এক

শৈলেন ঘোষ

তপোবন। তপোবনের রাত শেষ হয়ে আসছে তখন। রাতের ঝিকিমিকি তারা, আকাশের কপাল থেকে টুপ-টুপ করে নিভে যাচ্ছে—একটি একটি। ভোরের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে। কারা যেন গান গাইছে অনেকদূরে। অস্পষ্ট সুর তার ভেসে ভেসে হারিয়ে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। আবির ছড়িয়ে গেল আকাশে। সূর্য উঠছে। আলোর ঝিলমিল গাছের পাতার ওপর দুলে উঠল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। একটু দূরে একটি ছোট্ট কুটির। গাছ-গাছালির আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু দূরে একটি নদী। একেবারে কাছে—গাছে গাছে ফুল—লাল, নীল, হলুদ। সেই ফুলের বনে, ফুলের মত একটি মেয়ে, ছোট্ট ফুটফুটে, হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে ঢুকল। তার হাতে ফুলের সাজি। তার গায়ে ফুলের সাজ। পরণে ছোট্ট শাড়ি—হলুদ বরুণ। তার নাম কিরণমালা। কিরণমালা তার ফুলের সাজিতে ফুল তুলছে আর দুলছে। এমন সময় একটি পাখি ডাকল—টুই-টুই। থমকে দাঁড়াল কিরণমালা। চমকে চাইল গাছের দিকে। দুটি চোখ এদিক ওদিক মেলে খুঁজল যেন পাখিটাকে। না, দেখতে পেল না। আবার সে ফুল তুলবে। ঘুরে দাঁড়াল। আবার পাখি ডেকে উঠল—টুই-টুই। ফুল তোলা আর হল না।

কিরণমালা

গাছের দিকে চোখ মেলে ডাক দিল

কই, কই, কইরে আমার

লাল মনুয়া মিষ্টি?

চুপটি করে লুকিয়ে আছ

যায় না আমার দিষ্টি!

হঠাৎ গাছের আড়ালে দেখা দিল পাখি, কিন্তু কিরণমালার চোখের আড়ালে সে লুকিয়ে রইল।

পাখি

এই তো আমি ছোট্ট পাখি

সবুজ পাতার ফাঁকে,

ঐ তো তুমি কিরণমালা,

সক্কলে তাই ডাকে।

পাখির কথা শুনে কিরণমালা যেই চটপট তার দিকে ঘুরেছে, অমনি পাখি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।

কিরণমালা

একবার এদিক চাইল, ওদিক দেখল

ছোট্ট পাখি, ছোট্ট পাখি

কোথায় তুমি গাইছ,

কোত্থেকে ভাই লুকিয়ে বসে

আমার দিকে চাইছ?

পাখি আবার পাতায়-পাতায় লুকোচুরি খেললে।

পাখি

বলব না তো, বলব না!

অরুণ যদি আসে,

বরুণ ভালবাসে,

দেখতে আমায় তখন পাবে,

তার আগে তো বলব না!

ঠিক সেই সময় শোনা গেল কে যেন ছুটতে ছুটতে আসছে। ছুটতে ছুটতে একটি ছোট্ট ছেলে এল। তার নাম অরুণ। পরণে কাপড়। মালকোচা মারা। ফুটফুটে দেখতে। পাখির কথা শুনতে পেয়ে সে ছুটে ছুটে আসছে।

অরুণ

ছুটে এসে কিরণমালার হাত ধরল

এই তো আমি!

কিরণমালা

অরুণের মুখের দিকে চাইল। চোখ দুটি নাচছে খুশিতে

অরুণদাদা!

বনের আর এক দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আর একটি ছোট্ট ছেলে ঢুকল। অরুণের চেয়েও সে ছোট্ট। মুখের আদলটিও অরুণের মত। অরুণের মত সেও কাপড় পরেছে। তার নাম বরুণ।

বরুণ

ছুটতে ছুটতে এসে কিরণমালার হাত দুটি জড়িয়ে ধরল

এই তো আমি!

কিরণমালা

আরও খুশি হল

বরুণদাদা!

তিনজনে নেচে উঠল খুশিতে ভোরের আলোয়, ফুলের বনে। নাচতে নাচতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল কিরণমালা। হাসিমুখ তার হঠাৎ যেন ভার হয়েছে।

অরুণ

তাই দেখে ছুটে এল কিরণমালার কাছে

কী হয়েছে কিরণমালা বোনটি?

বরুণ

সকাল বেলায় ভার কেন আজ মনটি?

কিরণমালা

ঐ দেখ না সবুজ পাতার ফাঁকে,

চুপটি করে লুকিয়ে বসে

লাল মনুয়া ডাকে,

দিচ্ছে না যে দেখা,

আমার লাগছে বড় একা!

অরুণ-বরুণ গাছের দিকে তাকিয়ে লাল মনুয়া পাখিকে খুঁজতে লাগল।

অরুণ

দেখতে পেল না পাখিকে

কোথায় গেল সত্যি!

বরুণ

লাল মনুয়া রত্তি!

পাখি

দুষ্টুমি করে পাতায়-পাতায় নেচে উঠল

এই তো আমি, এই তো আমি

লাগল চোখে ধোঁকা,

অরুণ, বরুণ বোকা,

ছিঃ ছিঃ!

অরুণ

আদর করে ডাকল

লাল মনুয়া, লাল মনুয়া

লুকিয়ে কেন আছ?

সবুজ পাতায় দোদুলে দুলে

একবারটি নাচ।

বরুণ

নাচন-নাচন পাখি আমার

লক্ষ্মী সোনা তুমি,

তোমার গলায় দুলিয়ে দেব

ঝুমঝুম ঝুমঝুমি।

কিরণমালা

ঝুন-ঝুন-ঝুন রূপার নূপুর

গড়িয়ে দেব পা’য়,

দাও না দেখা ভাই?

পাখি

অত করে বলছ যখন

দেখা দিতে পারি,

আমার একটি কথা রাখবে বল?

নইলে পরে আড়ি!

কিরণমালা

খুশিতে উছলে গেল মুখখানি

ঠিক ঠিক ঠিক,

রাখব কথা ঠিক।

আগে শুনি কী-তা

লাল মনুয়া মিতা?

পাখি

বল     একটি আমায় নাচ দেখাবে তোমরা,

ফুলে ফুলে যেমন নাচে ভোমরা!

কিরণমালা

সারা মুখখানি হাসিতে-খুশিতে ভরে গেছে।

সে তো খুব সুন্দর মজা!

বরুণ

আনন্দে দুলে উঠল

এক্কেবারে সোজা!

অরুণ

নাচতে-নাচতে ছুটতে লাগল

হাসির মত ছড়িয়ে দেব তান,

ঝুন-ঝুন-ঝুন-ঝুন—

কিরণমালা

নাচের তালে তুমিও যদি

গাইতে পার গান—

গুন-গুন-গুন-গুন।

পাখি

বেশ তো আমি গাচ্ছি।

কিরণমালা

আমরাও বেশ নাচছি।

পাখি গাছের আড়ালে পাতার ফাঁকে বসে গান গাইছে, আর অরুণ-বরুণ-কিরণমালা নাচছে :

দোল দোল ডালে ডালে লুকোচুরি খেলা,

সবুজ-সবুজ ছায়া, ফুলের মেলা।

গুন গুন গানে গানে হাসে সোনা দিনটি,

ঝুন ঝুন নাচে সুখে ভাইবোন তিনটি।

অরুণ-বরুণ-কিরণমালা,

তিন ভুবনে প্রদীপ জ্বালা—তিনটি।

গান শেষ হল পাখির। নাচ শেষ হল অরুণ-বরুণ-কিরণমালার।

কিরণমালা

লাল মনুয়া লাল মনুয়া,

নাচ তো হল শেষ—

এবার দাও না দেখা বেশ।

পাখি

আগের মতই গাছের ডালে লুকিয়ে বসে

নাচ তো দেখে জুড়িয়ে গেল মন,

ভরে গেল আনন্দে যে বন।

আর     একটি কথা বলতে যদি পার

আমার দেখা পাবেই পাবে

নইলে পরে হারো!

অরুণ

লাল মনুয়া, লাল মনুয়া,

দুষ্টু তুমি ভারি,

সকাল থেকে খুনসুটি

আর বায়না গাড়ি গাড়ি!

কিরণমালা

বেশ, বেশ, বেশ,

এই বারটি শেষ।

শেষ কথাটি শুনে তোমার

দেখা পেলাম আচ্ছা

নইলে জেনো সাচ্চা

আড়ি, আড়ি, আড়ি,

চলে যাব বাড়ি!

পাখি

শেষ কথাটি শোন,

যেন     রাগ করো না কোন।

এই যে সবুজ গাছের ডালে

আমার ছোট্ট বাসা,

এই তো আমার আশা!

এইখানে যে পেলাম আমি

মায়ের ভালবাসা।

আচ্ছা    কে তোমাদের বাবা,

আর     কে তোমাদের মা?

আমি     জানতে পারি না!

কে তোমাদের আপন,

আর     কে তোমাদের পর?

কোন সুদূরে ঘর?

বলতে পারে যে—

আমার দেখা পাবেই পাবে সে।

অরুণ, বরুণ, কিরণমালা থতমত খেয়ে যাবে। থমকে এ-ওর মুখ চাওয়া-চায়ি করবে।

অরুণ

অনেকখানি অবাক হয়েছে। গলা দিয়ে কথা বেরুচ্ছে না

কী বললে লাল মনুয়া, কে আমাদের বাবা?

পাখি

হুঁ, হুঁ!

বরুণ

কে আমাদের মা?

পাখি

হ্যাঁ, হ্যাঁ।

কিরণমালা

চোখ দুটি তার ছলছল করছে

আমরা তা তো জানি না।

অরুণ

মোদের গুরু, মোদের পিতা

সন্ন্যাসীকেই জানি।

পাখি

না, না, না।

ঐ যে কুটির ছায়ায়-ঘেরা

নয় তোমাদের ঘর।

সন্ন্যাসী যে বসে বসে জপেন জপমালা,

তিনিও জেনো পর।

তোমরা যেন সবুজ বনে

হারিয়ে যাওয়া ফুল,

যা ভেবেছ, যা করেছ

সব জেনো ঠিক ভুল!

বল     কে তোমাদের বাবা?

শুনি    কে তোমাদের মা?

বলতে যদি পার,

আমার দেখা তখন পাবে,

তার আগে না না।

অরুণ, বরুণ, কিরণমালা যেন নিমেষের মধ্যে বোবা হয়ে গেল। আর যেন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তাকিয়ে রইল ফ্যাল ফ্যাল করে ছল ছল চোখে এ-ওর দিকে। এমন সময় পায়ের শব্দ ভেসে এল সন্ন্যাসীর। সন্ন্যাসীর আসার সাড়া পেয়ে—অরুণ, বরুণ, কিরণমালা ধীরে ধীরে বসে পড়ল গাছের ছায়ায়—মাথা নিচু করে। আর ভাল লাগছে না তাদের। সন্ন্যাসী তাদের ঐভাবে বসে থাকতে দেখে অবাক হলেন। আদর করে ডাকলেন :

সন্ন্যাসী

অরুণ, বরুণ, কিরণমালা,

আহা সোনার আলোর কিরণ ঢালা!

অরুণ, বরুণ, কিরণমালার মুখে কোন উত্তর নেই। সন্ন্যাসী আরও অবাক হলেন। কাছে এগিয়ে গেলেন। মাথায় হাত দিলেন একে একে তিনজনের।

সন্ন্যাসী

অরুণ, বরুণ, কিরণমালা,

বলছ না যে কথা,

মনে     হঠাৎ কিসের ব্যথা?

কিরণমালার চোখের দিকে হঠাৎ নজর গেল

কিরণমালার চোখে এ যে,

মুক্তামালা দেখি!

কী হয়েছে লক্ষ্মী মেয়ে?

কাঁদছ কেন একি!

কিরণমালা

চোখ দিয়ে জল উপচে পড়ল

গুরুদেব, কে আমাদের মা?

অরুণ

কে আমাদের বাবা?

বরুণ

কে আমাদের আপন

আর কে আমাদের পর?

কিরণমালা

কোথায় মোদের ঘর?

চমকে উঠলেন সন্ন্যাসী। থমকে দাঁড়ালেন। ভাবলেন এক নিমেষ। দূরে নদীর দিকে তাকালেন। আপন মনে বললেন :

সন্ন্যাসী

মা? তোমাদের বাবা? তোমাদের ঘর? আমিও তো জানি না! আমিও তো তাই ভাবি।

তিনজনে

মানে!

সন্ন্যাসী

চিন্তা করতে করতে

মানে? মানে? তবে শোন

সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত তপোবনে অন্ধকার নেমে এল। কালো মিশমিশে জমাট অন্ধকার। চোখে দেখা যায় না কিছু। ধীরে ধীরে যখন অন্ধকার কাটল, আলো ফুটল, তখন দেখা গেল সেখানে তপোবন আর নেই। না কুটির, না ফুলবন। না আছে অরুণ, বরুণ, কিরণমালা। সেখানে নদী। নদীর জল ছলছল। নদীর ঢেউ উঠছে নামছে। আর সেই নদীর জলে সকালের সোনালী আলো দোদুল-দুল দুলছে। সন্ন্যাসী সেই নদীতে স্নান করছেন।

সন্ন্যাসী

নদীর জলে স্নান করতে করতে

এই নদী। একদিন সকালে স্নান করছি।

দেখা গেল নদীর জলে একটি পাত্র ভেসে আসছে

হঠাৎ একটি মাটির পাত্র ভেসে এল।

মাটির পাত্রের দিকে তাকালেন। চমকে উঠলেন

একি! দেখলাম তার ভিতর একটি শিশু! আহা! যেন দেব-শিশু। বুকে তুললাম। নাম দিলাম—অরুণ!

আবার অন্ধকার নেমে এল। আলো ফুটলে দেখা গেল নদীর ওপর দিয়ে এক ঝাঁক বক উড়ে যাচ্ছে। সন্ন্যাসী স্নান করছেন।

সন্ন্যাসী

এক বছর কেটে গেল। সেদিনও স্নান করছি নদীর জলে। নদী সেদিনও ছলছল-টলটল।

দেখা গেল নদী জলে আর একটি পাত্র ভেসে আসছে।

সেদিনও দেখি আর একটি পাত্র ভেসে আসছে নদীর জলে।

চেয়ে দেখলেন পাত্রের দিকে

অবাক কাণ্ড! তাতে আর একটি শিশু। তার চোখে যেন স্বর্গের নীল। আহা! বুকে নিলাম। নাম দিলাম বরুণ।

সঙ্গে সঙ্গে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নদী। আলো ফুটলে দেখা গেল আকাশে মেঘ ছুটেছে। আর নদীতে সন্ন্যাসী স্নান করছেন।

সন্ন্যাসী

আর এক বছর চলে গেল। সকালের মেঘের ছায়া নদীর জলে ভালবেসে ছড়িয়ে গেছে। স্নান করছি।

দেখা গেল একটি খেলার নৌকা ভেসে আসছে

দেখি নদীর জলে নৌকা! কিসের নৌকা? আহা রে খেলার নৌকা এইটুকু। নৌকা দুলছে। চেয়ে দেখি তার সঙ্গে আর দুলছে একটি মেয়ে ছোট্ট এতটুকু। ফুল তুকতুক, লাল-টুকটুক। বুকে নিলাম। নাম দিলাম কিরণমালা।

আবার অন্ধকার। ধীরে ধীরে আবার যখন আলো ছড়িয়ে গেল—দেখা গেল সেই তপোবন। সেখানে আগের মতই অরুণ, বরুণ, কিরণমালা রয়েছে। আর রয়েছেন সন্ন্যাসী।

অরুণ

ছুটে গেল সন্ন্যাসীর কাছে। একটি হাত ধরল

তারপর?

বরুণ

ছুটে এল সন্ন্যাসীর কাছে। একটি হাত ধরল

এরপর?

সন্ন্যাসী

বড় করেছি বুকে করে আর ভেবেছি যেদিন তোমরা জানবে, আমি তোমাদের কেউ নই, সেদিন তোমাদের ছেড়ে, ঐ কুটির ছেড়ে, আমি চিরদিনের জন্যে গভীর বনে চলে যাব। আর কোনদিন ফিরব না। আজ সেইদিন এসেছে।

তিনজনে

হকচকিয়ে সন্ন্যাসীকে জড়িয়ে ধরবে।

না

কিরণমালা

না, না, তোমাকে যেতে দেব না। তুমি চলে গেলে আমরা কার কাছে থাকব। আমাদের যে কেউ নেই!

সন্ন্যাসী

শান্তগলায় মিষ্টি সুরে আদর করলেন

কে বললে তোমাদের নেই! তোমাদের সব আছে। এই বন, ঐ কুটির, গাছের পাখি, বনের পশু সব তোমাদের। আমি সন্ন্যাসী। আমি একবার যা মনে মনে ভেবে রেখেছি, আমাকে তা করতেই হবে। আমি তোমাদের সব দিয়ে গেলাম।

অরুণ, বরুণ, কিরণমালার চোখ ছলছল করছে। সন্ন্যাসী ওদের মাথায় হাত দিলেন

তোমরা সুখী হও। সুখী হও।

অরুণ, বরুণ, কিরণমালা সন্ন্যাসীর পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল। চোখের জলে সন্ন্যাসীর পা ভিজে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল তপোবন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%