মহাশ্বেতা দেবী
সময়টা বর্ষার ঠিক পরে, আকাশে বাতাসে যখন পুজো পুজো ভাব লেগে গেছে।
এইটেই হোল পর্যটকদের আসার সময়। মানুষের যখন ছুটি শুরু হয়, সুদেবের ছুটি ফুরোয়।
সুদেব চলে যাবে, বাঁধবেড়া গ্রামে ওদের বাড়িতে যেন বিদায়ের বাঁশি বাজল। মাদুলি মাছ কুটতে বসেছে। দাদা ভূদেব সাতসকালে আধ কিলো রুইয়ের পোনা কিনে এনেছে। বলে গেল, টাটকা মাছগুলো পেয়ে গেলাম ঝপ করে। খোকাকে ভেজে দাও, ঝোল করে দাও।
বউদি মীনা ভাত টিপে দেখছে। মা মুড়ির নাড়ু কৌটোয় ভরছে। সুদেব জানে যে মা কাল অনেক রাত অবধি বসে আধগুঁড়ো মুড়ি আর চিনেবাদাম তপ্ত গুড়ে মেখে নাড়ু তৈরি করেছে। না নিয়ে গেলে মা খুব কষ্ট পাবে।
মাদুলি বলল, আবার কবে আসবি ছোড়দা?
—কবে যে আসতে পারব!
—বটব্যালবাবু চাকরি দিয়েছে মানি, কিন্তু এমন চাকরি দিল যে ছুটি নেই।
মা বলল, সে যা হোক, বাঁচিয়ে দিয়েছে।
—ছোড়দাকে থাকতেই হয় আটকে, নইলে ঘর থেকে যেতে পারত, তাই না?
মীনা বলল, বাপ রে, ছোড়দা যদি না থাকে তাহলে সবই গণ্ডগোল।
সুদেব বলল, চান করে আসি। কি রে টিয়া, যাবি নাকি? চল, চান করিয়ে দিই।
মা বলল, পুকুরে যাবি?
—না না, ঘরে কুয়ো থাকতে....
আজ তাদের নিজের কুয়ো আছে, ঘরে টিনের চাল, দাওয়ার কোলে তিনটে ঘর, এ যেন ভাবা যায় না।
সবাই বলে, ওদের উন্নতি হচ্ছে। হবে না? দুই ভাই একত্র আছে, জমিজমা নেই যে বিবাদ লাগবে।
সবই ভালো এখন। দু'বছর সুদেব চাকরি করছে, আর ক'বছর চাকরি করলে ওরা জমি কিনবে, তখন আরো ভালো হবে।
দাদার স্বপ্ন, একটু জমি কেনা।
মার স্বপ্ন, সুদেবের বিয়ে হোক।
সুদেবের স্বপ্ন, মাদুলির জীবনটা একটা ঠিকানায় পৌঁছাক। ছোট বোন মাদুলি, ওকে দেখলে বড় কষ্ট হয়।
ওদের কপাল ভালো, বউদি মীনা একটু বোকাসোকা, মনটা ভালো, বিবাদ ঝগড়া করে না।
কাকার সঙ্গে স্নান করতে করতে টিয়া বলল, এবার পুজোয় আমি অপ্সরা ড্রেস নেবো।
—নিস, নিস।
—এবার ফাংশান হবে কাকা। তুমি আসবে না?
—দেখি, দেখি।
—বাবা বলেছে একদিন আমরা টাউনে পুজো দেখতে যাব।
—যাবি, যাবি।
স্নান করে সুদেব বলল, তুই জামা পর। আমি বালতিগুলো ভরে দিই। কি মাদুলি, মাছ ধুবি, জল দেব?
—দে।
মাদুলির সিঁথেয় এখনো সিন্দুর। কার কল্যাণে ও সিঁন্দুর পরে এখনো? ও কি মনে করে পরিমল ওকে নিয়ে যাবে কোনোদিন? যে পরিমল ''মৃদুলাকে পেলে ধন্য হবো'' বলেছিল, রানীপুর ব্লকে চতুর্থ শ্রেণীর চাকরি পাবার পর সে খুব বদলে গেছে। মাদুলিকে নিতে আসে না, আবার বিয়ে করবে বলে শোনা যাচ্ছে।
সুদেব বলে এসেছে, পরিমল যেন মনে রাখে মাদুলি কার বোন। সুদেব রায় কেস করবে না, দরকারে অন্যভাবে শাস্তি দেবে। সুদেবের খ্যাতি কিসে তা যেন মনে রাখে। বিয়ে করলে আমার বোনকে ডিভোর্স দাও, মাইনে পাচ্ছ, খোরপোষ দাও। পঞ্চায়েতে এসো, সেখানেই কথাবার্তা হয়ে যাবে।
না, পরিমল পঞ্চায়েতে আসেনি, কথাবার্তা বলেনি।
ওই চাকরিও তো সুদেবের মনিব অপরূপ বটব্যালের চেষ্টাতেই হোল। চাকরি পেয়েই তার মাথা ঘুরে গেল। সাইকেল, ঘড়ি এসব না নিয়ে বিয়ে করে খুব ঠকেছে বলে বোধ হোল। তারপরেই মাদুলির সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া শুরু হোল।
সুদেবের শাসানি শোনার পর পরিমলের মা নাকি বলছে, সাইকেল ঘড়ি দিয়ে বোনকে পৌঁছে দিক।
সাইকেল, ঘড়ি দুম করে কেনা যায়? বিয়েতে ট্রানজিস্টার, বাসন দু'প্রস্থ বিছানা, বরকে রূপোর বোতাম দেওয়া হয়েছিল। সবাই সুদেবদের অনেক টাকা দেখেছে!
সুদেব পায় আটশো টাকা।
ভূদেব পায় ছ'শো টাকা।
অঘ্রাণে ধান কেনে ভূদেব, জ্যৈষ্ঠ থেকে বেচে। ধান বেচে বেচে সংসারের হাল যা হয় ফিরছে। সুদেব ঘর থেকে চালটা নিয়ে যায় বলে খাওয়া খরচা সাশ্রয় হয়।
মাদুলি এইট পাশ। বাবুকে বলে ওকে মেয়ে ইস্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ঢোকাতে পারলে মস্ত কাজ হয়।
পরিমলের ওকে ফিরে নেবার চাড় হবে। ডিভোর্স হলেও আবার বিয়ের বাজারে ওর একটা দাম হবে।
বাবু বলে, সুবর্ণ লজে রাখা যেত। কিন্তু তুমি তো দেখছ, কতরকম মানুষ আসে। এখানে ওর ইজ্জত থাকবে না। দেখি কি করা যায়।
এসব ভাবতে ভাবতে ভাত বাড়া হয়ে যায়। মাদুলি পাখা নিয়ে বসে। টিয়া পাশে বসে।
ওর মা বলে, কাকার পাতেই খা।
—না না, ওকে আলাদা দাও। মাছের গন্ধ পেয়েছে, ও কি ছেড়ে দেবে? এ মেয়েটাকে জেলেপাড়ায় বিয়ে দিতে হবে গো বউদি! রোজ মাছ খাবে।
মা বলে, এবার মাছ খেয়েছে খুব। ওর মা তো খাল—কাঁদোর—ধানক্ষেক কোথা কোথা থেকে মাছ এনেছে।
—বড় মাছটা তো কবেই ধরেছে।
মীনা মুখ মুচকায়। মাছ ধরা আর আম চুরি করার দিন থেকে ভুদেব আর মীনার প্রেম। বিয়ের ছ'বছর বাদেও ওদের প্রেম সজীব আছে।
মীনার বোনদের বিয়ে টাউনে হয়েছে। একজনের স্বামী ক্যাসেট বেচে, পয়সা করেছে। আরেকজন কম্পাউন্ডার, সেও ভালো রোজগার করে। মীনার মা বুদ্ধিমতী।
তিনি যখন বাঁধবেড়াতে পুকুর—বাগান—জমি নিয়ে পড়ে থাকবেন স্বামী নেই ছেলে কোনোদিন হয়নি, তখন গ্রামের মধ্যে জামাই পেলে তাঁরও বল—ভরসা।
সর্বস্ব তিন মেয়ের, তবে মীনা একটু বেশি পাবে। একে ছোট মেয়ে, তায়, কাছে থাকে। ডাকলেই পান। মেয়ের ডান পায়ে ছয়টি আঙুল। জামাই কিনতে গেলে তাঁকে সর্বস্ব বেচতে হোত। ভুদেবের মা তো দু'ছেলের দাবড়িতে কিছুই চাননি। মীনার মা অবশ্য সাইকেল ঘড়ি, চৌকি, আলনা আর ছোট লোহার আলমারি দিয়েছেন, মেয়েকে চার ভরি সোনা। তাঁর বাগানের তরকারি, টাটকা মুড়ি, কাঁঠাল—আম—পেঁপে এ বাড়িতে আসে। এসব কারণে মীনার বোনরা বেশ অসন্তুষ্ট। একজন বাঁকুড়ায়, আরেকজন ছাতনায় থাকে।
বাঁধবেড়া থেকে দুটোই অনেক দূর।
মীনা যে খুব সুখী সেটাও ওদের পছন্দ নয়।
সুদেব খাওয়া শেষ করে।
—না, বউদি রান্না শিখে ফেলেছে।
—ভাগ্যে বললে!
—দেখ বউদি, বাঁধবেড়া থেকে সোনারেখা বাঁধ এগারো কিলোমিটার। এটা সেটা দিয়ে দাদাকে পাঠিও না তো। দাদার কষ্ট হয়।
ভূদেব ঢুকে পড়ে।
—কিছু কষ্ট হয় না। তোর হোল?
—হ্যাঁ, পান দাও।
মাদুলি এক কৌটা পান এগিয়ে দেয়। সুদেব মা আর দাদাকে প্রণাম কারে। বউদিকে বলে, আসি গো বউদি। টিয়াকে আদর করে আর মাদুলিকে বলে, অত ভাবিস না রাতদিন।
মাদুলি বলে, সায়া কিনবে আমার জন্যে। মায়ের জামাও লাগবে।
—আনব, সব আনব। সীজিন ভালো যায় তো কাপড়ও আনব।
ভূদেব ওর সঙ্গে এগোয়।
—সীজিন ভালো যায় তো, তোর বউদি বলছিল যে সাইকেল একটা, আর ঘড়ি কিনে...
—দাদা! সে দুটি হাজার টাকার ধাক্কা।
—বুঝি সবই। মাদুলির মুখ চেয়ে...
—এর তো শেষ নেই দাদা। ও বলল, লোকমুখে শুনে আমরা সব কিনেকেটে দিয়ে এলাম। ক'দিন বাদেই মাদুলিকে পাঠিয়ে দিল আর আরো কিছু চেয়ে বসল।
—কী করা যায় বলতো?
—পরিমল নিজে এসে বলুক, তবে ভেবে দেখব। ও ভেবেছে সুদেব মরে গেছে। সুদেব রায়ের বোনকে বিয়ে করে দু'নম্বরী করা অত সহজ নয়।
ভূদেব উদ্বিগ্ন হয়।
—মারদাঙ্গা করিস না সুদেব।
—না না, তুমি ভেবো না তো।
—রানীপুর গেলে ঘুরে আসব'খন।
—এসো। আমি আসি দাদা। তুমি সাবধানে থেকো। দিনকাল খুব খারাপ হয়ে গেছে।
—বাবুদের বিবাদ, আমাদের মরণ।
—তোমার কি! কাজ তো করো বড়বাবুর।
সুদেব সাইকেল চালিয়ে দেয়। দাদা তিরিশ না হতেই চুল পাকিয়ে ফেলেছে। বাঁধবেড়ায় বসে বাবুদের স্যালোগুলির তদারকি বড় কম কাজ নয়।
বাবুদের পৌষ মাস যে শুরু হয়েছে, সে চলছেই কত বছর। বাঁধবেড়া থেকে কয়েক মৌজা জুড়ে ওদের যেসব জমি পড়েছিল, সোনা নদীর বাঁধ ও ক্যানেল হবার পর সেসব জমিতে তিনটে ধান উঠছে।
সোনা বাঁধ, সংলগ্ন সরকারের তৈরি ফরেস্ট, নিচু পাহাড়, এসব এখন খুব ব্যস্ত ট্যুরিস্ট জায়গা। নিকটতম শহর রানীপুরের গুরুত্বই বেড়ে গেছে।
বাঁধের এক সাব—কন্ট্রাক্টার ছিল অপরূপ বটব্যাল, সুদেবের মনিব। বাঁধবেড়া গ্রামেই এখন কত পাকা বাড়ি, মল্লভূম গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, পোস্টাপিস, তিনটে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সারের দোকান। জয়পুর রোড দিয়ে বাস—মিনিবাস যাচ্ছে। কলেজে পড়তে চাও তো চলে যাও রানীপুর।
জায়গাটি সংরক্ষিত তপশিলী উপজাতি কেন্দ্র।
নির্বাচিত সদস্য গৌরদাস হেমব্রম। পঞ্চায়েত প্রধান ও উপপ্রধান হারান বাস্কে, শশধর সিং। কিন্তু টাকা, প্রভাব, প্রতিপত্তি বটব্যালদের। ওরা এক সময়ে জমিদার ছিল, আজও জমি ভূমি ওদের।
সুদেব শুনেছে ওর পূর্বপুরুষ রাজপুত ছিল। মল্ল রাজাদের কালে সেপাই ছিল, লড়ত। অনেকে জমি—ভূমিও পেয়েছিল। এখনো ওদের জ্ঞাতগুষ্টি বাঁকুড়া জেলায় ছড়িয়ে আছে। সবে ক্রমে তারা বাঙালী হয়ে গেছে। পুরুলিয়ার দিকে যেসব রাজপুত সে সময়ে জমিদার হয়েছিল, অনেকে ধনী থেকে গেছে।
পুরনো কথায় ফিরতে চায় না মন। কে কবে কোথা থেকে এসেছিল তা দিয়ে কি হবে। বহুকাল ওরা বাঁধবেড়ার অধিবাসী। এ দিকটা আদিবাসী অঞ্চল। আদিবাসী অঞ্চলে রাজপুত, ব্রাহ্মণ, তাম্বুলী, এরা বাইরে থেকেই এসেছিল নিশ্চয়।
সোনা বাঁধ থেকে বাঁধবেড়া তেমন দূর নয়। আদিবাসী অঞ্চলে পথঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকে না। বর্তমান সরকার বাঁধ, সংলগ্ন অরণ্য, এটাকে ''ভ্রমণকারীর স্বর্গ'' বলে বিজ্ঞাপন করেন। ফলে জয়পুর রোড বাঁধ অবধি পৌঁছে বাঁধ ঘুরে রানীপুর চলে গেছে। বাঁধ পত্তন হয় উনিশশো ষাট সালে। সে সময় সুপারভাইজার বাঁধ ঘিরে, তখনকার কাঁচা রাস্তার দুপাশে অনেক শাল ও অর্জুন গাছ লাগান।
সেসব গাছ এখন বড় হয়ে গেছে। বাঁধের পশ্চিম থেকে সরকারী বন শুরু। সরকারের বন বিভাগের বাংলো আছে, পর্যটন বিভাগ বাংলো করেছে, সেচ বিভাগের বাংলো আছে।
আর আছে সুবর্ণ লজ। পরিবার সহ থাকবার উত্তম ব্যবস্থা। নিজস্ব জেনারেটরে আলো পাখা চলে। কামরা সংলগ্ন বাথরুম, গ্রীল বেষ্টিত বারান্দা উপরন্তু আকর্ষণ, ছাদ থেকে সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়।
সবটাই অপরূপবাবু বাঁধের সাব—কন্ট্রাক্টরি থেকে করে নিয়েছে।
রানীপুরে সে বড় কন্ট্রাক্টর। সরকারী প্রকল্পগুলির ঠিকাদারি সেই পায় তার যোগাযোগেই নানারকম পর্যটক আসে। এটা স্বাভাবিক যে তারা সুবর্ণ লজে আসবে।
সরকারী বাংলোগুলি সুবর্ণ লজের খদ্দের কেড়ে নিতে পারে না। এখানে এসো। আরাম করো। এখানে আরাম করো। আর, অপরূপবাবুর একান্ত অনুগত আমিত কাপুর (ওরা অমিত বলতে পারে না), যে নাকি কলকাতায় কয়েকটি হাইরাইজ তুলেছে, সে একটি রঙিন টি.ভি., ভি.সি.আর. দিয়ে গেছে। উপহার। অপরূপবাবুর ছেলের দোকান থেকে ক্যাসেট নিয়ে চলে এসো। ছবি দেখ।
অপরূপবাবু বলে, টুরিস পয়সা খরচ করতে চায়, আনন্দ করতে চায়, সস্তার জায়গা সবাই খোঁজে না।
কাছাকাছি আছে বটেশ্বর শিবমন্দির। ইদানীং আমিত কাপুর মন্দির বড় করে দিয়েছে। সেখানে শিব ও জীয়ৎকুণ্ডের খুব নাম আছে। মানুষ সেখানেও পুজো দিতে যায়।
অপরূপবাবু বলেছে, এবার একটা মিনিবাস লাগাব। রানীপুর থেকে টুরিস আনবে, এলাকা ঘোরাবে। বটেশ্বর যাও, বিষ্ণুপুর ঘুরে এসো, শুশুনিয়া পাহাড় দেখ। প্যাকেজ টুর, বাঁকুড়া ভ্রমণ।
সুদেব জানে, অপরূপবাবুর বৃহস্পতি তুঙ্গে বসে আছে। সব করে ফেলবে ও।
''সুবর্ণ'' নামের সঙ্গে সোনা নদী ও বাঁধের কোনো সম্পর্ক নেই। সুবর্ণ অপরূপবাবুর স্ত্রী। বড়লোকের মেয়ে, স্বামীর সব কথা মানে না।
তার কড়া হুকুম, সুবর্ণ লজে মদের ব্যবস্থা তুমি রাখতে পারবে না। যে খায় সে নিয়ে আসবে, খাবে।
এর জন্যে সুদেব খুবই কৃতজ্ঞ।
সুবর্ণ লজে যদি মদও পাওয়া যেত, তাহলে যে কি বিপদ হোত তা বলা যায় না। মদ নিয়ে একেক পার্টি ঢোকে, তাদের হাঙ্গামা মেটাতে হয় সুদেবকে। সবচেয়ে ঝামেলা করে অপরূপের ছেলে দেবরূপ।
সে কথা মনিবকে বলা যায় না।
যদি চাকরি চলে যায়।
সুদেব রায়, উচ্চ—মাধ্যমিকে আর.এ; পাঁচ ফিট এগারো ইঞ্চি লম্বা; বুকের ছাতি চল্লিশ; সমস্ত দেহে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন; খুব পরিচিত মুখ রানীপুর থানায়; খুব পরিচিত নাম।
সুদেবকে কে চাকরি দিত, অপরূপবাবু ছাড়া?
ছাব্বিশ বছর বয়স না হতে সুদেব চাকরি—দেনে—অলা পার্টিদের অর্থাৎ লোকদের চিনে ফেলেছে।
খেলাধুলোয় খুব ভালো ছিল।
দৌড়, হাই জ্যাম্প, বাঁধবেড়া সুরাজমোহিনী স্কুল থেকে জেলা প্রতিযোগিতায় সুদেবই যেত।
ফেরার সময়ে খাটুয়ার দোকানে ঢুকত। মোহন ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে কাঠচেরাই কল ও ছুতোর কাজের দোকান করেছিল। মোহন ওকে উৎসাহ দিত।
—খেলাধুলো রাখবি, চাকরির বাজারে সুবিধে।
মারদাঙ্গা করাটা যে কিছুকালের মতো ওর জীবিকা হবে, তা সুদেব ভুলেও ভাবেনি।
বাঁধবেড়া ছোট জায়গা এক অর্থে। এই সম্পন্ন গ্রাম পাড়ায় পাড়ায় বিভক্ত। গ্রামে বহুজনের নিজস্ব স্যালো আছে। কে কবে টাকা পেল, কত পেল, সে কথা জানাজানি হয়েই যায়।
কলকাতায় অর্ডারী মাল চালান দিয়ে মোহন একান্ন হাজার টাকা পেয়েছে এটা বাঁধবেড়ায় সবাই জেনেছিল। এটা সাব—কন্ট্রাক্ট সাপ্লাই। চেকের ওপরে দশ হাজার টাকা ছিল নগদে।
নগদ টাকা বাড়িতে রাখার বিপদ মোহনকে সবাই বুঝিয়েছে। কিন্তু মোহন গ্রাজুয়েট, চাকরি করে না ব্যবসা করে। কাঠের ঠিকাদারি ও কাঠ চোরাই ফাড়াই কাজ ও স্ববুদ্ধিতে করেছে। বাপ ওকে ''হারামজাদা'' বলেছিল, এখন চুপ করে থাকে। মোহনের আত্মবিশ্বাস খুব বেড়েছিল। রানীপুরে বাড়ি করছে, বাড়ির কাজ ধিমা গতিতে এগোলেও বাড়ির কাজে নগদ দরকার। বাঁধবেড়ায় ওর বাড়িতেই দেয়ালে গাঁথা লোহার সিন্দুক আছে। সেখানেই ও টাকা রাখে।
ওর বাড়িতে ডাকাত পড়ে।
দিনটি সুনির্বাচিত ছিল।
মেয়ের বিয়ে এগিয়ে এসেছে। বাড়িতে গয়নাগাঁটি থাকবে, টাকা থাকবে এটা প্রত্যাশিত।
মোহন বাড়ি গিয়ে মাকে বলে এসেছিল, সুদেব খাটা—খাটনি করছে, রাতটা যদি থাকে ভরসা পাই। বাবা সবে মারা গেছে। দাদা একা সংসার টানে। সুদেবের মা লোকের বাড়ি ধান ভাপায় শুকোয়। সে সময়ে সুদেবের পড়ার খরচও জুটত না ঠিকমতো। মোহন খাটুয়া তখন সুদেবের মা'র চোখে খুব বড়লোক। মোহনকে ধরে থাকলে সুদেবের কিছু একটা হিল্লে হয়ে যাবে, এই ভাবে মা।
—তা থাকবে এখন, তাতে কি হয়েছে।
মোহনের মেয়ে অনীতার চোখটি টেরা, রং ময়লা, সে সময়ে তাকে বিয়ে দিতে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল মোহনের। অনীতা, অমিতা, মুক্তি, তারপরে শিবনাথ।
অনীতার মনটা ভালো ছিল। সুদেবকে খুব মমতা করত, তুই বলত।
অমিতা সুদেবেরই বয়সী। ইচ্ছে করে ওর গায়ে ঠেলা তাতে, গা ঘেঁসে দাঁড়াত, ফাজলামি করত।
মুক্তি নেহাতই ছোট, আর ছোট হয়েই থাকল। বয়স বেড়ে বেড়ে এখন ষোল হোল। দেহ বেড়েছে, মন বাড়ে নি।
সে সময়ে অনীতার বিয়ে।
মোহন বুঝতে পারত না, ওর কথায় সুদেবের মনে কোথাও খোঁচা লাগে। গরীবের মন খুব অনুভূতিপ্রবণ হয়, তা ধনীরা বোঝে না।
ঘটনার দিন সুদেব, মোহন আর মোহনের শালা, ভাইপো, ভাগ্নে, এমন অনেকের সঙ্গে খেতে বসেছিল। অনীতা আর অমিতা পরিবেশন করছিল।
মোহন উদার আতিথ্যে বলল, দে দে, সুদেবকে চারখানা মাছ দে। বাঁধের মাছ। এমন মাছ তো বেশি খেতে পায় না, পাকা মাছ।
কথাটা সুদেবের কানে লাগল।
—না না, আমি তেমন মাছের ভক্ত নই।
অমিতা গা দুলিয়ে বলল, শেলীর দাদার বিয়েতে তো কুড়িখানা মাছ খেয়েছিলে।
—সে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ফেলে।
মোহন এবার বলল, খা, খা। দেহটা রাখতে হবে।
খেলাধুলো করতে হবে। এবারে কলকাতা যাবি।
খাওয়াদাওয়া মিটলে বাড়ির ইন্দিছিন্দি বন্ধ করতে করতে মোহন নিশ্বাসে ফেলেছিল।
—তোরা ভালো আছিস সুদেব। ঘরে নেইও কিছু, ডাকাত পড়বে না।
আপনি কাকা, বড় রিস্ক নেন।
—কেন কেন?
—আজকাল আপনার চেয়ে ছোট কারবারীরা বন্দুকের লাইসেন্স নিচ্ছে, দিনকাল খারাপ!
—হ্যাঁ... এবারে দেখতে হবে। ডাকাতি রাহাজানিও বেড়েছে... ঝালাপাড়া থেকে গাড়ি নিয়ে এল, ডাকাতি করে কেটে গেল সিংভূমে, বিহারে... পুলিশ করে না কিছু!
—গ্রামে ব্যাঙ্ক হয়েছে সেখানে রাখুন।
—ব্যাঙ্কে ডাকাতি হয় না?
—তাতে আপনার কি? টাকা তো পাবেন।
এক সঙ্গে দুটো কাজ পড়ল... বাড়ি উঠছিল বটে...
অনীতার বিয়েটা ঝপ করে লেগে গেল! যাকগে, ছেলেটা ইনকামট্যাক্সে কাজ পেয়েছে। তেমন ঝামেলা নেই সংসারে... ভাবনায় নানাখানা হয়ে বাড়িতে টাকা রাখা... যাকগে, লোকজন জমজম করছে, তোমরা আছ।
মোহনের ভাইপো বরেন সুদেবের সহপাঠী! বরেন কাকার কাছে থেকে পড়ে। সে বয়সে যেমন হয়, বরেন সুদেবকে যাকে বলে 'হীরো' মনে করত।
অ্যাথলেটিকসে ভালো সুদেব। সাঁতারে ওস্তাদ।
লেখাপড়াতেও ভালো।
স্বভাবে সিরিয়াস।
বরেন, সুদেব, ওরা কয়েকজন বারান্দায় বসে তাস খেলল অনেকক্ষণ। মোহনের কাঠগোলার দু'জন লোকও থাকল। জেনারেটার আছে, আলো জ্বলছে।
এর মধ্যেই ডাকাত পড়েছিল।
সিনেমার ডাকাত নয়, সত্যি ডাকাত। বাঁধবেড়া অবধি জীপ এনেছিল। মুখে কালো রুমাল, একজনের হাতে বন্দুক। ওরা তিনজন ঢুকে পড়ে, জীপে দু'জন ছিল। ওদের আত্মবিশ্বাসও ছিল। গ্রামে বন্দুক নিয়ে ডাকাতি করলে সন্ত্রস্ত মানুষ তেমন বাধা দেয় না।
কিন্তু সুদেব ওদের ওপর ঝাঁপিয়েই পড়ে। ও চেঁচিয়ে সকলকে ডাকতে থাকে ও লোহা বাঁধানো লাঠির ঘায়ে বন্দুকের হাত ভেঙে দেয়। এবার লোকজন এসে পড়ে। গণধোলাইয়ে নিদারুণ জখম হয় ডাকাতরা। বাকি দু'জন জীপ চালিয়ে পালায়।
রাণীপুরে থানায় বলে, এই সুদেব রায় সাহস করে না এগোলে... যাকে বলে প্রাণটা চলে যেতে পারত। সাহসী ছেলে।
ও. সি. বলেছিলেন, বাঃ বাঃ!
'রানীপুর বার্তা' কাগজে সুদেবের প্রশংসা বেরিয়েছিল। আর মোহন খাটুয়া একটি একশো টাকার নোট সুদেবকে দিয়ে বলেছিল, টাকাটা কথা নয়, মান রক্ষে করলি এটাই বড় কথা।
সুদেব সেদিন খুব অভিভূত হয়।
এর কিছু পরেই তো ঘটে সেই ঘটনা। বাঁধবেড়ার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা অবনী মহান্ত ছেলের বিয়ে দিয়ে খাওড়া থেকে বউ নিয়ে ফিরছিল। ছেলে সূর্য, সুদেবদের ক্লাবের সেক্রেটারি, স্কুলে মাস্টার। সুদেবরা বরযাত্রী গিয়েছিল। ক্লাবের টপ টেন, দশ জন ছেলে।
বটেশ্বর শিবমন্দির ছাড়িয়ে জয়পুর রোড ধরার পরই পথে আড়াআড়ি গাছ দেখে গাড়ি থামাতে হয়।
মিনিবাস আক্রমণ করে দুঃসাহসিক সে ডাকাতি হয়েই যেত, এরা বোমাও ফাটিয়েছিল, কিন্তু সুদেব যে ওদের ওপর ঝাঁপ মারবে সেটা অবনীবাবুরাও ভাবেনি।
ওদের পিছনে আরেকটি বাস এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।
লোকজন দেখে তবে ডাকাতরা পালায়। তবে সুদেব পায়ে চোরা খেয়েছিল, পিঠে রড।
রাণীপুরের হাসপাতালে ওকে অবনীবাবু বলল, কোন সাহসে তুমি ঝাঁপ মারলে?
সুদেব বলেছিল, ভাবিনি।
কাউকে মারতে হবে, কেউ হামলা করছে দেখলে সুদেব বুদ্ধিবিবেচনা হারিয়ে ফেলত।
এবারে মা আর দাদা বলেছিল, তোকে বীরত্ব দেখাতে হবে না। পরীক্ষা দে, কাজ কর, পাঁচজনে যা করে। তাই করত, তাই করত সুদেব। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের সীট পড়ল রানীপুরে। পাশের ছেলের টুকলি করার জন্য সুদেব আর.এ. হয়ে গেল। সুদেবরা কয়েকজনই আর.এ. হোল।
সুদেব ক্ষেপে গিয়েছিল। বিনা দোষে আর. এ. করার জন্যে ও ইনভিজিলেটরকে ধরেছিল বাইরে।
ভীষণ মেরেছিল।
—আমার জীবন নষ্ট করে দেবে, আর.এ. করে দেবে? এটা দণ্ডনীয় অপরাধ।
থানা থেকে সাতদিন বাদে ওকে ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওর নিজের স্কুলের হেডমাস্টারও ওকে যথেষ্ট শাসান। বাঁধবেড়া স্কুলের সুনাম ও নষ্ট করেছে। ও গুণ্ডা, মস্তান হয়ে গেছে। একজন শিক্ষককে যে মারতে পারে.....
মা বোবা, দাদা বোবা।
সুদেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। রানীপুরে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছয়। কত দিকে বাস যাচ্ছে, চলে যাবে দুর্গাপুর।
না হয় কুলীর কাজই করবে।
সেখানেই ওকে ধরে ফেলে অনিল, ওরফে সিতু, ওরফে ভোম্বল। সুদেব ওকে দেখেছে। সুদেবদের সঙ্গে লকআপে তরুণ নামে যে ছেলেটি ছিল, অনিল তাকেই ছাড়াতে এসেছিল।
—এই যে, এখানে কি করছ?
—বসে আছি।
—স্কুল ঘুচে গেল?
সুদেব ক্ষেপতে শুরু করেছিল।
অনিলের মুখে একটা হাসি লেগে আছে।
—বাঁধবেড়ার দুঃসাহসী বালকের চেষ্টায় ডাকাত দল ধৃত। তারপর অবনী মহান্তির পুত্র যখন বিবাহ করে ফিরছিল...
—আপনি কে?
—অনিল। কোথায় যাচ্ছ, দুর্গাপুর?
—যেতে পারি।
—তাই যায় সবাই। কেন যাচ্ছ, কাজ খুঁজতে?
—হ্যাঁ। বাড়িতে আর...
—আমি তোমায় কাজ দেব।
—কি কাজ?
—ভালো কাজ, টাকা পাবে। কাজ করছ, টাকা আনছ, এ কথা জানলেই বাড়িতে পোজিশান ভালো হয়ে যাবে।
—দেবেন কাজ আপনি?
—নিশ্চয়ই। তোমার মতো ছেলেদেরই তো খুঁজি আমি। তরুণও একদিন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল।
—ও লকআপে ছিল কেন?
—পুলিসের কাজই হোল ফলস কেস দেওয়া।
সুদেবের অভিজ্ঞতা থাকলে বুঝত, অনিলের সঙ্গে থানার সম্পর্ক খারাপ নয়। তরুণকে ও তুড়ি মেরে বের করে এনেছিল। অনিলের ওই হাসিও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে তখন সুদেব সে সব বোঝেনি। পরে বুঝেছিল। অনিল ওকে হোটেলে মাংস ভাত খাওয়ায়। তারপর নিয়ে যায় ওর গ্যারেজে। সুদেব খুব চমকে যায়। চারটে ট্রাক আছে যার, ধনী লোক। গ্যারেজের পিছনে ওর দু'খানা ঘর, একটি গুদামঘর। অনিল ওকে বুঝিয়ে বলে।
—ট্রান্সপোর্ট বিজনেস। মানুষ মাল কেনে, আমি পৌঁছই।
খড়্গপুর, দুর্গাপুর, কলকাতা, দিকে দিকে ... ট্রাকে থাকবে, কেন না ডাকাতের ভয় থাকেই।
—তারপর?
—কতদিন থাকো দেখি। মাসে পাঁচশো দেব।
পড়া শুরু করতেই বয়স হয়েছিল। উনিশ বছর বয়সে পাঁচশো টাকাকে রাজার ঐশ্বর্য মনে হয়েছিল।
এখন মনে করলে বিস্ময় লাগে।
রানীপুর ছিল অনিলের অফিসিয়াল ঠিকানা। দুর্গাপুর, খড়্গপুর, সর্বত্র ওর যোগাযোগ ছিল। সুদেব, তরুণ, ভাল্লা, প্রবীণ, ওরা আজ দুর্গাপুর, সাতদিন বাদে খড়্গপুর, একেক জায়গায় পৌঁছত।
লরিতে লোহার রড, সিমেন্ট, চাল, কাপড়, চিনি, তেল, কি থাকত, কি থাকত না সুদেব জানে না।
তরুণ বলেছিল, কোথা থেকে আসছে জানতে চেও না। কোথায় যাচ্ছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ। কথা বোল না। সুদেবের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।
—আমরা কি চোরাই মাল চালান করছি?
—আমরা অনিলদার কাজ করছি।
—আমার ভয় করছে।
—তাহলে এলে কেন?
সে কি জীবন ছিল, কি জীবন! ওদের ট্রাকে হামলা হয়েছে, সুদেবরা মেরেছে, মার খেয়েছে। খড়্গপুরে সুজান সিং বলত, চলে এস অনিল। আমরা পার্টনার হয়ে যাই।
অনিল বলত, যে যার মতো থাকি।
অনিল টাকা ওদের দিত। দু'মাসের টাকা নিয়ে সুদেব বাড়ি গিয়েছিল একবার। বলেছিল, ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির চাকরি। ট্রাকে হেলপার।
দাদা বলেছিল, অনিল কিন্তু নোংরা লোক।
—পরিষ্কার লোক কে?
—চল তুই স্বরূপবাবুর কাছে।
—কি করব?
—ফিশারি করছে, পুকুর পাহারা দিবি।
—কত দেবে?
—দু'আড়াই শো' কি দেবে না?
—না দাদা!
সুদেব বলতে পারেনি, অনিল ওকে ছাড়বে না।
—কি কাজ করিস, কপালে হাতে কাটাকুটি?
—অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল।
এ ভাবে চলতে চলতে তরুণ একদিন ক্যাশ ভেঙে উধাও হয়ে যায়। অনিল বলেছিল, ভুল করল। আমার কাছে থাকলে পুলিস থেকে ছাড়াই, হাসপাতালে দিই। যাবে তো শিলিগুড়ি বা নেপাল। সেখানে ক'দিন টিকবে?
বলেছিল, এখন তুমিই আমার ভরসা।
—আমাকেও ছুটি করে দাও।
—তা হয় না সুদেব। পুলিস প্রোটেকশান দেয়, আবার ধরেও। ধরলে তুমি সব বলে দেবে।
—বলব না।
—পুলিসের হাতে থার্ড ডিগ্রী তো জানো না।
—মার কম খেলাম না, জখম কম হইনি।
—এ লাইফটাই তো ওই রকম।
—তুমি পারো কি করে?
—ঢুকে গেছি, বেরোনো যায় না।
সে তো সত্যি নয়, সত্যি নয়।
কলকাতাতেই সর্বনাশ হয়ে গেল। কলকাতা ছেড়ে খালি ট্রাক বেরিয়েছে, দক্ষিণেশ্বর ছাড়াতেই পুলিসের গাড়ি ওদের আটকাল।
ভাল্লা, প্রবীণ, ড্রাইভার পালাল। সুদেবও লাফিয়ে নেমেছিল। পায়ে গুলি লাগতে ও পড়ে যায়।
ধরা পড়ল সুদেব একা।
থানা—হাসপাতাল—থানা—জেল।
সুদেব আগাগোড়া বোবা হয়ে থাকল।
জাল নম্বরী ট্রাক অসদুদ্দেশে ব্যবহার করার জন্যে সুদেবের তিনমাস জেল হয়ে যায়।
জেলে খবর চলে এল, অনিল ওর জন্যে অপেক্ষায় থাকবে। ও যেন দেখা করে।
সুদেব জানত, ও দেখা করবে না।
কিন্তু অনিল কালো চশমা পরে গাড়ি দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুদেবকে ও তুলে নেয়। দমদমে একটি বাড়িতে নিয়ে যায় ওকে। সারা পথ কথা বলে না কোনো।
একতলা বাড়ি। একটি মোটা লোক চা খাবার আনতে চলে যায়। বিচলিত, বিস্মিত অনিল বলে, তুমি পুলিসকে কিছু বলোনি তা জানি।
বললে না কেন?
—কেন বলব?
—নিজে তো বেঁচে যেতে।
—না, তুমি ধরা পড়তে, বেরোলে আমাকে খুঁজে বের করতে, তা জানি।
—সেই ভয়েই বললে না?
—না অনিলদা। তোমার নিমকও খেয়েছি।
—খুব মার খেয়েছ, না?
—হ্যাঁ। পা থেকে গুলি বেরোল, ব্যান্ডেজ, তার ওপর মার পড়েছে। পিঠ কেটে গেছে, দেখে নাও।
—এখন কি করবে?
—আমি কি তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছি?
—হ্যাঁ.... বলতে পার....
—বিশ্বাস করো যে আমি তোমার কথা কাউকে বলব না কখনো?
—বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু করি।
—এবারে আমাকে ছেড়ে দাও।
—কি করবে?
—আমি খুব সামান্য মানুষ অনিলদা। আমি গ্রামে ফিরে যাব। এ জীবন আমার নয়।
—আমিও এখন বসে গেছি।
—আমাকে ছেড়ে দাও।
—সুজান সিংয়ের সঙ্গে যাচ্ছ না তো?
—লাইনে থাকলে তোমার সঙ্গেই থাকতাম।
—বেশ, যাও। আমিও যাচ্ছি ধানবাদ। অনিল ওকে টাকা দিয়েছিল।
—তোমার সার্ভিসের দাম টাকায় হয় না... তবু।
সুজন টাকা নিয়ে বাঁধবেড়া ফিরেছিল। দাদা আর মাকে বলেছিল, দাদা বিয়ে করে ফেলল?
—তোকে খবর দেব কি করে? তুই তো...
—জানো তাহলে?
দাদা বলেছিল, থানায় দেখা করতে বলেছে।
ও.সি. বললেন, এখন সৎপথে চলো।
কাজকর্ম করো। কি আর বলব...
অপরূপবাবু বলল, ভূদেব কোথায় আর তুমি কোথায়। যে সুখ্যাত করেছ, কাজ দেবে কে?
মোহন খাটুয়া বলল, খবর কি চাপা থাকে সুদেব? মানছি, তুমি আমার বড় উপকারই করেছিলে সেদিন। তা বলে এখন তোমায় কাজ দিতে ভরসা পাই না।
অবনীবাবু বলল, হ্যাঁ... সেদিন ব্যাপারটা ... কিন্তু টাটকা জেল থেকে এলে, এখন আমার পক্ষে তো...
সুদেব বলল, দাদা! সৎপথে তো দরজা বন্ধ।
—তোর টাকাটায় হাত দিইনি আমি। তা নিয়ে ব্যবসাপাতি করতে পারিস। নয় দুটো স্যালো কেন, ভাড়া খাটা।
—না দাদা। মাদুলির বিয়ে আছে।
টাকা ব্যাঙ্কে ফিক্স করে রাখো, খানিক বাড়বে।
কতই বা টাকা, পাঁচ হাজার মাত্র।
অনিল ও টাকা না দিলেই বা সুদেব কি করত?
বড় বন্ধুর মতো ব্যবহার করল উপেন কিসকু, সাঁওতাল পাড়ার মাঝি।
—মদ খাও না, নেশা কর না, বদনামটি নিলে কেন?
—কাকা, চক্করে পড়ে গিয়েছিলাম।
—একশো টাকা নিয়ে নেমে পড়তো।
—ব্যবসা করব?
নেশারক্ত চোখে উপেন বলল, গ্রাম গ্রাম থেকে তেঁতুল কেনো, এক হাটে বেচ, সে হাটে বেগুন কেনো, আর হাটে বেচ, চাল কিনতে বেচতে পারলে লাভ উঠবে। তা তুমি মাসে আড়াই তিনশো টাকা কামাবে।
—যাক, তবু তুমি বললে।
—বটেশ্বরে তো বারোমাসই হাট এখন।
—মন্দ বলনি।
তরকারি কেনাবেচা নয়। সুদেব বটেশ্বরে মন্দির কর্তৃপক্ষকে পয়সা দিয়ে একটা চালাঘর তুলেছিল। চা—বিস্কুট—পাঁউরুটি! দিন বিশ পঁচিশ টাকা বিক্রি হয়। তাই ভালো।
কিনেছিল এই সাইকেলটা। দাদাই কিনে আনল। বলল, তোর টাকা, তোর জিনিস, বেচলে দাম আছে। ওখানে পড়ে থাকবি, বাসে যাবি—আসবি কেন?
সাইকেলে চেপেই ও ফিরছিল গ্রামে।
বটেশ্বরে শিবরাত্রি উপলক্ষে তিনদিন মেলা চলে। শিব—পার্বতী সেজে ছেলেরা নাচে, সাঁওতালরা মোরগ লড়ায়, আর দিক দিক থেকে লোক আসে।
কেনাবেচা মন্দ হয়নি। সুদেবের মনটা হালকা লাগছিল। বাড়ি পৌঁছতে আটটা বাজবে।
পথে একটি গাড়ি দেখে ও ভ্রূ কুঁচকোয়। গাড়ির দরজা খোলা, কি ব্যাপার?
—কে, কে ওখানে?
—বাঁচাও...
কোনো স্ত্রীলোকের গলা।
সুদেব তখনি অতীত অভিজ্ঞতা ভুলেছিল। সাইকেল থামিয়ে ও নেমে পড়ে, দৌড়তে থাকে। টর্চ মারতে দেখতে পায় দুটি কালো কালো মস্তান চেহারা।
একজন স্ত্রীলোক!
সুদেব ঝাঁপ দেয়। টর্চের বাড়ি মারে একজনকে। তারপর স্ত্রীলোকটিকে টেনে সরিয়ে এলোপাথারি মার। একজনকে ও জাপটেই রাখে ও গলা পিষতে থাকে।
—কি হোল, কি হোল?
কে দৌড়ে আসছে।
একজন ছেনতাই পালায়।
এসে পৌঁছয় লোকটি।
—আমি জল আনতে গেলাম...
টর্চ জ্বালো।
লোকটি অপরূপবাবুর ড্রাইভার। আর আক্রান্ত স্ত্রীলোকটি অপরূপের বউ সুবর্ণ।
—এর মুখে ব্যাটারি মারো তো?
বছর বাইশের এই লাফাংগা ছেলেটাকে মেলায় তিনদিনই দেখেছে সুদেব।
ড্রাইভার বলে, তুই রানা। তোকে আমি....
সুদেব বলে, কোন আক্কেলে এই বেপট জায়গায় একা মেয়েছেলেকে ফেলে রেখে জল আনতে গিছলে?
মহিলাকে বলে, কিছু খোয়া গেছে?
—গলার চেনটা...
ড্রাইভার তেড়ে লাথি মারে রানাকে।
সুবর্ণ বলে, থাক! এই ছেলে না থাকলে আমি বাঁচতাম না। তুমি বুড়ো হচ্ছ, বাবু বলল, আরেকটা লোক নাও।
ছি ছি ছি, একটা ভালো কাজে এসেছিলাম, ফেরার কালে...
—একে নিয়ে যান, থানায় দিন।
—তুমি চলো বাবা...
—মন্দিরে চলুন, সেখানে ফাঁড়ি আছে।
গাড়ি থেকে নামবার সময়ে সুদেব রানাকে আরেকটি থাপ্পড় মারে।
ড্রাইভার বলে, বলতে পারবি সুদেব রায়ের হাতে মার খেয়েছিলি হে হে হে!
গাড়ির মাথা থেকে সাইকেল নামায় সুদেব। বলে, ওই ফাঁড়ি, চলুন চলুন।
পুলিশ রানাকে বলে, এক মাসও বেরোসনি। আবার.... জিত কোথায়?
সুদেব বলে, ভেগেছে।
পুলিস বলে, এই সময়ে সোনাদানা পরে বেরোবেন না। এখন হরঘড়ি ছেনতাই চলছে।
—নিন, মাল ক্যাচ করুন, আমি ফিরব।
—আপনাকেও তো স্টেটমেন্ট দিতে হবে।
—কাল দেব, আজ আমি ফিরব।
—ওই পথ দিয়ে ফিরবেন?
—তাইতো ফিরি।
সুবর্ণকে বলল, আপনি মা! দশ ভরি সোনা পরে এসব জায়গায় আসবেন না। এখন পাঁচ টাকার জন্যেও খুন হয়। এই ড্রাইভারের ভরসায় এমন বেপট জায়গায় আসে কেউ? সঙ্গে বেটাছেলে নেই।
পুলিশকে বলল, চেনেন তো এদের, ওর সঙ্গীতে ধরুন!
—হ্যাঁ এবারে পাচ—সাতটা কেস ফেলে...পরদিন বাঁধবেড়া থেকে বটেশ্বর গল্প উড়তে লাগল।
উপেন কিসকু বটেশ্বরে এসে জমিয়ে বসল।
—তা সুদেব! ওরা ছিল দশজন, আর তুমি একাই ওদেরকে...অপাবাবুর বউয়ের লাখ টাকার গয়না।
—নাও কাকা, চা খাও।
—আর ওই বিস্কুট!
—নাও।
উপেন হলুদ, বিভ্রান্ত চোখটি তুলে বলল, জলধরকে নিয়ে কি করি বল তো? পড়াতে পারলাম না, কাজ কে দেবে?
—আমার দোকান তো দেখছো, এখানে কাজ করতে পারে। কিবা দিতে পারব।
—তাই করুক।
—অবনীবাবু কিছু করে না?
—কিচ্ছু না। শোনেই না।
তারপর বলল, ওই রাস্তাটা! আলো যে কবে জ্বলবে!
—জ্বলবে। ভোট আসুক।
সুখ—দুঃখের কথা বলে উপেন চলে গেল। বটেশ্বরে আজ সুদেবের কৃতিত্বের কথা মুখে মুখে।
তারপরই আশ্চর্য, অবাক করা ব্যাপার। অপরূপবাবু আর সুবর্ণ গাড়ি থেকে নামল। ওরা সুদেবের দোকানের দিকেই আসছে।
—আপনারা?
—একটু আসবে সুদেব, কথা ছিল।
—কি কথা?
—গাড়িতে এসো।
—আজ অন্য ড্রাইভার। গাড়ি চলে এল সুবর্ণ লজে।
—ভেতরে চলো।
—কী হয়েছে, বলুন তো?
সুবর্ণ লজের ভেতরে এই প্রথম ঢোকা।
—বোস, বোস।
সুদেব বসল।
—তোমার কাছে আমি কত যে কৃতজ্ঞ...
—সে তো হয়ে গেছে।
—সুবর্ণর প্রাণটা বেঁচেছে।
সুদেব মনে মনে ভাবল, এবার নোট বের করবে।
—সুবর্ণ বলে টাকা দিয়ে ওকে ছোট কোর না। বরঞ্চ... সুদেব! এই লজে বসাই এমন বিশ্বাসী, আবার সাহসী লোক খুঁজছিলাম আমি। তা তোমাদের তো জানি কবে থেকে...
সুবর্ণ বলল, থামো তো। শোনো ছেলে! ''না'' বললে শুনব না। এই লজ আমার। তুমি এর কেয়ারটেকারের চাকরিটা করলে আমি খুব খুশি হব।
—আপনি আমার কথা জানেন না।
—আমি আমার স্বামীর মতো মানুষ নই। কাল অমন বাগে পেয়ে যদি তুমিই হার ছিনিয়ে নিতে.... ব্যাগে টাকাও ছিল... সব জেনেই বলছি ছেলে। এখানে থাকবে, সব দেখবে। আটশো টাকায় শুরু করো, ক্রমে ব্যবসা জমলে বাড়িয়ে দেব।
অপরূপবাবু বলল, এই কথাটা বলতে ডেকেছি।
—আমাকে .... কাজ দেবেন?
—দেব।
—আমি যদি সব লুট করে পালাই?
—পালাবে না। অনিল আমাকে সব বলেছে। অবাক হচ্ছ কেন? অনিলের বাবা আমাদের ম্যানেজার ছিল। অনিল আমায় খুব চেনে। ছেলেটা কুপথে চলে গেল, নইলে..
সুদেব বলল, বেশ। করব কাজ।
—তাহলে এখনি সব বুঝিয়ে দিই।
অপরূপবাবু হেসেছিল।
—হয়ে গেল, সুবর্ণ, হয়ে গেল। এতদিন ধরে লজটা চালুই করতে পারছিলাম না। দেবু, আমার ছেলে, সে তো আজ আসে, কাল আসে না। অথচ টুরিস পাঠাই আমি। সরকারী বাংলোতে সবার মন ওঠে না।
সুদেবের মনে পড়েছিল দুর্গাপুরে ভিকট্রি হোটেলের কথা। ও বলেছিল, সাজিয়ে গুজিয়ে ওপনিং করুন নতুন করে।
—করো, করো যা দরকার।
—এখনো তো খাটনি আছে, পয়সাও ঢালতে হবে।
সুবর্ণ বলল, সব করো ছেলে। ওনার যত কিছু সব আমার প'য়ে। সব করো।
সুদেব বুঝেছিল, সরকার যে জায়গাকে ট্যুরিস্ট আকর্ষণ করতে চায়, সে জায়গায় ট্যুরিস্ট লজ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ।
টাকাঅলা লোক ছাড়া বুদ্ধি করেও লাভ নেই।
অপরূপবাবু বলল, কয়েকবারে ভারত ভ্রমণ করে নিয়েছি। দিকে দিকে কত চমৎকার সব থাকার ব্যবস্থা করেছে। এ জায়গার বাজার আছে। ফরেস্ট পাচ্ছ, বাঁধ পাচ্ছ, মন্দির পাচ্ছ, আশপাশে পাহাড়ও আছে। খুব ভালো হবে।
সুদেবের চাকরি দু'বছরের।
তিনমাস লেগেছিল লজ রেডি করতে। আগেকার লোকজনের মধ্যে কুক মোহর ও তার বউ বিবি আছে। বাসন মাজে সনাতন হাঁসদার বউ গৌরী, সনাতন জল টানে। কুয়োর সঙ্গে পাম্প আছে। অমরু একাধারে মালী ও দারোয়ান। উপেনের ছেলে জলধর আর সুবর্ণর ড্রাইভারের ছেলে স্বপন লজের ''বয়''। জলধর বাগানের কাজও করে।
ঘরে ঘরে পর্দা, কার্পেট, ডানলোপিলোর বিছানা, সংলগ্ন বাথরুম। বসার ঘরটি সকলের জন্য। পাশেই সুদেবের ঘর ও বাথরুম। সুদেবের ঘরে যখন সুদেব থাকে না, জলধর থাকে। পিছনে চারটি ঘর, সামনে বারান্দা। দুটিতে মোহর, বিবি এবং স্বপন ও জলধর থাকে। অন্য দুটো ঘরে দরকারে ক্যাম্প খাট ফেলে অতিথি রাখা যায়। অমরুর ঘর গেটের পাশে।
সুদেব সাইকেল থেকে নামল।
লজের পূর্বদিকে সুবর্ণ কখনো এসে থাকবে বলে একটি কটেজ হয়েছে। অপরূপবাবু রানীপুরে কলেজ হোস্টেল, নতুন হাসপাতালের কনট্রাক্টর। রানীপুর মানেই অপরূপবাবু।
ইউক্যালিপটাস ও কৃষ্ণচূড়া গাছ বড় হয়ে গেছে। বুগেনভিলিয়া গাছ অনেক। বাগানে একটি ছোট লিলিপনড আছে। তাছাড়া গোলাপ, বেল, ক্যানা, করবী অনেক গাছ। অমরু কোন নার্সারিতে কাজ করত, গাছের ব্যাপারটা বোঝে। কোয়ার্টারে মোহরের বউ লাউ কুমড়ো লাগায়। পিছনে অনেকটা জমি পড়ে আছে। অপরূপবাবুর অনেক পরিকল্পনা। ওখানে স্কুল কলেজের ছাত্রদের থাকার জন্যে ডর্মিটরি করবে। সোনা বাঁধ ও ফরেস্ট এখন জনপ্রিয় জায়গা।
এখন রাস্তায় বাতির পোস্ট। পথ পেরোলেই ফরেস্ট। ফরেস্ট পেরোলেই বাঁধ।
সুদেব এসেছে দেখে জলধর দৌড়ে এল।
—খবর কি, সব ঠিক আছে তো?
—সিনেমা পার্টি আসছে। দেবুবাবু এসেছে। এখানে শুটিং হবে। মালা রায় থাকবে।
—কখন আসছে?
—বিকেলে পৌঁছবে। বাবু বসে আছে। অপরূপের ছেলে দেবরূপের নাম ও চেহারা কাছাকাছি যায়। সুদর্শন, স্মার্ট, চোখ দু'টি সুন্দর। চুলের ছাঁট ওর, জলধরের, অমরুর, স্বপনের, সকলেরই সিনেমার নায়কদের মতো। জলধররা এক জায়গায় চুল ছাঁটে, দেবরূপ অন্যত্র।
অমরু সরেন, জলধর কিসকু, সনাতন ও গৌরী হাঁসদাকে কাজ দেবার প্রস্তাব সুদেবের।
অমরু এদের মধ্যে শিক্ষিত। আট ক্লাস পড়েছে, দুর্গাপুর—ধানবাদ—হাওড়া লেবার খেটেছে। সরকারী চাকরির চেষ্টায় আছে, হয়তো হয়ে যাবে। ওদের বাড়ি কাছাকাছি কয়েকটি গ্রামে। সুদেব অপরূপকে বলেছিল, ভালো সার্ভিস চান, বিশ্বাসী হবে, ওদের রাখুন। সরকারী কাজ ছাড়া বেসরকারী কাজে ওরা সুযোগ পাক।
—বেকার তো আরো আছে।
—কাছাকাছি গ্রামে বাড়ি, যাবে—আসবে। ভালো ব্যবহার করলে ওরা মনে রাখে। সুদেবের কথা কার্যকরী বলে প্রমাণ হয়েছে। এখন দেবরূপও তা স্বীকার করে।
দেবরূপ ওদের সম্পর্কে ''বুনো, জংলী'' এসব একদা বলত। দিনকাল পাল্টে গেছে, এখন আর তা বললে বিপদ আছে তা ও ভালোই বোঝে। ফলে কথাবার্তা পাল্টেছে।
দেবরূপ বসেছিল। সঙ্গে একটি প্রৌঢ়। ওরা মারুতি ভ্যানে এসেছে নিশ্চয়ই, সব সময়ে তাই আসে।
—এই যে সুদেববাবু। বাড়ি থেকে ফিরতে এত দেরি?
—ক'মাসে এক দিন, তাও গেস্ট থাকলে যাই না।
—যাক গে, আপনার সুবর্ণলজ তো জাতে উঠে গেল।
—জাতে নিচু তো ছিল না।
—আরে ''দু'বার বিয়ে'' ছবির শুটিং হবে, তিনদিন পুরো লজ বুকিং, ইনি প্রোডাকশান ম্যানেজার রবীনবাবু। অ্যাডভান্স টাকা নিয়ে চলে এসেছেন।
—সুবর্ণ লজের ভালো পাবলিসিটি হবে।
—পুরোটা বুকিং।
—ক'দিনের জন্যে?
রবীনবাবু বলে, তিন দিনের জন্যে নিচ্ছি, অত লাগবে না।
—ক'জন থাকবেন?
—নায়িকা, নায়িকায় ডবল, ডিরেক্টর। আর ইউনিটে.... তা ধরুন জনা ছয়েক।
দেবরূপ বলে, নায়িকা, নায়িকার ডবল, ডিরেক্টর, ওনারা এখানে থাকবেন। ইউনিট থাকছে ইরিগেশন বাংলোয়। ওঁরা ওখানে খাবেন, এঁরা এখানে।
—সবটা বুক করবেন বললেন?
দেবরূপ বলে, মালা রায় টপ যাচ্ছে, মেজাজ তেমনি। ও চারপাশে গাদাগুচ্ছের লোক নিয়ে থাকবে না।
রবীনবাবু বলে, নায়িকার মা থাকবেন, সেটা বলা হয়নি। তারপর খাওয়া দাওয়া...
—কি হবে, বলুন?
—নায়িকা রাতে চিকেন সুপ, একটা রুটি, স্যালাড। সকালে কমলালেবুর রস, দইয়ের ঘোল। দুপুরে কি খাবেন, তা নিজেই বলবেন....
সুদেব বলে, দেবুবাবু! এখানে কমলালেবু পাব কোথায়? রানীপুরেই কি পাব?
দেবরূপ বলে, ভাবনা কি সুদেববাবু? সকালে আমি এসে যাব দশটা নাগাদ। রানীপুর থেকে সব নিয়ে আসব।
রবীনবাবু বলে, না, না, ফল আমরা নিয়ে আসব। ফ্রিজে রেখে দেবেন।
—দেবুবাবু! আপনার বাবাকে বলে কয়ে যদি রসুনকে জোগাড় করতে পারেন... মোহর যদি না পারে?
—জোগাড় করতেই হবে।
রবীনবাবু ভরসা দিয়ে বলে, মালা যা খেয়ালী। হয়তো পরশুই বলবে কলকাতা চলো।
দেবরূপ বলে, আমাদের প্রেস্টিজ এটা। আমি আর অমিত কাল দশটার মধ্যে... ভাবতে পারছি না, ভাবতে পারছি না সুদেববাবু! মালা রায়! ন্যাশনাল প্রোগ্রামে অভিনয় করছে... সে এখানে... মিউজিক রাহুলদেব বর্মন... প্লে ব্যাক আশা ভোঁসলে .. খবর পেলে শুটিং দেখতে ... রবীনবাবু! ইন্দ্র বোস রানীপুরের ছেলে বলেই এ জায়গা বেছেছে। এ ছবির খবর বেরোলে দমাদম শুটিং পার্টি আসবে।
—ঘরটর দেখে নিই?
সুদেব বলে, দেখুন।
ঘর দেখে রবীনবাবু বলেছিল চলবে। ওনার ঘরে ধোয়ানো পর্দা দিয়ে দেবেন।
—হ্যাঁ, পর্দা, তোয়ালে....
—আপনাদের তোয়ালে ও ব্যবহার করবে না। ও হচ্ছে... মানে খুব মুডি মেয়ে... নির্জনতা .... একা একা ... এসব ভালবাসে। তিন বছর লাইনে এসেছে... আলিপুরে বিশাল ফ্ল্যাট কিনল... গাড়ি.... এখন সব চটপট হয়ে যায়। আগে এত টাকা তো ছিল না!
—আপনি পুরানো লোক।
—হ্যাঁ, সে সময়ে টাকা ছিল না।
মানুষজন অন্যরকম ছিল। পাহাড়ীদা, এসেই বলত, রবীন কোথায়? উত্তম, আহা—হা, মানুষ ছিল বটে! কতবার কত সাহায্য করেছে... শুনুন, উনি যখন যা চাইবেন সেটুকু জোগান দিয়ে যাবেন, ব্যস। ইন্দ্র আজকালকার ছেলে, খুব বুঝদার, সে সব সামলে নেবে।
—নায়িকা কখন কি চাইবেন, জায়গা তো তেমন নয়!
—মাছ পাওয়া যাবে?
দেবরূপ বলে, বাঁধের মাছ খাইয়ে দেব।
আরে, বাঁধবেড়ায় আমাদের চারটে পুকুর আছে, মাছের অভাব?
রবীনবাবুর হঠাৎ কি মনে হয়।
—সুদেববাবু কি ছবি—টবি দেখেন না?
—অনেককাল দেখা হয় না।
দেবরূপ বলে, সুদেব জানে শুধু সুবর্ণ লজ! দারুণ ছেলে! আমার মাকে ডাকাতের হাত থেকে...
রবীনবাবু বলে, বা বা! কলকাতা এলে আসবেন ভাই গরীবের বাড়ি। আমার কাকা, স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশান পান, সর্বদা বলেন, বাঙালী লাঠি ধরতে ভুলে গেছে। আপনাকে দেখলে খুব আনন্দ পাবে।
সুদেব বলে, কাগজ পড়লে দেখবেন, বাঙালী পরের জন্যে না হোক, নিজের কাজ হাসিল করতে লাঠি থেকে রিভলভার, সব চালাচ্ছে।
দেবরূপ বলে অন্তত একটি ক্রাউড সীনে আমার মুখ দেখাবার ব্যবস্থাটা করে দেবেন।
—দেখা যাবে, দেখা যাবে। এখানে তো নায়ক—নায়িকার গান....ও, নায়ক আসবে পরশু। নতুন ছেলে রূপক, ইরিগেশান বাংলোতেই থাকবে। ওই গানের শট জঙ্গলে... মানে নায়িকা ভাবছে। নায়ক তো ওকে গোপনে বিয়ে করে শহরে কেটেছে...নায়িকা বাঁধে ঝাঁপ দেবে... মানে ওর ডবল.... তারপর নায়িকাকে বাঁচাবে এক ডাক্তার। সে ভীষণ ধনী। নায়িকা তাকে ''বাবা'' বলবে, তার সম্পত্তি পাবে, তারপর নায়কের সঙ্গেই তার দু'বার বিয়ে হবে।
—এর নাম সিনেমা।
—ডবল মেয়েটা ভালো। দেবরূপবাবু, সাঁতার জানা লোক মোতায়েত রাখবেন আপনি।
—অবশ্যই।
পরে অমরু বলে, হয়ে গেল কাজ।
—কি হোল?
—সুদেবদা, সিনেমার লোক এলে ভিড় যা হবে!
—তুমি ঘর থেকে ভাইকে নিয়ে এসো। গেট সামলানো মুশকিল হয়ে যাবে।
মোহর বলে, ইনসাল্ট হয়ে গেল দাদা।
কি এমন খাবে যে আমি পেরে উঠব না?
—মনিবের ছেলের কাস্টমার মোহরদা! তোমারও চাকরি, আমারও চাকরি। বোঝোই তো!
—গৌরী মাসিকে মুরগি আর ডিম আনতে দাও।
—হ্যাঁ, চিনি, চা—পাতা, কফি, আমুলের কৌটো, সব্জী, সবই আনতে হবে।
সুদেব বোঝে, এটা ওর পরীক্ষা।
—জলধর, বাঁশি বাজাবি না। পার্টি খুব নির্জনতা ভালোবাসে।
অত্যন্ত নির্জনতা প্রিয়, একলা থাকতে ভালোবাসা, খেয়ালী নায়িকার জন্যে সকালেই দেবরূপ ''দাতা'' ; ''জঙ্গবাজ'' ; ''ত্রিদেব'' ; ''যৈসি করনি ঐসি ভরনি'' ; ''রামলাখন''; ''বাটোয়ারা'' ; ইত্যাদি ক্যাসেট নিয়ে চলে আসে।
বিকেলে সোনা বাঁধের নির্জনতা ভেঙে দিয়ে কয়েকটি মারুতি, একটি মারুতি ভ্যান চলে আসে।
মালা রায় নেমেই বলে, ডিভাইন, ডিভাইন, কিন্তু চা খাব ইন্দ্র। এক পেয়ালা গ্রীন টি না পেলে মরে যাব—আর একটু স্নান... ও ডিভাইন বয়। ও কে?
সুদেব বলে, জলধর কিসকু।
—সেটা কি?
—ও সাঁওতাল।
—কি চেহারা। ইন্দ্র, কাল ওকে অবশ্য রেখো।
—ও এখানেই থাকে।
—আপনি?
—আমি এখানকার কেয়ারটেকার।
—ডিভাইন!
—ভেতরে চলুন।
—হ্যাঁ। ওঃ, এই ফুল, এই গাছ, আমি ভাবতে পারছি না। ইন্দ্র, এখানে একটা বাড়ি বানাব।
—অবশ্যই। দীঘা, চাঁদিপুর, খাজুরাহো, কোথায় বাড়ি বানাসনি? এখানেও হয়ে যাক।
মালা গলে পড়ে।
—কলেজে একসঙ্গে পড়তাম তো! ইন্দ্র আমাকে ''তুই'' বলে। কি সুইট, বলুন তো?
নায়িকার মা বললেন, ভেতরে চলো আগে।
—নিশ্চয়।
ঘর ডিভাইন, আলোর শেড কি মিষ্টি, জলটা কি ঠাণ্ডা! স্নানের পর, শুধু একটু কফি, একটু কাজু বাদাম। নায়িকার পিছনে ছোটাছুটি দেবরূপই করে। ওর জীবনে এটা একটা ঐতিহাসিক দিন।
স্বপন সুদেবকে বলে, ছোটবাবু ক্ষেপে গেছে।
—কিচ্ছু বলিস না।
নায়িকার মা কিন্তু সহজে খুশি হন না।
—নমিতা! নমিতা!
শান্ত চেহারার মেয়েটি সুদেবের ঘরে এসে দাঁড়ায়।
—বসতে পারি?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, কি আশ্চর্য, বসুন না।
—শুনুন, নায়িকার মা'র জন্যে স্নানের গরম জল চাই। আপনাদের কাপড় ধোবার লোক আছে?
—জায়গা তো দেখছেন। লনডারিং সার্ভিস নেই। হয়ে যাবে। তবে দরকার হলে বিবি মাসি ধুয়ে দেবে, চার্জ দেবেন।
নায়িকার চেয়ে নায়িকার মা অনেক বেশিবার কাপড় ছাড়বেন, ধুতে দেবেন। আপনারা ওঁকে চিনতে পারেননি, উনিও অভিনয় করতেন। নাম ছিল অনসূয়া দেবী।
—আমরা বুনো জংলী লোক!
—সকালে ওঁর চাই কড়া টোস্ট, দুধ, চীজ, মাখন।
—চীজ হবে না।
—ডিরেক্টরের কোনো বায়নাক্কা নেই।
—আপনার?
—আমার? আপনারা যা খাবেন তাই দেবেন।
—মাপ করবেন, আপনিও কি অভিনয় করেন?
—আমি এ ছবিতে নায়িকার ডবল।
নায়িকা তো জলে ঝাঁপ দিতে পারে না, আমি দেব।
—সোনা বাঁধে। সাঁতার জানেন?
—শুনেছি তোলার লোক থাকবে....
সাঁতার! জানতাম একসময়ে। যেহেতু ডুবছি আর ডুবছি, বুঝেছি জলে সাঁতার জানাটা কিছু কাজে লাগে না।
এবার ডিরেক্টরের প্রবেশ।
—নমিতা এইখানে? যাও যাও, স্নান করে নাও, স্নান করে নাও। সুদেববাবু! রাতের খাবারটা ন'টার মধ্যে দিয়ে দেবেন। রাতে বিশ্রাম দরকার। কি খেতে দেবেন?
—ফ্রায়েড রাইস, চিকেন দো পেঁয়াজী, স্যালাড, কাস্টার্ড। এখানে সব পাওয়াও যায় না, অসুবিধে খুব।
—যথেষ্ট, যথেষ্ট। সকালে আমাদের সকলকে... রবীনবাবুকে তো সন্ধের পর পাবেন না। সকালে একটা লুচি তরকারি করে দেবেন।
—দুপুরে মাছ দিতে পারব।
—চমৎকার জায়গা মশাই! আমার ছবির বিজ্ঞাপন শুরু হলেই এখানে শুটিং করার ভিড় লেগে যাবে।
—আমরা বিখ্যাত হয়ে যাব।
—রবীনবাবু কিছু দিয়েছে?
—হাজার টাকা আগাম দিয়েছেন।
—ওই পুরনো অভ্যেস। কাল সন্ধ্যায় মনে করাবেন তো। লজ চার্জ, খাওয়ার বিল, সব ধরিয়ে দেবেন।
ব্যস্ত সমস্ত ইন্দ্র বেরিয়ে যায়। মূল কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনা ইন্দ্র বসুর।
নমিতা বলে, টাকাটা নিয়ে নেবেন।
—আপনি শুধু জলে ঝাঁপ দেবেন?
—পেছন ফিরে। নায়িকার মতোই লম্বা, এক ফিগার, ইত্যাদি ইত্যাদ, ঝাঁপ দিয়েই আড়াইশো টাকা।
—কি করেন, এমনিতে?
নমিতার চোখ দুর্বোধ্য, কঠিনও বটে। ঈষৎ শুকনো গলায় বলে, একদিনেই সব জেনে নেবেন? গরম জলটা দিন।
—হ্যাঁ, পাঠিয়ে দিচ্ছি।
দেবরূপ শশব্যস্ত হয়ে ঢোকে।
—সুদেববাবু! রান্নার তো দেরি আছে।
—হ্যাঁ, ঘণ্টা দুই তো বটেই।
অনাবশ্যক গলা নামিয়ে দেবরূপ বলে, আমি ওদের ইরিগেশান বাংলায় ঘুরিয়ে আনি। কামেরা—ট্যামেরা এখানেই রইল। ফিরে এসে খাওয়াদাওয়া করা যাবে।
এখানে থাকছেন নায়িকা, তাঁর মা, নমিতা দেবী আর পরিচালক, এই তো?
—হ্যাঁ; বললাম তো!
সুদেব নিচু গলায় বলে, দেবুবাবু, এরকম পার্টি তো কখনো হ্যানডল করিনি। আপনাকে সাহায্য করতে হবে। নইলে বদনাম হয়ে যাবে। বাবুর বদনাম হবে।
দেবরূপ বলে, সব সাহায্য করব। বাবুর কথা বলবেন না। তার ক্ষমতা ছিল এ পার্টি আনে?
—একটু দেখবেন। আর... ওনারা যেন খানিক বুঝে চলেন.... এ সব জায়গায় মানুষ তো বাইরের লোকজনের উৎপাত সয়ে সয়ে অতিষ্ঠ হয়ে আছে। ওই ইরিগেশন বাংলোতেই সেবারে কি হয়ে গেল। আপনি জানবেন সবই।
—হ্যাঁ... তা বটে, তা বটে।
সকলেরই মনে থাকবে। এক সরকারী কেউ কেটা, ইরিগেশন বাংলোয় মদটদ খেয়ে সাঁওতালগ্রামে চলে গিয়েছিল। তখন ওখানে চলছে সারহুল পরব। মেয়েদের সঙ্গে নাচতে চেয়েছিল। ফলে মারধোর খায়, খুব হাঙ্গামা হয়। সে কথা এখানে সবাই মনে রেখেছে। বস্তুত, এরা আসার পরেই জলধর, অমরু, এদের চোখের ওপর একটা সতর্কতার ছায়া নেমে এসেছে। বাইরের টুরিস্ট এসে হৈ—চৈ, অসভ্যতা করে উত্তেজনার কারণ সৃষ্টি করলে তার ফল ভালো হয় না।
জলধর সুদেবকে ডাকল।
—কি হোল?
—বুড়ো বাবুটা কি এখানেই থাকবে?
—সে কোথায়?
—বাগানে বসে খাচ্ছে।
সুদেব ইন্দ্রকে খুঁজতে গেল। রূপক ইন্দ্রকে বলেছিল, আমি হীরো, কিন্তু আমাকে ওখানে ঠেলছেন, এটা ঠিক করছেন না, এটা অপমানজনক।
—দেখ রূপক! আমি স্বচ্ছন্দে ওখানে যেতে পারি, তোমাকে এখানে রাখতে পারি। তারপরের পরিস্থিতি সামলাতে পারবে?
—কি বলতে চান বলুন তো?
—নায়িকা তোমার ওপর ক্ষেপে আছে।
—এটা কি...জেলাসি?
—জেলাসি নয়। কিন্তু নায়িকা সামনে থাকতে তুমি নায়িকার ডবলকে চাঁদ দেখাবে, এটা চলে না। তুমি ওপরে ওঠো ভাই, এক নম্বর হও, তোমার সব ইচ্ছে অনিচ্ছে সহ্য করব।
—গল্পতে হীরো তো ভিলেন।
—অভিনয়ের স্কোপ পাচ্ছ, কাজে লাগাও। দেখ, মালার কথায় ঝামরিয়া টাকা ঢালছে। মালার কথা আমাদের শুনতেই হবে। এ ছবি না লাগলে আমিও...আর মালা আমাকে সুযোগটা এনে দিয়েছে।
সুদেব গলা খাঁখারি দিয়ে ঢোকে।
—ব্যস্ত আছেন স্যার?
—কেন ভাই?
—রবীনবাবু বাগানে বসে...উনি তো এখানে থাকবেন না।
—দেখছি, আমি দেখছি। খাবারটি খাবে, চলে যাবে। চলুন তো দেখি। ওখানে কি করছে?
বাগানের মাঝখানে শুকনো লিপিপুলের ধারে বসে রবীনবাবু, নমিতা দাঁড়িয়ে।
—নমিতা গ্রেট ম্যানেজার, ওকে ঠান্ডা করে দেবে।
নমিতা বলছিল, আপনি আর মদ খাবেন না।
—চুপ করো। চোখ রাঙাচ্ছে, জানো আমি তোমাকে...
—জানি। তবু বলছি, আপনি এভাবে চললে...
—আমাকে ইন্দ্র দেখিও না। আদি সিনেমার বাদশাহের সঙ্গে কাজ করেছি। ইন্দ্র এগিয়ে এল। বলল, আপনি চলে যান সুদেববাবু। এই এক দোষে লোকটা কাজ পেলেও রাখতে পারে না। নমিতা ঘরে যাও। মালার মা তোমায় খুঁজছিলেন।
—হ্যাঁ, যাচ্ছি।
—মালা এতক্ষণ চুপচাপ কেন?
—উনিতো ঘরেও নেই। তাই দেখতেই...
—ঘরে নেই? যাবে কোথায়?
বললেন, হাঁটতে যাব।
সুদেব বলল, একা হাঁটতে যাওয়া...
ঝোপঝাড় আছে... সাপখোপও আছে....
মালা সুবর্ণ লজে নেই, সামনের বাগানে নেই। অবশেষে অমরু টর্চ নিয়ে বেরিয়ে ওকে আবিষ্কার করল ফরেস্টে।
ইন্দ্র বলল, মালা! সাপের ভয় আছে কিন্তু।
—সেজন্যেই তো ফিরলাম। ইউক্যালিপটাস বনে হেঁটে দেখিস ইন্দ্র, ডিভাইন।
—গ্রেটা গার্বোর মতো করিস না ভাই।
—ইয়েস, আমি গার্বো।
—বুঝেছি। এবার বিশ্রাম কর।
—ইশ! এখন আমি ভি. সি. পি. দেখব।
—তাই দেখিস, কাল দেখিস।
—তোর মধ্যে কবিতা নেই।
—সবিতাকে বিয়ে করার পর কবিতা উধাও।
—ওঃ, ছাত্রজীবন, ছাত্রজীবন। সবিতা আর ইন্দ্র। আমি আর পল্লব। তারপর সবিতা পড়াচ্ছে ফিলজফি। ওদের কি মিষ্টি দুটো যমজ মেয়ে আছে সুদেববাবু। পল্লবতো এখন অ্যাড ফিল্ম করে। সবচেয়ে ডিভাইন কি ইন্দ্র, এরা কেউ আমাদের ছবি দেখে না, মফঃস্বলেও ভি. সি. পি. আর হিন্দী ছবি।
সুদেব বলে, তা কেন, স্বপন, দেবুবাবু, ওরা আপনার সব ছবি দেখেছে। আমাদের কথা ছেড়ে দিন।
—বেশ! ছেড়ে দিলাম!
সুদেব বোঝে, মালা নেশা করেছে।
—চলুন, ভেতরে যাই। নইলে বুড়ী ক্ষেপে যাবে।
ওরা ভেতরে আসে। রবীনবাবু গুম হয়ে থাকে। ইন্দ্র বলে, আপনি এখানে পুরো টাকাও দেন নি। দিন, টাকা আমাকে দিন। সেবারের মতো হারিয়ে যাবে।
—অবিশ্বাস করছ? নাও।
সুদেব বলে, ডিনার কি...
—হয়ে গেছে?
—মনে হয়।
—একসঙ্গে ক'জন বসা যায়?
—আটজন।
—আমি, রবীনবাবু, রূপক, নমিতা বসে যাই। মালার তো সুপ আর স্যালাড।
তোমার মা...
মালা বলে, আজ ইন্দ্র, তুই যা খাবি আমি তাই খাব।
—তোর মা?
অনসূয়া দেবী কালো জর্জেট, কালো জামা পরে ঢোকেন ঘরে। বলেন, যা হয়েছে তাই খাব। কি নির্জন জায়গা বেছেছ বাবা, প্যাঁচার ডাক শোনা যায়।
—লোকেশান কেমন তাই বলুন?
—জঙ্গল বলে জঙ্গল।
—এটা কি জঙ্গল ম্যাডাম। জঙ্গল দেখাই যায় না এখন। এ জঙ্গলে কোনো জীবজন্তু নেই।
—জঙ্গল আমি দেখেছি ইন্দ্র। মালার বাবার সঙ্গে ইউরোপ ঘুরেছি, কত বন—জঙ্গল দেখেছি। সে বাগানের মতো।
—ইন্দ্রও যাবে মা, দেখবে। খাও।
রবীনবাবু হঠাৎ বলে, হাজারিবাগের জঙ্গলে ''পলাশ মহুয়া'' ছবির শুটিং হয়েছিল, আপনার তো মনে থাকবে।
মালার মা গলে যান সহসা।
—সে তো ছোট্ট রোল। বাপ রে, কি জঙ্গল।
—আমার মনে আছে।
ইন্দ্র তাড়াতাড়ি বলে, খেয়ে নিই আমরা।
ওরাও তো আসবে। না সুদেববাবু, রান্না চমৎকার।
মা বলেন, মালা! তুমি এই ঘি—তেলের রান্না খাচ্ছ?
—খাচ্ছি, খুব আরাম করেই খাচ্ছি।
—তোমার ডায়েট!
—কাল থেকে।
—প্রভাত জানলে..
—তুমি ঝামারিয়ার এজেন্ট, না আমার মা? আমার মনে হচ্ছে তোমাকে নিয়ে ঘোরাফেরা করা আর চলবে না।
ম্যাডাম গলার স্বর বদলে পেলেন।
—এই দেখ! মেয়ের কথা মা ভাববে না তো কে ভাববে? কবে তোমার কথা ভাবিনি বলো?
—ভেবেছ। ভাবছ, কিন্তু আমি সাবালিকা।
ইন্দ্র বলল, তুই এখন আমাদের ভরসা।
কালকে গানের লিপটা সকালে প্রাকটিস করে নিবি।
দেখিস, তোর নাম কি ওপরে উঠে যায়।
—তোর ছবিতে আমি গ্রামের মেয়ে।
রঞ্জনবাবুর ছবিতে আমি হাসপাতালের ডাক্তার! কিন্তু গল্পগুলো তোরা এমন বাছিস, ভাবিস না।
—এ গল্প তো তোর পছন্দ।
—হ্যাঁ, তা পছন্দ।
সুদেব বলে, চিকেন কেমন খেলেন?
—ভীষণ ভালো।
—হতেই হবে। সাঁওতাল গ্রাম থেকে চিকেন আর ডিম আনাই, তার স্বাদই আলাদা।
মালা নেচে ওঠে।
—সাঁওতাল গ্রামও আছে।
—অনেক।
—ইন্দ্র! গ্রামে চল না।
—সময় তো কম। আমার স্বপ্ন অমলেন্দু মিত্রের ''কৃষ্ণা'' গল্পটা ছবি করা। সেটা করতে পারলে গ্রামেই যাব।
—ওদের নাচ—গানের শট নে না।
সুদেব বলে, সেজন্যে অনুমতি নিতে হয়। ওদের উৎসবের সময়ে চলে আসবেন, তখন হবে।
—ওরা ডিভাইন!
—ওরা ঠিক আমাদের মতো মানুষ।
ইন্দ্র বলে, আমার উচিত, কুককে ধন্যবাদ দেওয়া।
—যাবার সময়ে দেবেন!
—মা, বুড়ী হয়েছ, অত খেও না।
পঞ্চাশটা কোনো বয়স নয় মালা!
—ও, পঞ্চাশ! স্যরি!
ওরা উঠে পড়ে। সৌভাগ্যক্রমে দেবরূপরা এসে যায়। ইন্দ্র বলে, ভাই! ঝটপট সেরে নিলে আমরা একটু ঘুমোতে পারি।
ক্যামেরাম্যান সিং বলে, বউকে চিঠি লিখবে।
—এবার কিছু ছবি তুলে নিয়ে যাব।
ম্যাডামকে আনাটা ভুল হয়েছে। মালার মুড বিগড়ে দেবে।
—আবার হবে আউটডোর।
—এ বাজেটে? তাছাড়া মালা এখন ডেট—ই দিতে পারে না। বড় পর্দা, ছোট পর্দা, চালাচ্ছে বটে।
সিংহ বলে, সিমপ্যাথি, সিমপ্যাথি। ও তো টিকবে না। এরমধ্যেই বাজার পড়ছে।
বড় ছবি ধরতে পারছে না। ফলে যা পারে করে নিচ্ছে।
—চেহারা ছিল।
—সুচিত্রা ফেস, সুচিত্রার ট্যালেন্ট নেই।
দেবরূপ বলে, ইন্দ্র দা, আপনার ছবির টাকা আসছে বছর আমিই দিতে পারব।
—এই লজ থেকে?
—না না। ব্যবসা থেকে। জয়পুর কলিয়ারি ঘিরে নতুন টাউনশিপের কন্ট্রাক্টার আমার বাবা। সুবর্ণ লজ নাথিং। আমার মায়ের একটা শখ। অবশ্য সুদেববাবু আছে বলে এই জঙ্গলে ম্যাজিক করে ছেড়ে দিচ্ছে। সুদেববাবু! কাল সকালে লুচি, তরকারি, মিষ্টি। দুপুরে মাছ, ভাত, দই। রাতে মুরগির ঝোল আর ভাত। সকালে আমিতো আনছি টাটকা ফল, কাজু, আখরোট, মেওয়া। কলকাতা থেকে আনাচ্ছি। সম্মানিত অতিথিদের জন্যে...
মেকাপ—ম্যান বলে, ইরিগেশন বাংলো তো বিশাল!
—জয়পুর প্রপার্টি ছিল। জয়পুর স্টেটের ম্যানেজারের বাংলো ছিল।
—কোন জয়পুর?
—এখানকার জয়পুর।
—রাজাদের কিছু নেই?
—বাঁধের তলায়।
—ইন্টারেস্টিং।
সুদেব বলে, গল্প অনেক আছে। পরে শুনবেন।
নমিতা হঠাৎ বলে, খাওয়ার পরে সে সব গল্পই বলুন না।
ইন্দ্রবাবুও জানবেন।
ইন্দ্র মাথা নুইয়ে বলে, ইন্দ্রবাবু উচ্চমাধ্যমিকের পর কলকাতায় প্রেসিডেন্সিতে বিতাড়িত। তারপর বিজ্ঞাপন অপিসে যোগদান, তারপর বিবাহ, সংসার... রানীপুরেও তো থাকি নি। নরেন্দ্রপুরের ছাত্র।
সুদেব একটু মুগ্ধ হয়।
—আপনারা প্রেসিডেন্সির...?
—কলেজের নাম করি এমন রেজাল্ট করি নি। মালা অবশ্য ইকনমিক্স অনার্স ছেড়ে দিল। নইলে ও ভালো ছাত্রী ছিল। অত অ্যাডমায়ারার পিছনে ঘুরলে কি পড়াশোনা হয়? ফার্স্ট পার্টে হাইসেকেন্ড ক্লাশ পেল, কিচ্ছু পড়াশোনা করেনি। তারপর আমাদের টা টা করে চলে গেল অ্যামেচার থিয়েটারে।
—আর না, ইন্দ্র। আমার জীবনীটা তুই লিখিস।
—লেখার লোক অনেক আছে।
মালা আস্তে, একইসঙ্গে মুখে হাসি আর চোখে সামান্য জল নিয়ে বলে, আমি যে আবৃত্তি করতাম, কলেজ ম্যাগাজিনে লিখেছিলাম, পিকনিকে তোদের নেরুদা শুনিয়ে অবাক করে দিয়েছিলাম, ইনিসিয়েটিভ নিয়ে চাঁদা তুলে শ্রাবণী আর বিজুর বিয়ে দিয়েছিলাম, কি ভালো মাংস রাঁধতাম, এসব কথা তুই ছাড়া কেউ ভালো লিখতে পারবে না।
সবাই চুপ হয়ে যায়।
মালা বলে, আজ তাহলে গল্প হবে। আজ ক্যাসেট দেখব না।
দেবরূপরা খেতে বসে।
সব মিটতে মিটতে এগারোটা বাজে।
বিবি বলে, দাদা, তুমি আর আমরা দু'জন।
—খাবার কিছু বাঁচল কি?
—ভাতটা বেঁচেছে।
—সনাতনদা চলে গেছে?
—ওরা মিষ্টি ভাত খাবে না। জলধর আর অমরুও খাবে না। যা হয় হবে, খেতে এসো।
—তোমরাও শুয়ে পড়ো। যা ধকল গেল!
মোহর বলে, ধকল যাবে কাল। শুটিং দেখতে বাজার বসে যাবে এখানে। রাতে সব ঘুরে ঘুরে দেখা সুদেবের কাজ। করিডোর, দরজা, সব দেখতে গিয়ে ও চমকে ওঠে।
মালার মা'র বিষাক্ত গলা।
—দু'বার আমাকে ''বুড়ী'' বলেছ।
—বেশ! ''যুবতী'' বলব।
—বড্ড বাড়াবাড়ি করছ মালা। মনে রেখো, লাইনে তোমায় এনেছি আমি। আর এখনো তোমার ভালোমন্দ দেখে চলার দায়িত্ব আমার। কি করে ইন্দ্রের ছবিতে অত কম টাকায় সই করলে তা তুমিই জানো।
—জানি। সে আমি বুঝব।
—আর কতদিন ''নো—গুড'' গুলোকে ঠেলবে?
যতদিন পারি। আমিও তো ''নো—গুড''। আর তুমি? আদর্শ মা! বিশ বছর বয়স থেকে আমায় এর কাছে, তার কাছে ভিড়িয়ে দিয়ে—যথেষ্ট তো করে দিয়েছি। তোমাকে পুষছি, তোমার বয়ফ্রেন্ড সাহাকে... যাদবপুরের ফ্ল্যাটটা তোমার। তুমি ওকে বিয়ে করো না। কেন করছ না?
—তোমার ভালোর জন্যে।
—আমার ভালো আর হবে না। আমার ভাবনাটা আমাকে ভাবতে দাও। তোমার জন্যে...
ও, সেই ''নো গুড'' জার্নালিস্টটাকে বিয়ে করতে দিইনি বলে এত কথা বলছ?
—কিছু বলছি না। তুমি যেতে পারো।
সুদেব যেন গভীর লজ্জা পেয়ে নিঃশব্দে চলে আসে।
বাইরের ঘরে ধোঁয়ার স্পাইরাল।
ইন্দ্র বলে, বসুন।
—শুতে যাননি?
—যাব। শুনে ফেললেন মা—মেয়ে সংলাপ?
—আমি...আমি সব চেক করছিলাম।
—তবে তাই।
—লজের এবং গেস্টদের দায়িত্ব আমার।
—ওই সংলাপ সিনেমায় ব্যবহার করা যাবে না। ওই মহিলা মালার দখল ছাড়বেন না। মালা...খুবই দুর্ভাগা মেয়ে। তবে গ্রেট বিগ হার্ট। ওকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে...এই হয়। মালা এখন ওঁর ক্যাপিটাল। ক্যাপিটাল ভাঙাচ্ছেন
—দরজাটা খোলা কেন?
—নমিতা সিঁড়িতে বসে আছে।
নমিতা! শুতে যাও ভাই। সুদেববাবু, আর্ট ফিল্ম করলাম, ''প্ল্যাটফর্ম'', প্রশংসা পেলাম, চলল না। একেবারে বিদেশী ছবি মেরে করলাম ''হোটেল'', চলল।
এখন তো আরো বড় মেয়ে—কাঁদানী ছবি করছি। মেয়েরা কাঁদবে, বাচ্চুরা শিস দেবে, গান হিট হবে, তার নাম ছবি।
এ ছবিতেও দিসুম দিসুম পাঞ্চ থাকবে।
খাঁটি হুইস্কি সাধ্যে নেই। সবাই ককটেইল করছি। আচ্ছা, গুড নাইট।
এত রাতে নমিতা ভিজে চুল ছড়িয়ে নিশ্চল বসে আছে। আলো ওর মাথার ওপর।
—কাইন্ডলি শুতে যান।
—আপনি, এখানকার গল্প বললেন না?
—আজ থাক। ভেতরে আসুন।
দরজায় তালা মারব।
—ভয় আছে না কি?
—সাবধান তো হতে হবে। গেস্ট হাউস, গেস্ট থাকে, সাবধান হতেই হয়।
—চুরি ডাকাতি হলে?
—বটেশ্বর আউটপোস্ট আছে। সেটা তেমন কিছু নয়। তারপর রানীপুর থানা। সোনা বাঁধ থানা এ বছর শুরু হবে শুনছি।
—চোর ডাকাত এলে?
—এখনো আসেনি। এলে দেখা যাবে।
—দেবরূপ বলছিলেন, আপনি খুব...
—শুয়ে পড়ুন দয়া করে।
—হ্যাঁ..... যাই.....। রাতের মিউজিকটা অন্যরকম। পাতায় বাতাস বইছে, কি একটা পোকার ডানায় আওয়াজ ... আর গাছপালায় যে কি রকম একটা....
—শুয়ে পড়ুন। দরজা বন্ধ করবেন, বাথরুম দেখে নেবেন। প্রতি ঘরের সঙ্গে কলিংবেল আছে। জানালায় গ্রীল ও জাল আছে। মশারি ফেলতে ভুলবেন না। এ সব লেখাই আছে।
—মশা আছে?
—বাঁধের ধার... সাপ আসতে পারে....
আসেনি অবশ্য, এলেও তো কিছু করার নেই।
—হ্যাঁ ... গুড নাইট।
—গুড নাইট।
জলধর বলল, কাল আমরা শুটিং দেখব দাদা। গ্রাম থেকে সব আসবে। আমি বলে দিয়েছি।
—মস্ত কাজ করেছ। শুয়ে পড়ো।
—বুড়ি মেমটা এই কাগজ দিল।
''মালার জন্য :—সকাল ছ'টায় পাতিলেবু, গরমজল, মধু। সাড়ে সাতটায় টোস্ট...কমলার রস...''
—দেখা যাবে।
এত রাতে সুদেব স্নান করে। বাড়িতেও খবর চলে যাবে। এসব খবর বাতাসে ছড়ায়। মাদুলি, বউদি, টিয়া, আসতে চাইবে। না, এরকম পার্টি যদি ঘন ঘন জোটায় দেবরূপ, সুদেব তা সামলাতে অক্ষম।
সুদেব শুয়ে পড়ে।
* * * * *
সকালে শ্লোগান ছিল সোনাবাঁধ চলো।
দেবরূপ ও অমিতের পিছন পিছনই পুলিসের জীপ ও বড় গাড়ি।
ফরেস্টের অনেকটা ঘিরে দড়ির বাঁধ, পুলিস পাহারা। ফরেস্ট গার্ডরা নিরুপায়। জনগণকে রোখা আজকাল খুব মুশকিল। সবাই শুটিং দেখবে।
রূপক আজ সিনেমার শহর থেকে সিনেমার গ্রামে আসা প্রেমিক যুবক।
সিনেমায়, অতীব বাণিজ্যিক সিনেমায় শহর ও গ্রামের বিষয় একটা অঙ্ক আছে।
শহর থেকে যে যুবক আসবে, তার কাছে গ্রাম মানে আজও—
''ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।''
সে গ্রামের লোকেরা শহরের ছেলেটিকে দেখলেই হেদিয়ে মরে যায়। আর গ্রামে থাকতেই হবে এক যুবতী সুন্দরী মেয়ে, যার মা নেই, আছে এক স্নেহান্ধ বা সিনেমায় অন্ধ পিতা। সাধারণত এই পিতারা গায়ক বা বেয়ালাবাদক বা স্কুল—মাস্টার হয়ে থাকে, ভগবৎভক্ত তো হতেই হয়।
সিনেমার গ্রামে যুবক ও যুবতী গান গেয়ে দৌড়ায়, জড়াজড়ি করে, প্রেম করে।
সুদেবকে স্বপন বলল, এ গ্রাম কোথাকার?
—সিনেমার। পশ্চিমবঙ্গের নয়।
—তাই হবে। ঢুকুক কোনো শালা হাতিপোতা, বিটিছানা নিয়ে ছেনাল করুক, পঞ্চায়েত বেঁধে নিয়ে যাবে আর দে ধোলাই, দে বাঁধে ফেলে।
মালা রায় একটি ছাপা শাড়ি ও সবুজ জামা পরে আলুলায়িত চুলে রূপকের হাত ধরে, বনপথে দৌড়ে, গাছ ঘিরে ঘিরে ঘুরে, রূপকের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে, তারপর ওর হাত ধরে দুলে দুলে, যে গানটি আশা ভোঁসলের গলায় সুপারহিট হতে চলেছে তাতে লিপ দেয়।
দেবরূপ ফিসফিসিয়ে বলে, গান নেই শুধু লিপ, কিন্তু কি সুপার্ব।
রূপকও অনুরূপ ঠোঁট নাড়ে।
—কাট!
ইন্দ্র রূপককে একপাশে টেনে বলে, গানের কথাগুলো মনে আছে?
—নিশ্চয়।
—প্রেমের কথা। প্রতিশ্রুতির কথা।
মালার চোখ মুখ, প্রতিটি চাহনি কথা বলছে। রাইজ আপ টু হার।
—হ্যাঁ।
—মালা একটু কথা বলে নে।
মালা এখন প্রফেশনাল। সে মধুর হেসে বলে, যেহেতু আমরা এখানে অনাদি অনন্তকাল বসে থাকতে চাই না, সেহেতু ব্যাপারটা পরস্পর সহযোগিতা করে যত তাড়াতাড়ি মিটে যায় ততই ভালো, বুঝলে? কাম। ইন ক্যান ডু ইট!
—হ্যাঁ ম্যাডাম!
—মালা বলে। নো ম্যাডাম।
—থ্যাংকিউ।
—দেখ ভাই, নায়িকাপ্রধান ছবি। কিন্তু এ গানটাতে তোমার ম্যাক্সিমাম আন্তরিকতা থাকতে হবে। অর্থাৎ এ গানটা যে গাইছে, সে পার্বতীকে ঠকাতে পারে না। স্টোরিও তো বলছে, সন্দীপের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল বলেই সন্দীপ আসতে পারেনি।
—এবার ... ভুল হবে না।
—ইন্দ্র!
আবার শুরু হয় গান, ছোটাছুটি মালার আঁচল ওড়ে, চুল ওড়ে। দেখতে দেখতে সুদেব বোঝে, অভিনয় ব্যাপারটা আসলে যথেষ্ট পরিশ্রমের।
একটি দৃশ্যেই দুটো বাজে।
ইন্দ্র বলে, মালা! আজ কি আর?
—হবে কি? পার্বতী দাঁড়িয়ে আছে জলের ধারে, ভাবছে, ভাবছে। এই গানের কথা মনে পড়ল। ঘুরে ঘুরে দেখল। তারপর দৌড়তে দৌড়তে জলের ধারে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার মনে হয় না আজ হবে।
—ঠিক আছে।
—শোন, কুইক লাঞ্চ হয়ে যাক। আজ বরং মন্দিরটা দেখে আসা যাক। কাল সকালে শুটিং সেরে দুপুরের মধ্যে রওনা।
লজে ফেরার সময়ে পুলিসকে ভিড় ঠেলতে হয়। অবশেষে সুদেব মালাকে প্রায় আগলে ধরে দৌড়ে বের করে আনে।
গাড়িতে তুলেই বলে, চালান।
মালাকে বলে, কি কাণ্ড? এরকম হরদম হয়?
—তা হয়।
—আপনার ... লাগেনি তো?
—না না।
লজে ঢুকে যায় গাড়ি।
মালা অভিজ্ঞ চোখে আকাশ দেখে বলে, আকাশটা ঘোলাটে লাগছে। বৃষ্টি হলেই চিত্তির।
—না না, এখানে এখন বৃষ্টির সময় নয়।
ঝড় হতে পারে। জল হলেও সামান্য।
এটা খরাপ্রবণ এলাকা বলেই তো ওই বাঁধ।
—কাল দেখব।
মালা ঘরে চলে যায়।
আমিত সত্যিই প্রচুর ফল এনেছে।
এগুলো ফ্রিজে তোলাতে হবে। মোহর এসে বলে, বড়বাবু এসেছেন।
—কোথায়?
—শুটিং দেখছেন।
অপরূপবাবু আর সুবর্ণও আসেন।
—সুদেব! যত্নআত্তি কোর। কি করে কি করছ, তা তো জানি না। ইন্দ্রবাবু!
—আমাকে ইন্দ্র বলবেন।
—বিলক্ষণ! আমাদের অপুবাবুর ছেলে!
তা, তোমার বাবা মা সবাই কলকাতায়?
—হ্যাঁ, সল্টলেকে বাড়ি করল বড়দা।
—বেশ বেশ। তোমাদের অসুবিধে হচ্ছে....
—সুদেববাবু থাকতে?
—আমার গিন্নি একটু ওনার সঙ্গে আলাপ করবেন।
—স্নান করতে গেছে বোধহয়।
সুদেব আস্তে বলে, আপনারাও খেয়ে যান না কেন বড়বাবু? মাছ ভাত তো রান্না।
সুবর্ণ বলে, না ছেলে? আমার সোমবার। আর উনি মন্ত্র নেবার পর বাইরে ভাত খান না।
অপরূপবাবু সুদেবকে ওর ঘরে ডাকেন।
—সব এই দেবার কীর্তি! টাউনে সবাই বলছে সিনেমা পার্টি টাকা মেরে পালায়।
তুমি কিন্তু....
—দেবুবাবু কিছু বললে আমি কি করে....
—সে জন্যেই এসেছি। দেবার হাতে থেকে তো লজ লাটে উঠেছিল। তুমি এসে থেকে রিটার্ন পাচ্ছি। তুমি এলে কেন?
সুবর্ণ বলল, ও তো বলবে না। আমিই মনে করাতে এলাম। যেমন দেখে রাখছে, কাজের লোকজন যেমন সন্তুষ্ট আছে, এবারে ওর মাইনে দু'শো বাড়াও।
কথাই ছিল।
নিশ্চয় নিশ্চয়। তুমি যখন বলছ...
সুদেব বলে, পুজোর সময়ে স্টাফকে যদি একশোটা টাকা দেন, দেখেশুনে ওরাই রাখে।
—সে দেখব। তুমি কিন্তু হিসেবটা দেখে নিও।
—দেব।
—ক্লাব বলছিল, সংবর্ধনা দেবে। আমি বললাম, সেসব টাইম ওদের হবে না।
রানীপুরে যে কি গুলতানি হচ্ছে।
—এঁরা বেশ ভদ্র, ভালো।
—হতেই হবে। সবাই ভালো। শুধু দেবাটা....
অপরূপবাবুর এটা দুর্ভাগ্য। মেয়েগুলি সৎ পাত্রে বিয়ে দিয়েছেন। একতম পুত্রটি মানুষ হয়নি। তার একুশ বছর বয়সে যে সতেরো বছরের মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন, রানীপুর—চমকানো বৌভাত করেছিলেন, সে মেয়েটি দেবরূপের ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে বাপের বাড়ি বসে আছে।
বসে থাকার জোর তার আছে। সেও বাপের একমাত্র সন্তান। দুর্ব্যবহার বা অবহেলা উপেক্ষা সইতে রাজী নয়। তার বাবা বলেছেন, দেবযানী বণিকের কেস হতে দেখেছি। রানীপুরে বছরে কয়েকটা কেস হয়। মেয়েকে আমি পাঠাব না।
জামাই শোধরাক, তারপর ভাবব। নইলে ডাইভোর্স করাব।
ভদ্রলোক মানবেন না ডাইভোর্স খুব বড় কলঙ্কজনক। তাঁর কথা, মেয়ে মরে যাবে তার চেয়ে ডাইভোর্স শ্রেয়।
সুবর্ণ খুব অবিচলিত। দেবরূপের তিরিশ বছর বয়স অবধি কুসময় যাবে।
সে কথা না মেনে বিয়ে দেবার অপরাধ ছেলের বাবার। ছেলের বয়স তিরিশ হোক, সব ঠিক হয়ে যাবে।
সুবর্ণ বলে, চলো গো, ঝড় উঠবে।
খাওয়াদাওয়া মিটতে চারটে হয়।
মালা বলে, রাতে মাছ খাব।
তার লাঞ্চ কমলালেবু, আপেল, শসা, ঘোল।
অন্যরা মাছ খেয়ে ধন্য ধন্য করে।
দেবরূপ ইন্দ্রকে বলে, রাতে আসবেন?
—ওখানেই ''নো গুড' হয়ে গেছি। মদ খাই না, বউয়ের বারণ।
—মদ খান না, সিনেমা করেন?
—বলেন কেন। ওরা খায়, খাওয়াবেন।
রবীনবাবুকে সামলে রাখবেন।
রবীনবাবুকে খাওয়ার পর ডাকে ইন্দ্র।
রবীনবাবু সুদেবকে টাকা দেয়। বলে, রসিদ কাল দেবেন। ফাইনাল পেমেন্ট, পাকা রসিদ। ইন্দ্র! ওখানে ওরা গেলাস—টেলাস ভেঙে কাল....
—বিল নেবেন, হিসেব দেবেন।
না, আজও নমিতাকে তেমন দেখে না সুদেব। কিছুক্ষর বাদে ঝড় ওঠে।
ধুলোর ঝড় থামতে না থামতে কয়েক পশলা বৃষ্টি।
সনাতন বলে, ভালো, ভালো। এখন ঝড় জল হলে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠেও হবে। একটা বর্ষা ভালো পাই তো ধান তুলে নিব।
সনাতন জল—ভেজা মাটির গন্ধ শোঁকে।
বলে, না, মেঘ দৌড়ায়। ওই যা ধুলাটা মরবে।
পরদিন সকাল ছিল ঝকঝকে। গাছপালা বৃষ্টি ধোয়া। কে জানত এমন বিপদ ঘটে যাবে।
মালা আর নমিতার পরনে একই রকম ডুরে শাড়ি, একরকম জামা। সন্দীপের জন্যে অপেক্ষা করে করে হতাশ, ভগ্নহৃদয় পার্বতী ''মা গো''! বলে দৌড়ে গিয়ে জলে ঝাঁপ দেবে।
মালা দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে, দেখা যাচ্ছে ওকে।
নমিতা দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে, নমিতার পেছনটা দেখা যাচ্ছে, নমিতার ওপর ক্যামেরা।
নমিতা ঝাঁপ দিল।
জলে তলিয়ে যাবার শট খুব ফেথফুল।
কিন্তু তারপর?
নমিতা তো ওঠে না। ওর হাতটা উঠল একবার।
ঝপাঝপ জলে ঝাঁপ মারছে লোক।
সুদেব ঝাঁপ দিল। ডুবসাঁতারে ধরল মেয়েটাকে।
এক হাতে ঠেলে ঠেলে ওপরে তোলো, সুদেব বিপন্ন। নমিতার হাত ওর গলা জড়াচ্ছে।
সাঁতার কেটে কাছে এল কয়েকজন। তারপর পাড়ে তুলতে বোঝা গেল কাপড়ের আঁচল খুলে দু'পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল। তারপর অচৈতন্য নমিতাকে কাঁধে ফেলে পাক খাইয়ে জল বের করা। পেটে চাপ দাও, উপুড় করো।
—হাসপাতাল! হাসপাতাল!
—লাগবে না। জল বেরিয়ে গেছে।
—কিসের লাগবে না?
মারুতি ভ্যানে বটেশ্বর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ততক্ষণে নমিতা চোখ খুলেছে। ডাক্তার বললেন, সরে যান আপনারা। ইন্দ্র, মালা, রূপক, সবাই তটস্থ। কিছুক্ষণ বাদে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।
—ঘণ্টাখানেক বাদে নিয়ে যান!
—বাঁচবে?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভয় পেয়েছিলেন খুব।
শকেই তো.... বাঁধে আনাড়ি লোক নামে?
—সাঁতার জানে বলল!
—সামান্য সাঁতার জ্ঞান নিয়ে ও বাঁধে কেউ নামে না।
—সিনেমার শুটিং হচ্ছিল...
—খুব বিপজ্জনক কাজ করেছেন।
ইন্দ্র বলে, সুদেববাবু! আপনাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা আমি জানি না। মালা, নমিতার কাছে যা। বেণু! মালা আর নমিতার একটা স্টীল!
দেবরূপ মরিয়া হয়ে বলে, আমিও দাঁড়াব?
—দাঁড়ান।
সুদেব স্তম্ভিত। এমন ঘটনা নিয়েও বিজ্ঞাপন?
ইন্দ্র বলে, যাক! শটটা উৎরে গেছে। নাহলে যে কি হোত! নমিতাকে দিয়ে তো আর হোত না।
সুদেব বলে, উনি বেঁচেছেন এটাই বড় কথা।
—হ্যাঁ হ্যাঁ... ওর কিছু হলে... ও বাবা, সে খুব অপয়া হোত। আর না, কালই প্যাক আপ।
মালা বলে, আজই নয় কেন?
—নমিতা আছে না?
—রবীনবাবু ওকে নিয়ে কাল আসুন। আমি চলে যাব ইন্দ্র। খুব বিশ্রী লাগছে। কেমন যেন...
নমিতাকে নিয়েই ওরা ফেরে।
তারপর, এখন রওনা হয়ে রাত করে পৌঁছনোর চেয়ে কাল ভোরে যাওয়াই সাব্যস্ত হয়।
আজকের ঘটনায় একেকজন একেকভাবে নাড়া খেয়েছে।
লজে পৌঁছবার পর সনাতনের বউ গৌরী ও বিবি নমিতাকে ধরাধরি করে নিয়ে যায় ঘরে। হাসপাতালের সাদা চাদর জড়ানো, তা খুলে কাপড় পরায় চুল মোছায়।
ভেজা জামাকাপড় ধুয়ে মেলে দেয়।
সুদেব বলে, ওনাকে আগে আদা—চা করে দাও। তারপর গরম দুধ খেতে দাও।
—তুমি জামাকাপড় ছাড়ো।
—হ্যাঁ, আমিও একটু চা খাব।
ইন্দ্র বলে, আমরাও।
ইন্দ্র যে বলেছে, ''যাক, শটটা উৎরে গেছে।' এ কথাটাই সুদেবের কানে লেগে থাকে।
নমিতা মরে গেলেও শট উৎরে যেত। ওর কাজ তো ছিল ঝাঁপ দেওয়া, ও দিয়েছিল।
রবীনবাবু ওর ঘরে ঢোকে।
—আপনাকে আমার বিশেষ ধন্যবাদ।
—থাক ওসব কথা।
—আমিই ওকে জোগাড় করি।
—সাঁতার জানেন না জেনেও?
—বলেছিল, জানে। এই হলো এসব মেয়েদের বোকামি। বলে দে, জানি না। টাকার নাম শুনলে...
—টাকা ছাড়া কে কাজ করে? যাক গে। আজ দুবেলা ফুড, ব্রেকফার্স্ট, একদিনের অনসূয়াদেবীর লন্ড্রী চার্জ, সার্ভিস চার্জ, সব আমি বিল করে ফেলছি। কাল সকালে আপনারা কি খেয়ে যাবেন, জানাবেন, তার চার্জও বিল করব।
—করবেন, করবেন... সার্ভিস চার্জ?
—আপনাদের জন্যে তো স্পেশাল কুক আনা হোল।
—নেবেন। শুনুন, বিলটা বাড়িয়ে ধরবেন, যেন খরচে আর বিলে হাজার টাকা ফারাক থাকে। ডিফারেন্সটা আমার আপনার।
—বিল তো একটাই হবে।
—দুটো করবেন, কি আছে?
—আপনার কত, আর আমার কত?
ধরুন পাঁচশো—পাঁচশো।
—বলছেন ভালো।
—এসব করতেই হয়। আপনার—আমার সামান্য থাকল। আমি অন্যদেরও এজায়গা রেকমেন্ড করব।
—আমাকে দিয়ে তো তা হবে না।
—কার জন্যে সততা দেখাচ্ছেন? ওই দেবুবাবুর জন্যে?
—নিজের জন্যে, নিজের জন্যে। আপনি যান রবীনবাবু। আমার ঘরে ভিড় বাড়াবেন না।
অতঃপর দেবরূপ।
—লাঞ্চে ওদের কি দেবেন?
—কালই তো ঠিক ছিল মাটন হবে।
—রাতে চিকেন?
—হ্যাঁ। পরোটা—কারি। দেবুবাবু।
—বলুন, বলুন।
—রসুলের টাকাটা সার্ভিস চার্জে ধরে নেব?
—না। ওটা আমিই দিয়ে দেব। ভেরি ব্যাড, আজ এরকম একটা কাণ্ড হোল। এটা যদি মালা রায়ের হোত?
উনি তো ঝাঁপ দিতেন না। দুর্ঘটনা হলে ওঁর ডবলেরই হোত। তাতে সন্দেহ নেই।
—আপনি খুব সার্ভিস দিয়েছেন।
—এ জায়গায় জলে ঝাঁপ না দেওয়াই ভালো। বাঁধ কোথায় যে কত গভীর কেউ জানে না।
—হ্যাঁ, সব যেন সেঁতিয়ে গেল। আচ্ছা, নমিতা নর্মাল ডায়েট খাবে তো?
—ডাক্তার তো তাই বললেন।
দেবরূপ চলে গেল।
গৌরী এসে বলল, তোমায় ডাকছে।
—কে?
—মেয়েটা।
সুদেব নমিতার ঘরে ঢুকল।
—কিছু বলছিলেন?
—হ্যাঁ, ওরা তো আসছে না। শুটিংটা হয়েছে?
—শুনলাম তো হয়েছে।
—যাক। ওরা কি চলে গেছে?
—না, আপনারা কাল যাছেন।
—ভালো।
—এখন কেমন লাগছে?
—ভালো।
—সাঁতার জানেন কি?
—সামান্য।
—ওই বাঁধে ঝাঁপ দিলেন?
—হ্যাঁ সুদেববাবু।... সাঁতার কম জানলেও টাকার জন্য... ইন্দ্রবাবু বলেছিল রেসকিউ পার্টি থাকবে...
—ছিল তো। নইলে তুলল কারা?
—আপনি আগে ধরেন। শুনেছি।
—বহুকাল অপরের জীবন ও সম্পত্তি বাঁচাবার ভূমিকায় অভিনয় করছি তো। ঘুমোন। খাবেন পেট ভরে। কাল চাঙ্গা হয়ে চলে যাবেন।
—হ্যাঁ... গৌরীদি আমার কাছে একটু থাকবে আজ রাতটা? অসুবিধে হবে?
—না, ওকে বলব। ও তো কাজ করে, আসতে দেরি হবে ওর, আসবে। ভাববেন না। ঠিক হয়ে গেছেন, ঠিক হয়ে যাবেন।
—হ্যাঁ, ঠিক তো হতেই হবে। আচ্ছা... নমিতা চোখ বোজে। ওর লম্বা চুল মেঝে অবধি। কপালটি সুন্দর। চেহারায় কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। নেহাত অভাবী না হলে কেউ এ কাজে আসে? দিন কেটে যায়। রাত কেটে যায়। সকালে ওরা রওনা হয়ে যায়। ইন্দ্র ভূয়সী প্রশংসা করে যায় সুদেবের। বলে যায়, এবারে হরদম শুটিং হবে, দেখবেন।
—জলে ঝাঁপটা বাদ দিয়ে।
যাবার সময়ে নমিতা সুদেবকে বলে, গৌরীদি বলল, আপনার গ্রাম বাঁধবেড়া আর ওদের গ্রাম হাতিপোতা।
—তাই তো।
—কিছুই দেখা হোল না। নমস্কার।
—নমস্কার।
সবাই চলে গেলে মোহর বলে, আজ কি ছুটি?
—এখন তো সব ঝটাপট সাফসুতরো করতে হবে। কে কখন এসে পড়ে কে জানে।
—কালকের মাংস বেঁচেছে অনেক।
—মেশিনে থাকুক। বিকেল অবধি গেস্ট না এলে আমরাই খেয়ে নেব। স্বপন একটা প্লাস্টিকের বালতি এনে হাজির করে।
—মালা রায়ের সাবান, রুমাল, কাপড়ের চটি, ওর মায়ের আয়না, ডিরেক্টরের মোজা, সব ফেলে গেছে দাদা।
—নিয়ে যা।
—কি সাবান!
গৌরী একটি নাইলেন শাড়ি আনে।
—মেয়েটা আমাকে দিল। জলধর, স্বপন, অমরু ও মোহর আর বিবিকে পাঁচটা করে টাকা দিয়ে গেল আমার কাছে। মনটা খুব ভালো গো।
বিবি বলে, জীবনটা চলে যেত।
সুদেব বলে, আর না। ঝটপট কাজে লাগো।
অমরু খুব অসন্তুষ্ট। ওরা অমরুর সযত্নে সংগৃহীত, সযত্নে লালিত ভুঁইচাঁপার গাছগুলি মাড়িয়ে দিয়েছে। ''দুবার বিয়ে'' ছবি কেন যেন লেগে যায়, কৃতজ্ঞতা স্বীকারে সুবর্ণ লজ ও দেবরূপ বটব্যালের নাম থাকে। সুবর্ণ লজের সবাই ছবিটি দেখে আসে। রানীপুরের দর্শক ছবিটি নেয়। সোনা বাঁধ ও সুবর্ণ লজ খ্যাতি পায়। টাইটেলে নমিতার নাম থাকে না। মালার স্বাক্ষরিত একটি ছবি সুবর্ণ লজে বসার ঘরে দেয়ালে ঝোলে।
অমরু খড়গপুর ওয়ার্কশপে ডি—গ্রুপে কাজ পেয়ে চলে যায়। তার জায়গায় তার সুপারিশে গোপাল চলে আসে। ফরেস্টে ক্যাজুয়াল কাজ করছিল, এটা বাঁধা মাইনের কাজ।
অমরুর দৃষ্টান্তে জলধর পড়তে শুরু করে নিজে থেকেই। সুদেবও বলে, পড় আমার কাছে। নয় বাঁধবেড়া স্কুলে ভর্তি হবি। চাকরি যদি পাস বেঁচে যাবি। সুবর্ণ লজে কেয়ারটেকারের জীবন চলে, চলতে থাকে।
ইতিমধ্যে সোনা বাঁধ থানার কাজ শুরু হয়, এবং বটেশ্বরে উদ্বোধিত হয় এক গ্রন্থাগার। বাঁধে নমিতার আরেকবার পড়ে যাবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। কেন না জায়গাটির পর্যটক আকর্ষণ যেমন বাড়ে, পর্যটন বিভাগ বাঁধের গা দিয়ে রেলিং লাগায়, বেঞ্চ বসায় এবং নোটিস টাঙায় ''বাঁধে নামা বিপজ্জনক''।
এর মধ্যে কত পর্যটক আসেন ও যান তার ঠিক নেই। সুবর্ণ থাকার জন্যে যে কটেজটি, সেটি এখন হাওয়াবদলেচ্ছুক পারিবারিক কটেজ হয়ে যায়। সঙ্গে রান্নাঘর আছে। বাঁধ ও অরণ্যের বাতাস খাও, বেড়াও, থাকো।
অপরূপবাবু বলে যায়, মিডিল ক্লাস মানুষ মোটামুটি খরচায় থাকবে এমন জায়গা কোথায় পাচ্ছে? আমাদের বাবারা দেওঘর, কার্মাটার, মধুপুর, শিমুলতলা যেত। তা এখানে লালমাটি, ছোট পাহাড়, শালগাছ, সাঁওতাল গ্রাম, কি নেই?
প্রখ্যাত লেখক নীলেন্দু সেনরায় ওই কটেজে থেকে তাঁর পূজার উপন্যাস লিখে ফেলেন। বাঁধের ধারে বেড়িয়ে অসীম আনন্দ পান ও জলধর মহোৎসাহে ওঁকে ''করম পূজা'' দেখিয়ে মুগ্ধ করে দেয়। ভিজিটরের খাতায় উনি লিখে দেন—
''বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি, সোনা বাঁধ ও সুবর্ণ লজ সেই কথাটাই জানিয়ে দিল। এ পৃথিবী জানি নাই আগে।''
রানীপুরে সুবর্ণ লজ বুকিং আপিস খোলা হয় অপরূপ বটব্যালের বাড়িতে। সেখান থেকে মিনি বাসে যাত্রী চলে আসে এখন। বাঁধবেড়ার উত্তরে কয়লার খনি আবিষ্কার একটা নতুন খবর হয়। যদিও পঞ্চাশ সালে ভারুচা কোম্পানী ওখানে কয়লা তোলার চেষ্টা করেছিল, রেল যোগাযোগ না থাকায় তারা কাজ ছেড়ে দিয়েছিল।
অপরূপবাবুর ভাই স্বরূপ বলে, রেল তো এখনো নেই। স্যাংশান লাইন, জয়পুর থেকে মালঞ্চ করে দাও, জেলার ম্যাপ পালটে যাবে। রেল হচ্ছে না, সেটা কেন্দ্র বিরূপ বলেই তো। এরই মধ্যে সুবর্ণ লজে কলকাতার বড় ব্যবসায়ী আয়রন অ্যানড স্টীল এজেন্ট মণিময় রায়ের চিঠি নিয়ে অপরূপবাবু স্বয়ং আসেন।
—কাণ্ড দেখ। লোকটার শরীর খারাপ। ডাক্তার বলেছে বিশ্রাম নিতে। নার্স নিয়ে, ডাক্তার নিয়ে, অ্যাটেনডেন্ট নিয়ে এখানে আসছেন। ড্রাইভারকে নিয়ে পাঁচজন।
—লজে, না কটেজে?
—ডাক্তার, ড্রাইভার, লজ দিয়ে দাও। ওনারা, কটেজে থাকবেন। কে যেন বলেছে, সোনা বাঁধ শান্তির জায়গা। লোকটা ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ছেলেরা সব দেখছে। শরীর খারাপ, মানে বড়লোকের শরীর খারাপ....
—ডাক্তারতো আনছেন।
—হ্যাঁ, চলাফেরা রাজার মতো বলতে হবে। ব্যবসা আমিও করি। দেহগতি খারাপও হয়। তা বলে নার্স রে, ডাক্তার রে..... কটেজটা সাজিয়ে গুছিয়ে দিতে হয়।
—সবই তো আছে।
নীলেন্দু সেন রায়ের প্রস্তাব মতো কলকাতা থেকে কিছু যামিনী রায়ের প্রিন্ট এনে টাঙানো হয়েছে। অপরূপবাবু প্রথমে ছবি পছন্দ করেনি। কিন্তু শিল্পী বাঁকুড়ারই লোক, এ কথা জেনে মেনে নিয়েছে।
—ওঁরা আসবেন কবে?
—ওনারা জানাবেন, আমিও জানাব।
—লজ তো ভালো চলছে।
—তোমার হাত যশ!
—তা নয়। আপনি এভাবে টাকা না খাটালে.... আসলে বাগান বেড়ে গেছে। গোপালের আইডিয়াও যথেষ্ট। একজন দারোয়ান এবার দরকার। একেক সময়ে গোপাল দুটো সামলাতে পারে না।
—দেখি, ভেবে দেখি।
—লজের সম্পত্তিও তো বাড়ছে। এত পাখা, আলো, ভি. সি. আর., টি. ভি., বাসনকোসন, ফ্রিজ দুটো এখন। কটেজটা একপাশে। সেটারও সেফটি দরকার। সোনা বাঁধে লোকজন যাতায়াত বাড়ছে। চুরি, ডাকাতি রাহাজানি, সবই বাড়ছে। সেদিন বটেশ্বর গ্রামীণ ব্যাঙ্কে ডাকাতি হয়ে গেল। আমার কাছে ক্যাশও থাকে।
—দেখ, গিন্নিকে সব না বলে কাজ করব না। ওনাকে না বলে ছেলের বিয়ে দিলাম, সেই আমার সর্বনাশ হোল। তোর বউ বি. এ. পাশ করে ফেলল, তুই সেই.... এখন তো কলকাতায় ঘন ঘন যাচ্ছে। কার হাতে এসব রেখে যাব বল তো?
সুদেব হাসে।
—ভাববেন না।
—সুবর্ণও তাই বলে। বেটা কলকাতা যায়, একবার বোনগুলোর বাড়ি যায় না। তোমাকে সব বলে ফেলি। যাহোক, কাল সকালে আমি আসব, জনা চারেক বিজনেসের লোক। ওরা বিয়ার খাবে, দুপুরে মাংস ভাত, বিকেলে যাবে।
—আপনি কি খাবেন?
—ফল, ছানা, মিষ্টি, সে নিয়ে আসবে।
অপরূপবাবুর ব্যবসায়িক কথাবার্তা সুবর্ণ লজেই হয়ে থাকে। দেবরূপের বন্ধু—বান্ধবদের আড্ডাও।
—দেবা সেবারে কি বিল দেয়নি?
—ওঁর তিনবারের বিল হয়ে গেল।
অপুরূপবাবুর গলা পাল্টে যায়।
—এবারে আমি দিয়ে দিচ্ছি, পরে তুমিই বলবে। ওর দোকানে পাঠাওনি কেন?
—অন্যকে দিয়ে পাঠালে ওঁকে অসম্মান করা হয়। আমি নিজে বার কয়েক গেছি...
—বলতে পারো, আমার নিষেধ বাকি রাখা।
—আমি বললে উনি অসন্তুষ্ট হন।
—না, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সব ও উড়িয়ে দেবে। বউমাকে বুঝিয়ে পটিয়ে নিয়ে আসত যদি! ঘরে মন টেকে না। বয়স তো হোল। আর এগারোটা মাস কাটলে স্বস্তেন করে বউ আনাব। এতদিন ছাড়াছাড়ি, তারা অবশ্য আদালতে যায়নি। যদি সব ভালো হয়, শ্বশুর যদি ওকে জব্দ করতে পারে, স্বরূপ, মদন, আমার ভাইগুলোর ছেলেরা দেখ কেমন সুপথে চলছে।
সুদেব কিছু বলল না।
স্বরূপ আর মদনমোহন তো গ্রাম ছাড়েনি। সম্পন্ন চাষী, জোতদারই বলা চলে। মদনবাবুর আবার তেজারতি কারবার। ওদের ছেলেরা বাঁকুড়া কলেজে পড়েই দুজন ব্যাঙ্কে ঢুকেছে, একজন কলকাতায় ইনকামট্যাক্স প্র্যাকটিস করছে, এক ছেলের সারের ব্যবসা।
অপরূপবাবু গ্রামেও থাকেনি। ছেলেকে অত্যধিক প্রশ্রয় দিয়েছে। রাত—দিন শুনিয়েছে, মেয়েরা পরের ঘরে যাবে, এ সব তোমার।
দেবরূপের বিয়েও হল কলকাতায়। রানীপুরে তার মন বসে না। বাঁধবেড়ায় যায় না কত বছর। অপরূপবাবু তবু বাড়ির পুজোয় যায়। একেক বার একেক ভাইয়ের পালা পড়ে।
পরদিন অপরূপবাবুর বিশেষ অতিথিরা ঘুরে গেল। কটেজে এক অধ্যাপক সস্ত্রীক ছিলেন, তিনিও চলে গেলেন। বুকিং এখন রানীপুর থেকেই হয়। আজ কোনো বুকিং নেই। তবে সেচবাংলোয় সরকারী মিটিং চলছে, খাবারের অর্ডার আছে। এখন সেচ—ফরেস্ট বাংলোর খাবারের অর্ডার সুবর্ণ লজে খুব আসে।
সন্ধ্যায় ভূদেব এসে হাজির।
—সুদেব! তোকে খবর নিতে হবে।
—কি হোল? সেদিনই দিনে দিনে ঘুরে এলাম...
—আজই তো শুনলাম। স্বরূপবাবু বলল...
—কি বলল?
ভূদেবের চোখে জল।
—মাদুলির বর পরিমল নাকি বিয়ে করছে আবার। বটেশ্বরের যতীন সিংগির মেয়েকে। পাঁচ হাজার টাকা নগদ, ঘড়ি—আংটি সাইকেল—রেডিও মেয়েকে তিন ভরি সোনা...
—বটে!
সুদেবের মাথায় আগুন জ্বলে গেল।
—তুমি যাও বাড়ি। আমি দেখছি। কবে বিয়ে?
—সামনের মাসে...
—করাচ্ছি বিয়ে। মাদুলি কি কাঁদছে খুব?
—না। ভোমা মেরে বসে আছে।
—ওর ওপর নজর রাখো। বলো গে, ছোড়দা আছে, ভরসা রাখে যেন। ওঃ, এমন কাজের সময়টা এখন...যাক গে, কাজ তো বারমাসের দেখছি, দেখছি আমি। বটেশ্বরে বাড়ি তোর, চাকরি করে দিই আমরা ধরে করে...খুব বেড়েছে!
—কি হবে?
—পরিমল শিক্ষা পাবে। মাদুলিকে দিয়ে মামলা করাব। পঞ্চায়েত ডাকা করাব। আজ বিয়ে কাল ছাড়লাম, সুদেবের বোনকে নিয়ে সে করতে দেব না।
—মারদাঙ্গা করিস না।
—না না, তুমিও যাও। অন্ধকারে যাবে। জলধরকে নিয়ে যাও। ও সকালে চলে আসবে।
ভূদেব চলে যায়।
সুদেব বলে, স্বপ্ন! জেনে আয় তো, ইরিগেশন বাংলো থেকে কোন গাড়ি রানীপুরে যাবে কি না কাল ভোরে। বটেশ্বর যাব।
—বটেশ্বর যাবে দাদা, সাইকেলে যাও।
—ইরিগেশনে বি. ডি. ও এসেছে?
—না না, দেখলাম না তো।
রাত কাটে অস্বস্তিতে। পরিমলের সঙ্গে কাটান ছেঁড়ান করানো যায়, বোনের আরেকটা বিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু মাদুলির মনে কোনো জোর নেই। সুদেব অনেক বলে দেখেছে।
ভোরবেলা সুদেবকে দেখবে বলে পরিমল ভাবেনি। সুদেবকে দেখেই ঘরে ঢুকে পড়ে। সুদেবও ঢোকে।
পরিমলকে ঝুলিয়ে তুলে আনে বাইরে। পরিমল যদিও নিজেই বিয়ে ঠিক করেছে, এ সময়ে মাতৃভক্ত ছেলের মতো মাকে ডাকতে থাকে।
পরিমলের মা হামলে আছড়ে পড়ে।
—মেরো না, মেরো না সুদেব, পায়ে ধরি...
—বিয়ে দিচ্ছ ছেলের?
—সবে কথা হচ্ছে গো...ঠিক হয়নি।
পরিমলকে মারতে থাকে সুদেব।
—ভেবেছিস সুদেব রায় মরে গেছে? ভেবেছিস সুদেব রায় বাবু হয়ে গেছে? চাকরির পরোয়া করে? তোকে মেরে ফেলে ফাঁসি যেতে হয় যেতে পারি, জানিস?
ছেড়ে দিতে পরিমল ঘুরে পড়ে।
—এ যে রক্ত গো!
—জল ঢালো, আবার মারব।
পরিমল হাতজোড় করে।
—চল যতীন সিংগির বাড়ি।
—না দাদা! না!
—তোকে খুন করাই উচিত। পরশু এই বউকেও ছাড়বি, আবার বিয়ে করবি। ব্লকে পিওনের কাজ করে দিয়ে এই পরিণাম হোল? চল ওঠ। দরজার ভিড় সরে যায়। সুদেবের চণ্ডাল মূর্তি দেখে পরিমলের জ্ঞাতিরাও এগোয় না। ব্লকে চাকরি পেয়েছে বলে ওদের হিংসেও আছে।
যতীন সিংগি বটেশ্বরের সার—বীজ দোকানী।
সুদেব ওকে ডাকতে থাকে।
—আমাকে চেনো? দেখেছ?
—এ কি কথা সুদেব, কতবার দেখছি...
—এর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ? দেখ সিংগি, এ আমার নির্দোষী বোনকে নেয় না, চাকরি আমরা করে দিয়েছি, তারপর সাইকেল চাই বলে...সাইকেল চাই!
পরিমলকে ঝাঁকায় ও।
—হাতে আমার অনেক পথ আছে। পঞ্চায়েতে তুলব ওকে, কোর্টে যাব, পথ আছে। কিন্তু আমি তো সুদেব রায়। আমি ওকে কেটে ফেলব, তোমারও দোকানদারী ঘুচিয়ে দেব। পাপ নিকেশ করে ফাঁসি যেতে হলে যাব, জানলে?
যতীন সিংগি বলে, তবে যে শুনলাম কাটাছেঁড়া হয়ে গেছে? বিয়ে হতে পারে?
—কে বলল?
—পরিমল বলল।
—আমি বলি নি...
—তবে আমি জানলাম কোত্থেকে?
চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে সুদেব বলে, আমার বোনকে লাথ মেরে যে টোপর পরে, তার মাথা আমি ফেলে দেই। আজ এটা প্রথম দিন। এবার ওর অপিসে যাব, পঞ্চায়েতে তুলব ওকে, তারপর আদালতে তুলব, সাসপেন্ড করাব, মনে থাকে। তবে হ্যাঁ, যদি মিউচুয়াল করতে চায় সে অন্য কথা। সাতদিন সময় দিলাম, পরিমল ভেবে দেখুক। তিন দিনের পর, আমার যা মেজাজের হাল, ওকে আদালতেই তুলি, না ওর নামটাই তুলে দিই, সে আমার বিবেচনা।
পরিমল বসে থাকে। কান ছিঁড়েছে, গাল ফেটেছে, কাঁধের হাড়েও চোট।
—দেহেতো এতগুলো ঘা! যা! সাহস থাকে থানায় যা! নালিশ কর আমার নামে। কুত্তা কোথাকার। সিংগি বা বিয়ে দিচ্ছ, এ বিয়ে আইনী নয়। বউ থাকতে আবার বিয়ে! পরের বউটা রক্ষিতা! বুঝেছ? আইনে তাই বলে। দাও বিয়ে, কেমন সাহস দেখি!
পরিমলের মা বলে, তোমরা সব বোবা মেরে রইলে?
বটেশ্বরের প্রধান পূজারী বলে, ফ্যামিলি ব্যাপারে আমরা কি বলব? ছেলে সরকারী চাকরি করে, আদালতে মেয়ে কাটাছেঁড়া করো, সে বউকে খোরপোষ দাও, বিয়ে করো।
—আর বিয়ে! ছেলের যে দুর্গতি হোল...
সুদেব বলে, হয়নি হবে। আবার ডেকে হেঁকে বলে যাচ্ছি, দরকারে বোনকে বিধবা করব, ফাঁসি যাব।
সুদেবের মনে ভয় নেই।
সুদেব চলে আসে। আসার সময় আউটপোস্টে বলে আসে, আমার বোনকে ত্যাগ দেয়নি, আরেকটা বিয়ে করছে, শিক্ষা কিছু দিয়ে গেলাম।
বাঁধবেড়াতে গিয়েও ও সব বলে আসে।
ভবনীবাবুকে বলে, আপনি অঞ্চলপ্রধান। ওকে ডাকা করান। ও বলুক আমার বোনের কি দোষ। বোনকে ত্যাগ দিক, খোরপোষ দিক, তবে আবার বিয়ে করুক।
—দেখছি, দেখছি। তবে মারধোরটা না করলেই...
—করতে হয় দাদা। সেদিনে এই সুদেব মেরেছিল। মার খেয়েছিল বলেই আপনি বউ—বেটা নিয়ে বেঁচে ফিরলেন।
—হ্যাঁ হ্যাঁ, সে কথা ভুলিনি।
—বলে গেলাম। বিচার চেয়ে বিচার না পেলে তবে মানুষ নিজে বিচারে নামে? আমি তো আপনাকেই বললাম।
—এখনো তুমি...?
—মাদুলি আমার একমাত্র বোন দাদা!
মাদুলিকে বলে, তুই মনে সাহস আন। সোজা কথা, ওরা এসে ভালো ভাবে কথা বলবে, সাইকেল দেব, ঘড়ি দেব, তোকে পৌঁছে দিয়ে আসব।
—যদি এরপর মারধোর করে?
—সাহস হবে না। তবে ''যদি'' বলে কথা! তুই মন ঠিক কর। ''যদি'' মনে হলে বিয়ে কাটাব। আবার বিয়ে দেব। এখন তো হচ্ছে। ভাল হচ্ছে।
মীনা বলে, গ্রামে কি তা চলবে?
—অবনীবাবুর ভাগ্নী করেনি?
বেলডাংরা কি শহর? ওসব ভুলে যাও বউদি?
—বোসো, খেয়ে যাবে তো?
—না, জল দাও শুধু। ভি. আই. পি. গেস্ট আসছে, তার বাহানা কত! না গেলে হয়?
গলা নামিয়ে বলে, মাদুলির ওপর নজর রেখো।
মীনা নিশ্বাস ফেলে বলে, পরিমল মাদুলিকে নেবে না। তাহলে বিয়ে ঠিক করত না। এখন বলার সুযোগ পাবে, ওকে মেরেছ। আরো কি! তোমার ভয়ভীতে নিল ওকে, তারপর মেরে দিলে?
—মাদুলি ভাবুক। পঞ্চায়েতে কথাটা উঠলে তবে খানিক পথ মেলে। পঞ্চায়েতকে সবাই ডরায়।
সুদেব মীনাকে বলল, ফ্যামিলি কোয়ার্টার পেলে ওকে নিয়ে যেতাম, কোয়ার্টার তো নেই।
—বিয়ে করো, কোয়ার্টার পাবে।
—ব্যবস্থাই নেই।
—করে দেবে। সবাই বলছে, তোমার জন্যে ওর রোজগার অনেক হচ্ছে লজ থেকে।
—মাদুলি! সাবধানে থাকবে। কেউ এসে বলল পরিমল ডাকছে, দৌড় লাগাবে না।
—না, তা যাব কেন?
—দেখ মাদুলি, দুঃখের দিন চিরকাল থাকে না, কেটে যায়। আমি কোথায় ভেসে যেতাম, তোরাই ফিরিয়ে আনলি।
—ছোড়দা, তুই বিয়ে করবি না?
—তোকে হাসি মুখ না দেখলে তো নয়। শোন, তুই কার মেয়ে, কাদের বোন মনে রাখিস। পরিমল একবার বলুক তোকে সম্মান করে রাখবে, আমি ওর পা ধরব। কিন্তু ওকে বলতে হবে। তোকে শক্ত হতে হবে। মেয়েদের নিয়ে এত হেলা অছেদ্দা। যত চুপ করে সইবে তত বাড়বে।
মা সব শুনছিল। এখন বলল, মার খেয়েছে, সে আসবে?
—মার খায়নি যখন, আসছিল?
মাদুলি বলল, সকলকে অবাক করেই বলল, মার খাবার কাজ করেছে, মার খেয়েছে।
নিশ্বাস টেনে এতদিনের চেপে রাখা কথা প্রকাশ করল মাদুলি। বলল, আমাকে হপ্তায় পাঁচদিন ঠেঙিয়েছে, নিজে একদিন খাক। চাকরি পেয়ে নিজের মাকেও মেরেছিল!
কয়েকটা নিশ্বাস টেনে বলল, তোমরা ভাবতে আমি ওখানে ফেরবার জন্যে গুসসে আছি। আমি ভয়ে মরে থাকতাম। যদি সাইকেল নিয়ে তোমরা বেচে দিয়ে আস।
মীনা বলল, বলবে তো?
—কাকে বলব? কে জিগ্যেস করেছে?
মা বলল, তুই হোথা যাবি না?
—ছোড়দা যেমন বুঝবে তেমন করব।
আগে এমন ছিল না। চাকরি পেল, যতীন সিংগি পেছনে লাগল... শাশুড়ি কিছু বলেনি, মনে যা থাক। ছোড়দাকে ডরায়...
সুদেব অবাক, অবাক। মীনাকে বলল, দাদাকে বোলো সব কথা। আমি চললাম। দাদাকে ভাবতে ধারণ করো।
যাক! মাদুলি কুয়োতে কাঁপায়, না পুকুরে...দাদা পাগল হয়ে আছে।
ফেরো, ফেরো সোনা বাঁধ। সকাল থেকে অনেক হয়েছে, আর নয়। ডাকসাইটে অতিথি এসে পড়লে আবার কতদিন আটকে যাবে কে জানে। যিনি যেমন ডাকসাইটে, তাঁর আবদার তেমনি নানা খানা। সবাই কি নীলেন্দুবাবুর মতো সাদা মানুষ হবে? যা দাও তাই বলে, অপূর্ব রান্না। কত কুণ্ঠাভরে সকালে বলত, সকালে উঠতে পারি না, রাত জেগে লিখি। তোমাদের কত অসুবিধেয় ফেলেছি!
ওঁকে লিখতে হবে। বটেশ্বর গ্রন্থাগারে ওঁর লেখা কয়েকটা বই যদি দেন। সুদেব নিজে পড়ে নেবে, তারপর লাইব্রেরিতে দেবে।
সোনা বাঁধ, সুবর্ণ লজ।
আশ্চর্য ব্যাপার বটে!
অপূর্ববাবুর গাড়ি, একটি বড় বিদেশী গাড়ি, সঙ্গে একটি মারুতি।
অপরূপবাবু প্রায় খেঁকিয়ে ওঠেন।
—এটা বাড়ি যাবার সময় হোল?
—বড় বিপদ বাড়িতে...
—ওনারা এসে গেছেন।
—সে কি!
—কাল রওনা হয়েছেন, রাতে শালবনী ডাকবাংলোয় ছিলেন, আজ ভোরে শালবনী ছেড়েছেন।
—ছি ছি ছি! ওঁরা কোথায়?
—কটেজে। শোনো!
গলা নামিয়ে অপরূপবাবু বলে, এখানে সই করলেন ডাক্তারের নামে। ওনার নাম বলা চলবে না। ওনাকে সর্বদা ''স্যার'' বলবে।
ফিসফিস করে বলে, ডাক্তার বলল, এটা একটা রোগে দাঁড়িয়েছে! সদাই ভাবেন চারিদিকে শত্রু আমি তো বুঝিয়ে পাটিয়ে বললাম, কোনো অসুবিধে নেই। ওনার খাদ্য এবেলা ওবেলা সুপ, টোস্ট, কি কি, সব লেখা আছে। উনি অ্যাটেনডেন্ট আর নার্স নিয়ে কটেজে থাকবেন! ড্রাইভার আর ডাক্তার লজে। জলের ফিলটার এনেছে, ওনার খাবার জল ফোটাবে—জুড়োবে—ফিলটারে ঢালবে। ছি ছি! এখানকার জল বলে কত হজমী!
আর রান্না হবে...উনি এসেছেন...
সূর্যমুখীর তেলে!
—সব হয়ে যাবে, ভাববেন না।
—আমাকে এমন খেঁকাচ্ছে, আমি যেন ওর চাকর। আমি ''স্যার'' বলছি, উপায় কি?
—আর দুটো ঘরে গেস্ট এলে?
—তা আসুক না। উনি তো কটেজে।
—আমি একবার যাই।
—যাও, তাই যাও। তুমি না থাকায় আমি...কি বিপদ হয়েছে যেন বললে?
—ঝটপট তো বলা চলে না, পরে বলব।
—ওনারা যে ক'দিন থাকে, ঘরে যেও না।
এখানে কাজটা কম দায়িত্বের নয়। যাও, যাও...
—না, দায়িত্ব ফেলে যাব না।
সুদেব বলতে পারত, রক্ত যখন ক্ষেপে, আমাকে নোটিস দেয় না বড়বাবু রক্ত ক্ষেপলে আমি চাকরির পরোয়া করব না।
মনেই থাকবে না।
বলল না।
সুদেবকে যেতে হোল না।
চুল উঁচু করে বাঁধা, সুসজ্জিত একটি মেয়ে পারফিউমে বাতাস ভারি করে ঢুকল।
—আপনাদের কেয়ারটেকার এসেছেন?
—নমিতা, তুমি নমিতা!
—হ্যাঁ, ইনিই...নমস্কার করো সুদেব।
—ন...ন...নমস্কার। আমি সুদেব রায়।
—নমস্কার। শম্পা ঘোষাল। শুনুন, মিস্টার রায়ের জন্য স্নানের জল চাই, একটা পনেরোয় ওঁর লাঞ্চ যাবে। চিকেন সুপ, বিনসেদ্ধ, টোস্ট, একশো গ্রাম দই। খাবার ড্রাইভার নিয়ে যাবে। উনি সকালে সাতটা থেকে আটটা গাড়িতে বেড়াবেন। তার মধ্যে কটেজ পরিষ্কার করে দিতে হবে। কটেজে আপনারা কেউ যাবেন না। ড্রাইভার একটার মধ্যে খেয়ে নেবে। উনি লাঞ্চ খেলে আমি, ডাক্তার আর সিস্টার এসে খেয়ে যাব।
বিকেল চারটে পনেরোয় ওঁকে লেবু চা দেবেন, এই যে গ্রীন টী'র প্যাকেট।
রাত আটটা পনেরোয় উনি সব্জীর সুপ, একটা রুটি কাস্টার্ড খাবেন।
—লিখে নিতে হবে।
—নিন। ওঁর ব্যাপারে সময়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অপরূপবাবু বলে, খুব রাগী?
—সময়টা রেখে চলবেন। আপনি তাড়াতাড়ি সময়গুলো লিখে নিন। আমি গেলে ড্রাইভার আসবে জল নিতে।
—চলুন।
সুদেব যন্ত্রচালিত। সুদেব, শেখো, গতকালকে ভুলে যাওয়া দরকার।
সেদিন তুমি নমিতা নামে একটি মেয়েকে দেখেছিলে। সে রাতের নীরব সঙ্গীত ভালোবাসত। সামান্য সাঁতার জেনেই তাকে জলে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল। নিশ্চয় সামান্য টাকার জন্যে, যা তার কাছে সামান্য ছিল না। ছোট একটা সস্তা ব্যাগে দুটো তিনটে কাপড় নিয়ে সে এসেছিল। তাকে তুমি জল থেকে তুলেছিলে।
ভুলে যাও। ও সে পরিচয় মুছে ফেলেছে। এখন ওর পরণে দামী শিফন, গায়ে খাটো জামা এঁটে আছে। ঠোঁটে লিপস্টিক, হাতে ঘড়ি। কাঁধের ব্যাগটি দামী।
অফিসঘরে ও এমনভাবে বসে, যেন নবাগতা। ব্যাগ থেকে নোটবই খুলে বলে, লিখুন।
—লিখছি।
—সকাল আটটা পনেরোয় ওঁর ব্রেকফাস্ট যাবে। শুকনো টোস্ট, দুধ, কালো কফি। দুপুর একটা পনেরোয় লাঞ্চ।
চিকেন সুপ, বিনসেদ্ধ, দুটো টোস্ট, একশো গ্রাম দই। বিকেল চারটে পনেরোয় লেবু চা, এই চা দেবেন। রাত আটটা পনেরোয় সব্জীর সুপ, একটা পাতলা আটার রুটি—পোড়া দাগ থাকবে না—কাস্টার্ড দেবেন। ওঁর কাস্টার্ড প্যাকেট, খাবার দেবার প্লেট, বোল, কাপ, চামচ, ন্যাপকিন আনোয়ার দিয়ে যাবে, ড্রাইভার।
—আপনাদের?
—আমি, আনোয়ার, সিস্টার সবই খাব।
ডক্টর মোদী নিরামিষ খাবেন, যা হয় দেবেন, টক দই আর রুটি দু'বেলা।
—আর কিছু?
—সকালে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে ঘর পরিষ্কার করবে। মোট কথা উনি এখানকার কোনো লোককে ওঁর কটেজে দেখতে চান না।
—ঘর সাফ করার সময়ে ঘরে থাকবে কে?
—সিস্টার অথবা ডাক্তার মোদী!
—লিখে নিয়েছি।
—আচ্ছা।
—নমিতা দেবী!
—শম্পা ঘোষাল। কিছু বলবেন?
—কিছু না।
—ও, রোজ স্টেটসম্যান তো পাব না, তাই না?
—বড়বাবুকে বলুন, যদি কিছু করতে পারেন।
—কটেজে ভি. সি. পি. চলে তো?
—চলে।
—ইলেকট্রিক?
—সমস্যা নেই। ভালো ইনভার্টার, জেনারেটর...
—ধন্যবাদ।
শম্পা ঘোষাল বেরিয়ে যায়।
অপরূপবাবু বলেন, আমি চলি।
স্টেটসম্যান পাব বা কোথায়, পেতেও বিকেল হবে।
সুদেব বলে, মোহরদা, চা খাওয়াও।
গৌরী বলে, তোমায় চেনেনি, আমাদের ঠিক চিনেছে। বুড়াটার দেখা—ভালা করে, টাকা পায়।
—কিছু বলল?
—কি বলবে?
মোহর চা আনে। বলে, সায়েবের মেজাজ যত, ড্রাইভারের মেজাজ তত। হবে না।
ড্রাইভার ডান হাত। সায়েব ওকে অ্যাম্বাসাডর গাড়ি দিয়েছে, লাকসারি ট্যাক্সি খাটায়। হাজার টাকা মাইনে দেয়, খাওয়া পরা।
—দেখ! আমার চেয়ে কত বড়লোক ওই ড্রাইভার।
—ছোটবেলা থেকে আছে। আর দাদা! এটা হোল কপালের ব্যাপার। যে যেমন কপাল করে আসে।
—সেই তো কথা। এখন গুনে নাও...
—পথে হাট পেয়েছে। জলধরের বাপ উপেনের কাছে এক ঝাঁকা মুরগী কিনেছে।
—থাকবে?
—মর্জি! ড্রাইভার বলল, সাতদিন থাকবে বলে হাজারীবাগ গিয়ে দু'দিন বাদে চলে এসেছে। এখন প্রচণ্ড বাই রোগ। পেলেনে চাপে না, ট্রেনে যায় না, নাকি অ্যাক্সিডেন্ট হবে। গাড়িতে ঘোরে। ড্রাইভার বডিগার্ড গো!
পিস্তল রাখে।
—এত খবর জোগাড়ের সময় কখন পেলে?
—অনেকক্ষণ এসছে।
—আমার বড্ড ঘোরাঘুরি গেছে আজ।
স্নান করব, কিছু খাই।
—বটেশ্বর জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছ।
—কে বলল?
জলধর বলে, খবর চাপা থাকে? বাবা বলে গেল। বাবা চোদ্দোটা ছোটবড় মুরগী তিনশো টাকায় বেচেছে।
—সর্বনাশ। মদ খাবে।
জলধর ঝকঝকে দাঁত বের করে হাসে।
—সি হবে লাই। মা সাথকে আছে। গৌরীর চুল চুড়োতে বাঁধা, বড়—সড় কাপড় খাটো করে পরা। দেখলেই বোঝা যায় গৌরী 'কথা কম কাজ বেশি' পার্টি। গৌরী বলে, সবার জন্যে সুদেবের মতো কেউ ভাববে না। জলধর কাজে যাক এখন। বাসন মাজার পাউডার লাগবে, ঘর মোছার ঝাড়ন, এবং সন্ধ্যায় সুদেব যেন অবশ্য হাতিপোতা যায়। আজ শুয়োর খাওয়া হবে।
—এনে দিস মাসি। এখন গেলে চাকরি চলে যাবে।
স্নান করে সুদেব। স্নান করলে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কিন্তু মনের ভেতরটা জুড়োয় না। নমিতা...শম্পা...ওর আসল নাম কি? নমিতাকে ও যেন মুছে ফেলেছে। কিন্তু চোখের অতলে কি ছিল? সুদেব কোনোদিন বলতে পারবে না, নমিতাকে জল থেকে তোলার পর সুদেবের মনে কি মমতা হয়েছিল। ইন্দ্ররা ওর কথা ভাবছিল না।
মালা রায়ের ওই দুর্ঘটনা হলে ছবিটাতো পাল্টে যেত। ইন্দ্ররা অত নির্লিপ্ত থাকতে পারত না। সেদিন নমিতা মারা গেলেও সেটা হোত একটা অপ্রীতিকর দুর্ঘটনামাত্র। নমিতাদের জীবনের খুব একটা দাম নেই।
স্নান করে সুদেব একটু দই চিড়ে খায়।
যাক, শত অশান্তিতে একটা শান্তি, মাদুলি মনে মনে ভেঙে পড়েনি।
বিয়ে কাটাছেঁড়া করিয়ে মেয়েটাকে আবার বিয়ে দিলে ঠিক হয়। তবে পাড়াগাঁয়ে কাজটি সহজ নয়।
বিকেলে সুদেব দেখতে পায় মহামান্য অতিথিকে।
বয়স বছর সত্তর তো হবে। পাকানো চেহারা, কালো রঙ, ধপধপে পাঞ্জাবী পায়জামা পরে কোনোদিকে না চেয়ে হেঁটে এসে গাড়িতে ওঠে। একদিকে শম্পা, নতুন পোশাকে। অন্যদিকে সিস্টার। আনোয়ার গাড়ির দরজা খুলে ধরে। দুপুরে সুদেব শুনেছে ওটা জাপানী গাড়ি, কলকাতায় কমই আছে।
ভদ্রলোকের চোখে কালো চশমা।
ডাক্তার মোদী বলেন, এক ঘণ্টার জন্যে নিশ্চিন্ত। যাক, মনে হচ্ছে জায়গাটা ওঁর ভালো লেগেছে।
—কি করে বুঝলেন?
—এ অবধি একবারও চেঁচান নি।
—উনি অসুস্থ হলে এমন জায়গায়...
—অসুখ আছে, মনে। ওঁর ধারণা উনি অসুস্থ। যাক গে। আমার ঘরে পাখাটার স্পীড নেই।
—দিনে একটু কম থাকবে, রাতে বাড়বে।
—মশারি টাঙাতে হবে কেন?
—সাপ—টাপ আছে...সাবধানে থাকা।
তবে সাপ এ লজে কোনোদিন ঢোকেনি।
—চমৎকার বাগানটি। জায়গাটা সুন্দর।
কলকাতা থেকে এমন দূরে নয়, কিন্তু মনে হয় কোথায় চলে এসেছি। আচ্ছা, ওই মন্দিরের ঠাকুর খুব জাগ্রত?
—সবাই তাই বলে।
—যেতে হবে, যেতে হবে। আপনি তাস খেলেন?
—না।
—কি যে করি!
—হেঁটে আসুন না।
—না না। বস জানতে পারলে...
বাগানেই হাঁটি!
এক সময়ে ওঁরা ফিরে আসেন।
তারপর সিস্টার, আনোয়ার আর ডাক্তার তাস বের করেন লাউঞ্জে।
সিস্টার তাস ভাঁজতে ভাঁজতে বলে, এখন শম্পা দেখবে। ওঃ, বস পারে বটে...
আনোয়ার বলে, কথা নয় ম্যাডাম।
কি পারে শম্পা? কেন কটেজে ও এবং মনিব রইল, সিস্টার বেরিয়ে এল?
সুদেবের সব গোলমাল হয়ে যায়।
আটটার সময়ে আনোয়ার উঠে পড়ে।
বসের ডিনার নিয়ে আনোয়ার এবং তার সঙ্গে সিস্টার যায় কটেজে। ডাক্তার মোদী বলে, আমার ডিনারটা দিন!
—এখনি খাবেন?
—হ্যাঁ। আমি গেলে ওরা খেতে আসবে।
ওঁকে একলা রাখা বারণ। কাছে লোক থাকতে হবে।
—দিয়ে দিচ্ছে।
সুদেব ঠিক করেছে নিজের মধ্যে নিজেকে শাসন করে থামিয়ে রাখবে। সে সুবর্ণ লজের কেয়ারটেকার সে পরিচয়টাই প্রথম সত্য। অপরূপবাবু কয়েক ঘণ্টার অনুপস্থিতিও সহ্য করবে না। অতিথিদের বেলাও সজাগ থাকতে হবে। কেননা সকলে একরকম নন। কে কবে নালিশ করবেন, চটে যাবেন কে জানে।
ডাক্তার মোদী খেতে বসে। বলে, আমাদের বস অত্যন্ত সাহেবী মেজাজের লোক।
—রান্না বিষয়ে, খাবার বিষয়ে বলবেন দয়া করে।
—হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চই।
ন'টা নাগাদ শম্পা, আনোয়ার ও সিস্টার খেতে আসে। সিস্টার ও আনোয়ার কথা বলে। শম্পা নীরবে খেয়ে যায়।
সুদেব একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
সিস্টার বলে, কাল কি খাওয়াবেন?
—মাছ, মাংস, ডিম, বা বলবেন।
আনোয়ার বলে, জংলী জায়গা, যা পাবেন খেয়ে নেবেন। এ কি শহর যে চয়েস পাবেন?
তারপর বলে, রাস্তা খুব রাফ। কিন্তু বসের পছন্দ হয়েছে জায়গাটা।
খাওয়ার পর ওদের যান্ত্রিক প্রস্থান।
শম্পা আর সিস্টার চলে যায়, ডাক্তার মোদী চলে আসে।
রাতে টর্চ ফেলে বাগান, আশপাশ দেখা সুদেবের কাজ। বাগানে দাঁড়িয়ে আছে শম্পা।
—সুদেববাবু।
সুদেব দাঁড়িয়ে পড়ে।
—আমাকে বলছেন?
—হ্যাঁ।
—কি বলবেন, বলুন।
—আপনি তো আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না?
—আপনারা গেস্ট, আমি কেয়ারটেকার। সুবিধে—অসুবিধে জানাবেন, আমি সাধ্যমতো দেখতে চেষ্টা করব। কিছু মনে করবেন না, রাতে এ ভাবে বেরিয়ে এসে ঠিক করেননি।
সেবারও বলেছিলেন। সাপ আমাকে কামড়াবে না সুদেববাবু। সেবার আপনি আমার প্রাণ বাঁচালেন, তারপর আপনাকে ধন্যবাদও জানাইনি। জানালে আপনাকে অবশ্য ছোট করা হোত।
—আপনি শুতে যান।
শম্পা ঈষৎ হাসে।
—কত দূরে চলে গেছেন আপনি। যাব, পরে যাব। বস এখন ক্যাসেট দেখছেন। বারোটা অবধি সিস্টার ওঁর কাছে থাকলেই হয়। আমার ডিউটি তারপর।
—এটাও কি...সাঁতার কম জেনেই জলে নামতে বাধ্য হয়েছেন?
—অপমানকর কথা, কিন্তু সত্যি।
—আপনার কি কেউ নেই?
...সেদিন তো আপনি ছিলেন।
...এটা কি জবাব হোল?
—আপনার বাড়ি কাছেই, তাই না?
—হ্যাঁ।
—সেবার গৌরীদিদি অনেক কথা বলেছিল।
একটু হেসে শম্পা বলে, আপনি না কি ভীষণ ডাকাত। ক্ষেপে গেলে অন্য মানুষ।
—আর কি বলেছে?
—মা, দাদা, বউদি, ভাইঝি সবাই আছেন আপনার। কি কপাল আপনার। কত আপনজন।
—গৌরীদি। এত কথা বলল কেন?
—আমি জিজ্ঞেস করতাম। ওদের সঙ্গে গল্প করতাম তো। বলেছে আপনি ওদের জন্যে খুব করেন।
—আমি আর ওরাই থাকি। সনাতনদা, গৌরীদি ওদের কিছু জমিতে ভাগ আছে। ছেলে চাষ করে। গোপাল, অমরুর দাদা। গোপালের সঙ্গে ক্লাবে দৌড়েছি। জলধরের বাবা আমার উপেন কাকা।
—শুনতে কি ভালো লাগে।
—গ্রামে বলুন, এখানে বলুন, একটা সম্পর্ক গড়ে না দিলে আমরা বসবাস করতে পারিনা। অবস্থাতেও খুব তফাত ছিল না। মা পরের ধান এনে সেদ্ধ করতেন। দাদা অঘ্রাণে ধান কিনে ভাদ্রে বেচত। ক্রমে দাদা গ্রামে কাজ পেল...
আমি কাজ পেলাম এখানে...
—অমরু চাকরি পেয়েছে?
—পেয়ে গেছে।
—ওদের তো সুবিধে।
—লেখাপড়া কোথায়, যে সে সুবিধে কাজে লাগাবে। আর, খবরাখবরও তো রাখে না, জানতেই পারে না।
অসুবিধে ওদের অনেক।
—দেখাই হোল না ওদের গ্রাম।
—আপনি এবার যান।
—যাব। নিশ্বাস ফেলে শম্পা।
—মাপ করবেন, কেন আপনি...
—টাকার জন্যে।
—বিয়ে থা করে ঘরসংসার করতেন...
—সুদেববাবু, আপনাকে যদি কেউ বলে আমাকে বিয়ে করতে, আপনি কি সিনেমায় এক মিনিট চেহারা দেখায় এক নামে, এ রকম লোকের অ্যাটেনডেন্ট হয়ে আসে আরেক নামে, তেমন মেয়েকে বিয়ে করবেন? করবেন না। অন্য কেউ বা করবে কেন?
শম্পা চলে যায়।
সুদেবের মনে হয় ওর ভেতরটা কাঁপিয়ে দিয়ে গেল শম্পা! জানা হোল না ওর নাম কি।
চলে এল ও।
লাউঞ্চে বসে দামী সিগারেট টানছে আনোয়ার।
—কি বলছিল ম্যাডাম?
সুদেব জবাব দেয় না।
—শুনলেন কথাটা?
—আমাকে বলছেন?
—আর কাকে?
সুদেবের রক্ত ক্ষেপতে থাকে।
—আপনাকে জবাব দিতে হবে?
—আমি ছাড়া বসের ভালোমন্দ দেখার কেউ নেই, আমিই ওনাকে দেখি। এ ম্যাডাম, ভালো...নানারকম ম্যাডাম আসে...ফালতু কথা বলে কাজ খোয়ায়...লোকটা কি জানে, সুদেবের হাতের কবজি ও চেটোতে কি অসীম, বন্য শক্তি? কিন্তু হঠাৎ মনে হয়, শম্পা নমিতার বিপদ হতে পারে।
—সায়েবের টাইমগুলো আবার জেনে নিচ্ছিলাম। এখানে পাওয়া যায় না সব...লোকজনও তেমন তৈরি নয়...এই সব।
আনোয়ার ঈষৎ হাসে।
—তবে তাই। বস ইদানীং গাড়িতেই ঘুরছেন। এসব জায়গায় উনি আসবেন...দরজায় তালা দিচ্ছেন? রাতে কটেজে যেতে হলে কি করব?
—আমার ঘর দেখেছেন, ডাকবেন।
আমাদের যেমন নিয়ম তেমন কাজ করতে হবে। রাতে মশারি টানাবেন, গুঁজবেন। কোনো দরকারে বেল বাজাবেন। ডাক্তার মোদীকে কথাটা বলা হোল না, তবে ঘরে লেখা আছে।
—মোদী উঠবে না। লোহার পাত বালিশের নিচে রেখে ঘুমোবে সকাল অবধি। বেজায় ভূতের ভয়।
আনোয়ার হাসতে থাকে।
সকলের বিষয়ে এমন তাচ্ছিল্য ভরে কথা বলতে পারে যখন, এ আস্পর্ধাটা ওকে ওর মনিব দিয়েছে নিশ্চয়। এই অসভ্যতা এখন তো হরদম দেখা যায়।
—আমার কথায় রাগ করবেন না কেয়ারটেকারবাবু। ওনারা সবাই টেম্পোরারি। আমি পার্মানেন্ট।
সুদেব জবাব দেয় না। ঘরে চলে যায়।
শম্পা—নমিতা ওকে ভয়ানক ঘা দিয়েছে। কথাটা তো সত্যি। সুদেব ওর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে, ওকে মমতা দেখাতে পারে। কিন্তু বিয়ে করতে হলে সুদেব নিশ্চয়ই কোনো দাগী মেয়েকে নির্বাচন করবে না। অথচ সুদেবের নিজের জীবনেও অনেক দাগ।
এরকমই হয়ে থাকে, সে জন্যেই বলেছে সুদেবের হঠাৎ ওর দাদার কথা মনে হোল।
মাসখানেক আগেই মীনাকে বলেছিল, কতরকম অবস্থায় পড়ি, কত অপমান হই, সুদেব হলে সহ্য করত না। সুদেব ''সুদেব''ই থেকে গেল। মা দাদাকে ''বড় খোকা'' বলে, সুদেবকে ''ছোট খোকা'' কখনো বলেনি। দাদা বলেছিল, ক্ষেপে গেলে ও অন্য মানুষ। হবেই তো। পিছটান তো নেই। আমি ভাবি আমার মা—বোন আছে, বউ মেয়ে আছে।
মীনা আস্তে বলেছিল, ওরও মা—বোন আছে।
—আছে, আছে, সব আছে। কিন্তু বিয়ে করলে, ছেলেমেয়ে হলে, তবে সবটার ওপর পিছটান আসে।
—বিয়ে করে ছেলে মা—বাপকে ভোলে এও তো দেখছ।
...ও তো সে ছেলে নয়।
—মাদুলিকে দেখে জ্বলে আছে, তাতেই...আমারও খুব ইচ্ছে করে ও বিয়ে করুক ওর সংসার হোক। এখন দেখ, সংসারে মানুষজন দরকার। গ্রামদেশে বাস করতে লোকবল চাই। এখানে লোক ছাড়া চলে না।
—তুমি যেমন একটা ''লোক'' হয়েছ সংসারে।
—সে কথা ছেড়ে দাও। তোমার—আমার বিয়ে হতেই হোত। এটা হোল জন্ম—জন্মের লেখা।
সুদেব কি সে জন্যেই দাদার মতো বুঝদার, শান্ত, নিজেকে মানিয়ে চলা মানুষ হতে পারল না?
পরদিন সুদেব রাতে শম্পা—নমিতাকে বাগানে দেখে না। ও খেতে আসে, চলে যায়। সকালে ও বিকেলে বেরোয় গাড়িতে। সুদেবের দিকে তাকায় না। তার পরদিন কি হয় তা বোঝা যায় না।
রাতে খেতে এসে শম্পা—নমিতা বলে, বিলটা রেডি রাখবেন সুদেববাবু। কাল সাড়ে আটটা থেকে ন'টার মধ্যে বেরিয়ে যাব আমরা।
—কোথায়?
—কলকাতা।
—বিল রেডিই আছে।
সিস্টার, আনোয়ার, মোদী, সবাই নির্বাক।
শম্পা ঘোষাল বিল চুকিয়ে দেয়, রসিদ নেয়। সনাতন, গৌরী, জলধর, স্বপন, গোপাল, মোহর, বিবি, প্রত্যেকের সার্ভিসের জন্যে একশো টাকা করে দেয়।
—ওরা খুশি হবে।
—উনি খুশি হননি। খুশি হলে দুশো দিতেন। আর শুনুন আমি আপনাকে চিঠি লিখে জানাব আমার কথা। এদিকে কোথাও যেমন তেমন কাজ হলে আমাকে একটু খবর দেবেন? আমি থার্ড ডিভিশনে উচ্চমাধ্যমিক পাশ। বুড়ো লোকদের মাসাজ, সেবা করতে পারি। ভদ্র পরিবারে রান্নাবান্না করতে রাজী আছি, দেখবেন তো?
—দেখব।
—এ কাজ তো কলকাতায় ফিরলেই যাবে। দেখবেন।
সেদিন রাতে কথা বললেন বলেই কি...
—ও একা পার্মানেন্ট। ইনি কোনো লোককেই বেশিদিন সহ্য করতে পারেন না। আনোয়ারের সঙ্গে অন্য সম্পর্ক। চলি।
—আবার আসবেন?
—সে কি আমিই জানি?
এবার গৌরী আর বিবিকে নিজের কাপড় দুটো দেয়। জলধরকে বলে, লেখাপড়া কোর।
সুদেবকে বলে, গভীর মমতায় বলে, অমন হটচটকা ক্ষেপে যাবেন না। এবারে একটি লক্ষ্মী মেয়েকে বিয়ে করুন, ঘর সংসার করুন।
—ডাকাতকে মেয়ে দেবে কে?
—বেটাছেলের বিয়ের অভাব কি হয়?
হয় না। বিয়ে করবেন, কেমন?
মলিন হেসে বলে, এবারে যেতে ইচ্ছে করছে না একেবারে। কেন জানি না।
পরদিন ওরা চলে গেলে গৌরী বলে, বুড়াটা পিচাশ বটে। দিদিটাকে রোজ মার খেতে হবে এমন চাকরি, তাতেই অত মাইনা দেয়! তা দিদিটা ভালো তুই ওকে বিয়া কর কেনে?
—কি বলিস?
—উদামাদা থাকবি?
খুব উদ্বেগ না হলে গৌরী ওকে ''তুই'' বলে না।
—তুদের জাতে বিয়া করি যদি?
—মেরে বানধে ফেলে দিবে।
—আমি...আমি...সন্ন্যাসী হব।
—মিছা কথা। বাবুটো পিচাশ বটে। বড়লোকের কত খেলা, সাতবুড়ার এক বুড়ো! ছিঃ।
দেবরূপ সহসা দর্শন দিতে আসে।
—ম্যারেজ প্রবলেম সলভ হয়ে যাচ্ছে এবার।
—খুব ভালো কথা।
—শ্বশুর বলছে কলকাতায় এসে বিজনেস করো। বউ বলেছে, এখানে থাকবে, ঠিক ভাবে চলবে।
—তাই করুন।
—করতেই হবে। আগে শ্বশুর কিছু খসাক, এখানে ধার কর্জ মেটাই। জানেন তো এগারো মাসের আগে আমার রাহু কাটছে না। বরেন ব্রহ্মচারীর নাম শুনেছেন? ইন্টারন্যাশনাল জ্যোতিষী মশাই। ইন্দিরা গান্ধী খুন হবে, বলেছিল। রাজীব পি. এম. হবে, বলেছিল। খোমিনি মরবে, বলেছিল। মিডিল ইস্টে খুব পশার। তাকে দিয়ে শ্বশুর যজ্ঞ করাল।
বাঁ ও ডান, দু'হাতে নানাবিধ পাথর।
—খারাপ সময়টা কাটুক, অন্য দেবরূপ। অপরূপ বটব্যাল বনগাঁয়ে শেয়াল রাজা হয়ে থাকুক।
দুঃসময় অন্যভাবে কেটেছিল।
মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করে দেবরূপ হাসপাতালে পড়ে থাকল। অতঃপর নার্সিংহোম। তারপর স্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ। স্ত্রীও হিন্দি ছবির হিন্দু স্ত্রীর মতো দেবরূপকে নিয়ে গেল। সল্টলেকে ''উদয়াচল'' ভবনে। অপরূপবাবু বলল, সুবর্ণও ক'দিন ওখানে থাকবে। এ যাক, মন্দের ভালো হোল। প্রাণে বাঁচল, মতি যদি ফেরে।
অপরূপবাবুও বটেশ্বরে বিশাল আয়োজনে পুজো দিল। শিবকে সোনার বেলপাতা দিল। সুদেবকে বলল, ডাইভোর্স হলে নাক কাটা যেত সুদেব। বড় কেলেঙ্কারি থেকে বাঁচিয়েছে থেকে ভগবান।
অ্যাক্সিডেন্টের ফলে দেবরূপ ভগবৎভক্ত হয়ে গেছে। মদ, সিগারেট খায় না। বরেন ব্রহ্মচারীর ছবি পুজো করে। আর সুদেবকে চমকিত করে পরিমলের মা পরিমলকে নিয়ে বাঁধবেড়া গেল। পঞ্চায়েত মাদুলির সপক্ষে যেত। উত্তেজিত ভূদেব সুদেবকে সব বলে গেল।
সে এক বলার মতোই ঘটনা। বটেশ্বর অঞ্চলে কোনো পঞ্চায়েতে এমন ঘটনা ঘটেনি। অবশ্য কোন পঞ্চায়েতে অবনী, স্বরূপ, মদন, হোপন মান্ডি, বীরু পাত্র পাঁচ মাথা এক হয়! পরিমলের মা পরিমলকে নিয়ে এসেছিল। পরিমল বাড়িতে ঢোকেনি। ঘরের বাইরে পথের দিকে যে সজনে গাছটি অনেককাল মানুষকে চচ্চড়ি খেতে ফুল ও ডাঁটা দিচ্ছে, তার নিচে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাড়িতে সুদেবের বেয়ানকে দেখেই কাঁদতে শুরু করে।
—কোথা থেকে কি হয়ে গেল বেয়ান, আগে কত ভালোবাসা ছিল, মাদুলিকে দেখে তুমি বলেছিলে, বউ নয়, মেয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তারপর কোথায় কি দোষ হয়ে গেল, কে দোষী...
মীনা এসে পরিমলের মায়ের পা ধুয়ে দিল, গামছা দিয়ে মুছে দিল। ভূদেব এসে প্রণাম করে জোড় হাতে দাঁড়াল। তখন পরিমলের মা নিশ্বাস ফেলে বলল, ছেলেকে এনেছি। দোষ তো আমাদের। মিটমাট না করলে পঞ্চায়েত লোক ডাকবে, মারা করাবে, তা তোমরাই তাকে মারো। সুদেব তো বউনি করে এসেছে। শেষটাও এখানে হোক।
ভূদেব বলল, পঞ্চায়েত অতটা ঘামত না। কিন্তু বিচারটা ঠিকমতো করলে মানুষের মনে পঞ্চায়েতের ওপর একটু ভরসা ফেরে, সে কথা ভাবল। পঞ্চায়েতে সুবিচার অনেককাল হয় না। আর বউ ছেড়ে বিয়ে এখন ঘরে ঘরে।
ভূদেব গিয়ে স্বামী—স্ত্রীতে পরিমলকে যথেষ্ট খাতির করেও ভেতরে আনতে পারেনি।
মাদুলি বলেছে, পঞ্চায়েত বিচার করেছে, পঞ্চায়েতকে লিখে দিক।
পরিমলের মা বলেছে, ছোট ছেলে যখন সব করল, তাকে বোল আমি আর আমার বেটা এসেছিলাম।
সুদেব বলল, কি করবি?
সুদেব বলল, একবার ওরা ঘুরে গেল। কিন্তু মাদুলি যদি ভরসা পায় তবেই তো। আমিও যাব। এত কচাকচির পর মিলমিশ হয় কিনা দেখতে হয়।
—যাহোক ওরা ঘুরে গেল, অবনীবাবু বলছিল এবারে তোমরা যা হয় ঠিক করো। আমার কাছে নিয়ে এসো দুজনকে। পরিমল যদি কথা দেয়...
—দাদা! কথা দিলেও পরে হেনস্তা করতে পারে।
নিশ্বাস ফেলে সুদেব বলল, আমাদের দক্ষিণের জমিটা মাদুলিকে লিখে দেয়া যায়, দেড় কাঠা হবে, দামও আছে। ঘর তুলে দিতে পারি, সাইকেলও ধার করেই দেব। চোখের ওপর থাকলে অনেক নিশ্চিন্ত।
—সে আসবে?
—বলা যায়। কথাটা অবনীবাবু বললে ভালো হয়, যেন সেই বিচার করল।
—দেখি মাদুলি কি বলে।
মাদুলি বলল, বটেশ্বরে সে নিজেকে রাজাগজা মনে করে। এখানে সে জব্দ থাকবে এ এক কথা। আর কাটান—ছেঁড়ান, আবার বিয়ে, সেও গুচ্ছের খরচ তোমাদের। কিন্তু আর কি সম্পর্ক থাকবে ভালো মতো?
পরিমল প্রথমে রাজী হয়নি। কিন্তু এর পরে, যেন ওদের সম্পর্ক আবার বাঁচিয়ে তোলার জন্যেই পরিমল যেদিন মাইনে তুলে ফিরছে, মাথায় ডাং মেরে ওর টাকা নিয়ে ঘড়ি নিয়ে পালাল রজত ও সুবল। পরিমল ব্লকে কাজ পাওয়ার পর থেকে, সরকারী লোন পাইয়ে দেবে বলে ছ'সাতজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল। রজত ও সুবল তারই দু'জন।
এখন পরিমলের মার সন্দেহ রইল না তার ছেলের সময় খারাপ পড়েছে।
সুদেব মাদুলিকে নিয়ে ওকে দেখতে গেল হাসপাতালে। বলল, আটটা সেলাই পড়েছে, রক্ত পড়েছে খুব। এখন দেখতে যাওয়াটা কর্তব্য হয়।
মাদুলিকে দেখে পরিমল চেয়ে রইল। মাদুলিও ওকে দেখে নির্বাক।
সুদেবই বলল, অবনীবাবুর কথা শুনলে না। স্বগ্রামেই শত্রু তোমার। বাঁধবেড়ায় আমাদের পেতে।
পরিমলের মা বলল, তাই যাব। বাঁধবেড়া থেকে ওর পিতামো' বটেশ্বরে এসেছিল, ও আবার যাবে। ওর বাপ ছোট বউয়ের ছেলে বলে বড় তরফের সঙ্গে ঝগড়া—বিবাদ, মামলা কি হয়নি? জমি শেষে তিন বিঘায় ঠেকেছিল। আমিও বললাম, সুদেব ডাকাত বটে, কিন্তু বোনকে তো বিধবা করবে না। সবই কেমন হয়ে গেল আমার কপালে।
মাদুলি শাশুড়িকে প্রণাম করে বসে থাকল।
জমি লিখে দেয়া, ঘর তোলা এখনো হয়নি। হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। তবে পরিমল অবনীবাবুকে বলে গেছে, সে তাঁর শর্তে রাজী আছে।
ভূদেববাবুকে বলেছে, আমি ঘরের টিন, দোর জানালা, জমি সব বেচে আসব যেমন, তেমন আপনাদের ওদিকে ভালো জমি খানিক কিনে দেবেন। আমরা চাল কিনে খাইনি কখনো।
—বাস্তু কি করবে?
—শৎপথীকে বেচে। সেও চায়, আমিও দেব। শরিকরা এখন বুঝুক।
ভূদেব বলল, কথাবার্তা কাঠ কাঠ, তবে ক্রমে ক্রমে সব ঠিক হয়ে যাবে।
সুদেব মাদুলিকে আড়ালে নিয়ে গেল।
—তুই মন থেকে ''হ্যাঁ'' বললে তবে। দাদা বা আমি তোর ওপর জোর করিনি করব না।
মাদুলি যেন অনেক শান্ত, বিবেচক হয়ে গেছে।
—তোমার বয়স কত হোল ছোড়দা?
—আটাশ তো হোল।
—আমার তবে পঁচিশ।
—তোর বয়সের হিসেব সোজা। মেয়ে ইস্কুল যে বছর, সে বছর তুই হলি।
—ছোড়দা! আমাকে নিয়ে আর ভাবিস না। ও দাদার মতো মানুষ নয়। বউদির মতো সুখ আমার হবে না। তোদের চোখের সামনে থাকব। মানিয়ে গুছিয়ে চলব। ওরও শিক্ষে হয়েছে, বার বার নাক কাটা গেছে। ওকেও বুঝে চলতে হবে। আমি তো বলেছি, এদিক সেদিক করলে আমি সইব না।
—পারবি?
—একবার চেষ্টা করে দেখি। এবারে তো ওর ভরসা থাকবে না। নিজের ঘরে থাকব, পঞ্চায়েতে বলে ব্যাঙ্ক লোন নেব, ধান ভানারি করব।
—তবে সে কাজ এখনই শুরু কর।
—সে ভুল আর করছি না।
—শাশুড়ি কেমন?
—শাশুড়ি যেমন হয়। তবে এবারে ওরা আমার ঘরে থাকবে, আমি ওদের ঘরে থাকছি না।
—অর্থাৎ এমন—তেমন হলে গেট আউট?
—যা বলিস।
মাদুলি হাসল।
সুদেবের মনে হোল, নিজের জমি, নিজের ঘর হবে জেনেই মাদুলি যেন একটা জোর পেয়েছে।
—হাতে টাকা হলে ধান কিনব, চাল বেচব।
মাদুলি স্বাবলম্বী হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
—পারবি?
—কেন পারব না? মা পারেনি? তারপর মাদুলি বলল, তুইও বিয়ে কর এবারে। তুইও তো কম কষ্ট পেলি না, কম কষ্ট করছিস না।
একটু থেমে বলল, একদিন তোর ওখানে নিয়ে যাবি ছোড়দা? একদিন থাকতাম, বেড়ানো হোত।
সুদেব মাদুলিকে নিয়ে এসেছিল। মাদুলি বাঁধের ধারে বেড়িয়ে বাগান দেখে বিবিদের সঙ্গে গল্প করে কি খুশি, কি খুশি।
গেস্টদের মধ্যে সে অধ্যাপক সস্ত্রীক আবার এসেছেন। অধ্যাপকের স্ত্রী বললেন, সুদেববাবু! মাদুলি দেখতে কি সুন্দর! কে বলবে আপনার বোন! মাদুলি সুন্দরী? সুদেব সগর্বে হাসল।
মাদুলি কতটা সপ্রতিভ, তা সুদেব জানেনি কখনো। গৌরীদির সঙ্গে চলে চলে গেল হাতিপোতা। জলধর খুব গর্বিত। মাদুলি তারও দিদি হয় গ্রাম সম্পর্কে।
গৌরী বলল, বিকেলে কাজ করতে আসব। তখন নিয়ে আসব। রাতটা থাকুক কেন, মুরগী খাইয়ে দেব। মাদুলি বলল, পরের বার থাকব গো দিদি।
তারপর বলল, বেড়াবার জায়গা বটে।
বিকেলের ডাকে সুদেব চিঠিটা পেয়েছিল।
ছয়
''শ্রীচরণেষু সুদেববাবু,
দশবার লিখেছি আর ছিঁড়েছি। লিখব লিখব নিত্য ভাবি, আজ লিখছি। সব সময় সুযোগ পাই না। জীবনটা এরকম, আজ এখানে কাল ওখানে। আপনার কথা আমার প্রথম দিনের দেখা থেকে মনে হয়। জীবনে সদয় ব্যবহার তো পাইনি। দু'বার দেখা হোল দু'বার মনে হোল মানুষের মতো একটা মানুষ দেখলাম বটে। সেই কবে থেকে অমানুষই দেখছি।
আপনাকে আমার কথা জানানো দরকার মনে করি। আপনি আমার সঙ্গে যেমন ব্যবহার করেছেন, তাতে সে অধিকার আপনার কাছে। আমি সেই মানুষই আছি, যে সাঁতার একটু জানে কিন্তু যাকে গভীর জলে ঝাঁপ দিতে হয়। এইরকম ঝাঁপ দিতে দিতেই একদিন মরে যাব। সব জায়গায় তো আপনি থাকবেন না।
কেমন গুছিয়ে বাংলা লিখছি দেখুন। লেখারই কথা। মাধ্যমিক দিতে পারিনি। কিন্তু দিলে পাশ করতাম। বাংলা আর ইতিহাসে ভালো ছিলাম। অঙ্কে কাঁচা ছিলাম। কেমন করে বাঁচতে হয়, সে অঙ্কটা আর শেখা হোল না।
আমার নাম কিন্তু নমিতা। নমিতা মল্লিক। বনগাঁ লাইনে অশোকনগরে আমাদের বাড়ি। বাবা মঙ্গলা হাটে সায়া—জামা কিনে বাজারে বেচত। মা থাকতেই বাবা আবার বিয়ে করে। তিন বোন আর মাকে ভাত দিত না। মা মেয়ে স্কুলে আয়া ছিল। দিদি হাসপাতালে আয়ার কাজ করতে করতে এক রিকশাঅলাকে বিয়ে করে। ইস্কুলে পড়ছিলাম। মায়ের দিদিমণিরা জামা কাপড়—বই সাহায্য করত। কিন্তু মা পেটে পাথর অপারেশন করতে গিয়ে মরে গেল। তখন বাবা আমাদের নিয়ে গেল। আমি ইস্কুলে আয়া—কাজ পাব পাব করে পেলাম না। বাবার একটা ছেলে হয়েছে। পাঁচটা মুখে ভাত জোগানো বড় কষ্ট। এর মধ্যে ছোট বোনটা বিয়ে করে বসল লন্ড্রীর দোকানের মালিককে। বোনেদের মধ্যে ও দেখতে সবচেয়ে ভাল। আমাকে বলল, যাকে হোক, হাত ধরে চলে যা।
বাবা খুব চেঁচিয়েছিল। বলেছিল, নমিতাকে আমি বিয়ে দেব, তোদের মতো বিয়ে হবে না ওর।
কলকাতার লোক, সে হবে বর। বাবা আর বিমাতা কি সব পরামর্শ করল। তারপর একদিন বাবা হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি এল। আমাকে কলকাতায় নিয়ে বিয়ে দেবে।
কলকাতায় আনল আমাকে। একজায়গায়, পরে জেনেছি সেটা খিদিরপুর, আমাকে তুলে দিয়ে ''ঘুরে আসছি'' বলে চলে গেল। বুঝতেই পারছেন, বাবা আমাকে বিক্রী করে চলে গেল। বাড়ির মালিকও এক মেয়েছেলে। সে আমার মতো আরো মেয়ে কিনেছিল। মেয়েদের প্রথমবার কিনতে বেশি লাগে না সুদেববাবু। তিনশো, পাঁচশো, সাতশো, আমার ফটো দেখিয়ে বাবা হাজার নিয়েছিল। দ্বিতীয়বার বিক্রী হবার সময়ে বেশি দাম ওঠে। তারপর দাম পড়তে থাকে। এটাও বোধহয় বুঝেছেন, আট—দশ বছর সম্পর্ক না রাখুক, লোকটা আমার বাবা। আর বাবা মেয়েকে বেচে দিলে সে মেয়ের পালাবার জায়গা থাকে না। পালাবার চেষ্টা একবারই করি। কিন্তু মালকিনের হাতেই আবার ঘুরে ফিরে আসতে হোল। এরপরে আর পালাবার চেষ্টা করিনি। আমাকে এক বিপত্নীক প্রৌঢ়ের বাড়ি সেবিকা করে রেখে দিল। কিছুকাল ছিলাম।
আমাদের কামাইটা মালকিনই খায়। এরপর আমাকে এরকম ভাড়া ও আরো খাটিয়েছে। রবীনবাবু ওর পুরনো বন্ধু। রবীনবাবুই নাকি ওকে বের করেছিল অনেক আগে। তারপর ও এক বড়লোকের রক্ষিতা হয়ে যায়। তিনিই ওকে ''বুলবুল'' নাম দেন, বাড়ি লিখে দিয়ে এই ব্যবসায়ে বসিয়ে দেন। বুলবুল বাড়িতে বাবু আনে না। ও দু'জন ধর্ম ছেলে পোষে। তারা আমাদের ওপর নজর রাখে।
বুলবুল আমাদের ট্রেনিং দেয়, বিউটি পার্লারে নিয়ে যায়। নামে ক্লাব, কাজে মধুচক্র, সেখানে পাঠায়। কারো কম্প্যানিয়ান করে টুরে পাঠিয়ে দিল। শীলা ভেগে গেছে, তাই আমরা কড়া পাহারায় থাকি। বুলবুলের বাড়ির বাইরে ''ওয়ার্কিং গার্লস হস্টেল'' লেখা আছে। রবীনবাবু কিছু বললে আজও বুলবুল শোনে। মদ খেয়ে বলে, রবীনবাবুর সঙ্গে নাকি ওর ভালোবাসা আজও আছে।
হয়তো আছে। রবীনবাবুকে টাকা তো দেয়।
রবীনবাবুই আমাকে সোনাবাঁধের কাজটা পাইয়ে দেয়। আর এবারে ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে যে দেখলেন, টেম্পোরারি কম্প্যানিয়ন হিসেবে প্রৌঢ়। আধবুড়ো, বুড়োরা আমাকে খুব পছন্দ করে। আমি নাকি মাদারলি স্বভাবের বাঙালী মেয়ে; এখনো তো আরেক প্রৌঢ়ের কম্প্যানিয়ন হিসেবে একটা পাহাড়ী শহরে এসেছি। চারদিনে তিন হাজার, আড়াই বুলবুলের, পাঁচশো আমার।
এটাও আমি জানি, আমি আর পারছি না।
বুলবুলও বলছে, তুমি আর চার্মিং থাকছ না। তোমাকে কতদিন রাখা যাবে তা বুঝছি না।
আর না পারলে কি করব? নমিতা—আলো—শম্পা—শ্রাবণী—বিদিশা—রূপালি, কত নামে কত জায়গায় তো ঘুরলাম। বুলবুল জামাকাপড় দেয়, ভালো খেতে দেয়, ডাক্তার দেখায়, মেকাপের জিনিস দেয়। বলছে, তোমার দাম ঝপ করে পড়ে যাবে। তখন আমার ইনভেস্টমেন্ট জলে যাবে।
মেয়েদের দাম ফুরোলে তখন ও কোনো সস্তার মেয়ে খোঁজা খন্দেররা যেমন ব্রথেলে যায়, সেখানে বেচে দেয়। তারপর কি হয় ধরে নিন। ঠিকানাটা দিলাম না।
আমাকে তো বাঁচাতে পারবেন না।
পুলিসকে জানাব অত সাহস আমার সেই।
সব কথাই লিখে ফেললাম। প্রণাম জানবেন। খুব অন্ধকার লাগলে সুবর্ণ লজ, বাগানটা, বাঁধ ফরেস্ট, এ সব কথা মনে করি। আপনাদের মনে করি।'' —নমিতা।
সুদেব চিঠিটা হাতে করে বসে রইল। ঠিকানা নেই। খামের ওপরে ডাক ঘরের ছাপ অস্পষ্ট। চিঠি লিখেছে খাতার পাতা ছিঁড়ে। কালো রিফিল, সবুজ রিফিল, একদিনে লেখেনি।
সুদেব টেবিলে মাথা নামাল, দু'হাতের মুঠোর ওপর কপাল। নমিতা, নমিতা, মনে খুব তোলপাড় হচ্ছে। পাহাড়ী শহর তো কতই আছে। সুদেব অতীত জীবনে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার জন্যে। সেখানে নিশ্চয় ও আর নেই।
কোথায় সেই মেয়েদের হস্টেল, কোথায় সেই বাড়ি, এ সব খোঁজা তো অবাস্তব। নমিতা যদি চাইত ও সাহায্য করে তবে সে কথা লিখত। নমিতাকে ও সামান্য দেখেছে, যা দেখেছে তাতে মনে হয়েছে সব অবস্থাতেই ও নিজেকে সঁপে দিয়ে বসে থাকে। যেন জলে পড়ে মাথা তুলে দেখেছে স্রোত ভয়ানক প্রতিকূল। ওর পক্ষে স্রোতের বিপরীতে যাওয়া অসাধ্য। তাই ও স্রোতেই নিজেকে সমর্পণ করেছে। ভাসতে ভাসতে তলিয়ে যাবে বলে ধরে নিয়েছে। নমিতার অবস্থায় একজন মেয়ে কতটা অসহায়।
মাদুলির অবস্থায় একজন মেয়েও নিদারুণ অসহায়। কিন্তু ভাইরা হাত ধরলে, সাহায্য করলে, পৈতৃক সামান্য জমিতে নায্য অধিকার দিলে মাদুলিও বুকে জোর পায়।
মাদুলি জানে, সে একলা নয়।
নমিতা জানে, সে একান্ত একলা।
বাপ মেয়েকে বেচে দেয়, এও তো এখন সত্যি।
—ছোড়দা।
সুদেব মুখ তোলে।
—কার চিঠি, কি ভাবছিস?
—না, কিছু না।
—অনেকদিন ধরে তুই অন্যরকম হয়ে গেছিস। আমাকে বল, আমি হাজার হলেও তোর বোন।
—জেনে কিছু করতে পারবি না।
—ছোড়দা, কে কার জন্যে কতটা করতে পারে? তবু মানুষ মানুষকে বলে, খানিক হাল্কা হয়। আমি যেমন তোকে এখন সবই বলি।
—আগে বললে কাজ হোত।
—ও যেমন সেদিন বলল, আমার সঙ্গে আগে অমনটা করেছে, মতিচ্ছন্ন হয়েছিল। আমি বললাম, একদিনের কথা তো নয়। সারা জীবনটা সে—কথা খেয়াল রেখে চলতে পারো, দুজনেই ভালো থাকব। আসলে ও এখন আমাকে খানিক সমীহ করছে।
—ও এর—তার কাছে টাকা নিয়েছে?
—নিশ্চয়। তাতে রাগ করতাম বলেই তো...
—তখন টাকাপয়সা ছিল না। তেমন দেখতে পারেনি দাদা। নইলে তোকে অমন বিয়ে দেয়া ঠিক হয়নি।
...ঠিকভাবে চললে চলেই যেত। আর মা তখন পাগল হয়ে উঠেছিল, সে কথাও ভুলো না। মা এমন করতো যেন আমার বয়স তিরিশ, আর বিয়ে হবে না।
ওই যে সুপ্রিয়া অবনীবাবুর ছেলের সঙ্গে প্রেম করল, সূর্যবাবু ওকে বিয়ে করল না, সুপ্রিয়া ফলিডল খেল? সেই আমাদের বয়সী মেয়েদের যেন—তেন প্রকারে বিয়ে দেবার তাড়া লাগল।
—দিনে দিনে দিন বদলায়। বাঁধবেড়া থেকে মেয়েরা মাধ্যমিক পাশ করছে, কলেজে যাচ্ছে, চাকরিও করছে।
—এখন বল দেখি।
—বলব, পরে বলব। বলার কিছু নেই, বলব।
—হাতিপোতা বেশ দেখলাম গো।
পরিষ্কার তো হয়ই ঘরদোর, পাড়া, দেখার মতো। দীঘিটা দেখার মতো। গৌরীদি চালে খড় দিয়েছে, চৌকি কিনেছে।
—অমরুদের বাড়ি দেখলি?
—না, ওখানেই।
...তুই এখন শুয়ে থাক খানিক।
—আমি তোর ঘরে শোব, তুই?
—লাউঞ্জে। জায়গার কি অভাব?
স্বপন এসে বলে, এমেলের গেস্টরা ফরেস্ট বাংলোয় এসেছেন। বাবুদা বলতে এসেছে, আমরা ছ'টা চিকেন ডিনার, কাল ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ দিতে পারব কি না।
—বাবুদা কোথায়?
—এই যে!
—বাবু, দাম কে দেবে?
—ওঁরাই।
—সেবার এমেলের গেস্ট নিয়ে যা হোল...
এখন আমাদের ক্যাশ সিস্টেম।
দাম দিয়ে যাও, খাবার নিয়ে যাও তোমাদের বাসনে।
বুঝতেই পারছ, এদিক—ওদিক হলে আমি বিপদে পড়ি।
—ছ্যাঁচোড় পার্টি। যাক গে, তাই বলি।
—আমি নিরুপায়। নইলে পারব না।
ঝটপট নিয়ে যেও, আজকের ডিনার পঁচিশ টাকা মাথাপিছু। বোলো বিরিয়ানি, চিকেন মশলা, জিনজার পুডিং।
—ব্রেকফাস্ট?
—স্ট্যান্ডার্ড। পনেরো টাকা। লাঞ্চে মাছ, ভাত, দই। লাঞ্চ কুড়ি টাকা।
—ব্যাপার কি?
—সে সব বলা যাবে না।
মাদুলিও বলে তোরা কি এসব তৈরি রাখিস?
—কেউ তা রাখে এমন জায়গায়?
স্বপন বলে, মাঝে মাঝে ঘটে যায়।
আমিত কাপুর দশজনকে আনল, দিনে খেল, রাতের খাবার তৈরি, পার্টি তো চলে গেল। দাম দিয়ে গেছে। আমিত কাপুরের সব সময়ে আগাম পেমেন্ট। মক্কেল গাঁথে, তারাই দেয়।
খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে মাদুলি বলে, চল বাগানে বেড়াই। আমার দিনটা খুব ভালো কাটল।
ওরা লিলিপনডের ধারে বসে।
সুদেব ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, বলার মতো কি যে আছে।
—বললে তুই শান্তি পাবি।
—কাউকে বলিস না।
—তাই বলি?
সুদেব ওকে নমিতার কথা বলে। নমিতার চিঠির কথাও বলে। মাদুলি মন দিয়ে শোনে।
সব শুনে বলে, আহা।
—কি বুঝলি?
—কি বলব?
—কিছু করা যাবে না। ঠিকানাই তো দেয়নি।
—ঠিকানা পেলে যেতিস?
—হয়তো যেতাম।
—ধর গেলি, তাকে উদ্ধার করলি, তারপর?
—তা তো ভাবিনি।
মাদুলি গম্ভীর, বিবেকের গলায় বলে, তাহলে উদ্ধার বা করবে কেন? সেখান থেকে এনে আবার কোথায় ফেলবে?
তার কি হবে?
—সেও বলেছিল, আমার মতো মেয়েকে কে বিয়ে করবে, আপনিও অন্যরকম মেয়ে খুঁজবেন।
—হ্যাঁ, মেয়েদেরই তো দোষ হয়।
—সেই তো।
—সাহস থাকলে বিয়ে করতিস।
—কি বলছিস?
মাদুলি বলে, কাগজ পড়িস না? এমন মেয়েদেরও বিয়ে করেছে কেউ কেউ। কাগজে তাদের ছবি দিয়েছিল। পড়িসনি তুই।
না, অনেক কিছুই পড়া হয়নি সুদেবের বটেশ্বর লাইব্রেরি থেকে এনে ''পথের পাঁচালী'' যেমন সেদিনই পড়ল।
নীলেন্দুবাবুর বইগুলো পড়া হয়নি। বাংলা কাগজ লজে আসে একটি সেটি নিয়ে গেস্ট, স্টাফ, সকলে টানাটানি করে।
—চল শুতে যাই।
—চল। তবে বিয়ে করতেই হবে ছোড়দা। কাজ করছিস, বাড়ির প্রতি ডিউটি করছিস, কিন্তু এটা তো সব হতে পারে না। ভেবে দেখ, আমাকে নিয়ে ভাবনা ছিল। আমার জীবনে যা হয় ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। দাদা বউদির নিজের জীবন আছে। এবার সন্তানটি হলে তো আরোই জড়িয়ে পড়বে। মা আর কতদিন। নিজের কথা নিজে ভাব ছোড়দা।
—মীনার কি আবার...
—হ্যাঁ। ওকে খুশি খুশি দেখছিস না কিছুদিন?
—এটা একটা সুখবর।
—আমিও খুব খুশি।
—বিয়ে করব, অজানা অচেনা কোনো মেয়ে... আমার একটা ক্রিমিনাল পাস্ট আছে, সেটা না জানিয়ে আমি এগোব না। সেটা জানলে কোন মেয়ের অভিভাবক রাজী হবে?
—সত্যিই কি আছে?
—নিশ্চয়।
মাদুলি ঈষৎ হেসে বলে, দাগী একটা মেয়ে খোঁজ।
—যথেষ্ট হয়েছে, শুতে যা। কাল জলধরের সঙ্গে চলে যাবি। বাস তো এখন বকুলতলা অবধি যাচ্ছে।
—তোর সাইকেলে চেপে এলাম, যাবও তোর সাইকেলে। জলধর পৌঁছে দেবে।
মাদুলি হাই তোলে।
—তোর জন্য চিন্তা হয় ছোড়দা।
—অনেককাল বাদে দু'জনে এত কথা বললাম। চিন্তাটা এখন নিজের জন্যে কর। তুই যা। আমি সব ঘুরে—ঘেরে দেখে যাই। ডিউটি।
—যা। আমার ঘুম পাচ্ছে।
মাদুলি ঘরে চলে যায়।
ক্রমে পুজো এগিয়ে আসে।
পুজোর সময় থেকে এপ্রিল অবধি সোনা বাঁধে টুরিস্ট বোঝাই থাকে। সাতদিন লজ বন্ধ রেখে লজ রং করানো হয়। সুবর্ণ লজ ঝক ঝকে হয়ে যায়।
বাগানের শিউলিগাছ দুটোতে এবার প্রথম ফুল ফোটে। স্থলপদ্ম ফুলগাছ আলো করে রাখে। বাঁধের গা দিয়ে কাশফুলের ঝাড়। আকাশটা খুব নীল হয়ে যায়।
একদা বাঁধবেড়াতে স্বরূপবাবুদের বাড়িতে একটি পুজো হোত। এখন দুর্গাপুজো দুটি হয়। স্বরূপবাবুর বাড়ির পুজোটাকে তার মধ্যে ধরা হয় না। উত্তর বাঁধবেড়া ও দক্ষিণ বাঁধবেড়ায় দুটি বারোয়ারি পুজো। অবনীবাবুরা আছেন, উত্তর বাঁধবেড়ায় দুর্গাপুজোয় যাত্রা উৎসবও হয়।
সোনা বাঁধে পূজা হয় না, তবে পিকনিক স্পট, বাঁধের ধার, সর্বত্র আলোকসজ্জা হয়। বটেশ্বরে তিনটি বারোয়ারি পুজো, তার জাঁকজমক বেশি, উৎসবের আনন্দের গান—নাচের ঋতু এটা।
আশপাশের গ্রামে চলে বাঁধনা। দাঁসায় নাচের প্রতিযোগিতা সাঁওতালী যাত্রা হয়, ওদের একাঙ্ক প্রতিযোগিতা হয়। বাঁধনা যাদের যেমন সুবিধে, আগে পরে করে চলে। ওদের নাচ, যাত্রা, থিয়েটারে হাজার হাজার লোক চলে আসে।
এভাবেই বাতাসে বাজে বাজনা, বাতাসে লাগে হিম। রাতে বাগানে টর্চ ফেলে ঘুরতে ঘুরতে সুদেবের মাঝে মাঝে মনে হয়, নমিতা বেঁচে থাকলে ওকে হয়তো লিখত আরেকটা চিঠি। নমিতা যদি মরেও যায় সে কথা কাগজে বেরোবে না। এ রাজ্যে এখন কত মেয়ে প্রত্যহ বিক্রি হচ্ছে, স্বেচ্ছায় অন্নের জন্য লাইনে আসছে কে খবর রাখে। উচ্চকোটির সমাজের মেয়ে—বউরা বাঁচার মতো টাকা নয়, ভোগবিলাসের অনেক টাকার জন্য, অথবা বিকৃত রুচির তাড়নায় বিলাস—বহুল ফ্ল্যাটে নিজেদের বিক্রি করেছে।
গ্রাম—সমাজে ছেলেরা বহুবিবাহকে পেশা করে ফেলেছে। বধূ হত্যা এখন ভারতীয় ঐতিহ্য হয়ে গেছে।
সুদেব এখন কাগজ পড়ে, খুঁটিয়ে পড়ে। সেদিনই পড়ল, নারী ধর্ষণ ক্ষেত্রে পুলিসের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হোল, মেয়েটি চরিত্রহীনা। আর পুলিস নিজেও নারী ধর্ষণে অন্যতম প্রধান এই যখন বাস্তব, সেখানে নমিতার কথা কে ভাবে? সুদেব মেয়েদের এমন অবস্থার কথা এমন করে কখনো ভাবেনি আগে। এখন মনে হয়, খুব মনে হয়। পুজোর বোনাস চাই বলে গেল মোহর, অপরূপবাবু বলল, এ বছরটা তেমন...
সুবর্ণ বলল, তোমার সুবচ্ছর কোনোদিন আসবে না। দেবুর জীবন থিতু হয়েছে, ও বৌমাকে নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে যাচ্ছে। বড় খুকির মেয়ে ''বসে আঁকো''তে প্রাইজ পেল, ছোট খুকির মেয়ের পর খোকা হোল, আর কি চাও?
অপরূপবাবু ওদের এক মাসের টাকা দিতে রাজী হোল কিন্তু এমন হাহাকার করতে লাগল যেন ওর সর্বস্ব চুরি গেছে।
—এরপর ইউথ হস্টেল করবেন।
—হয় ইউথ হস্টেল, নয় চীনাবাদাম চাষ।
সুবর্ণ বলল, ঢং! দুটো যেন এক হোল।
অপরূপবাবু বলল, সবই হোল কত খাটাচ্ছ কত রিটার্ন পাচ্ছ। বাদাম বলো, স্কুল কলেজের ছেলে বলো...
সুবর্ণ গভীর বিশ্বাসে বলল, সময় দেবুর ফিরেছে। তোমারও এখন আট বছর সাত মাস সুসময় থাকবে।
—তোমার?
আমারও ভালো যাবে। অ ছেলে, এবারে আমাদের পুজোর পালা পড়েছে।
এবারে বড় ইচ্ছে ধুমধাম করি।
অপরূপবাবু বলল, চলো চলো তো।
খরচার এত পথ ভেবে বের করতে জানো?
—কেন করব না? বাবা আমাকে ভিখিরি দেখে বিয়ে দেয়নি। তোমার যা হয়েছে সব আমার পয়ে।
সুবর্ণ সুদেবকে শার্ট ও প্যান্টের কাপড় দিল। প্রথম বছর থেকে দিচ্ছ।
সুবর্ণ মনে রেখেছে সুদেব ওকে সেদিন বাঁচিয়েছিল।
এটাও অদ্ভুত লাগে সুদেবের। আজকাল এসব মনে রাখারাখি তো উঠেই গেছে। অপরূপবাবু ভুলে যেতে চায় সুদেবের চেষ্টা ও শ্রম না থাকলে সুবর্ণ লজ এত নাম করত না। সম্ভবত সুবর্ণ ভুলতে দেয় না। তাছাড়া, অপরূপ কন্ট্রাক্টর, ঝানু ব্যবসাদার।
কিন্তু বৈদ্যনাথ দত্ত মঞ্জন দিয়ে দাঁত মাজে, জিভ ছোলা দিয়ে জিভ চাঁছে।
মাটিতে বসে ভাত খায় বাড়িতে। মদ, মেয়েছেলে, হিন্দী ফিল্ম, পর্ণো ভি.ডি.ও. পরিহার করে চলে।
ওর মধ্যে প্রাচীন বাঁধবেড়ার জমিভূমিবান বটব্যাল ঐতিহ্য রয়ে গেছে। অব্রাহ্মণের হাতে অন্ন খায় না। বাড়ি থেকে রান্নার বামুন সহ ভারতভ্রমণ করে। বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।
অপরূপ বটব্যাল, আমিত কাপুরের মতো স্মার্ট ও চলতাপুরজা নয়, হতে পারেনি।
তবে ব্যবসা বোঝে। কাজ পেতে হবে, ''মিষ্ট কথায় কষ্ট নেই'' নীতিতে বাবা—বাছা বলে কাজ তুলে নেয়।
সুদেব শেষ আঘাতটি হানে।
—স্টাফের মাইনে কিছু বাড়ালে ভালো হোত। ওদের মতো বিশ্বাসী কর্মঠ লোক তো পাবেন না।
—হবে, হবে সুদেব। সব হবে।
অপরূপবাবু চলে যায়। সুবর্ণ বলে যায়, তুমিও বিয়ে করো, অ ছেলে বয়স তো হোল।
—চলো চলো। আজকালকার ছেলে কি ধপ বলতে ঝপ করে বিয়ে করে? এটাও বলতে হবে, অপরূপবাবু বউগত প্রাণ। বটেশ্বর, রাণীপুর, বাঁধবেড়াতেও দর্জিরা পুজোর বরাত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মাদুলির ঘরটি তোলা হয়ে গেছে। শেষ অবধি ঘরখানা মন্দ হোল না। দাওয়াটি চওড়া। এক পাশে রান্না, অন্য পাশে শাশুড়ির খুপরি ঘর। মাদুলিদের বড় ঘরের একদিকে বেড়ার দেওয়াল পড়ল।
ধান—চাল—ছাগল সব ওদিকেই থাকবে।
ভূদেব বলল, খড়ের চাল হোল, খরচ কম হোল না। তুই টিনের চাল করে নিস। দরজা—জানলা মীনার মার কাছে কেনা গেল। পুজোর পরে মাদুলি নিজের ঘরে উঠে যাবে।
পরিমল অনেক নতিস্বীকার করে আসছে। এবারে সাইকেল ওকে দিতেই হবে।
পুজো বোনাস থেকেই সাইকেল হবে।
এসব ভাবনায় সুদেব যখন খুব ব্যস্ত, তখন একদিন ওকে অবাক, অবাক করে নমিতা এল।
প্রথম দিনের মতো পরনে ছাপা কাপড়, চুলে বেণী, কাঁধে ব্যাগ। ব্যাগটা বেশ বড়সড়।
—আপনি!
—আসতে নেই?
খানিকটা শীর্ণ, চোখ একটু বসে গেছে। হাতে একটি সস্তা কোয়ার্টজ ঘড়ি।
—একা এসেছেন মনে হচ্ছে।
—হ্যাঁ, একাই এসেছি। শুনুন, আমি তিন—চারদিন থাকব। আপনাদের লজের ভাড়া তো অনেক। থাকার কি ব্যবস্থা হবে কোনো?
—না হলে কোথায় যাবেন?
—বটেশ্বরে তো হোটেল আছে।
—সেখানে থাকতে পারবেন না। না, লজেও হয় না। কিন্তু একটা ব্যবস্থা আছে।
—ঘর পাব?
—পাবেন। পাখা পাবেন না। ক্যাম্প—খাটে শোবেন।
—নিয়ে চলুন না আমাকে।
নমিতার আসাটা আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত। সুদেব ওর কথা শুধু ভেবেছে আর ভেবেছে এতদিন ধরে।
সে কথা বলা গেল না।
নমিতাকে ও উদ্ধার করতে রাজী ছিল।
সে কথা বলা গেল না।
মোহর ও বিবির ঘর সব চেয়ে শেষে।
মাঝের ঘরে স্বরূপ ও জলধর থাকে। এ পাশের ঘর দুটি তেমন দরকারে গেস্টকে দেওয়া হয়।
সুদেব তালা খুলল, জানলা খুলে দিল।
—পাখার সীজন নয়...
—কিচ্ছু লাগবে না...ভাড়া কত হবে?
—যা হয় হবে। ভয় নেই, দিতে পারবেন।
দুজনে দুজনের দিকে তাকাতে লজ্জা পাচ্ছে এখন!
—ক্যাম্পখাটটা পেতে দেবে? আমি একটু ঘুমোতাম।
—দেবে। আমার বাথরুমে স্নান করুন কিছু খান। তারপর ঘুমাবেন। আপত্তি আছে?
টিনের চেয়ারে বসে পড়ে নমিতা।
—খেতেও তো পয়সা লাগবে।
—কত আছে আপনার কাছে?
—শ' দুই হবে।
—আমাকে দিন।
—তারপরে?
—ঠিক ঠিক পেমেন্ট হয়ে যাবে।
—সব যে ফুরিয়ে যাবে।
—আবার চলে যাবেন, এই তো?
নমিতা চোখ তোলে।
—হ্যাঁ যাব...
—তখন টাকা দেব। শুনুন, আপনি তো এখানে এসেছেন। অত ভাববেন না।
—না, ভেবে করব বা কি! ভেবে লাভ নেই, তাই না। ভেবে কিছু হয় না।
—উঠুন।
—আমি...গামছা সাবান কিছু আনিনি।
—সব বাথরুমে আছে। দাঁড়ান।
বেরিয়ে আসে সুদেব। বিবিকে ডাকে।
—বিবি—দি! এনাকে আগেও দেখেছ।
—দেখেছি। এ কি চেহারা করেছ দিদি?
—অসুখ হয়েছিল বিবি—দি।
—বি—বি—দি জলধরকে বলো ঘরটা পরিষ্কার করে দিক। বিছানা দেবে, খাবার জল..বিবিদি উনি চান করবেন।
একটু চা রুটি দাও। ঘরেই খাবারটা দিও।
—দিচ্ছি। তুমি যাও।
—দাঁড়ান।
নমিতা জামার ভেতর থেকে রুমালে মোড়ানো টাকা দেয় সুদেবকে। তারপর ব্যাগটি খোলে। জামাকাপড় নেয়। বিবি বলে, কোথা চান করবে গো দিদি?
সুদেব বলে, আমার বাথরুমে যান এখন।
—ওখানে কাপড় কাচার সাবান আছে। তাড়াতাড়িতে...যা পেলাম তাই নিয়ে... হঠাৎ সুদেব বোঝে, নমিতা এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না! বিশ্বাস করতে পারছে না ও এখানে এসেছে। বিবির চোখে কৌতূহল।
—তুমি খাবারটা দেখ বিবিদি। জলধরকে...আপনি আসুন, স্নান করুন।
বেরিয়ে এসে সুদেব নিচু গলায় বলে, হঠাৎ এসেছেন, কিছুই জানি না। তবে বিবিদি বা কারো সামনে এমন কোনো কথা বলবেন না, যাতে ওদের কৌতূহল হয়।
—আমি...আমি...
—পরে হবে। শুনুন, আমি আছি, আপনার কোনো ভয় নেই। বুঝেছেন?
—কিন্তু...
—ভয় নেই।
নমিতা বাথরুমে ঢুকে যায়।
জলধর মন না করলে কিচ্ছু পারে না, মন করলে সব পারে। ''নমিতাদিদি'' এসেছে শুনে, সুদেবের চোখমুখ থমথমে দেখে জলধর ঝাঁটা নিয়ে দৌড়ায়।
স্নান করে, জামাকাপড় কেচে নমিতা বেরিয়ে আসে। তারপর কাপড় মেলতে চলে যায়।
বিবি চা, রুটি তরকারি নিয়ে আসে।
—খান।
নমিতা খেতে থাকে।
—কাল খাননি বোধহয়?
নমিতা শিউরে ওঠে।
—খেয়ে দরজা ভেজিয়ে শুয়ে থাকুন।
বিবিদি খাবার দিয়ে যাবে। খেয়ে আবার ঘুমোবেন।
—আপনি...?
—আমি আমার ঘরে আছি।
—ঘরটাও চেয়ে দেখলাম না। ঘরটা তেমনি আছে, না?
—বিকেলে দেখবেন।
কিচ্ছু দেখে না নমিতা। সকালে ঘুমোয়, দুপুরে ঘুমোয়, সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে ওকে তুলে দেয় গৌরী।
—ওঠো চুলটা বেঁধে দিয়ে যাই।
—দাও গৌরীদি।
—এমন চেহারা করেছ কেন?
—অসুখ করেছিল দিদি।
—থাকো, খাও, শরীর সারো। পুজোতে কত ধুমধাম হবে, কত গেস আসবে, ঘরে সিনেমা চলবে।
—আবার ঘুম পাচ্ছে।
আবার ঘুমোয় নমিতা। বিবি ডাকতে উঠে ভাত খায়। ও বাথরুমে গেলে সুদেব বলে, বিবিদি ওর দেহটা তো ভালো নেই। আজ রাতটা যদি এ ঘরে শোও।
—তা শোবো। তুমি বলছ আমি শোবো।
সুদেবের প্রতি স্টাফের এই আনুগত্যটা অপরূপবাবুর তেমন পছন্দ নয়। সুদেব মাঝে মাঝে ওঁর আহত অহংবোধে মলম মাখায়।
আমি আপনার কর্মচারী। ওরা আপনার সঙ্গে বলবে, সে সাহস তো নেই! আমি ওদের নিয়ে পড়ে আছি, ওরা আমাকেই সব বলে টলে। আপনি শুধু দেখবেন আমরা সার্ভিস দিচ্ছি কিনা। আপনি তো যখন—তখন চলে আসেন। ওদের কোনো গাফিলতি দেখেছেন কাজে?
—না, তা মানতেই হবে।
নমিতা ফিরে আসে।
সুদেব বলে, ঘুমোন। রাতে বিবিদি থাকবে। নো—পাওয়ার বালব জ্বলবে নিশ্চিন্তে ঘুমোন।
—হ্যাঁ, ঘুমোই।
নমিতা ঘুমিয়ে পড়ে। সুদেব বেরিয়ে আসে। কতদিনের অপূর্ণ ঘুম জমা হয়েছিল কে জানে।
জলধরকে বলে, তোরা বাবা আজ রাতটা, এই দিদি যে ক'দিন থাকবে, রাতে রেডিও জোরে বাজাস না।
—রেডিও তো বাজাই না, বাঁশি বাজাই।
—বাবার মতো পারিস।
—শিখছি।
জলধরের বাঁধবেড়া আদিবাসী ক্লাব দাঁসার নাচের প্রতিযোগিতায় তিন বছর প্রথম হয়েছে।
সুদেব ঘরে বসে ঠিক করে, কালই বড়বাবুকে জানাতে হবে যে তার একজন আত্মীয়া এখানে আছেন, কম ভাড়ার ঘরে আছেন। ভাড়া, খাবারের দাম, সার্ভিস চার্জ সুদেব বিল করে নিজে দিয়ে দেবে। নমিতাকে নিয়ে কোনো কথা হতে দেবে না ও।
পরদিনও ঘুমে ঘুমে যায়। সেদিনই আমিত বলছিল, ওর দাদা কাজের খাতিরে প্লেনে পৃথিবী ঘোরেন ও বাড়ি ফিরে কয়েকদিন ঘুমোন। তার নাম জেট ল্যাগ।
নমিতা নিশ্চয়ই ভীষণ ঘুরেছে, নিজেকে অতিরিক্ত খরচ করেছে, তাতেই এত ক্লান্ত। তার পরদিনও নমিতা সন্ধ্যায়, নতুন গেস্ট এক নব দম্পতি, দুই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা এবং দুটি রামভক্ত স্ক্রীপ্ট লেখক তরুণ (যারা বোতল বোতল রাম খেয়ে গেল সমানে), এদের চোখের সামনে বেরিয়ে বাগানে বসল।
সুদেব বলল, চলুন বাঁধের ধারে যাই।
—চলুন।
—হাঁটতে পারবেন?
—দেখি। না পারলে বসে পড়ব।
—থাক, এখানেই বসুন।
লাউঞ্জে ওরা ''ত্রিদেব'' বা ''ত্রিদেবা'' দেখছে। ছবির কোলাহলে সব গমগম করছে। স্বপনা, জলধর, সবাই সেঁটে বসে আছে। সেটাই স্বাভাবিক।
—এখানেও ক্যাসেট ফিল্ম?
—গেস্ট হাউস বলে কথা। এখনকার গেস্টদের রকম রকম রুচি। ক্যাসেট যে—যার মতো এনে দেখতে পারে। রাত বারোটা অবধি। দেখলে কমার্শিয়াল ছবি। অন্যরকম নোংরা ছবি আমরা অ্যালাও করি না।
—কটেজে তো দেখে।
—সেই বৃদ্ধ দেখত?
—অবশ্যই।
—কটেজে দরজা বন্ধ করে নিজে দেখলে আমরা কি করব। জানতে পারলে নিশ্চয়ই কিছু বলা যেত। সুবর্ণ লজটাকে লোকে মনে করে পরিবারবর্গ নিয়ে থাকার মতো জায়গা। সুবর্ণ লজের বাড়বাড়ন্ত লোকের ঈর্ষাও আছে। তাহলে এ জায়গার বদনাম করতে পারলে তাদের লাভ। যতটা সম্ভব দেখে চলি।
—বদনাম তো আমার জন্যেও হতে পারে।
—কি করে হবে? মনিবকে জানিয়েছি আপনি আমার আত্মীয়া। আপনার খরচপত্রের দায়িত্ব আমার।
—তা কেন, আমি তো টাকা...অবশ্য সামান্য দিয়েছি....
—বিল হবে, রসিদ পাবেন। দুশো টাকাকে অত কম মনে করছেন কেন?
দুশো পাব জানলে আমি রড নিয়ে গ্যাং ফাইটে নেমে গেছি এক সময়ে।
—মনে হয় না।
—সত্যি। কিন্তু...বলুন তো...চিঠি লিখলেন যদি ঠিকানা দিলেন না কেন? কেন আমাকে মানসিক যন্ত্রণায় রাখলেন। আর এলেন যদি, এমন দেরি করে এলেন কেন?
নমিতা আস্তে বলে, ঠিকানা দিলে বা কি করতেন?
—উদ্ধার করতাম, নিয়ে আসতাম।
—আমি তা আশা করিনি।
—তবে লিখেছিলেন কেন?
—দেখুন...মানুষ মরতে মরতেও ভাবে, তার কথা কাউকে বললে শান্তি পাবে।
আপনি ছাড়া কাকে লিখতাম? আমার আগেকার জীবনটা তো চলে গেছে।
ওখানে যাবার জায়গাই নেই। দিদি, রুনকি, যে—যার জীবনে যেমন হোক আছে। কোথায় যাব? বাবা...বাবার কাছে?
—ঠিকানাটা দেবেন তো।
—আপনি বলছেন, এত দেরি করি কেন এলাম। আগেই ঠিক করেছিলাম, ধরেই নিয়েছিলাম, এ ভাবেই আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে। মরেই যেতাম।
বাঁচার ইচ্ছেটা ফিরল যখন, তখন মনে হোল, একবার যাই। মনে খানিক জোর পাব, হয়তো চোখেও দেখতে পাব কোনো পথ। না—এসে পারব ভেবেছিলাম, পারলাম না।
—কিছুই বলেননি কিন্তু।
—বলার খুব নতুন কিছুতো নেই।
দার্জিলিং থেকে লিখেছিলাম। তারপর বুলবুল তো খুশি ছিল না। রবীনবাবুকে বললাম, আপনি যেমন হোক একটা কাজ জোগাড় করে দিন আমাকে।
ওখানে মিতালি আমাকে বলেছিল, এরা যেখানে পাঠাক, নিজেদের চক্রের মধ্যে রাখবে। বাইরে বেরিয়ে গিয়ে আমরা এদের কথা পাঁচজনকে জানিয়ে দেব, সে সহ্য করবে না।
—ঠিকই বলেছিল মেয়েটি?
—আমাকে বাঁচাবে কে! রবীনবাবুকে আমি আবার বিশ্বাস করলাম।
রবীনবাবু বলল, যে ডাক্তারবাবু তোমাদের দেখে শোনে, বুলবুলের ডাক্তার! ওনার নার্সিংহোমে দিতে পারি। কাজ শিখবে, রোগীর সেবা করবে, খাবে থাকবে, কাজ শিখলে মাইনে।
—আপনি বিশ্বাস করলেন?
—করলাম। শরীরে বয়না, মন ভেঙে গেছে। ভাবলাম এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে কাজ করলে হয়তো পথ পাব।
বুলবুল আপত্তি করল না। তবে বলল, কাপড় সব নিও না। যেমন যেমন দরকার নিয়ে যেও। আমি তখন আর ভাবতে পারি না। যা বলে তাই বলুক, বেরিয়ে তো যাই।
—রবীনবাবুই নিয়ে গেল?
—হ্যাঁ। মেটেবুরুজ জানেন?
—জানি।
—সেখানে নার্সিংহোম। আছি, আছি।
ডাক্তার বলল, দু'একদিন যাক, সব বুঝিয়ে দেব। নিচে দু'ঘরে কেবিন কয়েকটা। ওপরে দুটো ঘরে নার্সরা থাকে। আমাকেও সেখানে রাখল। তিনদিন বাদেই জানলায় বসে আছি, দেখলাম বুলবুল ডাক্তারকে নামিয়ে দিয়ে গেল।
—যোগাযোগটা ওরা ছাড়েনি।
—তারপরেই জানেন, কি করে সাহস পেলাম, ব্যাগে যা হয় ভরে নিয়ে নেমে এলাম। ডাক্তারের কাছে রোগীও ছিল।
বললাম, আমি এখানে থাকব না।—
ডাক্তার কি বলবে সে জন্যে দাঁড়াইনি।
নেমে এসেই যে মিনিবাসটা পেলাম চেপে বসলাম। বাস পৌঁছল ডালহৌসি। সেখান থেকে হাওড়া। তারপর কোনো দিকে তাকাইনি।
—ওরা খুঁজবে না?
—সেইতো আমার ভয়, ভীষণ ভয় ছিল সুদেববাবু। কিন্তু ভয় করতে করতে ভয়ের বোধ হারিয়ে যায়।
—হয়তো।
—আপনি কখনো ভয় পান নি?
—নিশ্চয় পেয়েছি, এখনো পাই। কিন্তু শুনুন, এখানে তো বাইরে থেকে লোক আসেই। কে দেখবে, কে চিনবে...
আপনি যতটা সম্ভব ঘরেই থাকুন। অত ভয়ের কিছু নেই। আপনি পুলিসে যেতেন, ওরা ঘাবড়াত।
—এই যে বললাম, এও তো অনেকদিন ধরে হোল। একদিনে তো হয়নি। ঘুম আমার হোত না, মনে হোত হবে না।
কিন্তু দেখুন এখানে এসে থেকে কি ঘুম ঘুমোচ্ছি।
—ঘুমোন। ঘুমিয়ে সুস্থ হওয়াই দরকার।
—তারপর? তারপর কি করব?
—ভাবা যাবে। চলুন।
—গৌরীদির জীবন বেশ সহজ, তাই না?
—আজকাল কারো জীবনই সহজ নেই।
দেখতে সহজ লাগে। চলুন, ঘরে চলুন। এখানে হিমটা আগেই পড়ে। ঠাণ্ডা লেগে যায়।
নমিতা নরম গলায় বলে, সেবারে এখানকার কোন এক আশ্রমের লোকরা এসেছিলেন। জলধর বলেছে সেখানে মেয়েরা থাকে, তাঁত বোনে, পুজো করে, তেমন জায়গায় আমার ঠাঁই করে দিন না। এখানে ক'দিন থাকা যাবে?
—দেখা যাবে। ঘরে চলুন।
—ভাবতে ইচ্ছে করে, যে কাজ দিল করলাম। তারপর একটা নিজের ঘরে থাকলাম।
—আপনাকে জলধর রামাশ্রয় আশ্রমের কথা বলেছে। ওখানে খোঁজ নিয়ে দেখব।
—হ্যাঁ...ঘরে যাই এবার। এই জায়গাটাই আমার পছন্দ খুব। এই আশ্রম তো কাছেই।
—হ্যাঁ।
—গ্রামই তো ভালো লাগত। এখনো লাগে।
আসলে মানুষ আজকাল ঝামেলা বাঁচিয়ে থাকতে পারবে না।
পরদিন অপরূপবাবু আসে। সুদেবকে কটেজে ডাকে।
—কি লিখেছে? কে এসেছে তোমার?
—আমার আত্মীয়া।
—তোমার আত্মীয়া। তোমাদের সবংশে চিনি। তোমার আত্মীয়া, এখানে এসে থাকছেন...?
—ওই ঘর তো ভাড়া দেয়াই হয় সীজনে।
ভাড়া দিয়ে আছেন, পয়সা দিয়ে খাচ্ছেন।
—সে কথা নয়, সে কথা নয়। কথা হোল সেদিনে আমার বাসেই এসেছেন। ড্রাইভার বলল, কোনো মন্দ ভাবে বলেনি, যে উনি সিনেমা করতে এসেছিল, ওরা শুটিং দেখেছে। আবার সেদিনে বাসে ডাক্তারও ছিল। সে বলল, মেয়েটা জলে ডুবে গেছল, ও চিকিৎসা করে।
—তাতে কি হোল?
সিনেমা করছিল, না জলে ডুবে গেল?
—সিনেমার জন্যেই জলে ঝাঁপ দেয়, তারপর ডুবে যেত। ওকে তোলা হোল।
—সে তো আমি জানি। তখনি শুনেছি।
—আপনার প্রশ্নটা কি?
—একলা মেয়েছেলে...তুমি বলছ আত্মীয়া এতেই আমি অবাক। তুমি তো কোনোদিন...
—একলা স্ত্রীলোক কি সুবর্ণ লজে থাকে না? বুকিং করে পাঠান না? এ কি নতুন?
—সুদেব, সুদেব, আমি তোমায় মন্দ ভাবে বলছি না। আসে বটে, কিন্তু রিটায়ার টিচার, ডাক্তার...বয়স্কা মেয়েছেলে—তোমাকে আমি...
—আর কিছু বলবেন?
—সুবর্ণ লজ তোমারি হাতে...
—ভাববেন না। যদি বুঝি যে আমার দ্বারা সুবর্ণ লজের কোনো দুর্নাম হচ্ছে, আমি ছেড়ে দেব।
—কি বললে?
—ছেড়ে দেব।
—ছেড়ে দেব! দাও! ভালো কথার কি জবাব! ছেড়ে দেব! বলতে একটু ইয়েও হয় না! দেখ সুদেব! আমার কথা পরিষ্কার। বলেছি ভালোভাবে। বলেছি তোমাকে ইয়ে করি বলে। বলাটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, ছেড়েই দাও।
তবে এ কথাতেই ছেড়ে দিলে ধর্ম করবে না।
রাগে অপরূপবাবুর চিবুক কাঁপে।
—যাও! বোগাস ছেলে তুমি। হটচটকা ক্ষেপে যেতেই জানো। হতেই হবে, ছাড়া ঘুড়ি যে! সংসার ধর্ম করলে পাঁচদিক ভেবে কথাবার্তা বলতে, বুঝতে। অপরের ব্যাপারটা তুমিই বোঝই না।
—আমি...স্যরি স্যার!
—ওই এক বাক্য ''স্যরি''! স্যরি বললেই সব হয়ে যায়। কলকাতায় মার্কেটে গেলে সব ব্যাটা পা মাড়িয়ে দেয় আর ''স্যরি'' বলে। কেন বলেছি, ভেবে দেখো।
—খুব দুঃখী মেয়েছেলে স্যার!
—তাই যদি হয়, কাজ দেখে দাও, সাহায্য করো। ঘাড়ে নিও না সুদেব। ভালো মানুষরাই বিপদে পড়ে।
—হ্যাঁ স্যার, মনে রাখব।
—এবারে সংসারী হও। ফ্যামিলি কোয়াটার করে দেব। নয় বউকে দেশে রাখবে, যাবে—আসবে।
—এদিকে কাজের কি হবে?
সুদেব বুঝতে পারে, চীনাবাদামের চাষ করবে না অপরূপবাবু। ইউথ হস্টেল করবে। তার জন্য আলাদা স্টাফ রাখবে না, এদিকে স্টাফ সামান্য বাড়াবে।
একজন অ্যাসিস্টান্ট নিয়ে সুদেব ওদিকে দেখবে। একটা দারোয়ান, একজন সুইপার, একটা বয় বাড়বে। সনাতন কিছু বেশি টাকা পাবে, জল দেবে।
অপরূপবাবুর উদ্বেগ সত্যি। কিন্তু নিশ্চয় কোনো লোক কান ভাঙিয়েছে। এ সব হবেই। নমিতা যেহেতু অসহায়, সেহেতু তার বিষয়ে কথাবার্তা হবে। নমিতার মুখও ঠিক অচেনা নয়। শুটিংয়ের সময় অনেকেই ওকে দেখেছিল।
রামাশ্রয় স্বামীর নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত চালকুড়া গ্রামে প্রাক্তন জমিদারদের দানে ধ্যানে আশ্রমের সূচনা। বর্তমান অধ্যক্ষ ধর্মাশ্রয় স্বামী। তিনি ছেলেদের এক আবাসিক স্কুলও চালান। সেবাপ্রাণা নারীআশ্রম চালান। নারীআশ্রমে বয়স্কা মেয়েরা আজীবন আশ্রম সেবাকার্য করবে বলে কথা দেয়। নিরাশ্রয়, স্বামী—পরিত্যক্তা, বিধবা, পুলিস রেইডে পতিতালয় থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তা ষাটজন বিভিন্ন বয়সী স্ত্রীলোক তাঁত বোনে, আচার বানায়, হজমি বানায়। সে সব বিক্রি হয়।
আছে ছোটছেলে ও মেয়েদের আলাদা অনাথাশ্রম। আছে মেয়েদের আবাসিক স্কুল। এ ছাড়া ডেয়ারি, সবজির বাগান, ধানক্ষেত আছে। স্কুল দুটি থেকে প্রতিবার ছেলে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করে। বিশাল গেটের ওপর সিমেন্টের হরফ বসানো, ''কর্মেই জীবনের আশ্রয়''।
—স্বামী রামাশ্রয়।
ধর্মাশ্রয় বলেন, আমাদের মূল আশ্রম হিমাচল প্রদেশে। রাঁচিতেও আশ্রম আছে। আপনার আত্মীয়া এখানে থাকলে থাকবেন। আশ্রয় প্রার্থীকে আমরা ফেরাই না। তবে কাজ করে থাকতে হবে।
—যাঁরা কাজ করতে করতে বুড়ো হয়ে যান?
—তাঁদেরও ব্যবস্থা আছে।
ধর্মাশ্রয় বলেন, আশ্রম দেখলেন, ব্যবস্থা জানলেন। দেশ ও বিদেশ থেকে ভক্তরা ডোনেশান দেন! কয়েকটা ব্যাপারে ভারত সরকারের সাহায্য পাচ্ছি। গ্রামোন্নয়ন কাজও হচ্ছে। ডেয়ারিতে, বাগানে, ক্ষেতে গ্রামবাসী কাজ পাচ্ছে। এ সব উন্নয়ন গত দশ বছরের মধ্যে হয়েছে।
—কি করতে হবে? ওঁকে নিয়ে এলেই হবে?
ধর্মাশ্রয় ঈষৎ হাসেন, বুঝিয়ে দেন সুদেব কত অজ্ঞ!
ওঁর নাম, বর্তমান ঠিকানা, এখানে আসার কারণ, সব লিখে আনবেন। ফর্ম দিয়ে দিচ্ছি, তাতে এখানে থাকার নিয়মাবলী আছে, সেগুলো পূরণ করবেন। আজীবন কুমারী থাকতে হবে, তাও জানালাম, লেখাও আছে। আশ্রমের নিয়মভঙ্গ করলে আমরা আশ্রমে রাখি না। আহার নিরামিষ, থাকবেন ডর্মেটরিতে, পরবেন সকলের মতো গেরুয়া লাল পাড় কাপড়। আর কাজ করবেন।
নামিতা ঘাড় কাত করে।
—ভিজিটর আসতে পায় না।
—বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না?
—না। আশ্রমের জীবন, আশ্রমেরই জীবন। এতজন স্ত্রীলোকের ব্যাপার, এসব কড়াকড়ি আমাদের রাখতেই হয়। সুদেব ও নমিতা বাসে ওঠে। রামাশ্রয় আশ্রমের কারণে এই অবহেলিত আদিবাসী অঞ্চলে পাকা রাস্তা হয়েছে, ডাকঘর বসেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, সবই হয়েছে। সমবায় মৎস্যচাষ অফিসও দেখা যায়। বাসে একজন বলে, চালকুড়া বললে কেউ বোঝে না। সব ''আশ্রম'' বললে বোঝে। ওদের গেস্ট হাউস, নিজেদের হাসপাতাল কি নেই?
এবারে কুষ্ঠ হাসপাতালও করবে।
স্থানীয় লোকের মনে সভয় সমীহ।
—শিবচতুর্দশী, রামনবমী, মিছিল যা করে তা দেখার মতো। খুব প্রতিপত্তি ওদের।
সোনাবাঁধে ফিরে নমিতা ঘরে চলে যায়। সুদেবও খুব নির্বাক হয়ে যায়। যেখানে ছিল সেখানকার মতো পণ্য হবে না। কিন্তু নিজস্ব জীবন বলে তো কিছুই থাকবে না।
আশ্রমে ঢুকে যাবে, বাইরের জগতকে চিরতরে ত্যাগ করে? আশ্রমের নিরমাবলীতে লেখা আছে সব। ভোর পাঁচটায় ওঠো, স্নান ও প্রাতঃকৃত্য, ধর্মোপাসনা জলযোগ, কর্মশালায় আটটা থেকে বারোটা। দুটো থেকে পাঁচটা। তারপর জলযোগ, উপাসনা গান। সাতটা থেকে ন'টা রামাশ্রয়ী গীতা অনুশীলনী। দশটার মধ্যে আহার ও শয়ন। জাগ্রত প্রহরগুলি নিয়মের ছকে বাঁধা।
রাতে নমিতা খেতে চায় না।
—খেলেন না কেন?
—ইচ্ছে করছে না।
—চলুন, বাইরে বসবেন?
—কি লাভ? চলেই তো যাব।
—ইচ্ছে না হলে যাবেন কেন?
—এখানে কত দিন থাকব বলুন?
আপনিও তো চাকরি করেন, আপনার লজ তো নয়।
—অন্য কোনো ব্যবস্থা দেখতে হবে।
নমিতা গভীর স্নেহে, যেন সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আমার মতো মেয়েদের জন্যে খুব অনেক দরজা খোলা নেই সুদেববাবু। আর...আপনি তো আমার কথাতেই নিয়ে গেলেন ওখানে। আমি...পারব...এই যে এখানে এ ক'দিন থেকে গেলাম...পারব।
—আপনার পরিণামের জন্যে আপনি তো দায়ী নন।
—সে কথা কি কেউ বিবেচনা করে? ওই সাধুর চোখ দেখছিলেন? আপনি বলে যাচ্ছেন, আপনার জানাচেনা, ভদ্রঘরের মেয়ে, দুরবস্থায় পড়েছে...উনি কেমন শুনে যাচ্ছিলেন?
—ওঁকে বলছি, শুনবেন না?
—আমি তো বুঝতে পারছিলাম, উনি একটা কথাও বিশ্বাস করেননি। উনি মনে করছিলেন দাগী মেয়ে, সাতঘাট ঘুরে এসেছে, আশ্রমে আসবে কেন, কলঙ্ক যদি না থাকে?
—ভাববেন না।
—ভাবা আর না ভাবা! পরশু থেকে তো সব ভাবনাই শেষ। নামটা আবার বদলে দেবে...তাই তো নিয়ম।
—যাবেন না তাহলে।
—কি যে বলেন! আপনি ভাললোক, দয়ার প্রাণ, তা বলে থেকেই যাব, তা কি হয়? আমি বা তা থাকব কেন? এসব ঘরও আপনারা পুজোয় ভাড়া দেন, আমি একটা ঘর আটকে বসে থাকতে পারি?
—ওখানে যে কোনো স্বাধীনতা থাকবে না।
—হাসাবেন না তো! স্বাধীনতা থাকবে না, সেটাই আপনার বড় মনে হচ্ছে? স্বাধীনতা আমার কবে ছিল? পেছনে তাকাই, পাঁচ বছরে কোন স্বাধীনতাটা পেয়েছি?
—আপনার বয়স...
—চবিবশ। উনিশ বছরে বাবা বেচে দেয়। আর না, যান তো। হাত মুখ ধুয়ে একটু ঘুমোই। আজ বড় নিশ্চিন্ত লাগছে! বাকি জীবনটার হিল্লে হয়ে গেল। আপনার কাছে এলাম, আপনি নিয়ে গেলেন...
সুদেব বেরিয়ে আসে। বলে, বিবি খাবার আনবে, আপনি যা হয় খাবেন।
—আপনি যান। আমার ঘুম পাচ্ছে! নমিতা তীব্র গলায় বলে, ''খাবেন খাবেন'' বললেন না। ইচ্ছে হলে খাব না, ঘুম পেলে ঘুমোব, এটুকু স্বাধীনতা তো দেবেন!
সুদেব চলে আসে।
বুকের ভেতর তোলপাড় করছে। ''স্বাধীনতা থাকবে না সেটাই আপনার বড় মনে হচ্ছে?''
নমিতা কি বলতে চাইছিল? ''পেছনে তাকাই, পাঁচ বছরে কোন স্বাধীনতাটা পেয়েছি?''
পাওনি, পাওনি নমিতা। আমি যা বলতে পারিনি, তুমি সে কথা বলার সুযোগ করে দিলে, আমি বলতে পারিনি।
আমার নিজের সম্পর্কে অবিশ্বাস আছে। বন্য, বর্বর, নিমেষে রক্ত জ্বলে যায় যার, সে সুদেবকে তো দেখনি। বিয়ের কথা সবাই বলে, আমি কোনো স্থায়ী মানবিক সম্পর্কের কথা ভাবতে ভয় পাই। কিন্তু তোমাকে আমি ভুলতে পারিনি। নমিতা কাল তোমাকে সব কথা বলব, সব। তোমার সেই অসহায় ডুবে যাওয়া, সব বলব তোমাকে। তোমারও জানার অধিকার আছে। সব শুনে যদি তবু যেতে চাও, যেও।
যাবার ব্যাপারটা তোমার সিদ্ধান্ত বলেই আমি কিছু বলিনি। কিন্তু মনে হচ্ছে, তোমার ওপরে এতটা না ছাড়লেও পারতাম। কি জীবন কাটিয়েছ, অথচ এখনো তুমি কত নরম, কত নির্ভরশীল, কত সহজে খুশি।
সব বলব তোমায়।
ঘুম আজ সুদেবকে ধরা দেয় না।
পাঁচটা না বাজতে ও উঠে পড়ে, দরজা খোলে। গেট খুলে দেয় গোপাল। সুদেব চোখ মুখ ধোয়। নমিতার ঘরে যায়।
দরজা খোল।
নমিতা ঘরে নেই।
ঘরে নেই বাগানে নেই, নমিতা কোথায়?
গোপাল বলে, হাঁটতে গেল।
—কোথায়?
—ফরেস্ট।
ফরেস্টের পরেই তো বাঁধ। এ বনপথ ফুলে ফুলে ঢাকা নয়। ইউক্যালিপটাসের শুকনো পাতা বিছানো।
সুদেব ভীষণ উদ্বেগে ছুটতে থাকে। নমিতা তুমি বাঁধের ওপর উঠছ কেন? পাঁচিল দিয়ে হাঁটছ কেন?
—নমিতা!
সুদেব প্রায় দৌড়ে গিয়ে ওর কোমর জাপটে টেনে নেয়। দু'জনেই গড়িয়ে পড়ে।
—নমিতা, কি করছিলে?
দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে থাকে। অন্তহীন, অন্তহীন সময়।
নমিতা দু'হাতে মুখ ঢাকে।
সুদেব চেয়ে থাকে বাঁধের দিকে। এখানে জল গভীর। জলে আকাশের ছায়া। তারপর নিশ্বাস ফেলে বলে, ওঠো। আঁচল গোছাও। শোনো, কোথাও যাবে না তুমি। আমার কাছে থাকবে।
—কি করে?
—বিয়ে করে। এই কথাটাই আজ বলতাম, ভোরেই বলা হয়ে গেল। শোনো, আমার জীবনটাও দাগী। আর তোমাকে আমার খুব দরকার। আজই রেজেস্ট্রি করে ফেলব রানীপুর গিয়ে, ঘুস দিলে সব হয়। এখন ওঠো, ফিরে চলো। মুখ চোখ মুছে ফেলো।
—সবাই নানা কথা বলবে।
সুদেব হাসে।
—সুদেব রায়কে? তার বউকে? এ তল্লাটে তো নয়। ওসব আমি ভাবব। তুমি আর ভেব না।
—আপনার বাড়ি...
—সবাই জানবে। আগে বিয়েটা করে ফেলি। তোমাকে বিশ্বাস কি, আবার হারিয়ে যাবে। ব্যবস্থা তো করে এনেছিলে, ছি ছি ছি! আবার আমাকে জলে নামাতে?
নমিতা ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে স্থির হয়। বলে, চলুন, কোথায় নিয়ে যাবেন।
—চলো।
ওরা ধীরে ধীরে হাঁটে। এখন আর তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।
সুদেব বলে, সবাই খুব খুশি হবে।
—আমাকে দেখলে...
—বা, আমি ছাড়া তোমাকে তো কেউ ধরে রাখতেই পারবে না, তাই না?
—আমার এখনো...
—বিশ্বাস হচ্ছে না তো? হয়ে যাবে, সব হয়ে যাবে। শুধু অতীতটাকে ভুলে যেতে হবে।
নমিতা বলে, হয়ে যাবে।
বনপথে ভোরের আলো। সোনা বাঁধ জেগে উঠছে।
__
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন