চতুর্থ পাঠ: প্রহরী

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

'কোনো প্রশ্ন আছে?'

'হ্যাঁ সুদ্ধিরদেব। মৃত্যুর আগে দেবী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি ফিরে আসবেন ফের, তাঁর প্রহরীর হাত থেকে আরাকিয়েনের জ্ঞানভাণ্ডারকে ফিরিয়ে নিতে। মৃতেরা কি কখনো ফিরে আসে?'

মৃদু হাসলেন বৃদ্ধ, 'আসে না। আবার আসেও। আরাকিয়েনের বিজ্ঞান সেই ধাঁধার উত্তর খুঁজে পেয়েছিল। উত্তর দিয়েছিল কালানিল অ্যালগরিদম। আর সে-উত্তর পাবার পরই, মৃত্যুর কিছুকাল আগে, জ্ঞানভাণ্ডারের প্রহরীকে নির্বাচন করে গিয়েছিলেন স্বয়ং দেবী আরাকিয়েন। পরের জানালায় তার উত্তর পাবে। এই কাহিনি দেবী আরকিয়েনের মৃত্যুর কিছুকাল আগের। দেখো...'

খ্রিস্টপূর্ব ২২০০

'কাজ শেষ হয়েছে কি?'

'অল্পই বাকি দেবী। আর একটু সময়...'

মৃদু ঘরঘরে আওয়াজ উঠল গুহার অন্যপাশ থেকে। সেখানে ক্রিস্টালের পর্দায় একরাশ আলোর বিন্দু খেলা করছিল। পর্দার সামনে আটটা অন্ধকার পা নির্দিষ্ট নকশায় নড়েচড়ে যায়। সেই নড়াচড়ার ইশারা মেনে আস্তে আস্তে একটা কিশোরীর মুখের আভাস গড়ে তুলছিল আলোর বিন্দুগুলো।

গুহানগরীর গভীরতম অঞ্চলে এই কেন্দ্রীয় জেনেটিক গবেষণাগার এখন নির্জন। একসময় এই গবেষণাকেন্দ্র বিশ্বজোড়া আরাকিয়েন সাম্রাজ্যের জীববৈজ্ঞানিকদের তীর্থক্ষেত্র ছিল। আর এখন...

একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল ঘরটার এক কোণে অপেক্ষায় থাকা বিরাট প্রাণীটার শরীর থেকে। সময় সবকিছুকেই শেষ করে। তাঁকেও সে শেষ করবে।

'সময়! তারই সবচেয়ে অভাব যে আমাদের কালানিল! দেরি নেই আর। হাইলাম শহরে চিরশত্রু উধীশদেব রাজগুরুর পদে বসেছেন।'

'জানি দেবী। অথচ, হিমালয় পার হয়ে ভারতবর্ষ থেকে যখন এই সন্ন্যাসী প্রথম এই দেশে এল, সেই ভয়ঙ্কর তুষারঝড়ের রাত্রে আমরা, আরাকিয়েনরাই তাঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিলাম। এই পাহাড়েরই বরফঢাকা ঢালে!'

'সেজন্য তার কাছে কৃতজ্ঞতার আশা করছ কালানিল? শব্দটার অর্থ এই অর্ধ-আরাকিয়েন জানে না। জানলে, এখানে আসবার দশ বছরের মধ্যে এভাবে সর্বশক্তি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরত না।'

'কিন্তু কেন? আমরা তাঁর প্রাণ বাঁচিয়েছি। গুহারাজ্যে তাকে স্বাগতও জানিয়েছি শুরুতে। সে তো জানত, আরাকিয়েনরা মানুষের শত্রু নয়। তবু...'

'ক্ষমতার লোভ কালানিল। হাইলামের বাসিন্দারা এখনও আমাদের অলৌকিক শক্তিধর ভেবে সমীহ করে। কাজেই, উধীশ আমাদের ধ্বংস করতে পারলে, নগরের সিংহাসন দখলে কেউ তাকে বাধা দেবে না। সেই লোভেই আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে সে। একদিন ওর হাতেই আমার...'

'প্রকৃতির প্রতিশোধ দেবী,' বৃদ্ধ কালানিল তার দুর্বল আটটা পায়ে টলতে টলতে এগিয়ে আসছিলেন দেবীর কাছে, 'একদিন বাঁদরদের কোষে আমাদের জিন প্রতিস্থাপন করে কৃত্রিম আরাকিয়েন সৃষ্টির আদেশ আপনিই আমাকে দিয়েছিলেন। কয়েক হাজার বছর পরে তাদেরই একজন আজ উঠে এসে অস্ত্র ধরেছে আপনার বিরুদ্ধে। নিজের সৃষ্টির হাতে শেষ আঘাতটা আপনাকেই সহ্য করতে হবে।'

'জানি কালানিল। সেদিন আমার আদেশেই তোমার মেধাকে এই কাজে লাগিয়েছিলে তুমি। ভুল করেছিলাম। ভীষণ ভুল। সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত তো আমাকেই...'

'কোনো ভুল আপনি করেননি দেবী। বন্ধ্যাত্বের মহামারীর হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। সে-মহামারীকে রুখতে পারেনি আরাকিয়েনের বিজ্ঞান। এরপর এইভাবে কৃত্রিম আরাকিয়েন তৈরির চেষ্টা ছাড়া আর কোনো পথ তো আমাদের হাতে ছিল না! আপনি আপনার কর্তব্য করেছিলেন শুধু।'

'কিন্তু তাতে ফল কী হল? সৃষ্টি হল হিংস্র একদল অর্ধ-আরাকিয়েন। দোপেয়ে মানুষের রূপ ছাড়া আরকিয়েনের এই দ্বিতীয় রূপ তো তারা ধরতে শিখল না! ব্যর্থ হয়েছি কালানিল! আমি...'

'ব্যর্থ আপনি হননি,' কালানিল মাথা নাড়লেন, 'নাহলে, সৃষ্টির দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছর পর, এদের সমাজে ফের একজন, দু'জন করে পূর্ণ দ্বিরূপধারী আরাকিয়েনের জন্ম শুরু হল কেমন করে? না দেবী। এ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাক তা প্রকৃতির উদ্দেশ্য নয়।'

'না কালানিল।' দেবী আরাকিয়েনের গলায় হতাশার সুর ছিল, 'সে ভরসা আমার নেই। দেখছ না, কী অকারণ হিংস্রতায়, সেই আরাকিয়েনদের খুঁজে বের করে ধ্বংস করে চলেছে উধীশের সৈন্যদল?'

'জানি! কিন্তু গুপ্তচরদের খবর ঠিক হলে এই মুহূর্তে যতজন উধীশের শিকার হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় নতুনদের জন্ম হচ্ছে দেবী। নিজেদের লুকিয়ে রাখতে শিখছে তারা। আমার আশা...'

'আশা! হাঃ! অর্ধ-আরাকিয়েনের সমাজে লুকিয়ে বেড়ানো কিছু দুর্ভাগা জীব। কোনোমতে পশুর মতো বেঁচে থাকবে হয়তো তারা। কিন্তু আরাকিয়েন সভ্যতা? তার কী হবে? মরতে বসা এই গুহানগরীতে আমরা যে ক'জন প্রাচীন আরাকিয়েন এখনো তার আলোটাকে জ্বালিয়ে রেখেছি তারা চলে গেলে...'

'সে আলো ফের জ্বলবে দেবী। যে শেষ গবেষণা আমি করে চলেছি, তাকে সম্পূর্ণ করে যেতে পারলে হয়তো...'

বলতে বলতে হঠাৎই মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে আটটা পা দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরলেন কালানিল। সেদিকে তাকিয়ে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন দেবী আরাকিয়েন। তারপর এগিয়ে এসে নীচুগলায় বললেন, 'তুমি বড় ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নাও। তারপর ফের...'

'না দেবী,' মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ বিজ্ঞানী, 'আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। মস্তিষ্কে মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি আমি। তার আসবার আগে এ-কাজ আমাকে শেষ করে রেখে যেতে হবে। যে কোনো মূল্যে। আমাদের শেষ আশা...'

কথাগুলো বলতে বলতেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন তিনি। টলোমলো পায়ে তাঁর যন্ত্রের পর্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ। তাঁকে দেখতে দেখতেই বিরাট চোখগুলো ম্লান হয়ে আসছিল দেবী আরাকিয়েনের। বড় ঘুম পায় আজকাল। বড় ঘুম...

'দেবী?'

নীচু গলায় ডাক শুনে হঠাৎ তন্দ্রাটা ভেঙে গেল দেবী আরাকিয়েনের। আর তারপরই চমকে উঠে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন তিনি দীর্ঘদিনের বন্ধুর পাশে। ক্রিস্টালের পর্দার সামনে কালানিলের শরীরটা কমলা আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে। এই মৃত্যু-আভার অর্থ দেবী জানেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে পৌঁছেছে সে এবার।

'কালানিল, না...'

'এবার আমায় ছুটি দিন,' বড় কষ্টে কথাগুলো উঠে আসছিল কালানিলের গলা বেয়ে, 'আমার কাজ শেষ হয়েছে দেবী। আপনার পুনর্জন্মের দিনক্ষণ...'

বলতে বলতেই ক্রিস্টালের পর্দার সামনে থেকে পাথরের মেঝের ওপর ঢলে পড়ছিল তাঁর শরীর। সে-পর্দায় ফুটে থাকা একটা কমবয়েসি মুখ চেয়ে দেখছিল দেবীর দিকে। সে-মুখ, অতীতের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কিশোরী আরাকিয়েনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি যেন। সুদূর ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে তার ফের আবির্ভূত হবার দিনক্ষণের হিসেব ফুটে উঠেছে ছবিটাকে ঘিরে।

'সময় বেশি নেই। প্রয়োজনীয় কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন।'

মৃত্যুপথযাত্রী বৈজ্ঞানিকের ক্ষীণ হয়ে আসা গলা দেবীকে বলে চলেছিল তাঁর আবিষ্কারের গোপন তথ্য। নিবিষ্ট হয়ে তাই শুনতে শুনতেই পরিকল্পনার পরের ধাপটা সাজিয়ে নিচ্ছিলেন দেবী আরাকিয়েন। অন্ধকারে একটা ঢিল ছোঁড়া। তবু সেই আশাটুকুতেই ভরসা রাখতে হবে তাঁকে এবার। হয়তো কখনো...

'জিরিয়েন।'

কানের কাছে নীচুগলার ডাকটা পেয়ে চমকে চোখ খুলল সে। সামনে এসে দাঁড়ানো বুড়ো সৈনিক তাকে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছিলেন।

'কী হয়েছে সৌফিল?'

'দেবীর ডাক এসেছে।'

তাড়াতাড়ি আটপায়ে ভর করে উঠে দাঁড়াল জিরিয়েন। নিজের বাবা-মায়ের খবর সে জানে না। জ্ঞান হয়ে অবধি দেবী আরাকিয়েনই তাকে বড় আদরে গড়ে তুলেছেন। গত চার শতাব্দি ধরে তিনিই তার গুরু। তাঁর ডাক আসবার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না।

'চলো।'

উঠে দাঁড়িয়ে ছাদের দরজার দিকে জাল ছুঁড়ে দিচ্ছিল জিরিয়েন। কিন্তু সৌফিল বাধা দিলেন, 'ওদিকে নয়। আমার সঙ্গে এসো। দেবী দশম তলের গবেষণাকেন্দ্রে রয়েছেন।' বলতে বলতেই শয়নগুহার মেঝের ওপরে খুলে যাওয়া পাতালমুখো সুড়ঙ্গটার দিকে এগিয়ে গেলেন সৌফিল।

'কিন্তু সেখানে তো প্রধানমন্ত্রী কালানিল ছাড়া আর কারো...'

'কালানিল আর নেই,' সৈনিকের গলায় কোনো আবেগের চিহ্ন ছিল না, 'দেবী তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। চলো।'

গভীর সুড়ঙ্গের মসৃণ দেয়াল বেয়ে ঝড়ের মতো পাহাড়ের শিকড়ের দিকে নেমে যায় জিরিয়েন। মাঝেমাঝেই এক একটা তলে ঢোকবার বিরাট দরজাগুলো সরে যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। ছোটবেলা থেকেই এ-জায়গাগুলোকে নির্জন থাকতে দেখে এসেছে সে। পুরনো বাসিন্দারা বলেন একসময় প্রত্যেকটা তল আরাকিয়েনদের একেকটা জনবহুল শহর ছিল নাকি। কে জানে!

তবে আজ আর সে-নিয়ে কিছু ভাবছিল না সে। মনের ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা হচ্ছিল। গবেষণাকেন্দ্রে কোন গোপন কাজে ব্যস্ত ছিলেন দেবী আর কালানিল? আজ কি তবে সে রহস্যের খবর তাকে জানাতেই এভাবে...

ক্রিস্টালের পর্দাটার সামনে শুয়ে থাকা কালানিলের শরীরে প্রাণের ছোঁয়া নেই। মৃত্যুর মুহূর্তে শরীরটা তাঁর দ্বিতীয় রূপে ফিরে গিয়েছিল। রোগজীর্ণ দেহকে অন্য রূপে বদলে নিয়ে বাঁচবার একটা অর্থহীন চেষ্টাতেই হয়তো! দেবী খানিক দূরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। মৃতের সম্মানে তিনিও এখন আরাকিয়েনের দ্বিতীয় রূপ, তাঁর মানুষ রূপ ধরেছেন।

তাঁর ভেজা চোখদুটো তখনও পর্দায় ফুটে থাকা কিশোরী মুখটার দিকে ধরা। দূর অতীতের কোনো ভুলে যাওয়া সময়ের স্মৃতি লেগে আছে যেন মুখটায়! যখন পৃথিবীর বুকে মানুষ নামের ওই হিংস্র অর্ধ-আরাকিয়েনের সৃষ্টি হয়নি! যখন তিনি দেবী আরাকিয়েন হয়ে ওঠেননি। কখনো বাবার, কখনো বা কালানিলের হাত ধরে কিশোরী মেয়েটা দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়াত। কত হাসি, কত খেলা, কত আলো ছিল! সাম্রাজ্যের কোণে কোণে অভিযানের সেইসব স্মৃতি! গভীর অরণ্যের প্রাচীন গাছগুলোর শরীর বেয়ে জাল ছুঁড়ে বিদ্যুতের মতো ধেয়ে যাওয়া...

খানিক বাদে কালানিলের শরীরটার সামনে হাঁটু গেড়ে একবার বসলেন দেবী আরাকিয়েন। দু'হাত বাড়িয়ে শেষবারের জন্য ছুঁলেন তার বুঁজে থাকা চোখদুটো। তারপর, পেছনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ানো জিরিয়েনের দিকে ঘুরে দেখলেন যখন, তখন তাঁর চোখে জল নেই।

'জিরিয়েন।'

'আদেশ করুন দেবী।'

কালানিলের শরীর ইরিসের চূড়ার গভীর বরফে বিসর্জন দিতে হবে। সেই তাঁর শেষ ইচ্ছে ছিল। তুমি তার ব্যবস্থা করবে। তারপর শববাহকদের রওনা করিয়ে দিয়ে এখানে ফিরে আসবে। অনেক প্রস্তুতি বাকি আছে।'

'আরো একটা শত্রুর শেষ হল। এর পরিচয় জানো কি সম্ভর?'

কুইনলিন পর্বতমালার পুবদিকের এই উপত্যকাটা থেকে আরাকিয়েনের গুহামুখ সরাসরি নজরে পড়ে। সন্ধ্যার অন্ধকারে সেখান থেকে ছায়ার মতো বের হয়ে এসেছিল দানবিক মাকড়সাদের দল। একটা মৃতদেহ বয়ে নিয়ে তারা এখন উঠে গেছে অনেক উঁচুতে। সেখানে চিরতুষারের গায়ে চাঁদের আলোয় কয়েকটা চলন্ত কালো ফোঁটার মতো তাদের এখনো দেখতে পাওয়া যায়।

'মৃতদেহের সঙ্গে কুড়িজন রাক্ষস যোদ্ধা ছিল উধীশদেব। উচ্চপদস্থ কেউ হবে। সেক্ষেত্রে এ নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী কালানিল। দেবীর আর কোনো মন্ত্রী তো এখন বেঁচে নেই!'

'ভালো খবর। রাক্ষসীর শেষ সহায়টাও বিদায় হল তাহলে এবার।' বলতে বলতেই ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকোনো তাঁবুগুলোর একটায় ঢুকে এলেন উধীশ। ভেতরে ঘন অন্ধকার। তবে তাতে তাঁর অসুবিধা হয় না এখন। আরাকিয়েনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে অন্ধকারে চলাফেরা রপ্ত করতে হয়। তাদের গুহা দুনিয়ার অন্ধকার দেশে এ-দক্ষতার অভাবের একটাই পরিণাম। মৃত্যু।

অন্ধকারে নিঃশব্দে অপেক্ষায় থাকা মানুষের দলটাকে একবার দেখে নিলেন তিনি। তারপর নীচুগলায় বললেন, 'সময় হয়েছে। দ্বিরূপা রাক্ষসীর কুড়িজন যোদ্ধা মৃতদেহ নিয়ে রওনা হয়ে গেছে। এ-মুহূর্তে ওখানে আর খুব বেশি রক্ষী নেই। এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিলাম আমি। তৈরি হও। অন্যান্য তাঁবুতে খবর দাও। আকাশে মেঘ উঠছে...'

এখন বর্ষাকাল। চাঁদ ঢেকে গেছে মেঘের আড়ালে। সেই অন্ধকারে মিশে ঔধিশ সন্ন্যাসীদের দলটা নিঃশব্দে উঠে চলে গুহানগরীর খোলা মুখের দিকে। তাদের হাতে আরাকিয়েনের নিশ্চিত মৃত্যুর ঠিকানা লেখা পারদমাখানো তলোয়ার। তাদের কাঁধে চামড়ার পাত্রে তামাক ও রসুনের বিষাক্ত রস। সে-রসের সামান্যতম ছোঁয়া সবচেয়ে শক্তিশালী আরাকিয়েনের দেহকেও পঙ্গু করে দেয় তীব্র যন্ত্রণায়...

'শববাহকরা রওনা হয়ে গেছে।'

নির্জন গবেষণাঘরের এক কোণে শুয়ে থাকা ক্লান্ত জীবটার চোখগুলো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল গলাটা শুনে, 'এসো জিরিয়েন। যে কাজের জন্য তোমাকে এতদিন ধরে গড়ে তুলেছি, এবার তার সময় এসেছে।'

'আদেশ করুন।'

'বলব। তবে তার আগে তোমার জন্মকথা তোমাকে জানানো প্রয়োজন। জানানো প্রয়োজন কেন তুমি ছাড়া এই গুহানগরীতে আর কোনো তরুণ আরাকিয়েন নেই।'

তরুণ জিরিয়েন আটটি পা ভাঁজ করে তাঁর সামনে নীচু হয়ে বসেছে। সস্নেহে তার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে গল্পের সুতোটা তুলে নিলেন দেবী।

'আরাকিয়েন সাম্রাজ্যে বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ নেমে এসেছিল বহুকাল আগেই। তার কথা আমি তোমায় বলেছি। এর প্রতিকারের জন্য পাঁচ হাজার বছর আগে বাঁদরের শরীরে আমাদের জিন প্রতিস্থাপন করে আরাকিয়েন সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন কালানিল। সেই পরীক্ষা ব্যর্থ হয়ে যখন এই অর্ধ-আরাকিয়েনদের জন্ম হল, তখন ভেবেছিলাম এই শেষ। দোপেয়ে মানুষশরীরে বন্দী এই জীবেরা আরাকিয়েনের দ্বিতীয় আটপেয়ে রূপ ধরতে পারত না।

'কিন্তু মাত্রই চার শতাব্দি আগে যখন হাইলাম শহরে প্রথম এক মানুষের শিশু পূর্ণগৌরবে আরাকিয়েনের দ্বিতীয় রূপ ধরল, তখন ফের একবার আশা জেগেছিল আমার। সে ছিলে তুমি জিরিয়েন।'

'আমি! মানুষের ঘরে...'

'হ্যাঁ। কিন্তু মানুষ তোমাকে মেনে নেয়নি। ভয় পেয়েছিল। সতর্ক পাহারায় গভীর বরফের রাজ্যে ফেলে এসেছিল তোমাকে।

'ততদিনে এই গুহানগরীতে আরাকিয়েনের সংখ্যা তলানিতে এসে ঠেকেছে। খবরটা পাবার পর তোমাকে উদ্ধার করতে তাই সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হয়েছিল আমাকে। কিন্তু এর পর...'

বলতে বলতে আবেগে গলা কেঁপে উঠল বুঝি দেবীর, 'গত চার শতাব্দি ধরে আমাদের আরো অনেকেই জন্মেছে মানুষের ঘরে। ধরা পড়েছে। নির্বাসিতও হয়েছে। কিন্তু ততদিনে আরো কমে এসেছে এই গুহারাজ্যের প্রাচীন আরাকিয়েনের সংখ্যা। আরো দুর্বল হয়েছি আমরা। তাই তাদের কোনো সাহায্য আমি করতে পারিনি জিরিয়েন।

'আর তারপর, মাত্রই দশ বছর আগে উধীশ এলেন হিমালয়ের পেরিয়ে। গড়ে তুললেন তাঁর ঔধীশ সেনাদল। এই হিংস্র সন্ন্যাসীর দল যেখানে সেই নির্বাসিতদের নাগাল পেয়েছে, নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছে। আমরা, এই গুহানগরের মৃত্যুপথযাত্রী আরাকিয়েন সভ্যতার শেষ সদস্যরা অসহায়ভাবে সেই ধ্বংসলীলার সাক্ষী থাকছিলাম শুধু। এই ভয়ঙ্কর হতাশার মধ্যেই হঠাৎ কালানিলের একটা আবিষ্কার আমাকে নতুন আলো দেখায়। পুনর্জন্ম! আমরা প্রত্যেকে ফের...'

'আমরা বিজ্ঞানের পূজারি দেবী,' জিরিয়েন হঠাৎ বাধা দিল তাঁর কথায়, 'মূর্খ মানুষের মতো জাদুতে বিশ্বাস করা আমাদের শোভা দেয় না।'

'হ্যাঁ জিরিয়েন। জাদু। তবে এর জাদুকর বিজ্ঞান নিজে। অর্ধ-আরাকিয়েনদের সৃষ্টির সময় আমরা প্রত্যেকে কিছু বাঁদরের শরীরে আমাদের জিন স্থাপন করেছিলাম। এদের উত্তরসূরিদের দেহে সেই জিনসমষ্টি নানা প্রজন্মে ঘুরেফিরে আসবেই। আর এইখানেই কালানিলের গবেষণা। তার গণনাপদ্ধতি, কোনো একটা বিশেষ জিনসমষ্টি ঠিক কতকাল পরে হুবহু ফিরে আসবে তার পূর্বাভাষ দেয়। পর্দার ওই ছবিটার দিকে দেখো। চিনতে পারো?'

'না দেবী। কোনো মানুষের ছবি?'

'ভুল জিরিয়েন। ঠিক কতকাল পরে হুবহু আমার জিনসংস্থান নিয়ে কেউ জন্মাবে মানুষের দুনিয়ায়, তার হিসেব সম্পূর্ণ করেছেন কালানিল। ওই যে তার সম্ভাব্য ছবি। আর তার জন্মের স্থানকালের হিসেব।'

'কিন্তু তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ...'

'প্রমাণ আমি নিজে,' দেবী মাথা নাড়লেন, 'ও আমার বহু হাজার বছর আগের কিশোরবেলার মুখের হুবহু প্রতিচ্ছবি জিরিয়েন। নিজের মুখটা আমি চিনি।'

পর্দায় ভেসে থাকা ছবিটা আর তার চারপাশে চলমান জটিল সংখ্যার সারির দিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল জিরিয়েন। তারপর বলল, 'কিন্তু তাতে লাভ কী হবে দেবী? আজ থেকে বাইশ শো বছর পরে... এ-সাম্রাজ্যের শেষ চিহ্নটুকুও তো তখন হারিয়ে যাবে!'

'দেবী।'

তাঁদের কথায় বাধা পড়ল হঠাৎ। ছাদের দরজা থেকে লাফিয়ে ভেতরে নেমে আসছিল একজন বৃদ্ধ যোদ্ধা।

'লিকন, আমি আদেশ দিয়েছিলাম আমাদের এখন কেউ বিরক্ত করবে না। তুমি দরজায় পাহারায় ছিলে। কেন তুমি...'

বৃদ্ধ সৈনিক মাথা নাড়লেন, 'উধীশের আক্রমণ। গুহামুখের পাহারাদাররা খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে ওদের সামনে। প্রধান সুড়ঙ্গে যুদ্ধ চলছে। আপনি...'

'কতজন বাকি আছ তোমরা?'

'সব মিলিয়ে ত্রিশজন দেবী। ওরা সংখ্যায় দুশো। এখনো পালাবার সময় আছে। আপনার আদেশ পেলে আমরা...'

'না লিকন,' দেবীর মানুষ মুখে যন্ত্রণাভরা একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। আস্তে আস্তে পাশে পড়ে থাকা দণ্ডটা হাতে তুলে নিলেন তিনি, 'আর পালানো নয়। এই শাসনদণ্ডে এখনো যেটুকু শক্তি বাকি আছে তার কামড় এবার ওরা টের পাবে। তবে তার আগে আমাকে দু'ঘণ্টা সময় দিতে পারবে তোমরা? কথা দিচ্ছি, তারপর ওই হানাদারদের সামনে আমি নিজে গিয়ে দাঁড়াব। আমি...'

'আদেশ পালিত হবে দেবী,' বলতে বলতেই হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল জিরিয়েনের মানুষ শরীর। তার চামড়ার আবরণ সরে গিয়ে বের হয়ে আসছিল শক্তিমান যোদ্ধার আটটা রোমশ পা।

'জিরিয়েন, না!' রেগে ওঠা প্রাণীটার মাথায় দুটো দুর্বল হাত বুলিয়ে দেবী শান্ত করছিলেন তাকে, 'ওদের পারদ মাখানো অস্ত্রের ঘা আরাকিয়েনের মৃত্যু ডেকে আনে। আজকের যুদ্ধে তুমি প্রাণ দিলে সব শেষ হয়ে যাবে যে!'

ততক্ষণে মানুষের চেহারা থেকে যোদ্ধা মাকড়সার রূপে নিজেকে ফের বদলে নিয়েছে লিকনও। সামনের দাঁড়াদুটি তুলে সামান্য একটু অভিবাদন জানাল সে। তারপর সুতোয় ভর করে বিদ্যুতের মতো ছিটকে গেল ছাদের দরজার খোলা মুখ দিয়ে।

একমুহূর্তের জন্য সেদিকে তাকিয়ে তীব্র অভিমানের ছাপ পড়ছিল জিরিয়েনের মুখে। দেবীর তা চোখ এড়িয়ে যায়নি। তার মাথায় হাত ছুঁইয়ে তিনি বললেন, 'আজকের যুদ্ধে ওরা সবাই প্রাণ দেবে। কিন্তু এ-যুদ্ধে শহীদ হওয়ার চাইতে অনেক কঠিন একটা দায়িত্ব তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে জিরিয়েন! এসো, এইখানে বোসো।'

কথা বলতে বলতেই স্ফটিকযন্ত্র থেকে বের হয়ে আসা ধাতব তারগুলোকে তিনি দ্রুতহাতে জুড়ে দিচ্ছিলেন জিরিয়েনের মাথার সঙ্গে...

'কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে।'

ক্রিস্টালের পর্দায় কথাগুলো ভেসে উঠেছে এবারে। জ্ঞানহীন জিরিয়েনের কপাল থেকে তারগুলো খুলে আনলেন দেবী। সঙ্গে সঙ্গেই, যেন দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে উঠে বসল জিরিয়েন। তার তরুণ চোখদুটোতে গভীর বদল এসেছে হঠাৎ।

দু'ঘণ্টা ধরে আরাকিয়েন সভ্যতার সম্পূর্ণ ইতিহাস, তার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমস্ত বিবরণকে তার মস্তিষ্কে সরিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়েছে গুহানগরীর প্রধান ক্রিস্টালগণক। সে-জ্ঞানের ভার মাথায় নিয়ে হঠাৎ যেন কোনো প্রাচীন, ধীমান সন্ন্যাসীতে বদলে গেছে এই আরাকিয়েন তরুণ।

'আমি দুঃখিত জিরিয়েন,' মৃদু মাথা নাড়লেন দেবী তার দিকে চেয়ে, 'এই যান্ত্রিক পদ্ধতিটা মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। কিন্তু এছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। প্রতিটি মুহূর্ত এখন মূল্যবান।'

মাথার ওপরে বহুদূরে চলতে থাকা অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ অনেক কাছে এগিয়ে এসেছে এখন। সেদিকে কান পেতে একবার শুনল জিরিয়েন। তারপর শান্ত গলায় বলল, 'আমার কর্তব্য কী হবে বলুন দেবী।'

'তোমার একমাত্র কর্তব্য হবে বেঁচে থাকা। সুদীর্ঘ জীবন অপেক্ষা করে আছে তোমার সামনে। অপেক্ষা করবে জিরিয়েন। তারপর একদিন নতুন করে আমার সৃষ্টি হলে তাকে খুঁজে বের করবার দায়িত্ব থাকবে তোমার ওপর।'

বলতে বলতে একটা গাঢ় লাল রঙের ক্রিস্টাল উঠে এসেছিল রানির হাতে। সেটা নবীন সন্ন্যাসীর দিকে বাড়িয়ে ধরে তিনি বললেন, 'এতে আমার স্মৃতি আর ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ সংগ্রহ আছে। একদিন নতুন শরীরে ফিরে আসব আমি। সেদিন এর সাহায্যে সেই শরীরে দেবী আরাকিয়েনের পুণর্জন্ম ঘটিও। তাকে ফিরিয়ে দিও এই সভ্যতার সমস্ত জ্ঞানবিজ্ঞানের উত্তরাধিকার। সেই দিনটার জন্য অপেক্ষায় থাকাই তোমার একমাত্র ব্রত হবে।'

মাথার ওপর বন্ধ দরজার গায়ে লাথির শব্দ উঠছিল। মড়মড় করে উঠছে গবেষণাগারের পুরনো দরজা। তার বাইরে হিংস্র পশুর মতো একদল অর্ধ-আরাকিয়েনের গর্জন শোনা যায়।

কয়েকমুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল জিরিয়েন। তারপর বলল, 'কিন্তু কেমন করে তাঁর সন্ধান পাব আমি?'

'পথ আছে জিরিয়েন। মানুষের ঘরে জন্ম নেওয়া আরাকিয়েনের দল সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এখন নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে। আমার ফেরবার সময় কাছে এলে তাদের তুমি আমার কথা জানিও। তারাই হাজারো চোখে নজর রাখবে আমার আবির্ভাবের সন্ধানে। তবে আর দেরি নয়। ওরা আসছে। তুমি...'

'কিন্তু ওদের সামনে আপনাকে একলা রেখে...'

ম্লান হাসলেন দেবী, 'আজ আমার মৃত্যুর দিন নয়। তবে, বেশি দেরি আর নেই সেদিনের। তুমি আর দেরি কোরো না।'

পাতালগুহার দেওয়ালে ততক্ষণে খুলে গেছে অন্য একটা সুড়ঙ্গের মুখ। সেদিকে তাকিয়ে একবার একটু ইতস্তত করল জিরিয়েন। তারপর রূপ বদলে নিয়ে জাল ছুঁড়ে ছিটকে গেল সেই নতুন সুড়ঙ্গের দিকে। গবেষণাগারের ছাদের দরজা ভেঙে পড়েছে ততক্ষণে। সেখান দিয়ে দড়ি বেয়ে ভেতরে নেমে আসছিল কালো পোশাক পরা একদল অর্ধ-আরাকিয়েন সন্ন্যাসী।

একনজর সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন দেবী আরাকিয়েন। তাঁর হাতে উঠে আসা দণ্ডের মাথায় তখন জেগে উঠছে তীব্র শক্তির ঝলক। আগুনরঙের একটা শক্তিবলয় গড়ে তুলেছে তা তাঁকে ঘিরে। পারদ মাখানো তিরগুলো নির্বিষভাবে ছিটকে যাচ্ছিল সেই শক্তিবলয়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে।

কিছুদূরে দাঁড়ানো উধীশের মুখটা ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গেছে। প্রাণপণে সে উত্তেজিত করে চলেছিল তার সৈন্যদলকে...

...আর তারপর, হঠাৎ সূর্যের ঔজ্জ্বল্য নিয়ে ঝলসে উঠল রানির দণ্ড। তার অবশিষ্ট শক্তির শেষ একটা ঝলক বাজের মতো ফেটে পড়ল গোটা গুহা জুড়ে।

ছিটকে যাওয়া অজ্ঞান শরীরগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি ধরে রেখে অতিকায় মাকড়সার চেহারায় নিজেকে বদলে নিচ্ছিলেন দেবী আরাকিয়েন। হাতে এখনো শক্তিদণ্ডটা ধরা আছে তাঁর। ওরা মরেনি। ততটা শক্তি আর বাকি ছিল না তাঁর দণ্ডে।

হাতের নির্জীব দণ্ডটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন রানি। হাজারো বছর ধরে এর শক্তি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতা দিয়েছে তাঁকে। সেই শক্তি চিরকাল পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করেছেন তিনি। অথচ আজ তার অন্তিম আঘাত হানতে হল নিজের সৃষ্টি মানুষের শরীরে। এ তিনি কখনো চাননি।

তবে সে-নিয়ে ভাববার সময় তখন নয়। কিছু পরে, চেতনা ফিরে এলে ফিরে যাবে উধীশের সৈন্যদল। তাঁর দণ্ডকে ভয় পেতে শিখেছে এরা আজ। অন্তত কিছুদিন তাঁর শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাবে না আর। কিন্তু একদিন না একদিন সে-ভয়কে জয় করবে ওরা। আবার ফিরে এরা আসবে তাঁর সন্ধানে। সেদিন একলা অসহায়ভাবে ওদের অস্ত্রের মুখে...

একরকম জোর করেই মন থেকে ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলে দিলেন রানি। যেতে হবে এখন। আস্তে আস্তে দেওয়াল বেয়ে উঠে ছাদের ভেঙে পড়া দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন তিনি। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মৃত আরাকিয়েন সেনাদের দেহগুলো সাবধানে এড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন কোন একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ ধরে।

'প্রভু উধীশ। ওইদিকে দেখুন।'

আস্তে আস্তে নড়ে উঠল শরীরটা। গোটা গহ্বর জুড়েই একে একে উঠে বসছে ঔধীশ সন্ন্যাসীসেনারা। তাদেরই একজন এসে বারবার ঝাঁকুনি দিচ্ছিল তাঁর কাঁধ ধরে।

তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন উধীশদেব। ঘরে আরাকিয়েনের কোনো চিহ্ন নেই। তখনও তাঁর চোখে ভাসছিল দেবীর দণ্ড থেকে উঠে আসা সেই আগুনের ছবি।

কিন্তু পরের মুহুর্তেই সেসব কথা মন থেকে মুছে গেল তাঁর। সৈনিকের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাঁর চোখ পড়েছে কিছুদূরে একটা মসৃণ স্ফটিকের দিকে। তার গায়ে একটা মুখের ছবি। এ কোন জাদু? আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ছবিটার গায়ে হাত ঠেকিয়েই ফের একবার কেঁপে উঠলেন তিনি। বজ্রাঘাতের মতো একটা যন্ত্রণাদায়ক কাঁপুনি তাঁর সারা গায়ে ছড়িয়ে দিয়েই নিভে গেল ছবিটা।

ওরা ফিরে গেছে এবারে। ফের মৃত্যুর নির্জনতা নেমে এসেছে গুহানগরীর বুকে। তখন, গবেষণাকক্ষের একপাশের একটা সুড়ঙ্গ বেয়ে ছায়ার মতো বের হয়ে এল একটা অতিকায় আটপেয়ে শরীর। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একটা পা সে বাড়িয়ে দিল দরজার পাশে পাথরের একটা খাঁজে। পাথরের গোপন ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বোতামের গায়ে তাঁর আঙুলের আদেশ জাগিয়ে তুলল অদৃশ্য কোন প্রহরীযন্ত্রকে। যেন জাদুমন্ত্রের মতোই পাহাড়ের শরীরে মিশে গেল গবেষণাগারের দরজা।

নির্জন, অন্ধকার গুহারাজ্যে প্রেতের মতো ঘুরে বেড়ান দেবী আরাকিয়েন। গুহানগরীর প্রতিটি প্রধান এলাকার দরজাগুলো একে একে মিলিয়ে যায় তাঁর আঙুলের নির্দেশে।

তারপর একদিন সে-কাজ শেষ হল তাঁর। এই দরজাদের খোলবার সংকেত তিনি গেঁথে দিয়েছেন শুধু একজনের মস্তিষ্কে। জিরিয়েন! হয়তো একদিন সে সফল হবে! সেদিন...

সুউচ্চ পইমার গিরিশিরা। পায়ের নীচে মেঘকুয়াশায় হারিয়ে গেছে চিরচেনা কুইনলিন। সে-পথ ধরে হেঁটে চলেন একলা এক সন্ন্যাসী। তাঁর শান্ত হাসিমুখ, গভীর জ্ঞান তাঁকে পাহাড়ি মানুষের কাছে দেবতার স্থান দিয়েছে। যে গ্রামে তিনি পা দেন তারা তাঁকে ধরে রাখতে চেয়েও পারে না। কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়েই ফের অজানার পথে হেঁটে যান সন্ন্যাসী। উঁচু থেকে আরও উঁচুতে বরফছাওয়া দুর্গম তুষারমরুর বুক চিরে তাঁর পথ চলা থামে না।

অবশেষে একদিন দিগন্তে দেখা দিল এক বরফঢাকা পাহাড়চূড়া। স্থানীয় মানুষরা সেই পাহাড়কে ঈশ্বর খাংতিসে নামে পুজো করে। তার পাদদেশে ছড়িয়ে আছে এক সুবিশাল সরোবর।

এই সরোবরের পাশে বেশ খানিকটা উঁচুতে দাঁড়ানো একটা গুহায় আস্তানা গাড়লেন সন্ন্যাসী। তবে সে ছিল কেবল তাঁর গ্রীষ্মকালের আশ্রয়। প্রতি বছর বর্ষার শেষ থেকে মানুষের দুনিয়ায় তাঁর পরিক্রমা চলে। শীতের শেষে, যখন পৃথিবী সবুজ হয়ে ওঠে ফের, তখন লম্বা পথ পেরিয়ে তাঁর গুহায় ফিরে আসেন তিনি।

কুইনলিনের নির্জন পাহাড়ে অন্তিম দ্বন্দ্বযুদ্ধে দেবী আরাকিয়েন আর উধীশদেবের মৃত্যু, ঔধীশ সম্প্রদায়ের ক্রমাগত শক্তিসঞ্চয়, মানুষের যুদ্ধ, শান্তি, প্রগতি সেই সবকিছুরই খবর পেয়েছেন তিনি সে-সব যাত্রায়। শীতের দীর্ঘ অবসরে সেই সব স্মৃতি তিনি ধরে রাখেন তাঁর গড়ে তোলা একটা নতুন ক্রিস্টালযন্ত্রের স্মৃতিতে। একদিন দেবী ফিরে এলে সেই সঞ্চিত জ্ঞান তাঁর কাজে লাগবে।

এমনি করেই কেটে চলে দশকের পর দশক, শতাব্দির পর শতাব্দি। তারপর একদিন, নির্দিষ্ট সময়টি আসবার কয়েক শতাব্দি আগে, তাঁর নির্জন গুহায় বসে সন্ন্যাসী হাতে তুলে নিলেন পালকের কলম। এবার আর যন্ত্রমস্তিষ্কে আরাকিয়েনের উন্নত ও জটিল ভাষায় লেখা নয়। ভুর্জপত্রের পাতায় মানুষের চেনা ভাষায় দ্রুত অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে চললেন তিনি। আরাকিয়েনের সুদীর্ঘ ইতিহাস প্রতিকী কাব্যের চেহারায় ধরা রইল তাঁর অমর সৃষ্টি, 'আমাসাদোমের পুঁথি' আর 'হিয়ালিকা সত্তসই' নামের দুটি পুঁথিতে।

ততদিনে মানুষ তাঁকে চিনেছে সাধক রাবটেন নামে। বিচিত্র এই সন্ন্যাসীর অলৌকিক শক্তির খবরও দূর-দূরান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্গম পথ পেরিয়ে তাঁর দরজায় আসা তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে বিচিত্র ধাঁধার ভাষায় কথা বলেন তিনি। কখনও বা মধুর সুরে পড়ে শোনান তাঁর হাতে ধরা পুঁথিদুটির থেকে।

এইভাবে একসময় মানুষের মুখে মুখে সেই দুই পুঁথি ছড়িয়ে গেল সারা দুনিয়ায়। নানা ভাষায় অনুদিত হয়ে পৌঁছে গেল অজস্র গ্রামশহরে।

সেইসব গ্রামশহরে, সাধারণের মধ্যে মিশে লুকিয়ে থাকা কিছু বিশেষ মানুষকে ভরসা দিয়েছিল আমাসাদোমের গাথা। জানিয়েছিল, তারা রাক্ষস নয়। তারা পৃথিবীর আদি অধীশ্বর। তারাই মানুষের সৃষ্টিকর্তা। হিয়ালিকা সত্তসইয়ের ধাঁধার অঙ্ক তাদের জানিয়েছিল দেবীর ফিরে আসবার সম্ভাব্য জায়গা আর সময়ের হিসেব। আশা জাগিয়েছিল। তৈরি হবার নির্দেশ পাঠিয়েছিল।

তবে, এর পাশাপাশি অন্য এক প্রাচীন সম্প্রদায়েরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সেই দুই পুঁথির গোপন সঙ্কেত...

খ্রিস্টাব্দ ২০০১

দক্ষিণ চিনের হাইনলিম শহর।

'সিমিয়ানা উধীশা' মন্দিরের গর্ভগৃহ

'আমাকে ডেকেছিলেন ঝাও?'

'হ্যাঁ অরিহন্ত। সময় হয়েছে।'

'আপনাকে আরো একবার ভেবে দেখতে বলব মহান ঝাও। দুটো তিব্বতী রূপকথার পুঁথির কথায় ভরসা করে...'

মৃদু হাসলেন গত তিন শতাব্দি ধরে ঔধীশ সম্প্রদায়ের প্রধান ঝাও ইয়াং, 'তুমি এ-যুগের তরুণ। অবিশ্বাস তোমার ধর্ম। কিন্তু আমি জানি, আমাসাদোমের গাথা মিথ্যে নয়। উধীশের আদি প্রস্তরলিপির অনেক তথ্যের সঙ্গে তার আশ্চর্য মিল আছে। রাক্ষসী আরাকিয়েনের এইবারে পুনর্জন্ম হয়েছে অরিহন্ত। এবং তা হয়েছে তোমার দেশে।'

'আদেশ করুন। আমি নিজে সেখানে ফিরে যাব। তারপর...'

'তুমি নয়। এ-কাজে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হবে। সঠিক কোথায় সে জন্মাবে সে-তথ্য হিয়ালিকা সত্তসইতে নেই। ভারতীয় ঔধীশ মঠের প্রধান শারণিককে খবর পাঠাও। আগামী এক দশকের মধ্যে সে-দেশের প্রতিটি আরাকিয়েনকে নিশ্চিহ্ন করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে সে।'

সেদিন সন্ধ্যায় চিনদেশ থেকে পূর্বভারতের এক গোপন মঠের উদ্দেশ্যে বেতারে ভেসে গিয়েছিল একটা সতর্কবার্তা। আর, তারপর শুরু হয়েছিল হাজারো বছরের প্রাচীন এক যুদ্ধের শেষ অধ্যায়...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%