দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

একটা প্রশ্ন আছে দেবী। তৃতীয় জানালায় শারণিকের মৃত্যু দেখেছিলাম। অথচ পঞ্চম জানালায় দেখছি...
মৃদু হাসলেন দেবী আনিপ্পা, 'নিয়তি জিমূতবাহন! তারই ইশারায় প্রায় অলৌকিক ভাবেই শারণিকের প্রাণরক্ষা হয়েছিল। কারণ, মানব-আরকিয়েন মিলিত সভ্যতার যে প্রথম অধ্যায় লেখা হয় এর পর, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শাণণিকের, পবর্তের অমর আত্মা রাবটেনের সন্ধানের জন্য তাকে নির্বাচন করবার মধ্যেই নিয়তির সেই ইঙ্গিত ধরা ছিল।
'মানব-আরাকিয়েন মিলিত সভ্যতার সেই প্রথম অধ্যায় লেখা হয়েছিল হিমালয়ের নিভৃত কোলে, একটা ছোট গ্রামের বুকে। আমাদের ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হবার সময় এসেছে তোমার জিমূতবাহন। দেখো...আমাসাদোমের পুঁথির একাদশ অধ্যায়... পর্বতের অমর আত্মা ও তাঁর শারণিকবিজয়ের মৃত্যুহীন গাথা।'
১। খৃ ১৭২১। সাংগ্রি গিরিশিরা
ঝড় উঠেছে। হিমালয়ের আকাশছোঁয়া দেশে হেমন্তের তীব্র ব্লিজার্ড। ছুটন্ত তুষারকণাদের আড়ালে, বহু নীচে জমাটবাঁধা মানস সরোবরের এবড়ো-খেবড়ো তুষারক্ষেত্র আবছা চোখে পড়ে এখান থেকে।
কাত হয়ে থাকা একটা বরফের দেওয়ালের গায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল তাদের মরতে বসা শরীরগুলো। হঠাৎ, প্রায় অমানুষিক শক্তিতে তাদের একজন মাথা উঁচু করে তাকাল সামনের বরফের দেওয়ালটার দিকে। ঝাপসা চোখদুটো তুলে ধরে কোনোমতে বলে উঠল সে, 'রক্ষা করো হে পর্বতের অমর আত্মা রাবটেন! আমরা তোমার শরণ নিলাম।'
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মৃদু একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল সামনের বরফের দেওয়ালটায়। এই উচ্চতার হালকা বাতাসে সামান্য কাঁপুনিও তুষারধ্বসের জন্ম দেয়। কেঁপে ওঠা বরফের দেয়ালের দিকে একনজর তাকিয়ে একটা গভীর ভয় ছড়িয়ে গেল মরতে বসা সন্ন্যাসীর মনে।
আর তারপরই হঠাৎ একটুকরো হাসিতে জমাটবাঁধা ঠোঁটদুটো ফেটে গিয়ে দু'ফোঁটা রক্ত বের হয়ে এল। তুষারধ্বস নয়। ধীরে ধীরে দরজার পাল্লার মতোই সরে যাচ্ছে সামনের তুষারের স্তর। তার পেছনে লুকোনো গুহামুখটায় এসে দাঁড়িয়েছেন এক সন্ন্যাসী। তাঁর হাতে ধরা দণ্ড থেকে সুগন্ধী ওম এসে ছড়িয়ে যাচ্ছিল পড়ে থাকা শরীর তিনটের ওপর। ধীরে ধীরে তাদের শরীরের কোষে কোষে মিশে যাচ্ছিল সেই প্রাণদায়ী রাসায়নিক।
কয়েকমুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়ালেন তিন সন্ন্যাসী। তাঁদের দিকে ফিরে হাসিমুখে হাতের রুপোলি দণ্ডটা উঁচিয়ে ধরলেন তরুণ সন্ন্যাসী, 'আর ভয় নেই। রাবটেনের আশীর্বাদ স্বীকার করুন আপনারা। তারপর নিরাপদে ফিরে যান।'
কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। হঠাৎ তাঁর বিস্মিত চোখের সামনে সদ্য প্রাণে বাঁচা তিন সন্ন্যাসীর পোশাকের আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে তিনটে তলোয়ার। তার ফলা থেকে চুঁইয়ে পড়ছিল রুপোলি পারদের ধারা।
'একটা ছোট কর্তব্য আমাদের বাকি রয়ে গেছে যে রাবটেন! তোমায় খুঁজে পাবার জন্য নিজেদের জীবনকে এভাবে বিপন্ন করে ফাঁদ পেতেছি, সে তো খালি হাতে ফিরে যাবার জন্য নয়!'
আলখাল্লা সরে গিয়ে তাদের কবজিতে বাঁধা কালো পাথরের চাকতিগুলো বের হয়ে এসেছে এবার। সেদিকে তাকিয়ে একটু চমকে উঠেই নিজেকে সামলে নিলেন তরুণ সন্ন্যাসী, 'ঔধীশের চিহ্ন! আমার কাছে কী চাও তোমরা?'
'সামান্য একটা খবর। আরাকিয়েনের সম্পর্কে এত খবর তুমি জানলে কীভাবে? বহুকাল আগে উধীশদেবের হাতে নিহত রাক্ষসীর পুনর্জন্মের মিথ্যা কাহিনি লিখে কোন উদ্দেশ্যে প্রচার করেছ পৃথিবীতে?'
হঠাৎ একটা অপার্থিব আগুন যেন ঝলসে উঠল তরুণ সন্ন্যাসীর দু'চোখে। আমূল বদল এসেছে তাঁর শরীরের ভাষায়। যেন অভিশাপ দিতে উদ্যত হয়েছেন কোন প্রাচীন দেবতা। তাঁর গলায় বেজে উঠেছে গুরুগুরু বাজের আওয়াজ, 'এর উত্তর তোমরা পাবে। কিন্তু সে খবর নিয়ে হাইনলিমের ডেরায় পৌঁছোন তোমাদের আর হবে না।'
দ্রুত বদলে যেতে থাকা জীবটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে তলোয়ার তুলে আক্রমণ করবার চেষ্টা করেছিল আততায়ীর দল, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। তাদের স্তম্ভিত করে দিয়ে, ধাতব জালের চেয়েও শক্ত, আঠালো একগোছা মাকড়সাতন্তু ছিটকে এসে তখন ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, আরাকিয়েনের মৃত্যুবিষ পারদমাখানো অস্ত্রতিনটেকে।
কিছুক্ষণ বাদে, আপাদমস্তক মাকড়সার জালে বাঁধা তিনটে নিশ্চল শরীরকে বরফের নীচে কবর দিতে দিতে মাথা নাড়ছিলেন রাবটেন। আমাসাদোমের পুঁথি ও হিয়ালিকা সত্তসই! দেবী আরাকিয়েনের পুনরাবির্ভাবের সংকেতবাহী এই পুঁথিদুটোর প্রচার মানুষের সমাজে তিনি করে চলেছেন কিছুকাল ধরে। সে-সংকেতের খবর তাহলে চিরশত্রু ঔধীশমঠেও গিয়ে পৌঁছেছে!
একবার এরা এসেছে যখন, তখন বারবারই তারা আসবে। কিন্তু তাঁর খবর নিয়ে ঔধীশমঠে কেউ ফিরে যাক তা তিনি চান না। আরো তিন শতাব্দির অপেক্ষা রয়েছে সামনে। তারপর একদিন...
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল অতিকায় আটপেয়ে জীবটা। তারপর একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে ফের মানুষের চেহারায় ফিরে গিয়ে গুহার খোলামুখ দিয়ে তার ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন সন্ন্যাসী। তার বন্ধ হয়ে যাওয়া তুষারদরজার বাইরে তখন উদ্দাম হয়ে উঠেছে হেমন্তের হিমালয়।
২। অক্টোবর ২০১৭। হাইনলিম শহর
'সিটবেল্টের সংকেত বন্ধ করা হল,' সিলকওয়ার্ম এয়ারওয়েজের কলকাতা-হাইনলিম ফ্লাইটের পাইলটের গলা ভেসে আসছিল মাইক্রোফোনে, 'দক্ষিণ চীনের প্রাচীন হাইলাম নগরীর আধুনিক রূপান্তর হাইনলিম-এ আপনার স্বাগত। আধুনিক শিল্পনগরী ও তার পাশাপাশি চীনের অধুনা অবলুপ্ত ফেনসানঔধীশ সম্প্রদায়ের পীঠস্থান এই শহরে আপনাদের যাত্রা আনন্দের হোক।'
ঘোষণা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আইল সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন লম্বাটে গড়নের সন্নাসীটি। তাঁর সারাগায়ে বেশ কিছু আঘাতের দাগ বুঝিয়ে দেয়, প্রাণঘাতী কোনো দুর্ঘটনা থেকে সদ্য ফিরে এসেছেন মানুষটা। ঝোলা থেকে একটা ফোন বের করে তার কিপ্যাডে দ্রুত আঙুল চালাচ্ছিলেন তিনি।
দরজা খুলে দেওয়া হতে ফোনটা কানে ধরেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন সন্ন্যাসী। দরজায় দাঁড়ানো কেবিন-ক্রুর অভিবাদনের জবাবে একঝলক ঘুরে তাকিয়েই সিঁড়ি বেয়ে নেমে সটান এগিয়ে গেলেন অপেক্ষায় থাকা বাসের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে অকারণেই বুকটা একটু কেঁপে উঠল স্টুয়ার্ডেসের। অত শীতল চাহনি সচরাচর চোখে পড়ে না তার।
পুরনো হাইলাম থেকে খানিক দূরে গড়ে ওঠা আধুনিক হাইনলিম এক ঝকঝকে শিল্পশহর। পৃথিবীর তাবড় বহুজাতিক বৈদ্যুতিন শিল্পের কারখানা রয়েছে এখানে। তেমনই একটি কোম্পানির প্রধান অরিহন্ত ত্রিপাঠীর টেবিলে ঠিক সে-মুহূর্তে তাঁর টেলিফোন বেজে উঠেছিল।
তাঁর উল্টোদিকে বসে থাকা শহরের পুরসচিব ঝাও ইয়াং-এর ভ্রুদুটো একটু কুঁচকে উঠল শব্দটা পেয়ে। তাঁর সঙ্গে আসা অন্যান্য সরকারি কর্মীরাও তাঁদের আলোচনা থামিয়ে ত্রিপাঠীর দিকে ফিরে দেখছেন।
একটু বিরক্ত মুখেই ফোনটা কানে লাগালেন অরিহন্ত, 'জিন, মিটিং চলাকালীন কোনো ফোন আমাকে ট্রান্সফার না করবার কথা বলেছিলাম তোমায়।'
'সরি স্যার। ওপাশ থেকে জবাব ভেসে এল, 'কিন্তু দশমিনিটের মধ্যে পরপর ছ'বার ফোন করলেন ভদ্রলোক। আমি...'
'ঠিক আছে। লাইনটা দাও।'
খুট করে একটা শব্দ হল ইয়ারপিসে। আর তারপরই গাড়িঘোড়ার শব্দ ভেসে এল সেখানে।
'হোয়াট ডু ইউ...'
কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলেন অরিহন্ত ত্রিপাঠী। তাঁর ইয়ারপিসে একটা ভারী গলা তখন বলে উঠেছে, 'উধীশা আরাকিয়াপিয়েহিন স্মুঃ জিয়া। আমি শারণিক।'
কথাগুলো বলেই, জবাবের অপেক্ষা না করে কেটে গেল ফোনটা। অবশ্য জবাবের কোনো প্রয়োজনও ছিল না। থেমে যাওয়া হ্যান্ডসেটটা নামিয়ে রেখে ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন অরিহন্ত, 'জেন্টেলমেন, আমি দুঃখিত। একটা অত্যন্ত জরুরি কল পেয়ে...'
প্রৌঢ় পুরসচিব ঝাও ইয়াং-এর পুঁতির মতো চোখদুটো তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টি ধরে রেখেছিল। সে চোখে কিছু নির্বাক জিজ্ঞাসা ছিল। যেন তার জবাবেই ইষৎ ঘাড় নাড়লেন অরিহন্ত। প্রত্যাশিত কলটা এসেছে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালেন ঝাও, 'তাহলে আমরাও এখন চলি মিস্টার ত্রিপাঠী। ওহো। আজ সন্ধের ডিনারে...'
ইশারাটা পরিষ্কার। মৃদু হেসে তাঁর হাতে চাপ দিলেন অরিহন্ত, 'শুধু সময়টা মেসেজ করে দেবেন প্লিজ। ভেনু আমার চেনা। পৌঁছে যাব।'
এর মিনিটদশেক বাদে অরিহন্তের ফোনে মেসেজ এসেছিল একটা। ঝাওয়ের আপডেট। তাতে শুধু একটা সময় নির্দেশ করা আছে। এই মিটিং-এর গোপন ঠিকানা অরিহন্তের জানা।
ল্যান্ডফোনের ডিসপ্লেতে খানিক আগে আসা কলটার নম্বর ভাসছিল। নম্বরটা মোবাইলে তুলে তাতে একটা ঠিকানা লিখে মেসেজ পাঠিয়ে দিয়ে ইন্টারকমের হ্যান্ডসেট কানে তুলে নিলেন অরিহন্ত।
'আমি বের হচ্ছি জিন। আজকের বাকি সমস্ত মিটিং বাতিল করে দিও। আজ আমার ফোন বন্ধ থাকবে।'
'ওকে স্যার। কিন্তু মোরিবাগ ফার্ম থেকে কোনো মেসেজ এলে?'
হঠাৎ অরিহন্তের মনে পড়ে গেল। আজ অনুপমার জন্মদিন। আঠেরোয় পা দিল মেয়েটা। চোখের সামনে পুরুলিয়ার ছড়ানো ফার্মহাউসটার ছবি ভেসে উঠছিল তাঁর। সন্ধেবেলা পার্টি আছে সেখানে। এবারেও যাওয়া হল না। রীণা দুঃখ পায়। মাঝেমাঝেই বলে, 'কী হবে চাকরির জন্য বিদেশবিভুঁয়ে পড়ে থেকে? আমাদের তো অভাব নেই কোনো!'
ওরা জানে না, শুধু মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির দামি চাকরি নয়, তার চেয়েও অনেক বড় কর্তব্যের টানে তাঁর এখানে পড়ে থাকা। গোটা মানবজাতির প্রতি কর্তব্য। তবে সে-কথা তাদের বলা যাবে না। গোপনীয়তার বিষয়ে ঔধীশ সংঘের নীতি বড় কঠিন।
'বোলো আমি সময়মতো যোগাযোগ করে নেব।' কথাগুলো বলে ফোন নামিয়ে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন অরিহন্ত ত্রিপাঠী।
'আমি যাব না মা। আমি আটপেয়ে জিজুদের ভয় পাই!'
'সিমিয়াও উধীশা', বা উধীশের মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে ঢোকবার দরজায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট মেয়েটা তার মাকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরেছে। বারবার দরজার মাথায় আধামানুষ-আধামাকড়সার বিরাট ফ্রেস্কোটার দিকে দেখায় সে। পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় ছবিটা দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়।
টুরিস্টের দলটার মধ্যে মৃদু হাসির শব্দ উঠেছে। মেয়েটার বিব্রত মা বারবার তাকে প্রবোধ দেয়, 'ভয় পাস না বোকা মেয়ে। ওসব তো পুরনোদিনের গল্প। তাছাড়া কমিকসে তো পড়েইছিস, উধীশ জাতক-এ এদেশে এসে ভগবান বুদ্ধ মাকড়সা-রাক্ষুসী জিজু আরাকিয়ানাকে দলবলশুদ্ধ মেরে ফেলেছিলেন! ওরা আর নেই।'
তাদের পাশ দিয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকা কালো আলখাল্লা পরা প্রৌঢ় টুরিস্টটি হঠাৎ থেমে গেলেন কথাগুলো শুনে। মা-মেয়ের কথা শুনে মৃদু হাসি ফুটছিল তাঁর মুখে। শান্তিপ্রিয় সরল মানুষ! ওরা জানে না...
সন্ধে নামছিল। বন্ধ হয়ে গেছে সিমিয়াও উধীশার মূল মন্দিরের দরজা। টুরিস্টের দলটাও কিছুক্ষণ আগে মন্দিরের টিলা ছেড়ে নেমে কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে গেছে।
শুধু একজন মানুষ তখনও সেখানে বসেছিলেন নিস্তব্ধ হয়ে। অন্ধকার মন্দিরচত্বরে তাঁর কালো আলখাল্লায় ঢাকা শরীর কারো নজরে পড়েনি।
সবাই চলে যাবার পর এইবার উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আলখাল্লার ভেতর থেকে তাঁর ফোনটা বের করে আনলেন। খুব কাছাকাছি দুটো আলোর বিন্দু দপদপ করছে সেখানে। প্রথমটা তাঁর এই মুহূর্তের জিপিএস অবস্থান, আর দ্বিতীয়টা অরিহন্তের পাঠানো ঠিকানার চিহ্ন।
সেই চিহ্ন ধরে মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে টিলার গায়ে উঠে এলেন তিনি। গোটা মন্দিরটা এই টিলার গায়ে খুদে তৈরি করা। তার পেছন দিয়ে বেয়ে উঠে চূড়ার কাছাকাছি একটা ফাটলের মুখে থামলেন সন্ন্যাসী।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পিঠে ঠান্ডা ধাতুর ছোঁয়া পেয়ে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন তিনি। কালো উর্দি পরা একজন মানুষ নিঃশব্দে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
'সংকেত?'
জবাবে ফোনের আলোজ্বলা পর্দাটা নিজের বাঁহাতের কবজির দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন সন্ন্যাসী। সেখানে ঔধীশের চিহ্ন, কালো পাথরের চাকতিটা ঝিকিয়ে উঠেছে মৃদু আলোয়। তারপর নীচুগলায় বললেন, 'উধীশা আরাকিয়াপিয়েহিন স্মুঃ জিয়া... আরাকিয়েননাশক উধীশের জয় হোক। আমি শারণিক।'
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধাতব নলটা সরে গেল তাঁর পিঠ থেকে। কানের কাছে একটা গলা বলে উঠল, 'স্বাগত মঠাধ্যক্ষ শারণিক। ওঁরা আপনার অপেক্ষায় আছেন।'
'আপনার পাঠানো বিবরণ আমরা পড়েছি ঔধীশ শারণিক। কিছুদিন আগে সুধীর নামের আরাকিয়েনটিকে অনুসরণ করে বাংলা জুড়ে এদের আরো একটা বড় দলের খোঁজ পাওয়া খুবই কৃতিত্বের কাজ ছিল। কিন্তু এদের হাতে ঔধীশ মঠের এভাবে পতন...'
ঝাও ইয়াং-এর ধারালো, ঠান্ডা চোখদুটো একদৃষ্টে শারণিকের দিকে দেখছিল। আস্তে আস্তে চোখ নামিয়ে নিলেন শারণিক, 'আমি এই হারের সমস্ত দায় মাথায় তুলে নিচ্ছি। আমার সেরা যোদ্ধা শৌভশামকে আমি পাঠিয়েছিলাম সুধীরকে সদলবলে শেষ করতে। তবে একটাই ভুল হয়েছিল আমার। সে ফিরে আসবার পর আমি সন্দেহ করতে পারিনি যে আসলে সুধীর নামের ওই মায়াবী আরাকিয়েন শৌভশামের চেহারা ধরে আমার কাছে ফিরে এসেছে। এ-ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমি...'
'না ঔধীশ শারণিক,' ঝাও মাথা নাড়ছিলেন, 'ঔধীশ ধর্মে হেরে যাবার একমাত্র পুরস্কার মৃত্যু তা আমি মানি। কিন্তু এক্ষেত্রে আপনার কোনো ত্রুটি ছিল না। অত্যন্ত রহস্যময় জীব এই আরাকিয়েন। তাদের এই অন্যের দেহ আর স্মৃতি ধরবার শক্তির কথা আমাদেরও জানা ছিল না। আর তাই আপনার কথার সত্যতা জানবার জন্য আমাদের...'
কথা বলতে বলতেই তাঁর দিকে এগিয়ে আসছিল ঝাও ইয়াং-এর ঠান্ডা চোখদুটো। একটা গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিলেন ভারতীয় ঔধীশ মঠের প্রাক্তন প্রধান শারণিক।
'অবিশ্বাস্য।'
'সম্মোহিত মানুষ মিথ্যা বলে না অরিহন্ত,' বলতে বলতেই অচেতন শারণিকের কপাল থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে আনছিলেন ঝাও ইয়াং, 'অতএব, শারণিকের দাবিকে ঘটনা বলে মেনে নিচ্ছি আমি।
'ভারতীয় ঔধীশ মঠ দখলের যুদ্ধে সুধীরের নেতৃত্বে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় রেখেছে এই আরাকিয়েনের দল। আর সুধীর নিজে, অন্যের দেহ ধারণ করে আরাকিয়েনের এমন এক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে, যা তাদের আছে বলে আমাদের জানা ছিল না। এর অর্থ...'
'একাধিক অর্থ হতে পারে মহান ঝাও। হয়তো আমাসাদোমের পুঁথির প্রবাদ অনুযায়ী দেবী আরাকিয়েন ফিরে এসেছেন ও এদের নতুন কিছু শক্তি দিয়ে উন্নত ও কুশলী সেনাদল গড়ে তুলেছেন। অথবা এই সুধীর হয়তো প্রকৃতির নতুন কোনো খেয়াল। কোনো মিউটেশান...'
'জানি না। তবে কারণ যেটাই হোক, ঔধীশ মঠের পক্ষে তা বিপজ্জনক। সুধীরের এই নতুন ক্ষমতা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। আরাকিয়েনের শক্তির বিষয়ে এখনো আমরা সবকিছু জানি না। এ-অবস্থায় যদি ভারতবর্ষের বুকে দেবী আরাকিয়েন পুনর্জন্ম নিয়েও থাকেন তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে এখনই আক্রমণ শানানো মূর্খামি হবে। তার আগে আরাকিয়েনের বিষয়ে এখনো অজ্ঞাত সবকিছু আমাদের জানতে হবে অরিহন্ত। আর, তার একমাত্র সূত্র লুকিয়ে আছে এই শারণিকের মাতৃভূমিতে।'
'আপনি তিব্বতের সাধক রাবটেনের কথা বলছেন?'
'হ্যাঁ। এবারে তার বিরুদ্ধে ফের একবার অভিযানের সময় হয়েছে অরিহন্ত।'
শারণিকের ঘুমন্ত শরীরটা ট্রলিতে করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সেদিকে চোখ রেখে অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন অরিহন্ত, 'ঘুমভাঙলে এর সঙ্গে কথা বলব আমি ঝাও। অভিযানে পাঠাবার আগে কিছু বিষয় একটু বুঝে নিতে চাই।'
৩। অরিহন্ত ও শারণিক
'ঔধীশ সঙ্ঘের ব্যাপারে তুমি কতটুকু জানো?'
সিমিয়াও উধীশার এই ঘরটার জানালা দিয়ে পশ্চিম দিগন্তে ধোঁয়ার মতো কুইনলিন পর্বতমালা চোখে পড়ে। সেইদিকে চোখ রেখে অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন শারণিক, 'এইটুকুই জানি যে মানুষের দুনিয়ায় কিছু ছদ্মবেশী পিশাচের বাস। প্রয়োজনে তারা মানুষের রূপ ছেড়ে দানব মাকড়সার রূপ নিতে পারে। উপকথায় বলে, উধীশ জাতক-এ ভগবান বুদ্ধ দেবী আরাকিয়েনকে হত্যা করেন। এই পিশাচদের নির্মূল করবার জন্য ঔধীশ সঙ্ঘের জন্মও তাঁরই হাতে। আজও আমার আপনার মতো ঔধীশ সন্ন্যাসীরা মানুষের সমাজে মিশে, গোপনে সেই কর্তব্য পালন করে চলেছি।'
'এ কাহিনিতে কতটা বিশ্বাস করো তুমি?'
'আমার জন্মভূমি তিব্বতে এদের আমি দেখেছি। যৌবনে ঔধীশ সন্ন্যাসীদের হাতে তাদের একজনের মৃত্যুর সাক্ষী ছিলাম। সে-দৃশ্য দেখবার পর আমি এই সঙ্ঘে যোগ দিই। পৃথিবী থেকে এই অভিশাপকে ধ্বংস করা আমারও জীবনের ব্রত। তবে, আমি একসময় লাসার তিব্বত বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। আমার বিশ্বাস, পিশাচ বা অলৌকিক কিছু নয়। বিবর্তনের পথে কোনো এক মিউটেশনের ফলে এই হিংস্র পশুর উদ্ভব।'
'ভুল শারণিক। এরা নিছক হিংস্র পশু নয়। তার প্রমাণ আমার কাছে আছে।' বলতে বলতেই সামনে রাখা ল্যাপটপটাকে চালু করছিলেন অরিহন্ত।
'খৃষ্টপূর্ব দুশো শতাব্দিতে দেবী আরাকিয়েনের সঙ্গে শেষ যুদ্ধে উধীশের মৃত্যু হয়। সঙ্ঘের পরবর্তী প্রধান সম্ভর এরপর আরাকিয়েন সম্পর্কে যাবতীয় বিবরণ একটা শিলালিপিতে লিখে, উধীশের আদি মন্দির এই গুহায় তা স্থাপন করেন। রেডিও কার্বন ডেটিং তার বয়স নির্ধারণ করেছে বাইশশো বছর।
'এই শিলালিপি থেকে শেষ যুদ্ধের বিবরণ বাদে আরো দুটো বিষয়ে জানা যায়। প্রথমটা হল, মাকড়সা ও মানুষ, এই দুই রূপ ধরতে পারা আরাকিয়েন জাতের জীবরা এ-গ্রহের প্রথম সভ্যতার জন্মদাতা। স্বাভাবিক মানুষ তাদের দাস ছিল।'
'তার কোনো প্রমাণ?'
'শিলালিপি থেকে পাওয়া দ্বিতীয় তথ্যটা এর প্রমাণ দেয়। সেখানে উল্লেখ আছে, আরাকিয়েন সুদীর্ঘ জীবনের প্রযুক্তি জানত। এক অকল্পনীয় দুঃসাহসিক পথে তাদের থেকে সে-প্রযুক্তি চুরি করেছিলেন উধীশ। এর সাহায্যে ঔধীশ সঙ্ঘের একেকজন প্রধান কয়েক শতাব্দি ধরে তাঁর কর্তব্য পালন করে চলেন।'
'অসম্ভব। সাধারণ ঔধীশদের মধ্যে এ-বিশ্বাস গভীরভাবে রয়েছে তা মানি। কিন্তু এমন প্রযুক্তি একুশ শতকেও...'
মৃদু হাসলেন অরিহন্ত, 'মানুষের নাগালের বাইরে, তাই তো? অথচ, বর্তমান প্রধান ঝাও, সতেরো শতকের কুইং রাজবংশের যুবরাজ ছিলেন। ঔধীশধর্মে দীক্ষিত হয়ে তিনি এখনও এই সঙ্ঘের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। এর প্রমাণ আমার এই ল্যাপটপেই রাখা আছে শারণিক। দেখো...'
পর্দায় ভেসে ওঠা পাশাপাশি তথ্যগুলোর দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলেন শারণিক। কথাগুলো বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু প্রমাণ তাঁর চোখের সামনে রয়েছে। প্রায় চার শতাব্দির পুরনো কিছু চুলের ডিএনএ আর ঝাও ইয়াং-এর শরীর থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণকে হুবহু এক বলে প্রমাণ করেছে আজকের বিজ্ঞান।
সেদিকে তাকিয়ে হাসলেন অরিহন্ত। ল্যাপটপটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে বললেন, 'এ-প্রযুক্তি মানুষের তৈরি নয়। সেক্ষেত্রে তাকে কয়েক হাজার বছরের পুরনো, উন্নততর আরাকিয়েন বিজ্ঞানের অবদান হিসেবে ধরে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
'তার মানে এ-গ্রহে মানুষের অনেক আগে ওরা...' নিজের মনেই বিড়বিড় করছিলেন শারণিক।
তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়লেন অরিহন্ত। তারপর বললেন, 'এবারে, তোমার দেশের একটা রহস্যের কথায় আসা যাক। অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে আমাসাদোমের পুঁথি ও হিয়ালিকা সত্তসই নামে দুটি পুঁথির কিছু টুকরো অংশের সন্ধান পান ঝাও ইয়াং। এর লেখক মানস সরোবরের কাছের কোন গোম্ফার বাসিন্দা, সাধক রাবটেন।'
'রাবটেন? ইনি তো...'
'তুমি এঁর নাম জানো?'
'জানি। আমার জন্মভূমি আকসাই চীনের প্রত্যেকে তাঁর নাম জানে। আমরা তাঁকে পর্বতের অমর আত্মা বলে ডাকি। সে-অঞ্চলের মানুষ এখনো বিশ্বাস করে, এই মঙ্গলময় আত্মা এখনও তাঁর গোপন গোম্ফায় জীবিত আছেন। অনেকেই দাবি করেন, সত্যি সত্যিই বিপদের মুহূর্তে ডাক দিয়ে তাঁর সাড়া পেয়েওছেন।'
'আর তুমি?'
'আমি তাঁর নামকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু, তিনি ঔধীশ সম্প্রদায়ের কেউ নন। সেক্ষেত্রে তাঁর এতকাল ধরে বেঁচে থাকা...'
'লম্বা জীবনের রহস্য যে শুধুমাত্র ঔধীশ সন্ন্যাসীদের অধিকারেই রয়েছে তা কিন্তু নয় শারণিক।' অরিহন্ত বলে উঠলেন, 'উধীশদেব সে বিদ্যা জেনেছিলেন...'
হঠাৎ ইঙ্গিতটা স্পষ্ট হয়ে উঠল শারণিকের কাছে। অবিশ্বাসের চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'রাবটেন...পিশাচপ্রজাতির আর এক সদস্য! আমি বিশ্বাস করি না!'
'এর সপক্ষে প্রথম প্রমাণ এই পুঁথিদের বক্তব্য। এদের যে অংশগুলো আমাদের হাতে এসেছিল, তার গল্পের সঙ্গে উধীশের শিলালিপিতে লেখা কিছু ঘটনা হুবহু এক। শুধু তফাৎ হল, রাবটেন আরাকিয়েনের সপক্ষে কথা বলেছেন এই পুঁথিতে। উধীশদেবকে একজন ক্ষমতালোভী খুনে হিসেবে দেখিয়েছেন। সেইসঙ্গে এও দাবি করেছেন, আরাকিয়েনদের এক ব্যর্থ পরীক্ষার ফল হল মানুষ।'
একচিলতে হাসি ফুটে উঠছিল শারণিকের মুখে। খানিক বাদে মাথা নেড়ে তিনি বললেন, 'তিব্বতে এমন হাজারো গালগল্পের পুঁথির সন্ধান মেলে। এতে কিছু প্রমাণ হয় কি?'
'ঠিক। অতএব, এবারে দ্বিতীয় প্রমাণ। পুঁথিতে রাবটেনের আস্তানার ইঙ্গিত ছিল। বিষয়টা জানবার পর ঝাও ১৭২১ খৃষ্টাব্দে মানসের কাছাকাছি অঞ্চলে একদল সন্ন্যাসী-সৈন্য পাঠান সেই আস্তানার খোঁজে। দলটার একজনও ফিরে আসেনি। এরপর গত তিন শতাব্দিতে মোট সাতবার অভিযান পাঠানো হয়েছে সে-এলাকায়। রহস্যজনকভাবে উধাও হয়েছে তাদের প্রত্যেকেই। শেষ অভিযান পাঠানো হয় ১৯৩০ সালে। মোট পঁচিশজন ঔধীশ যোদ্ধা এইভাবে উধাও হয়।'
'অস্বাভাবিক নয়। ওই ভয়ঙ্কর এলাকায় মৃত্যু মানুষের পায়ে পায়ে চলে।'
'মানছি। কিন্তু ১৯৫০ সালে চীন সরকার তিব্বত অধিকার করবার পর ও-অঞ্চলে একটা ভূতাত্ত্বিক অভিযান চালিয়েছিল। সেখানে বরফের তলায় খুঁড়তে গিয়ে এই দেহগুলোর খোঁজ মেলে...'
বলতে বলতেই ল্যাপটপের পর্দায় কয়েকটি বরফজমাট মৃতদেহের ছবি ভেসে উঠেছে। নিঃশব্দে সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন শারণিক। প্রত্যেকটা দেহকে ঘিরে জমাটবাঁধা মাকড়সার জালের বাঁধন!
'পঁচিশটা শরীর শারণিক। একটা গণকবরে রাখা। ১৯৫২ সালের সরকারি অনুসন্ধান রিপোর্ট দেখাচ্ছে সবচেয়ে পুরোনো তিনটে শরীরের বয়স দু'শো বছরের কিছু বেশি। আর সবচেয়ে নতুন দেহদুটো মাত্রই কুড়ি বছরের পুরনো। এখনো সরকারি তদন্তে এর কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি।'
স্থির চোখে ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়েছিলেন শারণিক। সেখানে মানস সরোবরের একটা অঞ্চলের স্যাটেলাইট মানচিত্র ভাসছে। তার উত্তরপশ্চিম কোণে একটা লাল বিন্দু দপদপ করছিল। মৃত ঔধীশের গণকবরের ঠিকানা!
তাঁর মুখের দিকে একনজর দেখে কথার সুতোটা ফের তুলে নিলেন অরিহন্ত, 'এর পাশাপাশি অন্য যে কথাটা রাবটেন বলেছেন তা বিপজ্জনক। তা হল, দেবী আরাকিয়েনের পুনরাবির্ভাবের ভবিষ্যৎবাণী। দাবি করা হয়েছে, আরাকিয়েনের সমস্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের সংগ্রহ নিয়ে সাধক রাবটেন দেবীর ফিরে আসবার অপেক্ষায় আছেন। হিয়ালিকা সত্তসইতে সেই ফিরে আসবার স্থানকালও সাংকেতিক ভাষায় জানানো আছে।'
স্থির হয়ে পর্দাটার দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন শারণিক। তাঁর বিশ্বাসের দুনিয়ায় বড় ওলটপালট চলেছে একটা। একটু বাদে সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে তিনি বললেন, 'দেবী আরাকিয়েনের পুনর্জন্মের ব্যাপারে হিয়ালিকা সত্তসইয়ের পূর্বাভাষ ঠিক কী ছিল?'
'২০০১ সাল। ভারতবর্ষ। আর তাই তোমার অধীনে ঔধীশ মঠের ভারতীয় শাখাকে সে-বছরের শুরুতে নির্দেশ দেয়া হয় সেখানকার সমস্ত আরাকিয়েনকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় খুঁজে বের করে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। কিন্তু তোমার মঠের ওপর এই আক্রমণ...'
'আমার কর্তব্য কী হবে বলুন?'
মন্দিরপাহাড়ের গায়ের এই গুহার ভেতরের ইলেকট্রিকের আলো বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছোয় না। টেবিল ঘিরে তাঁরা তিনজন বসেছিলেন। দেওয়ালের ঘড়িতে মাঝরাত অনেকক্ষণ হল পেরিয়েছে।
জবাবে শারণিকের দিকে ঘুরে তাকালেন ঝাও ইয়াং, 'আরাকিয়েনের একটা অজানা শক্তির ব্যবহার তোমাকে একবার হার মানতে বাধ্য করেছে। হয়তো আরো বহু অজ্ঞাত অস্ত্র আছে তাদের ভাণ্ডারে। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবার আগে সে-বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য আমার চাই। হত্যাকারী রাবটেনের পরিচয় তুমি জেনেছ। তার পাহারায় রাখা আরাকিয়েনের জ্ঞানভাণ্ডার আমার চাই শারণিক। তোমাকে সে-কাজের দায়িত্ব নিতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় লোকবল বা অন্যান্য সাহায্য...'
হঠাৎ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শারণিক। তাঁর দৃষ্টিতে ধিকিধিকি আগুনের ছোঁয়া ছিল, 'এক রাক্ষসকে দেবতা ভেবে পুজো করেছি আমি এতদিন। এবার তার প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে মহান ঝাও। এ-যুদ্ধ আমার একার। আপনি আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন...'
'ভরসা রেখেছি বলেই তোমাকে এই অভিযানের দায়িত্ব দিতে আমি ঝাওকে রাজি করিয়েছি, শারণিক, তবে দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হলে আর ক্ষমা পারে না।'
জবাবে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন শারণিক, 'এবারে আর ব্যর্থ হব না আমি।'
৪। দেবী
এখানে প্রাণের স্পন্দন নেই। বরফের আড়ালে, পাহাড় খুঁড়ে তৈরি গভীর এই গুহার অন্ধকারে এখন জেগে আছে একটা যান্ত্রিক চেতনা। আরাকিয়েন সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় ক্রিস্টাল কমপিউটারের নতুন প্রজন্ম সে। তবে আদিম পূর্বসূরির সঙ্গে তার চেহারার কোনো মিলই নেই। প্রভুর সঙ্গে যোগাযোগ করবার জন্য কোনো পর্দার সাহায্যও নেবার দরকার পড়ে না তার এখন।
সাধক রাবটেনের সৃষ্টি এই যন্ত্রমস্তিষ্ক একসময় একা ছিল। তখন তার একমাত্র কাজ ছিল পৃথিবীজোড়া মানুষের সভ্যতার অগ্রগতিকে অনুসরণ করা। প্রয়োজনে মানুষের অজান্তে, স্বপ্নপ্রক্ষেপণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের কারো কারো হাত ধরা। তার প্রভুর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ধীরে ধীরে তৈরি করে তোলা অর্ধ-আরাকিয়েন মানুষের সভ্যতাকে।
কিন্তু গত দু'শতাব্দি ধরে অন্য একটা কাজে লাগানো হয়েছে তাকে। সে-কাজে সে আর একা নয়। ভারতের বিভিন্ন এলাকার মাটির নীচে তার প্রভুর বসিয়ে আসা অজস্র জেনেটিক সেনসর তাকে সাহায্য করে তাতে।
সেইকাজ, ভারতবর্ষের মানুষের শরীরে ছড়িয়ে থাকা আরাকিয়েন জিনের প্রবাহকে অনুসরণ করা। এক শক্তিশালী অ্যালগরিদমে ভর করে সেই প্রবাহের মধ্যে সে খুঁজে চলে একটি বিশেষ জিন সংস্থানের পুনরাবির্ভাবের সংকেত।
দুইশতাব্দির ক্রমাগত চেষ্টায় আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছিল তার অনুসন্ধানের এলাকা। আর অবশেষে, সতেরো বছর আগে কিছু নিশ্চিত প্রমাণ পেয়ে, পূর্বভারতের একটা বিশেষ অঞ্চলে নিজের সমস্ত মনোযোগকে ঘুরিয়ে ধরেছে সে।
কাজটায় সময় লাগে। সে-অঞ্চলের প্রতিটা মানুষের জিনমানচিত্র তার কাছে পৌঁছে দেয় সেখানকার জেনেটিক সেনসরের দল। তার প্রত্যেকটাকে খুঁটিয়ে দেখে তা থেকে নির্দিষ্ট একটা জিনপ্রবাহকে বেছে নেয়া তার মতো শক্তিশালী যন্ত্রের পক্ষেও কঠিন।
তবে একসময় সে-কাজও শেষ হল তার। ফাঁকা গুহাটার মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠল তীক্ষ্ন একটা শিসের শব্দ। বুদ্ধিধর যন্ত্রমনের আনন্দের ঘোষণা। তবে সে কেবল এক মুহূর্তের জন্য। যন্ত্র কাজ বোঝে। আনন্দ বা বিশ্রামের ইচ্ছে তার প্রোগ্রামিং-এর অংশ নয়।
কয়েক মিনিট বাদে তার গবেষণার ফলাফল জানিয়ে একটা সঙ্কেতকে সে ছুঁড়ে দিল তাকে ঘিরে থাকা পাথরের দেয়ালের গায়ে। আলোর গতিতে পাথর বেয়ে সেই তথ্যের ঢেউ ছিটকে গেল চারদিকে। তার লক্ষ্য একটা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের রিসিভার। তাদের প্রভুর রিসিভার।
মুহূর্তের মধ্যে সেই সঙ্কেত গিয়ে ধরা দিল তার গন্তব্যে। বরফজমাট মানস ছাড়িয়ে আরো উত্তরে তীব্র ব্লিজার্ডের মধ্যে ধ্যানমগ্ন একটা অতিকায় প্রাণীর চারজোড়া চোখ হঠাৎ খুলে গেল তার ছোঁয়া পেয়ে...
'নির্দিষ্ট জিনসঙ্কেতের আবির্ভাব নিশ্চিত হয়েছে। আঠারো বছর আগে। মানুষের হিসাবে ২০০১ সালে। স্থানাংঙ্ক...'
সতর্ক হয়ে উঠল জীবটা। তারপর, মানুষের চেহারায় নিজেকে বদলে নিয়ে হাতের দণ্ডটা মাথার ওপরে তুলে ধরে মৃদু গলায় স্থানাঙ্কগুলো একবার উচ্চারণ করলেন সৌম্য চেহারার সন্ন্যাসী। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দণ্ডের শরীরে বসানো শক্তিশালী চিপ মানুষের সৃষ্টি জিপিএস উপগ্রহের সঙ্গে যোগযোগ করে তাঁর সামনে ফুটিয়ে তুলল নির্দিষ্ট স্থানাঙ্কের একটা নিখুঁত ছবি। লালমাটির পাহাড়ি এলাকা। সেখানে ফুলে ঢাকা একটা ফার্মহাউস।
কৌতূহলী চোখে ছবির তলায় ভেসে ওঠা লেখাটার দিকে একনজর তাকিয়ে একটু চমকে উঠলেন তিনি। তারপরই অদ্ভুত একটা হাসি ছড়িয়ে গেল তাঁর মুখে। মোরিবাগ ফার্মহাউস! অরিহন্ত ত্রিপাঠীর বাড়ি!
ঔধীশদের বিষয়ে সমস্ত খবর রাখা তাঁর কাজের অংশ। একসময় এক তরুণ আরাকিয়েন, তাঁর প্রাচীন সভ্যতার সমস্ত জ্ঞানকে মাথায় সঞ্চয় করে নিয়ে নিরুদ্দেশের পথে পা দিয়েছিল। কুইনলিন পর্বতমালায় তার প্রিয় গুহারাজ্যে তখন উধীশের আক্রমণের মুখে দেবী আরাকিয়েন একলা। তার পর বহুকাল কেটে গেছে। সেদিনের সেই তরুণ জিরিয়েনের পরিচয় হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। এখন তিনি মানস সরোবর অঞ্চলের লৌকিক দেবতা রাবটেন। পর্বতের অমর আত্মা।
কিন্তু তবু নিজের কর্তব্যকে তিনি ভোলেননি। দেবী আরাকিয়েনের ফিরে আসবার অপেক্ষা করতে করতে গত দু'হাজার বছর ধরে নিখুঁতভাবে পালন করে চলেছেন তা।
বুকের ভেতর একটা স্বপ্ন নিয়ে তাঁর পথ চলা। ঔধীশ আরাকিয়েনের শত্রু হতে পারে। কিন্তু মানুষের সমাজ তাই বলে আরকিয়েনের শত্রু নয়। তারা আরাকিয়েনেরই সন্তান। দেবী ফিরে এলে একদিন হয়তো ফের স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে। মানুষের সভ্যতার অগ্রগতিকে তাই গত দু'হাজার বছর ধরে অনুসরণ করেছেন তিনি। প্রয়োজনে সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন বারেবারে। তাদের অজান্তেই।
আর সেইসঙ্গে নজর রেখেছেন ঔধীশের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর। গত আঠারো বছর ধরে ভারতবর্ষের বুকে তাদের আগ্রাসী আক্রমণের কারণও তাঁর অজানা নয়। চীনপ্রবাসী অরিহন্ত ত্রিপাঠীর কর্পোরেট এগজিকিউটিভের ছদ্মবেশের আড়ালে তাঁর আসল পরিচয়ও তিনি জানেন। আর তাঁর ঘরেই...
ততক্ষণে সামনের ছবিটা বদলে গেছে। ইনটারনেটের তথ্যভাণ্ডার তাঁর দণ্ডের আদেশ মেনে সেখানে তুলে আনছিল অরিহন্ত ত্রিপাঠীর পরিবারের সদস্যদের ছবি।
সেদিকে চোখ ফিরিয়ে হঠাৎ একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল সন্ন্যাসীর গায়ে। সেখানে ভেসে উঠতে থাকা তরুণী মুখটার দিকে একনজর দেখেই হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে পড়লেন তিনি। অস্ফুটে বলে উঠলেন, 'দেবী...'
আর তারপরেই হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠলেন সাধক রাবটেন। নিশ্চিন্তে আনন্দ করবার সময় এ নয়। ভারতবর্ষের প্রত্যেক আরাকিয়েনের সন্ধান তাঁর তথ্যভাণ্ডারে রয়েছে। এঁর খবর সেখানে ছিল না এতদিন। তার অর্থ, এখনো তিনি আরাকিয়েনের আসল রূপ ধরতে শেখেননি। যদি অরিহন্তের জ্ঞাতসারে কখনো তা ঘটে যায় তবে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
নিরাপত্তার দরকার হবে দেবীর এখন। অন্তত যতক্ষণ না তিনি তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে এসে তাঁর সমস্ত স্মৃতি আর জ্ঞানভাণ্ডার ফিরিয়ে দেন। হাতের ইশারায় আলোর আবরণকে অদৃশ্য করে দিয়ে ফের নিজেকে আসল চেহারায় বদলে নিলেন তিনি।
ভয়াল তুষারঝড়কে তুচ্ছ করে বিশাল আটপেয়ে জীবটা বরফঢাকা পাথরের গায়ে জাল ছুঁড়ে দিতে দিতে ছিটকে যাচ্ছিল দক্ষিণে মানস সরোবরের দিকে। তার মস্তিষ্কের গায়ে আটকানো আণুবীক্ষণিক চিপ মূল ক্রিস্টাল গণকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে তখনও। তাঁর চিন্তাতরঙ্গকে ধরে নিয়ে তা ছুঁড়ে দিচ্ছিল গণকের মস্তিষ্কের উদ্দেশ্যে,
'স্বপ্নপ্রক্ষেপণের ব্যবস্থা করো। দেবীর আবির্ভাবের খবর ছড়িয়ে দাও। অনির্দিষ্টকাল ধরে ভারতবর্ষের সমস্ত পরিচিত আরাকিয়েন মস্তিষ্কের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে একসঙ্গে প্রচার চলবে...'
তাঁর ছুটন্ত পায়ের নীচে বিদ্যুতের মতো সরে যাচ্ছিল তুষারজমাট পাহাড়ের চূড়ার দল। কিন্তু সেদিকে তখন নজর ছিল না তাঁর। একটা গভীর দুশ্চিন্তা তখন তাঁকে ছেয়ে রয়েছে। নির্জন এই পাহাড়ি অঞ্চলে তাঁর যন্ত্রের শক্তির সরবরাহ সামান্যই। তার দুর্বল প্রক্ষেপণ সাধারণ আরাকিয়েনের অনুভূতিকে ছুঁতে পারবে না। একমাত্র উন্নত বোধির কোনো আরাকিয়েনের শক্তিশালী মস্তিষ্কই হয়তো...
৫। পথিক
তুষারজমাট মানস। গভীর শীতের হিমকুয়াশার আলো-আঁধারিতে তার বুকে অনেক রহস্য জেগে ওঠে। স্থানীয় মানুষেরা এ-সময়টা একান্ত নিরুপায় না হলে তার বরফজমাট বুকে পা দেয় না। যারা পা দেয় তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই ফিরে এসে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বাইরের দুনিয়াকে জানাতে পারে। সে অভিজ্ঞতা অতিবড় সাহসীরও বুকে কাঁপন ধরাবে।
সেই মৃত্যুভূমির বুক দিয়ে একলা একজন মানুষ পথ চলেছেন তখন। তাঁর লক্ষ্য মানস পেরিয়ে একটা জনহীন এলাকা। আজকাল ভারত থেকে অনেক সহজেই মানস অবধি পৌঁছোনো যায়। কিন্তু সেই সহজ পথ ছেড়ে কঠিন একটা অচেনা পথ ধরে চলেছেন তিনি। এ-পথে মানুষের পা পড়ে না। যে কাজে চলেছেন, তাতে অপ্রত্যাশিত হানাদারিই তাঁর প্রধান অস্ত্র। নির্জন এই রাস্তায় কেউ তাঁর ওপর নজরদারি করবে না।
ঘন কুয়াশার আড়ালে সূর্য পশ্চিমে ঢলছিল। হাওয়ার বেগ ক্রমশ বেড়ে উঠছিল তাঁকে ঘিরে। সভ্য দুনিয়ার মানুষ সে ঝড়ের গতির আন্দাজ পাবে না।
হাওয়া ঠেলে ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একটা সময়ে তিনি আর পারলেন না। হ্রদের বুক ফুঁড়ে ওঠা উঁচু একটা তুষারটিলার আড়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন। ধারালো বরফকুঁচি মেশা ঝড়ের ধাক্কাকে খানিক আটকে দিয়েছে তা।
সেখানে বসে বসেই ঝোলা থেকে একটা স্যাটেলাইট মানচিত্রের প্রিন্ট আউট আর কম্পাস বের করে আনলেন তিনি। তাতে কিছু মিলিয়ে দেখে এইবার হাসি ফুটল মানুষটার মুখে। যাত্রার প্রথম ধাপ শেষ। এক হাজার কিলোমিটার তুষারমরু পেরিয়ে লক্ষ্যের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছেন তিনি। মানস আর বেশি দূরে নেই।
হঠাৎ দূরে কিছু গম্ভীর শব্দ শুনে মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল তাঁর। অন্ধকারের ভেতরে যেন বেজে উঠেছে দামামার শব্দ, রামশিঙার আওয়াজ। তারপর হঠাৎ সে-শব্দকে ছাপিয়ে উঠল পশুরাজের রক্তজমানো হুঙ্কার।
ভয়ে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে মানুষটার। শীতের মানসের এই শব্দদের নিয়ে আকসাই চীন জুড়ে বহু অলৌকিক গল্পগাথা আছে। কিন্তু একসময় বিজ্ঞানের শিক্ষা পাওয়া মানুষটা জানেন, কোনো অশরীরি প্রেতের শব্দ এরা নয়। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর এক শত্রুর পদধ্বনি। বরফের আস্তণের তলায় ক্ষেপে উঠেছে মানসের গভীর জল। তার ধাক্কায় সরু-মোটা চিড় ধরছে বরফের জমাট শরীরে। চিড়গুলোর মধ্যে ছুটন্ত বাতাস মৃত্যুবাঁশির সুর তুলছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গত করছে বরফ আর জলের যুদ্ধের শব্দ।
হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল তাঁর পায়ের তলার জমি। আর তারপর, কর্কশ শব্দ তুলে খানিক দূরে বরফের স্তর ফেটে জেগে উঠল একটা ছুটন্ত ফাটল! নিশ্চিত মৃত্যুর বার্তা নিয়ে ধেয়ে আসছিল আঁকাবাঁকা ফাটলটা। অতিকায় কোনো প্রাগৈতিহাসিক জলজন্তু যেন বরফে চিড় ধরিয়ে ধেয়ে আসছে তার তলা দিয়ে।
হঠাৎ নিজের শিক্ষাদীক্ষা, মিশন, সবকিছু ভুলে গেলেন শারণিক। সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আকসাই চীনের কোনো এক গ্রামের ছোট ছেলেটা যেন ফের জেগে উঠেছে তাঁর ভেতরে। আকাশের দিকে মুখ তুলে আকুল প্রার্থনায় সে বলে ওঠে, 'রক্ষা করো হে পর্বতের অমর আত্মা। আমি তোমার শরণ নিলাম।' তারপর দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অন্ধের মতন ছুটতে শুরু করলেন তিনি।
তাঁর সে আর্তনাদের শব্দ কোনো অজানা যন্ত্রের গ্রাহক ঠিকই শুনে নিয়েছিল। কয়েকমুহূর্তের মধ্যে তাঁর অবস্থানের খবর ও প্রার্থনার শব্দ পৌঁছে গেল বরফের মধ্যে দিয়ে নিজের গুহার দিকে ছুটন্ত একটা অতিকায় প্রাণীর কানে। একমুহূর্ত থেমে থেকে অবস্থানটাকে একবার বুঝে নিল সে। ভাগ্য ভালো এর। তার থেকে বেশি দূরে সে নয়।
অতিকায় ফাটলটা এঁকেবেঁকে প্রাগৈতিহাসিক কোনো সরীসৃপের মতো ধাওয়া করছিল শারণিককে। শরীরের শেষ শক্তিটুকুকে অবলম্বন করেই তার হাত থেকে বাঁচবার জন্য এঁকেবেঁকে ছুটে পালাতে চান তিনি।
আর তারপর, কানফাটানো একটা শব্দ তাঁকে একেবারে থামিয়ে দিল। হ্রদের বিচিত্র খেলায় হঠাৎ তাঁর সামনে মাথা ঠেলে উঠে দাঁড়িয়েছে একটা বরফের টিলা। একে ডিঙিয়ে এগোন তাঁর সাধ্য নয়।
টিলাটার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি এবার। একটু একটু কাঁপছে বরফের স্তূপটা। সেই কাঁপুনি তখন তাঁর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছিল। নিজের জীবনকে বাজি রেখে যে জুয়া তিনি খেলেছেন এই মৃত্যুভূমিতে এসে, এবার তার শেষ দৃশ্য শুরু হতে চলেছে। এবার হয় তিনি সফল হবেন, অথবা...
না। আর কোনো ভয় তিনি করবেন না। তাঁর বুঁজে থাকা চোখদুটোর সামনে তখন ভেসে উঠেছে করুণাময় বুদ্ধের সুন্দর মুখ। ভেসে উঠেছে আদিদেব উধীশের বাণী, 'রাক্ষস আরাকিয়েনকে নিশ্চিহ্ন করবার যুদ্ধের শহিদ বুদ্ধের প্রিয় হন।'
মৃত্যুঘুমে তলিয়ে যেতে থাকা মানুষটার অজান্তে তার পেছনের টিলাটার ওপরে তখন অন্য একজন মানুষ উঠে এসেছেন। ফুটবিশেক নীচে স্থির হয়ে থাকা শরীরটার দিকে একনজর দেখলেন তিনি। পরনে স্থানীয় পোশাক। দুর্ভাগা মানুষ! প্রকৃতিকে দমন করবার বিজ্ঞান এখনো তাদের নাগালের অনেক বাইরে। অথচ এই বিপুল শক্তিকে বশ করা কত সহজ!
একে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে হবে। হালকা একটা লাফে জ্ঞানহীন শরীরটার ঠিক পাশে এসে নেমে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর হাতের দণ্ডটা তুলে ধরলেন কালান্তক ফাটলটার দিকে।
সঙ্গে-সঙ্গেই মন্ত্রমুগ্ধ সাপের মতো থমকে গেল ফাটলের গতি। থেমে আসছে টালমাটাল বরফের কাঁপুনিও। আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসছিল বরফচাপা সরোবরের খ্যাপা ঢেউয়ের উথাল-পাথাল। তারপর হঠাৎ, দণ্ডের ইশারায় প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করে সেই ফাটল বেয়ে ফোয়ারার মতো উঠে এল ঘুমন্ত মানস। তীব্র ঠান্ডা হাওয়ার ছোঁয়া পেয়ে জমাট বেঁধে গিয়ে সারিয়ে তুলল বরফের গায়ের ক্ষতকে। কয়েকমুহূর্তের মধ্যে ফাটলের কোনো চিহ্নও আর রইল না সেখানে।
ঝড়ের বেগ ততক্ষণে আরো বেড়ে উঠেছে। জ্ঞানহীন মানুষটার শরীরে উড়ন্ত বরফকুঁচিরা সাদা একটা আস্তর গড়ে তুলছিল দেখতে দেখতে। সেই শীতল ছোঁয়া তখন তাকে তখন তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গভীর শান্তির ঘুমের দুনিয়ায়। এ-ঘুম একবার এলে আর ভাঙে না।
নীচু হয়ে এবার একবার তাকে ছুঁয়ে দেখলেন সন্ন্যাসী। মানুষটা শক্তপোক্ত। চেতনা হারিয়ে গেলেও, এখনো লড়াই দিচ্ছে তার শরীর। এখনো আশা আছে।
হঠাৎ মানুষটার ডানহাতে বাঁধা কালো চাকতিটার দিকে চোখ পড়তে চমকে উঠলেন রাবটেন। ঔধীশের চিহ্ন! ফের একবার...
পুরনো স্মৃতিগুলো আবারও মনে পড়ে যাচ্ছিল তাঁর। এদের আদিগুরুর হাতেই প্রাণ দিয়েছেন দেবী আরাকিয়েন। তিন শতাব্দি ধরে বারেবারে এরাই এসেছে তাঁর খোঁজে। যারা সফল হয়েছে, তাঁর রহস্যকে জেনে ফেলবার মাশুল গুণেছে তারা নিজের প্রাণ দিয়ে। একেও সে-পথে পাঠাবার জন্য কিছুই করতে হবে না তাঁকে। প্রকৃতি নিজেই সেই ব্যবস্থা করে দেবেন।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা রাগটাকে সংযত করলেন সাধক রাবটেন। অকারণ প্রাণ নেওয়া তাঁর ধর্ম নয়। এই অর্ধ-আরাকিয়েন, এদের আগেকার দলগুলোর মতোই, নিজেকে অসহায় অবস্থায় ফেলে কৌশলে তাঁকে টেনে এনেছে। শুধু তফাৎ হল, এই জ্ঞানহীন মানুষটা তাঁকে দেখেনি। তাঁর অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পায়নি সে! মিছিমিছি এর প্রাণ নেবার অর্থ নেই কোনো।
তাড়াতাড়ি নিজের কর্তব্য স্থির করে নিলেন তিনি। তারপর হাতের দণ্ডটাকে ঘুরিয়ে মাথার ওপরে তুলে ধরলেন। তার থেকে ধেয়ে যাওয়া অদৃশ্য শক্তির ছোঁয়ায় শান্ত হয়ে আসছিল অজ্ঞান শরীরটাকে ঘিরে বয়ে চলা ঝড়ের বেগ।
পড়ন্ত সূর্যের মৃদু আলো তাঁর শরীরে হালকা উষ্ণতার ছোঁয়া দিচ্ছিল। আস্তে আস্তে চোখ খুলে উঠে বসলেন শারণিক। ঝড় থেমে গেছে। সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতো ফাটলটার কোনো চিহ্ন নেই আর। অথচ কয়েকমুহূর্ত আগেই তো... তাহলে কি...
উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে দেখলেন তিনি একবার। তাঁর পাশ থেকে দুটো পায়ের ছাপ এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। কাছে গিয়ে তার একজোড়া ছাপকে খুঁটিয়ে দেখলেন শারণিক। দানবের কোনো চিহ্ন নেই তাতে। তাঁরই মতন কোনো সাধারণ মানুষের পায়ের চিহ্ন ঝুরো বরফের গায়!
মনের ভেতর একটা উথাল-পাথাল চলছিল শারণিকের। জ্ঞান হওয়া থেকে মঙ্গলময় আত্মা রাবটেনের গল্প শুনে এসেছেন তিনি। আজ নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তাঁকে স্মরণ করেছিলেন। নিজেকে বিপন্ন করে ফাঁদ পেতেছিলেন তাঁকে ধরবার জন্য।
সে ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ এসেছিলেন খানিক আগে। হয়তো তিনিই অলৌকিক শক্তি দিয়ে রক্ষা করেছেন তাঁকে। রাবটেন? কিন্তু, ঝাও তো বলেছেন সে আরাকিয়েন প্রজাতির কোনো প্রাচীন রাক্ষস। সেই দাবির পেছনে যুক্তি যে আছে, তা শারণিক নিজেও বুঝেছেন। এই রাবটেনই আরাকিয়েনের জীবনীকার। অথচ তাই যদি হবে তাহলে সে-রাক্ষস কেন এভাবে একজন অসহায় শিকারের প্রাণ ফিরিয়ে দেবে?
বুকের ভেতর দুটো বিপরীত অনুভূতি ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল তাঁকে। যতটা নিশ্চিত হয়ে এ-কাজে বেরিয়েছিলেন শারণিক, এবার আর ততটা নিশ্চিত তিনি নন। আরো প্রমাণ চাই তাঁর। রাবটেন দৈবশক্তিধর অমর আত্মা, নাকি রাক্ষস আরাকিয়েন, তার নিশ্চিত প্রমাণ চাই আগে। যদি দেবতা হন তাহলে আরাকিয়েনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর শরণ নেবেন শারণিক। আর যদি রাক্ষস হন, তাহলে...
ছোটবেলা থেকে পর্বতের অমর আত্মাকে ভক্তি করতে শিখেছেন তিনি। কিন্তু একজন ঔধীশ হিসেবে তাঁর প্রথম কর্তব্যের সামনে সেই শিক্ষা কোনো কাজে আসবে না। সযত্নে পিঠের থলেতে রাখা উপকরণগুলোর গায়ে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন তিনি। আরাকিয়েনের শক্তিকে ভয় করেন না যোদ্ধা শারণিক।
সাবধানে...খুব সাবধানে চলমান পায়ের ছাপগুলোকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু খানিকদূর এগিয়েই চমকে উঠে থেমে যেতে হল তাঁকে। সামনে উঠে যাওয়া একটা বরফের টিলার তলায় এসে মিলিয়ে গেছে পায়ের ছাপ। তার গায়ের নরম তুষারে মানুষের পায়ের চিহ্ন নেই কোনো। টিলার ঠিক নীচে বরফের স্তূপ জমিয়ে একটা অতিকায় তিরচিহ্ন বানানো রয়েছে! তিরের ফলার কাছে বরফ জড়ো করে তৈরি একটা পাহাড় আকারের ঢিবি। তার মাথাটা সমতল করে ছাঁটা।
তিরচিহ্নের চারপাশে খুঁটিয়ে দেখেও লাভ হল না কোনো। মানুষটা যেন একেবারে উবে গেছেন এ-জায়গাটায় এসে। তবে, যাবার আগে বরফের বুকে একটা নিশানা গড়ে রেখে গিয়েছেন তাঁর রহস্যময় রক্ষাকর্তা। কেন?
সূর্যের আলো নিভে আসছিল। সেদিকে একনজর দেখে নিয়ে তাড়াতাড়ি ঝোলা থেকে মানচিত্রটা বের করে আনলেন শারণিক। তিরচিহ্নটার অভিমুখ কম্পাসে মেপে মানচিত্রের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখে নিলেন। সরোবর পেরিয়ে বেশ কিছুদূর উঠে গেলে, পাহাড়ের মাথায় লা মো নামে একটা জায়গার চিহ্ন দেওয়া রয়েছে সেখানে। জায়গাটা অরিহন্তের ল্যাপটপে দেখা ঔধীশদের গণকবরের একেবারে কাছাকাছি। কোনো গ্রাম? সম্ভবত তাই হবে। রাতের আশ্রয় হিসেবে তাহলে সেদিকেই ইশারা করেছেন তাঁর অদৃশ্য রক্ষাকর্তা।
গ্রামটার পাশ দিয়ে একটা নদীর ধারা বয়ে গেছে। ধারাটা শুরু হচ্ছে ওর ঠিক ওপরে একফোঁটা একটা হ্রদের থেকে। হাতে ধরা মানচিত্রে সেই জলাশয়ের সংকেতটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একচিলতে হাসি ফুটে গেল শারণিকের মুখে। পথ পাওয়া গেছে। ওই হ্রদটা!!
শরীরে শক্তি নেই বেশি আর। সামনে আরেকটা ভয়ঙ্কর রাত নামছে। কিন্তু তবু, যে কোনো মূল্যেই তাঁকে আজ পৌঁছোতে হবে ও-জায়গাটায়। এবার তাঁর কাছে ধরা দিতেই হবে পর্বতের অমর আত্মাকে। তাঁর রক্ষিত এলাকায় একজন অজানা মানুষের বিপদ হলেও তিনি তাকে রক্ষা করেন। কিন্তু সে-এলাকায় একটা গোটা গ্রাম যদি বিপন্ন হয়? যদি...
একটা পরিকল্পনা আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল তাঁর মাথায়। এবার প্রস্তুত থাকবেন শারণিক। তাঁর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে এবার পর্বতের অমর আত্মাকে।
৬। লা মো
কৈলাশ গিরিশিরার কোনো এক অনামা পাহাড়ের মাথায় সমতল একটুকরো জমি। হয়তো দূর অতীতের কোনো বিপর্যয়ে পাহাড়চুড়ো গুঁড়িয়ে গিয়ে তার জন্ম। তাকে ঘিরে থাকা পর্বতদের ফাঁকফোকড় বেয়ে ভয়াল উত্তুরে হাওয়ার ঝড় বয়ে চলে জায়গাটা দিয়ে। সময়ে-অসময়ে নেমে আসে তুষারধ্বসের আঘাত।
কিন্তু তবু, জায়গাটা পরিত্যক্ত নয়। কিছু মানুষ একে নিজেদের জন্মভূমি বলে মানে। জমে থাকা বরফের স্তূপের মধ্যে নজর চালালে ইতিউতি কয়েকটা ঘরের চাল নজরে পড়বে। সেখানে চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া, আর তুষার মেখে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিউতি দুটি একটি সোলার প্যানেল বুঝিয়ে দেয়, প্রকৃতির সব প্রতিরোধকে ভেঙে দিয়ে এখানেও বাসা বেঁধেছে কিছু দুর্দম মানুষ। সভ্য দুনিয়ার সামান্য দু'একটা সুবিধেও আস্তে আস্তে এসে পৌঁছোচ্ছে তাদের কাছে।
গ্রামের নাম লা মো। তার কিছুদূরে গ্রোৎসে গিরিশৃঙ্গের গায়ে একটা প্রাকৃতিক হ্রদ। সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে একটা সরু প্রপাত নেমে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যায়। সেই নদীর নামেই গ্রামের নাম। এখন, এই মাঝ-শীতে সে নদী জমে গেছে। কোনো জাদুকাঠির ছোঁয়ায় থেমে গেছে গ্রোৎসে হ্রদ থেকে নদীর খাতে ঝরে পড়া জলের ধারাও।
চাঁদ উঠেছিল সেদিন। ঝড় থেমে গিয়ে আশ্চর্য শান্ত হয়ে গিয়েছে আকাশ, বাতাস। জমাট বাঁধতে থাকা নতুন তুষারের স্তূপ বাতাস থেকে উষ্ণতার শেষ ছোঁয়াটুকুও শুষে নিয়েছে। একটুকরো জমাটবাঁধা ছবির মতোই আকাশের নীচে শুয়ে ছিল লা মো।
হঠাৎ একটা টংটং শব্দ উঠল বাইরে থেকে। ক্রমাগত বেজে চলেছে আওয়াজটা। বুড়ি কেসলাং-এর ঘুম এমনিতেই পাতলা। মাঝরাত্রে পুরনো কাশির বেগটা বাড়তে একেবারেই ঘুম আসছিল না তার। বিছানায় শুয়েই সে কান খাড়া করল। গ্রামের মাঝখানের ধর্মচক্র ঘোরবার শব্দ! হাওয়া? নাঃ। ঘরের এক কোণে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটা কান খাড়া করে ভুক ভুক করে উঠেছে। তার চোখ ঘরের বন্ধ দরজার দিকে। কেউ এসেছে গ্রামে! কিন্তু...দুর্গম এই পাহাড়ের মাথায় গভীর বরফ পার হয়ে কে এল এত রাতে!
ভূতপ্রেতে কেসলাং-এর গভীর বিশ্বাস। মাঝরাত্রে বাইরে এহেন শব্দ ওঠায় তাই সে খানিক ভয় পেয়েছিল বইকি। তাড়াতাড়ি ভারী কম্বলটা মাথার ওপর চাপিয়ে দিতে যাবে, ঠিক তক্ষুণি ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গলার আওয়াজও উঠল বাইরে থেকে। কেউ যেন বারবার দুর্বল গলায় বলছে, 'না কিয়োপো নাশি...'
এইবার তড়বড়িয়ে উঠে বসল কেসলাং। ও-ডাকের মানে সে জানে। ভূত-টুত কিচ্ছু নয়। বিপদে পড়ে কোনো মানুষ এসেছে গ্রামে। বলছে 'আমি ক্ষুধার্ত! আমায় বাঁচাও।'
দুর্গম এই পাহাড়ের মাথায় ক্বচিৎ দু-একজন পথ হারানো মানুষ এসে হাজির হয় বইকি কখনো কখনো! পাহাড়ের অমর আত্মাই তাদের এনে পৌঁছে দেন হয়তো। তাদের সাহায্য করা গ্রামের কর্তব্য।
ঘরের অন্যপাশে তাসি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। কাশি-টাশির তোয়াক্কা না করে বুড়ি কম্বল ফেলে তার দিকে এগিয়ে গেল তড়বড়িয়ে।
'এই তাসি! ওঠ...ওঠ...'
'উঁ!' বলে পাশ ফিরে কম্বলটা ভালো করে মুড়ি দিতে যাচ্ছিল তাসি। কিন্তু কেসলাং তাতে থামলে তো! একটানে তার গায়ের কম্বল ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে সে। তারপর তার মাথার চুল আঙুল পেঁচিয়ে টানতে টানতে কানের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে চিলচিৎকার করে, 'তাসি! এই ব্যাটা বুনো দ্রং। শিগগির জাগ।'
এইবার তাসি জেগছে। রাগী চোখে সে তার মায়ের দিকে দেখে আর দাঁত কড়মড়িয়ে বলে, 'আমি বুনো চমরী? উঠব না আমি। দেখি কেমন করে...'
বুড়ি অমনি তাড়াতাড়ি তার চুলের মুঠো ছেড়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলোতে লেগেছে, 'লক্ষ্মী বাপ আমার। উঠে গিয়ে একবারটি বাইরে দেখে আয়। অমর আত্মা রাবটেন অতিথি পাঠিয়েছেন গ্রামে। ওই শোন...'
এইবার দেখা গেল বাইরে থেকে ভেসে আসতে থাকা ডাকটা তাসির কানে গিয়ে পৌঁছেছে। কম্বল ছেড়ে একলাফে উঠে দাঁড়াল সে। পাহাড়ের গা থেকে চুঁইয়ে আসা তেলে ভেজানো ন্যাকড়ার একটা স্তূপ করা থাকে ঘরের একপাশে। তারই গুটিদুই তুলে নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে ফেলল নিভে আসা চুল্লির ভেতরে। তাতে কয়েক টুকরো কাঠ ছুঁড়ে ফেলে আরেকটা তেলে ভেজানো ন্যাকড়া একটা ডাণ্ডার মাথায় জড়িয়ে জ্বালিয়ে নিয়ে বড় বড় পায়ে বের হয়ে গেল ঘর থেকে। বুড়ি কেসলাং ততক্ষণে নতুন করে জ্বলে ওঠা চুলোটার একপাশে খানিক জল গরম করতে দিয়েছে। অন্যপাশে দড়িতে ঝোলানো শুঁটকি মাংসের ফিতেগুলোর একখানা নামিয়ে এনেছে তাড়াতাড়ি। সেইটেকে একটা পাথরের বাটিতে টুকরো করে ভাঙতে ভাঙতে কাশির বিরাম ছিল না তার।
দিনদুয়েক টানা ঘুমোবার পর লোকটা জাগল যখন তখন মুখটা অনেক ঝরঝরে হয়েছে তার। বুড়ি কেসলাং তার মাথার কাছে বসে তকলিতে পশমের সুতো টানছিল। কাশিটা বড্ড বেড়েছে তার আজকাল। বুকের ভেতর ভারি চাপ ঠেকে। লোকটার বড়সড় ঝোলাটাকে বেশ বালিশের মতো করে কোলের ওপরে নিয়ে জুত করে বসেছে সে। একটুখানি আরাম ঠেকছে ওতে।
চোখ খুলে লোকটা প্রথমেই একটা অদ্ভুত আচরণ করল। হাত বাড়িয়ে কেসলাং-এর কোল থেকে তার ঝোলাটা টেনে নিয়েছে সে এক হ্যাঁচকায়। পাকানো শুকনো শরীর। মোটা হাড়। শক্তি ধরে গায়ে। ঝোলাটা চেপে ধরে জ্বলন্ত চোখে তার দিকে দেখছে।
কেসলাং ভারি ঘাবড়ে গিয়ে তার দিকে ঘুরে দেখল একবার। তারপর মিনমিন করে বলে, 'আমি তো খালি একটু কোলের ওপর রেখে...' বলতে বলতেই ফের কাশিটা ফিরে এল তার।
লোকটা আস্তে-আস্তে শান্ত হয়ে আসছিল। ঝোলার মুখ খুলে ভেতরে কীসব ঘেঁটেঘুটে দেখে নিয়ে, বুড়ির কাশির বেগ কমলে বলে, 'এ-ঝোলা ধরলে বিপদ হতে পারে যে বুড়িমা! তাই ভয় পেয়েছিলাম।'
'কীসের বিপদ!' বুড়ি ভুরু কুঁচকে তাকাল তার দিকে, 'থাকবার মধ্যে তো গুটিকয় কাপড়, বিজলি মশালের ব্যাটারি আর তালা লাগানো একখানা বাক্স! তা হ্যাঁগো, ও-বাক্সে কি তোমার টাকাপয়সা আছে?'
মানুষটা এইবার হাসলেন একগাল, 'সন্নিসি মানুষ। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই। টাকায় আমার কাজ কী, অ্যাঁ? ওতে আমার সাধনভজনের জিনিস আছে। সে-সব অন্যের দেখা বারণ। দেখলে পর্বতের অমর আত্মা রুষ্ট হবেন।'
এইবার কেসলাং দেখা গেল একটু সমীহের চোখে দেখছে তাঁকে। খানিক বাদে বলে, 'তার মানে তুমি রাবটেনের সাধক? তুমি তাঁকে দেখেছ নাকি?'
মাথা নাড়লেন তিনি, 'দেখিনি, তবে তিনি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন বুড়িমা। তারপর এইখানে এসে তাঁর জন্য সাধনা করবার আদেশ দিয়েছেন।'
'তার মানে এইখানে তুমি একখানা লামাসেরি বানাবে, তাই না?' কেসলাং-এর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবারে। মঠ তৈরি হওয়া মানেই তো বারোমাসে তেরো পার্বণ, ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া!! আহা!
'তাহলে আমার তাসিটাকে চরণে জায়গা দিও বাবা। তোমার মঠ গড়বার পাথর বইবার থেকে শুরু করে...'
হঠাৎ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন মানুষটা, 'ভুল করছ বুড়িমা। পর্বতের অমর আত্মা মঠ-মন্দির চান না। তিনি আমাকে অন্য আদেশ দিয়েছেন। তিনি চান, আমি তোমাদের সঙ্গে এখানে থেকে তোমাদের কাজকর্মে সাহায্য করি। সেই হবে আমার সাধনা।'
বুড়ি একটু নিরাশ চোখে তাঁর দিকে দেখল একবার। দেবদেবতাদের আদেশ এমন অদ্ভুতুড়ে কেন হয় কে জানে! তবে হ্যাঁ। চেহারাটা শক্তপোক্ত। খাটতে পারবে ভালো। তাসির সঙ্গে কাজেকর্মে জুড়ে দিলে চার হাতে আয়-রোজগার খানিক বাড়বে বইকি। লামাসেরি নাহয় নাই হল, কিন্তু ছপ্পর ফুঁড়ে এমন একখানা জোয়ান ছেলে বাড়িতে জুটে যাওয়াও খারাপ কীসে? বিশেষ করে তেমনটা যদি রাবটেনের ইচ্ছে হয়!
খানিক বাদে সে মাথা নেড়ে বলে, 'সে থাকো না আমার কাছে! কে মানা করছে? কম্বলও পাবে একখানা। তবে হ্যাঁ। গতর খাটাতে হবে এই বলে রাখলাম। সারাদিন বসে ধ্যান করবে আর সন্ধেবেলা আমার ছেলের কষ্টের রোজগার খেয়ে পেট ভরাবে সেটি হচ্ছে না।'
একটুক্ষণ চুপ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন মানুষটা। তারপর একচিলতে হেসে বললেন, 'তাই হবে। আমার তো আর এখন শরীরে কষ্ট নেই কোনো! কিছু কাজ করে দিতে হলে বলো দেখি!'
কেসলাং এইবার বেশ আরাম করে পা'দুটো ছড়িয়ে বসল। শীতের সময়টা গ্রামের খাবার জল আসে গ্রোৎসের জমাটবাঁধা প্রপাতের বরফ ভেঙে। গত সপ্তাহখানেক ঝড়-ঝঞ্ঝায় সে কাজ হয়ে ওঠেনি তার। জলের ভাঁড়ার একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। ওদিকে তাসিটাও বাড়িতে নেই। গেছে নীচের জঙ্গলে তাজা কিছু একটা যদি মেরে আনতে পারে সেই খোঁজে। ভরা শীতে অবশ্য শিকার মেলবার সুযোগ কম। সারাটা দিন যাবে তার ওই বরফের মধ্যে জঙ্গল হাঁটকে।
'শোনো গো ছেলে, জলের ভাঁড়ার ফুরিয়েছে। আজ আর শরীর বইছে না আমার। চুলোর পেছনদিকে চামড়ার ভিশতি আর ওককাঠের বাঁক রাখা আছে। ওই নিয়ে গ্রোৎসের থেকে সাফসুতরো খানিক বরফ ভেঙে নিয়ে এসো দেখি! আর হ্যাঁ, যাবার আগে চুলোর আগুনটা একটু উশকে দিয়ে যেও। ঠান্ডাটা বেজায় পড়েছে ফের।'
এতগুলো কথা একটানা বলতে গিয়েই খকখকিয়ে কেশে উঠল কেসলাং। কাশির ধমকে শরীরটা বেঁকে উঠছে তার।
'জল আনতে তোমাকেই যেতে হয় বুঝি?'
'নইলে আর যাবেটা কে শুনি? ছেলেটা আমার একলা একলা কত খাটবে, বলো?'
কাছে এসে বুড়ির পিঠে হাত রাখলেন তিনি। মারমটের চর্বির মালিশের দুর্গন্ধ তার গায়ে। তিনি জানেন এতে কাজ হবে না। ফুসফুসে জল জমেছে এর। এবারে একদিন হয়তো এভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে নীরবে। বড় কষ্টে দিন চলে এখানকার বাসিন্দাদের। অথচ সামান্য অসুখ। এর প্রতিকার ছড়িয়ে আছে এদের বাসস্থানের আশপাশেই।
খানিক বাদে মানুষটা চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন। নীচু হয়ে তাঁর ঝোলা থেকে দুয়েকটা জিনিস বের করে নিয়ে জোব্বার ভেতর ঢুকিয়ে নিলেন। তারপর বড় বড় পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাঁক আর ভিশতিদুটো তুলে নিলেন হাতে।
প্রাকৃতিক হ্রদটা আয়তনে খুব বড় নয়। তবে এই হ্রদেরা খুব গভীর হয়। পায়ের অনেক নীচে পড়ে থাকা ভিশতিটার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখে নিলেন সন্ন্যাসী। জায়গাটা নির্জন। পাহাড়ের মাথা থেকে নেমে আসা ঝর্ণার জমাটবাঁধা ধারার পাশে পাথরগুলো এবড়ো-খেবড়ো। সেগুলো আঁকড়ে ধরে উৎসের কাছে বেয়ে উঠতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি তাঁর। নীচে থেকে বড়জোর শ'খানেক মিটার ওপরে হবে ঝর্ণাটার মুখ। পাথরের গায়ে একটা ছোট ফোকর। সেখান দিয়ে হ্রদের জমাট বাঁধা বরফ এগিয়ে এসে নিশ্চল, সফেদ ধারা হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে তলার দিকে।
ফোকরের চারপাশের পাথরগুলোকে খুব সাবধানে পরীক্ষা করলেন তিনি। ভঙ্গুর বেলেপাথর। ফোকর ঘিরে পাথরের বাঁধুনি একটু দুর্বল করে দেওয়ার শুধু। তারপর জলের চাপে আস্তে আস্তে ও নিজেই...
দূরে দুটো কালো ফুটকি দেখা দিয়েছে। এদিকেই উঠে আসছে সেগুলো পাহাড়ের গা বেয়ে। জল নিতে আসছে গ্রামের অন্য কোনো পরিবার। সেদিকে একনজর দেখে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে চললেন তিনি। দিনের আলোয় এ-কাজ করা সম্ভব হবে না। কারো সন্দেহ না হয় সেভাবে খুব সাবধানে সাজাতে হবে ছকটাকে।
অঙ্কের হিসেব মেনে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যাবে মৃত্যুফাঁদ। তাঁকে সময় দেবেন তিনি। ভাববার সময়। তারপর সামনাসামনি এসে ধ্বংস আটকাতে মাঠে নামতে হবে তাঁকে। আর সেই সময়...
জল নিয়ে ফিরে এসে ভিশতিদুটোকে ঠিক জায়গায় রেখে আগুনের পাশে গিয়ে বসল লোকটা। জোব্বার পকেটে গুঁজে কয়েকটা বুনো শেকড়-বাকড় তুলে এনেছে বরফ খুঁড়ে। একটুকরো পাথরের ওপর তাই রেখে ছোট একটা পাথরের টুকরো দিয়ে থেঁতো করছে টুকটুক করে। খানিক বাদে একটা ছোট কাঠের পাত্র খুঁজে এনে থকথকে জিনিসটাকে তাইতে তুলে নিল সে। তারপর সেটা হাতে করে বুড়ির সামনে এনে বলে, 'আঙুলে করে একটুখানি মুখে দাও তো! মনারের শেকড়। কষ্ট কমে যাবে।'
কেসলাং সন্দেহের চোখে একবার দেখল জিনিসটাকে। তারপর লোকটার দিকে ফিরে তাকাতে সে বোধ হয় তার সন্দেহটার কথা অনুমান করতে পারল। আঙুলে করে তার খানিক তুলে নিজের মুখে দিয়ে বলল, 'এই দেখ। খারাপ কিছু নয়।'
এইবার সাহস করে একটুখানি তুলে নিয়ে মুখে দিল বুড়ি। একটা মিষ্টি উত্তাপ জিভ থেকে তার ছড়িয়ে গেল গলার দিকে। অসহ্য খুশখুশানিটা কমে এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। এইবার আর আঙুলে করে ওষুধ তুলে মুখে চালান করতে আপত্তি করল না সে।
'আজ সারাদিন ধরে এইটে খানিক খানিক খেয়ে যাও। ভালো হয়ে যাবে দেখো,' বলে একটু হেসে লোকটা ফিরে গিয়ে বসল তার কম্বলটার ওপরে।
কেসলাং অবাক হচ্ছিল খুব। জিনিসটা খাবার পর থেকে বুকের ভেতরের চাপটা আর তত ঠেকছে না। খানিক বাদে লোকটার দিকে ফিরে তাকিয়ে সে বলল, 'অমর আত্মা তোমার ভালো করুন বাবা। আর কখনো যে বুক ভরে দম নিতে পারব সে আমি ভাবিনি। তোমার নাম কী?'
'আমার নাম শারণিক।'
'বেঁচে থাকো। বড় আরাম দিলে আমায়। তা, এখন তুমি আমার কাছে থাকবে তো? নাকি ফের ক'দিন বাদে...'
মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন শারণিক। বড় নিরীহ, সরল মানুষ এরা। অথচ এদের জীবনকেই চূড়ান্ত বিপদের মুখে ঠেলে দিতে হবে তাঁকে!
একটা তীব্র দুঃখের অনুভূতি তাঁর বুকের ভেতর ছেয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। সরল এই মানুষগুলোর ভালোবাসা আর বিশ্বাস এই ক'দিনেই তাঁর কঠিন বুকের মধ্যে কোথাও একটা চিড় ধরিয়েছে। আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছে চিড়টা। দুর্বল করে দিচ্ছে তাঁকে। এককালের সেই কর্তব্যে অটল নিষ্ঠুর মানুষটা মাঝেমধ্যেই কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে আজকাল বুকের ভেতর থেকে।
হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে সংযত করলেন শারণিক। আরাকিয়েনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ঔধীশ সন্ন্যাসীর এমন দুর্বলতা সাজে না। সে যুদ্ধে অনেক নিরীহ মানুষকেও প্রাণ দিতে হয়। প্রতিটি ঔধীশ মন্দিরের মেঝেতে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল লুকোনো থাকে! তাদের সবাই রাক্ষস ছিল না। পরীক্ষার পর সন্দেহমুক্ত হলেও শুধু গোপনীয়তার খাতিরে তাদের ফিরে যেতে দেওয়া হয়নি। আরাকিয়েনের সম্ভাব্য আস্তানা হিসেবে তিনি নিজেও তো কতবার কত নিরীহ গ্রামকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছেন! এবারে আরো একবার...এই গ্রামকে...
পাহাড়ে রাত নেমেছে। আকাশে চাঁদ নেই আজ। ঘন মেঘের চাঁদোয়া ভারী হয়ে ঝুলে রয়েছে সারা এলাকাটা জুড়ে। তার নীচে, কুয়াশার ভেতর দিয়ে কালো আলখাল্লা পরা একজন মানুষ হেঁটে যান।
গভীর রাত্রে তাঁর এভাবে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি এ গ্রামের মানুষজন। তাদের কাছে তিনি পর্বতের অমর আত্মার পাঠানো দেবদূত হয়ে উঠেছেন গত কয়েকটা সপ্তাহে। গ্রামের মানুষের যেকোনো বিপদে-আপদে এগিয়ে যান সবার আগে। পাহাড়ি জড়িবুটিতে গভীর জ্ঞান তাঁর। গ্রামের অসুস্থ মানুষজনকে সারিয়ে তোলেন সহজেই। প্রতিদানে কিছু দাবি না করলেও কেসলাং-এর ভাঁড়ার আজকাল ভরে উঠছে মানুষজনের অযাচিত দানে।
কোনো কোনো দিন, আকাশে চাঁদ না থাকলে গভীর রাত্রে এইভাবে একলা বের হয়ে যান তিনি। অনেকেই দেখেছে, গ্রোৎসের প্রপাতের খাড়া শৃঙ্গের দিকে মিলিয়ে যান তিনি হাঁটতে হাঁটতে। ফিরে আসেন সকাল হবার আগেই। কেউ প্রশ্ন করলে মৃদু হেসে মাথা নাড়েন শুধু।
গ্রামের মানুষ অবশ্য ঠিকই বুঝতে পারে, সন্ন্যাসী নির্জনে সাধনা করতে যান। তারা বিশ্বাস করে, সেইসব রাতে ধ্যানের মধ্যে পর্বতের অমর আত্মার সঙ্গে পৃথিবীর মঙ্গল নিয়ে আলাপচারিতা চলে তাঁর।
চলতে চলতে একসময় লা মো নদীর উৎসের জমাট বাঁধা ঝরনা নীচে গিয়ে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী। তারপর বাক্সটা নামিয়ে রেখে তার থেকে কিছু যন্ত্রপাতি বের করে কোমরে গুঁজে নিয়ে গ্রোৎসের শৃঙ্গকে বেড় দিয়ে তার উল্টোদিকে গিয়ে দাঁড়ালেন।
অভ্যস্ত হাতে অন্ধকারের মধ্যেই ওপর থেকে ঝুলিয়ে রাখা দড়িটার নাগাল পেতে সমস্যা হল না তাঁর। পাহাড়ের দেয়ালে গেঁথে রাখা পিটনের মধ্যে দিয়ে দড়ি চালিয়ে তৈরি পথ। তবে আজ সে-পথ বেয়ে উঠতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল শারণিকের। বসন্ত আসছে। উষ্ণতার প্রথম ছোঁয়ায় নরম হয়ে ওঠা বরফের চাঙরগুলো খসে পড়ছিল তাঁর পায়ের ধাক্কায়। সময় এগিয়ে আসছে!
চূড়ার কাছে জলপ্রপাত বের হয়ে আসবার ফোকরটার কাছে পৌঁছে গিয়ে কয়েকদিন ধরে চলতে থাকা কাজটায় ফের একবার হাত দিলেন তিনি। ফুটোর চারপাশের পাথরের স্তরে বাটালির একেকটা ঘায়ে চির ধরিয়ে চললেন দড়ির দোলনায় বসে। কয়েকদিনের মধ্যেই বরফ গলতে শুরু করলে হ্রদের জল ফোকর বেয়ে বইতে শুরু করবে ঝরনা হয়ে। নীচে থেকে বোঝা যাবে না কিছু। শুধু চিড় ধরিয়ে দেওয়া দুর্বল পাথরকে ফাটিয়ে আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করবে গর্তটা। বেড়ে চলবে ছুটন্ত জলের শক্তি। তারপর একদিন, প্রচণ্ড জলের চাপে পাথরের বাধা ভেঙে...
৭। পরীক্ষা
'রেখে দাও বাবা। আর কষ্ট করতে হবে না তোমায়। চাইলে আরেকটু ঘুমোও বরং। আজ আমি নিজেই...'
বুড়ি কেসলাং কখন যেন উঠে এসে দাঁড়িয়েছে শারণিকের পাশে। তার মুখে হাসি। তাঁর দেওয়া ওষুধ খেয়ে কাশি তার কমে গিয়েছিল মাসদুয়েক আগেই। এবারে গত দু'সপ্তাহ ধরে বসন্তের রোদ পুইয়ে সে একেবারে তরতাজা।
এখন তার অনেক কাজ। দিনের শেষে জঙ্গল থেকে পাখি আর খরগোশের বোঝা নিয়ে ফেরে তাসি। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সারাদিন চুলোর ধোঁয়ায় সে-মাংসের শুঁটকি বানায় কেসলাং। ওর ফাঁকে ফাঁকেই আবার চলে বাড়ি সাফ করবার কাজ। লম্বা শীতে আবর্জনা তো আর কম জমে না বাড়িঘরে!
ঘুমঘুম চোখে কেসলাঙের দিকে একবার ঘুরে দেখলেন শারণিক। বসন্ত আসতে জল আনা আজকাল সহজ হয়ে গেছে অবশ্য। ঘরের খানিক দূরেই খাদ বেয়ে বরফগলা লা মো ঝরঝরিয়ে চলেছে। গিয়ে ভরে নিয়ে এলেই হল। কিন্তু তবু...
'তুমি পারবে? মানে, বুড়োমানুষ খাদ বেয়ে অতটা নেমে গিয়ে...'
'এই দেখো। ঘুমিয়ে ছিলে কিনা, তাই জানতে পারোনি। এ-বছর রাবটেনের দয়ায় এমনিতেই লা মোর জল রোজই আরো বেশি করে বইছে সে তো দেখছই বাবা। লোকজন এবারে দুনো ফসল বুনছে সেই জল পেয়ে। তা কাল ভোররাত্রে পাহাড়ের মাথায় দুমদাম করে খানিক শব্দ হল, আর সকালে লোকজন উঠে গিয়ে দেখে সে এক অবাক কাণ্ড হয়েছে। লা মো খাদ বেয়ে উঁচু হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। আর এখন তো মাত্তর তিনহাত নীচে দিয়ে বইছে দেখে এসো গে যাও। জল ভরবার জন্য খাদেও নামতে হচ্ছে না আর। নাও। সরো দেখি এখন! কীসব পড়াশোনার কাজ করো দেখি মাঝেমধ্যে, সেইসব করো গে যাও। আর খিদে পেলে খানিক সাম্পা বের করে গরম জলে ফুটিয়ে নিও।'
বিড়বিড় করে কথাগুলো বলতে বলতে ভিশতি হাতে বুড়ি বের হয়ে গেল। কিন্তু তার কথা তখন আর কানে যাচ্ছিল না শারণিকের। বাক্স থেকে দূরবিনটা বের করে এনে, জানালা দিয়ে গ্রোৎসের চূড়ায় চোখ ফেলেছেন তিনি। খালি চোখে ধরা না পড়া ছবিটা তখন বড় হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর দূরবিনের কাচে। ক'দিন ধরে আস্তে আস্তে বাড়বার পর কাল রাত্রে জলের ধাক্কায় পাথর ফেটে একবারে অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে ফোকরটা। ভাঙা পাথরের টুকরোগুলো ক্রমাগত খসে পড়ছে ধেয়ে নামতে থাকা জলের ধাক্কায়।
তীব্র উত্তেজনাকে দমন করে তাড়াতাড়ি দূরবিনটা বাক্সে ভরে ফেললেন তিনি। তারপর সেখান থেকে দুটো শুকনো দলা বের করে এনে জলে ফেলে গুলতে শুরু করলেন। তামাক আর রসুনের ধারালো গন্ধে ভরে উঠছিল ঘরটা।
খানিক বাদে একটা পিচকিরিতে তরলটাকে ভরে নিয়ে সেটা কোমরে গুঁজে নিলেন শারণিক। তারপর পারদের বুলেট ভরা একটা ম্যাগাজিন ছোট পিস্তলটায় ভরে নিতে নিতে নিজের মনেই বিড়বিড় করছিলেন তিনি, 'যা ঘটতে চলেছে তা তো তোমার নজরের আড়ালে নেই। আজ দুপুরের মধ্যে বাঁধ ভাঙবে। আশ্রিতদের বাঁচাতে হলে সামনে তোমায় আসতেই হবে রাবটেন। আমি জানি, তুমি আসবেই। তোমার সে-দুর্বলতার পরিচয় আমি পেয়েছি। তারপর, তোমার পরীক্ষা নেব আমি...ঔধীশ শারণিক...'
ছুটন্ত নদীর স্রোত এইবার একেবারে খাদের কানা ছুঁয়েছে। সকালে তার জলকে হাতের নাগালের কাছাকাছি এসে পৌঁছোতে দেখে সবাই ভেবেছিল দয়াময় রাবটেনের কৃপা। কিন্তু এবার ফুঁসে ওঠা জল খাদ ছেড়ে বেরিয়ে গ্রামের ভেতর হানা দিতে এগিয়ে আসছে। সেদিকে নজর রেখে আতঙ্কে বদলে যাচ্ছিল তাদের আনন্দ। নদীর এমন রূপের কথা তারা কখনো শোনেনি। অজানা কোনো ভয়ে তারা বারবার গ্রোৎসের মাথার দিকে তাকিয়ে দেখে। সেখানে লা মো-র উৎসের কাছে রাতারাতি বড়ো হয়ে ওঠা গর্তটা দিয়ে তুমুল বেগে নেমে আসছে জলের ধারা। তার গর্জনে কান পাতা দায়।
ঘর থেকে বের হয়ে এসে গ্রোৎসের দিকে ছুটতে ছুটতেই তার মাথার দিকে তাকিয়ে মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমেল ধারা বয়ে গেল শারণিকের। আর দূরবিনের দরকার নেই। খালি চোখেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এবার। গর্তটাকে ঘিরে রাখা বিরাট একটা পাথরের চাঁই এবার দুলে উঠতে শুরু করেছে বিপজ্জনকভাবে। আর বেশিক্ষণ যুঝতে পারবে না পাহাড়। সময় এগিয়ে আসছে...
দুলন্ত পাথরটার দিকে গ্রামের লোকজনেরও চোখ পড়েছে এতক্ষণে। বিপদের আসল রূপটাকে বুঝতে পেরে তারা একযোগে বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছিল তাদের শেষ প্রার্থনার ধ্বনি, 'বাঁচাও হে পর্বতের অমর আত্মা!'
...আর তারপর সে শব্দ থেমে গেল একেবারে হঠাৎ করেই। ঝকমকে রোদে গ্রোৎসের চূড়ার কাছের বাতাসে কোথা থেকে হঠাৎ ধেয়ে এসেছে উজ্জ্বল কমলা রঙের একটা ফুটকি। আর নীচে থেকে, তার গা বেয়ে তখন তিরের মতো ওপরের দিকে উঠে চলেছে একটা কালো আলখাল্লায় ঢাকা শরীর।
সেদিকে একটুক্ষণ দেখেই কেসলাং বুড়ির বুকচেরা আর্তনাদ উঠে এল গলা বেয়ে, 'শারণিক...ফিরে আয় বাবা! ওখানে গেলে তুই বাঁচবি না... তুই যে...'
হঠাৎ কানফাটানো একটা শব্দ উঠে ঢেকে দিয়ে গেল তার চিৎকারটাকে। গ্রোৎসের মাথায় পাথরের বিরাট চাঁইটা ভারসাম্য হারিয়ে কাত হয়ে পড়ছে জলের প্রবল চাপে। শেষ বাধাটাকে সরিয়ে দিয়ে গ্রামের দিকে ছুটে আসতে চাইছে গোটা হ্রদটাই।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দিয়ে খাদ থেকে উঠে এল লা মো-র রাক্ষসী ধারা। গ্রামটার পাথরের ঘরবাড়িগুলোকে ঘিরে ফুঁসে উঠছিল তার পাক খাওয়া জল!
কিন্তু না! খসে পড়ল না তো পাথরটা! মানুষজনের অবাক চোখে সামনে মাতালের মতো টলতে টলতে ফের নিজের ভারসাম্যকে খুঁজে নিচ্ছিল সে। তার ঠিক তলায় এসে স্থির হওয়া, কমলা পোশাকে ঢাকা ছোট্ট চেহারাটা তার হাতের দণ্ডটাকে উঁচিয়ে ধরেছে সেদিকে। দণ্ড থেকে বের হয়ে আসা তীব্র আলোর একটা ঝলক মাধ্যাকর্ষণের টানকে অবহেলায় মোকাবিলা করে ফের সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে দিচ্ছিল পাথরটাকে। অনেক নীচে থেকে নদীর গর্জনকে ছাপিয়ে ভেসে আসছিল পর্বতের অমর আত্মার নামে জয়ধ্বনির শব্দ। ভেসে আসছিল শারণিকের নাম ধরে এক বৃদ্ধার বুকচেরা চিৎকারও।
তাদের উপেক্ষা করে ওপরে উঠে এসে, কমলা পোশাকে ঢাকা শরীরটার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন শারণিক। পাথরের চাঁইটা ততক্ষণে তার জায়গায় ফিরে গেছে ফের। থেমে আসছে ঝরনার উন্মত্ত স্রোত। শারণিকের একহাতে তখন উঠে এসেছে তামাক আর রসুনের মিশ্রণের তরলে ভরা পিচকিরি। অন্য হাতে উদ্যত পিস্তলটাকে নিশানায় ধরে রেখে তিনি ডাকলেন, 'রাবটেন?'
'এসো ঔধীশ সন্ন্যাসী।' নিবিষ্ট হয়ে কাজ করতে থাকা মানুষটা তাঁর দিকে না-ঘুরেই নীচু গলায় জবাব দিলেন।
'আপনি...আমায় চেনেন? কিন্তু...' হঠাৎ খানিকটা বিস্ময়ের ছোঁয়া লেগেছে শারণিকের গলায়।
'যেদিন তোমাকে মানসের বুক থেকে উদ্ধার করেছি সেদিনই আমি চিনেছি তোমায়। কেন তুমি এখানে এসেছ তাও বুঝেছিলাম। বারে বারেই তো সে-উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে হানা দিয়েছ তোমরা।'
'কিন্তু সব জেনেবুঝেও...'
'কেন তোমায় বাঁচিয়েছি?' পেছন ঘুরে এবার তাঁর মুখোমুখি হলেন সন্ন্যাসী। তাঁর প্রশান্ত চোখদুটো হাসছিল, 'কারণ আমি এই পর্বতের অমর আত্মা। শরণাগতকে রক্ষা করাই আমার কাজ। তাছাড়া, সেদিন তোমার জ্ঞান ছিল না। ফলে আমায় দেখবার কোনো সুযোগ পাওনি তুমি। তাহলে শুধুশুধু একটা নিরীহ প্রাণকে মুছে দেব কেন? আজকের এই দুর্ঘটনাটা না ঘটলে কোনোদিনই তুমি আমায় দেখতে পেতে না।'
'দুর্ঘটনা!' মুখে একটা তিক্ত হাসি খেলে গেল শারণিকের, 'পাথরের গায়ে ভালো করে লক্ষ করে দেখো রাবটেন। আমার অস্ত্রের দাগ এখনো সেখান থেকে মুছে যায়নি। জেনে রাখো, তোমাকে ফাঁদে ফেলে টেনে আনবার জন্য আমি নিজে...'
এক মুহুর্তের জন্য হঠাৎ ঝলসে উঠল সন্ন্যাসীর চোখদুটো। জল বেরিয়ে আসা ফোকরটার দিকে ধারালো চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন তিনি। তারপর ফের যখন কথা বললেন, তখন তাঁর গলায় যন্ত্রণার ছোঁওয়া ছিল, 'আমার দেখা পাবার জন্য এতগুলো নিরীহ প্রাণকে তুমি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারলে? কেন?'
বাঁ হাতে ধরে রাখা পিচকিরিটা এইবার তাঁর দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন শারণিক। তার পিস্টনে আঙুল রেখে বললেন, 'এই পরীক্ষাটা করবার জন্য রাবটেন। পর্বতের অমর আত্মার আসল পরিচয়টা জানবার জন্য।'
নিজের জায়গায় অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সন্ন্যাসী। তারপর শান্ত গলায় বললেন, 'বেশ। অনুমতি দিলাম। করো তোমার পরীক্ষা।'
পিচকিরির মুখের ঢাকনা সরিয়ে নিলেন শারণিক। তরলটার একটা ধারা গিয়ে সন্ন্যাসীর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ, শারণিকের স্তম্ভিত চোখের সামনে, তেমনই নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। শরীরের একটা পেশিও কাঁপছে না তাঁর।
নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন শারণিক। ঔধীশ বনাম আরাকিয়েনের দীর্ঘকালের যুদ্ধে, আরাকিয়েনের নার্ভতন্ত্রের ওপর এই তামাক ও রসুনের মিশ্রণের বিষক্রিয়া তাকে নির্ভুলভাবে ধরিয়ে দিয়েছে প্রতিবার।
অনেক নীচে, গোটা গ্রামটার বুকে থই থই করছিল লা মো-র জল। সর্বনেশে গতি থামিয়ে সে এখন মাথা নামিয়ে ফিরে চলেছে নিজের খাদে। তার টানে ভেসে চলা ঘরগৃহস্থালির জিনিসগুলো প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করে চলে মানুষগুলো।
'ওহো। আরাকিয়েনের প্রমাণ চাইছিলে? কিন্তু সে প্রমাণ কি এতটাই জরুরি ছিল? যে নিরীহ মানুষগুলোর প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেললে তুমি, তারা তোমায় আশ্রয় দিয়েছিল হে ঔধীশ। তোমার বিপদের দিনে তারা তোমায় রক্ষা করেছিল। আর তুমি...'
বুকের ভেতর একটা ভাঙচুর চলছিল শারণিকের। এতদিনের সব শিক্ষাদীক্ষা, সব প্রতিজ্ঞার বর্ম ছিঁড়েখুঁড়ে উঠে আসছে একটা যন্ত্রণা।
খানিক বাদে নীচু গলায় তিনি বললেন, 'ভুল করেছিলাম হে পর্বতের অমর আত্মা রাবটেন। আমি শুনেছিলাম, তুমি প্রাচীন শয়তান আরাকিয়েনের বংশধর। সেই মিথ্যেতে বিশ্বাস করে এতগুলো মানুষকে আমি...'
বলতে বলতেই হঠাৎ সরে এসে খাদের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন তিনি। মাথার ওপর উঁচু করে ধরেছেন দুটো হাত। তাঁর মুখে উঠে আসছিল ঔধীশের শেষ প্রার্থনামন্ত্র, 'ইয়া শারণিক আইইলা উধীশায়া আরাকিপিয়েহিন স্মুঃ!' শারণিকের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হোক হে আরাকিয়েননাশক আদি উধীশ!
শারণিক নামটা শুনেই হঠাৎ তার দিকে চমকে ঘুরে দেখলেন রাবটেন। একসঙ্গে অনেকগুলো ভাব খেলা করে যাচ্ছিল তাঁর মুখে। ভারসাম্য হারিয়ে বিপজ্জনকভাবে টলছিল শারণিকের শরীরটা। হঠাৎ রাবটেনের চোখে চোখ রেখে তিনি বললেন, 'ঔধীশ হিসেবে এতকাল আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি হে অমর আত্মা। তাতে আমার কোনো খেদ নেই। কিন্তু এইবার মানুষ হিসেবে এ-অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে আমাকে। আমি...'
'তুমি শারণিক!! ভারতীয় ঔধীশ মঠের প্রধান! আমি তোমার কথা জানি। কিন্তু এভাবে নিজেকে শেষ করে দিয়ে অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত হয় না! আমার হাত ধরো...'
এগিয়ে আসা হাতটাকে সরিয়ে দিয়ে শরীরটা হঠাৎ পেছনদিকে হেলে পড়ল। আজ, তাঁর আশ্রয়দাতা কিছু নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন তিনি। শুধু তাঁর একটা ভুল সন্দেহের প্রমাণ পাবার জন্য। এই তার যোগ্য প্রায়শ্চিত্ত। নীচের দিকে ধেয়ে যেতে যেতে একটা আশ্চর্য শান্তি ছড়িয়ে আসছিল তাঁর মনে।
আর তারপরেই হঠাৎ একটা সজোর ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ খুললেন তিনি। স্টিলের চেয়েও শক্ত আর রেশমের চেয়েও মোলায়েম একটা জাল হঠাৎ ওপর থেকে ছিটকে এসে তাঁর গতিকে রুখে দিয়েছে। দু'হাতের আঙুল থেকে বেরিয়ে আসা সে জালকে গুটিয়ে ওপরে তুলে আনতে আনতেই চোখদুটো হাসছিল রাবটেনের।
৮। প্রথম পদক্ষেপ
'একাধিক সহস্রাব্দি অনেকটা সময় শারণিক। এই সময় ধরে এ-পাহাড়ের নির্জন গবেষণাগারে আরাকিয়েনের বিজ্ঞানসাধনাকে আমি বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছি। তোমাদের, অর্ধ-আরাকিয়েনদের অগ্রগতির জন্য বারেবারে তার কিছু কিছু দানও করেছি। গত শতাব্দিতে তোমাদের সভ্যতার অকল্পনীয় উত্থান ঘটল যে, সে শুধু তোমাদের নিজেদের চেষ্টায় নয়। তোমাদের জিনপ্রযুক্তি, ধাতুবিদ্যা, গণকযন্ত্র-এর প্রতিটির সৃষ্টির পেছনে আমি ছিলাম। আরাকিয়েনের সন্তান যে তোমরা! শত অন্যায় করলেও তোমাদের ছেড়ে যেতে পারবে না আরাকিয়েন।
'আর এরই মধ্যে একটা তুচ্ছ আবিষ্কার ছিল, তোমাদের ওই রাসায়নিকের বিরুদ্ধে আরাকিয়েন শরীরের প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একটাই কারণ তার। দেবী ফিরে এলে সে-প্রতিরোধক্ষমতা যাতে তিনি ছড়িয়ে দিতে পারেন তাঁর প্রজাদের মধ্যে। তারা যেন আরো ভালোভাবে মিশে যেতে পারে অর্ধ-আরাকিয়েনের সমাজে। তারপর দুটো সভ্যতা মিলে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলা। অকল্পনীয় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে যে আমাদের সামনে!
'দেবী ফিরে এসেছেন। এই পুণ্যলগ্নে আজ তোমার আর আমার মধ্যে গড়ে ওঠা এই নতুন বন্ধুত্ব সেই ভবিষ্যতের পথে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ। সে-কাজে তুমি আমার প্রধান অস্ত্র হবে।'
নিঃশব্দে দেবী আরাকিয়েনের মানসপুত্র জিরিয়েন ওরফে রাবটেনের কথাগুলো শুনছিলেন শারণিক। গ্রোৎসের মাথায় এখন অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে। দীর্ঘসময় ধরে সেখানে বসে আরাকিয়েনের সমস্ত ইতিহাস তিনি শুনিয়েছেন তাঁকে। ঔধীশের লেখা ইতিহাসের থেকে অনেক আলাদা সেই কাহিনি। অকাট্য প্রমাণও দেখিয়েছেন তার, কাছে রাখা একটা ছোট স্ফটিকযন্ত্রের পর্দায়। সে-কাহিনি শেষ হয়েছে এতক্ষণে।
কিছুক্ষণ বাদে মুখ তুললেন শারণিক। সে-মুখে ধর্মযোদ্ধার নিষ্ঠুরতার কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই আর।
'কিন্তু চিরশত্রু এই ঔধীশ সন্ন্যাসীকে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন?'
মৃদু হাসলেন রাবটেন, 'হয়তো পারতাম না। কিন্তু যে-মুহূর্তে মানুষ হিসেবে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে নিজেকে শেষ করে দিতে গেলে তুমি, সেই মুহূর্ত থেকেই তোমার ওপরে বিশ্বাস ফিরে পেয়েছি আমি শারণিক। দুই সহস্রাব্দ ধরে সভ্যতার ইতিহাসের যে ধারাবিবরণ আমি লিখে রেখে চলেছি আমার আমাসাদোমের পুঁথিতে, তাতে একটা সম্পূর্ণ অধ্যায় এবার যোগ করা হবে তোমার এই হৃদয়ের পরিবর্তনকে নিয়ে।'
'আমায় কী করতে হবে?'
'গুরুদায়িত্ব অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য হে শারণিক। দেবী ফিরে এসেছেন। আরাকিয়েনের মহাশত্রুর ঘরে তাঁর পুনর্জন্ম হয়েছে। অরক্ষিত দেবীকে ঔধীশের হাত থেকে রক্ষা করবার ভার নিতে হবে তোমাকে। আমি তোমাকে সে কাজের জন্য তৈরি করব। চলো আমার সঙ্গে।'
পাহাড়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। সেই নিবিড় অন্ধকারে জাল ছুঁড়ে ছুঁড়ে উঁচু থেকে আরো উঁচুতে উঠে যায় আটপেয়ে একটা বিশাল প্রাণী। তার শরীরের সঙ্গে বাঁধা জালের নিরাপদ আশ্রয়ে শুয়ে একজন মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। তাদের সামনে, অন্ধকারের গভীরে অপেক্ষা করে থাকে এক অন্তিম যুদ্ধ, আর অদেখা কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
স্বপ্নমন্দির
গ্রহের নাম পৃথিবী। পবিত্র এই তীর্থগ্রহের নির্জন বুকে আজ কেবল এক দেব-দম্পতির বাস। গ্যালাক্সিজোড়া মানব-আরাকিয়েন সভ্যতার অভিভাবক তাঁরা।
সেখানে, কুইনলিন পর্বতের গভীরে, নির্জন এক পাতাল ঘরে তাঁদের নিস্পন্দ শরীর দুটি এখন ধ্যানস্থ। তাঁদের কোলের কাছটিতে শুয়ে ধ্যানস্থ হয়ে থাকে সেখানে জ্ঞানভিক্ষায় আসা এক মেধাবী তরুণের শরীরও।
তখন, দুই প্রাচীন ও শক্তিশালী মনের কল্পনায় গড়া কোনো স্বপ্নের ক্লাসরুমে জেগে থাকে তাঁদের তিনজনের চেতনা। তার অসংখ্য খোলা জানালায় ঘুরে ঘুরে দুই প্রাচীন দেব-দেবীর কাছে তার নিজের সভ্যতার ইতিহাসের পাঠ নিয়ে চলে এক তরুণ। তাঁদের স্মৃতির জানালা বেয়ে তার চেতনায় এসে জমা হয় এক মহান সভ্যতার বিবর্তনের অজস্র অজানা কাহিনি। সে কাহিনির সামান্য অংশই সবে জানা হয়েছে তার। এখনো অনেক পথ বাকি...

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন