। তারপর ঋষিকে বলেন, গোপা হতে পারে না।

কেন হতে পারে না, তা ঋষি জানে না। জানার কথাও নয় ওর।

তবু ও বলে, রূপা ভুল করবে?

—নিশ্চয় করেছে। ''করবে'' নয়, করেছে। তোমাকে বলা হয়নি আগে—এখন...,

—বলুন।

—তোমার সাহায্য চাই বলেই বলছি।

—বলুন।

—বলছি।

বস মন দিয়ে একটি টোস্ট খান মাখন মধু দিয়ে। চায়ে চুমুক দেন। তারপর ঋষির দিকে তাকিয়ে মনে মনে কোনো হিসেব করেন।

—অন্তত মাসখানেক আগেই গোপা সুজয়কে ছেড়ে চলে গেছে। শুনছি একলা যায়নি।

—খোঁজ করেছিলেন?

—অবশ্যই। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েই যাচ্ছি, বিবি, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করো—বাববাব, মামমাম। এই দেখ, তুমিও জানতে না যে ওর ডাক নাম বিবি, জানতে না, ছোটবেলা ও আমাদের বাববাব, মামমাম বলত।

—কিন্তু...ওরা তো...

—দেখ, মানুষ নিখুঁত হয় না। বিয়ের ব্যাপারে কতকটা দেখা যায়, কতকটা মানিয়ে নিতে হয়। যতদূর দেখা যায়, সবই দেখেছিলাম।

হয়তো! হয়তো! সে বিয়ের আগাগোড়া ফিলম তোলা হয়েছিল এবং ঋষি শুনেছে সে ফিলমে বিয়ের যৌতুক থেকে সম্মানিত অতিথিবর্গ সকলকেই বেশ পরিষ্কার দেখা যায়।

যতদূর দেখা যায়। কতদূর দেখা যায়?

গোপা এবং সুজয়ের বিয়ে তো দুটি যুবক যুবতীর বিয়ে নয়। অনেক টাকা, উচ্চাশা এবং দম্ভের সঙ্গে আরো টাকা, আরো উচ্চাশা, আরো দম্ভের বিয়ে।

সে বিয়েতে গোপার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোনো দামই দেয়া হয়নি। কেননা তার আগে গোপা কার মেয়ে, কোন বংশের মেয়ে, কিছু না ভেবে অরূপের সঙ্গে চলে গিয়েছিল।

চলে গিয়েছিল বিয়ে করবে বলে, কিন্তু বস অতীব ক্ষিপ্রতায় ওদের ধরে ফেলেন।

হয়কে নয় করবার ক্ষমতা ওঁর সেদিনও ছিল। গোপার বয়স তখন উনিশ হলেও ওকে নাবালিকা প্রতিপন্ন করা গিয়েছিল।

কেচ্ছা জানাজানি হওয়া বন্ধ করা গিয়েছিল।

নাবালিকা গোপাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফুসলানোর অপরাধে অরূপকে জেলে দেয়া গিয়েছিল।

কাগজে সংবাদ অপ্রকাশিতই ছিল।

দু'বছর বাদে বেরিয়ে অরূপ কোথাও হারিয়ে গেল। ওরকম একটা কেসের কলঙ্ক মেখে কলকাতায় থাকল না।

জনৈক ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান অরূপ নাকি মধ্যপ্রদেশে থাকে। মাঝে মাঝে ভিলাই, বা হিন্দোয়ারা বা রাজনন্দগাঁও থেকে ঋষি ''শুভ নববর্ষ'' বা ''শুভ বিজয়া'' লেখা কার্ড পায়।

আর গোপা?

যে এরকম একটা কাজ করতে পারে তাকে বিশ্বাস করবে কোন বাপ—মা?

সেখানেই তো শেষ নয়। শেষ নয়।

গোপা চিরকাল শান্ত, হাসিখুশি, জেদ বলে কিছু ছিল না স্বভাবে। রূপার মতো ব্রিলিয়ান্ট নয়।

ভালোমানুষ মেয়ে।

রাজপুর থেকে ধরে আনার পর সেই গোপা কি বদলে গিয়েছিল ভাবা যায় না।

গোপার উনিশ, অরূপের পঁচিশ, ওদের যাবার জায়গাও তো বেশি ছিল না। রাজপুরে অরূপের এক দিদির বাড়িতেই গিয়েছিল ওরা, আর দিদি ওদের বিয়ের ব্যবস্থাও করছিল।

তারপর গোপার সে কি অবস্থা।

...আমাকে বাঁচাচ্ছ আর ওকে জেলে দেবে। কেন মিথ্যে কথা বলছ? শুনুন, আপনি তো পুলিশ। আমাকে ও ফুসলায়নি। আমি ওকে ভালবেসে স্বেচ্ছায় চলে যাই। আমার বয়স উনিশ, উনিশ, উনিশ।

অরূপকে জেলে দেবার পর গোপা তো আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করেছিল।

বেচারা, বেচারা গোপা।

কোনো কাজটাই ও শেষ অবধি সফল করে উঠতে পারে না।

ঘুমের বড়ি পাম্প করে বের করে ফেলে ওকে তো বাঁচিয়েই তোলা হল।

অবশ্যই নার্সিংহোমে, হাসপাতালে নয়। হাসপাতালে গোপনতা থাকে না।

তারপর ও বাবা মার সঙ্গে কথা বলত না, ঘর থেকে বেরোত না, একেবারে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল।

সুপ্তি তখন ঘন ঘন ফোন করতেন।

—তুমি এলে ও তবু কথা বলে।

ঋষি আসত।

গোপা ওর সঙ্গেও সব সময়ে কথা বলত না। একদিন শুধু ম্লান হেসে বলেছিল, অরূপ আর আমি এক দেশেই থাকব, তবু দেখা হবে না।

—কি বলব বলো?

—আপনি আর কি বলবেন। শুধু মনে হয় অরূপ চিরকাল ভাববে গোপাটা কি যাচ্ছেতাই। ওকে কোনোদিন বলা যাবে না, গোপা চায়নি ও শাস্তি পাক।

—গোপা! একটু বেরোবে?

—না না। বেরোলে একবারই বেরোব।

—আমার সঙ্গেই যেতে?

—না না, কোথাও যাব না।

একবারই বেরোল গোপা চার বছর বাদে।

চার বছর অতীতকে ভোলার পক্ষে যথেষ্ট সময়, তাই ভেবেছিলেন বস। অল্প বয়সের হঠকারিতা ভুলতে কতদিন লাগে?

গোপা পড়ল না আর, গান ছেড়ে দিল। ঘরের বাইরেও যেত না।

তবে রূপাকে এড়াতে পারত না।

রূপা ওর চেয়ে সাত বছরের ছোট। রূপা বড় হবার সময়টা বসের জীবনে আরো বড়ো হবার সময়। সে জন্যে ওকে তাবে রাখা যায় নি।

রূপা বারো বছরেই জেদ করে ইংরিজি ইস্কুল ছেড়ে বাংলা ইস্কুলে ভর্তি হয়। বসকে ও জিগ্যেসই করেনি। শুধু বরাবরের প্রথম হওয়া ছাত্রী যখন সব বিষয়েই উনিশ কুড়ি পেতে থাকল, তখন কোন ভালো স্কুল ওকে রাখবে?

ওই ইস্কুল বদলেই ও গোপার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

ঋষি একদিন অবাক হয়ে দেখেছিল গোপা বোনের চুল বেঁধে দিচ্ছে।

তারপর শুনেছিল, রূপা দিদির ঘরে চলে এসেছে। ও দিদির ঘরেই থাকবে।

গোপা ম্লান হেসে ঋষিকে বলেছিল, রূপা কেন স্কুল বদলাল, কেন আমার ঘরে থাকছে, বোঝেন? ও কেন কি করে ভাবেন?

প্রথমত এ সব কথা ঋষির ভাবার কথা নয়। দ্বিতীয়ত রুদ্রকে সামলে, তখন যে কাজ করত তা সামলে রূপার কথা ভাববে কখন?

—তুমিই বলো।

গোপা শীতের পড়ন্ত বেলার মতো ম্লান, পলাতক চোখে বাইরের দিকে চেয়ে নিজের মনে বলেছিল, দেবদারু গাছটা কত ছোট ছিল তখন, কত বড় হয়ে গেছে। এত দেবদারু গাছ কেন জানেন তা? জানেন না?

—সত্যিই জানি না।

—কোনো পণ্ডিত বুঝিয়েছে দেবদারু গাছ অনেক থাকলে বাইরের শব্দ তেমন আসে না। এটা একটা দুর্গ তো! এটাকে বাইরের সব কিছু থেকে রক্ষা করে রাখতে হবে।

—ছবি আঁকছিল কে, রূপা?

—ভালো বলবেন না। ভালো বললেই ওর ছবির একজিবিশন হবে। দারুণ হইচই লাগবে। আর রূপা রেগে ছবি আঁকা ছেড়ে দেবে।

গোপাকে অবাক হয়ে দেখছিল ঋষি। যেন ও কত কত যুগ ধরে কত কিছু সইতে সইতে মূর্তির মতো প্রাচীন ও সুন্দর হয়ে গেছে।

অন্যমনস্ক গলায় গোপা বলেছিল, আমার আর অরূপের ব্যাপার! এটা তো সত্যি যে আমি বিদ্রোহ করতে পারলাম না। রূপার মনে লাগেনি, ও বোঝেনি, তা ভাববেন না। ইচ্ছে করে ও স্কুল ছেড়ে বাংলা স্কুলে এল। ওটাই ওর প্রতিবাদ বোঝাতে চাইল। দিদির মতো আমাকে ছেঁচতে পারবে না। আমি বিদ্রোহ করব।

—তাই?

—নয়তো কি? ওই করে আমাকেও বুঝতে দিল যে দিদি, তোর দুঃখ আমি বুঝি। ও রকম সাজানো ঘর ছেড়ে আমার ঘরে চলে এল, সেও তো বসকে চটাবে বলে।

—বস বলছ?

—বসই তো। একমাত্র বস।

—আর কি করছে রূপা?

—নো জন্মদিন। টেবিলে বসে খায় না এখানে আমার সঙ্গে খায়। স্কুলে যায় পাবলিক বাসে। বাড়িতে জিনস আর পাঞ্জাবি পরে ঘোরে। লেকে গিয়ে সাঁতার কাটে। দামী প্রেজেন্ট কিছু নেয় না।

—বাঃ!

গোপা সদুঃখে বলে, ওকেও তো ভেঙেচুরে দেবে একদিন। ওকে তো ওর ইচ্ছে মতো বড় হতে দেবে না।

বিয়ের প্রস্তাব আনতে গোপা কিছু বলেনি।

রূপা বলেছিল, ও রকম ঠিক বসের মতো হিসেবী ছেলে একটা, বিয়ে করছিস কেন?

গোপা বলেছিল, ওদের দেখতে হবে না।

—তুই আর আসবি না?

—দেখে নিস।

বম্বের এক কম্পুটার কোম্পানির কলকাতা শাখার সর্বেসর্বা সুজয়কে গাঁথতে বস প্রচুর ছোটাছুটি করেন। সুজয় গোপার অতীত জানত কি না কে জানে। বালিগঞ্জ সার্কুলারে মরকত প্রাসাদে সাতদিন বিবাহোৎসব চলে। আশীর্বাদও উৎসব। গায়ে হলুদও উৎসব। বিয়ের পর পার্টির বন্যা।

অবশ্যই গোপাকে বাদ দিয়ে।

কনকাঞ্জলি ঢেলে দিয়ে মা বাপের অন্নঋণ চুকিয়ে শুকনো চোখে গটগটিয়ে সেই যে গোপা গাড়িতে ওঠে, তারপরই গোপা অনুপস্থিত।

''মেয়ে অসুস্থ...বিয়ের ধকল...'' এসব বলে বস হাস্যাস্পদ হচ্ছিলেন। এবং অষ্টমঙ্গলার দিন সুজয় জানাল, যেহেতু গোপা আসবে না, সেহেতু ওর আসাও অপ্রাসঙ্গিক হবে। বস যেন মাপ করেন।

অপমানে জ্বলতে জ্বলতে বস দৌড়ে গিয়েছিলেন। সল্টলেকে সুজয়ের প্রকাণ্ড বাড়ি। একাধিক প্লট কোনো কৌশলে নিয়ে ভালো বাগান।

গোপা ভি. সি. আরে ছবি দেখছিল।

—তুমি কি ভেবেছ গোপা! আমাকে এ ভাবে বারবার অপদস্থ করছ কেন?

—বিরক্ত কোর না, ছবি দেখছি।

—কথা বলছ কার সঙ্গে?

—ওসব বলে লাভ নেই।

—তুমি যাবে না?

—না, কোনদিন না।

—বাড়ি ভর্তি নিমন্ত্রিত...

—ওটা তোমার প্রচারের জন্যে।

—তোমার মা...

—মা নয়, তুমি নয়...

—এত দেখে বিয়ে দিলাম...

—সব দেখেছিলে! সুজয় যে সাত বছর ধরে ওর বিধবা মাসতুতো বউদির সঙ্গে থাকে, তাও তো জানতে।

—ভেবেছিলাম কুৎসা!

—চমৎকার। এটা তো সুবিধার্থে বিবাহ। তুমি তোমার মেয়ের অতীত চেপে রেখে বিয়ে দিয়েছ। ও নিজের বর্তমান চেপে রেখে বিয়ে করেছে। এরপর সুজয়ের মুখ রাখবার জন্যে ভালো বউয়ের অভিনয় আমাকে করতে হবে না, করব না। তোমার মুখ রাখার জন্যে ভালো মেয়ের অভিনয়ও করব না।

—সম্পর্কই রাখবে না?

গোপা বসকে স্তম্ভিত করে টেবিলে পা তুলে দিয়ে সোফায় এলিয়ে পড়েছিল। হাতের হীরের আংটি ঘোরাতে ঘোরাতে বলেছিল, সম্পর্ক তো সবে শুরু। তোমাদের সম্পর্ক থাকবে।

—গোপা! তুমি এ কি বলছ?

—তোমরা টাটা বিড়লা নও। তাহলে বলা যেত হাউসে হাউসে বিয়ে হয়েছে। তবে তোমরা যেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অনেক দূর যাবে। বিয়েটা তো সে ভাবেই হল। সুজয়ের বাবা মাও পাটনা থেকে এসেছিলেন মাত্র।

—তুমি আমার বড় মেয়ে!

—কি আশ্চর্য! তোমার সম্পত্তি বলো। কিন্তু এখন সম্পত্তি তোমার নয়।

—সুজয় কি তোমায় ক্ষমা করবে?

—ওর সঙ্গে আমার চমৎকার বোঝাপড়া। আমার পক্ষে যদি ওর বর্তমানকে মেনে নিয়ে চলা সম্ভব হয়, ওকেও আমার অতীতকে মেনে নিতে হবে।

—তুমি...ওকে...সব বলেছ?

—নিশ্চয়। লুকোব কেন?

—ও মেনে নিয়েছে?

—নিশ্চয়। না মানলে আবার বেরিয়ে যেতাম, অবশ্য তোমাদের কাছে নয়!

—আমার বলার কিছু নেই।

—আহত পিতার ভূমিকাটা খুব মানাচ্ছে না তোমাকে। চার বছর ধরে আমাকে শুধু অবাঞ্ছিত বোঝা ভেবেছ। বিয়ে হয়ে গেল বলে হঠাৎ আমার দোষ কেটে গেল? আমি মুক্ত, না জামিন পেয়েছি, না প্যারোলে খালাস?

—ওই অরূপ!

—ওর নাম তুমি করবে না।

—বিশ্বাস করো, সুজয়ের বিষয়ে কানাঘুষো শুনেছিলাম মাত্র, সব জানতাম না।

—চাইলে জানতে পারতে। সবাই জানে, তুমি জান না কেন? ওদের সম্পর্ক তো বহুদিনের।

—তাকেই কেন বিয়ে করল না?

—বাঃ, বিধবাকে সুজয় বিয়ে করে? একে আত্মীয়, তাতে বিধবা। আবার যদি বিধবা হয়? এ সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিল বলেই তো সমাজের কাছে মুখ রাখতে এ বিয়েটা করল সুজয়।

—একটা মেয়ের...

—একটা মেয়ে বলতে যদি আমি হই, তাহলে সিধা কথা, আমার কথা তুমিও ভাবোনি, সেও ভাবেনি। অনেক সময় কেটে গেছে, এখন হঠাৎ আমার বিষয়ে দুশ্চিন্তা না করলে খুশি হবো।

—সুজয়!

—কি?

—সে মহিলাকে টাকাপয়সা দিয়ে...

—আমার সঙ্গে সুন্দর সুখী পরিবার গড়বে?

হঠাৎ ফুঁসে উঠেছিল গোপা, সে মেয়েটার দোষ কোথায়? সাত বছরের সম্পর্ক। সুজয় ওর মেয়ের বাবা। সে তো চিরন্তন ভারতীয়া। সম্পর্কও কাটাবে না, বিয়েও করবে না। কাজকর্ম করার যোগ্যতাও নেই। পাপবোধও ওকে তাড়ায়। রাতদিন গুরুর নাম জপে। সুজয় গিয়ে হাজির হয়।

—ছি ছি!

—সবই তো ইনভেস্টমেন্ট। মহিলার স্বামীর টাকা দেখভাল করতে গিয়ে সুজয় এ বাড়িটা দখল করেছে। মহিলাকে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে। মাসে মাসে খরচ দেয়। সুজয়ের দিক থেকে যথেষ্ট ইনভেস্টমেন্ট আছে। সময়, উদ্যম, টাকা খাটানোর পরিশ্রম। মহিলাকে টাকা তো দেয় এ বাড়ির ভাড়া বাবদ।

—আমি এত জানতাম না।

—এখন জানলে, এখন এসো। সুজয়ের সঙ্গে আমার কথা, দুজনে দুজনকে ঘাঁটাব না, এবং সুখী স্বামী—স্ত্রীর অভিনয় করে চলব। কে জানে কোনো অভিনয় শেখার স্কুল আছে কি না। যারা এ অভিনয়টা আমার মতো ধনী লোকদের বউদের শেখাতে পারে। ঋষিদাও জানবে না। ও তো অভিনয়টা বোঝে না।

পরাভূত, হতভম্ব বস বেরিয়ে এসেছিলেন।

বাড়িতে এসে বলেছিলেন, ওরা এ সব মানে না... আসতে চায় না...

রূপা বলেছিল, বাজে কথা। আমি জানতাম দিদি আসবে না। আসবেই বা কেন? এ বাড়ি থেকে বেরোতে চায় বলেই না বিয়ে করেছে।

—চুপ করো রূপা।

আত্মীয়স্বজনরা তো বসের এমন বোলবোলাও দেখে মনে মনে অনেকদিনই হিংসেয় পুড়ছেন।

এখন তাঁদের মুখ মুখর হল।

—মানা—না মানার কি আছে?

—নিয়ম মানতে হবে না?

—বিয়ে হল কেমন ঘরে তাই বা...

—আসলে গোপা সেবার যা যা করল...

—হ্যাঁ। এমন মেয়েকে যত দাপে রাখবে ততই ভালো।

সুপ্তি বসু অপ্রস্তুত, অপ্রস্তুত। রূপা ঋষিকে ডাকল।

—প্লেটে তুলে খেয়ে নিন তো, আমিও খাচ্ছি। শুনুন, আমি আর আপনি দিদির কাছে যাব। খান।

—খাব?

—কেন খাবেন না? দিদিকে তো আমার শ্রদ্ধা হচ্ছে। তবে ওকে তো এমন বিয়ে দেয়া হল...ঋষিদা! আপনার স্ত্রী কতদিন মারা গেছেন?

—কয়েক বছর হল!

রূপা মুরগির ঠ্যাং হাতে ধরে খুব সহজে বলেছিল, দিদির খুব সাদাসিধে মানুষপছন্দ। অরূপদার মতো। আপনি কিন্তু স্বচ্ছন্দে দিদিকে বিয়ে করতে পারতেন।

—যাঃ! তা কি হয়?

—কেন হয় না? রুদ্রর কথা বলছেন? দিদি ঠিক তাকে ভালোবাসত। এখনই বা কি...

—কি?

—তাও জানেন না? সুজয়দার তো কে একজন আছেন, তার মেয়েও আছে। দিদি বলেছে।

—তোমার বাবা জানতেন?

—তিনি জানেন।

—গোপা, গোপার কপালে শেষ অবধি...

অল্পবয়সে অত্যন্ত প্রখরবুদ্ধি থাকলে ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট রায় দিতে পারে।

রূপা বলল, একবার ঘা খেয়েছে বলে দিদি যেন ভাগ্যবাদী হয়ে গেল। একটা বিয়ের কথা হল, চোখ বুজে বিয়ের পিঁড়িতে বসল। এখন যে কি করবে তা তো ওকেই ঠিক করতে হবে।

—মনটা খারাপ হয়ে গেল।

—আইসক্রিমটা খান।

—বাড়ি যাব, রূপা।

—আমি কবে যাব আপনার বাড়ি?

—যেদিন ইচ্ছে, সেদিনই।

—আসলে দিদিকে গেঁজিয়ে যেতে দেয়া হবে না। কোনো ট্রেনিং নিক, কাজ করুক...শেষ পর্যন্ত ওকে অবশ্য ডাইভোর্স করতেই হবে, তাই না?

—তোমার মত তাই?

অবাক হয়ে রূপা বলেছিল, নিশ্চয়। আমি কেরিয়ারটা করে নিই, তারপর দিদিকে মনের জোর জোগাব!

—রূপা। তুমি এসব কথা ভাবো?

—নিশ্চয়। আপনি কি ভাবেন আমি গোয়েন্দা গল্প পড়ি? মালা প্যাটেল আমাদের গ্রুপের কাছে গুরু। ও তো প্রতিবাদ গ্রুপ চালায়। অ্যাডভোকেট। আমার বন্ধুর দিদি। বাঙালী মেয়ে, স্বামী প্যাটেল।

রূপা আরেকটা আইসক্রিম নিয়েছিল।

—আত্মীয়স্বজনদের দেখুন। সবাই দিদির নামে ফিশফিশ করে একশো কথা বলছে। আমি কেটে পড়ি ঋষিদা। এখন আমারও ঝামেলা, না?

—কেন?

—গোপা ফশকে বেরিয়ে গেল তো রূপাকে ধর। অবশ্য সেদিকে খুব সুবিধে হবে না। সুন্দর টুন্দর নই, সেটা হেভি বাঁচোয়া। তাছাড়া আমি রূপা, গোপা নই।

মাধ্যমিকে বেজায় ভালো ফল।

উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞানে তৃতীয়।

তারপর ফিজিকস অনার্স।

তারপর?

সকলকে হতভম্ব করে ''সুন্দর সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ'' (মূল নাম ইংরিজিতে) সংগঠনে যোগদান।

রূপাকে দেখাই যায় না এখন। কখন ও এখানে, কখন ও গ্রামে গ্রামে, জেলা শহরে।

ইউনিট নিয়ে তথ্যচিত্র করছে।

চুল ছেঁটে ফেলেছে, (কে চুলের জন্যে সময় দেয়)। শাড়ি ত্যাগ করেছে। (জিনস ও পাঞ্জাবী অনেক প্র্যাকটিকাল আর ময়লা হলেও বোঝা যায় না)। পায়ে পথের ধারের দোকানে মুচির সযত্ন তৈরি কাবলে পরে (টেকসই জুতো)। ঝোলায় সর্বস্ব বয়ে বেড়ায়।

রূপা বাড়িতে আছে না নেই বোঝা যায় যখন ও কয়েকদিন বাদে বাদে ধপাধপ জামাকাপড় কাচে, মাথায় সাবান ঘষে (নির্মা সাবানই ভালো)!

এ নিয়ে বহু ঝড় বয়েছে বাড়িতে।

রূপার সাফ জবাব। অন্যত্র থাকব। আমার বন্ধুরা অনেকেই থাকে। যারা রোজগার করে।

এ সব কথা হয় মার সঙ্গে।

—এভাবে ঘুরলে বিয়ে হবে?

রূপা চার্মস ধরায়।

—''বিয়ে হবে'' মানে? ও সব ভুলে যাও, ভুলে যাও মা। গোপা পাওনি যে বিয়ে ''হবে।''

—বিয়ে করবি?

—করলে করব, না করলে না করব।

—তোর বাবা...

—আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তোমার, বা বাবার মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই।

—কি এক দঙ্গল ছেলে মেয়ে নিয়ে ঘুরিস।

—চিয়াও মা।

—''বেসনে'' (বিউটিফুল সোসাল অ্যানড ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্টের সংক্ষেপিত নাম) রূপাকে খেল। কিন্তু সেখানে গোপা কি করে? ঋষি জানো?

—এখন করে না, করত।

—কি করত?

—অফিস সেক্রেটারি।

—সুজয় জানত?

—তা আমি জানি না।

বস জানলা দিয়ে বাইরে তাকান। বলেন, গোপা একমাস নিরুদ্দেশ। আজ ভোরে রূপার ট্রাঙ্ককল, গোপার মৃতদেহ ওটা। আমাকে যেতে বলছে।

—আপনি আমায় কি বলছেন?

—শোনো।

বসের কথা শুনতে শুনতে ঋষির মাথা যেন ক্রমেই ঘুরে যায়, ঘুরতে থাকে।

রূপা ট্রাঙ্ককল করেছে ঝাড়গ্রাম থেকে। সব শুদ্ধ বারো মিনিট কথা বলেছে।

রূপারা কাছাকাছি পিঠাডিহাতে শুটিং করতে গিয়েছিল। ওখানে অরবিন্দ সেন পঞ্চাশ একর জমিতে কাজু গাছ, চল্লিশ একর বিলে মাছচাষ, বিশ একর জমিতে পেঁপে ও পেয়ারার নার্সারি করেছেন। সবই সমবায় প্রথায় হচ্ছে এবং দুশো নরনারী কাজ করে খাচ্ছে। ওখানে বেসনে একটি বেবি ক্রেশ, মা ও শিশু কেন্দ্র, এবং ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্র খুলবে সরকারী সহযোগিতায়। অরবিন্দ সেনের বয়স হয়েছে। ওঁর ইচ্ছে ছিল বেসনেও চেয়েছিল, সমগ্র ব্যাপারটির একটি ডকুমেন্টারি তোলা হোক।

—রূপারা পনেরো দিন ওখানে ছিল।

—জানি।

—অবাধ্য, অসভ্য মেয়ে। বললাম ''নো'' হচ্ছে, সেখানে ঢোকো। জবাব দিল ''নো''। আমার কাগজ মানেই নাকি সেটা আরেকরকম ধান্দাবাজি। আমি ধান্দাবাজ।

—খবর তো আজ বেরিয়েছে।

—ওরা দেখেছে কালকেই। রূপা কাল থেকে চেষ্টা করে আজ লাইন পেল।

—তারপর?

—রূপার কথামতো ও গোপা। গোপাকে খুন করে ফেলে দেয়া হয়েছে। ও সনাক্ত করে বসে আছে।

—তারপর?

—বলছি বডি এখানে আনো। এখানে আনলে সব তো আমার হাতে আসে, বুঝলে?

—ও কি বলছে?

—ওখানে যেতে হবে। আমাকে, সুজয়কেও। পুলিশ বলছে, সুজয় সনাক্ত করলে তবে কাটাছেঁড়ার পর বডি দেবে। এখন ব্যাপার হল...

বস অকারণেই গলা নামাল।

—সুজয় তো সবে কাল রাতে ফিরল ট্যুর থেকে। ওকে ফোন করতে কেমন লাগছে।

—কেন? গোপা ওর স্ত্রী।

—যে স্ত্রী একমাস নিরুদ্দেশ, এবং যে...বলতে বাধা নেই....''ডিভোর্সের চিঠি পাবে'' লিখে রেখে চলে গেছে এবং যে যাবার সময় থেকে বেসনের উলটো দিকের ব্যাঙ্কের এক কর্মীও নিরুদ্দেশ, তাকে সনাক্ত করতে...মানে ও যদি গোপা হয়...অবশ্য হতে পারে না...সুজয়ের কতটা আগ্রহ থাকতে পারে তা তুমিই বলো।

—এ সব কথার জবাব, নিজের অভিজ্ঞতা থাকলে তবে বলা যায় হয়তো।

—তোমার সে অভিজ্ঞতা নেই। এই তো?

—হ্যাঁ। তবে একটা কথা নিশ্চয় বলা যায়, যে কারণেই হোক, গোপা যদি চলে গিয়ে থাকে, ডিভোর্স চেয়ে থাকে, তাহলেই তাকে একলা অপরাধী বলে ধরে নেব কেন?

—মেয়েছেলের বেলা সাত খুন মাপ?

—গোপা তো একটা খুনও করেনি। রূপা বলছে। আপনি যা বললেন, গোপাকেই খুন করা হয়েছে।

—তুমি বুঝতে পারছ না। বুঝতে পারছ না, ও যদি গোপা হয়, মৃত্যু যদি অস্বাভাবিক হয়, তাহলে এখনকার যা ব্যাপার, কাগজে কেচ্ছা বেরোবেই। গোপা কবে কি করেছিল...আমি... সুজয়...''নো'' কাগজ বেরোবার মুখে...

—আপনি চান, ও গোপা হলেও ব্যাপারটা ''না'' করতে হবে।

—যা বলেছ।

—আপনি গেলেই ভালো হত।

—না। রূপা সীন করবে।

—তবু চলুন।

—এখানে বডি নিয়ে এসো।

—আমি আনার কে?

—কি করতে বলো?

—সুজয়ের কাছে যান।

—তুমিও চলো।

—আপনারা দুজনেই যান।

—তুমিও চলো।

ঋষি কি করে বোঝাবে? ওর জীবন জেট সেট নয়। বস হয়তো একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে গেছেন, ঋষি যায়নি। কলকাতায় প্রাতরাশ, দিল্লীতে লাঞ্চ, বম্বেতে ডিনার একই দিনে খাওয়া ওঁর কাছে কিছু নয়।

ঋষি তো উনি নয়। রুদ্র আছে, মা আছেন, বাড়ি আছে।

—যেতে হলেও আমাকে বাড়ি যেতে হবে। বাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। রুদ্র ছোট, মা অসুস্থ।

—তোমাকে বলাটাই অন্যায়, আমার স্বার্থপরতা। কিন্তু আমার পক্ষে একা একা...

—রূপা ওখানে কোথায় আছে?

—আর কোথায়। অরবিন্দ সেনের একটা বাড়ি আছে না? রূপারা তো সেখানেই ওঠে।

—যেতেই বলছেন?

—হ্যাঁ। বলছি।

উনি চেয়ে থাকেন।

ঋষির মনের মধ্যে রেলগাড়ি চলতে থাকে। ''নো'' কাগজ বেরোচ্ছে, এটা ঘটনা। এক মাস থেকেই ঋষি মাইনে পাচ্ছে। '' তোমার ভারত'' বিভাগের সম্পাদক ঋষি। ঋষি চক্রবর্তী নয়, সি, ঋষি, ভালো দেখাবে ছাপা হরফে। ঋষির মনেও তো লোভ আছে, নাম করবে। ''নো'' কাগজ ...বস... গোপার খবর জেনেও ওর মন উতলা।

ঋষি নিশ্বাস ফেলে।

হঠাৎ রূপার কথাও মনে হয়। রূপা নিশ্চয় যথেষ্ট অসহায়, যথেষ্ট একলা।

—ব্যাঙ্কের ছেলেটির কথা ভাবা হচ্ছে কেন?

—ভাবার কারণ আছে।

ব্যাঙ্কে ও কি করে?

—কি আবার, কেরানি। গোপার রুচি আর কত ভালো হবে?

ঋষি আরেকটি ধাক্কা খায়। রূপা বলেছিল, আপনি যদি দিদিকে বিয়ে করতেন।

গোপা কেন, কাউকে বিয়ে করার কথাই ভাবেনি ঋষি। ভাবার ফুরসতই পায় না। কাকে বিয়ে করবে, সে আর রুদ্র কি পরস্পরকে মেনে নেবে? প্রেমজার মা বলেছিলেন, আমার মেয়ে তো থাকল না। তুমি বিয়ে করো আবার।

ঋষির কথা নয়, গোপার কথা। অরূপ ছিল সাধারণ মাপের ভদ্র সভ্য সৎ ছেলে। ব্যাঙ্কের এ ছেলেটিও তাই হবে। কিন্তু তার সঙ্গে চলে গেল গোপা? এত সাহস হল?

—কি ভাবছ?

—আমি বাড়ি যাই। বাড়িতেই থাকব। আপনি সুজয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে তুলে নেবেন। এখান থেকেই যেতে পারব না।

—বেশ।

ঋষি বেরিয়ে আসে। গোপা যে দেবদারু গাছটার কথা বলেছিল, সেটা অনেক বড়ো হয়েছে। হবারই কথা। একে কলকাতার মাটি বেশ সরস। তাতে প্রচুর আলগা মাটি, সার ঢালা হয়েছিল। নিয়মিত জলও পড়ে। দেবদারু, দেবদারু পার্ক থেকে পাতা ছিঁড়ে এনে ঋষিরা ক্লাবের অনুষ্ঠানে তোরণ সাজাত।

ভোঁদার বাবা ছিলেন এসব সাজসজ্জায় অত্যুৎসাহী। একবার সরস্বতী বসানো হয়েছিলো ওঁর হাতে তৈরী বাঁশের বাতার নৌকোর ফ্রেমে দেবদারু পাতার ঝালর লাগিয়ে সবুজ নৌকোতে। কাগজে সে ঠাকুরের ছবিও উঠেছিল!

ভদ্রলোক গানও বাঁধতেন। সরস্বতী পুজোয় ঋষিরা গাইত, বসন্ত—পঞ্চমী রজনী ভোরে।

গাহিয়া গাহিয়া ফিরি তোমার দ্বারে।

জাগো।

হবি তো হ, ভোঁদার কাকা বসন্তবাবু বিয়ে করে বউ আনলেন। বউয়ের নাম পঞ্চমী। ঋষিদের তখনও গান গাইবার উৎসাহ বেড়ে গিয়েছিল।

ঋষি বাড়ি পৌঁছে যায়।

নলিনী বলে, ভাল দিনে তাড়াতাড়ি এসেছ। আজ কমল কেমন তাজা ট্যাংরা এনেছে। মা বলল যেমন করে, তেমন করে ঝোল রাঁধছি।

—কমল কোথায়?

—মাকে কাগজ পড়ে শোনাচ্ছে।

ঋষি মার ঘরে ঢোকে।

মায়ের নাম কমলিনী, মায়ের বোনের নাম কুমুদিনী। ঋষির মাসি এই বাষট্টি বছরেও দিব্যি শক্ত আছেন। নারকেলডাঙ্গা থেকে বাস বদলে দিদিকে দেখতে আসেন ছোট একটি টিফিনক্যারিয়ার নিয়ে।

—থোড়ের ঘণ্ট তোর মা ভালবাসে, আর নতুন একটা রান্না শিখলাম, ঝিঙে নারকোলে, তোরাও খাস।

রুদ্র অমনি বলল, আমার মোয়া?

—তাও এনেছি দাদু। মোয়া, নারকোল তক্তি, তোমার জন্য আনব না?

মাসির পায়ে চাকা বাঁধা।

সরশুনা গিয়ে পিসতুত বোনের খবর আনেন। কল্যাণী যান কাকীমাকে দেখতে।

স—ব খবর দিদিকে শোনান।

নলিনী আর রানী ঘুরঘুর করে।

—নাও বাছা! তোমাদের দোক্তা ভাজা।

মাসি দেখ কেমন শক্ত আছেন। আর পঁয়ষট্টি না হতে ঋষির মা যেন অথর্ব হয়ে গেলেন। নিশ্বাস নেবার পরিশ্রমেই বুকের হাড় বেরিয়ে আসে। চোখে এ বয়সেই ছানি।

এই মা পাড়ার পুজোয় ভোগ রাঁধতেন। ঋষির পড়া ধরতেন। খটখট করে বাজারে চলে যেতেন। সবগুলো বাংলা কাগজ পড়তেন। পাড়ায় প্রতি বিয়েবাড়িতে আলপনা দিতেন। ঋষির বিয়ের সময়ে আলপনা দেননি। বিধবা হবার পর আর আলপনা দেন নি, তবু কত কাজ করতেন।

উল বুনছেন, সেলাই করছেন, ঋষির বিয়ের সময়ে সূচের কাজে কি সুন্দর বিছানা ঢাকনি বানালেন।

সধবা মার পছন্দ ছিল নীল রং।

বিধবা হয়ে পরতেন কালো পাড়ের কাপড়।

এখন থান সর্বস্ব ওই রোগা অসহায় মানুষটিকে দেখে ঋষির যে কি কষ্ট হয়।

—মা!

—কে, ঋষি এলি?

—হ্যাঁ মা! একটা কাজে হয়তো বস আমাকে ঝাড়গ্রাম নিয়ে যাবেন দিন দুই।

—কাল যাবি? ইস্পাতে? উনি থাকতে আমরা ইস্পাতেই তো যেতাম ঝাড়গ্রাম, ঘাটশিলা।

—না মা। উনি গাড়ি আনছেন।

—এখনি যাবি?

—এলেই যাব, তোমার কোনো কষ্ট হবে না। মাসিকে ফোন করতে পারি। কমল আছে। নিচে মাসিমারা আছেন। আমি চলে আসব।

—কুমুকে ফোন করিস না। ওর তো ঘরসংসার ফেলে আসা। কষ্ট হবে।

বউদি থাকতে মাসির আবার ঘরসংসারের দায়িত্ব কোথায়।

মাসি খুশিই হবে।

—হ্যাঁ ... জবা বড় ভালো বউ। বউ তো আমারো ছিল। কে জানত...

প্রেমজার জন্যে মা এখনো দুঃখ পান। ভাবলে ঋষির অবাকই লাগে। ওর মনে তো আর দুঃখ নেই। তবু অবচেতনে প্রেমজা থাকে, প্রেমজা থাকে। নইলে ওর মৃত্যুর ব্যাপারটা কয়েকবার স্বপ্ন দেখল কেন ঋষি?

জাগরণে তো মনে পড়ে না। দশ বছর হতে চলল, রুদ্রর জন্ম থেকে সোজা হিসেব। তখন ঋষির বয়স ছিল ত্রিশ। ওরও চল্লিশ হতে চলল।

প্রেমজার চব্বিশও পূর্ণ হয়নি।

পনের বছর বাদে রুদ্র ওর মার চেয়ে বড় হয়ে যাবে।

ততদিনে হরতনীর সাজে নৃত্যভঙ্গিমায় প্রেমজার ছবিটাও আবছা হয়ে যাবে।

—কমল, একটু শোন।

কমল উঠে আসে। জবাকুসুম তেলের গন্ধ এবং কোনো সাবানের। কমল কেন মাথায় জবাকুসুম মাখে এবং গায়ে মাখে রেশনে পাওয়া সাবান, তা ঋষি জানে না। কমল যেমন বিকট সবুজ রঙের লুঙ্গি পরে তাও ঋষি কাউকে পরতে দেখেনি।

—কি, বলো।

ঋষি সাধ্যমতো সংক্ষেপে ব্যাপারটি বলে। অবশ্যই কমলকে বলে, কাউকে বলিস না।

—বুঝলাম। ফেঁসে যাবে।

—কিসে?

—এ সব ব্যাপারের গুরুত্ব নেই?

—আমি ফাঁসব কেন?

—ওদের বাড়ির ব্যাপারে তোমাকে টানছে কেন? তোমার বস তো নিজেই যথেষ্ট সক্ষম।

—ওদের সঙ্গে আমার বহুকালের আলাপ। তা ছাড়া রূপার কথা ভেবেও যেতে হচ্ছে।

—দেখ! এখানকার জন্যে ভেবো না। আমি দোকান করব, রুদ্র স্কুলে গেলে ওপরেই থাকব। মাসিকে ফোন করবে?

—মাসি থাকলে আরো নিশ্চিন্ত।

—ফোন করো তবে। ঝপ করে খেয়ে নাও। রুদ্রকে বলে যাবে তো। দেরি কোর না।

—মাসিকে তবে তুই ফোন করিস।

মাসির ফোন নেই। ওপরতলায় ফোন করলে ওরা ডাকে। প্রথমত ফোন পাওয়া। তারপর ডাকা দেরি হবে।

নলিনী আর রানীকেও বলতে হয়। কমলকে টাকা দিতে হয়। তারপর কোনোমতে একটু খেয়ে নেওয়া। না, মাছের ঝোলটা ভালই হয়েছে, কিন্তু এমন আগুন গরম যে স্বাদ পাওয়া গেল না।

ছেলের ছুটির দিনে ধীরে সুস্থে দুজনে খায়। কমলের খাওয়া, বসল, গবগবিয়ে খেয়ে উঠে গেল।

রুদ্র ভালবাসে ছোট ছোট মাছ, মুসুর ডাল, উচ্ছে ভাজা। ছোট ছেলে যে অমন তৃপ্তি করে ছোট মাছ খায়, তেতো খায়, তা ভাবাই যায় না।

কুমুদিনী বলেন, জামাইবাবু ঘুরে এসেছেন। তাঁর মতো খাওয়ার রুচি। তেমনি মাথা হেলিয়ে হাসি।

মা বলেন, ছোটবেলার ঋষি।

নলিনী বলে, ওর মায়ের মতো ধরনধারণ।

যার যেমন মনে হয়, তেমন বলে।

ঋষি বলে, এই কমল। আমার বিছানায় শুবি তো বালিশে কিছু পেতে নিবি। বালিশে তেলের গন্ধ অসহ্য। কেমন করে মাখিস?

কেশশ্রী হবো। চুলের বাড় দেখেছ?

নেমে যায় কমল।

কুশল আর রুদ্র অত্যন্ত মন দিয়ে ক্যারম খেলছে। রুদ্র চোখ কুঁচকে ভালোই খেলছে।

—রুদ্র।

—আঃ! দাঁড়াও।

এক মিনিট।

—কি হল?

—শোনো বাবা, আমি একটা কাজে দু'দিন বাইরে যাচ্ছি। তুমি কমল কাকুর কাছে থাকবে। ঠাম্মাকে দেখবে। নলিনী পিসিদের কথা শুনবে, ছোট ঠাম্মা আসতে পারেন।

এলে ওঁর কথা শুনবে।

—তুমি কবে আসবে?

—ধরো দু'দিন।

—আমার হোমটাস্ক?

মেসোমশাই বলেন, আমার কাছে বসে করবে। কুশল করে, তুমিও করবে, ভাবনা কি?

—একটু দেখবেন মেসোমশাই।

—নিশ্চয়।

—মাসিমাকে বলে যাই।

—আমি বলে দিব। নাতিদের জন্য পাকসাকে তিনি বড়ই ব্যস্ত। ইস। মোচাঘণ্ট তো উপরেও দিবে।

—আরেকদিন হবে।

আচ্ছা। এই মেট্রো রেলের ব্যাপার কি চলতেই থাকব? রাসবিহারীর পর। ঈশ। অগম্য।

—হয়ে যাবে।

—তবে উঠতে বেশ লাগে। আর ওই এসকালেটর। কুশল আর আমি তো...

মেসোমশাই বাচ্চাদের মতই হাসেন। ঋষি দেখেছে, বাড়িতে একটু ভালো রান্না হলে, লোডশেডিং কম হলে, কলের জল ঠিকমতো এলে। মেসোমশাই খুব অল্পেই খুশি। ঋষির এটা ভালো লাগে।

সামান্য সন্তুষ্টি তো দেখা যায় না এখন।

—বস, এখানেই বস।

—বসি।

এখানে বসাই ভালো। তাহলে গাড়ি এলেই উঠে যাওয়া যাবে।

—ট্রেন কখন?

—একজন গাড়ি করে নিয়ে যাচ্ছেন।

—কোন জায়গা?

—ঝাড়গ্রাম?

—ভাল। জল ভাল, হাওয়া ভাল। স্বাস্থ্যকর জায়গা। শান্তির জায়গা। বিবাদ ঝামেলা নাই।

ঋষি বলতে পারত। সে কথা সত্যি নয়। বলল না। ওর মায়ের দেখা ঝাড়গ্রাম ওরও শৈশবে দেখা। সে ঝাড়গ্রাম শুধুই সুখস্মৃতি। মেসোমশাই ঝাড়গ্রাম গেছেন কি না ও জানে না। গেলেও অনেক আগে গেছেন। এ বাড়িতে বসবাসের পনেরো বছর ওদের শুধু দক্ষিণেশ্বর যেতে দেখেছে ঋষি। সেও নাকি খুব শান্তির জায়গা।

জন বিস্ফোরণ, ব্যাপক মস্তানী, ড্রাগ, মেয়েছেলে নিয়ে নোংরামি। এসব কারণে দক্ষিণেশ্বর এখন আর খুব শান্তির জায়গা নয় নিশ্চয়।

সে কথা মেসোমশাইকে বোঝানো যাবে না।

আর ঝাড়গ্রাম।

মহকুমা টাউন। রাজনীতিক দলাদলি। একশে রকম সংগঠন। ব্যাপক বনউচ্ছেদ। আদিবাসীদের বঞ্চনা। আদিবাসীদের নিয়ে নানা রাজার টানাটানি। ওদের নামে বহুজনের বহুরকম কাজ। জন বিস্ফোরণ। জমির দাম বাড়ছে। শহর এলোমেলো ছড়াচ্ছে। ধনীরা ধপাধপ বাড়ি করছে, সিনেমা, মিটিং। হইহট্টগোল, সবরকমে ঝাড়গ্রাম সে ঝাড়গ্রাম নেই।

মেসোমশাইকে তা বলা যাবে না।

ওই ওঁর মতে শান্তির জায়গাটিতেই রূপা কোনো এক রমণীর মৃতদেহ নিয়ে বসে আছে।

কে কাকে বোঝায়।

বস দেরি করছেন।

সুজয় সম্ভবত দেরি করাচ্ছে।

সুজয় প্রবঞ্চিত ভগ্নহৃদয় স্বামীর মতোই কথাবার্তা বলল বসের সঙ্গে।

অবশ্য যথেষ্ট বাগড়া দিল।

প্রথমে বলল, ফোনে এসব কথা হতে পারে না। আপনি আসুন।

সল্টলেকে পৌঁছবার বর বসকে ও ঝাড়া পঁচিশ মিনিট বসিয়ে রাখল, তারপর এল।

—স্নান করছিলাম। বলুন।

স্নাত চেহারা নয়। বরঞ্চ যথেষ্ট বিধ্বস্ত এবং বিচলিত চোখমুখ। সিগারেট ধরাচ্ছে। দু'টান দিয়ে সেটা ফেলে দিচ্ছে, আবার ধরাচ্ছে।

সব শুনে গেল ও।

—আমি কেন যাব বলুন?

—তুমি যাবে না?

—এর পরেও যাব? দেখুন। এটা দেখুন। একটি খাতার পাতার অর্ধেকটা ছিঁড়ে ''ডিভোর্সের চিঠি পাবে'' লেখা। গোপার লেখা, তবে নাম সই করে নি। বসের মনে খটকা লাগে।

—এই দেখুন।

এটা কি?

—রূপার অত ঘন ঘন আসা। গোপার বেসনেতে গিয়ে কাজ নেওয়া, আমার খুব পছন্দ হয়নি। তবে ও তো অ্যাবনর্মাল। সেটা আগে জানতাম না, জানার পর আর বাধা দিইনি। করুক, কাজ করুক...

—গোপা অ্যাবনর্মাল?

সুজয় ম্লান হেসে বলে। মা—বাবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায় না, আমার সঙ্গেও ...এগুলো কি নর্মাল?

ব্যাপারটি জটিল হতে থাকে। গোপার কথামতো ওর অতীতের সব কথাই ও সুজয়কে বলেছিল। গোপা বাপের বাড়ি যেত না। বাবা মাকে ও কেন সইতে পারত না, তা সুজয়ের বোঝা উচিত ছিল।

কিন্তু এখন তো তালে তাল দিতে হবে।

—হ্যাঁ। আমার ওপরেই...

—কিন্তু কেন? ও একজনের সঙ্গে পালাল। তারপর আত্মহত্যার চেষ্টা করল। আপনার মতো মানুষের মুখ পোড়াল বারবার। আপনি তো অত্যন্ত ক্ষমাশীল পিতা। তারপরেও ওকে সাধ্যমতো...

বসের চোখ ভিজে ওঠে। ''অত্যন্ত ক্ষমাশীল পিতা'' শব্দগুলি ওঁর মন ভেজায়।

—তুমিও তো উদার স্বামী।

বস ভাবেন। এবার সুজয় কি বলবে?

সুজয় আবার মলিন হাসে।

—জানি না আমার এক বউদি, মানে মাসতুত বউদি, তাঁর দায়িত্ব আমারই ওপর। সে কথা ওকে বলি। ও যে সে কথার কি ব্যাখ্যা করে নিল তা ওই জানে। বিয়ের পর থেকে আমার সঙ্গে...

—আমি তো তোমার সঙ্গে কখনো...

—না। কখনো নয়।

কথার দাবাখেলা চলতে থাকে, চলতে থাকে। সুজয় এবং বস অবশ্যই ''নো'' কাগজের ব্যাপারে, নতুন বিলডার্স ফার্মের ব্যাপারে, ব্যবসার অংশীদার।

তবুও এখন কথার দাবাখেলা।

গোপা বলেছিল, সুজয়ের ''বর্তমান'' থাকতে পারে। অর্থাৎ ওই মাসতুত বউদি। তাহলে গোপার একটা দুঃখময় ''অতীত'' কি দোষ করল?

সুজয় ব্যাপারটা ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

—দেখুন, বিবাহিত জীবনের বঞ্চনা তো থাকলই। কিন্তু কথা ছিল দুজনে ব্যবহারিক জীবনে মানিয়ে চলব। ভি সি আর দেখ। বেড়াও। পার্টি দাও যথেষ্ট। যা চাও তাই করো শুধু আমার মুখ পুড়িও না।

—কথা হয়েছিল?

—নিশ্চয়।

—ও কি বলল?

—তখন মনে হল মেনে নিল। অবশ্য আমার ওই মাসতুত বউদির ব্যাপারে ও বলতই ... কি করব। একজন অসহায়া বিধবাকে ভাসিয়ে দেব?

—তারপর?

—বেসনেতে যাবার পর ওর ধরণধারণ খুব পাল্টে যেতে থাকে। খুবই চোখে পড়ে। বেপট কিছু করলে আমার মুখ পুড়ত। অবশেষে পাঁচজনের কাছে শুনতে শুনতে আমি একটা প্রাইভেট সিক্রেট সার্ভিসকে লাগাই। ওদের রিপোর্ট পেয়ে আমি তাজ্জব।

—কোথায় সে রিপোর্ট?

—আছে, লকারে আছে।

—তাতে কি বলছে?

—চলে যাবার তিন মাস এগারো দিন আগে দেখা যাচ্ছে বেসনের উলটো দিকের এক ব্যাঙ্কের ছোকরার সঙ্গে গোপা ঘুরছে।

—ওঃ, গোপা! গোপা!

—ছবি দেখুন। দেখুন গোপা কি রকম হাসছে! এটা চিড়িয়াখানায় তোলা। কত চেষ্টা করেছি। আপনার মেয়েকে এমন করে হাসতে দেখিনি আমি।

বসের মধ্যে দুটো সত্তার টানাপোড়েন চলতে থাকে। পিতা ও বস। দড়ি টানাটানিতে কে জিতবে?

পিতা বলে (মনে মনে) হাসাতে চেষ্টা করেছ? কুলাঙ্গার। গোপা বিশ্বাস করত না। কিন্তু তুমি যে তোমার মাসতুত বউদির সঙ্গে থাকো, তা আমি জানতাম না। কানাঘুসো শুনেছি ভেবেছি বিয়ে করেনি। এত টাকা করে ফেলেছে, এরকম একটু আধটু খেয়াল হতেই পারে। বিয়ে করলে স্বভাব সেরে যাবে।

স্বভাব তো সারেনি তোমার। আমার মেয়েকে হাসাতে চেষ্টা করেছ? মিথ্যে কথা।

পিতা দড়ি ছেড়ে গড়িয়ে যান। বস শুকনো গলায় বলেন, ছেলেটা দেখতে বয়সেও ছোট। আর দেখতে অতি সাধারণ, কি করে গোপা ...

—এই ছবিটা দেখুন। ময়দানে বসে দুজনে চা খাচ্ছে।

ছেলেটা কি বলছে, গোপা শুনছে।

—রিপোর্টে কি জেনেছ?

—ছেলেটার নাম বিক্রম শতপথী। মেদিনীপুরের কোনো গ্রামে বাড়ি। এখানে থাকে বেলগাছিয়ার একটা মেসে। পরীক্ষা দিয়ে কাজ পেয়েছে। বি কম পাশ। রং ময়লা।

জানতেন, বস জানতেন, ওই রকম অরূপ মার্কা একটা ছেলেকেই গোপার পছন্দ হবে। হঠাৎ মনে যেন কেমন অনুভূতি হয়। গোপার জন্যে নিদারুণ কষ্ট হয়। আশ্চর্য অনুভূতি।

—চলে যাবার তিন মাস এগারো দিন আগে ওরা প্রতিদিন দেখা করেছে, চলে যাবার দিন পর্যন্ত। প্রতিদিনের রিপোর্ট আছে।

এমন কি বসেরও মনে হয়, সুজয় নিজে লম্পট, এবং মানুষ হিসেবে অতি দুর্জন। নিজে কি, তা জানো। বউ যেদিন থেকে নিজের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে থাকল, অমনি তার পেছনে গোয়েন্দা লাগালে?

—কেন লোক লাগিয়েছিলে?

—আশ্চর্য। জানতে চাইব না?

—এগুলো দেখিয়ে ডিভোর্স করতে?

—আপনি ভালোই জানেন যে ডিভোর্স ওকে আমি কোনদিন করতাম না।

—তবে?

—ওগুলো দেখিয়ে ওকে সাবধান করে দিতাম। এভাবে চলাফেরা করলে...

—বলেছিলে কিছু?

—বলার আগেই চলে গেল।

—ওই ছেলেটার খবর কি?

—গোপা চলে যাবার পরও ও অন্তত সাতদিন ব্যাঙ্কে এসেছে। তারপর আমি বললাম আর দরকার নেই। আশ্চর্য আটদিনের দিন থেকে ছেলেটাও উধাও। ব্যাঙ্ক বলছে, ছুটি নিয়ে গেছে।

—দাঁড়াও দাঁড়াও। ছেলেটি উধাও আটদিনের দিন থেকে? তুমি বলেছিলে দুজনেই একসঙ্গে... তা ছাড়া, এই গোয়েন্দা লাগাবার কথাটিও তো বলনি?

—আপনি বোধহয় ভুল করছেন। আমি কখনো বলিনি প্রথম থেকে... আর গোয়েন্দা লাগাব না তো কি আমার বউকে ফলো করে বেড়াব? এ আপনি কি বলছেন?

—একটু জল দাও।

—বিয়ার খাবেন?

—না ওষুধ খাব।

—কি ওষুধ?

—অ্যানালজেন। মাথাটা ধরছে।

—এখন বলছেন রূপা...বাহাদু।

—জী।

—পানি সাব কে লিয়ে।

—জী।

জল, ওষুধ, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে, এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।

—রূপা বলছে ওটা গোপা।

—বিশ্বাস করি না।

—বিশ্বাস আমিও করি না। তবু সেটা ওখানে গিয়ে বলতে হবে। রূপাকে বুঝিয়ে নিয়ে আসতে হবে। নইলে, রূপা জোরাজোরি করলে...

—কেচ্ছা হবে।

—এখন এরকম খবর! অসত্য খবর বেরোলেও রিপোর্টাররা তোমাকে, আমাকে...

দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে থাকেন।

—যেতেই হবে সুজয়। না গেলে সেটা আরো অস্বাভাবিক দেখাবে। আর রূপাকে আমি জানি। সব কেচ্ছা বেরোক, আমাদের নামে কালি পড়ুক। ও তাতে খুশিই হবে। ও—বড়ো ভীষণ মেয়ে।

—নকশাল না কি?

—না না, র‍্যাডিক্যাল, স্বাধীনচেতা, জেদী এবং আমি, আমার জীবন, সব কিছুর ভীষণ বিরোধী! গোপার মতো নয়।

—দাঁড়ান, সামন্তকে ফোন করি।

—সামন্তকে বলবে?

—ওখানকার পুলিশকে হাতে রাখতে হবে না? এটা অসম্ভব, ও গোপা নয়। কিন্তু রূপা যথেষ্ট কেচ্ছা বাড়াতে পারে।

—তুমি তা চাও?

—না চাই না।

—ঋষিকেও সঙ্গে নেব।

—কেন?

—রূপাকে ম্যানেজ করতে হলে ও পারলেও পারতে পারে।

সুজয় হঠাৎ বলে, গোপা মরে গেছে জানলে আমি তো হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম।

—এখানে বডি আনলে আমার সুবিধে হ'ত।

—যাঃ। আপনার বুদ্ধি নেই। বডি আনা হবে, তারপর বলবেন এ আমার মেয়ে নয়। তা কি হয়? রূপা যা বলছে সেটা সত্যি, এর ভিত্তিতে বডি আনা যায়। সামন্তকে জিজ্ঞেস করি।

—দেরি কোর না।

সুজয় খুব নাটকীয় ভাবে বলে, ও যদি গোপা হয়, তাহলে বিক্রমকে আমি ছেড়ে দেব না।

—ওরকম বেপট জায়গায় নিয়ে গোপাকে খুন করবে কে? কেমন করে?

—আমি কি করে জানব?

—বিক্রমের কথা ভুলে যাও সুজয়। নিজেদের কথা ভাবো। আমার কেন, কোনো ভদ্র পরিবারই এ রকম একটা কেচ্ছা এড়াতে পারে না। যে কোনো ভদ্র পরিবারই চাইবে মুখটা বাঁচুক।

সুজয়কে দুর্বোধ্য লাগে।

নিজেকে মনে হয় বৃদ্ধ ঔরংজেবের মতো অসহায়। দাক্ষিণাত্যে বসে বৃদ্ধ বাদশা মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেতে দেখতেন। ঠেকাতে পারেননি।

বসের মনে হয় ''নো'' হবে না, ফার্মও নয়, যারা টাকা লগ্নী করেছে তারা হাত তুলে নেবে। তাছাড়া কেচ্ছা, কেচ্ছা কেলেংকারি।

গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে। মেয়েদের ব্যাপারে হোক, অন্য খুনের ব্যাপারে হোক, সন্দেহজনক মৃত্যুর ব্যাপারে হোক, যদি নামীদামী পরিবার যুক্ত থাকে, তাহলে কাগজগুলো মেতে ওঠে।

সুজয় কি মনের কথা পড়ে ফেলছে? ও হঠাৎ আদেশের সুরে কথা বলে কেন?

—ভয় পাবেন না। স্ক্যানডাল হলেই বা কি? কেচ্ছা হয়েছে বলে ধসে যায় যারা, তারা বোকা, শক্ত নয়। শক্ত থাকুন, ঠিক টিকে যাবেন।

—আমি...আমি হয়তো অত শক্ত নই।

—তা বললে কি এখন চলে? দাঁড়ান, সামন্তকে ফোন করি। ও আমার বন্ধু। সুপরামর্শ দেবে।

—আমি একটু চোখ বুজে বসি।

রূপার জন্যে কষ্টও হচ্ছে। আবার খুব অবাকও লাগছে। ওঁর তো চাপা পড়া কুকুর দেখলেও মাথা কেমন করে। কেউ মরে গেলে শ্মশানে যায় না। ওঁর মেয়ে হয়ে রূপা একটা পচ ধরা বডি নিয়ে ব্যস্ত ব্যাপৃত হয়ে আছে কেমন করে কে জানে।

সুজয়ও হঠাৎ যেন আত্মস্থ।

গোপার কথা বারবার মনে হচ্ছে কেন?

হঠাৎ কার গলা শুনে চমকে তাকান উনি।

জনৈকা মহিলা। পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিন্দূর নয়। পরনে ছাপা হালকারঙা শাড়ি। দু'চোখে যেন তীব্র জ্বালা হাতের ব্যাগ যথেষ্ট দামী।

ফোন নামায় সুজয়।

—আঃ। তুমি এ ঘরে এলে কেন?

—কেন তা জানো না?

—ইনি গোপার বাবা। ইনি আমার...

মহিলা বলেন। মাসতুত বউদি। আমি যাচ্ছি। এর পরের কথাবার্তা ভবেন বলবে।

—দুটোদিন বাদেই তো...

—ও নো। আমি আজকেই যাচ্চি কানপুর। কানপুর থেকে আর ফিরব না।

—হঠাৎ ভাইয়ের বাড়ি যাবে?

—হঠাৎই ভালো।

সুজয়ের ভাষায় ''অসহায়া'' বিধবাটি বেরিয়ে যান। বসের দিকে কেমন যেন ইঙ্গিতভরা চোখে তাকিয়ে দেখে যান, অদ্ভুত।

সুজয় বলে। অদ্ভুত! মেয়েরা...

—এখন যাবে তো?

—চলুন।

—গোপার মা—র যে কি অবস্থা...

—যে মেয়ে তাঁর মুখ দেখত না, তার জন্যে হঠাৎ শোক করছেন না কি?

বস খুব আঘাত পান।

—মা তো।

—কি জানি। সম্ভবত উনিও অ্যাবনর্মাল। ওঁর জন্যে ভাববেন না। মেয়েরা আসলে খুব শক্ত হয়।

—চলো।

—বাড়ি যাবেন না তো?

—না না, সুপ্তি যেতে চাইবে।

—উনি চলুন। এটা তো সার্কাস। সবাই মিলেই যাওয়া যাক। ভাস্কর কোথায়?

—দিল্লীতে।

—সার্কাস মিস করল।

কালো চশমা পরে মুখের অর্ধেক ঢেকে সুজয় গাড়িতে ওঠে।

ঝাড়গ্রাম। ক'ঘণ্টা লাগবে কে জানে?

গাড়িতে উঠেই সুজয় ঘুমিয়ে পড়ে।

গাড়িতে সামনে বসে ঋষি। পেছনে বস ও সুজয়। ঋষি বুদ্ধি করে দু'বোতল খাবার জল এনেছে। সুজয় ঘুমোচ্ছে। বস চেয়ে আছেন বাইরের দিকে।

—আপনি খেয়েছেন?

—আমাকে বললে?

—হ্যাঁ।

—না, খাইনি।

—খড়্গপুরে টিফিন করে নিন।

—দেরি হয়ে যাবে।

—আধঘণ্টা দেরিতে এসে যাবে না কিছু।

হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল।

—থামালে কেন মণ্ডল?

কথা না বলে ড্রাইভার নেমে যায়। পথের ধারে বসে। গাড়ি ও ড্রাইভার ঋষির অচেনা।

—একটা চেনা গ্যরাজ থেকে গাড়ি নিলাম। ভালো ড্রাইভার, গাড়ি নিয়ে হরদম এদিকে আসে।

খড়্গপুরে টিফিন করতে বস বেজায় বেগ পান। এমন সব দোকানে খেতে হবে তা কখনো ভাবেননি। মণ্ডল জানে না এরা কেন, কি কাজে যাচ্ছে।

ও যথেষ্ট মনোযোগে কষা মাংস, রুটি, পেঁয়াজ ও টক দই খায়। এ পথে ওর নিত্য আসা যাওয়া তা বেশ বোঝা যায়। কেন না হোটেল মালিক ওকে ওর স্পেশাল পান আনিয়ে দেয় এবং বলে, খড়্গপুরের ট্রিপ কবে?

—ও মাসে।

—এখানেই থেকো।

—তা তো থাকবই। খবর সব ভালো?

—চলছে।

—চলি।

—বাবুরা খেল না?

—কি জানি।

—মাংস কেমন লাগল?

—কেন, ভালো?

হোটেল মালিক গভীর সন্তোষে হাসে।

—কেশরী রেঁধেছে, কেশরী। বেটাকে কুক করে দিলাম। প্রোমোশান হয়ে গেল। মধুকে তো বিলাস ভাঙিয়ে নিল। নিক গে। আমাকে ল্যাং মারবে কে? কেশরী আছে, দয়াল আছে। এবার হোটেলে ভি. ডি. ও লাগিয়ে দেব। খাও, সিনেমা দেখো আরাম করো, সব হোটেল কানা করে দেব।

বেরিয়ে আসে ওরা। শেষ অবধি বসে কয়েকটি বিস্কুট ও চা খান। ঋষি চা সিঙাড়া খায়। সুজয় জেগে গেছে। তবু নামে না।

ঋষি বলে, বাথরুমে যাবেন না?

—এখানে বাথরুম?

—যাক, রাস্তায় যাব, সিগারেট?

—আমি খাই না।

—মদও খান না?

—না।

—মনের জোর আছে মশাই।

—ধরে ছাড়তাম, মনের জোর আছে বলতাম। আমি তো ধরিই নি।

—কেন? আপনিও অ্যাবনর্মাল?

—কত লোকই তো খায় না।

সুজয় হঠাৎ বলে, আগে খেতাম না। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল বক্সার হব। যে কোনো স্পোর্টসে সিগারেট, মদ, না খেলেই ভালো। বক্সার হলাম না। কিন্তু এখনো ডান হাতটায় প্রচণ্ড জোর। দুহাতে চাপ দিলে হয়তো আপনার মাথা গুঁড়িয়ে দিতে পারি। সামনে একটা ভালো কেরিয়ায় ছিল। পাটনায় ওস্তাদ রেখেছিলাম।

ঋষি একটু অবাক হয়। না, ঝাড়গ্রাম কাছে আসছে যত, তত বিচলিত হচ্ছে সুজয়।

—এটা সার্কাস হচ্ছে, জানেন? মেয়েটা, গোপা নয়। সে তার ব্যাঙ্ক কেরানীর সঙ্গে ভেগে গেছে, অথচ গোপাকে সনাক্ত করতে যাচ্ছি, এ মাইরি কাফকা।

বস উঠে পড়েন। গাড়ি চলে।

—আমরা বাস রুটে এলাম না কেন?

—খড়্গপুরের পথেই ভালো।

—কোম্পানির গাড়ি পথে অ্যাকসিডেন্ট করল সেদিন মেচেদায়। এখন ক'দিন...

—তুমিই করলে?

—বাচ্চা ছেলে হঠাৎ এসে পড়ল পথে। ও রাস্তায় অ্যাকসিডেন্ট করলে.... আমি বেরিয়ে গেলাম অবশ্য।

বস ঘেমে ওঠেন।

—অ্যাকসিডেন্ট কোর না ভাই।

—পরপর তিন দিন তিন রাত গাড়ি চালালে.... কোম্পানি তো বোঝে না....

সুজয় চোখ বোজে।

কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে? গোপার ভাবগতিক দেখে বুঝতে ওর কি বাকি ছিল? গোপা হঠাৎ অত স্বাধীন। অত নিজের মতো হয়ে যাচ্ছিল কেন?

সাবধান তো গোপা হতে চায় নি? খাতা টেবিলেই থাকত। ডিভোর্স করব? ডিভোর্সই ভালো। এমনি চলে যাব? কেন যাব? জানিয়ে যাব।

বিক্রম কেন এমন সব কথা বলে?

গোপা, যার অতীত এমন কলঙ্কিত, এই এক ছোকরার সঙ্গে ভাগছ, এই ঘুমের বড়ি খাচ্ছ—তারপরেও তোমায় বিয়ে করেছি, ধন্য হয়ে যাও, বিনত বিনম্র হয়ে থাকো। জানাচ্ছি যে আমাদের বিয়েটা সুবিধার্থে বিবাহ। তোমার সুবিধে নয় গোপা। আমার এবং তোমার বাবার সুবিধার্থে।

বসের সঙ্গে ব্যবসার ব্যাপারে একটা সম্পর্ক হওয়া আমার দরকার ছিল। তুমি জানো না। আমাদের পরিচয় এবং কাজের ব্যাপারে যোগাযোগ ছিলই। বুঝেছিলাম এ লোক একেবারে মাফিয়া। কারবার হস্তগত করে আমাকে বাতিল করা ওর কাছে নিমেষের খেলা।

তাই চেয়েছিলাম জামাই হতে। জামাই শ্বশুরের ওপর ওপরহাত নিতে পারে। নিয়েছি, নিয়েছি। এ দরকার সে দরকার বলে কয়েক বারে পাঁচ—দশ করে আশি হাজার টাকা নিয়েছি।

বাপকে তুমি দোষ দিতে পার না। বাড়ি বাড়ি পালানো, আত্মহত্যার চেষ্টা করা তোমার জন্যে বাপের মুখ পুড়েছে বারবার। তারপর সুযোগ্য আমির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে উনিও তোমার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করেছেন, যা স্বাভাবিক। মেয়েছেলের অত বাড়াবাড়ি কে সহ্য করবে?

আমাকেও তুমি দোষ দিতে পার না। তোমায় বিয়ে করেছি এটাই যথেষ্ট। মাসতুত বউদি রিমকির সঙ্গে আমার সম্পর্ক তুমি মেনে নেবে, কেন না তোমার অতীত কলঙ্কিত।

দিব্যি থেকে যেতে, যেমন ছিলে। চমৎকার চলছিল সব।

রিমকি, আমার মেয়ে মোম, আমি।

আমি এবং তোমার বাবা।

কিন্তু তুমি তো সব এলোমেলো করে দিলে। চুপ করে থাকতে, আমি ভাবতাম তুমি সব মেনে নিয়েছ। মদ খেতে পারতে, ড্রাগ ধরতে পারতে।

না, বসে বসে তুমি ব্যক্তিত্ব অর্জন করলে। হঠাৎ হয়ে গেলে স্বাধীন মুক্ত। কোথায় যাও। বেশ যাও, কার সঙ্গে ঘোরো, তা লুকোবার চেষ্টা করলে না। কোনোদিন দেখিনি পাপ ঢাকার চেষ্টা। ফিরছ, একা খেয়ে নিচ্ছ, দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ছ।

হাতে বই, টেবিলে ক্যাসেট বাজছে।

ভারতীয় মার্গ সঙ্গীত।

সার্ভিস রিপোর্টটা দেখাতে তোমার ব্যবহারটা কেমন হল?

—আশ্চর্য! এ জন্যে গোয়েন্দা কেন? আমি তোমায় যে কোনো দিন বলতাম।

—তোমার আর কোনো বক্তব্য নেই?

—বক্তব্য? হাসালে সুজয়। আমি কি তোমার কাছে ক্ষমা চাইব ভেবেছিলে?

—চাওয়া উচিত।

—আর কি কি উচিত?

—বেসনে ছাড়ো। ছেলেটাকে ছাড়ো।

—ছেলেটা। বেচারা বিক্রম। আমি ''হ্যাঁ'' বললে ও তো এখনি রাজী।

—তার মানে?

—খাতাটা খুলে দেখ। প্রত্যেকদিন লিখি। ডিভোর্স করব। ডিভোর্সের চিঠি পাবে। কিন্তু সুজয়। আমি চাইনি যে বিক্রমের জন্যে তোমায় ডিভোর্স করি। আসলে তুমি আর বাবা। তোমাদের দাবার ঘুঁটি হয়ে থাকব না বলেই ডিভোর্স করব। নো বিক্রম, নাথিং।

—বিশ্বাস করি না।

—ডিভোর্সের পর, কোনোদিন মন চায় তো ওকে বিয়ে করব, নইলে করব না।

—এত জোর তুমি পাচ্ছ কোত্থেকে?

—নিজের মধ্যে থেকে। সেদিন যদি জোর পেতাম, তাহলে আজ আমার এ পরিণতি হয়?

—গোপা! যথেষ্ট হয়েছে।

—এবং রিমকির সঙ্গে তোমার সম্পর্কটাও এবার এসপার ওসপার করা দরকার।

—তার মানে?

গোপা তির্যক হেসে বলেছিল, বেচারা তুমি! দুটি মহিলার কাঁধে চেপে একবিংশ শতকের দিকে দৌড়চ্ছিলে। আমি তো আর পারছি না। রিমকিও তার ঘোর কাটিয়ে উঠেছে। অ্যাটর্নি ভবেন দত্তকেও বৈষয়িক ব্যাপারে পরামর্শদাতা ঠিক করেছে। ভবেনের কথা শোনার পর ও নিজের বিষয় বুঝে নেবার জন্যে তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া করবে।

—তুমি জানলে কোত্থেকে?

—বলব না।

আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল গোপা। তারপরেই তুমি চলে গেলে।

পালাতে পারলে?

এক মাস তোমাকে খুঁজেছি জগৎকে জানিয়ে।

এক মাসে রিমকি চাবুক হাঁকড়াচ্ছে।

রিমকিকে তুমি চিঠি লিখতে গেলে কেন? কোন সততাবোধে? কি রকম নির্বোধ মেয়ে তুমি?

ওকে না লিখলে কে জানত তুমি কোথায় আছ। রিমকিকে লিখে আমার সর্বনাশ করলে কেন?

রিমকি যদি আজ ওর স্বামীর টাকা পয়সার হিসেব বুঝে নিতে চায়।

সো সরি গোপা! দাবার ঘুঁটি হয়ে বহু মেয়ে বেঁচে থাকে, মরে যায়। সেদিকেই পাল্লা ভারি।

''মানব না, সইব না, সমান অধিকার চাই।'' ওদিকে পাল্লা খুবই হালকা।

কে শুনবে ও সব কথা? কে দেবে সমান অধিকার? পার্লামেন্টে বিল পাশ হল না। শাহবানু মামলা কি টিকল?

এ রকম চলছে, চলবে।

তুমি সহজ সত্যিটা দেখলে না?

হঠাৎ হয়ে উঠলে আলাদা মানুষ, রিমকিকেও তাই হতেই বললে। এ কথাও লিখলে, সুজয়কে জেরক্স কপি দেখিও, যদি দেখাতে চাও। আসল চিঠি গোপনে রেখো। বলা যায় না, কবে তোমারও দরকার হবে চিঠিটার।

রিমকি যদি চিঠিটার কপি না দেখাত।

ঝাড়গ্রাম শালবনী, পিঠাডিহা, বনকাপাসী, তিতাকুড়া, কত জনপদ, কত মানুষ।

গোপা, গোপা, এ কি করলে।

নিজের প্রতি করুণায় নিজের জন্যে চোখ দিয়ে জল নামে সুজয়ের।

বস ওকে বললেন, কেঁদো না।

—যদি....

—হতে পারে না।

ঋষি চুপ করে থাকে এবং লোডশেডিংয়ে নিষ্প্রদীপ ঝাড়গ্রামে গাড়ি ঢুকে যায়। মণ্ডল বলে কোথায় যাব?

সুজয় বলে থানা।

বস বলেন, রূপার খোঁজ আগে নিই।

—নিন। আমি থানায় থাকছি। সেখানে না পেলে এস.ডি.পি.ও—র বাড়ি যাবেন।

অরবিন্দ সেনের বাড়ির নাম 'স্বাগতম'! বাড়ির নাম ''শালবীথি'' বা ''কৃষ্ণচূড়া''ও দেওয়া যেত। বাড়ির প্রশস্ত হাতায় অনেক শাল, অনেক কৃষ্ণচূড়া। যে সব গাছের যত্ন করতে হয় সে সব গাছ এখানে নেই। বাড়িটি অনেক কালের। কবে কেনা, কে জানে।

বাড়িটি পেপার মিল ছাড়িয়ে। মণ্ডল বলে, আমি ঘুরে আসছি।

বস বলেন, না না।

—আমাদের যদি যেতে হয়...

—দেখুন।

এখানে হোটেল আছে?

—নিশ্চয়।

—ঋষি, দেখ তো।

বারান্দায় চেয়ারে চিনু। বেসনের ছেলে এবং রূপার বন্ধু।

—চিনু!

—ঋষিদা!

—রূপা কোথায়?

—আসছে। অনেক বলে কয়ে একটু শুইয়ে রেখেছি। আপনাদের জন্যেই বসে আছে ও।

—তোমাদের জীপ?

—রূপা অন্যদের কলকাতা পাঠিয়ে দিল। ওদের ব্যাপার নয়, আটকাতে চাইল না।

রূপা বেরিয়ে আসে। ভীষণ রুক্ষ, শুকনো চেহারা। মুখ চোখ যেন অন্যমানুষের।

—ঋষিদা, তুমি?

—এলাম।

—একলা?

—না, তোমার বাবা, সুজয় এসেছেন।

—ভালো, চলো।

—কোথায়?

রূপা নিশ্বাস ফেলে।

—মর্গে। এত দেরি হচ্ছে যখন, তখনি বুঝেছি যে কলকাতায় খেলা চলছে। চলো। নির্দেশ এসে গেছে। এঁরা আসার পরেই যেন ছবি তুলে রেখে লাশ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লাশ রাখাও যাবে না। পচে ঢোল হয়ে উঠেছে।

—আগে ছবি তোলে নি?

—না।

রূপা চিনুর দিকে চায়।

—চিনু, রবি চলে গেছে?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, স্টীলে গেল।

যেন খুব নিশ্চিন্ত হল রূপা। বাবাকে একবারও না চিনেই গাড়িতে উঠে বসল।

—চিনু, তুই থাক।

—তুই এখানেই ফিরবি তো?

—নিশ্চয়। ঋষিদাও থাকতে পারো।

গাড়িটি চলে মর্গের দিকে। সব মর্গের মতো এ মর্গও একটি নরক বিশেষ। কবে এ শহর শালপত্রমর্মরিত শান্ত সুন্দর ছিল, তা এখন জানা যায় না।

হ্যাজাক উজ্জ্বলিত একটি শবদেহের পায়ের বুড়ো আঙুলে ছোট কাগজ বাঁধা। অর্থাৎ শবচ্ছেদ হয়ে গেছে। শবদেহটি সামনে রেখে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে সুজয় সিগারেট খাচ্ছে। দারোগা বা এস. ডি. পি.ও বেশ সহজ গলায় বলছেন মিস বোস পোস্টমর্টেম করতে অত জোর না দিলেও আমরা করি। আজকাল জানেন তো। একটু সন্দেহজনক মৃত্যু হলেই ময়না তদন্ত করা হয়। এক ছেলে বুড়ো বাপকে পুড়িয়ে গেল, আরেক ছেলে কেস করল। মৃত্যু সন্দেহজনক। বিনা ময়নায় লাশ জ্বালানো হল কেন।

রূপা এগিয়ে আসে।

—ছবি তুলেছেন?

—নিশ্চয়।

—পোস্টমর্টেম রিপোর্ট?

—আগে এঁরা সনাক্ত করুন। আর নিয়ম মতে, মৃতের পার্টি, যে মৃতকে দাহ করছে তেমন কেউ কিছুদিন বাদে থানা থেকে রিপোর্ট নেবে।

রূপা ঋষির হাত শক্ত করে ধরে। রূপার হাত শুকনো, গরম, ঋষির গায়ে যেন ছ্যাঁকা লাগে।

—এঁদের দেখান।

এ সময়েই আলো জ্বলে ওঠে। রূপা, সুজয়, বস এগিয়ে যান। ঋষিও এগোয়।

ডোম ঢাকনা সরায়।

বসের চোখ বিস্ফারিত, নাকে মুখে রুমাল। সুজয়েরও তাই। যে লোক কুকুর চাপা পড়াও দেখতে পারেনা তার পক্ষে বড়ই ভয়ানক এ দৃশ্য।

ঋষি অনেকবার না হলেও বার কয়েক মর্গে গেছে। সেন্ট্রাল ক্যালকাটা মর্গে ভোর থেকে লাশ কাটা শুরু। কাঁটাপুকুর বা মোমিনপুরে দুপুর থেকে। শুনিলাম লাশকাটা ঘরে তারে ... শুনলেই দৌড়াতে হয়। দিন পরে যায় দিন ..... পরশুর আগের দিন সকালে আবিষ্কার হয়েছিল কোনো এক রমণীর দেহ। মফঃস্বলের বার্তা কলকাতায় আসতে সময় যায়। কলকাতায় সবসময়ে তেমন গুরুত্বও পায় না।

কেননা সন্দেহজনক মৃত্যুর লাশ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে একান্ত সুলভ। যেখানে চাও সেখানে পাবে। কত মানুষ কত জায়গায় কত জানা অজানা কারণে ''সন্দেহজনক মৃত্যু'' হয়ে যায়।

কাঁটাপুকুর, কত সে দূর। কাঁটাপুকুর, মোমিনপুর। রোদেপোড়া বারান্দায় কাঁচের বয়ামে কত শবদেহের ভাইটাল অর্গানস পড়ে থাকে। পড়ে থাকে, এখানে কি হয়? ঋষি কলকাতায় পুলিশ রিপোর্টার ছিল।

—দেখুন।

মাথা থেকে চেরাই হয়েছিল। পেটেও। সর্বত্র দলাদলা রক্ত! মুখ কোনো মানুষীর নয়। মাথা অদ্ভুতভাবে হেলানো।

পুলিশের নৈর্ব্যক্তিক অদেহী গলা।

—দেখলে বোঝা কঠিন। কিন্তু উচ্চতা পাঁচফুট তিন ইঞ্চি, মানে মিটারে।.....

—থাক। বোঝা যাচ্ছে।

—আমাদের তো ঠিক ঠিক বলতে হবে সার। কাঁটাজুড়ি ঝাড়গ্রাম থানার আন্ডারে... পায়ের আঙুলে চুটকি ছিল...

রূপা বলে, কখন? আমি যখন আসি তখন ছিল না। হঠাৎ চুটকি আমদানি করল কেন?

রূপা কোনো আমল পায় না।

—সনাক্তের কোনো চিহ্ন বলতে পেটে অপারেশনের দাগ ... আর ...মুখের ডান দিক পরিষ্কার ... বাঁ দিক অত্যন্ত জখম ছিল ... রং ফর্সার দিকে ...

প্রায় জোড়া ভুরু, চাপা কপাল, ঘন চুল, কিন্তু মৃতদেহ মৃতদেহের নিয়মে প্রথমে নরম থেকেছে, পরে শক্ত হয়েছে, তারপর আবার নরম হয়েছে, পেট ফুলেছে, সারা শরীরে পচ ধরেছে, চেনা বড় কঠিন।

চেনা বড় সোজা।

বস কোনো অভিনয় করেন না। এই বীভৎস, মুখের একপাশ থেঁতলানো। কাটা ছেঁড়া সেলাই করা রমণী তাঁর গোপা নয়। গোপা নয়। এমন বীভৎস পরিণতি তার হতে পারে না।

—না। গোপা নয়।

—বাবা!

—না, না, না! তুমি আমাকে কি দেখাতে ডেকেছ। কেন ভেবেছ, আমার গোপা, আমার গোপা...

বস বেরিয়ে আসেন। টলতে টলকে বসে পড়েন। ঋষি রূপার হাত ছাড়িয়ে ওঁকে ধরে।

সুজয় পরিষ্কার গলায় ঘোষণা জানায়।

—এ আমার স্ত্রী গোপা নয়।

রূপা আর সুজয় এ—ওর দিকে তাকায়।

রূপা আর ও. সি. পরস্পরের দিকে তাকান।

রূপার গলা শান্ত।

—এখন দেখে চেনা খুবই কঠিন। কিন্তু আমি যখন এসেছিলাম, তখন বডি অনেক অন্যরকম ছিল অফিসার?

—ছিল।

—আমি বলেছি, এটা আমার দিদি?

—বলেছিলেন, তবে যথেষ্ট বিচলিত ছিলেন।

—পোস্টমর্টেমে কি পেলেন আপনারা?

—মাপ করবেন। এ ভাবে...

—অলরাইট।

ও. সি. বলেন, আপনারা বলেছেন ইনি আপনার স্ত্রী, আপনার মেয়ে নন?

—না, গোপা নয়।

—না, গোপা নয়।

রূপা বলে, আমি বলছি ও দিদি। আমার কথাটাও নোট করে নেবেন। না কি, ভোটে হেরে গেলাম?

ও. সি.—তবে আপনারা যেমন বুঝবেন।

রূপা—রিপোর্ট?

ও.সি. ঈষৎ করুণার চোখে তাকান।

—এটা আপনার দিদির বডি হলে নিশ্চয় রিপোর্ট চাইতে পারতেন। এখন, যে লাশের কোনো দাবীদার নেই, তার ক্ষেত্রে লাশ দাহ হবে। নিয়মতো লাশের ছবি কাগজে ছাপা হবে।

—আপনাদের তোলা ছবি তো পচা লাশের।

—আমরা নিয়ম মেনে চলব ম্যাডাম।

—ধন্যবাদ।

বস গলা সাফ করে বলেন, রূপা! রূপা!

—কি আশ্চর্য। ও তো তোমার মেয়ে নয়। অজানা অচেনার জন্যে কাঁদছ কেন?

ঋষি ওকে বলে, চলো রূপা।

—কোথায় যাবে রূপা?

—আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই যাব।

—আমাদের সঙ্গে হোটেলে চলো। সেখান থেকে কাল একসঙ্গে বাড়ি যাবে। তোমার মা অত্যন্ত বিচলিত, অত্যন্ত ভাবছেন!

রূপা আস্তে বলে, মা যদি আটাশ বছর আগে থেকে ভাবতে শুরু করতেন।

ঋষি দেখে রূপা চলে যাচ্ছে।

ও এগিয়ে যায়।

—রূপা!

—ঋষিদা!

—ওঁদের হোটেলে রেখে আসি, তারপর তোমার সঙ্গে যাব। তুমিও এসো।

—রূপা হোটেলে যাবে। বাড়ি ফিরবে।

—ধন্যবাদ সহ ''নো'' বাবা! না ঋষিদা, আমি একটা রিকশা নিয়ে চলে যাচ্ছি। তুমি আসতে হলে এসো, যা মনে করো।

—একা যাবে?

—দুদিন তো তাই যাচ্ছি।

অন্ধকার বনচ্ছায়ে (এখানে শালবন) শুকনো পাতা মাড়িয়ে রূপা চলে যায়। এত শুকনো পাতা কে ছড়ায়, কারা ছড়ায়, পাতা পায়ে দলে রূপা যাবে বলে?

—রূপা!

বস ধমক দেন।

—দেখুন, ওর ওপর দিয়ে ভয়ানক ধকল গেছে। ওকে ধমকাধমকি করবেন না। যেতে দিন, আমি তো যাচ্ছি, কাছেই থাকব।

ও.সি. একটু সদুঃখ হাসেন।

—মিস বোস তো ''বেসনে''র কাজে ঝাড়গ্রাম হয়ে হরদম যাওয়া আসা করেন। খুব ফাইন লেডি। এবার একেবারে কি যে হল।

সুজয় বলে, চলেন।

—অগত্যা তাই হোক।

অনেক বৃদ্ধ, অনেক ভগ্ন একঘণ্টাতেই। ওঁদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে ঋষি দেখে, ঘরের কথা হোটেলে ও.সি. বলেছেন।

—আপনারা বিশ্রাম করুন।

—তোমাকে মণ্ডল পৌঁছে দিক।

—না, না, উনিও বিশ্রাম করুন। আপনি ভাই, থাকবেন কোথায় রাতে?

''ভাই'' বললেও নরম হয় না মণ্ডল।

—ঝাড়গ্রামে আমার থাকার জায়গা আছে। গাড়ি নিয়ে কখন আসব সেটাই বলুন।

—ভোরে আসুক সুজয়?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, যত তাড়াতাড়ি হয়।

মণ্ডল বলে, সাতটার আগে হবে না। টাকা দিন। খাব—টাব তো, আমরাও তো মানুষ।

—নিশ্চয় নিশ্চয়।

মণ্ডল ঋষিকে বলে, চলুন চেনা রিকশা ধরিয়ে দিই।

—বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে মণ্ডল বলে, উনি কে, লম্বাপানা?

—সুজয় মিত্র।

—অ। সবুজ অ্যামব্যাসাডর?

—তা হবে। কেন?

—এমনি। যাক গে। বড় ঘরের বড় ব্যাপার। এই রিকশাটা নিন। এই সাধন, বাবুকে নিয়ে যা।

—না, আমি লেশায় আছি।

—ধুর বাবু, তোর ঘর তো ওদিকে। ইনি মুরগা লড়াই বাড়ি যাবে।

—চলেন বাবু।

—বাঃ, আপনি তো চেনেন সব।

—তা চিনি।

—মুরগা লড়াই বাড়ি?

—সে বাবুর বাড়ির পিছনে মুরগা লড়াই হত। বাড়ির নাম হয়ে আছে মুরগা লড়াই বাড়ি। এই সাধন, গোকুল গ্যারাজে আছে?

—আছে। বুতল লিয়ে বসে আছে। যাও বাবু। লেশা কর, হরবকত টিপ মারছ, যাও!

সাধন নেশা করলেও ঋষিকে অনেক খবরাখবর দেয়। ঝাড়গ্রাম আর সে ঝাড়গ্রাম নেই। আনাজ থেকে সব দাম বাড়ছে। টাউনে পয়সা আছে, কিন্তু হাওয়া ভালো নেই। রিকশাও সংখ্যায় বাড়ছে। চারদিকে বাবু! বড় গোলমাল! সাধনের মতো লোকের বাঁচা দায়। গরিবের কথা বোঝে এমন মানুষ নেই। সেদিন সাধন পাঁচ টাকার বাজার করল, শুধু আলু আর ডাল।

এতক্ষণ কাফকার জগতে বন্দী ছিল ঋষি। সাধনের কথাগুলি বড় ভালো লাগে ওর। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখের কথাতেও যেন ভালো লাগে। এতক্ষণ অস্বাভাবিক মানুষদের অস্বাভাবিক আচরণ ওকে দুঃস্বপ্নে বন্দী করে রেখেছিল। ঋষি একদা পুলিশ রিপোর্টার ছিল। যে নাটকটা হয়ে গেল, তার নেপথ্যকাহিনী ও আন্দাজ করতে পারছে।

গোপা, অথচ গোপা নয়!

—গাছগুলান কেট্যে টাউন ধুলাধুলি হয়ে গেল বাবু। তাতের কালে ছায়া পাই না।

—তোমার বাড়ি কোথায়?

—হোই, দুধরাজপুর!

—বিয়ে করেছ?

—তিনটা ছেলে মেয়ে।

—স্কুলে যায়?

—না। কথা লেয় না।

—স্কুল তো আছে।

—পেটে ভাত না জুটলে বাবু .........

অনেক চিন্তা করে সাধন বলে। ছেলেটিকে ভাতবাগালিতে দিব।

—নেশাতেও তো পয়সা যায়।

—লিশ্চয়।

এবার সাধন চুপ করে যায়। রিকশা ডাইনে ঘোরে। চলে। ঝাড়গ্রামের আকাশ কি পরিষ্কার, তারা কি উজ্জ্বল। ঋষি এক সময়ে তারকাপুঞ্জ চিনবে বলে বই জোগাড় করেছিল। রুদ্র প্ল্যানেটোরিয়ামে গিয়ে অনেক তারা চিনেছে। হ্যালির ধূমকেতুটা ওর দেখা হল না। খুব ইচ্ছে ছিল।

—এসে গেলম বাবু।

সাধন থামায় রিকশা। ঋষি ওকে একটি পাঁচ টাকার নোট দেয়। নিয়ে যাও।

—হাঁ বাবু!

কলকাতার বাবুরা রেট শুধায় না বলে বেশি ভাড়া দেয় মাঝে মাঝে, তা সাধন জানে।

—কাল টাউন দেখবেন বাবু?

—না সাধন, কাজে এসেছি।

বাড়িতে ঢোকে ঋষি।

চিনু আর রূপা বসে আছে। রূপা চার্মস আঙুলে ধরে রেখেছে।

—রূপা।

—এসো ঋষিদা।

চিনু বলে, চা খাবেন?

—খাব। রান্নাবান্না হচ্ছে?

—হ্যাঁ। বূধরাজ তো থাকেই।

—কেয়ারটেকার?

—যা বলেন! সেনদা ওদের ঘর তুলে দিয়েছেন। পাকা ঘর, টিউবওয়েল, স্যানিটারি পায়খানা। আগে ওঁর প্রজেক্টে ছিল।

—খিদেও পেয়েছে।

—রান্না হয়ে যাবে।

—রূপা কিছু খেয়েছে?

—চা, সিগারেট। আমি চা নিয়ে আসি।

চিনু চলে যায়।

রূপা ঋষির দিকে তাকায়।

—তাহলে নাটক শেষ?

—আমি জানি?

—কে জানে ঋষিদা?

—তুমি জানো।

—আমি তো ফালতু হয়ে গেলাম।

—আমার কাছে নয়।

—তুমি তো ''নো''—তে কাজ করছ।

—হ্যাঁ... কিন্তু ...

ঋষিদা বেদনামলিন চোখ তোলে। অনেক সহজ মনে হচ্ছে কেন? এ বিষয়ে ও কোন পক্ষ নেবে সে বিষয়ে যদি বা সংশয় ছিল, গোপাকে দেখার পর কোনো সংশয় নেই। বুকটা পুড়ে যাচ্ছে।

—ও তো গোপা, রূপা!

—হ্যাঁ, দিদি। কিন্তু বাবা ... বাবা ...

রূপা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করে। ঋষি ওকে কাছে টেনে নেয়, মাথায় হাত বুলায়। হাজার হলেও রূপা তো বয়সে খুব তরুণ। তরুণ মনে মূল্যবোধ থাকলে আঘাত লাগে বেশি। রূপার মতো তরুণ যারা, তারা সাদা কালো ছাড়া কোনো রং মানে না।

ধবধবে সাদা আর কৃষ্ণপক্ষে কালো, দুয়ের মাঝামাঝি তো ধূসরের নানা স্তর থাকে। সে গুলোর সঙ্গে লড়াই করতে চাইলেও অভিজ্ঞ হতে হয়।

তরুণ, নিষ্পাপ রূপা তা জানবে কেমন করে?

কাঁদুক, কেঁদে হালকা হোক। প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা তো ও চলেছে উত্তেজনায় টানটান হয়ে।

—রূপা!

কান্নাবিকৃত গলায় রূপা বলে, এত বড় অবিচার ঋষিদা, এত বড় অবিচার! দিদিকে দিয়ে সমস্ত মেয়েদের ব্যাপারটা বোঝো ঋষিদা। দিদি! আমার দিদি!

—রূপা!

—বলো।

—এখন শক্তি হারালে চলবে না। তুমি স্নান করবে, খাবে, ঘুমোবে।

—তুমি আমার কাছে থাকবে।

চিনু চা নিয়ে ঢোকে।

—অবশ্যই থাকবে। শোবার ঘর, একটা, খাট দুটো, মশারি দুটো। আমি তুই, ঋষিদা ও ঘরেই থাকব। ঋষিদার কথা শুনবি তো?

—শুনব।

রূপা কাঁদতে কাঁদতেই বলে, আমি খাই নি বলে তুইও খাস নি, রবিও খায় নি...

—এখন খাব। ওঃ, ও.সি. লোকটা কিন্তু খারাপ নয়। অন্তত সকাল অব্দি কথাটথা বলছিল। আপনারা আসার আগে কি যে ফোন পেল...

রূপা বলে, ঋষিদা?

—বলো? বাঃ বেশ চা তো।

—চিনু করেছে। আচ্ছা ফোনটা কে করাল, সুজয় না বস, তা জানো?

—সত্যি জানি না। সকালে বসের ফোন পেয়ে ওবাড়ি গেলাম। ঝাড়গ্রাম আসতে হবে শুনে বাড়ি চলে গেলাম। বেলায় ওঁরা দুজন গাড়ি নিয়ে এলেন। ওঁদের দুজনের যে কেউ হতে পারেন। তবে বস খুব বিচলিত ছিলেন। আয়, সুজয় বারবার বলছিল, এটা সার্কাস হচ্ছে।

—সার্কাস! ও তার রিং মাস্টার?

—ব্যাপারটা যথেষ্ট ঘোরালো।

—না, ঘোরালো নয়।

রূপা মাথা নাড়ে, মাথা নাড়ে।

—এই চিঠিটা পড়লেই বুঝবে। পরে পোড়ো। দিদি যদি একবার জানত ও কত কাছে ছিল!

চিনু বলে, চিঠিটা ব্রেসনেতে এসেছিল। আমাদের ইউনিট তো চলে গেল। ক'দিন এখানে থাকবে রূপা জানত না ওরা। রবি কাল এল, চিঠিটা ভাগ্যে আসল।

—আজ ও চলে গেল?

রূপা চোখ মোছে। বৃষ্টি হলে আকাশ পরিষ্কার। কান্নার পর রূপার চোখ উজ্জ্বল।

—আমার সঙ্গে ইউনিট ছিল। দিদির অনেক ছবি চিনু লাইনের পাশেই তুলেছে। রবি নেগেটিভ নিয়ে চলে গেল। বস আর সুজয় যে ব্যাপারটা ঘোরালো করবে, চিনু তা ভেবেছিল।

চিনু একটু ঝুঁকে বসে। উজ্জ্বল, বুদ্ধিমান, দক্ষ একটি ছেলে, অসম্ভব স্মার্ট।

গোপা পছন্দ করত অন্যরকম পুরুষ। সাধারণ, ভদ্র, স্বভাববিনয়ী, ব্রিলিয়ান্ট না হলে কিছু এসে যেত না ওর। অরূপ যেমন ছিল। হয়তো বিক্রম তেমনই একটা ছেলে।

চিনু বলে, পিঠাডিহা থেকে ঝাড়গ্রাম কয়েকবার এসেছি, গিয়েছি। ঠিক তিনদিন আগে, এক ঝলক দেখলেও সুজয়কে আমি সবুজ গাড়ি চালিয়ে যেতে দেখেছি। রূপাকে বললাম;

—আমি বিশ্বাস করি নি। আমি তো... জানতাম না... দিদি কাঁটাজুড়ির কাছেই ছিল!

মণ্ডলও সুজয় এবং সবুজ গাড়ির কথা বলেছে।

—তুমি কবে জানলে?

—চিঠি পড়ে?

—কাঁটাজুড়ির কাছে!

চিনু বলে, অরবিন্দ সেন, মানে সেনদা। ওখানে আগে প্রজেকট করতে যায়, পরে ছেড়ে দেয়। জমিটা সুবিধের নয়, জল দাঁড়ায় না। বাড়ি একটা ছিলই।

—অরবিন্দ সেন জানতেন?

—ওখানেই তো দিদি মার খেল ঋষিদা। সেনদা তো কলকাতায়। দিদি আগে পিঠাডিহা এসেছে, কাঁটাজুড়িও গেছে। ওখানে যে থাকে, মণ্ডল দিদিকে চেনে। লোকটা একটু নেশাড়ে। দিদিকে বাড়ি খুলে দিয়েছে। রাতে শুতে আসত, ওর বোন থাকত। সব সময়ে না থাকতেও পারে। দিদি একা হতে চেয়েছিল।

—বিক্রম কোথায়?

—ওর মার অসুখ! কাঁথি চলে গেছে। দিদি লিখছে, বিক্রম আর রিমকিকেও লিখলাম।

—সুজয় জানত কাঁটাজুড়ির কথা?

—রিমকিকে লিখেছে, সে বলতে পারে।

হ্যাঁ, একের পর এক মিলে যাচ্ছে। শব্দ ধাঁধার শব্দ যেমন মিলিয়ে দেয় হিসেব।

ঋষি মন ঠিক করে।

—এখানে আর নয়। কলকাতায় গিয়ে সব ঠিক করা যাবে। রূপা! স্নান করো।

—যাই। শরীর এলে আসছে।

চিনু আর ঋষি কুয়োর জলে স্নান করে। চিনু রূপাকে বালতি ভরে জল দেয়। কুয়োর জল খুব ঠাণ্ডা।

বুধরাজের বউ ভাত, ডাল, আলুসেদ্ধ এনে দেয়। খেতে না খেতে রূপা ঘুমিয়ে পড়ে।

ঋষি আর চিনু বাইরে বসে।

—অরবিন্দ সেনের কত টাকা।

—অনেক। সেন অ্যানড সেনদত্ত জুয়েলার্স নাম জানেন না? উনি ব্যবসার অংশ ছেড়ে দিয়ে টাকা নিয়ে এখানে চলে আসেন। তবে ছিয়াত্তর বছর বয়স হল, এ বয়সে কিডনির নানা গণ্ডগোল! বিয়ে করেন নি। ওঁর পর কে চালাবে কে জানে!

—কে চালাবে?

—ট্রাস্ট করছেন একটা। দ্বিজেনবাবু যদি থাকে, চলবে। নইলে গণ্ডগোল!

—সমবায় আছে না?

—সবই সমবায়। তবে আদিবাসীদের ঠকিয়ে ব্যাপারটা হাত করতে অনেকেই চায়।

—দ্বিজেনবাবু কে?

—দ্বিজেন হেমব্রম। স্কুলটা চালায়। খুব সৎ সজ্জন। আর নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা রাখে। সেনদার হাতে তৈরি কর্মী। ওঁর বাবাই প্রথম থেকে ছিলেন।

—কেউই গোপাকে দেখে নি?

—না, গোপাদি তা চায় নি।

—ওকে... পেলে কি করে?

—খুব অদ্ভুত। আমরা ঝাড়গ্রামে ফিরছি। একদিন থেকে চলে যাব। ছবিটা ভালো তোলা হয়েছে। কাজের সময়ে খাওয়াদাওয়ার ঠিক থাকত না। ঝাড়গ্রামে এসে মাংস ভাত খাব... খুব। যাকে বলে খুশিয়াল মেজাজ! তা, হঠাৎ দেখি লাইনের ধারে ভিড়।

—তারপর?

—ওরাই এগিয়ে এল। বলল, একটা বাবু মেয়ে মরে পড়ে আছে। আমরা তো ঝাড়গ্রামের দিকে যাচ্ছি। থানায় যদি খবর দিই।

—তোমরা নামলে?

—নামলাম। তারপর তো...

—কি করলে?

—আমি রূপার কাছে থাকলাম। ওরা ঝাড়গ্রামে থানায় বলে ম্যাটাডোর ভাড়া করে নিয়ে এল। তারপর ... গোপাদিকে ... টেলিফোনে কলকাতা ধরা ...

—চিনু!

—বলুন।

—মুখের বাঁ দিকটা ও রকমই ছিল?

—শেষ অবধি রিপোর্টে কি থাকবে কে জানে। কিন্তু ডাক্তার বলেছিল, মুখের বাঁ দিকে মেরে এমন ভাবে ফেলা হয়েছে, যে গোপাদি নিশ্চয় জ্ঞানে ছিল না। ফেলার আঘাতে ঘাড় ভেঙে যায়। অবশ্য এটাও বলেছে, মৃত্যু অন্তত আগের রাতে হয়েছে। শরীরের যে সব দাগ ছিল, ছেঁচড়ে নিয়ে ওখানে ফেলা হয়েছে মনে হয়।

—কাছে কোনো লোকালয় নেই?

—না না। জল দাঁড়ায় না, চাষ হয় না, ঝোপঝাড় আর বুনো ঘাস। কাছে গ্রামও নেই।

—ও সব লোক কোত্থেকে এল।

—ওরা কাজে যাচ্ছিল। লাইন ধরে হেঁটে যাওয়াই তো সুবিধে ওদের।

—তুমি ছবি তুললে?

—হ্যাঁ, আমি তো একটু সন্দিগ্ধ প্রকৃতির বরাবরই। মনে হল তুলে রাখি। রূপাও একটু সামলে নিয়েই বলল, ছবি তোল চিনু। এরপরে কতক্ষণ যাবে, চেহারা বিকৃত হয়ে যাবে। আসলে রূপা আঁচ করেছিল যে ওর বাবা, সুজয় ঘোরপ্যাঁচ কষতে পারে। তবু বাবা যে ''না'' বলে দেবে, অতটা ভাবেনি। ভেবেছিল, বাবা দেখলে ''হ্যাঁ'' বলবে।

—ওটাতেই ওর লেগেছে বেশি।

—স্বাভাবিক।

—তুমি খুব অবাক হওনি।

—না না। ওরা যে শ্রেণীর লোক! ওরা সব পারে। আর গোপাদি আমাদের দিদি, বন্ধু। আমরা তো বুঝতাম যে ওকে অনেক সইতে হয়েছে। অরূপ টরূপ, সবই আমি জানি। আমি আর রূপা তো খুব বন্ধু।

—হ্যাঁ, অরূপ...

হঠাৎ কি কোনো চিঠি আসবে মধ্যপ্রদেশ থেকে? এলেও সে চিঠিতে ঠিকানা থাকে না কোনো। কেমন করে ঋষি জানাবে যে গোপা আর নেই। কে বা কাহারা গোপাকে হত্যা করে কিছু বুনো ঝোপ, বুনো ঘাসের প্রযত্নে রেখে সরে পড়েছে?

''কে বা কাহারা'' শব্দগুলির কি বিশাল বিস্তার। খুন, জখম, রাহাজানি, অত্যাচার, যেখানেই প্রভাবশালী মানুষ বা দল খবর চেপে দিতে চায়। সেখানেই অপরাধীদের নাম থাকে না। সবাই ''কে বা কাহারা'' হয়ে যায়।

—শুয়ে পড়ুন ঋষিদা।

—হ্যাঁ, চলো।

বুধরাজের বউ এসে দাঁড়ায়।

—কাল তোরা থাকবি?

না রে বউ।

—সকালে টিফিন কি খাবি?

—সকালে দেখা যাবে।

—দরজা বন্ধ করে দেখে নিস।

—হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই ভাবিস না।

ওরা ঘরে ঢোকে। চিনু বারান্দার চেয়ার ঘরে তোলে। দরজা জানলা বন্ধ করে। আলো নেভায়।

রূপা অঘোরে ঘুমোচেছ।

চিনু বলে, ভাগ্যে আপনি এলেন!

ওরা শুয়ে পড়ে। চিনু বলে বালিশ আপনি নিন।

আমি বালিশে শুই না।

ঋষির ঘুম আসে না। গোপা, গোপা, এখন বেওয়ারিশ লাশ। কাল হয়তো পুলিশ জ্বালিয়ে দেবে। কি প্রচণ্ড আঘাতে মুখ ওভাবে থেঁতলে যায়?

কোনো সময়ে ঘুম আসে। কেন না মুখে রোদ পড়তে ঋষির ঘুম ভাঙে।

চিনু নেই, রূপা নেই। ওরা চলে গেল?

রূপা মুখ ঢোকায়, উঠে পড়ো।

—হ্যাঁ বেলা হয়ে গেছে।

বেঁচে গেছ খুব। বস, গাড়ি, হাঁকাহাঁকি,—আমি বললাম ঋষিদাকে যেতে দেব না, আমার সঙ্গে যাবে, আমরা ট্রেনে যাব।

—ওঁরা চলে গেছেন?

—যাবেন না? আটটা তো বাজে।

—আটটা!

চিনু চা নিয়ে ঢোকে!

—হ্যাঁ, আটটা এবং আমরা স্নান সেরে দৌড়ব, দৌড়ব। স্টেশনের কাছের হোটেলে খাব। দশটা পাঁচের এক্সপ্রেস বাস ধরে দুটোয় হাওড়া পৌঁছব।

—রূপা রেডি?

—নিশ্চয়।

উঠে চা খেয়ে, স্নানাদি সেরে ওরা বাইরে এসে বসে। বুধরাজ দোকানে গেছে। ওকে সব বলে, বুঝিয়ে দিয়ে যেতে হবে।

—গোপার চিঠিটা!

—জেরক্স করে তবে দেব।

—এখানেই পড়ে নিই?

—না, ঋষিদা। তোমার মন খারাপ হয়ে যাবে। জেরক্স করব আর এটা যত্ন করে রেখে দেব। কাউকে ধরতে দেব না। রাগ কোর না, তোমাকেও দেব না। দিদি তো আর লিখবে না।

—না, আর লিখবে না।

—বিক্রমকেও দরকার।

বুধরাজ এসে পড়ে। দিনের আলোয় দেখা যায় বুধরাজের ঘরের সামনে মুরগি কয়েকটা। উঁচু বেড়ার ঘেরে কিছু সবজি চাষ।

রূপা বলে, বুধরাজ বাড়ি বিষয়ে ভীষণ সজাগ। সেনদার বিষয়ে ও অসম্ভব অনুগত। হবারই কথা। সেনদা ওকে লিখে পড়ে এ বাড়ি দিয়ে দিয়েছে। সেনদা মরে গেলে এখানে আমরা এলেও ভাড়া দিতে হবে।

—ও কি রক্ষা করতে পারবে?

—ওর ছেলেরা আছে না?

—তারা কোথায়?

—একজন এখানে রাজ কলেজে পড়ে, আরেকজন খড়্গপুরে কি ট্রেনিং নিচ্ছে। সব সেনদার জন্যে। ওর মেয়েকে তো দেখিনি। তার বর বাঁকুড়ায় হোমিওপ্যাথ। মেয়ে যা সুন্দরী, নায়িকা হতে পারে।

বুধরাজের বউ এগিয়ে এসে হঠাৎ রূপার হাত ধরে, দিদি, ভাবিস নাই।

—না বউ!

—আবার কবে আসবি?

—এই রকমই, হঠাৎ।

ওরা বেরিয়ে আসে। যাক, সুজয় এবং বস, আর অরবিন্দ সেন, সবই সত্যি। ঋষি বলে, থেকে যাবার মতো বাড়িটা।

—আমরা তো অনেক থেকেছি।

—বুধরাজরা বলাবলি করবে না তো?

—না, বারণ করেছি।

হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে, স্টেশনের কাছে। হোটেলে ভাত, ডাল, আলুভাজা, টক। খেতে না খেতে এক্সপ্রেস বাস।

রূপা জানলার ধারে বসে।

ওর চোখ দিয়ে চল পড়তে থাকে। চিনু একটা তোয়ালে রুমাল এগিয়ে দেয়।

রূপা বলে, ঝাড়গ্রাম আসতে পারব না মনে হচ্ছে। এলেই স—ব!

বাস দ্রুত চলে। ঋষি আশ্বস্ত হয় যে বাসে ক্যাসেটে গান বাজছে না।

চিনু বলে, রূপা! যাবি কোথায় ঠিক করেছিস? না কলকাতায় পৌঁছে ঠিক করবি।

ঋষি বলে ও বাড়ি না যায়, আমার ওখানে যাবে। কোনো অসুবিধে নেই।

রূপা বলে, বিজয়া প্যাটেলের ওখানে যাবি এখন। ও তো কবে থেকেই বলছে। ওদের ঘরও আছে, অসুবিধেও নেই। বাড়িতে গিয়ে জামাকাপড় আনতে হবে, মাকেও বলতে হবে, কিন্তু এখনই পারছি না।

—আমার বাড়িতেও থাকতে পারো।

—ভাড়া নেবেন তো?

—ভাড়া দেবার আলাদা ঘর নেই, তবু সর্বদাই তুমি স্বাগত।

—আপনার ওখানে গেলে বাবা যখন তখন যাবে।

—তাও সত্যি। তাতে আমার কিছু নয়....

—না, না, মাসিমা অসুস্থ তাকেন। রুদ্র আছে।

—বিজয়া প্যাটেল কে?

—আমাদের সহকর্মী। প্রজেকট করে।

—কোথায় বাড়ি?

—বালিগঞ্জ প্লেস ইস্ট। এত প্রশ্ন কেন, আপনি আমার গার্জেন হয়ে গেলেন।

—হ্যাঁ, আপাতত। তুমি যত স্বাবলম্বী হও, আমার কাছে তুমি তবুও ছোট।

চিনু বলে, বাঁচলাম।

—কেন?

—আপনাকে দলে পেয়ে।

—আমি বিশ্বাসযোগ্য তো?

—বিশ্বাস ভাঙলে বিশ্বাসযোগ্য থাকবেন না।

ক্রমে দৃশ্যপট বদলায়। কাঁকরমাটি ও সামাজিক বন সৃজন থাকে পেছনে! কলাগাছ, ধানক্ষেত, পাকাবাড়ি, কাঁচাবাড়ি, অন্য দৃশ্যপট।

কলকাতা অমোঘভাবে কাছে আসতে থাকে। কালই কি এমন সময়েও ঋষি সবে কলকাতা ছেড়েছিল?

রূপা হঠাৎ বলে, আমার কোনো বিশ্বাস নেই, কিন্তু বসের আছে। দিদিকে বেওয়ারিশ লাশ করে দিল। কোনো শ্রাদ্ধশান্তি.....

—তোমার ইচ্ছে হলে কোর। তবে সব ব্যাপারটা ঠিক মতো ওতরালে তাতেই পারলৌকিক হবে।

—রূপা বিষণ্ণ হেসে বলে, তাই ঠিক।

—কলকাতা পৌঁছে আগে ব্রেসনে?

—হ্যাঁ।

—ঠিক থাকবে তো?

—নিশ্চয়ই। আর কি ভাঙি? ... মেয়েরা সমাজের সব স্তরেই খরচের খাতায়।

—মেয়েদেরই সেটা বদলাতে হবে।

—সময় লাগবে। চারদিকে এত মধ্যযুগ।

কলকাতা পৌঁছেই ঋষি বলে, বস ফোন করলে আজ বলিস কমল, বাড়িতে নেই। কাল দেখা যাবে।

কুমুদিনী ওর হঠাৎ চলে আসায় যেন একটু নিরাশ কয়েকদিন থাকবেন বলে এসেছিলেন।

ঋষি বলে, তুমি থাকবে ক'দিন। শুধু ছেলে নাতিদের রেঁধে খাওয়াবে কেন? তুমি থাকলে রুদ্রও কত ভালো থাকে, তা তো দেখতেই পাও।

—চেহারা কালি বর্ণ কেন?

—যাওয়া আসার ধকল নেই!

কমল ঘরে আসে।

—ওদিকে কি হল?

—চূড়ান্ত জঘন্য ব্যাপার।

—থাক, পরে শুনব।

—এদিকে তোমার সাম্রাজ্য সব ঠিক আছে। মাসি এসে যেতেই আরোই ঠিকঠাক সব।

—মা, রুদ্র?

—মাসিমাকে তো দেখলেই। রুদ্রও ভালো। তবে দমাদম লাথি মারে ঘুমিয়ে। আগে তো মারত না।

—আগে তো টি.ভি.তে বিশ্বকাপ দেখে নি।

—বালিশ গুঁজে নিও।

—হ্যাঁ... তোয়ালেটা ফেলে এলাম।

—যাক গে।

—গোপাকে দেখার পর...

—গোপাই তবে?

—স—ব বলব।

স্নান করলেও স্মৃতি যাচ্ছে না। গোপার মৃতদেহ মনকে যেন কলঙ্কিত করে রেখে গেছে। আজ রাতে একটা ঘুমের ওষুধ খেতে হবে। খুব গাঢ় ঘুম দরকার।

রানী চা নিয়ে আসে।

—কিছু খাবে?

—কিছু না।

—মাসী নাতির জন্যে মোচার চপ ভাজছে।

—তাহলে আনো।

দৈনন্দিনতায় ফিরতে চায় ঋষি। দৈনন্দিনতায়। কি গোপার গলিত রক্তাক্ত দেহ এখন সব কিছু ঢেকে দিচ্ছে। কলকাতার ওপর দিয়ে বিছিয়ে যাবে না কি গোপার শব কেন, কেন গোপার এমন পরিণতি হবে?

জল ঢালে ঋষি, অনেক জল ঢালে।

ফোনটা রিসিভার থেকে নামিয়ে রাখে। বস হয়তো ফিরেই ফোন করতে থাকবেন।

সকাল না হতেই ফোন আসে। কমল ধরে।

—ঋষিদা, রূপা!

—রূপা। কেমন আছ?

—শোনো, সন্ধ্যায় এখানে এসো। ঠিকানাটা লিখে নাও। আর শোনো, বস ফোন করলে...

—''জানি না'' বলব।

—না, বলবে রূপাই যোগাযোগ করবে। বলবে, আমি ফিরছি না বলে হইচই করলে ফিরবই না।

—বাড়ি যাবে তা হলে?

—একবার তো যাবই। না গেলে বস যা করবে, তোমার অশান্তির শেষ থাকবে না।

এবং বেলার দিকে বস ফোনে গর্জে ওঠেন।

—ব্যাপার কি, ঋষি?

—কিসের ব্যাপার?

—তোমার খোঁজ নেই। রূপার খোঁজ নেই। কাল থেকে ভাবতে ভাবতে ... তোমরা কি চাও আমি পাগল হয়ে যাই?

—শুনুন, রূপা, আমরা কালই ফিরেছি।

—রূপা কোথায়?

—ওর কোনো পরিচিতের বাড়িতে। আমাকে বলে নি। আজ ফোন করেছিল। বলেছে, প্রথমত ওই যোগাযোগ করবে। দ্বিতীয়ত, ওর খোঁজে হইচই করলে ও আর ফিরবেই না।

—খোঁজও করব না?

—ওর মনের যা অবস্থা...

—বড্ড বেড়ে গেছে।

—ও যা বলেছে, বললাম। তারপর আপনি বুঝে দেখবেন। তবে রূপা তো গোপা নয়।

—ওঃ...!

—রাখছি।

—তুমি আসছ না কেন?

—আমি একটু অসুস্থই ওখানে যাবার পর... রাখছি।

—এখনি যাবার তো দরকারও নেই।

—বেশ!

ফোন নামিয়ে রাখেন উনি।

ঋষি বুঝতে পারে যে ওঁর মাথাও ছিঁড়ে যাচ্ছে! অবশ্য তাতে ভয়ের কিছু নেই। সকালে হাঁটেন, সারাদিন কাজ করেন, নিয়ম বেঁধে খান, মাঝে মাঝে ডাক্তার দেখে। রক্তচাপ, রক্তশর্করা, রক্তে ক্লোরেস্ট্রাল, হৃদযন্ত্রে যান্ত্রিক গোলযোগ, কিছু নেই। য়ুরোপ থেকে যখনি ফেরেন, তখন অত্যন্ত তরুণ।

—যাবার জন্যে য়ুরোপ, আমেরিকা, আর থাকার জন্য ভারতবর্ষ, বুঝলে ঋষি?

—বুঝেও তো আমি নবীনচাঁদ রোডেই থাকব।

বসের মাথাও ছিঁড়ছে।

রূপা ব্যাপারটা নিয়ে কি করবে তা জানতে না পারলে উনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। গোপাকে উনি মুছে ফেললেন মন থেকে?

মানুষ সব পারে।

নবীনচাঁদ রোডেই ''দেবস্মৃতি'' বাড়ি আজও আছে। ওই বাড়িটি বিক্রি করে মালিক চলে গেছে।

ঋষির জন্মেরও আগে ও বাড়ির মেয়ে সুজাতা এক বেজাতের ছেলেকে ভালোবেসেছিল। ওর বাবা মা খুবই দাম্ভিক ছিলেন। কিন্তু শেষ অবধি যা করলেন, তা পিশাচেও করে না।

রাত দশটা অবধি সুজাতাকে সবাই দেখেছে। ভোরে দেখা গেল ওর বাপ ভাই দাদারা শ্মশান থেকে ফিরছে। রাত বারোটায় কলেরা। একটায় মৃত্যু, চারটায় দাহ শেষ, এই গল্পটি বাজারে ছাড়া হল। মেয়েকে ওঁরা বিষই দেন, ঝি চাকররা বলে।

সবচেয়ে ভীষণ হল, এই মৃত্যুর বাইশ দিন বাদেই সুজাতার বাবা মা ফুলসাজে সেজে, সানাই বাজিয়ে নিজেদের বিয়ের তিরিশ বছর উদযাপন করেন। এই প্রথম বিবাহজয়ন্তী, তাও ওই মৃত্যুর পর।

মানুষই তো সব পারে। বস যদি গোপাকে খরচযোগ্য মনে করেন, রূপাকে ছেড়ে দেবেন? তা ছাড়া, ওঁর তো ছেলে আছে, ভাস্বর। রূপার কারণে যদি ওঁর সাম্রাজ্য বিপন্ন হয়, তাকে ছাড়বেন না।

রূপার নিরাপত্তা দরকার।

সন্ধ্যায় যেতে হবে বালিগঞ্জ প্লেস ইস্ট।

বালিগঞ্জ প্লেস ইস্টে রূপা একটি স্বতন্ত্র কামরা পেয়েছে। বিজয়ার বাবা মরে যেতে বিজয়ার মা অত্যন্ত সাহসে বাড়ি বিক্রির ব্যবসায়ে নেমে যায়। এখন ওঁর 'উর্বশী' বুটিক খুব দাঁড়িয়ে গেছে। দোকানটি পার্ক স্ট্রীটে। ছেলে আমেরিকায়, মেয়ে ব্রেসনেতে। একটি ঘর ও বাথরুম উনি চেনাজানার মধ্যে ভাড়া দিতেই চান। বাড়িতে লোক থাকা ভালো।

ঘরটি বড়সড়। একান্তেও বটে। এ ঘর থেকে বেরোবার দরজা আলাদা। ফলে বাড়ির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। বিজয়ার মা পাঞ্জাবিনী। বাবা গুজরাতী। ঠাকুমা মারাঠী। ফলে বাড়ির হাওয়া খুব আধুনিক। শত কাজেও বিজয়ার মা গোবিমটর, ছোলেপনির বা সর্ষে কা শাক রেঁধে যান। রূপার ধারণা, খেয়ে খেয়ে ও মোটা হয়ে যাবে।

চিনু, রূপা আর ঋষি বসে।

—আমরা একজনের জন্যে অপেক্ষা করছি ঋষিদা। ততক্ষণে তুমি ছবিগুলো দেখ, দিদির চিঠিটা পড়ো। দেখ, ছবি আর চিঠি সবই চার সেট। বস, সুজয় তুমি, আমি।

ছয়টি ছবি। গোপার ঘাড় ঘুরে গেছে। হাত এলানো। মুখের বাঁ পাশ থেঁতলানো।

আরো ক্লোজআপে গোপার চিবুকের নিচে জরুল, পেটের বড় তিল স্পট। হাত—পার আলাদা ছবি। বাঁ পায়ে বুড়ো আঙুলটা বেঁকা।

—আঙুল ভেঙে গিয়েছিল। ঠিক হয়নি।

সর্বাঙ্গ আভরণ হীন। চোখ একটু খোলা। হালকা ছাপা কাপড়, হাতকাটা জামা।

—শাড়িটা আমি দিছলাম।

—এখানে তো বডি খুব স্বাভাবিক।

চিনু বলে, ওই গরম! বরফের কোনো ব্যাপার নেই। ঝাড়গ্রামে নেবার পর পচ ধরে গেল, রস কাটল, কত রকম হল।

—চিঠিটা পড়ো।

গোপার চিঠি খুব পরিষ্কার। ছোটবেলা থেকে ভালো হাতের লেখার জন্যে পুরস্কার পেত।

''রূপা''!

ঠিকানাটা দেখে অবাক হবি। তোরা কাছেই আছিস, কাজ করছিস! তা জেনেও আমি যোগাযোগ করিনি। আমি একলা নিজের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম।

সেনদার এ বাড়িটায় কি শান্তি কি নির্মলতা। জানলা জানলা দিয়ে চাইলে আকাশ। জানলার বাইরে গাছের ডালে রোজ একটা লক্ষ্মীপেঁচা এসে বসে। কোনো বই পড়ি না। তিনটে কাপড় নিয়ে চলে এসেছি। মঙ্গলের বোন ফুলমণি রাতে শুতে আসে। ওদের কোনো বানানো সমস্যা নেই। একটা শুওরের দখল নিয়ে ফুলমণির সঙ্গে মঙ্গলের বউ ঝগড়া করে। ওই বউয়ের কেমন ভাইয়ের সঙ্গেই ফুলমণির প্রেম হয়েছে।

বিয়ের সময়ে বর ফুলমণির অভিভাবক মঙ্গলকে একটি শুওর দেবে। ফুলমণি তখন নিজের পালিত শুওরটি নিয়ে যাবে। ফুলমণির জন্যে আমি রাতে রেঁধে রাখি। কাঠের আগুনে ভাত, শাক, ও খায়। আমিও খাই। সকালে দুধ ছাড়া চা। কুয়োর জল তুলে স্নান করি।

সত্যি বলতে কি, পিঠাডিহাতে তুই আছিস, আর এত কাছে, মানে কয়েক মাইল উত্তর পশ্চিমে কাঁটাজুড়িতে আমি আছি। তবু তোকে জানাইনি। আমি তো নিজের সঙ্গে নিজে একা থাকব। যে সিদ্ধান্ত নেব সেটা হবে আমার একার, তার মধ্যে তুই, বিক্রম, কেউ থাকবি না। এটা আমার নিজের জন্যেই খুব দরকার ছিল।

একলা থাকার কি যে আনন্দ তা আগে বুঝি নি। একা তো আমি বরাবরই। বাবা কত বড়, আমি কত অযোগ্য, এটা তো আমাকে অনেক আগেই বুঝিয়ে দেয়া হয়। তোর কত বুদ্ধি, আর আমি কোনোদিন চক্রবৃদ্ধি সুদের অঙ্কই বুঝতাম না বলে ''বোকা, গবেট'' তো কম শুনি নি।

কোনদিন তোকে হিংসে করার কথা মনেও হয়নি। বরং খুব গর্ব হয়েছে বরাবর। তারপর, আমি তো আমাকে মুক্তি দিতে পারছিলাম না। যেন মাকড়সার জালে জড়িয়ে পড়ছিলাম। বাবা, মা, সুজয়, সকলেই আমার কাছে অলীক। তবু নিজে নিজের জন্যে কি করছিলাম! তুই তো আমাকে ''ব্রেসনে''তে নিয়ে এলি। বেরিয়ে এসে আবিষ্কার করলাম। এটা আরো আগে আমিই করতে পারলে নিশ্চয় আরো আগে জালটাও অলীক হয়ে যেত।

বাবা আর সুজয়ের সুবিধার্থে, বিয়ে।

মাকড়সার জাল খুব বাস্তব। একই সঙ্গে খুব অলীক। ''অলীক'' সেটা নিজে জানতে হয়। জানার পরেও মুক্তি পায় কতজন? সকলের তো রূপা থাকে না ব্রেসনে না অনুরূপ কিছু থাকে না। থাকে না আমার মতো কিছু লেখাপড়া ও যোগাযোগ থাকার জোর।

আমার একাকীত্বের কথা বলছিলাম।

অরূপের সঙ্গে সে সময়টা একা ছিলাম না। অরূপের জেল হল, লজ্জা, লজ্জা! পথ না পেয়ে মরতে গেলাম। সে সময় যদি মনে জোর এনে চেঁচিয়ে বলতে পারতাম, আমার বয়স উনিশ! কেউ ফুসলে আনে নি আমাকে!—এ সব কথা লিখছি, কেন না অরূপ আমার মনে কোথাও বিবেকের মতো জেগে থাকে।

তারপর একা, তারপর সুজয়।

কয়েকটা কাজের কথা বলি। সুজয় রিমকির ব্যাপারেও এক ব্যবহারই করেছে। বিধবাকে বিয়ে করতে ওর সংস্কারে বাধে। তাই বিয়ে করে নি।

রিমকি ভেবেছে সুজয় ওকে ভালবাসে।

সুজয় কাউকে ভালবাসতে পারে না। রিমকিকে ও ছাড়বে না কেন না রিমকির স্বামী চা বাগান থেকে অনেক টাকা করেছিল। সল্টলেকের বাড়ি, ব্যাঙ্কের টাকা, সবই সুজয় বাগাবে।

সুজয় সুকৌশলে রিমকির ভাইকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এরপর রিমকিকে হয়তো চিরতরে সরাবে। কেন না আমি রিমকিকে ফোনে সেদিন বলেছি, তোমরা বিয়ে কর না কেন?

শুনলাম, আমি ডিভোর্স দিচ্ছি না।

তখন দেখা করে সব খুলে বললাম। আর আজ একই সঙ্গে রিমকিকে সব খুলে লিখেছি।

বিক্রমকেও লিখেছি।

আমার চিঠি পেলে রিমকির যদি কোনো দুর্বলতা থাকে, তা কেটে যাবে। অবশ্যই ডিভোর্সের পর ও সুজয়কে বিয়ে করতে পারে। না করলেই বুদ্ধির পরিচয় দেবে। অন্তত এটা ভাবতে ভালো লাগছে যে আমার চিঠি পেয়ে রিমকি ওকে চেপে ধরবে। সুজয় দেখবে আমি আর রিমকি, ওর পা রাখার দুটো জায়গাই নেই।

রিমকিকে বলেছি, সুজয়কে দেখালে জেরকস চিঠি দেখিও। চিনুর কথা শুনে শুনে আমার চোখ বেশ খুলেছে।

বিক্রমের কথা বলি।

ও যে আমাকে চায়, সে তো আমি জানি। কিন্তু একেবারে একলা না হলে আমি কেমন করে জানব যে আমি সব কিছুর পরে ওকেই চাই?

একা, একা, নিজের মনের জোরে জটগুলো খুলছি। আমি জানি, এবার ফিরে গিয়ে ডিভোর্স করব। বিক্রমকে লিখেছি, তোমার জন্যে আজ ডিভোর্স চাই, সেটা সত্যি নয়।

মুক্তি চাই নিজের জন্যে।

তোমাকে পরে যদি বিয়েও করি, তাহলেও যেন নিজের মনে এ অহংকার থাকে, যে অসহ ও ব্যর্থ জীবন টানব না বলেই ডিভোর্স করেছি। তুমি আমার জীবনে না এলে, আমায় পরেও বিয়ে না করলে, তবু আমি সুজয়কে ছাড়তাম।

বিক্রমকে এ সব কথাই লিখেছি। ও অবশ্য কথাটা জানে। আমিই বলেছি।

বিক্রমের ধরন—ধারণ, ভদ্রস্বভাব, স্বভাবনম্রতা কেমন যেন অরূপের সঙ্গে মেলে, তাই না?

আমার ওরকম সাধারণ মানুষই ভাল লাগে।

আজ তোকে সব কথা লিখলাম। তুই, রিমকি, বিক্রম, কিছু আগে পরে চিঠি পাবি।

আর দিন সাতেক বাদে আমি কলকাতা ফিরব।

এখানে ঝোপে কি যেন নীলচে তুলোর পুঁটলির মতো ছোট ছোট নরম ফুল ফোটে। ফুলমণি রোজ খোঁপায় পরে, কিন্তু কী আশ্চর্য, ফুলটার নাম জানে না।

তোকে লিখতে লিখতে রাতই হয়ে গেল। রোজ রাতে মঙ্গলদের গ্রামে মাদল বাজে গান হয়।

সেদিন ওরা আমাকে বলছিল, এখানে ইস্কুল করে আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়া তুই।

সেটাই বা মন্দ জীবন কি! সেনদার এ বাড়িটা তো থাকবেই না, পোড়ো হয়ে যাচ্ছে।

সাতদিন পরে তোদের দেখব, তোকে দেখব, ভাবলেও ভালো লাগছে।

এই তো! সব কথা কি বললাম?

সব কথা কি বলা শেষ হয় কখনো?

দেখলে বেশ অবাক হবি। আমি বুঝতে পারি, আমি যেন নতুন মানুষ হয়ে গেছি।

একই জন্মে অনেক জন্ম, জন্মান্তর ঘটানো যায়। নিজেকেই বারবার জন্ম নিতে হয়।

ঋষিদাকে সব বলিস। ও তো চিরকাল আমাকে স্নেহ করেছে।

তুই অত সিগারেট খাস না।—দিদি।

রূপা বলে, পড়লে?

—হ্যাঁ...নাও।

—কি বলবে?

ঋষি বলে, আমি কি বলছি সেটা সব নয়। আসল কথা হল, এরপর কি করব আমরা।

চিনু বলে, তুমিই বলো না, বুড়ি, আপনি...

—দূর! আমাকে তুমি ''তুমিই'' বলো।

—বেশ তো, বলো।

রূপা বলে, দাঁড়াও, বেল বাজল।

উঠে যায় ও, যাকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে আসে, সে যে বিক্রম তা বলে দিতে হয় না ঋষিকে।

—বোস বিক্রম।

রূপা পারতপক্ষে কাউকে ''দাদা'' বলার মধ্যে নেই ''আপনি''ও ও পারতপক্ষে বলে না।

বিক্রম বসে। ওর চেহারা দেখে মনে হয় শ্মশান থেকে এল। মুখ চোখ সব জ্বলে গেছে।

আস্তে বলে, ছবিগুলো সরাও।

—দেখবে না?

গোপার চিঠি পেয়ে খড়্গপুর, ঝাড়গ্রাম, কাঁটাজুড়ি হয়ে ফিরেছি। সবই জেনে এসেছি।

বিক্রম টেবিলে ঘুসি মারে ও কেঁদে ফেলে।

—বারবার বললাম, আমার সঙ্গে চলো, আমার বাড়ি চলো। বাবা মা দাদারা জানে, আমি কোনদিন কারো কথা শুনি না, নিজের মতে চলি। গোপা স্বচ্ছন্দে থাকতে পারত। ওখানে গোপার গায়ে হাত দিতে পারত না কেউ। আমাদের সমর্থক প্রচুর মানুষ।

—আমি ওর ঋষিদা।

—আপনার কথা বলত।

—তোমার ওখানে যায় নি, রূপাকেও জানায় নি, রূপারা তো কাছেই ছিল।

—কেন, কেন এমন করল?

—একা থাকতে চেয়েছিল।

—ফুলমণি তো সে রাতে আসে নি। ওর জ্বর হয়েছিল। গোপা মঙ্গলকেও ঘরে পাঠিয়ে দেয়। তবে...মঙ্গলরা গাড়ির শব্দ পেয়েছিল।

—কখন?

—মঙ্গলকে দেখেছেন?

—না।

—খুব নেশা করে। নেশার ঘুমে কে আর সময়ের খেয়াল করেছে।

—ও বাড়িতে মঙ্গলরা সকালে গেল?

—হ্যাঁ...কে মারা গেছে শুনে, ওরা যখন যায় তখন তোমরা চলে গেছ। ব্যাগ, জামাকাপড়, সব আমাকেই দিয়ে দিল ওরা। ব্যাগে...আমার...একটা ছবি...

বিক্রম নিঃসংকোচে কাঁদে।

—মেরে ফেলল? মেরে ফেলল?

রূপা আবার বেরিয়ে যায়। কফি নিয়ে আসে। অসম্ভব বড় কাপ, আধ কাপ কফি।

—বিক্রম, চোখ মোছ, কফি খাও।

—কবে থেকে বলছিলাম...শুনল না।

চিনু হঠাৎ তেতে উঠে বলে, বাস বাস। পরের স্টপে চলো। এখন কি করা যাবে তাই বলো।

—কেস করব।

—রূপা! এবার পুলিশ রিপোর্টার বলুক?

—বলো।

—এই ছবি, এই চিঠি, বিশেষ এই ছবি, জ্বলন্ত প্রমাণ যে এই গোপা।

—এবং তাকে খুন করেছে সুজয়।

—সুজয়ের মুখ থেকে স্বীকারোক্তি না পেলে সে কথা প্রমাণ করা যাবে না।

—বাঃ সবুজ গাড়ি চালিয়ে ও যায় নি?

—ও হল ঘুঘু। প্রমাণ করে দেবে সে সময়ে ও অন্য কোথাও ছিল।

চিনু বলে, তা ছাড়া, বস আর সুজয় হাত মেলালে কতদূর কি করবে পুলিশ...

ঋষি বলে, সুজয় যে গোপাকে মেরেছে সেটা জানলে বসও হয়তো...

রূপা বলে, বস বলবে, যা হবার হয়ে গেছে, গোপা তো ফিরে আসবে না।

ঋষি বলে, আমার বিশ্বাস, রিমকি চিঠি পেয়ে সুজয়ের কাছে যায়। সুজয় মরিয়া হয়ে ওঠে। ঠিকানাও পেয়ে যায়। গোপা রিমকিকেও বিষিয়ে দিয়েছে। হাত থেকে সব বেরিয়ে যাচ্ছে...

—ওদের একসঙ্গে করে সামনে সব প্রমাণ ফেলে দেয়া যায়। তারপর বলা যায়, বোন হিসেবে আমি কেস করব। ছবি দেখে বাবা কি বলে, সেটাই দেখার বিষয়। মার সামনে না হলেই ভাল হত। কিন্তু মারও তো জানার অধিকার আছে যে তার মেয়ের কি হাল।

চিনু বলে, কেলোর কীর্তি হবে। বস ঢাক বাজিয়ে ''নো'' শুরুই করতে যাচ্ছে।

ঋষি ইষৎ হেসে বলে, ধস নেমে যাবে। তবে রূপা...কেসের ব্যাপারে অনেকদূর ভাবতে হবে।

—কি ভাবব?

—মেয়ে বাপকেও তো অভিযুক্ত করছে। গোপাকে উনি চিনেও চেনেননি।

বিক্রম বলে, ওঁদের দুজনেই কেন জেনে শুনেও ''না'' বললেন। সে সব নিয়েও লেখালেখি হবে।

রূপা যন্ত্রণায়, বেদনায় বলে, বস ভেঙে যাবে। তবু তাই হোক, তাই হোক। ওদের মুখ বাঁচাবার জন্যে আমরা সব চেপে যাব, ওরা ক্যানসারের মত বাড়তে থাকবে?

ঋষি বলে, তুমি ভাবো।

—কি ভাবব?

রূপা জ্বলে ওঠে। তুমি না বলছিলে, এ বিষয়ে কাজের কাজ করলে তবেই দিদির পারলৌকিক হবে?

—এখনো তাই বলছি। শুধু ছেলেমানুষী না করে এটা ভেবে দেখ খুব ঠাণ্ডা মাথায়। কেন না, তোমাকেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। যা ভাববার, তা আগে ভাবো। রিমকির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব?

—ফোনে পাচ্ছি না। মানে, ফোন কাজই করছে না বলতে গেলে।

—তোমাকে যা লিখেছে তাই যথেষ্ট। তবে পরের দিকে রিমকিকে দরকার হবে।

—তবে বাবাকে ফোন করি কাল। কাল, সন্ধ্যাবেলা, বাবা আর সুজয় দুজনেই যেন থাকে।

—সুজয়, আসবে?

রূপা বলে, আমি কাল অনুতপ্ত মেয়ে হয়ে যাব। সুজয়কেও বলব আসতে। দুজনকেই বলল, ঝাড়গ্রামে আমার মাথা ঠিক ছিল না, রূঢ় ব্যবহার করেছি। ভাব দেখাব, যেন সব ভুলে গিয়ে আমি বাড়িতে থাকতে যাচ্ছি।

চিনু বলে, তুই অভিনয় করবি?

—পারব।

চিনু প্রাজ্ঞের মতো বলে, কেস করে তো এদের শাস্তি দেয়া যায় না। দুজনেরই অনেক খুঁটি। কিন্তু এ ভাবে ধাক্কা খেলে ওদের জগতও ধসে যায়। সুজয় টোপ খেলেও খেতে পারে। গোপাদি নেই, তুই বসের একমাত্র মেয়ে এখন, দেখ।

ঋষি বলে, উঠি। রুদ্র আছে। কাল কখন, কোথায় তা জানিও। সব কিছুর পরেও তোমার মার জন্যে আমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এ রকম কাহিনীর শেষ তো সুখী সুখী হতে পারে, না। বিক্রম, যাবে না?

চিনু বলে, আমার সঙ্গে চলুক। একা থাকতে ওর ভালো লাগবে না।

বিক্রম বলে, গোপা আর আমি একসঙ্গে কোনদিন থাকব বলে, বাড়ির খোঁজ নিতাম, জানেন? ওর কথাতেই ব্যাঙ্কের পরীক্ষা দেব... হয়ে গেল!

—আমি চলি রূপা।

বেরিয়ে এসে হাঁটতে থাকে ঋষি। ভেতর ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে এক সময় বালিগঞ্জের ফাঁড়ি। আট নম্বর বাস পেলে ল্যান্সডাউন বাজারের পরের স্টপে নামবে। তারপর পশ্চিম পানে শুধু হাঁটা। নবীন চাঁদ রোডকে টেনে কাছে আনা বড় কষ্ট।

রুদ্র তো ঘুমিয়েই যাবে।

বস, ঋষি, কতকালের চেনা?

বসের বাড়িতে সন্ধ্যাবেলা ঋষি, চিনু আর বিক্রমকে দেখে সুজয় প্রথম সন্দিগ্ধ হয়! তার আগে অবধি ও বেশ সহজ ছিল। বসের মুখ খুবই গম্ভীর, বিষণ্ণ, এবং চোখে কোনো অস্থিরতা।

রূপার হঠাৎ মনে হয় ও যেন বিচারক। গোপাকে ''গোপা নয়'' বলার শাস্তি বাবা এখনি পাচ্ছে। টাকার জোরে হয়কে নয় করে ছুটে চলা এক কথা। মুখ বাঁচাবার জন্যে মেয়ের মরামুখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবার পরেও সমান আত্মবিশ্বাস তো থাকে না। ভেতরে কোথাও যন্ত্রণা হয়। ''ও গোপা'' বলে বাবা মনে করেছে বাবা মুখ বাঁচাল। কিন্তু দাড়ি কামাবার সময়ে স্নানের পরে, বিকেলে স্নানের পর, রাতে শোবার সময় চারবার আয়নার সামনে দাঁড়ালেই তো বাবা বুঝছে। ও ভাবে মুখ বাঁচালেও যার মুখ সে মানুষ ভেতরে ভেতরে মরতে থাকে।

আর মা! মা প্রথমত এত কিছু জানে না, বোঝে না। বাবার কথামতো জল উঁচু জল নিচু করতে করতে মার নিজস্ব বলতে কিছু নেই। দিদির জন্যে কাঁদে, সেও লুকিয়ে। রূপার কাছে গোপার খবর নিত, সেও লুকিয়ে।

চিনু বলেছে, আমরা যা করতে যাচ্ছি তা বড় ভয়ানক জিনিস রূপা। সত্যিমিথ্যে জড়িয়ে কতকগুলো সম্পর্ক এতদিন ছিল। এরপর সব ভেঙে যাবে।

হ্যাঁ, বড় প্রচণ্ড ধাক্কা দিতে চলেছে রূপা। প্রাগৈতিহাসিক যুগে, পৃথিবী যখন নবীনা, তখন মহাদেশ ছিল না, ছিল একটি জমাট ভূখণ্ড।

কোন কল্পনাতীত চাপে, বিস্ফোরণে, সমুদ্রের চাপে, সেই একপিণ্ড পৃথিবী ভেঙে গেল, সরে গেল।

আজ মহাদেশদের টেনে এনে কাছাকাছি জুড়ে দিলে তারা খাঁজে খাঁজে অনেকটা জুড়ে যায়। কিন্তু কে পারে তা করতে? পৃথিবী এখন বৃদ্ধ, নিরাসক্ত, উদাসীন।

এ বাড়ির লোকজনের মধ্যে মানবিক, রক্তের, এসব সম্পর্কে যা হয়তো খানিক অবাস্তব, খানিক বাস্তব।

রূপা স—ব ভেঙে দেবে।

রূপাও তা জানে।

সুপ্তি বসুর বেশবাস যত্নহীন। চুল খোলা, চোখ দেখে ঋষির মনে হল, ঘুমের ওষুধ নিয়মিত খাচ্ছেন।

আজ দুপুরে রূপা এসেছে। নিজের ঘরে ঘুরছিল, দিদির ঘরেও। দেয়ালে গোপার ছবি। বিছানাটা ঢাকাই থাকে, বাথরুমে থাকে সাবান, শ্যাম্পু তোয়ালে। যেন এ বাড়ির বড় মেয়েটি আসে যায় নিয়মিত।

আলমারি খুললে দিদির বিয়ের আগেকার কিছু জামাকাপড় কি দেখা যাবে না?

বারান্দায় ঝাঁপিয়ে নেমেছে ঝুমকোলতা। ওই গাছের নিচে লুকিয়ে পড়ে রূপা পরীক্ষার সময়ে পড়ত। ওর থ্রিলার পড়ার জায়গাও ছিল ওটা।

কি একটা বিদেশী পাখি অসম্ভব দামে কিনেছিল বাবা। সে হতভাগা সকলকে নকল করত।

—রূপা!

—গোপা!

—রূপা!

—গোপা!

ডাকত ওদের। পাখিটা মরে গেছে। কিন্তু রূপা যে বয়ামে বয়ামে ফর্মালিন ঢেলে ডুবিয়ে রাখত কাঁকড়া বিছে, ব্যাঙ, একটা সাপ, সেগুলো আছে।

দিদি আর ওর স্কুলের বইগুলোও আছে। মা কেন স—ব জমিয়ে রেখেছে? ওগুলোই কি মার কাছে ওর হারানো, দূরে চলে যাওয়া মেয়েরা।

মা প্রচণ্ড আঘাত পাবে।

রূপার নিজেকে কসাই মনে হচ্ছে। বাবা যদি তখন মুখ বাঁচাতে না যেত, বলত ''এ গোপা', তাহলে তো এত কিছু হত না। পুলিশ স্বাভাবিক নিয়মে যতটা এগোবার এগোত। অদৃশ্য চাপ আনলে আর না এগিয়ে কেসকে গোলকধাঁধায় ফেলত।

কেসে কি আর বড়লোক ফাঁসে?

বাবা ''এ গোপা'' বলেনি।

সেজন্যেই তো রূপাকে কসাই হতে হচ্ছে।

আর তো ফেরা চলে না।

ওদের ঢুকতে দেখে বস চোখ তোলেন।

রূপা বলে, ঋষিদাকে সবাই চেনে। চিনু আমার সহকর্মী। আর এর নাম বিক্রম।.... ইনি মা ইনি বাবা, ইনি সুজয়।

বিক্রমের ছবি সুজয়ের কাছেই দেখেছেন বস, এবং সত্যিই বিশ্বাস করেছেন ওরা এক সঙ্গে চলে যায়। তারপর ঝাড়গ্রামে ধাঁধায় পড়েন, কেননা সুজয় অগে বলেছিল ওরা দুজনে মাসখানেক উধাও। পরে বলল, বিক্রম না গোপা কে যেন সাত আট দিন আগে পরে...

—বিক্রম! এই বিক্রম?

সুপ্তি! সোজা হয়ে বসেন।

—বিক্রম! গোপা কোথায়?

—রূপা বলে, বিক্রম জানে না মা, আমি জানি। সো সরি বাবা, তুমি আমাকে বাধ্য করলে।

—না।

বলে চেঁচাতে যান বস, কিন্তু রূপা বলে আর ''না'' বললে হবে না বাবা। ''হ্যাঁ'' বলতে হবে।

এ সময়ে ভাস্বর ঢোকে।

গোপা ও রূপার দাদা।

—কি ব্যাপার জরুরি তলব?

''দাড়ি কামাবার পরে লাগান ওলড স্পাইস লোশন''—এর মৃদু গন্ধ। চিকনের পাঞ্জাবী ও যোধপুরী। সঞ্জয় গান্ধী যে পাশে—বোতাম পাঞ্জাবি ও যোধপুরীকে ''অমর রহে'' করে রেখে গেছেন।

পায়ে চটি, হাতে পাইপ।

—এসো ভাস্বর।

সুপ্তি আবার বলেন, বিক্রম। গোপা কোথায়?

ভাস্বর বলে, এ বিক্রম?

রূপা বলে, হ্যাঁ, তবে প্রশ্নের উত্তরটা জানি আমি। বোসো দাদা।

—হঠাৎ গোলটেবিল বৈঠক? কতক্ষণ চলবে?

তোমার তাড়া আছে?

—একটা গেট টুগেদার...

—বোসো। সবটা শোনো। সুজয় উসখুস করছে। চিনু তুই আর ঋষিদা ওর দু'পাশে বোস।

—আমার পাশে বোসো সুজয়।

—না মা। তুমি যেখানে আছ থাকো। আচ্ছা, আমি শুরু করছি। সেদিন ঝাড়গ্রামে কি হয়েছে তোমরা জানো।

ভাস্বর বলে, কার না কার বডিকে ''গোপা'' বলে তুমি..... ছি ছি, রূপা! নিজেকে ভগবান ভাবা ঠিক নয়।

—অবশ্যই। এই ছবিগুলো তোমরা প্রত্যেকেই দেখ। বাবার চেয়েও সুজয়ের ভুল হয়েছিল, মর্গের বিকৃত লাশটার যে ছবি পুলিশ তোলে, সে ছবিই একমাত্র ছবি মনে করা। দিদিকে প্রথম দেখি আমরা। ব্রেসনের একটা ইউনিট। তোমরা ভুলেই গেলে যে আমরা ফিল্ম ইউনিট নিয়ে বেরিয়েছি।

সে সময়েই চিনু তোলে ছবিগুলো।

সুজয়ের চোখের ওপর কোনো ঢাকনা বা পর্দা নামে। ঈষৎ হেসে ও বলে, ভুল হয়নি। ভুলেও যাইনি। আমি বলা সত্ত্বেও আমার সিক্রেট সার্ভিস ফেল করল। ওরা ব্রেসনেতে কোনো ছবি বা নেগেটিভ পায় নি।

চিনু বলে, গোয়েন্দা সার্ভিস?

—হ্যাঁ, দি হান্টার হক।

—হলিউডের ছবি হয়ে গেল।

সুজয় বলে, রূপাকে আমি কোনোদিন বিশ্বাস করিনি, সেদিনও নয়। তবে আমি জানতাম খুব সময় পাবে না। বর্তমানে আমি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছি।

বস বলেন, এ সব কথার মানে?

সুজয় বলে, রূপা বলুক। আজকের খেলা রূপার খেলা। সুযোগ্য সহকারী ঋষি, চিনু, বিক্রম।

—ছবিগুলো দেখ। এখন বাবা আর সুজয় আবার বলুক এ গোপা নয়।

—ছবি? এটা কার ছবি? গোপা, গোপা এমন করে ঘাড় ভেঙে, মুখের বাঁ পাশে এ কি, গোপা, গোপার.... গোপা ছবি এটা।

বস ঘামতে থাকেন।

সুপ্তি বলেন, তুমি কেন বললে গোপা নয়?

—আমি .... আমি এ ছবি দেখিনি।

—স্বাভাবিক, বাবা। ছবি তোলে চিনু, বিকেলের ট্রেনে রবি চলে আসে নেগেটিভ, ক্যামেরা সব নিয়ে। রবিই প্রিন্ট করতে দেয়।

—নেগেটিভ কোথায়?

—বলা গেল না। দুঃখিত সুজয়।

সুপ্তি আমার বলেন, ছবি না দেখ, তাকেই তো দেখেছিল। কেন বললে গোপা নয়?

—খুব বিকৃত বডি সুপ্তি। দেখে চেনা খুব—কঠিন। যদি তুমি দেখতে...

—আমি দেখলে বলতাম ''এ গোপা!'' বিকৃত বডি? কত বিকৃত বডি? সুজয় কি করে ভুল করলে? গোপার সঙ্গে এত বছর ঘর করেছ, চিনতে পারলে না? ভাস্বর! তুই কিছু বলছিস না কেন?

—আমি .... আমি .....

ভাস্বর হঠাৎ ককিয়ে ওঠে ও উঠে যায়। বমির শব্দ। ডাইনিং রুমে বেসিনে ও বমি করছে।

—সুজয়! তুমি বলো।

—রূপাই বলবে।

পাশে বসে ঋষি টের পায়, পাশে রাখা ফ্লাসক থেকে সুজয় হুইস্কি খাচ্ছে।

—রূপা কি বলবে। সে তো আগাগোড়াই বলেছে দিদির বডি পেয়েছি, তোমরা এসো।

রূপা বলে, ধূর্তামি অনেক করতে হয়েছে মা। ডাক্তার আমাকে আর চিনুকে বলেছে, দিদিকে মুখ ও মাথার বাঁ দিকে মেরে ঘাড় ভেঙে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নইলে এমন ভাবে ফেলা হয়েছে, যাতে ঘাড় ভেঙে যায়। মোটকথা দিদিকে খুন করা হয়েছে।

সুজয় ধূর্ত হাসে, বিক্রম খুন করে থাকবে। আমাকে তুমি খুনে জড়াতে পারছ না রূপা,—আঃ।

বিক্রম প্রচণ্ড জোরে চড় মারে ওকে।

রূপা বলে, না বিক্রম, না।

—ওকে আমি...

সুজয় এটাও মেনে নেয়। ঘাড় নেড়ে বিড়বিড় করে বলে, সময়টা ভায়োলেনসের!

রূপা বলে, বাবা কিছু বলবে?

বস মুখ ঢেকেছেন। হাত নেড়ে বলেন, ''না''।

—হ্যাঁ, নো! এ সব ছবিসহ রিপোর্ট দিয়ে ''নো'' কাগজের উদ্বোধন করো।

—রূপা...ডোনট বি ক্রুয়েল!

বসের গলা চাপা।

—দাদা কোথায় গেল?

সাদা মুখে ভাস্বর ফিরে আসে।

—আমি তুমি নই রূপা। গোপার ছবি দেখে...

—ছবি দেখেই ভেঙে পড়লে? আমি বডির ওই অবস্থা থেকে পচে যাওয়া অব্দি সঙ্গে থেকেছি। দিদির বডির গন্ধ আমার ভেতরে ঢুকে গেছে।

ঋষি বলে, রূপা থেমো না।

—হ্যাঁ...সুজয় বলছ, বিক্রম খুনী?

—আর কে? লাভার...জেলাসি...দেখ রূপা! গোপা নেই।

এখন পোষ্টমর্টেম করে কি হবে?

ঘটনাটি পোষ্টমর্টেম করলে তবেই বুঝবে, জীবিত দিদির চেয়ে মৃতা দিদির শক্তি বেশী।

সুজয় যেন সবিস্ময়ে বলে, কেন, কেন? গোপার গল্প লিখতে চাও?

পুরনো ত্রিভুজের নকশায় ফেলো, ব্যাখ্যা পেয়ে যাবে। গোপা আর আমি। গোপা আর বিক্রম।

বিক্রম গোপাকে.....

রূপার চোখ নেচে ওঠে।

—দিদি একই দিনে আমাকে, বিক্রমকে, আর রিমকিকে চিঠি লেখে।

—আবার রিমকি কেন?

সুজয় মুখ মোছে। মুখ থেকে অদৃশ্য মাছি তাড়ায়। তারপর বলে রিমকি এখন ভবেশ দত্তের কথায় উঠছে বসছে, এবং আমাকে গেট আউট করে কানপুরে ওর ভাই, সেই আই. এ. এস. অরুণের কাছে চলে গেছে ওকে বাদ দাও।

বস মুখ ঢেকে রেখেই বলেন, সেদিন তো দেখলাম মহিলাকে। তিনি তোমাকে যা বললেন....

রূপা বলে, কি বলেছে আমি আন্দাজ করতে পারি। দিদি বিক্রমকে কি লিখেছে। শোন...

—বিক্রমকেও?

নিশ্চয়। ''বিক্রম, তোমাকে খুব বড় চিঠি লিখব না। কেন না, দেখা আমাদের হচ্ছে। যেখান থেকে লিখছি, সে জায়গাটা কেমন, তা ভাবতেও পারবে না। পিঠাডিহার চেয়ে অনেক বুনো, অনেক পিছিয়ে থাকা এই কাঁটাজুড়ি। আছি সেনদার বাড়িতে, বাড়িটা বেজায় পোড়ো। মঙ্গল, ফুলমণি, ওদের তুমি চেনো না। ওদের হেফাজতে আছি বলতে পারো।

কাগজ নেই, রেডিও নেই, টি.ভি. নেই, সিনেমা নেই, মানুষও বলতে গেলে নেই।

অনেক কাঠবেড়ালী আছে। আছে পাখি।

ওরা কোনো ডিসটার্ব করে না।

নিজের সঙ্গে একা থাকব বলেই এখানে আসা। রূপারা কাছেই ছবি তুলেছে। ওরাও জানে না যে আমি এখানে আছি। লুকিয়ে থাকার কি মজা!

তুমি বলা সত্ত্বেও তোমার গ্রামে যাইনি। তার কারণ, কখনো চাইনি, তোমাকে ভয় করে মুক্তি পেতে।

অরূপের কাছ থেকে আমাকে সরিয়ে আনার পর থেকে যে রকম জীবন হয়ে উঠেছিল বাড়িতে, সুজয়ের কাছে, সেটাও অপমানজনক। আমি নিজেই নিজেকে অপমান করছিলাম। তাই মুক্তিটা আমাকে একলাই নিতে হবে। বলতে পারো এই নতুন গোপা, যে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার শক্তি সামর্থ্য বোঝার জন্যেই চলে এসেছি।

চলে এসে কোনো বিবেকদংশন হচ্ছে না। বাবার মুখ থাকল না গেল তা তুচ্ছ মনে হচ্ছে। বিয়েটা বাবা ও সুজয়ের ব্যবসায়িক সুবিধার্থে হয়েছিল। ওদের ব্যাপার ওরাই বুঝুক।

মার জন্যে কষ্ট হয়। করুণা হয়। মা তো মুক্তি পাবে না কোনোদিন। এ কথা ভাবতেও পারবে না।

রূপাকে সবই লিখলাম।

রিমকিকেও সবই লিখলাম। সুজয় ওকে বুঝিয়েছিল। আমি ডিভোর্স দিচ্ছিনা বলে সুজয় ওকে বিয়ে করতে পারছে না। সুজয় ওকে বিয়ে করবে না। কেননা রিমকির নাকি বৈধব্য যোগ আছে এবং সুজয় মরতে ভয় পায়।

ওর সঙ্গে দেখা করে বলেছি, লিখে জানালাম, যে সুজয় ওর বাড়ি, টাকা সব নিচ্ছে। নেবে। রিমকি যেন সেটা বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়।

কলকাতায় ফিরছি বিক্রম। আগে ডিভোর্স করি। তারপর তুমি আর আমি বিয়ে করব কিনা, তুমি আর আমি ঠিক করব।

তুমি পারলে, আমি আর তুমি এ বাড়িতেই একটা স্কুলও খুলতে পারি। খুব অন্যরকম জীবন হবে।

আমার জন্যে চিন্তা কোর না। আমি খুব ভাল আছি। এত ভাল আছি যে ভাবলে পরে মাতাল মাতাল লাগে। বেঁচে এত আনন্দ।

তুমি ভাল থেকো।

শীগগিরই একটা নতুন গোপাকে দেখতে পাবে। তাকে ''এসো, পাশে বোস'' বলতে পারবে তো? তোমাকে দেখব বলে খুব ভাল লাগছে সব কিছু।

—গোপা।''

সবাই স্তব্ধ, স্তব্ধ।

—এবার আমাকে লেখা চিঠিটা শোন।

রূপা পড়তে তাকে। সুজয় এখন মাথা রাখে নিজের হাতে। বস খুব নিশ্চল।

চিনু চার্মস ধরায়।

রূপার চিঠিটা পড়া শেষ হয়।

সুপ্তি বোস কাঁদছেন, মার জন্যে কষ্ট হয়, মার জন্যে করুণা হয়। গোপা, গোপা, গোপা!

রূপা চিঠি ও ছবি ব্যাগে ভরে।

—এবার?

সুজয় মুখ তোলে।

—এবার কি? ফাইন! গোপা একা থাকছে, গোপা স্বাধীন হচ্ছে, চমৎকার উপসংহার।

ঋষি গলা সাফ করে।

—উপসংহারটা ওভাবে হয়নি সুজয়।

—বলুক, পুলিশ রিপোর্টার বলুক।

—বলছি। গোপা কোথায় গেছে তুমিও জানতে না।

সম্ভবত গোয়েন্দা এজেন্সির সাহায্যে ওর ওপর নজর রাখছিলে। বস কি মনে করেন?

বস রক্তাক্ত ঘোলাটে চোখ থেকে হাত সরান। সুজয়ের দিকে তাকান।

—রাখছিল। আমায় বলেছে।

—একশো বার রাখব। আমার বউ আমার মুখ হাসিয়ে একটা তিন পয়সার কেরানীর সঙ্গে ঘুরবে? আমি ডিভোর্স করব বলে খবর নিচ্ছিলাম।

ঋষি একটু থেমে থেমে কথা বলে।

—ডিভোর্স করতে ওকে?

—অবশ্যই।

—মনে হয় না। তুমি এবং বস, তোমাদের যা সম্পর্ক, বসের মেয়েকে ডিভোর্স তুমি করতে না।

—তার আগেই তো ''ডিভোর্সের চিঠি পাবে'' লিখে গোপা চলে গেল না?

—শুনেছি খাতার ছেঁড়া পাতার আধখানায় ওকথা লেখা ছিল। হয়তো ওরকম লেখা খাতায় লিখতই। যদ্দিন সাহস পায় নি।

—কি বলতে চাও?

ঋষি ক্লান্ত গলায় কথা বলে।

—গোপার চিঠি দেখার পর ব্যাপারটা এরকম ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। গোপা চলে যাওয়াতে তোমার অহংকারে ভীষণ লাগে। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো তুমি ওকে খুঁজছ। কেননা ডিভোর্স তোমার ইচ্ছে নয়। তার চেয়ে ও মরে গেলে তুমি বাঁচো। তুমি বসকে ছাড়তে পার না, বসও তোমাকে ছাড়তে পারেন না। যদিও, তুমি কোন স্তরে নামতে পার তা বসও বোঝেন নি বলেই আমার মনে হয়। উনি ঠিক তুমি নন।

—না, উনি আলবার্ট সোয়াইৎজার, উনি বাবা সাহেব আমতে, আমি একা চার্লস শোভরাজ!

—সুজয়, মাত্রা ছাড়িও না।

—একশোবার ছাড়াব।

—বাস্টার্ড! বাস্টার্ড!

বস ভাঙা গলায় বলেন। ওঁর সাম্রাজ্য ভেঙে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে, গলা তো ভাঙবেই।

—আমি বলেছিলাম তুমি আমার মেয়ের পেছনে হকিং হান্ট লাগাও?

—বস! আপনার কাছে এ রকম ভুল অপ্রত্যাশিত। কথাটা হান্টিং হক, শিকারী বাজ!

—ওই হল।

ঋষি বলে, গোপা তোমাকে ছেড়ে যাওয়াতেই তুমি রাগে গোমরাচ্ছ। মেয়ে চলে গেলে বস ক'দিন খুশি থাকবে তা তুমি জানো না। তোমার ভয়। বাপ মেয়েতে যদি মিলমিশ খেয়ে যায়, তুমি আরো বিপন্ন হবে।

—চমৎকার! বলে যাও।

—আসলে তুমি কত বিপন্ন তা তুমি বুঝলে যখন রিমকি তোমায় চেপে ধরল। গোপা ওর সঙ্গে দেখা করেছে, তোমার স্বরূপ কি, তা বলে গেছে, তা জেনেছ যখন তখনি কিন্তু গোপার মৃত্যু পরোয়ানা লিখেছ তুমি। কেননা, আমার ধারণা, রিমকি তোমাকে সন্দেহ করতে থাকে, অ্যাটর্নিকে ডেকে সব বলে। এবং তোমাকে চাপ দিতে থাকে। বাড়িটা তো ওর!

—রিমকি! একটা ভদ্রলোকের বিধবা হয়ে দেওরের সঙ্গে সম্পর্ক করে... বেশ্যা একটা। আমায় বিয়ে করো। সুজয় ওকে বিয়ে করবে?

রূপা মন্ত্রমুগ্ধ। সুজয়ের মতো লোক হয়, তা ও পড়েছে বইয়ে, চোখে দেখেনি।

ঋষি বলে, তোমার মতো লোকের পক্ষে এ ভাবে ভাবাই স্বাভাবিক। রিমকিকে তুমি ব্যবহার করেছ। ওর গর্ভে তোমার মেয়ে হয়েছে, ওর বাড়িতে গেড়ে বসে আছ। সেই রিমকি বিগড়ে যাচ্ছে গোপার কথায়। তুমি আর কত সইতে পারো। গোপাকে খুন করাই সমাধান।

—ঠিক বলেছ ঋষি।

সুপ্তি বোস ও ভাস্বর একসঙ্গে কথা বলেন।

—বাড়ি তোমার নয়?

—বাবা! তুমি কি দেখেছিলে?

—মাসতুত বউদি! ছি, ছি, ছি!

—অমার্জনীয়। জঘন্য।

সুজয় বলে, কোন মহাপুরুষ তোমার বোনকে বিয়ে করত হে ভাস্বর বোস? বেশি বোক না।

ঋষি বলে, আমি শেষ করিনি।

—ও, তোমার রূপকথা।

ঋষি ঈষৎ হাসে।

—বেশ তো রূপকথাই হোক। গোপাকে খুন করবে বলে তুমি মনে মনে অন্ধ, অথচ ঠিকানা জানো না। তারপর রিমকি যখন চিঠি চার্জ করে, তখন তুমি ঠিকানা জানলে, এবং সেদিনই ট্যুর থেকে ফিরেছ। রিমকি যদি বোকা না হয়, সে চিঠির জেরকস তোমাকে দেয়, বিকেলেই তুমি সবুজ গাড়ি নিয়ে কাঁটাজুড়ি ছোটো।

—বাঃ, তারপর?

তারপর..... এমন অন্ধ তখন তুমি... রাতে ওখানে পৌঁছও। গোপা তো নতুন গোপাকে আবিষ্কার করে নির্ভীক, সাহসী তখন, ও দরজা খুলে দেয়।

—মিথ্যে কথা!

—ট্যুর থেকে তোমার সঙ্গে যে রাতুলও ফেরে। রাতুল তোমার সেক্রেটারি, আমার স্ত্রীর কি রকম ভাই, তুমি তা জানো না।

—কি? রাতুল.... তোমাকে.....

—স্বভাবতই বলেছে। এটা একটু কাকতালীয় হয়েছে। রাতুল আমার সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ।। আজ সকালে ও রুদ্রকে, প্রমিস করা ''সুপারম্যান'' খেলনা পৌঁছতে এসেছিল। খেলনাটা কেনার সময়ে বম্বেতে তুমি তো গাড়িতে বসেছিলে।

—কোনো প্রমাণ নেই।

—কেন থাকবে না? ঝাড়গ্রামে তোমাকে সিগারেট কিনতে, ওদিকে যেতে দেখেছে চিনু।

সুজয় এখন এদিক ওদিক ঘাড় ঘোরায়। বুনো শুওরকে কারা যেন বেড়াজালে ঘিরছে বর্শা তুলে। বন্যবরাহের মত ও কোণঠাসা মরিয়া।

—না, দেখে নি।

—দেখেছি। পরনে স্টোনওয়াশ, সবজে জ্যাকেট, সন্ধ্যাবেলাতেও চোখে সানগ্লাস। নিতাইয়ের দোকানে সিগারেট কিনলেন, চেঞ্জ নিলেন না। শনিবার, জাস্ট গত শনিবার। আরো বলছি, কাঁটাজুড়ির সঠিক পথটা নিতাইয়ের কাছেই জেনে নেন।

—না!

বস, সুপ্তি, ভাস্বর, এ—ওর গায়ে ঠেসে বসেন। ওঁরা বিপন্ন, অসহায়। সুজয়কে ভয় পেতে হচ্ছে যে জন্যে ওঁরা অত্যন্ত বিপন্ন। বস সুপ্তির দিকে তাকান। সুপ্তি! সুজয় যে এত খারাপ তা আমি জানতাম না। ওঁর চোখ বলে।

সুপ্তি ওঁর দিকে তাকান না। ঝুঁকে বসেন, কথা শোনেন।

—সুজয়! যে ভাড়া গাড়িতে আমরা গেলাম, তার ড্রাইভার মণ্ডল আমাকে রূপাদের বাড়িতে পৌঁছবার সময়েই জিগ্যেস করেছিল তোমার সবুজ অ্যামবাসাডর আছে কি না, তুমি ঝাড়গ্রামে যাও কি না। মণ্ডল হরদম ঝাড়গ্রামে যায়, তোমাকে দেখে থাকবে।

—তাতে কি প্রমাণ হয়?

''কি'' শব্দের ওপর যথেষ্ট জোর।

ঋষির গলা নৈর্ব্যক্তিক হতে থাকে।

—তুমি খুঁজতে শুরু করলে প্রমাণ বেরোবে বইকি। যথেষ্ট প্রমাণ বেরোবে। শুধু... সুজয়... সঙ্গে মেয়েটিকে নিয়ে গেছল কেন? কেন?

সুজয় চেঁচিয়ে ওঠে, মিথ্যে কথা! কোনো মেয়ে সঙ্গে ছিল না। আমি একলা... আমি..

সুজয় চারদিকে তাকায়।

ভাস্বর, ''ওলড স্পাইস'' সুরভিত ভাস্বর, গোপার ছবি দেখেই যে বমি করছিল। সেই ভাস্বর লাফিয়ে ওঠে, তুমি স্বীকার করছ, তুমি একলা গিয়েছিলে?

সুজয় বলে, ঋষি! তুমি ফাঁদে ফেলে আমাকে দিয়ে বলিয়ে নিলে?

হঠাৎ ও ক্ষিপ্ত বাঘের মতো বোধহয় ঋষিকে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল। চিনু ওর দু—হাত টিপে ঝাঁকি মেরে বসিয়ে দেয়।

সুজয় ''আঃ'' বলে চেঁচিয়ে ওঠে ও বলে আমার হাতে ভেঙে দিয়েছে!

—ভাঙিনি চাঁদ। কিছুক্ষণ ঝনঝনাবে।

ঋষি বলে, এটা কি প্যাঁচ, চিনু?

—সম্পূর্ণ স্বদেশী। রকের ট্র্যাডিশনাল প্যাঁচ। তোমাকেও শিখিয়ে দেব।

—আর না সুজয়, এবার বলো। একলা গিয়েছিলে, তারপর? তারপর কখন পৌঁছলে?

সুজয় বলে, জল খাব।

রূপা উঠে গিয়ে জল এনে দেয়। জলের জাগ। গেলাস কয়েকটি। রূপাকে এ বাড়িতে সামান্য কাজ করতে দেখলেও অবাক লাগে ঋষির।

নীরবে ও মা, দাদা, বাবা, বিক্রম, চিনু, ঋষিকে জল দিতে থাকে।

সুজয় বলে, জল দান বড় পুণ্যের কাজ।

—আর নয়। বলো।

সুজয়ের চোখ স্বপ্নিল। স্বপ্নিল। ও কি করেছে তা বলে অপার আনন্দ পাচ্ছে। এমনভাবে ও বলে, যেন এভারেস্টে ওঠা বা বিশ্ব কাপে খেলার মতো বাহাদুরির কথা বলছে।

হিংস্র আনন্দে ও দাঁত বের করে।

—ঋষি ইজ রাইট!

—সুজয়, সুজয়।

—বস, আপনি গাধা! ঋষি ঠিক বলছে।

—তুমি... গোপাকে...

—নিশ্চয়। আমাকে ছেড়ে যাবে, আস্পর্ধা। রিমকিকে বিষিয়ে দেবে। লম্পট একটা মেয়ে, বিয়ে করে ধন্য করে দিয়েছি, পাপোশের মত পড়ে থাক। থাকত, তাই থাকত। যদি রূপা, ওই কুত্তীটা না যেত।

আবার জল খায় সুজয়।

—হঠাৎ দেখি, ওকে আর ধরাছোঁয়া যাচ্ছে না। নিজের চারদিকে খোলস গজিয়ে ও বদলে যাচ্ছে, প্রজাপতি হচ্ছে। কুত্তী।

—বিশেষণ বাদ দিয়ে সুজয়।

ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো ঘাড় বাঁকায় সুজয়।

—রিমকিকে চিটি লেখার আগেই ওকে খুঁজছি, মেরে ফেলব। বিক্রমের সঙ্গে যায়নি, কোথায় গেছে? তারপর রিমকি এই চিঠি নিয়ে আমাকে চার্জ করল।

—তারপর?

—তারপর....

সুজয় এখন থামতে পারে না। হড়বড়িয়ে বলতে থাকে, কথা উপছে পড়ে মুখ থেকে।

না, তারপরে আর দেরি করিনি আমি। তখন আমার অবস্থা কোণঠাসা জন্তুর মতো। আমি তখন ক্ষ্যাপা কুকুর। বিবাহিত স্ত্রীর মর‍্যাদা দিয়েছি। দিয়েছি অঢেল টাকা। তারপরে আর কি চাইতে পার তুমি?

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক তুমিই তৈরি করতে দাওনি। গোটা দুই বাচ্চা বিয়ালে তুমি ঠাণ্ডা হয়ে যেতে। আমার কোনো আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল তোমার।

যাতে ধরা না পড়ি সে চিন্তা আগে ছিল, পরে সব গোলমাল হয়ে যায়। মাথা কাজ করছিল না। গাড়ি চালাবার সময়ে বারবার মনে হচ্ছিল পাশে কেউ বসে আছে।

বিশ্বাস করবে কেউ? কিচ্ছু খাইনি সারাদিন। মেচেদা পৌঁছে প্রথম জল খেলাম। মদ খাইনি। মদ খেলে মাত্রা থাকবে না ভয় ছিল।

ঝাড়গ্রামে মণ্ডল আমাকে দেখেছিল? সবই সম্ভব। বেরোবার সময়ে পথের দুইদিকেই মড়া দেখলাম। খুব কুলক্ষণ। তা ছাড়া মেচেদাতে একটা বিকট দর্শন পাগলী হঠাৎ আমাকে গালাগালি করল। খুব কুলক্ষণ। এ রকম সব কুলক্ষণ দেখতে দেখতে গেলাম।

আশ্চর্য কি, ঝাড়গ্রামে আমাকে চিনু দেখবে, দেখবে মণ্ডলও। কুলক্ষণগুলো যে দেখলাম। তার অভিশাপ তো ফলতে হবে কোনো না কোনো সময়ে। এক হারামজাদার দোকানে সিগারেট কিনলাম। মনে আছে।

ঝাড়গ্রাম থেকে কাঁটাজুড়ি পৌঁছতে সময় লেগেছিল, পথ চেনা নেই বলে। পথে লোকও পাই না যে জিগ্যেস করব।

কাঁটাজুড়ি ছাড়িয়ে ওই বাড়িটাতে পৌঁছবার আগেই অস্বস্তি হচ্ছিল। বাড়ির সামনে গাড়ি রাখলাম। সঙ্গে সঙ্গে এক রাশ তারা। গাছে গাছে বাতাস, বুনো ফুলের গন্ধ। আর অপার নৈঃশব্দ্য আমাকে আক্রমণ করল। আমি এতে অভ্যস্ত নই। আমি চাই শব্দ, বাজনা, আলো, ক্লাব, অনুগত মেয়েমানুষ রিমকি। বাথরুমে গেলেও আমি ক্যাসেট বাজাই।

এত তারা। এমন বাতাস, এমন নীরবতা, এমন অজানা ফুলের গন্ধে আমার ভয় করল।

ঋষি একটা ভুল করেছে। দরজায় টোকা মেরে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। হাতে ছিল ভারি হাতুড়ি। হাতুড়ি খুব ভালো হাতিয়ার। মারতে জানলে হাতুড়ি খুব ভালো।

আমি তো বিশ্বাস করিনি গোপা একা আছে। চিঠিতে যাই লিখুক, আমার হিসেব বলছে যে বিক্রমকে ওখানে থাকতেই হবে। থাকুক। অতর্কিতে হাতুড়ি মারলে দুজনেই মরবে।

গোপা বলেছিল, কে?

বলেই বোকার মতো ও দরজা খুলল। দরজা খুলতেই লাথি মেরে কপাটে ধাক্কা মেরে আমি ভেতরে ঢুকলাম।

—তুমি? এখানে?

নোট করো, নোট করো ঋষি, গোপা শুধু বলতে সময় পেয়েছিল, ''তুমি? এখানে?''

তারপরেই তো আমি ওর মুখে প্রচণ্ড জোরে হাতুড়ি মারি। তারপরেই তো ও পড়ে যায়। হাতুড়ির পর হাতুড়ি মেরে মেরে, মেরে মেরে... তাতেও নিশ্চিন্ত না হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ওর ঘাড় শুদ্ধ মাথা ঘুরিয়ে দিই।

তারপর গাড়ি থেকে পলিথিন এনে ওকে জড়িয়ে তুলি গাড়িতে। আবার ফিরলাম। ঘরের কলসি লাথ মেরে ভেঙে রক্তের দাগের ওপর জল গড়িয়ে দিলাম। এখানে আমার আঙুলের ছাপ নিতে আসবে কে?

হাতুড়িটা নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ির বুকে গোপা, বুট লক করেছি। তারপর গাড়ি চালিয়ে এসে পথে গাড়ি থামালাম। কাঁটাজুড়ির পথে। পাকা রাস্তায় উঠিনি।

বসে বসে দেখলাম তারা ঘুরে যাচ্ছে, আকাশ ফিকে হচ্ছে। ব্যস, পাকা রাস্তায় উঠে গাড়ি দাঁড় করিয়ে গোপাকে খানিক বয়ে খানিক ছেঁচড়ে লাইন অবধি নিলাম।

সে সময়ে কোনো লরি বা ট্রাক গেলে ধরা পড়তাম। ধরা পড়িনি।

ঝোপের পাশে ওকে আছড়ে ফেলতে মাথাটা সম্পূর্ণ বেঁকে গেল। পলিথিনটা নিয়ে বললাম, সো লং গোপা।

সে সময়ে একটা আশ্চর্য আনন্দ। এত সহজে সব হয়ে গেল? বেশি বিগড়ালে রিমকিকেও আমি কোথাও অন্য কোনো ভাবে...

তারপরে ঘরে ফেরা, ঘরে ফেরা। কলকাতা ফিরে গাড়ির বুট পরিষ্কার। পলিথিন কেটে কেটে খাটের নিচে ঢোকানো, হাতুড়িটা পথেই ফেলে দিই.... তারপর স্নান করে টলতে টলতে ফ্রিজ খুলে কি সব খেলাম।

তারপর ঘুমোচ্ছিলাম।

পরদিন আপনি ফোন করলেন। সে সময়ে আমার বাড়িতে রিমকি।

গোপা আর নেই। তবুও রিমকি বলল ও কানপুরে যাচ্ছে। আর বৈষয়িক ব্যাপারে ভবেন দত্ত কথা বলবে।

দেখুন কপাল। রিমকি নেই, আমি নিঃস্ব নিঃস্ব, তবু গোপার বডি দেখতে যেতে হল আমাকে।

আপনি বলুন। বঞ্চিত স্বামীর ভূমিকায় কি চমৎকার অভিনয় করে গেলাম?

রিমকি যায় যাক। গোপার ব্যাপারটা যদি চাপা পড়ত। তাহলেও বাঁচতাম।

না, রূপা সব উলটে দিল।

আমার শেষ জিজ্ঞাসা বসকে।

আমি ''গোপা নয়'' বলব, কেন বলব তা জানতাম। আপনি কেন বললেন?

মুখ বাঁচাবার জন্যে তো?

সামনে ''নো''—এর উদ্বোধন, ফার্মের বিশাল বিস্তৃতি, এ সবের মধ্যে গোপার ব্যাপারটা জানাজানি হলে চলবে না।

আমার আপনার মুখ বাঁচানো দরকার! তা এদেরকে দয়া করে বলুন। কাদা ঘাঁটলে গোপা ফিরবে না। আপনার কনিষ্ঠাকে বোঝান।

পুলিশে আমার কিছু চেনাজানা আছে, ঝাড়গ্রামের ব্যাপারে তা বুঝেছেন। এখন যাতে আমাদের মুখ বাঁচে কাজের কাজ হয়...

এতক্ষণে বিক্রম কথা বলে।

—সত্যি। কি করলে ঠিক হয়, বলুন তো? আপনার কথা তো শুনলাম।

—ভুলে যান সব। আমাদের কাজ করতে দিন। ঘরে যেয়ে একটা ভালো মেয়েকে বিয়ে করুন। মনেও রাখবেন না কিছু।

—''নো'' বেরোবে?

—নিশ্চয়। নৌকো বোঝাই শুধুই পাপী, সে নৌকো কি ডোবে?

—গোপার ব্যাপারটা?

—ওর খোঁজ চলুক না। খোঁজ চলতে বাধা নেই। অবশ্য এ ক্ষেত্রে....

বিক্রম হঠাৎ লাফিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সুজয়ের ওপর।

সুজয় নিজেকে ছাড়ায়। টেবিল উলটে দেয়। ঝনঝন গেলাস ভাঙে, জাগ।

সুজয় লাফিয়ে বেরিয়ে যায়। দৌড়য়, দৌড়য়, গাড়ির শব্দ।

ঋষি বিক্রমকে ধরে।

—যেও না। ও কোথায় যাবে এরপর?

—কিসের পর?

—সব কিছুর পর?

—পুলিশ কখনো ওদের ধরে?

রূপা বলে। সব যদি ছেপে বেরোয়, আমার রিপোর্ট হিসেবেও, তাহলেও.....

হঠাৎ সবাই চুপ করে যায়।

সুপ্তি বোস বলেন, সুজয় চলে যাচ্ছে। গাড়ির শব্দ। ঋষি। ভাস্বর।

তারপর একই তীব্র তীক্ষ্ন অস্বাভাবিক গলায় বসকে বলেন, সুজয় খুনী, সে সেজন্যে ''গোপা নয়'' বলেছে। তুমি বাপ হয়ে কি জন্যে বললে? কি জন্যে? মুখ রাখবার জন্যে? তুমি তোমার মুখ বাঁচাতে চেয়েছিলে? বলো, বলো। আমাকে বলো। মেয়ের মরামুখ দেখে বাপ হয়ে.....

গলাটা ওপরে উঠতে উঠতে চিরে যায়। রূপা ওঁকে ধরে। আর ঋষি হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে।

—বস।

বস ঢলে পড়ছেন, ঢলে পড়ছেন। শরীর কাঁপছে, মুখের একপাশ যেন বেঁকে যাচ্ছে।

—ভাস্বর। ডাক্তারকে ডাকো।

সুপ্তি অজ্ঞান প্রায়, ধসে পড়েছেন।

বস অবশ, অক্ষম।

ভাস্কর ডাক্তারকে ফোন করে।

বিক্রম উঠে আসে।

—ওঁর বোধহয় স্ট্রোক হয়েছে। শুইয়ে দিন! মাথাটা উঁচু রাখুন। চামচ দিন, মুখ ফাঁক না রাখলে জিভে কামড় বসে যেতে পারে।

চিনু কোথা থেকে ঠাণ্ডা জল এনে বলে, রূপা। তোর মার মুখে চোখে জল দে।

দেয়াল থেকে দেগার ঘোড়ার ছবির ঘোড়াগুলো গভীর আগ্রহে মুখ নামায়। তিব্বতী মুখোশের সবুজ চোখেও গভীর বিস্ময়। যামিনী রায়ের পট থেকে যশোদার কোল থেকে মাথা উলটে গোপাল দেখে গভীর কৌতূহলে। এ ঘরে এমন বিশৃঙ্খলা তো কাচের কেসে সাজানো ড্রেসডেনের পুতুলরাও আশা করেনি।

এবং ডাক্তার এসে পড়েন।

—হ্যাঁ। সামান্য হলেও স্ট্রোক। কয়েকদিন খুব টেনশনে ছিলেন কি? নার্সিংহোম। বেলভিউ।

এ সবের মধ্যে সুজয় ছিল না! ছিল না।

গাড়ি ঘুরিয়ে লোয়ার সার্কুলার। বেরিয়ে যেতে হবে সল্টলেক। আশ্চর্য। মণ্ডল আর চিনু ওকে এখনো দেখছে। দেখে নাও, দেখে নাও।

পথের প্রহরী হঠাৎ লাল আলো জ্বালে।

লালবাতি দাঁড় করায়।

হলুদ বাতি—গাড়িতে স্টার্ট।

সবুজ বাতি—চালাও গাড়ি।

—গাড়ি থামিও না।

গোপা বলে!

—গোপা! তুমি।

—নিশ্চয়।

—না, গোপা নয়।

সুজয় গাড়ির স্পীড বাড়ায়। গাড়ি ও বাসের জঙ্গল থেকে বেরোতে হবে, বেরোতে হবে। হর্ন চীৎকার ভীষণ গণ্ডগোল। রিকশা ছিটকে পড়ে। মিনিবাসের হেলপার আর্তনাদ করে, সবুজ অ্যামবাসাডর দৌড়তে গিয়ে আকাশ চেরা আর্তনাদে একটি লরির সঙ্গে চেপটে যায়! পিষে যায়। হুইল ক্ষেপে গিয়ে সুজয়ের বুক গুঁড়িয়ে ওকে চেপে ধরে।

সুজয় জ্ঞান হারাতে হারাতে সভয়ে দেখে লরি থেকে লোহার রড কাচ ভেঙে ওর মাথা.... ওর কপাল...

ওর চেতনায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। তারপর সব ঢেকে যায় অন্ধকারে।

দু'মাস কেটে যায়।

পথ দুর্ঘটনায় সুজয়ের মৃত্যু এবং ব্রজেন বোসের পক্ষাঘাত জনিত অসুস্থতা যার প্রেসার ছিল না, তার প্রেসারও চড়তে পারে।

বালিগঞ্জ সার্কুলারের বাড়িতে এখন অপার নৈঃশব্দ্য একমাত্র সুপ্তি বোসই নতুন হয়ে ফিরে এসেছেন।

কেননা বস এখন তাঁর ওপরেই নির্ভরশীল।

ভাস্বর বোস, কেজিয়া ও দরানি এনটারপ্রাইজের ''নো'' বেরোচ্ছে, বেরাচ্ছে।

ভাস্বর বোস তাঁর অংশ বিক্রি করে দিচ্ছেন ভাটিয়া ও জো পরাশরকে। বাঙালীদের চেয়ে ওরা ব্যবসা ভাল বোঝে।

ভাস্বরের শালা ''নো'' আপিসে বসছে।

রূপা বিজয়ার চেষ্টায় ও বাড়িতেই ঘরটিও পেয়ে গেছে ফলে ও এখন বেজায় খুশি।

ঋষি থমকে ছিল, বোবা হয়ে ছিল।

বিক্রম বলে, ভালোই হয়েছে ঋষিদা। কেস করলে দাঁড় করানো যেত না।

—কে জানে।

—শুধু মাঝখান থেকে বহু অপচয় ঘটে গেল।

চিনু বলে, কাব্যিক বিচার। পোয়েটিক জাস্টিস। এক নম্বর আসামী নিহত। দু'নম্বর মঞ্চ থেকে আউট।

—ভাস্বর চলে এসেছে শূন্য স্থানে।

—ভাস্বর বস হতে পারবে না। ''নো'' দেখেছ? দুধু ভাতু পত্রিকা। উঠে যাবে।

বিক্রম বলে, ঋষিদার কাজটা গেল।

ঋষি বলে, সে তো গেলই। তবে সেদিন মারদাঙ্গা করে সুজয় আমার চশমাটা ভাঙল। বড় শখের চশমা ছিল।

চিনু বলে, ভ্যান ভ্যান কোর না। বন্ধুর দোকান থেকে চশমা তোমায় করিয়ে দিয়েছি। তা ছাড়া বিক্রম দেখছে বলে রুদ্র অঙ্কে ভালো নম্বর পাচ্ছে। তা ছাড়া সেনদা পিঠাডিহি থেকে যে সব লতাপাতার ওষুধ পাঠাচ্ছে, তা খেয়ে তোমার মা অনেক ভালো আছেন।

ঋষি হাসে।

মনে মনে বলে, গোপা। তুমি চলে গেলে, কিন্তু আমার সংসারটা কত বড় করে দিয়ে গেলে। বিক্রম, চিনু, রূপা। তুমি শুধু দেখে গেলে না।

এরই মধ্যে রুদ্রর জন্মদিন এসে পড়ে। দশ বছর পেরিয়ে যাব বাবা, এবার শুধু জন্মদিন করো। বড় হয়ে গেলে আর কেউ জন্মদিন করে না।

জন্মদিনে স্ক্র্যাবল বোর্ড কিনতে বেরোল ঋষি। আবার পুরনো কাগজে ফিরে যেতে হচ্ছে, পুরনো কাজে, ভালো লাগে না ভাবতে।

স্ক্র্যাবল বোর্ড কিনে ফিরে ঋষি কি অবাক, কি অবাক, তা বলা যায় না।

সিঁড়ির মুখে রূপা। শাড়ি পরেছে বলে খুব অন্যরকম দেখাচ্ছে।

—জন্মদিনের অভিনন্দন ঋষিদা।

—জানলে কি করে? রুদ্র আর আমার এক তারিখেই জন্ম, এ কথা তো কেউ জানে না।

রূপা বলল, মাসিমা?

কমল, বিক্রম, চিনু, বিজয়া, রূপা, অনেক লোক, অনেক লোক। একতলার মাসিমা, মেসোমশাই, কুশল।

ভোঁদাকেও দেখা গেল।

—তুই কি করছিস?

—সার্ভিস দিচ্ছি। দাদা কেটারিং খুলেছে, বউনি তোমার ওপর দিয়ে হচ্ছে।

—ব্যবস্থা করল কে?

রূপা বলল, আমি, কমল....

বড় আনন্দ সন্ধ্যা। রুদ্রর এমন জন্মদিন কোনোদিনই হয়নি। নলিনী আর রানী বলল, বাড়ি এমন গমগম করলে তবে না ভালো লাগে।

খেতে খেতে রূপা একটা খাম এগিয়ে দিল ঋষিকে, খুলে দেখ।

—কি?

—তোমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। ব্রেসনে এখানে আর ইউনিট রাখবে না। আমরাও বম্বে যাব না। আমরা নিজেরা ইউনিট করেই ডকুমেন্টারি তুলব, অনেক কাজ করব, তুমিও থাকবে আমাদের প্রজেকট অফিসার হয়ে। বিক্রম অবশ্য অবৈতনিক পরামর্শদাতা, কিন্তু শাড়ি পরা ভীষণ গোলমাল বাপু সামলানো দায়। —যাক! খুশি হয়েছ তো?

এতদিন বাদে রূপা যখন এই প্রথম খুশি হতে পারে, ঘাড় কাত করে হাসতে পারে, ঋষি বা খুশি হবে না কেন, বিশেষ, ছাপা শাড়ি পরে রূপাকে যখন কেমন যেন গোপার মত দেখাচ্ছে?

ঋষি খুশি হয়েছে। ঋষি হাসে। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে গলা যেন আটকে যায়।

রূপা বলে, আমাদের মধ্যেই দিদিও আছে। যারা ওকে ভালবাসে তাদের মধ্যে।

ঋষি মাথা হেলায়। হ্যাঁ রূপা, সত্যি বলেছ। ভালবাসাই তো শেষ অবধি সত্যি আর ভালোবাসা একশো রকম। সময় থাকতে সবাই যদি বুঝত।

রূপা বলে, আনন্দের দিনে নো বরুডং।

—নো পুডিং বাবা।

রুদ্র চেঁচিয়ে বলে। ও সবটা শোনে নি।

সবাই হেসে ফেলে, ঋষিও।

__

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%