দেবব্রত সান্যাল
দার এস সালাম শুধু তানজানিয়া নয়, সমস্ত পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শহর। কিন্তু তানজানিয়ার রাজধানী দোদোমা। অনেকটা পথ, দুটো গাড়ি নেওয়া হলো। প্যাটেল আর সুশীলা সাথে আছে। জল, কিছু খাওয়ার ও উঠলো।
দার এস সালাম সমুদ্রের ধারে, তাই না শীত না গরম। কিন্তু সাইট ঠান্ডা হতে পারে। এ খবরটা শান্তনুর মোটেই জানা ছিলো না। এখন তো আর কিছু করার নেই। জানলে সাথে অন্তত একটা জ্যাকেট নিয়ে আসতো। প্যাটেল, সুশীলা দিব্যি তৈরি হয়ে এসেছে। এদের এই দলবাজিতে শান্তনু একটু ক্ষুণ্ন হলো।
‘জানেন স্যার এখন থেকে সবাই মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো আর জাঞ্জিবার আইল্যান্ড দেখতে যায়।’
‘এবার তো আর সময় হবে না। সামনের বার নিশ্চয়ই যাবো।’
ওরা বেরিয়ে যেতেই দু’জন স্বাস্থ্যবান কালো জ্যাকেট পরা লোক হোয়াইট স্যান্ডের রিসেপশনে এসে দাঁড়ালো।
‘আপনাদের রিসোর্টে কোনো ইন্ডিয়ান এসেছে?’
‘এসব খবর দেওয়ার অনুমতি আমাদের নেই।’
‘এসব খবর নেওয়ার অনুমতি আমাদের আছে। কথা না বাড়িয়ে কাজের কথা বলুন।’
‘আজ সকালে চেক আউট করে গেছে।’
‘ছবিটা দেখুন। এই কী না?
‘হ্যাঁ, এই।’
‘হতেই হবে, কোথায় গিয়েছে?’
‘আমি জানি না।’
‘আমি জানি, যদি তুলে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি, তাহলে হয়তো আপনারও মনে পড়তেও পারে। কী বলেন মিস?’
‘মাগাঙ্গা মাটিটু।’
‘এইতো মনে পড়েছে, এখন সময় নষ্ট না করে ওর পাসপোর্টের কপি, বাকি সবার নাম ধাম আর গাড়ির নম্বর গুলো দিয়ে দিন।’
সোজা বেরিয়ে গিয়ে ওদের গাড়ি দুটো হাইওয়ে ধরলো। সুশীলা, শান্তনুর গাড়িতে আর প্যাটেল অন্য গাড়িতে। এখানে রাস্তার নাম এ ৭। শান্তনুর চোখে পড়লো সুশীলার গায়ে একটা বাহারি টি শার্ট, তাতে লেখা কিবোকো। কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে, জিজ্ঞেস করলো, ‘কিবোকো? মানে কী হলো।’
‘হিপ্পো স্যার।’ হৃদয়ে হিপ্পো নিয়ে ঘুরছে, কী দিনকাল পড়েছে!
এখানে একটা ব্যাপার খুব কড়াকড়ি। বড়ো রাস্তার ধারে ঝোপে পুলিশ লুকিয়ে থাকে। ঘন্টায় পঞ্চাশ কিলোমিটারের বেশি জোরে গাড়ি চালালেই ব্যাস, ধরে জরিমানা। এখানে ড্রাইভারদের মধ্যে কী দারুণ বোঝাপড়া। যদি একজনের জরিমানা হয়, সে তখন যেতে যেতে হাতের ভঙ্গিতে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়িদের আগামী বিপদ থেকে সাবধান করে দেয়। কাঁকড়ার অভ্যেস নেই।
প্যাটেল অন্য গাড়িতে আছে, ওর গাড়ি এরিক বলে একজন চালাচ্ছে। মাঝ বয়েসী, স্বাস্থ্যবান, খুব কম কথা বলে। একটা রাগি রাগি ভাব আছে। শান্তনুদের গাড়ি চালাচ্ছে ম্যাক, একেবারেই অল্প বয়েসী। একটু বেশিই ছটফটে। সুশীলা টুকটাক কথা বলতে বলতে চলেছে। বেলা বারোটা নাগাদ মোরোগোরো বলে একটা জায়গায় এসে জানা গেল, গাড়িটা এখন মিকুমি অভয় অরণ্যের ধার ঘেঁষে যাবে। যেতে যেতে জানলা দিয়ে গলা বের করে শান্তনু, ঐরে জিরাফ, জেব্রা নাকি? করে গেল। সুশীলা হেসে বললো, ‘স্যার আপনি বন্যপ্রাণী দেখতে ভালোবাসেন তাই না। প্যাটেল স্যার বলছিলেন ফেরার পথে মিকুমিতে ঢুকবেন।’
অভয় অরণ্যের শেষে গাড়ি দুটো থামলো একটা খাবার জায়গায়। নামটা বেশ, সেভিয়ার। গাছ পালা নিয়ে জায়গাটা বেশ ভালো। একটা হলঘরে বুফে সাজানো রয়েছে। পাশে খাদ্য বস্তুর নামও লেখা আছে। সব খাবারের টুকরোই বেশ বড়ো বড়ো। এতে নিরীহ জিনিসও, সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। প্যাটেল বাড়ি থেকে দিস্তে দিস্তে রুটি এনেছে। আচার, ঝুরি ভাজা, এসব দিয়েই লাঞ্চ সারার ইচ্ছে। শান্তনু না না করেও একটা রুটি নিলো, আর স্থানীয় খাবার, ভাত - তরকারি, মাছ। কিসের তরকারি, কী মাছ সেসব নিয়ে শান্তনু আর মাথা ঘামালো না।
‘স্যার, এখন থেকে তানজানাইট নিয়ে যাবেন না?’
সুশীলার প্রশ্নে শান্তনু নড়ে চড়ে বসলেন। তানজানাইট নামটাই প্রথম শুনলেন। নাম শুনে স্থানীয় পাথর মনে হয়, কিন্তু আর কিছুই জানা নেই শান্তনুর।।
‘সেটা আবার কী?’
‘তানজানাইট এখানকার বিশেষ দামি পাথর। প্রায় হিরের মতো দামি। নীল রঙের হয়। খুব সুন্দর। নিয়ে যান, ভাবীজি খুব খুশি হবে।’
হিরে তো জিরে নয়, হট করে কেনা যায় না। আর হিরে তো দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো পাওয়া যায়। সেটা বলতে সুশীলা হেসে উঠলো। ‘হিরে না স্যার, এটা শুধু এখানেই পাওয়া যায়। আবিষ্কারই তো হ’লো ষাটের দশকের শেষে।’
‘অনেক দাম হবে।’
‘না স্যার, দুই আড়াই হাজার ডলারে ঠিক ঠাক গয়না চলে আসবে।’
‘কাষ্টম টাষ্টম ঝামেলা করবে না? মানে আমি কোনো আইন ভাঙতে চাই না।’
‘না না স্যার, আমরাই কী আইন ভাঙতে চাই? আপনি একবার হুকুম করবেন, আমি আপনার সঙ্গে গিয়ে পছন্দ করিয়ে দেব।’
সুশীলা মোবাইলের স্ক্রিনে কিছু ছবি দেখালো। শান্তনুর গয়নাগাটিতে কোনো উৎসাহ নেই, তবু দেখে দিব্য লাগলো। শান্তনু ভেবে রেখেছেন ভালোয় ভালোয় কাজটা হয়ে গেলে, কিছু শপিং করে নিয়ে যাবেন। তবে আগের কাজ আগে।
ইরিঙ্গার আগে পথে অনেক বাওবাব গাছ; কান্ডটা মোটা, তারপর অনেক শাখা প্রশাখা। একটাও পাতা নেই। শান্তনুদের গাড়িটা থামলো। সুশীলা বললো, ‘জানেন তো স্যার, বাওবাব গাছ হলো কল্প বৃক্ষ। আপনি কী চাইবেন।’
শান্তনু হেসে বললো, ‘গাছ ভর্তি পাতা হয়ে যাক।’
সুশীলা কিন্তু বেশ কিছুটা হেঁটে গাছের সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলো। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে কিছু প্রার্থনা জানালো আর তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণামের মতো করলো। শান্তনু কটা ছবি তুলে রাখলো। সুশীলা ফিরে এসে গাড়িতে বসলো। শান্তনু জিজ্ঞেস করলো, ‘কী চাইলে?’
‘হয়ে গেলে ব’লবো।’
যেমন কথা ছিলো সে রাতে সাইটের থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে
একটা সরাইখানায় রাত কাটানোর ব্যবস্থা হলো। জায়গার অনুপাতে ব্যবস্থা মন্দ নয়। ঘরটা ছোট, তবে বাথরুম পরিষ্কার। এক রাতের তো ব্যাপার। শান্তনুর অত বায়নাক্কা নেই। কাল সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে প্রথম দিন কাটেওয়াক, আর পরদিন মাগাঙ্গা মাটিটু। শান্তনুর একবার মনে হচ্ছিলো, সারাটা দিন এতটাই যখন চললাম, তখন সোজা সাইটের ক্যাম্প অফিসে গিয়ে উঠলেই তো হতো। কথাটা প্যাটেলকে বললেন। প্যাটেল সে প্রস্তাব একেবারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘সামনের রাস্তাটা একটু খারাপ। অনেকটা সময় লাগবে। আর ক্যাম্প অফিসে আমাদের মতো লোকের থাকার ব্যবস্থা নেই। প্ল্যান্ট তৈরি হোক কিছু একটা ব্যবস্থার কথা ভাববো।’
গ্রেস দু’দিন আগে গডফ্রের ঘরটা গিয়েছিল। ঘরটা একদম এলোমেলো করা। কে বা কারা তন্ন তন্ন করে ঘরের ভিতর কিছু খুঁজেছে। একথাটা গ্রেসের মাথায় ঢোকে না। সবাই জানে খুনটা নোয়েল করেছে, সেই রাতের পর থেকে নোয়েল ফেরার। তাহলে গডফ্রের ঘরটা এলোমেলো করলো কে? আর যেই করে থাকুক, নোয়েল তো হতে পারে না। গডফ্রের মৃত্যু গ্রেসকে শোকের সাথে সাথে পাপবোধও দিয়েছে। তার জন্য গডফ্রেকে মরতে হলো একথাটা তার কাছে অসহ্য পীড়াদায়ক। আর সবচেয়ে বড়ো ভুল হলো, নোয়েলকে বুঝতে না পারা। কেন যে কখনো মনে হয়নি, নোয়েল এমন সাংঘাতিক একটা কাজ করতে পারে। তাহলে আগে ভাগে গডফ্রেকে সাবধান করে দিতো।
আজ রাতের রান্নার দায়িত্বটা গ্রেসের নয়। সন্ধ্যে হতেই ঝুপ করে একরাশ মন খারাপের পাথর বুকের ভিতর চেপে বসে। কখনো মনে হয় কাজের মধ্যে থাকলেই ভালো। তবু শরীর বিশ্রাম চায়। তাই গ্রেস ভাবলো ঘরে এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবে। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালার আগেই পিছন থেকে কে যেন ওর মুখ টা চেপে ধরলো।
‘গ্রেস প্লিজ। চেঁচিও না।’
নোয়েল, গ্রেস ভয়ে বিস্ময়ে প্রাণপন নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। নোয়েল তাকে মারতে এসেছে, নাকি জোর করে অধিকার করতে এসেছে।
‘গ্রেস, আমার কথা শোনো। আমি কোনো অপরাধ করিনি। গডফ্রেকে আমি মারিনি।’
নোয়েল যে মিথ্যে বলছে তাতে গ্রেসের কোনো দ্বিমত নেই, কী চায় নোয়েল? আজ গ্রেস নোয়েলকে ছাড়বে না।
‘বোঝার চেষ্টা কারো গ্রেস আমি তো সে রাতে কোথাও যাইনি। ঝগড়া হবার পর মাথা গরম ছিলো। জোসেফ এক কোণে বসিয়ে দিয়ে হাতে একটা বোতল ধরিয়ে দিলো। আমি বোতল শেষ করে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার হুঁশ ছিলো না। সে রাতে আমি গডফ্রেকে মারতে চাইলেও সম্ভব হতো না।’
গ্রেস ছাড়া পেয়ে আলো জ্বালাতে গেলো।
‘আলো জ্বালিও না। ক্যাম্পের লোকেরা আমাকে পেলে মেরে ফেলবে।’
‘আমিও তোকে মেরে ফেলবো। খুনি তুই। আমার গডফ্রেকে খুন করেছিস।’
‘ভুল গ্রেস ভুল। ক্যাম্পে কোনো গোলমাল আছে। গডফ্রে খুব এদিক ওদিক ঘুরতো। কী পেয়েছিলো, কী করেছিল জানিনা। কেউ একজন গডফ্রেকে খুন করে আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আমার নিস্তার নেই আমি জানি। তোমার জন্য আমার ভয় হচ্ছে। সাবধানে থাকবে। আবার বলছি আমি খুনি নই।’
গ্রেস কিছু করার আগেই নোয়েল অন্ধকারে মিশে গেলো।
শান্তনুর একটু শীত শীত করছে। ঘরেই রাতের খাবার খেয়ে, প্লেটটা বাইরে বের করে দিলো। যদি নিয়ে না যায় তবে সকালে বিরক্তির কারণ হবে। নতুন জায়গা, তার ওপর এতো তাড়াতাড়ি ঘুমোনোর অভ্যেস নেই। ল্যাপটপ খুলে একবার নিজের কাজটা দেখে নিচ্ছিলো। এদিক ওদিকে কিছু জানতে চেয়ে মেল পাঠানো হয়েছিল। তার জবাবগুলো দেখছিলো শান্তনু। এরপর কী করা যায়, ভেবে বের করার আগেই, দরজায় টোকা পড়লো।
‘একদম ঘুম আসছেনা স্যার। ভাবলাম রাত তো বেশি হয়নি, যাই স্যারের সাথে একটু গল্প করে আসি। কাল সকাল থেকে তো আবার অনেক দৌড়া দৌড়ি।’ (কেনো? স্যার কী ঘুমের বড়ি? না গল্প দাদুর আসর?)
সুশীলা একটা বাড়ির পোশাক পরে, চুল ছেড়ে এসেছে। দেখতে অন্যরকম, মানে ভালোই লাগছে। সুশীলা যেন কোনো অপ্সরা, ঋষির ধ্যান ভঙ্গ করতে এসেছে। এই ধ্যানের মাঝে কমার্শিয়াল ব্রেক, ব্যবসার জন্য কতটা অনুকূল জানা নেই, কিন্তু ঋষির পক্ষে মোটেই কূল নয়। (যেমন ঋষি, তার তেমনি ম্যাচিং অপ্সরা)। শান্তনুর ঘরটা বিশেষ বড়ো নয়, তার ওপর চেয়ারের ওপর ল্যাপটপ খুলে রেখেছিল, কী করবে ভেবে না পেয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে সরিয়ে রাখলো। সুশীলাকে কোথায় বসাবে ভাবার আগেই সুশীলা ওর পাশে বিছানায় বসে পড়লো। বলা নেই কওয়া নেই সুশীলা হঠাৎ ওর মোবাইল বের করে, ‘একটা সেলফি নিয়ে নি।’ বলে পট পট করে ছবি তুলে নিলো।
‘দেখুন স্যার ভালো উঠেছে না?’ বলে যখন ছবিটা দেখালো, তখন শান্তনুর রীতিমতো অস্বস্তি হলো। ছবিটা একটু বেশিই অন্তরঙ্গ, তার ওপর আবার বাড়ির পোশাকে, বিছানার ওপর। মেয়েটার কান্ডজ্ঞান একটু কম। সুশীলা কোনো ফরাসি পারফিউম মেখে এসেছে। গন্ধে একটা হালকা মাদকীয় আমেজ রয়েছে। শান্তনু নিজের কান্ডজ্ঞানটাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিলো।
‘আপনাকে আবার বিরক্ত করলাম না তো?’ এবার স্যারটা লক্ষণীয় ভাবে অনুপস্থিত।
শান্তনুর আরেকটু বেশিই শীত করছিল। কোনোমতে মুখে হাসি টেনে বললো, ‘না না, ঠিক আছে।’
‘আপনার কী শীত করছে?’
‘ওই একটু, মানে আগে থেকে জানা ছিলো না তো।’
‘একটা ছোটো ক’রে ড্রিংক নিয়ে নিন।’
মদ্যপান শান্তনুর স্বভাব নয়। কখনো কখনও নিয়েছেন, এই মাত্র।
শীত তাড়াতে অল্প ক’রে নিলে আর কী? সুশীলা যেন তৈরিই ছিলো। দরজা খুলে কাউকে কিছু বলে চটপট ব্যবস্থা করে ফেললো। শুরুটা ছোট করেই হয়েছিল। কিন্তু তারপর আর শান্তনুর বিশেষ মনে নেই। একটু আবছা আবছা মনে হচ্ছিলো, কেউ হাত ধরে টানছে। অভ্যাসবশে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু ছাড়ানো অতটা সোজা হ’লো না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন