শৈলেন ঘোষ
অরুণ, বরুণ, কিরণমালার কুটিরের ছোট্ট ঘর। তকতকে ঝকঝকে সাজানো। দেওয়ালের গায়ে গায়ে ছবি। কোনটা পাখি, কোনটা হরিণ, হাতির মা আর তার ছেলে। আলপনা। লতাপাতা। মধ্যে একটি সুন্দর আসন পাতা। তার সামনে খাবার। কত রকমের খাবার ভারে ভারে থালায় থালায় সাজানো। অরুণ, বরুণ, কিরণমালা পথ দেখিয়ে রাজাকে সেখানে নিয়ে এল। রাজা আসনে বসলেন। থালায় থালায় নানান রকম খাবার দেখে অবাক চোখে চাইলেন। তারপর খাবারে হাত দিয়ে মুখে তুলতে গিয়ে চমকে গেলেন। আর ঠিক সেই সময় সোনার পাখি অন্যদিক দিয়ে চুপিসারে এসে রাজার পিছনে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রাজা
খাবার হাতে নিয়ে অবাক চোখে দেখলেন
একি! খাবার যে সব মোহরের!
সোনার পাখি
পেছনে লুকিয়ে চোখ টিপে-টিপে হাসতে লাগল
তাতে কী?
রাজা
আপন মনেই বলে গেলেন
কেমন করে খাব?
সোনার পাখি
তেমনিভাবে রাজার চোখের আড়ালেই রইল
কেন খাওয়া যাবে না? ও তো পায়েস, পিঠা, ক্ষীর!
রাজা
অরুণ, বরুণ, কিরণমালাকে কথা বলতে না দেখে, অথচ কে কথা বলছে বুঝতে না পেরে চমকে এদিক ওদিক চাইলেন।
কে কথা বলে?
সোনার পাখি
এই তো আমি। পিছনদিকে ফিরে চান।
রাজা
সোনার পাখিকে দেখলেন, আরও অবাক হয়ে গেলেন
পাখি! পাখি কথা বলে কেমন করে?
সোনার পাখি
মায়ায়!
রাজা
মায়ায়! মোহরের পায়েস, মোতির পিঠা, মুক্তার মিঠাই মানুষ কেমন করে খাবে?
সোনার পাখি
রাজামশাই, এ যদি খাওয়া না যায় তো, মানুষের পেটে কুকুরের ছানা, বেড়ালের ছানা, কাঠপুতলি জন্ম নেয়, একথা ভাবা যায় কী করে?
রাজা
আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
মানে! তুমি কী বলতে চাও?
সোনার পাখি
বলতে কিছুই চাই না। তবে কী জানেন, রাজা হয়ে, অন্যের কথা শুনে, আপনি যে এত বড় একটা ভুল কাজ করে বসবেন—এইটাই আশ্চর্য!
রাজা
ভুল! আমি ভুল করেছি! কক্ষনো না।
সোনার পাখি
করেছেন রাজামশাই, করেছেন। শুনবেন তা হলে? অরুণ, বরুণ, কিরণমালা আপনার ছেলেমেয়ে!
রাজা
অত্যন্ত অবাক হয়ে তাকালেন অরুণ, বরুণ, কিরণমালার দিকে
আমার ছেলেমেয়ে!
সোনার পাখি
হ্যাঁ, আপনার ছেলেমেয়ে। আচ্ছা রাজামশাই, মনে পড়ে রানীমায়ের বোনেদের কথা?
রাজা
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
সোনার পাখি
মনে পড়ে পর পর সেই তিনটি বছরের কথা? সে এক বছর রাজবাড়িতে আনন্দের হাট লেগেছে। রানীর ছেলে হয়েছে। ওমা হঠাৎ রানীর এক বোন এসে বললে, রানীর পেটে কুকুরছানা হয়েছে! আর এক বছর কেটে গেল। সে বছর আবার আনন্দের বান বইছে রাজবাড়িতে। রানীর আবার ছেলে হয়েছে। সে বছর রানীর আর এক বোন এসে বললে, ছেলে নয়, রানীর পেটে বেড়ালছানা হয়েছে। আর সেই শেষ বছর, আর এক বোন বললে, রানীর পেটে কাঠের পুতুল জন্মেছে। রাজামশাই, এই রানীর বোনেরা ছিল ভীষণ হিংসুটে। কুকুরছানা, বেড়ালছানা নয় রাজামশাই, সেদিন রানীর পেটে অরুণ, বরুণ, কিরণমালা জন্মেছিল। রানীর বোনেরা হিংসেয় ফেটে পড়ে আপনার এই সোনার টুকরো ছেলেমেয়েদের নদীর জলে ভাসিয়ে দিল আর রানীর নামে গঞ্জনা দিয়ে বেড়ালো। আপনিও তাদের কথায় রানীকে নির্বাসন দিলেন।
রাজা
কী বলছ তুমি পাখি?
সোনার পাখি
ঠিক বলছি আমি, রাজা!
রাজা
সঙ্গে সঙ্গে অরুণ, বরুণ, কিরণমালাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন
তোরা আমার ছেলেমেয়ে!
তিনজনে
রাজার পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল
বাবা!
রাজা
হায়! কোথায় আমার সেই দুঃখিনী রানী! আজ যদি থাকত সে!
কিরণমালা
রাজার হাত ধরে দেখাল
বাবা, বাবা, বাবা,
ঐ যে অনেক দূরে,
ছোট্ট নদী এঁকে বেঁকে
যেথায় গেছে ঘুরে,
ঐ খানেতে ঐ দেখ-না
ছোট্ট মত কুঁড়ে,
মা থাকে যে সেথা!
আগে জানতো কে তা!
রাজা
সত্যি নাকি তাই,
আমি কী করেছি হায়!
সোনায় গড়া চৌদোলাতে
আনতে তাকে যাই।
রাজা চলে গেলেন। রাজা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল টুই-টুই—লাল মনুয়ার ডাক। লাল মনুয়া ডানা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে হাসতে সেখানে এল।
তিনজনে
আনন্দে ছুটে গেল
লাল মনুয়া!
লাল মনুয়া
কিরণমালা বোন
লক্ষ্মী সোনা ধন
বাবা মাকে খুঁজে পেলে
আনন্দ আজ কার—
আমার! আমার! আমার!
নেচে উঠল লাল মনুয়া। সঙ্গে সঙ্গে নাচল সোনার পাখি, অরুণ, বরুণ, কিরণমালা। নাচতে নাচতে তাদের ছোট্ট কুটিরের ছোট্ট ঘর আনন্দে ভরে গেল। এমন সময় রাজা রানীর হাত ধরে সেখানে এলেন। নাচতে নাচতে সক্কলে তাদের ঘিরে ধরল। ছোট্ট কুটিরের ছোট্ট ঘর আলোয়-আলো হয়ে গেল।
শেষ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন