দেবব্রত সান্যাল
রাত ১১-২০, শনিবার
মাগাঙ্গা মাটিটু
লুডেওয়া, তাঞ্জানিয়া
পূর্ব আফ্রিকা
গত সোমবার তিন নম্বর পিট্ থেকে একটা দারুণ নমুনা পাওয়া গেছে, পাওয়া এস্তক গডফ্রে খুব উত্তেজিত ছিলো। উত্তেজিত কারণ ম্যাগনেটাইট ওরের মধ্যে এই ধরনের কিছু পাওয়া যেতে পারে সে কখনো শোনেনি। তাই বিশ্বাস হয় না। কিন্তু সত্যি হলে বড়ো খবর। গডফ্রে এই প্রজেক্টের সহকারী ভূবিজ্ঞানী। নমুনাটা আনতে আনতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিলো। পুরো প্রমাণ হাতে না পেয়ে লাফালাফি করে লোক হাসাবার পাত্র গডফ্রে নয়। তবু এখানকার প্রধান ভূবিজ্ঞানী জোসেফকে কিছু একটা না বললে চলে না। ফিরে এসে জোসেফকে বলাতে ও কোনো গুরুত্বই দিলো না। বরং একটু রেগে গিয়ে অনুসন্ধান পরিকল্পনার বাইরে পাকামো করতে মানা করে দিলো। গডফ্রে কত করে বোঝানোর চেষ্টা করলো, আজকের নমুনাটা অনেকটা আলাদা, নতুন কিছু পাবার সম্ভাবনা আছে। একবার দার এস সালামে এক্স.আর.এফ করতে দেওয়া উচিত। এক্স.আর.এফ মেশিনে পরীক্ষা করলে তবেই না নির্ভুল ভাবে জানা যাবে ওই নমুনায় কোন উপাদান কতটা আছে। চোখে দেখে যা মনে হচ্ছে, সেটা বড়ো ব্যাপার। তাই সঠিক যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাতে জোসেফ আরও বিরক্ত হয়ে ওকে বললো, ‘দেখো বেশি সেয়ানাগিরি দেখিও না, আয়রন ওর আর কয়লা খোঁজা আমাদের কাজ, সেজন্যই টাকা পাই। যদি চাকরিটা করে যেতে চাও, তবে নিজের কাজে মতলব রাখো। যখন নিয়ে এসেছো, তখন যাও নমুনাটাকে কোরশেডের ভিতরে ছোট শেডটার সামনে রেখে এসো। মার্কিং করে নম্বর দিয়ে রাখবে। অন্য নমুনার সাথে যেন মিশে না যায়।’
২০১২ সাল থেকে জম্বে অঞ্চলের ছটা জেলার মধ্যে একটা হলো লুডেওয়া। দার এস সালাম থেকে আটশো কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে একটা অনুন্নত এলাকা লুডেওয়া। মাগাঙ্গা মাটিটুতে আয়রন ওরের খনি আর কাটেওয়াকে কয়লার খনি এখনো তেমন ভাবে লোকচক্ষুর সামনে আসেনি। মেহেতা গ্রুপের পূর্ব আফ্রিকাতে বেশ কিছু ব্যবসা আছে, হোটেল, সিমেন্ট, সার আরও কত কী! গত দশ বছরে মেহেতা গ্রুপের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। মেহেতা গ্রুপ এই ইস্পাতের ব্যবসায় নতুন। দুটো খনির লাইসেন্স নিয়ে, একদল ভূবিজ্ঞানী আর রসায়নবিদ নিয়ে দল বানিয়ে গত ক’মাস ধরে ক্যাম্প বানিয়ে আছে। ক্যাম্প বলতে বাঁশ পাতার ঘর, মানানসই একটা হল যেখানে খাওয়া আর টিভি দেখা হয়। একটু দূরে সবার জন্য রান্নার থাকার জায়গা ইত্যাদি। শক্ত পোক্ত পাকা বলতে কোর শেডটা। কোরশেডে মাটি খুঁড়ে আনা নমুনা ঠিকঠাক লোহার তাকে গুছিয়ে রাখা থাকে। বিদ্যুতের জন্য জেনারেটার আছে, তবে হিসেবে করে চালানো হয়। দিনের বেলা কাজের দরকার না হলে বন্ধ থাকে। যাতায়াতের জন্য দুটো জায়গা মিলিয়ে তিনটে গাড়ি আছে। রাসায়নাগারটি একেবারে ছোটো, আসল কাজ হেড অফিসে হয়। এই দলটার কাজ হ’ল একটা রিসোর্সে রিপোর্ট বানানো। মাগাঙ্গা মাটিটুর খনি প্রধানত তিনটে ছোট ছোট পাহাড়ের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। কোম্পানি নিশ্চিত ভাবে জানতে চায়, এই পাহাড় - বনে কত লক্ষ টন আকর জমা আছে। আকর বলতে প্রাথমিক ভাবে লোহা আর কয়লার খনিতে কয়লা। সেটাই প্রথম কাজ। তারপর জানতে হয় এই লক্ষ লক্ষ টন আকর থেকে বাস্তবে কত টন ইস্পাত তৈরি হতে পারে। তার ওপর হিসেবে হবে এখানে এসে পয়সা ও পরিশ্রম খরচটা লাভজনক হবে কিনা। সেটা নির্ধারণ করার বিশেষজ্ঞরা আলাদা। পুরো ব্যাপারটা বিশেষ গোপনীয়তার সাথে চলছে। বালি পাথর মাটির সাথে কতটা কী মিশে আছে, যত কম লোকে জানে কোম্পানির পক্ষে ততই ভালো।
গডফ্রের প্রচুর জীবনীশক্তি। একদম বসে থাকতে ভালোবাসে না, ঘুরে বেড়াতে আর মাথা খাটাতে ভালোবাসে। আর সেই মাথা খাটানোটা যখন নিজের রোজকার কাজের গন্ডি ছাড়িয়ে যায়, তখন কখনো কখনো অসুবিধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন ওদের প্ল্যান্টের জন্য যে জমিটা নেওয়া হয়েছে, সেটার চেয়ে ভালো জমি পাওয়া যাবে বলে ওর মনে হয়েছে। গডফ্রে প্রজেক্টের লোক নয়। কিন্তু জল, বিদ্যুৎ আর রাস্তা জমির কাছে থাকাটা যে দরকার, সেটা সে বোঝে। তাই লুপালী নদীর পাশের জমিটা ওর বেশি উপযুক্ত মনে হয়েছে। জমিটার বিবরণ আর সুবিধার কথা একটা রিপোর্ট বানিয়ে, কোম্পানির চেয়ারম্যান মিঃ মেহেতার কাছে পাঠিয়ে দেয়। রিপোর্টটা ওনার পছন্দ হয়, এবং ওনার পি এ ফোন করে গডফ্রেকে, জমিটার পুরো ম্যাপ বানিয়ে পাঠাতে বলে। উনি আরও বলে দেন, ভারত থেকে যে বিশেষজ্ঞ আসবে, তার কাছ থেকে এ বিষয়ে যেন বিশেষ রায় নেওয়া হয়। ওনার মতামত পাবার পর, কোম্পানি জমিটার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে চায়। আপাতত খনির একটা সঠিক মূল্যায়ন হোক আর মন্ত্রালয় থেকে জমিটা সম্বন্ধে খোঁজ খবর চলুক। খবরটা চাপা থাকে না। জোসেফ ওকে প্রকান্তরে বুঝিয়ে দিয়েছে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া ওর পছন্দ নয়। গডফ্রে হেসে বলেছিলো, ‘আমার আর ঘাসের মাঝখানে না থাকলেই তো পারো।’
দার এস সালামের সামোরা এভিনিউয়ে তানজানিয়ার খনি মন্ত্রালয়। সকাল সাড়ে সাতটায় অফিস খুলে যায়। সেখান থেকে ইস্মানি রোডে ফোন গেলো।
‘স্যার, মাগাঙ্গা মাটিটুর জমির জন্য একটা দরখাস্ত আসতে চলেছে। আপনি বলেছিলেন আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে খবর দিতে।’
‘এক ঘন্টার মধ্যে লোক পাঠাচ্ছি, জমির কো-অর্ডিনেটস, ম্যাপ সব খবর দিয়ে সিল করা খাম হাতে হাতে দেবে।’
‘দরখাস্ত জমা পড়লে কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখা যাবেনা। মাননীয় মন্ত্রী নিজে চাইছেন ওখানে কারখানা হোক। স্থানীয় লোকেদের কিছু রোজগারের পথ খুলুক।’
‘হোক। আমি বাধা দেবার কে? কেনই বা দিতে যাবো। শুধু যেখানে সেখানে যেন না হয়। তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, দরখাস্ত আসবে না।।’
কোর ড্রিলিং তো শেষের দিকেই ছিলো তবু পুরো কাজটা শেষ হবার আগে গডফ্রেকে, পরের দিন থেকে ম্যাপিং করতে পাঠানো হলো। এ নিয়ে আপত্তি করার তো উপায় নেই। তানজানিয়ার বাজারে ভূবিজ্ঞানীর কাজ খুব কম, পাকামো করে নিজের কৌতুহল মিটাতে গিয়ে কাজ খোয়ালে আর পাওয়া যাবে না। এর দুদিন পর কোর শেডে গিয়ে গডফ্রের চোখে পড়লো, ওর আনা স্যাম্পলটা যেখানে রেখেছিলো সেখানে নেই। গডফ্রের মনে হলো, জোসেফ যেমন ত্যাঁদড়, ফেলে দিলো নাকি? ওদের কোর শেডটা বেশ বড়। তার ডানদিকে দুটো ঘর, তালা মারাই থাকে। আজ খোলা আছে, আর কিছু কোর বক্স গাড়িতে তোলা হচ্ছে। স্যাম্পল সাইটের বাইরে পাঠানোর কাজটা গডফ্রের। কাজটা সাবধানে না করলে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে যাবার সম্ভাবনা আর সবাই গডফ্রেকে কাজের ছেলে বলে জানে। গাড়িটা চলে যাবার পর দেখলো নোয়েল দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছে।
গডফ্রের কী মনে হলো জিজ্ঞেস করলো, ‘সাত এ নম্বর কোর বক্সটা পাঠালি?’ নোয়েল একটু অবাক হয়ে বললো, ‘জোসেফ যে লিস্ট দিয়েছে তাতে সাত এ নেই।’
‘নেই, কী যে করে না। চলতো ভিতরে গিয়ে দেখি।’ নোয়েল একটু ইতস্তত করে দরজাটা খুললো।
সাত এ বলে কোনো বাক্স পাওয়া গেলোনা। নোয়েল গজগজ করতে করতে দরজা বন্ধ করলো। কিন্তু গডফ্রের তখন অনেক কিছু দেখা হয়ে গেছে। কোর স্যাম্পল চিরকাল খোলা শেডে তাকের ওপর থাকে। ঘরের মধ্যে তালা মারা কেন রে বাবা। আর একটা ভাঙা কোরের টুকরো দেখে হাতে তুলে নিলো গডফ্রে। সোমবারে পাওয়া কোরটার সাথে কোথাও যেন মিল আছে। কী আছে ওই পিট গুলোতে, যে স্যাম্পলগুলোকে এমন চোখের আড়ালে রাখতে হবে।
নোয়েলের চোখ বাঁচিয়ে গডফ্রে স্যাম্পলটা সাথে নিলো। নোয়েল এমনিতেই গডফ্রেকে বিশেষ পছন্দ করে না। তাই দেখে ফেললে বিরাট ঝামেলা করবে। নোয়েলের রাগের কারণ পেশাদারি নয়। কারণটা গ্রেস। এই ক্যাম্পে তিনজন নারীর মধ্যে একজন। যেমনটা সাধারণ নিয়মে হয়ে থাকে গডফ্রে আর গ্রেসের মধ্যে একটা সম্পর্ক ক্যাম্পে তৈরি হয়েছে। আর সবাই ভাবে ক্যাম্প ভেঙে গেলে হয়তো সম্পর্কও ভেঙে যাবে। এই পাহাড় জঙ্গলের জীবন, তার প্রয়োজনীয়তা বিচিত্র। শহরের আপাত সভ্য এখানকার পরিবেশে সেটা অবাস্তব ও অসত্য। গ্রেস তা মোটেই ভাবে না, সে নিজের মতো করে গডফ্রেকে ভালোবাসে। ঘর বাঁধতে চায়, যতদিন তা না হচ্ছে, সেই স্বপ্ন নিয়ে খুশি থাকতে চায়। আর মনে প্রাণে বিশ্বাস করে গডফ্রেও তার মতোই ভাবছে। সব জেনেও নোয়েল গ্রেসকে একান্ত নিজের করে রাখতে চায়। তার ধারণা তার লম্বা পেটানো শরীর তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের দূরে রাখবে। গডফ্রে যতটা না গ্রেসকে পছন্দ করে, গ্রেস গডফ্রেকে পছন্দ করে অনেকটা বেশি। ক্যাম্পের আকর্ষণ, প্রেম এই পরিবেশের মতোই বন্য। গতকাল লুপালী নদীর ধারের জমিটার ড্রিলিং করতে গিয়ে যা দেখেছে তাতে গডফ্রে স্বাভাবিক ভাবে ভয় পেয়ে গিয়েছে। কাউকে কিছু বলতে পারছে না।
দেওয়ালের কান আছে। বেচারা গডফ্রে জানে না দেওয়ালের কান থাকলে, খোলা মাঠের চোখ আছে।
ক্যাম্পের আইন কানুন একটু ঢিলে ঢালা হলেও, কাজের সময় মদ খাওয়া ভালো চোখে দেখা হয় না। সন্ধ্যাবেলা রেশন করে দেওয়া আলোয় সবাইকে একসাথে মিলতেই হয়। শনিবার রাতে টিভিতে যতটা দেখা যায়। তারপর গিটার বাজিয়ে গান, নাচ, মদ্যপান। গডফ্রের গিটারে আর গলায় অনেক সুর। সবাই ওর গানের প্রতীক্ষায় থাকে। গন্ডগোলটা কিভাবে শুরু হয়েছিল কারোর ঠিক জানা নেই। দুনিয়ার অর্ধেক চেঁচামেচির দায়, হয় সুরা নয় ব্লাড প্রেসারের ওপর গিয়ে পরে। নোয়েল গডফ্রের ওপর রাগ করে চেঁচাচ্ছিলো। আসল কথা না ব’লে, ‘কাজ করিস না। কোর শেডে ছোঁক ছোঁক করিস ইত্যাদি।’ বলে চেঁচাচ্ছিলো। আসল কথা বলে চেঁচালে লাভ নেই। নারীর দেহ মন জয় করতে গেলে অধিকার ফলালেই চলে না। যাহোক জোসেফ এসে নোয়েলকে নিয়ে চলে গেলো। কিন্তু আসরের ছেঁড়া সুর আর জোড়া লাগলো না। গডফ্রে সন্ধ্যের আগেই একবার দরকারি কথা বলতে গ্রেসের ঘরে এসেছিলো। তখনি কিন্তু গ্রেসের অদ্ভুত লাগছিলো। রাতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গডফ্রে চলে গিয়েছিলো। এতোসব হবার পর গ্রেস নিশ্চিত ছিলো না, রাতে গডফ্রে ওর কাছে আসবে কী না। রাতে গডফ্রে না আসাতে গ্রেস একটু হতাশ হলো। পরদিন রবিবার। ছুটির দিন, তাই সকালে কেউ কারোর বিশেষ খোঁজ রাখে না। সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে গডফ্রেকে না দেখেও কারোর কিছু মনে হয়নি। দুপুরে খাবার সময় না দেখা যেতে ডেভিড গিয়ে ওর ঘরটা দেখে এলো। গডফ্রে ছিমছাম মানুষ। ঘর সাফ সুতরো রাখে। বিছানা দেখে মনে হচ্ছে, রাতে ব্যবহার হয়নি।
এবার সবার টনক একটু নড়লো। এদিক ওদিক দেখা শুরু হলো। শেষে খাদের ধারে গডফ্রের দেহ পাওয়া গেলো।
মাথায় ভারি জিনিস, সম্ভবত মদের বোতল দিয়ে মারা হয়েছে। রাতের অন্ধকারে গডফ্রে এতদূর এসে কী করছিল? ক্যাম্পের মাঝে খুন, কে করলো, কেনই বা করলো!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন