শৈলেন ঘোষ
এ দিকটা তপোবনের আর একদিক। বনের একটু দূরে। সেদিন আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে। কালো মেঘে থমথম করছে বন। ঝুনঝুন করে কারা যেন নেচে নেচে আসছে এদিকে। বনের পাশে পাহাড়। পাহাড়তলির একদল ছেলেমেয়ে নাচতে নাচতে এল সেখানে। মেঘ দেখে খুশিতে ওরা উছলে উঠেছে। এমন সময় ঝিলিক দিল আকাশে। বন কাঁপিয়ে বাজ পড়ল কড়-কড়-কড়াৎ। আর সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল কার যেন ঘোড়া ছুটে আসছে। টগবগ-টগবগ। পাহাড়তলির ছেলেমেয়েরা নাচতে নাচতে থমকে গেল। দেখল তারা ঘোড়ার পিঠে রাজা। পিছিয়ে গেল তারা—খানিকটা ভয়ে, অনেকটা অবাক হয়ে।
রাজা
একজনের কাছে এগিয়ে গেলেন
আমি রাজা শিকার খোঁজে
বনে বনে যাই,
কোথাও হরিণ, কোথাও ময়াল
খুঁজে নাহি পাই!
একজন মেয়ে
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে সে
রাজামশায় শিকার খোঁজার
সময় এটা নয়তো,
আকাশে ঐ জুটছে দেখুন
ঝড়ো মেঘের ভয় তো!
রাজা
বুক ফুলিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন
ভয় করি না ঝড়কে আমি
ঝড় তো আমার খেলনা,
রাক্ষুসী ঐ ঝড়ের ঝুঁটি
রাজার কাছে ফেলনা!
একজন ছেলে
রাজার কাছে এগিয়ে এসে তপোবনের দিকে আঙুল দেখাল
তবে ঐ যে কুটির ছায়ায় ঘেরা
ঐখানেতে যান,
বনের ছায়ায় হরিণশিশু
পাবেন যতই চান।
আবার বাজ পড়ল কড়-কড়—কড়াৎ। রাজার ঘোড়া ছুট দিলে। পাহাড়তলির ছেলেমেয়েরা দৌড় মারল। দুটো বাঁদর লাফিয়ে পড়ল গাছ থেকে। আনন্দে নাচন-কোদন লাগিয়ে দিলে। আবার বাজ পড়ল কড়-কড়-কড়াৎ। পালাল বাঁদর দুটো। ক’টা হরিণ ছুটল ভয়ে-ভয়ে লাফাতে লাফাতে। একটা ময়ূর এল কোত্থেকে পেখম তুলে। সবুজ বনে ঝড়ের দিনে রঙিন পাখার দোলন লাগল। আবার আকাশে বিদ্যুতের ঝিলিক দিল। ময়ূরটাও ছুট দিলে। আর ঠিক তক্ষুনি ঝড় উঠল। বন কাঁপিয়ে, গাছ দুলিয়ে—হু-হু শব্দে। সেই ঝড়ে ছুটতে ছুটতে রাজা ঢুকেছেন। ঝড়ের ঝাপটায় দিশেহারা হয়ে গেছেন তিনি। আশ্রয় খুঁজছেন এদিক ওদিক। ঝড়ের ধুলো চোখে লাগছে। দেখতে পাচ্ছেন না কিচ্ছু। গাছে ধাক্কা লেগে টলে পড়লেন। এমন সময় একটা আকাশছোঁয়া গাছ ভেঙে পড়ল—ভীষণ আওয়াজ হল মড়-মড়-মড়। সঙ্গে সঙ্গে কড়-কড়-কড়াৎ আবার বাজ পড়ল। রাজা পড়ি-মরি করে ছুট দিলেন। সমস্ত বন নিমেষে অন্ধকার হয়ে গেল।

আবার যখন আলো ফুটল দেখা গেল ঝড়ের সঙ্গে বিষ্টি নেমেছে ঝমঝমিয়ে। রাজা একবন থেকে আর একবনে চলে এসেছেন। ঝড়ের ঝাপটায়, জলের তোড়ে নাস্তানাবুদ রাজা। আর পারছেন না। টলে টলে পড়ছেন। হাঁপাচ্ছেন। হাঁকছেন। কারো সাড়া নেই। রাজা পড়ে গেলেন মাটিতে। রাজা অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
একটু পরে ঝড় থামল। বিষ্টি ধরল। রাজা অজ্ঞান হয়ে পড়েই রইলেন। ধীরে ধীরে রাত এল। রাত গড়িয়ে সকাল এল। তবু রাজার জ্ঞান এল না। আকাশ যখন ভোরের আলোয় রঙিন হয়েছে, তখন কিরণমালা সেখানে ফুল তুলতে এল। আনমনে সে ফুল তুলছে, আর দুলছে। এমন সময় হঠাৎ তার নজরে পড়ল—কে যেন বনের মাঝে শুয়ে আছে! অবাক হল কিরণমালা। এগিয়ে গেল। গায়ে হাত দিল। ডাকল। সাড়া পেল না। ভয় পেল। তাদের কুটিরের দিকে চেয়ে ডাকলে—
কিরণমালা
অরুণদাদা, বরুণদাদা,
এস শিগগির,
দেখ বনের মাঝে পথ হারিয়ে
শুয়ে এ কোন বীর!
সঙ্গে সঙ্গে অরুণ, বরুণ ছুটে ছুটে এল। তারাও দেখল। তারাও অবাক হল। ভয় পেল। ছুটে গেল অরুণ জল আনতে। কাছে এল বরুণ মাথায় হাত বুলাতে। তিনজনে সেবা করতে লাগল। একটু পরেই রাজার জ্ঞান এল। রাজা চমকে উঠলেন। ধীরে ধীরে বসলেন। চারিদিক ক্লান্ত চোখে দেখলেন।
রাজা
অবাক হয়ে তাকালেন
কোথায় আমি?
অরুণ, বরুণ, কিরণমালাকে দেখে
তোমরা কারা?
অরুণ
আমি অরুণ
বরুণ
আমি বরুণ
কিরণমালা
আমি কিরণমালা।
আমরা এই বনেতে থাকি।
আপনি কেবা।
জানতে পারি তা কি?
রাজা
উঠে দাঁড়ালেন অনেক কষ্টে
আমি? আমি এক দুঃখী রাজা।
তিনজনে
ভীষণ অবাক হয়ে পিছিয়ে গেল
রাজা!
বরুণ
গলা দিয়ে অস্ফুট সুরে বেরিয়ে এল
দুঃখী কেন?
কিরণমালা
শুনি রাজার আছে মস্ত বাড়ি, জুড়ি গাড়ি
হাতি ঘোড়া কত,
মুক্তা মানিক পান্না চুনি
ছড়িয়ে শত শত!
রাজবাড়ি তো রানী মায়ের
হাসি দিয়ে ভরা,
রাজার ছেলে, রাজার মেয়ে
সোনায় যেন গড়া!
রাজা
দুঃখে গলা ভার
সব যে আমার হারিয়ে গেছে
আনন্দ আর আলো,
ঘর যে আমার শূন্য পড়ে
ছায়ায় কালো-কালো!
অরুণ
অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেছে
হারিয়ে গেছে সব!
বরুণ
রাজার কাছে এগিয়ে গেল
আমরা কি করতে পারি?
রাজা
একবার অরুণের মাথায় হাত দিয়ে, একবার বরুণের চিবুক ছুঁয়ে আর কিরণমালাকে আদর করে
তোমরা যা করেছ, এই করেছ বেশ,
এর নাই তো কোন শেষ।
তোমরা যা দিয়েছ সেবা,
তার মূল্য দেবে কেবা!
আমার ফিরিয়ে দিলে প্রাণ,
আমি কী দেব আজ দান?
অরুণ
না না চাই না কোন দান,
আমরা চাই না কোন দান,
বনের সবুজ ছায়ার মত
সেবাই মোদের গান।
রাজা
আহা! কে শেখাল এমন কথা,
কে শেখাল শুনি?
কই তোমাদের পিতামাতা
কোথায় তাঁরা গুণী?
হঠাৎ অরুণ, বরুণ, কিরণমালার মুখ যেন শুকিয়ে গেল। কোন কথার উত্তর না দিয়ে চমকে এ-ওর মুখ চাওয়া-চায়ি করলে।
রাজা
হঠাৎ অরুণ, বরুণ, কিরণমালার মুখের দিকে নজর পড়ল
কী হয়েছে, কী হয়েছে?
ভয় পেয়েছ যেন!
চমকে ওঠ কেন?
কিরণমালা
চোখ ছলছল করে উঠল
আমাদের নেইকো বাবা, নেইকো যে মা,
নেইকো আপন পর,
বনের মাঝে ঐ যে কুটির
ঐ আমাদের ঘর।
রাজা
অবাক হলেন
নেইকো বাবা নেই!
আহা মায়ের আদর নেই!
আমার সঙ্গে চল তবে
আমার কাছে থাকবে,
তোমরা আমায়
আপন বলে ডাকবে?
কিরণমালা
রাজামশাই, রাজামশাই,
কেমন করে হবে?
এই বনের পাখি, বনের হাসি,
তারা কোথায় রবে?
অরুণ
এই আমাদের ভালো
বরুণ
এই আমাদের আনন্দ
আর এই আমাদের আলো।
রাজা
বেশ তা হলে একটি কথা রাখবে?
কোনদিন কিছুর প্রয়োজনে,
যদি বা আমায় পড়ে মনে,
সেদিন আমায় ডাকবে?
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা এক সঙ্গে হাত যোড় করলে
অরুণ
আহা! অনেক বড় আপনি রাজা
দয়ায় ভরা মন,
আপনি গুণী দুঃখীজনের ধন।
তিনজনে এক সঙ্গে নমস্কার করল রাজাকে। রাজা সবার মাথায় হাত দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন। অরুণ, বরুণ, কিরণমালা এগিয়ে গেল তাঁর সঙ্গে কয়েক পা, তারপর ফিরে এল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তিনজন। একটা কেমন যেন থমথমে ভাব। তিনজনে চাইছে এ-ওর মুখের দিকে।
কিরণমালা
আপন মনে বলল
কে আমাদের বাবা,
কে আমাদের মা,
জানতে সবাই চায়
আমাদের কিচ্ছু বলার নাই!
অরুণ
যে গাছে লাল মনুয়ার বাসা সেইদিকে তাকাল একবার, তারপর কিরণমালার কাছে এল
কিরণমালা বোন,
আজ সকাল থেকে বলছে আমার মন,
ঐ লাল মনুয়া দুষ্টু সোনা
ঠিক জানে, ঠিক জানে,
কোথায় বাবা, কোথায় আহা!
মা আছে কোনখানে!
কিরণমালা
হঠাৎ খুশিতে চোখ দুটি চিকচিক করে উঠল
দুষ্টু সোনা, লাল মনুয়া পক্ষী,
জানে নাকি লক্ষ্মী?
আমি জিগেস করি তবে!
গাছের কাছে এগিয়ে গেল, গাছের দিকে তাকিয়ে খুব আব্দার করে জিজ্ঞেস করল
লাল মনুয়া, ভাইটি আমার, লক্ষ্মী আমার
সোনা আমার মানিক,
তাকাও না-ভাই খানিক?
পাখি
আগের মতই গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল
কী বলছ, কিরণমালা?
কিরণমালা
তুমি নাকি ভাই জান, কোথায় আমাদের মা আছে, বাবা আছে?
পাখি
না, না! কে বলল?
কিরণমালা
জান তো ভাই, বল না?
পাখি
সত্যি বলছি, বিশ্বাস কর, আমি জানি না। তোমাদের বাবা আর মার কথা আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল বলেই, সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম।
কিরণমালা
হতাশ হয়ে অরুণের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে
তবে?
পাখি
তবে হদিশ আমি একটা বলে দিতে পারি, কিন্তু তোমরা কি পারবে?
তিনজনে
পাখির কথা শুনে অত্যন্ত আগ্রহে চেঁচিয়ে উঠল
হ্যাঁ পারব, ঠিক পারব!
পাখি
আবার একবার জিজ্ঞেস করলে
পারবে ঠিক?
তিনজনে
হ্যাঁ!
পাখি
তাহলে শোন। এখান থেকে যোজন দূরে তোমাদের যেতে হবে। যোজন দূরে গিয়ে দেখবে, একটা ছোট্ট কুঁড়ে ঘর। কুঁড়ে ঘরে বসে বসে এক খুনখুনে বুড়ি আনমনে গান গাইছে। গান শুনতে শুনতে দেখো বুড়ির চোখের সামনে যেন যেও না। তাহলেই ব্যস! বুড়ির চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বেরুবে—আর তোমরা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে!
কিরণমালা
ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল
তা হলে কী হবে ভাই লাল মনুয়া!
পাখি
কিচ্ছু হবে না। সব বলে দিচ্ছি। তোমাদের কী করতে হবে জানো?
তিনজনে
কী করতে হবে ভাই?
পাখি
করতে হবে কী—পেছন দিক দিয়ে চুপি চুপি গিয়ে টুপ করে বুড়ির পাকা চুলে একটি ফুল বেঁধে দিতে হবে!
বরুণ
ফুল! কেন ভাই লাল মনুয়া!
পাখি
ফুল বেঁধে দিলে যে বুড়ির চোখ দিয়ে আর আগুন বেরুবে না!
অরুণ
আগুন বেরুবে না?
পাখি
না! ফুল দেখে বুড়ি খুব খুশি হবে। আদর করবে তোমাদের। তোমরা যা জিজ্ঞেস করবে সব বলে দেবে।
বরুণ
খুব অবাক হল
তাই নাকি!
পাখি
গেলে বুঝবে—তাই কি না!
কিরণমালা
খুশিতে-হাসিতে উছলে নেচে উঠল
লক্ষ্মী তুমি লাল মনুয়া,
লক্ষ্মী তুমি সত্যি
ছোট্ট তোমার বুকখানি ভাই
মুক্তা মানিক ভর্তি!
তারপর অরুণ, বরুণ, কিরণমালা তিনজনে একসঙ্গে নেচে উঠল
তিনজনে
নাচতে নাচতে
বেশ, বেশ, বেশ,
আমরা যাচ্ছি যে সেই দেশ।
যোজন দূরে যাব,
বুড়ির দেখা পাব,
বলে দেবে বুড়ি
কোথায় মায়ের দেখা পাব।
তিনজনে নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল। পাখি ডাকল টুই-টুই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন