শৈলেন ঘোষ
মায়াপুরীর মায়া-কানন। গাছে গাছে লতায় পাতায় সাজানো। ডালে ডালে ফুলে ফুলে ভরানো। অবাক হয়ে দেখতে দেখতে অরুণ, বরুণ সেখানে এল। কেউ কোথাও নেই। কেমন থমথম করছে যেন সারা কানন। না একটি পাখি ডাকছে, না গাছের পাতা নড়ছে।
অরুণ
অবাক চোখে চারিদিক দেখতে দেখতে
বরুণভাই, এই বোধ হয় মায়াপুরীর মায়াকানন!
বরুণ
অরুণদাদা, কিরণমালা এদিকে না এসে ওদিকে কোথা গেল?
অরুণ
সোনার পাখির খোঁজ আনতে।
বরুণ
হঠাৎ একটা অদ্ভুত ধরনের ফুল দেখতে পেল
অরুণদাদা, দেখ দেখ কী সুন্দর ফুল ফুটেছে!
অরুণ, বরুণ, দুজনাই ছুটে গেল সেই ফুলটার দিকে। যেই হাত দিতে গেল ফুলের পাপড়িতে, অমনি ফুলের ভেতর থেকে অপ্সরী বেরিয়ে পড়ল। কী সুন্দর দেখতে তাদের! একবার চাইলে আর চোখ ফেরান যায় না। অরুণ বরুণ ভয়ে পালাতে গেল। পালাবে কোথায়? তাদের একেবারে সামনে আর একটা ফুল থেকে আর একজন অপ্সরী চটপট বেরিয়ে এল। এমনি করে পর পর পাঁচটা ফুল থেকে পাঁচজন অপ্সরী বেরিয়ে নাচ শুরু করে দিলে। প্রথমটা অরুণ, বরুণ ভয় পেলেও শেষে কিন্তু কেমন যেন অবাক হয়ে, তন্ময় হয়ে অপ্সরীদের নাচ দেখতে লাগল— চোখ আর ফেরাতে পারল না। সব ভুলে গেল। হঠাৎ হল কি—দেখা গেল মায়া-কাননে কেমন যেন গা-ছমছম অন্ধকার নেমে আসছে। অমনি অপ্সরীরা আবার টুপটুপ করে ফুলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ছে। আর সেই অন্ধকারে চোখ রাঙিয়ে, দাঁত খিঁচিয়ে, কাকের বাসার মত মাথার চুল ঝাঁকিয়ে, এক ডাইনি ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসে দু হাত ছড়িয়ে একেবারে অরুণ, বরুণের সামনে। অরুণ, বরুণ পড়িমরি করে যেই পালাতে গেছে অমনি ডাইনিটা বিকট চিৎকার করে লাফাতে লাফাতে অরুণ, বরুণের মুখের কাছে হাত ছুঁড়ে যাদু করতে লাগল। অরুণ, বরুণ পালাতে গিয়েও পারল না। তাদের হাত পা যেন কেমন অবশ হয়ে আসছে। তারা দাঁড়াতে পারছে না। বসে পড়ল। তারা বসতেও পারছে না। শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর ডাইনিটা চিঁহিঁহিঁ করে হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে আবার ঝোপের মধ্যে ঝুপ করে লুকিয়ে পড়ল। আবার সব নিঃঝুম।
একটু পরেই কিরণমালা সেখানে এল। অরুণ, বরুণকে ঘুমুতে দেখে ভয় পেয়ে গেছে। গায়ে হাত দিয়ে ডাকল। সাড়া পেল না। তাদের ঘুমও ভাঙল না। কী করবে এখন? ভাবতে ভাবতে এদিক ওদিক দেখছে। দেখতে দেখতে সেই অপ্সরীদের ফুলের কাছে যেই এসেছে, অমনি একসঙ্গে সেই পাঁচটা ফুলের মধ্যে থেকে পাঁচটা রাক্ষস বেরিয়ে তেড়ে এল কিরণমালাকে। কিরণমালা প্রথমটা থমকে গেলেও ভয় পেল না। সাহস করে ঘুরে দাঁড়াল রাক্ষসদের সামনে। রাক্ষসেরা হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ করে, বিকট চিৎকার সুরু করে নাচানাচি লাফালাফি লাগিয়ে দিলে। তাদের একজনের হাতে একটা তলোয়ার। নাচানাচি যখন করছে, কিরণমালা তক্কে-তক্কে ঐ একটা রাক্ষসের হাত থেকে তলোয়ারটা আচমকা চট করে কেড়ে নিয়ে রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ লাগিয়ে দিলে। ভীষণ যুদ্ধ হল। কিরণমালা একে একে পাঁচটা রাক্ষসকে তলোয়ার দিয়ে কেটে মেরে ফেললে। মেরে হাঁপাতে-হাঁপাতে আবার অরুণ, বরুণকে ডাক দিল। তাদের ঘুম ভাঙল না। ঠিক তক্ষুনি একটা পাখি এল সেখানে। তার সারা দেহ সোনায়-সোনা। তাকে দেখে কিরণমালা প্রথমটা চোখ ফেরাতে পারে না। কথা বেরয় না। অবাক হয়ে দেখছে খালি। পাখি কিরণমালার দিকে চেয়ে মুচকি হাসল। কিরণমালার মনে সাহস এল।
কিরণমালা
সোনার পাখিভাই, বুড়ি মা যে পাখির কথা বলল—তুমিই কী সেই পাখি?
সোনার পাখি
মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে
হ্যাঁ, তোমার নাম বুঝি কিরণমালা?
কিরণমালা
অবাক হয়ে পাখির দিকে তাকাল
কেমন করে জানলে?
সোনার পাখি
আমি যে মায়াপুরীর পাখি? আমি জানব না?
কিরণমালা
অরুণ বরুণের কাছে ছুটে এল, গলা তার ভার হল
মায়াপুরীর পাখিভাই, আমার অরুণদাদা, বরুণদাদার কী হয়েছে বল না?
সোনার পাখি
না, না, কিচ্ছু হয়নি। ডাইনি বুড়িটা ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
কিরণমালা
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলে
ঘুম কেমন করে ভাঙবে?
সোনার পাখি
ঐ গাছের নিচে একটা কমণ্ডলু দেখতে পাচ্ছ?
কিরণমালা
চোখ ঘুরিয়ে দেখতে পেল
হ্যাঁ হ্যাঁ!
সোনার পাখি
ঐটা নাও—নাও।
কিরণমালা আস্তে আস্তে গিয়ে কমণ্ডলু নিল
কমণ্ডলুর জল অরুণ, বরুণের গায়ে ছিটিয়ে দাও—দাও!
কিরণমালা জল ছিটিয়ে দিল অরুণ বরুণের গায়ে। অমনি সঙ্গে সঙ্গে অরুণ বরুণের ঘুম ভেঙে গেল। অবাক হয়ে উঠে বসল। তারপর উঠে দাঁড়াল তারা। কিরণমালাকে দেখে খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরল।
কিরণমালা
আনন্দে নাচতে নাচতে পাখির কাছে এগিয়ে গেল
সোনার পাখি, লক্ষ্মী পাখি,
তুমিই নাকি জান,
কে আমাদের বাবা, আর কে আমাদের মা?
সোনার পাখি
অরুণ, বরুণ, কিরণমালা, তোমরা যখন এসেছ, আমায় ভালবেসেছ, তখন আমি তোমাদের সব বলে দেব। এখন আমায় তোমাদের বাড়িতে নিয়ে চল। তারপর যা করবার আমি করব।
কিরণমালা
সত্যি বলছ সোনার পাখিভাই, তুমি আমাদের বাড়ি যাবে?
সোনার পাখি
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
অরুণ, বরুণ, কিরণমালার মুখ খুশিতে উছলে গেল। তিনজনে আনন্দে নেচে উঠল।
তিনজনে
তাই ভাল, এই ভাল, সেই ভাল বেশ,
চল ভাই, বেশ ভাই ফিরে যাই দেশ।
পাখিকে নিয়ে অরুণ, বরুণ, কিরণমালা নাচতে নাচতে মায়াকানন ছেড়ে চলে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন