মহাশ্বেতা দেবী
সরমা দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ উঠোনের দরজায় ঘা পড়ল।
—দরজা খোলেন মাসিমা, দরজা খোলেন, আমারে বাঁচান, দরজা খোলেন!
সরমা দরজা খুলতে যাচ্ছিলেন, মিলন দৌড়ে এসে মার হাত ধরল।
—কী করছো?
—কে ডাকছে, অতসী না?
—না, না, চলে এসো।
—মাসীমা! অরা আমার ইজ্জত লইব, দরজা খোলেন, না না, অমন কাজ কইরো না। ছারো, ছাইরা দেও,
বকুদা গো...!
চিৎকারটা হঠাৎ কেটে যায়। পায়ের শব্দ, অনেক পায়ের শব্দ গলি দিয়ে চলে যাচ্ছে। কে গর্জে ওঠে চাপা গলায়, কে বলে, ইজ্জত দেখাচ্ছে!
সরমা বসে পড়েন।
—সর্বনাশ হয়ে গেল মিলন.... অতসীর সর্বনাশ হয়ে গেল।
মিলন, তাঁর ছোট ছেলে মিলন, ঠিক তাঁর বড় ছেলে বকুর গলায় গর্জে ওঠে, সন্ধেবেলা দরজা খুলছো? মেয়েছেলে এভাবে ডেকে দরজা খুলিয়েছে তারপর ডাকাত ঢুকেছে জানো না? গত মাসেই তো....
—কিন্তু, কিন্তু ও 'বকুদা' বলল কেন?
—জানি না। চলে এসো ঘরে।
—মিলন, ও অতসী।
—আমি চিনলাম না গলা?
সরমা শান্ত হন, সংবিৎ ফিরে পান, আঁচল টেনে নেন গায়ে।
—তুমি চেনোনি, কেন না তুমি এখানে থাকো না। সাত বছর ধরে কাজ করছো। খুব কমই আসো এখানে।
ভয় পেয়েছে বলেই মিলন হঠাৎ রুক্ষ হয়ে ওঠে।
—কে আসবে। কেন আসবে! প্রতি মাসে ডাকাতি, খুন পলিটিকস নিয়ে মারামারি, অনন্তপুরের কোন ইজ্জত আছে না কি? দাদার নামে আতঙ্ক... তুমি বলেই পড়ে আছো।
—পালিয়ে যাব? এই বয়সে?
—পড়ে আছো তো বড় ছেলের জন্যে। আমি তো এখানে কেন, জেলাতেই থাকতে চাই না। যে একখানা নাম তোমার বড় ছেলের। খুব চেষ্টা করছি চলে যেতে। আমি কি বহরমপুরেই থাকব না কি?
—কোথায় যাবে?
—কলকাতা, কলকাতা। লিলির দাদার সঙ্গে ব্যবসা করব। বউ কলকাতায়, ছেলে কলকাতায়, আমি একটা মেসে...
কলকাতা তবু সেফ। মফঃস্বলের শহরগুলো...
সরমা, ছেলে কি বলবে তা বলে দিতে পারেন। মফঃস্বলে জীবন খুব বিপন্ন। সর্বত্র সমাজবিরোধী। কলকাতা এখন সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। জেলার তুলনায় কলকাতা নিরাপদ। কলকাতার তুলনায় ব্যাঙ্গালোর। ব্যাঙ্গালোরের তুলনায় লন্ডন। মিলনের বুদ্ধি এই রকমই।
সরমা ছোটছেলের দিকে তাকান।
—কথা বাড়িয়ে লাভ নেই মিলন... চলো, খেতে দিই।
—তুমি কি দাদার জন্যে বসে থাকবে?
কেন, কেন মিলন দাদার কথা তুলে মাকে এমন করে বিদ্ধ কর? আত্মজ বকুও। কিন্তু তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ তো নেই সরমার। মিলন তা জানে, তবু বলে।
—তার জন্যে অনেককাল বসে থাকি না। সে বাড়িতে আসে না, এলেও আলাদা চাবি আছে, ওর ঘরেই চলে যায়। বাড়িতে আসেও কম, খায় না তো বহুকাল...
.... তবু তার জন্যে তুমি এখানে...
সরমা শ্রান্ত গলায় বলেন, চাকরি একটা করি। তোমার বাবার পেনশানটাও পাই ... তার টানে পড়ে থাকি না।
—চাকরি করার দরকার কী?
—নিজের জন্যে। সে তুমি বুঝবে না। লিলি চাকরি করে কেন? তুমি তো অনেক টাকা পাও!
মিলন অবাক হয়ে যায়। লিলি ওর কাছে এমন অনন্য এক মেয়ে, যে লিলির সঙ্গে কারো তুলনা চলে এ মিলন ভাবতেই পারে না। মা যে কী!
শিশুকে বোঝাবার মতো ধীর গলায় ও বলে, মা! লিলি একটা নামকরা বড় ফার্মে রিসেপশানিস্ট। আমার সঙ্গে আলাপ হয় যখন, তখনি ও তিন হাজার টাকা পেত।
—আর আমি একজন ডাক্তারের প্রসূতিসদনের আপিসে বসি, মাইনে পাই চারশো!
—সে কথা নয় মা... সে তো লিলিও তোমার খুব প্রশংসা করে, নিজের মাকে কত বলে, তুমি শুধু দোকানে যাও! হাবিজাবি কেনো আর টিভি দেখো,—দেখো তো আমার শাশুড়িকে। এখনো কি চমৎকার কাজ করছেন, একেবারে স্বাবলম্বী।
সরমা লিলিকে জীবনে বার তিনেক দেখেছেন। লিলির মা, ওষুধ দোকানমালিক লিলির দাদা, এদের একবারও দেখেননি।
কাজ করা মানে স্বাধীনতা। কাজ করেন বলে তাঁকে ছেলেদের ওপর নির্ভর করতে হয় না। মিলন তা বুঝবে না। ওর কাছে লিলির কাজটা 'কাজ', কেননা তাতে টাকা অনেক। সরমার কাজটা সম্ভবত 'অকাজ'।
মনের ভেতরের মনটা মরে গেছে বলেই জানতেন। যেদিন বকু বাসস্ট্যান্ডে গ্যারেজ মালিক লালু সাহাকে খুন করল এবং প্রমাণাভাবে খালাস হয়ে সগর্বে ঘুরে বেড়াতে থাকল, সেদিনই সরমার মনটা নিঃশেষে মরে যায়। বকু নিশ্চয় একজন সমাজবিরোধী।
সে ভাড়া খাটে দাম নিয়ে। ভাড়াটে গুণ্ডা সে, ভাড়াটে খুনী।
অথচ তার কাছেই আসে সবাই। বেশ একজন মাননীয় লোকের কাছে আসছে। অনন্তপুর টাউনের সমাজে বকুর সঙ্গে শত্রুতা করে কেউ টিকতে পারে না। অনন্তপুরে বকু ''বকু বাবু''।
এখানেই তো সরমার মনে যত প্রশ্ন। বকু সমাজবিরোধী। সমাজের শত্রু সে। কিন্তু অনন্তপুরের সমাজে বকু একজন অত্যন্ত দরকারী লোক।
কেন?
কেন তাকে নেতারা মান্য করে? বাপের বয়সী নেতারা বকুর ঘাড়ে হাত রেখে হাঁটে? বকুর দুর্গাপুজো এ টাউনে বিখ্যাত। পয়লা জানুয়ারি বকুর ক্লাবে বিশাল ধুমধাম ফাংশান হয়।
সমাজবিরোধীকে নেতাদের এত দরকার?
সমাজবিরোধীকে পুলিশ এত খাতির করে?
এ টাউনে সরমার মত সুরক্ষিত কেউ নয়। বকুর মা তিনি!
এ সব কথা ভাবেন যখন .... মিলনকে কি বলবেন। এখানে তুই খুব নিরাপদ মিলন। কি এখানে, কি বহরমপুরে বকুর ভাই খুব নিরাপদ।
কেননা ''বকু'' একটি আতঙ্কের নাম।
—কী ভাবছো, মা?
—কিছু না। খেতে আয়। ভোরের বাস ধরবি। তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়।
সরমা আর মিলন এক টেবিলেই বসেন।
খেতে খেতে মিলন বলে, একা থাকো, ভয় করে না? সরমা ক্ষীণ হাসেন।
—বকুর মা—হওয়া এ টাউনে খুব নিরাপদ মিলন। আমার কিছু হবে না।
—আমার। আমার কি ইচ্ছে করে না, লিলিদের নিয়ে ঘুরে যাই? কিন্তু দাদা এমন একটা নাম করেছে ... আমারই ওকে ভয় করে।
—না। বলতে হবে না, বুঝি।
—খবর তো বহরমপুরেও যায়। এর চেয়ে বিয়ে টিয়ে করে... টাকাও তো করেছে।
সরমার মনে হয়, কোন মেয়ের যেন বকুর মত স্বামী না হয়।
তিনি বলেন, রুটিটা নতুন গুড় দিয়ে খা।
—হ্যাঁ..... কী যে হল তখন .... কে ডাকল...
—ডাকল অতসী। এখন ভেবে লাভ নেই। সকালেই জানা যাবে।
—ওরা তো সেই কুলডাঙায় আছে।
সেখানেই।
—বহুকাল দেখি না।
—আমি দেখি, আমার কাছে আসে।
—তোমাকেই বা ডাকবে কেন?
—অনেক কাল ধরে আমাকেই তো ডাকে। আমার কাছে ছিল। আমিই ওকে প্যারামেডিক্যাল পড়তে পাঠাই। আমার কাছে থেকেছে মাঝে মাঝে।
—ওদের জমি নিয়ে তো মামলা চলছিল। মামলায় কী হল?
—জিতেছে, জমি দখল নেয়ার জন্যে ছুটছিল। ওর কথা থাক, আমার ভাল লাগছে না।
—এখন আর আসে?
—তত সময় পায় না।
—না এলেই ভাল। ওর রেপুটেশান তো...
সরমা বলেন, ওগুলো রটনা। যা জানিস না তুই ... ভাসা ভাসা শুনে ... ও রেবতীর মেয়ে!
—যাক গে, আমার আর কী! এমনি জিজ্ঞেস করা!
সরমা বলেন, ও রেবতীর মেয়ে শুনেও তুই.... সে সময়ে রেবতী না থাকলে তোর আর আমার কি হত? অনেক উপকার পেয়েছিস মিলন...
মিলন যেন হতবাক। আসলে মিলন তো অন্য প্রজন্মের ছেলে! উপকার পেলেই তা মনে রাখবে তা মিলন জানে না।
সরমা কি মিলনকে কিছুই শেখাতে পারেননি? কাদের জন্যে সরমা এমন করে লড়াই করলেন?
ভাল কথা, লিলির দাদা আরেকটা ওষুধের দোকান করছেন, আমি পার্টনার হব।
—বললি তো তখন।
—টাকা এখন ওষুধের দোকানে.... বছর খানেকের মধ্যে কলকাতায় ফ্ল্যাট না করি তো... এ বাড়ির দাম এখন কত?
—জানি না। আমি মরে গেলে তোমরা বাড়ি বেচে দিও। তখন দাম জানতে পারবে।
—দাদার সঙ্গে আমি কোন ডিলিংসে যাব না। টাকা তো অনেক করেছে, আমাকে আমার শেয়ার বলে যা দেবে, ক্যাশ চাইব।
—আমাকে শোনাচ্ছিস কেন?
—মা! তোমার সঙ্গে তো দাদা কথা বলে.....তুমি একটা সময়ে যদি বলে রাখো...
সরমা মুখ তুলে তাকাল। মিলনের চোখে কি প্রত্যাশা। মিলন নিরীহ, ভাল ছাত্র ছিল, ভাল কাজ করে। বিয়ে করেছে, বউ ছেলেকে ভালবাসে, বউকে ভয় পায় খুব। এ বাড়ির ভাগ না হলেও ওর চলে যায়। কিন্তু ভাগের টাকাটা ও চায়। আজকাল সবাই চায়, টাকা চায়।
—আমার সঙ্গে ওর কথা হয় কখন, যে বলব? আচ্ছা মিলন! তোর বাবা বাড়িটা করলেন, কত আশা ছিল তোরা থাকবি। বাড়িটা রাখা যায়, এমন কথা তোর মনে হয় না? বেচে দেবার কথাই ভাবিস।
—দাদার মনে হয়?
—বকু তো আমার হিসেবের বাইরে।
—দাদার সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয় মা। তুমি আলাদা। তুমি যতদিন থাকবে, আমি টাকা পাঠাব। আসব, যাব। তবে ভয় তো দাদাকে। আর বাইরে পরিচয় দিতেও লজ্জা করে। লিলিকে নিয়ে এলাম সকালে, সেদিনই দাদা বাস দাঁড় করিয়ে একটা মেয়েকে নামিয়ে.... পরদিন ভোরে আমাকে পালাতে হয়েছিল মা।
—জানি। তোর পালাবার জায়গা আছে ... তুই পালাতে পারিস। আমার জায়গা নেই। বেঁধে মার খাই।
—তুমি চলে আসতেই পারো। আমি তো বলেছি...
—হ্যাঁ, মনে আছে।
—তোমার জন্যেই ছুটে ছুটে আসা....
—তাও জানি। চল হাত ধুয়ে নে।
মিলন হাত ধোয়। রান্নাঘরটা বন্ধই থাকে এখন, বন্ধ থাকে দোতলার ঘর ও ছাত। বারান্দার কোণেই রান্না করেন সরমা। বাড়ি খুব বড় নয়, তবু মনে হয় কত বড়। তাঁর বাড়িতে রাতে কেউ থাকবে না। কোন কাজের লোক।
বকুর বাড়িতে থাকবে কে? কোন ভরসায়? সরমা কি জানতেন, মেয়েদের বিষয়ে ওর এমন হিংস্র লোভ জন্মাবে? মেয়েদের বেইজ্জত করে ও এমন আনন্দ পাবে?
জানতেন না।
অতসীর একদিনের চাপা আর্তনাদ ও মিনতি মনে থাকবে। না বকুদা। তোমাকে আমি 'দাদা' বলেছি।
সে অনেকদিন আগে। সরমা যেন বাঘিনী হয়ে গিয়েছিলেন।
বকুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন, অতসীকে টেনে এনেছিলেন নিজের ঘরে। বকুকে বলেছিলেন, বেরিয়ে যা তুই এ বাড়ি থেকে।
উত্তরে বকু বলেছিল, তোমার বাড়ি? টাকা নিয়েছো, টাকা দাও চলে যাচ্ছি।
—কিসের টাকা?
—কেন, নতুন ঘর তুললে। দোকান ঘর করলে। সে সময়ে অনেক টাকা নিয়েছো।
—টাকা দিইনি?
—যা দিয়েছো, তার চেয়ে বেশি নিয়েছো।
—দেব, বাড়ি বেচে তোর ধার শোধ করব।
বকু হঠাৎ মুখ ঢেকে মুখোশ পরে নিয়েছিল। অন্যরকম গলায় বলেছিল কেন ঝামেলা করছো? অতসী.... অতসীর সঙ্গে আমি ঠাট্টা করেছিলাম!
সরমা দরজা বন্ধ করে দেন। অতসীকে বলেন, সকালেই তোকে পৌঁছে দিয়ে আসব। এ বাড়িতে আসিস না আর দরকার হলে প্রসূতিসদনে যাস।
—হ মাসিমা, তাই যামু।
পরদিন অতসী চলে যায়। অতসীকে কাছে পেয়ে সরমা বড় স্বস্তি, বড় শান্তি পেয়েছিলেন। রাখতে পারলেন না। সারাজীবন খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছেন আর সে খড়কুটো ভেসে গেছে।
এখন একজন প্রৌঢ়া ঠিকে লোক সকালে কাজ করে দিয়ে যায়। সরমা বাকি কাজ নিজেই সেরে নেন।
মিলন হাত মুখ ধোয়। দাঁত মাজে। লিলির শাসন বড়ই কড়া, কোন রকম নড়চড় হবে না। তবু ভাল। মিলন শান্তিতে আছে। লিলির কাছে আত্মসমর্পণেই ওর শান্তি।
—চল শুবি চল।
দরজা বন্ধ করেন সরমা। নিজের ঘরে ঢোকেন। একা শোবার ঘরে পালঙ্কটা খুবই বড়। স্বামী রাত জেগে বই পড়তেন। হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর, অতসী যখন এসে থাকত তখন এখানেই ঘুমোত। সরমার ইচ্ছে ছিল, ক্রমে ক্রমে অতসী এখানেই থাকবে। এখান থেকেই কাজ করতে যাবে। বিয়ে হলেও যাবে—আসবে। কিন্তু তা হতে দিল কোথায়?
মিলন বোঝে না, ওর পালাবার জায়গা আছে। সরমা কোথায় পালাবেন?
বকু আর মিলন যেন দুই মেরুর মানুষ; স্বামীর ছবির দিকে তাকান সরমা। কেন ওরা ওই রকম, কেন বকু বাড়ির টাকা চুরি করত? স্কুল ছেড়েছিল। কেন? ব্যায়াম করত, খেয়ে খেয়ে স্বাস্থ্য ও শক্তি বাড়িয়েছিল। আঠারো বছর বয়স থেকেই সাইকেলের চেন হাতে জড়িয়ে মস্তানি করে বেড়াত।
পুলিশ তুলে নিয়ে যেত।
বাবা ছাড়িয়ে আনতেন।
চেষ্টা কি কম করেছেন? মোটর গ্যারেজে কাজ শিখতে দিয়েছেন, বলেছেন, হাতের কাজ করা খুব ভাল। তাতেও মানুষ খেটে খেয়ে বাঁচতে পারে।
বকু মোটর পার্টস বেচে দিয়ে টাউন ছাড়ে।
সে সময়েই অবনীবাবু বকুকে ফিরিয়ে আনে টাউনে। বলে, সুধন্যবাবু! বকু একটা তরুণ ছেলে। ওদের এ সব দামালপনা হল ফাসটেশানের কারণে।
—কিসের ফ্রাসট্রেশান সার? আমি একটা চাকরি করি, যে ভাবে হক, গ্রামের সম্পত্তি বেচে এ বাড়িটা করেছি ... ছেলেদের পড়াশোনা, খাওয়া—পরা, কোন কষ্ট রাখিনি। এমন নয় যে ওকে সংসার চালাতে হয়।
অবনীবাবু তখন কংরেস রাজনীতি করে। স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্তপুরের যে কোন অবদান ছিল এ কথা কেউই জানত না। অবনীবাবু যে রাজনীতি করত তাও কেউ জানত না। কিন্তু স্বাধীনতার সময় থেকেই অবনীবাবু রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে। স্বাধীনতার বয়স তখন একত্রিশ, অবনীবাবু তখন তিনটে নির্বাচন পার করেছে। সে নির্বাচনে দাঁড়ায় না, নির্বাচন জেতায়।
অবনীবাবু 'র—ফলা' যুক্ত শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। বকুর বাবার কথা শুনে সে ঈষৎ হাসল।
—কিসের ফাসটেশান? দেখুন অল্প বয়সে সকলেরই মনে কোন না কোন ডিম থাকে।
—ডিম?
—স্বপ্ন, স্বপ্ন! আমার আপনার ডিম ছিল বিটিশকে তাড়াব। আমার বাবার ডিম ছিল আমাকে উকিল বানাবেন। মানুষের ডিম থাকে।
—বকু কি বলেছে কিছু?
—ওদের বলতে হয় না। ওদের মুখ দেখেই বোঝা যায়।
হঠাৎ অবনীবাবু জনসভায় বক্তৃতা করার ঢঙে চেঁচিয়ে বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর এত বছর কাটল! যুবকদের চারদিকে শুধু হতাশা আর হতাশা! শিক্ষকরা আদর্শচ্যুত। নেতারা উদাসীন! যুবকদের মনের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে! অথচ যুবশক্তি এখন আসল শক্তি। ওদের কাজে লাগাতে হবে।
সুধন্যবাবু হাত তুলেছিলেন।
—কাজে লাগাবেন? বকুকে?
—ওদের সকলকে।
—কী কাজে লাগাবেন?
রাজনীতিতে জয়েন করুক। টেম্পোরারি হলে হবে না, প্রাণমন দিতে হবে। নেতাজি বলেছিলেন, রক্ত দাও, আমি ফিডাম এনে দেব। আমি বলি, আমাকে মদত দাও, আমি তোমাদের ডিম ফিরিয়ে এনে দেব।
—তা দিন। বকুকে.... আপনি যদি .... বড় ছেলে ... ও যদি সংসারের কথা না ভাবে......
—ভাববেন না।
—কিন্তু গ্যারেজমালিক যে কেস করেছে?
—লালচাঁদ তো? ও আমাদের দলে আছে, ওসব আমি ঠিক করে নেব।
—পুলিশ শুনবে?
—পুলিশকে বোঝাতে হবে। যুবকদের সামান্য অপরাধে কড়া শাস্তি দিও না। তাদের একটা চানস দাও! সে আমি বুঝব।
—বেশ! আমি চলি।
—এখন বাড়িতে কোনও মুখ করবেন না।
—কে ওকে মুখ করে? আমি করি না, ওর মা তো কথাই বলে কম। আর চেঁচিয়ে কথা বলা তার স্বভাবেই নেই। মিলন একেবারেই অন্যরকম।
—জানি জানি, ফাস্ট হয় ক্লাসে। আচ্ছো আপনি আসুন তবে।
সুধন্যবাবু বাড়ি এসে সরমাকে বলেছিলেন, মিলন ছোট, ওর স্বপ্নও অনেক। ওর কথাই ভাবো।
—অবনীবাবু কেন ডেকেছিল?
—সে বকুর ঠিকা নিল। মানুষ ঠিকাদারি করে না? অবনীবাবু ছেলেদের ঠিকা নিচ্ছে।
—বকুকে দিয়ে ভোটের কাজ করাবে?
—যা হয় করাবে। আমি ভাবতে পারি না আর। কেন, কী কারণে বকু আমাকে এমন কষ্ট দিচ্ছে! আমাদের বংশে কেউ এমন ছিল না। তোমার বা কী দোষ, ভেবে পাই না। কর্মফল? কোন কর্মের ফল এটা? কবে কাজে ঢুকেছি। গ্রামের জমিজমা, বাড়ি পুকুর বেঁচে ছেলেদের টাউনে পড়াব বলে টাউনে বাড়ি করেছি। জীবনে বিলাসিতা করিনি. .... কী দেখলে বকু জন্ম থেকে। কী হল তার।
সরমা বলেছিলেন, ভেবো না। যা হবার তা হবে।
—থাকত তেমন আত্মীয় কেউ, পাঠিয়ে দিতাম দূরে।
''দূরে'' বলতে সুধন্য আর সরমা বুঝতেন কলকাতা, বম্বে, দিল্লি, পাটনা। অনন্তপুরে তখন সবচেয়ে দেশ—বেড়ানো লোক ছিল রতন ডাক্তারের ছোট মেয়ে ও জামাই। জামাই রেলে চাকরি করত, পাশ পেত। তাই সপরিবারে ঘুরে ঘুরে বেড়াত। গল্প করত, একবার কন্যাকুমারিকা দেখে আসব, আর রামেশ্বর সেতুবন্ধ। তাহলেই ভারতভ্রমণ পুরো হয়ে যাবে।
সেই রতনবাবুর ছেলেও ডাক্তার। তার স্থাপিত প্রসূতিসদনেই সরমা কাজ করেন।
যা ছিল দূর, তা এখন কাছে।
অনন্তপুরেই কত জনের ছেলে বা মেয়ে এখন লন্ডনে বা আমেরিকায় বা জার্মানিতে থাকে। রতনবাবুর ছেলে প্রদীপ্ত তো ভাইয়ের কাছে কয়েকবার গেল আমেরিকা। আর সরমার যা যা কাছে ছিল, সবই দূরে চলে গেল।
সবচেয়ে অতর্কিতে, বিনা নোটিশে চলে যান সুধন্য। তিরিশ বছর বিবাহিত জীবন তাঁদের। একবারই সুধন্য সরমাকে ছেড়ে থেকেছিলেন।
যখন বাবা—মার পিণ্ড দিতে গয়া যান পাঁচ দিনের জন্যে। নইলে কখনও ছেড়ে থাকেননি সরমাকে।
বড় শান্ত মানুষ ছিলেন, বড় অল্পে পরিতৃপ্ত।
আগে কাজ করতেন ছগনলাল জৈনদের এস্টেট আপিসে। তারপর জমিদারি ব্যবস্থা চলে গেল। ছগনলাল'জৈনরা অনন্তপুরে বাসের ব্যবসা খুললেন, সরকারি কন্ট্রাকটর হলেন, জৈন অ্যানড জৈন আপিসেই থেকে গেলেন সুধন্যবাবু। ছগনলাল জৈনই ওঁকে ঢুকিয়ে দেন ফুড সপ্লাই আপিসে। তখন লোক ঢোকাবার ক্ষমতা ওঁর ছিল। কংরেস দলের ভোটে টাকা ঢালতেন। বিকল্প শাসন চালাতেন।
সরকারি কাজ বছর পনেরো করতে করতেই সুধন্যকে বুড়ো করে দেয় বকু।
বকু ও তার সঙ্গীরা অবনীবাবুর বলে বলীয়ান। বাজার থেকে, দোকান থেকে তোলা ওঠাত।
ওয়াগন থেকে মাল সরাত।
নির্বাচনের সময় গ্রাম থেকে লরি বোঝাই লোক আনত। সর্বদাই ওর পকেটে পয়সা থাকত। টাউনে ঘুরত প্রথমে সাইকেলে, পরে মোটর সাইকেলে, চোখে কালো চশমা পরে।
ফুড সাপ্লাই গুদাম করার ঠিকাদারি যখন অবনীবাবু পেল ছগনবাবুকে টপকে, বকু হয়ে গেল সুপারভাইজার। ওই গুদাম সে সময়ে একটা ভয়ের জায়গা হয়ে ওঠে। ওপার বাংলা থেকে মেয়ে নিয়ে এসে এ শহরে গণিকাপট্টি খোলার কৃতিত্বও বকুর। মেয়েদের ওরা গুদামেও আনত।
এমন কত কাজে বকু পথিকৃৎ। এখন খুন, জখম, মস্তানি, মেয়েদের মাংস নিয়ে কেনাবেচা তো চারদিকে। এ ঢাউনে এ সব কাজে পথ দেখাল বকু।
সুধন্যবাবু যেদিন শুনলেন, পোস্ট মাস্টারের মেয়েকে রাস্তায় টানাটানি করেছে বকু, সেদিন তিনি থানায় ছুটে গিয়েছিলেন!
—আপনারা কী করেন? টাউনে মেয়েদের ইজ্জত নিয়ে এমন কাণ্ড? গ্রেপ্তার করুন দোষীকে।
—আপনি উত্তেজিত হচ্ছেন।
—হব না? আমার ছেলে এতে জড়িত!
—বকুবাবু তো সিনেমা দেখছিলেন।
—কিসের সিনেমা দেখছিল। অন্য ছেলেরাই তো একে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। ওরা বকুকে দেখেনি? এই কিশোর, পার্থ টাউনের ভাল ছেলে এরা মিথ্যে বলবে?
—আপনি বাড়ি যান।
বকু এ সময়ে 'কে, কে রংবাজি করছে?' বলে মঞ্চে ঢুকেছিল এবং বাবাকে দেখে বলেছিল, তুমি এখানে কী করছো? যাও, বাড়ি যাও।
—পাপিষ্ঠ! তুই ক্ষমা চা মেয়েটার কাছে, পা ধর। বকু বলেছিল, কাকে কী বলছো? মেয়েছেলে যদি ওখানে তার লাভারকে মিট করতে যায়, সে বেলেল্লাপনা সওয়া যায়? তোমরা কেন এসেছো ভাই? কেটে যাও, সরে পড়ো। টাউনের ভাল ছেলে তোমরা!
মেয়েটি কাঁপতে শুরু করেছিল। বলেছিল, আমি কোন রিপোর্ট লেখাতে চাই না, আমি বাড়ি যাব।
দারোগা বললেন, এই তো সুবুদ্ধির কথা। এ সব নিয়ে যত কচলাবেন তত তিতো হবে।
পথিক বলল, রীতা! উঠে আয়। এতে লাভ হবে না কিছু।
মাঝখান থেকে—
বকু বলল, ঠিক বলেছিস পথিক।
—তোর সঙ্গে কথা বলছি? বকু, চুপ কর।
কিশোর কিছু বলে না, চেয়ে থাকে। ভ্রূ কুঁচকে, গভীর অভিনিবেশে।
সুধন্যর বুকে শ্মশানের বাতাস বয়ে যায়। এরা তো এক সময়ের ছেলে, মোটামুটি এক বয়সীও। সুধন্যর ছেলে মেয়েদের বেইজ্জত করে, এরা তাকে বাঁচায়। কিন্তু অবাক হয়ে শোনে যে তিনিই বলেছেন, করুক, রীতা নালিশ করুক। আমি সাক্ষী দেব।
দারোগা বলেন, অ্যাকট ইওর এজ মশাই। আপনি জানেন কিছু? ছিলেন ওখানে? ৩৫৪ ধারা প্রমাণ করতে পারবে রীতা? আইনের বোঝেন কিছু?
বকু বলে, বাড়ি যাও, বাড়ি যাও। বুড়ো হয়েছো, বাড়ি গিয়ে হরিনাম করো গে।
—ক্ষমতা থাকলে আমি—ই ... সুধন্য আপন মনে বলে যান নিজেকেই আমরা জানতাম, ছেলেমেয়েকে সম্মান করতে হয় ... সে কারো মেয়ে, কারো বোন... আমি পাপ করেছিলাম কিছু। ও....
মাথা টলে যায় ওঁর।
পথিক বলে, উঠুন মেসোমশাই। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে যাই। কিশোর, রীতাকে বাড়ি নিয়ে যা।
—চল, তাই চল।
বকু চেয়ার টেনে দারোগার দিকে ঝুঁকে বসে।
—লিখিয়েছে কিছু?
—আপনি যান বকুবাবু। আমার কাজ আছে।
—আরে, আমার যে কথা আছে!
বেরিয়ে এসে ওরা সাইকেল রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে থাকে।
সুধন্যবাবু মাথা নাড়তে থাকেন, নাড়তে থাকেন। বিড়বিড় করে বলেন, যুবকরাও নড়ে না। তারা এক হলে কি বকুদের এত দর্প বাড়ে।
কিশোর ক্রুদ্ধ হেসে বলে, যুবকরা ওদের ঠেকাতে একত্র হলে পুলিশ তাদের ধরে মেসোমশায়।
—পারত, তারা পারত। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি বকুকে মেরে জেলে যেতাম ... ভয় পাই। ওর দেহে শক্তি বেশি, আর মন বলতে কিছু নেই...
কিশোর বলে, পার্থ তুই রীতাকে নিয়ে যা। আমার মনে হচ্ছে ওঁর শরীর ভাল নেই...
হঠাৎ অনন্তপুরে বাজারের বাস স্ট্যান্ডে দোকানে আলো, দোকানে রেডিওতে 'জয়মালা' প্রোগ্রামে ''ও দুনিয়াকে রাখওয়ালে'' বাজছে, সাইকেল ও সাইকেল রিকশা চলেছে, এমন মঞ্চে সুধন্যবাবু মাটিতে বসে পড়েন রীতার পা ধরে।
হাহাকার করে বলেন, পাপী শাস্তি পেল না। ওই পাপের জন্মদাতা আমি! তুই আমাকে লাথি মার মা, তুই আমাকে শাস্তি দে, শাস্তি দে....
সুধন্যবাবু খোয়ো—ওঠা বেমেরামতি রাস্তায় মাথা ঠুকতে থাকেন।
লোকজন ভিড় করে, সরে যায়। টাউনের প্রচার ব্যবস্থা খুব পাকা। একঘণ্টার মধ্যেই সবাই জেনে গেছে যে রীতাকে বকু টানাটানি করছিল, কিশোর ও পথিক তাকে উদ্ধার করে ও থানায় নিয়ে যায়। বকুর বাবাও সেখানে গিয়েছিলেন।
দৃশ্যটি নাটকীয় সন্দেহ নেই। লাঞ্ছিতা মেয়েটিকে তাঁরই গায়ে লাথি মারতে বলছেন বকুরই বাবা। পাপ যে করেছে সে পাপীকে শাস্তি দিতে পারো না যখন, পাপীর জন্মদাতাকে লাথি মারো, লাথি মারো...
কিন্তু দর্শকরা এটাও জানে যে ঘটনার নেপথ্যনায়ক বকু; 'বকু' নামের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছুতে থাকা বিপজ্জনক। দর্শকরা সরে যেতে থাকে।
পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে আসেন কমলেশবাবু, জরুরি অবস্থায় জেল খেটে বেরিয়েছেন, অনন্তপুরে তিনশো ভোটে আর এস পি—র কাছে পরাজিত হয়েছে, প্রবীণ, রাশভারি মানুষ।
—কী, কী হয়েছে! সরে যান সবাই।
কিশোর ওঁকে দ্রুত কী বলে নিচু গলায়। তিনি বলেন, তুমি রীতাকে নিয়ে যাও। রিকশা ডাকো, সুধন্যকে ডাক্তারখানায় নাও। এঃ! লোকটা ছেলের কারণে মুখ নিচু করে চলে, খুব সজ্জন!
রীতা নিচু হয়ে সুধন্যবাবুর হাত ধরে।
—উঠুন, উঠুন আপনি ... রক্ত পড়ছে কপাল থেকে ... উঠুন! আপনি কিছু করেননি.... উঠুন!
পার্থ ও কমলেশ সুধন্যকে ডাক্তারখানায় নেয়। রক্তটা বেশিই পড়ছে একটু।
কিশোর রীতাকে নিয়েও রিকশায় ওঠে। আস্তে বলে, আমি তোমাকে ক্লাবে যেতে বলেই ভুল করেছি।
—আমিও ভুল করেছি। আসলে অফিসে ছুটি তো পাই না। ভাবলাম... মাসখানেক দেখা হয় না।
—এখন আর এখানে থেকো না রীতা। ভোরের ট্রেনেই ফিরে যাও। এখানে থাকা আর ঠিক হবে না।
—ভীষণ কথা ছড়াবে কিশোর টাউনে। বাবা বদলি হয়ে গেছে! কিন্তু লোক না এলে যেতে পারছে না। নীতা আর মিতা এখানেই পড়ছে।
কিশোর বলল, ভেবো না। পরীক্ষা দিয়েছি, কাজটা পাবই। কাজ পেলে বিয়ে করতাম, এ মাসেই রেজেস্ট্রি করে নেব।
—নীতা আর মিতাকে একটু দেখো!
—আমি কাজ পেলে ওদের শান্তিনিকেতনেই পাঠাব। দুজনের রোজগার, পারব না?
—দেখা যাক। দু'জনকে হস্টেলে দিলে খরচ আছে।
—বাবাও কিছু দেবে নিশ্চয়। নীতার জন্যে ভাবি না। শক্ত মেয়ে, সাবধানে চলতে জানে। মিতার জন্যে ভাবনা হয়। শরীর বেড়েছে, মন অপরিণত, স্বভাবটাও হয়েছে গায়ে পড়া।
—ওদের বুঝিয়ে বলে যেও।
—বলব। সর্বদাই বলি।
—বকুর মতো ছেলেদের মন তো সহজ পথে চলে না। ও তোমাকে হাতে পেয়ে ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। থানায় ওর বাবা ও সব কথা বললেন....
রীতা বলল, আমরা সবাই কাপুরুষ হয়ে গেছি খুব। ওর বাবা তো অন্যায় বলেননি কিছু.... এ কথা তো সত্যি যে যুবকরাও সত্যি করে এগিয়ে আসে না। যদি আসত, তাহলে বকুরা ভয় পেত।
কিশোর ক্লিষ্ট হেসে বলে, হ্যাঁ। স্বাধীনতার ফলে আমাদের নৈতিকতার বোধও ভেঙে গেছে। সামনে অন্যায় দেখলে পাশ কাটিয়ে যাই, মেয়েদের অপমান করতে দেখলে চুপ করে থাকি।
রীতা বলে, আমার ওপর ওর রাগ থাকল। সে রাগটা নীতাদের ওপর গিয়ে পড়লে...
—এ সব ভেবেও তো চুপ করে যেতে হয়। তবে শহর ছেড়ে যাবার আগে ওকে আমি শিক্ষা দিয়ে যাব।
—তোমার দিদি জামাইবাবু এখানে থাকে না?
—জামাইবাবু তো অবনীবাবুর ডান হাত। সাব ঠিকাদার, চোর একটা। আমি তো যাই না। দিদি কী করে বিয়েটা মেনে নিল? দোজবরে লোকটা। ছেলে মেয়ে আছে....
—মেনে নিতে হয় কিশোর। তোমার দিদির বিয়ে হচ্ছিল না, স্কুলের ক্লার্ক, চাকরি করে বিয়ের টাকা জমাত। দোজবরে হক, যা হক, টাউনে বাড়ি আছে, নদীর ওপারে ধানজমি আছে, সচ্ছল সংসার, অনুগত স্বামী .... সতীশের মেয়ে তো মামাবাড়ি থাকে।
—হ্যাঁ, দিদি চিরকালই মোটা সুখের কথা ভেবেছে। তাই পেয়েছে, সবাই জানে আমার সঙ্গে জামাইবাবুর বনে না। তাই আমি বকুকে মারলে, বকু দিদিদের কিছু বলবে না।
—নীতা আর মিতার কথা ভেবেও তুমি তোমার রাগ সামলে রেখো।
—রাখব।
—মা যদি থাকত। তাহলে অনেক ভরসা পেত বাবা। কী করে জানা যাবে ক্যানসার? ডাক্তাররাই ধরতে পারেনি।
—ক্যানসার তো সর্বত্র।
—শহরে খুব ক্যানসার হচ্ছে?
—শহরে, গ্রামে, সর্বত্র। ক্যানসার ধরেছে সমাজদেহে। নইলে এত নোংরা হয়ে যায় সব?
—বকু? ওকে কবে থেকে দেখেছি! ও কী করে...
রীতা কেঁদে ফেলে এতক্ষণে।
—আমার... নিজেকে.... এমন... অশুচি.... লাগছে....
রিকশা দাঁড়ায়। কিশোর রীতার হাত ধরে নামায়, ভাড়া দেয়।
রীতার বাবা যেহেতু অনন্তপুরে পোস্টমাস্টার, ওঁর বাড়িটা সেকেলে বাংলার অর্ধেক অংশে। বাকি অর্ধেকে পোস্টাফিস। পোস্টাফিসের জন্য নতুন বাড়ি উঠেছে। এই পুরনো বাড়ি নাকি ভাঙা হবে।
—চোখ মোছো রীতা।
—সুধন্যবাবু আমার পায়ে...
—কী যন্ত্রণা পাচ্ছেন উনি। তাই ভাবো!
—যন্ত্রণা, যন্ত্রণা, ভীষণ যন্ত্রণা সরমা?
—কোথায় যন্ত্রণা?
—দেহে নয়। মনে...
কমলেশবাবু বললেন, পার্থ! ওঁকে শুইয়ে দাও, এতটা উত্তেজনার পর...
সরমা সুধন্যবাবুকে ভেতরে নিয়ে যান। কমলেশবাবু বলেন, আমি গেলাম।
—আমিও যাব।
সরমা এসে দাঁড়ালেন।
—কী হয়েছে, বলে যাও পার্থ।
অপ্রতিভ পার্থ বলে, কাল বলব এসে। আজ একটু তাড়াও আছে। ডাক্তার দেখেছে...ওঁর প্রেসার কিন্তু বেশি।
—মাথা ফেটে গেছে?
—না... হঠাৎ মাথা ঘুরে .... আজ আসি।
—যাক। খুব উপকার করলে বাবা।
—আপনি ওঁর কাছে যান।
সরমা দরজা বন্ধ করে স্বামীর কাছে এসে বসেছিলেন। বিচলিত হয়ে চেঁচামেচি তিনি কোনদিন করেন না। আজও মনে আছে, সুধন্য চোখ বুজে শুয়েছিলেন।
—এখন একটু ভাল বোধ করছো?
—ভাল?
সুধন্যর চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল। হতাশ, শূন্য গলায় বলেছিলেন, কাল কী হবে সরমা? কেমন করে মুখ দেখাব শহরে?
—কী হয়েছে?
—পোস্টমাস্টারের মেয়ে রীতাকে ওই গুদামঘরে নিয়ে তুলেছিল বকু। ভাবতে পারো? পার্থ..... কিশোর...... ওরা এসে পড়ল বলে....
—রীতা কে?
বুদ্ধিমতী ভাল মেয়ে রীতা! কলকাতায় টেলিফোন অফিসে কাজ করে। কিশোরের সঙ্গে ভালবাসা ওর। কিশোরও ভাল ছাত্র ছিল। এম এস সি পাশ করে কী সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে, পাশ করবে, কাজও পাবে। কিশোর আর পার্থ এ শহরের ভাল ছেলে। পার্থ তো বহরমপুর কলেজে কাজও পেয়েছে, আসছে মাসে জয়েন করবে।
টাউনের.... ভদ্রলোকের মেয়েদের.... আমি দারোগাকে বললাম, ওকে ধরুন! দারোগা... দারোগা বলল, কী বলব? বকুকে নির্দোষ বলল!
—বকু কি... রীতাকে...
—না... ইজ্জত নিতে পারেনি। এরা ছিল... কিন্তু এরপর? কেমন করে পথ দিয়ে হাঁটব, কাজে যাব, বলতে পার? মিলন বা পড়তে যাবে কী করে?
—তুমি ওষুধ খেয়েছো, ঘুমোও।
—ঘুম আসবে?
একটু কিছু খাও খেলেই ঘুম আসবে।
—খাব না।
সরমা শক্ত গলায় বলেছিলেন, হ্যাঁ, খাবে। খেয়ে ঘুমোবে। একটা অমানুষের জন্যে বাড়িতে আর সবাই কি মুখ লুকিয়ে থাকবে? উপোষ করে মরবে?
—দরজা বন্ধ করো, বকু যদি আসে! সে শুনলে...
—এলে আমি দেখব।
দেখতে হয়নি সরমাকে। বকু সে রাত্রে ফেরেনি। সকালেও ফেরেনি।
বেলা আটটা নাগাদ খবর এসেছিল, মিলন খবর এনেছিল।
—মা! কী হয়েছে শুনেছো?
—কী হয়েছে?
—দাদা... দাদা আর নেপালকে মেরেছে কারা যেন গুদাম ঘরের কাছে।
—মেরেছে?
হ্যাঁ হ্যাঁ, হাত ভেঙে দিয়েছে, এলোপাথাড়ি পিটেছে, ওদের হাসপাতালে নিয়ে গেছে মা! আর অবনীবাবু বলছে, এ নিশ্চয় পার্থদার কাজ।
সরমা নির্বাক।
—আমি হাসপাতালে যাব মা?
—না।
সরমা গর্জে উঠেছিলেন।
—তুমি তোমার কাজ করবে, পড়তে যাবে। বাবার আপিসে বলে যাবে যে বাবা আজ যাবে না, কয়েকদিনই যাবে না, প্রেসার বেড়েছে খুব।
সুধন্য উঠে এসেছিলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিলেন, মেরেছে? পার্থ বকুকে মেরেছে?
—হ্যাঁ বাবা।
—যাক, তা হলে কিছু ভরসা আছে! ছেলেরা সবাই অমানুষ হয়ে যায়নি। খুব ভাল, খুব ভাল!
বেশ কিছুদিন অনন্তপুর গরম হয়ে থাকল। বকুর খবরের জন্যে সরমার মন ব্যাকুল হত। ভাবতে চেষ্টা করতেন, এবার বকু বদলে যাবে।
সুধন্যবাবু শুধু বলতেন, ওই ছেলে কেন এমন হল বলতে পারো? মেয়েদের ইজ্জত নেয়, .... কোন বংশের ছেলে সে? কিছুই মনে রাখল না? শুনেছি, অনেক পাপের ফলে এমন কুলাঙ্গার জন্মায়.....
—তুমি শান্ত হও।
—কেমন করে?
মিলনের কথা, আমার কথা তো ভাববে....
—তোমার কথাই ভাবি।
—যাক, ঘুমাও একটু।
—ঘুম তো হয় না!
সরমার বুকে পাষাণ চেপে বসত। বকুর কথা ভাবলে শিউরে উঠতেন অথচ তার কথা মনে হত বারবার।
অবনীবাবু একদিন সুধন্যবাবুকে দেখতে এলেন। বসলেন, ঘরদোর দেখলেন।
—না, বাড়ি খারাপ নয়, তবে পুরনো ফ্যাশানের।
যেন বকুকে নিয়ে কোন ঘটনা ঘটেনি। যেন বাড়ির দরদাম করতে এসেছেন।
একটু বা বিস্মিত। সুধন্যবাবুর মত সামান্য মানুষ এমন বাসযোগ্য বাড়ি বানাল কি করে?
—এ হে হে, এত চওড়া বারান্দা? আরেকটা ঘর হয়ে যেত।
—ওই আর কি...
—তা, বকুর তো বেরোবার সময় হল।
—কবে বেরোবে?
সুধন্যবাবুর গলা নেমে গেল, চোখ অসহায়।
—হাসপাতাল তো টিটমেন করে ছেড়ে দিত। কিন্তু বকু বাড়ি আসবে.... আমার সঙ্গে একটা, যাকে বলে মিসান্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে আছে... আমার কথাতেই ওখেনে...
—এখানে নয়।
অবনীবাবু জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ হাসি হাসলেন।
—আপনি ও বুঝবেন না.... একটা ফলস কমপেনের ওপর... ছেলেটার ডিম সব নষ্ট হয়ে গেল....
সুধন্যবাবু বললেন, ডিম? স্বপ্ন? মেয়েটার ইজ্জত নেবে, সেই স্বপ্ন ছিল তার? একে আপনি স্বপ্ন বলবেন?
সরমা নিবিষ্ট চোখে অবনীবাবুকে দেখছিলেন।
—আ হা হা, বকু যদি গিলটি হবে, তাহলে ওই মেয়ে কি সোনা? টাউন ছেড়ে ভাগল কেন? ছোঁড়াও তো ভেগেছে।
—আমি শুনতে চাই না।
—নরম হোন। ফরগিভনেস ইজ হেভেনলি। আর... ছেলে তো আপনার দুটো। এ বাড়িতে তার দাবিও আছে।
—কিসের দাবি? বাড়ি ওদের মায়ের। আপনি, আপনি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন কেন?
—আরে, ওরা হল ইউথ। আমরা হলাম... যাকে বলে.... আমি হলাম ডিমার... স্বপ্ন দেখি। এসব ছেলে পুলে.... ফাসটেশান... ওকে বিয়ে দিন।
সরমা এগিয়ে এলেন। স্বামীকে বললেন, তুমি একটি কথাও বলবে না।
অবনীবাবুকে বললেন, বিয়ে দেব বকুর?
অবনীবাবু বললেন, তাই দিন। দেখবেন, বকু ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
তারপর মধুর স্মৃতিতে মগ্ন হয়ে সস্নেহ হাসলেন, আমিও দামাল ছিলাম তো। বাবা কুড়ি না হতে গোয়ালে ঢোকালেন। আমিও বাঁধা পড়লাম।
—আপনাদের জমিদার ঘরে ও সব সাজে। বকুর লেখাপড়া কী, রোজগার কী, স্বভাব কী, যে ওকে মেয়ে দেবে?
—দেবে, দেবে। মেয়ে আছে!
—কে?
—সে আমি ঘটিয়ে দেব। পোস্টমাস্টারের কি একটা মেয়ে?
সরমা মাথা নাড়লেন।
—আমার ছেলে যদি পাত্র হিসেবে আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, আপনি দিতেন?
অবনীবাবু দেঁতো এবং ঠাণ্ডা হাসি হাসলেন।
—বিয়ে হয় সমানে সমানে। যাক গে! বকু বাড়ি এলে যদি এমন অশান্তি হয় .... থাকুক, আমার ব্যবস্থাতেই থাকুক।
সরমা আস্তে বললেন, আমি ... আমি তাকে পেটে ধরেছি.... সে আমার ছেলে! ভাল হক... এই চেয়েছি।
—সে তা বলে না।
—আপনি. .... আপনি টাউনে ধনীমানী লোক ... আপনি কেন বকুকে, ওদের বয়সি ছেলেদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন? কেন সব অন্যায়কে ঢাকছেন? চলে যাবেন না, সত্যি কথা বলুন!
অবনীবাবু তাকালেন সরমার দিকে। ওঁর গলা এখন খুব ঠাণ্ডা।
—আমার দরকার ওদেরকে।
সরমা ফিসফিস করে বললেন, দরকার ফুরিয়ে গেলে?
—তখনকার কথা তখন।
সময়টা অদ্ভুত ছিল।
১৯৭৭—এর নির্বাচনের পর দেড় বছর কেটেছে। সরমা জানতেন না, অবনীবাবু কত তাড়াতাড়ি ভোল পালটে নতুন সরকার সমর্থক হবে। জানতেন না রাজনীতিকদের দরকার হবে সমাজবিরোধীদের আর সমাজবিরোধীদের দরকার হবে রাজনীতিকদের।
জানতেন না, কেন না অনন্তপুর এ সবের সঙ্গে অপরিচিত ছিল। অবনীবাবুই এ টাউনে সমাজবিরোধীদের তৈরি করে। মাথায় তোলে।
'তখনকার কথা তখন' মানে কী?
ব্যবহার করে বকুকে ফেলে দেবে? পুরনো, বরবাদ জুতো বা ছাতার মতো?
বকুর জন্যে উদ্বেগ হয়েছিল কিছুক্ষণ।
তারপর মনে হয়েছিল, 'পোস্টমাস্টারের কি একটা মেয়ে?' বলল কেন? কী জন্যে বলল? পোস্টমাস্টারের তো তিনটি মেয়ে। রীতা কলকাতায় চাকরি করছে। মিতা উচ্চমাধ্যমিক পড়ছে, খেলাধুলায় ভাল। সাঁতারে ভাল, ঝকঝকে মেয়ে। সাজগোজ করে না। বাজে আড্ডা মারে না, মায়ের অকালমৃত্যুর পর সংসার ওই দেখে।
নীতা ক্লাস টেনে পড়ছে। অসম্ভব বাড়ন্ত চেহারা, খুব ঝোঁক সাজগোজের। সিনেমা দেখার, রেস্টুরেন্টে খাওয়ার। বুদ্ধিও কম। পড়াশোনাতেও খারাপ।
—কী করবেন?
—পোস্টমাস্টারকে বলবেন, 'আমার ছেলে বকু হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছে, মেয়েকে সাবধান করুন, সাবধানে রাখুন?'
কেমন করে বলবেন?
কাকে বলবেন? পার্থকে? পথিককে? কী বলবেন?
সুধন্যবাবুকে ছেড়ে যাবেন বা কী করে? ভীষণ, ভীষণ উৎকণ্ঠায় সে রাত কেটেছিল।
সুধন্যবাবু বুঝেছিলেন।
রাতে সেদিন বললেন, একটু সুজির পায়েস করবে? আর দু'খানা রুটি। নয় বেশি করেই করো। মিলনও খাবে। তুমিও খাও।
—খেতে ইচ্ছে করছে?
—খুব?
—নিশ্চয় করে দেব।
মিলন বাড়ির ভাবগতিক দেখে চুপ করে থাকত, মাথা গুঁজে খেত। বাপের কাছে বসত, হঠাৎ যেন বড্ড বড় হয়ে গিয়েছিল ছোট বয়সেই।
সরমা বললেন, মিলন! একটু সুজি আন বাবা। একটা দুধের কৌটো।
খেতে বসে মিলন বলেছিল, আজ নেমতন্ন, মা?
—হ্যাঁ রে। ভাল করে খা।
—মা! একদিন লুচি আর ছোলার ডাল করবে?
—নিশ্চয় করব। তোর বাবা ভাল হলে মন্দিরে পুজো পাঠাব, লুচি ভোগ দেব, সব করব।
সুধন্যবাবু বলেছিলেন, আর মিলন ফার্স্ট ডিভিশানে পাশ করলে আমি ওকে ঘড়ি দেব।
বেশ সহজভাবে খাওয়াদাওয়া হল। বাসন কোসন তুলে সরমা শুতে গেলেন। সুধন্যবাবু বললেন, শুয়ে পড়ি আজ। ক'দিন তো গেল! সরকারী চাকরি বলে চাকরি যায় না। নইলে এমন কামাই...
—এত বছরে একদিন কামাই হবে না?
—ভাবছি আমিও চাকরি করব। ম্যাট্রিক পাশ। ঘরে বসে থাকব কেন?
—দূর। স্বামী স্ত্রী দুজনে বাইরে কাজ করব?
—অনেকেই করছে। পার্থ বহরমপুর কলেজে পড়াবে, আর ও যাকে বিয়ে করবে সেই অনিন্দিতা তো বহরমপুর গার্লস কলেজেই ঢুকেছে।
—লেখাপড়াই সব সরমা!
—সত্যিই তাই।
—মিলনকে নিয়ে দুঃখ ভোলো।
সরমা নীরব।
—সব কি আর হয়?
—আর না, ঘুমোও।
—বাড়ি কিন্তু তোমার।
—জানি।
—এটাই তোমার সম্বল।
—তুমিই তো আছো।
—হ্যাঁ.... আছি... ঘুমোও।
সরমা আলো নেভালেন, শুলেন, কিন্তু ঘুম তো আসে না। সুধন্যবাবুর প্রেসার এভাবে বেড়ে যাবে, রাস্তায় ঘুরে পড়বেন, কবে ভেবে ছিলেন?
সেদিন রক্ত দেখে ভয় পেয়েছিলেন। ডাক্তার বললেন, রক্ত পড়ল বলে বেঁচে গেলেন। ব্রেন হেমারেজ হলে.....
সরকারি আপিস এখন, চাকরি যাবে না, সেটা সহকর্মীরা দেখছে। কিন্তু সুধন্যবাবু উঠবেন কবে?
—টাউনের বাড়ি বেচে দিয়ে, কুলডাঙার দিকে সস্তায় বাড়ি করে নিলে ... মিলনকেও সারগাছি রামকৃষ্ণ হস্টেলে রাখা যায়....।
সুধন্যবাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন।
সেই ভাল, সেই ভাল। সরমা যেন ভেসে যাচ্ছিলেন বর্ষায় ভরা গঙ্গার স্রোতে। ভাসতে ভাসতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ যেন পায়ের নিচে মাটি পেলেন। কুলডাঙাতে বাড়ি তো কম খরচেই করা যাবে। সুধন্যবাবু না হয় বাসেই যাওয়া আসা করবেন। মিলন হস্টেলে থাকবে। সেখানে 'বকু' শুনে চমকে উঠতে হবে না।
সরমা সকালেই সুধন্যবাবুকে বলবেন কথাটা।
কিন্তু রাতের পর কেমন সকাল এসেছিল?
ভোরবেলাই দরজায় ধাক্কা, পার্থ চেঁচাচ্ছে, বকু! বকু! বকু!
আমরা জানি তুই লুকিয়ে আছিস!
সরমা দরজা খুলে দিলেন।
ক্রুদ্ধ, বন্য, বর্বর গলা পার্থর। সঙ্গে অনেক লোক।
—বকু কোথায়?
—বাড়িতে আসেনি।
—আমরা দেখব।
সরমা সরে দাঁড়ালেন। দেয়ালে হেলান দিয়ে নিথর, মুখে আঁচল। মিলন ভয়ার্ত চোখে তাকাচ্ছে।
—বাবার কাছে যা!
ওরা ওপরে উঠে যাচ্ছে, ঘর দেখছে, ছাত। পার্থ চেঁচিয়ে চলেছে, বেরিয়ে আয় বকু! তোকে খুন করে আমি ফাঁসি যাব! বেরিয়ে আয়!
সুধন্যবাবু কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসেন। সরমা দৌড়ে গিয়ে ওঁকে ধরেন।
পার্থরা নেমে আসছে।
—কী... কী হয়েছে পার্থ?
পার্থ ঘুরে দাঁড়ায়। ওর চোখ মুখ এমন হিংস্র, ক্রুদ্ধ, নির্দয়।
—মিতা, পোস্টমাস্টারের ছোট মেয়ে ... সোনালীতে সিনেমা দেখে ফিরছিল। বকু ওকে তুলে নিয়ে গেছে কাল রাত সাড়ে ন'টায়।
—তার...পর....?
—আজ নদীর পাড়ে মিতার লাশ পাওয়া গেছে। রেপ করে খুন করে গেছে তাকে।
—ধর্ষণ ... খুন....?
—হ্যাঁ, আপনার ছেলে। চল তোরা, ওই অবনীবাবু সরিয়ে দিয়েছে। আজ ছাড়ব না... সব জ্বালিয়ে দেব। থানাতে লাশ যাবে।
ওরা বেরিয়ে যায়।
সুধন্যবাবু চেঁচাতে যান, গলা আটকে যায়। তারপরই মাটিতে ভেঙেচুরে ঢলে পড়েন। অনেকটা বমি করে অজ্ঞান হয়ে যান।
মিলন চেঁচিয়ে ওঠে, বাবা!
—আপিসের সত্যবাবুকে ডাক মিলন, বাবাকে তুলতে হবে খাটে। বল, ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনতে।
—বাবা নড়ছে না, মা!
—যা, যা! দাঁড়াস না।
মিলন চলে যায়। উদভ্রান্ত এক কিশোর পথ ধরে ছুটে যায়, সত্য কাকা! সত্য কাকা!—ওর চিৎকার কিছুক্ষণ শোনা যায়।
আবার সব নিঃশব্দ। সকালে মধ্য রাতের নৈঃশব্দ্য। সরমার কোলে সুধন্যবাবুর মাথা। সরমা আঁচলে সযত্নে বমি মোছান। সুধন্যবাবুর শরীর আবার কেঁপে ওঠে। আবারও বমি। সরমা মুখ মোছান।
গয়লা ঢোকে পা টিপে টিপে। ভয় পাচ্ছে? এ বাড়িতে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে? মিতার কথা নিশ্চয় শহরের এদিক থেকে ওদিক অবধি সবাই জেনে গেছে।
—মা!
সরমা মুখ তুলে তাকান। গয়লার চোখে করুণা, উদ্বেগ। ও নাড়ে, মাথা নাড়ে।
—এক ঘটি জল আর গামছাটা দেবে শরণ?
বাবুজি... ছি ছি ছি ... ছোট খোকা কোথায়?
—আমি তো ওঁকে তুলতে পারব না। মিলন সত্যবাবুকে ডাকতে গেছে।
শরণ দুধের ঘটিটা রান্নাঘরে রাখে, জোরে শেকল দেয়। তারপর বলে, আমি তুলে দিচ্ছি ঘরে।
—তুমি পারবে?
—পারব।
শরণ সুধন্যবাবুকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়।
সরমা তাড়াতাড়ি আলনা থেকে একটা কাপড় টেনে নিয়ে বমির ওপর ফেলে দেন। বলেন, সাবধানে শরণ, পা সামলে!
বাসি বিছানাতেই শোয়াতে হয়। মশারি টেনে খুলে ফেলেন সরমা, জানলা খুলে দেন। গামছা ভিজিয়ে সুধন্যবাবুর মুখ, কপাল গা মোছাতে থাকেন।
—বাতাস করেন, বাতাস করেন মা! বাবু ঘেমে যাচ্ছেন।
সরমা বাতাস করেন, আর ঝুঁকে পড়ে বলতে থাকেন, শোনো। মিলন সত্যবাবুকে ডাকতে গেছে! সত্যবাবু ডাক্তার আনবে! শোনো! মিলন....
সত্যবাবু, ডাক্তারবাবু, কমলেশবাবু। কমলেশবাবু বলতে বলতে ঢোকেন, পার্থ এ কী করল? ইশশ! সেদিনই পথের মধ্যে... আমি প্রেসারটা দেখাতে এসেছিলাম ডাক্তারের বাড়ি....
ডাক্তার বলেন, টর্চ আছে?
মিলন টর্চ দেয়....
চোখ দেখেন। নাড়ী দেখেন। তারপর বলেন, মাথায় যন্ত্রণার কথা বলেছিলেন কি?
সরমা মাথা নাড়েন।
—ঘুম হচ্ছিল?
—না... সেদিন থেকেই ....
—হাসপাতালে নিতে হবে।
—কী হয়েছে?
ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকাল। তরুণ ডাক্তার, টাউনে এসেছেন বছরখানেক। অনন্তপুরে ডাক্তারদের পয়সা খুব।
—মানে... মনে হচ্ছে মাসিভ সেরিব্রাল হেমারেজ। বাড়িতে কিছুই হওয়া সম্ভব নয়।
কমলেশবাবু বলেন, হাসপাতালে যাবে কী করে? হাসপাতালে তো অ্যাম্বুলেনস নেই।
সরমা বলেন, রিকশায়।
—না না, ঝাঁকি লাগবে।
—তবে?
সত্যবাবু বলেন, গোপালবাবুর গাড়িটা দেখি, সে তো ভাড়া দেয়?
সরমা লাজলজ্জা ভুলে বলেন, তাই করুন, তাই করুন....
—মিলন যে বড্ড ছোট....
কমলেশবাবু বলেন, ওঁর বা বয়স কী!
—পঞ্চাশ হয়নি....
সরমা স্বামীর দিকে চেয়ে থাকেন। স্বপ্ন ছিল অনেক সুধন্যবাবুর ... অনেক স্বপ্ন ... মামাবাড়িতে অবহেলা অনাদরে মানুষ সরমার বিয়ে হচ্ছিল না। সুধন্যবাবু বিয়ে করে নিজের পরিবারে অপ্রিয় হয়ে যান। দেশের ঘরবাড়ি জমিজমা বেচে অনন্তপুরে বাড়ি করলেন, উৎসাহ দিয়ে সরমাকে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করালেন। সর্বদা বলতেন, পাড়াগাঁয়ে বড় হলে মন বড় সংকীর্ণ হয়। ছেলেরা টাউনে পড়বে সরমা, সুযোগ সুবিধা কত!
সুধন্যবাবুর কাছে আধাগ্রাম—আধাশহর অনন্তপুর ছিল মস্ত টাউন। বহরমপুর, কৃষ্ণনগর ছিল বিগ টাউন। কলকাতা ছিল মেট্রোপলিস।
স্বপ্ন ছিল অনেক.... বাইরের দিকে দুটো ঘর তুলে নেবেন ক্রমে ক্রমে... টাউন ডেভেলপ করবে, দেখো সরমা, জমি—জায়গার দাম বাড়বে... চোখ পড়ে বাইরে তুলসী মঞ্চের ওপর। সুধন্যবাবু নিজের হাতে করেছিলেন মঞ্চটা। তুলসীর বাতাস খুব ভাল।
সত্যবাবু গাড়ি আনেন। বলেন, মানুষ অবস্থা বিচার করে না... আরে পঁচিশ টাকা চেয়ে বসলি, মানুষের অবস্থার সুযোগ নিতে আছে? বৌঠান, আপনি যাবেন?
—যাব, মিলনও যাবে।
—চলুন তবে।
—আপনারা গাড়িতে যান, আমি নয় রিকশায়... টাকা পয়সার ব্যবস্থা...
কমলেশবাবু বলে, না! মিলন বাড়ি বন্ধ করে যাক, আমি দাঁড়াচ্ছি। আপনি যান... বউমা! নিরীহ মানুষই যত কষ্ট পায়... কিন্তু পার্থ এ কী করল! এখানে...
সরমা মাথা নাড়েন। পার্থ কোন অন্যায় করেনি। বকুকে খুঁজতে এসেছিল। বকু! তাঁর বড় ছেলে। তাঁর গর্ভজাত সন্তান। পঁচিশ বছরের ছেলে বাপ—মার ভরসা হতে পারত। পার্থ দোষ করেনি।
দোষী সুধন্যবাবু, দোষী তিনি।
তাঁদের সন্তান সমাজদেহে একটা ক্যানসার।
অথচ জ্ঞানত সরমা ছেলেদের কোন প্রশ্রয় দেননি, আদর দিয়ে বাঁদর করেননি।
হাসপাতালের একদিকে জনতার জটলা, ভিড়। সরমা তাকান না। ওরা মিতাকে এনেছে। নিশ্চয় ময়না হবে।
সকলের মাথা ওঁদের দিকে ঘুরে যায়।
আস্তে আস্তে জনতার গলা নেমে আসে।
কে বলে, কার পাপের শাস্তি কে পায় দেখ!
পার্থর ক্লান্ত গলা, চুপ কর হিমু।
হাসপাতালে সুধন্যবাবু। সরমা ও মিলন বাইরে বেঞ্চে।
আপিসের আরও কে কে আসে। সত্যবাবু এগিয়ে আসেন, আপনারা বাড়ি যান বৌঠান। স্নান করে কিছু খেয়ে টেয়ে আসুন।
—উনি?
—মাথার ভেতরে, মানে ব্রেনে হেমারেজ তো.... আমরা আছি তো। আপনারা ঘুরে আসুন।
—টাকা লাগবে তো!
—পরে। পরে হবে। এখন যান। বাড়িতে থাকবে এমন কেউ আছে?
—কে থাকবে?
—যাক গে, যান।
সরমা বলেন, চল মিলন। যাবার সময়ে রামের মাকে ডেকে নিয়ে যাবি। ঘর দোরটা...
মিলন উঠে দাঁড়ায়। বাড়িতে বাবা নয়, মা'র কথাই চলে চিরকাল। মায়ের ওপর অপার ভরসা মিলনের। দশ বছরের বড় দাদার সঙ্গে ওর কোন আদানপ্রদান নেই কোনদিন।
রামের মা বলল, আপনের লগে যাইত্যাছি, কিন্তু আর কাম করতে পারতাম না মা!
—আজ ঘরদোরটা সেরে দিয়ে যাও।
—পোলা নিষেধ করত্যাছে। আপনে বা কী করবেন, বাবুর মতো মাইনষের কপালে এমুন শাস্তি... হা রে ভগবানের বিচার! কার দোষে কারে শাস্তি দিলা!
হ্যায় কী করছিল?
তালা খুলে ঢোকেন সরমা। রামের মা বলে, আপনে ছান করেন, পোলারে দেন, নিজে মুখে দেন! আমি দুধ জ্বাল দিয়া দিত্যাছি।
বাসি বিছানা তোলে রামের মা। ঘরদোর মুক্ত করে। কাপড় চোপড় ধুয়ে দেয়। সরমা মিলনকে বলেন, দুধ পাউরুটি খা মিলন।
—ওপরে যাচ্ছো কেন?
—ঘর বন্ধ করব। তুই জানালাগুলো বন্ধ করে দে।
যন্ত্রের মতো পরপর কাজ করে যান সরমা। কত বয়স হয়েছিল মিতার? পনেরো না তার কম? শুনেছিলেন, ওই মেয়ে বুদ্ধিতে খাটো, দেহে বাড়ন্ত। রীতা তো ভাল ছাত্রী, কলকাতায় কাজও করছে। মেজ মেয়েটি না কি খুব ভাল খেলাধুলোয়, ব্যায়ামে। ওদের মা তো গেলেন অকালে ক্যানসারে।
কাউকে চেনেন না সরমা। পোস্টমাস্টারকে একদিন বাজারে দেখেছেন মাত্র। সরমা দোকান বাজার করেন, সংসার দেখেন, মিলনকে চোখে চোখে রাখেন। ওঁর চেনাশোনার পরিধিও ছোট।
টাউনের সুপরিচিত হোমিওপ্যাথ ডাক্তার রতনবাবুর প্রথম পক্ষের মেয়ে অসীমা ছাড়া বন্ধু বলতে কেউ নেই। অসীমা অকালে বিধবা, তাঁর সঙ্গেই প্রাইভেটে ম্যাট্রিক দেয়। টাউনে স্বামীর তৈরি নিজের বাড়িতেই 'কল্যাণ সংঘ' করেছে। মেয়েদের সেলাই শেখায়। পুজোর মণ্ডপে প্রতি বছর মেয়েদের তৈরি খাবারের দোকান দেয়। সরমা এক সময়ে 'কল্যাণ সংঘে' যেতেন। আর যান না বকু বড় হবার পর।
দরজা বন্ধ করে সরমা দেয়ালে গাঁথা ছোট সিন্দুক খেলেন। টাকা শ'তিনেক। এতে কী হবে? তাঁর গয়না অবশ্য আছে। মামা—মামি দেখতে পারতেন না। দিদিমা মায়ের ষোল ভরি সোনা দিয়েছিলেন সরমাকে। নিজের কানের মুক্তো ফল। সুধন্যর কাকিমা সোনা বাঁধানো লোহা আর একটি সরু চেন দেন। সুধন্যর মায়ের গয়না সরমা পাননি। সোনা বেচতে হলে বেচবেন।
সুধন্য ভাল হয়ে উঠুন। কিছু করতে হবে না সুধন্যকে। সব সরমা করবেন।
এ বাড়ি বেচবেন।
কুলডাঙায় বাড়ি করবেন।
মিলন আর সুধন্য আর সুরমা।
—মা, চলো।
—চল।
—তুমি কিছু খেলে না?
—একটু দুধ খাই।
বাড়ি বন্ধ করে তালা দেন দরজায়।
—মা... দাদা যদি আসে?
—আমি আছি, ভাবিস না।
তারপর হাসপাতাল। প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা। রাত শেষ হয় হয়, নার্স দৌড়ে এল।
—তোমার বাবা?
—হ্যাঁ....
—এস... জল দাও।
সরমা মিলনের হাত ধরে নিয়ে গেলেন।
সুধন্যর জ্ঞানও আসেনি, চোখও খোলেননি। সকালে সেই আপিসের লোকেদেরই খবর দিতে হল।
আর ঘণ্টাখানেক বাদে পার্থ মিলনকে নিয়ে এল। মিলনকে বলল, বাবাকে বাড়ি নিয়ে যাবে?
সরমা ওর দিকে তাকালেন।
দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। পার্থ মাথা নামিয়ে বলল, আমার.... মাথার ঠিক ছিল না...
তারপর যেন সেন্টিমেন্টকে প্রশ্রয় দিতে চায় না, এ ভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে নরম, ক্ষমাপ্রার্থী গলাতেই বলল, বাড়ি নিয়ে যাবেন?
সরমা মাথা হেলালেন। বাড়ি থাকতে হাসপাতাল থেকেই শ্মশান কেন?
আমরা নিয়ে আসছি। আপনি চলুন।
—মিলন ছুঁয়ে থাকুক।
—ঠিক আছে, মিলন আমাদের সঙ্গে যাবে। আপনি .. দাঁড়ান, একটু দেখি।
বাইরে চলে যায় ও। কাকে কী বলে। বলে, খবর দিয়ে এলাম... তা এমন বিপদের সময়ে...
—এই তো এসে পড়েছি।
অসীমা? এখানে?
সরমার মাথা আর কাজ করছে না।
অসীমা বলে, পার্থ ছুটতে ছুটতে গেল বলে জানলুম... তা ওঠো সরমা, বাড়ি চলো।
—উনি?
—ওরা নিয়ে আসবে। চলো। ইশশ। এভাবে... মিলনের বাবা...
অসীমার সঙ্গে বাড়ী এসেছিলেন। আগের দিন সকালে উঠেছেন। চব্বিশ ঘণ্টা কেটে গেছে। কিন্তু সরমা তখনও ভেঙে পড়েননি। কী যেন তাঁকে চালাচ্ছিল। ভীষণ কড়া হাতে চালাচ্ছিল। মিলনের মুখ? তাঁর গভীর একাকীত্ব? কী?
সব জায়গার মতো অনন্তপুরেও মড়া পোড়াবার একজন থাকে, অন্তত অনেক কাল ছিল, গুনু দত্ত। ছেলেমেয়েদের ব্যায়াম করাত, ক্লাবের ছেলেদের নিয়ে মড়া পোড়াতে যেত। গুনু দত্তই সুধন্যবাবুকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করল।
বাড়ি। পাটভাঙা জামা ও ধুতি, চশমা। মিলনকে নিয়ে ওরাই গেল। যাবার সময়ে সরমা বললেন, মিলন সব করবে।
—হ্যাঁ, সে আমি দেখব।
তখন তো সরমা জানেন না যে বকু পালিয়েছে কেষ্টনগর। কেষ্টনগর থেকে কলকাতা। অসীমাই শ্মশানযাত্রীদের জন্য নিমপাতা, আগুন, মিষ্টি, সব ব্যবস্থা করলেন। অসীমা বললেন, একেবারে একা!
—কে থাকবে আর?......
—আজ নয় থাকলাম, কাল...
—না না। তুমি চলে যেও।
রামের মা এসে পড়ে। সে কাঁদতে কাঁদতে ঢোকে এবং ভগবানের একচোখো বিচারকে অনেক গালাগালি দেয়। গয়লা, মুদি, সাইকেল রিকশা চালক, কতজন এসে দাঁড়ায় ও রামের মা অতীব যোগ্যতার সঙ্গে তাদের সঙ্গে পাবলিক রিলেশন করে যায়।
—পোলায় তো কইয়াই খালাস? আমি কই, বাবুর মতো মায়ের মতো মানুষ হয় না কি? ভাইগ্য দোষে অমুন পোলা হইছে। আগে তো আছিল না... কী বা হইল... বাবুর কথা কী মিষ্টি! মা ভিন্ন ডাকে না, এট্টা ফরমাজ করে না....
পরে সরমা শুনেছিলেন, সুধন্যবাবুর চিতা নিভতে না নিভতে অনেক, অনেক লোক মিতার মৃতদেহ বয়ে এনেছিল।
পরদিন অসীমা, চুল ছাঁটা, বলিষ্ঠ চেহারার একজন মেয়েকে নিয়ে আসেন। বয়স বছর তিরিশ হবে। অত্যন্ত শক্ত মজবুত হাত পা। পরনে সেমিজ ও কাপড়। ধারালো চোখ, কালো মুখে কালো ভুরু, ঠোঁট পাতলা, সর্বদা টিপে থাকে। পরে, হাসলে দেখেছিলেন দাঁত ঝকঝকে।
—রেবতী। ওর কথা পরে বলব। এখন ও তোমার কাছে থাকুক।
—কী করবে?
খাবে, থাকবে বাড়ি পাহারা দেবে। নরসিং লেঠেলের নাম শুনেছো?
—শুনেছি বোধ হয়।
—বিখ্যাত লেঠেল ছিল। রেবতী ওর ভাইঝি। জ্যাঠার কাছে মালকোঁচা মেরে লাঠি শিখেছিল। নরসিং কাকার কাছে এক সময়ে গুনুদারাও লাঠি শিখত। শোন সরমা, পরে কথা হবে। তোমার আর মিলনের একা থাকাটা আমার ভাল লাগছে না। রেবতী থাকুক, পাহারা দেবে। রেবতী, তোমাকে তো সব বলেছি।
—হ, শুনছি সব।
—তোমাদের স্বজাতি, কায়স্থ।
—আর জাত, অসীমা!
—আমি চলি। রেবতী ওর মতো ফুটিয়ে নেবে। তোমাদের তো হবিষ্যি চলছে এখন। কাজ কবে?
—ও—ই, এগারো দিনে।
এর মধ্যে বকু আসবে কি না, এই চিন্তায় সরমা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলেন, যদিও বকুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছিল না।
মনে মনে ভাবছিলেন, থানায় ডায়েরি করবেন।
রেবতী ওঁর কাছে মেঝেতে বসে সুপুরি কুচোচ্ছিল। মিলনও মেজেতে বসেছিল।
—এত সুপুরি কি হবে মাসী?
জীবনেও মা—বাবা ছাড়া কাছে পায়নি কাউকে। তাছাড়া সেদিন থেকে আজও মিলনের স্বভাব, ও নিজে কিছুর মধ্যে যায় না। অন্যে দায়িত্ব নিক, ও আজ্ঞা পালন করে চলবে। প্রথম জীবনে মা (দাদাকেও পায়নি এবং এক বাড়িতে থেকেও); এক ছোট্ট ইনটারভ্যাল রেবতী মাসি; তারপর ওর শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুবর্গ ; তারপর থেকে লিলি।
—রেবতীর ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য, কর্মক্ষমতা দেখে মিলন আশ্বস্ত। ওর দরকার শক্ত থাম। যাতে হেলান দেবে।
—এত সুপুরি?
—কামের দিন মানুষজন আইব। পান দিতে লাগব। লও, সইরা বও। কামের দিন তক সাবধানে থাকবা। তোমার হাতে অন্নজল লইব বইলা তিনিও হুতাশে আছে। তুমি তারে মুক্তি দিবা। ইশশ! কী বা বয়েস!
সরমার মনে হল, সুধন্যও তো যেতেন না। বাঁচার কত ইচ্ছে না ছিল। বকু, বকুই পিতৃঘাতী। হায়! এ হত্যাও তো হত্যা। সরমা কী করবেন?
—লন, আপনারা দুধ খই খাইয়া নেন।
—তুমি রোজ রোজ মিষ্টি আনচো কেন?
—অসীমা দিদি দিয়া গেছে আমার কাছে।
—দরকার বা কী?
—দেহে শক্তি না রাখলে পারবেন কী কইরা। নিজেরে নিজে না দ্যাখলে কেও দ্যাখে না রে মা! এক্কেরে খাটি কথা! মিলন আছে না?
—হ্যাঁ .... খাই.....
—অহন আপনের উপর
মিলন খেয়ে শুয়ে পড়ে। প্রতিটি দরজা জানালা বন্ধ কি না আবার দেখে নেয় রেবতী। নিজে রুটি তরকারি খায়। তারপর রান্নাঘরে তালা দিয়ে ঘরে এসে নিজের বিছানা পাতে। মশারি টাঙাতে টাঙাতে বলে, মিলন ঘুমাইছে?
—হ্যাঁ, ও তো শুলেই ঘুম।
আপনেও চক্ষু বোজেন। চিন্তা করবেন না। আপনের বরো পোলা টাউনে ঢুকব না।
সরমা নির্বাক।
—অহন ঢুকলে পাবলিক কাইটা ফালাইব।
সত্যি বলছো?
—হ দিদি।
সরমা মনে মনে বলেন, তাই ফেলুক। সুধন্য মরে যাবেন, মিতা মরে যাবে, মিতার বাবা আর বোনরা বাকি জীবন জ্বলবেন, সে কেন বেঁচে থাকবে? মরে যাক, সরমা শোক করবেন। চলে যাক দূরে কোথাও, সরমা জানবেন তাঁর একটা ছেলে, যার নাম মিলন।
কিন্তু ঘুম আসে না। বকু কেন এমন হল? ... কেন?
অনন্তপুরে পরপর অনেক ঘটনা ঘটে যায়।
মিতার হাতে 'বকু' লেখা রুপোর তাবিজ সহ চেন হার ছিল, নখে ছিল চামড়া ও মাংস। বকুর অপরাধ এড়াবার কোন উপায় ছিল না।
বকু ধরা পড়ছে না এই আক্রোশে মানুষ ফুঁসছিল। অবনীবাবুকে ঘেরাও করেও কোন উত্তর মেলেনি। হঠাৎ একদিন, সুধন্যবাবুর শ্রাদ্ধের আগেই, অবনীবাবুর গুদামঘর জ্বলে যায়।
জ্বলে যায় তাঁর গ্যারেজ ঘর।
অবনীবাবুর বাড়িতে বোম পড়ে।
কমলেশবাবুর নেতৃত্বে এক বিশাল জনতা মিটিং করে ও থানা ঘেরাও করে ও. সি—কে চব্বিশ ঘণ্টা টেবিলে বসিয়ে রাখে।
অনন্তপুর—কাটোয়া লাইনে অবনীবাবুর বাস লুঠ হয়, জ্বলে যায়।
বকুর সাগরেদদের চোলাই ঠেক জ্বলে যায়। সাগররেদরা নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যায়।
এস. পি—র কাছে ডেপুটেশনে যায় শহরবাসী। আর কে জানে কার কলকাঠি নাড়ার ফলে সর্বাধিক বিক্রিত বাংলা দৈনিকে অনন্তপুর নামক আধাশহরে রাজনীতিক ও সমাজবিরোধীর অশুভ আঁতাত বিষয়ে নিজস্ব সংবাদ বেরোয়। তাতে বালিকা ধর্ষণ ও হত্যা খুবই হাইলাইটেড হয়। বকুর কীর্তিকলাপ, তার আদর্শনিষ্ঠা, সমাজসেবী স্বাধীনতা সংগ্রামী পিতার পুত্রের কীর্তি শ্রবণে তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগের খবরও বেরোয়।
ফলে যে তুফান ওঠে তা সামলানো কঠিন হয়। নির্বাচিত সদস্য ও বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী এর তদন্ত, অপরাধী গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তি দাবি করেন। তিনি অনন্তপুর চলে আসেন এবং জনসভায় ঘোষণা করেন, জনগণের সরকার রাজনীতিতে সমাজবিরোধীর অনুপ্রবেশ সহ্য করবে না, করবে না।
অবনীবাবুর সঙ্গে তিনি কথাই বলেন না এবং ও. সি—কে বলেন, আপনি পাবলিকের সারভেন্ট। আপনার মতো অফিসাররাই আমাদের ইমেজ নষ্ট করছে চক্রান্ত করে।
ও. সি. সাসপেন্ড হয়।
নতুন ও. সি. আসে।
এত কিছুর পর বকু কলকাতায় গ্রেপ্তার হয় ও বহরমপুর জেলে আনীত হয়।
জেলের মধ্যেই অন্য কয়েদীরা বা কেউ বা কাহারা বকুকে নির্মল আনন্দে মারে। এ সব খবর সরমার কাছে সবই পৌঁছয়, পরের ঘটনা আগে বা আগের ঘটনা পরে।
মিলন ও তাঁর মধ্যে কোন কথা ব্যতীতই একটা বোঝাপড়া হয়ে যায়, উনি বলেন না 'বকু'। মিলনও বলে না 'দাদা'। অথচ এ বাড়িতে সেও ছিল একদিন।
এখনকার বকু ছিল?
অন্য কোন বকু ছিল?
সুধন্য চলে গিয়ে বেঁচে গেছেন। পরের পরিণতি কি তিনি সইতে পারতেন?
রেবতী একদিন বলে, নূতন পোস্টমাস্টার আইল না তবুও পোস্টমাস্টারবাবু চইলা গেল।
—চলে গেলেন মানে?
—কলকাতায় অগো কে আছে, গেল! মাইয়া লইয়া গেল, বাবু আর কামও করব না।
সরমা নির্বাক।
—বরো মাইয়া কলকাতায় কাম করে... এই আর কি!
—হ্যাঁ। পরিবারটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
—তাগো অবশ্য রেহাই নাই। কেস যহন চলব, অগো আইতে হইব।
—ভাবতে পারি না রেবতী, ওদের কথা...
—আমি তা আশ্চজ্য মানছি আপনাগো দেইখা। কী বংশে কী পোলা ... হয়, এমুন হয়....
—কেসে... কিছু... হবে?
রেবতী ঈষৎ হাসল।
—এই কেসে কুন—অ—দিন কিছু হয় নাই। হইবও না। মাইয়া মরে, কলঙ্ক হয়, আসামী ছাড়া পায়!
—যদি কোথাও চলে যেতে পারতাম....
—দিদি, তো কয় আপনাগো নাই কেউ....
না, কেউ নেই।
রেবতী কোন অতীত স্মৃতিতে অবগাহন করে। অনেক দূরে চলে যায়। তারপর ফিরে এসে নিশ্বাস ফেলে বলে, আপনজন কি আপনজন হয় সগলার ভাইগ্যে। আপন থ'নে পর ভালো, পর থ'নে বন ভালো—কথায় আছে, সে কি মিছা?
যাবেন কোথায়? কোথাও কেউ নেই তাঁর। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে কতকাল সম্পর্ক নেই। তারাও না কি দেশের বসবাস তুলে দিয়ে রানাঘাট লাইনে পায়রাডাঙা গেছে, আর ভাগীরথীর ভাঙনে দেশঘরও গেছে। সরমার মামাবাড়ি তো তখনি কোন সম্পর্ক রাখেনি বিয়ের পর। শুনেছিলেন এক মামাত বোনের বিয়ে হয়েছে বেলডাঙায়, সেও শোনা কথা।
—রেবতী, তুমি থাকবে তো?
—থাকার কথা তো দিদি বলে নাই। আর, আপনের বিপদের সময়, দিদি থুইয়া গেল, আমার কথা আপনে জানেনও না।
—কী কথা?
—দিদির কাছে শোনবেন।
অসীমার কাছেই শুনেছিলেন সরমা।
সেটা কোন সাল? যে সালে সুধন্য মারা যান, মিতা ধর্ষণ ও খুন হয়, অনন্তপুরে আগুন জ্বলে, মন্ত্রী বলে যান, সমাজবিরোধীকে রাজনীতিতে ঢুকতে দেব না?
উনিশশো আটাত্তর সাল ছিল, আটাত্তর। এই তো সে বছরই রতন ডাক্তারের দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে প্রদীপ্ত ডাক্তারি প্র্যাকটিশ করতে করতে 'প্রসূতিসদন' প্রতিষ্ঠা করল।
অসীমাই জমিটা দিয়েছিল ভাইকে। সরমাকে বলেছিল, ছেলেপুলে নেই, সম্পত্তি নিয়ে কী করব? আমার বাড়িটা কল্যাণ সংঘকে দেব। জমিতে ও প্রসূতিসদন করুক।
অসীমার স্বামী অনেকটা জমি কিনেছিলেন। বহরমপুর তিনঘণ্টার বাসপথ, কে জানত অনন্তপুর হঠাৎ এমন কুলীন হবে, জমির দাম বাড়বে?
অসীমার সে সব জমি তো প্রদীপ্তই কেনে। দিদিকে বলেছিল, দেশ বেড়াও, আনন্দ করো। তীর্থে যাও। অসীমা সেই তীর্থভ্রমণে গিয়েই মারা যায়। প্রসূতিসদনের পাশে নার্সিং হোম, ওষুধের দোকান, প্যাথলজি ও এক্স—রে ক্লিনিক। টাউনের ওদিকটাই বাড়ছে।
আটাত্তর সালে তো ভবিষ্যত দেখতে পাননি সরমা। অসীমার হাত ধরে বলেছিলেন, রেবতী কী আমার কাছে থাকতে পারে না? বাড়ির একজন হয়ে?
—ওর জীবনের কোন কথাই তুমি জান না।
—অবশ্য, টাকা আমি ওকে কী বা দিতে পারব।
অসীমা নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন, টাকা আমিও দিই না। রেবতী বছরে আট হাজার টাকার ধান বেচে সরমা, চার হাজার টাকার সরষে। ভাগ্য মেরেছে ওকে। নইলে ওর জেল খাটার কথা নয়।.... চমকে উঠলে?
—জল খাটবে কেন?
—তেজি মেয়ে। দেওরের গলায় কোপ দিয়েছিল। বলি তা হ'লে...
রেবতীর জ্যেঠা নরসিং দত্তের জমিজমা ছিল কুলডাঙায়। রেবতীকে ওই মানুষ করে, বিয়েও দেয় কুলডাঙায়। স্বামী ভাল, চাষবাস করে। ওদের একটা মেয়েও হয়। রেবতী অকালে বিধবা হল। তারপর ও জ্যাঠার দেওয়া নিজের জমি, নিজের ঘর নিয়েই থাকত। লোক দিয়ে চাষ করাত।
আজ ওর বয়স তিরিশই হবে। বিধবা হয়েছিল বিশ বছরে। ওর জ্ঞাতি দেওরের নজর পড়ল ওর ওপর। অমন বয়স। এক ঢাল চুলও ছিল। বাবা কত বললেন, সব বেচে দিয়ে টাউনে চলে আয়। রাজি হয়নি। কুলডাঙা থেকে নরসিংহ দত্ত নামটা মুছে যাবে? জেদি, তেজি, একরোখা মেয়ে। চরিত্র নিয়ে কেউ একটা কথা বলতে পারেনি।
এই দেওর কুমতবলবেই ঢুকেছিল। রেবতী ওর গলায় কোপ দেয়। তারপর মেয়েকে কাঁধে বসিয়ে, রক্তমাখা দা নিয়ে নিজেই থানায় যায়।
—খুব সাহস তো!
—রেবতী অসামান্য মেয়ে।
—তারপর?
অসীমা হেলান দিয়ে বসেন ইজিচেয়ারে। বলেন, বয়স হচ্ছে, বুঝতে পারি।
—তোমার আমার একই বয়স।
—তবু ভেঙে গেছি। তুমি শক্ত আছো, অসীমা বলে। সরমা বিষণ্ণ হাসেন।
—যাকে দেখার কেউ নেই, তাকে শক্তই থাকতে হয় অসীমা। তোমার তো আমার অবস্থা নয়। আর আমার অবস্থা যেন শত্রুরও না হয়।
—মিলনের পনেরো হল?
—হ্যাঁ। দশ বছর তফাৎ দু'জনের।
—মিলনের পড়াশোনার ক্ষতি হবে।
—সংগতি থাকলে হাতে পায়ে ধরে ওকে বিনোদপুরে রামকৃষ্ণ মিশনে দিতাম।
—তুমি তো পেনশান পাবে একটা। নয় চাকরি।
—দেখি! রেবতীর কথা বলো।
—বলি।
কেস হয়েছিল। যদিও রেবতী নিজেই আত্মসমর্পণ করে। রতনবাবু বহরমপুরের দুঁদে উকিল লাগিয়েছিলেন। ফলে রেবতীর মাত্র দু'বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। আর ওর শ্বশুরবাড়ির গুষ্ঠি রেবতীর জমিজমা ঘরদোর নিতে পারেনি।
—আমাদের তো জমিজমা কুলডাঙাতেই। বাবা লোক রেখে সব সামলে রাখেন।
—ওর মেয়ে?
—অতসী আমার কাছে। নরসিং জ্যাঠা ভালবাসার সম্পর্কে আমারও জ্যাঠা। রেবতীর দায়িত্ব বাবাকেই দিয়েছিল জ্যাঠা। তাই আমার বাবা ওর কাকা, আমি ওর দিদি। এ সব গ্রাম সম্পর্ক কয়েক পুরুষের।
একেবারে পদ্মাপারের কথা বলে!
—ওদিকেও ঠাকুর্দার জমিদারী ছিল। নদীর ভাঙনে সব যেতে ওদের এনে বসবাস করান। মুখের ভাষা ছাড়বে কেন?
—জেল খাটতে হল।
—শুনে মন শিউরে উঠছে?
খুনী মেয়েমানুষ দেখেননি আগে। তবু শিউরে ওঠেননি সরমা। ইজ্জত রাখার জন্য খুন করেছিল রেবতী।
মিতার ইজ্জতও গেল। সে খুনও হল। রেবতীকে কেমন করে অপরাধী ভাববেন সরমা?
সরমা মাথা নাড়েন।
—না, শ্রদ্ধা হচ্ছে।
—জেলের পরই তীর্থ ঘুরে এল। মাথার চুল কাটল, কুলডাঙা যায় মাঝে মাঝে। তা ও তো থাকবে না সরমা। যাবে আসবে, আমার কাছেও আসে যায়। ওকেই জিজ্ঞেস করি।
রেবতী ঘরে ঢুকল।
—বেত্তান্ত শোনলেন?
—শুনলাম।
—কেমন বোঝলেন?
—তোমার মতো মেয়ে যদি ঘরে ঘরে হত, তাহলে কাজের কাজ হত।
—কী ক'মু? ইজ্জত লয় পুরুষ, কলঙ্ক হয় মাইয়ালোকের। আর জেলে যা দেখছি! বিচার হয় না। মাইয়া যদি নালিশ করে, তাগো আটক রাখে। আপনের পোলাও আজ নয় কাল খালাস পাইব, দেইখা নিয়েন।
সরমা শিউরে উঠে চোখ মুখ ঢাকলেন।
অসীমা বললেন, থাক রেবতী!
বকু সগৌরবে খালাস পায়নি।
অবনীবাবুও জান লড়িয়ে দেয়নি বকুর জন্যে, টাউনে জনমত এতই বিরুদ্ধ ছিল। অবনীবাবুর ওপর খুব ভরসা করেছিল বকু। তখন অবনীবাবু বলে পাঠায়, আমি কী করব? এমন করে গুছিয়ে নিলাম। ওর জন্যে সব ল্যাজেগোবরে হয়ে গেল। আমার ওপর ইনজাস্টিস হল সেটা দেখছে না?
অবনীর বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ডেভিড ধনুর্ধর দাশ, 'মডেল' নামে পরিচিত। কেন না তার কুঞ্চিত বাবরি চুল, ওপর পাটির দাঁতের স্বাভাবিক বেরিয়ে থাকা, বিশাল পাকানো গোঁফ, ইত্যকার কারণে তাঁকে মডেল করেই নাকি শারদীয়া মহিষাসুর বানানো হয় বলে টাউনে গল্প চালু আছে।
একদা সে খুবই খেপে যেত এবং কমলেশবাবুকে নালিশও করেছিল। কমলেশবাবু ওকে দীর্ঘকাল দেখছেন। ওর দাদাকে জানতেন।
তিনি বুঝিয়ে দিলেন, এ তো বিরাট সম্মান হে! মহিষাসুর যদি তোমাকে দেখে তৈরি করে, সেটা তো সম্মান।
অবনীবাবু তেতে বলেছিল, একেকবার একেক ফিলিমের মেয়ে স্টারের মুকের মডেলে দুগ্গার মুখ তৈরি হয়। তা অ্যাকটেসরা কি নালিশ করে? কমলেশবাবু রাজনীতি করে, সাচ্চা লোক, ঠিক বলেছে।
মডেলের বিশেষ ক্ষমতা বাহুবল এবং ওর মগজ এক মেশিন বিশেষ। আজকের সময় হলে ওর মগজে কম্প্যুটার বলা যেত। এখন আমরা কম্প্যুটার মগজ বিশিষ্ট শিশুর খবর কাগজে পড়ি। কিন্তু এ লাইনে অন্যতম পথিকৃৎ মডেলের নাম কেউ মনে রাখেনি। যা শোনে, তা ও কয়েকদিন বাদেও নির্ভুল বলতে পারে। অবনীবাবু দাবড়ে উঠল।
কী ভাবছো?
—এত ব্রেন নিয়ে চাশশো বিশ হয়ে থাকলাম! বাবা মাস্টার, দাদা, ভাই, বোনটা অবধি শিক্ষিত। লেখাপড়া শিখলে কাজে লাগত।
—বেন দিয়ে কিছু হয় না মডেল! শুধু ফাসটেশান! লেখাপড়া তো সবাই শিখছে। পাচ্ছে চাকরি? যাক গে, শোন যা বলি। বকুকে সব বলবে। আরও বলবে, তার জন্যে আমি ফাসটেশান। এত করে চল্লিশ বিঘে জমি ভেস করতে দিলাম! ভোটে টাকা দিলাম, গাড়ি দিলাম! যা ভেবেছিলাম, সব নষ্ট করে দিল বকু। পরের ইলেকশানে চানস নেব, সে আর হবে না। বকু আমার ডিম নষ্ট করল।
—যাগ গে, বলুন!
অবনীবাবু বলে যায়। সবার শেষে বলে, বকুর বাপ—মাকেও বলিহারি যাই! ছেলেকে বাঁচাবার জন্যে মা কোন চেষ্টা করল না। বাপটাও ছিল বেয়াড়া। বাড়িতে ভালবাসা পেলে ছেলেটা অমন হত?
সগ্যত লোকের নামে কিছু বলবেন না।
—বেশ! তবে শোন! দেখতে গেলাম। বললাম, ছেলের বিয়ে দিন! মা বলল, আসপদ্দা শোন! মা বলল, আপনার তো মেয়ে আছে। বকুর হাতে মেয়ে দিতে পারবেন? বলাটা আস্পদ্দা নয়?
—আস্পদ্দা কেন? বকুর হাতে মেয়ে দেবার চেয়ে মেয়েকে কোপ মেরে নিকেশ করা ভাল। আপনি বলছেন, আমি যাব। কিন্তু হাতে পেলে আমিই ওকে....
মডেল হাতের পেশী ফোলাল। বলল, রেপ করবে, খুন করবে, এ কি মাজাকি?
—আমারও তো সেই কথা। এখন ওকে মদত দেব, কোন ভরসায়? টাকার লসটা ভাবো তো? বাস! গুদাম! ও ভেবেছে কী?
—বহরমপুর যেতে যেতে পশশু।
—কাল যাও না।
—না, কাজ আছে।
দেখো!
—বড় মেয়েকে বেইজ্জত করল, তখন তো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রোটেকশান দিলেন!
—ওদের পিটিয়েছিল কে? তুমি?
—আমি পিটিয়েছিল কে? তুমি?
—আমি ধরলে ওরা বাঁচত? দেখছিলাম .... দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
—দেখছিলে!
—দেখার জিনিস, দেখব না? আপনার পেয়ারের বকু! সেদিন তো পায়ে পড়ছিল ওদের। ছোঃ।
—বকু এদিকে আমাকে সমানে খবর দিচ্ছে!
—আপনি ছাড়া ওর আপনজন কে?
—না, না, তোমরা আমার .... তোমরা আগে, বকু পরে। এ তুমি জেনে রেখো।
—ওসব বাতেলা ছাড়ুন দাদা। আমাদের সার্ভিস যখন নেবার তখন নিয়েছেন। এখন বকুকে তুলছেন।
—তোমাকে তো.....
—হিসেব করবেন। যা দিয়েছেন, তার দশগুণ পেয়েছেন। যাক গে! যেদিনে যাব বলে দেব।
বকুকে সবই বলে মডেল।
—দাদা তোমায় প্রোটেকশান দিতে আসবে না। এখন হাওয়া খুব খারাপ! দাদা হাত বাড়ালে টাউন তাকে শেষ করে দেবে। তোমার ঢোকাও বিপদ। দাদার পলিটিকসের বারোটা বাজিয়েছো তুমি।
—সরকারও ক্ষেপে আছে, নতুন এস. পি—ও। কাগজে যাচ্ছেতাই, সভা—মিছিল—মিটিং! তোমাকে শাস্তি দেবেই। মন্ত্রী এসেছিল, বিধানসভায় কথা উঠেছে। তোমাকে বাঁচাতে যাবে না দাদা।
—গুদাম জ্বলেছে, নতুন 'রামেশ্বরী' বাস জ্বলেছে, দাদার বাড়িতে বোমা পড়েছে, দাদার টাউনে থাকতে হলে তোমাকে উকিল দেয়াও সম্ভব নয়।
বকু হাত তোলে, কিছু বলতে যায়। কিন্তু মডেল পালটা হাত তোলে ও আঙুল বাঁকায়। বকু চুপ।
—দাদা বলেছে, এখন তোমার জেলখানাই ভাল। জেল খেটে বেরোও। গরমেন্টের এখন যেমন ট্যাঁ ফোঁ আছে, পরে এত থাকবে না। হাওয়া ঠাণ্ডা হবে, মানুষও ক্রমে ভুলে যাবে। তখন দাদা তোমায় দেখবে, ব্যস! যা যা বলেছিল সব বলে গেলাম।
বকু ফিশফিশ করে বলে, জামিন পাব না!
—জানি না।
—তুমি কিছু বলো!
—আমি? তোমার বিষয়ে? সিধে কথা বকু! আমি তোমায় হাতে পেলে জেল অবধি পৌঁছতে না।
—বুঝলাম।
—বোঝোনি, বোঝো।
—আমার জায়গায় পড়লে.....
—পড়তাম না। আমি বড়বোনকে টেনে নামাইনি, সে ঘটনা দেখে আমার বাপ বড় রাস্তায় সন্নেস হয়ে পড়ে যায়নি। আমি পনেরো বছরের বাচ্চার ইজ্জত নিয়ে তাকে খুন করিনি। আমার কীর্তি শুনে আমার বাপ মাথার শির ছিঁড়ে মরেনি। যা করেছি তা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসে। জেনে রাখ হারামি, আদালত তোকে ছেড়ে দিলে আমি তোকে মারব।
মডেল বেরিয়ে যায়।
বিদেশ সরকার (বকু নিজে এফিডেভিট করে বিক্রম নাম বদলেছিল) ওরফে বকু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মামলা আদালতে ওঠে ১৯৭৯ সালের গোড়ায়।
সব কিছুর পরেও অবনীবাবু বকুকে হাত ধুয়ে ফেলে দিতে পারছিলেন না। যাদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে, সেই তরুণ প্রজন্মকে তিনি স্বপ্ন ফিরে দেবেন, প্রথম নির্বাচনের পর বাতাস তেমন ছিল না। যাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, তারা তাঁর দ্বারে প্রার্থী হয়ে আসবে এমন কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না।
তবু বকুকে বুঝতে দেয়া দরকার যে অবনীবাবু তাকে ভোলেনি। একটি উকিল দেওয়া দরকার। সরকারি উকিল কী খেলা করবে, তা কে জানে।
কিন্তু উকিল দেবে কী করে?
না দিলেও নয়। মডেল যে সব কথা বলছে যেমন গলায় বলছে, তাতে তাকে কতটা হাতে রাখা যাবে, কতদিন হাতে রাখা যাবে?
হ্যাঁ, দিতে পারে বকুর মা।
সে রাজি হলে বলা যাবে, আমি নাচার। ছেলে যেমন হোক, মা যদি কেঁদে কেটে বলে যে দেখুন! ছেলের যেন ভয়ানক শাস্তি না হয় আমি দেখব না?
সরমার চাপা ঠোঁট, চোখে কঠিন তাচ্ছিল্য মনে পড়ল। তবু চেষ্টা করতে কষ্ট নেই।
যাবে কে?
মডেলকে পাঠানো যাবে না।
নিজে যাবে অপমান হতে?
রতনবাবুর মেয়ের কাছে যাবে? অবনীবাবু রোগেভোগে রতনবাবু, নয় প্রদীপ্ত ওদের কাছেই যায়। বড় মেয়ের ভালই বিয়ে দিয়েছিল, বিধবা হল। সেই যে খুনে মেয়েছেলেটা, সেও তো ও বাড়ির এক পুষ্যি। রতনবাবুর মেয়েই তাকে দিয়েছে বকুর মার কাছে।
না, বড়ই কানাকানি হবে। তার চেয়ে কথাটা চারিয়ে দিয়ে দেখা যাক।
এ সব ভেবেই অবনীবাবু রতনবাবুর বাড়ি যায়। কিন্তু কাকতালীয় যোগাযোগ, রতনবাবু সরমাকেই দেখছিলেন। অবনীবাবু বসে পড়ে এবং কথাটি পাড়ার সময় খোঁজে। সরমার মুখ দেখে মনেও হয় না অবনীবাবুকে চেনেন।
দরকারটা নিজের। তাই অবনীবাবু বলে, আপনি বকুর জন্যে উকিল দিতে চান? দেখব?
সরমা মুখ ফিরিয়ে বলেন, না!
কিন্তু...
সরমা বলেন আমি আপনার কাছে যাইনি। আপনি কেন আমাকে .... এ অবস্থায়....
—আসেন দিদি, আমার লগে আসেন।
রেবতী সরমাকে ভিতরে নিয়ে যায়। রতনবাবু শুকনো গলায় বলেন, তোমার কী হল?
—এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম.... তাতেই....
শরীর কিছু খারাপ নয় তো?
—না... তেমন কিছু নয়....
—তাহলে এসো আজকে। আজ রোগী অনেক। নদীর ওপার থেকে, এদিক থেকে.. একেক দিন...
লক্ষণীয় এই, তারপরেও অবনীবাবু উকিল দেবে ঠিক করেই বাড়ি ফেরে। রেবতী বলেছিল, মেয়েদের ইজ্জত নিলে আদালতে 'ধর্ষণ' প্রমাণ করা যায় না। ধর্ষণের আসামীর সাজাও হয় না।
বকুর জামিন হয়নি। সে নিজেও জামিন নিতে চায়নি।
সাইকেল রিকশা চালক বলেছিল, তার রিকশায় মিতা বসেছিল, বকুবাবু মটর সাইকেল চালিয়ে এসে রিকশায় ধাক্কা মারে বটতলার সামনে।
—তারপর কয়, তোর বরো বুনের ত্যাল বারছে। তরে দিয়া তগো ত্যাল ভাঙ্গুম!
মিতাকে হিঁচকে তুলে নেয় মটর সাইকেলে, গাড়ি ছোটায়। প্যাডলার পড়ে গিয়েছিল, উঠে প্রাণপণে রিকশা চালিয়ে পালায়।
সে কারো কাছে যায়নি? বলেনি?
না, বলেনি। বকুবাবুরে অরা ডরায়। হ্যায় আইসা জবরদস্তি টাকা তুলে পেডলার পিটায়। থানায় বইলা কিছু হয় না। হেয়ার লিগ্যাই অহনে পার্টি পেডলার ইউনিয়ান বানাইছে। অরা অবনীবাবুর ইউনিয়ানে আছিল, অহন নূতন ইউনাইনে যাইব।
সরকারি উকিলের মন্তব্য, রিপোর্ট করা উচিত ছিল, রিকশাচালক বোঝে না।
তয় কোলোনির হকল পেডলার জানে। ও জনায় জনায় কইছে হকলে জানে। এ কথাও অ কইত না, সাওস আছিল না। কিন্তু আদালতে ডাকছে, পার্থবাবু হকল লিখ্যা নিছে, না আইলেও বিপদ। যার নিজের রিকশা নাই, তেমুন পেডলারের সবেতেই বিপদ।
বকুই যে মিতাকে তুলে নিয়ে যায়, এ কথা বটতলার পান দোকানিও বলে।
মিতার দেহে কৌমার্য অটুট ছিল ধর্ষণাবধি, ডাক্তারের রিপোর্ট।
মিতা যে বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল, নখে লেগে থাকা চামড়া ও মাংসে তার প্রমাণ মেলে।
'বকু' লেখা পদক ও চেনহার আরেকটি প্রমাণ।
'ধর্ষণ' বিষয়ে এখনও অপরাধ প্রমাণ ও অপরাধীর শাস্তি খুব গোলমেলে ব্যাপার। তবে মিতা শহরের সরকারি অফিসারের নাবালিকা মেয়ে, ধর্ষণের পর হত্যা ব্যাপারটি জনতাকে ক্রুদ্ধ করে বেশি।
মিতার দেহে ছেঁড়াফোঁড়া ব্লাউজ, অন্তর্বাস ছিল। দেহের নিম্নাঙ্গ অনাবৃত। কাপড়ের এক প্রান্ত ওর গলায় পেঁচিয়ে বাঁধা ছিল। এবং মাটিতে হেঁচড়ানোর দাগ দেখে বোঝা যায় ওকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
একজন ধর্ষণকারী, না একাধিক? মার্ডার না কালপেবল হমিসাইড অ্যামাউন্টিং টু মার্ডার? অপরাধীকে সাহায্য করে অন্ধকার। উল্লেখিত মটর সাইকেল রাতের পর দেখা যায়নি। এখন প্রমাণিত, রোড কন্ট্রাকটর ভগবান দাসের ওয়ার্কসাইটের গুদামের পেছনে ওটা আছে। হেড কুলীর বক্তব্য ও দুশো টাকা দিয়ে ওটা বকুবাবুর কাছে কিনেছে।
সরকারি উকিল প্রাণপণ লড়ে যান। তারিখের পর তারিখ পড়ে।
তারপর ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে বকুর নয় বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড হয় না। মিতার গলার হার, কানের দুল, হাতের চুড়ি ইত্যাদি পাওয়া যায়নি। বকুই খুন করেছে, না অন্য কেউ মিতাকে পড়ে থাকতে দেখে সেগুলো নেবার জন্যে....?
রায় বেরোলে পার্থরা খুশি হয় না। রীতা বলে, যা হয়েছে এতটাও আশা করিনি। রীতাই কলকাতা থেকে আসত বারবার। ওর বাবা শারীরিক কারণে একবারও আসতে পারেনি।
শেষদিন রায় বেরোলে রীতা পার্থকে বলে আর আসব না পার্থ।
—আমাদের ত্যাগ করবি?
—তা কখনও হয়? তবে এদিকে আর নয়।
—ন'বছর চাক্কি পিষুক!
রীতা বিষণ্ণ হেসে বলে, সরকারি উকিল দম দিয়ে জেরাই করল না! ... ছেড়ে দে!... যা হয়েছে, তোদের জন্যই হয়েছে। আর ন'বছর জেল হয়েছে বলে আনন্দ করিস না। সাজার সময় তো কাটান যায়। কী নিয়মে কাটান যায় জানি না। যায়।
—হ্যাঁ, জানি।
—৩৭৫ আই. পি. সি. এদেশে ফালতু।
কেন রে?
—কখনও সাজা হয়? আমি কলকাতায় জাস্টিস করবী মিত্রের সঙ্গে অনেক কথা বলেছি। আসলে এ দেশে, মনের মধ্যে বসে আছে আদিম সংস্কার। পুলিশ, আদালত, সমাজ, সব আগেভাগে মনে মনে রায় দিয়ে বসে থাকে যে ধর্ষণ করা হল যাকে সে মেয়েই অপরাধী। নইলে সে কেন রেপড হল?
—আমি কিছু বলব না।
—জানি। বলতে পারছিস না যে মিতা বিপদ ডেকে এনেছিল। ওভাবে সিনেমা যাওয়াই ঠিক হয়নি ওর। সে তো আমরাও জানি। কিন্তু মিতার তো কোন পরিণত বুদ্ধিই ছিল না। বাড়িতে বলেও যেত না। বাবা ওকে কম বলেছে, নীতা কম সামলে চলত? আমি কম বুঝিয়েছি? আজ বলছি... কাউকে বলিস না.... আমার ... খুব দুশ্চিন্তা ছিল! ওর লেখাপড়া হবে না.... বিয়ে দেওয়া অনৈতিক হবে... কে ওকে বিয়ে করবে, কেন বিয়ে করবে... সাজগোজ, সিনেমা দেখা, সিনেমার পত্রিকা পড়া, এ ছাড়া কিছুতে আগ্রহ নেই। বাবা কতদিন পারবে? আমি কতদিন পারব? মিতা... আমাকে... নিশ্চিন্ত....
রীতা কেঁদে ফেলে।
—এখন অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে!
—এই! চোখ মুছে ফেল। আজই ফিরবি না তো?
—না। জয়তীদি'র বাড়ি থাকব। ওঁরা খুব সহযোগিতা করেছেন।
—চল, চা খাবি চল।
—চল।
—কোর্টবাজার ছাড়িয়ে লালদিঘির দিকে হাঁটতে হাঁটতে পার্থ বলে, কিশোর কি চাকরি পেয়ে ভুলেই গেল আমাদের, না অন্য কিছু?
—কিচ্ছু না। এল আই সি তো! ট্রেনিঙে গেছে।
—বিয়েটা কবে হবে?
—ওর পোস্টিংটা হোক!
—ধর কলকাতায় হল না।
—যেখানেই হোক, কাজ একটা না একটা আমি করবই। নীতা হস্টেলে থাকবে, বাবা আমাদের কাছে।
—কিশোর পিছিয়ে যাবে না তো?
—সে ভয় করি না। আর এ সব কথা আমরা বারবার আলোচনা করেছি। বাবার পেনশান থাকবে.... আর যা পাবে তাতে নীতার একটা সম্বল।
—হ্যাঁ, তোদের জীবনটা সার্থক হোক।
—তুই কী করবি, রাজনীতি?
—সরাসরি না করলেও সমর্থনে তো থাকবই। ভেবে চিন্তেই ডিসিশান নিলাম।
—কী পাপবোধে অবসন্ন হয়ে আছিস?
—বকুকে খুঁজতে ওদের বাড়ি গিয়ে ও রকম পাগলামো না করলে হয়তো ওর বাবা...
—হ্যাঁ। সইতে পারলেন না।
—কী মহিমাময়ী মা। একবারও বললেন না পার্থ অন্যায় করেছে। বলেছেন, ও বকুকে খুঁজতে এসেছে, কোন দোষ করেনি।
—বকুর জন্যে নিজেদের অপরাধী ভাবেন তো!
—মহিলার কথা ভাবলে আমার...
—ওর উপকার করতে চাস?
—কী করব? কোন মুখে যাব?
—যাবি কেন! কলেজে পড়াচ্ছিস, ছেলেটাকে হস্টেলে সুবিধে করে দে, ও তো ভাল ছাত্র। ওখানে থাকলে পাপবোধেই শেষ হয়ে যাবে।
—তা করা যায়। যদি ওর মা করতে দেন.....
—নে, চা খাওয়া। তোদের সব সমস্যার সমাধান চিরকাল বাৎলে এলাম।
—তোর শক্তি আছে।
—গোড়া থেকেই থাকে না পার্থ। অবস্থায় পড়লে শক্ত হতেই হয়। নীতাকে মানুষ করতে পারলে....
—দেখ, তুই পারবি।
—টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, ভাইরাস জ্বর, তখন মিতা গেল না। আর এই মর্মান্তিক মৃত্যু! বাকি জীবন কি ওকে ভুলতে পারব? অনন্তপুরে আমি কোনদিন যাব না।
—যাস না। পরের স্টপ থেকে জীবন শুরু কর।
—জানি না.... কবে কী পারব... তুই কী করবি?
—বহরমপুরে মাস্টারি করব, যা করছি।
—দেবাশিস চলে গেছে সোনালিকে বিয়ে করে, তাই বিয়ে করবি না।
—কারো সঙ্গে মনের মিল খুঁজে পাই তো বিয়ে করব।
—তোদের বাড়িতে তো কেউ কারো বিয়ে দেয় না।
না। বাবা মা নিজেরা বিয়ে করেছিল। বিয়ে দেয়াতে বিশ্বাসই করে না। দিদি নিজে বিয়ে করল। দাদাও তাই। আমাকেও তাই করতে হবে।
—কী লাকি তুই!
—তোর বাড়িই বা কম লিবারাল না কি?
—বাবা... খুব সাধারণ মানুষ, কিন্তু বাধা দেয়নি কখনও। এম এ পড়তে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ব্যাঙ্কে ঢুকে গেলাম, বলেনি কিছু। খুশি হয়েছিল।
—চল দোকান এসে গেছে। কিশোরকে যোগাযোগ রাখতে বলিস।
—তোরা না এলে বিয়েই হবে না।
—বিয়ে দিতে দিতে গুনুদা না হয়ে যাই। লোকটা সারাজীবন এর—তার বিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, নিজের বিয়ে হল না।
—বড় ভাল লোক।
—গুনুদা না থাকলে সুধন্যবাবুর দাহ আমাকে করতে হত। আমি ওদের দিকে চাইতে পারছিলাম না...
—দেখা করিস একবার।
—অসীমাদিকে বলব যা বলার। ওঁর সামনে যেতে.....
—দেখ!
—একবারও পুলিশ খুনের ব্যাপারটা পারস্যু করল না...
—বেরোলে তো আবার...
—বাধা দিতে হবে। মানুষ তো সচেতন হচ্ছে। বামফ্রন্ট জেতায় একটা ইনপ্যাকট আছে না? মানুষ আশা করছে, দাবি জানাচ্ছে।
পার্থর গলায় বিশ্বাস ছিল, প্রত্যয়।
সরমা এ সব কথা অসীমার কাছে শুনেছেন। অসীমা মানুষটা এমনই, যে তাঁর কাছে যে কোন বয়সের মানুষ অনায়াসে বলতে পারে মনের কথা। কতজনের যে একান্ত আপনজন অসীমা, ভাবাই যায় না। পার্থ ওঁকেই সব বলেছিল।
বকুর ন'বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে জেনে সরমা অসীমাকে বলছিলেন, হয়তো শুধরে যাবে, হয়তো বুঝবে। বুঝলে ওরই ভাল।
—দেখো!
—বাপের মৃত্যুর জন্যও তো ওই দায়ী।
—সে কি তা মনে করে?
—জানি না অসীমা। ওকে আমি চিনিই না। বিক্রম নাম রাখল বাবা, ক'বছর আগে গিয়ে পালটে এল। 'ভদ্র বংশ! কী ঘরের ছেলে' এ সব বলত বাবাকে বললে ওঃ মস্ত বংশ! রাজা না জমিদার ছিলে তোমরা? কত রুক্ষ কথা না বলেছে!
—একটা কথা বলব?
—বলো?
—যে সময়টা পাচ্ছো, কাজে লাগাও।
—কী করব?
মিলনের বাবার রোজগারটা চলে গেল। আপিস থেকে কী পাও দেখো? নিজে কোনও কাজ নাও। মিলনকে মানুষ করো।
—আপিসে কাজ পেলেও পেতে পেতে অনেক সময় লাগবে। আর সত্যি বলছি, ওখানে অনেক বেটাছেলের মধ্যে বসে কাজ করব, সবাই জানে কার মা! ভাবতে গেলে এখন....
—সত্যবাবুকে ধরো, টাকাপয়সা আদায় করো।
—সে চেষ্টা করছি।
—কাজ.... কাজ.... আচ্ছা, বলব তোমাকে। মিলন যদি বড় হত...
—মাত্রই পনেরো। লেখাপড়ায় ভাল কিন্তু দাদার জন্যে মন ভেঙে গেছে, মুখ লুকিয়ে বেড়ায়। ওর ক্লাসের ছেলেরা আগে কত এসেছে, এখন কতদিন এ বাড়ি আসে না।
ওকে পাস করার পর সরিয়ে দাও।
—কোথায়? কোনও জায়গা আছে?
—বহরমপুরে পড়াও হস্টেলে রেখে।
—কী করে?
—পার্থ দেখবে, চেষ্টা করবে, সাহায্য করবে। ও তোমার সামনে আসতে...
—কেন সংকোচ বোধ করে? ও না বললেও আসতই খবর। যখনই শুনতেন, তখনই ওঁর ও অবস্থা হত।
সরমারই কি হয়নি? কিন্তু নিজের যন্ত্রণা চাপতে হয়েছিল স্বামীকে দেখে।
—পার্থ ভাবে ও দায়ী।
—ভাবতে নিষেধ কোরো। আমি অন্তর থেকে বলছি সে দায়ী নয়। সেই তোমাকে এনে দেয় অমন বিপদে, মিলনের বাবাকে হাসপাতাল থেকে.... আমার উচিত তাকে ধন্যবাদ দেওয়া, যাব কোন মুখে? টাউনে তেমন বেরোতাম না, যেটুকু যেতাম সে পথ বকু বন্ধ করে দিল।
—এটাই তো ভুল করছো সরমা! তোমাদের কেউ দোষী মনে করে না। তুমি মাথা উঁচু করে বেরোতে পারো যখন দরকার।
—অমন ছেলের জন্ম দেওয়া পাপ নয়?
—রোজ কত শিশু জন্মাচ্ছে। সে বড় হয়ে কেমন দাঁড়াবে, কে বলতে পারে? সন্তানের পরিণাম বিষয়ে বাপ—মার হাত থাকে অনেক সময়ে। তবে তোমাদের বিষয়ে সে কথা কেউ মনে করে না। আজ না হোক, কাল তোমাকে বেরোতেই হবে। রেবতী তো বসে থাকবে না।
—রেবতী চলে যাবে?
—রেবতীর মেয়েকে নিয়ে ওর যত চিন্তা। আমার কাছে আছে অন্নদাসুন্দরী স্কুলে ভর্তিও করেছি। তবু মেয়ের কাছে থাকে ক'দিন, দেশে যায় জমিজমা দেখতে। আর কী করে জানো?
—কী করে?
—এখন ও ধরে নিয়েছে, ইহকালের নয়, পরকালের কথা ভাববে। গুরুপাড়া মঠে দীক্ষা নেবে, সেখানে থেকে মঠের কাজকর্ম করবে।
ওর মেয়ে?
—মেয়ের জন্যেও মাসে একশো টাকা দেয়, আমাকেও নিতে হয়। ওর আত্মসম্মান আছে, আর বললাম তো ওর অর্থাভাব নেই। মেয়েকে ও লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াবার মত স্বাবলম্বী করতে চায়; একই সঙ্গে, মেয়ের মায়ায় জড়াতে চায় না। রেবতী একটা আশ্চর্য মেয়ে। লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেলে ও দেখিয়ে দিত।
সরমার মনে হল। সবচেয়ে আশ্চর্য ওর স্বাধীন থাকার চেষ্টা। রেবতীর মত মন ক'জনের থাকে?
সেদিন কি সরমা জানতেন যে অতসী আসবে তার কাছে। তাঁর জীবন সুধায় ভরে দেবে?
অসীমার কথা শুনেছিলেন।
বুঝেছিলেন এই ন'বছর সময়কে কাজে লাগাতে হবে। নইলে ভেসে যাবেন।
অসীমাকে বলেছিলেন, দেখি কী করতে পারি?
রেবতী বলেছিল, আমি আইতে যাইতে খবর নিমু দিদি, কথা দিত্যাছি। অহন আমারে ছাইরা দেন। এট্টা কথা শোনেন।
—বলো রেবতী।
—আপনের বারির পিছনের জমি বেইচা দেন, টাকা লইয়া সামনের পাচিলের গা দিয়া দোকানঘর তুইলা ভারা বসান। মাইনষের সাহায্যও পাইবেন, ভারা বা কুন না পঞ্চাশ—পচাত্তর পাইবেন?
—এখানে দোকান করবে কে?
—কয়েন কী, আপনাগো পারায় এট্টা মুদি দোকান নাই, এট্টা পানের দোকান নাই। ছুটতে হয় রাস্তার মোরে, দোকান দিলে চলব। চলেন, আজ আমার লগে বাজার চলেন।
—আমি?
—কাল নয় পরশু থনে যাইতে অইব না? নিজে করবেন না পোলার পরাল্যাখা নষ্ট করবেন? চলেন! আমিও জেল থিক্যা বারাইয়া পরথম যহন হাটে বারাই আমারও ডর ধরছিল। ঝাইরা ফালাই। আর ডরাই নাই। পাপ অ করি নাই, ডর অ করি নাই। আপনি বা কী পাপ করছেন? যে করছে, হ্যায় শাস্তি পাইছে।
সরমা বুঝেছিলেন, রেবতী সত্যি কথাই বলল। বেরোবেন না। দোকানবাজার করবেন না। মুখ লুকিয়ে কতদিন থাকবেন? খুব খুব কৃতজ্ঞ হয়েছিল মন।
—হ্যাঁ রেবতী, চলো।
—মন দিয়া পাকসাক কইরেন। মিলনের অহন বারের বয়স। মাছও কিনেন, নয় অরে পাক কইরা দিবেন। আপনার রামের মারেও কইছি। অহন হে কাম করব।
—রেবতী। বয়সে ছোট না হলে প্রণাম করতাম।
—থোঁন ফালাইয়া ও কথা। কে কারে দ্যাহে দিদি! নিজে নিজেরে দ্যাহেন। আমি আবাইগা, আপনে তো জলে ভাসতেয়াছেন! সাতরাইয়া ডাঙায় ওঠেন। মিলনের বাপ যা থুইয়া গেলেন, রক্ষা করেন! চলেন।
রেবতী নিয়ে গিয়েছিল।
—নেন, দরদাম দেখেন, বাইছা নিবেন। এহানে আলু নিয়েন দিদি! চিনা মানুষ। চলেন, লাউ কুমড়া বাইগন নিবেন কার থনে, দেখাই।
—উনি বাজার করতেন।
—নাই তিনি। পাপ জগৎ ছাইরা বৈকুণ্ঠে গিছেন। আপনের প্যাটের খিদা তো লইয়া যান নাই! দ্যাখেন, এহানে চিরা—গুর—চিনি—বাতসা নিয়েন। দাদা গো! দিদিরে দেইখা দিও সওদা।
এভাবেই পথে বেরোবার দীক্ষা হয়।
ক'দিন বাদে সরমা নিজেই গেলেন বাজারে। মিলনের জন্যে ডিম কিনছেন, কে বলল, ও ডিম নেবেন না।
পার্থ!
—ওঁকে টাটকা ডিম দাও, আমার মাসিমা।
—হ্যাঁ দাদা। দিচ্ছি।
—চলুন, থলিটা আমাকে দিন। পার্থ সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে চলে। হাতলে থলি ঝোলায়।
—তোমার বাজার?
—সে তো শুধু কাঁচালঙ্কা। পৌঁছে দিই আপনাকে, কিনে নেব। বাজারে যত কাঁচালঙ্কা আসে, আমার মা তার অর্ধেক খায়। কী ঝাল খেতে পারে।
—তোমার মা তো স্কুল করেছেন। গানের স্কুল।
—বাবা মা দু'জনেই।
—বেশ নাম করেছে স্কুলটা।
—হ্যাঁ, ছেলে মেয়ে তো আসে। মিলন বাজারে আসে না বুঝি?
—কখন আসবে? সকালে কোচিং ক্লাসে যায়, এসেই স্কুলে যায়। বিকেলে সত্যবাবুর ছেলের সময় হলে অঙ্কটা দেখিয়ে নেয়... শনি—রবি বইয়ে মুখ গুঁজে....
—খেলতে যায় না?
—এখন আর....
—আজ আমার অফ ডে, বিকেলে আসব। ওকে থাকতে বলবেন।
—বলব।
—নিন। বাড়ি এসে গেছে।
সরমা ওর দিকে তাকান। বলেন, পার্থ! তুমি একটু খবর নিও, এসো। কেমন?
—নিশ্চয় আসব। আপনাকে মাসীমা বললাম...... অসীমাদি'কে দিদি বলি...
—তোমার যা খুশি, ডেকো।
—আপনিও যে কোন দরকারে মিলনকে পাঠাবেন আমার কাছে। বাস স্ট্যান্ডের সামনেই আমাদের ক্লাব, 'সংস্কৃতি চক্র।'
—নিশ্চয় পাঠাব।
—আপিসে গিয়েছিলেন?
—সত্যবাবুরাই দেখছেন।
—যান তো আমি বুধবার নিয়ে যেতে পারি, অফ—ডে থাকে।
—বলব পার্থ। এসো ... চা খাবে?
—বিকেলে খাব।
পার্থ চলে যায়। সরমাকে খুব হালকা করে রেখে যায়।
বিকেলে পার্থ এসেছিল। মিলনকে বলেছিল, তুমি খেলতে যাবে। ঘরে বসে থাকবে কেন?
—ছেলেরা ..... ছেলেরা .....
—তোমার সঙ্গে খেলে না?
—অনেক টিটকারি দেয়....
—দিক। তবুও যাবে। বলবে, আমি তো কিছু করিনি। না গেলে তোমারই ক্ষতি, বুঝেছো? এখন বাড়িতে পুরুষ বলতে তুমি। বড় হয়ে যাও, মিলন।
—যাব..... পার্থদা!
খুব বুঝিয়েছিল পার্থ। দাদা যা করেছে সেটা ঘৃণ্য অপরাধ। তুমি তো অপরাধ করনি। এ ভাবে চোরের মত পালিয়ে বেড়াবে না। পুরুষ মানুষ, শক্ত হও। তোমার মাকে দেখ। জীবন বড় কঠিন মিলন। পালিয়ে বাঁচা যায় না।
—স্কুলে কোন সাবজেক্টে সাহায্য দরকার? শুনলাম অঙ্ক দেখাতে যাও?
—মোটামুটি পঁচাত্তর থেকে আশি পাই সব সাবজেক্টে। অঙ্কটা আরও ভাল হলে নম্বর উঠবে।
—আমি অত পেতাম না। মাধ্যমিকটা পাস করো। তারপর দেখব বহরমপুর হস্টেলে থাকবে, কে এন কলেজে পড়বে, ব্যবস্থা করে দেব।
—সে যে অনেক খরচ....
—হয়ে যাবে। তুমি দাঁড়ালে তোমার মা'র কত সাহায্য হবে ভাবো তো?
—হ্যাঁ....
—আর মিলন....
—কী?
—সেদিন ... আমার মাথার ঠিক ছিল না ভাই। আমি এখনও নিজেকে...
পার্থ মাথা নিচু করে।
মিলন ফিসফিস করে বলে, মা বলেছেন... আপনার... কোন দোষ হয়নি... ও খবর জানলেই ... বাবা...।
মিলন কেঁদে ফেলে।
—আমার বাবা মা খুব ভাল পার্থদা! খুব ভাল...
—নিশ্চয়। এ কথা টাউনসুদ্ধ সবাই জানে। সবাই বলে। যাকগে, আজ চা খেতে পারি।
সরমা চা নিয়ে আসেন, দুটি বিস্কুট। মিলন চোখ মুছে পার্থর দিকে তাকায়।
—আমি..... স্টার পেলে স্কলারশিপ পাব না?
—নিশ্চয় পাবে। পাঁচ বছর বাদে দেখবে পড়াশোনা খতম করে ফেলেছো। সাত বছরে এম এ।
মিলন আস্তে বলে, এম এস সি।
আর ভাবেননি সরমা।
এটাও খুব আশ্চর্য, যে মিলন পালিয়ে পালিয়েই বাঁচল, আজও তাই বাঁচছে।
মাধ্যমিক পাস করে সেই যে গেল বহরমপুরে পড়তে, কোনদিন ভাবল না, বাড়িটা মা রক্ষা করবে কি করে। বাজারহাট করতে তো বলতেন না সরমা।
কোনদিন বললে বলত, ওই তো। আলু আর ডাল আছে। চালিয়ে নাও না।
সমস্যা দেখলেই ও সরে যেত কারো আড়ালে। একদা সরমা, কিছুদিন রেবতী, কিছুকাল পার্থ। আবার সরমা!
যে পার্থ ওর এত উপকার করেছিল, তার সঙ্গে দেখাও করে না। তারপরে তো লিলিকে বিয়ে করল।
লিলি বলে, তাই মিলন রাতে আর সকালে দু'বার দাঁত মাজে।
লিলি বলে, তাই মিলন ঠোঁট টিপে ভাত খেতে শিখেছে।
মিলন হল একেবারে প্যাসিভ মানুষ। অন্যে চালালে তবে ও চলতে পারে।
অথচ ''মা'' বলে মিলনই আসে। বাড়িতে তারও অংশ আছে, সেটা ও ভোলে না।
মিলনকে যদি বলা যায়, তুমি একটি স্বার্থপর মানুষ,—মিলন অবাকও হবে, আঘাতও পাবে।
বেচারি মিলন! তাঁর ভালমানুষ, ব্যক্তিত্বহীন ছেলে! আজ রাতে কী নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে!
ও জানেও না অতসীর গলা সরমার ঘুম কেড়ে নিয়ে গেছে। সরমা শুধু ভাবছেন কখন রাত কাটবে, কখন ছুটে বেরোবেন!
আপিস থেকে তেরো হাজার টাকা পান সরমা। পিছনের দু'কাঠা বেচেন চৌদ্দ হাজারে।
অসীমার বাবাই ক্রেতা জোগাড় করে দেন। বলেন, টাকা ফিকস ডিপোজিটে রাখো, সুদ পাবে। দোকান করার মধ্যে যেও না। কাটোয়া—আজিমগঞ্জ—ওদিকে খাগড়াঘাট স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে, ফারাক্কা ব্যারেজও হবে। অনন্তপুরে জায়গা—জমির দাম বাড়বে। কলেজ হচ্ছে, মেয়েদের কলেজও হবে। এতগুলো রোড জংশন টাউন, জায়গা ছেড়ো না মা! পরে বুঝবে আমার কথা কত দামি। পেনশান তো পাবে যা হোক!
—হ্যাঁ, তিনশোর কাছে।
একাশিতে মিলন স্টার পেয়ে মাধ্যমিক পাস করে। সত্যিই বহরমপুরে পড়তে চলে যায়।
আর মিলন পিছন ফিরে তাকায়নি। বি এস সি পাস করেই ও মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ নিয়ে কলকাতা চলে যায়। ওষুধ কোম্পানির কাজের সূত্রেই লিলির দাদার সঙ্গে আলাপ। তারপর মাঝারি ওষুধ কোম্পানি থেকে মস্ত কোম্পানিতে ঢুকল মিলন। লিলি মুখে যাই বলুক, আজ ১৯৯২ সালে মিলনের বয়স যদি ঊনত্রিশ হয়, লিলির বয়স অন্তত ছত্রিশ—সাঁইত্রিশ হবে। মিলনকে কেন কর্মরত, ইংরিজিতে তুখোড়, অমন একটি মেয়ের দাদা, মা সবাই 'ক্যাচ' ঠাওরালেন, তা সরমা জানেন না। লিলির সম্পর্কে কানাঘুষো যা শুনেছেন, তা কানেও নেননি। শুনে কি করতেন? মিলন যে লিলিকে বিয়ে করে ধন্য হয়ে গেছে, সেটা তো দেখতে পাচ্ছিলেন। শুধু মনে হয়েছিল, মিলনের তখনই চাকরি নেওয়ার পেছনে কারণ একটাই।
ও পালাতে চাইছিল। বকুর বা বিদেশবাবুর বা মিস্টার সরকারের বহুজনের 'দাদা'—র ছায়া থেকে পালাতে চাইছিল।
বকুর প্রত্যাবর্তন সম্ভাবনাতেই ও ঘাবড়ে যায়।
মিলন দীর্ঘকাল মাকে দুশো টাকা পাঠিয়ে যায়। সরমা 'না' বলেন, ও শোনে না। একদা মা'র অনুগত ছিল, এখন লিলির অনুগত হয়ে ও সুখী হয়েছে। থাকুক, সুখে থাকুক, শান্তি পাক।
যখন আসে, কোন সমস্যায় প্রবেশ করতে চায় না। সরমাও আশা করে না।
কিন্তু মিলন মাধ্যমিক পাস করার সঙ্গে সঙ্গে সরমাও 'প্রসূতিসদন—এ কাজ পেয়ে যান। খাতা লেখা কাজ। দুশোয় ঢুকেছিলেন, আজ তার চারশোয় থেমে আছে, তা থাকুক। তবু কাজ তো! কাজ করে তাঁর নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে এল।
আর... মিলন যখন বহরমপুরে গেল, সরমার সময় যখন কাটে না, তখন একদিন রেবতী এসে হাজির।
—দিদি! সাহায্য চাই।
—কী করব বলো রেবতী?
—আমার মাইয়া.....অতসী!
—কী হল তার?
—হয় নাই কিছু। কিন্তু থাকে তো ডাক্তার দিদির কাছে! (বাবা ডাক্তার, ভাই ডাক্তার, তাই অসীমা ডাক্তার দিদি।) তিনি অহন যাইব গিয়া কুনখানে য্যান? দক্ষিণ ভারত! সে কুন দেশ?
—মাদ্রাজ যাচ্ছে?
—না, অনেক ঘুরব। হেই যে রাম সেতু বানছিল, হেই যে বিবেকানন্দ সাগরে ঝাপাইয়া সাগর পারাইছিল, দ্যাশে দ্যাশে ঘুরব চার মাস!
—অতসীকে আমার কাছে?
—দিদি যেমুন, ভাই বউ কই তেমুন না। দিদি কয়, রেবতী, আইয়া থাক তুই চারমাস। আমি ভাগ্না, ভাগ্না বউয়ের লগে ঘুরুম অনেক! তা কয়েন তো? এই জমিজমা সামলাই, এই মঠে দৌড়াই। মঠে অহনে আমার উপর ডিউটি অনেক! মঠের বৈকালী, আরতি, হকল দেখি! মচ্ছব লাগলে পাক সাক দেখি। মিছা কমু না, আনন্দও পাই। অহন আমি অগো বাড়ি.... সব টেবুলে খায়.... মাছ মাংসের ম্যাল্লোছ কারখানা..... আমি পারুম না।
—অতসীকে রেখে যাও।
—দিদিও তাই কইছে। মাইয়ার পরালিখায় খুব মাথা! ডাক্তার দাদা কয়, নয় ক্লাস পাস করলেই নার্সিং পরার বেবস্থা কইরা দিবে।
—পাস করে কলেজে পড়বে না?
—না দিদি! নার্স কামে টাকা ভাল। দাদার ওখানে কাম করব। আজকাল লিখিপরি চাকুইরা মাইয়া বিয়া দিতে শিক্ষিত বর জুটে গো! হকলই তো কইলাম।
—কী পড়ছে এখন?
—ছিকছে উঠব। আশ্চাজ্জ মাথা! কুনোটায় ফেল নাই।
—বয়স কত?
এগারো হইব। দ্যাশের লোকের তো একটাই কথা। বিয়া দাও, জামাই আনো। ক্যান? অহন বিয়া। তিন বছরে পোলার মা! ধান সিদ্ধ করো, ভাত রানবো, পোলা বিয়াও, অরা তো টাউনের গতিক বুঝে না। মাইয়ারা কাম করে। বিয়াও করে, ফকফকা কাপড় পইরা কামে যায়, সংসারিও দেখে, আমি তো কই খুব ভাল আছে তারা। নাও কও!
—আমি তো এখনি রাজি। তবে, ওদের বাড়ি অনেক আরাম ... এখানে...
—এহানে ভাল থাকব! তয়, খরচ নিবে।
—দেবেই তুমি?
—নিশ্চয়। কাছে রাখি নাই, কিন্তু এটা জানি মনে জানে যে মা তার লিগ্যা সব করছে, পরেও করব। শুধু এট্টা কথা দিদি!
—বলো?
—তোমার হেই পোলা আইয়া পরলে মাইয়ারে তহনি সরাইবা।
—এখন তো আসবে না। ততদিনে ও নার্সিং পড়তে চলে যায় তো ভাল। না রেবতী, সে এখানে আসবে না, কিন্তু এলে অতসীকে রাখব না এখানে। আমার নিজের দায়িত্ব নেই?
—নিশ্চিন্ত করলা দিদি!
—তুমি যা করেছো...
—হকলই গুরু করায়। তিনি সুতার পাকে জগৎ ঘুরায় তো! তোমার বিপদ আমারে টাইনা ফালাইল!
—অসীমা সে সময়ে....
—তানারেও টাইনা আনছিল। আজ আমারে এহানে আনল। মঠে কী সুন্দর গায় দিদি—
এ জগৎ রে মন! সদ্গুরুর কারখানা!
মানুষ যত সুতায় বাঁধা
তাঁর হাতে লাটাইখানা
রে মন! সদ্গুরুর কারখানা!
তীর্থে তীর্থে ঘুইরা মরো
তাঁরে কেন না দর্শন করো
যাবে মোহভ্রান্তি পাবে শান্তি
তিনি ভিন্ন আর কিছু নাই
রে মন!
সদ্গুরুর কারখানা!
সত্যই কথা! একশৎ বৎসর আগে গুরুপাড়ায় প্রকাশ! আবার একশৎ বৎসর পরে গুরুপাড়ায় অপ্রকাশ! ম্যাল্লোছ যখন জমিদার! সেই নাম লইল, গেরুয়া পরল, জমি জিরাত, সম্পত্তি দিয়া মঠরে দাড় করাইল। দুর্গাষ্টমীতে প্রকাশ দিবসে যে মেলা লাগে!
—শুনেছি। তোমার মেয়েকে বড় করে দিয়ে তবে যেতে....
—তাঁর ইচ্ছা! সুতার টান, চইলা গেলাম!
—রোগা হয়ে গেছো!
—এক লক্ষ একবার মালা ঘুরাই, একাহারে খাই! দেহ তো তিনি দিছে। তিনি লইব দিদি!
—অতসীকে নিয়ে এসো।
অতসী এল।
এগারো বছরের মেয়ে। চোখে ধানক্ষেতের শ্যামলিমা। মুখটি রেবতীর মতো কাটা কাটা। যেন কালো পাথরের কোন দেবীর বালিকা মূর্তি। তেলে জলে চকচকে চামড়া। একরাশ চুল অনেক উঁচুতে তুলে দু'বেণী বাঁধা। পরনের ফ্রক অসীমার কল্যাণসংঘে তৈরি, স্কুল ইউনিফর্মের মতো কলার দেওয়া।
—দেখেন, মাইয়া দেখেন!
—তোমার সঙ্গে এত মিল!
—হ, মায়ের অভিশাপ হকলটি পাইছে। স্বাস্থ্য! চুলের রাশ! তবে হ্যাঁ, ঘরের কামকার্য জানে, সাজনগোজনের মন নাই। যা অতসী! মাসিমারে পরণাম কর।
অতসী গম্ভীর মুখে জুতো মোজা খুলে এগিয়ে এসে সরমা ও রেবতীকে প্রণাম করল।
সরমা ওকে কাছে টেনে নিলেন।
—আমি কে, বল তো?
—মাসিমা।
—আমার কাছে থাকবি তো?
—থাকুম।
—মায়ের জন্যে মন খারাপ করবি না? অতসী সবেগে মাথা নাড়ল।
—অর বেছনাও আনছি।
—কিসের বিছানা? ও আমার কাছে শোবে।
রেবতী বড় নিশ্চিন্ত মনে চলে গিয়েছিল। আর অতসী ওঁকে, উনি অতসীকে আঁকড়ে ধরলেন। রামের মা বলত, কুন গাছের বাকল কুন গাছে লাগল, এ যে দেখি সেই বিত্তান্ত। ক্যান বা মায়ায় জরান মা? হেই তো যাইবই। বুকে চাকু মাইরা যাইব।
সে কথাই কি সত্যি হল?
অতসীর আর্তনাদ বুকে ছুরিই তো মেরেছে। মায়াবী, মায়াবী মেয়ে।
—আপনের লগে শুমু, গায়ে যদি পা লাগে পাপ তো হইব নিঘাথ। তহন?
—কী হবে বল তো?
—ঘুমের কালে দোষ লাগে না মাসিমা।
ভোরে উঠত, চটপট বিছানা তুলে ফেলত। ছুটে চলে যেত রান্নাঘরে। চা করত, দুধ জ্বাল দিত।
—তুই কি এইসব করতে এসেছিস?
—ক্যান, কাম করলে পরা হয় না বুঝি?
সরমার ঘরটিই আশ্রয় করেছিল। ঘরের এক কোণে যে টেবিল ঘরের শোভা হয়ে বিরাজ করত, তাতে বইখাতা, পেনসিল রাখত। আলনার নিচে ওর টিনের বাক্স।
নিজের জামা টামা নিজে কাচত। রবিবার সরমার জামা, সায়া, কাপড়, সাবানে কেচে দিত।
আর পড়ত চওড়া জানলায় বসে, কপাটে হেলান দিয়ে। বলত, মাসিমা। পরা ধরেন ত!
অতসীকে নিয়ে পড়তে বসা, সেও একটা কাজ হল!
—বাবাঃ। বাচলাম য্যান। ওহানে ভাল তো বাসে সবাই, পরা ধরবে, সময় নাই কারো। হকলডি মানুষ ব্যস্ত। আর মামীমা কথায়, কথায় জল দিয়া যা। চা দিয়া যা! সময়ই দিত না।
—ওখানেও কাজ করতিস?
—হ' করছি। তা তো করতেই লাগত। দাদু আমারে ডাক্তারখানায় ডাইকা পরা ধরত। কইত, তর মা খুব কষ্ট করছে। তুই পইরা শুইনা নিজ পায়ে দাড়াইবি।
—তোরও নার্স হবার ইচ্ছে?
—খুব। মামা কয় ওই কাম শিখলে উপার্জন অনেক। আমি জ্বর দেখতে পারি। মাথায় বরফ দিতে পারি, মামা কয়, আমার হইব।
—নিশ্চয় হবে। তবে রেজাল্ট ভাল হওয়া চাই অতসী। নয় তো মা তোকে.....
—ক্লাসে ফাস। সেকেন হই।
কী ঝরঝরে মেয়ে! নিজে ভাত বেড়ে খেয়ে চলে যেত স্কুলে। আর বিকেলে এসেও ভাতই খেত। ওর জন্যে মাছ আনতে শুরু করেন সরমা। স্কুলে যাবার সময় মাছ হয়ে উঠত না, বিকেলে এসে মাছ—ভাত খেত।
পাতে মাছ দেখে বলেছিল, আমি মাছ না হইলেও খাইতে পারি।
—মাছ হলে?
—ভাল খাই।
খাওয়ার পর বলেছিল, অগো বাড়িতে খাওনদাওন তো মামীমার হাতে। ডাক্তার মাসি এ সব দেখে না কিছু। তার খাবার ঘরে পৌঁছায়।
—এত কাজ করে।
—মামীমা ভাত দিত না বিকালে। কইত পাউরুটি খা। ভাতের মতো কী আছে, কয়েন?
—ও বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না?
—যামু। ডাক্তার মাসি ঘুইরা আসুক।
—মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছা করে না।?
—মায়ের কাছে থাকিই নাই।
—এখানে থাকতে ভাল লাগে?
—খুব।
মিলন যখন ছুটিতে বাড়ি এল, ওকে দেখে অবাক।
—এ কে, মা?
—রেবতীর মেয়ে অতসী।
—এখানে থাকে?
—অসীমাদের বাড়ি ছিল। এখন....
—ওকে কাজের জন্যে রেখেছো?
—ছি ছি ছি! ওর মা খরচ দিয়ে রেখেছে। স্কুলে পড়ে। লেখাপড়ায় ভাল। আমারও আর একলা লাগে না অত।
অতসী টিপ করে মিলনকে প্রণাম করেছিল।
—নানা.... এ কী।
—ক্যান? আপনে ত দাদা হইলেন। পরণাম করব না কেন? মাসিমা, দাদা চা খায় ত?
—হ্যাঁ, ওর জন্যেও কর।
—রেবতীমাসি আসে?
—মাঝে মাঝে আসে।
রেবতী আসত। ওর বাগানের তরকারি, গাছের নারকেল আনত, শীতকালে খেজুরে গুড়।
—মাইয়া খুব বশ হইছে তোমার।
—তোমার মেয়ে যে লক্ষ্মী।
—অহন যা ভাইবা থুইছি, তা যদি হয়...
—হবে রেবতী।
—ল' অতসী। ও বাড়ি ঘুইরা যাই।
—ছুটি তো ওরও, দেশে নিয়ে যাবে?
—না না। মাইনষের হিংসার অন্ত আছে? আমি মরলাম না। লজ্জায় দেশঘর ছারলাম না, মাইয়া টাউনে পড়তেয়াছে, জমিজমাও ভাইসা যায় নাই, মাইনষে হিংসা করে। দ্যাশে লইলেই কইব, ল' রেবতী মাইয়ার বিয়া দে! তারা আর কী বোঝে?
রেবতী বলেছিল, নারকেল ভাইঙা আন অতসী, কুরাইয়া দেই।
—থাক রেবতী, একটু বোস।
—নেন, কুরানি দেন। আপনে কন, দ্যাশের কথা! দ্যাশ কি তেমুন আছে? শুধু হিংসা আর হিংসা। অতসীরে না কি বাবু বানাইতেছি! মাইয়া বুঝি হাকিম হইব! এমুন সব কথা কয় যে গা জইলা যায়।
—তোমারও ছেড়ে থাকা...
—না দিদি। আমি অরে দূরে রাইখা মানুষ করতেয়াছি অনেক ভাইবা। রেবতী নিশ্বাস ফেলেছিল।
—জ্যাঠা নামের ডাকের মানুষ আছিল, পালছিল, বিয়া দিছিল, সইত্য। কিন্তু চার ক্লাসের পর লিখিপড়ি শিখি নাই। অসীমাদিদি কও, তুমি কও, অনেক মাইয়া দেখি। লিখিপড়ির জোরে পায়ে দাড়াইত্যাছে। আমিও ঠিক করছিলাম, মাইয়া নিজের জোরে দাড়াক। দেহ, আর জমিজমা থাকব। টাকাও কি থাকব না? কিন্তু লিখিপড়ি না হইলে বাচাইতে পারব না কিছু। আমি নির্মমতা নয়, ভাইবা শুইনা এই বলি।
—তা সত্যি।
—আমারে যারা সাহায্য হইছে, দিদির বাপ অহনে বুড়া। দিনকালও তেমুন নাই। অর কালে দিন মন্দই হইব। অ জানুক আমারে দাড়ইতে হইব। আপনেও দেখবেন অরে, বেশি আদর দিয়েন না।
—বুঝলাম।
—কই রে অতসী?
—এই যে।
—চল মা! এইবার ঘুইরা আসি। মাসিমার কাজকাম করিস তো?
সরমা বললেন, সব করে।
—কই! করতে গ্যালেই আপনে....
—যা করিস সেই যথেষ্ট।
মায়ের হাত ধরে অতসী চলে গেল।
আর রেবতীর স্বপ্ন সরমার মনেও সঞ্চারিত হয়ে যায়, হয়ে যায়। রেবতী অতসীকে সবল, আত্মনির্ভরশীল করতে চায়। ওকে উপার্জনক্ষম করতে চায়। তাই হোক, তাই হোক!
শুধু কিছুটা সময় চান সরমা। মিলন দাঁড়াল, অতসী দাঁড়াক, ক'বছর সময় পাবেন?
বকু মিতাকে খুন করে জেলে গেছে।
'বকু' নামের কালো ছায়ার হাতে সরমারও তো দীর্ঘকাল কারাবাসই চলছে।
সে জামিন পায়নি।
তিনি ক'বছর জামিন পেয়েছেন জানেন না।
কিন্তু মরে তো যাননি। নিজে কাজ করছেন, কাজে কী মুক্তি। মিলন কলেজে পড়ছে বহরমপুরে থেকে, পথ পেয়েছে। কতজনের কত সাহায্য পেলেন! বকু বাইরে থাকলে কে সম্পর্ক রাখত তাঁর সঙ্গে?
জীবন এত জটিল কেন? সন্তান কেন মায়ের কাছে ভয়ের কারণ হবে? সন্তান কারাগারে, তাতে মা কেন স্বস্তি পাবে?
সরমা কি খুব নিষ্ঠুর, খুব মমতাহীন?
রেবতী আর অতসীর কথা ভাবতে ভাবতে সরমার চোখে বকুর জন্যে জল এল। সে কি বুঝবে না, কত বড় একটা সুযোগ পেল? অনুশোচনায় পুড়বে না? ভাল হয়ে বাঁচবে না? হয়তো সরমার এত নীরব থাকাটা ভাল হচ্ছে না।
চিঠি লিখবেন কাকে, কোথায়?
বহরমপুরে আছে, না অন্য কোন জেলে?
লিখবেন, বহরমপুর জেলেই লিখবেন। কে জানে, সে চিঠি বকুর হাতে পৌঁছবে কিনা।
ভাবতে ভাবতে সরমা সন্ধ্যা দেন, শাঁখে ফুঁ দেন। তারপর হাত জোড় করে মনে মনে বলেন, সে মানুষ হোক। এমন কাজ করেও বেঁচে গেল যখন, তখন তা বুঝে অনুতপ্ত হোক। আর কিছু চায় না সরমা। এমন অবাঞ্ছিত, সকলের ভয়ের পাত্র হয়ে যেন সে না থাকে।
—মা! কী ভাবছো?
—কিছু না মিলন। খাবি কিছু?
—না মা, তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ব আজ। কাল ভোরে যাব বাদলের বাড়ি। কোশ্চেন আনব কয়েকটা।
—বেরোচ্ছিস?
—পার্থদা একটা বই দেবেন বলেছেন।
—ঘুরে আয়।
—তোমার অ্যাসিস্টেন্ট কোথায়?
—রেবতীর সঙ্গে অসীমাদের বাড়ি গেছে।
—মা!
—কী?
—রেবতী মাসি জেল খেটেছিল তুমি জানো?
—জানি।
—তারপরেও.... ও তো ক্রিমিনাল মা!
—জেলে গেলেই সবাই ক্রিমিনাল হয়?
—খুন করেছিল...
—খুন করেছিল....
—সে অনেক কাহিনী মিলন.... ইজ্জত রাখার জন্যে রেবতী....
—না... তবে একই রক্তে জন্ম তো মেয়েটার.....
—লেখাপড়া শিখছিস না তুই? যাদের বংশে কেউ কোন অপরাধ করেনি, তাদের বংশেও তো ... থাক মিলন!
মিলন কী বলতে গিয়েও বলে না।
—ও সব ভাবিস না। সেদিন রেবতী এসে হাল না ধরলে আমরা কী বিপদে পড়তাম সেটা মনে করিস বাবা। ওর কাছে আমরা তো কৃতজ্ঞ।
—সে তো নিশ্চয় মা। আমি ঘুরে আসি।
মিলন চলে যায়।
সরমা বোঝেন ওর মনে একটা 'কিন্তু' থেকেই গেল। যে যেমন হয়। মিলন শান্ত, নিস্তরঙ্গ, ওর বাবার মতো।
সরমাও তো তাই ছিলেন।
শান্ত আজও আছেন, ধৈর্য আজও আছে! পরিস্থিতির জন্যে তাঁকে জীবনের অন্য রূপ চিনতে হচ্ছে।
আরও কঠিন হতে হচ্ছে।
মেয়েকে নিয়ে ফিরে এসে রেবতী রাতটা থেকে গেল। বলল, দাদারে কইলাম, যতটুকু পরলে নার্সিং শিখাইতে পারেন, ততটুকুই পরুক। মিলন তো বিদ্বান হইব। অর নামে আমি মানসিক করছি।
সত্যি?
—নিশ্চয়। এমুন পোলা। এমুন কথাবাত্তা! অ ভাল কইরা পাস করলে আমি সর্বমঙ্গলা মন্দিরে অন্নভোগ দিমু। খুব জাগ্রত ঠাকুর!
সরমা কেমন করে বলবেন, রেবতীর বিষয়ে মিলনের মনে এখন ঘোর অবিশ্বাস?
—অহনও ফিরে নাই?
—তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছে। কাল ভোরে এক বন্ধুর বাড়ি যাবে।
—পার্থ দাদাও অর সুখ্যাত করে।
—দেখ, তোমাদের আশীর্বাদ!
—সদাসর্বদা মনে জাগাইয়া থুই। গুরুরে বলি, সরমাদিদির মতো আবাগী বিশ্বসংসারে নাই। তারে দেইখ ঠাকুর, সে বড় কষ্ট করত্যাছে।
—এসো, খেয়ে নাও কিছু।
—কিসের খাওয়া? খই বাতসা লইয়া আইছি। জপ সারুম, মুখে দিয়া জল খাইয়া শুইয়া যামু।
—দেহ ভেঙে পড়বে।
—বরো ছায়া মায়ায় পালছিল জ্যাঠা। পরে তো আগুন দিয়া হাঁটত্যাছি। এ কারণেও মাইয়ারে বুক ফাটলেও মুখে মিষ্ট বলি না। অরে তো জানতে হইব জীবনে কষ্টই বেশি, সুখ কম।
—কী হয় রেবতী? ছেলেদের.... আবদার দিইনি কখনও। অন্যায় দেখলে শাসন করেছি...
—হ দিদি। সইত্য। অহন মিলন দারাইলে তুমি মাটি পাইবা।
—প্রদীপ্ত ওকে নার্সিং শেখাবে?
—বেবস্থা করবে। সে ফাঁকা কথা কয় না। কথাই কয় কম, যা কয় সেইমত কাম করে। অনেক দিন দেখতেয়াছি ত! অর ভাইরাও অমুনই।
—খুব ভাল পরিবার।
—বেবাগ মানুষ ভাল। তবে বুড়াবাবুর বউ ভাগ্য নাই। পরথমজন। অসীমাদিদিরে থুইয়া মইরা গেল। শালীরেই বিয়া করল তিনি। ইনিও তিনপোলা, এক মাইয়া রাইখা মইরা গেল। অসীমাদিদির কপালও পুড়ল কুন বা বয়সে। বর পোলা ডাক্তার, মেজ জনা বুঝি ইঞ্জিনিয়ার হইব, ছোটটাও কী পড়তেয়াছে।
—ছোট মেয়ের বর তো ভাল।
—খুব ভাল। রেলে অপিচার। বউ লইয়া বেরায় দেশে দেশে। বেবাক ভাল! তবে বরো বউদি কই, তেমুন মনের মানুষ না।
—সব কি হয়? এখন ছেলে মানুষ... শিখে যাবে।
—দাদা দিদিরে মাথায় রাইখা চলে।
—খুব ভক্তি করে।
—অগো বংশ, জমিদার বংশ.. লিখি পরি বংশ... অগো ঘরে ভাল হয়। আমার বংশে লিখিপড়ির দাম ছিল না... আমারেও চাষীবাসি দেইখাই দিছিল বিয়া। আমি ত দিদিগো ঘরে আইতাম, থাকতাম, তাতেই হুতাশ ছিল যে মাইয়ারে মানুষ করুম। লও, খাইয়া শুইয়া পরো।
—তুমিও হাতমুখ ধুয়ে নাও। অসীমা ফিরেছে?
—না। দেরি অইব। তিনি থাকব না বইলাই মাইয়া লইয়া আইলাম।
—আমি বড় বেঁচে গেছি।
—যদি দারাইতে পারে, অতসীও তোমারে দেখব। মাইয়া ছিল না, পাইলা!
—হ্যাঁ রেবতী...
মেয়ে ছিল না, মেয়ের মমতা বোঝেননি। অতসী তো তাঁকে ভুলিয়ে দেয় অনেক দুঃখ।
—অহন আপনি কাম করেন, না খাইলে দেহ টেকব? খান, ভাত হাতে চিন্তা করেন কেন?
—ইস! মাথায় সাবান দিয়া দেই। কী আঠা পড়ছে চুলে!
—প্রসূতিসদনে কাজ! জামা কাপড় সাদা চাই। মাসি কাচতে পারে না। আমি কাইচা দিমু।
—পূজায় মেলা লাগছে, দেখবেন না? চলেন, ঘুইরা আসি। যান না ক্যান?
অতসী, অতসী, কবে থেকে আমি সকলের জন্যে করে আসছি। আমার কোন শৈশব ছিল না। মামা—মামীর সংসারে এত হেলাফেলায় মানুষ, যে ছোটবেলায় খেলাধুলো জানি না। স্কুলে যেতাম, সেও দিনের পর দিন ভাত না খেয়ে। বিয়ের আগে নতুন কাপড়জামা গায়ে ওঠেনি।
বিয়ে হয়েছিল, স্বামী আর দু'ছেলের সংসার। কাজকর্ম, দায়িত্ব সবই তো আমার ছিল।
কথায় বলে, আশার দোরে, ভূত খাটে। তা ছেলেরা মানুষ হবে, এই আশায় ভূতগত খাটতেন স্বামী, খাটতাম আমি। স্বামী গেলেন, বড় ছেলে এরকম, আমি যেন সেই পথিক যাকে ঝড় তাড়া করেছে। যে গাছের নিচে দাঁড়াতে যায়, সেটাই উপড়ে পড়ে।
কোনও আশা, কোনও আকাঙ্ক্ষা ছিল না আর।
তবু মিলন আছে, তাকে যত তাড়াতাড়ি পারি দাঁড় করাব বলে এত চেষ্টা।
অতসী, তুই মনে করিয়ে দিলি আমার একটু যত্ন দরকার, আমার কোনও সাধ আহ্লাদ আছে।
আজ, এত বছর বাদে সরমা সেদিনের সরমাকে দেখতে পাচ্ছেন।
খেয়েদেয়ে, ঘরে ঘরে তালা দিয়ে সেই সরমা ধবধবে কাপড়জামা পরে সাইকেল রিকশায় অতসীকে নিয়ে স্কুলে যান। নামিয়ে দেন। প্রসূতিসদনে চলে যান। তিনি গেলে লক্ষ্মীদি রোজ বলেন, আজ দশটা বেজে দু'মিনিট হল গো!
লক্ষ্মীটি কটকট করে কথা শোনাতেন, কিন্তু সময়ে অসময়ে উনিই দেখতেন।
সেই সরমার মন পড়ে থাকত দরজার দিকে। বিকেলে অতসী এসে পড়ত।
—আইয়া পড়ছি মাসিমা।
—বোস একটু।
ঘাড় নেড়ে অতসী ব্যাগ থেকে বই নিয়ে পড়ত মন দিয়ে! স্কুলের বন্ধু জয়া ওকে গল্পের বই দিত।
লক্ষ্মীদি বলতেন, রেবতীর মেয়ে যে এমন হবে তা কে জানত? হক, মানুষ হক। আবার দু'জনে বাড়ি ফিরতেন। রামের মা এসে পড়ত। অতসী ভাত খেত কুড়িয়ে বাড়িয়ে, তারপর মাঠে একটু খেলতে যেত। সন্ধ্যা দেখতে না দেখতে এসে যেত।
সেই সরমা এতটুকু উনোনে রাঁধতেন, রান্নাঘরের কোণে বসেই অতসী দুলে দুলে পড়ত।
মাঝে মাঝে বলত, পরুম না। হইয়া গেছে পরা। সকালে অঙ্ক কইরা নিমু।
—এখন কী করা হবে?
—আপনে গল্প বলবেন, আমি শোনব।
—কোন গল্পটা বলব?
—ক্যান, সেই যে বলতেন টাউনে বাঘ আইছিল? সেই গল্প বলেন!
—সে কত আগে। তখন সব ঝোপঝাড়... মাঠ...
—সিনেমা আছিল?
—একটা। এখন তো দুটো। তুই সিনেমা দেখেছিস?
—মায়ে 'রানি রাসমণি' দেখাইছিল।
—চল, ঘরে যাই।
মাঝে মাঝে বলত, চুল বাঁইধা দেন তো।
—আমার বাঁধা তোর পছন্দ হবে?
—হইব, হইব।
মাঝে মাঝে বারান্দায় চকে ঘর এঁকে একাই এক্কা—দোক্কা খেলত লাফিয়ে লাফিয়ে।
ঝড় হলে এত এত আম কুড়িয়ে আনত।
—আমি কাইটা দিমু, আপনে আচার করেন। আর সরমার গায়ে ঘেঁষে রাতে কত কথা যে বলত।
—বৃষ্টি হইব না। হইত যদি মাইনষে ব্যাঙের বিয়া দিত।
—ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হয়?
—হয়। মাসীমার ঝি গুরুদাসী কইছে।
—বৃষ্টি হলে তো সব ভেসে যায়।
—তাতে কী? যখনকার যা, হওয়াই লাগে। মাসীমা! খুব নাকি বান আইছিল অনেক আগে?
—সে তো ক'বছর আগে।
না, না, অনেক আগে। তহন নদী দিয়া সোনাভরা ঘড়া ভাইসা গিছিল, তাই উঠাইয়া একজন রাজা হইয়া যায়।
—তুই গল্পটা বল।
—অনে—ক দিন আগে, এক আষাঢ় মাসে....
কথা বলতে বলতে অতসী হঠাৎ ঘুমিয়ে যেত।
অন্ধকারে সেই সরমা অতসীর গায়ে হাত বোলাতেন। মাঝে মাঝে বলতেন। তুই ভাল থাক, নিজের পায়ে দাঁড়া...
সেই সরমার খোঁজ নিয়ে যেত পার্থ। বলত, খুব ভাল হয়েছে। একটা মেয়ে পেয়েছেন।
বলত, কাজ করছেন, বেরোচ্ছেন, এতে আমারও খুব ভাল লাগছে। আর মিলনও মন দিয়ে পড়ছে। কলেজে সুনাম হয়েছে।
—সে তো তোমার জন্যেই।
—না, না, আমি আর কী করেছি।
আজ সরমা বোঝেন, যে ক'বছর বকু জেলে ছিল, সেই ক'বছর তিনি ছিলেন জেলের বাইরে।
ওই ক'বছরই তো জীবনের শেষ সুসময়। বকু যে আবার বেরোতে পারে, এখানেই ফিরে আসতে পারে, সে সম্ভাবনার কথা যেন ইচ্ছে করেই ভুলে থাকছিলেন!
ভুলের স্বর্গে বাস করে যে, সে নির্বোধ। জীবন তাকে ক্ষমা করে না। তাকে দাম দিতে হয়। আজ কেন, অনেকদিন ধরেই তো সরমা দাম দিয়ে চলেছেন। তবু বোধহয় দাম দেয়া বাকি ছিল। নিঃশেষে সব দাম চুকিয়ে নিয়ে গেল সন্ধ্যা ও রাতের মধ্যবর্তী সময়টা।
যখন অতসীর গলা শুনলেন। অতসী তাঁকে ডাকল। তিনি দরজা খুললেন না।
মিলন ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়। অতসীর গলার আর্ত চীৎকার ওকে বিচলিত করেনি। কেননা মিলন ভুলে গেছে সব।
রেবতীর বিষয়ে এতটুকু কৃতজ্ঞতা নেই মনে।
অতসীকে ও মনেই রাখেনি।
দাদা একটা আতঙ্ক, তাই এখানে আসে কম। যখনি আসে, তখনি বাড়ির শেয়ার যে ওরও প্রাপ্য সে কথাটা বলতে ভোলে না।
দাদার ভাই হয়ে পালানো যায়। দাদা যদি আতঙ্ক হয়, সে আতঙ্কের গ্রাসে মা কত বছর তিলে তিলে মরছে, তা মিলন ভাবে না।
ভাবতে গেলে সরমার.....
অসীমা বলতেন, দুঃখ পাও? দুঃখ পেয়ে কি করবে সরমা? মানুষ ভুলে যায়, ভুলে যেতে হয়। সব সময়ে অতীতকে মনে করলে মানুষ বাঁচতে পারে না। মিলন খুবই অন্যরকম। ভেবে কি করবে?
ভুলে যায়। ভুলে যাওয়াটা বোধহয় নিয়ম।
মিতার কেসের পর পোস্টমাস্টাররা চলে গেলেন। সরমা শুনেছেন, তিনি রীতা আর কিশোরের কাছে থাকেন। নীতা খেলাধুলো করত, বি. এস. সি. পাশ করল, রেলে চাকরি পেয়ে গেছে।
তখন যারা ছোট ছিল, তারা বড় হয়ে গেল। মিতার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে এল মানুষের মনে। তখনকার অনেক পরিবার টাউন ছেড়ে চলে গেল ; আবার নতুন নতুন মানুষ এসে শূন্যস্থান পূর্ণ করল।
অনেক, অনেক নতুন বাড়ি উঠেছে। মানুষ এখন মাইনে পায় বেশি, কলেজে বা আপিসে বা ব্যাঙ্কে লোন নিয়ে বাড়িও করে ফেলে।
করবে নাই বা কেন? মহকুমা সদর হিসেবে ভাল টাউন। চার পাঁচটা বড় বড় খেলার মাঠ আছে। তরুণ সংঘ ক্লাব থেকে ভাল ভাল ফুটবলার বেরিয়েছে। আর চিত্রাভিনেত্রী সুমনার পরিচয়ে সবসময়ে দাবী করা হয় ও এই টাউনের মেয়ে। যদিও সুমনার বাবা এ শহরে মাত্র তিন বছর কাজ করেছেন।
এ শহরের পাশে আছে বহতা নদী। হাইওয়ে তো সর্বদা ব্যস্ত থাকে। উত্তরবঙ্গগামী কত বাস। কত বাস! হাওড়া লাইনের ট্রেন ধরা খুব সহজ এখন।
এততেও অনন্তপুর প্রচণ্ড গুরুত্ব পায়নি।
শহরকে প্রকৃত গুরুত্ব দিলেন যোগপ্রেমানন্দ। তিনি একজন অতিমানব, দেবতার অংশ। চেহারায় জেল্লা, বসন ভূষণ, সবই টি. ভি.—র বিজ্ঞাপনের মত। চেহারা দেখলে মনে হয় কবির বেদী কোন সন্ন্যাসী সেজেছে। অথচ ওঁর বয়স না কি একশো পঁচিশ।
একশো বছর আগে বিকানীর থেকে পঁচিশ বছরের যে যুবক যথারীতি হিমালয় গমন করেন। তিনি একদা হরিদ্বারে চলে এলেন যোগাসনে আসীন অবস্থায়। গঙ্গাবক্ষে ভাসতে ভাসতে।
হরিদ্বারেই বসে গিয়েছিলেন। কিন্তু অনন্তপুরের বিখ্যাত জৈন পরিবারের এক প্রৌঢ়, যিনি দিল্লীতে বিশাল ব্যবসা ফেঁদেছিলেন, ভালই ছিলেন, তাঁকে সহসা সস্ত্রীক শান্তির সন্ধানে হরিদ্বার যেতে হয়।
কারণ তাঁর পুত্রবধূ চন্দা। চন্দাকে পুড়িয়ে মারার অপরাধে তার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি সকলে ধরা পড়ে, অহেতুক প্রচার পায় ঘটনাটি, ঢি ঢি পড়ে যায় দিল্লীতে, এবং শ্বশুরের ব্যবসা চোট খায়।
চন্দা জনৈক মন্ত্রীর আত্মীয়া, যে মন্ত্রী অতীব প্রভাবশালী। শ্রীযুক্ত ও শ্রীযুক্তা জৈন তীর্থে তীর্থে ঘুরতে থাকেন।
যোগপ্রেমানন্দকে তিনিই ''আবিষ্কার'' করেন। সাশ্রু নয়নে বলেন, সব লপসাইডেড গ্রোথ হয়ে যাচ্ছে প্রভু। একদিকে পশ্চিম ও উত্তর ভারত দপদপিয়ে বাড়ছে শুধু ধর্মানুগত্যের জন্যে। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গ দেখ। গডলেস দেশ। একটা কিছু করো।
—এর জন্য চাই ত্যাগ।
—আমি তো আমার সর্বস্ব...
—তোমার জনসংযোগ কি রকম?
—হয়ে যাবে প্রভু।
হয়ে যায়, সবই হয়ে যায় এখন, মনে যদি বিশ্বাস থাকে, বিশ্বাসে শুধু বস্তু নয়, ধর্মাচার্যের কৃপাও মেলে।
যোগপ্রেমানন্দ এবং জৈন দম্পতি তিন মাস বাদে দিল্লীতে উপস্থিত হন। জৈন বলেন, আমার ওপর ছেড়ে দিন সব।
সাধুমহারাজ বলেন, সব মনে রেখো।
—রেখেছি।
মধ্যবর্তী তিন মাস সময়ে দুজনে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। দুজনেই বুঝেছেন, এ যুগে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে একেবারে ব্যবসায়ীর মত। প্রোমোটার চাই, টাকা খাটাবার লোক চাই, জনসংযোগ অফিসার চাই, চাই ধনী ভক্তকুল।
দিল্লী ব্যবসা বা রাজনীতি বা ধর্মের পক্ষে উর্বর ক্ষেত্র।
দিল্লীতে সাধু বা সাধ্বী, মহাপ্রাণ ও মহাপ্রাণা, জ্যোতিষী, গণক, ম্যাজিক দ্বারা রোগ আরোগ্য ইত্যাদি ইত্যাদির সমাজে যোগপ্রেমানন্দ যে ফিট করে গেলেন, এ শ্রীযুক্ত জৈনের অবদান। ব্যবসা নয়, দোরে দোরে ঘুষ দিতে হল না। ক্যাবিনেট ও অন্যান্য দলের মানুষরাও ভিড় করলেন। প্রেমানন্দ আশ্রমের প্রাণপুরুষ বললেন, মাটি, মাটির দখল নাও।
বললেন, বাংলার মহিমা অস্ত গেছে। কিন্তু সূর্য তো পুব আকাশেই ওঠে। বাংলার মাটি থেকেই উদিত হবে প্রকৃত ধর্মচেতনা।
দিল্লী থেকে পাটনা, ক্রমে তাঁর নাম ছড়াল। এখন বিদেশে তাঁর ভক্ত অনেক, অনাবাসী ভারতীয় আছে, আছে সেখানকার অধিবাসীরা।
অখ্যাত অনন্তপুরে নদীর ওপারে এঁর বিশাল আশ্রম ও অতিথি—আবাস প্রতিষ্ঠা সুরেশ জৈনের কীর্তি। প্রেমযোগানন্দ সেখানে বছরে চারবার আসেন। তাঁর মূর্তি পূজা পায়। ক্যাসেট তাঁর কণ্ঠ শোনায়।
সরমা দেখতে যাননি। কিন্তু প্রদীপ্তর বৌ দেখতে গিয়ে অভিভূত হয়ে ফিরে এল।
—কি আশ্চর্য জায়গা, স্বর্গ বললেও হয়।
—শুনেছি তো খুব দেখার মত জায়গা।
—বই এনেছি পড়ে দেখুন।
—ইংরিজি বই, সায়েবদের লেখা?
—না না, এ তো প্রেমযোগ ট্রাস্টের বই।
—বাঙালী ভক্তও অনেক?
—অনেক। সাতদিন ধ্যানমন্দিরে ধ্যান করলে, থাকলে সাত বছর বয়স কমে যায়। কি ব্যবস্থা! হট্টগোল নেই, নোংরা নয়, আলো ঝলমল করছে, বিশাল ফুলবাগান। বসে থাকলেও শান্তি।
বসে থাকলে শান্তি যে পাবার সে পায়।
সরমা কেমন করে তেমন শান্তির ছোঁয়া পাবেন?
প্রদীপ্তর বউ যে কি বলে!
—আমার কপালে নেই দিদি।
—কেন?
—ও তো বিশ্বাসই করে না। বলে, বাড়িতে দুর্গোৎসব হচ্ছে, ঘরে বিগ্রহ আছেন, ও সব ফ্যাশানেবল গুরুতে আমার বিশ্বাস নেই।
—অসীমা গিয়েছে?
—না না, কেউ না। আমার বাবা মা গেলেন, আমিও ঘুরে এলাম।
প্রেমযোগানন্দ নিয়ে ক্ষ্যাপামি কয়েক বছর চলল। কত ধানক্ষেত বিক্রি হল, আশ্রমের জমি হয়ে গেল, তার ঠিকঠিকানা নেই।
সরমা একদিনও যাননি।
অসীমা বললেন, যেতে ইচ্ছে হয় সরমা?
—না, কি হবে গিয়ে।
রেবতী বলে গেল, দেইখা আইলাম দিদি। ও বরলোকের জায়গা। আমার মত চাষীবাসীর লিগ্যা গুরুপাড়ার মঠই ভাল।
সরমা গেলেন না, অসীমা গেল না, কিন্তু অনন্তপুর প্রেমযোগাশ্রম নাম করতে থাকল। এপারে নয়, ওপারে একটা অন্যরকম মানুষের ভিড় হয়। বড় বড় গাড়ি আসে আর ঢুকে যায়। লাভের মধ্যে ওখানে একটা বাস স্টপ হল। অসীমা ঠোঁট উলটে বললেন, ভীমরতি ধরেছে মানুষের। যুবো যুবো ছেলে মেয়েও ভক্ত হচ্ছে।
পার্থ কলকাতার কোনো কলেজে সুযোগ পেয়ে চলে যাচ্ছে। যাবার আগে বলে গেল, একদিকে বাংলাদেশ থেকে মৌলবী আসছে, নতুন নতুন মসজিদ উঠছে। এখানে এক ঢঙের মন্দির হল। দেখলেন, পুজোপাট, কবচমাদুলি, নতুন নতুন ঠাকুরদেবতা কি রকম বাড়ছে এখন। আশ্চর্য!
—আশ্চর্য কেন?
—আশ্চর্য অথবা দুঃখের বিষয়। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায়। রাজনীতির বোধচেতনা এখন উধাও। যুক্তিহীন, অন্ধ বিশ্বাস এ ভাবে বাড়বে?
—তাই তো বাড়ছে পার্থ।
—দুঃসময় এটা। এ দুঃসময় কি কাটবে?
সরমা ভাবলো, দুঃসময় তো অনেককাল শুরু হয়েছে। নইলে বকুদের এমন করে আশ্রয় দেয় অনন্তবাবুরা?
কয়েকটা বছর তো নিঃশ্বাস নেবার সময় পেয়েছিলেন, তখন কি জানেন, এরপর জীবনটা নিষ্প্রদীপ হয়ে যাবে, থেকেই যাবে অন্ধকারে?
মিলন বি. এস—সি এত ভালভাবে পাশ করল যে, কলেজও আশা করল ও এম. এস—সি পড়বে, রিসার্চ করবে।
মিলন সে কথা ভাবলই না!
মিলন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি নিল।
সরমা বললেন, এ কি করলি?
—অত পড়ে কি হবে?
—কলেজে পড়াতে পারতিস আরো পড়লে।
—এমন চাকরি পেয়ে ছেড়ে দেব? তা ছাড়া, আমি দূরে যেতে চাই। অন্য কোথাও.... ফোর্থ ইয়ারে একবার শুনেছিলাম ওরা ছেড়ে দিতে পারে। শুনে আমি কলেজ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলাম।
হ্যাঁ। মিলন ওই রকমই।
পালিয়ে বাঁচতে চায়।
—আমার কথা ভেবেছিস?
—আমি, আমি যদি দাঁড়াই মা, তোমাকে নিয়ে যাব সেখানে। এখন তো মাত্র ন'শো আশি পাব। তোমাকে আমি টাকা পাঠাব মা।
ভীষণ, ভীষণ আঘাত পান সরমা। কিন্তু মিলনের কথা তো মিথ্যে নয়। বকুর ছায়াতে সে বাঁচবে কী করে? বকু একটি এমন নাম, যার সংস্পর্শে এলেই সব নষ্ট হয়ে যায়।
—তুমি একলা হয়ে যাবে.... কিন্তু অতসী তো আসবে, আসেও তো।
—আমার কথা ছেড়ে দে। না... রাগ করে বলছি না মিলন!
সরমা চেষ্টা করেই হাসেন।
—আমার তো বড় বন্ধন এই বাড়ি... তোর বাবার স্মৃতি... এমন নয় যে কোনও জায়গা আছে গিয়ে দাঁড়াব।
—আমি দাঁড়ালেই তোমাকে নিয়ে যাব মা!
—আগে দাঁড়া! মাইনে তো ভালই।
—শুনতে ভাল। আজকাল টাকার দাম কী? এক টাকায় কী কেনা যায়? টাকার কোন দাম আছে?
—কলকাতায় চাকরি।
—হ্যাঁ.... একটা ট্রেনিংয়ে পাঠাবে বম্বেতে, যদি মনে করে। লাইনটা ভাল। কতজন ওপরে উঠে গেছে। বহরমপুর বড় জায়গা তো, সব জানা যায়। এ টাউনে কিছুই নেই। ওখানে ক্লাব, খেলাধুলো, বইমেলা, কলেজে ডিবেট, সেমিনার, সে অন্য পরিবেশ। এত বদ্ধ জলা নয়। বাবা যে কেন এখানে...
—সময়ে সব বদলে যায় মিলন। গ্রামে থাকবেন না বলে এখানে বাড়ি করলেন। আমাদের কাছে এটাই টাউন। টাউনের পরিবেশে ছেলেরা বড় হবে! নইলে যে জমিজায়গা ছিল!
—বাবা ফার্মিং করতে পারতেন! চাষবাসে নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করে পানজাবে সব ফার্মিং করছে!
—আগে অত কথা কেউ জানত না। সামান্যেই খুশি থাকত। তোর বাবা তো সাবেককেলে মানুষ ছিলেন! যাকগে, যাবার আগে মন্দিরে পুজো দেব। অসীমাদের বলে আসব কালই। জামাকাপড়, সুটকেস, সব তো লাগবে।
—তা লাগবে।
—দেব। টাকা তুলে দেব।
—আমার জন্যে ফিকস ডিপোজিট ভাঙবে?
—যা হয় করব।
—টাকা আমি তোমায় দিয়ে দেব মা!
—বেশ তো। দিস! পার্থ... জানে....?
—জানে, বলেছি।
সরমা হাজার টাকা ভেঙেছিলেন। সব টাকাই তো মেচিওর করবে, বাড়বে, আবার ফিকস ডিপোজিট করবেন এভাবে রেখেছিলেন। কিছু টাকার সুদ সেভিংসে জমা পড়ে। তা থেকেই ভাঙলেন। ব্যাঙ্কের টাকায় হাত দিতে চান না সরমা, কিন্তু বাড়ি মেরামত করতে হয়। পুজোর আগে কিছু তুলতে হয়। এ ভাবেই গুনে গুনে চালান।
মিলন ছ'শো টাকা নিয়েছিল।
সে টাকা সে ফেরত ঠিকই দিয়ে দেয়। কিন্তু সরমাকে নিয়ে যাবে, সে কথা রাখতে পারেনি মিলন। সে জন্যে মিলনকে অনেকে স্বার্থপর বলে।
সরমা বলেন না।
গ্রাম থেকে অনন্তপুরে, এ টাউন ছেড়ে বহরমপুর, সে শহর ছেড়ে কলকাতা....টাউন ছাড়ার পরই ওর জীবনও অন্যরকম হয়ে গেল!
থাক, সুখে থাকুক। ওরা নিজেদের নিয়ে ভালই থাকে। লিলিকে সরমা কাছেও পান না, আশাও করেন না। পুত্রবধূর সঙ্গে তো সম্পর্ক হয় বছরে একবার।
পুজোর আগে মিলন মাকে দামি কাপড় দিয়ে যায়। বলে, লিলি কিনেছে মা!
বিজয়ার পর লিলির একটা পোস্টকার্ড পান। সরমাও আশীর্বাদ জানিয়ে চিঠি দেন।
ওরা স্বার্থপর, না স্বার্থপর নয়, সে বিচার সরমা করতেও যান না।
নিঃস্বার্থ ও দরদী হলেই কি আসতে পারত?
মিলনের দাদা যখন বকু?
দেয়ালে সুধন্যর ছবিটার দিকে তাকালেন সরমা। সুধন্যর বয়স সেই আটচল্লিশেই আটকে আছে।
সুরমার বয়স বাষট্টি হয়ে গেল।
পঁচিশ বছরে বকু জেলে যায়। এখন ওর বয়স ঊনচল্লিশ।
বাবার মৃত্যুকালে মিলনের পনেরো।
আজ ওর বয়স ঊনত্রিশ।
একা সরমার জীবনে এমন দুঃসহ ভার কেন?
অতসীর জীবনটাও যদি পরিপূর্ণ হতে পারত, সরমার একটা যাবার জায়গা হত। সব বেচে দিয়ে যাকে যা দেবার দিয়ে টাকা নিয়ে ওর কাছেই চলে যেতেন।
তাই যাবেন। তাই যাবেন, কোলে তুলে নেবেন ওকে। বলবেন, আমি আছি মা। আমি তোর কাছে আছি।
যদি সুযোগ পান।
অতসীও তো এক লক্ষ্যে এগোচ্ছিল।
চুরাশি সালে নাইন থেকে টেনে উঠল। রেবতীকে কথা দিয়েছিলেন সরমা। ওকে নিয়ে গেলেন প্রদীপ্তর কাছে।
—দিদি! ম্যাট্রিক পাস করলে তো সরকারি নার্সিংই পড়তে পারে।
—সে হয় না। ও তো বর্ণহিন্দু। তপশীলী বা আদিবাসী নয়। যদি চানস না পায়? তুমি তো বলেছিলে....
—জুনিয়ার নার্সিংই শেখাও ওকে। নার্সিংহোমে হাতেকলমে কাজ শিখুক।
সুরমা বোঝাতে পারছিলেন না কেন তাঁর এত উদ্বেগ। সময় যে কমে আসছে। বকু যদি এসে পড়ে? তখন অতসী কি করবে?
রেবতী একলক্ষ্যে অর্জুনের মত অতসীকে স্বাবলম্বী করতে চাইছে। অতসীকে দাঁড় করাতে হবে। সে উদ্বেগ তো সরমারও।
প্রদীপ্ত বলল, বড় চিন্তা হচ্ছে?
—হ্যাঁ। ওকে তো খুব তাড়াতাড়ি পায়ে দাঁড়াতে হবে!
—ঠিক আছে, ঠিক আছে।
অসীমা বলেছিলেন, তোর ভরসাতেই রেবতী ওকে রেখে গেছে।
—জানি। আমি ব্যবস্থা করছি। কেষ্টনগরের কাছে একটা মিশন হাসপাতালে প্রাকটিকাল নার্সিং শিখুক। পড়বে, হাতে—কলমে কাজ করবে। তিন বছর শিখুক, আমার নার্সিংহোমে নিয়ে নেব। ওখানে ওরা খুব কড়া নজরে রাখে মেয়েদের। কাজও শেখায়। একটি মেয়েও বসে নেই আজ। আর এখানে তো.... অতসী ক্রমে হেড নার্সই হয়ে যাবে।
—খুব ভাল হবে!
—কেষ্টনগরে আমি জানিয়ে দেব। কলকাতায় মিশনের হেডমাস্টার। কলকাতার মিশন তো খুব চেনা আমার। কিন্তু ওকে পৌঁছে দেবে কে?
সরমা বললেন, আমি নিয়ে যাব।
অতসীর ছোট ট্রাঙ্ক গুছিয়ে দিলেন। ওর মা যে টাকা দিত তার অর্ধেক তো জমাতেন। টাকা দিলেন। বললেন, খিদে পায়, কিনে খাবি। সবাই মেয়ে, কোন অসুবিধে হবে না।
—আপনে ভাল থাকবেন কিন্তু....
—থাকব।
—ছুটি পাইলেই চইলা আসুম।
—সে তো আসবিই। শোন, চলেই তো যাবি! মার সঙ্গে একবার দেখা করে আসি চল। তখনি কিন্তু যেতে পারেননি! যাবার সময় হল দু'বছর বাদে।
—চলেন। সে অহন বাড়িতে আইছে। কুলডাঙায়।
অতসী বড় হয়ে গেছে। রেবতীর কথামতো আজও ওর সাজগোজে মন নেই। সুঠাম স্বাস্থ্য, অনেক তৈলাক্ত চুলে যান টান বেণী। জামার হাতা প্রায় কনুই অবধি, ঝুলও লম্বা। পেট বা পিঠ দেখা যায় না। হাসপাতালে তো সাদা থান, সাদা জামা, কোমরে সাদা বেলট মাথায় সাদা ক্যাপ পরে। নিজের সম্পর্কে খুব সচেতন। ওর সঙ্গে ঠাট্টা মশকরা সম্ভব নয়।
সরমা বলেছিলেন, হাত, কান, সব ন্যাড়া করে রাখিস! আমার কাছে এলে তো পরতে পারিস।
—ইচ্ছাই চইলা গিছে মাসিমা।
—একটা টিপ পরলে কী সুন্দর দেখায়?
—পুরুষ পিছে লাগবে। আপনাগো সময় চইলা গিছে। অহন মাইয়ালোকের... হাসপাতালে কত কি দেখি মাসিমা! আপনে ভাবতে পারবেন না। শুধু পয়সায় লিগ্যা স্বামী তার পরিবারে বাঘের মুখে ঠেইলা পাঠায়! একটা মাইয়ার ইজ্জত লয় তিনজন! মাইয়ারে মায়েবাপেও খেদায়। হাসপাতালে আনছিল তারে, বাঁইচা উঠল, বিষ খাইছিল। শুধু কান্দে আর কয়, বাঁচাইলেন ক্যান? আমি যামু কোথা?
সরমা নিশ্বাস ফেলেন।
—মায়ে ঠিক কামই করছিল।
—তুই শুনেছিস?
—হ, মায়েই কইছে।
—তোর মার মতো হয় ক'জন?
—মাইয়ারা ছুরি ছোরা ধরতে শিখলে কিছু বাচতে পারত।
—তুই যেখানে আছিস, সে জায়গা তো ভাল?
—খুব ভাল।
—পরে দেখিস, বিয়েও ভাল হবে তোর।
—কে জানে! আজকাল বিয়ের আগে টাকা হাঁকে, টাকা নাই ত বিয়া নাই।
—যাক গে, সে সব পরের কথা।
—হ মাসিমা। নিজের পায়ে দাড়াই, কর্তব্য তো কিছুই করি নাই। মায়ের কিছু করতে হইব না.... সে আমি জাইনা রাখছি।
—এ কথা বললি কেন?
—তার দেহে আছেই বা কী! মরলেও সে ওই গুরুপাড়াতেই মরব। সেখানে শ্মশানে জায়গা কিন্যা থুছে।
—জানি। ও সব ভেবো না মা। তুমি পায়ে দাঁড়িয়েছো, কারো ভরসা করো না, এটা জানলেই মা অনেক শান্তি পাবে। একদিকে তাকিয়ে আছে কতকাল!
—আপনে আমার কাছে মায়ের থিক্যা বেশি ছারা কম নয়। আপনারে কাছে রাখুম, স্যাবা করুম, তা হইলে বাচি। আর কিছু চাই না... ন্যান, দারাইলেন ক্যান?
—ফল কিনে নিই... তোর মা তো দোকানের মিষ্টি খাবে না।
—ফল বা কী খায়! একেক বছর একেক ফল গুরুর চরণে দেয়। দ্যাখেন, ভাতও দিয়া থুছে কিনা! আমি তো কই। অন্নজলটাও দিয়া দাও!
বাসে ব্রিজ পেরোলেন, ওপারে নেমে রিকশা নেন।
অতসী বলে, নদী পারাইতাম কবে, ভুইলা গিছি। আগে তো আছিল নৌকা।
—কতটা দূর?
—ধরেন এক কিলোমিটার। আগে আছিল তিন মাইল পথ! হাইটা আইতে হইত। অহন পথরে, ঘাটরে, দোকান, বাজার!
প্যাডলার বলল, কুলডাঙায় যাইবেন কুনবারি?
—নরসিংহ পারা।
—অহন এহানেও জমির দাম বাড়ত্যাছে।
—জানি, চলেন।
সরমা আগে বোঝেননি কুলডাঙা কত বড় জায়গা। পাড়ার পর পাড়া, দোকানপাটও আছে। বেশ বড় একটা মাঠ। কোন মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ে। অতসী অস্ফুটে বলে, এত মানুষজন আছিল না। রেবতীর বাড়ি দেখে উনি অবাক হয়ে যান। টিনের চালের পাকা বাড়ি, পাঁচিল ঘেরা।
—বাড়ির সামনে ওই যে টিউব কল, আর মাথায় পাকা ছাওনি দেখেন, মা তার জ্যাঠার নামে দান করছে। যত ঘরবাড়ি, সকল জমি মা'গো আছিল। পাঁচ জাত বসত করাইছিল মায়ের জ্যাঠা! তাতেই নরসিংপারা নাম হইছে। শুনি পঞ্চায়েত থিক্যা নাম দিবে নরসিংহপুর।
—এত গাছগাছালি!
—চলেন, দ্যাখেন।
—জোরে জোরে পাঁচিলের দরজায় ঘা দেয় অতসী।
... দরজা খোলো মা, কারে লইয়া আসছি দ্যাখো।
রেবতী আতিপাতি দরজা খোলে। বলে, এমুন খবরবার্তা না দিয়া... এ কী? সপন তো দেখি না। সরমা দিদি আইতে পারলা?
—মা কি দরজায় কথা কইয়া বিদায় দিবা?
—ল' অতসী, বরো মুখ হইছে তোর। আসো দিদি, আসো! গোপাইলা গেল কই? আসো দিদি, ঘরে আসো।
দরজার পর অনেকটা জমিতে ফুলবাগান। জবার গাছই কতগুলো। কলাঝাড় বেশ ঘন। অপরাজিতা লতিয়ে উঠেছে পেয়ারা গাছে।
চওড়া বারান্দা, তারপর ঘর। চৌকি, আলমারি, টেবিল, দুটো চেয়ার।
—দারাও, জল আইনা দেই। হাতমুখ ধোও।
—না, মাসিমারে আমি কলপারে লইয়া যাই। বারি দেখাই।
ঘরের পর অন্দরেও বারান্দা। বারান্দার কোলে আরেকটি ঘর। শেকল তোলা।
—মায়ে ওই ঘরে থাকে।
—বড় ঘরে কে থাকে?
—এই গোপাইলা। সুবল, গোপাল, অদের বাপের লগে মায়ের জমি চাষ করে। ডাক্তার মাসির বাপ, বুড়া দাদুর বেবস্থাই চলত্যাছে। সুবল বিয়া করছে, অহন গোপাল তার ভাগ্না নিয়া ওই ঘরে থাকে। ভাগ্না পড়তেয়াছে, ওই টেবুলে পড়ে।
স্নানের পাকা ঘর, মেঝেতে টিউবওয়েল।
—সব ব্যবস্থা করেছে।
—হ তা করছে। মাসিগো বারি যাইত, থাকত, চালচলনে অন্যরকম চিরকাল। গায়ে জামা, পরনে সায়া পরত, অহনও পরে। দারান, গামছা আনি। আমার তো সবই আছে এখানে। আসাই হয় না, এই যা।
হাত মুখ ধুয়ে ঘরে আসেন ওঁরা। রেবতী বলে, রাতে তো থাকবা না দিদি?
—কেমন করে থাকব বাড়ি ফেলে?
—কও ক্যান, সেই টানেই তো বার বার আসি অহন। টান গিয়াও যায় না। অতসীর হাতে সর্ব—সমর্পণ কইরা ছুটি নিমু।
—আমি এহানে থাকুম না।
—বারি কী করবি?
—তোমার নামে ইসকুল দিমু মাইয়াগো।
—গোপাইলা আইছে, ডাক দেহি?
—থাক মা, বকাবকি কইরা কাম নাই। অদের ভরসার বাস।
—ক্যান বকুম না? হাতি খন্দেও পরে নাই, বানরের লাথ খাইব ক্যান?
রেবতী চোখ বুজে নিজেকে স্থির করে ও সম্পূর্ণ শান্ত গলায় বলে, অরে এই টাকাটা দে। মন্টুর দোকান হইতে কাচা সন্দেশ আনব।
—এত টাকার সন্দেশ কেন রেবতী?
—তোমরা খাইবা, লইয়া যাইবা। গছের ফল ছারা ত দিতেও পারুম না কিছু।
অতসী বলে, মায়ের তিনটা গাই আছিল।
—হঃ করছিলাম সব। জিদের বশে করছিলাম। অহন কত বছর হয়, নাইরকেল বাগান বেচলাম, গাই গরু বেচলাম। বারি বাসের যুগ্য কইয়া নিলাম। হকলই অতসীর। অতসীর আঠারো হইছে, অরে নিয়া হকল ওর নামে কইরা দিমু।
গোপাল নামে একটি আঠার—উনিশ বছরের ছেলে মিষ্টির বাক্স এনে অতসীকে দেয়। রেবতী বলে, দেখ গোপাইল্যা! আমার দিদি হয়।
—অতসী দিদি কইছে সে কথা, পিসি।
—ল, মাইন্য দে। এমন মাইনষের পায়ের ধূলাও আশীর্বাদ। অরে আশীর্বাদ করো দিদি! গোপাইল্যা ছাওয়াল ভাল। অদের হাতেই সব। যত্ন কইরা রাখে। এট্টা বকনা দিছি, অর্ধেক ধান দেই। ডাল কলাই যা করে অরাই নেয়। ঘর তুইলা দিছিলাম, তা তার বাপের চেষ্টায় রক্ষা পাইছে। তিন বিঘা জমি লিখ্যা দিলাম, অর দাদা বিয়া বসল। শউরের কুমন্ত্রণায় বাপরে দিয়া সেই জমি বেচাইল। তিন বিঘা পনেরো হাজার। শোনছে কেউ? অহন বিশ পচিশ হাজার বিঘার দর? ভাবলে...
—মা। যা দিয়া দিছ, তা লইয়া ভাইব না। তয় মায়ের দুঃখ গোপাইল্যা। টাকা দিয়া তরা কাম করলি না কুনো। হকলটি রেডিও, টেপরেকর্ডার, খাওনদাওন আর সুবইলার সাইকেল কিন্যা উরাইয়া দিলি।
—দাদার শউর হাওলাত নিল।
—হ হ, নিধিরামের ভাই বলরামের হাওলাৎ! সে টাকা জলে গিছে। যা গোপাইল্যা, কামে যা!
গোপাল চলে যায়। খুবই জোয়ান, বেঁটেখাটো, পরনে জয় বাংলার প্যান্ট ও গেঞ্জি। তবে মুখ চোখের ভাব সরল, বোকা বোকা।
রেবতী নিঃশ্বাস ফেলে। বলে, অগো তরে আমিও কম করি না। অদের ভরসাতেই সব ছাইড়া রাখি। তর, এহানে হকলই বেচতে অইব। বলরাম আর কৎজন অহনে জমি কও, মাইয়া কও, গরু কও, হকল বেচনের দালালি করে। ভাইগ্য! যে নিধিরাম পাকা গরু চোর, জালিয়াতির আসামি, সেই অহনে পঞ্চায়েত সদস্য! অরা অহনে নানা কালা কারবারে লামছে। যাউক গা! আমি চোখ বুজলে অতসীরে আসতেও হইব না। ভুজঙ্গ উকিল টাউনে বইসাই বেইচা দিব।
—ইস! তোমার নামে ইস্কুল দিব।
—পারবি না। জবরদখল কইরা বইসা গেলে উঠাইতে পারবি না। রতনবাবুদের কাছারিবাড়ি, ময়রাজানে আমবাগান, হকলই জবরদখল হইয়া গেল না? অহন জমির ফাটকা চলত্যাছে। কাচা টাকার লোভে চাষি জমি বেইচা হাহাকার করত্যাছে। সুবইলার বাপ যা করল!
অতসী মুচকি হেসে বলল, তার নাম কি গো মা? সে না ডাকসম্বন্ধে ভাই?
—দূর মুখপুরি। সে নাম আমি বলতে পারি?
—পতিতপাবন! আমার বাবার নাম, জানেন মাসি? তাতেই মা.....
সরমা ঈষৎ হেসে বললেন, মিলনের বাবার নাম আমি তো দরকারে বলি। অবশ্য তেমন দরকার হলে....
—মাসিমা! জিগান না মারে বাবা কি বইলা ডাকত!
রেবতী হেসে ফেলে।
—দুজনাই পোলাপান। আমি ক্ষীরমুরকি খাইতে বরো ভালবাসতাম। তা হে জনা আমারে অ আমার মুরকি গো! বইলা ক্ষ্যাপাইছে।
নিশ্বাস ফেলে রেবতী—কুন—অ কষ্ট দেয় নাই। আমারে কত যত্ন করছে। অতসী হইতে কত আনন্দ করছে। ভাল লোকটাই থাকল না গো দিদি!
অতসী বলে, থাক ও সব কথা, মা!
—তর নামে বেবাগটি রাইখা যাই। বিয়ার লাইগা শিক্ষিৎ পোলা আইসা লাইন দিব। চাকুইরা মাইয়া, এত সম্পত্তি!
—বিয়ার আগে কিছু খাইতে দিবা কি না ভাব।
—যা, আমার চৈকির নিচে পিফা আছে, কলা আছে, সব গাছের! লইয়া আয় কাইটা। মাসিরে দে, নিজেও খা।
—তোমার বাড়ি বড় সুন্দর রেবতী।
—ক'দিন থাকলে গুরুপাড়া লইয়া যাইতাম।
—সেখানে শ্মশানে জমি কিনেছো?
—হ দিদি! জমি কিনছি। রান্নাশাল, পাকা দালান বারি বানাইয়া দিছি। মাইয়ারা নিত্য ভোগ রান্ধে, ঘরখান বরোসরো হইলে তাগো আরাম। আমি ছারা কারেও এমুন বারি আইসা থাকতে দেয় তারা? আমি কই, মাইয়ার সম্পত্তি, দেখভালন আমার। তা এটুক আমি করব। কয় না কিছু। আমারে মাইন্য দেয়।
অতসী পাথরের থালায় পেঁপে, কলা, সন্দেশ নিয়ে আসে। কাঁসার রেকাবি এগিয়ে ধরে, দেন আমাদের তুইলা দেন।
রেবতী বলে, আল্লাইদা মাইয়া!
—মাসিমা না থাকলে অতসী পাইতা?
—ল', থাল হাতে ও কথা বলতে নাই।
—রেবতী তুমি!
—দিনে একপাকে হবিষ্য। রাতে খই, কলা, দুধ।
—সে কী মা? রাতে না তুমি বাতাস খাইতা? ছি ছি, পাপ হইব।
—না লো! অহন খাই। মহারাজ খুব বকছে। বলছে দেহ শুকাইয়া লাভ নাই কুনো।
—বাঁচলাম।
—চশমাও লইছি। পুথি পড়তে চক্ষে দেই।
ওঁদের ফেরার সময় হয়। রেবতী বলে, আজ মিষ্টিটা লইয়া যা। টানতে কষ্ট, নয় ডাটা, লঙ্কা, লাউ, কলা দিতাম।
—দাও না, রিকশাতেই তো যামু।
—দেই তবে।
মস্ত এক থলিতে সব নিয়ে আসে রেবতী। বলে, দিদির বাজার করতে লাগব না দু'দিন।
—মা! চিঠি যেমুন দেও দিও।
—তুইও দিস।
ছিপছিপে, শুভ্রবসনা রেবতী দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়, যতক্ষণ না রিকশা মোড় নেয়।
অতসী বলে, সত্যই সুবইলা বরো বেইমানি করল। মায়ে অগো ঘর, বৎসরের ধান, কলাই, বেবাগ দেয়, আজও দিত্যাছে। অর শ্বশুরের মতলব, সে বারি আর বাগান লেখাইয়া লও। অতসী পাইব ক্যান?
—বেচেই দিক। শত্রুতা করে সম্পত্তি রাখা যায় না।
অতসী ঘাড় নাড়ল। বলল, আমিও মায়ের মাইয়া। সে যহন এত কষ্ট করছে, আমি তার নাম জাগাইয়া যামু। অরা কয়, মাইয়ার বিয়া হইব না। সহ্য হয় না মাসিমা, এমুন ব্যবহার... মায়ে বইলা অগো রাখছে। আমি হইলে বেবাগ তারাইতাম। ওই সুবইলার অসুখ কম করছে মা?
ওই একটা দিন বড় ভাল কেটেছিল সরমার। ভগবান দিয়েছিল একটি সুন্দর, সমুজ্জ্বল শান্তির দিন! ভগবান আছেন? আজ সরমা ভেবে পান না কিছু।
ওই দিনটি তাঁর শেষ পাওনা ছিল এত দীর্ঘ পথ হাঁটার পর?
তাই হবে, তাই হবে, নইলে অতসী ফিরে যাবে দু'দিন বাদে। সরমা রান্নাবান্না সেরে ওর সঙ্গে গল্প করছেন, পার্থ কেন অসময়ে এসে দাঁড়াল?
কেন বলল, বকু ছাড়া পেয়ে গেছে শুনলাম।
ঘড়ির কাঁটা থেমে গিয়েছিল সরমার হৃৎপিণ্ডও বুঝি এক নিমেষ থমকে দাঁড়িয়েছিল, মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল, গলা শুকনো।
—ছাড়া পেয়ে গেল? কিন্তু...
—অবনীবাবু যোগাযোগ রেখেছিল... কলকাতায় ছিল বকু... কলকাতাতেই কেসটা রি—ওপন করায়.... এসব আইনের মারপ্যাঁচ বুঝি না.... এখন শুনছি, ওর শাস্তিটাই বেআইনী হয়েছে। যথেষ্ট প্রমাণ ওর বিরুদ্ধে ছিল না, হেন তেন...
—কিন্তু.... কেস তো পুলিশ করেছিল...
—আপিল করিয়ে টরিয়ে ...আমি এসব বুঝিও না তেমন। আপনাকে বলে গেলাম।
—সে.... এখানে আসছে?
—তাও জানি না। আচ্ছা চলি। মাঝে মাঝে আপনার খবর নিতাম, প্রসূতিসদনে খবর নেব। ও এলে... ওখানে আসা....
সরমার চোখে অন্ধকার নেমেছিল। আবার, আবার তাঁর কারাবাস শুরু হবে?
—টাউনে সে সময়ে ওর ওপর সবাই তো...
—কয়েকটা বছর গড়িয়ে গেছে। টাউনে সে সময়ে যারা ছিল, সবাই নেই। আর রাজনীতিও তো দিন দিন নোংরা থেকে নোংরা হচ্ছে। লুম্পেন, গুণ্ডা ঢুকে পড়েছে সর্বত্র। বর্ডার জেলা, নানা রকম ক্রাইম হচ্ছে এখন.... সবই বদলে গেছে। জানি না... বুঝি না... চলি তবে। অবনীবাবুকে খুব উল্লসিত দেখলাম.... মনে হ'ল আপনিই একা জানেন না। চলি।
সে কথাও সত্যি। মানুষ, মূল্যবোধ এক রকম থাকছে না। ডাকাতি, ধর্ষণ, কোন কেসে আসামী ধরা পড়ে না। রাজনীতিক আর সমাজবিরোধী আজ পরস্পরের সঙ্গে গাঁঠছড়ায় বাঁধা।
সাধারণ মানুষের জীবনও নিয়ন্ত্রণ করে সমাজবিরোধীরাই।
হতাশ মানুষ এখন দেবদৈবে ভরসা খোঁজে। কিন্তু দেবদৈবের বা কি ক্ষমতা আছে?
গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে চেয়েছিলেন সুধন্য। আজ শহরের কালো ছায়া গ্রামকেও গ্রাস করেছে। সরমা, রেবতী, এদের মত মানুষেরা এ সমাজে একেবারে অপ্রয়োজনীয়।
সরমা দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে পড়েছিলেন। অতসী সব শুনছিল এতক্ষণ। ও এগিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
তারপর বলল, চলেন, খাইয়া লই।
—অতসী!
—কানবেন না, কানবেন না। ইশশ .... নিজের পোলা ঘরে আইবে, মারে কানতে হয়! কানবেন না, অমঙ্গল হয় মাসিমা....
সরমা চোখ মোছেন। কান্নাভেজা রুদ্ধপ্রায় গলায় বলেন, সবই আমার অদৃষ্ট!
—নেন, ওঠেন।
—চল, খাবি চল?
—খাইয়া চইলা যাই মাসিমা? বাস পামু এখন।
—না মা, তুমি যাবে কেন? কাল যেও ধীরে আস্তে। তোমার ক্ষতি করবে কে?
—মায়ে বলছিল....
—আমার মনে আছে। কাল যেও।
—আপনারে রাইখা যাইতে আমার....
—কাঁদে না অতসী, কাঁদে না। কাঁদলে কাঁদার শেষ নেই মা। কেঁদে জুড়োব তেমন কপাল করে আমিও আসিনি, তুইও আসিসনি।
—আমার উপর দিয়া ত কিছুই যায় নাই। মা জানলাম না, আপনে বাচাইয়া রাখছেন এতকাল.... আপনেরে ভগবান কেন এমুন শাস্তি দিত্যাছে? আপনের কথাই ভাবলে...
সেদিন রাতে অতসী হঠাৎ বলেছিল মাসিমা! শাস্তি ত দাদাও কম পায় নাই... দ্যাখেন হয়তো দাদায় সুবুদ্ধি হইয়া ঘরে আসব। আপনের দুশ্চিন্তা থাকব না আর! এক পোলা এত ভাল..
সরমা নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।
—ঘুমো অতসী!
অতসী তাঁর মনের কথাই বলেছে। যে ছেলে ভাল, সে তো টাকা পাঠিয়েই কর্তব্য সারে। আসতেই পারে না। আর বকু? এত বছর ধরে তো এক প্রার্থনাই জানিয়ে যান সরমা, সে যেন ভাল হয়ে যায়। যেখানে থাকুক, মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচে। নরকের প্রেতের জীবন যেন ত্যাগ করে।
এ প্রার্থনা যে করেন, তাও তো নীরবে। এ কী ভাগ্য তাঁর, এ কী নিয়তি?
দগ্ধ, জীর্ণ জীবনে অতসী একমাত্র সান্ত্বনার প্রলেপ। মনে মনে গভীর আবেগে বলেন, তোর ভাল হক অতসী, তুই ভাল থাক। তোর মায়ের স্বপ্ন পূর্ণ হক। আমিও শান্তি পাব। চোখে দেখি না দেখি—কাছে পাই বা না পাই—ভাল আছিস জেনে শান্তি পাব।
অতসী ঘুম ঘুম চোখে বলেছিল, কাপর ইস্ত্রি করতে দিছি, আইনা নিবেন।
—নেব, তুই ঘুমো।
অতসী ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সরমার গায়ে হাত রেখে। আপনের গায়ে হাত রাখলে বরো ভরসা পাই। ভয়ভীত চইলা যায় মাসীমা।
ছাড়া পেয়েই বাড়ি আসেনি বকু। টাউনেও আসেনি। জেল থেকে বেরিয়ে অবনীবাবুর যোগাযোগেই শেলটার পেয়েছিল কলকাতার কাছাকাছি। অবনীবাবু বলেছিল, নতুন টাউনশিপ হচ্ছে এখন, এখন জমি ডেভেলপ করো আর বাড়ি বানাও। ঢুকিয়ে দিলাম বীরু পাঠকের আপিসে। খাটবে খাবে। কারু কিছু বলার নেই।
এ কথা মিলনই সরমাকে বলে গেল।
—টাউনে আসবে না সে?
—এলে আসবে।
—তাকে দেখেছিস তুই?
—না মা। তবে বাবুল দেখেছে, আমার ক্লাসে পড়ত যে বাবুল? দাদা না কি অন্য মানুষ হয়ে গেছে। বাবুলকে চা খাইয়েছে। বলেছে, কুসঙ্গে পড়েছিলাম, মাকে মুখ দেখাতে লজ্জা করে। পায়ে দাঁড়াই, তখন আসব।
—আমি তো চিঠিও লিখেছিলাম দু'বার। জবাব দেয়নি।
—পায়নি হয় তো।
—বাইরেই থাকুক, ভাল পথে চলুক। এ টাউনে তো...
—না মা, আজকাল কে কী মনে রাখছে বলো। মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল অবস্থা মানুষের, কেউ আর ভাবে না কিছু।
—যাক, ''মা'' শব্দটা মনে আছে ওর;
—বাবুল তো তাই বলল।
—তুই হঠাৎ এলি যে?
—কাজে ফরাক্কা গিয়েছিলাম, তোমাকে দেখে গেলাম। কাল যাব।
—ওরা ভাল আছে?
—ভাল থাকে কোথায়? লিলির মা'র জ্বর হয়েছিল, লিলি সেখানেই। ওঁরা লিলির খুব ভরসা করেন তো! ওকেও ছুটতে হয়।
—সে তো হবেই!
—অতসী আসে না?
—মাঝে মাঝে; তারও তো কাজ!
—রেবতী মাসি বেশ এখানে রেখে তোমার ঘাড়ে মেয়ে মানুষ করে নিল যা হক।
—কী বলছিস?
—রেবতী মাসি তো পসয়াঅলা মানুষ! যথেষ্ট আছে ওর। বাবুলের মেসোই তো ওর জমিজমা বেচার ব্যবস্থা করে দেয়।
—আছে, বেচছে।
—এ বাড়ির দামও অনেক এখন।
—শুনে কী হবে মিলন? আমি বেচে দেব? যাব কোথায়? আমাকে এখানেই থাকতে হবে।
—লিলি আর আমি আলোচনা করি তো...
—আমি বেঁচে থাকতে ও বাড়ি ছেড়ে যাব কোথায়? এখানেই যে ভাবে পারি...
মন বলছিল, বকু যদি ভাল হয়ে কোনদিন ফিরে আসে, বাড়িটা না থাকলে সে দাঁড়াবে কোথায়?
মন বলছিল, মুখ বলতে পারছিল না।
—দাদা খুব অন্য রকম হয়ে গেছে। বাবুল বলল, কী সব আংটি কবচ পরেছে।
সরমা শ্রান্ত গলায় বলেছিলেন, তাকে তো বহুকাল দেখি না, তোকেও কমই দেখি। যে যেখানে থাকো, ভাল থাকো।
—রত্ন ধারণা করলে ভাল হয় মা!
—সেইজন্যে পলা পরেছিস?
—হ্যাঁ, খুব কাজ দিচ্ছে।
এও বোধহয় পরিবর্তিত সময়ের লক্ষণ। তাই হবে। টাউনেও তো এখন গ্রহরত্ন বিচার ইত্যাদির জোর হাওয়া। যারই পয়সা আছে সেই কলকাতা ছুটছে। টাউনেও জ্যোতিষীরা পসার জমিয়েছে। কী হয় রত্ন ধারণ করলে? সরমা আর সুধন্য যদি তা করতেন। কী এড়ানো যেত? বকুর অধঃপতন? সুধন্যর মৃত্যু? মিলনের এমন আলাদা হয়ে যাওয়া?
সরমা জানেন না, সরমা জানেন না।
শুধু জানেন তাঁকে থাকতে হবে নির্বাসনে। একবার অতসীকে বলেছিলেন, পারলে টাউনের বাড়ি বেচে তোর মায়ের বাড়ির কাছে বাড়ি করে নিতাম।
—পারতেন না।
—কী সুন্দর বাড়ি। কী শান্তি!
—টাউনের কাছের গ্রাম। টাউনের চেয়ে খারাপ মাসিমা। অশান্তি, দলাদলি, হিংসা, মারদাঙ্গা, কী নাই? আর, সারা জীবন টাউনে থাইকা, অহনে .... হয় না মাসিমা। অল্প বয়সে পারা যায়, বেশি বয়সে.... আমিই পারি না। কত অকথা কুকথা। এই বলে, বিয়া দাও মাইয়ার। আবার বলে, অতসী তো সেখানে বিয়া করছে। আমাগো লুকায়। মা আছিল না, নিধিরাম মায়ের পাকা তেতুল গাছটা কাইটা বেইচা দিল?
—সত্যি, শান্তি কোথাও নেই।
—মায়ে ভাবে গুরুপাড়ায় শান্তি পাইব, সেখানেও অহনে হিংসাহিংসি। অহন তো কাম শিখাইছে, ওহানে ডিউটি দেই। যখন স্বাধীনে চাকরি করুম, জানি মায়ে যাইব না। তয় আপনাকে নিয়া যামু। বারি দাদারে দিয়া চইলা যিবেন।
সরমা কি সে আশাও রাখেননি মনের সঙ্গোপনে? বকু বা মিলনের তো তাঁকে দরকার নেই। তাঁর আর অতসীর পরস্পরকে দরকার।
আর দেখো আজ সন্ধ্যায় কী শুনলেন?
রাত কি কাটবে না?
রাত যেন অন্ধকার হচ্ছে ক্রমে।
জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া।
মেঘ জমছে আকাশে। তারা ঢেকে গেছে, বুঝি প্রলয় নামবে।
নামুক, ঝড়ঝঞ্ঝা, মহাপ্রলয়। সরমা কালকের সকাল দেখতে চান না।
ছাড়া পাবার দেড় বছর বাদে বকু টাউনে ফেরে। এসে মার সামনে দাঁড়িয়েছিল।
বলেছিল, বসব একটু?
সরমা ঘাড় হেলিয়ে ছিলেন।
—মিথ্যে কখনও টেকে না মা।
সরমা অনেক চেষ্টায় বললেন, ও সব কথা থাক বকু। কী হবে বলে?
বকু কী নিখুঁতভাবে অনুশোচনা দগ্ধ সন্তানের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল, সরমার মনও কেঁপে উঠেছিল বারবার। কীভাবে সত্য—অর্ধসত্য ও মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে কথা বলেছিল।
হ্যাঁ, সে সময়ে ও একেবারে বয়ে নিয়েছিল। পাপের পথের নিদারুণ মোহ ওকে বেঁধে ফেলেছিল।
—বাড়িতে ভাল লাগত না মা? দামি জামাকাপড় পরব, নোট ওড়াব, মস্তানি করব, না করলে অবনীবাবু বা পুলিশ ফেলে দেবে আমাকে।
—কেন, কেন বকু? আমরা কি খারাপ থাকছিলাম? সামান্য, খেয়ে পরেও তো মাথা তুলে বাঁচা যায়!
—আমি তো তা চাইনি।
—এখন ... এখন কী হবে?
বকু তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখছিল।
—প্রায়শ্চিত্ত।
—তুমি করবে?
বকুর চোখ স্থির, যেন ছায়াঢাকা। চোখ দেখে ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে না। গলার স্বরও সম্পূর্ণ অন্য রকম। কথা বলছিল ও গলায় প্রলম্বিত কবচে আঙুল রেখে।
—বাবার মৃত্যুর কারণও তো আমি।
সরমা নিরুত্তর।
—অনেক কথাই মনে হয়, বলার লোক পাই না।
—সঙ্গে কোন ব্যাগ সুটকেশ নেই?
—লালবাবুর গ্যারেজে রেখে এসেছি।
—কাজ করছো কোথাও? এখন.... যদি বুঝে শুনে চলো...
—তোমার সঙ্গে জড়াব না ভাবছি। ওদিকে দুটো ঘর তুলে নেব, বাথরুম থাকবে। নিজের মত আসব, যাব। তোমার আপত্তি আছে?
—সে তো অনেক টাকার ধাক্কা।
বকু ঈষৎ হেসে বলল, টাকা আমার, তোমার মতামতটা দরকার। বাড়ি তোমার।
—করে নিতে পারলে করে নাও।
—ওপরেও রান্নাঘর বাথরুম করে দিতে পারি। একটা বড় ঘর। বাবা তো শেষ করে যেতে পারেনি... ওপরে থেকে একতলা ভাড়াও দিতে পারো। মিলন তো বউ নিয়ে এখানে থাকবে না।
—না, আমি যতদিন আছি, যেমন রেখে গেছেন, তেমনই থাকুক বাড়ি। আমার পরে...
—সেই ভাল। আমি উঠি মা।
—বাড়িতে থাকবে না?
—না... এখনি নয়...অনুমতি করলে আসব যাব... ঘর তুলে নিলে থাকব...
—কোথায় আছো বকু?
—গ্যারেজে। মানে... পিছনের ঘরে। একটা অফিসও করব ওদিকে....
—কিসের?
—ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। পয়সা এখন মাটিতে।
—তোমার অফিস?
—পাঠক কোম্পানির। ওর ব্যবসা ছড়াচ্ছে এখন। নর্থ বেঙ্গলে চা বাগান, কলকাতায় হাউসিং, দুর্গাপুরে হাউসিং, সে অনেক ব্যাপার। চলি এখন।
—এসো বকু। ভাল থাকো, ভাল কাজ করো, আমি চিঠি লিখলে জবাব দাওনি... তুমি ভাল থাকো তেমন প্রার্থনাই করে যাচ্ছি। তোমাকে ভাল দেখলে আমি শান্তিতে মরব।
—মিলন টাকা দেয়?
—মাসে মাসে পাঠায়।
—ওর ক্ষমতাই বা কী, পাঠাবেই বা কত।
বকুর গলায় তাচ্ছিল্য পরিষ্কার। তারপরই ও সম্পূর্ণ অন্য গলায় বলল, টাকা লাগবে? রেখে যাব টাকা?
—না বকু। টাকা লাগবে না।
আজ মনে হয়, ভাগ্যে টাকা নেননি। টাকা নিলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতেন না।
বকুর বাইরের ব্যবহার কিছুকাল অন্তত খুবই ভদ্র, নম্র, অনুতপ্ত ছিল। শুধু তাঁর কাছেই নয়, টাউনের কাছেও। যারা ওকে আগে দেখেছে, তারাও বলত, আগের মতো অসভ্য চোয়াড়ে নেই ও।
সরমা শুনে যেতেন। অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে চাইতেন, বিশ্বাস আসত না।
বকু তার মনের মতো ঘর তুলে নিয়েছিল, যদিও সে ঘরে ও কমই এসেছে পরে। এখন তো বহুদিন আসে না। রেবতী বলে গেল, শোধরাইছে, ঘর তোলছে, এবারে সংসারি হইয়া বসুক।
সরমা কথা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু পোড়খাওয়া, বহুদর্শী রেবতীও তো ভুলে গিয়েছিল। একবার ও ডাক্তার দেখাতে এল। কেবল অক্ষিদে, নয় অজীর্ণ, কিছুই ভাল লাগে না মুখে। বলে গেল, দাদায় অষুধ দিল খানিক, লইলাম, খামু না।
—কেন রেবতী!
—আর দিদি! বাঁচবার ইচ্ছাই চইলা যাইত্যাছে। মন কয়, রেবতী লো! দ্যাহ ফালাইয়া মুক্ত হ'! আর বাচুম ক্যান? অতসীর বান্ধা কাম, পাকা চাকরি ওখানেই হইব। অর নামেই সগলই লেখ্যা দিছি। কাম করলাম অনেক, অহন আর মন চলে না।
—তাহলেও ওষুধ খেও।
—রাখেন ছিরা কথা। শোনেন, আপনের বড় পোলারে যে দেখলাম। হ' দিদি, সাচাই কই। লোকজন নিয়া কুলডাঙা, মদনখালি বিবির হাট ঘুরতেছিল। জমি খুঁজে। তা আমার বারি আইল, গড় হইয়া পন্নাম করল। কইল, মায়ের লিগ্যা আপনে কত করছেন তা জানি। মুখ দেইখ্যা কে বলব...
—তোমার বিশ্বাস হয় ও শুধরে গেছে?
—কথা তো ভালই কয়। আর শোনেন। ভালর পর মন্দ, মন্দের পর ভাল, ঠাকুরের পিথিবিতে এই তো চলে। আমারেই দেখেন।
সরমা নিরুত্তর।
—এমন ঘর বানাইল, থাকে না?
—না। মাঝে মাঝে আসে।
এই রেবতীর সঙ্গে ওঁর শেষ দেখা। তারপরেই তো অতসী একদিন এসে আছড়ে পড়ল।
—মা মইরা গেল মাসিমা! আমার কপাল! আমি সময়ে খবরও পাই নাই। পায়রাডাঙা গিছিলাম আরেক নার্সের বিয়া দেখতে, অরা মায়ের কিনা জমিতে তার গতি করছে, আমি দেখতেও পাইলাম না।
অতসী সারাদিন, সারা রাত কেঁদেছিল মায়ের জন্যে। সরমা ওকে ধরে বসেছিলেন। তারপর, অতসী চোখ মুছে উঠে বসেছিল।
—আজ যামু মাসিমা।
—কোথায় যাবি?
—কুলডাঙা যামু, গুরুপারা এক রাত থাকুম, তারপর উকিলবাড়ি হইয়া হাসপাতাল ফিরুম।
—আমি সঙ্গে যাব?
অতসী সবেগে মাথা নেড়েছিল। বলেছিল, যা কান্দা ছিল, আপনের কাছে কাইন্দা লইছি। আর কান্দুম না।
—একলা যাবি মা?
—না, জবা সিসটারের কাকা আছে, তারে লইয়া যামু। তিনি মায়ের গুরুভাই।
—কাজকর্মও আছে মায়ের...
—মায়ের গুরু থানে অরাই বলল। ওইখানেই শান্তি পাইত, ওইখানেই দিন দেইখা কাম কইরা দিমু। কাঙ্গালী ভোজনের কথা বলত মা, ওখানেই....
সরমা মাথা নেড়েছিলেন।
—তোকে নিয়ে থাকলেই শান্তি পেত মা। তুই বলে এত চিন্তা ছিল!
—থাকে তো নাই। বলত, আমারে দোষ দিস না মা। আমার কত জন্মের পাপ আছিল, এ জন্মে জেল খাটলাম। তরে কাছে রাখি নাই, আমার কপাল দেইখা। যারে ধইরা বাচতে গিছি, সেই চইলা যায়। তর বাপ, আমার জ্যাঠা, দেখ! অসীমা দিদি যে এত ভালবাসত, সেও তীর্থে গিয়া মইরা গেল। তরে কাছে রাখলে তরই খারাপ হইত। তাতেই... দোষ নিস না মা!
এরকমই জটিল ছিল রেবতীর মন?
—আয় তবে। যাতে শান্তি পাস...
—শান্তি পাই আপনের কাছে আইলে। সে তো আমার আপনার কপালে নাই! তয়, নিধিরামের বিষদাঁত আমি ভাঙব। ওই বারি আর লগের জমি অরে লইতে দিব না।
নিধিরাম নয়, বকু ছিল পিছনে। সরমা তা জানতেন না।
তখনও জানেননি, বোঝা উচিত ছিল। বোঝেননি বলেই না আজ সরমা রাত জাগছেন এমন করে। এ বিছানায় অতসী অনেকদিন শোয় না। তবু হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন পাশের খালি জায়গায়। মিলন ঘুমোচ্ছে ওপরে। টাউনে আর কে জেগে আছে সরমার মতো?
অসীমা গেল, রেবতী গেল, সরমা এমন করে বেঁচে থাকবেন কেন? অতসী কি আছে, না নেই? কেন মনে হচ্ছে অতসী এখানে আছে এখানেই?
সব কাজ সেরে বিজয়িনীর মতো ফিরেছিল অতসী।
—আপনে একলা? রাতটুকু থাকুম?
—নিশ্চয় অতসী।
—দাদা তো আসেই না, তাই না?
—এলেও চলে যায়। থাকে না।
—গেরেজের পিছনে ভাল ঘরে থাকে। আপিসও করছে, খুব জমি কিনতেয়াছে।
—আমাকে কিছু বলে না। ওখানে সব ভালভাবে হয়ে গেল!
—হ। টাকা তুইলা নিছিলাম। কাঙ্গালী ভোজন.... আমিও একটু জল দিলাম মায়েরে। শ্মশান মনে হয় না মাসিমা, এমন সুন্দর জায়গা। গাছ লাগাইছে, মড়া রাইখা বসব, তার চালা তুলছে। পুরোত ভাল। মন দিয়া মন্ত্র পরায়। দেখেন! জীবনে আমার কাছে কিছু লইল না। মইরা তবে অন্নজল নিল! মারে যেহানে দিছে, সেহানে পাচিল ঘেইরা মায়ের নামে ফলক দিব।
—কোন বিঘ্ন হয়নি তো?
—বিঘ্ন মনে করলে বিঘ্ন।
অতসী নিশ্বাস ফেলল।
—সুবইলার বউ বইলা গেল, জমি—বাড়ি রাখতে পারবা না তুমি। গ্রামেই ঢুকতে পারবা না। অহন সবাই না কি বলত্যাছে, মায়ে জল্লাদ আছিল, মাইয়া দুশ্চরিত্র। নার্সিং করে, না হাতি, নামে নার্স, কামে পাচজনের লগে লটরঘটর করে।
—ছি ছি ছি!
—এ তো বউয়ের কাকা নিধিরামের রটনা। আমি ঘরের খাট চৌকি সর্বস্ব বিলাইয়া দিছি মাসিমা। ঘর তালা দিয়া আইছি, চাবি দিছি নিধিরামের শত্রু বঙ্কিমরে। বলছি, তগো ক্লাবে টাকা দিমু। তরা গাছের ফল খা, ঘরটা দেখ, রাতে জানি মানুষ থাকে।
—বেচে দিলেই হত না?
—ইশ! অমুন মাগনা কি না! পাচটা গ্রামে মুনুষ জমি বেচছে, অহন হাহাকার কান্দে। নিধিরাম দালালি খাইয়া কোঠাবাড়ি তুলছে। আমি অগো বিষদাত ভাইঙা দিমু।
ভুজঙ্গ উকিলও অতসীকে শুনিয়েছিলেন যে, জমি বা বাড়ি রাখতে লোকবল চাই।
অতসী শোনেনি।
—উকিলবাবু কয় অহন জমি বাপের নয়, দাপের। তোমার লোকবল নাই, বেইচা দাও। তা মাসিমা, আমার মায়েও জিদ্দি আছিল, আমিও তার মাইয়া। সে জীবন দিয়া রাইখা গেল, আমি বেইচা দিমু?
—রেবতীও তো তাই বলেছিল।
—না মাসিমা! আমি মায়ের নাম জাগাইয়া করুম কিছু। ওই গ্রামে মা শত লাঞ্ছনা সইয়া মাতা তুইলা থাকছে। তার সম্মান এট্টা.... টাকা দিয়া কী করুম? আমিও তো ধরেন হাজার টাকা পাইব এবার। অবশ্য দুই শৎ টাকা মিশনরে দান করুম মাসে মাসে। অরা ত ভাল কাম করে।
—মায়ের নামে ওখানেই বেড করে দে।
—না, কুলডাঙায় করুম।
জেদ, অল্প বয়সের জেদ। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার জেদ।
—ঠিক আছে, খাবি চল!
কী যোগাযোগ। সেই সন্ধ্যাতেই বকু এসেছিল। ''মা'! বলে ডেকে ও ঢুকল আর অতসীকে দেখেই কত সহজে বলল, রেবতী মাসির মেয়ে অতসী না? মুখ দেখেই চিনেছি।
সরমা নির্বাক দর্শক।
অতসী কিন্তু খুব সহজে বলল, আপনে বকুদা না? এক্কেরে বাপের মুখ পাইছেন। দারান, গর করি।
মাটিতে লুটিয়ে প্রণাম করেছিল অতসী। বলেছিল, আমি আপনের এক আবাইগা বোন গো দাদা।
—অভাগী কিসে? মায়ের সম্পত্তি পেয়েছো! নিজে কাজ করছো!
—তাতে কী হয় দাদা? মা কবে হইতে গুরুপারার মঠে নাম লিখাইছে, মাসিমা না থাকলে আমি ত দারাইতাম না। আমার কে আছে দাদা?
—না না, ভেবো না। বিপদ হলেই চলে এসো। তোমার মা.... আগে জমিজমা বেচেছে জলের দরে। তুমি যেন তা কোরো না।
—আমি বেচুম না।
—নিধিরাম তোমাদের কে হয় না? লোকটা খুব বাজে স্বভাবের। যাকে অসহায় পাচ্ছে, তার জমি কম দামে কিনে নিচ্ছে। লোকটার কোন কৃতজ্ঞতা নেই। এ কথা বলায় অতসী নিমেষে গলে যায়।
—সেই তো পিছনে লাগছে।
—বেচলে আমায় বোলো। ওদিকে নিউ অনন্তপুর টাউনশিপ হবে। পার্ক, বাজার, সুন্দর সুন্দর বাড়ি। বদলে যাবে চেহারা।
—আমি বেচুম না দাদা!
—দাদা কেন, 'বকুদা' বলো।
—বোন বইলা একটু দেখবেন বকুদা!
—নিশ্চয় দেখব। আচ্ছা, চলি আমি। মা! কাল কলকাতা যাব। কিছু আনব না কি?
—না বকু... দরকার নেই কিছু।
—জানতাম, এই কথাই বলবে।
একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে বকু চলে গেল। বলল, দরজা খোলা রাখো কেন? যে কেউ ঢুকতে পারে?
ও চলে গেলে অতসী বলল, এই মানুষের নামে এত কথা? আমি ত ভালই দেখলাম মাসিমা। আপনে বা কিছু নেন না কেন?
—অভ্যেস চলে গেছে অসী। থাক... খাবি আয়।
তিনি আর অতসী একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, সেও তো সেদিনই শেষবারের মতো। যদিও তা জানতেন না সরমা।
আজ মনে হয়, বকু যখন থেকে আতঙ্ক হয়ে উঠল, তখন থেকেই তাঁর কারাদণ্ড শুরু। শহরে থেকেও মুখ লুকিয়ে চলতেন, কারও সঙ্গে মিশতেন না। বকুকে জন্ম দিয়েছেন, সেই অপরাধে কারাবাস।
বকু যতদিন জেলে ছিল, সেই সময়টুকুই যেন জামিনে খালাস ছিলেন।
বকু ফিরে এসেছে, আবার তাঁর কারাবাস শুরু। পার্থ আসে না, অসীমা নেই, রেবতী চলে গেল, প্রসূতিসদনে যান, মুখ বুজে কাজ করে চলে আসেন। এ জীবন কতদিন, কতদিন সইতে হবে?
মিলন কবে দূরে সরে গেছে। অতসী, অতসী যেন এক টুকরো আকাশ। অন্ধকার কারাকক্ষের একমাত্র জানলা দিয়ে ওকে দেখতে পান। মুক্তি পায় মন। অতসী ওর বুভুক্ষু, স্নেহকাতর মনে এক পশলা বৃষ্টি, একটি স্নিগ্ধ প্রলেপ।
—কী ভাবেন মাসীমা?
—কিছু না মা, তুই খা।
—মায়ে বুঝে নাই, দাদা তো সেই মানুষ নাই। তাতেই থাকতে মানা করছিল।
—তুই খা।
—আপনের বিশ্বাস হয় না?
—বিশ্বাস... করতে ভয় পাই।
অতসী বিশ্বাস উজ্জ্বল চোখে বলেছিল, কুলডাঙ্গায় বঙ্কিমের কাকা কত পাপ করছে, মদ খাইত, প্রথম বউরে মাইরাই ফেলে। অহন তার কী পরিবর্তন! কী শান্ত মানুষ! পরে বিয়া করছে, সংসারি হইছে, আগের পক্ষের মাইয়ারে ভাল বিয়া দিছে। মাইনষের বিপদে আপদে গিয়া দারায়। মাইনষে মন্দ হয়, আবার ভালও হয়। রত্নাকরের কথা তো আপনেই বলতেন।
—বুঝছি, ভাল হক, সে তো আমিও চাই। তবে অতসী... এখন বিশ্বাস আসে না। আমার অবস্থা...
—আমি বুঝি। ওঠেন, ছোট পোলা আসে না?
—কমই আসে।
—দ্যাখবেন, আপনের মতো মায়েরে যারা বুঝল না, একদিন তারা আইসা পায়ে পরবে।
অতসী এইভাবে ভাবত। দুঃখের পর সুখ আসে। দুঃখিনী মায়ের মহিমা একদিন বোঝে হৃদয়হীন সন্তান! কেমন করে সে এসব বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখেছিল?
* * *
অতসী আর থাকতে আসেনি বেশ কিছুদিন। তবে আসতে যেতে দেখা করেছে। একবার বকুর সঙ্গে দেখাও হয়েছে।
বকু ইদানীং মায়ের কাছে আসছিল। বলতে শুরু করেছিল, অতসীকে সরমা বলুন জেদ ছাড়তে। কুলডাঙ্গায় জমি কিনছে বকুর আপিস। বেচে দেওয়া বুদ্ধির কাজ হবে।
—এত জমি দিয়ে কী করবে তোমরা?
—এখন ফেলে রাখব! পরে দেখা যাবে।
—ওর অনেক স্বপ্ন আছে। ও রাজি হবে না।
—তুমি বললেও না?
—প্রথমত আমি বলতে যাব না। আগে বলেছি, রাজি হয়নি। তারপর ও জেদি মেয়ে।
—ও! জেদ!
—খুব জেদি। মায়ের মতো।
—তা হলে বলতে হবে না। তবে মা! কেউ যদি জবরদখল করে বসে, ওঠাতে পারবে না।
জবরদখলই বা করবে কেন? তুমি তো অতসীর সঙ্গে কথা বলবে।
—জবরদখল যারা করে, তারা কি ভাল লোক?
—জবরদখল হবে? ওর মায়ের এত কষ্টের সম্পত্তি?
—এখন তো.... জবরদখলের ভয় দেখিয়ে বেচতেও বাধ্য করছে।
—কুলডাঙাতেও?
—কলকাতার আশপাশেও হচ্ছে। ওকে বেচতেই বলো।
—ও অন্য জাতের মেয়ে বকু। ভীষণ জেদ ওর।
—বুঝিয়ে বলো। জমির কাজে যারা নেমেছে, টাকা—থানা—আদালত—এল. আর. আপিস, সব তাদের হাতে।
—সরমা কেন বোঝেন নি, বকু তার নিজের কথাই বলছে? এ টাউনে সবই বকুর হাতে চলে গেছে, তা কেন বোঝেন নি?
দুরাশা, দুরাশা ছিল মনে যে বকু সৎপথে যাবার চেষ্টা করছে। বকু যা বলছে তা অতসীর ভালর জন্যই।
—বুঝিয়ে বলো, তোমার কথা তো মানে।
—সব কথা মানে, কিন্তু জমি বাড়ি বেচতে বললে শোনে না।
—বুঝতে চায় না।
—নদীর ও ধারটাই ডেভলপ করছে... করবে। এ টাউনের তো ভবিষ্যৎ নেই।
সরমার অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই অন্য কথা বললেন।
—বাড়ি করেছো, থাকো না কেন?
—থাকব... থাকব.... তোমার সম্পত্তির দামও বাড়িয়ে দিলাম বাড়ি করে। তোমারই তো জমি বাড়ি।
—আমার দরকার নেই সম্পত্তিতে।
—এগুলোই তো ভুল মা। টাকার মর্মই বোঝো না। এখন কি আর আদ্যিকেলে আইডিয়া নিয়ে চলে?
—চিরকাল জেনেছি, ভদ্রভাবে কোনও মতে ধারকর্জ না করে জীবন কাটালে সেই যথেষ্ট।
বকু ভুরু কুঁচকে পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলার ছোপে কিছু পড়তে চেষ্টা করেছিল চোখ ওর সুদূরে! ও আস্তে অন্যমনস্ক গলায় বলল, বাবা তাই বলত! সে রকম জীবনই কাটিয়ে গেল, একটা নো—বডি হয়ে।
সরমা কঠিন গলায় বললেন, বাবার নামও কোরো না।
রকুর গলা একই রকম। বিস্মিতও বটে, বাবার মৃত্যুর কারণও আমি হলাম। তাই তুমি আমাকে দেখলে পাথর হয়ে যাও। আশ্চর্য। ছেলে কী করছে তাই নিয়ে হার্ট অ্যাটাক!
সম্পূর্ণ অন্য নগ্ন, বর্বর গলায় বলল! তোমাদের সব ধারণা ভুল! আজ ভিখিরির মতো বাঁচা যায় না। কবুতরের কলিজা নিয়ে বাঁচা যায় না।
—তুমি... সিংহের মতো বাঁচো।
বকু মাথা ঝাঁকাল। বলল, বাবার জন্যে আমাকে তুমি কাঠগড়ায় তুলে রেখেছো। এত নির্মম হওয়া ঠিক নয় মা! এত অভিমানী হওয়াও ঠিক নয়। আমি অমানুষ, মিলন বা মানুষ কিসে? সেও তো নিজেরটুকু নিয়ে ঘর গোছাচ্ছে। কিন্তু মা! আমি চেষ্টা করছি, চেষ্টা করছি। এত বিচার কোরো না মা একটু নরম হও। কেন টাকা চাইছি? যাতে তুমি ভাল থাকো, খুব ভাল থাকো, চাকরি ছেড়ে দিতে পারো...
এরকম ভাবাবেগপূর্ণ বাক্য অসমাপ্ত রেখেই বকু চলে গিয়েছিল।
সরমা মাথা নেড়েছিলেন।
কেন বাড়িতে থাকে না?
কেন গ্যারেজের পিছনে থাকে?
কেন অবনীবাবু আর বীরু পাঠক ওকে খাতির করে?
কোথা থেকে ও জমি কেনার টাকা পাচ্ছে?
কিসের পিছনে দৌড়াচ্ছে ও?
কেন ও টাউনে ফিরে এল?
অবনীবাবু আর বীরু পাঠক না কি বলে, বকুকে টাউন থেকে মিথ্যা দুর্নাম নিয়ে বেরোতে হয়েছিল। তাই নিজের নামকে প্রতিষ্ঠা করবে এখানেই, সেই জেদেই ও ফিরে এসেছে।
সরমা জানেন, ''মিথ্যা দুর্নাম'' নয়। বকু মিতাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছিল। কীভাবে ও ছাড়া পেল তা সরমা জানেন না। সরমা জানেন, ক্ষমতা থাকলে তিনি সব ফেলে রেখে চলে যেতেন।
ভীষণ চূড়ান্ত রকম একা তিনি।
অতসী, শেষ অবধি তোর কাছেই চলে যাব।
সুধন্যের স্মৃতির প্রতি বিশ্বস্ততাও তো বিশাল বন্ধন।
মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু আসে না কেন?
মরতেও ইচ্ছে করে না। এ বাড়ি বাড়ি নয়। সুধন্যের বড় কষ্টের, বড় যত্নের ও ত্যাগের স্মৃতি। তিনি রেখেছেন, ছেলেদের কাছে এর মূল্য শুধু টাকার অঙ্কে।
অতসী, তুই তাড়াতাড়ি দাঁড়া। আমি দেখে যাই। কবে বকু তার মুখোশ ফেলে দেবে, সেদিন কী হবে?
মুখোশ পরে চলতে বকুর খুব কষ্ট হচ্ছিল। একদিন মুখোশ খুলে গেল, পর্দা উড়ে গেল, বকু ছিন্নভিন্ন করে দিল তাঁর এত কষ্টে ও ত্যাগে অর্জিত ক্ষণিকের শান্তি।
বকু মাঝে মঝে বাড়িতে থাকতে শুরু করেছিল। ওর নিজের অংশেই থাকত মার সঙ্গে কথাবার্তা বলত, একটু বসত।
সেই উদ্যোগ নিয়ে পুরো বাড়ি খুচরো মেরামত, ঘরে চুনকাম, বাইরে রং দরজা জানলায় রং করাল। রান্নাঘরে গ্যাস এনে দিল, পাঁচিল ফেলে শক্ত মজবুত পাঁচিল তুলল।
সবাই প্রশংসা করল, কিন্তু সরমা একটু হেসে চুপ করে গেলেন। বকুকে বলেন, অনেক খরচ হল।
—হক। বাড়ি রাখতে গেলে খরচ করতে হয়। মিলন তো চার পয়সা দেবে না।
—গ্রিল লাগালে, আবার নেট?
—নিরাপদ থাকবে, একা থাকো।
রামের মা এখন কাজ করে না, ও এনে দিয়েছে মীরাকে। প্রসূতিসদনে রামের বউয়ের যমজ ছেলে হয়েছে, সরমা বলে কয়ে খরচ কম করে দিয়েছিলেন। সরমা একদা পার্থকে বলে রামকে ব্যাঙ্ক লোন পাইয়ে দেন, ফলে রাম নিজের রিকশা কিনে নেয়। ইত্যকার কারণে রামের মা খুবই কৃতজ্ঞ। মাঝে মাঝে আসে খোঁজ নিতে। সে বলল, অহন বারি হাসতেছে। এবারে বউ আনেন, দুঃখ তো অনেক করলেন।
—দুঃখ কিসের? খাটা তো ভাল।
—এবারে আরাম করেন। বউ আনেন। সরমার চোখে পর্দা পড়ল ঝপ করে! বললেন, এখন কি বিয়ে দেয় কেউ? ছেলেরা বিয়ে করে।
—হ, আমার রাম যেমুন সীতা আনছে। আমি বউ আনলে উচকপালি মাইয়া আনতাম না। মন্দ কপাল হয় ঢিপকপালি মাইয়ার।
সরমা বুঝলেন, সবাই সব ভুলে গেছে। কার বিয়ে দেবেন? বকুর? বকু ক'বছর আগে কী করেছিল? হয় ভুলে গেছে, নয় সেদিনের স্মৃতি চাপা পড়েছে মনে। বর্তমানে মানুষ আর ভাবে না, বিচার করে না। চাল—তেল—কেরোসিন—লোডশেডিং—ছেলেমেয়ের স্কুলে ভর্তি—মানুষ বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত।
ব্যস্ত নিরাপত্তার জন্যেও। রোজগার বেড়েছে শিক্ষক শিক্ষিকারও। জমি কিংবা বাড়ি করব, গ্যাস চাই, ফ্রিজ চাই, এর জন্যও ধাবিত মানুষ। ঐহিক নিরাপত্তার জন্য চাই সেফগার্ড। তাই এত ধর্মগুরু ও জ্যোতিষী ও তন্ত্রমন্ত্রের জন্য রেস চলছে। টাউন সেদিনের মতো প্রতিবাদী, মানবিক ও নৈতিক নেই। একা সরমার মনে শুধু নিরন্তর রক্ত ঝরে ফোঁটা—ফোঁটা। আবার তো তিনি বোবা, কার সঙ্গে কথা বলবেন? আকাশে বৃষ্টি ছিল, বিকেলে ঘনিয়েছিল আঁধার।
বকু ভিজতে ভিজতে এল।
—আজ থেকে যেতে হবে মা! ফরাক্কা যাওয়া হল না, আজ টাউনে ফিরব না। ভোরে চলে যাব।
এদিকটা এখন 'টাউন' নয়, নদীতে খেয়া চলত বলে ''ঘাটপাড়া'' নাম ছিল, সে নামই ফিরে এসেছে।
—এদিকে একটা খাওয়ার মতো হোটেল নেই।
—বিষ্টিতে হোটেলে যাবে কে?
—তাহলে খিচুড়ি করবে মা?
—তাই করি।
একদা সুদূর অতীতে, বালক বকু বলত, আজ খিচুড়ি করবে মা? বড় বড় আলু দিয়ে?
—আমি জামাকাপড় বদলে আসি।
বকু গেল জামাকাপড় বদলাতে, অতসী ধাক্কা দিল দরজায়।
—দরজা খোলেন মাসিমা। জলে ভিজত্যাছি?
—দরজা খুলতে বৃষ্টিস্নাত অতসী ঢুকল।
—কী বা অ্যাকসিডেন্ট হইছে, বাস বন্ধ। কুলডাঙা হইতে ফিরতে কী বিপদ তাই বলেন? অথচ জরুরী কাম, কাল যাইতেই হইব। যাক, আইয়া পরলাম।
—যা যা, চাবি নিয়ে যা। জামাকাপড় ছাড়। তোর একটা জামা, সায়া সবই তো আছে। আমার কাপড়ই পর।
কালো জামা, সাদা পাতলা থান কাপড়ে অতসীকে অন্যরকম দেখাচ্ছিল। এক পিঠ ভেজা চুল। খুব অন্যরকম।
—আজ খিচুরির দিন।
—তাই করছি। বকুও খেতে চাইল।
—বকুদা আইছে? দারান আমি রানধি।
বকু পিছন থেকে বলল, রাঁধতে পারো?
—সব পারি। আর অহন তো বারি নূতন কইরা দিছেন, গ্যাসে রানতে আরাম কত!
বকু বারান্দায় গিয়ে মোড়ায় বসল কাগজ নিয়ে। সরমা বাংলা কাগজ একটা রাখেন। অনেককালের অভ্যাস।
খাওয়া দাওয়া সহজ ভাবেই হল। বকু তৃপ্তি করে খেল। বলল, বেশ হয়েছে।
—মাসিমার মতো হয় না।
—তা কী করে হবে? মার মতো কে রাঁধবে? কত কম ঘি—তেলে রাঁধত!
আমার মা কোজাগরী পুজোর দিন যে নিরামিষ তরকারি রাঁধত!
—পূজা হইত বারিতে?
—হত বই কি। মা খাবার করত কত রকম। বাবা তো দোকানের খাবার খেত না।
—মনে আছে আপনের?
—সব মনে আছে। জেলে বসে সে সব কথাই ভাবতাম।
—অহন ও সব ভুইলা যান। মাসিমা কষ্ট পাইছে খুব....
—বাড়ি নতুন করে ফেললাম, মায়ের জন্যেই তো। দাঁড়াও, রান্নাঘরে কল এনে দেব।
সরমার মনে হচ্ছিল, এত স্বাভাবিক কথাবার্তা, বকু কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে?
খাওয়া হয়ে গেল। অতসী, সরমা আর বকু বসে কথা বললেন। তারপর অতসী বলল, বিছানা কইরা ফেলি মাসিমা। কাল ভোরে বারাইতে হইব।
—যা। আমি রান্নাঘর বন্ধ করে আসছি। তোর ভিজে কাপড় পাশের ঘরে মেলে দে।
—বারি জানি হাসতেয়াছে।
—বকু সব করল।
—শুনছি সব। খুব পছন্দ হইছে আমার। যাই, কাপর মেইলা দেই। নাইলন ত পরতে পারি না যে নিমেষে শুকাইব। সুতির কাপড়...
কাপড় মেলতে গেল অতসী! বকু চলে গেল নিজের ঘরে। রান্নাঘর বন্ধ করে সরমা শোবার ঘরে ঢুকলেন, বিছানা ঝাড়ার ঝাঁটা খুঁজছেন। হঠাৎ অতসীর গলায় চাপা আর্তনাদ শুনলেন।
—না বকুদা না। ছারেন আমারে! না..
সরমা দৌড়ে ঢুকেছিলেন ও ঘরে। বকুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন।
—বেরোও, বেরোও তুমি! বেরো আমার বাড়ি থেকে, বেরো!
—আমি ওর সঙ্গে ঠাট্টা করছিলাম মা!
—বেরো, বেরো তুই; আমার বাড়িতে আমার অতসীকে....
বকু মুখোশ ফেলে দিয়েছিল। হিংস্র, কুটিল, ভয়াল ও ধূর্ত ওর মুখচোখ।
—টাকা ফেলে দাও চলে যাচ্ছি।
—কিসের টাকা?
—বাড়ির মধ্যে বাড়ি.... এ বাড়ি মেরামত ... মনে ছিল না?
—বেরো তুই। টাকা খরচ আমি করেছি?
বুক বাজিয়ে বকু বলেছিল, আমি করেছি। ইনভেসটমেন্ট। সে টাকা জলে যাবে?
সরমা ওকে প্রবল ধাক্কায় বাইরে বের করে দেয়। বকু নিজের ঘরে চলে যায়।
অতসীকে জাপটে ধরে ঘরে নিয়ে আসেন। বলেন, ভয় কী মা! আমি আছি।
অতসী মাথা হেলায়। ও তখনও বিমূঢ়।
—এখানে পা দিস না আর প্রসূতিসদনে দেখা করিস।
অতসী! ও অমানুষ, আক্রোশ পুষে রাখবে।
—বুঝেছি।
—এখন বুঝছিস, কেন আমি ওকে বিশ্বাস পাইনি?
—আপনারে যদি....
—না... আমাকে মেরে শাস্তি দেবে না....আমার উপর ওর আক্রোশ .... দগ্ধে দগ্ধে মারবে...। এ বাড়ির লোভই কি ওর নেই?
দুজনে দুজনকে জড়িয়ে শুয়েছিলেন। সারা রাত, সারা রাত, নিদ্রাহীন। কারাকক্ষে একটা জানলা ছিল। এক টুকরো আকাশ। বকু সে জানলা বন্ধ করে দিচ্ছে।
—প্রসূতিসদনে চিঠি লিখিস।
—হ। আপনে... এ কথা... কারেও ...
—তাই বলি? কলঙ্ক তো মেয়েদেরই হয়।
ভোরবেলা সরমা বাড়ি বন্ধ করে অতসীর সঙ্গে বাস অবধি গিয়েছিলেন। বাসস্টান্ডে চা খেয়েছিলেন দুজনে।
হঠাৎ অতসী বলল, ক্যান মাইয়াদেরই হয় মাসিমা?
—কী হয় মা?
—কলঙ্ক? শুধু মাইয়াগো হয়?
—তাই তো দেখি!
হয়নি। মিতার বেলা হয়নি। টাউন ক্ষেপে গিয়েছিল। বকুকে হাতে পেলে মেরে ফেলত।
—আমিও তো দেখি। কত মাইয়ার ইজ্জত লইতেয়াছে কত পুরুষ। একজনারে চারজন... হাসপাতালে তো আনেই। ধরাই পরে না অনাচারগুলা... ধরলেও আদালত ছাইরা দেয়... মাইয়াদের কলঙ্ক হয়... বিয়া হয় না... শুধু... মাইয়ারা।
—কী বলব মা।
—দাদা ডাকলাম.... সম্মান করলাম... বুঝি নাই মাসিমা। তয় অহন হইতে আর ক্যাও আমার গায়ে হাত দিতে পারব না, আপনে দেখবেন!
—হ্যাঁ অতসী। বিশ্বাস করি।
—আপনে পারবেন না থাকতে। আমি কোয়াটার পাই, আপনারে মাথায় কইরা লইয়া যামু।
—আমিও সেই দিনের পথ চেয়ে থাকব।
—মা আর কী সইছে? আপনে... বাসে উঠি মাসিমা।
শক্ত মেয়ে অতসী। নাক টেনে মুখচোখ মুছে নিল।
সরমা ফিরে এলেন।
ছয়
ওই ক'মাস বকু টাউনে পা রাখছিল। তাই মুখোশটা রাখার দরকার হয়েছিল।
মুখোশ টেনে ফেলে দিল। আর ও মুখোশ পরেনি।
না, বাড়িতে বাস করতে আসেনি আর। সরমার সঙ্গে দরকারও ফুরিয়ে গিয়েছিল। প্রসূতিসদন তো টাউনে, সে তো ঘাটপাড়ায় নয়। সেখানেই সরমার কর্মস্থান।
আর পেনশান আনতেও টাউনেই যেতে হত।
মেট্রন প্রায়ই হা—হুতাশ করতেন, তাঁর বোন ভগ্নীপতি মাটির মানুষ ছিল। কিন্তু তাদের দুই ছেলে জয় ও তিলক দুটোই জানোয়ার হয়ে গেছে।
—তোমার ছেলের দলে ভিড়েছে সরমাদি!
—আমার এই ছেলের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই।
—এক বাড়িতে বাস তো করছো।
—সে বাড়ি তুলেছে, বাস করে না। কোন কোন দিন আসে! বাইরে গেট করেছে। ঢোকে আর বেরোয়। আমার দিকে আসে না।
মেট্রন নিশ্বাস ফেলল।
—কী বলব! বর্ডার থেকে মেয়ে এনেও পাচার করে, নানা কীর্তি করছে।
—পুলিশ ধরে না কেন?
—কী করে ধরবে? ওর পেছনে অবনীবাবু। আবার কলকাতা থেকে বীরু পাঠক আসছে রবি পাঠককে মদত দিতে। বকুর পেছনে সেই তো আসল লোক। ভোট আসছে, বকুর মদত চায়।
—সেই তো আমারও কথা, বহুকাল ধরে। বকুকে ওরা সমর্থন কেন করে, কেন ওর কাছে যায়। কেন, ওকে মেয়াদ না ফুরোতে বার করে আনল!
সরমার চোখ মুখ গনগন করছিল, চোখে কী যন্ত্রণা, যেন দগ্ধ হচ্ছেন, জ্বলে যাচ্ছেন।
মেট্রন নীরব।
—আজ অনেকদিন ধরে আমি এ প্রশ্নটা করি।
—আমাদের ভয় হয়। আপনার খোঁজে যদি এখানে কোনদিন....
—ডাক্তারবাবু কিছু বলেছেন?
—তিনি কি বলবার লোক?
—আমিই জিজ্ঞেস করব।
সরমা জিজ্ঞেস করেছিলেন।
অসীমার ভাই, একদা তাকে ''তুমি'' বলতেন, সেভাবে বলেননি। সেভাবে তো বলেন না কথা। তিনি কর্মদাতা মনিব, সরমা কর্মী। এভাবেই কথা বলেন।
খুব সসংকোচে বলেছিলেন, আমি এখানে কাজ করছি বলে প্রসূতিসদনের কোন অসুবিধে হচ্ছে?
প্রদীপ্তর মুখ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।
—বুঝলাম না। বসুন না।
—আমার ছেলের কথা তো জানেন! তার মা হয়ে এখানে কাজ করলে আপনার কোন অসুবিধা হলে... বলবেন, আমি তখনই....
—ছেড়ে দেবেন।
—হ্যাঁ ডাক্তারবাবু।
প্রদীপ্ত নিশ্বাস ফেলেছিল। বলেছিল, আপনার ছেলে এ টাউনেই আতঙ্ক একটা। আপনাকে নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। বরঞ্চ আপনাকে ছাড়ালে আমার অসুবিধা হতে পারে।
—আমিই যদি ছেড়ে দিই?
—তাহলে আমরা আরও বিপন্ন হব। হয়তো আপনি আছেন বলে ঘাটপাড়ায় ওর জুলুম কম। হয়তো এই কারণে আমিও মাসে মাসে হাজার টাকা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছি।
—হাজার টাকা?
—হ্যাঁ... ভোটের সময় বেশি দিতে হয়। কিছু করার নেই। অন্য ডাক্তাররা বেশিই দেন। এটা তো এখানকার প্যাটার্ন।
—আপনারা পারেন না পুলিশকে বলে ওর জুলুম বন্ধ করতে?
—কী করে করব? পুলিশ আমাদের কথা শুনবে কেন?
প্রদীপ্ত তিক্ত গলায় বলেছিলেন, রাজনীতিক নানা রঙের নেতা লোকেরা ওর পিছনে। পুলিশ বা প্রশাসন নেতাদের চটাবে? খুন দেখলে বলবে আত্মহত্যা, মেয়ে তুলে নিয়ে গেলে কয়েকটা চুনোপুঁটিকে জেরা করে ছেড়ে দেবে। আমি প্রত্যাশাও করি না কিছু। ভাবাও ছেড়ে দিয়েছি।
—আমি কী বলব?
—কী আর বলবেন! বেঁধে মার তো আপনিই খাচ্ছেন। রেবতীদির মেয়ে আসে?
—আসত, আমি নিষেধ করেছি। বলেছি, এখানে দেখা করে যাবে আমার সঙ্গে।
—বাবা আর দিদি রেবতীদিকে আহ্লাদ দিয়ে মাথায় তুলে গেছেন। তখন দিনকাল অন্যরকম ছিল। রেবতীদি যা করেছে, মানিয়ে গেছে। অতসী ওর মায়ের মতোই জেদি। নিজের ভাল বোঝে না। আমরা ওপারের জমি বেচে দিচ্ছি, ও ওই জমি আর বাড়ি নিয়ে জেদ করে শত্রু ডেকে আনছে।
—আমি... ওকে বারবার বলি বেচে দিতে... ও চায়...
—হ্যাঁ, মায়ের নামে কিছু করবে। করবে তো করুক না, ওখানেই করতে হবে? জমি বাড়ী তো যাবেই, ও নিজেও...
—এত জমি কিনছে কে?
—আপনার ছেলে আছে, বীরু পাঠক আছে, লক্ষ্মণ জৈন আছে, কেনার লোক অনেক।
—ওদের কাছ থেকে.....?
—টাউনশিপ হেনতেন হবে না। হবে প্ল্যানলেস বাড়ির জঙ্গল। কেনার লোকের অভাব? বর্ডার পেরিয়ে লোক আসছে, সম্পত্তি করে রেখে যাচ্ছে। এতগুলো রাস্তা, এত যাতায়াতের সুবিধে, গঙ্গার পাড় ধরে জমি, ব্রিজ বা খেয়া পেরোলে টাউন, যে পারছে সে কিনছে।
—অতসীকে বলব।
—বলুন, শুনবে বলে মনে হয় না। আর আপনি যদি বছর দুয়েক আগে ছেড়ে দিতেন, তাহলে প্রশ্ন ছিল না। এখন ছাড়বেন না। কারণ বললাম তো। আমাদের বাগানটার ওপর খুব লোভ ওর, ছুতো পেলেই... আর আপনি বা বাড়িতে বসে কী করবেন? আপনি নিজেও আছেন জাঁতাকলে। আসুন!
সেদিন, কেন সেদিন সরমা প্রদীপ্তকে বলেননি, যে বকু অতসীকে বেইজ্জত করতে গিয়েছিল বলে সরমা তাকে বের করে দিয়েছেন? কেন বলেননি, অতসী অত্যন্ত বিপন্ন?
কী করে বলতেন? অতসীকে বলতে গেলেন মাসখানেক বাদে ও প্রসূতিসদনে এসেছিল, ও কানেই নিল না।
বললেন, বকুর কথাবার্তা আমার ভাল লাগছে না রে। মনে হচ্ছে কী জানি কি বিপদ হবে।
—ভয় পান?
—হ্যাঁ মা। তুমি যে আমার...
—না মাসিমা। আমার জিদ উঠছে। মা এমুন কইরা চইলা গেল...কুন বয়সে বিয়া, কুন বয়সে বিধবা...কারো দিকে চায় নাই। দেহসুখ ভাবে নাই। আহার ছাইরা দিল। তার সম্পত্তি নিব নিধিরাম আর বকুদা?
—রাখবি কি করে।
—মাইনষে সপন দেখে। আমি সপন দেখি, দ্যাশের আবাইগা মাইয়াগো লিগ্যা মায়ের নামে কিছু করলাম। এ কাজ আমি না করলে...
—ওখানে তোর আছে কে?
—বঙ্কিমদের দলে টানছি না?
—শত্রুপক্ষ কি চুপ করে থাকবে?
—অহন তো চুপ। দ্যাখেন অরা ডরাইতে চায়। ডর করি না দেইখা আরও চুপ। মারে দেইখা শিখছি।
—ওরা করবে সব? বিশ্বাস পাস?
—বঙ্কিমরা সব কইরা দিতে আছে। এবার ঘর উঠামু পাশ দিয়া, মায়ের নামে মহিলা আর শিশু হাসপাতাল হইব। নিধিরাম এরেতারে দিয়া শাসাইতেছে খুব। আমি ডরাই নাই।
—ভয় পেলে ভাল করতিস।
—থানায় লেখাইয়া আইছি যে আমার সম্পত্তির বেবস্থা আমি করতেয়াছি, দুষ্ট লোকে শাসায়।
—পুলিশের ভরসা করিস?
—না কইরা উপায়? বকুদা না কি আমাকে সিধা করব! ডরাইয়া বাচা যায় না মাসিমা।
অতসী চলে গিয়েছিল। বলেছিল, অহন জেদ উঠছে আমারও। অদের শিক্ষা দিয়া ছারুম।
রেবতী যদি সব বেচে দিয়ে যেত!
—চাইছিল। আমি দিই নাই।
সরমা কী করবেন? অতসী যদি এমন একরোখা হয়। বাস্তব পরিস্থিতি মানে না? অতসীর কথা ভাবলে বুক ফেটে যাচ্ছিল। তরুণ, সাহসী, পবিত্র মেয়ে। রেবতীর সময় আর ওর সময়, দুটোতে যে অনেক তফাৎ।
থানার নতুন বড়বাবু না কি খুবই ভাল। তার কাছে যাবেন? কোন অভিযোগ নিয়ে?
অসহ অসহ সরমার এই নির্জন একাকীত্বে কারাবাস।
* * *
বকুও তার দাপটে বুঝিয়ে দিচ্ছিল টাউনকে।
নির্বাচন তো আসেই নির্বাচনের নিয়মে, প্রস্তুতি চালাতে হয় অনেক আগে থেকে।
অনন্তপুর টাউন এখন চারদিকে হাত ছড়াচ্ছে, দানবশিশুর মতো দিনে দিনে অতিকায় হচ্ছে। যে জনস্রোত দেখেন বাজারে, পথে সর্বত্র, তাদের মুখও চেনেন না সরমা। অনেক কিছু জানবার চেষ্টাও না করে অন্ধকারে থেকে যান। কিন্তু সে অন্ধকারেও তীব্র হেডলাইট এসে পড়ে। আলো ফেলে বকু। শীর্ণ, ঋজু, শুভ্রবসনা সরমার রেখাজীর্ণ মুখ আলোর ফ্রেমে ধরা পড়ে। বকুর গলায় উল্লাস থাকে, যেন শিকার ধরে ফেলেছে, যে শিকার ব্যাধকে এড়িয়ে লুকোতে চায়।
সাইকেল রিকশা থেকে নেমে বাজারে যাবেন, বিকট শব্দে জিপ দাঁড়াল।
বকু বলে, ছি ছি, তুমি থলি হাতে বাজারে? তিলক যা যা, বাজার করে দিয়ে আয়। আমার মা বাজার টেনে নিয়ে যাবে?
সকলে চমকে তাকায়। সরমা নির্বাক। অত্যন্ত লোমশ ও ঝাঁকড়াচুলো এক যুবক লাফিয়ে নামে।
—ওকে দাও মা, তুমি চলে যাও। জিপে পৌঁছে দেব?
সরমা মাথা নাড়েন। বলতে পারেন না, চিরকাল একাই বাজার করছি।
—তিলক পৌঁছে দেবে। চলি মা। কাজ আছে।
সরমা জোর করে নিজেকে শাসন করেন, আত্মস্থ হন। তিলককে বলেন, দরকার নেই, সামান্যই বাজার।
তাঁর ও বকুর সম্পর্ক তো সবাই জানে। তবু তিলক বলে, সে কী হয় ম্যাডাম? বস তাহলে...
—না না, তুমি চলে যাও। আমার...সামান্যই বাজার।
তিলক পাশাপাশি হাঁটে। সরমা কোনমতে আলু কেনেন। বেগুন ও লাউ একফালি। তিলক বলতে থাকে, ঠকিও না, ঠকিও না ভাই, কার মা জানো তো?
সরমা কীভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন জানেন না। বকু তাঁকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছে কেন?
তারপর থেকে বাজারে সরমার সংবর্ধনা অন্যরকম। তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে রিকশায় ঠেলাঠেলি।
মিলন বলল, দাদা শোধ নিচ্ছে মা!
—কিসের শোধ?
—ওই জানে।
প্রসূতিসদনে যান, যেখানে যান, মাঝে মাঝেই বকু জিপ থামায়।
—দেখুন রবিদা, আমার মা। সবাই শ্রদ্ধা করে জানেন?
অথবা, আশীর্বাদ করো মা, কাজে যাচ্ছি।
সরমা কোথায় যাবেন? কোথায় বকু নেই।
কত কী ঘটেছে, কত কী ঘটল! ''অনন্তপুর জনবাণী কে গলিয়ে দিত তাঁর জানলা দিয়ে। কে চাইত সরমাও জানুন। তিনি পড়ুন। এ কাগজ পড়বেন বলেই তো জানতেন যে কোথাও আছে প্রতিবাদী কণ্ঠ।
নালিখালের আবুল মণ্ডল তার কৃষিজমি বেচতে অস্বীকার করে। তার সদ্যবিবাহিতা মেয়েকে এই গ্রামস্থ স্বামীর ঘর থেকে অপহরণ করা হয়। ধর্ষিতা আমিনাকে উলঙ্গ অবস্থায় নদীর ধারে পাওয়া যায়। পুলিশের কাছে সে জবানবন্দি দেয় যে দোকান থেকে ফেরার সময়ে বিদেশ মিত্র, ওরফে বকু মিত্র বা ''বড়দা'' এবং তার দুই সঙ্গী জিপ থামিয়ে তাকে... তদন্ত চলছে।
এমনি করেই বেরোয় কিশোরী রেবা দাসের অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার সংবাদ।
দুর্ঘটনার খবর বেরোত। অনন্তপুরে সে সময়ে পার্টিবাজি এক চূড়ান্ত নোংরামিতে পৌঁছেছে।
আবুল মণ্ডলের মেয়েকে আদালতে তোলা যায় নি। কেননা থানায় তার জবানবন্দীর কাগজই ছিল না।
আবুল মণ্ডল নাকি চীৎকার করে মাথা কুটে মরেছিল। কার কাছে যাবে আবুল? পুলিশের কাছে গেল, কী লাভ হল?
ওই কাগজেই যখন পড়লেন, আবুলের মেয়ে সাইদাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে, আর পুলিশ আবুলকেই খুনী বলে ধরেছে, সরমা অবাক হন নি।
আবুল নাকি আদালতে বলেছিল, আমিই খুনী। আমি তাকে পুলিশের কাছে নিয়ে যাই। পুলিশ কেস করতে বলি দারোগাকে। এ কথা যে বাপ বলে, সে বাপ তো মেয়েকে তখনি খুন করে বসে আছে। আর মেয়েও তো খুন হতে চাইছিল। আল্লা আমারে নাও, আমারে নাও বলে বাগানে—জঙ্গলে ঘুরত যে, সে খুন হতে চায় নি?
আবুলকে দিয়ে স্বীকার করানো গেল না, সে তখন গ্রামেই ছিল না। সে ঘরের শেষ সম্বল বলদটি বেচতে বেলডাঙা গিয়েছিল।
''আমি খুনী, আমার ফাঁসী দেন'' বলে আবুল আবার মাথা কুটেছিল।
তারপর?
তারপর আবুল মণ্ডল, এমন কি ''অনন্তপুর জনবাণী'র পাতা থেকেও হারিয়ে গেল।
রেবা দাসের বাবা বুদ্ধি ধরে। সে লেখাপড়া জানত। সে বলে, রেপ কেস করতে পারে পুলিশ। মেয়ের মা, বাপ, ভাই কেউ পারে না। গরমেন কেস করলে তবে কেস হয়।
সুকেশ সরকার, যে না কি খবরগুলো লিখেছিল, সে ছুটে গিয়েছিল রেবার বাপের কাছে।
—চলুন, পুলিশকে চাপ দিয়ে কেস করাব।
নবনীমোহন দাস, মুড়ি—চিড়ে—বাতাসা দোকানী রাজী হয় নি।
—আপনি বলছ, ভালই বলছ, কিন্তু কেস করাব কাকে দিয়ে?
—পুলিশকে দিয়ে।
—ওঃ! পুলিশকে দিয়ে! পুলিশ যদি কিছু করত, তবে পিশাচগুলো সাহস পায় এত? ধরবে বা কেন? পেছনে ন্যাতারা আছে না?
—বকু বারবার এ ভাবে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে...
—কে বকু? কার নাম বলছ বাবু? আমি চিনি না, জানি না। বাতসা নেবে আপনি?
সুকেশ সরকার বাতাসা কিনেছিল কি না, তা সরমা জানেন না। তবে এটা সত্যি, যে সাইদা, রেখা, এদের কথা ভাবলেই মনে হত অতসীর কথা!
রেবা দাসের বাবা পুলিশের কাছে যেত কোন ভরসায়?
তাকে তো বাস করতে হবে মুচিখোলা গ্রামে, তার তো বউ ছেলে মেয়ে আছে।
ধর্ষণ ক্ষেত্রে অপরাধীর বিরুদ্ধে কেস করার অধিকার সরকারের। শুধু সরকারের?
ধর্ষিতার। তার আপনজনের, কারো কোন অধিকার নেই?
অতসীর কি হবে, অতসীর? সময়ের গা যখন এইডস সংক্রমণে পচে যাচ্ছে?
অতসীর কি হবে?
সরমাকে রামের মা বলেছিল, ক'টা মাইয়া এভাবে মইরা গেল, আমার বোনঝির ঘটনাও তো ওই।
—পুলিশ জানে?
—পুলিশ কী করবে? আপনারে পোলারে সবাই...
কিন্তু কোথায় সাহস পেয়েছিল পার্থদের সহপাঠী সুকেশ সরকার? শুনেছেন বটে ও ছাত্র—কংগ্রেস করত। কে ওকে ভরসা দিয়েছিল, তুমি লিখে যাও? সুকেশ তো রাজনীতি করত না।
মেট্রন বলেছিল, লিখবে না? বকুকে ছেড়ে দেবার বিরুদ্ধে ওই তো লেখে আগে। পরে না কলকাতার কাগজ লিখল? সুকেশের বউ কাজ করে, ও বাড়িভাড়ার টাকা পায়, কাগজ চালায়। পণ দেব না বলে জেদ ধরেছিল, তাতেই বোনের বিয়ে হল না। কী লাভ হল? বোন তো সেই ভেগেই গেল লাইট মিস্ত্রীর সঙ্গে? তবে হ্যাঁ, মিথ্যে খবর লেখে না।
—খবর ধরে নিলাম সত্যি। কিন্তু পুলিশ কিছু করে না কেন?
—দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না।
কিন্তু কেন?
''জনবাণী''র ওপরে লেখা থাকে নির্ভীক সংবাদপত্র। ছাপার ভুল থাকে, কৃষি সংবাদ, খেলাধুলার খবর। টাউনের আশপাশের মেলা ইত্যাদির খবর থাকে।
মাঝে মাঝে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ উত্তপ্ত ভাষায় নারীধর্ষণ—নির্যাতন ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার খবর থাকে।
মিলন বলে, এসব তো বহরমপুরেও কাগজে বেরোয় মা, আমার যে কী অবস্থা!
—তুই আসিস কেন মিলন?
—তুমি আছো বলে।
—আমি আছি, বাধ্য হয়ে আছি। তোর তো কোন বাধ্যবাধকতা নেই। সবাই জানে আমি কার মা। এ কলঙ্ক নিয়েই আমাকে চলতে হবে। তুই তো না এলেই পারিস।
—সবাই জানে আমি কার ভাই।
একজনের জন্যে কতজন জ্বলে মরবে, কতদিন?
—''জনবাণী'' পড়ে খবর পাও?
—শুনি মাঝে মাঝে। কাগজটাও দিয়ে যায়।
—কোনদিন কী লিখে বসবে, মরবে। একবার ভাবেও না, মেয়ে বড় হয়েছে, কলেজে যায় বাসে চেপে।
—তোর জন্যেও ভয় হয়। কেন বা আসিস!
—লিলি তো আসতে দিতেই চায় না।
—ঠিকই করে। আমি বা কী লোহা না পাথরে তৈরি হয়ে এসেছি। মরি না।
—দাদা কোথা থেকে টাকা নিয়ে টাউনে এসে জমির কারবার শুরু করল তা জানো?
—ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে থাকবে। সৎপথের রোজগার কেমন হয় তা তো ও জানে না।
—বলতে পারো। বীরু পাঠকের হয়ে এক কাজই করত। দু'আড়াই লাখ নিয়ে কেটে পড়ে।
—বীরু পাঠক তো ওর সঙ্গে ঘোরে।
—ওই তো। তালে তাল দিচ্ছে, টাকাও তুলে নেবে। একবার রবি পাঠক জিতুক। বীরুবাবু আর অবনীবাবু দুজনেই তাল দিয়ে যাচ্ছে।
—ওকে বাঁচিয়েও যাচ্ছে।
—এখন তো রাজনীতি এরকমই।
—গুণ্ডা, মস্তান, খুনে নিয়ে?
—হ্যাঁ মা, এখন এ রকমই। ওদের এখানে টাউনেই দাদাকে দরকার। দাদা জমির ব্যবসা, ঠিকাদারি, বর্ডার কারবার করে যথেষ্ট প্রভাব করে ফেলেছে। তবে তা এখানেই। যাক না বহরমপুর, ঢুকতেও পারবে না। সেখানে অন্য ব্যাপার। আবার দাদার তো কলকাতায় কোন কানেকশান নেই, ওদের আছে। দাদারও ওদেরকে দরকার। যাক গে, তুমি কি উইল করেছো?
—করব এবার। ভাল মনে করেছিস।
—উইল থাকলেও, দাদা জুড়ে বসলে আমি কিছু পাব না। ও যদি আমাকে একটা ন্যায্য টাকা ধরে দিত, আমি আর ভাগ চাইতাম না।
—আমি জানি না।
—তুমিও সম্পর্কটা কাটিয়ে দিলে একেবারে। না কি?
—সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয় মিলন, আর বলিস না।
—তোমার অবস্থাই সবচেয়ে...
সকলের চোখে যে ভয় ও ঘৃণার পাত্র, তার মা হয়ে একটি ছোট টাউনে বাস করবার দুঃসহ যন্ত্রণা মিলন কী বুঝবে। সরমা বললেন, খেয়ে নে। আমার সকালে ডিউটি। কাল রাখি আসবে না, ওর ছেলের অসুখ।
—একেবারে একা থাকা..
সরমা শুকনো, তীব্র গলায় বললেন, চোর বা ডাকাত, বকুর বাড়ি ঢুকবে না। সে ভয় নেই! কিন্তু ঘর পড়ে থাকলেও রাতে এখানে বাস করবে না কেউ, কোন কাজের লোক নয়। একা থাকা? একাই তো থাকি। মেশিনের মতো হয়ে গেছি মিলন, আর ভাবি না ভাবতে ভুলে গেছি।
—অসুখ বিসুখও তো হতে পারে।
—হয় কোথায়? তোর বাবা...নরম মানুষ ছিল...আঘাত সইতে পারল না। আমি তো পাথর। পাথর কি ক্ষয় হয়? যা, হাত মুখ ধুয়ে আয়।
এরপরেই সহসা গ্যারেজ হস্তান্তরিত হয়ে যায় বকুর নামে। প্রদীপ্তদের যে বৃহৎ আমবাগানের ওপর বকুর লোভ ছিল, সেটি বকুই কিনে নেয়।
কী শর্তে, কী টাকায়, কী চাপে পড়ে, তা জানতে পান না সরমা। তবে এটা বোঝেন, যে অত্যল্প দামে কোহিতুর, সাদৌল্লা, আনারসা, ভবানীচৌরসের যে আমবাগান জেলার গর্ব ছিল; সেটি প্রদীপ্ত স্বেচ্ছায় বিক্রি করেনি।
বারো হাজার টাকায় বাগান বিক্রি হল, আর—
প্রদীপ্তর রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যায়। ওর বউ ওকে নিয়ে গাড়িতে চলে যায় কলকাতা। সেখানে দু'মাস থেকে প্রদীপ্ত ফিরে আসে শীর্ণ আর গম্ভীর হয়ে।
সরমা মাথা নিচু করে বোবা হয়ে কাজ করেন। কাজের স্বাভাবিক ছন্দ ধরে রাখার মধ্যেও কৃত্রিমতা এসে যায়। যন্ত্রের মত কাজের কথা বলে যান।
—সাত নম্বর বেডে ডাকছিল রাখি!
—এই ওষুধগুলো আঠারো নম্বর বেডের জন্য।
—দু'নম্বর কেবিনকে রাতে শুধু সুপ দেবেন।
—টাকাটা জমা করে নিন বাদলবাবু, শিপ্রার দিদির জন্যে দিয়ে গেল।
—লিনেনের আলমারির তালা পালটাতে হবে। এ মাসেও তিনটে তোয়ালে কম দেখছি।
খাতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে অনেক বেশি প্রয়োজনীয় করে তুলেছিলেন সরমা। বিশেষ প্রদীপ্তর অনুপস্থিতির সময়ে!
মেট্রন আর ক্যাশিয়ার বাদলবাবু বলতে বাধ্য হলেন, সরমা যেভাবে নিজের কাজের বাইরে সবদিকে নজর রেখে চলেছেন, তা দেখা যায় না।
মেট্রন বললেন, আপনাকে ইনক্রিমেন্ট দেয়া উচিত।
—না!
সরমা আর্তনাদ করেছিলেন। কিছু চান না তিনি। তাঁর এই প্রাণ দিয়ে কাজ করার পেছনে কথা তো একটাই। বকু এক অপমানজনক অবস্থায় ফেলে প্রদীপ্তকে বাগান বেচতে বাধ্য করেছে। সরমার এ আচরণ, তিনি বকুর মা বলে নিরন্তর প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। প্রায়শ্চিত্ত!
কিন্তু কতদিন এভাবে পারবেন, কতদিন?
ওই প্রাচীন বাগান হস্তান্তর নিয়ে ''জনবাণী'' লিখতে শুরু করল। জমি, বিশেষ কৃষিজমি দিয়ে ফাটকাবাজি, রাজনীতিক নেতা, সরকারি অফিসার ও জনৈক সমাজবিরোধীর জোট বাঁধার কথা।
তার পরে পরেই বেরোল ''জনৈক সমাজবিরোধীর বিষয়ে বিশেষ সংবাদ'', যাতে মিতা ধর্ষণ ও হত্যা, কয়েক বছর আগে অন্য গ্যারেজ মালিক লালচাঁদ রাই হত্যা, বীরু পাঠকের সঙ্গে এক দুষ্কৃতীর অশুভ যোগাযোগের কথা, সবই বেরোয়। টাউনের আশপাশে নারী অপহরণ, বিক্রি, ধর্ষণ ও হত্যার তালিকা বেরোল। ''পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা কেন'' তার বিশ্লেষণও বেরোল। সরমা বুঝলেন এবার কিছু হবে।
সুকেশের প্রেসে বোমা ফেলা ও সুকেশের মেয়েকে বাসস্টপ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া এক সন্ধ্যাতেই ঘটে।
সে মেয়ে নিখোঁজ থাকল একদিন, দু'দিন, তিনদিন। তারপর পাওয়া গেলে ব্রিজের নিচে তার ধর্ষিত ও নিহত শরীর।
টাউনের মনে শ্যাওলা জমেছিল। প্রতিবাদ করতে ভুলে গিয়েছিল মানুষ। মানুষ শিখেছিল, চোখ খোলা রেখেই কিছু না দেখতে।
কান খোলা রেখেও কিছুই না বলতে।
মুখ থাকতেও কিছুই না বলতে।
প্রদীপ্তদের বাগান এভাবে বিক্রি হতে পারে, কিন্তু শহরে কেউ ভুলেও সেকথা আলোচনা করবে না।
বস্তি পুড়তে পারে, মানুষ উচ্ছেদ হতে পারে,—সেটা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এ শহর উদযাপন করে রবীন্দ্রমেলা। একাঙ্ক নাটক উৎসব। মে—দিবস উদযাপন। নেলসন ম্যান্ডেলাকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্টার লাগাতে পারে।
কিন্তু উদিতা, একটি ছোট মেয়ের নগ্ন শরীর যেন এ শহরের এসব হিপোক্রিসির আবরণ খানিক খুলে দিল।
বহুদিন বাদে এ শহরে এ ঘটনা নিয়ে গোলমাল শুরু হল।
সুকেশের মেয়ে উদিতা সরকারের ধর্ষণ ও হত্যা থেকে যেন টাউন হঠাৎ বুঝল, নারীঘটিত অপরাধ খুব বেড়েছে।
রবি পাঠক এক ডেপুটেশন নিয়ে গেল থানায়।
মহিলা এম.এল.এ. চলে এলেন সরেজমিন তদন্তের ওপর জোর দিতে।
জেলার অন্যান্য কাগজেও লেখালেখি শুরু হল। উদিতা যদিও ''বকু গুণ্ডা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, বাঁচাও বাঁচাও'' বলে চেঁচিয়েছিল, অনেকে শুনেছিল, সে কথা কেউ বলল না।
একদা সুধন্যবাবু থানায় গিয়েছিলেন। সরমা ঠিক করলেন, এবার তিনি যাবেন। থানায় যাবেন। একা? একাই তো হয়ে গেছেন বহুকাল। কবে সুধন্য ছিলেন, ছেলেরা ছোট ছিল। সন্ধ্যায় ওদের পড়াতে বসতেন সরমা। তখন তাঁর জীবনে নিয়মিত বৃষ্টি ঝরত, খরা ছিল না কোথাও। তারপর বকুর বন্য, উদ্দাম, হিংস্র ও কামুক হয়ে ওঠা, সুধন্যর হৃৎপিণ্ড ও চেতনায় রক্তপাত, সরমার অপার গ্লানি, মিলনের চোর হয়ে থাকা, খরার কাল শুরু। বাড়তে বাড়তে খরার তাপ সুধন্যকে নিল, সরমাকে নগ্ন ও অসহায় করে দিল দুনিয়ার সামনে। অতসী এল বৃষ্টির আশ্বাস নিয়ে। দিনে দিনে, বছরে বছরে, ঝরঝরে বৃষ্টিতে সরমার জীবন আবার সিক্ত, শ্যামল, স্নিগ্ধ হয়ে উঠল। বকু এক প্রচণ্ড দাবানলের মতো এসে সব স্নিগ্ধতা মুছে নিয়ে গেছে। আবার বিশাল মরুপথে যাত্রা, এবার একেবারে নিঃশেষে একা।
থানায় একাই যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাজারতলার মাঠে জনসমাগম, সরু পথ, রিকশা চলছে, উঠে দাঁড়ালেন দোকানের দাওয়ায়। হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান। দাওয়ায় দাঁড়িয়েছিলেন কমলেশবাবু।
আরও বয়ঃজীর্ণ, রোগা, চশমার পিছনের চোখের দৃষ্টি অবোধ্য, মুখে অনেক রেখা। এই কমলেশবাবু অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য, স্থানীয় নেতা, ষাটের দশকে খাদ্য আন্দোলনে মিছিল নিয়ে কলকাতা গিয়েছিলেন। চেনা যায় না।
—মিলনের মা নয়?
—হ্যাঁ আপনি এখানে দাঁড়িয়ে।
—আমি তো এখন পথপার্শ্বের জনতা। দাঁড়িয়ে দেখি। আমাকে কেউ দেখে না আমি অন্যদের দেখি। আমি এখন বরবাদ। তা...আপনি কি মিটিংয়ে এসেছেন?
—কিসের মিটিং? আমি থানায় যাব।
—কেন? এমন সময়ে...একা একা...
—থানায় যাব। বলব বকুকে ধরুন। শাস্তি দিন...মানুষের ক্ষতি করবে বলে পাগলা কুকুর মেরে ফেলেন...ওকে কেন ছেড়ে রেখেছেন? পুলিশ কত নির্দোষকেও মারে, দোষীকে ছেড়ে রেখেছে কেন?
—আস্তে মিলনের মা, আস্তে। মিটিং দেখুন।
—কিসের মিটিং?
—আইনশৃঙ্খলার অবনতি, উদিতা সরকার ধর্ষণ ও হত্যা, প্রতি মাসে সাত—সাতটা নারী—ধর্ষণ, কখনও ধর্ষণের পর হত্যা। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা,—প্রতিবাদ জানাতে এবং প্রতিকার দাবি করে মিটিং। ওই দেখুন, প্রধান বক্তা রবি পাঠক, মায়া ঘোষ ঢুকল। দেখুন সঙ্গে কে?
খোলা ম্যাটাডোরে লাল ব্যানারে লেখা, নারী ধর্ষণকারী ঘাতকদের শাস্তি চাই। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে পরশু দিন বন্ধ পালন করুন।
ব্যানারে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে স্বয়ং বকু। রবি পাঠক ও মায়া ঘোষ বসে আছে।
—দেখলেন?
সরমা মুখে হাত চাপা দেন।
—চলে যান, বাড়ি চলে যান, ওরা থানা থেকেই আসছে। এখানে থাকবেন না। এরপরেও থানা যাবেন?
—কার কাছে যাবেন? শহরে কি মানুষ আছে? সব কেনাবেচা হয়ে গেছে এখন। এ এক বিশাল মাংসের বাজার। কসাইদের কাছে যাবেন? যাবেন না।
—আপনি...
—দেখে যাই। এখন শুধু দেখি। ছানি পড়েছে তো, তাই সব স্পষ্ট দেখি।
কি, যাবেন থানায়?
সরমা মাথা নাড়লেন। কী আশ্চর্য অবাস্তব সব। কী আশ্চর্য রকম অবাস্তব! সরমা নেমে আসেন। পথ ধরে বাড়ির দিকে চলেন। মাইকে বকুর গলা, বন্ধুগণ! এই টাউনে এবং আশেপাশে নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা চলছে, তবে চলবে না...আমরা...
পথচারী ও প্যাডলার মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে কেউ কেউ।
সরমা কী করবেন? পুলিশের কাছে গিয়ে কী লাভ?
সেদিন সুধন্য ফিরে আসেন, আজ সরমাও ফিরে আসছেন। কোন দেশে, কোন সমাজে বাস করছেন সরমা?
একটা কী যেন গোলমাল। সরমা থমকে দাঁড়াল।
ভীষণ, ভীষণ দর্শন একটা লোক। ঝাঁকড়া কোঁকড়া চুল কাঁচাপাকা, বেঁটে, চৌকো ও বলিষ্ঠ। কুচকুচে কালো রং, গোঁপ পাকানো, ওপর পাটির দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে। সে ঠেলছে দু'চার—জনকে চেঁচাচ্ছে ফ্যাঁসফেঁসে গলায়।
—আমি ছাড়ব না। আমি যাব। বকুকে আমি...
ছেড়ে দে তোরা...ওকে মেরে আমি ফাঁসি যাব...সুকেশের মেয়েকে ও...
মডেলদা! মডেলদা!
—আমি যাব।
একটি ক্রুদ্ধ রণরঙ্গিনী মেয়ে এগিয়ে যায়।
—কার কাছে যাবে বাবা! অবনীবাবুর কাছে?
—এই, এই বীণা!
—বাপকে নিয়ে যা। তুই চুপ কর।
—আরে, তোরা ভয় পাস, আমি ভয় পাই না। বাবা! বাড়ি চলো।
মডেল বলে, বাড়ি যাব?
—হ্যাঁ, বাড়ি যাবে। এখানে কাদের সঙ্গে কথা বলছো?
—বীণা, মাইরি বলছি...
—যা যা, সবাইকে চেনা আছে। বাড়ি চলো বাবা। টর্চ কোথায়?
—বাড়ি যাব!
—হ্যাঁ, মা বসে আছে।
—চল, তাই চল।
—করতে পারবে না কিছু যখন, তখন চেঁচিয়ে দম নষ্ট করো কেন? তখন তো ...যাক গে।
—আমি ওকে একদিন...
—আপনি...এখানে কেন?
পরিশীলিত কণ্ঠ, গলায় উদ্বেগ।
—পার্থ!
—আপনি বাড়ি যাচ্ছেন?
—হ্যাঁ।
—চলুন, খানিক এগিয়ে দিই।
হাঁটতে থাকেন সরমা। দু'পাশ দিয়ে টাউনও চলেছে, কিন্তু সবাই অচেনা, অন্য জগৎ।
—কোথায় যাচ্ছিলেন?
—থানায়। গেলে বলতাম, বকুকে ধরুন...মারুন...কত নির্দোষকে মারেন...ওকে...
—যাননি তো?
—না, পথে...কমলেশবাবু...মিটিং দেখলাম...ওকেও দেখলাম...
—যাবেন না থানায়।
—এ টাউনে সবাই কি মরে গেল?
—না। পরশুর বনধ কেটে যাক, আমরা মিটিং করব, থানা ঘেরাও করব, কলকাতার কাগজের লোক আনব, বকুকে নিয়ে নির্বাচন জেতা বন্ধ করব রবি পাঠকের।
—আমি যাব মিটিংয়ে, আমি বলব।
—তারপর এখানে ফিরবেন, জীবন বিপন্ন হবে, হয় তো মিলনেরও। আমার ধারণা বকু সাইকোপ্যাথ। এ রকম কেস পাওয়া যায়, মেয়েদের সম্মান লুঠে তাদের খুন করে। যাবেন না। ও বিকারগ্রস্ত। আপনার আর মিলনের ওপর রাগও আছে।
—ওই লোকটি কে? চেঁচাচ্ছিল?
পার্থ ঈষৎ হাসে।
—নাম ধনুর্ধারী। তবে টাউন বলে ওর মডেলে দুর্গাপূজোর মহিষাসুর তৈরি হয়। নাম এখন মডেল। অবনীর লোক, সমাজ—বিরোধী ছিল, তবে তিন—চার বছর বসে গেছে। পুলিশ ওর ছেলেকে মারল, ওকে শাসাল...বর্ডার থেকে জামা প্যান্টের কাপড় আনে, বেচে। জামাইকে ক্যাসেটের দোকান করে দিয়েছে, ওই মেয়ে ওর। এসে গেছেন প্রায়, চলে যান।
—অনেকদিন বাদে দেখলাম...ভাল থেকো।
—চলি!
সরমা দরজা খুলে ঢুকে বসে পড়েছিলেন বারান্দায়। তারপর মাথায় জল ঢেলে স্নান করে অনেকটা জল খেয়ে শুয়ে পড়েছিলেন। ঘুম আসেনি।
* * *
আজ যেমন আসছে না আসবে না। কে নিয়ে গেল তাঁর ঘুম?
অতসী নিয়ে গেছে।
অতসীর বিপন্ন আর্তনাদে সরমা রক্তমাংসের মানুষ হয়ে গেছেন।
নইলে তিনি তো মেশিন হয়ে গিয়েছিলেন। আশ্চর্য যান্ত্রিকতায় কাজ করতেন, খেতেন, ঘুমোতেন। ভাবতেন, এর পরেও বাঁচবো কেন? মেশিনও ক্ষয় হয়, জীর্ণ হয়। আমি তেমনি করে শেষ হব একদিন।
কাল রাত অবধি ঘুমিয়েছেন।
আজ ঘুম নেই, অতসী ঘুম নিয়ে গেছে।
সেবার দীর্ঘকাল বাদে টাউনের মানুষ নড়ে বসেছিল। মিতা হত্যার পর যেমন, তেমন ক্ষেপে দোষীকে ধরার জন্যে ছুটে বেড়ায়নি। মিতার দিদি রীতার বন্ধু ছিল পার্থরা। তখন হাওয়া ছিল অন্য রকম। নব নির্বাচিত সরকার আসার ফলে মানুষের মধ্যে একটা জাগরণ এসেছিল।
সেদিনও বকুর প্রকৃত বিচার ও শাস্তি হয়নি।
এতকাল বাদে হাওয়া ঘুরে গেছে।
সুকেশের মেয়ের বন্ধুরা ও বান্ধবীরা অন্য মানসিকতার। মানুষও পালটে যাচ্ছে। মেট্রনই বললেন, সব মেয়ের তো এমন পরিণতি হয় না। যাদের হয়, জানবেন তারাও গঙ্গাজলে ধোয়া নয়।
সরমা নির্বাক থাকলেন।
—আপনার কী মনে হয়? মেয়েটা...
—যে মেয়ে ধর্ষণ হয়, সে নিজেও খারাপ, এ আমি বিশ্বাস করি না। যদি খারাপও হয়, তার ইজ্জত নেবে?
—অ, কাগজ পড়েন খুব? মেয়েদের স্বাধীনতা?
—পড়ি।
মেট্রন কেন, মেয়েদের ব্যাপারে সবসময়ে মেয়েরা কেন নির্দয় হয়? মিতা হত্যার পর থেকে কত, কত ধর্ষণ, ধর্ষণ ও হত্যার কথা পড়লেন। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হয় এ খবর তো কখনও পড়েননি।
অতসী বলত, উকিলবাবুর কাছে শুনি তো! কিছুই হয় না অগো। কেসই হয় না, কেস উঠলেও আসামি কয়, কিয়ের জোরে করছি? অ আমারে ডাইকা নিচ্ছে। এই তো! আর মাসিমা, আদালত বলেন, পুলিশ বলেন, সমাজ বলেন, বেবাক মনে করে মাইয়াটাই মন্দ। ইজ্জত লইলে সে মাইয়ার আর উদ্ধার নাই।
তবু তো সংগঠিত প্রতিবাদ হয়।
''জনবাণী'', নীরব থাকলেও জেলার অন্যান্য কাগজ তো লিখল? কলকাতার কাগজেও সংক্ষিপ্ত খবর বেরোল। টাউনে মেয়েদের সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করল, প্রতিকার চাইল।
সেদিনের মিটিঙের ব্যাপারও মুখে মুখে ফিরল। ফলে রবি পাঠকের দাঁড়াবার ব্যাপার বাতিল হয়ে গেল। পুলিশ ইনসপেক্টর সাসপেনডেড হলেন। তদন্ত শুরু হ'ল।
কলকাতা থেকে এলেন এ জেলা থেকে নির্বাচিত মন্ত্রী।
তিনি মিতার সময়েও এসেছিলেন।
বললেন, নারী ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিরোধে সমাজের শুভকামী নর—নারীকেই এগোতে হবে।
এ কথা সেবারও বলেছিলেন।
বললেন, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তায় সমাজবিরোধীরা প্রশ্রয় পাচ্ছে।
এ কথাও সেবার বলেছিলেন।
এ সময়ে হঠাৎ শোনা গেল বকু টাউনে নেই। সে কলকাতা গেছে।
জনমত যেমন হয়। জাগ্রত হল, জাগ্রত থাকল, অতঃপর বিশ্রাম করতে গেল।
কমলেশবাবু বললেন, এই জনমতের কোন দাম নাই। যত অনাচার, তার নিরসন করবে কে? না অনাচারী।
সে অনাচারীর মদত দেয় কে? না রাজনীতিক নেতারা। এই নেতারা কে?
কেউ কোন আন্দোলন করেনি, দল করতে এসে ক্ষমতায় বসেছে।
কোন জনতা সামিল হল? এক বোবা—কালা—কানা জনতা। বকু যেয়ে মিটিং করে, জনতা শোনে। এদের জনমতের দাম কি?
কমলেশবাবুর শ্রোতা এখন মডেল। কেননা মডেলই তাঁর কাছে এসে বসে।
মডেল বলল, রেখে দিন ও সব কথা। ঘেন্না ধরে গেল।
আর অতসী প্রসূতিসদনে এসে বলল, মায়ের নামে মহিলা—শিশু সদন উদ্বোধন করবে সাক্ষাৎ এম. এল. এ মায়া ঘোষ। কয়, তুমি চালাইবা কী কইরা? সমাজকল্যাণ দপ্তররে দিয়া দেও, অরা দায়িত্ব নিব। আমি কইলাম, মানে ওনারে কই নাই, ভাবলাম, মিশনরে দিয়া দিলে অরা ওখানে মাইয়াগো, শিশুগো, চিকিৎসার কাম করতে পারে। ডাক্তার বসলে গ্রামের লোকেরও উপকার।
—বলেছিস মিশনকে?
—আপনেরে না কইয়া বলতে পারি?
—সেই ভাল অতসী। একটা প্রতিষ্ঠান চালানো কি সহজ কথা?
—টাকাও দিয়া দিমু। অরা তো ভাল কাজই করে।
—সব দিয়া দিবি?
—আমারে অরাই ত শিখাইয়া নার্স বানাইল। যে কাজ শিখছি, মাসিমা, আর উপাস করব না।
—নিজের একটা থাকার জায়গা?
—নিজেই কইরা নিমু। আমি ত কোয়াটারও পাইতেয়াছি। পাইলে আপনেরে নিয়া যামু।
—তাই নিয়ে যাস। এ কাজটা হোক আগে।
—আজ ডাক্তার মামারে বইলা যাই।
প্রদীপ্ত ও তার স্ত্রীকে বলে বড় আনন্দ করে চলে গিয়েছিল অতসী।
এবার ওই সদন উদ্বোধন হবে। সরমা ভেবেছিলেন, এখন আর কেউ দখল করতে পারবে না অতসীর মায়ের বাড়ি। অতসীর স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারবে না।
ভেবেছিলেন?
তারপর, তারপর আজ সন্ধ্যায় অতসী তাঁকে ডাকল।
সরমা উঠলেন, জানলার পর্দা টানলেন।
আজকের রাতই কি বড় বেশি লম্বা? না এখনও ভোর হবার সময় হয়নি?
বাইরের দরজায় ধড়াম করে শব্দ হল। কে যেন দরজার গায়ে আছাড় খেয়ে পড়ল।
অতসী? অতসী এল?
চাপা, বিকৃত গলা কারও।
''মা'' বলে কে ডাকল? ''মা'' ডাক এত লম্বা হবে কেন? ''মা'' বলল, না ''মাসিমা'' বলল? সরমা আঁচল গুছিয়ে দৌড়ে গিয়ে বারান্দায় আলো জ্বেলে দরজা খুললেন।
বকু আছড়ে পড়ল ধপাস করে। রক্ত, রক্ত, রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর মুখ, গা, শরীর। গায়ের গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি ছেঁড়া ঝুলছে। বাঁ হাতে চোখ ঢেকে আছে, রক্ত।
সরমা মুখে আঁচল গুঁজলেন।
—ঘরে...ঘরে যাব...
—তোমার...কী হয়েছে?
বকু বিদ্ধ শূকরের মতো চেঁচিয়ে ওঠে, আমার...আমার চোখ...আঙুল ঢুকিয়ে খিমচে নিল...চোখ...খুনে...খুনে...মাগী...
—তোয়ালে...তোয়ালে...রক্ত...
—অতসী?
সরমা শুনতে পান তিনি বলছেন, ঘরে চলো।
—দেখতে পাচ্ছি না...মাথায় আধলা ইট বসিয়ে দিল...
সরমার গলা বলে—ঘরে চলো।
—আমার ঘরে না।
বকুর গলায় আতঙ্ক রাস্তার ওপার ওপারে...কেউ এলে আমাকে...
—ভিতরেই চলো।
বকু নিজেকে টেনে হেঁচড়ে এনে কোনমতে বারান্দায় ওঠে। গলায় কবচ নেই, আঙুলে আঙুলে আংটি। বারান্দায় উঠেই পড়ে যায় ধপাস করে।
মিলন চোখ কচলাতে কচলাতে নেমে আসে।
—কী হয়েছে মা?
তারপর নির্বাক হয়ে যায়।
—ওকে ঘরে তোল।
মিলন ও সরমা ওকে ঘরে নিয়ে মাদুরে শোয়ান। মিলন আতঙ্কিত।
—কিন্তু এ যে...ভীষণ ব্লিডিং হচ্ছে।
বকু জড়িয়ে জড়িয়ে বলে, ডাক্তার ডাকো।
—ক'টা বাজে মিলন?
—দুটো পনেরো। তুমি...তুমি কিছু করো না মা?
—কী করব?
—নার্সিংহোমে কী করে?
—ওটা প্রসূতিসদন মিলন...বাচ্চাদের ডেলিভারি ও চিকিৎসা হয়...সেও রোগের চিকিৎসা হয়...এমারজেন্সি কেস নয়। আমিও ডাক্তার নই।
সরমা আলমারি খোলেন, তাঁর ধোয়া কাপড় বের করেন। বলেন, জল আন এক বালতি।
কাপড় বালতির জলে ডোবান, চেপেন, রক্ত মুছতে থাকেন।
—মাথার দিকে মা! মাথায় আঘাত...
—কী রকম চোট জানি না। যদি ক্ষতি হয়?
—রক্ত তো পড়ছেই। ইশ, মাথা থেকেও...
সরমা মিলনের দিকে সরোষে তাকান। মিলন কী ভেবেছিল? ওর দাদা একতরফা মেরে যাবে, অথচ অক্ষত, অটুট থেকে চলে যাবে?
আরেকটা কাপড় বের করেন।
মিলন মাথাটা সামান্য তোলে। কাপড় দিয়ে পরতে পরতে জড়িয়ে দেন মাথা ও চোখ। অসীম শক্তিতে কপাল ও চোখ থেকে টেনে নামান বকুর হাত।
বাঁ চোখের কোটর থেকে উছলে আসে রক্ত। মিলন বেরিয়ে যায়, বমি করে।
—কী করছো? দেখতে পাচ্ছি না কেন? ডাক্তার...
—রাত তিনটেও বাজেনি বকু।
—কাউকে...বলো না...আমি...এখানে...
—না। বলব না...
বকুর গলা অবসন্ন হয়ে আসে, আমিও ওকে... শেষ করে দিয়েছি...খতম।
—সে কোথায়?
এ সময়েও বকু ধূর্ত হাসতে চেষ্টা করে।
—বলব...তুমি তো...
সরমার হাতের কাছে বালতির জল লাল। হাতের কাপড় লাল? মুছতে মুছতে দেখতে পান, গলা ও মুখ নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত। অতসী এত শক্তি কোথা থেকে পেয়েছিল। মাথায় রগ থেকে রক্ত ঝরছে।
—ডাক্তার...হাসপাতাল...টাকা...আমি...দেব! জল!
—আনছি..
জল আনেন সরমা, কিন্তু বকু জ্ঞান হারায়।
নিশ্বাস ফেলেন সরমা। জল দেবেন কাকে?
মিলন দরজা ধরে দাঁড়ায়।
—আমি দেখতে পারব না মা।
—দেখো না।
—ডাক্তার কোথাও পাবে না?
—আমি জানিও না টাউনের কিছু।
সরমা, যেন তৃতীয় কোন ব্যক্তির কথা বলছেন এ ভাবে বলেন, হাসপাতালে নিতে পারো, নেবে কিসে?
—অ্যাম্বুলেন্স নেই?
—তুমি তো খবর রাখো না। এখনও নেই।
—লোকে রুগি হাসপাতালে নেয় কিসে?
—সাইকেল রিকশা, কারোও গাড়ি পেলে তাতে, ভ্যান রিকশা, খাটুলি কাঁধে বয়ে। গরুর গাড়িতে।
—ইশশ...মানুষ কী করে...
—এখানে থাকে? আমরা তো থাকি।
—অবনীবাবু...রবি পাঠক...
—যেতে চাও, যাও না। তোমার দাদার জন্যে তারা গাড়ি নিয়ে ছুটে আসবে? জানি না।
—কী...হল, কী করে হল...
সরমা নিষ্প্রাণ গলায় বলেন, তোমাকে বলাও বৃথা মিলন।
অবসন্ন, অবসন্ন সরমা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়েন। চোখ বোজেন।
—সন্ধ্যেবেলা আমি ঠিকই শুনেছিলাম।
—কী ''ঠিক'' শুনেছিলে?
—কত তাড়াতাড়ি ভুলে গেছো, তাই অবশ্য স্বাভাবিক। নিজের আর নিজেরটা ছাড়া কবে বা কার কথা ভেবেছো? সন্ধ্যেবেলা অতসীই ডেকেছিল।
—অতসী!
—হ্যাঁ, অতসী। তোমার দাদা তাকে মেরেছে, সেও তোমার দাদাকে...
অতসী, তোকে বকু কোথায় নিয়েছিল টেনে? কত দূরে?
—অতসী এই কাণ্ড করেছে?
—নিশ্চয়।
—দাদা বলল?
—সেই বলল।
—খুনে মায়ের খুনে মেয়ে...ইশশ।
সরমার ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি ফুটে ওঠে।
—পোস্টমাস্টারের মেয়ে মিতা, সুকেশের মেয়ে উদিতা, এরা খুনী মায়ের খুনী মেয়ে ছিল না মিলন। মিতা আর উদিতার মাঝামাঝি সময়ে আর কে কে মরেছে জানি না। যাক গে, তখন যদি তোমার নিষেধ না শুনে বেরিয়ে যাই...
—কোথায় যেতে?
—অতসীকে ডাকতে ডাকতে যেতাম, ও নিশ্চয় সাড়া দিত।
—কিন্তু দাদা...
—দাদার জন্যে কষ্ট হচ্ছে?
—মা...তুমি এ সময়ও...
—আমি তো ডাক্তার আনতে পারব না। তুমিই যাও না।
—রামকে ডাকব?
—ও পাড়ায় তোমার দাদা খুব জনপ্রিয় নয় মিলন। যেতে চাও, যেতে পারো। আমি যাব কি করে?
—তুমি বলবে তো!
—চিরদিন যে যা বলবে, তাই করবে? নিজে পার না কিছু?
—কলকাতা হলে...
—এটা কলকাতা নয়।
—দাদা যদি সেরে ওঠে, যদি জানে আমরা কিছু করিনি...
—বকু আমাদের দুজনকেই মারত, তাই ভাল হত?
অতসী, তোর জন্যে আমি কিছু করতে পারলাম না। বকুকে শাস্তিও তুই—ই দিয়ে গেছিস।
—সকাল হচ্ছে বোধহয় মা।
—এখনই?
না, তিনটে বেজেছে, দু'মিনিট বাকি। সময় থেমে গেল আজ? এতক্ষণ এত কিছু হয়ে গেল, এতটুকু সময় লেগেছে? সকাল কখন হবে, সকাল? যদিও এরপর আর কোনদিন কোনও সূর্যোদয় আলো এনে দেবে না সরমাকে, শুধু অন্ধকারই থাকবে।
মিলন বিমূঢ়ের মতো চেয়ে আছে?
—চারটেয় তবু ফর্সা হবে।
—হলে কী করবে?
—দাদাকে...হাসপাতালে...
সরমা মাথা নাড়ল।
—আমি পারব না মিলন। এই বয়সে...রিকশা পাব না...দৌড়ে দৌড়ে যাব...আমি পারব না। তুমি পারো তো যাও, তোমার যদি প্রাণ ব্যাকুল হয়।
—আমি কাকে চিনি এখানে?
—জানি না, আমি আর পারব না।
—আজ না ফিরলে...আমার ওদিকে...
সরমা নির্বাক।
—রক্তে তো ভিজে যাচ্ছে সব এখনোও। অবশ্য...কমে এসেছে।
—জানি না।
মিলন খুব বিপর্যস্ত। কোনদিন কোন সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি...ঝামেলা এড়িয়ে চলা ওর স্বভাবে ঢুকে গেছে। আর সুরমা দীর্ঘকাল হাঁটছেন মরুভূমি ধরে। মিলন আশা করে আজও মা ঝামেলা সামলে দেবে। খুব, খুব প্রত্যাশী চোখে ও চেয়ে আছে।
সরমা মাথা নাড়েন।
—মা, কাপড়টা ছাড়ো।
—যেতে চাইলে চলে যাও মিলন।
—ছি ছি মা! আমি কি অমানুষ? তোমাকে এর মধ্যে ফেলে...
সরমা ক্ষীণ হাসেন।
—মা, চা করব?
—করতে পারবে?
—কেন পারব না? চা করি, রান্নাও চালিয়ে নিতে পারি...
—করো তবে।
মিলন চা করতে যায়। বকু খুবই নিথর। সহসা মনে খেলে যায় বিদ্যুৎ ঝিলিক। বকুর হাতটা তুলে নেন সরমা। না নাড়ী ধীরে চলছে, চলছে। হাত নামিয়ে রাখেন সরমা। নাড়ী দেখতে জানেন না, ব্যান্ডেজ বাঁধেননি দীর্ঘকাল। অবিরাম রক্তপাত বন্ধ করতে হলে কী করতে হয়? অবিরাম—রক্তপাত—অবিরাম—
চমকিত সরমা হাতের দিকে তাকান। মেঝেতে রক্ত হয়েছে, চাপ বাঁধছে, ক্ষীণ ধারায় নামছে...
—বাইরে এসো মা। ও ঘরে আমি...যত ঝামেলা এড়িয়ে চলি, ততই...
সরমা ওঠেন। আলমারির আয়নায় আরেক সরমা। রক্তে ভেজা কাপড়, রাত জেগে চোখ লাল। আলনা থেকে জামা সায়া কাপড় নেন, গামছা। কাল অবধি কী নিয়মে বাঁধা ছিল জীবন। আর আজ?
বাথরুমে চলে যান, কাপড় ছাড়েন। জল ঢালেন গায়ে। ঘষে ঘষে রক্ত তোলেন। জল ঢেলে রক্ত তোলেন, মাথা ও গা মোছেন। অতসী ওঁর পিঠে সাবান দিয়ে দিত। বকুর বিষয়ে কোন স্মৃতি মনে আসছে না, শুধু অতসীর চিৎকার শুনতে পাচ্ছেন, সরমা কি স্বাভাবিক মানুষ নন? বকু মানে শৈশব থেকে কৈশোরের বকু। ও ঘরে যে শুয়ে আছে সে কোন বকু? সরমা কী করবেন? বেরিয়ে আসেন।
মিলন চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
—এখন জল ঢাললে গায়ে?
—চা দাও মিলন।
চা খান। বলেন, এখানেই বসি। তুমি জামাকাপড় পালটে নাও মিলন।
—দাদা যে কী জীবন বেছে নিয়েছিল!
—চা খাও।
—কোনদিন শান্তি দিল না কাউকে। নিজেও...
মাথা নাড়েন সরমা। মৃদু গলায় বলেন, শান্তি তো ও চায়নি। কী যে চেয়েছিল। ছোটবেলার পর...কেন এমন হয়ে গেল...জানি না।
দুজনে চুপ করে বসে থাকেন।
থাকতে, থাকতে থাকতে থাকতে এক সময় পাঁচটা বাজে। সরমা উঠে দাঁড়ান।
মিলন দেয়ালে হেলান দিয়ে ঝিমোচ্ছে।
ভেজানো দরজা খুলে ঢোকেন। বকু এখনও নিথর, যেন বেশি নিথর।
—মা, দাদা কি...
সরমা জবাব দেন না।
—আমি হাসপাতালে যাচ্ছি, তুমি কোথায় যাচ্ছো মা?
সরমা ক্ষিপ্র পায়ে বারান্দা থেকে নেমে বেরিয়ে যান দরজা খুলে।
মিলনের ''মা'' ডাক শুনতে পান না।
ঘাটপাড়ার পথ দিয়ে এগোতে এগোতে নদী থেকে আধ কিলোমিটার দূরে সরমা থেমেছিলেন।
দোকানপাট খুলছে। ভোরের বাস ধরতে লোক ও পথ দিয়েই যায়। ওপার থেকে তরকারি, ডিম, চাল নিয়েও লোক আসে।
কিছু লোকজন, কিছু ভিড়। টর্চের আলো।
সরমা এগিয়ে যান। ভিড় সরিয়ে দেন দু'হাতে। একজনকে বলেন, টর্চটা নেভান। আমি চিনেছি।
অতসী। মাথা একদিকে হেলান। হাত বোলান সরমা। জামা ছেঁড়া, কাপড় বা সায়া নেই।
কে একজন আস্তে বলে, বকুর মা!
সরমা বলেন, সরে যান। তারপর দাঁড়িয়ে পরনের কাপড় খুলে ফেলেন। হাতড়ে হাতড়ে অতসীকে যথাসাধ্য ঢাকেন, জড়িয়ে দেন কাপড়।
নতজানু সরমা ধীরে মুখ তোলেন চিবুক উঁচু করে। বলেন, বকু আমার কাছে স্বীকার করেছে সে অতসীকে মেরেছে আর...
—সে কোথায়?
মডেল গর্জে বলে।
ঈষৎ হাসেন সরমা।
—তার...আমার বাড়িতে...
—তাকে আমি...
—আপনারা তো কিছু করলেন না তাকে, এতকাল গেল, বিচার হল না...শাস্তি পেল না ...অতসী, অতসী কিন্তু তাকে ছাড়েনি। সে সাধ্যমতো...
সরমার গলা নেমে আসে। ফিশফিশ করে বলেন, তাকে শাস্তি দিয়ে গেছে।
সরমা অতসীর বুকে মাথা রাখেন। দু'হাতে জড়িয়ে ধরেন ওকে।
মডেল বলে, ওনার গায়ে কিছু একটা ঢাকা দাও, এই চাদরটা দিন না আপনি। ভ্যান রিকশা বের করো। আর আমার সঙ্গে চলো হে যে যাবে। ওকে বাড়িতে...
কয়েক জোড়া পা ছুটে যাবার শব্দ।
সূর্য উঠছে। আকাশ লাল। প্রত্যুষ সূচিত হয়। সরমা নিশ্চল। জনতার আদালতেই তবে ৩৭৫ ধারায় আসামির বিচার হোক, যদিও অতসী আগেই সে দণ্ড দিয়ে গেছে। বকু নেই, অতসী নেই, সরমা ও নদী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন