পঞ্চম পাঠ: অনুপমা

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

'পুঁথির ভবিষ্যতবাণী কি সত্যি হয়েছিল? সত্যিই কি...'

জবাবে জিমূতবাহনের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন দেবী আনিপ্পা, 'হয়েছিল জিমূতবাহন। আমি স্বয়ং তার প্রমাণ। আমিই আদি দেবী আরাকিয়েন। মৃত্যুর দেশ থেকে ফিরে এসেছিলাম আমি কালানিল অ্যালগরিদমের অমোঘ পথ ধরে। খ্রিস্টিয় ২০১৭ সালে। অনুপমা নাম নিয়ে। দেখ...'

মিয়ারি পাহাড়ের হাতির মাথার মতো চুড়োটা এখান থেকে দেখা যায়। ছোটবেলা থেকেই এখানটা অনুপমার খুব ভালোবাসার জায়গা তাই। রাঙা ধুলোয় ছাওয়া একফালি পথ। একপাশে গভীর শালবন নেমে গেছে অনেক দূরে। অন্যদিকে মাঠ পেরিয়ে বনছাওয়া মিয়ারি পাহাড়ের দেওয়াল উঠে গেছে আকাশমুখো। সেদিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে এখন। পাহাড়ের পেছন থেকে তার কমলা আলোর ছটা চোখে পড়ে।

হাতে ধরা মোবাইল ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল তার। মায়ের ফোন। বনের ধারে বেশিক্ষণ সময় কাটালে মা রেগে যায়। আসলে বাবার ভিনদেশের চাকরি। এতবড় ফার্মহাউস, নার্শারি সব মা'কে একলা হাতে সামলাতে হয়। তার ওপরে জায়গাটাও খুব ভালো নয়। জন্তুজানোয়ার ছাড়াও, ডাকাতের উপদ্রবও লেগেই থাকে।

তবে আজকের দিনটা মা কিছুতেই তাকে বকবে না। আজ তার জন্মদিন। ফোনটা তুলে কানে লাগাল সে।

'কোথায় রে তুই? জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে ফের বসে আছিস বুঝি?'

'হ্যাঁ মা। আর একটুখানি। প্লিজ। সূর্যটা কী সুন্দর অস্ত যাচ্ছে এখান থেকে জানো? আর একটুখানি দেখে নিই।'

'হ্যাঁ দেখ। এই ঠান্ডায় খালি মাথায় পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে অসুখে পড়বি যে সে খেয়াল আছে? হ্যাঁরে অনু, এতটা বড় হলি; রাতের অনুষ্ঠানে কত মানুষজন আসবে। আমি সেই নিয়ে খেটে খেটে হেদিয়ে যাচ্ছি, আর যার জন্মদিন সে গিয়েছে...'

'ইয়ে অরিহন্ত ত্রিপাঠিজিকা বাংলা কিস তরফ পড়েগা বেটা?'

পুরনো মডেলের খোলা জিপসিটা কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছন ঘেঁষে। অনুপমা ঘুরে দেখল। জনাকয়েক মানুষ। গায়ে ভালো পোশাক-আশাক। কথাবার্তার টানে বোঝা যায় ঝাড়খণ্ড থেকে আসছেন।

'কঁহা সে আয়ে আপলোগ?'

'রাঁচি সে বেটা।'

রাঁচি! তার মানে এঁরা বাবার ছোটবেলার বন্ধুবান্ধব! জীবনের প্রথম দিকটা রাঁচিতেই কেটেছে বাবার। ইদানীং যাওয়া আসা না থাকলেও ফোনে, চিঠিতে যোগাযোগটা রাখেন। এবারে তার জন্মদিনের পার্টিতে আসবার জন্য সেখানে কয়েকজনকে নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন। বলেন, 'তোকে এইটুকু দেখেছে ওরা। এবারে আঠারো বছর হবে তোর। তাই ডাকলাম। খুশি হবে দেখিস।'

আর তারপর সেইসব করে টরে এখন নিজেই আসতে পারলেন না জন্মদিনের অনুষ্ঠানে! বাবাটা এমন কাজপাগল মানুষ! ভালোবাসেন তাকে খুব। কিন্তু সময় দিতে পারেন না একদম। চিরটাকালই তো হাইনলিমের ওই কোম্পানিতে কাটালেন। মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসেন। তারাও ছুটিছাটায় চিন-এ যায় বাবার কাছে। তবে ওই পর্যন্তই। ছোটবেলা থেকে বাবাকে ঠিক ক'দিন বাড়িতে দেখেছে সে-কথা হাতে গুণে বলে দিতে পারে অনুপমা। মা খুব রেগে গিয়েছিল বাবা শেষমুহূর্তে নিজের প্রোগ্রামটা ক্যানসেল করায়। শেষে অনুপমাই বুঝিয়েসুজিয়ে মা'কে ঠান্ডা করে।

ড্রাইভারের পাশে বসা বয়স্ক মানুষটা তার দিকে তাকিয়েছিলেন। কাছে গিয়ে অনুপমা তাঁর পায়ে হাত ছোঁয়াল, 'আমি অনুপমা। অরিহন্ত ত্রিপাঠীর মেয়ে। আজ আমার জন্মদিন।'

'জিতা রহো বেটা। হাঁ মুঝে পতা হৈ। খবর মিল গয়া থা। ইসি লিয়ে হি তো আজ আয়া ইস তরফ। আও, গাড়ি মে বৈঠো।'

আকাশের দিকে একবার ঘুরে দেখল অনুপমা। এখনও মিনিটদশেক লাগবে ঠিক রঙটা আসতে। তারপর ওর একটা ছবি তুলে নিয়ে বাবাকে মেল করতে হবে। বাবা তার তোলা ছবি পছন্দ করে খুব।

'আপনারা সোজা এগিয়ে যান। ওই যে মিয়ারি পাহাড়টা দেখছেন, ওকে বেড় দিয়ে ওপাশে চলে গিয়ে সামনেই দেখতে পাবেন মোরিবাগ এস্টেট। দশ মিনিট লাগবে। মা বাড়িতে আছেন। আমি একটু বাদে আসছি। মাকে বলবেন...'

কথা বলতে বলতেই গাড়িটার ইঞ্জিন ফের গর্জন করে উঠেছে। তারপর লাল ধুলো উড়িয়ে তা এগিয়ে গেল মিয়ারি পাহাড়কে বের দিয়ে এগিয়ে যাওয়া রাস্তা ধরে।

'অনু...'

বাবার প্রাইভেট নম্বরটা পর্দায় ভাসছিল। এ-নম্বরটা শুধু বাড়ির জন্য। অনুপমা তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরল, 'তোমার রেগুলার ফোনটার কী হল বাবা? ফোন করলাম তা বলে সুইচ অফ। অফিসে নেই তুমি?'

'উঁহু। বেরিয়েছি একটু। তোর মা'কে পাচ্ছি না। দিবি একবার?'

'আমি বাড়িতে নেই তো!'

এখানটায় রাস্তা একেবারে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে এগোচ্ছে। মাথার ওপর ঝুঁকে পড়া তেন্দুয়াঘাটির টিলার পাথরগুলোর তলা দিয়ে যেতে-যেতেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল অনুপমা। এবড়ো-খেবড়ো পথে আধো অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কথা বলাটা কঠিন।

'সন্ধেবেলা বাড়িতে নেই, তাহলে কোথায় গেছিস?

'মিয়ারি। ছবি মেল করলাম যে এখুনি! দেখনি?'

'হুঁ।'

'দারুণ, না?'

'দারুণ। কিন্তু এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। কতদিন বলেছি অন্ধকারে বনপাহাড়ে...'

'বাবা। একদম বকবে না বলছি। আজ আমার জন্মদিন।'

'ভয় লাগে রে। আমি এলাকায় থাকি না। তাছাড়া জায়গাটাও তো খুব ভালো নেই এখন।'

'ওসব ভয় একদম পেয়ো না তো! আমি তো দিব্যি কলেজ যাই একা একা রোজ। ও বাবা জানো? কলেজে না, কালকে...'

সন্ধে নেমে এসেছে অনেকক্ষণ। পাহাড়ি জায়গা। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। ঠান্ডা হাওয়া ছেড়েছে। শীত লাগছিল অনুপমার। কলকল করে সে কত কথা বলে যায় তার বাবার সঙ্গে।

'এবারের জন্মদিনে তুমি আমাকে কী গিফট দিচ্ছ তা কিন্তু এখনো বলনি বাবা।'

জবাবে হাসির শব্দ ভেসে এল একটা, 'সারপ্রাইজ। ঠিক সময়ে জানতে পারবি!'

'উঁহু তা হবে না। ও বাবা, এখুনি, এখুনি!'

কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎ থেমে গেল অনুপমা। অন্য একটা কল ঢুকছে ফোনে। মায়ের নম্বর...

এইবার কপালে দুঃখ আছে। কলটা নেবার আগে মোবাইলের ঘড়ির দিকে দেখে নিল সে। সাতটা দশ। মায়ের আগের ফোনটা এসেছিল ঠিক ছ'টায়। কী করে যে এতটা সময়...

'উফ আসছি, আসছি। তুমি না...'

এই অবধি বলেই হঠাৎ থেমে যেতে হল তাকে। ইয়ারপিসে মায়ের গলাটা একেবারে অন্যরকম লাগছে। ভয় পাওয়া, কান্নাজড়ানো গলাটা বারবার বলে চলেছে, 'তুই কোথায়? ওরা একটা খোলা জিপসিতে এসে...'

'জিপসিতে এসে!! কী হয়েছে মা?'

'সব নিয়ে গেল। পাঁচটা লোক ছিল। বলল রাঁচি থেকে আসছে। আমি ভাবলাম তোর বাবার দিকের লোকজন কেউ হবে! তারপর...

'ওদের সঙ্গে আমস ছিল। তোর সব গয়নাগাঁটি যা এনে রাখা ছিল...সব...আমার ডান হাতটা মুচড়ে...'

হঠাৎ অনুপমার মাথার মধ্যে চিড়িক দিয়ে উঠল একটা। না, ভয় নয়। একটা তীব্র অচেনা রাগ আগুনের মতো তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে যাচ্ছিল। লোকটার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছে সে খানিকক্ষণ আগে। তাকে সে বাবার বন্ধু ভেবেছিল। অথচ...ওরা তার মাকে আঘাত করেছে! ওরা...

'কোনদিকে গেছে ওরা মা?'

কথাগুলো কেমন জড়িয়ে আসছিল তার। হঠাৎ গলার মধ্যে কেমন একটা অচেনা খসখসে একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে যেন।

'যে রাস্তায় এসেছিল সেদিকেই ফিরে গেল। তুই কোথায়? রাস্তায় নেই তো?'

হাত থেকে ফোনটা হঠাৎ খসে পড়তে গিয়েছিল অনুপমার। চোখের সামনে সবকিছু কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে যেন। আর, তারপরেই সে খেয়াল করল, ফোনটা মাটিতে পড়ে যায়নি! আঙুলের বাঁধন ছেড়েও হাতের তেলোয় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অসংখ্য সূক্ষ্ম রোঁয়ার মধ্যে ভারি অদ্ভুতভাবে আটকে আছে যন্ত্রটা। সেখান থেকে তখনো মায়ের গলাটা ভেসে আসছিল খুব আস্তে আস্তে।

শরীরের মধ্যে ঝড়ের মতো একটা বদল উঠে আসছিল তার। তীক্ষ্ন হয়ে ওঠা শ্রবণশক্তি পাহাড়ের গায়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাঁপুনিগুলোকে টের পাচ্ছে। এগিয়ে আসতে থাকা গাড়িটা এখনো পাহাড়ের অন্যধারে। কিন্তু রাস্তার সঙ্গে তার চাকার ঘষার শব্দ, তার ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন, বাতাসে তার জ্বালানির হালকা পোড়া গন্ধ, সব এসে পৌঁছোচ্ছিল তার তীক্ষ্ন হয়ে ওঠা জান্তব ইন্দ্রিয়ে।

আর তারপর সেই অন্ধকারের মধ্যে একটা তীক্ষ্ন ক্র-র-র-র শব্দ উঠে এল তার গলা থেকে। হঠাৎ বিরাট একটা লাফে ছিটকে গিয়ে, শরীর ঘিরে বের হয়ে আসা আটটা অতিকায় রোমশ পা দিয়ে পাহাড়ের দেওয়াল আঁকড়ে ধরে, তরতর করে বেশ খানিকটা উঠে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল জীবটা।

স্বাভাবিক অবস্থায় এমনটা ঘটলে হয়তো ভয়ে অবশ হয়ে যেত অনুপমা। কিন্তু বুকের ভেতর গড়ে উঠতে থাকা একটা গভীর রাগ তখন তাকে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। ওরা তার মাকে আঘাত করেছে! ওরা...

মাথায় একটা পরিকল্পনা গড়ে উঠছিল তার। আটকাতে হবে ওদের। সহজ কায়দা। আস্তে আস্তে আট পায়ে ভর করে পাহাড় থেকে রাস্তার ওপরে ফের নেমে এল সে। অন্ধকারের ভেতর, প্রকৃতিদত্ত কোন প্রবৃত্তিতেই যেন পথটার এপাশ ওপাশ করে মোটা, স্টিলের চেয়েও শক্ত সুতোর জাল ছড়িয়ে দিচ্ছিল অতিকায় জীবটা। বাঁকের আড়ালে জিপের ইঞ্জিনের গুরগুর শব্দটা ততক্ষণে অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবছা, হলদেটে আলোর আভাসটা ক্রমশ বেড়ে উঠছিল সেদিক থেকে।

কয়েকমুহূর্তের মধ্যে কাজ শেষ করে ফের পাহাড়ের গায়ে ফিরে গেল সে। অন্ধকার পাথরের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে দিয়ে এবার অপেক্ষার পালা। গাড়িটার হেডল্যাম্পের আলোর জোড়া ফলা অন্ধকার চিরে এগিয়ে আসছিল...

...ওরা দেখতে পেয়েছে। হেডলাইটের জোরালো আলোয় রাস্তা জুড়ে চিকমিক করতে থাকা জালগুলোকে নজর করেছে। নিজেদের শক্তির ওপর বড় ভরসা ওদের। ফোর্থ গিয়ারে তিরবেগে ছুটে আসছে সেই জালের দিকে।

ছুটন্ত গাড়ির ধাক্কায় জালের সুতোগুলো স্প্রিংএর মতো অনেকটা এগিয়ে গেল হঠাৎ। পাথরে চাকা ঘষটে থেমে গেছে গাড়িটা। কী ঘটছে বুঝতে না পেরে ক্রমাগত অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ তুলছিল ওরা। নুড়িপাথরের একটা স্রোত চারধারে ছড়িয়ে দিয়ে পেছনের চাকাদুটো বনবন করে ঘুরে উঠছে বারবার।

আর ঠিক সেই মুহূর্তটায় পাশের পাহাড়ের অন্ধকার থেকে তীক্ষ্ন ক্র-র-র-র শব্দটা হঠাৎ সতর্ক করে তুলল গাড়ির অন্য আরোহীদের। চারটে আগ্নেয়াস্ত্রের নল ঘুরে গেছে শব্দটার উৎসের দিকে।

অনুপমা লাফ দিল। প্রায় কুড়ি ফুট ওপর থেকে নিখুঁত ঝাঁপে তার আটটা পা এসে গাড়িটার শরীরকে ঘিরে স্থির হয়েছে। ড্রাইভারের পাশে তার মায়ের একটা শাড়ি পুঁটুলি করে রাখা। দ্রুত কাজ করছিল অনুপমা। না। নিজের জন্মদিনে কারো প্রাণ সে নেবে না। তার সদ্য জেগে ওঠা নতুন চেতনা তাকে বলে দিয়েছিল তার দেহে তৈরি হওয়া দু'ধরনের বিষের খবর। শিকারকে বশ করবার বিষ, আর হত্যাবিষ! শক্তিশালী পা'গুলোর বাঁধনে ধরে রাখা হতভম্ব মানুষগুলোর ঘাড়ের কাছে তার হুল থেকে সে বিদ্যুতবেগে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল একফোঁটা করে চেতনানাশক বিষ।

কয়েক সেকেন্ড বাদে চেতনাহীন মানুষগুলোকে গাড়ির ভেতরেই ফেলে রেখে উঠে এল জীবটা। রাস্তার দু'পাশের গাছপালার গা থেকে জালের বাঁধন সরিয়ে দিতে বেশি সময় লাগল না তার। সে কাজ শেষ করে, গয়নার পুঁটুলিটা তুলে নিয়ে পাহাড়ের গায়ে লাফিয়ে উঠল সে। তারপর তিরের মতো ধেয়ে গেল পাহাড়ের গা বেয়ে উল্টোদিকের মোরিবাগ এস্টেটের উদ্দেশ্যে।

চলতে চলতেই ফের স্বাভাবিক চেহারায় ফিরে আসছিল অনুপমা। ঠিক কী যে ঘটে গেল গত দশ মিনিটে তা সে নিজেও বোঝেনি ভালো করে। কিন্তু এটা ঠিক যে মাকে এসব কথা এখুনি খুলে বলা যাবে না। আগে তার নিজের বুঝে নেওয়া প্রয়োজন ব্যাপারটা। গায়ের পোশাক আশাকগুলো ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে একেবারে। সেদিকে দেখে একটু হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। এর ব্যাখ্যা দেওয়াটা কঠিন হবে না তার পক্ষে।

যতটুকু বিষ সে দিয়েছে তাতে লোকগুলো বড়জোর আধঘণ্টাখানেক অজ্ঞান থাকবে। তারপর, জ্ঞান ফিরে এলে হারানো লুটের মাল খুঁজে দেখবার সাহস ওদের না হওয়াই স্বাভাবিক। তার যুক্তি বলছিল, পালাবে ওরা। প্রাণপণে পালিয়ে যাবে এই এলাকা থেকে। মোরিবাগের দিকে দ্বিতীয়বার পা দেবার সাহস আর হবে না ওদের। পাহাড়ের নীচের অন্ধকারে কী দেখেছে ওরা সে কথা যদি কাউকে বলেও তাহলে কেউ যে তা বিশ্বাস করবে না সে ব্যাপারে অনুপমা নিশ্চিত, কারণ তার নিজেরও তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না ব্যাপারটা।

'কত করে বলেছি আপনাকে মিসেস ত্রিপাঠি, অনুষ্ঠানের দিন অ্যাট লিস্ট দুজন কনস্টেবল পোস্ট করে দি। লোকাল থানাকে বলে দিলেই তো...'

ডিএসপি অমিত চৌবেও নিমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন। সাবডিভিশন অফিসে আছেন। একটু রাতের দিকে কাজ সেরে তারপর আসবেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে হঠাৎ রীণার এমার্জেন্সি ফোন পেয়ে অফিস ছেড়ে সন্ধের মধ্যেই পুলিশের দল নিয়ে মোরিবাগ পৌঁছে গেছেন। উপস্থিত তিনি পুরো ধড়াচূড়ায় পাক্কা পুলিশকর্তা।

'আসলে, এতকাল এখানে আছি। এ বাড়িতে এমন কিছু হতে পারে তা কখনো ভাবিনি। কী যে হয়ে গেল!' রীণা ত্রিপাঠীর গলায় তখনও কাঁপুনির স্পষ্ট ছোঁয়া। ডানহাতের ব্যান্ডেজটার ওপরে অন্যমনস্কভাবে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, 'গয়না ফিরে পেয়েছি সে বড় কথা নয় অমিত, মেয়েটা যে আমার বেঁচে ফিরেছে এই ঢের। এখন ডাকাতগুলো যদি ধরা পড়ত তাহলে একটু নিশ্চিন্ত হতাম।'

'সে হবে'খন। যাবে আর কোথায়? সবক'টা পেট্রল ভ্যানকে অ্যালার্ট করে দেয়া আছে গাড়ির ডেসক্রিপশান দিয়ে। কিন্তু ম্যাডাম, গেস্টরা একে একে এসে যাচ্ছেন। মিসহ্যাপটার কথা ভুলে গিয়ে আপনি বরং অনুষ্ঠানটা নিয়ে ভাবুন এখন। কয়েকটা ক্রিমিনালের জন্য আমাদের অনুপমার বার্থ ডে পার্টি বন্ধ হয়ে গেলে অরিহন্তের সামনে বড় লজ্জায় পড়ে যাব যে। আমি বাড়ির সামনে গার্ড পোস্ট করে দিয়ে একবার লোকাল থানায় যাচ্ছি। যাবার আগে অনুপমার সঙ্গে একবার একটু দেখা করে যেতাম। দু'একটা প্রশ্ন করবার ছিল।'

রীণা ত্রিপাঠী হাসলেন একটুখানি। অমিত নিজে যখন এসে পড়েছে তখন ব্যাপারটা নিয়ে তিনি আর ভাববেন না। মাথা নেড়ে বললেন, 'যান না! ভেতরবাড়িতে আছে। স্নানটান করে এতক্ষণে একটু ফ্রেশ। তবে দেখবেন, পুলিশি জেরায় ফেলে...'

'আরে না না,' অমিত হাসলেন একটু, 'জাস্ট কয়েকটা প্রশ্ন করে নেব শুধু।'

'মায়ের ফোন পেয়েই মাথাটা ঘুরে উঠেছিল হঠাৎ আংকল। ওই তেন্দুয়াঘাটির টিলাটার ওপর থেকে রাস্তার দিকে নেমে আসছি তখন। ব্যালেন্স হারিয়ে রাস্তার ওপর এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ব্ল্যাক আউট মতন হয়ে গিয়েছিল একটা।'

'কতক্ষণ ওভাবে ছিলে কোনো আন্দাজ দিতে পারবে?'

ভুরু কুঁচকে একটু ভাবল অনুপমা। তারপর বলল, 'বোধ হয় পনেরো বিশ মিনিট।'

'বেশ। তারপর?'

'তারপর হঠাৎ খেয়াল হল চড়া আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। চোখ খুলে দেখি জিপসিটা প্রায় আমার ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে। ইঞ্জিন নিউট্রালে রাখা। লোকজনের কোনো সাড়াশব্দ নেই। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি লোকগুলো ওর মধ্যে এলোমেলো পড়ে আছে। জ্ঞান নেই। সামনের সিটে গয়নার পুঁটুলিটা পড়ে ছিল। সেটা তুলে নিয়ে...'

তার কথাটা শেষ হবার আগেই অমিত চৌবের ফোনটা বেজে উঠল হঠাৎ।

'এক মিনিট,' বলে ফোনটা কানে ধরে তাড়াতাড়ি ঘরের অন্যদিকে চলে গেলেন অমিত। কয়েক মিনিট বাদে ফের যখন অনুপমার কাছে ফিরে এলেন, তখন মুখে হাসি ফুটে উঠেছে তাঁর।

'জিপসিটাকে এখান থেকে একুশ কিলোমিটার দূরে রাঁচি রোডের ওপর ধরা হয়েছে অনুপমা। এখন মোরিবাগ থানায় নিয়ে আসা হয়েছে ওদের। প্রবাবলি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে রাঁচি রোডে উঠেছিল। জিপের বনেট আর সামনের গার্ডে বেশ খানিক মাকড়সার জাল লেগে ছিল এদের। অস্বাভাবিক মোটা জাল। তাছাড়া লক আপে ঢোকাবার আগের মেডিক্যাল টেস্টেও কিছু অদ্ভুত ফল এসেছে।

'তবে রাতে তো আর কিছু করা যাবে না। আজকের মতো আটকানো থাকুক। কাল সকালে খানিক জিজ্ঞাসাবাদ করলেই গোটা প্লটটা বেরিয়ে আসবেখন।'

বলতে বলতেই পুলিশি হাবভাব ছেড়ে হঠাৎ বেশ হাসিখুশি হয়ে উঠলেন অমিত চৌবে, 'কিন্তু এখন আর একদম ওসব কথা নয়। আমি আর কোথাও যাচ্ছি না। একেবারে অনুষ্ঠান শেষ করিয়ে তারপর...'

'আন্টি আসবেন না তাহলে?' হঠাৎ অনুপমা মুখ তুলে তাকাল তাঁর দিকে।

'আসবে আসবে! আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমাদের অনুপমাদেবীর জন্মদিন বলে কথা! গিফটটা তো আন্টির কাছেই আছে। তোমার সঙ্গে ও নিয়ে কী তার কথাবার্তা হচ্ছে ক'দিন ধরে সে আমি জানি না নাকি, অ্যাঁ?'

হাসতে হাসতেই অনুপমার মাথায় হাতটা একবার বুলিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন অমিত চৌবে। অরিহন্তের সঙ্গে অনেক দিনের পরিচয় তাঁর। রাঁচি থেকে এদিকে এসে যখন সে ফার্মহাউসটা কিনে পরিবারকে নিয়ে সেটল হয়েছে সেই তখন থেকেই আলাপ। অমিত তখন সদ্য চাকরিতে ঢুকেছেন।

পেছন থেকে তীক্ষ্ন দুটো চোখ মেলে ধরে অনুপমা তাঁর দিকে দেখছিল। মাথার ভেতরে জেগে ওঠা ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে একটা সতর্কবার্তা দিয়ে চলেছে তখন বারবার! গাড়ির বনেটে মাকড়সার জাল! ডাক্তারি পরীক্ষায় লোকগুলোর রক্তে মাকড়সার বিষের প্রমাণ পাওয়া অসম্ভব নয়।

না। এদের জবানবন্দি দিতে দেওয়া চলবে না এই মুহূর্তে। কী ঘটছে সেটা প্রথমে ভালো করে বুঝতে হবে তাকে। তার আগে, এরা কী দেখেছে বা কতটা দেখেছে সে কথা কাউকে জানতে দেওয়া ঠিক হবে না। যা করবার আজ রাতের মধ্যেই...

'বন্ধুরা, আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। অমিত, তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না। তুমি আমার বন্ধু। বন্ধুর মতোই আমার অনুপস্থিতিতে ওদের পাশে দাঁড়িয়েছ তুমি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমার অনুপমা মায়ের জন্মদিনটা শেষ অবধি আনন্দেই কাটছে।'

বাগানের একপাশে বসানো ল্যাপটপের পর্দায় ফুটে ওঠা অরিহন্তের চেহারায় দৃশ্যতই বিধ্বস্ত ভাব। রীণার কাছে ফোনে খবরটা পাবার পর থেকেই ঘনঘন স্কাইপ-এ যোগাযোগ রেখে চলেছেন তিনি বাড়ির সঙ্গে। আর অবশেষে অনুষ্ঠানটা ভালো করে চলতে শুরু করবার পর মুখে একটুখানি হাসি ফুটে উঠেছে তাঁর।

পর্দার সামনে রাখা বিরাট চকোলেট কেকটা ইংরিজি ১৮ সংখ্যাটার আদলে তৈরি। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছেন অতিথিরা। কেকের ওপর জ্বলতে থাকা মোমবাতিগুলো এইবার ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল অনুপমা। জরির কাজ করা লম্বা গাউনটা চমৎকার মানিয়েছে তার ধারালো চেহারায়।

সব্বাই মিলে চিরচেনা সেই জন্মদিনের গান গাইছিলেন অতিথিরা। তাঁদের মাথার ওপর তারাভরা আকাশ ঝুঁকে ছিল। সেই গানের মধ্যেই ছুরিতে কেকের একটা টুকরো কেটে তুলে পর্দায় তার বাবার ছবিটার দিকে তুলে ধরল অনুপমা।

হাসছিলেন অরিহন্ত। হাসতে হাসতেই হঠাৎ বললেন, 'এ-যাত্রা দেখেই সুখ করে নিলাম। কিন্তু মার্চে দেশে ফিরে তোর মায়ের জন্মদিনেও এই কেকটাই ফের অর্ডার দেব, বুঝলি?'

'মার্চে? কিন্তু তুমি যে বললে দু'সপ্তাহ বাদে আসছ?' রীণার ভ্রূদুটো কুঁচকে উঠল একবার।

অরিহন্ত মাথা নাড়লেন, 'না। এদিককার পাট গোটাতে আরেকটু সময় লেগে যাবে আমার। ওর আগে...'

'পাট গোটাতে! মানে?'

অরিহন্ত হাসছিলেন, 'আমার মেয়ের সতেরো পেরিয়ে আঠেরোয় পা দেওয়া উপলক্ষে আমি তাকে একটা দারুণ সারপ্রাইজ গিফট দিতে চাই রীণা। সেটা হল, আমি দেশে ফিরে আসছি। ছুটি নিয়ে নয়। হাইনলিম-এর পাট গুটিয়ে। আমার নিজের দেশে, আমার মেয়ের কাছে।'

'পার্মানেন্টলি?' অনুপমার যেন বিশ্বাস হতে চাইছিল না।

'হ্যাঁ রে মা। আর পরের চাকরি নয়। দেশে ফিরে নিজের আলাদা ব্যাবসা শুরু করবার কথা কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম। আজকের ঘটনাটার পর ডিসিশানটা নিয়েই নিলাম। প্রথম-প্রথম প্রচুর ঘুরে বেড়াতে হবে দেশ জুড়ে। কিন্তু তবু বাড়িতেই তো থাকব! বল!'

খুশিতে অনুপমার গলায় স্বর বেরোচ্ছিল না। খানিক বাদে চোখের জলের ফোঁটাদুটো মুছে নিয়ে সে ধরা গলায় বলল, 'থ্যাংক ইউ বাবা। আমার জন্মদিনের বেস্ট গিফট এটা।'

স্কাইপ সংযোগ কেটে দিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেললেন অরিহন্ত। রাত বেড়েছে। দক্ষিণ চিনের হাইনলিম শহরের একপ্রান্তে দাঁড়ানো উধীশের গুহামন্দিরের এই ঘরে এখন কেবল তাঁরা দু'জন।

'উধীশদেব সহায় হয়েছেন অরিহন্ত,' মাথা নাড়ছিলেন ঔধীশপ্রধান ঝাও, 'তোমার পরিবারের ওপর এই আক্রমণ দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু তা নাহলে এভাবে, কারো কোনো সন্দেহ তৈরি না করে দেশে ফিরে যাবার সুযোগটাও তোমার গড়ে উঠত না। কিন্তু মার্চ কেন? তোমার এখনই দেশের দিকে রওনা হওয়া উচিত হবে।'

'আরো কিছু সময় লাগবে ঝাও,' মাথা নাড়লেন অরিহন্ত ত্রিপাঠী, 'বাইরের দুনিয়ায় আমার দীর্ঘকালের পরিচিতি এ-শহরের প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট এগজিকিউটিভ হিসেবে। হঠাৎ করে আমি অদৃশ্য হলে তাতে কিছু সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া...'

'তাছাড়া...কী?'

'শিকারে যাবার আগে এই দ্বিরূপা রাক্ষসী আরাকিয়েনের বিষয়ে আরো তথ্য আমার দরকার হবে। এই শতাব্দির শুরুতে রাক্ষসীর পুনর্জন্ম ভারতের বুকেই হয়েছে তা আমরা জানি। ভারতীয় ঔধীশ মঠের ধ্বংস হওয়া থেকে এ-ও ধরে নেয়া যায় যে উপমহাদেশে আরাকিয়েন শক্তি সঞ্চয় করছে। লক্ষণগুলো দুশ্চিন্তার। কিন্তু তবু, তার সন্ধানে যাবার আগে কিছু খুঁটিনাটি তথ্যের প্রয়োজন হবে আমার। এতবড় দেশের ঠিক কোন এলাকায় তার পুনর্জন্ম হয়েছে? কেমন দেখতে তার মানুষ রূপ? কোনবিশেষ ক্ষমতা তার আছে, যা আমরা এখনও জানি না?

'আর, এই তথ্যগুলো পেতে হলে প্রথমে আকসাই চিনে লুকিয়ে থাকা আরাকিয়েনের মানসপুত্র, আমাসাদোমের পুঁথির রচয়িতা জিরিয়েন ওরফে সাধক রাবটেনের সন্ধান আমাদের বের করতে হবে ঝাও।'

'কিন্তু, সেখানে গত কয়েক শতাব্দি জুড়ে তার সন্ধানে সেখানে আমার পাঠানো একাধিক অভিযান...'

'ব্যর্থ হয়েছে। আমি জানি। কিন্তু এবারে আমরা ব্যর্থ হব না। এ-কাজের জন্য সঠিক মানুষ পাওয়া গেছে শারণিক।'

ঝাও তাঁর পুঁতির মতো চোখদুটো তুলে চিন্তিতভাবে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন অরিহন্তের দিকে, 'শারণিক! সতেরো বছর আগে, রাক্ষসীর পুনর্জন্মের লগ্নে একবার তোমাকে বাদ দিয়ে তার হাতে আমি ভারতবর্ষের বুক থেকে আরাকিয়েনকে নিশ্চিহ্ন করবার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তাতে সে ব্যর্থ হয়েছে। এবারে ফের এই নতুন দায়িত্ব তার হাতে দেবার বিষয়ে আমি...'

মৃদু হাসলেন অরিহন্ত, 'আরাকিয়েনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে 'নিশ্চিত' শব্দটার কোনো অর্থ হয় না ঝাও। আজ শারণিক এখানে ফিরে আসবার পর আপনিও তাকে পরীক্ষা করেছেন। তার আনুগত্য প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। মানছি, আরাকিয়েন বাহিনীর হাতে ভারতীয় ঔধীশ মঠ ধ্বংস হওয়া সে রুখতে পারেনি। কিন্তু তার পরেও, নিজেকে বাঁচিয়ে, অমূল্য কিছু খবর নিয়ে সে আজ এখানে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে।

'আর তাছাড়া, আকসাই চিন তার জন্মভূমি। তাঁর মতো করে সে জায়গাকে আর কেউ চেনে না। আপনার পরামর্শ অনুযায়ী আজ বিকেলে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ কথাবার্তার পর আমার আশা, সেখানে আত্মগোপন করে থাকা রাক্ষসীর মানসপুত্র রাবটেনকে যদি কেউ খুঁজে বের করতে পারে তবে সে ওই শারণিক। হ্যাঁ ঝাও। রাবটেনের খোঁজে তাকেই পাঠাব আমরা। সে অভিযান শেষ হবার পর...'

'বেশ। তাকে ডেকে পাঠাও। কাল রওনা হবে সে। আর, ইতিমধ্যে অন্য একটা দায়িত্ব নিতে হবে তোমাকে। ভারতীয় ঔধীশ মঠ ধ্বংস হবার পর, পরবর্তী আক্রমণ কোথায় আসবে আমি জানি না। আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না আমি। শারণিক অভিযান সেরে ফিরে না আসা অবধি তুমি নিজে পৃথিবীর সবক'টা মহাদেশের ঔধীশ মঠগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্ত করবে।'

মাথা নেড়ে টেবিলের তলায় লুকানো ঘণ্টার সুইচে মৃদু চাপ দিলেন অরিহন্ত। ঘড়িতে তখন মধ্যরাত্রির ঘণ্টা বেজে উঠেছে।

'কিন্তু এটা কী করে সম্ভব? এতগুলো বছর কেটে গেল আমার এ-জায়গায়। কখনো এরকম কোনোকিছুর কথা...'

মেঝের ওপর চিত হয়ে শুয়ে লকআপের কড়িকাঠের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল জগদীপ। দীর্ঘদিনের সঙ্গী সুভাষ যাদবের এই কথাগুলো এক অর্থে তার নিজেরও বটে। পাহাড়ের অন্ধকার থেকে প্রথম যখন গাড়ির দিকে ধেয়ে এল দুঃস্বপ্নের মতো জীবটা...একেবারে হতচকিত হয়ে গিয়েছিল তারা। হাতে ধরা অস্ত্রগুলোর ট্রিগারও টিপতে ভুলে গিয়েছিল একমুহূর্তের জন্য। আর সেই মুহূর্তটার সুযোগ নিয়ে নিল ধূর্ত জীবটা!! চোখের পলকে গাড়ির ওপরে উঠে এসে... ঘাড়ের কাছে হুলের ক্ষতস্থানটাতে হাত দিয়ে ফের শিউরে উঠল সে। এখনও যন্ত্রণা রয়ে গেছে ফুলে থাকা জায়গাটায়। কিন্তু...

'একটা আশ্চর্য ব্যাপার খেয়াল করেছিস জগদীপ? জন্তুটা কিন্তু আমাদের প্রাণে মারেনি। শুধু গয়নার পুঁটুলিটা ওর নিশানা ছিল। ওটা নেবার জন্যই যেন...শসস...'

হঠাৎ কথা বন্ধ করে এদিক-ওদিক ঘুরে দেখল সে। রাত নিশুতি হয়েছে। ডিউটি রুমের বাঁদিক ঘেঁষে লক আপ। তার দরজা দিয়ে ওসির টেবিলটা দেখা যায়। এখন সেটা ফাঁকা। ঘরের অন্যপাশে পাতা ক্যাম্পখাটে রাতের ডিউটি অফিসার ঘুমিয়ে নিচ্ছেন খানিক।

মৃদু ক্র-র-র-র শব্দটা হঠাৎ করেই স্পষ্ট হয়ে উঠল এবার। নিঃশব্দ রাতে বড় বেশি তীক্ষ্ন ঠেকছিল তা তাদের কানে। হঠাৎ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে দলটার প্রত্যেকের মুখ। এ-শব্দ তারা চেনে! অসহায়ভাবে লকআপের শিকের দরজাটার দিকে দেখছিল তারা।

'সুভাষ, শাকিল... আলো নেভা। শব্দ না হয়...' চাপা গলার নির্দেশটা শুনেই সুভাষ গিয়ে উবু হয়ে বসে পড়েছে দেয়ালের ইলেকট্রিক বালবটার ঠিক নীচে। তার ঘাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে খালি হাতেই জ্বলন্ত আলোটাকে খুলে আনল শাকিল নামে কমবয়েসি ছেলেটা।

লকআপের গরাদের ফাঁক দিয়ে বাইরের একচিলতে আলো তেরছা হয়ে ঢুকে আসছিল। অন্ধকার দেওয়ালের গায়ে ঠেসাঠেসি করে বসে, ভয়ার্ত চোখে সেদিকে নজর রাখছিল তারা। আলোটার আভাকে ঢেকে দিয়ে গরাদের সামনে তখন বড় হয়ে উঠছিল এগিয়ে আসতে থাকা অতিকায় ছায়াটা...

ডিউটিরুমের ভেতর মাথা বাড়িয়ে দাঁড়াগুলো একবার এদিক-ওদিক নাড়িয়ে নিল জীবটা। আর তারপর, অতবড় শরীরটা প্রায় নিঃশব্দে ছিটকে গেল ক্যাম্পখাটে ঘুমন্ত ডিউটি অফিসারের দিকে।

এক মুহূর্ত বাদে ক্যাম্পখাটটার ওপর থেকে সরে এল সে। মাটির ওপর গড়িয়ে পড়েছে অফিসারের নিথর শরীরটা। সেদিকে তাকিয়ে তার চোখগুলো মৃদু আলোয় ঝলসে উঠল যেন একবার। প্রত্যেকটা আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই আরো নিখুঁত হয়ে উঠছে তার চেতনানাশক বিষের আক্রমণ। বাইরের সেপাই বা এই ডিউটি অফিসার, অন্তত ঘন্টাতিনেক ঘুমোবে এখন দুজনেই।

এইবার আস্তে আস্তে সে ঘুরে দাঁড়াল লকআপের দিকে। সেখানকার অন্ধকারে দেখবার কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না তার চারজোড়া তীক্ষ্ন চোখের। লকআপের ভেতরে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা মানুষগুলোকে দেখে একরকম করুণাই হচ্ছিল তার। তবে সে-সব ভাবনাচিন্তার অবসর তখন নেই...

নিঃশব্দে, প্রাগৈতিহাসিক কোনো রাক্ষসের মতো আটপায়ে লকআপের দরজার দিকে এগিয়ে আসছিল সে। সেইদিকে চোখ স্থির রেখে জগদীপ হঠাৎ নীচু হয়ে ডানপায়ের উরুতে হাত দিল। একটানে সেখান থেকে খুলে এসেছে বাদামি রঙের আঠালো পটিটা। পুলিশের দায়সারা বডিসার্চ এত খুঁটিয়ে দেখে না কখনও।

পটির নীচে চামড়ার সঙ্গে সেঁটে থাকা ইস্পাতের ফিনফিনে ছুরিটা হাতে তুলল সে। যাদবও ততক্ষণে আরেকটা ছুরি নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। এত সহজে একটা জন্তুর কাছে হার মেনে নেবে না তারা...

'চোখে তাক কর। একসঙ্গে দুজন। অন্তত দুটো চোখকে গাঁথব এটার... ওয়ান...টু...'

লকআপের আধো অন্ধকারে হঠাৎ জেগে ওঠা রুপোলি ঝলকদুটো তাকে সতর্ক করে তুলেছিল। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে হাঁটার ভঙ্গি বদলে আট পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়াল সে। সময় ধীরে চলছে যেন এই মুহূর্তে। সিনেমার স্লো মোশনের মতোই বাতাসে ভেসে ভেসে ছুরিদুটো এগিয়ে আসছে তার দিকে। সেদিকে লক্ষ্যস্থির করল সে। তারপর বিদ্যুতের মতো ছিটকে আসা দুটো মাকড়সাতন্তুর ধারা গিয়ে মাঝপথেই ধরে নিল ছুটে আসা অস্ত্রদুটোকে।

ছুরিদুটো নির্বিষভাবে আছড়ে পড়েছে মেঝের ওপর। পায়ের ধাক্কায় সেগুলোকে ছিটকে দিয়ে এগিয়ে আসছিল জীবটা। সামনের শক্তিশালী পা-চারটে এসে আঁকড়ে ধরেছে লক আপের দরজার শিক। মানুষগুলোর নিরাপত্তার সেই শেষ আড়ালটুকুও এবার থরথর করে কেঁপে উঠছে সেই টানে। দেওয়ালের বালি সিমেন্টের টুকরো ভেঙে উপড়ে আসছে তার গভীরভাবে পোঁতা কবজাগুলো। ঝলমলে থালার মতো চোখগুলো একদৃষ্টে দেখছিল তাদের দিকে...

দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেলেছিল ওরা। শুনতে পেয়েছিল, ধাতুর দরজার মেঝেতে আছড়ে পড়বার আওয়াজ। জান্তব একটা গন্ধ এসে ছেয়ে ফেলছিল তাদের চেতনাকে। আর তারপর...

কতক্ষণ যে সেভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য সেখানে অপেক্ষা করেছিল তারা, তা তাদের খেয়াল ছিল না। তারপর সাহসে বুক বেঁধে আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখল জগদীপ। আর সঙ্গে সঙ্গেই একটা উল্লাসের চিৎকার বের হয়ে এল তার গলা দিয়ে। তাদের সামনে হা হা করছে ভেঙে যাওয়া লকআপের দরজা। তার বাইরে মেঝের ওপর তেমনভাবেই পড়ে আছে তাদের ছুরিদুটো। দুঃস্বপ্নের জীবটা তাদের রেখে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে যেন!

সাবধানে পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। দরজার একপাশে রাতের পাহারাদার সেপাইয়ের নিশ্চল শরীর একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। থানার উঠোন পেরিয়ে দূরে রাঁচি-হাজারিবাগ এক্সপ্রেসওয়ে চোখে পড়ে। ভোরের মুখেমুখে বেশি গাড়িঘোড়ার চলাচল নেই সেখানে।

উঠোনের একপাশে তাদের আটক করা জিপসিটা রাখা ছিল। ওর চাবি থানার লকারে রয়েছে। তা থাক। সমস্যা নেই কোনো। গাড়ির বনেটটা খুলে ফেলে তার মধ্যে ঝুঁকে পড়ল শাকিল নামে ছেলেটা। গাড়ি চুরিতে এই বয়সেই ভালো ডাকনাম হয়েছে তার। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গরগর করে উঠল গাড়ির ইঞ্জিন।

থানা থেকে বের হয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে পড়েই গতি বাড়িয়েছে গাড়িটা। ঊর্ধশ্বাসে ছুটছে রাস্তা বেয়ে। রাস্তার উলটোদিকের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সেদিকে নজর ধরে রেখে তিরবেগে এগিয়ে যেতে যেতে নিজের মনেই একটু হাসল অনুপমা। এ চত্বরে আর সহজে মুখ দেখাবে না এরা। ইচ্ছে করলে সহজেই এই মানুষগুলোকে শেষ করে দিতে পারত সে। ভালোও হতো করতে পারলে। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকত না আর। কিন্তু না! তা সে পারবে না। মনের গভীরে বসে থাকা অপরিচিত একটা ব্যক্তিত্ব তাকে বাধা দিচ্ছিল যেন। তুচ্ছ কোনো অপরাধীর প্রাণ নেবার জন্য এ-শক্তি নয়। আরো বড় কোনো কাজের জন্য তার কাছে ধরা দিয়েছে তা!

ছুটন্ত গাড়ির ভীত যাত্রীরা লক্ষ করল না, গাছপালার আড়াল দিয়ে তাদের পেছনে ছায়ার মতো এগিয়ে আসতে থাকা অতিকায় একটা জীব কখন যেন নিজেকে বদলে নিল তাদের পরিচিত একটা মেয়ের চেহারায়। ভোর হয়ে আসছিল। লম্বা লম্বা পায়ে ঝোপঝাড় ভেঙে পা চালাল অনুপমা। এখান থেকে বাড়ি অন্তত কিলোমিটার তিনেক হবে। নিজের পোশাকটার দিকে একবার নজর করে দেখে নিল সে। ট্র্যাকস্যুটটা পরে রাতে বের হওয়াতে ভালোই হয়েছে। এতক্ষণে মা জেগে গিয়ে থাকলে, 'জগিং-এ গিয়েছিলাম' বলে দিলেই হবে'খন। মা অবশ্য তাতেও রাগ করবে। কাল সন্ধের ডাকাতির ঘটনাটার পর থেকেই তো ভয়ে শিঁটিয়ে আছে একেবারে। বারবার শুধু বলছে, 'তোর বাবা না এসে পড়া অবধি বাইরে হাঁটাহাঁটিটা একটু বন্ধ রাখ।'

বাবার কথাটা মনে হতেই হঠাৎ অনুপমার মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। বাবা ফিরে আসছে। পার্মানেন্টলি!! বাবা তার ভালো বন্ধু। কাছে থাকলে দুনিয়ার কাউকে সে পরোয়া করে না।

আচ্ছা বাবাকে কি তার এই ইচ্ছেমতো দুটো রূপে বদলে যাবার ব্যাপারটা খুলে বলে দেবে সে? ভাবনাটা মাথায় আসবার পরক্ষণেই মাথা নাড়ল অনুপমা। বাবা ভয় পাবেন। শুধু শুধু একজন বয়স্ক মানুষকে ভয় দেখিয়ে লাভ কী? কাউকে কিছু জানাবার আগে নিজে সে ভালো করে বুঝে নিতে চায় বিষয়টা। তারপর সুযোগ মতো আস্তে আস্তে ওঁদের কাছে খুলে বললেই হবে।

আকস্মিকতার প্রথম ধাক্কাটা কেটে যেতে আগের দিন রাতে একটা তীব্র দুঃখ জেগে উঠেছিল তার মনে। আর দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবন আর তার ভাগ্যে জুটবে না। কিন্তু তার পর থেকে একটা অদ্ভুত, ব্যাখ্যাহীন আনন্দও জেগে উঠছে সেখানে। এমন শক্তি ক'জনের মেলে? অলৌকিকে তার বিশ্বাস নেই। জীববিজ্ঞানের ছাত্রী সে। তার যুক্তি বলে, কোনো জীব পৃথিবীতে একা থাকতে পারে না। তার মতো শক্তি নিয়ে আরো প্রাণী নিশ্চয় রয়েছে কোথাও। একদিন না একদিন তাদের সন্ধান সে পাবে। এবারে সেই সন্ধানে যেতে হবে তাকে।

তখনও সে জানত না...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%