দেবব্রত সান্যাল
শান্তনুর প্লেন ছাড়ার সময় রাত চারটে প্রায়, ভোর ও বলা যায়। এরা আর প্লেন পায়নি। শান্তনুর দৃঢ় ধারণা প্যাটেল এই টিকিটটাই সবচেয়ে সস্তায় পেয়েছে। কলকাতা থেকে দোহা পাঁচ ঘন্টা দশ মিনিটের যাত্রা। ভারত আর কাতারের মধ্যে সময়ের তফাত আড়াই ঘন্টার। তাতে করে দোহাতে শান্তনু যখন পৌঁছাবে তখন ওদের ঘড়িতে বাজবে সকাল ছটা পঁয়ত্রিশ আর ঠিক এক ঘন্টা পরই দার এস সালামের ফ্লাইট ধরতে হবে। এক ঘন্টা নিয়ে একটা টেনশন তো থাকেই।
অত রাতে প্যাঁচার মত ফ্লাইট ধরা, তার ওপর শান্তনু এমনিতেই একটু ব্যস্তবাগীশ। তাই আগে ভাগে এসে কলকাতা এয়ারপোর্টে বসে থেকে সব করে ফেলার চেষ্টা করলো। চেক ইন কাউন্টারে প্রথম বাধা, ‘ভিসা কোথায়?’
‘ভিসা তো অন অ্যারাইভাল পৌঁছে করতে হবে, তাই তো বলা আছে।’ কাউন্টারে বসা মহিলা শান্তনুর কথায় এক ফোঁটা গুরুত্ব না দিয়ে আবার ভিসা চাইলো। শান্তনুর একটা জিনিস দেখা আছে। টাকা পয়সা নেওয়া হয়ে গেলে, অল্প বিস্তর সবাই সর্দারি করে, সিনেমা হলের সিট দেখানো টর্চ বাবুর মতো। যদিও শান্তনু একেবারেই নারী বিদ্বেষী নয়, তবু ওর অভিজ্ঞতা বলে এয়ারলাইন্স-এর কাউন্টারে মহিলারা বেশি ঝামেলা দেয়। আধখামচা নিয়ম দেখায়, ওজন নিয়ে এমন ভাব করে যেন তুমি মাদক নিয়ে যাচ্ছো। আজও তাই হ’লো। একটু সময় এবং কিছু কথা খরচ করে বোর্ডিং পাস পাওয়া গেলো। হাতে একটা লাগেজ। কিন্তু আসল ঝামেলা হলো ইমিগ্রেশনে গিয়ে। লাইন দিয়ে শান্তনু যে কাউন্টারে পৌঁছালো, সেখানকার ভদ্রলোক ওর পাসপোর্টটা উল্টে পাল্টে দেখে বিরক্ত মুখে বললো, ‘ভিসা কোথায়? ভিসা ছাড়া হবে না।’ বোঝো কারবার, শান্তনু যত বলে, ‘তানজানিয়ায় পৌঁছে ভিসা ক’রবো।’ ভদ্রলোক রাজি হন না। তারপর শুরু হলো ভূগোল ক্লাস। তানজানিয়া কোথায়, কার পাশে ইত্যাদি। তখন বেশ রাত, শান্তনুর প্রবল বিরক্তি লাগছিল। ইমিগ্রেশনের লোকটা বোকা না অসৎ ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। হঠাৎ করে কোথা থেকে আর একজন এসে বললো, ‘দার এস সালাম? কোনো অসুবিধে নেই তো, তানজানিয়া - নন ইবোলা দেশ, ভিসা তো অন অ্যারাইভাল হবে।’ তারপর পাসপোর্টের ওপর দুম দুম করে স্ট্যাম্প মেরে দিয়ে বললো, ‘সোজা ক্যামেরার দিকে তাকান।’ শান্তনু এতক্ষণ পরে এবার একটু হাসি হাসি মুখ করলো।
সুরক্ষা দরজাটা নিরুপদ্রবে পার হয়ে যাবার পর শান্তনুর কাজ আপাতত শেষ। কাতার যাবার যাত্রী খুব বেশি নয়। তেইশ নম্বর গেট থেকে বোর্ডিং। শান্তনু বোর্ডিং গেটের কাছে এসে একটা সিট দখল করে বসে রইলো। একটু সতর্ক থাকলো যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে। সাথে একটা বই ছিলো। কিন্তু বই পড়লে ঘুম বেশি পায়। একসময় গায়ে মৃদু ধাক্কা খেয়ে শান্তনু ধর ফর করে উঠে বসলো। ‘এই যাঃ, ঘুমোবো না ঘুমাবো না বলতে বলতে সেই ঘুমিয়ে পড়লাম।’ শান্তনু তাকিয়ে দেখলো এক রাত জাগা পাখি তার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলছে, ‘দোহা? স্যার আপনার বোর্ডিং ঘোষণা করা হয়েছে।’
শান্তনু প্লেন ফ্লেন নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না। তবে ছেলে অনেক কিছু বলে দিয়েছিলো, যার অনেক কিছু সে কান থেকেই ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। মনে রাখার মধ্যে এটা কাতার এয়ারওয়েসের এয়ারবাস এ ৩২০। কম্বল, বালিশ, হেড ফোন সব সামলে শান্তনু যখন জানালার ধারে বসলো, তখন ঘুম টুম পুরো গায়েব।
অতো রাতে কিছু খাওয়া যায় না কথাটা শান্তনুর ক্ষেত্রে অন্তত খাটলো না। ফ্লাইটে যা দিলো সোনা মুখ করে খেলো। ছেলে বলে দিয়েছিলো, জল জুস্ বারবার খাবে আর মাঝে মাঝে সিট ছেড়ে উঠে একটু হেঁটে নেবে। জল কম জুস্ বেশি নিয়ে, সময়, অভ্যেসের পরোয়া না করে দিব্যি চালিয়ে গেলো শান্তনু। কিছুটা সামনের সিটের পিছে থাকা স্ক্রিনে মুভি দেখে, কিছুটা ঝিমিয়ে পাঁচ ঘন্টা কাটলো। এর মধ্যে আবার চিন্তা, দেরি যেন না হয়। দোহা থেকে আবার দার এস সালামের ফ্লাইট ধরতে হবে তো, দুই ফ্লাইটের মধ্যে সময় বেশি নেই।
দোহার হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন প্লেন নামলো তখন স্থানীয় সময় প্রায় পৌনে সাতটা। দু’দিকে নীলচে সবুজ জল। কিন্তু টেনশনের ঠেলায় শান্তনুর আর কিছু ভালো লাগছিলো না। নামা-নামি করতে আরও কিছু সময় নষ্ট হলো। এয়ারপোর্টটা নতুন, বিশাল আর দারুণ সাজানো।
সেসব দেখার সময় শান্তনুর একেবারে নেই। বোর্ডিং পাস কলকাতাতেই নেওয়া ছিলো। বোর্ডিং গেট বন্ধ হবার আগে সেখানে পৌঁছানোটাই ব্যাপার। কে জানতো এতটা হাঁটতে হবে। হাতের ব্যাগটা ভারি লাগতে শুরু করেছে, হাত বদল করেও আর পোষাচ্ছে না। ভাগ্যিস একটু পরে পরেই চলন্ত ফুটপাথ, যাকে ট্রাভোলেটার বলে সেগুলো ছিলো। তাই শান্তনু হাঁফাতে হাঁফাতে গেট বন্ধ হওয়ার আগেই বোর্ডিং গেটের সামনে পৌঁছে গেলো। শান্তনু যখন বোর্ডিং গেটে পৌছালো তখন আর প্লেন ছাড়তে মিনিট কুড়ি বাকি। গেটের ভদ্রলোক অলস হাতে বোর্ডিং পাসটা দেখে বললেন, ‘একটা সমস্যা আছে। আপনার মালপত্র এসে পৌঁছায়নি।’
‘সে আবার কী?’
রাতজাগার পর আর এইসব ঝামেলা শান্তনুর একেবারে ভালো লাগলো না। কাতার এয়ারলাইন্সের ওপর প্রচন্ড রেগে গেলো। গেটের লোকটাকে বকাবকি শুরু করে দিলো। লোকটা একটু শুনে নির্লিপ্ত গলায় বললো, ‘এখনই গেট বন্ধ হবে। ঠিক করুন, মাল ছাড়া আসবেন, না মালের সাথে পরে আসবেন।’ শান্তনু আরেক প্রস্থ হৈ চৈ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, হঠাৎ এক অল্প বয়েসী মহিলা কপালকুন্ডলার কায়দায় এসে বললেন, ‘আমার সাথে চলে আসুন। চিন্তা করবেন না। পরের ফ্লাইটে আপনার মাল চলে আসবে। আপনার কাছে পৌঁছে যাবে।’
শান্তনু এক মুহূর্তে চিন্তা করে নিলো। এ ফ্লাইটটা ছেড়ে দিলে অনেক অসুবিধে। সব প্রোগ্রামে দেরি হয়ে যাবে। পরের ফ্লাইটটা কখন তাও তো জানা নেই। তারপর তানজানিয়ায় প্যাটেলকে যদি জানাতে না পারা যায়, তাহলে হাঁ করে এয়ারপোর্টে বসে থাকতে হবে। তাছাড়া বাড়িতেও চিন্তা করবে। তার ওপর বোর্ডিং পাস একবার বাতিল হলে, কী হবে কে জানে!
সেই একই কাতার এয়ারলাইন্স, প্লেনের একই চেহারা। শান্তনু ভেবেছিলো, এয়ারপোর্টের ওয়াই ফাই থেকে বাড়িতে একটু জানিয়ে দেবে, সেটা আর হলো না। ইন্টারন্যাশনাল রোমিং অনেক খরচের ব্যাপার, তাই করায় নি। আর প্যাটেল বলেছে ওখানে পৌঁছালে একটা স্থানীয় সিম দেবে। তাছাড়া আজকাল সব হোটেলেই ওয়াই ফাই থাকে। একবার পৌঁছে গেলে চিন্তা নেই। শান্তনুর এখন প্রধান চিন্তা ফেলে আসা মালটা নিয়ে। ভাগ্যক্রমে ল্যাপটপ, ডলার, কার্ড সব সাথে আছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সব হোটেল থেকেই দেয়। কিন্তু বাড়িতে বাইরে পরার জামা কাপড় সব তো লাগেজে। এই লম্বা সফরের পর একই জামা কাপড়ে রাতে শোয়ার কথা ভাবতেই শান্তনুর বিশ্রী লাগলো। আরও টেনশন, যদি মালটা আদৌ না আসে! খুব বাজে ব্যাপার হবে। এই সব ভাবনা চিন্তায় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে শান্তনু, স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা নাগাদ জুলিয়াস ন্যেরেরে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পোঁছালো। যথেষ্টই ভিড় ভাট্টা, নেমে পঞ্চাশ ডলার দিয়ে টুরিস্ট ভিসা করিয়ে ব্যাগের খোঁজে চললো। যদিও কাতার এয়ারলাইন্স ওকে ভরসা দিয়েছিলো যে মালটা আপনা আপনিই পৌঁছে যাবে, তাতে আশ্বস্ত হবার মানুষ শান্তনু নয়। কিন্তু কাতার এয়ারলাইনসের হারানো - প্রাপ্তি ধরনের কোনো কাউন্টার এয়ারপোর্ট টার্মিনালে দেখা গেলো না। পরে বোঝা গেলো, এখন এসব দেখবে সুইস পোর্ট বলে একটা কোম্পানি। সুইস পোর্টের কাউন্টারে এক মহিলা নির্লিপ্ত মুখে ফর্ম ভরিয়ে, পাসপোর্ট, টিকিট আর হোটেলের বিবরণ কপি করে রেখে দিলো। শান্তনু যতই জানতে চায়, সুটকেস কবে পাওয়া যাবে, মহিলা বলেন, ‘ফোন নম্বর রেখে যান, আসলে জানিয়ে দেবো।’ মহা জ্বালা, শান্তনুর তো ফোন নম্বরই নেই। হোটেলের রুম নম্বর জানা নেই। অগত্যা হোটেলের নম্বরে ফোন করতে বলতে হ’লো।
আফ্রিকা, মানে জংলি, জঙ্গল আর সিংহ এই তো শুনে এসেছে শান্তনু। চাঁদের পাহাড় নয়তো সাহারায় শিহরণ। দার এস সালাম এয়ারপোর্টের বাইরে এসে তেমন কোনো ভাবনাই মনে এলো না, বরং একজনের হাতের নিজের নাম লেখা বোর্ড দেখে খুশি হয়ে গেলো, নামের বানান ভুলটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনলো না। যেন শত্রু পুরীতে এক আপনজন। ছেলেটা নিজে থেকে বললো, ‘আমার নাম ম্যাক। আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। আপনার মালপত্র সব কোথায়?’
শান্তনুর মুখে যতটা হাসি লেগেছিলো, সব খসে পড়লো।
শান্তনুর যেখানে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সেটা ওশান ব্লু বিচ রিসর্ট। মেহেতাদের অনেক ব্যাবসার একটি। শহর থেকে বেশ দূরে, এয়ারপোর্ট থেকে ততো দূরে নয়। কিন্তু রাস্তায় এমন জ্যাম যে পৌঁছাতে সোয়া ঘন্টার ওপর সময় লেগে গেলো। রাস্তায় গাড়ি জ্যামে আটকে থাকলে গাড়ির পাশে ফেরিওয়ালাদের ভিড় লেগে যায়। ‘কোথায় যাবে তুমি? যেখানে যাও সেই, একই মাটি ঘাস, একই নীলাকাশ।’ মাসাইদের অনেক গল্প পড়েছে শান্তনু, সবই বেশ রোমহর্ষক। রিসোর্টের গেটে একজন মাসাইকে দেখলো। যেমন ছবিতে দেখা যায় তেমনি পোশাক, হাতে একটা বর্ষা, রোগা সাত ফুটের মতো লম্বা। রিসোর্টের রিসেপশনে অনেকটা জায়গা, বেশ সাজানো, নানান বড়ো বড়ো কাঠের মূর্তি, জন্তু, মাসাই অনেক কিছু। দেয়ালে অনেক ছবি। কিলিমাঞ্জারো পাহাড়ে সূর্যাস্ত, শিকার কত কিছু। লাউঞ্জে বসার জন্যও সুন্দর ব্যবস্থা আছে। তখন শান্তনুর বোধগম্য হলো ওই মাসাই, রিসোর্টের দারোয়ান। দার এস সালাম নামের মানে শান্তির নীড়, ওশান ব্লুতে আসলে তার সার্থকতা বোঝা যায়। সামনে বিশাল ভারত মহাসাগর। বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে ছোট বড় কটেজ। এপাশে ওপাশে দুটো রেস্তোরাঁ। বালিয়াড়ির ওপর লম্বা লম্বা কাঠের জেটি বানানো রয়েছে। আপাত শান্ত মহাসমুদ্রর ছোট ছোট ঢেউ সেই কাঠের খুঁটির ওপর খেলা করছে। এদিক ওদিক কটা নৌকো রাখা আছে। স্বপ্নের পিকচার পোস্ট কার্ডের থেকেও সুন্দর। চোখ জুড়িয়ে যায়। গরম নেই, ফুরফুরে হওয়া বইছে। শান্তনু তখন বাক্সের বিচ্ছেদ বেদনা প্রায় ভুলে এসেছে।
যেটায় শান্তনুর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কটেজটা সুন্দর। ঘরটা মাঝারি মাপের, একটা বড়ো বিছানা। চা কফি বানানোর জায়গা। জলও আছে। জল থাকাটা শান্তনুর কাছে একটা নিশ্চিন্তি। একগাদা দাম দিয়ে জল কিনতে প্রাণে বড়ো লাগে। শান্তনু সব হোটেলের স্নান ঘর দেখে নেয়। এখানে দেখে সন্তুষ্ট হলো। এক কাপ চা বানিয়ে বারান্দায় এসে ব’সলো। দিনের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। সূর্য আকাশের ক্যানভাসে সৌন্দর্যের যন্ত্রণাহীন জন্ম দিচ্ছে। দরজায় ঘন্টি বাজলো। হোটেলের হাউস কিপিং এর মহিলা। ঘরে মশা মারার ওষুধ দেওয়ার জন্য। দেশটা আফ্রিকা, যদিও ঘরে সাদা নেটের মশারি আছে, তবু সাবধানের মার নেই। নাকি তাও আছে।
ফোনটা বেজে উঠলো। রিসেপশন থেকে জানালো ওর জন্য মেহেতা গ্রুপের কোনো এক সুশীলা মোরাবিয়া অপেক্ষা করছে। সুশীলা মোরাবিয়ার নাম শান্তনু আগে কখনো শোনেনি। রিসেপশনে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে একজন মহিলা ওঠে এলো। বয়েস আঠাশ থেকে বত্রিশ যা কিছু হতে পারে। চেহারা, সুশ্রী, সপ্রতিভ, ফিটফাট জামা কাপড়। হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে বললো, ‘আমি সুশীলা স্যার। দার এস সালামে স্বাগত।’
সুশীলা একটা কাজের কাজ করেছে, একটা ফোন নিয়ে এসেছে লোকাল সিম সমেত। ‘নোকিয়া ফোন স্যার। আপনার কাছে রাখুন। প্যাটেল স্যার, আমার ফোন নম্বর লোড করা আছে। বারো হাজার সিলিং ভরা আছে। যতদিন এখানে আছেন ব্যবহার করুন। যাবার সময় দিয়ে যাবেন।’
বারো হাজার শিলিং শুনে শান্তনুর চোখ কপালে। পরে বুঝলো এখানকার হাজার শিলিং ভারতের আঠাশ টাকার সমান।
‘সব সিম তো সব ফোনে লাগে না, তাই চান্স নিলাম না। আপনি এসে ফ্রেশ হয়ে গেছেন তো স্যার?’
শান্তনু হাসবে না কাঁদবে? গায়ে সেই ক’লকাতার পোশাক, ব্যাগের খোঁজ নেই, ফ্রেশটা হবে কী করে, নাকি ফ্রেশের মানেটাই পাল্টে গেছে?
শান্তনু ব্যাগের কথাটা সুশীলাকে বলতে বললো, ‘আমাকে ডকুমেন্ট দিয়ে দিন। আমি আনিয়ে নেবো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন স্যার, আমি আছি তো। সোয়াহিলিতে একটা কথা আছে হাকুনা মাটাটা, মানে নো ওরিস।’
অন্যের ওপর নিজের চিন্তা ছেড়ে বিন্দাস হবার মানুষ শান্তনু চ্যাটার্জী নয়। তবে বিদেশে স্থানীয় সাহায্য পেলে ভালো লাগে।
সুশীলার আগ্রহে দু’জনে রিসর্টের একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে ব’সলো। নাম দ্য পাম। অনেকটা জায়গা নিয়ে সাজানো গোছানো রেস্তোরাঁ। লোকজন বেশি নেই, আর হৈ চৈ একদম না। দিনের আলো নিভে এলেও, রাতের আলোয় ভারত মহাসাগরকে অপরূপ দেখাচ্ছে। হালকা আলো আর স্থানীয় সজ্জায়, দ্য পাম কে ভারি মনোরম দেখাচ্ছে।
‘স্যার দুটো কুল ড্রিঙ্কস কি বলবো? এখানে আবার হার্ড ড্রিঙ্কস নিলে কোম্পানি অনুমোদন দেয় না।’
শান্তনুর খিদে যথেষ্টই পেয়েছে, কিন্তু কী খাবে, মানে সামনের মেনু কার্ডের কোনটা খাওয়া যায় বুঝে উঠতে পারছে না। তবে বিদেশে গিয়েও যারা ভারতীয় খাবারের জন্য হন্যে হয়ে যায়, শান্তনু তাদের দলে নয়। নতুন খাবার চেখে দেখতে ভালোই লাগে। খাবার দেখে জায়গাটার চরিত্রের একটা দিক বোঝা যায়।
‘উগালি খেয়ে দেখবেন?’
বন্ধু মহলে থাকলে শান্তনু বলতো, ‘উৎকৃষ্ট গালি হলো উগালি?’
মুখে বললো, ‘উগালি, না মানে?’
‘উগালি এখানকার রোজকার খাবার। ভুট্টার গুঁড়ো লবন দিয়ে সিদ্ধ করে তৈরি করে।’
‘খেতে ঠিক হবে তো?’
‘খেয়ে দেখুন, আপনি কি ভেজেটেরিয়ান?’
‘না না, নন, মানে চিকেন টিকেন খাই। মাছ তো খাই।’
‘হা, হা! বাঙালি মানেই তো মাছের ঝোল আর রোসোগোল্লা! ‘
বাঙালি সম্বন্ধে এমন কথা আগেও শুনতে হয়েছে। শান্তনু অকারণে তর্ক না বাড়িয়ে, খাবারের দিকে মন দিলো। উগালি, প্লেটের উপর বাটি ওল্টানো সুজির মতো। সাথে স্যালাড আর মুরগির ঝোল। এবার ওই মন্ডটা থেকে ছোট ছোট কাগের দলা, বগের দলা বানিয়ে, মাথায় একটা জায়গা করতে হবে। তাতে সেই ঝোল ঢেলে খেতে হবে। ভুট্টার দলার তো কোনো স্বাদ নেই, ঝোলটা পাতলা। খেতে খারাপ ভালো বলার মতো কিছু নয়। ওই একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকলো।
চারদিকে আলো অন্ধকারের একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চলছে। সময়টা কলকাতার তুলনায় আড়াই ঘন্টা পিছে। তাই খাওয়ার পাট মিটিয়ে বাড়ির সঙ্গে কথা বলে নেওয়াটা ভালো। তাছাড়া আজ থেকেই শান্তনু পাইলট প্ল্যান্টের প্রাথমিক ডিজাইন নিয়ে বসতে চায়। এরা যখন এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তখন আর ফেলে রাখা কেন! হঠাৎ শান্তনুর মনে হলো পিছে কেউ দাঁড়িয়ে। গা টা একটু শির শির করে উঠলো। সেই গেটের মাসাই। নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। শান্তনুর কেন যেন মনে হ’লো, সুশীলা আর মাসাইয়ের চোখে চোখে কথা হ’লো। ‘নাঃ! সত্যিই বয়েস হয়ে যাচ্ছে।’ ভাবতে ভাবতে শান্তনু শুনলো সুশীলা বলছে, ‘জানেন তো, মাসাইরা নিয়মিত দুধ আর রক্ত খায়।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন