মহাশ্বেতা দেবী
মালা মণ্ডলকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই—
—পুলিশ অপরাধীদের ধরছে না কেন?
—অপদার্থ ও. সি. জবাব দাও!
না, সুতানপুর থানার সামনের মাঠে মিটিং করে শ্লোগান দিয়েই ওরা থেমে যায়নি। পোস্টার মেরে এসেছিল সব জায়গায়। আর মালা মণ্ডলের ধর্ষণকারী চাঁদ যখন ধরা পড়ে, তখন আশ্চর্য উল্লাস হয়েছিল পুতলির।
—সুজাতাদি! ধরা পড়েছে লোকটা।
—ধরা পড়াই সব নয় পুতলি, এরপর কি হবে?
—শাস্তি হবে।
—তুমি এখনো অনেক ছেলেমানুষ আছ।
সুজাতাদির বয়স ষাট। রোগাটে চেহারায় এমন কিছু আছে যা সম্ভ্রম জাগায়। সবচেয়ে চোখে পড়ে এই বয়সেই ধপধপে সাদা হয়ে যাওয়া চুল, যে চুল উনি ছোট করে ছেঁটে ফেলেছেন।
—বাইশ বছর বয়সটা ছেলেমানুষের বয়স নয়।
—কিন্তু এখন তো খানিক বুঝবে!
—কি বুঝিনি?
—মালা তো মরেই গেছে। লোকটাকে কি অপরাধে শাস্তি দেবে পুলিশ?
—ধর্ষণ, তারপর খুন!
—ধর্ষণ, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়। সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ। একমাত্র পুলিশ পারে কেস করতে।
—সত্যি, সুজাতাদি?
—খুব সত্যি। তারপর তাকে খুন। গোপাল যে খুন করেছে, তা নিয়ে পুলিশ কেস করবে?
— কেস করবে না?
—মালার বাবাই পিছিয়ে যাবে। ওর আরো তিনটে মেয়ে আছে। একটা ছোটখাট মুদী দোকান চালায়। ও কোন সাহসে চাইবে যে কেস হোক?
—বাপ হয়ে মেয়ের খুনের শাস্তি চাইবে না?
—তোমাকে তোমার পরিবার অসম্ভব অবাস্তব পরিবেশে বড় করেছে পুতলি। জানি তো তোমার বাবা—মাকে, বাস্তব নয়, কি হচ্ছে তা নয়, কি হওয়া উচিত সেই থিওরিটাই বুঝত তারা।
সুজাতাদি জানবেন। পুতলি তো শুনেছে সুজাতা, অশ্রুকণা আর নীহার ছিলেন সহপাঠী। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজনই ছিলেন পরস্পরের বন্ধু। তারপর অশ্রু আর নীহারের বিয়েতে সুজাতা ছিলেন অন্যতম সাক্ষী। তারপরেই সুজাতা স্কুলের কাজ নিয়ে চলে যায় শিলংয়ে।
পুতলির বাবা—মা দুজনেই এই শহরে চলে এলেন চাকরি নিয়ে। মা ঢুকলেন মেয়েদের কলেজে, বাবা ছেলেদের কলেজে। তখন ছিল না, এখনো এখানে কোনো কো—এডুকেশনাল কলেজ নেই।
সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, সুজাতাও এলেন মেয়েদের স্কুলে। বললেন, বাধ্য হয়েই এলাম। মা কতদিন বা বাঁচবেন? ছোট ভাইও চলে গেল দিল্লী। বাড়িটা আছে, মা আছেন।
পুতলির মা—বাবা কি অবাক হয়েছিলেন!
—এই টাউনে তোমাদের বাড়ি?
—বরাবরই ছিল।
—কি আশ্চর্য, কোথায়?
—লাইনের ওপারে।
—বাড়ির কোনো নাম আছে?
—সিংহবাড়ি বললেই লোকে চিনবে।
—সুজাতা, ওটা তো মস্ত বাড়ি।
—তাই তো সমস্যা।
—কেন?
—ভাইরা থাকবে না, দিদি থাকবে না, বাড়িটার কি হবে?
—সত্যিই তো...
নীহার যেন পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্যে বললেন, সম্পত্তি ব্যাপারটা এত ঘৃণা করতো সুজাতা, কিন্তু শেষ অবধি সম্পত্তির মালিকই হয়ে গেলো।
সুজাতা একটু হেসেছিলেন।
—বিশাল বাড়ি, পিছনে জমি, পাশে পুকুর।
পুতলি বলেছিল ও! পিকনিক বাড়ি, তাই না?
—কথাটা সত্যি। মানুষ তো পিকনিক করতেই যায়। মামা পিকনিক করতে দেন, মা খুশি হন।
—তোমার মামা আছেন?
—না না। ''মামা'' বলে ডাকি। অনেকদিন আছেন, বাবার আমল থেকে। ওঁরাই তো দেখেন মাকে।
—বিশাল বাড়ি।
—হ্যাঁ, বাবারা তো জমিদার ছিল। বাড়িটা সত্যিই খুব বড়।
—এখন কি করবে?
—মা যতদিন বেঁচে আছেন বাড়ি থাকবে। কিন্তু মা আর কতদিন, চুরাশি পার হলো। আমি বাড়িটাকে একটা শিশু হাসপাতাল বা মেয়েদের হোম, যা হয় করে দিতে বলেছি। কিন্তু অন্যরা মত করলে তো। একলা আমার কথায় কি হবে?
এ তো ভাল প্রস্তাব। কিন্তু তুমি? তোমার তো একটা থাকার জায়গা চাই।
—ভাবনা হচ্ছে? ভেব না। আমার জন্যে আমিই ভাবি না, তোমরা ভাববে কেন?
—একদিন এসো আমাদের বাড়ি।
—দেখি, সময় পেলে যাব... তোমাদের মেয়েটি বেশ। আমাদের 'পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ' ক্লাবে আসে তো, বেশ উৎসাহী।
—অশ্রুকণা সগর্বে বলেছিলেন, ওর দাদা আর দিদিও খুব ব্রাইট।
—ওর মতো উৎসাহী?
—না না, তারা দারুণ কেরিয়ার করেছে একেকজন। কুমার আর্কিটেকট, তার বৌ ঝুমাও তাই। ওরা দিল্লীতে থাকে। আমার বড় মেয়ে পিপলি আর ওর বর অমেয় দুজনেই মস্ত একটা বিজ্ঞাপন অফিসের হয়ে অ্যাড—ফিল্ম করে। ও এখনো তেমন সিরিয়াস নয়।
—নামগুলো তো স্মার্ট রেখেছ।
—না ভাই, মধুরা আর পল্লবী নাম রেখেছিলাম। ওরা পিপলি আর পুতলি হয়েই রইল।
কথা হচ্ছিল বইমেলায় দাঁড়িয়ে। সুজাতা ঘড়ি দেখে বললেন, চলি। অনেকক্ষণ স্টল ছেড়ে এসেছি।
—স্টলেও বসছ?
—নইলে তরুণরা কি ভাববে? দেখেছ আমাদের স্টল? একেবারে অন্যরকম।
'পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ' স্টলে বিজ্ঞানচেতনার বই, নাগরিক অধিকারের বই, 'সমাজে শিশুশ্রমিক কেন?' 'পণের বিরুদ্ধে লড়াই করুন'...
নীহার আর অশ্রুর মুখচোখ নিরুৎসাহ হয়ে যায়।
—না... দেখলাম না তো...চলি সুজাতা...
এরা চলে গেলে পুতলি বলেছিল, মা—বাবা আপনাকে সন্দেহ করবে এখন।
—কেন?
সমু বলেছিল, ওঁরা শুধু ভোট দেন। রাজনীতির মধ্যে যাদের সমর্থক হলে সবচেয়ে নিরাপদ থাকা যায়, ওঁরা তাদের ছাড়া সবাইকে এড়িয়ে চলেন।
পুতলি বলেছিল, এই, কি হচ্ছে?
—তুই অবশ্য কাচের ঘর থেকে বেরিয়েছিস...
—জানিস, সুজাতাদি, মা আর বাবা একসঙ্গে পড়তেন ইউনিভার্সিটিতে—
—তাই তো শুনলাম। তা বলে তুই যেন ওঁকে মাসি বা পিসি বলিস না।
সুজাতাদি বললেন, এই! বাদলের মা আসছেন। এখনো মেলায় আসেন!
বাদলের মা গীতাদিকে সুজাতাদি খুব শ্রদ্ধা করতেন। কি রকম মনের জোর। ছেলে মরে গেল জেলে গুলি খেয়ে, মেয়ে জামাই নাতনি একসঙ্গে প্লেন দুর্ঘটনায় মরল, হাসপাতালের মেট্রন গীতাদি রিটায়ার করে কেমন একলা মাথা তুলে থেকে গেলেন।
বইমেলাতেও আসেন, থিয়েটার দেখতেও যান, বাড়িতে 'পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ' ক্লাব করতে দিয়েছেন, খুব মনের জোর!
বইমেলাতে সেবার যে এলেন, তার পরের বছরই উনি ক্যানসারে মারা যান।
সমু বলেছিল, কাচের বাড়ি তোদের।
ঠিকই বলেছিল, পুতলি তো কাচের দেয়ালের ভেতরেই থেকে যেত, যদি না একদিন ওর বন্ধু বুলির দাদা সৌম্য বা সমু ওকে না বলত, এই পুতলি! আমাদের ক্লাবের সরস্বতীপুজোয় ফাংশান করব। তুই একটা গান গাইবি?
পুতুলিদের পাড়ার নাম ভূদেবপাড়া।
ভূদেব রায় একসময়ে বুঝেছিলেন এ টাউনও বড় হবে, লোক বাড়বে, জমির দাম বাড়বে।
ভূদেব রায় তাঁর দশ বিঘা জমিকে প্লট করে করে তেমন সব লোককে বেচেন, যারা এখানে বাস করবে, শিক্ষিত ও রুচিবান লোক হবে। 'কালচার লোক চাই, বুঝলেন?' ভূদেব রায় সব সময়ে বলতেন।
সেই ভূদেব রায়েরই নাতি ওই সমু। ওদের বাড়ি অবশ্য শহরের মাঝামাঝি। এক সময়ে তো কেউ ভাবেনি শহর দক্ষিণে আর পুবে এমন করে ছড়াবে। দক্ষিণে রায়েদের জমি,পূবে ত্রিবেদীদের জমি, এ সবের মাঝে মাঝে ছিল আমগাছ, খেজুর আর পিটুলি গাছ, ঝোপঝাড় মাঠ।
সমুদের বাড়ির নাম মহাদেব ভবন। মহাদেব, ভূদেব, সুদেব, তারপর বুদ্ধদেব, সৌম্যদেব আর ধৌম্যদেব। বুদ্ধদেব অ্যাডভোকেট বিষ্টু রায়, সৌম্য তো সমু, আর ধৌম্য বা শংকর স্পোর্টসম্যান। ওর উচ্চাশা, ফুটবল খেলে রেলের চাকরিতে ঢুকবে।
নীহার বলতেন, এমন একটা উচ্চাশাহীন পরিবার আমি দেখিনি। ঠাকুরদার আমলেই জমিদারি চলে গেছে। কিন্তু জমিদারি মেজাজটা রেখে গেছে।
পুতলি ফোঁস করত, জমিদারি মেজাজ?
—ওই যে আলসেমি। প্রাণ থাকতে এ শহরের বাইরে যাব না। সুদেববাবু কি করে? বাবার রেখে যাওয়া বাড়িগুলো থেকে ভাড়া তোলে, বাজারের খাজনা তোলে। বুদ্ধ, ঐ বিষ্টুটার কি মাথা! সে এখানেই প্র্যাকটিস করছে। সমুর উচ্চাশা তো বোঝা যায় না। ছোটটা বল পেটায়।
অশ্রুকণা বলতেন, ঠাকুর্দার নামে রাস্তা, প্রপিতামহের নামে বাজার, মন্দির, শহরটা এখনো ওদের কাছে জমিদারি হয়ে আছে।
—সে ঐ সুদেবেরই। ওর ভাইরা তো কলকাতা চলে গেছে।—
—মেয়েটাকেও দেখো, পোঁটলার মতো চালান করে দেবে কারো ঘরে। বড় মেয়ের স্বামী, ছি ছি, প্রাইমারি মাস্টার। সমুর মায়ের বড় গর্ব যে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ধানচাল অঢেল, গোয়ালে অনেক গরু।
—অ্যামবিশান চাই, অ্যামবিশান!
ও কথা ওঁরাই বলতে পারতেন। ছেলে কুমার তো পরিষ্কার বলে, এ রাজ্যে কিছু হয় না। বাঙালী কাজ করে না, রাজনীতি করে আর দলাদলি।
কলকাতা শহরকেই গ্রাম মনে হয় কুমারের, এ টাউনে তো তার কাছে কানা গলি।
বাস করার পক্ষে দিল্লী নাকি অনেক, অনেক ভালো। রাজধানী বলে কথা।
কুমার আর ঝুমার পক্ষে পশ্চিমবঙ্গে বেশি আসা সম্ভব নয়। ওদের মেয়ে লালী পড়ে ইণ্টারন্যাশনাল স্কুলে। বাংলা সে বোঝে না, বলে না, পড়ে না। দু'তিন বছরে একেকবার আসে ওরা।
প্রতি বছর ব্যাঙ্গালোরে যাবেই ওরা 'স্বর্গ—হৃদয়' আশ্রমে। সেখানে স্বর্গীয় শান্তি, আরাম আর আনন্দ আছে, আত্মশক্তিও বাড়ে।
কুমার আর ঝুমা, দুজনের দুটো গাড়ি, সফদরজঙ্গ এনক্লেভে ফ্ল্যাট, কেননা ওদের উচ্চাশা আছে। কুমার অবশ্য বাবা, মা, পুতলিকে কয়েকবার নিয়ে গেছে। রাজস্থান, হিমাচল, অনেক ঘুরিয়েছে। আর পুতলিকে বলেছে, পড়বি তো চলে আয়। ছোট শহরে থাকলে মানুষের মন সংকীর্ণ হয়ে যায়।
—তোমার মন কি সংকীর্ণ হয়েছে?
—তা হয়েছে পুতলি। এখন নিজের কাজ, ফ্যামিলি, এ সব ছাড়া আর কি ভাবি বল? কিচ্ছু না।
ঝুমা ঈষৎ হেসে বলেছিল, যা হোক, তোমার দাদার মন থেকে মফস্বলী সকীর্ণতাটা চলে গেছে। দিল্লী না এলে....
অশ্রুর কথাগুলো ভাল লাগত না। কিন্তু এ সংসার ঝুমারই সংসার। কুমার ঝুমার অনুগত প্রজা।
—তোরা বাংলা গান—টান শুনিস?
—না মা। সময় কোথায়?
—বাঙালী সমাজে মিশিস?
—চিত্তরঞ্জন পার্কে দুর্গাপুজো, ব্যস খতম। অবাঙালী সমাজটা মন্দ কিসের? যাক গে, বলো, একবার হিমালয়টা ঘুরিয়ে আনি।
—হবে, হবে, এত ব্যস্ত কেন?
দিল্লী দেখে দেখেই নীহারের বিস্ময় ফুরোত না। লালীর সঙ্গে ইংরিজিতে গল্প করা, সেও তো এক নতুন অভিজ্ঞতা।
অশ্রু বলতেন, মোটে বাংলা শিখবে না!
ঝুমা বলত, তোমার পিপলি তো কলকাতায় বসে আছে। জয় আর জয়িকে ঋষিভ্যালি পাঠাল কেন? তারাই কি বাংলা বলে, না পড়ে?
তারপর আদুরে গলায় বলত, মা! একটু বোঝো। তোমাদের সময় কেটে গেছে, তোমার ছেলেমেয়েদের সময়েও। ওনলি বেঙ্গলি নিয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গলে পড়ে থাকলে আজ কেউ কেরিয়ার করতে পারবে না।
নীহার বলতেন, সে তো ঠিক কথাই বলছ। আমার কথা, একটু বাংলাও জানুক, বাংলা গান শুনুক, এমন ভাবে সব শিকড় কেটে গেলে...
ঝুমা আরো আদুরে গলায় বলত, আমরাই বলি না। সেই জন্যেই তো বলি যে তোমরা এলে একটা বাংলা বলার প্র্যাকটিস হয়। পুতলির জন্যে এত চিন্তা হয়!
—কেন?
—একেবারে বাঙালী হয়েই রইল।
—থাকুক না।
কুমার একটু হতাশ হয়ে বলেছিল, এই মানসিকতাটাই পশ্চিমবঙ্গকে মেরে ফেলেছে। তোমাদের অ্যাটিচ্যুডটা এমন, যেন বাঙালী ভারতবর্ষের সব জাত থেকে সুপিরিয়ার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। এটা কিন্তু ভুল।
নীহার ঈষৎ হেসে বলেছিলেন। বুঝি রে! কি করব বল। আমরা বাঙালীই থেকে গেলাম, তোরা ভারতীয় হয়ে যাচ্ছিস।
ঝুমা বলল, সেটাই কি বলা যায়? হরদম দেখছি তো ভারতীয় ছেলেমেয়ে বিদেশ বেছে নিচ্ছে।
—হ্যাঁ...ভূগোলটা বড় হচ্ছে...
রাতে পুতলি নীহারের ঘরে খাবার জল রাখতে বলেছিল, ভেবো না বাবা। আমি একেবারে বাঙালী থেকে যাব। ওই রাজ্যের, ওই টাউনের মেয়ে হয়ে থেকে যাব।
—সমু যদি বাইরে চলে যায়?
—সে দেখা যাবে।
—ওর যদি ব্যবসায়ে মাথা থাকত...
—তাহলে বর্ডারে ক্রাইম করতে চলে যেত...
—কি যে যা তা বলিস!
নীহার যেন শিউরে উঠেছিলেন। ভীষণ, ভীষণ দুর্বলতা নীহার আর অশ্রুকণার 'পূর্বাশা' বিষয়ে। ওটা যেন বাড়ি নয়, তার চেয়েও বড় কিছু। ওঁদের রুচি, ওঁদের বিশ্বাস, সব কিছুর মূর্ত প্রতীক। রবীন্দ্রভক্ত নীহার ও অশ্রুকণা একতলায় অন্দর চাতালে বিশাল বিশাল সিমেন্টের টবে রক্তকরবী, কৃষ্ণচূড়া, শিউলী, ছাতিম, এমন কত গাছ রেখেছেন, তারা বনসাই হয়ে গেছে, ফুল আর ফোটে না। তবু গাছগুলি ওঁদের বড় প্রিয়।
ওখানে বসে নীহার আর অশ্রু ছুটির দিনে চা খান, কাগজ পড়েন।
ওই দুর্গ ওঁদের দুজনের স্বপ্নপ্রাসাদ যেন।
টাউনে বোমবাজি হলে দরজা—জানলা এঁটে দেন।
নিষ্প্রদীপ হলে ইনভার্টার জ্বালেন।
কথা হয় বই নিয়ে, গান নিয়ে।
কিন্তু কুমার আর পিপলি তো অন্যরকম জীবন বেছে নিল, তৈরি করে নিল।
কুমারের ফ্ল্যাটের কোনো নাম নেই।
পিপলি আর অমেয়র বাড়ির নাম 'দি অর্কিড'। কেন, তা নীহার জানেন না। কিন্তু তাঁর দেওয়া 'অরুণোদয়' নামটা অনেক ভাল ছিল এ কথা বললেই পিপলি বলে, 'অ'টা তো রেখেছি বাবা।
অমেয় বা পিপলি গান বাজনার ভক্ত নয়। ওরা বিজ্ঞানের ছবি বা ফিলম ইত্যাদি ছাড়া কিছু ভাবেই না। ওঁদের শেষ ভরসা পুতলি।
যদিও পুতলি ওঁদের খুব বাধ্য প্রজা নয়।
পুতলি সংস্কৃতি ক্লাবে যায়, পরিবেশদূষণ নিয়ে মিটিং করে, মেয়েদের উপর সমাজ ও পরিবারের নির্যাতন নিয়ে সুজাতার সঙ্গে সংগঠনে যায়। কিন্তু পুতলি এখনো জটিলতাগুলো বোঝে না। সমু বলে, আসলে তুই হাঁদা।
—একটা হাঁদা মেয়েকে বিয়ে করবি?
—আমিও তো হাঁদা।
—তুই করবিটা কি?
—আমি? সবাই যা করে।
—কি, চাকরি?
—যা হয় কিছু।
—কলেজে পড়াবি?
—অত বোকা নই চাঁদু।
—তা হলে?
—ভেবে রেখেছি।
—কি?
—ল' পড়ব।
—উকিল হবি?
—বিধুবাবু মারা যাবার পর শহরে একটা উকিল নেই যে সাধারণ মানুষকে বা সংগঠনকে আইনি প্রতিকার পেতে সাহায্য করে।
—তোর দাদা তো উকিল।
—তাতে কি? না হয় জেরকস মেশিন বসাব, টিউটোরিয়াল হোম খুলব। মোট কথা, টাউন ছাড়তে বা চাকরি করতে পারব না। তোর বাবাই তো বলেন, আমাদের পরিবারে উচ্চাশা নেই।
—আমি কি করব?
—কাজ করবি। টাউন ছাড়ব না পুতলি, এখানেই থাকব। এখন ভেবে দেখ।
—কি ভাবব রে?
—তোর দাদা দিদি তো সরে গেছে।
—ওরা পারে। আমি একটা ভেতো বাঙালী, তাছাড়া এ শহর ছাড়া কোথাও স্বস্তি পাই না।...
—বাঁচা গেল।
—তার মানে?
—বুলিটা বিদায় হলেই...
—বুলিকে তোরা অন্যত্র বিয়ে দিবি?
—কি করা যাবে? সাগর তো তার বাবার বিরুদ্ধে যাবে না, আর সাগরের বাবাও ক্যাশে যৌতুকে পাঁচলাখ না দিলে ব্যাঙ্ক কেরানি ছেলের বিয়ে দেবে না।
—বুলিকে সাগর ভালবাসে না?
—সাগর প্র্যাকটিক্যাল ছেলে।
—সত্যি! ভাবলেও খারাপ লাগে।
—আমার বাবাকে তোর বাবা খুব আনকালচার্ড মনে করে তো! জানি। বাবা সত্যিই সাদামাটা মানুষ। কিন্তু ছেলের বিয়েতে পণ নেয়নি, মেয়েদের বিয়েতে পণ দেয়নি। ভুজঙ্গবাবু প্রতিবেশী, সে ছেলের বিয়েতে পণ নিল বলে বাবা বৌভাতে যায়নি।
—যাক গে, এ সব কথা থাক।
সমু সেদিন পুতলির মনে প্রশ্নের ঝড় তুলে দেয়। সত্যিই তো? পুতলিরা অনেক বিয়েবাড়ি যায়, যেখানে পণ দেওয়া—নেওয়া হয়।
বাবা—মা মুখে বলে, পণপ্রথা নিপাত যাক। কিন্তু তা বলে কোনো বিয়ে তো বয়কট করে না।
সমু বলেছিল, আমরা একটা সাদা রেজিস্ট্রি বিয়ে করব, দেখিয়ে দেব টাউনকে।
—তোদের বাড়ি শুনবে?
—শুনবে শুনবে। শোনাতে হবে।
—সত্যি, মানুষ কতরকম হয়! মা—বাবা...
—ছেড়ে দে তো। ও সব ভাবিস না। আমি উঠছি আজ।
—কোথায় যাবি?
—সুজাতাদির মা'র শরীরটা আবার খারাপ হয়েছে। রাতে ওখানে থাকব আমি আর গুলতি।
—সত্যি সুজাতাদি মা'র জন্যে কত করে!
—কার জন্যে করে না? একটা মানুষের মতো মানুষ। টাউনটা তো বোবা হয়ে যাচ্ছিল।
—যাঃ, কি যে বলিস!
দশ বছর আগে মালা মণ্ডলের ব্যাপার নিয়ে এত হইচই ভাবা যেত?
—এত খবরই বেরোত না কাগজে।
সমু, যে পুতলির চেয়ে মাত্র চার বছরের বড় সে গভীর স্নেহে তাকিয়েছিল পুতলির দিকে।
—সম্ভব ছিল না তখন। জরুরি অবস্থার পর মানুষ বেশি সোচ্চার হলো, আর সাতাত্তরে বামফ্রন্ট আসার পর এ রাজ্যেও মানুষ গলা খুলতে শিখেছিল, এটা ঘটনা।
—তার মানে?
—ধর্ষণ আগেও হতো, জানা যেত না। এখন বেশি হয়, জানা যায়। ব্যাপার তো তা নয়, হবার পরে উপায় কি?
—লোকটা ছাড়া পেয়ে যাবে?
—মনে হয়, প্রমাণাভাবে। স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছিল, বাপের ঘরে থাকত, ব্রিজের মুখে সন্ধ্যায় বাজারে সবজি বেচত, ঘরে ফেরার পথে...ধর্ষণের সাক্ষী কে? হত্যার সাক্ষী কে?
—চাঁদ ওর পেছনে লেগেছিল না?
—লেগেছিল, সাক্ষী দেবে না কেউ।
—কিচ্ছু ভাল লাগে না আমার, এ সব ভাবলে।
—ভাবিস না। দেখ, নৌকাগুলোতে আলো জ্বালাচ্ছে। আপনার মেয়াদ উত্তীর্ণ। যান, পূর্বাশায় প্রত্যাবর্তন করুন। আমাকেও যেতে হবে।
পুতলি বাড়ি ফিরে এসেছিল। ফিরতে ফিরতে ওর আবারও মনে হয়েছিল, তাদের টাউনটা সত্যই খুব সুন্দর, এমন নদী, এমন পরিবেশ, আর টাউনের যত মাঠই নষ্ট হোক, ব্যারাকের মাঠটা তো থাকবেই। চিরদিন চিরকাল থাকবে। পুতলিও এই টাউনেই থাকবে।
এরকম সে ভেবেছিল ১৯৮৭ সালের জুন মাসে। সেই জুন মাসে এ টাউনে অনেক কিছু ঘটে যায় যা কিছুদিন আগেও ভাবা যেত না। ছোট ছোট ঘটনা, কিন্তু আজ, পাঁচ বছর বাদে পুতলির সেই সব ছোট ছোট কথাই বারবার ভাবতে ভাল লাগে। যেমন তারকবাবুর ছেলে বাবলু আর রাজ্যবিদ্যুৎ পর্ষদের দীপকবাবুর মেয়ে সরস্বতীর যুগলে আত্মহত্যা করা। বাবলু কলেজে কেমিস্ট্রির ডেমনস্ট্রেটর ছিল, সরস্বতী দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজছিল, মাধ্যমিক পাশ করেই।
সেই সন্ধ্যায় ও যখন লাইব্রেরিতে আসে, পুতলি বলেছিল, বই নেবে না?
সরস্বতী খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, না আজ কলকাতা যাচ্ছি রাতের গাড়িতে।
—বিয়ের কেনাকাটা করতে?
—হ্যাঁ, বাবা যখন এত খরচই করবে, শাড়ি, জামাগুলো নিজে কিনি।
হ্যাঁ, বাবলুর সঙ্গে সরস্বতীর বিয়েতে দুজনের বিয়েতেই ঘোর আপত্তি ছিল। বাবলুরা নাকি বারুজীবী, আর সরস্বতী ব্রাহ্মণের মেয়ে। কতদিনের প্রেম, কতটা গভীর, তা কেউ জানত না। সরস্বতীর বিয়েও ঠিক হয়েছিল। পাত্র কেষ্টনগরে ব্যাঙ্কের অফিসার। আর দীপকবাবু ভি সি আরের, টেলিভিশনের দোকান এতই রমরমিয়ে চলে যে তিনি পাঁচ লক্ষ টাকার যৌতুক দিচ্ছিলেন, পণ নয়, তবে স্বর্ণময়ী রোডে চার কাঠা জমি।
—স্বাতী আর শ্বাশতীকে দিয়েছি, ওকেও দেব। ছোট মেয়ে তো! এমন নয় যে আমার ছেলে আছে।
—আজ খুব সেজেছ সরস্বতীদি।
—সাজব না কেন বল? এত শাড়ি, এত শাড়ি, রোজ একটা করে পরে নিচ্ছি।
পুতলিকে হঠাৎ দোকানে মিষ্টি খাওয়াল সরস্বতী। বলল, খা না! আজ আমি খুব খুশি।
—বাবলুদার কি হবে?
—বিয়ে করবে কাউকে। আর কি হবে?
এমন সব স্বাভাবিক কথাবার্তার পর টাউন থেকে দুজনেই নিরুদ্দেশ।
কলকাতাতেই শেয়ালদার কাছে এক হোটেলে ওদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। আত্মহত্যার কোনো চিঠিও রেখে যায়নি। নিজেদের পরিচয়ও দিয়ে যায়নি।
বাবলুর বন্ধুরা কাগজে সব পড়ে কলকাতায় যায়। কি ভাবে ওদের দেহ টাউনে আনে, সে নাকি অনেক কথা। ওদের জেদেই শ্মশানে এক চিতায় দুজনকে দাহ করা হয়।
অনেক পরে সরস্বতীর মা পুতলির মাকে বলেছিলেন, আত্মহত্যা করল কেন? এ শহরে বাস করব কি করে তা একটু ভাবল না?
অশ্রুকণা বলেছিলেন, আত্মহত্যা করার সময়ে ও সব কথা কেউ ভাবে না।
—কি করে জানব ওই বাবলুকেই...
পুতলি বলেছিল, মা! ওঁর সঙ্গে কথা বলো কেন? আজকাল জাতবেজাতে বিয়ে সরকার আইন করে অনুমোদন করেছে।
—এ সব সংকীর্ণতা কি যায়?
—দাদা আর দিদি তো...
—স্বজাতে বিয়ে করেছে, বেজাত হলেও মেনে নিতাম। জাতিভেদের সংকীর্ণতার ওপরে উঠতে পারব না?
তারকবাবু বলেছিলেন, সিনেমা। সিনেমার প্রভাব এ সব। নইলে বাবলু...
সমু সব ছবি দেখে, ও যেগুলো দেখে উঠতে পারে না, সেগুলো গুলতি দেখে। গুলতি বলল, সব ফালতু বাত! হিন্দিতে ট্র্যাজিডি দেখায় কোথায়? সেই তো কয়ামত সে কয়ামত তক, এক দুজেকে লিয়ে, আর মিট্টি ঔর সোনা। আর সব ছবিই তো...
পুতলি আর সরস্বতীর লাইব্রেরিতে দেখা হয়েছিল, আর বাবলু সমুদের ক্লাবে আড্ডা দিতে গিয়েছিল। দুজনের একজনকে দেখেও বোঝা যায়নি যে আজকের দিনে ভালোবাসার জন্যে ওরা মরতে যাচ্ছে!
—ভালবাসলে সমাজকে কলা দেখিয়ে বিয়ে করে, মরে কেউ, সমু?
—যারা কলা দেখাতে পারে না তারা মরে। যদিও বাঁচাটাই বড় কথা।
মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওদের। সুজাতা খুব আঘাত পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, কত, কতবার জিগ্যেস করেছি, সরস্বতী কিছু বলতই না। গীতাদি বলেছিলেন, কি অর্থহীন অপচয়। বুলিকে তো আমি ভাল বলি। আজকাল মেয়েরা প্রেমও করে, আবার পণ—যৌতুকও দিতে বাধ্য করে। আমার ননদকে তো তার মেয়ের প্রেমিককে দু'লাখ ক্যাশ, মারুতি গাড়ি দিয়ে বিয়ে দিতে হলো। মেয়েই আদায় করল। সুজাতাই ভাল আছে।
—বিয়েটা করে ওঠা গেল না। যাকে বিয়ে করব ভাবলাম, তার রাজনীতিক উচ্চাশা মন্ত্রী হবার। আমি কেটে পড়লাম।
সমু বলল, কি করলে। ইশ!
—মন্ত্রীর বউ হিসেবে আমি খুব উৎরোতাম না। সে লোক মন্ত্রী হয়নি, কিন্তু রাজনীতিকে কেরিয়ার করেছে।
—কে গো?
—কিছুটা অজানা থাক। যাক, সরস্বতীর ইস্যুতে একটা মিটিং করা দরকার। আজকের দিনে জাতপাতে বিরোধ একটা ইস্যু হলো?
আর গীতাদি বলেছিলেন, সব, সব ইস্যু থেকে গেছে সুজাতা।
—সেজন্যই তো প্রতিবাদ দরকার। পুতলি, কাঁদছ কেন? চোখ মোছ, কেঁদ না।
—সরস্বতী...এমন করে—কেন!
সমু বলেছিল, জাতপাত মানামানি এখনো খুব আছে। এটা ঘটনা।
সরস্বতী আর বাবলুর মৃত্যু টাউনকে একটা ছোটখাট নাড়া দিয়ে যায়।
কিন্তু জুন মাসেই টাউন থেকে অদূরে একটা বাস আর ড্রাইভার থেকে যাত্রী হঠাৎ জ্বলে যায়। বাসে বিস্ফোরক কিছু আনছিল কেউ। যে আনছিল সেও বাঁচেনি।
সরস্বতী আর বাবলু স্থানীয় কাগজে স্থানীয় সংবাদ হয়েছিল। বাস জ্বলে যাওয়াটা বড় কাগজে বড় খবর হয়ে যায়।
এটা খবর থাকতে থাকতেই সুজাতাদিদের বাড়ির কাছাকাছি অলকাপুরী নামে এক বিলাস হোটেলের ভিত গড়ে ওঠে। টাউনে ঢোকার আগেই পথের ধারে এমন হোটেল। সঙ্গে বার, এই নেহাৎ মধ্যবিত্ত ও কিছু উচ্চবিত্ত মানুষের শহরে এক চমকপ্রদ ঘটনা।
অবাঙালী মালিকানার অনুপ্রবেশ বলা যাবে না। কেন না মালিক বাঙালী, স্থানীয় হোক বা না হোক। রাণা সেন জমি কিনছিলেন, পেট্রল পাম্প বসাচ্ছিলেন। আধুনিক মোটর গ্যারেজ করছিলেন, কিন্তু এরকম একটা হোটেল করবেন, তা কেউ ভাবেনি।
এ হোটেলের কাছাকাছি যে সব বাড়ি, তার লোকরা আপত্তি জানিয়েছিল এম. এল. এ.—কে। পরিবেশ নষ্ট হবে, মানুষ প্রভাবিত হবে। জমির দাম বাড়বে।
সে আপত্তি ধোপে টেকেনি। কেননা রাণা সেনের রাজনীতিক খুঁটি নাকি শক্ত। তা ছাড়া এ পথ দিয়ে যারা যায় তারা এখান থেকে লালবাগ ইত্যাদি দেখে যাবে। টাউন বড় হচ্ছে, ভালো হোটেল দরকার। সরকারী বেসরকারী অনেক মিটিং হয়। থাকার পক্ষে ভাল জায়গা।
নীহার আর অশ্রুকণা বললেন, যাক এমন জায়গায় বাড়ি করেছি, চট করে কেউ আশপাশে এসব করতে পারবে না।
কুমার হঠাৎ একদিনের জন্যে এসেছিল, সে লম্বা লেকচার দিয়ে গেল।
—তোমাদের মানসিকতা বদলাও। নিছক রেসিডেনশিয়াল কোনো জায়গা থাকতে পারে না। এক সময়ে চেঞ্জের জায়গা, রিটায়ারমেণ্টের জায়গা ছিল হাজারীবাগ, মধুপুর, গিরিডি, দেওঘর। আজ আছে?
—সত্যি কথা, কিন্তু এ টাউন তো...
—একদা অন্যরকম ছিল, সময়ের প্রয়োজনে বদলাচ্ছে। লোকের পয়সা হয়েছে, খরচ করে যাবে। এটা হলে বহু ছেলে তো কাজও পাবে।
—জমির দামও তো বাড়বে।
—দেখ, সুজাতাদি হয়তো সব বেচে দিয়ে শহরের সবচেয়ে ধনী লোক হয়ে যাবে।
অশ্রুকণা বললেন, মনে হয় না। এ ছাড়া সুজাতা একা তো নয়।
—ভাইবোনদের বুদ্ধি থাকলে বেচতেই চাইবে। কি করবে? তারা আসবে না, থাকবে না। বাড়ি জমি বেচে দাও, যে যার টাকা নিয়ে নাও। এ বাড়িটার দাম এখন কত হবে?
নীহার হাসলেন, কি করে জানব। এখানে এখনো কেউ বাড়ি বেচেনি।
—তা ছাড়া, এক সময়ে আভিজাত্য ছিল, এখন টাউন তো উত্তরে আর পুবে ছড়াচ্ছে। তোমাদেরও এক সময়ে বাড়ি বেচার কথাই ভাবতে হবে।
—কেন?
—কে থাকবে?
পুতলি বলল, আমি তো থাকব।
—ঝুমা ঠিকই বলে। তোর সেই মফঃস্বল মানসিকতা আর গেল না।
—নাই বা গেল দাদা? তোমরা এক রকম, আমি আরেক রকম। সেটাই ভালো নয়?
নীহার অধ্যাপকীয় ভাষায় বা বইয়ের ভাষায় বলেছিলেন, বৈচিত্র্যই ঐক্য আনে।
—বাবা! এত বইয়ের ভাষায় কথা বলো!
কুমার বলেছিল, বাবা—মা যতদিন, ততদিন। তারপর তুই এখানে থাকলেও বাড়ি বিক্রিই হবে।
—আমি দেবই না বিক্রি করতে। কি সুন্দর বাড়ি দাদা! তোমরা কি করে বিক্রির কথা বলো!
নীহার সস্নেহে বলেছিলেন, বাড়িটাকে বড্ড ভালবাসিস। তাই না?
—নিশ্চয়। সেবার দিদির ওখানে গিয়ে টাইফয়েড হলো, আমি তো সব সময়ে বলতাম, 'পূর্বাশা' নিয়ে চলো, আমি ভাল হয়ে যাব। তা তো হলো না, সব কেমন অন্যরকম হয়ে গেল।
জুনের শেষ থেকে বর্ষা নেমেছিল। জুলাইয়ে বর্ষা আরো বাড়ল। টাউনে পৌরধর্মঘট অনেক মাস ধরে চলেছে। এমনিতেই জঞ্জালে রাস্তা বোঝাই। টাউনের ঘিঞ্জি, পুরনো এলাকায় নালা—নর্দমা উপছে একাকার হয়ে গেল সব।
বুলির বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।
বুলি বলল, এমন বর্ষায় বিয়ে, ভাল লাগে?
পুতলি বলল, নভেম্বরে বিয়ে কর।
—আহা! বিয়ে করে হরিয়ানা নিয়ে যাবে না?
—তোর ভাল লাগছে?
—কি আর লাগবে? এ তো আমার মামাতো বোনের দেওর হয়। আগে দেখেছি। আমার বিয়ে হলে তোরাও বিয়ে করতে পারবি।
—দুজনেই রোজগার করব, তবে তো বিয়ে।
—কে জানে, চণ্ডীগড়ে কেমন করে থাকব।
—সেখান অনেক মেয়ে বিয়ে হয়ে চলে যায়। তারা যেমন করে থাকে, তেমনিই থাকবি।
বুলি বলল, ভাগ্যে তোর মতো 'কাজ করব', 'পায়ে দাঁড়াব' এ সব চিন্তা কোনোদিন নেই। টি. ভি. দেখব, ফ্যাশান ম্যাগাজিন পড়ব, সালোয়ার কুর্তা পরে বেড়াতে যাব, সেটাও তো জীবন।
—নিশ্চয়, যতদিন ভাল লাগে।
—ভাল লাগতেই হবে পুতলি। আমি তো একটা কথাই বলেছি, অনেক, অনেক দূরে সম্বন্ধ করো। এ টাউনে নয়, এ রাজ্যে নয়, অনেক দূরে।
—দূরেই তো...যাচ্ছিস।
—এখানে সাগর...ছি ছি, কি অপমান বল তো? পণ চেয়ে বসল, পণ?
—সে আর যোগাযোগ করে না তো?
—সাহস আছে তার? আমার সামনে দাঁড়াবার?
নরম, সাদাসিধে, অল্পে খুশি, অগভীর বুলির মুখে এমন কথা শুনে পুতলি বুঝেছিলেন সে মানুষ চিনতে শেখেনি।
বুলি একটু হেসে বলেছিল, তোরা তো এখানেই থাকবি। তোদের একটা বেড়াবার জায়গা হবে।
—হ্যাঁ...যাব। বিয়ে কবে?
—বাবারাই ঠিক করছে। হোক গে বৃষ্টি—বাদল, যত তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়, ততই ভাল। সাগরও জ্বলেপুড়ে মরবে বল? কি আর কাজ করে সে! এ তো অনেক, অনেক বড় ফার্মে অনেক বড় পোস্টে আছে। বিয়ে করবে না বলেছিল, তারপর বলেছে খুব গৃহস্থ ঘরের শান্ত, ভদ্র মেয়ে চাই। প্রথম শর্ত, অনেক চুল থাকা চাই।
—তা তোর আছে।
—আমাকে তো ও দেখেছে মাঝে মধ্যে।
—ভালই হবে, ভাল থাকবি।
—তুইও ভাল থাকবি। তোর বাবা—মা অবশ্য...
—বিয়েটা তো আমার, তাই না?
পুতলি জানত তার নির্বাচনে বাবা—মা খুব সুখী নয়। এটাও জানত, ছেলেমেয়েদের স্বাধীনতা দিয়ে মানুষ করেছে বলে বাবা—মা তার স্বাধীন ইচ্ছেতে বাধা দেবে না।
দিদি নিজে বিয়ে করেছে।
দাদা নিজে করেছে।
পুতলিও করবে।
বাবা—মার মনে মনে ক্ষোভ যা, তা হলো, দিদি আর দাদা তো টাউন ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে অনেক দেখে শুনে তবে বিয়ে করল।
পুতলি তা করল না। বাবা—মার মনে কি আশা ছিল, পুতলি যদি বাইরে বেরোত, আরেকটু দেখত জীবনটাকে, তাহলে হয়তো সমুকেই একমাত্র মনে করত না? আজকের দিনে, যখন জীবনে এত বিস্তার, নিজেকে বিকাশের এত দরজা খোলা, পুতলি একটা কূপমণ্ডুকের মতো জীবন বেছে নিল?
হ্যাঁ, তারা বাড়ি করেছেন। কিন্তু তাঁদের জীবন তো কেটে গেছে। এখন তো বোঝেন এখানে জীবন সীমাবদ্ধ। যে ছেলেটি একদা ওলিম্পিকে দৌড়বার স্বপ্ন দেখেছিল, সম্ভাবনাও ছিল যার, সে এখন একটি মুদী+স্টেশনার্স+আটা ভাঙাবার দোকান চালায়। প্রৌঢ় বয়সে সে 'বয়স্কদের দ্রুত হণ্টন' প্রতিযোগিতায় মেডেল নিয়ে এসেছে।
যে ছেলেটি পনেরো বছর আগেও ছিল প্রতিভাবান নাট্যকার ও পরিচালক, সে পৌরসভায় কেরানি হয়ে বসে আছে।
আর যার তুলিতে পোস্টার হতো আগুনের মতো সংক্রামক ও লকলকে, সে এখন এক প্রাইভেট বাস কোম্পানীর হিসাবরক্ষক।
এদের, আর এদের মতো অনেকের জীবন এই শহরেই সীমাবদ্ধ।
পুতলি তেমন জীবনই বেছে নিল কেন?
নীহারকে অশ্রুকণা নিভৃতে বললেন, আমার পিসির মতো। সেকালের ম্যাট্রিক পাশ পিসি বিয়ে করলেন একজনকে যাদের ক্ষেত খামার আছে, কালচার নেই। সারাজীবন মহানন্দে ধান সেদ্ধ করলেন, গোলা থেকে ধান বের করলেন, মুনিষদের ভাত রাঁধলেন।
নীহার পরিবেশটা হালকা করতে চাইলেন। বললেন, তোমার রমুপিসি তো? এখন তো ওঁরাই সুখী পরিবার। ওঁর ছেলে মাঝে মাঝে আসে শহরে। লবণ, কেরোসিন আর চিনি ছাড়া কিছু কেনে না। বাড়িতে ট্রাক্টর, তিনটে মোটরসাইকেল, বিরাট ব্যাপার ওদের।
—আমার ভালো লাগছে না। যাক গে, দুজনে রিটায়ার করলে বাড়ি বেচে কলকাতার কাছাকাছি একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনব।
—শুধু বেড়াবে এখানে ওখানে।
—হ্যাঁ, তাই ভালো। এখান থেকে থেকে পুতলি বুলির মায়ের মতো একটা বোঁচকা হয়ে যাবে, সে আমি দেখতে পারব কেন?
—ওর কোনো উচ্চাশা নেই।
—কেন, কেন?
—নেই, কি করবে বলো? 'পূর্বাশা' ওর কাছে শ্রেষ্ঠ বাড়ি, টাউন এক শ্রেষ্ঠ টাউন,সমু ওর কাছে আদর্শ পুরুষ, সুজাতা ওর কাছে আইডিয়াল।
—ইংরিজিতে এত ভালো, এম. এ. পড়তে পারত ডক্টরেট করতে পারত!
—ভেবো না! তোমার তো প্রেসার বাড়ে।
—পুতলিই বাড়িয়ে দিল।
—ভেবো না, ঘুমোও। বর্ষাটা এবার বড্ড বেশি নেমেছে।
—লোডশেডিঙেই বুঝছি।
—কুমার ইনভার্টার কিনে দিয়ে বাঁচিয়েছে। ফোনটা পেয়েও নিজেদের অতটা নির্বাসিত মনে হয় না। ওদের সঙ্গে কথা বলা যায়।
—তা যায়।
কিন্তু ১৯৮৭—র জুন—জুলাইয়ে ওঁরা যে যা ভাবেন, সব তো আগস্টে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অদূর ভবিষ্যৎটা কেউ দেখতে পাননি।
কত তাড়াতাড়ি, কিভাবে অতর্কিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল সব।
পুতলিকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল ঝড়ে। এজন্য সুজাতাকে দোষ দেন নীহার।
দোষ দেয় পিপলি আর কুমার।
কিন্তু সুজাতা এমন কিছুই করেননি। ধারা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এসেছিলেন 'পূর্বাশা' বাড়িতে।
—তোমার কাছেই এলাম অশ্রু।
—এসো, ভেতরে এসো।
—না, না, ছাতাটা উলটে গেল, ভিজে গেছি, জল ঝরছে। তোমার ঘরদোর ভিজে যাবে।
—কিছু বলবে? একটু চা করে আনব?
—না না। বলছিলাম কি, মায়ের বড্ড বাড়াবাড়ি যাচ্ছে। এখানে তো হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে নার্স পাই না। আয়া রেখেছিলাম, সেও এই জলঝড়ে আসছে না। রাতে সমু, আবীর (গুলতির ভালো নাম), তাপস, অমিত, অভ্র, এরা পালা করে জাগছে। আমার কাছে পূজা, মীনাক্ষী, আমাদের ক্লাবের মেয়েরাই চার রাত থাকল। আজ অভ্র আর তাপস থাকবে। পুতলি কি দু'এক রাত আমার কাছে থাকতে পারে?
—পুতলি তো তোমার বাড়ি আগেও থেকেছে।
—সে তো একদিন। রিহার্সালে দেরি হয়েছিল বলে। আজ একটু বিশেষ দরকার...
অশ্রুকণা বললেন, তোমার ভাইবোনরা জানে?
—সবাই জানে। নিশীথ এসে পড়ল বলে রক্ষে। ও ডাক্তারী না পড়েও আধা ডাক্তার। হেলথ ফর অল—এ কাজ করে। ক'দিন থাকবে।
—না...বিপদে আপদে...
নীহারের নিমোনিয়ায়, অশ্রুকণার অ্যাপেনডিকস অপারেশনের সময় সুজাতা তাঁর ক্লাবের মেয়েদের পাঠাতেন, নিজে আসতেন, সমুরা রাতে জাগত হাসপাতালে, কিন্তু না, সুজাতা কোনো প্রতিদান দাবি করছেন না, ওঁর চোখে মিনতি।
—বেশ তো...যাবে...বড্ড বৃষ্টি যে।
—তাতেই তো একা থাকতে...এমন আমার কখনো হয়নি।
—নিরাপদও তো তোমার বাড়ি।
—অতগুলো রিকশাওলাকে থাকতে দিই। পাশে পুলিশ ফাঁড়ি। ঝড়ে জলে বিপন্ন হয়ে কাঠগোলায় বস্তির ক'ঘরও এসে উঠেছে। নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই।
—তুমিই ভয় পাচ্ছ...
—ও থাকলে বেশ ভরসা পাই।
—বেশ তো, জলটা ধরলে যাবে।
—জল কি ধরবে?
—আমি নিয়ে যাব বিকেলে, ডাক্তার সোমকে যখন নিয়ে যাব ওঁর গাড়িতেই।
—ডাক্তার সোম যাচ্ছেন?
—হ্যাঁ...রোজই যান। আমি স্কুলে বলতে এলাম যে আসতে পারব না এখন।
—জামাকাপড় বদলাবে?
—আবার তো ভিজব। চলে যাই, রিকশায় এসেছি। খুব নিশ্চিন্ত করলে ভাই।
—এতগুলো লোক থাকছে, খাওয়াদাওয়া...
—সে তো যাঁকে মামা বলি...বাড়ির কেয়ারটেকার, কিন্তু অনেকদিন আছেন, ওঁরাই তো সব দেখেন। ওঁর পুত্রবধূ যে কলকাতায়। সে থাকলে এত একলা লাগত না।
—বসবে না, জামাকাপড়ও ছাড়বে না?
—না অশ্রু, আসি।
না, পুতলি এক রাত সুজাতার বাড়ি থাকবে বলে কিছু ভাবেননি অশ্রু।
—তুমি তো ফোন করলেই পারতে।
—ফোনে এ কথা বলা ঠিক হতো না। তা ছাড়া, লাইন তো সবসময়ে থাকছেও না।
সুজাতা যেন নিজেকেই বললেন, বাড়িটাও টাউনের প্রায় বাইরে, মা একা কি করে থাকতেন :
—পুতলি তোমার কম্প্যানিই হবে, রোগীকে দেখা তো...
—সেটুকু যে কতখানি!
সুজাতা বেরিয়ে গেলেন। পুতলি অবেলায় ঘুমোচ্ছিল, তাকে যখন বললেন অশ্রু, পুতলি বলল, বুঝেছি। সুজাতাদির নিজের শরীরটা আবার খারাপ হয়েছে।
—কি অসুখ ওর?
—ওই যে কি বলে, মিগ্রেইন না কি যেন। মাথার যন্ত্রণা যখন হয়, অজ্ঞান হয়ে যায়। মা! বাবাকে তো বললাম না।
—কত বলো!
—বাঃ, সব সময়ে বলে যাই। থিয়েটার গেলাম কেষ্টনগর, বলে যাইনি? সেবার ফরাক্কা গেলাম সম্মেলনে...
—আমি বলে দেব।
ঠিক সময়ে গাড়ি এসেছিল, ঠিক সময়ে চলে গিয়েছিল পুতলি। মোটা বিনুনি বাঁধা, বর্ষার জন্যে নাইলন পরা, মোটামুটি সুশ্রী কিন্তু বুদ্ধিতে উজ্জ্বল, ঝলমলে স্বাস্থ্য একটি মেয়ে।
বাড়ি ফিরে নীহার বলেছিলেন, এই বৃষ্টিতে?
—সুজাতা ওকে ডাক্তার সোমের গাড়িতে নিয়ে গেল। ...আচ্ছা, মা মরে গেলে সুজাতা ওখানে থাকবে কি করে?
—সে সুজাতাই বুঝবে। কিন্তু এত বৃষ্টিতে...
—সুজাতা এমনিতে আসে না যায় না, কিন্তু তোমার অসুখে, আমার অপারেশনে যথেষ্ট করেছে।
—হ্যাঁ, একটা পাবলিক স্পিরিট আছে।
—ওদের ক্লাবের ছেলেমেয়েগুলোও ভাল।
—ভালই তো। আজ তাহলে আমি আর তুমি!
—আর কি!
—এত বর্ষায় বন্যা না হয়।
—যাক, একটু চা খাওয়া যাক। আজ কাগজটাও দেখিনি ভাল করে।
—পিপলি আর তোমার সেই বউদির চিঠি এসেছে।
—আবার টাকা চেয়েছে?
—না, মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে অনন্ত বসুর ছেলের সঙ্গে। অরূপ বসু নাকি নাম... ছেলে কেমন, জানতে চেয়েছে।
—আমাদেরই ছাত্র। চায়ের ব্যবসা করছে। ওর দোকান থেকেই চা কিনি।
—দোকানদার!
—খারাপ কি! স্বাবলম্বী ছেলে।
—লিখেছে পণটনের ব্যাপার আছে।
—ও সব লিখে লাভ নেই। দাদা নেই, নিজে চাকরি করছে, যে করে পারুক বিয়ে দিক।
—হ্যাঁ... যে সব সম্পর্ক উঠে গেছে, সেগুলো এ বয়সে আর না জড়ালেই ভাল।
—কে জড়াচ্ছে? আমি তো নয়।
নীহার চায়ে চুমুক দিয়ে স্টেটসম্যানে ডুবে গিয়েছিলেন। অশ্রু খুলেছিলেন এ সপ্তাহের 'দেশ'—এর পাতা।
বৃষ্টি পড়ছিল, পড়ে চলছিল।
বৃষ্টি কমে তার পরদিন বিকেলে। বৃষ্টির জোরটা কমে। আর তার পরদিন আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ, এই আছে, এই নেই।
তার পরদিন একেবারে নির্মেঘ আকাশ উজ্জ্বল রোদ। সব যেন আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
অথচ কি অন্ধকার, কি গাঢ় তমিস্রা নেমেছিল এই টাউনে, কি অশুভ কালো ছায়া।
সুজাতার মার অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে পুতলি পরদিন আসতে পারেনি। বিকেলে যখন বৃষ্টি কমল, তখন তো ওঁর শেষ অবস্থা।
পুতলিই সুজাতাকে হাত ধরে নিয়ে এল। সুজাতা কপালের দু'রগ টিপে আস্তে আস্তে এলেন। তারপর বললেন, এত কষ্ট কেন পাচ্ছে মা?
ডাক্তারকে বললেন, মা তো থাকবেই না, এই যন্ত্রণাটা কমানো যায় না?
ওঁর মামা বললেন, এ যন্ত্রণা কে কমাবে মা? জানি না শ্বাসকষ্ট কতক্ষণ পাবেন দিদি।
পুতলি অবাক, বিস্ফারিত চোখে দেখছিল। এমনি করেই মরে যায় মানুষ? খাটে ওই যে বৃদ্ধা শীর্ণ মানুষটির চোখ ঠেলে উঠছে, নিশ্বাসের জন্যে হাঁকপাঁক করছেন, ওঁরই ছবি ঘরের দেয়ালে?
বিয়ের পর স্টুডিওতে তোলানো ছবি, বোর্ন অ্যানড শেপার্ডে। চোদ্দ বছরের বউ, কুড়ি বছরের বর।
তারপর নানা বয়সের ছবি। ছেলে মেয়েদের সঙ্গে, শিশু সুজাতাকে কোলে নিয়ে। কাটা কাটা মুখ চোখ, কোঁকড়া চুলে খোঁপা বাঁধা, সিলক বা ঢাকাই বা তসর পরনে। জামার হাতে গলায় লেস।
ওঁর সঙ্গে বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটির কোনো সাদৃশ্য নেই।
পুতলি মুখে আঁচল গুঁজল, ওর কান্না পাচ্ছিল। সমু, গুলতি, তাপস, অমিত, সব দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিশীথই সুজাতার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
ডাক্তার সোম মাথা নেড়ে এক সময়ে উঠে দাঁড়ালেন। সুজাতা মায়ের মুখের ওপর ঝুঁকে বসে থাকলেন। সমু এগিয়ে এল, পুতলি, বাইরে চল।
—মাসিমা...মাসিমা কি...
—হ্যাঁ, চল।
বাইরে এসে পুতলি কেঁদে ফেলল।
—কাঁদছিস কেন?
—মাসিমা...এত...
—মাসিমা বেঁচে গেলেন, মুক্তি পেলেন বল। যুক্তি দিয়ে বোঝ পুতলি, যেমন কষ্ট পাচ্ছিলেন, সুজাতাদিকে যত কষ্ট দিচ্ছিলেন, সেটা একটা অসহ্য অবস্থা। সুজাতাদির পক্ষে দেখা আর সহ্য করাটা কি কষ্টকর তাই বল।
—সত্যি সমু, সত্যি, তবু...
—তুই কাউকে মরতে—টরতে দেখিসনি, তাই না? তাই এত...
মানে...
পুতলি সজোরে মাথা নাড়ল।
না, সে দেখেনি কাউকে মরতে, দেখতে চায় না।
—আমরা তো বুঝেছিলাম, টাইমটা দেখছিলাম শুধু...কতক্ষণ কষ্ট পান।
গুলতি আর তাপস বেরিয়ে এল। গুলতি সবচেয়ে অভিজ্ঞ এসব বিষয়ে।
আকাশের দিকে চেয়ে বলল, বিকেল বিকেল মারা গেল, সুজাতাদি 'রাতেই দাহ হবে' না বললে বাঁচি। শ্মশান জাব হয়ে আছে মাইরি, কাঠফাট সব ভিজে, রাস্তায় কাদা।
পুতলি বলল, ওঃ গুলতি! এখন এ সব কথা...
—যা বাব্বা, কি হলো?
—সুজাতাদি শুনলে...
—আরে দাহ করতে হবে...
সমু বলল, তুই বাড়ি যাবি না?
—এখনি কি করে যাব? একটা ফোন করি বাড়িতে...মা—বাবা বুঝবে যে এখন যাওয়া চলে না।
পুতলি ফোন করেছিল।
মা—বাবা বুঝেছিলেন।
অশ্রু, বলেছিলেন, কাল চলে এসো। সুজাতার ওখানে তো অনেক লোক। ওর ভাইবোনও আসবে।
ডাক্তার সোম ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে, সুজাতাকে 'বি ব্রেভ' বলে চলে গেলেন।
পুতলিরা ও ঘরে ঢুকল। সুজাতা হেলান দিয়ে বসে আছেন। মামীমা, বাড়ির পুরনো কাজের লোক দু'জন মৃদু গুঞ্জনে কাঁদছেন। সুজাতার মার মুখ এখন শান্ত ও অন্যরকম দেখাচ্ছে।
নিশীথকে পুতলি আগে দেখেনি। কালো, বলিষ্ঠ, মাঝামাঝি লম্বা চেহারার মানুষ। চুল ছাঁটা, পরনে পাঞ্জাবি ও জিনসের প্যান্ট। নিশীথই যেন বুঝল, ওকে এখন পরিস্থিতির দায়িত্ব নিতে হবে।
—সুজাতাদি।
—বলো নিশীথ।
—ভালই গেছেন মাসিমা। এ অবস্থায় বেঁচে থেকে কষ্ট পাচ্ছিলেন।
—হ্যাঁ...শান্তি পেয়েছেন।
—রনোদা, জয়, সুচেতাদি, এদের তো খবর দিতে হয়।
—হ্যাঁ...
—আর, আজ তো ফিউনেরাল হচ্ছে না?
—নিশীথ, আমি কিছু ভাবতে পারছি না। পুতলি কোথায়?
—এই তো সুজাতাদি!
—আজ থাকবে?
হ্যাঁ, সুজাতাদি।
নিশীথ বলল, দ্যাটস গুড। আপনি থাকলে সুজাতাদির একটু...
—থাকব। মাকে বলেছি।
হাতঘড়িটা দেখে নিশীথ বলে, একটু চা অর্গানাইজ করে ফেলুন তো!
সুজাতাদিকে বলে, চলো, ও ঘরে। শুয়ে থাকো। কাল থেকে জেগে আছ।
সুজাতাদি বলেন, চলো।
ওঁকে ধরে ধরে নিয়ে যায় নিশীথ। পুতলি চলে যায় চা করতে। তাপস বলে, চল, আমি তোর সঙ্গে যাচ্ছি।
ওরা চা খায় সুজাতার ঘরে বসে। নিশীথ নিচু গলায় বলে, আমি ওঁর ভাইকে খবর দিচ্ছি। জানি না লাইন পাব কি না।
গুলতি বলে, বডি রাখবেন তো?
—রাখতেই হবে। কাল সকাল দশটা নাগাদ এসে যাবেন। আপনারা আজ বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিন; আপনারাই তো সব করবেন।
—বরফ দিয়ে রাখতে হবে?
—কোথায় পাবেন বরফ এখন? এ দিকটা আমি সামলে নেব। লোক তো আছে। এত রিকশাওলা, বস্তির লোক...
সমু বলে, পুতলি যেন রাতে একটু ঘুমোয়।
নিশীথ ঈষৎ হাসে ও আঙুল তোলে।
—সব আমার উপর ছেড়ে দিন তো।
—সুজাতাদিকে আপনি অনেক দিন চেনেন?
—অনেক দিন। আপনাদের কথা কত বলেছে আমাকে। কলকাতা গেলে তো আমার ওখানেই ওঠে। কতবার বলেছে, আপনাদের পেয়ে ওঁর বাঁচার ইচ্ছেটা ফিরে এসেছে।
অমিত বলে, আমাদের...খুব আপনজন।
—তাই তো দেখলাম। আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়নি। নইলে দু'বছরে তিন বার ঘুরে গেছি মাসিমার কাছে।
মামীমা বললেন, আরে নিশীথের বোনকেই তো বিয়ে করেছে সুজয়, ওদের ছোটভাই।
নিশীথ বলল, সুজাতাদি আর মাসিমার সঙ্গে সম্পর্কটা অন্য রকম...যাক গে। মামীমা, এ বাড়িতে তো আজ রান্না হবে না, তাই না?
সুজাতা ক্ষীণ স্বরে বললেন, ও সব মানামানি করে কি হবে নিশীথ?
—তুমি থামো।
—তোমরা...
—ছেলেরা চলে যাক আজ। দু'রাত জেগেছে। কাল আসুক দশটা নাগাদ।
—তুমি কল বুক করো।
গুলতি বলে, আমি টেলিফোন আপিস থেকে বরং সহজে লাইন পাব, যদি পাই।
—দেখ!
নিশীথ বলে, হয়ে যাবে সব।
—মাকে একটু পরিষ্কার...
—তুমি থামবে? শোও, শুয়ে থাকো। মামীমা একটু ধুনো দিন ঘরে ঘরে, এ ঘরে মশার ধূপ জ্বেলে দিন। সবই তো করতে হবে, কিছু তো থেমে থাকবে না।
মামীমা বলেন, তুমিই এ সময়ে এসে পড়লে, এটা মস্ত ভরসা...
—সুজাতাদি ডেকেছিল।
সমু পুতলিকে বলে, আমরা যাচ্ছি তবে। তুই কিন্তু রেস্ট করিস।
—হ্যাঁ...কাল কখন আসবি?
—সকালেই।
ছেলেরা চলে গিয়েছিল। জহর রিকশাঅলাকে পাঠিয়ে নিশীথ পথের ধার থেকে রুটি তরকারি আনাল। সুজাতাকে হরলিকস খাওয়াল, ঘুমের ওষুধ। বলল, আমি থাকব ওঁর ঘরে।
ভরসা, একটা মস্ত ভরসা।
ট্রাঙ্ককল বুক করে নিশীথই মাসিমাকে গা মুছিয়ে, ধোয়া কাপড় জামা পরিয়ে, বিছানায় ফর্সা চাদর পেতে শুইয়ে দিল। গায়ে চাদর ঢেকে ফ্যানটা খুলে দিল, ধূপ জ্বেলে দিল ঘরে।
মামীমাকে বলল, ছোঁয়ালেপা হেনতেন বলবেন না। স্নান আমি করব।
—দেখ! তিনিও তেমন মানত না, এরা তেমন মানে না, সুজাতা তো বিশ্বাসই করে না কিছু। কিন্তু যেটুকু নিয়ম...
—সব হবে।
ট্রাঙ্কে লাইন পেতে পেতে রাত দশটা হলো।
—রণোদা, আমি নিশীথ...হ্যাঁ, তিনটে দশে...ঘুমোচ্ছে, ওষুধ দিলাম...কয়েক রাত জেগেছে...। ও! শেষ খবর দিচ্ছি কেন? তোমায় তো বলে এসেছিলাম, মাসিমা সিরিয়াস। সুজাতাদি ডেকেছে। তুমি তো ট্যুরে গেলে।...এলে আসবে, তুমি বা জয়...কাল এগারোটা নাগাদ বেরোতে হবে, আর রাখা যাবে না। কি? রিচুয়ালস? ও সব আমি জানি না। তোমরা যা হয়...এঃ, এ কি হলো?
রিসিভার নামিয়ে নিশীথ বলল, কেটে গেল।
মামীমা বললেন, ওরা আসবে? খবর তো সুজাতা বারবার দিয়েছে।
—সিংহদের ব্যাপার! আমি রণোদাকে বললাম, ছেলেরা জয়কে বলবে, রাতে গাড়ি নিয়ে বেরোলেও সকালে পৌঁছে যাবে। না এলেও আটকাবে না। ওরা যে আসবেই, তা আপনি জানেন, আমিও জানি।
—জানি...সম্পত্তি...
—ছেড়ে দিন ও সব কথা। এই যে, পুতলি। আসুন, কিছু খেয়ে নিন।
পুতলি নীরবে এসে দাঁড়াল।
—বসুন। আপনি না খেলে আমি বা খাই কি করে?
—আমার নাম পল্লবী।
—বেশ নাম। নিন, খান।
—ভাল লাগছে না।
—ভাল লাগার কি আছে?
—ভাল লাগার কি আছে? এটা প্রয়োজন। মামীমা, আপনারা কি করবেন?
—আমরা আছি এরা আছে...খাব যা হয়। রক্তের সম্পর্কই নেই, নইলে ওর মা...
—জানি। দেখছি তো এত বছর...
পুতলি বলল, আমরা কেউ আপনাকে দেখিনি।
—না, সন্ধ্যায় পৌঁছতাম...পরদিন চলে যেতাম...সুজাতাদি তো ডাকে সবসময়ে...
—আমার মা'র সঙ্গে পড়তেন...
—ওকে 'দিদি' বলি, মায়ের কাজ করেছে।
—আপনার বোন ওঁর...
—ওটা আমার বোন আর ওঁর ভাইয়ের ব্যাপার। তাই বাইরেই আমার সম্পর্কটা...
—অনেক দিনের?
—অনেক দিনের। আমার বয়স ত্রিশ। বলতে পারেন আমার জন্ম থেকেই ওঁকে দেখেছি। মানে...একদা উনি আমার কাকীমা হবেন এমন সম্ভাবনা ছিল। তা হয়নি। কিন্তু আমাদের সঙ্গে ওঁর একটা আলাদা সম্পর্ক...
—আপনার মায়ের নাম মনীষা? যাঁর কথা সুজাতাদি বলেন?
—ঠিক বলেছেন। নিন, শেষ করুন। আমি স্নান করব, মাসিমার ঘরে থাকব।
মামীমা বললেন, স্টোভের পাশে কেটলি, কফি, সব আছে 'নিশীথ'।
—করে নেব। যান তো, শুয়ে পড়ুন।
মামীমা চলে গেলে নিশীথ বলে, মাসিমা এত বছর অসুস্থ যে, ভাবিনি এত বছর বাঁচবেন।
—সুজাতাদি যা যত্ন করত...
—সিংহ বংশে পুরুষ তো ও একা। দিদি, দুই ভাই, সব কলকাতাতেই থাকে। আসবে সবাই...বাড়ি...বাগান...সম্পত্তি...
—সুজাতাদি যাবে না।
—না গেলেই ভাল। যান, শুয়ে পড়ুন।
সুজাতাদির পাশে শুয়ে পড়েছিল পুতলি। ওঁর গায়ে হাত রেখে ঘুমিয়েও পড়েছিল। জানতও না যে এটাই অনেক দিনের মতো শেষ নিশ্চিন্তে ঘুম হবে ওর।
পরদিন সুজাতাদির দু'ভাই এসেছিল, সুনন্দ আর সুজয়।
ওরাই শ্মশানে গেল, সুজাতা থেকে গেলেন। নিশীথও গেল।
সুজাতা বললেন, এখন ওরা করুক।
পুতলি বলল, তুমি একা থাকবে?
—একা কিসের? মামীমারা আছেন, তুই চলে যা বেলা থাকতে থাকতে।
—না, ওরা ফিরুক।
মামীমা কাছের কলোনি থেকে ডেকে আনলেন কাদের। বাড়ি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা নিয়ম। পুতলি স্নান করল, সুজাতাও।
সুজাতাদির জামা কাপড় পরে মামীমার ঘরে গিয়ে পুতলি ভাত খেয়ে এল।
—তুই যাবি না পুতলি?
—একটু শুয়ে থাকি তোমার কাছে।
—শ্মশান বহুদূর, চন্দনপাড়া কি এখানে? ওদের ফিরতে দেরি হবে।
—রিকশায় চলে যাব আমি আর সমু।
—স্কুল থেকে, ক্লাব থেকে, সব শ্মশানেই যাবে। এত দূরে কে আসবে?
—তোমার দিদি এলেন না?
ঈষৎ তিক্ত গলায় সুজাতা বললেন, আসবে। সুচেতা রায় আসবে। নিজের কন্ট্রাক্টর স্বামী, রণো আর জয়ের বউরা, সব নিয়ে আসবে। মার শ্রাদ্ধশান্তিতে কত জাঁক হবে দেখিস?
ঘুম ঘুম গলায় পুতলি বলেছিল, তোমার মতো খালি খালি তো ওদের লাগবে না।
তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ঘুম ভাঙতে সন্ধ্যা।
সুজাতা বললেন, কি করবি এখন? অশ্রু বারবার ফোন করছে।
—সন্ধ্যা হয়ে গেল?
—ভীষণ ঘুমিয়েছিস।
—ওরা ফেরেনি?
—একটায় তো বেরোল, এবার ফিরবে বোধহয়।
—আমি আর দেরি করব না, চলে যাই।
যেতে পারবি?
—কত বার গেছি! রাস্তায় গেলেই তো রিকশা পেয়ে যাব।
চুলে এলো খোঁপা জড়িয়ে নিয়ে পুতলি বেরিয়ে পড়েছিল। খানিকটা এগোলেই বড় রাস্তা, রিকশা পেয়ে যাবে। বাড়িতে মা—বাবা ভাবছে নিশ্চয়। ইশ, এতটা ঘুম পেয়ে গেল কেন?
বড় রাস্তা দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ সব ঘুটঘুটে হয়ে গেল।
লোডশেডিং! টর্চ তো নেই!
ফিরে যাবে আবার?
না, সাবধানে এগোলেই তো বড় রাস্তা। যে হোটেল তৈরি হচ্ছে, তার পাশে পৌঁছেই লোডশেডিংটা হলো?
একটা গাড়ি দাঁড়াল সামনে, ঘ্যাঁচ করে।
টর্চের আলো পুতলির মুখে।
হাতে মুখ আড়াল করে পুতলি এগোল।
গাড়ির পাশ কাটিয়ে আরো একটু, আর খানিকটা এগোলেই...
গাড়ির দরজা খুলে কারা নামল।
পুতলি পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, চলে যাচ্ছে, অসম্ভব পেশাদারী দক্ষতায় কারা ওর মুখ চেপে ধরল, টেনে তুলল গাড়িতে।
গন্ধ, মদের গন্ধ। একজন মুখ চেপে আছে, আরেকজনের লোলুপ হাত ওর হাত দুটো চেপে আছে।
—স্পীডে বেরিয়ে যা!
কে বলল?
অশ্রু আর নীহার, আর শ্মশানযাত্রীরা নিষ্প্রদীপ অন্ধকারেই এসেছিলেন সুজাতাদের বাড়ি।
—পুতলি! পুতলি কোথায়?
—সে তো চলে গেছে কখন?
—কখন?
—লোডশেডিং হলো ও বেরোবার কিছুটা বাদেই। সে তো...
—এক ঘণ্টা হয়ে গেল?
—বাড়ি যায়নি?
—না সুজাতা, না! কেন, কেন এত দেরিতে একা ছেড়ে দিলে?
—ও ঘুমিয়ে...
—কেন একা যেতে...
—পড়েছিল, বললাম, শ্মশান থেকে...
—দিলে, এই বয়স ওর...এ দিকটা...
—ওরা ফিরুক, তবে যাস, ও জেদ করে...
—এমন বিচ্ছিরি, টাউনের বাইরে...
—সমু চেঁচিয়ে বলল, গুলতি, তাপস, আয়।
ওরা দুপ দুপ করে ছুটে গেল। পুতলি! পুতলি! পুতলি! সমুর আর্ত ডাক।
আলো জ্বলে উঠল হঠাৎ।
না, সেদিন পুতলিকে পাওয়া যায়নি, তার পরদিন না, তার পরদিনও না।
চারদিন পরে নদীর ওপারে গৌরীপুর থানা এলাকাধীন নন্দচক বাজার পেরিয়ে একটি কালভার্টের পাশে সম্পূর্ণ নগ্ন একটি মেয়েকে পাওয়া যায়। প্রভাতে মাঠে মলত্যাগ উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল, এমন কয়েকটি লোক ওটিকে মৃতদেহ মনে করে এবং একজন গামছা দিয়ে তাকে ঢাকতে গিয়ে বলে, বেঁচে আছে।
এরাই মেয়েটিকে নিকটস্থ থানায় নিয়ে যায় একটা কাপড় জড়িয়ে। ভদ্দরঘরের মেয়ে, হাতে ঘড়ির দাগ আছে, বয়সও বছর কুড়ি। থানা থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র। খবর ঘুরতে থাকে, ঘুরতে থাকে। অবশেষে সদর থানায় খবর যায়, এবং নিরুদ্দেশ হবার আটদিনের মাথায় গণধর্ষিতা পুতলিকে সদর হাসপাতালে আনা হয়।
হাসপাতালে আঁচড়েকামড়ে ক্ষতবিক্ষত পুতলির অস্বাভাবিক চাহনি ও গাড়ি থেকে ফেলে দেবার ফলে থেঁৎলানো কপাল দেখে অশ্রুকণার মাথায় অন্ধকার নামে।
কে? কারা? কতজন?
পুতলি বোবা চোখে চেয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ আতঙ্কে সিঁটিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।
ডাক্তার বলতে বাধ্য হন, এ সময়ে আপনারা না এলেই ভালো, একটু ধাতস্থ হোক আগে।
পুতলিকে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ, এ ভাবে তাকে ফেলে যাওয়া, টাউনের মানসিকতায় ভীষণ ঝড় তোলে।
পুতলি আর কিছুই জানেনি। ভয়ঙ্কর শকে, ব্রেনসেলে ও মনে, ও জীবন্মৃতের মতো হয়ে গিয়েছিল।
যেমন জানেনি অশ্রুকণার অতর্কিত রক্তচাপ বেড়ে সেরিব্রাল অ্যাটাক ও মৃত্যুর কথা।
একটা ছোট শহর, বড় শহর নয়। নয় কলকাতা। বড় হবার জন্যই হোক, বা অন্য কোনো গবেষণাযোগ্য কারণ থাকুক, কলকাতা ভয়ংকর ও বিধ্বংসী সব আঘাতের পর চলতে পারে। বিনোদ মেহেতা হত্যা, অথবা বানতলা—রাইটার্সে বোবা কালা ধর্ষিতা মেয়ে ফেলানী, অথবা বউবাজার, কলকাতা চলতে পারে, চলতে পারে।
একটা ছোট শহর পারে না এত আঘাত নিতে। তাকেও চলতে হয় সব কিছুর পরেও, জীবনের নিয়মেই চলতে হয়। কিন্তু আঘাতের ক্ষত বহন করতে বড় কষ্ট হয়।
শহরের আশপাশে নারীধর্ষণ ও হত্যা এমন বিরল কোনো ঘটনা নয়। এরকম হয়, মাঝে মাঝে হয়। কখনো প্রতিবাদ হয়, কখনো হয় না। অ্যাসেমব্লিতে পঠিত স্টেটমেন্ট কাগজে পড়ে আমরা ২/১ মিনিট ভাবিত হই। অতঃপর কাগজের মতো খবরটিও বাসি হয়ে যায়।
প্রতিবাদের প্রতিরোধের ছোট ছোট দ্বীপ দেখা যায় এখানে সেখানে। এখনো তা দ্বীপ, সম্মিলিত বিশাল ভূখণ্ড নয়।
সুজাতাকে সহ্যই করতে পারছিলেন না নীহার। আসলে কোনো আঘাত আসেনি জীবনে, পূর্বাশার ভেতরে ঢুকে গেলেই নিজেদের ভীষণ সুরক্ষিত মনে হতো। পুতলির বা সমুর উচ্চাশা নেই। ওরা এ—ওকে বিয়ে করবে, এর চেয়ে বড় দুঃখ ওঁরা পাননি। সুরক্ষিত, সুছন্দ, নিয়মবাঁধা জীবনযাত্রা।
হঠাৎ তাঁরা যেন নগ্ন, জনতার চোখের সামনে।
পুতলি গণধর্ষণের পর জীবন্মৃত এক নির্বাক শরীর মাত্র, হাসপাতালে পড়ে আছে।
এ আঘাত অশ্রুকণা নিতে পারলেন না।
কুমার ও পিপলি ও নীহার বললেন, সুজাতা ডেকে নিয়ে গেল কেন?
এস. পি. বললেন, আপনাদের মতে তিনিই দায়ী?
—নিশ্চয় দায়ী।
—বী রীজনেবল।
—এক গ্যাং ছেলেমেয়ে থাকতে...
—গ্যাং যদি বলেন, তাতে আপনার মেয়েও আছেন, আর ওরা তো ড্রাগ, পণপ্রথা, মেয়েদের ওপর নির্যাতন, পুকুর ডোবা দূষণ ইত্যাদি পাবলিক ইস্যুর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। কোনো রাজনীতিক স্বার্থ নেই।
কুমার বলে, বুঝলাম। এখন হবেটা কি?
—কেস হবে।
—কেস! পুতলি বাঁচে কি মরে...
—এখানে কি চিকিৎসা বা হবে...
—অফ দি রেকর্ড বলছি। নিয়ে যান না বোনকে। ভর্তি করুন কলকাতার কোথাও...
নীহার বলেছিলেন, খুনীদের কি হবে?
—মার্ডার? কোথায়?
—মার্ডার নয় এটা? আমার জীবন, সম্মান, সব খুন হয়ে গেল। আমার স্ত্রী...আমার স্ত্রী...এটা মার্ডার। আমার মেয়ে কোনোদিন স্বাভাবিক হবে? এতগুলো জীবন নষ্ট, এটা মার্ডার নয়?
এস. পি. সময়োচিত গাম্ভীর্য মুখে এনে মাথা নেড়ে সম্মতি জানান।
কুমারকে বলেন, এই তো হয়! কিন্তু পুলিশ তো চায় এভিডেনস।
—ট্রু।
—আপনার বোনকে এখনো জিজ্ঞাসা করলে উত্তর মিলছে না কিছু। কারা ধরল, কোন জায়গায় নিল, কাউকে চিনেছেন কি না...
কুমার তেতো বিরক্তিতে বলল, লোডশেডিংয়ে তুলে নিয়ে ক্লোরোফর্ম করলে ও চিনবে কাকে? গাড়িটা ট্রেস করেছেন?
—ও রাস্তায় গাড়ি ট্রেস?
—কি করছেন? একটা কিছু করুন।
—আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আপনাদের শত্রু আছে কোনো, আপনার মেয়ের?
—না না না! আমরা লেফট ফ্রণ্টকে ভোট দিই, অ্যান্ড সেখানেই শেষ। কলেজে আমি বা আমার স্ত্রী, কোনোদিন কোনো রাজনীতিতে থাকিনি। ছেলে আর বড় মেয়ে তা বাইরে থাকে। শহরেও আমরা খুব বেরোই না।
—পুতুলি বেরোত বাবা।
—হ্যাঁ...ও খুব অ্যাকটিভ...পরিবেশ—দূষণ প্রতিরোধ, হেনতেন ...টাউনের প্রোগ্রেসিভ একটা গ্রুপ...
—সুজাতা সিংহের সঙ্গে উনিও গিয়েছিলেন?
—কোথায়?
—সুতানপুর...মালা মণ্ডল...
—তা হবে। সব সময়েই তো...
—চাঁদের নামে অনেক চেঁচামেচি...
নীহারের ভেতরে বরফের তীর বিঁধতে থাকে, সব ঠাণ্ডা হয়ে আসে।
—মিস্টার সামন্ত?
—বলুন।
—সেই...চাঁদ কি...
এস. পি. ঈষৎ হাসেন।
—চাঁদকে আমরা জামিন দিতে বাধ্য হই...কিন্তু চাঁদ আর ওর সঙ্গী বলাই মোমিনপঞ্জে গণপিটুনিতে মরে গেছে দিন তিনেক আগে। চাঁদ এর মধ্যে ছিল কি না তা আর প্রমাণ করা যাবে না, বুঝলেন?
—এ অবস্থায়...আমি কি করব ...গ্যাং রেপ...তার আসামী ধরবেন না?
—আপনি শোকাহত, আর এরকম ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো...আপনি জানেন না, ধর্ষণের কেস করতে পারে পুলিশ, কেন না ধর্ষণ হলো স্টেটের বিরুদ্ধে অপরাধ।
—স্টেট...ব্যক্তি নয়...পুতলি ধ্বংস হয়ে গেল...বাপ হয়ে আমি...
কুমার বলল, চলো বাবা, চলো।
রিকশায় বসে বলল, মার শ্রাদ্ধশান্তি সেরে পুতলিকে কোথাও ভাল নার্সিংহোমে রাখা...সেটা করে তুমি অমেয়র সাহায্যে বাড়ি বেচে দাও।
—বাড়ি বেচে দেব? এ বাড়ি তোমার মা আর আমি ...তিলে তিলে...
—আচ্ছা আচ্ছা, সে পরে হবে এখন...
টাউনে পুতলিকে ঘিরে তখন কতকগুলো জীবনের কতগুলো বৃত্ত আবর্তিত হচ্ছিল, পুতলি তার কিছুই জানে না।
সমু ভূতে—পাওয়া মানুষের মতো হয়ে গিয়েছিল। প্রথমটা পাগলের মতো ছোটাছুটি করছিল, তারপর ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাকে পাওয়া গেছে সে যে পুতলি, তা সমু একবারও ভাবেনি।
—না না, পুতলি না। উলঙ্গ অবস্থায়...পথের ধারে...না ও পুতলি নয়।
গুলতি মাটিতে পা রেখে চলে, অতীব গদ্য প্রকৃতির ছেলে, গোদা বাস্তব বোঝে।
ও বলল, যা বাব্বা! তুমি 'না' বললে তো 'না' হয়ে যাচ্ছে না।
—না, পুতলি না।
সুজাতা বললেন, ও পুতলি সমু, আর এখনি ওর কাছে যাওয়া দরকার।
সমুর মা কাতর গলায় বললেন, ক্ষমা দিন আপনারা একটু। সে মেয়ের তো যা কপালে ছিল তা হলো। আমার মেয়ের বিয়ে যে ক'দিন বাদে। সেটা তো নষ্ট হয়ে যাবে।
—কেন? তা হবে কেন?
—তারাও তো জানে পুতলি এ বাড়ির বউ হয়ে আসবে। এখন এ কথা জানতে বাকি নেই কারো। এ সময়ে এ বাড়িতে পুতলিকে নিয়ে এত কথা, সমুকে নিয়ে টানাটানি... আহা। আমি মেয়ের মা, আমি বুঝি না পুতলির মায়ের বুকে কি হচ্ছে?
—আমরা জানিয়ে গেলাম শুধু।
সমু রক্তাভ চোখ মুছে বলল, চলুন আমি যাচ্ছি। আমি চোখে না দেখলে..
সুজাতা বললেন, চোখে দেখলেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে সমু, মনে জোর রেখো।
পুতলির অসাড়, বিবর্ণ ক্ষতবিক্ষত চেহারা দেখে সমু বমি করে ফেলেছিল, হো হো করে কেঁদেছিল, তারপর বলেছিল, কারা এ কাজ করল?
গুলতি বলল, জানি না। খুঁজে খুঁজে তোলপাড় করছি আমরা। পুলিশও খুঁজছে।
—পুলিশ কিছু করবে না।
—এ তো মালা মণ্ডল নয়, পুতলি চৌধুরী, চারদিকের চাপ আছে।
লোকাল কাগজ, নিজস্ব সংবাদদাতা মাধ্যমে বড় কাগজ খবরটিকে যথেষ্ট প্রচার করে।
ডি. এম. ও এস. পি.—র কাছে শহরের বিভিন্ন স্তর থেকে পুতলি সহ অন্যান্য নারী নির্যাতনকারীদের সমূহ শাস্তি দাবি করে মেমোরেনডাম আসে।
সুজাতারা সদর থানা ঘেরাও করে মিটিং মিছিলের প্রস্তুতি নেন।
এর মধ্যে অশ্রুকণার মৃত্যু ঘটে যায়।
টাউন থমকে যায়।
অনেকে বলতে থাকে, অভিশপ্ত পরিবার বলতে হবে। নইলে এমনটা ঘটে?
যাদের মেয়েরা এভাবে নিগৃহীত হয়নি, তারা বলতে থাকে, নীহার ও অশ্রু ওই মেয়েকে লাগামছাড়া স্বাধীনতা দিয়েছিলেন বলতে হবে। নইলে সুজাতা সিংহের মা মরছে বলে ওখানে গিয়ে থেকেই যায়? একা একা রওনা হয় অন্ধকারে?
এমন কথাও শোনা যায়, যেত তো অনেকেই। কিন্তু পুতলির স্বভাব ছিল...বাইরে থেকে দেখে মেয়েছেলেকে চেনা যায়?
অমিত সুজাতাকে বলে, বাজারে মারামারি করতে হলো। দিলীপ এমন সব কথা বলছিল...
সুজাতা বললেন, কত জনের মুখ বন্ধ করবে? এ দেশে তো এ ধারণা সর্বব্যাপী অমিত যে, যদি কোনো মেয়ে ধর্ষিতা হয়, এটা তারই অপরাধ!
—কেউ এরকম ভাবলে সে মানুষ নয়।
নিশীথ বলে, এটা কি বললেন ভাই? রেপ কেসে সমাজ তাই ভাবে, পুলিশ তাই ভাবে, এমনকি বিচারকরাও তাই ভাবে।
—তা হতে পারে?
—পারে না? শিবশঙ্কর চক্রবর্তীর কেস স্টাডি পড়েছেন? দেখবেন, কেস করলে কি হয়! আসামীরা ধরা পড়লেও, প্রমাণাভাবে খালাস পেয়ে যায়। মেয়েটা জেল হাজতে পচে। জেলের বাইরে রেপ হয়েছে, এখন জেলই ওর পক্ষে সেফ কাস্টডি।
—এ দেশের কি হবে!
—ভাবুন, কাজ করুন। আপাতত ভাবুন, মেয়েটার কি হবে!
—ওদের বাড়িতেও এমন সর্বনাশ হয়ে গেল, কিন্তু আমি যে পাশে দাঁড়াব, পুতলির দাদা, বাবা, দিদি তো তা দেবে না।
নিশীথ বলে, তোমার ওপরেই রাগ।
—সত্যি, ভাবলেও নিজেকে...
—দোষী মনে হচ্ছে?
—বুঝি না। পুতলির কথাই ভাবছি।
—আপাতত ওকে সরানো দরকার। অন্য কোথাও, কলকাতার কোনো নার্সিংহোমে।
—পুলিশ তা অ্যালাও করবে?
—কেন করবে না? ওর বাড়ির লোকরা স্বচ্ছন্দে নিয়ে যেতে পারে।
—বাড়ির লোকরা কি করবে, তা ভেবেও পাচ্ছে না। তাতে শ্রাদ্ধশান্তির ব্যাপার।
—স্বাভাবিক। যা শুনেছি, ওঁদের জীবনে আঘাত এই প্রথম এল, আর বলতেই হবে এরকম ভয়ংকর আঘাতের পর সামলানো খুব কঠিন। পুতলির যা হলো, সেটা তো সব হিসেবের বাইরে, তারপর ওর মা...ওর বাবা আত্মহত্যা করলেও অবাক হবার নেই কিছু।
—এত বড় স্ক্যানডাল সয়ে মাথা তুলে থাকা...পুতুলিকে নিয়ে কলকাতায় কোথাও রাখলেন, নীহারবাবুকে ছেলে বা মেয়ে কাছে রাখল...কিন্তু বলবে কে ওঁদের?
—সমুর অবস্থাও ভয়ংকর...
—হ্যাঁ...
সুজাতা বড় দুঃখে ক্ষীণ হেসে বললেন, নীহারবাবুর সরে যাবার জায়গা আছে, সমু কি করবে? ওদের বাড়ি এখানে, ওর বোনের বিয়ে সামনে, ওর মনের জোর, সততা, সব আছে। কিন্তু গ্যাংরেপের শিকার যে মেয়ে, তাকে বিয়ে করে এ টাউনে থাকবে কি করে?
—বিয়ে বা করবে কি করে সুজাতাদি? অনেক, অনেক বাধা আসবে দুজনের মনের ভেতর থেকে, এটা ঘটনা। মেয়েরাই কি তা ভুলতে পারে? নীরা তো পারেনি। আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, বলেছিলাম, কতকগুলো জনোয়ার তোমাকে থানায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে, সেজন্য আমরা কেন বিয়ে করব না?
—জানি, ও মাঝে মাঝে চিঠি লেখে।
—জেল থেকে বেরিয়ে বিদেশে চলে গিয়ে ভালই করেছে। এখন বুঝি। কাজ করছে, ভাল স্বামী জেকব, ভাল আছে।
—নীরার জন্যে এখনো কষ্ট হয়, নিশীথ?
—না সুজাতাদি। আর হয় না, একদা হতো। কিন্তু পুতলির কি হবে? সমুর কি হবে? এত কম বয়স ওদের...এরকম ভাঙা ভাঙা জীবন নিয়ে কেউ বাঁচে, কেউ মরে, দেখতে আর পারি না।
—আমাকে ওর মধ্যে ধর না নিশীথ, আমার জীবন পূর্ণতায় ভরা।
—ভাবতে ভাল লাগে। তোমাদের বাড়ির বিষয়ে কিছু ঠিক হলো?
—ভাবেভঙ্গিতে বুঝলাম, ওরা বেচেই দেবে।
—তুমি কি করবে?
—আমি বাধা দিলে বেচতে পারবে না, কিন্তু আমি তা করব না। আমারও আটান্ন হলো, কতদিন বাঁচব? যা চায় করুক... স্বচ্ছন্দে এটা বাবা—মার নামে কোনো ভাল কাজে দিতে পারত। মামারা আছেন...ওঁদের ব্যবস্থা অবশ্য আমি আমার শেয়ার থেকে করে দেব...পুতলি আমাকেও অসম্ভব...অসম্ভব দায়ী করে রেখে দিল।
—দায়ী? তুমি দায়ী?
—না না, তা নয়। ভাবনার দায়িত্ব দিল, কাজের দায়িত্ব। এমন তো কত মেয়ের হয়,, তারপর? সকলকে তার পরিবারে শেলটার দেয় না, সমাজ ক্ষমা করে না, মেয়েটার মনে দগদগে ঘা হয়ে যায়। এ সব মেয়েরা কোথায় যায়, কি করে, সে কথা ভাবতে শেখাল পুতলি। এ চিন্তা বহন করাটা দায় নয়?
—বুঝেছি। চল তো আমার সঙ্গে ক'দিন থাকবে।
—পুতলি এখানে, আমি চলে যাব? তুমিও কি রণো, জয় আর দিদি হয়ে গেলে? তারা জন্মে যেতে বলে না, এবার বলল, মা নেই, একলা থাকবি? তা ছাড়া থাকলেই ওই স্কানডালে জড়িয়ে পড়বি, চল কলকাতা।
—বেশ, থাকো। থাকলে টাইমে পেটভরে খাবে, প্রেসার দেখাবে, ওষুধ খেয়ে ঘুমোবে। এটুকু অন্তত দেখে যাই। নিজে শক্ত না থাকলে ওকে, দরকার পড়লে সাহায্য করবে কি করে?
—যাক, মা যে চলে গেলেন, পুতলির জন্যে সে কথা ভাবতেই পারি না যেন।
মামীমা নিশীথকে বললেন, মা তো জীবন্মৃত হয়ে পড়েছিল। সে শোক বাজবে, পরে বাজবে। মেয়েটার জন্যেই ভেবে পাগল হচ্ছে। কি লাভ বল? তার কপালে ছিল অভিশাপ...মেয়ে জন্মই তো কপালের নির্দেশে চলে, হক কথা।
শুধু কপাল বা ভাগ্য নয়। সুজাতার বাড়ি থেকে ভরা বর্ষায় পূজা আর মীনাক্ষী টাউনে ফিরেছে তাদের কিছু হলো না কেন?
যারা ধর্ষণ করল, তারা পুতলিকে বেছে নিল কেন? পুতলি তো চোখে পড়ার মতো সুন্দরীও নয়।
মেয়েটাই ওই গর্বিত, দেমাকী পরিবারকে ভেঙেচুরে দিল। কারো সঙ্গে মিশি না, কোথাও যাই না, কারো বিপদে দাঁড়াই না, ঝামেলা এড়িয়ে চলি, টাউনে কাউকে মেশার যোগ্য মনে করি না।
এখন কি করবি? তোর মেয়েই রেপ হলো, তোর বউই মরল, এ যে লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল।
এমন অনেক কথা হতে থাকল, অনেক কথা।
শেষ অবধি সুজাতা মরিয়া হয়ে পূর্বাশায় গেলেন।
পিপলি বলল, আসুন।
পিপলি বাইরে থাকে, যথেষ্ট সফিস্টিকেড, সুজাতার ওপর ও মোটেই প্রসন্ন নয়। কিন্তু তাঁকে দরজা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধির কাজ নয়, সেটা ও বোঝে।
কুমার বলল, ওঁকে ভেতরে বসালে?
—বসালাম। টাউনে বাবাদের কোনো পাবলিক রিলেশান নেই। কত কম লোক এসেছে এত বড় ঘটনার পর। ক্রিমিনালদের ধরার জন্য পুলিশে এরাই যাচ্ছে, মাকে শ্মশানেও নিয়ে গেল পুতলির বন্ধুরাই।
—বাবা জানলে...
—বাবা জানবে কেন? ফ্রাংকলি কুমার, ম্যাডেনেস অনেক হয়েছে। তুমি দিল্লী ফিরে যাবে, আমিও থাকব না। এখন প্র্যাকটিকালি কি করা যায়, তা ভাবতে হবে, করতেও হবে। ওঁর সঙ্গেই কথা বলি?
—আমিও বলব।
—এসো, বাবা বা বোন আমার একার নয়।
সুজাতা অশ্রুকণার ছবিটার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। ওঁরা ঢুকতে বললেন, বিয়ের সময়ে অশ্রুর চেহারা খুব ভালো ছিল, এ ছবি অনেক পরের।
—হ্যাঁ...গত বছরের...
—তোমরা কি করবে কিছু ভেবেছ?
—কেস করব।
—তুমি তো দাদা ওর...রেপকেসে কেস করতে পারে শুধু পুলিশ। পুলিশকে দিয়ে কেস করানোর প্রসেস অসম্ভব জটিল, সময়সাধ্য। আর কেসটা হবে এখানে, তোমরা তো বাইরে থাকো।
—তা বলে কতকগুলো ক্রিমিনালকে....
—দেখ!
পিপলি বলল, আপনি তো কেস একটা... কি যেন...পুতলি বলেছিল...
—মিতালি দাস। পুলিশকে অনেক চাপ দিয়েও পারিনি। রেপকেসে সামনের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে দেখা যায় আসামী প্রমাণাভাবে বেরিয়ে গেল।
—ইশশ! দিল্লীতে সহেলী কিন্তু...
—এখানে তেমন সংগঠন গড়ে তোলা যায়নি। গড়ে উঠেছিল, এ ব্যাপারে প্রচণ্ড ঘা খেল। যাক গে, ওঁদের কি ব্যবস্থা করবে, পুতলির আর তোমাদের বাবার?
—তাই তো ভাবছি। আমরা তো এখানে থাকব না। ফিরে যেতেই হবে।
—আমি একটা কথা বলব?
—বলুন।
—পুতলিকে তোমরা কলকাতা নিয়ে যাও, কোনো ভালো জায়গায় ভর্তি করো। ওর সুস্থ হতে অনেকদিন লাগবে। তোমার বাবাকেও নিয়ে যাও। এখানে থাকবেন কি করে? রেপকেস বলো, স্বামী তাড়িয়ে দিলে বলো, পরিবারের লোকজনের সহানুভূতিটা একেবারে ওষুধের কাজ করে।
—কলকাতায়...কোন নার্সিংহোমে?
—সে তোমার ভাবতে হবে না কুমার। আমার বন্ধুরই নার্সিংহোম আছে।
—তুমি ওকে নিয়ে গেলে, বাবাকে আমি...অবশ্য আমরা বাড়ি থাকি না।
—বাবা এখন কলকাতা চলুক, পরে দেখা যাবে। বাড়িটা নিয়ে অবশ্য সমস্যা...
—তোমরা যদি বলো, আমি বাড়িতে থাকার বিশ্বাসী লোক দিতে পারি।
—বাবার কলেজের কোনো স্টাফ, না হয় বন্ধ থাকবে।
—কবে যাবে তোমরা?
—তাড়াতাড়িই যাব।
—এখানে থাকলে...
কুমার সঘৃণায় বলল, শুধু কথা। শুধু গসিপ। এখানে বাড়ি রাখারই মানে হয় না কোনো। বাবাই বা পরে থেকে কি করবে? পুতলিও তো বার্ডেন হয়ে যাবে একটা। নর্মাল হতে পারবে?
—পারবে, যদি তোমরা পাশে থাকো।
পিপলি সদুঃখে বলল, এ শহরকে সবচেয়ে ভালবেসেছে পুতলি। বাইরে থাকতেই চাইত না।
—জানি। আমি উঠি।
দাঁড়িয়ে সুজাতা বললেন, তোমাদের সামনে আসার মুখ নেই আমার, তবু বিশ্বাস করো, মায়ের শোক আমি ভুলে গেছি, সব ভুলে গেছি, শুধু পুতলির কথা ভেবে। তোমাদের আগে দেখিনি আজ দেখলাম। খুব শান্তি নিয়ে গেলাম মনে, খুব শ্রদ্ধা...সব পরিবার যদি এমন হতো...
সুজাতা বেরিয়ে গেলেন।
কুমার বলল, যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
—হ্যাঁ...কিন্তু বাড়িটা আগলাবার জন্যে ওদের বললেই ভাল হতো। ওদের এ বাড়ি দখল করবার চেষ্টা থাকবে না।
—ওদের ফেভার নেব?
—ওরা প্রত্যেকে মনে মনে জ্বলে আছে। আমাদের জন্যে এটুকু করতে পারলে...
—দেখ! তুমি যা হোক কলকাতায় আছ। পুতলিও তোমার বাড়িতে থাকছে না এখন। আমার কাছে বাবা থাকবে...আমরা দুজন থাকব কাজে...ঝামেলাটা আমাদের বেশি।
পিপলি আস্তে বলল, থাক কুমার। বাবা—মা আমাদের জন্যে কম করেনি। কোনোদিন বার্ডেন হয়নি। আমি আর তুমি ছাড়া কে দেখবে ওদের? পুতলি আমাদের বোন!
—বাড়ি দেখার জন্যে ওঁকেই খবর দিতে হয়।
—তাই দেব।
—বাবা একটু ধাতস্থ হলে এ বাড়ি বিক্রি করে কলকাতায় কোথাও...
—ধাতস্থ হোক আগে। বাবা চলে গেলে মা সামলে নিতে পারত। বাবার পক্ষে...মার ওপর এত নির্ভর করত...কি রকম হয়ে গেছে বাবা। ঘর থেকে বেরোয় না, কথা বলে না...আমি অমেয়কে ফোন করে সব ব্যবস্থা করতে বলি।
নিয়ে যেতে...পুলিশ কিছু...
ওরা যখন সুজাতার বাড়ি গেল, সুজাতা বললেন, গুলতি, তাপস, ওরা থাকবে কেউ না কেউ। এখানেও সিকিউরিটি সার্ভিস হয়েছে, তাদের কাছেও লোক নিতে পার। পুলিশ কি করবে? যদি...যদি কোনোদিন ধরা পড়ে লোকগুলো...তখন পুতলিকে দরকার হতে পারে শনাক্ত করার জন্যে।
পিপলি বলল, সে দেখা যাবে।
পিপলি আর কুমার সুজাতার বাড়ি অবাক হয়ে দেখছিল। শ্বেতপাথরের টেবিল, সেকেলে ভারি ভারি আসবাব, আলমারি ভরা বই, বাগান থেকে কি সব ফুলের গন্ধ আসছিল।
—এ তো বিশাল ব্যাপার...
—হ্যাঁ...ঠাকুরদার তৈরি...ওঁরা তো জমিদার ছিলেন...আর কোনো সাহায্য চাই?
—অমেয়কে বলেছি নার্সিংহোম ঠিক করতে।
—ওকে নিয়ে যাবার সময়ে তোমাদের যদি এদিকে ব্যবস্থা করতে দু'একদিন থাকতে হয়, আমি আর নিশীথ অ্যাম্বুলেন্সে যেতে পারি।
—সেটা খুব উপকার হবে, সত্যি। আমি থেকে বাড়িটা বন্ধ করব, লোক থাকার ব্যবস্থা করব, কুমার বাবাকে নিয়ে যাবে।
নিশীথ মৃদুস্বরে বলল, সব এক সঙ্গেই হোক না? অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে গাড়িও নেওয়া হোক। আমার সঙ্গে যাব।
—পুতলি এখনো কথা বলছে না।
নিশীথ নরম গলায় বলল, অসম্ভব শক লেগেছে মনে, তবে ফেলে দেয় যখন, কাদায় পড়েছিল বলে মাথায় তেমন ইনজুরি হয়েছে মনে হয় না। কলকাতায় সব চিকিৎসাই হবে।
সুরভিত, ঝকঝকে, ছোট করে চুল ছাঁটা পিপলি কপাল কুঁচকে বলল, পুতলির নখে চামড়া, মাংস, ও ফাইট করেছিল, তাই না?
সুজাতা বললেন, হ্যাঁ...
—কি করে করল তাই ভাবি...অত ছেলেমানুষ...অত নরম মেয়ে...মাগো!
সুজাতার চোখে পর্দা নেমে এল, খুব সাহস ওর, খুব পিওর, খুব ইনোসেন্ট...ঠিক এই মুহূর্তে ছেলেরা অপরাধীদের পেলে খুন করতে রাজী আছে। ওকে সবাই এত ভালবাসে...
—সেদিন যদি কেউ সঙ্গে যেত...
—সবাই শ্মশানে ....মানা করলাম বারবার... ছেলেরা সাইকেলেই পৌঁছে দিত...শুনল সে কথা? জেদও আছে খুব...আর অশ্রুর জন্যে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। হতভাগী জানেও না...
পিপলি বলল, না। শক কেটে গেলেও জানানো যাবে না। তাতে...আমরা উঠি তাহলে।
ওরা চলে গেলে সুজাতা বললেন, ওরা সমুর নামও করল না।
—না সুজাতাদি। কেউই ওদের কাছে ম্যাটার করে না। ভেব না।
—সে ছেলে কেমন করে বুলির বিয়ের আয়োজন করছে?
—জানি না। গুলতিরা তো আছে।
—যাক, তবু আমাদের কথাগুলোয় রাজী হলো। সাহায্য নিতে এত ভয় পায় কেন? সাহায্য ছাড়া চলে মানুষের কখনো?
—তোমাদের বাড়ি দেখে ওদের সমীহ হয়েছে। কিন্তু এ টাউনে পড়েছে, আগে আসেনি কখনো?
—কে জানে! আমি থাকতাম না, মা বেরোত না, কার কাছে আসবে? ওই বাগানে পিকনিক করতে আসত...গাছে আম পাকলে আসত...ওরা নাকি জানি না, শহরের ছেলেপিলে যত। শুনেছি, টাউনে যাঁরা স্বদেশী করতেন, তাঁরা এখানে লুকিয়ে মিটিংও করেছেন, শোনা কথা, দেখিনি।
—তুমিও এখানেই ছিলে ছোটবেলা।
—হস্টেলে পড়তাম, ছুটিতে আসতাম, ওই গাছটা, যেটা মা মরতে কাটা হলো, ওটা একসময়ে ফল দিত। ও গাছে দোলনা টাঙিয়ে দুলেছি।
—এ বাড়িও তো থাকবে না।
—মানুষ চলে যায় নিশীথ, বাড়ি দিয়ে কি হবে?
—তুমিও ছেড়ে চলে যাবে?
—হোক না বিক্রিবাটা। আমার নিজস্ব দশ কাঠা আছে না, স্বর্ণময়ীতে? একটা ছোট বাড়ি করে নেব বা কিনে নেব ওটা বেচে, আমার শেয়ারের টাকা দিয়ে। আমাদের সংগঠনের স্থায়ী ঘর হবে, মামা মামী থাকবে। ভাবলেও অনেক মুক্ত লাগছে। এ বাড়ি বলে বড্ড আসক্তি ছিল। পুতলি বুঝিয়ে দিল জীবিত মানুষই সব।
—ভাগ্যি কাকাকে বিয়ে করনি তখন! ভাল কথা, আমি যে ফ্ল্যাট কিনছি।
—সে কি?
—ক্রিস্টোফার রোডে আমার ফ্ল্যাটটা কি ভাল বলো? একেবারে কোণের দিকে তেতলায়, সামনে দিয়ে ট্রেন যায়, বলো?
—তাই তো! অমন বাড়ি থাকতে...
—সরকার বলছে কিনে নাও। জলের দামে পেয়ে যাব, কিনেও নেব।
—বাঁচা গেল।
—একটা কাজ করবে আমার সঙ্গে?
—যা করব, এখানে...
—বলব, পরে বলব। এখন এখানে পুতলির সমস্যা খানিকটা মিটুক।
—সমুটা যদি একটু আসত।
সমু এসেছিল।
সুজাতার কাছে বসেছিল কপালে হাত রেখে। কয়েকদিনে বয়স বেড়ে গেছে ওর, চোখের নিচে কালি পড়েছে।
—পুতলিকে তোমরা নিয়ে যাচ্ছ সুজাতাদি?
—ওর দিদি নিয়ে যাচ্ছে সমু, সঙ্গে যাচ্ছি। এখানে না হবে তেমন চিকিৎসা, আর শকের অবস্থা কেটে গেলে চেনা পরিবেশ, চেনা মানুষ, ওর মনে আবার শক লাগতে পারে।
—কোনোদিন কি ফিরবে এখানে?
—সে কি বলা যায়?
—কেন ফিরবে না? মাথা উঁচু করে ফিরবে। ও তো কোনো দোষ করেনি।
—তুমি গিয়েছিলে তো!
—গিয়েছিলাম...ডাকলাম...ও চিনতে পারল না।
—এখন দীর্ঘকাল চিকিৎসা দরকার, প্রথমত শরীরের, তারপর মনের...
—আমি কি করব?
—আমরা যা করছিলাম, তাই করব। কিন্তু এক বছরে আটাশটা রেকর্ডেড নারীধর্ষণ, এ নিয়ে ঝড় তুলতে হবে আমাদেরই।
—পুলিশের বিরুদ্ধে।
—ধর্ষিতা মেয়েদের ট্রাজিডি কি জান? কেস থেকে সুবিচার পাবার পথ অতীব ঘোরাল। ট্রাজিডি হলো সমাজ আগেভাগেই রায় দিয়ে রাখে ধর্ষিতা মেয়েটিই দোষী। পুলিশ বা জজ বা উকিল, এই সমাজেরই লোকজন। তাই ধর্ষিতা মেয়েটি মানবিক বিচার পায় না।
—পুতলির বেলাও তাই হবে?
—সমাজের চোখে পুতলিতে বা মালা মণ্ডলে কোন তফাত নেই।
—জানি। কিন্তু পুতলি যদি সব কিছুর পর রাজী থাকে, আমি ওকে বিয়ে করব।
—খুব বড় কথা সমু, কিন্তু আগে ও শরীরে মনে সুস্থ হোক।
—এদিকে বুলির বিয়ে...
—হ্যাঁ, সেটা হোক...
—সব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সুজাতাদি, যখন সবাই বলে, ওর নাম করব না, আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে।
—ছিঃ সমু!
—আমি যাই সুজাতাদি। আপনি, আপনি ওকে দেখবেন। নিশীথদাকেও বলবেন।
—সমু, আমি তোমার সঙ্গে আছি, তুমি একলা নও...
—জানি, কিন্তু একটা নিষ্পাপ, অসামান্য মেয়েকে ভালবেসে এতদিন...ওদের বাড়ি বিরূপ...আমার বাবা—মার সঙ্গেও কম কথা বলতে হয়নি। ওদের কালচার এক রকম। আমরা নেহাৎ গেরস্ত সংসারের লোক... দেশের বাড়িতে পুজো হয়...আগেই শুনতাম বেজাতে বিয়ে করব, আমার জ্ঞাতি জ্যাঠা কাকাদের মেয়েদের বিয়ের সময়ে কথা হবে। আজ বাবা বলছে, এত সবের পরেও তাকে বিয়ে করলে আমাদের সঙ্গে যোগ থাকবে না।
—তুমি তো ওকেই চাও...
হ্যাঁ...চাই...পরিবারে ও বড় একলা...
—দেখা যাবে সমু। এখন ওর ভাল হয়ে ওঠা দরকার। সবে তো কয়েকদিনের ব্যাপার।
—এখানেই ছেড়ে দেব না আমি, পুলিশকে দিয়ে কেস করিয়ে ছাড়ব।
—শান্ত হও, শান্ত হও সমু।
নিশীথ বেরিয়ে এল।
—আমি ওর সঙ্গে যাই। টেলিফোন অফিস থেকে একটা ফোন করব। চলো সমু।
এর পরে পরেই, একদিন কাকভোরে একটা অ্যাম্বুলেন্স ও একটি অ্যামবাসাডর কলকাতা রওনা হয়ে গেল।
পুতলি ইনজেকশনের ঘোরে ঘুমোচ্ছিল।
'পূর্বাশা'য় 'মান্না'জ সিকিউরিটি সার্ভিসের লোক মোতায়েন হয়ে যায়। একজন দিনে, একজন রাতে। শোনা যায় সুজাতাও সঙ্গে গেছেন।
সমু বন্ধুদের বলে, বুলির বিয়ে মিটে যাক। দেখব, পুলিশ কেমন কেস না করে।
গুলতি বলে, অন্তত জোরদার মিটিং দরকার, লাগাতর। যাতে অন্য মালা, অন্য পুতলিরা বেঁচে যায়।
আন্দোলনটা হয়েছিল।
এ রাজ্যের বড় বড় দৈনিকে খবরটা খুব ফলাও করে কভার করে।
রাজনীতিক দলগুলিও মঞ্চে নামতে বাধ্য হয়। কলকাতা থেকে ছুটে আসেন নেতারা, জেলার মন্ত্রীরা। পুলিশ সকলের আক্রমণের টার্গেট হয়।
ফলে নির্মীয়মাণ হোটেলের সামনে বসে এক অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি।
সুজাতারা মেমোরেণ্ডাম ছাপান ও বিলি করেন। এ সীমান্ত জেলা থেকে কত মেয়ে তিন বছরে অপহৃত, কতজন ধর্ষিতা, কতজন ধর্ষণের পর নিহত। চিহ্নিত আসামীরা কিভাবে নিশ্চিন্তে ঘুরছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এস. পি. সবচেয়ে আক্রান্ত হন।
কারা এ কাজ করল? তারা কি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মস্তান?
সমুরা দাবি করে, ধর্ষণ যখন রাজ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ, তখন পুলিশ কেন কেস করছে না?
ওরা কলকাতা ছুটে গিয়েছিল শ্রীমতী বর্ষা প্যাটেলের কাছে। বর্ষা প্যাটেল বম্বেতে কুলাম্বা নায়ারের কেস করেছিলেন, জিতেছিলেন, আসামী ধরা পড়েছিল। কিন্তু ওঁর কথাবার্তা আশাবাদী নয়, সিনিকাল।
—সে তো ১৯৮৩—র ঘটনা। রেপ কেস প্রমাণ করাই কঠিন, আর তার ম্যক্সিমাম সাজা যাবজ্জীবন। এতে জামিন মেলে না। লোকটা বেরিয়ে যাবে, সুপ্রীম কোর্টে আপীল করেছে।
—বেরিয়ে যাবে?
—মনে হয়। আপনাদের এটা তো গ্যাংরেপ।
—তাই মনে হয়।
—'মনে হয়'! বর্ষা প্যাটেল বিষণ্ণ হাসি হাসলেন। সমু, সুজাতা, গুলতি, পিপলি—সবাই কিছুটা আশাহত। বর্ষা প্যাটেল কৃতী আইনজীবী, মেয়েদের ধর্ষণের কত রকম কেস না করেছেন। কত লেখা বেরিয়েছে তাঁর বিষয়ে।
তারপর সেই বর্ষা প্যাটেল কলকাতায় আসছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে, এটা জানার পর নিশীথই যোগাযোগ করে দেয়। একটি ঘণ্টা সময় বের করা গেল তাঁর ব্যস্ত কর্মসূচীর মধ্য থেকে। বললেন, 'মনে হয়' শব্দের তো কোনো দাম নেই। রেপ কেসের নিয়মগুলো শুনলেই বুঝবেন। প্রথম রিপোর্ট কে করে, মেয়েটি?
—ও তো সেন্সলেস ছিল।
—'রেপ হয়েছে' বলে কেউ রিপোর্ট লিখিয়েছে?
—না। ওকে নগ্ন ও ক্ষতবিক্ষত দেখে লোকাল থানা কিছুই লেখেনি। সদরে ফোন করে সদর থানা মারফৎ হাসপাতালে দিয়ে যায়।
—গ্যাংরেপ বলল কে?
—ডাক্তাররা, আমরাও বুঝেছিলাম।
—আপনাদের বোঝার তো কোনো দাম নেই। পুলিশে লেখায়নি কেউ?
—ওর বাবা।
—ডাক্তারী পরীক্ষাতেও তাই বলছে?
—ওখানে তো বলছিলেন, এমন জঘন্য গ্যাংরেপ কেস আগে পাননি।
—কারা রেপ করে, কোথায় রেপ হয়...
সুজাতা বললেন, বলতে পারত একমাত্র পুতলি। কিন্তু লোডশেডিং ছিল, ওকে বারবার ফ্লোরোফর্মও করা হয়। ও অ্যাট অল কিছু বলতে পারবে কিনা জানি না।
—আর নিয়ম হলো, ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট বা এফ আই আর—এ শুধু প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকবে। এটা যে রেপ তা পরিষ্কার বলতে হবে। তার সঙ্গে অন্যান্য অপরাধ ঘটে থাকলে তাও বলতে হবে। এফ আই আর সই করতে হবে। মেয়েটির বাবা এ সব করেছিলেন?
—উনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন।
—তারপর পুলিশ যাবে ক্রাইমের সীনে, ধর্ষিতার জবানবন্দী নেবে, ডাক্তারী পরীক্ষা করাবে, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দী নেবে, কাপড়চোপড় ইত্যাদি প্রমাণ সংগ্রহ করবে, রাসায়নিক পরীক্ষায় পাঠাবে।
সমু চেঁচিয়ে ওঠে, ওকে নগ্ন করে ফেলে দিয়ে যায়, নগ্ন করে...
সমু উঠে গিয়ে জানালায় দাঁড়ায়।
—তারপর আসছে আসামীকে/আসামীদের গ্রেপ্তার। তারপর ধর্ষিতা মেয়েটি তাকে/তাদের শনাক্ত করবে।
সুজাতা আস্তে ইংরেজিতে বলেন, ও আমার বাড়ি থেকে সন্ধ্যার মুখে বেরোয়, কিছুদূর যেতে লোডশেডিং এবং নিখোঁজ। চারদিন বাদে হাইওয়ের পাশে ওকে পাওয়া যায়। নগ্ন, বুকে আঁচড়, কামড়ের দাগ, লজ্জাস্থানে চাপ চাপ রক্ত, ও বেহুঁশ। হাসপাতালে এত চিকিৎসার পর এখনো ওর ট্রমা কাটেনি। তাকাচ্ছে, কাউকে দেখলে কুঁকড়ে যাচ্ছে, অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।
—এ কেস তো দাঁড় করানোই কঠিন। আমি আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। পুলিশের যা অ্যাটিচুড...প্রপার মেডিক্যাল একজামিনেশান করবার ব্যবস্থা কোথায় জেলা হাসপাতালে? যথেষ্ট প্রমাণ পেলে তবে তা পুলিশ চার্জশীট দেয়। কি করে ধর্ষিতা মেয়েটি সুবিচার পাবে। পুলিশ কি কম মেয়ে ধর্ষণ করে?
—লীগ্যালি কিছু করা যাবে না তবে?
—খুব কঠিন। যদি মেয়েটি যথেষ্ট রিকভার করে, যদি আসামীদের চিনতে পেরে থাকে, 'জার্নি টু জাসটিস' বইটা দিয়ে গেলাম, এতে সবই লেখা আছে। কেস করবার যথেষ্ট গ্রাউণ্ড থাকলে জানাবেন। আমি সানন্দে আসব।
—এত সব জানিনা।
—জানুন, লীগ্যাল সেলস গড়ুন, আন্দোলন গড়ে তুলুন। হাজার হাজার মেয়ে ধর্ষিতা হয়, ক'জন ধর্ষণকারী কোথায় শাস্তি পায়? কি করে পাবে?
নিচু অথচ তীব্র গলায় বললেন, যে দেশে প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে একটা করে নারী ধর্ষণ হয়, প্রতি দু'ঘণ্টায় পণের কারণে একটি করে বধূ হত্যা হয়, প্রতি তেতাল্লিশ মিনিটে একটি মেয়ে অপহৃতা হয়, নির্যাতিতা হয় প্রতি ছাব্বিশ মিনিটে, সে দেশে কোন মেয়ে এই মান্ধাতার আমলের পুরুষদের তৈরি বিচার—ব্যবস্থার কাছে সুবিচার পাবে? হিন্দী ছবিতে নারী ধর্ষণ দেখানো চলবে না বলে আমরা একটা সেমিনার করি। এক তরুণ অ্যাডভোকেট বললেন, যা ঘটছে, তাই দেখাচ্ছে। অবাস্তব কিছু দেখাচ্ছে?
ঘড়ি দেখে উঠে পড়লেন। করজোড়ে বললেন, আমি আপনাদের কোনো সাহায্যই করতে পারলাম না। কিন্তু রেপ প্রমাণ, ও রেপ কেস করতে করতে আমি তিক্তই হয়ে গেছি। আইনগুলো এত অমানবিক!
নিশীথ বলল, ছেড়ে তো দেননি।
—ছাড়ব কি করে? দরকার প্রতি রাজ্যে তেমন আশ্রয় কেন্দ্রের ... যেখানে এ সব মেয়েরা প্রকৃত আশ্রয় পাবে, যা আপনাদের সরকারী লিলুয়া হোম নয়। মধ্যপ্রদেশে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ হয়, নিষ্ঠুরতায় নির্যাতনে পশ্চিমবঙ্গের স্থান দ্বিতীয়।
—এগুলো..?
বর্ষা সুন্দর হেসে বললেন, পুলিশের রিপোর্ট। অর্থাৎ পুলিশে ডায়েরি করা কেস থেকে গৃহীত পরিসংখ্যান। নিজেরাই ভাবুন, এক পার্সেন্ট কেসও কি থানায় যায়?
—কিসে যে ওকে সুস্থ করা যাবে!
—ভালবাসা আর ঘিরে থাকা। ওর যেন কখনো না মনে হয়, ও একা।
—আচ্ছ...চলি...
—আমার দিদির মেয়েই রেপ হয়, নিহতও হয়।
—ঈশশ।
—আমি আজও আসামীকে খুঁজছি। চেষ্টা হারাতে নেই। আচ্ছা!
ওঁরা বেরিয়ে আসেন। সমু বলে, আমরা ফিরেই যাই সুজাতাদি, ও তো কাউকে চিনতে পারছে না। আর, এখন ও যেমন আছে তেমন থাকাই ভালো।
সুজাতাদি, পিপলি আর নিশীথ একটা কফির দোকানে বসলেন।
পিপলি বলল, বাবা যা হোক, পুতলির জন্যে অনেকটা নর্মাল। খাবার নিয়ে যায়, বসে থাকে। বাবা কুমারের কাছে তো থাকল না।
—কিন্তু তোমার...?
—কি করব বলুন? পূর্বাশা বেচতে পারলে পুতলিকে নিয়ে বাবা একটা আলাদা ফ্ল্যাটে থাকলে...
—তোমার খুব স্ট্রেইন হচ্ছে।
—আমার...অমেয়র... ছেলেমেয়েকে বা কি বোঝাব? কুমার আর ঝুমাও কাজ করে। কে ওঁদের নিয়ে...একা বাবা কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু পুতলি...
—আমরা তো দেখতে যেতে পারি।
—নিশীথ তো ফোন করে, ওঁকে জানাব।
—তুমি রোজ যাও?
—সময় কোথায়? প্রতি বছরই এ সময়টা বড্ড কাজ থাকে। ছেলেমেয়ে অক্টোবরে বাড়ি আসে, আমরা একসঙ্গে দিন পনেরো কোথাও যাই। এ বছর...
—অসুবিধে?
—ওকে তো ছেড়েও দেবে। তখন আমার বাড়ি, কি কুমারের বাড়ি... ওর পক্ষে, আমাদের পক্ষেও একটা এমবারসিং পোজিশান। কি বলব সকলকে? কি হয়েছে ওর?
—বলবে... রেপ হয়েছে...
—সর্বনাশ হবে তাহলে। এত কথা হবে, এত লোক নাক গলাবে, এমন স্ক্যানডাল হবে!
—ওর এত বড় ট্রাজিডি... তোমরা না দেখলে...
—তেমন কোনো ইনস্টিটিউশনও নেই যে ওকে রাখা যায়। একটা রিয়াল প্রবলেম। ওই ছেলেটাকেই যদি বিয়ে করত...
নিশীথ বলে, ওই টাউনে সমু যদি ওকে বিয়ে করে সমাজকে তুড়ি মেরে থাকতে পারে, সমুর পায়ের ধুলো নেব।
পিপলি বলে, পারবে না। ধর্ষিতা মেয়ে নিয়ে? দুজনেই অসুখী হবে। অমেয় তো আমার পুরনো ছেলেবন্ধুদের দেখলেও রেগে যায়। এ তো রেপ হওয়া মেয়ে।
—তুমি সেটা মেনে নাও?
—নিশ্চয়। বিবাহিত জীবনে সুখী হওয়া মানে কিছু ছাড়ো, কিছু পাবে। আমরা তো সুখী হয়েছি।
—কুমার?
—পিপলি সগর্বে বলে, দুজনে দুজনের মত কথা বলে কয়ে নিয়েছে। ওরাও সুখী। পুতলি সবসময়ে অন্যরকম ছিল, আমাদের সঙ্গে মিলতই না। এমন গাঁইয়া, এমন গোঁয়ার, এমন সামান্যে তুষ্ট!
সুজাতা বললেন, তোমাদের বোন, তোমরা তো দেখবেই। যদি বিশ্বাস পাও, আমি ওকে নিয়ে কোথাও চলে যাব।
—কোথাও?
—ম্যাকলাসকিগঞ্জে নিশীথদের একটা বাড়ি আছে। খুব নির্জন, চেনাশোনা জগৎ নয়।
—দেখি, জানাব। আমার প্ল্যান, যত থাকে থাকবে। কুমার ওকে রাখুক কিছুকাল যতদিন না পূর্বাশা বেচা যায়।
—ওখানে বাড়ি রাখবে না?
—ওখানে কেমন করে ওর থাকা সম্ভব অথবা বাবার? ওখানে আমরা কেউ যাব না। এই স্ক্যানডালের পর? আচ্ছা আমি উঠি। বর্ষা প্যাটেল খুব ইমপ্রেসিভ, তাই না? দেখলে মনে হয়, তিরিশ, আমি জানি ওঁর বয়স বাহান্ন। নিশ্চয় ফেসিয়াল করায় বিদেশে গিয়ে।
—আমার তো মনে হলো না।
—আরে, এত বিদেশে যায়, ওর সুবিধে কত। থাকে তো এক বিপত্নীক অ্যাডভোকেটের সঙ্গে। সব জানি। চলি আজ।
নিশীথ মাথা নাড়ল।
—স্বার্থপর পরিবার। পুতলি তেমন মনের আশ্রয় পাবে না।
—সেটুকু দিতেই হবে। নইলে মেয়েটা কোনদিন কি করে বসবে।
—আত্মহত্যা?
—অবাক হবো না।
—না সুজাতাদি। আমার কেন যেন একটা নৈতিক দায়িত্ব এসে গেছে। আমি ওকে বাঁচাতেই চেষ্টা করব।
—হয়তো তোমার ওখানেই হাজির হবো দুজনে। নীহারবাবু নার্সিংহোমে বসে কি পড়ে বল তো?
—গীতা পড়ে, সেদিন হঠাৎ বলল, আমি আর পুতলি দুজনেই তো একটা ধর্মীয় আশ্রমে গিয়ে থাকতে পারি টাকা দিয়ে। ওর তো আর স্বাভাবিক জীবন হবে না।
—বুঝেছি, ওঠো। বাজার করে ফিরতে হবে। বাড়িতে সবজি নেই।
—সুজয় আর জয়া আসে।
—না। আমার সঙ্গে যোগ রাখার সাহস ওদের নেই। ওরা নিরাপত্তায় বিশ্বাসী। আমার একটা রাজনীতিক অতীত আছে না? কুড়ি বছর বয়সে উগ্রপন্থীদের সঙ্গে যুক্ত হবার অপরাধ আমাদের বাড়িতে অমার্জনীয়।
—তাই চা—বাগানের শেয়ার নাওনি?
—নিজেদের বাগানের শোষণের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করি না? সে বাগানের শেয়ার নেব? ছিঃ। ওঠো।
—পুতলির ট্রমা কাটবে কবে? ওরা আমার সঙ্গে ওকে যেতে দেয় তো...
—বয়সটা তো কম। তাড়াতাড়ি শরীর সেরে যাবে।
—মন?
—সময় লাগবে অনেক সময়, ওঠো এখন।
শরীরের ক্ষত সেরে যায় একদিন।
পুতলি অন্য মানুষ হয়ে বাড়ি ফেরে পিপলির কাছে। সম্ভবত ও কোনো অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে। অমেয় আর পিপলি যখন বলে, এবার শুধু রিল্যাকস করো, খাও, ঘুমোও, বেড়াও।
—বাবা কোথায়?
—এই তো...বাড়িতে...
দাঁড়ি গোঁফ কামানো, পরিচ্ছন্ন ফিটফাট নীহার ওকে দেখে কেঁদেই ফেলেন।
—ভাবিনি, ভাবিনি মা, এমন দিনও আসবে।
অমেয় সস্নেহে বলে, যাও বাবার কাছে বসো।
অমেয় ওর কাঁধে হাত রাখতেই পুতলি ছিটকে ওঠে।
—না, ছোঁবেন না আমাকে...গায়ে হাত দেবেন না।
পিপলি বলে, পুতলি!
না, কেউ আমাকে ছুঁও না। আমার...আমার...ভয় করে। সরি অমেয়দা...আমি বাবার কাছে বসছি।
—বোস, চা খাবি?
—খেতে পারি।
এসো না একটু, চা—টা নিয়ে আসবে।
একেবারে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের মতো সুসজ্জিত রান্নাঘরে গিয়ে পিপলি বলে, ও বদলে গেছে। হয়তো মাথাটাই...
—না পিপলি, সম্ভবত কোনো পুরুষ মানুষের ছোঁয়া ও সহ্য করতে পারছে না।
—জানি না কি হবে!
ওরা চা আনে। সোফায় দু'কোণে দু'জন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছেন।
—কি হলো, তোমরা কথা বলছ না?
—পুতলি...বলছে...
—মা নেই, তাই না দিদি?
পিপলি চায়ের ট্রে নামায়। ডাক্তার বন্ধু বলেছে, সব সোজাসুজি জবাব দেবে ওকে।
—না পুতলি।
—পনেরই আগস্ট ছিল...পনেরই...মা কবে মারা গেল?
—দিন চারেক বাদে।
—আমি কিচ্ছু জানি না।
—তুই তখন জানার অবস্থায় ছিলি না। জ্ঞানই ছিল না তোর।
—মা...কি করে?
—প্রেসার বেড়ে...একটা স্ট্রোকেই...
—দাদা এসেছিল?
—এসেছিল, ছিল, আমরাই তো তোদের নিয়ে...
—বাড়ি কি বন্ধ?
—একটা সিকিউরিটি কোম্পানি দেখছে।
—বাড়ি ফিরব না আমরা?
—নীহার বলেন, সে সব কথা পরে হবে পুতলি, তুই একটু আরাম কর।
—আরাম! রিল্যাকস। ডক্টর মিসেস দত্তও বললেন। কিন্তু এখন তো অক্টোবর এসে গেল। আমি তো যথেষ্ট রিল্যাকস করেছি দিদি! কিন্তু এত খরচ...এত টাকা খরচ...সব আমার জন্যে, তো ভাবলে...
—তোর বিয়ে হলে খরচ হতো না?
—বিয়ে! আমার! কিন্তু সে তো অন্য খরচ হতো। এটা অন্যরকম নয়?
অমেয় সস্নেহে বলে, একটা বড়সড় অসুখ হলে চিকিৎসার জন্যেও খরচ হতো।
—দিদি! বাড়ি কি তোমরা বেচে দিয়েছ?
—তোকে না জানিয়ে?
—ওখানে আমরা ফিরব না?
নীহার কেঁদে ফেলেন, সে নেই...শূন্য বাড়ি...ওই টাউনে আমরা মুখ দেখাব কি করে? আমার মনই তো উঠে গেছে পুতলি।
—ও। আমার জন্যে। কিন্তু কেস হবে না? ওদের ধরবে না?
পিপলি বলে, সব চেষ্টাই করা হয়েছে পুতলি। গত তিন মাস আমরা আর কিছু ভাবিনি। তোমার ভাল হয়ে ওঠা...ওখানে থাকলে এর সিকির সিকি চিকিৎসা হতো না।
—তা হতো না।
—বাবাকে আমরা রেখে আসতাম কি করে?
—দাদা আসেনি তারপর?
পিপলি আঙুল ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, কুমার বাবাকে নিয়ে গেল, আমরা তোমাকে নিয়ে ব্যস্ত...বাবা তো থাকল না ওখানে। তোমার জন্য ব্যস্ত হয়ে চলে এল। থাকলে ভাল করত।
পিপলিকে খুব অল্পবয়স্কা দেখাচ্ছে। সুন্দর ফিগার, ছাঁটা চুল, কলকাতায় ও সালোয়ার কামিজই পরে। পুতলি নিজেকে দেখছে আয়নায়। আঁচড়ের দাগ, গলা থেকে তলপেট, হাত, কত ক্ষতচিহ্ন। মাথাও কেটে কুটে গিয়েছিল। চুল নার্সিংহোমে কেটে দেয়। পুতলি বলল, বুঝেছি, তোমাদের বড্ড ধকল যাচ্ছে।
—এবার তো পুজোতেও বেরোব না।
—তা কেন করবে?
—না, পূর্বাশার বিষয়ে একটা ব্যবস্থা না করে...
পিপলির দিকে তাকাল পুতলি। বলল, তাই করো, তাই করো। কিন্তু জেনো, বাড়ি থাক বা না থাক, আমি ওই টাউনে যাব একদিন, মাথা তুলে যাব। কেন যাব না? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি? আমি যাব।
—এর পরেও?
—এর পরেও।
—সমু তোকে বিয়ে করবে এর পর?
—বিয়ে? বিয়ের কথা কে ভাবছে বাবা? বিয়ে নয়, এ তুমি বুঝবে না। আমি শুতে গেলাম দিদি, আমি খাব না কিছু।
পিপলি বলল, বদলে গেছে খুব। কিন্তু এবার একটা ব্যবস্থা করতে হয়।
—বাড়ি বেচে ওকে নিয়ে কোনো আশ্রমে চলে গেলে হয় না?
অমেয় বলল, ওর সুজাতাদিকে আসতে দিন। ওর এখন...সকলের ওপর বিশ্বাস নেই।
—বিশ্বাসই পাচ্ছি না কাউকে সুজাতাদি।
সমুর কথা মনে হয়?
—বিয়ে মানে তো দেহেরও সম্পর্ক। না, বিয়ের কথা আমি ভাবতে পারছি না আর।
—কি ভাবছ?
—রাগে, অবিচারে জ্বলে যাচ্ছি।
—কাউকে চিনেছিলে?
—কাউকে না। এমন অতর্কিতে ধরল, মুখে ক্লোরোফর্ম চেপে ধরল...জ্ঞান হলো তো কোথায় কোন একটা ঘরে।...বুঝলাম শরীরে কেন যন্ত্রণা এত...সন্ধ্যার পর বাতি নিভিয়ে একটা লোক ঢুকল খাবার নিয়ে। তাকে আঁচড়ে কামড়ে জাপটে ধরি, মাথায় মারল, ঘাড়ের কাছে। আবার অজ্ঞান হয়ে যাই।
—গলা শুনে চেনা মনে হলো?
—না, খুব কর্কশ গলা...শুনলামই বা কোথায়? তারপর তো...লোকটার মুখ ফালা ফালা করে দিয়েছিলাম...গাল কামড়ে ধরেছিলাম...
নিশীথ বলল, এটা ওখানে পুলিশকে জানানো যায়। যদি কোনো লোককে ধরতে পারে।
সুজাতা বলেন, তিন মাস বাদে? নর্থবেঙ্গল পালাতে পারে, বর্ডার পেরোতে পারে...গাড়ির চাকার দাগ তো জলে ধুয়ে গেল...
—'জার্নিং টু জাসটিস' পড়লাম সুজাতাদি। রেপ কেসে সুবিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
—ওখানে আন্দোলনটা বেশ জোরদার হয়েছে। দুটো রেপ কেসের খবর এল, আসামীরা ধরাও পড়েছে।
—তুই কি করবি?
—দাদা জানিয়েছে, আমাকে রাখা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। দিল্লীতেও রেপ হয়, ওরা বাড়ি থাকে না।
—দিদি?
—দিদির ধারণায় ওরা যথাসাধ্য করেছে। এখন আমার বাবার কথা শোনা উচিত।
—কথাটা কি পুতলি?
নিশীথদা, বাড়িটা ছ'লাখে বেচেছে। চার ভাগ করলে সবাই দেড় লাখ করে পায়। বাবার ইচ্ছে, আমি আর বাবা তিন লাখ ডোনেশান করে কোনো ধর্মাশ্রমে থাকি। বাবার মন...খুব দুর্বল হয়ে গেছে। আগে এ সব বলত না। ধর্মাশ্রম কেন? আমি কোনো পাপ করেছি?
—তুমি কি চাও?
—আমি কাজ করতে চাই। অন্য কোথাও, অচেনা পরিবেশে।
—আমি তো বলছি, আমার সঙ্গে চল।
—ম্যাকলাস্কিগঞ্জে?
—নিরিবিলিতে ভাল লাগবে।
নিশীথ বলল, পালিয়ে বাঁচা যায় না পল্লবী। কাজ করো, কাজ আছে, জীবনকে ফেস করো।
—আপনি আমায় পল্লবী বললেন?
—নামটা সুন্দর, তাছাড়া পুতুল তো নও, মানুষ।
—কি কাজ পারব?
—জানার জন্যেও একটু নির্জন বাস ভালো।
—সে তো সুজাতাদির বাড়িই আছে!
—যাবে, কোনোদিন সেখানেও যাবে।
—আমিই যদি আমার ভাই—বোন—বাবার কাছে একটা অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠি, তাহলে মালার বাড়িতে মালা মরে গিয়েও কি বিপদের কারণ হয়েছিল?
—সমাজ, এই সমাজ!
—দাদা যখন বলল, দিল্লীতেও রেপ হয়, নিশ্চয় ঠিক বলেছে, হয়, সর্বত্র হয়। কিন্তু আমি গেলে আবারও রেপড হব, এটা ভাবল? না সব কিছুর পর, দাদা—বউদির মতো সো—কলড উদারচিত্ত লোকদের মনেও রেপ হওয়া মেয়েদের বিষয়ে রিজার্ভেশন আছে?
—তা হয়তো নয়।
—মনে হচ্ছে, রেপড হয়ে আমি একটা অন্য গ্রহের মানুষ হয়ে গেছি। আমার সঙ্গে কিভাবে কথা বলবে; কি আচরণ করবে, তা ওরা জানে না।
—তুমি নিজেও কি খুব স্বাভাবিক হতে পারছ পল্লবী? সত্যি বলো তো ভাই।
—না নিশীথদা, পারছি না। আয়নার সামনে গেলে যাকে দেখি সে আগেকার আমি নয়। কেউ এসে ভালভাবে কথা বললেও মনে হয়, কৌতূহল বশে এসেছে, নয় করুণা দেখাচ্ছে।
—তখন?
—অযৌক্তিক রাগ হয়, নিজেও রুক্ষ হয়ে উঠি। জানেন, এক সময়ে কাঁদতে পারতাম খুব। মালার জন্যে কেঁদেছি, সরস্বতীর জন্যে কেঁদেছি, সমুর সঙ্গে 'এক দুজেকে লিয়ে' দেখতে গিয়ে কেঁদেছি, আমার মার জন্যে কাঁদতে পারি না। ওরা হয়তো ভাবে আমি খুব নিষ্ঠুর হয়ে গেছি।
—হয়ে গেছ, পল্লবী?
—না নিশীথদা। মার কথা ভাবলেই মনে হয় মা আমার জন্যে মরেছে, আমাকে দেখে সইতে পারেনি। ওরাই মাকে মেরেছে। কান্না শুকিয়ে গেছে আমার।
সুজাতা বললেন, কি করবে সে সিদ্ধান্তটা নাও।
—হ্যাঁ, নেব।
—একবার নির্জনে গেলে...
—জানাব। নির্জন বলো, জনারণ্য বলো, আমাকে আর কেউ তুলে নিয়ে যেতে পারবে না।
—সমুকে জানাবে না কিছু?
—একটা কথাই জানাতে পারি। ও আঘাত পাবে, বুঝবেও।
পুতলির চিঠি—''সমু, অবাক হোস না। আমি একদিকে শরীরে ভাল আছি, অন্যদিকে আমার ভেতরে সব ভেঙেচুরে আমি অন্য মানুষ হয়ে গেছি।
আমাকে তুই ভুলে যেতে পারবি না, তবু বলছি, আমি তোকে বিয়ে করতে পারব না। কোনো পুরুষ আমার খুব কাছে আসবে, গায়ে হাত দেবে, ভাবলেও আমি যুক্তিবুদ্ধি হারিয়ে ফেলি। হিংস্র হয়ে উঠি। ক্ষ্যাপা কুকুরকে খেতে দিতে গেলি, তোর হাত কামড়ে দেয়নি? কতগুলো ইঞ্জেকশান নিলি তুই?
বাবা আমাকে ধর্মাশ্রমে রেখে দিতে চায়, যেন আমি পাপী, প্রায়শ্চিত্ত করব। দিদি আর দাদা আমাকে কাছে রাখতে হবে ভাবলেও অস্বস্তিতে পড়ে। ওরা কেউ মন থেকে আমাকে সহজ, স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না। কেউ একবারও বলল না, রেপড হয়েছিল? তাতে কি? মাথা তুলে বেঁচে দেখিয়ে দে যে, ধর্ষিতা মেয়েটির মাথা তুলে বাঁচার অধিকার আছে।
টাউনের মালবিকাদির কথা শুনেছি, দেখিনি। ওঁরা নকশাল আন্দোলনে ছিলেন, পুলিশ রেপ করেছে, জঘন্য অত্যাচার করেছে, কিন্তু জেল থেকে ওঁরা মাথা নিচু করে বেরোননি। অর্চনা গুহনিয়োগী তো এখনো লড়ে যাচ্ছেন।
তোর, আমার, আমাদের প্রজন্মটা কোনো রাজনীতিক আন্দোলন জানে না। আমরা লড়ি সিভিল রাইট নিয়ে। সে লড়াইটা লড়েছিলাম বলে বোধহয় মনে ভীষণ জেদ, মাথা তুলে বাঁচব, লড়ে বাঁচব।
এই হিসেবের মধ্যে বিয়ে আসতে পারে না এখন। ওই টাউনে পূর্বাশা থাক বা না থাক, সুজাতাদি যদি আমাদের মত মেয়েদের কথা ভেবে, তার সঙ্গে ও টাউনে আমাদের আন্দোলনগুলো যোগ করে কোনো সংগঠন গড়েন, আমি সেখানে নিশ্চয় যাব।
বিয়ে বিষয়ে বাধা একান্ত আমার মনে, নিজস্ব। এটা বুঝে আমাকে ক্ষমা করে দে। ভুলে যাস না, তোর, তোদের বন্ধুত্ব আমার চিরকাল দরকার হবে। এখন বুঝতে পারছি, তুই কেন ল' পড়তে চেয়েছিলি। লীগ্যাল এইডের দরকার, সবচেয়ে যে কোনো লড়িয়ে সংগঠনে।
ভাল থাকিস, কেননা আমি ভাল থাকার জন্যে নিজের সঙ্গেও লড়ছি—পুতলি।''
পুতলিকে সমু—''তোর চিঠি পেলাম, তোর নিজস্ব সিদ্ধান্তে, নিজস্ব কাজে, আমার বিশ্বাস চিরদিন থাকবে।
তোর টাউনকে আমরা গরম রাখছি। তোর ব্যাপার আর নারী ধর্ষণ ও পাচার নিয়ে এ পর্যন্ত চৌত্রিশটা মিটিং হয়েছে টাউনে, টাউনের বাইরে। এস. পি. ঘেরাও হয়েছে তিন বার, এবার পালাই পালাই করছে। অবশ্য এ সব মিটিং ক্ষমতাশীন দল, বিরোধী দল, এমনকি বিকাশবাবুদের দলও করেছে।
টাউনে 'পূর্বাশা' বিক্রি (কিনল সুকোমল বসু, আর গাছপালাগুলো একরকম রেখেছে), তারপর তোদের চলে যাওয়া, স্যারের রিজাইন করা, মাসিমার মৃত্যু—এসব খুব নাড়া দিয়েছে। শুনছি মস্তান রবিও নাকি বলেছে, বেঁচে থাকলে বেটাদের ধরব। টাউনে টাঙিয়ে রেখে দেব।
বুলি সবসময়ে তোর কথা জানতে চায়। আমি শক্ত থাকতে পারছিলাম না, এখন পারছি, আরো পারব।
এখনই তো তোকে ভোলা যাবে না, কোনোদিনই যাবে? তাই ওসব কথা এখন থাক। ভাল থাকিস, ইচ্ছে হলেই চিঠি লিখিস, কেমন?—সমু।
পুঃ—বন্ধুরা সবাই এক সঙ্গে তোকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, আলাদা কাগজে।''
বন্ধুদের চিঠি—''আমরা তোমার সঙ্গে আছি, ছিলাম, থাকব—গুলতি, তাপস, অমিত, পূজা, অভ্র, মীনাক্ষী।''
নিশীথ আর সুজাতা চা খাচ্ছিলেন। পুতলি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে চলে এল।
—এর মানে?
—চলে এলাম সুজাতাদি। বাবা খুব আপত্তি করছিল, বলছিল আমার দায়িত্ব নাকি বাবার! আমি ওদের বুঝিয়েই বললাম, আমার বয়স উনিশ পেরিয়ে গেছে। আমি আমার জীবন কোনো ধর্মাশ্রমে কাটাব না, পূর্ব ইতিহাস লুকিয়ে কোনো বিয়ের পিঁড়িতে বসব না। আমি আমার দায়িত্ব থেকে তোমাদের মুক্তি দিচ্ছি। কাজ করব, চাকরির জন্য চাকরি নয়। আমি নিশ্চয় তোমাদের সব জানাব।
—সহজে ছেড়ে দিলেন?
—না। তিন দিন বাবাকে বোঝাতে হয়েছে।
—কিন্তু আমি তো ভাবছিলাম...
—কি হবে জঙ্গলে পালিয়ে সুজাতাদি? এখন আমি কাজ না পাওয়া পর্যন্ত তোমাকেও থাকতে হবে। ব্যাচেলর নিশীথদা, আর গণধর্ষিতা পল্লবী নিজেরা থাকবে?
—তোর শরীর ভাল আছে?
—যথেষ্ট ভাল আছে।
—টাকা পয়সা নিয়ে বেরিয়েছিস?
—পাওনা দেড় লাখ, ছেড়ে দিলাম। পাঁচশো চেয়ে এনেছি, রেখে দাও।
পুতলি বসে পড়ল। তারপর ঈষৎ তির্যক হেসে বলল, সাহায্য করতে চেয়েছ বারবার, তোমাদের ঘাড়েই চাপলাম।
নিশীথ খুব স্বাভাবিক, আত্মস্থ গলায় বলল, এখানে অনেকে থেকে গেছে, তুমিও থাকবে। তবে সুজাতাদির প্রস্তাবটা খারাপ ছিল না। মানুষের জঙ্গলেই মানুষকে থাকতে হয়। মাঝে মাঝে, সুযোগ থাকলে গাছের জঙ্গল খারাপ নয়। গাছরা তো বেইমানি করে না।
—কোন কাজে লাগবে আমাকে?
—লে চেষ্টাতেও তো সময় লাগবে।
—কত সময়?
—বলা যায় না পল্লবী। আমরা ধরে নিয়েছিলাম তুমি তোমার দাদা বা দিদির কাছে থাকতে থাকতেই...
—দাদার কথা তো বললাম! আর দিদির কথা যদি বলেন, দিদির জীবনের অভিধানমতে সে যথেষ্ট ত্যাগ করেছে। ওদের কাজকর্ম নষ্ট হয়েছে, এ ছুটিতে ছেলেমেয়ে গেল ওদের পিসির বাড়ি শিলংয়ে। আর কতদিন আমাকে নিয়ে ভাববে?
—তোমার বাবা কি করবেন?
—বাবা তো দাদার কাছে থাকতে চান, দিদিও দেখলাম অরাজী নয়। ফ্ল্যাট ছেড়ে রেখে চলে যায়, একজন থাকলে তো ভালো। কাল বাবার সঙ্গে কথা বলেছি অনেক। বলেছি, বাড়ি তোমার। তুমি বেঁচে আছ। এখনি টাকা ওদের দেবে কেন? ওদের তো অনেক আছে।
—রাজী হলেন?
—না। বললে, আমি মুক্ত হতে চাই। বলে, এ টাকা তুই নে।
পুতলি ঠোঁট কামড়াল।
—আমি কতকগুলো রূঢ় সত্যি কথা বললাম। বললাম, আমার তোমার মিলিয়ে সব টাকা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখো। কলেজের টাকাও পাবে, পেনশানও পাবে। তুমি টাকা দিয়ে দাদা বা দিদির কাছেই থাকো। যত্ন পাবে, আদরও পাবে। জানেন সুজাতাদি, আমাকে ওখানে থেকে কলকাতায় আনা, নার্সিংহোমে রাখা, সব খরচ বাবা দিদিকে দিয়ে দিয়েছে।
—চিরদিনই তো তোমার বাবা—মা আত্মসম্মানী।
—বাবা—মা'র অসুখে, সমুরা, আমার বন্ধুরাই করেছে। মা'র সময়েও হয়তো...
—হ্যাঁ, ওরাই করেছে।
—বাবা—মা'র জন্যে ওদের কিছু করতে হয়নি কোনোদিন। কখনো আমরা বেড়াতে গেলে মা বাবা কত খরচ করত। চিরকাল...চিরকাল...যা করতে হলো সে তো এই প্রথম! কেন করতে হলো? এ রকম উদ্ভট বিপদের জন্যে। মা মারা যাওয়াতে বাবা আরো অসহায় হয়ে পড়ল। কিন্তু এটা তো পরের জন্যে করেনি, নিজের বাবা...ছোট বোন...
পুতলি ঠোঁট কামড়ায়, চুপ করে।
নিশীথ বলে, আজ থেকে তো এখানেই থাকছ, চলো, আমার ফ্ল্যাট দেখাই।
—আপনি ফ্ল্যাট কিনেছেন?
—কিনেছি।
—কোথায়?
—এখানেই।
—যাঃ, এখানে তো সব সরকারী ফ্ল্যাট।
—সরকারই তো বেচল।
—বেশ করেছেন।
—দেখ, দুটো ঘর, একটা বসবার আর খাবার জায়গা। ছোট্ট কিচেন, আর বাথরুম। একটা তাসের মাপের ব্যালকনিও আছে।
—কি সুন্দর রেখেছেন।
—হ্যাঁ আমি হাউসপ্রাউড ম্যান। কম ভাড়া দিতাম, কিন্তু বছর বছর রং করিয়েছি, কিচেন সাজিয়ে নিয়েছি।
—এতগুলো ফোলডিং খাট!
—এটা তো সুজাতাদিরও বাড়ি। তাছাড়া লোকজন আসে, যায়, থাকে! পছন্দ হলো?
—খুব ভালো।
—থাকো, মন খুশি করে থাকো আজকে। কাল থেকে তোমার কাজের খোঁজ করব।
—হ্যাঁ...কাল থেকেই...বাবা যে কি করবে! কোনোদিন তেমন বন্ধুবান্ধব দেখিনি...মা ছিল আর পূর্বাশা! আমার জন্যে...
—নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করেছ?
—না...দোষী নয়...কিন্তু অশুচি লাগে ভাবলে...অবশ্য আমার জ্ঞান ছিল না...মানুষ এমন হয় কেন?
নিশীথ গ্যাস জ্বেলে চা বসায়। বলে, যত রেপ হয়, তার সঠিক সংখ্যা কখনো জানা যাবে না। পুলিশে এফ আই আর করার পর পুলিশ যদি আসামীর নামে চার্জশীট আনে, তাহলে সেটা রেকর্ড হয়। এটা তো ১৯৮৭। বম্বেতে ১৯৮৬ সালে একশো দুইটা ডায়েরি হয়, চার্জশীট করে ছিয়ানববই জনকে...চা—টা ভেজাই। সাজা হয় একজনের, ছাড়া পায় তিনজন, বিচারাধীন একানব্বই জন। ধরে নিতে পারো প্রমাণাভাবে অধিকাংশই ছাড়া পাবে।
—ওই সব...মেয়েদের...কি হয়?
—প্রধানত ভেসে যায়। যদি না কোনো স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সাহায্য করে।
—কি ভয়ানক!
—হ্যাঁ পল্লবী, খুব ভয়ানক।
—এ রাজ্যে?
—বলতে পারব না।
সুজাতাদি বলেন, আবার চা?
—এটা সেই চা যা রুমা গছিয়ে গেল।
—চা তো ভাল করেন আপনি।
সুজাতা সগর্বে বলেন, সব ভাল করে। রান্না, বাড়ির কাজ, সব একা করে। খুব গিন্নিবান্নি ছেলে।
—রান্না করে খাইয়ে দেব।
—দেবেন।
—চাও তো বাবাকে ফোনে বলো যে সুজাতাদির সঙ্গে ম্যাকলাসকিগঞ্জ যাচ্ছ। নিশ্চিন্ত হবেন।
—বলব!
ম্যাকলাস্কিগঞ্জের দক্ষিণতম প্রান্তে রাস্তা যেখানে ফুরিয়ে যায়, সেখানকার শাল, সিধা, অর্জুন ও ইউক্যালিপটাসে আড়াল করা মাঝারি বাংলোটিতে চারদিনও কাটেনি, নিশীথ এসে হাজির হলো।
বলল, রাঁচি থেকে মাছ কিনে এনেছি।
—এমন হঠাৎ নিশীথ?
—কালই ফিরব আমরা।
—কেন?
—উইন, 'ফর উইমেন ইন নীড' বারুইপুরের কাছে মেটেলিতে একটা ইউনিট খুলছে জানতাম। ওরা পল্লবীকে প্রথমে অফিস—ওয়ার্কে নিয়ে নেবে। জেলে পচছিল দশ বছর ধরে এমন দশজন মহিলাকে রাখার জন্যে একজন বাড়ি দিয়েছেন, একজন মানে মিসেস দত্ত। এরা নন ক্রিমিনাল লুনেটিক হিসেবে জেলে ছিল, পাগল নয়।
—এদের পরিবার পরিজন?
—সে পরের কথা। অ্যাডভোকেট বরুণবাবুর কেস, জাস্টিস বোস ছিলেন বলে মুক্তি পেল। থাকুক না ওখানে। কতকগুলো ধবংস হয়ে যাওয়া মেয়েকে আবার বাঁচতে সাহায্য করবে।
—আমি পারব?
—পারতেই হবে। তুমি তো একা নও। তোমরা চারজন মেয়ে থাকবে। বলা যায় না, হয়তো এদের ফ্যামিলির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার সোস্যাল ওয়ার্কার হবে। একশো টাকা পাবে, থাকবে খাবে, নতুন সংগঠন, সংগতি বাড়লে টাকা বাড়বে।
—খুব ভাল, খুব ভাল।
—এখানে ভাল লাগেনি?
—দারুণ লেগেছে। এখানে যদি কিছু করা যেত।
—অসম্ভব! দাদারা দাঁওয়ে কিনেছে, লাভে বেচবে। ওরা আসে না, আমি সময় পেলে আসি।
—আপনি আসবেন ওখানে?
—না, আমার সেণ্টার তো ধাপায়। মাঝে মাঝে যোগাযোগ হয়ে যেতেও পারে। বিখনি আসেনি? কোথায় গেল?
—আভি আয়া দাদা!
—মাছটা বিখনি, খুব ভাল করে বানাও।
—তব মুরগি না লাই?
—না না। কাল আমরা চলেও যাব।
—ঔর এত্তা চাল, দাল, নমক, তেল, হরদি, চিনি, চা কা হোগা দিদি?
সুজাতা বললেন, তুই নিয়ে যাবি।
—কাল হি যানেকা, কা?
—হ্যাঁ বিখনি, কাজ আছে।
—যৈসন সমঝো।
বিখনি মাছটা নিয়ে চলে গেল। নিশীথ বলল, বাড়িটা নাকি সকলের। কেউ আসে না। বিখনিরা যা থাকে সপরিবারে। একটু চাষবাস করে।
পুতলি বলল, স্বামীটা মদ খায়, বড় ছেলে চলে গেছে খালারি, ছোট ছেলে, বিখনি আর ওর মেয়ে যা পারে করে।
—ও সব বলো না। বিখনির প্রেমজ বিবাহ।
—বাড়িটা এত সুন্দর, জায়গাটা এত ভালো।
—চোট্টি নদী দেখেছ?
—আগে আরো নির্জন, আরো সুন্দর ছিল। গাছও অনেক ছিল। পলাশের জঙ্গল কি! ফুল যখন ফুটত।
—হয়তো পরে, পরে কখনো আসব।
—কাজ চেয়েছিলে, কঠিন কাজেই দিচ্ছি, তোমার চেয়ে অনেক দুর্ভাগা ওই মেয়েরা। তাদের মনে বাঁচার আশা জাগিয়ে তোলার কাজ।
—বললেন যে আপিসের কাজ?
—সবরকম কাজ পল্লবী। ওখানে তুমি পল্লবী। যাদের সঙ্গে কাজ করবে, সকলেই জীবনে নানারকম অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এসেছে।
—আমার চেনা কেউ আছে?
—শুধু রুচিরাকে চেনে সুজাতাদি। পল্লবীকে প্রত্যেকের ব্যাকগ্রাউণ্ড বলে দেবে।
রাতে, গায়ে শাল জড়িয়ে ঘরে বসে পল্লবী শুনেছিল 'আশ্রয়'—এর কথা।
'উইন চালাচ্ছে, সংগঠনটা অনেক আগে মিসেস সুশীলা দত্ত গড়েছিলেন। বাড়ি ও জমি তাঁরই দান। গড়েছিলেন বলতে—সূচনা করেছিলেন। মেটেলিতে একশো বছর আগে নির্মিত 'মহিলা জাতি বিদ্যালয়' ওঁর প্রপিতামহের দানে ধ্যানে তৈরি, যা এখন 'রসময় মিত্র স্মৃতি মহিলা কলেজ'। মিসেস দত্তের মেয়ে অনীতা বিয়ের পরেই মারা যায়। ওঁর স্বামী নতুন জামাই ও মেয়েকে নিয়ে কোথা থেকে ফিরছিলেন গাড়ি চালিয়ে। দুর্ঘটনায় অনীতা, ওর স্বামী দুজনেই মারা যান। জামাই বেঁচে যায় ও বছর চারেক বাদে আবার বিয়ে করে। মিসেস দত্ত মেয়েদের কল্যাণকারী কয়েকটি জায়গায় অনেক দিয়েছেন। শেষে তাঁর পিতৃপুরুষদের গ্রাম মেটেলিতে এটা বলতে গেলে গড়ে দিলেন। তাঁর দান এক লক্ষ টাকা নিয়েই কাজ শুরু হয়। তারপর রেজিস্ট্রি হলো, ফাণ্ড তোলা গেল।
—রুচিয়া মেহতা সব কিছুর ইন—চার্জ। বাঙালী মেয়ে, সোসিওলজিতে এম.এ.। স্বামীকে ডিভোর্স করে চলে এসেছে। খুব মেজাজী মেয়ে, খুব কর্মঠ। মেয়েকে ছেড়ে আসতে হয়, কাস্টডি ও পায়নি। ওর মেয়েও বড় হয়ে গেছে এখন, বিদেশে রিসার্চ করছে কি যেন একটা কঠিন বিষয়ে। ওর স্বামীও অনেক কাল অনাবাসী ভারতীয়।
—স্বাস্থ্যকর্মী মাধবী আর গৌরী দুজনেই স্বামীপরিত্যক্তা। গৌরীর একটা ছেলেও আছে। খালপাড়ার কলোনির রেপ, ভিকটিম, বাড়িতে নেয়নি আর।
—রান্নাবান্না করে বাসন্তীর মা। বাসন্তী বকফুলিয়াতে রেপড হয়, পুলিশ আসামীদের চিনত। রেপের ফলে পনের বছরে বাসন্তীর গর্ভ হয়। বাসন্তীর মা—বাবা মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে আসে। তারপর বাসন্তীর সন্তান হলে মা—মেয়ে বাচ্চা নিয়ে রেলে মাথা দিতে যাচ্ছিল। স্থানীয় লোকরা উদ্ধার করে আমাদের ওখানে নিয়ে আসে। বাসন্তীর মা আর বাসন্তী রাঁধে, অন্য কাজ করে। বাসন্তীর ছেলেকে আমরা স্কুলে দিয়েছি।
—এদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, যাদের জন্য এই সেণ্টার। জেলে এ সব মেয়ের বিরুদ্ধে কোনো চার্জ থাকে না, নন—ক্রিমিনাল লুনেটিক, বা এন—সি—এল মেয়ে হিসেবে এরা জেলে যায়। এদের ওপর চলে অমানবিক নিষ্ঠুরতা। শিবশঙ্কর চক্রবর্তী এদের হয়ে লড়েছেন, লিখেছেন, ছাড়িয়েছেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এরা যাবে কোথায়? পরিবার ফিরে নেবে ওদের? কুড়ি বাইশ বছর এ ভাবে থেকে অনেক মেয়ে পাগল হয়ে যায়, যৎসামান্য আহার পায় বলে টি. বি. ও অন্য রোগে ভোগে। বছর বছর বেশ কিছু মরেও যায়।
—রুচিরা ও বরুণবাবুর চেষ্টায়, খুবই মানবিকতাপূর্ণ জাস্টিস বোসের সহৃদয় সাহায্যে তেমন দশটি মেয়েকে ছাড়ানো হয়েছে, যারা এখনো সুস্থ মস্তিক। এমন মেয়ে সকলকে তখনি ছাড়ানো সম্ভব, যখন তাদের কোথাও নিরাপদে রাখা যাবে। যেখানে থেকে ওরা সহজ ও স্বাভাবিক হবে, বাইরের জগতের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠবে ওদের। ওদের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাবে। যাদের যাবার জায়গা নেই তাদের কোনো কাজের ট্রেনিং দেওয়া যাবে...কষ্টসাধ্য কাজ, ধাপে ধাপে করতে হবে।
—দশটি মেয়ে, দশ রকম ব্যাকগ্রাউণ্ড। পুলিশ এদের তুলে আনে, আদালতে তোলে, আদালত পাঠায় জেলে। জেলে অমানবিকতার কথা বললাম, কিন্তু আদালত পাঠালে জেল ওদের নিতে বাধ্য। আইন বলে, ওদের এক মাসের বেশি জেলে রাখা বেআইনী। কিন্তু জেলে ঢোকাবার পর ওদের কথা সবাই ভুলে যায়। ব্যস, ওরা থেকে যায়।
কি...কি...ভয়ংকর।
নিশীথ ঠোঁটে আঙুল রাখে। বাইরে গাছপালার পাতা মাড়িয়ে কি যেন ছুটে গেল।
পল্লবীর চোখ কৌতূহলে বড় বড়।
নিশীথ মাথা নেড়ে হাসল, এক সময়ে হরিণ দৌড়ত, লেপার্ড আসত, এটা একটা বুনো শুওর। কারো ক্ষেতে যাবে, কারো চিনাবাদাম বা পান আলু খুঁড়ে খাবে।
—এ সব আমার জানাই হলো না।
—জীবন তো এইরকমই। ভালো লাগার সব কিছুই পিছনে ফেলে চলে যেতে হয় কোনো কোনো লোককে।
নিশীথের গলাটা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল।
—দরজা খুলে বাইরে একটু দাঁড়াও। দেখে নাও, এমন আকাশ দেখা যায় না।
কাচের দরজার বাইরে হিমেল বাতাস, বাতাস যেন হিমগর্ভ। সকালে দেখা যাবে রাতের হিম সকালের শিশির হয়ে ঝরছে আর ঝরছে।
বিখনিরা শুকনো পাতা জ্বালাচ্ছে, কি সুন্দর অচেনা গন্ধ। আকাশ, তারাভরা আকাশ, এত নিচে নেমে এসেছে যে মনে হয়, হাত বাড়ালে ছোঁয়া যায়। গাছের পর গাছ, গাছের পর গাছ। কোনো রাতের পাখি ডেকে ডেকে উড়ে গেল।
এইসব ছেড়ে যেতে হবে। কোন গাছের কি নাম তা না জেনেই।
ছয়
''সমু, তোর বিয়ের চিঠিটা পেয়ে খুব ভাল লাগল। এখনই বসে বসে ভাবছিলাম, জীবনে ভাল লাগার কত কি পিছনে ফেলে আসতে হয়। আমাকেও ফেলে আসতে হয়েছে সমু। পূর্বাশাকে বড় ভালবাসতাম, ওই শহরকে বড্ড ভালবাসতাম। তোদের বন্ধুত্ব আমাকে আমি তৈরি করেছে। তোকে, তোদের আজও ভালবাসি। আমার তোর বন্ধুত্ব কেড়ে নেয় কে? তুই পূজাকে বিয়ে করছিস জেনে আরোই খুশি হলাম। চলে এসেছিলাম ১৯৮৭—তে। এটা ১৯৯৩ পড়ে গেল। আমাদের সকলের বয়সই ছ'বছর বেড়ে গেল তাই না? সুজাতাদির সঙ্গে যোগাযোগ তো আছেই। তোদের কাজকর্ম কত বেড়েছে। ওখানে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির সঙ্গে তোরাও আছিস। এ সব ভাবলে আমার খুব গর্ব হয়।
আমার কথা তুই খুব জানতে চাস, তাই না? তাহলে বাড়ির কথাই বলি আগে। বাবা, দাদা, দিদি, সবাই খুব গর্বিত এখন আমার জন্যে। আমি তো জানি, কাগজে এত লেখালেখি না হলে ওরা এমন উচ্ছ্বসিত হতো না। দাদা লিখেছে, ঝুমা খুব গর্বিত, আর দাদা দেখছে, ডোনেশান তুলতে পারে কি না।
দিদি আর অমেয়দার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে জানিস বোধহয়। দিদি আবার বিয়েও করছে। ছেলেমেয়েরা নাকি বাবা—মা দুজনের কাছেই আসতে পারবে।
বাবা তো এখন দেওঘরে থাকে। কোনোদিন ধর্মে মন ছিল না। এখন নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। লিখেছে গভীর শান্তি পাই। তোমার জন্যে মনে দুশ্চিন্তা ছিল। তুমি মানব—সেবাব্রতে নিজেকে সমর্পণ করেছ, ভাবলে বড় শান্তি পাই।
ব্যাপারটা দেখ। ধর, আমি যদি কোনোদিন বিয়ে করি (করব বলছি না), তাহলে বাবা, দিদি, দাদা, সবাই হয়তো দুঃখই পাবে।
তোকে সব লেখা যায়, তাই বলছি, এখানে যাদের মধ্যে আছি, তাদের জীবন এমনই ভাঙাচোরা যে, নিজের কথা ভাবার সময়ই পাইনি। ওদের কথা জানার পর আর নিজের দুঃখ বা ক্ষতিকে বড় মনে হয় না। অনেক, অনেক মেয়ে আমার চেয়েও লাঞ্ছিত সমু, তাদের আমি জানিও না। কিন্তু এটা জানি যে, আমার মতো মেয়েরা অনেক। আমি তাদের একজন হয়তো। চরম সৌভাগ্যবতী একজন। আমাকে তো মুখ লুকিয়ে বেড়াতে হয়নি। আমি আরো বড় একটা কাজের মধ্যে মুক্তি পেয়েছি।
ক'বছর দেখা হয় না? ছ'বছর। তুই এখন আমাকে দেখলে চিনতে পারবি না। তুই রাগলে বলতিস, চড় মেরে মুখের ম্যাপ পালটে দেব। তা, আমার মুখের ম্যাপ পালটে গেছেই (কতগুলো আঁচড় কামড় বল তো?), আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের আগেকার মুখ মনে করতে পারি না। বাঁ গালটা, কামড় সেলাই করেছিল বলে অদ্ভুত কোঁচকানো। কপালে একটা লম্বা সাদাটে দাগ। আর দাগগুলোর কথা নাই বললাম। চুলগুলো তখন ডাক্তার কেটেছিল, কেটেই ফেলেছি।
নিজের কথা ভাববার সময় দেয়নি নিশীথদা। আমাকে এনে ফেলল এখানে। প্রথমে কাজই হলো, যে দশজনকে নিয়ে উইন—এর (ফর উইমেন ইন নীড) সংসার শুরু হয়, তাদের কেস হিস্ট্রি লিখে ফেলা। আমার খুব ইচ্ছে, এ চিঠিটা তুই আমাদের বন্ধুদের পড়ে শোনাবি, আমার ভাল লাগবে। আচ্ছা, গুলতি এমন সাঁতারু ছিল যে, কম্পিটিশনে নামতে গেল। ও জলে ডুবে মারা গেছে, এ কথা এখনো ভাবতে খুব কষ্ট হয়। ওর মা কেমন করে সামলাবেন নিজেকে? এক ছেলে গেল বাস চাপা পড়ে, গুলতি গেল জলে ডুবে। তোরা তো ওর নামে 'আবীর স্মৃতি পাঠাগার' করেছিস।
কাদের পেলাম জানিস?
প্রথম মেয়ে বিদ্যুৎরানী পাল, ডাকনাম বিবি। শুনলাম বয়স তেইশ, দশ বছর জেলে ছিল এন. সি. এল. মেয়ে হিসেবে। রোগা হাড় বের করা কেঠো চেহারা, চুল উকুনে বোঝাই ছিল, এখানে ওষুধ দিয়ে সারিয়েছে। অবশ্য চুলে উকুন, আর উপযুক্ত খাদ্যের অভাবে সর্বাঙ্গে ঘা এদের সকলেরই ছিল। মাধবী আর গৌরী, আমাদের দুই স্বাস্থ্যকর্মী এদের ধরে ধরে পরিষ্কার করেছে।
বিদ্যুৎ তো বলতেই চায় না কিছু। অনেক সাধ্যসাধনার পর বলল, আমরা কর্মকার। বাপের নাম নারায়ণ কর্মকার। আমি স্কুলেও গেছি, পড়তেও পারি, জেলে তো বই পাইনি। জানি না ভুলে গেছি কিনা। আমাদের গ্রাম সুলাপুর, ডাক চাম্পাবাজার। বাড়িতে সৎমা, খুব মারত। তা একদিন সৎমার ভাই বলল, বাড়িতে মেরে মেরে মেয়েটাকে মেরে ফেলবে? আমি ওকে নিয়ে যাই। বাহিরগাছি থেকে ট্রেনে উঠব। ঠাকুরনগরে আমার শাশুড়ী থাকে। তিনি ওকে তিরিশ টাকা মাইনে দেবে, খাওয়া—পরায় থাকবে। তিনি মানুষ খুব ভাল, ওর বিয়েও দিয়ে দেবে।
আমাকে বাহিরগাছি স্টেশনে বলল, কানের ফুল আমায় দে। পথে বড় চোরের ভয়, তা দিলাম। তারপর ঠাকুরনগরে নেমে 'রিকশা ডাকি' বলে সেই যে পালায় আর তার দেখা নেই। সেখান থেকে রেলপুলিশ আমাকে থানায় জমা দিল। কত বললাম বাবার নাম এই, ঠিকানা এই, কিছু শুনল না জেলে ঢুকিয়ে দিল। তা কত বলেছি, বাবাকে খবর দাও। মেট্রন বলত, জেলখাটা মেয়ে ফেরত নিতে তাদের বয়ে গেছে।
মেট্রনের পা টিপতাম, গায়ে তেল মাখাতাম, তার কাপড় কাচতাম। পাগলীদের সঙ্গে থাকতাম, তবে আমার বিছানা ছিল।
বিদ্যুতের অনেক প্রশ্ন। এটাও কি জেল? পেট ভরে খেতে কেন দেয়? এই মেট্রন (রুচিরাদি) লাথি মারে না কেন? জামাকাপড় পরতে দিয়েছে, কেড়ে নেবে?
এই বিদ্যুতের বাবাকে চিঠি লিখেছি আমরা। শেষে নিশীথদা কাদের নিয়ে সুলাপুরেও গেল। নারায়ণ কর্মকার নাকি বসবাস তুলে কোথায় চলে গেছে।
এই বিদ্যুৎ আস্তে আস্তে নরম হলো। ও এখন মেটেলিতেই দর্জিদের কাছ থেকে কাজ আনে। কলে সেলাই করে। বইটইও পড়ে। আর সকলকে বোঝায়, এ খুব ভাল জায়গা। মন দিয়ে থাকো, ঠিক ভাল হবে তোমার! ওর চেহারাটাও পালটে গেছে।
অঞ্জু দাশ যখন আসে, ওর বয়স সাঁইত্রিশ। নদীয়া জেলায় শ্যামপুরে বাড়ি। কেষ্টনগরে পুজো দেখতে এসে স্বামী আর মেয়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। দু'দিন বাদে বাড়ি ফিরে যায়, কিন্তু স্বামী ওকে ফিরে নেয়নি। পঞ্চায়েতের বিচারে তবে ওকে নিল। কিন্তু স্বামী বরাবরই বড় বউদির বশ ছিল। বাড়িতে কষ্ট হঠাৎ বেড়ে গেল, অঞ্জু একটা টাকা চাইলে পায় না। শেষে অঞ্জুরা কয়েকজন মেয়ে ধানকলে কাজ করতে গেল।
অঞ্জুর মতে সে মহাপাপী। সেখানে আরেকজনের সঙ্গে ওর ভাষায় ''প্যাম হইল, লাব বলতে পারেন। হে খুব দরদ দেখাইত! আহা! সোয়ামি চক্ষে দ্যাহে না। আহা! হে তার বরবউদির হাতের বশ! ক্যান পইরা থাকবা চ্যালাকাঠের বারি খাইয়া? আমার লগে চল কলকাতা! মাইয়া পরে আইনা নিমু।''
এবং কলকাতায় তাকে শেয়ালদায় এনেই তার 'টাকাটুকা বাসনকুসন, ছুটকেসটা লইয়া হে উধাও।'' অঞ্জুদের জীবনের একটা অলিখিত হিসাব আছে সমু। সেই হিসাবে অঞ্জুও পৌঁছে গেল জেলখানায়।
অঞ্জু জেলখানা থেকে খুব তেজস্বিনী আর খানিকটা ছিটেল হয়ে এসেছিল। বলত, মারুম! কাটুম! জীয়ন্ত পোড়ামু অরে।
—কাকে অঞ্জুদি?
—সুধইন্য পালরে, যে আমারে লইয়া...
কখনো বলত, মাইয়ার বাপরে, যে আমারে এত কষ্ট...কিন্তু মাঝে মাঝেই বলত, জেলখানায় কি চলে তা যদি জানতা! মাগো! তার নাম করতে ডরাই। মাইয়াগো...বাপ রে! তার নিরশংস, নির্দয়।
শ্যামপুর থেকে কিন্তু ওর স্বামী চিঠি লিখেছিল। চিঠিটা রুচিরাদিকে লেখা। একবার আসতে চেয়েছিল।
আধা বৃদ্ধ, শুকনো চেহারার লোকটি যেমন ভীরু, তেমন কুণ্ঠিত। অঞ্জুর জন্যে ও গুড়, মোয়া একটি ঊষসী সাবান এনেছিল। ওদের বসিয়ে রেখে আমি বেরিয়ে আসি, কেন না অঞ্জুকে দেখেই লোকটি হো হো করে কেঁদে বলেছিল, বুনির মা রে! ক্যান তুই ঘর ছাইরা গেলি?
সসম্ভ্রম চাহনি ছিল ওর চোখে। ও তো ভাবেনি বাগান ঘেরা এমন এক দোতলা বাড়িতে ঢুকবে, এমন সাজানো ঘরে দেখা করবে তার বউয়ের সঙ্গে।
আমি, মাধবী আর গৌরী ভাবলাম, হয়তো ওরা কথাবার্তা বলছে তো বলছেই। হয়তো আমাদের ভাষায় ইন্টারঅ্যাকশানের একটা সূচনা হচ্ছে।
হয়নি। অঞ্জু সে ঘরে একাই বসেছিল, গৌরী যখন ওর স্বামী চা খাবে কিনা জানতে গেল। অঞ্জু বলল, হে বিয়া করছে বরো বউয়ের বুনরে। বুনিরে সে অযতন করে না। হেয়াগো আবুস্তা ফিরছে, সেলোয় চাষ করে, সেলো ভারা দেয়। দ্যাশে দশে জানে বুনির মা চইলা গিছে। অহন ফিরুম ক্যান। অগো বারা ভাতে ছাই দিতে? ভাল সংবাদ, ভাই ভাই আলাদা। বুনিদের ঘরে তার জেঠি পা দেয় না। বুন বুনের মুখ দেখে না।
অঞ্জুদি আয়া ট্রেনিং নিয়ে বারুইপুরে এক নার্সিংহোমে প্রাইভেট আয়ার কাজ করে, রাতে ডিউটি নেয় না। রাতে রান্নাঘরে বাসন্তীর মাকে সাহায্য করে।
মিনু যখন আসে, ওর বয়স বারো। একেবারে পাঁচবছরের মেয়েকে নিয়ে মা জেলে ঢুকেছিল কেন, তা মিনু জানে না। মিনু জেলের বাইরের কোনো জগৎ জানত না। ও কোনোদিন আস্ত জামা ইজের পরেনি, বেড়াল ও কাক ছাড়া কোনো পশুপাখি দেখেনি, কেমন জীবন ছিল বুঝতে পারেন, ওকে জেলের ভেতরে অন্য মেয়ে কয়েদীদের কেউ কেউ যৌন সম্পর্কে বাধ্য করত। মা—দিদি—মাসি—পিসি, এমন কোনো সম্পর্ক যে হয়, তাও ও জানত না।
ও সবসময় ফুলকুমারীর সঙ্গ খুঁজত। ফুলকুমারী একটি নেপালী মেয়ে। জগদ্দলের কোনো কারখানায় ওর স্বামী কাজ করত। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে ওরা কলকাতায় চলে আসে। শেয়ালদার কাছে বস্তিতে গ্যাংরেপড হবার পর নেপালী মেয়ে ফুলকুমারী আর বিহারী মেয়ে জানকী (নৈহাটি থেকে একই কারণে কলকাতা আসে) দুজনকেই ধর্ষণকারীরা শাসিয়ে যায় যে বস্তির দখল ছেড়ে চলে না গেলে আবার ওরা গ্যাংরেপড হবে। জানকীর বর ছিল না, প্রেমিক ছিল। ফুলকুমারীর ছিল বর, মেয়ে, ছেলে।
ভাবতে পারিস, নৈহাটি—জগদ্দল এলাকার ওই ছাবিবশ ঘরকে তুলে দেবার জন্যে লোকাল মস্তানরা ওদের চার বার গ্যাংরেপ করেছে?
চার বার সমু! ওরা তাদের মুখ দেখেছিল, চিনত। আমি তো কাউকে দেখিনি।
শেষে স্থানীয় নাগরিক সমিতি এসে পড়ে। প্রচুর লেখালেখি হয়। মেয়েরা ''সেফ কাস্টাডি'' লেবেল পেয়ে জেলে যায়। কেসও হয়। আসামীরা প্রমাণাভাবে খালাস পায়, আর এরা থেকে যায়।
এখানে যখন আসে, ফুলকুমারীর বয়স চল্লিশ আর জানকীর আটত্রিশ।
ওদের বাড়ির খবর তো নেওয়াই যায়নি। সেসব বস্তির জায়গায় ঘরদোর, দোকান—পাট। ওদের ছবি কাগজে দিয়েও খবর মেলেনি। ফুলকুমারী, বোধহয় নিজের মেয়ে ছিল বলেই, মিনুকে এত ভালোবাসত।
ওরা দুজনেই এখানে থেকে গেছে। লেখাপড়া শিখেছে। নিশীথদা ওদের দুজনকে নিজেদের ''মা ও শিশু'' সেণ্টারে ট্রেনিং দিয়ে নিয়েছে, ওরা ওখানে কাজ করছিল, কিন্তু জানকী এখন ওখানকার দরোয়ানের বউ। এখানকার বউ। দেশেও দরোয়ানের বউ আছে।
বসিরহাটের দীপালি নস্কর এগারো বছর জেলে কাটিয়ে আটাশ বছর বয়সে এখানে এসেছিল। সুন্দর মুখ—চোখ, চেহারা দেখে মনে হয় না ওর কোনো ভীষণ অতীত আছে। অতীতটা ভীষণই। ওর সতেরো বছর বয়সে ওর মামা ওকে এক অবাঙালীর কাছে বেচে দেয় কলকাতায় এনে। সে অবাঙালী ওকে মাস আষ্টেক রেখে গর্ভপাত করিয়ে বেচে দেয় এক বাঙালী মহিলার কাছে। ইনি মধ্য কলকাতায় কোথাও নিজ বাড়িতেই ব্যবসা চালাতেন, কলগার্ল জোগান দিতেন। তাঁরই কোনো এজেণ্ট তাঁকে খুন করে পালায় এবং কলগার্লরা ধরা পড়ে। তারপর কোন আইনের কোন নিয়মে দীপালি থেকে যায় পুলিশ লকআপে এবং ধর্ষিতাও হয় বার বার, সে অঙ্ক জানতে চাস না।
দীপালি নিষ্প্রাণ জড় হয়ে গিয়েছিল। এখানে তো নিয়মিত আসেন সাইকিয়াট্রিস্ট। দীপালি চিকিৎসাধীন, হয়তো আজীবনই তাই থাকবে। সহ্য করতে পারে না বন্ধ জায়গা। বাগানে ঘোরে, খুব ঘোরে। কিন্তু গেট পেরিয়ে মেটেলির মাটিতে পায় দেয় না কখনো।
রামপুরহাটের শেলী আর বেলী সিং ''ইট ভাটায় কাজ করবি'' পার্টির সঙ্গে, দিন বিশ টাকা মজুরির লোভে ট্রাকে চেপে বসেছিল। ওদের বাড়ি মহিষা, ডাক নামোপুর—খাসাড়া, বাবার নাম উমাকান্ত সিং। ওরা জাতে ডোম, শেলী আর বেলী, দুই বোনই বলে, ''আমরা ব্রহ্ম ডোম''—তার মানে কি, আমি জানি না।
ওদের মধ্যে শেলীর বিয়ে হয়েছিল, বেলী বিধবা হবার পর সাঙা করে। ওরা বলে, ''এখন পঞ্চাইত থেকে কাজ মেলে, মজুরিও বেড়েছে, তখন এমুন ছিল নাই।'' শেলীর বর আর বেলীর সাঙা বরও সঙ্গে ছিল। কিন্তু ট্রাকটি বারাসাত নীলগঞ্জে পৌঁছে আরেকটি ট্রাকে চাপিয়ে দেয় এবং রাতে হুড়োহুড়িতে অপেক্ষমান দুটি ট্রাকের যে ট্রাকে ওরা ওঠে, তাতে বেলীর সাঙা বর ছিল না।
যে ইটভাটায় ওদের নিয়ে যায়, তার মালিকানা নিয়ে লড়াই চলছিলই, যা এদের জানার কথা নয়। দুই মালিকই লেবার আনে। তারা স্থানীয় লোক, দুজনেরই ছিল মস্তান বাহিনী। কাজ শুরু হবার আগেই হামলা শুরু হয়, মারামারি বোমবাজিতে একজনের মুনসী (ভাটায় সর্বশক্তিমানদের একজন) মারা যায়। মাতাল মস্তানরা কুলি ঝোপড়ি ভেঙে দেয়। শেলী ও বেলী আর ওন্দা থানার লক্ষ্মী দৌড়তে দৌড়তে বাসরাস্তায় গিয়ে ওঠে। সেখানে ওরা সারারাত জড়াজড়ি করে বসে থাকে। লক্ষ্মী বলে, এর চেয়ে বর্ধমান গেলে ভাল হতো। মাঠে কাজ পেতাম। শেলী আর বেলী (আসল নাম মিলন আর খেলন, কিন্তু যাত্রাপালা দেখে ওরা নাম পালটেছিল) এক রাতের কামারাদোরির ফলে গভীর বিশ্বাস পায় ও বলে যে ওরাও যাবে। খেটে টাকা নিয়ে ঘরে ফিরলে কে কি বলবে? ওদের আশা থাকে, সকালের মধ্যে অন্যরা এসে পড়বে।
সকালে যে আসে ওরা শুনল তার নাম রেণুবালা, সে অন্য ট্রাকে এসেছে। রেণুবালা বলে ওখানে খুব হ্যাংগামা, খুনের ব্যাপার, তাই বেটাছেলেদের বেরোতে দেবে না পুলিশ।
চল চল, তোদেরে আমি ভাল জায়গায় নে যাব বলে রেণুবালা ওদের একটি ট্রাকে তোলে।
অঙ্কের স্বাভাবিক হিসাবেই রেণুবালা (গোসাবায় ও রেণুবালা কলকাতায় ও রানী এবং বাংলাদেশে ও সালেহা) ওদের নিয়ে যায় ব্রথেলের উদ্দেশে। কোনো চায়ের দোকানে বসিয়ে চা কচুরি, মামলেট খাওয়াতে খাওয়াতে ব্রথেলের দালালের সঙ্গে যখন দরকষাকষি হয় (ওরা দূরের টেবিলে বসেছিল) তখন লক্ষ্মী কিছু আঁচ করে এবং ওদের দুজনকে নিয়ে পথে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে দৌড়তে থাকে।
এদের দৌড়বার পথ, সে যেখান থেকেই হোক, প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়েই শেষ হয়। ফুটপাথ ও প্রেসিডেন্সি জেলের মধ্যবর্তী সময়ে শেলী ও বেলী লক্ষ্মী থেকে ছিটকে যায়। সে সময়ে ওরা কি করেছে তা ওরা বলে না। কিন্তু জেলে দু'বছর থাকার পর লক্ষ্মীকেও ওরা পেয়ে যায়। শেলী ও বেলী ন'বছর, এবং লক্ষ্মী সাত বছর জেলে ছিল।
যেটা অবিশ্বাস্য, অথচ ঘটে, যে মিরাকাল বুঝিয়ে দেয় জীবনে অনেক ইতিবাচক দিক আছে, তা আমি ঘটতে দেখেছি তিন বছর ধরে।
লক্ষ্মীর মনে ভয়ানক গোলযোগ ঘটে গিয়েছিল। পুরুষ মানুষ দেখলেই বলত, জামা খুলব না কাপড় তুলব? সেই লক্ষ্মীর সাইকিয়াট্রিক ট্রিটমেণ্ট আজও চলছে। কিন্তু ওর বাবা বগাডিহা গ্রাম থেকে দু মাস বাদে বাদে আসে, কথা বলে এটা সেটা আনে! লোকটি ঋজু স্বভাবের, কঠিন মতামতের লোক। সে বলল, আমি তো মেয়েকে অনেক খুঁজেছি। এখন আমি একা পড়েছি। ছেলে খড়গপুরে কাজ করে, আসবে না। ওর মা কবে মরে গেছে। লোকের কথায় 'বাঁকুড়া জনমত' কাগজে বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলাম। জেল থেকে একটা চিঠি দিলে...
ওর গ্রাম? ওর সমাজ?
ও বলল, বাঁকুড়া বড় দুঃখী জেলা গো মা! বছর বছর মেয়েরা নামালে যায় বর্ধমানে। সাঁওতাল মেয়ে...আমাদের মেয়ে...আমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাব, কিছু বলবে কে?
তিন বছর হলো লক্ষ্মীকে ওর বাবা নিয়ে গেছে। যাক অঞ্জুর স্বামী, লক্ষ্মীর বাবা, এদের কথা ভাল লাগল না?
শেলী ও বেলীর বাড়িতে চিঠি লিখে, খবর দিয়েও উত্তর পাইনি আমরা। রুচিরাদির খুড়তুত ভাইয়ের ব্যবসা নানা মাপের খাম তৈরি করা। শেলী সেই কাজ করছে, থাকে ও খায় মালিকের বাড়ি। নিশ্চয় বাড়ির কাজ কিছু করতে হয়।
বেলীর বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাটা ভাল হলো না। কোনো ট্রেনিং নেবে না, সাজগোজ প্রসাধনে অত্যধিক মন। রুচিরাদি কত বোঝাল, ভাল হয়ে থাকো, কোনো কাজ করো, তাহলে হয়তো বিয়েও হবে। কিন্তু ও একদিন জাস্ট বেরিয়ে গেল।
দোকান থেকে সেণ্টারের সাবান, লবণ, আরো কি কি কিনবে বলে পঞ্চাশ টাকা ওকে দেওয়া হয়েছিল।
যাবার আগে ও বাসন্তীকে বলে গেছে, বয়স হলো আটাশ। খেয়ে মেখে গতর ফিরেছে, দেহের রোগবালাই গেছে। এখন বল, লাইনে দাঁড়ালে দিন চল্লিশ/পঞ্চাশ রোজগার। ব্যাণ্ডেজ পাকিয়ে বা বই বাধিয়ে কি পাব?
বাসন্তীকে রুচিরাদি খুব বকলেন। ও বলল, ও তো এমন কথা হরদম বলে, আবার সওদাও কিনে আনে। কেমন করে জানব যে মোটে আসবে না?
গোসাবার মনোরমার কাহিনী খুব সংক্ষিপ্ত। মনোরমা যখন আসে, বয়স চল্লিশ। দশ বছর জেলে কাটিয়েছে! ওর ভাষায় বারো বচরে বিয়ে, তিরিশ বচর অব্দি বাঁজা। সোয়ামি আবার বে' করে। করবে নে? ছেলে চায় তো মানুষ। তা ধরো সতীন নে' সাত বচর ঘর করিচি। আমারে তাইড়ে দেয়নে, খাটতাম, খেতাম। সোয়ামির শাগসবজির আবাদ, ধেনো জমিও দু'বিঘে।
তা ছেলেপুলে হয় নে, গতর খুব। হাট হতে ফিরতেছি, আমারই পাড়ার কজনে আমারে ইয়ে করে মাতায় বাড়ি দে' গাঙে ফেলে পালায়। তা বাদে তুলল মিঞারা। তারা থানায় গেল, আমারে হাসপাতালে নিল পুলিশ। তা বাদে কি হাংনামা। পাশের গাঁয়ে আমাদের জ্ঞেয়াতি জন, খুব শত্তুরতা সম্পক্কো। তারা রইটে দিল হিঁদুর বউরে মোচনমানেরা ওই সব করেচে। কি সাজো সাজো, মারো মারো, শেষে বলে ও বলতেচে এরা ওরে ইজ্জত লুটেচে, মোচনমানে বাঁইচেছে, ওরে মেরে ফেলব। তাইতেই আমার জেলে আসা। পেরথম পেরথম সোয়ামি আসত, দেখে ঝেতু। তা বাদে আসে নে আর। এই তো কতা''।
মনোরমা আর মিনুর ভাব খুব। মিনু ইস্কুলে যায় এখানকার। মনোরমা পৌঁছে দেয়। ওকে শেখানো হচ্ছে নাইলন সুতোর থলি বানানো। ওর কাজে মন আছে।
এখানে এসে জানলাম, কত রকমে মেয়েদের গায়ে দাগ পড়ে, কত ভাবে তারা ব্যবহৃত হয়।
যাদের পুনর্বাসিত করা সহজ হবে, এমন দশজনকেই ১৯৮৭—তে আনা হয়েছিল।
তারপর যারা এসেছে, তাদের চার জনের কোনো কেস হিস্ট্রি নেই। স্রেফ রাস্তা থেকে কোনো কারণে তুলে নিয়ে আসে পুলিশ, ঢুকে যায় এন—সি—এল ওয়ার্ডে।
ওদের কথা অন্য কোনোদিন জানবি।
আমি তো মনে করি, এখানে না এলে, নিজের সর্বনাশকে বড় করে দেখতে দেখতে আমি মানসিক রোগী হয়ে যেতাম।
ওদের জেনে তবে যেন পায়ের তলার মাটি পেলাম। মনোরমা যখন বড় বড় অক্ষরে বাজারের হিসেব লেখে, সেটা আমাকে গভীর আনন্দ দেয়। ও তো নিরক্ষর ছিল।
আর মিনু! এই বয়সে ক্লাস ফাইভে পড়ছে সুনন্দাদির ননফর্মাল স্কুলে। কি যত্ন করে ও একটা চড়াই পাখির ভাঙা ডানা মেরামত করে, শালিকের বাচ্চাকে বাঁচায় বেড়ালের থাবা থেকে, আমার ঘরটাতে মাঝেমাঝেই হাসপাতাল বানিয়ে ফেলে। রুচিরাদি ওকে আমার ঘরে রেখেছেন।
আমার কাটাকুটি দেখলে বলত, জেলে খুব মারত মাসি? কেটে কেটে দিত?
জেলে এদের অভিজ্ঞতার কথা কি বলব বল?
মেয়েদের শরীরটার এমন বাজার! জেল থেকে জেলকর্মী রামদুলারী মেয়ে পাচার করত বলেই তো তার বিরুদ্ধে কেস করেছেন শিবশঙ্কর চক্রবর্তী। একটা কেস একজনের চেষ্টায়। কত রামদুলারী জড়িয়ে থাকে মেয়ে—পাচার চক্রের সঙ্গে, কত চান্দোয়া তাদের শিকার হয়, হিসেবে কোথায়?
জেলে মেয়েরা মেয়েদের কামুকতার শিকার হয় না? জয়া মিত্রের বইটা পড়ে নিস।
আমি খুব ভাল আছি সমু। ভালই থাকব। অবশ্য নিশীথদা বলে, এই শক থেরাপিটা আমার দরকার ছিল। ঠিকই বলে। ওর ওপর আমার মনে খুব নির্ভরতা এসে গেছে।
অমিত গঙ্গাদূষণের ওপর অমন একটা ডকু ফিলম করে ফেলল? ভাবা যায় না।
তুই তো তোর কথা রেখেছিস। সুধীনবাবুর জুনিয়ার। পূজা এখন আই—সি—ডি—এস—এ কাজ করে, স—ব খবর রাখি।
ভাল থাকিস, ভালবাসা নিস তোরা সবাই। তোদের সকলকে কত ভালবাসি এখন বুঝতে পারি। তোদের বিয়েতে কি প্রেজেণ্ট পাঠাব ভাবতে পারবি না—পুতলি (এখন কিন্তু আমি পল্লবী।)
সুজাতার নতুন সেণ্টারে সমু আর পূজার বিয়ের জন্য প্রীতি সম্মেলন। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা দেখছে তাপস। ওর কেটারিং বেশ নাম করেছে।
পূজাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে, আর সমু শুধু বলে যাচ্ছে, তোরা শুধু ওকে দেখছিস আমাকে দেখছিস না।
তাপস বলল, আমরা সবাই আছি। কিন্তু গুলতি নেই, পুতলি থেকেও নেই...
—হ্যাঁ, সব সুখ কি হয়?
একটা জীপ থামল।
—নিশীথদা'র জীপ না?
—আরে হ্যাঁ...
ওরা সবাই এগিয়ে এল। নিশীথদার সঙ্গে সঙ্গে নামল চুল ছাঁটা, ঋজু চেহারার একটি মেয়ে। পরনে ছাপা শাড়ি, কাঁধে ব্যাগ।
—পুতলি!
পুতলি হেসে এগিয়ে এল। বলল, লিখেছিলাম না তোদের বিয়েতে কি দেব, ভাবতে পারবি না? আমি নিজে চলে এলাম, সারপ্রাইজ।
সবাই এগিয়ে এসে ঘিরে ধরল। নিশীথ বলল, আরো একটা সারপ্রাইজ আছে, সেটা আমি আর পল্লবী দেব।
—তোরা বিয়ে করছিস?
পূজা পুতলিকে জড়িয়ে ধরল। পুতলি চোখ তুলল, সমুর, তাপসদের চোখে কি আনন্দ কি নিশ্চিন্ততা।
অমিত বলল, ফ্রীজ। আমি ছবি তুলব।
সবাই ফ্রীজ করে গেল।
পুতলি বলল, এখনো কিন্তু প্রোপোজই করেনি নিশীথদা।
—করিনি বুঝি? করলাম।
অমিত আবার বলল, এবার সবাই তাকাও ক্যামেরার দিকে।
তারপর ফ্রীজ ভেঙে গেল। সমু বলল, কাল আমরা জীপে করে শহর ঘুরছি।
সুজাতা বললেন, আমি এ প্রস্তাব সমর্থন করছি।
এত রকম স্মৃতি আর অনুভূতির ঢেউ ছুটে এল যে অনেককাল পরে আনন্দে পুতলি কেঁদে ফেলল।
__
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন