দেবব্রত সান্যাল
ক’লকাতা
‘তোরা ইয়েলো ফিভারের টিকা দিস?’ শান্তনু চ্যাটার্জির একটু ব্যস্ত হয়ে পরার অভ্যেস আছে, সেটা শুধু তার ডাক্তার ছেলে বিনীত নয়, সবাই কম বেশি জানে।
‘তার মানে তোমার তানজানিয়া যাবার ব্যাপারটা ফাইনাল হলো।’ ডঃ বিনীত চ্যাটার্জী, কলকাতার বি. সি রায় শিশু হাসপাতালে ডাক্তারি করে। শান্তনুর নিজের অফিস, দেরী হলে কাউকে জবাবদিহি করার নেই, তবু দেরী করতে পছন্দ করে না। বিনীতকে অনেকটা যেতে হবে, তাই খাবার টেবিলে বসে চটপট খাচ্ছিলো।
‘যাবার কথা হচ্ছে, এই মাত্র মেল এসেছে প্যাটেলের কাছ থেকে। বললি না তো তোদের ওখানে টীকা দেয় কিনা।’
‘বাবা, আমাদেরটা বাচ্চাদের হাসপাতাল, এখানে পোলিও খাওয়ানো হয়।’
‘তার মানে কী হলো? বাচ্চাদের ইয়েলো ফিভার হয় না।’
‘সেটা আবার কে বললো? তবে ইয়েলো ফিবারের ভ্যাকসিন সব জায়গায় সব দিন দেয় না। তুমি টেনশন নিও না, আমি তোমার জন্য একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিচ্ছি।’ বিনীত মার হাত থেকে টিফিনের বাক্সটা নিয়ে, গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে আর দাঁড়ালো না।
শান্তনু চ্যাটার্জীর বয়েসটা যদি পঞ্চান্ন না হয়ে তিরিশ হত, তাহলে সুরেশ প্যাটেলের তানজানিয়া আসার আমন্ত্রণে লাফিয়ে উঠতো। শান্তনু চ্যাটার্জী তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে, দেশের নানান খনিতে, কারখানায় লোহা আর ইস্পাত তৈরি করে আপতত কলকাতায় কন্সালটেন্সির ব্যবসা খুলেছেন।
শান্তনু চ্যাটার্জী কাজের সূত্রে চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইরান ঘুরে এসেছেন। কাজও করেছেন সুনামের সঙ্গে। কিন্তু আফ্রিকা এই প্রথম বার। কী করে লোহার আকর থেকে ইস্পাত বানাতে হয়, সেটা বিজ্ঞানের সব ছাত্রকে স্কুলেই পড়তে হয়। আরও বিস্তারিত ভাবে জানতে হয়। কিন্তু লোহার আকর বেনিফিসিয়েশন যে কী, কী করে কী করে, কী পদ্ধতি বা যন্ত্রপাতি, সেটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বের হবার সময় শান্তনুর জানা ছিলো না। ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে, নিকল নামক ভারত সরকারের একটি উদ্যোগে যোগ দেবার পর, জানতে পারলো কোম্পানির প্রধান কাজ আয়রন ওর বেনিফিসিয়েশন, তারপর সেই আকরের প্যালেট বানানো আর তার থেকে স্পঞ্জ আয়রন। এই দেশে, শুধু দেশে কেন সারা পৃথিবীতে প্রচুর আকরিক ধাতু রয়েছে, যেটা সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তাকে নানান পদ্ধতিতে উন্নত ও ব্যবহার যোগ্য করার নাম হলো বেনিফিসিয়েশন। নিজের চেষ্টায়, আগ্রহে, পরিশ্রমে, আজকের দিনে শান্তনু চ্যাটার্জি দেশের বেনিফিসিয়েশন ও সেই আকর থেকে ধাতু বানানোয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম।
তানজানিয়া সংক্রান্ত পুরো ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এ বছরই এপ্রিলের প্রথম দিকে। কলকাতার হোটেল হায়াতে স্টিল ওয়ার্ল্ডের এক সেমিনারে বক্তা ছিলো শান্তনু। চৈত্র মাস। গরমেও পাতলা স্যুট আর টাই পরে এসেছিলো শান্তনু। স্টিল ওয়ার্ল্ডের অনুষ্ঠানে দেশ বিদেশ থেকে লোহা আর ইস্পাতের সাথে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আসে। মঞ্চে উঠে বক্তব্য রাখবে, তাই ছেলে জোরজার করলো ভালো পোষাক পরে যেতে। গাড়ি এসি, হোটেল এসি। চিন্তা কী? শান্তনু বলা শেষ করেছিল স্বভাবসিদ্ধ কায়দায়, ‘আমাকে যে কোনো ওর দিন আর আমি আপনাকে মেটাল বের করে দেখাবো।’ (ওর স্ত্রী বলে থাকে, ‘কায়দা তো নয়, আল-কায়দা। যেদিন ঝামেলায় পড়বে, বুঝবে।’) শান্তনুদের সেশনের পরেই নেট ওয়ার্কিং লাঞ্চ। নেট ওয়ার্কিং মাথায় উঠলো, বেশির ভাগেরই লাঞ্চের দিকেই ঝোঁকটা বেশি দেখা গেলো। দেখেই মনে হয় বেচারাদের বাড়িতে প্রচুর নিয়মে থাকতে হয়, আজ গরু ছাড়া পেয়েছে। শান্তনু, একটু কোণের দিকে একটা টেবিল জুটিয়ে, নাম না জানা সুপে চামচ চালাচ্ছিলো। এক জন ডার্ক স্যুট পড়া, অবাঙালি মধ্যবয়েসী ভদ্রলোক কাছে এসে দাঁড়ালেন। শক্ত-পোক্ত চেহারা, রোদে পোড়া গায়ের রং, মুখটা হাসি হাসি।
‘নমস্কার, আমি সুরেশ প্যাটেল। আপনার সাথে আলাপ করতে চাই। এই টেবিলে বসতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। বসুন।’ চামচ ধরা হাতে করমর্দন করাটা দরকার নেই, সিদ্ধান্ত নিয়ে, শান্তনু ঘাড় কাত করে মুখটা হাসি হাসি করলো।
ভদ্রলোক একটা সুদৃশ্য কার্ড হোল্ডার থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দিলো।
কার্ডে লেখা, সুরেশ প্যাটেল। ভাইস প্রেসিডেন্ট (মেহেতা গ্রুপ : দার এস সালাম, তানজানিয়া)
এবার তো শান্তনুকেও কার্ডটা দিতে হয়। সুরেশ প্যাটেল, যেন মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, ‘আপনার কার্ড তো নিশ্চয়ই নেব, তাড়াহুড়োর কিছু নেই, আগে খেতে খেতে আলাপটা হয়ে যাক। আপনার সাথে একটা প্রজেক্টের ব্যাপারে আলোচনা করতে চাই।’ এক বছরের ওপর স্টিল উদ্যোগে তো প্রায় তালা পড়ার জোগাড়। হাতে কোনো ভদ্র-সদ্র কাজ নেই, তাই খাওয়ার থেকেও প্যাটেলের দিকে মন দেওয়াটা বেশি দরকার বলে মনে হলো শান্তনুর।
‘আপনার ভাষণটা খুব মন দিয়ে শুনলাম। আমার আশা আরও বেড়ে গেলো। আপনার নাম আগেই শুনেছিলাম, আলাপ করার খুব ইচ্ছে ছিলো।’ প্যাটেল ততক্ষণে একপাত্র, লেবু আর ধনে পাতা মেশানো নিরামিষ স্যুপ আর ক্রোকে নিয়ে এসেছে।
এসব মিষ্টি মিষ্টি কথার মিষ্টি মিষ্টি উত্তর দিয়ে কাজের কথাটার জন্য শান্তনু কান পেতে রইলো।
মেহেতা গ্রুপ তানজানিয়ায় অনেক বছর আছে। নানান ব্যবসা। গত বছর লুডেবা জেলার আমিনা গ্রামের কাছে দুটো খনিতে লীজ নিয়েছে মেহেতারা। প্রথম খনিটা আয়রন ওরের, প্রধানত ম্যাগনেটাইট, আর সাথে মিশে আছে অনেক অন্য ধাতু। সেখানে, জল, কয়লার অভাব নেই। দ্বিতীয় খনিটা কয়লার। ওদের ইচ্ছে সেখানে বেনিফিসিয়েশন থেকে শুরু করে স্টিল অবধি যাওয়া। অনেক বড় স্বপ্ন। টাকা দেবার জন্য গৌরী সেনও রাজি। তার আগে ওরা একটা পাইলট প্ল্যান্ট করে দেখে নিতে চায়। পাইলট প্ল্যান্ট হ’লো একেবারে ছোট করে, মূল প্ল্যান্টের কাজ করবে এমন একটা মডেল। তবে এখানে মডেলটা একেবারে আসল। পুরো কাজ করবে। শুধু আকার আয়তনে অনেক ছোট। সুরেশ প্যাটেল জানতে চাইছেন, একটা পাইলট প্ল্যান্টের পুরো কাজটা শান্তনু চ্যাটার্জী করতে চান কী?
শুধু পাইলট প্ল্যান্ট? শান্তনুর মনটা দমে গেল। ছোট কাজ, আর না কাজ করে সুখ, না পয়সা পাওয়া যাবে। মাঝ থেকে আইডিয়াটা ওদের হাতে চলে যাবে। কথাটা বলে নেওয়া উচিত মনে করে, শান্তনু বললো, ‘একটা কথা বলি মিঃ প্যাটেল, যেমন শুনলাম আপনাদের ওরটা একটু ঘোরালো, তাই সেটাকে খুব সাবধানে বেনিফিশিয়েট করতে হবে। আর প্ল্যান্টের সাইজ যাই হোক না কেন, আমার খাটনি কিন্তু একই। তাই বলছিলাম...’
‘আরে না না, মিঃ চ্যাটার্জী, আপনি ভুল বুঝলেন। পাইলট প্ল্যান্ট তো শুধু শুরু। আমরা পুরো প্রজেক্টটা বানাবো, কিন্তু ধীরে ধীরে। আর আপনার পুরো ফিস আমরা দেব। আপনার পাইলট প্ল্যান্ট প্রজেক্ট সাকসেস হোলে, আমার সাহস পাবো। আমাদের কোম্পানি অনেকগুলো টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। কোনো বিরাট মতপার্থক্য না হলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি আমাদের কোম্পানির পরামর্শদাতা থাকবেন।’
কথাটা সত্যি, প্রত্যেক ওরের একটা নিজস্ব চরিত্র আছে, সেটা একবার পরীক্ষা না করে একবারে নেমে পড়াও কোনো কাজের কথা নয়।
‘আপনাদের প্রজেক্টের জন্য জমি নেওয়া কি হয়ে গিয়েছে?’
‘ওই মানে একরকম, ঠিক আছে। ওখানে তো এখন জিওলজিকাল পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। তার জন্য একটা ক্যাম্প বানানো হয়েছে।’
শান্তনু মুখে একটু হাসি টেনে এনে বললো, ‘দেখুন একটা কথা বলি। আপনাদের মতো প্রজেক্টে, ঠিকঠাক জমি দেখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রজেক্টের সাফল্যের অনেকটাই, প্রজেক্ট কোথায় করছেন তার ওপর নির্ভর করে।’
‘একবার পাইলট প্ল্যান্টটা চালু হয়ে যাক, আপনাকে ওখানে দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হবে, তখন জমির ব্যাপারে আপনার মূল্যবান মতামত তো নেওয়াই হবে। আপাতত, আপনার জন্য পাইলট প্ল্যান্টের সাইট একেবারে তৈরি।’
ঘন্টায় পাঁচশো কেজির পাইলট প্ল্যান্ট নিয়ে আদিখ্যেতা, শান্তনুর বোঝার বাইরে।
‘কোথায় হবে আপনাদের পাইলট প্ল্যান্ট? দার এস সালামে?’
‘না না, সব কিছু হবে মাইনসের পাশেই।’
‘তো মাইনসটা একবার দেখতে হবে, তার আসে পাশের জল জায়গা রাস্তা দেখতে হবে।’
‘মাগাঙ্গা মাটিটু? আপনি যাবেন! দার এস সালামের থেকে আটশো কিলোমিটারের বেশি হবে, পুরো রাস্তাটা গাড়িতে যেতে হবে। আপনার বয়েস হয়েছে, খুব কষ্ট হবে। আমরা আপনাকে সব ছবি, ম্যাপ আর টেস্ট রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব, আপনার এত এক্সপেরিয়েন্স, আপনি তো কলকাতায় ব’সে বানিয়ে দেবেন।’
বয়েস হয়েছে কথাটা শান্তনুর বিশেষ অপছন্দ। সংখ্যা দিয়ে মানুষের ক্ষমতা সম্বন্ধে ধারণা করা যায়! ‘দেখুন কলকাতায় বসে পাইলট প্ল্যান্টের নকশা আমি বানিয়ে দেব। কিন্তু যে আসল প্ল্যান্টের জন্য এই পাইলট প্ল্যান্ট, সেটা প্রাথমিক ভাবে আদৌ সম্ভব কিনা না দেখে নিয়ে পাইলট প্ল্যান্ট করতে যাওয়াটা ভুল হবে।’
‘ভুলের তো কোনো কথা নেই চ্যাটার্জী সাব। যদি পাইলট টেস্টে দেখা যায়, স্টিল প্ল্যান্ট করা যাবে না, তাহলে কোম্পানি আপনাকে দোষ দেবে না।’
‘একটা প্রজেক্টে টেস্টিং ছাড়াও অনেক কিছু থাকে। যেটা সাইটে গিয়ে জানা যায়। সাইট না দেখে প্ল্যান্ট বানালে লোকে আমাকে পাগল বলবে। বাজারে আমার একটা সুনাম আছে, সেটা একেবারে মাটিতে মিশে যাবে। যত কষ্টই হোক আমি যেতে চাই।’ এতক্ষণে শান্তনুর জেদি চেহারাটা বেরিয়ে এসেছে।
‘অনেক ঝামেলা আছে কিন্তু। ইয়েলো ফিবারের ভ্যাকসিন নিতে হবে, তাছাড়া আজকাল ইবোলার ঝামেলা আছে। তাই বলছিলাম। তাছাড়া এতে কাজ শুরু করতে দেরী হয়ে যাবে, সেটাও তো ভেবে দেখুন।’
এবার শান্তনু বিরক্ত হলো। আচ্ছা কিপ্টে তো। এত বড় প্রজেক্ট করতে যাচ্ছে আর একটা ভিজিটের টাকার জন্য এতগুলো বাজে কথা বলছে। ওর এক ভাইপো ঘানায় থাকে, তাই শান্তনু ইবোলার সম্বন্ধে যথেষ্ট খবর রাখে। তানজানিয়ায় ইবোলা ভাইরাস নেই। আর ইয়েলো ফিবারের ভ্যাকসিন এমন কী হাতি ঘোড়া হবে! মুখে বললো, ‘আমার কাজ করার একটা পদ্ধতি আছে মি.প্যাটেল। সেটা পাল্টাতে পারবো না।’
প্যাটেল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না, ঠিক আছে, ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলে বলছি। তবে ব্যাপারটা হলো, আমাদের একটু তাড়া আছে, তাই বলছিলাম আপনি আমাদের টার্মস অ্যাকসেপ্ট করে নিলে ম্যানেজমেন্ট কিছু এক্সট্রা পেমেন্টের কথাও ভাবতে পারে।’ শান্তনু এমন কথার কী জবাব দেবে! চুপ করে থাকলো। প্যাটেল বুঝতে পারলো আর কথা এগোচ্ছে না, তাই প্যাটেল শান্তনুর হাত টাত ঝাঁকিয়ে উঠে পড়লো। শান্তনু উঠে মুখ ধুতে ধুতে ভাবছিল, কাজটা ঠিক করলাম তো? লোকটা বেশ আজব কিন্তু, কাজ না করার জন্য বেশি টাকার লোভ দেখাচ্ছিল!
তবে মেহেতা গ্রুপ আর যাই হোক না কেন কিপ্টে নয়। দিন দশেকের মধ্যে প্যাটেলের ফোন এলো। পয়সা কড়ি শান্তনু যা চেয়েছে, আপত্তি করেনি। তাছাড়া মি.মেহেতার অফিস থেকে একটা মেল এলো, যাতে লেখা আছে, ‘মি. মেহেতা আশা করেন, মি. চ্যাটার্জী প্রজেক্টের জন্য জমি নির্বাচন করতে কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।’ টাকার পরিমাণে শান্তনু এতদিন বেশ খুশি ছিলো। মানব চরিত্র, কী অদ্ভুত! পরে মনে হলো বেশি চাইলেও বোধহয় না করতো না। তখন প্রথমে নিজের ওপর রাগ হলো আর শেষে মনে হলো প্যাটেলটা পাজি, ঠকিয়ে দিলো! যখন প্যাটেল ভিজিটের জন্য রাজি হচ্ছিল না, তখন শান্তনুও ঘাড় কাত করেনি। কিন্তু আজ যখন মেল এলো তানজানিয়া যাবার জন্য, তখন শান্তনুর এক সাথে অনেক টেনশন। তার প্রথমটাই হলো একটা ইয়েলো কার্ড করানো।
বিনীত ফোন টোন করে সব ঠিক করে রেখেছিল। সল্টলেকের সেক্টর থ্রিতে শুক্রবার সকাল দশটায় গিয়ে হাজির হয়ে গেল শান্তনু। বিনীত জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সাথে যাব?’
‘কেন? আমি কী তোর হাসপাতালের বাচ্চা! যে একটা ইনজেকশন নিতে সাথে গার্ডিয়ান নিয়ে যেতে হবে!’
অখিল ভারত স্বচ্ছতা ও জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র, এখানকার নিপাট সরকারি ব্যাপার স্যাপার দেখে একটু কেমন যেন লাগতে থাকলো শান্তনুর। অনেক লোক এসেছেন সুঁচ ফোটাতে, এমন কী ওয়েটিং লিস্টেও আছে জনা কয়েক। সেই স্কুলে লাইন করিয়ে বি সি জি র টিকা দেবার মতো প্রায়। শান্তনু পাসপোর্ট আর তিনশ’ টাকা জমা দিয়ে ইনজেকশন নিতে গেলো মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে। সাদা ডাক্তারি কোট পরা এক মহিলা তৈরি হতে হতে, একবার জিজ্ঞেস করে নিলেন, ‘ডিম টিম খেলে অ্যালার্জি হয় নাতো?’
সন্ধ্যাবেলা ছেলে হাসপাতাল থেকে ফিরতেই শান্তনু মুখ হাঁড়ি করে বললো, ‘জ্বর হবে আগে বলিস নি তো!’
বিনীত বললো, ‘কেন, আগে বললে কী করতে? টীকা নিতে না, না ক্রোসিন খেয়ে ব’সে থাকতে?’
তানজানিয়া যাবার দিন ঠিক হয়ে গেলো। টিকিট হাতে পাবার দু’দিন আগে একটা আজব ফোন এলো। ফোনটা আক্ষরিক অর্থেও অজানা নম্বর থেকে, নম্বরের জায়গায় মোবাইলে তাই ফুটে উঠছিলো। ভাষাটা ইংরেজি, ফোনটা করেছেন কোনো এক ভবিষ্যৎ বক্তা, অবশ্যই অচেনা। শান্তনু হাত দেখা, ভবিষ্যৎ বাণী, পাথর শেকড় ইত্যাদিতে একদম বিশ্বাস করেন না। যিনি ফোন করেছেন তিনি শান্তনুর নাম জানেন, পরিবারের সম্বন্ধেও বেশ কিছু জানেন। শান্তনু শুনেছে, কোনো কোনো এফ.এম চ্যানেলে মানুষকে এমনটাই ফোন করে উল্টোপাল্টা কথা বলে শেষে মুরগি বা মোরগ বানানো হয়। তাই সোজা জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন চ্যানেল ভাই? ব্যস্ত আছি। বিরক্ত করবেন না।’
ওপার থেকে একটা চাপা হাসির আওয়াজ এলো, ‘খুব ব্যস্ত? কোথায় যাবি, তানজানিয়া - মাগাঙ্গা মাটিটু?’
এবার শান্তনুর চমকানোর পালা। মাগাঙ্গা মাটিটু নামটা ও কাউকে বলেনি। বলার তেমন প্রয়োজন বোধ হয়নি। তাই একজন বাইরের লোকের মুখে নামটা শুনে, যথেষ্ট অবাক হ’লো।
‘কে আপনি? এতসব কী করে জানলেন?’
‘বাবা সব জানে।’
শান্তনু বলতে যাচ্ছিলো, কার বাবা? কিন্তু আর আগেই আবার হাসির শব্দ, এবারের হাসিটা স্বর্গীয়, ‘যাস্ না, আমার কথা শোন, ইবোলায় মরবি। যাস্ না, গেলেই সাতদিনের মধ্যে মৃত্যু।’
যেহেতু মাগাঙ্গা মাটিটু নামটা বেশ খটোমটো, তাই প্রথম প্রথম তো শান্তনুর নিজেরই মনে থাকছিল না। ফেসবুকে অনেককেই দেখেছে, ভিসা পাবার পর থেকে বাজার গরম করা শুরু করে দেয়। এই বিমানবন্দরে বসে আছি, এই নামলাম, এই খেলাম, এখানে আছি, ধারাবাহিক সচিত্র ভ্রমণ কাহিনি। যারা দেয় তারা দেয়, তাতে শান্তনু লাইকও দেয়, কিন্তু নিজের কাজ নিয়ে ফেসবুক বা অন্য কোথাও ছালা খুলে বলার লোক সে নয়। নিজের বাড়ির লোককেও মাগাঙ্গা মাটিটু নামটা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাহলে এই বাবা লোকটা এতো সব জানলো কী করে? এইসব বাবা টাবা শান্তনুর দু’চোখের বিষ। কথা নেই বার্তা নেই যাওয়াটা চটকাতে চাইছে। কী চায়? শান্তনুকে সাবধান করে ওর লাভ কী? এরা একটা প্রশ্নের উত্তর দিতেও পয়সা চায়। সাবধান করা, না ভয় দেখানো? ইবোলা? তাও আবার তানজানিয়ায়? যত সব বাজে কথা। কিন্তু একটু খোঁচা রয়েই গেলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন