দেবব্রত সান্যাল
শান্তনু ভেবেছিলো, এতসবের পরে রাতে ভালো ঘুম হবে না। বরং ক্লান্তিতে চটপট ঘুম এলো। সক্কাল সক্কাল উঠে তৈরি হয়ে নিলো। সুটকেসের তালার কম্বিনেশনটা কাল রাতেই পাল্টেছিলো, সেটা মনে ছিলো না। তাতেই একটু দেরি হলো। জিপিএস ট্র্যাকারটা হাতের মুঠোয় নিয়ে অলস ভাবে সরাইখানার পার্কিঙে এলো। ওদের গাড়ি দুটো ছাড়া একটা মিনি ট্রাক ছিলো। কেউ দেখছে না, দেখে নিয়ে টুক করে ট্রাকটায় ওটা ফেলে দিলো। কাজটা ক’রে, শান্তনুর বেশ একটা ছেলেমানুষি আনন্দ হলো। ‘দেখ এবার সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।’
‘গুড মর্নিং স্যার।’
শান্তনু চমকে দেখলো, ওদের গাড়ির ড্রাইভার ম্যাক। গাড়িটায় জল ঢেলে পরিষ্কার করছে। দেখে ফেললো নাকি।
‘গুড মর্নিং ম্যাক।’
‘স্যার আজ আপনি আমার গাড়িতে থাকবেন।’
‘তোমার গাড়িতেই কেন? সিংহ দেখাবে?’
‘সিরিয়াস ব্যাপার স্যার। একটু সতর্ক থাকবেন।’ শান্তনু আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলো, কিন্তু ম্যাক হঠাৎ কথা বন্ধ করে গাড়ি মুছতে শুরু ক’রলো। শান্তনু পিছে তাকিয়ে দেখে কিছুটা দূরে সুশীলা ওদের দিকেই আসছে। ওদের কথা বলতে দেখেছে, কিন্তু শুনতে পায়নি। আজ সুশীলা একটা চকরা বকরা বারমুডার সাথে ভারি জুতো পড়েছে। মাথায় টুপি।
‘মর্নিং।’ শান্তনু নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা ঢাকবার জন্য যোগ করলো। ‘দেখে মনে হচ্ছে আফ্রিকান সাফারির জন্য একেবারে তৈরি।’
‘মিকুমি যাবো তো।’
‘আরে সিগনালটা এমন দেখাচ্ছে কেন? আজ তো ওদের ফেরার কথা। এতো গ্রামের দিকে যাচ্ছে।’
‘আমি বলেছি, ইন্ডিয়ানটা মহা সেয়ানা। দেখতেই নিরীহ। আমাদের ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।’
‘তার মানে, ও ট্র্যাকারটার কথা জানতে পেরেছে।’
‘চলো ওকে খুঁজে বের করতে হবে।
ওদের গাড়ি বেলা বারোটার আগেই মিকুমি পৌঁছে গেলো। দার এস সালামের রাস্তার প্রায় ওপরেই মিকুমির দরজা। সকাল সাতটায় খুলে যায়। সেই ভোরের কুয়াশার চাদরের আলসেমিতে সূর্যের পৌঁছাতে একটু দেরিই হয়ে যায়। আর সেই কুয়াশার বুক চিরে সূর্যের আলোর বর্শা ঘন ঘাস বনকে বিঁধে ফেলে। মিকুমিতে সবাই নাকি প্রধানত পাঁচটা পশু দেখতে যায়, চিতা, সিংহ, হাতি, জংলী মহিষ আর গন্ডার। শান্তনুর জলদাপাড়াতে গন্ডার ভালোমতো দেখা আছে। বরং জিরাফ, জেব্রা দেখলে বেশি খুশি হবে। শান্তনু এখন অভয়ারণ্যের ভিতরে ঢোকার জন্য অধীর, আর ঠিক তখন প্যাটেলের খাইখাই শান্তনুর অসহ্য লাগে। আরে বাবা খাবি তো ওই রুটি আর ঝুরি ভাজা। কী আর করা যাবে, তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নিয়ে গাড়ি নিয়ে ভিতরে ঢোকা হলো। মিকুমিতে ঢোকার আগে প্যাটেল বললো, ‘আমার গাড়িতে আসুন চ্যাটার্জী সাব। আপনার সাথে কথা আছে, আর আমি মিকুমিতে আগে অনেকবার এসেছি। আপনাকে সব জন্তু জানোয়ার দেখিয়ে দেবো।’
শান্তনুর আর মানা করতে পারলো না। এই গাড়ি বদল করার কথাটা ম্যাকের জানা ছিলো না। কিন্তু ব্যাপারটা তার পছন্দ হলো না, কিন্তু কিছু করারও তো নেই। প্যাটেল, শান্তনুর সাথে এক গাড়িতেই। অন্য গাড়িতে ম্যাকের সাথে সুশীলা। জঙ্গল বলতে প্রধানত ঘাস বন। আর মাঝে মাঝে কিছু গাছ। এখানে ওই ঘাসবনেই সিংহ পেটভরা থাকলে অলস বিড়ালের মতো শুয়ে থাকে। জংলী মহিষ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর প্রাণী। ওর আসে পাশে না যাওয়াই ভালো। প্যাটেল আগেও কয়েকবার এসেছে, তাই এলাকাটা মোটের ওপর জানা। পালে পালে হরিণ, জেব্রা দেখে শান্তনু পাগলের মতো ছবি তুলছিলো। জিরাফের দল, সাথে বাচ্চা, ঠিক যেন বাঁকুড়ার ঘোড়া। আরেকটা প্রাণী, যাকে শান্তনু আগে কখনো দেখেনি, প্যাটেল বললো, ‘বিস্ট।’ ওরা ঘুরতে ঘুরতে একটা পুকুরের কাছে এলো। দৃষ্টিটা একটু ঠিক করলেই জলে হিপ্পো আর কুমির, শুধু নাকের ডগাটাই দেখা যাচ্ছে। শান্তনু ছবি তোলার অত্যুৎসাহে প্যাটেল কিছু বলার আগেই গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো। সাথে সাথেই একটু দূর দিয়ে একটা কুমির সরসর শব্দে জলে নেমে গেলো। পাশের গাড়ি থেকে ম্যাক চিৎকার করলো, ‘স্যার উঠে আসুন।’ শান্তনু ঘাবড়ে গিয়ে গাড়িতে বসলো। ‘হাজার হোক এটা আফ্রিকা মি.চ্যাটার্জী। সাবধান থাকবেন তো বেঁচে থাকবেন।’ প্যাটেল গম্ভীর গলায় বললো।
শান্তনু নিজের হঠকারিতার জন্য লজ্জিত হলো।
‘কাল আপনার প্রেসেন্টেশন আছে মি.চ্যাটার্জী। আজ এসব করলে চলবে! আপনার কিছু হয়ে গেলে কী হবে?’
শান্তনুর মনে হলো, কাল যদি প্রেসেন্টেশন না থাকতো তবে, আজ ও কুমিরের পেটে গেলে প্যাটেলের বিশেষ আপত্তি ছিলো না। কী ছোটোলোক দেখেছো!
‘আপনার পেপার তো তৈরি, তাই না মি.চ্যাটার্জী। কাল রাতে অনেকক্ষণ কাজ করছিলেন।’
‘আমি কাজ ফেলে রাখি না। আর কালকে সকাল দশটায় মিটিং। সময় কোথায়?’
‘বাঃ, কোথায় আপনার রিপোর্ট? আমার সাথে তো আপনি ডিসকাস করলেনই না।’
‘আপনার সাথে ডিসকাস করার বিশেষ কিছু নেই। কাল তো আপনিও থাকবেন। তখনি সব বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবো। আপনাদের মাগাঙ্গা মাটিটুর আয়রন ওর ইস্পাত বানানোর জন্য উপযুক্ত নয়। ম্যাগনেটাইটের সাথে টাইটেনিয়াম এমন ভাবে মিশে আছে যে আলাদা করা কঠিন। তাই পাইলট প্ল্যান্টেরও কোনো দরকার নেই। ব্যাপারটা একটু জটিল, কাল প্রেসেন্টেশনে বুঝিয়ে বলবো।’
‘এটা কেমন কথা হলো মি.চ্যাটার্জী। আপনি তো যে কোনো আয়রন ওর থেকে ইস্পাত করতে পারেন। তাই তো বলেন আপনি? নাকি ওটা আপনার ফাঁকা বুলি?’ প্যাটেলের মুখে ব্যঙ্গ খুব স্পষ্ট।
‘সেটা এখনো পারি, কিন্তু এক্ষেত্রে ইস্পাত এতো কম বের হবে, খরচ এতো বেশি হবে যে, তাতে ব্যবসা করে লাভ করা যাবে না।’
‘ইস্পাতের ব্যবসা আপনি ভুলে যান মি.চ্যাটার্জী। আপনি শুধু মেটালগুলো আলাদা করার টেকনোলজিটা ডিসাইন করে দিন।’
‘কেন তাতে কী লাভ হবে? এতদূরে এসে, একটা ছোট প্ল্যান্ট বানিয়ে নগন্য ট্রেস মেটাল পর্যন্ত উদ্ধার করে কী করবেন আপনারা। কী আছে ওই ট্রেস মেটেরিয়ালে?’
‘কিছু মনে করবেন না চ্যাটার্জী সাব, জিওলজি আপনার বিষয় নয়। আপনি তো পেশাদার। নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে কৌতূহল দেখানো কী ভালো?’
ওরা ঘুরতে ঘুরতে একটা ছোট নদীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। একপাল হাতি সাথে একটা বাচ্চা। একটা হাতি বাচ্চা হাতিটাকে স্নান করাচ্ছে। নদীর এপারে উত্তেজনায় গাড়ি থেকে নেমে পড়লো শান্তনু। সাথে সাথে প্যাটেল ও।
ওদের গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করা আছে, যাতে শব্দ না হয়। হাতি প্রাণীটিকে শান্তনুর কখনো ভয়ঙ্কর বোধ হয়নি। সার্কাসে, চিড়িয়াখানায়, রাস্তায় হাতিকে খোলা ঘুরতে দেখেছে। হাতির পিঠে চড়েছেও বেশ ক’বার। কিন্তু সামনে যা দেখছে তা অনেক বিশাল। বিশাল বলতে উচ্চতা বেশি, আকারে বড়, বিরাট কান যেন আফ্রিকার ম্যাপ। আর সবগুলো দাঁতালো। এমনকি মাথাটাও বেশ বড়ো আর গোল, শুঁড়টাও বড়ো মনে হয়। তবে হাতি তো সাথীই হয়। তাই নিশ্চিন্তে শান্তনু একটু আগে হওয়া বাদানুবাদ পাশে রেখে, যত্ন করে ভিডিও ছবি তুলছিলো। বিনীত দেখলে খুশি হবে।
‘তো আপনি খুশি হয়েছেন তো মি.চ্যাটার্জী।’
‘অবশ্যই।’ শান্তনুর ভিডিও করা শেষ। মোবাইলে আর বেশি জায়গা বাকি নেই।
‘তো আমাকে দুঃখী করছেন কেন?’
‘সরি, কী বললাম। আপনি দুঃখী হলেন কেন?’ শান্তনু অবাক হওয়ার ভান করলো।
‘আমি এতো কষ্ট করে, আপনাকে কলকাতা থেকে নিয়ে আসলাম। আর আপনি আমার পাইলট প্ল্যান্টটা করলেন না।’
‘আরে পাইলট প্ল্যান্ট কোনো ব্যাপার নাকি? ঘন্টায় পাঁচশো কেজি? সেটা নিয়ে ভাবছেন কেন? আসল প্ল্যান্টটার কথাটা ভাবুন যেটা ঘন্টায় একশো টন।’
‘দাদা, পুরো প্ল্যান্ট পরের কথা। ওটাতো মেহেতাজীর প্রজেক্ট। বড়ো মানুষ, তার বড়ো ব্যাপার। আপনি এখন আমাকে আমার পাইলট প্ল্যান্ট করে দিন।’
‘আপনার পাইলট প্ল্যান্ট? তার মানে?’
‘দাদা আপনাকে নিজের লোক মনে করি বলে বলছি, এর সাথে মি.মেহেতা জড়িত নয়। পাইলট প্ল্যান্টটা আমার দরকার।’
‘আপনি যে রকম টিপটপ পাইলট প্ল্যান্ট চাইছেন তাতে মেহেতা গ্রুপের ষাট-সত্তর হাজার ডলার খরচ হবে। টাকাটা বরবাদ হবে মি.প্যাটেল।’
‘সেভেন্টি কে, ব্যাস! ওটা একটা অ্যামাউন্ট হলো চ্যাটার্জী সাব? মেহেতা গ্রুপের কাছে ওটা হাতের ময়লা। ওসব চিন্তা আপনি আমার ওপর ছেড়ে দিন। আপনি টেকনিক্যাল ব্যাপারটা দেখুন।’
‘আমার কাছে কোনো নির্ভুল প্রমাণ নেই, খনিতে অন্য কিছু আছে কিনা। সবই অনুমান। তাই ওসব কোনো কথা যদি এখন আমার রিপোর্টে নাও বলি, তবু কালকে আমার প্রাথমিক রিপোর্ট শুনলেই মেহেতা গ্রুপ পিছিয়ে আসবে। পাইলট প্ল্যান্টের নাম করে আপনার মিনি ট্রেস মেটাল একস্ট্রাকশন প্ল্যান্ট আর হবে না। আর যদি মেহেতা গ্রুপ নিজেই ট্রেস মেটালে উৎসাহ দেখায়, তাহলে তো পুরো গল্পটাই পাল্টে যাবে মি.প্যাটেল।’
‘গল্প আমি থাকতে পাল্টাবে না চ্যাটার্জী সাব। এতদিন ধরে এতো সব প্ল্যানিং আপনার বোকামির জন্য নষ্ট হতে দেবো না। আপনাকে শেষ সুযোগ দিচ্ছি। আপনার রিপোর্টে লিখুন ওরটা গোলমেলে আছে পাইলট টেস্ট না করে কিছু বলা যাচ্ছে না। মিথ্যে তো নয়।’
‘আলবাত মিথ্যে। আমার একটা অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতা বলছে পাইলট প্ল্যান্ট চাই না। দুশো কেজি আয়রন ওর পাঠিয়ে দেবেন, ভুবনেশ্বর, নয়তো জামশেদপুরে বেঞ্চ স্কেল টেস্ট করে একদম পাক্কা বলে দেব, কত ওরে কতটা কী বের হবে।’
‘আপনি খুব জেদি মানুষ চ্যাটার্জী সাব। একটা কাজ করুন। আপনার ল্যাপটপটা খুলে দিন আর কিছু করতে হবে না। কাল আপনি সিক হয়ে যান, মেহেতা সাবকে আমি ম্যানেজ করবো। আপনার পুরো পেমেন্ট তো করবোই, তার সাথে লাভের একটা অংশ ও আপনি পাবেন।’
তখনি পুরো ব্যাপারটাই শান্তনুর সামনে একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেলো।
ভূবিজ্ঞানী জোসেফ সোনার খোঁজটা পায়, সে জানতো একা একা কিছু করতে পারবে না। লোকবল চাই, টাকা চাই। প্যাটেল লোভী আর অসৎ সেটা জোসেফের জানা ছিল। তাই একান্তে প্যাটেলকে বলেছিলো। জমি, লোকজন টাকার যোগান, সবই আসবে মেহেতাদের কাছ থেকে। আর জোসেফ আর প্যাটেল দল পাকিয়ে, যা সোনা আছে, দেড় দু’বছরে তুলে নেবে। বাইরে থাকবে মেহেতাদের ইস্পাতের কারখানার মোড়ক। শান্তনুর বানানো পাইলট প্ল্যান্ট আসলে ওদের সোনা বানানোর প্ল্যান্ট। জঙ্গলের ভিতর, পুরো অটোমেটিক, লোকের চোখের আড়ালে। খনির একটা বিশেষ জায়গায় সোনাটা লোহার আকরের সাথে মিশে আছে। শান্তনুর পছন্দ করা যন্ত্র যে লোহাটা আলাদা করবে, সে লোহাটা ওদের মোটেও চাই না। লোহাটা ওরা ফেলে দেবে আর আর ওই পাঁচশো ভাগের এক ভাগ, সেই নাম না জানা ট্রেস মেটেরিয়াল তৈরি হবে সেটাই হবে আসল প্রোডাক্ট। দিনে বারো টনের প্ল্যান্টের আসল হলো তিরিশ কেজি সোনা। বছরে প্রায় এক টন।
‘আপনি আমাকে নাটক করতে বলছেন মি.প্যাটেল?
‘ঠিক তাই। এতে দোষের কী আছে?’
‘পুরোটাই দোষের। খনি থেকে যাই তুলবেন তার জন্য সরকারকে জানাতে হবে। অনুমতি নিতে হবে সরকারের কাছ থেকে। আর আপনি তো এই দেশকে, আপনার বসকে ঠকাচ্ছেন। আমাকেও ছাড়েননি।’
‘অনুমতি নিয়ে কিছু করতে গেলে আমার সারাটা জীবন চলে যাবে। যারা অমন দামি সম্পদ তানজানাইটকে কাজে লাগাতে পারে না, তারা আমাকে কী করতে দেবে? আপনি ট্যালেন্টেড ইঞ্জিনিয়ার চ্যাটার্জী সাব। আমার দেশের লোক। আপনি একটু সমঝদারি দেখান, আপনাকে ঠকাবো না। আপনি মুখটা একটু বুঝে সুঝে খুলবেন। অনেক টাকার ব্যাপার। এ টাকার জন্য অনেক কিছু হতে পারে। আপনি শুধু বুদ্ধি করে রিপোর্টটা লিখুন।’
‘তোমার লোভ খুব বেশি প্যাটেল। খনি ও তোমার না, জমিও তোমার না, টাকাটাও তোমার না। তাই সেই খনি থেকে যা বের হবে তাও তোমার না।’
‘বাঙালিগুলোর খুব বাজে অভ্যেস। পরিস্থিতি না দেখেই ভাষণ দিতে শুরু করে। চোখ মেলে দেখুন। এটা আপনার পশ্চিম বাঙাল না, আফ্রিকা। আর সামনে আফ্রিকান এলিফ্যান্ট।’
‘গডফ্রেকে মারলেন কেন?’
‘গডফ্রেকে আমি মেরেছি!’
‘নিজে কী আর মেরেছেন। লোক দিয়ে মারিয়েছেন।’
‘কে বললো আমি মারিয়েছি। আমি বিজনেস করতে চাই খুন জখম নয়। ও একটু বেশি মাথা খাটাচ্ছিলো, সেতো টাকা পেলে চুপ করে যেত। এখানে সব কিছু কেনা যায় দাদা। ওসব লাভ ট্র্যাংগলের পরিণাম। ওসব ফালতু ব্যাপারে টাইম ওয়েস্ট করবেন না দাদা। ল্যাপটপটা খুলে দিন।’
‘নিজে খুলে নিন, চেষ্টা তো কম করেন নি।’
‘আর কথা নয়। ল্যাপটপ খুলে দিন।’
‘আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটাকে বলুন। খুলে দেবে।’
‘আপনার বুড়ো আঙুলের ছাপ তো তোলাই আছে, আপনি অনেক সিকিউরিটি দিয়ে রেখেছেন। কোনো ব্যাপার না। সময় পেলে ল্যাপটপ তো আমরা খুলে নেবো, কিন্তু আপনার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেলে ভালো হবে না মি.চ্যাটার্জী।’
‘ভয় দেখাচ্ছ প্যাটেল? ও ল্যাপটপ তোমার কোনো কাজে লাগবে না। তোমাদের হাবভাব, আমার কখনোই ভালো লাগে নি। যা করতে হয় করো। তোমাদের আমি বিশ্বাস করি না। আর জেনে রাখো, সবাইকে লোভ দেখিয়ে কেনা যায় না।’
সত্যি ল্যাপটপে কিছু নেই। আগেই সব বিনীতকে মেল পাঠিয়ে দিয়ে, মেলবক্স, ব্যাকআপ সব মুছে দিয়েছে শান্তনু। আর গডফ্রের সেই বিশেষ স্যাম্পল, পেন ড্রাইভ গায়ে পরা জামার পকেটে সতর্ক অবহেলায় আছে।
‘তো সত্যি কথাটা জেনে নিন চ্যাটার্জী সাব। আসতে কত মানা করলাম, শুনলেন না। মেহেতা সাবকে পটিয়ে যখন চলে এলেন, তখন থেকেই আপনার অ্যাক্সিডেন্ট পাক্কা হয়ে গেলো। আপনি খুব বেশি বেশি জানতে চান। একদম সেফ না। গুড বাই।’ প্যাটেল গাড়িতে উঠে পড়লো। ড্রাইভারকে বললো, ‘স্টার্ট দাও।’ শান্তনু গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখে, প্যাটেল দরজা বন্ধ করে কাঁচ তুলে দিয়েছে। ততক্ষণে হাতিদের স্নান শেষ। গাড়ির আওয়াজে হাতিরা বিরক্ত হচ্ছে, আর সাথে বাচ্চা আছে তাই যে কোনো মুহূর্তে বিরক্তিটা অন্য চেহারা নিতে পারে। প্যাটেলের গাড়িটা হঠাৎ হর্ণ বাজাতে শুরু করলো। মিকুমির ভিতর এমন করে হর্ণ বাজানো নিষিদ্ধ।
শান্তনু প্যাটেলের অভিনব চালাকিতে ঘাবড়ে গেলো। এবার হাতির দল ওদের দিকে আসতে শুরু করলো। ম্যাক যে গাড়িতে ছিলো, সেটা হুড়মুড় করে শান্তনুর দিকে এগিয়ে এলো। ওই গাড়িতেই শান্তনুর সুটকেস আর ল্যাপটপ ব্যাগ। জানলাটা সামান্য খুলে ম্যাক চেঁচিয়ে বললো, ‘উঠে পড়ুন স্যার। দেরি করবেন না।’ সুশীলা পিছনের সিটে বসেছিল, কিছু করার আগেই শান্তনু উঠে পড়লো। ‘সিট্ বেল্ট বাঁধুন, এখুনি।’ ম্যাক চাপা গলায় চিৎকার করে উঠলো। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে ম্যাক নিজের গাড়িটা দিয়ে প্যাটেলের গাড়িটাকে বিশ্রীভাবে ধাক্কা মেরে বসলো। ম্যাক নিজের গাড়ি সামলে নিলো, কিন্তু প্যাটেলের গাড়ি গিয়ে পড়লো সামনের একটা গর্তে। প্যাটেল আর তার ড্রাইভার এরিক, অল্পবিস্তর আহত হওয়ার সাথে সাথে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলো। সুশীলার আর করার কিছু নেই। শান্তনুর পুরো শরীরটা ঝাঁকিয়ে উঠেছে। কোনো এক অতীতে মৃত্যুর সাথে কানামাছি খেলার অভ্যেসটা এখন গল্পের পাতায়। হাতির দল তখন আরও কাছে চলে এসেছে। ম্যাক গাড়িটা চালু রেখেছিলো, ব্যাক গিয়ার দিয়ে, সুশীলা একবার, প্যাটেল স্যার, জাতীয় আধখানা কথা বলার আগেই মিকুমির গেটের দিকে রওনা দিলো। প্যাটেলের গাড়িটা ফেঁসে রইলো। যেহেতু প্যাটেলের গাড়ি আওয়াজ করছে, তাই হাতির প্রাথমিক লক্ষ্য সেটাই। শান্তনু একবার পিছে তাকিয়ে দেখলো হাতির পাল প্যাটেলের গাড়ির ওপর চড়াও হয়েছে।
মিকুমির দরজায় পৌঁছাতেই, ওদের পথ আটকানো হলো। মোজেস, ওদের গাড়ির সামনে এসে আদেশের সুরে বললো, ‘নেমে আসুন।’ ম্যাক শান্তনুর আদেশের অপেক্ষায় আছে। শান্তনু ম্যাককে হাত দিয়ে ইশারা করে, গাড়ি থেকে নেমে এলো। সাথে সাথে সুশীলা উদ্ভ্রান্তের মতো গাড়ি থেকে নেমে গেম পার্কের অফিসের খোঁজে ছুটলো। প্যাটেলকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা। শান্তনুকে নিয়ে মোজেস আরেকটা গাড়িতে গিয়ে উঠলো। গাড়িতে বসে আছে ডঃ উইলসন। ভাবলেশহীন মুখ।
‘উঠে আসুন কথা আছে।’ শান্তনুর না বলার উপায় নেই। চুপচাপ গাড়িতে পিছনের সিটে গিয়ে ব’সলো। গাড়ি চললো দার এস সালামের দিকে। কেউ কোনো কথা বলছে না। শান্তনু এখনো বুঝতে পারছে না, ওই উইলসনের দল তাকে সাথে নিলো কেন, আর কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! পথের ধারে একটা ছোট রেস্তোরাঁর সামনে গাড়ি থামলো।
‘আপনি ঠিক আছেন মি.চ্যাটার্জী?’
‘ঠিক আছি, আমার বাক্স, ল্যাপটপ কিন্তু আমার সাথে নেই কাছে।’
‘সে আপনি সব পেয়ে যাবেন। চলুন একটু বসে কফি খেতে খেতে কথা বলি।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন