শৈলেন ঘোষ
একটা ছোট্ট কুঁড়ে ঘর। এক কোণে একটা মাদুর, ছেঁড়া কাঁথা। ভাঙা পাখা। একটা কুলো। কলসি। ঘটি। আর একদিকে ঝাঁটা। দেওয়ালে টাঙানো ঝুলি, তাতে—সাত-সতের জিনিস। একটা বুড়ি বসে ছিল। বসে বসে গান গাইছিল ছড়া কেটে কেটে। বুড়ি গান গাইতে গাইতে দাঁড়াল। কাঁপতে কাঁপতে নাচতে লাগল। ঠিক সেই সময়ে অরুণ, বরুণ, কিরণমালা চুপি চুপি, লুকিয়ে লুকিয়ে বুড়ির ঘরে এল।
বুড়ির ছড়া
দাঁড় কাক, দাঁড় কাক, ঠ্যাঁ দুটো কাঠি
ঠুক ঠুক পায়ে-পায়ে খুট খুট হাঁটি।
হাঁটি হাঁটি পা-পা দিন গেল হুস,
ভাঙা দাঁতে ডাঁটা খাবে নেই তার হুঁস।
হাঁসফাঁস হাঁসফাঁস পেট ফোলা ব্যাঙ,
চিৎ হয়ে পড়ে আছে ড্যাং ড্যাং ড্যাং।
পেটে মারি লাথি,
লাথি খেয়ে সোনা ব্যাঙ হয়ে গেল হাতি!
গান শেষ করে বুড়ি ধপাস করে বসে পড়ল, আর ঠিক তক্ষুনি কিরণমালা একটি ফুল নিয়ে বুড়ির চুলে বেঁধে দিল। সঙ্গে সঙ্গে রঙিন আলোয় বুড়ির ঘর ভরে গেল।
বুড়ি
চটপট উঠে দাঁড়াল; অরুণ, বরুণ, কিরণমালাকে দেখতে পেয়ে তেড়ে গেল
কে রে? কে রে? কে রে?
অরুণ
ভয় পেল না। শান্ত গলায় বললে
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা, আমরা ভাইবোন।
বরুণ
আমরা অনেক দূরে থাকি।
কিরণমালা
আমাদের নেইকো আপনজন।
বুড়ি
রাগটা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে গেল। ওদের দিকে চোখ রেখে পিট পিট করে দেখলে। কেমন যেন মায়া হল তার। তারপর নিজের মাথায় হাত দিলে। মাথায় ফুল দেখে অবাক হল। আনন্দে বুক ভরে গেল
ওমা! এযে গোলাপ রাঙা ফুল!
কেমন করে মাথায় এল?
দেখছি না তো ভুল!
অরুণ
বুড়ি মাগো তোমার মাথায়
আমরা দিলাম ফুল,
রঙিন তুলতুল!
বুড়ি
খুশি হয়ে অরুণ, বরুণ, কিরমালার চিবুক ধরে চুমু খেলে
আহা রে! লক্ষ্মী সোনা ছেলে এ যে,
লক্ষ্মী সোনা মেয়ে
এমন সোনার কপাল জোড়া
আঁধার কেন ছেয়ে!
কিরণমালা
গলায় তার কান্নার সুর
বুড়ি মাগো বুড়ি মা,
আমরা জানি না,
কে আমাদের বাবা,
আর কে আমাদের মা।
অরুণ
তুমি দাও না বলে খোঁজ?
বুড়ি
অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে না-জানার ভান করে চোখ টিপলে
আমি সে খোঁজ কেমন করে
জানব বাছা বল?
আমার কাছে আছে কী আর
বলে দেবার কল!
অরুণ
কিরণমালার হাতটি ধরে বুড়ির কাছে এগিয়ে গেল
বোনটি আমার দিনরাত্তির
কাঁদছে দেখ না!
কিরণমালা
চোখ কান্নার জলে টলটল করছে
দাও না বলে কোথায় বাবা,
কোথায় আমার মা?
বুড়ি
কিরণমালার চোখে জল দেখে মন ভিজে গেল
আহা! তোদের দেখে লাগছে বড় মায়া,
হচ্ছে মনে দূর করে দিই
কপাল জোড়া ছায়া!
একটু ভাবল যেন। তারপর কেমন জোর দিল গলায়
বেশ, বেশ, বেশ,
করছি এবার শেষ,
সব দুঃখের শেষ,
ভয় পেয়ো না যেন!
ঘুরে দাঁড়াল ঘরের দেওয়ালের দিকে, তারপর হাঁক দিল
আকুম বাকুম চ্যাপ্টা মাকুম কইরে,
কইরে আমার ফুসমন্তর যাদু,
নাক বোঁচকা, ঠোঁট চ্যাপ্টা খাঁদু!
সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রের মত ঘরের দেওয়ালে দেখা গেল এক বিরাট, ভয়ঙ্কর রাক্ষসের মুখ। তার মুখ দিয়ে দাউ দাউ করে আগুন বেরুচ্ছে। তার আশেপাশে আরও রাক্ষস-তারা লাফালাফি করছে। আর দেখা গেল এক মস্ত কিম্ভূতকিমাকার বাড়ি। আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অরুণ, বরুণ, কিরণমালা ভয়ে চমকে উঠল। বুড়ি অরুণ, বরুণ, কিরণমালার কাছে এগিয়ে এসে বললে :
ঐ যে মায়াপুরী দেখতে পাচ্ছিস, ঐখানে যেতে হবে।
অরুণ
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলে
কেমন করে যাব?
বুড়ি
প্রথমে বাঁদিক দিয়ে গিয়ে ডানদিকে। ডানদিক দিয়ে পিছন দিকে। তারপর সামনে। ওখানে গেলে এক মায়াপাখি দেখতে পাবি তাকে জিজ্ঞেস করবি—সে সব বলে দেবে। যা এক্ষুনি চলে যা।
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা ভয়ে জড়ামড়ি করে চলে যাচ্ছিল, বুড়ির যেন কি মনে পড়ে গেল, তাই ডাকলে
এই শোন, শোন, শোন।
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা দাঁড়াল
দেখিস, খুব সাবধান! এক ডাইনি আছে ওখানে। তার সামনে যেন যাস না। তার সামনে গেলে, সে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। ওখানে অপ্সরী আছে। তাদের দেখে ভুলিস না যেন, তাহলে রাক্ষস এসে গপ গপ করে গিলে খেয়ে ফেলবে। খুব সাবধান। যা, যা, এখন যা।
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা এবারও চলে যাচ্ছিল। বুড়ি আবার ডাকলে
এই শোন, আর একটা কথা
বুড়ির মাথায় কিরণমালা যে ফুলটা দিয়েছিল, সেইটা অরুণের হাতে দিলে
এই ফুলটা কাছে রাখবি, তাহলে কেউ তোদের গায়ে হাত দিতে পারবে না। নে। ধর।
বরুণ ফুলটা হাতে নিল।
যা, এবার যা। যা—ছোট—ছোট।
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা তিনজনে হাত ধরাধরি করে ছুটল। আর বুড়িটা ছড়া কেটে কেটে, কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে গেল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন