পাঁচ

দেবব্রত সান্যাল

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শান্তনুর মাথাটা ভারি ভারি লাগছিলো। এখানকার চাই বোরা খেয়ে মাথা ধরা কিছুটা কমলেও মুখের স্বাদ বিগড়ে গেলো। গতরাতের স্মৃতি আবছা আবছা মনে পড়তেই মুখটা আরও তেতো হয়ে গেলো। শান্তনু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেললো, ‘শীত করলে কম্বল মুড়ি দেবো, কিন্তু ওসব আর না। পৃথিবীর অধিকাংশ লোক ঠান্ডা লাগলে গায়ে গরম জামা দেয়, আগুন তাপায়, বোতল খোলে না।

শান্তনু তৈরি হয়ে দেখলো, বাকিরা সবাই ততক্ষণে প্রাতরাশের টেবিলে। জ্যাম মাখানো পাঁউরুটি খেতে খেতে প্যাটেল জিজ্ঞেস করলো, ‘রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?’ তারপর উত্তরের আশা না করেই বললো, ‘পনেরো মিনিটের মধ্যে বেরোতে হবে। আজ কাটেওয়াকায় যাবো, কাল যাবো মাগাঙ্গা মাটিটু।

কাটেওয়াকা কয়লার খনি। কিন্তু কয়লা মাটির বেশি নিচে নয়। পাশ দিয়ে কাটেওয়াকা নদী। গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা পায়ে হেঁটে পিটগুলো দেখছিলো শান্তনু। এখানে যেমন দেখা যায়, হালকা জঙ্গল। কয়লার সাথে মাইকাও আছে, আছে আরও কিছু। শান্তনু ভূবিজ্ঞানী নয়, তেমন ভাবে পাথর চেনে না। সাথে একজন স্থানীয় ভদ্রলোক আছেন, এখানকার সব কিছু দেখে, নাম জোসেফ। জোসেফ বললো, ‘কয়লার খনিতে এখানে সেখানে আরও কিছু পাওয়া যেতেই পারে, তবে পরিমাণে এতো কম হয়, যে হাত দিয়ে লাভ হয় না।’

‘হিরে পাওয়া যায়?’

জোসেফ একটু হেসে ঘুরে তাকালো --

‘এই খনিতে তার সম্ভাবনা বেশ কম।’

‘আর তানজানাইট?’

‘তানজানাইট! আপনি জানেন?’ জোসেফ একটু অবাক হলো।

‘ওই আসতে আসতে শুনলাম।’ শান্তনু লজ্জা লজ্জা করে বললো।

‘তানজানাইট পাওয়া যায় কিলিমাঞ্জারো পর্বতের পাশেই। মেরেরানি পাহাড়ের পাশে প্রায় পাঁচ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে রয়েছে এই পাথর। হিরের চেয়ে অনেক বেশি দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু আমাদের দেশ তার সদ্ব্যবহার করতে পারলো কই?’ জোসেফ হাঁটতে হাঁটতে বললো।

শান্তনু সেলফি তোলার পক্ষে নয়। নিজের ছবি নিজেই? নাম সেলফি, না সেলফিশ? নিজেই কটা ছবি তুললো, আর একে ওকে বলে আরো কটা ছবি তুলিয়ে নিলো। একটু বেলা করে সবাই মিলে ক্যাম্পে পৌঁছাল। প্যাটেল রুটির মধ্যে ঝুরি ভাজা পুরে সস টস লাগিয়ে দিব্যি রোল বানিয়ে ফেললো। তাছাড়া শান্তনুর সম্মানার্থে ওখানে মুরগি রান্না হয়েছিল। শান্তনুর মনে হলো মাংস এরা বেশ কম সিদ্ধ করে। সেখানে গিয়ে খাওয়ার পর প্যাটেল জোসেফের সাথে মিটিং করতে বসলো। কাটেওয়াকাতে কয়লার প্রাচুর্য দেখে, এখানে একটা তাপবিদ্যুৎ কারখানার কথা মাথায় এলো শান্তনুর। কয়লার প্রক্সিমিটি অ্যানালিসিসের রিপোর্টগুলো চাই শান্তনুর। শান্তনু নোটবুকে, কিছু দরকারি তথ্য লিখে রাখতে লাগলো।

নোট লেখা শেষ করে শান্তনু একটু হেঁটে বেড়াচ্ছিল।

‘মাফ করবেন, আপনি কী ভারতীয় বিশেষজ্ঞ?’

যিনি বললেন, তার উচ্চতা শান্তনুর মাথার ওপর অনেকটা। জিনসের প্যান্ট, জিনসের জ্যাকেট। পেশিবহুল চেহারা। তার সাথের লোকটির চোখে চশমা আর বয়েস একটু বেশি।

‘ভারতীয় তো বটেই। আর যারা আমাকে এক্সপার্ট মনে করে দায়িত্বটা তাদের।’

রসিকতায় বিন্দুমাত্র না হেসে বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি ডঃ উইলসন আর আমার সাথে মিস্টার মোসেস। আমরা রক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আসছি।’

‘আমি এস. চ্যাটার্জী, এই কোম্পানির কেউ নই, আপনারা বোধ হয় মিস্টার প্যাটেলের সাথে কথা বলতে চাইবেন।’

ডঃ উইলসন বললেন, ‘আমাদের দরকারটা আপনার সাথে। আসুন একটু বসি।’ গলায় একটু আদেশের সুর। শান্তনু আপত্তি করতে গিয়ে ঢোঁক গিলে ফেললো।

বসার জন্য তেমন ভালো কিছু আয়োজন ছিলো না। ওরা একটু সরে গিয়ে একটা বাঁশের মাচায় বসলো। শান্তনুর অস্বস্তি হচ্ছিলো, আগন্তুকদেরও অসুবিধে হচ্ছিলো, যদিও তাদের মুখে কোন ছাপ পড়লো না।

‘আপনার এখানে কাজটা কী একটু বিশদ ভাবে বলবেন কী?’ ডঃ উইলসন কোনো ভনিতা না করেই শুরু করলো।

‘কিছু মনে করবেন না, ব্যাপারটা আমার আর মেহেতা গ্ৰুপের মধ্যে। আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয় যা জানার মেহেতা গ্ৰুপের কাছে জানবেন।’

মোসেস বিরক্ত হয়ে বললো, ‘আমাদের কাছে খবর আছে, আপনি আমাদের দেশের সুরক্ষা সংক্রান্ত খবর জোগাড় করছেন। তাই বেশি তেজ দেখবেন না। একবার জেলে ঢুকিয়ে দিলে এই অপরাধে আর বেরোতে হবে না।’

শান্তনু অবাক হয়ে গেলো, ‘আমি এসেছি, মেহেতা গ্ৰুপের আমন্ত্রণে, ওদের স্টিল প্ল্যান্টের পরামর্শ দাতা হিসেবে। আমার সাথে সুরক্ষার কী সম্পর্ক?’

ডঃ উইলসন বললেন, ‘সেটা আমরা বুঝবো। আপনি উত্তেজিত না হয়ে ঠিক ঠাক আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিন।’ শান্তনু বেশ অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালো। কেন যেন মনে হলো, মোসেসের সাথে অস্ত্র আছে। ধীরে ধীরে নিজের কাজের কথা বললো। হাতি ঘোড়া কিছু তো নয়। মোসেস কথাগুলো রেকর্ড করছিল। ডঃ উইলসন মন দিয়ে শুনছিলো আর মাঝে মাঝে একটা দুটো প্রশ্ন করছিল।

‘যাবার আগে একটা কথা বলে দিয়ে যাই। আপনি শুধু আপনার পাইলট প্রজেক্টের কাজ নিয়েই থাকবেন, অন্য কোনো ব্যাপারে যাবেন না। কোনো জায়গায় মাটি খুঁড়বেন না বা খুঁড়তে বলবেন না। আর মেহেতা গ্রুপের বর্তমান এলাকার বাইরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন না। আমাদের নজর আপনার ওপর থাকবে।’

ওরা যাবার পর শান্তনু কিছুক্ষণ গুম মেরে রইলো। এদের খবরদারিতে শান্তনুর আত্মাভিমানে যথেষ্ট ধাক্কা লেগেছে। হাজার হোক দেশে ওর একটা সম্মান আছে। দুটা গুন্ডা মতো পুলিশের লোক বিনা কারণে মুখের ওপর গুপ্তচর বলে গেলো, শান্তনু ঠিক মতো প্রতিবাদ ও করতে পারলো না। একটা সাধারণ ব্যাপারকে এরা এতো কেন ঘাঁটছে, শান্তনুর মাথায় ঢুকছে না। আর কী কী বাকি আছে কে জানে? এই প্রথম মনে হলো, না এলেই ভালো ছিলো। প্যাটেলের কথা মেনে নিয়ে ঘরে বসে পাইলট প্লান্টের ডিসাইন করে টাকাটা ট্যাঁকে গুঁজলেই ভালো হ’তো। ওকে নিয়ে সবারই সাতশো অসুবিধে।

একটু পরেই সুশীলা এসে উপস্থিত, ‘ওরা কারা স্যার?’

‘তোমার কোনো আত্মীয় হবে।’

‘আমি তো গুজরাতি স্যার।’

ন্যাকামোটা শান্তনুর বিশেষ সহ্য হয় না।

‘এ সমস্ত কী হচ্ছে একটু বলবে?’

‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না, স্যার। আপনি কী বলতে চাইছেন।’

‘তোমাদের এলাকায় ঢুকে দু’জন লোক হলিউডি কায়দায় আমাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে যায়। আর তোমরা কিছুই জানো না।’

‘এসব রুটিন ব্যাপার স্যার। এত সিরিয়াসলি কিছু নেবেন না স্যার। হাকুনা মাটাটা স্যার।’

সন্ধ্যাবেলা ওরা মাগাঙ্গা মাটিটু থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে যে সরাইখানায় থাকতে এলো, সেরকম থাকার জায়গা পাওয়া যাবে তা শান্তনু ভাবেইনি। আর আফ্রিকা বলতে সব সময়েই সিংহ আর জঙ্গল ভেবে এসে, এখানে ডুয়ার্সের থেকেও কম জঙ্গল দেখে শান্তনু একটু আশাহত। রাতে রুটি, বড়ো বড়ো মাংস, টমেটো ভাসা ঝোল আর কোক। ঘরে ফিরে স্কাইপে ছেলের সাথে খবর বিনিময় করলো শান্তনু।

‘আচ্ছা তোমার ওই ডঃ উইলসন কেমন দেখতে? মর্গান ফ্রীম্যানের মতো? না লরেন্স ফিসবর্ণের মতো গাঁট্টাগোঁট্টা?’

‘মর্গান ফ্রীম্যান তো ভগবান সেজেছিল, এর বয়েস একটু কম। আর লরেন্স ফিসবর্ণটা আবার কে?’

‘আরে ওই ম্যাট্রিক্সের মর্ফিয়াস। ছবি পাঠাবো?’

‘তুই মজা পেয়েছিস? এদিকে আমি বিরক্ত হয়ে গেলাম।’

‘তোমার মাগাঙ্গা মাটিটুর ইতিহাসটা একবার নেটে খুঁজে দেখি। তোমাকে পরে বলছি। পেন ড্রাইভটা সামলে ব্যাস।’

পরদিন সকাল সকাল ডিম রুটি চা খেয়ে শান্তনু তৈরি। দুটো গাড়ি চললো মাগাঙ্গা মাটিটুর দিকে। রাস্তা বেশ খারাপ। খনি এলাকার রাস্তা আবার ভালো হয় কবে? ওরা প্রথমে ক্যাম্পে পৌঁছালো। জায়গাটা কাটেওয়াকের চেয়ে অনেকটা বড়ো। কোর শেড, থাকার জায়গা, খালি জায়গা অনেকটাই। ওখান থেকে খনি দেখতে একটু জঙ্গলের পথে যেতে হয়। কিছুটা গিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে প্যাটেল বললো। এখানে হবে আপনার পাইলট প্ল্যান্ট। শান্তনুর মেজাজটা তখনও ঠিক হয় নি। তাই মৃদুস্বরে বললো,’আমার বাবার প্ল্যান্ট।’তারপর অবাক হয়ে বললো, ‘এখানে? কাজের লোকেরা সব থাকবে কোথায়?’

‘কেন, ক্যাম্প তো দূরে নয়। আর ছোট একটা পুরো অটোমেটিক প্ল্যান্ট, চালাতে কটা লোক চাই?’

‘তা নয়, পাইলট প্ল্যান্ট তো ক্যাম্পের মধ্যেই করা যেত।’

‘আমাদের কোম্পানি চায় না, ক্যাম্পের মধ্যে আয়রন ওর উড়ুক। তাছাড়া টেস্টের খবর বাইরে যেতে দেওয়া হবে না।’

শান্তনু নোট খাতা বের করে, জমির একটা ম্যাপ বানালো, প্যাটেলের লোকেদের দিয়ে জমিটা মাপালো, তাছাড়াও জমির উচ্চতা, কোঅর্ডিনেটস লিখে, অনেক কটা ছবি তুলে নিলো। তারপর মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলো,

‘আর আপনাদের আসল প্ল্যান্টটা কোথায় ভাবছেন?’

‘সামনে চলুন দেখাচ্ছি।’

ইতিমধ্যে ওরা খনির দু তিনটে স্যাম্পলিং পিট্ দেখে নিলো। শান্তনু ভূবিজ্ঞানী না হলেও খনিজের চেহারা দেখে চমৎকৃত না হয়ে পারলো না। দেখে মনে হয় লোহার সাথে তামা আর আরও কিছু মিশে আছে। তামার কথাটা প্যাটেলকে বলতে হেসে বললো, ‘সেটা তো আপনি করে দেবেন, সব মেটাল গুলোকে আলাদা করে দিন।’

সামনে একটা বড়ো আকারের ঘাস জমি, সেটা দেখিয়ে প্যাটেল বললো, ‘এখানে হবে আপনার ওর ড্রেসিং ইউনিট আর স্টিল প্ল্যান্টটা হবে নিচে।’ শান্তনু এবার বলেই ফেললো, ‘সবই তো আমার, আপনাদের তো কিছু নেই।’

সুশীলা কথাটায় জোরে জোরে হাসলো, যেন এমন মজার কথা জীবনে শোনেনি।

‘এই জমিটার ম্যাপ আছে? না বানাতে হবে?’

‘আছে। হঠাৎ করে ঘাসজমির ভিতর যাবেন না। বিপদ থাকতে পারে।’

বিপদ মানে কী শুধু বন্যপ্রাণী। শান্তনুর জানা নেই, বা এখনো জানার বাকি আছে।

শান্তনু আবার অনেক ছবি তুললো। প্রশ্ন করে বেশ কিছু উত্তর জেনে নোট করে নিলো।

‘আচ্ছা এখানে জল কোথায়?’

‘মাটির তলায় আছে, ওদিকে লুপালী নদী আছে।’

‘লুপালী নদীর ধারের জমিটা কার? ওটাই তো ভালো লোকেশন হতে পারতো।’

‘ওটা আমাদের লীজের বাইরে। সরকারি জমি।’

‘ওখানে একবার যাওয়া যায়?’

‘দুপুরে খেতে কিন্তু দেরি হয়ে যাবে।’

ঐতো খাওয়ার ছিরি, শান্তনু মনে মনে ভাবলো, এতদূর এসে যদি সবটা না দেখা যায় তবে আসাটা কেন?

লুপালী নদী একটু নিচে, ছোট তবে জল যথেষ্টই। নদীর ধারে অনেকটা পাতলা ঘাসের জমি। জমিটা অনেক পরিষ্কার। অনায়াসে হাঁটা যায়, শান্তনুর জমিটা মাপার ইচ্ছে ছিলো। ওদের আলসেমি দেখে আর বললো না। শান্তনুর মনে অনেক প্রশ্ন আসছিলো। ওদের কাছ থেকে বিশেষ সদুত্তর না পেয়ে, খাতায় লিখে রাখলো। সুশীলা প্রায় শান্তনুর ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার হয়ে গিয়েছে। যেখানেই যায়, ‘স্যার, আপনার একটা ফটো তুলি?’ কেনোরে বাপু? শান্তনু কী অমিতাভ?

ক্যাম্পে দুপুরের খাওয়ার বিশেষ আয়োজন। তবে প্যাটেল তো এসব ছোঁবেও না, তাহলে কেন খাই খাই করছিল, তা শান্তনুর বোধগম্য হলো না।

ক্যাম্পে বাকিরাও শান্তনুদের সাথেই খেতে বসলো। শান্তনু ক’জনের নাম জানলো। একটি মেয়ের নাম শুনে ভালো করে দেখলো। গ্রেস, এখানকার আবলুশ কাঠ দিয়ে তৈরি এক যুবতী। চাকরির প্রথম দিকে শান্তনু যখন কিছুদিন গোয়ার চোগলদের কোম্পানিতে ডেপুটেশনে ছিলো, সেখানে গ্রেস বলে একটি মেয়ের সাথে একটু বেশি আলাপ হয়েছিল। কোঙ্কনি খ্রিস্টান, মিশুকে। শান্তনুকে অনেক সাহায্য করেছিল। আজ হঠাৎ করে মনে পরে গেলো নামটা গ্রেস ফার্নান্ডেজ। মেয়েটা হাত ধোবার সময় এগিয়ে এসে শান্তনুকে সাহায্য করলো। তারপর হাতের ইশারায় ওদের থাকা খাওয়ার জায়গাটা দেখিয়ে বললো, ‘সি।’ শান্তনুর ওদের জীবন যাত্রার ওপর একটা উৎসাহ আছেই, তাই রাজি হয়ে গেলো। সুশীলা লেজুড় ধরার আগেই, গ্রেসের সাথে ওদের রান্নার জায়গা, থাকার জায়গায় ঢুকে পড়লো। গ্রেস একটা একটা শব্দ বলতে পারে। সেটাও কম কিছু নয়। মেয়েদের থাকার জায়গাটা আলাদা, সেখানে ঘরের মধ্যে ঢুকে গ্রেস হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ থাকতে বললো। তারপর নিজের বাক্স থেকে একটা নোট বুক আর কাগজে মোড়া একটা কোর স্যাম্পলের টুকরো বের করে শান্তনুর হাতে গুঁজে দিলো। শান্তনু খুলে দেখতে গেলে গ্রেস ইশারায় বললো, এখানে নয়। শান্তনু বেরিয়ে এসে দেখে সুশীলা কৌতূহলে ফেটে যাচ্ছে। ‘ওদের ঘর টর সব দেখছিলেন স্যার?’

‘আরে না, মেয়েটার সাথে সেলফি তুলছিলাম।’

ক্যাম্প থেকে ওদের ফেরার পালা। আজ রাতের আগে যতটা পারা যায় এগিয়ে গেলে, আগামী কাল একটু তাড়াতাড়ি দার এস সালামে যাবে। পথে মিকুমি দেখে যাবার কথাও আছে।

গডউইন গডফ্রে, নোট বইটার প্রথম পাতায় লেখা আছে, ভূবিজ্ঞানী। কাউকে না দেখিয়ে এতটুকুই পড়তে পেলো শান্তনু। মেয়েটার গোপনীয়তার চেষ্টা দেখে শান্তনুও সাবধান হয়ে গেছে। সন্ধ্যের আগে আগে ওদের গাড়ি অনেকটাই চলে এলো। পথের পাশে অনেক হাতে আঁকা ছবি রাখা থাকে। শান্তনু সে অর্থে ছবি বোঝে না। কিন্তু ভালো লাগলো।

খাওয়ার টেবিলে শান্তনু চুপচাপ ছিলো দেখে, প্যাটেল জিজ্ঞেস করলো, ‘কেমন দেখলেন আমাদের সাইট।’

‘দেখা তো খুব ভালো হলো। না আসলে অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম না। এখন কাজটা অনেক সোজা হবে।’

‘সে তো খুব ভালো কথা। আমাদের পাইলট প্ল্যান্টটা তিন চার মাসের মধ্যে করে ফেলতে পারবেন?’

‘আপনারা করতে চাইলে তো চার মাসে অবশ্যই। তবে আপনাদের এখানে চটপট শেডটা বানাতে হবে। ছোট প্ল্যান্ট, বানাতে তো কোনো অসুবিধে নেই। যা দেরি হবে অটোমেশনের জন্য। খরচও বেশি ওরই জন্য।’

‘আপনি আমাদের বসের সামনে একটু সুপারিশ করে দিলে হয়ে যাবে।’

‘সুপারিশ মানে?’

‘মানে পাইলট প্ল্যান্টটা একটু খরচ করে বানালে ভবিষ্যতে লাভই হবে।’

‘সে তো বটেই। অনেক টাকার প্রজেক্ট। আজ একটু হিসাব করে দেখি।’

‘হুম’ বলে প্যাটেল বিয়ারে চুমুক দিলো। বিয়ারটাতো আমিষ নয়।

‘আচ্ছা, গডফ্রে কে? আজ দেখলাম না তো!’

টেবিলে উপস্থিত সবাই চমকে গেলো।

প্যাটেল একটু সামলে প্রশ্ন করলো, ‘এই নামটা কোথা থেকে শুনলেন?’

প্রশ্নটা আসবে সেটা শান্তনু জানতো, তাই উত্তর তৈরি ছিলো।

‘আমাকে যে রিপোর্টগুলো দিয়েছিলেন তার নিচে নাম ছিলো। ভেবেছিলাম এখানে এসে দেখা হ’লে, কিছু কথা জেনে নেবো।’

‘গডফ্রে এখানে সহকারী ভূবিজ্ঞানী ছিলো। কিছুদিন হলো কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। আপনার যা যা জানার জোসেফের কাছ থেকে জানতে পারবেন।’

গ্রেস বেশি কথা বলেনি বটে, কিন্তু ইশারায় শান্তনুকে দেখিয়েছিলো গডফ্রে মারা গেছে। মুখে বলেছিলো, ‘ডেড।’

তাহলে প্যাটেল এমন মিথ্যে কথা বললো কেন?

একটু রাতে খাওয়া দাওয়ার পর জোসেফ গ্রেসের ঘরে ঢুকে বললো, ‘গডফ্রে তো যাবার ছিলো গেছে। তোকে তো বাঁচতে হবে। ওর ঘরে ঘুর ঘুর করবি না।’

গ্রেস চুপ করে রইলো। জোসেফের সাথে একটা রামের বোতল। জোসেফ সেটা গ্রেসের হাতে তুলে দিলো।

‘নোয়েলের এতো মাথা গরম কে জানতো? তোকে আমার বরাবই ভালো লাগে। এই ক্যাম্পে থাকতে হলে আমার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলবি।’

গ্রেস কোনো কথা না বলে, জল গেলাস আনতে গেলো। জোসেফ গ্রেসের বিছানায় অধিকার জমিয়ে আধ শোয়া হয়ে বসে একটা, সিগারেট ধরালো।

‘ওই ইন্ডিটা ঘরে এসে কী করছিল? কিছু জিজ্ঞেস করেছে?’

‘ছবি তুলছিল। কিছু বলেনি।’

‘কী ছবি? তোর স্পেশাল ছবি।’ জোসেফ অশ্লীল ভাবে হাসলো। ‘বুড়োর খুব রস।’

গ্রেস জোসেফের হাতে গেলাসটা এগিয়ে দিতেই, জোসেফ ওর হাত ধরে ফেললো। গ্রেস কিছু না বলে তাকালো। গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিতেই, হাতটা খসে গেলো।

নোয়েল নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো। জোসেফের ছোট খাটো মৃত শরীরটা অক্লেশে তুলে নিয়ে যেতে যেতে একবার গ্রেসের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এবার ক্ষমা করে দিও।’

গ্রেস কোনো জবাব না দিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করতে লাগলো।

‘একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না স্যার। ওই চ্যাটার্জী কী দুনিয়ার একমাত্র কাজের লোক? ও যখন আপনার শর্তে রাজি হলো না, তখন অন্য লোককে চেষ্টা করলেন না কেন?’

‘চেষ্টা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের বস ওনার প্রবন্ধ পড়ে একেবারে মুগ্ধ। তাছাড়া উনিও চাইছিলেন, আমাদের বিশেষজ্ঞ একবার সাইটটা দেখুক। আমি বেশি আপত্তি করলে মেহেতাজির সন্দেহ হতো।’

‘ওকে মাইনসে নিয়ে আসা একদম কাজের কথা হয়নি। খুব বিপদজ্জনক কাজ।’

‘আরে না। ওতো জিওলজিস্ট নয়, সন্দেহ হবার কথা নয়।’

‘অন্য ভাবে তো আটকানো যেত?’

‘চেষ্টা তো করলাম, যাতে নিজে থেকে বলে, যাবো না। লোকটা খুব জেদি। মানলো না।’

‘আমি কী করবো স্যার?’

‘ওকে দিয়ে কাজটা পুরো করিয়ে নিয়ে, তারপর, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।’

রাতের বেলা ঘরে এসে শান্তনু দরজা ভালো করে এঁটে, গডফ্রের নোটবই খুলে বসলো। অনেক কিছুই লেখা। তারিখ দিয়ে কিছু নমুনার বিবরণ লেখা। ছোট ছোট ড্রয়িং করা। এক দু জায়গায় গ্রেস ও লেখা আছে। শেষ কটা পাতায় তিন নম্বর পিটের কথা লেখা আছে আর লেখা আছে এক স্যাম্পলের কথা। আর যা লেখা আছে, তা পড়ে শান্তনু চমকে উঠলো। লুপালী নদীর ধারে মাটি খুঁড়ে গডফ্রে মানুষের হাড় পেয়েছিলো। দিনটা মাস খানেক আগের এক শুক্রবার।

জমির নিচে কঙ্কাল পাওয়া যাওয়া এতকিছু অবাক করা ব্যাপার নয়। মানুষ যখন আশ্চর্যতম প্রাণী, তার আচরণ আশ্চর্যরকম হবে বৈকি। একটা কঙ্কাল পাওয়া যাওয়াটা, গডফ্রে হয়তো কাউকে জানায়নি।

হয়তো এটার বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই, ও এমনিই লিখেছে। গ্রেসের হাবে ভাবে শান্তনুর মনে হলো ডায়রিটা গডফ্রে গ্রেসকে দিয়েছিলো তাকে দেবার জন্য। কিন্তু মুশকিল হলো, শান্তনুকে গডফ্রে চেনে না, শান্তনু ও না। আর শান্তনুকে দেওয়া মানে এর মধ্যে এমন কিছু তথ্য আছে, যা শান্তনুর সাথে জড়িত। সেটা কী? সারা দিন ঘোরা ঘুরির পর ঘুম পাচ্ছে শান্তনুর, ভাবছিলো সব কিছু গুটিয়ে ঘুমিয়ে নি। তখনি ছেলের মেসেজ এলো একবার অনলাইনে এসো কথা আছে।

‘ঘুম পাচ্ছে।’

‘উড়িয়ে দিচ্ছি। তিন বছর আগে, লুডেওয়ায় একটা বাজে ঘটনা হয়েছিল।’

‘বাজে ঘটনা মানে?’

‘ওখানে একটা ছোট বসতি ছিলো। সেখানে সেনার একটা ছাউনি হবে বলে, গ্রামের লোকদের চলে যেতে বলে। চলে যাবার সময় চল্লিশ জন নদীতে ডুবে মারা যায়।’

‘আষাঢ়ে গল্প। নদী বলতে তো লুপালী! হেঁটে পার হওয়া যায়। সেখানে চল্লিশ জন ডুবে মরবে! বিশ্বাসযোগ্য নয়।।’

‘হ্যাঁ, লুপালী নদীর কথাই লেখা আছে।’

‘এখানে এতো কিছু বর্ষা হয় না যে নদী তেমন ফুলে ফেঁপে উঠবে।’

‘শোনো বাবা, লোক তো মারা গিয়েই ছিলো, সে যে ভাবেই যাক।’

‘আরে হ্যাঁ। গডফ্রে নদীর ধারে মানুষের হাড় খুঁজে পেয়েছিলো।’

‘বাবা, একটা বাজে সন্দেহ হচ্ছে। তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছে। তুমি তো বলেছিলে তোমার সুটকেস থেকে

কিছুই খোয়া যায়নি। কোনো অচেনা জিনিস

বেশি লাগছিলো?’

‘কী যে হেঁয়ালি করিস! তুই বলছিস, কেউ কিছু পুরে দিয়েছে কি না।’

‘ঠিক তাই। খুঁজে দেখো তোমার বাক্সে ক্যামেরা, রেকর্ডার বা ট্র্যাকার কিছু লাগানো কিনা। পুরো বাক্স খালি করে লাইনিং এর তলে দেখো।’

‘কী বলছিস?’

‘সময় নষ্ট করোনা বাবা, দেখো। কিছু পেলে?

‘হ্যাঁ। এ কিরে, একটা গোলমতো জিনিস।’

‘মনে হয় ট্র্যাকার।’

‘এখন কী করবো?’

‘না ভেঙে খুলে বের করো। যেন অকেজো হয়ে না যায়। কাল বের হবার আগে জিনিসটা অন্য অচেনা কারোর গাড়ি, ট্রাক, বাইক যা পাবে তাতে ফেলে দেবে।’

‘যদি কেউ দেখে ফেলে।’

‘সাবধানে করবে। তোমার ভদ্র সদ্র চেহারা, কেউ সন্দেহ করবে না।’

‘ভদ্র সদ্র চেহারা মানে? ভদ্র লোকের তো ভদ্র চেহারাই হবে।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমার মনে হয় না এটা তোমার মেহেতা গ্রুপের কীর্তি। তুমি সব সময়েই ওদের নজরের সামনে আছো, ওদের সাথেই ঘুরছো। তাই এটা সম্ভবত ডঃ উইলসনের কাজ। যা যা করতে হবে এক এক করে বলছি। আর তোমার নিজের ফোনটাতে, রোমিং করিয়ে দিচ্ছি। প্যাটেল যাই বলুক, তুমি নিজের সন্দেহের কথা ওকে বলবে না। ফোনটা পুরো চার্জ করে রাখবে।’

শান্তনু গডফ্রের ডায়রির প্রতিটা পাতা ছেলে বিনীতকে ছবি তুলে পাঠিয়ে তবে শুতে গেলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%