দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

এই আমার পরিচয় জিমূতবাহন,' জানালার পাশ থেকে সরে যেতে যেতে সুদ্ধিরদেব মাথা নাড়লেন, 'তবে তখনও আমার জানা ছিল না, আসলে কে আমি। জানা ছিল না কোন ভয়ঙ্কর মৃত্যুদূতের দল অপেক্ষা করছে আমার বা আমার নির্দোষ মা-বাপের জন্য। এইবার, পরের জানালায় এই গ্রহের সভ্যতার ইতিহাসের সেই কলঙ্কদের পরিচয় জানতে হবে তোমাকে। জানবে তাদের সঙ্গে আমার নতুন জন্মে প্রথম মুখোমুখি হবার কথা। বাইরে তাকিয়ে দেখো...'
সন্ধে হয়ে এসেছে। নির্জন পাহাড়ের নীচে এসে থামা সৈন্যদের দল, হাঁ করে থাকা গুহাটার অন্ধকার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। রাজগুরু উধীশ তাদের অভয় দিয়েছেন। তবু, দেবী আরাকিয়েনের গুহা নিয়ে বহু শতাব্দির পুরনো গল্পগুলো এখনো তাদের বুকে কাঁপন ধরায়।
সঙ্গে আসা বন্ধ গাড়িটাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ঔধীশ সঙ্ঘের রক্ষীরা। কালো আলখাল্লায় ঢাকা সশস্ত্র এই মানুষগুলোকে রাজধানীতে দেখা যায় না বিশেষ। উধীশের নির্দেশে দেশজুড়ে তারা কিছু খুঁজে চলেছে গত কয়েকবছর ধরে। মাত্রই কয়েকদিন আগে তাদের একটা দল এই ঢাকা গাড়ি নিয়ে উধীশদেবের মন্দিরে ফিরে আসে। তারপরেই আরাকিয়েনের গুহায় এই অভিযানে নেমেছেন উধীশ।
গাড়িটার দরজা খুলে ফেলা হয়েছে এবারে। খানিকদূরে পাহারায় থাকা সেনাদল একটু অবাক হল। বন্দী সাধারণ চেহারার একজন লামা। নীচে নেমে দাঁড়িয়ে একবার হাতপায়ে বাঁধা শেকলগুলোকে নাড়িয়ে দেখলেন তিনি। তারপর হঠাৎই হিংস্র একটা শব্দ করে উঠে টান দিলেন শেকলে। দু-পাশ থেকে শেকল ধরে দাঁড়ানো ছ'জন ঔধীশ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সেই টানে। ছেঁড়া আলখাল্লার ফাঁক দিয়ে দৃঢ়বদ্ধ পেশিগুলো ফুলে ফুলে উঠছিল লামার। মটমট শব্দ উঠছিল শক্তিশালী লোহার শেকলে।
হঠাৎ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন উধীশ। সামনে নামিয়ে রাখা পিপেটা থেকে ছোট্ট হাতায় করে কিছু একটা তুলে ছিটিয়ে দিলেন লামার গায়ে। তামাক আর রসুনের তীব্র গন্ধে ভরে উঠল বাতাস।
থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মাটির ওপর বসে পড়লেন লামা। তীব্র যন্ত্রণায় মুখ বেঁকে যাচ্ছে তাঁর। মুখ থেকে গড়িয়ে আসা লালা সরু সরু শক্ত সুতোর মতন ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশে।
'ঔদ্ধত্য দেখালে শাস্তি পাবে আরাকিয়েনের উপাসক শয়তান,' কথাগুলো বলে উধীশ মুখ ফিরিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তাঁর পেছন পেছন শেকলবাঁধা বন্দীকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছিল উধীশের রক্ষিবাহিনী।
বহুকাল পরে ফের একবার মানুষের সাড়া জেগেছে তাঁর গুহার সামনে। অতিকষ্টে চোখ খুললেন তিনি। অন্ধকার এই গুহার স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে বহু শতাব্দির স্মৃতিচিহ্ন মাখা আছে। তাঁর প্রায় অন্ধ চারজোড়া চোখ সেইদিকে তাকিয়ে দেখে। পাহাড়ের গভীর অবধি ছড়িয়ে থাকা এককালের আরাকিয়েন রাজধানী শহর আজ নির্জন। কেউ বেঁচে নেই। এই গ্রহ এখন তার নতুন প্রভুর হুকুমে চলে। সময় বড় নিষ্ঠুর। তাঁরই সৃষ্টি ওই প্রাণীরা, নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দেওয়া অর্ধ-আরাকিয়েনের দল, একদিন যারা তাঁর কৃপার কণামাত্র পেলে ধন্য হতো, আজ তারা তাঁকে ঘৃণা করে। কিন্তু আজ ফের কী চাইতে এসেছে এরা?
'দেবী আরাকিয়েন।'
বাইরে থেকে গম্ভীর গলার ডাকটা গুহার দেওয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছিল। আট পায়ে ভর দিয়ে টলতে টলতে কোনোমতে গুহার মুখে এসে দাঁড়ালেন দেবী। রোমশ শরীরটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে মানুষের চেহারায়। বলিরেখায় ছাওয়া মুখে এককালের স্বর্গীয় রূপের চিহ্নমাত্র নেই।
সামনের মানুষটা নতজানু হবার বদলে সটান দাঁড়িয়ে আছে। তাকে ঘিরে কালো পোশাক পরা একদল রক্ষী। তাদের চোখে মৃত্যুর ছায়া নাচছিল।
'কী চাও? আমার শক্তি আর...'
'কী চাই? চাই তোমার নতুন করে শুরু হওয়া শয়তানি চক্রান্তের অবসান।'
'আ...আমি...চক্রান্ত?'
'হ্যাঁ। এককালে পৃথিবীর শাসক ছিলে তুমি। মানুষ তোমার দাস ছিল। প্রাচীন পুঁথিতে তার কথা লেখা আছে। নিজের হারানো রাজত্বকে ফের নতুন করে গড়তে চাও তুমি, তাই না?'
থরথর করে কেঁপে উঠলেন বৃদ্ধা। হাতে ধরা দণ্ডটার দিকে একবার ফিরে দেখলেন। একদিন এই যন্ত্রের অসীম ক্ষমতা প্রকৃতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করত। ওর শক্তিকোষ বহুকাল হল ফুরিয়েছে। অক্ষম চেষ্টায় তবুও তা একবার উদ্ধত মানুষটার দিকে উঁচিয়ে ধরেছিলেন তিনি। কোনো লাভ হল না। দুজন মানুষ, হাতে ধরা দুর্গন্ধ তরল ভরা বিরাট পাত্রটা মাটিতে নামিয়ে রেখে দণ্ডটা কেড়ে নিল তাঁর হাত থেকে। তারপর ছেঁড়া পোশাক পরা একটা মানুষকে ধাক্কা দিয়ে তাঁর সামনে এনে ফেলে দিল।
'একে দেখো দেবী আরাকিয়েন। দ্বি-রূপধারী এই আরাকিয়েনদের ফের জন্ম দিয়ে তাদের মানুষের সমাজে...'
উদ্ধত লোকটার কথা আর তাঁর কানে যাচ্ছিল না। মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটার পুঁতির মতো জ্বলজ্বলে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল দেবীর। নীচু হয়ে তাঁর কর্কশ হাতের তালুদুটোয় একবার হাত বুলিয়ে দেখলেন তিনি। অবিশ্বাস্য!
হঠাৎ পড়ে থাকা মানুষটাকে ছেড়ে দিয়ে সটান উঠে দাঁড়ালেন দেবী আরাকিয়েন। মুখে মৃদু হাসি খেলে যাচ্ছিল তাঁর। আর ভয় নেই।
'আমি এর সৃষ্টি করিনি মূর্খ অর্ধ-আরাকিয়েন। এই গ্রহের দোপেয়ে বাঁদরদের জিনে আরাকিয়েন জিন প্রতিস্থাপন করে তোমাদের সৃষ্টি করেছিলাম আমরা। কিন্তু আমাদের মতো দুই রূপ তোমরা ধরতে শেখনি তখন। তোমাদের কোষে ঘুমন্ত সেই সুপ্ত জিন ফের জেগে উঠছে! এই তার প্রমাণ। সুদিন আসছে! জেনে রাখো, একদিন আমিও ফিরে আসব আবার। সেই দিনটার অপেক্ষায় আমার প্রহরীর হাতে নিরাপদে থাকবে আরাকিয়েনের অন্তহীন জ্ঞানভাণ্ডার...'
অদ্ভুত, অবোধ্য কথাগুলোর কোনো অর্থ বুঝতে পারছিলেন না উধীশ। তাঁকে ঘিরে থাকা সৈন্যদলও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল এই আশ্চর্য জীবটার দিকে। পুঁথির পাতা থেকে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক প্রাচীন প্রবাদ!
পায়ের কাছ থেকে একটা মৃদু ক্র-র-র শব্দ শুনে চমক ভাঙল তাদের। মাটিতে বসে থাকা লামার শরীরটা বেঁকেচুরে উঠছে হঠাৎ। তাঁর ছেঁড়া পোশাকের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে আসছে আটটা রোমশ পা। ছিঁড়ে ফেলছে শেকলের শক্ত বাঁধন। তার পাশে দাঁড়ানো দেবীর চেহারাও তখন ঝড়ের গতিতে বদলে যাচ্ছে...
সৈন্যরা ভয় পেয়েছে। তাদের সামনে মানুষের রূপ ছেড়ে উঠে আসা অতিকায় মাকড়সাদুটোর দাঁড়ায় তীব্র বিষের ফোঁটা টলমল করছিল।
হঠাৎ একটা বিরাট লাফে ছিটকে গিয়ে পায়ের ধাক্কায় মেঝের ওপর রাখা পিপেটা জীবদুটোর দিকে ছুঁড়ে দিলেন উধীশ। তামাক আর রসুনের তীব্র গন্ধ ছেয়ে গেল গোটা গুহামুখটা জুড়ে। ছটফট করে উঠেছে প্রাণীদুটো। এ তরল তাদের কাছে বিষ।
'পালাও। দাঁড়িয়ে থেকো না কেউ।' বলতে বলতেই ঊর্ধ্বশ্বাসে গুহার বাইরের দিকে ছুটলেন উধীশ। ছুটতে ছুটতেই তাঁর মুখে উঠে এসেছে ছোট্টো শিঙাটি। তার তীব্র শব্দ, জীবদুটোর দাঁড়ায় ধরা পড়া দুই হতভাগ্য সৈনিকের মরণ চিৎকারকে ঢেকে দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল বাইরে। অগ্নিসংযোগের সংকেত।
দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে গুহার মুখে। সেদিকে তাকিয়ে নীরবে অপেক্ষা করছিলেন উধীশ। পাশে রাখা একটা পাত্রের রুপোলি রঙের ধাতব তরলে ডুবিয়ে রেখেছেন দুই হাতে ধরা তলোয়ারদুটোকে।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না তাঁকে। হঠাৎ আগুনের দেওয়াল টপকে বাইরে লাফিয়ে এল অতিকায় মাকড়সাদুটোর জ্বলন্ত শরীর। সেনারা ভয় পেয়ে ছিটকে গেছে দূরে। উধীশ একা নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নিজের জায়গায়। টলতে টলতে জীবদুটো তাঁর কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে এবারে। শেষ মরণকামড় দেবার জন্য দু'জোড়া দাঁড়া বাড়িয়ে ধরেছে তাঁর দিকে।
উধীশের হাতে ততক্ষণে উঠে এসেছে ঘন পারদের আস্তরণমাখা দুটো তলোয়ার। অবিচল পায়ে জীবদুটোর দিকে এগিয়ে গিয়ে একে একে তাদের বুকে তিনি বিঁধিয়ে দিলেন তলোয়ারদুটো। তীক্ষ্ন আর্তনাদে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সন্ধ্যার আকাশ।
হঠাৎ তার সঙ্গে মিশে গেল একটা গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠের মরণ চিৎকার। মরতে মরতেও দেবী আরাকিয়েনের একটা বিষমাখানো দাঁড়া উধীশের পায়ে বিঁধে গেছে একেবারে শেষমুহূর্তে।
গুহামুখের লেলিহান আগুনের মধ্যে মৃত প্রাণীদুটোকে ছুঁড়ে ফেলছিল সেনারা। সেইদিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই মাটিতে শুয়ে থাকা উধীশ নীচু গলায় ডাকলেন, 'সম্ভর।'
কালো পোশাক পরা একজন সেনা নিঃশব্দে এগিয়ে এসে অভিবাদন জানাল।
'রাক্ষসী আরাকিয়েন শেষ হয়েছে। আমারও ব্রত উদযাপিত হল অবশেষে। কিন্তু তোমার কাজ এখনো শেষ হয়নি।'
মিলিয়ে আসতে থাকা ক্ষীণ গলাটা ভালো করে বোঝা যায় না। চোখে জল নিয়ে সম্ভর জবাব দিল, 'আদেশ প্রভু।'
'রাক্ষসীর শেষ কথাগুলোর কোনো অর্থ বুঝেছ কি?'
'না প্রভু। কোনো জাদুক্রিয়ার কথা...'
'হয়তো তাই। আমি জানি না। তবে এর প্রলাপ থেকে এটুকু বোঝা গেছে যে মানুষের মধ্যে এর আরও সন্তান লুকিয়ে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। আমার আয়ু শেষ। কিন্তু, তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিতে হবে তোমাদের। বংশানুক্রমে ঔধীশদের গোপন সঙ্ঘ যেন তাদের...'
আস্তে আস্তে মিলিয়ে এল উধীশের কন্ঠস্বর। পাহাড়ে তখন গভীর অন্ধকার নেমে এসেছে।
'এসো সুধীর। ভালো আছ?'
সামনে এসে দাঁড়ানো ছেলেটা নীচু হয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিল। মাঝেমাঝেই এমনই পুরনো ছাত্রদের কেউ না কেউ এসে দেখা করে যায় এখনো। বড় ভালো লাগে কৃষ্ণবাবুর। সেই কবে অনাথ শিশুদের আশ্রয় দেবার ব্রত নিয়ে আশ্রম খুলেছিলেন এই পাহাড়ি শহরে এসে। এদের দেখলে মনে হয় সে ব্রত সার্থক হয়েছে তাঁর।
'আছ কোথায়? কী করছ এখন?'
'শিলিগুড়িতে সেটল করেছি। হাকিমপাড়া। একটু অন্যরকম পেশায় গেছি স্যার। ম্যাজিক দেখাই আমি। আপনি স্পাইডার সুধীরের শো-এর কথা শুনেছেন বোধ হয়।'
'কাগজে দেখি বটে মাঝেমাঝে। ''স্টেজে জীবন্ত মাকড়সা মানবের কীর্তি'! তবে আমার ওসব ম্যাজিক-ট্যাজিক...' বলতে বলতেই থেমে গিয়ে তার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন কৃষ্ণবাবু, 'আরে, ওটা যে তুমিই সেটা তো আমার নাম শুনেই বোঝা উচিত ছিল হে। সুধীর প্লাস স্পাইডার! কী জ্বালানোই জ্বালিয়েছ গোটা স্কুল লাইফটা ওই মাকড়শা পোষার নেশা নিয়ে! নেশাটা এখনো যায়নি তোমার?'
লাজুক হাসল ছেলেটা, 'না স্যার। বরং বেড়েছে। অ্যারাকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছি বেশ কিছু। একটা ছোট লাইভ কালেকশানও আছে। এখন তো ওই নিয়েই আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটাও বেঁধেছি।'
'দেখো বাবা, সঙ্গে করে দু'একটা...
'আরে না না স্যার। আপনার সামনে মাকড়সা নিয়ে ফের? এখনো পিঠের ব্যথাগুলো মনে আছে তো!'
'ভালো ভালো। তা এতদিন পরে হঠাৎ নিজের আশ্রমকে স্মরণ করলে যে? এদিকে কোনো শো হচ্ছে নাকি?'
'না স্যার,' সুধীর একটু নড়েচড়ে বসল, 'আপনার কাছেই এসেছি।'
'আমার কাছে? কী ব্যাপার?'
'একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছিলাম স্যার।'
'হুম। ইমপর্ট্যান্ট কিছু মনে হচ্ছে! নইলে কাজকম্ম ফেলে অ্যাদ্দুর আসতে না। বলো।'
'আমার মা-বাবার সন্ধান করছিলাম স্যার। আপনি যদি কিছু...'
কৃষ্ণবাবু গম্ভীর হলেন, 'আশ্রমের রেজিস্টারে সেরকম কোনো তথ্য যে নেই তা তো আমি তোমায় আগেও বলেছি সুধীর।'
'জানি স্যার। কিন্তু খাতায় না থাকলেও আপনি যদি কোনোকিছু খবর, মানে আপনার হাতেই তো আমায় তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন ওঁরা!'
কৃষ্ণবাবুর চোখে বেশ কিছুকাল আগের সেই রাতটার ছবি ভাসছিল। ওর বাপ-মায়ের অদ্ভুত ঝিলমিলে চোখগুলো এখনো তিনি চোখ বুঁজলে দেখতে পান। মাঝরাতে তাঁর দরজায় এসে কড়া নেড়েছিলেন। কোলে পুঁটুলিতে জড়ানো ছোট্ট ছেলেটা। রেজিস্টারের পাতায় তার বিষয়ে কোনো তথ্য লেখা থাক তা তাঁরা চাননি।
অনাথ আশ্রমের সাহায্য নিতে আসা মানুষজনের কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই এমন অনুরোধে কৃষ্ণবাবু অভ্যস্ত। বলেছিলেন, 'আমি রাজি। কিন্তু এ যে আপনাদের সন্তান তারও একটা প্রমাণ দরকার। বার্থ সার্টিফিকেট বা অন্য কিছু একটা...'
কথাটা শুনে বাচ্চাটার গালে টোকা দিয়ে তাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন ভদ্রমহিলা। তারপর তার মুখটাকে মাঝখানে রেখে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই তীক্ষ্ন দৃষ্টি ফেলেছিলেন কৃষ্ণবাবুর দিকে।
ছেলেটার মুখে বাপ-মায়ের মুখের স্পষ্ট আদল ছিল। কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্য মিলটা ছিল তিনজনের চোখে। অদ্ভুত নীলচে, ঝিলমিলে তিনজোড়া চোখ। হিংস্র কোনো পতঙ্গের মতো দৃষ্টি তাতে। বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠেছিল কৃষ্ণবাবুর। আর কোনো তর্ক করেননি তিনি তাদের সঙ্গে।
নিজেদের পরিচয়পত্র বলতে একটা ব্যাঙ্কের জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের পাশবইয়ের ফোটোকপি দেখানো হয় তাঁকে। সেখানে ছেলেটার মা-বাপের ছবি ছিল। ডঃ বিজয় গুপ্ত আর তাঁর স্ত্রী সেমন্তী। ঠিকানাটা দেখে একটু অবাক হয়েছিলেন তিনি। দেংচেন নামে তিব্বত সীমান্তের একটা পাহাড়ি গ্রাম। অথচ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টটা কলকাতার।
যাবার আগে বারংবার একটাই অনুরোধ করে গিয়েছিলেন তাঁরা, 'আমাদের জীবন বিপন্ন কৃষ্ণবাবু। পালিয়ে বেড়াচ্ছি আমরা। ওকে আপনার আশ্রয়ে রেখে গেলাম। ওর পরিচয় জানাজানি হলে আমাদের দুর্ভাগ্য ওকেও ছেড়ে দেবে না। আমাদের যা হয় হোক, কিন্তু ছেলেটা যেন একজন স্বাভাবিক মানুষ হয়ে বাঁচে সে দায়িত্ব আপনার। ও নিজেও যেন কখনো...'
কর্তব্যে অবহেলা করেননি কৃষ্ণবাবু। কাউকে জানাননি কিছু। তবে তাই বলে আজ নিজের ছাত্রকে মিথ্যে বলতে পারবেন না তিনি। খানিক চুপ করে থেকে বললেন, 'হ্যাঁ সুধীর, আমি জানি। কিন্তু সে-কথা তোমাকে জানাবার উপায় নেই আমার।'
'কিন্তু স্যার...'
'সুধীর!'
মৃদু ধমকটায় পুরনোকালের সেই আশ্রম-সুপারের ব্যক্তিত্বের ছাপ ছিল। এ-গলার সামনে প্রতিবাদ করবার শক্তি সুধীরের ছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে নীচু হয়ে তাঁর পায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সে, 'আমি আসি স্যার।'
'এসো। অতীতকে খুঁড়ে বের না করে বর্তমানকে নিয়ে বাঁচো সুধীর। তাতে তোমারই মঙ্গল।' বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়ে তার পিঠে হাত রাখলেন কৃষ্ণবাবু।
'কিন্তু কেন অমূল্যবাবু?'
আজ দীপাবলি। পাঁচিলঘেরা বাড়িটার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে দূরে তিনিঝোরার আকাশ থেকে বাজির রোশনাই জ্বলে উঠছে মাঝেমাঝেই। অন্ধকার বাগানটাকে ম্লান আলোয় মুড়ে দিয়েই ফের মিলিয়ে যাচ্ছে তা। সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে ঝুলে রইল জীবটা। তারপর নিঃশব্দে, দাঁড়ার দ্রুত নাড়াচাড়ায় উত্তর দিল, 'উত্তরটা আমি জানি। ঔধীশ সম্প্রদায়ের নাম শুনেছ?'
'না।'
''আমাসাদোম'', বা মাকড়সাজননী নামে একটা তিব্বতি পুঁথিতে আমি এদের সন্ধান পাই। খৃষ্টের জন্মের দেড়শো বছর আগে এই সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা করেন দেবী আরাকিয়েনের হত্যাকারী উধীশ। তারপর থেকে এই গোপন সম্প্রদায়ের বংশানুক্রমে একটাই ব্রত...'
'ইতিহাস পরে হবে। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। কৃষ্ণবাবু কেন আমার পরিচয় এভাবে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন?' জালের ঘনতর অংশ থেকে বিরাট আকারের উলফ স্পাইডারটা এগিয়ে এল প্রথমজনের কাছে।
'সেই উত্তর দেবারই চেষ্টা করছি সুধীর। ঔধীশদের নিয়ে দীর্ঘকাল অনুসন্ধান করে চলেছি আমি। আমাসাদোমের পুঁথিটা দেখা দরকার তোমার। ঘরে এসো।'
জাল ছেড়ে নেমে আসতে আসতেই দ্রুত বদলে যাচ্ছিল জীবদুটোর শরীর। কয়েকমিনিটের মধ্যেই বয়স্ক মানুষটি আর তাঁর তরুণ সঙ্গী এগিয়ে গেলেন দোতলার কোণের আলো জ্বলা ঘরটার দিকে।
'এবারে ম্যাপটা দেখো সুধীর,' আমাসাদোমের পুঁথির শেষ পাতাটা বন্ধ করে অমূল্যবাবু টেবিলে ছড়ানো ম্যাপটার দিকে দেখালেন। তাতে নেপাল থেকে চীন অবধি এলাকা জুড়ে কতগুলো নীল ফুটকি আঁকা। 'এই মুহূর্তে এই জায়গাগুলোতে ঔধীশদের দলের হাজিরার খবর আমার কাছে রয়েছে সুধীর। এবারে এটা দেখো।'
লাল বিন্দুর ঘন ঝাঁক আঁকা দ্বিতীয় একটা ম্যাপ টেবিলের ওপর মেলে ধরেছেন অমূল্যবাবু, 'গত পঞ্চাশ বছরে এই জায়গাগুলোতে ঔধীশ লামাদের অবস্থানের খবর জোগাড় করতে পেরেছি আমি। আর, প্রত্যেকটা জায়গায় সেই হাজিরার কাছাকাছি সময়ে কিছু রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।'
'ইন্টারেস্টিং। কিন্তু তাতে—'
'এর অধিকাংশ জায়গায় আমি গিয়েছি সুধীর। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে পারদ ভরা বুলেটের ঘায়ে। আর, যে-ক'টা ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের হদিশ মিলেছে তাতে প্রতিটা ক্ষেত্রেই মৃতের শরীরে তামাক আর রসুনের গন্ধ ছিল। আমাসাদোমের পুঁথিতে যে মাকড়সাজননীর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ পড়লে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি দেবী আরাকিয়েন ছাড়া আর কেউ নন। সময় বদলেছে। পারদমাখা তলোয়ারের জায়গা নিয়েছে পারদের বুলেট। কিন্তু তবু, তাঁর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই মৃত্যুগুলোর মিল ঔধীশ কাল্টের উপস্থিতির অভ্রান্ত প্রমাণ। চোখের সামনে সব প্রমাণই ছিল সুধীর, কিন্তু হাজার খুঁজেও দ্বিতীয় কোনো আরাকিয়েনের দেখা না পেয়ে ভেবেছিলাম কুসংস্কারাচ্ছন্ন কোনো মানুষের দল একটা পুরোনো কাল্টকে অনুসরণ করে কিছু নিরীহ মানুষের প্রাণ নিচ্ছে। ভেবেছিলাম আমি একাই বুঝি পৃথিবীর এই অঞ্চলের শেষ দ্বিরূপধারী আরাকিয়েন হয়ে বেঁচে আছি। তারপর মালবাজারের সেই ম্যাজিক শোয়ে তোমার মাকড়সার খেলা দেখে বুঝতে পারলাম...'
সুধীরের চোখের কোণে চিকচিক করছিল দুফোঁটা জল, 'আমার বাবা-মা জানতেন। তাই তাঁরা আমাকে এভাবে লুকিয়ে রেখে নিজেরা...'
বলতে বলতেই হঠাৎ চোখদুটো ঝলসে উঠল তার, 'ওঁদের খবর আমার চাই। দরকারে কৃষ্ণবাবুকে আমাদের দ্বিতীয় রূপটা দেখিয়ে...'
'নিজের উপস্থিতির খবরটা ঔধীশদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে, তাই তো?' অমূল্যবাবুর খড়খড়ে হাতটা দ্রুত বদলে যেতে থাকা সুধীরের শরীরে ছুঁয়ে যাচ্ছিল, 'শান্ত হও। মানুষের চেহারায় ফিরে এসো। কাজটা কঠিন নয়। একটা ভুয়ো কার্ড ছাপতে হবে শুধু।'
সারগ্রং, মানে নতুন শহর। চুম্বি উপত্যকার এই ছোট ব্যাবসাকেন্দ্রটার বুক চিরে তিব্বতের দিকে উঠে গেছে প্রাচীন বাণিজ্যসড়ক।
শেষ হেমন্তের কনকনে এক ভোরে সারগ্রং-এর নির্জন হাট কুয়াশা মুড়ি দিয়ে পড়েছিল। তবে, তার সরাইগুলোতে সাতসকালেই আঁচ পড়ে গেছে। আজ হাটবার। পাহাড় উজিয়ে দূর-দূরান্তের অসংখ্য গ্রামের মানুষজন জড়ো হবে খানিক বাদে। দশটা বাজতে না বাজতে খাবারের জন্য হাঁকডাক শুরু করে দেবে সব।
বাইরে রোদ উঠছে। মোমোর ময়দা ঠুসতে ঠুসতে বুড়ি জেটসুন তাই দেখছিল এমন সময় জানালা দিয়ে অ্যামি'জ নুডলশপ-এর কালসাং উঁকি মারল এসে, 'নাগপো গ্রাপা-রা আসছে জেটসুন।'
চমকে মুখ তুলে জেটসুন বলল, 'কোথায়?'
'জানালা দিয়ে দেখে নাও। আমি চলি। উনোন ধরাতে দেরি হয়ে গেল আজ।' বলতে বলতে কালসাঙের মুণ্ডুটা অদৃশ্য হল।
ঘাড় উঁচিয়ে জানালা দিয়ে একঝলক দেখে নিল বুড়ি। কালো কালো ফোঁটার একটা সার নেমে আসছে পুবের পাহাড় বেয়ে। ওইদিকেই দূরে কোথাও ওদের মঠ। সারা বছর ধরেই নানান হাটে ঘুরে বেড়ান ওই নাগপো গ্রাপার, মানে কালোপোশাকি সাধুদের দল। তামাক আর রসুনের গন্ধ মেশা একটা করে গুলি সরাইগুলোর খাবারে মিশিয়ে দেন। সে নাকি মঠের প্রসাদ। খেলে লোকের মঙ্গল হয়। যাবার সময় গ্রাপা-রা সরাইওলাদের হাতে ওমনি একটা-দুটো সোনার টাকাও গুঁজে দিয়ে যান। শর্ত একটাই। প্রসাদের কথা কাউকে বলা চলবে না।
খানিক বাদে, উনুনের আগুনটা খুঁচিয়ে তুলছে জেটসুন, তখন দরজায় একটা ছায়া পড়ল এসে। মানুষটা লম্বা। কালো জোব্বায় আপাদমস্তক ঢাকা। জোড়হাত করে উঠে দাঁড়ানো জেটসুনের দিকে ফিরেও দেখল না সে। বড়বড় পায়ে তার ময়দার পাত্রের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতে ধরা প্রসাদি একটা গুলি তাতে ফেলে দিল। তারপর, জোব্বা থেকে একটা সোনার চাকতি বের করে বুড়ির হাতে দিয়ে বাইরে গিয়ে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে পড়ল। আজ সারাটা দিন প্রত্যেকটা সরাইতে ওইভাবে থানা দিয়ে থাকবে ওদের একেকজন। তারপর হাট ভাঙলে ফের দল বেঁধে চলে যাবে পাহাড় উজিয়ে তাদের মঠের দিকে।
বেলা বেড়েছে। জেটসুনের দোকানে এখন বেজায় ভিড়। তার মোমোর খ্যাতি আছে এলাকায়।
'কই জেটসুন, দেরি হবে নাকি?'
বাজারের থলে হাতে টেবিলে এসে বসা প্রৌঢ় দম্পতিটির গলায় অধৈর্যের ছোঁয়া ছিল। জোব্বাঢাকা সন্ন্যাসী অলসচোখে তাদের দিকে দেখলেন একবার। এরা স্থানীয় মানুষ নয়।
'এই যে ডাক্তারসাহেব, এসে গেল,' হাসিমাখা মুখে তাঁদের সামনে ধোঁয়া ওঠা মোমোর বাটি নামিয়ে রাখছে জেটসুন। বোঝা যাচ্ছিল সে তাঁদের চেনে।
বাটি থেকে একটা মোমো তুলে মুখে দিলেন মহিলাটি। আর তারপরেই মুখ থেকে খাবারটা ফেলে দিয়ে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
'কী হল তোমার সেমন্তী?' বলতে বলতে তাঁর স্বামী বাটিটা তুলে একবার শুঁকে দেখেই ঠক করে নামিয়ে রাখলেন সেটাকে।
জেটসুন ভয় পেয়ে গেছে। তীক্ষ্ন গলায় হাঁক পাড়ছে, 'কী হল ডাক্তারসাহেব?'
প্রৌঢ় মানুষটা বিব্রতমুখে হাসলেন একটু, 'ভয়ের কিছু নয় জেটসুন। প্রেশারটা একটু বেড়েছে বোধ হয়। আমরা বরং চলি।'
'আপনি নিজে খেলেন না?' হঠাৎ নীচু গম্ভীর গলায় একটা প্রশ্ন ভেসে এল তাঁদের দিকে। কালো জোব্বা পরা সন্ন্যাসীটি কখন যেন উঠে এসে দাঁড়িয়েছেন তাদের কাছে।
ভদ্রলোক একটু অপ্রস্তুত মুখে বিড়বিড় করে কিছু বললেন, তারপর স্ত্রীকে নিয়ে পাশে দাঁড়ানো গাড়িটায় উঠে পড়লেন।
ধোঁয়া ছড়িয়ে চলে যাওয়া গাড়িটা পাকদণ্ডীতে গিয়ে উঠেছে। সেদিকেই তাকিয়েছিল জেটসুন তখন হঠাৎ সাঁড়াশির মতো শক্ত একটা হাত তার কাঁধটা চেপে ধরল এসে। মুখ ঘুরিয়েই ভয়ে পাথর হয়ে গেল জেটসুন। কালো আলখাল্লার ভেতরে তীক্ষ্ন চোখদুটো ধকধক করে জ্বলছিল যেন।
'ওদের চেনো?'
তার তীব্র দৃষ্টির থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জেটসুন বিড়বিড় করে বলল, 'পঁচিশ বছর ধরে দেখছি। এখানকার বিশ-তিরিশটা গ্রামের মানুষের অসুখে-বিসুখে ওই বিজয় ডাক্তারই ভরসা।'
'হুঁ। থাকে কোথায়?'
'দেংচেন।'
'বলুন আপনার জন্য কী করতে পারি ডঃ?'
উল্টোদিকে বসা বিরাট চেহারার মানুষটা কৃষ্ণবাবুর দিকে একটা কার্ড বাড়িয়ে ধরলেন, 'অমূল্য সেন। প্র্যাকটিশিং সাইকিয়াট্রিস্ট। আমার এক পেশেন্টের বিষয়ে আপনার সাহায্য চাইতে এসেছিলাম কৃষ্ণবাবু।'
'আপনার পেশেন্টের বিষয়ে আমি...'
'পেশেন্ট আপনার চেনা। সুধীর এখানকারই ছাত্র ছিল।'
'সুধীর? অসুস্থ? কিন্তু সে তো এক সপ্তাহ আগে...'
'আপনার কাছে এসেছিল। জানি। আমাকে সে বলেছে।'
'কিন্তু তাকে দেখে তো...'
চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে একটু হাসলেন মানুষটা, 'রেয়ার রোগ মশাই। শাস্ত্রে এর নাম অ্যারাকানথ্রপি। নিজেকে মাকড়সার বংশধর ভাবা। বাড়িতে হাজারো জাতের মাকড়সা জমিয়েছে। তাদের সঙ্গেই ওঠাবসা। চিকিৎসায় সামান্য উপকার হচ্ছিল, কিন্তু গত সপ্তাহে এখান থেকে ঘুরে গিয়ে ইস্তক পুরোদমে রিল্যাপ্স করেছে। আচ্ছা, ছোটবেলাতেও কী ওর মধ্যে এমন কোনো পাগলামো ছিল?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ ছিল। তবে সেটা যে একটা কঠিন অসুখ তা বুঝিনি।'
'না বোঝবারই কথা স্যার,' অমূল্য সেন হাসলেন একটু, 'এবারে যখন এল, তখন ঠিক কী কথা হয়েছিল ওর সঙ্গে সেটা বলা যাবে কি? যদি রিল্যাপ্স করবার বিষয়ে কোনো ক্লু মেলে।'
খানিকক্ষণ চুপ করে একটু ভাবলেন কৃষ্ণবাবু। তারপর বললেন, 'নিজের বাবা-মায়ের খোঁজ করছিল।'
'বলেছেন?'
'না। একটু সমস্যা আছে।'
একটু চুপ করে রইলেন অমূল্যবাবু। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, 'বলে দিলে ভালোই করতেন। হয়তো মানুষ বাপ-মার সঙ্গে দেখা হলে সুফল হতো। সেইটেকে মিসট্রি দিয়ে মুড়ে দেওয়াটাই বোধ হয় রোগটাকে ফিরিয়ে আনছে।'
'আপনি বলছেন নিজের বাবা-মায়ের খোঁজ পেলে...'
'বলছি না। অনুমান করছি। মনের রোগ মশাই। নিখুঁতভাবে কিছুই বলা যায় না। তবে হ্যাঁ, ওতে বাতিকটা কমবার সম্ভাবনা যথেষ্টই আছে।'
'কিন্তু-জিনিসটা গোপনীয়। আমি ওর বাবা-মাকে কথা দিয়েছিলাম।'
হঠাৎ মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে বসলেন মানুষটা, 'ছেলেটা উন্মাদ হতে বসেছে কৃষ্ণবাবু। একটা চেষ্টা করতে দিন আমায় প্লিজ। আমি ডাক্তার। গোপনীয়তা রক্ষা করা আমার পেশার অঙ্গ।'
তাঁর মুখের দিকে একটুক্ষণ চেয়ে রইলেন কৃষ্ণবাবু। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টেবিলের ড্রয়ারে চাবি ঘুরিয়ে একটা ছেঁড়াখোঁড়া ডায়েরি বের করে আনলেন।
দেংচেন গ্রামের একটেরেতে কাঠের তৈরি বাড়িটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। মেঘলা আকাশে চাঁদ নেই আজ। সেই অন্ধকারের আড়াল নিয়ে সেদিকে নঃশব্দে এগিয়ে আসছিল কয়েকটা কালো ছায়া।
বাড়ির বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে একটা ইশারা করলেন তাদের দলপতি। সঙ্গে সঙ্গে গোটা দলটা বাড়ির দেওয়াল বেয়ে উঠে তার ছাদের স্লেটের কয়েকটা টালি সরিয়ে হিলহিল করে ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে। কোনো শব্দ হল না।
কয়েকমুহূর্ত বাদে ঘরের দরজায় টোকা দিলেন দলপতি। নিঃশব্দে খুলে গেল দরজা।
'শুনছ? দরজায় শব্দ করছে কেউ। কে এল আবার এত রাতে?' বলতে বলতে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলেন সেমন্তী। কাচের জানালার বাইরে অন্ধকার। মেঘ জমেছে আকাশে।
'ডাক্তারের বাড়ি মাঝরাতে কে আসে তা অ্যাদ্দিনেও বুঝলে না?' উঠে বসে ড্রেসিং গাউনটা গায়ে জড়াতে জড়াতেই মৃদু হাসলেন ডঃ গুপ্ত।
'সে বুঝেছি। কিন্তু আউটডোর কল হলে তুমি এখন যাবে না। বরফ পড়ার সময় হয়ে গেছে। যা মেঘ করেছে তাতে আজ রাতেই না শুরু হয়ে যায়!'
'দেখছি দাঁড়াও। আলোটা জ্বালি,' বলতে বলতে মেঝেতে পা দিতে গিয়েই হঠাৎ থমকে গেলেন তিনি। বেডরুমের দরজার কাছে কার্পেটের ওপর কারো পায়ের শব্দ উঠছে। আর ঠিক তখনই দপ করে ঘরের আলোটা জ্বলে উঠল।
চৌকিটার সামনে কালো পোশাক পরা মানুষগুলো সার বেঁধে পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে। তাদের দুজনের হাতে ধরা অটোমেটিক পিস্তলের নল বিজয় আর সেমন্তীর দিকে উঁচানো।
তুলোর দলার মতো বরফের ঝাঁক ভেসে ভেসে নেমে আসছিল প্রাচীন পাইনের বনে। বড় বড় লাফে গাছ থেকে গাছে ছুটে যেতে যেতেই সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল তারা দুজন। দূরে পাহাড়ের মাথায় একলা বাড়িটা নিঃঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে। পাইনের বন শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। আর দেরি নেই। একটা অদ্ভুত উত্তেজনা তিরতিরে কাঁপুনি জাগাচ্ছিল সুধীরের বুকে। অমূল্য নীচে নেমে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছেন। লম্বা একটা আঠালো সুতোয় ভর করে শেষ গাছটা থেকে তাঁর কাছে নেমে আসতেই একটা সাবধানী পা তার গায়ে এসে ঠেকল, 'বাড়িতে কেউ ঢুকছে। দেখো!'
তাদের তীক্ষ্ন নিশাচর দৃষ্টিতে বাড়িটার স্লেটের ছাদের গর্তগুলো ধরা পড়ছিল। সেখান দিয়ে কয়েকটা কালো ছায়া ঢুকে যাচ্ছে তার ভেতরে।
থরথর করে কেঁপে উঠল একবার অন্য জীবটা। তারপর তার সঙ্গীর মতো সেও মাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দু'পায়ে ভর করে।
'ঔধীশদের হানা?' বলতে বলতেই দ্রুত মানুষের চেহারায় ফিরে যাচ্ছিল সুধীর।
'হ্যাঁ। সশস্ত্র শিকারীদল। দেরি হয়ে গেল।'
সেদিকে একটুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে রইল সুধীর। একদল হিংস্র শিকারীর সামনে দুজন মুখহীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ছবিই শুধু বারবার ভেসে উঠছিল তার মনে। বাবা-মায়ের মুখ কেমন সে জানে না।
'না। এত সহজে হাল ছেড়ে দেব না অমূল্যবাবু। উধীশের যুগ থেকেই দল বেঁধে একলা আরাকিয়েনের শিকার করেছে এরা। কিন্তু এবার ওদের শিকার একলা নয়। বলতে বলতেই ঝড়ের বেগে ফের বদলে যাচ্ছিল তার রূপ। দ্বিপদ রূপ ছেড়ে ফের একবার স্বরূপে ফিরে যাচ্ছে প্রাচীন আরাকিয়েনের শক্তিমান উত্তরসূরি।
সামনে দাঁড়ানো ঔধীশ দলপতির হাতে রাখা কালো রঙের বড়িটার থেকে তামাক আর রসুনের মিশ্রিত দুর্গন্ধ উঠে আসছিল। তাঁর পাশে দাঁড়ানো গোটা দলটারই চোখ এখন তাঁদের দুজনের দিকে আটকানো।
'আমরা কোনো নির্দোষ মানুষের হত্যা করি না। আপনাদেরও একটা সুযোগ দিতে চাই। এটা মুখে দিন আপনি। আপনার প্রতিক্রিয়া আমাদের নিশ্চিত প্রমাণ দেবে।'
একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়েছিলেন ডক্টর বিজয় গুপ্ত। লোকগুলোর পেছনে, ঘরের দরজায় চারজোড়া চোখে ঘেরা একটা মাথা একঝলকের জন্য দেখা দিয়েছে। কে ও? দাঁড়ার সাংকেতিক ভাষায় নিঃশব্দে কিছু কথা বলে গেল। সামান্য সময়ের জন্য এদের অন্যমনস্ক করে রাখবার অনুরোধ।
'বড়িটা মুখে দিন ডক্টর।'
কঠোর হয়ে উঠেছে সামনে দাঁড়ানো দলপতির মুখটা। আস্তে আস্তে হাতের বড়িটা মুখে ফেললেন বিজয় গুপ্ত। সারা শরীর বেয়ে আগুনের মতো তীব্র একটা জ্বালা ছড়িয়ে যাচ্ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল তাঁর। না। সহ্য করতে হবে। যতক্ষণ পারা যায়, ওদের অন্যমনস্ক করে...
প্রাণপণে দাঁত কামড়ে নিজেকে সংযত রাখছিলেন ডক্টর গুপ্ত। শক্ত করে টিপে থাকা ঠোঁটের পেছন থেকে ঘন লালার স্রোত বের হয়ে আসতে চাইছে। তাঁর আসল পরিচয়ের অব্যর্থ প্রমাণ ওই মাকড়সার রস।
দুটো বিচিত্র চেহারার পিস্তল তাঁদের দিকে তাক করে আছে। তিনি জানেন ওর মধ্যে থাকা পারদ মাখানো দুটো গুলি, প্রমাণ পাবার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসবে তাঁদের মাথা লক্ষ্য করে।
কিন্তু, বেশিক্ষণ যুঝতে পারলেন না মানুষটা। সারা শরীর কাঁপিয়ে উঠে আসা বমির তীব্র ধাক্কায় হঠাৎ তাঁর মুখ থেকে গলগল করে বের হয়ে এল আঠালো রসের একটা ধারা। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই নিখুঁত লক্ষ্যে দুটো আঠালো সুতো ওপর থেকে ছিটকে এসে অস্ত্রদুটোকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল মানুষদু'জনের হাত থেকে। ছাদের ফুটো দিয়ে মাকড়সার সুতোয় ভর করে নেমে আসছিল দুজন মানুষ। তাদের হাতের মুঠোয় সদ্য ছিনিয়ে নেওয়া অস্ত্রগুলো ঔধীশ হত্যাকারীদের দিকে ধরা।
ডক্টর গুপ্তর অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের একজন বলল, 'আমি সুধীর। সময় নেই বাবা। এদের বাঁধবার ব্যবস্থা করো। আমরা কভার করছি তোমাদের।'
নিরস্ত্র ঔধীশ হত্যাকারীদের চোখের সামনে তখন সেই নিরীহদর্শন দুই প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া বদলে যাচ্ছিলেন দুটি অতিকায় উলফ স্পাইডারে। তাঁদের শরীর থেকে ছিটকে আসা স্টিলের সুতোর চেয়েও শক্ত জাল বজ্রবাঁধনে জড়িয়ে ধরছিল তাদের।
সেদিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে অমূল্য বিড়বিড় করছিলেন, 'হত্যার দিন শেষ অর্ধ-আরাকিয়েনের দল। এইবার যুদ্ধ।'
'এবার কোনদিকে সুধীর?'
ঘন তুষারপাতকে উপেক্ষা করে ক্রমশই আরো উচ্চতায় উঠে যাচ্ছিল চারটে অতিকায় জীব। পায়ের অনেক নীচে পরিত্যক্ত বাড়িটা ছোট হয়ে আসছে।
'এদিককার পাহাড়ে অমূল্যবাবুর গোপন আস্তানা আছে একটা। উপস্থিত সেখানে ক'টা দিন চুপচাপ থাকা যাক।'
'তারপর?'
'ঔধীশদের প্রধান ঘাঁটিটা খুঁজে বের করব প্রথমে বাবা। তারপর...'
চারটে অতিকায় মাকড়সা গতি বাড়িয়ে তিরবেগে ধেয়ে গেল সামনের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন